Wednesday, November 6, 2013

নির্বাচন- সেই সত্য যা রচিবে তুমি by আলী ইমাম মজুমদার

পাঠক বুঝতে পারছেন শিরোনামটি মৌলিক নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘ভাষা ও ছন্দ’ কবিতা থেকে চয়ন করা। তবে অনেক প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে আমাদের সমকালীন রাজনীতির প্রেক্ষাপটে।

গণতন্ত্র- রাজনৈতিক গোষ্ঠীতন্ত্র ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ by রেহমান সোবহান

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এ রকম জাতীয় সংসদ নির্বাচন খুব কমই হয়েছে, যার প্রক্রিয়া বা ফলাফলের বৈধতা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়নি।

আদালতের প্রতি আবেদন- হরতালের নৃশংসতা থেকে রক্ষা করুন by মাহ্ফুজ আনাম

মঙ্গলবার দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রথম পাতায় প্রকাশিত ১৪ বছরের কিশোর মনিরের ছবির প্রতি আমরা যথাযথ শ্রদ্ধা এবং বিনয়ের সঙ্গে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বিচারকদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। অনুগ্রহ করে মনিরের ও আট বছরের শিশু সুমির কাহিনি পড়ুন।

সপ্তাহের হালচাল- আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য by আব্দুল কাইয়ুম

নির্বাচন-বিবাদ চিরতরে শেষ করার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেশের জন্য এটা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এবার কারিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হৃতিক

করণ জোহরের ‘শুদ্ধি’ ছবিতে জুটি বেঁধেছেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় দুই তারকা হৃতিক রোশন ও কারিনা কাপুর খান।

মিসরে মুরসির বিচার মুলতবি

মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসির বিচারের স্থান পরিবর্তন করার পর তার বিচারও স্থগিত করেছে দেশটির সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার। সহিংসতা ও রক্তপাতের আশংকায় আগামী ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এ বিচার স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে মিসরের আপিল আদালতের বিচারপতি মেধাত ইদ্রিস কায়রোয় এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, সোমবার কায়রোর একটি পুলিশ একাডেমির ভেতর মুরসির মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে যে আদালতে মুরসিকে হাজির করার কথা ছিল তার সামনে মুরসি সমর্থকদের বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দেয়ার পর শেষ মুহূর্তে ভেন্যু পরিবর্তন করা হল। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুরসির দফতরের বাইরে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের দায়ে তার বিচার করবে সেনা সমর্থিত সরকার। এর আগে মুরসির ছেলে ওসামা মুরসি বলেছেন, বর্তমান সরকারের আদালতকে তারা বৈধ মনে করেন না বলে তারা এ শুনানিতে অংশ নেবেন না।
তিনি বলেন, তার পিতাকে অপহরণ করে পণবন্দি করে রেখেছে সেনাবাহিনী। অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসি নিজেও তার বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করে বলেছেন, আÍপক্ষ সমর্থনের জন্য তিনি কোনো আইনজীবী রাখবেন না। নিজের পক্ষে নিজেই বক্তব্য রাখবেন তিনি। তবে অবৈধ আদালত কী প্রক্রিয়ায় তার বিচার করে তা শুধু পর্যবেক্ষণ করার জন্য ব্রাদারহুডের পক্ষ থেকে আইনজীবীদের একটি প্যানেল আদালতে উপস্থিত থাকবেন। মুরসির বিচার নিয়ে আজও সংঘর্ষ হয়েছে। বিচারবিরোধী বিক্ষোভ হতে ৫ জনকে আটক করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। সম্ভবত এ কারণেই মুরসির বিচার স্থগিত করা হল। আলজাজিরা। উল্লেখ্য, গত ৩ জুলাই সামরিক অভ্যুত্থানে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে তাকে অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে ফেলেন সেনাপ্রধান জেনারেল সিসি। তারপর থেকে মুরসিকে আর জনসম্মুখে দেখা যায়নি বা তার সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের দেখা করতে দেয়া হয়নি। ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসি নিজেও তার বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করে বলেছেন, আÍপক্ষ সমর্থনের জন্য তিনি কোনো আইনজীবী রাখবেন না। নিজের পক্ষে নিজেই বক্তব্য রাখবেন তিনি। তবে অবৈধ আদালত কী প্রক্রিয়ায় তার বিচার করে তা শুধু পর্যবেক্ষণ করার জন্য মুসলিম ব্রাদারহুডের পক্ষ থেকে আইনজীবীদের একটি প্যানেল আদালতে উপস্থিত থাকবেন। মুরসি এখনও নিজেকে মিসরের বৈধ প্রেসিডেন্ট মনে করেন বলে সম্প্রতি আল-ওয়াতান পত্রিকা জানিয়েছে। মিসরের ইতিহাসে মুরসি ছিলেন প্রথম জনগণের সরাসরি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।

স্নোডেনকে ছাড় নয় : যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) পলাতক সাবেক গোয়েন্দা বিশ্লেষক এডওয়ার্ড স্নোডেনের প্রতি সদয় মনোভাব দেখানোর সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতারা। স্নোডেন তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাগিরির অভিযোগ প্রত্যাহারে আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য আবেদন জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন আইনপ্রণেতারা এই মনোভাব দেখিয়েছেন বলে সোমবার জানিয়েছে বিবিসি অনলাইন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ড্যান ফেইফার রোববার বলেছেন, ‘øোডেন যুক্তরাষ্ট্রের আইন ভেঙেছেন। তার উচিত যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে বিচারের মুখোমুখি হওয়া।’ স্নোডেনের আবেদনের বিষয়ে হোয়াইট হাউসে কোনো আলোচনা হয়নি বলেও জানিয়েছেন তিনি। রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্স ও ডেমক্রেটিক সিনেটর ডিয়ানি ফিয়েনস্টাইনও একই মনোভাব ব্যক্ত করেন।
ডিয়ানি বলেন, প্রকৃত হুইসেলব্লোয়ার হলে স্নোডেন তার (ডিয়ানির) কমিটির কাছে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবেদন দাখিল করতে পারতেন, কিন্তু তিনি (স্নোডেন) তা করেননি। ‘আমরা তাকে দেখে রাখতাম এবং তার দেয়া তথ্যগুলো খতিয়ে দেখতাম। তা হয়নি, আর এখন আমাদের দেশের অনেক ক্ষতি করে ফেলেছেন তিনি। তাই আমার মতে তার আবেদনের উত্তর হওয়া উচিত, কোনো ছাড় নয়,’ বলেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার জার্মান এক রাজনীতিবিদের মাধ্যমে পাঠানো এক চিঠিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ওই আবেদন জানান স্নোডেন। টেলিফোন ও ইন্টারনেটে আড়িপাতার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের গোপন গোয়েন্দা নজরদারির বিস্তারিত ফাঁস করে দিয়েছেন স্নোডেন। এ কাজ করে পালিয়ে প্রথমে তিনি হংকং ও পরে রাশিয়ায় যান। রাশিয়া ২০১৪ সাল পর্যন্ত শর্তাধীন রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে তাকে। গত সপ্তাহে জার্মানির গ্রিন পার্টির এমপি হ্যান্স খ্রিশ্চিয়ান স্ট্রেবেলি মস্কোতে স্নোডেনের সঙ্গে দেখা করেন। সেখান থেকে বার্লিন ফিরে স্ট্রেবেলি জানান, এনএসএ’র চালানো গোয়েন্দাগিরির বিষয়ে জার্মান সরকারকে অবহিত করতে প্রস্তুত আছেন স্নোডেন।

মেহসুদের বিলাসবহুল খামারবাড়ি!

মার্বেল বসানো মেঝে, সবুজ ঘাসের সমারোহে লন কিংবা উঁচু গম্বুজবিশিষ্ট খামারবাড়িতেই বছরখানেক কাটিয়েছেন পাকিস্তান তালেবানের সাবেক প্রধান হাকিমুল্লাহ মেহসুদ। আট রুমবিশিষ্ট একতলা এ বাড়ির চারপাশে আপেল, আঙুর বেদানাগাছের উপস্থিতি খামারবাড়িটির জৌলুস বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। মিরানশাহর ৫ মাইল উত্তরে খামারবাড়িটির চারপাশে বর্গাকার চারটি গম্বুজ নিঃসন্দেহে স্থাপত্য নান্দনিকতার অপরূপ প্রকাশ ঘটিয়েছে। আর্থিক দরদামেও কিন্তু কম নয়।
হাকিমুল্লাহ মেহসুদকে এর মূল্য বাবদ ১ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার দিয়ে কিনতে হয়েছিল। এএফপি’র এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদক কয়েকবার এ খামারবাড়িটি পরিদর্শন করেছেন। তার মতে, এ বাড়িটির মালিক ছিল ধনী জোতদার। উত্তর ওয়াজিরস্তানের পাকিস্তান সেনা সদর দফতর থেকে ১ কিলোমিটার দূরের এ বাড়িটিই মেহসুদের জন্য একবছর ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহৃত। নিরাপদ এ আশ্রয়ে ফেরার পথে বাড়িটির গেটে গাড়ি আসতেই শুক্রবার ড্রোন হামলায় মেহসুদের মৃত্যু ঘটে। এএফপি।

সৌজন্যবোধ ও বাঙালির কথাবার্তার কথা

বনে-জঙ্গলে বাস করলে আলাদা কথা, কিন্তু সংসারে বাস করলে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করতেই হয়, এমনকি কখনো শত্রুর সঙ্গেও। সমঝোতা হোক বা না হোক, শত্রুর সঙ্গেও সৌজন্যমূলক আচরণ মনুষ্যত্বের পরিচয়। শত্রুকে ছলে-বলে-কৌশলে পরাজিত করা এক কথা, আর তাকে অপমান করা আরেক কথা। শত্রুকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান করার মধ্যে বাহাদুরি তো নেই-ই, নিজের নিচুতারই প্রকাশ ঘটে। পুরো পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই বাসের মধ্যে লেখা দেখেছি ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’, যদিও বাংলাদেশেই বাসের মধ্যে যাত্রীদের সঙ্গে বাস কন্ডাক্টরের বচসা শুধু নয়, মারামারি পর্যন্ত হয়। ভাড়া নিয়ে মারামারি হওয়া খুব স্বাভাবিক। পা মাড়ানো নিয়ে তর্ক করতে করতেও হাত চলে। কার আগে কে বসবে, তা নিয়ে ধস্তাধস্তি ও ঘুষাঘুষি। ঘুমের আবেশে পাশের যাত্রীর ঘাড়ের ওপর ঢলে পড়া নিয়ে ধাক্কাধাক্কি ও অশ্লীল বাক্যবিনিময়। যেখানে দশজন বঙ্গসন্তান আছে, সেখানে কথাবার্তা হবে না, তা ভাবাই যায় না। এবং বাংলা ভাষাভাষী কথা বলতে গেলে শরীরের নিচের অংশের যেসব অঙ্গ গোপনীয়, যেসব প্রত্যঙ্গের উল্লেখ খুবই লজ্জার, সেগুলোর নাম না নিলে তার শান্তি নেই।
তা ছাড়া বাঙালি কথায় কথায় অবাঞ্ছিত কেশ (উর্দু ও হিন্দিতে চুলকে যা বলা হয়) চাঁছতে বা ছিঁড়তে চায়। স্ল্যাং—পশ্চিমের, বিশেষ করে আমেরিকার মানুষও খুবই ব্যবহার করে। তবে তারা বাঙালিকে হারাতে পারেনি। মানুষ নানাভাবে মনের ভাব প্রকাশ করে। মুখে সামনাসামনি সংলাপে, লিখে চিঠিপত্রে, টেলিফোনে এবং বর্তমানে স্কাইপে-আইফোনে। দশ হাজার বছর বাঙালি মুখে কথা বলে বিপত্তি ঘটিয়েছে। তিন-চার শ বছর যাবৎ চিঠি লেখালেখি করছে। প্রথম লিখেছে সংস্কৃত ও ফারসিতে। ওই দুই বনেদি ভাষায় অশ্লীলতা নেই বললেই চলে। আঠারো শতক থেকে মাতৃভাষা বাংলায় চিঠি লেখা শুরু করে। বাঙালির চিঠির ভাষাও যে কত জঘন্য ও বিপজ্জনক হতে পারে, তা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানে। চিঠির কারণে কত সংসার ভেঙেছে, কতজন খুন হয়েছে, কত রকম বিপত্তি ঘটেছে, তার হিসাব নেই। উগ্র রাজনৈতিক চিঠি চালাচালির কারণে ভারতবর্ষের মতো একটি প্রকাণ্ড জিনিস ভেঙে তিন টুকরা হয়। তবে সেকালের মানুষের ভাষা যদি কঠোরও হয়ে থাকে, অশ্রাব্য ও অভব্য ছিল না। সেকালের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে বিবাদ—তা ব্যক্তিগত কারণেই হোক বা নীতিগত কারণেই হোক, কিছুমাত্র কম ছিল না। গান্ধীজির সঙ্গে সুভাষ বসুর ব্যক্তিগত ও নীতিগত দূরত্ব ছিল। তা খুব খারাপ পর্যায়ে যায়। এমন সময় গান্ধীজি বাংলায় সফরে আসেন।
নেতাজিপন্থীরা তাঁকে অসম্মান করতে চান। নেতাজি তাঁদের প্রতিহত করেন এবং কাগজে বিবৃতি দিয়ে বলেন, গান্ধীজিকে যেন কোনো রকম অমর্যাদা করা না হয়। ব্যক্তিগত সৌজন্যের বহু দৃষ্টান্ত উপমহাদেশের রাজনীতিকদের জীবনে পাওয়া যাবে। আইয়ুব খান ছিলেন একনায়ক। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করেছি। তিনি পাঞ্জাবি ছিলেন না, জাতিতে ছিলেন পাঠান। উচ্চশিক্ষা খুব বেশি ছিল, তা বলা যাবে না। আলীগড়ে পড়াশোনা করেছেন। বিলেতেও শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সুশিক্ষা পেয়েছেন। পাকিস্তান যদি প্রতিষ্ঠিত না হতো এবং ব্রিটিশ সরকার যদি আরও দশ বছর থাকত, তা হলেও তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিনিয়র জেনারেল হয়ে অবসর নিতেন। ভারতের সঙ্গে দুটি যুদ্ধে তিনি পাকিস্তানের নেতৃত্ব দেন: একটিতে সেনাবাহিনীপ্রধান হিসেবে, অন্যটিতে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রথম সেনাপ্রধান জেনারেল কারিয়াপ্পা একসময় ছিলেন আইয়ুবের বস। পাক-ভারত যুদ্ধে জেনারেল কারিয়াপ্পার ছেলে পাকিস্তানি সৈনিকদের হাতে বন্দী হন। পাকিস্তানি সেনারা খুব খুশি। কিন্তু কথাটি আইয়ুবের কানে যাওয়া মাত্র তিনি নির্দেশ দেন, কারিয়াপ্পার ছেলের যেন কোনো অমর্যাদা না হয় এবং অতিসত্বর তাঁকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হোক। আইয়ুব উপলব্ধি করে থাকবেন, যুদ্ধ হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে, ব্যক্তির মধ্যে নয়।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝোলাতে চেয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থানে মুজিব মুক্তি পান। তারপর আইয়ুবের আমন্ত্রণেই বঙ্গবন্ধু ইসলামাবাদ যান। শুধু গোলটেবিল বৈঠকে যাওয়া নয়; এক সন্ধ্যায় তাঁরা রাতের খাবার একত্রে খান। প্রেসিডেন্ট হাউসের বারান্দার এক কোণে তাঁরা বসে একান্তে কথা বলেন। রাজনীতির চেয়ে ব্যক্তিগত কথাই বেশি। তথ্যসচিব আলতাফ গওহর কথাবার্তার সময় আশপাশে থাকতে চেয়েছিলেন। আইয়ুব তাঁকে বলেন, তোমার থাকার দরকার নেই। বাড়িতে চলে যাও। প্রবল রক্তস্রোতের ওপর দিয়ে ভারতবর্ষ ভাগ হয়। কংগ্রেস ও লীগে মারামারি। হিন্দু-মুসলমান-শিখে হানাহানি। পাঞ্জাবে যে রক্তবন্যা বয়ে যায়, মানবজাতির ইতিহাসে তার তুলনা বিরল। আজন্ম শত্রুতা নিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে ভারত ও পাকিস্তান। মধ্যপ্রদেশের মানুষ লিয়াকত আলী খান, উত্তর প্রদেশের জওহরলাল নেহরু। নেহরুর অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থমন্ত্রী থাকার সময় তাঁদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে নানা বিষয়ে। খুবই তিক্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে অর্থ বরাদ্দ প্রভৃতি নিয়ে। মুসলমান হওয়ার কারণে লিয়াকত আলীর ভাগ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের পদটি জোটে। তিনি সেই পদে যোগ দিতে করাচি যাবেন চিরকালের জন্য তাঁর জন্মভূমিকে ফেলে। যাওয়ার আগের দিন ঘটা করে নয়, লোক দেখিয়ে নয়, সাংবাদিকদের জানান দিয়ে নয়—একান্তে তাঁরা একসঙ্গে খান। সম্ভবত সেদিন কোনো রাজনৈতিক কথাবার্তা নয়, ব্যক্তিগত কথাবার্তাই হয়ে থাকবে। নতুন দুই স্বাধীন দেশের সরকারপ্রধানদের সেই খাওয়াদাওয়ার খবর সাংবাদিকেরা জানতেই পারেননি।
পরদিন কোনো কোনো দৈনিকে একটি বাক্যে খবরটি বেরিয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দুই দেশের দেনা-পাওনা প্রভৃতি নিয়ে বিতর্ক ছিলই, তার মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে হয়ে যায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। কিন্তু তার পরেও নেহরু-লিয়াকত শুধু নন, ভারত ও পাকিস্তানের নেতাদের মধ্যে যে পত্র বিনিময় হয়েছে বহু তিক্ত বিষয়ে, তাতে দুই পক্ষই অসামান্য সৌজন্য দেখিয়েছে। সেই অপ্রকাশিত চিঠিপত্র কিছু পড়ার সুযোগ আমার হয়েছে। অতীতকালের অনেক নেতার কথাই এখন উপকথার মতো মনে হয়। এমনকি মাত্র ৪০ বছর আগে নিজের চোখে যা দেখেছি, নিজের কানে যা শুনেছি, তা আমার কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। আজ হিংসায় জাতি এতটা উন্মত্ত যে, আমার কথা অন্যের বিশ্বাস করা তো দূরের কথা, আমার নিজেরই বিশ্বাস হয় না। মনে হয়, মিথ্যা কথা বলছি। মুসলিম লীগের নেতা আবদুস সবুর খান একাত্তরে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সহযোগী ছিলেন। সাতচল্লিশের পর থেকে ছিলেন শেখ মুজিবের রাজনীতির একেবারে বিপরীত মেরুর। বাহাত্তরে দালাল আইনে জেলে যান। ’৭৩-এ বঙ্গবন্ধু সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে মুক্তি পান। ’৭৪-এর প্রথম দিকে তিনি সম্ভবত চিকিৎসার জন্য লন্ডন যেতে চেয়েছিলেন। সে জন্য পাসপোর্ট করা প্রয়োজন। তাঁর কোনো এক লোক সেই তদবিরে খুলনা থেকে বেইলি রোডে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে যাচ্ছিলেন।
সিঁড়ির কাছে লোকটি সালাম জানিয়ে কথা বলেন। তাঁর কথা শুনে বঙ্গবন্ধু একজন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিলেন, ‘সবুর ভাই পাঠিয়েছেন, হোমে (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) বলে দাও।’ ঘটনাটি অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু আমার কানে বাজল ‘সবুর ভাই’ সম্বোধনটি। দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে সবুর খান যখন বিরোধী দলের নেতা, তিনি শেখ মুজিব সম্পর্কে সৌজন্যের সঙ্গে কথা বলেছেন। আর একটি ঘটনা, এখন যাঁদের বয়স ৬০-এর নিচে, তাঁদের মাথায় বাড়ি মারলেও বিশ্বাস করবেন না। ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা ডাক্তার আবদুল মোত্তালেব মালিককে মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করে। ডা. মালিককে যাঁরা জানতেন, তাঁরা জানেন ওই পদে তিনি গিয়েছিলেন সম্পূর্ণ তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে। জান্তা চেয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনকে একটি বেসামরিক রূপ দিতে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যে অতি অল্পসংখ্যক মুসলমান পরিবারে রবীন্দ্রসংগীত নিষ্ঠার সঙ্গে চর্চা হতো, মালিক পরিবার তার একটি। তাঁর নিজের মেয়ে এবং ভাতিজি ফরিদা মালিক রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন, ডা. মালিক ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর প্রীতিভাজন এবং গান্ধী-অনুরাগী। যা হোক, পাকিস্তান সরকারের সহযোগী হিসেবে স্বাধীনতার পরে বিশেষ আদালতে তাঁর বিচার হয় এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। পরে বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমায় ’৭৪-এ মুক্তি পান। ওই বছরই চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন যান।
তাঁকে পাসপোর্ট করে দেওয়া এবং লন্ডনে যাওয়ার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু নিজে কীভাবে সাহায্য করেছিলেন, তার আমি একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। সে কাহিনি লিখলে লেখা অনেক বড় হবে। সৌজন্য প্রকাশের আরেকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। রেসকোর্সের মাঠে জেনারেল অরোরা এবং জেনারেল নিয়াজি যখন চুক্তি স্বাক্ষর করেন, তখন ডা. মালিক ছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (রূপসী বাংলা)। পরে তাঁকে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় ভারতীয় সেনাবাহিনী। অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের (তাঁর জার্মান পত্নী ও মেয়ে) গাড়ি থেকে নামানো হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল বা ব্রিগেডিয়ার সালাম জানিয়ে এগিয়ে আসেন। বাগান থেকে ছেঁড়া একটি বড় লাল গোলাপ ছিল তাঁর হাতে। সেটি ডা. মালিকের হাতে দেন। ভারতীয় সেনা কর্মকর্তার ওই সৌজন্যে বিস্মিত হন ডা. মালিক। দশ-বারো দিন পরে আমি ব্রিগেডিয়ার পান্ডে এবং কর্নেল ব্রার-এর সঙ্গে ক্যান্টনমেন্টে যাই। ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ আমার পরবর্তী কোনো লেখায় থাকবে। ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের একটি কাহিনি। দিগ্বিজয়ী গ্রিক বীর আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। পশ্চিম ভারতের পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন পুরু। ঝিলন নদীর তীরে যুদ্ধে পুরু পরাজিত হয়ে বন্দী হন। পুরুকে যখন আলেকজান্ডারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, আলেকজান্ডার জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি আমার কাছে কেমন আচরণ আশা করেন?’
পুরু বলেন, একজন রাজা আর একজন রাজার থেকে যেমন ব্যবহার পেয়ে থাকেন, তেমনটিই। আলেকজান্ডার তাঁর সৎ সাহসে মুগ্ধ হয়ে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে মুক্তি দেন। শুধু মুক্তিই নয়, ইতিহাসে পড়েছি, তাঁর রাজ্যও তাঁকে ফিরিয়ে দেন। অত কাল আগের কাহিনির সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সাধ্য নেই। কিন্তু আমাদের স্বল্পকাল জীবনেও কম দেখলাম না সৌজন্য প্রকাশের ঘটনা। অদূরদর্শী আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল এমন এক যন্ত্র চালু করে দিয়ে গেছেন যে তা ডেড থাকলেই ভালো, ভালো থাকলেই বিপত্তি। বহু সংসার ভেঙেছে। এখন তাঁর ওই যন্ত্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী তোলপাড় চলছে। লাখ লাখ টেলিফোনে আড়ি পাতা হচ্ছে। শক্তিশালী দেশগুলোর শাসকদের ফোন পর্যন্ত রেকর্ড হচ্ছে। তা করছে তাদেরই বড় বন্ধু দেশটি, শত্রুরা কেউ নয়। তবে কখনো কখনো একটি ফোনকলের জন্যও দেশবাসী উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করে। কোনো কোনো প্রত্যাশিত ফোনকলের বক্তব্যে মানুষের অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার জো! একাত্তরের ২২ মার্চ আমরা শুনলাম, চট্টগ্রাম থেকে মওলানা ভাসানী ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলবেন। ৩২ নম্বর ঝিলের পাড় তখন লোকে লোকারণ্য। একপর্যায়ে ফোন এল। মওলানা ছিলেন ন্যাপের নেতা বজলুস সাত্তারের বাড়িতে। ফোনে কী কথা হয়, তা দুই নেতাই জানেন, আর জানেন তাঁদের ঘনিষ্ঠ দু-একজন। দুই তরফ থেকেই জানানো হয়, আর আপস নয়।
চট্টগ্রামে ভাসানী এক সভায় বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে আমি আহ্বান জানাচ্ছি, মাউন্টব্যাটেন যেমন নেহরু-জিন্নাহর কাছে টেবিলে বসে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সসম্মানে গিয়েছিলেন, আপনিও মুজিবরের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে ইসলামাবাদ চলে যান। সংঘাতের পথে যাবেন না। স্বাধীনতা ছাড়া বাংলাদেশের মানুষ আর কিছু চায় না। আমরা আপনাকে সসম্মানে প্লেনে তুলে দিয়ে বিদায় জানাব। সেকালে ফোন রেকর্ড করার এন্তেজাম বোধ হয় ছিল না। থাকলে ভালোই হতো। দুই নেতার ঐতিহাসিক সংলাপ জানা যেত। একালেই বরং ফোনের কথাবার্তা রেকর্ডের ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ বেঁচে যেত। বছর খানেক যাবৎ বিজ্ঞজনদের বড়ই আশা, একটি ফোনকল হোক—সামনাসামনি সংলাপ পরে। মাত্র একটি ফোনই ডেড ছিল, কিন্তু ভেবে দেখলাম, বাংলাদেশের সবগুলো ফোনই অচল থাকলে ভালো হতো। দেশবাসীর মনোবাসনা পূরণ করে ফোনকলটি হলো। তবে যখন ফোনকলটি হলো, তখন সরকারি দলের নেতাদের মতো তা উপভোগ করার সৌভাগ্য হয়নি জনগণের। মানুষ প্রাথমিকভাবে উপভোগ করেছে মিনিট তিনেক।
কিন্তু পরে যখন ৩৭ মিনিটের পুরো কথাবার্তাই শোনার সুযোগ করে দেয় আমাদের তথ্য বিভাগ ও টেলিফোন বিভাগ, তখন তাদের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। হায়, আজ একি শুনি প্রিয় নেতাদের মুখে? মন্ত্রী মহোদয় বলে দিয়েছেন, নেতাদের মুখনিঃসৃত বাণী নাকি ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদ’। দুজনের কথা শোনার আকাঙ্ক্ষা বা হাউস হয়েছিল নাগরিক নেতাদের, রাজনীতি বিষয়ে অব্যাহত মতদানকারীদের, বণিক সমাজের শীর্ষ কর্তাদের, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত গৃহকর্তা ও গৃহিণীদের। তাঁরা ভেবেছিলেন, মিনিট চার-পাঁচেক কথা হবে, তারপর হবে অন্য নেতাদের মধ্যে সংলাপ। তাঁদের এমনই সৌভাগ্য যে তাঁরা শুনেছেন ৩৭ মিনিট কথাবার্তা। তাঁদের কথা শোনার সাধ হয়েছিল। সেই সাধ মিটে গেছে। পারস্পরিক সৌজন্যবোধ কী জিনিস, তা বাংলার বালক-বালিকাও এবার শিখে গেল।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

শেখ ফরিদকে বাঁচতে দিন!

বাংলাদেশের পাখির বৈজ্ঞানিকভাবে তালিকা করতে গেলে, যে পাখিটি প্রথমে আসবে তার নাম কালা তিতির। স্থানীয় লোকজনের কাছে পাখিটি শেখ ফরিদ ও বনমুরগি নামেই পরিচিত। পুরুষ পাখি যখন ডাকে, তখন তার ডাকের শব্দটি বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, পাখিটি শেখ ফরিদ নাম ধরে কোনো মানুষকে ডাকছে। তাই লোকে এ পাখিকে নাম দিয়েছেন শেখ ফরিদ। আবার পাখিটি দেখতে মুরগির মতো, তাই অনেকে পাখিটিকে বলে বনমুরগি। এ পাখি একসময় অনেক ছিল তেঁতুলিয়ার ঝোপঝাড়ে। কিন্তু বসতি ধ্বংস ও স্থানীয় শিকারিদের কারণে হারিয়ে গেছে ৯৯ শতাংশ পাখি। বাংলাদেশের পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার কাজীপাড়ার গ্রামের পাঁচ-ছয় শ একর কৃষিজমি, কয়েকটি চা-বাগান ও কিছু গুল্ম উদ্ভিদ ঝোপই জানামতে এ পাখির শেষ প্রাকৃতিক আবাসস্থল। বলা যায়, কালা তিতির কাজীপাড়ায় এন্ডিমিক হয়ে গেছে (এন্ডিমিক প্রজাতি বলতে কোনো নির্দিষ্ট একটি প্রজাতির নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক স্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া বোঝায়)।
২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বছরের বিভিন্ন সময়ে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, পাখিটি সাধারণত আখখেত, গম, ভুট্টা, তিল, শ্বেতদ্রোণ, বুনো গুল্মের ঝোপ, চা-বাগান, ছনঘাসের বাগান, মেলাস্টোমা বা দাঁতরাঙা ফুলগাছের ঝোপে বিচরণ করে। খুব সকালে ও শেষ বিকেলে খাবার খেতে পাখিটি একটু খোলা জায়গায় চলে আসে। তবে, সব সময়ই দেখা গেছে, নিজেকে আড়াল করা যায় এমন গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে শেখ ফরিদ হেঁটে বেড়ায়। প্রজনন সময় পুরুষ পাখিটি বেশি ডাকাডাকি করে, আর দেখা পাওয়া কিছুটা সহজ। মেয়ে পাখিটির দেখা কালেভদ্রে মেলে। ঝোপ থেকে খাবার খাওয়ার প্রয়োজন হলে ছেলে পাখিটিই প্রথম বের হয়ে। এর কিছুক্ষণ পর মেয়ে পাখিটি এক বা দুই পা করে বের হয়। এদের চলাফেরা আমাদের মুরগির মতোই। খেতের ভেতর থেকে কোনো আল বা খোলা জায়গা পার হতে হলে মেয়ে পাখিটি ছেলে পাখিটির পিছু পিছু হেঁটে বেড়ায়। আবার মানুষের দেখা পেলে মেয়ে পাখিটিই দ্রুত উড়ে বা দৌড়ে পালায়। মানুষ দেখলেই পাখিগুলো পালানোর জন্য দিশেহারা হয়ে পড়ে। দেখা গেছে, প্রায় আধা কিলোমিটার দূর থেকে এ পাখি মানুষ দেখলেই পালিয়ে যায় ঝোপের ভেতর। মানুষকে কেন এ পাখি ভয় পায়?
তবে তেঁতুলিয়ার এক ছেলে আমাকে বলেছে, সে নিজেই প্রায় এক হাজার শেখ ফরিদ পাখি জবাই করেছে। উল্লেখ্য, সেই ছেলেটির বাবা ছিলেন তেঁতুলিয়ার নামকরা পাখি শিকারি। প্রতিদিন তিনি শেখ ফরিদ শিকার করতেন এবং বাজারে বিক্রি করতেন। পাখিটি একসময় আমাদের মধুপুরের শালবনে, চট্টগ্রামের পত্রঝরা বনে ও সিলেটে ছিল, কিন্তু বসতি ধ্বংস ও মানুষের শিকারের কারণে এসব জায়গা থেকে পাখিটি চিরতরে হারিয়ে গেছে। কালা তিতির পার্বত্য চট্টগ্রামের সাঙ্গু ভ্যালিতে শেষবার দেখা গেছে ২০০৬ সালে, মধুপুরে শেষবার দেখা গেছে ২০০৩ সালে এবং সিলেটে ১৯৮৮ সালে। তেঁতুলিয়ায় স্থানীয় অনেক শিকারি ও মানুষ পাখিটি শিকার করেছে, এমন তথ্য অনেক। পাঁচ বছর ধরে পাখিটির সন্ধানে ও ছবি তোলা এবং সংরক্ষণকাজে সেখানে যাওয়া-আসার ফলে স্থানীয় জনগণ কিছুটা সচেতন হয়েছেন। প্রতিবারই সেখানকার মানুষকে বোঝানো হয়েছে। আর স্থানীয়ভাবে কাজীপাড়ার যে জমিতে পাখিটি বিচরণ করে, সেই জমির মালিক কাজীবাড়ির কর্তৃপক্ষও পাখিটি শিকার তাদের জমিতে নিষিদ্ধ করেছে। তাই পাখিটি শিকার একটু কমেছে। বিভিন্ন সময় যাওয়া-আসার ফলে দেখা গেছে, এখানে ২০-৩০টি পাখি এখনো টিকে আছে। কাজীপাড়ার চারদিকে ভারতের চা-বাগান থাকায় এটি টিকে আছে। ভারতের চা-বাগানগুলো না থাকলে পাখিটি অনেক আগেই বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেত। চা-বাগানের ভেতর পাখিটি লুকিয়ে পড়লে তাকে ধরা ও শিকার মুশকিল।
আর এসব চা-বাগানে শিকারিদের ঢোকার কোনো সুযোগ নেই এবং ভারতে পাখি শিকার নিষিদ্ধ। সাধারণত বাসা করার মৌসুমে পাখিটি সবচেয়ে বেশি শিকার হয়। কারণ, পাখিটি গুল্মের ঝোপে, ছনঘাসের বনে, চা-বাগানে, আখখেতের ভেতর মাটিতে বাস করে। যখন স্থানীয় লোকজন মাঠে কাজ করে এবং খেতে আগাছা পরিষ্কার করতে আসে, তখন তারা বাসা দেখতে পায়। তারপর রাতে গিয়ে পাখিটি জাল বা ঝাঁপি দিয়ে ধরে ফেলে। তা ছাড়া লোকজন আখখেতে ও চা-বাগানের দুই দিকে জাল পেতে অন্য দুই দিক থেকে ধাওয়া করলে পাখি দৌড়ে গিয়ে পাতা জালে আটকা পড়ে। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Francolinus francolinus এবং ইংরেজি নাম Black Francolin। কালা তিতির উঁচু ঘাস, কৃষি খামার, চা-বাগানে একাকী ও জোড়ায় চলে। এরা খোলা মাঠ, ঝোপ ও ঘাসের ভেতর খাবার খোঁজে। খাদ্যতালিকায় আছে ঘাসবীজ, আগাছা, শস্যদানা, কচি ফল ও পোকামাকড়। উষা ও গোধূলিবেলায় এরা কর্মচঞ্চল থাকে। শেখ ফরিদ বা কালা তিতির পাখিটি আর কত দিন টিকে থাকবে বাংলাদেশে, তা নির্ভর করছে মানুষের ওপরই। ছোট্ট এক চিলতে জায়গায় ওর বাস। যদি সরকার ও কাজীপাড়ার মানুষ এগিয়ে আসে পাখিটি সংরক্ষণের জন্য, তা হলে কালা তিতির টিকে থাকবে অনাগত সময় নিয়ে। আমরাও চাই না মায়াবী এ পাখিটি হারিয়ে যাক আমাদের দেশ থেকে।
সৌরভ মাহমুদ, পাখি ও উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ।
nature.surav@gmail.com

কাবিলার বাইরের সেই মানুষেরা কোথায়?

আমরা পালাচ্ছি, জ্বলছি, পথ খুঁজছি: হরতালের আগের দিন দুপুর। মানুষভর্তি অনেক বাস। মাইক বাজছে, স্লোগান হচ্ছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, পোশাকশ্রমিকদের আনা হয়েছে। বস্তিবাসীদের হাঁটাপথে রওনা করানো হচ্ছে। মহাসমারোহে সবাই যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর জনসভায়। এবং মহাসমারোহে ঢাকার রাজপথ থমকে আছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানুষ, জনসভার মানুষ, কাজকর্মে বেরোনো মানুষ, কেউই চলতে পারছে না। হরতালের আগের সন্ধ্যার প্রস্তুতি ছিল, ভরদুপুরে থমকে যেতে হবে কে ভাবতে পেরেছিল? বিরোধী দল যেমন হরতালের আগে হুমকি দেয়, সরকারি দলও মহাসভার দিন সেভাবে হুঁশিয়ার করলেই পারে! সন্ধ্যায় রাস্তায় ভুতুড়ে পরিস্থিতি। সড়কবাতি থাকার পরও অন্ধকার জমে আছে। রাস্তায় গাড়ি কম, তাই গাড়ির হেডলাইটের আলোও কম। দেশের হেডলাইটও কি এ রকম নিবু নিবু? অন্ধকারের মধ্যে পথ দেখা যাবে তো? হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়। সন্ধ্যা পেরোতে চলল, এখনই বাড়ি ফিরতে না পারলে রাতের ভুতুড়ে ঢাকায় পুলিশ অথবা পিকেটারের পাল্লায় পড়ার ভয়। হেঁটেই রওনা হলাম গন্তব্যে। রাস্তায় পুলিশ আর পুলিশ। নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে যাওয়া নগর, ভয়ের জালের তলায় আটকে পড়া জীবন।
সবই গণতন্ত্র আর মুক্তিযুদ্ধের জন্য! অথচ এই দুই-ই দুই দলের কারণে আজ বিপদে। গোপালগঞ্জ বনাম বগুড়া: রাত ১২টার দিকে ফিরছি। মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ মোড়ে দাঁড়িয়ে বন্ধুর সঙ্গে চা খাচ্ছি। একটা প্রাইভেট কার পাশ দিয়ে ধীরগতিতে যেতে যেতে থামল। তিন যুবক নামল সেখান থেকে, হাতে লাঠি। নেমেই বুড়ো দোকানিকে ধমক, দোকান খোলা কেন? দোকান খোলা থাকলেই মানুষ আসে, তাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমস্যা হয়। বুঝলাম, ওনারা সিভিল পোশাকের পুলিশ। ওপর মহলের চাপে আছে, তাই মানুষকে ভয় পাচ্ছে এবং ভয় দেখাচ্ছে। মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট, তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ। কথাবার্তায় ভুল হলেই বিপদ। তেমন বিপদের মুখেই পড়লাম যেন। দোকানিকে ছেড়ে পুলিশ আমাদের নিয়ে পড়ল। আগে শরীর তল্লাশি পরে কথা: কেন এখানে এসেছি, বাসা কোথায় ইত্যাদি। কোনো উত্তরেই তারা খুশি হয় না। দলটির কর্তাব্যক্তি যিনি তাঁর চ্যাতব্যাত কিছু কম। কিন্তু সঙ্গের এসআইটি ধমক ছাড়া কথা বলেন না। হয়তো সম্প্রতি ছাত্রসংগঠনের ক্যাডার থেকে পুলিশে এসেছেন। অবশ্য পুলিশ আর ক্যাডারের মধ্যে পার্থক্য তো কেবল পোশাকে। যা হোক, বাড়ির কথা বলায় বললাম, বগুড়া। জেলাটির নাম শুনেই তাঁরা যেন আর্কিমিডিসের ‘ইউরেকা’ টাইপের খুশি হয়ে উঠলেন। ওসি সাহেব লাঠি দুলিয়ে দুলিয়ে শোনালেন, ‘এই তো, আপনার গোড়াতেই তো দোষ,
ঠিকানা ধরে গেলে তো আরও দোষ মিলব।’ বললাম, ‘বগুড়ায় জন্মালে সমস্যা কী? গত নির্বাচনে কি বগুড়ায় আওয়ামী লীগ জেতে নাই?’ তিনি সর্বদর্শী: ‘বগুড়ার লোক ভালো হয় নাকি?’ ওনার বাড়ি গোপালগঞ্জে। ভাবতে থাকলাম, জন্মস্থান তো বদলানো যায় না, কিন্তু বুদ্ধি করে যদি গোপালগঞ্জে শ্বশুরবাড়ি বানাতাম, তাহলে যে সরকারই আসুক, অসুবিধা হতো না। একদিকে বঙ্গবন্ধুর গোপালগঞ্জ অন্যদিকে জিয়াউর রহমানের বগুড়া। বাংলাদেশ তাহলে কোথায় হারাল? গোপালগঞ্জ আর বগুড়া কীভাবে ঢেকে ফেলল বাংলাদেশকে? দুই জোটের সমর্থক নন, এমন মানুষদের কি হাতিয়া বা সোনাদিয়ায় পাঠানো হবে? সাতচল্লিশের দেশভাগ, একাত্তরের স্বাধীনতার পরও দেখি, দেশভাগ শেষ হচ্ছে না। দুই দল মিলে দেশটাকে এমনভাবে ভাগ করে ফেলেছে যে বাংলাদেশকে আঁকড়ে ধরে বাঁচা কঠিন। পথ বন্ধ। দুই পক্ষের সাঁড়াশি চাপে বাংলাদেশ নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। সরকারের এখন সবাইকেই সন্দেহ। কোনো সরকার যতই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, ততই ক্ষমতার লাঠি আঁকড়ে ধরে। জনগণের স্বাভাবিক নড়াচড়াতেও তখন তাদের ভয়। তাঁরা কি জানেন, এই সন্দেহ, তল্লাশি, হুমকি মানুষ কীভাবে দেখছে? অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত যে গণতন্ত্র চায়, তার জন্মের উৎসবে ককটেলের বিস্ফোরণ আর আগুনের হলকা ছাড়া আর কিছু নেই। এ এমন গণতন্ত্র,
যার জন্য সরকারকে করতে হয় মানবাধিকার লঙ্ঘন আর বিরোধী দলকে চালাতে হয় নৈরাজ্য! জনসমাজকে অসহায়করার গণতন্ত্র ও সংবিধান কার দরকার? ফাটল, ফাটল কেবল চারদিকে: লীগ যদি গোপালগঞ্জি ছাড়া ভরসা না পায়, বিএনপি যদি বগুড়াবাসী ছাড়া আর সবাইকে অবিশ্বাস করে, তাহলে কী করে তারা জাতীয় দল হয়? এমন অঞ্চল-অন্ধত্ব নিয়ে কী করে দেশের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব? ইংরেজের খলবুদ্ধিতে ভারত বিভক্ত হয়। এখন কার বুদ্ধিতে জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরানো হচ্ছে? শুনি দেশ স্বাধীন এবং দলগুলো গণতান্ত্রিক! তাহলে কাবিলা-সংস্কৃতি চলে কী করে? অনৈক্যের এই পরিস্থিতি অনেকের কাছে সামাজিক সন্ত্রাসের জন্য মওকা এনে দিয়েছে। সাঁথিয়ায় ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেওয়ার ধোঁয়াটে অভিযোগে হিন্দুসমাজের মানুষের বাড়িঘর-মন্দিরে হামলা হয়েছে। সেই ফেসবুক, সেই গুজব, সেই প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, সেই অচেনা লোকদের চালানো তাণ্ডব। রামু আর সাঁথিয়ার হামলার ছক হুবহু এক। সেই ঘটনায়ও দ্বিদলীয় দোষাদুষির ঢলে সত্য ভেসে গেছে। যখন সত্য জানা যায় না, তখন জনশত্রুরা অপার ক্ষমতাধর হয়ে পড়ে। রামু থেকে সাঁথিয়া: ধর্মীয় সহাবস্থানের জমিতে একেকটি ফাটল এবংফাটলগুলো বোজানোর বদলেবাড়ানো হচ্ছে। কল্পিত অভিযোগে ইসলামের যতটা না অবমাননা হলো, তার থেকে বেশি অবমাননা ও সমালোচনা জুটল দাঙ্গাবাজদের আচরণে। রামুর মতো এবারও সরকার দোষারোপ করছে বিরোধী দলকে, বিরোধী দল দেখাতে চাইছে সরকারি ষড়যন্ত্রের আলামত। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক ফাটল, ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক ফাটলের পর আশা তাহলে থাকল কোথায়? এত ফাটল, এত বিভাজন নিয়ে কীভাবে চলবে এই দেশ? সেই মানুষেরা কোথায়: মুসলমান সমাজকে ‘অপরাধী’ ও ‘লজ্জিত’ করে হিন্দুসমাজকে বিপন্ন করায় নাগরিক সংহতিতে যে ফাটল ধরে, তাতে কার লাভ?
‘সংখ্যালঘু’ বনাম ‘সংখ্যাগুরু’র গণিতকে রাজনীতির পাশা খেলায় বাজি রাখার এই নির্বাচনী রাজনীতি নিজেই কি সাম্প্রদায়িকতার জনক নয়, দেশভাগের কারিকাশক্তি নয়? এই নির্বাচনী গণিত এখনো উপমহাদেশে ‘সংখ্যালঘুত্বকে’ আক্রমণের সহজ শিকার করে রেখেছে। ভয় হয়, নির্বাচনী ডামাডোলের সুবিধার্থে এমন ঘটনা আরও ঘটবে। এ রকম পরিস্থিতিতে ঘটনার সত্য আর জড়িত ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ চেইনটা উন্মোচন করা ছাড়া সমস্যার গোড়া ধরা যাবে না। যখন ক্ষমতা মিথ্যা বলে তখন সত্যকে আলিঙ্গন করার দায়জনগণের। তবু ফাটল বোজানোর মতো মানুষ থাকে। রামুর ঘটনায় স্থানীয় একদল যুবক রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, সাঁথিয়ায় বাবলু সাহাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন বাজারের সহ-ব্যবসায়ীরা। সময়ের প্রয়োজনে সামান্য মানুষও অসামান্য হয়ে ওঠেন। আজ আমাদের সেসব মানুষকে বড় প্রয়োজন, যাঁদের বাড়ি যে জেলাতেই হোক, যে দলের বা যে ধর্মসমাজের সদস্য তাঁরা হোন না কেন, বাংলাদেশের বিপদটা তাঁরা বোঝেন। সেই মানুষ খুঁজি যাঁরা একজন হলেও রুখে দাঁড়ান আর তাঁদের ডাকে কমপক্ষে দশজন লোক দাঁড়িয়ে যায়। আপনি কি তিনি? আপনার চারপাশে আরও দশজনকে কি আপনি ডাকছেন?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com