Showing posts with label জঙ্গিবাদ. Show all posts
Showing posts with label জঙ্গিবাদ. Show all posts

Sunday, January 9, 2011

পাকিস্তানের সহিংস পথচলা by মশিউল আলম

মালিক মমতাজ হুসেইন কাদরি নামের দেহরক্ষীটি যাঁকে রক্ষা করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন, তাঁকেই হত্যা করলেন। পাকিস্তানের পাঞ্জাব রাজ্যের গভর্নর সালমান তাসিরকে তিনি গুলি করেছিলেন খুব কাছে থেকে। সাব-মেশিনগান থেকে গুলি করেছেন একটি নয়, পর পর নয়টি। দুটি ম্যাগাজিনের সব কটি বুলেট শেষ করেই কেবল ক্ষান্ত হয়েছেন। বোঝা যায়, কী প্রচণ্ড ঘৃণা থেকে তিনি এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন। গুলি শেষ করে অস্ত্র ফেলে দিয়ে তিনি দুই হাত ওপরে তুলেছেন, আত্মসমর্পণ করে স্বীকার করেছেন যে তিনি গভর্নরকে হত্যা করেছেন। কেন? কারণ গভর্নর সালমান তাসির পাকিস্তানের ব্লাসফেমি আইনকে কালাকানুন বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি আইনটি সংশোধনের দাবি তুলেছিলেন এবং আসিয়া বিবি নামের এক খ্রিষ্টান নারীকে ধর্মদ্রোহের অভিযোগে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পুলিশের গাড়িতে আটক মালিক কাদরির একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেখা যাচ্ছে, যেন তিনি এক মহান কাজ করেছেন। তিনি এক টিভি চ্যানেলকে বলেছেন, ‘সালমান তাসির একজন ধর্মদ্রোহী। তাঁর শাস্তি এটাই।’
হিলারি ক্লিনটন থেকে শুরু করে বান কি মুন পর্যন্ত বিশ্বের বড় বড় নেতারা সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডের কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। কিন্তু খোদ পাকিস্তানের নাগরিক সমাজ অতি সতর্ক, প্রকাশ্যে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানাতে তাঁরা ভয় পাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামাবাদের বিবিসির সংবাদ-বিশ্লেষক ইলিয়াস খান। উল্টো দিকে বরং সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন অনেক ধর্মীয় নেতা। অনেকে হত্যাকারী মালিক কাদরির প্রশংসা করেছেন। সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডের পরপরই ফেসবুকে হত্যাকারী মালিক কাদরির নামে একটি পাতা খোলা হয়েছে, সেখানে প্রায় দুই হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কাদরির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
শুধু তা-ই নয়, লাহোরে সালমান তাসিরের জানাজা বর্জন করার ডাকও দিয়েছে কয়েকটি ধর্মীয় গোষ্ঠী। সুন্নি মুসলমানদের একটি গোত্রের ৫০০ জন আলেম এক বিবৃতি দিয়ে সবাইকে সাবধান করেছেন: সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডে কেউ শোক প্রকাশ করলে তারও একই পরিণাম হবে। জামায়াত-এ-আহলে সুন্নাত পাকিস্তান নামের এক সংগঠন বিবৃতি দিয়েছে, কোনো মুসলমান যেন সালমান তাসিরের জানাজায় শরিক না হয়, কেউ যেন তার জন্য দোয়া করার চেষ্টা না করে, কেউ যেন তার জন্য কোনো ধরনের আফসোস বা অনুকম্পা প্রকাশ না করে। সালমান তাসিরকে একজন ধর্মদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তারা বলেছে, কেউ যদি কোনো ধর্মদ্রোহীর হত্যাকাণ্ডে সমবেদনা প্রকাশ করে, তাহলে সেও তার মতোই ধর্মদ্রোহী বলে গণ্য হবে।
সালমান তাসির পাকিস্তান পিপলস পার্টির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক উদারপন্থী রাজনীতিক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল, বিশেষ করে নারীসমাজের ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর অধিকার রক্ষার পক্ষে তিনি সোচ্চার ছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেছেন, তাঁর মৃত্যু একটি ‘বিরাট ক্ষতি’। ষাটের দশকে ছাত্রজীবন থেকে তিনি পাকিস্তান পিপলস পার্টির সঙ্গে জড়িত, জুলফিকার আলী ভুট্টোর একজন ভক্ত, ভুট্টো: এ পলিটিক্যাল বায়োগ্রাফি নামে একটি বইও লিখেছেন। তিনি লন্ডনে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পড়েছেন এবং পরবর্তীকালে রাজনীতির পাশাপাশি একজন সফল ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসনামলে ভুট্টোর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে জেল খেটেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডেইলি টাইমস ও উর্দু দৈনিক আজকাল-এর প্রকাশক, দুটি ইংরেজি টিভি চ্যানেলের মালিক এই ভদ্রলোক ইন্টারনেটে ফেসবুক ও টুইটার ব্যবহার করতেন। জীবনযাপনে ছিলেন শৌখিন, আধুনিক ও কেতাদুরস্ত। ডানপন্থী ও ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন গণমাধ্যমে তাঁর ও তাঁর পরিবারের বিলাসী জীবনযাপনকে অনৈসলামিক আখ্যা দিয়ে নানা ধরনের প্রচারণা চলে এসেছে।
অকপটে নিজের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করতেন সালমান তাসির। সে জন্য তাঁকে বিতর্কিত ব্যক্তিও বলা হয়। গত বছর আসিয়া বিবি নামের এক খ্রিষ্টান নারীর বিরুদ্ধে ইসলামের নবীর অবমাননার অভিযোগে ব্লাসফেমি আইনে মামলা হয়, পাঞ্জাবের এক নিম্ন আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আসিয়া বিবি সেই থেকে কারারুদ্ধ। উচ্চ আদালতে তিনি আপিল করেছেন। এই সংখ্যালঘু নারী ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার বলে উল্লেখ করে সালমান তাসির তাঁর দণ্ড মওকুফের আবেদন জানান, একই সঙ্গে ব্লাসফেমি আইন সংশোধনের দাবি তোলেন। তখন থেকেই তিনি উগ্রপন্থী ধর্মীয় সংগঠনগুলোর রোষানলে পড়েন, তাঁকে ধর্মদ্রোহী আখ্যা দিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। তিনি নিজেও একাধিকবার বলেছেন যে তাঁর জীবনের ঝুঁকি আছে, কিন্তু তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসবেন না। প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির খুব ঘনিষ্ঠ তিনি; ধারণা করা হয়, উচ্চ আদালতের রায়ে যদি আসিয়া বিবির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে, তাহলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। সালমান তাসির এটা করিয়ে নেবেন। তাই তিনি উগ্রপন্থীদের ঘৃণার পাত্র।
জেনারেল জিয়াউল হকের জারি করা ব্লাসফেমি আইনটির বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলতে ভয় পায়। সালমান তাসিরের নিজের দল পাকিস্তান পিপলস পার্টিও এ ব্যাপারে বরাবর নীরবতা পালন করে আসছে। শুধু সালমান তাসির ও শেরি রেহমান নামের একজন জাতীয় পরিষদের সদস্য ছাড়া পিপিপির কোনো নেতা ব্লাসফেমি আইন বাতিল বা সংশোধনের কথা তোলেননি। এর আগে এ আইনটি বাতিল বা সংশোধনের কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। উগ্রপন্থা ও তালেবানীকরণের বিরুদ্ধেও বেনজির অবস্থান নিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, এসব কারণেই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে। সুতরাং সালমান তাসিরও যে হত্যার শিকার হতে পারেন, এমন আশঙ্কা অনেকেই প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তাঁরই দেহরক্ষী দলের কোনো সদস্য যে কাজটি করতে পারেন, এটা বোধ হয় কেউ ভাবেনি।
সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডটি মালিক কাদরির একার কাজ, নাকি তাঁর পেছনে আরও কেউ আছে, এ বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক বিবিসিকে জানিয়েছেন। পাঞ্জাব এলিট ফোর্স নামের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর যে দলটি সেদিন সালমান তাসিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল, তার সব সদস্যকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাকিস্তানের ডেইলি টাইমস পত্রিকায় ৪ জানুরির সম্পাদকীয় নিবন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, মালিক কাদরির পেছনে আরও কোনো ব্যক্তি বা মহলের হাত থাকতে পারে। মালিক কাদরির মতো একজন উগ্র মানসিকতার ব্যক্তিকে গভর্নরের নিরাপত্তারক্ষীর দলে কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, এই প্রশ্নটিও ডেইলি টাইমস তুলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কাদরি গভর্নরের নিরাপত্তারক্ষী দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে পত্রিকাটি লিখেছে, হত্যাকাণ্ডটি যদি একান্তই মালিক কাদরির একার কাজ হয়ে থাকে, তাহলে এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি রাষ্ট্র ও সমাজের এক ভয়াবহ চরিত্র ফুটে ওঠে। প্রমাণিত হয় যে ধর্মীয় উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতা পাকিস্তানের সমাজকে নৈরাজ্য ও বর্বরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ, বুদ্ধিবিবেচনার কোনো জায়গা আর এ সমাজে থাকছে না, হিংস্র অন্ধবিশ্বাস পুরো সমাজকে গ্রাস করে ফেলছে, এমনকি একটি প্রদেশের গভর্নরের মতো উচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিও ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের ক্রোধের আগুন থেকে আজ নিরাপদ নন।
পাকিস্তানে ধর্মদ্রোহের অভিযোগে দায়ের করা মামলার আসামি জেলখানায় বন্দী অবস্থায়ও খুন হয়ে যায়। অন্য কয়েদিরা তাদের খুন করে। আসামিদের আত্মীয়স্বজনও খুন হয়, ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে পালিয়ে বেড়ায়। পাকিস্তানের জাস্টিস অ্যান্ড পিস কমিশন নামের এক বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ১৯৮৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৪ জন মানুষ এভাবে খুন হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একজন বিচারকও ছিলেন। আদালতে মামলার শুনানি চলা অবস্থায় আসামিদের গুলি করে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। আসিয়া বিবি নামের খ্রিষ্টান নারীর মৃত্যুদণ্ড উচ্চ আদালতে মওকুফ হলে বা প্রেসিডেন্ট তাঁকে ক্ষমা করে দিলেও তিনি মুক্তভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন না। কারণ ইতিমধ্যে এক মোল্লা ঘোষণা করেছেন, জেলের ভেতরে বা বাইরে যেখানেই হোক, আসিয়া বিবিকে যে হত্যা করতে পারবে, তাকে তিনি পাঁচ লাখ রুপি পুরস্কার দেবেন। এক মসজিদের ইমাম আগাম বলে রেখেছেন, ‘আইন যদি কোনো ধর্মদ্রোহীকে সাজা দেয়, আর তাকে যদি ক্ষমা করে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নেব।’
পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ধর্মীয় ব্যাপারে সব ধরনের ভিন্নমতকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করার প্রবণতা বাড়ছে, জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো আর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এতে মদদ দিচ্ছে। ‘অরাজনৈতিক’ আলেম সমাজে যাঁরা অপেক্ষাকৃত উদার ও সহনশীল, তাঁদের অনেকেই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, ইতিমধ্যে অনেকে আত্মঘাতী বোমা হামলায় মারা গেছেন, অনেকে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। শিয়া সম্প্রদায়ের অনেক সুফি সাধকের মাজার বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে ওহাবি উগ্রপন্থীরা। প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার মানুষেরা ক্রমশ আরও বেশি করে কোণঠাসা হচ্ছে। সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাদের অবস্থান আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।
যে পাকিস্তানে ধর্মভিত্তিক দলগুলো কখনো নির্বাচনে জয়ী হয় না বা সরকার গঠন করতে পারে না, সেখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও উগ্রপন্থা হিংস্রতার পর্যায়ে উঠে যাচ্ছে। এর কারণ কী? প্রচণ্ড আমেরিকা-বিদ্বেষ; পশ্চিমা ভাবধারা ও সভ্যতা-সংস্কৃতি বলে যা কিছু পরিচিত, তার সবকিছুর প্রতিই প্রচণ্ড ঘৃণা। ইসলামাবাদের কায়েদে আজম ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পারভেজ হুদভয় মনে করেন, পাকিস্তানি সমাজে আমেরিকা-বিদ্বেষ ভারত-বিদ্বেষকেও ছাড়িয়ে গেছে। মালিক কাদরি ও তাঁর মতো মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিকনির্বিশেষে সব ধর্মীয় উগ্রপন্থী ব্যক্তির কাছে সালমান তাসির ছিলেন পাশ্চাত্য ভাবধারা ও সংস্কৃতির প্রতিনিধি। উপরন্তু তিনি পক্ষ নিয়েছেন একজন খ্রিষ্টান নারীর, যিনি নবীর অবমাননা করেছেন।
আমেরিকানরা যত দিন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নারী স্বাধীনতা ইত্যাদি পশ্চিমা ভাবপণ্য রপ্তানি করার সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে যাবে, তত দিন সেখানে মালিক কাদরির মতো উগ্রপন্থীদের জন্ম হতে থাকবে। তালেবানীকরণ প্রতিহত করতে গিয়ে আমেরিকা, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পুরো সমাজকে মনেপ্রাণে তালেবান বানিয়ে ফেলছে, এটা তারা নিজেরাই হয়তো বুঝতে পারছে না।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

Wednesday, May 26, 2010

জঙ্গি দমনে অব্যাহত নজরদারির বিকল্প নেই -রাজধানীতে জেএমবির আস্তানা

জঙ্গি তৎপরতা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন সাফল্য দাবি করে আসছিল, তখনই রাজধানীতে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নতুন আস্তানার সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ঘটনা স্বভাবতই শান্তিপ্রিয় জনগণকে উদ্বিগ্ন করবে। জঙ্গিরা সেখানে কেবল আস্তানাই গাড়েনি, অস্ত্রশস্ত্র নিয়েও প্রস্তুত ছিল। গত রোববার রাতে দনিয়ার শাহজালাল এলাকায় পুলিশ অভিযান চালালে জঙ্গিরা তাদের ওপর বোমা হামলা চালায়। এতে পুলিশসহ ১২ জন আহত হন। আত্মঘাতী বোমা হামলায় জেএমবির কথিত সামরিক শাখার কমান্ডার শিবলীও আহত হয়ে বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একই দিন কুড়িগ্রামে জঙ্গি সন্দেহে ১৪ জনের আটক হওয়ার ঘটনাও প্রমাণ করে, জঙ্গি তৎপরতা বন্ধ হয়নি। কয়েক দিন আগে রাজধানীর মিরপুর ও টঙ্গীতেও বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে আটক করা হয়েছিল।
জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। জঙ্গিবাদ প্রচলিত আইনকানুনের তোয়াক্কা করে না। তারা সংবিধান, গণতন্ত্র, রাষ্ট্র কিছুই মানে না। যারাই তাদের মতের বিরোধী, বোমাবাজি করে তাদেরই কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিতে চায়। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জঙ্গিরা সারা দেশে ভয়াবহ অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, জঙ্গিরা একেবারে নিষ্ক্রিয় না হলেও বড় ধরনের হামলা পরিচালনার ক্ষমতা তাদের নেই। তাদের এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত না করেও যে কথাটি বলা প্রয়োজন তা হলো, জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।
এ কথাও মনে রাখতে হবে, কেবল অভিযান চালিয়ে জঙ্গিদের নির্মূল করা যাবে না। যে রাজনৈতিক মতবাদ তাদের এই মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে প্ররোচনা জোগায়, মানুষ মারতে শেখায়, সেই রাজনীতির ভুলগুলোও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে। জঙ্গিবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণের কাজটিও করতে হবে সরকারকে, পাশাপাশি তাদের অস্ত্র ও অর্থের উৎসও বন্ধ করতে হবে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পথ ও মতের ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু যে অপরাজনীতি মানবতা ও সভ্যতার পরিপন্থী, তার বিরুদ্ধে দলমতনির্বিশেষে সবাইকে দাঁড়াতে হবে। দলীয় বা সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে জঙ্গিবাদের ব্যবহারের আত্মঘাতী পথও পরিহার করতে হবে তাদের। বৃহত্তর সমাজের সমর্থন তথা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয় না পেলে এই অপশক্তি ধ্বংস হতে বাধ্য।

Saturday, December 26, 2009

উলফা ও বাংলাদেশ -বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় আর নয় by মতিউর রহমান

আসামের উলফা (ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম) এবং বিভিন্ন ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন বাংলাদেশে নানাভাবে সক্রিয় ছিল, তাদের আস্তানা ছিল—এ বিষয়টি এখন দেশের সংবাদমাধ্যমে বহুল আলোচিত। এটা যে আগে কেউ জানত না, ব্যাপারটা তা নয়। এসব ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর এ দেশে অবস্থান বা তত্পরতার কথা অতীতের সব সরকার ও বিরোধী দল এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানত। দীর্ঘদিন তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতাও পেয়েছে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো, যদিও অতীতে আমাদের সরকারগুলো দেশে এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করে এসেছে। আন্তদেশীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সরকারগুলো যেন সংকটে না পড়ে, সে বিবেচনা থেকে দেশের সংবাদমাধ্যমও এদের নিয়ে বড় কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। তবে বিভিন্ন সময় এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরকারের কিছু তত্পরতা বা তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নানা ব্যবস্থা সম্পর্কে সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে।
আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এ দেশে আস্তানার বা অবস্থানের সত্যতা বাংলাদেশের একাধিক সরকারের আমলে একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী আমাদের নিশ্চিত করেছিলেন। অন্তত তিনজন সাবেক সেনাপ্রধানের কাছ থেকেও এসব আমরা শুনে এসেছি। প্রভাবশালী একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতাও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পেয়েছে বলে জানা যায়। তারা অবশ্য এ সমালোচনা এখন মেনে নেয়। তারা এ-ও জানায়, আর এ রকম হবে না। ভারতের অভিযোগের জবাবে আমাদের সব সরকারই অবশ্য উলফাসহ বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বাংলাদেশে অবস্থানের কথা অস্বীকার করে এসেছে। এখন তো বাংলাদেশের সরকার এদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তবে এটাও সত্য, অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় সরকারের আমলে এসব গোষ্ঠীর ওপর কখনো কখনো কিছু চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। উলফা বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর কিছু আস্তানা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময় কিছু ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহতও হয়েছে।
বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালের ২৭ মে ভোরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুরে র্যাব ও বিডিআর যৌথ অভিযান চালাতে গেলে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ হয়। এতে ছয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়। পরে র্যাব ওই এলাকা থেকে আটজনকে গ্রেপ্তার এবং গ্রেনেডসহ বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে।
২০০৬ সালের ১২ জুন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার মাচালংয়ে সেনাবাহিনী ও র্যাবের যৌথ অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে ১০ জন ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়। অভিযানকালে বিচ্ছিন্নতাবাদী দলটির ঘাঁটি থেকে একটি সাব-মেশিনগান (এসএমজি), ৩০৩ রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তলসহ আটটি অস্ত্র এবং গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ২০০৬ সালের ৩০ জুন ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে একে-৪৭ রাইফেল, গ্রেনেড ও মর্টার শেলসহ উদ্ধার করা হয় বেশকিছু অস্ত্র।
২০০৭ সালের মার্চের শুরুতে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার বারোমারি ক্যাম্পের বিডিআরের সদস্যরা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি গোষ্ঠীর ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধার করেন।
এর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, ১৯৯৭ সালে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন উলফার সাধারণ সম্পাদক অনুপ চেটিয়া। আবার বিএনপি সরকারের আমলে ২০০৬ সালে মৌলভীবাজারে গ্রেপ্তার হন ত্রিপুরার বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এনএলএফটির (ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা) একাংশের প্রধান নয়নবাসী জামাতিয়া। দুজন এখনো বাংলাদেশের কারাগারে রয়েছেন।
শুধু তা-ই নয়, ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল এ দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চালান ধরা পড়ার ঘটনা ঘটে। ওই দিন চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তীরে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) জেটিতে খালাস করার সময় ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক করে পুলিশ। এ অস্ত্রের চালান যে উলফার আমদানি করা ছিল, সেটা তখনই জানা গিয়েছিল। মামলার তদন্তে এখন এমন তথ্য বেরিয়ে আসছে যে, উলফাকে এ ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করছিল একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এরই মধ্যে ওই গোয়েন্দা সংস্থার দুজন সাবেক মহাপরিচালককে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন ওই সংস্থার একজন সাবেক পরিচালক। অস্ত্র চোরাচালানের পুরো প্রক্রিয়াটির সঙ্গে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশের কথাও শোনা যায়।
ওই অস্ত্রের চালান ধরা পড়ার পর বিএনপির তত্কালীন একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী আমাদের বলেছিলেন, এই অস্ত্রের চালান এনেছে উলফা। ওই মন্ত্রী আরও বলেছিলেন, উলফা নিজ ব্যবস্থাপনায় এ রকম বড় ধরনের অস্ত্রের চালান নিয়ে আসতে পারে, তাদের সেই শক্তি-সামর্থ্য ও যোগাযোগ রয়েছে। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার পুরো বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে রাখে।
এর আগে ২০০৩ সালের ২৭ জুন বগুড়ার কাহালুতে এক লাখ গুলি ও ১৭৪ কেজি উচ্চক্ষমতার বিস্ফোরক আরডিএক্স ধরা পড়ে। সে চালানও উলফার ছিল বলে এখন তদন্তে বেরিয়ে আসছে। এসব ঘটনা এটাই প্রমাণ করে, এ দেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা শুধু অবস্থানই করেনি, তারা বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদ মজুদও করেছে। আর এ সবই করতে পেরেছে দেশের অভ্যন্তরের কোনো না কোনো রাজনৈতিক শক্তি ও গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায়।
সম্প্রতি উলফার চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়াসহ সংগঠনটির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতার গ্রেপ্তারের ঘটনায় বাংলাদেশে এসব গোষ্ঠী আবার আলোচনায় এসেছে। তারা কোথায় ও কীভাবে গ্রেপ্তার হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিতর্ক যা-ই হোক, দেশের ভেতরে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। সার্ক ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাসবিরোধী সনদে স্বাক্ষরদানকারী দেশ বাংলাদেশ। তবে সে বিতর্কে না গিয়েও এখন এটা স্পষ্ট করে বলা যায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে এ দেশে থেকে তত্পরতা চালিয়ে ছিল। উলফার সামরিক বিভাগের প্রধান পরেশ বড়ুয়া একসময় এ দেশে অনেকটা প্রকাশ্যেই চলাফেরা করেছেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব গোষ্ঠীর তত্পরতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। ২০০৪ সালের শুরুতে পরেশ বড়ুয়া বিএনপি সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীকে হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। ওই মন্ত্রী তখন অনেককেই এ কথা বলেছিলেন।
সম্প্রতি উলফার চেয়ারম্যানসহ একাধিক নেতার গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি আলোচনায় এলেও বিরোধী দল বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামী এখনো এ বিষয়ে কিছু বলেনি। তবে এ দলগুলোর সমর্থক-সংবাদমাধ্যমে তাদের পক্ষের সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা তুলছেন। তাঁরা এমনও প্রচার করছেন, উলফা এ দেশে পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারে। অবশ্য পরেশ বড়ুয়া বিবৃতি দিয়ে সে আশঙ্কা দূর করেছেন। বলেছেন, বাংলাদেশ তাদের লক্ষ্য নয়।
আমরা মনে করি, এ ধরনের ভারতীয় সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো গোষ্ঠীকে কোনো প্রকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া আমাদের দেশের জন্য ঠিক নয়। কোনো গোয়েন্দা সংস্থারও উচিত নয় তাদের সহযোগিতা করা। বাংলাদেশের ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে, অন্য দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ক্ষেত্রে আমরা কাউকে কোনো সহায়তা করব না। কিন্তু বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এ ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা করা হয়েছে। ফলে ওই সময় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এর আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও শুরুর দিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ ছিল, কিন্তু পরে সে উষ্ণতা আর বজায় থাকেনি। সে সময় অনুপ চেটিয়া গ্রেপ্তার এবং বিচারের সম্মুখীন হলেও উলফা বা অন্য কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
শুধু ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়, ভারত ও পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর কথাও এ ক্ষেত্রে বলতে হয়। এসব জঙ্গিগোষ্ঠী এ দেশে শুধু আনাগোনাই করেনি, এখানে তাদের আস্তানা ছিল, এখানে তারা অত্যন্ত তত্পর ছিল। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এ-জাতীয় জঙ্গিদের আনাগোনা ছিল সবচেয়ে বেশি। তাদের তত্পরতার কথা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অজানা ছিল—এ কথা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। আবার এ কথাও সত্য, এসব জঙ্গির প্রতি পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ঘনিষ্ঠতা এবং নানা রকম যোগাযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। জঙ্গিদের প্রতি উদাসীন থাকার পরিণতি বিগত জোট সরকারের আমলে আমরা দেখেছি। দেশব্যাপী ভয়ংকর বোমা-গ্রেনেড হামলা ও হতাহতের সেসব স্মৃতি সহজে ম্লান হওয়ার নয়। গত কয়েক মাসে ভারত ও পাকিস্তানের ১০ জন জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়েছে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে।
আমরা মনে করি, ভারতের উলফা, পাকিস্তানের লস্কর-ই-তাইয়েবা কিংবা অন্য যেকোনো বিদেশি সন্ত্রাসী বা জঙ্গিগোষ্ঠীই হোক না কেন, কখনোই আমাদের ভূমি ব্যবহারের কোনো সুযোগ তাদের দেওয়া ঠিক নয়। এসব গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে তা আন্তরাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। ভূ-রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেশ হয়ে পড়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ; আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি হয়ে ওঠে বড় বাধা। পাশাপাশি আমাদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
বর্তমান সরকার এরই মধ্যে কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে এ ধরনের বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। আমরা এ ক্ষেত্রে সরকারি এসব ব্যবস্থাকে সঠিক পদক্ষেপ বলে মনে করি। বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গিগোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে পাকিস্তান এখন যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।
আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী সামনের ভারত সফরে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করবেন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের এসব অন্তরায় দূর করতে উদ্যোগ নেবেন। অন্য কোনো দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গিদের এ দেশের ভূমি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না—এমন আশ্বাস নিশ্চয় তিনি ভারতকে দেবেন। পাশাপাশি ভারতের কাছ থেকেও নিশ্চয় আমরা এ প্রতিশ্রুতি ও নিশ্চয়তা আদায় করতে পারব যে, আমাদের দেশের কোনো সন্ত্রাসীও ভারতে আশ্রয়-প্রশ্রয় পাবে না। কারণ এটাও আমরা জানি, বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ভারতে গিয়ে লুকিয়ে থাকে। সেখানে থেকেই এ দেশে নানা অপরাধ সংগঠিত করে। সে জন্য এই অপরাধীদের অপতত্পরতা বন্ধে অবশ্যই আমাদের ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন।
ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গেও বর্তমান মহাজোটের শেখ হাসিনার সরকারকে আলোচনা করতে হবে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের সঙ্গে এই সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে যে, বাংলাদেশের কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী পাকিস্তানে কোনো প্রশিক্ষণ বা অন্য কোনো ধরনের সহযোগিতা পাবে না। পাকিস্তানের জঙ্গিদেরও বাংলাদেশে প্রবেশে বা তত্পরতা চালানোর ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হবে, এবং এ সংক্রান্ত সব বিষয়ে দুই দেশ পরস্পরকে সহযোগিতা করবে।
আমরা কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা চাই না। আমরা সমঝোতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ও আমাদের আঞ্চলিক ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক উন্নয়নে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা চাই, ভারত ও পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিদেশীয় এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে দক্ষিণ এশীয় পরিমণ্ডলের নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার একটি উদ্যোগী ভূমিকা নেবে। আসন্ন নয়াদিল্লি সফরের মধ্য দিয়ে এর সূত্রপাত হতে পারে। অন্তত এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে, যাতে সে লক্ষ্যে একটি ইতিবাচক যাত্রার সূচনা হয়।
মতিউর রহমান: সম্পাদক, প্রথম আলো।

Thursday, November 12, 2009

জঙ্গিরা এ দেশে কী চায় by আব্দুল কাইয়ুম

বিশ্বের কোনো দেশেই ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তি, আল-কায়েদা বা তালেবানপন্থীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় নেই। আফগানিস্তানে ছিল, এখন ক্ষমতাচ্যুত। চেষ্টা করছে আবার ক্ষমতা ফিরে পেতে। শুধু কি আফগানিস্তানেই তারা সীমিত? ক্ষমতাচ্যুত হিংস্র তালেবানরা একটা রাষ্ট্র দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাহলে তারা কি বাংলাদেশে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখছে? তারা হয়তো ভাবছে, এখানে গণতন্ত্র দুর্বল, তাই এখানেই সুযোগ। ব্যাপারটা গুরুতর। যাঁরা গণতন্ত্রের পতাকা বহন করছেন, তাঁদের ভেবে দেখতে হবে।
সম্প্রতি সন্দেহভাজন তিন জঙ্গি যুবক ধরা পড়ায় প্রশ্নটি সত্যিই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, তবে কি আফগানিস্তানের পর এবার বাংলাদেশ? আটকদের মধ্যে দুজন নাকি পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবার সদস্য। তাঁদের যোগাযোগে দুই বিদেশি জঙ্গি নাকি কয়েক দিন আগে বারিধারায় আমেরিকান দূতাবাস এলাকা রেকি (হামলা চালানোর আগে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ) করে গেছেন। সেখান থেকে মোবাইল ফোনে চট্টগ্রামে কথা বলেছেন। তারই সূত্র ধরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনজনকে।
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামে চোরাচালানের ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণসহ সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় প্রশ্ন জাগে, আমাদের দেশে উগ্র ধর্মীয় চরমপন্থীরা কতটা শক্তি রাখে, তাদের হাতে কি গণতন্ত্র বিপন্ন হতে পারে? এসব জঙ্গি তত্পরতা স্থিতিশীল রাজনীতির জন্য কতটা হুমকি তার একটা হিসাব করা দরকার। কারণ, গণতন্ত্র অতীতে অনেকবারই বিপন্ন হয়েছে। ধ্বংসের দোরগোড়ায় গিয়ে আবার ফিরে এসেছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ও তারপর ৩ নভেম্বর জেলহত্যা, ৭ নভেম্বর সিপাহি বিদ্রোহের নামে সামরিক কর্মকর্তা হত্যা, ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির উদ্ভব আমরা দেখেছি। আবার গণতন্ত্র উঠে দাঁড়িয়েছে, সেটাও দেখেছি। এ অবস্থায় আমরা কি বলব, বাংলাদেশের গণতন্ত্র এত চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে, এত কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও এখন সত্যিই ভঙ্গুর দশায়? যদি তা-ই হতো, তাহলে তো অনেক আগেই বাংলাদেশের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা যখন হয়নি, তাহলে হয়তো আমরা সাহস করে বলতে পারি, আমাদের গণতন্ত্র অত সহজে ধ্বংস হওয়ার নয়। এত ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও টিকে থাকতে পারাটা আমাদের গণতন্ত্রের শক্তির দিক, যা ভবিষ্যত্ সম্পর্কে আশাবাদী হওয়ার মতো একটি উপাদান।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ নিয়ে আমেরিকা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট রাজনীতি-বিজ্ঞানী, সমাজ বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছুকাল ধরে তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। লেখালেখি করছেন। নিউইয়র্ক টাইমস (২৩ জানুয়ারি, ২০০৫) পত্রিকায় নিউইয়র্ক-ভিত্তিক লেখক এলিজা গ্লিজওয়াল্ড ‘দি নেক্সট ইসলামিস্ট রেভ্যুলুশন?’ (পরবর্তী ইসলামি বিপ্লব?) নামে একটি নিবন্ধে মূলত দেখান যে বাংলাদেশ যেন ধীরে ধীরে আফগানিস্তানের পরিণতি বরণ করতে চলেছে। তিনি এই সিদ্ধান্তে আসেন যে বাংলাদেশ আল-কায়েদার মুঠোয় চলে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সে সময় রাজশাহীর বাগমারায় বাংলা ভাই (সিদ্দিকুর রহমান) ও শায়েখ আবদুর রহমানের দল জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) যে সহিংস তত্পরতা চালাচ্ছিল, তারই পটভূমিতে গ্লিজওয়াল্ড ওই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
ভারতীয় বিশেষজ্ঞ হিরণ্ময় কারলেকারও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে লেখেন, ‘বাংলাদেশ: দি নিউ আফগানিস্তান?’। সে সময় সারা দেশে একযোগে ৫০০ বোমা বিস্ফোরণে সবাই হতভম্ব। মনে হয়েছিল, আল-কায়েদা গোষ্ঠী বুঝি এসেই গেল। ওই পটভূমিতে বাংলাদেশের মানুষের উদার ধর্মীয় মনোভাবের (মডারেট মুসলিম) প্রতি আস্থাশীল হয়েও কারলেকার বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পরিণতি সম্পর্কে শঙ্কামুক্ত হতে পারেননি। সেই উদ্বেগের প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বইয়ে। বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করেন ভারতীয় বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত। তিনিও লেখেন, ‘বাংলাদেশ: এ ফ্র্যাজাইল ডেমোক্রেসি’ (বাংলাদেশে ভঙ্গুর গণতন্ত্র)। একানব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দুই নেত্রীর মধ্যে ব্যক্তিত্বের সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি এবং তার পটভূমিতে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যদিকে ইসলামি চরমপন্থী শক্তির উদ্ভবের বিপদ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন।
এভাবে দেখা যায়, বিগত চার-পাঁচ বছরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে বেশ কিছু লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু তার পর দেখা গেল পরিস্থিতি তত খারাপ না, যতটা অন্যরা বাইরে থেকে মনে করেছেন। বিশেষত, বাংলা ভাই ও শায়খ রহমানসহ জঙ্গি তত্পরতায় লিপ্ত ব্যক্তিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এটা অন্তত বলা যায়, এখানে জঙ্গিদের চেয়ে গণতন্ত্রের শক্তি এখনো বেশি। আত্মতৃপ্তির জন্য নয়, পরিস্থিতি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভের জন্যই এটা বলা দরকার।
কিন্তু এর পরও বলতে হয় যে বিশ্বের চোখে বাংলাদেশ এখনো ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে। ইংল্যান্ডের রয়েল কলেজ অব ডিফেন্স স্টাডিজের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ঢাকা সফরে এসেছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইংল্যান্ড-আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের বেসামরিক ও কর্নেল-ব্রিগেডিয়ার পদবির উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। গত ৩ অক্টোবর তাঁদের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের একটি সৌজন্য সাক্ষাত্ অনুষ্ঠানে আমি যাই। নানা কথার মধ্যে প্রতিনিধি দলের সদস্য একজন সেনাকর্মকর্তা জিজ্ঞেস করেন, বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্রের ব্যাপারে আমরা কতটা উদ্বিগ্ন? বলার অপেক্ষা রাখে না, বাইরে যে ধরনের আলোচনা রয়েছে, তার ভিত্তিতেই তিনি ওই প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সুষ্ঠু নির্বাচনের পর হয়তো এ প্রশ্নটি ওভাবে আসত না, যদি ২৬ ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় রক্তক্ষয়ী ঘটনা না ঘটত। এই হলো আমাদের গণতন্ত্রের সমস্যা। এখানে যেমন আছে সংসদ, তেমন আছে বর্জন। যেমন আছে ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করার গৌরব, তেমনি আবার আছে ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করি। কিন্তু তিনি সম্ভবত একটা ৫০: ৫০ হ্যাঁ-না মনোভাব নিয়ে গেছেন।
এটা ঠিক যে ২০০৬ সালের অক্টোবরে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পটভূমিতে এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল, সেটা গণতন্ত্রের আকাশে কালো মেঘ রূপেই আবির্ভূত হয়। কারণ, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা হবে কি না সে প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। সরাসরি সেনা হস্তক্ষেপের আশঙ্কা মূর্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিপদও পার হয়েছে বাংলাদেশ। এ সম্পর্কে এক-এগারোর তিন উদ্যোক্তার একজন লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর একটি সাক্ষাত্কার গত তিন অক্টোবর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়। এটি নেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অনলাইন পত্রিকা এন ওয়াই এবং কানাডা থেকে প্রকাশিত নতুন দেশে প্রচারিত সাক্ষাত্কার থেকে। সেখানে তিনি বলেন, ‘মার্শাল ল জারি করে দেশ শাসনের ইচ্ছার সাথে আমি কখনো একমত ছিলাম না। তা ছাড়া দেশে তো আমরা সামরিক শাসন জারি করিনি।’ সাক্ষাত্কারে আরও অনেক চমকপ্রদ কথা ছিল, কিন্তু পরে জেনারেল মাসুদ সাক্ষাত্কারের কথা অস্বীকার করেছেন বলে একটি পত্রিকায় জানানো হয়। যা হোক, আমরা একটি ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারি যে, ক্ষমতা দখলের কোনো বাস্তব উদ্যোগ তাঁদের ছিল না; বা থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় সেদিকে তাঁরা যাননি। আর সেটা যদি না হয়, তাহলে তো আমরা বলতে পারি, আমাদের গণতন্ত্র বেশ মজবুত, ভঙ্গুরের প্রশ্ন ওঠে না। আসলে গণতন্ত্রের পরীক্ষা হয় নির্বাচনে। গত ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে যে ৮৭ দশমিক ১৬ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে তাতে বোঝা যায়, আমাদের গণতন্ত্র ভাঙে তবু মচকায় না।
এখন সরকারি ও বিরোধী দলের কর্তব্য হবে, গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের সমর্থন আরও শক্তিশালী করা। মানুষের পাশে থাকা। তাহলে জঙ্গিবাদীরা দূরে সরে যেতে বাধ্য হবে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।

Tuesday, October 13, 2009

জেএমবির সাত জঙ্গি গ্রেপ্তার -নিরাপত্তা প্রশাসনে জঙ্গিবিষয়ক সেল দরকার

নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গিসংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) তথাকথিত রাজশাহী বিভাগীয় প্রধানসহ সাত জঙ্গির গ্রেপ্তার হওয়াটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর কৃতিত্বের পরিচায়ক। কিন্তু একই সঙ্গে জেএমবির কৌশলগত পরিবর্তনের দিকটি খুবই উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রক্ষমতায় মিত্র ও সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের অনুপস্থিতির কারণে তারা সামরিক দিকটি নিষ্ক্রিয় রেখে দাওয়াতি কার্যক্রমের দিকে ঝুঁকেছে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে নিরন্ন জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে আকৃষ্ট করতে তারা যে সফল হতে পারে, তার ধারণাও আমরা পাচ্ছি। কিন্তু মুশকিল হলো, রাজশাহীর পুলিশ প্রশাসনের কাছে এমন কোনো রক্ষাকবচ নেই, যার সাহায্যে তারা অব্যাহত ও কার্যকরভাবে জেএমবির ‘দাওয়াতি’ কৌশল মোকাবিলা করতে পারে।
আসল কথা হচ্ছে, সশস্ত্র জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় আঞ্চলিক পুলিশ প্রশাসনে উপযুক্ত সাংগঠনিক কাঠামোগত কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য, পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগসহ নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট নানা স্তরে ‘কমিউনিজম’ প্রতিরোধ বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বামপন্থীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে মান্ধাতার আমলের সাংগঠনিক অবকাঠামো এখনো বিদ্যমান। জাতীয় নিরাপত্তা প্রশাসন থেকে উত্তরাধিকারের এ ভূত অবিলম্বে তাড়াতে হবে। আমাদের জাতীয় জীবনে জঙ্গিবাদের হুমকি এখনো প্রবল। হয়তো এ কথা সত্য, জঙ্গিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বর্তমানে খুব বেশি সংগঠিত পর্যায়ে নেই। কিন্তু তাই বলে কোনোক্রমেই অসতর্ক বা শিথিল মনোভাব পোষণের সুযোগ নেই। ধর্মভিত্তিক সশস্ত্র জঙ্গিবাদ এমন এক দুরারোগ্য ব্যাধি, যার পুনরুত্থানের আশঙ্কাকে খাটো করে দেখা যায় না। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারে আমাদের অনেকেরই ক্লান্তি নেই। সে কারণে জেএমবির কথিত সামরিক শাখার কার্যক্রম সীমিত করে দাওয়াতি কাজ বাড়ানোর বিষয়টি প্রতিহত করতে নিরাপত্তা প্রশাসনকে উপযুক্তরূপে ঢেলে সাজাতে হবে।
বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলটির দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। বাংলা ভাই, শায়খ রহমানদের আবির্ভাব যে এলাকায়, সেখানে গত ১০ মাসে একটি ডাকাতিও হয়নি, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে কেউ কাউকে খুন করেনি—এ তথ্য গতকাল প্রথম আলোকে জানালেন রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার এ এফ এম মাসুম রব্বানী। রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ শান্তিপ্রিয় এবং তাদের অনগ্রসর অংশকে আকৃষ্ট করতে জঙ্গিরা সহজে সফল হতে পারে। এ দিকটি উপযুক্তরূপে মোকাবিলা করতে এখনই জুতসই কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। তিনি আমাদের সঙ্গে একমত হন, জাতীয় নিরাপত্তা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জঙ্গিবাদ প্রতিহত করতে অনতিবিলম্বে বিশেষ সেল গঠন করতে হবে। আঞ্চলিক পুলিশেও তা থাকতে হবে এবং এর একটা সমন্বিত রূপ অবশ্যই থাকা দরকার। দীর্ঘদিন চরমপন্থী দমনকাজে অভিজ্ঞ ওই পুলিশ সুপারের কথায়, এ ধরনের উদ্যোগের দ্রুত বাস্তবায়ন অপরিহার্য। জঙ্গি দমনসংক্রান্ত ওই প্রস্তাবিত সেল স্বতন্ত্রভাবে কাজ করবে এবং জঙ্গিবিষয়ক গবেষণা ও তথ্যের আদান-প্রদান নিশ্চিত করবে। মনে রাখতে হবে, জঙ্গিবাদ এমন এক ব্যাধি, তা কেবল ধরপাকড় ও আস্তানা গুঁড়িয়ে নিঃশেষ করা যাবে না। বর্তমানের নিস্তেজ জেএমবিকে খাটো করে দেখা ঠিক

Monday, October 5, 2009

দিল্লির চিঠি -জঙ্গি তত্পরতা ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক by কুলদীপ নায়ার

স্বাধীনতার প্রায় ৩৮ বছর হয়ে গেল, কিন্তু অপ্রতুল সম্পদ আর অধিক জনসংখ্যার কারণে বাংলাদেশ এখনো ‘সোনার বাংলা’ হয়ে উঠতে পারেনি। ধারাবাহিকভাবে দেশটির মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ভর করেছে।
প্রথম আঘাতটি আসে স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন স্বাপ্নিক এই মানুষটির প্রতি জনগণের আস্থা ছিল। তাঁর কথায় জনগণ যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত ছিল। দ্বিতীয় আঘাতটি আসে সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে। এর ফলে মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। সামরিক শাসনের ফলে উদারপন্থীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় এবং মুক্তচিন্তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। সে জায়গায় বলপ্রয়োগ, ধর্মান্ধতা ও সংঘাতের সংস্কৃতি এসে জুড়ে বসে।
বাংলাদেশ মুখোমুখি হয়েছে একাধিক সামরিক ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনামলের। এর পর ঘুরেফিরে দুই নারীর শাসনকালই চলছে—হয় আওয়ামী লাগের শেখ হাসিনা অথবা বিএনপির খালেদা জিয়া। জনগণ আবার শিকড়ে ফিরে গেছে এবং দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতার কন্যা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। বাংলাদেশের উন্নতির জন্য প্রয়োজন ঐক্য। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সংসদ বর্জন অব্যাহত রাখায় রাজনৈতিক ঐক্যের কোনো সুবাতাস পাওয়া যাচ্ছে না।
চলমান কিছু ঘটনা দেশটির জন্য হুমকিস্বরূপ। ইসলামি মৌলবাদ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এরা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে এবং বিপ্লবের ডাক দিয়ে যাচ্ছে। জিহাদিরা সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। বাংলা ভাই এবং তাঁর আট মৌলবাদী সহযোগীকে ফাঁসি দেওয়ার পর কোনো বিক্ষোভ হয়নি, যা একটি ভালো লক্ষণ। বাংলা ভাই ধর্মীয় নেতার বদলে একজন সন্ত্রাসী-খুনি হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। দেশের আলেম সম্প্রদায়ও এঁদের ফাঁসি হওয়ায় স্বস্তি বোধ করেছিল।
বিএনপির সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদীরা যেভাবে হাত মিলিয়েছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে তারা ধর্ম ও রাজনীতিকে একাকার করে দেখতে আগ্রহী। এই জোটে অন্তর্ভুক্ত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধকে মেনে নিয়েছে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ যদিও উদারপন্থী, কিন্তু আওয়ামী লীগের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে ধর্মীয় মৌলবাদীরা সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
বাংলাদেশে আরেকটি নেতিবাচক প্রবণতা হচ্ছে, হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করতে গিয়ে তাদের কাছে সীমান্ত এলাকা মোটেও গুরুত্ব পায়নি। ফলে ভারত, শ্রীলঙ্কা এমনকি মিয়ানমারের বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে দেশটি। এরা বাংলাদেশ থেকে তাদের কার্যক্রম চালায় এবং এটাকেই নিরাপদ আস্তানা মনে করে। এদের মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা), দ্য লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই)—এমন আরও অনেক চরমপন্থী দল।
সম্প্রতি দিল্লিতে এক বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণার কাছে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। দীপু মনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের মাটিতে কোনো সন্ত্রাসীকে জায়গা দেব না, তা সে যে ধর্ম-বর্ণেরই হোক না কেন। আমরা সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও মূলোত্পাটনের জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছি।’ তিনি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমনের একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
ওই বৈঠকে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়া এবং পাওয়ার গ্রিড সংযোগ স্থাপনে সহায়তাসহ ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত। (উল্লেখ্য, বাংলাদেশে চরম বিদ্যুত্সংকট বিদ্যমান।)
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে একটা যৌথ পরিকল্পনা বোর্ড কার্যকর ছিল। কীভাবে উভয় দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে, তার একটা খসড়াও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর থেকে এগুলো খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এটা সত্য যে ভারতের নানা সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। কিন্তু তার পরও ভারতের রয়েছে বৃহত্ অর্থনৈতিক ভিত্তি। ভারত যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার চেয়েও বেশি কিছু করার সামর্থ্য রয়েছে দেশটির। ভারত বেসরকারি কিছু বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উত্সাহী করতে পারে অথবা যৌথ মালিকানার কিছু প্রতিষ্ঠান স্থাপনেরও উদ্যোগ নিতে পারে। টাটার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারতের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি এবং তারা ভারতবিরোধিতার জিগির তুলতে ব্যস্ত ছিল। এখনো ওই প্রবণতা চলমান।
শেখ হাসিনা তাঁর আগের শাসনামলে ঠিকই বুঝেছিলেন যে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা খুব সহজ নয়, যখন উভয় দেশেই এদের পৃষ্ঠপোষক রয়েছে। জঙ্গিদের মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে তাদের আয় হয় প্রায় শত কোটি টাকা। দাগি আসামি, চোরাচালানি ও গোঁড়া ধর্মান্ধদের নেটওয়ার্ক ভাঙা খুব সহজ নয়, যখন অনেকেই রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তাদের ব্যবহার করে থাকে।
জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ অল্পবিস্তর যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, তার ফলে বিদ্যমান ভারতবিদ্বেষী মনোভাব চাঙা হতে পারে। পাকিস্তানবিদ্বেষী মনোভাব ভারতবিদ্বেষী মনোভাবে পরিণত হয়েছে—আজও বাংলাদেশকে এ অবস্থা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দেশ থেকে জঙ্গি তত্পরতা নির্মূল করতে ব্যর্থ হলে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হতে পারে— বাংলাদেশ নিশ্চয় এ বিষয়ে সজাগ।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থানই আসলে মূল উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশের সামর্থ্যের চেয়েও ভারত বেশি প্রত্যাশা করে। ভারত তার উত্তর-পশ্চিমাংশের রাজ্যে সহজে পৌঁছার জন্য ট্রানজিটসুবিধা পেতে এবং রপ্তানিসুবিধা বাড়ানোর জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে আগ্রহী। এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভারতের আগ্রাসন হিসেবে দেখে থাকে। এসব বিষয়ে আলোচনা অতীতে অনেক তিক্ততার জন্ম দিয়েছে। ভারতের কর্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করা যে তারা কী চাইছে এবং এতে বাংলাদেশের কী ধরনের লাভ হবে।
মণিপুর রাজ্যের বরাক উপত্যকায় টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বিষয়ে বাংলাদেশে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যদিও ভারত বলছে যে সেখানে পানির গতিপথ পরিবর্তন করা হবে না। এই শঙ্কা নিরসনের জন্য দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অকুস্থল পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না কেন? ফারাক্কা বাঁধ বিতর্ক থামানোর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বাঁধ নিয়ে আর কোনো ঝামেলায় জড়ানো উচিত হবে না।
ভারতকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে, কেন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। কোনো সন্দেহ নেই, ভারতের বিশাল আয়তন একটা ভয়ের কারণ। এর চেয়েও প্রতিবেশী দেশগুলোর আশঙ্কা হলো, ভারত বিশ্বের আরেকটা পরাশক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সত্যিকারের ভূমিকা নিয়ে শঙ্কার জন্ম হয়েছে।
ভারতের অবশ্যই আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। কারণ তা না হলে সব প্রতিবেশীর সঙ্গে তার খারাপ সম্পর্ক তৈরি হবে। সবার সন্দেহের চোখ তার দিকে। সুতরাং প্রতিবেশী দেশের উদ্বেগের বিষয়গুলো ভারতকে অবশ্যই দূর করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: ফিরোজ জামান চৌধুরী
কুলদীপ নায়ার: ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক

Friday, September 4, 2009

চরমপন্থীদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা আগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন

দেশের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানের কথা শোনা যাচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরে। এখন তাদের প্রতি আত্মসমর্পণের আহ্বান ও প্রয়োজনে সাধারণ ক্ষমার বিষয়টি বিবেচনা করারও ঘোষণা পাওয়া গেল স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থীদের তত্পরতা, অর্থাত্ খুনাখুনি, চাঁদাবাজি—এসব বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এমন পরিস্থিতিতে কার্যকর কিছু করা যে দরকার হয়ে পড়েছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। চরমপন্থীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা এর আগেও হয়েছে। আমরা মনে করি, বর্তমানে এ ধরনের কিছু করার ক্ষেত্রে আগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
আওয়ামী লীগ গত মেয়াদে যখন ক্ষমতাসীন ছিল, তখন মাওবাদী দাবিদার ও সাধারণভাবে চরমপন্থী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৯ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে আড়াই হাজারের বেশি চরমপন্থী আত্মসমর্পণ করেছিল। অস্ত্র জমা পড়েছিল দুই হাজার ৭৭টি। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে ৭৮০ জনকে আনসারে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। উদ্যোগটি ভালো ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু সফল যে হয়নি, তার প্রমাণ চরমপন্থীদের বর্তমান তত্পরতা। সরকার যদি আন্তরিকভাবে এই সমস্যার একটি সমাধান চায়, তাহলে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পাশাপাশি আরও কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে।
সমাজের শোষিত শ্রেণীর অধিকার রক্ষায় শ্রেণীশত্রু খতম ও সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক স্লোগান নিয়ে একসময় এ ধারার রাজনীতির সূচনা হলেও বর্তমানে তা স্রেফ চাঁদাবাজির রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। আর চাঁদাবাজির কর্তৃত্ব এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে ঘটে চলেছে খুনাখুনির ঘটনা। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের মূলধারার বড় বড় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা চরমপন্থী হিসেবে পরিচয় পাওয়া এই গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে আসছেন নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে—কখনো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে, কখনো নির্বাচনে জিততে, কখনো এলাকায় নিজের ক্ষমতা, প্রভাব ও শক্তি ধরে রাখতে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনেক স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে চরমপন্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও তাদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। চরমপন্থীদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কখনো সফল হবে না। সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই প্রথম এ ব্যাপারে তাদের সদিচ্ছার প্রমাণ রাখতে হবে। আওয়ামী লীগকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের দলের কোনো নেতা চরমপন্থীদের নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও ব্যবহার করবেন না। এই বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে বাকি কাজ অনেক সহজ হয়ে আসবে।
আগেরবার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর যাদের আনসারে চাকরি দেওয়া হয়েছিল, পরে তাদের মধ্যে ১৩৭ জন বিভিন্ন সময় চাকরি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তাদের অনেকেই আবার চরমপন্থী দলের সঙ্গে জড়িত হয়েছে বলে জানা গেছে। বোঝা যায় যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা ও কয়েকজনের চাকরি দিয়েই সরকার তার দায়িত্ব শেষ বলে মনে করেছিল। বিষয়টির যে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে, সে বিবেচনা ছিল বলে মনে হয় না।
আমরা চরমপন্থীদের সাধারণ ক্ষমা বা এ ধরনের যেকোনো উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই। তবে এর আগে দেশের মূল রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের স্বার্থে চরমপন্থীদের ব্যবহার না করার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা এবং তারা যাতে কোনো হতাশা থেকে আবার চরমপন্থার পথে ফিরে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই কেবল সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ সফল হতে পারে।