Saturday, June 21, 2025

ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ, ছবি

যুদ্ধের ভয়ে তেহরান ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে পৌঁছেছেন ৫৮ বছর বয়সী মোহরান আতেই ও তাঁর ২৭ বছর বয়সী কন্যা লিডা পোরমোমেন। ১৯ জুন
যুদ্ধের ভয়ে তেহরান ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে পৌঁছেছেন ৫৮ বছর বয়সী মোহরান আতেই ও তাঁর ২৭ বছর বয়সী কন্যা লিডা পোরমোমেন। ১৯ জুন। ছবি: এএফপি

উত্তর-পূর্ব তুরস্কের রাজি-কাপিকোয় সীমান্ত পেরিয়ে অসংখ্য ইরানি তুরস্কে পৌঁছেছেন। ১৯ জুন
উত্তর-পূর্ব তুরস্কের রাজি-কাপিকোয় সীমান্ত পেরিয়ে অসংখ্য ইরানি তুরস্কে পৌঁছেছেন। ১৯ জুন। ছবি: এএফপি

ইরানের রাজধানী তেহরানে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিংয়ের (আইআরআইবি) ভবনে হামলা চালায় ইসরায়েল। ১৯ জুন
ইরানের রাজধানী তেহরানে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিংয়ের (আইআরআইবি) ভবনে হামলা চালায় ইসরায়েল। ১৯ জুন। ছবি: এএফপি

তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে প্রায় সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। ১৬ জুন
তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে প্রায় সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। ১৬ জুন। ছবি: এএফপি

উত্তর-পূর্ব তুরস্কের রাজি-কাপিকোয় সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে ঢোকার অপেক্ষায় ইরানি নাগরিকদের নিয়ে বাসের সারি। ১৯ জুন
উত্তর-পূর্ব তুরস্কের রাজি-কাপিকোয় সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে ঢোকার অপেক্ষায় ইরানি নাগরিকদের নিয়ে বাসের সারি। ১৯ জুন। ছবি: এএফপি

সংঘাতের আতঙ্কে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। ১৬ জুন
সংঘাতের আতঙ্কে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। ১৬ জুন। ছবি: এএফপি

ইরানের রাজধানী তেহরান ছাড়ছেন অনেক মানুষ। এ কারণে তেহরানের রাস্তায় তীব্র যানজট দেখা যাচ্ছে। ১৫ জুন
ইরানের রাজধানী তেহরান ছাড়ছেন অনেক মানুষ। এ কারণে তেহরানের রাস্তায় তীব্র যানজট দেখা যাচ্ছে। ১৫ জুন। ছবি: এএফপি


ইরানিদের জীবনযুদ্ধ, যে যুদ্ধে সাইরেন বাজে না by সুজন সুপান্থ

‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।’ আর যাঁরা বেঁচে যান? তাঁদের কাছে যুদ্ধ মানে আতঙ্ক, মৃত্যু, ধ্বংস, আহাজারি, পঙ্গুত্ব, খাদ্যসংকট, বিভীষিকা—মানুষের তৈরি সবচেয়ে ভয়াল সম্মেলন। এ সবকিছুর সঙ্গে সামলে নিতে তাঁদের প্রতিনিয়ত পরিস্থিতির সঙ্গে, নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলতে হয়। তার মানে রাজায় রাজায় যুদ্ধের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও একধরনের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোনো সাইরেন বাজানো হয় না।

ঠিক তেমনি ইসরায়েল আগ্রাসন চালানোর পর থেকে ইরানে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষদের জীবনে নেমে এসেছে ভয় ও অনিশ্চয়তা। সংঘাত শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সাধারণ ইরানিদের বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট ও মুঠোফোন নেটওয়ার্ক বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে, বাজার প্রায় বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কে তেহরান ছাড়ছেন অনেকে। এ ছাড়া প্রতিদিন আরও নানা ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে ইরানিদের।

ধ্বংস ও হতাশা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে বলা হয়েছিল ‘আ ওয়ার টু এন্ড অল ওয়ারস’। কিন্তু সব যুদ্ধ শেষ করার জন্য এই যুদ্ধ হলেও ২০ বছর পেরোতে না পেরোতেই আবার যুদ্ধ দেখেছে বিশ্ববাসী। তার মানে, যুদ্ধ চলতেই থাকবে। যাঁরা যুদ্ধে গেলেন, যাঁরা ঘরে অপেক্ষা করলেন—সবাই যুদ্ধের ভেতর আরেক ভয়ংকর যুদ্ধ করে চলেছেন। নেটফ্লিক্সে ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’ নামে একটি ওয়েব সিরিজ আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় তৈরি এই সিরিজে বার্মিংহাম শহরকে দেখানো হয়েছে। এই গল্পের নায়ক যুদ্ধ শেষের একজন সৈনিক। তিনি প্রতি রাতে ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেন, যেন এখনো বাংকারে শুয়ে আছেন। তাঁর বন্ধুও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেঁচে ফিরে এসেছেন। মাঝে মাঝেই এই বন্ধু হিংসাত্মক হয়ে যান। সে সময় সামনে যাকে পান, তাঁকেই মেরে ফেলতে চান।

বৃহস্পতিবার সিএনএনকে ঠিক একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ইরানের ২৭ বছর বয়সী এক সেনাসদস্য। সামরিক শৃঙ্খলার কারণে তেহরানে তিনি ফোন বা অন্য কোনো ডিভাইস ব্যবহার করতে পারেন না। তিনি বলেছেন, ‘মনে হয় যেন একটা ক্ষেপণাস্ত্র আমার পিছু নিয়েছে। আমি কারাজ যাই, ওরা সেখানে বোমা মারে। তেহরানে ফিরি, ওরা এখানেও আঘাত হানে।’

দক্ষিণ ইরানের শিরাজ শহরে একটি সেলুনে কাজ করা একজন নারী বলেন, ‘আমি জানি না কী বলব! ভিডিও, ছবি দেখুন—মানুষ মারা যাচ্ছে, আমাদের দেশ লুটপাট হচ্ছে, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’

তেহরানের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে থাকা ২২ বছর বয়সী একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, ‘এত ধ্বংস মেরামত করতে দশক লেগে যাবে, তা–ও যদি সম্ভব হয়। আর এ খরচটা আমাদেরই বহন করতে হবে।’

অর্থের সংকট

সিএনএনের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতকালীন অদ্ভুতভাবে চলছে ইরানিদের জীবন। পাড়ায় পাড়ায় দোকানপাট এখনো খোলা থাকলেও অনেকেই খরচ করছেন বাকিতে বা ঋণে। ব্যাংকগুলো থেকে চাহিদামতো নগদ অর্থ তোলা সম্ভব না হওয়ায় এই ঋণই এখন তাঁদের ভরসা।

নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের এক ব্যক্তি বলেছেন, ব্যাংক থেকে রিয়াল তোলা সম্ভব না হওয়ায় এখন ঋণের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। তাঁদের বিদ্যুৎ আছে। কিন্তু পেট্রল কোনো কাজে লাগছে না। কারণ, তেহরানের বাইরে যাওয়ার মতো তাঁদের কোনো জায়গা নেই।

শিরাজ শহরের ৫৫ বছর বয়সী একজন শিক্ষক বলেন, নগর কেন্দ্রের একটি ব্যাংকে শাখার সামনে ‘রিয়াল তোলার জন্য মানুষের বিশাল সারি’ দেখা গেছে। এসব নগদ অর্থ তোলার অনুরোধ সামাল দিতে ব্যাংকের কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছিলেন। আতঙ্ক থেকেই মানুষ এসব করছে।

ফাঁকা দোকান, আতঙ্কিত হৃদয়

যেকোনো যুদ্ধ বা সংঘাতের বাড়তি চাপ বহন করতে হয় সাধারণ মানুষদের। বৃহস্পতিবার দ্য ইনডিপেনডেন্টকে উত্তর-পূর্ব তেহরানের একজন স্থানীয় খাবার বিক্রেতা বলেছেন, ‘মানুষের মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। আর যাঁদের হাতে সামান্য অর্থ আছে, তাঁরা এই কয়েক দিনেই কয়েক বছরের বুড়ো হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, দোকানগুলো থেকে বোতলজাত পানি ও প্যাকেটজাত খাবার দ্রুতই বিক্রি হয়ে গেছে। যারা কিনতে পারেনি, তারা এখন গভীর মানসিক ও আর্থিক চাপে আছে।

এই খাবার বিক্রেতা আরও বলেন, ‘যুদ্ধ শুধু বোমা আর ড্রোন দিয়ে মানুষকে আঘাত করে না। এটা মানসিক স্বাস্থ্যও ধ্বংস করে দেয়। প্রতিটি বিস্ফোরণে কতজন হার্ট অ্যাটাক বা নার্ভাস ব্রেকডাউনে আক্রান্ত হয়, কেউ জানে না। সরকার এসবের কোনো দায় নেবে না, কিন্তু আমরা আমাদের চোখে এসব দেখছি।’

দ্য ইনডিপেনডেন্টের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে জানিয়েছেন, দোকানগুলো থেকে বিস্কুটের মতো হালকা খাবারও শেষ হয়ে গেছে। দক্ষিণ তেহরানের মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি বলেন, কয়েকটি দোকান ঘুরে তিনি কেবল দুটি মুরগি কিনতে পেরেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি খাবার দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ যুদ্ধকে এখন গায়ে লেগে থাকা বাস্তবতা হিসেবে অনুভব করছে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ

দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ জুন তেহরানের আলাদ্দিন মলে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে দিচ্ছেন। আবার এই দোকান খুলতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে তাঁরা জানেন না।

এই দৃশ্য শুধু আলাদ্দিন মলের নয়; তেহরানের পূর্ব থেকে পশ্চিম এবং অন্যান্য শহরের শপিং সেন্টারগুলোরও একই অবস্থা। ফারজাম স্ট্রিটের কাছে একজন পোশাক বিক্রেতা বলেন, ‘প্রায় সবাই দোকান বন্ধ করে ফেলেছে। কেউ কেউ শুধু দিনে অন্তত একটা পণ্য বিক্রির আশায় দোকান খোলা রাখছে। কারণ, কিছু বিক্রি না হলে রাতে হয়তো রুটি জুটবে না।’

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত শুরুর আগে থেকেই মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও করের চাপে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা হিমশিম খাচ্ছিলেন। এখন এই সংঘাত সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, তাঁর পাশের দোকানদার কয়েকজনের কাছ থেকে ধার করে ১০ লাখ তুমান (রিয়ালের একক) জোগাড় করেছেন কেবল খাবার কিনে রাখার জন্য। এই অর্থ হয়তো তিনি শোধও করতে পারবেন না।

বাড়ছে ভয়

ইরানে বোমা থেকে বাঁচার জন্য নির্ধারিত কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। ১৫ জুন শহর কর্তৃপক্ষ মেট্রোরেল স্টেশনগুলোকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খুলে দিয়েছে এবং মানুষকে মসজিদে যেতে বলেছে। যদিও এসব ভূমি-উপরস্থ আশ্রয়কেন্দ্র কতটা সুরক্ষা দিতে পারে, তা অনিশ্চিত। দ্য ইনডিপেনডেন্টের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এর এক দিন পর ১৬ জুন সকালে তেহরানের মেট্রো স্টেশন বন্ধ দেখা গেছে। আর স্টেশনের বাইরে ছিল আতঙ্কিত মানুষদের ভিড়।

ইস্পাহানসহ অন্যান্য শহরেও একই অবস্থা। চার দশক আগের যুদ্ধের পরও কেন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়নি—এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে মানুষের মনে।

তেহরান সিটি কাউন্সিলের প্রধান মেহেদি চামরান বলেন, ‘আমাদের এখনো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। এমনকি ১৯৮০–এর যুদ্ধেও যথাযথ অভিজ্ঞতা ছিল না।’

এসব কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে গ্লাস যেন না ভাঙে, এ কারণে জানালায় ক্রস আকৃতি করে টেপ লাগিয়ে দিচ্ছেন। তেহরানের নাজাফাবাদ এলাকার ৬০ বছর বয়সী এক নারী বলেন, ‘আমার মানসিক অসুস্থতা আছে। বিস্ফোরণের প্রতিটি শব্দে মনে হয়, আমার জীবনের অর্ধেকটা ঝরে যাচ্ছে।’ এই নারী আরও বলেন, তাঁর ৮৭ বছর বয়সী বাবাও ভয় চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিস্ফোরণের শব্দে তিনিও গভীরভাবে বিচলিত হন।

ইন্টারনেট সেবা বিঘ্নিত

ইসরায়েলি হামলার কারণে অনেক ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। এ কারণে ইন্টারনেট ও মুঠোফোন নেটওয়ার্ক বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

দেশটির উপযোগাযোগমন্ত্রী এক্সে বলেছেন, ‘আমরা চাই ইন্টারনেট থাকুক, কিন্তু এটা আমাদের হাতে নেই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ইরানিপ্রবাসী বলেন, ‘আমার বাড়ির কাছে হামলা হয়েছিল। আমি পারিবারিক গ্রুপে খুদে বার্তা দিয়েছিলাম, কিন্তু সেটা পৌঁছায়নি। তিন ঘণ্টা কোনো উত্তর পাইনি। পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।’

তেহরান ছাড়ছে মানুষ

বিবিসির মঙ্গলবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের কারণে আতঙ্কে ইরানের রাজধানী ছেড়ে চলে যাচ্ছে মানুষ। অধিকাংশই গাড়িতে, কেউ মোটরসাইকেল আর কেউবা হেঁটেই নিরুদ্দেশের দিকে যাত্রা করেছেন। পেট্রলপাম্পগুলোয়ও গাদাগাদি ভিড়। কোথাও তিলধারণের জায়গা নেই।

দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তে তেহরানবাসীর লম্বা সারি দেখা গেছে। বিশেষ করে তুরস্কগামী বাজারগানে। উড়োজাহাজ বন্ধ। তাই মানুষ গাড়ি বা বাসের ওপর নির্ভর করছে।

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়তো একদিন থেমে যায়। কিন্তু এই সংঘাতেই শুরু হওয়া সাধারণের জীবনের ছোট ছোট যুদ্ধ কিছুতেই শেষ হয় না। মূল যুদ্ধ শেষে তাঁদের শুরু হয় বেঁচে থাকার নতুন আরেক যুদ্ধ।

তথ্যসূত্র: সিএনএন, দ্য ইনডিপেনডেন্ট বিবিসি

তেহরানে ইসরায়েলি হামলা চলার সময়কার ছবি
তেহরানে ইসরায়েলি হামলা চলার সময়কার ছবি। ছবি: এক্স থেকে

ট্রাম্পের হম্বিতম্বির নেপথ্যে কী

সময় যত গড়াচ্ছে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত তীব্র হচ্ছে। ইসরায়েলি বিমান হামলায় আক্রান্ত হচ্ছে ইরানের নতুন নতুন শহর। তেমনি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়চ্ছে ইরান। জ্বলছে ইসরায়েলের তেলক্ষেত্র, গবেষণাগার, সামরিক স্থাপনাসহ আবাসিক এলাকা। দুই পক্ষের সংঘাতে বিশ্বও দ্বিধাবিভক্ত। তবে সবাই একমত, সংঘাত বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সর্বাত্মক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এমন পরিস্থিতিতেও খেলো করে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ভাষ্য, তিনি চাইলেই সব সমস্যা সমাধান করে দিতে পারেন। ইরানকে দমানো বা কোণঠাসা করার মাধ্যমেই সংঘাত বন্ধের হুঁশিয়ারি তার। অথচ ইসরায়েলের আগ্রাসনবাদের প্রশ্ন ট্রাম্প উড়িয়ে দিচ্ছেন।

বিশ্ব পরিস্থিতি বলছে, ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রক। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তার প্রক্সি বাহিনী মার্কিনিদের দিশেহারা করে তুলতে সক্ষম। এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের নিবিড় সম্পর্ক থাকায় ট্রাম্পের দমন-নীতি বাস্তবায়ন ততটা সহজ নয়। তবু ট্রাম্পের হম্বিতম্বির নেপথ্যে কী?

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসলে ট্রাম্প কৃতিত্ব নিতে চান। তিনি এ নিয়ে কথা বলতেও উপভোগ করেন। তার মনোভাব হলো, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির আলোচনায় ইউরোপের কোনো ভূমিকা নেই। যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশেষ করে ট্রাম্প নিজেই এ সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম।

ট্রাম্পের বিবৃতিই এই বিষয়ে তার আরও শক্তিশালী অবস্থানের প্রতিফলন। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে বিমান হামলায় যোগ দেবেন কি না, এ সিদ্ধান্ত তিনি এখনও নেননি। তবে যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন; তিনি বলেছেন, ‘একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পছন্দ করি না।’ তার মনে, ইরানের বিষয়ে খুব দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ধারে কাছে ইরান, তার প্রক্সি বাহিনী বা মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত চেষ্টা টিকবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ মনোতুষ্টি নিছক হেলাফেলা নয়। তিনি ভালো করেই জানেন, আমেরিকা এই অঞ্চলের কমপক্ষে ১৯টি স্থানে স্থায়ী এবং অস্থায়ী উভয় ধরনের সামরিক ঘাঁটির একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। এর মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি বাহরাইন, মিশর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত।

এই অঞ্চলে তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি রয়েছে কাতারে। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা রয়েছে। এখানে অন্তত ১০০ যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ড্রোন, বোম্বারসহ উন্নত যুদ্ধযান সক্রিয়। ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানে যুদ্ধের সময় এ ঘাঁটি কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টারের কাজ করে।

এ ছাড়া ইরাক, সিরিয়া, বাহরাইন, ওমান, তুরস্কে মার্কিন ঘাঁটি আছে। এসব ঘাঁটিতে সাধারণ সময়ে প্রায় ৪০-৫০ হাজার মার্কিন সেনা থাকে। তবে বড় কোনো অভিযানের সময়ে তা কয়েকগুণ বাড়ানো হয়। যেমন, ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার পর ২০০৭ সালের মধ্যে এসব ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি।

এসব ঘাঁটি থেকে সহজেই ইরানে হামলা করা সম্ভব। এ ছাড়া কোনো মুসলিম দেশ ট্রাম্পের বিরোধিতা করলে তাদের আক্রমণ করাও সহজ। আর সেজন্যই ঘাঁটি সক্রিয় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি মার্কিন নৌবাহিনীর নতুন ও বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড ভূমধ্যসাগরে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। শিগগির তা ইরানের দিকে যাত্রা করবে। এ ছাড়া বাইরে থেকে আরও রণতরী আনা হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত সংঘাত শুরু হলে সেসব রণতরী থেকে ঘাঁটিগুলোকে প্রয়োজনীয় সাহায্যের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

পেশিশক্তিতে বিশ্বাসী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, চলমান যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানের চেয়ে ভালো করছে। ইসরায়েল যখন জয়ের পথে থাকে, তখন তাদের থামানো কঠিন হয়ে পড়ে। ইসরায়েল খুব ভালো করছে যুদ্ধে, আর ইরান তুলনামূলকভাবে কম সফল।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয়, তেল আবিবের সামরিক অভিযানের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন অব্যাহত রয়েছে। যাই হোক না কেন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে একা ছেড়ে যাবে না। 

তেলআবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। ছবি : সংগৃহীত
তেলআবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। ছবি : সংগৃহীত

এসব কি যুদ্ধাপরাধ নয়? by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

ইসরাইলের বিরশেভায় একটি হাসপাতালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হলো খবর। একে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলো। পশ্চিমা মিডিয়া এ বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে খবর প্রচার করেছে। অবশ্যই হাসপাতালে বোমা হামলা বা যেকোনো হামলা নিন্দনীয়। তবে একখানা কথা আছে। ইরানে আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরাইল। নজর দিতে চাই ২০শে জুন তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলুতে। সেখানে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে  শুক্রবার শুরুর দিকে তেহরানে আরও একটি হাসপাতালে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এ নিয়ে রাজধানী শহরে মোট ৩টি হাসপাতালে হামলা চালালো ইসরাইল। শুক্রবারের হামলায় ৬টি অ্যাম্বুলেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থাপনার বড় রকমের ক্ষতি হয়েছে। মেডিসিন সান ফ্রন্টিয়ার্সের মতে, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পর্যায়ক্রমিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।

জাতিসংঘে মানবাধিকার বিষয়ক সমন্বয়কের অফিসের (ওসিএইচএ) তথ্যমতে, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৭টি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত আংশিক কার্যকর ছিল। অন্য ১৯টি বন্ধ হয়ে গেছে। এ সময়ে হত্যা করা হয়েছে কমপক্ষে এক হাজার স্বাস্থ্যকর্মীকে। ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে সব মেডিকেল স্থাপনা, মসজিদ, স্কুল কলেজ, আশ্রয়শিবির, অনাহারী মানুষ খাদ্য সংগ্রহ করতে গেলে তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলা হচ্ছে। এটা করছে ইসরাইল। এখন যদি প্রশ্ন তোলা হয় ইসরাইলের এসব কর্মকাণ্ড কি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়? এসব কি যুদ্ধাপরাধ নয়? ঠুটো জগন্নাথের মতো জাতিসংঘ শুধু বক্তব্য, বিবৃতি দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করছে। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট, হামাসের একজন নেতাকে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তা সত্ত্বেও তিনি হাঙ্গেরি সফর করেছেন।

সেক্ষেত্রে বিশ্ববাসীর ভূমিকা কী? জাতিসংঘের ভূমিকা কি? ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের যেসব ফিরিস্তি দিলাম তাতে, তাদেরকে যুদ্ধাপরাধী বলবেন না আপনি? উল্টো তারা যখন ইরানে হাসপাতালে হামলা চালালো, নিরীহ মানুষকে হত্যা করলো তাকে ন্যায়বিচারের কোন পাল্লায় পরিমাপ করবেন। ইরানের হাসপাতাল আক্রান্ত হওয়ারও পরে ইসরাইলে হামলা হয়েছে, বীরশেভায় হাসপাতাল আক্রান্ত হয়েছে। তাহলে ইসরাইলের হামলাকে যদি আপনি যুদ্ধাপরাধ না বলেন, তবে কেন ইরানের পাল্টা আঘাত হবে যুদ্ধাপরাধ? শক্তিধরের জন্য এক নিয়ম। দুর্বলের জন্য আরেক নিয়ম। যতদিন বিশ্বে এই বিভাজন মানবজাতিকে ভাগ করে রাখবে ততদিন এই সংঘাত চলতেই থাকবে। আজ এখানে, কাল ওখানে।  

এ জন্যই মধ্যপ্রাচ্যের বাতাস ভরে গেছে বারুদের গন্ধে। আগ্রাসনের শিকার ইরান। ইরান এবং ইসরাইলের মাঝখানে দুটি দেশ। সিরিয়া ও জর্ডান। তাদেরকে অতিক্রম করে ইরানে নৃশংস হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। তবুও বিশ্বের তাবৎ মোড়লদের অবস্থান ইসরাইলের পক্ষে। তাদের অভিযোগ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। তারা ওই অঞ্চলে হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুতিদের মতো সংগঠনকে মদত দিয়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে ইরান বার বার বলে যাচ্ছে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যবহারের জন্য। তা সত্ত্বেও সেখানে প্রতিক্ষণ ইসরাইলি যুদ্ধবিমান থেকে বোমা ফেলা হচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে এসে পড়ছে। এই সংঘর্ষ ক্রমশ এক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই যুদ্ধে একটু একটু করে জড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো— যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়রা। এই মুহূর্তে গোটা বিশ্ব এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যার ফলাফল হতে পারে বিস্ময়কর কিংবা ধ্বংসাত্মক। এখানে আমরা পর্যবেক্ষণ করব এই সংকটের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষগুলোর অবস্থান, হুমকি, উদ্যোগ এবং সম্ভাব্য সমঝোতা প্রক্রিয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ প্রস্তুতি: ইসরাইলের প্রতি দীর্ঘদিনের সমর্থনের ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধ সাজে সজ্জিত। দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ— ইউএসএস নিমিটজু এবং ইউএসএস কার্ল ভিনসন— মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে। পেন্টাগনের তরফে জানানো হয়েছে, এই প্রস্তুতি প্রতিরোধের জন্য। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন— এটি পূর্ণাঙ্গ হামলার প্রস্তুতি নির্দেশ করে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান যদি সরাসরি ইসরাইল আক্রমণ করে, তবে আমরা নিরব থাকবো না। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন ড্রোন, ফাইটার জেট ও ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম ইতিমধ্যেই প্রতিরক্ষার নামে আক্রমণাত্মক মোড় নিচ্ছে। এর পাশাপাশি সাইবার যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ ‘অ্যাক্টিভেশন’ রীতিমতো ইরানকে অস্থির করে তুলেছে। তবে এখনও ঘোষণা দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধে যোগ দেয়ার অনুমোদন দিয়েছেন। তবে সিদ্ধান্ত দেননি। তিনি ইরানকে আপস করার জন্য দুই সপ্তাহ সময় দিয়েছেন।

রাশিয়ার হুঁশিয়ারি: রাশিয়া দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র। ইরানের পক্ষ নিয়ে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ একাধিকবার বলেছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হলে রাশিয়া চুপ থাকবে না। মস্কোর মতে, এই যুদ্ধে ইরানকে দুর্বল করা মানেই সিরিয়া, লেবানন ও দক্ষিণ ককেশাসে পশ্চিমা আধিপত্য বিস্তার। রুশ প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আলেক্সেই ঝুরাভলেভ একধাপ এগিয়ে বলেছেন, ইরান যদি বিপর্যস্ত হয়, তাহলে আমরা তাকেও অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দেব। আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা সেই পরিসরে জড়িত। ক্রেমলিনের সাম্প্রতিক ইরান-রাশিয়া চুক্তি নবায়ন কৌশলগত বার্তা দেয় যে, যুদ্ধের ছায়া যদি রাশিয়ার প্রভাবিত অঞ্চলে পড়ে, সেক্ষেত্রে মস্কো সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।

চীনের প্রতিক্রিয়া: চীনের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ আসে ইরান থেকে। তারাও এই উত্তেজনায় শঙ্কিত। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার বলেছে, এ যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারকে ধ্বংস করবে। চীন দ্বিপক্ষীয় শান্তি প্রতিষ্ঠায় একাধিক বৈঠক আয়োজন করেছে, যার একটি অনুষ্ঠিত হয়েছে কাতারে, আরেকটি ভিডিও কনফারেন্সে রিয়াদ ও তেহরানের প্রতিনিধিদের নিয়ে। চীন সরাসরি কোনো পক্ষ না নিলেও ইসরাইলকে সতর্ক করেছে যুদ্ধ থামাতে, এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছে উস্কানিমূলক নীতি এড়াতে। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, এই সংঘাত বন্ধ করা এখন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, যাতে জাতিসংঘও কার্যকরভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

তুরস্কের কূটনৈতিক উদ্যোগ: তুরস্কের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সংযোগস্থলে। তারা কূটনীতিতে সক্রিয়। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান এ পর্যন্ত দু’বার তেহরান সফর করেছেন এবং একবার ফোনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করে বলেছেন, এ যুদ্ধ মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামে পরিণত হতে পারে। তুরস্ক একটি সমঝোতা পরিকল্পনা জাতিসংঘ ও ওআইসি উভয়কে পাঠিয়েছে। এর মূল বিষয়: একমাস যুদ্ধবিরতি, এবং পরবর্তী বৈঠকে স্থায়ী শান্তি কাঠামো নির্ধারণ। তবে এরদোগানের ‘মুসলিম ঐক্যের ডাক’ আবারো ওয়াশিংটনের সন্দেহকে বাড়িয়েছে যে, তুরস্ক হয়তো রাশিয়া-চীন-পূর্ব এশিয়া জোটে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে।

হিজবুল্লাহর হুমকি: ইসরাইল মনে করছে হিজবুল্লাহর হুমকি বাস্তব। একাধিক ইসরাইলি শহরে বোমাশেল্টার প্রস্তুত করা হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে—ি হজবুল্লাহর প্রায় ৩০,০০০ রকেট এবং বহু সুড়ঙ্গ সিস্টেম যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। এটি একটি ‘মাল্টি-ফ্রন্ট ওয়ার’ এর ইঙ্গিত দেয়।

সমঝোতা প্রক্রিয়া: যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। কাতার, ওমান, চীন, তুরস্ক ও ফ্রান্স পৃথক পৃথকভাবে আলোচনা উদ্যোগে নিয়েছে। তবে এসব আলোচনা ‘শর্তহীন’ নয়। যুক্তরাষ্ট্র চায়— ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত করুক এবং হিজবুল্লাহ-হামাসকে ‘নিয়ন্ত্রণে’ আনুক। ইরান চায়— ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করুক এবং পশ্চিম তীর থেকে সেনা প্রত্যাহার করুক। এই ‘অচলাবস্থায়’ কূটনৈতিক চেষ্টা স্তব্ধ নয়, কিন্তু গতি নেই। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি তিনদফা শান্তি প্রস্তাব প্রস্তুত রয়েছে, কিন্তু তা এখনও কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেনি।

ইরানি নেতাদের প্রত্যয়: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সরাসরি বলেছেন, ইসরাইল ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের আমরা প্রতিরোধ করবো। তেহরানের পতন নয়, বরং জেরুজালেমের মুক্তিই আমাদের লক্ষ্য। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের মুখপাত্র জানান, আমরা সাইবার, ড্রোন, এবং ব্যালিস্টিক শক্তিতে শতভাগ প্রস্তুত। যদি আমাদের উপর হামলা হয়, তাহলে হাইফা, তেল আবিব এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলো অগ্নিগর্ভ হবে।

মৃত্যু যেখানে মধুর: একটি ফোনেই যুদ্ধ থামাতে পারে

ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা মজিদ ফারাহানি শুক্রবার সিএনএন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এই যুদ্ধ আজই শেষ হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি ইসরাইলি নেতাদের একটিমাত্র ফোন করে বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে বলেন, তাহলে কূটনৈতিক আলোচনার পথ আবার খুলে যাবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান সবসময় বেসামরিক সংলাপের পক্ষে। সেটা সরাসরি হোক কিংবা পরোক্ষভাবে— পদ্ধতিটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু বোমা পড়তে থাকলে আলোচনার কোনো মানে হয় না। ফারাহানি আবারও নিশ্চিত করেন যে, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ পুরোপুরি বন্ধ করবে না। তবে কিছুটা কমানো যেতে পারে, উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা বলেছি, থামাব না। কিন্তু হয়তো কমানো সম্ভব। এই মন্তব্য এমন এক সময় এসেছে, যখন ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় শক্তিগুলোও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে একত্র হয়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ শূন্যে নামিয়ে আনার অবস্থান গ্রহণ করেছে।

ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ক্রিস্টোফ লেমোইন শুক্রবার সিএনএন-কে বলেন, আমাদের অবস্থান খুব স্পষ্ট— শূন্য সমৃদ্ধিকরণ ছাড়া কোনো আলোচনায় আমরা যাব না। ওদিকে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানকে আলোচনার জন্য দুই সপ্তাহের সময় দেওয়ার ঘোষণা এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে একমাত্র আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। শুক্রবার জেনেভায় ইরান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধানের মধ্যে সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়— যা চলমান যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা।

সাম্প্রতিক বক্তব্য ও নীতিগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই ইরানকে সামরিকভাবে আক্রমণ করা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ সরাসরি হামলার পক্ষে, আবার কেউ কূটনীতির সুযোগ রেখে চলেছে। ফারাহানি বলেন, যদি আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়, তবে আমাদের অনেক বিকল্প আছে এবং সব বিকল্পই হাতে আছে।

মৃত্যু আমাদের জন্য মধুর
শুক্রবার তেহরানে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাজপথে নেমে আসে। সরকারি সমর্থনে আয়োজিত এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষজন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। সিএনএনের প্রতিনিধি জানান, লোকজন ইরান, ফিলিস্তিন ও হিজবুল্লাহর পতাকা নেড়ে এবং আমেরিকা ও ইসরাইলের পতাকা পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানায়। বিক্ষোভে বারবার ধ্বনিত হয় ‘ইসরাইল নিপাত যাক, আমেরিকা নিপাত যাক’। এক বিক্ষোভকারি সিএনএনকে বলেন, ‘ট্রাম্প, তুমি আমার নেতাকে হুমকি দিচ্ছ? তুমি কি জানো না যে আমার জাতি বিশ্বাস করে, মৃত্যুও আমাদের কাছে মধুর!’

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইসরায়েলের আগ্রাসন নিঃশর্তভাবে বন্ধ করাই এ সংঘাত বন্ধের একমাত্র উপায়।
শুক্রবার এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া পোস্টে পেজেশকিয়ান লিখেছেন, ‘আমরা সব সময় শান্তি ও স্থিতিশীলতা চেয়েছি। চলমান চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের অবসানের একমাত্র পথ হলো শত্রুর আগ্রাসন নিঃশর্তভাবে বন্ধ করা এবং জায়নিস্ট সন্ত্রাসীদের দুঃসাহসিক তৎপরতা চিরতরে বন্ধের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা।’ আল–জাজিরার খবরে বলা হয়, ইরানের প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসন যদি থামানো না হয়, তাহলে ইরান আরও কঠোর জবাব দেবে। সেই জবাব এমন হবে, যা আগ্রাসনকারীকে এ দেশের ওপর হামলার জন্য অনুতপ্ত করবে।

ইরানে হামলা: যুক্তরাষ্ট্র-জার্মানির অস্ত্র নিয়ে ১৪ কার্গো বিমান ইসরায়েলে

অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের চালান নিয়ে আরও কয়েকটি পরিবহন উড়োজাহাজ (কার্গো) গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলে পৌঁছেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ কথা জানিয়েছে। এসব অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি থেকে এসেছে বলে তুরস্কের সরকারি সংবাদমাধ্যম আনাদলু জানায়।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের হামলা শুরুর পর এ নিয়ে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ১৪টি কার্গো ইসরায়েলে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর ৮০০ কার্গো এ ধরনের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ইসরায়েলে এসেছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, অস্ত্রের এই সরবরাহ ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর আভিযানিক ধারাবাহিকতা জোরদার এবং এর সব ধরনের চাহিদা মেটানোর প্রচেষ্টারই অংশ। এটি যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন এবং প্রস্তুতি ও মজুত বাড়ানো, উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন এসব চালানে কী ধরনের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেনি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি কর্তৃপক্ষও এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

এমন সময় অস্ত্রের নতুন চালানের এ কথা জানিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, যখন মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে ইসরায়েলের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ‘অ্যারো’র ক্ষেপণাস্ত্রের (ইন্টারসেপ্টর) মজুত ফুরিয়ে আসছে। যদিও এ খবর নাকচ করে দিয়েছেন ইসরায়েলের কর্মকর্তারা।

ইসরায়েল ১৩ জুন ভোররাতে ইরানে নজিরবিহীন হামলা শুরু করে। জবাবে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে গত কয়েক দিনে ১৪ দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার কথা জানিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বেশির ভাগই আকাশে ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো নিয়ে চিন্তা

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠিয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে অবগত আছে এবং স্থল, সমুদ্র ও আকাশে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারে কাজ করছে।

গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি ইরান একই গতিতে আক্রমণ চালিয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ ছাড়া অথবা মার্কিন বাহিনীর ব্যাপক অংশগ্রহণ ছাড়া ইসরায়েল আর ১০-১২ দিন তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা মূল্যায়ন সম্পর্কে অবহিত এক ব্যক্তি এ তথ্য জানান।

উল্লিখিত ব্যক্তি জানান, চলতি সপ্তাহের শেষ দিক থেকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হয়তো কমসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে সক্ষম হবে। কারণ, তাদের প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ পালা করে ব্যবহার করতে হবে।

বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় নাম না প্রকাশ করার শর্তে ওই ব্যক্তি আরও বলেন, তাদের (ইসরায়েল) বেছে নিতে হবে তারা কোনটা (ক্ষেপণাস্ত্র) আটকাতে চায়। ইতিমধ্যে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জিবিইউ-৫৭ ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল এ পর্যন্ত ইরানের ফোর্দোয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি। কেন্দ্রটি পাহাড়ের ভূগর্ভে তৈরি করা হয়েছে, এর মূল কক্ষগুলো মাটির নিচে ৮০ থেকে ৯০ মিটার (প্রায় ২৬০ থেকে ৩০০ ফুট) গভীরে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক কেলসি ডেভেনপোর্ট বলেন, ইসরায়েল যদি এসব ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলা করতে চায়, তাহলে সম্ভবত তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা দরকার হবে। কারণ, সেখানে ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম বোমা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আছে।

জিবিইউ-৫৭ বাংকার বাস্টার নামে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোমাটি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি) নামে পরিচিত। এতে ১২ টনের বেশি বিস্ফোরক থাকে।

ইরানে হামলা করে যে উভয়সংকটে ইসরায়েল by এমা গ্রাহাম-হ্যারিসন

গত শুক্রবার শুরু হওয়া হামলায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা কয়েক মাসের মধ্যে পুনর্গঠন সম্ভব। এই হামলা ইরানের সরকার ও সাধারণ জনগণের মধ্যে পারমাণবিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

মাত্র কয়েক দিনের যুদ্ধেই ইসরায়েল ইরানের ১২ জনের বেশি শীর্ষ পরমাণুবিজ্ঞানী হত্যা করেছে। তাদের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশকে নিশ্চিহ্ন করেছে। হামলা হয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশে। কিন্তু  ইরানের বিস্তৃত ও সুরক্ষিত পারমাণবিক কর্মসূচিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি। আর এ বিষয়ে ইসরায়েলি সেনা কমান্ডার ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার বিশেষজ্ঞরা একমত।

ইসরায়েলের প্রাথমিক হামলাগুলো ইরানকে একটি কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার ক্ষমতা কয়েক মাস পিছিয়ে দিতে পেরেছে, এমনটা জানিয়েছেন এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, ইরান বোমা তৈরি করতে আরও অন্তত তিন বছর দূরে ছিল।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরান পারমাণবিক বোমার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে বলেই তিনি হামলা চালানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু সেটি সত্য হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইসরায়েল হয়তো আরও বেশি ক্ষতি করতে পারবে না।

হামলাগুলো যা অর্জন করেছে, তা হলো ইরানের নেতৃত্বে ভীতি ও ইরানি জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করা। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শিশুরা নিহত হয়েছে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে পুরো তেহরানের মহল্লা খালি করার নির্দেশ গাজার ঘটনার ভয়াবহতার সঙ্গে মিল আছে। ফলে নিজের সরকারকে পছন্দ না করলেও তা ইরানিদের ইসরায়েলের প্রতি ঘৃণাকেই উসকে দিয়েছে। ইসরায়েল নিজে পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তা স্বীকার করেনি। বহু ইরানি এখন বিশ্বাস করেন, তাঁদেরও এমন অস্ত্র দরকার।

এক পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েলের হামলাগুলো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের পক্ষেই কাজ করবে। তিনি বলেন, ‘আমার নিজস্ব মত হলো, যদি এরপরও তাদের সক্ষমতা থাকে, তাহলে তারা যত দ্রুত সম্ভব পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে এগিয়ে যাবে।’

ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প সামরিকভাবে ধ্বংস করার সবচেয়ে বড় বাধা হলো পবিত্র নগর কোমের কাছে ফোর্দো স্থাপনাটি। এটি পাহাড়ের গভীরে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে ইসরায়েলের সবচেয়ে শক্তিশালী বোমাও এর নাগাল পাবে না। এখানে সেন্ট্রিফিউজ ও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ রয়েছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বাংকার ধ্বংসকারী বোমা হয়তো এটি ধ্বংস করতে পারে। তা–ও নিশ্চিত নয়।

প্রাথমিক হামলার সাফল্যে ইসরায়েলে যখন উচ্ছ্বাস, তখন ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জাচি হানেগবি সতর্ক করেছেন, ইরানি পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু সামরিক উপায়ে ধ্বংস করা যাবে না। তিনি ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘স্থাপনায় হামলা করার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রক্রিয়া থামানো সম্ভব নয়।’ তার চেয়ে বরং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পথ সুগম করা উচিত, যাতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি থামানো যাবে।

এদিকে নেতানিয়াহু স্পষ্ট বলেছেন, তিনি কূটনৈতিক সমাধানের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিতে বেশি আগ্রহী। ট্রাম্পকে তাঁর যুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসার জন্য উৎসাহ দিচ্ছেন নেতানিয়াহু।

ইসরায়েলি নেতারা শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস নয়, তেহরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের স্বপ্নও দেখেন। কিন্তু বেসামরিক এলাকায় ইসরায়েলের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রতি ইরানি জনগণের সমর্থন বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইসরায়েলি হামলার ভয় আরও বেড়েছে পশ্চিমা দেশের নীরবতার কারণে। গণহত্যা ও চরম সামরিক অন্যায় আক্রমণের পরও পশ্চিমারা কোনো বাধা দেয়নি। একসময় বিশ্বাস করা হতো আন্তর্জাতিক উদারপন্থী ব্যবস্থা ইসরায়েলকে লাগাম টেনে ধরবে। গাজার ধ্বংসস্তূপে সেই বিশ্বাসকে শেষ করে দিয়েছে।

যদি শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প এই যুদ্ধে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে কোনো চুক্তি করতে দেরি করে, তাহলে ফোর্দোতে আরও বড় হামলা করতে ইসরায়েল দ্বিধা করবে না।

ইরানের বিশাল পারমাণবিক তথ্যের ভান্ডার ইসরায়েল হাতিয়ে নিয়েছে। তাতে সম্ভবত ফোর্দোর পারমাণবিক স্থাপনার পরিকল্পনা তারা পেয়েছে। এর মাধ্যমে স্থাপনার সহায়ক কাঠামো অচল করা, প্রবেশপথ বন্ধ করা বা বিশেষ বাহিনী দিয়ে স্থল অভিযানে প্ল্যান্ট ধ্বংস করা সহজ হয়ে যাবে।

গত বছর ইসরায়েল স্পেশাল ফোর্স কমান্ডো পাঠিয়ে সিরিয়ায় এক গোপন হিজবুল্লাহ ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা ধ্বংস করেছিল। ইরানের ফোর্দো পারমাণবিক স্থাপনা সুরক্ষিত হলেও ইসরায়েল এখন পশ্চিম ইরানের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে দাবি করছে। তাই সি-১৩০ বিমানে করে বিশেষ বাহিনী সেখানে পাঠিয়ে সাইটটি দখলের চেষ্টা ইসরায়েল করতে পারে।

ইসরায়েল এখন পড়ে গেছে উভয়সংকটে। তারা যদি হামলা বন্ধ করে, তাহলে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ আবার শুরু করবে। তখন তাদের আবার বোমাবাজি শুরু করতে হবে।

* এমা গ্রাহাম-হ্যারিসন গার্ডিয়ানের মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সংবাদদাতা
- গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া ইংরেজির সংক্ষেপিত অনুবাদ: জাভেদ হুসেন

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনে কাজ করছেন ইসরায়েলি উদ্ধারকর্মী। গতকাল শুক্রবার, ইসরায়েলের বন্দরনগরী হাইফায়।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনে কাজ করছেন ইসরায়েলি উদ্ধারকর্মী। গতকাল শুক্রবার, ইসরায়েলের বন্দরনগরী হাইফায়। ছবি: রয়টার্স

ইরান-ইসরাইল সংঘাত: ‘নিঃশর্ত সমাপ্তি নইলে হামলা চলবে’

দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ। কোনো পক্ষই কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। এদিকে ভয়াবহ এই সংঘাতের লাগাম টানতে ইরানকে সমঝোতায় আনতে মরিয়া ইসরাইলের সহযোগীরা। তবে ইরান সাফ জানিয়েছে, ইসরাইলের নিঃশর্ত সমাপ্তি ব্যতীত এই যুদ্ধের ইতি টানা সম্ভব নয়। শুক্রবার এক্সের এক পোস্টে এ কথা জানান  দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বলেছেন, ইসরাইলের নিঃশর্ত সমাপ্তিই এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারে। যদি এমনটা না হয় তাহলে ইসরাইলে হামলা অব্যাহত থাকবে। কার্যত এই হুঁশিয়ারির মাধ্যমে ইসরাইলকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কথা বলেছে ইরান। এদিকে ইরানে হামলার বিষয়ে দুই সপ্তাহের সময় নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তাকে উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানান হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা সামনে রয়েছে- যা হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। ইরানের সঙ্গে হামলায় জড়াবে কিনা তা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবেন ট্রাম্প। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেছেন ফ্রান্স, জার্মানি ও বৃটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এতে প্রাথমিক আলোচনা থেকে কোনো সমঝোতার আভাস পাওয়া যায়নি। ইরান-ইসরাইল পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে।

এদিকে শুক্রবার ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তেহরানের রাস্তায় নামে লাখ লাখ মানুষ। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ও শুক্রবার দিনভর হামলা-পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান-ইসরাইল। কোনো পক্ষই ছাড় দেয়নি। তবে এদিন ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে ইরানের ভয়াবহ হামলা পরিলক্ষিত হয়েছে। ইরানের হামলায় হাইফায় ১৭ ইসরাইলি নিহত হন। যাদের তিনজনের অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বিয়েরশেভায় একাধিক ভবনের বহু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়েছে একাধিক জানবাহন। এছাড়া ইরানের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে প্রধান একটি সড়কে বিশাল গর্ত দেখা গেছে। এছাড়া ইসরাইলের বিরসেবা শহরের সামরিক গোয়েন্দা ঘাঁটিতে নিখুঁত হামলার দাবি করেছে ইরান। অন্যদিকে ইরানেও ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে এই হামলায় ইরানের আরেক পরমাণুবিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন। যদিও এই খবরের সত্যতা নিরপেক্ষ কোনো সূত্র নিশ্চিত করতে পারেনি। আবারও ইরানে হামলা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ। অন্যদিকে ইরান-ইসরাইল সংঘাতে তৃতীয় কোনো পক্ষ জড়ালে এর পরিণতি ভয়াবহ হবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

জেনেভায় ইইউ মন্ত্রীদের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক: ইরান-ইসরাইল সংঘাতের সমাধান পেতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইউরোপীয় কূটনীতিক এবং বৃটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তেহরানের সঙ্গে তেল আবিবের সংঘাতের পর এবারই প্রথম পশ্চিমাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন তিনি। এই বৈঠকে বৃটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিও উপস্থিত ছিলেন। কূটনৈতিক সমাধান পেতে ইরানের সঙ্গে বসাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন তিনি। বৈঠকে আরাঘচি বলেন, চলমান কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে তারা। এমন অবস্থায় এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে জোর দেন আরাঘচি। অন্যথায় জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক আইন খুব খারাপভাবে ব্যাহত হবে। এটি এমন একজনের আহ্বান যিনি তার পুরো জীবন সংলাপ ও কূটনীতির জন্য উৎসর্গ করেছেন। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, যিনি (ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম  হোসেনের) চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের মোকাবিলা করা অভিজ্ঞ সৈনিক এবং তিনি জানেন কীভাবে নিজ মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে হয়। বিবিসি জানিয়েছে, বৈঠক শুরু হওয়ার পরপরই উভয়পক্ষের মধ্যে মতানৈক্য শুরু হয়েছে বলে মনে হয়েছে। ইসরাইল জানিয়েছে তারা এখনো ইরানে তাদের সকল লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তারা ইরানে হামলা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। এদিকে ইরান জানিয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তি বিকাশের সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে তাদের। তবে ইসরাইল এটা মানতে নারাজ। তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে। এই বৈঠকের মাঝেই ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানি প্রেসিডেন্টের হুঁশিয়ারি: শুক্রবার এক্সের এক পোস্টে মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, আমরা সবসময়ই শান্তি এবং শান্ত থাকার পক্ষে আছি। তবে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ বন্ধের একমাত্র উপায় হচ্ছে ইসরাইলের নিঃশর্ত সমাপ্তি। চিরতরে ইহুদিবাদীদের শত্রুভাবাপন্ন এমন হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা দিতে হবে। ইসরাইলি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, তারা আগ্রাসন অব্যাহত রাখলে এই যুদ্ধ বন্ধ হবে না। বরং ইরান আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে, যার ফলে হামলাকারীদের ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।

ইরানে হামলা নিয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবেন ট্রাম্প: হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখেন। বক্তব্য শুরুর পর, তিনি চলে আসেন ইসরাইল ও ইরানের চলমান সংঘাতে। তিনি বলেন, আমি জানি প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নিয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্র এ সংঘাতে জড়াবে কিনা- সে বিষয়ে অনেক জল্পনা চলছে। এরপর তিনি প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের একটি সরাসরি উদ্ধৃতি পড়ে শোনান। তাতে বলা হয়- ইরানের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা সামনে রয়েছে- যা হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আমি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবো, আমরা এতে যাবো কিনা।

‘যুক্তরাষ্ট্র যুুদ্ধে যোগ দিলে পুরো অঞ্চলে নরক ডেকে আনবে’: এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে সতর্ক করেছে ইরান। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদে বলেছেন, ইসরাইলের হামলায় যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা পুরো অঞ্চলের জন্য নরক ডেকে আনবে। তিনি বলেন, এটা আমেরিকার যুদ্ধ নয়। যদি প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়ান, তাহলে ইতিহাসে তিনি একজন ‘অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত হবেন। খাতিবজাদে সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা এই সংঘাতকে একটি দীর্ঘস্থায়ী জঞ্জালে পরিণত করবে, আগ্রাসনকে আরও বাড়াবে এবং নৃশংসতা বন্ধের পথকে দীর্ঘায়িত করবে।

মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে এরদোগান-মের্জের ফোনালাপ: ইরান-ইসরাইল সংঘাতের মধ্যে প্রথমবারের মতো ফোনে কথা বলেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান এবং জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ। উভয় নেতাই এই সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন জার্মান সরকারের এক মুখপাত্র। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানে সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছে উভয় দেশ। বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, জার্মান সরকারের চিফ অব স্টাফ থর্স্টেন বলেছেন, যদিও ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির মুহূর্ত ভালো নয়। তবে চলমান পরিস্থিতিতে এটা গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে জার্মান সরকারকে তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইসরাইলের ক্রমাগত হামলায় ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। যাতে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

mzamin
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জ্বলছে ইসরাইলের একটি ভবন

সুঁই-সুতার জীবনযুদ্ধ by সোহেল রানা

ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত আশুলিয়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিক দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রমে নিজেদের এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। তাদের জীবন-জীবিকা মিশে আছে সুঁই-সুতা আর কাপড়ের বুননে। যা কেবল পোশাক নয়, বুনছে তাদের স্বপ্ন আর টিকে থাকার গল্প। এখানকার শ্রমিকদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অভিবাসী। গ্রামীণ জীবনের টানাপড়েন আর অভাব তাদের ঠেলে দিয়েছে এই শিল্পনগরীতে। একটি ভালো জীবনের আশায়, নিজেদের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তারা বেছে নিয়েছেন কঠিন পথ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কারখানার নির্দিষ্ট ছন্দে চলে তাদের জীবন। কখনো ওভারটাইমের চাপ, কখনো উৎপাদন লক্ষ্য পূরণের তাড়া। সবকিছু ছাপিয়ে তারা অবিচল থাকেন নিজেদের কাজে।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ এবং পরিশ্রম নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ শ্রমিকের কাছে এটাই একমাত্র আয়ের উৎস। একজন শ্রমিক সাধারণত মাসে ৮-১২ হাজার টাকা আয় করেন। যা দিয়ে তাদের নিজেদের থাকা-খাওয়ার খরচ মেটানোর পাশাপাশি গ্রামের বাড়িতে থাকা পরিবারের কাছেও কিছু টাকা পাঠাতে হয়। অল্প টাকায় জীবনযাপন করা তাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। কারখানার আশপাশে গড়ে ওঠা স্বল্প ভাড়ার খুপড়ি ঘরে তাদের বসবাস। একটি ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয় অনেককে। যেখানে আলোর স্বল্পতা, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং পয়ঃনিষ্কাশনের সমস্যা নিত্যদিনের চিত্র। স্বাস্থ্যসেবা তাদের জন্য এক বড় উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে কাজ করা, মেশিনের শব্দের মধ্যে থাকা এবং রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শে আসার কারণে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, মেরুদণ্ডের ব্যথা এবং চোখের সমস্যা তাদের নিত্যসঙ্গী। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ খুব কম শ্রমিকেরই হয়। জরুরি প্রয়োজনে সরকারি হাসপাতালের লম্বা লাইন বা উচ্চমূল্যের বেসরকারি চিকিৎসা তাদের নাগালের বাইরে।

শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়া তাদের সন্তানদের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা। অনেক শ্রমিকের সন্তানরা তাদের সঙ্গে আশুলিয়াতেই থাকে। কিন্তু বাবা-মায়ের সীমিত আয়ে মানসম্মত শিক্ষা পাওয়া তাদের জন্য বিলাসিতা। কেউ কেউ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখার সুযোগ পেলেও উচ্চশিক্ষা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। ফলে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে দারিদ্র্যের চক্রাবর্ত চলতে থাকে। গার্মেন্টস শিল্পের এ শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। মজুরি বৃদ্ধি, কর্মপরিবেশের উন্নতি, ওভারটাইম ভাতা এবং ছুটির দাবি নিয়ে তাদের আন্দোলন প্রায়শই সহিংস রূপ নেয়। অনেক সময় এই আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়, যা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। তবে, এই সংগ্রামের মাধ্যমেই শ্রমিকরা একত্রিত হতে শিখেছেন এবং নিজেদের দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে পারছেন।

আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবন কেবল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের জীবন গল্প বলে অধ্যবসায়, আত্মত্যাগ আর টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছার। দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করলেও তাদের জীবনমান উন্নয়নে এখনো অনেক পথ বাকি। তাদের কাজের ন্যায্য স্বীকৃতি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানসম্মত আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে তাদের জীবন-জীবিকার মান আরও উন্নত হবে এবং দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে।

আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপ:
আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (ঘএঙ) নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। যদিও চ্যালেঞ্জের শেষ নেই, তবুও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ তাদের অবস্থার উন্নতিতে সাহায্য করছে।

সরকারি উদ্যোগ-
সরকার শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় বেশ কিছু আইন ও নীতি প্রণয়ন করেছে। শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩) শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সরকার শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, যা পর্যায়ক্রমে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা তাদের আর্থিক সচ্ছলতায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এনেছে।
শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিভিন্ন শিল্প এলাকায় শ্রমিক কল্যাণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে শ্রমিকরা বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারেন। এ ছাড়াও, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকার জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ঘঝউঅ) গঠন করেছে। এই কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করে, যা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করে এবং উন্নত বেতনের পথ সুগম করে।

বেসরকারি সংস্থার ভূমিকা-
বিভিন্ন দেশি ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা (ঘএঙ) আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই সংস্থাগুলো মূলত কয়েকটি ক্ষেত্রে কাজ করে-
শ্রমিক অধিকার ও সচেতনতা বৃদ্ধি: অনেক ঘএঙ শ্রমিকদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। তারা কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, মজুরি বঞ্চনা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাবের মতো বিষয়গুলো নিয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং তাদের প্রতিবাদ করার জন্য সংগঠিত হতে সাহায্য করে।

স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি সহায়তা: কিছু ঘএঙ বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালনা করে, যেখানে শ্রমিকরা স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ওষুধ পান। তারা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের মধ্যে পুষ্টি বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করে।
শিক্ষা ও শিশু যত্নের সুযোগ: শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য কিছু ঘএঙ স্বল্প খরচে বা বিনামূল্যে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করে। এ ছাড়াও, কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করে, যা শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ এবং মায়েদের কাজ করার সুযোগ করে দেয়।

আবাসন ও স্যানিটেশন: কিছু ঘএঙ শ্রমিকদের জন্য উন্নত আবাসন এবং স্যানিটেশন সুবিধার উন্নয়নে কাজ করে, যদিও এটি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এ বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই শিল্পাঞ্চল কমিটির সাধারণ সম্পাদক আহমেদ জীবন মানবজমিনকে জানান, শ্রমিকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করার পরেও তাদের জীবনমানের কোনো উন্নয়ন হয়নি। স্বাস্থ্যসেবার নামে লোক দেখানো মেডিকেল টিম নিয়ে চলছে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া, লাখ লাখ শ্রমিকের জন্য তেমন উল্লেখযোগ্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা নেই। ফলে শিশু সন্তানদেরকে ঘরে রেখেই কারখানায় ছুটতে হয় মা-বাবাকে। এতে যেমন নিরাপত্তাহীনতায় থাকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের শিশুরা, তেমনি বিভিন্ন সময় তারা অপহরণ ও ধর্ষণের শিকার হয়। 

mzamin

ইরানে হামলার মাস্টারমাইন্ড: মোসাদকে নীরবে পাল্টে দিলেন যিনি by শালোম ইয়েরুসালমি

গত সপ্তাহে ইরান আক্রমণের জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাটকীয় সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিলেন দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

এই হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, সামরিক নেতৃত্ব, পরমাণুবিজ্ঞানীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।

সেই দুই ব্যক্তি হলেন ইসরায়েলি গোয়েন্দাবাহিনী মোসাদের পরিচালক ডেভিড বার্নিয়া এবং বিমানবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল তোমার বার।

ইসরায়েলের এক সিনিয়র প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ‘মোসাদের স্থলভাগের কার্যক্রম এবং বিমানবাহিনীর আকাশপথে হামলার নিখুঁত সমন্বয়ে এক মিলিমিটারও এদিক-সেদিক হয়নি। তারা একটি অবিশ্বাস্য পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং আমরা এখনো এর সবকিছু দেখিনি। সে পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে তা ড্রোন ও বিপারের অপারেশনকেও ম্লান করে দেবে।’

এবার মোসাদই ইরানে হামলার পরিকল্পনাটি তৈরি করে এবং সামরিক বাহিনী তা কার্যকর করার জন্য আগ্রহের সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানে হামলার পক্ষে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জাচি হানেগবি। তিনি নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফের প্রধান থেকে সহায়তা আদায় করে নেন ইরানে হামলার জন্য। দেশটির নিরাপত্তা পরিষদে হানেগবি নিজের পরিকল্পনাগুলো উপস্থাপন করেন এবং তা সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন পায়।

২০০৭ সাল থেকে গাবি আশকেনাজি, বেনি গানৎজ, গাদি আইজেনকোটসহ যাঁরাই আইডিএফের প্রধান ছিলেন, সবাই ইরান আক্রমণের বিরোধিতা করেছিলেন। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তির পর ইরানে হামলার ধারণাটিও বাতিল হয়ে যায়।

এবার দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বার্নিয়া ও তাঁর সহকর্মীরা গুপ্তচর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিজেদের পরিকল্পনা সাজান। সেটির ভিত্তিতে একের পর এক অপারেশন চালায় মোসাদ।

২০২১ সালে মোসাদের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর বার্নিয়া গোয়েন্দা সংস্থাটিতে ‘বায়োমেট্রিক বিপ্লব’ ঘটানোর দিকে মনোযোগ দেন। এর মধ্য দিয়ে সংস্থাটিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে রূপান্তর করেছিলেন তিনি।

ইসরায়েলের এক সিনিয়র প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ‘বার্নিয়া মোসাদকে আমূল পরিবর্তন করেছেন। তিনি মোসাদের কাজের ধারা পাল্টে দিয়েছেন এবং স্মার্ট নজরদারি ক্যামেরা ও চেহারা শনাক্তকরণের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এটা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। মোসাদ এখনো একটি রক্ষণশীল সংস্থা এবং সেখানে পরিবর্তন আনতে বার্নিয়াকে অনেক অভ্যন্তরীণ লড়াই করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি জিতেছেন এবং আমরা ইরানে তার ফলাফল দেখতে পাচ্ছি।’

এই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, বার্নিয়া একজন অসাধারণ অপারেটর। তিনি এমন ব্যক্তি যিনি মিডিয়ায় কোনো আলোচনায় থাকতে চান না। কোনো সাক্ষাৎকার দেওয়া বা মোসাদের অপারেশন সম্পর্কে কথা বলারও সুযোগ নেই তাঁর পক্ষ থেকে। আবার বার্নিয়া অহংকারীও নন। তিনি কোনো কিছুতে ভয় পান না, যাতে কেউ তাঁকে দুর্বল ভাবতে পারে।

৬০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্যতিক্রমী সব অপারেশন চালিয়ে সাফল্যের রেকর্ড দেখিয়েছেন। এরপর তিনি ইরানে হামলার বিষয়ে পদক্ষেপ নেন। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-নেতৃত্বাধীন আক্রমণ ও দক্ষিণ ইসরায়েলে হত্যাকাণ্ড এবং এর প্রতিক্রিয়ায় গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি ইরানে হামলার বিষয়ে ভাবতে থাকেন।

নেতানিয়াহুর মতো বার্নিয়াও বিশ্বাস করতেন যে ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা উচিত। বারাক ওবামার সময় যুক্তরাষ্ট্র সে চুক্তি করেছিল। বার্নিয়া নিশ্চিত ছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র সে চুক্তি থেকে সরে এলে পরিস্থিতি ইসরায়েলের অনুকূলে আসবে। যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালের মে মাসে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন ইরানিরা আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। এতে মূলত ইরানে হামলার একটা সুযোগ তৈরি হয়।

ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর সমর্থিত অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষ সংঘাতে বার্নিয়া সুনাম অর্জন করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মোসাদ ‘বিপার অপারেশন’ চালায়। যে অপারেশনে হিজবুল্লাহর সদস্যদের হাতে হাজার হাজার পেজার ও শত শত ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত হয়েছিল। এ অপারেশন বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে তেহরানে হামাসপ্রধান ইসমাইল হানিয়ার হত্যাকাণ্ডও বার্নিয়া ও মোসাদের কৃতিত্ব। এরপর হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা এবং এখন ইরানিদের নিজস্ব মাটিতে একের পর এক সিনিয়র ইরানি সামরিক ব্যক্তিদের গুপ্তহত্যাগুলো করা সম্ভব হয়েছে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও মোসাদের তথ্যের ওপর নির্ভর করে নির্ভুল বিমান হামলার মাধ্যমে।

এ সপ্তাহের শুরুতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশ করেছে যে বছরের পর বছর ধরে মোসাদ স্যুটকেস, ট্রাক ও শিপিং কনটেইনারের ভেতরে ড্রোন এবং গোলাবারুদ তৈরির উপাদান ইরানে পাচার করতে সক্ষম হয়েছিল। ইরানের ভেতরই সরঞ্জামগুলো জোড়া লাগানো হয়েছিল। গত শুক্রবার সবুজসংকেত না আসা পর্যন্ত সেসব অস্ত্র ও সরঞ্জাম লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

যখন ইসরায়েলের যুদ্ধবিমানগুলো তেহরান, নাতানজ ও অন্যান্য এলাকার দিকে উড়ে যাচ্ছিল, তখন ইরানের ভেতর থেকে ড্রোনগুলো সক্রিয় করা হয়। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানকে নিরাপদে পথ তৈরি করে দিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে এসব ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল।

ওই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘বার্নিয়া বুঝেছিলেন যে এবার কোনো বিকল্প নেই, আমাদের ইরান আক্রমণ করতে হবে। আমরা সব সময় জানতাম, ইরানিরা ভাবছে যে আমরা কোনো পদক্ষেপ নেব না। তারা মনে করেছিল, আমাদের সেই সক্ষমতা নেই। তারা দেখেছিল যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি ইরানে হামলার বিষয়টি সমর্থন করেননি। ট্রাম্পও ইরানে হামলা করতে আগ্রহী ছিলেন না।’

কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, ‘ইরানিরা ভেবেছিল যে তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সব হুমকি অর্থহীন ছিল। তারা মনে করেছিল, আসলে কিছুই হবে না এবং তারা তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে থাকে। তারা আসলে সেই ভুলের ফল ভোগ করছে এখন। ইসরায়েল ইরানকে হতবাক করতে সক্ষম হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে নিজেদের যুক্ত করলে আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারব। সে ক্ষেত্রে, ইরানের আর কোনো সুযোগ থাকবে না। তখন সম্ভবত আমরা বলতে পারব যে পারমাণবিক হুমকি দূর করার একটি বড় বিজয়ের মাধ্যমে আইডিএফ-মোসাদের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শেষ হয়েছে।’

সরকার যদি আরও এক বছর মেয়াদ না বাড়ায়, তাহলে বার্নিয়ার দায়িত্ব ২০২৬ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। যদি তিনি রাজনীতিতে নিজেকে যুক্ত করতে চান, তাহলে অবসরের পর নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে। এরপর একজন জনপ্রিয় প্রার্থী হওয়ার সুযোগ আছে তাঁর। এমন রাজনৈতিক দল খুব কমই আছে যারা তাঁকে উচ্চপদে, এমনকি দলীয় প্রধান হিসেবেও চাইবে না, যদিও এটি ঘটবে না। কারণ, তাঁর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আছে, কিন্তু জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা নেই।

মোসাদের প্রধানকে ভালোভাবে চেনেন এমন এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, বার্নিয়া এমন ধরনের ব্যক্তি নন যিনি রাজনীতিতে শীর্ষ অবস্থানে যেতে মিডিয়ায় লড়াই করবেন বা রাজনৈতিক বিবাদে জড়াবেন। কখনো কখনো আপনাকে আপনার আজীবনের স্বপ্ন পূরণ করতে নেতিবাচক কৌশল অবলম্বন করতে হয়, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বসার মতো সেই স্বপ্ন নেই বার্নিয়ার।

* শালোম ইয়েরুসালমি, টাইমস অব ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- টাইমস অব ইসরায়েল থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: রাফসান গালিব

মোসাদ প্রধান ডেভিড
মোসাদ প্রধান ডেভিড

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রকৃত খবর কি গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে দিচ্ছে ইসরায়েলি সরকার

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের খবর কীভাবে প্রকাশ করবে, সে বিষয়ে দেশটি একটি নতুন নির্দেশনা জারি করেছে।

গত বুধবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সেন্সরশিপ বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কোবি ম্যান্ডেলব্লিট এক বিজ্ঞপ্তিতে কিছু নিয়মনীতি ঘোষণা করেন। ইরানি হামলার প্রভাব নিয়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকেরা কী প্রকাশ করতে পারবেন এবং কী পারবেন না, তা এসব নিয়মনীতিতে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলে সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের (সেন্সরশিপ) আইনি ভিত্তি দেশটির জন্মের চেয়েও অনেক পুরোনো।

ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৪৫ সালে প্রথম সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেই বিধিনিষেধগুলোই ইসরায়েলি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তবে ইসরায়েলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি কেবল নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সংবাদ প্রকাশে নিষিদ্ধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশনের (আইএফজে) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় অন্তত ১৬৪ সাংবাদিককে হত্যা করেছে ইসরায়েল।

এর বাইরে লেবানন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ও বর্তমানে ইরানেও অনেক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।

২০২৪ সালের মে থেকে ইসরায়েলি সরকার আল–জাজিরাকে সে দেশে নিষিদ্ধ করেছে। নভেম্বরে ইসরায়েলের উদারপন্থী দৈনিক হারেৎজ পত্রিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কারণ, তাদের কিছু প্রতিবেদনে সরকারের কার্যকলাপের সমালোচনা করা হয়েছিল।

সাংবাদিকদের ওপর নতুন কী বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীন। জেনে নেওয়া যাক এ–সংক্রান্ত খুঁটিনাটি।

নতুন বিধিনিষেধে কী রয়েছে

চলমান ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করেই মূলত সংবাদমাধ্যমের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসরায়েল সরকার।

ইসরায়েলে ইরানের পাল্টা হামলার প্রভাব নিয়ে সাংবাদিক ও সম্পাদকেরা কীভাবে সংবাদ প্রকাশ করতে পারবেন, তার ওপর বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

‘অপারেশন রাইজিং লায়ন—ইসরায়েলি ফ্রন্টে হামলার সংবাদ সংগ্রহ বিষয়ে আইডিএফ সেন্সরের নির্দেশনা’ শিরোনামে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করা হয়। এতে সম্পাদকদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সংবাদ প্রকাশের সময় ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক সেন্সরের দপ্তর।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সেন্সরশিপ বিভাগ সতর্ক করে বলেছে, সাংবাদিকেরা এমন কিছু লিখতে বা দেখাতে পারবেন না, যা থেকে বোঝা যায় কোথা থেকে হামলা হয়েছে, কীভাবে আকাশ প্রতিরক্ষা কাজ করছে বা হামলায় কতটা ক্ষতি হয়েছে। কারণ, এসব তথ্য শত্রুর কাজে লাগতে পারে এবং দেশের নিরাপত্তার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

বিশেষ করে সাংবাদিক ও সম্পাদকদের নিচের কাজগুলো করতে নিষেধ করা হয়েছে।

হামলার জায়গা থেকে ছবি তোলা বা ভিডিও সম্প্রচার করা, বিশেষ করে সামরিক স্থাপনার আশপাশে। ড্রোন বা ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ক্যামেরা ব্যবহার করে হামলায় বিধ্বস্ত এলাকা দেখানো। সেনা স্থাপনার কাছাকাছি ক্ষতিগ্রস্ত জায়গার নির্দিষ্ট অবস্থান জানানো। ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ বা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের দৃশ্য সম্প্রচার করা।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, সেন্সরশিপ বিভাগের অনুমোদন ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ভিডিও প্রকাশ করা যাবে না। এসব ভিডিও ‘শত্রুপক্ষের তৈরি ভুয়া খবর’ হতে পারে।

নতুন বিধিনিষেধগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।

মঙ্গলবার ভোরে ইসরায়েলের হাইফা বন্দরনগরে সম্ভাব্য হামলার ছবি তুলতে ক্যামেরা বসানোর সময় কয়েকজন আলোকচিত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা ছিল

যেকোনো সংবাদে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে কোনো তথ্য থাকলে, তা ছাপার আগে সাংবাদিক ও সম্পাদকেদের সেন্সরশিপ বিভাগের অনুমতি নিতে হয়।

বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য নিশ্চিতভাবে ক্ষতিকর হতে পারে, এমন যেকোনো সংবাদ প্রকাশ রুখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে সেন্সরশিপ বিভাগ।

তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বা দেশের রাজনীতিবিদদের খ্যাতি নষ্ট করবে, এমন কোনো প্রতিবেদন প্রকাশে হয়তো বাধা দিতে পারবে না সেন্সর।

সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনের মাধ্যমে ২০২৩ সালে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরও তীব্র করা হয়। এতে বলা হয়, যাঁরা ‘সুশৃঙ্খলভাবে ও ধারাবাহিকভাবে সন্ত্রাসবাদী প্রকাশনা পড়েন’ বা ‘সন্ত্রাসী কাজের সরাসরি আহ্বান প্রচার করেন’, তাঁরা শাস্তিযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত হবেন।

‘ইনডেক্স অন সেন্সরশিপ’-এর মতো গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক সংগঠনগুলোর মতে, ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে নতুন বিধিনিষেধ আসার আগেই সেন্সরশিপ বিভাগের ‘নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়বস্তুর’ সংজ্ঞা ছিল খুব বিস্তৃত। এর মধ্যে সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, অস্ত্র চুক্তি, প্রশাসনিক বন্দী, ইসরায়েলের বৈদেশিক নীতিসহ অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কোনো সাংবাদিক, প্রকাশনা বা সংবাদমাধ্যম সেন্সরশিপ বিভাগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারে। আদালত চাইলে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবেন।

সেন্সরশিপ বিভাগ কত ঘন ঘন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে

প্রায়ই হস্তক্ষেপ করে। গত মে মাসে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সাময়িকী +৯৭২ জানিয়েছিল, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সংবাদমাধ্যমে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাময়িকীটির মতে, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের সামরিক সেন্সরশিপ বিভাগ সম্পূর্ণভাবে ১ হাজার ৬৩৫টি সংবাদ প্রকাশে বাধা দিয়েছে এবং আরও ৬ হাজার ২৬৫টি সংবাদ প্রতিবেদনের ওপর আংশিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় গড়ে ২১টি প্রতিবেদনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিবেদনের কোনো অংশের ওপর বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করাও নিষেধ। ফলে কোন তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে এবং কোনটি রাখা হয়েছে, তা পাঠকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।

‘পশ্চিমা ধাঁচের’ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় ইসরায়েলের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন?

যেসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলি নেতারা নিজেদের তুলনা করেন, সেসব দেশে ইসরায়েলের মতো কোনো সামরিক সেন্সরশিপ বিভাগ নেই।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের (আরএসএফ) বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ইসরায়েলের অবস্থান ১১২তম। দেশটি হাইতি, গিনি-বিসাউ, দক্ষিণ সুদান ও চাদের চেয়েও পিছিয়ে আছে।

আরএসএফের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েল নৃশংস হামলা শুরু করার পর থেকে দেশটিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বহুমাত্রিকতা ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ক্রমাগত কমছে।

আরএসএফ আরও জানিয়েছে, ইসরায়েলের সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনে রাজনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। কেবল সরকারপন্থী চ্যানেলকে সাধারণত শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রে বিধ্বস্ত ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েইজমান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স ক্যাম্পাসে সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন অধ্যাপক রোয়ে ওজেরি। রোহেবোট, ইসরায়েল
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রে বিধ্বস্ত ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েইজমান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স ক্যাম্পাসে সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন অধ্যাপক রোয়ে ওজেরি। রোহেবোট, ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স