Thursday, March 25, 2010

তবে কি আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা নন by দীপ্তি লাহিড়ী

মাটির দোতলা বাড়ি। পাকিস্তানি সেনারা এসেছে শুনে তিনি দোতলায় চলে যান। নিচ থেকে দোতলায় ওঠার দরজার একটি কপাট বন্ধ করে তার পাশে গিয়ে বসেন। হাতে একটি রামদা। সে সময় প্রতিদিনই যে রামদা তিনি ধার করে রাখতেন! বাড়ির ভেতর ঢুকে এক পাকিস্তানি সেনা যখন দোতলায় উঠতে যান, তখনই রামদার কোপ দিয়ে তাঁকে হত্যা করেন। দ্বিতীয় সেনাসদস্য দোতলায় উঠতে গেলে তাঁকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। হানাদারেরা ভেবেছিল, অনেক মুক্তিযোদ্ধা বুঝি বাড়িটির দোতলায় লুকিয়ে আছে। তাই আরও শক্তি সঞ্চয় করার জন্য তারা চলে যায়। যাওয়ার আগে বাড়িতে একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
এতক্ষণ যাঁর কথা বললাম, তিনি আমার বাবা। প্রতুল চন্দ্র গোস্বামী। পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার বল্লভপুর গ্রামের গোস্বামীবাড়ির বাসিন্দা আমরা। বড় বাড়ি। গোসাইবাড়ি হিসেবে এক নামে সবাই চেনে।
বাবার জন্ম হয় ১৯১৮ সালে চাটমোহর উপজেলার বল্লভপুর গ্রামে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। আত্মীয়-শরিকসহ আমাদের বিশাল পরিবার। সাত বছর বয়সে মাকে হারান। হোমিওপ্যাথি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। হোমিও চিকিৎসক হিসেবে এলাকায় তাঁর সুনাম ছিল। এলাকার সবাই তাঁকে ভালোবাসত, সমীহ করত।
পাকিস্তানি সেনারা গ্রেনেড নিক্ষেপ করে চলে যাওয়ার পর বাবা ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে মারতে পারেনি। কিন্তু ধরা পড়ে যান এলাকার মুসলিম লীগের সদস্য রাজাকারদের কাছে। তারা বাবাকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। এর পর থেকে বাবার আর কোনো খবর আমরা পাইনি।
১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল তাড়াশে অভিযান চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। তাদের মূল টার্গেট ছিল আমাদের বাড়ি। কেননা মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওই এলাকায় আমাদের বাড়িই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মূল আখড়া। ট্রেনিং থেকে খাওয়াদাওয়া—সবকিছুই এখানে হতো। ভোরে তিন দিক থেকে তাড়াশ আক্রমণ করে পাকিস্তানি বাহিনী। খবর জানামাত্রই বাবা আমাদের সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। আমাকেসহ পরিবারের সবাইকে তিনি পাঠিয়ে দেন পাশের গ্রামের নিরাপদ আশ্রয়ে। কিন্তু কোনোমতেই তিনি বাড়ি ছাড়তে রাজি হলেন না। তাঁর এক কথা, ‘আমি চলে গেলে সবকিছু লুট হয়ে যাবে।’ ওই দিনই আমাদের বাড়িতে হামলা হয়। তাড়াশ দখল করে নেয় পাকিস্তানি বাহিনী। পরে সামান্য কিছু টাকা ও শুকনো খাবার নিয়ে আমরা ভারতের পথে পা বাড়াই। বাবার দেখা আর পাইনি।
ডিসেম্বরের শেষের দিকে দেশে ফিরে আসি। পরিচিতজনদের কাছে বাবার বীরত্বগাথার কথা জানতে পারি। চারদিকে তখন যুদ্ধের চিহ্ন। সমগ্র দেশটাই যেন পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। একটা প্রলয় যেন বয়ে গেছে আমাদের বাড়িটির ওপর দিয়ে। বাড়ির একটা অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। টিনের চাল, মাটির দেয়াল ফুটো হয়ে গেছে। বুঝিবা গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে। বাড়ির ভেতর সবকিছুই লন্ডভন্ড। রক্তের পুরোনো দাগ। ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন মা। সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় তিন সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় আমার মায়ের কঠিন জীবনসংগ্রাম। তাঁর মনে ক্ষীণ আশা কখনো নিভতে দেখিনি—তাঁর স্বামী একদিন ফিরে আসবেনই। বাবাকে আমরা আর খুঁজে পাইনি। তিনি নিহত হয়েছেন? নিরুদ্দেশ? কোনো কিছুই আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।
পৃথিবীর সবচেয়ে শাশ্বত, স্নেহময় সম্পর্কের আধার বাবার আদর। বাবা মানে পরম আশ্রয়। পরম নির্ভরতার স্থান। পনেরো বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়েছি। বাবার সঙ্গে শেষ দেখা ওই একাত্তরের ২৭ এপ্রিল। বাবার মাথার চুলগুলোতে তখন পাক ধরেছে। চোখে উঠে এসেছে চশমা। আপাতকঠোর হলেও দুই ঠোঁটের ফাঁকে স্মিত এক টুকরো হাসি সব সময় লেগেই থাকত তাঁর।
আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন যুদ্ধের সূচনালগ্নে। দুজন পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যকে হত্যা করেছেন। তিনি কি মুক্তিযোদ্ধা নন? রাজাকাররা তাঁকে হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ। যিনি কিনা দুজন হানাদারকে হত্যা করেছেন, তাঁকে হানাদারেরা বাঁচিয়ে রাখবে, তা হতে পারে না। আমার বাবা কি শহীদ নন? আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের ধারার সঙ্গে মিশে আছে তাঁর রক্ত? তাও আমরা জানি না। দেশের মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাঁর নাম নেই। নাম নেই শহীদের তালিকায়। লাখো শহীদের এ দেশে আরও অনেক শহীদ আছেন, যাঁদের নাম তালিকায় নেই। যাঁদের খবর গত ঊনচল্লিশ বছরেও দেশবাসী জানতে পারেনি। নাম না-জানা এমন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি নয় কি?

প্রধানমন্ত্রীর নিরুত্তাপ চীন সফর by সোহরাব হাসান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শোরগোল উঠেছিল, চীন সফরের সময় তার শতকরা এক ভাগও লক্ষ করা যায়নি। এর অর্থ এ নয় যে তিনি ভারতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে এসেছিলেন এবং চীনে সবকিছু আদায় করতে পেরেছেন। ভারত সফর নিয়ে শোরগোল উঠেছিল দলীয় বা গোষ্ঠী স্বার্থে, আর চীন সফর নিয়ে ওঠেনি, তাও একই কারণে। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা দেশীয় তো বটেই, বৈদেশিক নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম মতৈক্যে আসতে পারিনি। আমাদের রাজনীতিকেরা মুখে স্লোগান দেন ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’। কাজ করেন ঠিক উল্টোটি।
ভারত সফরের আগে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘খালি হাতে ফিরলে পথে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া হবে।’ চীন সফরের সময়ও তাঁর অবস্থান অভিন্ন হলে জনগণ বুঝতে পারত দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েই বিরোধীদলীয় নেত্রী এসব কথাবার্তা বলছেন। কিন্তু তাঁরা একেবারে নিশ্চুপ থাকলেন। জাতীয়তাবাদী ঘরানার কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী প্রধানমন্ত্রীকে এই বলে মৃদু ভর্ৎসনাও করেছেন, ‘ভারতের আগে তাঁর চীনে যাওয়া উচিত ছিল।’ এই বুদ্ধিজীবীরা বিএনপির আমলে সব বোমাবাজি, জঙ্গি হামলার দায়ও চাপিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের ওপর। আসলে বিরোধী শিবিরের এসব গরম কথাবার্তা বা সমালোচনার উদ্দেশ্য জাতীয় স্বার্থ রক্ষা নয়, কোনো বিশেষ দেশের প্রতি তাদের রাগ বা অনুরাগ প্রকাশ করা।
নেতা-নেত্রীরা যা-ই বলুন না কেন, বাংলাদেশের জনগণের কাছে ভারত ও চীন—উভয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার এই দেশ দুটির কাছেও বাংলাদেশ একবারে ফেলনা নয়। দেশের আমদানি বাজার বলতে গেলে এ দুটি দেশের দখলে। নিজ নিজ স্বার্থেই তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সদ্ভাব রাখতে চাইবে। প্রশ্ন হলো, আমরা কী করব? একজনকে কাছে টানতে গিয়ে আরেকজনকে দূরে ঠেলে দেব, না উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে যতটা সম্ভব জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করব? যেকোনো দুটি দেশের সঙ্গে স্বার্থের বিরোধ থাকবে, ঝগড়াঝাঁটি থাকবে, সন্দেহ-অবিশ্বাস থাকাও অস্বাভাবিক নয়। আবার সেই ঝগড়াঝাঁটি মিটিয়ে ফেলতে হবে আলোচনার মাধ্যমে। ভারত গঙ্গায় ফারাক্কা বাঁধ কিংবা বরাক নদীতে টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখলে আমরা অবশ্যই প্রতিবাদ করব। একই ভাগে ব্রহ্মপুত্রের উৎসস্থলে চীন বাঁধ দিলেও চুপচাপ বসে থাকব না। বিএনপি সরকার তথাকথিত পূর্বমুখী কূটনীতি করে ভারতের বিরাগ ভাজন হয়েছিল, আবার ঢাকায় তাইওয়ানের বাণিজ্যিক অফিস খুলতে দিয়ে চীনকেও খেপিয়ে দিয়েছিল। অর্থাৎ তারা আম-ছালা দুটোই খুইয়েছিল। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এ ধরনের আহম্মকি শুধু সরকারকে ডুবায় না, দেশকেও একঘরে করে ফেলে।
চীন ও ভারত শুধু আমাদের দুই বৃহত্ প্রতিবেশী নয়, বিশাল অর্থনীতিরও দেশ। চীন আগামী দিনে বিশ্ব অর্থনীতির এক নম্বর শক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। ভারতও দ্রুত উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। দুটি দেশেরই রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে তাদের সহযোগিতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি জরুরি নিজের সক্ষমতা বাড়ানো। পশ্চিমা দেশগুলোতে বিনা শুল্কে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে কিংবা মধ্য ও নিকট প্রাচ্যে পাঠানো অদক্ষ শ্রমিকদের রেমিট্যান্সে বেশি দিন ভালো থাকা যাবে না। দেশের দুর্বল অর্থনীতিকে সবল করতে দরকার অবকাঠামোর উন্নয়ন, শিল্পবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং বিপুল অদক্ষ জনশক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে যারাই সহযোগিতা করবে, তাদেরই স্বাগত জানাব, দুয়ার বন্ধ করে থাকব না। দেশ বিক্রি ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার সস্তা স্লোগান দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার পরিণাম হবে আত্মঘাতী।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীন ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মনস্তাত্ত্বিক বাধা ছিল। তার ঐতিহাসিক কারণও আছে। পঁচাত্তরের পর যাঁরা এ দেশ শাসন করেছেন, তাঁরা ভারত-সোভিয়েত বলয় থেকে বেরিয়ে আসার নামে এক হাত মধ্যপ্রাচ্যে এবং আরেক হাত চীনের দিকে বাড়িয়ে দেন। মাঝখানে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছে পাকিস্তান। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে দুই বিশাল প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য আনার উদ্যোগ নেন। সেবার তিনি এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল হয়েছেন বলা যাবে না। সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল দুই তরফেই। ইতিমধ্যে মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায় বিপুল পানি গড়িয়েছে। বাংলাদেশের ডান পন্থার রাজনীতির প্রতি পশ্চিমেরও মোহ কেটে গেছে। আশা করি চীনেরও। সে ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এগোলে চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন নয়।
এ প্রেক্ষাপটে আড়াই মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিল্লি ও বেইজিং সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ভারত বা চীন থেকে তিনি কত বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও মঞ্জুরি আদায় করে নিতে পেরেছেন, কতটি চুক্তি করেছেন, স্বাগতিক দেশের নেতাদের কাছ থেকে কী কী আশ্বাস পেয়েছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক বাধাটি সরিয়ে ফেলা। এত দিন ধারণা করা হতো, চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক করতে হলে ভারতের সঙ্গে বৈরিতা দেখাতে হবে। কিংবা ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখলে চীনের বিপক্ষে অবস্থান নিতে হবে। সারা বিশ্বে স্নায়ুযুদ্ধের দিন শেষ হলেও বাংলাদেশের একশ্রেণীর রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীর মধ্যে এটি পুরোপুরি রয়ে গেছে। সীমান্ত বিরোধ, পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি সত্ত্বেও ভারত ও চীন ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে পারলে আমরা কেন পারব না? মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের পছন্দ না করলেও ভারত ও চীন সেখানে চুটিয়ে ব্যবসা করছে, বিনিয়োগ করছে। কিন্তু বাংলাদেশে কেউ বিনিয়োগ করতে এলেই ‘সার্বভৌমত্ব গেল’ ‘সার্বভৌমত্ব গেল’ বলে আমরা চিত্কার করি। কী চুক্তি হচ্ছে, তার শর্ত কতটা দেশের স্বার্থানুকূল হলো—তা বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হচ্ছে কোন দেশের সঙ্গে চুক্তিটি হলো। এ কূপমণ্ডূকতার কোনো চিকিৎসা নেই। অথচ এটা সবাই জানে যে চীন ও ভারত জাতীয় স্বার্থের বাইরে কিছু করে না, বিদেশ নীতি নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো ঝগড়ায়ও লিপ্ত হয় না।
ভারত ও চীনের সঙ্গে আমাদের পর্বতপ্রমাণ বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। চীনের অনুকূলে বছরে এ ঘাটতির পরিমাণ ৩৮০ কোটি ডলার, ভারতের অনুকূলে ২৬০ কোটি ডলার। অথচ স্রেফ রাজনৈতিক কারণে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টিই সামনে আনেন, চীনের কথা বেমালুম ভুলে যান। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে অনেক পত্রিকা পরিসংখ্যান তুলে দিয়ে বলেছে, বাণিজ্য ব্যবধান কমিয়ে ফেলতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময়ও তারা সে কথাটি জোর দিয়ে বললে প্রধানমন্ত্রীর হাত শক্তিশালী হতো। স্বাগতিক দেশ ভাবত, গোটা দেশ প্রধানমন্ত্রীর পেছনে আছে। অতএব, তাঁকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত বা চীন সফর কতটা সফল হয়েছে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণের সময় এখনো আসেনি। তবে একটি কথা জোর দিয়ে বলা যায়, এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রশ্ন হলো সেই সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে পারব কি না। পারলে দেশের উন্নতি হবে, মানুষের অভাব-দারিদ্র্য কিছুটা হলেও কমবে। আর না পারলে পাকিস্তানি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর ভাষায়, সহস্র বছর ঘাস খেয়ে থাকতে হবে। চীন বা ভারত নিজের স্বার্থ বিকিয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করবে না। কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হবে। আলপিন থেকে পরোটা আমদানি করে কোনো দেশ টিকে থাকতে পারবে না। আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। সমুদ্রবন্দর খুলে দিতে হবে চীন, ভারত, ভুটান, নেপালসহ সব প্রতিবেশী দেশের জন্য।
শেখ হাসিনা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কিছু উদাহরণ টানতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে বঙ্গবন্ধুর চীন সফরের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু একাত্তরের কথা বলেননি। বলা হয়তো কূটনৈতিক শিষ্টাচারও নয়। তবে চীন যে ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তা ঐতিহাসিক সত্য। কূটনীতিতে স্থায়ী বন্ধুত্ব বলে কিছু নেই। যখন যার সঙ্গে সদ্ভাব থাকলে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া যাবে, তার সঙ্গে সেটি রক্ষা করতে হবে। আবার কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গিয়ে অন্যের সঙ্গে শত্রুতা করাও ঠিক হবে না। চলতি বছর বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৩৫ বছর পূর্ণ হবে। চীন বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছে ১৯৭৫ সালের ২ অক্টোবর, তার আগেই ঘাতকদের হাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। চীনের সঙ্গে আমরা বন্ধুত্ব করব, কিন্তু একাত্তরের কথা ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই, যেমন ভুলে যাওয়া যাবে না আমেরিকার বিরোধিতার কথাও। ১৯৭১ সালে যে দেশ সহায়তা করেছে, পরবর্তীকালে তারা আমাদের জন্য ক্ষতিকর কিছু করলে তার বিরোধিতাও করতে হবে। আবার পরবর্তীকালের বন্ধু হলে একাত্তরে তার শত্রুতার কথাও ভুলে যাব না। এটিই হলো ইতিহাসের সত্য। একে অগ্রাহ্য করা কঠিন। জাতীয় স্বার্থে বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী দল একমত হলে বিদেশিরাও সমঝে চলবে।
চীনে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ছিলেন ৯১ জন। এর মধ্যে মন্ত্রী, আমলা, সাবেক আমলা, সাংবাদিকও রয়েছেন। নেতাদের রাষ্ট্রীয় সফরে এত বিরাট লটবহরের কী প্রয়োজন, বোধগম্য নয়। যাঁরা যান তাঁরাও কি দেশটি দেখার সুযোগ পান? স্বাগতিক দেশের সব আয়োজনে মনোযোগ থাকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি। সেখানে সফরসঙ্গীদের কোনো কাজ থাকে না। তার পরও প্রতিবার বিশাল বাহিনী নিতে হয় তাঁদের খুশি করতে। তাঁদের মধ্যে এমন ভাগ্যবান লোকও আছেন, যাঁরা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয়ের আশীর্বাদ পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বাকশাল, নকশাল, নরম বা গরম জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে পার্থক্য খুবই কম। দেশের যে গরিব জনগণ প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-সাংসদ-আমলাদের বেতন-ভাতা জোগান, তার সফরসঙ্গীদের বিদেশ ভ্রমণের ব্যয় বহন করেন, তাদের জন্য তারা কী করেছেন—একবার ভেবে দেখছেন কি?
>>>সোহরাব হাসান: কবি ও সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

দলীয় লেজুড়বৃত্তি -সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন by মিজানুর রহমান খান

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে এবার ভোটার সংখ্যা ১৯৭১। ২৪ ও ২৫ মার্চ নির্বাচন। স্বাধীনতা দিবসের প্রথম প্রহরে শোনা যাবে নির্বাচনী ফল। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটা ব্যাপার থাকাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু এই চেতনার সংজ্ঞা যদি হয় বিচারিক স্বাধীনতা, বিচারবিভাগের স্বায়ত্তশাসন বা আইনের শাসনের ঝাণ্ডা তুলে ধরা কিংবা নির্দিষ্টভাবে বিচারবিভাগীয় সংস্কারের সপক্ষে কোনো এজেন্ডাকে জনগণের সামনে আনা; তাহলে আক্ষেপ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এ নির্বাচনের মন-মেজাজে বাগাড়ম্বর ও মেঠো বক্তৃতার সুর উদগ্র। ভালো কিছু বা দরকারি বিষয় সত্যিই পুরোপুরি অনুপস্থিত। সুপ্রিম কোর্ট বার ঐতিহ্য ও কৌলীন্য হারাচ্ছে। এটি পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতাক্ষয়িষ্ণু এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার হুমকির মুখে রয়েছে।
স্বাচিপ ও ড্যাবের মতো দুই বড় দলের অঙ্গ হিসেবে শোভাবর্ধন করছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। প্রার্থীরা শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার আশীর্বাদধন্য। আইনজীবীদের জন্য এটা যে একটা লজ্জার বিষয় সেটাও অনেকে বিস্মৃত হচ্ছেন। বরং দলীয় নেতৃত্বের খাস তালিকায় নামভুক্তিকে একটা গর্বের ব্যাপার মনে করা হচ্ছে।
এটা এখন সন্দেহাতীত, সর্বোচ্চ বিচারালয়ের আইনজীবী সমিতি ক্রমশ মূল দলের লেজুড়ে পরিণত হচ্ছে। এই অঙ্গনের রাজনীতি আর সংসদ নির্বাচনের টিকিট জোগাড়ের রাজনীতি মিলেমিশে একাকার হচ্ছে। মুলো দুটো। বিচারক কিংবা সাংসদ পদ। যখন যাকে যেটা দিয়ে তুষ্ট রাখা যায়। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটা প্রহসনের নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনের বিজয়ী সাংসদও বিচারক হয়েছেন।
রাজনৈতিক দল ও নেত্রীর খেদমতগার হওয়ার ইঁদুর দৌড় এখন সহজেই চোখে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে রাখঢাক বা চক্ষুলজ্জা দ্রুত লোপ পাচ্ছে। মূলধারার অনেক নেতা-কর্মীর মতো বার নেতারাও সক্রিয়, উদ্বিগ্ন কিংবা উদ্ভ্রান্ত। বইপত্র পাঠের পরিবর্তে অনেকেই যেন সতত হাইকমান্ডের মনোভাব পাঠে সচেষ্ট থাকেন। রাজনীতিতে শেষ কথা নেই। এ কথা বলে রাজনীতিকেরা নীতিহীন কাণ্ডকারখানা জায়েজ করেন। সেই প্রবণতা এই অঙ্গনেও চলছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির বর্তমান প্যানেলের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন রীতিমতো একজন এমজে। এমজে মানে মহাগুরু। তাঁর ডিগবাজি অতুলনীয়। বাংলাদেশের ম্যাকিয়াভেলীয় রাজনীতিটা তিনি সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে গেছেন। তিনি কখনো স্বতন্ত্র, কখনো জাতীয় পার্টি বা বিএনপি। তাঁদের টিকিটে তিনটি সংসদ নির্বাচনে তিনি দাঁড়ান। পরাজিত হন। আওয়ামী লীগের খাতায়ও তাঁর নাম আছে। এই তিনিই প্রায় একই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের বার সভাপতির নির্বাচনেও চারবার প্রার্থী হন। প্রত্যেকবারই পরাজিত হন। ফুলের তোড়া হাতে তিনি দুই বড় দলেই যোগ দেন। কাউকে বিয়োগ করেন না। দুই দলই কিন্তু তাঁকে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি পদে টিকিট দিয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হয়েও ২০০৭ সালে নির্বাচন করা হয়নি। কারণ, জরুরি অবস্থায় ভোটই হয়নি। পরের বছর প্রথমে আওয়ামী লীগের টিকিট পান। কিন্তু পরে নেত্রীর ইচ্ছায় বিকল্প প্রার্থী আসে। তাঁর নৌকা ডোবে। এবার তিনি পঞ্চমবারের মতো সভাপতির লড়াইয়ে রয়েছেন। ভালো আইনজীবী হিসেবে তাঁর একটা সুনাম অবশ্য সুবিদিত। কিন্তু ডিগবাজি বা সর্বদলীয় হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি। ভয় হয় তিনিই কিনা এ অঙ্গনের আদর্শ বা নমস্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
আওয়ামী লীগের প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী মো. মুনসুরুল হক চৌধুরী। তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থক। আওয়ামী লীগের বিগত সরকারে তিনি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হন। পরে তাঁকে বিচারক করা হয়। কিন্তু বিএনপি তাঁকে আওয়ামী লীগার বিবেচনায় স্থায়ী করেনি।
বারের ১৪টি পদের বিপরীতে ৩৬ জন লড়ছেন। পুনর্নির্বাচিত হতে চেয়েছিলেন বর্তমান সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম। কিন্তু বাদ সাধলেন মো. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। সমন্বয় পরিষদ ‘দলের বৃহত্তর স্বার্থে’ পুনঃ প্রার্থীবিরোধী এক নীতিগত অবস্থান নেয়। কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কৌতুক হলো, তাঁর নামকরণ। তিনি লর্ড ভানু বন্দ্যোপাধ্যয়। লর্ড কীভাবে হলেন? দেশভাগের আগে তিনি পূর্ব বাংলায় ল্যান্ডলর্ড ছিলেন। তো ল্যান্ড ফেলে এসেছেন। লর্ডটা কী করবেন? তাই বহন করছেন। সেভাবে এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলাকালে নন্দিত একটি ব্যানার ছিল সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ। সেই পরিষদ মৃত। কিন্তু নন্দিত নামটা ব্যবহার করছেন আওয়ামী তরিকার আইনজীবীরা। এই পরিষদের ভেতরে এক হালি সংগঠন আছে।
প্রথমত, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ। এটি আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েও এর সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেননি। ওই পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ঢাকার জজকোর্টের পিপি আবু আবদুল্লাহ। কয়েক দিন পর তাঁকে বিচারপতি হিসেবে পেলে অবাক হব না। দ্বিতীয়টির নাম গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি। এতে বিভক্তি এসেছে। এর সভাপতি আইনমন্ত্রী স্বয়ং। তিনিও ইস্তফা দেননি। তৃতীয়টি, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ। চতুর্থটি জাসদসমর্থিত জাতীয় আইনজীবী সমিতি। এ ছাড়া সরকারি দলের জন্য আইন কর্মকর্তাদের সেবা সর্বদা অটুট থাকে।
জাতীয় রাজনীতির মতো এখানেও তৃতীয় ধারার ঠাঁই নেই। এবার একটা প্যানেল দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঐক্য টেকেনি। আওয়ামী ঘরানার অনেকে নির্দলীয় ও দলীয় দুটো পরিচয় একই সঙ্গে বহন করতে পছন্দ করেন। তাঁরা নিজেদের এই সমন্বয় পরিষদভুক্ত বলেন। আইনের লোক বলে কথা, তাই তাঁরা বিলক্ষণ আইন মানেন। বড় কোর্টে একটা দশদশার ব্যাপার আছে। বিচারক হতে বারে ১০ বছর থাকা লাগে। বারের নির্বাচনে প্রার্থী হতেও একই শর্ত। বিএনপি ১০ ছুঁতেই একজনকে বিচারক করেছিল। এবার প্রায় কাছাকাছি একটা কাণ্ড ঘটল। বারের নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ১০ মার্চ। ৭ মার্চে ওই দশদশা পূরণ করেন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। ওই রাতেই তাঁর প্রার্থিতা চূড়ান্ত হয়। কে তিনি? তিনি ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের হয়ে গত সংসদ নির্বাচনে মস্ত বড় ভূমিকা রাখেন। এটা সেই সেবার পুরস্কার বলে অনেকেই মনে করেন।
সুপ্রিম কোর্ট বারে সমতালে বিএনপির পক্ষে লেজুড়বৃত্তি চলছে। গুলশানে বিএনপির চেয়ারপার্সনের কার্যালয় থেকে রাতবিরাতে ঘোষিত হলো বার প্রার্থীদের নাম। বার ও বেঞ্চকে বলা হয় এক ইগলের দুই ডানা। এবার বুঝুন অবস্থা! রাজনীতিক কাম আইনজীবীদের নেতৃত্বে রয়েছে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। জামায়াতের রয়েছে ইসলামিক লইয়ার্স কাউন্সিল। তাদের ভান্ডার দলীয় সেবার নানাবিধ উপচারে ভরপুর। এসব দেখেশুনে বারের অভিজ্ঞ ও নবীন আইনজীবীদের নিশ্চয় রক্তক্ষরণ ঘটে। কিন্তু ভোট এলে তাঁরা নীরবে ভোট দেন। ভোটটা নষ্ট করেন না! তাঁদের চোখের সামনে ক্যাডারগিরি চলে। সুপ্রিম কোর্টের পবিত্রতা নষ্ট হয়। কিন্তু তাঁরা গ্রামের অসংগঠিত নিরীহ মানুষের মতো ঝামেলা এড়ান। সুখে থাকেন। তাঁরা জানেন, সুপ্রিম কোর্টে ট্রেড ইউনিয়নগিরি নিষিদ্ধের দাবি তুললে তাঁদের সম্মানহানি ঘটতে পারে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

ডায়রিয়ায় শিশুমৃত্যু -দূষিত পানিই যখন মহামারির ‘গণবিধ্বংসী’ উৎস

পানির অপর নাম যেখানে জীবন, সেখানে পানিই এখন বাংলাদেশে অজস্র শিশুর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছর লক্ষাধিক শিশুর মৃত্যু হয় ডায়রিয়ায়। প্রতিবছর অজস্র শিশুর জীবনের আস্বাদন না পাওয়ার আগেই মৃত্যুর কঠিন স্বাদ পাওয়া দুঃখজনক। জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান যেখানে এত ক্ষীণ, সেখানে অজস্র নবজাতকের মৃত্যু সরকারের করণীয়র কথাই মনে করিয়ে দেয়।
ব্রিটিশ আমল থেকেই পানিদূষণ ও পানিবাহিত রোগে লাখ লাখ শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটে আসছে। প্রধানত ম্যালেরিয়া, কলেরা ও ডায়রিয়াই বড়দের মতো শিশুদের জন্যও মারাত্মক হয়ে উঠত। এগুলো সবই পানিবাহিত রোগ। বর্তমানে কলেরা ও ম্যালেরিয়ার করাল থাবা দুর্বল হয়ে এলেও ডায়রিয়া এখনো প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর গ্রীষ্মের শুরুতে এই বিপদ চরম আকার ধারণ করে। বিশ্ব পানি দিবসের এক আলোচনা সভার বরাতে গত সোমবারের প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে এই দুঃখজনক সত্যটি ফুটে ওঠে।
পানির দেশ বাংলাদেশ দিনে দিনে এখন পানিবিপন্ন দেশে পরিণত হয়েছে। দেশের নদ-নদী-খাল-বিল-পুকুর-জলাশয়গুলো হয় দূষণে, নয় তো ভরাট হয়ে আমাদের পানি-নিরাপত্তার ঝুঁকিতে ফেলেছে। ৬১টি জেলার পানিতে আর্সেনিকদূষণ। শহরে শিল্পকারখানার বর্জ্যে এবং গ্রামাঞ্চলে সার ও কীটনাশকের দূষণে পানযোগ্য পানির অভাব তুঙ্গে উঠেছে। উপকূলীয় অঞ্চলের পানিতে লবণের আধিক্য। সম্প্রতি আর্সেনিক-আক্রান্ত এলাকায় উৎপাদিত চালেও আর্সেনিক মিলেছে। এভাবে দূষিত পানি হয়ে উঠেছে ডায়রিয়া মহামারির ‘গণবিধ্বংসী’ উৎস।
মানুষের জীবনের জন্য হুমকির যেকোনো পরিস্থিতিতে শিশুরাই আক্রান্ত হয় সবচেয়ে বেশি। পানির সমস্যা কতটা সর্বব্যাপী হলে তা শিশুদের জীবনের জন্য জাতীয় হুমকি হয়ে ওঠে, তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। শিশুদের জন্য আলাদা করে এর সুরাহা করা সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন একদিকে দেশের জলদেহকে দূষণমুক্ত ও বহমান রাখার ব্যবস্থা করা, অন্যদিকে সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থাকে চাহিদা মেটানোর উপযোগী করার কর্মসূচি হাতে নেওয়া। অথচ জনস্বার্থের জন্য জরুরি এত বড় বিষয় যথাযথ সরকারি গুরুত্ব পেয়ে আসছে বলে মনে হয় না। পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আগেই এ বিষয়ে জরুরিভাবে সমন্বিত ও কার্যকর কর্মসূচি হাতে নেওয়া এখন সরকারের অগ্রাধিকারই নয় কেবল, জীবনের প্রয়োজন।

সরকারের বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত -জনমতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে গৃহীত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এক অর্থে ব্যতিক্রমধর্মী, কারণ এর মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হলো যে জনমতের স্বীকৃতি দিতে গিয়ে সরকার তার পূর্বঘোষিত অবস্থান থেকে সরে আসতেও দ্বিধা করে না। ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের পূর্বসিদ্ধান্ত বাতিল সে রকম একটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। নতুন করে বিদ্যুতের খুঁটি কেনা ও পোঁতা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটিও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি ও অপচয় রোধে এ রকম দৃঢ় সিদ্ধান্তের প্রয়োজন ছিল।
বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ের জন্য গত বছরের ১৯ জুন ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে একবার সরকার ঘোষণা করে যে ঘড়ির কাঁটা আর পেছানো হবে না, সব সময়ই সেই এক ঘণ্টা এগিয়ে রাখা কৃত্রিম সময় ধরেই চলতে হবে। বিশ্বের কোথাও এ রকম বিধান নেই। দেশের মানুষও এটা মেনে নিতে পারেনি। পরে ১ জানুয়ারি থেকে আবার ঘড়ির কাঁটা পেছানো হয়।
কিন্তু ১ এপ্রিল থেকে আবার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত মানুষকে বিচলিত করে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ অন্য কিছু দেশে ঘড়ির সময় পরিবর্তনের কার্যকারিতা থাকলেও বাংলাদেশের মানুষের জীবনধারার সঙ্গে এ ব্যাপারটা খাপ খায় না। তাই বাস্তবতা বিবেচনায় ঘড়ির কাঁটা আর পরিবর্তন না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সরকার সেটা করে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। পূর্বঘোষিত একটি অবস্থান থেকে যৌক্তিক কারণে সরে আসার জন্য একটি সরকারের যে খোলা মন থাকা দরকার, তা এই সরকারের আছে, সেটাই বড় কথা। সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত জনকল্যাণের জন্যই। সেই জনগণ বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাপারে কী বলছে, তার প্রতি মনোযোগ অনেক সরকারেরই থাকে না। এভাবেই জনপ্রিয় অনেক সরকার শেষ পর্যন্ত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারের অপরিহার্য গুণ হওয়া প্রয়োজন।
প্রথম আলোয় গত সোমবার পল্লী বিদ্যুতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত কাজের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখানো হয়, নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রগতি না হওয়া সত্ত্বেও ৫১ হাজার খুঁটি ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় বিদ্যুতের খুঁটি পোঁতা হচ্ছে। বিদ্যুতের দেখা নেই অথচ খুঁটির আয়োজন চলছে। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় বিদ্যুতের খুঁটি কেনা ও পোঁতা নিয়ে অনেক কেলেঙ্কারি হয়েছে। ‘খাম্বা-দুর্নীতি’র কথা আরও বহুকাল লোকের মুখে মুখে ফিরবে। এ অবস্থায় বর্তমান সরকারের আমলেও যে নতুন করে খাম্বা প্রকল্প ফিরে আসতে পারে, তা কল্পনাতীত। রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই অপচয় রোধ করার জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল। প্রথম আলোয় তথ্য প্রকাশের পরদিনই সরকার সেটা করেছে। খুঁটি কেনা বন্ধ করে এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রশাসন আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে।
গণমাধ্যমে সাধারণত জনমতের প্রতিফলন ঘটে। সরকারের কার্যক্রমের ওপর যেমন বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, তেমনি আবার বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধ ও অভিমতও তুলে ধরা হয়। এসব মতামতের প্রতি সরকার আরও বেশি মনোযোগী হলে জনগণ যেমন উপকৃত হবে, সরকারের জনপ্রিয়তাও বাড়বে।

কুকুরের হামলায় আহত

নিজের পোষা কুকুরের হামলায় আহত হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার এক নারী। তাঁর ডান বাহু গুরুতর জখম হয়েছে। এ ছাড়া হালকা জখম হয়েছে বাঁ বাহু ও মুখমণ্ডল।
গতকাল মঙ্গলবার ভিক্টোরিয়া প্রদেশের রাজধানী মেলবোর্নের পোর্টল্যান্ড শহরে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রতিবেশিরা ময়লার ঝুড়ি ছুড়ে কুকুরটিকে নিবৃত্ত করে এবং আহত ওই নারীকে হাসপাতালে নিয়েযায়।

ইসরায়েলি কূটনীতিককে বহিষ্কার করতে পারে যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যের ১২টি জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে হামাসের এক নেতাকে হত্যায় সহযোগিতা করায় ইসরায়েলের এক কূটনীতিককে বহিষ্কার করতে পারে যুক্তরাজ্য। কোন কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হবে, তা জানা যায়নি। তবে তিনি লন্ডনে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রন প্রসর নন বলেনিশ্চিত হওয়া গেছে।
গত জানুয়ারি মাসে দুবাইয়ের একটি হোটেলকক্ষে হামাসের সামরিক শাখার প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদ আল মাবুয়াহকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় ব্যবহার করা হয় ১২টি ব্রিটিশ জাল পাসপোর্ট।
দুবাইয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা ৯৯ শতাংশ নিশ্চিত যে মাহমুদকে হত্যার ঘটনার পেছনে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ জড়িত। তবে ইসরায়েল জানিয়েছে, মাহমুদ আল মাবুয়াহের হত্যার ঘটনায় তাঁদের প্রতিনিধির জড়িত থাকার ব্যাপারে কোনো প্রমাণ নেই।

ফিদেল কাস্ত্রো বয়সের তুলনায় অনেক ভালো আছেন: রাউল

কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো বয়সের তুলনায় এখন অনেক ভালো আছেন। তাঁর ছোট ভাই এবং দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো এ কথা জানিয়েছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন ফিদেল।
কিউবার পূর্বাঞ্চলীয় শহর মায়ারি সফরকালে জাতীয় টেলিভিশনে এক সাক্ষাত্কারে রাউল বলেন, ফিদেল কাস্ত্রো এখন প্রতিদিন ব্যায়াম করছেন, সঠিক সময়ে খাওয়া-দাওয়া করছেন। সব মিলিয়ে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তিনি এখন অনেক বেশি শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন যাপন করছেন।
রাউল বলেন, তিনি তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যান এবং সকাল সাতটা বা আটটার আগে কাজ শুরু করেন না। তিনি বলেন, ফিদেল এখন অনেক ওপরে হাত তুলতে পারেন এবং লেখা ও পড়া দুটোই চালাতে পারছেন। বয়সের তুলনায় তিনি এখন অনেক ভালো আছেন।
২০০৬ সালের জুলাই মাসের পর থেকে জনসমক্ষে আসেননি ফিদেল। ওই বছর তাঁর পাকস্থলীতে অস্ত্রোপচার করা হয়। এ কারণে রাউল কাস্ত্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি।

হেডলিকে ভারতের জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র

ভারতের মুম্বাই হামলার ঘটনায় জড়িত মার্কিন নাগরিক ডেভিড হেডলিকে ভারত সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে কি না, এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টিমোথি জে রোয়েমার গতকাল মঙ্গলবার এ কথা জানান।
মুম্বাই হামলায় জড়িত সন্দেহে মার্কিন নাগরিক ডেভিড হেডলিকে গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো থেকে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানায় ভারত। ভারতের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে তাদের সঙ্গে টানাপোড়েন সম্পর্ক তৈরি হতে পারে, এ আশঙ্কায় বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখে মার্কিন প্রশাসন।
নয়াদিল্লিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত টিমোথি জে রোয়েমার বলেন, ‘আমাদের সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগীর সঙ্গে সব ধরনের তথ্য বিনিময় করা হবে বলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সে জন্য ভারতের কাছে উল্লেখযোগ্য তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ডেভিড হেডলিকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করতে ভারতকে সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
হেডলি গত সপ্তাহে ২০০৮ সালের মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং তদন্তকাজে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে সম্মত হন। বিনিময়ে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি থেকে রেহাই এবং ভারতের কাছে হস্তান্তর না করার নিশ্চয়তা চান তিনি।
হেডলিকে গ্রেপ্তারের পর ভারতের একদল তদন্ত কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ দেওয়া হয়নি তাঁদের। ভারত তখন থেকে হেডলিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ চেয়ে আসছে।

অনিরাপদ পানির কারণে অনেক মানুষ মারা যায়

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, বিশ্বে প্রতিবছর যুদ্ধসহ সব ধরনের দাঙ্গা-সংঘাতে যত মানুষ মারা যায়, অনিরাপদ পানি পান করে ও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ মারা যায়। গত সোমবার বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে তিনি এ কথা বলেন।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এক প্রতিবেদনে বলেছে, পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার মোট জনসংখ্যার ৩৯ শতাংশ, অর্থাৎ ওই অঞ্চলের সাড়ে ১৫ কোটি মানুষ তাদের প্রয়োজনমতো পানযোগ্য পানি পায় না। আফ্রিকার এখন সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে খাবার পানির অভাব। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে ওই এলাকায় পানিসংকটে থাকা লোকের সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৬০ লাখ। ২০০৮ সালে সেই সংখ্যা সাড়ে ১৫ কোটিতে এসে দাঁড়িয়েছে।
বান কি মুন বলেন, পানির অভাবে এই বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি মানবতার জন্য চরম অপমানজনক। যেসব উন্নত দেশ আফ্রিকাবাসীর উন্নয়নের জন্য কাজ করছে, তাদের সেই প্রচেষ্টাও এতে খর্ব হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, বিশুদ্ধ পানির অভাব একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সরবরাহের ওপর বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নির্ভর করছে। এটা মানবিক ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। হিলারি বলেন, বিশুদ্ধ পানির অভাব যেভাবে দিন দিন বাড়ছে, তাতে নিকট-ভবিষ্যতে পানিসম্পদ ব্যবহারের সফলতার ওপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
বান কি মুন তাঁর বাণীতে বলেন, ‘বিশ্বের প্রাকৃতিক পানিচক্রের মধ্যে আমরা প্রতিবছর লাখ লাখ টন শিল্পবর্জ্য, রাসায়নিক দ্রব্য ও কৃষিবর্জ্য ফেলছি। এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশুদ্ধ পানির পরিমাণ কমে এসেছে। তার ওপর কৃত্রিমভাবে পানিদূষণ অব্যাহত থাকলে তা সবাইকে বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেবে।’
বান কি মুন বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, আফ্রিকার মোট ৫০টি দেশের মধ্যে মাত্র ছয়টি দেশ খাবার পানির চাহিদা পূরণে সক্ষম।
হিলারি ক্লিনটন বলেন, পূর্ব আফ্রিকার ১০টি দেশ যে নীল নদের ওপর নির্ভরশীল, সেই নীল নদের পানিও কৃত্রিম বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে। এখনই বিশুদ্ধ পানিসম্পদ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নারীদের যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করছে সেনারা: ইওপিএম

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সংখ্যালঘু নারীদের যৌন নিপীড়ন করছে এবং তাঁদের যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করছে। সে দেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ইউরোপিয়ান অরগানাইজেশন অব পাকিস্তানি মাইনরিটিজ (ইওপিএম) এ অভিযোগ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ ও দাবি জানানোর সময় এই অভিযোগ করে ইওপিএম। খবর এনডিটিভি অনলাইনের।
সংস্থার কর্মীরা দাবি করেছেন, পাকিস্তানি সেনারা সেখানকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীদের জোর করে পরিবার থেকে ধরে নিয়ে যায়, তাঁদের ধর্ষণ করে এবং তাঁদের যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করে। গত ডিসেম্বরে লাহোরে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর একটি হামলার ঘটনা উল্লেখ করে ইওপিএম আরও দাবি করে, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে।
সংখ্যালঘুদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরতে প্রতীক হিসেবে একটি ভাঙা চেয়ার ব্যবহার করেন সংস্থার কর্মীরা। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতে ধর্ষিত ও নিহত হওয়ার অভিযোগ এনে ওই সব নারীর স্মরণে সে দেশের বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শতাধিক নারী মোমবাতি জ্বালান।
বেলুচিস্তান, গিলগিত ও বালতিস্তানের নারীদের দুর্দশায় উদ্বেগ জানিয়ে ইওপিএমের কর্মীরা অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানকার নারীদের নির্যাতনকেন্দ্রে ধরে নিয়ে ধর্ষণ করেন এবং পরে যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করেন। সংস্থার এক বিবৃতিতে জানানো হয়, কোয়েটার এক স্কুলশিক্ষিকার ওপর এ ধরনের নির্যাতন চালিয়েছে সেনাবাহিনী। নারীদের দুর্দশার প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে বেলুচিস্তান, গিলগিত ও বালতিস্তানে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ারও আহ্বান জানায় সংস্থাটি। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘে একটি বিশেষ অধিবেশনের আয়োজনেরও আহ্বান জানানো হয়।
ইওপিএমের তথ্যানুসারে, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি, যার মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাসিন্দা রয়েছে পাঁচ শতাংশের বেশি। সংস্থার অভিযোগ, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এই তথ্য গোপন করে সংখ্যালঘুদের উপস্থিতি আরও কম বলে প্রচার করে। সংখ্যালঘুদের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় পাকিস্তানের নাম রয়েছে।

থাইল্যান্ডে নিরাপত্তা আইনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে

থাইল্যান্ডের সরকার গতকাল মঙ্গলবার নিরাপত্তা আইনের মেয়াদ আরও এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে। বিক্ষোভকারী নেতারা রাজধানী ব্যাংকককে অচল করে দেওয়ার জন্য ঐতিহাসিক সমাবেশের ডাক দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকক ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় এই আইন বলবত্ থাকবে।
সরকারবিরোধী বিক্ষোভের কারণে গত ১১ মার্চ থেকে থাইল্যান্ডের আটটি প্রদেশে ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইন’ জারি করা হয়। এর আওতায় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন স্থানে তল্লাশিচৌকি স্থাপন এবং কারফিউ জারি করে। গতকাল এই আইন তুলে নেওয়ার কথা ছিল।
বিক্ষোভকারী নেতারা জানান, আগামী শনিবার তাঁরা ওই ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা করেছেন। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাননি তাঁরা। গতকাল বিক্ষোভকারীরা ব্যাংকককে এক হাজার মোটরসাইকেলের শোভাযাত্রা নিয়ে ওই সমাবেশে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রচারপত্র বিলি করেন।
প্রধানমন্ত্রী অভিজিত্ ভেজ্জাজিভার পদত্যাগ ও পার্লামেন্ট ভেঙে নতুন নির্বাচন দেওয়ার দাবিতে গত সপ্তাহে লাল শার্ট গায়ে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারী রাজধানীতে জড়ো হন। শান্তিপূর্ণ এই বিক্ষোভ এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে পৌঁছেছে। তবে ভেজ্জাজিভা পদত্যাগ ও আগাম নির্বাচন দেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বেশির ভাগ বিশ্লেষক বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার সমর্থক এসব বিক্ষোভকারী ধীরে ধীরে হতোদ্যম হয়ে পড়ছেন। কারণ ভেজ্জাজিভা সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্লামেন্ট সদস্যদের সমর্থন পাচ্ছেন। পাশাপাশি দেশের সামরিক বাহিনী ও অভিজাত শ্রেণীর সমর্থন রয়েছে তাঁর পেছনে।
প্রধানমন্ত্রী অভিজিত্ সাংবাদিকদের বলেন, ‘মন্ত্রিসভার সদস্যরা বলছেন, এখনো সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। কড়া নিরাপত্তা আইন আগামী ৩০ মার্চ পর্যন্ত বলবত্ থাকবে।’

উজবেকিস্তানে চিকিৎসকের অবহেলায় ১৫০টি শিশু এইচআইভিতে আক্রান্ত

চিকিৎসকের অবহেলায় ২০০৭-০৮ সালে উজবেকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে ১৫০টি শিশু এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে। গত সোমবার সংবাদ ওয়েবসাইট ফের্গহানা ডট আরইউ এ খবর জানায়।
সরকারি টেলিভিশনের একটি প্রামাণ্যচিত্রের বরাত দিয়ে ওয়েবসাইটে বলা হয়, চিকিৎসকের অবহেলার কারণে শুধু নামানগান অ্যান্ড নামানগান অঞ্চলেই ১৪৭টি শিশু এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি শিশু মারা গেছে।
ওয়েবসাইটে বলা হয়, জীবাণুমুক্ত করা ছাড়াই ক্যাথেটার ও সিরিঞ্জের বারবার ব্যবহারের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।

চীন-মার্কিন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক মে মাসে

আগামী মে মাসে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক হবে। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে এ বৈঠক হবে। চীনা কর্তৃপক্ষ গতকাল মঙ্গলবার এ কথা জানায়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কিন গ্যাং বলেছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র মে মাসের শেষ নাগাদ বেইজিংয়ে দ্বিতীয় দফার বৈঠক করতে প্রাথমিকভাবে রাজি হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঠিক করা হয়নি। গত বছরের জুলাই মাসে ওয়াশিংটনে দুই দেশের মধ্যে প্রথম দফার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়।

কলকাতায় বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ড নিহত ৬, আহত ২০

কলকাতার প্রাণকেন্দ্র পার্ক স্ট্রিটের একটি বহুতল ভবনে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আগুন লেগে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে ২০ জন। এর মধ্যে গুরুতর আহত ১৭ জনকে কলকাতার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বহুতল ভবনের এই বাড়ির পাঁচতলায় বেলা দুইটার দিকে এই আগুন লাগে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের ৪৫টি ইউনিট কাজ করছে। আগুন লাগার কারণ এখনো জানা যায়নি। আগুন থেকে বাঁচার জন্য পাঁচতলা থেকে ঝাঁপ দিলেপাঁচজনের মৃত্যু হয়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়একজন।
সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, এখনো আগুন নেভাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, এখনো ওই ভবনে অন্তত ৭০-৮০ জন আটকে আছে। ফায়ার সার্ভিস বড় মই এনে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

‘ইরানের ওপর শিগগিরই অবরোধ আরোপ করা হবে’

পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করতে রাজি না হওয়ায় ইরানের ওপর নতুন অবরোধ আরোপ করার একটি প্রস্তাব অনুমোদনের ব্যাপারে শিগগিরই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে মার্কিন কংগ্রেস। গত সোমবার মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদলীয় সদস্যদের নেতা স্টেনি হয়ার এ কথা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থী লবিগোষ্ঠী এইপ্যাকের সম্মেলনে মার্কিন এই আইন প্রণেতা বলেন, ‘সহিংসতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া একটি শাসকগোষ্ঠীর (ইরানের সরকার) কাছ থেকে এ ব্যাপারে আন্তরিকভাবে মনোভাবের পরিবর্তন আশা করতে পারি না আমরা। তবে আমরা আচরণ পরিবর্তন করার দাবি জানাতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘ইরানের অর্থনীতিকে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে নামিয়ে আনতে অবরোধ আরোপের ব্যাপারে কংগ্রেস দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। আর এ জন্য ইরানের তেলসম্পদকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।’
অভ্যন্তরীণ পরিশোধন ক্ষমতা কম হওয়ায় ইরানের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ পূরণ করা হয় আমদানি করা তেল দিয়ে। আর দেশটির এই দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর মতো একটি আইন তৈরি করতে কাজ করছে মার্কিন কংগ্রেস।
হয়ার আরও বলেন, ‘এই অবরোধ আরোপের ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন ইরানকে চড়া মূল্য দিতে হবে।’ ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও নিজের সমর্থন জানান তিনি। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ ইরান পরমাণু বোমা তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলে আসছে তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
এদিকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে কঠোর অবরোধ আরোপ করার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের শীর্ষ দুই রিপাবলিকানদলীয় সদস্য। তাঁরা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান টানাপোড়েনের ইতি টানারও আহ্বান জানিয়েছেন।

বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে রেললাইন উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে

ভারতের সাতটি রাজ্যে মাওবাদীদের ডাকা ৪৮ ঘণ্টা বনেধর সময় গত সোমবার গভীর রাতে বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রেললাইন উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে মাওবাদীরা সোমবার দুপুরে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ভালুককোনিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রেললাইন উড়িয়ে দেয়।
কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষিত অপারেশন গ্রিন হান্টের প্রতিবাদে মাওবাদীরা ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়, অন্ধ্রপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে বন্ধ্ আহ্বান করেছে। গত সোমবার থেকে এই বন্ধ্ কর্মসূচি শুরু হয়।
সোমবার গভীর রাতে মাওবাদীরা বিহারের গয়ার কাছে রেললাইনে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে রেললাইন। এ কারণে ওই পথে আসা রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনের আটটি বগি ও ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হয়। এতে কারও প্রাণহানি না ঘটলেও বিস্ফোরণে আপ ও ডাউন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর এই পথে বন্ধ হয়ে গেছে ট্রেন চলাচল। আটকে পড়েছে বহু দূরপাল্লার ট্রেন।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী অধ্যুষিত পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রামের ছয় কিলোমিটার দূরে গিডনি ঘাটকুরা স্টেশনের মাঝে মাওবাদীরা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ট্রেন লাইন উড়িয়ে দিয়েছে। এতে এই পথেও বন্ধ হয়ে গেছে ট্রেন চলাচল। রেল কর্তৃপক্ষ ট্রেন লাইন দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছে। একই জেলার সাকরাইলে একজন সিপিএম নেতাকে হত্যা করেছে মাওবাদীরা।
অন্যদিকে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পূর্ব সিংভূম জেলার কোকপাড়া-ডালভূমগড়ি রেললাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পথেও বন্ধ হয়ে গেছে ট্রেন চলাচল। এ রাজ্যের সরইকেলা এলাকায় মাওবাদীরা একজন পুলিশকে হত্যা করেছে। বোকারো এলাকায় চারজন ব্যবসায়ীকে অপহরণ করেছে তারা।
এদিকে ওড়িশার রাউরকেল্লার কাছে বিরসা-বঙ্গমুন্ডা স্টেশনের মাঝামাঝি জায়গায় গতকাল মঙ্গলবার সকালে রেললাইনে পরপর বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ওই পথে আসা একটি মালগাড়ির পাঁচটি বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রেললাইন ওড়ানোর কারণে এই লাইনেও ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

জেরুজালেম আমাদের রাজধানী

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘জেরুজালেমে বসতি নির্মাণের অধিকার ইসরায়েলিদের রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জেরুজালেম কোনো অধিকৃত বসতি নয়, এটি আমাদের রাজধানী।’ গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ইসরায়েলপন্থী লবিগোষ্ঠী এইপ্যাকের একটি সম্মেলনে বক্তৃতা দেয়ার সময় এ কথা বলেন তিনি। খবর বিবিসি ও এএফপির।
এর আগে একই সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু করার জন্য ইসরায়েলকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকায় ইহুদি বসতি স্থাপন কার্যক্রমের সম্প্রসারণ শান্তিপ্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে খাটো করে ফেলছে। তবে দুজনই তাঁদের বক্তব্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একই ধরনের সতর্ক বার্তা উচ্চারণ করেন এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ সমর্থনের কথা জানান।
হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে বৈঠকের আগে হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে আলাদা একটি বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা বৈঠকের একপর্যায়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাকও যোগ দেন।
হিলারির মুখপাত্র ফিলিপ ক্রাউলি বলেন, বৈঠকে তাঁরা পরিস্থিতি ভালো করার বিষয়ে সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আস্থার একটি পরিবেশ তৈরি করার জন্যই মূলত আজ করছি আমরা। যাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পরোক্ষ আলোচনায় মূল বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারে এবং যত দ্রুত সম্ভব সরাসরি আলোচনায় বসতে পারে।’ এই মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা, জেরুজালেম নিয়ে সিদ্ধান্ত, ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের ভাগ্য এবং ভবিষ্যত্ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সীমানা।
প্রভাবশালী আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (এইপ্যাক) সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইহুদিরা তিন হাজার বছর আগে জেরুজালেম তৈরি করেছে এবং আজও তারা এই নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে।’ অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের বসতি জেরুজালেম শহরের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং যেকোনো শান্তি চুক্তিতেই এটি ইসরায়েলের অধীনে থাকবে। তাই এখানে বসতি নির্মাণ দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে শান্তি আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনিদের প্রতিবেশী হিসেবে চায় এবং চায় তারা স্বাধীনভাবে বসবাস করুক।’ সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, বাইরে থেকে শান্তি চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
একই সম্মেলনে ক্লিনটন বলেন, শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতেই অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন কার্যক্রমের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি পশ্চিম তীরের পাশাপাশি পূর্ব জেরুজালেমেও বসতি স্থাপন কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানান। এ ছাড়া মানবিক দিক বিবেচনা করে গাজা থেকে ইসরায়েলের অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বানও জানান হিলারি।

আঞ্চলিক নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর মন্ত্রিসভায় রদবদল করেছেন সারকোজি

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি গত সোমবার তাঁর সরকারের এক মন্ত্রীকে বরখাস্ত এবং মন্ত্রিপরিষদে রদবদল করেছেন। গত রোববার ফ্রান্সের আঞ্চলিক নির্বাচনে বামপন্থীদের কাছে পরাজয়ের পর সারকোজি এ সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে গতকাল মঙ্গলবার থেকে বিভিন্ন শহরে ধর্মঘট শুরু হওয়ায় এখনো চাপের মধ্যে রয়েছেন সারকোজি। এদিকে ফ্রান্সে বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি, মজুরি হ্রাস এবং অবসরভাতা সংস্কারের পরিকল্পনার প্রতিবাদে ফ্রান্সের ডজনখানেক শহরে গতকাল ধর্মঘট পালিত হয়। বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পেনশন-ব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিতে এ ধর্মঘট শুরু হয়েছে। খবর এএফপির।
সারকোজি শ্রমমন্ত্রী জ্যাভিয়ার দার্কোসকে বরখাস্ত করেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন বাজেটমন্ত্রী এরিক ওয়ের্থ। অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাকের সময়ের মন্ত্রী ফ্রানকো ব্যারনকে বাজেটমন্ত্রী করা হয়েছে। এ ছাড়া সারকোজি যুবমন্ত্রী ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নতুন দুজনকে দায়িত্ব দিয়েছেন। ফ্রানকোর নিয়োগের মধ্য দিয়ে সারকোজি তাঁর দলের মধ্য ও ডানপন্থী সদস্যদের শান্ত করলেন।
ফ্রান্সে গত রোববারের আঞ্চলিক নির্বাচনে দ্বিতীয় দফা ভোট নেওয়া হয়। গত সোমবার প্রকাশিত ফলে দেখা যায়, সমাজতান্ত্রিক দল এবং অন্যান্য বামপন্থী দল ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পায়। অন্যদিকে সারকোজির ইউনিয়ন ফর এ পপুলার মুভমেন্ট (ইউএমপি) দল পায় ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট। ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ড ও কোরসিয়ার ২২টি অঞ্চলের মধ্যে মাত্র একটিতে জিততে পারে ইউএমপি। এর আগে গত ১৪ মার্চের প্রথম দফা নির্বাচনে বামপন্থীরা ৫০ শতাংশ ভোট পায়। ইউএমপি মোট ভোটের এক-চতুর্থাংশের কিছু বেশি পায়। সারকোজির দল গত এক দশকের মধ্যে এই প্রথম সবচেয়ে কম ভোট পেল। এতে ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের আশা করছে বামপন্থীরা।
বিশ্লেষকেরা বলেছেন, বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে ফ্রান্সে অর্থনৈতিক ধস নেমে বেকারত্ব বাড়ায় সারকোজির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে ফরাসিরা। আঞ্চলিক নির্বাচনে তাদের সেই আস্থাহীনতার প্রতিফলন ঘটেছে।
ফ্রান্সের অর্থনীতির উন্নয়ন এবং মানুষকে কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সারকোজি। কিন্তু গত বছরের অর্থনৈতিক মন্দায় ফ্রান্সে বেকারত্বের হার ১০ শতাংশ বাড়ে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

নারায়ণগঞ্জে এনসিসি ব্যাংকের ৬৬তম শাখা উদ্বোধন

প্রথম দিন থেকেই অনলাইন সুবিধা নিয়ে বন্দরনগর নারায়ণগঞ্জে এনসিসি ব্যাংক লিমিটেডের ৬৬তম শাখার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী গতকাল সোমবার শাখাটির উদ্বোধন করেন।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান সাংসদ মো. হারুনুর রশীদ, পরিচালক নূরুন নেওয়াজ, খায়রুল আলম চাকলাদার ও এম এ কাশেম।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম হাফিজ আহমেদ।
এ ছাড়া ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে মো. সিদ্দিকসহ ঊর্ধ্বতন নির্বাহী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

খুলনায় ঢাকা ব্যাংকের শাখা উদ্বোধন

ঢাকা ব্যাংকের খুলনার কেডিএ এভিনিউ শাখার উদ্বোধন করা হয়েছে।
শাখাটির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন সরকার। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হানিফ, প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও পরিচালক আবদুল হাই সরকার, সাবেক চেয়ারম্যান এ টি এম হায়াতুজ্জামান খান, পরিচালক আফরোজা আব্বাস, রোকসানা জামান, মো. আমির উল্লাহ, রেশাদুর রহমান ও জসিম উদ্দিন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোন্দকার ফজলে রশীদ এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর রহিমসহ প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন বিভাগীয় প্রধান ও খুলনা শাখার ব্যবস্থাপক উপস্থিত ছিলেন।

দেশের পোলট্রিশিল্প রক্ষার দাবি

ভারত থেকে অবাধে ডিম ও মুরগি আমদানির অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি বড় বড় হ্যাচারির মালিক ও ফিড-মিলারদের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দেশের পোলট্রিশিল্প ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
পোলট্রি খাতের তিনটি সমিতির নেতারা গত সোমবার দিনাজপুর প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন।তাঁরা পোলট্রিশিল্প রক্ষায় সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে দিনাজপুর চেম্বারের সভাপতি নুরুল মঈন, বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মো. মহসীন, জেলা পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মাসুম আল আমিন এবং খামারি রানা দে ও তাইবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, দেশে ডিমের দাম বাড়ার অজুহাতে তিন মাস আগে বাণিজ্যমন্ত্রীর নির্দেশে আগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। যে কারণে দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে বৈধ পথে আমদানির পাশাপাশি চোরাচালানেও বার্ড ফ্লু আক্রান্ত মুরগি ও ডিম আসছে। এতে পোলট্রিশিল্প যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি বার্ড ফ্লু মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, ব্রয়লার বা লেয়ার মুরগির এক দিনের একটি বাচ্চা উৎপাদনে খরচ পড়ে মাত্র ২০ টাকা, অথচ হ্যাচারির মালিকেরা তা ৫০ টাকায় এবং লেয়ারের বাচ্চা ৭০ টাকার কমে বিক্রি করছেন না। অন্যদিকে ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা মুরগির খাবারের ন্যায্য দাম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা হলেও পোলট্রি মিলের মালিকেরা বর্তমানে তা বিক্রি করছেন দেড় হাজার টাকায়।

তথ্যপ্রযুক্তি হতে পারে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত

২০২১ সালের মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাত (আইসিটি) দেশের রপ্তানি আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাতে পরিণত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
আমদানি করা পণ্যের শুল্কায়নে প্রাক-জাহাজীকরণ পরিদর্শন (পিএসআই) পদ্ধতি তুলে দেওয়া হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর স্থানীয় একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) মাসিক মধ্যাহ্নভোজ সভায় বিশেষ বক্তা হিসেবে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। ভোজসভার এবারের আলোচ্য বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যত্’।
অ্যামচেমের সভাপতি আফতাব উল ইসলাম এতে স্বাগত বক্তব্য দেন। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহসভাপতি খালিদ হাসান, কোষাধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদ, সদস্য স্টিভেন এন উইলসন, দেবাশীষ দেব, জিয়া ইউ আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক এ গফুর, বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দি অ্যাফেয়ার্স নিকোলাস জে ডিন, সাবেক সচিব ফারুক সোবহান প্রমুখ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থনীতির ভবিষ্যত্ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু বলা হচ্ছে। সরকারের দিক থেকে স্বচ্ছতা রয়েছে এ ব্যাপারে। এর মধ্যে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রেক্ষিত পরিকল্পনাও করা হয়েছে।’
তথ্যপ্রযুক্তি এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগের উন্নয়নকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম দুই গুরুত্বপূর্ণ খাত বলে আখ্যা দেন অর্থমন্ত্রী। উন্নয়নের জন্য সুশাসনের প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিকে জনগণের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রেই দরকার তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগ। সরকারঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে সুশাসনেরও অনেক কাজ হবে, ফিরে আসবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। তবে এক দিনেই তা করা সম্ভব হবে না।’
এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, এক হাজার ৮০০টি পণ্যে বর্তমানে পিএসআই বাধ্যতামূলক। এ পদ্ধতি তুলে দেওয়া হবে। পণ্যের শুল্কায়নের ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি চালু করার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, এ ব্যাপারে কাজ চলছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্রোকার, বিনিয়োগকারী ও তারল্যের দিক থেকে দেশের পুঁজিবাজার অনেক বড় হয়েছে। আর বাজার যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁরা সংকুচিত। গোটা পুঁজিবাজারেরই সংস্কার দরকার বলে তিনি মনে করেন।
অ্যামচেমের সভাপতি বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) আকর্ষণে বেসরকারি খাতের মুনাফার নিশ্চয়তা একটি অন্যতম দিক। তা না হলে বেসরকারি খাত এগিয়ে আসবে না। তিনি বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-সংকটে বিনিয়োগ হচ্ছে না। আর ওদিকে পিপিপির নীতিনির্দেশনাই এখনো তৈরি হয়নি।
দেশের বিভিন্ন খাতের আইন যুগোপযোগী করার পরামর্শ দেন আফতাব উল ইসলাম। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘মেক্সিকোতে ছয় বছরে আইনকানুনের ৯০ শতাংশ পরিবর্তন করা হয়েছে। বাংলাদেশেও তা অসম্ভব নয়।’

বর্গাচাষিদের ঋণে দালালদের পুরো মাত্রায় প্রভাব আছে

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) সমীক্ষা করে দেখেছে, কৃষিঋণ বিশেষত বর্গাচাষিদের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এখনো স্থানীয় দালাল, টাউট ও সম্ভ্রান্তদেরই প্রভাব রয়েছে পুরো মাত্রায়। ঋণ পেতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কৃষকদের এদের অবৈধ সুবিধা দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকসহ রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও বেসরকারি ব্যাংকের কৃষিঋণ বিতরণের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে এ তথ্য উপস্থাপন করেছে সংস্থাটি।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, যে উদ্দেশ্যে বর্গাচাষিদের অর্থ জোগানের জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা উচ্চসুদের হার ব্যাহত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে কার্যকর সুদের হার গিয়ে ঠেকেছে ১৩ দশমিক ৬৮ শতাংশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ ব্যাংকগুলোকে এসব বিষয়ে তদারকির ব্যবস্থা জোরদার করারও তাগিদ দিয়েছে বিআইবিএম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান অবশ্য বলেছেন, পরীক্ষামূলকভাবে বর্গাচাষিদের কৃষিঋণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ভবিষ্যতে এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি কাটানোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএমের মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বর্গাচাষিদের জন্য আর্থিক সহায়তা’ শীর্ষক সেমিনারে গতকাল মঙ্গলবার এ সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়। আতিউর রহমান সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন।
নির্ধারিত আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এবং বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত পরিচালক ও গবেষণা বিভাগের প্রধান উত্তম কুমার দেব।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক বন্দনা সাহা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল জলিল চৌধুরী।
প্রবন্ধে বলা হয়, উচ্চসুদে ঋণ নেওয়ায় তা পরিশোধে অনীহা দেখাতে পারেন বর্গাচাষিরা। আবার ঋণ বিতরণ ও পরিশোধে সামাজিক দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করতে বর্গাচাষিদের নিয়ে দল গঠনের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, ব্যাংকগুলো তা অনুসরণ করেনি। তাই বর্গাচাষিদের অর্থায়ন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগের ফলাফলটি সফল নাও হতে পারে।
সম্প্রতি বিআইবিএম বর্গাচাষিদের ব্যাংকঋণ বিতরণের ওপর একটি সমীক্ষা চালায়। এটি পরিচালনা করেন বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল জলিল চৌধুরী, অনুষদ সদস্য শেখ নজিবুল ইসলাম ও প্রভাষক মোহাম্মদ শফিউল্লাহ।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ২০টি জেলার ৩৪৩ জন বর্গাচাষির সাক্ষাত্কার নেওয়া হয় এ সমীক্ষা চালাতে। আবার ঋণ নিয়েছেন এমন ১৫ জন ভূমিহীন বর্গাচাষি, ৭৩ জন ব্যাংক ও এনজিও কর্মকর্তা, ৫৯ জন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ১৬ জন সহকারী কৃষি কর্মকর্তার সাক্ষাত্কারও সমীক্ষাকালে নেওয়া হয়।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, জামানতবিহীন কৃষিঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ভূমিহীন বর্গাচাষিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তাঁরা যথেষ্ট ঋণ পাননি। ঋণ বিতরণে প্রান্তিক চাষিরা অগ্রাধিকার পেয়েছেন।
সমীক্ষা অনুসারে কৃষি ব্যাংক বিতরণ করা ঋণের মাত্র ১৬ দশমিক ২৮ শতাংশ দিয়েছে ভূমিহীন বর্গাচাষিদের, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) দিয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ, উত্তরা ব্যাংক দিয়েছে ১০ শতাংশ আর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ভূমিহীন বর্গাচাষিদের ঋণ দিয়েছে ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
ফলে ভূমিহীন বর্গাচাষিরা বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়ন-সুবিধার আওতার বাইরে রয়ে গেছেন বলে সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমীক্ষার সুপারিশে এসব অসংগতি দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা সংশোধন এবং ঋণ বিতরণ কার্যক্রম তদারক করার জন্য একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
অবশ্য আতিউর রহমান বলেন, নীতিমালায় সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। আগামী জুলাই মাসে কৃষিঋণনীতি (সংশোধিত) প্রকাশকালে গবেষণা থেকে যেসব সুপারিশ বেরিয়ে এসেছে, তা বিবেচনায় নেওয়া হবে। বিআইবিএম কৃষিঋণ বিতরণ নিয়ে যে সমীক্ষা করেছে, তা ভবিষ্যতে অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, কৃষিঋণ বিতরণের জন্য অবশ্যই একটি তদারকি কাঠামো থাকতে হবে। ঋণ পরিশোধে সামাজিক দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করতে কৃষকদের নিয়ে দল গঠন করা আবশ্যক বলেও তিনি মত দেন।
তিনি সত্যিকার কৃষকদের চিহ্নিত করতে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের নেতৃত্বে গ্রামের সব পক্ষকে নিয়ে একটি সমীক্ষা চালানোর আহ্বান জানান। ওই সমীক্ষার ভিত্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের পরিচয়পত্র দেওয়া যেতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ চান ব্যবসায়ীরা



স্থানীয় শিল্প খাতের উন্নয়ন ও দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আর এ জন্য ২০১০-১১ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে এ খাতে অধিক পরিমাণে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
গতকাল মঙ্গলবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘শুল্ক ও অশুল্ক কাঠামো: শিল্প খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। তাঁরা রাজস্ব আদায় বাড়াতে আগামী পাঁচ বছর পিএসআই বহাল রাখার তাগিদ দিয়েছেন।
রাজধানীর স্থানীয় একটি হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া প্রধান অতিথি ছিলেন। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রথম সহসভাপতি আবুল কাশেম আহমেদের সভাপতিত্বে আয়োজিত কর্মশালায় শিল্পসচিব দেওয়ান জাকির হোসাইন বিশেষ অতিথি ছিলেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ বি এম খোরশেদ আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘অতীতে শিল্প মন্ত্রণালয় শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানাগুলো দেখভাল করেছে, আর সময়-সুযোগ বুঝে সেগুলো বেসরকারি খাতে বিক্রি করে দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এ মন্ত্রণালয় দেশকে শিল্পায়িত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। বর্তমান সরকার ব্যবসানির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে এসে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।’
শিল্পসচিব দেওয়ান জাকির হোসাইন বলেন, ‘২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে হলে শিল্পায়নের বিকল্প নেই। শিল্পায়নের মাধ্যমে জিডিপিতে শিল্পের অবদান ২৮ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।’
সচিব আরও জানান, ইতিমধ্যে বেসরকারি খাতগুলোর সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি অনুবিভাগ চালু করা হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে আবুল কাশেম আহমেদ বলেন, দেশীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রাক-জাহাজীকরণ প্রথা (পিএসআই) আরও পাঁচ বছর বহাল রাখতে হবে। তা ছাড়া এ প্রথা চালু রাখা হলে রাজস্ব আদায় বাড়বে।
এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ও সাংসদ গোলাম দস্তগীর গাজী বিদ্যুৎ উৎপাদন নিজেই একটি শিল্প খাত হওয়ায় এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না বাড়ালে দেশে শিল্পায়ন হবে না। তিনি শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত ডিজেলের ভর্তুকি দেওয়ার সুপারিশ করেন।
বিসিআইয়ের পরিচালক প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, বিদ্যুৎ সমস্যার দ্রুত সমাধানে সরকারকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য সবাইকে উৎসাহিত করতে হবে।
বিটিএমএর মহাসচিব তৌফিক হাসান বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে আর কিছু করতে হবে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রতি জেলায় ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করেন।

এসইসির বিভ্রান্তিকর নির্দেশনা

দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল মঙ্গলবার লেনদেন শুরু হয়েছিল সূচকের ঊর্ধ্বগতি দিয়ে।
কিন্তু বেলা দেড়টার পর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) ঋণসুবিধাসংক্রান্ত একটি আদেশকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে দ্রুত কমতে থাকে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম। এ সময় বিনিয়োগকারীদের একটা অংশ রাস্তায় নেমে এসে এসইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পরে তারা রাজধানীর দিলকুশায় এসইসির কার্যালয়ে গিয়ে আদেশটি প্রত্যাহারের দাবি জানায়।
তবে এসইসি বলেছে, আদেশটির ভুল ব্যাখ্যার কারণে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। সিদ্ধান্তটি বরং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের কথা মাথায় রেখেই নেওয়া হয়েছে।
এসইসির আদেশে বলা হয়েছে, ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে তাদের গ্রাহকদের ঋণ রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনে পোর্টফোলিও বা শেয়ারের মূল্যায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শেয়ারের সর্বশেষ বাজারমূল্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রকৃত সম্পদমূল্য (এনএভি) যোগ করে দুই দিয়ে ভাগ দিয়ে যে অঙ্কটি দাঁড়াবে, সেটিই হবে ঋণ রক্ষণাবেক্ষণের ভিত্তি। অর্থাৎ কোনো শেয়ারের বাজারমূল্য এক হাজার টাকা ও এনএভি ৪০০ টাকা হলে এসইসির পদ্ধতি অনুযায়ী ঋণ রক্ষণাবেক্ষণের সময় শেয়ারটির মূল্য ৭০০ টাকা ধরে নেওয়া হবে।
যোগাযোগ করা হলে এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আনোয়ারুল কবির ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন এ আদেশ ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে যে হারে ঋণসুবিধা পাচ্ছেন সে হারেই পাবেন। পদ্ধতিটি কেবল মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসের গ্রাহকদের ঋণ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রযোজ্য হবে।’
কিন্তু এসইসিরই অনেক কর্মকর্তা এ পদ্ধতিকে হাস্যকর বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলেন, নিজের মূলধনের দেড় গুণ (১:১.৫) ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করার পর এ পদ্ধতিতে শেয়ারের মূল্যায়ন করা অনেক ক্ষেত্রে প্রথম দিনেই গ্রাহককে বিক্রির চাপে পড়তে হবে।
লেনদেন চলাকালীন এমন একটি আদেশ দেওয়ার জন্য কঠোর সমালোচনা করেন তাঁরা। তাঁরা বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে লেনদেন চলাকালীন কোনো তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকার কথা বললেও এসইসি নিজেই তা মানছে না।
বাজার পরিস্থিতি: গতকাল দিন শেষে ডিএসইর সাধারণ সূচক ৪৩ পয়েন্ট কমে পাঁচ হাজার ৫৮৫ পয়েন্টে নেমে আসে।
তবে সূচক কমলেও লেনদেন আগের দিনের চেয়ে প্রায় ৯০ কোটি টাকা বেড়ে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই)। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক ২৫ পয়েন্ট কমে হয়েছে ১৬ হাজার ৬৮। লেনদেন হয়েছে ৯৪ কোটি টাকার শেয়ার।

চেন্নাইকে হারাল বেঙ্গালুরু

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের পঞ্চম ম্যাচে আউট হলেন জ্যাক ক্যালিস। তাঁকে আউট করলেন লক্ষ্মীপতি বালাজি। কাল বেঙ্গালুরু রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্সের বড় রান করার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গিয়েছিল ১৬.৫ ওভারে, তখন তাদের স্কোর ছিল ১১৯/৫। সেখান থেকেই তারা ১৭১ পর্যন্ত গেল ‘উথাপ্পা-ঝড়ে’। ৬টি ছক্কা ও ৩টি চারের সাহায্যে ৩৮ বলে ৬৮ রান করে অপরাজিত থাকেন রবিন উথাপ্পা। জবাবে ৭ উইকেটে ১৩৫ রান তুলতেই শেষ চেন্নাইয়ের ইনিংস। চেন্নাইয়ের ম্যাথু হেইডেন করেন সর্বোচ্চ ৩২ রান।

সিনিয়র ডিভিশন ফুটবল

অবশেষে দুই বছর পর ঢাকার সিনিয়র ডিভিশন ফুটবল লিগ মাঠে গড়াচ্ছে। ৫-১০ এপ্রিল দলবদল। লিগ শুরু ২ মে। সিদ্ধান্তটা নিয়েছে নবগঠিত সিনিয়র ডিভিশন লিগ কমিটি। ইসমত জামিল আকন্দকে (লাভলু) চেয়ারম্যান ও সাব্বির হোসেনকে সম্পাদক করে ১১ সদস্যের ওই লিগ কমিটি গঠিত হয়েছে সম্প্রতি। এর আগে বারবার তারিখ দিয়েও এই লিগ হয়নি। দলবদল নিয়ে ছিল নানা টালবাহানা। নতুন কমিটির প্রতিশ্রুতি, কোনো অজুহাতেই আর পেছানো হবে না লিগ। যেখানে খেলার কথা পেশাদার লিগের বাইরের দলগুলো।

লাঞ্চের আগেই জিতল অস্ট্রেলিয়া

ওয়েলিংটনের প্রকৃতি আর ব্রেন্ডন ম্যাককালাম— নিউজিল্যান্ড বড় আশায় তাকিয়ে ছিল এই দুইয়ের দিকে। তৃতীয় দিনেই ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাওয়া ম্যাচটি পঞ্চম দিনে গড়াল তো এই দুইয়ের সৌজন্যেই। কিন্তু আগের দিনের বৈরী প্রকৃতির চিহ্নমাত্র ছিল না কাল ওয়েলিংটনে, সকাল থেকেই ঝলমলে আবহাওয়া, চনমনে রোদ। আর আগের দিন রিকি পন্টিংদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ানো ‘ম্যাককালাম প্রাচীর’ও ভেঙে পড়ল দিনের চতুর্থ ওভারেই। অস্ট্রেলিয়ান পেসারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের পর ফিলিপ হিউজের ঝোড়ো ইনিংস, লাঞ্চের আগেই নিউজিল্যান্ডকে ১০ উইকেটে উড়িয়ে দিয়ে ট্রান্স-তাসমান ট্রফিতে এগিয়ে গেল অস্ট্রেলিয়া।
প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে না পারলেও প্রত্যাশিত সেঞ্চুরিটা ঠিকই পেয়েছেন ম্যাককালাম। ৯৪ রানে দিন শুরু করেছিলেন, বলিঞ্জারের করা দিনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বলেই টানা দুই চারে ছুঁয়েছেন তিন অঙ্ক। দলের প্রয়োজনে খেলেছেন নিজের স্বভাববিরুদ্ধ, ক্যারিয়ায়ের পঞ্চম ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম সেঞ্চুরিটা তাঁর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে মন্থর সেঞ্চুরিও। দলের কাজে না লাগায় তার পরও অবশ্য খুব একটা খুশি নন ম্যাককালাম, ‘খুব ভালো একটা দলের বিপক্ষে করা বলে এটাকে আমার সেরা সেঞ্চুরিই বলব। কিন্তু যখন দলের কাজে আসে না, তখন অনুভূতিটা ঠিক একই রকম থাকে না।’
চতুর্থ দিনটা পন্টিংয়ের কপালে যতটুকু ভাঁজ ফেলেছিল, কাল সাতসকালেই তা দূর করে দেন অভিষিক্ত পেসার রায়ান হ্যারিস। টানা তিন ওভারে ফিরিয়ে দেন ম্যাককালাম, সাউদি ও আরনেলকে। প্রথম ইনিংসে দুটির পর দ্বিতীয় ইনিংসে চারটি, স্মরণীয় অভিষেকই হলো ৩০ বছর বয়সী কুইন্সল্যান্ড পেসারের। জনসন মার্টিনকে বোল্ড করে দিলে কাল ১০.১ ওভারে মাত্র ৩৮ রান যোগ করেই শেষ কিউই ইনিংস।
হিউজের সৌজন্যে ১০৬ রানের লক্ষ্যে পৌঁছাতে অস্ট্রেলিয়ার লাগে মাত্র ২৩ ওভার। ক্রিস মার্টিনের করা প্রথম ওভারে ১০ রান নিয়ে শুরু করেছেন হিউজ, ড্যানিয়েল ভেট্টোরিকেও স্বাগত জানিয়েছেন চার-ছয়ে। ৪৩ বলে ছোঁয়া ফিফটিটি ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্টে সেই জোড়া সেঞ্চুরির পর প্রথম। ৭৫ বলে অপরাজিত ৮৬, অধিনায়ক পন্টিংয়ের কাছ থেকে পেয়েছেন দারুণ প্রশংসা, ‘হিউজ শেবাগের মতো ব্যাটসম্যান’। তার পরও হয়তো ২৭ মার্চ শুরু হ্যামিল্টন টেস্টে বাইরেই বসে থাকতে হবে তাঁকে, শেন ওয়াটসন যে দ্রুত কাটিয়ে উঠছেন ইনজুরি!
ফলোঅন করানোয় ফিল্ডিং হয়েছে টানা প্রায় চার দিন, তার পরও নিজের সিদ্ধান্তের জন্য স্বস্তি প্রকাশ করেছেন পন্টিং, ‘আমি জানতাম প্রকৃতি ঝামেলা পাকাতে পারে। হয়তো আবার ব্যাটিং করে আমরা ৬০০ রানের মতো টার্গেট দিতে পারতাম, কিন্তু এতে ফলাফল আসার সম্ভাবনা কমে যেত। আমি নিজে এবং অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দল সব সময় জয়ের সেরা সুযোগটাই নেওয়া চেষ্টা করে। এমন নিবেদনের জন্য বোলারদের ধন্যবাদ, দু দিন বিশ্রাম ওদের প্রাপ্য।’ আর ভেট্টোরিকে পোড়াচ্ছে প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং-বোলিং, ‘আমাদের অনেক উন্নতি করতে হবে, বিশেষ করে প্রথম ইনিংসে। দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি, কিন্তু প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং-বোলিংয়ে আরও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।’

চট্টগ্রাম আবাহনীর জয় মুক্তিযোদ্ধার ড্র

বাংলাদেশ লিগে কাল আরও চারটি দল প্রথম পর্বের খেলা শেষ করেছে। ঢাকার কমলাপুর স্টেডিয়ামে মুক্তিযোদ্ধা-বিয়ানীবাজার ম্যাচ ড্র হয়েছে (১-১)। চট্টগ্রামে স্থানীয় আবাহনী ১-০ গোলে হারিয়েছে রহমতগঞ্জকে।
চট্টগ্রাম আবাহনী জয়সূচক গোল পেয়েছে অতিরিক্ত সময়ে। রনি করেছেন ওই গোল। ৩০ গজ দূর থেকে তাঁর আচমকা শট জালে যেতেই নির্ধারিত হয়ে যায় ম্যাচের ভাগ্য। গোল পরিশোধের আর সময়ই পায়নি রহমতগঞ্জ।
মুক্তিযোদ্ধা-বিয়ানীবাজার ম্যাচটা ছিল একেবারেই সাদামাটা। ২২ মিনিটে বিয়ানীবাজারকে এগিয়ে নেন জুয়েল। ৬৮ মিনিটে রাসেল আনসারি মুক্তিযোদ্ধাকে ম্যাচে ফেরান। ইনজুরিগ্রস্ত-ভাঙাচোরা দল নিয়ে জিততেও পারত মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু জয় না পাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা দুষছে রেফারিকে। মুক্তিযোদ্ধার দাবি, বিয়ানীবাজারের বক্সে তাদেরই এক খেলোয়াড়ের হাতে বল লাগলেও পেনাল্টি দেননি রেফারি।
সেটা যাই হোক, এই ড্র লিগের অবনমন এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগুন ছড়িয়ে দিল। ১২ ম্যাচে মুক্তিযোদ্ধার পয়েন্ট ১১। রহমতগঞ্জের পয়েন্টও ১১। চট্টগ্রাম আবাহনীর ১৪, বিয়ানীবাজারের ১২। ৭ পয়েন্ট নিয়ে শুকতারা সবার নিচে। তবে দ্বিতীয় পর্বের ১২ ম্যাচ বাকি। দুটি দল অবনমিত হবে।
মুক্তিযোদ্ধা কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শেষ তিন ম্যাচ থেকে তারা পেয়েছে ৭ পয়েন্ট। সর্বশেষ দুটি ম্যাচ তো তারা খেলল তিন বিদেশিকে বাদ দিয়েই। দ্বিতীয় পর্বে তারা পেতে পারে আগে খেলে যাওয়া নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার পলকে।
চট্টগ্রামে দুই মোহামেডানের ম্যাচ দিয়ে আজ শেষ হচ্ছে লিগের প্রথম পর্ব। এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে ম্যাচ এক ঘণ্টা পিছিয়ে শুরু হবে সাড়ে চারটায়। দ্বিতীয় পর্ব শুরু ২৯ মার্চ, সূচি অনুয়ায়ী শেষ হওয়ার কথা ৮ জুন। আজ শুরু হচ্ছে বিশেষ দলবদল।

আফ্রিদিই পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক

শহীদ আফ্রিদির অধিনায়কত্বেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলবে পাকিস্তান। আগামী মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজে শুরু হতে যাওয়া টুর্নামেন্টের জন্য পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) কাল অধিনায়ক ঘোষণা করেছে আফ্রিদিকে।
গত বছর টি-টোয়েন্টি থেকে অধিনায়ক ইউনুস খানের অবসর নেওয়ার পর পাকিস্তান দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন আফ্রিদিই। তাঁর নেতৃত্বে খেলা তিনটি টি-টোয়েন্টির তিনটিতেই জিতেছে পাকিস্তান। আরেকটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের নেতৃত্ব দেওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু মাঝখানে অস্ট্রেলিয়া সফরে বল টেম্পারিং-কলঙ্ক গায়ে মাখা, দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে নিষেধাজ্ঞা কাটানো এবং পিসিবির ৩০ লাখ রুপি জরিমানা পরিস্থিতি বদলে দিয়েছিল। অধিনায়ক ছাড়াই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করে নতুন অধিনায়ক নির্বাচনেরই ইঙ্গিত দিয়েছিল পিসিবি। সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন আবদুল রাজ্জাক, মিসবাহ-উল হক; সালমান বাটের নামও শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আফ্রিদির ওপরই আস্থা রাখা হলো।
অধিনায়ক নির্বাচিত হওয়ায় উচ্ছ্বসিত আফ্রিদি ধরে রাখতে চান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপা, ‘অধিনায়ক হতে পেরে আমি খুব খুশি। পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব আমি।’ ১ মে বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচ দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করবে পাকিস্তান।

বাংলাদেশকে জেনেই এসেছিল ইংল্যান্ড

২১ ফেব্রুয়ারি রাতে বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছিল ইংল্যান্ড। তার পর থেকে গত এক মাসে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়-কোচ সবার মুখ থেকে একটা কথাই বারবার শোনা গেছে, ‘আমরা জানতাম কী ধরনের পরিবেশ আর উইকেট আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেই অনুযায়ীই প্রস্তুতি নিয়েছি, আমাদের প্রস্তুতিটা খুব ভালো হয়েছে।’ তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচটি ছাড়া এখনো পর্যন্ত শেষ হওয়া দুটো প্রস্তুতি ওয়ানডে, তিনটি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ও একটি টেস্টে জিতেছে ইংল্যান্ড। বাংলাদেশ আজ খুব ভালো খেললে দ্বিতীয় টেস্টে হয়তো ড্র সম্ভব, কিন্তু সফরের শেষ দিনে এসেও ইংল্যান্ডের জয়টাকেই মনে হচ্ছে সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল। প্রস্তুতিটা যে খুব ভালো নিয়েছিল, ইংলিশদের সেটা এখন আর মুখে না বললেও চলবে।
অনেকে বলতে পারেন, বাংলাদেশের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের তো জেতারই কথা। র্যাঙ্কিং-পারফরম্যান্স সবকিছু বিবেচনায় নিলে হয়তো ঠিক। আবার কন্ডিশন, ইংল্যান্ডের ভাঙাচোরা দল সব মিলিয়ে পুরো সিরিজে অন্তত একটা জয়ের বাসনা বাংলাদেশ দলের কিন্তু প্রকাশ্যই ছিল। শেষ পর্যন্ত ইচ্ছেটা ইচ্ছেই থেকে গেল, বাস্তবে অনূদিত হলো না!
পা হড়কানোর একটা সম্ভাবনা যে আছে, এটা হয়তো বুঝতে পেরেছিল ইংল্যান্ডও। ঢাকা টেস্ট শুরুর এক দিন আগে শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ভিআইপি স্ট্যান্ডে বসে কেভিন পিটারসেন বলেছিলেন, ‘একমাত্র টেস্ট দল হিসেবে বাংলাদেশের বিপক্ষে না হারার গর্বিত রেকর্ড আছে আমাদের, আমরা চাই না গর্বটা হাতছাড়া হোক।’ বাংলাদেশের কাছে না হেরে ইংলিশরা গর্ব করছে, বাংলাদেশিদের সেটা শুনে খারাপ লাগার কথা নয়। আবার এটাও বোঝা গেছে, সফরটাকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল ইংল্যান্ড। এই সফরের আগে দুবাইয়ে প্রায় একই রকম কন্ডিশনে পাকিস্তান ‘এ’ দলের বিপক্ষে যে ইংল্যান্ড লায়নস খেলেছে, সেই দলে ছিলেন এই দলের ইয়ান বেল, মাইকেল কারবেরি, জেমস ট্রেডওয়েল, স্টিভ ফিন, আজমল শেহজাদ, স্টিভ ডেভিসরা। প্রতি ম্যাচে পাকিস্তান ‘এ’ দলের চারজন স্পিনারকে খেলা যে কতটা সাহায্য করেছে, এটা তো পরশু দিন শেষের সংবাদ সম্মেলনে অকপটে বলেছেন বেল।
বাংলাদেশে এসেও ওয়ানডে সিরিজের আগে দুটো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে ইংল্যান্ড। আর কোনো দল বাংলাদেশে ওয়ানডে সিরিজের আগে দুটো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছে কি না কে জানে, পেলেও যে সংখ্যাটা হাতে গুনে বলা যাবে এটা নিশ্চিত। দুবাইয়ে ভালো করেই তো ওয়ানডে দলে সুযোগ পেয়েছিলেন ক্রেইগ কিসওয়েটার, এখানে এসে প্রস্তুতি ম্যাচে করলেন ১৪৪। এরপর ওয়ানডে সিরিজেও যে সেঞ্চুরি পেয়ে গেলেন, এতে আর অবাক হওয়ার কিছু নেই। দুটো প্রস্তুতি ওয়ানডের সুযোগটাকে অবশ্য খুব বেশি কিছু মনে হয়নি চট্টগ্রাম টেস্টের আগে বিসিবি একই ভেন্যুতে তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচটি রাখার পর।
ক্রিকেট তার সমস্ত অনিশ্চয়তা নিয়ে হাজির না হলে এই ম্যাচে বাংলাদেশের জয় চলে গেছে অনেক দূরে। খুব ভালো করলে ড্র, না হলে ইংল্যান্ডের জয়টাই সবচেয়ে বেশি সম্ভব। এত কিছুর পরও ইংল্যান্ডের সব ম্যাচ না জেতাটাই হতো বিস্ময়ের।

ছক্কায় শুরু

জহুরুল ইসলাম কাজটা ঠিক করলেন না! টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম স্কোরিং শটটিই ছক্কা। সেটিও কখন? টেস্ট অভিষেকেই ‘পেয়ার’ যখন চোখ রাঙাচ্ছে। পেয়ারের মুখে দাঁড়িয়ে এক টেস্ট অভিষিক্তর ছক্কা মেরে সেই দুঃস্বপ্নকে সীমানাছাড়া করা—বীররসে টইটম্বুর এক ক্রিকেটীয় রূপকথা!
কিন্তু সেটিতে যে একটু জল ঢেলে দিলেন জহুরুল নিজেই! কোথায় বলবেন—ছক্কা মেরেই চেপে বসা বিষম চাপটা উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম—তা না—বললেন, ফিল্ডাররা সব ঘিরে ধরেছিল বলে এক রান নেওয়া কঠিন ছিল। তাই ওভার দ্য টপ মেরেছেন, উদ্দেশ্যটা ছক্কা মারা ছিল না। কী দরকার ছিল বাপু ও কথা বলার!
উদ্দেশ্য যা-ই থাক, সোয়ানের বলে ওভার দ্য টপ ওই শটেই লং অনের ওপর দিয়ে ছক্কা। ছয় বল পর টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর দ্বিতীয় স্কোরিং শটটিও ছক্কা, এবার বোলার ট্রেডওয়েল। এক বল পর চার। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫ বল খেলার পর নামের পাশে ১৬ রান। স্কোরিং শট মাত্র ৩টি—দুটি ছয় ও একটি চার!
ইতিহাস হয়ে গেছে ওতেই। চারটার কথা বাদই দিন, টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম দুটি স্কোরিং শটই ছক্কা—এই কীর্তিই কি আর কারও আছে? ক্রিকেট ইতিহাস আঁতিপাতি করে খুঁজেও আর কাউকে পেলাম না। ছক্কা মেরে টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম রান—এই ঘটনা আছে। তবে সেটিও জহুরুলের আগে মাত্র চারজনের। শুধু দুই ছক্কাই নয়, জহুরুল এগিয়ে থাকছেন আরও একটি কারণে। ছক্কা মেরে টেস্ট ক্রিকেটে রানের খাতা খোলার ওই চারটি ঘটনাই প্রথম ইনিংসে। অভিষেকেই ‘পেয়ার’-এর লজ্জা ধাওয়া করছিল না আর কাউকেই।
‘পেয়ার’ পেয়ে গেলে জহুরুলকে সান্ত্বনা খুঁজতে হতো অন্যভাবে। টেস্ট ক্রিকেটে ৩৭ জনের হয়েছে এই দুর্ভাগ্য। তবে তাঁদের মধ্যে অন্তত তিনজন ভালোভাবেই প্রমাণ করতে পেরেছেন যে প্রভাত সব সময় দিনের সঠিক পূর্বাভাস দেয় না। অভিষেকে ‘চশমা’ পাওয়া গ্রাহাম গুচ ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ৮৯০০ রান করে। এখনো ইংল্যান্ডের পক্ষে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রান তাঁর। মারভান আতাপাত্তু শুধু অভিষেকেই নয়, প্রথম তিন টেস্টের দুটিতেই পেয়ার পাওয়ার পর রান করেছেন ৫৫০২। সেঞ্চুরি ১৬টি, যার ৬টিই ডাবল। সাঈদ আনোয়ারের অভিষেকে দুই গোল্লা পরপর দুই দিনে। টেস্ট ক্রিকেটে দু দিন পর যাঁর রেকর্ড ছিল ৫ বল খেলে শূন্য, ক্যারিয়ার শেষে তাঁর নামের পাশেই ৪০৫২ রান!
দ্বিতীয় ইনিংসে জহুরুল ৪৩ রান করে ফেলায় এই আলোচনাটা এখন অপ্রাসঙ্গিকই। এটা বাদ দিয়ে বরং টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কায় ফিরে যাই। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে পরিসংখ্যানবিদেরা অবশ্য শুরুতেই একটা টীকা দিয়ে নেন—টেস্ট ক্রিকেটের শুরুর দিকের অনেক ম্যাচের বল বাই বল স্কোর পাওয়া যায় না বলে দু-একটা ঘটনা বাদও পড়ে গিয়ে থাকতে পারে। ছক্কার নিয়মও তো অন্য রকম ছিল শুরুতে। ছক্কা মারতে বল মাঠের বাইরে পাঠাতে হতো, বল শুধু বাউন্ডারি পেরোলে হতো ৫ রান। প্রথম ছক্কা দেখতে টেস্ট ক্রিকেটকে তাই অপেক্ষা করতে হয়েছে ৫৫তম টেস্ট পর্যন্ত। ১৮৯৭-৯৮ অ্যাশেজ সিরিজের অ্যাডিলেড টেস্টে সেটি মেরেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার জো ডার্লিং। বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে টেস্ট সেঞ্চুরি করার প্রথম কৃতিত্বও এই ভদ্রলোকের।
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কা মারায় জহুরুলের পূর্বসূরি চারজনের কেউই তেমন বিখ্যাত কেউ নন। এই কীর্তি গড়ায় প্রথম অস্ট্রেলিয়ার এরিক ফ্রিম্যান (১৯৬৮ সালে ভারতের বিপক্ষে ব্রিসবেনে) খেলেছেন সবচেয়ে বেশি ১১টি টেস্ট। বাকি তিনজন—ওয়েস্ট ইন্ডিজের কার্লাইল বেস্ট ও ডেল রিচার্ডস এবং জিম্বাবুয়ের কিথ দাবেংওয়া টেস্ট খেলেছেন যথাক্রমে ৮, ২ ও ৩টি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুজনকে একসঙ্গে রাখতে ডেল রিচার্ডসের নামটা আগে লিখতে হলো। তবে ঘটনার ক্রম হিসেবে চার নম্বরে আসবে এই ওপেনারের নাম। বাংলাদেশ আছে এখানেও। গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সেন্ট ভিনসেন্ট টেস্টে ডেল রিচার্ডসের ওই কীর্তি—মাশরাফির করা ইনিংসের প্রথম তিনটি বলে রান নিতে না পারার পর চতুর্থ বলেই ছক্কা!
ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের মুখে তখনই শুনেছিলাম কার্লাইল বেস্টের বীরত্বগাথা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৮৫-৮৬ সিরিজে কিংস্টন টেস্ট। ইয়ান বোথাম প্রথম বলটিই দিলেন বাউন্সার। সেটি এড়ালেন বেস্ট। দ্বিতীয়টিও বাউন্সার, সেটি লাগল কাঁধে। তৃতীয় বলটিও যখন শরীরের দিকে ধেয়ে এল, বেস্টের ভাষায় ‘আত্মরক্ষা করতে’ হুক করলেন তিনি। লং লেগের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে দর্শকের মধ্যে হারিয়ে গেল বল। টেস্ট ক্রিকেটে তৃতীয় বলেই ছক্কা, অথচ ৮ টেস্টের ক্যারিয়ারে আর মাত্র একটিই ছক্কা মারতে পেরেছেন বেস্ট।
জিম্বাবুইয়ান অলরাউন্ডার কিথ দাবেংওয়ার প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কাটাকে বলতে পারেন গলায় চেপে বসা শূন্যের ফাঁস থেকে বাঁচার মরিয়া চেষ্টার ফসল। ২০০৫ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বুলাওয়ে টেস্টে ১৫ বল খেলেও রান করতে না পারার পর ‘যা আছে কপালে’ বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। তাতেই সীমানার বাইরে আছড়ে পড়লেন ড্যানিয়েল ভেট্টোরি।
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কার কীর্তি খুঁজতে গিয়ে কিছু মজার ব্যাপার চোখে পড়ল। এর একটাকে মজার না বলে অবিশ্বাস্য বলাই ভালো। সুনীল গাভাস্কারের দীর্ঘদিনের ওপেনিং পার্টনার চেতন চৌহান টেস্ট ইতিহাসে প্রথম ব্যাটসম্যান, যিনি একটাও সেঞ্চুরি না করে দুই হাজার করেছেন। রক্ষণাত্মক ব্যাটসম্যান হিসেবেই পরিচিতি, অথচ টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর প্রথম দুটি স্কোরিং শট ছিল চার ও ছয়। চৌহানের ৪০ টেস্টের ক্যারিয়ারে ওই একটিই ছয়!
টেস্ট অভিষেকে একজন ব্যাটসম্যান নিশ্চয়ই সেঞ্চুরির স্বপ্ন দেখেন। জহুরুলও হয়তো দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় আফসোস করার কী আছে! টেস্ট অভিষেকে সেঞ্চুরি আছে ৮৮ জনের, প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কা তো মাত্র পাঁচজনের!