Tuesday, February 27, 2018

সিরিয়ায় সরকারি বাহিনীর হামলা অব্যাহত: বিষাক্ত গ্যাসে বিপন্ন শিশুদের জীবন

বিষাক্ত গ্যাসে বিপন্ন হয়ে পড়েছে সিরিয়ার শিশুদের জীবন। দামেস্কের উপকন্ঠে ইস্টার্ন ঘৌটায় চলমান হামলার অংশ হিসেবে সেখানে বিষাক্ত গ্যাস ‘ক্লোরিন’ ব্যবহার করতে শুরু করেছে সরকারি বাহিনী। প্রাপ্তবয়স্করা কোন রকমে আত্মরক্ষা করতে পারলেও এর নির্মম শিকার হচ্ছে অল্পবয়স্ক শিশুরা। শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত জটিলতার পাশাপাশি ত্বক ও চোখে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করছে তারা। সিরিয়ার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হোয়াইট হেলমেট বলেছে, এখন পর্যন্ত বিষাক্ত ক্লোরিনের শিকার হয়ে একজন শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন তারা। সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে আরো এক ডজনেরও বেশি শিশু।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আহতদের মধ্যে বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে। নিকটবর্তী এর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাদেরকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। সেখানকার চিকিৎসক ইয়াকুব বলেন, বেশিরভাগ রোগীর শরীর থেকেই ক্লোরিনের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া অসুস্থতার লক্ষণ থেকেও তাদের ক্লোরিন গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি বোঝা যায়। লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, রোববার ইস্টার্ন ঘৌটায় সরকারি বাহিনীর এক হামলার পর থেকে ১৪ শিশু শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত জটিলতায় ভুগছে। আর সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, গ্যাস হামলায় অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও আক্রান্ত হয়েছে। আহত এক নারী বেশ সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে, ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহারের জন্য উল্টো বিদ্রোহীদেরকে দায়ী করেছে সিরিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া। তারা অভিযোগ করেছে, বিদ্রোহীরা নিজেরাই ক্লোরিন ব্যবহার করে সরকারি বাহিনীকে দোষ দিচ্ছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেছেন, নিজেরাই বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে তারা উত্তেজনা উস্কে দিচ্ছে। পরে এর জন্য সরকারি বাহিনীকে দায়ী করছে তারা। রাশিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই কথা বলেছে সিরিয়ার সরকার। পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এর আগেও গত মাসে ২১ জন শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়েছিল ইস্টার্ন ঘৌটার অধিবাসীরা। তখনও সরকারি বাহিনীর ক্লোরিন গ্যাসের শিকার হয়েছিলেন তারা।  
উল্লেখ্য, ২০১৩ সাল থেকে ইস্টার্ন ঘৌটা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখান থেকে বিদ্রোহীদের উৎখাত করতে কয়েক বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে সরকারি বাহিনী। কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় সম্প্রতি সেখানে বড় ধরণের অভিযান শুরু করেছে তারা। বিদ্রোহীদের মূল ঘাটি আল শিফোনিয়াহকে লক্ষ্য করেই বেশিরভাগ হামলা চালাচ্ছে তারা। কিন্ত শত শত বেসামরিক নাগরিক এই হামলার শিকার হচ্ছে। পুরো অঞ্চলটিই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মূলত এসব বিমান হামলা চালিয়ে সরকারি বাহিনী তাদের স্থলবাহিনীকে প্রবেশ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। সরকারি বাহিনীর হামলায় প্রতিদিনই কয়েক ডজন করে মানুষ মারা যাচ্ছে। সোমবার নিহত হয়েছে ১৬ জন। একদিন আগে রোববার বোমার আঘাতে নিহত হয়েছে আরো ২৭ বেসামরিক নাগরিক। সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে, নয় দিন ধরে চলমান হামলায় নিহতরে সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইস্টার্ন ঘৌটায় যুদ্ধবিরতির জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি আহবান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। কিন্তু তাও কোন কাজে আসছে না। প্রস্তাব পাসের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই নতুন উদ্যমে ঘৌটায় হামলা চালায় সরকারি বাহিনী।

অসমতা

সম্পদ ও অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে অসমতা মানবসভ্যতার এক চিরায়ত সমস্যা। যুগ যুগ ধরে মানুষ অসমতা দূর করার স্বপ্ন দেখেছে। মার্ক্সীয় রাজনৈতিক দর্শনের মূল প্রতিপাদ্যই অসমতা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মানুষ সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিপ্লব করেছে। কিন্তু কোথাও সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। অসমতা যেন এক অনিবার্য বাস্তবতার মতো পুরো মানবজাতির মধ্যে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু এটা নিয়ে কোনো মতভেদ এখন আর নেই যে অসমতা শুধু অনৈতিক নয়, মানবসমাজের উন্নয়ন-অগ্রগতির প্রতিবন্ধকও বটে। অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকদের প্রায়োগিক গবেষণায় ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়েছে যে কোনো দেশ বা অঞ্চলের মানুষের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণির মধ্যে অসমতা বেড়ে গেলে পুরো জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তাই উন্নত ও অনুন্নত সব দেশেই অসমতা কমানোর ওপর এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত রোববার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ‘চ্যালেঞ্জিং ইনজাস্টিস ইন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক যে সংলাপের আয়োজন করেছিল, তার প্রধান প্রতিপাদ্যই ছিল অসমতা। সেখানে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষে মানুষে অসমতাও বেড়ে গেছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য বেড়ে চলেছে। এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য ফরাসি অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি ক্রমবর্ধমান হারে করারোপের যে প্রস্তাব তাঁর ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরিতে করেছেন, অধ্যাপক রেহমান সোবহান মনে করেন তা যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, এটা মাঝারি মাত্রার হস্তক্ষেপ, অসমতা দূর করার জন্য আরও তীব্র কর্মসূচি প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, আমাদের গোড়ায় হাত দিতে হবে। রেহমান সোবহান দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে দারিদ্র্যের চারটি কাঠামোগত উৎস চিহ্নিত করেন।
সম্পদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অসমতা, বাজারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যায্যতা, মানব উন্নয়নের সুযোগ প্রাপ্তিতে অসমতা ও অন্যায্য শাসনব্যবস্থা—অসমতার এই চারটি উৎসে হাত দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন। সে জন্য ছয়টি ক্ষেত্রে কাজ করা দরকার: কৃষি খাতে সংস্কারে অগ্রগতি সাধন করতে হবে, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূল্য সংযোজন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাজারব্যবস্থায় তাদের অংশগ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে, শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, বাজেটের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে, দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য আর্থিক নীতি প্রণয়ন করতে হবে এবং যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে সম্পদের মালিকানা সম্প্রসারণ করতে হবে। আমাদের মতে, এর প্রতিটি ক্ষেত্রে ফলদায়ক কার্যসম্পাদনের জন্য সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। সুশাসন নিশ্চিত হতে পারে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের অধিকার সমান—এই নীতির বাস্তবায়ন অসমতা বা বৈষম্য লাঘবে নিঃসন্দেহে সহায়ক। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য লাগামহীনভাবে বাড়তে পারে না, যদি নীতি ও আইনের দ্বারা সব ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়। সুশাসনের দ্বারা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলে সুবিধাভোগী ও প্রভাবশালী শ্রেণির পক্ষে সীমাহীন লুটপাটের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়া সম্ভব নয়। পিছিয়ে পড়া বিপুল জনগোষ্ঠীর চিরবঞ্চনা ও ক্ষমতাহীনতা দূর করা না হলে অসমতা কমানো সম্ভব নয়। সে জন্য তাদের শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। গণতান্ত্রিক চেতনার কেন্দ্রীয় বিষয় অধিকারের সমতা। তাই গণতন্ত্র ও সুশাসনই অসমতা কমানোর সর্বোত্তম পন্থা।

ধর্ষক এবার ইজিবাইকের চালক

রাজবাড়ীতে এক তরুণীকে ইজিবাইকের চালকসহ তিনজনের ধর্ষণের খবরে আমরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। হতাশ এ কারণে যে চলতি মাসেই রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আদালত চারজনকে ফাঁসির আদেশ, একজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার পরও আবার একই ধরনের ঘটনা ঘটল। গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। এসব শাস্তির খবর কি তাহলে সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না? নাকি মৃত্যুদণ্ডকেও এখন কেউ ভয় পাচ্ছে না। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ওই তরুণী গত শুক্রবার ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জে যাওয়ার পথে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ মোড়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় বাস ধরিয়ে দেওয়ার কথা বলে তরুণীকে এক চালক নিজের ইজিবাইকে তোলেন। ওই ইজিবাইকে আরও দুই তরুণ ছিলেন। পরে এক নির্জন স্থানে তরুণীকে নামিয়ে চালকসহ তিনজন মিলে ধর্ষণ করেন।
এমনকি তাঁরা মুঠোফোনে আরও চারজনকে সেখানে ডেকে আনেন। তাঁরাও তরুণীকে ধর্ষণ করেন। পরদিন সকালে ফরিদপুর র‍্যাব ক্যাম্পকে বিষয়টি জানান। ওই দিনই তিন ধর্ষককে আটক করা হয়।  দেখা যাচ্ছে, কোনো তরুণী একা হলেই তিনি ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। আমরা রূপার বেলায়ও তা-ই দেখেছি। রূপার ঘটনার পর গত নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামে এক পোশাককর্মী চলন্ত বাসে একা হয়ে পড়লে পরিবহনশ্রমিকদের ধর্ষণের শিকার হন। সম্প্রতি যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৩ মাসে গণপরিবহনে ২১ জন নারী ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাহলে কি আমাদের দেশে নারীরা একা একা চলাচল করতে পারবেন না? একা হলেই কি তাঁরা ধর্ষণের শিকার হবেন? পথেঘাটে, গণপরিবহনে, কর্মস্থলে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনা নারীদের অগ্রযাত্রাকে নিঃসন্দেহে বাধাগ্রস্ত করছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে নারী একা বা নিজের মতো করে চলাফেরা করবেন কী করে? এ ধরনের পরিস্থিতি নারীর কাজের ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে দিতে ও বাধাগ্রস্ত করতে পারে। জাতীয় অর্থনীতিতে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গণপরিবহনকে নারীবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি নারীর চলাচল নিরাপদ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বাসে বা ট্রেনে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হলে অভিযোগ জানানোর বিষয়টি সহজ করতে হবে। এ জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত চালু করা যেতে পারে। রুট অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালতের ফোন নম্বর গণপরিবহনের প্রকাশ্য স্থানে লিখে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে সব স্থানে সিসি ক্যামেরা লাগাতে হবে। চালকসহ অন্য পরিবহনশ্রমিকদের যাত্রীদের সঙ্গে আচরণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।  যৌন হয়রানিকারী ও ধর্ষকদের কঠোর সাজা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ নিয়ে যথাযথ প্রচার–প্রচারণাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

একা হওয়া যাবে না? by রোকেয়া রহমান

তরুণীটি একা যাচ্ছিলেন নিজের বাড়ি। পথে উঠে পড়েন এক ইজিবাইকে। যাত্রীর আসনে আগে থেকেই ছিলেন দুজন তরুণ। তাঁরা একপর্যায়ে তরুণীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করতে শুরু করেন। চালক নিয়ে যান একটি নির্জন স্থানে। ইজিবাইক থেকে জোর করে তরুণীকে নামিয়ে পালাক্রমে তিনজন ধর্ষণ করেন। নিজেরা ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হননি; ফোন করে ডেকে নিয়ে আসেন আরও চারজনকে। তাঁরাও ধর্ষণ করেন তরুণীটিকে। ভয়াবহ এই ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজবাড়ী জেলায়। টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারের রায়ে সারা দেশের মানুষ যখন একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে, ঠিক তখনই আবার একই ধরনের ঘটনা ঘটল। মনে প্রশ্ন জাগে, কবে আমাদের দেশের নারীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন? আদৌ কখনো পারবেন কি? প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মোট সাতজন পুরুষ তরুণীটিকে বলতে গেলে মহাসমারোহে ধর্ষণ করেন। একা অসহায় মেয়েটির নিজেকে রক্ষা করার কোনো উপায়ই ছিল না। ভয়ে শিউরে উঠি—আমিও তো একা চলাচল করি! যদি কোনো দিন আমার অবস্থা ওই তরুণীর মতো হয়? হবে না—এমন কথা তো আমি হলফ করে বলতে পারি না। আমার মনে হয় কোনো নারীই বলতে পারবেন না। মনে আছে, আমি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, তখন একবার এক বান্ধবীর বাসায় যেতে চাই। আমার মা আমাকে একা ছাড়লেন না। সঙ্গে দিলেন ছোট ভাইকে। বোধ হয় নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকেই তিনি এ কাজ করেছিলেন। যদিও আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট ভাইটির তখন কারও দ্বারা আক্রান্ত হলে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ছিল না। মা হয়তো ভেবেছিলেন, আমার পাশে কোনো ছেলেকে দেখলে কেউ কিছু বলতে আসবে না। কেউ উত্ত্যক্ত করার সাহস পাবে না। তার মানে কি মেয়েদের একা হওয়া মানেই উত্ত্যক্তের শিকার হওয়া? পুরুষের ভোগের বস্তুতে পরিণত হওয়া? আচ্ছা, যখন কোনো নারী কোথাও একা হয়ে পড়েন, তখন তাঁর আশপাশে কি একজন পুরুষও থাকেন না, যিনি তাঁকে ভোগের বস্তু মনে করেন না? রূপা যখন চলন্ত বাসে একা হয়ে পড়েছিলেন, তখন বাসের চালক ও সহকারী পুরুষেরা কেন একযোগে হিংস্র হায়েনা হয়ে গিয়েছিলেন? এঁদের মধ্যে অন্তত একজন থাকতে পারতেন, যিনি কিনা অন্যদের বাধা দিতে পারতেন। বলতে পারতেন, না, কাজটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু সে রকম হয়নি। সবাই একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েন রূপার ওপর।
কেন এ রকম হয়? এসব পুরুষ তো এই সমাজেরই মানুষ। তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ। কিন্তু তাঁদের রিপুর এমনই তাড়না যে একা পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়েন একটি অসহায় মেয়ের ওপর। শুধু কি গণপরিবহনে? কর্মস্থলে, এমনকি বাসাবাড়িতে এভাবে একা হয়ে পড়া নারীরা পুরুষের লোভ-লালসার শিকার হচ্ছেন। আমার এক পরিচিত নারী গত ডিসেম্বরে ছেলেমেয়েদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ১৫ দিনে জন্য বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন। বাড়িতে রেখে যান স্বামী ও অল্পবয়সী গৃহকর্মীকে। প্রথম দুদিন ঠিকঠাক গেলেও তৃতীয় দিন ওই নারীর স্বামী চড়াও হন গৃহকর্মীটির ওপর। স্ত্রী যেন কোনোভাবেই জানতে না পারেন, সে জন্য গৃহকর্মীকে প্রাণনাশসহ নানা ধরনের হুমকি দেন তিনি। কিন্তু স্ত্রী ফিরে এসে যখন সব জানতে পারেন, তখন তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ওই নারী কখনো ভাবতে পারেননি, তাঁর উচ্চশিক্ষিত স্বামীটি এভাবে লম্পটের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। এ রকম আরও বহু নজির আছে। দেখা যাচ্ছে, নারীদের যৌন হয়রানি, উত্ত্যক্ত বা ধর্ষণ করার জন্য পুরুষের শিক্ষা বা অশিক্ষা কোনো বিষয় নয়; বিষয় নয় তাদের বয়স বা সামাজিক অবস্থান। প্রশ্ন হচ্ছে, এ রকম কি চলতেই থাকবে? আমরা নারীরা কি সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকব? ঘর থেকে বের হতে হবে ভাই, বাবা বা স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে? ঘরে থাকতে হবে দল বেঁধে? দেশে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইন হয়েছে। কিন্তু এ দেশে প্রতিদিন যে হারে নারীরা যৌন হয়রানি, ধর্ষণসহ নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, তাতে এসব আইন ও নীতিমালা অসার প্রমাণিত হচ্ছে। এসব আইন ও নীতিমালার কোনো প্রয়োগ নেই। এভাবে আর কত দিন? এখন সময় হয়েছে পুরুষদের এসব লাম্পট্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে সেসব পুরুষকে, যাঁরা নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধ, নারী ধর্ষণের বিরুদ্ধে। নারীদেরও মুখ বুজে বসে থাকলে চলবে না। পুরুষের অপকর্মের কথা সবাইকে জানাতে হবে। সরকারকেও নারীদের সুরক্ষায় গৃহীত আইন ও নীতিমালা কার্যকর করতে হবে। নারী নিগ্রহকারীদের কঠিন শাস্তি দিতে হবে। তা নাহলে এই পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না। আসুন, সবাই আমরা রুখে দাঁড়াই।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক

ইহলোকোত্তর পদক-পুরস্কার by সৈয়দ আবুল মকসুদ

মরণোত্তর শব্দটি বাংলাদেশে বহুল পরিচিত। আমাদের রাষ্ট্রে পদক-পুরস্কার দুই ভাগে বিভক্ত। কিছু সরকারি, কিছু বেসরকারি। বেসরকারি পদক-পুরস্কার সাধারণত জীবিতদের দেওয়া হয়। সরকারি পদক-পুরস্কার জীবিত ও পরলোকগত উভয় শ্রণিকেও দেওয়া হয়। পরলোকগত ব্যক্তিদের পদক-পুরস্কারের পাশে ব্র্যাকেটে লেখা থাকে ‘মরণোত্তর’। বড় ধর্মগুলোতে ভালো কাজের জন্য পরলোকে পুরস্কৃত হওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে। মরণোত্তর কথাটা ভালো শোনায় না। সরকারি অনেক কিছুরই নাম বদল করা হয়েছে। মরণোত্তর পুরস্কার কথাটা বদলে ইহলোকোত্তর পুরস্কার বা ইন্তেকালোত্তর ইনাম করা যেতে পারে। শুভ ব্যাপারে মরণ শব্দটি থাকায় পুরস্কারপ্রাপ্তির আনন্দের মধ্যে একটি কালো ছায়া পড়ে। মরণ বড়ই বেদনাদায়ক জিনিস। মরণোত্তর পুরস্কারের নীতিমালা কী, তা আমাদের জানা নেই। অর্থাৎ, যে বছর পুরস্কার প্রদান করা হলো, তার কমপক্ষে কত বছর আগে ইন্তেকাল করলে একজন পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। পুরস্কার প্রদানের পূর্ববর্তী বছর পরলোকগমন এক কথা আর এক যুগ আগে বা অনির্দিষ্টকাল আগে গত হওয়া অন্য ব্যাপার। যদি সে রকম নীতিমালা না থাকে, তাহলে কোনো সরকার মান্ধাতার আমলের বা মোগল আমলের কোনো কৃতীকেও মরণোত্তর পুরস্কার দিয়ে ভূষিত করলে কেউ প্রশ্ন তুলবে না। দেশে পালাক্রমে নানা ধরনের সরকার আসে। অতি প্রগতিশীল ও অতি প্রাচীনপন্থী সরকারের আবির্ভাব ঘটা অসম্ভব নয়। কখনো যদি প্রবল প্রগতিশীল সরকার অধিষ্ঠিত হয়, তারা পুরস্কার দেওয়া শুরু করতে পারে ফকির লালন শাহ বা তারও আগে থেকে। সমাজসংস্কারে রামমোহন রায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে দ্বারকানাথ ঠাকুর, ধর্ম সংস্কারে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কেশবচন্দ্র সেন, সাহিত্যে ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা ওরফে বিদ্যাসাগর, সংগীতে রামপ্রসাদ সেন, কবিতায় ভারতচন্দ্র রায়, প্রবন্ধে অক্ষয় কুমার দত্ত, উপন্যাসে যৌথভাবে প্যারীচাঁদ মিত্র ও মীর মশাররফ হোসেন ইহলোকোত্তর পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। ইসলামপন্থী সরকার ক্ষমতায় এলে ধর্ম সংস্কারে হাজি শরীয়তুল্লাহ, রাজনীতিতে মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর, সমাজ সংস্কারে মুন্সি মেহেরুল্লাহ, কবিতায় কাজেম আল কোরেশী ওরফে কায়কোবাদ ও সৈয়দ এমদাদ আলী, উপন্যাসে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, রাজনীতিতে নবাব সলিমুল্লাহ ও সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী মরণোত্তর পদক-পুরস্কার পেলে কেউ আপত্তি করবে না।
আরও দূরে যদি যেতে চান তাঁরা, তাহলে সৈয়দ আলাওল ও সৈয়দ হামজা থেকে শুরু করতে পারেন। যে দেশে আবদুল হামিদ খান ভাসানী ইন্তেকালোত্তর পদক পেয়েছেন, সেখানে আবুল কাশেম ফজলুল হক ওরফে শেরেবাংলা না পেলে অবিচার করা হবে। ভবিষ্যতে কোনো সরকার যদি মনে করে তাঁর লেখা গান বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মরণোত্তর একুশে পদক বা স্বাধীনতা পুরস্কার পাননি, তা খুবই অবহেলা, সুতরাং তাঁকে ভাসানীর মতো পদক-পুরস্কার দেওয়া দরকার। অবশ্য বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে সাধারণ কবি কাজী নজরুল ইসলামও একুশে পদক পেয়েছেন। ইহলোকোত্তর পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব জটিলতা রয়েছে। সব মানুষ উত্তরাধিকারী রেখে জান্নাতবাসী বা স্বর্গবাসী হন না। যিনি পুরস্কৃত হন, তাঁর দুনিয়ায় কোনো উত্তরাধিকারী না-ও থাকতে পারে। অথবা কেউ রেখে যান তাঁর হেরোইন-ইয়াবাসেবী পুত্রধন। যাঁকে পদক প্রদান করা হয়, সেটা তাঁর গলাতেই শোভা পাওয়ার কথা। পদকটা প্রদান করা হলো একজনকে, কিন্তু সেটা পরিয়ে দেওয়া হলো আরেকজনের গলায়। হোক সেই গলা তাঁর স্ত্রী বা স্বামী, পুত্র বা কন্যা বা নাতি-নাতনির। তিনি যদি বিপত্নীক হন এবং তাঁর ভাই-বোন ভাতিজি-ভাগনি কিছুই না থাকে, তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি বা শালা-শালি মেডেল নিতে আসেন তাতে প্রাপকের কী প্রাপ্তি? ইন্তেকালোত্তর পুরস্কারের আরেকটি জটিলতা হলো, যদি কেউ জীবিত থাকা অবস্থায় একাধিক বিয়ে করে থাকেন এবং প্রত্যেক স্ত্রীর গর্ভে একাধিক সন্তান রেখে দেহত্যাগ করেন, তখন তাঁদের মধ্যে বিবাদ বেধে যেতে পারে। সে রকম ঘটনা আশি ও নব্বইয়ের দশকে স্বচক্ষে দেখেছি। সব পক্ষের ছেলেমেয়েরাই দাবি করেছেন তাঁরা পদকপ্রাপকের ঔরসজাত সন্তান বা নাতি-নাতনি। পদকের ব্যাপারে আরেকটি সমস্যা আছে-সেটি খাঁটি সোনা না নকল সোনা। স্বর্ণ আর তামা-পিতল ধাতু হিসেবে দেখতে একই রকম। ইহলোকোত্তর পুরস্কারপ্রাপকদের উত্তরাধিকারীদের কাছে ধাতুটাই মূল্যবান। বিদেশি বন্ধুদের যখন পদক দেওয়া হয় এবং মেডেলের ধাতুর আসলত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন আমি প্রস্তাব করেছিলাম, ভবিষ্যতে পদক বানানোর সময় সেটা খাঁটি সোনা না নকল, তা পরীক্ষার জন্য জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ টিমকে যেন আমন্ত্রণ করে আনা হয়। বাংলাদেশ যেহেতু একটি অত্যন্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, এখানে প্রতিটি সরকার যে কাজটি করতে পারে তা হলো, যে বছর যাঁরা পুরস্কার পাচ্ছেন, শুধু তাঁদের নামই নয়, ওই সরকার ক্ষমতায় থাকলে (হতে পারে দুই বা তিন মেয়াদ) আর কারা কারা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হবেন, তাঁদের তালিকাও করা। ওয়েটিং লিস্টে থাকলে কামড়াকামড়ি হয় না। যেমন ২০২১ সালে কে পুরস্কৃত হবেন, ২০৩১ সালে বা ২০৪১ সালে কে, তাঁদের নামও বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা। কাজটি যদি সরকার না-ও করে, বড় দলগুলো আরেকটি কাজ করতে পারে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যে অগণিত প্রতিশ্রুতি থাকে, তার সঙ্গে হবু পুরস্কৃতদের নামেরও তালিকা রাখতে পারে। তাতে সুবিধা হবে এই যে ওই সময়সীমার মধ্যে যদি কেউ ইহলোক ত্যাগ করেন, তাহলে অবধারিতভাবে তিনি পরবর্তী বছর পুরস্কার পাবেন। তাতে হবু পুরস্কারপ্রাপকেরা মৃত্যুর আগে তাঁদের পুরস্কার গ্রহণের নমিনি ঠিক করে যেতে পারেন। নমিনি করার মতো যদি একাধিক ব্যক্তি থাকেন, তাহলে তিনি তারও সুরাহা করে যেতে পারেন। অনেক দেশেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে কীর্তিমান ব্যক্তিদের পদক-পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। পুরস্কৃত করা হয় কৃতী ব্যক্তিকে, তাঁর আত্মাকে নয়। আমরা সবকিছুকেই খেলো করে ফেলেছি ক্ষুদ্র স্বার্থে। অবশ্য রাষ্ট্র কাউকে সম্মানিত করতে পারে না। কেউ যদি সম্মানিত হন বা স্বীকৃত হন, তা হন মানুষের দ্বারা তাঁর কাজের জন্য। বাঙালি জানে না কীভাবে পছন্দের বা খাতিরের ব্যক্তিটিকে পুরস্কৃত করতে হয়। সে আরও জানে না অপছন্দের বা বিরোধীকে কীভাবে শাস্তি দিতে হয়। পুরস্কৃত করা ও শাস্তি দেওয়ার মধ্যে কোনো সরকারের নীতি, আদর্শ ও চারিত্রেযর প্রকাশ ঘটে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক

ট্রাম্পিজম ও গণতন্ত্রের গোধূলি by মারুফ মল্লিক

ট্রাম্প সাহেব হামেশাই বিশ্বকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। ওদিকে ইউরোপে লোকরঞ্জনবাদীরা অভিবাসীদের বের করে দেওয়ার কথা বলছে। ভারতেও শিবসেনারা কম যায় না। চীনের সি চিন পিং আজীবন ক্ষমতায় থাকার বন্দোবস্ত পাকা করলেন বলে। কয়েকটি দেশে আবার উন্নয়নের জন্য সীমিত গণতন্ত্রের কথাও বলা হচ্ছে। আরবে তো গণতন্ত্রই নেই। জার্মানিতে লোকরঞ্জনবাদীদের উত্থান বা যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় কিংবা ব্রেক্সিটের পর একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে, গণতন্ত্র কি গোধূলিলগ্নে উপনীত? প্রশ্ন যখন সামনে হাজির, তখন চলমান বিশ্বরাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে এর উত্তর খোঁজাও জরুরি। ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক মডেল কি এক সংকটময় মুহূর্ত অতিক্রম করছে? হার্ভার্ড তাত্ত্বিক ইয়াশা মৌঙ্ক ট্রাম্পের বিজয়, ব্রেক্সিটে ইউরোপীয় বিরোধীদের জয়লাভ বা ইউরোপজুড়ে লোকরঞ্জনবাদের উত্থানকে চিহ্নিত করেছেন অগণতান্ত্রিক উদারতাবাদের পর্ব হিসেবে। তিনি মনে করেন, আমাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বেশ কিছু দিন উদার গণতন্ত্রের চক্রে আটকে ছিল। উদার গণতন্ত্রের ঝুঁকি হচ্ছে, এটি কখনো কখনো কর্তৃত্ববাদী শাসনের সূচনা করতে পারে। মৌঙ্ক ভোটের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েমের নাম দিয়েছেন ‘ট্রাম্পিজম’। এই কর্তৃত্ববাদী অগণতান্ত্রিক উদাররা বিরোধী মতকে উপেক্ষা করে। আইনের শাসন, বাক্‌স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সংখ্যালঘুর অধিকারকে পুরোপুরি অস্বীকার করে না। তবে সীমিত করে দেয়। নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। ইউরোপজুড়ে লোকরঞ্জনবাদীদের উত্থান বা ট্রাম্পের বিজয় কিন্তু এই রকম একটি রাজনৈতিক ধারার বিকাশকেই স্পষ্ট করে দেয়। কারণ, কখনোই বলা যাবে না যে ট্রাম্প অগণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত। বা ইউরোপে লোকরঞ্জনবাদীরা ভোটকেন্দ্র দখল করে নিজেদের পক্ষে ব্যালটে সিল মারছে। বা এদের কেউ বিনা ভোটে জয়লাভ করেছে। এরা জনসাধারণের ভোটেই নির্বাচিত হচ্ছে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক দলগুলোর ভোট কমে যাচ্ছে কেন? তত্ত্ব ও দর্শন হিসেবে ইউরোপীয় গণতন্ত্রের মডেলকে বাতিল করার সময় আসেনি এখনো। বরং অনেকেই সমস্যা খুঁজে পাচ্ছেন এর প্রায়োগিক পদ্ধতিতে। উদার গণতন্ত্র ও লোকরঞ্জনবাদকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলেই মনে করা হচ্ছে। আসলে মূল সমস্যা অর্থনৈতিক। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে উদার গণতন্ত্রের সুযোগ নেয় লোকরঞ্জনবাদীরা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন হতে পারে এর একটি চমৎকার উদাহরণ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সমন্বয় ছাড়াই একটি একক বাজার ও মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন করেছে। এই একক বাজার ও মুদ্রা সম্পর্কে আবার সিদ্ধান্ত আসছে টেকনোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে। ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ইউরোপীয় আদালত টেকনোক্র্যাটদের সিদ্ধান্ত জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এখানে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে জনসাধারণের একধরনের দূরত্ব থেকেই যাচ্ছে। এ কারণেই ইউরোজোনের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার পরও ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ব্রেক্সিটের পক্ষাবলম্বনকারীদের স্লোগানই ছিল ‘নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আন নিজের হাতে’। ইউরোপজুড়ে একই মানসিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কারণ, ব্রাসেলস থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত পোল্যান্ডের প্রত্যন্ত এলাকার জনসাধারণ মানবে কেন? ব্রাসেলস যখন পোল্যান্ডের শ্রমবাজারের বিভিন্ন বিষয় ঠিক করে দেয়, কৃষিতে ভর্তুকির হার নির্ধারণ করে দেয়, তখন জনসাধারণ বিকল্প পথের সন্ধান করে। এই এই বিকল্প পথেরই সুযোগ নেয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো চতুর লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতিবিদেরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা ঠিক ইইউয়ের মতো নয়। তবে সেখানেও শাসনব্যবস্থায় জনসাধারণের মতামত প্রতিফলিত হচ্ছে না বলেই ট্রাম্পের মতো চটকদার প্রার্থীকে ভোটাররা বেছে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রেও বিভিন্ন সংস্থা বা এজেন্সির মাধ্যমে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্ত প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আগে জনসাধারণের মতামত শোনাও হয় না অনেক সময়। এসব দিক বিবেচনায় বলা যায়, উদার গণতন্ত্রের নামে যে মডেল এখন অনুসরণ করা হচ্ছে, ঐতিহ্যগতভাবেই তা ঝুঁকিপূর্ণ একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এটি সমাজে রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতির ভারসাম্য আনতে পারছে না। অভিজাত ও আমজনতার দূরত্ব থেকেই যায়। কারণ, রাজনৈতিক অভিজাতরা যখন ক্ষমতা হস্তগত করে জনসাধারণের মতামতকে এড়িয়ে যায়, তখনই উদার গণতন্ত্রের অগণতান্ত্রিক উদারবাদের দিকে মোড় নেওয়ার ঝুঁকি থাকে। ইউরোপে যদিও ইতিমধ্যেই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও বিভাজন করে রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে একধরনের ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে, আইনের শাসন বিদ্যমান। সংখ্যালঘুর মতামতকেও যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারেই বিবেচনা করা হয়। এরপরও কোথায় যেন একটি ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এই ঘাটতি হচ্ছে রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতির সমন্বয়ের ঘাটতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে অপেক্ষাকৃত জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের দিকে যাত্রা করে ইউরোপ লোকরঞ্জনবাদী নাজি বা ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দর্শন থেকে বেরিয়ে আসে। বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, গত শতকের ৯০ দশকের শুরু থেকে যখন সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন সুবিধা হ্রাস করা হয়; এরপর থেকেই লোকরঞ্জনবাদের আবার প্রসার ঘটতে থাকবে। মূলত ওই দেশগুলোতেই দ্রুত লোকরঞ্জনবাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে সামাজিক নিরাপত্তায় কাটছাঁট করা হয়েছে এবং অভিবাসনের হার বেড়েছে। তাই সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, গণতন্ত্রের দিন শেষ—এই ধরনের মন্তব্য অনেকটা আগ বাড়িয়েই করা হচ্ছে। মূলত জনকল্যাণমূলক নীতি থেকে সরে গিয়ে মুনাফানির্ভর অর্থনৈতিক নীতিই গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ঠেলে নিয়েছে। তাই সময়ে এসেছে এমন ধরনের জননীতি প্রণয়নের, যেখানে আমজনতার আর্থিক নিশ্চিত হবে। সমাজ মূলত দুই ভাবে বিভাজিত। প্রথমত পরিচয়গত বিভাজন। যেমন ধর্মীয়, নৃতাত্ত্বিক বা আদর্শ ভিত্তিক বিভাজন। অপরটি হচ্ছে অর্থনৈতিক। ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য। গণতন্ত্রের ইউরোপীয় মডেল সেই বিভাজন ঘুচিয়ে এনেছে সোশ্যালিস্ট কাঠামোর প্রয়োগের মাধ্যমে অনেকটাই। তবে সমস্যা হচ্ছে এই সোশ্যালিস্ট কাঠামো থেকে গণতন্ত্রীরা যখন সরে বাজার অর্থনীতির দিকে যায়, তখনই উদার গণতন্ত্রের সুযোগে লোকরঞ্জনবাদীরা ক্ষমতার নিকটবর্তী হয়। কখনো কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতেও চলে আসে।
ড. মারুফ মল্লিক, রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর কনটেমপোরারি কনসার্নস, জার্মানি

বাড়ছে চালের দাম

চালের বাজারে উত্তাপ বাড়ছে। মাসখানেক আগে দাম কিছুটা কমে উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল হয়েছিল। তবে ভারতে চালের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে দেশে আবারও দাম বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও সোমবার মোটাসহ সব ধরনের চাল ২ থেকে ৩ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত থেকে চাল আমদানিতে আগের চেয়ে টনপ্রতি ১ হাজার ৬৪০ থেকে দুই হাজার ৪৬০ টাকা বেশি ব্যয় হচ্ছে। বাড়তি মূল্যে আমদানি করা এ চাল স্থানীয় বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া দেশে মজুদ ধানের সংকট রয়েছে। তাই চালের দাম কমতে এবার বোরো মৌসুম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সোমবার যুগান্তরকে বলেন, দেশে চাল ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাতে চালের দাম বাড়াচ্ছে। গত বছর যখন চালের বাজারে উত্তাপ ছিল, তখন সবাই তাকিয়ে ছিল আমন ফলনের দিকে। আমন চাল বাজারে আসার পরও ভোক্তাদের নাগালে আসেনি চালের দাম। এ বছর আবার বিভিন্ন অজুহাতে চালের দাম বাড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার ৫০ লাখ মানুষকে ১০ টাকায় চাল দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবায়ন হয়, তবে দেশে চালের দাম কমে আসবে।
এছাড়া সরকারি গুদামে বলা হচ্ছে- ১৪ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ আছে। এ মজুদ পরিস্থিতিও যদি স্থিতিশীল থাকে, তবে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে। এদিকে হিলি স্থলবন্দরের চাল আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই সপ্তাহ আগেও ভারত থেকে মানভেদে প্রতি টন স্বর্ণ চাল আমদানি হতো ৩৪ হাজার ৪৪০ থেকে ৩৫ হাজার ২৬০ টাকায়। একই চাল আমদানিতে এখন ব্যয় হচ্ছে ৩৬ হাজার ৪০ টাকা থেকে ৩৬ হাজার ৪৯০ টাকা। একইভাবে রত্ন জাতের চালেও টনপ্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪৬০ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। সপ্তাহখানেক আগে স্থলবন্দরটি দিয়ে প্রতি টন ভারতীয় রত্না চাল ৩৬ হাজার ৮০ টাকা থেকে ৩৬ হাজার ৯০০ টাকায় আমদানি হলেও এখন ব্যয় করতে হচ্ছে ৩৮ হাজার ৫৪০ টাকা। রাজধানীর চালের বৃহৎ পাইকারি আড়ত বাদামতলী ও কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সোমবার কথা বলে জানা গেছে, পাইকারি দরে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ৫৮ টাকায়। নাজিরশাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৫৯ টাকায়। আঠাশ বিক্রি হচ্ছে ৪৪ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ৪২ টাকা কেজি। মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি, যা এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ৩৮ টাকায়। কারওয়ান বাজারের পাইকারি চালের আড়ত আল্লাহর দাম রাইস এজেন্সির মালিক সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মিল মালিকরা চালের দাম বাড়ানোর সুযোগ খুঁজে। তারা ভারতে চালের দাম বেড়ে গেছে বলে এখানেও চালের দাম বেশি নিচ্ছে। এতে করে আমাদের মতো পাইকারি ব্যবসায়ীদের তাদের কাছ থেকে বেশি দামে চাল কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সামনে বৈশাখ মাস। তখন বোরো মৌসুম। সে সময় দেশে নতুন চাল উঠলে চালের দাম কমে আসবে। এদিকে রাজধানীর পুরান ঢাকার নয়াবাজার ও মালিবাগ বাজারে খুচরা চাল বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৩ থেকে ৬৪ টাকা কেজি, যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ৬১ থেকে ৬২ টাকায়। ভালো মানের নাজিরশাল চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৭২ টাকায়, যার কেজি গত সপ্তাহে ছিল ৬৮ টাকা। আঠাশ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৩ থেকে ৫৪ টাকা, যা সপ্তাহখানেক আগে বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫১ টাকা কেজি। মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা বিক্রি হচ্ছে ৪৭ টাকা কেজি, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৪৫ টাকা। মালিবাগ বাজারের খালেক রাইস এজেন্সির খুচরা চাল ব্যবসায়ী দিদার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে রাজধানীতে পাইকারি ও খুচরা বাজারে চালের দাম বাড়তির দিকে রয়েছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা হঠাৎ করেই ২ থেকে ৩ টাকা বেশিতে সব ধরনের চাল বিক্রি করছে, যার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর খুচরা চালের বাজারে।
এদিকে সোমবার সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) দৈনিক বাজার দরের তালিকায় চালের দাম বৃদ্ধির চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সরু চালের দাম দেয়া আছে কেজিপ্রতি ৫৮ থেকে ৭০ টাকা, যা এক মাস আগে ৫৮ থেকে ৬৮ টাকা ছিল। মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অন্যদিকে মোটা চালের দাম দেয়া আছে ৪৪ থেকে ৪৭ টাকা কেজি, যা এক মাস আগে ছিল ৪৪ থেকে ৪৬ টাকা। সেক্ষেত্রে মাসের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ১১ শতাংশ। নওগাঁ জেলা ধান-চাল আড়তদার সমিতির সভাপতি নিরদ বরণ সাহা বলেন, দেশে বর্তমানে চালের কোনো সংকট নেই। ভারত থেকেও পর্যাপ্ত চাল আমদানি হচ্ছে। তবে বর্তমানে ভারত সরকার চাল সংগ্রহ করায় সে দেশে দাম কিছুটা বেড়েছে। আমদানি নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারেও। ভারতে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বড় মিল মালিকরাও সরবরাহ সীমিত করে এনেছেন। দু-একদিনের মধ্যে দাম বাড়িয়ে তারা সরবরাহ স্বাভাবিক করবেন। রাজধানীর মালিবাগ বাজারের চাল কিনতে আসা রাশেদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, প্রতিনিয়ত খাদ্যদ্রব্য কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে চালের দাম কমছে না। ভেবেছিলাম নতুন বছরে চালসহ সব ধরনের পণ্যের দাম কমবে; কিন্তু তা হল না। তাই সরকারের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং করে খাদ্যপণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে। না হলে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

পরামর্শকের পকেটেই ৬৭ কোটি!

দাতাদের বেঁধে দেয়া শর্তের কারণে ঋণ ও অনুদানের একটি বড় অংশ যে তাদের নিজেদের পকেটেই চলে যায়, তার একটি উদাহরণ গতকাল যুগান্তরে প্রকাশিত ‘পরামর্শকের পকেটে ৬৭ কোটি টাকা’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি। এতে জানা যায়, গ্রামীণ ও নগরাঞ্চলের, বিশেষত উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণের জীবনের মানোন্নয়ন, দারিদ্র্যবিমোচন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে সুরক্ষার জন্য সরকার, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) ও আন্তর্জাতিক সংস্থা কেএফডব্লিউর যৌথ অর্থায়নে ‘জলবায়ু সহিষ্ণু অবকাঠামো প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ নামের প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ২৪৮ কোটি টাকা এবং জিসিএফ ও কেএফডব্লিউর অনুদান থেকে ৪৪০ কোটি টাকা ব্যয় করার কথা। অর্থের ৬৭ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় হবে পরামর্শকের পেছনে।
এ প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির বাস্তবায়নে দেশি ও আন্তর্জাতিক পরামর্শকের যৌক্তিকতা এবং এ খাতে ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। আমরাও মনে করি, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আদৌ পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজন আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা উচিত। প্রকল্পের অর্থের একটি বড় অংশ যদি অপ্রয়োজনীয় খাতে চলে যায়, তাহলে স্বভাবতই প্রকল্পটির যথাযথ বাস্তবায়নে এর প্রভাব পড়বে। এতে প্রকল্পের উদ্দেশ্য হবে ব্যাহত। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো রয়েছে ঝুঁকিতে। এসব এলাকায় জলবায়ু সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণ শুধু প্রয়োজন নয়, জরুরি। জলবায়ু সহনশীল গ্রামীণ অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলবেষ্টিত গ্রামীণ জনপদের মানুষ জলবায়ু সহিষ্ণু মানের টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আসবে। এতে ব্যাপক জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে এবং এসব এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে। কাজেই এ প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থের অপচয় ও নয়ছয় রোধ করতে হবে কঠোরভাবে। এ ব্যাপারে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

এ কথা বন্ধুত্বের নমুনা নয় by ড. মাহবুব উল্লাহ্

আজ যখন দৈনিক যুগান্তরের জন্য নিয়মিত সাপ্তাহিক কলামটি লিখছি, তখন যে দিনটি অতিবাহিত হচ্ছে সেটি ২৫ ফেব্রুয়ারি। আজকের এদিনে ২০০৯ সালে বিডিআর বাহিনীতে এক কলঙ্কময় বিদ্রোহের নামে হত্যা করা হয় আমাদের সামরিক বাহিনীর ৫৭ জন চৌকস ও দেশপ্রেমিক অফিসারকে। তাদের সঙ্গে নিহত হয়েছিলেন আরও অনেকে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে কিছু বেদনাঘন দিন আছে। তার সঙ্গে সেদিন যুক্ত হয়েছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি। চ্যানেল আই তৃতীয়মাত্রা অনুষ্ঠানে ২৫ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে নিজেদের অনুভূতি সম্পর্কে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ছয়জন শহীদ সেনা অফিসারের স্ত্রী-পুত্র কন্যাদের। তাদের অনুভূতির কথা শুনে অশ্রু সংবরণ করা সম্ভব হয়নি। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক জিল্লুর রহমানও একপর্যায়ে অশ্রুসজল হয়ে পড়েছিলেন। দিবসটিকে ঘিরে আমাদের স্মৃতির বীণায় যে করুণ সুর জাগিয়ে তোলা হয়েছিল তার জন্য চ্যানেল আই এবং উপস্থাপক জিল্লুর রহমানের প্রতি রইল অন্তরসিক্ত কৃতজ্ঞতা। একজন শহীদ অফিসারের সন্তান বলতে চাইল, ‘ওটা বিদ্রোহ ছিল না, ছিল হত্যাকাণ্ড।’ যুক্তিস্বরূপ এ যুবক বলল, বিদ্রোহের একটা আইডিওলজি থাকে। সে জন্য মানবসমাজে বিদ্রোহ নন্দিত হয়। ১৮৫৭ সালে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ইংরেজদের ভাষায় যে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ হয়েছিল, কার্ল মার্কসের দৃষ্টিতে তা ছিল ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’। যারা ইতিহাসে উপস্থাপিত ঘটনাবলি সম্পর্কে কোনো বিকৃতি বা বিচ্যুতি মানতে চান না, তাদের অনেকে মার্কসের দোহাই দিয়ে যে শব্দগুচ্ছ উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলো মার্কসের নিজের কথা ছিল না বলে দাবি করেছেন। মার্কস ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন সম্পর্কে বেশকিছু লেখা লিখেছিলেন। সেগুলো সংকলিত করে প্রকাশ করতে গিয়ে একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের মার্কস-লেনিন ইন্সটিটিউট এই মহাবিদ্রোহ সম্পর্কিত লেখাগুলোর শিরোনাম করেছিলেন, ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’। ইতিহাসের ইতিহাস নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, আমাদের কাছে ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তার সঙ্গে চির অম্লান হয়ে থাকবে মহাবিদ্রোহের মহানায়কদের নাম। যেমন, তাতিয়া তপী, নানা ফড়নবীশ, সিপাহি মঙ্গল পান্ডে এবং মওলানা আহমদ উল্লাহ। তাদের সঙ্গে যে নামটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে সেই নামটি হল বাহাদুর শাহ জাফর। ২০০৯-এর ২৫ ফেব্রুয়ারির বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের জন্য এ দেশের কোনো মানুষেরই সামান্যতম সহানুভূতি থাকবে না। ইতিহাসের ধারায় তারা তৈরি করেছিল এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। যে বীর সেনা অফিসাররা সেদিন প্রাণ হারিয়েছিল, তারা জানতে পারেনি তাদের কী অপরাধ। তারা জানতে পারেনি কোন ষড়যন্ত্রীরা দেশের কোন সর্বনাশ করার জন্য তাদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। একজন সৈনিকের জন্য সবচেয়ে গর্বের বিষয় হল তার ইউনিফর্ম। ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় তাদের হত্যা করা হয়েছিল। এ ছিল তাদের ইউনিফর্মের প্রতি চরম অবমাননা। একজন সৈনিক দেশের জন্য প্রাণ দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। বরং দেশের জন্য শাহাদতবরণ করাটা তারা অতি গর্ব ও বীরত্বের কাজ হিসেবে গ্রহণ করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে এত বিশালসংখ্যক অফিসার শহীদ হননি। তাহলে কি এদের হত্যা করে কুচক্রীরা চেয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বর্মটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে। এসব সেনা অফিসারের স্বজনরা আজও অপেক্ষায় আছেন দিবসটিকে যেন শহীদ সেনাদিবস হিসেবে ঘোষণা করে রাষ্ট্র। তারা দিবসটিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবেও চান না। তাদের একটি মাত্র চাওয়া হল, দিবসটির প্রতি জাতির অকুণ্ঠ মর্যাদা জ্ঞাপন। কী শোকাবহ ছিল এ সেনা অফিসারদের মৃত্যু! তাদের কফিন যেসব সেনা অফিসার ইউনিফর্ম পরে কাঁধে বহন করে ধীর পদক্ষেপে শেষ যাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তারাও অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। কী গভীর বেদনাভূতি এ ঘটনাটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তা ভাষায় বর্ণনা করা সহজ নয়। এমন শোকে মানুষ ভাষা হারিয়ে ফেলে, হয়ে যায় বাকশক্তিহীন। তাই তো গায়ক হায়দার হোসেন গেয়েছিলেন, ‘আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার।’ শুধু সেনা অফিসার হত্যার জন্যই স্মরণীয় নয়, ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষার মাস, শহীদদের মাস, মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রতিরোধের মাস। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বরকত, সালাম, রফিক ও জব্বাররা আমাদের যেভাবে আত্মসচেতন করে গেছেন, সেটাই আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। আমরা একটি দেশের উপনিবেশবাদের শৃঙ্খল ভেঙেছি অন্য একটি দেশের উপনিবেশে পরিণত হওয়ার জন্য নয়। গত দু-তিন দিনের সংবাদপত্র পড়ে মনে হচ্ছে আমাদের আত্মমর্যাদাবোধকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর ২য় পাতায় একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল, ভারতীয় সেনাপ্রধানের মন্তব্য/‘বাংলাদেশিদের’ ব্যবহার করছে চীন ও পাকিস্তান। এ সংবাদে বলা হয়েছে, চীনের সহায়তায় পাকিস্তান ‘বাংলাদেশি’ মুসলমানদের ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঠেলে পাঠাচ্ছে- প্রকারান্তরে এ কথাই বলেছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল দিপিন রাওয়াত। গত বুধবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি জানান, ভারতের পশ্চিম প্রান্তের প্রতিবেশীর কাছে এটা আরেক ধরনের ছায়াযুদ্ধ। ছায়াযুদ্ধের চরিত্র কেমন তা বোঝাতে গিয়ে রাওয়াত আসামের রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (AIUDF) উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, রাজ্যে এ দলটির বাড়-বাড়ন্ত বিজেপির চেয়ে অনেক বেশি। বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি মুসলমান জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কথা বলেন। এই যে বেড়ে যাওয়া, তার একটা বড় কারণ হিসেবে তিনি বন্যার কথা বলেছেন, যার ফলে নিম্ন প্রবাহিকার দেশ বাংলাদেশে বাসস্থানের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। তার ব্যাখ্যায়, চীনের সাহায্যে পাকিস্তান ওই মানুষজনকে উত্তর পূর্বাঞ্চলে পাঠিয়ে জনবিন্যাস বদলে দিচ্ছে। এটা ওদের এক ধরনের ছায়াযুদ্ধ। ওদের উদ্দেশ্য এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অশান্তি জিইয়ে রাখা। জেনারেল রাওয়াতের এ মন্তব্যে হতভম্ব হওয়া ছাড়া কী-ই বা করার থাকে! ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বঞ্চনাজনিত কারণে একধরনের সশস্ত্র বিদ্রোহাত্মক তৎপরতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
কখনও এই তৎপরতা বেড়ে যায়, আবার কখনও স্তিমিত হয়ে পড়ে। ওখানে যা ঘটছে সেটি ঘটছে মূলত অভ্যন্তরীণ কারণে। এসব বিদ্রোহাত্মক তৎপরতার সূচনা ১৯৪৮ সাল থেকে। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পরের বছর থেকে। এ কথা অনস্বীকার্য, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে পূর্ববঙ্গের গরিব কৃষকরা আসামে অভিবাসন শুরু করে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা যায়, পুশ অ্যান্ড পুল ফ্যাক্টর। এ গরিব কৃষক প্রজারাই আসামের বন-জঙ্গল সাফ করে এবং হিংস্র পশুদের দমন করে আসামকে কৃষির জন্য উপযোগী করে তোলে। অথচ দেখা গেল একপর্যায়ে আসামের মূল বাসিন্দারা এটা পছন্দ করছে না। তারা ‘বাঙাল খেদা’ আন্দোলন গড়ে তুলল। এই ঘৃণাশ্রয়ী আন্দোলন প্রতিরোধ করতে গিয়ে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে লাইন প্রথাবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সেই সময় থেকেই আসামে বারবার বাঙালি বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়েছে। এ থেকে পশ্চিম বাংলার বাঙালিরাও রেহাই পায়নি। জেনারেল রাওয়াতের দাবি, বন্যা ও জনসংখ্যার চাপের ফলেই আসামে ‘বাংলাদেশি’দের অনুপ্রবেশ ঘটছে। ফলে আসামের জনবিন্যাসে পরিবর্তন হচ্ছে এবং দিনে দিনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতের সামরিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে এটা হল এক ধরনের জনমিতিক আগ্রাসন বা Demographic Invasion; কিন্তু গত ২-৩ দশকে বাংলাদেশে যতটুকু অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে তার ফলে বাংলাদেশিদের আসামে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশিরা ভারতের তুলনায় পৃথিবীর অন্য অনেক দেশকে আকর্ষণীয় মনে করে। এ ছাড়া আসামে ১৯৪৭-এর পর এমন কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়নি যার ফলে বাংলাদেশিরা কর্মসংস্থানের গন্তব্য হিসেবে আসামকে বেছে নিতে পারে। সর্বোপরি চীনের সহায়তায় পাকিস্তান ‘বাংলাদেশি’ মুসলমানদের ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঠেলে পাঠাচ্ছে- জেনারেল রাওয়াতের এমন অভিযোগ উদ্ভটও বটে। কারণ বাংলাদেশে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতাকে দমিয়ে দেয়ার জন্য বাংলাদেশের সরকার প্রচণ্ডভাবে তৎপর রয়েছে। এ কথা নিশ্চয়ই জেনারেল রাওয়াত আমাদের মতো বেসামরিক নাগরিকদের তুলনায় অনেক বেশি অবগত আছেন। বাংলাদেশ সরকার অনুপ চেটিয়াসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহী নেতাদের ভারত সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে। এর ফলে ভারতের নিরাপত্তা শঙ্কা দূরীভূত হওয়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে এখন ভিন্নতর অভিযোগ তোলা হচ্ছে। এর সঙ্গে চীনকেও যুক্ত করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের কথিত উদ্বেগ প্রশমনের জন্য অতি সম্প্রতি বলে দিয়েছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ততটুকুই, যতটুকু প্রয়োজন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য। বাংলাদেশ ভারতকে অনেক কিছু দিয়েছে- দিয়েছে করিডোর সুবিধা এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে সহায়তা। এতকিছু করেও ভারতের মন জয় করা সম্ভব হয়নি। আরও কত কী করলে ভারতের মন জয় করা সম্ভব হবে বলা দুষ্কর। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ৩-৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিটেন্স যায় ভারতে। এখন মনে হচ্ছে জনমিতিক বিন্যাসে ভারসাম্য আনার নামে ভারতও মিয়ানমারের মতো ২০-৪০ লাখ মুসলমানকে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে পারে। এটা কি বন্ধুত্বের নমুনা? ভারত ভালো বন্ধু হলে অন্তত তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশকে দিত। আমরা ভারতকে বন্ধু হিসেবে পেতে চাই, অভিযোগ উত্থাপনকারী প্রভু হিসেবে নয়।
ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

ব্রিটেনের ইরানবিরোধী প্রস্তাবে ভেটো দিল রাশিয়া

ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ব্রিটেনের পক্ষ থেকে উত্থাপিত প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে রাশিয়া। ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ হাউছি বিদ্রোহীদের কাছে ইরানের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে ওই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। ব্রিটেন গত সপ্তাহে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর কাছে এই প্রস্তাবে খসড়া বিতরণ করেছিল।
প্রস্তাবে ইয়েমেনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আরো এক বছরের জন্য বৃদ্ধির পাশাপাশি হাউছি বিদ্রোহীদেরকে অস্ত্র সরবরাহ না করা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব লঙ্ঘনের দায়ে ইরানকে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু সোমবার রাতে নিরাপত্তা পরিষদে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে রাশিয়ার ভেটোর কারণে প্রস্তাবটি পাস হতে পারেনি। ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে সৌদি আরব ইয়েমেনে হাউছিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এ অভিযানে সৌদি সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছে আমেরিকা ও ব্রিটেন। সোমবার ব্রিটেনের পক্ষ থেকে উত্থাপিত প্রস্তাবটির প্রতি ফ্রান্স ও আমেরিকা সমর্থন জানিয়েছিল। প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছিল, ইয়েমেনে ইরানের ভূমিকার কারণে দেশটির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি পাস হলে এর পরবর্তী প্রস্তাবে সেই ‘অতিরিক্ত ব্যবস্থাগুলো’ অনুমোদন করা হতো। এর আগেও আমেরিকা ও সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ ইয়েমেনকে অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র দেয়ার দায়ে ইরানকে অভিযুক্ত করেছিল। কিন্তু ইরান এবং ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীরা সেসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে। হাউছিরা বলেছে, ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীই তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি বাড়িয়েছে। এ ছাড়া, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি গত মঙ্গলবার বলেছিলেন, ইয়েমেন যখন চারদিক দিয়ে কঠোর অবরোধের সম্মুখীন তখন ইরানের পক্ষে হাউছিদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছে দেয়ার অভিযোগ অত্যন্ত হাস্যকর।

ধুলার সাথে বসবাস by সুমনা শারমিন

ধুলার সাথে নিত্য বসবাস। ঘর ছেড়ে বেরোলেই আর কিছু না হোক, ধুলার মুখোমুখি হতেই হয় রাজধানীবাসীকে। ভাঙাচোরা রাস্তা আর বছরজুড়ে উন্নয়নের নামে চলা খোঁড়াখুঁড়ির ধুলা দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। শীতের শেষে এর তীব্রতা বেড়েছে। রাজধানীর বেশির ভাগ রাস্তায় এখন ধুলার রাজত্ব। একে সঙ্গী করে চলা অনেকে ভুগছেন শ্বাসকষ্ট, শ্বাসনালীর ক্ষতসহ নানা ধরনের মারাত্মক সমস্যায়। পাশেই বুড়িগঙ্গা নদী। অথচ প্রাণভরে শ্বাস নেয়া তো দূরের কথা, উল্টো দূষিত পানির দুর্গন্ধ সহ্য করতে হয় সদরঘাট-গাবতলী বেড়িবাঁধ সড়কের পাশের বাসিন্দাদের। কয়েক বছর ধরে যুক্ত হয়েছে নতুন ধুলার ভোগান্তি। সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত দীর্ঘ ১১ কিলোমিটার এই সড়কের প্রায় সাত কিলোমিটার অংশের পিচ উঠে গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে সৃষ্টি হচ্ছে ধুলার। বেড়িবাঁধ সড়কের সোয়ারীঘাটের কামালবাগ বটতলা মোড় থেকে হাজারীবাগ পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার অংশ ঘুরে দেখা যায়, সড়কের পিচ উঠে বের হয়ে পড়েছে মাটি। আলগা হয়ে গেছে খোয়া। সড়কের পাশের বাসাবাড়ি ও দোকানের আবর্জনা স্তূপ করে রাখা হয়েছে রাস্তার ধারে। পথচারীরা চলছে হাত দিয়ে নাক-মুখ চেপে। সড়কে চলাচল করছে বাস, ট্রাক, লেগুনা, ব্যাটারিচালিত রিকশা। সড়ক দিয়ে কোনো যানবাহন গেলেই ধুলায় ভরে যাচ্ছে আশপাশের এলাকা। একসাথে একাধিক গাড়ি চললে ধুলায় একরকম অন্ধকার হয়ে যায় সড়কের ওই অংশ। বেড়িবাঁধ সড়কের কেল্লার মোড় অংশে দেখা যায়, ধুলা থেকে বাঁচতে যানবাহনের যাত্রীদের কেউ মাস্ক পরেছেন, কেউবা হাত দিয়ে নাক-মুখ চেপে রেখেছেন। সড়কের পাশের চা-দোকানিরা কাপড় দিয়ে খাবার ঢেকে রেখেছেন। ধুলা জমে বিবর্ণ হয়ে গেছে সড়কের আশপাশের গাছের পাতা। কথা হয় লেগুনার যাত্রী মাহমুদা খাতুনের সাথে।
তিনি বলেন, সকালে ভালো কাপড় পরে বাইরে বের হলে পরের দিনই সেটা পরা যায় না। শিশুদের স্কুল ড্রেস প্রতিদিনই ধুয়ে দিতে হয়। ধুলার কারণে মাঝেমধ্যে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। গলা ব্যথা করে, নাক-বুক জ্বলে। এই সড়ক তৈরির কয়েক বছর পর থেকেই নষ্ট হতে শুরু করে। বৃষ্টিতে কাদা-পানি জমে। আর শুষ্ক মওসুমে ধুলা। বালুঘাটের বাসিন্দা মকবুল হোসেন বলেন, দিনে তো নয়ই, রাতেও ঘরের দরজা-জানালা খোলা রাখা যায় না। সড়ক থেকে উড়ে আসা ধুলাবালুতে ঘরের আসবাব-বিছানাপত্র ময়লা হয়ে যায়। সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী ইকবাল বলেন, ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি সংস্কার করা হচ্ছে। কাজটি করছে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গাবতলী ও সোয়ারীঘাট অংশে এরই মধ্যে সংস্কারকাজ শুরু হয়ে গেছে। এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে। তখন আর ধুলাবালুর সমস্যা থাকবে না। শুধু এই সড়ক না, রাজধানীর অভিজাত গুলশান বনানীর ফুটপাথেও ধুলার যন্ত্রণায় হাঁটা যায় না। বাড্ডা লিংক রোড হয়ে গুলশান ১ নম্বর সড়ক পর্যন্ত চলছে ডিভাইডার সংস্কারের কাজ। ফলে অফিসগামী যাত্রীদের মুখে মাস্ক পরে হাঁটতে হয় এই রাস্তায়। গুলশান ১ থেকে পুলিশপ্লাজা পর্যন্ত সড়কের ফুটপাথ সংস্কারের নামে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী ফলে প্রতিনিয়তই ধুলার কবলে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বে বায়ুদূষণের শীর্ষে যেসব নগরী, ঢাকা তার অন্যতম। শীতকালে ঢাকার বাতাসে ক্ষতিকর কণার পরিমাণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে দশগুণ বেড়ে যায়। ফলে শ্বাসকষ্ট, এলার্জিসহ নানা রোগে ভুগতে হয় নগরবাসীকে। এই দূষণ থেকে নগরবাসীকে বাঁচাতে ধুলার উৎস বন্ধ করতে হবে। প্রতিদিন পানি ছিটাতে হবে রাস্তায়। সড়কের পাশে খোলা জায়গায় রাখা যাবে না নির্মাণসামগ্রী। এছাড়া নগরীতে যেভাবে সবুজের পরিসর কমছে- তাতে বায়ুদূষণ ঠেকাতে যে পদক্ষেপই নেয়া হোক না কেন তা কোনো কাজে আসবে না। তাই কেটে ফেলা গাছের চেয়ে নতুন করে লাগানো গাছের সংখ্যা যেন বেশি হয় সেই পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

জাতিসংঘে ইরানের বিরুদ্ধে প্রস্তাবে রাশিয়ার ভেটো

ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ব্রিটেনের পক্ষ থেকে উত্থাপিত প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে রাশিয়া। ইয়ামেনের হুতি বিদ্রোহীদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহ বন্ধে ইরান ব্যর্থ বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে ইরান অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছে। সোমবার ব্রিটেনের প্রস্তাবে ফ্রান্স, আমেরিকাসহ ১১ দেশ সমর্থন জানিয়েছিল। রাশিয়া ও বলিভিয়া বিরোধিতা করেছে। চীনা ও কাজাখস্তান ভোটদানে বিরত ছিল। খবর পার্স টুডে ও লস এঞ্জেলেস টাইমসের। ব্রিটেন গত সপ্তাহে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর কাছে এ প্রস্তাবে খসড়া বিতরণ করেছিল।
এতে ইয়ামেনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আরও এক বছরের জন্য বাড়াতে বলা হয়েছিল। পাশাপাশি হুতি যোদ্ধাদের অস্ত্র সরবরাহ না করা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব লঙ্ঘনের দায়ে ইরানকে অভিযুক্ত করা হয়। সোমবার রাতে নিরাপত্তা পরিষদে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে রাশিয়ার ভেটোর কারণে প্রস্তাবটি পাস হতে পারেনি। ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে সৌদি আরব ইয়ামেনে যে বর্বর হামলা চালাচ্ছে তা প্রতিহত করছেন হুতি যোদ্ধারা। রিয়াদের পছন্দসই সরকার ইয়েমেনের ক্ষমতায় সৌদিকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন। প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছিল, ইয়েমেনে ইরানের কথিত ভূমিকার কারণে দেশটির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি পাস হলে এর পরবর্তী প্রস্তাবে সেই অতিরিক্ত ব্যবস্থাগুলো অনুমোদন করা হতো। যারা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা লঙ্ঘন করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নিরাপত্তা পরিষদকে অস্বস্তি দূর করতে আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘে ব্রিটেনের উপরাষ্ট্রদূত জোনাথন অ্যালেন।

সৌদিতে এক রাতেই এত বদল!

সৌদি আরবের সেনাপ্রধানকে বরখাস্ত করেছেন দেশটির বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ। সেনাপ্রধানের সঙ্গে আরও কয়েকজন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিবিসির খবরে বলা হয়, সোমবার গভীর রাতে কয়েকটি আদেশ জারির মাধ্যমে সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেন বাদশাহ সালমান।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সৌদি নিউজ এজেন্সিতে এসব খবর জানানো হলেও সামরিক কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করার কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সৌদি নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, সৌদি সেনাপ্রধান আবদুল রহমান বিন সালেহ আল বানিয়ানকে সরিয়ে ফায়াদ আল রুয়ালিকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিমানবাহিনী ও স্থলবাহিনীর প্রধানের পদেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ ছাড়া শ্রম ও সমাজ উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এক নারীকে উপমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর নাম তামাদার বিনতে ইউসুফ আল রামাহ। দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের আসির প্রদেশে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রিন্স তুর্কি বিন তালালকে। প্রিন্স তুর্কি বিন তালালের ভাই বিলিয়নিয়ার প্রিন্স আলওয়ালেদ বিন তালালকে কিছুদিন আগে আরও কয়েকজন প্রিন্সের সঙ্গে বন্দী করা হয়। দুই মাস পর মুক্ত হন তিনি। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে প্রায় তিন বছর ধরে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি সেখানে কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে সৌদি জোট। এই পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিল সৌদি আরব। সঙ্গে আরও কিছু পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হলো। সৌদিতে সাম্প্রতিক কালের অনেকগুলো বরখাস্তের পেছনে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের হাত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কয়েক মাস আগে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে বেশ কয়েকজন প্রিন্স, মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীকে বন্দী করা হয়েছিল ক্রাউন প্রিন্সের নির্দেশেই।

কাতারে নতুন প্রজন্মকে বাংলা শেখাবে কে? by তামীম রায়হান

কাতারে বর্তমানে প্রায় চার লাখ বাংলাদেশি বাস করছেন। নির্মাণ খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ছাড়াও বিভিন্ন পেশা ও বাণিজ্য খাতে জড়িত হাজার হাজার বাংলাদেশি। তাঁদের অনেকেই সপরিবারে কাতারে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। ফলে গত কয়েক দশকে কাতারে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি নতুন প্রজন্ম, যাদের অধিকাংশের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এখানে। এই নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ বাংলাদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমএইচএম স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ালেখা করছে বা করেছেন। আবার অনেকে বিদেশি স্কুলে ইংরেজি মাধ্যমে বা কাতারি স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরবি মাধ্যমে পড়াশোনা করছে। যারা ইংরেজি বা আরবি মাধ্যমে পড়ালেখা করছে, স্বাভাবিকভাবে তারা মাতৃভাষা শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ইংরেজি বা আরবি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত অধিকাংশ বাংলাদেশি শিশু-কিশোর ও তরুণ বাংলা লিখতে বা পড়তে পারে না। অনেকের বাংলা শব্দজ্ঞানও বেশ সীমিত। কিন্তু এই ভিন্নভাবে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের জন্য মাতৃভাষা শেখা ও চর্চার খুব বেশি সুযোগ কাতারে নেই বললেই চলে। এর ফলে বাংলাদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে অধ্যয়নরত নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি অনেক শিশু-কিশোর ও তরুণের কাছে বাংলা ভাষার সঙ্গে মৌখিক পরিচয় থাকলেও হাতে-কলমে কোনো চর্চা নেই। এর চেয়েও আশ্চর্যের বিষয়, এটি নিয়ে অভিভাবকদেরও কোনো মাথাব্যথা নেই। একমাত্র বাংলাদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমএইচএম স্কুল অ্যান্ড কলেজ ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। সেখানে বাংলা ভাষা সম্পর্কে জানাশোনা বাড়াতে এবং বাংলা সাহিত্যের চর্চায় শিক্ষার্থীদের জন্য একাডেমিক সিলেবাসের বাইরে বাড়তি কোনো আয়োজন নেই। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পর চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তৈরি হয়নি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চা এবং বাংলা বিতর্কসহ সাংস্কৃতিক চর্চার কোনো আলাদা ক্লাব বা সংগঠন। এমএইচএম স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসিমউদ্দীন প্রথম আলোর কাছে বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘একাডেমিক কার্যক্রমের বাইরে বাড়তি উদ্যোগ না থাকলেও বিভিন্ন জাতীয় দিবসে আমরা বাংলা ভাষায় রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকি। আমাদের স্কুলে বাংলা বিভাগ রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবস উপলক্ষে স্কুলের চারটি ভবন থেকে আলাদা বাংলা দেয়ালিকা প্রকাশ করা হয়ে থাকে।’প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে অধ্যক্ষ জসিমউদ্দীন বলেন, ‘বাংলাদেশি কমিউনিটির যেসব নতুন প্রজন্ম এই স্কুলের শিক্ষার্থী নয়, তাদের জন্য বিনা মূল্যে বাংলা ভাষা শেখাতে ২০১৩ সালে একবার আমরা উদ্যোগ নিয়েছিলাম।
কিন্তু আমরা খুব অল্প সাড়া পেয়েছি। এরপর আর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে কেউ যদি বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য বাংলা ভাষা শেখা ও চর্চার উদ্যোগ নেয়, তবে বাংলাদেশ স্কুল এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’ এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্কুল পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রদূত আসুদ আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘একাডেমিক সিলেবাসের বাইরে বছরজুড়ে স্কুলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এত দিন। এখন আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাবব। এ জন্য উদ্যোগ নিতে আলোচনা করব।’ তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ স্কুলের বাইরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য দু-একটি সংগঠন বাংলা ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেয়। তবে অভিভাবকদের আগ্রহের অভাবে এসব উদ্যোগ সীমিত পর্যায়ে রয়ে গেছে। ২০১৫ সালে কাতারে আরবি ও ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেয় আলনুর কালচারাল সেন্টার। এই সংগঠনের তত্ত্বাবধানে বাংলা ভাষা শেখা শুরু করে ২২ জন শিক্ষার্থী। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক মাওলানা ইউসুফ নুর বলেন, ‘আমরা আরও বেশি শিক্ষার্থী আশা করেছিলাম। কিন্তু অভিভাবকদের অনাগ্রহ ও অসচেতনতার কারণে অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরও অভিভাবকদের কারণে প্রায়ই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সংকট দেখা দেয়।’ কোর্সটির প্রশিক্ষক অধ্যাপক এ কে এম আমিনুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বর্ণমালা পরিচয় থেকে শুরু করি। সপ্তাহে এক দিন তাদের শেখানো হতো। কিছু বিরতি দিয়ে হলেও দুই বছর পর আজ তারা সবাই বাংলা পড়তে পারে। তবে চলতি বছর নতুন করে আবারও এই কোর্স শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’কাতারে বাংলাদেশি শিশু-কিশোরদের জন্য গড়ে ওঠা বাংলাদেশ চিলড্রেনস ফোরামের সদস্য তালিকায় প্রায় ৭৬ জন প্রবাসী শিশু রয়েছে। এই শিশুদের সঙ্গে বাংলা বর্ণমালা পরিচয় করিয়ে দিতে উদ্যোগ নেয় চিলড্রেনস ফোরাম। তবে এখনো সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। ফোরামের অন্যতম উদ্যোক্তা মোহাম্মদ শাহেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা মূলত জায়গা সংকটের কারণে কার্যক্রম শুরু করতে পারিনি। একটি কমন রুম পেলে আমরা শিশুদের ভাষা শেখানোর কাজ শুরু করব।’ দিওয়ানে আমিরিতে কর্মরত ইতিহাস বিশেষজ্ঞ হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ কথাও সত্য, কাতারপ্রবাসী অনেক বাংলাদেশি অভিভাবক নিজেদের সন্তানদের বাংলা ভাষা শেখাতে আগ্রহী নন। তাঁরা ভাবেন, তাঁদের সন্তানেরা এখানে পড়ালেখা শেষে উচ্চশিক্ষা বা জীবনের তাগিদে ইউরোপ-আমেরিকায় চলে যাবে, ফলে পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় বাংলার বাইরে বেশি কিছুর প্রতি তাঁদের মনোযোগ নেই।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিভাবক বলেন, ‘আমরা আমাদের মাতৃভাষা দিবসকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি। অথচ দেশের সীমানার বাইরে খোদ আমাদের মধ্যেই ভাষার জন্য মমতা ও ভালোবাসা নেই। এর পেছনে অভিভাবকদের দায়টা বেশি। কারণ, নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হলে সেটির শুরু ঘর থেকে হতে হবে।’ রাষ্ট্রদূত আসুদ আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রবাসে সন্তানদের বাংলা ভাষা শেখানো ও চর্চায় অভিভাবকদের অনাগ্রহ বা অসচেতনতার বিষয়টি কোনোভাবেই ইতিবাচক হতে পারে না। বিদেশে বেড়ে ওঠা এই নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষা না জানলে নিজস্ব স্বকীয়তা ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাবে।’ রাষ্ট্রদূত প্রবাসীদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেসব বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশ স্কুলে লেখাপড়া করছে না, তাদের অভিভাবকেরা যেন নিজ সন্তানদের বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বাংলাদেশ এমএইচএম স্কুলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পাঠান। এর ফলে তারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে ও শেখায় উত্সাহী হবে।

ঠান্ডায় কাঁপছে ইউরোপ

ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে নতুন করে তীব্র কনকনে আবহাওয়া ইউরোপের নানা দেশের জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সোমবার ভোর থেকেই মধ্য ইউরোপে তাপমাত্রা মাইনাস ১০ থেকে মাইনাস ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। তীব্র ঠান্ডায় বিভিন্ন দেশে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এই বছরের শীতে প্রথমবারের মতো রেকর্ড পরিমাণ ঠান্ডা পড়েছে এবং এই সপ্তাহজুড়ে তাপমাত্রা আরও কমতে থাকবে। এই তীব্র শীতের কারণ মূলত উওর মেরু থেকে বয়ে আসা আর্টিক বায়ু। তীব্র শীত ও তুষারপাতের কারণে মধ্য ইউরোপের কিছু বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। রাস্তাঘাট পিচ্ছিল হওয়ার কারণে বহু জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঠান্ডার প্রকোপে পোল্যান্ডে আট ব্যক্তি মারা গেছেন, ইতালির রাজধানী রোমে সোমবার থেকে স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। সোমবার জার্মানির ব্রিমেন ও কোলন-বন বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, কেবল উওর জার্মানির লুবেক শহরেই পিচ্ছিল রাস্তায় কয়েক ঘণ্টার মধ্য শতাধিক এবং হামবুর্গে ৭৫ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। সড়ক পিচ্ছিল হওয়ায় সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লোফভেনে গাড়িটি উপসালা শহরের সন্নিকটে দুর্ঘটনায় পড়ে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর কোনো ক্ষতি হয়নি। স্টকহোমে তুষারপাতের কারণে একই সঙ্গে অন্তত ২০টি গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়। প্রচণ্ড ঠান্ডায় অস্ট্রিয়ার পুলিশ কপাল থেকে থুতনি ঢেকে চলাফেরার বিষয়ে নতুন নির্দেশ জারি করেছে। ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে দেশটির আইন অনুযায়ী নেকাব ও বোরকা পড়ে বা মুখমণ্ডল ঢেকে চলাফেরায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এখন প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে মুখমণ্ডল ঢেকে চলাফেরার বৈধতা পেয়েছে। বাল্টিক অঞ্চলের দেশ লিথাউনে প্রচণ্ড ঠান্ডায় তিন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। দেশটির তাপমাত্রা এখন সর্বনিম্ন মাইনাস ২৪ সেলসিয়াস। ফ্রান্সে ঠান্ডায় এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের মেয়র ভিনশেন্ট ড্য ভলফ শহরটির গৃহহীনদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। গ্রিসের উত্তরাঞ্চলে প্রদেশ মেসিডোনিয়াতে ঠান্ডার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বুলগেরিয়াতে ঠান্ডার কারণে বহু মালবাহী গাড়ি সড়কে আটকা পড়েছে। ব্রিটিশ আবহাওয়া দপ্তরের প্রধান আবহাওয়াবিদ ফ্রাঙ্ক সাউন্ডেরস জানিয়েছেন এই সপ্তাহে ১৯৯১ সালের পর ইংল্যান্ড ওয়েলসে সর্বোচ্চ ঠান্ডা পড়বে।

নতুন আইনে আশার আলো

দুই কিশোরীর মা সামেহ (৪৫)। শিক্ষকতা করেন। তবে বিয়ের পর থেকে গত ১৫ বছরে বেতন কখনো নিজের কাছে রাখতে পারেননি। স্বামীর হাতে তুলে দিতে হতো। এরপরও সইতে হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। কিন্তু দেশের আইনের দৃষ্টিতে এগুলো অপরাধ ছিল না। ফলে আইনের আশ্রয় নেওয়ার কোনো সুযোগই তাঁর ছিল না। সম্প্রতি দেশটিতে আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটি সামেহর মতো অনেক নারীর জীবনে আলো হয়ে দেখা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। নারীর প্রতি সহিংসতার সংজ্ঞায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে তিউনিসিয়া গত বছরের জুলাই মাসে আইন পাস করে। চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। শারীরিক, নৈতিক ও যৌন হয়রানির পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিপীড়নের বিষয়টিও আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশটির মানবাধিকারকর্মীদের গত ২৫ বছরের লড়াইয়ে এটা সম্ভব হয়েছে। সম্প্রতি সামেহ বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে আবেদন করেছেন।
দুই বছর আগেই তিনি এটা করতে চেয়েছিলেন উল্লেখ করে বলেন, মেয়েদের সামনে নির্যাতন করতেন স্বামী। মানসিকভাবে তখন ভেঙে পড়েছিলেন। অর্থনৈতিক নিপীড়ন তো ছিলই। তবে স্বামী অনুমতি দেননি বলে সেটা করতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, ‘নতুন আইনের কথা জেনে মনে হলো, এই আইন আমার জীবনে ন্যায়বিচার আনবে।’ এরপরই তিনি নৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ দেখিয়ে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। নতুন আইন সামেহর মতো পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারীদের জীবন বদলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। নারীদের সহায়তার জন্য গঠিত তিউনিসিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্রেটিক উইমেনের (এএফটিডি) আহলেফ বেলহাজ বলেন, এটা সত্যিকারের অগ্রগতি। নারীর জীবন বদলে দিতে পারে।

ডাক্তার দেখতে অস্বীকার, পরে মারা গেল শিশুটি

দেরিতে আসায় হাঁপানি রোগে আক্রান্ত এলি মে নামে একটি শিশুকে দেখতে অস্বীকার করেন চিকিৎসক। আর সে রাতেই হাসপাতালে মারা গেল শিশুটি। পাঁচ বছরের শিশুটির হাসপাতালে আসতে দেরি হয়েছিল ৫ মিনিট। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাতেই তাকে ফিরিয়ে দেন।
এমনকি তার রোগ যে মারাত্মক পর্যায়ের, সেই নথিপত্র চিকিৎসকের কাছে থাকা সত্ত্বেও তিনি শিশুটিকে দেখলেন না। ঘটনাটি ঘটেছে যুক্তরাজ্যের নিউপোর্টের গ্রাঞ্জ ক্লিনিকে। এ নিয়ে তদন্তে নিয়োজিত বিচারক বলেন, শিশুটিকে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ দেয়ার সুযোগ নষ্ট করা হয়েছে। এলি মের পরিবার জানায়, তারা ভেঙে পড়েছেন। হতাশ হয়েছেন। কারণ তদন্তে চিকিৎসকের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিচারক বলেন, তাকে চিকিৎসা দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুতরও ব্যর্থতা রয়েছে। শিশুটি সিস্টেমের ফাঁদে পড়েছিল। তিনি বলেন, যেহেতু মামলাটি অবহেলার, সে হিসেবে এখানে কোনো অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শিশুটির মা শ্যানিস ক্ল্যার্ক সোমবার বলেন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তার মেয়েকে নিয়ে যখন আসার কথা, তখন তিনি আসতে পারেননি। ডা. জোয়ান রো তাকে দেখার কথা ছিল। কিন্তু তার কন্যা মারাত্মকভাবে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল, সে হাঁটতে পারছিল না। চিকিৎসক তাকে বিকাল ৫টায় দেখার কথা ছিল। ডা. জোয়ান রো ১০ মিনিট বিলম্ব নামে একটি নীতি মেনে চলেন।
সে অনুসারে যে রোগী ১০ মিনিট পর আসবে, তাকে তিনি দেখবেন না। হাসপাতালে এসে অভর্থ্যনার সামনে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং ৫টা ১০ থেকে ৫টা ১৮ মিনিটের মধ্যে তিনি ডাক্তারের চেম্বারের সামনের লাইনে গিয়ে দাঁড়ান। বাসায় ফেরার আগে এলি মে জানতে চাইল- ডাক্তার কেন আমাকে দেখবেন না? এলি রাত ৮টার সময় ঘুমাতে যায়। কিন্তু রাত সাড়ে ১০টার দিকে সে আবার জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করে। তার হাত-পা মুখমণ্ডল নীল হয়ে যায়। এর পর রয়েল জেওয়েন্ট হাসপাতালে আসার কিছুক্ষণ পরেই মারা যায় এলি মে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কারাগার গাজা

ইসরাইল ফিলিস্তিনের গাজা অবরোধ করার পর থেকে গত ১২ বছরে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। উপকূলীয় এ ছিটমহলের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ তথ্য দিয়েছে। সংগঠনগুলোর সমন্বয়ক আহমেদ আল কুর্দ রোববার আলজাজিরাকে বলেন, গত কয়েক দিনে যথাযথ চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় পাঁচটি নবজাতক মারা গেছে। ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনের পার্লামেন্টে হামাস বিজয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসরাইল ফিলিস্তিনে অর্থনৈতিক অবরোধ দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অবরোধের কারণে যেসব ফিলিস্তিনি মারা গেছে, তার মধ্যে সাড়ে চারশ’ মারা গেছে শুধু চিকিৎসাসেবার সংকটের কারণে। যেমন- যথাযথ চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকা বা চিকিৎসাসেবা নিতে গাজার বাইরে যেতে না পারা। অবরোধের কারণে গাজাবাসী প্রতিনিয়ত ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। কারণ অবরোধের কারণে সেখানে পানি ও বিদ্যুৎ সংকট, ওষুধ ও চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। এমনকি চিকিৎসকরা চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে অপারেশন পর্যন্ত করতে পারেন না। কুর্দ বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে অন্তত ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যেমন, মোমবাতি, কাঠ কিংবা জেনারেটর ব্যবহারের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এসব লোক প্রাণ হারায়। তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া ৩৫০ ফিলিস্তিনি কৃষিকাজ করতে গিয়ে বা মাছ ধরতে গিয়ে অথবা বাণিজ্যিক টানেলে কাজ করতে গিয়ে মারা গেছেন। রোববার ইসরাইলি নৌ-সেনাদের গুলিতে এক ফিলিস্তিনি জেলের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছেন দু’জন। অথচ তারা ফিলিস্তিনি সীমান্তেই মাছ ধরছিলেন। কিন্তু ইসরাইল বলছে, তারা সীমান্ত লঙ্ঘন করায় গুলি চালানো হয়েছে। আহমেদ আল কুর্দ বলেন, ২০ লাখ লোকের বসবাসের স্থান গাজা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কারাগার। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, পরিবেশ, সমাজ কিংবা জ্বালানি যেদিক থেকেই চিন্তা করেন, গাজা একটি বিপর্যয়কর এলাকা।

সাত ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা: অর্থমন্ত্রী

সাত ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। সোমবার জাতীয় সংসদে আবদুল মতিনের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ তথ্য জানান। তিনি জানান, চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত আর তিনটি বেসরকারি ব্যাংকে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সাতটি ব্যাংকে মোট মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ৯ হাজার ৪১৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি তিন হাজার ১৪০ কোটি ৪১ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংকের ঘাটতি ৬৮৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা, জনতা ব্যাংকের ঘাটতি এক হাজার ২৭২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দুই হাজার ৫২২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। মূলধন ঘাটতিতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংক সোনালী, রূপালী, জনতা ও বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি সাত হাজার ৬২৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা। আর বেসরকারি তিনটি ব্যাংক কমার্স, ফারমার্স ও আইসিবি ইসলামি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি এক হাজার ৭৯১ কোটি ২০ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঘাটতি : বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ২৩১ কোটি ৩১ লাখ টাকা, ফারমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ৭৪কোটি ৭৬ লাখ টাকা আর আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ঘাটতি এক হাজার ৪৮৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে ২০০৫–২০০৬ অর্থবছর থেকে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছর পর্যন্ত সরকার ১০ হাজার ২৭২ কোটি টাকার পুনঃমূলধনীকরণ সুবিধা দিয়েছে। যা ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলোতে মূলধন হিসাবায়নে যুক্ত হয়েছে।’ তিনি জানান, ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি ছিল সাত হাজার ৫৬৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এ সময়ে বেসরকারি ব্যাংকে উদ্বৃত্ত প্রভিশন রয়েছে এক হাজার ৭৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। সামগ্রিকভাবে মোট ঘাটতি প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৩৪৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী সোনালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দুই হাজার ৯০০ কোটি ৯১ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংকের এক হাজার ২৪৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বেসিক ব্যাংকের তিন হাজার ৪২১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ১৯৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ৮৬১ কোটি ৬১ লাখ টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১৫৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ৮৯ কোটি ৯ লাখ টাকা।

পথে প্রান্তরে জাবির একঝাঁক তরুণ গবেষক

সকাল ৭টা। তীব্র কুয়াশার মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কলা ভবনের সামনে জমায়েত বাড়তে থাকে তরুণ গবেষকদের। উদ্দেশ্য কুমিল্লার বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা। কনকনে শীতের বাধাকে অতিক্রম করে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে জড়ো হলো ৬৮ জন তরুণ গবেষক। ভিন্ন এক কারণে ট্যুর নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি উত্তেজনার আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ, গবেষণা কার্যক্রম-ই নয়, গবেষণার পাশাপাশি কুমিল্লার ঐতিহাসিক স্থানগুলো ভ্রমণের সুযোগও যে মিলছে শিক্ষার্থীদের! বলছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেল্থ অ্যান্ড ইনফরমেটিভ বিভাগের কথা। বাংলাদেশের একমাত্র বিভাগ হিসেবে স্নাতক পর্যায়ে চালু হওয়া বিভাগটি ২০১১ সালের ২১ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে জনস্বাস্থ্য গবেষণায় ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। কুমিল্লার উদ্দেশে শিক্ষার্থীদের যাত্রা শুরু হয় সকাল ৮টায়। বিভাগের দুই ব্যাচ অর্থাৎ ৪৪তম ব্যাচ এবং ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এবারের ফিল্ড ট্যুরে অংশ নেন। এই ট্যুরের সার্বিক দায়িত্বে থাকেন বিভাগটির দুই শিক্ষক জনাব জেবুন্নেসা জেবা এবং ডা. মোসা. সাবরীনা মোনাজিলিন। নলেজ-অ্যাটিচিউড অ্যান্ড প্র্যাকটিস রিগার্ডিং নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ, সেল্ফ মেডিকেশন ইন ফার্মাসিউটিক্যাল ভিজিটরস এবং হেলথ অ্যাসপেক্ট অব সেইফ মাদারহুড ইন এ গিভেন এরিয়া; গবেষণার এই তিনটি বিষয় নিয়ে শুরু হয় এবারের যাত্রা।
বাস যখন ঢাকা আরিচা মহাসড়কে তখন হঠাৎ ‘নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে’ গানের সুর ভেসে ওঠে বিভাগের ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী দিদারুল আলম দ্বীপ এবং রাইসুল ইসলাম রিমন এর কণ্ঠে। সঙ্গে সঙ্গে বাসের সব শিক্ষার্থীর একসঙ্গে গাওয়া গান বাসে এক অন্যরকম উত্তেজনার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে একটির পর একটি গান আসতে থাকে আর বাস এগিয়ে চলে কুমিল্লার দিকে। যেন সেদিন চারদিক গানের আভাসে মুখরিত আকার ধারণ করেছিল। ‘রাস্তার চারপাশের লোকজন, অন্য বাসের যাত্রী, আর পথচারীদের আমাদের দিকে কী যে কৌতূহল চোখে তাকিয়ে ছিল, ভাবতে এখনো ভালো লাগে’ বলছিলেন ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আয়েশা আহমেদ। কিছুক্ষণ পর, সবাইকে চকোলেট বিতরণের দায়িত্ব পড়ল ৪৪তম ব্যাচের (বন্ধুদের কাছে) রয়েল বেঙ্গল টাইগার নামক খ্যাত বন্ধু শরীফ। এবারের পুরো ট্যুর নিয়ে তাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি মজা হয়। তারপর ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফিরোজ যখন "টিকাতলীর মোড়ে একটা হল রয়েছে" নামক গানের সুরে বন্ধু ও সিনিয়রদের গোপন ও মজার তথ্য ফাঁস করছিল তখন শিক্ষার্থীদের মুখে সে কি হাসি। বন্ধুদের কাছে ‘বিজ্ঞানী হংকং’ নামে খ্যাত মনিরের একসাথে একাধিক প্রেমের রহস্য জানতে এই দিনের মতো উপযুক্ত সময় আর কোথায়, তাই তো বন্ধুরা সবাই হামলে পড়ল মনিরের কাছে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধু তালিকায় থাকা মেয়েদের মেসেঞ্জারে একের পর এক নক দিয়েও কোনো সাড়া না পাওয়ার দুঃখ নিয়ে রাইসুলের গাওয়া গানও ব্যাপক সাড়া পায়। ‘এত বিপুল আনন্দের মাঝে কখন যে বাস এসে গন্তব্যস্থানে পৌঁছে গেছে টের ই পেলাম না’ বলছিলেন ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সায়েমা মিম। বলে রাখা ভালো এবারের সফরে গবেষণার পাশাপাশি ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত ছিল। সেই অনুযায়ী দুপুর ১টায় বাস দুটি কুমিল্লার ময়নামতি জাদুঘর এবং শালবন বৌদ্ধবিহারের সামনে ভিড় জমায়। ‘গবেষণার জন্যে এলেও প্রথমে এই দুইটি স্থান ভ্রমণের লোভ সামলাতে পারলাম না। এসব স্থান দেখার জন্য আমরা সবাই উদগ্রীব হয়ে উঠলাম। তাই প্রথমেই আমরা সব শিক্ষার্থীরা ময়নামতি জাদুঘরের প্রাচীন স্থাপনা দেখি’ বলেন তৌসিফ রহমান। ময়নামতি ভ্রমণ শেষে শিক্ষার্থীরা যায় প্রাচীন শহরের অন্যতম সেরা নিদর্শন ময়নামতির শালবন বৌদ্ধবিহারে। সবকিছু প্রদক্ষিণ শেষে দুপুর ২টায় সবাই স্থানীয় বিখ্যাত রেস্টুরেন্ট কাশফুলে দুপুরের খাবার সম্পন্ন করেন। খাবারের পর উঁচ-নিচু পাহাড়ের আলিঙ্গনে অবস্থিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় যায় শিক্ষার্থী। সেখানে অবস্থানরত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী প্রক্টর ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখান এই তরুণ গবেষকদের। পরে সন্ধ্যার সময় কুমিল্লার মনোরম সৌন্দর্য ও পরিপাটি স্থান বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) যায় তারা। সফরের প্রথম দিন এভাবেই কর্মব্যস্ততার মধ্যে কাটে। ভিতরে প্রবেশ করেই বার্ডের মধ্যে পরিকল্পিত স্থাপনা ও রাস্তার দুই ধারে বিস্তৃত বনায়নে চোখ জুড়িয়ে যায়।
আমরা ৬৫ জন শিক্ষার্থী শিক্ষকসহ মোট ৬৮ জন। প্রতি দুজনের জন্য একটি করে রুম বরাদ্দ। তারপর রাত সাড়ে ৮টায় সবাই একসঙ্গে বার্ডের মনোরম ক্যান্টিনে রাতের খাবার সেরে ক্লান্ত দিনের সমাপ্তি ঘটে। প্রথম যেহতু বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনের কারণে গবেষণার কোনো কাজ সম্পন্ন হয়নি তাই পরের দিন সবাই সকালের নাশতা করেই ডাটা কালেকশনের জন্যে বিভিন্ন গন্তব্যে রওনা করেন শিক্ষার্থীরা। তারই ধারাবাহিকতায় সকালের নাশতা করেই বিভাগের ৪৪তম ব্যাচ দুটি ভাগ হয়েই দুটি টপিক নিয়ে চলে যায় বার্ডের আশপাশে এলাকায় এবং ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী কুমিল্লা মেডিকেলে চলে যায়। সেখানে তারা মহিলাদের ওপর নিরাপদ মাতৃত্বের বিষয় নিয়ে ডাটা কালেকশন করবে। ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ ও সেলফ মেডিকেশন নিয়ে ডাটা কালেকশন করে। সেখানকার জনসাধারণের কাছে ওই বিষয় সংশ্লিষ্ট তাদের সমস্যাবলী খুব নিরূপণভাবে পর্যবেক্ষণ করে। ‘আমরা খুবই নিখুঁতভাবে তাদের সব প্রশ্নগুলো মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করি। তারা সেখানে তাদের স্বাস্থ্যগত সেবার মান ও সব সমস্যাদি আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেন। আমরা তাদের স্বাস্থ্যগত সব সমস্যাবলি খুবই নিরূপণভাবে টুকে নেয়ার চেষ্টা করি’ বলেন ইশরাত নিঝুম। এভাবেই সারা দিন গবেষণার ডাটা সংগ্রহের কাজ শেষ হয়। ক্যাম্পাসে ফিরে সেগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষণার বাকি ধাপগুলো সম্পন্ন করা হবে। ‘আমরা আশা করি এখান থেকে আমরা ভালো কিছু গবেষণার ফলাফল পাব যা বাংলাদেশের আগামীর হেলথ পলিসি তৈরিতে বিশেষ অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে’ বলেন বিভাগটির শিক্ষক ও এই সফরের সার্বিক দায়িত্বে থাকা ডা. মোসা. সাবরীনা।

৩৫ বছর পর মাকে ফিরে পেল ২ ভাই

৩৫ বছর আগে সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে দিল্লিতে গিয়েছিলেন চল্লিশোর্ধ্ব এক নারী। কিন্তু পথ হারিয়ে দিল্লির বদলে তিনি চলে যান রাজস্থানে— আজমির শরিফে। দীর্ঘদিনে নন্দকুমার থানার শ্রীধরপুর গ্রামে তার আত্মীয়স্বজনরাও তাকে প্রায় ভুলতে বসেছিলেন। অবশেষে কলকাতার মিশনারিজ অব চ্যারিটির উদ্যোগে নিজের দুই ছেলের কাছে ফিরলেন নিখোঁজ মাজেদা বিবি।
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর, শ্রীধরপুর গ্রামের বাসিন্দা মাজেদার স্বামী শেখ ইয়াকুব পেশায় শ্রমিক ছিলেন। পাড়ার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে দিল্লিতে গিয়ে তিনি কাজ করতেন। দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়িতেই থাকতেন মাজেদা। কিন্তু আর্থিক অনটনে একসময় তিনিও দিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু হাওড়া থেকে ভুল ট্রেনে উঠে তিনি রাজস্থানে পৌঁছান। ভাষাগত সমস্যা ও বিভিন্ন কারণে মাজেদার আর বাড়ি ফেরা হয়নি। আজমির শরিফে তিনি ভিক্ষাবৃত্তি করে দিন কাটাতেন। বছর ছয়েক আগে তাকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেন স্থানীয় মিশনারিজ অব চ্যারিটির সদস্যরা। চিকিৎসায় মাজেদা সুস্থ হলেও নিজের পরিচয় ও ঠিকানা বলতে পারেননি। তবে বাংলা ভাষায় কথা বলায় তাকে কলকাতার মিশনারিজ অব চ্যারিটির আশ্রমে পাঠানো হয়। সম্প্রতি মাজেদা নিজের পরিচয় জানান। এর পরই মিশনারিজ অব চ্যারিটির পক্ষ থেকে নন্দকুমার থানার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সোমবার বিকালে মাজেদাকে নিয়ে নন্দকুমার থানায় যান তারা। পুলিশের সহায়তায় দুই ছেলের হাতে তুলে দেয়া হয় ওই বৃদ্ধাকে। মাকে ফিরে পেয়ে অনেক খুশি দুই ছেলে শেখ মুস্তাফা ও শেখ মুরতাজা।

প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ওজন কমান

বাড়তি ওজন স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ওজন কমানোর কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম আছে।
* তাজা ফলমূল ও সবুজ শাকসবজি হল কম ক্যালরিযুক্ত খাদ্য, তাই যাদের ওজন বেশি তাদের বেশি করে এগুলো খাওয়া উচিত।
* অতিরিক্ত লবণ খাওয়া পরিহার করতে হবে। কারণ, লবণ শরীরের ওজন বাড়াতে সাহায্য করে।
* দুধযুক্ত খাবার, যেমন- পনির, মাখন পরিহার করতে হবে। এগুলো উচ্চ চর্বিযুক্ত। মাংস ও আমিষ জাতীয় খাবারও নির্দিষ্ট পরিমাণে খেতে হবে।
* উচ্চ শর্করাসমৃদ্ধ খাদ্য, যেমন- চাল, আলু নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় খেতে হবে, গম (আটা) খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
* অতিরিক্ত স্বাদযুক্ত সবজি ও করলা কার্যকর।
* মসলা জাতীয় খাবার, যেমন- আদা, দারচিনি, কালো মরিচ এগুলো প্রতিদিনের খাবারে রাখতে হবে। মসলা জাতীয় খাবার হল ওজন কমানোর কার্যকর ঘরোয়া পদ্ধতি।
* ঘরোয়া পদ্ধতিতে ওজন কমানোর আরেকটি ভালো উপায় হল মধু খাওয়া। মধু দেহের অতিরিক্ত জমানো চর্বিকে রক্ত চলাচলে পাঠিয়ে শক্তি উৎপাদন করে, যা ব্যবহৃত হয় দেহের স্বাভাবিক কার্যকলাপে। মধু খাওয়া প্রথমে শুরু করতে পারেন অল্প পরিমাণে, যেমন- এক চামচ বা ১০০ গ্রাম, যা হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে এর সঙ্গে এক চামচ লেবুর রস দিয়ে খেতে পারেন।
* যারা পথ্য নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মেনে চলেন বা দিনের পর দিন উপবাস করেন ওজন কমানোর জন্য, তাদের জন্য মধু ও লেবুর রস উপকারি। এ ধরনের চিকিৎসায় এক চামচ টাটকা মধুর সঙ্গে আধা চামচ কাঁচা লেবুর রস আধা গ্লাস হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে প্রতিদিন কয়েকবার খেতে হবে।
লেখক : হারবাল গবেষক ও চিকিৎসক, মডার্ন হারবাল গ্রুপ

ইসবগুলের ভুসি কেন খাবেন by শহীদ মনসুর আলী

ইসবগুলের অনেক উপকারিতা রয়েছে।
কোষ্ঠকঠিন্যতায় : এ সমস্যা হলে ৫-১০ গ্রাম ইসবগুল নিয়ে ১ কাপ ঠাণ্ডা বা গরম পানিতে আধাঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে তাতে ২-৩ চামচ চিনি মিশিয়ে সকালে খালি পেটে খেলে বা রাতে শোয়ার আগে খেলে উপকার পাওয়া যায়। এতে রয়েছে প্রাকৃতিক উপাদান যা আমাদের পেটের পীড়া, কোষ্ঠকঠিন্যতায় উপকারী। যারা দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকঠিন্যতায় ভুগছেন তারা ২ মাস নিয়মিত খেলে কোষ্ঠকঠিন্য দূর হবে। পেট স্বাভাবিক হলে সপ্তাহে ১-২ দিনের বেশি না খাওয়াই ভালো। বেশি মাত্রায় খেলে ডায়রিয়ার সমস্যা হতে পারে। পেট পরিষ্কারে ওষুধের চেয়ে ইসবগুল অনেকগুণে উপকারী। সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে অর্শ্বরোগের সৃষ্টি হয়। অর্শ্বরোগ অনেক সময় ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধিতেও রূপান্তরিত হতে পারে। এসব সমস্যার শুরু থেকে সমাধান করতে ইসবগুলের ভুসি উপকারী। ওষুধ পেটকে কেমিক্যালাইস করে; ইসবগুলের ভুসি প্রাকৃতিকভাবে আমাদের সুস্থ রাখে। প্রতি রাতে ভুসি খেয়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস করলে আমাশয় থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। ইসবগুল আমাশয়ের জীবাণু ধ্বংস করতে পারে না, তবে বের করে দিতে পারবে। তাই আমাশয়ের রোগীরা সকালে ও রাতে একগ্লাস ইসবগুলের শরবত খেলে উপকার পাবে। ওষুধ খেয়ে আমাশায় ঠিক করলে জীবাণুগুলো পেটের ভেতরে মরে গেলেও শরীর থেকে বের হয় না; যার কারণে আবারও আমাশায় রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে। যাদের ইউরিনে জ্বালাপোড়া আছে তারা সকালে-বিকালে শরবতের সঙ্গে ইসবগুলের ভুসি খেলে প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া কমবে এবং ইউরিনের রং স্বাভাবিক হয়ে যাবে। হাতে, পায়ে জ্বালাপোড়া ও মাথা ঘোরানো রোগে আখের গুড়ের সঙ্গে ইসবগুলের ভুসি মিলিয়ে সকাল-বিকাল এক সপ্তাহ খেলে অনেক উপকার পাওয়া যাবে।
লেখক : শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, উত্তরা, ঢাকা

শিশুর অ্যাজমা চিকিৎসা নিয়ে বিভ্রান্ত

অধিকাংশ অভিভাবকের ধারণা বড় হলে বাচ্চার অ্যাজমা এমনিতেই সেরে যাবে।
বাস্তবতা- ছোট থেকেই অ্যাজমার চিকিৎসা না aহলে বড় হলে বা সাঁতার শেখালে শিশুর অ্যাজমা সেরে যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে না থাকলে অ্যাজমা ক্রনিক হয়ে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য লক্ষণ দেখে বুঝতে পারেন শিশুর অ্যাজমা সেরে যাবে কিনা। ইনহেলার একবার শুরু করলে সারাজীবন ব্যবহার করতে হতো। বাস্তবতা- চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দিলেও অনেক অভিভাবক শিশুকে ইনহেলার দিতে চান না। তারা মনে করেন এটা শেষ চিকিৎসা এবং একবার ব্যবহার শুরু করলে সারাজীবন করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে ইনহেলার অ্যাজমা সবচেয়ে কার্যকরী চিকিৎসা, এটি সরাসরি শ্বাসতন্ত্রে কাজ করে ফলে অন্যান্য ওষুধ কম লাগে ও অল্প সময়েই কাজ হয় সর্বোপরি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম। শিশুদের স্পেসারের মাধ্যমে ইনহেলার নিতে হয়।
অ্যালার্জি থেকে কি অ্যাজমা হয়?
বাস্তবতা- অ্যাজমা অ্যালার্জিজনিত রোগ। অ্যালার্জি দ্রব্যাদি পরিহার করে চলতে পারলে সুফল পাওয়া যায়। পুরনো ধুলোবালি ও ঘরের লেপ-তোষকের মাইট অ্যালার্জি ছড়ায়।
অ্যালার্জি ভ্যাকসিন কি কার্যকরী?
বাস্তবতা- বিশ্বের অধিকাংশ দেশে অ্যালার্জি ভ্যাকসিন বা ডিসেনসিটাইজেশনের মাধ্যমে অ্যাজমার চিকিৎসা দিয়ে সুফল পাওয়া যাচ্ছে।
অ্যাজমা ও অ্যালার্জি রোগ বিশেষজ্ঞ
দি অ্যালার্জি ও অ্যাজমা সেন্টার, পান্থপথ, ঢাকা।
মোবাইল ফোন : ০১৭২১৮৬৮৬০৬

ভারতে সেনাদের পেছনে টাকার শ্রাদ্ধ কেন?

দোকলাম সীমান্ত ও মালদ্বীপের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্য চাপান-উতোর যেন নিয়মিত ব্যাপার। বাংলাদেশে শেয়ারবাজারে কে বিনিয়োগ করবে, তা নিয়ে নানা আলোচনার পর ভারত নয়, সুযোগ পেল চীন। এমন অনেক কিছু নিয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশ দুটি। এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে দুই দেশের চেষ্টাও নিরন্তর। এ জন্যই বোধ হয় সামরিক খাতে দিন দিন বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তির অস্ত্রও তৈরি বাড়িয়েছে দেশ দুটি। তবে সামরিক খাতে ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে অনেক দেশের মতো চীনকে নিশ্চয়ই ব্যাপারটি আমলে নিতে হবে। বিশ্বে নিজ প্রভাব-প্রতিপত্তি জানান দিতে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ছে। পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর বাইরেও অনেক দেশই সামরিক খাতে দিন দিন তাদের খরচ বাড়াচ্ছে। সামরিক শক্তিকে বিশ্বের শক্তির আধার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই সামরিক শক্তি বাড়াতে একে অপরকে পেছনে ফেলতে কয়েকটি দেশ উঠেপড়ে লেগেছে। বছর বছর বাড়ানো হচ্ছে অস্ত্রশস্ত্র কেনাকাটা। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে ভারত ও চীন। ‘দ্য মিলিটারি ব্যালেন্স ২০১৮’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)। এ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ভারতের সামরিক বাজেট যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন দেশটি সামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্য আছে। আর শীর্ষ পাঁচে ভারত ঢুকে পড়ায় প্রথমবারের মতো শীর্ষ পাঁচ থেকে বের হয়ে গেছে যুক্তরাজ্যর মতো দেশ। গত বছরে সামরিক খাতে ভারতের ব্যয় ছিল ৫ হাজার ২৫০ কোটি ডলার। ২০১৬ সালে এ খাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির ব্যয় বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ১১০ কোটি ডলার। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেই নরেন্দ্র মোদি সরকার ৫ হাজার ৫৭ লাখ ডলারের সামরিক অস্ত্র বিদেশ থেকে কেনে। এ বছরের ফ্রান্সের রাফায়েল যুদ্ধবিমান কিনতে ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরোয় একটি চুক্তি করে ভারত। ভারতীয় মুদ্রায় যা ৫৮ হাজার কোটি রুপির মতো। মোদির সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারত তাদের প্রবৃদ্ধির ১ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় করছে সামরিক খাতে। দেশীয় সামরিক সরঞ্জাম তৈরিও বৃদ্ধি করেছে। সিএনএনের খবরে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের সামরিক খাতে ব্যয় ২০১৬ সালে ছিল ৫ হাজার ২৫০ কোটি ডলার। আর গত বছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭০ কোটি ডলারে। এ ব্যাপারে আইআইএসএসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো রাহুল রায় চৌধুরী পিটিআইকে বলেন, ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সামরিক ভারসাম্য পর্যালোচনার পর দেখা যাবে, গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো যুক্তরাজ্যর চেয়ে ভারত তার আঞ্চলিক সম্পদ বিকাশে অধিকতর সামর্থ্য রাখে। আইআইএসএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত তার সামরিক সক্ষমতা দিন দিন আধুনিকায়ন করছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিরক্ষা বাজেটের দেশ চীন ভারতের চেয়ে তিন গুণ বেশি সামরিক খাতে ব্যয় করছে, এর পরিমাণ হচ্ছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার। সামরিক খাতে ব্যয়ের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই চীন, সৌদি আরব, রাশিয়া ও ভারত। বর্তমান সময়ে নানা সংস্কারমূলক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে যাওয়া তৃতীয় স্থানে থাকা সৌদি আরবের সামরিক খাতে ব্যয় যে চোখ কপালে ওঠার মতোই।
৭ হাজার ৬৭০ কোটি ডলার এ খাতে ব্যয় করে সালমানের সৌদি আরব। চীন ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে ২৫ শতাংশ, যেখানে ভারত বাড়িয়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। রাহুল রায় চৌধুরী বলছিলেন, ‘দোকলাম ঘটনার পরে চীন ও ভারতের মধ্যকার সামরিক ভারসাম্যর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে গেছে চীন। ২০০০ সালের পর থেকে দেশটি অধিক সাবমেরিন, রণতরি, রণতরি বিধ্বংসী জাহাজ, মাঝারি আকারের যুদ্ধজাহাজ তাদের প্রতিরক্ষা খাতে যুক্ত করেছে। চীনের সামরিক খাতে এ সংযোজন যৌথভাবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের চেয়ে বেশি। পাশাপাশি চীন এ অঞ্চলে মার্কিন প্রতিরক্ষা খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীনের সেনাবাহিনীতে ভারতের চেয়ে ছয় লাখ বেশি সক্রিয় সামরিক সদস্য রয়েছে। যেখানে চীনের ১ হাজার ২০০ কৌশলগত বিমান আছে, সেখানে ভারতের আছে ৭৮৫টি। ক্রুজ, ধ্বংসাত্মক ক্রুজ-ফ্রিগেটও ভারতের চেয়ে ৫৫টি বেশি আছে চীনের। প্রতিবেদনে ভারত সরকারের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতির প্রতি দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। এই নীতির লক্ষ্য হচ্ছে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে পুনঃপ্রতিষ্ঠার (এফডিআই) পাশাপাশি প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করা এবং ভারত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযানের শীর্ষস্থানের দেশের মর্যাদা ধরে রাখা। রাহুল রায় চৌধুরী বলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র না পাওয়ার সীমাবদ্ধতা কিন্তু আছে। এ ছাড়া গোলাবারুদ এবং খুচরা যন্ত্রাংশের ঘাটতিও বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ক্রমবর্ধমান হারে ভারতের সামরিক সক্ষমতা বাড়ছে। সর্বোপরি এ প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য দেখা যাচ্ছে যে সামরিক খাতে চীন ও রাশিয়ার প্রত্যকের বাজেট ৬ হাজার ১২০ কোটি ডলার। দেশ দুটি সামরিক ব্যয়ে শীর্ষে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর চেষ্টা করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশ বছরে ৬০ হাজার ২৮০ কোটি ডলার খরচ করে সামরিক খাতে। তবে এ কথা সত্য যে মিত্র দেশগুলো এত দিন ধরে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এসেছে, দিন দিন চ্যালেঞ্জ বেড়ে যাওয়ায় তা ভবিষ্যতে ধরে রাখা কঠিন হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য।

টয়লেট পেপার নিয়ে হুলুস্থুল

তাইওয়ানে টয়লেট পেপার নিয়ে হুলুস্থুল বেধে গেছে। শিগগির দাম বাড়ছে—এমন কথা ছড়িয়ে পড়ার পর লোকজন ধুমছে টয়লেট পেপার কিনছে। দোকানদারেরা সামাজিক মাধ্যমে টয়লেট পেপারের ফাঁকা তাকের ছবি পোস্ট করছেন। ছবির মর্মার্থ—ওই সব তাকে টয়লেট পেপার সাজানো ছিল। কিন্তু এখন তা ফাঁকা।
তাইওয়ানের উৎপাদনকারীরা খুচরা বিক্রেতাদের সতর্ক করেছে যে আগামী মাসে টয়লেট পেপারের দাম ১০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। এরপরই টয়লেট পেপার নিয়ে হুলুস্থুল শুরু। কিছু দোকানদার জানিয়েছেন, তাঁরা ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ টয়লেট পেপার কিনে রেখেছেন। তাঁদের আশঙ্কা—চাহিদার কারণে বাজারে টয়লেট পেপার ফুরিয়ে যেতে পারে। তাইওয়ানের অর্থবিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, টয়লেট পেপারের দাম দিন দিন বাড়ছে। কারণ, টয়লেট পেপারের কাঁচামালের দাম বৈশ্বিকভাবেই ঊর্ধ্বমুখী। ব্যবসায়ীরা বলছেন, টয়লেট পেপারের দাম বেড়ে যাওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তার মধ্যে কানাডায় দাবানল এবং ব্রাজিলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া দাম বাড়ার অন্যতম কারণ। তাইওয়ানের অন্যতম বৃহত্তম টয়লেট পেপার সরবরাহকারী ওয়াইএফওয়াইয়ের ভাষ্য, পরিস্থিতি বাজে। মণ্ডের দাম হু হু করে বাড়ছে। প্যাকিং ও পরিবহন খরচও বাড়ছে। অনেক দোকানদার জানিয়েছেন, চাহিদার কারণে গত রোববারই তাঁদের দোকানের টয়লেট পেপারের তাক ফাঁকা হয়ে গেছে।
তাইওয়ানের বৃহত্তম হোম শপিং চ্যানেল ইটি মল জানিয়েছে, তাদের বিক্রি হওয়া শীর্ষ ২০টি আইটেমের মধ্যে ৬টিই টয়লেট পেপার। সাধারণ সময়ের চেয়ে টয়লেট পেপারের চাহিদা ১০ গুণ বেশি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দোকানদারদের আতঙ্কিত না হতে বলা হয়েছে। টয়লেট পেপার নিয়ে সৃষ্ট অস্থিরতার বিষয়ে অবগত আছে তাইওয়ানের সরকার। তারা এ ব্যাপারে তৎপর হয়েছে। দাম বাড়ার বিষয়ে সরকার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। তাইওয়ানের ভোক্তা সুরক্ষা বিভাগ বলেছে, মধ্য মার্চ নাগাদ টয়লেট পেপারের দাম বাড়বে না বলে তারা চারটি বড় খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে নিশ্চয়তা পেয়েছে। এর আগে দাম বাড়লে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘ব্যানানা’ সুপারহিরো!

নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে ১৭ ফেব্রুয়ারি দেখা মিলল একজন সুপারহিরোর! হাতে হলুদ পাকা একটি ব্যানানা (কলা)। খয়েরি প্রিন্টের হাফ প্যান্ট, হাঁটু পর্যন্ত মোজা জড়ানো জুতো, ম্যাগি হাতা কালো টি-শার্ট, ম্যাচিং করে মুখে মাস্কের মতন একটা কাপড়; আর পেছনে সুপারম্যানের মতো গলায় বাঁধা উড়ন্ত উত্তরীয়!
ফ্রাঙ্কলিন অ্যাভিনিউয়ের লোকজন সকাল ৯টার দিকে আবিষ্কার করল, এক বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে আরেক বিল্ডিংয়ের ছাদে লাফিয়ে চলছে রীতিমতো এই ‘ব্যানানা’ সুপারম্যান! লোকজন পুলিশে খবর দিলে পুলিশ এই লাফানো সুপারহিরোকে (!) অবশেষে থামাল এক বিল্ডিংয়ের ছাদের কার্নিশে। আগুন লাগলে বেরোনোর জরুরি সিঁড়ির ওপরে হাতে ব্যানানা নিয়ে উদ্‌যাপনের ভঙ্গিতে লোকের মুঠোফোনে ছবিতে ‘ব্যানানা সুপারহিরো’ পোজ দিয়ে গেলেন। নিউইয়র্ক পুলিশ (এনওয়াইপিডি) ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পরও সুপারহিরোকে নামাতে একেবারে গলদঘর্ম যাকে বলে! ধরার চেষ্টা করলে বিল্ডিং থেকে লাফিয়ে আত্মাহুতি (!) দেবেন বলে হুমকি দিচ্ছিলেন ব্যানানা সুপারহিরো। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, ‘আত্মাহুতি’। প্রায় এক ঘণ্টা বচসার পর নিউইয়র্ক পুলিশের সদস্যরা এই সাক্ষাৎ ‘ক্যালাস’কে নামাতে সমর্থ হলে ততক্ষণে সবাই বুঝে ফেলেছে, আসলে এই ব্যানানা সুপারহিরো রূপী যুবকটির কর্মকাণ্ড ‘মাথায় ছিট ওঠা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। অগত্যা নিউইয়র্ক পুলিশ যুবকটিকে নিকটস্থ উডহাল হাসপাতালে ভর্তি করে। মাথায় সুপারহিরো হওয়ার ভূত চাপা এই যুবকের নাম আপাতত জানা যায়নি। এত সব কাণ্ড করে ‘ব্যানানা সুপারহিরো’ অবশেষে কোনো শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই এখন চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।

মিশেল ওবামার আত্মজীবনী আসছে ১৩ নভেম্বর

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা আত্মজীবনীমূলক বই ‘বিকামিং’ ১৩ নভেম্বর প্রকাশ করা হবে। গতকাল রোববার বইটির প্রকাশক আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দিয়েছেন। সিএনএনের খবরে জানানো হয়, এটি মিশেলের দ্বিতীয় বই। এর আগে ২০১২ সালে তাঁর প্রথম বই ‘আমেরিকান গ্রোন’ প্রকাশিত হয়। এতে হোয়াইট হাউসে তাঁর করা সবজির বাগান সম্পর্ক লিখেছেন এবং স্বাস্থ্যকর জীবন সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে উৎসাহ জোগাতে প্রচার চালান। প্রকাশনী সংস্থা পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বইটি বিভিন্ন দেশে প্রচারে অংশ নেবেন। বইটি ২৪টি ভাষায় প্রকাশিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বইটির মূল্য রাখা হবে সাড়ে ৩২ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ হাজার ৭০০ টাকা)। বিবৃতিতে বলা হয়, বইটির মাধ্যমে পাঠককে তাঁর ভুবনে স্বাগত জানানো হয়েছে।
জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, যা তাঁকে পূর্ণতা দিয়েছে, এর বিবরণ আছে বইয়ে। শৈশব থেকে শিকাগোর সাউথ সাইডে তাঁর কর্মজীবন, মাতৃত্ব ও পেশার মধ্যে ভারসাম্য রাখা, বিশ্বের বিখ্যাত সব স্থানে তাঁর সময় কাটানোর বিষয়গুলো বইয়ে উঠে এসেছে। গতকাল এক টুইটে মিশেল ওবামা বইটি লেখা নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘গভীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে বইটি লেখা হচ্ছে। আমি আমার শিকড়ের কথা বলেছি এবং একটি মেয়ে কীভাবে সাউথ সাইড থেকে আত্মপ্রকাশ করেছে, তা জানিয়েছি। আমি প্রত্যাশা করি, আমার ওই যাত্রা পাঠককে নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে আত্মবিশ্বাসী হতে উৎসাহিত করবে।’ বইটি প্রকাশের সময় বারাক ওবামা বইটির ১০ লাখ কপি ওবামার পরিবারের নামে তৈরি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে দান করার পরিকল্পনা করেছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক ওই প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার শিশুদের জন্য শিক্ষায় সমসুযোগ নিশ্চিত করতে নতুন বই, শিক্ষা উপকরণ ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সরবরাহ করে থাকে। একই প্রকাশনা থেকে বারাক ওবামাও একটি আত্মজীবনীমূলক বই লিখছেন। এ বছরেই বইটি প্রকাশ হওয়ার কথা।

মাত্র তিনজন এই ভাষায় কথা বলেন!

একবার ভাবুন তো, আপনি একটি ভাষার কয়েকটি শব্দ শিখে নিচ্ছেন, যে ভাষায় সারা দুনিয়ায় মাত্র তিনজন বলে থাকেন! ‘বাদেশি’ নামের এই ভাষা একসময় ব্যাপক চর্চা হতো। এখন তা বিলুপ্ত হওয়ার পথে। কারণ, মাত্র তিনজন ব্যক্তি এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। আজ সোমবার বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের বরফাচ্ছাদিত দুর্গম পার্বত্য এলাকায় বাদেশি ভাষায় একসময় কথা বলার প্রচুর লোক ছিল। তবে বিশিগ্রাম ভ্যালিতে তিনজন বয়স্ক ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া গেছে, যাঁরা এই ভাষায় কথা বলেন। ওই তিনজনের ধারণা, তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই ভাষার বিলুপ্তি ঘটবে। তাঁরা তিনজন হলেন রহিম গুল, সাইদ গুল ও আলী শের। ওই তিনজনের একজন রহিম গুলের বয়স কত, তা তিনি জানেন না। তাঁকে দেখতে ৭০ বছর বয়সী মনে হয়। রহিম গুল বলেন, এর আগের প্রজন্মে গ্রামে বাদেশি ভাষায় কথা বলত নয়-দশটি পরিবার। এসব পরিবারের পুরুষেরা অন্য গ্রামের ভিন্ন ভাষার নারীদের বিয়ে করে আনার পর এই ভাষার ব্যবহার ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ওই নারীদের বেশির ভাগের ভাষা ছিল তরওয়ালি। দেখা যেত, মায়ের ভাষায় কথা বলা শুরু করে তাঁর ছেলেমেয়েরা। এভাবে আস্তে আস্তে বাদেশি ভাষায় কথা বলার লোক কমতে থাকে। জানা গেছে, ওই এলাকায় এখন তরওয়ালি ভাষার দাপট বেশি। রহিম গুলের চাচাতো ভাই সাইদ গুল (৫০) বলেন, ‘আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন তরওয়ালি ভাষায় কথা বলে।’ ওই এলাকায় চাকরির কোনো সুযোগ নেই।
এই তিনজন তাই পর্যটন এলাকা স্বাত জেলায় সময় কাটান। সেখান থেকে তাঁরা পশতু ভাষা রপ্ত করেছেন। সেই ভাষাতেই অন্যদের সঙ্গে কথা বলেন। রহিম গুল ও সাইদ গুল নিজেদের মধ্যে বাদেশি ভাষায় কথা বলতে গিয়ে এখন হরহামেশাই দু-একটি শব্দ ভুলে যান। বাদেশি ভাষায় কথা বলার সুযোগ কমে যাওয়ায় এই তিনজনও এখন ভাষাটি ভুলতে বসেছেন। রহিম গুলের একটি ছেলে আছেন। সেই ছেলের পাঁচ সন্তান রয়েছে। তবে তারা সবাই তরওয়ালি ভাষায় কথা বলে। রহিম গুলের ছেলে বলেন, তাঁর মা তরওয়ালি ভাষায় কথা বলতেন। বাসায় বাবা-মা কখনো বাদেশি ভাষায় কথা বলেননি। তাই ছোটবেলায় বাদেশি ভাষা শেখার কোনো সুযোগ পাননি তিনি। বাদেশি ভাষায় কয়েকটি শব্দ শুধু জানেন, ভাষাটি জানেন না। তাঁর সন্তানেরাও তরওয়ালি ভাষায় কথা বলে। দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৩২ বছর। এখন আর বাদেশি ভাষা শেখার কোনো সুযোগ নেই। ভাবতেই খারাপ লাগে, বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই ভাষাটিও শেষ হয়ে যাবে।’ পাকিস্তানের বিপন্ন কিছু ভাষা সংরক্ষণের জন্য কাজ করছেন সাগর জামান নামের একজন ভাষা বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘আমি তিনবার ওই এলাকায় গেছি। সেখানের বাসিন্দারা আমার সামনে বাদেশি ভাষায় কথা বলতে আড়ষ্ট হয়ে যায়। তা ছাড়া সেখানে তরওয়ালি ও পশতু ভাষায় কথা বলা ব্যক্তিরা বাদেশি ভাষার লোকজনকে অবজ্ঞার চোখে দেখে। এ কারণে বাদেশি ভাষাভাষীর লোকজন এই ভাষায় কথা বলতে লজ্জাবোধ করেন।’

করবিনের বক্তব্যে আরও চাপে থেরেসা

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ (ব্রেক্সিট নামে পরিচিত) কার্যকর করা নিয়ে এমনিতে নানামুখী চাপে আছেন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। সোমবার বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরিমি করবিন ঘোষিত বিকল্প ব্রেক্সিট পরিকল্পনা সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিল। করবিন বলেন, ‘কাস্টমস ইউনিয়ন’-এর সুবিধা বজায় রেখেই ব্রেক্সিট কার্যকর করতে হবে। এ জন্য ইইউ-যুক্তরাজ্যের নতুন একটি ‘কাস্টমস ইউনিয়ন’ চায় লেবার পার্টি। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে আগেই ঘোষণা দিয়েছেন যে যুক্তরাজ্য কাস্টমস ইউনিয়ন ত্যাগ করবে। সরকার ও বিরোধী দলের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে জটিল হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। মূলত সংসদে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় করবিনের ভাষণ এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কাস্টমস ইউনিয়ন প্রশ্নে সরকারের অবস্থান নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ব্রেক্সিট-বিরোধী এমপিদের অসন্তোষ আছে। এসব বিরোধীরা লেবার পার্টির অবস্থানকে সমর্থন দিলে থেরেসার জন্য ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ, ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের বিষয়টি কেবল যুক্তরাজ্য সরকার ও ইইউর মধ্যে সমঝোতার বিষয় নয়।
এ ক্ষেত্রে পার্লামেন্টের ভূমিকা অনেক। পার্লামেন্টে পাস হলেই কেবল ব্রেক্সিট চুক্তি কার্যকর হবে। কাস্টমস ইউনিয়নের মাধ্যমে জোটভুক্ত দেশগুলো নিজেদের মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য করে। এ ছাড়া জোটবহির্ভূত দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একই শুল্কনীতি মেনে চলে। যুক্তরাজ্যের অংশ নর্দান আয়ারল্যান্ড এবং ইইউর সদস্য স্বাধীন আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার বিদ্যমান শান্তিচুক্তি টিকিয়ে রাখতে কাস্টমস ইউনিয়নে সদস্যপদ ধরে রাখা যুক্তরাজ্যের জন্য জরুরি। ব্রেক্সিট বিষয়ে করবিন এতটা খোলাসা করে আগে কথা বলেননি। এখন হঠাৎ ব্রেক্সিট বিষয়ে আলাদা করে করবিনের ভাষণ নানা কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। ক্ষমতাসীনদের আরও বিভক্ত ও দুর্বল করতে করবিন এই কৌশল নিয়েছেন বলে কারও কারও ধারণা। ইইউ অভিবাসন, সিঙ্গেল মার্কেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে কিছুই বলেননি করবিন। নতুন কাস্টমস ইউনিয়ন কতটা বাস্তবসম্মত, সেটিরও ব্যাখ্যা নেই তাঁর ভাষণে। তাই রাজনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, ব্রেক্সিট বিষয়ে লেবার পার্টির অবস্থান নিয়ে আরও অনেক কিছু জানার রয়ে গেছে। কাস্টমস ইউনিয়ন প্রশ্নে করবিনের অবস্থানকে ‘অবাস্তব’ আখ্যা দিয়েছেন ব্রেক্সিট-বিষয়ক মন্ত্রী ডেভিড ডেভিস। এটিকে সাপের তেল বিক্রির সঙ্গে তুলনা করেন তিনি।

‘ঘরে বসে রাজনীতি হয় না, তা কাদেরকে কীভাবে শেখাবো’

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে রাজনীতি শেখাতে না পারার ব্যর্থতার দায় নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমেদ। তিনি  বলেছেন, ঘরের মধ্যে থেকে বা অফিসে বসে রাজনীতি হয় না তা তাঁকে (ওবায়দুল কাদের) কীভাবে শেখাব। তাঁকে শেখাতে না পারার ব্যর্থতা আমারই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন- বিএনপিকে ঘরের মধ্যে রাজনীতি করতে। সে হয়তো জানে না রাজনীতি সব জায়গাতে হয়। সে আমার ছাত্র ছিল।
আমি হয়তো তাকে শিখাতে পারিনি। তাই এ মুহূর্তে তার কথা শুনে থাকাই ভালো। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যতই বলুক কাউকে ভোটে আনার দায়িত্ব সরকারের নয়। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরপেক্ষতা ও সবার অংশগ্রহণের পরিবেশ প্রধানমন্ত্রীকেই তৈরি করতে হবে। আর এটা না করে নির্বাচন ব্যবস্থায় যাওয়া যাবে না। বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ঢাবির সাবেক এ ভিসি বলেন, এখন আর কারো জেলে যাওয়ার দরকার নেই। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। কোনো সংঘাতে জড়ানো যাবে না। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে স্বাধীনতা অধিকার আন্দোলন আয়োজিত ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংকটে আগামী জাতীয় নির্বাচন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, আওয়ামী লীগ খালেদা জিয়াকে কারাগারে বন্দি  রেখে সুপরিকল্পিতভাবে ও কৌশলে এগুচ্ছে। তা বিএনপি না বুঝলেও আমরা বুঝি। শুধু তাই নয়, সরকারের মন্ত্রী এমপিদের কথাবার্তা শুনেও স্পষ্ট বুঝতে পারছি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সহজে মুক্তি দেয়া হবে না। খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানের জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ  অন্যায়ভাবে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এলডিপি সভাপতি বলেন, এক এগারোর সেনা সমর্থিত সরকারের সময় অনেক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে এ মামলা হয়েছে। বর্তমান সরকারের অনেক নেতার বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় তাদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলাগুলো চালু রেখে হয়রানি করা হচ্ছে, সাজা দেয়া হচ্ছে। সাবেক এ মন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়েও বর্তমান সরকারে অনেক মন্ত্রী এমপি স্বপদে বহাল আছেন। তাদের কারাগারে যেতে হয়নি। কিন্তু খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে নির্জন কারাগারে পাঠানো হয়েছে। খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করতে হলে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করতে হবে। এলডিপি সভাপতি বলেন, আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বিএনপি ও ২০ দল নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা? কারণ এখন ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে আন্দোলন সফল হবে না। বর্তমান সরকার সহজে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেবে না। খালেদা জিয়ার নির্জন কারাগারে থেকে হয়তো  মৃত্যুও হতে পারে। সেই বিষয়গুলো চিন্তা করে বিএনপিকে পরিকল্পিতভাবে সামনের দিকে এগুতে হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ কখনও স্বাভাবিক পন্থায় ক্ষমতায় আসেনি। তারা কখনও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আবার কখনও লগি বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে ক্ষমতায় এসেছে। তাদের তখন দমন করা কঠিন ছিল না। বিএনপি নেতাদের উদ্দেশ্যে এলডিপি প্রধান বলেন, আওয়ামী লীগ যেভাবে অবরোধ হরতাল করে ক্ষমতায় এসেছে আমরা সেভাবে রাজনীতি করতে চাই না। আমা?দের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় করতে হবে। কোনো সংঘাতে জড়িয়ে আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে চাই না। বিএনপি চেয়ারপারসনের কারামুক্তির বিষয়ে অলি আহমদ বলেন, সরকারের আচরণ দেখে মনে হয় না খালেদা জিয়াকে সহজে মুক্তি দেবে। কিন্তু বিএনপির কিছু কিছু নেতা বলেন আজ, কাল খালেদা জিয়ার জামিন হয়ে যাবে। কিন্তু তারা কিসের ভিত্তিতে বলেন সেটা তারাই ভালো জানেন। যেখা?নে সরকার এই-সেই ক?রে জনগণ?কে বু?ঝি?য়ে দি?চ্ছে। তাই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা আমাদের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
সংগঠনের সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান মনির সভাপতিত্বে গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম ও এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক শাহাদাত হোসেন সেলিম প্রমুখ।