Saturday, October 4, 2025

ইসরায়েলের প্রতি মার্কিনদের সমর্থন নাটকীয়ভাবে কমছে: টাইমস/সিয়েনা জরিপ

নিউইয়র্ক টাইমসঃ গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার প্রায় দুই বছর পর ইহুদি রাষ্ট্রটির প্রতি মার্কিনদের সমর্থনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা ইউনিভার্সিটির নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক ভোটার এই সংঘাত মোকাবিলায় ইসরায়েলি সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র নেতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছেন।

গাজায় হামলার প্রতি এই অসন্তোষের কারণেই সম্ভবত মার্কিন ভোটাররা এই অঞ্চলের কয়েক দশকের পুরোনো সংঘাতের বিষয়ে তাঁদের সহানুভূতি পুনর্মূল্যায়ন করছেন। টাইমস ১৯৯৮ সাল থেকে ভোটারদের সহানুভূতি নিয়ে প্রশ্ন শুরু করার পর এই প্রথম ইসরায়েলিদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কিছুটা বেশি ভোটার সমর্থন জানিয়েছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর মার্কিন ভোটারদের বেশির ভাগই ফিলিস্তিনিদের চেয়ে ইসরায়েলিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। সে সময় ৪৭ শতাংশ ইসরায়েলকে এবং ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।

নতুন জরিপে ৩৪ শতাংশ ইসরায়েলিদের পক্ষে এবং ৩৫ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের পক্ষে মত দিয়েছেন। ৩১ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা সংশয়ে আছেন অথবা দুই পক্ষকেই সমানভাবে সমর্থন করেন।

অধিকাংশ মার্কিন ভোটার এখন ইসরায়েলকে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা পাঠানোর বিরোধিতা করছেন। ৭ অক্টোবরের হামলার পর জনমতে এটি একধরনের বড় পরিবর্তন। প্রতি ১০ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬ জন বলেছেন, বাকি ইসরায়েলি জিম্মিরা মুক্তি পাক বা না পাক বা হামাস নির্মূল হোক বা না হোক, তবু ইসরায়েলের উচিত সামরিক অভিযান বন্ধ করা।

৪০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ইসরায়েল গাজায় ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা চালাচ্ছে। এই সংখ্যা ২০২৩ সালের জরিপের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

সব মিলিয়ে টাইমস/সিয়েনা জরিপের এই ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের একনিষ্ঠ মিত্রের প্রতি মার্কিনদের সমর্থনে বড় ধরনের অবনতির দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কয়েক দশক ধরে দুই দলই সমানভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন করে আসছিল। এই অতি বিভক্ত যুগে জনমতে এত বড় পরিবর্তন অস্বাভাবিক ঘটনা বটে। সাধারণত যুদ্ধ বা বিপর্যয়ের মতো বড় ঘটনা ছাড়া জনমত ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়।

আইডাহো অঙ্গরাজ্যের ব্ল্যাকফুট শহরের ডেমোক্র্যাট সমর্থক অস্টিন মাগলস্টন বলেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

যোগাযোগ খাতে কাজ করা ৩৩ বছর বয়সী মাগলস্টন বলেন, ‘আমি আসলে কয়েক বছর ধরে বেশ ইসরায়েলপন্থী ছিলাম, বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের সেই বিধ্বংসী হামলার রাতের কথা শোনার পর। এমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে কাউকে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু এটি যত দীর্ঘ হচ্ছে এবং ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যা করছে, তা দেখে এটিকে আর কোনোভাবেই সমান ক্ষেত্র বলে মনে হচ্ছে না।’

এই জরিপ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের জন্যও চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সাহায্যের বৃহত্তম প্রাপক, যারা এ পর্যন্ত শত শত বিলিয়ন ডলার সহায়তা পেয়েছে।

দল-মতনির্বিশেষে তরুণ ভোটাররা ইসরায়েলের প্রতি এই সমর্থন অব্যাহত রাখার পক্ষে কম আগ্রহী। ৩০ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৭ জন অতিরিক্ত অর্থনৈতিক বা সামরিক সাহায্যের বিরোধিতা করেছেন।

ইসরায়েলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তনের মূল কারণ হচ্ছে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ভোটারদের সমর্থন ব্যাপক হারে কমে যাওয়া। রিপাবলিকানরা মূলত ইসরায়েলকে সমর্থন করে চলেছে। তবে তাঁদের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন সামান্য কমেছে।

প্রায় দুই বছর আগে ডেমোক্র্যাটরা সমানভাবে বিভক্ত ছিল। তখন ৩৪ শতাংশ ইসরায়েল এবং ৩১ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এখন সারা দেশের সাধারণ ডেমোক্র্যাটরা বিপুলভাবে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে। ৫৪ শতাংশ ডেমোক্র্যাট বলেছেন, তাঁরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল, যেখানে মাত্র ১৩ শতাংশ ইসরায়েলের প্রতি বেশি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।

প্রতি ১০ জন ডেমোক্র্যাটের মধ্যে ৮ জনের বেশি বলেছেন, লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারলেও ইসরায়েলের উচিত গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করা। দুই বছর আগে এই সংখ্যা ছিল প্রতি ১০ জনে ৬ জন। এখন এটিকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি বলা যায়।

কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের হার্টফোর্ডের শহরতলির ৩৯ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাট সমর্থক শ্যানন ক্যারি বলেন, ৭ অক্টোবরের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি সরকারের পদক্ষেপ ‘অযৌক্তিক’ হয়ে উঠেছে। তিনি চান যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করুক।

পেশায় স্বাস্থ্য সহকারী মিসেস ক্যারি বলেন, একজন মা হিসেবে ওই শিশুদের দেখাটা ভয়ংকর। এটা কোনো যুদ্ধ নয়। এটা জাতিগত নিধন।

ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে একটি অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে—শ্বেতাঙ্গ, কলেজ-শিক্ষিত, বয়স্ক ডেমোক্র্যাট। এসব ব্যক্তিই সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোয় দলের মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছেন। তরুণ ডেমোক্র্যাট ও কলেজ ডিগ্রিবিহীন ডেমোক্র্যাটরা প্রায় দুই বছর আগে সংঘাত শুরুর সময় থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

২০২৩ সালে ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ডেমোক্র্যাট ভোটারদের প্রতি ২ জন ইসরায়েলকে সমর্থন করতেন আর একজন ফিলিস্তিনকে। সেই চিত্র উল্টে গেছে। এখন ৪২ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি এবং ১৭ শতাংশ ইসরায়েলের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল।

মধ্য ফ্লোরিডার ৬৭ বছর বয়সী প্যাটি ওয়েস্ট বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলে মার্কিন সম্পৃক্ততার একজন শক্তিশালী সমর্থক ছিলেন। তিনি সহায়তা বন্ধ করার ধারণার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। অবশেষে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, এটি সংঘাত অবসানে সাহায্য করছে না।

ডেমোক্র্যাট সমর্থক ওয়েস্ট বলেন, ‘আমরা কেন এতে অর্থায়ন করে চলেছি? এটা আমার ছোটবেলা থেকে চলছে এবং এখনো চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওরা একে অপরকে সারা জীবন ঘৃণা করে যাবে।’

শ্বেতাঙ্গ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমে যাওয়াটা অ-শ্বেতাঙ্গ ডেমোক্র্যাটদের পরিবর্তনের চেয়েও বেশি স্পষ্ট। সংঘাত শুরুর সময় অ-শ্বেতাঙ্গ ডেমোক্র্যাটরা এমনিতেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাঁর মেয়াদকালে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। এমনকি তিনি ইসরায়েল সরকারের প্রতি কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরও তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত ছিল।

বিপরীতে, রিপাবলিকান ভোটাররা মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সমর্থন করেন। একাধিক পশ্চিমা দেশ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার দিকে এগোলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে খুব কমই পার্থক্য রেখেছেন।

প্রতি ১০ জন রিপাবলিকানের মধ্যে ৭ জন ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। অধিকাংশ রিপাবলিকান বলেছেন, সব জিম্মি মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া উচিত। এমনকি এর জন্য বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হলেও। ৪৭ শতাংশ রিপাবলিকান বলেছেন, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বেসামরিক মৃত্যুরোধে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করছে।

মিনিয়াপোলিসের ৫১ বছর বয়সী রক্ষণশীল ভোটার এডওয়ার্ড জনসন বলেন, ইসরায়েলিরা নিজেদের রক্ষা করতে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে যথেষ্ট সক্ষম। কিন্তু আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, যেন কেউ তাদের ওপর চড়াও না হয়।

তবে রিপাবলিকানদের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমেছে। অবশ্য তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

রিপাবলিকানরা এখনো ফিলিস্তিনিদের চেয়ে ইসরায়েলের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। ৬৪ শতাংশের বিপরীতে ৯ শতাংশ। কিন্তু ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ২০২৩ সালের তুলনায় ১২ শতাংশ কমেছে। ওই সময় ৭৬ শতাংশ ইসরায়েলের পক্ষে ছিলেন।

প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রিপাবলিকান বলেছেন, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বেসামরিক মৃত্যুরোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

সেন্ট লুইসের ২৯ বছর বয়সী ট্রাম্প সমর্থক মেসন নর্থরুপ বলেন, তিনি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে সমর্থন করেন। তবে তিনি চান প্রেসিডেন্ট যেন এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমান।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্পর্কে নর্থরুপ বলেন, ‘তাঁর একটু পিছিয়ে আসা দরকার। কারণ, ইসরায়েলিরা বেশ কঠিন কাজ করতে সক্ষম। আমাদের উচিত তাদের নিজেদের যুদ্ধ লড়তে দেওয়া।’

২০২৫ সালের ২২ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মোট ১ হাজার ৩১৩ জন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে পরিচালিত এই জরিপ চালানো হয়েছে।

ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা আর খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় গাজায় দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখা দিয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, মধ্য গাজা
ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা আর খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় গাজায় দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখা দিয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, মধ্য গাজা। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলের আগ্রাসন কীভাবে মোকাবিলা করবে তুরস্ক by মুরাত ইয়েসিলতাস

বাশার–আল–আসাদের শাসন অবসানের পর তুরস্ক যে কৌশলগত সুবিধা পেয়েছিল, তা তারা সতর্ক পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে কাজে লাগিয়েছে। তুরস্কের এই কৌশলকে কূটনৈতিক আপস হিসেবে বর্ণনা করা যায়।

তুরস্ক তাদের এই নতুন সিরিয়া নীতি ‘আঞ্চলিক মালিকানা’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড় করায়। তুরস্কের সিরিয়া নীতির কেন্দ্রে রয়েছে ইস্যু কুর্দি পিপলস প্রটেকশন ইউনিটস (ওয়াইপিজি)। এরপরও তুরস্ক ওয়াইপিজিকে নিয়ে তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে দামেস্কের সঙ্গে সংগঠনটির সমঝোতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে।

তুরস্কের লক্ষ্য হলো একদিকে সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা, অন্যদিকে ওয়াইপিজির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা ঠেকানো। এই ফাঁকে ওয়াইপিজি দামেস্কের সঙ্গে একটি চুক্তি করার জন্য সময় পায়। এতে তারা আঙ্কারা ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সামরিক চাপ এড়াতে সক্ষম হয়।

সিরিয়ায় ইসরায়েলের আগ্রাসী অবস্থানের ক্ষেত্রেও আঙ্কারা একই ধরনের আপসকামী নীতি নেয়। নতুন দামেস্ক প্রশাসনকে দুর্বল করা ও সিরিয়ার ভেতরে নিজেদের প্রভাববলয় বাড়ানোর ইসরায়েলি উদ্যোগের মুখে তুরস্ক কূটনৈতিক আলোচনা ও গোয়েন্দাপ্রক্রিয়া সক্রিয় করে। সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়ে কৌশলী আলোচনার পথ বেছে নেয়।

এই সময়ে ইসরায়েল সিরিয়ার নতুন সরকারের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে, গোলান মালভূমিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত করে এবং দক্ষিণের দ্রুজ জনগোষ্ঠীকে ‘রক্ষা’র নামে দামেস্কে প্রতীকী বিমান হামলা চালায়।

কিন্তু এখন ইসরায়েল ও ওয়াইপিজির সঙ্গে তুরস্কের আপসের এই কৌশল আর কাজ করছে না।

সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে সরাসরি নিজেদের প্রভাববলয় গড়ে তুলতে চাইছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো তুরস্ককে অঞ্চলটি থেকে বের করে দেওয়া এবং দামেস্ক সরকারকে দুর্বল করে দিয়ে একটি অস্থিতিশীল সিরিয়া তৈরি করা। সুয়েইদাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সিরিয়ার ভেতরে গড়ে তোলা তুরস্কের নিরাপত্তাকাঠামোর প্রতি হুমকি তৈরি করছে।

সিরিয়া এখন তুরস্ক ও ইসরায়েলের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মঞ্চ। এ অবস্থায় ইসরায়েলের আঞ্চলিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আরও সুস্পষ্ট প্রতিরোধমূলক অবস্থান না নিলে তুরস্কেরর পক্ষে পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কঠিন বলে মনে হচ্ছে। ইসরায়েল চায় সিরিয়ার আকাশসীমায় পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে।

অন্যদিকে তুরস্ক এ ব্যাপারে সজাগ যে ইসরায়েলের এই হস্তক্ষেপ ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো দামেস্ক প্রশাসনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। কিন্তু আঙ্কারা ও দামেস্কের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে এবং ‘ঘাঁটিসংক্রান্ত চুক্তি’ হলে সেটিকে ইসরায়েল ‘লাল রেখা’ বলে ঘোষণা করেছে। তবে এই তথাকথিত লাল রেখা প্রকৃতপক্ষে যতটা বাস্তব প্রতিরোধ, তার চেয়ে বেশি কৌশলগত ভাঁওতাবাজি। এর কারণ হলো, ইসরায়েল যদি সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তবে সেটি আঙ্কারাকে সরাসরি যুদ্ধে টেনে নেওয়ার সমান হবে। তুরস্ক যদি দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তেল আবিব বা ওয়াশিংটন—কেউই ঝুঁকি নিতে চাইবে না।

সিরিয়ায় ইসরায়েলের নীতি শুধু দক্ষিণ সিরিয়ায় দ্রুজ সম্প্রদায়কে হাতিয়ার বানিয়ে নতুন প্রভাববলয় তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ওয়াইপিজিও দেশটির এই সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসরায়েল চাইছে ওয়াইপিজি ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে সিরিয়ার মাটিতে তুরস্কের কৌশলগত অবস্থানকে সংকুচিত করে দিতে।

এই কৌশল এখন কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ইসরায়েল ব্যবহার করছে। ওয়াইপিজিকে পরোক্ষ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিয়ে তাদের তুরস্কের ‘লাল রেখা’ অতিক্রমের পথে নিয়ে যেতে চাইছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো ওয়াইপিজি ও দামেস্কের মধ্যে সম্ভাব্য কোনো সমঝোতা ঠেকানো, তুরস্কের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা দুর্বল করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া নীতি তুরস্কবিরোধী অবস্থানের দিকে ঠেলে দেওয়া। অভিযোগ আছে, ওয়াশিংটনে তুরস্কের অবস্থানের প্রতি সহানুভূতিশীল কূটনীতিকদের সরিয়ে দিয়ে ইসরায়েল–ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বসাতে চাপ দিয়েছে তেল আবিব।

অন্যদিকে তুরস্ক ওয়াইপিজি ইস্যুতে স্পষ্ট একটি কৌশলগত সীমারেখার নীতি অনুসরণ করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তুরস্ক ওয়াইপিজিকে নির্দিষ্ট সময় দিয়েছে এবং সে সময়ের মধ্যে সংগঠনটির দামেস্কের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা করছে।

যদি এই প্রত্যাশা পূরণ না হয়, তবে তুরস্ক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে সামরিক বিকল্পটি তারা আরও জোরদারভাবে ব্যবহার করবে। এর অর্থ হচ্ছে, ওয়াইপিজি যাতে শান্তিপূর্ণ পথে নিজেদের রূপান্তর করতে পারে, সেটাতেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে তুরস্ক, কিন্তু প্রয়োজনে ওয়াইপিজিকে সামরিকভাবে দুর্বল করার বিকল্পও ভেবে রেখেছে।

তুরস্কের জন্য ওয়াইপিজি ইস্যুটি এখন শুধুই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুও।

এখন ইসরায়েলের আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য তুরস্কের প্রয়োজন আরও সক্রিয় একটি কৌশল। দামেস্কের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করা, আরব দেশগুলোর সঙ্গে কূটনীতি গভীর করা এবং ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই ওয়াইপিজিকে অন্তর্ভুক্ত বা নিষ্ক্রিয় করা—এই তিনটি কৌশলের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।

* মুরাত ইয়েসিলতাস, তুরস্কের সিএটিএ ফাউন্ডেশনের নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা বিভাগের পরিচালক
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে আবার কেন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল

আল জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে থমথমে পরিস্থিতি। গতকাল বৃহস্পতিবার ওই অঞ্চল টানা চতুর্থ দিনের মতো অচল ছিল। গত কয়েক দিনে সেখানে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তাও আছেন।

কেন্দ্রীয় সরকার একটি আলোচক কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটির সদস্যরা গতকাল পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফফরাবাদ পৌঁছেছেন। কমিটি আলোচনার মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) সঙ্গে বৈঠক করবে। জেএসিসি হলো এমন একটি সংস্থা, যা ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজভিত্তিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছে। এটি পুরো অঞ্চলে সাধারণ মানুষের অসন্তোষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।

অধিকারকর্মী শওকত নওয়াজ মীরের নেতৃত্বে জেএএসি গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে এমন অচলাবস্থা শুরু করেছে। এতে পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের (আজাদ কাশ্মীর) অনেক জায়গা পুরোপুরি থমকে গেছে। কাশ্মীর সরকার ইতিমধ্যে পুরো যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা মুঠোফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন না।

মুজাফফরাবাদে যেসব বাজার জমজমাট থাকে, সেগুলো এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। রাস্তার পাশে যাঁরা পণ্য বিক্রি করেন, তাঁদেরও উপস্থিতি নেই। এমনকি রাস্তায় গণপরিবহনও চলছে না। এই স্থবিরতার কারণে সেখানকার প্রায় ৪০ লাখ মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

আজাদ কাশ্মীর সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, কর্তৃপক্ষ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা ‘প্রচার’ ও ‘ভুয়া খবর’-এর প্রভাবে বিভ্রান্ত না হতে জনগণের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে তারা। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট কোনো অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এমনটা করা হচ্ছে।

গত দুই বছরে এ নিয়ে তৃতীয় দফা বড় বিক্ষোভে নেমেছে জেএএসি। সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় তাদের ৩৮ দফা দাবির ব্যাপারে কোনো সমঝোতা হয়নি। সে কারণেই নতুন করে এই আন্দোলন শুরু হয়েছে।

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের স্থানীয় সরকার ও তৃণমূলভিত্তিক আন্দোলনের দীর্ঘ দুই বছরের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বর্তমান এ সংকট তৈরি হয়েছে। এ সময়ে আন্দোলনকারীরা একাধিকবার রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে।

কীভাবে বিক্ষোভ ছড়াল

২০১৭ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে জনসংখ্যা ৪০ লাখের বেশি। এখানকার প্রশাসন আংশিক স্বায়ত্তশাসিত, যার নিজস্ব প্রধানমন্ত্রী ও আইনসভা রয়েছে।

বর্তমান অস্থিরতার মূল শিকড় ২০২৩ সালের মে মাসে। তখন প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধির বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। একই সঙ্গে ভর্তুকিপ্রাপ্ত গমের তীব্র ঘাটতি এবং ব্যাপক হারে আটা পাচারের অভিযোগও সামনে আসে।

২০২৩ সালের আগস্ট নাগাদ এসব বিচ্ছিন্ন অভিযোগ একত্র হয়ে সংগঠিত প্রতিরোধে রূপ নেয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে কয়েক শ কর্মী মুজাফফরাবাদে জড়ো হয়ে জেএএসি গঠন করেন। সেখানে অঞ্চলটির সব এলাকার প্রতিনিধিরা জড়ো হন।

এ আন্দোলন বড় আকার ধারণ করে ২০২৪ সালের মে মাসে। বিক্ষোভকারীরা মুজাফফরাবাদের দিকে দীর্ঘ মিছিল শুরু করলে সহিংস সংঘর্ষ হয়। এতে কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হন। এর মধ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তাও ছিলেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো মেনে নেওয়ার পরই শুধু সহিংস বিক্ষোভ শেষ হয়। সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে কোটি কোটি রুপি ভর্তুকি দেওয়া হয়।

তবে শান্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। চলতি বছরের আগস্টে জেএএসি ঘোষণা করেছে, তারা নতুন করে আন্দোলন শুরু করবে। এবার তাদের প্রতিবাদ শুধু অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

বিক্ষোভকারীরা কেন অসন্তুষ্ট

জেএএসির পক্ষ থেকে করা ৩৮ দফা দাবির মধ্যে আছে—বিনা মূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং প্রদেশের আইনসভা কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে বড় অবকাঠামো প্রকল্প চালু করা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিটি হলো ‘ক্ষমতাসীন অভিজাতদরে বিশেষ সুবিধা’ বিলুপ্ত করা। এ দাবিটি আগের বিক্ষোভের সময়ও বারবার করা হয়েছে।

জেএএসি বলেছে, ২০২৪ সালের মে মাসে বিক্ষোভের পর সরকার উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রদত্ত বিশেষ সুবিধাগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি বিচারিক কমিশন গঠন করার ঘোষণা দিয়েছে।

মন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য দেওয়া সরকারি সুবিধার মধ্যে রয়েছে—দুটি সরকারি গাড়ি, ব্যক্তিগত সহকারী ও নিরাপত্তা প্রহরী এবং সরকারি কাজে ব্যবহৃত গাড়ির জন্য সীমাহীন জ্বালানি।

জেএএসির দাবির তালিকায় এবার প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। তা হলো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের আইনসভায় শরণার্থীদের জন্য নির্ধারিত ১২টি সংরক্ষিত আসন বিলোপ করা।

জেএসিসির ভাষ্য অনুযায়ী, শরণার্থী ও তাঁদের সন্তানেরা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে এসে বসতি গড়েছেন। আর এখন তাঁরা শক্তিশালী রাজনৈতিক জোট তৈরি করছেন এবং উন্নয়ন তহবিলের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন।

জেএএসির দাবির তালিকায় ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বিক্ষোভ চলাকালে আটক কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করার কথাও বলা হয়েছে। কর ছাড়, কর্মসংস্থানের উন্নয়ন এবং পরিকাঠামোগত প্রকল্প চালুর দাবিও এর অন্তর্ভুক্ত।

পার্বত্য অঞ্চলকে পাকিস্তানের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করবে—এমন নতুন সেতু ও সুড়ঙ্গ নির্মাণ করতে চায় কমিটি।

মুজাফফরাবাদে বর্তমানে একটি বিমানবন্দর থাকলেও তা বছরের পর বছর কার্যক্রমবিহীন। তবে বিমানবন্দরটি আবার চালু করার জন্য চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একটি কমিটি গঠন করেছেন। অঞ্চলটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মিরপুরে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

সরকার কী করছে

স্থানীয় প্রশাসন যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করেছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি আধা সামরিক বাহিনী ও পাকিস্তানের অন্য অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

জেএএসি এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। জেএএসির নেতা শওকত নওয়াজ মীর সাংবাদিকদের বলেছেন, স্থানীয় পুলিশ ইতিমধ্যেই দায়িত্বে থাকায় পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ড থেকে আধা সামরিক বাহিনীর কোনো প্রয়োজন নেই।

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অর্থমন্ত্রী আবদুল মজিদ খান বলেছেন, প্রথম দফার আলোচনা শেষ হওয়ার পরও নতুন একটি কমিটি মুজাফফরাবাদে এসেছে। তারা বিশেষভাবে বিক্ষোভকারীদের দাবির সমাধান করবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘গত বছর আন্দোলন শুরু হওয়ার সময় দাবি ছিল মূলত বিদ্যুৎ ও আটার দাম নিয়ে, যা আমরা মেনে নিয়েছি। তবে তাদের বুঝতে হবে, সবকিছু রাতারাতি সম্ভব নয় এবং এতে সময় লাগে।’

তবে খান স্বীকার করেছেন, সরকার জেএএসির ৩৮ দফা দাবির অধিকাংশ মেনে নিলেও আলোচনায় দুটি বিতর্কিত বিষয় এখনো মীমাংসা হয়নি। সেগুলো হলো শরণার্থীদের জন্য ১২টি সংরক্ষিত আসন বিলোপ এবং ক্ষমতাসীন অভিজাতদের বিশেষ সুবিধা বাতিল করা।

দেশভাগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বাতিল করার যৌক্তিকতা নিয়ে মন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা সেই মানুষদের পরিবার, যারা ভারত থেকে পাকিস্তানে এসেছে। সেখানে তারা জমিদার ও ব্যবসায়ী ছিল, কিন্তু সব সম্পদ পেছনে ফেলে এখানে এসে দারিদ্র্যের জীবন শুরু করতে হয়েছে। তবু জেএএসি মনে করে, তাদের জন্য সংরক্ষিত আসন দেওয়া অন্যায়। যদি আমরা এদের অধিকার না দিই, তবে তারা কেন এত কষ্ট করে এখানে এল?’

মন্ত্রী নিজেই সেই ২৭ লাখ মানুষের মধ্যে একজন, যাদের পরিবার ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে আজাদ কাশ্মীরে এসেছে।

মজিদ খান নতুন বিক্ষোভের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, জেএএসির আগের বেশির ভাগ দাবি ইতিমধ্যেই পূরণ হয়েছে। অনেক চলমান সমস্যার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ইসলামাবাদ থেকে ফেডারেল তহবিল নিতে হয়।

এরপর কী হবে

গতকাল কোনো সমাধান ছাড়াই সরকারি প্রতিনিধি এবং জেএএসির সদস্যদের মধ্যকার প্রথম দফার আলোচনা শেষ হয়। আজ শুক্রবার পরবর্তী দফার আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে সংলাপে যুক্ত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বারবার প্রতিশ্রুতি এবং হতাশার চক্রের পর গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

জেএএসি বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার পরও সরকার দাবি করছে, তারা বেশির ভাগ দাবি পূরণ করেছে। সংবিধান ও নির্বাচনী সংস্কারের জন্য আইনসভায় প্রক্রিয়া প্রয়োজন, যা এক দিনে সম্ভব নয়।

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আলোচনা থেকে যথাযথ অগ্রগতি হলে সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবা দ্রুত পুনঃস্থাপন করবে, যা ‘মাঠের পরিস্থিতির কারণে সীমিত রাখা হয়েছিল’।

আবদুল মজিদ খান ইঙ্গিত দিয়েছেন, আলোচনার ক্ষেত্রে গঠনমূলক অগ্রগতি হবে। ইন্টারনেট ও মোবাইল সেবা পুনঃস্থাপন করতে সরকার খুব দ্রুতই পদক্ষেপ নেবে।

মজিদ খান বলেন, ‘মুজাফফরাবাদে আলোচনা কমিটি উপস্থিত থাকায় আমি আশাবাদী। শিগগিরই এই স্থবির অবস্থার সমাধান হবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-03%2Ff3z8neni%2FKashmir-1.webp?rect=0%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মুজাফফরাবাদে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি ছুড়ছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ১ অক্টোবর, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

গাজা নিয়ে ট্রাম্পের বিশ দফা যেন বিশটি ‘বিষের বড়ি’ by মনযূরুল হক

গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই যুদ্ধে ৬৬ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত, ১ লাখ ৬৮ হাজার জন আহত এবং কয়েক হাজার শিশু অনাহারে মারা গেছে। সর্বশেষ গাজা সিটি দখল করতে স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলে।

এই নির্মম চক্র ‘ভাঙতে’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একাধিক প্রস্তাব ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি একটি এআই-জেনারেটেড ভিডিও পোস্ট করে গাজাকে মার্কিন দখলে নিয়ে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা’ বানানোর স্বপ্নের কথাও জানান দিয়েছিলেন তিনি।

নতুন করে আবারও তিনি ২০ দফা পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। যেখানে হামাসকে উচ্ছেদ করে ‘টেকনোক্র্যাটিক ফিলিস্তিনি কমিটি’ গঠনের কথা রয়েছে। সেই কমিটিকে তদারক করার জন্য একটি ‘শান্তি পরিষদ’ গঠন করা হবে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে। তবে চেয়ারম্যান প্রধান থাকবেন ট্রাম্প নিজেই।

সোমবার হোয়াইট হাউস এই পরিকল্পনা প্রকাশের আগে চলমান জাতিসংঘের ৮০তম অধিবেশনের ফাঁকে আরব নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ট্রাম্প। এরপর তিনি নেতানিয়াহুর সম্মতি গ্রহণ করেন এবং হামাসকে হুমকি দিয়েছেন, ‘মেনে নাও, নইলে যুদ্ধ চলবে।’

কিন্তু এই ‘শান্তি পরিকল্পনা’ কি শান্তি আনবে, নাকি ফিলিস্তিনিদের জন্য এটা হবে একটা নতুন শৃঙ্খল? ফিলিস্তিনি-আমেরিকান বিশ্লেষক ওমর বদ্দার এই পরিকল্পনাকে আখ্যা দিয়েছেন ‘পয়জন পিল’ বলে। তিনি আল–জাজিরাকে বলেছেন, কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও এর মূল উপাদান ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হয়েছে। গাজার বাসিন্দা ইবরাহিম জুদেহ বলেন, ‘এটি অবাস্তব—যুদ্ধ চলবে।’

বিষাক্ত স্বপ্নের সূচনা যেভাবে হয়

ট্রাম্পের বর্তমান পরিকল্পনা মূলত তার ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর ‘গাজা রিভিয়েরা’ প্রস্তাবেরই ছায়া। সে সময় তার ‘গাজা রিকনস্ট্রাকশন, ইকোনমিক অ্যাকসিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন ট্রাস্ট (GREAT) প্রকল্পে গাজাকে দুবাই-স্টাইলের রিসোর্টে রূপান্তরের কল্পনা করা হয়, যেখানে থাকবে স্কাইস্ক্র্যাপার, কৃত্রিম দ্বীপ, ‘ট্রাম্প রিভিয়েরা’ এবং ‘ইলন মাস্ক স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং জোন’।

৫ লাখ ফিলিস্তিনিকে ৯ হাজার ডলারের ‘রিলোকেশন প্যাকেজ’ দিয়ে ‘স্বেচ্ছায়’ অন্য দেশে সরানোর পরিকল্পনা ছিল। পরে আরব রাষ্ট্রনেতারা ও জাতিসংঘ এটিকে ‘পাগলামি’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। এমনটি ইসরায়েলে জনপ্রিয় দৈনিক হারেৎজ ‘ট্রাম্পিয়ান গেট-রিচ-কুইক স্কিম’ বলে উপহাস করে।

পরে প্রকাশ পায় যে, এই প্রস্তাবের নেপথ্যে ছিলেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তদন্তে উঠে আসে, ব্লেয়ারের ‘টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল চেঞ্জ’ (টিবিআই) ইসরায়েলি ব্যবসায়ী ও বিসিজির সঙ্গে মিলে ‘গাজা ইকোনমিক ব্লুপ্রিন্ট’ তৈরি করে এবং ইসরায়েল পরিচালিত ‘গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) নিরাপত্তা প্রধান সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা ফিল রিলে সে সময় ব্লেয়ারের সঙ্গে লন্ডনে সাক্ষাৎ করে প্রজেক্ট পিচ করেন।

সেই ‘রিভিয়েরা’র ছায়াই ট্রাম্পের বর্তমান পরিকল্পনায় ফিরে এসেছে। ধারণা করা হয়, সে কারণেই বর্তমান পরিকল্পনায় ব্লেয়ার ‘ট্রানজিশনাল অথরিটি’র পরিচালক হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্লেয়ারের বিতর্কিত ভূমিকা

পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে গাজার শাসন একটি ‘অস্থায়ী টেকনোক্র্যাটিক ফিলিস্তিনি কমিটি’, যা ‘শান্তি পরিষদ’–এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। কিন্তু কমিটির সদস্য কে নির্বাচন করবে? প্রক্রিয়া কী? এর কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। ব্লেয়ারকে বলা হয় ২০০৩-এর ইরাক যুদ্ধের ‘স্থপতি’। চিলকট রিপোর্ট প্রমাণ করে, ব্লেয়ার শান্তিপূর্ণ বিকল্প চূড়ান্ত না করে যুদ্ধে যান, যা লাখ লাখ জীবন ধ্বংস করেছে।

ওমর বদ্দার বলেন, ‘ব্লেয়ার ও ট্রাম্পের রেকর্ড অপরাধমূলক। ব্লেয়ার ইরাক আক্রমণের মিথ্যার অজুহাতের নায়ক ছিলেন; আর ট্রাম্প হলো পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি স্থাপন, গোলান মালভূমি দখল, জেরুজালেম ইসরায়েলের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সমর্থক।’

জাতিসংঘের আবাসন বিশেষজ্ঞ বালাকৃষ্ণান রাজাগোপাল আল–জাজিরাকে বলেছেন, ‘ব্লেয়ারের নেতৃত্বে ‘ট্রানজিশনাল অথরিটি’ মাধ্যমে স্থায়ী বাফার জোন তৈরি গাজার ভূমি দখলের একটি ঘৃণ্য প্রচেষ্টামাত্র।’ অস্ট্রেলিয়ান সিনেটর ডেভিড শুব্রিজ বলেছেন, ‘ব্লেয়ার গাজায় কেন, তার তো ইরাক যুদ্ধের জন্য বিচারের কাঠগড়ায় থাকা উচিত।’ লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিনের মতে, ‘ব্লেয়ার মধ্যপ্রাচ্যে থাকা উচিত নয়—তার ইরাক সিদ্ধান্ত হাজার হাজার জীবন কেড়েছে।’

২০০২ সালে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তিপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে, বিশেষ করে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের লক্ষ্যে ‘কোয়ার্টেট অন দ্য মিডল ইস্ট’ নামের একটি আন্তর্জাতিক গ্রুপ গঠিত হয়েছিল। ব্লেয়ার ছিল এই গ্রুপের প্রতিনিধি। ব্লেয়ারের দায়িত্ব ছিল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) প্রতিষ্ঠান গঠনে সহায়তা, অর্থনৈতিক প্রকল্প তত্ত্বাবধান এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনায় সহযোগিতা করা। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, তিনি তখন অবৈধ ইসরায়েলি বসতি রোধ করতে কোনো ভূমিকা রাখেননি, বরং ইসরায়েলের পক্ষ নিয়েছেন। এমনকি ২০১৪ সালে ইসরায়েল গাজায় অভিযান চালালেও ব্লেয়ার নীরব থাকেন।

হামাসকে নিরস্ত্র করা নাকি স্থায়ী দখলের চেষ্টা

পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, হামাস অস্ত্র ছাড়লে ইসরায়েল ‘মান, অগ্রগতি ও সময়সীমা’ বিবেচনা করে সেনা প্রত্যাহার করবে। কিন্তু কোনো টাইমলাইন নেই। গাজা ‘সন্ত্রাসমুক্ত’ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল একটা ‘নিরাপত্তাবেষ্টনী’ দিয়ে রাখবে। কিন্তু কে ঠিক করবে যে ‘সন্ত্রাসমুক্ত’ হয়েছে কি না?

ওমর বদ্দার বলেন, ‘ইসরায়েল অনির্দিষ্টকাল দখল চালাবে, প্রত্যাহারের কোনো গ্যারান্টি নেই। ফিলিস্তিনিরা বন্দি জীবন যাপন করবে।’ ফিলিস বেনিস বলেন, ‘কোনো নিশ্চয়তা নেই যুদ্ধ শেষ হবে। ইসরায়েল জিম্মি ফিরিয়ে নিয়ে বলতে পারে, ‘সহযোগিতা পাচ্ছি না, যুদ্ধে ফিরব।’ হোয়াইট হাউসের মানচিত্রে দেখানো হয়েছে, তৃতীয় ধাপে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ‘নিরাপত্তা বাফার জোন’ ধরে রাখবে।

একটি ‘অস্থায়ী আন্তর্জাতিক শান্তি বাহিনী’ (আইএসএফ) নিরাপত্তা দেখবে। কিন্তু কোন দেশ? ম্যান্ডেট কী? ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো হাজার হাজার শান্তিরক্ষী পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন, আবার তিনি জাতিসংঘের অধিবেশনে শিগগিরই ইসরায়েলকে ইন্দোনেশিয়া ‘স্বীকৃতি’ দেওয়ার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেছেন।

তা ছাড়া এই বাহিনীকে কি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা দেওয়া হবে? সাবেক ইসরায়েলি কূটনীতিক অ্যালন পিনকাস বলেন, ‘এটি একটি সিমুলেশন গেম—জটিল, বিতর্কিত। নেতানিয়াহু চুক্তি ব্যর্থ করতে সময় কিনবেন। হামাস ৭২ ঘণ্টায় বন্দী মুক্তি দেবে না।’

ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কী হবে

পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রত্বের ‘বিশ্বাসযোগ্য পথ’ আছে বলা হয়েছে, কিন্তু তা শর্ত সাপেক্ষে। আগে গাজা পুনর্নির্মাণ, তারপর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) সংস্কার। অথচ একই সঙ্গে ট্রাম্প এটাও বলেছেন, ‘কিছু দেশ বোকামি করে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।’

নেতানিয়াহু সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পিএ গাজায় আসতে পারবে না, হামাসও না। পরিকল্পনার ১৭ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, হামাস যদি পরিকল্পনা গ্রহণে বিলম্ব করে কিংবা প্রত্যাখ্যান করে তবু ‘সন্ত্রাসমুক্ত এলাকায়’ নতুন গঠিত কমিটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।

আল–জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারার মতে, হামাস যদি এটা মেনে নেয়, তাহলে তা হবে ‘হামাসের আত্মসমর্পণ। ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে হামাস একটি আলটিমেটাম হিসেবে দেখবে—হয় আত্মসমর্পণ করো, নয়তো যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে কাছের মিত্র ইসরায়েলকে সমর্থন করবে। এখন তাদের বোঝানো হতে পারে যে হয়তো তাদের উন্নতির জন্য আত্মসমর্পণ করা উচিত। তিন বছরের গণহত্যার পর রক্তপাত বন্ধ হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র? কোথায়?’

বিশ্লেষক রিমা হোসেইনের মতে, ‘এটা কোনো শান্তি প্রচেষ্টা নয়, ইসরায়েলের আধিপত্যের নতুন রূপ। পিএ-কে বাইপাস করে গাজাকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।’

যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি, ভারত, যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে এই পরিকল্পনায় সমর্থন জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ স্বাগত জানিয়েছে; তুরস্কের এরদোগান ট্রাম্পের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। আরব নেতারা (মিসর, জর্ডান, সৌদি, কাতার) সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা এই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে রাজি নয়। কেননা, এতে কেবল ‘প্রতিশ্রুতি’ আছে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো সম্ভাবনা নেই।

কী বলছে ফিলিস্তিনিরা

গাজার মানুষ পরিকল্পনাকে ‘হাস্যকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ৩৯ বছয় বয়সী গাজার বাসিন্দা ইবরাহিম জুদেহ আল-মাওয়াসিতে তার আশ্রয় থেকে এএফপি নিউজ এজেন্সিকে বলেছেন, ‘এটা স্পষ্ট যে এই পরিকল্পনা অবাস্তব, এটি এমন শর্ত দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ে জানে হামাস কখনো মানবে না। আমাদের জন্য এর অর্থ হলো যুদ্ধ ও কষ্ট অব্যাহত থাকবে।’

উত্তর গাজার বাড়ি থেকে মধ্য গাজার দেইর এল-বালাহতে উদ্বাস্তু হওয়া ৫২ বছর বয়সী আবু মাজেন নাসার সমানভাবে হতাশ। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ করার জন্য আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা ছাড়া সব বন্দীকে হস্তান্তর করার মানে কী? আমরা, জনগণ হিসেবে এই হাস্যকর প্রস্তাব মানব না, হামাস এখন চুক্তি নিয়ে যা-ই সিদ্ধান্ত নিক, তা অনেক দেরি হয়ে গেছে।’

ফিলিস্তিনি বুদ্ধিজীবী কবি তামিম বারগুসি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে লিখেছেন, ১৯৮২ সালে ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগঠন (পিএলও) এমন একটা মার্কিন পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছিল। শর্ত ছিল, তারা অস্ত্রসহ বৈরুত থেকে বেরিয়ে যাবে, শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে একটা আন্তর্জাতিক বাহিনী, আর নিশ্চয়তা থাকবে যে ইসরায়েল সেখানে প্রবেশ করবে না। পিএলও বেরিয়ে গেল, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাহিনী সরে দাঁড়াল, আর তখনই ইসরায়েল ঢুকে পড়ে সাবরা ও শাতিলায় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়।

আজকের মার্কিন পরিকল্পনার খসড়ায় বলা হচ্ছে—(হামাসের) টানেল ও অস্ত্র ধ্বংস করা হবে, অস্ত্রধারীরা বেরিয়ে যাবে, আর গাজার মানুষকে রেখে দেওয়া হবে কেবল এক ‘প্রতিশ্রুতির‘ ভরসায়। বন্দিমুক্তির বিনিময়েও দেওয়া হবে কেবল প্রতিশ্রুতি…। যদি প্রতিরোধশক্তি (হামাস) এই প্রস্তাব মেনে নেয়, তবে তো হামাস নিজেই টিকবে না। তাদের যোদ্ধারাই তাহলে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সংগঠনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, আত্মরক্ষার তাগিদে এবং নিজের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য।

এটা কোনো ভবিষ্যদ্বাণী না—বরং অতীতের শিক্ষা। সাবরা-শাতিলার পর যেমন সংগঠন ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছিল, শরণার্থীশিবিরগুলোয়ও ফিলিস্তিনিদের নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ লেগেছিল। তাই কোনো ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এই পরিকল্পনা গ্রহণ করলে দেখা যাবে তার নিজের যোদ্ধারাই তাকে উৎখাত করবে।

* মনযূরুল হক, লেখক ও সাংবাদিক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: রয়টার্স

নতুন গাজা প্রস্তাব মানতে হামাসের প্রতি ট্রাম্পের আল্টিমেটাম

গাজা শান্তি প্রস্তাব মেনে নিতে হামাসকে রোববার পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে এ হুঁশিয়ার বার্তা দেন তিনি। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনটিকে ‘নিষ্ঠুর ও সহিংস হুমকি’ বলে নিন্দা জানান রিপাবলিকান এই নেতা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

ট্রাম্প জানান, রোববার আন্তর্জাতিক সময় সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অবশ্যই চুক্তিতে রাজি হতে হবে। অন্যথায় গাজায় আরও ভয়াবহ সহিংসতা দেখা দেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এই শান্তি প্রস্তাবকে শেষ সুযোগ উল্লেখ করে ট্রাম্প লিখেছেন, যদি এই শেষ সুযোগের মধ্যে চুক্তিটি না হয় তাহলে হামাসের বিরুদ্ধে এমন এক সর্বনাশা পরিস্থিতি নেমে আসবে, যা কেউ আগে কখনও দেখেনি। যেভাবেই হোক মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আরব ও মুসলিম নেতার সঙ্গে এই শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এরপর গত সোমবার হোয়াইট হাউসে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে স্বাগত জানানোর সময় তিনি পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব উল্লেখ করেন।

ট্রাম্পের ওই পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার কোনো পথ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যদিও তেল আবিবের সামরিক অভিযানে ৬৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পরও ওই প্রস্তাবে তেল আবিবের ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয়নি। ফলে এ নিয় তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন কমিশন নির্ধারণ করেছে যে গাজায় ইসরাইলের কার্যকলাপ গণহত্যার সমতুল্য।

ট্রাম্পের রূপরেখায় হামাসকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গাজার প্রশাসনে কোনো ভূমিকা না রাখতে সম্মত হতে চাপ দেয়া হয়েছে। বিনিময়ে গাজায় ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে, যেখানে ইতিমধ্যে অর্ধ মিলিয়ন মানুষের জন্য দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসরাইলি অবরোধের ফলে বেসামরিক মানুষের কাছে পর্যাপ্ত সম্পদ পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে ক্ষুধা আরও তীব্র হয়েছে।
পরিকল্পনায় ইসরাইলি জিবীত জিম্মিদের এবং যারা মারা গেছেন তাদের দেহাবশেষ হস্তান্তরের প্রস্তাব রয়েছে। পরিবর্তে ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর আটক হওয়া ১,১৭০ জন গাজাবাসী এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ২৫০ জনকে মুক্তি দেবে ইসরাইল। পাশাপাশি ওই পরিকল্পনায় একটি পিস (শান্তি) বোর্ড প্রতিষ্ঠার আহ্বানও জানানো হয়েছে। যার নেতৃত্বে থাকবেন স্বয়ং ট্রাম্প এবং অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধান। সেখানে সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারেরও থাকার কথা রয়েছে।

শুক্রবারের ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টে, ট্রাম্প বারবার এই প্রস্তাবকে হামাসের আলোচনার টেবিলে আসার ‘শেষ সুযোগ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, হামাস যদি তার প্রস্তাব মেনে না নেয় তবে তাদের চরম মূল্য দিতে হবে। ট্রাম্প লিখেছেন, সভ্যতার উপর ৭ই অক্টোবরের হামলার প্রতিশোধ হিসাবে, ২৫ হাজারের বেশি হামাস যোদ্ধাকে নিহত করা হয়েছে। বাকিরা কোথায় আছেন এবং তারা কারা তাদেরও খুঁজে বের করে নিহত করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।

https://mzamin.com/uploads/news/main/183057_Kaium-7.webp

ইরানি ড্রোনে যেভাবে যুদ্ধের রূপ বদলে দিচ্ছে রাশিয়া

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে দেশটির সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক অগ্রগতি পাচ্ছে রুশ বাহিনী। এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরেও রাশিয়ার হামলা চলছে। এ হামলা চালানো হচ্ছে গভীর রাতে ড্রোনের মাধ্যমে ইউক্রেনের শহর ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোয়। হামলার জন্য ড্রোনের উৎপাদনও বাড়াচ্ছে মস্কো।

এসব ড্রোনের বেশির ভাগ দ্রুতগতির বা উচ্চ প্রযুক্তির নয়। বরং সেগুলো এতটাই সস্তা যে প্রতি রাতে ৭০০টির বেশি ড্রোন ছুড়তে পারছে ক্রেমলিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিপুল পরিমাণ ড্রোন হামলার পেছনে রাশিয়ার লক্ষ্য হলো ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাওয়া এবং দেশটির নাগরিকদের মনোবল ভেঙে দেওয়া।

ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইরান থেকে শাহেদ ড্রোন কিনেছিল রাশিয়া। এখন প্রতি মাসে হাজার হাজার এ ধরনের ড্রোন তৈরি করতে বড় বড় কারখানা গড়ে তুলেছে মস্কো। রাশিয়ার এই কম দামি ড্রোন ঠেকাতে ইউক্রেনকে দামি গোলাবারুদ ব্যবহার করতে হচ্ছে। কারণ, কম দামি প্রতিরক্ষা কৌশলগুলো অতটাও কার্যকর নয়।

২০২৪ সালের তুলনায় গত মাসে ইউক্রেনে রাশিয়ার দৈনিক ড্রোন হামলার পরিমাণ প্রায় ১৪ গুণ বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ইউক্রেনে প্রতিদিন গড়ে ১৪টি ড্রোন ছুড়েছিল রাশিয়া। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে ৮০টির বেশিতে দাঁড়ায়। গত জুলাই মাসে প্রতিদিন গড়ে দুই শতাধিক ড্রোন ছুড়েছে রাশিয়া। এর মধ্যে এক রাতে সর্বোচ্চ ৭২৮টি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।

ড্রোন হামলার এই বৃদ্ধি থেকে বোঝা যায়, কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে মনুষ্যবিহীন আকাশযানের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। নিজেদের বিমানবাহিনীর সক্ষমতার ঘাটতি পূরণে রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষই নিজেদের ড্রোনগুলো আরও উন্নত করার দিকে ঝুঁকছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যৎ কোনো সংঘাতে এগিয়ে থাকার জন্য এখন যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির ন্যাটো মিত্ররাও ড্রোন উন্নয়নে কাজ করছে।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) গবেষক রবার্ট টলেস্ট বলেন, ‘ন্যাটোও হয়তো বড় পরিসরে ড্রোন ব্যবহারের দিকে যাবে। তবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মতো এত ব্যাপকহারে নয়। কারণ, আমাদের বিশাল বিমানবাহিনী রয়েছে। সেখানে আমরা বিনিয়োগ করেছি। এই বিমানবাহিনী খুব দ্রুত শক্তিশালী হামলা চালাতে পারে।’

রাশিয়া যেসব ড্রোন ব্যবহার করে

এফপিভি ড্রোন: এফপিভি ড্রোনগুলোর বেশ কয়েকটি ধরন ব্যবহার করে রাশিয়া। এই ড্রোনগুলো সাধারণত সর্বোচ্চ ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। এফপিভি ড্রোনে করে ছোট বিস্ফোরক বহন করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে ট্যাংক ধ্বংস করতে সক্ষম গ্রেনেডও। তবে মূল যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে ইউক্রেনের শহরগুলোতে হামলার জন্য বড় আকৃতির শাহেদ ড্রোন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে রাশিয়া।

শাহেদ-১৩১ ড্রোন: রাশিয়া মোট তিন ধরনের শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করে থাকে। প্রথমেই রয়েছে শাহেদ-১৩১ বা গেরান-১ ড্রোন। এই ড্রোনগুলোর সর্বোচ্চ পাল্লা ৯০০ কিলোমিটার। ১০ থেকে ১৫ কেজি ওজনের বস্তু বা বিস্ফোরক বহন করতে পারে এটি।
শাহেদ-১৩৬ ড্রোন: এরপর রয়েছে শাহেদ-১৩৬ বা গেরান-২ ড্র্রোন। এই ড্রোনগুলো সর্বোচ্চ ১ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার। এগুলো সর্বোচ্চ ৪০ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে পারে।

বর্তমানে রাশিয়ার আলাবুগা শহরে গোপন কারখানায় শাহেদ-১৩৬ ড্রোন তৈরি করছে মস্কো। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার লক্ষ্য ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রতিদিন প্রায় ২০০টি শাহেদ-১৩৬ ড্রোন তৈরি করা।

শাহেদ-২৩৮ ড্রোন: রাশিয়ার শাহেদ-২৩৮ বা গেরান-৩ ড্রোনের আকার এই শ্রেণির ড্রোনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়। এই ড্রোনগুলো সর্বোচ্চ আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটার। শাহেদ-২৩৮ ড্রোন ৫০ থেকে ৩০০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে।

খরচ কমেছে রাশিয়ার

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সিএনএনকে জানিয়েছেন, প্রতি মাসে ছয় হাজারের বেশি শাহেদ ড্রোন উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে রাশিয়া। যুদ্ধের শুরুর দিকে এ ধরনের ড্রোনগুলো ইরানের কাছ থেকে কিনত মস্কো। তবে রাশিয়ার অভ্যন্তরে সেগুলো উৎপাদন করতে এখন খরচ অনেক কম পড়ছে।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দার একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, ২০২২ সালে প্রতিটি শাহেদ ড্রোন কিনতে গড়ে দুই লাখ ডলার খরচ হতো রাশিয়ার। রাশিয়ার তাতারেস্তান অঞ্চলের আলাবুগা ড্রোন কারখানায় সেগুলো ব্যাপক আকারে উৎপাদনের পর এখন খরচ কমে গড়ে ৭০ হাজার ডলারে নেমে এসেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শাহেদ-১৩৬ ড্রোনগুলোর প্রতিটি তৈরি করতে রাশিয়ার ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার খরচ হচ্ছে। এর তুলনায় ভূমি থেকে আকাশে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধকের (ইন্টারসেপটর) দাম ৩০ লাখ ডলারের বেশি।

এই কম খরচের জন্য প্রতি রাতে ড্রোন হামলা চালানো রাশিয়ার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো কোনো রাতে বড় পরিসরেও হামলা চালাতে পারছে তারা। যুদ্ধের শুরুর দিকে মাসে টেনেটুনে একবার বড় পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাত রাশিয়া। এখন গড়ে প্রায় প্রতি রাতেই ড্রোন দিয়ে এমন হামলা হচ্ছে বলে সিএসআইএসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে।

সিএসআইএসের গবেষক ইয়াসিরর আতালানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে রাশিয়ার ছোড়া ড্রোন আঘাত হানার হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত এপ্রিল থেকে প্রায় ২০ শতাংশ ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ২০২৪ সালে তা ছিল গড়ে ১০ শতাংশের কম। তিনি বলেন, ‘একটি শাহেদ ড্রোন সেটির লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারছে, সেটি বিষয় নয়। ভয় ধরানো এই অস্ত্র বেসামরিক লোকজনের ওপর যে প্রভাব ফেলছে এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর যে চাপ সৃষ্টি করছে, সেটিই মূল বিষয়।’

এআই ড্রোন নিয়ে কাজ করছে রাশিয়া-ইউক্রেন

যুদ্ধের সম্মুখসারিতে এফপিভি ড্রোন ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইউক্রেনও। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর স্টাডি অব ওয়ারের (আইএসডব্লিউ) রাশিয়াবিষয়ক গবেষক কাতেরিনা স্তেপানেঙ্কো বলেন, প্রযুক্তিগত প্রতিটি উদ্ভাবনের পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য দুই পক্ষই চেষ্টা করছে। জবাবের গতি এতটাই দ্রুত যে মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই কোনো প্রযুক্তিগত সাফল্যের বিরুদ্ধে পাল্টা উদ্ভাবন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কিছু উদ্ভাবন, যেগুলো আজ কাজে আসছে, তা আগামী মাসগুলোয় না-ও কাজে আসতে পারে।

আইএসডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউক্রেন ও রাশিয়া—দুই পক্ষই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত (এআই) ড্রোন নিয়ে কাজ করছে। এই ড্রোনগুলো এমনভাবে তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন সেগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একই সঙ্গে হামলা প্রতিহত করতে পারে এআই–চালিত এমন ড্রোন তৈরির চেষ্টাও করা হচ্ছে। এমন ড্রোন তৈরি করা হলে হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের চেয়ে কম খরচ হবে।

গবেষক কাতেরিনা স্তেপানেঙ্কো বলেন, ‘এ ধরনের (এআইচালিত) ড্রোন নিয়ে ইউক্রেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে, তার বহু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সেগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে মোতায়ন হতে দেখা যায়নি। ইউক্রেন যদি হামলা প্রতিহতকারী ড্রোন তৈরি করতে পারে, তাহলে তাদের সক্ষমতা বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর জন্য নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সংরক্ষণ করতে পারবে।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-22%2Fpgn2lom3%2F1.avif?rect=1%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ড্রোন। ফাইল ছবি