Thursday, January 23, 2014

নারীর প্রতি সহিংসতা- ‘যোগ্যতমের উদবর্তন’ by উম্মে মুসলিমা

নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ হলো নারীকে দ্বিতীয় লিঙ্গ বা অধস্তন হিসেবে বিবেচনা। ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’-এর সংজ্ঞার মধ্যে নারীও অন্তর্ভুক্ত। যোগ্যদেরই বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
বনের বড় ও শক্তিশালী পশুরা ছোট ও দুর্বল পশুদের ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে। কীটপতঙ্গ, পক্ষী ও মৎস্যকুলেও একই চিত্র। মনুষ্যসমাজই বা এর বাইরে থাকে কেন?

যে সমাজ নির্ধারণ করে পুরুষই প্রধান, বাহুবলে বীর, বুদ্ধিতে প্রখর, শারীরিক উচ্চতা ও ওজনে অধিক, অকুতোভয়—তারা ভাবতেই পারে, তাদের চেয়ে দুর্বলদের দমন তাদের কর্তব্য। কাব্য করে বলা হয়ে থাকে, নারী হরিণবিশেষ, ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’। এখনো পুরুষসমাজ নারীকে মাংসপিণ্ড হিসেবে দেখতে পছন্দ করে। অথচ নারী তাঁর আপন মহিমায় দিন দিন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছেন। শত প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে নারী স্বাক্ষর রাখছেন অনেক চ্যালেঞ্জিং পেশায়। এ যুগ খনা বা জোয়ান অব আর্কের যুগ না হলেও একবিংশ শতাব্দীতে সাহসী, বুদ্ধিমান নারী অনেক নিগ্রহ, অনেক সমালোচনার শিকার। হাতে গোনা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ কটা বাদে নারীর প্রতি মনোভাব অন্য সব দেশে কমবেশি একই রকম।

আমাদের দেশে যখন কোনো কোনো নারী সাংবাদিক তাবড় তাবড় মহাজনকে বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নবাণে ঘায়েল করেন বা কোনো তথ্য উদ্ঘাটনে পুরুষ সহকর্মীদের সমান বা তাঁদের চেয়ে ভালো করেন, তখন তাঁদের সম্পর্কে বলা হয়, ‘আরে, ওর ভেতর কোনো মেয়েসুলভ আচরণ দেখেছ?’ কিংবা ‘ভাবখানা সবজান্তা, জানে তো ঘণ্টা!’ আরও অনেক বাজে কথা রটিয়ে দেওয়া হয়। এসব মাৎসর্য ছাড়া আর কিছুই নয়।

নারী কেন ঘরে বসে সেলাই-ফোঁড়াই করেন না, কেন কেবল সন্তান মানুষ করেন না, নারীর প্রতি নির্যাতনের জন্য নারী নিজেই দায়ী। অনেকে বলবেন, নারীর ওপর নারীও তো সহিংস হয়ে ওঠেন। তাহলে আর কেবল পুরুষতান্ত্রিকতার দোষ কেন? পুরুষতন্ত্র অর্থে এখানে ক্ষমতাবানদের কথাই বলা হয়; তিনি নারীও হতে পারেন। নারীর প্রতি সহিংসতারও অনেক রূপ। শুধু শারীরিক নির্যাতন নয়, নারীকে মানসিক নির্যাতনেও প্রাণ দিতে হয়।

দুর্বলদের উপহাস করে সবলেরা একধরনের অশ্লীল আনন্দ উপভোগ করে। নতুন জামাইকে নিয়ে শালা-শালিরা যেসব কাণ্ড করে, সেখানে মজাটাই মুখ্য। কিন্তু নতুন বউকে সহ্য করতে হয় বিভিন্নজনের খোঁটা। কারণ, বউটা একে একা, তার ওপর অসহায়। তা ছাড়া শ্বশুরবাড়ির ছোট-বড় সবাই তাঁর অভিভাবক।

গ্রামগঞ্জে একটা কথা প্রচলিত, ‘গরিবের সুন্দরী বউ’। গরিবের সুন্দরী বউ রাখারও উপায় নেই। সুন্দর পালনের অধিকার কেবল ধনীদের। সিন্ডারেলা দুঃখী, দরিদ্র, গুণী মেয়ে, কিন্তু সুন্দরী না হলে যতই জুতোর মাপ সঠিক হোক, রাজপুত্র হতাশ হয়েই প্রাসাদে ফিরে আসত।

বড় বড় মাছ ছোট মাছদের খেয়ে ফেলে। মনুষ্যসমাজেও এ রকম নৈরাজ্যকর কালের উদ্ভব হলে তাকে বলে মাৎস্যন্যায়। নারীর জীবনে চিরকালই মাৎস্যন্যায়। পুরুষসমাজ নারীকে ভাবতে শিখিয়েছে যে নারী যত কোমল, তিনি তত গ্রহণীয়। এর মূল কথা হলো, নারী কোমল ও দুর্বল হলে তাঁকে নিপীড়ন করা সহজ হয়। তাই মেয়েরা যখন পেশিবহুল খেলা বা প্রতিরক্ষামূলক পেশায় নিয়োজিত হন, তাঁদের বিয়ে দেওয়া বা হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই মেয়েদের পেশা নির্ধারণ করে দেন মা-বাবা, যাতে তাঁদের মেয়েরা সারা জীবন মার খেতে পারেন।

তবে শিক্ষিত মানুষজনের মধ্যে নারী নির্যাতনের প্রবণতা একটু কম। এ শিক্ষিতেরও সংজ্ঞা আছে। যাঁরা স্বশিক্ষিত নন, তাঁরা যত উচ্চশিক্ষিতই হোন না কেন, নিজেদের পরিবর্তন করতে পারেন না। প্রকৃতির কাছে মানুষ চিরদিনের শিক্ষার্থী।

একসময় আমাদের প্রপিতামহী-প্রমাতামহীরা ছিলেন প্রায় অসূর্যম্পশ্যা। এ রকম রূপকথাও প্রচলিত: একজন কন্যাদায়গ্রস্ত দরিদ্র বাবার কুটিরে আশ্রয় নিলেন একজন রাজার ছেলে। রাজার ছেলে গৃহস্বামীর আতিথ্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে যা ইচ্ছে চাওয়ার অনুমতি দিলেন। গৃহস্বামী বললেন, তাঁর ঘরে একজন অন্ধ, কালা, বোবা ও খঞ্জ বিবাহযোগ্য মেয়ে রয়েছেন। যদি অনুগ্রহ করে রাজপুত্র তাঁকে বিয়ে করেন, তাহলেই তিনি কৃতার্থ হবেন।

রাজপুত্র বড় মনের মানুষ, তাই দ্বিধা সত্ত্বেও রাজি হলেন। বিয়ে হয়ে গেলে রাজপুত্র দেখলেন, এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে তাঁর বধূ। তিনি অন্ধ-কালা-বোবা-খঞ্জ কিছুই নন। শ্বশুরমশাইকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, তাঁর মেয়ে কোনো পরপুরুষকে চাক্ষুষ করেননি, তাই তিনি অন্ধ, কোনো পরপুরুষের কথা শোনেননি, তাই তিনি কালা, কোনো পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলেননি, তাই তিনি বোবা আর বাড়ি ছাড়া কোথাও যাননি তাই তিনি খঞ্জ।

রাজপুত্র ধন্য হয়ে গেলেন এমন সর্বগুণসম্পন্না স্ত্রী পেয়ে। তো, সেসব দিন নেই। সময়ের প্রয়োজনে অনেক কিছু বদলাচ্ছে। পরিবর্তনকে অনেকে দ্রুত গ্রহণ করছেন, অনেকে একটু দেরিতে, অনেকে করছেনই না। যাঁরা পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে পারছেন না, তাঁদের দ্বারাই সংঘটিত হচ্ছে যত অনাচার।

বলা হয়, সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। নারী-পুরুষ উভয়েই মানুষ। নারীর শারীরিক পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ অবস্থান্তর—এসবই প্রাকৃতিক। এটি কোনো অধস্তনতার পরিচয় বহন করে না বা এতে তাঁকে দুর্বল ভাবার কারণ নেই। পুরুষ পেশিবহুল। ভারী কাজ করার ক্ষমতা রাখে। নারীর ক্ষমতা অন্তরীণ। সন্তান ধারণ, জন্মদান ও লালনের ক্ষমতাকে যাঁরা বড় করে দেখেন, তাঁরা নারীর বাহ্যিক গড়নকে নিজেদের শরীরের সঙ্গে তুলনায় আনা বোকামি ভাবেন। তাহলে যাঁরা সন্তান জন্ম দেন না বা পারেন না, তাঁরা কী ক্ষমতাহীন? তাহলে খনা বা জোয়ান অব আর্কের প্রজ্ঞাকে কী নামে অভিহিত করি? পাহাড়ি বা আদিবাসী সমাজে নারীরাই বেশি কর্মঠ। তার পরও কেবল নারী হওয়ার অযোগ্যতাতেই তাঁরা দমিত।

এককালে কায়িক পরিশ্রম দিয়ে মানুষের শক্তি-সামর্থ্য বিচার করা হতো। কিন্তু এখন অসির চেয়ে মসির মতো পেশির চেয়ে মস্তিষ্কের শক্তি বেশি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে দিনকে দিন। নারী-পুরুষনির্বিশেষে যোগ্যতা প্রমাণের সমান সুযোগ খুঁজে নিতে হবে। এখন সময় বুদ্ধিবৃত্তিতে যে বেশি যোগ্য, সে-ই ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’।

উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।

রাষ্ট্র ও রাজনীতি- বিএনপির ঘাড়ে সিন্দবাদের বুড়ো by আবদুল মান্নান

আরব্য রজনীর গল্পে আছে, সিন্দবাদ সাতটি সমুদ্রযাত্রা করেছিল। প্রতিটি যাত্রায় তার যত সব রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। সিন্দবাদের পঞ্চম যাত্রার গল্পে আছে, তার কাঁধে এক বুড়ো সওয়ার হয়েছিল।

পালাবদল- সংঘাতের কেন্দ্রে এশিয়ার নতুন নেতারা by পঙ্কজ মিশ্র

এশিয়ার শহরমুখী অভিবাসন ঘটাচ্ছে এক ‘ফাটানো পালাবদল’। কীভাবে এশিয়ায় ধনকুবের হওয়া যায়, তা নিয়ে পাকিস্তানি ঔপন্যাসিক মোহসিন হামিদ বই লিখেছেন।
সেখানে তিনি বলেছেন, ‘সহায়ক, সীমাবদ্ধ, স্থায়ী সম্পর্কের বন্ধন আলগা হয়ে জায়গা করে দিচ্ছে, জাগিয়ে তুলছে নিরাপত্তাহীনতা, উদ্বেগ, উৎপাদনশীলতা ও সম্ভাবনাকে।’

এশিয়াজুড়েই এই পালাবদলের রাজনৈতিক সম্ভাবনা ব্যাপক। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময় এর প্রথম দেখা মিলেছিল। সেখানে রেজা শাহ পাহলভির আমলে মহাসমারোহে দ্বিগুণ গতিতে নগরায়ণ করতে গিয়ে কৃষকেরা উচ্ছেদ হন। এই বিক্ষুব্ধ শ্রেণীটিকেই নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসে ইসলামি বিপ্লবীরা এবং তাঁরাই হন এদের প্রধান অনুগত ভিত্তি।
হাল আমলে জনসংখ্যার গঠনের রদবদলের সুফল নিয়ে ক্ষমতাসীন হয় তুরস্কের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি)। এর নেতা রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান প্রায় এক দশক অপ্রতিহত অবস্থানে দেশ শাসন করেন। থাইল্যান্ডের টেলিকম বিলিয়নিয়ার থাকসিন সিনাওয়াত্রার উত্থানের গল্পটাও এ রকমই। তিনি এর আগে উপেক্ষিত দুটি গোষ্ঠী: ব্যাংককের শহুরে গরিব আর উত্তর থাইল্যান্ডের বঞ্চিত গ্রামবাসীকে একতালে আলোড়িত করেন।
শহর এলাকা থেকে নতুন ধরনের মোহজাগানো রাজনীতিকের উত্থান ঘটেছে ইন্দোনেশিয়ায়ও। তিনি হলেন জাকার্তার গভর্নর জোকো উইদোদো। ভারতের নয়াদিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের উত্থানের চালিকাশক্তিও এই শহুরে নিম্নবর্গ। নতুন নেতাদের ব্যতিক্রমী অতীত পেশাদার রাজনীতিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ভোটারদের কাছে টেনেছে। জনপ্রিয়তার সুবাদে তাঁরাও পুরোনো পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক এবং জাত, ধর্ম ও আঞ্চলিকতাকে তেল-তোয়াজ করা এড়িয়ে যেতে পেরেছেন। এশিয়াজুড়ে সাবেকি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক এলিটদের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে; কখনো কখনো তাঁরা উৎখাতও হয়ে যাচ্ছেন। একেবারে নতুন সামাজিক যোগাযোগজাল, এনজিও-ধরনের তৎপরতা এবং মিডিয়াবান্ধব ঘষামাজা ইমেজ ও প্রতীক—যেমন কেজরিওয়ালের বেলায় গান্ধী টুপি—রাজনীতির বিকল্প পথ গড়ে নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ, ক্ষমতার দালাল ও ব্যবসায়ীদের গড়ে তোলা ভারসাম্য ভেঙে দিচ্ছে শহুরে শ্রমিক এবং চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণী।
এশিয়াজুড়ে ঘটে চলা এই নতুন ঘটনা যতই ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র’ অথবা ‘আমজনতা’ আবিষ্কারে উল্লসিত হোক না কেন, এ ফাটানো পরিবর্তনের অন্য দিকটির দিকে অনেকেরই নজর নেই। এটা জন্ম দিচ্ছে সংঘাতেরও বিস্ফোরণ। সর্বক্ষেত্রে অর্থনীতির গতি ধীর হয়ে আসা এই সংঘাতের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেমন বলা যায়, আমজনতার বিদ্রোহ এলিট মহলের তরফে পাল্টা-বিদ্রোহ উসকে দিচ্ছে। সাবেকি এলিটরা নিজের অবস্থান আপসে আপ ছেড়ে দেবে না। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বাইরে থেকে থাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে মধ্যবিত্তের ক্রোধ দেশটাকে অবশ এবং অর্থনীতিকে করে দিচ্ছে অবশ। যে এরদোয়ান একসময় তুরস্কের ওপর প্রায় ওসমানিয়া সাম্রাজ্যকালীন অধিরাজ হয়ে উঠেছিলেন, তাঁকে এখন বিরোধী জোটের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই বিরোধী জোট গঠিত হয়েছে মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী এবং সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক এলিটদের নিয়ে। ঠিক এ ধরনেরই একটা জোট থাকসিনকে নির্বাসিত করেছিল এবং এখন তাঁর বোনের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
দিল্লিতে কেজরিওয়ালের অপ্রত্যাশিত অর্জন সুনিশ্চিত হয়েছিল মধ্যবিত্ত এবং শহুরে গরিব ভোটারদের ঐক্যের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এ জোট কেজরিওয়ালের দিল্লির দপ্তরকে বেশি দিন শান্তিতে থাকতে দেবে বলে মনে হয় না। কারণ, মধ্যবিত্তরা চায় স্বচ্ছ ও দক্ষ সরকারি সেবা, অন্যদিকে সুবিধাবঞ্চিতরা চায় মৌলিক সামাজিক অধিকারের বাস্তবায়ন। দেখা যাচ্ছে, সংখ্যায় বৃহত্তর গরিব শ্রেণীই কেজরিওয়ালের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলোর লক্ষ্য।
ব্যাংককে থাকসিনের বোনের বিরুদ্ধে চলমান প্রতিবাদ দেখায় যে, দুই ধরনের গণতন্ত্রের মধ্যকার সংঘাতে একটি দেশ কেমন অচল হয়ে যেতে পারে। এই গণতন্ত্রগুলোর একটি গঠিত হয়েছে আগেকার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে, যারা চায় যে রাজনীতিবিদেরা তাদের ওপর ভর্তুকি, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধার ঝরনা ঝরান। অন্য পক্ষটি শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ঘিরে পাক খাচ্ছে। এরা জনমনকে খুশি করার কাজকারবার ঘৃণা করে, উঠে আসা সামাজিক শ্রেণীগুলোর রাজনৈতিক ভূমিকাকে ভয় পায়। এ ভয় থেকেই তাদের দৃষ্টিতে অদক্ষ সরকারের পতনের জন্য তারা মরিয়া।
ভারতে সাবেকি রাজনৈতিক আনুগত্য জাত-বর্ণের সংহতি এবং অন্যান্য ধরনের পরিচয় ও পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি দিয়ে কাটাকুটি হয়ে যাচ্ছে। দলিত, সাম্প্রদায়িক, আঞ্চলিক ও শ্রেণীসংঘাত যখন পরস্পরকে দুর্বল করায় ব্যস্ত, তখন দিল্লির মতো জায়গায় দুর্নীতি ও সুশাসনের মতো স্থানীয় ইস্যু সবকিছু ছাপিয়ে ওঠে। আর তাই কেজরিওয়ালকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জাত-সম্প্রদায়ের সনাতন ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর কাছে ধরনা দিতে হয়নি। তিনি সরাসরি সবার জন্য নাগরিক অধিকারের দাবি তুলেছেন। তবে অচিরেই তাঁর বামমনা সহকর্মী, মধ্যবিত্ত থেকে আসা স্বেচ্ছাসেবক কর্মী এবং নিচুতলার ভোটারদের মধ্যে বেসুরো মতাদর্শিক মতভেদ তৈরি হতে পারে।
গত সপ্তাহে কেজরিওয়াল আগের সরকারের আমলের মাল্টিব্র্যান্ড সুপারশপে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ বাতিল করেছেন। এটা খুদে দোকানদার ও ব্যবসায়ীদের খুশি করলেও আরও সচ্ছল ভোটারদের মনঃপূত হবে না। যেসব করপোরেশন সাততাড়াতাড়ি তাঁর রাজনৈতিক গতিধারার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে, এটা তাদেরও নাখোশ করবে। যেসব কায়েমি রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক আম আদমির রাজনৈতিক উত্থানে বেকায়দায় পড়ে গেছে, তারাও চাল দেওয়া শুরু করেছে। ইতিমধ্যে তারা জম্মু ও কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর উপস্থিতির মতো বিতর্কিত ইস্যুতে কেজরিওয়ালকে কথা বলার জন্য চাপ দিচ্ছে। নির্বাচিত রাজনীতিবিদেরা যতটা হানিমুন-সময় পান, সেটাও কেজরিওয়াল পাচ্ছেন না। জনতুষ্টিবাদী সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাপারে এঁদের আক্রমণের শিকার কেজরিওয়াল হরহামেশাই হচ্ছেন।
কার্যকর বামপন্থী দল না থাকার সুবিধা কেজরিওয়াল সাময়িকভাবে পাচ্ছেন। ভারতের কোনো বামপন্থী দলই সর্বভারতীয় স্তরে সামাজিক ক্ষোভ-বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক সংঘাতের ফায়দা নিতে সক্ষম নয়। এমনকি মৌলিক পরিবর্তনকামী রাজনীতিবিদেরাও নিজেদের সব আদর্শের প্রতি নিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করছেন। শাসকের বিরুদ্ধে শাসিতদের চালনা করে কেজরিওয়াল খুব আকর্ষণীয় ও সহজ রাজনৈতিক কর্মসূচি হাজির করেছেন।
অস্পষ্টতা কিংবা সবাইকে খুশি করার চেষ্টা রাজনীতির এক অনস্বীকার্য সম্পদ। কিন্তু সারা দেশের আগে অন্তত দিল্লিতে হলেও কেজরিওয়ালকে বিভক্ত রাজনৈতিক দৃশ্যপটের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিতেই হবে; যেখানে গ্রামীণ গরিব, শহরে অভিবাসিত পল্লির মানুষ এবং মধ্যবিত্তরা পরস্পরের সঙ্গে গা-ঘেঁষাঘেঁষি উত্তেজনার মধ্যে বাস করছে। আর এ চাপ ঘনীভূত হচ্ছে শ্রেণী ও বর্ণগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা অনিবার্য ও ক্রমবর্ধমান সংঘাতের পটভূমিতে।
গালফ নিউজ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ
পঙ্কজ মিশ্র: ভারতীয় লেখক ও ঔপন্যাসিক।

কালের পুরাণ- শেখ হাসিনার যোগ-বিয়োগ by সোহরাব হাসান

শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভায় আগের মন্ত্রিসভার ৫১ সদস্যের মধ্যে ৩৫ জনই বাদ পড়েছেন। ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভায় আগের মন্ত্রিসভার আছেন মাত্র ১৮ জন। বাকিরা সবাই নতুন।

অঘটন-উত্তর বোধোদয়, নাকি রাজনীতি?

ব্রিটেনে ইংরেজি শব্দ ‘হাইন্ডসাইট’ একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। বিশেষ করে রাজনীতিকদের কাছে। যখনই কোনো কৈফিয়তের প্রশ্ন আসে, তখনই তাঁরা এই শব্দটি ব্যবহার করে ‘কী করিলে কী হইত’-এর বিভিন্ন সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরে তাঁদের নিজেদের অক্ষমতা বা না পারার যৌক্তিকতা ব্যাখা করে থাকেন। বাংলা একাডেমির অভিধান এবং গুগল-এর অনুবাদ অনুযায়ী এর অর্থ হচ্ছে ‘সংঘটনের পর বোধোদয়’। এটি বাংলা প্রবাদ ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’র অনুরূপ। বাংলাদেশেও রাজনীতিক ও বিভিন্ন নাগরিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের দাবিদার গোষ্ঠীগুলো ক্রমেই  এই অঘটন-উত্তর বোধোদয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। তা না হলে বছর খানেক ধরে যে অঘটনের আশঙ্কা সবাই করছিলেন, তা ঠেকানোর কোনো চেষ্টাই কেন হয়নি? বরং মনে হয়, রাজনীতির খোরাক হিসেবে এই অঘটনকে পুঁজি করার জন্য এঁদের অধিকাংশই অপেক্ষায় ছিলেন। সাংবাদিকদের কলম অথবা ক্যামেরায় দেশের নানা জায়গায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার যেসব চিত্র উঠে এসেছে, তাতে কোথাও তো এসব ক্ষমতাধর রাজনীতিক, আমলা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাউকে নিপীড়িত-নির্যাতিতের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। অথচ, এখন তাঁরাই ডজন ডজন ক্যামেরার সামনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে সাহায্য দেওয়ার আয়োজন করছেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুষছেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় বেশ কিছু সরেজমিন প্রতিবেদন দেখছি। আর দেখছি মানববন্ধন, লংমার্চ এবং বক্তৃতা-বিবৃতি, যেগুলোর সবই অঘটনোত্তর প্রতিক্রিয়া।
অনেক দিন থেকেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য নির্বাচনকালীন মৌসুম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের ওপর হামলার বিষয়টি চরমে পৌঁছায় ২০০১ সালে। এর পর একমাত্র ব্যতিক্রম ২০০৯। এ ধরনের একটি সর্বজনবিদিত ঝুঁকি প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় রাজনীতিকদের উপেক্ষা করার কারণ নেই। অথচ সে রকমটিই ঘটেছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে এসব বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তেমন একটা চোখে পড়ছে না। হামলাকারী দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হলেও নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠানের, তাদের ব্যর্থতা কিংবা গাফিলতি অথবা সম্ভাব্য কোনো রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির বিষয়গুলো অনুসন্ধানে কারও কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। প্রধান দুই দল বা জোট বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করতে যতটা আগ্রহী, তার কারণ অনুসন্ধান, অপরাধীদের বিচার এবং ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি রোধের শিক্ষা গ্রহণে ততটাই উদাসীন। সুতরাং, এসব হামলার বিষয়ে ইউরোপীয় জনপ্রতিনিধিরা কিংবা বহির্বিশ্ব থেকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের যেসব আহ্বান জানানো হয়েছে, সেগুলো কেউ কানে তুলছেন না। রাজনৈতিক কারণ না থাকলে এ ধরনের তদন্তে সরকারের অনাগ্রহের কোনো কারণ থাকার কথা নয়। নাগরিক গোষ্ঠীগুলোর গণতদন্ত কমিশনের মতো বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণেও তো কোনো বাধা দেখি না। তদন্তে মাঠপর্যায়ে হামলাগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি বৃহত্তর পরিসরে অন্য যেসব বিষয় নজর দেওয়া প্রয়োজন সেগুলো হলো—নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, প্রশাসন, অন্তর্বর্তী সরকার এবং মানবাধিকার কমিশনের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা।
১. নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশ্নবিদ্ধ। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন স্পষ্ট করেই বলেছেন যে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, অন্য কারও নয় (‘নির্বাচন কমিশন দায় এড়াতে পারে না’, প্রথম আলো, ১১ জানুয়ারি)। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার একজন অভিজ্ঞ প্রশাসক। অতীতে সচিবের দায়িত্ব পালনের কারণে বেসামরিক নিরাপত্তা বাহিনীর কাজের ধরন, রীতিনীতি, প্রটোকল তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। কমিশনারদের মধ্যে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাও আছেন, যাঁর ব্রিগেড পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সুতরাং, জাতীয় নির্বাচনের মতো একটা বিশাল আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা প্রয়োজনীয় অনুশীলন করেননি এমনটা ভাবা দুষ্কর। যেকোনো নির্বাচন আয়োজনের আগে সেই নির্বাচনে সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণের একটি বিষয় থাকে। স্বভাবতই তাই প্রশ্ন উঠছে যে কমিশন কি সেসব ঝুঁকি নির্ধারণ করেছিল, নাকি সেগুলো উপেক্ষা করেছে? নাকি ঝুঁকি নির্ধারণের পর তা মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে? কমিশনের তরফ থেকে সংখ্যালঘুদের বিপদ এবং তা মোকাবিলার বিষয়ে কী ধরনের প্রস্তুতি বা নির্দেশনা ছিল? আর, প্রশাসনের ওপরই বা কমিশন কতটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল?
২. মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব যেহেতু পুলিশের, সেহেতু তাদের ভূমিকাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। জানা দরকার যে নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচনোত্তর সময়ে পুলিশের প্রতি কী ধরনের নির্দেশনা ছিল? সংখ্যালঘুদের বসতিগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না থেকে থাকলে কেন ছিল না? পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে মোতায়েনের সময় তাদের অপারেশনাল গাইডলাইন কি দেওয়া হয়েছিল? কে বা কারা এসব নির্দেশনা দিয়েছিলেন? অপারেশনের নিয়ন্ত্রণ কার কাছে ছিল? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নাকি নির্বাচন কমিশনের কাছে? নাকি পুলিশ নিজেদের মতো স্বাধীনভাবে তা পরিচালনা করেছে? সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল কি না? এসব নির্দেশনা নথিভুক্ত থাকার কথা। সেগুলো পর্যালোচনা করলেই জানা সম্ভব যে তাদের প্রতি এমন কোনো নির্দেশনা ছিল কি না যে নির্বাচনবিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সামাল দিতে হবে, অথবা প্রার্থী ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দেওয়াই তাদের প্রধান কাজ। বিরোধী জোটের নির্বাচন বর্জন এবং প্রতিরোধের ঘোষণা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়তি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল এ কথা সত্য। কিন্তু সেই কারণে সমাজে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকা জনগোষ্ঠী, যাদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিদেশিরাও আগাম সর্তকবার্তা দিয়েছে, তারা কীভাবে উপেক্ষিত হলো তা বোঝা মুশকিল।
৩. এরপর মাঠ প্রশাসনের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশেষ করে যেসব জেলায় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে সাতক্ষীরা, যশোর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও রংপুরের কথা বলা যায়, যেসব জেলায় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর থেকেই জামায়াত-শিবির একধরনের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। নির্বাচনের মতো বড় আয়োজনের প্রাক্কালে জেলা পর্যায়ে একাধিক প্রশাসনিক প্রস্তুতি সভা হয়ে থাকে। সময়ে সময়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি নামক একটি কমিটিরও সভা হয়ে থাকে। সেসব সভায় সংখ্যালঘুদের ঝুঁকি এবং তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে কী আলোচনা হয়েছিল? নাকি তা উপেক্ষিত থেকেছে? কেন্দ্রীয়ভাবে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে কী ধরনের নির্দেশনা ছিল? এসব নির্দেশনা কোত্থেকে এসেছে? নির্বাচন কমিশন নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের কাছ থেকে?
৪. নির্বাচনকালীন সরকারের যেসব প্রকাশ্য কার্যকলাপ দৃশ্যমান ছিল, সেগুলো নাটকীয়তায় সরেস হলেও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসকে কলুষিত করেছে সন্দেহ নেই। নিরাপত্তা বাহিনী এবং সেনাবাহিনীর হাসপাতাল ব্যবহূত হয়েছে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে। র‌্যাবের গাড়িতে করে জেনারেল এরশাদকে হাসপাতালে নেওয়ার দৃশ্য দেখে অনেকেই বলতে শুরু করেছিলেন যে কারও হার্ট অ্যাটাক হলে অ্যাম্বুলেন্সের বদলে র‌্যাবকে ফোন করা উচিত, তাহলেই দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া যাবে। নিরাপত্তার নামে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে কার্যত গৃহবন্দী করা, হরেদরে বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার, এগুলো সামাল দিতে সরকার যতটা তৎপর ছিল, তাতে করে ঝুঁকিতে থাকা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দিকে তাদের নজর দেওয়ার সময় কোথায়? সে কারণেই যেসব এলাকায় এসব সহিংসতা হয়েছে, সেসব জায়গার স্থানীয় রাজনীতিক এবং সরকারের পরিকল্পনা কিছু ছিল কি না সেটাও বিশেষভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর উদ্বেগ এবং দাবির মুখে লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম এবং বিএনপির নেতা এম কে আনোয়ার ২০১২ সালের ডিসেম্বরেই অঙ্গীকার করেছিলেন যে ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলায় তাঁরা একযোগে কাজ করবেন। নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের তোড়ে সেই সহযোগিতা ভেসে গেলেও সরকার তার দায়িত্ব এড়াতে পারে না। নির্বাচনী সহিংসতার ক্ষেত্রে ৫ জানুয়ারির একতরফা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন নতুন রেকর্ড করেছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে।
আর এই সহিংসতার একটা বড় ক্ষত বহন করছে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। এ ক্ষেত্রে হতাহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী হতে পারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। কমিশনের চেয়ারম্যান ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করে নির্যাতনের শিকার লোকজনের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটা ভালো উদাহরণ। রাষ্ট্রের অন্তত একটি প্রতিষ্ঠান কিছুটা হলেও নৈতিক দায় স্বীকার করেছে। কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইনে কমিশনকে যে ক্ষমতা দেওয়া আছে তার সদ্ব্যবহার করে তাদের উচিত হবে অচিরেই একটি ব্যাপকভিত্তিক তদন্ত শুরু করা। সময় চলে গেলে অনেক স্মৃতিই ফিকে হয়ে যাবে, সাক্ষী হারিয়ে যাবেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্ট হবে। আইন তাদের যে ক্ষমতা দিয়েছে, সেই ক্ষমতার বলে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের নথিপত্র তলব করার এখতিয়ার মানবাধিকার কমিশনের রয়েছে। সুতরাং, সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র কেন ব্যর্থ হলো, তার কারণ উদ্ঘাটনের জন্য আশা করি কমিশন আরেকটু সাহসী হবে। মাঠ পর্যায়ের অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়দায়িত্ব নির্ধারণে বৃহত্তর তদন্ত ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি রোধের জন্যই বেশি প্রয়োজন। শুধু ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন, পরিবার এবং সম্পদের ওপর হামলা হবে, রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হবে, অথচ দায়িত্বহীনতার জন্য কারও শাস্তি হবে না—এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান প্রয়োজন।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

স্কুলে পুলিশ ক্যাম্প

রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে গত বছর নানা সময়ে চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে, শুরু হয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষ। কিন্তু ঠাকুরগাঁও জেলার গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন এখনো স্বাভাবিক হতে পারছে না। স্কুলটি এখন পুলিশ ক্যাম্প, ফলে ক্লাস ও পাঠদান সবই বন্ধ! গত বছর ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন বছরের শুরুতে নতুন উদ্যমে পাঠদান শুরুর বিষয়টিই ছিল প্রত্যাশিত। শিক্ষার্থীরা নতুন বইও পেয়েছে, কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকায় এই স্কুলটি শিক্ষার্থীদের জীবনে গত বছরের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন ক্ষতি। স্কুলটিকে পুলিশ ক্যাম্প বানানোর পেছনে বাস্তব কারণ রয়েছে। ভোটের দিন বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হওয়া স্কুলটি। আর ভোটের পর সেই একই গোষ্ঠীর হামলার শিকার হয় কাছাকাছি এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের দোকান ও বাড়িঘর। এ নিয়ে সংঘাত-সহিংসতায় একজনের প্রাণহানিও ঘটেছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয় স্কুলটিতে।
শিক্ষা না নিরাপত্তা—এ বিবেচনায় সম্ভবত নিরাপত্তার বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনও তো এভাবে দিনের পর দিন নষ্ট করার সুযোগ নেই। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষার দিকটিকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এখন প্রতিযোগিতামূলক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ক্লাস বন্ধ থাকায় এই বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে। স্কুলটি খোলা রেখে কীভাবে সে অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা যায় বা বিকল্প হিসেবে কোথায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা যায়, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের মনোযোগ প্রত্যাশা করছি। আর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ভার শুধু প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ছেড়ে না দিয়ে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কেও অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।

বিএনপির ঘাড়ে সিন্দবাদের বুড়ো

আরব্য রজনীর গল্পে আছে, সিন্দবাদ সাতটি সমুদ্রযাত্রা করেছিল। প্রতিটি যাত্রায় তার যত সব রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। সিন্দবাদের পঞ্চম যাত্রার গল্পে আছে, তার কাঁধে এক বুড়ো সওয়ার হয়েছিল। বুড়ো আবার কাঁধে এমন প্যাঁচ কষে বসেছিল যে সিন্দবাদ বস্তুতপক্ষে বুড়োর ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল। শেষে সিন্দবাদ বিশেষ সুরা তৈরি করে বুড়োকে পান করিয়ে তাকে হত্যা করে। সিন্দবাদ তো বুড়ো থেকে নিস্তার পেতে একটা উপায় বের করেছিল। কারণ, সে বুড়োর জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বিএনপির ঘাড়ে জামায়াত নামের যে বুড়ো বা দৈত্যটি গেড়ে বসেছে, সবার প্রশ্ন, তার কী হবে? কারণ, বিএনপি নামের সিন্দবাদ তো এই দৈত্যটিকে বধ করতে নারাজ। বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান সম্পর্ক অনেকটা দুজন দুজনার মতো। অবশ্য এর আগে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, বিএনপি-জামায়াত একই মায়ের পেটের দুই ভাই। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে সাম্প্রতিক কালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির যে রাজনৈতিক বিপর্যয়, তার প্রধান কারণ জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি আর দেশ ও সম্পদ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড, যা দেড় বছর ধরে চলে আসছে। আন্দোলনের নামে তাদের মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো ভয়ানক অমানবিক কর্মকাণ্ড বিএনপির অনেক গোঁড়া সমর্থককেও বিএনপিবিমুখ করেছে।
কদিন আগে দায়িত্বশীল বিএনপি ঘরানার এক সরকারি কর্মকর্তা আমাকে বলেছেন, জামায়াতের খপ্পরে পড়ে বিএনপি নিজের পাকা ধানে মই দিয়েছে। নির্বাচনের আগে অনেকে তাদের ধারণা দিয়েছিল, নির্বাচনে অংশ নিলে ভালো করবে, এমনকি হয়তো সরকারও গঠন করতে পারে। কিন্তু জামায়াত নির্বাচনে যাওয়া থেকে বিএনপিকে বিরত রাখতে পেরেছে। কারণ, বিএনপির ‘আন্দোলন’ আর জামায়াতের ‘আন্দোলন’ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে। বিএনপি চাইছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দশম সংসদ নির্বাচন আর জামায়াতের উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো উপায়ে মহাজোট সরকারকে উৎখাত করে বিএনপির সঙ্গে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বানচাল করা। এই দুটি দলই আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকে সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক অক্ষমতা আর দুর্বলতা আছে, কিন্তু আওয়ামী লীগের এখনো একটি রাজনৈতিক চরিত্র আছে আর আছেন তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা। অনেকেই আওয়ামী লীগের মতাদর্শের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু এই দুই দলের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, বিএনপির তেমন রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই। তারা বুঝতে পারে না, সাধারণ মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি সচেতন।
লক্ষ করলে, বেগম জিয়ার চারপাশে, যাঁরা তাঁকে সব সময় ঘিরে থাকেন, তাঁরা প্রায় সবাই সাবেক সামরিক-বেসামরিক আমলা। তাঁরা গুলশানের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের আলো-আঁধারে বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করেন। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। বিএনপির এই নেতারা মিডিয়ার সামনে এলে, আধো ইংরেজি আধো বাংলায়, যা জনমানুষের কাছে দুর্ভেদ্য, তেমন ভাষায় কথা বলেন। আর সরকার অফেন্সিভে গেলে আত্মগোপন করেন। নির্বাচনের আগে তাঁরা ভিডিওবার্তার সাহায্যে আন্দোলন পরিচালনা করার নতুন সংস্কৃতি চালু করেছেন। শুধু দেশের ভেতর থেকেই আন্দোলনের এমন আহ্বান আসছে, তা-ই নয়, দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকেও আন্দোলনের এমন বার্তা পাঠাচ্ছেন। যে রাজনৈতিক দল এমন নেতাদের ওপর ভর করে সরকারবিরোধী রাজনীতি করতে চায়, তারা বোকার স্বর্গে বাস করে। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সমালোচকেরা তাদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উত্থাপন করেন, কিন্তু তারা যে একটি সন্ত্রাসী দল, তেমন অভিযোগ একটাও নেই।
মিছিল করে যাওয়ার সময় তারা দু-চারটি গাড়িতে আগুন দেয়, পুলিশের সঙ্গে মারদাঙ্গায় লিপ্ত হয় অথবা কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ছাত্রশিবিরের মতো বলা যাবে না তারা গণহারে প্রতিপক্ষের রগ কাটে, গলা কেটে মানুষ হত্যা করে অথবা নির্বিচারে সংখ্যালঘু আর আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাড়ি বা গ্রামে আগুন দেয়। এযাবৎ ছাত্রশিবির যত সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে, তার অধিকাংশই ছিল ছাত্রদলের সঙ্গে। আমার আগের কর্মক্ষেত্রে জিয়া পরিষদের সভাপতি ড. এনামুল হকের ছেলে মুসাকে তো ওরা পিটিয়েই মেরে ফেলেছিল। ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আবদুল হামিদ ছাত্রদল ছেড়ে এরশাদের ছাত্রসমাজে যোগ দিয়েছিল। তাঁর হাতের কবজি কেটে কিরিচের মাথায় গেঁথে শিবির ভরদুপুরে ক্যাম্পাসে মিছিল করেছিল। তাঁর অপরাধ ছিল, তিনি শিবিরের রাজনীতির একজন বড় বিরুদ্ধবাদী ছিলেন। ড. কাজী আহম্মদ নবী মনেপ্রাণে জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী। তাঁর একমাত্র ছেলে মুসফিক প্রগতিশীল রাজনীতিতে নতুন দীক্ষা নিয়েছেন। এক গুলিতেই তাঁকে শেষ করে দিল শিবিরের সন্ত্রাসীরা। হেলালি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। ছাত্রদলের নেতা। তাঁকে ১০ জনে টেবিলের ওপর চেপে ধরে চোখ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। সময়মতো শিক্ষকেরা সেখানে হাজির না হলে হেলালি এখন অন্ধ হয়ে হয়তো বেঁচে থাকতেন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনয়নে সংসদ নির্বাচন করেছেন। ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আর রাজশাহী মেডিকেল কলেজে যখন শিবির ছাত্রদলের ওপর হামলা করে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল, তখন ক্ষমতায় বেগম জিয়া। তিনি কিন্তু তাঁর দলের আহত সদস্যদের একবারও দেখতে যাননি, গিয়েছিলেন সে সময়কার সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনা। দুই নেত্রীর মধ্যে এটাই তফাত। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বেগম জিয়ার অনেক সমর্থক আর উপদেষ্টা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি শক্তিশালী দেশের এক কূটনীতিককে বাংলাদেশে তাঁদের রাজনৈতিক চালের বিপর্যয়ের কারণে নিজ দেশ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ২০০৬ সালেও ঠিক তেমনটি ঘটেছিল। বিদেশিরা এখন বলছে, বেগম জিয়াকে জামায়াতের সংস্পর্শ ছাড়তে হবে। এত দিনে তারা উপলব্ধি করেছে, জামায়াত একটি সন্ত্রাসী সংগঠন, কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এই দেশগুলোই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিল, ‘জামায়াত একটি উদারপন্থী রাজনৈতিক দল’। কিন্তু তারা বললেই তো আর বেগম জিয়া বা বিএনপি জামায়াতকে ছাড়তে পারবে না। অদৃশ্য কারণে বিএনপির রাজনীতি জামায়াতের কাছে বাঁধা রয়েছে বলে বিশ্বাস। সোমবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি তাদের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জনসভা করল। প্রথমে শোনা গিয়েছিল, এটি ১৮ দলের জনসভা।
পরে জানা গেল, এটি বিএনপির জনসভা। জামায়াতকে নাকি সভায় আসতে নিষেধও করা হয়েছিল। জামায়াত এসেছিল, কিন্তু ব্যানার ছাড়া। সঙ্গে ছিলেন হেফাজতের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী। মঞ্চেও জামায়াতের নেতারা ছাড়া শরিক দলগুলোর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রামেও অনুরূপ একটি সমাবেশ হয়েছিল এবং সেখানে মঞ্চে জামায়াতের নেতারা বক্তব্য দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক মঞ্চে জামায়াতকে দেখে আর মঞ্চে ওঠেননি। নিচে বসে তাঁর ছাত্রদের বলেছেন, এখনো যদি বিএনপির বোধোদয় না হয়, তাহলে তাদের ভবিষ্যতে ভালো তো কিছু দেখি না। বেগম জিয়ার সব উপদেষ্টা হিসেবে সামরিক-বেসামরিক আমলা ছাড়াও আছেন বেশ কিছু আইনজীবী নতুবা বাস্তব জীবন-জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু বুদ্ধিজীবী আর সুশীল ব্যক্তি। একজন আইনজীবী সেদিন জানান, সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে শতভাগ লাভ বিএনপির। কারণ, জামায়াতের সবাই কাতারবন্দী হয়ে বিএনপিতে যোগ দেবে। এই না হলে উপদেষ্টা। তিনি বুঝতে পারেননি অথবা বুঝতে চাননি, জামায়াত হচ্ছে একটি ভাইরাস। দেহে প্রবেশ করলে দেহটাকে ধ্বংস করে দেবে। জামায়াত যদি বিএনপির সঙ্গে একীভূত হয়, তাহলে বিএনপিও যে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হয়ে উঠবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। কোনো কোনো বিএনপি-সমর্থক পেশাজীবী বিএনপিকে বাহবা দিচ্ছেন এই বলে, তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নাকি মানুষ ৫ জানুয়ারি ভোট দিতে যাননি। তাঁরাও বিএনপির ৫ শতাংশ ভোট-তত্ত্বে বিশ্বাস করেন
 ৫ জানুয়ারি অনেক কেন্দ্রে ভোট কম পড়েছে সত্য, কিন্তু তা স্রেফ বেগম জিয়া বা বিএনপির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘটেছে, তা বিশ্বাস করা চরম আহাম্মকি। যে মাত্রায় সহিংসতা নির্বাচনের আগের কয়েক দিন হয়েছে, তাতে স্বাভাবিকভাবে মানুষ ভোট দিতে যাবে, তা তো আশা করা যায় না। বেগম জিয়ার এসব সর্বনাশা সমর্থক গোষ্ঠী তাঁকে মনে করিয়ে দেয়নি, নির্বাচনের আগের রাতে যদি ২০০ স্কুল, মাদ্রাসা আর কলেজ ভোটকেন্দ্র হওয়ার ‘অপরাধে’ জামায়াত-বিএনপির দুর্বৃত্তরা আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয়, তাহলে সেসব কেন্দ্রে কোন ভরসায় ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন? ২০০৮ সালের নির্বাচনে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এককভাবে ৪২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। নির্দয়ভাবে এখান থেকে ৫ থেকে ৭ শতাংশ ভোট ছাঁটাই করলেও আওয়ামী লীগের একেবারে ‘দলকানা’ ভোটার ৩২ থেকে ৩৫ শতাংশ। নির্বাচন ঠেকানোর নামে বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা সারা দেশে এই ভয়াবহ তাণ্ডব না চালালে আওয়ামী লীগ কমপক্ষে এই ভোটগুলো তো পেত। যদি নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ৪০ শতাংশ হিসাব বিশ্বাস না করেন, তাই বলে ৫ শতাংশ বিশ্বাস করতে হবে কেন? বিএনপির কাঁধ থেকে জামায়াত নামের সিন্দবাদের সেই দৈত্য বা বুড়োটাকে তারা নামাবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এককভাবে তাদের। কিন্তু দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে হলে দেশে একাধিক সুস্থধারার রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। তেমনই একটি দল হিসেবে বিএনপি নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। তাদের উপলব্ধি করতে হবে, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে পাঁচ বছরের আগে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষমতা তাদের নেই। আওয়ামী লীগ অন্য চিন্তা করলে ভিন্ন কথা। বাস্তববাদী হওয়া মঙ্গল।
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

নারীর প্রতি সহিংসতা- ‘যোগ্যতমের উদবর্তন’ by উম্মে মুসলিমা

নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ হলো নারীকে দ্বিতীয় লিঙ্গ বা অধস্তন হিসেবে বিবেচনা। ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’-এর সংজ্ঞার মধ্যে নারীও অন্তর্ভুক্ত। যোগ্যদেরই বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

বিশ্বায়নের কাল- অঘটন-উত্তর বোধোদয়, নাকি রাজনীতি? by কামাল আহমেদ

ব্রিটেনে ইংরেজি শব্দ ‘হাইন্ডসাইট’ একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। বিশেষ করে রাজনীতিকদের কাছে। যখনই কোনো কৈফিয়তের প্রশ্ন আসে, তখনই তাঁরা এই শব্দটি ব্যবহার করে ‘কী করিলে কী হইত’-এর বিভিন্ন সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরে তাঁদের নিজেদের অক্ষমতা বা না পারার যৌক্তিকতা ব্যাখা করে থাকেন।
বাংলা একাডেমির অভিধান এবং গুগল-এর অনুবাদ অনুযায়ী এর অর্থ হচ্ছে ‘সংঘটনের পর বোধোদয়’। এটি বাংলা প্রবাদ ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’র অনুরূপ। বাংলাদেশেও রাজনীতিক ও বিভিন্ন নাগরিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের দাবিদার গোষ্ঠীগুলো ক্রমেই

এই অঘটন-উত্তর বোধোদয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। তা না হলে বছর খানেক ধরে যে অঘটনের আশঙ্কা সবাই করছিলেন, তা ঠেকানোর কোনো চেষ্টাই কেন হয়নি? বরং মনে হয়, রাজনীতির খোরাক হিসেবে এই অঘটনকে পুঁজি করার জন্য এঁদের অধিকাংশই অপেক্ষায় ছিলেন।

সাংবাদিকদের কলম অথবা ক্যামেরায় দেশের নানা জায়গায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার যেসব চিত্র উঠে এসেছে, তাতে কোথাও তো এসব ক্ষমতাধর রাজনীতিক, আমলা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাউকে নিপীড়িত-নির্যাতিতের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। অথচ, এখন তাঁরাই ডজন ডজন ক্যামেরার সামনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে সাহায্য দেওয়ার আয়োজন করছেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুষছেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় বেশ কিছু সরেজমিন প্রতিবেদন দেখছি। আর দেখছি মানববন্ধন, লংমার্চ এবং বক্তৃতা-বিবৃতি, যেগুলোর সবই অঘটনোত্তর প্রতিক্রিয়া।

অনেক দিন থেকেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য নির্বাচনকালীন মৌসুম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের ওপর হামলার বিষয়টি চরমে পৌঁছায় ২০০১ সালে। এর পর একমাত্র ব্যতিক্রম ২০০৯। এ ধরনের একটি সর্বজনবিদিত ঝুঁকি প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় রাজনীতিকদের উপেক্ষা করার কারণ নেই। অথচ সে রকমটিই ঘটেছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে এসব বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তেমন একটা চোখে পড়ছে না। হামলাকারী দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হলেও নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠানের, তাদের ব্যর্থতা কিংবা গাফিলতি অথবা সম্ভাব্য কোনো রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির বিষয়গুলো অনুসন্ধানে কারও কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। প্রধান দুই দল বা জোট বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করতে যতটা আগ্রহী, তার কারণ অনুসন্ধান, অপরাধীদের বিচার এবং ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি রোধের শিক্ষা গ্রহণে ততটাই উদাসীন। সুতরাং, এসব হামলার বিষয়ে ইউরোপীয় জনপ্রতিনিধিরা কিংবা বহির্বিশ্ব থেকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের যেসব আহ্বান জানানো হয়েছে, সেগুলো কেউ কানে তুলছেন না। রাজনৈতিক কারণ না থাকলে এ ধরনের তদন্তে সরকারের অনাগ্রহের কোনো কারণ থাকার কথা নয়। নাগরিক গোষ্ঠীগুলোর গণতদন্ত কমিশনের মতো বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণেও তো কোনো বাধা দেখি না।

তদন্তে মাঠপর্যায়ে হামলাগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি বৃহত্তর পরিসরে অন্য যেসব বিষয় নজর দেওয়া প্রয়োজন সেগুলো হলো—নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, প্রশাসন, অন্তর্বর্তী সরকার এবং মানবাধিকার কমিশনের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা।

১. নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশ্নবিদ্ধ। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন স্পষ্ট করেই বলেছেন যে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, অন্য কারও নয় (‘নির্বাচন কমিশন দায় এড়াতে পারে না’, প্রথম আলো, ১১ জানুয়ারি)। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার একজন অভিজ্ঞ প্রশাসক। অতীতে সচিবের দায়িত্ব পালনের কারণে বেসামরিক নিরাপত্তা বাহিনীর কাজের ধরন, রীতিনীতি, প্রটোকল তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। কমিশনারদের মধ্যে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাও আছেন, যাঁর ব্রিগেড পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সুতরাং, জাতীয় নির্বাচনের মতো একটা বিশাল আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা প্রয়োজনীয় অনুশীলন করেননি এমনটা ভাবা দুষ্কর। যেকোনো নির্বাচন আয়োজনের আগে সেই নির্বাচনে সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণের একটি বিষয় থাকে। স্বভাবতই তাই প্রশ্ন উঠছে যে কমিশন কি সেসব ঝুঁকি নির্ধারণ করেছিল, নাকি সেগুলো উপেক্ষা করেছে? নাকি ঝুঁকি নির্ধারণের পর তা মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে? কমিশনের তরফ থেকে সংখ্যালঘুদের বিপদ এবং তা মোকাবিলার বিষয়ে কী ধরনের প্রস্তুতি বা নির্দেশনা ছিল? আর, প্রশাসনের ওপরই বা কমিশন কতটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল?

২. মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব যেহেতু পুলিশের, সেহেতু তাদের ভূমিকাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। জানা দরকার যে নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচনোত্তর সময়ে পুলিশের প্রতি কী ধরনের নির্দেশনা ছিল? সংখ্যালঘুদের বসতিগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না থেকে থাকলে কেন ছিল না? পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে মোতায়েনের সময় তাদের অপারেশনাল গাইডলাইন কি দেওয়া হয়েছিল? কে বা কারা এসব নির্দেশনা দিয়েছিলেন? অপারেশনের নিয়ন্ত্রণ কার কাছে ছিল? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নাকি নির্বাচন কমিশনের কাছে? নাকি পুলিশ নিজেদের মতো স্বাধীনভাবে তা পরিচালনা করেছে? সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল কি না? এসব নির্দেশনা নথিভুক্ত থাকার কথা। সেগুলো পর্যালোচনা করলেই জানা সম্ভব যে তাদের প্রতি এমন কোনো নির্দেশনা ছিল কি না যে নির্বাচনবিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সামাল দিতে হবে, অথবা প্রার্থী ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দেওয়াই তাদের প্রধান কাজ। বিরোধী জোটের নির্বাচন বর্জন এবং প্রতিরোধের ঘোষণা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়তি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল এ কথা সত্য। কিন্তু সেই কারণে সমাজে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকা জনগোষ্ঠী, যাদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিদেশিরাও আগাম সর্তকবার্তা দিয়েছে, তারা কীভাবে উপেক্ষিত হলো তা বোঝা মুশকিল।

৩. এরপর মাঠ প্রশাসনের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশেষ করে যেসব জেলায় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে সাতক্ষীরা, যশোর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও রংপুরের কথা বলা যায়, যেসব জেলায় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর থেকেই জামায়াত-শিবির একধরনের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। নির্বাচনের মতো বড় আয়োজনের প্রাক্কালে জেলা পর্যায়ে একাধিক প্রশাসনিক প্রস্তুতি সভা হয়ে থাকে। সময়ে সময়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি নামক একটি কমিটিরও সভা হয়ে থাকে। সেসব সভায় সংখ্যালঘুদের ঝুঁকি এবং তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে কী আলোচনা হয়েছিল? নাকি তা উপেক্ষিত থেকেছে? কেন্দ্রীয়ভাবে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে কী ধরনের নির্দেশনা ছিল? এসব নির্দেশনা কোত্থেকে এসেছে? নির্বাচন কমিশন নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের কাছ থেকে?

৪. নির্বাচনকালীন সরকারের যেসব প্রকাশ্য কার্যকলাপ দৃশ্যমান ছিল, সেগুলো নাটকীয়তায় সরেস হলেও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসকে কলুষিত করেছে সন্দেহ নেই। নিরাপত্তা বাহিনী এবং সেনাবাহিনীর হাসপাতাল ব্যবহূত হয়েছে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে। র‌্যাবের গাড়িতে করে জেনারেল এরশাদকে হাসপাতালে নেওয়ার দৃশ্য দেখে অনেকেই বলতে শুরু করেছিলেন যে কারও হার্ট অ্যাটাক হলে অ্যাম্বুলেন্সের বদলে র‌্যাবকে ফোন করা উচিত, তাহলেই দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া যাবে। নিরাপত্তার নামে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে কার্যত গৃহবন্দী করা, হরেদরে বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার, এগুলো সামাল দিতে সরকার যতটা তৎপর ছিল, তাতে করে ঝুঁকিতে থাকা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দিকে তাদের নজর দেওয়ার সময় কোথায়? সে কারণেই যেসব এলাকায় এসব সহিংসতা হয়েছে, সেসব জায়গার স্থানীয় রাজনীতিক এবং সরকারের পরিকল্পনা কিছু ছিল কি না সেটাও বিশেষভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর উদ্বেগ এবং দাবির মুখে লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম এবং বিএনপির নেতা এম কে আনোয়ার ২০১২ সালের ডিসেম্বরেই অঙ্গীকার করেছিলেন যে ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলায় তাঁরা একযোগে কাজ করবেন। নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের তোড়ে সেই সহযোগিতা ভেসে গেলেও সরকার তার দায়িত্ব এড়াতে পারে না।

নির্বাচনী সহিংসতার ক্ষেত্রে ৫ জানুয়ারির একতরফা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন নতুন রেকর্ড করেছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে। আর এই সহিংসতার একটা বড় ক্ষত বহন করছে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। এ ক্ষেত্রে হতাহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী হতে পারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। কমিশনের চেয়ারম্যান ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করে নির্যাতনের শিকার লোকজনের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটা ভালো উদাহরণ। রাষ্ট্রের অন্তত একটি প্রতিষ্ঠান কিছুটা হলেও নৈতিক দায় স্বীকার করেছে। কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইনে কমিশনকে যে ক্ষমতা দেওয়া আছে তার সদ্ব্যবহার করে তাদের উচিত হবে অচিরেই একটি ব্যাপকভিত্তিক তদন্ত শুরু করা। সময় চলে গেলে অনেক স্মৃতিই ফিকে হয়ে যাবে, সাক্ষী হারিয়ে যাবেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্ট হবে। আইন তাদের যে ক্ষমতা দিয়েছে, সেই ক্ষমতার বলে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের নথিপত্র তলব করার এখতিয়ার মানবাধিকার কমিশনের রয়েছে। সুতরাং, সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র কেন ব্যর্থ হলো, তার কারণ উদ্ঘাটনের জন্য আশা করি কমিশন আরেকটু সাহসী হবে। মাঠ পর্যায়ের অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়দায়িত্ব নির্ধারণে বৃহত্তর তদন্ত ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি রোধের জন্যই বেশি প্রয়োজন। শুধু ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন, পরিবার এবং সম্পদের ওপর হামলা হবে, রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হবে, অথচ দায়িত্বহীনতার জন্য কারও শাস্তি হবে না—এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান প্রয়োজন।

কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

দিল্লির আম আদমি দলের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ

দিল্লিতে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল আম আদমি পার্টির বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ তুলে নারীদের বিক্ষোভ করেছেন নারীরা। মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নজিরবিহীন বিক্ষোভ শেষ হতে না হতেই ওই ঘটনায় ধর্নাকারীদের বিরুদ্ধে দু’ দুটি এফআইআর দাখিল করেছে দিল্লি পুলিশ।

প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট থাকবেন এরশাদ

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হওয়ার পর বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, দূত হিসেবে বিশেষ কোন সুবিধা নিতে চান না তিনি। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে প্রাপ্য সুবিধা নিয়েই তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করার পর বৃহস্পতিবার দীর্ঘ বিবৃতি পাঠিয়েছেন এরশাদ । এতে তিনি বলেন, বিগত দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে মুছে ফেলে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার উপর একটি গুরু দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। তার জন্য আমি কৃতজ্ঞতা জানাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। অতীতের যত গ¬ানি ভুলে গিয়ে গৌরবময় অধ্যায়কে পথ ও পাথেয় হিসাবে ধরে নিয়ে আমাদের আগামী দিনের পথ চলা শুরু করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই চলার পথে আমাকে যে সহযাত্রীরূপে সাথে নিয়েছেন- আমি তার মর্যাদা রক্ষা করতে সদা সচেষ্ট থাকবো। জাতির স্বার্থে এবং দেশের ভাবমূর্তি সমুন্নুত রাখার জন্য আমি নিবেদিতভাবে কাজ করে যাবার চেষ্টা করবো।

এরশাদ বলেন, রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দেশের ভাবমূর্তির বিরাট ক্ষতি হয়েছে। জনশক্তি রপ্তানি, তৈরী পোশাক শিল্প খাত, বিদেশী বিনিয়োগ, বাংলাদেশের উপর বহিঃর্বিশ্বের আস্থাÑ ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমরা হুমকির মুখে পড়েছি। বিগত সরকার আমলের ব্যাপক অগ্রগতি ও উন্নয়ন কর্মকান্ডের পরেও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য জনগণের মধ্যে চরম হতাশার সৃষ্টি হয়। আমার বিশ্বাস অচিরেই সেই হতাশা কেটে যাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে আমার প্রথম এবং প্রধান কাজ হবে একটি আধুনিক মুসলিম প্রধান গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সু-মহান ভাবমূর্তি বিশ্ব দরবারে পেঁৗঁছে দেওয়া। বাংলাদেশ এমন একটি মুসলিম প্রধান দেশ যার প্রতিবেশী কোন মুসলিম দেশ নেই। আমাদের দেশ এগিয়ে চলছে একটি স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে। আমরা শিক্ষা, দীক্ষা ও সংস্কৃতিতে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছি। আমরা অসম্প্রাদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ একটি জাতি। বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির বিশাল বাজার ছিল মধ্যপ্রাচ্যে। সেই বাজার প্রায় হারিয়ে গেছে। আমার শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ় ছিল। সেখানে আমার ব্যাক্তিগত সম্পর্কও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরো জোরদার করতে ভূমিকা রেখেছে। আমার বিশ্বাস এবং আস্থাÑ সেই সম্পর্ককে আবার ফিরিয়ে আনতে পারবো। তার ফলে জনশক্তির বাজার ফিরে পাবো।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত এবং হানাহানির কারণে আমাদের অনেক অর্জন চাপা পড়ে যাচ্ছে। দেশে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ৬ থেকে এতোদিনে দুই অংকের কোটায় পৌঁছে যেতো। বাংলাদেশকে আর তলাবিহীন ঝুড়ি বলার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অবস্থান নেক্সটÑইলাভেন থেকে ফ্রন্টিয়ার- ফাইভ এ উন্নিত হয়েছে। তৈরী পোশাক রপ্তানির হার বৃদ্ধি পেয়েছে। শান্তি মিশনে আমাদের  সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্নতা এসেছে। খাদ্য রপ্তানিও হচ্ছে। মানুষের মাথা-পিছু আয় বেড়েছে। দারিদ্রের হার কমেছে। এখন কোনো মানুষকে আর না খেয়ে থাকতে  হয়না। শিক্ষার হার ও মান বেড়েছে। এইসব অগ্রসরমান বিষয়গুলো জাতীয়ভাবে যেমন প্রচারে আসছেনা তেমনিÑ বহিঃর্বিশ্বেও জানছে না। অপরদিকে অপপ্রচার ও সংঘাতের রাজনীতির কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আস্থা হারাচ্ছে। দেশের বৃহৎ রপ্তানিখাত তৈরী পোশাক শিল্প এখন সংকটের মুখে। এই মুহুর্তে এফডিআই ক্রমহ্রাসমান অবস্থায় চলছে। এখানে আমার একান্ত চেষ্টা থাকবেÑ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে এফডিআই বৃদ্ধি করা। বিদেশী বিনিয়োগের দিক থেকে আমরা মধ্যপ্রাচ্যকে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারি। সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বিশেষ ইপিজেড প্রতিষ্ঠার জন্য আমার প্রস্তাব থাকবে।

তিনি বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু মৃত্যুর হার রোধ, জনস্বাস্থ্য, স্যানিটেশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে দেশটি বিশ্ব দরবারে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল সেই দেশকে এখন রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে ইমেজ সংকটে ভুগতে হচ্ছে। কিছু পশ্চিমা মিডিয়া বাংলাদেশের নেতিবাচক বিষয়ের উপরে অধিকতর আলোকপাত করে আমাদের ইমেজ ক্ষুণœ করছে। কোন কোন মহল বাংলাদেশ জঙ্গি রাষ্ট্র হয়ে যাচ্ছে বলেও অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করছেÑ যা কখনই এদেশে হবেনা। অপপ্রচারের কবলে পড়েও দেশের ভাবমূর্তি অনেক ক্ষুণœ হয়েছে।

এরশাদ বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়ে নিজে কোন ব্যাক্তিগত সুযোগ-সুবিধা চাচ্ছিনা। আমার সরকারী বাড়ি-গাড়িরও প্রয়োজন নেই। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে যেটুকু সুযোগ-সুবিধা আমার প্রাপ্য সেটুকু ভোগ করেই আমি বিশেষ দূতের দায়িত্ব পালন করে যেতে চাই। আমি বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক মন-মানসিকতা, উদার ধর্মীয় মনোভাব বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে চাই। আমি বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই- বাংলাদেশ একটি জঙ্গিবাদমুক্ত, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত এবং রাজনৈতিক হানাহানিমুক্ত একটি দেশ। আমি মনে করি, বাংলাদেশকে একটি আধুনিক মুসলিম প্রধান গণতান্ত্রিক এবং শান্তি প্রিয়, নিরাপদ, ও সহনশীল জাতিগোষ্ঠির দেশ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করতে পারলে আমাদের জনশক্তি রপ্তানি বাড়বে, এফডিআই বাড়বে এবং দেশের অথনৈতিক প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। আমি সৈনিক হিসেবে দেশের স্বার্থে সবসময় যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিলাম এবং এখনও দেশের অর্থনৈতিক ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে আমার দায়িত্ব পালন করে যেতে পারবো। আমি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। এখন আর আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। দেশ-জাতির কল্যাণ এবং মঙ্গল সাধনই আমার জীবনের একান্ত কাম্য ও লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট থাকবেন এরশাদ

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হওয়ার পর বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

রাষ্ট্র ও রাজনীতি- বিএনপির ঘাড়ে সিন্দবাদের বুড়ো by আবদুল মান্নান

আরব্য রজনীর গল্পে আছে, সিন্দবাদ সাতটি সমুদ্রযাত্রা করেছিল। প্রতিটি যাত্রায় তার যত সব রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। সিন্দবাদের পঞ্চম যাত্রার গল্পে আছে, তার কাঁধে এক বুড়ো সওয়ার হয়েছিল।
বুড়ো আবার কাঁধে এমন প্যাঁচ কষে বসেছিল যে সিন্দবাদ বস্তুতপক্ষে বুড়োর ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল। শেষে সিন্দবাদ বিশেষ সুরা তৈরি করে বুড়োকে পান করিয়ে তাকে হত্যা করে। সিন্দবাদ তো বুড়ো থেকে নিস্তার পেতে একটা উপায় বের করেছিল। কারণ, সে বুড়োর জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বিএনপির ঘাড়ে জামায়াত নামের যে বুড়ো বা দৈত্যটি গেড়ে বসেছে, সবার প্রশ্ন, তার কী হবে? কারণ, বিএনপি নামের সিন্দবাদ তো এই দৈত্যটিকে বধ করতে নারাজ।

বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান সম্পর্ক অনেকটা দুজন দুজনার মতো। অবশ্য এর আগে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, বিএনপি-জামায়াত একই মায়ের পেটের দুই ভাই। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে সাম্প্রতিক কালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির যে রাজনৈতিক বিপর্যয়, তার প্রধান কারণ জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি আর দেশ ও সম্পদ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড, যা দেড় বছর ধরে চলে আসছে। আন্দোলনের নামে তাদের মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো ভয়ানক অমানবিক কর্মকাণ্ড বিএনপির অনেক গোঁড়া সমর্থককেও বিএনপিবিমুখ করেছে।

কদিন আগে দায়িত্বশীল বিএনপি ঘরানার এক সরকারি কর্মকর্তা আমাকে বলেছেন, জামায়াতের খপ্পরে পড়ে বিএনপি নিজের পাকা ধানে মই দিয়েছে। নির্বাচনের আগে অনেকে তাদের ধারণা দিয়েছিল, নির্বাচনে অংশ নিলে ভালো করবে, এমনকি হয়তো সরকারও গঠন করতে পারে। কিন্তু জামায়াত নির্বাচনে যাওয়া থেকে বিএনপিকে বিরত রাখতে পেরেছে। কারণ, বিএনপির ‘আন্দোলন’ আর জামায়াতের ‘আন্দোলন’ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে। বিএনপি চাইছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দশম সংসদ নির্বাচন আর জামায়াতের উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো উপায়ে মহাজোট সরকারকে উৎখাত করে বিএনপির সঙ্গে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বানচাল করা। এই দুটি দলই আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকে সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।

আওয়ামী লীগের অনেক অক্ষমতা আর দুর্বলতা আছে, কিন্তু আওয়ামী লীগের এখনো একটি রাজনৈতিক চরিত্র আছে আর আছেন তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা। অনেকেই আওয়ামী লীগের মতাদর্শের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু এই দুই দলের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, বিএনপির তেমন রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই। তারা বুঝতে পারে না, সাধারণ মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি সচেতন। লক্ষ করলে, বেগম জিয়ার চারপাশে, যাঁরা তাঁকে সব সময় ঘিরে থাকেন, তাঁরা প্রায় সবাই সাবেক সামরিক-বেসামরিক আমলা। তাঁরা গুলশানের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের আলো-আঁধারে বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করেন। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। বিএনপির এই নেতারা মিডিয়ার সামনে এলে, আধো ইংরেজি আধো বাংলায়, যা জনমানুষের কাছে দুর্ভেদ্য, তেমন ভাষায় কথা বলেন। আর সরকার অফেন্সিভে গেলে আত্মগোপন করেন। নির্বাচনের আগে তাঁরা ভিডিওবার্তার সাহায্যে আন্দোলন পরিচালনা করার নতুন সংস্কৃতি চালু করেছেন। শুধু দেশের ভেতর থেকেই আন্দোলনের এমন আহ্বান আসছে, তা-ই নয়, দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকেও আন্দোলনের এমন বার্তা পাঠাচ্ছেন। যে রাজনৈতিক দল এমন নেতাদের ওপর ভর করে সরকারবিরোধী রাজনীতি করতে চায়, তারা বোকার স্বর্গে বাস করে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সমালোচকেরা তাদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উত্থাপন করেন, কিন্তু তারা যে একটি সন্ত্রাসী দল, তেমন অভিযোগ একটাও নেই। মিছিল করে যাওয়ার সময় তারা দু-চারটি গাড়িতে আগুন দেয়, পুলিশের সঙ্গে মারদাঙ্গায় লিপ্ত হয় অথবা কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ছাত্রশিবিরের মতো বলা যাবে না তারা গণহারে প্রতিপক্ষের রগ কাটে, গলা কেটে মানুষ হত্যা করে অথবা নির্বিচারে সংখ্যালঘু আর আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাড়ি বা গ্রামে আগুন দেয়।

এযাবৎ ছাত্রশিবির যত সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে, তার অধিকাংশই ছিল ছাত্রদলের সঙ্গে। আমার আগের কর্মক্ষেত্রে জিয়া পরিষদের সভাপতি ড. এনামুল হকের ছেলে মুসাকে তো ওরা পিটিয়েই মেরে ফেলেছিল। ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আবদুল হামিদ ছাত্রদল ছেড়ে এরশাদের ছাত্রসমাজে যোগ দিয়েছিল। তাঁর হাতের কবজি কেটে কিরিচের মাথায় গেঁথে শিবির ভরদুপুরে ক্যাম্পাসে মিছিল করেছিল। তাঁর অপরাধ ছিল, তিনি শিবিরের রাজনীতির একজন বড় বিরুদ্ধবাদী ছিলেন। ড. কাজী আহম্মদ নবী মনেপ্রাণে জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী। তাঁর একমাত্র ছেলে মুসফিক প্রগতিশীল রাজনীতিতে নতুন দীক্ষা নিয়েছেন। এক গুলিতেই তাঁকে শেষ করে দিল শিবিরের সন্ত্রাসীরা। হেলালি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। ছাত্রদলের নেতা। তাঁকে ১০ জনে টেবিলের ওপর চেপে ধরে চোখ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। সময়মতো শিক্ষকেরা সেখানে হাজির না হলে হেলালি এখন অন্ধ হয়ে হয়তো বেঁচে থাকতেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনয়নে সংসদ নির্বাচন করেছেন। ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আর রাজশাহী মেডিকেল কলেজে যখন শিবির ছাত্রদলের ওপর হামলা করে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল, তখন ক্ষমতায় বেগম জিয়া। তিনি কিন্তু তাঁর দলের আহত সদস্যদের একবারও দেখতে যাননি, গিয়েছিলেন সে সময়কার সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনা। দুই নেত্রীর মধ্যে এটাই তফাত।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বেগম জিয়ার অনেক সমর্থক আর উপদেষ্টা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি শক্তিশালী দেশের এক কূটনীতিককে বাংলাদেশে তাঁদের রাজনৈতিক চালের বিপর্যয়ের কারণে নিজ দেশ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ২০০৬ সালেও ঠিক তেমনটি ঘটেছিল। বিদেশিরা এখন বলছে, বেগম জিয়াকে জামায়াতের সংস্পর্শ ছাড়তে হবে। এত দিনে তারা উপলব্ধি করেছে, জামায়াত একটি সন্ত্রাসী সংগঠন, কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এই দেশগুলোই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিল, ‘জামায়াত একটি উদারপন্থী রাজনৈতিক দল’। কিন্তু তারা বললেই তো আর বেগম জিয়া বা বিএনপি জামায়াতকে ছাড়তে পারবে না। অদৃশ্য কারণে বিএনপির রাজনীতি জামায়াতের কাছে বাঁধা রয়েছে বলে বিশ্বাস।

সোমবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি তাদের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জনসভা করল। প্রথমে শোনা গিয়েছিল, এটি ১৮ দলের জনসভা। পরে জানা গেল, এটি বিএনপির জনসভা। জামায়াতকে নাকি সভায় আসতে নিষেধও করা হয়েছিল। জামায়াত এসেছিল, কিন্তু ব্যানার ছাড়া। সঙ্গে ছিলেন হেফাজতের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী। মঞ্চেও জামায়াতের নেতারা ছাড়া শরিক দলগুলোর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রামেও অনুরূপ একটি সমাবেশ হয়েছিল এবং সেখানে মঞ্চে জামায়াতের নেতারা বক্তব্য দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক মঞ্চে জামায়াতকে দেখে আর মঞ্চে ওঠেননি। নিচে বসে তাঁর ছাত্রদের বলেছেন, এখনো যদি বিএনপির বোধোদয় না হয়, তাহলে তাদের ভবিষ্যতে ভালো তো কিছু দেখি না।

বেগম জিয়ার সব উপদেষ্টা হিসেবে সামরিক-বেসামরিক আমলা ছাড়াও আছেন বেশ কিছু আইনজীবী নতুবা বাস্তব জীবন-জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু বুদ্ধিজীবী আর সুশীল ব্যক্তি। একজন আইনজীবী সেদিন জানান, সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে শতভাগ লাভ বিএনপির। কারণ, জামায়াতের সবাই কাতারবন্দী হয়ে বিএনপিতে যোগ দেবে। এই না হলে উপদেষ্টা। তিনি বুঝতে পারেননি অথবা বুঝতে চাননি, জামায়াত হচ্ছে একটি ভাইরাস। দেহে প্রবেশ করলে দেহটাকে ধ্বংস করে দেবে। জামায়াত যদি বিএনপির সঙ্গে একীভূত হয়, তাহলে বিএনপিও যে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হয়ে উঠবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

কোনো কোনো বিএনপি-সমর্থক পেশাজীবী বিএনপিকে বাহবা দিচ্ছেন এই বলে, তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নাকি মানুষ ৫ জানুয়ারি ভোট দিতে যাননি। তাঁরাও বিএনপির ৫ শতাংশ ভোট-তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। ৫ জানুয়ারি অনেক কেন্দ্রে ভোট কম পড়েছে সত্য, কিন্তু তা স্রেফ বেগম জিয়া বা বিএনপির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘটেছে, তা বিশ্বাস করা চরম আহাম্মকি। যে মাত্রায় সহিংসতা নির্বাচনের আগের কয়েক দিন হয়েছে, তাতে স্বাভাবিকভাবে মানুষ ভোট দিতে যাবে, তা তো আশা করা যায় না। বেগম জিয়ার এসব সর্বনাশা সমর্থক গোষ্ঠী তাঁকে মনে করিয়ে দেয়নি, নির্বাচনের আগের রাতে যদি ২০০ স্কুল, মাদ্রাসা আর কলেজ ভোটকেন্দ্র হওয়ার ‘অপরাধে’ জামায়াত-বিএনপির দুর্বৃত্তরা আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয়, তাহলে সেসব কেন্দ্রে কোন ভরসায় ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন? ২০০৮ সালের নির্বাচনে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এককভাবে ৪২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। নির্দয়ভাবে এখান থেকে ৫ থেকে ৭ শতাংশ ভোট ছাঁটাই করলেও আওয়ামী লীগের একেবারে ‘দলকানা’ ভোটার ৩২ থেকে ৩৫ শতাংশ। নির্বাচন ঠেকানোর নামে বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা সারা দেশে এই ভয়াবহ তাণ্ডব না চালালে আওয়ামী লীগ কমপক্ষে এই ভোটগুলো তো পেত।

যদি নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ৪০ শতাংশ হিসাব বিশ্বাস না করেন, তাই বলে ৫ শতাংশ বিশ্বাস করতে হবে কেন? বিএনপির কাঁধ থেকে জামায়াত নামের সিন্দবাদের সেই দৈত্য বা বুড়োটাকে তারা নামাবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এককভাবে তাদের। কিন্তু দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে হলে দেশে একাধিক সুস্থধারার রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। তেমনই একটি দল হিসেবে বিএনপি নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। তাদের উপলব্ধি করতে হবে, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে পাঁচ বছরের আগে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষমতা তাদের নেই। আওয়ামী লীগ অন্য চিন্তা করলে ভিন্ন কথা। বাস্তববাদী হওয়া মঙ্গল।

আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ওষুধের বিষক্রিয়ায় সুনন্দার মৃত্যু

সুনন্দা পুশকার
ওষুধের বিষক্রিয়ায় ভারতের মানবসম্পদ প্রতিমন্ত্রী শশী থারুরের স্ত্রী সুনন্দা পুশকারের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মরদেহের ফরেনসিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকেরা বলছেন, অসাবধানতাবশত মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ সেবন নয়, বরং সচেতনভাবে সুনির্দিষ্ট ওষুধ প্রয়োগ করার কারণেই সুনন্দার মৃত্যু হয়েছে। ফরেনসিক প্রতিবেদনের পর প্রশ্ন উঠেছে, সুনন্দা কি আত্মহত্যা করেছেন নাকি তাঁকে হত্যা করা হয়েছে? এ বিষয়ে চিকিত্সকেরা কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে তাঁরা বলেন, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে কি না, সেটি পুলিশকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চিকিত্সা গবেষণা প্রতিষ্ঠান অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (এআইআইএমএস) গত সোমবার ওই প্রতিবেদন পেশ করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত শনিবার সুনন্দার লাশের ময়নাতদন্ত হয়।
আর ফরেনসিক প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে উপবিভাগীয় হাকিম (এসডিএম) অলক শর্মার কাছে। তিনি ফৌজদারি বিধির আওতায় ঘটনাটির তদন্ত করছেন। আরেকটি সূত্র জানায়, সুনন্দার শরীর, হূিপণ্ড, যকৃত্ ও অন্ত্রের ওপর পরীক্ষার ভিত্তিতে তৈরি ফরেনসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষক্রিয়ার কারণেই সুনন্দার মৃত্যু হয়েছে। এটি মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ সেবনের মতো কোনো দুর্ঘটনা নয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সুনন্দার মৃত্যুরহস্য তদন্তে নতুন মোড় নিতে পারে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, দিল্লির যে পাঁচ তারকা হোটেল থেকে সুনন্দাকে গত শুক্রবার মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, সেখানকার সব ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হবে। ফরেনসিক প্রতিবেদনের বিস্তারিত আপাতত তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করা হবে না বলে জানান এসডিএম। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে কোনো এক সময় সুনন্দার মৃত্যু হয়। তাঁর ‘শরীরের নির্দিষ্ট কয়েকটি অংশে’ জখমের চিহ্ন ছিল। তবে সংখ্যা নয়, বরং এসব জখম প্রাণঘাতী কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সুনন্দার রহস্যজনক মৃত্যুর জন্য দাম্পত্য কলহকে দায়ী করা হয়। পাকিস্তানি সাংবাদিক মেহর তারারের সঙ্গে শশীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে খবর বের হয়। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

নেপালের ‘কামলারি’ ক্রীতদাসীরা

মনিজা চৌধুরী
নয় বছরের মেয়েশিশু মনিজা চৌধুরী। বাবা-মা ছাড়া কখনো একটি রাত কাটানোর চিন্তাও করেনি সে। তবে বাবা তাকে মাত্র ২৫ মার্কিন ডলারে একজন নেপালি পুলিশ সদস্যের কাছে বিক্রি করে দিলে পরিবারের সঙ্গে থাকা তার কাছে কেবলই স্বপ্ন হয়ে যায়। মনিজাকে বিক্রির পর ওই পুলিশ সদস্য প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান।
মনিবের বাড়িতে নতুন জীবনে মনিজার দিন শুরু হয় ভোর চারটায়। প্রতিদিন ওই সময়ে উঠে প্রথমে বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হয়; এরপর রান্নাবাড়া। মনিবের বাড়ির পাশাপাশি তার স্বজনদের বাড়িতেও একই কাজ করতে হতো। সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে মধ্যরাতের কিছুটা আগে যখন আবার মনিবের বাড়িতে ফেরা হয়, তখন দুচোখ ঘুমে একেবারে বন্ধ হয়ে আসে। প্রতিদিন একই রুটিনে চলা। মনিজা (২২) বলেন, ‘আমি এত কাজ সামলাতে পারতাম না। তাই আমার মনিবের স্ত্রী আমাকে নির্যাতন করতেন। কখনো কখনো অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকি দিতেন।’ নেপালে এই প্রথাকে বলা হয় ‘কামলারি’। মাত্র ছয় বছর বয়সী মেয়েশিশুদের এভাবে দরিদ্র্য বাবা-মা চুক্তির মাধ্যমে গৃহদাস হিসেবে বিক্রি করেন। তারা মনিবের বাসায় কার্যত বন্দী জীবনযাপন করে।
মারধরের পাশাপাশি শিকার হয় যৌন সহিংসতার। ২০০৬ সালে ‘কামলারি’ প্রথা নিষিদ্ধ হলেও নেপালের বিভিন্ন এলাকায় তা আজও বহাল আছে। বিশেষ করে থারু সম্প্রদায়ের সদস্যরা অর্থের বিনিময়ে তাঁদের মেয়েশিশুদের বিক্রি করে দেন। মনিজার পরিবারও থারু সম্প্রদায়ের। বেশ কয়েক বছর আগে নেপাল ইয়ুথ ফাউন্ডেশন নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সংগঠন মনিজার বাবার কাছে গিয়ে প্রস্তাব দেয়, মনিজাকে ফিরিয়ে আনতে রাজি হলে সহায়তা দেওয়া হবে এবং শিক্ষার ব্যবস্থা নেবে। ১২ বছর বয়সে মনিজা লেখতে-পড়তে শেখেন। বর্তমানে তিনি বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক শেষ করা আত্মবিশ্বাসী এক তরুণী। তবে শৈশবের সেই ভয়ার্ত স্মৃতি আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তাই নিজে এখন কামলারি অধিকার নিয়ে কাজ করেন মনিজা। তিনি বলেন, ‘আমার শৈশব চুরি হয়ে গেছে। আমি এই প্রথা মুছে ফেলতে কাজ করব।’ এএফপি।

সিরিয়ায় অনাহার, নির্যাতনে ১১ হাজার বন্দীর মৃত্যু

সিরিয়ায় গণবিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত নির্যাতনের মাধ্যমে কারাগারে ১১ হাজার বন্দীকে হত্যা করার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে বলে একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধবিষয়ক সাবেক তিন কৌঁসুলি ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। সিরিয়া-পরিস্থিতি নিয়ে সুইজারল্যান্ডে শান্তি আলোচনা শুরুর আগে এসব ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সিরিয়ার সব পক্ষকে নিয়ে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও যুক্তরাজ্যের দৈনিক গার্ডিয়ান প্রতিবেদনটি গত সোমবার প্রথম প্রকাশ করে। সিরিয়ায় তিন বছর ধরে চলা লড়াইয়ের অবসানের লক্ষ্যে এবারের আলোচনাটি সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারাগারে বন্দী নির্যাতনে সিরিয়া সরকার জড়িত বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী স্যার জেওফ্রি নাইস। তবে দামেস্ক এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মৃত কয়েদিদের হাজার হাজার ছবি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। সিরিয়ায় বাশার-আল আসাদ সরকারের পক্ষত্যাগী এক ব্যক্তি (সামরিক পুলিশের আলোকচিত্রী) ১১ হাজার বন্দীর প্রায় ৫৫ হাজার ডিজিটাল ছবি বিদেশে পাচার করেছিলেন। ‘সিজার’ নামে উল্লিখিত ওই ব্যক্তি বলেন, মৃত্যুসনদ তৈরির জন্য লাশের ছবি তোলার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তবে তিনি নিজে এসব হত্যাকাণ্ড বা নির্যাতনের ঘটনা দেখেননি।
দিনে তিনি প্রায় ৫০টি করে লাশের ছবি তুলতেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর ১৫ মিনিট থেকে আধা ঘণ্টা সময় লাগত। ২০১১ সাল থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত কারাগারে নির্যাতনে নিহত ব্যক্তিদের ছবি তোলা হয়। আর প্রতিবেদনটি তৈরির নেপথ্যে জড়িত রয়েছে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সমর্থনকারী দেশ কাতার। ফরেনসিক চিকিত্সক স্টুয়ার্ট হ্যামিল্টন বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে স্পষ্ট যে ‘বন্দীদের অনাহারে রাখা হয়েছিল’। বহু কয়েদিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং অল্পসংখ্যক বন্দীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। প্রতিবেদনটির ব্যাপারে সিরিয়া সরকার সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও দেশটিতে ৩৪ মাস ধরে যুদ্ধ চলাকালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একাধিক সূত্র জানায়, সিরিয়ায় সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিরোধীদের লড়াইয়ে এ পর্যন্ত এক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এ ছাড়া কয়েক লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছে। ময়নাতদন্ত বিশেষজ্ঞ স্টুয়ার্ট হ্যামিল্টন এসব ছবি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি বলেন, এসব ছবি দেখে মনে হচ্ছে, কারাগারে বিপুলসংখ্যক বন্দীকে ‘অনাহারে’ রাখা হয়েছে। জিওফ্রে নাইস বলেন, হত্যাকাণ্ডের ব্যাপকতা ও পূর্বাপর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সিরিয়া সরকার যে ফৌজদারি অপরাধ করছে—এসব ছবি তার পক্ষে বড় প্রমাণ হতে পারে। বিবিসি।

‘দৃশ্যত বাংলাদেশের নেতারা গণতন্ত্রচর্চায় আগ্রহী নন’

৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কের পটভূমিতে বাংলাদেশ সরকারকে সরাসরি সাহায্য দেয়ার বিষয়ে বৃটেন সতর্ক থাকবে বলে জানিয়েছেন দেশটির আন্তর্জাতিক সহায়তা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যালান ডানকান।
তবে ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি) এনজিওর মাধ্যমে যেসব প্রকল্পে কাজ হচ্ছে, তা চালু থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বুধবার বৃটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে তিনি এ তথ্য জানান।

হাউস অব কমন্সে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন অ্যালান ডানকান। লন্ডনের এনফিল্ড এলাকার এমপি নিক ডি বোয়া কমন্স সভায় জানতে চান, সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে কী প্রভাব পড়বে বলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মনে করেন? জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৃটিশ সরকার সতর্কতার সঙ্গে সেখানকার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কোনো প্রকল্পও বাতিল হয়নি।
সম্পূরক প্রশ্নে নিক ডি বোয়া জানতে চান, মন্ত্রী তাঁর সঙ্গে একমত হবেন কি না যে, তাঁর মন্ত্রণালয়ের ব্যয় করা অর্থের অনেকটাই সদ্ব্যবহার হলেও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তা কার্যত অপচয় হয়েছে। কেননা, দৃশ্যত দেশটির নেতারা গণতন্ত্রচর্চায় আগ্রহী নন। জবাবে ডানকান বলেন, এ কথা সত্য, বাংলাদেশের রাজনীতি এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছে, যেটা প্রত্যাশিত নয়। তবে আমাদের অর্থের অপচয় হয়েছে এমন নয়। আমরা কোনো রাজনৈতিক দলকেই অর্থ দিইনি। পার্লামেন্টারি কমিটিগুলো বিশেষ করে সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত কমিটির সঙ্গে কাজ করেছি। যার উদ্দেশ্য ছিল সরকারের কাজকর্মে পার্লামেন্টের নজরদারির ব্যবস্থা জোরদার করা। আর এ কাজটি এনজিওর মাধ্যমে করা হয়েছে।

‘দৃশ্যত বাংলাদেশের নেতারা গণতন্ত্রচর্চায় আগ্রহী নন’

৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কের পটভূমিতে বাংলাদেশ সরকারকে সরাসরি সাহায্য দেয়ার বিষয়ে বৃটেন সতর্ক থাকবে বলে জানিয়েছেন দেশটির আন্তর্জাতিক সহায়তা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যালান ডানকান।

সংলাপ কবে জানতে চায় কানাডা

পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ‘সংলাপ’ প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের ইতিবাচক মনোভাবের প্রশংসা করেছে কানাডা। দেশটির ঢাকাস্থ হাইকমিশনার হিদার ক্রুডেন এবার জানার চেষ্টা করছেন,
কাঙ্ক্ষিত ওই সংলাপ কবে নাগাদ শুরু করতে চায় সরকার। নবগঠিত সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে গতকাল কানাডা দূতের এক ঘণ্টা বৈঠকের মুখ্য আলোচ্য ছিল এটি। বৈঠক সূত্রের দাবি, অত্যন্ত খোলামেলা ও প্রাণবন্ত আলোচনা হয়েছে দু’জনের মধ্যে। বৈঠকে ক্রুডেন ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তার দেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ভোট গ্রহণের পর কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে ‘হতাশা’ ব্যক্ত করেছেন তারও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, বেশির ভাগ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভোট না হওয়ায় তারা হতাশ হয়েছেন। ভোটের আগে-পরে রাজনৈতিক অস্থিরতায় সংখ্যালঘু সমপ্রদায় যেভাবে আক্রান্ত হয়েছে তাতে কানাডা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর আরেকটি নির্বাচনের বিষয়ে সমঝোতার জন্য প্রধান দুই দলের মধ্যে সংলাপের যে তাগিদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে তার প্রশংসা করেছেন হাইকমিশনার। বিরোধী জোটের হরতাল, অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূূচি থেকে সরে আসা, বিরোধী দলকে সমাবেশের অনুমতি দেয়া এবং কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ সম্পন্ন হওয়া সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টিতে ‘ইতিবাচক’ ও ‘উৎসাহব্যঞ্জক’ বলে মনে করছেন তিনি। একই সঙ্গে তার দেশ আশা করে, উভয় পক্ষের ইতিবাচক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এক গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান বিরোধী জোটসহ বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন বর্জনের কৌশল গ্রহণ ঠিক হয়নি বলেও মনে করেন কানাডিয়ান হাইকমিশনার। তার সব জিজ্ঞাসার জবাবে নয়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অবশ্য আরেকটি নির্বাচনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার পুনরুল্লেখ করেছেন। বলেছেন, সহিংসতা ও জামায়াতকে ত্যাগ করলে সরকারের পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শনের ধারাবাহিকতা রক্ষা সম্ভব হবে। সরকারের ভেতরে বা বাইরে যে যাই বলুল না কেন- প্রধানমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছেন সেটাই ‘বটম লাইন’ বলে জানিয়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। দীর্ঘ ওই বৈঠকে সরকারের ১০০ দিনের পরিকল্পনা প্রসঙ্গেও জানতে চেয়েছেন প্রভাবশালী ওই দূত। জবাবে শাহরিয়ার আলম এমপি বলেছেন, গত ৫ বছরে অভিজ্ঞতার আলোকেই তার দল একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। পর্যায়ক্রমে সেটি বাস্তবায়নে তারা সচেষ্ট থাকবেন।

সংলাপ কবে জানতে চায় কানাডা

পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ‘সংলাপ’ প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের ইতিবাচক মনোভাবের প্রশংসা করেছে কানাডা। দেশটির ঢাকাস্থ হাইকমিশনার হিদার ক্রুডেন এবার জানার চেষ্টা করছেন,

রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ by সাজেদুল হক

আপাতত রাজনীতি নেই এ কথা সত্য। তবে ৫ই জানুয়ারি পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ কিছু নতুন সমীকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বিএনপির সঙ্গে জামায়াত এবং অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের জন্য বিএনপির ওপর দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এরই পটভূমিতে সর্বশেষ ২০শে জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিরোধী জোটের সমাবেশে জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতাদের দেখা যায়নি। যদিও জোটভুক্ত অন্যান্য দলের নেতারা মঞ্চে ছিলেন। এ সমাবেশের পরই ১৮ দলীয় জোটে ভাঙনের কথা ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, এখনই এ জোট ভাঙার ঘোষণা না দিলেও কৌশলগত কারণেই জোটের ভবিষ্যৎ অনেকটা অনিশ্চিত। কারণ বিএনপি ও জামায়াতের বুদ্ধিদাতা হিসেবে পরিচিত অনেকেই মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় ইসলাম যুক্ত আছে এমন কোন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা খুবই কম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ একেবারেই স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো প্রতিনিয়ত খোলামেলাভাবেই কথা বলছে বাংলাদেশ নিয়ে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াতেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ভারত, চীন, রাশিয়াসহ সাবেক বাম বলয়ের দেশগুলো এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনসহ অনেক দেশ সরকারকে অভিনন্দিত না করলেও সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। যদিও এসব দেশ সবার অংশগ্রহণে নতুন নির্বাচনের জন্য সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করছে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী তিনটি পার্লামেন্টে সম্প্রতি বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এসব আলোচনায় সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের কোন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এরই মধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সরকার ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ করবে। কোন সংলাপও হবে না।

এ অবস্থায় নিজেদের রাজনীতি রিভিউ করছে বিরোধী জোট। জামায়াত এবং অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন পরিবর্তন নিয়ে চলছে আলোচনা। মূলত ভোটের পাটিগণিতের হিসাবেই ১৯৯৯ সালের ৩০শে নভেম্বর চারদলীয় জোট গঠন করা হয়। বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত এবং ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে এ জোট গঠিত হয়েছিল। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি পরে জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও নাজিউর রহমান মঞ্জুরের নেতৃত্বে দলের একটি অংশ জোটে থেকে যায়। ২০০১ সালে এ জোট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জোটের ভরাডুবি ঘটে। এর পরও এ জোটে আরও কয়েকটি দলকে নিয়ে গঠন করা হয় ১৮ দলীয় জোট। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনও করে জোটবদ্ধভাবে। এ আন্দোলনের দাবির যৌক্তিকতা বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো স্বীকার করলেও আন্দোলনে সহিংসতারও সমান তালে নিন্দা জানান তারা। মিডিয়া এবং পর্যবেক্ষকদের অনেকে এ সহিংসতার জন্য জামায়াতকেই দায়ী করেন। যদিও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার এ জন্য সরকারকেই দায়ী করেছেন। তিনি লিখেছেন, গণ-আন্দোলন অহিংস নাকি সহিংস হবে তার ট্রিগার সব সময়ই সরকারেরই হাতে থাকে। রাজনৈতিক বিরোধ সহিংস বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে দমন এবং তার পালটা প্রতিক্রিয়া থেকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের সরকারি আচরণ থেকেই এখনকার সহিংসতার জন্ম। এ পরিস্থিতিতে একতরফা গণ-আন্দোলনের ধরন বিশেষত সহিংসতাকে নিন্দা করার একটাই অর্থ : ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়ানো, সাফাই গাওয়া। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টের প্রস্তাবেও সহিংসতায় জড়িত সংগঠন নিষিদ্ধের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানানো হয়। যদিও ওই প্রস্তাবের মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক আগাম নির্বাচন। সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংসদের জামায়াত এবং হেফাজতকে একসঙ্গে ব্র্যাকেটবন্দি করা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, এটা কৌতূহল উদ্দীপক যে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে জামায়াত-হেফাজতকে একই কাতারে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু হেফাজত কোন ধরনের সহিংসতায় জড়িত থাকার কথা আমি শুনিনি এবং বিরোধী দলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার কথাও শোনা যায়নি। কিছু আদর্শগত মিল থাকা সত্ত্বেও জামায়াত ও হেফাজত রাজনৈতিক মিত্র নয়। তাদের একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়তো ইউরোপীয় পার্লামেন্টের তথ্যগত ভুল।
নির্বাচন পরবর্তি সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে সংলাপের পূর্ব-শর্ত হিসেবে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের কথা বলেছেন। অন্যদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ককে বর্ণনা করেছেন, কৌশলগত হিসেবে। এ অবস্থায় বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলোর সম্পর্ক নিয়ে চলছে নতুন পর্যালোচনা। জামায়াতের পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচিত একজন সাবেক সচিবের মতে, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ বিএনপির জন্য ক্ষতির কারণই হবে। যদিও অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, বিএনপি সবসময়ই একটি মধ্যপন্থী দল হিসেবে পরিচিত। এছাড়া জামায়াতের প্রায় সব শীর্ষ নেতাই যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত। এ অবস্থায় জোটের বাইরে যুগপৎ আন্দোলনই বিএনপির জন্য সুফল বয়ে আনবে। যদিও ইসলামপন্থীদের ভোট ব্যাংকের বিষয়টিও বিএনপিকে বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ by সাজেদুল হক

আপাতত রাজনীতি নেই এ কথা সত্য। তবে ৫ই জানুয়ারি পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ কিছু নতুন সমীকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

প্রসঙ্গ: মানবাধিকার by মনির হায়দার

ব্যাপারটা খুবই অনুচিত। কেবল অনুচিত নয়, কিছুটা অমানবিকও বটে। আমরা এতটা অকৃতজ্ঞ কেন? অবশ্যই আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। একটুখানি নয়, অনেকখানি।
এমনিতেই বাঙালির কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়ে নানা কথা আছে। অনুযোগপ্রিয় জাতি হিসেবেও বেশ বদনাম আছে। প্রজাকুল তথা সাধারণ মানুষের এসব দোষ-ত্রুটির কথা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন জনসেবকগণ হরহামেশাই টের পান। তাদেরও তো ধৈর্যের একটা সীমা আছে। এত সমালোচনা আর বিরোধিতা সহ্য করার মুচলেকা দিয়ে তো তারা মসনদে বসেননি। তাদের কর্মকাণ্ড কারও পছন্দ না হলে চোখ বন্ধ রাখলেই পারেন। জনসেবকদের কথাবার্তা কারও ভাল না লাগলে কানে দিতে পারেন তুলো। তাই বলে অধিকারের অজুহাতে সেবকদের সমালোচনায় এত মুখর হতে হবে কেন?

দেশবাসীর সুখ-শান্তি আর উন্নতির জন্য আমাদের খাদেমগণ তো কম চেষ্টা করছেন না। দিন-রাত কি অক্লান্ত পরিশ্রমই না তারা করে চলেছেন। শুধু কি কাজ? কণ্ঠকেও কোন বিশ্রাম দিচ্ছেন না বেচারারা। জনতার উদ্দেশে বিরামহীনভাবে বলে চলেছেন নানা রকম টক-ঝাল-মিষ্টি কথা। তাতে বিশেষ উপকার হচ্ছে সংবাদ মাধ্যমগুলোরও। তুলনামূলক অল্প চেষ্টাতেই মিলে যাচ্ছে দারুণ সব খবর। প্রজাকুলও সহজেই জানতে পারছে জনসেবকদের নানা রকম বৈচিত্র্যময় ভাবনা ও স্বপ্ন-কল্পনার সমৃদ্ধ সম্ভার সম্পর্কে। সুতরাং জনসাধারণের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা ছাড়া অন্য কিছুই কাম্য হতে পারে না।
রাষ্ট্রীয় কোষাগারের খরচ বাঁচাতে এবং ভোটারদের ভোগান্তির হাত থেকে রেহাই দিতে আমাদের শাসক মহল তাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতার প্রমাণ রেখেছে গত ৫ই জানুয়ারির ভোটকাণ্ডে। ১৫৩ আসনের ভোটারদের তো ঘর থেকে বের হওয়ার কষ্টটুকুও করতে হয়নি। সম্পূর্ণ বিনা পরিশ্রমে এসব নির্বাচনী এলাকার জনগণ পেয়ে গেছেন এক-একজন প্রভাবশালী এমপি। বাকি ১৪৭ আসনেরও বেশির ভাগ ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার কষ্ট থেকে বেঁচে যান সরকার মহাশয়ের বদান্যতায়। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের খরচ বাঁচানো কিংবা ভোটারকুলকে কষ্টের হাত থেকে রক্ষা করাই শুধু নয়, বরং অভিনব এ রাজনৈতিক চমকের মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে আমরা অনেকগুলো বিশ্বরেকর্ড অর্জনেও সক্ষম হয়েছি। সুতরাং এমন একটি জনদরদি শাসককুলের প্রতি অকাতরে কৃতজ্ঞতাই কেবল জানানো যায়।
দেশবাসীর নিরাপত্তা এবং আরাম-নিদ্রার জন্যও কি আমাদের রাজন্যবর্গের চেষ্টার কোন কমতি আছে? শহরে-গ্রামে সহিংসতা দমনের জন্য নেয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। দেশীয় পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে যৌথবাহিনী। এ বাহিনীর সুপ্রশিক্ষিত সদস্যরা রাতের ঘুটঘুটে আঁধার চিরে সহিংসতাকারীর খোঁজে চষে বেড়াচ্ছেন শহর-বন্দর-গ্রাম। কোথাও কোন সহিংসতাকারীর টিকি দৃশ্যমান হওয়া মাত্রই গর্জে উঠছে যৌথবাহিনীর রাইফেল। মুহূর্তেই এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে শত্রুর শরীর। আর বন্দুকযুদ্ধের গল্প তো সবারই জানা। সব যুদ্ধই জনগণকে দেখিয়ে করতে হবে এমন কোন কথা নেই। গুলির শব্দ শোনা গেলেই তো হলো। বাঙালির এ আরেক সমস্যা। সব কিছু নিজের চোখে দেখতে চায়। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই কি তা সম্ভব? কোন হামলা মামলার প্রধান আসামি কিংবা অন্য আসামিদের লাশ কোথাও পাওয়া গেলে কিংবা আদৌ না পাওয়া গেলে সেটার সঙ্গে মানবাধিকারের কি সম্পর্ক? সীতাকুণ্ডের গ্রামে ১৪ বছর বয়েসী কিশোরের লাশ পাওয়া নিয়ে এত হইচইয়ের কি আছে? বয়সটাই বড় বিবেচ্য! সে তো শিবিরকর্মী। মানবাধিকারের অজুহাতে তাকেও ছেড়ে দিতে হবে? শিবির মানেই যে জঙ্গি, তা কি কারও অজানা আছে? রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সড়ক-অবরোধের মতো গুরুতর অপরাধ কি ক্ষমা করা যায়? এ ধরনের অপরাধীরা যদি যৌথবাহিনীর হাতে ধরা না দেয়, তাহলে তাদের স্ত্রী-সন্তান কিংবা পিতা-মাতাকে আটক করে কারাগারে পাঠানো কি অন্যায়? তাদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়ার মধ্যে মানবতার বিসর্জন কোথায়? এসবই ফালতু কথা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ টাইপের কিছু ভুঁইফোড় সংগঠনের ভূমিকাও খুবই বিরক্তিকর। কয়েক দিন পরপরই অদ্ভুত ধরনের সব মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশের মাধ্যমে এ দেশের সহজ-সরল মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালায়। আমাদের উচিত সমস্বরে এসব কাজের নিন্দা জানানো। কেবল মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান একাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সমালোচনা করবেন, তার কি এতই দায় ঠেকেছে? সরকারের ইমেজ রক্ষার চেষ্টায় এমনিতেই শুদ্ধভাষী এই বেচারাকে দিন-রাত মহাব্যস্ত থাকতে হয়। এসব মহৎ কাজে প্রজাকুলেরও দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত। জনগণের প্রতি সরকার বাহাদুর যথেষ্ট দয়াশীল বলেই তো দেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনও বেঁচে আছে। সকাল-দুপুর-রাতে খাওয়া-দাওয়া করছে, শঙ্কা-আতঙ্কের মধ্যেও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মতপ্রকাশের অধিকার নিয়েও আজকাল কিছু লোকের চেঁচামেচি ক্রমেই সহ্যের সীমা ছাড়াচ্ছে। সদাশয় সরকার মতপ্রকাশের জন্যই তো এতগুলো টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দিয়েছে। তাতে সবার মত সমানভাবে প্রকাশ করতে হবে এমন কোন কথা নেই। ক্ষমতাসীনদের মতটা ঠিকমতো প্রকাশের ক্ষেত্রে তো কেউ অবহেলা করছে না। তাহলে আর এতে কথা কেন? এখনও তো সব টিভিতেই টকশো হচ্ছে। সব সময়ই দর্শকদের চাহিদা বা পছন্দ অনুযায়ী অতিথি-আলোচক আনতে হবে এমনকি কোন দাসখত দেয়া হয়েছে? বশ্যতা মানতে না চাওয়ার কারণে দু’-চারটি টিভি চ্যানেল কিংবা সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হলে তাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলো কোথায়? খামোখা এসব মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা মানবাধিকারের ধুয়া তুলে সরকারের ইচ্ছাপূরণের পথে অন্তরায় সৃষ্টির চেষ্টা কি বরদাশত করা ঠিক?

প্রসঙ্গ: মানবাধিকার by মনির হায়দার

ব্যাপারটা খুবই অনুচিত। কেবল অনুচিত নয়, কিছুটা অমানবিকও বটে। আমরা এতটা অকৃতজ্ঞ কেন? অবশ্যই আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। একটুখানি নয়, অনেকখানি।

বাংলাদেশ সঙ্কটে ভারতের হস্তক্ষেপ করা উচিত

৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের প্রতি ভারতের সাড়াকে ‘কুসুম কুসুম গরম’ আখ্যা দিয়েছেন দিল্লি ভিত্তিক এশীয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশীয় পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি।
একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে এর আগে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াতের কোয়ালিশন সরকার নিস্পৃহ মনোভাব দেখিয়েছিল। এর মাশুল হিসেবেই বর্তমান সঙ্কটে ভারত [বিএনপির প্রতিকূলে] ঔদাসীন্যের পরিচয় দিচ্ছে।

গতকাল ভারতের ইংরেজি দৈনিক দি এশিয়ান এজ পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে তিনি অবশ্য চলতি অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় বের করতে ভারতীয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। টাইম ম্যাগাজিনের সাবেক দক্ষিণ এশীয় সংবাদদাতা মীনাক্ষী লিখেছেন, ভারত নিজেকে যখন আঞ্চলিক, এমনকি বিশ্ব নেতৃত্বের দাবিদার মনে করে তখন তার উচিত বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করা এবং একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়তে সহায়তা প্রদান করা। সহিংসতা ও আটকাভিযান বন্ধ, রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূর এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার ও বিরাধী দলকে আহবান জানাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নেয়া কোন যৌথ উদ্যোগে ভারতের উচিত হবে অংশগ্রহণ করা।
মীনাক্ষী মন্তব্য করেন, প্রধান বিরোধী দলের বয়কট করা এক অসাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী পদে শেখ হাসিনা টানা দ্বিতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে রয়েছেন। তবে প্রচলিত রাজনীতির পথ বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটতে পারে। তিনি লিখেছেন, আওয়ামী লীগ দাবি করেছে যে, হিন্দুদের ৭০০-র বেশি বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জামায়াত ও বিএনপি সমর্থকরা হামলা করেছে। কিন্তু এই অভিযোগ জামায়াত ও বিএনপি উভয়ে নাকচ করেছে। তারা এসব ঘটনার স্বাধীনভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
ওই নিবন্ধে সুপারিশ করা হয়- ভারতের উচিত হবে আরও বেশি ঘনিষ্ঠভাবে বাংলাদেশ বিষয়ে সম্পৃক্ত হওয়া। ভারত ঘোষণা দিয়েছে যে, ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অবশ্যই এগিয়ে নিতে হবে’। কিন্তু যদি বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ফৌজদারি অপরাধের মামলা মোকাবিলা কিংবা পালিয়ে বেড়াতে হয় তাহলে একথার বাস্তবায়ন বর্তমান বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে দুরূহ হবে। সরকারের এই কর্তৃত্ববাদী মনোভাবটাই বাংলাদেশে নতুন করে সহিংসতা বৃদ্ধি ও অচলাবস্থার রেসিপি হিসেবে দেখা দিতে পারে। এটা চলতে থাকলে এমনকি হয়তো ভারতের যেটা সবচেয়ে বেশি ভয়, সেই ইসলামি জঙ্গিত্বের বৃদ্ধি ঘটতে পারে। রাজনীতি বিষয়ে বাংলাদেশীদের বিমুখ করা হয়েছে। তারা এখন মত প্রকাশের অন্য উপায়ের দিকে ঝুঁকেছে।
উল্লেখ্য, নিবন্ধে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও নাশকতার জন্য বিএনপি ও জামায়াতকে দায়ী করার পাশাপাশি উল্লেখ করা হয় যে, ‘শাসক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও সহিংস ঘটনা ঘটাতে সমর্থ রয়েছে। দৃশ্যত রাষ্ট্র যন্ত্রের প্রশ্রয়ে তারা বিরোধী দলের সদস্যদের প্রহার করেছে। দুষ্কৃতকারী ও বিরোধী কর্মীদের মধ্যে তফাৎ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ সরকার পাইকারি হারে জ্যেষ্ঠ নেতাদেরসহ বিরোধী দলের বিপুল সংখ্যক কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার এড়াতে অনেক জামায়াতকর্মী পলাতক রয়েছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিবাদকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে গুলি করেছে।
ওই নিবন্ধে এই পর্যায়ে মন্তব্য করা হয় যে, ভারত দীর্ঘকাল ধরে ভারতের কাছে হুমকি বিবেচিত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে মদতদান বন্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশের কাছে। আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের এই অনুরোধে সাড়া দিয়েছিল। এই বিষয়ে বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারের রেকর্ড দুর্বল। সে কারণে ভারতের বিদেশ নীতিনির্ধারণী মহলের কেউ কেউ অধিকতর ধর্মনিরেপক্ষ আওয়ামী লীগকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন- যা চলতি সঙ্কটের প্রতি ভারতের দৃশ্যমান ঔদাসীন্য অনুধাবনে সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশ সঙ্কটে ভারতের হস্তক্ষেপ করা উচিত

৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের প্রতি ভারতের সাড়াকে ‘কুসুম কুসুম গরম’ আখ্যা দিয়েছেন দিল্লি ভিত্তিক এশীয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশীয় পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি।

রাজনৈতিক মামলা- ফেরারি লাখো মানুষ

হরতাল-অবরোধ আর রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে সারা দেশে দায়ের করা হয়েছে শ’ শ’ মামলা। রাজনৈতিক মামলায় আসামি হয়েছেন অন্তত আট লাখ মানুষ। তাদের কেউ কেউ জামিন পেয়েছেন।
তবে অনেকে গ্রেপ্তার এড়াতে কাটাচ্ছেন ফেরারি জীবন। সামপ্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতায় দায়ের করা মামলার কারণে অনেক এলাকায় গ্রামের নারী-পুরুষ, শিশুরাও থাকতে পারছেন না নিজ বাড়িঘরে। নিরাপদে থাকতে তারা বাড়ি ছেড়ে বসবাস করছেন অন্যত্র। পালিয়ে থাকা এসব মানুষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ আসছে নারী নির্যাতনেরও। রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে অনেক সংখ্যালঘু পরিবারও। শ’ শ’ মামলায় অজ্ঞাত সংখ্যক আসামি করায় বিরোধীপক্ষের লোকজনকে হয়রানি করতে গ্রেপ্তার ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠছে পুলিশের বিরুদ্ধে। বিরোধী জোটের দেয়া তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে এ পর্যন্ত রাজনৈতিক মামলায় আসামি আট লাখের মতো। এসব মামলায় অন্তত অর্ধ লাখ নেতাকর্মী কারাগারে আটক আছেন। বিএনপির দাবি গত তিন মাসে ৪৫৫১টি মামলা হয়েছে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার জনকে। এদিকে কয়েকটি জেলায় মামলা ও পুলিশি হয়রানির কারণে স্বাভাবিক জীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করেছে সহিংসতা ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং প্রকৃত অপরাধীদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

স্টাফ রিপোর্টার যশোর থেকে জানান, নির্বাচনপূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে যশোরে বিএনপি-জামায়াতসহ জোটভুক্ত শরিক দলের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগ পুলিশি আতঙ্কে ঘরছাড়া। ইতিমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকার প্রায় ২০০০ নেতাকর্মী কারাগারে আটক আছেন। গাড়ি পোড়ানো, সড়ক অবরোধ, যানবাহন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, পুলিশি কাজে বাধা, বিজিবির গাড়িতে হামলা, বিআরটিসির বাসে অগ্নিসংযোগ, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, নির্বাচন বানচালের চেষ্টা, ভোটকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, ভোটকেন্দ্রে বোমা হামলা, অস্ত্র প্রদর্শন, ভোটের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ওপর হামলা, মারপিট, স্কুলে অগ্নিসংযোগ, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নির্যাতন, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, সংখ্যালঘু নারীদের ওপর নির্যাতন, ধর্ষণসহ হাজারো অভিযোগে যশোরের বিভিন্ন থানায় গত ৬ মাসে বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নামে ৫৮২টি মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ। এর বেশির ভাগই রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হয়েছে বলে দাবি বিএনপি-জামায়াতের। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার নেতাকর্মীকে। কোর্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এসব মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে মনিরামপুর থানায়। এই থানায় গত ৬ মাসে মোট ২৩৭টি মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ। এর মধ্যে গত ৫ তারিখের নির্বাচনের দিনই মামলা হয়েছে ৬১টি। এসব মামলায় ৩৫ হাজারের বেশি মানুষকে আসামি করা হয়েছে। এই থানায় আরও ১০ হাজারের বেশি মানুষ বিভিন্ন মামলার আসামি হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।  ইতিমধ্যে পুলিশ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দায়েরকৃত মামলায় বিএনপি জামায়াতের প্রায় ২ হাজার কর্মী-সমর্থককে আটক করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে। যাদের অনেকে ইতিমধ্যে জামিনে বের হয়েছেন। কিন্তু ফের পুলিশি গ্রেপ্তার এড়াতে তারাও ঘরছাড়া। গত ৬ মাসে বিরোধী দলের সরকারবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন- সংগ্রাম চলাকালে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় ৬৫টি, মনিরামপুর থানায় ২৩৭টি, কেশবপুর থানায় ৩২টি, অভয়নগর থানায় ৩৯টি, বাঘারপাড়া থানায় ৩৫টি, চৌগাছায় ৪১টি, ঝিকরগাছায় ৪৮টি, শার্শায় ৪৭টি ও বেনাপোল পোর্ট থানায় ৩৮টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। দায়েরকৃত এসব মামলার অধিকাংশের বাদী পুলিশ বা সরকারি দলের নেতাকর্মীরা। মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৬ মাসে যশোরের বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত মামলায় পুলিশ বিএনপি-জামায়াত ও শিবিরের প্রায় ২০০০ নেতাকর্মীকে আটক করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে।
অভয়নগরের চাপাতলার মালোপাড়া আর মনিরামপুরের হাজরাঈলের ঋষিপাড়ায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ১৫ দিনে এই দুই উপজেলার কমপক্ষে ৫০০০ মানুষ ঘরছাড়া। পুলিশ সুপার জয়দেব ভদ্র স্বীকার করেছেন চাপাতলা মালোপাড়ায় নির্বাচন পরবর্তী সহিংস ঘটনায় পুলিশ বাদী মামলায় ৩৯ জন এজাহারনামীয় আসামির পাশাপাশি অজ্ঞাত ২শ’ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ এ পর্যন্ত ওই মামলার এজাহারভুক্ত মাত্র  ২ জন আসামিকে আটক করেছে। অপরদিকে সন্দেহজনক হিসেবে আটক করেছে আরও ৫৪ জনকে। তাদের মধ্যে বাহাদুর নামে একজন চা বিক্রেতাও রয়েছেন।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, রাজশাহীতে সামপ্রতিক ঘটনায় তিন সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করে নগরীর বিভিন্ন থানায় অর্ধশতাধিক মামলা হয়েছে। এছাড়া, নির্বাচনকালীন সহিংসতায় রাজশাহী জেলার বাঘা, পবা এবং নগরীর মতিহার, শাহ্‌মখদম থানায় পৃথক ১৫টি মামলা দায়ের হয়েছে। এদিকে দফায় দফায় হামলা-পাল্টা হামলা ও গ্রেপ্তার অভিযানে আতঙ্কে রয়েছে ১৮ দলের নেতাকর্মীরা। অনেকে আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন।
জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও বাঘা থানার সভাপতি নুরুজ্জামান খান মানিক বলেন, নির্বাচন চলাকালে ও নির্বাচনের পরদিন বাঘার মানিগ্রাম ইউনিয়নের তুলশীপুর ও গঙ্গারামপুরের মহসীন আলী, রমজান আলী, মজি সরকার, এরশাদ আলী, রেজাউল হক, মতিউর রহমান মতি, কুরবান আলী, রাহেদ আলীসহ বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর শতাধিক আম ও মেহগনি গাছ কেটে ফেলা হয়। পুলিশের উপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগ কর্মীরা এ হামলা চালায়। এরপরও পুলিশ জড়িতদের গ্রেপ্তার না করে নিরীহ গ্রামবাসীদের ধরতে গ্রামে গ্রামে অভিযান চালাচ্ছে। ফলে গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাসিন্দারা এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এখনও তারা এলাকায় ফিরতে পারছেন না। তাদের নেতাকর্মীরা জামিনে মুক্ত হয়ে এসেও স্বস্তিতে থাকতে পারছে না। তাদের অন্য কোন মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, নগরীর মতিহার, বোয়ালিয়া, শাহমখদুম ও রাজপাড়া থানায় শুধু গত ডিসেম্বর মাসেই ১০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার আছে ১০৮ জন। এজাহারভুক্ত আসামিসহ ১৮ দলের দেড় সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে।
সর্বশেষ গত বছরের ২৬শে ডিসেম্বর রাজশাহী নগরীর লোকনাথ স্কুলের মার্কেট এলাকায় ১৮ দলের মিছিল শেষে পুলিশের একটি ভ্যানে ককটেল হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে গুরুতর আহত হয়ে বোয়ালিয়া থানার পুলিশ কনস্টেবল সিদ্ধার্থ চন্দ্র মারা যান। ওই রাতেই বোয়ালিয়া মডেল থানার এসআই রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও মহানগর সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এবং মহানগর সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট শফিকুল হক মিলন, জেলা বিএনপির সভাপতি নাদিম মোস্তফা ও মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরসহ ৮৭ জনের নাম উল্লেখসহ ১৮ দলের চার শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এর পর থেকে ১৮ দলের শীর্ষ নেতারা গা-ঢাকা দেন।
গত সোমবার রাজশাহীতে পুলিশ কনস্টেবল সিদ্ধার্থ হত্যা ও বিস্ফোরক মামলায় এক মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও মহানগর সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এবং মহানগর সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট শফিকুল হক মিলন। গতকাল মঙ্গলবার জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক কামরুল মনির আদালত থেকে জামিন পেয়ে মুক্ত হয়েছেন।
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ, রায়পুর, সদর, রামগতি ও কমলনগরসহ ৫টি উপজেলায় গত তিন মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ১০৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৭৮টি ও জামায়াতের ২৮টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাত আসামিসহ প্রায় ৪০ হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। মামলার ভয় ও গ্রেপ্তার এড়াতে দলীয় নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে রয়েছেন। জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট হারুনুর রশিদ ব্যাপারী বলেন, গত তিন মাসে পুলিশ, র‌্যাব ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা বিএনপির নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হয়রানির উদ্দেশ্যে মিথ্যা ৭৮টি মামলা করা হয়েছে।
আসামি  করা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার নেতাকর্মীকে। গুম খুনসহ এসব মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে নেতাকর্মীরা কৌশল করে একটু সরে আছেন। জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক মহসিন কবির মুরাদ জানান, গত তিন মাসে আমাদের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাজানো মিথ্যা ২৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা-হামলা দিয়ে আন্দোলন দমানো যাবে না। আন্দোলন চলবে। পুলিশ সুপার মো. আবুল ফয়েজ বলেন, নাশকতা ও সহিংসতার ঘটনায়  কয়েকটি মামলা হয়েছে। বেশ কয়েজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার অভিযান চলছে এবং তা অব্যাহত থাকবে।
উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় রাজনৈতিক মামলার আসামি প্রায় ১ লাখ মানুষ। তার মধ্যে আসামি হয়েছেন বিএনপি, জামায়াত, শিবির, নেতাকর্মীরা। আর সাত উপজেলায় মামলা হয়েছে অন্তত ১ শতাধিক। পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে সুন্দরগঞ্জ ও পলাশবাড়ী উপজেলার হাজারো মানুষ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কারাগারে আছেন ২ শতাধিক। গত বছর গাইবান্ধায় রাজনৈতিক সহিংসতা হয় ব্যাপক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে জামায়াত বিএনপি অধ্যুষিত পলাশবাড়ী ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়। রাজনৈতিক সহিংসতায় পলাশবাড়ীতে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, রাস্তা কেটে ফেলা, ঘরবাড়ি ও মোটরযানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা হয়েছে সর্বাধিক।
২৮শে ফেব্রুয়ারি সাইদীর রায় ঘোষণার পর গাইবান্ধার জামায়াত শিবির অধ্যুষিত এলাকা সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। হামলা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী পর্যায়ে পুলিশ ও ক্ষতিগ্রস্তরা বাদী হয়ে সুন্দরগঞ্জ থানায় ৩২টি মামলা করা হয়। মামলায় আসামি করা হয় ১২০০ জনকে। আর অজ্ঞাত দেখানো হয় ৬০ হাজার মানুষকে। এই মামলায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২শ’ ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। আসামিদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নামও আছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন বলেন, পুলিশের হাতে সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানি না হয় সেজন্য দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের জামায়াত-শিবির বানিয়ে গ্রেপ্তার করার ষড়যন্ত্র আওযামী লীগ কোনভাবেই মেনে নেবে না। তিনি বলেন, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার নামে পুলিশ অযথা নিরীহ মানুষকে হয়রানি করে লাভবান হচ্ছেন। অথচ প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছে না। এ অবস্থায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে আছেন সুন্দরঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ মানুষ । ধরপাকড়ের ভয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় যাওয়া বন্ধ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। উপস্থিতি কমে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। অপরদিকে গোবিন্দগঞ্জে ১৫টি, সাদুল্লাপুরে ১১টি, সাঘাটায় ১৪টি, ফুলছড়িসহ সাত উপজেলায় কমপক্ষে আড়াই মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে বিএনপি সভাপতি আনিসুজ্জামান খান বাবু বলেন । তিনি বলেন, মামলার কারণে দুই উপজেলার ৬০ হাজার মানুষ ঘরছাড়া । তবে কেউ কেউ এখনও কারাগারে আছেন, কেউ আদালতে জামিনে মুক্ত হয়েছেন।

রাজনৈতিক মামলা- ফেরারি লাখো মানুষ

হরতাল-অবরোধ আর রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে সারা দেশে দায়ের করা হয়েছে শ’ শ’ মামলা। রাজনৈতিক মামলায় আসামি হয়েছেন অন্তত আট লাখ মানুষ। তাদের কেউ কেউ জামিন পেয়েছেন।

নিরাপত্তা ও শিক্ষা দুটোই জরুরি বিষয়- স্কুলে পুলিশ ক্যাম্প

রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে গত বছর নানা সময়ে চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে, শুরু হয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষ।
কিন্তু ঠাকুরগাঁও জেলার গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন এখনো স্বাভাবিক হতে পারছে না। স্কুলটি এখন পুলিশ ক্যাম্প, ফলে ক্লাস ও পাঠদান সবই বন্ধ!

গত বছর ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন বছরের শুরুতে নতুন উদ্যমে পাঠদান শুরুর বিষয়টিই ছিল প্রত্যাশিত। শিক্ষার্থীরা নতুন বইও পেয়েছে, কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকায় এই স্কুলটি শিক্ষার্থীদের জীবনে গত বছরের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন ক্ষতি। স্কুলটিকে পুলিশ ক্যাম্প বানানোর পেছনে বাস্তব কারণ রয়েছে। ভোটের দিন বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হওয়া স্কুলটি। আর ভোটের পর সেই একই গোষ্ঠীর হামলার শিকার হয় কাছাকাছি এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের দোকান ও বাড়িঘর। এ নিয়ে সংঘাত-সহিংসতায় একজনের প্রাণহানিও ঘটেছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয় স্কুলটিতে। শিক্ষা না নিরাপত্তা—এ বিবেচনায় সম্ভবত নিরাপত্তার বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনও তো এভাবে দিনের পর দিন নষ্ট করার সুযোগ নেই। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষার দিকটিকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এখন প্রতিযোগিতামূলক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ক্লাস বন্ধ থাকায় এই বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে। স্কুলটি খোলা রেখে কীভাবে সে অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা যায় বা বিকল্প হিসেবে কোথায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা যায়, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের মনোযোগ প্রত্যাশা করছি। আর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ভার শুধু প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ছেড়ে না দিয়ে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কেও অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।

নিরাপত্তা ও শিক্ষা দুটোই জরুরি বিষয়- স্কুলে পুলিশ ক্যাম্প

রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে গত বছর নানা সময়ে চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে, শুরু হয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষ।

পালাবদল- সংঘাতের কেন্দ্রে এশিয়ার নতুন নেতারা by পঙ্কজ মিশ্র

এশিয়ার শহরমুখী অভিবাসন ঘটাচ্ছে এক ‘ফাটানো পালাবদল’। কীভাবে এশিয়ায় ধনকুবের হওয়া যায়, তা নিয়ে পাকিস্তানি ঔপন্যাসিক মোহসিন হামিদ বই লিখেছেন।

দায়মোচন- বিএনপির নাজুক গোড়ালি by ফারুক ওয়াসিফ

সরকারেও নেই, সংসদেও নেই। বিএনপি তাহলে কোথায় আছে? রাষ্ট্রে যা নেই, তা সমাজে থাকতে পারে। ক্ষমতার লড়াইয়ে জয়ের জন্য স্প্রিংয়ের মতো বিস্তারশীল সংগঠন লাগে, জনগণের অধিকাংশকে ধারণ করার মতো আদর্শ লাগে।
দুটো ক্ষেত্রেই বিএনপি মোটামুটি ব্যর্থ। এ কারণে মহাজোট সরকারের অজনপ্রিয়তা থেকে তারা ফায়দা তুলতে পারেনি। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামক রাজনৈতিক যুদ্ধে বিএনপি সব সময়ই দুর্বল থেকেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি যখনই দেশে প্রবল হয়েছে—প্রথমবার জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণ-আদালতের সময়, দ্বিতীয়বার ২০০৬ সালের পর—তখনই বিএনপি পিছু হটেছে। দলের শীর্ষনেতাদের অনেকের মুক্তিযুদ্ধে অবদান থাকা সত্ত্বেও বিএনপি কেন মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বেকায়দায় থাকে, তার উত্তর দলটির কর্মী-সমর্থকদেরই খুঁজতে হবে।

বিএনপির সাংগঠনিক ও মতাদর্শিক দুর্বলতার সুযোগ জামায়াতও নিয়েছে, আওয়ামী লীগও নিয়েছে। বিএনপি জামায়াত হয়ে গেছে বলে আওয়ামী লীগ যতই রব তোলে, বিএনপি যেন ততই জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়। বিএনপির দুর্বলতা হলো জামায়াত। বিভিন্ন নির্বাচনের ফল প্রমাণ করে, জামায়াত ছাড়াই বিএনপি এককভাবে আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি জনসমর্থন ভোগ করে। তার পরও জামায়াতকে তাদের লাগবে কেন? যুক্তরাষ্ট্র ‘মডারেট মুসলিম দলকে’ চায় বলে? সাংগঠনিক ও আদর্শিক টনিকের দরকারে? ইসলামি ভোট পাওয়ার আশায়? কার্যত, এগুলো বিএনপির জন্য হিতে বিপরীত। এসব কারণেই বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও দলটি বারবার নাজুক অবস্থায় পড়ে। এ যেন কবিতার ভাষায়, এ শুধু জানালার লোভে বেচে দিলাম ঘর-দরজা।
যে দলটি একাত্তরে তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত নয়, কোনো দিন ক্ষমা চাওয়ার চিন্তাও যারা করেনি, তাদের আগ বাড়িয়ে কে ক্ষমা করবে, কে ছাড় দেবে? কিন্তু খালেদা জিয়া এখনো ‘কৌশলগত কারণে’ জামায়াতকে ছাড়ছেন না। অথচ দেখা যাচ্ছে, ‘কৌশল’ নিয়েছে নীতির জায়গা আর লেজুড় জামায়াত হয়েছে বিএনপির ভরকেন্দ্র। এটাই হলো লেজ হয়ে দেহ নাড়ানোর উদ্ভট কেচ্ছা। বিএনপিকে এখন ভাবতে হবে, জামায়াতের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির সরকারে এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল আন্দোলন থেকে তারা আসলে কী অর্জন করেছিল। বিএনপির প্রতিপক্ষ মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে যে বিএনপি-জামায়াত সরকারে থাকা মানে জঙ্গিবাদের উত্থান; গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র; বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন মানে আগুনে মানুষের মৃত্যু। এই অভিযোগ খণ্ডনে ব্যর্থ বিএনপির ‘হূদয় খুঁড়ে’ সন্ধান করা উচিত, কোথায় কোথায় তারা ভুল করেছিল।

২.
ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী আকারে ও প্রভাবে অনেক বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আধুনিকতায় দীক্ষিত বিরাট তরুণ জনগোষ্ঠী। এদের বেশির ভাগের জীবনের কল্পনার সঙ্গে জামায়াত-যুদ্ধাপরাধী-হেফাজতের জীবনদর্শন মেলে না। মুক্তিযুদ্ধ এদের কাছে কেবল ইতিহাস নয়, আত্মপরিচয়ের সূত্র, বিশ্বায়িত দুনিয়ায় বলার মতো গর্ব। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও তার তরুণ শাখা-প্রশাখার প্রভাব অনেক বেড়েছে। এদের কাছে টানার মতো, কোটি কোটি নতুন ভোটারকে আশাবাদী ও আশ্বস্ত করার জন্য কী করেছে বিএনপি?
মিসরের ঘটনাবলি দেখায়, তরুণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর শক্ত প্রভাব ছাড়া নির্বাচন-জয় সম্ভব, ক্ষমতা ধরে রাখা বা আঘাত মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এবং এই প্রভাব লাগবে মধ্যবিত্ত দুর্গ তথা রাজধানীতে। গ্রাম-মফস্বলে বিএনপি-জামায়াতের প্রতিপত্তি যতটাই বেশি, রাজধানীতে ততটাই কম। ঔপনিবেশিক আমলে রাজধানীই ছিল সব ক্ষমতার কেন্দ্র আর প্রান্তিক এলাকাগুলো ছিল বিদ্রোহ-বিক্ষোভের ঘাঁটি। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। তার পরও সেসব বিদ্রোহের পরাজয় অবধারিত ছিল, কারণ রাজধানীকে কাবু করতে না পারা, কারণ মধ্যবিত্তমহল ছিল ক্ষমতাসীনদের পক্ষে। বাংলাদেশেও মধ্যবিত্তদের প্রধান আবাস ঢাকা। সেই ঢাকাকে আলোড়িত করতে না পারাও বিএনপিকে ব্যর্থ করেছে।
এটা নিছক সাংগঠনিক ব্যর্থতা নয়, এর সঙ্গে আদর্শিক দুর্বলতাও সরাসরি জড়িত। অতীতের ব্যাপারে বিএনপির বয়ান পরিষ্কার নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম প্রশ্নে ধরি মাছ না ছুঁই পানি খেলা বিএনপির প্রতি সন্দেহ বাড়িয়েছে। অনেকেই তাদের গত আমলের মতো যুদ্ধাপরাধীদের জয়জয়কারের দুঃসহ পুনরাবৃত্তির ভয়ে ভীত। তাদের নাশকতাপন্থী কর্মসূচি মনে করায় জেএমবি নামক ত্রাসের কথা। বিএনপিকে উঠে দাঁড়াতে হলে এই অসাধু উত্তরাধিকার ছাড়তেই হবে।
বাংলাদেশ আর কোনোভাবেই ২০১৩ সালের আগে ফিরে যাবে না। যেতে পারবে না। এ কথা বলার যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি হয়েছে সমাজে ও রাষ্ট্রে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে গড়ে ওঠা জনমতকে উপেক্ষা করা হবে দলটির জন্য আত্মঘাতী। উন্নয়ন ও শান্তির স্বার্থে ‘পুরোনো কাসুন্দি’ না ঘাঁটার ওকালতি কেউ কেউ করে থাকেন। কিন্তু অমীমাংসিত অতীত স্মৃতি হতে অস্বীকার করে। তা মানুষের মনে জ্যান্ত হয়ে পাওনা দাবি করে। আওয়ামী লীগ এবং তার দেশি-বিদেশি শরিকেরা একাত্তরের সেই পাওনাই যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবির আকারে ফিরিয়ে এনেছে এবং সেয়ানার মতো কাজেও লাগিয়েছে। জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অঘোষিত আঁতাত ছাপিয়ে উঠেছে একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে আবারও পরাজিত করার ডাক।
এটা এমন এক অবস্থান, যার বিরোধিতা করার নৈতিক ভিত্তি বিএনপির নেই। ১৯৯২-৯৩ সালেও জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের চাপে এ রকম অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। তখন, এমনকি সংসদীয় আলোচনায় বিএনপি বিচারের পক্ষে মৌখিক সম্মতি জানাতে বাধ্যও হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিশ্বাসযোগ্যভাবে এগিয়ে নেওয়ার অকপট অঙ্গীকার এবং জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার মুহূর্ত আবারও হাজির। মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে তাদের ঘোলাটে অতীতকে শুধরে নেওয়ার এই সুযোগকে কাজে লাগানোর ওপরই নির্ভর করবে দলটির ভবিষ্যৎ। আওয়ামী লীগের দেশি-বিদেশি জোটের কাছে পরাজয়ের অসুবিধাকে এভাবেই বিএনপি সুবিধায় পরিণত করতে পারে। মুসলিম লীগ হওয়া থেকে রক্ষারও এটাই উপায়।
মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগের জন্য মেডুসার মাথা, যতই কাটা হোক নতুন করে গজাবেই। মুক্তিযুদ্ধ; তার ইতিহাস, তার আত্মত্যাগ, তার বীরত্ব ও অশ্রুগাথা বাংলাদেশের জনগণের পরম সম্পদ। বিপুল রাজনৈতিক শক্তি এর মধ্যে মজুত রয়েছে। আন্তরিকভাবে যে চাইবে, সেই এই খনি থেকে শক্তি ও সমর্থন পাবে। তা না করা বিএনপির গোড়ার গলদ বা একিলিসের গোড়ালি। গ্রিক পুরাণকথার একিলিসকে তার মা মন্ত্রপূত পানিতে চুবিয়ে অমরত্ব দিতে চেয়েছিলেন। তাহলেও ছোট্ট একটি জায়গায় পানি লাগে না। পায়ের গোড়ালির যে জায়গাটি ধরে শিশু একিলিসকে মা পানিতে চুবিয়েছিলেন, সেই জায়গাটি অরক্ষিতই রয়ে গেল। একিলিসের মৃত্যু হয় সেই গোড়ালিতেই তিরবিদ্ধ হয়ে। জামায়াত হলো বিএনপির একিলিসের গোড়ালি।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার দাবি করার অধিকার বিএনপিরও রয়েছে। কিন্তু সেটা ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধতা পাবে না, যতক্ষণ না একাত্তরকে তারাও তাদের রাজনীতির ভিত্তিমূলে স্থাপন করবে। একাত্তর সম্পর্কে বিমনা থাকলে বিএনপির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বুলি দাম পাবে না। একাত্তর প্রশ্নে রাজনীতি ও সমাজে সমঝোতা হতে পারে বাকি সব সমঝোতার পূর্বশর্ত।
জামায়াত যে কারণে বিচার না মানতে বাধ্য, বিএনপির তো তেমন নিরুপায় দশা ছিল না! ঐতিহাসিক ভুলের খেসারত হিসেবে বিএনপি যে ‘কলঙ্কের’ বোঝা বইছে, সেই বোঝা এখন নামাতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচার কোনো না-কোনো দিন হতোই। হতেই হতো। রাষ্ট্র হিসেবে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ এবং তার সাপেক্ষে আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠনও বকেয়া হয়ে আছে। এই কাজে বিএনপি যদি এগিয়ে না আসতে পারে, তাহলে বিএনপি হয়তো আবারও ক্ষমতায় যাবে, কিন্তু তার রাজনীতি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারবে না। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিএনপিকে বদলাতে হবে। অদূরভবিষ্যতে কোনো পরাশক্তির আধিপত্যের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী জাগরণ যদি অনিবার্য হয়ে পড়ে, তা ধারণের কী প্রস্তুতি আছে বিএনপির? কেবল ইসলাম দিয়ে এই শূন্যতা পূরণ করতে চাওয়া মানে সাম্প্রদায়িক ও অগণতান্ত্রিক শক্তির খপ্পরে পড়া। এভাবে যে হবে না, পাকিস্তান তার উদাহরণ।
বাংলাদেশের মানুষ মধ্যপন্থী। মধ্যেই থাকে ভরকেন্দ্র। বিএনপি ক্রমাগত ডানে সরলে মধ্যপন্থী বাংলাদেশে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে। নিজের স্বার্থে এবং দেশের স্বার্থে বিএনপির সংশোধন জরুরি। দলটির সমর্থকদের রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার এই দায় বিএনপি অস্বীকার করতে পারে না।

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com