Showing posts with label ফ্রান্স. Show all posts
Showing posts with label ফ্রান্স. Show all posts

Wednesday, January 21, 2026

মাখোঁর ব্যক্তিগত বার্তার স্ক্রিনশট ফাঁস করলেন ট্রাম্প, কী আছে তাতে

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর পাঠানো একটি ব্যক্তিগত বার্তার স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ঘিরে চলমান সংকটের মধ্যেই এ কাজ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ফরাসি মদের ওপর বিশাল শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন তিনি।

আজ মঙ্গলবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ওই স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন ট্রাম্প। পোস্টের শিরোনাম—‘ফ্রান্সের হয়ে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর বার্তা।’ স্ক্রিনশটে থাকা বার্তা যে সঠিক, তা সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে নিশ্চিত করেছে মাখোঁর ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র। তবে বার্তাটি কবে পাঠানো, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্ক্রিনশটের থাকা বার্তার শুরুতেই লেখা—‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ।’ এরপর তাতে লেখা—‘আমার বন্ধু, সিরিয়ার বিষয়ে আমরা পুরোপুরি একমত। ইরান নিয়ে আমরা বড় কাজ করতে পারি। আমি বুঝতে পারছি না, আপনি গ্রিনল্যান্ডে কী করছেন। চলুন বড় কিছু করার চেষ্টা করি।’

বার্তায় ‘বড় কিছুর’ তালিকাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমেই মাখোঁ বলেছেন, সুইজারল্যান্ডের দাভোস শহরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার প্যারিসে জি–৭ সদস্যদেশগুলোকে নিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করতে পারেন তিনি। সেখানে ইউক্রেন, ডেনমার্ক ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানাবেন। এরপর প্যারিসে ট্রাম্পকে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান মাখোঁ।

গ্রিনল্যান্ড দখল করা নিয়ে ট্রাম্পের একের পর এক হুমকির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বেশির ভাগ নেতাই সোচ্চার। তবে সবচেয়ে কঠোর হয়েছেন মাখোঁ। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী বাণিজ্যিক হাতিয়ার ব্যবহারের জন্য চাপ দিচ্ছেন। এ ছাড়া ডেনমার্কের সমর্থনে গ্রিনল্যান্ডে ফরাসি সেনাও পাঠাচ্ছেন মাখোঁ।

ট্রাম্পও মাখোঁর বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ফিলিস্তিনের গাজা পরিচালনায় তদারকির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ গঠন করা হচ্ছে, তাতে ফরাসি প্রেসিডেন্টকে রাখতে চান না তিনি। ইসরায়েলের হামলায় বিধ্বস্ত গাজায় জাতিসংঘের ভূমিকার ওপর এই বোর্ডের প্রভাব পড়বে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্যারিস।

বোর্ড অব পিস নিয়ে ফ্রান্সের অবস্থান সম্পর্কে ট্রাম্পের কাছে জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকেরা। জবাবে তিনি বলেন, ‘তিনি কি এটি বলেছেন? ভালো কথা, তাঁকে কেউ চান না। কারণ, খুব শিগগির তাঁকে পদ ছাড়তে হবে। তাঁর ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর আমি ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করব।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Wednesday, December 31, 2025

ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ব্রিজিত বার্দো আর নেই

ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ব্রিজিত বার্দো আর নেই। রবিবার তার প্রতিষ্ঠিত বার্দো ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ৯১ বছর বয়সে মারা গেছেন তিনি। অভিনয়জীবনে বার্দো ৫০টিরও বেশি ছবিতে কাজ করেছেন। এরপর তিনি নিজেকে প্রাণী অধিকার আন্দোলনে উৎসর্গ করেন। জীবনের পরবর্তী দশকগুলোতে তিনি চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সমকামী সম্প্রদায়, মুসলিম ও অভিবাসীদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করার কারণে বর্ণবিদ্বেষ উসকানির অভিযোগে পাঁচবার দোষী সাব্যস্ত হন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ফ্রান্স ২৪।

এতে আরও বলা হয়, যৌবনে বার্দো ছিলেন নিরঙ্কুশ এক যৌন-প্রতীক। তার মোহময়ী শারীরিক আবেদন ও মুক্ত জীবনযাপন তৎকালীন ১৯৫০-এর দশকে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু খুব শিগগিরই পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির সেই অবিরাম অনুসরণে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং সবকিছু ছেড়ে দেন পশুদের জন্য কাজ করতে। শুরুর দিনে যখন তার বাঁকানো দেহরেখা, কাজল নয়ন আর অভিমানী ঠোঁট ফরাসি চলচ্চিত্রের পোস্টারজুড়ে ছড়িয়ে ছিল, তখন ‘বিবি’ নামে পরিচিত এই অভিনেত্রীকে প্রায়ই তুলনা করা হতো মেরিলিন মনরোর সঙ্গে। কিন্তু ১৯৭৩ সালে, হঠাৎ একদিন তিনি খ্যাতির সেই নীল জগতকে বিদায় জানান। অবহেলিত প্রাণীদের দেখভাল করার জন্য সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষায়, তিনি ‘প্রতিদিন সুন্দর হতে হতে অসুস্থ’ হয়ে পড়েছিলেন। তার অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত অভিনয়জীবনে বার্দো একের পর এক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করলেও সমালোচকদের কাছ থেকে খুব বেশি প্রশংসা পাননি। তার পঞ্চাশটির বেশি চলচ্চিত্রের বেশির ভাগই ছিল মজাদার। তবে তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি, কেবল কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া। ১৯৫৬ সালে ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওমেন’ ছবিতে তিনি ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। সেই তরুণীর প্রেম জড়িয়ে পড়ে এক ত্রিভুজ প্রেমে। ছবিটি পরিচালনা করেন তার তৎকালীন স্বামী রজার ভাদিম। ভাদিমের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, এই তরুণ নৃত্যশিল্পী হয়ে উঠবেন ‘সমস্ত বিবাহিত পুরুষের নাগালের বাইরে থাকা কল্পনার নারী’ এবং তার সেই কথাই সত্যি হয়। ছবিটির এক বিখ্যাত দৃশ্যে, কোমর পর্যন্ত চেরা স্কার্ট পরে মাম্বো নাচতে থাকা বার্দোর মুক্ত যৌনশক্তির প্রকাশ তাকে দেবীর মর্যাদা দেয়। যদিও তা একই সঙ্গে তা চলচ্চিত্র সেন্সরদের বিরক্তির কারণ হয়। সাত বছর পর জ্যঁ-লুক গদারের ‘কনটেম্পট’-এ এক হতাশ, নির্জীব স্ত্রী চরিত্রে তার অভিনয়ও পরিণত হয় চলচ্চিত্রকিংবদন্তির অংশে। প্রযোজক ও দর্শকদের নগ্নদৃশ্যের প্রত্যাশার সঙ্গে গদার এমনভাবে দৃশ্য নির্মাণ করেন যেখানে বিছানায় শুয়ে থাকা বার্দোর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কোলাজ তৈরি করা হয়। আর তিনি স্বামীকে জিজ্ঞেস করেন, তার শরীরের কোন অংশটি তার সবচেয়ে প্রিয়।

১৯৫৮ সালে ফরাসি লেখিকা মার্গারিত দ্যুরাস লিখেছিলেন- ‘রানী বার্দো দাঁড়ায় সেখানেই, যেখানে নীতিনৈতিকতার শেষ সীমানা।’ এক বছর পর দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার মন্তব্য করেন, তিনি নিজের ইচ্ছামতো চলেন। আর এটাই মানুষকে বিচলিত করে।
কিন্তু ‘স্বাধীনচেতা নারী’ রূপে নিজের এই জন-ইমেজে আনন্দ খুঁজে পাননি বার্দো; বরং তিনি সংগ্রাম করেছেন বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টির বিরুদ্ধে। ১৯৬০ সালে ২৬তম জন্মদিনে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। আর ১৯৭৩ সালে চল্লিশে পা দেয়ার আগে তিনি পুরোপুরি সরে দাঁড়ান আলো-ঝলমলে জীবন থেকে। ১৯৭৮ সালে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম আমার ক্যারিয়ার সম্পূর্ণভাবে আমার শরীরের ওপর দাঁড়িয়ে। তাই আমি সিনেমা ছেড়ে দিলাম। যেমন আমি সবসময় পুরুষদের ছেড়ে যাই, আগে।’

১৯৩৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসে জন্ম নেয়া বার্দো বেড়ে উঠেছিলেন সচ্ছল, ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিক পরিবারে। চারবার বিয়ে করা বার্দোর একমাত্র সন্তান নিকোলা। তার পিতা বার্দোর দ্বিতীয় স্বামী অভিনেতা জ্যাক শারিয়ের। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি সেন্ট-ট্রোপেজে প্রায় নির্জন জীবন বেছে নেন এবং এরপর থেকে প্রাণীঅধিকারই হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রধান পরিচয়। ১৯৮০-এর দশকে কানাডায় বার্ষিক সীলশাবক হত্যাযজ্ঞ দেখার অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। ২০১১ সালে ডব্লিউডব্লিউএফ’কে দেয়া এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘ওই দৃশ্যগুলো আমি কখনো ভুলতে পারি না। যন্ত্রণাভরা সেই আর্তচিৎকার এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু সেগুলোই আমাকে শক্তি দিয়েছে নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করার, প্রাণীর জীবনের পক্ষে।’

প্রাণী সুরক্ষার লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন। তিনি শিশু সীল, হাতি, পশুবলি প্রথা ও ঘোড়া জবাইখানা বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করেন। পরবর্তী জীবনে বার্দো ক্রমশ চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সমকামী, মুসলিম ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্যের কারণে তাকে পাঁচবার আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় বর্ণবিদ্বেষ উসকানির অভিযোগে। ২০০৩ সালের বই ‘এ ক্রাই ইন দ্য সাইলেন্স’-এ তিনি সতর্ক করেন ফ্রান্সের গোপন, বিপজ্জনক, নিয়ন্ত্রণহীন অনুপ্রবেশ সম্পর্কে। ২০১২ ও ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন দেন অতি ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেনকে । তিনি তাকে বলেন ‘২১শ শতকের জোয়ান অব আর্ক’।

ফ্যাশন ও চলচ্চিত্র জগত থেকে সরে যাওয়ার বহু বছর পরও বার্দো সেই জগতগুলো থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। পশমের পোশাক পরার বিরুদ্ধে ছিলেন সরব এবং গর্বের সঙ্গে এড়িয়ে গিয়েছেন প্লাস্টিক সার্জারি। ২০১৭ সালে হার্ভে  ওয়েনস্টিন কেলেঙ্কারির পর যখন মি-টু আন্দোলন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তখনও তিনি উল্টো স্রোতে হাঁটেন। ২০১৮ সালে প্যারিস ম্যাচ’কে তিনি বলেন, বেশিরভাগই ভণ্ডামি ও হাস্যকর আচরণ করছে। তার মতে, অনেক অভিনেত্রী প্রযোজকদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। আর পরে আলোচনায় আসার জন্য বলে বসে তারা হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পুরুষরা যখন আমাকে সুন্দর বলত, বা বলত আমার নাকি সুন্দর পশ্চাৎদেশ- আমি সেটাকে আকর্ষণীয়ই মনে করতাম।’

mzamin

Monday, November 24, 2025

মৃত্যুর গুজব উড়িয়ে দিলেন ব্রিজিত বার্দো

এক সময়ের সেক্স সিম্বল হিসেবে পরিচিত প্রখ্যাত ফরাসি অভিনেত্রী ব্রিজিত বার্দো সম্প্রতি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। ওদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি মারা গেছেন বলে খবর ছড়িয়ে দেয় একটি মহল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফিরে  নিজের মৃত্যুর গুজব উড়িয়ে দিয়েছেন ৯১ বছর বয়সী ব্রিজিত বার্দো। এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে স্পষ্ট করে তিনি জানিয়েছেন, আমি ভালো আছি এবং বিদায় নেয়ার কোনো পরিকল্পনা করিনি। তার মৃত্যুর খবর প্রচার করেছিলেন ২৭ বছর বয়সী ইনফ্লুয়েন্সার আনিস জিতুনি। বার্দো তিন সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে সেন্ট-ট্রোপেজে নিজের বাড়িতে ফিরেছেন। তিনি ২০২৩ সালের গরমে শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগেছিলেন।

তার স্বামী বার্নার্ড ডি’ওরমালে নিশ্চিত করেছেন, তিনি এখন বিশ্রামে আছেন এবং সুস্থ আছেন। ১৯৫২ সালে ‘দ্য গার্ল ইন দ্য বিকিনি’ ছবির মাধ্যমে সিনেমায় প্রবেশ করেন ব্রিজিত। ১৯৫৬ সালে ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওমেন’ ছবিতে রজার ভাদিমের সাথে অভিনয় করেন। ৪৫টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ৭০টিরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন। ফ্যাশনে আইকনিক অবদান আছে তার। বার্দো পোজ এবং বার্দো নেকলাইন জনপ্রিয় করেছেন তিনি। সাহসী ও বিতর্কিত মিডিয়ার উপস্থিতি তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে।

ব্রিজিত বার্দো চার বার বিবাহ করেছেন। তার স্বামীদের ক্রম হলো- রজার ভাদিম (১৯৫২-৫৭), জ্যাক কেয়ারিয়ার (১৯৫৯-৬২), গুন্টার স্যাকস (১৯৬৬-৬৯), বার্নার্ড ডি’ওরমালে (১৯৯২-বর্তমান)। তাদের এক সন্তান আছে। সন্তান লালন-পালনের ব্যাপারে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে নিয়মিত মাতৃত্বের ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রেমের জীবনে অনেক সম্পর্ক ছিল ব্রিজিতের। তার প্রেমে পড়েছেন স্যাশা ডিসটেল, ওয়ারেন বিটি এবং সংক্ষেপে শন কনারি। ১৯৭৩ সালে অভিনয় থেকে অবসর নিয়ে জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেন। ১৯৮৬ সালে প্রাণী অধিকার সংরক্ষণে বার্জিত বার্দো ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। বার্দো এখনও সক্রিয়। সামাজিক এবং প্রাণী অধিকার সংরক্ষণের কাজে নিয়োজিত আছেন। তার জীবন ও কাজ নিয়ে বিতর্ক হলেও, তিনি নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন।

mzamin

Sunday, November 2, 2025

কেমন ছিল লুভ্যরের চুরির ঘটনা

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অবস্থিত বিশ্ব বিখ্যাত মিউজিয়াম ল্যুভরে ঘটে গেল এক বিস্ময়কর চুরির ঘটনা। দিবালোকে শত শত দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে মাস্ক পরা একদল চোর ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের রাজকীয় গহনা চুরে করে পালিয়ে গেছে। যা ১৯১১ সালে মোনালিসা চুরির পর এটিই ল্যুভরের সবচেয়ে বড় চুরি। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এখনও তাদের কাছ থেকে চুরি হওয়া গহনার হদিশ পায়নি তদন্তকারীরা। বলা হচ্ছে ইতিমধ্যেই চুরির গহনা বিক্রির চেষ্টা শুরু হয়ে গেছে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, ঘটনাটি ঘটেছে ১৯ অক্টোবর সকাল ৯টা ৩৪ মিনিটে। প্যারিসে অবস্থিত ল্যুভর মিউজিয়ামের অ্যাপোলো গ্যালারিতে ঢুকে চোরের একটি দল। মিউজিয়ামের এই গ্যালারিতেই রয়েছে ফ্রান্সের রাজপরিবারের মূল্যবান গয়না। যার মধ্যে নেপোলিয়নের দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্য উপহার দেওয়া একটি এমেরাল্ড ও হীরার হারও ছিল।

ফরাসি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চারজন চোর একটি ট্রাক ও দুইটি মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থলে আসে। ট্রাকের ওপরে চুরি করা একটি বৈদ্যুতিক মই স্থাপন করে তারা জাদুঘরের দ্বিতীয় তলায় উঠে যায়। চোরেরা নির্মাণশ্রমিক সেজে হলুদ সেফটি ভেস্ট পরে আসে। যেন তাদের দেখে কেউ সন্দেহ করতে না পারে। এরপর তারা বিশেষ ইলেকট্রিক ডিস্ক গ্রাইন্ডার ব্যবহার করে শক্তিশালী কাচ কেটে ঢোকে গ্যালারিতে।

দুইজন চোর সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে এগিয়ে যায়। যেখানে কাচের বাক্সে ছিল নেপোলিয়নের উপহার হিসেবে দেওয়া বিখ্যাত এমেরাল্ড নেকলেস ও রানী মেরি-আমেলির টায়ারা। ল্যুভরের নিরাপত্তা নির্দেশিকাতেই উল্লেখ আছে- আগুন লাগলে এই ধরণের ডিস্ক কাটার দিয়ে কাচ কাটা হয়। চোরেরা সেই কৌশলই ব্যবহার করেছে।
ল্যুভর মিউজিয়ামের পরিচালক লরেন্স দে কার্স ফরাসি সিনেটকে জানিয়েছেন, জাদুঘরের বাইরের নিরাপত্তা ক্যামেরাগুলোর অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল ও পুরোনো। যেখানে চোরের দল প্রবেশ করেছিল, সেখানে কেবল একটি ক্যামেরা ছিল। কিন্তু সেটির দৃষ্টি ছিল পাশের দিকে, ফলে চোরদের মই বেয়ে ওঠার দৃশ্য ধরা পড়েনি। পুলিশের তরফেও স্বীকার করা হয়েছে যে তাদের নিজস্ব রাস্তার ক্যামেরায় চোরদের ট্রাক ধরা পড়লেও কেউ বিষয়টি খেয়াল করেনি।

চোরদের ঢুকতে সময় লাগে মাত্র চার মিনিট, কিন্তু পুলিশের হাতে খবর পৌঁছায় যখন তারা কাচ কেটে গয়না বের করতে শুরু করেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশের পৌঁছাতে সময় লাগে তিন মিনিট। কিন্তু ততক্ষণে চোরেরা পালিয়ে যায়। চোরেরা পালানোর সময় তাড়াহুড়ো করে প্রচুর প্রমাণ রেখে যায়। ঘটনাস্থলেই পাওয়া যায় গ্লাভস, মোটরসাইকেল হেলমেট, ব্লোটর্চ, হলুদ ভেস্ট, এমনকি একজোড়া গয়না ও সম্রাজ্ঞী ইউজেনির মুকুটও।

পুলিশ জানিয়েছে, ফেলে যাওয়া জিনিস থেকে সংগৃহীত ১৫০টির বেশি ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ করেছে তারা। যার মধ্যে ডিএনএ ও আঙুলের ছাপও রয়েছে। এ কারণেই দ্রুত দুই অভিযুক্তকে পাকরাও করতে পেরেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে চার্ল দ্য গোল বিমানবন্দর থেকে এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন তিনি একমুখী টিকিট নিয়ে আলজেরিয়া পালাতে চাচ্ছিলেন। ৪০ মিনিট পর তার সহযোগীকেও ধরা হয়। তবে আরও দুইজন এখনো পলাতক। গত বুধবার রাতে প্যারিস থেকে আরও পাঁচ সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। যাদেরকে এখন জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়নি।

পুলিশ আশঙ্কা করছে, চুরি হওয়া গয়নাগুলো ইতিমধ্যেই টুকরো করে রত্ন আলাদা করা বা ধাতু গলিয়ে বিক্রির চেষ্টা চলছে। এখনো কোনো সম্পদ উদ্ধার করা যায়নি। ল্যুভরের অলঙ্কার বিভাগীয় পরিচালক অলিভিয়ে গাবে বলেন, রাতের বেলায় আমি যখন গ্যালারিতে ঢুকেছিলাম, চারদিকে এক ভয়ানক নীরবতা। কাচের বাক্সগুলো ফাঁকা পড়ে ছিল। যেন ইতিহাসের এক অংশ হারিয়ে গেছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানাপোলিসের শিক্ষক হোলি বার্কার বলেন, আমি নেপোলিয়নের সেই হারটির ছবি তুলেছিলাম। মুহূর্তের মধ্যেই গর্জন শুনে আমরা দৌড়ে বেরিয়ে আসি। এখন ভাবলে মনে হয়, আমি হয়তো সেই হারটি শেষবার দেখেছিলাম।

মিউজিয়ামের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ: ল্যুভরের ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুলটি ছিল নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা। বিশেষ করে দেয়ালের বাইরের ক্যামেরায়। গত সপ্তাহে ফরাসি সিনেটে এমনটাই স্বীকার করেছেন জাদুঘরের পরিচালক লরঁস দে কার। তিনি শুনানিতে বলেন, বাইরের ক্যামেরাগুলো খুব পুরোনো, আর এত কম যে পুরো এলাকা কাভার করে না। সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদক জাদুঘরে গিয়ে দেখেছেন, বাইরের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ২৫টি ক্যামেরা আছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র পাঁচটি বাইরের দেয়ালে, বাকিগুলো ভেতরের প্রাঙ্গণে। সেই তুলনায় আকারে অনেক ছোট বৃটিশ মিউজিয়াম বলছে, তাদের বাইরে কয়েক ডজন ক্যামেরা রয়েছে।

বাইরের এত কম ক্যামেরা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ল্যুভর কর্তৃপক্ষ মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। জাদুঘরের পরিচালক বলছিলেন, সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চোরের দল যে স্থানে লক্ষ্য করেছিল, সেই প্রান্তে বাইরে মাত্র একটি ক্যামেরা ছিল। সেটিও আবার ব্যালকনির পশ্চিম দিকে তাক করা ছিল। ফলে চোরের দলের কর্মকাণ্ড বা জানালা ভাঙচুরের দৃশ্য ধরা পড়েনি। ক্যামেরাটি অন্যভাবে বসানো থাকলে জাদুঘরের কন্ট্রোল রুমে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা দেখতে পারতেন, কীভাবে চোরের দল বৈদ্যুতিক মই বেয়ে ব্যালকনিতে উঠছে। চোরের দলের জানালা কাটতে যে কয়েক মিনিট লেগেছিল, তাতে আগে থেকে প্রহরীরা জানলে চুরি ঠেকানোর প্রস্তুতি নিতে পারতেন। কিন্তু সেই সময়ে প্রহরীরা কার্যত অন্ধকারে ছিলেন। ফলে পুলিশকে খবর দিতে তাদের দেরি হয়।

গত বুধবার সিনেটে সাক্ষ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেন, জাদুঘরের বাইরের প্রান্ত পাহারায় তাদেরও দায়িত্ব ছিল। তারাও গাফিলতি করেছে। প্যারিস পুলিশের ক্রাইম প্রিভেনশন সার্ভিসের প্রধান ভিনসাঁ আনরো বলেন, ল্যুভরের চারপাশে পুলিশের সাতটি স্ট্রিট ক্যামেরা আছে। একটি ক্যামেরায় চোরের দলের উপস্থিতি ধরা পড়েছিল। তবে কেউ সেটি খেয়াল করেনি বা সন্দেহ করেনি। জাদুঘর থেকে চুরির অ্যালার্ট আসার পর সবার হুঁশ হয়। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্যারিসে নির্মাণকাজ নিত্যদিনের বিষয়। ক্যামেরা মনিটরিংয়ে পুলিশের কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নেই। জাদুঘরের পরিচালকসহ বিভিন্ন কর্মকর্তার দেওয়া সময়সূচি মিলিয়ে মনে হচ্ছে, এক মিনিটের কম সময়ের ব্যবধানে চোরের দল পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে। প্যারিসের পুলিশপ্রধান বলেন, জাদুঘরকর্মীদের ফোন ও এক সাইকেল আরোহীর খবর পাওয়ামাত্র তিন মিনিটের মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল; কিন্তু তাদের খবর দেওয়া হয়েছিল তখন, যখন চোরের দল প্রদর্শন বক্সের কাচ কাটাকাটি শুরু করে দিয়েছে। তিন মিনিটের কম সময়ের মধ্যে চোরের দল আটটি মূল্যবান জিনিস নিয়ে ছিটকে পড়ে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/187391_Kaium-9.webp

Sunday, October 5, 2025

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়ে কি প্রায়শ্চিত্ত করতে চায় ফ্রান্স-যুক্তরাজ্য by মো. সাহাবুল হক

জি-৭ ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ তিন দেশ—কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে।

এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৫০–এ দাঁড়াবে। প্রশ্ন উঠছে, এ স্বীকৃতির বাস্তবিক অর্থ কী? এতে আসলে ফিলিস্তিনের কতটুকু লাভ হবে? এর আগে ১৪৭টি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও তা ৭৭ বছর ধরে ফিলিস্তিন একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি।

বহু দেশের স্বীকৃতি সত্ত্বেও ফিলিস্তিন কিংবা গাজা উপত্যকার নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসন কখনোই থামেনি। এমনকি বর্তমানে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল সৃষ্ট চলমান অবরোধ সেখানে দুর্ভিক্ষ রূপ লাভ করেছে। ওষুধ, খাদ্য ও জরুরি সহায়তা সেখানে পৌঁছানো একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

আজ পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় হাজার শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও নিরস্ত্র সাধারণ নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরে গাজায় অন্তত ৩৫ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই অঞ্চলে ইসরায়েলের নৃশংসতায় প্রায় দেড় লাখ ফিলিস্তিনি মানুষ নিহত হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষকে হতে হয়েছে পঙ্গু আহত ও উদ্বাস্তু। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি হয়েছেন শরণার্থী।

বিশ্লেষকের মতে, জি-৭ ভুক্ত উল্লিখিত রাষ্ট্রগুলোর স্বীকৃতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য অবশ্যই কূটনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। তবে সেটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

অনেক বিশ্লেষক বলেছেন, ফিলিস্তিনির পক্ষে স্বীকৃতি দেওয়া আগের ১৪৭ দেশের মতো এই তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিও একধরনের প্রতীকী। এ প্রতীকী স্বীকৃতি ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত স্বাধীনতা কতটুকু আনতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

ফিলিস্তিনের পক্ষে স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের সংখ্যা দিন দিন হয়তো আরও বাড়বে, তবে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যর ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য এ স্বীকৃতি অনেকটা ‘পাপের প্রায়শ্চিত্ত’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের এ সংকটের পেছনে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক নীতি এবং সমর্থনই মূলভাবে দায়ী।

অটোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ও ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের তৎপরতা

ফিলিস্তিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের (১২৯৯-১৯২২) একটি প্রদেশ। শত শত বছর ধরে খ্রিষ্টান জনগণ ও মুসলমানরা ফিলিস্তিনে পাশাপাশি বসবাস করতেন। সেখানে ছোট একটি ইহুদি গোষ্ঠীও বাস করত।

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিলে মিত্রশক্তির টার্গেটে পরিণত হয়। এ সময়ে অটোমানদের আরব প্রদেশগুলোতে ধীরে ধীরে আরব জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে।

আরবরা অনুভব করে তুর্কিরা তাদের ওপর শাসন করছে এবং নিজেদের সংস্কৃতি ও ভাষা উপেক্ষা করছে। সুযোগটি ব্রিটিশরা কাজে লাগায় এবং আরব ও তুর্কিদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে।

ব্রিটিশরা আরবদের স্বপ্ন দেখায়, আরবরা অটোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে যুদ্ধ শেষে আরবদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে ব্রিটেন সহায়তা করবে {ম্যাকমোহন-হুসেইন চিঠিপত্র (১৯১৫-১৬)}। আরবরা ব্রিটিশদের এই ফাঁদে পা দেয়। ঠিক একই সময়ে ব্রিটেন ফ্রান্সের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি করে, ইতিহাসে যেটি সাইক্স-পিকো চুক্তি (১৯১৬) হিসেবে পরিচিত।

অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এ চুক্তি সম্পন্ন হয়। এ চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ঐকমত্যে পৌঁছে যে যুদ্ধোত্তর অটোমান ভূখণ্ডকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে। ব্রিটেন পাবে ইরাক ও ফিলিস্তিন আর ফ্রান্স পাবে সিরিয়া, লেবানন, দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়া (তুরস্ক) ও মসুলের (ইরাক) কিছু অংশ।

এ চুক্তিতে রাশিয়া পরে যুক্ত হয় এবং তারা পায় কনস্টান্টিনেপল (ইস্তাম্বুল), আর্মেনিয়া ও কুর্দিস্তানের কিছু অংশ। সাইক্স-পিকো চুক্তি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। যদিও তা পরে ব্রিটেন দখল করে নেয়।

রাশিয়া পরে এ চুক্তির বিষয় ফাঁস করে দিলে বিষয়টি বিশ্ববাসীর নজরে আসে। ওই বছরেই আরবরা ব্রিটিশদের সহায়তায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং আরবরা মক্কা, জেদ্দা, দামেস্ক ও অন্যান্য শহর দখল করে নেয়।

এর পরের বছর ১৯১৭ সালে ব্রিটেনের তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব আর্থার বেলফোর ঘোষণা দেন যে ব্রিটেন ফিলিস্তিনে ‘ইহুদি জনগণের একটি জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করে। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম হয়।

এখানে ব্রিটিশরা একসঙ্গে কয়েকটি কাজ করে। তারা আরবদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়, ইহুদিদের জন্য আবাসভূমির ঘোষণা করে এবং ফ্রান্সের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের জমি ভাগাভাগির বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এসব ঘটনা একসঙ্গে ঘটে। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে (আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয় ১৯২২ সালে), সাইক্স-পিকো চুক্তি এবং পরে সেভ্রেস (১৯২০) চুক্তির মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট অংশ বিভক্ত হয়। কিন্তু আরবদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ব্রিটেন স্বাধীন আরব রাষ্ট্র বানানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না, অর্থাৎ ব্রিটেনের কাছ থেকে আরবরা ধোকা খায়। মাঝখান দিয়ে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র বানানোর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ও ইহুদি রাষ্ট্র তৈরির চূড়ান্ত রূপ

১৯২০ সালে লিগ অব ন্যাশনসের মাধ্যমে ব্রিটেন ফিলিস্তিনে ম্যান্ডেট গ্রহণ করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে শাসন করার বৈধতা পায়। এ ম্যান্ডেটের একমাত্র ভিত্তি ছিল বেলফোর ঘোষণা (১৯১৭)। ব্রিটেন ফিলিস্তিনে ম্যান্ডেট পাওয়ার পর এ সময়ে রাশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিরা জাহাজে করে দলে দলে ফিলিস্তিনে আসা শুরু করে।

এককথায় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ঢল নামে। ফিলিস্তিনি আরবরা বুঝতে পারে, তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। বিষয়টা আরব জনগণের মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং ক্ষোভ দেখা দেয়। ফলে ফিলিস্তিনি আরবরা বিদ্রোহ (১৯৩৬-১৯৩৯) শুরু করে।
এ সময় পর্যন্ত ব্রিটেন ফিলিস্তিনিদের জাতি হিসেবে ন্যূনতম অধিকারের প্রতি কোনো সম্মান প্রদর্শন করেনি।

ফিলিস্তিনি আরবরা ব্রিটিশ সেনা ও ইহুদি নাগরিকদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। কিন্তু ব্রিটিশ সেনারা ফিলিস্তিনি আরবদের কঠোর হাতে দমন করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৭ সালে পিল কমিশন গঠন করে।

সেখানে ফিলিস্তিনকে আরব ও ইহুদি অঞ্চলে দুই ভাগে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনি আরব ও ইহুদি উভয়ই এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এরই মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) শুরু হয়। এ যুদ্ধে হিটলারের নাৎসি বাহিনী দ্বারা লাখ লাখ ইহুদি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় ও ইহুদিদের প্রতি আন্তর্জাতিক সহানুভূতি বাড়ে।

যুদ্ধ শেষে দাবি উঠতে থাকে বেঁচে যাওয়া ইহুদিদের নিয়ে আলাদা একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ইহুদিদের রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো দাবি জানান এবং ফিলিস্তিনে তাদের জায়গা দেওয়া পক্ষে মতামত দেন। ব্রিটেন বিষয়টা ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে তোলে।

জাতিসংঘ ফিলিস্তিন বিভক্তকরণ পরিকল্পনা (ইউএন রেজল্যুশন ১৮১) অনুমোদন করে। যেখানে ফিলিস্তিনকে দুটি রাষ্ট্রের ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, একটি ইহুদি রাষ্ট্র ও অন্যটি ফিলিস্তিনি আরব রাষ্ট্র। জেরুজালেমকে রাখা হয় আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে।

প্রস্তাবে বলা হয়, ফিলিস্তিনের মোট জমির ৫৫ ভাগ জমি ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য। ৪৫ ভাগ জমি ফিলিস্তিনি আরবদের জন্য। অথচ ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ।

তাদের মালিকানাধীন জমি ছিল ফিলিস্তিনের মোট জমির ৭ শতাংশ। জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্ত আরব রাষ্ট্রগুলো মেনে নেয়নি।

এ সিদ্ধান্তকে ইহুদিরা সাধুবাদ জানায় এবং ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে ইহুদিরা বিজয় উল্লাস শুরু করে। জাতিসংঘের একতরফা এ ঘোষণার পর শুরু হয় নতুন অধ্যায়। ইহুদি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ধীরে ধীরে সামনে আসে এবং সেখানকার আরব জনগোষ্ঠীর ওপর শুরু হয় নির্যাতন।

১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ৭ লাখ ফিলিস্তিনি নিজ ভূখণ্ড ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হয় এবং ব্রিটিশরা ওই দিনই ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যায়। পরদিন ইহুদি নেতারা ঘোষণা করেন, সেদিন রাতেই ইহুদি রাষ্ট্রের জন্ম হবে। ইসরায়েল রাষ্ট্র জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরবরা আক্রমণ শুরু করে।

শুরু হয় প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। এরপর বিভিন্ন সময় ১৯৫৬, ১৯৬৭, ১৯৭৩, ১৯৮২ ও গাজা যুদ্ধগুলো, যা এখনো চলমান। প্রতিটি যুদ্ধে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপরই বয়ে গেছে নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ।

বেলফোর ঘোষণার (১৯১৭) মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন শুরু হলেও ইহুদিরা ১৮৯৭ সাল থেকে চাইছিল, একটি আলাদা রাষ্ট্র গড়তে। সে হিসাবে ৫০ বছর ধরে সময় নিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র জোর করে দখল করে নেয় ইসরায়েল।

আর এ পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্রিটেন ও ফ্রান্স। এ রাষ্ট্র দুটি এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে। সেটাও আবার শর্ত সাপেক্ষে। এটি একধরনের পাপের প্রায়শ্চিত্ত বললে বেশি বলা হবে। গত ১০০ বছরে ইসরায়েলের এই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র দখলকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো যুদ্ধ–বিগ্রহ হয়েছে।

হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন। লাখ লাখ আরব তাঁদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন। আহত ও পঙ্গু হয়েছেন অগণিত মানুষ। এ ইস্যু নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য বছরের পর বছর উত্তেজনা বিরাজ করে। মধ্যপ্রাচ্যের খুব কম দেশ আছে, যার সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ হয়নি।

এ যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যাও অনেক, শুধু টাকা দিয়ে যেটা গণনা করা সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সীমারেখাতেও এসেছে পরিবর্তন। এর সব দায়ভার ব্রিটেন ও ফ্রান্স কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

রাষ্ট্র দুটি তাদের কৃতকর্মের জন্য পৃথিবীবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে, বিনা শর্তে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলে যদি পাপের প্রায়শ্চিত্ত কিছুটা লাঘব হয়। তা না হলে প্রতীকী স্বীকৃতি দিয়ে শুধু সংখ্যায় বাড়ানো হবে, ফিলিস্তিনের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কিছুই হবে না।

ফিলিস্তিন সংকট কোনো ধর্মীয় সংকট নয়, এটি একটি দখলদারি ও উপনিবেশবাদী আগ্রাসনের ইতিহাস। ইহুদি জনগণের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্রের প্রয়োজন থাকলেও ফিলিস্তিন জাতিকে তাদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হওয়া ইতিহাসের একটি বড় অন্যায়।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আন্তর্জাতিক সমাজের উচিত সেই ভুল শোধরানোর। শুধু প্রতীকী স্বীকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

এগুলো হলো গাজা উপত্যকায় অবরোধ প্রত্যাহার, মানবিক সাহায্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং একটি কার্যকর ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।

* ড. মো. সাহাবুল হক, অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Monday, September 29, 2025

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতিতে নতুন প্রশ্ন, নেতৃত্ব দেবে কে? by পল অ্যাডামস

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসে আয়োজিত আলোচনায় অংশ নেন ফিলিস্তিনি কূটনীতিক হুসাম জমলট। তখনই বৃটেন, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দেয় বেলজিয়াম। জমলট একে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আখ্যা দিয়ে বলেন, নিউইয়র্কে যা হতে যাচ্ছে, সেটিই হয়তো দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান কার্যকর করার শেষ চেষ্টা। সেটা ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না।

কয়েক সপ্তাহ পর বৃটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও একই পদক্ষেপ নিল। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে আমরা শান্তির সম্ভাবনা ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান টিকিয়ে রাখতে পদক্ষেপ নিচ্ছি। নিরাপদ ইসরাইলের পাশাপাশি টিকে থাকার মতো একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু এ মুহূর্তে আমরা কোনোটিই পাইনি।

এর আগে ১৫০টির বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে বৃটেন ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বলে মনে করছেন অনেকেই। সাবেক কর্মকর্তা জাভিয়ের আবু ঈদ বলেন, ফিলিস্তিন এখন বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে আছে। বিশ্ব ফিলিস্তিনের পক্ষে সংগঠিত।

রাষ্ট্রস্বীকৃতির জটিল প্রশ্ন:
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- কোন ভূখণ্ডকে ফিলিস্তিন বলা হচ্ছে? রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির জন্য ১৯৩৩ সালের মন্টেভিডিও কনভেনশন চারটি মানদণ্ড দিয়েছে। ফিলিস্তিনের আছে স্থায়ী জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা। কিন্তু ‘সংজ্ঞায়িত ভূখণ্ড’ বা কার্যকর সরকার নেই। ফিলিস্তিনিদের স্বপ্নের রাষ্ট্র হলো তিন অংশে বিভক্ত। তাহলো পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা। এর সবই ইসরাইল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করে। পশ্চিম তীর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে ইসরাইলি দখল ও বসতি স্থাপনের কারণে। গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত। আর পূর্ব জেরুজালেম বসতি দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে।

নেতৃত্ব সংকট: রাষ্ট্রের জন্য কার্যকর সরকার প্রয়োজন। কিন্তু ২০০৭ সালের পর থেকে ফাতাহ ও হামাসের দ্বন্দ্বে গাজা ও পশ্চিম তীরে দুই ভিন্ন শাসনব্যবস্থা চলছে। মাহমুদ আব্বাস নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ কার্যত অসহায়। সেখানে সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০০৬ সালে। এর মানে ৩৬ বছরের নিচে কেউ কখনো ভোট দেয়নি। আইনজীবী ডায়ানা বুত্তু বলেন, এত বছর নির্বাচন হয়নি- এটা অকল্পনীয়। নতুন নেতৃত্ব দরকার। এই নেতৃত্ব সংকটে বারবার উঠে আসে কারাগারে বন্দি মারওয়ান বারঘুতির নাম। জনসমর্থনে তিনি আব্বাসের চেয়ে অনেক এগিয়ে, যদিও ২০০২ সাল থেকে ইসরাইলি কারাগারে আছেন। জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি ফিলিস্তিনি তাঁকেই ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে চান।

ইসরাইলের অবস্থান: বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহুবার স্পষ্ট করেছেন, তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র চান না। বরং নতুন বসতি অনুমোদন দিয়ে পূর্ব জেরুজালেমকে পশ্চিম তীর থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করেছেন। ইসরাইলি মন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ বলেন, স্বীকৃতি দেয়ার মতো কোনো রাষ্ট্র নেই, আর স্বীকৃতি দেয়ার মতো কেউ নেই।

আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও বাস্তবতা: ফ্রান্স-সৌদি আরবের পৃষ্ঠপোষকতায় গৃহীত ‘নিউইয়র্ক ডিক্লারেশন’-এ বলা হয়েছে, হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করে গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের হাতে দিতে হবে। ১৪২টি দেশ এটি সমর্থন করেছে। হামাসও বলেছে, তারা টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের হাতে দায়িত্ব ছাড়তে প্রস্তুত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছেন এবং তার ‘রিভেরা প্ল্যান’-এ গাজার দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কোনো উল্লেখ নেই।

প্রতীকী স্বীকৃতির সীমাবদ্ধতা: ডায়ানা বুত্তু মনে করেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মূল্যবান হতে পারে, তবে নির্ভর করছে দেশগুলোর উদ্দেশ্যের ওপর। লন্ডনের কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল প্রতীকী স্বীকৃতিতে কাজ হবে না, বাস্তব অগ্রগতি দরকার। যেমন পশ্চিম তীর-গাজার একত্রীকরণ, নির্বাচন আয়োজন, পুনর্গঠন পরিকল্পনা ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে বড় বাধা ইসরাইলের কঠোর বিরোধিতা। ইসরাইল ইতিমধ্যে পশ্চিমতীর দখল করার হুমকি দিয়েছে।

শেষ কথা: অতএব, রাষ্ট্রস্বীকৃতি পেলেও ফিলিস্তিন এখনো কার্যকর নেতৃত্বহীন। আব্বাস প্রায় ৯০ বছরের, বারঘুতি কারাগারে, হামাস বিপর্যস্ত, আর পশ্চিম তীর খণ্ডিত। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অবশ্যই প্রতীকী শক্তি দেয়, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি বিষয় হলো- গাজায় রক্তপাত বন্ধ করা। ডায়ানা বুত্তু বলেন, আমার কাছে রাষ্ট্রস্বীকৃতির চেয়ে জরুরি হলো হত্যাযজ্ঞ থামানো। দেশগুলোকে এখনই কিছু করতে হবে।
(অনলাইন বিবিসি থেকে অনুবাদ)

mzamin

Wednesday, September 24, 2025

জাতিসংঘ ফিলিস্তিন সম্মেলন: কেন যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সকে আক্রমণ করছে, সৌদি আরবের বিষয়ে নীরব

মিডল ইস্ট আইঃ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ‘দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান’ (ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংকটের) কার্যকর করা বিষয়ে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের উদ্যোগে আয়োজিত জাতিসংঘ শীর্ষ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র খুশি নয়। ওয়াশিংটন এটি স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও শীর্ষ কর্মকর্তা এ নিয়ে কিছু লুকোননি। তাঁরা নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনের সমালোচনা করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্মেলনকে আগে ‘প্রতীকী’ ও ‘ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাতের ওপর কোনো প্রভাব নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি বলেছিলেন, এটি হামাসকে ‘সাহস জোগানোর’ একটি পদক্ষেপ।

ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি আরও খানিকটা এগিয়ে সম্মেলনকে ‘ঘৃণ্য’ আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন, সহ-আয়োজক ফ্রান্সকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য ‘ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা’ (ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সমুদ্রসৈকত এলাকা) ত্যাগ করতে হবে।

যেখানে ট্রাম্প প্রশাসন ফ্রান্সকে ব্যঙ্গ করাসহ সম্মেলনের সমালোচনায় জোরালো ও শক্ত ভাষা ব্যবহার করতে দ্বিধা করেনি; সেখানে সৌদি আরবের সহ-আয়োজক হওয়ার সিদ্ধান্তে উল্লেখযোগ্যভাবে নীরব থেকেছে তারা।

কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ফ্রান্সকে আক্রমণ করে সৌদি আরবকে ছাড় দেওয়ার এ দ্ব্যর্থহীন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি রিয়াদের ক্ষমতাকেই প্রতিফলিত করে। এর পেছনে রয়েছে সৌদি আরবের আর্থিক শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সম্পর্ক সম্প্রসারণের ক্ষমতা।

কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক বাদের আল-সাইফ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন নীরবে দেখিয়েছে যে, তারা ফিলিস্তিন বিষয়ে তাদের ঘনিষ্ঠ আরব মিত্রদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে চায় না।

‘ফ্রান্স কি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে’, প্রশ্ন তোলেন সাইফ। বলেন, ‘গালফভুক্ত দেশগুলোর প্রকৃত প্রভাব তাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি, আর এটি এমন প্রভাব, যা ট্রাম্প সহজে বোঝেন।’

গতকাল সোমবার জাতিসংঘের শীর্ষ সম্মেলনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর বক্তব্যে উপস্থিত নেতারা দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানান। ফ্রান্স সম্মেলনে একটি উচ্চপর্যায়ের অবস্থান নিয়েছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান উপস্থিত না হলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান তাঁর পক্ষে বক্তব্য দেন।

গত মে মাসে ট্রাম্প সৌদি আরবে এক ঐতিহাসিক সফর করেন। সফরে তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন যে তাঁর প্রশাসন বৈদেশিক সংঘাতে কম হস্তক্ষেপ করবে। সফরের সময় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০ বিলিয়ন (৬০ হাজার কোটি) ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সফরে ট্রাম্পের দেওয়া ভাষণ ও সৌদি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির প্রভাব মিশ্র—কিছু ভালো ফল হয়েছে, কিছু হয়নি।

রিয়াদের চাপের কারণে ট্রাম্প ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা বন্ধ করেছেন। হুতিরা এখনো ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে। একইভাবে, ট্রাম্প সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন।

কিন্তু মূল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ট্রাম্প তাঁর ভাষণ অনুযায়ী কাজ করেননি। তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের সময় তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করেন, যদিও দ্রুতই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি হত্যাকাণ্ডেও নিঃশর্ত সমর্থন দিয়েছেন; যা জাতিসংঘ, ইতিহাসবিদ ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা জাতিগত হত্যা বলে উল্লেখ করেছেন।

এদিকে সৌদি আরব–যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষের মধ্যে ১৪২ বিলিয়ন (১৪ হাজার ২০০ কোটি) ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হওয়ার পর থেকে কোনো বড় অস্ত্র বিক্রয়ের প্রকাশ্যে ঘোষণা আসেনি। সৌদি আরব এআই চিপের বড় ক্রেতা হতে চলেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত এ–সংক্রান্ত চুক্তির কোনো প্রকাশ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।

‘সৌদি আরবকে পাশে রাখা’

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা নিয়ে আলোচনার সময় ট্রাম্প বিশেষভাবে আক্রমণাত্মক বা কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ৭ অক্টোবর ২০২৩ ইসরায়েলে হামাসের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছেন। এটি ‘জাতিহত্যা, সম্ভবত’। ইসরায়েল গাজায় জাতিহত্যা চালাচ্ছে—সম্প্রতি জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্তে বিষয়টি (ইসরায়েলে হামাসের হামলা) এড়িয়ে গেছে।

কিন্তু সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘোষণা—ইসরায়েল গণহত্যা করছে। এ বিষয়ে ট্রাম্প নীরব।

‘যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নীতি এসেছে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে (ইউরোপ ও গালফের দেশগুলোর বিষয়ে)’, বলেন ওয়াশিংটনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি গস।

গ্রেগরি বলেন, ট্রাম্প প্রথমেই জার্মানি বা ফ্রান্সকে নেতিবাচকভাবে দেখেন। কিন্তু গালফের দেশগুলো তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করে ও ইউরোপের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

ট্রাম্পের আশা, জাতিসংঘে তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, কাতার ও সৌদি আরবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গাজার বিষয়ে আলোচনা করবেন তিনি; যদিও অনেক নেতাই এ সময় ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকবেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্রান্সের সমালোচনা করা ট্রাম্পের দূতদের জন্য সহজ, কারণ এতে ঝুঁকি কম। বিপরীতে, গুরুত্বপূর্ণ গালফ মিত্র সৌদি আরবের সমালোচনা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন। কারণ, মিত্রদেশটির জনগণ গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতা নিয়ে রেগে আছেন।

ফ্রান্স ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় তারা চায়, যুক্তরাষ্ট্র জোটে সক্রিয় থাকুক এবং এজন্য দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সচেষ্ট প্যারিস। কিন্তু সৌদি আরব ন্যাটোর অংশ নয়, তাই তাদের ওপর এমন চাপ নেই। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আবার, সিরিয়া, লেবানন ও ইরানের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসন যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেওয়ায় গালফের দেশগুলো উদ্বিগ্ন।

গত সপ্তাহে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। এ ছাড়া চীনের সহায়তায় নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনও শুরু করেছে রিয়াদ।

গ্রেগরি গস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান–সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তিকে আমলে নিয়েছে। সেই সঙ্গে সৌদি আরবকে পাশে রাখার চেষ্টা করছে তারা। কারণ, অনেকেরই ধারণা, পাকিস্তানের মাধ্যমে চীন ওই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। এ অবস্থায় ফ্রান্স যদি ন্যাটো ছেড়েও যায়, তাতে কারও মাথাব্যথা নেই।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-23%2Fxfp4d0bz%2FSaudi-Arabia%E2%80%9301.webp?rect=77%2C0%2C1182%2C788&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত আরব–ইসলামিক জরুরি সম্মেলনে অংশ নেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

Thursday, August 28, 2025

ফ্রান্সে ইহুদিবিদ্বেষ অভিযোগ তোলায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে তলব

ফ্রান্স ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে এমন অভিযোগ করায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত চার্লস কুশনারকে তলব করবে ফ্রান্স। এরই মধ্যে এ বিষয়ে জানিয়ে দিয়েছে ফ্রান্স। এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি বলছে, কুশনার নিজে ইহুদি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাই ডারেড কুশনারের পিতা। সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনকে উদ্দেশ্য করে এক খোলা চিঠিতে মন্তব্য করেন তিনি। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফ্রান্সে ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষ তীব্রভাবে বেড়েছে বলে দাবি করেন কুশনার। ইসরাইলের সমালোচনার প্রতিধ্বনি করে তিনি লিখেছেন, ফ্রান্সে প্রায়দিন রাস্তায় হামলার শিকার হতে হচ্ছে ইহুদিদের। সিনাগগ বা স্কুলে ভাঙচুর চলছে। ইহুদিদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হচ্ছে। এমনকি কিন্ডারগার্টেনেও ইহুদিবিদ্বেষী ঘটনার কথা আপনার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে।

তিনি ম্যাক্রনকে ইসরাইলবিরোধী সমালোচনা কমানোর আহ্বান জানান এবং বলেন, আমি প্রস্তুত আছি ফ্রান্সের নেতাদের সঙ্গে কাজ করে একটি কার্যকর পরিকল্পনা তৈরির জন্য। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ফ্রান্স এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। এগুলো একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। একই সঙ্গে তারা ভিয়েনা কনভেনশন ১৯৬১-এর কথা উল্লেখ করে জানায়, কোনো রাষ্ট্রদূতের বিদেশি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি নেই। এই চিঠি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও মিলে যায়। গত সপ্তাহে ম্যাক্রনকে চিঠি লিখে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নিয়ে ম্যাক্রন ইহুদিবিদ্বেষ উসকে দিচ্ছেন।

ফ্রান্স আগামী সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা করছে। ঘোষণার সময় ম্যাক্রন বলেন, আমাদের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে এবং ইসরাইলকে পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়ে ও নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে সবার নিরাপত্তায় অবদান রাখতে হবে। অন্য কোনো বিকল্প নেই। ম্যাক্রন আগেও প্রকাশ্যে বলেছেন, ইহুদিবিদ্বেষ ফরাসি মূল্যবোধের পরিপন্থি। এ কারণে গাজা সংঘাতের পর ইহুদিদের উপাসনালয় ও কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে আক্রমণ চালায়। এতে প্রায় ১২০০ জন নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরাইল গাজায় হামলা চালায়। সেখানকার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ইতিমধ্যে ৬২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি গাজা সিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক সংস্থা জানিয়েছে, অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ক্ষুধা, নিঃস্বতা ও মৃত্যুর মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। অন্যদিকে ইসরাইল এই প্রতিবেদনের সত্যতা অস্বীকার করে একে নির্লজ্জ মিথ্যা বলে দাবি করেছে।

Tuesday, July 29, 2025

ফ্রান্স কেন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, আসল কারণ কী by মুহাম্মদ জুলফিকার রাহমাত

ফ্রান্সের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইন্দোনেশিয়া ‘শান্তির পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। ভাসা ভাসাভাবে দেখতে গেলে, এই কূটনৈতিক সমর্থন ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ফ্রান্সের এই ইঙ্গিতের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ও বিপজ্জনক হিসাব–নিকাশ, যা কেবল বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে না, বরং সেটিকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ফ্রান্স যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটা মোটেই ন্যায়বিচার নয়। এটি স্বাধীনতাও নয়। এটি সেই পুরোনো বিভ্রমেরই আধুনিক সংস্করণ, যা দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের বন্দী ও ভূমিহীন করে রেখেছে। সেই তথাকথিত দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান।

জাকার্তার সরকারি বিবৃতিতে ফ্রান্সের পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো হয়েছে তার কারণ হলো একটি ‘সার্বভৌম ও স্বাধীন’ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন করা হয়েছে। এর ভিত্তি হবে ১৯৬৭ সালের সীমানা এবং যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি কেমন ধরনের রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করছেন। একটি সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকৃত ফিলিস্তিন, ইসরায়েলের স্বীকৃতি যেখানে থাকবে। মাখোঁর কল্পিত রাষ্ট্রে বসতি উচ্ছেদের কথা নেই, দখলকৃত ভূমিতে পুনর্বাসনের কথা নেই। এমনকি গাজায় যুদ্ধাপরাধের জন্য জবাবদিহির কোনো বালাই নেই। শুধু একটি কূটনৈতিক তকমার বিনিময়ে একপেশে আত্মসমর্পণ।

এটি শান্তির পথে কোনো পদক্ষেপ নয়—এটি স্থায়ী দাসত্বের ছক।

ফ্রান্সের অবস্থান শুধু পক্ষপাতদুষ্টই নয়, এটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ম্যাখোঁ ‘হামাসের নিরস্ত্রীকরণের’ আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে গাজা পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে ইসরায়েলের নিরস্ত্রীকরণ কোনো দাবি নেই, বেসামরিক মানুষ হত্যার জন্য কোনো জবাবদিহি নেই, আর ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত সার্বভৌমত্বের কোনো নিশ্চয়তাও নেই। বরং ফিলিস্তিনিদের বলা হচ্ছে প্রতিরোধ ত্যাগ করতে, অথচ দখলদার রাষ্ট্রটির ওপর দখল শেষ করার কোনো চাপই নেই।

ইন্দোনেশিয়া যদি কোনো শর্ত ছাড়াই এই চুক্তিকে প্রশংসা করে, তবে সেটি এমন একটি কাঠামোকে সমর্থন করা হয়, যা কূটনীতির ভাষায় ফিলিস্তিনিদের অধিকার বিসর্জন দেওয়ার পথ খুলে দেয়। এভাবে, ইন্দোনেশিয়াও এমন এক প্রক্রিয়ার অংশ হচ্ছে, যা ইসরায়েলকে তার দীর্ঘস্থায়ী দখল ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করে।

কারণ, আমরা গাজায় যা দেখছি, তা শুধু যুদ্ধ নয়—এটি একটি জাতিকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার একটি প্রক্রিয়া।

ইসরায়েলের নেতারা সংযমের কোনো ভান করছেন না। দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল বেজালেল স্মোট্রিচ ঘোষণা দিয়েছেন যে গাজাকে ‘পুরোপুরি ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া’ উচিত। ইসরায়েলের আইনসভা নেসেটের সদস্যরা এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা এই ভূখণ্ডকে ‘সমূলে উৎপাটন’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। অনাহার, অবরোধ ও বোমাবর্ষণ কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এর পেছনে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য আছে। লক্ষ্য শুধু শাস্তি দেওয়া নয়, বরং গাজাকে জনশূন্য করে ফেলা।

আর এই গণহত্যার আকাঙ্ক্ষাটা নতুন কিছু নয়। এটি ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থীদের দীর্ঘদিনের একটি নীলনকশার অংশ, যেটি ‘মহান ইসরায়েল’ প্রকল্প নামে পরিচিত। এই নীলনকশায় কেবল জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করাটাই উদ্দেশ্য নয়, এর বিস্তৃতি আরও বেশি। একটি বিশাল ভূখণ্ডে কেবল একটি জাতির নিয়ন্ত্রণে থাকার স্বপ্ন এখানে রয়েছে। এই মডেলে ফিলিস্তিনিরা নাগরিক বা প্রতিবেশী নয়, তারা এমন এক পথের কাঁটা, যাদেরকে তুলে ফেলতে হবে।

এই প্রেক্ষাপট থেকেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রতি ফ্রান্সের স্বীকৃতিকে বুঝতে হবে। এটি কোনো নীতিগত সাহসী সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে একটি বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার কূটনৈতিক কৌশল। সচেতনভাবে হোক আর অসচেতনভাবে হোক, এটি গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে ইন্দোনেশিয়া, ইসরায়েলি শাসকদের নৈতিক মনোবল সেটিকে গ্রহণ করে, সেই শাসনব্যবস্থার জন্য একটি নৈতিক বৈধতা তৈরি করে দিচ্ছে।

এত দুর্ভোগের মুখে, অগ্রগতির যেকোনো ইঙ্গিতকে স্বাগত জানানো প্রলুব্ধকর হতে পারে। কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া প্রতীকী স্বীকৃতি কেবল বিদ্যমান বৈষম্যকেই আরও শক্তিশালী করে। একটিকে যদি বলা হয় ‘রাষ্ট্র’, অথচ সেটি থাকবে ইসরায়েলি চেকপোস্টে ঘেরা, কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকবে না, থাকবে না ফেরার অধিকার—তাহলে তা প্রকৃতপক্ষে কোনো রাষ্ট্র নয়, বরং একটি খোলা আকাশের নিচের কারাগার, যার হাতে শুধু একটি পতাকা তুলে দেওয়া হয়েছে।

গাজাবাসী যে সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে আছে, তাতে কোনো অগ্রগতির আভাসকে স্বাগত জানানো যায় না। কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কোনো প্রতীকী স্বীকৃতি বিদ্যমান বাস্তবতাকেই আরও শক্তিশালী করবে। সামরিক বাহিনীহীন ফিলিস্তিন! এর মানে হচ্ছে, ইসরায়েলি চেকপোস্টে ঘেরা একটি জায়গা, যাদের কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকবে না, থাকবে না সেখানে ফেরার অধিকার। এটি কোনো রাষ্ট্র নয়, এটি এমন এক খোলা কারাগার, যেখানে শুধু একটা পতাকা থাকবে।

এখন কূটনৈতিক নাটকের জন্য করতালি দেওয়ার দরকার নেই। এখন প্রয়োজন মিথ্যা সমাধানকে প্রত্যাখ্যান করা। এখন যে দ্বিরাষ্ট্র কাঠামোর কথা বলা হচ্ছে, সেটা ন্যায়বিচারের পথ নয়। এটি এমন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা কিনা উপনিবেশবাদকে সক্ষম করে তোলে।

* মুহাম্মদ জুলফিকার রাহমাত, সেন্টার ফর ইকোনমিকের ইন্দোনেশিয়া-মেনা ডেস্কের পরিচালক
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ বাড়ছেই
গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ বাড়ছেই। ছবি : রয়টার্স

Wednesday, July 23, 2025

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ ২৩ দেশের বিবৃতি

দুই ডজনেরও বেশি দেশ গাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, গাজায় দুর্ভোগ নতুন মাত্রার অমানবিকতায় পৌঁছেছে। খবর আলজাজিরার।

এ ধরনের বিবৃতি ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরও ত্বরান্বিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। কারণ, মিত্রদের তীব্র ভাষায় প্রতিবাদের সর্বশেষ পরিস্থিতি বলছে, গাজায় চলমান অমানবিক যুদ্ধের রেশ ইউরোপে ইসরায়েলের মিত্রদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।

সোমবার (২১ জুলাই) এ বিবৃতিটি এসেছে। ২১ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে গাজার দুই মিলিয়নেরও বেশি বাসিন্দা বিপর্যয়কর মানবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর এ পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে ইসরায়েলের সৃষ্টি।

ইসরায়েলি মিত্র যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরও ২১টি দেশ যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, যুদ্ধ এখনই শেষ হওয়া উচিত।

স্বাক্ষরকারীরা আরও বলেন, গাজার বেসামরিক নাগরিকদের দুর্ভোগ নতুন গভীরতায় পৌঁছেছে। আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি, ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের হাতে বন্দিদের মুক্তি এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সাহায্যের অবাধ প্রবাহের আহ্বান জানিয়েছে দেশগুলো।

শিশুসহ বেসামরিক নাগরিকদের অমানবিক হত্যার নিন্দা জানিয়েছে দেশগুলো বলেছে, গাজার মানুষ পানি ও খাদ্যের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা মেটাতে চেয়ে হত্যার শিকার হচ্ছে। বিবৃতিতে ত্রাণগ্রহণকালে গাজাবাসীর ওপর ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদ জানানো হয়।

জাতিসংঘ এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মে মাসের শেষের দিক থেকে খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে গিয়ে গাজায় ৮৭৫ জন নিহত হওয়ার রেকর্ড করেছে। তবে সংখ্যাটা আরও বেশি। কারণ, অনেক নিহতকে হাসপাতাল পর্যন্ত আনা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া অনেকের মরদেহ উদ্ধারও করা সম্ভব হয়নি। সেসব ধ্বংসস্তূপে পচে-গলে নিঃশেষ হচ্ছে।

দেশগুলো বলেছে, ইসরায়েলি সরকারের সাহায্য বিতরণ মডেল বিপজ্জনক। এটি অস্থিতিশীলতাকে ইন্ধন জোগায় এবং গাজাবাসীকে মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে। ইসরায়েলি সরকারের বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা প্রদানের অস্বীকৃতি গ্রহণযোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে ইসরায়েলকে তার বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে।

লন্ডন থেকে আলজাজিরার সোনিয়া গ্যালেগো বলেন, গাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিষয়ে ইসরায়েলের মিত্রদের কাছ থেকে এই বিবৃতিটি উল্লেখযোগ্যভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি এ বিবৃতিকে ফিলিস্তিনের পক্ষে আন্তর্জাতিক কূটনীতির বড় সফলতা হিসেবে বর্ণনা করেন। 

গাজায় ত্রাণের জন্য হাহাকার। ছবি : সংগৃহীত
গাজায় ত্রাণের জন্য হাহাকার। ছবি : সংগৃহীত

Friday, July 18, 2025

ফ্রান্সে ৪০ বছর কারাভোগের পর এক ফিলিস্তিনপন্থী যোদ্ধাকে মুক্তির নির্দেশ

৪০ বছর কারাভোগের পর ফিলিস্তিনপন্থী এক লেবানিজকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছে ফ্রান্সের আদলত। তার নাম জর্জ ইব্রাহিম আব্দাল্লাহ। আশির দশকে দুই বিদেশি কূটনীতিককে হত্যা করেন তিনি। বর্তমানে আব্দাল্লাহর বয়স ৭৪ বছর। বৃহস্পতিবার প্যারিসের আপিল আদালত এক নির্দেশনায় বলেছে, আগামী ২৫ জুলাই মুক্তি পাবেন ওই ফিলিস্তিনপন্থী যোদ্ধা। তবে শর্ত হচ্ছে মুক্তির পরপরই তাকে ফ্রান্স ত্যাগ করতে হবে এবং তিনি আর কখনই সেখানে ফিরতে পারবেন না। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এতে বলা হয়, ১৯৮২ সালে প্যারিসে মার্কিন কূটনীতিক চার্লস রবার্ট রয় এবং ইসরাইলি কূটনীতিক ইয়াকভ ব্যারিসমান্টভকে হত্যা করেন আব্দাল্লাহ। এছাড়া ১৯৮৪ সালে মার্কিন কনস্যুল জেনারেল রবার্ট হোমকে হত্যার চেষ্টা করেন তিনি। ওই বছরই তাকে আটক করা হয়। পরে ১৯৮৭ সালে দোষী সাবস্ত হওয়ার পর তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত। আব্দাল্লাহ লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী রেভ্যুলশনারি বিগ্রেডের একজন সদস্য ছিলেন। তিনি ফ্রান্সে যাবজ্জীবন পাওয়াদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কারাভোগ করা আসামী। দেশটির নিয়ম অনুযায়ী যাবজ্জীবন পাওয়া আসামীরা ৩০ বছরের কম সময়ের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যান। তবে তার ক্ষেত্রে সে নিয়মের ব্যাতয় ঘটেছে।

ভাইয়ের মুক্তির সংবাদে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন আব্দাল্লাহর ভাই রবার্ট আব্দাল্লাহ। বৃহস্পতিবার লেবাননে বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা আনন্দিত। আমি কখনই ভাবিনি যে ফরাসি কর্তৃপক্ষ তাকে মুক্তি দেবে। বিশেষ করে বেশ কয়েকবার তার মুক্তির আবেদন খারিজ হওয়ার পর সত্যিই এটা আমাদের জন্য আনন্দের। তিনি আরও বলেন, অন্তত একবারের জন্য হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপ থেকে মুক্ত হতে পেরেছে ফ্রান্স।

এই মুক্তির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন আব্দাল্লাহর আইনজীবী জ্য-লুইস চ্যালানসেট। বলেছেন, তাকে আগে মুক্তি না দেয়াটা আইনের জয় অথবা রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি, দুটো বিষয়কেই নির্দেশ করে। আব্দাল্লাহকে লেবাননে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনাই বেশি।

বিপক্ষের আইনজীবীরা আব্দাল্লাহর মুক্তি ঠেকাতে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করতে পারেন। তবে এক সপ্তাহের মধ্যে এই মুক্তি ঠেকানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। ২৫ বছর ধরে মুক্তির আবেদন করছেন আব্দাল্লাহ। তবে এখানে তার মুক্তির বিষয়ে ক্রমাগত ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও একটি বেসামরিক পক্ষ। লেবাননও তাকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছে। দেশটি বারবার বলেছে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া উচিত। এছাড়া তাকে বৈরুতে ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দেশটি।

নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত নভেম্বরে শর্তসাপেক্ষে আব্দাল্লাহার মুক্তির আদেশ দেয় ফ্রান্সের একটি আদালত। তবে বিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, তিনি এখনও তার রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তন করেন নি। তারা এ বিষয়ে আপিল করেন। ফলে আব্দাল্লাহর মুক্তির বিষয়টি তখন স্থগিত করা হয়। 

mzamin

Tuesday, June 10, 2025

আফ্রিকার নতুন ‘চে গুয়েভারা’ ইব্রাহিম যেভাবে আলোড়ন তুললেন by জাভেদ হুসেন

আধুনিক আফ্রিকায় নতুন এক রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ সেনানায়ক ইব্রাহিম ত্রাউরে। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন তিনি।

দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুনভাবে সাজাচ্ছেন তিনি। সেই সঙ্গে নাড়া দিয়েছেন ভিমরুলের চাকে। গোটা সাহেল অঞ্চলে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তাও দিয়েছেন।

মালি ও নাইজারের সাম্প্রতিক সামরিক নেতাদের সঙ্গে একযোগে ফ্রান্সবিরোধী একটি জোট গড়ে তুলেছেন। এই ঘটনা আফ্রিকার নতুন রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছে।

কিন্তু এই ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়ে উঠবে? কারা এর পৃষ্ঠপোষক? এই সামরিক বাহিনী থেকে আসা নেতাদের নিয়ে আফ্রিকার জনমনে প্রতিক্রিয়া কেমন?

ইব্রাহিম ত্রাউরে আর নতুন যুগের বাসনা

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বুরকিনা ফাসোর তৎকালীন সামরিক শাসক পল-হেনরি সান্দাওগো দামিবাকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় আসেন ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাউরে।

সেনাবাহিনীর এই বিদ্রোহের পেছনে প্রধান কারণ ছিল জিহাদি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দামিবার ব্যর্থতা। এই শাসক ছিলেন ফ্রান্সপন্থী। সেটাও তরুণ বুরকিনা নাগরিকদের মনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছিল।

ত্রাউরে শুরু থেকেই নিজেকে টমাস সাংকারার উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরেছেন। সাংকারা ছিলেন এক বিপ্লবী নেতা। তাঁকে আফ্রিকার চে গুয়েভারা বলে ডাকা হয়। তিনি ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বুরকিনা ফাসো শাসন করেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন আফ্রিকান সমাজতন্ত্র ও স্বনির্ভরতার প্রতীক।

ত্রাউরের নেতৃত্বে বুরকিনা ফাসো সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার দিয়েছে ‘জিহাদি’দের বিরুদ্ধে ‘জনগণকে সম্পৃক্ত করে’ লড়াই করার। সরকার একদিকে গণমিলিশিয়া সংগঠনের মাধ্যমে তরুণদের সশস্ত্র প্রতিরোধে যুক্ত করছে।

অন্যদিকে পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ত্রাউরে ফ্রান্সকে তাঁর দেশ থেকে তাদের বাহিনী সরিয়ে নিতে বলেন। বাতিল করেন ফ্রান্সের সঙ্গে করা আগের পুতুল শাসকদের সাক্ষর করা সশস্ত্র চুক্তি। এই সিদ্ধান্ত ছিল যুগান্তকারী।

টমাস সাংকারার উত্তরাধিকার

ত্রাউরের নেতৃত্বের ভাবধারায় স্পষ্টভাবেই প্রতিফলিত হচ্ছে সাংকারার রাজনৈতিক চেতনা-জাতীয় মর্যাদা, স্বনির্ভরতা, উপনিবেশবাদ-বিরোধিতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। সাংকারা তাঁর সময়েই বহুজাতিক করপোরেশন ও পশ্চিমা সাহায্যের বিকল্প খুঁজতে চেষ্টা করেছিলেন।

নারী স্বাধীনতা, গণস্বাস্থ্য, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও কৃষিভিত্তিক স্বনির্ভরতা ছিল তার নীতির মূল কথা। যদিও ১৯৮৭ সালে এক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। সেই অভ্যুত্থানের সঙ্গে দেশের ফ্রান্সপন্থী শক্তির যোগসূত্র ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। কিন্তু সাংকারার ভাবমূর্তি আজও বুরকিনা ফাসো ও গোটা আফ্রিকায় জীবন্ত।

আফ্রিকার বাস্তবতা আজ আরও জটিল। এখন আফ্রিকায় সন্ত্রাসবাদ, চরম দারিদ্র্য, দুর্বল রাষ্ট্রযন্ত্র এবং বৈশ্বিক শক্তির দ্বন্দ্ব একই সঙ্গে উপস্থিত। কিন্তু এই জটিল সময়ে ত্রাউরে সাংকারার সেই ভাবনাকে নতুন যুগে রূপান্তরিত করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন।

সাহেল অঞ্চলে নতুন সামরিক জোট: ফ্রান্সের পতনের সূচনা


২০২৩–২৪ সালের মধ্যে সাহেল অঞ্চলে তিনটি দেশের ক্ষমতায় সামরিক বাহিনী এসেছে—মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজার। তিন দেশের এই সামরিক নেতৃত্ব এখন একত্র হয়ে ‘সাহেল রাষ্ট্রজোট’ (আলিয়ঁস দে জেতা দ্যু সাহেল) নামের একটি জোট গঠন করেছে।

এই জোটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিজের হাতে তুলে নেওয়া, ফ্রান্স ও পশ্চিমাদের সামরিক প্রভাব দূর করা এবং একটি বিকল্প ভূরাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা।

নাইজারে ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম খনি রয়েছে। এই খনি বহু বছর ধরে ফরাসি পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এই খনিজ সম্পদ ব্যবহারের জন্য ফ্রান্স নিজের দেশকে জ্বালানি জোগান দিচ্ছে।

কিন্তু খোদ নাইজারের নাগরিকেরা এখনো সামান্য বিদ্যুতের অভাবে ঘরে কেরোসিনের বাতি জ্বালায়। এসব কিছু সাহেল অঞ্চলে জনরোষের বড় কারণ।

নাইজারে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বাজুমকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল আবদুর রহমান তিয়ানী। এরপর ফ্রান্সবিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র হয়।

এই জোট কেবল নিরাপত্তা নয়, একটি আদর্শিক অবস্থানও গ্রহণ করছে। আর তা হলো পশ্চিমা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আফ্রিকার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার।

এই আন্দোলন শুধু সামরিক নয়। এর একটি গণ ভিত্তিও তৈরি হয়েছে। সেখানকার জনগণ মনে করছে, পশ্চিমা শক্তির উপস্থিতি তাদের দেশে সন্ত্রাস দমন করেনি, বরং তা আরও গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে।

নৈতিক পরাজয়ের মুখে ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্ব

এই অঞ্চলে ফ্রান্স ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল স্থানীয় সরকারগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় ‘সহায়তা’ প্রদান।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এই সহায়তার মধ্য দিয়ে আফ্রিকান দেশগুলোর ওপর এক প্রকার আধিপত্য কায়েম রাখা হয়েছে।

ফরাসি বাহিনীর উপস্থিতি সন্ত্রাস দমন করতে পারেনি। বরং স্থানীয় জনমনে সেই পুরোনো ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে।

এখন ফ্রান্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই পরিবর্তনের জবাবে নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। মানবিক সহায়তা বন্ধ করছে এবং সামরিক হুমকিও দিচ্ছে। কিন্তু এতে কার্যত আফ্রিকার এই নতুন নেতৃত্ব আরও জেদি হয়ে উঠছেন।

জনসাধারণের সমর্থনও বাড়ছে। আফ্রিকান জনমনে এখন প্রশ্ন উঠছে যে ফ্রান্স আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার নামে খনিজ সম্পদ লুটে নিয়েছে, তাকে আর কত দিন সহ্য করব?

রাশিয়া ও চীন: নতুন মিত্র না নতুন আধিপত্য

পশ্চিমা জগৎ আফ্রিকার এই সামরিক নেতৃত্বকে একঘরে করতে চাইছে। আর রাশিয়া ও চীন সেই শূন্যস্থান পূরণে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

মালিতে রাশিয়ার ভাগনার বাহিনী প্রবল হয়েছে। বিভিন্ন দেশে ভাগনারের ভূমিকা বিতর্কিত। কিন্তু মালির সামরিক সরকার মনে করছে, রাশিয়ার সহায়তায় তারা অন্তত সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বাস্তব ফল পাচ্ছে।

বুরকিনা ফাসোতেও রাশিয়ার পতাকা নিয়ে মিছিল হয়েছে। ত্রাউরে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করছেন। চীন তুলনামূলকভাবে ধীরে কিন্তু বিস্তৃত পরিসরে কাজ করছে। তারা কাজ করছে বৃহৎ পরিকাঠামো নির্মাণ, বাণিজ্যিক চুক্তি ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য সহায়তার মাধ্যমে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই নতুন মিত্ররা কতটা স্বাধীনতা দেবে আফ্রিকাকে? নাকি এটি কেবল ঔপনিবেশিকতার নতুন রূপ?

আফ্রিকান জনমতে নতুন আশার উত্থান

সাহেল অঞ্চলে জনসাধারণের একটি বড় অংশ সামরিক সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে। যদিও গণতন্ত্রবাদীরা এতে উদ্বিগ্ন। তবে সাধারণ মানুষ এই পরিবর্তনে নিজেদের নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছে।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম সাংকারার মতো আদর্শবান নেতৃত্বের খোঁজে ছিল বহুদিন ধরে। সেই নেতা এখন তাঁরা ত্রাউরের মতো নেতাদের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন।

ত্রাউরের মতো নেতাদের আফ্রিকার রাজনৈতিক মঞ্চে আসা কেবল একটা দেশ চালানোর ব্যাপার নয়। এই বাস্তবতা একই সঙ্গে একটি ইতিহাসের পুনরায় আবিষ্কার।

অনেক পুরোনো এক লড়াইয়ের আবার জেগে ওঠা। আফ্রিকানরা নিজেদের মতো করে বাঁচতে চান, নিজের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিজে গড়তে চান। সেই সঙ্গে চান নিজের সম্পদের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা।

ভবিষ্যৎ কে জানে

এই নতুন জোট ও নেতৃত্ব যতটা আশা জাগায়, ততটাই প্রশ্নও তোলে। কীভাবে এই সামরিক সরকারগুলো গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষা করবে? পশ্চিমা সহায়তা ছাড়া কীভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যাবে? এখন কি ফ্রান্সের জায়গায় নতুন ঔপনিবেশিক শক্তি হয়ে আসবে রাশিয়া আর চীন?

এই নেতারা যদি সত্যিই সাংকারার উত্তরাধিকার বহন করতে চান, তবে তাঁদের স্বচ্ছতা, জনসাধারণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং স্বাধীনতার পাশাপাশি সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথেই এগোতে হবে। নইলে এই বিপ্লবও শেষ পর্যন্ত মৌলিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে পুরোনো ক্ষমতায় নতুন শাসক আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

ইব্রাহিম ত্রাউরে ও সাহেল অঞ্চলের বর্তমান সামরিক আন্দোলন এক গভীর ঐতিহাসিক ক্ষোভ ও আশার বহিঃপ্রকাশ। আজকের যুগেও যে উপনিবেশ প্রথা শেষ হয়নি, এই আন্দোলন সেই বিরোধী চেতনার নতুন রূপ।

আফ্রিকার মানুষ এখানে শুধু আর দরিদ্র নিঃস্বতার প্রতীক হয়ে থাকতে চাইছেন না। তাঁরা বাস্তব পরিবর্তনের অংশ হতে চাইছেন। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমাদের হাতে লেখা আফ্রিকার ইতিহাসের পাঠ নতুন করে লেখার চেষ্টা হচ্ছে। আর এবার তা আফ্রিকার মানুষ নিজ হাতেই লিখবে।

* জাভেদ হুসেন প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

নতুন এক রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ সেনানায়ক ইব্রাহিম ত্রাউরে
নতুন এক রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ সেনানায়ক ইব্রাহিম ত্রাউরে। ছবি: রয়টার্স

Thursday, May 29, 2025

শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক ফরাসি চিকিৎসকের ২০ বছরের জেল

শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক এক ফরাসি চিকিৎসককে ২০ বছরের জেল দিয়েছে দেশটির আদালত। অভিযুক্ত ওই চিকিৎসকের নাম জো লে স্কুয়ার্নেক (৭৪)। তার বিরুদ্ধে ১৯৮৯-২০১৪ সালের মধ্যে কয়েকশ রোগীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে। যার মধ্যে বেশিরভাগই শিশু। মার্চে নিজের বিরুদ্ধে আনা ওইসব অভিযোগ স্বীকার করেন তিনি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ওই চিকিৎসক বর্তমানে কারাগারে আছেন। ২০২০ সালে চার শিশুকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে তার দুই ভাগ্নিও ছিলো। তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। শিশু বয়সে তারা যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তা তাদের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে সে বিষয়ে বলেছেন তারা। মার্চে ওই চিকিৎসক ২৯৯ রোগীকে যৌন নির্যাতন করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি তার ডায়েরিতে হেনস্থার বিষয়ে লিখে রাখেন। সেখান থেকে তথ্য নিয়ে পুলিশ ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করেছে। এদের অনেকের অবশ্য ধারণাই নেই তাদের সঙ্গে কী হয়েছে। কারণ রোগীদেরকে অ্যানেস্থেসিয়া দেয়ার সময় বা অস্ত্রপচারের পর তাদেরকে যৌন নির্যাতন করতেন ওই চিকিৎসক।

এদিকে গত সপ্তাহে আদালতে অনুতপ্ত হন লে স্কুয়ার্নেক । তিনি বলেছেন, আমি নিজের দিকে তাকাতে পারিনা। এটি ভেবেই লজ্জিত যে, আমি একজন শিশু নির্যাতনকারী। তিনি আরও বলেছেন, আমি কোনো সহানুভূতি চাইনা। এই মাসের শুরুতে ওই চিকিৎসক বলেছেন, দুই ভুক্তভোগীর মৃত্যুর জন্য তিনি দায়ী। শিশু বয়সে যৌন হেনস্তার শিকার হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি দুইজন ভুক্তভোগী। এর পরিপ্রেক্ষিতে আত্মহত্যা করেছেন তারা। চার বছর আগে মারা গেছেন এমন একজন হলেন ম্যাথিয়াস ভিনেট। চিকিৎসকের ডায়েরিতে তার নাম আছে এ তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর নাতির হেনস্তা হওয়ার বিষয়টি বিবিসিকে জানান তার দাদা। পনেরো বছর ধরে শিশু নির্যাতন করেও পার পেয়ে যাওয়ার কারণে জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এছাড়া ২০০৫ সালে শিশু নির্যাতনের ছবি ডাউনলোড দেয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসলেও তাকে কেন শিশুদের চিকিৎসা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়নি এ নিয়েও তীব্র জনরোষের সৃষ্টি হয়। এদিকে এ বিষয়ে রাজনীতিবিদরা তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীদের একটি দল। তারা বলেন, এ থেকে কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করা হয়নি।

mzamin

Tuesday, May 27, 2025

ফরাসি প্রেসিডেন্টের গালে স্ত্রীর ‘চড়’: বয়সে ২৪ বছরের বড় ব্রিজিতের সঙ্গে মাখোঁর বিয়ের পেছনের সত্যিকার গল্প কী

ব্রিজিত ও এমানুয়েল মাখোঁর সম্পর্কের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো—এটি সত্যি। ফ্রান্সে বহু প্রেসিডেন্ট পরকীয়ায় জড়িয়েছেন, তাই অনেকে অবাক হন যখন শোনেন, কিশোর বয়স থেকেই মাখোঁ একনিষ্ঠভাবে ব্রিজিতকে ভালোবেসেছেন এবং সবসময় তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। অথচ ব্রিজিত মাখোঁর নতুন জীবনী বলছে, যতই অস্বাভাবিক মনে হোক—এই বিয়েটিই ফ্রান্সের রাজনীতিতে অন্যতম স্থির দাম্পত্য সম্পর্ক, আর দেশের নেতৃত্বে আছেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি নিজের কাজে পুরোপুরি নিবেদিত।

সত্যি কথা হলো, পারিবারিক সুখ থাকলেই যে পেশাগত জীবনে সফলতা আসবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে ‘ইল ভনেই দাভোয়ার ডিজ-সেত আন’ (তাঁর বয়স তখন সবে সতেরো) বইয়ের লেখক, ফরাসি সাংবাদিক সিলভি বোমেল মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কেলেঙ্কারি বা বিতর্ক ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টদের পদকে অনেক সময় হাস্যকর বা নাটকীয় করে তুলেছে। কিন্তু ৪১ বছর বয়সী মাখোঁ এসব কিছুতে প্রভাবিত হননি।

তবে তা মানে এই নয় যে (ফরাসি প্রেসিডেন্টের) জীবনে কোনো বিতর্ক ছিল না। সিলভি বোমেলের লেখা বইটি সম্প্রতি ফ্রান্সে প্রকাশিত হয়েছে, যার জন্য পাঠকেরা অনেক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। কারণ, এতে এক ‘সাধারণ প্রেমকাহিনি’ বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে, যার শুরু মাখোঁর স্কুলজীবনে। যেই স্কুলে মাখোঁ ছাত্র ছিলেন, সেখানেই শিক্ষকতা করতেন ব্রিজিত—যিনি পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী হন।

বইটিতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে থাকা মাখোঁ যখন ব্রিজিতের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, তখন তাঁকে নানা বিরোধিতা ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। এক কিশোর ছেলের সঙ্গে তাঁকে দেখলে স্থানীয় সমাজে নানা সন্দেহ আর গুঞ্জন ছড়াতে থাকে। তাঁর আত্মীয় ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন এই সম্পর্ক নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন। কিন্তু এই সম্পর্ককে বিয়েতে রূপ দিতে মাখোঁ যে জেদ ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন ৬৩ বছর বয়সী লেখিকা। সমাজের চোখরাঙানি, আইনি জটিলতা আর বাস্তব সমস্যা—সব বাধা একে একে পেরিয়ে গেছেন মাখোঁ।

বোমেল মনে করেন, ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের বিশৃঙ্খলা, চরম ডানপন্থার উত্থান আর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার মাঝেও প্রেসিডেন্ট মাখোঁ যেভাবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন, তা সম্ভব হয়েছে তাঁর সেই একই ব্যক্তিত্ব ও মানসিক দৃঢ়তার কারণে। প্যারিসের শঁজেলিজের কাছে নেপোলিয়ন হোটেলের একটি ছোট রেস্তোরাঁয় আলাপচারিতায় বোমেল বলেন, ‘তিনি (মাখোঁ) জানেন তিনি কী চান, যা চান তা পেতে জানেন এবং তিনি একজন স্বাধীনচেতা মানুষ।’

ব্রিজিত মাখোঁর চেয়ে বয়সে ২৪ বছর বড়। তাঁদের প্রথম দেখা হয় ফ্রান্সের আমিয়েঁ শহরের একটি বেসরকারি কলেজে—যেখানে ব্রিজিত ছিলেন ফরাসি ভাষার শিক্ষক আর মাখোঁ ছিলেন ছাত্র। তখন ব্রিজিত শহরের অভিজাত এলাকায় থাকতেন। তাঁর পরিবার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির ব্যবসার জন্য পরিচিত ছিল। তিনি তখন বিবাহিত ছিলেন, স্বামী ছিলেন নামকরা ব্যাংকার আন্দ্রে-লুই ওজিয়ের। লেখক বোমেল তাঁকে একজন ‘নির্ভরযোগ্য কিন্তু একঘেয়ে’ মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের সংসারে ছিল তিনটি সন্তান। বোমেল বলেন, ‘আমার মনে হয় না ব্রিজিত তাঁর সঙ্গে অখুশি ছিলেন। তাঁর জীবন ছিল নির্ঝঞ্ঝাট ও গোছানো। কিন্তু হঠাৎ করেই (মাখোঁর সঙ্গে) এই সম্পর্কটা তাঁর জীবনে চলে আসে।’

এখানে ‘এই’ বলতে বোঝানো হচ্ছে, সেই মেধাবী ছাত্র মাখোঁর প্রতি ব্রিজিতের আকর্ষণকে—যে তখন তাঁর স্কুলের নাট্যদলে অংশ নিয়েছিল, যেটি ব্রিজিত পরিচালনা করতেন। লেখক বোমেল জানান, তাঁদের সম্পর্কের শুরু ১৯৯৪ সালের বসন্তে। তখন মাখোঁর বয়স ছিল ১৬ বছর, আর ব্রিজিতের ৪০। দুজনে মিলে একটি নাটক নতুনভাবে সাজিয়েছিলেন, যাতে দলের সবাইকে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়া যায়। বোমেল বলেন, ‘কমপক্ষে তখন থেকেই মানুষ তাঁদের একসঙ্গে হাত ধরে হাঁটতে দেখত।’

এই সম্পর্ক আমিয়েঁ শহরের ক্যাথলিক মধ্যবিত্ত সমাজ ভালোভাবে নেয়নি। স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অনেক চিঠি আসে, যেগুলোর বেশির ভাগই ছিল বেনামি এবং তাতে শিক্ষিকা ব্রিজিতের আচরণকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করা হয়। এমনকি ব্রিজিতের পরিবারের কাছেও একই ধরনের কটূ ও বিরূপ চিঠি পাঠানো হয়েছিল। মাখোঁর মা–বাবাও সরাসরি ব্রিজিতকে বলেন, যেন তিনি তাঁদের ছেলেকে ছেড়ে দেন।

আইন অনুযায়ী, মাখোঁর মা–বাবা চাইলে বিষয়টি কৌঁসুলিকে জানাতে পারতেন এবং তা থেকে একটি তদন্তও শুরু হতে পারত। কারণ, ফরাসি আইনে কেউ যদি কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকে কোনো নাবালকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

তবে বাস্তবে মাখোঁর মা–বাবা, স্কুলের কর্তৃপক্ষ বা অন্য কেউই এ নিয়ে কোনো তদন্ত চাননি। এমনকি তাঁরা এটা জানার চেষ্টাও করেননি যে, ব্রিজিত আর মাখোঁর সম্পর্ক কেবল হাত ধরা পর্যন্ত ছিল কিনা। এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত, মা–বাবা মাখোঁকে প্যারিসে পাঠিয়ে দেন এই ভেবে যে সময়ের সঙ্গে এই সম্পর্ক নিজে থেকেই শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু তা হয়নি। মাখোঁ সম্পর্কটা ভাঙেননি, বরং পড়াশোনা চালিয়ে যান। তিনি ফ্রান্সের এক শীর্ষস্থানীয় কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন—একটি এমন প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৪৫ সাল থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় অভিজাত ও নেতৃত্বস্থানীয় মানুষ তৈরি করে আসছে।

এদিকে ব্রিজিত তখনো ‘ম্যাডাম ওজিয়ের’ নামেই পরিচিত ছিলেন। তিনি সন্তানদের দেখভাল করতেন এবং বাইরের দুনিয়ায় তাঁর বৈবাহিক জীবনকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করতেন। তাঁর স্বামী আন্দ্রে-লুই ওজিয়ের বেশিরভাগ সময় কাজের কারণে বাড়ির বাইরে থাকতেন। যদিও সপ্তাহান্তে তিনি বাড়ি ফিরতেন, অনেক সময় দেখা যেত, ব্রিজিত তখন তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে বাইরে বেরিয়ে যেতেন। শেষ পর্যন্ত, ২০০৬ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয় এবং এর এক বছর পর ২০০৭ সালে ব্রিজিত মাখোঁকে বিয়ে করেন।

ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া ফিলঁন ও তাঁর স্ত্রী পেনেলোপকে নিয়েও একটি বই লিখেছেন সাংবাদিক সিলভি বোমেল। মাখোঁ ও ব্রিজিতকে নিয়ে লেখা এই বই সম্পর্কে তিনি বলেন, ম্যাডাম মাখোঁর ‘অবিশ্বাস্য সাহস’ বোঝার জন্যই তিনি এ বই লিখেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, ব্রিজিতের প্রাক্তন স্বামী ওজিয়ের এসব ঘটনা কিভাবে দেখেছিলেন—বিশেষ করে যখন মাখোঁ ব্রিজিতের দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে ‘আমার সন্তান’ বলে ডাকেন, তখন ওজিয়েরের প্রতিক্রিয়া কী ছিল। বোমেলের ধারণা, ওজিয়ের সম্ভবত এতে খুশি ছিলেন না।

তবে লেখিকা বোমেল ওজিয়ের সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য খুঁজে পাননি। বরং তাঁর ধারণা, মাখোঁর উপদেষ্টারা ইচ্ছাকৃতভাবে ওজিয়েরকে ইতিহাস থেকে, অন্তত অনলাইনে, মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যেটা আমাকে সবচেয়ে অবাক করেছে, তা হলো—ইন্টারনেটে ওজিয়ের সম্পর্কে কোনো তথ্যই নেই। আমি মনে করি, মাখোঁর নির্বাচনী প্রচারের সময় কেউ হয়তো ইচ্ছা করেই এসব তথ্য মুছে ফেলার অনুরোধ করেছিলেন। অথচ ওজিয়ের ছিলেন ফ্রান্সের একটি বড় ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁর মতো একজন মানুষ সম্পর্কে কোনো তথ্য না থাকা সত্যিই বিস্ময়কর।’

বোমেল মনে করেন, ওজিয়ের ৬৮ বছর বয়সে অবসর নিয়েছেন এবং এখন প্যারিসে থাকেন। হতে পারে, ওজিয়ের নিজেই এসব বিষয় গোপন রাখতে চেয়েছেন। ব্রিজিতের ছোট মেয়ে, ৩৫ বছর বয়সী টিফেন ওজিয়ের একবার বলেছিলেন, ‘তাঁরা ভালো আছেন, তবে একেবারে গোপনীয়ভাবে থাকতে চান।’

তবে বোমেল বিশ্বাস করেন না, ওজিয়ের এমন কিছু বলবেন যা তাঁর বইয়ের মূল বক্তব্যকে দুর্বল করে। তাঁর মতে, বইটির কেন্দ্রীয় তত্ত্ব হলো—মাখোঁ ও ব্রিজিত ১৯৯০-এর দশক থেকে অনেক বাধা ও সমালোচনা সত্ত্বেও একে অপরের প্রতি অনুগত থেকেছেন।

বোমেল বলেন, ‘তাঁরা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে একে অপরকে ভালোবেসে গেছেন, যদিও তখন একসঙ্গে থাকতেন না। এই সময় মাখোঁর একগুঁয়েমি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এটা তাঁর স্বভাবের অংশ। আপনি তাঁকে পছন্দ করুন বা না করুন, এই দৃঢ়তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি ব্রিজিতকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন এবং সেই সিদ্ধান্তে তিনি কখনো নড়েননি।’

ব্রিজিতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সম্পর্কের শুরুর দিকে তিনি অনেক ধিক্কার ও সামাজিক বর্জনের শিকার হন এবং এখনো মাঝে মাঝে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। যদিও অনেক ভোটার তাঁর সাহসিকতার প্রশংসা করেন—কারণ, তিনি নিজের চেয়ে দুই দশকের বেশি ছোট একজন পুরুষকে বিয়ে করেছেন। তবে অনেকে তাঁকে অপছন্দও করেন, কারণ তিনি ফরাসি সামাজিক রীতি ভেঙেছেন, যেখানে সাধারণভাবে নারীরা নিজের চেয়ে বয়সে বড় পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন।

সংবাদপত্রের মন্তব্য বিভাগে তাঁর সম্পর্কে প্রায়ই নেতিবাচক মন্তব্য দেখা যায়। এমনকি এলিসি প্রাসাদে পাঠানো অনেক চিঠিতেও তাঁকে উদ্দেশ করে অপমানজনক কথা লেখা থাকে বলে জানান লেখিকা বোমেল।

বোমেল বলেন, ‘মাখোঁ তো ব্রিজিতের নিজের সন্তানের চেয়েও ছোট—এটাই অনেকের মনে এক ধরনের অবচেতনের অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ, কেউ যদি এমন একজন ছেলের সঙ্গে প্রেম করেন, যিনি তাঁর নিজের ছেলের চেয়েও ছোট, তখন অনেকেই মনে মনে ভাবেন, এ তো নিজের ছেলের সঙ্গেও প্রেম করার মতো ব্যাপার। এটাই এই সম্পর্ককে ঘিরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করে, যা মানুষকে নাড়া দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি তাঁদের সম্পর্কে ভয়ংকর সব লেখা পড়েছি। অনেকেই বলেন, এই জুটি বিকৃত মানসিকতার। এমনকি কেউ কেউ তো বিশ্বাসই করেন না, তাঁরা সত্যিই একসঙ্গে থাকেন।’

বোমেল বলেন, ‘আমি মনে করি, এসব প্রতিক্রিয়া আমাদের সমাজ সম্পর্কে অনেক কিছু বলে। এটা দেখায়, আমাদের সমাজের একটা অংশ এখনো এমন ধরনের বৈচিত্র্যময় বৈবাহিক সম্পর্ক মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।’

তাঁর মতে, এই মানসিকতাই হয়তো সেই সব গুজবের পেছনে রয়েছে, যেগুলো ছড়াতে শুরু করে ২০১৪ সালে, যখন মাখোঁ অর্থমন্ত্রী হন।

একটি গুজবে বলা হয়, মাখোঁ সমকামী। আরেকটি গুজবে দাবি করা হয়, তাঁর স্ত্রী আজীবন তরুণ ছেলেদের প্রেমে পড়েছেন। বোমেল বলেন, ‘সমকামী গুজব তো এক সময় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল।’

তিনি জানান, এমনকি ফ্রান্সের দূরবর্তী গ্রামগুলোতেও তিনি শুনেছেন—লোকজন বলত, ‘আমি জানি, সে সমকামী।’

বোমেলের দীর্ঘ ও গভীর গবেষণায় এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি যে ইলিসি প্রাসাদে কোথাও কোনো গোপন সমকামী প্রেমিক আছেন, বা কোথাও লুকানো কোনো “খেলনা বালক” রয়েছে। বরং তিনি নিশ্চিত, গত ৫০ বছরে এই প্রথম ফ্রান্স এমন একজন প্রেসিডেন্ট পেয়েছে, যিনি সত্যিই একটি সুখী দাম্পত্য জীবনে আছেন।

বোমেল বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে তিনি একটি স্থিতিশীল সম্পর্কে রয়েছেন, আর এটা মোটেই কোনো তুচ্ছ ব্যাপার নয়। আপনি বা আমি যদি কোনো বড় পারিবারিক সমস্যায় পড়ি, তাহলে তা আমাদের কাজে প্রভাব ফেলে। কিন্তু মাখোঁ তা হতে দেননি—তিনি পুরোপুরি তাঁর কাজে মনোযোগ দিতে পেরেছেন।’

মাখোঁকে ঘিরে আরেকটি গুজব রয়েছে—তিনি নাকি যৌনতার প্রতি আগ্রহহীন। বোমেলের বইয়ে একজন উপদেষ্টার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, যিনি বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সময় মাখোঁর মধ্যে তরুণীদের প্রতি কোনো আকর্ষণ দেখা যায়নি, যা সেখানে কাজ করা অধিকাংশ পুরুষের মধ্যে সাধারণ বিষয় ছিল।’

তবে বোমেল নিশ্চিত নন, মাখোঁ কি স্ত্রীর প্রতি এতটাই নিবেদিত যে অন্য কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজনই অনুভব করেন না, নাকি সত্যিই তাঁর মধ্যে যৌন আকর্ষণের ঘাটতি রয়েছে।

তবু বোমেল মাখোঁকে তুলনা করেছেন ডমিনিক স্ট্রস-কানের একেবারে বিপরীত রূপ হিসেবে—যিনি আইএমএফের সাবেক প্রধান হিসেবে ধর্ষণ ও দেহব্যবসার অভিযোগে বড় ধরনের বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। যদিও পরবর্তীতে তিনি আইনি অভিযোগ থেকে মুক্তি পান, কিন্তু তাঁর ভাবমূর্তি আর আগের মতো ফিরেনি।

মাখোঁ সেই দিক থেকে একেবারেই আলাদা—নির্মল, নিয়ন্ত্রিত এবং কেলেঙ্কারিমুক্ত।

দুজনের সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৯৪ সালের বসন্তে। তখন মাখোঁর বয়স ১৬, আর ব্রিজিতের ৪০
দুজনের সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৯৪ সালের বসন্তে। তখন মাখোঁর বয়স ১৬, আর ব্রিজিতের ৪০ ছবি: এএফপি

Friday, April 11, 2025

হামাসকে সন্ত্রাসী তালিকা থেকে বাদ দেয়ার আবেদন

সন্ত্রাসীদের তালিকা থেকে নিজেদেরকে বাদ দেয়ার জন্য বৃটেনের কাছে আবেদন করেছে ফিলিস্তিনের যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাস। এ বিষয়ে বৃটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারের কাছে হামাসের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বুধবার আবেদন জমা দিয়েছেন হামাসের সিনিয়র কর্মকর্তা মুসা আলু মারজুক। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাসের রাজনৈতিক শাখার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আইনি বিষয়ক প্রধান মারজুক ওই আবেদনে জানিয়েছেন, হামাস হলো ফিলিস্তিনের ইসলামপন্থি স্বাধীনতা ও প্রতিরোধ আন্দোলনের সংগঠন। তাদের উদ্দেশ্যই হলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এবং জায়নবাদী প্রকল্পগুলোর মুখোমুখি হওয়া। এই আবেদনের পরিধি কমপক্ষে ১০০ পৃষ্ঠা। এতে মত নেয়া হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের সাবেক এডহকভিত্তিক বিচারক জন দুগার্ড সহ কমপক্ষে ২০ জন বিশেষজ্ঞের। এতে যুক্তি দেয়া হয়েছে যে, গাজায় গণহত্যা চালানো হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বৃটেনের এর বিরোধিতা করার বাধ্যবাধকতা আছে। তা তারা করছে না। এর মধ্য দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। হামাসের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। সমাবেশের অধিকার আছে। তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না বৃটেন। এটা বৈষম্যমূলক। এই আবেদনে বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন বৃটেনের আইনের অধীনে যেভাবে হামাসের কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাস হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, একই কাজ তো করছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী এবং বৃটিশ সেনাবাহিনী।

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে ফ্রান্স
ফিলিস্তিনিদের জন্য সুখবর দিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে তার দেশ। তার এমন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ভারসেন আঘাবেকিয়ান শাহিন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়, বুধবার ফ্রান্স ৫ টেলিভিশন চ্যানেলকে ম্যাক্রন বলেছেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘের সম্মেলনে চূড়ান্তভাবে তিনি তার দেশের অবস্থানের কথা পরিষ্কার করবেন। জুনে অনুষ্ঠেয় সৌদি আরবের ওই সম্মেলনের সহ-সভাপতি তার দেশ। ম্যাক্রন বলেন, আমাদেরকে অবশ্যই স্বীকৃতি দেয়ার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। কয়েক মাসের মধ্যেই সেটা করবো আমরা। কাউকে খুশি করার জন্য আমি এটা করবো না। এটা করছি, এর একটিই কারণ। তা হলো ফিলিস্তিনিদের অধিকার আছে। ভারসেন আঘাবেকিয়ান শাহিন বার্তা সংস্থা এএফপি’কে বলেছেন, এই স্বীকৃতি হবে তার দেশের জন্য আর একটি সঠিক নির্দেশনা। ফিলিস্তিনি জনগণ এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য একটি রক্ষাকবচ। তবে ফ্রান্সের এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার।

তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নিয়ে যেকোনো ‘একতরফা স্বীকৃতি’ হামাসকে উদ্বুদ্ধ করবে। এই ধরনের পদক্ষেপ কোনো শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা আনবে না এ অঞ্চলে। পক্ষান্তরে এই পদক্ষেপ এসব বিষয়কে আরও দূরে সরিয়ে দেবে। উল্লেখ্য, এরই মধ্যে জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৪৭টি দেশ ফিলিস্তিনকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মধ্যে আছে আর্মেনিয়া, স্লোভেনিয়া, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, স্পেন, বাহামা, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো, জ্যামাইকা এবং বারবাডোজ। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক সমর্থন সত্ত্বেও কয়েকটি পশ্চিমা শক্তিধর দেশের কারণে সেই স্বীকৃতি আটকে আছে। এর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, বৃটেন ও জার্মানি। এবার ইমানুয়েল ম্যাক্রন বলেছেন, কতোগুলো দেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে তিনিও ইসরাইলকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করেন। যেসব দেশ ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে না তার মধ্যে আছে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেন। ম্যাক্রন বলেছেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে ইসরাইলের অধিকারের পক্ষে যারা তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থানকে পরিষ্কার করে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের সমাধানে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান ফ্রান্সের। ফ্রান্সের এই স্বীকৃতি দেয়ার ফলে ক্ষুব্ধ হবে ইসরাইল, এটা নিশ্চিত।  ওদিকে সম্প্রতি মিশর সফরে গিয়ে সেখানকার প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি এবং জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন ইমানুয়েল ম্যাক্রন। সেখানে তিনি পরিষ্কার করেছেন যে, গাজায় জায়নবাদীদের বসতি সম্প্রসারণ অথবা গাজার মানুষের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার দৃঢ়বিরোধী ফ্রান্স।

বেশির ভাগ আমেরিকানই ইসরাইলকে অপছন্দ করেন
সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিকেরই ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। গাজায় ইসরাইলের বর্বর হামলার ফলে এই বিদ্বেষ আরও জোরদার হয়েছে। এ খবর দিয়েছে মিডেল ইস্ট আই। এতে বলা হয়, সম্প্রতি পিউ রিসার্চ নামের একটি সংগঠন এ বিষয়ে একটি জরিপ করেছে। সেখানে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন ইসরাইলের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভব পোষণ করেন। ২০২২ সালের মার্চে করা জরিপে এ হার ছিল ৪২ শতাংশ। রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্রেটদের ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মতামত প্রকাশের পরিসংখ্যান বেশি। সর্বশেষ জরিপে ৬৯ শতাংশ ডেমোক্রেট ও ৩৭ শতাংশ রিপাবলিকান ইসরাইলকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। গাজা যুদ্ধ শুরুর আগে ২০২২ সালে ২৭ শতাংশ রিপাবলিকান ইসরাইলের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব রাখতেন। তবে গাজা যুদ্ধের পর থেকে রিপাবলিকানদের মধ্যে নেতিবাচক মতামত পোষণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ শতাংশ। এক্ষেত্রে ৫০ বছরের নিচে যাদের বয়স তাদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি বিদ্বেষী মনোভাব বেশি বেড়েছে বলে ওই জরিপে বলা হয়েছে। এ বয়সের প্রায় ৫০ শতাংশ রিপাবলিকান এবার ইসরাইলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ডেমোক্রেটদের মধ্যেও ইসরাইলকে নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বেড়েছে। ২০২২ সালের তুলনায় এবার ১৬ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকান গ্রুপ ছাড়া বাকি সব ধরনের বয়স গ্রুপের মানুষ মনে করেন, গাজায় ইসরাইলের হামলা তাদের ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে মার্কিন ইহুদিদের সঙ্গে ইসরাইলের দূরত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে ইসরাইল সরকার ও দেশটির সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ দূরত্ব আরও দ্রুত বেড়েছে।

mzamin

Thursday, April 10, 2025

ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত ফ্রান্স: প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন by আব্দুল মোমিত

ফিলিস্তিনকে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে ফ্রান্স। এমনটি জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। গতকাল (৯ই এপ্রিল) তিনি ফরাসি সংবাদমাধ্যম (ফ্রান্স ৫ টেলিভিশনকে)দেয়া এক সাক্ষাৎকারে  বলেছেন, আমাদের অবশ্যই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি  দেয়ার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।  এটি আমরা কয়েক মাসের মধ্যেই  করব । আমাদের লক্ষ্য হলো- আগামী জুনে সৌদি আরবের সঙ্গে জাতিসংঘের কনফারেন্সের নেতৃত্ব দেয়া, যেখানে আমরা একাধিক পার্টির সঙ্গে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করতে পারব ।

আগামী জুনে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কনফারেন্সে ফিলিস্তনকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করবে ফ্রান্স- এমন সম্ভাবনা রয়েছে । ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইল এবং ফিলিস্তিন আলাদা দুটি রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে মতামত দিচ্ছে । তবে  এবারই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন জানালো ফ্রান্স ।

প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন স্পষ্ট করে বলেছেন, আমি এটি করব কারণ আমি মনে করি এক সময় এটি সঠিক হবে। আমি একটি যৌথ গতিশীলতাতে যুক্ত হতে চাই ।

এদিকে ফ্রান্সের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী  ভার্সেন আঘাবেকিয়ান শাহিন।  তিনি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ফিলিস্তিনকে ফ্রান্সের স্বীকৃতি  দেশটির  অধিকার রক্ষা এবং দ্বি-রাষ্ট্র নীতির পক্ষে একটি সঠিক পদক্ষেপ হবে। ফিলিস্তিনকে গত বছরের ২৮ মে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে আয়ারল্যান্ড। তারও আগে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয় স্পেন ও  নরওয়ে । এই তিন দেশের স্বীকৃতি দেয়ার পর ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে ফ্রান্স।

এদিকে ফরাসি আইনপ্রণেতারা ২০১৪ সালে তাদের সরকারকে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আহ্বান জানাতে ভোট দিয়েছিলেন।  এটি একটি প্রতীকী পদক্ষেপ ছিল যা ফ্রান্সের কূটনীতিক অবস্থানে সামান্য প্রভাব ফেলেছিল । শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স যদি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয় তাহলে এটি তাদের পররাষ্ট্রনীতির বড় পরিবর্তন হবেI  ইতিমধ্যে বার্তা সংস্থা এ এফ পি জানিয়েছে, ফ্রান্স ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলে ক্ষুদ্ধ হতে পারে দখলদার ইসরাইল। কারণ তারা দাবি করছে এখনই ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত হবে অপরিপক্ক।

mzamin


Tuesday, February 11, 2025

ভারত থেকে রকেট লঞ্চার কিনতে চায় ফ্রান্স

এবার ভারত থেকে রকেট লঞ্চার ক্রয় করতে যাচ্ছে ফ্রান্স। সোমবার ভারতীয় কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অস্ত্র সরবরাহকারী ফ্রান্স। এবার তারাই দিল্লির কাছ থেকে কোনো অস্ত্র ক্রয় করতে যাচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আরব নিউজ। উল্লেখ্য, ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ অস্ত্র আমদানীকারক দেশ। তবে বর্তমানে দেশটি প্রতিরক্ষা প্রয়োজনীয়তা মেটাতে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়া ক্রমাগত প্রতিরক্ষা বিষয়ক সরঞ্জাম রপ্তানিও বৃদ্ধি করেছে।  ২০১১ সালের ২৩শে জানুয়ারি নয়া দিল্লিতে প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে প্যারেডের মহড়ায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘পিনাকা’ মাল্টি ব্যারেল রকেট নিক্ষেপক সিস্টেম প্রদর্শন করা হয়। উল্লেখ্য, বুধবার ভারত তাদের প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করবে।

আরেক ভারতীয় কর্মকর্তা জানান, তিন মাস আগে ফ্রান্সের এক প্রতিনিধি দলের সামনে প্রদর্শিত হয় ঘরোয়াভাবে তৈরি ‘পিনাকা’ রকেট সিস্টেম। যার পাল্লা ৯০ কিলোমিটার (৫৬ মাইল)। ওই সময় পিনাকা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে ফ্রান্সের ওই প্রতিনিধি দল। ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার মহাপরিচালক উম্মালানেনি রাজা বাবু বলেন, পিনাকার জন্য ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলমান রেখেছে ফ্রান্স। যদিও এখনো পর্যন্ত চুক্তি হয়নি, তবে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে সোমবার ফ্রান্সে যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মঙ্গলবার দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসার কথা ওই দুই নেতার। যদিও রকেট উৎক্ষেপকের বিষয়ে সেখানে আলোচনা হবে কি না তা স্পষ্ট নয়। অবশ্য কোনো মন্তব্য করেনি ভারতে অবস্থিত ফ্রান্সের দূতাবাস। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার পর ফ্রান্স ছিলো ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অস্ত্র সরবরাহকারী।

mzamin

Thursday, January 30, 2025

সরানো হচ্ছে মোনালিসাকে, রাখা হবে বিশেষভাবে নির্মিত কক্ষে

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী আসেন ফ্রান্সের ল্যুভর জাদুঘরে। এ জাদুঘরটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অমর সৃষ্টি মোনালিসা ছবিটি। পৃথিবীর সব থেকে চর্চিত শিল্পকর্মটির সামনে যখন পৌঁছবেন, তখন বুলেটপ্রুফ কাচের আড়ালে থাকা ‘ছোট্ট’ ছবিটিতে রহস্যময়ীর অবিস্মরণীয় হাসি ও কাব্যিক সত্তা আপনাকে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ করে দেবেই।

ল্যুভর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, মোনালিসাকে তার বর্তমান স্থান থেকে সরিয়ে একটি পৃথক বিশেষভাবে নির্মিত কক্ষে রাখা হবে। এই ঘোষণা দেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো।

বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জাদুঘর সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মোনালিসাকে এবার সরানো হবে। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগমের কারণে জাদুঘরের অন্য শিল্পকর্মের প্রতি মনোযোগ দেয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ বলে জানানো হয়েছে। অতিরিক্ত ভিড়ের ফলে জাদুঘরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং শিল্পকর্ম সংরক্ষণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

ল্যুভর কর্তৃপক্ষের মতে, এই স্থানান্তরের ফলে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা উন্নত হবে, পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পকর্মও তাদের প্রাপ্য গুরুত্ব পাবে। ২০৩১ সালের মধ্যে এ সংস্কার কাজ শেষ হবে বলে ঘোষণা দেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। পরবর্তীতে এ ছবিটি দেখতে হলে দর্শনার্থীদের আলাদা করে টিকিট কেটেই এ চিত্রকর্ম দেখতে হবে। আগামী জানুয়ারি থেকে প্রবেশমূল্যের পরিবর্তন আনা হবে। এখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের দর্শনার্থীদের বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের পর্যটকদেরও ল্যুভর জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হবে।

ল্যুভর পরিচালক লরেন্স দে কার সতর্ক করে বলেছে, জাদুঘরটিতে ভিড় আগে থেকে অনেক বেশি বেড়ে গেছে এবং এ কারণে অবকাঠামোগত সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন জাদুঘরে আসা ৩০ হাজার দর্শনার্থীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশই লিওনার্দো দা ভিঞ্চির এই চিত্রকর্ম দেখতে আসেন। তবে এটি যেন ধৈর্যের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন ভিড় সামলাতে দর্শনার্থীদের সাল দে জেতা হলের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সেখানে দর্শকরা গড়ে মাত্র ৫০ সেকেন্ডের জন্য তারা ছবিটি পর্যবেক্ষণ ও ছবি তোলার সুযোগ পান।

ম্যাডাম দে কার্স তার চিঠিতে লিখেছেন, জনসাধারণ কোনোভাবেই শিল্পীর কাজকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে না, যা আমাদের পুরো জনসেবামূলক মিশনকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, মোনালিসা শুধু একটি চিত্রকর্ম নয়, এটি ল্যুভর প্রতীক এবং একে আলাদা কক্ষে সরানো এই জাদুঘরের ঐতিহ্যের পরিপন্থী।

শিল্পবিশ্বের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ শিল্পের গভীর ঐতিহ্যকে গুরুত্ব না দিয়ে আধুনিকীকরণের নামে একটি কৃত্রিম অভিজ্ঞতা তৈরি করার চেষ্টা করছে। সূত্র: বিবিসি

mzamin

Thursday, December 12, 2024

ফ্রান্সে স্বামীর প্ররোচনায় স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছেন ৫০ পুরুষ, রায় আগামী সপ্তাহে

কেউ তরুণ, কেউ বৃদ্ধ, কেউ দশাসই, কেউ আবার শীর্ণকায়, কেউ সাদা, কেউ শ্বেতাঙ্গ, কেউ-বা কৃষ্ণাঙ্গ। তাঁদের মধ্যে কেউ গাড়িচালক, কেউ দমকল কর্মকর্তা, কেউ সেনাসদস্য, কেউ-বা নিরাপত্তারক্ষী। এমনকি একজন সাংবাদিক ও একজন ডিজেও রয়েছেন।

এসব পুরুষের সংখ্যা ৫০। তাঁরা ফ্রান্সের আলোচিত গিস লে পেলিকোতকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত। অভিযোগ, গিস লে-এর স্বামী ৭২ বছর বয়সী ডোমিনিক পেলিকোত তাঁকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করতেন। এরপর অন্য পুরুষ দিয়ে স্ত্রীকে ধর্ষণ করাতেন। এভাবে চলেছিল প্রায় এক দশক।

গত সেপ্টেম্বর থেকে এই মামলার বিচার চলছে। আগামী সপ্তাহে মামলার বিচার শেষে রায় হতে পারে। যদি তাঁরা দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে সম্মিলিতভাবে তাঁদের সাজার মেয়াদ হবে ৬০০ বছরের বেশি।

বিচার চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কয়েকজন বেশ প্রতিবাদ জানান। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগই যখন বিচারকের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, তখন তাঁদের চোখ ছিল মাটির দিকে। মাঝেমধ্যে শুধু নিজের আইনজীবীর দিকে তাকিয়েছেন, তবে সে তাকানোয় ছিল একধরনের আশ্বাস পাওয়ার আকুতি।

অভিযুক্ত এই ৫০ ব্যক্তির বেশির ভাগই এসেছেন গিস লে–র গ্রাম মাজানের ৫০ কিলোমিটারের মধ্যকার ছোট শহর ও গ্রাম থেকে।

৬৯ বছর বয়সী জোসেফ সি নামের একজন অবসরপ্রাপ্ত ক্রীড়া কোচ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একজন। তিনি যদি দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তাঁর চার বছরের কারাদণ্ড হবে। আইনজীবীরা যে দণ্ড দাবি করেছেন, তার মধ্যে এটি সবচেয়ে কম। অন্যদিকে আরেকজন হলেন ৬৩ বছর বয়সী রোমেইন ভি। তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে ১৮ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

রোমেইন ভি নিজে এইচআইভি সংক্রমিত ছিলেন জানার পরও গিস লে-কে বিভিন্ন সময় ছয়বার ধর্ষণ করেছেন। এ সময় তিনি কোনো সুরক্ষা নেননি। যদিও তাঁর আইনজীবী জানিয়েছেন, তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাই তাঁর মাধ্যমে এই ভাইরাস সংক্রমিত না–ও হতে পারে।

আইনজীবীরা এই মামলায় বিশদ তথ্যপ্রমাণ পেয়েছেন। কারণ, গিস লে-এর স্বামী ডোমিনিক পেলিকোত এক দশকের বেশি সময় ধরে স্ত্রীকে ধর্ষণ করানোর ঘটনাগুলো ভিডিও করে রেখেছেন। তিনি নিজেও আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ স্বীকার করেছেন। এবং আদালতকে বলেছেন, তাঁর সহ-অভিযুক্ত এই ৫০ জনই দোষী।

ফ্রান্সে ধর্ষণবিরোধী আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘সহিংসতা, জবরদস্তি, হুমকি বা আকস্মিকভাবে’ কোনো যৌন নির্যাতন করা হলে তাকে ধর্ষণ বলা যাবে। এতে ভুক্তভোগীর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজনের কথা বলা হয়নি।

এই আইনের ভিত্তিতে বিবাদীদের আইনজীবীরা যুক্তি তুলে ধরে বলেন, গিস লে অনুমতি দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। এটা তাঁরা জানতেন না। তাই ওই ঘটনা ধর্ষণ হতে পারে না। এক বিবাদীর আইনজীবী বলেন, ইচ্ছে করে ধর্ষণ না করে থাকলে সেটা কোনো অপরাধ হতে পারে না।

স্বেচ্ছাসেবী একজন দমকলকর্মী ক্রিশ্চিয়ান এল বলেন, ‘আমার শরীর তাঁকে ধর্ষণ করেছে, কিন্তু আমার মস্তিষ্ক এতে সায় দেয়নি।’

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একজন ৬৩ বছর বয়সী জেন-পিয়ারি। তাঁকে বলা হচ্ছে ডোমিনিকের শিষ্য। কীভাবে নিজের স্ত্রীকে ওষুধ দিয়ে অচেতন করে অপব্যবহার করবেন, সেই শিক্ষা তিনি ডোমিনিকের কাছ থেকে শিখেছেন। এটা তিনি পাঁচ বছর ধরে করেছেন বলেও স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ডোমিনিকের সঙ্গে দেখা করাটাই তাঁর অপরাধ ছিল। ডোমিনিক তাঁকে নিজের ভাইয়ের (কাজিন) মতো কাছে টেনে নিয়েছিল। আইনজীবীরা তাঁর ১৭ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছেন।

ডোমিনিক প্রতারণা করেছেন

৫৪ বছরের আহমেদ টি পেশায় পানির পাইপের মিস্ত্রি। ছোটবেলার প্রেমিকাকে বিয়ে করে ৩০ বছরের সংসার তাঁদের। তিনি বলেন, তিনি যদি ধর্ষণ করতেই চাইতেন, তাহলে ষাটোর্ধ্ব কাউকে নয় নিশ্চয়ই।

রেদোয়ান এ একজন বেকার মানুষ। ৪০ বছরের এই ব্যক্তি বলেন, তিনি যদি ধর্ষণই করতেন, তাহলে নিশ্চয়ই ডোমিনিককে সেই দৃশ্য ধারণ করার অনুমতি দিতেন না।

কেউ কেউ আবার বলেছেন, ডোমিনিক তাঁদের এমনটা করতে ভয় দেখিয়েছিলেন। আইনজীবী বিবিসিকে বলেন, ডোমিনিক হলেন জঘন্য চরিত্রের মানুষ।

পুরুষ নার্স রেদোয়ান ই আদালতকক্ষে বলেন, শোবার ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় তিনি অনেক ভয় পেয়েছিলেন।

অন্যরা যুক্তি দেন, ডোমিনিক তাঁদের পানীয় পান করিয়েছিলেন। সেখানে মাদক বা অন্য কিছু মেশানো ছিল। তাই তাঁরা কী হয়েছিল, তা মনে করতে পারছেন না। যদিও ডোমিনিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বেশির ভাগই বলেন, ডোমিনিক তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা বা কৌশল খাটিয়েছেন। ডোমিনিক তাঁদের বুঝিয়েছিলেন, তাঁরা এই দম্পতির সঙ্গে একটি ‘যৌন খেলায়’ অংশ নিচ্ছেন।

অভিযুক্ত ক্রিস্টোফ ব্রুচি, জোসেফ সির আইনজীবী বিবিসিকে বলেন, তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তবে ডোমিনিক বরাবরই বলে আসছেন, তাঁর স্ত্রী যে বিষয়টি জানেন না, তিনি ওই ব্যক্তিদের কাছে সেই বিষয়টি অনেকবার স্পষ্ট করেছেন।

ডোমিনিক তাঁদের বলেছেন, তাঁর স্ত্রী যেন কোনোভাবেই জেগে না ওঠেন বা তাঁরা যেন এমন কিছু ফেলে না যান, যাতে তাঁদের শনাক্ত করা যায়। যেমন গিস লে-কে স্পর্শ করার আগে তাঁদের হাত গরম করে নিতে বলতেন। তাঁরা যেন কোনো ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার না করেন বা ধূমপান না করে আসেন। কারণ, এর ঘ্রাণ থেকে গেলে গিস লে-এর মনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। তাঁরা সবাই এটা জানতেন।

গত সেপ্টেম্বর থেকে একের পর এক এই ৫০ জনকে অ্যাভিগনন শহরে আদালতে হাজির করা হচ্ছে। সাধারণত ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত করতে কয়েক দিন লাগে। কিন্তু এই মামলার বিচারে বিবাদীর সংখ্যাটি বেশি হওয়ায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের জড়ো করা হয়।

গিস লে পেলিকোত: তাঁরা সজ্ঞানে আমাকে ধর্ষণ করেছিলেন

অনেক বিবাদীর বর্তমান ও সাবেক নারী সঙ্গীর স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গেও গিস লে-এর মতো হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে এই পরীক্ষা করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন নারী বলেন, তাঁর মধ্যে এখন থেকে তীব্র সন্দেহ থাকবে, ‘শ্রদ্ধাশীল, চিন্তাশীল ও মিষ্টি এই মানুষটা’ তাঁকে কখনো তাঁর অজান্তে এমন খারাপ কিছু করেছেন কি না।

এই মামলার বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একই সুতায় গাঁথতে এমন একটি উপাদান খুঁজে পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হচ্ছিল।

গিস লে-এর আইনজীবীরা বলেন, সেখানে সবার ক্ষেত্রে যা পাওয়া গেছে, তা হলো প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছেতেই গিস লে–র বাড়িতে গেছেন, এমনটা এখনো দেখা যায়নি। তবে সবার মধ্যে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে, তা হলো তাঁরা সবাই সচেতনভাবে পুলিশের কাছে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিচার কার্যক্রম শুরুর হওয়ার প্রথম দিকে গিস লে-এর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি কি মনে করেন বিবাদীরা তাঁর স্বামীর কারসাজির শিকার। জবাবে গিস লে মাথা নেড়ে বলেছিলেন, তাঁকে ধর্ষণের জন্য কেউ তাঁদের মাথায় বন্দুক ধরেননি। তাঁরা পূর্ণজ্ঞানে তাঁকে ধর্ষণ করেছেন। তিনি উল্টো জানতে চান, তাঁরা কেন পুলিশের কাছে গেলেন না? এমনকি একটি বেনামে কলও তাঁর জীবন রক্ষা করতে পারত। কিন্তু একজনও তা করেননি।

আদালতে আইনজীবীর সঙ্গে গিস লে পেলিকোত। ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪
আদালতে আইনজীবীর সঙ্গে গিস লে পেলিকোত। ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ছবি: রয়টার্স

Monday, September 23, 2024

ফ্রান্সে নতুন সরকারের ঘোষণা

এ মাসের শুরুর দিকে নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। রোববার নতুন সরকার ঘোষণা করা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী মিশেল বার্নিয়ের নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হচ্ছেন ব্রুনো রোতাইয়ু। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে আরও বলা হয়, নতুন সরকারের মন্ত্রীদের নাম সামনে এনেছেন ম্যাক্রন। প্রায় তিন মাস আগে অনুষ্ঠিত হয় সেখানে আগাম নির্বাচন। তাতে পার্লামেন্টের বেশির ভাগ আসন পায় বামপন্থিরা। তবে নতুন গঠন করা সরকারের বেশির ভাগ সদস্যই ডানপন্থি। বেশি আসন পাওয়া বামপন্থি দলগুলোর জোটকে টপকাতে ডানপন্থি রক্ষণশীল দলগুলোর সঙ্গে জোট করেছিল প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের দল। তারপরও তাদের গঠন করা এই সরকার নতুন কোনো আইন পাসের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তাই আইন পাসের জন্য মেরি লা পেনের ন্যাশনাল র‌্যালির মতো দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে হবে তাদের। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজির রক্ষণশীল দল রিপাবলিকান পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রোতাইয়ু। এই দল থেকে মোট ১০ জন রাজনীতিক মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন। বিদায়ী অনেক মন্ত্রীকেও নতুন মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে রেখেছেন  ম্যাক্রন। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী সেবাস্টিয়ান লেকোর্নু প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। ইউরোপবিষয়ক বিদায়ী মন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বাহো আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। মাত্র একজন বামপন্থী রাজনীতিক মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। তিনি দিদিয়ে মিগু। তাকে বিচারবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী মিশেল বার্নিয়েও একজন রক্ষণশীল রাজনীতিক। ব্রেক্সিট নিয়ে আলোচনায় তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিলেন। ফ্রান্সের পার্লামেন্টের জাতীয় পরিষদ বর্তমানে যে বিভক্ত অবস্থায় রয়েছে, তাতে অন্তত টিকে থাকার মতো নতুন একটি সরকার গঠনের পেছনে কাজ করেছেন বার্নিয়ে। 
mzamin