Wednesday, August 5, 2015

পরমাণু যুগের ৭০ বছর : বিপর্যয়ের শঙ্কা অব্যাহত by জোসেফ ম্যাঙ্গানো ও জ্যানেট ডি. শেরম্যান

আজ ৬ আগস্ট। ৪০ বছর আগে এ দিনে ‘লিট্ল বয়’ নামের আণবিক বোমা নিয়ে বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ উড়ে গিয়েছিল জাপানের হিরোশিমা নগরীতে। সেদিন সেখানে যে ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল, এমন ভয়াবহ ঘটনা এর আগে দেখা যায়নি কোনো দিন। এই বোমাবর্ষণ চিরদিনের জন্য ইতিহাস বদলে দিয়েছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ভীতিকর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। এই প্রতিযোগিতা ছিল আরো শক্তিশালী আণবিক বা পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ক্রমবর্ধমান হারে এ ধরনের মারণান্ত্র মজুদ করার জন্য। পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের মধ্যে যে ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ চলেছিল, তার একটা বড় দিক ছিল পারমাণবিক প্রতিযোগিতা। বিষয়টি এই প্রশ্ন জাগিয়ে দিয়েছিল : পৃথিবী নামের গ্রহটিতে জীবনের অস্তিত্ব থাকবে কি? পরীক্ষা করা হলো চার শতাধিক পরমাণু বোমা এবং এর জের ধরে হাজার হাজার মারণাস্ত্র তৈরি করা হলো।
সঙ্কটের অতল গহ্বর সৃষ্টি হলো ১৯৬২ সালে ‘কিউবা মিসাইল’কে কেন্দ্র করে। তখন মার্কিন ও সোভিয়েত, দু’পক্ষেই সামরিক ও সরকারি উপদেষ্টাদের বেশির ভাগই যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি এবং রুশ প্রধানমন্ত্রী ক্রুশ্চেভ শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক সমাধানে উপনীত হওয়ায় যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়। অন্যথায়, যুদ্ধ বেধে গেলে সর্বব্যাপী পারমাণবিক বিপর্যয় এমন তেজস্ক্রিয়তার বিকিরণ ঘটাত, যাতে সব জীবনেরই অবসান ঘটে যেত।
যুক্তরাষ্ট্র মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে ১৯৪৬ ও ’৬২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। তখন যে দূষণ ঘটেছিল এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের ওপর যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তা আজো শেষ হয়নি। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে ইউরেনিয়ামসংশ্লিষ্ট মারণাস্ত্রের প্রয়োগ ঘটিয়েছে। নবজাতক এবং কম বয়সী শিশুদের ওপর এর ফলাফল বিপর্যয়কর।
পারমাণবিক দুর্যোগের লাগাম টেনে ধরার জন্য বড় বড় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ভূ-উপরিস্থিত কিংবা ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার উভয় ধরনের কোনোটাই এখন আর হয় না। নিরস্ত্রীকরণের আওতায় হাজার হাজার মারণাস্ত্র করা হয়েছে ধ্বংস। তবে এসব কিছু সত্ত্বেও পরমাণুই পৃথিবীর বুকে প্রাণের প্রতি সবচেয়ে মারাত্মক হুমকি হয়ে রয়েছে। আজো বিশ্বজুড়ে ১৬ হাজার পরমাণু অস্ত্র মোতায়েন অবস্থায় আছে। এর সাথে আছে এই অস্ত্র দিয়ে মানুষকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা। হিরোশিমার ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা রাখে এসব অস্ত্র। আটটি রাষ্ট্র পারমাণবিক সমরাস্ত্রের ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। আরো কয়েকটি দেশ নিজেরা পরমাণু বোমা বানানোর খায়েশ পোষণ করছে।
কিন্তু, ৭০ বছর আগে যা ঘটেছিল, তার ধারাবাহিকতায় যা হচ্ছে, তা পরমাণু বোমার সম্ভাব্য হুমকির বাইরেও বিপদের কারণ সৃষ্টি করছে। পারমাণবিক মারণাস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়া এই গ্রহটিকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। খনি থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলন, বিচূর্ণকরণ, সমৃদ্ধকরণ, বিশুদ্ধকরণ, সজ্জিতকরণ- এ সবকিছুই বোমা বানাতে দরকার। এতে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে, সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে দূষণের বিস্তার ঘটছে। এ ধরনের বড় প্লান্টের এলাকায়, যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের ওক রিজ টিএন এবং সাভান্নাহ রিভারে মানুষের বসবাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এর কারণ, বিপুল পরিমাণ পরমাণুবর্জ্য। এর একাংশ ভূমিতে অনুপ্রবেশ করছে। বছরের পর বছর ধরে অত্যন্ত ব্যয়বহুল পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়েও সম্ভব হচ্ছে না এসব অত্যধিক বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ সামাল দেয়া।
পরমাণু যুগের একটি বড় বিষয় হলো, বোমার পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যদিও তা এখন থেমে আছে। পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের স্থানটির কাছাকাছি যারা ছিলেন, তারাই এর সবচেয়ে মর্মান্তিক শিকার। এই বিস্ফোরণস্থলের পাশে যেসব সৈন্য সম্ভাব্য যুদ্ধের মহড়ায় অংশ নিয়েছে, তাদের দেহ মারাত্মকভাবে হয়েছে সংক্রমিত। তারা পরে ক্যান্সারসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছে ব্যাপকভাবে। আমেরিকার নেভাদায় সংশ্লিষ্ট কর্মীরাও একই ভাগ্যবরণ করেছে। সেখানে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষাস্থলের কাছের বাসিন্দাদের নিয়তিও অভিন্ন।
পরমাণু বোমার পরীক্ষাকালে ব্যাঙের ছাতার আকৃতির বিশাল মেঘের সৃষ্টি হয়েছিল। এই মেঘ বাতাসের প্রবাহে হাজার হাজার মাইলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তেজস্ক্রিয়তা বিকিরণকারী শতাধিক রাসায়নিক পদার্থের এই বিষাক্ত মিশ্রণের অস্তিত্ব ১৯৪৫ সালের (হিরোশিমার ঘটনা) আগে ছিল না। এই মিশ্রণ পরিবেশের সাথে মিশে গিয়ে মানুষ, পশুপাখি ও উদ্ভিদকে বিপন্ন করে তুলেছে। ১৯৬৩ সালের পরে ভূ-উপরিস্থিত পারমাণবিক পরীক্ষা হয়েছে কমই। তবে দীর্ঘ দিন এর জের টানতে হয়েছে। যাদের বয়স বর্তমানে ৪৫ বছরের বেশি, বিশেষ করে ‘বেবি বুম’ প্রজন্ম ছিল বিপদের মুখে। ‘বেবি বুম’ মানে, যারা পারমাণবিক পরীক্ষার সময়ে মাতৃগর্ভে ভ্রুণ, নবজাতক, কিংবা শিশুর পর্যায়ে ছিল। তেজস্ক্রিয়তা ডিএনএকে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে। তাই পরবর্তী প্রজন্মগুলো ‘উত্তরাধিকার’ সূত্রে পেয়েছে ত্রুটিপূর্ণ ‘জিন’।
‘হিরোশিমা’র বর্তমান তাৎপর্য প্রকৃতপক্ষে শুধু বোমার মধ্যে সীমিত নয়। ‘ঠাণ্ডা’ যুদ্ধের পরিস্থিতি খুবই গরম হয়ে ওঠার পর পরমাণুকে অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি। এর দ্বারা ইউরেনিয়াম পরমাণুকে বিভাজনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ ঘটাতেও হুবহু একই বিভাজন প্রক্রিয়া অবলম্বনের প্রয়োজন পড়ে।
পৃথিবীজুড়ে চার শতাধিক পরমাণুবিদ্যুৎ চুল্লি নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো পরিবেশের জন্য ডেকে এনেছে বিপর্যয়। অতীতে ক্ষুদ্র পরীক্ষাচুল্লিতে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার ব্যাপারে সতর্কতা দেখা যায়নি। এ দিকে, বৈদ্যুতিক পরমাণুশক্তি উৎপাদন থেকেছে অব্যাহত। একসময় বড় বড় অঘটন ঘটতে থাকে। যেমন- থ্রি মাইল আইল্যান্ড (১৯৭৯), চেরনোবিল (১৯৮৬) এবং ফুকুশিমার (২০১১) দুর্ঘটনা। ফুকুশিমার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আজ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ফলে বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঘটছে। এটা হতে পারে ইতিহাসের সর্বাধিক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়।
উত্তাপে গলে যাওয়া ছাড়াও পারমাণবিক চুল্লি থেকে ক্রমেই নির্গত হয়েছে শতাধিক তেজস্ক্রিয় রাসায়নিকের মিশ্রণের একাংশ। পরমাণু বোমা বিস্ফোরণে যে বিশাল মেঘ সঞ্চারিত হয়ে থাকে, এতেও ওইসব তেজস্ক্রিয় রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি দেখা গেছে। বিদ্যুৎ চুল্লির আশপাশে বসবাসকারী মানুষের দেহে এসব বিষাক্ত পদার্থ শ্বাস-প্রশ্বাস এবং খাদ্যের মধ্য দিয়ে অনুপ্রবেশ করে। এ যাবৎ বৈজ্ঞানিক জার্নালের ৬০টিরও বেশি নিবন্ধে এসব এলাকার শিশুদের মাঝে ক্যান্সারের ব্যাপক প্রকোপের বিষয় প্রমাণসহ তুলে ধরা হয়েছে।
পরমাণু বিদ্যুতের আরেকটি বিরাট ক্ষতির দিক হলো, বিপুল পরিমাণ বর্জ্য। চুল্লি থেকে নির্গমনের আগে এটা সংগ্রহ করা হয়েছিল। হাজার হাজার বছরেও এই বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব নিঃশেষ হবে না। পরমাণু বর্জ্যরে নিরাপদ সংরক্ষণের ব্যাপারে স্থায়ী কোনো সমাধান আজো নির্দেশ করা যায়নি। অথচ কয়েক দশক আগেই এই লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে। এখন প্রতিটি পরমাণু প্রকল্পে বিরাট বিরাট জলাশয়ে বেশির ভাগ বর্জ্য জমিয়ে রাখা হয়। এই পানি অবিরাম শীতল রাখা অপরিহার্য। কারিগরি ব্যর্থতা, মানবিক ত্রুটি কিংবা নাশকতার কারণে এই পানি ঠাণ্ডা না থাকলে বর্জ্য গলে বিপদ ঘটাবে।
পরমাণু যুগের ইতিহাস বিষাদময়। আজো এ বিষাদ কাটেনি। বহু বছর আগে বোতল থেকে যে দৈত্যকে বের হতে দেয়া হয়েছিল, সেটি এখনো বোতলে ঢোকেনি। মানবজাতিকে আরো বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে হলে পরিবেশ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য যে মহাবিপদের জন্ম দিয়েছে, তার মোকাবিলায় চাই অব্যাহত সতর্কতা।
লেখক : জোসেফ ম্যাঙ্গানো জ্যানেট শেরম্যান Radiation and Public Health Projeet-এর নির্বাহী পরিচালক ও গবেষণা উপদেষ্টা
ভাষান্তর- মীযানুল করীম

নৃশংস- খুলনায় ১২ বছরের রাকিবকে কম্প্রেসার মেশিনে বসিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যা

সিলেটের পর এবার খুলনা। নৃশংস, বর্বর কায়দায় খুন করা হলো আরেক শিশুকে। এবার পিটিয়ে নয়, খুনের কায়দা একেবারেই আলাদা। মলদ্বারে ইলেকট্রিক কম্প্রেসার দিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে। ঘটনার শিকার ১২ বছরের দরিদ্র শিশু রাকিব। তার অপরাধ ছিল কর্মস্থল ত্যাগ করে অন্যত্র কাজ নেয়া! আর এ কারণে জঘন্য বর্বর কায়দায় হত্যাকারীরা রাকিবের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে। শরীরে অতিরিক্ত বাতাস প্রবেশ করানোর ফলে তার নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় শরীরের স্বাভাবিক ক্রিয়া। এতে ঘটনার কিছু সময়ের মধ্যেই মারা যায় শিশু রাকিব। সিলেটে পিটিয়ে শিশু রাজনকে হত্যা ও এর দৃশ ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় যখন বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে ঠিক সেই সময়ে এমন নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলো। ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা তিন খুনিকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে। হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে স্থানীয় জনতা। সোমবার বিকালে নগরীর টুটপাড়া কবরখানা এলাকায় শিশুটির ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের পর রাত ১২টার দিকে রাকিবের মৃত্যু হয়। রাকিবের পারিবারিক সূত্র জানায়, কর্মস্থল ছেড়ে অন্য গ্যারেজে কাজ করার অপরাধে তাকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করেছে স্থানীয় শরিফ মোটর্স’র মালিক শরিফ ও তার সহযোগী মিন্টু। গুরুতর আহত অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানকার চিকিৎসকরা রাকিবকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন। ঢাকায় নেয়ার পথে রাত ১২টার দিকে মারা যায় শিশু রাকিব। তার বাবা আলম হাওলাদার জানান, বিকালে গ্যারেজ মালিক শরিফ ও তার সহযোগী মিন্টু মিলে রাকিবকে ধরে তার মলদ্বারে মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেয়ার পাইপ (কম্প্রেসার) ঢুকিয়ে দেয়। এতে রাকিবের পেট ফুলে গেলে সে অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে নির্যাতনকারী দুজনই রাকিবকে খুমেকে ভর্তি করে এবং তার পরিবারকে খবর দেয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রাকিবের শরীরে অস্বাভাবিক পরিমাণ বাতাস প্রবেশ করানোর কারণে তার নাড়িভুড়ি ছিঁড়ে যায় এবং ফুসফুস ফেটে যায়। এসব ছাড়াও শরীরের বিভিন্ন অর্গান অকেজো হয়ে যাওয়ায় সে মারা যায়।
রাকিবের বাবা আলম হাওলাদার ও খালা পারুল বেগম বলেন, খুমেকের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আমাদের জানান, রাকিব জীবনমরণের সন্ধিক্ষণে আছে। তার চিকিৎসা এখানে সম্ভব নয়। এরপর রাকিবকে নিয়ে ঢাকার পথে রওনা হলে পথে সে মারা যায়। নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী এক নারীসহ শরীফ ও তার ভাই মিন্টুকে পিটুনি দেয়। পুলিশ আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে খুমেক হাসপাতালে নিয়ে যায়। এলাকাবাসী জানায়, রাকিব এর আগে শরীফের মোটরসাইকেল গ্যারেজে কাজ করতো। কিন্তু সে সেখান থেকে কাজ ছেড়ে দিয়ে নগরীর পিটিআই মোড়ের নাসিরের গ্যারেজে কাজ নেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শরীফ ও তার ভাই মিন্টু তাকে ‘শায়েস্তা’ করতে এ পথ বেছে নেয়। খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকুমার বিশ্বাস জানান, শিশু রাকিবকে শরীফ মোটরসাইকেল গ্যারেজে তুলে নিয়ে গিয়ে মোটরসাইকেলের টায়ারে হাওয়া দেয়ার মেশিন তার মলদ্বারে ঢুকিয়ে পেটে হাওয়া দেয় শরীফ ও মিন্টু। একপর্যায়ে শিশু রাকিবের পেটসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে ফেঁপে ওঠে। এতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে রাকিব। অবস্থা গুরুতর দেখে নির্যাতনকারীরা রাকিবের শরীরের বিভিন্ন অংশে চাপ প্রয়োগ করে বাতাস বের করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়। উপায়ন্তর না দেখে রাকিবকে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেও অবস্থার কোন উন্নতি না হওয়ায় তাকে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। ঢাকায় নেয়ার পথেই সে মারা যায়।
এদিকে, রাকিবকে নির্যাতনকারী গ্যারেজ মালিক শরিফ ও তার ভাই মিন্টুকে জনতার রোষানল থেকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, এ মামলায় আটক হওয়া তিনজন হলেন গ্যারেজ মালিক ওমর শরিফ, তার মা বিউটি বেগম ও মিন্টু খান।
হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ:  গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত নগরীর ব্যস্ততম খানজাহান আলী রোড ও সেন্ট্রাল রোডে দফায় দফায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ খুলনাবাসী। এ সময় এ দুই সড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
রাকিব হত্যায় অভিযুক্ত নগরীর টুটপাড়ার শরীফ মোটরসাইকেল গ্যারেজের মালিক শরীফ ও তার সহযোগী মিন্টুর ফাঁসি দাবি করা হয় মিছিল ও বিক্ষোভ থেকে। বিক্ষোভ মিছিলে শিশু রাকিবের একমাত্র বোন রিমি (৮) ও খালা পারুল বেগমসহ সর্বস্তরের নারী, পুরুষ ও শিশুরা অংশ নেয়।
তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা:  এদিকে সকালে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার নিবাস চন্দ্র মাঝি নির্যাতনে নিহত রাকিবের বাড়িতে এসে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দিয়ে বলেন, এ ঘটনায় ৩ সদস্যের একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এদিকে জানাজা শেষে নিহত রাকিবকে টুটপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়।
রাকিবের বাবা আলম হাওলাদার এক ট্রাকচালকের সহকারী। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তার সংসার ছিল। অভাব-অনটনের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরুনের আগেই মোটরসাইকেল গ্যারেজে কাজ নিয়েছিল সে। এদিকে রাকিবের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে তার পরিবার। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তার বাবা-মা। তারা রাকিবের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ

শিশু যৌন নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার অ্যাডওয়ার্ড হিথ। ১৯৬১ সালে ক্ষমতায় থাকাকালে রাস্তা থেকে ফুঁসলিয়ে-ফাঁসলিয়ে ১২ বছরের এক ছেলেকে লন্ডনের পার্কলেনে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে ধর্ষণ করেন তিনি। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া। ১৯৯০ সালে উইলটসায়ার পুলিশ স্টেশনে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগ গ্রহণ করলেও তা তদন্তের ব্যাপারে মাথা ঘামায়নি পুলিশ। সম্প্রতি ৬০ বছর বয়সী হয়রানির স্বীকার ওই ব্যক্তি দি মিররকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমাকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে ধর্ষণ করেন স্যার হিথ। আমি তখন তাকে চিনতে পারিনি। কিন্তু পত্রিকায় মার্গারেট থ্যাচারের সঙ্গে দেখে আমি চিনতে পারি তাকে। তার বিরুদ্ধে দেয়া আমার অভিযোগ কেউ বিশ্বাস করেনি। অনেকে আমাকে পাগল বলেও গালি দিয়েছিল।

অবশেষে শাফকাতের ফাঁসি

২০০৪ সালে একটি শিশুকে হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত শাফকাত হুসেইনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে পাকিস্তান। কিশোর বয়সে হত্যাকাণ্ডে দোষীসাব্যস্ত হওয়া শাফকাত হুসেইনের ফাঁসি স্থগিত করার জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন আহ্বান জানিয়ে আসছিল। কিন্তু তা আমলে না নিয়েই মৃত্যুদণ্ডের রায়টি কার্যকর করে দেশটি। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও অনলাইন বিবিসি। শাফকাত হুসেইনের পক্ষে মামলায় লড়া ‘জাস্টিস প্রজেক্ট পাকিস্তান’ এক বিবৃতিতে বলেছে, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর ফাঁসি স্থগিতকরণের আহ্বান সত্ত্বেও, পাকিস্তানে মঙ্গলবার ভোরের আগে শাফকাত হুসেইনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
করাচি কেন্দ্রীয় জেলের এক কর্মকর্তাও ফাঁসি কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পাকিস্তানের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, কিশোর বয়সে আটক কাউকে হত্যার অভিযোগে ফাঁসি দেয়া যাবে না। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অবশ্য বলেছেন, শাফকাতকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখন সে প্রাপ্তবয়স্ক ছিল এবং প্রহরী হিসেবে কাজ করত। কিন্তু শাফকাতের আইনজীবীরা বলছেন, শিশুটিকে হত্যার জন্য শাফকাতকে গ্রেফতার করা হয়, তখন সে ছিল ১৪ বছরের কিশোর। শুধু তাই নয়, ভয়াবহ নির্যাতন করে শাফকাতের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের। চলতি বছর চারবার তার ফাঁসি স্থগিত করা হয়।

গ্রিসের ঋণ সংকট: ঋণ পরিশোধের অনেক উপায় আছে by টমাস পিকেটি

টমাস পিকেটি
জার্মানির ডাই সাইট পত্রিকাকে দেওয়া এক তেজস্বী সাক্ষাৎকারে বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরির লেখক টমাস পিকেটি বলেছেন, ইউরোপের ঋণ পুনর্গঠন করতে সবার আলোচনায় বসা উচিত। গ্রিসের সঙ্গে যে জবরদস্তি করা হয়েছে, তার বিরোধিতা করে তিনি বলেছেন, ঋণ দেওয়া-নেওয়ার ইতিহাসে অনেক বিপরীতধর্মী ঘটনার দৃষ্টান্ত রয়েছে। সাক্ষাৎকারটির নির্বাচিত অংশ প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য অনুবাদ করে প্রকাশিত হলো।
ডাই সাইট: গ্রিস কীভাবে এই ঋণসংকট কাটিয়ে উঠতে পারে, আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি?
টমাস পিকেটি: ইউরোপের সব ঋণ নিয়েই আমাদের আলোচনা করা উচিত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও এমন আলোচনা হয়েছিল। শুধু গ্রিস নয়, ইউরোপের অন্য কয়েকটি দেশের ঋণও পুনর্গঠন করা উচিত, ব্যাপারটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যে এথেন্সের সঙ্গে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আলোচনা করতে গিয়ে আমরা ছয় মাস সময় হারিয়েছি। ইউরো গ্রুপের ধারণা হচ্ছে, গ্রিস তাদের বাজেটের ৪ শতাংশ উদ্বৃত্ত অর্জন করে আগামী ৩০-৪০ বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করবে। এ বিষয়টি এখনো আলোচনার টেবিলে আছে। সবাই মনে করছে, ২০১৫ সালে তারা ১ শতাংশ, ২০১৬ সালে ২ শতাংশ ও ২০১৭ সালে সাড়ে ৩ শতাংশ উদ্বৃত্ত অর্জন করবে। ব্যাপারটা একদমই হাস্যকর! এটা কখনো হবে না। তারপরও যে বিতর্কটা করা প্রয়োজন, সেটা আমরা বহুদিন ধরে স্থগিত করেই যাচ্ছি।
ডাই সাইট: বড় অঙ্কের ঋণ মওকুফ হলে কী হতে পারে?
টমাস পিকেটি: ঋণ যাতে আবার নতুন করে না বাড়ে সে লক্ষ্যে নতুন ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান দরকার হবে, যারা বাজেট ঘাটতির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করবে। যেমন ইউরোপীয় সংসদে বিভিন্ন দেশের সাংসদদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। বাজেট-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংসদকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া যাবে না। ইউরোপের গণতন্ত্রকে অবমূল্যায়ন করলে তা হবে নিদারুণ এক ভুল। জার্মানি এখন ঠিক সে কাজটিই করছে, তারা এখন পীড়াপীড়ি করছে, রাষ্ট্রগুলোকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় দারিদ্র্যপীড়িত রাখা হোক।
ডাই সাইট: কিন্তু গ্রিসের কি ঋণ পরিশোধ করা উচিত নয়?
টমাস পিকেটি: আমি আমার বইয়ে আয় ও সম্পদের ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছি, জাতির ইতিহাস বিষয়েও বলেছি। বইটি লেখার সময় যে বিষয়টি আমাকে ধাক্কা দিয়েছে তা হলো, জার্মানিই একমাত্র ও সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত, যারা তাদের ইতিহাসে কখনো বাহ্যিক ঋণ পরিশোধ করেনি। প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ—কোনোটির পরেও তারা সেটা করেনি। যদিও সে অন্য দেশগুলোকে নিয়মিতভাবে টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য করেছে। যেমন, ১৮৭০ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুসীয় যুদ্ধের পর তারা পরাজিত ফ্রান্সের কাছ থেকে ক্ষয়ক্ষতি বাবদ বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করেছিল, সেটা তারা আদায়ও করেছিল। ফলে ফরাসিদের বহুদিন ভুগতে হয়েছে। আসলে সার্বভৌম ঋণের ইতিহাসে নানা বিপরীতধর্মী ঘটনা দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার কদাচিৎই মানা হয়।
ডাই সাইট: আপনি বলতে চাইছেন, যে দেশগুলো ঋণ পরিশোধ করে না, তারাই বিজয়ী হয়?
টমাস পিকেটি: জার্মানি আসলে ঠিক সে রকমই একটা দেশ। কিন্তু না, ইতিহাসে দেখা যায়, ঋণগ্রস্ত দেশগুলো দুভাবে সংকট থেকে বেরোতে পারে। একটি দৃষ্টান্ত দেখা যায় ১৯ শতকে, নেপোলিয়নের সঙ্গে ব্যয়বহুল যুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যা করেছিল। প্রক্রিয়া হিসেবে তা ছিল ধীরগতির, যে তরিকা এখন গ্রিসের জন্য বাতলানো হচ্ছে। সে সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কঠোরভাবে বাজেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ করেছিল। এই তরিকা কাজ করলেও তা শেষ হতে অনেক সময় লেগেছিল। এই ঋণ পরিশোধ করতে ব্রিটিশরা ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের অর্থনীতির ২ থেকে ৩ শতাংশ ব্যয় করেছে। স্কুল ও শিক্ষার পেছনেও ব্রিটিশরা সে সময় এত ব্যয় করেনি। এটা হওয়া উচিত ছিল না, এখনো হওয়া উচিত নয়। দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি খুবই দ্রুত গতির, জার্মানি ২০ শতকে তা প্রমাণ করেছে। মূলত এর তিনটি উপাদান আছে: মূল্যস্ফীতি, ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর বিশেষ করারোপ, ঋণ ছাড়।
ডাই সাইট: তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, জার্মানির অর্থনীতিতে যে অলৌকিক কাণ্ড ঘটেছে, তার ভিত্তি ছিল সেই একই রকম ঋণ ছাড়, যেটা আজ গ্রিসকে দেওয়া হচ্ছে না?
টমাস পিকেটি: ঠিক তা-ই, ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জার্মানির ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল তার মোট দেশজ উৎপাদনের ২০০ শতাংশ। ১০ বছর পর দেখা গেল, সেই ঋণভারের ছিটেফোঁটা মাত্র আছে, মোট দেশজ উৎপাদনের ২০ শতাংশ। সেই একই সময়ে ফ্রান্সও একরকম চাতুরীর সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। রাজস্ব খাতে শৃঙ্খলা এনে এত দ্রুত ঋণ কমানো সম্ভব ছিল না, আজ যেটা গ্রিসের জন্য আমরা সুপারিশ করছি। ১৯৫৩ সালের লন্ডন ঋণ চুক্তির কথা ভাবুন, যেখানে জার্মানির বিদেশি ঋণের ৬০ শতাংশ বাতিল করা হয়েছিল, আর তার অভ্যন্তরীণ ঋণ পুনর্গঠন করা হয়েছিল।
ডাই সাইট: সেটা হওয়ার কারণ হচ্ছে, মানুষ বুঝতে পেরেছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কাছ থেকে যে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছিল, সে কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। মানুষ সেবার জার্মানির পাপ মাফ করে দিতে চেয়েছিল!
টমাস পিকেটি: এর কোনো অর্থ হয় না। এর সঙ্গে নৈতিক স্বচ্ছতার সম্পর্ক নেই, এটা ছিল যৌক্তিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। তারা বুঝতে পেরেছিল, গুরুতর সংকটের পর যে বিশাল ঋণভার সৃষ্টি হয়েছিল, তারপর মানুষকে একসময় ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে, সঠিকভাবেই তারা এটা বুঝতে পেরেছিল। আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে দাবি করতে পারি না, তাদের মা-বাবারা যে ভুল করেছিলেন, তার জন্য তারা দশকের পর দশক ধরে মাশুল দিয়েই যাবে। ২০০৯ সাল পর্যন্ত গ্রিক সরকার হিসাবে জালিয়াতি করেছে। কিন্তু এটা ছাড়া গ্রিসের নতুন প্রজন্মের আর কোনো দায় নেই, ঠিক যেমন ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকের জার্মানদের দায় ছিল না। ইউরোপ প্রতিষ্ঠিতই হয়েছিল ঋণ মওকুফ ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ভিত্তিতে, চিরকাল ধরে শাস্তি ভোগের ভিত্তিতে নয়।
ডাই সাইট: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সভ্যতা ভেঙে পড়েছিল, ইউরোপ যেন বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি তো ভিন্ন।
টমাস পিকেটি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতির সঙ্গে আজকের পরিস্থিতির মিল নেই, এমন কথা বললে ভুল হবে। ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক সংকটের কথা চিন্তা করুন। ওটা স্রেফ সংকট ছিল না। ওটা ছিল ১৯২৯ সালের পর সবচেয়ে বড় আর্থিক সংকট। সে কারণে এই তুলনা করাটা সাজে। গ্রিসের অর্থনীতির ক্ষেত্রে তা একইভাবে সত্য: ২০০৯-১৫ সালের মধ্যে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমেছে। এটা ১৯২৯-৩৫ সালের জার্মানি ও ফ্রান্সের মন্দার সঙ্গে তুলনীয়। গ্রেট ব্রিটেনও এমন পরিস্থিতিতে পড়েছিল। এটা নতুন সমস্যা নয়। আর ঋণ পরিশোধের অনেক উপায়ই আছে, একটি নয়। এ বিষয়টি মনে রাখা দরকার।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
টমাস পিকেটি: ফরাসি অর্থনীতিবিদ।

বিভক্তির কবলে বিশ্বাস-৫: গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত by হামিদ বিশ্বাস ও সিরাজুস সালেকিন

বিভক্তি গ্রাস করেছে বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটিকে। সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরাই একে চিহ্নিত করেছেন গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেছেন,  বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটি বলে কিছু নেই। এখানে যারা সিভিল সোসাইটির নামে কাজ করছেন তারা কারও না কারও লবিস্ট। মতাদর্শটি বিদেশী। এখনও ইউরোপে চালু রয়েছে। আমি সিভিল সোসাইটি বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস করি নাগরিক সমাজে। কারণ আমি নিজেও একজন নাগরিক। এই সমাজে বাস করি। একজন নাগরিক-ই পারেন অপর নাগরিকের সমস্যার সমাধান করতে। সব কিছুতে বিভক্তি থাকে। নাগরিক সমাজেও কিছুটা বিভক্তি আছে। এটা সাময়িক। যারা পাকিস্তানে বিশ্বাস করে তারা এক পক্ষ। অপর পক্ষ যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। বিভক্তির কারণে নাগরিক সমাজ মূল দায়িত্ব থেকে দূরে সরে গেছেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভক্তির সঙ্গে দায়িত্ব পালনের কোন সম্পর্ক নেই। দায়িত্ব পালন হলো মানসিকতার বিষয়। মানসিকতা ভাল হলে সঠিক দায়িত্ব পালন করবে। ভাল না হলে দায়িত্ব পালন করবে না। এটাই স্বাভাবিক।
সিভিল সোসাইটি নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলামেরও অভিন্ন বক্তব্য। তিনি বলেন, আমাদের দেশে সিভিল সোসাইটি বলে যা বোঝানো হচ্ছে তা আসল সিভিল সোসাইটি নয়। তবে বিষয়টি নিয়ে আর কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক এডভোকেট শ ম রেজাউল করিম বলেন, যে কোন নাগরিকের রাজনৈতিক বিশ্বাস খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সুশীল হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের সরাসরি রাজনৈতিক পক্ষ অবলম্বন এবং অন্ধ রাজনৈতিক পক্ষ অবলম্বন বা দলীয় বক্তব্য রাখা, মতামত ব্যক্ত করা, নিজের পদ থেকে দলকে অন্ধের মতো সমর্থন করা কোনভাবেই সুখকর না। কোন কোন ক্ষেত্রে কিছু সুশীলজনকে চাওয়া-পাওয়ার বিষয়কে মাথায় রেখে নেতানেত্রীদের অনুগ্রহ, অনুকম্পা ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধার জন্য বিবেক বহির্ভূত ভূমিকার রাখতে দেখা যায়। এটা কোনভাবেই কাম্য না। সুশীল সমাজের স্বকীয়তা রক্ষা করা জরুরি। এর পরিণতি সম্পর্কে তিনি বলেন, সমাজের বিবেক হিসেবে পরিচিত সুশীল জনদের সরাসরি রাজনৈতিক বিভক্তি দেশের জন্য, আইনের শাসনের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য অশনী সংকেত।
অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের ধুয়া ও যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটি সুশীল সমাজকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সুশীলের কেউ কখনও যুদ্ধাপরাধের পক্ষ কিংবা স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়নি। তারা প্রত্যেকে এসব সমস্যার সুষ্ঠু মীমাংসা চেয়েছিলেন। তবুও বিষয়টিকে জিইয়ে রেখে বারবার সামনে আনা হয়। সৃষ্টি হয় পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি। ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায় জাতির দুর্দিনের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর সুশীল সমাজ। বিভক্তির দ্বিতীয় কারণ বর্ণনায় মামুন বলেন, শাসক গোষ্ঠী দমন-নিপীড়নের মাধ্যমে বিরোধী পক্ষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকিয়ে দেয় তখন সুশীল সমাজের নাগরিকরা ভয় পেয়ে যায়। সাধারণত সুশীল সমাজের নাগরিকরা হলেন সমাজের সব চেয়ে ভদ্র ও উচ্চ শিক্ষিত। সঙ্গত কারণে সুশীলরা রক্তচক্ষু, রাজনৈতিক হাঙ্গামা ও জেল-জরিমানার সঙ্গে অভ্যস্ত নয়। সে কারণে দেশের সুশীলরা আস্তে আস্তে নিষ্ক্রিয় হতে থাকেন। এছাড়া বিরোধী দল যদি ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে আমাদের বাঁচাবে কে- এ ধরনের চিন্তা থেকেও সিভিল সোসাইটি দুর্বল হয়ে থাকতে পারে। যারা বর্তমানে সিভিল সোসাইটির ভূমিকায় আছেন তারা যে কোন বিষয়ের গভীরে যাচ্ছেন না। যেনতেনভাবে মন্তব্য করে যাচ্ছেন। সুশীল সমাজ দুষ্টক্ষত মুক্ত নয় উল্লেখ করে মামুন রশীদ আরও বলেন, সুশীলের ব্যক্তিগত আমলনামা ঠিক করা দরকার। তারা নানা সুযোগ-সুবিধায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অল্পতে হাতবদল হয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান সুশীল সমাজ মিডিয়া কেন্দ্রিক হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। বলেন, মিডিয়া যাকে বলবে সুশীল, সে হবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি। সে কারণে অনেক সুশীল মিডিয়ার প্রতি ঝুঁকছেন। এসব পার্থিব চাওয়া-পাওয়া থেকে বের হতে না পারলে নিরপেক্ষ সৃজনশীল সুশীল সমাজ পাওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন মামুন রশীদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস এ প্রসঙ্গে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সুশীল সমাজের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিকদের দুটি গ্রুপ, শিক্ষকদের বিভিন্ন গ্রুপ দেখা যায়। এই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সিভিল সোসাইটিকে তাদের পছন্দমতো বানিয়ে ফেলেছে। সিভিল সোসাইটি যে স্বায়ত্তশাসিত, নিজেদের স্বত্বা নিয়ে দাঁড়াবে সেই জায়গটা আওয়ামী লীগ-বিএনপি নষ্ট করে দিয়েছে। যে কারণে তাঁতী দল, আওয়ামী শিশু লীগ, আওয়ামী ভাঙ্গারী লীগ তৈরি হয়েছে। অথচ এরা নিজেদের স্বকীয়তা নিয়ে দাঁড়ানোর কথা। সাপুড়ে লীগ তৈরি করার তো কোন দরকার নেই। একে বলে পার্টিয়ার্কি, দলতন্ত্র বা দলবাজি। বিএনপি-আওয়ামী লীগ সমস্ত জায়গাগুলো গ্রাস করে ফেলেছে। সুশীল সমাজের একটি অংশকে দায়ী করে তিনি বলেন, আবার সিভিল সোসাইটির কিছু লোক নিজেদের পদ-পদবি, সুযোগ-সুবিধা, লোভের ফাঁদে পড়ে নিজেদের সত্তা হারিয়ে ফেলেছে। সুশীল সমাজের বিভাজনের পরিণতি সম্পর্কে রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, পরিণতি খুব দুঃখজনক। এই বিভাজনের ফলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে না। বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, নির্বাচন কমিশন সেগুলো দলীয়করণ হয়েছে। আমাদের আমলারা দলীয়করণের শিকার। পিয়ন থেকে সেক্রেটারি দলীয়করণের শিকার। এসমস্ত কারণে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো উঠে দাঁড়াতে পারছে না।
সাংবাদিক আশরাফ কায়সার বলেন, সুশীল সমাজের বিভাজনটা দেশের জন্য মঙ্গলজনক না। সুশীল সমাজ অথবা যারা জাতিকে দিকনির্দেশনা দেবেন তারা যখন রাজনৈতিক কারণে বিভাজিত হন তখন তাদের জন্য গুণগতমান সেটি নিচের দিকে যায় এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা কোন বিষয়কে বিবেচনা করেন। তাদের যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, তাদের সঠিক মন্তব্য করার ক্ষমতা এটিতে তারা আপস করেন রাজনৈতিক কারণে। তা থেকে তখন বাংলাদেশের মানুষ বা যে কোন জাতি সঠিক দিকনির্দেশনা পায় না। রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ থাকতেই পারে। কিন্তু তারা অন্ধ দলীয় আনুগত্যের দিকে চলে যাচ্ছে। সুশলী সমাজ এর বাইরে নয়। সুশীল সমাজের বিভাজন দূর করতে দূর করতে দলীয় আনুগত্য পরিহার জরুরি মনে করেন তিনি। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, এখান থেকে বের হয়ে আসার বড় উপায় হচ্ছে সেন্সিবল হওয়া। যারা সুশীল সমাজের অংশ এবং দলীয় কর্মীর মতো কথা বলেন বা ব্যবহার করেন তাদের আসলে দলের পরিচয়ে পরিচিত হওয়া ভাল নিজেদের সুশীল সমাজ না বলে। আমরা সেই সুশীল সমাজ প্রত্যাশা করি যারা দলীয় পরিচয়ে বাইরে গিয়ে সত্যকে সত্য বলার সাহস রাখে।

শীতে হাফশার্ট গ্রীষ্মে ওভারকোট by কাফি কামাল

একের পর এক ভুল চাল। বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন। রাজনীতিতে কখনও কখনও ভুলের মাশুল দিতে হয় দীর্ঘকাল। সে মাশুলই যেন দিয়ে চলছে বিএনপি। রাজনীতিতে সবদিন সমান যায় না- এ কথা সত্য। তবে দীর্ঘ আট বছর ধরে একইদিন যাচ্ছে বিএনপির। কোথায় ভুল করেছে দলটি? কেনইবা ব্যর্থতার চোরাবালি থেকে বের হতে পারছে না। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন আমাদের রাজনৈতিক সংবাদদাতা কাফি কামাল। ‘বিএনপির ময়নাতদন্ত’ শীর্ষক ধারাবাহিকের আজ ছাপা হলো পঞ্চম পর্ব-
ওয়ান ইলেভেনের বিশেষ সময়ের পর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত থাকলেও জোটের চাপে শেষ মুহূর্তে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। বিশেষ করে জামায়াতের আগ্রহ ছিল বেশি। ফলে প্রার্থী চূড়ান্ত থেকে শুরু করে সবকিছুই ছিল অগোছালো। নির্বাচনের ফলাফলও ছিল ভূমিধস পরাজয়। ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও ভোটের হিসাবে অনেকটাই অটুট ছিল জনসমর্থন। এছাড়া, দেশব্যাপী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অবিশ্রান্ত সফরের মধ্য দিয়ে সাংগঠনিকভাবে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখে বিএনপি। সে নির্বাচনকে বৈধতা দিয়ে বিএনপির তরফে বলা হয়েছিল, ‘একটি অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে একটি যেনতেনভাবে নির্বাচিত সরকার ভাল।’
কিন্তু খুব দ্রুতই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে  প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দিন দিন কঠোর হতে থাকে। এমনই সময়ে হঠাৎ মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে সরব হয়ে ওঠে বিএনপি। অন্যদিকে একদা নিজেদের আন্দোলনের ফসল ‘নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি’ থেকে সরে আসার উদ্যোগ নেয় সরকার। দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার বিষয়টি সুরাহার দায়িত্ব সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়া হয় উচ্চ আদালতের রায়ে। সংসদের সংবিধান সংশোধন কমিটি ও সুধী সমাজের পরামর্শের বিপরীতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এ পদ্ধতিটি বাতিল করেন। বিএনপির তরফে ইস্যুটির তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব, পরিবর্তিত পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দূরদর্শী প্রতিবাদ ও বিকল্প দাবির বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেনি দলটি। বিপুল জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে রাজপথের কার্যকর আন্দোলন কিংবা বিকল্প পথে এগিয়ে পরিস্থিতি উত্তরণে কোন সফলতা দেখাতে পারেনি বিএনপি।
আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির একটি দর্শন হচ্ছে মৌলিক ইস্যুতে আপসহীন মনোভাব ধরে রাখা। অতীতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় এ আপসহীন মনোভাবের কারণেই সাংগঠনিকভাবে ভঙ্গুর ও অগোছালো বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছিল জনগণ। যা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যময় ঘটনা। ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে দেশত্যাগ করতে অস্বীকৃতির আপসহীন মনোভাব বিএনপির রাজনীতিকে চাঙ্গা করে। নবম সংসদে ক্ষমতার বাইরে থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে- ওয়ান ইলেভেনের রাজনীতিহীনতা থেকে উত্তরণের বিজয় এসেছে বিএনপির হাত ধরেই। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে এ আপসহীন মনোভাব থেকে ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তটি নিয়েও মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা বিতর্ক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘আন্দোলনের অংশ হিসেবে’ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে গেলেও বিএনপি জোটের জেতার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যেত না। পাবলিক মুড সে রকমই ছিল।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা মহাজোট সরকারের দ্বিতীয় বছর থেকেই কড়া আন্দোলনে যায় বিএনপি। বিশেষ করে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে সে আন্দোলনের বিস্তৃতি। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দলের সিনিয়র নেতাদের নামে দায়ের করা হয় একের পর এক মামলা। এ সময় তৃণমূলের চাঙ্গা মনোভাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কার্যকর কর্মসূচি দিতে ব্যর্থ হয় দলটি। সারা দেশে আন্দোলন তুঙ্গে উঠলেও তার রেশ ছড়ায়নি রাজধানী ঢাকায়।
ঢাকার দুর্বলতা বহুকাল ঢাকা থাকার চরম খেসারত দিয়েছে এবং দিয়ে চলেছে বিএনপি। সাদেক হোসেন খোকার হাত থেকে কমিটি করার ভার মির্জা আব্বাসকে দেয়া হলেও কোন লাভ হয়নি। ঢাকায় কমিটিই করতে পারে না বিএনপি। ঢাকার এমন দুর্দশা দেখে সারা দেশে কর্র্মীদের মনোবল ভেঙেছে।  বিএনপির আন্দোলন যে তীব্রতা পায়নি, সেখানে ঢাকার ঢাকা পড়া দুর্বলতা বিরাট কারণ। কিন্তু এনিয়ে কোন গবেষণা নেই, কোন মূল্যায়ন নেই। অবশ্য পুলিশি নির্যাতন ও মামলার ভয়ে সবাই ভীত। সারা দেশে নেতাদের পাইকারি গ্রেপ্তার শুরু হলে অচিরেই ভাটা পড়ে আন্দোলন। আর আন্দোলন কর্মসূচির বিষয়টিকে কোন কোন সময় হাস্যকর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গেছেন বিএনপির অনেক নেতা। সম্ভাব্য কড়া ও কঠোর আন্দোলন নিয়ে পরস্পরবিরোধী মনোভাব দেখা দেয় নেতাদের মধ্যে। এতে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। এরপর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণায় বিএনপি নেতাদের অপেক্ষা ছিল ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার। ফলে কড়া আন্দোলনের হুমকি-ধামকি সরকারকে যেমন চাপে ফেলতে পারেনি, তেমনি উজ্জীবিত করতে পারেনি দলের তৃণমূলকে। কর্মসূচি নিয়ে বিএনপির এ রহস্যময়তা রাজনৈতিক মহলে একটি প্রবাদের জন্ম দেয়।
বিএনপির আন্দোলন হচ্ছে, ‘শীতের হাফশার্ট আর গ্রীষ্মের ওভারকোট’। এ নিয়ে রীতিমতো কার্টুন ছাপা হয়েছে গণমাধ্যমে। এভাবেই আন্দোলনের সময়-অসময় বিবেচনায় অদূরদর্শিতার পরিচয় দিতে থাকে দলটি। বারবার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব পিছু হটার কারণে আশাহত ও হতাশ হয়েছে তৃণমূল। অনেক ক্ষেত্রে কর্মসূচি প্রণয়ন ও ঘোষণার বিষয়গুলোতে অন্ধকারে ছিলেন শীর্ষ নেতারা। প্রশ্ন ওঠে, এ ধরনের কর্মসূচিকে এগিয়ে নিতে যে প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন তা কি বিএনপির ছিল?
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুতে আন্দোলন করলেও এখনও তার কোন বিকল্প সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দিতে পারেনি বিএনপি। দেশের ইতিহাস বলে নেতারা ব্যর্থ হলে, তারা ভীরু হলে এগিয়ে আসে ছাত্ররা, ’৬৯ এবং ’৯০-এ তাই ঘটেছে। এবারে তা নেই। এবারে এসেছে অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের শত নাগরিক। সেখানেও শত ছিল না। এক নাগরিক। প্রফেসর এমাজউদ্দীন সম্প্রতি বলেছেন, তিনি ঈদের আগেই ওই বিকল্প রূপরেখার খসড়া দেবেন। কিন্তু তার কোন খবর নেই। তিনি তা দিলেও তাতে বিএনপি চাঙ্গা হবে, সেটা ভাবা কঠিন।
 দলটির পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে যে ফর্মুলা দেয়া হয়েছিল তাতে কোন দূরদর্শী দিকনির্দেশনা ছিল না। এছাড়া, জনগণের সমস্যার চেয়ে ক্ষমতার পরিবর্তনকেন্দ্রিক কর্মসূচিই বেশি এসেছে দলটির তরফে। প্রো-অ্যাকটিভ রাজনীতির চেয়ে রি-অ্যাকটিভ রাজনীতির ঝোঁক বেড়েছে। ১৯৯০ থেকেই দেখা গেছে, বিরোধী দল কখনও শাসনগত ব্যর্থতা নিয়ে তেমন কোন কথা বলেন না। কারণ তারা ক্ষমতায় গিয়ে তেমন ধরনের শাসনই দেবেন। যেমন বিএনপি বলে না যে তারা ক্ষমতায় গেলে বিচার বিভাগ কেমন হবে। বিচারক নিয়োগে নীতিমালা করবে। তারা পুলিশ সংস্কার করবে। মোবাইল কোর্ট বিলোপ করবে। এসব তারা করবে না। সেকারণেও বিএনপির আন্দোলনের প্রতি মানুষের আগ্রহ নেই। সরকারের শাসনগত নানা ব্যর্থতা নিয়ে বিএনপি ইস্যুভিত্তিক ছোটখাটো কর্মসূচি পালন করতে পারতো। জলাবদ্ধতায় মানুষ ডুবে মরছে। কিন্তু বিএনপির ওয়ার্ড কমিটিগুলো এবিষয়ে কোন কথা বলছে না। তারা চেয়ে থাকে কখন বড় ডাক আসবে। তাই বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা এখনও কৌশল বদলাচ্ছেন না। তাদের কাছে বড় কর্মসূচির মানেই হলো হরতাল দেয়া, দেশ অচল করা। সরকার ফেলে দেয়ার হুমকি দেয়া। কেয়ারটেকারের অধীনে নতুন নির্বাচন আদায় করা। বিএনপিকে এই ভাষা বদলাতে হবে। আওয়ামী লীগও বিরোধী দলে গেলে আর হরতাল, জ্বালাও পোড়াও করে আগের মতো যুৎ করতে পারবে না বলে অনেকেই মনে করেন।  
বিএনপিকে অরাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক ও তার প্রতিবাদ জানাতেই ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে পরনির্ভর রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে বিএনপি। আন্দোলন-সংগ্রাম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কখনও জামায়াতে ইসলামী, কখনও হেফাজতে ইসলাম, কখনও বিদেশী কূটনীতিবিদদের ওপর নির্ভর করে রাজনীতি করছে দলটি।
আন্দোলন ও বিপ্লব এক নয়। বিপ্লব বা প্রতিবিপ্লব দুটোই ঘটে আকস্মিক। বাংলাদেশে এর নজির থাকলেও গণআন্দোলন গড়ে ওঠে ধাপে ধাপে। জনগণের ব্যাপকভিত্তিক সম্পৃক্ততায়। ১৯৫২ সালে পূর্ণতা পাওয়া ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনবিরোধী ছাত্র বিক্ষোভের মাধ্যমে। যা ’৬৬, ’৬৮, ’৬৯ হয়ে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৮৩ সালের ছাত্র বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে। এরপর ’৮৪, ’৮৫, ’৮৬, ’৮৭, ’৮৮ হয়ে নব্বইয়ে আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং এরশাদের পতন ঘটে। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন শুরু করেছিল ১৯৯৩ সালে। মাগুরা ছিল টার্নিং পয়েন্ট। এরপর ধীরে ধীরে তারা চূড়ান্ত পর্বে গিয়ে সংসদ থেকে গণপদত্যাগ করেছিল। বিএনপি নেতারা এই বাস্তবতা বিবেচনায় নেননি যে, দলটির ইতিহাসে আন্দোলন করে আওয়ামী লীগের পতন ঘটানোর নজির নেই। সাম্প্রতিক আন্দোলনে ধারাবাহিকতা ছিল কেবল খালেদা জিয়ার দেশব্যাপী গণসংযোগে। কিন্তু কর্মসূচি ঘোষণায় কখনও ধীর আবার কখনও ছিল তাড়াহুড়ো।
ইসলাম ধর্ম ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে ২০১৩ সালে আন্দোলনে নামে দেশের আলেম-ওলামাদের একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফরম হেফাজতে ইসলাম। রাজধানীর শাপলা চত্বরে বিশাল একটি সমাবেশ করে তারা। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ক্ষোভের লক্ষ্য হয়ে পড়েছিল সরকার। যদিও এ প্ল্যাটফরমটির নেপথ্য শক্তির রেকর্ড হচ্ছে সর্বদা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝে চলার। হেফাজতে ইসলামের উত্থান এবং জনসম্পৃক্ততা দেখে তাদের আন্দোলনের ঢেউকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল বিএনপি। দলটির কিছু তাত্ত্বিক শীর্ষ নেতৃত্বকে এ ঢেউয়ের ভেতর দেখিয়েছিলেন সুনামির সম্ভাবনা। কিন্তু হেফাজতকে রুখে দেয়ার ব্যাপারে সরকারের কৌশল, আন্তর্জাতিক মহলের মনোভাব ও হেফাজতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে বুঝে উঠতে ব্যর্থ হয় বিএনপি। অবশ্য বিএনপির একাংশ হেফাজতকে সমর্থন না দিতে সতর্ক করে দিলেও কোন কোন অতি উৎসাহী নেতা বেগম জিয়াকে বিভ্রান্ত করেছিলেন বলে জানা যায়। পল্টনের এক মঞ্চে এনিয়ে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বাদানুবাদও ঘটে। যে সম্ভাবনার ভিত্তিতে হেফাজতের দাবির প্রতি বিএনপি সমর্থন দেয়, দ্রুত তা দলটির জন্য নেতিবাচক পরিস্থিতিই ত্বরান্বিত করে। প্রকাশ্যে হেফাজতকে সমর্থন দিলেও তাদেরকেও কার্যকর সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হয় দলটি। এমনকি খালেদা জিয়ার নির্দেশনা সত্ত্বেও মহানগর বিএনপি তাতে সাড়া দেয়নি। এবারও বিএনপির ঢাকা মহানগর নেতৃত্বের ব্যর্থতার মোড়কে বন্দি হয় আন্দোলন।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে কড়া আন্দোলনে যায় বিএনপি। সারা দেশে সে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সরকারকে এ ইস্যুতে কার্যকর আলোচনায় বসাতে ব্যর্থ হলে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। কিন্তু তারা অনুমান করতে পারেনি যে, তাদের বয়কট মোকাবিলায় সরকারি দল কি করতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়ে কৌশলে ১৫৩ আসনে বিনাভোটে নিজেদের প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করে আনে সরকার।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে এক রহস্যময় কর্মসূচি আসে ২০ দলের তরফে। আন্দোলনের মুখে সারা দেশ যখন রাজধানী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তৃণমূলে বিএনপির নিয়ন্ত্রণ প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই আসে সে সিদ্ধান্ত। ২০১৩ সালের ২৯শে ডিসেম্বর ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশের জোরালো আন্দোলনকে ঢাকায় কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ঢাকার দলীয় নেতৃত্ব সেজন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না, তাদের সামর্থ্যও ছিল না। আখেরে দেখা যায় সেটি ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। একদিকে সরকার প্রতিবন্ধকতার মাধ্যমে সেটা রুখে দেয় অন্যদিকে সারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যায়। বাস্তবে দেখা যায়, ২৯শে ডিসেম্বর রাজধানীতে একজন বিএনপি নেতাও রাজপথে নামার সাহস দেখাননি। অন্যদিকে ১৪৭টি আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে খালেদা জিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে কিংবা বিএনপির বর্জনে নিরুৎসাহিত হয়ে বেশির ভাগ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বিরত থাকেন। তবে ভোটারদের এ মনোভাবকে বিবেচনায় নিয়ে আন্দোলনকে একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিতে ব্যর্থ হয় বিএনপি। আত্মগোপনে গিয়ে দল পরিচালনা শুরু করেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার এ সিদ্ধান্ত ব্যাপকভাবে সমালোচনার মুখে পড়ে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আত্মগোপন কৌশল অনেকটাই আত্মঘাতী হয়েছে বিএনপির। কারণ নেতারা আত্মগোপনে গিয়েও গ্রেপ্তার এড়াতে পারেননি। বরং তাদের এই মনোভাব কর্মীদের হতাশ, জবাবদিহি ও দায়িত্ববিমুখ করে তোলে।
২৯শে ডিসেম্বর ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচির মতো ফের রহস্যময় সিদ্ধান্ত আসে দলটির তরফে। ২০ দলের আনুষ্ঠানিক বৈঠক থেকে কর্মসূচি দু’দিনের জন্য স্থগিত ঘোষণার ১ ঘণ্টার ব্যবধানে রহস্যময় সিদ্ধান্তে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে একদিকে সরকারকে তাদের নড়বড়ে অবস্থান শক্ত করার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়, অন্যদিকে ভেঙে দেয়া হয় কর্মী-সমর্থকদের মনোবল। ওই আন্দোলন থামানোটা ভুল ছিল বলে স্বীকার করেছেন খোদ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কিন্তু কারা এবং কেন সে সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাব খাটিয়েছিল, তাদের ব্যাপারে কোন কথা বা সাংগঠনিক উদ্যোগ নেননি তিনি। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, প্রথমদিকে আন্দোলনের জন্য শরিক দলের ওপর নির্ভর করা। এতে একদিকে বিরোধী জোটের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণায় সরকারের সুবিধা হয়েছে অন্যদিকে বিএনপি কর্মীদের করে তুলেছে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সুবিধাবাদী।
সরকার খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয়ে অন্যায়ভাবে অবরুদ্ধ করেছে সেটা যেমন ঠিক, তেমনি বিএনপির দেশের সর্বস্তরের মানুষকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অবরুদ্ধ করে রাখার বিষয়টিও অস্বীকার করা যাবে না। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পাবলিক পরীক্ষা, জাতীয় দিবস পালন কোন কিছুই গ্রাহ্য করা হয়নি। কিন্তু আন্দোলন বা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নাশকতার ঘটনা যতই হোক, মানুষ কতদিন স্বাভাবিক কাজকর্ম ফেলে ঘরে বসে থাকবে? ১৫৩ আসনে নির্বাচন করতে না পারা এবং ১৪৭ আসনে ভোটের শতকরা হার বিবেচনায় ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহতকরণে সফল বিএনপি। কিন্তু আইনগতভাবে সেখানে অসহায় বিএনপি। সর্বোচ্চ আদালতে একটি ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক তাৎপর্যও বুঝতে পারেনি বিএনপি নেতৃত্ব। পঁচাত্তরের পরে প্রতিকূল অবস্থায় আওয়ামী লীগ চাইলে লাগাতার নির্বাচন বয়কট করতে পারতো, কিন্তু সেটা তারা করেনি। এক অর্থে বিএনপির অধীনে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করেছে। তারা হেরেছে। এবং সে ফল নিয়ে তারা সংসদেও বসেছে।

গ্রামের মেয়েরাই ওদের টার্গেট by রুদ্র মিজান

দৌলতুননেছা। বগুড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ-সরল, সুন্দরী নারী। বিয়ের অল্প দিনের মধ্যেই স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। মা-বাবার টানাপড়েনের সংসারে ঠাঁই নেন তিনি। নিজেকে তখন বোঝা মনে হতো তার। হন্যে হয়ে একটা চাকরি খুঁজছিলেন দৌলতুননেছা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। এ অবস্থায় অসহায় হয়ে যান তিনি। এই অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় প্রতারক চক্র। দেশের বাইরে মোটা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখানো হয় তাকে। এভাবেই নারী পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে নগদ টাকাসহ বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে পা বাড়ান দৌলতুননেছা। এ নারীসহ ৩৫ নারী তাদের কবল থেকে উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে র‌্যাব উদ্ধার করেছে নয় জনকে। কিন্তু চার শতাধিক নারীকে এই চক্র পাচার করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
র‌্যাব-২ এর কার্যালয়ে কথা হয় প্রতারণার শিকার দৌলতুননেছার সঙ্গে। অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কিভাবে নারী পাচারকারী চক্রের দালাল তাকে অন্ধকারের পথে ঠেলে দিচ্ছিলো তার করুণ বর্ণনা দেন তিনি। তিনি জানান, তার প্রাক্তন স্বামী আরিফুল হাসান রুবেলের বন্ধু কামরুল ইসলামই তাকে বিদেশে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখায়। আরিফের সঙ্গে ডিভোর্সের তিন-চার বছর পর আড়াই মাস আগে হঠাৎ করেই ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কামরুল। এ সময় নিজের অসহায়ত্বের কথা তোলে ধরলে কামরুল তাকে চাকরি করবেন কি-না জানতে চায়। কামরুল জানায়, সরকারিভাবে সৌদি আরবে পাঠানোর একটা সুযোগ আছে। সেখানে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করতে হবে। এজন্য প্রতি মাসে তাকে ৩০ হাজার টাকা বেতন দেয়া হবে। রাজি থাকলে ৫০ হাজার টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজ-কাপড়সহ কালই ঢাকায় যেতে বলে। পাসপোর্ট-ভিসাসহ বাকি সব ব্যবস্থা করে দেবে কামরুল। পারিবারিক বিষয় শোনার পর কামরুল জানায়, বিদেশে যাওয়ার বিষয়টি কাউকে জানানো যাবে না। জানলে কেউ তাকে যেতে দেবে না। দৌলতুননেছাও রাজি হন।
দৌলতুননেছা জানান, পরিবারে কোন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নেই। ছোট ভাই-বোন লেখাপড়া করে। দৌলতুননেছার পিতা আহত মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান। একজন কৃষক। কৃষি জমির আয়ে টেনেটুনে সংসার চলে তাদের। এই অবস্থায় কামরুলের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান তিনি। দৌলতুননেছা জানান, পরদিন নিজের জমানো ৫০ হাজার টাকা ও ব্যাগ গুছিয়ে সবার অজান্তে বাড়ি থেকে বের হন। টঙ্গী থেকে দৌলতুননেছাকে রিসিভ করে কামরুল। ওই দিন তার বাসায় রাত যাপন শেষে সকালে উত্তরার আল-আতিক বিডি লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে নাম, ঠিকানাসহ ফরম পূরণ, আলোকচিত্র ধারণ শেষে তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে যায় আল-আতিক কর্তৃপক্ষ। তারপর ভাষা শিক্ষাসহ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের জন্য ওই প্রতিষ্ঠানের তুরাগ থানার কামারপাড়া এলাকার কথিত প্রশিক্ষণ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। তৃতীয় তলার ওই ফ্ল্যাটে তার মতো ৩৫ জন নারীকে দেখতে পান। একইভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সৌদি আরবে পাঠানোর জন্য তাদের জড়ো করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের নামে প্রায় দুই মাস তাদের সেখানে রাখা হয়। এর মধ্যেই পাসপোর্ট তৈরি ও মেডিক্যাল পরীক্ষা করা হয়। দেশের বাইরে পাঠানোর কাজ প্রায় সম্পন্ন। এর মধ্যেই দৌলতুননেছা বাড়িতে যোগাযোগ করার কথা বলেন। দেশের  বাইরে যাওয়ার আগে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে আপত্তি জানায় সেন্টারের দেখভালের দায়িত্বে থাকা রীনা বেগম। দৌলতুননেছা জানান, ওই কেন্দ্র প্রবেশের পর থেকে কাউকেই বাইরে বের হতে দেয়া হতো না। ফোনে কথা বলা ছিল নিষিদ্ধ। কারও সঙ্গেই মোবাইলফোন রাখতে দিতো না। দুই মাসের মধ্যে দৌলতুননেছা একবার জ্বরে আক্রান্ত হন। তখনও বাইরে কোন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়নি। বাইরে যাওয়ার খুব বেশি আবদার করলে বিদেশে যাওয়া হবে না বলে হুমকি দিতো। এমনকি অনেক সময় মারধরও করা হতো অনেককে। এই অবস্থাতেই প্রতিবেশী এক নারীর সহযোগিতায় বাড়িতে ছোট বোন মিতুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন দৌলতুননেছা। মিতুকে তিনি জানান, কয়েক দিনের মধ্যেই দেশের বাইরে চলে যাবেন তিনি। মিতু জানতে চায়, আপা তুমি কোথায় আছো? এই উত্তর দেয়ার আগেই ফোন কেড়ে নেয় রীনা।
এদিকে হন্যে হয়ে মেয়েকে খুঁজছিলেন দৌলতুননেছার মা-বাবা। তার মা গুলশান আরা জানান, এই ঘটনার পর থেকে ওই ফোনটি বন্ধ পান। কয়েকদিন আগে ওই নম্বরে কল করে জানতে পারেন ওই এলাকার নাম কামারপাড়া। তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকায় এসে কামারপাড়া এলাকার বিভিন্ন বাসায় মেয়ের খোঁজ করছিলেন তিনি। ভাড়া বাসার অজুহাতে খোঁজ করতে গিয়ে গত সোমবার বিকালে কামারপাড়ার ছয় নম্বর সড়কের চতুর্থ তলার একটি  বাসায় তার মেয়ের সন্ধান পান তিনি। ওই সময়ে ওই বাসায় অভিযান চালাচ্ছিল র‌্যাব-২। র‌্যাবের সহযোগিতায় দৌলতুননেছাসহ নয় নারীকে উদ্ধার করা হয়। অন্য নারীরা অভিযান চলাকালে বাসা থেকে নিজের মতো করে চলে যায় বলে দৌলতুননেছা জানিয়েছেন। দৌলতুননেছার বাড়ি বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার বড় নিলাহালী।
এ বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, দীর্ঘদিন থেকে উত্তরায় ১০ নম্বর সেক্টরে অফিস নিয়ে নারী পাচার করছিল এই চক্র। সংবাদ পেয়ে অভিযান চালিয়ে নয় জনকে উদ্ধার করা হয়। সেই সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে ১৯৫টি পাসপোর্ট, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ও নগদ ২লাখ ৫০ হাজার ১২৭ টাকা উদ্ধার করা হয়। মুফতি মাহমুদ খান জানান, বিভিন্ন সূত্রমতে এ পর্যন্ত এই চক্র বিভিন্ন দেশে চার শতাধিক নারীকে পাচার করেছে। এই চক্রটি সরলমনা মেয়েদের মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্নপ্রান্ত থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে। আল-আতিক বিডি লিমিটেড নামের এই প্রতিষ্ঠানটির বৈধ কোন কাগজপত্র নেই। রিক্রুটিং এজেন্সির কোন লাইসেন্স নেই। মূলত প্রতারণা করে নারীদের বিক্রির উদ্দেশ্যে বিদেশে পাচার করা হয়। দেশব্যাপী তাদের দালাল চক্র রয়েছে। দালালদের মধ্যে বগুড়ায় কামরুল, চট্টগ্রামে এনামুল, ঢাকায় আবুল হোসেন, খুলনায় নুরুল ইসলামসহ আরও অনেকের পরিচয় জানতে পেরেছে র‌্যাব। দেশে এই চক্রের মূলহোতা শাহিন খন্দকার। চক্রের সবাইকে গ্রেপ্তারের জন্য র‌্যাব অভিযান অব্যাহত রেখেছে বলে জানান কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান।
র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতদের কথা বলে জানা গেছে, এই চক্রের হোতাদের মধ্যে শাহীন খন্দকার একজন। তবে মূল হোতা সৌদি আরবের বাসিন্দা ফাহাদ নামক ব্যক্তি। তার সহযোগিতায় দেশ থেকে মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারী পাচার করতো শাহীন খন্দকার। গ্রেপ্তারকৃত সীমা আক্তার মৌসুমী জানায়, আল-আতিক বিডি লিমিটেড নামক এই প্রতিষ্ঠানে চার মাসে আগে যোগ দেয় সে। মৌসুমী এবং শিল্পী আক্তার দুজনেই ওই অফিসের অভ্যর্থনাকারী হিসেবে কাজ করতো। শাহীনের নির্দেশ মতো ফোনে তারা শেখানো কথার বাইরে কোন তথ্য দিতেন না কাউকে। মৌসুমী জানান, বান্ধবী সানজিদার এক বন্ধুর মাধ্যমে শাহীনের সঙ্গে পরিচয়। পরে শাহীন তাকে এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেন। মৌসুমীর বাড়ি হযরত শাহজালাল (র) বিমানবন্দর এলাকার হাজী ক্যাম্পে। তার পিতার নাম আনিসুর রহমান। শিল্পী আক্তারের বাড়ি চাঁদপুর জেলা সদরের রামদাশদি। একই এলাকায় বাড়ি ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার গ্রেপ্তারকৃত আবদুল লতিফের। অফিস সহকারী গ্রেপ্তারকৃত শহিদুলের বাড়ি নওগাঁ জেলার মহাদবেপুরের রনাইলে।

অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাক হর্সের মতো দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরুন by পীর হাবিবুর রহমান

উন্নয়নের চাকা ঘুরালেও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারছে না সরকার। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের যে স্বীকৃতি দিয়েছে তা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু শতাধিক দেশ রয়ে গেছে, স্বল্প-উন্নত দেশের কাতারে থেকে ৫০-৬০ বছর ধরে হামাগুড়ি দিচ্ছে। বাংলাদেশকে তাই এই অর্জন ধরে রেখে সুশাসন নিশ্চিত করে শিক্ষা স্বাস্থ্য অবকাঠামোর উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখে শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে মধ্যম আয়ের সিঁড়ি টপকে দেশকে আরো উঁচুতে নিয়ে যেতে হবে। অনেকের মতে, শেখ হাসিনার সরকার ব্যাপক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাক হর্সের মতো ছুটলেও দুর্নীতির ঢেউ তৃণমূল পর্যন্ত আছড়ে পড়েছে। কমিশন, ঘুষ ও তদবিরের স্বর্ণযুগ চলছে। চাটুকারদের তেলবাজিতে স্বার্থ হাসিল, মধ্য স্বত্বভোগী দালাল, তদবির বাজিতে কমিশন খেয়ে বিত্তবৈভবের মালিক হচ্ছে। আমলা পাড়া থেকে রাজনৈতিক পাড়া, মন্ত্রী পাড়া থেকে এমপি পাড়া, পেশাদার টাউটদের সঙ্গে রাজনৈতিক পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মহিলাকর্মীরাও আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। আমলা, প্রকৌশলী থেকে ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতাদের অন্দরে তাদের যাতায়াত। ফাইল পাস, ফাইল     ছুটানো থেকে শুরু করে এমন কোনো তদবির নেই যেখানে তারা সফল হচ্ছেন না। অতি সাধারণ বেশভূষায় যারা গণপরিবহনে চলাফেরা করতেন তাদের এখন হাসের সোনার ডিম পাড়ার মতো জীবন। রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়ায় সিন্ডিকেট ঘরে ঘরে। নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার বাজি থেকে সর্বত্র হাত ডুবিয়ে টাকার খনি পাচ্ছেন। চেহারা বদলে যাচ্ছে, বেশভূষা বদলেছে, ফ্যাশনে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের পোশাক, ঘড়ি, গহনাই গায়ে শোভা পাচ্ছে না, দামি গাড়ি হাঁকিয়ে পথ চলছেন। দেশে বিত্তবৈভব গড়ে, দেশের বাইরেও সম্পদ গড়ছেন। উন্নয়নের পাশাপাশি হরিলুট চলছে। সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের মতো সৎ, সাহসী মানুষ যখন বলেন, ‘আমাদের লোকদের জন্য ব্যাংক ডাকাতদের জেলে নিতে পারিনি’, তখন শেয়ার কেলেঙ্কারি থেকে ব্যাংকিং খাতের লুটপাট ও সারাদেশের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ থেকে দুর্নীতিবাজদের লুটের মহাৎসবের চিত্র ফুটে ওঠে।
সীমান্ত জেলা শহর সুনামগঞ্জের তিনটি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির চিত্র মহান সংসদে বারবার উঠে এলেও এটির তদন্ত যেমন হয়নি, তেমনি দুর্নীতির বরপুত্রদের হাতে আইনের কড়া পরানো যায়নি। এভাবে সারাদেশে উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতির মহাৎসব চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, পাওয়ার গ্রিড সুনামগঞ্জ শহরের প্রবেশের মুখে বিদ্যুতের সাবস্টেশন বসানোর জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে জেলা প্রশাসনের সাবেক এক কর্মকর্তার সঙ্গে হাফ প্যান্ট পরা বয়সী এক যুবলীগ নেতা মাত্র ৬০ লাখ টাকার জমি কিনেছেন পাঁচ কোটি ছিয়ানব্বই লাখ টাকায়।
লন্ডন প্রবাসী এক ব্যক্তিকে ৬০ লাখ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বাকিটা ভাগাভাগি করে পকেটে তুলেছেন। এই নিয়ে বারবার সংসদে অভিযোগ তুললেও তার তদন্ত হয়নি। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল রক্ষণাবেক্ষণে পাঁচ কোটি টাকার দুইভাগ কাজ করে তিনভাগই ঢাকায় বসে স্থানীয় প্রকৌশলীদের সহায়তায় লুটে নিয়েছেন ঠিকাদাররা। এ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। তবুও তদন্ত নেই, ব্যবস্থা নেই। সুনামগঞ্জ সুরমা নদীতে ধোপাজান বালুপাথর মহালে নৌ শ্রমিকদের ওপর চাঁদাবাজি-জুলুম চিরস্থায়ী রূপ নিয়েছে। এখানেও সরকারি দলের একটি চক্র মুনাফা লুটছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায়। না হচ্ছে তদন্ত, না নেয়া হচ্ছে ব্যবস্থা। অথচ সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ যেতে শেখ হাসিনার সরকার এগারোটি নতুন ব্রিজ নির্মাণ করেছে। সুনামগঞ্জবাসীর বহুল প্রত্যাশা সুরমা সেতু নির্মাণ হয়েছে। এভাবে সারাদেশে অবকাঠামোর উন্নয়নসহ শিক্ষা স্বাস্থ্য বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে। পাশাপাশি এসব জায়গায় দগদগে ঘায়ের মতো স্থানীয় মানুষদের গা জ্বলছে দুর্নীতি চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্যের রমরমা ব্যবসায়। সারাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো নিয়োগ নিয়ে সেই নিয়োগ-বাণিজ্য এখনো চলমান।
ঢাকা জেলা পরিষদ প্রশাসকের বিরুদ্ধে ভুতুড়ে প্রকল্পের নামে কাজ না করিয়ে বরাদ্দের টাকা লুটপাট নিয়ে গণমাধ্যম সরগরম। ব্যবস্থা নেয়ার যেন কেউ নেই। শুধু মন্ত্রী এমপি প্রশাসন নয় জেলা পরিষদের রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকরাও অনেক জায়গায় বিতর্কের মুখে।
বিএনপি শাসনামলে আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক ডক্টর মাহাথির মোহাম্মদ ঢাকায় এসেছিলেন। তখন তিনি তার দেশের ক্ষমতায়। আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠককালে মাহাথির মুজিব কন্যাকে বলেছিলেন, আপনার প্রথম পাঁচ বছর আমার পাঁচ বছরের চেয়ে উত্তম। কিন্তু আমরা সফল হয়েছি, কারণ নীতির পরিবর্তন যেমন ঘটাইনি তেমন দুর্নীতির লাগাম শক্ত হাতে টেনে ধরেছিলাম।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এতটাই পরিশ্রমী যে, ১৯৯৬ সালে তার সরকারের যোগাযোগমন্ত্রীর অভিজ্ঞতা নিয়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছিলেন, ‘এই প্রধানমন্ত্রী কাজের জন্য অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাক হর্সের মতো ছোটেন। যেখানে আর কেউ তার সঙ্গে পা মেলাতে পারেন না।’ তিনি আরো বলেছিলেন, তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষিপ্রতা দেখে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু মুজিবকন্যাকে ইলেক্টেড সিএম বলতেন। এখনো তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে ইবাদত বন্দেগি শেষে চায়ের কাপের সঙ্গে দৈনিক পত্রিকাগুলোর খবর পাঠ করে শেখ হাসিনা দিন শুরু করেন। তিনি ফাইলওয়ার্ক করেন, সই করেন এমনকি যে কোনো মিটিংয়ে যাওয়ার আগে হোমওয়ার্ক করে যান।
কোনো কোনো মন্ত্রী পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেন। তিনি সামাল দেন। গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করা শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদেরও নিয়মিত সাক্ষাৎ দেন। পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, টাকার অবমূল্যায়ন না হওয়া, ডলারের স্থিতিশীলতা, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবার ইতিহাসের রেকর্ড গড়াতেই বাংলাদেশ নি¤œ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। এখন দরকার দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরে শুধু গার্মেন্টস শিল্পই নয় রফতানি সামনে রেখে অন্যান্য শিল্প খাতকে শক্তিশালী ও বিকশিত করা। অন্যদিকে, বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। ধনী ও গরিবের বৈষম্য কমিয়ে আনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ডক্টর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেছেন, তিনি কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালে একজন মন্ত্রী ও তার বউ এতই তদবির করতেন যে, সেহরির সময়ও ফোন করে বসতেন। তিনি খুব বিরক্ত হতেন। তার প্রস্তাব যে কোনো ব্যাংকঋণে কোনো মন্ত্রী বা প্রভাবশালী কারো সুপারিশ বা তদবির থাকলে ঋণদানের সময় সেই ব্যক্তির নামটিও লিপিবদ্ধ করে রাখা দরকার। শুধু তাই নয়, অনেকেই ইব্রাহিম খালেদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মনে করেন, যে কোনো প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রী এমপি বা রাজনৈতিক ক্ষমতাবানরা তদবির করলে তার নামটিও ফুটনোটে রাখা যেতে পারে। এতে তদবিরবাজরা নিরুৎসাহিত হবেন। উন্নয়নেই নয় দুর্নীতির লাগামটিও অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাক হর্সের মতো ধরতে হবে। না হয় সরকারের জন্য উন্নয়নের লড়াই পণ্ডশ্রমে পরিণত হতে পারে।

আইন ভাঙেন তাঁরাও

ট্রাফিক আইন ভেঙে গাড়ি চলাচল ঢাকার যানজটের বড় কারণ। সাধারণ মানুষ থেকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত ট্রাফিক আইন ভাঙছেন। আজ সোমবার এ রকম একটি চিত্র ধরা পড়ে প্রথম আলোর আলোকচিত্রী মনিরুল আলমের ক্যামেরায়। ছবিগুলো জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের সড়ক থেকে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তোলা।  ছবি: মনিরুল আলম
ছবি: মনিরুল আলম
তোপখানা রোডে পতাকাবাহী গাড়িটি ট্রাফিক আইন না মেনে সড়ক অতিক্রম করছে। এতে সাহায্য করছে পুলিশ। গাড়ি পার হওয়ার সময় উভয় পাশে গাড়ির জট লেগে যায়।
ছবি: মনিরুল আলম
পতাকাবাহী গাড়িটিকে পার হতে সাহায্য করছেন পুলিশের একজন সদস্য।
ছবি: মনিরুল আলম
পতাকাবাহী গাড়িটিকে পার করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনগুলোকে থামার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন কর্মরত পুলিশ সদস্য। 
ছবি: মনিরুল আলম
পতাকাবাহী গাড়িটি উল্টো দিক দিয়ে সড়ক অতিক্রম করার পরও আটকে থাকতে হলো সেই যানজটেই।
ছবি: মনিরুল আলম
পতাকাবাহী গাড়িটির নম্বর ছিল ঢাকা মেট্রো: ঘ ১০৯১৭০।
ছবি: মনিরুল আলম
পতাকাবাহী গাড়িটি টার্ন নিচ্ছে, পেছনে জট।

দিনে ২ জন ধর্ষণের শিকার: ৬ মাসে মামলা ১০,০০০ by নুরুজ্জামান লাবু

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বেড়েই চলছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। বাড়ছে খুন, ধর্ষণের ঘটনাও। দুর্বৃত্তদের পাশবিকতা থেকে বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও। গত কয়েক মাসে খোদ রাজধানীতেই একাধিক গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরতে মাইক্রোবাসে তুলে, বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে, এমনকি স্বামীকে অতিরিক্ত মদ্যপান করিয়ে মাতাল করে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরায় এক কিশোরীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে তিন সহযোগীসহ গণর্ধষণ করে কিশোরীর কর্মস্থলের এক সহকর্মী। আর শনিবার রাতে রাজধানীর রায়েরবাজার ও মিরপুরে পৃথক ঘটনায় দুই শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত ছয় মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় অন্তত ১০ হাজার মামলা হয়েছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজে মূল্যবোধের অভাব এত প্রকট হচ্ছে যে মানুষ তার মানবিকতাবোধ হারিয়ে ফেলছে। এ কারণে তরুণী ও মহিলার পাশাপাশি শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। অপরদিকে অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। অপরাধ করে পার পেয়ে গেলে অপরাধ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। ধর্ষণের অনেক ঘটনায় সামাজিক সম্মানের কারণে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘমেয়াদি বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। এই সুযোগে ধর্ষকরা শাস্তি থেকে বেঁচে যায়। এসব দেখে অন্যরা অপরাধ কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হয়। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের ভাষ্য, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার সম্পন্ন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমেই কেবল ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো অপরাধ রোধ করা সম্ভব।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য মতে, গত জুলাই মাসে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ৫৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এই হিসাবে গড়ে প্রতিদিন দুটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া জুন মাসে ৬৫টি, মে মাসে ৮২টি, এপ্রিল মাসে ৪৩টি, মার্চ মাসে ৪১টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৪৪ ও জানুয়ারি মাসে ৩৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে ধর্ষণের পৃথক কোন  পরিসংখ্যান নেই। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলি একসঙ্গে হিসাব করা হয়। সেই হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ১০ হাজার ৩২৪টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ধর্ষণের বলে জানা গেছে। এর মধ্যে খোদ রাজধানীতে ঘটে যাওয়া প্রায় সাত শতাধিক ঘটনার উল্লেখযোগ্য হলো ধর্ষণের ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ একটি সংস্থার হিসেবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে ১০৮ ধর্ষণের ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
সমাজ বিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় বেড়েই চলছে। নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই ধর্ষণের মতো ঘটনা বেশি ঘটছে। তারা বলছেন, শিশু বা নারী যেই ধর্ষণের শিকার হোক না কেন প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনাই স্পর্শকাতর। এজন্য ধর্ষণের ঘটনাগুলিকে বিশেষভাবে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আদালতে চার্জশিট ও বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা উচিত। একই সঙ্গে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির স্থাপন করতে পারলে ধর্ষণের ঘটনা কমে যাবে। এ ছাড়া সমাজ থেকে ধর্ষণের মতো অপরাধগুলি রোধ করা সম্ভব নয়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধর্ষণের ঘটনায় কমপক্ষে দুজন সাক্ষী কিংবা আদালতে গিয়ে নতুন করে ধর্ষণের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়ার ভয়ে অনেকেই আসামি পক্ষের সঙ্গে আপস করে ফেলেন। এ কারণে ধর্ষকেরা সহজেই পার পেয়ে যায়। এ ছাড়া সামাজিকতা বা সামাজিক সম্মান ধর্ষকদের শাস্তি পেতে বড় একটি বাধা। কারণ সামাজিক সম্মানের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার আদালত পর্যন্ত যেতে চায় না। ধর্ষণের শিকার যদি তরুণী বা কিশোরী হয় তাহলে তো বিষয়টি পরিবার থেকে গোপন করার চেষ্টা করা হয়। এর কারণ হলো ধর্ষিতা তরুণীকে সমাজে ভিন্ন চোখে দেখার প্রবণতা রয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, কোন অপরাধ ঘটলে যেরকম ফলাও করে সারা দেশে প্রচারিত হয় তেমনি ওই অপরাধের শাস্তিটাও ফলাও করে প্রচার করা উচিত। কারণ একটি অপরাধ দেখেই অন্যদের সুপ্ত অপরাধ মন জাগ্রত হয়ে অপরাধ করতে ঠেলে দেয়। তেমনি যদি তার সামনে অপরাধের শাস্তির বিষয়টি সামনে আসে তাহলে সে অপরাধ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারবে। এজন্য ধর্ষণ বা নারী নির্যাতের ঘটনাগুলিতে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। একই সঙ্গে অপরাধ করে পার পাওয়া যায় না সেই বার্তাটি সকলস্তরে পৌঁছানো উচিত। তাহলেই কেবল ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধ কমানো সম্ভব।
চলতি বছরের ২১শে মে রাজধানীর কুড়িল এলাকায় গারো তরুণীকে মাইক্রোবাসে তুলে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরতে গিয়ে গণধর্ষণের এই ঘটনাটি নিয়ে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এ ঘটনা তরুণী নিজেই বাদী হয়ে রাজধানীর ভাটারা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন। ঘটনার কয়েকদিনের মাথায় র‌্যাব দুই ধর্ষক লাভলু ও তুষার নামে দুই ধর্ষককে গ্রেপ্তার করে। মামলাটির তদন্তভার থানা পুলিশের কাছ থেকে র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ জানান, মামলাটির তদন্ত চলছে। খুব শিগগিরই আদালতে চার্জশিট জমা দেয়া হবে। সর্বশেষ উত্তরায় গণধর্ষণের ঘটনাটিতে চার ধর্ষকের মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূল জবানবন্দি দিয়েছে। প্রধান আসামি মেহেদী হাসান আরিফকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। হায়দার নামে অপর এক আসামি পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বিপ্লব কুমার শীল জানান, আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আর পলাতক হায়দারকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। হায়দারকে ধরতে পারলে যত দ্রুত সম্ভব মামলার চার্জশিট দিয়ে দেয়া হবে। এ ছাড়া জুলাই মাসে রাজধানীর লালবাগে বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে এক কিশোরী ও সূত্রাপুরে স্বামীকে অতিরিক্ত মদ্যপান করিয়ে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
২২শে জুন জামালপুর থেকে ঢাকার খিলক্ষেতে চাকরির দেয়ার নাম করে এক তরুণীকে হানিফ ও কামাল নামে দুই যুবক ধর্ষণ করে। একদিন আগে গত ২১শে জুন মিরপুরে এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার হন কলেজছাত্রী। ধর্ষকরা ওই কলেজছাত্রীর নগ্ন ভিডিও করে তার কাছে চাঁদাও দাবি করে। ২০শে জুন নোয়াখালীতে চলন্ত বাসে এক কিশোরী বধূকে গণধর্ষণ করা হয়। ১৮ই জুন দিনাজপুরের এক তরুণীকে গণধর্ষণ করা হয়। এর আগে গত ১২ই জুন রাজধানীর রামপুরা উলনে খালার বাসায় বেড়াতে এসে গণধর্ষণের শিকার হন এক নারী। দুর্বৃত্তরা ওই নারীর স্বামীকে বেঁধে রেখে তাকে ধর্ষণ করে। ১২ই জুন সিরাজগঞ্জের তাড়াসে আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ১১ই জুন নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় ৮ম শ্রেণীর এক ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হয়। ৮ই জুন নরসিংদীতে এক প্রতিবন্ধী তরুণীকে ৪ জন মিলে গণধর্ষণ করে। ৫ই জুন নওগাঁয় এক স্কুলশিক্ষিকা ও তার বড় বোনকে তাদের নিজ বাড়িতে স্বামী ও তার তিন বন্ধু মিলে ধর্ষণ করে। ২রা জুন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানিতে সদ্য এসএসসি পাস করা এক ছাত্রীকে তার প্রেমিক হৃদয় ও তার দুই বন্ধু মিলে ধর্ষণ করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব ঘটনার বেশির ভাগেরই আসামিরা পলাতক রয়েছে। পুলিশ আসামিদের ধরতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যেসব ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনা হয় সেসব ঘটনাই কেবল গুরুত্ব দিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যগুলোতে পুলিশ গা’ করে না। আসামিরাও কিছুদিন পালিয়ে থাকার পর ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে আপসরফা করে ফেলে।

৬৮ বছর পর মানচিত্রের অংশ

ছিটমহল বিনিময়ের আনন্দে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের
বাঁশকাটা ছিটমহলে লাঠিখেলার আয়োজন করা হয়
বাংলাদেশ এবং ভারতের মানচিত্রে দীর্ঘ ৬৮ বছর পর যাঁরা ছিলেন অস্তিত্বহীন, সেই ১৬২টি ছিটমহলের প্রায় ৫১ হাজার মানুষ এখন নিজ নিজ পছন্দের দেশের নাগরিক। যত দিন বেঁচে থাকবেন, এসব মানুষ তো বটেই, তাঁদের উত্তরাধিকারদের কাছে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাত হবে বিশেষ এক দিন। কাঁটাতারের কোনো বেড়া ছিল না, ছিল না সীমানা পিলার। অথচ এক দেশের মানুষ হয়েও তাঁদের বসবাস করতে হয়েছে অন্য দেশের ভূখণ্ডে। দেশহীন, নাগরিকত্বহীন ‘ছিটের মানুষ’দের জীবনযাপনের কষ্ট, যাতায়াত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কষ্ট, নিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতার আজ অবসান ঘটতে চলেছে।
ছিটমহলগুলোর ইতিহাস মোগল আমলের রাজন্যবর্গের খামখেয়ালিপনা অথবা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের নির্মম পরিণতির প্রতীক। ১৯৪৭-এ উপমহাদেশের বিভক্তির পর ব্রিটিশ আইনজীবী সেরিল র্যাডক্লিফকে সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই বছরের ৮ জুলাই ভারতে এসে ১৩ আগস্ট তিনি সীমানা নির্ধারণের যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন, তার অনুসরণে ১৬ আগস্ট প্রকাশ করা হয় ভারত ও পাকিস্তানের মানচিত্র। হুটহাট এ ধরনের সীমান্ত নির্ধারণে ছিটমহলের মানুষগুলোর ভাগ্য ঝুলে থাকে। তাঁরা রয়ে যান মানচিত্রের বাইরের মানুষ হিসেবে।
সীমান্তের এই জটিলতা অবসানের জন্য ১৯৫৮ সালে সই হয় নেহরু-নুন চুক্তি। ওই চুক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ীর উত্তর দিকের অর্ধেক অংশ ভারত এবং দক্ষিণ দিকের অর্ধেক অংশ ও এর সংলগ্ন এলাকা পাবে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ীর সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারতের অসহযোগিতায় তা মুখ থুবড়ে পড়ে। ফলে বেরুবাড়ীর দক্ষিণ দিকের অর্ধেক অংশ ও এর ছিটমহলের সুরাহা হয়নি।
১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি সই হয় বিষয়টি সুরাহার জন্য। বাংলাদেশ চুক্তিটি অনুসমর্থন করলেও ভারত তা না করায় চুক্তিটি বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর দুই দেশ ছিটমহলের আলাদাভাবে তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে। কিন্তু দুই পক্ষের তালিকায় দেখা দেয় গরমিল। পরে ১৯৯৭ সালের ৯ এপ্রিল চূড়ান্ত হয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ও ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে। কিন্তু ওই চুক্তিও আলোর মুখ দেখেনি।
চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং স্থলসীমান্ত চুক্তির প্রটোকলে সই করেন। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ভারতের সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক জোট সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের সংবিধান সংশোধনী বিল পাসে ব্যর্থ হয়। এবার নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত মে মাসে সর্বসম্মতভাবে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় ভারতের সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হয়। অবসান ঘটে দীর্ঘ ৪১ বছরের অপেক্ষার।
এখানে বলে রাখা ভালো, ১৯৫৮ সালে সই হওয়া নেহরু-নুন চুক্তিতে ছিটমহল বিনিময়ের উল্লেখ থাকলেও এ ব্যাপারে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সে দেশের সংবিধানের ১৪৩ ধারা সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চান। তখন আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে হবে। পরে ভারতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধনী আর জনগণনার অজুহাতে বিলম্বিত হয়েছে ছিটমহল বিনিময়।
ছিটমহল বিনিময়ের পাশাপাশি ’৭৪-এর সীমান্ত চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে অপদখলীয় জমি বিনিময় ও সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমানা চিহ্নিত করার কথা রয়েছে। আর ২০১১ সালে সই হওয়া প্রটোকল অনুযায়ী ছিটমহল বিনিময়ের পাশাপাশি অপদখলীয় জমি ও সীমানা চিহ্নিত করার কাজ এগিয়ে চলেছে। ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে এ বিষয় দুটির চূড়ান্ত সমাধান হবে। অর্থাৎ অপদখলীয় জমি বিনিময় ও অচিহ্নিত সীমানা চিহ্নিত করে স্থলসীমান্ত চূড়ান্ত হবে। এর মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পাবে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশীর মানচিত্রের।
পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ছিটমহল বিনিময়ের ফলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নতুন করে ১০ হাজার একরের বেশি ভূমি যুক্ত হবে। আবার অপদখলীয় জমি বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ২ হাজার ৭৭৭ একর জমি ভারতকে এবং ভারত ২ হাজার ২৬৭ একর জমি বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দেবে। এ ক্ষেত্রে ভারত অতিরিক্ত ৫১০ একর জমি পাবে।
চূড়ান্তভাবে কোন দেশের কত ভূমি নতুন করে যুক্ত হলো, সে ব্যাপারে দুই দেশ প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে।
গত শুক্রবার বাংলাদেশে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহলের (আয়তন ১৭ হাজার ১৫৮ একর) বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সঙ্গে এবং ভারতে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (আয়তন ৭ হাজার ১১০ একর) ভারতের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, ১৬২ ছিটমহলে ৫১ হাজার ৫৪৯ অধিবাসীকে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ৩৭ হাজার ৩৩৪ জন ভারতীয় বাংলাদেশে অবস্থিত ছিটমহলগুলোতে বাস করে এবং ১৪ হাজার ২১৫ জন বাংলাদেশি ভারতের ছিটমহলগুলোতে বাস করে।
এসব লোকজনের মধ্যে বাংলাদেশে থাকা ভারতের ছিটমহলের ৯৭৯ জন ভারতে ফিরে যেতে চান। তবে তাঁদের রাতারাতি ভিটে ছাড়তে হবে না। সীমান্ত চুক্তি প্রটোকল অনুযায়ী যাঁরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ফিরতে চান, এ বছরের নভেম্বরের মধ্যে তাঁদের চলে যেতে হবে। ওই সময়ের আগ পর্যন্ত তাঁদের স্থানীয় প্রশাসন থেকে নিরাপত্তা ও সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশের ছিটমহলের অন্য লোকজন যে যেখানে আছেন, সেখানেই থেকে যাবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের যেসব ছিটমহল এখন বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে যুক্ত হচ্ছে, সেগুলোর বেশির ভাগের অবস্থান দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। এসব ছিটমহলের ৫৯টি লালমনিরহাটে, পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি ও নীলফামারীতে চারটি। অন্যদিকে ভারতে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহলগুলোর ৪৭টি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে এবং চারটি জলপাইগুড়ি জেলায়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, দুই দেশের জন্য ৩১ জুলাই একটি ঐতিহাসিক দিন। এখন থেকে সীমান্তের দুই পাড়ের ওই লোকজন যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকত্ব ভোগ করবেন। দুই দেশের সরকার এসব লোকজনের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ অন্যান্য মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।
ছিটমহলবাসীর নাগরিক সুবিধা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ছিটমহল বিনিময়ের পর সেখানকার লোকজনকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। তাঁদের কথা বিবেচনায় রেখে সরকার এবার বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রেখেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখান থেকে তাঁদের জন্য অর্থ খরচ করা হবে। এ কাজটি করার জন্য জেলা প্রশাসকদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই ‘নতুন নাগরিক’দের দোরগোড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা কীভাবে এবং কবে নাগাদ পৌঁছানো হবে, সেই পরিকল্পনার বিষয়ে জেলা প্রশাসন সূত্রে বিস্তারিত জানা যায়নি।
ছিটমহল বিনিময়ের পর কোনো পরিবারের বাংলাদেশে থেকে যাওয়া সদস্য যদি ভারতে বা ভারতে থেকে যাওয়া সদস্য বাংলাদেশে জরুরি প্রয়োজনে তাঁর স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে চান, সে ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ পাস দেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে শহীদুল হক আরও বলেন, এমন কোনো পাস দেওয়া হবে না। স্বাভাবিক নিয়মে ভিসা নিয়ে দেখা করতে হবে।

ক্যানসার মৃত্যুর পরোয়ানা নয় -ক্যানসারে আক্রান্ত মনীষা কৈরালা

মনীষা কৈরালা
অনলাইন ডেস্ক | ০৪ আগস্ট, ২০১৫ঃ 
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বই লিখবেন মনীষা কৈরালা। সবাইকে বলবেন, ক্যানসার মৃত্যুর পরোয়ানা নয়। সম্প্রতি এমনটিই জানিয়েছেন ক্যানসার থেকে সেরে ওঠা বলিউডের এ অভিনেত্রী। বই লেখার পাশাপাশি চলচ্চিত্র তৈরির আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে ঘর করার স্বপ্নের কথাও জানিয়েছেন ৪৫ বছর বয়সী মনীষা। জীবনের কঠিনতম সময়ই পার করছেন নেপালি বংশোদ্ভূত বলিউডের অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা। ২০১২ সালের নভেম্বরে তাঁর ডিম্বাশয়ে ক্যানসার ধরা পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি উন্নত চিকিৎসা শেষে পরের বছরের মে মাসে তাঁকে ‘ক্যানসারমুক্ত’ ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। এরপর দুই বছর পেরিয়ে গেছে। তৃতীয় বছরটা ‘ক্যানসারমুক্ত’ অবস্থায় পার করতে পারলে ক্যানসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চূড়ান্ত জয় পাবেন। এগিয়ে যেতে পারবেন সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের পথে। সম্প্রতি এক খবরে এমনটিই জানিয়েছে মুম্বাই মিরর। পাঁচ বেডরুমের বিলাসবহুল পেন্টহাউস অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন মনীষা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, স্বামী ও সন্তান নিয়ে থাকবেন— এমন ভাবনা থেকেই অ্যাপার্টমেন্টটি কিনেছেন।
মনীষা বলেন, ‘যেদিন আমি জানতে পারব, আমি পুরোপুরি সুস্থ সেদিন আমি দুটি শিশু দত্তক নেব। একটি মেয়ে ও একটি ছেলে। জীবন নিয়ে আমার কিছু প্রত্যাশা আছে। আমি ঠিক নিশ্চিত নই, সেগুলো পূরণ হবে কি না। পূরণ হলে আমি হয়তো বিয়ে করব। তবে আপাতত দত্তক নেওয়া সন্তান নিয়েই পরিবার গড়ার স্বপ্ন দেখছি। আশা করছি, আগামী বছর তা সম্ভব হবে।’
ফেসবুকে নেপালি ব্যবসায়ী সম্রাট দাহালের সঙ্গে পরিচয়ের পর ২০১০ সালে তাঁকে বিয়ে করেন নেপালের সম্ভ্রান্ত কৈরালা পরিবারের মেয়ে মনীষা। বিয়ের পর ফিনল্যান্ডে মধুচন্দ্রিমায় যান। কিন্তু খুব বেশিদিন ঘর করা হয়নি মনীষার। মাত্র দুই বছরের মাথায় সম্রাটের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
ক্যানসারে আক্রান্ত মনীষা কৈরালা
আপডেট তারিখ: ২৯-১১-২০১২
প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য সম্প্রতি মুম্বাইয়ের পেডার রোডে অবস্থিত জাসলক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল নেপালি বংশোদ্ভূত বলিউডি অভিনেত্রী মনীষা কৈরালাকে। স্বাস্থ্যপরীক্ষায় ক্যানসার ধরা পড়েছে তাঁর। সম্প্রতি এক খবরে জিনিউজ ব্যুরো জানিয়েছে, জাসলক হাসপাতালেই তাঁর চিকিত্সা চলবে।
জাসলক হাসপাতালের মুখপাত্র কৃষ্ণকান্ত দেশম বলেছেন, ‘২৮ নভেম্বর বুধবার আমাদের হাসাপাতালে ভর্তি হয়েছেন মনীষা কৈরালা।’
মনীষার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নভেম্বর মাসের শুরু থেকে কাঠমান্ডুতে অবস্থান করছিলেন এ অভিনেত্রী। সেখানে তিনি নিজের নতুন বাড়ি তৈরির কাজ করছিলেন। কদিন আগে হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়েন মনীষা। সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার একটি ওবেসাইটে তিনি জানান, খাদ্যে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি।
এই ঘটনার পর হঠাত্ অচেতন হয়ে পড়লে মনীষাকে নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। দ্রুত তাঁকে মুম্বাই নিয়ে যান তাঁর মা সুষমা কৈরালা। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য তাঁকে ভর্তি করা হয় জাসলক হাসপাতালে। স্বাস্থ্যপরীক্ষার পর তাঁর ক্যানসার হয়েছে বলে জানান চিকিত্সকেরা।
মনীষার কাছের এক বন্ধু জানিয়েছেন, অসুস্থতার খবর পেয়ে মোটেও ভেঙে পড়েননি মনীষা। অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ক্যানসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এই যুদ্ধে জয়ের ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী।
নেপালের সম্ভ্রান্ত কৈরালা পরিবারে মনীষার জন্ম ১৯৭০ সালে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাঁর দাদা বিশ্বেশ্বর প্রসাদ কৈরালা। মনীষার দুই চাচা গিরিজা প্রসাদ কৈরালা ও মাতৃকা প্রসাদ কৈরালাও নেপালের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মনীষার বাবা প্রকাশ কৈরালা সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
মনীষা হিন্দি ছবির পাশাপাশি তামিল, তেলেগু, মালয়ালম, বাংলা ও নেপালি ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর অভিনীত প্রথম বলিউডি ছবি ‘সওদাগর’ মুক্তি পায় ১৯৯১ সালে। পরবর্তী সময়ে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’, ‘বোম্বে’, ‘একেলে হাম একেলে তুম’, ‘খামোশি’, ‘গুপ্ত’, ‘দিল সে’, ‘মন’, ‘লজ্জা’, ‘আনোয়ার’সহ বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন।
মাঝে কিছুদিন অনিয়মিত থাকার পর রাম গোপাল ভার্মার ‘ভূত রিটার্নস’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে সফল প্রত্যাবর্তন ঘটে মনীষার। ১২ অক্টোবর ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর তিনি বলিউডে নিয়মিত হওয়ার পরিকল্পনা করেন। বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাবও পান।
বেশ আটঘাট বেঁধেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মনীষা। শরীরের বাড়তি ওজন কমানোর জন্য নিয়ম করে জিমে গিয়ে ঘাম ঝরানোও শুরু করেছিলেন। সুস্থ হয়ে তিনি আবার চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
ঘরে ফিরলেন মনীষা. আপডেট তারিখ: ৩০-০৬-২০১৩ দিন কয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্রে বসে মনীষা কৈরালা তাঁর ফেসবুক পাতায় লিখেছিলেন, ‘মুম্বাইয়ের চমত্কার বৃষ্টি দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। বাসার টেরাসে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছি অধীর আগ্রহে।’ অবশেষে মুম্বাইয়ের ভারসোভায় নিজের ঘরে ফিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন ৪২ বছর বয়সী এ তারকা অভিনেত্রী। মুম্বাইয়ে নিজ বাড়িতে বরষা মৌসুমের ধারাস্নানে এবার নির্ভার হবেন মনীষা। মনীষার ফিরে আসার খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন তাঁর ব্যবস্থাপক সুব্রত ঘোষ। এ প্রসঙ্গে সুব্রত বলেন, ‘মুম্বাইয়ে নিজের বাসায় ফিরেছেন মনীষা। তিনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।’ সুব্রত আরও বলেন, ‘আগামী আগস্টে তাঁকে আরেকবার যুক্তরাষ্ট্র যেতে হবে। সেখান থেকে ফেরার পর মুম্বাইতেই তাঁর নিয়মিত স্বাস্থ্য-পরীক্ষা করা হবে।’ এক খবরে জানিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ডটকম। ‘আমার জীবনের বাকি অংশটাকে আমি জীবনের সেরা সময় বানাব। আমি এখন বাসায়। সবাইকে অনেক অনেক ভালোবাসা।’ ক্যানসারকে পরাস্ত করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাত মাস পর সম্প্রতি মুম্বাই ফিরে ব্ল্যাকবেরি মেসেঞ্জারে এমন বার্তাই লিখেছেন বলিউডের অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা। ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে উন্নত চিকিত্সা নিতে গত বছরের ডিসেম্বরে নিউইয়র্ক গিয়েছিলেন মনীষা। দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সা শেষে গত মে মাসে মনীষাকে ‘ক্যানসারমুক্ত’ ঘোষণা করেন চিকিত্সকেরা। দিন কয়েক আগে মনীষা তাঁর ফেসবুক পাতায় লিখেছিলেন, মুম্বাইয়ের চমত্কার বৃষ্টি দেখার আকাঙ্ক্ষার কথা। যত দ্রুত সম্ভব কাজে ফিরতে ব্যাকুল হয়ে আছেন মনীষা। এরই মধ্যে মালয়ালম একটি ছবির অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য শিডিউল দিয়েছেন নেপালের সম্ভ্রান্ত কৈরালা পরিবারের মেয়ে মনীষা। তিনি আগামী নভেম্বরে লেনিন রাজেন্দ্র পরিচালিত ‘ইডাভাপতি: নো ম্যান’স ল্যান্ড’ ছবিটির শুটিংয়ে অংশ নেবেন।

নাগা চুক্তির শর্ত নিয়ে ধোঁয়াশা

ভারত সরকারের সঙ্গে গতকাল সোমবার ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছে নাগা বিদ্রোহীদের। এর মাধ্যমে ছয় দশকের রক্তপাতের অবসান ঘটতে পারে বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে চুক্তিটি হয়েছে একটি বিদ্রোহীদের একটি পক্ষের সঙ্গে, আবার চুক্তির শর্তগুলোও স্পষ্ট করা হয়নি। এতে চুক্তিটি কতটা বাস্তবে রূপ নিতে পারবে, তা নিয়ে আজ মঙ্গলবার টাইমস অব ইন্ডিয়ার অনলাইন সংস্করণে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। স্বাধীন ভূখণ্ডের দাবিতে দীর্ঘ সময় ধরে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্যের নাগারা। কখনো প্রকাশ্যে, কখনোবা লোক চোখের আড়ালে এই রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছিল। প্রাণহানি ঘটেছে বহু মানুষের। এই রক্তক্ষয়ী অবস্থা থেকে পরিত্রাণে লড়াইরত নাগাদের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে ১৯৯৭ সাল থেকে জোরেশোরে কাজ শুরু হয়। এর সুফল মিলেছে গতকাল। সরকার ও নাগা বিদ্রোহীরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছে।
ভারত সরকারের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ডের ইসাক-মুইভাহ গ্রুপের (এনএসসিএন-আইএম) শান্তি চুক্তি হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবন রেস কোর্স রোডের ৭ নম্বর বাড়িতে তাঁর ও এনএসসিএনের (আইএম) প্রধান থুইংগালাং মুইভার উপস্থিতিতে শান্তি চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদি এই ঘটনাকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে মন্তব্য করে বলেন, ‘নাগাল্যান্ডের রাজনৈতিক এই ইস্যুটি ছয় দশক ধরে ঝুলে ছিল। এ সময় আমাদের কয়েক প্রজন্মকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।’ এর সঙ্গে তিনি যোগ করেন, ‘নাগা সমস্যা সমাধানে দীর্ঘ সময় লাগল। কারণ আমরা পরস্পরকে বুঝতে পারিনি।’ আর বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মুইভা প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রশংসা করে বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদির অধীনে আমরা পরস্পরকে বুঝতে পেরেছি এবং এবং দুই পক্ষের মধ্যে নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।’
শান্তি চুক্তি নিয়ে যে পরিমাণ উচ্ছ্বসিত কথাবার্তা হচ্ছে, শান্তি চুক্তির শর্ত নিয়ে তেমন কোনো কথা হচ্ছে না। শর্তগুলো এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তাই শর্ত নিয়ে অস্পষ্টতা থেকেই যাচ্ছে। তবে চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টেকসই সমাধানের লক্ষ্য নিয়েই চুক্তিটি হয়েছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে এই সমঝোতা প্রক্রিয়ার প্রতি মনোযোগ রাখছিলেন। চুক্তিটির ফলে সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উন্নয়ন কাজ শুরুর আশা করছে। নাগাদের সশস্ত্র লড়াইয়ে ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়কটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যা উন্নয়নকে আটকে দিয়েছে।
শান্তির পথে অন্যতম বড় বাধা হতে পারে একটি বিষয়। সেটি হলো, নাগা বিদ্রোহীরা মণিপুর রাজ্যের নাগা-ভাষাভাষীদের এই চুক্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। তবে সরকার বিষয়টির সঙ্গে একমত হয়নি বলে সূত্রগুলো বলছে। চুক্তির শর্তগুলো স্পষ্ট করা না হলেও দুই পক্ষ একসঙ্গে বসে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে তা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া এই চুক্তির সঙ্গে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ডের (এনএসসিএন-খাপলং) অংশটিকে যুক্ত করা হয়নি। এই অংশের প্রধান এস এস খাপলং একজন বার্মিজ নাগা। তিনি ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যেতে চান না। ভারত সরকারকে পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে ২০১২ ও ২০১৫ সালের মার্চে এনএসসিএন (খাপলং) মিয়ানমারের সঙ্গে অস্ত্রবিরতিতে স্বাক্ষর করে। এনএসসিএন (খাপলং) পরেশ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের (উলফা) সঙ্গেও মিলেমিশে কাজ করে। এ ছাড়া গত কয়েক মাস ধরে এনএসসিএন (খাপলং) ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ক্রমাগত হামলা চালিয়েছে। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক সদস্য নিহত হয়েছে। দুর্নীতি, অর্থ লুটপাট, অপহরণ সাম্প্রতিক সময়ে নাগাল্যান্ড ও মণিপুরে সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চুক্তির সাফল্য নিয়ে সংশয় দেখা দিতেই পারে।
তবে চুক্তিটির ফলে নাগাল্যান্ডের তরুণ প্রজন্ম ভারতের মূলধারার সঙ্গে মিলে যাওয়ার সুযোগ পাবে। এনএসসিএন-আইএমের মুইভাহর ব্যক্তিগত অর্জনও কম হবে না। বিদ্রোহীর বদলে শান্তি স্থাপনকারী হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই করে নেওয়ার সুযোগ তিনি পাচ্ছেন। চুক্তিটি ভারত-মিয়ানমার সম্পর্কের জন্য লাভজনক হবে। কারণ, এত দিন নাগা বিদ্রোহীরা চীনের কারখানা থেকে মিয়ানমার-চীন সীমান্ত ব্যবহার করে অস্ত্র এনে ভারতের বেসামরিক-সামরিক নাগরিকদের হত্যা করেছে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আর তর্ক-বিতর্ক চাই না: আশরাফ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ। আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বাংলাদেশে কোনো তর্ক-বিতর্ক দেখতে চান না জনপ্রশাসন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, যাঁর যে যোগ্য আসন, সে আসনই তিনি পাক।’
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় সৈয়দ আশরাফ এসব কথা বলেন।
এদিকে অনুষ্ঠানে সামনের দিকে বসাকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ধস্তাধস্তি ও চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ওনার জন্মদিন ১৫ আগস্ট না। তারপরেও তিনি ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন করেন, কেক কাটেন। আমি কয়েক দিন আগে বলেছি, আমরা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পার করেছি। আমরা চাই সবাই মিলে সর্বজনীনভাবে জাতির পিতার মৃত্যুদিবস পালন করি। দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আমাদের। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা কায়েম করতে হবে আমাদের। এই বিভাজন আমরা চাই না।’
সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে প্রস্তাব করেছিলাম। আপনি দয়া করে ১৫ আগস্ট আপনার জন্মদিন পালন না করে ১৬ তারিখে করেন বা ১৭ তারিখে করেন। কিন্তু আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে এই ১৫ তারিখ বেছে নিয়েছেন, আপনার জন্মদিন হিসেবে। এইভাবে কোনো দিন দেশ গড়া চলতে পারে না। এবারও আমি ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে ১৫ আগস্ট সর্বজনীনভাবে পালনের জন্য আহ্বান জানিয়েছি। কারণ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এই বাংলাদেশে আমরা কোনো তর্ক-বিতর্ক দেখতে চাই না। আমরা চাই, যে যাঁর যোগ্য আসন, সেই আসনই তারা পাক। বঙ্গবন্ধুর একমাত্র প্রাপ্য এই বাংলাদেশ।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমি সাঈদ খোকনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এর আগে ঢাকা সিটি করপোরেশনের কেউ কী জাতীয় শোক দিবস পালন করেছে। সে বলে যে না। এবার প্রথম। আমি মেয়রকে ধন্যবাদ জানাই। একটি নতুন সূচনা করার জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ধন্যবাদ। আমি আশা করব, সারা বাংলাদেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন, মিউনিসিপ্যালটি এবং সব নির্বাচিত সংস্থা জাতির পিতার জন্মদিন ও মৃত্যুদিনের তারা যেন অনুষ্ঠান করেন। আমি আশা করব, আমাদের এই আহ্বানের পর বাংলাদেশের সব নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবেন। ভবিষ্যতে জন্মদিনে উৎসব করার জন্য, শোক দিবসে শোক পালন করবেন।
একই আলোচনা সভায় শিল্পমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, প্রথমে মনে করা হয়েছিল-বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড হচ্ছে পারিবারিক হত্যাকাণ্ড। কিন্তু তাঁকে হত্যার কয়েক দিন পরে যখন জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হলো তখন স্পষ্ট হয়েছে-বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে হত্যা করা হয়েছে।
আমু বলেন, সবাই মনে করে খন্দকার মোশতাক হচ্ছে মীরজাফর। হ্যাঁ, মোশতাক মীরজাফর। আর রবার্ট ক্লাইভ ছিল জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান আড়ালে থেকে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তাই দুই মাস যেতে না যেতেই তিনি ক্ষমতা দখল করে বসে স্বরূপে ফিরে আসেন। তিনি বলেন, ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে না হারালে বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যই উন্নত দেশে পরিণত হতো। ২০৪১ সাল লাগত না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, আবদুর রাজ্জাক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, কামরুল ইসলাম, আবদুস সোবহান গোলাপ, সাংসদ মন্নুজান সুফিয়ান, শেখ ফজলে নূর তাপস প্রমুখ। এ ছাড়া আলোচনা সভায় সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর লেখা একটি কবিতা পড়ে শোনান।
বসাকে কেন্দ্র করে ধস্তাধস্তি, চেয়ার ছোড়াছুড়ি
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শোক দিবসের আলোচনা সভা চলাকালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বসাকে কেন্দ্র করে তিন দফা ধস্তাধস্তিতে ও চেয়ার ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত হন। মঞ্চ থেকে মাইকে ঘোষণা দিয়েও তাঁদের নিবৃত্ত করা যাচ্ছিল না। সাংসদ ফজলে নূর তাপসের বক্তব্যের সময় চেয়ার ছোড়াছুড়ি বেশি শুরু হয়। তবে পুলিশের হস্তক্ষেপে তা নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময় মঞ্চে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ অপর অতিথিরা বসে ছিলেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় সামনের দিকে বসাকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ধস্তাধস্তি ও চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা