Monday, August 27, 2018

গণহত্যার জন্য অবশ্যই মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের বিচার করতে হবে: জাতিসংঘ

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও গণধর্ষণের দায়ে দেশটির সেনাপ্রধানসহ ছয় শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। আজ (সোমবার) জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানিয়েছেন মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের চেয়ারপারসন মারজুকি দারুসমান। সংবাদ সম্মেলনে তিনি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, 'রাখাইন রাজ্যে গণহত্যার তদন্ত করে সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় জেনারেলদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।'
গত বছরের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা অভিযানের নামে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সে সময়ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানকে জাতিসংঘ 'জাতিগত নিধনযজ্ঞ' বলে অভিহিত করে বলেছিল, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ।
মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমান
রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর থেকে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান প্রাণ বাঁচাতে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, রাখাইনে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা ও ধর্ষণ করছে এবং তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে।
আজ জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনও তাদের প্রতিবেদনে রাখাইনে গণহত্যা ও গণধর্ষণের মতো অপরাধের কথা তুলে ধরেছে।
২০১৭ সালের মার্চে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল গঠিত এই মিশনের প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে বলেও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। জাতিসংঘ এই প্রতিবেদনটি তৈরি করতে ৮৭৫টি সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
রাখাইন ছেড়ে পালাচ্ছেন রোহিঙ্গারা; পেছনে জ্বলছে তাদের ঘরবাড়ী

৩৫-এ ধারাকে কেন্দ্র করে গুজবের জেরে কাশ্মিরে তীব্র উত্তেজনা ও সহিংসতা

জম্মু-কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা সম্বলিত সংবিধানের ৩৫-এ ধারাকে কেন্দ্র করে গুজবের ফলে কাশ্মিরের বিভিন্নস্থানে তীব্র উত্তেজনা ও সহিংসতায় কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন। ৩৫-এ ধারা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানিকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ালে ওই সহিংসতা হয়।
আজ (সোমবার) কাশ্মির উপত্যকার সমস্ত দোকানপাট আচমকা বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদী জনতা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার সংশ্লিষ্ট সকলকে গুজবে কান না দিতে অনুরোধ জানানো হলেও দিনভর উপত্যকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ছিল।
আজ অনন্তনাগ, সোপিয়ান, পুলওয়ামা, শ্রীনগর, সোপর, বারামুল্লা, বান্দিপোরা, গান্দেরবল, কঙ্গন, কুপওয়াড়া প্রভৃতি এলাকায় দোকানপাট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য রেখে স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি দিয়ে দেয়া হয়।
সংবিধানের ৩৫-এ ধারায় কোনোভাবেই রদবদল করা চলবে না বলে ওই ধারার সমর্থনে মানুষজন সড়কে নেমে স্লোগান দেন এবং বিভিন্নস্থানে দোকানপাট বন্ধ করে দেয়াসহ নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করেন।
মারমুখী জনতাকে মোকাবিলা করতে নিরাপত্তা বাহিনীকে এসময় লাঠি চালানোর পাশাপাশি কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ এবং পেলেট গান ব্যবহার করতে হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে আহত মানুষের সংখ্যা কত তা জানানো না হলেও গণমাধ্যমের বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ, এসব ঘটনায় কমপক্ষে ত্রিশেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
পুলিশের অতিরিক্ত মহা নির্দেশক মুনীর খান বলেন, কিছু অসামাজিক মানুষজন আজ ৩৫-এ ধারা নিয়ে আদালতে শুনানিকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ায়। যারা গুজব রটনা  করেছে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হবে।
২০১৪ সালে এক বেসরকারি সংগঠন সুপ্রিম কোর্টে জম্মু-কাশ্মির থেকে ৩৫-এ ধারা বাতিল করার আবেদন জানায়। এরপর থেকে ওই ধারায় হস্তক্ষেপ করাকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
৩৫-এ ধারা অনুযায়ী, রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া কেউ সেখানকার সম্পত্তি বেচাকেনা করতে পারেন না। স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য সরকারি চাকরি এবং স্কলারশিপ সংরক্ষিত থাক। কোনো কাশ্মিরি নারী অন্য রাজ্যের কাউকে বিয়ে করলে তিনি রাজ্যে বিষয়-সম্পত্তির মালিকানার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।

কারও কথাই আমলে নিচ্ছে না সরকার

‘সরকার বেপরোয়াভাবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে সুন্দরবন একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’
আজ সোমবার বিকেলে ‘সুন্দরবন রক্ষায় অবিলম্বে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেপরোয়া শিল্প বন্ধের দাবিতে’ ডাকা এক সংবাদ সম্মেলনে আলোচকেরা একথা বলেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার ও পরিবেশবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোটিয়ার জন নক্সের বিবৃতির বিষয়ে যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল জন নক্সের বরাত দিয়ে বলেন, ‘সুন্দরবনের ওপর শিল্পায়নের ক্রমাগত হুমকি সারা বিশ্বের পরিবেশের প্রতি হুমকিরই প্রতীকী রূপ। জন নক্স তাঁর বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বিশ্বের বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বন সুন্দরবন সংরক্ষণে সবার স্বার্থ জড়িত। সুন্দরবন সবার আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। আমরা কি মানবাধিকার ও পরিবেশের প্রতি সম্মানজনক উন্নয়ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করব, নাকি এমন শিল্প স্থাপনাকে গ্রহণ করব যা পরিবেশের ক্ষতি করে।’
সুলতানা কামাল বলেন, বাংলাদেশের আদালত, জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং ইউনেসকোর বিশ্ব-ঐতিহ্য কমিটি, প্রকৃতি সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক ইউনিয়নের (আইইউসিএন) আপত্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশ সুন্দরবন এলাকায় ৩২০টি শিল্প প্রকল্প স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে বৃহদাকার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রও রয়েছে। আদালত অবমাননা করে সেখানে শিল্পকারখানা হচ্ছে।
লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘সরকার সব সময় বলে আসছে আমরা আবেগে কথা বলি, যুক্তি ও বিজ্ঞান নেই। অথচ ১০ মাস আগে সরকারের অতি উচ্চপর্যায়ের আমলা আবুল কালাম আজাদের কাছে ১৩টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র দিয়েছি, সেখানে বৈজ্ঞানিকভাবে দেখানো হয়েছে রামপাল হলে সুন্দরবনের কী ক্ষতি হবে। এরপর সরকার এ বিষয়ে একটি কথাও বলেনি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভূ-তত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলেন, এলপিজি ও পেট্রোলিয়াম কারখানা হলো সারা দুনিয়াতে লাল ক্যাটাগরি যা পরিবেশের জন্য অতি বিপজ্জনক শিল্প। বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তর ‘লাল ক্যাটাগরি’ থেকে এটিকে বাদ দিয়ে সবুজ ক্যাটাগরিতে নিয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘পৃথিবীর বহু দেশে পরিবেশ রক্ষা করেই উন্নয়ন করেছে। উন্নয়নের নামে কিছু শিল্পপতির হাতে গোটা দেশ জিম্মি। উন্নয়নের নামে কিছু শিল্পপতির হাতে কিভাবে গোটা দেশ জিম্মি হতে পারে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাপার সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ও শরীফ জামিল।

ইভিএম নিয়ে ইসিতে নানা আলোচনা

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিধান অন্তর্ভুক্তের বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, আরপিওতে ইভিএম এর প্রভিশন (বিধান) রাখা হলে ভবিষ্যতে নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহার করা যাবে। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কী না তা নিশ্চিত করেননি এ কমিশনার। গতকাল  নির্বাচন কমিশনের ৩৫তম সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার এসব কথা বলেন। এর আগে গতকাল সকাল ১০টায় কমিশন সভা শুরু হয়ে চলে বেলা ১১টা পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশনার ও ইসির আইন সংস্কার কমিটির সভাপতি কবিতা খানম ঢাকার বাইরে থাকায় সভায় অংশ নিতে পারেননি। আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার গতকাল দুপুরের ফ্লাইটে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার কর্মসূচি থাকায় সংক্ষিপ্ত সভা শেষে তা মুলতবি করা হয়। আগামী ৩০শে আগস্ট পুনরায় কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হবে।
বৈঠকে অংশ নেয়া একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কমিশন সভায় আরপিও সংশোধন করে ইভিএম এর বিধান অন্তর্ভুক্তের বিষয়ে মূল আলোচনা হয়। এছাড়া সভায় ইসির আইন পরামর্শক তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। সেগুলো হচ্ছে- আরপিওর বিভিন্ন ধারায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী, বিভিন্ন সময়ে আরপিওর সংশোধনী একত্রিত করে নতুন রূপ দেয়া, আরপিও বাংলায় রূপান্তর করা। বৈঠকে আরপিও সংশোধনী একত্রিত করার বিষয়ে আপত্তি তোলেন ইসির কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা বৈঠকে বলেন, সামনে সংসদ নির্বাচন। নতুন আইন করার মতো পর্যাপ্ত সময় নেই। এ উদ্যোগ নিলে নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা জানান, বৈঠকে আরপিওতে ইভিএম এর বিধান অন্তর্ভুক্তের বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, আইন পরামর্শক আরপিও সংশোধনে যেসব প্রস্তাব তুলেছেন, অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান ইভিএম’র সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই। এসব সংশোধন করা দরকার। আরপিওতে যেসব স্থানে ব্যালট শব্দ উল্লেখ রয়েছে, প্রায় সব স্থানে ব্যালট শব্দের সঙ্গে ইভিএম শব্দও যুক্ত করতে হবে। আরপিওতে সাজার বিধানগুলোতেও ইভিএম’র বিষয়টি যুক্ত করতে হবে। এছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে হলে এ সংক্রান্ত একটি বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এসব সংশোধনীর বিষয়ে আগামী সভায় তোলার জন্য বলা হয়েছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, আরপিওর মতো একটি আইনকে এত তাড়াহুড়ো করে চূড়ান্ত করার কথা চিন্তা করছি না। আমরা আরপিও সংশোধন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছি। ভবিষ্যতে আরো আলোচনা করার পর চূড়ান্ত কিছু সিদ্ধান্ত নেবো। তিনি বলেন, যেসব ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন করা দরকার বলে মনে করছি, সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইন সংস্কার কমিটি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকগুলো পরিবর্তনের জন্য সুপারিশ করেছে। তবে আমরা এসব সুপারিশ এখনই বাস্তবায়ন করবো তা নয়, ধাপে ধাপে এগুলো নিয়ে অগ্রসর হবো।
আরপিওতে ইভিএম-এর বিধান অন্তর্ভুক্তের বিষয়ে তিনি বলেন, বৈঠকে ইভিএম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা আরপিওতে ইভিএম ব্যবহারের প্রভিশন তৈরি করে রাখতে চাই। যাতে ভবিষ্যতে ইলেকট্রনিক মেশিন ব্যবহার করা যায়।
আগামী ৯ই সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হচ্ছে। ওই অধিবেশনে আরপিও সংশোধন সম্ভব কী না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করবো যথাযথ রূপ দিয়ে আরপিও সংশোধনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠিয়ে দেয়ার। এরপর আইন মন্ত্রণালয় তা ভেটিং করে মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবে। এসব প্রক্রিয়া সরকারের বিষয়, আমাদের বিষয় নয়। আমরা আরপিও সংশোধন করতেছি। যদি আমাদের কারণে বা অন্য কারণে সংশোধন না হলে বিদ্যমান আইন দিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচন হবে।
যদিও এর আগে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইসি আরপিও সংশোধন করবে না। শুধুমাত্র ইভিএম-এর বিধান যুক্ত করবে।

চামড়ার দরপতন: সংকটে মাদরাসা এতিমখানা

এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দামে ধস নামায় বড় ধরনের সংকটে পড়তে যাচ্ছে মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো। বিশেষ করে দেশের কওমি মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষা কার্যক্রমে ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, চামড়ার দাম কমার কারণে অনেক কওমি মাদরাসার আয় কমে যাবে। এর ফলে এসব মাদরাসায় বার্ষিক বাজেটে ঘাটতি দেখা দিতে পারে । যা শিক্ষা কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলবে। সাধারণ মানুষের দানের পাশাপাশি যাকাত, ফিতরা ও কোরবানির সময় দান করা চামড়া বিক্রির আয়ের ওপরই নির্ভরশীল অধিকাংশ মাদরাসার পরিচালনা ব্যয়। এতে অনুদান হিসেবে পাওয়া চামড়ার দাম না পেলে আর্থিক সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের। এদিকে কোরবানি পশুর চামড়ার বাজারে আকস্মিক ধসের নেপথ্যে একে অপরকেই দোষারোপ করছেন মৌসুমি, পাইকারি ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকরা। একাধিক মৌসুমি, খুচরা, পাইকারি ব্যবসায়ী, কওমি মাদরাসার নীতিনির্ধারক, ট্যানারি ব্যবসায়ী ও চামড়া ব্যবসা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কতিপয় পাইকারি ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছেন চামড়া বাজার। ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে সাধারণ ব্যবসায়ী, কওমি মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো। এ ছাড়া বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি না হলেও কোনো তদারকি লক্ষ্য করা যায়নি।
রাজধানীর উত্তরা এলাকার সব চেয়ে বড় কওমি মাদরাসা আজমপুর দারুল উলুম মাদরাসা ও এতিমখানার পরিচালনা কমিটির সদস্য মোহাম্মদ সাঈদুল ইসলাম সরকার বলেন, চামড়ার বাজার ধসের কারণে তাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের মাদরাসা এলাকাবাসীর অনুদানে চলে থাকে। আর অনুদানের বড় অংশ পেয়ে থাকি চামড়ার দান থেকে। কিন্তু চামড়ার দামের যে অবস্থা, তাতে করে প্রতিষ্ঠান চালানো আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, গত বছর ৪৩০ পিসের বেশি চামড়া কিনে আয় হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা (প্রতি পিস ১২০০ টাকা ধরে)। আর এবার ৫১৫ পিস চামড়ায় হতে পারে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা। তিনি বলেন, কোরবানির সময় কিনে বা দানের চামড়া দিয়ে বড় একটা অঙ্ক আয় আসে মাদরাসায়। আর এটা সম্পূর্ণ ব্যয় হয় এতিম ছাত্র ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে। এখন সেই চামড়ার দামই বছর বছর কমানো হচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক। তিনি জানান, এই মাদরাসায় প্রায় ৫০০ ছাত্র পড়াশুনা করে। তাদের পেছনে মাসে খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা। চামড়ার দাম বেশি পাওয়া গেলে এই এতিম ছাত্ররাই উপকৃত হতো। এখন দাম কমায় এরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ চমড়া-চামড়াজাত পণ্যের দাম খুবই চড়া। তিনি বলেন, দাম কমার ফলে আর্থিক সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের।
কাওরান বাজার আম্বর শাহ জামে মসজিদ ও মাদরাসার সহসভাপতি আমীর হোসেন পাটোয়ারি বলেন, গত বছর এই মাদরাসার পক্ষ থেকে ৩০০ পিস চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছিল। প্রতি পিস দাম পড়েছিল গড়ে ১১০০ টাকা। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা আয় হয়েছিল। কিন্তু এবার ৩৩০টির বেশি সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব চামড়া গড়ে প্রতি পিস দাম পড়ছে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। তিনি বলেন, এবার বেশি চামড়া সংগ্রহ করেও গত বারের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দাম পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, এই মাদরাসায় ৩০০ জন ছাত্র পড়াশুনা করে। তাদের খাওয়ার পিছনে দিনে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতি বছর কোরবানির পশুর চামড়া থেকে একটা আয় আসে। এবার এ আয় হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হবে।
এদিকে গত বছরের চেয়ে এ বছর চামড়ার দাম কমানোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ঈদের আগেই সংবাদ সম্মেলন করেছিল কওমি মাদরাসাগুলোর সংগঠন কওমি ফোরাম। সংগঠনটির দাবি, সরকার চামড়ার দাম কমানোর পরও প্রতিটা গরুর চামড়ার দাম ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা করে আসার কথা। কিন্তু সেখানে চামড়াগুলো বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা করে। ফলে ক্ষতির পরিমাণটা বেড়ে গেছে কওমি মাদরাসাগুলোতে। চামড়ার দাম কম হওয়াতে আয়ের কিছু অংশ কমে যাবে।
চামড়ার দাম নিয়ে ট্যানারি মালিকরা কোনো সিন্ডিকেট করেননি দাবি করে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, কোরবানি পশুর চামড়ার দাম গত বছরের তুলনায় কম হওয়ার জন্য দায়ী স্থানীয় সিন্ডিকেট। রাজনৈতিক কর্মীবাহিনী, সামাজিক ক্লাবভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন এলাকাভিত্তিক চামড়ার দাম তারা নিয়ন্ত্রণ করে। তারা যদি ২০০-৩০০ টাকা করে চামড়া ক্রয় করে, ট্যানারি মালিকদের এখানে কী করার আছে?
খুচরা ব্যবসায়ী এবং চামড়ার আড়তদারদের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, এখনো যারা চামড়া বিক্রি করতে পারেননি, তাদের লোকসানের আশঙ্কা নেই। আপনারা কাঁচা চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করেন। ট্যানারির প্রতিনিধিরা তিন থেকে চার দিনের মধ্যে আড়তদারদের কাছে থেকে নির্ধারিত মূল্যে লবণযুক্ত চামড়া নিয়ে আসবে।
আমাদের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ কওমি মাদরাসাগুলোর আয়ের অন্যতম উৎস। অর্জিত এই অর্থ দিয়ে চলে মাদরাসাগুলোর লিল্লাহ বোডিং। কিন্তু এবার চামড়া নিয়েই চরম বিপাকে পড়েছে মাদরাসাগুলো। আয় তো দূরের কথা এবার চামড়ার ক্রেতাই পাচ্ছে না মাদরাসার কর্তারা।
চামড়ার দাম কম হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রামের চান্দগাঁও হাজিরপুল আযিযাবাদ এলাকায় অবস্থিত কওমি মাদরাসা জামিয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়ার পরিচালক আল্লামা সুলতান যওক নদভী। তিনি জানান, মাদরাসায় এক হাজার ৮০০’রও বেশি কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিটি চামড়া সর্বনিম্ন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে কেনা হয়েছে। কিন্তু এসব চামড়া কিনতে কোনো ব্যবসায়ী আসেননি। শনিবার দুপুরে একজন ব্যবসায়ীকে ডেকে আনা হলেও সে গড়ে প্রতিটি চামড়া ৩০০ টাকার বেশি কিনতে রাজি নন। কিন্তু ক্রয়মূল্য ছাড়াও এসব চামড়া ক্রয়ে পরিবহন খরচ, লবণজাত করা ও শ্রমিকের বেতনসহ প্রতিটি চামড়ার পেছনে আরো ২০০ টাকা খরচ পড়েছে। এ অবস্থায় ৩০০ টাকা করে চামড়া বিক্রি করলে বিপুল অঙ্কের টাকা লোকসান যাবে।
একই কথা জানালেন, চট্টগ্রামের লালখান বাজারে অবস্থিত কওমি মাদরাসা জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়ার লিল্লাহ বোর্ডের সদস্য আল্লামা সামশুদ্দিন আল মাদানী। তিনি বলেন, ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে চামড়া কিনলেও ব্যবসায়ীরা একই মূল্যে চামড়া কিনতে চাচ্ছে। ফলে নিরুপায় হয়ে লোকসান দিয়ে এবার কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে দিয়েছি। তিনি বলেন, এবার এক হাজার ৩৪৭ পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেছি আমরা। যা বিক্রি করে দুই লাখ টাকার মতো লোকসান গুনতে হয়েছে। আর এসব টাকা মাদরাসার গরিব-এতিম শিক্ষার্থীদের হক। অথচ প্রতিবছর কোরবানির পশুর চামড়া থেকে আমরা ৫-৬ লাখ টাকা আয় করতাম। যা দিয়ে লিল্লাহ বোর্ডের কয়েক মাসের খোর-পোষের যোগান হতো।
চট্টগ্রামের রাউজানের মদুনাঘাট ইউনুসিয়া ফাতহুল ইসলাম মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডের পরিচালক আল্লামা খায়রুল আলা নদভী বলেন, মাদরাসায় এবার কোরবানির পশুর ৭০০ চামড়া সংগ্রহ করা হলেও লাভ হয়নি তেমন। এর মধ্যে বিনামূল্যের চামড়া থাকায় সামান্য টাকা লাভ হয়েছে। যা দিয়ে মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডের ৫ দিনের খরচও হবে না। অথচ প্রতিবছর ৩-৪ মাসের খরচের টাকা আসত এই কোরবানির পশুর চামড়া থেকে।
দেশের প্রাচীন কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার সহকারী শিক্ষা পরিচালক আল্লামা শফীপুত্র মাওলানা আনাস মাদানী জানান, এবার কোরবানির পশুর প্রায় সাড়ে ৪ হাজার চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে মাদরাসায়। কিন্তু দাম কম হওয়ায় চামড়া এখনো বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। ব্যবসায়ীরা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার উপরে চামড়ার দাম বলছেই না। এ দামে চামড়া বিক্রি করা হলে নিশ্চিত লোকসান হবে। তিনি বলেন, মাদরাসায় গরিব-এতিম ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করে। তাদের খাওয়া-দাওয়া, কাপড় ও পড়ালেখার খরচ যোগাতে প্রতিবছর কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এ কাজে মাদরাসার পরিপক্ব শিক্ষার্থীরা শ্রম দিলেও পরিবহণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ করতেই হয়। ফলে কোরবানিতে তিনভাবে পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এরমধ্যে প্রথমত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
কোরবানি দাতা তাতে রাজি না হলে অর্ধেক মূল্যে। তাতেও রাজি না হলে বাজার মূল্যে চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু এ বছর চামড়ার মূল্য এত কম যে, যা সংগ্রহ করতেই ক্রয়মূল্যের চেয়েও খরচ বেশি পড়ে। অথচ চামড়া ব্যবসায়ীরা আমাদের ক্রয়মূল্যের চেয়েও কমমূল্যে চামড়া কিনছে। ফলে এবার চামড়া নিয়েই চরম বেকায়দায় পড়েছি।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে কওমি মাদরাসাসহ ৩ শতাধিক মাদরাসা রয়েছে। প্রতিটি মাদরাসায় লিল্লাহ বোডিং রয়েছে। ফলে প্রতিটি মাদরাসায় কিছু না কিছু কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেছে প্রতিবছরের মতো। কিন্তু এবার লাভের মুখ দেখেছে এমন একটি মাদরাসাও নেই।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নানুপুর আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া ওবায়দিয়া মাদরাসার প্রধান আল্লামা শাহ ছালাহ উদ্দীন নানুপুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, চামড়ার দাম কমানো মাদরাসাগুলো ধ্বংসের একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র। কারন মাদরাসাগুলোর লিল্লাহ বডিং টিকে আছে কোরবানির পশুর চামড়ার আয়ের উপর। প্রতিবছর মাদরাসাগুলো যেখানে চামড়া থেকে আয় করে, সেখানে এবার লোকসান গুনছে। যা এতিমের হক। কেন? প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের সবক’টি ট্যানারি বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ট্যানারিতে চামড়া নিতে পরিবহণ খরচও অনেক বেশি। যা ট্যানারির মালিক বা সরকার দেন না। এক্ষেত্রে ঢাকার বাইরে চামড়ার দাম বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু ঢাকার বাইরে পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে কম। এটাও চরম বৈষম্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
স্টাফ রিপোর্টার কিশোরগঞ্জ থেকে জানান, এবারের কোরবানির ঈদে পশুর চামড়ার দাম আগের বছরের তুলনায় অনেক কম। চামড়ার এই দরপতনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুস্থ, এতিম, হতদরিদ্র, এতিমখানা এবং কওমি মাদরাসা। বিশেষ করে কওমি মাদরাসায় যেসব এতিম ও গরিব মেধাবী প্রতিষ্ঠানের দরিদ্র তহবিল থেকে সহায়তা পাচ্ছে, তারা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কোরবানির চামড়া সংগ্রহের অর্থে পরিচালিত এসব কওমি মাদরাসার দরিদ্র তহবিল এবার সঙ্কুচিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কওমি মাদরাসাগুলোর বার্ষিক খরচ পরিচালনায় এটি বিশাল এক সংকট বলে মনে করছেন কিশোরগঞ্জে কওমি মাদরাসা পরিচালনার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরা। তাদের অনেকেই কোরবানির চামড়ার এই দরপতনকে কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন।
জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে তিনশ’র মতো কওমি মাদরাসা রয়েছে। এসব মাদরাসায় প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তাদের মধ্যে সিংহভাগ শিক্ষার্থীর থাকা-খাওয়ার খরচ বহন করে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন দান এবং ঈদুল ফিতরের যাকাত ও ঈদুল আজহার কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থে পরিচালিত হয় এসব মাদরাসার গোরাবা ফান্ড অর্থাৎ দরিদ্র তহবিল। এই তহবিল থেকে এতিম ও দরিদ্র মেধাবীদের থাকা-খাওয়ার ব্যয় নির্বাহ করা হয়। কিন্তু এবার কোরবানির চামড়ার কাঙ্ক্ষিত দাম দূরে থাক, ন্যূনতম দামও মিলছে না। ফলে তহবিলে অর্থ সংকটের কারণে মাদরাসাগুলোর এতিম-অসহায় ছাত্ররা বিপাকে পড়বে। এ পরিস্থিতিকে কওমি মাদরাসাগুলোর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে কিশোরগঞ্জের আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার মহাপরিচালক আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ বলেন, কওমি মাদরাসা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় পরিকল্পিতভাবে চামড়া নিয়ে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। কেননা আন্তর্জাতিক বাজারের কোথাও চামড়ার দাম কমেনি।
আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সমাজের গরিব, সুবিধাবঞ্চিত, বাবা-মা হারা প্রায় দেড় হাজার শিশু-কিশোর এই মাদরাসায় পড়াশোনা করে। এবার গত বছরের চেয়ে মাদরাসাটিতে চামড়ার সংগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় তারা স্বস্তিতে ছিলেন। কিন্তু চামড়ার রেকর্ড দরপতনের কারণে তাদের সেই স্বস্তি এখন অস্বস্তিতে পরিণত হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ শহরের বড় বাজারের আলহাজ শামসুদ্দিন ভুঁইয়া জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, তাদের মাদরাসার গোরাবা ফান্ড থেকে এতিম-গরিব মেধাবীদের ভরণ-পোষণের ব্যয় নির্বাহের অন্যতম প্রধান খাত কোরবানির চামড়া সংগ্রহের অর্থ। কিন্তু এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে অন্যান্য মাদরাসার মতো তাদেরও অর্থসংকটের মধ্যে পড়তে হবে।
কিশোরগঞ্জ শহরের তারাপাশা এলাকার জামিয়া নূরানিয়া মাদরাসার মুহাতামিম মাওলানা আবুল বাশার জানান, তাদের মাদরাসায় প্রায় এক হাজার ৪০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এবার চামড়ার কম দামের কারণে মাদরাসার বার্ষিক খরচ পরিচালনায় তাদের ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, চামড়ার দাম কমার কারণে অনেক কওমি মাদরাসার আয় কমে যাবে। এর ফলে সেসব মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
কিশোরগঞ্জ শহরের গাইটাল নামাপাড়া এলাকার জামিয়া রাহমানিয়া, মারিয়া এলাকার আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) ও জামিয়া আবুবকরসহ আরো বেশ কয়েকটি মাদরাসার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হলে তারা একই রকম আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য কম হওয়ার ফলে কওমি মাদরাসাগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মাগুরা প্রতিনিধি জানান, মাগুরায় এবার কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে দিয়ে দিয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে কেউবা চামড়া ফেলে দিয়েছেন বর্জ্য হিসেবে। এ কারণে বঞ্চিত হয়েছে মাগুরার শত শত এতিমখানা ও লিল্লাহ বডিং।
মাগুরা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ গত বছর ছিল ১০ শতাংশ এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ শতাংশ। এবছর ১৩২৫০টি পশু কোরবানি হলেও ব্যবসায়ীরা ১৭০০টি মত চামড়া সংগ্রহ করেছে। শহরের একটি মাদরাসা ও এতিমখানার পরিচালক মাওলানা অব্দুল মেমিন বলেন, প্রতিবছর চামড়া বিক্রির টাকা থেকে আমরা একটি ভালো অঙ্কের অনুদান পাই। এবার তা নেই বললেই চলে। আমার এতিমখানার বাচ্চাদের ভরণপোষণে এটি একটি বড় প্রভাব ফেলবে।
শহরের নতুন বাজার এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী শ্যামল কুমার বলেন, এবছর সরকার নির্ধারিত চামড়ার দর খুবই কম। ঐ দামে আমরা যত চামড়া কিনব তত লোকসান বাড়বে। একারণেই এবার বাজারে প্রচুর চামড়া থাকা সত্ত্বেও ক্রেতার সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাছাড়া ট্যানারি মালিকদের কাছে প্রত্যেক ব্যবসায়ীই কয়েক লাখ করে পুরানো টাকা এখনো পাননি।

সিসিটিভি ফুটেজে মুহিবুর হত্যার দৃশ্য by ওয়েছ খছরু

সুইডেন প্রবাসী মুহিবুর রহমান খুনের মিশনে অংশ নিয়েছে তিন যুবক। একটি মোটরসাইকেলে আসা ওই যুবকরা মুহিবুর রহমানকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলের অদূরে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। পুলিশের ধারণা, পরিকল্পিতভাবেই খুন করা হয়েছে সুইডেন প্রবাসী মুহিবুর রহমানকে। তবে, খুনিরা যে মোটরসাইকেলে পালিয়েছে সেটির নাম্বার ঝাপসা। এ কারণে সিলেট কোতোয়ালি থানা পুলিশ নাম্বারের সটিকতা নির্ণয়ের জন্য সিআইডির কাছে ওই ফুটেজ পাঠিয়েছে। এদিকে, মুহিবুর রহমান খুনের ঘটনায় সিলেটের মীরাবাজারের আগপাড়াবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পাড়ার ভেতরে এমন ঘটনায় তারা হতবাক। আর খুনের ঘটনার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও খুনিরা শনাক্ত না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। তারা জানিয়েছেন, আগপাড়া এলাকায় মুহিবুর রহমানের কোনো শত্রু ছিল না। নিজ বাড়ি জগন্নাথপুরের কাতিয়া এলাকার বিরোধ সংক্রান্ত কোনো ঘটনায় এ খুনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানান তারা। পুলিশ বলছে, আপাতত তারা খুনিদের সন্ধানে রয়েছে। আর পরিবার থেকে কোনো তথ্য দিলে সেগুলো তারা যাচাই-বাছাই করবেন। ষাটোর্ধ্ব মুহিবুর রহমান সুইডেন প্রবাসী।
পরিবার-পরিজন নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন বসবাস করেন সুইডেনে। নগরীর মীরাবাজারের আগপাড়া এলাকায় রয়েছে তার নিজস্ব বাসা। বাসা নম্বর আগপাড়া ১২৪। মূল বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার কাতিয়ার অলইতলি গ্রাম। তার পিতা মৃত আইন উদ্দিন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মুহিবুর রহমান প্রায় সময় পরিবার পরিজনকে সুইডেনে রেখেই সিলেটে আসতেন। ঈদ-পার্বণকে সামনে রেখে তিনি দেশে বেশি আসতেন। দেশে এলেই নিজের বাড়ি জগন্নাথপুরের অলইতলি গ্রামে যাতায়াত করতেন বেশি। এবার প্রায় দুই মাস আগে তিনি দেশে ফেরেন এবং কয়েকদিন তিনি জগন্নাথপুরের অলইতলির বাড়িতে যান। কখনো কখনো তার সঙ্গে আত্মীয় স্বজনও থাকতেন। পরিবারের লোকজনকে সুইডেনে রেখেই তিনি সিলেটে আসেন। ঈদকে সামনে রেখে তিনি কোরবানিরও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঘটনা ১৯শে আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে। সিসিটিভির ফুটেজ ঘেঁটে পুলিশ জানিয়েছে, ওই রাতে সুইডেন প্রবাসী মুহিবুর রহমান বাসা থেকে একাই বের হন। একটু দূরে আসার পর মোটরসাইকেলে আসা তিন যুবক তার ওপর হামলা চালায়। তারা মুহিবুরের মাথায় ও ঘাড়ে কয়েকটি ছুরিকাঘাত করে ফের মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়।
তবে, খুনের ঘটনার আগে থেকেই তারা ওই এলাকায় রেকি করছিল। মুহিবুর রহমানকে তারা ফলো করছিল বলে ফুটেজে প্রতীয়মান হয়। এদিকে, ঘটনার পরপরই মুহিবুর রহমানকে স্থানীয়রা সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। পরে সেখান থেকে তাকে ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ঈদের দিন মধ্যরাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মুহিবুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনায় ২১শে আগস্ট তার স্বজন জোবায়ের আহমদ কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় তিনি হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে পুলিশ ওই এজাহারকে হত্যা মামলা হিসেবে রেকর্ড করেছে। এদিকে, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই কোতোয়ালি থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ সময় পুলিশ ওই এলাকা থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে। কোতোয়ালি থানার ওসি রোকেয়া খানম গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, তিন যুবক মোটরসাইকেল নিয়ে এসে প্রবাসী মুহিবুর রহমানের ওপর হামলা চালিয়েছে।
সেটি সিসিটিভি ফুটেজে ধারণ হয়েছে। হামলার পর খুনিরা মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। হামলাকারীদের মুখ ও মোটরসাইকেলের নাম্বার ঝাপসা দেখা যায়। এ কারণে ওই ফুটেজটি সিআইডির কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, এ খুনের ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে কোনো তথ্য থাকলে সেটি পুলিশকে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, মোটরসাইকেলের নাম্বার পাওয়া গেলে তদন্ত অনেক এগিয়ে যাবে। স্থানীয় ১৮নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবিএম জিল্লুর রহমান উজ্জ্বল জানান, ঘটনাটি মর্মান্তিক। পাড়ার ভেতরে এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা চাই খুনিরা গ্রেপ্তার হোক। খুনের ঘটনার পর মুহিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা সুইডেন থেকে সিলেটে ফিরেছেন বলে জানান তিনি।

ধর্ষিত সেইসব রোহিঙ্গা নারীদের কথা

৩৩ দিন বয়সী ইয়াসমিন। একটি কম্পলে পেচিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। ছালা দিয়ে তৈরি ছাদের দিকে তাকিয়ে ইতিউতি করছে সে। তার মা মেহের। তাকে তুলে নিলেন। বুকের দুধ পান করানো শুরু করলেন। দেখে মনে হয় তার বয়স ২৫ বছর। তিনি বললেন, এই শিশুটি আমার বাচ্চা। সে পুরোপুরিই আমার। আমার ভালবাসা সে। কিন্তু যখনই তার দিকে তাকাই তখনই স্মরণে আসে এখ নৃশংস ভয়াবহতা।
মেহের রোহিঙ্গা মুসলিম। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখন রোহিঙ্গা মুসলিম নারীদের গণহারে ধর্ষণ করে তখন তাদের দ্বারা ধর্ষিত হন মেহেরও। আর তাতেই তার গর্ভসঞ্চার হয়ে যায়। এমন নৃশংসতার শিকার হয়ে অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী গত বছর পাড়ি জমান বাংলাদেশে। হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও গণধর্ষণের শিকার হয়ে কমপক্ষে ৭ লাখ রোহিঙ্গা নরনারী, শিশু, কিশোর পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হন। তারা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে ভীষণ গাদাগাদি করে অবস্থান করছেন।
মিয়ানমারের সেনাদের দ্বারা ধর্ষিত হয়ে যেসব নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন তাদের মধ্যে মেহের অন্যতম। তারই গর্ভে অনাকাঙ্খিত সন্তান ইয়াসমিনের জন্ম হয়েছে কিছুদিন আগে। মেহের জুনের প্রথম দিকে প্রথম তার প্রসব বেদনা বুঝতে পারেন। তিনি কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান নি। ছালা আর বাঁশ দিয়ে তৈরি ঘরের কাঁচা মেঝেতেই তিনি একা একা প্রসব করেছেন ইয়াসমিনকে। তিনি বলেন, এই প্রসব বেদনা ছিল অসহনীয়। টানা পাঁচ ঘন্টা জীবনের সঙ্গে লড়াই করে তিনি প্রসব করেছেন ইয়াসমিনকে। মেহেরের আগে থেকেই দুটি সন্তান আছে। তাদের একজনের বয়স ৫ বছর। আরেকজনের ২ বছর।
কক্সবাজারে খাড়া পাহাড়ি ঢালে যে আশ্রয়শিবির গড়ে উঠেছে সেখানে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। আছে পপকর্ন বিক্রেটা, মাছবিক্রেতা, সেলুন। ল্যাংটা ছেলেমেয়ে এখানে ওখানে কর্দমাক্ত মাটিতে খেলছে। এসব আশ্রয়শিবিরের প্রবেশ পথেই এনজিওগুলো স্থাপন করেছে ক্লিনিক। সেখানে গিয়ে নারীরা সন্তান প্রসব করতে পারেন। ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ)-এর হিসাবমতে, ওই শরণার্থী শিবিরে এখন প্রায় ৩০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারী আছেন। প্রতি মাসে সেখানে জন্ম নিচ্ছে ৩ হাজার শিশু। এসব শিশুর কতজনের জন্ম ধর্ষণের ফলে তার প্রকৃত হিসাব কেউ বলতে পারেন না। তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মার্চে যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তাতে দেখা যায় যৌন সহিংসতার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া কমপক্ষে ২৭০০ নারীকে মানবিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। এমএসএফ কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০১৭ সালের আগস্টের শেষ থেকে মে মাসের শেষ নাগাদ তারা ৪৪৩ জন ধর্ষিতার দেখা পেয়েছে। সঙ্কটের প্রথম ৫ মাসে ১০২জন ধর্ষিতাকে চিকিৎসা দিয়েছে আরেকটি এনজিও হোপ ফাউন্ডেশনের নেটওয়ার্ক ক্লিনিক। তারা বলেছে, এই সংখ্যা বরফ চাঁইয়ের একটি বিন্দুর মতো। ধারণা করা হয়, এমন ধর্ষিতা কয়েক হাজার আছেন। এমএসএফের ইতালিয়ান ধাত্রী জুলিয়া মেইস্ট্রেলি বলেন, মে মাসে আমরা সন্তান প্রসবের হার কিছুটা বাড়তে দেখেছি। তবে বেশির ভাগ সন্তান প্রসবের ঘটনা সনাক্ত করা যাচ্ছে না। এর কারণ, চার ভাগের তিন ভাগ নারীই তাদের সন্তান প্রসব করছেন নিজের আশ্রয়ে। যেসব নারী ক্লিনিকে সন্তান প্রসব করতে যাচ্ছেন সন্তান প্রসবের পরে তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কখনো তারা ওই সন্তানকে ফেলে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু যখন সন্তানের মুখ দেখেন তখন আর তাকে ফেলে যেতে পারেন না। তাকে সঙ্গে নিয়ে যান।
যে রাতে মেহেরকে ধর্ষণ করা হয় সে রাতে তিনি দুই সন্তান সহ একা ছিলেন বাড়িতে। তার স্বামী একজন কৃষক। তিনি তখনও মাঠে ছিলেন। ওই রাতে সেনাবাহিনীর পোশাক পরে অনেক মানুষ তাদের গ্রামে প্রবেশ করে এবং নারীদের একত্রিত করে। এরপর তাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। একদিকে সাজানো বাড়িঘর জ্বলতে থাকে। অন্যদিকে এসব নারীকে তারা নিয়ে যায় বনের ভিতর। সেখানে কয়েক ঘন্টা আটকে রাখে তাদেরকে। এরই এক পর্যায়ে মেহের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। ঘুম থেকে জেগেই তিনি দেখতে পান দু’জন সেনা সদস্য তার দুই সন্তানের মাথায় বন্দুক তাক করে রেখেছে। মেহের বলেন, ওই সেনা সদস্যরা তাদেরকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এ সময় আমি তাদের কাছে কাকুতি মিনটি করি। আমি তাদেরকে বলি তোমাদের যা খুশি আমার সঙ্গে করো তবু ওদের ছেড়ে দাও। এ সময় সেনারা আমার দিকে এগিয়ে আসে এবং আমাকে ধর্ষণ করে পালাক্রমে। সিএনএনের সঙ্গে নিজের ধর্ষিত হওয়ার কথা যেসব নারী সাহস দেখিয়ে স্বীকার করেছেন তাদের মধ্যে মেহের অন্যতম। এমনি আরেক নারী সেনুয়ারা (৩৫)। যখন তার ওপর হামলা চালানো হয় তখন তিনি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি বলেন, ৯ জন সেনা সদস্য জোর করে আমার বাড়িতে প্রবেশ করে। তারা আমার দেড় বছর বয়সী ছেলেকে গুলি করে। তারপর আমাকে রশি দিয়ে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলে। একজনের পর অন্যজন এভাবে তারা সবাই আমাকে ধর্ষণ করে। এ সময় তিনজন সেনা সদস্য তাদের বুঁট ও বন্দুক দিয়ে আমাকে প্রহার করতে থাকে। সকাল থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত এভাবে ওই সেনা সদস্যরা আমাকে ধর্ষণ করে। যখন তারা আমাকে ছেড়ে যায় তখন আমি ছিলাম ভীষণ দুর্বল। এমনকি আমার আঙ্গুলের সামনের অংশও নড়াচড়া করতে পারছিলাম না।
এরপর তার এক ভাই ও এক কাজিন তাকে তিন দিন ঝুলন্ত দোলনার মতো করে বহন করে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এখানে আসার পর তিনি একটি সন্তান প্রসব করেছেন। বলেছেন, এখনও আমাকে ভীতি তাড়া করে ফেরে। গভীর রাতে যখন ঘুম ভেঙে যায় তখন দেখি আমার সারা শরীর ভয়ে ঘামছে।
মেহেরও তার দু’সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে কক্সবাজার এসেছেন। কিন্তু এখানে এসেই তার সব বিপদ কাটে নি। দু’মাস পরে তিনি বুঝতে পারেন ধর্ষিত হওয়ার ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন। মেহের বলেন, এটা বুঝতে পেরে একজন ওঝার কাছে গিয়েছিলাম। তার কাছে গর্ভপাতের ওষুধ চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে একটি বড়ি দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কাজ হয় নি।

টার্নিং পয়েন্টে জোট রাজনীতি: কী হচ্ছে, কী হবে

শেষ পর্যন্ত কী হবে বলা মুশকিল। তবে সম্ভবত বাংলাদেশে জোট রাজনীতি এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। দুই-চার দিনের মধ্যেই আরো অনেক কিছু খোলাসা হয়ে যেতে পারে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতে দীর্ঘদিন ধরেই তৎপরতা চলছে। বারবার এই প্রচেষ্টা হোঁচটও খেয়েছে। তবে এর উদ্যোক্তারা এখন বলছেন, তারা সাফল্যের কাছাকাছি রয়েছেন। যদিও কিছু জটিলতা এখনো রয়ে গেছে। ওদিকে, সরকার পক্ষ থেকেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। দুই ধরনের কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে ক্ষমতাসীন মহল। বিএনপি নির্বাচনে থাকলে কৌশল হবে এক ধরনের আর না থাকলে ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করা হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইতিমধ্যে একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতিতে আগামী ১২০-১২৫ দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় প্রতিদিনই নাটকীয় কোনো না কোনো কিছু ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ চলতি বছরের শেষদিকে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো দৃশ্যত পুরোটাই সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণে। এ নিয়ন্ত্রণ সামনের দিনগুলোতে আরো শক্ত হতে পারে। কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলনের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে হয়তো হার্ডলাইনেই থাকবে সরকার।
এই যখন অবস্থা তখন ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে তৎপরতা জোরদার করেছে। এরই মধ্যে একাধিক বৈঠকও হয়েছে দলগুলোর মধ্যে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে আন্দোলন প্রশ্নে প্রায় সব দলই একমত পোষণ করেছে। জামায়াত প্রশ্নে এক ধরনের জটিলতা থাকলেও তা সমাধানের পথে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তারা বলছেন, ২০ দলীয় জোট অক্ষুণ্ন থাকবে। সেখানে জামায়াত ও অন্যান্য যে ইসলামপন্থি দলগুলো আছে সেগুলো থাকবে। সম্মিলিত বিরোধী দলে বিএনপি যোগ দিতে পারে।
ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গতকাল তিনি মানবজমিনকে বলেন, ঐক্য প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি রয়েছে। মঙ্গলবারই এ ব্যাপারে একটি চুক্তি সই হতে পারে। কেন এই চুক্তি? কারণ এটা শুধু ক্ষমতার রদবদলের প্রশ্ন নয়। ঐক্য হতে হবে সুশাসনের জন্য, আইনের শাসনের জন্য, নাগরিক অধিকারের জন্য। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার পক্ষ থেকে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে ক্ষমতা পরিবর্তন হলে তাদের এক লাখ কর্মী নিহত হতে পারে। এমন পরিস্থিতি যেন কখনো না হয় সে ব্যাপারেও অঙ্গীকার থাকতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনে যারাই ক্ষমতায় আসে এতে কেউ আপত্তি করবে না। তিনি বলেন, আমি আশা করি সর্বদলীয় ঐক্যে বিএনপি যোগ দেবে। সেখানে জামায়াত থাকবে না। তবে ২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকতে পারে।
গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যারা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় এবং দেশের শুভ পরিবর্তন চায়, তাদের নিয়েই জাতীয় ঐক্য হবে। বিএনপির ব্যাপারে বলেন, দেশে কার্যকর গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ নির্বাচনসহ ঐক্য প্রক্রিয়ার কথাগুলো যেসব দল মানবে, তারাই এখানে যোগ দিতে পারবে। এসব দাবির সঙ্গে সরকার একমত হলে তারাও আসতে পারে।’ সর্বদলীয় জোটের ব্যাপারে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করলেও ২০ দলীয় জোটে জামায়াতের থাকা নিয়ে বিকল্প ধারার আপত্তি রয়েছে বলে একটি সূত্রের দাবি।  ওই সূত্র বলছে, বিকল্প ধারা চায় বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করেই সর্বদলীয় জোটে যোগ দিক। তবে বৃহৎ জোটের সম্ভাব্য অন্য দলগুলোর এ নিয়ে তেমন কোনো আপত্তি নেই। বৃহৎ জোটের আকৃতি কী হবে তা নিয়ে সম্ভাব্য দলগুলোর মধ্যে সংশয় থাকলেও যেকোনো ফরম্যাটে কাছাকাছি আসা নিয়ে বেশিরভাগ দলই আগ্রহী। জোট না হয়ে যুগপৎ আন্দোলনের সম্ভাবনাও রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে নানা কর্মসূচিতে মাঠে থাকতে চায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। আটটি বামপন্থি রাজনৈতিক দলের জোটও সেপ্টেম্বর মাস ধরে নানা কর্মসূচি পালন করবে। নির্বাচন কমিশন ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও দিতে পারে এ জোট। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশ থেকে বিএনপিও নতুন কর্মসূচি দিতে পারে। অন্যদিকে, আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার উদ্যোগ নিয়েছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। ওই সমাবেশে বিরোধী দলের নেতাদের এক মঞ্চে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
জোট অথবা যুগপৎ আন্দোলন- যাই হোক না কেন, রাজনীতি এখন নতুন এক টার্নিং পয়েন্টে। সক্রিয় পর্দার আড়ালের নানা মহল। আলোচনায় রয়েছে মালয়েশীয় মডেল আর ড. কামাল হোসেনের নামও। তবে পুনরায় বলা দরকার, বিরোধীদের জন্য রাজনীতি এখন অনেক কঠিন।

চামড়া ৩০০ টাকা, জুতা ৬০০০! by গোলাম মওলা

আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৩০ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি হচ্ছে। এ বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সরব। চামড়ার দাম কম কিন্তু চামড়াজাত জুতার দাম বৃদ্ধি নিয়ে অনেকে সমালোচনা করছেন। তারা বলছেন, মাত্র ৩০০ টাকার চামড়া থেকে তৈরি এক জোড়া জুতা ৬০০০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিষয়টিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। আবার কেউ কেউ ফড়িয়াদের কাছে চামড়া বিক্রি না করে মাটিতে পুঁতে রেখেছেন বলেও ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানাচ্ছেন।
প্রসঙ্গত, এবারের কোরবানির ঈদের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে সরকার চামড়ার দাম আগেরবারের চেয়েও কম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। অথচ কোরবানির পর এমন হয়েছে যে সেই দরও ঠিক থাকেনি। অর্থাৎ কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা হয়েছে সরকার-নির্ধারিত দরের চেয়েও কমে। এক লাখ টাকা দামের গরুর চামড়া এক হাজার টাকায়ও বিক্রি হয়নি। অথচ তিন-চার বছর আগে ৫০ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়াই কেনাবেচা হতো ২ থেকে ৩ হাজার টাকায়।
জানা গেছে, এক জোড়া জুতা তৈরিতে সাড়ে ৩ বর্গফুট চামড়া লাগে। এছাড়া আরও দেড় বর্গফুট চামড়া লাগে লাইনিংয়ের জন্য। সব মিলিয়ে জুতা তৈরিতে ৫ বর্গফুট চামড়া লাগে। এই ৫ বর্গফুট চামড়ার দামের সঙ্গে সোলের দাম, তার সঙ্গে কস্টিং খরচ, শ্রমিকদের খরচ যুক্ত করে হিসাব করলেই জুতার দাম বের করা সম্ভব।
কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়ে জহিরুল ইসলাম নামে একজন তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘বড়লোকদের ব্যবসায় ঘি ঢালতে ৫০০ টাকার জুতা ৬০০০ করা হয়, আর গরিবদের হক মারতে ৩ হাজার টাকার চামড়া ৩০০!’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে চামড়া থেকে তৈরি জুতা ছয় হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়, সেই চামড়ার দাম কেন মাত্র ৩০০ টাকা হবে?’
নিউ গ্রিন পার্টির চেয়ারম্যান রাজু আহম্মদ খান তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘যে দেশের জুতার দাম ৬ হাজার টাকা, অথচ চামড়ার দাম ৩০০ টাকা, সে দেশের সত্যিই মেরামত দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবারের কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য সত্যিই হতাশাজনক।’
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল মোজাম্মেল হক চৌধুরী তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘৮২ হাজার টাকা দামের মহিষের চামড়া ৬০ টাকায় বিক্রি না করে মাটিতে পুঁতে রাখলাম। ভালো করলাম না মন্দ করলাম।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘গত পাঁচ বছরে ক্রমাগত চামড়ার দাম কমলেও জুতার দাম কিন্তু বেড়েই চলেছে। বিষয়টি সত্যি অবাক হওয়ার মতো। পশুর ক্রয়মূল্যের সঙ্গে তার চামড়ার দামের সামঞ্জস্য নেই। আবার চামড়ার সঙ্গে জুতার বিক্রির মূল্যের সঙ্গতি নেই। দেশে দিনে দিনে চামড়ার মূল্য কমলেও জুতার মূল্য বাড়ছে। এটি গরিব ঠকানোর উদ্দেশ্যেই হচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চামড়ার দামের সঙ্গে জুতার দামের কোনও সম্পর্ক নেই। কারণ, কোনও জুতার মালিকই বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরাসরি চামড়া কেনেন না। শুধু তাই নয়, যারা চামড়া কেনেন, তাদের সঙ্গে জুতার মালিকদের কোনও সম্পর্কই নেই।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘চার স্তর পার হয়ে চামড়া ট্যানারি মালিকদের কাছে পৌঁছায়। ফলে পশুর মালিক চামড়া ৫০০ টাকায় বিক্রি করলেও ওই চামড়া ট্যানারি মালিকদের কিনতে হয় এক হাজার টাকার ওপরে। সরাসরি ট্যানারি মালিকরা চামড়া কেনেন না। তিন বা চার হাত পার হয়ে চামড়া যখন ট্যানারিতে আসে, তখন এর প্রসেসিং শুরু হয়। সেখানেই ২০-৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। চামড়া প্রসেসিং হলে মাত্র ২০ শতাংশ চামড়া যায় সু ফ্যাক্টরিতে বা জুতা তৈরির কারখানায়। সেই সু ফ্যাক্টরিরও ওয়ার্কার টিম কাজ করে। তাদের বেতনভাতা, সুযোগ-সুবিধাসহ বিভিন্ন ধরনের খরচ করতে হয়। ফ্যাক্টরিতে তারা জুতার যে দাম নির্ধারণ করে, বাজারে সেই দামে পাওয়া যায় না। তাদের কাছ থেকে বড় বড় ব্র্যান্ডের কোম্পানি কিনে নেয়। এখানেও সাত থেকে ১০ স্তর পার করে তারপর সেই জুতা তারা বাজারে ছাড়ে। সেখান থেকে আমি-আপনি সেই জুতা ৫ বা ৬ হাজার টাকায় কিনে আনি।’
মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যেসব কোম্পানি জুতা তৈরি করে বিদেশে রফতানি করে, সেই জুতার দামও ৫ হাজার টাকা পড়ে না। রফতানি করা প্রত্যেক জোড়া জুতার দাম পড়ে গড়ে ১৪ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ১২শ' টাকারও কম। ১২০০ টাকারও সেই জুতা বিভিন্ন দেশের বড় বড় কোম্পানি তাদের ব্র্যান্ডে নামে ১০০ ডলারে বা বাংলাদেশি টাকায় ৮ হাজার টাকায় বিক্রি করে। এখানে বাংলাদেশের চামড়া ব্যবসায়ীদের কী করার আছে? বিদেশিরা ১২০০ টাকার জুতা ৫ হাজার টাকায় কেন বিক্রি করে, তারা ভালো বলতে পারবেন। তবে এটা ঠিক যে তারা যেসব জুতা নেয়, তার সব বিক্রি হয় না। অনেক সময় অবিক্রীত থাকে ৭০ শতাংশ। ফলে ১০০ ডলারে না বিক্রি করলে তারাও লোকসানে পড়তে পারে।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যে চামড়া ৫০০ টাকায় কেনেন, সেই চামড়া তাদের কাছ থেকে তিন বা চার হাত বদল হয়ে আমাদের কাছে আসে। আমাদের কিন্তু এই চামড়া এক হাজারের ওপরে দাম দিয়ে কিনতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে চামড়া সংগ্রহ করা হয়, তা থেকে জুতা তৈরির জন্য ৩০ শতাংশও পাওয়া যায় না। কারণ, জুতা তৈরিতে উন্নতমানের চামড়া লাগে। আমরা এক হাজার ফুট চামড়া কিনলে সেখান থেকে ৩০০ ফুট চামড়া জুতার জন্য বের করা সম্ভব হয় না।’
সাখাওয়াত উল্লাহ আরও বলেন, ‘বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জুতা কিনতে ৫ হাজার টাকা লাগলেও দেশে স্থানীয় জুতা কিনতে ৫ হাজার টাকা লাগে না। এক হাজার টাকা বা ১২শ টাকায়ও পাওয়া যায়।’

মসজিদের মাইকে আজান ছাড়া শব্দ প্রচারে নিষেধাজ্ঞা ইন্দোনেশিয়ায়

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলমানদের দেশ ইন্দোনেশিয়াতে আজান ছাড়া মসজিদের মাইকে অন্য কোনও শব্দ প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে মানুষ যখন ঘুমাচ্ছে, বিশ্রাম নিচ্ছে অথবা নামাজ পড়ছেন। একই সঙ্গে নামাজের সময় মাইকের শব্দ না বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। মালয়েশীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্টার এখবর জানিয়েছে।
খবরে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার ধর্ম মন্ত্রণালয় আজান বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে। এতে দেশটির মসজিদগুলোতে কিভাবে আজান দেওয়া হবে তা সম্পর্কে নির্দেশনা রয়েছে।
আজানের উচ্চ শব্দ নিয়ে অভিযোগ করায় এক নারীকে কারাদণ্ড দেওয়ার সমালোচনার সময় ইন্দোনেশিয়ার ধর্ম মন্ত্রণালয় এসব নির্দেশনা জারি করলো। ২৪ আগস্ট এসব নির্দেশনা জারি করা হয়। ছয় দফা নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে-
১। মসজিদের মাইক অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালনা করতে হবে যাতে করে আজানের শব্দ মানুষের মনে মসজিদের প্রতি সম্ভাব্য বিদ্বেষ তৈরি না করে।
২। যারা আজান দেবেন তাদের অবশ্যই সমধুর ও ভালো কণ্ঠের অধিকারী হতে হবে।
৩। নামাজের সময় শব্দের মাত্রা বাড়ানো যাবে না।
৪। মানুষ যখন ঘুম, বিশ্রাম ও নামাজ আদায় করছে তখন আজান ছাড়া কোনও ধরনের শব্দ প্রচার করা যাবে না।
৫। আজানকে অবশ্যই মৌলিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে হবে। হতে হবে সমধুর ও কানের জন্য শ্রুতিমধূর।
৬। অবশ্যই উপযুক্ত সময়ে আজান দিতে হবে। যেমন: ভোরে। কোরান তেলাওয়াতে মসজিদের  ভেতরের স্পিকার ব্যবহার করতে হবে।
সম্প্রতি দেশটিতে আজানের উচ্চস্বর নিয়ে অভিযোগ করায় মেলিয়ানা নামের নারীকে ধর্ম অবমানায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে তার বাড়ির পাশের মসজিদে উচ্চস্বরের আজান নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন তিনি। কিন্তু গুজব ছড়ায় মেলিয়ানা আজান নিষিদ্ধ করতে চাইছেন। অনেক মুসলিম তখন বৌদ্ধদের মন্দিরে হামলা চালায়। ১৯৯৮ সালে চীনবিরোধী সহিংসতার পর এটাই ছিল সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সংঘাত।
মেলিয়ানার কারাদণ্ডের পর সিভিল সোসাইটি ও আইনজীবীরা রায়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সংগঠন নাহদাতুল উলামা শুক্রবার ঘোষণা দিয়েছে, মাইকের আজানের উচ্চস্বর নিয়ে আপত্তি জানানো ধর্ম অবমাননার আওতায় পড়ে না। বরং এরকম আপত্তিকে গঠনমূলক সমালোচনা হিসেবেই দেখা উচিত।
প্রায় চার কোটি সদস্যের সংগঠন নাহদাতুল উলামার আইন বিভাগের প্রধান রবিকিন এমহাস বলেছিলেন, মাইকে দেওয়া আজানের শব্দ অনেক বেশি, এমনটা বললে তাকে ধর্ম অবমাননা হিসেবে গণ্য করা যায় না। বরং ইন্দোনেশিয়ার মতো একটি বহুত্ববাদী সমাজে এমন অভিযোগকে মুসলমানদের গঠনমূলক সমালোচনা হিসেবেই দেখা উচিত।

রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে অপকর্ম করতো ইভটিজাররা by নাদিম হোসেন

সাভারে তরুণীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় কলেজছাত্র খুন হওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত ইভটিজাররা রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানার ব্যবহার করে এলাকায় অপকর্মে লিপ্ত ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সাভার পৌর এলাকার তালবাগ ও গেণ্ডা মহল্লার স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এরা (ইভটিজাররা) কখনও ছাত্রলীগ, কখনও তরুণ লীগ আবার কখনও যুবলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুন ঝুলিয়ে এলাকায় প্রচার প্রচারণা চালাতো। তবে সরকার দলীয় বিভিন্ন ব্যানার ব্যবহার করে টেন্ডারবাজিতে সহায়তা, চাঁদা আদায়, মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়সহ বিভিন্ন অপকর্ম করাই ছিল এদের মূল কাজ। এই গ্রুপের সদস্যদের সবার বয়স ২০ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে হলেও এদের মধ্যে অধিকাংশই লেখাপড়ার সঙ্গে জড়িত নয়। এদের স্থানীয়ভাবে মঞ্জু গ্রুপ বলেও ডাকা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাভার পৌর এলাকার তালবাগ মহল্লার রমিজ উদ্দিন ওরফে রইমার ছেলে মঞ্জু। স্কুলের গণ্ডি পেরুতে না পারলেও নিজেকে ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে দাবি করতো। এলাকায় বখাটে ও উচ্ছৃঙ্খল হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত সে। ২০১০ সালে ছাত্রলীগের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিল মঞ্জু। তবে ছাত্রলীগ নেতা না হতে পেরে বাংলাদেশ আওয়ামী তরুণ লীগের সাভার পৌর সভাপতি হিসেবে যোগ দেওয়ার চেষ্টা চালায়। এরপর থেকেই নিজ বাড়ির ভাড়াটিয়া মুস্তাকিন, টিয়াবাড়ি এলাকার রহিজ, গেণ্ডা এলাকার প্লাবন, শ্যামল, শামিম, ইমরান, মমিনসহ প্রায় ১০-১৫ জনকে নিয়ে গ্রুপ তৈরি করে সে। সরকার দলীয় সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে সড়কে মিছিল করতে দেখা যায় তাদের। আবার যুবলীগের কর্মী হিসেবেও নিজেকে দাবি করতো মঞ্জু। কখনও ছাত্রলীগ, কখনও তরুণ লীগ আবার কখনও যুবলীগ হিসেবে বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে এলাকায় প্রচারণা চালিয়ে বেড়াতো সে। আর এসবের আড়ালে টেন্ডারবাজিতে সহযোগিতা, কাঁচাবাজার থেকে চাঁদা আদায়, মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায়সহ এলাকায় স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করেই সময় কাটাতো এরা।
সাভারের টিয়াবাড়ী এলাকার ফারুক হাসান নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘বেশ কয়েক মাস আগে গেণ্ডা এলাকার কাঁচাবাজার নিয়ে বখাটে শুভ, আরিফ ও মঞ্জু গ্রুপের লোকজনের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয়। এরই জের ধরে পিটিয়ে আমার ডান পা ভেঙে দেয় তারা।’
অন্যদিকে তালবাগ এলাকার সামছুল হক নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘মঞ্জু এলাকায় উচ্ছৃঙ্খলভাবে চলাফেরা করে। গেণ্ডা কাঁচাবাজার এলাকার বিভিন্ন দোকান থেকে চাঁদা আদায় করত। এছাড়াও এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিক ও নিরীহ মানুষকে বিভিন্ন অজুহাতে জিম্মি করে টাকা আদায় করে সে।’
তিনি আরও জানান, কেউ প্রতিবাদ করতে চাইলে ছাত্রলীগ ও তরুণ লীগ নেতা পরিচয় দিয়ে তাদের মারধরের হুমকি দিত মঞ্জু গ্রুপের লোকজন। এ কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে তাদের অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতো।
একই ধরনের অভিযোগ করেন টিয়াবাড়ি এলাকার মুদি দোকানি লিটন মিয়া। এ প্রসঙ্গে তালবাগ এলাকার বছির উদ্দিন ও আলাল হোসেন বলেন, ‘মঞ্জু গ্রুপের লোকজন সরকার দলীয় বিভিন্ন ব্যানার ব্যবহার করে এলাকায় অপকর্ম করত। গেণ্ডা বাসস্ট্যান্ড থেকে টিয়াবাড়ি এলাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দোকানপাট থেকে অনুষ্ঠানের কথা বলে টাকা আদায় করতো। টাকা দিতে না চাইলে মারধরের ভয় দেখাতো এই গ্রুপের বখাটে ছেলেরা। তারা এলাকায় ছিনতাইয়ের সঙ্গেও জড়িত।’ এছাড়া এই গ্রুপের ছেলেরা স্কুল-কলেজের মেয়েদের যাওয়া-আসার পথে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতো বলেও অভিযোগ তাদের।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলার পর সাভারের তালবাগ এলাকার মঞ্জুর বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কাউকে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও টিয়াবাড়ি এলাকার জাহাঙ্গীরের বাসার ভাড়াটিয়া রহিজের বাড়িতে গিয়েও মূল ফটকে তালা ঝুলতে দেখা যায়।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুর রহমান বলেন, ‘মঞ্জু ছাত্রলীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাঝে মধ্যে আসত। তবে ছাত্রলীগের লোক দাবি করে এলাকায় অপকর্ম করার বিষয়ে কিছু জানি না। মঞ্জু ছাত্রলীগের কোনও কর্মী নয়।’ এছাড়াও এই ঘটনার সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, তার শাস্তি দাবি করেছেন এই ছাত্রলীগ নেতা।
বাংলাদেশ আওয়ামী তরুণ লীগের ঢাকা জেলার আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খাজা বলেন, ‘তাদের সাভার পৌর কমিটি দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আর ওই কমিটিতে মঞ্জু সভাপতি প্রার্থী ছিল। তার বিরুদ্ধে গেণ্ডায় কাঁচাবাজার থেকে টাকা আদায়সহ একাধিক অভিযোগের কথা শুনেছি। এ কারণে তাকে এখনও কমিটিতে কোনও পদ দেওয়া হয়নি।’ এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।
এ ব্যাপারে সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অপূর্ব দাশ বলেন, ‘মঞ্জু গ্রুপের একজনকে আটক করা হয়েছে। তবে একজনকে আটক করার বিষয়টি গ্রুপের অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তারা গা-ঢাকা দেয়।’ তবে তাদের গ্রেফতারের জন্য বিভিন্ন এলাকায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত, ২১ আগস্ট রাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের উলাইল গরুর হাটের সামনে দিয়ে এক তরুণী হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় ওই গরুর হাটের কাজের জন্য থাকা স্থানীয় বখাটে মঞ্জু, শ্যামল ও প্লাবনসহ বেশ কয়েকজন ওই তরুণীকে উত্ত্যক্ত করে। পরে ওই তরুণীর সহপাঠী মারুফ এ ঘটনার প্রতিবাদ করে। এর কিছুক্ষণ পরই মারুফ রাজাবাড়ী এলাকায় পৌঁছালে বখাটেরা তার পথরোধ করে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা মারুফকে উদ্ধার করে প্রথমে এনাম মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই রাতেই নিহতের ভাই লুৎফর রহমান খান বাদী হয়ে শ্যামল, মঞ্জু, প্লাবন, রহিজ, শামীম, ইমরান ও মমিনসহ ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করে সাভার মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এই ঘটনায় আসাদুল নামে এক যুবককে আটক করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার বন্ধ হয়নি, পরিবর্তন আসছে কর্মী নিয়োগে by চৌধুরী আকবর হোসেন

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার বন্ধ হয়নি। তবে, বিদ্যমান পদ্ধতিতে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নেবে না দেশটি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে দেশটি পরিবর্তন আনছে। অভিবাসী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার সিন্ডিকেট অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে—এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিবর্তন আনছে দেশটি। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো সূত্র এসব তথ্য জানা গেছে।
ড. মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর অভিযোগ পাওয়া গেছে, গত দুই বছরে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যোগসাজশে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিকদের পাঠানোর ক্ষেত্রে দুই বছরে কমপক্ষে ২০০ কোটি রিঙ্গিত (৪ হাজার ৮০ কোটি ৩ লাখ টাকা ) হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগের তদন্ত ও  শ্রমিক পাঠানোর পদ্ধতি পরবর্তনে সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি। আগস্ট মাসে এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে জানায় মালয়েশিয়া।
জানা গেছে,  দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সালে সরকারি পর্যায়ে (জি টু জি) পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি  নেওয়া শুরু করে মালয়েশিয়া। ২০১৬ সালে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বয়ে ‘জি টু জি প্লাস’ পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার সমঝোতা হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি এই সমঝোতা চুক্তির আওতায় দশটি জনশক্তি রফতানিকারক এজেন্সিকে লোক পাঠাতে অনুমোদন দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ মালয়েশিয়া স্থগিত করেছে বলে দেশটির গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। দেশটির সংবাদ মাধ্যম স্টার অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়,  বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে  মাথাপিছু দুই হাজার রিংগিত খরচ হবে, কিন্তু এজেন্টরা বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছ থেকে ২০ হাজার রিংগিত আদায় করেন।  প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১০টি এজেন্সি সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। এ সিন্ডিকেট পকেটে ২০০ কোটি রিংগিত গত দুই বছরে গিয়েছে। আর এ অভিযোগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ স্থগিত থাকবে।
জানা গেছে, আলোচিত এই  ১০ প্রতিষ্ঠান হলো বায়রার সাবেক সভাপতি নুর আলীর ইউনিক ইস্টার্ন, বায়রার সাবেক সভাপতি গোলাম মোস্তফার প্রান্তিক ট্রাভেলস, বায়রার সদ্য বিলুপ্ত কমিটির মহাসচিব রুহুল আমিনের মালিকানাধীন ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল, বদরুল আমিনের ক্যারিয়ার ওভারসিজ, আরিফুল ইসলামের আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স, শেখ আবদুল্লাহর সনজরী ইন্টারন্যাশনাল, মোহাম্মদ বশিরের রাব্বী ইন্টারন্যাশনাল, আরিফ আলমের প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটস, ব্যবসায়ী রুহুল আমিনের আমিন ট্যুরস ও জয়নাল আবেদিনের আল ইসলাম ওভারসিজ।
এদিকে, মালয়েশিয়া অভিবাসী কর্মী নিয়োগে সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের আহবান জানিয়েছে  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রবিবার (২৬ আগস্ট) এক বিবৃতিতে জনশক্তি রফতানিতে একচেটিয়া ও সিন্ডিকেটভিত্তিক অনৈতিক ব্যবসা বন্ধে মালয়েশিয়া সরকারের এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখার জন্য সরকারের কাছে আহবান জানান টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, ‘এর মাধ্যমে মালয়েশিয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইতিবাচক ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনার মাধ্যমে পুনরায় অভিবাসী কর্মী পাঠানোর সুষম সুযোগ তৈরির পথ সুগম হয়েছে। এটাও পরিষ্কার—এ সুযোগ গ্রহণের পূর্বশর্ত হচ্ছে পুরো খাতকে সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত করা। একইসঙ্গে যারা অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।’
বর্তমানে  বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক পাঠানো ১০টি প্রতিষ্ঠানের একটি ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সদ্য বিলুপ্ত কমিটির মহাসচিব মো. রুহুল আমিন স্বপন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার বন্ধ হয়নি, শুধু পদ্ধতিগত পরিবর্তন আসছে। যারা ভিসা পেয়েছেন, তারা যাবেন এতে কোনও বাধা নেই। আগে একজন শ্রমিক পাঠাতে ৪টি ধাপে কাজ করতে হতো। এগুলো পৃথক পৃথক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করতে হতো। কিন্তু এখন পদ্ধতি পরিবর্ততনের ফলে এই ৪টি ধাপ একটি প্রতিষ্ঠানই করতে পারবে।’
১০টি রিক্রুট এজেন্সিদের বাধ্যবাধকতা প্রসঙ্গে মো. রুহুল আমিন স্বপন বলেন, ‘এ বিষয়ে মালয়েশিয়া  কথা বলেছে, কিন্তু কী পদ্ধতি হবে, সেটি  এখনও পরিষ্কার করা হয়নি।’
সিঙ্গাপুরে থাকায় এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলামের মন্তব্য জানা যায়নি। তবে, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. সেলিম রেজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়নি। শ্রম বাজার বন্ধের যে খবর ছড়িয়েছে, তাও ঠিক নয়। তবে  কর্মী  নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসবে। কী পরিবর্তন হবে, কীভাবে হবে, সে বিষয়ে  মালায়শিয়া অফিসিয়ালি আমাদের জানায়নি। তবে যারা আগে ভিসা পেয়েছেন, তাদের মালায়শিয়া যেতে কোনও বাধা নেই।’