Thursday, September 18, 2014

আ.লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে দ্বিধান্বিত: ইমরান

বর্তমান আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ নয়, বরং বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে যে রাজনীতি শুরু হয়েছিল, তারা সে রাজনীতিই করছে।
আজ বৃহস্পতিবার শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে এ মন্তব্য করেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। তিনি বলেন, ‘বলতে বাধ্য হচ্ছি, আজকে এই সরকার, এই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পঁচাত্তরের পর যে রাজনীতি শুরু হয়েছিল, সেই রাজনীতি করে যাচ্ছে। এ কারণেই তাঁরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার ক্ষেত্রে সব সময় দ্বিধান্বিত।’
ইমরান বলেন, ‘বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতাও “মহান” সংসদ নিয়েছেন। কিছুদিন আগেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি বাদে সবাইকে টাকা দিয়ে কেনা যায়। তার মানে অপেক্ষা করছি, যাঁদের টাকা দিয়ে কেনা যায়, তারাই ভবিষ্যৎ​ বিচারকদের নিয়োগ দেবেন।’
বিকেল চারটা থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সমাবেশে বিভিন্ন বাম এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা যোগ দেন। তাঁরা স্লোগান তোলেন, ‘দেইল্লা চোরার ফাঁসির রায়, বেইচা দিলি কয় টাকায়’, ‘রং বেরংয়ের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’।

সমাবেশের সময় গণজাগরণ মঞ্চের কামাল পাশা চৌধুরী-সমর্থিত অংশটির নেতারা জাদুঘরের সামনে উত্তর পাশে উপস্থিত থাকলেও তাঁরা আলাদা কোনো কর্মসূচি পালন করেননি। তবে বেলা ১১টার দিকে ‘শাহবাগ আন্দোলন’ ব্যানারে দুই অংশের বাইরে পাঁচটি বাম ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ করেন। সন্ধ্যায় তাঁরা শাহবাগ থেকে মশাল মিছিলও করেছেন।
গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশে যুব ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান বলেন, সাঈদীর এমন একটি রায় দেওয়া হয়েছে যাতে জনগণের করের টাকায় তাঁকে সারা জীবন পুষতে হয়। স্বৈরাচারী এরশাদ ও জিয়ার সংসদেও এমন কেউ ছিল না, যারা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ধিক্কার জানাই এই সংসদে এমন কেউ নেই যে বাংলাদেশের মানুষের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি করতে পারে।’
ইমরান এইচ সরকার সংবিধানের ৪৯ ধারার সমালোচনা করে বলেন, এই ধারা অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি যেকোনো অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। অতীতে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত অপরাধীদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। কোনোভাবেই যাতে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে এ ধারা ব্যবহার করা না যায়, সে জন্য এই ধারা বাতিল করতে হবে।
সাংসদদের সমালোচনা করে ইমরান বলেন, ‘যখন যুদ্ধাপরাধীরা নানা রকম তাণ্ডব করে, বিচার যখন রাতের অন্ধকারে পরিবর্তন হয়ে যায়, তখন কিন্তু সাংসদদের দেখি না বক্তব্য দিতে। গতকালকে দেখলাম এই সাংসদরা, মন্ত্রীরা অনেকে হাততালি দিয়েছেন। বলেছেন, খুব ভালো রায় হয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতারাও এই রায়কে সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছেন।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের দপ্তর সম্পাদক নাসিরউদ্দিন প্রিন্স বলেন, বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে নেওয়ার মাধ্যমে তাদের ন্যূনতম যে স্বাধীনতা ছিল, তা-ও হরণ করা হয়েছে। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে সম্প্রচার নীতিমালা করা হয়েছে।
সমাবেশে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক জি এম জিলানি, ব্লগার আরিফ জেবতিক, উদীচীর সহ সাধারণ সম্পাদক জমশেদ আনোয়ার প্রমুখ বক্তব্য দেন। সমাবেশ সঞ্চালনা করেন ব্লগার মারুফ রসূল।
কাল শুক্রবার বিকেল চারটায় শাহবাগে গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের প্রকৃত অবস্থা দেখেন -প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেশের মানুষের প্রকৃত অবস্থা দেখে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। আজ বৃহস্পতিবার দশম সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সমাপনী দিনের বক্তৃতায় তিনি এ আহ্বান জানান। রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘একদিন বের হয়ে দেখেন। মানুষ কীভাবে বেঁচে আছে। আপনাকে এ বিষয়ে কেউ বাস্তব কথা বলবে না। সবাই গা বাঁচিয়ে চলবে। আপনাকে নিজের চোখে গিয়ে দেখতে হবে।’

রওশন এরশাদ আরও বলেন, ‘আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। আপনি দেশের কথা, জনগণের কথা ভাবেন না কেন? আপনারা এ নিয়ে তিনবার ক্ষমতায়। কেন খাদ্যে ও ওষুধে ভেজালের ওপর গুরুত্ব দেননি। ভুয়া ডাক্তারের কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ভেজাল ওষুধ খেলে কি রোগী বাঁচবে। খাদ্যে বিষ বন্ধ না করতে পারলে আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা হলেন কীভাবে? আপনি দেশকে ভালোবাসেন না? আপনি চাইলে এক দিনেই ফরমালিন বন্ধ করতে পারেন। এখন কোরবানির গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে, হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে। মুরগিকে খাওয়ানো হচ্ছে ট্যানারির বর্জ্য। এগুলো যারা খাবে, নির্ঘাত তার মৃত্যু হবে। খাদ্যে বিষক্রিয়ায় প্রতি বছর ৪৫ লাখ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আপনি কেবল আওয়ামী লীগের নয়, সারা দেশের প্রধানমন্ত্রী। সারা দেশের কথা ভাবতে হবে।’
বন্যায় দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে এবং এর আর্থিক মূল্য এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করেন রওশন এরশাদ। তিনি কৃষকদের ঋণ না দিয়ে আর্থিক সাহায্য, বিনা মূল্যে সার ও বীজ সরবরাহের অনুরোধ জানান।
দরিদ্রদের জন্য সরকারের আবাসন প্রকল্পের সমালোচনা করে রওশন এরশাদ বলেন, এসব আবাসন প্রকল্প না করে ছোট ছোট শিল্প কারখানা তৈরি করতে হবে। এতে দরিদ্ররা নিজেদের আবাসন নিজেরাই তৈরি করে নিতে পারবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করে আবাসনের ব্যবস্থা করে দিলে তারা না খেয়ে খালি পেটে বাড়িতে বসে থাকবে?
প্রধানমন্ত্রীর বাসার বিদ্যুৎ যায় না, লোডশেডিং কীভাবে বুঝবেন
বিরোধীদলীয় নেতা জানান, বিদ্যুৎ খাতে বছরে লুটপাট হয় দেড় হাজার কোটি টাকা। বছরে ২২০ কোটি টাকার তিন কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হচ্ছে। বিদ্যুতে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিল বকেয়া। বিদ্যুতের লোডশেডিং সম্পর্কে রওশন এরশাদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বাসার বিদ্যুৎ তো যায় না। তিনি কীভাবে বিদ্যুতের লোডশেডিং বুঝবেন।
ব্যাংক ও আর্থিক খাত সম্পর্কে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ব্যাংকগুলো থেকে বিভিন্ন কোম্পানি তিন দশকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি ঋণ নিয়েছে। সরকার আদায় করতে পারবে না বলে এগুলোকে এখন আল্লাহর ওয়াস্তে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এনামে-সেনামে ঋণ নিয়ে তারা দেশ ছেড়ে চলে গেছে।
রওশন এরশাদ বলেন, ঢাকার বাইরে প্রতিটি মহাসড়কের অবস্থা বেহাল, চলাচলের অযোগ্য। দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। চালকেরা পয়সা দিয়ে লাইসেন্স নিয়েছে, যে কারণে অবিরাম দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। ঢাকা চলাচলের অযোগ্য। রাস্তার দৈর্ঘ্য ২ হাজার ২৮৯ কিলোমিটার। রাস্তার সংখ্যা ৪ হাজার ১০৭টি। ৬০ শতাংশ রাস্তা চলাচলের অযোগ্য। ফুটপাত হকারদের দখলে। যানজট তো আছেই। গুলশান থেকে মতিঝিল যেতে আসতে আট ঘণ্টা সময় লাগে। এর বিকল্প একটা কিছু করতে হবে।
সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের প্রসঙ্গ তুলে রওশন এরশাদ বলেন, ছোটকালে বাবার, যৌবনে স্বামীর, বৃদ্ধ বয়সে ছেলের কাছে থাকতে হয়। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
শিক্ষার মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন রওশন এরশাদ। তিনি বলেন, লাখে লাখে জিপিএ পাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস করতে পারছে না।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে রওশন এরশাদ বলেন, ‘আপনার কাছে আমার দাবি, আমার কথা আপনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। দেশের জন্য, জনগণের জন্য ভাবতে হবে।’

এই দুনিয়ায় আসল ভালো নকল ভালো by সৈয়দ আবুল মকসুদ

গত শুক্রবারের একটি দৈনিকের প্রথম পাতার একটি খবরের শিরোনাম: ‘সাভারে পাঁচ ভুয়া ডিবি পুলিশ আটক’। শেষ পাতায় আরেক খবরে বলা হয়, র্যাবের মোবাইল কোর্ট সাভারেই ভুয়া দন্ত চিকিৎসকদের চেম্বারে অভিযান চালিয়ে ১০ জন ভুয়া ‘দন্ত চিকিৎসককে’ দণ্ড দিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো ডিগ্রি তো নেই-ই, এসএসসি পর্যন্ত পাস করতে পারেননি। ...তাঁদের নামের শেষে আবার বিভিন্ন ইংরেজি শব্দে লেখা নানা ‘ডিগ্রি’। বছরের পর বছর ধরে তাঁরা করছেন ‘দন্ত চিকিৎসা’। তাঁদের চেম্বারের দেয়ালে টাঙানো বিভিন্ন সনদ। বাংলার মাটিতে মানুষটির চেয়ে একটি সনদের দাম বেশি। সে জন্য সনদ জোগাড়ের হিড়িক পড়েছে।

একই সময় পাঁচ সচিবের মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিলের সংবাদও কাগজে এসেছে। অন্যান্য পেশার ভুয়ার সঙ্গে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার পার্থক্যটা এখানে যে, অন্যান্য ভুয়া ধরা পড়লে তাদের কোমরে দড়ি পড়ে, হাতে হাতকড়া এবং ঢুকতে হয় গিয়ে শ্রীঘরে; কিন্তু ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সে ভয় নেই। কারণ, এ মাটিতে আসল ভালো নকল ভালো। শুধু এই পাঁচ সচিব নন, ‘এর আগে ১৮২ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার সনদ গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের সনদ বাতিল করা হয়।’ তবে ভুয়া ডিবি, ভুয়া পুলিশ অফিসার, ভুয়া র্যাব, ভুয়া দন্ত চিকিৎসক, ভুয়া সাংবাদিক, ভুয়া চাকরিদাতা, ভুয়া ম্যাজিস্ট্রেট প্রভৃতির মতো কেউ হাজতে যাননি।
সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মুক্তিযোদ্ধার সনদপ্রাপ্তির আগে যে প্রস্তুতিপর্ব গেছে, সেটি ছিল খুবই নাটকীয়। মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা শোনার পর তাঁরা আর স্থির থাকতে পারেননি। হঠাৎ এক রাতে ধর্মপত্নীকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে বললেন: গত ২৬ বছর তোমাকে একটা কথা কই নাই।
কী সে কথা? উৎকণ্ঠার সঙ্গে স্ত্রী মনে মনে বলেন, অতীত জীবনের প্রেম-ট্রেমের কথা নাকি! বিয়ের আগে কোনো সহপাঠী বা মামাতো-খালাতো কারও সঙ্গে কিছু হয়েছিল কি না, সে সন্দেহও জাগে।
সহধর্মিণীর চোখেমুখে উদ্বেগ লক্ষ করে কর্তা বলেন, ডরাইও না। কোনো খারাপ কথা না।
সন্ধ্যায় সুপার মার্কেটে গিয়ে প্রচুর কেনাকাটা করে বেগম সাহেবা ক্লান্ত। আজকাল প্রায়ই মাথা ধরে। সিঙ্গাপুরে চেকআপে যাওয়া দরকার। বলেন, কী কথা, তাড়াতাড়ি কও। আমি ঘুমাব।
বাতি নিভিয়ে ডিমলাইটটা জ্বালিয়ে কর্তা অমোঘ স্বীকারোক্তির মতো বলেন, আসলে আমি একজন একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা। বিবর্ণ আলোয় তিনি কথাটি বললেন বটে, কিন্তু হঠাৎ তাঁর বুকটা কেঁপে ওঠে।
বেগম সাহেবা বলেন, কও কী? তুমি না বলছিলা ওই বছরই তোমার খুব ধুমধাম কইরা খাতনা হয়?
কর্তা বলেন, তাতে কী? কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধার সনদ পাইতেছি।
একদিন সনদ নিয়ে বাড়ি ফেরেন কর্তা। তাঁর মনোবল একজন মুক্তিযোদ্ধার মতোই বেড়ে যায়। একটা বীর বীর ভাব! গিন্নিকে বলেন, ড্রয়িং রুমের শোকেস তো হাবিজাবি ক্রেস্ট-ট্রেস্ট দিয়া ভইরা ফেলাইছ। এই সার্টিফিকেট বাঁধাই কইরা রাখবা। কেউ ঘরে ঢুকলেই যাতে চোখে পড়ে। সনদের ৫০টি ফটোকপি করা আছে।
কয়েক দিন পর কানাডাপ্রবাসী এক শালা আসেন। তিনি দেয়ালে তাকিয়ে বলেন, দুলাভাই, মুক্তিযোদ্ধার এই সার্টিফিকেট পাইলেন কই?
বোকার মতো কথা কইও না মিয়া—তিনি কথা শেষ না করতেই শ্যালকের মেজো আপা বলেন, তোর দুলাভাই তো বীর মুক্তিযোদ্ধা। শোনোস নাই?
রাতে খাওয়ার সময় শ্যালক আবার ওই প্রসঙ্গ পাড়েন। বলেন, আপনারা কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেন?
কর্তা বলেন, তোমার ওই সেক্টর-টেক্টরের কথা ছাইড়া দেও। আমাদের গ্রামে নদীর পাড়ে শ্মশানঘাটে পাকসেনাদের সাথে তুমুল যুদ্ধ হয়। আমরাই করি। রাইফেল নিয়া ক্রলিং করতে করতে আধা কিলোমিটার যাই। বুকটুক সব ছিলা গেছিল। বলতে বলতে শ্যালকের প্লেটে বড় পাবদা মাছটা তুলে দেন।
আবার বলেন, তবে কথা কি জানো তুতুল মিয়া, পাকসেনাদের ভয় করি নাই। ডরাই এখন পত্রপত্রিকারে। স্লারা কিছুই ছিঁড়তে পারব না, কিন্তু ঝামেলা বাধাতে ওস্তাদ।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে ডায়াবেটিস-ব্লাডপ্রেশার কোলেস্টেরলের একমুঠ ট্যাবলেট খেয়ে কর্তা বলেন, তবে চিন্তা নাই। আসতেছে সম্প্রচার নীতিমালা। আমরাই ড্রাফট করছি। গলা চিপা ধরুম। এর পরে আসতেছে পম্প্রচার নীতিমালা।
শ্যালক বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা তো বুঝলাম। পম্প্রচার নীতিমালাটা কী?
কর্তা বলেন, পম্প্রচার নীতিমালা হলো পত্রিকা নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি। একটু এদিক-ওদিক হইলেই সাংবাদিকদের ফাটকে ঢোকানো যাইব। দুই-চারটা সম্পাদককে জেলে ঢুকাইলেই সব ঠান্ডা হইয়া যাইব।
শ্যালক অট্টহাসি দিয়ে বলেন, ভালোই তো, সম্প্রচার নীতিমালার মতো পম্প্রচার নীতিমালা। তিনি তাঁর ল্যাপটপ নিয়ে তাঁর ঘরে গিয়ে ঢোকেন।
দুলাভাই যে মুক্তিযোদ্ধা, এ কথা বোকাসোকা ধরনের তুতুল মিয়াও বিশ্বাস করেন না। বিশেষ করে তাঁর মনে পড়ে, তাঁর মরহুম বাবা ছিলেন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। জামাই সনদ জোগাড় করায় তাঁর আত্মা কষ্ট পাবে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার চেয়েও বেশি। কারণ, ওই আত্মা রোজকিয়ামত পর্যন্ত পাকিস্তানে বিশ্বাস করবে।
৫ জানুয়ারির সরকারের এক মন্ত্রী বলেছেন, তাঁরা অগণিত ব্যাপারে কাজ করবেন, সেগুলোর একটি ‘মুক্তিযোদ্ধা’র ডেফিনেশন বা সংজ্ঞা নির্ণয়। ৪৩ বছরে পানি বহুদূর গড়িয়েছে। কাগজপত্র উইয়ে খেয়েছে। স্মৃতিশক্তি ঝাপসা হয়ে গেছে। অত দিন আগে কে কী ছিল, প্রমাণ করা কঠিন। অনাগত সংজ্ঞায় মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক বা উপপ্রধান অথবা সেক্টর কমান্ডাররাও বাদ পড়তে পারেন। বরং বহু শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান-মেম্বর গোঁফে তা দিচ্ছেন। তাঁদের ভাগ্য খুলতে পারে। যুক্তির কোনো অভাব হবে না। সংজ্ঞাদাতারা বলবেন, ওই চেয়ারম্যান বহু মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে পাকসেনাদের কর্নেলের ক্যাম্পে তিন যুবতীকে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তা ছাড়া, ডেফিনেশনের কথা শুনে আমার আরেকটি ধারণা হয়েছে। কোন দেশে মুক্তিযোদ্ধার কী ডেফিনেশন, তা সরেজমিনে জেনে আসার জন্য কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের ডেলিগেশন লন্ডন, নিউইয়র্ক, প্যারিস, বার্লিন ঘুরে আসবে শিগগিরই। আমরা ফিলোসফিতে থিওরি অব ডেফিনেশন পড়েছি। চিন্তাকে স্বচ্ছ করতে প্লেটোর সময় থেকে কোনো বিষয়ের সংজ্ঞা নিয়ে চর্চা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ণয়ের উদ্যোগকে আমি অন্তত স্বাগত জানাই।
নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে রচিত রিপোর্টে জানা যাচ্ছে: ‘দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) অনুমোদন না নিয়ে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী তাজুল ইসলামের একক ক্ষমতাবলে গেজেট ও সাময়িক সনদ নিয়েছিলেন চার সচিব ও একজন যুগ্ম সচিব।’ [প্রথম আলো] কেন ৪২ বছর পরে সনদ নেওয়ার আগ্রহ এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে, তার কারণও কাগজের প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। ‘মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও পোষ্যদের বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। এসব সুযোগ-সুবিধা নিতে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়েও অসৎ উপায়ে গেজেটে নাম উঠিয়ে সনদ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।’ [সমকাল, ১৫ সেপ্টেম্বর]
যাঁদের সনদ বাতিল হয়েছে, তাঁরা যে খুব লজ্জিত বা বিব্রত, তা নয়। পাঁচ সনদ প্রাপকের একজন মোল্লা সাহেব সমকালকে বলেছেন, সনদ তিনি চেয়েছেন এবং পেয়েছেন। ‘তার জন্য তিনি দায়ী হতে পারেন না। এ দায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয় কেন নিয়মকানুন অনুসরণ করেনি।’ আমরাও একমত। সনদ যিনি চাহিবা মাত্র পেয়েছেন এবং যিনি দিয়েছেন উভয়ই শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। তবে এ রাষ্ট্রে তাঁদের কারোরই শাস্তি হবে না। একাত্তরের লাখ লাখ শহীদের আত্মার অভিশাপ শুধু বর্ষিত হবে তাঁদের ওপর।
নকল ‘সোনা’ দিয়ে তৈরি মেডেল বিদেশি বন্ধুদের গলায় পরিয়ে দিয়ে বিশ্ববাসীর সঙ্গে যে বাটপারি আমরা করেছি, গত আড়াই হাজার বছরে ওই জাতীয় সংঘবদ্ধ প্রতারণা পৃথিবীর আর কোনো দেশে হয়নি। অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য ৭২ ঘণ্টাই যথেষ্ট সময়। কেউ ধরা পড়েনি। ২০৪১ সালের আগে কারও ধরা পড়ার সম্ভাবনা নেই। জাতির জীবনের কোনো মহত্তম বিষয় নিয়ে যখন ধড়িবাজেরা ব্যবসা করে, তখন ওই জিনিসটির মহিমা শেষ হয়ে যায়।
কোনো সমাজ তখনই ভুয়াতে ভরে যায়, যখন সেখানে আসলকে করা হয় অসম্মান। আসল হয় অবহেলিত। ফলে আসল প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়—প্রভুত্ব করে ভুয়ারা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

জাতিসংঘের ৬৯তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন। ২১শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেন। ২৩শে সেপ্টেম্বর থেকে তার সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে চলবে ২৮শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল পররাষ্ট্র দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করে মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সচিব মো. শহীদুল হকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। ৫ই জানুয়ারীর একতরফা নির্বাচনে তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর শেখ হাসিনা এই প্রথম জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন। বিশ্ব পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আসন্ন অধিবেশনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পেশাদার কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। এ কারণে এবারে বেশ বড় ডেলিগেশন নিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। মোট কতজন তার সফরসঙ্গী হচ্ছেন- জানতে চেয়ে একাধিক প্রশ্ন আসে সংবাদ সম্মেলনে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী সঠিক সংখ্যা প্রকাশ না করে বলেন, অর্থ, পররাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, প্রবাসী কল্যাণ, পরিবেশ ও বন, খাদ্যমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ প্রায় ৫০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে যাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো না হলেও সফর প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রী, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, সংসদ সদস্য, সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা, বিশিষ্ট বক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, নিরাপত্তা ও মিডিয়া টিম এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল (নিজ খরচে) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন। সব মিলে এ সংখ্যা ১৭০’র বেশি হবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। স্বাধীনতার পর এত বৃহৎ ডেলিগেশন এবারই প্রথম। সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রীর সফরের পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রায় সব সদস্যই জাতিসংঘ অধিবেশনের বিভিন্ন পর্বে অংশ নেবেন। ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনকে সামনে রেখে গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ৬৮তম জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইড লাইনে সংস্থার মহাসচিব বান কি-মুনের সঙ্গে ১৫ মিনিটের একটি বৈঠক হয়েছিল। বৈঠকে স্থায়ীস্থ কম হলেও এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। ওই বৈঠকেই বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার তাগিদ পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন মুন। বিশ্ব বিবেকের আহ্বান সত্ত্বেও দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোন সমঝোতা হয়নি। বরং বিরোধী প্রধান জোট ও দলগুলোকে বাদ দিয়ে এখানে একটি নির্বাচন হয়েছে। এর ১৫৪ আসনে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতারই প্রয়োজনই পড়েনি। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বান কি-মুন তার অবস্থানেই অটল রয়েছেন। সম্প্রতি আবারও তিনি সংলাপ ও সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে এবার মুনের সঙ্গে কোন বৈঠক প্রস্তাব করা হয়েছে কিনা জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিক। পররাষ্ট্র মন্ত্রী তা স্পষ্ট করেননি। অবশ্য সফর প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক বৈঠক না হলেও একটি অনুষ্ঠানে  শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মুন। প্রধানমন্ত্রী সেই অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন এটা প্রায় নিশ্চিত।

সংবাদ সম্মেলনে যা বলা হয়েছে: পররাষ্ট্র দপ্তরের আনক্লজ সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর এই প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসছে। এটি সরকারের ভাবমূর্তি উপস্থাপনের একটি সুযোগ হতে পারে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, নিয়মিত অধিবেশনে ভাষন দেয়া ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সঙ্গে বৈঠক করবেন। সাইড লাইনে চিলি, কাতার, নেপাল ও বেলারুশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গেও তার বৈঠকের আলোচনা চলছে। ২৭ শে সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দেয়ার সময়ক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন আয়োজিত জলবায়ু সম্মেলনে ২৩ শে সেপ্টেম্বর, বৈশ্বিক শিক্ষা নিয়ে ২৪ শে সেপ্টেম্বর, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম নিয়ে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে ২৬ শে সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেয়ার কথা রয়েছে বলেও জানান মাহমুদ আলী। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য পদ লাভের ৪০ বছরপূর্তি  উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও শেখ হাসিনার বক্তৃতা করার কথা রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
জলবায়ু ও অভিবাসী শ্রমিকের অধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে ভাষণে: আসন্ন সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে ২০১৫ পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডার পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু ও অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘ডেলিভারিং অন এ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টিং এ ট্র্যান্সফরমেটিভ পোস্ট-২০১৫ ডেভেলপমেন্ট এজেন্ডা’। অধিবেশনে জাতিসংঘের পোস্ট মিলিনিয়াম গোলস-এর (এমডিজি) একটি প্রস্তাবনা আনা হতে পারে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, অতীতের বছরগুলোর মতো এবারও প্রধানমন্ত্রী বাংলায় ভাষণ দেবেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি বিষয়ের অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন।

‘সংশোধনীতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হুমকির মুখে’

বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে দিয়ে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। সমিতির সভাপতি সিনিয়র এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন,  বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে  ফেলতে এই সংশোধন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারকে এ জন্য একদিন জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আজ এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। এসময় সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক এডভোকেট নাসরিন আক্তার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় ভোটারবিহীন নির্বাচন করে অবৈধভাবে ক্ষমতায় রয়েছে। সেই ভোটারবিহীন সংসদের কাছে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা দিয়ে সরকার সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অবৈধভাবে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করেছে। বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে দিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বুধবার রাতে সংসদে পাস হয়।

সব সংশোধন ছুড়ে ফেলা হবে -বিএনপি

দেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা সংবিধানের সংশোধনগুলো ছুড়ে ফেলে দেয়া হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার। বলেছেন, জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া একটা ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী ক্ষমতায় বসে আছে। তারা সংবিধানকে নিজেদের মতো করে যাচ্ছেতাইভাবে কাটাছেঁড়া করেছে। বিচার বিভাগকে তারা ধ্বংস করে ফেলেছে। আমরা স্পষ্টভাষায় বলতে চাই, যখন জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হবে, এই সরকারের সব সংশোধনী ছুড়ে  ফেলে দেয়া হবে। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে দিগন্ত টেলিভিশন আয়োজিত ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দিগন্ত টেলিভিশন-সাময়িক নিষেধাজ্ঞার ৫শ’তম দিন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ‘ছক’ শিগগিরই খালেদা জিয়া প্রকাশ করবেন জানিয়ে এমকে আনোয়ার বলেন, আন্দোলনের ছক তৈরি করে রেখেছেন খালেদা জিয়া। সেই ছকেই আন্দোলন হবে। আপনারা শুরু অপেক্ষা করেন। বিএনপির এ সিনিয়র নেতা বলেন, গণমাধ্যমের ওপর সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। রাষ্ট্রের সব অঙ্গকে আজ ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমকে  নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার নানা নীতিমালা করেছে। তিনি বলেন, ৭৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কি করেছিল? ’৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর তারা কয়েকটি সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিল। কেবল তাই নয়, তারা যখনই ক্ষমতায় এসেছে, প্রশাসনসহ সব কিছু চরমভাবে দলীয়করণ করেছে। পাঁচ সচিবের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে চাকরি করাকে নজিরবিহীন দলীয়করণ মন্তব্য করে এম কে আনোয়ার বলেন, আমরা কোথায় যাবো? যারা রাষ্ট্রের সচিব মর্যাদায় আছেন, তারা কয়েক বছর চাকরির মেয়াদ বাড়াতে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ জমা দিয়েছেন। যা আজ ধরা পড়েছে। এসব সচিব এমন কাজ করার সাহস কোথা থেকে পায়- প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ওই সচিবদের দিয়ে সরকার এমন কাজ করিয়েছে যে তারা যে কোন সময়ে থলের বিড়াল প্রকাশ করতে পারেন। সেজন্য তারা আজ যা ইচ্ছা তাই করছেন। সরকারের এম কে আনোয়ার বলেছেন, বাঘের পিঠে উঠে ক্ষমতার বড়াই দেখাচ্ছেন। এখনও সময় আছে এই বাঘের পিঠ  থেকে নামুন। অন্যথায় বাঘের পেটে যেতে হবে। দিগন্ত টেলিভিশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মাহবুব আলমের সভাপতিত্বে আলোচনায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী, কলামনিস্ট ফরহাদ মজহার, সাংবাদিক সাদেক খান, কল্যাণ পার্টির সভাপতি মে.জে. (অব.) সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন,  চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে প্রস্তাব পাস

বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপিয় পার্লামেন্ট। এ বিষয়ে আজ সেখানে একটি যৌথ প্রস্তাব পাস হয়েছে। এতে র‌্যাব ও অন্যান্য নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর অব্যাহত মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- ঘটনো। শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদ- বাতিল করতে বলা হয়েছে এতে। নারায়ণগঞ্জে বহুল আলোচিত সেভেন হত্যা মামলার বিষয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। মিডিয়ার স্বাধীনতা মেনে নিয়ে তার প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে সরকারের প্রতি। বলা হয়েছে নতুন সম্প্রচার নীতিমালা বাতিল করতে। গত ৬ই আগস্ট বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ করেছে নতুন সম্প্রচার নীতিমালা। এর মাধ্যমে মিডিয়ার স্বাধীনতাকে সীমিত করা হয়েছে। সুশীল সমাজের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছে। নতুন নিয়ম করে এনজিওগুলোর ওপর বেশ কিছু বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। জোরালো সমালোচনা আছে যে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আন্তর্জাতিক মানদন্ড মেনে চলছে না। রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর বিদেশী সংস্থাগুলো যে তদন্ত করেছে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু যে তদন্ত বাংলাদেশ সরকার করেছে তা এখনও পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। শ্রম আইনের সামান্য সংস্কার হলেও এখনও যারা শ্রমিক ইউনিয়নে যোগ দিতে চান বা ইউনিয়ন গঠন করতে চান তাদেরকে অব্যাহতভাবে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

হাসিনা বিচার বিভাগকে ধন্যবাদ দিতেই পারেন

জামাতে ইসলামির শীর্ষ নেতা দেলোয়ার হোসেন সাইদির প্রাণদণ্ডের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিল বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট। একাত্তরে খুন, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুঠপাট ও ধর্মান্তরের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি সাইদিকে প্রাণদণ্ড দিয়েছিল আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালত। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন জামাতের এই নায়েবে আমির। এ দিন সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত রায়ে সেই সাজা বদল করল।
সরকার এই রায়কে সর্বোচ্চ আদালতের স্বাধীন মতামত বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু সাইদির ফাঁসির দাবিতে কাল থেকে ঢাকার শাহবাগ চত্বরে অবস্থান শুরু করা গণজাগরণ মঞ্চের সদস্যরা এই রায়কে ‘সরকার-মৌলবাদী আঁতাঁতের রায়’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ‘ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’ সরকারকে দোষারোপ না-করে ব্যর্থতার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের দফতরকে দায়ী করেছেন। কমিটির আহ্বায়ক শাহরিয়ার কবির বলেন, “যুদ্ধাপরাধ আদালতে সাইদির বিরুদ্ধে মামলায় যে সব আইনজীবী আপ্রাণ পরিশ্রম করে জয় আদায় করেছিলেন, আপিল মামলায় তাঁদের ডাকা তো দূরের কথা, পরামর্শটুকু নেয়নি এজি অফিস। অথচ আন্তর্জাতিক আইনকানুনে সরকারি আইনজীবীরা আদৌ অভ্যস্থ নন। তার ফলেই সাইদির মতো এক জন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ফাঁসি থেকে পার পেয়ে গেল।” কবিরের কথায়, আমৃত্যু কারাবাস খুবই বড় শাস্তি। কিন্তু সাইদির বিরুদ্ধে যে সব অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, তাতে তাঁর প্রাণদণ্ড প্রাপ্য ছিল বলেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মনে করেন। প্রশাসনিক সূত্রের ব্যাখ্যা, শেখ হাসিনার সরকার এই রায়ে ঘরে-বাইরে বেশ খানিকটা স্বস্তিতেই থাকবে। ধর্মীয় নেতা হিসেবে দেলোয়ার হোসেন সাইদির সমর্থন জামাতে ইসলামির চৌহদ্দি ছাড়িয়ে অন্য দলের মানুষের মধ্যেও কম নেই। তাঁর ফাঁসি অনেকেই হয়তো মেনে নিতে পারতেন না। তা ছাড়া, যৌথ বাহিনীর একের পর এক অভিযানে জামাতের সংগঠন এখন অনেকটাই কোণঠাসা। সুপ্রিম কোর্ট সাইদির ফাঁসির রায় বহাল রাখলে নাশকতার মাধ্যমে তারা ফের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেত। আন্তর্জাতিক মহলেও জামাত নেতাদের ফাঁসির বিরুদ্ধে একটা জনমত গড়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা ও কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ ধর্মীয় নেতাদের ফাঁসির বিরোধিতা করেছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ইইউ। সরকারের এক কর্তার কথায় এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্ট যে সরকারকে অস্বস্তি থেকে বাঁচাল, শেখ হাসিনা তার জন্য বিচার বিভাগকে ধন্যবাদ দিতেই পারেন।
এই রায় উপলক্ষে কাল বিকেল থেকেই গোটা বাংলাদেশের নিরাপত্তা কঠোর করা হয়েছিল। ঢাকায় পুলিশের বিশেষ পাহারা ও টহলদারি চোখে পড়েছে। পুলিশের পাশাপাশি ছিল সীমান্তরক্ষী বাহিনীও। খানাতল্লাশির পরে আইনজীবী-সহ সবাইকে আদালত প্রাঙ্গণে ঢুকতে দেওয়া হয়। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে প্রধান বিচারপতি মহম্মদ মোজাম্মেল ও অন্য চার বিচারপতি আদালত কক্ষে আসেন। মাত্র তিন মিনিটে তাঁরা রায়ের সারাংশ পাঠ করে আদালত মুলতবি করে দেন। আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার পরে এই নিয়ে দ্বিতীয় যুদ্ধাপরাধের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হল। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ও কার্যকর করেছে সরকার। রায় ঘোষণার পরে দুপুরেই সরকারি জোটের ১৪ দল বৈঠকে বসে। পরিস্থিতি পর্য়ালোচনার পরে রায়কে স্বাগত জানায় তারা। তবে জামাত রায়কে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করে কাল ও রবিবার দু’দফায় ৪৮ ঘণ্টা করে হরতালের ডাক দিয়েছে। সরকার তাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, হরতালে নাশকতা ও সন্ত্রাসের চেষ্টা হলে কঠোর হাতে মোকাবিলা করা হবে।
আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, পছন্দ হোক বা না-হোক, সর্বোচ্চ আদালতের রায় মানতেই হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানান, প্রাণদণ্ড বহাল থাকবে বলেই তিনি আশাবাদী ছিলেন। এই রায় রিভিউয়ের সুযোগ থাকলে সরকার নিশ্চয়ই তা গ্রহণ করবে। শরিক নেতা বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, মানুষ ফাঁসির রায় চেয়েছিলেন। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের রায় মেনে নিতেই হয়।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

হাজারো মানুষের নিরন্তর অপেক্ষা

গাজার বাসিন্দা মোহাম্মেদ আল নাজার অনেক শখ করে একটি বাড়ি বানিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন পরিবারের সবাই মিলে হাত-পা ছড়িয়ে থাকবেন সেখানে। কিন্তু ইসরায়েলের হামলায় গুঁড়িয়ে গেছে তাঁর স্বপ্নের বাড়ি। বড় পরিবার নিয়ে এখন একটি কুঠুরির মধ্যে গাদাগাদি করে থাকেন তাঁরা।

গাজার এমন অনেক পরিবার এভাবে বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বাস করছেন। হাজারো মানুষের চলছে নিরন্তর অপেক্ষা—কবে নতুন করে গড়ে উঠবে বাড়ি, কবে ফিরবে সেই স্বাভাবিক জীবন।
আজ বৃহস্পতিবার এএফপিতে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ইসরায়েলে আট বছর ধরে চলা অবরোধে বসতি নির্মাণের সামগ্রী গাজায় আসে না। ইসরায়েলি হামলায় গাজায় একের পর এক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হলেও এ অবরোধের কারণে ধ্বংস হওয়া ভবন আর গড়ে ওঠেনি। এতে গাজায় পুনর্বাসনকাজ এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ৬০ বছর বয়সী নাজ্জার সাই বলেন, অস্থায়ী হিসেবে পাওয়া আশ্রয়কেন্দ্র এখন স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আতঙ্কে আছি যে গাজার অবরোধ কোনোদিনও উঠবে না। ইসরায়েল আমাদের বসতি নির্মাণের জন্য কোনো সামগ্রী দেবে না।’
গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনুস শহরের কাছে খুজানা এলাকায় অস্থায়ী ওই আশ্রয়কেন্দ্রে মাত্র দুটি ঘর। সেখানেই গাদাগাদি করে ছয়জনকে নিয়ে থাকেন নাজ্জার সাই। সবাই মিলে একটি ছোট রান্নাঘর আর শৌচাগার ব্যবহার করেন।
তবু নিজেদের অন্যের তুলনায় সৌভাগ্যবান মনে করেন নাজ্জার সাই। কারণ অন্য গৃহহীনরা এর চেয়েও করুণ অবস্থায় রয়েছেন।
গত জুলাই থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত চলা ইসরায়েলের হামলায় গাজার ১৮ হাজারের বেশি বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। কয়েকটি ত্রাণ সংস্থা গাজায় গৃহহীনদের জন্য ১০০টি মোবাইল ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। কিছু অস্থায়ী স্কুলও নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে পুনর্বাসন আদৌ সম্ভব কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার মুখপাত্র আদনান আবু হাসনা বলেন, ২০০৬ সাল থেকে ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজায় স্টিল, সিমেন্ট বা কংক্রিট আসে না। এই অবরোধ না তুললে গাজা পুনর্বাসন করতে আরও ১০ বছর সময় লাগবে।
ফিলিস্তিনের কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুসারে ইসরায়েল গাজায় নির্মাণসামগ্রী পাঠানোর ব্যাপারে তাদের নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করবে বলে জানিয়েছিল। কিন্তু এতে খুব সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে।
নাজ্জার সাইয়ের মতো আরেক হতভাগ্য হলেন গাজার পূর্বাঞ্চলে শেজায়া শহরের বাসিন্দা সুহেলা মোহাম্মেদ। স্বামী, শিশু ও নাতি নাতনিদের নিয়ে ছোট একটি তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন। সুহেলা বলেন, অনেক স্বপ্ন নিয়ে ১০ বছর ধরে আমরা একটি বাড়ি করেছিলাম। কিন্তু আমাদের শিশুরা সেখানে থাকতে পারেনি।
সাধের বাড়ির পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষের পাশে দাঁড়িয়ে সুহেলা বলেন, ‘এই ঘর আবার গড়ে ওঠার আগেই আমি মারা যাব।’
নিজের বিধ্বস্ত বাড়ির সিঁড়ির কাছে ঘুমাতে হয় শোকরকে। তিনি বলেন, হামলায় বিধ্বস্ত তাঁর বাড়ি আবার ঠিক করতে আট বছরের বেশি সময় লাগবে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘এই আট বছর আমরা কোথায় থাকব? আমাদের কোনো খাবার নেই। পানি নেই। এমনকি বিদ্যুৎও নেই।’
জাতিসংঘের শান্তিবিষয়ক দূত রবার্ট শেরি বলেন, গত মঙ্গলবার ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সে অনুসারে নির্মাণসামগ্রী গাজায় আসতে পারে। পশ্চিমা বিশ্ব সমর্থিত ফিলিস্তিনের সরকার জানায়, তারা এই চুক্তি কার্যকর করতে কাজ করে যাচ্ছে।
রামাল্লা ভিত্তিক প্যালেস্টাইন ইকোনমিক কাউন্সিল ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যদি গাজা থেকে এখন অবরোধ তুলেও নেওয়া হয় তাহলে পুনর্বাসনকাজে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগবে। খরচ হবে ৭৮০ কোটি ডলার।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মুখপাত্র আবু হাসনা বলেন, অবরোধ তুলে নিতে ইসরায়েল যত বেশি সময় পার করবে, গাজার গৃহহীনদের হতাশাও তত বাড়বে।

নেপথ্যে গোপন বিয়ে by মহিউদ্দীন জুয়েল

নওগাঁয় এক স্ত্রী রয়েছে। সেখানে আছে দুই সন্তান। পরিবারের লোকজন জানতেন সেটিই সুখের সংসার। কিন্তু মৃত্যুর পর বেরিয়ে এসেছে আরেক নতুন তথ্য। মিশু নামের এক মেয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক ছিল তার। গত জুন মাসে গোপনে বিয়ে হয় তাদের। এরপর থেকে আলাদা বাসা নিয়ে প্রথম স্ত্রীর অগোচরে থাকতেন তিনি। আর এ নিয়ে অশান্তি শুরু। সেখান থেকেই হত্যা। চট্টগ্রামে কাজী আবদুল হাসিব মোহাম্মদ সাঈদ (৪৭) নামের এক বিচারকের মৃত্যুর ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

এ ঘটনায় ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে স্ত্রী বলে দাবি করা সানজিদা আক্তার মিশু ও শাশুড়ি লাকি আক্তার নামে দুই নারীকে। গতকাল বুধবার সকালে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছে।
গত মঙ্গলবার রাতে নগরীর হালিশহরের মোল্লাপাড়া এলাকার একটি বাসা থেকে কাজী আবদুল হাসিবকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান গ্রেপ্তার হওয়া এ দুই নারী। ওই সময় তারা দাবি করেন, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। পরে তাদের কথাবার্তায় সন্দেহ হয় মেডিকেল পুলিশের। এরপর দু’জনকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (পশ্চিম) এস এম তানভির আরাফাত এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, ‘কথিত স্ত্রী মিশুর সঙ্গে নিহত বিচারকের সম্পর্ক ছিল এ বিষয়টি আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তবে তারা বিয়ে করেছেন কিনা তা জানা যাবে কাবিন হাতে পাওয়ার পর। মিশুকে নিয়ে আমরা যেসব তথ্য পেয়েছি তা চমকে ওঠার মতো। তদন্তের স্বার্থে এখনই কিছু বলতে পারছি না।
গতকাল সকালে এ বিষয়ে জানতে যাওয়া হয় নগরীর হালিশহর এলাকার সেই মোল্লাপাড়ায়। সেখানে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে পাওয়া যায় নানা তথ্য। তারা জানান, প্রায় সময় বিচারক সাঈদকে কথিত স্ত্রী সানজিদা আক্তার মিশুর বাসায় আসা-যাওয়া করতে দেখতেন সেখানকার বাসিন্দারা।
এরপর গত জুন মাসে ওই নারী তাকে বিয়ে করেছেন বলে আশপাশের লোকজনকে জানান। বিষয়টি সত্য বলে ধরে নেন লোকজন। কেননা বিয়ের খবর চাউর হওয়ার পরই নওগাঁ থেকে ঘন ঘন চট্টগ্রামে আসতেন এই অতিরিক্ত জেলা জজ।
পুলিশের ধারণা, নওগাঁয় বদলি হওয়ার আগ থেকে মিশুর সঙ্গে পরিচয় ঘটে বিচারক সাঈদের। বিষয়টি তার প্রথম স্ত্রী জানতেন না। নওগাঁয় প্রথম স্ত্রী থাকার বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি দ্বিতীয় স্ত্রী মিশু। আর তা নিয়ে সংসারে টানাপড়েন শুরু হয়।
তাকে ডিভোর্স দেয়ার জন্য চাপাচাপি করলে এ নিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েন বিচারক সাঈদ। একপর্যায়ে বাসার ভেতর ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটলে কেউ একজন পেছন থেকে ধারালো লোহা দিয়ে মাথায় আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি লুটিয়ে পড়ে মারা যান।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের একটি সূত্র জানায়, নিহত বিচারক সাঈদের মাথার পেছনে ও মাঝে বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বিশেষ করে মাঝখানে একটি গর্ত দেখা গেছে, যা থেকে বোঝা যায় তিনি আত্মহত্যা করেননি। তাকে কেউ একজন আঘাত করেছে।
গত মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালে তার মৃত্যুর পেছনে আত্মহত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলে চালিয়ে দেয়া হয়। এ কাজটি খুবই কৌশলে করার চেষ্টা করেন স্ত্রী বলে পরিচয় দেয়া মিশু ও শাশুড়ি লাকী আক্তার। সাঈদের মাথার খুলিতে গর্ত দেখা যায়। মাথার খুলি থেকে মৃত্যুর সময় তাজা রক্ত বের হচ্ছিল। নিহতের গলায় কালো দাগ দেখা যায়। হাত-পা ছিল স্বাভাবিক।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ঘটনাটিকে প্রাথমিক দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে না। কেননা গলায় ফাঁস দিলে মুখ দিয়ে ফেনা বের হতো।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, নওগাঁয় নিহত বিচারক সাঈদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। সেখানে অবস্থান করা তার স্ত্রীর নাম মনিকা। আর দুই সন্তান অনিন্দ্য (১২) ও মেয়ে রোসাবা (১০)। ১৮তম বিসিএস (বিচার) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী জজ হিসেবে চাকরি শুরু করেন তিনি।
ঘটনার ৪ দিন আগে গত শুক্রবার সকালে বিচারক সাঈদ মিশুর হালিশহরের বাসায় আসেন। মঙ্গলবার বিকালে চিৎকার শুনতে পেয়ে আশপাশের লোকজন সেখানে গিয়ে দেখতে পান ওই বিচারক গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছেন। পরে এ ঘটনায় কথিত স্ত্রী মিশু ও তার মা লাকী আক্তার পুলিশের কাছে ব্যাখ্যা দেন দাম্পত্য কলহের জের ধরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।
আর মাথায় নিজেই ধারালো কাঁচি দিয়ে আঘাত করে রক্ত বের করেছেন। বিচারক সাঈদকে মিশু নিজের স্ত্রী বলে দাবি করলেও তার পরিবারের অনেক কিছুই তিনি জানেন না বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্ত্রী দাবি করা মিশুর এর আগে আরও একবার বিয়ে হয়েছিল। সেখানে তার একটি পুত্রসন্তানও রয়েছে। তবে ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর ওই সংসারের কারও সঙ্গে মিশুর কোন সম্পর্ক নেই। মিশুর পিতা একজন ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী। তার নাম নাছির আহমেদ। তিনিও হালিশহরের ওই বাসায় বসবাস করতেন।
এ বিষয়ে হালিশহর থানার ওসি (তদন্ত) সাইফুদ্দিন আনোয়ার বলেন, মিশুর আচরণ বেশ রহস্যজনক। তার কথাবার্তা অসংলগ্ন। ওই বিচারকের মৃত্যুর পরও সে বেশ স্বাভাবিক। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে এ বিষয়ে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছি।
তিনি আরও বলেন, মনে হচ্ছে কৌশলে জজ সাঈদকে হত্যা করা হয়েছে। মিশু ধরা পড়ার পর থেকেই বলছেন তাকে বিয়ে করেছেন। অথচ সাঈদের প্রথম স্ত্রী এ নিয়ে কিছুই জানেন না। তার মানে যদি বিয়ে হয়ে থাকে তবে তা গোপনে। আর না হলে কোন ধরনের ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে তাদের সম্পর্ক আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করছি দু’-একদিনের মধ্যে সব কিছু বের হয়ে আসবে।

সুখ-দুঃখের চট্টগ্রাম বন্দর, তুমি কার? by সোহরাব হাসান

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চরম ঝুঁকি নিয়েও জাতীয় স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেন না। এ প্রসঙ্গে তাঁরা প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের মুখের ওপর গ্যাস রপ্তানির প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়ার উদাহরণ দেন। কিন্তু সব ক্ষেত্রে যে শেখ হাসিনা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না কিংবা নিলেও সেটি জাতীয় স্বার্থের পক্ষে যায় না, চট্টগ্রাম বন্দরই তার প্রমাণ।
শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় বেসরকারি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য অখ্যাত মার্কিন কোম্পানি এসভিডর সার্ভিসেস এজেন্সিকে (এসএসএ) ১৯৯ বছরের লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের মেয়র ও আওয়ামী লীগের নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে বড় ধরনের আন্দোলন হয়। তখন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের অপর নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী এসএসএর পক্ষে ছিলেন। সেই আন্দোলনে চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক, প্রগতিশীল লেখক-বুদ্ধিজীবী এবং জাতীয় তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষার জাতীয় কমিটি সক্রিয় ছিল।
আন্দোলনের মুখে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি লিজের মেয়াদ কমিয়ে প্রথমে ৯৯ বছর এবং পরে ৩৩ বছর করে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা তাও মেনে নেয়নি। একপর্যায়ে বন্দরের ২২টি শ্রমিক সংগঠন জাতীয় স্বার্থে সরকারের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে রিট করলে আদালত সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। বাদীদের পক্ষে ড. কামাল হোসেন এই মামলাটি লড়েছিলেন। ১৩ সেপ্টেম্বর আলাপ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মইনুল ইসলাম জানান, এসএসএকে টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্ব দিলে দেশের সর্বনাশ হয়ে যেত।

এসএসএর গল্প এখানে শেষ হলেও নিউমুরিং টার্মিনালের গল্প শেষ হয় না।

৫৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শেষ হয়। এখন ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর। কিন্তু কী পদ্ধতিতে টার্মিনাল ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে গত সাড়ে পাঁচ বছরেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকার।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নৌপরিবহন উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল মতিন সাইফ পাওয়ার টেক নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষামূলকভাবে অপারেশনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেই ব্যবস্থা এখনো চলছে। টার্মিনালের পাঁচটি জেটির মাত্র দুটি আংশিক ব্যবহৃত হচ্ছে। এ নিয়ে তখনই প্রশ্ন ওঠে।
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, বন্দর কর্তৃপক্ষ যন্ত্রপাতি কিনে দেবে, না ঠিকাদারকে তার দায়িত্ব দেবে, তা নিয়ে সরকারের ভেতরেই দুই মত। ২০০৮ সালে দরপত্রের মাধ্যমে চারটি বিদেশি অপারেটরকে নির্বাচিত করা হলেও ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংসদীয় কমিটির সুপারিশে বন্দর কর্তৃপক্ষ তা বাতিল করে দেয়। এরপর দফায় দফায় প্রাক্যোগ্যতার দলিলপত্র সংশোধন করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ার টেক ও বিদেশি পিএসএ ইউরোপ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়। ২০১২ সালে ৩০ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় মূল দরপত্রে পাঁচটি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। একই সময়ে দরপত্রের শর্ত সংশোধন ও বিলোপ করে দেশীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার চেষ্টা হয়। এরপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দাবি, লবি ও মামলায় আটকে আছে সিদ্ধান্ত।
বিগত সরকারের (২০০৯–১৩) আমলে নৌপরিবহনমন্ত্রী, সংসদীয় কমিটি ও বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে যন্ত্রপাতি কিনে টার্মিনাল ব্যবহারের পক্ষে কঠোর অবস্থান নেয়। কিন্তু দশম সংসদে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়–সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি বদল হলে তারা যন্ত্রপাতি কেনার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। তাদের যুক্তি, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতিতেই টার্মিনাল ব্যবহার করে বন্দর কর্তৃপক্ষ অধিক সুবিধা পাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আগের অবস্থান থেকে সরে এসে বিদেশি অপারেটরকেই যন্ত্রপাতি কেনাসহ অপারেশনের সমুদয় দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষপাতী। তিনি বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এখন বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছেন বলে শুনেছি। এই দরপত্র এখনই বাতিল করা উচিত।’
অন্যদিকে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান প্রধানমন্ত্রীর দোহাই দিয়ে তাঁর অবস্থানে অনড় আছেন। আসলে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে সরকারের মধ্যেই বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের রশি টানাটানি চলছে। নৌপরিবহনমন্ত্রীর সঙ্গে চট্টগ্রামের একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী আছেন। আছেন ব্যবসায়ী নেতাদের একাংশ। অন্যদিকে সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী বন্দরের নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই অন্যের হাতে ছেড়ে দেওয়ার বিরোধী। বন্দরের অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠন তাঁর সঙ্গে আছে। হজে যাওয়ার আগে মহিউদ্দিন চৌধুরী লালদীঘিতে জনসভা করে আন্দোলনের আগাম ঘোষণা দিয়ে ছিলেন। আগামী বছর অনুষ্ঠেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সামনে রেখে তিনি বন্দর রক্ষার আন্দোলন করে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে চান। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী সাইফুদ্দিন চৌধুরীসহ চট্টগ্রামের অধিকাংশ সাংসদ চান না, বন্দরের কাজে মহিউদ্দিন চৌধুরীর হস্তক্ষেপ বাড়ুক।
ফলে বন্দর নিয়ে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের রাজনীতি ফের সরগরম হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সংগঠন একে অপরের বিরুদ্ধে বিবৃতি–পাল্টা বিবৃতি দিচ্ছে। এক পক্ষের যুক্তি হলো বন্দর কর্তৃপক্ষকে যন্ত্রপাতি কেনার দায়িত্ব দেওয়া মানে চুরি ও অপচয়। অন্য পক্ষের সাফাই, বিদেশি অপারেটরদের যন্ত্রপাতি কেনার দায়িত্ব দিলে সেবাপ্রার্থীদের খরচ বাড়বে, বন্দরের আয় কমবে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের একজন ব্যবসায়ী নেতার বক্তব্য হলো চট্টগ্রাম বন্দর একটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের সেবা যঁারা নেন অর্থাৎ আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের মতামত সরকার কখনোই নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। কে কীভাবে অপারেট করল, সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সমুদ্রবন্দরগুলো যে পদ্ধতিতে চলে, আমাদের এখানেও সে পদ্ধতিতে চলতে হবে। ব্যবসায়ীরা চান দ্রুত ও উত্তম সেবা। সরকার সেটি দিতে পারলে ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি দেশও। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়েছে। আর রাজনীতি নয়। বন্দরের প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের যে সক্ষমতা আছে, তার ৭০ ভাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। বাকি ৩০ ভাগই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
বন্দর রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, আমাদের সরকারগুলো বিদেশের সঙ্গে চুক্তি কিংবা অপারেটর নিয়োগে সব সময় ঢাক ঢাক গুড় গুড় ভাব দেখায়। বিষয়টি সংসদে বা অন্য কোনো ফোরামে আলোচনা করে না। চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে যা চলছে, তা হলো মাফিয়া চক্রের দৌরাত্ম্য। সবাই ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সুবিধার পেতে উদ্গ্রীব। কিন্তু তারা দেশ ও জনগণের স্বার্থের কথা ভাবে না।
আমরা বিশ্বায়নের কথা বলি। গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু যে বন্দরটি দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি, সেই বন্দরটি পরিচালনায় কর্তৃপক্ষ যে পদে পদে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, তার প্রতিকার কী? তারা বন্দরের যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় যত আগ্রহী, বন্দর ব্যবহারকারীদের সেবা বাড়ানোর ব্যাপারে ততই নিষ্ক্রিয়। এ অবস্থায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি চলতে পারে না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

মাইলামের আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হোক by আলী ইমাম মজুমদার

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলামের একটি নিবন্ধের অনুবাদ কিছুদিন আগে প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়। নিবন্ধে মাইলাম বলেছেন, গত সংসদ নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। অনেকটা একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতার ভিত জোরদার করেছে সরকার। পাশাপাশি মূল বিরোধী দলের প্রতি করছে অসহিষ্ণু আচরণ। গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে করেছে সম্প্রচার নীতিমালা। এ ধরনের বিশ্লেষণ থেকে তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। উইলিয়াম বি মাইলাম একজন পেশাদার কূটনীতিক। ২০০১ সালের জুলাই মাসে তিনি অবসর গ্রহণ করেছেন। ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণে তিনি এ দেশে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সময়টা ছিল ১৯৯০-এর আগস্ট থেকে ১৯৯৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। গণতন্ত্রায়ণের পথে দেশটির নতুন অভিযাত্রায় তিনি ছিলেন একজন সচেতন পর্যবেক্ষক। দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকা সম্পর্কে তাঁর হয়েছে ব্যাপক অভিজ্ঞতা। অবসর গ্রহণের পরে দুবার তাঁকে রাষ্ট্রীয় কাজে ডেকে আনা হয়। প্রথমত, নয়-এগারোর পর আফগানিস্তানে বহুপক্ষীয় পুনর্গঠন-প্রক্রিয়ায় অংশীদার হতে নয় মাসের জন্য। এরপর আবার ২০০৭-০৮ সালে কয়েক মাসের জন্য লাইবেরিয়ায় রাষ্ট্রদূতের পদে। উল্লেখ্য, ১৯৯৫-৯৮ সালে তিনি সেখানকার মিশনপ্রধান থাকাকালে সাত বছর চলমান গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। অনুষ্ঠিত হয় একটি স্বচ্ছ নির্বাচন। এখন তিনি কাজ করছেন উড্রো উইলসন সেন্টারে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র পলিসি স্কলার হিসেবে।

বহুদর্শী এ কূটনীতিকের অভিজ্ঞতালব্ধ মতামতকে তাচ্ছিল্য করার কোনো সুযোগ নেই। এটি আমাদের জন্য সুখবর নয় বটে। তবে তাঁর বিশ্লেষণকে অসংগত বলা যাবে না। আমাদের গত জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তিনি কেন, পাশ্চাত্যের সব দেশই প্রায় এক সুরে কথা বলেছে। নির্বাচনের পরদিনই যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট অসন্তোষ প্রকাশ করে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের সহকারী সচিব নিশা দেশাই বিসওয়াল ও আমাদের দেশে নিয়োগ-প্রক্রিয়াধীন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাট সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতে একই ভাষায় বলেছেন, নির্বাচনটি ছিল অনস্বীকার্য ত্রুটিপূর্ণ। এ বক্তব্যগুলো যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীতির অংশ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রদূত
ড্যান মজীনা। তাঁদের মতে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্রুত কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল একটি সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা উচিত। কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার দিকে দেশটি চলমান বলে মাইলামের বক্তব্যও কিছু যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমাদের উচিত বার্তাটি নিয়ে নিজেদের সংশোধন করে তাঁর বিশ্লেষণ ভুল প্রমাণ করা। তা না করে সেটাকে আরও জোরদার করতে উঠেপড়ে লাগেন কেউ কেউ। এর দায়ভার চাপে সরকার ও দেশের ওপর। সরকারি দলের নেতাদের একটি অংশ মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রমীলার মতোই যেন বলছেন—
‘দানব-নন্দিনী আমি রক্ষঃ কুলবধূ
রাবণ শ্বশুর মম মেঘনাদ স্বামী,
আমি কি ডরাই সখি, ভিখারী রাঘবে?’
রাঘব যে মেঘনাদবধ কাব্য-এর মতোই ভিখারি নয়, তা তাঁরা যত দ্রুত বুঝতে পারবেন, ততই মঙ্গল। আরও বিস্ময়কর হলো, যখন যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁরা নিজেদের দলীয় স্বার্থের প্রতিকূল যেকোনো দেশি-বিদেশি পরামর্শ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে নাকচ করেন। এটা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।
সাংবিধানিক পদে আসীন সব পদের অপসারণ-প্রক্রিয়া সংসদের হাতে নিতে সংবিধান সংশোধনের ব্যবস্থা হলো। এ ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর শাসন সংস্কৃতির অনুকরণেই করা হয়েছে, এমনটাই সরকারি ভাষ্য। এর পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক মতামত আছে। তবে এর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অনেক কিছুই রইল উপেক্ষিত। যাদের নজির টানা হচ্ছে, তাদের অনুকরণে অন্তত একটি অংশগ্রহণমূলক পক্ষপাতহীন নির্বাচনও তো হওয়া দরকার।
রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার অনেক ক্ষেত্রে অসহিষ্ণুতার লক্ষণ সুস্পষ্ট। বিষয়টি নতুন নয়। তবে ক্রমবর্ধমান। ধারাবাহিকভাবে সব সরকার এমনটা করে চলছে। কিন্তু এক জায়গায় গিয়ে তো বিরতি দিতে হবে। বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে যেনতেন কারণে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে শত শত মামলা। রাস্তাঘাটে গাড়ি ভাঙচুর মামলায় অশীতিপর নেতারাও আসামি হন। তাঁরাও ক্ষমতায় থাকতে করেছেন একই ধরনের কাজ। আর সে জন্যই তো জনগণ তাঁদের বর্জন করেছে। এটা এখনকার সরকার কখন বুঝতে পারবে? গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে জেদ একটি জগাখিচুড়ি অবস্থা সৃষ্টি করেছে। এটা সরকারকে কোনো সুফল দিয়েছে—এমন দাবি সরকারি দলের অনেক নেতা-কর্মীই করেন না। বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। কিন্তু তা করতে রেন্টাল, কুইক রেন্টাল ইত্যাদি কেন্দ্র দীর্ঘকাল চালু রাখার ফলে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। তার পরও এ কাজ করতে আইন করে দায়মুক্তি দিতে হবে কেন,
এটা দুর্বোধ্য। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচন কিংবা পদ্মা সেতু নির্মাণের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তো কাজ করার জন্য দায়মুক্তি আইন করা আবশ্যক হয়নি। এসব ক্ষেত্রে অসহিষ্ণুতা পর্যবেক্ষণ করে ক্রমান্বয়ে আরও কর্তৃত্ববাদী শাসনের আশঙ্কা করাকে অযৌক্তিক বলা যাবে না।
গত সংসদ নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। এমনকি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী গৃহীত হওয়ার পরও। অনেক বিজ্ঞজন এগুলো পর্যালোচনা করে মতামতও দিয়েছেন। কিন্তু তা হোক, এটা সরকার চায় না বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়। পাশাপাশি বিএনপি এ ফাঁদে পা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উভয় দল। সরকার আগের মেয়াদে জনগণের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ছিল। এখন তাদের সে গৌরববোধ মলিন হয়ে গেছে। পাশাপাশি বিএনপি অন্তত এখনকার মতো ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা সংসদে প্রধান বিরোধী দল হওয়ার সুযোগ হারিয়েছে। চূড়ান্ত ক্ষতি হয়েছে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার। সরকার অধিকতর হারে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এ ধরনের সরকারের অসহিষ্ণু আর কর্তৃত্ববাদী হওয়ার দিকেই প্রবণতা থাকার কথা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যেও অকারণ কিছু সমস্যা মাথাচাড়া দিচ্ছে। র্যাব গঠনের পর যখন বিচারবহির্ভূত হত্যা শুরু হয়, তখন থেকেই আতঙ্কিত ছিল সচেতন মহল। তবে শুরুর দিকে নিহত ব্যক্তিরা ছিল চিহ্নিত সন্ত্রাসী, খুনি, ডাকাত ইত্যাদি। আইনের আওতার বাইরেই ছিল তাদের বিচরণ। সে পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষ এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে ছিল উল্লসিত। তার পরও জঙ্গি দমনে বাহিনীটি বিস্ময়কর সাফল্যের ছাপ রাখে। সেখানে আবশ্যক হয়নি কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যা। অথচ এরপর? উপযুক্ত তদারকি না থাকায় এ বাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্য খুনির পর্যায়ে নেমে যান। নারায়ণগঞ্জ ঘটনায় গোটা সংস্থাটির ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কিছুটা স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে সংস্থায়। অবশ্য এটা কাঙ্ক্ষিত নয়। সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও এদের আবশ্যকতা রয়েছে। তবে র্যাবসহ সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় নিতে হবে জিরো টলারেন্স নীতি। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার পর মূল আসামিদের গ্রেপ্তারে হাইকোর্টের আদেশ আবশ্যক হয়। আর অপর প্রধান আসামি দিন দুই দেশে অবস্থান করে টেলিফোনে স্বজনদের নির্দেশনা নিয়ে সরে পড়েন পাশের দেশে। এ ক্ষেত্রে সূচনায় প্রশাসনের নৈরাশ্যজনক ভূমিকা সবাইকে বিস্মিত করেছে। মনে হতে পারে, সরকারি পদ-পদবিধারী ব্যক্তিরা ঘৃণ্য অপরাধ করলেও দায়মুক্ত। আর তা হলে শাসনযন্ত্রকে কর্তৃত্ববাদী আখ্যায়িত করলে দোষ দেওয়া যাবে না।
এত সব বিভ্রান্তির পরও আমরা আশাবাদী। উইলিয়াম বি মাইলাম বা যাঁরা তাঁর বিশ্লেষণের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেন, তাঁরা একপর্যায়ে ভ্রান্ত প্রমাণিত হবেন। এ দেশে গণতন্ত্রকামী মানুষের দাবির মুখে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অস্তিত্বের স্বার্থে আচরণে পরিবর্তন আনবে। পরিহার করবে কর্তৃত্বমূলক মনোভাব। জনগণের চিন্তা–চেতনাকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর অগ্রযাত্রার কাফেলায় আমরাও তখন শরিক হতে পারব। এ দেশ সম্পর্কে ১৯৭৪ সালে তাচ্ছিল্যমূলক মন্তব্য করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। বলেছিলেন, দেশটি তলাবিহীন ঝুড়ি। সমকালীন সব সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় এ দেশের জনগণ, বিশেষ করে কৃষক, পোশাককর্মী আর প্রবাসী শ্রমিকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে প্রমাণিত হয়েছে, তাঁর বিশ্লেষণ ছিল ভ্রান্ত। তেমনি ভ্রান্ত প্রমাণ করা দরকার উইলিয়াম বি মাইলামের বিশ্লেষণ। তবে এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা নিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

শ্রদ্ধা কাপুর আলোচনায় আসতে চাইছেন ভিন্ন উপায়ে

চেহারা তার বেশ। ফিগারও তেমনই। আর অভিনয়েও কম যান না। এর পরেও বলিউডের শক্তিমান ভিলেন শক্তি কাপুর কন্যা শ্রদ্ধা কাপুর অন্য কিছুকে পুঁজি করেই এগোতে চাইছেন বলিউডের পথে। তার সব ছবিতেই দেখা যাচ্ছে ভিন্ন উপায়ে আলোচনায় আসতে চাইছেন তিনি। আর সেটি হচ্ছে ছবির নায়কের সঙ্গে গভীর চুম্বন দৃশ্যে পারফরম করা। ‘আশিকি টু’ ছবিতে আদিত্যর সঙ্গে চুম্বন দৃশ্যে অভিনয় করার পর এবার বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত ‘হায়দার’ ছবিতেও একটি গানে শাহিদ কাপুরের সঙ্গে গভীর চুম্বনের দৃশ্যে অভিনয় করেছেন তিনি। গত বছর মুক্তি পাওয়া ‘আশিকি টু’ ছবিতে মদ্যপ আদিত্য রয় কাপুরের সঙ্গে চুম্বন দৃশ্যে অভিনয় করেছিলেন শ্রদ্ধা। এরপর ‘এক ভিলেন’ ছবিতেও সিদ্ধার্থ মালহোত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় করেন তিনি। জানা গেছে, ‘হায়দার’ ছবিতে চুম্বনের পাশাপাশি শাহিদের সঙ্গে শ্রদ্ধার ঘনিষ্ঠ দৃশ্যও রয়েছে।

চট্টগ্রাম এখন নিত্যদুর্ভোগের শহর by সোহরাব হাসান

১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে নেমেই দেখি, রাস্তায় যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা, অপরিচ্ছন্ন ফুটপাত। প্রাচ্যের রানী নামে খ্যাত সমুদ্র ও পাহাড়বেষ্টিত এই বন্দরনগরটি একেবারেই শ্রীহীন। মনটা খারাপ হয়ে গেল। বছর চারেক আগে যখন চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম, অনেকটা পরিষ্কার ও ছিমছাম ছিল। অন্তত ঢাকার তুলনায় সব দিকে এগিয়ে ছিল। এবারে ঠিক উল্টো। কোনো কোনো সড়ক প্রশস্ত করা হলেও কাজ অসমাপ্ত। সবচেয়ে দৃষ্টিকটু হলো অপরিকল্পিত সাইনবোর্ড ও ব্যানার। বেশির ভাগই সরকারি দলের নেতাদের ব্যক্তিগত প্রচার ও দলীয় প্রধানের স্তুতিতে ভরা। নগরের একটি মোড়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের নামাঙ্কিত একটি হোর্ডিং দেখলাম। তাতে লেখা, ‘শেখ হাসিনার উন্নয়ন, বদলে গেছে চট্টগ্রাম।’

হ্যাঁ, চট্টগ্রাম বদলে গেছে। তবে ভালোর দিকে নয়, খারাপের দিকে।
সাতসকালে চট্টগ্রাম শহর জাগে না। দু-চারটি রিকশা ও বেবিট্যাক্সি ইতস্তত চলাচল করছিল। দোকানপাট তখনো খোলেনি। রেলস্টেশন থেকে জুবিলী রোডে আল ফায়সাল হোটেলে গিয়েই টের পেলাম চট্টগ্রামের জনজীবন কতটা বিপর্যস্ত। হোটেলকর্মীরা জানালেন, গত রাত থেকে বিদ্যুৎ নেই। কয়েক ঘণ্টা ধরে জেনারেটর দিয়ে সীমিত পাখা ও বাতি চলছিল। এখন তাও বন্ধ। কিছুক্ষণ পর চালু হবে।
এরপর জুবিলী রোড থেকে হিলভিউ আবাসিক এলাকায় প্রথম আলো কার্যালয়ে গিয়ে দেখি, সেখানেও বিদ্যুৎ নেই। জেনারেটর দিয়ে কাজকর্ম চলছে। সহকর্মীরা জানালেন, কয়েক দিন ধরেই এ অবস্থা। ঢাকায় যেখানে এক ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হয় না, সেখানে চট্টগ্রামে সাত-আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলে। এমনকি বিকেলে প্রথম আলো আয়োজিত ‘জোয়ারের পানিতে বিপর্যস্ত জনজীবন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক চলাকালেও কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। গত জুলাই থেকে এ অবস্থা চলছে চট্টগ্রামের প্রতিটি আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকায়। এই হলো দেশের প্রধান বন্দর ও শিল্পনগরের হাল।
গোলটেবিল বৈঠকেই আগ্রাবাদ এলাকার একজন বাসিন্দা জানালেন, চতুর্মুখী সমস্যায় তাঁদের জীবন বিপন্নপ্রায়। প্রথমত, জোয়ারের পানিতে তাঁদের ঘরবাড়ি ডুবে যায়, রাস্তায় রিকশা ছাড়া কোনো যানবাহন চলে না। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক সময় স্কুল বন্ধ রাখতে হয়। এক জোয়ারের পানি চলে যেতে না-যেতেই ফের জোয়ার আসে। দ্বিতীয়ত, লোডশেডিংয়ের কারণে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারে না। দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্পগুলোও অকেজো। তৃতীয়ত, মেরামতের অভাবে রাস্তাঘাটগুলো যান চলাচলের প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। খানাখন্দে ভরা রাস্তায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে থাকে। শহরের ড্রেনেজব্যবস্থা খুবই নাজুক। চতুর্থত, যানজটেও নগরবাসীকে প্রায়ই নাকাল হতে হয়।
সরকার চট্টগ্রামের বাহারি নাম দিয়েছে—বাণিজ্যিক রাজধানী। একজন ব্যবসায়ী সখেদে বললেন, ‘ভাই, বাণিজ্যিক রাজধানী করতে কী কী লাগে জানেন?’ তাঁর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বললেন, যানজট, জলাবদ্ধতা, বিদ্যুৎবিভ্রাট ও অপরিকল্পিত উন্নয়েনর অপর নাম বাণিজ্যিক রাজধানী।
এসবের কারণ কী? চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, চট্টগ্রাম শহরের উন্নয়নকাজে আগের সেই গতি নেই। যেটুকু হচ্ছে, তাতে রয়েছে প্রচুর সমন্বয়হীনতা। সিটি করপোরেশন কী করছে, সেটি সিডিএ জানে না। আর সিডিএ কী করছে, তার খোঁজ বন্দর কর্তৃপক্ষ রাখে না। সমন্বয় নেই পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাজেও। চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা সমস্যাটি অনেক পুরোনো হলেও কোনো সরকারই সমাধানে এগিয়ে আসেনি।
প্রথম আলোর গোলটেবিল বৈঠকে সিটি করপোরেশনের মেয়র মন্জুর আলম ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম—দুজনই নগরবাসীর সমস্যা সমাধানে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেন কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মেয়র বিরোধী দলের। তাই নগরবাসীর ধারণা, নগরের উন্নয়নে সরকার সিটি করপোরেশনকে যথেষ্ট অর্থ দেয় না। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে মেয়র বহুবার তাগাদা দিলেও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে গত জুনের মহাবিপর্যয়ের পর। সে সময়ে কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়।
তাঁরা আরও জানান, সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী কিছুটা একগুঁয়েমি চরিত্রের হলেও বেশ করিতকর্মা ছিলেন। সরকার টাকা না দিলেও সিটি করপোরেশনের আয় বাড়িয়ে তিনি অনেক কাজ করেছেন। অনেক জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ নিয়েছেন; যদিও সেসব কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আর বর্তমান মেয়র? কেউ বলেন, খুবই সজ্জন ব্যক্তি। বিএনপির লোক হলেও সরকারের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলেন। কেউ বলেন, কোনো কাজের নন। কোনোরকমে মেয়াদ পার করতে চান।
তাহলে কি আপনারা আবার মহিউদ্দিন চৌধুরীর যুগে ফিরে যাচ্ছেন? এর জবাবে একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক বললেন, এবারে অত সহজ হবে না। তিনি দলের মনোনয়ন পাবেনই, সে কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। নগর এলাকার সাংসদেরা চান না, মহিউদ্দিন চৌধুরী ফের মেয়র হন। তাহলে তাঁদের গুরুত্ব কমে যাবে।
বিকল্প কে? তাঁর জবাব, সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামও আগ্রহী। তাঁর সঙ্গে দলের হাইকমান্ডের সম্পর্ক ভালো।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৯৯৫ সালে মাস্টারপ্ল্যান দেওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে চার চারটি সরকার গেছে। কেউ তা বাস্তবায়ন করার প্রয়োজন বোধ করেনি। এখন নড়াচড়া শুরু হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হতে আরও কয়েক বছর লেগে যাবে। তত দিন িক চট্টগ্রামবাসী এই দুর্ভোগ পোহাতেই থাকবেন? আর রাস্তাগুলো অপরিষ্কার কেন? মেয়র মহোদয় বললেন, সিটি করপোরেশনের লোকবল কম। ৬০ লাখ লোকের শহরের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা মাত্র দুই হাজার লোক দিয়ে সম্ভব নয়।
মানলাম। কিন্তু যে কর্মীরা সকাল ১০টায় রাস্তার আবর্জনা পরিষ্কার করেন, তাঁরা কেন ভোর ছয়টায় নামতে পারেন না? এ সমস্যা সব শহরেই। আসলে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কোথাও জবাবদিহি নেই।
মহিউদ্দিন চৌধুরী নিজের এখতিয়ারের বাইরে গিয়েও বেশ কিছু কাজ করেছিলেন। যেমন, সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, মার্কেট প্রতিষ্ঠা। সেগুলো লাভজনকও হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান মেয়রের সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো জৌলুশ হারিয়েছে।
অন্যদিকে সিডিএর মূল যে কাজ পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা, সে ব্যাপারে তারা কিছুই করেনি। নগরবিদদের অভিযোগ, সিডিএ চেয়ারম্যান উন্নয়নকাজগুলো করেছেন সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়াই। এমনকি প্রকৌশলী, স্থপতিদের পরামর্শও তিনি শোনেন না। নগরের রাস্তাঘাটগুলো মেরামেতর দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের হলেও সেগুলো করছে সিডিএ। তারা বড় বড় ফ্লাইওভার নির্মাণ করছে। বহদ্দারহাটের ফ্লাইওভার দুর্ঘটনায় কয়েকজনকে মারাও গেছেন। কিন্তু শহরের যানজট সমস্যার সমাধান হয়নি। এলোমেলো ফ্লাইওভার যানজট কমাবে না, বরং বাড়াবে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

জামায়াতকে পুনর্বাসন করতেই এ রায়: গণজাগরণ মঞ্চ

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের রায়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। রায় ঘোষণার পর গণজাগরণ মঞ্চের তিনটি অংশ আলাদাভাবে বিক্ষোভ কর্মসূচি ও সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে দু’টি অংশ আলাদা কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে। শাহবাগে রাস্তায় অবস্থান কর্মসূচি পালনের সময় পুলিশি হামলার শিকার হয়েছে মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকারসহ বেশ কয়েকজন কর্মী। তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। শাহবাগে সমাবেশ থেকে ইমরান এইচ সরকার বলেন, সরকার জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করেই এই রায় দিয়েছে। আমরা এই রায় মানি না। দেশবাসী এই রায় মানে না। সরকার জামায়াতকে পুনর্বাসন করতেই এই রায় ঘোষণা করেছে। ডা. ইমরান আরও বলেন, ফাঁসির রায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়বো না। তিনি দেশবাসীকে রায় প্রত্যাখ্যান করে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানান। এদিকে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শাহবাগে আবারও অবস্থান নিয়েছে মঞ্চের দুই পক্ষ। মঙ্গলবার থেকে শাহবাগে অবস্থান করছেন মঞ্চের ডা. ইমরানের নেতৃত্বাধীন অংশ। সকাল থেকে কামাল পাশার নেতৃত্বাধীন পক্ষও অবস্থান নেয়। দুই পক্ষ ঘোষণা করেছে আলাদা আলাদা কর্মসূচি। এর আগে রায় ঘোষণার পর রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগান দিতে থাকেন ডা. ইমরানের নেতৃত্বাধীন অংশের কর্মীরা। এতে শাহবাগ মোড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দশটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এ সময় পুলিশ তাদের ওপর জলকামান এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এতে ডা. ইমরানসহ চার জন আহত হন। আহতদের ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। মঞ্চের কর্মীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। প্রায় ১০ মিনিট পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। হামলার বিষয়ে পুলিশের রমনা জোনের এসি শিবলী নোমান বলেন, মঞ্চের বিক্ষোভ মিছিলে আমরা বাধা দিইনি। কিন্তু তারা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে যান চলাচলে বাধা দেয়ায় আমরা তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছি। তখন মঞ্চের অপর পক্ষ জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণসংগীত পরিবেশন করছিলেন। তারা ডা. ইমরানদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিক নিন্দা জানান।

কর্মসূচি: মঞ্চের কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিকালে প্রতিবাদী সমাবেশের আয়োজন করেন ডা. ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বাধীন অংশ। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ডাকসু’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক হোসেন, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সম্পা বসু, কেন্দ্রীয় খেলাঘরের সাবেক সভাপতি তাহমিনা সুলতানা সাথী, ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাসান তারেক, যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, মঞ্চের অন্যতম সংগঠক মারুফ রাসুল প্রমুখ। সমাবেশে ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী বলেন, স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধী সাঈদীকে ফাঁসি দেয়া হলো না। এর প্রতিবাদ জানালে নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর পুলিশ হামলা করেছে। এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। একই সঙ্গে হামলায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিচারের দাবি জানাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, আমরা দীর্ঘ কাল ধরে যুদ্ধাপরাধী পোষার কলঙ্ক বয়ে চলছি। জাতিকে এই অভিশাপ ও কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। সমাবেশ শেষে কর্মসূচি ঘোষণা করেন আরিফ জেবতিক। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ বিকাল চারটায় শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও রাত দশটা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি এবং আগামীকাল শুক্রবার বিকাল চারটায় শাহবাগ জাদুঘরের সামনে গণসমাবেশ। এরপর কর্মসূচি ঘোষণা করেন কামাল পাশা পক্ষ। তারা শুক্রবার বিকাল চারটায় জাদুঘরের সামনে সমাবেশের ঘোষণা দেন। আবারও সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছে মঞ্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠনগুলো। শত চেষ্টা করেও এক করতে পারেন নি মঞ্চের অন্য দুইপক্ষকে। এ বিষয়ে ছাত্র মৈত্রীর বাপ্পাদিত্য বসু বলেন, মঞ্চ আলাদা আলাদা থাকলে কোন দাবিই আদায় করা যাবে না। আগেও অনেক চেষ্টা করেছি। এখনও করছি। তাদের কোন কর্মসূচি রয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এখনও সবাইকে একসাথে করার প্রক্রিয়া চলছে। যদি না হয় তবে আলাদা কর্মসূচি ঘোষণা করবো। যদি তারা সঙ্গে আসে তবে স্বাগতম।
ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল: এদিকে রায়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ছাত্রলীগ। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে একটি মিছিল শুরু হয়ে রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, ঢাবি শাখার সভাপতি মেহেদী হাসান, সাধারণ সম্পাদক ওমর শরীফ প্রমুখ।

ফাঁসি নয়, আমৃত্যু কারাদণ্ড -বাকি জীবন কারাগারে থাকবেন সাঈদী by মহিউদ্দিন ফারুক ও কুন্তল রায়

ফাঁসির মঞ্চে যেতে হচ্ছে না জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আদেশে সেই সর্বোচ্চ সাজা থেকে তিনি রেহাই পেয়েছেন। এর পরিবর্তে তাঁকে বাকি জীবন কারাগারে থাকার দণ্ড দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম আপিল নিষ্পত্তির ঠিক এক বছর পর গতকাল দ্বিতীয় আরেকটি মামলা নিষ্পত্তি করলেন আপিল বিভাগ। প্রথমটিতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ।
গতকাল বুধবার প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল আংশিক মঞ্জুর করে রায় দেন। রায়ে পাঁচটি অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে দণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে একাত্তর সালে তিন নারীকে অপহরণ করে আটকে রেখে ধর্ষণ এবং কয়েকজন ব্যক্তিকে জোর করে ধর্মান্তরিত করার ঘটনায় জড়িত থাকাসহ তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সাঈদীকে স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে সরকার ও আসামিপক্ষ উভয়েই বলেছে, রায়ে তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালায় জামায়াত-শিবির। সহিংসতায় প্রথম তিন দিনেই ৭০ জন নিহত হন। এই মামলায় আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের করা দুটি আপিলের ওপর ৫০ দিনের মতো শুনানি শেষে গত ১৬ এপ্রিল আপিল বিভাগ রায় অপেক্ষমাণ রাখেন। ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় গতকাল রায় ঘোষণা করা হয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে গঠিত ২০টি অভিযোগের মধ্যে আটটি প্রমাণিত হয়। এগুলো হচ্ছে-৬, ৭, ৮, ১০, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগ। এর মধ্যে ১০, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন আপিল বিভাগ।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে গতকাল সকাল সাড়ে আটটা থেকে আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকেরা আপিল বিভাগে জড়ো হন। সকাল ১০টা পাঁচ মিনিটে এজলাসে বসেন বিচারপতিরা। ততক্ষণে শতাধিক গণমাধ্যমকর্মী, পাঁচ শতাধিক আইনজীবী, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে এজলাসকক্ষ ভরে যায়। এ সময় সাঈদীর ছেলে পিরোজপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীও উপস্থিত ছিলেন।
১০টা সাত মিনিটে রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পড়ে শোনান প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন। পিনপতন নীরবতায় মাত্র তিন মিনিটে রায় ঘোষণা শেষ হয়। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন: বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
রায়ে বলা হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর করা ফৌজদারি আপিল ও সরকারের ফৌজদারি আপিল আংশিক মঞ্জুর করা হলো। ৬, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ থেকে সাঈদীকে খালাস দেওয়া হলো। অষ্টম অভিযোগের একটি অংশ থেকে তাঁকে খালাস এবং অপর অংশে দণ্ড পরিবর্তন করে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হলো। সপ্তম অভিযোগে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হলো। সাজা ও খালাসের সব সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে নেওয়া হয়।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে রায় দেওয়া হলেও কোন বিচারপতি কী মত দিয়েছেন, তা ঘোষিত রায়ে উল্লেখ করা হয়নি।
তিন অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ড: ১০ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২ জুন সকাল ১০টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে সশস্ত্র দল পিরোজপুরের উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার ২৫টি ঘরে আগুন দেয়। পরে সাঈদীর ইন্ধনে বিসাবালিকে নারিকেলগাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।

১৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, সাঈদীর নেতৃত্বে ১০-১২ জনের রাজাকার দল পারেরহাট বন্দরের একটি বাড়ি থেকে তিন বোনকে ধরে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁদের তিন দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয়। এই অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও ট্রাইব্যুনাল কোনো সাজা দেননি। আপিল বিভাগ এই অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন।
১৯ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, সাঈদী জোর করে পারেরহাটসহ অন্য গ্রামের ১০০-১৫০ হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করেন। এই অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও ট্রাইব্যুনাল কোনো সাজা দেননি। আপিল বিভাগ এই অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন।
দুটিতে দুই মেয়াদে কারাদণ্ড: ৭ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ৮ মে সাঈদী পাকিস্তানি সেনাদের বাদুরিয়া গ্রামের নুরুল ইসলাম খানের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে নুরুল ইসলাম খানকে আওয়ামী লীগার এবং তাঁর ছেলে শহীদুল ইসলামকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেন। পরে তাঁদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই অপরাধে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে কোনো দণ্ড দেননি। তবে গতকাল আপিল বিভাগ সাঈদীকে এই অপরাধে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।
৮ নম্বর অভিযোগ অনুসারে, ১৯৭১ সালের ৮ মে সাঈদী ও তাঁর দলের সদস্যরা চিথোলিয়া গ্রামের মানিক পশারির গ্রাম লুট করেন। সেখান থেকে মানিক পশারির ভাই মফিজুদ্দিন ও ইব্রাহিম কুট্টিকে ধরে নিয়ে যান। পাঁচটি ঘরে আগুন দেন। সেনাক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার সময় সাঈদীর প্ররোচনায় পাকিস্তানি সেনারা ইব্রাহিমকে হত্যা করে। মফিজকে সেনাক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। আপিল বিভাগ এই অভিযোগের অংশবিশেষ থেকে তাঁকে খালাস দিয়েছেন। বাকি অভিযোগের জন্য মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।
তিন অভিযোগে খালাস: রায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ৬, ১১ ও ১৪—এই তিন অভিযোগ থেকে সাঈদীকে খালাস দেওয়া হয়। ৬ নম্বর অভিযোগ হচ্ছে, পারেরহাট বাজারের আওয়ামী লীগ, হিন্দু সম্প্রদায় ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের বাড়িঘর ও দোকান লুট করা। ১১ নম্বর অভিযোগ ছিল, পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে গিয়ে টেংরাখালী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুল আলম হাওলাদারের বড় ভাই আবদুল মজিদ হাওলাদারকে নির্যাতন এবং বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ।
১৪ নম্বর অভিযোগ ছিল, ৫০-৬০ জনের একটি রাজাকার বাহিনী নিয়ে গিয়ে হোগলাবুনিয়ার হিন্দুপাড়ায় কয়েকজনকে ধর্ষণ করা এবং পাড়ায় আগুন দেওয়া।
এই তিন অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে কোনো সাজা দেননি। আপিল বিভাগ গতকালের রায়ে তাঁকে তিনটি অভিযোগ থেকেই খালাস দেন।
প্রতিক্রিয়া: রায়ে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি মন্তব্য করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকুক, এটাই ছিল আমার প্রত্যাশা। সেটা থাকেনি। এ জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে।’
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রতিক্রিয়ায় মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। যে রায় হয়েছে, তা মাথা পেতে নিচ্ছি। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি বলব, কিছুটা হতাশ ও মর্মাহত হয়েছি। এটা আমার আবেগ। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর এ ব্যপারে কিছু করা যায় কি না, সেটা খতিয়ে দেখা হবে।’
রায় ঘোষণার পর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে এক প্রতিক্রিয়ায় সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালত সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে রায় দিয়েছেন। আপিল বিভাগের রায় সবাইকে মেনে নিতে হবে।’
সাঈদীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলাটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা। রায় পর্যালোচনা করে এর বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করা হবে। এখনো বিশ্বাস করি, আসামি ন্যায়বিচার পাবেন।’
রায়ে সংক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট জানিয়ে সাঈদীর অপর আইনজীবী তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হবে।
সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘রায়ে সন্তুষ্ট নই। আমরা প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার পাইনি। আশা করেছিলাম তিনি খালাস পাবেন। পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর পুনর্বিবেচনার আবেদন করব।’
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন সাঈদী গ্রেপ্তার হন। ওই বছরের ২ আগস্ট তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২৮ মার্চ দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর আপিলের শুনানি শুরু হয়।

মোদির রাজ্য দিয়ে সফর শুরু শি জিনপিংয়ের

আহমেদাবাদের একটি হোটেলে গতকাল বিকেলে চীনের
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে স্বাগত জানান ভারতের
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এএফপি
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৬৪তম জন্মদিনে তাঁর রাজ্য গুজরাটের রাজধানী আহমেদাবাদ থেকে তিন দিনের ভারত সফর শুরু করলেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গতকাল বুধবার বিকেলে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন সস্ত্রীক প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁদের স্বাগত জানান হোটেলে। চীনা প্রেসিডেন্টকে আজ রাষ্ট্রপতি ভবনে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানো হবে। ২০০৬ সালের পর এই প্রথম কোনো চীনা প্রেসিডেন্ট ভারতে এলেন।
তা ছাড়া এই প্রথম কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান রাজধানী দিল্লির বদলে দেশের অন্য কোনো শহরে অবতরণ করলেন এবং প্রধানমন্ত্রী সেই শহরে গিয়ে তাঁকে স্বাগত জানালেন। শি জিনপিংয়ের এই সফরকে ‘যুগান্তকারী’ মনে করা হচ্ছে। এ সফর দুই দেশের সম্পর্ককে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। প্রধানমন্ত্রী মোদির কথায়, ‘এই সম্পর্ক নিছক পাটিগণিতের বাইরে।’ সেই ধারণার সঙ্গে সংগতি রাখতেই সফর শুরুর প্রথম দিনে তিনটি সমঝোতা সই হলো। গুজরাট রাজ্য ও চীনের গুয়াংডং প্রদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হলো প্রথম সমঝোতা। এই চুক্তির ফলে দুই রাজ্য বাণিজ্য, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পর্যটন, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। দ্বিতীয় সমঝোতা গুয়াংজৌ ও আহমেদাবাদ শহরের মধ্যে। দুই শহর বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। গুজরাটে শিল্প এলাকা গঠনের জন্য তৃতীয় সমঝোতা স্মারকে সই করলেন চীনের ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও গুজরাটের শিল্পোন্নয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যানেরা। দুই নেতা এরপর যান সবরমতি নদীর তীরে গান্ধীজির আশ্রমে। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন এই নদীটির সংস্কার করেন মোদি। রাতে প্রেসিডেন্টের সম্মানে প্রধানমন্ত্রী গুজরাটি ডিনারের বন্দোবস্ত করেছেন। দেড় শ পদের এই নৈশভোজের তদারকিতে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। চীনা প্রেসিডেন্টের এ সফর এককথায় ত্রিমাত্রিক। আশা করা হচ্ছে, এ সফরের পর সীমান্ত সমস্যার একটা সুরাহা হবে। চীনা প্রেসিডেন্টের এ সফরের সময়ই কাশ্মীরের লাদাখের চুমুর এলাকায় চীনা সেনাদের ‘অনুপ্রবেশের’ ঘটনা নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া সরব।
আজ দিল্লিতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সীমান্ত বিরোধ প্রসঙ্গ বিবেচিত হবে। ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের বাকি দুটি ক্ষেত্র সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা। সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তারে ভারতের আগ্রহ বিপুল এবং এ সহযোগিতা যাতে একতরফা না হয়, সেটাও ভারতের লক্ষ্য। এ জন্য এই সফরে ভারত চাইছে দুই দেশের বাণিজ্যে (সাড়ে ছয় হাজার কোটি ডলার) চীনের পক্ষে একতরফা যে ধারা চলছে, তাতে সামঞ্জস্য আনতে। এ কারণেই মোদি ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’র স্লোগান দিয়ে রেখেছেন। চীনকে বলা হবে, তারা একদিকে সে দেশে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ বাড়াক, অন্যদিকে তাদের জিনিস ভারতে তৈরি করুক এবং বিশ্বের যেখানে খুশি বেচুক। প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে ভারত চায় চীন তাদের বাজার ভারতীয় পণ্যের জন্য আরও খুলে দিক। চীনের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় এই মুহূর্তে চার ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিপুল সঞ্চয় থেকে চীন অন্তত ৫০ হাজার কোটি ডলার বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। এই মুহূর্তে ভারতে চীনের লগ্নি কমবেশি ৪০ কোটি ডলার, যার বেশিটাই গুজরাটে। চীন-ভারত সম্পর্কে আশার ক্ষেত্র যতটা, আশঙ্কার ক্ষেত্রও ততখানি। জাপান ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ভারতের মাখামাখি চীনের পছন্দ নয়। এ নিয়ে সম্পর্কে টানাপোড়েন আছে। যেমন আছে দালাই লামা ও তিব্বতনীতি নিয়ে। অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে চীনের নীতিও ভারতের অপছন্দ। সেখানকার ভারতীয়দের জন্য চীনের পৃথক ভিসানীতির কোনো সুরাহা হয় কি না, আজ তা বোঝা যাবে।

স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আজ

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে গতকাল ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে
শোভাযাত্রা বের করেন স্বাধীনতাকামীরা। এএফপি
স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকবে, নাকি স্বাধীন হবে, আজ বৃহস্পতিবার সেই রায় দেবেন স্কটিশরা। গতকাল বুধবার স্বাধীনতাকামীরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে এবং বিরোধিতাকারী ‘না’ ভোটের পক্ষে শেষ প্রচারণা চালান। শেষ মুহূর্তের বেশির ভাগ জনমত জরিপে ‘না’ ভোট এগিয়ে থাকার কথা বলা হলেও ব্যবধান খুবই কম। তাই দুই পক্ষের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলেই ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা। খবর বিবিসি ও গার্ডিয়ানের। স্বাধীনতাকামী নেতা ও স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যামন্ড গতকাল ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালান। শেষ দিনের প্রচারাভিযানে স্কটল্যান্ডের জনগণের উদ্দেশে এক চিঠিতে স্যামন্ড বলেন, স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিলে তাঁরা নিজের হাতে ক্ষমতা পাবেন। সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্যামন্ড বলেন, ‘ভোটের জন্য কয়েক ঘণ্টা সময় ব্যয় করার মধ্য দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নিজের হাতে চলে আসবে।...এটা আমাদের জন্য অসাধারণ একটা মুহূর্ত। স্কটল্যান্ডের ভবিষ্যৎ—আমাদের দেশ, আমাদের হাতে।’ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, উপপ্রধানমন্ত্রী নিক ক্লেগ ও প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড স্কটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একীভূত রাখার জন্য জোর তৎপরতা চালিয়ে আসছেন।
গতকালও তাঁরা বিভিন্নভাবে ‘না’ ভোটের জন্য প্রচারণা চালান। ক্যামেরনের দুঃস্বপ্ন: ব্রিটিশ প্রভাবশালী দৈনিক দ্য টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন বলেন, গণভোটে ‘হ্যঁা’ ভোট জিততে যাচ্ছে—এমন দুঃস্বপ্ন দেখে মাঝরাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন তিনি। ক্যামেরন আরও বলেন, জরিপে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর ব্যবধান কেন এত কাছাকাছি, তা তাঁর বোধগম্য নয়। ক্যামেরন গতকাল হ্যাম্পশায়ারে এক অনুষ্ঠানে আবারও জানিয়ে দেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও তিনি পদত্যাগ করবেন না। ক্যামেরন বলেন, ‘গণভোটের ব্যালট পেপারে আমার নাম থাকবে না। গণভোটে শুধু সিদ্ধান্ত হবে, স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকবে কি না। যুক্তরাজ্যের আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমেই আমার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।’ না ভোটই এগিয়ে: গত মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত তিনটি জনমত জরিপে দেখা যায়, ‘না’ ভোটই জয় পেতে চলেছে। ডেইলি েটলিগ্রাফ, ডেইলি মেইল ও স্কটসম্যান-এর প্রকাশিত এসব জরিপে অংশ নেওয়া ৫২ শতাংশই ‘না’ ভোটের পক্ষে মত দিয়েছেন। বিপরীতে ৪৮ শতাংশ মত দিয়েছেন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। এই জরিপগুলোতে অবশ্য মনস্থির না করা ভোটারদের বাইরে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন হিসাবে দেখা যায়, মনস্থির না করা ভোটার রয়েছেন অন্তত পাঁচ লাখ। ক্লিনটন ঐক্যের পক্ষে: এদিকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেছেন, যুক্তরাজ্যের সঙ্গেই থাকা উচিত স্কটল্যান্ডের। এর মাধ্যমে তারা বিশ্বের কাছে ঐক্যের একটি ‘শক্তিশালী বার্তা’ পাঠাতে পারবে। এক বিবৃতিতে ক্লিনটন তাঁর এই অবস্থানের কথা জানান।

রুপালি পর্দার কুহকিনী

পুরুষেরা সাবধান! পাপ নগরে আছে এক কুহকিনী। তার নাম ইভা গ্রিন। অবিশ্বস্ত খুনে এক ছলনাময়ী সে। তার মোহের মায়ায় জড়ালে মেরুর বরফও মেঘ হয়ে যায়। ‘সিন সিটি: আ ড্যামে টু কিল ফর’ সিনেমায় ইভা গ্রিনের চরিত্রটি এমনই। সিনেমায় তার নাম আভা লর্ড। কিন্তু তাকে ‘ফেমে ফ্যাটালে’ বা ‘মারাত্মক কুহকিনী’ বলেও ডাকা যেতে পারে! লক্ষ্য হাসিলে ছলনায় ভুলিয়ে পুরুষকে ঘায়েল করে সে। যেন ঠিক একইভাবে রুপালি পর্দার দর্শকদেরও ঘায়েল করতে পারে সিনেমার এই নারী চরিত্ররা! পশ্চিমা সিনে দুনিয়ার এই ‘কুহকিনী’ চরিত্রের সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিবিসি অবলম্বনে এই প্রতিবেদন।

রুপালি পর্দার কুহকিনী
সিনেমায় এই ধাঁচের নারী চরিত্রের উপস্থিতির বিষয়টা খুবই স্পষ্ট। সুন্দর কোমল আঙুলে জশ ব্রোলিনের পুরো শরীর জড়িয়ে নিচ্ছেন ইভা গ্রিন...এই দৃশ্য কে-ই বা না দেখতে চাইবে! পুরুষ দর্শককেও সে এই মোহজালেই ভোলায়, কাছে টানে, কিন্তু সে নিষিদ্ধ ফলের স্বাদ দেয় না। সিনেমার এই ‘কুহকিনী’ চরিত্র নিয়ে একটা গবেষণা সম্পাদনা করেছেন ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর ক্যাথেরিন ও’রাওয়ে। গবেষণাটির শিরোনাম ‘ফিমে ফ্যাটালে: ইমেজেস, হিস্টোরিস, কনটেক্সটস’ বা ‘মারাত্মক কুহকিনী: প্রতিমূর্তি, ইতিহাস, পরিপ্রেক্ষিত’। ও’রাওয়ে মনে করেন, সিনেমায় এই ধাঁচের নারী চরিত্র আসলে ‘স্বাধীন নারী’র প্রতি সমাজের মিশ্র দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।

ও’রাওয়ে বলছেন, ‘নারী প্ররোচকের এই চরিত্র নন্দনকাননে আদম-হাওয়ার কাহিনির মতোই আদি।’ তবে, ব্রিস্টলের এই গবেষক বলেন, ‘আজকে আমরা যে কুহকিনী নারীর চরিত্র দেখছি তার উত্থান ১৯ শতকের শেষ ভাগে। যে সময়টায় হেরোডের কন্যা সালোমে থেকে শুরু করে হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের শি কিংবা ব্রাম স্টোকারের নারী ভ্যাম্পায়ারের মতো একের পর এক এমন চরিত্র সমকালীন গল্প-উপন্যাসে আসতে শুরু করল। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এমন এক সময়ে এসব চরিত্রের উত্থান ঘটতে থাকল যখন জনপরিসরে নারীর উপস্থিতি নিয়ে তুমুল আলোচনা হচ্ছে।’

একই বিষয় লক্ষ্য করা যাবে রুপালি পর্দায় মারাত্মক কুহকিনীদের উত্থান পর্বেও। এ জাতীয় চলচ্চিত্রগুলোতে সব সময়ই নারীকে পাতক ও প্ররোচক হিসেবে হাজির করা হয়েছে। ১৯১৫ সালের নির্বাক সিনেমা ‘আ ফুল দেয়ার ওয়াজ’-এর মধ্য দিয়েই হলিউডের এমন চরিত্রের রূপায়ণ শুরু হয়। এতে দেখা যায় ওয়াল স্ট্রিটের এক সম্মানিত আইনজীবী ‘মারাত্মক কুহকিনী’ থেডা বারার আদিরসের মোহবাণে আবিষ্ট হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছেন। তবে, হালের ‘মারাত্মক কুহকিনী’ চরিত্র ষোলকলা পূর্ণ করে পর্দায় হাজির হয় ১৯৪০-এর দিকে।

‘ফিল্ম নোয়া’ হিসেবে অভিহিত সিনেমার এ ঘরানা বিকশিত হয়ে ওঠে ‘গিল্ডা’, ‘দ্য কিলারস’, ‘মার্ডার’, ‘মাই সুইট’ এবং ‘ডাবল ইনডেমনিটি’র মতো চলচ্চিত্রগুলোর মাধ্যমেই। এ সময় নিজেদের আদিরসাত্মক সম্মোহনী ক্ষমতা দিয়ে রিটা হেওয়ার্থ, আভা গার্ডনার ও বারবারা স্ট্যানউইকের মতো অভিনেত্রীরা হয়ে ওঠেন রুপালি পর্দার ধ্রুপদী ‘কুহকিনী’। সিনেমায় দেখা যায় এই নারীরা যা চান, তা পাওয়ার জন্য তাঁরা সবকিছুই করতে প্রস্তুত। প্রতারণা হোক কিংবা প্ররোচনা যেকোনো মূল্যে খলনায়ককে বশে আনছে, এমনকি প্রয়োজনে খুন করতেও পিছপা হচ্ছে না। তবে, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট আঙ্গিলার ‘ফিল্ম নোয়া’ বিশেষজ্ঞ ডক্টর অ্যালেন রাইট মনে করেন সিনেমার এমন চরিত্র কল্পনার জগতের মনে হলেও বাস্তব সমাজের সঙ্গে বিষয়গুলোকে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

‘ঘরের নারী’ না ‘বাইরের নারী’
ডক্টর অ্যালেন রাইট মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে যে শ্রম ঘাটতি দেখা দেয়, তা পূরণের জন্য অনেক নারীকে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বাইরের কাজ করতে হয়। এমনকি যেসব কাজকে একসময় ‘পুরুষালি’ কাজ বলে নারীদের দূরে রাখা হয়েছিল, সেসব কাজও করতে হয় নারীকেই। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় নারীরা তখন অনেক বেশি পারিশ্রমিক পান। নিজের উপার্জনে ঘরের বাইরে নারীর এ উপস্থিতি নিয়ে সমাজে আলোচনার ঝড় ওঠে। যুদ্ধকালীন আমেরিকায় আলোচনার অন্যতম বিষয়ে পরিণত হয় বাইরে কাজ করা, নারীর অবসর যাপন এবং তাঁর যৌনতার বিষয়টি। অ্যালেন রাইটের ধারণা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এমন সামাজিক পরিস্থিতিতেই সিনেমায় এই ‘কুহকিনী’ চরিত্রের জন্ম এবং ঘর থেকে বেরোনো নারীকে আক্রমণ করা এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু এমন বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত নন অধ্যাপক মার্ক জাঙ্কোভিচ। ‘ডিফাইনিং কাল্ট মুভিস’ বইয়ের সহ-লেখক এবং চলচ্চিত্র গবেষক জাঙ্কোভিচ বলেন, ‘একটা নারীবাদী আলোচনা আছে যে, যুদ্ধের দিনগুলোতে স্বাধীন কর্মজীবী নারীর চরিত্র হনন করতেই কুহকিনী চরিত্রের সৃষ্টি হয়েছে।’ কিন্তু এ ধারণার সঙ্গে একমত নন জাঙ্কোভিচ। তিনি বলেন, ‘মনে করা হয় নারীকে বাইরে থেকে হটিয়ে আবারও ঘরে ফেরত পাঠানোর প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবেই এসব চরিত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমি এর ঠিক উল্টোটাই বলব। এই সিনেমাগুলো বরং যে নারীরা যুদ্ধের সময়েও কাজের জন্য ঘর থেকে বেরোয়নি তাঁদেরই সমালোচনা করে। কল-কারখানায় কাজ করে খেটে খাওয়া, দৃঢ় প্রত্যয়ী আধুনিক নারীরা কুহকিনী চরিত্রের বিষয় নয়; বরং জনপরিসরে এসে কোনো সামাজিক দায়িত্ব না নেওয়া, আলস্যে জীবন পার করা, স্বামীর টাকায় সেজেগুজে স্বল্প-বসনে ঘরে বসে থাকা নারীরাই মারাত্মক কুহকিনী।’

‘ঘরে থাকা নারী’ কিংবা ‘বাইরে বেরোনো’ বা ‘স্বাধীন কর্মজীবী নারী’ যাকেই ‘কুহকিনী’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়ে থাকুক না কেন বাস্তবতা হলো—সিনেমার এই নারীরা ঘৃণা নয় ভালোবাসাই পেয়েছেন। আর তা কেবল মোহগ্রস্ত পুরুষ দর্শকদের কাছ থেকেই নয়; বরং অনেক নারীর কাছ থেকেও। ডক্টর অ্যালেন রাইট বলেন, ‘একজন নারী দর্শক হিসেবে আমি এমন চরিত্রকে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দক্ষ চরিত্র হিসেবে মনে করি। যে শুধু আখ্যানকেই নিয়ন্ত্রণ করে না, সেজেগুজে টুমটুমা হয়ে নিজের যৌনতাকে মুক্ত করে ঘুরে বেড়ায় না; বরং শেষ পর্যন্ত সামাজিক ব্যবস্থায় নিজের অসম্মানজনক অবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করে। কৃতকর্মের জন্য কপালে যে শাস্তিই জুটুক, এই নারী তার পরোয়া করে না। আমার এখনো মনে হয়, সে প্রবলভাবেই শক্তিমান ও উদ্দীপনামূলক একটা বার্তাই দেয়।’

কুহকিনী রমণী! না কুহক পুরুষ!
১৯৫০ সালের দিকে আমেরিকা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে শুরু করলে কুহকিনী চরিত্রটা বিবর্ণ হয়ে যেতে থাকে। কিন্তু পর্দা থেকে কখনোই পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি সে। ১৯৯০ সালের দিকে শ্যারন স্টোনের ‘বেসিক ইন্সটিঙ্কট’, ম্যাডোনার ‘বডি অব এভিডেন্স’ ডেমি মুরের ‘ডিসক্লোজার’ এবং নিকোল কিডম্যানের ‘টু ডাই ফর’-এর মতো সিনেমার মধ্য দিয়ে রুপালি পর্দায় আবারও জাঁকিয়ে বসে কুহকিনী চরিত্র।

নব্বইয়ের দশকে এ চরিত্রের পুনরুত্থানের সময়ও দেখা গেছে, সমকালীন সামাজিক উদ্বেগের সঙ্গে এর সম্পর্ক খুবই স্পষ্ট। রোনাল্ড রিগান এবং সিনিয়র বুশের শাসনামলে রক্ষণশীল যুক্তরাষ্ট্রে সতর্কভাবে স্বাধীন নারীর গল্প তুলে ধরতে পেরে আনন্দিতই ছিল হলিউড। ডক্টর ক্যাথেরিন ও’রাওয়ের ভাষায় এ সময়ে এমন সিনেমায় গল্পের আবশ্যক শর্ত ছিল ‘সামাজিক সীমা পেরোনো নারীকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।’ হলিউডের বাস্তবতা যা-ই হোক আজকাল আর আগের মতো কুহকিনী রমণীদের দেখা যাচ্ছে না। তবে, ‘সিন সিটি: আ ড্যামে টু কিল ফর’ সিনেমায় ইভা গ্রিনের চরিত্রটির ‘আভা লর্ড’ নামের সঙ্গে ধ্রুপদী যুগের কুহকিনী ‘দ্য কিলার’-এর ‘আভা গার্ডনারের’ নামের মিল কাকতালীয় বলে মনে করার কোনো কারণই নেই। এই নতুন সিনেমাটিও হালের অন্যান্য সিনেমার মতোই সমকালীন বিষয় নিয়ে তেমন কিছুই বলছে না। বরং পুরোনো যুগের আবহে নিয়ে গিয়ে দর্শকদের কাছে ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’ জোগাচ্ছে।

সাবেক কালের কুহকিনীদের আর দেখা যাচ্ছে না বলে ভাবার কোনো কারণ নেই যে, অনুরাগীদের তৃষ্ণা মেটানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া রহস্যময় আর খুনে প্ররোচকের আকাল পড়েছে সিনেমায়। কুহকিনী রমণীর জায়গায় আমরা ‘ফিফটি শেডস অব গ্রে’তে ক্রিশ্চিয়ান গ্রে এবং ‘টোয়াইলাইট’-এর এডওয়ার্ড কালেনের মতো প্ররোচক পুরুষের চরিত্র পাচ্ছি, যে কিনা আক্ষরিক অর্থেই একজন ড্রাকুলা। নারীরা সাবধান! এখানে হাজির ‘হোমে ফ্যাটালে’ বা ‘কুহক পুরুষ!’

স্বাধীন স্কটল্যান্ডের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

স্কটল্যান্ডের উপকূলে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রসমৃদ্ধ ব্রিটিশ ডুবোজাহাজ
স্কটল্যান্ড স্বাধীন হলে মুদ্রা, জাতীয় ঋণ, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) সদস্যপদ ইত্যাদি বড় ইস্যুগুলোতে ‘নতুন’ স্কটল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের অবস্থান কী হতে পারে, তা নিয়ে রয়টার্সের বিশ্লেষণ পাউন্ড: স্কটল্যান্ড আলাদা হয়ে গেলে তার মুদ্রা কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাজ্যের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দল পৃথক স্কটল্যান্ডকে পাউন্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার পক্ষে একমত। এই দলগুলোর আশঙ্কা, পৃথক হওয়ার পরও স্কটল্যান্ডকে মুদ্রা হিসেবে পাউন্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হলে, ইউরো জোনের মতো অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হবে। স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী নেতা সেখানকার ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যামন্ড অবশ্য ওই আশঙ্কাকে ধোঁকাবাজি বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, স্কটল্যান্ড একতরফাভাবে পাউন্ডকেই মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করবে কিংবা আলাদা মুদ্রা বের করবে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় ঋণ: ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যের জাতীয় ঋণ দাঁড়াবে দেড় ট্রিলিয়ন পাউন্ডে। স্বাধীনতাকামী নেতা স্যামন্ড বলেছেন, স্বাধীন স্কটল্যান্ডকে মুদ্রা হিসেবে পাউন্ড ব্যবহার করতে দেওয়া না হলে জাতীয় ঋণের ভাগও নেবে না স্কটল্যান্ড। তবে যুক্তরাজ্য অত সহজে ছাড়বে না বলে আভাস দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। তারা বলেছে, স্কটল্যান্ড আলাদা হলে জাতীয় ঋণের অংশ পরিশোধের জন্য স্কটিশদের কাছে অবশ্যই দাবি তোলা হবে। তেল-গ্যাসের আয়: যুক্তরাজ্যের তেল-গ্যাসের মজুতের বেশির ভাগই রয়েছে উত্তর উপকূলে। স্কটল্যান্ড আলাদা হয়ে গেলে এই মজুতের বেশির ভাগই পড়বে স্কটল্যান্ডের অংশে।
বর্তমান স্কটিশ সরকার দাবি করছে, তেল-গ্যাস মজুতের ৯০ শতাংশই নতুন স্কটল্যান্ডের আওতায় থাকবে। কেউ কেউ বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী তেল-গ্যাসের আয় ভাগাভাগি হবে। স্বাধীনতাকামীদের মতে, উত্তর উপকূলে দুই হাজার ৪০০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে। বিপক্ষের লোকজন বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বলছেন, মজুতের পরিমাণ দেড় হাজার কোটি থেকে এক হাজার ৫০ কোটি ব্যারেল। নাগরিকত্ব: স্কটিশ সরকার বলছে, স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী অথবা বর্তমান ব্রিটিশ নাগরিকেরা ‘স্বভাবতই নাগরিকত্ব’ পাবেন। স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার দিন থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা কার্যকর হবে। স্কটিশ বাবা-মায়ের সন্তানেরা নাগরিকত্ব পাবে। ব্রিটিশ সংবিধানে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি অনুমোদিত। কিন্তু স্কটল্যান্ডের ক্ষেত্রে কী হবে, তা বলেনি ব্রিটিশ সরকার। ইইউ সদস্যপদ: ইইউ সদস্যপদ পেতে স্বাধীন স্কটল্যান্ড ঝামেলায় পড়তে পারে। স্যামন্ডের দল এসএনপির দাবি, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থেকে স্কটল্যান্ড দীর্ঘদিন ইইউ নীতি পর্যবেক্ষণ করেছে। তাই সদস্যপদ পেতে তার কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু স্পেনসহ ইইউর কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্র মনে করে, এটা করলে এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উৎসাহ দেওয়া হবে। পারমাণবিক অস্ত্র: স্কটল্যান্ড চায় সেখানে থাকা ব্রিটিশ পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রসমৃদ্ধ চারটি ডুবোজাহাজ সরিয়ে নিক যুক্তরাজ্য। এ জন্য তারা যুক্তরাজ্যকে পাঁচ বছর সময় দিতে রাজি। তবে যুক্তরাজ্য সরকার বলছে, এগুলো সরিয়ে নেওয়া জটিল ও ব্যয়বহুল কাজ। আর এটা যদি করতেই হয়, তাহলে পাঁচ বছরের বেশি সময় দিতে হবে।
এক ঝলকে স্কটল্যান্ড
জনসংখ্যা: ৫২ লাখ ৯৫ হাজার ৪০০ (২০১১)
রাজধানী: এডিনবরা
বৃহত্তম শহর: গ্লাসগো
জাতীয় ব্যক্তিত্ব: রবার্ট ব্রুস (রাজা), রবার্ট বার্নস (কবি) আয়তন: ৭৮ হাজার ৭৭২ বর্গকিলোমিটার সীমান্ত: ইংল্যান্ডের সঙ্গে ১৫৪ কিলোমিটার জনসংখ্যার বিন্যাস (শতাংশ): শ্বেতাঙ্গ স্কটিশ (৮৪), অন্যান্য শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ (৭.৯), অন্যান্য শ্বেতাঙ্গ (১.৯), শ্বেতাঙ্গ পোলিশ (১.২), শ্বেতাঙ্গ আইরিশ (১.০), পাকিস্তানি (০.৯), কৃষ্ণাঙ্গ ক্যারিবিয়ান স্কটিশ (০.১২)
প্রধান ধর্ম: খ্রিষ্টান ৫৩.৮ শতাংশ, মুসলিম (১.৪ শতাংশ), হিন্দু (০.৩ শতাংশ)
গড় আয়ুষ্কাল: নারী ৮০.১ বছর এবং পুরুষ ৭৫.৩ বছর। মুদ্রা: পাউন্ড স্টার্লিং
মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন: ২৪ হাজার ৩০০ পাউন্ড মোট রপ্তানি: ২৬ বিলিয়ন পাউন্ড (তেল ও গ্যাস ছাড়া)
প্রধান রপ্তানি পণ্য: হুইস্কি (৪.৩ বিলিয়ন পাউন্ড) ১৭০৭ সাল: যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একীভূত হয় স্কটল্যান্ড
১৯৯৯ সাল: গণভোটের পর নবগঠিত স্কটিশ পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন সরকার ও রাজনীতি: রাষ্ট্রপ্রধান রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যামন্ড সংস্কৃতি: খাদ্য: হাগিস, শর্টব্রেড, ফিশ অ্যান্ড চিপস, স্মোকড স্যামন; পানীয়: হুইস্কি, টেন্যান্টস বিয়ার; উৎসব: বার্নস নাইট, এডিনবরা ফেস্টিভ্যাল, হাইল্যান্ড গেমস। সূত্র: এএফপি।

স্কটল্যান্ডের ভাগ্য নির্ধারণ আজ

স্কটল্যান্ডবাসীর দোটানা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে স্কটল্যান্ড থাকবে, নাকি স্বাধীন হবে—আজ বৃহস্পতিবার ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করবেন স্কটিশরা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, গণভোট নিয়ে যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডে একধরনের উত্তেজনা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী মানুষ আজ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন। বিপক্ষে থাকা ব্যক্তিরা দেবেন ‘না’ ভোট।
ফলাফল কী আসবে—এখনই তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে বিভিন্ন জনমত জরিপে ব্যবধান কম ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, পাঁচটি জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ ভোটার স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে। ৫২ শতাংশ বিপক্ষে। অর্থাৎ, জরিপ অনুযায়ী, ‘না’ ভোট কিছুটা এগিয়ে আছে।
গ্রিনিচমান সময় ছয়টা থেকে শুরু হয়ে গণভোট শেষ হবে নয়টায়। ১৫ ঘণ্টা ধরে চলা এই গণভোটের ফল আগামীকাল শুক্রবার সকালে পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্কটল্যান্ডের ৪২ লাখ ৮৫ হাজার ৩২৩ জন নিবন্ধিত ভোটার এই গণভোটে অংশ নেবেন। ২ হাজার ৬০৮টি কেন্দ্রে ভোট নেওয়া হবে। গণভোটে রেকর্ড পরিমাণ ৮০ শতাংশ ভোট পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রচারের শেষ দিন গতকাল বুধবার স্বাধীনতাকামী নেতা ও স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যামন্ড স্কটল্যান্ডের জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘এটা আমাদের সারা জীবনের জন্য একটা সুযোগ। এমন সুযোগ আর আসবে না।’
এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন স্কটিশ ভোটারদের ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাজ্য থেকে স্কটল্যান্ডের বিচ্ছেদ হবে কষ্টদায়ক। সৃষ্টি হবে চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
যুক্তরাজ্যের উপপ্রধানমন্ত্রী নিক ক্লেগ ও প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ডও স্কটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একীভূত রাখার জন্য গতকাল ‘না’ ভোটের জন্য প্রচারণা চালান।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
স্কটল্যান্ডের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। পঞ্চদশ শতক থেকে ওই ভূখণ্ডের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তথ্য এখানে দেওয়া হলো:
১৫৬০: সংস্কার আন্দোলন হয়।
১৬০৩: স্কটল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জেমস ইংল্যান্ডেরও রাজা হিসেবে স্বীকৃতি পান। ইংল্যান্ডে তিনি পরিচিতি পান প্রথম জেমস হিসেবে।
১৭০৭: অ্যাক্টস অব ইউনিয়ন বিধানের মাধ্যমে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড এক করে গ্রেট ব্রিটেন গঠন করা হয়, যা যুক্তরাজ্য নামে আত্মপ্রকাশ করে। এতে এক মুকুট ও এক পার্লামেন্টের আওতায় আসে দেশ দুটি।
১৯৯৯: নতুন করে স্কটিশ পার্লামেন্ট গঠনের পর সদস্যরা প্রথমবারের মতো মিলিত হন এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের প্রস্তাব ওঠে।
২০১৪: স্বাধীনতা নিয়ে গণভোটের আয়োজন।

১০ দস্যুদলের নিয়ন্ত্রণে সুন্দরবন by এ, কে আজাদ

মুক্তিপণ আর লুটপাটের নেশায় অন্তত ১০টি বনদস্যু বাহিনী চষে বেড়াচ্ছে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন গোটা সুন্দরবন উপকূল। জেলেদের জিম্মি করে আদায় করছে মোটা অংকের অর্থ। লুটে নিচ্ছে মাছ ও নৌকাসহ অন্যান্য মালামাল। অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও দস্যুদের দমনে হিমশিম খাচ্ছে। কখনও আঁতাত করে আবার কখনও দস্যুদের অস্ত্রের মুখে জীবনবাজি রেখে মাছ শিকার করছে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মৎস্যজীবী। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিবছর দু’দফায় সাগরে মাছ শিকারে যান এ অঞ্চলের জেলেরা। শীত মওসুমে শুঁটকি আর বর্ষা মওসুমে ইলিশ আহরণকে কেন্দ্র করে সাগর উপকূলে জেলেদের ঢল নামে। চট্টগ্রাম, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের কয়েক লাখ জেলে অস্থায়ী বাসা বাঁধে সুন্দরবন উপকূলের সাগর চরে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আর উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে তারা মাছ শিকার করেন। কিন্তু বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও জেলেদের কাছে বড় আতংক দস্যুবাহিনী। চলতি ইলিশ মওসুমকে ঘিরে সাগর উপকূলে চলছে দস্যুবাহিনীর রামরাজত্ব। ছোট বড় অন্তত ১০টি দস্যুবাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোটা সাগর উপকূল। একের পর এক ঘটছে অপহরণ আর লুটপাটের ঘটনা। জেলেদেরকে শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও মহাজনদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকার মুক্তিপণ। অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও হাঁপিয়ে উঠছে  দস্যু দমনে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মংলার একজন আড়ৎদার জানান, সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে রাজু বাহিনী, জুলফু বাহিনী, রাংগা বাহিনী, আউয়াল বাহিনী, বেলাল বাহিনী, ফরহাদ বাহিনী, রবিউল বাহিনী ও জিয়া বাহিনী বেশী বেপরোয়া। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে এসব দস্যু বাহিনী উপকূল থেকে দু’শতাধিক জেলেকে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করেছে। নিরস্ত্র জেলেদের ওপর হামলা করে এরা লুটে নিয়েছে জাল, নৌকা, মাছ ও জেলেদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র। সর্বশেষ গত শুক্র ও শনিবার সুন্দরবনের নারিকেল বাড়িয়ায় বেলাল বাহিনী ও চরাপুটিয়া থেকে রাংগা বাহিনী অন্তত ৮০ জন জেলেকে অপহরণ করেছে। মংলার একাধিক মৎস্য আড়ৎদার জানান, দস্যুরা নৌকা প্রতি একজন কিংবা দু’জন জেলেকে উঠিয়ে নিয়ে আড়ৎদারের কাছ থেকে আদায় করছে লাখ লাখ টাকার মুক্তিপণ। টাকা না দিলে জিম্মি জেলেদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। কখনো আবার গুলি করে জেলেদের লাশ ফেলে দেয়া হয় নদীতে। ব্যবসা চালানোর স্বার্থেই জেলে মহাজনরা দস্যুদের এসব নির্যাতন মুখ বুঁজে সহ্য করছেন। দস্যুদের সঙ্গে একরকম আঁতাত করেই ব্যবসা চালাচ্ছেন সাগরভিত্তিক এসব মৎস্য ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, প্রতিটি বনদস্যু বাহিনীকে জেলে প্রতি ৫শ’ থেকে ১ হাজার টাকা করে নিয়মিত মাসিক চাঁদা দিতে হয়। তারপরেও মাঝে মধ্যে তারা চড়াও হয় জেলেদের ওপর। এক গ্রুপকে চাঁদা দিয়ে শান্ত করলে আরেকটি গ্রুপ এসে জেলে বহরে হামলা করে। সুন্দরবন উপকূলে এরকম ছোট বড় অন্তত ১০টি গ্রুপ সক্রিয়  রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নদীতে নিয়মিত টহল দিলেও দস্যুরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে শুরু করে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে দস্যুদের একাধিক আস্তানা রয়েছে। এর মধ্যে মেহের আলীর চর, আলোর কোল, কটকা, আম বাড়িয়া, ডিমের চর, নারকেল বাড়িয়া, সোনার চর, ভদ্রা, চরাপুটিয়া, হারবাড়িয়া, বলেশ্বর নদীর মোহনা ও চান্দেরশ্বর সহ আশপাশের এলাকায় রয়েছে দস্যুদের অবাধ বিচরণ। দস্যুবৃত্তির খবর পাবার পর আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে অভিযান চালালেও দস্যুরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সময়ের ব্যবধানে তারা চলে যায় তাদের নিরাপদ আস্তানায়। মাঝে মধ্যে দু’চারজন দস্যু ধরা পরলেও তাতে বাহিনীর তেমন কোন ক্ষতি হয় না। মাছ শিকারের জন্য বন বিভাগকে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব দেন জেলে মহাজনরা। কিন্তু বনরক্ষীরা জেলেদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। একের পর এক দস্যুদের হামলা ও গণহারে লুটপাটের ঘটনায় ইলিশ জেলেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। জাল নৌকা আর পুঁজি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন জেলে মহাজনরা। দস্যুদের কাছে বনরক্ষীরাও নাকি অসহায়। তারা দস্যুদের সঙ্গে বিরোধে জড়ায় না, এমন অভিযোগ জেলেদের। অভিযোগ মতে, সুন্দরবনের অভ্যন্তরের অনেক ফরেস্ট ক্যাম্পেই নির্ভয়ে রাত কাটায় দস্যুরা। দস্যুদের হামলার কথা স্বীকার করে দুবলা ফরেস্ট ক্যাম্পের ওসি শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ডাকাতির খবর পেলেই আমরা ঘটনাস্থলে যাই, জেলেদের খোঁজ খবর নিই, কিন্তু দস্যুদের নাগাল পাওয়া যায় না। বিশাল সাগর উপকূল আর অসংখ্য নদ-নদীতে গুটি কয়েক বনরক্ষী দিয়ে জেলেদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়।” কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন (মংলা) অপারেশন কমান্ডার লে. কমান্ডার আলাউদ্দিন বলেন, ‘সুন্দরবনসহ সাগর উপকূলে কোস্টগার্ডের নিয়মিত টহল ছাড়াও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’