Wednesday, August 19, 2026

ঠোঁট ফাটা দূর করার উপায় by আলিয়া রিফাত

শীত নিয়ে আসে ত্বকের কিছু সমস্যা। এসব সমস্যার মধ্যে অন্যতম ঠোঁট ফাটা। তাপমাত্রা কমতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতা কমতে থাকে। তাই শীতে আমাদের ঠোঁট ফেটে যায়। ঠোঁটে মরা চামড়া সৃষ্টি হয়, ঠোঁট দেখায় নিষ্প্রাণ।

ঠোঁটে কোনো তেলগ্রন্থি নেই। ঠান্ডা বাতাসে, এমনকি ঘরের তাপমাত্রায়ও ঠোঁট পানিশূন্য হয়ে যায়। জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজালে, পর্যাপ্ত পানি না খেলে এসব সমস্যা আরও বাড়ে। ভয়ের কিছু নেই।

সঠিকভাবে সঠিক উপকরণ ব্যবহার করে ঠোঁটের যত্ন নিতে হবে। মেনে চলতে হবে কিছু অভ্যাস। তাহলে শীতজুড়েই আপনার ঠোঁট থাকবে কোমল ও উজ্জ্বল।

মরা চামড়া এক্সফলিয়েট করুন

কোমল ঠোঁটের জন্য আপনাকে অবশ্যই নিয়মিত এক্সফলিয়েশন করতে হবে। এক্সফলিয়েটর হিসেবে ব্যবহার করতে হবে একটি ভালো মানের লিপ স্ক্রাব। ঘরোয়াভাবেই লিপ স্ক্রাব তৈরি করা যায়। মধু ও চিনি মিশিয়ে লিপ স্ক্রাব তৈরি করতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে চিনি ও মধুর অনুপাত হতে হবে ১: ১। চাইলে অলিভ অয়েলও মেশাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে চিনির পরিমাণ দ্বিগুণ করতে হবে। এই লিপ স্ক্রাব সপ্তাহে অন্তত এক দিন ব্যবহার করা প্রয়োজন।

প্রতিবার এক মিনিট ধরে লিপ স্ক্রাব দিয়ে ঘষে ঘষে ঠোঁটের মরা চামড়া তুলে ফেলতে হবে। এ ছাড়া এক্সট্রা সফট টুথ ব্রাশ দিয়ে ঠোঁটের মরা চামড়া তুলে ফেলতে পারেন। প্রতিবার এক্সফলিয়েশনের পর ঠোঁটে লিপ বাম ব্যবহার করতে ভুলবেন না।

এতে ঠোঁট মোলায়েম হবে। নিয়মিত এক্সফলিয়েট করা ঠোঁটে ময়েশ্চারাইজার লাগালে ঠোঁট খুব ভালোভাবে সেটি শুষে নেবে। খুব ঘন ঘন এক্সফলিয়েট করবেন না। সপ্তাহে দুই দিন এক্সফলিয়েট করাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত এক্সফলিয়েশনের ফলে ঠোঁটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

নিয়মিত ঠোঁট ময়েশ্চারাইজ করুন

ঠোঁটে নিয়মিত ময়েশ্চারাইজিং লিপ বাম ব্যবহার করতে হবে। শিয়া বাটার, নারকেল তেল কিংবা কোকো বাটার-সমৃদ্ধ লিপ বাম ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। এসব উপাদান প্রাকৃতিকভাবে ঠোঁট কোমল করে।

ভিটামিন ই এবং বিজওয়াক্স ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখে। ফেটে যাওয়া ঠোঁট সারিয়ে তুলতেও উপাদান দুটি কার্যকর। দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার ঠোঁটে লিপ বাম দিতে হবে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে। এটি ঠোঁটে পুষ্টি জোগাতে খুবই প্রয়োজন।

পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার খান


শীতকালেও আপনার পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খেতে হবে। পাশাপাশি গ্রিন-টি খেতে পারেন। এতে আপনার শরীরের ও ঠোঁটের পানিশূন্যতা দূর হবে। শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে ঠোঁটে তার চিহ্ন ফুঁটে ওঠে।

চরম আবহাওয়া থেকে ঠোঁটকে রক্ষা করুন

বাইরে বের হওয়ার আগে এসপিএফ-যুক্ত লিপ বাম ব্যবহার করুন। এতে আপনার ঠোঁট ঠান্ডা বাতাস ও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা পায়। বাইরের অতিরিক্ত ঠান্ডায় খসখসে হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে ঠোঁট স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে রাখতে পারেন।

বদভ্যাস এড়িয়ে চলুন

জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজানো, দাঁত দিয়ে কামড়ানো, খুঁটতে থাকা, ঠোঁটের চামড়া তোলা—এসব বদভ্যাস বাদ দিতে হবে। এসব করলে ঠোঁট আরও শুকিয়ে যায়, ফাটা সহজে সেরে ওঠে না।

এসব নিয়ম মেনে চললে শীতকালেও আপনার ঠোঁট থাকবে কোমল ও মসৃণ।

সূত্র: উইকিহাউ

সঠিকভাবে যত্ন নিলে শীতেও ঠোঁট থাকবে কোমল, উজ্জ্বল
সঠিকভাবে যত্ন নিলে শীতেও ঠোঁট থাকবে কোমল, উজ্জ্বল। ছবি: পেক্সেলস

Tuesday, August 18, 2026

শাসকের পরামর্শকরা একালে ও সেকালে by এলাহী নেওয়াজ খান

আকবর দ্য গ্রেট। মোগল সাম্রাজ্যের মহান সম্রাট। অতুলনীয় বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতায় গড়ে তুলেছিলেন এই বিশাল সাম্রাজ্য। পিতা সম্রাট হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যুর পর শিশু বয়সেই আরোহণ করেছিলেন সিংহাসনে। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর ৪ মাস। না ছিল অক্ষরজ্ঞান, না ছিল রাজ্য শাসনের সামান্যতম ধারণা। কিন্তু তার অভিভাবক ছিলেন সেনাপ্রধান বৈরাম খাঁ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত, দক্ষ ও প্রতিভাবান এক সামরিক কমান্ডার। তিনি মূলত আকবরকে এক মহান সম্রাট হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

বৈরাম খাঁর সাহচর্যে থেকে আকবর বুঝেছিলেন, হারানো রাজ্যগুলো পুনরুদ্ধার করা এবং বিশাল মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন বৈরাম খাঁর মতো দক্ষ ও প্রতিভাবান একদল পরামর্শক। মূলত বৈরাম খাঁই সাম্রাজ্যের অভিভাবক হয়ে আকবরকে রাজ্য শাসনে অভিজ্ঞ করে তুলেছিলেন। তাই সম্রাট আকবর তার অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান অর্জন করে তার চারপাশে এমন একদল পরামর্শক জড়ো করেছিলেন, যারা ছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। এদের বলা হতো নবরত্ন। প্রকৃতপক্ষেই তারা রত্নই ছিলেন। ইতিহাসে তারা স্বীয় প্রতিভা ও দক্ষতা দিয়ে সমুজ্জ্বল হয়ে আছেন। তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন প্রশাসনের দক্ষ, কেউ ছিলেন যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী, কেউ সংগীতজ্ঞ আবার কেউ ছিলেন সভাকবি ।

নবরত্ন হিসেবে পরিচিত সম্রাট আকবরের সেই ৯ জন পরামর্শক হলেন বীরবল : তিনি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা, সেনাপতি ও কৌতুকবিদ। আবুল ফজল : প্রধান সভাকবি এবং আইন-ই-আকবর ও আকবরনামার রচয়িতা। ফৈজি : প্রখ্যাত কবি ও রাজকুমারদের গৃহশিক্ষক। তানসেন : সুরসম্রাট ও বিশ্ববিখ্যাত সংগীতজ্ঞ । টোডরমল : আকবরের দক্ষ অর্থমন্ত্রী ও রাজস্ব সংস্কারক। রাজা মানসিংহ : মোগল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। ফকির আজিম উদ্দিন : ধর্মীয় ও সুফিবিষয়ক উপদেষ্টা। আব্দুর রহিম খান-ই-খালান : সেনাপতি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও হিন্দি দোহার রচয়িতা । মোল্লা দো-পিয়াজা : চতুর ও হাস্যরসাত্মক সভাসদ।

এই উপদেষ্টাদের বা পরামর্শকদের বৈশিষ্ট্য দেখে বোঝা যায় সম্রাট আকবর একজন মহান শাসক হিসেবে নিজেকে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সাধারণত মানব ইতিহাসজুড়ে নিপীড়নমূলক শাসনের কাহিনি বেশি থাকালেও সম্রাট আকবরের মতো এমন অনেক শাসকের নজির ইতিহাসে আছেন, যার দক্ষ ও প্রতিভাবান পরামর্শকদের সহায়তায় মহান শাসক হিসেবে ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছেন। এটি সবাই জানে যে, সম্রাট আকবর নিরক্ষর ছিলেন। কিন্তু তার ছিল তীব্র জ্ঞানপিপাসা। সে কারণেই তিনি তার চারপাশে জড়ো করেছিলেন জ্ঞানীগুণী পরামর্শকরা। তারা তাকে বই পড়ে শোনাতেন এবং তাদের কাছ থেকে তিনি নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতেন। তাই এ ধরনের সুপরামর্শকদের কারণে একদিকে যেমন তিনি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে করতে সক্ষম হয়েছিলেন; তেমনি টানা ৫০ বছর শাসন করেছিলেন নির্বিঘ্নে। আর এ কারণেই ইতিহাসবিদরা তাকে ‘আকবর দ্য গ্রেট’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

সম্রাট আকবরকে নিয়ে এভাবে শুরু করার মূল লক্ষ্য হচ্ছে, একজন শাসকের জন্য পরামর্শকরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝানোর জন্য। কারণ একজন শাসক কেমন তা জানা যায়, তার চারপাশের পরামর্শকদের দেখে। এ ব্যাপারে চীনা একটি প্রবাদবাক্য আছে। তাতে বলা হয়েছে, পাখি নিজের পালক দেখে দল বাঁধে আর মানুষ চেনা যায় তার সঙ্গীদের দেখে। তাই চীনের বিখ্যাত দার্শনিক ও তাত্ত্বিক কনফুসিয়াস বলেছেন, যদি জানতে চাও কোন দেশের শাসনব্যবস্থা কেমন, তবে তার মন্ত্রীদের দিকে তাকাও।

মূলত একজন শাসক ঠিক তেমন লোকদের নিজের পাশে রাখেন, যাদের চিন্তাভাবনা তার নিজের সঙ্গে মেলে। এটাই আমরা সাধারণত চারপাশে দেখে থাকি। কারণ একই বৈশিষ্ট্যের মানুষ সবসময় এক জায়গায় সমবেত হয়। যাকে আমরা বলি সমমনা। যেমন ধরুন কেউ কোনো মজলিশে গেল। সেখানে প্রথম সে তার সমমনা কেউ আছে কি না খুঁজবে। তা না পেলে সে একাই এক জায়গায় বসে পড়বে। এটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য। তাই একজন শাসক যদি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হন, তাহলে তিনি তার চারপাশে এ ধরনের লোকই খুঁজবেন। আর শাসকের জন্য তোষামোদকারীরা সবসময় বিপজ্জনক। তাই যেমন চীনা একজন দার্শনিক বলেছেন, হাজার তোষামোদকারীর হ্যাঁ-বাচক কথার চেয়ে একজন সৎ পরামর্শকের স্পষ্ট ও সত্য কথা অনেক বেশি মূল্যবান।

অন্যদিকে ইতালি ও রেনেসাঁ যুগের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিকোলো মেকিয়াভেলি তার বিখ্যাত প্রিন্স গ্রন্থে লিখেছেন, ‘একজন শাসকের বুদ্ধিমত্তা অনুমান করার প্রথম পদ্ধতি হলো তার চারপাশে কেমন মানুষ রয়েছে, তা লক্ষ করা।’

এই প্রেক্ষাপটে এটা বলা যায়, আগেকার দিনে রাজতন্ত্র এবং একালের গণতন্ত্র কিংবা যেকোনো সরকারপদ্ধতিতে একজন শাসক কেমন সেটি বোঝার একমাত্র উপায় হচ্ছে, শাসকের পরামর্শকরা কেমন সেটি দেখে। এছাড়া একজন সৎ ও দক্ষ পরামর্শদাতা শাসকের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ। ইতিহাসে এ ধরনের অনুগ্রহপ্রাপ্তদের অনেক নজির আছে। যেমন : ইসলামের ইতিহাসে সত্যবাদিতা, নির্ভীক মনোভাব, দূরদর্শিতা ও নিঃস্বার্থ উপদেষ্টাদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার অনেক দৃষ্টান্ত আছে। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)-এর কথায়ই ধরা যাক। তার তার খেলাফত পরিচালনায় প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। উমর (রা.) সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে জোরালো মতামত দিতেন, যা খলিফাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করত। আবার একইভাবে হজরত উমর (রা.)-এর মূল পরামর্শক ছিলেন হজরত আলী (রা.)। তিনি আইন ও নীতিগত পরামর্শ দিতেন। জটিল রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক সমস্যায় আলী (রা.)-এর পরামর্শ ছিল অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ ।

ইসলাম ইতিহাসের ওইসব মহান দৃষ্টান্ত ছাড়াও বিশ্ব ইতিহাসে এ ধরনের আরো অনেক দৃষ্টান্ত আছে। যেমন প্রাচীনকালের আলেকজান্ডারের কথা উল্লেখ করা যায়। তার শিক্ষক ও উপদেষ্টা ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টটল। রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনীতি ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়ে অ্যারিস্টটলের শিক্ষাই আলেকজান্ডারকে একজন বিশ্বজয়ী শাসক হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

অন্যদিকে বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের কথা উল্লেখ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চার্চিলের প্রধান সামরিক পরামর্শক ছিলেন অ্যালেন ব্রুক। তিনি চার্চিলের ভুল সিদ্ধান্তগুলোর সরাসরি বিরোধিতা করতেন। এই নির্ভীক ও যৌক্তিক বিরোধিতাই শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করেছিল।
যাই হোক, পরিশেষে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর ঘটনা উল্লেখ করে আমার এই লেখা শেষ করতে চাই। এ ঘটনাটি ‘নাহজুলবালাগা’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। এটিও তো অনেকের জানা আছে, হজরত আলী (রা.)-এর খেলাফতকালে চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দিয়েছিল। তখন একজন সাহাবি তার কাছে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘হে আমিরুল মোমিনিন! হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত ওমর (রা.)-এর সময় তো শাসনব্যবস্থা শান্ত এবং শৃঙ্খল ছিল; কিন্তু আপনার সময় কেন এতটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে?

জবাবে হজরত আলী (রা.) বলেছিলেন, তখন আমি ও উসমান এবং অন্যান্য বিজ্ঞ সাহাবা ছিলাম তাদের পরামর্শক আর এখন তোমরা হচ্ছো আমার পরামর্শক। তিনি এ কথা বলে মূলত বোঝাতে চেয়েছিলেন, ভালো শাসন শুধু শাসকদের ওপর নির্ভর করে না; তার চারপাশের মানুষ এবং প্রজাকুল কেমন তার ওপরও নির্ভর করে।

শাসকের পরামর্শকরা একালে ও সেকালে
এআই দ্বারা নির্মিত প্রতীকী ছবি।

ইরান ও ইউক্রেন যেভাবে সমুদ্রপথে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করছে by ওমর আশুর

ইরান যুদ্ধ হয়তো দূরনিয়ন্ত্রিত বিমান হামলা ও আকাশপথেই লড়া হচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধের আসল ভাগ্য বা কৌশলগত পরিণতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে সমুদ্র।

সাম্প্রতিক সময়ের হামলা ও পাল্টা হামলা এই বাস্তবতা তৈরি করেনি, বরং এটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ওয়াশিংটন হয়তো এখন স্থলভাগে সেনা অভিযান, ইরানের বিদ্যুৎ-জ্বালানির মতো জরুরি অবকাঠামোতে হামলা, কিংবা ইসফাহান প্রদেশের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর গভীরে লুকিয়ে থাকা পরমাণু কেন্দ্রে আঘাত হেনে সংঘাত বাড়াতে পারে।

এসব পদক্ষেপে ইরানের ব্যাপক ক্ষতি হবে এবং যুদ্ধও ছড়াবে, সন্দেহ নেই। তবে এতে সমুদ্রজুড়ে ছড়িয়ে রাখা ইরানের নৌ প্রতিরক্ষাব্যূহ ধসে পড়বে না, কিংবা প্রণালি হিসেবে হরমুজের কৌশলগত গুরুত্বও কমবে না।

গত মাসেই তেহরানে দেখা গেছে এই যুদ্ধের এক রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবন। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল শোক পালনের অনুষ্ঠান ছিল না; ভয়াবহ হামলা, শীর্ষ নেতৃত্ব হারানো আর বোমাবর্ষণের পর ইরান তার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধারাবাহিকতা কতখানি বজায় রাখতে পেরেছে, এটি ছিল তারই এক শক্তি প্রদর্শন।

এই টিকে থাকার শক্তি কেবল সমুদ্র তৈরি করেনি, তবে সমুদ্র সেই শক্তিকে ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

নিজের আকাশসীমা সুরক্ষিত না থাকা সত্ত্বেও ইরান পশ্চিমাদের ভারী আক্রমণ হজম করতে পেরেছে একটি বড় কারণে—সমুদ্রে তাদের একটি জবরদস্তিমূলক দর-কষাকষির ক্ষমতা ছিল। আকাশে চালানো প্রতিটি হামলার একটি বিশাল মূল্য দিতে হবে ওয়াশিংটন, উপসাগরীয় রাজধানী, বিমা কোম্পানি ও বিশ্ব জ্বালানির বাজারকে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশাসন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে বিষের পেয়ালায় চুমুক দিতে বাধ্য করতে পারেনি—যেমনটা একসময় রুহুল্লাহ খোমেনি করেছিলেন।

দেখা গেল, ট্রাম্প নিজেই নিজের তৈরি করা ফাঁদে পড়েছেন। ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতা শতভাগ ধ্বংস করা হয়েছে’—নিজের এই অসত্য দাবির পর একপ্রকার বাধ্য হয়েই তিনি পিছু হটেছেন। ইরানের সঙ্গে ১৪ দফার যে মধ্যবর্তী চুক্তি হলো, তা কিন্তু ওয়াশিংটনের কাছে তেহরানের আত্মসমর্পণ নয়; বরং এটি ছিল সমুদ্রের এক কঠিন বাস্তবতার কূটনৈতিক রূপান্তর।

একে হয়তো চিরাচরিত অর্থে কোনো ‘জয়’ বলা যাবে না। তবে এটি ছিল ওয়াশিংটনের যুদ্ধচেষ্টাকে কৌশলগতভাবে নস্যাৎ করে দিয়ে নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর এক নিখুঁত উদাহরণ।

মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানশক্তি ইরানের বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করতে পেরেছে, অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে, শীর্ষ সামরিক কর্তাদের হত্যা করেছে। কিন্তু সরকার পতন, ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা কিংবা পুরোপুরি সামরিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো উদ্দেশ্যগুলো অর্জিত হয়নি।

ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী ‘অরতেশ’-এর পদাতিক শক্তিতে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরেনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ইরান তাদের সামরিক কাঠামোর যে অংশকে সুরক্ষিত আকাশের ওপর নির্ভর না করে তৈরি করেছিল—অর্থাৎ তাদের উপকূলীয় নৌ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনব্যবস্থা—তা তার সামরিক কার্যকারিতা ও প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার ক্ষমতা, দুটোই অক্ষুণ্ণ রেখেছে।

ইতিহাসের শিক্ষা

অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যে কতটা বিপজ্জনক, ইতিহাস তা বহুবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে হ্যানয়ে এক মার্কিন কর্নেল হ্যারি জি সামারস জুনিয়র তাঁর উত্তর ভিয়েতনামি প্রতিপক্ষকে বলেছিলেন, ‘তোমরা কিন্তু আমাদের যুদ্ধের ময়দানে কখনোই হারাতে পারোনি।’

উত্তর ভিয়েতনামের কর্নেল টু এর উত্তর দিয়েছিলেন খুব সংক্ষেপে, ‘কথাটা সত্যি হতে পারে, তবে তা সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিকতাহীন।’

২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধের যেকোনো মূল্যায়নে কথোপকথনটি বড় এক শিক্ষা হয়ে ওঠার কথা। এ কথার পেছনের যুক্তি খুব সহজ, আকাশপথে আপনি কতটা একচ্ছত্র আধিপত্য দেখাচ্ছেন, তা দিয়ে যুদ্ধ জয় নিশ্চিত হয় না, যদি না আপনি শত্রুর কৌশলগত অবস্থান ও তার মানসিক শক্তিতে ফাটল ধরাতে পারেন।

একই কথা সমুদ্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ১৯৮০-এর দশকের ট্যাংকার যুদ্ধের কথা ধরা যাক। সাত বছরের রক্তক্ষয়ী ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরান যখন এমনিতেই ক্লান্ত, ঠিক তখন আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে একাধিক অভিযানের মাধ্যমে—আর্নেস্ট উইল, প্রাইম চ্যান্স, নিম্বল আর্চার এবং সর্বশেষ প্রেয়িং ম্যান্টিস।

১৯৮৮ সালের এপ্রিলে এক দিনের অভিযানে মার্কিন বাহিনী মূল ইরানি নৌসম্পদ ও তেল প্ল্যাটফর্মের কমান্ড পোস্টগুলো ধ্বংস করে এক বিরাট জয় পেয়েছিল। কিন্তু সেই জয় এসেছিল এক অভিজ্ঞতাশূন্য, ক্লান্ত ইরানি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ এসকর্ট, মাইন অপসারণ ও আক্রমণের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল।
সেগুলো ছিল শাসনক্ষমতা বদলানোর মতো বড় উদ্দেশ্যের তুলনায় অনেকটাই সীমিত এবং এক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত মিশন।

কিন্তু আজকের পরিস্থিতি মার্কিন বাহিনীর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান তাদের নৌশক্তিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। একদিকে নিয়মিত নৌবাহিনী ‘নেদাজা’, যারা গভীর সমুদ্রে নিজেদের অবস্থান জাহির করতে চায়; অন্যদিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী ‘নেদসা’, যারা পারস্য উপসাগরকে এক কঠিন ও অনিশ্চিত রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।

নেদাজা মূলত একটি প্রথাগত ও মর্যাদার নৌবাহিনী। কিন্তু নেদসা হলো এমন এক ব্যবস্থা, যা শত্রু প্রতিরোধ, হয়রানি, ধোঁয়াশা ও কৌশলগত কার্যকারিতার জন্য তৈরি।
প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ের মতো ভৌগোলিক অবস্থানও এক নিরপেক্ষ ব্যাপার। এটা বন্ধু বা শত্রু, যে কারোর কাজেই লাগতে পারে। কিন্তু কৌশল, কাজের পদ্ধতি, যুদ্ধ উপকরণের অভিযোজন এবং কমান্ড কালচার দিয়ে সেই ভূগোলকে কতটা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটাই মূল বিষয়। ইরান এ শিক্ষা আকাশের চেয়ে সমুদ্রেই সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে।

এগুলো কোনো বিমানবাহী রণতরি নয়। এগুলো হলো সমুদ্রে বসানো একেকটি অদম্য দুর্গ এবং অনিশ্চয়তা তৈরির কারখানা।

সমুদ্রের দাবার চাল

ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে সমুদ্রের লড়াই স্থলযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া হাতছাড়া হওয়ার পর ইউক্রেন তাদের নৌসম্পদের বড় অংশ হারায়, আর ২০২২ সালের মধ্যে তাদের প্রথাগত কোনো নৌবাহিনীই অবশিষ্ট ছিল না।

তা সত্ত্বেও ইউক্রেন উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ মিসাইল, বিশেষ অভিযান, ড্রোন বোট এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভর করে কৃষ্ণসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশকে রাশিয়ার জন্য এক নিষিদ্ধ এলাকায় পরিণত করে।
এর ফলাফল শুধু কৌশলগত নয়, ছিল সুদূরপ্রসারী। ইউক্রেন রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে তাদের সেভাসতোপোল ঘাঁটি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এতে রাশিয়ার অবাধ নৌ চলাচল বন্ধ হয়েছে এবং ইউক্রেন ওদেসা বন্দর দিয়ে নিজেদের পণ্য রপ্তানি পথ আবার চালু করতে পেরেছে।

মূলত সাগরে সম্পূর্ণ আধিপত্য না থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেন রাশিয়ার বড় বড় উদ্দেশ্য—যেমন ইউক্রেনকে অবরুদ্ধ করা, ওদেসায় চাপ সৃষ্টি করা এবং ক্রিমিয়াকে সুরক্ষিত রাখা—ব্যর্থ করে দিতে পেরেছে।

ইরানের উপসাগরীয় রণকৌশলও ঠিক আমেরিকার বিরুদ্ধে এই একই ব্যবস্থার এক রূপ। তেহরানের উদ্দেশ্য মার্কিন নৌবাহিনীকে সম্মুখযুদ্ধে হারানো নয়। তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে বিশাল শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়ে এসেও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে হেরে যেতে পারে।

এ থেকে শিক্ষা স্পষ্ট, দুর্বল শক্তির জন্য সমুদ্রকে অবরুদ্ধ করা কেবল এক বিকল্প পথ নয়, এটিই এখন যুদ্ধ জয়ের বড় অস্ত্র। কৃষ্ণসাগরে এই কৌশল ব্যবহার করে ইউক্রেন যেমন এক পরাশক্তিকে রুখে দিয়েছে, ঠিক তেমনি উপসাগরে ইরানও কোনো বড় নৌযুদ্ধ না জিতেই ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোকে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

অবশ্য ইউক্রেন ও ইরানের ঘটনা হুবহু এক নয়। ইউক্রেন সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে এবং বাণিজ্যপথ সচল রাখতে এসব ব্যবহার করেছে। আর ইরান তা ব্যবহার করেছে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে—বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে, বিমা মাশুল বাড়াতে এবং ওয়াশিংটনকে মনে করিয়ে দিতে যে বিমান হামলার একটা বড় আর্থিক মূল্য সমুদ্রেই চোকাতে হবে।

ইরানের এই পথ কোনো প্রথাগত নৌসংগ্রাম নয়; এটি হলো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে নৌ অবরোধের এক চতুর মিশ্রণ।

পরিস্থিতি তাই এক বড় বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ইরান হয়তো আকাশে অনেক লড়াইয়ে হেরেছে, কিন্তু সমুদ্রের কারণে তাদের কৌশলগত দর-কষাকষির ক্ষমতা কমেনি। যুক্তরাষ্ট্র আকাশে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখালেও সমুদ্রকে অপ্রাসঙ্গিক করতে পারেনি।

ইউক্রেন বিশ্বকে দেখিয়েছে, নৌবহর না নিয়েও একটি বিশাল নৌবাহিনীকে ঠেকিয়ে দেওয়া যায়। আর ইরান দেখিয়ে দিল, একটি বড় নৌযুদ্ধ না জিতেও কীভাবে এক পরাশক্তির মূল উদ্দেশ্যগুলোকে সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দেওয়া যায়।

* ড. ওমর আশুর, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ক্রিটিক্যাল সিকিউরিটি স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নৌযানের টহল
হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নৌযানের টহল। ফাইল ছবি: এএফপি

নিজের নির্বাচনী প্রচারের বিলবোর্ডে মামদানির ছবি ব্যবহার করে কী বোঝাতে চাইছেন নেতানিয়াহু

দ্য গার্ডিয়ানঃ ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দলের নির্বাচনী প্রচারের একটি বিলবোর্ডে ইরান ও হিজবুল্লাহর নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরের মেয়র জোহরান মামদানির ছবি দেখা যাচ্ছে।

তেল আবিবের কেন্দ্রস্থলে স্থাপিত ওই বিলবোর্ডে মামদানির পাশাপাশি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ছবিও আছে। তাঁদের পাশে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর প্রধান নাইম কাসেমের ছবি রয়েছে।

নেতানিয়াহুর ডানপন্থী লিকুদ পার্টির প্রতীকযুক্ত ওই বিলবোর্ডে লেখা আছে, ‘তাঁরা চান নেতানিয়াহু হেরে যান...তাঁদের জিততে দেবেন না।’

গত জুলাইয়ে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট ভেঙে দেওয়ার পর নেতানিয়াহু তাঁর উগ্র ডানপন্থী জোটকে আবার জেতাতে জোর নির্বাচনী প্রচারে নেমেছেন। আগামী ২৭ অক্টোবর দেশটিতে সাধারণ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলে এটাই প্রথম জাতীয় নির্বাচন।

নিউইয়র্ক নগরের মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর শুরু থেকেই প্রকাশ্যে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের কড়া সমালোচনা করেছেন মামদানি। গত মাসে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর বাগ্‌যুদ্ধ আরও তীব্র হয়। তিনি নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তাঁর (নেতানিয়াহুর) হেগে থাকা উচিত।’

এমনকি এর আগে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে গ্রেপ্তার করবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন জোহরান মামদানি।

সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেতানিয়াহু যোগ দিতে এলে তাঁর ওপর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে মার্কিন কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন মামদানি।

জবাবে নেতানিয়াহু জোহরান মামদানির বিরুদ্ধে ‘বিদ্বেষ উসকে দেওয়া’ এবং তাঁর শহরে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর অভিযোগ তুলেছেন।

নেতানিয়াহু আরও বলেন, মামদানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি একসময় যে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক সমর্থন ছিল, তা হুমকির মুখে পড়েছে। এ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোয় দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর তুলনায় মার্কিন ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে মামদানির জনপ্রিয়তা বেশি।

ইসরায়েলে আসন্ন নির্বাচন ঘিরে জনমত জরিপগুলোতেও নেতানিয়াহুর দলের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের পিছিয়ে থাকার আভাস পাওয়া গেছে।

নেতানিয়াহু গত রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে ওই বিলবোর্ডের একটি ছবি পোস্ট করেন। তিনি একটি ভিডিও–ও পোস্ট করেন। ভিডিওতে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত এই উগ্র ইহুদিবাদী আসামি উল্টো মামদানিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে আখ্যা দেন।

মামদানি ও নেতানিয়াহুর মধ্যে এই কথার লড়াই এমন এক সময়ে চলছে, যখন গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আলোচনায় অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে।

গতকাল সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন, বৈঠক থেকে কোনো অগ্রগতি আসেনি।

কারণ, ইসরায়েল বলেছে, হামাস নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে তারা সেনা প্রত্যাহার করবে না।

নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে নিজের ছবি ও বক্তব্যের ব্যবহারের বিষয়ে মামদানি এখনো প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে তেল আবিবে এই বিলবোর্ড টানানো হয়েছে
নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে তেল আবিবে এই বিলবোর্ড টানানো হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

পশ্চিমবঙ্গে পরপর তিন খুন ঘিরে উত্তেজনা, নিহতদের সবাই মুসলিম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঁকুড়ায় ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এক কর্মীর বাবাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাঙ্কা রাজ্য সরকারকে ১০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। সঠিক তদন্ত নিশ্চিত করতে এবং স্থানীয় পুলিশের ওপর চাপ বজায় রাখতে তাঁরা আপাতত বাঁকুড়া জেলাতেই অবস্থান করছেন তিনি।

পাশাপাশি রাঙ্কা পুরো ঘটনার একটি আদালতের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত, নিহতের পরিবারের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা এবং নিহত ব্যক্তির স্মৃতিতে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিদ্যালয় স্থাপনেরও দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনের দাবি, ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ইতিমধ্যে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিবারটির অভিযোগ, সিজেপির কর্মীর বৃদ্ধ বাবাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ গত সপ্তাহান্তে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে খুনের ঘটনায় রাজ্যে কিছুটা রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। গত শনিবার রাতে নদীয়া জেলায় বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা ৫৪ বছর বয়সী আনিসুর রহমান এবং তাঁর ২৩ বছর বয়সী ছেলে আবু সুফিয়ানকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ, এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের হাত। গত রোববার এই ঘটনায় পুলিশ স্থানীয় হরনগর পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান ফাতেমা বিবি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাহেব আলী মণ্ডল ও মিঠু শেখকে গ্রেপ্তার করেছে। ঠিক এই সময়ই অর্থাৎ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক তাণ্ডব চলার মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার সাবেক ডেপুটি স্পিকার আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় আত্মহত্যা করেন।

এই চারটি মৃত্যুর জেরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি উত্তাল হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি স্বাভাবিকভাবেই এসব খুনের দায় এড়াতে পারে না; কারণ, তারা রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু বিরোধী পক্ষ সরকারকে খুব একটা কোণঠাসা করতে পারেনি। কারণ, প্রধান বিরোধী মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া বাকি তিন বিরোধী অর্থাৎ সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ঋতব্রতপন্থী অংশ এখনো ঘর গুছিয়ে উঠতে পারেনি। ফলে বিজেপির ওপর চাপ খুব একটা বাড়েনি। তবে পরপর এতগুলো খুন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রবল উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

বাঁকুড়ার ঘটনা

ককরোচ জনতা পার্টির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা দিল্লি থেকে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ইন্দাসের কারিশুন্ডা গ্রামে এসে পৌঁছান এবং বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে মারা যাওয়া মোহাম্মদ মাফিকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন।

দুদিন আগে নিজের বাড়িতেই নির্মমভাবে পেটানোর পর মাফিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনা নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকাবাসী। তাঁদের আসার ও এই ঘটনা নিয়ে আন্দোলনে নামার কারণ, নিহত মাফিকের ছেলে আবদুল হাফিজ সিজেপির সদস্য। দিল্লিতে সিজেপির প্রতিবাদ চলাকালে তিনি সক্রিয়ভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন।

রাঙ্কা জানিয়ে দেন, ১০ দিনের মধ্যে সব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে উপযুক্ত আইনি ধারায় কঠোর সাজা দিতে হবে এবং ইন্দাস থানার পুলিশ কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও আদালত-পর্যবেক্ষিত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ, পুলিশ প্রশাসন পরিবারটির পাশে সঠিকভাবে দাঁড়ায়নি।

​নিহত মাফিকের পরিবার রাজ্য সরকারের আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং মাফিকের ছেলে আবদুল হাফিজ তাঁর বাবার স্মরণে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্কুল গড়ে তোলার দাবি তুলেছেন।

হাফিজের কথায়, শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে এ ধরনের স্কুল তৈরি হওয়াই হবে তাঁর বাবার প্রতি সঠিক শ্রদ্ধাঞ্জলি। এই দাবিকে সমর্থন জানিয়ে সিজেপি নেতা রাঙ্কা ঘোষণা করেন, তাঁরা হাফিজকে আর্থিক সহায়তা দেবেন এবং রাজ্যজুড়ে ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন গড়ে তুলবেন, একই সঙ্গে সময়সীমার মধ্যে আসামিরা গ্রেপ্তার না হলে জেলা প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করারও হুঁশিয়ারি দেন।

নদীয়া জেলার ঘটনা

​এরই মধ্যে নদীয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া তৃণমূল নেত্রীসহ তিনজনকে শারীরিক পরীক্ষার পর আদালতে পেশ করে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে চায়। আদালত তাঁদের ৯ দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

শনিবার রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ কংগ্রেসের নদীয়া জেলা সম্পাদক আনিসুর রহমান তাঁর ছেলে, পেশায় আইনজীবী আবু সুফিয়ানকে নিয়ে গাড়িতে বাড়ি ফিরছিলেন। একটি রেলওয়ে আন্ডারপাসের কাছে তাঁদের গাড়ি আটকে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয় এবং পরে গাড়ি থেকে টেনে বের করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়।

​তদন্তের শুরুতেই পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ইঙ্গিত দিয়েছে, এই জোড়া হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফল। কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার অতুল ভি এই তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবর নিশ্চিত করেছেন।

তবে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য কী এবং এর পেছনে আর কারা জড়িত রয়েছে, তা নিয়ে এখনই মন্তব্য করা তড়িঘড়ি হয়ে যাবে বলে তিনি জানান।

নিহত কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান (বাঁয়ে) ও তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ান
নিহত কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান (বাঁয়ে) ও তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ান ছবি: সংগৃহীত। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় বাড়ি ফেরার পথে এক কংগ্রেস নেতা ও তাঁর ছেলেকে কুপিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। নিহত ব্যক্তিরা হলেন আনিসুর রহমান ও তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ান। গত শনিবার রাতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এতে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় এক পঞ্চায়েতপ্রধানসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, কারাবন্দী তৃণমূল নেতা জব্বার শেখের পরিকল্পনা ও নির্দেশে এই জোড়া হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর আগে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ জব্বারকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুমান, নিজের গ্রেপ্তারের বদলা নিতেই এই নেতার নির্দেশে প্রতিপক্ষ কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান ও তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া পঞ্চায়েতপ্রধান ফাতেমা বিবি জব্বার শেখের স্ত্রী। রাজ্য সচিবালয়ে রোববার সাংবাদিকদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘তৃণমূলই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশ আমাকে জানিয়েছে, জব্বার শেখ এখন জেলে আছে। জেল থেকেই সে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। জব্বার শেখের স্ত্রীও গ্রেপ্তার হয়েছেন, যিনি তৃণমূলের পঞ্চায়েতপ্রধান।’ জব্বার শেখের স্ত্রী হরনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান। তাঁর নাম ফাতেমা বিবি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার রাতে নদীয়ার নাগাদি রেলগেটের কাছে একদল দুষ্কৃতকারী বেথুয়াডহরী থেকে ফেরার পথে আনিসুর রহমানের গাড়ি আটকে বোমা ছুড়ে তাঁকে গাড়ির ভেতর থেকে টেনে বের করে পিটিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করে। স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে বেথুয়াডহরী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। জব্বার শেখের গ্রেপ্তারের বদলা নিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে কি না, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে।

ইরানি বিপ্লব এখন তৃতীয় অধ্যায়ে by সাইয়্যেদ মার্কোস তেনোরিও

পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মধ্যে ইরানের রাজনৈতিক রূপান্তরকে ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা থেকে আমদানি করা ধারণা ও শ্রেণিবিভাগের আলোকে ব্যাখ্যা করার একটি প্রবণতা বারবার দেখা যায়। যেমন ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি ‘তৃতীয় প্রজাতন্ত্রে’ প্রবেশ করছে—এমন ধারণা ফরাসি প্রজাতন্ত্রগুলোর ধারাবাহিক পরিবর্তনের মতো একটি বিচ্ছেদের ইঙ্গিত দেয়। আরও সমস্যাজনক হলো, এই কাঠামো ইরানে ক্ষমতার প্রায় বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের একটি প্রাচ্যবাদী ব্যাখ্যাকে শক্তিশালী করে।

প্রথম পর্যায়টি চিহ্নিত হয়েছিল ইসলামি বিপ্লব, ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এবং ‘ওয়ালিয়াত আল–ফাকিহ’; অর্থাৎ ইসলামি আইনজ্ঞের অভিভাবকত্ব বা শাসনব্যবস্থাভিত্তিক একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে। এই কাঠামোর মধ্যে একই সঙ্গে বিপ্লবকে সংরক্ষণ, দেশের ভূখণ্ড রক্ষা এবং বিপ্লবের নীতিগুলোকে এমন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা জরুরি ছিল, যা বিপুল বাহ্যিক চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম।

দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ইমাম খোমেনির মৃত্যুর পর এবং আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির উত্থানের মধ্য দিয়ে। এ সময় ইরান কেবল টিকে থাকার সংগ্রামে থাকা একটি বিপ্লব হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং নিজেকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে সুসংহত করেছে।

এই সময়েই গড়ে উঠতে শুরু করে পরবর্তীকালে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে পরিচিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামো। এতে এমন বিভিন্ন আন্দোলন ও শক্তি যুক্ত ছিল, যেগুলোর জাতীয় ও মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য এবং ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরোধিতায় তাদের অবস্থান ছিল অভিন্ন।

তৃতীয় পর্যায়টি শুরু হচ্ছে এখন, আরও নাটকীয় পরিস্থিতিতে—যুদ্ধের মধ্যেই নেতা সাইয়্যেদ আলী খামেনির শাহাদাত এবং আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনির উত্থানের পর।

সাম্প্রতিক সামরিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বে পরিবর্তনগুলো থেকে মনে হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর সংঘাত থেকে অর্জিত শিক্ষাগুলোকে ইরান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। সশস্ত্র বাহিনী, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), বাসিজ গণসংগঠন এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নতুন নিয়োগ থেকে কমান্ড কাঠামোর অধিকতর কেন্দ্রীকরণ, গোয়েন্দা সক্ষমতা জোরদার, অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট প্রস্তুত করা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সংবেদনশীল বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে আইআরজিসির নৌবাহিনীতে অভিজ্ঞ কমান্ডারদের নিয়োগ অতিরিক্ত গুরুত্ব বহন করে এমন এক সময়ে, যখন হরমুজ প্রণালি আঞ্চলিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নতুন নেতৃত্বের গ্রহণ করা ভাষা ও অবস্থান। ইরানের প্রচলিত ‘কৌশলগত ধৈর্যের’ নীতি যেন এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিরোধক্ষমতার একটি মতবাদকে জায়গা করে দিচ্ছে, যার সঙ্গে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতার কথাও স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তবে এই রূপান্তরের অর্থ এই নয় যে ইরান তার কৌশলের আঞ্চলিক মাত্রা পরিত্যাগ করে কেবল নিজস্ব সীমান্ত রক্ষাকেন্দ্রিক নীতির দিকে এগোচ্ছে। বরং এখানেই ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বজায় রয়েছে।

সম্প্রতি হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য এবং বহির্বিশ্ববিষয়ক রাজনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান বাসেম নাইম বলেছেন, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা এবং গাজা, লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের অবসানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই যে অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, তা হামাস ‘গভীর আগ্রহের সঙ্গে’ গ্রহণ করেছে।

এই বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে যদি ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ আঞ্চলিক কৌশলগত গভীরতা তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠে, তাহলে তৃতীয় পর্যায়ে সেটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আরও প্রত্যক্ষ সংঘাতের পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া হবে বলেই মনে হচ্ছে।

এই কাঠামোর মধ্যে গাজা ইরানের পররাষ্ট্রনীতির কোনো প্রান্তিক ইস্যু নয়। ফিলিস্তিন এখনো সেই রাজনৈতিক ও প্রতীকী উপাদানগুলোর অন্যতম, যা এই আঞ্চলিক কাঠামোকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।

অতএব, আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক যুদ্ধের অবসানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মধ্যে কেবল আপাতদৃষ্টিতে একটি বিরোধ রয়েছে। ইরানের কৌশলগত চিন্তায় অধিকতর সামরিক শক্তির উদ্দেশ্য হলো আগ্রাসনের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে প্রতিরোধক্ষমতাকে শক্তিশালী করা।

কূটনীতি এই কৌশল থেকে হারিয়ে যায়নি। কিন্তু দৃশ্যত এটিকে আর যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে না। অতএব, ইরান হয়তো কোনো ‘তৃতীয় প্রজাতন্ত্রে’ প্রবেশ করছে না; বরং এটি তার বিপ্লবের তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করছে—যার সূচনা হচ্ছে যুদ্ধ, প্রতিপক্ষদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাত এবং প্রতিরোধনীতির গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে।

সম্ভবত আগের কোনো পর্যায়ই এমন একটি কৌশলগত পরিবেশে শুরু হয়নি, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিরোধ, অভিযোজন এবং শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাকে এত স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। প্রতিপক্ষদের সর্বোচ্চ চাপের মধ্যেই ইরানি বিপ্লবের এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে—পশ্চাদপসরণের প্রকাশ হিসেবে নয়, বরং ঝড়ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করে টিকে থাকা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে।

* সাইয়্যেদ মার্কোস তেনোরিও, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিবিষয়ক একজন ইতিহাসবিদ, লেখক ও বিশ্লেষক। তিনি ব্রাজিল-ইরান ফ্রেন্ডশিপ ইনস্টিটিউটের সভাপতি।
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।

তেহরানের রাস্তায় একটি দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন ইরানি। ১১ মে, ২০২৬।
তেহরানের রাস্তায় একটি দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন ইরানি। ১১ মে, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

গাজায় অবরোধে বিপর্যস্ত নারীরা, চিকিৎসা সংকট চরমে

ইসরাইলের অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে গাজায় স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে অনেক রোগীর রোগ শনাক্ত হচ্ছে দেরিতে। ফলে চিকিৎসকের কাছে আসার সময় অনেকের ক্যানসার উন্নত পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা যুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের চাপে প্রায় ভেঙে পড়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং বিশেষায়িত রোগ নির্ণয় সেবার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। স্তন ক্যানসার শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ম্যামোগ্রাফি মেশিনও নিয়মিত অচল হয়ে পড়ছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে।

গাজার চিকিৎসক হালা আল-বুহাইসি জানান, এখন অনেক নারী হাসপাতালে আসছেন ক্যানসারের জটিল বা অগ্রসর পর্যায়ে। যুদ্ধের কারণে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবায় তাদের স্বাভাবিক প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, গাজায় বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার ক্যানসার রোগী রয়েছেন। প্রতিবছর সেখানে দুই হাজারের বেশি নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হন। স্তন ক্যানসার নারীদের মধ্যে অন্যতম সাধারণ ক্যানসার। দ্রুত রোগ শনাক্ত ও সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া এই রোগে সুস্থ হওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গাজায় সেই সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

রোগীদের দুর্ভোগ শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও হাসপাতাল সেবার ঘাটতিও রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা ও চিকিৎসার অনিশ্চয়তা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গবেষণাতেও বলা হয়েছে, গাজার ক্যানসার রোগীরা প্রয়োজনীয় কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং চিকিৎসাকর্মীর ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

ফলে গাজায় যুদ্ধের প্রভাব শুধু আহত ও নিহত মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; ক্যানসারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত নারীরাও জীবন বাঁচানোর চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত প্রয়োজনীয় ওষুধ, সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

গাজায় অবরোধে বিপর্যস্ত নারীরা, চিকিৎসা সংকট চরমে

তালেবান শাসন: শরিয়া আইন পাঁচ বছরে আফগানিস্তানে কী পরিবর্তন এনেছে

বিবিসি বাংলাঃ কাবুলের দক্ষিণে একটি গ্রামে দেয়ালে চুনের প্রলেপ লাগানো বেসমেন্টে প্রায় ১২ জন নারী ফুটন্ত চেরি আর আলুবোখরার রসের পাত্র নাড়তে এবং জ্যামের কাচের জারে লেবেল লাগাতে ব্যস্ত।

তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে, এই ব্যবসাগুলো সেই বিরল সুযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে নারীরা এখনো নিজেদের দক্ষতায় তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে নিতে পারেন।

৪৭ বছর বয়সী নাজিয়া একজন আফগান শিল্পোদ্যোক্তা এবং নয় সন্তানের মা, তিনিই এটি পরিচালনা করেন। ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। এখন এখানে যে তরুণীরা কাজ করেন তাদের মধ্যে নাজিয়ার মেয়েও রয়েছে, অন্য মেয়েদের জ্যাম তৈরি শেখাতে কর্মশালাটি চালাচ্ছেন তিনি।

প্রশাসন যদি তরুণীদের মাধ্যমিক স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে বাধা না দিত, তাহলে এখানে কর্মশালায় অংশ নেওয়ার পরিবর্তে সবাই হয়তো তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য পড়াশোনা করতেন।

তবে এখন এই ধরনের কাজের বিষয়েও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি চালু হওয়া নিয়ম অনুযায়ী, নারীদের তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুরুষদের সাহায্য নিতে হবে। বাণিজ্য মেলায় শুধু পুরুষরাই তাদের পণ্য প্রদর্শনের জন্য স্টলে বসতে পারবেন।

এই নিয়ম চালু করার নেপথ্যে তালেবান একাধিক কারণ উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, নারীরা হিজাব বা মাথা ঢাকার নিয়মকানুন সঠিকভাবে অনুসরণ করছে না।

মিজ. নাজিয়া বলেন, "তালেবানের সঙ্গে বাকি বিশ্বের কথোপকথনের পদ্ধতি বদলানো প্রয়োজন। বর্তমান পন্থায় কাজ হচ্ছে না। আফগান নারীদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন প্রয়োজন। না হলে আমরা আশা হারিয়ে ফেলছি।"

এই কট্টরপন্থি ইসলামী গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসার পর পাঁচ বছর কেটে গেছে।

এই সময়ে নারীরা মূলত জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদেরও স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ।

আফগানিস্তানের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই একই প্রশ্ন করছেন– তালেবানের সঙ্গে সংলাপের কোন পন্থাটি সঠিক যার দ্বারা প্রকৃত পরিবর্তন আসতে পারে?

এই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। নারীর অধিকার, তালেবানের খামখেয়ালি নির্দেশ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকটের মধ্যে সবকিছুই ঝুঁকির মুখে।

এই বিষয়ে বিশ্বে নানা মত শোনা যায়।

পশ্চিমের দেশগুলো সাধারণত মানবাধিকারের ওপর জোর দেয়, অন্যদিকে অন্যরা বিনিয়োগের সুযোগে বেশি আগ্রহী। এমনকি পশ্চিমের দেশগুলোর মধ্যেও কোনটা সবচেয়ে ভালো প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

অনেকেই এখন বিশ্বাস করেন যে, এ পর্যন্ত যা করা হয়েছে তাতে কোনো কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না।

আফগানিস্তানকে বিচ্ছিন্ন না করে রেখে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া

বিশ্ব থেকে আফগানিস্তানকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার পক্ষে খুব কম লোকই মতামত দেন।

এর একটি প্রধান কারণ হলো, জাতিসংঘের মতে, দুই কোটি ২০ লাখ আফগান, অর্থাৎ দেশটির জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, বেঁচে থাকার জন্য কোনো না কোনো ধরনের বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তান বেশ কয়েকটি বড় সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। দেশটি গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে এবং বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও সম্মুখীন হয়েছে।

প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। উপরন্তু, বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত লাখ লাখ আফগান এই দরিদ্র দেশটিতে ফিরে এসেছেন।

একটি সত্য অনস্বীকার্য তালেবান বর্তমানে আফগানিস্তানের ক্ষমতা ধরে রেখেছে।

২০২১ সালের ১৫ই অগাস্ট তালেবান যোদ্ধারা কাবুলে প্রবেশ করে। তারপর থেকে তারা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়েছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে।

বিদেশে অবস্থিত সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী এবং ইসলামিক স্টেট যোদ্ধাদের পর্যায়ক্রমিক আক্রমণ সত্ত্বেও এটি ঘটেছে।

তালেবান রাজস্ব থেকে আয় করছে। চীন, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং উজবেকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে খনি, জ্বালানি এবং অন্যান্য খাতে চুক্তিও করছে।

তবে, সন্ত্রাসবাদ ও মানবাধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোর প্রবল চাপ তাদের ওপর রয়েছে।

রাশিয়া একমাত্র দেশ যে তালেবান শাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে তারা এখনো নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে আসন লাভ করতে পারেনি, যেটিকে তালেবান তাদের বৈধ অধিকার বলে মনে করে।

আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি এখন আর তালেবানের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতিসংঘের একজন প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "স্বীকৃতির ব্যাপারে পশ্চিমের দেশগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।"

তিনি বলেন যে, অনেক দেশ তালেবানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছেছে, তাদের কূটনীতিকদের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং নিজেদের দূতাবাসের মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়েছে। এর ফলে তালেবান কার্যত স্বীকৃতি পেয়েই গেছে।

তিনি বলেন, "তালেবান যে জাতিসংঘের স্বীকৃতি চায়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শুরুর দিকে চাপ প্রয়োগের জন্য এটি তাদের কাছে যতটা কার্যকর হাতিয়ার ছিল, এখন আর তা নেই।"

কাবুলে তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আফগান দূতাবাসগুলোর তালিকা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে।

এই দূতাবাসগুলো আগের ক্ষমতাচ্যুত সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন, বিশ্বজুড়ে ৪০টিরও বেশি আফগান দূতাবাস তালেবানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে।

তালেবানের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, "আমরা যদি সম্পর্কের উন্নতি করতে চাই, তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে আমাদের একে অপরের কাছাকাছি আসতে হবে।"

বিবিসির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় কান্দাহারে, যেটি দক্ষিণ আফগানিস্তানের একটি শহর যা তালেবানদের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।

এখানেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি সুসংহত করেছেন। তিনিই শতাধিক ফরমান বা ফতোয়া জারি করেছেন।

এই আদেশগুলোর অনেকগুলোই নারীদের স্বাভাবিক জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আখুন্দজাদা একে নারীদের সুরক্ষার প্রতি একটি ইসলামী দায়িত্ব হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন।

তালেবান শাসনের পাঁচ বছর পূর্তিকে অনেকেই একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখছেন। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক বৈঠকে জাতিসংঘের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রুদ্ধদ্বার আলোচনায় পরিস্থিতিটিকে "অস্থির ও সম্ভাব্য বিপজ্জনক ভারসাম্য" হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে আফগানিস্তান বিশ্ববাসীর মনোযোগ অনেকটাই হারিয়েছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মনোযোগ আদায় করেছে।

এদিকে, ইউরোপের জন্য জরুরি প্রশ্ন হলো কীভাবে বিপুল সংখ্যক আফগানকে তাদের সীমান্ত অতিক্রম করা থেকে বিরত রাখা যায়। এই পরিস্থিতি আগের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

"২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে পশ্চিমের দেশগুলো যে পরিমাণ নজর দিয়েছে তার নিরিখে এটা আশ্চর্যজনক যে দেশটি এখন এত কম মনোযোগ পাচ্ছে," এমনই মত একজন পশ্চিমী কূটনীতিকের, যিনি সম্প্রতি আফগানিস্তানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যদিও তিনি এখনো কূটনৈতিক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন বলে পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

তিনি বলেন, "প্রকৃত কূটনৈতিক ফাটলটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে।"

তিনি আফগানিস্তানের জন্য বিশেষ দূত পদটি বিলুপ্ত করার বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করছিলেন।

একই সময়ে, ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএআইডি) সহ বেশ কয়েকটি সংস্থাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

একসময় আফগানিস্তান সম্পর্কিত প্রায় প্রতিটি বিষয়ে বিশ্বের নজর কাড়ার জন্য ইউএসএআইডি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

এমনকি তালেবানের মধ্যেও এমন অনেকেই যারা সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন, তাদের মধ্যেও হতাশা লক্ষ্য করা গেছে।

তারা মনে করেন যে, ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে বিশ্বসমাজ যে খুব একটা আগ্রহী তেমনটা একেবারেই মনে হচ্ছে না।

তালেবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোল্লা আব্দুল সালাম জাইফ বলেন, "আমরা আন্তর্জাতিক সমাজের অংশ হতে চাই।"

তিনি এখন কাবুলের উপকণ্ঠে ছেলে ও মেয়েদের জন্য একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করেন।

মাদ্রাসা মূলধারার স্কুলের মতো নয়, সেখানে সব বয়সের মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারে। কিছু মাদ্রাসায় বিশেষ করে যেগুলো বেসরকারিভাবে পরিচালিত, সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ও পড়ানো হয়।

তিনি বলেন, "শুধু চাপ প্রয়োগ করলেই কাজ হবে না।"

আফগানিস্তানের ইতিহাসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা রুশদের কাছে আত্মসমর্পণ করিনি, আমেরিকানদের কাছেও না। তাহলে তালেবান এখন কেন আত্মসমর্পণ করবে?"

যোগাযোগ ও খোলামেলা আলোচনা

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে আফগানিস্তানে তাদের উপস্থিতি কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলে।

তারা কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করছেন।

এর মধ্যে রয়েছে বন্দিদের সঙ্গে আচরণ, 'সৎকাজের প্রচার ও অসৎকাজের প্রতিরোধ' নামে পরিচিত নৈতিক বিধির কঠোর বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার উন্নত করার প্রচেষ্টা।

জাতিসংঘ জানিয়েছে যে গত পাঁচ বছর ধরে তালেবানের সঙ্গে তাদের 'অনিয়মিত সম্পৃক্ততা' রয়েছে।

তার মতে, "আলোচনার গতি ধীর হলেও ধাপে ধাপে অগ্রগতি হয়েছে, তবে মাঝেমধ্যে বাধারও সম্মুখীন হতে হয়েছে।"

তা সত্ত্বেও, জাতিসংঘ মনে করে যে এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া অপরিহার্য।

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের মহাসচিবের উপ-বিশেষ প্রতিনিধি জর্জেট গ্যাগনন বলেন, "কোনো প্রক্রিয়া একেবারেই না থাকার চেয়ে ধীরে ধীরে এগোনো ভালো।"

বর্তমানে কাবুলে তিনি জাতিসংঘের মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

জাতিসংঘকেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। সমালোচকদের মতে, তারা তালেবানের বিরুদ্ধে যথেষ্ট জোরালো অবস্থান নেয়নি। দোহা প্রক্রিয়ার মতো ফোরামগুলোর ক্ষেত্রেও এই সমালোচনা উঠে এসেছে, যেখানে তালেবানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

২০২৪ সালে তালেবানের একটি প্রতিনিধিদল কাতারের রাজধানী দোহা সফর করে এবং সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। তালেবানের শর্ত ছিল, এই বৈঠকে আফগান নারীদের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতে পারবেন না।

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই বৈঠকগুলোতে সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তারা এও উল্লেখ করেন যে, পরবর্তী বৈঠকগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

বর্তমানে 'মোজাইক' নামে একটি নতুন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় ছয়টি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে আরও সুশৃঙ্খলভাবে আলোচনা চালানো হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার, নারীর অধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমের মতো বিষয়গুলো।

অন্যদিকে তালেবানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, আটকে রাখা অর্থ বা তহবিল মুক্ত করা এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মতো বিষয়গুলো।

কাবুলে জাতিসংঘের কঠোর নিরাপত্তায় মোড়া একটি জায়গায় আমরা জর্জেট গ্যাগননের সঙ্গে দেখা করি। তিনি বলেন, "ধীরে ধীরে আস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। এটি জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে পারে।"

তিনি এই প্রচেষ্টাকে "দীর্ঘ যাত্রার ক্ষুদ্র পদক্ষেপ" হিসেবে দেখছেন।

গ্যাগনন উল্লেখ করেন যে, কেবল পৃথক দেশগুলোর মধ্যকার আলোচনার মাধ্যমে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

তিনি বলেন, "এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের চাপই কাজে আসেনি; এমনকি হুমকি-ধমকিতেও কোনো কাজ হয়নি। আমাদের প্রধান আশা, সব দেশ যেন একটি ঐক্যবদ্ধ বার্তা দেয় এবং সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।"

তবে অনেকেরই আশঙ্কা এমনকি খোদ জাতিসংঘের ভেতরেও এমন ধারণা রয়েছে যে এই 'মিশ্র বা বহুমুখী' কৌশলটিও হয়তো সফল হবে না।

তা সত্ত্বেও, অনেকেই মনে করেন যে আফগানিস্তানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। তাই সেখানে উপস্থিত থেকে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া জরুরি বলে মনে করেন অনেকে।

একই সঙ্গে অসুরক্ষিত ও অভাবী জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের সহায়তা ও সুরক্ষার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাওয়াকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই।

নেপথ্যের কথোপকথন

আন্তর্জাতিক ও আফগান সহায়তা সংস্থাগুলো একেবারে তৃণমূল স্তরে কার্যক্রম পরিচালনা করার উপায় খুঁজে যাচ্ছে।

এই সব জায়গাতেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতার ফরমান বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালানো হয়। এ লক্ষ্যে 'বিকল্প ব্যবস্থা' বা 'অল্টারনেটিভ অ্যারেঞ্জমেন্ট' নামে বিভিন্ন পদক্ষেপের পরিকল্পনা করা হয়।

এই ব্যবস্থার আওতায় কোনো কোনো এলাকার নারীরা ঘরে বসেই কাজ করার সুযোগ পান।

কিছু ক্ষেত্রে, তারা পুরুষ সহকর্মীদের থেকে আলাদা কক্ষে, ভিন্ন তলায় কিংবা পৃথক ভবনে কাজ করেন।

আফগানিস্তানে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত ব্রিটিশ সংস্থা 'আফগান-এইড'-এর প্রধান ক্রিস কিন্ডার বলেন, "আফগানিস্তানে অনেক কিছুই ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে এই সম্পর্কগুলো প্রায়শই কাজকে সহজ করে তোলে।"

তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে, কার্যক্রম পরিচালনা ও কাজের সুযোগ বা প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত অধিকাংশ বিষয় অভিজ্ঞ আফগান কর্মীরাই সামলে থাকেন।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন প্রাদেশিক শহর ও মফস্বল এলাকায় সফরের সময় দেখা গেছে যে, স্থানীয় তালেবান কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করেন।

তবে কেউ কেউ আবার যে কোনো ধরনের বিদেশি সহায়তার বিষয়ে গভীর সংশয় পোষণ করেন।

আরেকটি সহায়তা সংস্থা স্থানীয় পর্যায়ে হওয়া সমঝোতাগুলোকে 'মৌখিক ও ভঙ্গুর' বলে অভিহিত করেছে।

প্রকল্পগুলো চালিয়ে যাওয়ার জন্য সহায়তা সংস্থাগুলোকে তাদের নীতির সঙ্গে আপস করতে হয়েছে - এমন সমালোচনাকে কিন্ডার নাকচ করে দিয়েছেন।

তারা বলেন, "তালেবানদের যেমন সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তেমনি আমাদের এবং আমাদের দাতাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা বিভিন্ন কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করি যাতে উভয় পক্ষই একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারে।"

এক্ষেত্রেও একাধিক কর্মকর্তা আরও ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত কর্মপন্থা গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন।

কঠোর অবস্থান গ্রহণের দাবি

জ্যাম প্রস্তুতকারক নাজিয়া বলেন, "আমাদের আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত, এবার কিছু সুনির্দিষ্ট শর্তও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।"

বিদেশে বসবাসরত আফগান নারী অধিকারকর্মী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোও একই মত পোষণ করেন।

তাদের মতে, আলোচনাটি এই পর্যন্ত একপেশে হয়েছে; কারণ তালিবান এর বিনিময়ে কোনো বড় বা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেনি।

তারা মনে করেন, তালেবান যতক্ষণ না দৃশ্যমান ও সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আলোচনার পরিধি মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত বিষয়ের বাইরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

সম্প্রতি একটি নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয় যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা জুন মাসে ব্রাসেলসে তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদলকে বৈঠকে স্বাগত জানান।

তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর এটিই ছিল এই ধরনের প্রথম বৈঠক।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একদিনের ওই বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে মূলত সেই সব আফগান নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করা হয়, যাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নে বসবাসের আইনি অধিকার নেই।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই আয়োজনটিকে "টেকনিক্যাল পর্যায়ের আলোচনা" হিসেবে অভিহিত করলেও, তালেবান বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেছিল।

তালেবানের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, বৈঠকের আলোচ্যসূচির মধ্যে ইউরোপে সম্ভাব্য কনসালের উপস্থিতি এবং "বিশ্বাস-স্থাপনের পদক্ষেপ" গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আফগান বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক রিনা আমিরি বলেন, "কূটনৈতিক মহল এ বিষয়ে ভালোভাবে অবগত যে, টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি মাধ্যম এগিয়ে এসেছে।"

রিনা আমিরি ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আফগান নারী, কন্যাশিশু ও মানবাধিকার বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই সময়ে, তালিবানের সঙ্গে আলোচনার শর্তাবলীও তাদের নির্ধারণ করতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, "ব্রাসেলসে বৈঠকটি আয়োজন করা স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল, কেবল বাস্তব বা প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়।"

সমালোচকরা এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে "স্বাভাবিকীকরণের দিকে একটি ধীর পদক্ষেপ" হিসেবে বর্ণনা করেন।

কোনো পরিবর্তন আসবে?

কাবুলে আমরা আফগান অধিকারকর্মী মেহবুবা সিরাজের সঙ্গে দেখা করি, যিনি নারীদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করেন।

তার প্রশ্ন, "আফগানিস্তানে কাটানো গত পাঁচ বছরে আমি কী অর্জন করেছি?"

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর, নারীদের অধিকারের লড়াইয়ে নিজের দেশেই থেকে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে সিরাজ ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন।

তবে ৭৮ বছর বয়সী সিরাজ এখন বলছেন যে, তিনি দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ডিসেম্বরে তার শেষ আশ্রয়কেন্দ্রটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই কেন্দ্রটি পারিবারিক সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা ৩০ জনেরও বেশি আফগান নারীর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল।

নারীদের জন্য ক্লাস পুনরায় চালু করার বিষয়ে বারবার করা আবেদনও তালিবান নেতৃত্ব উপেক্ষা করেছে।

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি বলেন, "বিশ্বকে দেখানোর আশার আলো, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু সুযোগ, এমনকি মেয়েদের জন্য পরিচালিত গোপন স্কুলগুলোও - আসলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যই করা হয়।"

তা সত্ত্বেও সিরাজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, "তাদের সঙ্গে কথাবার্তায় অংশ নেওয়া উচিত। কিন্তু তাদের এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, যখন তারা আলোচনায় বসবেন তখন তা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।"

আরও অনেকে একই কথা বলেন।

আফগানিস্তানের একজন সাবেক কর্মকর্তা, যিনি তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে পর্দার আড়ালে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন, তিনি বলেন, "আরও দক্ষ কূটনীতি এবং নিভৃত ও গোপনীয় আলোচনার মাধ্যমেই কেবল পরিবর্তন আনা সম্ভব।"

তিনি আশা করেন, জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব যিনি আগামী বছরের গোড়ার দিকে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তিনি এ ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন।

তবে শেষ পর্যন্ত, পরিবর্তনের চাবিকাঠি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে নেই।

আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আছে, পশ্চিমের এমন একজন বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন, যেমন এই প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া আরও অনেকেই করেছেন।

তিনি বলেন, "আমি মনে করি না যে তালেবানের সঙ্গে আলোচনার ভাষা যা সারা বিশ্ব খুঁজে বেড়াচ্ছে, তার ভেতরেই এই সমাধান লুকিয়ে আছে।"

তিনি আরও বলেন, "পাঁচ বছর পর এটা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গেছে যে প্রকৃত পরিবর্তন কেবল ভেতর থেকেই আসতে পারে।"

তালেবানের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মাঝে মাঝে সর্বোচ্চ নেতার কঠোরতম নির্দেশাবলী নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

কিছু কর্মকর্তা দ্বিমত পোষণ করেছেন, বিশেষ করে মেয়েদের স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের বিষয়ে।

খুব কম ক্ষেত্রে হলেও, তারা কিছু নিয়ম বাতিল করানোর উপায় বের করতেও সফল হয়েছেন।

এমনই একটি ঘটনা ছিল গত বছর দেশজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া। সেই সিদ্ধান্তের ফলে জনজীবন থমকে যায়। যা পরবর্তীতে প্রত্যাহার করা হয়।

তালেবানের সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশাবলী চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই গোষ্ঠীটি সর্বদা ঐক্য ও ক্ষমতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।

এমনকি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামী পণ্ডিতদের পক্ষ থেকে করা আহ্বানও সর্বোচ্চ নেতা ও তার অনুসারীদের নেওয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেনি।

বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তাদের কঠোর অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো সহজ বা দ্রুত সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

নাজিয়ার জ্যাম তৈরির কর্মশালায় একটি টেবিলের ওপর তার প্রশিক্ষণের বেশ কয়েকটি সার্টিফিকেট সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় আফগান সংস্থার দেওয়া সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে বর্তমানে দেশটিতে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউএসএআইডি-এর সার্টিফিকেটও রয়েছে।

এই নথিপত্রগুলো প্রমাণ করে যে, নানাবিধ বিধিনিষেধ ক্রমাগত বাড়তে থাকা সত্ত্বেও একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার প্রচেষ্টায় তিনি অবিচল থেকেছেন।

প্রতি বছরই সমাজের এক নতুন রূপ বা চিত্র সামনে আসে। তা সত্ত্বেও, অনেক আফগান একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় সংগ্রাম ও প্রার্থনা চালিয়ে যাচ্ছেন - এই আশায় যে, বিশ্ব তাদের ভুলে যাবে না।

তালেবান শাসন: শরিয়া আইন পাঁচ বছরে আফগানিস্তানে কী পরিবর্তন এনেছে

বিয়ে করে সংসারী পপি, ইরিন নিউজার্সিতে, সিমলা ও জেবা কোথায়

অভিনয়ে কেউ ৩৫ বছর, আবার কেউ–বা পার করেছেন ২৫ বছর। নব্বই দশকে ঢালিউডে আলো ছড়ানো এমন নায়িকা প্রায় ডজনখানেক। তাঁদের কাউকে এখন আর সেই অর্থে অভিনয়ে দেখা যায় না। দু-একজন আবার বিনোদন অঙ্গনে কাজের ধরন বদলে ফেলেছেন। নায়িকার চরিত্রে অভিনয় না করলেও উপস্থাপনা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিচারকাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। একনজরে দেখে নেওয়া যাক নব্বই দশকে আলো ছড়ানো নায়িকাদের এখন কে কী করছেন, কোথায় আছেন?

পপি : ছয় ভাইবোনের মধ্যে পপি সবার বড়। তাঁর বাবা আমির হোসেন পেশায় একজন ঠিকাদার। মা মরিয়ম বেগম গৃহিণী। তাঁর জন্ম খুলনা শহরের সোনাডাঙ্গায়। তিনি যখন খুলনার একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়তেন, তখন লাক্স আনন্দ বিচিত্রা ফটোসুন্দরী প্রতিযোগিতা চলছিল। পত্রিকায় এই খবর দেখে তাঁর মা পপির ছবি পাঠান। এরপর মায়ের ইচ্ছায় পপি ওই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। কিশোরী পপি সবাইকে অবাক করে লাক্স আনন্দ বিচিত্রা ফটোসুন্দরী চ্যাম্পিয়ন হন। এরপর তাঁকে নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। এর মধ্যে শেষ হয় স্কুলজীবন। এরপর মাকে সঙ্গে করে পপি চলে আসেন ঢাকায়। ভর্তি হন লালমাটিয়া মহিলা কলেজে।

পপির মা মেয়েকে চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। এর মধ্যে পরিচয় হয় পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের সঙ্গে। তাঁর হাত ধরেই পপির সিনেমাযাত্রা শুরু। প্রথম সিনেমা ‘আমার ঘর আমার বেহেশত’। নায়ক শাকিল খান। তবে এই ছবিতে প্রথম অভিনয় করলেও পপিকে মানুষ চেনে ‘কুলি’ সিনেমা দিয়ে। তাঁর নায়ক ছিলেন ওমর সানী, পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবর।

ব্যবসাসফল ‘কুলি’ সিনেমার জনপ্রিয়তার পর পপিকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অল্প বয়সেই পপি বিরাট তারকাখ্যাতি পেয়ে যান। হাতে আসতে থাকে একের পর এক সিনেমা। দিনরাত অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হতো। তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করে তিনি দর্শকের মন জয় করেন।

পপি ২০২০ সালে সর্বশেষ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ নামের একটি সিনেমার শুটিং করেন। এরপর একেবারে আড়ালে চলে যান। পাঁচ বছর আড়াল জীবনযাপনের পর এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ্যে আসেন তিনি। আড়াল ভাঙার পর জানা যায়, পপি বিয়ে করে পুরোদস্তুর সংসারী। তিনি এক পুত্রসন্তানের মা।

জেবা :
তুমি চাঁদের জোছনা নও, ফুলের উপমা নও/ নও কোন পাহাড়ি ঝরনা, তুমি হৃদয়ের আয়না...এই গান সব শ্রেণির দর্শকের মন কেড়েছিল। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হৃদয়ের আয়না’ ছবির গানটির কথা অনেকেরই মনে আছে। প্রেমের গল্পের এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ওই সময়ের জনপ্রিয় নায়ক রিয়াজ।

ছবিটিতে রিয়াজের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন নবাগতা জেবা, আসল নাম জেবা হলেও চলচ্চিত্রে আয়না নামেই পরিচিত ছিলেন তিনি। ‘হৃদয়ের আয়না’ ছবিতে অভিনয়ের পর আয়না নামেই পরিচিতি পান।

‘আয়না’ চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পেয়েছিলেন তিনি। ওই এক ছবি করার পরই হারিয়ে যান এই নায়িকা। আর কোনো ছবিতে দেখা যায়নি তাঁকে। নুরুল ইসলাম পারভেজ পরিচালিত এই ছবিটির পরিচালক মোখলেছুর রহমান। জানা গেছে, ধানমন্ডিতে স্বামী সন্তান নিয়ে থাকে এই চিত্রনায়িকা।

ইরিন : সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মাধ্যমে সিনেমায় অভিষেক ঘটে চিত্রনায়িকা মৌসুমীর। একই পরিচালকের সিনেমা অনন্ত ভালোবাসা দিয়ে ঢালিউডে অভিষেক ঘটে তাঁরই ছোট বোন চিত্রনায়িকা ইরিন জামানের। এই সিনেমা দিয়ে ঢালিউডে অভিষেক ঘটে শাকিব খানেরও।

১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবি দিয়ে আলোচনায় আসেন ইরিন। এরপর বেশ কয়েকটি ছবিতে তাঁকে দেখা গেলেও নজর কাড়তে পারেননি পরিচালক, প্রযোজক বা দর্শকদের।

অভিনয়ের পাশাপাশি গায়িকা হিসেবে তাঁকে মাঝেমধ্যে পাওয়া গেছে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ‘মধুরাত’ ও ‘তোমায় দেখবো ছুঁয়ে’ নামের দুটি অ্যালবাম মুক্তি পায় তাঁর। এরপর থেকে খবরে নেই এই নায়িকা-গায়িকার। স্বামী-সন্তান নিয়ে থিতু হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে।

সিমলা : ঢালিউডে অভিষেক সিনেমায় ‘ফুলি’ এবং ‘সিমলা’ নামের দুটি চরিত্রে অভিনয় করে জিতে নিয়েছিলেন ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’। ১৯৯৯ সালে শহিদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত সেই ছবিতে সিমলার অভিনয় দেখে, অনেক চলচ্চিত্র বোদ্ধাই তাঁকে নিয়ে নানা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে আর আলো ছড়াতে পারেননি এই নায়িকা। বরং ছড়িয়েছেন সমালোচনা। ২০১৫ সালে ‘নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প’ নামের একটি ছবিতে ১৫ বছরের এক বালকের নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করে সমালোচিত হন তিনি।

‘ম্যাডাম ফুলি’ ছবির পর আর কোনো ছবিতেই সাফল্যের দেখা পাননি তিনি। তবে ‘ম্যাডাম ফুলি টু’ দিয়ে তিনি চলচ্চিত্রে ফিরে আসবেন বলে শোনা গেলেও, আর ফিরে আসেননি। এদিকে কয়েক বছর আগে আবারও নতুন করে সমালোচনার শিকার হন এই নায়িকা।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-26%2Fg5w3a6c2%2F086bd917-7be2-4757-8389-92898a55336a.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইরিন জামান, শিমলা, জেবা ও পপি। কোলাজ

চাপের মুখেও আবু সাঈদকে গুলির দৃশ্য কীভাবে টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছিল, উঠে এল সেই গল্প

‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’: রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, সেই অবস্থাতেই তাঁর বুকে গুলি করছে পুলিশ—এটি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যগুলোর একটি। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সেই দৃশ্যের ফুটেজ প্রথম প্রচারিত হয়েছিল বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভিতে।

আওয়ামী লীগ সরকারের প্রবল চাপ সত্ত্বেও সেই দৃশ্য কীভাবে এনটিভিতে প্রচার করা হয়েছিল, সেই গল্প উঠে এল সাংবাদিকদের নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে এনসিপি–সংশ্লিষ্ট ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স (ডিজেএ) আয়োজিত ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সেই গল্প বলেছেন এনটিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক ফকরুল আলম (কাঞ্চন)। ওই দৃশ্য ধারণ করা এনটিভির রংপুরের স্টাফ ক্যামেরাপারসন আসাদুজ্জামান আরমান এবং টেলিভিশনটির রংপুরের সিনিয়র স্টাফ করেসপনডেন্ট এ কে এম মঈনুল হকও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার সেই দৃশ্য এনটিভিতে প্রচারের গল্প বলতে গিয়ে ফকরুল আলম বলেন, ‘জুলাই বেদনার স্মৃতিতে ভরা। কারণ, যেদিন প্রথম আলোতে ৯৮ জনের মৃত্যুর খবর ছাপা হয়, সেদিন বিভিন্ন টেলিভিশন দুজনের মৃত্যুর খবর প্রচার করেছিল। আমাদের কাছে অনেক ফুটেজ থাকলেও দেখানো সম্ভব হয়নি। আবু সাঈদকে যেদিন শহীদ করা হয়, সেদিন রানডাউনে (বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে) তিনি ছিলেন।’

সে সময় আন্দোলনে সংঘাত-সংঘর্ষের খবর দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল উল্লেখ করে ফকরুল আলম বলেন, ‘১৬ জুলাই সংবাদ চলাকালে আমরা দুটি জায়গা থেকে লাইভ করি। প্রথমে বরিশালে সংঘর্ষের ঘটনার লাইভ প্রচারিত হয়। এরপর কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে রংপুরে লাইভে চলে গেলাম। আরমান (পাশে থাকা) সেদিন স্পটে ছিলেন। তিনি সেদিনের সুপার হিরো। মঈনুলও ছিলেন। ক্যামেরা নিয়ে দুঃসাহসী কাজটি করেছিলেন আরমান।’

শুধু এনটিভিই আবু সাঈদকে গুলি করার সেই দৃশ্য লাইভে প্রচার করেছিল উল্লেখ করে এনটিভির জ্যেষ্ঠ সংবাদ ব্যবস্থাপক ফকরুল আলম বলেন, ‘লাইভের পর আমরা নিউজরুমে হতভম্ব হয়ে পড়ি, হাত-পা কাঁপছিল। কারণ, আমি জানতাম এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এরপর অনেক কিছু হলো—নানা রকম জিজ্ঞাসাবাদ, গোয়েন্দা, সরকারি কর্মকর্তা, মালিকপক্ষ ও জ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের অনেক প্রশ্ন।’

সে যাত্রায় কীভাবে জেলে যাওয়া থেকে রেহাই পেয়েছিলেন, সে বিষয়ে ফকরুল আলম বলেন, ‘সেদিন গোয়েন্দাদের বলেছিলাম—এ রকম একটি ঘটনা ঘটবে আমি তো জানি না, সংঘর্ষের ঘটনা দেখে লাইভে গিয়েছিলাম, আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে, পুলিশ তাঁকে গুলি করবে—তা আমরা জানতাম না। এ কথা বলে সেদিন রেহাই পেয়েছিলাম।’

জুলাইয়ের স্মৃতিচারণা, ক্ষোভ–হতাশা

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জুলাই অভ্যুত্থানের সংবাদ সংগ্রহ করা বেশ কয়েকজন সাংবাদিক তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা–প্রাপ্তি নিয়ে অনুষ্ঠানে কথা বলেন। তাঁদের অধিকাংশ জুলাইয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণা করেন। কেউ কেউ অভ্যুত্থানের পর চাকরিচ্যুতির ঘটনা উল্লেখ করেন। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় কেউ কেউ হতাশা প্রকাশ করেন।

ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জুলাইয়ে যাঁরা যাত্রাবাড়ী-রামপুরার মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে ফুটেজ নিয়েছেন, মোবাইলকে যাঁরা অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন, গুলির পাশে দাঁড়িয়ে জুলাইকে লিপিদ্ধ করা সেই সাংবাদিকদের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের চেয়ে বড়। আর যাঁরা জুলাইয়ের বিপক্ষে ছিলেন, ইতিহাস তাঁদের অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে কৌশলে কিছু মানুষের সুবিধা পাওয়া আর কিছু মানুষ বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন অভ্যুত্থানে মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মুক্তাদির রশিদ। ঘৃণার সংস্কৃতি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের অ্যাসাইমেন্ট এডিটর মাকসুদ উন নবী জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংবাদ প্রচারে বিভিন্ন সংস্থার বাধার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের প্রতি বিশ্বাস উঠে যাওয়ায় অনেক ছাত্র-জনতা সাংবাদিকদের মেরেছিল।

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব অভ্যুত্থানের সময় দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করতেন। সে সময়ের অভিজ্ঞতা তুরে ধরে তিনি বলেন, নাহিদ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র পাওয়ায় তাঁকে টার্গেট (নিশানা) করা হয়েছিল। ২৬ জুলাই তাঁর অফিসে তাঁকে তুলে আনতে গিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অফিসে ঢুকে তাঁর ব্যবহৃত কম্পিউটার ভাঙচুর ও নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করা হয়। মালিক–সম্পাদককে চাপ দেওয়া তাঁকে র‌্যাবের হাতে তুলে দিতে। তবে সম্পাদক দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে তাঁকে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

বর্তমানে কালের কণ্ঠে কর্মরত জাহিদুল ইসলাম অভ্যুত্থানের সময় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে কাজ করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মিরপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহের শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য ছিলেন সাংবাদিকেরা।

বর্তমানে দৈনিক আগামীর সময়ের স্টাফ রিপোর্টার আমজাদ হোসেন (হৃদয়) অভ্যুত্থানের সময় ছিলেন দেশ রূপান্তর পত্রিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক। তিনি বলেন, আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়ন, ৯ দফা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং গুজব ডিবাঙ্ক (উন্মোচন) করতে ভূমিকা রেখেছিলেন সাংবাদিকেরা।

অভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মহিউদ্দিন মুজাহিদ (মাহি)। সে সময় ‘কঠিন সেন্সরশিপে’ আবদ্ধ থাকার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

এখন টেলিভিশন চ্যানেল থেকে চাকরিচ্যুত বেলায়েত হোসেন নিজের ভোগান্তির কথা উল্লেখ করেন। তিনি সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের কাছে প্রশ্ন রাখেন, দায়িত্বে থাকার সময় জুলাইয়ে ভূমিকা রাখা সাংবাদিকদের সঙ্গে বসার কোনো তাড়না তাঁর ছিল কি না।

স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানান দ্য ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাইমা ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাইয়ের পর অনেক সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে মালিকানা পরিবর্তন বা তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক অ্যালায়েন্সটা শিফট হয়েছে। এটা ভবিষ্যতে পীড়া দেবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে নিউ এজের নির্বাহী সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ মজুমদার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আসিফ শওকত (কল্লোল), ডেইলি স্টারের জিনা তাসরিন, টিআরটি ওয়ার্ল্ডের বাংলাদেশ প্রতিনিধি কামরুজ্জামান বাবলু, চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের সাংবাদিক জুমাতুল বিদা, বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক তৌহিদ হায়দার, এখন টিভির মাহমুদ রাকিব, যমুনা টিভির আহমেদ রেজা ও লামিয়া তিথি প্রমুখ বক্তব্য দেন।

‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অতিথিদের একাংশ। রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে। ১৭ আগস্ট ২০২৬
‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অতিথিদের একাংশ। রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে। ১৭ আগস্ট ২০২৬ ছবি: এনসিপির সৌজন্যে

হার্ভার্ডের অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলাদেশি কুদসিয়া হুদা, বিস্তারিত জানুন তাঁর সম্পর্কে

জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের পাঁচ সাবেক শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশের কুদসিয়া হুদা। তিনি পাবলিক হেলথ প্র্যাকটিসে পেয়েছেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড। প্রতি বছর অ্যালামনাই উইকেন্ডে হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের সাবেক শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ বছর অ্যালামনাই উইকেন্ড অনুষ্ঠিত হবে ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে কুদসিয়া হুদা বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সদর দপ্তর জেনেভায় দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, স্থিতিস্থাপকতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। ২০২৩ সালের ১২ আগস্ট কুদসিয়া হুদাকে নিয়ে ‘অনেকেই বলেছিল ক্যারিয়ার হবে না, সেই কুদসিয়াই এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটা বিভাগের প্রধান’ শিরোনামে একটি লেখা ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোয়।

অনেকেই বলেছিল ক্যারিয়ার হবে না, সেই কুদসিয়াই এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটা বিভাগের প্রধান

কঙ্গো থেকে ইন্দোনেশিয়া, ইরান থেকে ইয়েমেন, ভারত থেকে জর্ডান—যেখানে মানবিক বিপর্যয়, সেখানেই ছুটে যান কুদসিয়া হুদা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স বিভাগের তিনি প্রধান। তাঁর ছুটে চলা জীবনের গল্প শুনেছেন তানজিনা হোসেন

২০০৪ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ইরানের কেরমান প্রদেশের অনেক ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। মারা যান ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ। আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নেন গৃহহারা হাজারো মানুষ। দুর্গত এলাকায় ছুটে যান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ কুদসিয়া হুদা। একদিন এক আশ্রয়শিবিরে ছোট্ট এক মেয়ের সঙ্গে তাঁর আলাপ। চার বছরের ফুটফুটে মেয়েটির সঙ্গে ওর বাবা ও ভাইও আছেন। আলাপের একপর্যায়ে কুদসিয়ার কাছে মেয়েটার আবদার, ‘তুমি কি আমার মাকে এনে দিতে পারবে?’

‘কোথায় তোমার মা?’ জানতে চান কুদসিয়া।

জবাবে মেয়েটি আর তার বাবা যা বললেন, শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান কুদসিয়া। শেষ রাতে যখন ভূমিকম্পে সবকিছু কেঁপে ওঠে, মেয়েকে কোলে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন মা। আর তার বাবা হাত ধরে টেনে এনেছিলেন ছেলেকে। খানিকটা পথ আসার পর ছোট মেয়েটা কাঁদতে শুরু করে। কারণ, তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী খেলনা পুতুলটা ঘরে ফেলে এসেছে। মুহূর্ত না ভেবেই মেয়েকে বাবার কোলে দিয়ে মা বলেছিলেন, ‘তোমরা যাও, আমি এক্ষুনি পুতুলটা নিয়ে আসছি। যাব আর আসব।’

সেই যে গেলেন, আর ফিরে এলেন না মা!

কুদসিয়ার হৃদয়-আয়নায় নিজের মেয়ের ছবিটা ভেসে ওঠে। দূর দেশে এই মেয়ের বয়সী সন্তানকে রেখে এসেছেন তিনি। বুকটা হু হু করে ওঠে। এক মায়ের সন্তানবৎসল হৃদয়কে উপলব্ধি করে চোখে পানি আসে। চোখের পানি মুছে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে কুদসিয়া বললেন, ‘নিশ্চয়ই একদিন মায়ের সঙ্গে তোমার দেখা হবে। সেদিন তুমি মাকে জানিও যে তুমি তাকে কত মিস করেছ। আর এ জন্য নিজেকে দায়ী কোরো না।’

ভূমিকম্পের ওই বছরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেন কুদসিয়া। এরপর মা-হারা সেই মেয়েটার মতো দেশে দেশে আরও অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়েছে। সেই যে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে সুনামিতে সবাইকে হারানো নারী, কুদসিয়ার মাথায় হাত দিয়ে যিনি আশীর্বাদ করেছিলেন।

আফগানিস্তানে যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করা এক চিকিৎসকের অসহায় মুখ, দায়িত্ব পালনের সময় জানতে পারেন বোমার আঘাতে উড়ে গেছে তাঁর পুরো পরিবার। আর সুনামিতে আক্রান্ত এলাকায় সব হারানো সেই তরুণ, আশ্রয়শিবিরে গান গেয়ে যিনি শিশুদের আনন্দ দিতেন।

বর্তমানে জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স (দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন) বিভাগের প্রধান কুদসিয়ার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা আছে এমন অনেক মানুষের মুখ, হৃদয়স্পর্শী সত্য গল্প।

কোনো কোনো গল্প তাঁকে যেমন ঘুমাতে দেয় না, তেমনি কোনো গল্প এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাও দেয়। সেদিন আলাপের সময় তেমনি কিছু আশ্চর্য গল্পের ঝাঁপিই খুলেছিলেন কুদসিয়া হুদা।

নিজেও পড়েছেন বিপদে

মিসরে কর্মরত অবস্থায় ২০১১ সালে একবার স্বামী-সন্তানকে কায়রোতে রেখে অফিসের কাজে ওমান গেছেন কুদসিয়া। মাসকাটে বসেই শোনেন আরব বসন্ত শুরু হয়ে গেছে। উত্তাল কায়রো আর ততোধিক উত্তাল তাঁর অতি পরিচিত তাহরির স্কয়ার।

একসময় স্বামী-সন্তানের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এদিকে মাসকাট থেকেও কিছুতেই আর কায়রোতে ফিরতে পারছিলেন না। তারপর কী কষ্ট আর কত ঝামেলা করেই না অগ্নিগর্ভ কায়রোতে পৌঁছালেন।

কারফিউয়ের মধ্যে পথে পথে কূটনৈতিক পরিচয়পত্র দেখিয়ে স্বামী-সন্তানের কাছে গেলেন। তারপর পুরো পরিবার গৃহবন্দী। সে এক অদ্ভুত সময়। চারদিকে সামরিক ট্যাংক বহর ঘুরছে, থরথর করে কাঁপছে পুরো বাড়ি।

বন্দী অবস্থায় আরও কিছুদিন থাকার পর বিশেষ বিমানে জাতিসংঘের অন্য কর্মীদের সঙ্গে মিসর ছাড়তে সক্ষম হন।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহুবার এমন ঝুঁকির মুখে পড়েছেন কুদসিয়া। আফগানিস্তানে কাজ করার সময় প্রাচীরঘেরা সুরক্ষিত হোটেলে থাকার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ভূমিকম্পে সব ভেঙে যেতে থাকল।

সুরক্ষিত জায়গাটাই তাঁদের জন্য হয়ে উঠল মরণফাঁদ। ঠিক একইভাবে ইরাকে কাজ করতে গিয়ে পার্শ্ববর্তী ভবনে আকস্মিক বোমা হামলা থেকে স্রেফ কপালগুণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

আরাম দেয় লেখালেখি

দুর্গত মানুষেরা যেমন মানসিক কষ্টে ভোগেন, তেমনই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিতরাও নানা রকম ট্রমার শিকার হন। বিপর্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করতে গিয়ে অনেকে অস্বাভাবিক হয়ে পড়েন।

কুদসিয়া হুদা বলেন, ‘আমাদের এ জন্য নানা রকম প্রশিক্ষণ নিতে হয়। তারপরও মাঝেমধ্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে।’

এ জন্য এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে কুদসিয়া হুদা শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করেন, নিয়ম করে ধ্যানও করেন। মন ভালো না হলে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আমার বরের সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করেও আমি অনেক স্বস্তিবোধ করি। তবে সবচেয়ে যে জিনিসটা আমাকে প্রশান্তি এনে দেয় তা হলো, লেখালেখি। আমার স্ট্রেস দূর হয় এতে।’

কুদসিয়া হুদার লেখক নাম দীপা ফিরোজ। তিনি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। ছোটবেলায় শেখা গানের চর্চাও ধরে রেখেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিপজ্জনক আর চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করতে গিয়েও প্রিয় পোশাক শাড়ির প্রতি ভালোবাসা হারাননি। জেনেভায় নিজের অফিসে প্রতিদিন শাড়ি পরেন। যেকোনো দেশে বিপর্যয়ের খবর পেয়ে উড়াল দেওয়ার সময় স্যুটকেসে অন্তত একটা শাড়ি নিতে ভোলেন না কখনো।

ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরাম কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সম্মেলন, জলবায়ু সম্মেলনে পুরোপুরি বাঙালি বেশভূষায় হাজির হন কুদসিয়া।

পৃথিবীর নানা ভাষা আর সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করতে সমস্যা হয় না। তিনি বলেন, ‘যে দেশ বা যে কমিউনিটিতে কাজ করি, তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার জন্য দরকার তাদের জীবনযাত্রার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।

যেমন ইরানে কাজ করার সময় লম্বা পোশাক পরতে হতো, আমার দীর্ঘ চুল তখন পিন দিয়ে আটকে স্কার্ফে মাথা ঢাকতে হতো। এত সব কাজের মধ্যেও আমাকে মাথার স্কার্ফ সামলে চলতে হতো। ইয়েমেন, সিরিয়া, সোমালিয়া, ইরাকে কাজের সময় পরতে হতো বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট আর হেলমেট।

আফ্রিকায় ইবোলা সংক্রমণে কাজ করার সময় পরতে হতো জীবাণুরোধী পোশাক। কাজ চালানোর মতো ফরাসি, আরবি ও ফারসি ভাষা শিখেছি। একজীবনে বিচিত্র ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মের মানুষের আপনজন হয়ে ওঠা—এ এক পরম পাওয়া।’

অনেকেই বলেছিলেন, কুদসিয়ার ক্যারিয়ার হবে না

কুদসিয়া হুদার বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা ঢাকায়। ছোটবেলায় গান শিখেছেন, নেচেছেন, ছবি এঁকেছেন, স্কুলে পড়ার সময় ফুটবলও খেলেছেন। ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে এসএসসি আর হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি।

এরপর ভর্তি হয়েছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে। মেডিকেলে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। প্রথম সন্তানের জন্ম চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময়। বিয়ের পর অনেকে বলেছিলেন, কুদসিয়াকে দিয়ে পড়াশোনা হবে না। সন্তান হওয়ার পর তাঁরাই বলতে থাকলেন, তাঁকে দিয়ে আর ক্যারিয়ার হবে না।

সবার কথাই ভুল প্রমাণ করেছেন কুদসিয়া। ১৯৯১ সালে এমবিবিএস পাস করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে যোগ দেন। কাজ করতে করতেই স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিসিএস দিয়ে পঞ্চগড়ে যোগ দেন।

সেখানে প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে কাজ করেছেন। জনস্বাস্থ্য বিষয়টি তখন প্রিয় বিষয় হয়ে ওঠে। তাই পরে এসে যোগ দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে। পরবর্তীকালে এই বিষয়েই উচ্চতর ডিগ্রি নিতে যান যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

হার্ভার্ডে পড়তে পড়তেই একটি মাস্টার্স কোর্সে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পান। সেটি ছিল হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ, টাফট বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একটি সমন্বিত কোর্স।

আমন্ত্রণ পেয়েও দ্বিধায় ছিলেন কুদসিয়া। ছোট ছোট দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে হার্ভার্ডে পড়তে গিয়েছিলেন তিনি। যাদের একজন তখনো দুগ্ধপোষ্য শিশু। দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে একা বোস্টনে থাকা, স্কুলে ও ডে কেয়ারে রাখা, আনা-নেওয়া, রান্নাবান্নাসহ সব কাজ করে পড়তে বসতেন গভীর রাতে।

কুদসিয়া ভাবলেন আবেদন করে কী হবে, এত কিছু তিনি সামাল দিতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর পরামর্শক রিচার্ড ক্যাশ পরামর্শ দিয়ে বললেন, ‘কেন তুমি আবেদন করবে না? মাত্র ২০ জনকে এই সুযোগ দেওয়া হবে। আরেকটা কথা মনে রেখো, তোমার এই সন্তানেরাই তোমার শক্তি। আমার বিশ্বাস, তুমি দুটো মাস্টার্স প্রোগ্রাম করতে পারবে।’

রিচার্ড ক্যাশের কথাটাই এখনো বিশ্বাস করেন কুদসিয়া। আসলে যা যা মানুষ প্রতিবন্ধকতা, বাধা বা দুর্বলতা মনে করে, প্রতিটিই জীবনে শক্তিদায়ী রূপে দেখা দিতে পারে। জনস্বাস্থ্যে পড়াশোনা শেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেন ২০০৪ সালে। এরপর সংস্থাটির নানা পদে কাজ করেছেন।

কুদসিয়া বললেন, মা-বাবার পর সব সময় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন তাঁর স্থপতি স্বামী আর সন্তানেরা। একজন বিবাহিত নারীর এমন যাত্রায় বরের ভূমিকা অনেক। বোঝাপড়া না হলে সবকিছু সামলানো কঠিন!

কুদসিয়ার দুই মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন থেকে দক্ষিণ ভারতের কোদাইকানাল, মিসরের কায়রো থেকে বিলেত—নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে বড় হয়েছেন। দুজনই এখন প্রতিষ্ঠিত। বড় মেয়ে বিশ্বব্যাংক সদর দপ্তরে এনার্জি সেক্টরে কাজ করেন, আর ছোট মেয়েটি বাবার মতো স্থাপত্য পেশা বেছে নিয়েছেন।

কুদসিয়া হুদার কাছে জানতে চাই, ‘আপনি একজন এশীয়, তার ওপর বাংলাদেশি নারী। এই পরিচয়গুলো বৈশ্বিক সমাজে কি আপনার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কখনো?’ কুদসিয়া হুদা হেসে বলেন, ‘যেসব বিষয় নিয়ে আমি কাজ করি, যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়, তা একজন বাংলাদেশির চেয়ে ভালো আর কে বুঝতে পারে? বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, লঞ্চডুবি—এসব দেখেশুনে আর মোকাবিলা করেই বড় হই আমরা।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স বিভাগের  প্রধান কুদসিয়া হুদা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স বিভাগের প্রধান কুদসিয়া হুদা। ছবি: সংগৃহীত

৭৯ বছর বয়সে বাবা হওয়া; ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক এই তারকার জীবন সিনেমার মতোই

রবার্ট ডি নিরো—নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কখনো ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এর ট্রাভিস বিকল, কখনো ‘রেজিং বুল’-এর জেক লামোটা, কখনো ‘দ্য গডফাদার ২’-এর তরুণ ভিটো করলিওনে। আবার কখনো তিনি একেবারেই অন্য মানুষ—‘মিট দ্য প্যারেন্টস’-এর অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ শ্বশুর, ‘অ্যানালাইজ দিস’-এর মজার মাফিয়া কিংবা ‘সিলভার লাইনিংস প্লেবুক’-এর আবেগপ্রবণ বাবা।

আজ ৮৩ বছরে পা দিলেন এই অভিনেতা। জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ আগস্ট, নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সিনেমায় কাজ করেও অবসর নেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই তাঁর। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিবার, ব্যবসা ও নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও হয়ে উঠেছে জীবনের বড় অংশ। ২০২৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসব তাঁকে আজীবন সম্মাননা হিসেবে অনারারি পাম দ’র দিয়েছে, যা তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের আরেকটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।

শিল্পী পরিবারে জন্ম, কিন্তু অভিনয়ের পথ সহজ ছিল না
রবার্ট অ্যান্টনি ডি নিরোর জন্ম নিউইয়র্কের গ্রিনউইচ ভিলেজে। বাবা রবার্ট ডি নিরো সিনিয়র ছিলেন কবি, ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী; মা ভার্জিনিয়া অ্যাডমিরালও ছিলেন চিত্রশিল্পী। মা–বাবার বিচ্ছেদের পর মূলত মায়ের কাছেই বড় হয়েছেন তিনি। শৈশব কেটেছে গ্রিনউইচ ভিলেজ ও লিটল ইতালির পরিবেশে। তাঁর গায়ের ফরসা রঙের কারণে ছোটবেলায় ডাকনাম ছিল ‘ববি মিল্ক’।

অভিনয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয় খুব ছোট বয়সেই। ১০ বছর বয়সে স্কুলের মঞ্চে চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর কিছুটা সময় অভিনয় থেকে দূরে সরে গেলেও ১৬ বছর বয়সে আবার মঞ্চে ফেরেন। পরে স্টেলা অ্যাডলার ও লি স্ট্রাসবার্গের কাছে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন। সেখান থেকেই তৈরি হয় সেই অভিনয়পদ্ধতি, যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে হলিউডের সবচেয়ে প্রভাবশালী অভিনেতাদের একজন করে তোলে।

তবে ডি নিরোর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়া। তিনি শুধু সংলাপ বলতেন না; চরিত্রের হাঁটা, কথা বলার ধরন, চোখের ভাষা, শরীরের ভঙ্গি—সবকিছু বদলে ফেলতেন। ফলে পর্দায় রবার্ট ডি নিরোকে নয়, চরিত্রটিকেই দেখা যেত।

স্করসেজির সঙ্গে যে বন্ধুত্ব বদলে দিল সিনেমা
রবার্ট ডি নিরোর ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলতে গেলে একজন পরিচালকের নাম বারবার ফিরে আসে—মার্টিন স্করসেজি। ১৯৭৩ সালের ‘মিন স্ট্রিটস’ দিয়ে তাঁদের সৃজনশীল জুটি শুরু। এরপর ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘রেজিং বুল’, ‘দ্য কিং অব কমেডি’, ‘গুডফেলাস’, ‘ক্যাসিনো’ থেকে ‘দ্য আইরিশম্যান’—দুজনের সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে আমেরিকান সিনেমার একাধিক মাইলফলক। আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসও তাঁদের দীর্ঘ সহযোগিতাকে ডি নিরোর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এ ট্রাভিস বিকল চরিত্রটি ডি নিরোর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শহরের একাকিত্ব, মানসিক অস্থিরতা ও সহিংসতার দিকে এগিয়ে যাওয়া এক মানুষের চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও চলচ্চিত্রের শিক্ষার্থীদের কাছে আলোচনার বিষয়।
আর ‘রেজিং বুল’-এ নিরো যেন অভিনয়ের সংজ্ঞাই বদলে দেন। কিংবদন্তি বক্সার জেক লামোটার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নিজের শরীরকে আমূল পরিবর্তন করেছিলেন। সেই অভিনয় তাঁকে এনে দেয় সেরা অভিনেতার অস্কার।

দুই অস্কার, অসংখ্য অবিস্মরণীয় চরিত্র
ডি নিরো প্রথম অস্কার পান ১৯৭৪ সালে ‘দ্য গডফাদার ২’-এ তরুণ ভিটো করলিওনে চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। এই পুরস্কার ছিল সেরা পার্শ্ব অভিনেতার। দ্বিতীয় অস্কার আসে ১৯৮০ সালে ‘রেজিং বুল’-এর জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে। তবে পুরস্কারের হিসাব দিয়ে ডি নিরোর প্রভাব মাপা কঠিন। একই অভিনেতা যে এত বিচিত্র চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেন, ডি নিরো এর অন্যতম বড় উদাহরণ।

মাফিয়া চরিত্রের সঙ্গে এত মিল কেন
ডি নিরোকে নিয়ে দর্শকের একটি ধারণা দীর্ঘদিনের—তিনি মাফিয়া বা অপরাধজগতের চরিত্রে অসাধারণ।

এর পেছনে কেবল অভিনয়প্রতিভা নয়, গবেষণার অভ্যাসও ছিল। ‘দ্য গডফাদার ২’-এর তরুণ ভিটো করলিওনে চরিত্রের জন্য তিনি ইতালীয় বংশোদ্ভূত মানুষের উচ্চারণ ও শরীরী ভাষা নিয়ে কাজ করেছিলেন। ‘রেজিং বুল’-এর জন্য বক্সারের শরীরী প্রস্তুতি, ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এর জন্য নিউইয়র্কের অন্ধকার রাস্তাঘাট পর্যবেক্ষণ—চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তাঁর প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘ ও নিবিড়।
নিরোর এই অভিনয়পদ্ধতি পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য অভিনেতাকে প্রভাবিত করেছে।

পরিচালক ডি নিরো
অভিনেতা হিসেবে খ্যাতির পাশাপাশি পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন ডি নিরো। ১৯৯৩ সালে ‘আ ব্রঙ্কস টেল’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে অভিষেক। ছবিতে তিনি নিজেও অভিনয় করেন। এরপর ২০০৬ সালে পরিচালনা করেন ‘দ্য গুড শেফার্ড’। তাঁর পরিচালনায় অপরাধ, ক্ষমতা, আনুগত্য ও আমেরিকান ইতিহাসের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ ক্যামেরার সামনে থাকার পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনের ভাষাটিও তিনি বুঝতেন।

সিনেমার বাইরে তাঁর আরেক সাম্রাজ্য
রবার্ট ডি নিরোর সম্পদের গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়। ২০২৬ সালে তাঁর আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে এটি কোনো সরকারি বা অডিট করা হিসাব নয়; তারকাদের সম্পদের হিসাব সাধারণত বিভিন্ন প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়। তাঁর অর্থের উৎস শুধু অভিনয় নয়; রেস্তোরাঁ, হোটেল, প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠান ও বিনোদন ব্যবসাও গুরুত্বপূর্ণ।

ডি নিরোর সবচেয়ে সফল ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলোর একটি নোবু। জাপানি রন্ধনশিল্পী নোবু মাতসুহিসা ও মেইর টেপারের সঙ্গে তাঁর অংশীদারত্বে গড়ে ওঠে এই রেস্তোরাঁ ও হোটেল সাম্রাজ্য।
১৯৯৪ সালে প্রথম রেস্তোরাঁ চালু হওয়ার পর সেটি ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে বিলাসবহুল খাবার ও আতিথেয়তার ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। নিউইয়র্কের কয়েকটি হোটেলের সঙ্গেও ডি নিরোর ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে।

ট্রাইবেকা: নিজের শহরের জন্য নিজের সিনেমাজগৎ
ডি নিরোর আরেক বড় উদ্যোগ ট্রাইবেকা। ২০০৩ সালে রবার্ট ডি নিরো, জেন রোজেনথাল ও ক্রেগ হ্যাটকফ মিলে ট্রাইবেকা এন্টারপ্রাইজ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, সংগীত, গেমস ও নানা ধরনের গল্প বলার মাধ্যম নিয়ে কাজ করে এবং ট্রাইবেকা উৎসব পরিচালনা করে।

নিউইয়র্কের ৯/১১-এর পরবর্তী সময়ে ট্রাইবেকা এলাকার পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে চলচ্চিত্র উৎসবটির সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে ট্রাইবেকা উৎসব স্বাধীন ও বিকল্পধারার সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ডি নিরোর কাছে এটি শুধু ব্যবসা নয়, নিজের শহরের প্রতি একধরনের দায়বদ্ধতাও।

ব্যক্তিগত জীবন: দুই বিয়ে, একাধিক সম্পর্ক
ক্যামেরার সামনে ডি নিরো যতটা দৃশ্যমান, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এর বিপরীত। নিজের পরিবার ও সম্পর্ক নিয়ে সাধারণত খুব বেশি কথা বলেন না।
১৯৭৬ সালে অভিনেত্রী ডায়ান অ্যাবটকে বিয়ে করেন। তাঁদের ছেলে রাফায়েল। অ্যাবটের আগের সম্পর্কের মেয়ে ড্রেনাকেও ডি নিরো দত্তক নেন। ১৯৮৮ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়।

এরপর মডেল টুকি স্মিথের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল নিরোর। এ সম্পর্ক থেকে যমজ সন্তান জুলিয়ান ও অ্যারন জন্ম নেন ১৯৯৫ সালে সারোগেসির মাধ্যমে। অ্যারন পরবর্তী সময়ে এয়ারিন নাম গ্রহণ করেন এবং ২০২৫ সালে প্রকাশ্যে ট্রান্স নারী হিসেবে নিজের পরিচয় জানান। বাবা ডি নিরো তাঁর পরিচয়কে সমর্থন করেছেন।

১৯৯৭ সালে অভিনেত্রী ও গায়িকা গ্রেস হাইটাওয়ারকে বিয়ে করেন ডি নিরো। তাঁদের ছেলে এলিয়ট জন্ম নেন ১৯৯৮ সালে। ১৯৯৯ সালে দম্পতির বিচ্ছেদের উদ্যোগ হলেও পরে তাঁরা আবার সম্পর্ক জোড়া লাগান এবং ২০০৪ সালে পুনরায় বিয়ের অঙ্গীকার করেন। ২০১১ সালে সারোগেসির মাধ্যমে তাঁদের মেয়ে হেলেন গ্রেস জন্ম নেয়। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে তাঁদের বিচ্ছেদের খবর প্রকাশ্যে আসে।

৭৯ বছর বয়সে আবার বাবা
ডি নিরোর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত সাম্প্রতিক অধ্যায়গুলোর একটি তাঁর সপ্তম সন্তান। ২০২৩ সালে ৭৯ বছর বয়সে নিরো কন্যাসন্তানের বাবা হন। সন্তানের নাম জিয়া ভার্জিনিয়া চেন-ডি নিরো। শিশুটির মা তিফানি চেন। তখন সাক্ষাৎকারে ডি নিরো নিজেই জানান, তাঁর ছয় সন্তান নয়, আসলে সাত সন্তান হয়েছে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সন্তানদের প্রতি নিরোর দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। ২০২৩ সালে ৮০ বছর বয়সে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, জিয়াকে দেখলে তাঁর উদ্বেগ ও চিন্তাগুলো যেন দূরে সরে যায়।

এখন সাত সন্তানের পাশাপাশি নিরো দাদাও। তাঁর বড় মেয়ে ড্রেনার ছেলে লিওন ২০২৩ সালে ১৯ বছর বয়সে দুর্ঘটনাজনিত ওভারডোজে মারা যান, যা পরিবারটির জন্য ছিল গভীর শোকের ঘটনা।

কান তাঁকে যখন ‘সিনেমার কিংবদন্তি’ বলল
২০২৫ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব ছিল ডি নিরোর ক্যারিয়ারের আরেক স্মরণীয় মুহূর্ত। উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁকে দেওয়া হয় সম্মানসূচক স্বর্ণপাম। এর আগে ২০১১ সালে তিনি কান উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরি সভাপতি ছিলেন।
কান নিরোকে সম্মান জানাতে গিয়ে তাঁর অভিনয়ের একটি বৈশিষ্ট্য আলাদা করে উল্লেখ করেছিল, তাঁর ‘অন্তর্মুখী’ অভিনয়শৈলী, যা কখনো মৃদু হাসি, কখনো কঠিন দৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।

২০২৫ সালের কান মাস্টারক্লাসে নিজের বাবা ও পরিবার নিয়েও কথা বলেন ডি নিরো। বাবার রেখে যাওয়া স্টুডিও, চিঠি ও ছবির ঐতিহ্য নিয়ে শিল্পী জেআরের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত প্রকল্পে কাজ করছেন বলেও জানান। সেখানে তিনি বলেছিলেন, তাঁর বাবা তাঁকে সত্যিকারের ভালোবাসতেন, আর তিনিও তাঁর সন্তানদের ভালোবাসেন।

ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক
হলিউডে রাজনীতি নিয়ে কথা বলা নতুন কিছু নয়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে রবার্ট ডি নিরোর অবস্থান অন্য রকম। তিনি শুধু ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেননি, বহুবার সরাসরি আক্রমণ করেছেন তাঁর চরিত্র, রাজনৈতিক দর্শন ও নেতৃত্বের ধরনকে। কখনো পুরস্কার বিতরণীর মঞ্চে, কখনো নির্বাচনী প্রচারে, কখনো আদালতের বাইরে, আবার কখনো কান চলচ্চিত্র উৎসবের মতো আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আয়োজনে—ডি নিরো বারবার একই বার্তা দিয়েছেন, ট্রাম্পের রাজনীতিকে তিনি আমেরিকার গণতন্ত্র ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি মনে করেন। এই বিরোধের বয়সও কম নয়। ট্রাম্পের সঙ্গে ডি নিরোর প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের শুরু ২০১১ সালে। এরপর একের পর এক নির্বাচনী প্রচারণা, ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্সি, ২০২১ সালের ক্যাপিটল হামলা, ২০২৪ সালের নির্বাচন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ—প্রতিটি পর্যায়েই ডি নিরো তাঁর অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন। ২০২৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে আজীবন সম্মাননা পাওয়ার মঞ্চেও তিনি ট্রাম্পকে আক্রমণ করেন। আর ২০২৬ সালের জুনে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের জন্মদিনের সময়ও তাঁকে রেহাই দেননি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে রবার্ট ডি নিরোর রাজনৈতিক বিরোধ যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন ট্রাম্প প্রেসিডেন্টই হননি। ২০১১ সালে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্মস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে ‘বার্থার’ ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে সামনে আনছিলেন।

সেই সময় ডি নিরো ট্রাম্পের নাম সরাসরি না নিয়ে এ ধরনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল—কোনো মানুষের বিরুদ্ধে এমন কথা বলার আগে তথ্যপ্রমাণ দেখা উচিত।

সেখান থেকেই শুরু হয় দুই নিউইয়র্কবাসীর দীর্ঘ প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব। দুজনের পথ আলাদা হলেও দুজনই নিউইয়র্কের মানুষ। আর সেই একই শহরের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জনজীবনকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে বিরোধ ক্রমে ব্যক্তিগত পর্যায়েও পৌঁছায়।

ডি নিরোর ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি আসে ২০১৮ সালের টনি অ্যাওয়ার্ডসে। সেদিন ব্রুস স্প্রিংস্টিনকে মঞ্চে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে ডি নিরো হঠাৎ ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করেন। টেলিভিশন সম্প্রচারে শব্দটি ‘বিপ’ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। কিন্তু হলভর্তি দর্শকের প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্ট—উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে করতালি দেন অনেকে। এরপর ডি নিরো ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান এবং স্প্রিংস্টিনের সত্য, স্বচ্ছতা ও সরকারের সততার পক্ষে অবস্থানের প্রশংসা করেন।

আর ট্রাম্পও চুপ থাকেননি। সময়ের সঙ্গে পাল্টা আক্রমণ করেছেন ডি নিরোকে। কখনো তাঁকে ‘লো আইকিউ’ ধরনের অপমানজনক বিশেষণে আক্রমণ করেছেন, কখনো তাঁর অভিনয়জীবন নিয়েও কটাক্ষ করেছেন। ফলে দুই তারকার দ্বন্দ্ব একসময় মার্কিন রাজনীতির বৃহত্তর সাংস্কৃতিক বিভাজনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ডি নিরোর অবস্থান আরও কঠোর হয়। ট্রাম্পের অভিবাসননীতি, বক্তব্য, প্রশাসনের ধরন, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সরকারি অর্থায়ন নিয়ে তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে থাকে। তিনি ট্রাম্পকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেননি; তাঁর কাছে ট্রাম্পের রাজনীতি ছিল আমেরিকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য বিপজ্জনক।

ট্রাম্প প্রশাসনের রাশিয়া তদন্তের সময় ডি নিরো ‘সেটারডে নাইট লাইভ’-এ বিশেষ কৌঁসুলি রবার্ট মুলারের চরিত্রেও অভিনয় করেন। পাশাপাশি ট্রাম্পকে অভিশংসনের দাবির পক্ষেও অবস্থান নেন। ডি নিরোর বক্তব্যের ভাষাও ক্রমে আরও কঠোর হতে থাকে। তিনি ট্রাম্পকে ‘স্টুপিড’, ‘ইভিল’ ও ‘ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিস্ট’-এর মতো শব্দে আক্রমণ করেছেন।

২০২৪ সালের নির্বাচনী লড়াইয়ে এসে ডি নিরোর বক্তব্য আরও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিউইয়র্কের ফৌজদারি মামলার বিচার চলাকালে আদালতের বাইরে জো বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারণার এক অনুষ্ঠানে অংশ নেন ডি নিরো। সেখানে তিনি ট্রাম্পকে ‘ক্লাউন’ বলে আখ্যা দেন এবং সতর্ক করেন, ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক স্বাধীনতা ও নির্বাচনব্যবস্থা বিপদের মুখে পড়তে পারে।ডি নিরোর বক্তব্যের অন্যতম কেন্দ্র ছিল ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হামলা। তিনি মনে করতেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্য ও নির্বাচনের ফল নিয়ে তাঁর প্রচারণা আমেরিকান গণতন্ত্রকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তরের মৌলিক ধারণাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আদালতের বাইরে সেদিন তাঁর উপস্থিতিও ছিল প্রতীকী। একদিকে ট্রাম্পের ফৌজদারি মামলা, অন্যদিকে ৬ জানুয়ারির স্মৃতি—এই দুই বিষয় সামনে এনে ডি নিরো বলেছিলেন, ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরানো মানে বড় ঝুঁকি নেওয়া।

২০২৫ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব ছিল ডি নিরোর ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানের সবচেয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলোর একটি। কানে তাঁকে সম্মানসূচক পাম দ’অর দেওয়া হয়। সাধারণত এমন মুহূর্তে একজন অভিনেতা নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ার, সহকর্মী ও সিনেমা নিয়ে কথা বলেন। ডি নিরোও সেগুলো করেছেন। কিন্তু এরপরই তাঁর বক্তব্য ঘুরে যায় রাজনীতির দিকে।

ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বিদেশি চলচ্চিত্রে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল—সৃজনশীলতার কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায় না, অথচ চলচ্চিত্রের ওপর শুল্ক বসানোর পরিকল্পনা সেই সৃজনশীলতাকেই বাধাগ্রস্ত করবে। তিনি ট্রাম্পকে ‘ফিলিস্তিন’—অর্থাৎ শিল্প-সংস্কৃতির মূল্য না বোঝা ব্যক্তি—হিসেবে আক্রমণ করেন এবং শিল্প, মানবিক বিদ্যা ও শিক্ষায় কাটছাঁটেরও সমালোচনা করেন।

ট্রাম্প আবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও ডি নিরোর অবস্থান বদলায়নি। বরং ২০২৬ সালে তাঁর বক্তব্য আরও আবেগপ্রবণ হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণের আগে ডি নিরো একটি অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে আশঙ্কা ছিল, ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়তে চাইবেন না এবং তাঁকে থামানোর দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মার্কিন নাগরিকদেরই নিতে হবে।

তার কয়েক মাস পর, জুনে নিউইয়র্কে ‘রাইজ আপ, সিং আউট: আ কনসার্ট ফর দ্য ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট’ অনুষ্ঠানে আবারও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরব হন ডি নিরো।

সেদিন ছিল ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিন। ডি নিরো অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের একটি সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর বিখ্যাত সিনেমা ‘মিডনাইট রান’-এর সংলাপ ব্যবহার করে ট্রাম্পকে চুপ করতে বলেন। এরপর দর্শকদের সঙ্গে নিয়ে সেই বাক্যটি স্লোগানে পরিণত করেন।

এবার তাঁর বক্তব্য শুধু ট্রাম্পকে ঘিরে ছিল না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, যুদ্ধ, স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশের সহিংসতা ও বর্ণবৈষম্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে যখন ডি নিরো বলেন, তিনি আবার তাঁর দেশকে ভালোবাসতে চান। দেশপ্রেমের প্রচলিত ধারণাকেও তিনি উল্টে দেন। তাঁর ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা বলা অনেকটা এমন—যেন নির্যাতনের শিকার কেউ তাঁর নির্যাতনকারীকে ভালোবাসার কথা বলছেন। একই বক্তৃতায় তিনি ট্রাম্পকে বর্ণবাদী, নারীবিদ্বেষী ও বিদেশিবিদ্বেষী স্বৈরাচারী হিসেবে বর্ণনা করেন।

আইএমডিবি ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রবার্ট ডি নিরো। ছবি: রয়টার্স
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রবার্ট ডি নিরো। ছবি: রয়টার্স

তালেবান পাঁচ বছরে যা অর্জন করেছে, যা করতে ব্যর্থ হয়েছে by ওবাইদুল্লাহ বাহির

পাঁচ বছর আগে তালেবান বিজয়ীর বেশে কাবুলে প্রবেশ করেছিল। এর প্রায় ২০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর তালেবানের প্রথম সরকারের পতন হয়েছিল।

২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতা দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সেনারা তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান ছাড়ছিল। সেই সময়ের বিশৃঙ্খলার মধ্যে বোমা হামলায় প্রায় ২০০ আফগান প্রাণ হারান।

আজকের কাবুল অনেকটাই ভিন্ন। বোমা হামলা ঠেকাতে শক্ত দেয়াল, নিরাপত্তাব্যবস্থা আর যান চলাচলে বাধা দেওয়া অস্ত্রধারী বহর এখন আগের মতো নেই। শহরটি অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন ও শান্ত। স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে কাবুল। তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্তিতে তাই দেখা দরকার, তারা কী অর্জন করেছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং সামনে কী অপেক্ষা করছে।

তালেবানের প্রথম শাসনামলের বড় ব্যর্থতা ছিল পুরো আফগানিস্তান দখল করতে না পারা। যেসব প্রদেশ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করেছিল, পরে সেগুলোই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তালেবানবিরোধী লড়াইয়ের ঘাঁটিতে পরিণত হয়।

এবার তালেবান সেই ভুল করেনি। তারা পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং তুলনামূলক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারের শেষ বছরগুলোতে ইসলামিক স্টেট-খোরাসান প্রদেশের যে হুমকি ছিল, সেটিও তারা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করেছে।

এখন বড় কোনো বিদ্রোহী চ্যালেঞ্জ নেই। আফগানরা দেশের এমন অনেক এলাকায় যেতে পারছেন, যেখানে আগে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। দীর্ঘ সংঘাতের দেশে এটিকে তালেবানের বড় অর্জন হিসেবেই দেখতে হবে।

অর্থনীতির চিত্র অবশ্য জটিল। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগের দুই দশকে আফগান অর্থনীতি আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতাও অর্থনীতিকে দুর্বল করেছিল। ২০২১ সালে বিদেশি সহায়তা হঠাৎ কমে যাওয়ায় বড় ধাক্কা এলেও তালেবান অর্থনীতিকে সচল রাখতে পেরেছে। নিরাপত্তার উন্নতিতে ব্যবসা ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বেড়েছে। দেশে ফেরা শরণার্থীরা পুঁজি এনেছেন এবং কেউ কেউ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। কর ও শুল্ক আদায় বেড়েছে। বিদেশে থাকা আফগানরা প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠাচ্ছেন।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত সম্পর্ক ও বাণিজ্যও সহায়ক হয়েছে। তালেবান কোশ তেপা খাল, তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত গ্যাস পাইপলাইন এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মতো বড় প্রকল্পে কাজ করছে। সড়ক ও অন্যান্য নির্মাণকাজও চলছে। এসব প্রকল্প সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা আশার সৃষ্টি করেছে।

তবে সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে অনীহা রয়ে গেছে। ফলে জবাবদিহি ও দুর্নীতির মতো কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলায় সরকার দুর্বল।

তালেবানের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সামাজিক নীতিতে। গত পাঁচ বছরে একের পর এক আদেশে নারী ও মেয়েদের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের আধুনিক আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ। ফলে আফগানিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে চরম লিঙ্গবৈষম্যের উদাহরণগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। এর অর্থনৈতিক মূল্যও বড়। নারী চিকিৎসক, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীর ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অথচ যে কাজগুলোতে নারীদের প্রয়োজন, সেই কাজের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগই তাঁদের দেওয়া হচ্ছে না।

শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগ্য শিক্ষক ধরে রাখার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব নেই। বরং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে। ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ স্থান থাকলেও তা আধুনিক শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না।

এর সঙ্গে বেড়েছে নৈতিক পুলিশিং। নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। এতে শুধু মানুষের জীবনযাপন বদলাচ্ছে না, সরকার ও জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে দূরত্বও বাড়ছে।

তালেবান সরকারকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতেও ব্যর্থ হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে পাশে সরিয়ে দিয়েছেন। দোহা চুক্তিতে আলোচনাকারী ও স্বাক্ষরকারীদের অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ হারিয়েছেন। ফলে ক্ষমতা একজন নেতাকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এতে শাসনব্যবস্থা ধীর হয়েছে এবং অল্প কয়েকজনের দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রাধান্য পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তালেবানের প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। প্রতিবেশী ও কিছু ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক থাকলেও আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো অধরা। নারীশিক্ষা ও অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ বহাল থাকলে এই বিচ্ছিন্নতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে তালেবানের বিরুদ্ধে কার্যকর সামরিক হুমকি নেই। রাজনৈতিক বিরোধীরা বিভক্ত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও আবার সামরিকভাবে সরকার পরিবর্তনের আগ্রহ বা সামর্থ্য নেই। তাই তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকির চেয়ে ধীরে ধীরে জমতে থাকা জনঅসন্তোষই তালেবানের জন্য বড় বিপদ হতে পারে।

কোনো সরকার দীর্ঘদিন বিরোধিতার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন সরকারের প্রতি এতটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যে তাকে দুর্বল করতে চাওয়া শক্তিগুলোর প্রতি আর উদ্বিগ্ন থাকে না, তখন সরকার ঝুঁকিতে পড়ে। সেই শক্তি বিদেশি রাষ্ট্রও হতে পারে, আবার দেশের ভেতরের বিদ্রোহী গোষ্ঠীও হতে পারে।

পাঁচ বছর পর তালেবান আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু তারা এখনো মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারেনি—তারা আসলে কী ধরনের রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও জনবিচ্ছিন্নতা ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তালেবানের ভেতরে কেউ কেউ তা বুঝতেও পারছেন। কিন্তু তাঁরা কি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের পথ খুলবেন? কোনো না কোনো জায়গায় পরিবর্তন আসতেই হবে।

* ওবাইদুল্লাহ বাহির, আফগানিস্তানের আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার বিষয়ের শিক্ষক
- আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

এবার পুরো দেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তালেবান
এবার পুরো দেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তালেবান। ছবি: রয়টার্স

নগ্ন ছবি তুলে ব্ল্যাকমেল! স্বামীর বিরুদ্ধে সেলিনার যত অভিযোগ

প্রকাশ ২৭ নভেম্বর ২০২৫ঃ বলিউড অভিনেত্রী ও সাবেক মিস ইন্ডিয়া সেলিনা জেটলি স্বামী পিটার হাগের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা করেছেন। ভারতীয় গণমাধ্যমে স্বামীর বিরুদ্ধে সেলিনার ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এসেছে। মামলায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিনি ৫০ কোটি রুপি দাবি করেছেন।

২০১০ সালে অস্ট্রিয়ার উদ্যোক্তা ও হোটেলিয়ার পিটার হাগের সঙ্গে বিয়ে করা সেলিনার এই সম্পর্কের গল্প প্রকাশ্যে আসার পরই চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের তিন সন্তান—যমজ ছেলে উইনস্টন ও বিরাজ (২০১২ সালে জন্ম) ও আর্থার (২০১৭)। এ ছাড়া এক যমজ ছেলে শমশের হৃদ্‌রোগে মারা গেছে। মামলায় সেলিনা উল্লেখ করেছেন, পিটার অনেকবারই তাঁকে সন্তানদের সামনে অপমানিত করেছেন।

মধুচন্দ্রিমা থেকে শুরু
সেলিনা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের দাম্পত্য জীবনে অব্যাহত মানসিক চাপ ছিল। স্বামীর রাগী স্বভাব ও কথিত মদ্যপান সম্পর্ককে কঠিন করে তুলেছিল। তিনি আরও দাবি করেছেন, পিটার প্রায়ই তাঁকে আর্থিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁর ভঙ্গুর অবস্থার সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে শোষণ করেছেন।

দাম্পত্য জীবনের প্রথম দিনগুলোও সরাসরি নিরাপত্তাহীনতা দিয়ে শুরু হয়। মধুচন্দ্রিমায় তাঁরা গিয়েছিলেন ইতালিতে, তখন সেলিনা স্বাস্থ্যের সমস্যার কথা উল্লেখ করলে পিটার রেগে যান, চিৎকার করেন এবং একটি গ্লাস দেয়ালে ছুড়ে ফেলেন। সন্তান জন্মের পরও পরিস্থিতি বদলায়নি। জোড়া সন্তান জন্মানোর কয়েক সপ্তাহ পরে যখন তিনি স্বামীকে পিতৃত্বকালীন ছুটির জন্য অনুরোধ করেন, তখন পিটার রেগে গিয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
স্বামীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগও করেছেন সেলিনা। অভিনেত্রী দাবি করেছেন, তিনি স্বামীর যৌন হুমকির শিকার হয়েছেন। এমনকি একপর্যায়ে তাঁকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। সেলিনার আরও অভিযোগ, পিটার প্রায়ই তাঁকে অন্য পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চাপ দিতেন, যাতে তাঁর কর্মজীবনে সুবিধা পাওয়া যায়। পাশাপাশি কিছু অস্বাভাবিক যৌন সম্পর্কের জন্যও চাপ প্রয়োগ করা হতো।

সেলিনা আরও অভিযোগ করেছেন, পিটার তাঁকে নগ্ন ছবি তুলতে বাধ্য করেছিলেন এবং সেই ছবির মাধ্যমে ব্ল্যাকমেল করতেন। এ ছাড়া সন্তানদের সামনে প্রায়ই কটু ভাষা ব্যবহার করতেন, যা সেলিনার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলেছে।

এখনো চুপ পিটার
সেলিনার করা সব অভিযোগই আদালতে বিচারাধীন। এ বিষয়ে পিটার হাগের পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে

সেলিনা জেটলি। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে
সেলিনা জেটলি। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে