Monday, July 27, 2026

ফিলিস্তিনিদের ‘রক্তপ্রবাহ’ দেখতে চায় ইসরাইলি নেতারা

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতারা। তারা স্লোগান দিচ্ছেন, ‘আমরা রক্তপ্রবাহ দেখতে চাই’, ‘তাল গ্রামকে নিশ্চিহ্ন করো।’

শুক্রবার ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেৎজালেল স্মোটরিচ পশ্চিম তীরের তাল, ইরাক বুরিন ও বাইত ফুরিক গ্রাম নিশ্চিহ্ন করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ গ্রামের অধিবাসীদের নাবলুস ও তুলকারামের শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দাদের মতো হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ‘এ লোকদের জায়গা খালি করে দেওয়া উচিত।’ তিনি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানান, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাত থেকে যেন এ অঞ্চলের দায়িত্ব ইসরাইল নেয়।

ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির বলেন, ‘যত ইহুদি নিহত হয়েছে, তার বদলায় শত্রুদের ভূমি ও ঘরছাড়া করতে হবে।’ গাজায় যেভাবে পুরো বসতিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, পশ্চিম তীরেও একই কৌশল বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

পশ্চিম তীরের তাল গ্রামে ইসরাইলি সেনা সহায়তায় অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলার মধ্যেই এ আহ্বান এলো। শুক্রবার হামলায় ইসরাইলিদের গুলিতে গ্রামের চার বাসিন্দা নিহত হয়েছেন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, এক বাসিন্দা ইসরাইলিদের থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে হামলা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, চলতি বছর এ পর্যন্ত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পশ্চিম তীরে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৮৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২১ জন বসতি স্থাপনকারীদের হাতে নিহত হন।

বেৎজালেল স্মোটরিচের দল রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট পার্টির সদস্য জভি সুককত শুক্রবার চ্যানেল ফোরটিনকে সাক্ষাৎকারে বলেন, তাল গ্রামকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা প্রয়োজন। একইদিন ফেসবুক পোস্টে একটি কালো পর্দায় ‘প্রতিশোধ’ লিখে পোস্ট করেন তিনি।

সশস্ত্র ইসরাইল বসতি স্থাপনকারী দল হিলটপ ইয়ুথের পক্ষ থেকে একই আহ্বান জানানো হয়। মিডল ইস্ট আই গ্রুপটির হোয়াটস অ্যাপ চ্যানেলে ‘তাল গ্রাম নিশ্চিহ্ন করো’ লেখা বার্তা দেখতে পায়।

এক বার্তায় লেখা হয়, ‘আমরা প্রতিশোধ চাই। কোনো ধরনের বসতি স্থাপন বা আরো বাড়ি তৈরির প্রতিশ্রুতি নয়।’ আরেকটি বার্তায় লেখা হয়, ‘আমরা রক্তপ্রবাহ দেখতে চাই। প্রতিশোধ ছাড়া কিছুতেই শান্তি আসবে না।’

ফিলিস্তিনিদের ‘রক্তপ্রবাহ’ দেখতে চায় ইসরাইলি নেতারা
ছবি: সংগৃহীত

‘শোলে’ থেকে ‘চুপকে চুপকে’, ধর্মেন্দ্রর আলোচিত ১০ সিনেমা কোনগুলো

ছয় দশকের অভিনয় জীবনে তিন শর বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন ধর্মেন্দ্র। অ্যাকশন, রোমান্টিক থেকে শুরু করে পর্দায় দেখা গেছে নানা বৈচিত্র্যময় চরিত্রে। এমনকি চলতি শতকে এসেও নানা নিরীক্ষাধর্মী ছবিতে অভিনয় করেছেন। তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ার থেকে আলোচিত দশ সিনেমা বেছে নেওয়া সহজ নয়। তবে হিট, সমালোচকদের কাছে প্রশংসিত অভিনেতার আলোচিত ১০ সিনেমার তালিকা প্রকাশ করেছে ভারতের অনলাইন গণমাধ্যম দ্য ইকোনমিক টাইমস। সেই প্রতিবেদন অবলম্বনে জেনে নেওয়া যাক প্রয়াত অভিনেতার ১০ সিনেমার কথা।

‘হকিকত’ (১৯৬৪)
ধর্মেন্দ্র এই সিনেমায় একজন সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে আবেগপূর্ণ অভিনয় করেন। ভারত-চীন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমাটিতে ধর্মেন্দ্র অভিনীত চরিত্রটি সাহস, ত্যাগ এবং মানবিক দিক ফুটিয়ে তোলে। চেতন আনন্দ পরিচালিত সিনেমাটিতে আরও ছিলেন বলরাজ সাহনি, সঞ্জয় খান, বিজয় আনন্দ।

‘অনুপমা’ (১৯৬৬)
হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন ধর্মেন্দ্র, শর্মিলা ঠাকুর। ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এটি হিন্দিতে সেরা ফিচার ফিল্মের পুরস্কার জেতে। ছবিটির ব্যাপক প্রশংসা করেন সমালোচকেরা। ছবিতে ধর্মেন্দ্রকে দেখা যায় শান্ত, সংবেদনশীল চরিত্রে, যা তাঁর ‘হি-ম্যান’ ইমেজের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

‘ফুল অউর পাত্থর’ (১৯৬৬)
এই ছবিই ধর্মেন্দ্রকে প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতা থেকে সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ছবির শাকা চরিত্রটি ছিল কঠোরতা ও কোমলতার এক আশ্চর্য সমন্বয়। এই সিনেমার জন্য প্রথমবার ফিল্মফেয়ার মনোনয়ন পান ধর্মেন্দ্র।

‘সত্যকাম’ (১৯৬৯)
ধর্মেন্দ্রর চরিত্রটি ছিল নৈতিকতা ও সততার সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের মিশেলে তৈরি। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রমাণ করে তিনি কেবল তারকা নন বরং অভিনেতা হিসেবেও আলোচনার দাবি রাখেন। নারায়ণ সান্যালের একই নামের বাংলা উপন্যাস অবলম্বনে হৃষিকেশ মুখার্জির ছবিটিতে আরও অভিনয় করেছেন শর্মিলা ঠাকুর, সঞ্জীব কুমার ও অশোক কুমার।

‘সীতা অউর গীতা’ (১৯৭২)
ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনীর কেমিস্ট্রি দর্শকদের মন জয় করেছিল। রমেশ সিপ্পির সিনেমাটির কাহিনি লিখেছিলেন সেলিম-জাভেদ জুটি। রাহুল দেব বর্মণ গানগুলোর সুরকার ছিলেন। চলচ্চিত্রটি দুই যমজ বোনের কাহিনি নিয়ে, যারা জন্মের পর আলাদা হয়ে আলাদাভাবে বড় হয়, এই চরিত্রে হেমা মালিনী অভিনয় করেছিলেন।

‘জঙ্গু’ (১৯৭৩)
ধর্মেন্দ্রকে ছবিতে দেখা যায় অশোক রায় জঙ্গু চরিত্রে। প্রমোদ চক্রবর্তী পরিচালিত সিনেমাটিতে আরও ছিলেন হেমা মালিনী। ছবিতে ধর্মেন্দ্র অ্যাকশন দিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হন, এ ছাড়া হেমা মালিনীর সঙ্গে তাঁর পর্দার রসায়ন নিয়েও বিস্তর চর্চা হয়।

‘শোলে’ (১৯৭৫)
ধর্মেন্দ্রের করা সিনেমায় বীরু চরিত্রটি এখনো মনে রেখেছেন দর্শকেরা। কিছুদিন আগেই সিনেমাটি মুক্তির সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হলো। বীরু চরিত্রটি ছিল বহুমাত্রিক; যেখানে হাস্যরস ও রোমাঞ্চ একত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। ধর্মেন্দ্র ও অমিতাভ বচ্চনের পর্দার রসায়ন এখনো চর্চায়। ‘শোলে’ শুধু একটি সিনেমা নয়; এটি এক অনুভূতি, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে একত্র করে।

‘চুপকে চুপকে’ (১৯৭৫)
এই সিনেমায় প্রফেসর পরিমল ত্রিপাঠি চরিত্রে কমেডি করতে দেখা যায় ধর্মেন্দ্রকে। হৃষিকেশ মুখার্জি সিনেমাটিতে তিনি বুদ্ধিমত্তা ও হাস্যরসের নিখুঁত সমন্বয় দেখান। এই সিনেমায় শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর জুটি আজও মনে আছে অনেক দর্শকের। উপেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর গল্প ‘ছদ্মবেশী’ অবলম্বনে নির্মিত হয় সিনেমাটি।

‘প্রতিজ্ঞা’ (১৯৭৫)
ধর্মেন্দ্রকে এখানে দেখা গেছে প্রতিশোধপরায়ণ এক ন্যায়পরায়ণ তরুণ হিসেবে। ছবিতে অ্যাকশন, আবেগ ও কমেডি সবই রয়েছে। দুলাল গুহ পরিচালিত সিনেমাটিতে আরও অভিনয় করেছেন হেমা মালিনী, অজিত, জনি ওয়াকার।

‘আপনে’ (২০০৭)
অনিল শর্মার সিনেমাটিকে ধর্মেন্দ্রর পরের দিকের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সিনেমা বলা হয়। এখানে তিনি অভিনয় করেন এক প্রবীণ বক্সারের চরিত্রে। সিনেমাটিতে ছিলেন তাঁর দুই সন্তান সানি ও ববি দেওলও।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-11%2Fzadktx8z%2F83c6efc9-1ac7-4d24-8fc5-147e64e54303.jpg?rect=0%2C0%2C1599%2C1066&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ধর্মেন্দ্রর আলোচিত ১০ সিনেমা কোনগুলো। কোলাজ

ট্রাম্পের কঠিন শর্ত, সৌদি আরব এখন কী করবে by উমুদ শোকরি

২২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিসচিব ক্রিস রাইট এবং সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান একটি বহুল প্রতীক্ষিত ‘সেকশন ১২৩’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি ও উপাদান বেচাকেনার একটি আইনগত ভিত্তি তৈরি হলো। ওয়াশিংটন এই চুক্তিকে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শতকোটি ডলারের বাণিজ্য এবং কয়েক দশকের এক দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সূচনা হিসেবে উপস্থাপন করেছিল।

তবে এর ঠিক এক দিন পরই দৃশ্যপট বদলে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তি স্বাক্ষরের মূল ঘোষণার বাইরে গিয়ে তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক শর্ত জুড়ে দেন। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সৌদি আরবকে আব্রাহাম আকোর্ডের আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। তা না হলে এই চুক্তি কার্যকর হবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই চরমপত্র একটি সম্পন্নপ্রায় জ্বালানি চুক্তিকে রাজনৈতিক শর্তের বেড়াজালে আটকে দিয়েছে। এতে করে রিয়াদ, মার্কিন কংগ্রেস এবং সম্ভাব্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আইনি কাঠামো, সুযোগ ও ভবিষ্যৎ সময়সীমা

যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৪৬ সালের অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্টের ‘সেকশন ১২৩’ অনুযায়ী, যেকোনো দেশের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করতে হলে ৯টি শর্ত মেনে চলতে হয়। এ ছাড়া জ্বালানি পুনর্নবীকরণ বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি বাধ্যতামূলক। এই চুক্তি নিজে থেকেই কোনো পারমাণবিক চুল্লি তৈরির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় না; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক সরঞ্জাম, অবকাঠামোগত লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার দুয়ার খুলে দেয়।

সৌদি আরবের জন্য এই চুক্তির অর্থ হলো, আমেরিকান রিঅ্যাক্টর, প্রযুক্তি ও রেগুলেটরি সুবিধার নিয়ন্ত্রণ পাওয়া। আর ওয়াশিংটনের জন্য এটি বিপুল অঙ্কের প্রযুক্তি রপ্তানি, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কর্মসংস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্য ধরে রাখার বড় সুযোগ।

তবে আলোচনার সবচেয়ে জটিল বিষয়টি হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে চুক্তি হয়েছিল, তাকে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বলা হয়। কারণ, সংযুক্ত আরব আমিরাত স্বেচ্ছায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের পথ বন্ধ রেখেছিল।

কিন্তু সৌদি আরবের ক্ষেত্রে এই পথটি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। ওয়াশিংটন ও রিয়াদ হয়তো সৌদি ভূমিতেই মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারে একটি সর্বাধুনিক ও নিবিড় নিয়ন্ত্রণে থাকা গোপন ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পথ খোলা রাখতে চাইছে। এটি সাময়িক ঝুঁকি কমালেও সৌদি ভূখণ্ডে যেকোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ব্যবস্থা অনুপ্রসারণ ঝুঁকির সৃষ্টি করে।

এই কাঠামোগত চুক্তির মেয়াদ ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ বছর। বড় ধরনের পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ এবং তা থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি। এতে সৌদি আরবকে প্রযুক্তি চয়ন, অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দক্ষতা বাড়াতে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হবে। এর বাণিজ্যিক সুবিধা পাবে ওয়েস্টিংহাউজের মতো খ্যাতনামা মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো।

সৌদি আরবের লাভ ও যুক্তরাষ্ট্রের সুযোগ

সৌদি আরবে জনসংখ্যা, শিল্পকারখানা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (কুলিং), পানি শোধন (ডি স্যালাইনেশন) এবং ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্পের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি হিসেবে খনিজ তেল ও গ্যাস পোড়ানো কমিয়ে আনতেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হতে পারে একটি পরিবেশবান্ধব ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প।

বিশ্বে সুপেয় পানির সবচেয়ে বড় উৎপাদক হওয়ায় দেশটি পানি শোধন প্রক্রিয়ায় পারমাণবিক শক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যেমন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, তেমনি এর উৎপাদিত তাপ পানি শোধনে সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব। এটা ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ বহুলাংশে কমিয়ে আনবে।

তবে দ্রুত বিস্তার পাওয়া সৌরশক্তি ও প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে পারমাণবিক শক্তিকে ঠিক কতটুকু প্রাধান্য দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো সৌদিকে নিতে হবে।

অপর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই প্রকল্পের সুফল প্রচুর—জ্বালানি সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ খাতেই কেবল মার্কিন ব্যবসার বড় পথ খুলবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত ও নজরদারি জোরদারে সাহায্য করবে। তা ছাড়া সৌদির বিনিয়োগ মার্কিন পারমাণবিক সরবরাহ খাতের অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করবে।

প্রধান চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ‘পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসার’। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে সৌদি আরবের সুরক্ষামূলক চুক্তি থাকলেও দেশটি এখনো ‘অ্যাডিশনাল প্রটোকল’ গ্রহণ করেনি। অথচ পারমাণবিক কর্মসূচির বাইরে কোনো গোপন তৎপরতা চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ব্যাপক এখতিয়ার দেয় এই প্রটোকল।

উদ্বেগের কারণটা পরিষ্কার, রিঅ্যাক্টরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের যে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, তা দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রও তৈরি করা সম্ভব। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, ইরান যদি পারমাণবিক বোমা বানায়, তবে সৌদি আরবও একই পথে হাঁটবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি, দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা চুক্তি, আইএইএর পর্যবেক্ষণ এবং রপ্তানি লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন অবাধ প্রবেশাধিকার, স্বচ্ছ ও কঠোর প্রয়োগ।

খরচ আরেক বড় বাধা। বিশেষ করে যেসব দেশ প্রথমবারের মতো পারমাণবিক খাতে নামছে, তাদের ক্ষেত্রে সময়মতো কাজ শেষ না হওয়া এবং বাজেট উপচে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এ জন্য সৌদি আরবের একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা দরকার, যেখানে পর্যাপ্ত দক্ষ লোকবল থাকবে।

আমেরিকান কংগ্রেস দীর্ঘ ৯০ কার্যদিবস ধরে এই চুক্তি পর্যালোচনার সুযোগ পাবে। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের নজর থাকবে মূলত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও নিরাপত্তা সুরক্ষার দিকে।

একই সঙ্গে ইসরায়েলের উদ্বেগও এখানে বেশ জোরালো। সৌদি আরবের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নতুন কোনো আঞ্চলিক পারমাণবিক প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে কি না, সেই ভয়ে ইসরায়েল শক্ত শর্ত, কঠোর পরিদর্শন এবং আলোচনার টেবিলে ‘সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ’-এর শর্ত বেঁধে দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা

আমেরিকার প্রস্তাব যদি সৌদির কাছে আকর্ষণীয় মনে না হয়, তবে তারা খুব সহজেই রাশিয়ার রোসাটম, চীনের সিএনএনসি, দক্ষিণ কোরিয়ার কেপকো কিংবা ফ্রান্সের মতো সরবরাহকারীদের বেছে নিতে পারে। রাশিয়া ও চীন কোনো রাজনৈতিক শর্ত ছাড়াই প্রকল্প অর্থায়ন ও সম্পূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি সেবা দেওয়ার প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত। এটা রিয়াদে তাদের অবস্থান শক্ত করবে এবং ওয়াশিংটনের তদারকি কমিয়ে দেবে।

তাই চরম এক দর–কষাকষির মুখে দাঁড়িয়েছে ওয়াশিংটন। অতিরিক্ত কড়া শর্ত আরোপ করলে রিয়াদ হয়তো শিথিল শর্তের অন্য কোনো দেশের দিকে ঝুঁকবে, আবার খুব বেশি নমনীয়তা দেখালে পারমাণবিক অপ্রসারণের বৈশ্বিক নীতিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট

ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘাত ও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যেই এই চুক্তির প্রসঙ্গটি এসেছে। রিয়াদের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা একদিকে আমেরিকান সামরিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়, অন্যদিকে চীন বা রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমায়।

তবে ২৩ জুলাই ট্রাম্পের আলটিমেটাম এই বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিকে কেবল এক সাধারণ বাণিজ্যিক সম্পর্কে সীমাবদ্ধ রাখেনি, তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে ‘সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ’ না হলে এই ডিল বাতিল। এর মাধ্যমে ‘আব্রাহাম একর্ডস’-কে চুক্তির মূল শর্ত বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এতে ওয়াশিংটনের হাতে হয়তো বড় রাজনৈতিক দর–কষাকষির সুযোগ তৈরি হয়েছে, কিন্তু এতে রিয়াদের নমনীয় হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট অগ্রগতি ছাড়া এমন কোনো চুক্তিতে রাজি হতে সৌদি নেতৃত্ব নারাজ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের এই সংকটময় মুহূর্তে। তাই এমন প্রকাশ্য আলটিমেটাম আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বদলে অচলাবস্থা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

নিয়মনীতি শিথিল হলে ইরান একে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজের পারমাণবিক কর্মসূচির পক্ষে সাফাই গাইবে; এমনকি মিসর ও তুরস্কের মতো দেশগুলোও একই সুবিধা দাবি করে বসতে পারে।

শেষ পর্যন্ত এটি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে, নাকি এক বিপজ্জনক পারমাণবিক প্রতিযোগিতার সূচনা করবে, তাই চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।

সুযোগ বনাম ঝুঁকি

চুক্তিটির সুফল স্পষ্ট: সৌদি বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ, পানি শোধন ও শিল্পায়ন দ্রুততর হওয়া আমেরিকার জন্য নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ উন্মোচন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার। প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতাহীন অন্য কোনো দেশের হাতে সৌদির বাজার ছেড়ে দিয়ে আমেরিকার সরে আসা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

ট্রাম্পের দেওয়া আলটিমেটাম হয়তো এক মহা কূটনৈতিক চুক্তির পথ খুলতে পারে, আবার বহু পরিশ্রমে দাঁড় করানো এই পারমাণবিক শক্তি চুক্তিকে এক লহমায় ভেস্তেও দিতে পারে। দিন শেষে এই চুক্তির ভাগ্য নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে তার পারমাণবিক বাণিজ্য, নিরাপত্তার কড়াকড়ি এবং বাস্তবসম্মত কূটনীতিকে একই সুতোয় বাঁধতে পারছে।

* উমুদ শোকরি, জ্বালানিবিশেষজ্ঞ

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়, ইংরেজি থেকে অনূদিত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান

পশ্চিম তীরে দুটি মসজিদে আগুন দিয়েছে ইসরায়েলিরা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে দুটি মসজিদে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বলেছে, গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে নাবলুস ও তুলকারেম এলাকার দুটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

নাবলুস শহরের দক্ষিণে কুসরা শহরের মেয়র আবদেল আজিম ওয়াদি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, শহরের দক্ষিণাংশে নির্মাণাধীন একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা।

আবদেল আজিম ওয়াদি জানান, আগুনে মসজিদের প্রবেশপথ পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নির্মাণকাজও। হামলাকারীরা মসজিদের দেয়ালে হিব্রু ভাষায় ‘প্রতিশোধ’ শব্দসহ বিভিন্ন স্লোগান লিখে রেখে যায়।

ইসরায়েলের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, একটি মসজিদে আগুন লাগার খবর পেয়ে সেনারা কুসরার উপকণ্ঠে যান। তবে তাঁদের পৌঁছানোর আগেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে আগুন দেওয়ার আলামত এবং দেয়ালে লেখা পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করা হবে।

তুলকারেমের কাছে কুর গ্রামে আরেকটি মসজিদে আগুন দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের দাবি, বসতি স্থাপনকারীরা মসজিদে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি দেয়ালে বর্ণবাদী স্লোগানও লিখে যায়।

গত শুক্রবার পশ্চিম তীরের তেল গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘর্ষে চার ফিলিস্তিনি ও দুই ইসরায়েলি নিহত হন। এরপর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নাবলুস শহর ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনিকে আটক করে। সেনাবাহিনীর দাবি, এটি ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’-এর অংশ।

গতকাল নাবলুস শহরে জ্বালানিসংকট দেখা দেয়। পেট্রলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা যায় বলে জানিয়েছে এএফপির একজন সংবাদদাতা।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরেও সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তখন থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনা বা বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১ হাজার ৯৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সশস্ত্র যোদ্ধারাও রয়েছেন।

অন্যদিকে ইসরায়েলের সরকারি তথ্য বলছে, একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের হামলা অথবা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় অন্তত ৪৮ ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন।

পূর্ব জেরুজালেম বাদে পশ্চিম তীরে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির বসবাস। একই এলাকায় আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ বলে বিবেচিত বসতিগুলোতে পাঁচ লাখের বেশি ইসরায়েলি বসবাস করছে।

পশ্চিম তীরে একটি অবৈধ বসতিতে কয়েকজন সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী
পশ্চিম তীরে একটি অবৈধ বসতিতে কয়েকজন সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী। ছবি: এএফপি

ইয়েমেনি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সৌদি ড্রোন বিধ্বস্ত

ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী দাবি করেছে, দেশটির আল-জাওফ প্রদেশের আকাশসীমায় সৌদি আরবের ব্যবহৃত একটি তুরস্কে নির্মিত বায়রাক্তার আকিঞ্জি সশস্ত্র নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।

রোববার (স্থানীয় সময়) ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহইয়া সারি এক বিবৃতিতে বলেন, ড্রোনটি ‘শত্রুতামূলক অভিযান’ পরিচালনার সময় উপযুক্ত অস্ত্র ব্যবহার করে ভূপাতিত করা হয়। তিনি দাবি করেন, ইয়েমেনের আকাশসীমা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে তাদের বাহিনী প্রস্তুত এবং এ ধরনের সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

এর আগে শনিবার ইয়াহইয়া সারি আরো দাবি করেন, সৌদি আরবের ‘আগ্রাসনের’ জবাবে ইয়েমেনের বাহিনী দুটি পৃথক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। প্রথম অভিযানে জিজানে সৌদি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয় অভিযানে ইয়ানবু অঞ্চলে আরামকো-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করা হয়।

ইয়েমেনি বাহিনীর দাবি, উভয় অভিযানে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে ‘নির্ভুল ও সরাসরি’ আঘাত হানা হয়েছে।

এদিকে ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সাবা-এর প্রধান নাসের আল-আমের বলেন, সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের জবাবে ইয়েমেন ‘উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া’ জানাবে। তিনি বলেন, ইয়েমেনের জনগণকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয় এবং সৌদি আরবকে অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে।

এর আগে ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী ঘোষণা দেয়, ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়েছে। তাদের দাবি, সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ইরানি বেসামরিক উড়োজাহাজ অবতরণের কয়েক মিনিট আগে সৌদি বিমান হামলার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বিমানে রোগী, আহত ব্যক্তি, প্রবাসী ইয়েমেনি এবং একটি শোকানুষ্ঠান শেষে ফেরা প্রতিনিধিদল ছিলেন, ফলে বিমানটিকে হোদেইদাহ বিমানবন্দরে অবতরণ করতে বাধ্য হতে হয়।

পরে ইয়েমেন ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’ নীতির অংশ হিসেবে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয়। তাদের দাবি, এর অংশ হিসেবে লোহিত সাগরে সৌদি কোম্পানির জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

অন্যদিকে আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরো অভিযোগ করেছে, সৌদি আরব হোদেইদাহ প্রদেশ ও কামারান দ্বীপের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে সংঘাতকে আরও উসকে দিয়েছে। সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ, বন্দরের জবাবে বন্দর এবং উত্তেজনার জবাবে উত্তেজনা’—এই নীতিতেই তারা প্রতিক্রিয়া জানাবে।

তবে ইয়েমেনের পক্ষ থেকে ড্রোন ভূপাতিত করা, আরামকোর স্থাপনায় হামলা কিংবা অন্যান্য সামরিক অভিযানের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।

সূত্র: আল মায়াদীন

ইয়েমেনি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সৌদি ড্রোন বিধ্বস্ত

ফিলিস্তিনের দুটি মসজিদে ইসরায়েলিদের অগ্নিসংযোগ

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে হামলা চালিয়ে দুটি মসজিদে অগ্নিসংযোগ করেছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। এ সময় বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে হিব্রু ভাষায় উসকানিমূলক স্লোগানও লিখে রাখা হয়। রোববার (২৬ জুলাই) ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর রয়টার্সের।

এর আগে শুক্রবার নাবলুসের দক্ষিণ-পশ্চিমে তাল গ্রামে সংঘর্ষে চার ফিলিস্তিনি এবং দুই ইসরায়েলি নিরাপত্তা সদস্য নিহত হন। নিহত ইসরায়েলিদের একজন পাশের একটি বসতির নিরাপত্তা সমন্বয়কারী ছিলেন। ওই ঘটনার পরপরই নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

শুক্রবারের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রোববার ভোরে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলা চালায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা বলে অভিযোগ করেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।

নাবলুসের দক্ষিণ-পূর্বে কুসরা গ্রামের কাউন্সিলপ্রধান আবদেল আজিম ওয়াদি জানান, নতুন নির্মিত একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, মসজিদটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হয়েছিল এবং নামাজ আদায়ের জন্য প্রস্তুত ছিল। ভেতরে আসবাবপত্রও রাখা হয়েছিল। হামলাকারীরা আগুন লাগিয়ে দেয় এবং দেয়ালে হিব্রু ভাষায় বিভিন্ন স্লোগান লিখে যায়।

দেয়ালে লেখা স্লোগানগুলোর মধ্যে ছিল ‘ইহুদিদের প্রতিশোধ’ এবং তাল গ্রামের ঘটনায় নিহত এক ইসরায়েলির নাম।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে বলেছে, এ হামলা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান বৃহত্তর সহিংসতার অংশ।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে জানায়, ইসরায়েলি রাষ্ট্রের মদদপুষ্ট বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাস এখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে পরিকল্পিত গণহামলার রূপ নিয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, কুসরা গ্রামে গিয়ে তারা অগ্নিসংযোগ ও দেয়ালে লেখা স্লোগানের প্রমাণ পেয়েছে এবং হামলাকারীদের শনাক্তে অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রমাণ সংগ্রহে পুলিশও কাজ করছে।

সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলাসহ এ ধরনের সব ঘটনা আমরা কঠোরভাবে নিন্দা জানাই। এলাকায় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিরাপত্তা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের দাবি, তুলকারম শহরের দক্ষিণ-পূর্বে কুর গ্রামের একটি মসজিদেও আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একই সময়ে রামাল্লার কাছে কাফর মালিক শহরের একটি পাথর কাটার কারখানায় কর্মরত ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের ওপরও হামলা চালানো হয়।

কুর গ্রামের কাউন্সিল সদস্য ফরিদ জিয়ুসি বলেন, ভোরে তিনজন বসতি স্থাপনকারী মসজিদে আগুন লাগানোর চেষ্টা করে। তবে মুসল্লিরা দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনায় মূল নামাজঘর রক্ষা পায়।

তিনি বলেন, আমাদের গ্রামে এ ধরনের হামলা এই প্রথম। হামলাকারীরা মসজিদের দেয়ালেও হিব্রু ভাষায় বিভিন্ন স্লোগান লিখে গেছে।

ফিলিস্তিনি সূত্র জানায়, সশস্ত্র কিছু ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী তাল গ্রামে প্রবেশ করলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের বাধা দিতে বেরিয়ে আসেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক ফিলিস্তিনি একজন বসতি স্থাপনকারীর অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দাবি, বসতি স্থাপনকারীরাই প্রথমে হামলা চালিয়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটায়। তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, উভয় পক্ষ থেকেই গুলি ছোড়া হয়েছিল।

জাতিসংঘ ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন।

অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে কথিত সন্ত্রাসী হামলামোকাবিলায় পশ্চিম তীরে বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন এবং সদস্যদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

নেতানিয়াহুর সরকারের কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচসহ কয়েকজন মন্ত্রী ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় দখল করা পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

পশ্চিম তীরজুড়ে নিরাপত্তা অভিযান চালিয়ে শনিবার রাত থেকে প্রায় ৬০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী বলে জানিয়েছে প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স ক্লাব, যারা ইসরায়েলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনিদের তথ্য সংরক্ষণ করে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের অধিকাংশ সংস্থা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী বলে মনে করে। যদিও ইসরায়েল এ অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে।

ফিলিস্তিনিরা ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড হিসেবে পশ্চিম তীরকে দাবি করে। অন্যদিকে ইসরায়েল ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ওই ভূখণ্ডের ওপর নিজেদের দাবি তুলে ধরে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী নেতানিয়াহু সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুতগতিতে নতুন বসতি সম্প্রসারণ করছে।

এদিকে রোববার পোপ লিও পশ্চিম তীরে বাড়তে থাকা সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে আলোচনার আহ্বান জানান এবং সব ধর্মের পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা ও প্রচলিত অবস্থান লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। 

ফিলিস্তিনের মসজিদে ইসরায়েলিদের অগ্নিসংযোগ। ছবি : সংগৃহীত
ফিলিস্তিনের মসজিদে ইসরায়েলিদের অগ্নিসংযোগ। ছবি : সংগৃহীত

একসময় দর্শক আবিষ্কার করেন, দেলুপি আসলে বাংলাদেশ by আহমেদ মুনির

প্রকাশ ২৪ নভেম্বর ২০২৫ঃ ঘটনার শুরু খুলনার পাইকগাছা উপজেলার একটি ইউনিয়নে।নাম দেলুপি। যাত্রাপালার মহড়া চলছিল গ্রামের একটি বাড়িতে। মথুরার মহারাজা উগ্রসেনের রাজ্যে মহা দুর্বিপাক। তার ছেলে যুবরাজ কংসের অত্যাচারে দেশবাসী বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে যাত্রাপালার এক অভিনেতার মুঠোফোন বেজে ওঠে। খবর আসে প্রধানমন্ত্রী ‘সাবিনা’ পালিয়ে গেছেন।

মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের ‘দেলুপি’ সিনেমার গল্প ঠিক এখান থেকে শুরু। একটা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। আর তার প্রায় কাছাকাছি সময়ে দেখা দেওয়া আকস্মিক বন্যায় দেলুপির মানুষ হতভম্ব। শুরু হয় নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আর প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক, এই দুই দুর্যোগ যেভাবে দেলুপির মানুষজন মোকাবিলা করে, সে গল্প নিয়েই এই চলচ্চিত্র।

সিনেমা দেখতে দেখতে একসময় দর্শক আবিষ্কার করেন, দেলুপি আসলে বাংলাদেশ। যে ঘটনাপ্রবাহ দেলুপির কৃষক, জেলে, যাত্রাপালা দলের সদস্য, রাজনীতিবিদ, তরুণদের ছুঁয়ে এগিয়ে চলে, তা পুরো দেশেরই কাহিনি।

দেবেশ রায় তাঁর ‘উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে’ বইয়ে অভিযোগ করেছিলেন, এ দেশের লেখকেরা পাশ্চাত্য গদ্যরীতিতে ভর করে, তাঁদের মননে উপন্যাসের কাঠামো নির্মাণ করেছেন। বাংলার পুঁথি, পালা বা গীতিকার ধারা থেকে সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদি সে ধারায় বাংলা উপন্যাস এগিয়ে যেত তবে নিশ্চয় ভিন্ন কিছু পেতাম আমরা।

চলচ্চিত্র মাধ্যমের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা খাটে। এ দেশের শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রে আমরা তেমন স্বতন্ত্র দেশীয় ভাষা খুঁজে পাই না। সেটা যে থাকতে হবে, তা–ও নয়। কিন্তু ‘দেলুপি’ যেন সেই চেষ্টা করেছে। সেদিক দিয়ে ‘দেলুপি’ বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য একটা ঘটনাও হয়ে থাকল।

যাত্রাপালার নাটকীয়তাকে ধরে নতুন নির্মাণের পথে এগিয়েছে এই চলচ্চিত্র। একই সঙ্গে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতা থেকেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেনি। লম্বা বেড়িবাঁধ ধরে যাত্রাপালার অভিনেতাদের হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় ইংমার বার্গম্যানের ‘সেভেন্থ সিল’–এর দৃশ্যকে। অথবা ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ও যেন উঠে আসে মিহিরকে বলা পলাশের সংলাপে।

পলাশ যেন বিজন ভট্টাচার্যের কণ্ঠেই মিহিরকে বলতে থাকে, ‘তুই চলে যা।’ দুঃখকে মেনে নেওয়া বাঙালির নিয়তি, ট্র্যাজেডিকে বরণ করে নেওয়াই তার পরমার্থ—এই সংলাপে সেই মনোভাবকে যেন ঠাট্টা করা হলো। কিন্তু তরুণ মিহির এই অমোঘ সত্যকে বদলে দিল।

‘দেলুপি’তে কোনো ভিলেন নেই। কোনো বিদ্বেষ নেই। আছে বিশ্বাস, আছে প্রেম। নতুন কিছু হবে, সেই স্বপ্নের বীজ। যারা বাংলাদেশের বড় পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে আবার আশাহত হয়েছেন, ‘দেলুপি’ তাদের শুশ্রূষা দেবে। এই চলচ্চিত্র আশাবাদের চলচ্চিত্র। সেই আশাবাদ কোনো রাজনৈতিক প্রত্যয় থেকে আসেনি। এসেছে এ দেশের মানুষের প্রতি বিশ্বাস থেকে।

চট্টগ্রামে আমি যখন প্রেক্ষাগৃহে বসে সিনেমাটি দেখছিলাম, তখন দর্শকদের ক্ষণে ক্ষণে হেসে উঠতে, হাততালি দিতে শুনেছি। বিশেষ করে যখন একদিকে কংসের বধ হচ্ছে আর অন্যদিকে একটি যুগলের প্রেম পরিণতি পাচ্ছে। অশুভের পতন আর প্রেমের জয়, এর বাইরে মানুষ আর কী চাইতে পারে। এক দর্শক তো বলে ফেললেন, ‘দেলুপি’ না দেখাটা রীতিমতো অন্যায়।

‘দেলুপি’র দৃশ্য। নির্মাতার সৌজন্যে
‘দেলুপি’র দৃশ্য। নির্মাতার সৌজন্যে

কলকাতায় ৬৫৩ বছরের পুরোনো মসজিদে পূজার আয়োজন

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মসজিদ ভাঙা কিংবা মসজিদের মধ্যে মন্দিরের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে প্রতিনিয়তই বিদ্বেষ বাড়ছে। দেশের সংখ্যালঘু মুসলিমদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠা এই বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে। সম্প্রতি কলকাতার পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার পান্ডুয়া এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদকে ঘিরে হিন্দুত্ববাদীরা তাদের দাবিকে আরো তীব্র করেছে। তাদের দাবি আদিনা মসজিদ নাকি আদিনাথের প্রাচীন শিবমন্দির—আর এই দাবিকে কেন্দ্র করে মসজিদটির কাছাকাছি এলাকায় শিবপূজা ও রুদ্রাভিষেকের আয়োজন করা হয়েছে।

সোমবার প্রায় ৬৫৩ বছরের পুরোনো এই স্থাপনার ৫০ মিটারের মধ্যে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সেখানে আদিনাথের রুদ্রাভিষেকের (হিন্দু ধর্মে দেবাদিদেব মহাদেবের পবিত্র মন্ত্রপাঠ সহকারে জল ও পঞ্চামৃত দিয়ে শিবলিঙ্গ স্নান করানোর একটি বিশেষ পূজা) আয়োজন করা হয়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিজেপির রাজারহাটের বিধায়ক তরুণজ্যোতি তেওয়ারি আদিনা মসজিদকে আদিনাথ মন্দির হিসেবে দাবি করলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সিকান্দর শাহ আদিনা মসজিদ নির্মাণ করেন। তবে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে স্থাপনাটির বিভিন্ন কারুকাজে শিবসহ হিন্দু দেবদেবীর নিদর্শন রয়েছে—এমন দাবি তুলে একাংশের মানুষ এটিকে প্রাচীন আদিনাথ শিবমন্দির বলে দাবি করে আসছেন।

এ নিয়ে বর্তমানে আদালতেও মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মসজিদের নিকটবর্তী এলাকায় শিবপূজার আয়োজনকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ উপলক্ষে আশপাশের এলাকাও সাজসজ্জা করা হয়েছে।

আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা কাজল গোস্বামীর দাবি, স্থাপনাটির বিভিন্ন কারুকাজে আদিনাথ ও অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীর উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে। তার ভাষ্য, এটি মূলত একটি প্রাচীন শিবমন্দির, যা পরবর্তীতে মসজিদে রূপান্তর করা হয়।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও একই ধরনের দাবি করে বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় শিব ও দুর্গার মূর্তি উদ্ধার হয়েছে। তাই তারা স্থাপনাটিকে মন্দির হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।

আদিনাথ শিব মন্দির ও মেলা কমিটির পক্ষ থেকে কাজল গোস্বামী আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা এই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। আদালতের নির্দেশনা মেনে ভবিষ্যতে শিবলিঙ্গ নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্তমানে স্থাপনাটি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (এএসআই)-এর অধীনে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, স্তম্ভটিকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের একটি অন্যতম বিষয় হলো এর কিছু ব্যাসল্ট পাথরের দেয়াল ও দরজায় খোদাই করা হিন্দু চিত্রকলার উপস্থিতি।

স্থাপত্য ইতিহাসবিদরা সাধারণত এই খোদাইগুলোকে পূর্ববর্তী কাঠামোর উপকরণ পুনঃব্যবহারের ফল বলে মনে করেন—যা মধ্যযুগীয় নির্মাণে একটি সাধারণ রীতি ছিল—অন্যদিকে পণ্ডিতরা স্মৃতিস্তম্ভটিকে ইসলামি ও দেশীয় স্থাপত্য ঐতিহ্যের সংশ্লেষণ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

তবে, পুনঃব্যবহৃত উপকরণগুলোর সঠিক উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদ এবং স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

নতুন করে আন্দোলন জোরদার হওয়ায় জেলা প্রশাসন স্মৃতিস্তম্ভটির চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।

যদিও হিন্দু সংগঠনটি জানিয়েছে যে এ বছরের আচার-অনুষ্ঠান নিকটবর্তী মন্দিরেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং স্মৃতিস্তম্ভটির ওপর ভবিষ্যতের যেকোনো দাবি শুধুমাত্র বিচারিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই উত্থাপন করা হবে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও শতবর্ষী আদিনা মসজিদকে প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস, ধর্ম ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এক বিতর্কিত আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গ শাসন করছে, তাই এই বিবাদটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, কারণ ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে পরস্পরবিরোধী বয়ান জনমতকে প্রভাবিত করে চলেছে।

ওই স্থানে প্রস্তাবিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মালদা জেলা পুলিশও একটি জনবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে জনগণকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই স্মৃতিস্তম্ভটি ১৯৫৮ সালের প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও ধ্বংসাবশেষ আইনের অধীনে সুরক্ষিত। এতে সতর্ক করা হয়েছে যে, অনুমতিবিহীন ধর্মীয় কার্যকলাপ আয়োজন বা এই সুরক্ষিত কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনার চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতেরও পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আদালতের মাধ্যমে আদিনাথ শিবমন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে আদিনা মসজিদের ঐতিহাসিক পরিচয় ও মালিকানা নিয়ে বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।

কলকাতায় ৬৫৩ বছরের পুরোনো মসজিদে পূজার আয়োজন
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মালদা জেলার পান্ডুয়া এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত।

Sunday, July 26, 2026

ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জামের তালিকা প্রকাশ

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পরিচালিত অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জামের একটি বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করেছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।

রোববার (২৬ জুলাই) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি এক বিবৃতিতে জানান, ৮ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ১৫ দিনের অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলা চালানো হয়।

তিনি বলেন, এসব হামলায় মার্কিন বাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, জ্বালানি অবকাঠামো, ড্রোন ঘাঁটি, যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

আইআরজিসির প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা ও সরঞ্জামের মধ্যে যা যা রয়েছে-

রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা খাত:
৭টি কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, ৩টি স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা, ৬টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার, ৩টি আকাশ ও সমুদ্র পর্যবেক্ষণ রাডার, ৮টি আগাম সতর্কীকরণ রাডার, ৭টি আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার, ৩টি ইপিএস রাডার ব্যবস্থা, ২টি ইপিএস-১১৭ রাডার, ৫টি দীর্ঘপাল্লার রাডার, ২টি বিমান প্রতিরক্ষা রাডার ও ১টি ট্যাকটিক্যাল রাডার কমপ্লেক্স।

সহায়তা ও রসদ খাত:
৬টি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র, ৩টি লজিস্টিক ও সহায়তা কেন্দ্র, ১২টি জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাংক, ১৭টি অস্ত্র, খুচরা যন্ত্রাংশ ও সামরিক সরঞ্জামের গুদাম ও ৬টি ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার।

অপারেশনাল অবকাঠামো খাত: ৬টি এমকিউ-৯ ড্রোন বেস, ১টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান প্রস্তুতকরণ কেন্দ্র, ১টি ড্রোন বেস; যেখানে ৮টি নতুন ড্রোন ছিল, ২টি কমান্ড সেন্টার, ১টি বিমানবাহী রণতরির জ্বালানি সরবরাহ প্ল্যাটফর্ম, ১টি পি-৮ নজরদারি বিমানের বেস, ৪টি হাইমার্স ক্ষেপণাস্ত্র প্ল্যাটফর্ম, ৫টি যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার, ৪টি প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা কমপ্লেক্স, ৬টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম, ১টি জ্বালানি পাম্পিং স্টেশন, ২টি সিগন্যাল যোগাযোগ কেন্দ্র, ১টি গোয়েন্দা তথ্যকেন্দ্র, অ্যামাজনের ১টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, দূরনিয়ন্ত্রিত নৌযান সংরক্ষণের ১টি ডিপো, ১টি জ্বালানি জেটি, ৪টি যুদ্ধবিমানের সুরক্ষিত আশ্রয়কেন্দ্র, ৬টি বিমান উড্ডয়ন ও পার্কিং র‌্যাম্প।

বিমান সক্ষমতা খাত: মাটিতে থাকা ১১টি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত, ১৭টি নজরদারি ও অভিযান, পরিচালনাকারী ড্রোন, যার মধ্যে ৮টি ছিল একেবারে নতুন, আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরে থাকা ১টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ১টি পি-৮ নজরদারি বিমান, ১টি সি-১৭ সামরিক পরিবহন বিমান, ৮টি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, ৪টি ভারী হেলিকপ্টার ও গুদামে থাকা ৬টি ক্ষেপণাস্ত্র।

আইআরজিসির দাবি, এসব হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে এবং প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সহজেই নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। তবে আইআরজিসির এই দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। 

ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্র। পুরোনো ছবি
ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্র। পুরোনো ছবি

ইরানের ‘খাইবার শেকান’ ক্ষেপণাস্ত্রেই কুপোকাত যুক্তরাষ্ট্র

তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘খাইবার শেকান’ সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে। সহজে মোতায়েনযোগ্য, তুলনামূলক কম খরচে তৈরি এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতার কারণে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরান নিয়মিত এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত করতে ইরান একইসঙ্গে বিভিন্ন গতিপথ, গতি ও কৌশলে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের সমন্বিত হামলা চালাচ্ছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অধিকাংশ খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই প্রতিহত করা হয়েছে, তবু কয়েকটি প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আগের অনেক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি ভরার প্রয়োজন হতো। কিন্তু খাইবার শেকান কঠিন জ্বালানিচালিত হওয়ায় আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা যায়। ফলে এটি দ্রুত ট্রাক বা মোবাইল লঞ্চার থেকে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হয়। এতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগে শত্রুপক্ষের হামলার ঝুঁকিও কমে যায়।

খাইবার শেকানের কিছু সংস্করণে এমন ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়েছে, যা লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে যাওয়ার শেষ পর্যায়ে মূল ক্ষেপণাস্ত্র থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। এই কৌশল রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়।

মার্কিন কর্মকর্তারা আরও জানান, ইরান এখন একই লক্ষ্যবস্তুতে খাইবার শেকানের পাশাপাশি দ্রুতগতির ড্রোন এবং তুলনামূলক পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্রও একযোগে ব্যবহার করছে। এতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একসঙ্গে একাধিক ধরনের হুমকির মুখে পড়ছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জোসেফ ভোটেল বলেন, ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে দ্রুত শিক্ষা নিচ্ছে এবং নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ করছে। তার মতে, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট প্রযুক্তিতে ইরানের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ এখন যুদ্ধক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের হাতে প্রায় দুই হাজার মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যার মধ্যে খাইবার শেকানও রয়েছে। যদিও বিশ্লেষকদের ধারণা, ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে এখনো নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজনের সক্ষমতা ইরানের থাকতে পারে।

ইরানবিষয়ক গবেষক নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেন, খাইবার শেকান ইরানের জন্য একটি কার্যকর অস্ত্র, কারণ এটি তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা যায়, বিভিন্ন ধরনের মোবাইল লঞ্চার থেকে ছোড়া সম্ভব এবং এর নির্ভুলতা আগের অনেক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি।

ইরান এই ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করেছে। তবে হামলার প্রকৃত ফলাফল নিয়ে দুই পক্ষের দাবি ভিন্ন। ইসরায়েল বলছে, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের দাবি, তারা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় সফলভাবে আঘাত হেনেছে। এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

খাইবার শেকানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ব্যয়। একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সুনির্দিষ্ট খরচ প্রকাশ করেনি ইরান। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তার প্রতিটির দাম প্রায় ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ তুলনামূলক কম খরচের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে তেহরান।

স্বাধীন ক্ষেপণাস্ত্র বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিঞ্জের মতে, ইরান প্রতিটি হামলার অভিজ্ঞতা থেকে নতুন তথ্য সংগ্রহ করছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষেপণাস্ত্রের কৌশল ও নির্ভুলতা আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই ইরান বুঝতে পারছে কোন কৌশলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

তথ্যসূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল 

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ইরানের হামলার শিকার হওয়ার পরও কেন মার্কিন উপস্থিতি আরও বাড়াচ্ছে জর্ডান সরকার

মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় তিন দশক ধরে মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য জর্ডান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আগ্রাসনের পর সেই জর্ডানকে এখন চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। সম্প্রতি জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি নিশানা করে দেশটির ওপর হামলা জোরদার করেছে ইরান।

তবে জর্ডানের আকাশে নিয়মিত সাইরেন বাজতে থাকলেও দেশটি মার্কিন উপস্থিতি সীমিত করার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে জর্ডান সেসব সামরিক কার্যক্রম সংকুচিত করতে পারছে না।

কয়েক দশকের সম্পর্ক ও সুরক্ষার পাশাপাশি কোটি কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার জন্য জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

প্রচুর তেল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় কিছু আরব প্রতিবেশীর তুলনায় জর্ডান অনেকটা সম্পদহীন দেশ। দেশটি ব্যাপকভাবে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। জর্ডানের কর্মকর্তাদের মতে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে ১৬৫ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এই অঞ্চলের অন্যান্য কিছু মার্কিন মিত্র তাদের ভূখণ্ডে সেনা ঘাঁটি তৈরি এবং ওপর দিয়ে বিমান উড্ডয়নের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও জর্ডান এমন কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করার মতো অবস্থানে নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের টেম্পল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং ‘জর্ডান: পলিটিকস ইন অ্যান অ্যাক্সিডেন্টাল ক্রুসিবল’ বইয়ের লেখক শন ইয়োম বলেছেন, ‘জর্ডান মধ্যপ্রাচ্যের দুর্বল একটি রাষ্ট্র। এটি বেশ ছোট এবং আঞ্চলিক হুমকিতে ঘেরা। আর এর কোনো ধরনের মহাশক্তিধর পৃষ্ঠপোষক বা বাইরের রক্ষকের প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক প্রজন্ম ধরে সেই ভূমিকা পালন করে আসছে।’

ইয়োম বলেন, ১৯৫০-এর দশক থেকে জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যে সহায়তা পেয়ে আসছে, তা অন্য কারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।

গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নেয়। যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসে ইরান মূলত ইসরায়েল ও উপসাগরে থাকা মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল, তবে তারা জর্ডানের দিকেও শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।

উচ্চ পর্যটন মৌসুম মাত্র শুরু হওয়ার মুখে এই সংঘাত দ্রুত জর্ডানের পর্যটনশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা দেশটির রাজস্বের ১৮ শতাংশ পর্যন্ত জুগিয়ে থাকে। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আটকে দেওয়া হয়েছিল, তা সত্ত্বেও এয়ারলাইনসগুলোকে ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে এবং সম্ভাব্য পর্যটকেরা হোটেলের বুকিং বাতিল করছেন।

ইরানের হামলায় বিপদে জর্ডান

এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষই হামলা বাড়িয়েছে এবং ইরান তাদের লক্ষ্যবস্তুর পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত রোববার জর্ডানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। চতুর্থ ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি জনহীন এলাকায় গিয়ে পড়েছে।

জর্ডান সরকারকে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক হাসান আলমোমানি বলেছেন, ‘প্রতিবেশীদের আঘাত করার এই ইরানি কৌশলগত তীব্রতার লক্ষ্য হলো ওই প্রতিবেশীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যার মূল উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি করা।’

ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সির মতে, ইরান সম্প্রতি জানিয়েছে, জর্ডানে ইউএস বিমান বাহিনীর কেন্দ্রস্থল আজরাকের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংক এবং অন্যান্য ঘাঁটির বিমান আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। এর আগে ইরান জানিয়েছিল, তারা মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত রাডার এবং যোগাযোগব্যবস্থাকে নিশানা করেছিল।

শুক্রবার মুওয়াফফাক সালতি ঘাঁটিতে ইরানি হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং তৃতীয় একজন নিখোঁজ হন। সপ্তাহের শুরুতে জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ওপর অন্য তিনটি হামলায় ডজনখানেক মার্কিন সেনা আহত হন এবং বেশ কয়েকটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মার্কিন বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে জর্ডানের বিমানঘাঁটিগুলো থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াই, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় বিদ্রোহী যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং ইরাকে আক্রমণের মতো মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের ঘাঁটি ছিল এই দেশ। একটি সংসদীয় প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় চার হাজার মার্কিন সামরিক সদস্য রয়েছেন।

স্থায়ী মার্কিন উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মুওয়াফফাক সালতি এবং অন্য ঘাঁটিগুলোকে মানানসই করে গড়ে তোলা হয়েছে। পেন্টাগনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বর্তমানে ‘ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির’ সিনিয়র ফেলো গ্রান্ট রামলে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে জর্ডানের অবকাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী। তিনি এটিকে একটি স্থলভিত্তিক বিমানবাহী রণতরীর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

রামলে বলেন, মুওয়াফফাক সালতি তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত, যা মার্কিন বাহিনীকে অহেতুক নজরকাড়া এড়িয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেয়। আর জর্ডান উপসাগরীয় দেশগুলোর চেয়ে ইরান থেকে দূরে হওয়ায় জর্ডানে থাকা মার্কিন বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব দেওয়ার জন্য বেশি সময় পায়।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপদ আশ্রয়

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে এবং যুদ্ধের শুরুর দিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনী বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় আরব দেশ থেকে তাদের কিছু সৈন্যকে জর্ডান এবং প্রতিবেশী ইসরায়েলের তুলনামূলকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছিল।

আলমোমানি বলেন, ‘ইরানের যুদ্ধ প্রকাশ করে দিয়েছে, জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, চলতি বছর ওয়াশিংটন জর্ডানে সামরিক সাহায্য ৫০ কোটি ডলার বাড়িয়েছে।

জর্ডানের কর্মকর্তারা প্রায়শই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে থাকেন। এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সংঘাত কমানোর সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর জোর দেন।

জর্ডানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পেট্রার তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুর দিকে জর্ডানের সেনাবাহিনীপ্রধান মেজর জেনারেল ইউসেফ হুনাইতি এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ড্যানিয়েল জিমারম্যান সামরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

জর্ডান সরকার প্রকাশ্যে ব্যাপক মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি খুব কমই আলোচনা করে। জর্ডান ইরানে বিমান হামলা চালানোর জন্য বা ইসরায়েলের পাশাপাশি যুদ্ধ শুরুর জন্য প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেনি। যদিও বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকার শুরু থেকেই এই সংঘাতের তীব্র বিরোধী ছিল।

জর্ডানের কর্মকর্তারা তাদের ভূখণ্ডে ইরানের হামলার বারবার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং গত সপ্তাহে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইমান সাফাদি বলেছেন, জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে বলে ইরান হামলার যে অজুহাত দেখাচ্ছে, তা মিথ্যা।

অ্যাসপেন সিকিউরিটি ফোরামের এক প্যানেল আলোচনায় সাফাদি বলেন, ‘জর্ডানে কোনো মার্কিন ঘাঁটি নেই। আমাদের দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে জর্ডানে মার্কিন সেনা রয়েছে। তাদের উপস্থিতি একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পরিচালিত হয়, যা আমাদের সার্বভৌমত্বকে পূর্ণ সম্মান জানিয়ে থাকে।’

হামলা সত্ত্বেও জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের জোটের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার কথা ভাববে না বলে জানান আলমোমানি। তিনি বলেন, কোনো অবস্থাতেই জর্ডান তার কৌশলগত অংশীদারত্ব পরিবর্তন করতে পারে না।

ইয়োম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে জর্ডানের নির্ভরশীলতা কমানোর মতো কোনো অর্থবহ দাবি সে দেশে নেই। তিনি বলেন, ‘কোনো গুরুতর রাজনৈতিক অংশীদারই এই পরামর্শ দিচ্ছে না যে জর্ডান প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া ১৫০ কোটি ডলারের বেশি অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার বদলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থ বা চীনের সমর্থনের মতো কিছু নিক।’

জর্ডানে মার্কিন সেনা উপস্থিতি প্রতিরক্ষাচুক্তির অংশ বলে উল্লেখ করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা
জর্ডানে মার্কিন সেনা উপস্থিতি প্রতিরক্ষাচুক্তির অংশ বলে উল্লেখ করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা। ছবি : রয়টার্স

প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কাতেই কি ইরানে হামলা স্থগিত করলেন ট্রাম্প

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদনঃ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের কাছে থাকা প্রতিরোধ ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্য গোলাবারুদের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে এর অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানে সামরিক অভিযান আবার শুরু করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে হিসাব-নিকাশ করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হলো, প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুত।

ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টারাও আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে ইরানের হামলার ঝুঁকিতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি ও শরণার্থী সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

আলোচনার বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তি বলেছেন, গত শুক্রবার ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পরই ইরানকে ঘিরে তাঁর কৌশলে সর্বশেষ পরিবর্তন আসে।

কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় পেন্টাগনের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রসহ অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুত কমে আসার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, শুক্রবার জর্ডানে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার সময় একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এতে তিন মার্কিন সেনা নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ব্যক্তিগতভাবে একটি বিষয়ে সতর্ক করেছেন। সেটি হলো, ইরানের বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর কাছে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাবে।

তবে প্রেসিডেন্টকে জেনারেল কেইন কী পরামর্শ দিয়েছেন, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তাঁর মুখপাত্র।

হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চিউং বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সব সময়ই বলে আসছেন যে তিনি কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন। তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে ‘‘সন্ত্রাসী’’ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায় বা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তিনি সব ধরনের বিকল্প উপায়ের কথা মাথায় রাখবেন।’

স্টিভেন চিউং আরও বলেন, ‘কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও বারবার সামরিক হামলার পর ইরানের জন্য আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করাটাই বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে। না হলে কী ঘটতে পারে, তা তারা ভালোভাবেই জানে।’

প্রায় পাঁচ মাস ধরে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যে যুদ্ধ চলছে, সেটিকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে এবং বিশেষ করে কীভাবে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া যাবে—এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দোটানায় আছেন। গত দুই সপ্তাহে সংঘাত আবারও বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কার্যত ভেঙে পড়েছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ব্যাপক হামলাও ইরানকে তার সামরিক অবস্থান থেকে পিছু হটাতে পারেনি।

বৈঠক সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি বলেন, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের মধ্যে প্রায় কেউই সামরিক অভিযান আরও জোরদারের পরিকল্পনাকে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত বলে মনে করেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তাও এ ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ওই কর্মকর্তার মতে, এসব হামলা কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না, বরং এর উল্টো প্রভাব পড়ছে। এতে ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য আরও শক্তিশালী হচ্ছে। দেশটির নেতারা অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে বাইরের হুমকির দিকে কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ পাচ্ছেন।

টানা দুই সপ্তাহের সংঘাতের পর গতকাল শনিবার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি লড়াই হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। তবে পরিস্থিতি এখনো উত্তেজনাপূর্ণ। কারণ, ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। ইরানে টানা ১৩তম রাতের মতো হামলা চালানোর পর গতকাল রাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আর নতুন কোনো হামলার ঘোষণা দেয়নি।

শুক্রবারের বৈঠকের আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রয়োজন হলে মার্কিন সেনাবাহিনী আরও ব্যাপক হামলা চালাতে প্রস্তুত আছে। তবে একই সঙ্গে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখার কথা বলেন।

শুক্রবার বিকেলে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘দেখুন, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান শুরু করতে পারি। তবে আমরা এখনো তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। তাই পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।’

এ মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এমন এক সময় এ বৈঠক হয়েছে, যখন ইরান-নীতি নিয়ে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। কারণ, দুই দেশের নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনায় ফেরানোর উদ্দেশ্যে করা সমঝোতা স্মারকও কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে পেন্টাগনের কয়েকজন কর্মকর্তা ও মার্কিন সামরিক কমান্ডার বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের হামলার অনুমোদন দেওয়ার কথা ভাবছিলেন।

যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে—এমন আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের এমন বেশ কয়েকটি রেলসেতুতেও হামলা চালানো হয়েছে, যেগুলো সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও ব্যবহার করে। ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকায় অস্ত্র ও রসদ পৌঁছাতে এ সেতুগুলো ব্যবহার করে সেনাবাহিনী।

এ ছাড়া ইরানের জ্বালানি এবং পারমাণবিক স্থাপনায়ও হামলা বৃদ্ধি করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছিল।

গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি তখন বলেন, ‘আমি বড় ধরনের একটি হামলার কথা বিবেচনা করছি। এটি আগের যেকোনো হামলার চেয়ে বড় হবে। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার খুব কাছাকাছি আছি। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।’

তবে শুক্রবার রাতের দিকে ট্রাম্প সেই বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেন। সামরিক উপদেষ্টাদের দেওয়া এক সতর্কবার্তা বিবেচনা করে ট্রাম্প এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে বলেছেন, জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের সুরক্ষায় ব্যবহৃত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে। গত দুই সপ্তাহে এসব ঘাঁটি ইরানের ব্যাপক হামলার মুখে পড়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের হামলা চালালে ইরান আরও কঠোরভাবে পাল্টা হামলা চালাতে পারে, যা মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে।

গত এপ্রিলের শেষ দিকে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ চলাকালে পেন্টাগন ১ হাজার ২০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ৪০ লাখ ডলারের বেশি। প্রতিরক্ষা দপ্তরের অভ্যন্তরীণ হিসাব ও কংগ্রেসের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের এমন অস্ত্রের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে।

ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারসহ তাঁর অনেক উপদেষ্টা মনে করেন, কম ঝুঁকিপূর্ণ আরেকটি পথ রয়েছে। সেটি হলো দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। তবে বর্তমানে কার্যকর কোনো আলোচনা চলছে কি না বা আলোচনা হলেও তা ইরান সরকারের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য কাটিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি আবার চালু করা যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের ফলও মিশ্র। এ অবরোধের লক্ষ্য ছিল ইরানের বন্দরে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজগুলোর যাত্রা বাধাগ্রস্ত করা। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, জুনের মাঝামাঝি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর ইরান আবারও কিছু তেল রপ্তানি করতে (মূলত চীনে) সক্ষম হয়েছে। সেই তেলের বড় অংশ এখনো সরবরাহের পথে আছে।

মঙ্গলবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীন ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। তাঁর দাবি, এতে ইরানের তেল বিক্রির আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

- অনুবাদ: ফাহমিদা আক্তার

শুক্রবার রাতের দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেন
শুক্রবার রাতের দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেন। ফাইল ছবি: এএফপি

সিআইএ ঘাঁটিতে ইরানের হামলা: রাশিয়া যেভাবে ‘কলকাঠি’ নাড়ল by ইদনা মোহামেদ

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে গত বৃহস্পতিবার ম্যানিলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বৈঠকে বসেন। মুখে অফিশিয়ালি বলা হচ্ছিল, এই বৈঠকের প্রধান এজেন্ডা ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ।

তবে রুবিও ও লাভরভের বৈঠকটি এমন এক সময়ে হলো, যার নেপথ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে নতুন কিছু চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থানগুলোতে ইরানের হামলা নিয়ে প্রকাশ্যে যতটুকু স্বীকার করা হচ্ছে, রাশিয়া আসলে তার চেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরুর দিকেই প্রথম খবর আসে যে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে তেহরান। যুদ্ধ শুরুর তিন দিনের মাথায়, ৩ মার্চ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এ–সংক্রান্ত বিষয়ে অভিজ্ঞ দুটি সূত্রের বরাতে জানায়, রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে থাকা একটি সিআইএ স্টেশনে হামলা চালানো হয়েছে। এরপর ৬ মার্চ মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, পারস্য উপসাগরে মার্কিন সেনাসদস্য ও যুদ্ধবিমানের অবস্থান শনাক্ত করতে তেহরানকে সহায়তা করছে মস্কো।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত বুধবার এক প্রতিবেদনে জানায়, সিআইএর অবকাঠামো, বিশেষ করে সৌদি আরবের মার্কিন দূতাবাসে ইরানি ড্রোন হামলার ঘটনার পর মার্কিন গোয়েন্দারা এতে রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। হামলার নির্ভুল নিশানা ও নিখুঁত কার্যকারিতা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এর পেছনে হয়তো রুশ সহায়তার প্রমাণ রয়েছে।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেভস্কি জানান, ইরানের এই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়ার জড়িত থাকার তথ্যটি বেশ ‘বাস্তবসম্মত’। গ্রাজেভস্কি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘বিষয়টি অনেকটা এমনই সন্দেহ করা হচ্ছিল। কারণ, ইরান আগে যেসব হামলা চালিয়েছে, এবারের হামলাগুলো ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও আধুনিক।’

নিকোল গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘রাশিয়ার মতো ইরানের কাছে মহাকাশভিত্তিক উচ্চ সক্ষমতা নেই। রাশিয়ার তুলনায় সাধারণ নজরদারির জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক মানের স্যাটেলাইটও ইরানের পর্যাপ্ত নেই...তাই মনে হচ্ছে, তারা রাশিয়ানদের সঙ্গেই হয়তো কোনো চুক্তি করেছে।’

তবে নিকোল গ্রাজেভস্কি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজস্ব কিছু হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (সোর্স বা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক) রয়েছে ইরানের, যা প্রায়ই অনেকে এড়িয়ে যান।

ইরানকে রাশিয়ার সহায়তা

যুদ্ধ আর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে মস্কো ও তেহরান তাদের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। অনেক বিশ্লেষক দাবি করেন, দুই দেশের এই সম্পর্ক কোনো স্থায়ী জোট নয়, বরং পশ্চিমের বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক সাময়িক সুবিধাভিত্তিক সমঝোতা। তবে এতে দ্বিমত পোষণ করেন গ্রাজেভস্কি।

নিকোল গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘দুই দেশই নিজেদের বৈশ্বিক রাজনীতিতে একই ধরনের হুমকির মুখে আছে বলে মনে করে। আর ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে তাদের সহযোগিতা সত্যি বেশ জোরালো হয়েছে, যা সম্প্রতি আরও বেড়েছে। তারা এখন একে অপরের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।’

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর তেহরান মস্কোকে শাহেদ ড্রোন ও ফাতেহ-১১০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহ করায় দুটি দেশ সামরিকভাবে আরও কাছাকাছি আসে।

গত বছর দুই পক্ষ ২০ বছর মেয়াদি একটি ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছিল।

তবে সেই সময় রুশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে রুদেনকো স্টেট দুমায় দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন, এই চুক্তির অর্থ এই নয় যে ‘ইরানের সঙ্গে কোনো সামরিক জোট বা পারস্পরিক সামরিক সহায়তা গড়ে উঠেছে।’ দ্য মস্কো টাইমস এ তথ্য প্রচার করে।

এ ছাড়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা ‘কোমেটা-এম’ অ্যান্টি-জ্যামিং নেভিগেশন সিস্টেম সরবরাহ করে ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের নির্ভুল নিশানা বাড়াতে সহায়তা করছে।

গত মার্চ মাসের খবরের বরাতে জানা যায়, সাইপ্রাসে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) একটি ঘাঁটিতে ইরানের ব্যর্থ হামলার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা শাহেদ-১৩৬ ড্রোনে একটি রুশ জ্যামিং-প্রতিরোধী প্রযুক্তি পাওয়া গেছে।

যদিও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর এই ‘কোমেটা-এম’–সংক্রান্ত রিপোর্টটিকে সম্পূর্ণ ভুয়া খবর বা ‘ফেক নিউজ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে রাশিয়া।

তা সত্ত্বেও গ্রাজেভস্কি ব্যাখ্যা করে বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ একদিক থেকে মস্কোর জন্যই সুবিধাজনক। কারণ, এটি ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয় এবং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি দুর্বল করার ক্ষমতা রাখে।

গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘আমার মনে হয়, রাশিয়ানরা এটিকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার এক বৃহত্তর লড়াই হিসেবে দেখছে। আর তারা মনে করে, এই ঘটনাই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পতনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।’

‘অবশ্যই তারা চায় না ইরান পুরোপুরি ধসে পড়ুক। তাই তারা সব সময় একটা সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করে—ইরান একদিকে একাই যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হোক, আবার একই সাথে তাদের ইতিহাসের এই কঠিন সময়ে টিকে থাকার মতো যথেষ্ট সহায়তাও যেন তারা পায়।’

সাম্প্রতিক হামলা

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্র হয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা টানা ১২তম রাতের মতো অব্যাহত ছিল। গত বৃহস্পতিবার সকালে ইরাক সীমান্তবর্তী শালামচে ক্রসিংয়ে এক হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়। এর জবাবে গত কয়েক দিনে জর্ডানসহ পারস্য উপসাগরীয় একাধিক দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান।

তবে গ্রাজেভস্কির মতে, রাশিয়ার কোনো গোয়েন্দা সহায়তার চেয়ে বরং ইরানের নিজস্ব কৌশল ও সমরাস্ত্রই যুদ্ধের গতিপথে বেশি প্রভাব ফেলছে।

গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘রাশিয়ার সম্পৃক্ততা কিন্তু ইরানিদের জন্য একমাত্র মূল চালিকা শক্তি বা মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বিষয় নয়। ইরানের এই সক্ষমতা আগেই ছিল। তারা ইতিমধ্যেই বিশাল ড্রেন ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে। যা ঘটেছে তা হলো রাশিয়ার সহায়তা ইরানকে সামান্য বাড়তি সুবিধা দিয়েছে ও শক্তিশালী করেছে।’

* ইদনা মোহামেদ, আল–জাজিরার লন্ডনভিত্তিক সাংবাদিক
- আলজাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ

ভ্লাদিমির পুতিন এবং মোজতবা খামেনি
ভ্লাদিমির পুতিন এবং মোজতবা খামেনি। ফাইল ছবি

মার্কিন গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতে টান, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্স ও কেইনের উদ্বেগ

ইরানের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং যৌথ চিফ অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে নিজেদের শঙ্কা তুলে ধরেন তারা। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ট্রাম্প যখন হামলা জোরদার করার নানা দিক বিবেচনা করছিলেন, ঠিক তখনই তারা এই সতর্কবার্তা দেন।

বৈঠকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি বা মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিশেষভাবে ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন জেনারেল কেইন। এই বৈঠকের পরপরই টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা হামলা আপাতত স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন।

কেইন জানান, প্রেসিডেন্টের নির্দেশিত যেকোনো পদক্ষেপ মার্কিন সামরিক বাহিনী সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম। তবে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং হামলা বাড়ালে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার ওপর। মজুত কমে যাওয়া এবং যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার এই উদ্বেগের পরই শুক্রবার রাতে ইরানে নতুন করে কোনো হামলা চালানো হয়নি।

এই বিষয়ে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং এক বিবৃতিতে জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সবসময়ই কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন। তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বা মার্কিন মিত্রদের ওপর সন্ত্রাসী তৎপরতা অব্যাহত রাখে, তবে তার কাছে সামরিক সব বিকল্পই খোলা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, টানা ১৩ দিনের বিধ্বংসী আক্রমণ এবং কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের পর ইরানের উচিত আলোচনার টেবিলে এসে সমঝোতায় পৌঁছানো। শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প জানান, ইরানের সাথে মার্কিন কর্মকর্তারা সক্রিয়ভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ইরান ধীরে ধীরে আলোচনার বিষয়ে আরও আন্তরিক হচ্ছে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে হামলা আরও জোরদার করা কিংবা আগের মতো চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে। সূত্রের খবর, সামরিক হামলার ক্ষেত্র বাড়ানো নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এখনো নানামুখী পর্যালোচনা চলছে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে চরম পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকার এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। স্থলভাগে সেনা না পাঠিয়ে কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলেও নানা প্রশ্ন ও দ্বিধা রয়েছে। স্থল অভিযান পরিচালনা করলে তা আরো বিপর্যয় ডেকে আনার সম্ভাবনাও রয়েছে।

মার্কিন গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতে টান, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্স ও কেইনের উদ্বেগ

অরুন্ধতী রায় অভিনয় করতেন, পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও by তপতী বর্মন

প্রকাশ ২৪ নভেম্বর ২০২৫ঃ এই অরুন্ধতী রায় একসময় চিত্রনাট্য লিখতেন, অভিনয় করতেন, জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারও পেয়েছেন। তাঁর সাম্প্রতিক বই ‘মাদার মেরি কামস টু মি’–তে এসব নিয়ে আছে নানা তথ্য। আজ তাঁর জন্মদিনে জেনে নেওয়া যাক চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাঁর জড়িয়ে পড়ার গল্প।

গত শতকের আশির দশকের কথা। ভারতের স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা ও পরিবেশবিদ প্রদীপ কৃষেণ একটি চিত্রনাট্য লেখা প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পান। এর আয়োজক ছিল ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এনএফডিসি)। তারা প্রদীপকে সেই চিত্রনাট্য নিয়ে সিনেমা বানাতে উৎসাহ দেন।

প্রদীপ কৃষেণ মোটামুটি কে কোন চরিত্রে অভিনয় করবেন, সেটা ঠিক করে ফেলেন। তবে মূল নারী চরিত্রের জন্য কাউকে মনে ধরছিল না।

একদিন তিনি তাঁর স্ত্রীর অফিসে গিয়ে কোঁকড়া চুলের, হালকা-পাতলা গড়ন আর চোখে গভীর কী যেন আছে; এমন এক তরুণীকে দেখতে পান। দেখেই তাঁর মনে হয়, তিনি-ই সেই নারী, যাকে তিনি সিনেমার জন্য মনে মনে খুঁজছিলেন।

এই তরুণী হলেন অরুন্ধতী রায়। তিনি তখন দিল্লির স্কুল অব প্ল্যানিং অ্যান্ড আর্কিটেকচার থেকে পাস করে স্থপতি হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছেন। স্ত্রীর মাধ্যমে প্রদীপ সেই তরুণীকে ডাকেন। তিনি কী চান, সেটা জানান।

তবে অভিনয় করার ব্যাপারে একদমই রাজি ছিলেন না অরুন্ধতী রায়। তিনি প্রদীপকে বলেছিলেন, অভিনয়ের অ-ও তিনি জানেন না, তা ছাড়া তাঁর হিন্দি ভীষণ খারাপ। প্রদীপ দমে যাওয়ার পাত্র নন। অরুন্ধতীকে আশ্বস্ত করে বললেন, ওই চরিত্রের নাম শৈলা আর তাঁর কোনো সংলাপ নেই। গল্পটি সংক্ষেপে অরুন্ধতীকে শোনালেন। চিত্রনাট্যটি হাতে ধরিয়ে দিলেন। বাড়ি গিয়ে ভালোভাবে ভেবে দেখতে অনুরোধ করলেন।

অভিনয়ের প্রস্তাবটি নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বললেন অরুন্ধতী রায়। সেই বন্ধু তাঁকে রাজি হয়ে যেতে বললেন। তিনিও ‘দেখি না কী হয়’ মনে করে রাজি হয়ে গেলেন। এভাবেই ১৯৮৪ সালে ‘ম্যাসি সাহেব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়জগতে পা রাখেন অরুন্ধতী রায়। ছবিটি ব্যবসায়িক সাফল্য না পেলেও সমালোচকদের মন জয় করেছিল।

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে আমন্ত্রণ পেয়েছিল। সিনেমার নায়ক ও পরিচালক উভয়েই দেশ-বিদেশে নানা পুরস্কার পেয়েছিলেন।

প্রদীপের বন্ধুরা মিলে প্রযোজনা সংস্থা করেন। তখন অরুন্ধতী রায়কে তাঁদের সঙ্গে কাজের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি গল্পের খসড়া তৈরি করতে শুরু করেন।

২৬ পর্বের একটি ধারাবাহিকের চিত্রনাট্য লিখেন তিনি। নাম—‘বারগদ’। খুব উৎসাহ নিয়ে শুটিং শুরু করেন, তবে টাকার অভাবে মাঝপথে সব থেমে যায়। সেই ধারাবাহিক আর কখনো আলোর মুখ দেখেনি।

এরপর অরুন্ধতী রায় ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোস ওয়ানস’ নামের (১৯৮৯) একটি সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেন। সেখানে তিনি অ্যানি নামের চরিত্রে অভিনয় করেন। সেটার সঙ্গে অবশ্য তাঁর নিজের জীবনের মিল ছিল। অ্যানি স্থাপত্যবিদ্যার একজন, কিন্তু সেটা ছেড়ে তিনি লেখালেখির জগতে ঢুকে পড়েন।

এই সিনেমার জন্য সেরা চিত্রনাট্য বিভাগে অরুন্ধতী রায় সেবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এ ছাড়া অন্য ভাষার (ভারতের সংবিধানে উল্লিখিত ভাষা ছাড়া) সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কারও পেয়েছিল এটি, যা অরুন্ধতী রায়ের কাছে ‘প্রিয়তম পুরস্কার’। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেরও সুনাম কুড়িয়েছিল ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোস ওয়ানস’।

অরুন্ধতী রায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের একটি বর্ণনাও দিয়েছেন তাঁর বইয়ে। সেখানে তিনি লিখেছেন, অনুষ্ঠানটি ছিল গুরুগম্ভীর ও জাঁকজমকপূর্ণ।

মূলধারার চলচ্চিত্র জগতের অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালকসহ সবাই চমকপ্রদ পোশাকে হাজির। রাষ্ট্রপতি আর ভেঙ্কটারামন পুরস্কার তুলে দিচ্ছিলেন। যখন অরুন্ধতীর ডাক এল, তিনি মঞ্চে যাচ্ছেন পুরস্কার নেওয়ার জন্য; তখন এক আমলা তাঁর পোশাক দেখে খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। বলেছিলেন, পোশাকবিধি করতে হবে। কারণ, তিনি প্রতিদিনের সাধারণ পোশাক পরে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন।

অরুন্ধতী রায়ের জন্ম ১৯৬১ সালে, ভারতের শিলংয়ে। শৈশব কাটিয়েছেন কেরালায়। স্থাপত্যবিদ্যায় পড়ালেখা করেছেন। তবে লেখালেখিতেই তাঁর মন ও খ্যাতি। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’-এর জন্য বুকার পুরস্কার পান। সাহিত্যের বাইরে তিনি যুক্ত আছেন রাজনৈতিক ও মানবাধিকার আন্দোলনে। কাশ্মীর, নর্মদা আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী রাজনীতি—এসব বিষয়ে তাঁর প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত।

প্রদীপ ও অরুন্ধতী মিলে আরেকটি সিনেমা বানানোর উদ্যোগ নেন। নাম—‘ইলেকট্রিক মুন’ (১৯৯২)। এই সিনেমার জন্য ব্রিটিশ টিভি চ্যানেল ‘চ্যানেল ফোর’ তাদের টাকা দিয়েছিল।

‘মাদার মেরি কামস টু মি’ বইয়ে অরুন্ধতী রায় লিখেছেন, তিনি এই চিত্রনাট্য মাথা দিয়ে লিখেছেন, মন দিয়ে নয়। ভালোবাসার মতো কিছু এটাতে তিনি পাননি। অনেকটা টাকার প্রয়োজনে যুক্ত থাকার মতো ব্যাপার ছিল।

‘বিদেশি সিনেমা’ হিসেবে শুটিং করতে গিয়ে নানা দপ্তরের, কর্মকর্তাদের এত বাধাবিপত্তির মুখে পড়তে হয়েছিল যে অরুন্ধতী রায় খুব বিরক্ত হন। ছন্দে ফিরতে তিনি নিজের জন্য লিখতে শুরু করেন। অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, লিখতে তাঁর খুব ভালো লাগছে। সিদ্ধান্ত নিলেন, সিনেমাজগতে আর না। তিনি শুধু লিখবেন, যা ইচ্ছা হবে তা-ই লিখবেন।

একদিন বেড়াতে এসে অরুন্ধতী রায়ের লেখার খাতা পড়ে মুগ্ধ হলেন সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সানডে’র সম্পাদক। তিনি সেই লেখা নিয়ে নিজের কাগজে ছাপালেন। এভাবেই ১৯৯২ সালে প্রথম কোনো কাগজে তাঁর লেখা প্রকাশিত হলো। ওই বছরই তিনি ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন।

পরের বছর ১৯৯৭ সালে এটি প্রকাশিত হলে হইচই পড়ে যায়। অরুন্ধতী রায় এই বইয়ের জন্য বুকার পুরস্কার পান। লেখালেখির পাশাপাশি ক্রমশ অধিকারকর্মী হিসেবে নানা কাজে জড়িয়ে পড়তে থাকেন তিনি।

তাঁর জীবন থেকে সিনেমাজগৎ একেবারেই হারিয়ে যায়। আসলে কী তাই! বরং উল্টো করে বলা চলে, সিনেমার জগতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, স্থপতি নন, অভিনেত্রী নন কিংবা চিত্রনাট্যকারও নন; তিনি শুধু লেখক হতে চেয়েছেন।

অরুন্ধতী রায়
অরুন্ধতী রায়। ছবি: প্রথম আলো

বারান্দা ও বাগানের টবে বিটরুট ফলাবেন যেভাবে by এম এ হান্নান

ফুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রঙিন বিটরুট চাষ করতে পারেন আপনার ছাদ কিংবা বারান্দা–বাগানে। লালচে–সবুজ পাতার গোড়ায় লালচে–বেগুনি রঙের বিটরুট চমৎকার হয়ে ধরা দেবে আপনার বাগানে। এর জন্য খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না এবং অল্প যত্নেই বেডে বা টবে চাষ করা যায়। বাড়েও খুব দ্রুত। একসময় পাবেন চোখধাঁধানো রঙিন বিটরুট, সঙ্গে পুষ্টিকর সবুজ শাক। আপনার ফলানো বিটরুট নতুন স্বাদ ও পুষ্টি যোগ করবে প্রতিদিনের খাবারে। সালাদ হিসেবে, সবজি হিসেবে, এমনকি জুস বানিয়েও খেতে পারেন পুষ্টিকর বিটরুট। বিশেষত হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্যের জন্য বিটরুট দারুণ উপকারী। শীতের এ সময়টাই বিটরুট ফলানোর মোক্ষম সময়। তাই জেনে রাখুন বিস্তারিত।

উপযুক্ত টব নির্বাচন

১০-১২ ইঞ্চি গভীরতার টব বেছে নিন, এতে বিটরুটের শিকড় দ্রুত ছড়াবে আর যথেষ্ট বড় হওয়ার সুযোগও পাবে। একেকটি বিটরুট ২০০–৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। টবে অতিরিক্ত পানি জমে শিকড়ে পচন ধরতে পারে, তাই টবের নিচে পানিনিষ্কাশনের জন্য ছিদ্র থাকতে হবে। মাটির টব বা জিও ব্যাগ বিটরুট চাষের জন্য ভালো।

উর্বর বেলে দোঁআশ মাটি ব্যবহার করুন

বিটরুটগাছ জৈব পদার্থসমৃদ্ধ উর্বর বেলে দোঁআশ মাটিতে ভালো হয়। বেলে দোঁআশ মাটি, গোবর সার বা ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো কম্পোস্ট সার এবং কোকোপিট মিশিয়ে টবের মাটি প্রস্তুত করুন। পরে প্রতি সপ্তাহে অল্প করে কম্পোস্ট সার যোগ করলেই বিটরুট তার বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পেয়ে যাবে।

সঠিকভাবে বীজ বপন করুন

বিটরুটের বীজ প্রায় ১ ইঞ্চি গভীরে এবং ৩-৪ ইঞ্চি দূরে দূরে বপন করুন। ১০-১২ ইঞ্চি ব্যাসের টবে সর্বোচ্চ চারটি গাছ রাখতে পারেন। শুরুতে পাশাপাশি দুটি করে একই টবে মোট ৮টি গর্ত করুন। গর্তের গভীরতা হতে হবে ২-৩ সেন্টিমিটার।

বীজ অঙ্কুরোদ্‌গম হতে যা সাধারণত ৫–১০ দিন সময় নেয়। এ সময় মাটির আর্দ্রতা ঠিক রাখতে মাঝেমধ্যে পানি স্প্রে করে টবের মাটি ভিজিয়ে দিন।

চারা গজানোর ২০-২৫ দিন পর, পাশাপাশি থাকা দুটি চারার মধ্যে সবচেয়ে সুস্থ–সবল চারাটি রেখে অন্যটি তুলে ফেলুন। এভাবে জন্মানো ৮টি গাছ থেকে একটি টবের জন্য ৪টি চারা রাখুন। সুস্থ–সবল এই চারা থেকে ভালো ফলন আশা করা যায়।

বীজ থেকে চারা করা কষ্টসাধ্য মনে হলে নিকটবর্তী নার্সারি থেকে চারা এনেও সরাসরি রোপণ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে চারা রোপণের পর প্রথম ১০ দিন ছায়াযুক্ত স্থানে রাখুন। চারার বৃদ্ধি খেয়াল করে রোদে দিন।

সূর্যালোকের প্রাপ্যতা

বিটরুটের বাল্ব বা কন্দ গঠনের জন্য প্রতিদিন চার-ছয় ঘণ্টা রোদের প্রয়োজন। সকালের মিষ্টি রোদ আমাদের মতো গাছের জন্যও ভালো। যদি খেয়াল করেন দুপুর রোদের তীব্রতায় গাছের পাতা নেতিয়ে পড়ছে বা শুকিয়ে যাচ্ছে, তখন ওপরে কাপড় বা তেমন কিছু দিয়ে ছায়ার ব্যবস্থা করতে পারেন।

নিয়মিত পানি দিন সাবধানে

সামঞ্জস্যপূর্ণ আর্দ্রতা ধরে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত পানি দিলে বিটরুটের কন্দে ফাটল ধরতে পারে, ছত্রাকের সংক্রমণে পচন ধরতে পারে। তাহলে উপায়? উপায় হলো মাটির ওপরের অংশ শুকিয়ে এলে তবেই পানি দেওয়া।

বাগানের শুকনা পাতা দিয়ে মাটির ওপরের অংশ ঢেকে দিতে পারেন। এভাবে মালচিং করলে মাটি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।

ফসল তোলার সঠিক সময়ে

জাতের ওপর নির্ভর করে বিটরুট তোলার সময়। জাতভেদে বীজ বপন থেকে শুরু করে বিটরুট তোলা পর্যন্ত ৭০-১০০ দিন সময় লাগতে পারে। এ ছাড়া বিটরুটের বৃদ্ধি আপনি নিজেই দেখতে পাবেন। কতটা বড় হওয়া পর্যন্ত টবের মাটিতে রাখবেন, সে–ও আপনার ওপর নির্ভর করে।

সাধারণত কন্দের আকার টেনিস বল বা গলফ বলের সমান হলে নিখুঁত আকার ধরে নেওয়া যায়। বিটরুট খুব বড় হলে তা শক্ত আর আঁশযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সবে তোলা বিটরুটগুলো বাজার থেকে কেনা বিটরুটের তুলনায় তরতাজা হয়, স্বাদ হয় মিষ্টি ও রসালো।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-24%2Fqf39lw3o%2Fbeetroot-pot-webuse-NHTG20277.jpg?rect=0%2C0%2C940%2C627&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ফুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রঙিন বিটরুট চাষ করতে পারেন আপনার ছাদ কিংবা বারান্দা–বাগানে। ছবি: দ্য রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি

Saturday, July 25, 2026

ইরানের জোড়া চমক: বদলে দিল যুদ্ধের সমীকরণ

মার্কিন সংবাদ ও বিশ্লেষণধর্মী ওয়েবসাইট 'ভক্স'-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—লড়াইয়ের ময়দানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শুরুর দিকের সব হিসেবনিকেশ চরম প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তেহরান এখনও তাদের ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির বড় একটি অংশ অক্ষত রেখেছে। রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধ যত গড়াবে, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন বাহিনীর বিপদ ততই বাড়বে।

ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা শনিবার (২৫ জুলাই) জানিয়েছে, ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে পদাতিক সেনা পাঠাতে এখনও নারাজ। সেনা হতাহতের ঘটনা বাড়লে দেশে যে রাজনৈতিক ঝড় উঠবে, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত। কিন্তু এতে অঞ্চলে থাকা মার্কিন সেনাদের ওপর ঝুঁকির আঁচ বিন্দুমাত্র কমছে না। গত জুনের তথ্যমতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির বেশিরভাগই এখনও সুরক্ষিত আছে এবং যুদ্ধপূর্ব ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের প্রায় ৭০ শতাংশই তেহরানের হাতে রয়ে গেছে।

গত এপ্রিলের প্রথম অস্ত্রবিরতির পর থেকে সাম্প্রতিক দিনগুলো মার্কিন বাহিনীর জন্য সবচেয়ে মারাত্মক প্রমাণিত হয়েছে। জর্দান ও ইরাকে ইরান-সংশ্লিষ্ট হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৭ মার্কিন সেনা প্রাণ হারায়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও হামলা জোরদার করেছে; যার মধ্যে তাবরিজের সেই ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিও রয়েছে, যেখান থেকে জর্দানে হামলা চালানো হয়েছিল বলে ওয়াশিংটনের দাবি।

সাম্প্রতিক দিনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার পাশাপাশি বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে ইরান। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজেও আঘাত হানা হয়েছে, যার ফলে এই পথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গেছে।

হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল অচল করে দেওয়ার ইরানীয় সক্ষমতা যদি এই যুদ্ধের প্রথম চমক হয়, তবে পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও জ্বালানি স্থাপনায় অব্যাহতভাবে আঘাত হানার ক্ষমতা বজায় রাখাটা ছিল ওয়াশিংটনের জন্য দ্বিতীয় বড় চমক।

যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন বাহিনী তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার বাইরে থাকতে বাহরাইন, ইউএই ও কাতার থেকে কিছু সেনা ও সরঞ্জাম জর্দান এবং দখলকৃত ভূখণ্ডে সরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু স্যাটেলাইট ছবি ও খবরে স্পষ্ট দেখা গেছে, ওই ঘাঁটিগুলোও ইরানীয় হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত কয়েকটি ঘাঁটিতে গাদাগাদি করে সেনা ও সরঞ্জাম রাখায় মার্কিন সেনাদের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।

খুব দ্রুতগতির এবং দিক পরিবর্তন করতে পারা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ইরান হয়তো এ কাজে রাশিয়া বা চীনের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা পাচ্ছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন।

তবে ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজুয়েস্কি মনে করেন, এই নিরবচ্ছিন্ন হামলা প্রমাণ করে যে ইরানের সামরিক শক্তি ওয়াশিংটনের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক দাবির তোয়াক্কা না করে তেহরান তাদের শক্তি ধরে রেখেছে এবং বিমান হামলার তীব্রতা কিছুটা কমায় তারা সক্ষমতা পুনর্গঠনের সুযোগও পেয়ে গেছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের প্রতিরোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতে টান পড়েছে। সেন্ট্রাল ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্যমতে, এপ্রিলের অস্ত্রবিরতির আগেই ওয়াশিংটন তাদের মোট ২,৩০০ প্যাট্রিওট ক্ষেপণাস্ত্রের ১,০০০টির বেশি এবং থাড ক্ষেপণাস্ত্রের ৫০ থেকে ৮০ শতাংশই খরচ করে ফেলেছে। এসব প্রতিরক্ষা সামগ্রীর ঘাটতি মেটাতে অনেক মাস সময় লাগবে। বিশেষ করে ইরানের তৈরি সস্তা আত্মঘাতী ড্রোনের আকাশজুড়ে আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত আকাশসীমার শ্রেষ্ঠত্বকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে।

প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নিজেদের মাটিতে গিয়ে সরাসরি যুদ্ধ বা দখল করার শক্তি ইরানের নেই; কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বুকেই মার্কিন বাহিনীকে দূরপাল্লার অস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে রক্তাক্ত এবং কোণঠাসা করে রাখার মতো যথেষ্ট শক্তি তেহরানের অক্ষত রয়েছে।

ইরানি ড্রােন বহর
ইরানি ড্রােন বহর। সংগৃহীত

মুখের ক্যানসার কেন বাড়ছে, প্রতিরোধে করণীয় by অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী

বাংলাদেশে মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অনেক বেশি। নতুন রোগীও বাড়ছে। খাদ্যনালি বা মুখগহ্বরের কোনো অংশে ক্যানসার হলে এক পর্যায়ে রোগীর জন্য খাবার গ্রহণ কষ্টকর হয়ে পড়ে।

যেসব অভ্যাসের কারণে মুখগহ্বরের সরাসরি ক্ষতি হয়, সেগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া আবশ্যক। যেমন তামাক মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির শত্রু। তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের কারণে মুখগহ্বরের ও খাদ্যনালির কোষে ক্ষত সৃষ্টি হতে থাকে। এই ক্ষত থেকেই একসময় ক্যানসার হয়।

মুখে কেন ক্যানসার হয়

* সিগারেট, ই-সিগারেট, পান, সুপারি, চুন, জর্দা, গুল, খইনি—সবই মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির ক্যানসারের জন্য দায়ী।

* আমাদের দেশে যত মানুষ মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির ক্যানসারে আক্রান্ত, তাঁদের ৮০-৯০ শতাংশেরই তামাক বা তামাকজাত পণ্য সেবনের কারণ রয়েছে।

* কেউ কেউ মদপানও করেন। যাঁরা মুখগহ্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে যত্নশীল নন কিংবা যাঁদের দাঁতের অংশ অত্যধিক ধারালো, তাঁদের ঝুঁকি বেশি।

* প্রক্রিয়াজাত খাবারেও হতে পারে।

* ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখলে মুখের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে বেশি।

উপসর্গ ও শনাক্ত

যদি মুখে ঘা তৈরি হয় ও চিকিৎসার পরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে অবশ্যই বায়োপসি বা মাংসের টিস্যু পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ, মুখের ঘা বা সাদা ক্ষতকে বলা হয় ক্যানসারপূর্ব ক্ষত।

ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, রিউমাটিক ডিজিজ, পরিপাকতন্ত্রের রোগ, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ওষুধ খান, কৃত্রিম দাঁত ব্যবহার করেন, ধূমপান করলে অবশ্যই দাঁত ও মুখে যেকোনো ঘা দেখা দেওয়ামাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

যদি দেখেন মুখগহ্বরের ক্ষত বা ঘা শুকাচ্ছে না, রক্তক্ষরণ বা গিলতে অসুবিধা হচ্ছে, সব সময় গলায় কোনো কিছুর উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মুখগহ্বরের কোষকলায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ করুন।

প্রতিরোধে করণীয়

* তামাক ও তামাকজাত পণ্য সেবন বন্ধ করুন।

* দুবেলা ব্রাশ ও খাওয়ার পর ভালোভাবে কুলকুচি করুন।

* দাঁতের কোনো অংশ ধারালো থাকলে চিকিৎসা করান।

* প্রচুর ফল, শাকসবজি ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খান।

* ফাস্টফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।

* অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

* অতিরিক্ত ঝাল বা গরম খাবার ও পানীয় বর্জন করুন।

* সব ধরনের মাদক ও অ্যালকোহল বর্জন করতে হবে।

* অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী, দন্তবিশেষজ্ঞ

বাংলাদেশে মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অনেক বেশি, নতুন রোগীও বাড়ছে
বাংলাদেশে মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অনেক বেশি, নতুন রোগীও বাড়ছে। ছবি: পেক্সেলস

যে কারণে কথায় কথায় অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না by ডা. কাকলী হালদার

১৮-২৪ নভেম্বর বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) সচেতনতা সপ্তাহ। ‘অ্যাক্ট নাউ: প্রোটেক্ট আওয়ার প্রেজেন্ট, সিকিউর আওয়ার ফিউচার’ বা ‘এখনই পদক্ষেপ নিন: বর্তমানকে রক্ষা করুন, সুরক্ষিত করুন ভবিষ্যৎ’—এই প্রতিপাদ্য আজকের বিশ্ব স্বাস্থ্য প্রেক্ষাপটে এক গভীর তাৎপর্য বহন করে।

অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স কী

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালস রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর এক নীরব মহামারি, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিকে হার মানাচ্ছে। এতে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসাশাস্ত্র উভয়ই হুমকির মুখে পড়ছে মারাত্মকভাবে।

অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্সের মানে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীবীগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসকারী ওষুধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠা। ফলে একসময় যেসব সংক্রমণ সহজেই সারানো যেত, সেসবই আবার প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

মূল কারণ কী

এ সমস্যার মূলে বিশেষ করে আছে অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গালের যথেচ্ছ ব্যবহার, যা অণুজীবদের বিবর্তনে সাহায্য করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল ড. টেড্রোস আধানম ঘেব্রেইসাসও বলেছেন, ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী পরিবারগুলোর স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।’

একটি সাধারণ সংক্রমণ যখন চিকিৎসার অসাধ্য হয়ে ওঠে, তখন অস্ত্রোপচার, ক্যানসার থেরাপি বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাগুলোও খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

করণীয়

এ মুহূর্তে ‘অ্যাক্ট নাউ’ বা এখনই পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে কেবল বিজ্ঞানী বা চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করা নয়, বরং এ লড়াইয়ে আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে।

১. সচেতন ব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা কোর্স অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না। মনে রাখতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক কেবল ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রেই কার্যকর। ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়াটিক অকার্যকর।

২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: সংক্রমণ রোধের জন্য নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ ও টিকা নেওয়া অপরিহার্য। এটি অণুজীবের বিস্তার রোধ করে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা কমায়।

৩. নতুন উদ্ভাবনে বিনিয়োগ: সরকার ও সংস্থাগুলোর উচিত নতুন অ্যান্টিবায়োটিক ও রোগনির্ণয়ের উন্নত প্রযুক্তির গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগ করা।

শেষ কথা

‘প্রোটেক্ট আওয়ার প্রেজেন্ট’ মানে হলো আমাদের বর্তমান চিকিৎসাব্যবস্থা, যার ওপর আমরা নির্ভর করি, তাকে সচল ও সুরক্ষিত রাখা। আর ‘সিকিউর আওয়ার ফিউচার’ মানে হলো এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, যেখানে আমাদের শিশুরা যেন সাধারণ সংক্রমণে মারা না যায়।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যার জন্য প্রয়োজন একীভূত ও বহুক্ষেত্রীয় পদক্ষেপ। এখনই সম্মিলিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে আমরা এই নীরব হুমকি মোকাবিলা করতে পারি এবং মানবতার জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারি।

* ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাউক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-24%2F8ye2l7oh%2Fpexels-photo-3683088.jpg?rect=202%2C0%2C2178%2C1452&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা কোর্স অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না। ছবি: পেক্সেলস

Friday, July 24, 2026

সিআইয়ের স্থাপনায় ইরানের নির্ভুল হামলা, রাশিয়ার সহায়তা নিয়ে গুঞ্জন

আল জাজিরার প্রতিবেদনঃ ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর এক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের বৈঠকে আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ।

তবে বৈঠকটি এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হয়, যখন নতুন কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরানের হামলায় রাশিয়া প্রকাশ্যে যা স্বীকার করেছে তার চেয়েও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ইরানের হামলার খবর প্রথম প্রকাশ্যে আসে ইরানের যুদ্ধের শুরুর দিকে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তৃতীয় দিনে সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ স্টেশন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

এরপর ৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনা সদস্য ও সামরিক বিমানের অবস্থান শনাক্ত করতে তেহরানকে সহায়তা করছিল মস্কো।

সবশেষ বুধবার রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাসে অবস্থিত সিআইএর স্থাপনাসহ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের ড্রোন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য রুশ সম্পৃক্ততার তদন্ত শুরু করেছে। তাদের মতে, হামলাগুলোর কার্যকারিতা ও নির্ভুলতা রাশিয়ার সহায়তার ইঙ্গিত দিতে পারে।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রায়েভস্কির মতে, ইরানের হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে রাশিয়ার ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা বাস্তবসম্মত।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের আশঙ্কা আগেও ছিল। কারণ ইরানের সাম্প্রতিক অনেক হামলাই অতীতের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত ও নিখুঁত।’

তিনি বলেন, ‘ইরানের নিজস্ব মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা খুব শক্তিশালী নয়, যেখানে রাশিয়ার সক্ষমতা অনেক বেশি। সামরিক মানের পর্যাপ্ত উপগ্রহও ইরানের নেই। তাই ধারণা করা যায়, এ বিষয়ে তারা রাশিয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছে।’

তবে তিনি উল্লেখ করেন, লক্ষ্য নির্বাচন ও তথ্য সংগ্রহে ইরানের নিজস্ব মানব গোয়েন্দা (হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স) নেটওয়ার্কও রয়েছে, যা অনেক সময় গুরুত্ব পায় না।

ইরানকে রাশিয়ার সমর্থন

যুদ্ধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কো ও তেহরানের সামরিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে।

অনেক বিশ্লেষক দুই দেশের সম্পর্ককে পশ্চিমাবিরোধী স্বার্থভিত্তিক ‘সুবিধাবাদী জোট’ হিসেবে দেখলেও গ্রায়েভস্কি এ মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন।

তিনি বলেন, ‘দুই দেশই মনে করে তারা বৈশ্বিক পর্যায়ে একই ধরনের হুমকির মুখে রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর তাদের সহযোগিতা আরো গভীর হয়েছে, আর সাম্প্রতিক সময়ে তা আরো বেড়েছে। এখন তারা একে অপরের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।’

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইরান মস্কোকে শাহেদ ড্রোন ও ফাতেহ-১১০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে। এর ফলে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়।

গত বছর উভয় দেশ ২০ বছরের সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে, যেখানে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়।

তবে সে সময় রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই রুদেঙ্কো দেশটির পার্লামেন্টে বলেন, এই চুক্তির অর্থ ‘ইরানের সঙ্গে সামরিক জোট গঠন বা পারস্পরিক সামরিক সহায়তার বাধ্যবাধকতা নয়’।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, রাশিয়া কোমেটা-এম নামে একটি অ্যান্টি-জ্যামিং নেভিগেশন ব্যবস্থা সরবরাহ করে ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের নির্ভুলতা বাড়াতে সহায়তা করেছে।

মস্কোর কৌশলগত স্বার্থ

গ্রায়েভস্কির মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত কিছুটা হলেও রাশিয়ার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করছে। কারণ এতে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরে যাচ্ছে এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘রাশিয়া একে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থার লড়াই হিসেবে দেখে। তারা একে এমন এক ধারাবাহিক পরিণতি হিসেবে দেখছে যা যুক্তরাষ্ট্রের পতনের কারণ হতে পারে।’

তার ভাষায়, ‘রাশিয়া অবশ্যই চায় না ইরান পরাজিত হোক। তাই তারা একদিকে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একা লড়তে দিচ্ছে। অন্যদিকে কঠিন এই সময়ে টিকে থাকার মতো প্রয়োজনীয় সহায়তাও নিশ্চিত করতে চাইছে।’

সাম্প্রতিক হামলা

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা আরো তীব্র হয়েছে।

গ্রায়েভস্কির মতে, রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তার চেয়ে ইরানের নিজস্ব কৌশলই যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারিণে বেশি প্রভাব ফেলছে বলে প্রমাণিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার সহায়তা ইরানের জন্য কোনো মৌলিক পরিবর্তন এনে দেয়নি। ইরানের নিজস্ব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আগেই ছিল এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে তা গড়ে তুলেছে। তবে রাশিয়ার সহযোগিতা তাদের সক্ষমতাকে আরো কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছে।’

সিআইয়ের স্থাপনায় ইরানের নির্ভুল হামলা, রাশিয়ার সহায়তা নিয়ে গুঞ্জন

টানা ১৩ রাত ধরে মার্কিন হামলা, কঠোর জবাব দেওয়ার হুশিয়ারি ইরানের

ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে টানা ১৩তম রাতের মতো হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এতে রাজধানী তেহরানসহ দেশটির একাধিক নগরী ও উপকূলীয় কৌশলগত এলাকা কেঁপে উঠেছে। সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর পাওয়া গেছে। এর জবাবে মার্কিন বাহিনীর ওপর আরো বিধ্বংসী ও কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

হরমুজ প্রণালিতে অসামরিক নাবিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অজুহাতে ইরানে টানা ১৩ রাতের মতো অভিযান চালিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ইরানজুড়ে নতুন দফায় এই হামলা চালানো হয়।

সেন্টকমের দাবি, সর্বশেষ হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, ড্রোন সংরক্ষণাগার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং সামরিক নৌ সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে উত্তেজনা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক এই সমুদ্রপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে সেন্টকম জানায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় জাহাজগুলো এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচল করছে। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা সদস্য মোতায়েন রয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

মার্কিন হামলার জেরে ইরানের মূল ভূখণ্ডের একাধিক শহরে পর পর বিকট বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

দেশটির মূলধারার গণমাধ্যমগুলো এসব হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, খোন্দাব শহরের বাইরের একটি এলাকায় শত্রুপক্ষের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এ ছাড়া খোররামাবাদ ও কোনারাক শহরেও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ ও আইআরআইবি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত অত্যন্ত কৌশলগত বন্দরনগরী জাস্কেও বিকট বিস্ফোরণ ঘটেছে।

অন্যদিকে বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ জানায়, রাজধানী তেহরানের পূর্বাঞ্চলের আকাশে শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করতে উচ্চ সতর্কতাবস্থায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।

বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহত

উপকূলীয় বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের আবাসিক এলাকা ‘তাপ্পে আল্লাহ-ও-আকবর’-এ চালানো হামলায় অন্তত দু’জন আহত হয়েছেন।

হরমুজগান প্রদেশের উপ-গভর্নর ওয়ালিউল্লাহ হায়াতিকে উদ্ধৃত করে ফারস নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।

এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের আন্দিমেশক ও ওমিদিয়ে শহরের আশপাশের এলাকায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। তবে এসব হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে মেহর বার্তা সংস্থা নিশ্চিত করেছে।

সংঘাতের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপ এবং খুজেস্তানের প্রধান শহর আহভাজেও নতুন করে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। কেশম দ্বীপের আকাশে একটি উড়ন্ত বস্তু বা ড্রোন ভূপাতিত করার প্রাথমিক অসংবাদিত তথ্যও পাওয়া গেছে।

আরো বিধ্বংসী জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের

মার্কিন আক্রমণ অব্যাহত থাকায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধ না হলে ইরানও পাল্টা আঘাত চালিয়ে যাবে।

ইরানের সামরিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন না থামলে প্রতিবার আরো বিধ্বংসী ও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে সামনে আরো শক্তিশালী প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটি।

টানা ১৩ রাত ধরে মার্কিন হামলা, কঠোর জবাব দেওয়ার হুশিয়ারি ইরানের
ফাইল ছবি

ইরানের নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চিন্তা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও ইরানের সামরিক বাহিনী এখনও মারাত্মক আঘাত হানার সক্ষমতা বজায় রেখেছে। সম্প্রতি জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাটিতে ইরানি হামলায় ৩ মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর এই বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

গত শুক্রবারের এ হামলাটি ছিল গত ১ মার্চের পর কোনো সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি আঘাতে মার্কিন সেনা নিহতের প্রথম ঘটনা। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ না করলেও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটনের জন্য এটি এক নির্মম বাস্তবতার স্মারক। প্রতিনিয়ত মার্কিন বিমান হামলা চালানো হলেও ইরান নিজেদের অসম যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান 'ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ'-এর সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনোফার কাভানাঘ কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখনো বেশ শক্তিশালী। ধারণার চেয়েও দ্রুত তারা নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের হামলাগুলো আরো নিখুঁত হচ্ছে, যেখানে রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তা থাকার সম্ভাবনা প্রবল।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, পেন্টাগন দাবি করেছিল ইরানের সামরিক বাহিনী ‘যুদ্ধক্ষেত্রে অকার্যকর’ হয়ে পড়েছে, কিন্তু বাস্তবতা তা বলছে না। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তারা দ্রুত পরিস্থিতি থেকে শিখছে এবং নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে।

কিং'স কলেজ লন্ডনের সিকিউরিটি স্টাডিজ বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অ্যান্ড্রিয়াস ক্রিগ জানান, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর অবস্থান এবং সেগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতাই মূলত মার্কিন সেনাদের ঝুঁকিতে ফেলছে।

বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সাধ্যের মধ্যে থাকা স্থায়ী ও উন্মুক্ত ঘাঁটিগুলোতে অবস্থান করছে। এসব ঘাঁটির আবাসন মূলত হালকা রকেট, মর্টার বা হাতে তৈরি বিস্ফোরক হামলা ঠেকানোর জন্য তৈরি; বড় ধরনের ওয়্যারহেড বহনকারী নিখুঁত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা সহ্য করার মতো নয়।

সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ১ মার্চ কুয়েতের একটি ট্যাকটিক্যাল অপারেশন সেন্টার এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ৭ সেনা নিহত হন। এ ছাড়া জর্ডানে নিহত ৩ জন ছাড়া বাকিদের মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত বা বিস্ফোরক ধ্বংসের মতো ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

গত ৮ জুলাই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। এ ছাড়া দেশটির প্রায় ২২০টি সামরিক অবকাঠামো, ভবন ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

এয়ার ডিফেন্স অকার্যকর করার রণকৌশল


বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন—‘প্যাট্রিয়ট’ এবং উচ্চ ওপরে আঘাত হানতে সক্ষম ‘থাড’ অকার্যকর করতে ইরান তাদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বহুমুখী ব্যবহার করছে।

ভিন্ন গতি ও ভিন্ন দিক থেকে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি সশস্ত্র ড্রোন ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। মূল অস্ত্রের সঙ্গে ভুয়া সংকেত বা 'ডিকয়' ব্যবহার করায় মার্কিন এয়ার ডিফেন্স অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে।

ক্রিগ বলেন, ‘অধিকাংশ অস্ত্র ধ্বংস করা গেলেও অল্প কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করতে পারলেই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ঘটে যায়।’

ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (সিএসআইএস)-এর মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, সংঘাতের শুরুর সপ্তাহের তুলনায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে ইরানের মধ্যে বেশি দৃঢ়তা দেখা গেছে। এটি হামলার তীব্রতা বৃদ্ধির এক নতুন ধারা।

ইতোমধ্যে টানা ১৩ দিন ধরে উভয় পক্ষ একে অপরের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের সেনাবাহিনী সম্প্রতি জর্ডানের প্রিন্স হাসান ও কিং ফয়সাল ঘাঁটিতে মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ড্রোন প্রস্তুতকারী সাইট ও হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন ইরানি সামরিক অবকাঠামো ও ড্রোন স্টোরেজে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে।

পেন্টাগনের দাবি ও বাস্তবতার ব্যবধান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি দাবি করেছিলেন যে, ইরানের সামরিক বাহিনী ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে এবং তারা ‘যুদ্ধক্ষেত্রে অকার্যকর’। তবে মার্কিন সিনেটর জেন ওসফ এর সত্যতা নিয়ে গত মঙ্গলবার সিনেটে প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে তীব্র জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

সিনেটরের প্রশ্নের জবাবে হেগসেথ দাবি করেন, এটি এক ঐতিহাসিক সামরিক বিজয় এবং ইরানের নৌ, বিমান ও প্রতিরক্ষা শিল্প অকার্যকর করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘আমরা কখনোই ভাবিনি যে তাদের গুলি ছোড়ার সক্ষমতা একদম বন্ধ হয়ে যাবে।’

পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ও মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল মনে করেন, মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্ব ইরানের সামরিক ক্ষয়প্রাপ্তির তথ্যকে অতিরিক্ত বাড়িয়ে বলছে।

ক্যাম্পবেল বলেন, ‘আমরা জানি যে সংঘাতের শুরুতে ইরান কিছু অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত ছিল, যা তারা পরে ব্যবহারের সুযোগ রেখেছিল। তারা এখন তাদের তুলনামূলক বড় ও শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে সক্ষম। জর্ডানের ঘটনায় তারা সেই সুনির্দিষ্ট নির্ভুলতারই প্রমাণ দিয়েছে।’

ইউনিভার্সিটি অব বাথ-এর সহযোগী অধ্যাপক এবং ন্যাটোর সাবেক গবেষণা বিশ্লেষক প্যাট্রিক বুরি জানান, মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত হলেও খরচের দিক থেকে ইরান বড় সুবিধা পাচ্ছে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির খরচ অনেক কম, অথচ সেগুলো মাঝপথে ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রের যে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হয়, সেগুলোর খরচ বহুগুণ বেশি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি পরাজিত করতে হবে না। মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে ব্যাহত করতে এবং তাদের রাজনৈতিক ও মানবিক ক্ষতি বাড়াতে মাঝেমধ্যেই এই প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করাই ইরানের মূল লক্ষ্য।

ইরানের নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চিন্তা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ফাইল ছবি