Wednesday, November 5, 2014

নির্বাচন নিয়ে অবস্থান বদলায়নি ইউরোপীয় ইউনিয়ন : রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অবস্থান বদলায়নি। ঢাকায় ইইউ’র নতুন রাষ্ট্রদূত মাইয়ুদ পিয়ার বুধবার রাজধানীর এক হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর ইইউ’র পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিষয়ক হাই রিপ্রেসেন্টেটিভ (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ক্যাথরিন অ্যাসটনের দেয়া বিবৃতিটিই আমাদের অবস্থান। এতে অ্যাসটন সহিংসতা থেকে বিরত থেকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপায় খুজে বের করতে সব দলকে প্রকৃত সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন।

মাইয়ুদ মধ্য সেপ্টেম্বরে ঢাকা এসে গত ৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের কাছে পরিচয় পত্র পেশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিল তার পরিচিতিমূলক সংবাদ সম্মেলন।
জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদন্ড রহিত করতে ইইউ কেন আহ্বান জানিয়েছে - প্রশ্ন করা হলে মাইয়ুদ বলেন, মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ইইউ’র অবস্থান একই। ইইউ সর্বোচ্চ সাজা হিসাবে মৃত্যুদন্ডের বিধানের বিলুপ্তি চায়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রেও যখন কারো মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করা হয় সেদেশে নিযুক্ত ইইউ’র রাষ্ট্রদূত তা স্থগিত করার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। তাই নিজামীর মৃত্যুদন্ড রহিত করার আহ্বানকে কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) বিরুদ্ধে অবস্থান হিসাবে বিবেচনা করা যাবে না।
ইইউ কেবল নিজামীর মৃত্যুদন্ড রহিত করার আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে অন্য কারো একই সাজা হলে চুপ থেকেছে। এটা কি যুদ্ধাপরাধের পক্ষে অবস্থান নয় - জানতে চাওয়া হলে রাষ্ট্রদূত বলেন, ইইউ কোনো অপরাধ, বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের পক্ষে নয়। দয়া করে এ ধরনের অপপ্রচার চালাবেন না। আমরা শুধু চাই বিচারের ক্ষেত্রে আইসিটি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরন করুক। আর কারো মৃত্যুদন্ড ঘোষণা হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলেই ইইউ এর বিরোধীতা করে বিবৃতি দেয়।
সূচনা বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে ইইউর বাজারে ‘অস্ত্র ছাড়া সবকিছু’ (ইবিএ) পদ্ধতির আওতায় শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে ২০২১ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করতে পারে। স্বাধীনতার মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে এ ধরনের অর্জন সফলতার চমৎকার দৃষ্টান্ত হিসাবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করবে। তবে আইনগত দিকটি হল এর ফলে বাংলাদেশ ইবিএর সুবিধা হারাবে। এর বিকল্প হিসাবে বাংলাদেশকে জিএসপি প্লাসের জন্য আবেদন করতে হবে। জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে কঠোর কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। এজন্য মানবাধিকার, শ্রম আইন, পরিবেশ ও সুশাসন বিষয়ক ২৭টি আন্তর্জাতিক সনদ সই, অনুস্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ২০২১ খুব বেশী দূরের সময় না হওয়ায় এখনই এ ব্যাপারে কাজ শুরু করা প্রয়োজন।
মাইয়ুদ বলেন, ইইউর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ সক্রিয় নাগরিক সমাজ ও শক্তিশালী বেসরকারি খাত দ্বারা আশীর্বাদপুষ্ট। বাংলাদেশের হাজারো এনজিওর মধ্যে ব্র্যাক ও গ্রামীণের মত প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের খ্যাতি দেশের সীমানার বাইরে ছড়িয়ে পরেছে। তারা বাংলাদেশের গর্র্ব। বাংলাদেশের জনগন ও সরকারের জন্য এনজিওগুলো একটি সম্পদ যারা এদেশের টেকসই উন্নয়নের অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনার মত মাইয়ুদ বাংলাদেশের সবকটি জেলা ঘুরে দেখবেন কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কারো সাথে আমি প্রতিযোগিতা করব না। তবে ইইউর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলো সম্পর্কে জানতে এবং জনগনের কথা শুনতে যতটা সম্ভব বাংলাদেশ ঘুরে দেখব।

মীর কাসেম আলীর মন খারাপ! by গোলাম মাওলা রনি

জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর সাথে আমার দেখা হয়েছিল গত রমজানে। আমি তখন কাসিমপুর কারাগারে বন্দী। সে দিন আমাকে একজন চোর-গুণ্ডা বা বদমাশের মতো মহা যতন করে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সে দিন আমার নামের সাথে এমপি নামক একটি পদবিও ছিল। আমাকে নেয়া হলো প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে- তারপর কী মনে করে যেন সন্ধ্যার পরপরই পাঠানো হলো কাসিমপুর। গভীর রাতে আমি যখন কারা ফটক অতিক্রম করে আমার বন্দিনিবাসের দিকে যাচ্ছি, তখন ক্ষুধা, ক্লান্তি, অবসাদ এবং অপমান আমাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। জীবনের প্রথম কারাবাস- আমার চৌদ্দগোষ্ঠীর কেউ ওখানে যায়নি- আর তাই আমি জানতাম না ওখানকার নিয়মকানুন, সুযোগ সুবিধা বা অসুবিধাগুলো।

কাসিমপুর কারাগারের মূল ফটক পার হয়ে অনেকখানি পথ হেঁটে যেতে হয়। তখন সম্ভবত ১৪ বা ১৫ রোজা চলছিল। আকাশে অর্ধচন্দ্রের মিষ্টি আলো। আমি হাঁটছি, সাথে দুজন কারারক্ষী। চার দিকে গা ছমছম করা সুমসাম নীরবতা। ভয়ে ভয়ে কারারক্ষীদের বললাম- আমি যেখানে থাকব সেখানে আর কে কে আছেন। তারা বলল- মীর কাসেম, মাহমুদুর রহমান ও গিয়াস উদ্দিন আল মামুন। রাতে কারো সাথে দেখা হবে না, তবে সকালে দেখতে পাবেন সবাইকে। সকালে দেখা হলো মীর কাসেমের সাথে। করমর্দন করলেন এবং আমার দিকে অতীব আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে বললেন, আপনাকে বেশ চেনা চেনা মনে হচ্ছে! কোথায় যেন দেখেছি! আমি বললাম, টিভিতে দেখেছেন। তিনি ও আচ্ছা বলে তখনকার আলোচনার ইতি টানলেন। আমি কিছুটা মনোক্ষুণ্ন হলাম। কারণ মাহমুদুর রহমান কিংবা গিয়াস উদ্দিন আল মামুন যতটা আন্তরিকতা, আগ্রহ এবং খোলামেলা ব্যবহার দেখালেন, সে তুলনায় মীর কাসেমের অভিব্যক্তি ছিল স্বতন্ত্র। আমার মনে হলো- লোকটি ভীষণ রাশভারী, বেরসিক অথবা মনেপ্রাণে প্রচণ্ড আওয়ামীবিদ্বেষী। কিন্তু আমার সেই ভুল ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
রোজার মাসে আমরা ইফতারি এবং রাতের খাবার একসাথে খেতাম। রোজার পর সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার একসাথে খেতাম। প্রথমে আমরা ছিলাম চারজন, পরে আমাদের সাথে যোগ হন অপর জামায়াত নেতা এ টি এম আজহার। তাকে গাজীপুর জেলা কারাগার থেকে কাসিমপুরে আনা হয় রমজানের ঠিক কয়েক দিন পর। আমরা ফজর ছাড়া বাকি নামাজ জামাতে আদায় করতাম। আর প্রতি বিকেলে আমাদের ভবনের সামনে খোলার মাঠে চেয়ার নিয়ে বসে গল্পগুজব করতাম- আবার মাঝে মধ্যে হাঁটাহাঁটি করতাম। দু-তিন দিন পর আমার সাথে অন্য সবার মতো মীর কাসেমের সম্পর্কও স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং আমরা পরস্পরের প্রতি সম্মান রেখে বন্ধুর মতো আচরণ করতে থাকি।
জেলখানার অখণ্ড অবসরে আমি প্রায়ই হাঁপিয়ে উঠতাম। নামাজ-কালাম, তসবিহ-তাহলিল, বই পড়া, ঘুম, ব্যায়াম- সব কিছু রুটিন মতো করার পরও হাতে অনেক সময়। মন ভার হলেই আমি বারান্দায় পায়চারি করতাম। মীর কাসেম তখন পরম স্নেহে আমাকে তার রুমে ডেকে নিতেন নতুবা আমার রুমে আসতেন। তিনি কথা বলতেন কম এবং শুনতেন খুব বেশি। তিনি আমার জীবন, দর্শন, রাজনীতি, ধর্ম, প্রেম-ভালোবাসা, সমাজ, সংসার, নির্বাচনী এলাকার খুঁটিনাটি নিয়ে মেধাদীপ্ত প্রশ্ন করতেন এবং সব কিছু শোনার পর সুন্দর বা আলহামদুলিল্লাহ ইত্যাদি বলেই ক্ষান্ত থাকতেন। কয়েক দিন পর আমি বুঝলাম মীর কাসেম সমাজের অন্য মানুষের মতো নন। এ আমি বুঝেছিলাম তার আচার-আচরণ, চালচলন, কথাবার্তা, খাদ্যাভ্যাস ও ইবাদত বন্দেগির ধরন দেখে। যেসব বিষয়ে আমার মনে প্রশ্ন জাগত, আমি নির্দ্বিধায় সেগুলো তাকে জিজ্ঞেস করতাম এবং তিনি সাধ্য মতো সুন্দর করে আমাকে সব কিছু বুঝিয়ে বলতেন।
জেলে যাওয়ার আগে বহুজনের কাছে বহুবার তার ব্যাপারে বহু কথা শুনেছি। তার নাকি আছে হাজার হাজার কোটি টাকা। তিনি জামায়াতের প্রধান অর্থ যোগানদাতা, দেশে-বিদেশে তার রয়েছে নামে বেনামে বহু প্রতিষ্ঠান। দেশের মধ্যে চলাফেরার জন্য তিনি সব সময় নাকি নিজস্ব হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন ইত্যাদি। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় গুজবটি হলো- তিনি নাকি যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছিলেন। আমি এসব গাঁজাখুরি গল্প বিশ্বাস করতাম না। আবার যারা ওসব বলত তাদের সাথে তর্কও করতাম না। কারণ, গুজবকারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্তর এত নিচু মানের যে, তাদের সাথে তর্ক করাটাই মস্তবড় এক নির্বুদ্ধিতা। আমি নিজে ব্যবসাবাণিজ্য করি সেই ১৯৯১ সাল থেকে। বাংলাদেশে কয়জন ধনী আছেন এবং কোন কোন ধনীর কী কী ব্যবসা আছে তা মোটামুটি নখদর্পণে। বাংলাদেশের ধনীদের বসবাসের কয়েকটি এলাকা আছে- তাদের মেলামেশার জন্য কয়েকটি ক্লাব আছে, তাদের ব্যক্তিগত বিলাসিতার গাড়ি, বাড়ি, নারী, বাগানবাড়ি, বন্ধু-বান্ধব, সভা-সমিতির এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নাম ধাম অনেকের মতো আমিও জানি। ওই সমাজে মীর কাসেম নামে কোনো লোক নেই। মিরপুরের কোনো এক জায়গায় পাঁচ কাঠার ওপর নির্মিত একটি পৈতৃক বাড়িতে স্বাধীনতার পর থেকেই তিনি অন্য ভাইদের সাথে ভাগাভাগি করে থাকেন।
মার্কিন রাজনীতি, অর্থনীতি ও লবিস্ট ফার্ম সম্পর্কে আমার ধারণা বাংলাদেশের অনেকের চেয়ে স্পষ্ট। কারণ ওই বিষয়ের ওপর আমার মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ফেলোশিপ রয়েছে। ওখানকার লবিস্ট ফার্মগুলো কী কী কাজ করে বা করতে পারে তা আগে জানতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল করবে? যুক্তরাষ্ট্র কেন- পৃথিবীর কোনো দেশের কি সেই ক্ষমতা আছে? আর আমরাই কি সেই আগের অবস্থায় আছি? যেখানে জননেত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন ধরেন না! বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে সাক্ষাৎকার দেন না, সফররত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত তারানকোর সাথে সাক্ষাৎ করেন না, সেখানে কোনো লবিস্ট ফার্ম কী করবে তা নিয়ে গল্প বানানোর নির্বুদ্ধিতা আমার সাজে না। মার্কিন সমাজের বেশির ভাগ নাগরিক দিন আনে দিন খায়। শতকরা ৯০ ভাগ লোকের সামনে পাঁচ হাজার ডলার নগদ ফেললে তারা ভয় পেয়ে যায়। কাজেই বাজারের গুজব নিয়ে কথা না বলে আমি কথা বলতাম ১৯৭১ সাল নিয়ে এবং জানার চেষ্টা করতাম ওই সময়ে তার ভূমিকা সম্পর্কে।
একদিন কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলাম, জেলে থাকার কারণে আপনার ব্যবসাবাণিজ্যের কি কোনো সমস্যা হচ্ছে না? তিনি বললেন, ঝামেলার মতো কোনো ব্যবসাবাণিজ্য নেই। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি ডেভেলপার কোম্পানি আছে। এখন ফ্ল্যাট ব্যবসায়ের বাজার মন্দা থাকায় নতুন কোনো প্রজেক্ট নেই। সেন্ট মার্টিন টেকনাফ রুটে দুটি জাহাজ চলে কেয়ারী সিন্দবাদ নামে। সিজনাল ব্যবসা। ভালো চলছে। অন্য দিকে নয়া দিগন্ত ও দিগন্ত টিভিতে অনেক পরিচালক আছেন আর উভয় কোম্পানিই পাবলিক লিমিটেড। কাজেই টেনশন নেই। ব্যবসাবাণিজ্য ছেলেরাই দেখাশোনা করে। অন্য দিকে ইবনে সিনা বা ইসলামী ব্যাংকে আমার পরিচালক পদ অনেকটা অনারারি ধরনের। এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক জামায়াত নেতার মতো আমিও ছিলাম পরিচালনা পরিষদে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর গঠনপ্রক্রিয়া এবং পরিচালন পদ্ধতি দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো নয়। যেমন- ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন যাদের এক টাকার মালিকানাও ব্যাংকটিতে ছিল না।
আমি মীর কাসেমের কথা শুনছিলাম এবং তার রুমের চার দিকে চোখ বুলাচ্ছিলাম। জামা-কাপড়, সাজসজ্জা, আসবাবপত্র কোনো কিছুই আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়নি, বিশেষ করে ডিভিশনপ্রাপ্ত অন্য কয়েদিদের তুলনায়। আমরা সবাই জেলখানার ভেতরের দোকান থেকে কিনে মিনারেল ওয়াটার খেতাম। অন্য দিকে মীর কাসেম খেতেন সাধারণ ট্যাপের পানি। কোনো বিদেশী ফলমূল খেতেন না। জাম্বুরা, আনারস, আমড়া, কলা প্রভৃতি দেশী ফল সময় ও সুযোগ মতো খেতেন। আমাদের সবার রুমে ছয়টি করে সিলিং ফ্যান ছিল। আমরা নিজেরা সব সময় সব ফ্যান ছেড়ে রাখতাম। মীর কাসেম ভুলেও সে কাজটি করতেন না- দরকার পড়লে একটি মাত্র ফ্যান ছাড়তেন। তার এই অবস্থা দেখে গিয়াস উদ্দিন আল মামুন প্রায়ই বলতেন- স্যার, এত টাকা দিয়ে কী করবেন! তিনি জবাব না দিয়ে শুধু হাসতেন। ইতোমধ্যে আমার সাথে তিনি আরো খোলামেলা এবং আন্তরিকতা দেখাতে লাগলেন। আর এই সুযোগে আমিও নানা রকম বেফাঁস কথা বলে তার মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করতাম। একদিনের একটি কথার জন্য আমার আজো আফসোস হয়, কেন আমি অমন করে সে দিন ওকথা বলতে গিয়েছিলাম। ঘটনার দিন বিকেলে আমি, মাহমুদুর রহমান ও মীর কাসেম আমাদের কারা প্রকোষ্ঠের সামনের মাঠটিতে চেয়ারে বসে গল্প করছিলাম। হঠাৎ আমি প্রশ্ন করলাম- ভাই, আপনার ওজন কত? তিনি বললেন, ৯২ কেজি? আমি বললাম, সর্বনাশ, তাড়াতাড়ি কমান! না হলে সিরিয়াস ঘটনা ঘটে যাবে। কী ঘটনা ঘটবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন। আমি বললাম- হাবভাবে মনে হচ্ছে আপনার ফাঁসি হবে! তিনি বললেন- তাতে কী? আর ফাঁসির সাথে ওজনের কী সম্পর্ক? আমি বেকুবের মতো বলে ফেললাম- শুনেছি শায়খ আবদুর রহমানের অতিরিক্ত ওজনের জন্য তার লাশ ফাঁসিতে ঝুলানোর একপর্যায়ে ঘাড় থেকে...। আমার কথা শুনে তিনি শিশুর মতো হো হো হেসে উঠলেন। তারপর হাসতে হাসতে আসমানের পানে তাকালেন এবং বললেন, এমপি সাহেব! সব ফয়সালা তো ওই আসমান থেকেই আসবে! আমার মুখের ওপর যেন বজ্রপাত হলো, বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। আমি অনেকটা অমনোযোগী হওয়ার ভান করে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকলাম; কিন্তু কিছুতেই নিজের দুর্বলতা গোপন রাখতে পারলাম না। আমি তার মুখপানে তাকালাম। আমার চোখ অস্বস্তিতে জ্বালাপোড়া করতে লাগল। আমি দুহাতে মুখ ঢেকে চোখের যন্ত্রণা আড়াল করতে চেষ্টা করলাম। তিনি তখনো আকাশের পানে তাকিয়ে ছিলেন।
এ ঘটনার পর আমি মনে মনে তওবা করলাম এবং সিদ্ধান্ত নিলাম জীবনে আর বেফাঁস কথা বলব না। মাহমুদুর রহমান, মামুন ও আমি বেশির ভাগ সময়ই রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা করতাম। আর মীর কাসেম শুধু শুনতেন। একদিন মামুন বললেন- স্যার! আমি আপনার মতো বেকুব লোক জিন্দেগিতে দেখিনি। আপনি তো বিদেশ ছিলেন। দেশে এসে ধরা দিলেন কোন? তিনি শিশুর মতো প্রশ্ন করলেন- বিদেশে কেন থাকব? মামুন আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন- শোনেন! কথা শোনেন! তিনি মামুনের কথার জবাবে বললেন- আমি তো নিজে জানি যে আমি কী করেছি! তাই নিজের কর্মের ওপর বিশ্বাস করেই দেশে ফিরেছিলাম। তা ছাড়া দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতিও আমার আস্থা ছিল। তার উত্তর শুনে মামুন মহা বিরক্ত হয়ে বলল- স্যার খান! আরেকটি রুটি খান। আমি আর মাহমুদুর রহমান মুচকি মুচকি হাসতে লাগলাম।
মীর কাসেমের দুটি অভ্যাস নিয়ে আমরা হাসাহাসি করতাম। প্রতি ওয়াক্ত নামাজে তিনি একেক সেট পোশাক পরতেন। আমরা চার ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করতে গিয়ে দেখতাম প্রতিবারই তিনি পোশাক পরিবর্তন করে আসতেন। মামুন ছিলেন দারুণ মুখপোড়া প্রকৃতির। বলতেন, কেন চার বেলা পোশাক পরিবর্তন করেন? তিনি বলতেন, চার বেলা নয় আমি তো পাঁচ বেলা পোশাক পরিবর্তন করি। একজন রাজা বাদশাহ বা সম্মানিত লোকের দরবারে আমরা যেমন পরিপাটি নতুন পোশাকে হাজির হই, তেমনি আল্লাহর দরবারে হাজির হতে গিয়ে আমি দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় পোশাক পরিবর্তন করি।
পোশাক পরিবর্তন ছাড়াও তার আরেকটি অভ্যাস ছিল- প্রতি বিকেলে নিচে নেমে সবার সাথে সালাম বিনিময় ও করমর্দন করা। আমাদের সেলের প্রধান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি রাস্তা চলাচলকারী আসামি ও অন্য সেলের কয়েদিদের সাথে সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। আসামিদের মধ্যে কিলার আব্বাসসহ বেশ কয়েকজনের বাড়ি ছিল মিরপুরে। তিনি তাদের সাথে একটু বেশি আন্তরিকতা দেখাতেন। মামুন টিপ্পনী কাটতেন- স্যার, মিরপুর থেকে ইলেকশন করবেন তো! তাই জেলে বসেই সব কিছু ঠিকঠাক করছেন। তিনি শান্তশিষ্ট ভঙ্গিতে সিরিয়াস হয়ে উত্তর দিতেন- আরে নাহ কোনো ইলেকশন না। আমি প্রতিবেশীর হক আদায় করার চেষ্টা করছি।
যে দিন তার কোর্টে হাজিরা থাকত, সে দিন সকালে তিনি আমাদের সবাইকে সালাম জানিয়ে যেতেন। ট্রাইব্যুনালে হাজিরার দিন তিনি সব সময় স্যুট নিয়ে যেতেন। ফিরে এসে বিভিন্ন বিষয় মজা করে বর্ণনা করতেন। তাকে আমরা মুখ কালো করে থাকতে দেখিনি কোনো দিন। হঠাৎ একদিন নাশতার টেবিলে দেখলাম মীর কাসেমের মন খুব খারাপ। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম- ব্যাপার কী? কী হয়েছে? তিনি বললেন- একটি বিষয় চিন্তা করতে করতে রাতে আর ঘুম হলো না। আর সে কারণেই রাত থেকে মনটা ভার হয়ে আছে। আমরা তার কথায় সিরিয়াস হয়ে গেলাম। প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- কী নিয়ে সারা রাত চিন্তা করলেন আর কেনোই বা এত মন খারাপ হলো? তিনি মুখ ভার করেই জবাব দিলেন- কাল রাতে একটি জার্নালে পড়লাম সাইবেরিয়া, আইসল্যান্ড ও অ্যানটার্কটিকার বরফের স্তর বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে দ্রুত গলে যাচ্ছে। এভাবে গলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মতো দেশ সমুদ্রের জলরাশির মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। বাংলাদেশ যদি বিলীন হয়ে যায় তবে, ১৭ কোটি মানুষের কী হবে? আমি পুরো বেকুব হয়ে গেলাম এবং তার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবলাম- হায়রে মানুষ! যার নিজের জীবনের যেখানে ঠাঁইঠিকানা নেই, সেখানে তিনি কিনা ভাবছেন অ্যানটার্কটিকার বরফ নিয়ে।
আমার ওয়াক্তের নামাজসহ তারাবির নামাজে তিনিই ইমামতি করতেন। নামাজ শেষে লম্বা মোনাজাত ধরতেন। আমরা ছাড়াও আরো সাত-আটজন সেবক কয়েদি আমাদের সাথে নামাজ আদায় করতেন। প্রতি দিনকার মোনাজাতে বলতেন- ‘হে আমাদের পরওয়ারদিগার। তুমি আমাদের কর্ম, আমাদের মন এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বেখবর নও। আমরা যদি অন্যায় করে থাকি- তাহলে আমাদের বিচার করো। আর যদি অন্যায় না করে থাকি, তবে তোমার রহমতের চাদর দিয়ে আমাদের আচ্ছাদন করে রাখো। তোমার উত্তম ফয়সালা, রহমত ও বরকত সম্পর্কে আমরা যেনো হতাশ হয়ে না পড়ি; এ জন্য আমাদের চিত্তকে শক্তিশালী করে দাও। ইয়া আল্লাহ! আমরা বিশ্বাস করি, পৃথিবীর কোনো জালেমের জুলুম কোনো দিন তোমার মাহবুব বান্দাদের একচুল ক্ষতি করতে পারেনি। হায় আল্লাহ! তুমি আমাদের তোমার মাহবুব বানিয়ে নাও। আমাদের এই কারাগার থেকে বের করো- তোমার দেয়া নেয়ামত- আমাদের পরিবার পরিজন সন্তানসন্ততিদের নিকট আমাদেরকে ফেরত যাওয়ার তওফিক দাও। এই কারাগারের চার দেয়ালের বেদনা ও অপমান থেকে আমাদের ও আমাদের পরিবারপরিজনকে রক্ষা করো। হে মালিক! বাংলাদেশের প্রতি তুমি রহম করো। দেশের ক্ষমতাসীনদের ন্যায়বিচার করার তওফিক দাও। আর আমাদের বিশ্বাসকে মজবুতি দান করো। তোমার রহমতের আশায় চাতক পাখির মতো আকাশ পানে তাকিয়ে থাকি! তোমার দরবারে হাত পাতি- হে আল্লাহ! তুমি আমাদের গুনাহসমূহ মাফ করো, আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতে অতি উত্তম প্রতিদান দাও এবং সর্বাবস্থায় আমাদের হেফাজত করো। আমিন।’
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

অস্তাচলের পথে যখন উকিল ও বিচারকরা by শফিক রেহমান

আগস্ট ১৯৪৭-এ ইনডিয়া যখন বিভক্ত হয় তখন পূর্ব পাকিস্তানমুখী আমাদের মতো খুদে পাঠকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছিল। আমরা ভাবছিলাম ঢাকায় গিয়ে কিভাবে কলকাতার দেব সাহিত্য কুটির কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক পূজা সংখ্যা এবং মাসিক কাঞ্চনজঙ্ঘা ও মাসিক প্রহেলিকা সিরিজের বইগুলো পাবো। এই বইগুলো বাধানোভাবে অর্থাৎ হার্ড কভারে প্রকাশিত হতো এবং তাতে সেই সময়ের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকরা লিখতেন। কভার এবং ভেতরের পৃষ্ঠায় ছবি আকতেন প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিটি ছবির নিচে ইংরেজিতে লেখা থাকত তার প্রথম নামটি : Protul, প্রতুল। ছোটদের চিত্তাকর্ষক এই দুটি সিরিজের লেখাগুলো ছিল রহস্য-রোমাঞ্চে ভরা এবং আমরা প্রতি মাসে তাকিয়ে থাকতাম নতুন বইটির প্রকাশনার জন্য।
যত দূর মনে পড়ে ১৯৫০ পর্যন্ত দেব সাহিত্য কুটিরের বইগুলো পূর্ব পাকিস্তানে আসত। এর মধ্যে একটি বই আমার কিশোর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল। সেই বইটির নাম ছিল অস্তাচলের পথে। বইটির লেখকের নাম মনে নেই। তবে কাহিনীর সারমর্ম মনে আছে।
এই বইয়ের প্রধান চরিত্র ছিল এমন এক ব্যক্তি যার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। কিন্তু সে ছিল সম্পূর্ণ নির্দোষ। ব্যক্তিটি কোনোভাবে জেলখানা থেকে পালিয়ে যায়। তারপর তাকে যারা দণ্ডিত করেছিল, সেই বিচারক, জুরি এবং সরকার পক্ষের উকিলের বিরুদ্ধে সে প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করে। একে একে তাদের হত্যা করতে থাকে। বইটির প্রচ্ছদে ছিল এক ব্যক্তি বড় সাড়াশি হাতে তাড়া করছে পলায়নপর বিচারক অথবা জুরিকে। তার সাড়াশির লক্ষ্য ছিল প্রাণভয়ে ভীত বিচারক অথবা জুরির গলা। প্রচ্ছদে বোঝার উপায় ছিল না পলায়নপর ব্যক্তিটি কে ছিলেন। বিচারক? নাকি কোনো জুরি? নাকি সরকারি কৌশুলি?
তবে ওই কিশোর বয়সে অস্তাচলের পথে বইটির এই প্রচ্ছদ এবং কাহিনীটি আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। আমি এতটুকু বুঝেছিলাম, অন্যায় বিচারে নিষ্পাপ কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দিলে, শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতিশোধস্পৃহা চরমে উঠতে পারে এবং পরবর্তী কোনো সময়ে সেই মামলায় অভিযোগকারী উকিল এবং রায় দানকারী বিচারক ও জুরিবৃন্দকে চরম খেসারত দিতে হতে পারে।
তাদের সবাইকে অস্তাচলের পথে যেতে হতে পারে।
অস্তাচল কি?
অস্তাচল হচ্ছে হিন্দু পুরাণে বর্ণিত একটি পাহাড়।
কল্পনা করা হয় সূর্য এই পাহাড়ের পেছনে অস্ত যায়।
বইটি পড়ার প্রায় ৬৭ বছর পরে সে রকমই একটি ঘটনা ঘটেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসে ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪-তে রিচার্ড এ. ওপেল জুনিয়র-এর লেখা একটি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল অ্যাজ টু মেন গো ফৃ, এ ডগেড এক্স-প্রসিকিউটর ডিগস ইন (As two Men Go Free, a Dogged Ex-Prosecutor Digs In, দুই ব্যক্তি যখন মুক্তি পেল, তখন এক নাছোড়বান্দা সরকারি কৌশুলি আত্মরক্ষার্থে গেড়ে বসল।) এখন পুরো রিপোর্টের ভাষান্তরটি পড়ুন।
ল্যামবারটন, নর্থ ক্যারোলাইনা। ১৯৮৩-তে একটি জঘন্য ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের যে মামলায় হেনরি ম্যাককালাম ও তার সৎ ভাই লিওন ব্রাউনকে তিন দশক জেলে কাটাতে হয়েছিল তার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি ছিল আদালতে একটি বৃলিয়ান্ট নাটকীয়তা প্রদর্শন।
রোবসন কাউন্টির ডিস্টৃক্ট এটর্নি (সরকারি কৌশুলি), সংক্ষেপে ডিএ (D.A.) জো ফৃম্যান বৃট-র উচ্চতা ছিল সাড়ে ছয় ফিট। তিনি আমেরিকার ডেডলিয়েস্ট ডিএ (Deadliest D.A.) বা সবচেয়ে প্রাণঘাতী সরকারি কৌশুলি নামে কুখ্যাত হয়েছিলেন। ওই মামলার শেষপর্যায়ে জুরিদের তিনি অনুরোধ করেন পাচ মিনিট দম বন্ধ করে থাকতে যাতে তারা কিছুটা হলেও বুঝতে পারেন হতভাগিনী ধর্ষিতা কি মৃত্যুযন্ত্রণা অনুভব করেছিল। এগারো বছর বয়সী একটি কিশোরী সাবৃনা বুলে-কে ধর্ষণের পর তার খুনিরা তার প্যান্টি গলায় একটি লাঠি দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। ফলে ওই কিশোরী সাবৃনার দম বন্ধ হয়ে মারা যেতে পাচ মিনিট সময় লেগেছিল।
মি. বৃটের ওই নাটকের পর জুরি রায় দেন অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি দোষী। বিচারক কর্তৃক ম্যাককালাম মৃত্যুদণ্ডে এবং ব্রাউন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। দুই দশকে এভাবেই মি. বৃট ৪০-টিরও বেশি মৃত্যুদণ্ড আদায় করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু ওই দুই ভাইয়ের অসংলগ্ন কথার ভিত্তিতে ওই দন্ড দুটি আদায় করা হয়েছিল। কয়েক দিন পরে সে সব কথা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তার পরিবর্তে ওই দুই ব্যক্তির স্বীকারোক্তি (Confessions কনফেশনস) এবং সিনকেয়ার নামে একজন ইনফর্মারের (যিনি এর আগে ওই দুই ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করেন নি) তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তারা দণ্ডিত হন। যদিও মামলা চলার সময়ে আদালতে ওই দুই ব্যক্তি বলেছিলেন, তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে স্বীকারোক্তিতে সই দিতে তাদের বাধ্য করা হয়েছিল।
গত সপ্তাহে সেই স্বীকারোক্তি ও সাক্ষ্য নাকচ করে দেওয়া হয়। ফলে ম্যাককালাম ও ব্রাউন সকল অভিযোগ থেকে মুক্তি পান এবং জেল থেকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
তাদের মুক্তির ফলে একটি বিচার বিভাগীয় ভয়ঙ্কর কাহিনীর (a judicial horror story) সমাপ্তি ঘটল। হত্যাকাণ্ডটির সঙ্গে ওই দুই ব্যক্তির জড়িত থাকার কোনো দৈহিক প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও তাদের একজনকে ডেথ রো-তে (Death Row বা কমনডেমড সেলে) পাঠানো হয়েছিল।
এই মামলাটি যখন চলছিল তখন ঠিক সেই সময়ে অপরাধ সংঘটিত হবার স্থান (ক্রাইম সিন, Crime scene) থেকে ১০০ গজেরও কম দূরে থাকত এক সিরিয়াল যৌন অপরাধী। তার নাম ছিল রস্কো আর্টিস। বিচারাধীন হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হবার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে ক্রাইম সিনের কাছেই প্রায় একই রকম পরিস্থিতিতে একটি টিনএজার মেয়েকে ওই সিরিয়াল যৌন অপরাধী খুন করেছিল। কিন্তু আর্টিসকে চলমান মামলায় সন্দেহভাজন রূপে উপস্থিত করানোর কোনো চেষ্টা কখনোই হয় নি।
পরিচয়ের বিভ্রান্তির ফলে নির্দোষ ব্যক্তি যে মৃত্যুদণ্ড পেতে পারেন এই মামলাটি সেটা প্রমাণ করে।
এই কেইস ফাইনালি শেষ হলেও, সমালোচকরা বলছেন, আমেরিকার এই অঙ্গরাজ্যে যেখানে বর্ণবৈষম্য প্রবল এবং দারিদ্র বেড়ে চলেছে, সেখানে হতভাগ্য গরিব মানুষরা যুগ যুগ ধরে একটি নিষ্ঠুর ফৌজাদারি বিচার পদ্ধতির (a merciless criminal justice system) শিকার হয়েছে। এই মামলার চূড়ান্ত পরিণতি মনে করিয়ে দিয়েছে কত নোংরা সেই বিচারব্যবস্থা।
এই নোংরামির প্রাণপুরুষটি হচ্ছেন জো ফৃম্যান বৃট, যিনি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে এবং ৬০ মিনিটে (60 Minutes) নিজের স্থান করে নিয়েছেন মানুষকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করাতে সর্বাধিক পারদর্শি ব্যক্তি রূপে। তবে বৃটের ওকালতিতে দণ্ডিত সকল ব্যক্তিদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত মাত্র দুইজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। (এই দুইজনের মধ্যে একজন ছিলেন মিজ ভেলমা বারফিল্ড (৫২) যিনি তার প্রেমিকের বিয়ারের মধ্যে বিষ মিশিয়ে তাকে হত্যা করেছিলেন।)
জো ফৃম্যান বৃটের বয়স এখন ৭৯। তিনি রিটায়ার করেছেন। মৃত্যুদণ্ড আদায়ে পারদর্শী রূপে এই অঙ্গরাজ্যে তিনি আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। এখন আদালতে ভিন্ন পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
বর্তমান ডিস্টৃক্ট এটর্নি জনসন বৃট-এর দাদা ছিলেন জো ফোরম্যান বৃটের পিতার কাজিন ভাই। জনসন বৃট বলেন, আমার পূর্বসূরী হয়তো অত্যাচারী ছিলেন। দোর্দন্ড প্রতাপে তিনি তার অফিস চালাতেন। মানুষজন তাকে ভয় করত। উকিলরা তাকে ভয় করত। তার ট্যাকটিকসে অন্য উকিলরা আতংকিত থাকত। সেভাবেই তিনি তার কাজ করতেন। কিন্তু আমাদের উচিত মানুষকে সম্মান দেখিয়ে কাজ করা কারণ তাতে অনেক বেশি সুফল পাওয়া যায়। মানুষকে গাড়িচাপা দেওয়ার ভয় না দেখিয়ে তাকে গাড়িতে তুললে ভালো ফল হয়। কিন্তু তার ট্যাকটিকসই ছিল মানুষকে ভয় দেখানো।
জনসন বৃটের এই কথার উত্তরে জো ফৃম্যান বৃট বলেন, ধরেই যদি নিই আমি ছিলাম একটা মূর্তিমান বাঘ তাহলে জনসন একটা মূর্তিমান বিড়াল। কি বলবেন? আমি মনে করি, যারা শুধু মদ খায় আর ফুর্তি করে, তাদের সঙ্গে জনসন বৃট খুব বেশি সময় কাটিয়েছে। আপিলে জনসন তাই কিছুই করতে পারেনি। ডিস্টৃক্ট এটর্নি রূপে সে আদালতে ফেল করেছে। তাই বিচারকরা আগের রায় উলটে দিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু আমি জানি ওই দুই অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকৃতই দোষী।
নর্থ ক্যারোলাইনা নিষ্পাপ তদন্ত কমিশন (North Carolina lnnocence Commission) এই আপিলের সূচনা করেছিল এবং এটা সমর্থন করেছিলেন জনসন বৃট।
এক সময়ে নথ ক্যারোলাইনাতে টেক্সটাইল ও তামাকের শিল্পব্যবসা রমরমা ছিল। কিন্তু সে সব পড়ে যাওয়ার পর এই রাজ্যে বেড়ে যায় ড্রাগসের ব্যবসা। এখনো এই রাজ্যে সবচেয়ে বেশি সহিংস অপরাধ সংঘটিত হয়। এখানে মানুষ তিন ভাগে বিভক্ত : শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ এবং আদিবাসী আমেরিকান ইনডিয়া। শ্বেতাঙ্গরা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও কৃষ্ণাঙ্গ ও আদিবাসীদের দাবিয়ে রেখেছে। ১৯৮৬-তে এক নিরস্ত্র ড্রাগস সন্দেহভাজনকে এক শ্বেতাঙ্গ ডেপুটি শেরিফ গুলি করে হত্যা করেছিল। কিন্তু অতি দ্রুত এবং অসম্পূর্ণ তদন্তের পর ডেপুটি শেরিফের বিরুদ্ধে মামলা খারিজ হয়ে যায়। এই ঘটনার দুই বছর পরে, এই ধরনের বৈষম্য এবং ফৌজদারি বিচার পদ্ধতিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য একটি স্থানীয় সংবাদপত্র অফিসে ১৯ জনকে জিম্মি করেছিল একজন আদিবাসী।
জনসন বৃট এবং সমালোচকরা বলছেন, রস্কো আর্টিস-কে যে তখন বিন্দুমাত্র সন্দেহ করা হয়নি সেটা খুবই আশ্চর্যের। কারণ, ধর্ষিতার মৃতদেহ যে সময় ক্ষেতের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল তার পাশেই থাকতো রস্কো আর্টিস। সবারই জানা ছিল তার আগেই সে জেল খেটেছিল এবং একাধিকবার সহিংস যৌন অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিল। ১৯৮৪-তে মামলার সময়ে সরকারি কৌসুলি জো ফৃম্যান বৃট একটা সিগারেট আলামত হিসাবে কোর্টে দেখিয়ে দাবি করেছিলেন, সেটি ওই ক্ষেতে পাওয়া গিয়েছিল এবং সেটি ছিল দুই খুনির মধ্যে একজনের।
কিন্তু ল্যাবরেটরিতে সাম্প্রতিক পরীক্ষায় ওই সিগারেটে রস্কো আর্টিসের ডিএনএ পাওয়া যাওয়ার পর ম্যাককালাম ও ব্রাউনের মুক্তিপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।
প্রথম কিশোরী সাবৃনা ধর্ষিতা ও খুন হবার চার সপ্তাহ পরে একইভাবে প্রায় একই স্থানে এক ধর্ষিতা এক টিনএজার মেয়ের মৃতদেহ পাওয়া যায়। এই ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ আর্টিস স্বীকার করেছিল এবং তার দন্ড হয়েছিল। সে এখনো জেলে আছে। কিন্তু আর্টিস যে দুই মেয়েকেই ধর্ষণ ও হত্যা করেছিল সেই সম্ভাবনা বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত হয়নি।
জনসন বৃট বলেন, রেড স্পৃংস শহরটি খুবই ছোট। এই ছোট একটি শহরে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রায় একই ধরনের দুটি খুন যদি হয়- তাহলে অতি স্বাভাবিকভাবে সন্দেহ করা উচিত ছিল দুটি খুনের মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে। জো ফৃম্যান বৃট ৯০ দিনের ব্যবধানে দুটি মামলাই পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু এই যোগসূত্রের সম্ভাবনার বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। এটা খুবই দুঃখজনক। ...ওই সময় ক্ষেতে বিয়ারের একটা ক্যান পাওয়া গিয়েছিল। তাতে যে দুটি আঙুলের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল তার একটি ছিল নিহত কিশোরী সাবৃনার। কিন্তু অপর ছাপটি কার আঙুলের ছিল? ম্যাককালামের? ব্রাউনের? আর্টিসের? নাকি সিনকেয়ারের? অতি দুঃখের বিষয় সেই টেস্ট তখন করা হয়নি।
জনসন বৃট বলেন, এই নিষ্ক্রিয়তার কথা তখন ম্যাককালাম-ব্রাউনের উকিলদের জানানো হয়নি।
ইনফর্মার সিনকেয়ার আদালতে বলেছিলেন, কিশোরীটিকে খুনের কথা ম্যাককালাম তার কাছে স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু তার আগে ম্যাককালাম তারই কাছে বলেছিলেন খুনের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। একটা লাই ডিটেক্টর মেশিন টেস্টে তখন ধরা পড়েছিল ম্যাককালাম সত্যি কথাই বলেছিলেন- অর্থাৎ, বিষয়টি তিনি জানতেন না। জনসন বৃট বলেন, এটা আরেকটা আশ্চর্য যে লাই ডিটেক্টরে ম্যাককালামকে টেস্ট করার ঘটনাটিও আদালতে তখন জানানো হয়নি।
জনসন বৃট বলেন, আরেকটি উদ্বেগের বিষয় যে, রেড স্পৃংস পুলিশ বহু বছর যাবত দাবি করে আসছিল যে তাদের কাছে কোনো ফিজিকাল এভিডেন্স নেই। অথচ এই বছরে ইনোসেন্স কমিশন কর্মকর্তারা থানায় গিয়ে ফিজিকাল এভিডেন্স আবিষ্কার করেন। খুনের স্থান থেকে সংগৃহীত চুলের স্যাম্পল তারা পান এবং তার কোনো ডিএনএ ম্যাককালাম অথবা ব্রাউনের সঙ্গে ম্যাচ করেনি।
ম্যাককালামের উকিল কেনেথ রোজ বলেন, যে স্বীকারোক্তি আদালতে পেশ করা হয়েছিল তার পুরোটাই ছিল বানোয়াট। ...বরং সেই স্বীকারোক্তিতে বোঝা যায় ম্যাককালাম ছিলেন আংশিকভাবে মানসিক প্রতিবন্ধী। ...এটা দেখে হতভম্ব হয়ে যেতে হয়, যে নিরপরাধ একটি ব্যক্তির জীবন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে জেনেও জো ফৃম্যান বৃটের মতো ব্যক্তিরা বিভিন্ন আলামত আমলে নেননি।
জো ফৃম্যান বৃট এখন বলেছেন, এসব কিছু আমার মনে নেই। ডিএনএ এভিডেন্সকে কেন যে এত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সেটা আমি বুঝি না। যখনই কোর্টে আমরা জেরা শুরু করেছি তখনই তাদের উকিলরা বলতো ওরা মানসিক প্রতিবন্ধী! এটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হতো। ...আদালতে আমি যেসব যুক্তিতর্ক করেছি তার দরকার ছিল।
ল্যামবারটনের জনৈক উকিল উডি বাওয়েন বারো বছর জো ফৃম্যান বৃটের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। বাওয়েন বলেন, ম্যাককালাম ও ব্রাউনকে তিন দশক জেলবন্দী রাখাটা হয়েছে একটি অবর্ণনীয় মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। ...জো ফৃম্যান বৃটকে ভয় করতেন অন্য সব উকিলরা।
আরেকজন উকিল এংগাস টমসন বলেন, যখন কোনো ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তখন বিচারক তার রায়ের সমাপ্তি টানেন তাকে এই বলে যে, তোমার আত্মার প্রতি ঈশ্বরের করুণা বর্ষিত হোক। তারপর বিচারক আদালতের বেইলিফ বা নাজিরকে বলেন, এই ব্যক্তি এখন আপনার হেফাজতে। আমি (টমসন) আশা করি এখন জো ফৃম্যান বৃটের আত্মার প্রতি ঈশ্বর করুণা বর্ষণ করবেন।
কোনো ক্ষতিপূরণ সম্ভব না
নর্থ ক্যারোলাইনার নিয়ম অনুযায়ী অন্যায়ভাবে দণ্ডিত হবার ক্ষতিপূরণস্বরূপ ম্যাককালাম ও ব্রাউন উভয়েই ৭৫০,০০০ ডলার পাবেন। কিন্তু তাতে তাদের ৩০ বছরের জেলজীবনের কোনো ক্ষতিপূরণ সত্যিই কি হবে?
এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে ম্যাককালামের উকিল কেনেথ রোজ লিখেছেন, ম্যাককালাম ও ব্রাউন শেষ পর্যন্ত যে মুক্তি পেয়েছেন তাতে কেউ কেউ আশা করছেন আমি সন্তুষ্ট হবো - এমনকি খুশিও হবো। কিন্তু সত্যটা হচ্ছে এই যে আমি ক্রুদ্ধ। আমি প্রচণ্ড রেগে আছি। কারণ, আমরা এমন একটা পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে পুলিশ মিথ্যা বলতে পারে, নির্দোষ মানুষকে অত্যাচার করে বানোয়াট স্বীকারোক্তি আদায় করতে পারে, মিথ্যা সাক্ষী হাজির করাতে পারে, ভুয়া ইনফর্মারকে আদালতে আনতে পারে। আর সেই আদালতে প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হতে পারে বিভিন্ন কারণে। আর তার ফলে নিরপরাধ ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। ...আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। যখন জেগে থাকি এবং এই মামলার বিস্তারিত বিষয়গুলো চিন্তা করি তখন ভাবি, ম্যাককালামের মতো আরো কত মানুষ ডেথ সেলে আছেন যারা ব্যাকুলভাবে সাহায্যের অপেক্ষায় আছেন যে সাহায্য হয়তো কখনোই তারা পাবেন না।
বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি
কেনেথ রোজের এই ক্ষোভে হয়তো বাংলাদেশের মানুষ নিজ দেশেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন। বাংলাদেশে হাই প্রোফাইল পলিটিকাল বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড এবং সেসব কার্যকর হওয়া অথবা না হওয়া নিয়ে গণদাবি হয়, টকশো হয়, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। কিন্তু লো প্রোফাইল অথবা নো প্রোফাইলের সাধারণ মানুষের মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না।
বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা যে অস্তাচলে যাচ্ছে সেই কথা বলা হয় না।
সবচেয়ে বড় কথা যেহেতু হেনরি ম্যাককালামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে দেরি হয়ে গিয়েছিল এবং যেহেতু এই সময়ের মধ্যে ডিএনএ শনাক্তকরণ পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়, সেহেতু আমেরিকার মতো উন্নত দেশে ত্রিশ বছর পরে জানা গেল ম্যাককালাম ও ব্রাউন নির্দোষ ছিলেন।
যদি ম্যাককালামের মৃত্যুদণ্ড আগেই কার্যকর হয়ে যেত তাহলে এই সত্যটা কোনো দিনই জানা যেত না। আর তাই কোনো অপরাধেই অপরাধীর শাস্তি রূপে মৃত্যুদণ্ড গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার পরে ভুল সংশোধনের কোনো উপায়ই থাকে না।
তখন শুধু থাকে উকিল, বিচারক ও জুরিবৃন্দকে অস্তাচলে পাঠানোর অদম্য প্রতিশোধস্পৃহা।
facebook.com/Shafik Rehman Presents
৫ নভেম্বর, ২০১৪

মাসকাদজার শতকে নির্ভার জিম্বাবুয়ে (৩৩১/৫)

খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে আজ বুধবার বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ের মধ্যকার টেস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচের তৃতীয় দিনে প্রথম ইনিংসে জিম্বাবুয়ের সংগ্রহ ৫ উইকেটে ৩৩১ রান। বাংলাদেশের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান পেয়েছেন ৩টি উইকেট। জিম্বাবুয়ের হ্যামিল্টন মাসকাদজা ১৫৪ রান ও রেগিস চাকাবভা ৭৫ রানে অপরাজিত থেকে তৃতীয় দিনের খেলা শেষ করেছেন। মাসকাদজা দ্বিতীয় দিনের ১৫ রান নিয়ে খেলতে নেমে আজ তৃতীয় দিনে ১৭টি ৪ এবং দুটি ৬ মেরে এই রান পূর্ণ করেন। এটি ছিল তার ক্যারিয়ারের ৪র্থ শতক। এ ছাড়া চাকাবভা ১০টি ৪ মেরে ৭৫ রান তুলতে সক্ষম হন। এই জুটি ৪৭.১ ওভারের পার্টনারশীপে ১৪২ রান তোলেন। খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে ম্যাচের দ্বিতীয় দিনে এক উইকেট হারিয়ে ৫৩ রান তুলেছিল জিম্বাবুয়ে। তৃতীয় দিন খেলতে নামার পর শুরুতেই অতিথি শিবিরের ওপর আঘাত হানেন বোলার তাইজুল। ব্যক্তিগত ২৫ রানে এবং দলীয় ৮৪ রানের মাথায় তাইজুলের বলে তামিমের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন ব্রায়ান চারি। আগের দিন সিকান্দার রাজাকেও আউট করেছিলেন তিনি। এরপর ভালোভাবেই মাসকাদজা-টেইলর জুটি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এই জুটি ভয়ংকরও হয়ে উঠেছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে গেল দৃশ্যপট। সাকিব আল হাসান বল হাতেই কাঁপিয়ে দিলেন জিম্বাবুয়েকে। সাকিবের বলটি লেগের দিকে ঘুরাতে গিয়েই ফাঁদে পা দেন জিম্বাবুয়ের সেরা ব্যাটসম্যান টেলর। তৃতীয় উইকেটে মাসকাদজার সাথে দুর্দান্ত খেলতে থাকা অতিথি অধিনায়ক ব্রেন্ডন টেলরকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান সাকিব। তার বলে ব্যক্তিগত ৩৭ রানে মমিনুলের কাছে ক্যাচ দিয়েছেন টেলর। টেলরের পর সাকিবের দ্বিতীয় শিকার হন ক্রেইগ আরভিন। তিনি ১৭ রান করে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিযে সাঝঘরে ফিরে যান। সাকিবের তৃতীয় শিকার এল্টন চিগুম্বরা মাত্র ১ রানে মমিনুলের হাতে ক্যাচ তুলে দেন।৩৮ রানেই সাকিব তুলে নেন ৩ উইকেট। তৃতীয় দিনের শুরুতেই দুটি ক্যাচ মিস করেছে টাইগাররা। দুইবারই শামসুর রহমান শুভর হাত থেকে জীবন পেয়েছেন জিম্বাবুয়ের অন্যতম ব্যাটসম্যান মাসাকাদজা। ব্যক্তিগত ১৫ রানের মাথায় রুবেলের বলে ক্যাচ তুলে দেন তিনি। দ্বিতীয় বার ১৯ রানের মাথায়। এবার বোলার ছিলেন তাইজুল ইসলাম। উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিমও হাতছাড়া করেন স্ট্যাম্পিংয়ের দারুণ এক সুযোগ। এর আগে তামিম-সাকিবের জোড়া শতকে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস ৪৩৩ রানে শেষ হয়। ৩ টেস্টের সিরিজে ১-০ তে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। সূত্র : বাসস।

টাওয়ার হ্যামলেটসে মেয়র লুৎফর রহমানের ওপর নজর রাখবে সরকার

টাওয়ার হ্যামলেটসের বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মেয়র লুৎফর রহমানের কাজকর্মের ওপর নজর রাখবে বৃটিশ সরকার। এ জন্য তিনজন পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের কাউন্সিলের কাজকর্ম নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে ওই কাউন্সিলে সুশাসনের অভাব রয়েছে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। এতে আরও বলা হয়, বৃটেনের কমিউনিটি বিষয়ক মন্ত্রী এরিক পিকলস বলেছেন, এই কাউন্সিলে নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে। লন্ডনের বাঙাালি অধ্যুষিত এই কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র হলেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত লুৎফর রহমান।  এরিক পিকলস মঙ্গলবার পার্লামেন্টে বলেন, এই কাউন্সিলের দুটি কার্যক্রম দেখাশোনার জন্য তিনি তিনজন কমিশনার নিয়োগ করছেন। এই কমিশনাররা ২০১৭ সালের ৩১শে মার্চ পর্যন্ত কাউন্সিলের অনুদান এবং ভূ-সম্পত্তি বিক্রি সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখাশোনা করবেন। বিবিসির বিশ্লেষক কার্ল মার্সার বলেন, এই পরিদর্শকরা এরিক পিকলসের চোখ-কান হিসেবে কাজ করবেন এবং নির্বাচিত মেয়র লুৎফর রহমানের প্রায় সব কাজকর্মের ওপর নজর রাখার অধিকার তাদের থাকবে। অবশ্য মন্ত্রীর প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে দু’সপ্তাহের মধ্যে টাওয়ার হ্যামলেটসকে তাদের জবাব জানাতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইনী চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। প্রাইসওয়াটারকুপার্স (পিডব্লিউসি) নামে একটি একাউনটেন্সি ফার্মের দেয়া ২০০ পৃষ্ঠার রিপোর্টে বলা হয়, মেয়র লুৎফর রহমানের সাথে সম্পর্কিত একটি কোম্পানির কাছে পপলার টাউন হল নামে একটি সরকারি ভবন বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এরিক পিকলস বলেন, এ ঘটনা বিরল। এখানে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের দরকার হলো। এর ফলে অনুদান এবং ভূ-সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে যে নীতি অনুসৃত হয় - তা লংঘিত হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়। এছাড়া এই কাউন্সিল কিছু অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে সরকারি অর্থ অনুদান দিয়েছে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। এর পর লুৎফর রহমান এক বিবৃতিতে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, পিডব্লিউসির এই রিপোর্টে প্রক্রিয়াগত কিছু ত্রুটি তুলে ধরা হয়েছে যা দুঃখজনক। আমরা এই রিপোর্ট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবো এবং আমাদের প্র্রক্রিয়া শক্তিশালী করবো। বিবৃতিতে আস্থা প্রকাশ করা হয় যে, অনিয়মের কোন অভিযোগ প্রমাণিত হবে না। এর আগে লুৎফর রহমান টুইটার বার্তায় জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে একটি বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া শিগগিরই জানানো হবে।

মিছিল সভা বন্ধ করার অধিকার কারো নেই : ড. কামাল

মিছিল সভা বন্ধ করার অধিকার কারো নেই। এই অধিকার শহিদরা আমাদের দিয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও তথ্যমন্ত্রীর দয়ায় হয়নি। এটাও শহিদরা আমাদের দিয়েছে।
তিনি বলেন, আগামীতে রাজপথে মিছিল হবে, বিক্ষোভ হবে, এগুলো রুখার অধিকার কারো নেই। এই অধিকার সংবিধান কাউকে দেয়নি।
আজ বুধবার জাতীয় প্রেস কাব অডিটরিয়ামে জেএসডির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনাসভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

অপহরণ নাটক সাজিয়ে বাবার কাছে মুক্তিপণ দাবি

নিজে অপহৃত হওয়ার নাটক সাজিয়ে বাবার কাছ থেকে মুক্তিপণ হিসেবে দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে কয়েক বন্ধুসহ ধরা পড়েছে এক কিশোর। ফরিদপুরের বাসিন্দা ওই কিশোরকে রাজবাড়ী থেকে আটক করা হয়।  ওই কিশোরের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায়। সে উপজেলার একটি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। তার বাবা একটি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। পাশাপাশি তিনি চালের ব্যবসা করেন।
পুলিশ ও ওই কিশোরের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কয়েকজন বন্ধু নিয়ে রাজবাড়ীর বসন্তপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে চলে যায় ওই কিশোর। সেখান থেকে এক বন্ধুকে দিয়ে সে তার বাবার মোবাইলে ফোন করায়। তার বন্ধু বলে, ‘আপনার ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। আর তাকে জীবিত পেতে হলে দিতে হবে দুই লাখ টাকা।’ মোবাইল ফোন নম্বরটি ট্র্যাক করে পুলিশ গতকাল রাতেই ওই কিশোরকে উদ্ধার করে।
পুলিশ জানায়, ফোন পাওয়ার পরপরই ওই কিশোরের বাবা বিষয়টি নগরকান্দা থানা পুলিশকে জানান। পুলিশ মোবাইল ট্র্যাক করে গতকাল রাত ১২টার দিকে রাজবাড়ীর সুলতানপুর ইউনিয়ন কার্যালয়-সংলগ্ন বাজার থেকে ওই কিশোরকে উদ্ধার করে। নগরকান্দা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুকান্ত দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, ওই কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই অপহরণের নাটকের বিষয়টি বের হয়ে আসে। পরে তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার অপর দুই সহযোগীকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে একজন একটি বেকারির কর্মচারী ও অপরজন ফরিদপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র। ওই কিশোরের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে তার কয়েকজন বন্ধু নিয়ে দুষ্টুমি করতে গিয়ে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ করে ফেলেছে।’
নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফসারউদ্দিন জানান, আটক করা তিনজনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা না করে আজ বুধবার বিকেলে তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে সোপর্দ করা হয়।
আদালতের বিচারক ও নগরকান্দা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবদুল আজিজ জানান, দোষী সাব্যস্ত করে তিনজনকেই ছয় সপ্তাহের বিনা শ্রম কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও এক সপ্তাহ বেশি কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

সুন্দরগঞ্জে পুত্র বধুকে ধর্ষণ : শ্বশুর আটক by শহিদার রহমান জাহাঙ্গীর

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় পুত্রবধুকে ধর্ষণ মামলায় শ্বশুর আবুল হোসেনকে বুধবার গ্রেফতার করেছে পুলিশ।  
জানা যায়, গত ৫ বছর  পূর্বে শান্তিরাম গ্রামের সামাদের কন্যা সালমার সঙ্গে কঞ্চিবাড়ি গ্রামের আবুল হোসেনের পুত্র হামিদুলের বিয়ে হয়। হামিদুল জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় অবস্থান করাকালীন গত ৯ অক্টোবর রাতে আবুল হোসেন পুত্রবধুকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।
ঘটনাটি এলাকাবাসি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করলে গত ৩ নভেম্বর সালমা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় পুলিশ আবুল হোসেনকে গ্রেফতার করে।

‘পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগে ফাঁসি কার্যকর বেআইনী’

আপিল বিভাগের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগে ফাঁসি কার্যকর করা বেআইনী উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের ফাঁসির দ-ের বিষয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ এবং রিভিউ নিষ্পত্তির আগে রায কার্যকর হবে বেআইনী। রিভিউ করতে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে আমরা রিভিউ দাখিল করব। এর আগে রায় কার্যকর করা আইনসম্মত হবে না। বুধবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্টে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, যেহেতু আপিলে বিভক্তি রায় এসেছে সেজন্য রিভিউ করা আরও বেশি জরুরি। রিভিউ করলে কামরারুজ্জামান খালাস পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে এডভোকেট নজরুল ইসলাম, এডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, এডভোকেট সাইফুর রহমান, শিশির মুহাম্মদ মনির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

রিভিউ আবেদনের শুনানির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত : খন্দকার মাহবুব

জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলার প্রধান আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, রিভিউ আবেদনের শুনানির পর রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর রায় কার্যকর হবে না।

আজ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েসনের অডিটরিয়ামে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। এসময় সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির উপস্থিত ছিলেন।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমরা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার রিভিউ আবেদনের শুনানি করেছি। কিন্তু এ বিষয়ে আদেশ এখনো পাইনি। সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদে রিভিউ আবেদনের ক্ষমতা আছে। এই অনুচ্ছেদ ছাড়াও দেশের সর্বোচ্চ আদালত ন্যায় বিচারের জন্য বিষয়টি দেখবে। আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর রিভিউ আবেদন করব।
যে সোহাগপুর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে সে সম্পর্কে খন্দকার মাহবুব সরকারকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন করেন, যদি আপনারা জানতেন তাহলে ৪৩ বছর পর এ করুণ কাহিনী এলো কেন?
তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালকে একদিন বলা হয় ইন্টারন্যাশনাল, আরেকদিন ডমিস্টিক। বর্তমান ট্রাইব্যুনাল দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত।

কারফিউর মধ্যেই খণ্ডযুদ্ধ কাশ্মীরে

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিভিন্ন জেলায় গতকালও কারফিউ
ভেঙে বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় বিভিন্ন
স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। ছবিটি
গতকাল রাজধানী শ্রীনগর থেকে তোলা। এএফপি
ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর উপত্যকা গতকাল রোববারও থমথমে ছিল। কারফিউ সত্ত্বেও সেখানকার বিভিন্ন জেলায় জনতা-পুলিশ সংঘর্ষ অব্যাহত। নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা গতকাল বিকেল পর্যন্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। তাঁদের মধ্যে এক পুলিশ কর্মীও রয়েছেন। তাঁকে গাড়িসহ খরস্রোতা ঝিলম নদে ফেলে দেওয়া হয়। গত দুদিনের হিংসাত্মক ঘটনায় আহত ব্যক্তির সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে শতাধিক নিরাপত্তারক্ষী। তিনজন পুলিশ কর্মী তাঁদের অস্ত্রসহ নিখোঁজ হয়ে যান। গতকাল তাঁদের মধ্যে দুজন ফিরে এসেছেন বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। হিজবুল মুজাহিদীন কমান্ডার বুরহান ওয়ানি গত শুক্রবার নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হওয়ার পর শনিবার থেকে উপত্যকার দক্ষিণের জেলাগুলোতে অশান্তি শুরু হয়।
বুরহানের দাফনে হাজার হাজার মানুষ যোগ দেয়। বিভিন্ন স্থানে উত্তেজিত জনতার সঙ্গে শুরু হয় নিরাপত্তা বাহিনীর খণ্ডযুদ্ধ। সবচেয়ে বেশি উপদ্রুত অনন্তনাগ, পুলুয়ামা, সোপোর ও কুলগাম জেলা। এসব জেলায় কয়েকটি থানাও আক্রান্ত হয়। লুট হয় অস্ত্র। পুলিশের গুলিতে শনিবারই মারা যান ১১ জন। অশান্ত অবস্থা থাকে গতকাল পর্যন্তও। শাসক দল পিডিপি ও বিজেপির কয়েকটি অফিস আক্রান্ত হয়। দেদার পাথর ছোড়া হয় পুলিশকে তাক করে। পুলিশের গাড়িতেও আগুন লাগানো হয়। গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং দিল্লিতে তাঁর বাসভবনে কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকেন। শনিবারই নিরাপত্তা বাহিনীর দেড় হাজার বাড়তি সদস্য উপত্যকায় পাঠানো হয়। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মনে করে, উপত্যকায় পাকিস্তানি এজেন্টরা পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তুলতে যাবতীয় ইন্ধন জোগাচ্ছে। গতকালের বৈঠকে ঠিক হয়েছে, কোনোভাবেই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার সব রকম চেষ্টা করা হবে। গুলি চালানো হবে একেবারে উপায় না থাকলে। কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ভেঙ্কাইয়া নাইডু গতকাল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, নিহত বুরহান সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের নেতা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে হা-হুতাশ করার কোনো কারণই নেই। সমবেদনাও নেই। নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে শনিবারই গোটা উপত্যকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
গতকাল পর্যন্ত তা বন্ধই ছিল। বন্ধ ছিল জম্মু-শ্রীনগর জাতীয় সড়ক ও উপত্যকার রেল, উপত্যকার সব স্কুল-কলেজ। বিভিন্ন পরীক্ষাও স্থগিত রাখা হয়েছে। শ্রীনগরে তেমন কোনো হিংসাত্মক ঘটনা না ঘটলেও শহরের পুরোনো এলাকাগুলোতে উত্তেজনা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি সবাইকে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। পর্যটকেরা আটকে পড়েছেন। আশা করা হচ্ছে, আজ সোমবার থেকে জাতীয় সড়ক খুলে দেওয়া হলে সড়ক পথেও পর্যটকেরা জম্মু ফিরে যেতে পারবেন। উপত্যকার বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা হরতালের যে ডাক দিয়েছিলেন, তা সোমবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে দোকানপাটসহ অফিস-আদালত ওই দিন পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। সৈয়দ আলি শাহ গিলানি, মীরওয়াইজ ওমর ফারুক ও ইয়াসিন মালিককে শনিবার থেকেই গৃহবন্দী রাখা হয়। রাজ্য প্রশাসন ঠিক করেছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত তাঁদের নজরবন্দী রাখা হবে। এই সময়ে ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা অমরনাথ যাত্রা করে থাকেন। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে তীর্থযাত্রীদের নির্ভর করতে হয় কাশ্মীরি মুসলমানদের ওপর। শনিবার এই যাত্রা বন্ধ করে দেওয়া হয় নিরাপত্তার স্বার্থে। গতকাল অবশ্য যাত্রা ফের শুরু হয়েছে।

‘ইরাক যুদ্ধ অবৈধ ছিল’

জন প্রেসকট
ইরাক যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ বলে মন্তব্য করলেন যুক্তরাজ্যের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকট। ২০০৩ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ওই যুদ্ধে ব্রিটিশরাও অংশ নেয়। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ওই আগ্রাসনের দীর্ঘ ১৩ বছর পর এসে সানডে মিরর পত্রিকার একটি লেখায় প্রেসকট এই মন্তব্য করেন। এতে তিনি আরও লেখেন, তাঁকে বাকি জীবন ‘বিপর্যয়কর’ এ সিদ্ধান্ত মাথায় নিয়ে কাটাতে হবে। লর্ড প্রেসকট বলেন, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের মতো গভীর দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে তিনি এখন একমত যে ওই যুদ্ধ ছিল অবৈধ। তা সত্ত্বেও ইরাক আগ্রাসনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।
প্রেসকট বলেন, ২০০৩ সালের মার্চে ইরাক অভিযান শুরুর আগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে পাঠানো ব্লেয়ারের বার্তা, ‘যাই ঘটুক, আমি আপনার সঙ্গে আছি’—ছিল ‘বিধ্বংসী’। প্রেসকট বলেন, ‘এমন একটা দিনও কাটে না, যেদিন যুদ্ধে যাওয়ার ওই সিদ্ধান্তের কথা আমি ভাবি না। যেসব ব্রিটিশ সেনা দেশের জন্য যুদ্ধে অংশ নিয়ে জীবন দিয়েছেন বা আহত হয়েছেন; সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের মাধ্যমে আমাদের খোলা প্যান্ডোরার বাক্সের কারণে যে ১ লাখ ৭৫ হাজার বেসামরিক ইরাকি নিহত হয়েছে তাদের কথা না ভেবে এক দিনও পার হয় না।’ ওই যুদ্ধের জন্য দলের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের দুঃখপ্রকাশকে অভিনন্দন জানান প্রেসকট। প্রেসকটের ওই মন্তব্যের আগে গত বুধবার সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতে ইরাকে হামলার যৌক্তিকতা ও ফলাফল নিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘চিলকট রিপোর্ট’ নামের ঐতিহাসিক এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনি ব্লেয়ারকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
ইরাক যুদ্ধে হতাহত ব্রিটিশ সৈন্যদের পরিবার ব্লেয়ারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে মিলে যুক্তরাজ্য ইরাকে যে হামলা চালিয়েছে, সেটার কোনো যৌক্তিক বিবেচনার ভিত্তিতে ছিল না। দেশটিকে নিরস্ত্র করার শান্তিপূর্ণ উপায় পাশ কাটিয়ে ওই হামলা চালানো হয়। ভবিষ্যতে কোনো দেশে হস্তক্ষেপ বা হামলার আগে এই প্রতিবেদনের শিক্ষাগুলো বিবেচনায় রাখতে যুক্তরাজ্য সরকারকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। ইরাকে হামলায় যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা অনুসন্ধান ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সরকারের ভূমিকা তদন্তে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা স্যার জন চিলকটকে প্রধান করে ২০০৯ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ সদস্যের ওই কমিটি দীর্ঘ সাত বছর পর তাদের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

‘হিলারি ও ট্রাম্প জনপ্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছেন’

হিলারি ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন ইতিহাসবিদ ডরিস কিয়ার্ন গুডউইন বর্তমান সময়কে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, জনগণ সন্দেহের ঊর্ধ্বে বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব চায়। কিন্তু আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই জনপ্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমস-এ গুডউইনকে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা উল্লেখ করা হয়। টানা চার দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুলিশের গুলিতে দুজন কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হওয়ার পর থেকে প্রতিবাদ চলছে। কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে ডালাস নগরে পাঁচ পুলিশ সদস্য হত্যার বিষয়টি। বর্ণবাদ, সন্ত্রাস, সহিংসতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন অস্থির সময় পার করছে। এমন অবস্থায় মার্কিন জনগণের দৃষ্টি যোগ্য নেতৃত্বের দিকে। সাধারণ জনগণের আকাঙ্ক্ষা—এমন ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন, যিনি সব ধরনের অস্থিরতা সামাল দিতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্রে চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের দৃষ্টি এখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের দিকে। কিন্তু উভয় প্রার্থী জনগণের প্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি তাঁরা নিজ দলকেই ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি। ইতিহাসবিদ গুডউইন বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করার সম্ভাবনা ছিল, ছিল সুযোগও। কিন্তু তিনি ভিন্ন পথে হেঁটেছেন।
ঐক্যের বদলে অনৈক্যকে আলিঙ্গন করেছেন তিনি। গুডউইন বলেন, হিলারির ই-মেইল ইস্যু, এফবিআই প্রতিবেদন প্রভৃতি নিয়ে জনগণের মধ্যে, এমনকি তাঁর সমর্থকদের মধ্যেও সন্দেহ-সংশয় প্রবল হয়েছে। হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। সেখানে দলের বাইরের লোকদের ঐক্যবদ্ধ করা তো তাঁদের জন্য আরও দুরূহ ব্যাপার। সংগত কারণে দুজনের কেউই এখন পর্যন্ত জনগণের ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেননি। হিলারি কৃষ্ণাঙ্গদের কাছে জনপ্রিয়। তবে শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা নিয়ে হিলারির প্রতি দলীয় সমর্থকদের আস্থার সংকট রয়েছে। হিস্পানিক, অভিবাসী ও মুসলমানদের নিয়ে বিতর্কিত কথাবার্তা বলে ট্রাম্প ইতিমধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। উত্তেজনা ও অসন্তোষ দূর করার পরিবর্তে তিনি লাগামহীন মন্তব্য করে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছেন বলে মনে করা হচ্ছে। কৃষ্ণাঙ্গ ও নাগরিক আন্দোলনের লোকজনের কাছে হিলারি জনপ্রিয় হলেও তাঁকে নিয়ে তাঁর দলের সমর্থকদের মধ্যে একধরনের সন্দেহ কাজ করছে। অনেকেই তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির প্রতিনিধি মনে করে। এর ওপর যোগ হয়েছে ই-মেইল কেলেঙ্কারি। সব মিলিয়ে তাঁকে নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় বাড়ছে। ট্রাম্পের সমর্থক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ফ্রেড ডিলুকা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, পুলিশ হত্যার পর ট্রাম্পের বক্তব্য শতভাগ খাঁটি; যদিও ট্রাম্পের অন্য সব মন্তব্য ও বক্তব্য জনগণকে উদ্বিগ্ন করার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করেন তিনি। হিলারিকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না বলেও মন্তব্য সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার।

‘বাবার মতো শক্ত মানুষ আমি দেখিনি’ -কামারুজ্জামানের ছেলে হাসান ইকবাল

>>জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান কারাগারে সুস্থ, স্বাভাবিক ও শক্ত আছেন বলে দাবি করেছেন তাঁর ছেলে হাসান ইকবাল। তিনি বলেন, ‘বাবার মতো শক্ত মানুষ আমি দেখিনি।’ আজ বুধবার সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কামারুজ্জামানের সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যরা দেখা করেন। সেখান থেকে বেরিয়ে ছেলে হাসান ইকবাল সাংবাদিকদের কাছে এমন দাবি করেন। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর পরিবারের ১০ জন সদস্য আজ সকাল ১০টার আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসেন। কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তাঁরা ভেতরে যান। তাঁরা কামারুজ্জামানের সঙ্গে আধঘণ্টা সময় কাটান। পরিবারের সদস্যরা সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট থেকে বেলা ১১টা আট মিনিট পর্যন্ত ভেতরে ছিলেন। কারাগারে সাক্ষাৎ করেছেন কামারুজ্জামানের স্ত্রী নুরুন্নাহার, তাঁর চার ছেলে হাসান ইকবাল, আহমেদ হাসান, ইকরাম হাসান ও হাসান ঈমাম, মেয়ে আফিয়া নূর, ভাই নাজিরুজ্জামান ও আবদুল্লাহ আল মাহাদী, বোন মোহসীনা বেগম ও ভাগনে আবদুল আলিম। সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে হাসান ইকবাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাবা সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন। বাবার মতো শক্ত মানুষ আমি দেখিনি।’ পরে হাসান ইকবাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, কামারুজ্জামান তাঁদের বলেছেন, ‘এটা ন্যায়ভ্রষ্ট রায়, রূপকথার কল্পকাহিনি। যাঁরা এই জুলুম করেছেন, একদিন তাঁদের বিচার হবে।’ হাসান ইকবাল বলেন, কামারুজ্জামান ধৈর্য ধারণ করতে বলেছেন। তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। তিনি শক্ত আছেন। অবিচল আছেন। কামারুজ্জামানের এই ছেলে বলেন, ‘আমরা তাঁর জন্য শুকনো খাবার, শীতের কাপড় ও কম্বল নিয়ে গেছি। আপিলের রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পেলে রিভিউ করব।’ কামারুজ্জামানের আইনজীবী শিশির মনির প্রথম আলোকে বলেন, ‘কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের ডাকেনি। নিয়মিত সাক্ষাৎকারের অংশ হিসেবে পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন।’ কামারুজ্জামানের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে এই আইনজীবী দাবি করেন, ‘তিনি সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন। তিনি বলেছেন, আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউয়ের জন্য আবেদন করবেন।’ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে কামারুজ্জামানের ছেলে হাসান ইকবাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে পরিবারের সবাই এই মাত্র কারা ফটকে এসেছি।’ সকালে কারা তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করার জন্য তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে আবেদনটি আমার হাতে এসেছে। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সাক্ষী চিনলে সালমানের ১০ বছরের জেল!

২০০২ সালে গাড়িচাপা দিয়ে মানুষ হত্যার অভিযোগে সালমান খানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার কার্যক্রম চলছে বছরের পর বছর ধরে। আজ মুম্বাইয়ের একটি আদালতে এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দুর্ঘটনার সময় সালমান চালকের আসনে ছিলেন কি না, তা শনাক্ত করবেন সাক্ষীরা। সালমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে ১০ বছরের জেলের ঘানি টানতে হবে তাঁকে।

গত অক্টোবর মাসেই সালমানকে তাঁর টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি চালাতে দেখা গেছে। এই গাড়িতে চাপা পড়েই ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভোররাতে বান্দ্রায় একটি বেকারির সামনে ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা পাঁচজন হতদরিদ্র মানুষ হতাহত হন। সালমানের টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার গাড়িটি তাঁদের চাপা দিয়ে পালিয়ে গেলে একজন নিহত ও চারজন আহত হন। বরাবরই সালমানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দুর্ঘটনার সময় তিনি চালকের আসনে ছিলেন না। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, দুর্ঘটনার সময় মদ্যপ অবস্থায় ঘণ্টায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার গতিবেগে গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর একপর্যায়ে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতের ওপর ঘুমিয়ে থাকা মানুষদের চাপা দিলে হতাহতের ঘটনা ঘটে। গত অক্টোবর মাসে মামলার একজন সাক্ষী নিশ্চিত করেন, দুর্ঘটনার সময় সালমানই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তিনি মুম্বাইয়ের জে ডব্লিউ ম্যারিয়ট হোটেলের পার্কিং কর্মচারী। তিনি আদালতকে জানান, দুর্ঘটনার আগমুহূর্তে ম্যারিয়ট হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার গাড়ির চালকের আসনে ছিলেন সালমান। তিনি এও জানান, সেদিন তাঁকে ৫০০ রুপি বখশিশও দিয়েছিলেন খান সাহেব। গাড়ির পেছনের আসনের বাম দিকে গায়ক কামাল খান বসেছিলেন বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া আরেকজন সাক্ষীও সালমানকে শনাক্ত করেন। ওই সাক্ষী জানান, ঘটনার দিন ম্যারিয়ট হোটেল থেকে সালমানের টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার গাড়িটি বের হতে দেখেন তিনি। সে সময় ডান দিকে চালকের আসনে বসেছিলেন সালমান। এক খবরে এমনটিই জানিয়েছে এনডিটিভি। সালমানের গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ হত্যা মামলার বিচারকার্যক্রম বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। নানা কারণ দেখিয়ে এখন পর্যন্ত বহুবার তাঁর মামলার তারিখ পেছানো হয়েছে। গত আগস্ট মাসেই মুম্বাই পুলিশ দাবি করে, মামলার গুরুত্বপূর্ণ সব নথি হারিয়ে গেছে। পরে পুলিশ চিফ রাকেশ মারিয়া তদন্তের আদেশ দিলে তাঁদের দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তবে কি তারকা প্রভাব খাটিয়ে বিচারকার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছেন বলিউডের প্রভাবশালী তারকা অভিনেতা সালমান খান! যদি সত্যিই আইন সবার জন্য সমান হয়, তবে শিগগির সালমানের মামলার চূড়ান্ত রায় হবে বলেই প্রত্যাশা সবার।

মোবাইল ফোনে সংসার ভাঙছে?

অতিরিক্ত স্মার্টফোনের ব্যবহার, বিশেষ করে মাঝরাতে বেশি বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে সংসারে ভাঙন দেখা দিচ্ছে বলেই সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে। গবেষকেরা দাবি করেছেন, মাঝরাতে অতিরিক্ত সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা কমে যাচ্ছে যার ফলে সম্পর্ক টিকছে না। আজকাল প্রতারণা ও ডিভোর্সের ঘটনাও ঘটাচ্ছে মোবাইল ফোন। এক খবরে আইএএনএস এ তথ্য জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২৪ হাজার ইউরোপিয়ান দম্পতিকে নিয়ে এই গবেষণা করেছেন। গবেষণায় তাঁরা সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটের ব্যবহার ও বৈবাহিক জীবনের তুষ্টির মধ্যে সরাসরি সম্পর্কের বিষয়টি ধরতে পেরেছেন বলে দাবি করেছেন।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক এই গবেষণায় একটি বিষয় ফুটে উঠেছে আর তা হচ্ছে শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টিকে হালকা করে দিচ্ছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। এ ছাড়াও পরস্পরের কাছ থেকে চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টিও অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে না। মাঝরাতে মোবাইল ফোনে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ব্যবহারের ফলে দম্পতির মধ্যেকার সত্যিকারের রোমান্স বিষয়টিই হারিয়ে যেতে বসেছে।
গবেষকেরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অন্যদের রোমাঞ্চকর জীবনযাপনের কথা যখন দম্পতিরা জানতে পারছেন তখন তাঁরাও নিজেদের জীবনযাপন নিয়ে হতাশ হচ্ছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মিসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সীদের নিয়ে আলাদা আরেকটি গবেষণায় দেখেছেন যে, মাঝরাতে স্মার্টফোনে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ব্যবহারে আন্তরিক সম্পর্কের ক্ষতি হচ্ছে।
>>মাঝরাতে মোবাইল ফোনের ব্যবহারে সম্পর্কের ক্ষতি হচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকানদের জয়-জয়কার

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের জয়-জয়কার। কংগ্রেসের সিনেটে রিপাবলিকান দল তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। গতকাল মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। এবার সিনেটেও রিপাবলিকানদের আধিপত্যের কারণে ওয়াশিংটনের রাজনীতি পরবর্তী দিনগুলোতে আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

>>যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের জয়ে উচ্ছ্বসিত সমর্থকেরা। ছবিটি গতকাল মঙ্গলবার রাতে আইওয়ার ম্যারিয়ট হোটেলের সামনে থেকে তোলা। ছবি: এএফপি
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দল ডেমোক্র্যাটিক দলের তিনজন সিনেটরের পুনর্নির্বাচন ঠেকিয়ে দিয়েছে। আর উন্মুক্ত আসনে জয় পেয়েছে তিনটি আসনে। এ ছয়টি আসনের মাধ্যমে রিপাবলিকান দল সিনেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল।
আগামী দুই বছর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে আপস করেই চলতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আগামী দিনগুলোতে রিপাবলিকানরা রক্ষণশীল সব আইন প্রস্তাব গ্রহণ করবে। ওবামার সার্বজনীন বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবিমা বাতিলের জন্য একের পর এক আইন প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বরাদ্দও কংগ্রেসে ঠেকিয়ে রাখবে রিপাবলিকানরা। ওবামাকে ভেটো প্রদান করে এসব আইন প্রস্তাব ঠেকাতে হবে। রিপাবলিকানদের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে, ওবামার উদারনৈতিক কর্ম-উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করা। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া অভিবাসন সংস্কারসহ উদারনৈতিক নানা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
গতকাল মধ্যরাতের মধ্যেই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভরাডুবি নিশ্চিত হয়ে যায়। প্রতিনিধি পরিষদ নিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমে তেমন মাতামাতি ছিল না। সবার দৃষ্টি ছিল, সিনেটে রিপাবলিকানরা ছয়টি আসন যোগ করতে পারছে কি না। ছয়টি আসনের বিষয় নিশ্চিত হওয়ার পরই ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ শুরু হয়েছে। ব্যর্থতার জন্য একতরফাভাবে ওবামাকে দায়ী করা হচ্ছে।
জাতীয় সমস্যা নিয়ে ওবামার জনগণের সঙ্গে সঠিক সংযোগ সৃষ্টি না করতে পারার অভিযোগ উঠেছে। মধ্যবিত্তের জীবনমানের উন্নতির কথা বলে ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি। দীর্ঘ চার বছরে মার্কিন মধ্যবিত্তরা তাদের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে নিশ্চিত নয়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দেওয়া হলেও মধ্যবিত্ত মার্কিনিদের মধ্যে এখনো কর্মহীনের সংখ্যা ব্যাপক। অনেকেই খণ্ডকালীন কাজে নিয়োগ পাচ্ছে। এসব কাজের মধ্য দিয়ে এই মধ্যবিত্তের বার্ষিক আয় বাড়েনি। ধসে পড়া আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়ায়নি জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী। মধ্যপ্রাচ্য সমস্যা, ইবোলা সমস্যা, জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে রক্ষণশীলদের প্রচারণাকে ঠিকমতো মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে ডেমোক্রেটিক দল।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কার্যত ওবামার ব্যাপারে গণভোটে পরিণত হয়েছিল। জনগণের চাপা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই নির্বাচনে। ওবামা নির্বাচনের দিন কানেকটিকাটের এক বেতারকেন্দ্রে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, গত ৫০ বছরের মধ্যে মঙ্গলবার রাতটি ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য কঠিনতম রাত।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের জাতীয় পর্যায়ের ফলাফলে পাল্টে গেছে আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্র। জানুয়ারি মাসে নতুন কংগ্রেস ক্ষমতা গ্রহণ করবে। ওবামার শেষ দুটি বছরের পরিবর্তিত শাসনকাল দেখার অপেক্ষায় শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, অপেক্ষায় সারা বিশ্বের মানুষও।

‘নির্ধারিত সময়ের আগেই কামারুজ্জামানকে ফাঁসি দেয়া হতে পারে’

নির্ধারিত সময়ের আগেই ফাঁসি দেয়া হতে পারে বলে পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। তবে তিনি বিচলতি নন জানিয়ে পরিবারের সদস্যদেরও চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করার কথা বলেছেন। সকালে তার সাক্ষাৎ করে এসে কামারুজ্জামানকে উদ্বৃত করে তার বড় ছেলে ইকবাল হাসান ওয়ামী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, রায় প্রসঙ্গে কামারুজ্জামান বলেছেন, আমি কোন অপরাধী নই। প্রমাণের ভিত্তিতে নয়, রূপকথার ভিত্তিতে রায় দেয়া হয়েছে। এটি একটি রূপকথার গল্প। এটি ন্যায়ভ্রষ্ট রায়। আমার ওপর যারা জুলুম করেছে তাদের বিচার একদিন হবেই। কামারুজ্জামান প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা জানতে চাইলে ওয়ামী বলেন, এটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পেলে তিনি তার সিদ্ধান্ত জানাবেন। কামারুজ্জামান সুস্থ আছেন বলেও জানান ছেলে ওয়ামী। পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতের বিষয়ে কামারুজ্জামানের আইনজীবী এডভোকেট শিশির মুহাম্মদ মনির বলেন, এটি তাদের নিয়মিত সাক্ষাৎ। কারা কর্তৃপক্ষ তাদের সাক্ষাতের জন্য ডাকেনি। বুধবার সকাল ১০টায় কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেয়ে কামারুজ্জামানের পরিবারের ৯ সদস্য জেলের ভেতরে যান। এ সময় তারা কামারুজ্জামানের সঙ্গে প্রায় পৌনে একঘণ্টা সময় কাটান। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন স্ত্রী নুরুন্নাহার, চার ছেলে, ভাই ও এক মেয়ে। এর আগে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামি কামারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে তার পরিবার। মঙ্গলবার দুপুরে কামারুজ্জামানকে কাশিরপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

রাজধানীতে জামায়াতের মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির রায় আপিল বিভাগে বহাল রাখার প্রতিবাদে ডাকা হরতালের সমর্থনে রাজধানীর মগবাজারে মিছিল করে জামায়াত। বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মগবাজার রেলগেইট এলাকা থেকে মিছিলটি বের হয়। এতে রমনা থানা জামায়াতের সেক্রেটারি হাবিবুর রহমান, জামায়াত নেতা জিল্লুর রহমান, ইউসুফ আলী মেল্লা, আকতার হোসেন ও সুলতান মাহমুদসহ স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এছাড়া সকাল ৮টার দিকে মাদরাটেক এলাকায় শিবির ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। শাখা সেক্রেটারি এম শামীমের নেতৃত্বে মিছিলে অংশ নেন সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল ইসলাম, অফিস সম্পাদক সোহেল রানা মিটু, প্রচার সম্পাদক আব্দুল কাদেরসহ শিবির নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এদিকে বকশিবাজারে চকবাজার থানা শিবির হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলে নেতৃত্ব দেন চকবাজার থানা শিবিরের সভাপতি হেলাল উদ্দিন। এতে উপস্থিত ছিলেন আলিয়া মাদ্রাসার সভাপতি রেদোয়ান উল্লাহ, সেক্রেটারি আশরাফুল আলমসহ শিবির নেতাকর্মীরা। মিছিল থেকে তারা কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তারা চলে যান।

রাজধানীতে জামায়াতের মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ
অনলাইন ডেস্ক: জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির রায় আপিল বিভাগে বহাল রাখার প্রতিবাদে ডাকা হরতালের সমর্থনে রাজধানীর মগবাজারে মিছিল করে জামায়াত। বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মগবাজার রেলগেইট এলাকা থেকে মিছিলটি বের হয়। এতে রমনা থানা জামায়াতের সেক্রেটারি হাবিবুর রহমান, জামায়াত নেতা জিল্লুর রহমান, ইউসুফ আলী মেল্লা, আকতার হোসেন ও সুলতান মাহমুদসহ স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এছাড়া সকাল ৮টার দিকে মাদরাটেক এলাকায় শিবির ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। শাখা সেক্রেটারি এম শামীমের নেতৃত্বে মিছিলে অংশ নেন সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল ইসলাম, অফিস সম্পাদক সোহেল রানা মিটু, প্রচার সম্পাদক আব্দুল কাদেরসহ শিবির নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এদিকে বকশিবাজারে চকবাজার থানা শিবির হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলে নেতৃত্ব দেন চকবাজার থানা শিবিরের সভাপতি হেলাল উদ্দিন। এতে উপস্থিত ছিলেন আলিয়া মাদ্রাসার সভাপতি রেদোয়ান উল্লাহ, সেক্রেটারি আশরাফুল আলমসহ শিবির নেতাকর্মীরা। মিছিল থেকে তারা কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তারা চলে যান।

রাজনগরে যুবতীর বিবস্ত্র লাশ উদ্ধার

রাজনগরে অজ্ঞাত এক যুবতীর (২৫) বিবস্ত্র লাশ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার ক্ষেমসহস্র গ্রামের বড়বন্দ তালেরতল নামক স্থানের ধান ক্ষেতের পাশ থেকে রাজনগর থানার পুলিশ লাশ উদ্ধার করে মৌলভীবাজার মর্গে পাঠিয়েছে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে রাজনগর উপজেলার ক্ষেমসহস্র গ্রামের বড়বন্দ তালেরতল নামক স্থানের ধান ক্ষেতের পাশে স্থানীয় লোকজন এক যুবতীর (২৫) লাশ দেখতে পান। খবর পেয়ে রাজনগর থানার পুলিশ দুপুর ১২টার দিকে লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। লাশের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতকারী এসআই আব্দুর রহমান জানান, লাশের গায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। গলা চেপে ধরা এবং নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। নিহতের মাথায় সিঁদুর এবং পাশে শাঁখার ভাঙ্গা চুঁড়ি পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে সে সনাতন ধর্মালম্বী। রাতের আঁধারে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে একটি সূত্র জানেিয়ছে, নিহত ওই যুবতী বিবস্ত্র এবং পাশে পড়নের কাপড় পড়ে থাকায় ধারণা করা হচ্ছে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধারণা করা হচেছ- অন্য কোথাও থেকে ওই নারীকে ওই স্থানে টাকার বিনিময়ে আনা হয়েছিল। তবে কোন কারণে তাদের মধ্যে দ্বন্দ দেখা দেয়ায় হত্যা করা হয়েছে।

সন্তানদের বিচলিত না হওয়ার পরামর্শ কামারুজ্জামানের

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান তার সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের বিচলিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আজ সকালে পরিবারের সদস্যরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার সাথে দেখা করতে গেলে এই পরামর্শ দেন কামারুজ্জামান।
কারাগার থেকে বের হয়ে তার বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী জেলগেটে সাংবাদিকদের একথা জানান। এটি তাদের নিয়মিত সাক্ষাৎ বলে জানান তিনি।
হাসান ইকবাল বলেন, ‘বাবা বিচলিত নন। বাবা বলেছেন, আমার মৃত্যু হতে পারে কিন্তু আমি যে আদর্শে বিশ্বাস করি সে আদর্শ যুগ যুগ ধরে এ দেশে বেঁচে থাকবে। বাবা মাকে বলেছেন, তিনি যে আদর্শের আন্দোলন করছেন, তার সন্তানদেরও যেন সেই আদর্শে গড়ে তোলা হয়। আর যে মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত বলে তিনি জানিয়েছে।’
সকাল ১০টা ২০ মিনিটে স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ১০ সদস্য কামারুজ্জামানের সাথে দেখা করতে কারাগারে প্রবেশ করেন। এক ঘণ্টা পর ১১টা ২০ মিনিটে তারা কারাগার থেকে বের হয়ে আসনে।
হাসান ইকবাল আরো বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় বের হওয়ার পর রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করা হবে। প্রাণভিক্ষার বিষয়ে গতকাল বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি চাওয়া না চাওয়া বাবার ব্যক্তিগত ইচ্ছা। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই।

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা-মন্তব্য হাইকোর্ট রায়ের চেতনাবিরোধী by মিজানুর রহমান খান

যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। এটা শুনে অনেকের মনে আবারও হয়তো প্রশ্ন জাগবে, আপিলে তা হ্রাস পেলে কিংবা অন্য যাঁরা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো ‘আজীবন কারাদণ্ড’ পেয়েছেন বা পেতে পারেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রপতিরা কী করবেন? পুরোনো প্রশ্ন নতুনই থাকছে: সরকার বদলে গেলে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীরা পার পেয়ে যাবে না তো? আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক এ বিষয়ে একটি আশাবাদ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যৎ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না এলে যাতে অন্য সরকার তাঁদের ছেড়ে না দিতে পারে, সে জন্য সংবিধান সংশোধনের কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু এই বক্তব্য যে দ্রুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উড়িয়ে দেবেন, সেটা ভাবিনি। তবে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গত অক্টোবরে এক সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা বিষয়ে তিনি যে বক্তব্য দেন, তাতে আমাদের মনে হয়েছে, তিনি প্রচলিত আইনে সাধারণ অপরাধীদের ক্ষমার যে বিধান, তাতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না মর্মে মত দিয়েছেন। ৪৯ অনুচ্ছেদের আওতায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিধান থাকবে কি থাকবে না? প্রধানমন্ত্রী যদি সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকেন, তাহলে তার সঙ্গে দ্বিমত করব না। ক্ষমতার অপব্যবহারের অনেক বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নির্বাহী বিভাগের কাছে নিশ্চয় এই ক্ষমতা থাকতে হবে।

কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির কাছে এ ধরনের কিছু ক্ষমতা থাকতে হবে।’ এতে মনে হতে পারে সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আর তার মধ্যে ক্ষমার ক্ষমতা অন্যতম। এটা সত্য নয়। বাংলাদেশ সংবিধান প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীনভাবে অন্য কোনো দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়নি। বরং প্রধানমন্ত্রী একটি অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করতে পারতেন যে সংবিধানে নির্দিষ্ট করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ লাগবে না, সংবিধানে এটি থাকার পরও প্রধানমন্ত্রীরা তা পদ্ধতিগতভাবে অমান্য করে চলেছেন। এবং আলোচিত জিন্টু এবং তাহেরপুত্রের মতো বহু দণ্ডিত অপরাধীর সাজা মওকুফ করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীরা যেরূপ পরামর্শ দেন, রাষ্ট্রপতিরা তা বিনা বাক্যব্যয়ে সাধারণত তামিল করে থাকেন। কখনো কোনো রাষ্ট্রপতি এ-সংক্রান্ত নথি ফেরত পাঠিয়েছিলেন কি না, তা আমরা জানতে পারি না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সংবিধান যাকে যেভাবেই ক্ষমতা দিক না কেন, তা কোনো অবস্থাতেই স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে জনকল্যাণের প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে প্রয়োগ করতে পারে না। সেটা এখতিয়াবহির্ভূত। ৪৯ অনুচ্ছেদটির দিকে এ পর্যন্ত বিশেষভাবে নজর দিয়েছেন সম্প্রতি মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদানকারী ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। তিনি হাইকোর্ট বিভাগে থাকাকালে ২০১২ সালের ২৫ এপ্রিল সারওয়ার কামাল বনাম রাষ্ট্র মামলায় ৪৯ অনুচ্ছেদ প্রয়োগে ভারতীয় নজির বিবেচনায় একটি গাইডলাইন বা বিধি প্রস্তুত এবং সিআরপিসি সংশোধনের দিকে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তিনি রায়ের কপি রাষ্ট্রপতির সচিব এবং আইন ও বিচারসচিবকে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এবং নিশ্চয় সেটা খামোখা নয়। এরপর দুই বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু আদালতের এই নির্দেশনার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের কোনো প্রতিক্রিয়া জানা গেল না। অবশ্য আমরা রুটিন যুক্তি শুনতে পারি, ওই রায় তো চূড়ান্ত নয়। আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। তবে কেবল এই যুক্তিতে সরকার গাইডলাইনের মাধ্যমে ৪৯ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা অনুশীলনের যৌক্তিকতা দূরে ঠেলতে পারে না।
ওই রায়ে উল্লেখ করা হয়, ক্ষমার ক্ষমতা অনুশীলনে কোনো বিধি বা ‘স্ট্যান্ডার্ড গাইডলাইন’ নেই। সে কারণে আমরা মনে করি, ‘প্রতিবেশী একটি দেশ যেভাবে করেছে সেভাবে এ বিষয়ে ন্যায্য, যথাযথ ও খাঁটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকার বিধি-গাইডলাইন কিংবা সিআরপিসি সংশোধন করতে পারে।’ এরপর হাইকোর্ট বিভাগ অত্যন্ত যুক্তিসংগত মন্তব্য করেন যে ‘সম্ভবত ক্ষমার ক্ষমতা প্রয়োগবিষয়ক সমালোচনা এবং ক্ষমা করার ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এড়াতে চিন্তাভাবনা করার এখনই হাইটাইম।’
এখানে দুটি বিষয়। যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়েও ৪৯ অনুচ্ছেদের ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার দাবি রাখে। প্রতিবছর কত লোক কে কীভাবে সুবিধা পাচ্ছে বা দরখাস্ত করেও প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে, সেই বিষয়ে আমরা অন্ধকারে আছি। সেই বিচারে প্রধানমন্ত্রী ৪৯ অনুচ্ছেদের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, তা হাইকোর্টের ওই রায়ের চেতনাবিরোধী। শেখ হাসিনা সরকারের (১৯৯৬-২০০১) সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম তাঁর কন্সটিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ বইয়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকারের দ্বারা ৪৯ অনুচ্ছেদ অপপ্রয়োগের কঠোর সমালোচনা করেছেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর সংসদে এক প্রশ্নোত্তরে বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তিন বছরে (২০০৯-২০১২) মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২১ জনকে ক্ষমা করেছিলেন। এর মধ্যে ২০১০ সালেই ১৮ জনকে ক্ষমা করা হয়। ১৯৭২ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ৩৬ বছরে মাত্র চারজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়েছিলেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে তথ্য প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা দেননি। সুতরাং ক্ষমা বিষয়ে আমাদের রাষ্ট্রপতিদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার কোনো উপায় নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ অক্টোবর যুক্তি দিয়েছেন, ‘এটা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা। এটা থাকতে পারে। আমরা (সরকার) দেশ চালাই। নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতি কিছু ক্ষমতা রাখতে পারেন’ (বিডিনিউজ২৪)। প্রশ্ন হলো, সরকার চালানোর মানে কী? সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ যুক্তি দেন, সামরিক আদালতে দণ্ডিত হওয়ার কারণে জিন্টুকে ক্ষমা করা হয়েছে। কিন্তু এটাই কি রাষ্ট্রের নীতি? এটা কি সবার জন্য প্রযোজ্য? আমরা কি এটা গাইডলাইনে লিখতে রাজি আছি? ১৯৬৮ সালের ১২ নভেম্বর ভারতের মন্ত্রিসভা এ মর্মে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ওই তারিখ পর্যন্ত সারা দেশের মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হবে। সে দিনের ‘অপরিপক্ব’ গণতন্ত্রের দেশ যা পেরেছিল, আমরা কি এমন কিছু আজ চিন্তাও করতে পারি? তবু সরকার চালাই তাই এই ক্ষমতা চাই, এ কথার কিন্তু যুক্তি আছে। কারণ, ৪৯ অনুচ্ছেদের অন্তর্গত দর্শন হলো, সমাজে ‘শান্তি ও সুসরকার’ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কখনো কখনো এর প্রয়োগ দরকার হতে পারে।
কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী হাইকোর্টের রায় মেনে নিতে উৎসাহী বলে মনে হয় না। সারওয়ার কামাল বনাম রাষ্ট্র মামলায় ক্ষমার আবেদনকারীরা (একজন মীর কাসেম নামধারীও ছিলেন) ১৯৮৯ সালে প্রত্যেকে ১০ বছর করে সাজা পেয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়ার সরকার এদের ছেড়ে দিল। ক্ষমা চাওয়ার একটি দরখাস্তের ভাষা এ রকম: ‘শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিকেরা যাতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব বাস্তবায়নসহ দুই মরণপথযাত্রী সম্ভ্রান্ত পরিবারকে রক্ষার স্বার্থে।’ এই ছিল খালেদা জিয়ার সরকার চালানোর নমুনা। আবু তাহেরের আবেদন ও নথিপত্র পড়েছিলাম। সেখানেও এই একই সুর ধ্বনিত।
তাই নাগরিকের মনে এই সন্দেহ জাগতেই পারে যে নির্বাহী বিভাগ এই ক্ষমতা দিয়ে কার্যত একটি ‘সুপ্রিম নির্বাহী আপিল কোর্ট’ চালু রাখতে কিংবা ইতিমধ্যেই তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে কি না। এটা আমাদের অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ভারতের উচ্চ আদালতে এটা মীমাংসিত যে ক্ষমার ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের কোনো নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নয়। এটা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। কিন্তু এটা দুঃখের বিষয় যে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে ৪৯ অনুচ্ছেদবিষয়ক কোনো মামলা এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি
হয়নি। মাহমুদুল ইসলাম ৪৯ অনুচ্ছেদ নিয়ে ভাষ্য লিখতে গিয়ে দুই ডজন বিদেশি রায়ের বরাত দিয়েছেন। সেখানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট অনুপস্থিত। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সরকারগুলো দলীয় স্বার্থে এই ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। দণ্ডিত ব্যক্তি ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার আত্মীয় বিবেচনায় সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করেছেন, সেটা কেবল সাংবিধানিকতা ও আইনের শাসনবিরুদ্ধ নয়। বরং এটা দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংসের নামান্তর।’
জেনারেল এরশাদ আওয়ামী লীগের শ্রদ্ধাভাজন নেতা ময়েজউদ্দিন হত্যাকাণ্ডের আসামি আজম খানকে দণ্ড প্রদানের পরপরই ক্ষমা করেছিলেন।
ড. কামাল হোসেন শনিবার আমাকে বলেন, ‘এটা চ্যালেঞ্জ করতে ময়েজউদ্দিনের ভাইকে একজন রিটকারী হতে তিনি অনুরোধ করেছিলেন। তিনি তাৎক্ষণিক রাজি হলেও পরে আর আসেননি। এ বিষয়ে নাগরিক সমাজকে আইনি লড়াইয়ে নামতে হবে। তবে সরকারের কাছে অনুরোধ, হাইকোর্টের রায় যেন তারা অবিলম্বে বিবেচনায় নেয়। সত্যিই এ বিষয়ে একটা কিছু করার এখনই ‘হাইটাইম’।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

‘বিশ্ব ইতিহাসের দ্বিতীয় হাত’ by সৈয়দ আবুল মকসুদ

একুশ শতকে সংবাদমাধ্যম জনজীবনে যে ভূমিকা পালন করছে, দেড় শ বা দু শ বছর আগের মানুষ তা কল্পনাও করতে পারতেন না। বাংলাদেশে তো নয়ই, পশ্চিমা দেশগুলোতেও নয়। তাই নেপোলিয়নের উক্তিটি অতিশয়োক্তি বলে গণ্য করা হয় না। তাঁর ভাষায় সংবাদপত্র ‘রাষ্ট্রের পঞ্চম প্রধান স্তম্ভ’। জার্মানির এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানবিভাসিত যুগের অন্যতম আলোকবর্তিকা দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার (১৭৮৮-১৮৬০) বলেছেন, সংবাদপত্র হলো ‘বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতর হাত’ সেকেন্ড হ্যান্ড অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি। অর্থাৎ একটি হাত নিয়ে যেমন একজন মানুষ অসম্পূর্ণ, তেমনি পৃথিবীর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার জন্য প্রতিদিনের ইতিহাস বা সংবাদপত্রের সাহায্য না নিলে তা হবে অসম্পূর্ণ। পৌনে দু শ বছর আগে তিনি বলেছেন, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাকে যিনি পেশা হিসেবে বেছে নেবেন, তাঁর কাজ সদ্য-অতীতের দৈনন্দিন ধারার সঙ্গে যুক্ত থাকা; কারণ তাঁর রচিত প্রতিদিনের ইতিহাসের উপাদান ভবিষ্যতের ইতিহাসের গতিধারাকে প্রভাবিত করবে। এই ভূমিকা তিনি পালন করেন তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ওজন (ইনটেলেকচুয়াল ওয়েট) ও অন্তরস্থ স্বাধীন সত্তা দ্বারা। সুতরাং একটি উন্নতমানের সংবাদপত্র প্রকাশ ও সম্পাদনা করা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়, যার-তার কাজও নয়।

সাংবাদিকতায় পাঠ বা প্রশিক্ষণ নিতে সত্তরের দশকে গিয়েছিলাম জার্মানির বার্লিনে। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে জার্মান ছাড়া কেউ কেউ এসেছিলেন যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যুক্তরাজ্য থেকে আসা একজন অধ্যাপক অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে একজন সম্পাদক ও সাংবাদিকের ভূমিকা, তাঁর নৈতিক দায়িত্ব, তাঁর বিপদ প্রভৃতি নিয়েও বলতেন। পশ্চিমের সংবাদপত্রজগৎ ও সাংবাদিক সমিতি প্রভৃতির কিছু দলিলপত্র ফটোকপি করে তিনি আমাদের দিয়েছিলেন। ১৯৫৪-তে ফরাসি দেশের বর্দো নগরে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশনের দ্বিতীয় কংগ্রেস। ভারত ও পাকিস্তানের সাংবাদিক নেতারাও তাতে যোগ দেন। সেই কংগ্রেসের ঘোষণাপত্রের একটি বাক্যের প্রতি তিনি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন: ‘সাংবাদিকদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো সত্যকে সম্মান প্রদর্শন (টু রেসপেক্ট দ্য ট্রুথ) ও সত্য অবগত হওয়ার জনগণের অধিকারকে (দ্য রাইট অব দ্য পাবলিক) শ্রদ্ধার সঙ্গে বিবেচনায় রাখা।’
সেটি ছিল দুই পরাশক্তির শীতল যুদ্ধের কাল। সংবাদপত্রের নীতির প্রশ্নে দুই শিবিরের দুই রকম মত। পশ্চিমের তথাকথিত উদার গণতান্ত্রিক দেশের এক মত, কমিউনিস্ট পার্টিশাসিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর আরেক মত। সমাজতান্ত্রিক দেশের নেতারা লেনিনের বাক্য ধর্মীয় শ্লোকের মতো বিশ্বাস করতেন। সংবাদপত্র সম্পর্কে লেনিন বলেছিলেন, সংবাদপত্র শুধু যৌথ তথ্য প্রচারক এবং যৌথ আন্দোলনের সংগঠন নয়, সংবাদপত্র যৌথ সংগঠকও বটে। জনগণের পক্ষে সংবাদপত্র যদি তার সঠিক দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে প্রতিদিন কিছু তথ্য প্রচার করে মানুষের কোনো লাভ হয় না। কিন্তু লেনিনের অনুসারী কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা সংবাদপত্রকে শুধু তাঁদের সরকারের, লেনিনের ভাষায়, প্রপাগান্ডিস্ট করে রাখেন। জনগণের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের সব পথ বন্ধ করে সংবাদপত্রের ভূমিকাকে খর্ব করেন। সত্যকে সম্মান জানানোর প্রয়োজন তাঁরা বোধ করেননি, বরং জনগণকে সত্য জানার অধিকার থেকে রেখেছেন বঞ্চিত। তা করে তাঁরা সমাজতন্ত্রেরই সর্বনাশ ডেকে আনেন। জনগণের মুক্তি ও ব্যক্তির স্বাধীন বিকাশের পথ বন্ধ করে দেন।
আমাদের অর্থাৎ বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অহংকারের কথা এই যে, প্রায় দু শ বছর আগে ১৮২১ সালে প্রকাশিত সম্বাদ-কৌমুদী থেকে আজ পর্যন্ত মূলধারার বাংলা সংবাদপত্র জনগণের পক্ষেই কাজ করেছে। সত্য প্রকাশে যথাসাধ্য ভূমিকা পালনে সাংবাদিকেরা সাহসের পরিচয় দিয়ে আসছেন। বহু সম্পাদক কঠিন ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করেননি। ব্যক্তিগত বিপদ পর্যন্ত ডেকে এনেছেন অনেকে। বলা বাহুল্য, মুক্ত সমাজব্যবস্থায় প্রতিক্রিয়াশীল ও ক্ষমতাবানদের পদলেহনকারী সংবাদপত্রও থাকে। একশ্রেণির পাঠককে তারা বিভ্রান্ত করে। তবে ইতিহাসে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।
সংবাদপত্র সময়ের সঙ্গে চলে। তাই একেক কালে একেক রকম ভূমিকা পালন করে। বাংলা ভাষার মূলধারার সংবাদপত্র শুরু থেকেই প্রতিক্রিয়াশীলতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কাজ করছে। সম্বাদ-কৌমুদীও তা করেছে এবং রামমোহন রায় ও তাঁর সহযোগীরা প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীলদের গালাগাল শুনেছেন। একপর্যায়ে সইতে না পেরে পত্রিকাই বন্ধ করে দেন। ১৯৪৭ পর্যন্ত বাংলা সংবাদপত্র ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রচারে কাজ করেছে। ’৪৭-এর পর থেকে ’৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লিখেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা বিরাট। একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত নিয়ে যেতে সংবাদপত্রের ভূমিকা ইতিহাসে খুব বড় করে লেখা থাকবে। স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সংবাদপত্রকে সংগ্রাম করতে হয়। সামরিক শাসনের মধ্যে প্রথম কিছু সময় সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ থাকলেও একপর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে সংবাদপত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় স্মরণীয় ভূমিকা রাখে। সংবাদপত্রের সহযোগিতা ছাড়া আশির দশকের সামরিক স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন সফল হতে আরও দেরি হতো। রাজনীতিবিদদের যে গোত্রই যখন আপসের পথ ধরেছে, পত্রিকা তখনই তার বিরোধিতা করেছে। নব্বইয়ে সামরিক একনায়কের পতন হলো, নির্বাচিত সরকার গঠিত হলো, কিন্তু গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায় তা এল না। সংবাদপত্রও বসে রইল না।
সংবাদপত্র নিয়ে এসব কথা বলছি এ জন্য যে আজ ষোলো পূর্ণ করে প্রথম আলো সতেরোতে পড়ল। একটি কাগজের জীবনে ষোলো বছর কম সময় নয়। বহু পত্রিকা এত দিন টেকেই না। এই ষোলো বছরেও অনেক দৈনিক বেরিয়েছে ও বন্ধ হয়ে গেছে। পনেরো বছরের বেশি সময় ধরে আমি প্রথম আলোতে লিখছি। তার বাইরে এই পত্রিকার আমি একজন—কোটি পাঠকের একজন পাঠকও বটে। পাঠক হিসেবে পর্যবেক্ষকও বটে।
প্রথম আলোর প্রণীত সম্পাদকীয় নীতি কী, তা বাইরের একজন লোক হিসেবে আমার জানার কথা নয়। কিন্তু একজন পাঠক হিসেবে এর প্রবণতা বা ঝোঁক কোন কোন বিষয়ে, তা বোঝা কঠিন নয়। মুক্তিযুদ্ধের জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক চেতনা অনির্বাণ রাখার প্রশ্নে অবিচল। একাত্তরের ঘাতক-দালালদের প্রশ্নে কঠোর। খবরে ও নিবন্ধে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা সাবলীলভাবে প্রকাশ পায়। নানা রকম সামাজিক অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় মৌলবাদ, নারী নির্যাতন, মাদক, দুর্নীতি প্রভৃতির প্রশ্নে আপসহীন। পরিবেশ রক্ষায় পরিবেশকর্মীদের পাশে সক্রিয়ভাবে থাকছে। তরুণদের যেকোনো সৃষ্টিশীল উদ্যোগে অবিচল উৎসাহদাতা প্রথম আলো। শুধু বিষয়বস্তুর কারণে নয়, সুসম্পাদিত ও রুচিশীল বলে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে প্রথম আলো। আমাদের সমাজে কর্তব্যের অবহেলার সংস্কৃতিতে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় বিভাগ, প্রশাসন ও অন্যান্য বিভাগের কর্মীদের যে সমন্বয়ী উদ্যম, তা সবার কাছেই স্বীকৃত। সেই স্বীকৃতির প্রমাণ সম্পাদকের আন্তর্জাতিক ম্যাগসাইসাই পুরস্কারে ভূষিত হওয়া।
এ তো গেল এক দিক। অন্য দিকও আছে। যে সময়টিতে প্রথম আলো আত্মপ্রকাশ করে, তা দেশের রাজনীতির ইতিহাসের এক দুঃসময়। অপশাসনে অতিষ্ঠ দেশবাসী। দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন। দুর্নীতির সঙ্গে দলীয়করণ। রাজনৈতিক হানাহানি ও রক্তপাত অতীতের যেকোনো সময়কে ছাড়িয়ে যায়। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বৈরিতা সংসদীয় গণতন্ত্রকে করে কলুষিত। এসবের বিরুদ্ধে প্রথম দিন থেকেই প্রথম আলো আপসহীন অবস্থান নেয়। ফলে অবিলম্বে সরকারের বিরাগভাজন হতে হয় সম্পাদককে। এরপর এল বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোটের সরকার। সেই সরকার সুশাসন দেওয়া তো দূরের কথা, দেশকে একটি সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী রাষ্ট্রে পর্যবসিত করার পথ করে দেয়। ইসলামি জঙ্গিবাদীরা পায় সরকারের প্রশ্রয়। আগের সরকারের দুর্নীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা দিয়ে যোগ হয় নতুন মাত্রা। এসবের বিরুদ্ধে প্রথম আলো বলিষ্ঠ ভূমিকা নেয়। তখন বিরোধী দল খুশি হলেও সরকার ক্ষুব্ধ হয়। চারদলীয় জোট ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার যে স্থূল কৌশল গ্রহণ করে, তার বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবীদের আন্দোলনকে ব্যাপক প্রচার দেয় প্রথম আলো। সেই আন্দোলন সফল না হলে, ভুয়া ভোটার তালিকা বাতিল না হলে, ২০০৮-এ নির্বাচন না হলে, ১৪-দলীয় জোটের সরকার গঠন সম্ভব হতো না। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ওই সময় প্রথম আলো যে ভূমিকা রেখেছে, তা এই কাগজের ঘোরতর শত্রুও অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু নির্বাচনের পরে পত্রিকা দুর্নীতি, অনাচার ও অপশাসনের বিরুদ্ধে নীরবতা অবলম্বন করেনি। তার ফলে সরকারের বিরাগভাজনে পরিণত হয়। মন্ত্রী ও সাংসদদের কেউ কেউ প্রকাশ্য জনসভা ও সংসদ থেকেও নিন্দা করতে সংকোচ করেননি। এ প্রসঙ্গে একটি অমার্জিত গ্রাম্য প্রবাদ মনে পড়ে: ‘গাঙ পার অইলে মাঝি অয় হালা’ (নৌকায় নদী পার করে দেওয়ার পর মাঝি হয় শালা)।
একটি স্বাধীন সংবাদপত্রের প্রতিপক্ষ শুধু সরকার নয়, রাজনৈতিক শক্তিগুলোও নয়, সমাজে যত রকম অপশক্তি আছে—দুর্নীতিবাজ আমলা, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি, ভূমিদস্যু, রাষ্ট্রের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ আত্মসাৎকারী প্রভৃতি একটি দৈনিকের প্রতিপক্ষ শুধু নয়, শক্তিশালী শত্রু। এখনো দেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করা যায়। কিন্তু এসব সমাজশত্রুর বিরদ্ধে লিখলে নানা রকম বিপদ। আর আছে মানহানির মামলা। আইনের মাধ্যমে একজন সম্পাদক ও তাঁর সহকর্মীদের নাজেহাল করার এর চেয়ে উত্তম উপায় পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই শাস্তি। জরুরি কাজ ফেলে সম্পাদককে ছুটতে হয় প্রত্যন্ত মফস্বলে। আদালত প্রাঙ্গণের বটগাছের তলায় চা ও পাউরুটি-কলা খেয়ে মামলায় হাজিরা দিতে হয়। কিছুকাল আমি সম্পাদক ছিলাম। মানহানির উকিল নোটিশ নিয়ে এক মারাত্মক মানীর প্রতিনিধি আমার অফিসে এলেন। তাঁকে আমি সবিনয়ে বললাম, ফরিয়াদিকেই আগে প্রমাণ করতে হবে তিনি মানী ব্যক্তি; আমাদের প্রতিবেদক জেনেশুনেই লিখেছেন। বস্তুত এই লোকের মান বলে কিছু নেই, তাঁর আছে মানি—অনেক টাকা ও সম্পদ।
সংবাদপত্রের সম্পাদক ও তাঁর সহকর্মীদের সামনে দুটি বিকল্প: শাসকশ্রেণির সহযোগী হয়ে তাদের প্রীতিভাজন থাকা; অথবা জনগণ, রাষ্ট্র ও জাতির স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে প্রয়োজনে ক্ষমতার বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া। দ্বিতীয় বিকল্পটি সম্ভবত প্রথম আলোর পছন্দ।
তবে সব দোষ সরকারের নয়। জনগণকেও পক্ষ নিতে হবে, সাহসী ও প্রতিবাদী হতে হবে। শুধু পত্রিকার ঘাড়ে সব দায়িত্ব চাপিয়ে চুপ থাকা যাবে না। তাতে কপাল পোড়া কেউ ঠেকাতে পারবে না। শুরু করেছিলাম দার্শনিক শোপেনহাওয়ারকে দিয়ে। শেষ করতে চাই তাঁরই দেশের কুড়ি শতকের শ্রেষ্ঠ অস্তিত্ববাদী দার্শনিক কার্ল ইয়েসপার্সকে দিয়ে। তিনি বলেছেন: ‘বড় সাংবাদিকেরা সত্যনিষ্ঠার জন্ম দেন।’ তবে ইয়েসপার্সের আরেকটি কথাও তাৎপর্যপূর্ণ: ‘একটি জাতি যে ধরনের সাংবাদিকদের জন্ম দেয়, তার ভাগ্যটিও সে রকম হয়ে থাকে। সাংবাদিকেরা জাতির নিয়তির অনিবার্য প্রতিনিধি।’
প্রথম আলো শতায়ু হোক।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

ব্যাধিগ্রস্ত দুনিয়ার চিকিৎসা by আন-মেরি স্লটার

আমরা কি এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি না, যার ফলে দুনিয়ার শান্তি রক্ষা করা সম্ভব হবে, আর সব দেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে চলবে? হেনরি কিসিঞ্জার তাঁর নতুন বই ওয়ার্ল্ড অর্ডার-এ ঠিক এ কথাই বলেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রশ্নটি সঠিক নয়। কিসিঞ্জারের কাছে ‘বিশ্বব্যবস্থা’ একটি আন্তর্জাতিক বন্দোবস্ত মাত্র। ভাবা হয়, ‘এটা সারা দুনিয়ার জন্যই প্রযোজ্য’। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সৃষ্টির আগে ইউরোপের কাছে বিশ্বব্যবস্থার অর্থ ছিল বিভিন্ন দেশের মধ্যকার ভারসাম্য, যার মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম ও ধরনের সরকার সহাবস্থান করতে পারবে।
ইসলাম একই সঙ্গে একটি ধর্ম ও সভ্যতা, তার কাছে বিশ্বব্যবস্থার সর্বোচ্চ রূপটি স্বাভাবিকভাবেই একটু ভিন্ন প্রকৃতির। ইসলাম খিলাফতে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ, যেখানে ধর্মবিশ্বাস ও সরকারব্যবস্থা একসঙ্গে জড়াজড়ি করে থাকে—এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আর ইসলামের ঘর বা দার আল-ইসলামের সর্বত্র শান্তি বিরাজ করবে। নিঃসন্দেহে এটা সব মুসলমান ও মুসলিম-অধ্যুষিত সব রাষ্ট্রের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নয়। ইসলামিক স্টেটের মতো কট্টর গ্রুপ এখনো খিলাফতের স্বপ্ন দেখে, তারা শুধু কোনো জীবনবিধানই প্রচার করে না, তারা একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিই প্রচার করে। কিসিঞ্জারের দৃষ্টিতে বিশ্বব্যবস্থার নানা রূপ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়াজুড়েই গড়ে উঠছে। চীন আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে চললেও তারা অন্যদের চেয়ে যে একটু ভিন্ন, সে কথাটা এখন ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিতে চায়। আইনের চোখে সবাই সমান, কিন্তু তারা একটু বেশি, যেটা যুক্তরাষ্ট্রও মনে করে। চীন ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে, তারা এশিয়ায় নিজেদের ঐতিহাসিক অবস্থান পুনরুদ্ধারের পথে নেমেছে। ফলে কিছুদিনের মধ্যে হয়তো দেখা যাবে, তারাও আন্তর্জাতিক আইন বদলের কথা বলছে। রাশিয়া তো প্রকাশ্যেই আইন লঙ্ঘন করছে, এমনকি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় তারা নিজেদের অবস্থানের যৌক্তিকতা বিধানেরও চেষ্টা করছে না। উল্টো তারা সোভিয়েত আমলের ভূমি পুনরুদ্ধার করে গৌরব বোধ করছে, আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত রুশদের রক্ষায় বলপ্রয়োগের হুমকি দিচ্ছে।
এ বছরের মার্চে রাশিয়া ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ করেছে। এর আগে ২০০৮ সালে তারা জর্জিয়াতেও আগ্রাসন চালিয়েছিল। তবে এ দুই ক্ষেত্রে রাশিয়ার আচরণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে বলে মনে করেন ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের কাদরি লিক। জর্জিয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়া প্রথমে আক্রমণ করেনি, বরং তারা জর্জিয়াকে আক্রমণ করতে উসকানি দিয়েছে। তারপর এমন এক ব্যাখ্যা তারা দিয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় তার কাজের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা যায়। কাদরির কথায় এবার ‘মস্কো শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপীয় ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে, একই সঙ্গে তার নিয়মনীতিও তছনছ করে দিয়েছে।’
কিসিঞ্জার আশা করেন, এই দেশগুলো এবং ভারত ও ব্রাজিলের মতো উদীয়মান শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে একটি মতৈক্যে পৌঁছাতে পারবে, যার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত বিশ্বে একটি স্থিতাবস্থা বজায় রাখা যাবে (তিনি এর মধ্যে লাতিন আমেরিকা বাদ দিয়েছেন)। বহুত্বের এই ওয়েস্টফালীয় নীতি সমালোচনার মুখে পড়বে, কারণ বিভিন্ন দেশ ও সভ্যতাকে তাদের নিজস্ব নীতিতে চলতে দেওয়া দরকার।
২১ শতকের একটি কার্যকর বিশ্বব্যবস্থার কাজ শুধু শান্তি রক্ষাই নয়, তাকে এর চেয়ে বেশি কিছু করতে হবে। কিসিঞ্জার আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে জোর দিয়েছেন, অর্থাৎ একটি দেশ কীভাবে অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধ এড়াতে পারে। আবার কোনো আগ্রাসী শক্তি যাতে আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট করতে না পারে, সে চেষ্টাও জারি রাখতে হবে। আজ পত্রিকার শিরোনামে চোখ বুলালে দেখা যায়, আগামী দিনগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসী ও অপরাধী নেটওয়ার্কের মতো কারণে লাখ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে, যদি সে সংখ্যাটা কোটির কোঠায় নাও যায়। মোদ্দা কথা হচ্ছে, আন্তরাষ্ট্রীয় যুদ্ধের চেয়ে এসবই এখন প্রাণহানির প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
তবে ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার আগ্রাসনে তিন হাজার ৮০০-এর চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে। আর ইবোলা এখন যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে সামনের জানুয়ারির মধ্যে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এইচআইভি/এইডস রোগে বিশ্বে ৩৬ মিলিয়ন মানুষ মারা গেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা এর চেয়ে ১০ মিলিয়ন কম, আর এ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আরও ৩৫ মিলিয়ন মানুষ।
এসব হুমকির অধিকাংশের সঙ্গেই যুদ্ধের সম্পর্ক আছে। কিন্তু এই যুদ্ধ এখন নিজ দেশের মধ্যেই হবে, মানে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ হওয়ার চেয়ে এক রাষ্ট্রের মধ্যে বিবদমান গোষ্ঠীগুলোরই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি। যেমন: সিরিয়ার কথাই ভাবুন, সেখানকার গৃহযুদ্ধে দেশটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। আরও লাখ লাখ মানুষ শরণার্থী শিবিরে অসহায় জীবন যাপন করছে। লিবিয়া ও সিয়েরা লিওনে স্বাস্থ্যসেবার যে করুণ দশা, আর সে কারণে ইবোলা যে পরিমাণে ছড়িয়ে পড়ছে, তা আমাদের গৃহযুদ্ধের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আফ্রিকার গ্রেট লেক অঞ্চলে চলমান সহিংসতায় লাখ লাখ মানুষ মারা গেছে, ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যাই এর মূল কারণ। সে কারণে হুতু জনগোষ্ঠী বানের জলের মতো ভেসে গিয়ে আশপাশের দেশগুলোয় আশ্রয় নিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট খরা ও বন্যার কারণে লাখ লাখ মানুষ এখন দৌড়ের ওপর আছে। তারা জনবহুল শহরগুলোয় আশ্রয় নিতে বা সীমান্ত পাড়ি দিতেও বাধ্য হচ্ছে। রাশিয়া ও কানাডার বিপুল পরিমাণ ভূমি খালি পড়ে আছে, ফলে তারা এসব মানুষকে আশ্রয় দিতে পারে। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলো তাদের আশ্রয় দিতে পারে না। এতে সেসব দেশে একধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে।
শান্তি বজায় রাখার ব্যাপারটা আসলে সংযমের, আবার এর মধ্যে একধরনের চাপ প্রয়োগের ব্যাপার আছে। বৈশ্বিক পরিসরে কার্যকর সহযোগিতার জন্য আরও অনেক কিছুর প্রয়োজন। সব দেশের সরকারের উচিত একত্রে বসা, সঙ্গে নিতে হবে সুশীল সমাজ ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে। তাদের একত্রে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
পক্ষান্তরে, এরূপ পরিকল্পনা নেওয়া হলে তাতে তহবিল ও জনশক্তি থাকতে হবে। প্রয়োজন হবে সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি ও প্রয়োগক্ষমতার। আজ দুনিয়া ইবোলার মতো মহামারিতে আক্রান্ত হয়েও প্রয়োজনীয় অর্থ ও বস্তুগত সহায়তার বন্দোবস্ত করতে পারেনি। এই মহামারিতে আক্রান্ত অর্ধেক মানুষ মারা যেতে পারে, যা আফ্রিকার একটি অংশ ধ্বংস করে দিতে পারে, দুনিয়ার বিমান যোগাযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের আলাদা বেষ্টনীতে ঠেলে দিতে পারে— অথচ সে বিষয়ে এখনো আমরা যথাযথ গুরুত্ব দিতে পারিনি।
আমাদের দুনিয়ার সমস্যাগুলোর ধরন বৈশ্বিক, কিন্তু এগুলোর সমাধান মূলত জাতীয় প্রকৃতির। আমাদের এমন কিছু প্রতিষ্ঠান দরকার, যেগুলো কার্যকরভাবে খুব দ্রুততার সঙ্গে বিভিন্ন প্রয়োজনে সাড়া দিতে পারে। সুশাসন আছে—এমন দেশের কোনো আঞ্চলিক সরকার যা করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ের প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সময় এসেছে, এগুলোর সংস্কার করতে হবে। বিশ্বের সমস্যা মোকাবিলায় নতুন নতুন হাতিয়ার তৈরি করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
আন-মেরি স্লটার: যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের পলিসি প্ল্যানিংয়ের সাবেক পরিচালক।

সাফল্য সম্ভাবনার বাংলাদেশ—অনুমান নয় বাস্তবতা by মিজানুর রহমান খান

বাংলাদেশ কবে একটি বিরাট বিস্ময়কর সাফল্যের গল্পে পরিণত হবে, তা হয়তো অনিশ্চিত। কিন্তু এটা এখন বিন্দুমাত্র বাড়িয়ে বলা নয় যে, বাংলাদেশ একটি অমিত সম্ভাবনাময় দেশ। বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের সাফল্যের জন্য গর্ব করতে পারে। বিশ্বে কেবল অন্যরাই পেরেছে, আমাদের দিয়ে হবে না—সেটা আর সত্য নয়। বরং বাস্তবতা এটাই, আজ আর কোনো আবেগপ্রসূত নিছক অনুমানসিদ্ধ কোনো আশাবাদ নয় যে, বাংলাদেশ একদিন একটি অনুসরণীয় উন্নয়ন মডেলে রূপান্তরিত হতে পারে।
২০০৬ সালের জানুয়ারিতে প্রথম মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং সংস্থা গোল্ডম্যান স্যাকসের সেই প্রতিবেদনটি আলোড়ন তুলেছিল, যখন সবেমাত্র বার্লিনভিত্তিক টিআইবি বাংলাদেশকে শীর্ষস্থানীয় দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অক্টোবরে টিআইবির সেই প্রতিবেদন প্রকাশের দুই মাসের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ১১টি দেশের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল গোল্ডম্যান স্যাকস। আর তাতে চীন, ভারত, ব্রাজিল ও রাশিয়ার পাশে বাংলাদেশ নামটিও ঠাঁই করে নেয়।  
আগামী এক দশকে বাংলাদেশের  রাজনৈতিক বিতর্কের একটা  স্থায়ী কিনারা হতে পারে, আবার না-ও পারে।  তবে গণতন্ত্রের পথ চলার প্রয়াসকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। কারণ, গণতন্ত্র ছাড়া সামাজিক সূচকের শ্রীবৃদ্ধি টেকসই হবে না। উন্নয়নহীনতা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য যতটা না হুমকি, তার চেয়ে অনেক বড় হুমকি গণতন্ত্রহীন পরিবেশ। তবে আমাদেরকে সম্ভবত এই দুইয়ের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে পথ চলতে হতে পারে। আর সেটা করতে গিয়ে কী করে আমরা একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারি, সেদিকেই মনোযোগী হতে হবে।
২০২১ সালের মধ্যে আমাদের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষণ আছে কি? অবশ্যই আছে। কারণ অর্থনীতিবিদরা মানছেন বাংলাদেশ সেদিকেই যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, মধ্যম আয়ের মর্যাদাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রডাক্ট) নয়, জিএনআই (গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম) হলো ‘মধ্যম আয়’ মাপার মাপকাঠি। নিম্ন আয় হলো ১০২৫ ডলার। নিম্ন মধ্যম আয় ১০২৬ থেকে ৪০৩৫ ডলার। উচ্চ মধ্যম আয় ৪০৩৬ থেকে ১২৪৭৫ ডলার। উচ্চ আয় ১২,৪৭৬ ডলার ও তার ওপরে। দুই বছর আগে জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই এখন ১৮৫১ ডলার, এটা অব্যাহতভাবে ২ দশমিক ১ ভাগ এবং মোট জিডিপি বছরে নিয়মিতভাবে সাড়ে তিন ভাগ হারে বৃদ্ধি পেতে হবে। আর তাহলেই ২০২১ সালে বাংলাদেশ তার ৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপনকালে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে।’
সাংবাদিক শওকত হোসেন মাসুমের ‘ভারতকে ছাপিয়ে গেছে বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন কার্যত সেই সম্ভাবনার ওপর আলো ফেলেছেন। বিশ্বব্যাংক দেখিয়ে দিয়েছে যে, অস্থিরতার মধ্যে এই সমাজে শুভ লক্ষণগুলো দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মাথাপিছু আয় যথাক্রমে ১৮৮৩ ডলার ও ৩,৮৭৬ ডলার।
সামাজিক প্রায় সব সূচকে বাংলাদেশ যে ভারতকে ছাপিয়ে যেতে পারল, সেটা কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতাকে বাগে আনতে না পারার অক্ষমতা সত্ত্বেও। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে আমরা কোথায় যেতে পারতাম, সেই প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলেও এসব অর্জনের পথে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সীমিত হলেও একটি উন্নয়নের গল্প ইতিমধ্যে বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ও তার জনগণকে তাই নিজের শক্তির দিকে নতুন করে নজর দিতে হবে। মনের গহিনে লালন করতে হবে আত্মমর্যাদা ও আস্থা।
নানা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের বিষয়টি টিভি টক শোর মতো পাবলিক ফোরামে সাধারণ আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত। এ জন্য আমাদের সমাজ এখন যেভাবে দলীয় লাইনে বিভক্ত রয়েছে, সেই দুঃখজনক বিভক্তি সত্ত্বেও এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কারণ, কিছু বিষয়ে আমরা এমন সাফল্য পেয়েছি, যার কৃতিত্ব কোনো একটি রাজনৈতিক দল এককভাবে দাবি করতে পারে না। উন্নয়ন ও অগ্রগতির এই অর্জন যেটা সাধারণ মানুষের। সরকারে কে থাকল বা থাকল না, তা বিবেচনায় নেয়নি তারা। এখানে একটি সত্য হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যারাই যখন ক্ষমতায় থেকেছে, তারা উন্নয়নের কয়েকটি সাধারণ নীতি অনুসরণে ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। এসবের কারণেই নারীশিক্ষা, শিশুমৃত্যুর হার, জন্মহার, অপুষ্টির মতো সামাজিক সূচকগুলোতে একসময় যথেষ্ট পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ বদলে গেছে। তারপর এসব ক্ষেত্রে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়া বা তার অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া নিশ্চয় বিস্ময়কর।
হাজারো প্রতিকূলতার জন্য বেঁচে থাকাই যখন পরমানন্দ, বেঁচে থাকাই যখন জিন্দাবাদ, তখন তো আমরা ক্ষণকালের জন্য হলেও অবাক হতে পারি। ১৯৭১ সালে আমাদের ভূখণ্ডের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ছিল ৩৯ আর ভারতের ছিল ৫০ বছর। আর এখন ভারতে ৬৬ বছর, বাংলাদেশে ৬৯। বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ ভারতের সঙ্গে তুলনামূলক এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের জন্য।
লন্ডনের প্রভাবশালী সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অনেক বিষয়ে কঠোর মন্তব্য করলেও এ দেশকে চিনতে ভুল করেনি। ২০১২ সালের ৩ নভেম্বর ‘আউট অব দ্যা বাস্কেট’ নিবন্ধে ইকোনমিস্ট বলেছে, ‘কী করা যায়, সেটা দেখিয়ে দেওয়ার মডেলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। কী করে উন্নয়নের মডেলে পরিণত হওয়া যায়, সেটা দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। যদিও তার অগ্রগতি রাজনীতির কারণে ভঙ্গুর রয়ে গেছে।’

প্রজ্বলিত মঙ্গলালোক by আবুল হায়াত

‘আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি
আলোর ঢেউয়ে উঠল নেচে মল্লিকা মালতী।’
শুধুই কি মল্লিকা-মালতীরা নেচে ওঠে? আর প্রজাপতিই বুঝি একা স্রোতে পাল তোলে? আমরাও তো ওদের সঙ্গে সঙ্গে স্রোতে ভাসি আনন্দে, নেচে-গেয়ে উঠি আলোর ঝলকানিতে। ভুবনভরা আলোয় আবেগাপ্লুত হই আমরাও। কবিগুরুর ধার করা বাণীই বলছি, ‘আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন–ভরা,/ আলো নয়ন–ধোওয়া আমার, আলো হৃদয়–হরা।।’
অন্ধকার ছিল বলেই তো আলো। আলো চলে গেলেই আবার অন্ধকার। শুরুকে যদি বলি আলো, তো শেষই আঁধার। আলোর কদর অন্ধকারের জন্য।
শরৎচন্দ্রের সেই আঁধারের রূপ পড়েছিলাম ক্লাস টেনে পড়ার সময়। মানে তখন কত দূর কী উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম, বলা কঠিন। তবে পরবর্তী সময়ে অনেক মুহূর্তেই মনে যে ঝিলিক দিয়ে যায়নি সেই কথাগুলো, তা হলফ করে বলতে পারব না। শ্রীকান্ত অন্ধকার রাতে শ্মশানে একাকী বসে অন্ধকারের যে রূপ আবিষ্কার, তথা অনুভব করতে পেরেছিল, তা নিশ্চয় ছিল প্রকৃতির কাছে তার নীরব, নিঃশব্দ, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ফল।
এ নিশ্চয় কোনো সহজলভ্য বস্তু নয়। লেখক নিজের জীবনের উপলব্ধিটাই যে শ্রীকান্তের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন, তাতেও সন্দেহের অবকাশ নেই। তিনি আমাদের অন্ধকারকে চিনিয়েছেন।
মৃত্যুকে আমরা বলি অন্ধকারের পথে যাত্রা, যে অন্ধকারের ঠিক-ঠিকানা আজও অনাবিষ্কৃত। মৃত্যু যদি হয় অন্ধকারযাত্রা, তাহলে জন্ম নিশ্চয় আলোকযাত্রা। একটি প্রাণ যখন মাতৃজঠর থেকে উদ্গত হয় বা ডিম ফুটে বেরিয়ে আসে, সে অন্ধকার ভেদ করে আসে আলোয়। আলোয় ভরা ভুবনে। হয়ে ওঠে চঞ্চল। আবেগে আপ্লুত। কেউ চিৎকার করে জানান দেয় আলো দেখার অনুভূতি (কেউ কিচিরমিচির করে; কেউ-বা করে ছটফট, ছোটাছুটি। মহোৎসব করে নিজে নিজে)।

আলো এমনই নাচানো নাচায় প্রাণিকুলকে।
এই একটি মুহূর্ত, যখন একটি প্রাণ আলোর স্পর্শ পায়। সেই মুহূর্তটি হয়ে ওঠে অবিস্মরণীয়। সেই ব্রহ্মমুহূর্তটিই জন্মমুহূর্ত। এই মুহূর্তের আলোটিকেই আমরা বলতে পারি প্রথম আলো। নয় কি?
আবার দিনের শুরুতেই যে আলো সর্বপ্রথম ছুঁয়ে ফেলে পৃথিবীকে, সেও প্রথম আলো। জন্ম নেয় একটি নতুন দিন। বুড়িয়ে যায় পৃথিবী আরও একটু।
ভাগ্যিস, পৃথিবীর জন্মদিন পালন হয় না, নইলে বার্থডে কেকের ওপর কতগুলো যে মোমবাতি লাগাতে হতো! ইশ্, কল্পনা করাটাই পাকামি হবে।
তবে এটুকু বোধ করি, কল্পনা করতে দোষ নেই যে কেকের ওপর যাতে মোমবাতির বোঝা না বাড়ে, সে কারণেই ইদানীং এক মোমেই কাজ সারা হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য তো বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমেই। মোমের দাম শেষ পর্যন্ত কেকের দাম ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই মানুষকে এখন এক মোমের দিকে ফিরিয়ে এনেছে। এ ছাড়া অবশ্যি আরেকটি কারণও অনুমেয় যে বেশি মোম জ্বালালে হয়তো ফুঁ দিয়ে নেভানো অসম্ভব হবে। ফলে ফায়ার সার্ভিস হায়ার করতে হবে। তাতেও তো টাকার শ্রাদ্ধ!
দুর্মুেখরা অবশ্য বলেন, নারীকুল বয়স প্রকাশে অনীহার কারণেই মোমবাতির সংখ্যা একে এসে ঠেকেছে।
একটা গল্প শোনেন, এক সুন্দরী লাস ভেগাসে জুয়া খেলতে গেছেন। খেলা তখন বেশ জমজমাট। তিনি ভাবছেন, কত নম্বর ঘরে বাজিটা ধরবেন। এক বয়স্ক ভদ্রলোক তাঁকে খেয়াল করছিলেন। তাঁর দেরি দেখে বললেন, ‘এত ভাবছেন কী? আপনার যত বয়স, তত নম্বর ঘরে বাজি ধরেন।’
সুন্দরীর মনে ধরল কথাটা। তিনি ২৪ নম্বর ঘরে বাজি ধরলেন। ঘুরল বোর্ডের চাকা। তিনি অপেক্ষা করছেন। তাঁর কাঁটা এসে থামল ৪২-এর ঘরে। অমনি তিনি মূর্ছা গেলেন। সব সময় বয়স ভাঁড়াতে নেই।
এবার একটা জন্মকাহিনি শুনুন। ভদ্রলোকের স্ত্রীর প্রসববেদনা উঠেছে প্রচণ্ড। ভেতরের সন্তানটি প্রথম আলো দর্শনে ব্যাকুল। তিনি হাসপাতালে ফোন করলেন—
‘এই ঠিকানায় একজন গর্ভবতী নারী প্রসববেদনায় ভীষণ ছটফট করছেন। এখনই দয়া করে একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো যাবে?’
‘এটা কি তাঁর প্রথম সন্তান?’
‘দূর মিঞা, এটা তাঁর হাজব্যান্ড।’
ওই যে প্রথম আলো দর্শনের কথা বলছিলাম, মানে জন্মদিন, ওই মুহূর্তকে আমরা স্মরণ করতে চাই। চাই বন্ধু, আত্মীয়, পরিজন—সবাই স্মরণ রাখুক। শুভেচ্ছা দিক। এতে যদিও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে আমি বুড়িয়েছি, তার পরও শুভেচ্ছা না পেলেই যেন বয়সটা বেশি মনে পড়ে। হারিয়ে যেতে বসে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
দাম্পত্য জীবনে জন্মদিনের বেশ ভালো ভূমিকা আছে। মনোমালিন্য বা বাগ্বিতণ্ডা দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু স্ত্রীর জন্মদিন ভুলে যাওয়া মানে মহা প্রলয়। মনে রাখার উপায় অবশ্য একজন বাতলেছেন: ‘জীবনে একবার শুধু ভুলে যাবেন স্ত্রীর জন্মদিনটা, তাহলে আর কোনো দিনই ভুলতে হবে না।’
তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় কখন জানেন? আপনার যমজ বোন বা ভাই যখন আপনার জন্মদিনটা ভুলে যায়।
জন্ম আর জন্মদিন নিয়ে মেলা কিছুই হতে পারে, কিন্তু তার আগে জন্মটা তো নিতে হবে। সেই প্রথম আলো দেখার জন্য অন্ধকারে ভ্রূণ সৃষ্টি তো হতে হবে। এই দেখুন, আবার ঘুরেফিরে অন্ধকারটাই চলে আসছে কলমে। পৃথিবীর ৭২৭ কোটি মানুষের জীবন তো আলো আর আঁধার নিয়েই। জন্ম-মৃত্যু সবই ঘটে চলেছে সময়ের সঙ্গে তাল রেখে। দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, জয়, পরাজয়—সবই আলো-আঁধারের খেলা বৈ তো নয়।
ও হ্যাঁ, মৃত্যুর একটি গল্প বলি। এক ব্যক্তি বলছেন, ‘মরতে আমি ভয় পাই না। তবে মৃত্যুর সময়টাতে আমি ওখানে থাকতে চাই না।’ আরেকজন বলছেন, ‘আমি স্বর্গে যেতে চাই, কিন্তু মরতে চাই না।’ ভুলে যাই, আমরা আলোতে এলেও একসময় আঁধারের কোলে প্রত্যাগমন করতেই হয়।
নাহ্! ওসব ভয় দেখানো কথা আজ না-ই বললাম। গল্প বলি আরেকটা। এক নারীর যমজ বাচ্চা হয়েছে। তিনি খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন—একটার বাপ কে, তা তো আমি জানি, কিন্তু সর্বনাশ! আরেকটার বাপ কে?
শেষ গল্পটা বলি এবার। এক নিঃসন্তান দম্পতি দরবেশের কাছে হাজির সন্তান লাভের আশায়। দরবেশ দোয়া করে বললেন, ‘আমি এই সপ্তাহে পৃথিবী ভ্রমণে যাব। যাওয়ার পথে প্রথমেই আজমির শরিফে তোমাদের নামে খাজা বাবা (রা.)-র দরগায় মোম জ্বালিয়ে দিয়ে যাব।’ বছর না ঘুরতেই ওই নারীর কোলজুড়ে এল ছয়টি যমজ বাচ্চা। তার কিছুদিন পর দরবেশ বাবা পৃথিবী ভ্রমণ শেষে এসে খবর নিতে গেলেন সেই দম্পতির বাড়ি। খুশির সংবাদে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। খোঁজ করে জানলেন গৃহকর্তা আজমির গেছেন।
‘কেন? হঠাৎ তিনি আজমির কেন গেলেন?’
‘আপনার জ্বালানো মোমবাতিটা নেভাতে।’
কিন্তু আমি চাই না দেশের প্রতিদিনের সেই ব্রহ্মমুহূর্তের নব-আলোটাকে যে নিজ অস্তিত্বে ধারণ করেছে, সেই প্রথম আলো নামের দৈনিক পত্রিকার মঙ্গল কামনায় লাখো পাঠক কর্তৃক প্রজ্বলিত মঙ্গলালোক নিভে যাক। জ্বলতে থাকুক শুভেচ্ছার মঙ্গলালোক শিখা অনির্বাণ হয়ে। জন্ম নিক নব নব উদ্ভাবন, বৈচিত্র্যের সমাহারে ভরে উঠুক প্রতিটি পাতা। নির্ভীক চিত্তে প্রকাশিত হোক অজানা সব সত্য, গৌরব, অর্জন। জলপ্রপাতের মতো বয়ে চলুক তথ্যপ্রবাহের ধারা। নেচে উঠুক পাঠকের মন, স্রোতে ভেসে যাক আনন্দসাগরে, প্রতিদিন, প্রতি সংখ্যায়, প্রতি পাতায়, প্রতি ছত্রে। সংযুক্ত হোক নব নব ধারার সাময়িকী, ফিচার পাতা—প্রথম আলোর সংসার হোক ফুলে, ফলে, ফসলে সমৃদ্ধ।
দৈনিক পত্রিকার ইতিহাসে এ দেশে যে নতুন ধারার প্রবর্তন সাধন করেছে প্রথম আলো, তা যেন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে দেখা দেয় দেশ ও দেশের আপামর জনসাধারণকে।
জয়তু প্রথম আলো।
ঢাকা, ৩ নভেম্বর ২০১৪
আবুল হায়াত: নাট্যব্যক্তিত্ব।