Friday, June 23, 2023

স্বামী না নরপিশাচ! স্ত্রীকে ভোগ করাতো অন্য পুরুষ দিয়ে

ফরাসি এক ব্যক্তি প্রতি রাতে তার স্ত্রীর ওপর মাদক ব্যবহার করতো। এরপর অন্য পুরুষদের আমন্ত্রণ জানাতো তার স্ত্রীকে ধর্ষণে। এমনিভাবে ১০ বছর ধরে তার ওপর নরপিশাচের মতো আচরণ করেছে তার স্বামী ও ওই মানুষ নামের অমানুষগুলো। অনলাইন দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হতাশাজনক এই খবর প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, তদন্তে দেখা গেছে ১০ বছরে ওই নারীকে এভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে কমপক্ষে ৯২ বার। এতে জড়িত ২৬ থেকে ৭৩ বছর বয়সী ৫১ নরপিশাচকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। পুলিশ অন্যদের খুঁজছে। ধর্ষকদের মধ্যে আছে একজন অগ্নিনির্বাপণকর্মী, একজন লরি চালক, মিউনিসিপ্যালিটির একজন কাউন্সিলর, একটি ব্যাংকের আইটিকর্মী, জেলখানার প্রহরী, হাসপাতালের একজন সেবক ও একজন সাংবাদিক।
ফরাসি ওই ব্যক্তিকে দ্য টেলিগ্রাফ ডমিনিক পি হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। সে হতাশাবিরোধী ওষুধ লোরাজিপাম প্রয়োগ করতো তার স্ত্রীর খাবারে। এরপর তিনি গভীর ঘুমে চলে যাওয়ার পর তার ওপর চলতো নারকীয়তা। ফ্রান্সের মাজানে অবস্থিত তার বাড়িতে কথিত ওইসব ‘অতিথি’কে আমন্ত্রণ জানাতো তার স্বামী। ওই নরপিশাচরা যখন এই ঘুমন্ত নারীর শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতো, তখন সেই দৃশ্য ভিডিওতে রেকর্ড করতো স্বামী নামের ওই জানোয়ার। রেকর্ড করে সে এসব দৃশ্য ধারণ করে রাখতো ইউএসবি ড্রাইভে। সেখানে একটি ফোল্ডার করেছিল। এর নাম দিয়েছিল ‘অ্যাবিউসেস’। তার ভিতরে জমা করে রাখতো এসব ফাইল। এখন তা পুলিশের হাতে রয়েছে। পুলিশ বলেছে, এসব ঘটনা ঘটেছে ২০১১ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে। উল্লেখ্য, ফ্রাঁসোয়া নামের ওই নারীর সঙ্গে কমপক্ষে ৫০ বছর আগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় ডমিনিক। এই যুগল তিনটি সন্তানের পিতামাতা।

 

Tuesday, June 20, 2023

মৃতের সঙ্গে বসবাস

মৃত আত্মীয়ের সঙ্গে দিব্যি বসবাস করছিলেন তিনি। অবশেষে বিষয়টি সামনে আসার পর ৬১ বছর বয়সী আলাবামা ব্যক্তিকে তদন্তকারীরা গ্রেপ্তার করে । ওয়াকার কাউন্টি শেরিফের অফিসের ডেপুটিরা ৯ জুন বার্মিংহামের ৩২ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ছোট শহর সিপসির একটি বাসায় পরিবারের একজন সদস্যকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে।


লিয়েন্ড্রু স্মিথ জুনিয়রকে একটি মৃতদেহের সঙ্গে বসবাসের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল এবং তাকে কাউন্টি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
পোস্ট অনুসারে, স্মিথ স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানানোর প্রয়োজনবোধ করেননি যে তার আত্মীয় মারা গেছে। ওয়াকার কাউন্টি জেল কর্তৃপক্ষ সিএনএন- এর সাথে এবিষয়ে কথা বলতে চায়নি ।
এটা স্পষ্ট নয় যে, স্মিথের আইনী প্রতিনিধিত্ব আছে কিনা বা তার আত্মীয়  কত দিন আগে  মারা গেছেন। পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। শেরিফের অফিসের ফেসবুক পোস্টে বলা হয়েছে- ''একটি মানুষের মৃতদেহের সঙ্গে বসবাস পরিবারের সংবেদনশীলতাকে আঘাত করে,  এটি  'ক্লাস সি' অপরাধের মধ্যে পড়ে। ''

পোস্ট অনুসারে, তদন্তকারীরা মারা যাওয়া ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করছেন।

সূত্র : সিএনএন

Thursday, June 15, 2023

গল্প- শ্রেষ্ঠ যুদ্ধ by সুশান্ত মজুমদার

সুনীলের জীবনে সেই একসময় এসেছিল চারপাশে যখন চরম মৃত্যু। মফস্বল ছেড়ে নদী পার হওয়ার কালে সে জলে মানুষের গলিত শব দেখেছিল। তিনদিন সুনীল ঘুমাতে পারেনি। গুলি-আগুন-হত্যাযজ্ঞ-ভস্মীভূত চরাচর দেখে সুনীল হয়ে উঠেছিল সহ্যক্ষম নিরেট প্রতিবাদী লোহা। নিজে বাঁচতে, মানুষ বাঁচাতে এবং দেশের মাটির দখল রাখতে সে হয় সাহসী এক মুক্তিযোদ্ধা। বিজয় বহন করে সে ফিরে এসেছিল ধ্বংসত্মূপের নিচে চাপাপড়া নিজের শহরে। তাদের ঘর-দরজা উধাও – ভিটে চাষ করে সস্তা তরকারির গাছ লাগিয়েছিল দুশমন রাজাকাররা। স্বাধীনতার জন্য মানুষকে ত্যাগ-বিসর্জন দিতে হয়। বারোয়ারি সুনীল সামর্থ্য, প্রতিষ্ঠা, আশ্রয় উৎসর্গ করে মিশে যায় মানুষের ভিড়ে। সময়ের স্রোতে ঘাটে ঘাটে ঘুরে হয় এক অফিসের কর্মচারী। মাথার ওপর ভাঁড়ার ছাউনি, লবণাক্ত পুরনো দেয়াল, গোঁজামিল দেওয়া কৌটার দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে সুনীলের দিনযাপন। তার বর্তমান আখ্যানের একটি টুকরো এখানে বিবৃত হলো।

মাঝারি গোছের রোজগেরের আবার গোছালো ড্রয়িংরুম; গোঁজামিলে ভরা গৃহস্থের ওই বিশেষ নামের সামনের রুমের অল্প পরিসরে তিন বেলা খাওয়ার, অষ্টপ্রহর বসার সুযোগ; আর রাতে হাত-পা ছড়িয়ে এর মেঝেতে চাদর বা কাঁথা পেতে ব্যবস্থা হয় আঠালো ঘুমের। রুমের উত্তর-পূর্ব কোণে পাতা সাধারণ একটা ডাইনিং টেবিল, তিনটি ফালতু চেয়ার, এ-পাশে রাখা রংজ্বলা মোটা কাপড়ে আঁটা ছোট্ট দুটো সস্তা সোফা। ভেতরের রুমে ঢোকার দরজার পাশের এমন একটা সোফায় সুনীল গা ছেড়ে বসা। সিঁড়ি থেকে পায়ের শব্দ উঠে আসছে। ভেজানো দরজা ঠেলে দীপু ভেতরে ঢোকে। বয়সের চেয়ে পুষ্ট অপেক্ষাকৃত লম্বা বাসার এই ছোট ছেলেটা বাবার সঙ্গে চোখাচোখি হলেই মিষ্টি করে হাসে। পাশ কেটে সে ভেতরে চলে যায়। ব্যাপার কী! মুহূর্তে ভুরু বেঁকে আসে সুনীলের। ছেলের শরীর থেকে যেন সিগারেটের গন্ধ ভেসে এলো। এবার লম্বা করে সে শ্বাস টানে – হ্যাঁ নির্ভুল, গন্ধ সিগারেটেরই। তাজ্জব হয়ে সুনীল ধীরে ধীরে জমে যেতে থাকে – বয়স কেবল উনিশ, সেদিনের ছেলে, আরে মুখ থেকে যার পুরোপুরি দুধের গন্ধ যায়নি, এই সে বাবা-মার চোখের আড়ালে দিব্যি সিগারেট টানছে!

ভাবতেই সুনীলের মাথার মধ্যে সহসা খর প্রশ্ন ছোঁ মারে – এত তাড়াতাড়ি এই বয়সে একা একা তো নেশা জমে না, নিশ্চয় সঙ্গদোষ। তা-ই যদি হয়, কাদের সঙ্গে ছেলে মিশছে, বন্ধুবান্ধব কারা, খোঁজখবর নেওয়া জরুরি। এ-সময় আরতি ভেতর থেকে জলভর্তি একটা জগ এনে টেবিলে রাখে। ছেলের মা থাকে সর্বক্ষণ বাসায়, সে কি আদৌ জানে না? টের পায়নি? ছোট ছেলের মৌতাত বিষয়ে কথা শোনা ও শোনানোর এই তো সুযোগ। রাগ জুড়িয়ে যাওয়ার আগে আগে দু-চারটা গরম বাক্য না রাখলে মন ঠান্ডা হবে না। সুনীলের স্বর যেন বর্শা ছুড়ে মারে – ‘তুমি জানো কিছু?’

স্বামীর শক্ত গলার অমন ঘণ্টা আওয়াজে আরতি ঘুরে দাঁড়ায়। কী জানব? হঠাৎ জানাজানির ঘটনা কী! তার চোখেমুখে জিজ্ঞাসা ফুটে ওঠে – মানুষটা কী বলতে চায়?

সুনীলের নজর খসে নিচে পড়লে সে দেখে, আরতির ডান হাতের আঙুল হলুদ। ও, এখন রান্না করছে। ছোট ছেলের সিগারেট টানাটানি নিয়ে কথা ঘোলা করার উপযুক্ত সময় এখন নয়। আরতিকে চলে যেতে সুনীল ইশারা করে।

কখনো কি সে সিগারেট টেনেছে? হারানো-ফুরানো স্মৃতি খুঁড়ে তুলতে নিজের স্মরণের ওপর চাপ রাখে সুনীল। না, স্কুলজীবনে গোঁফের রেখা ফুটে ওঠার আগে-পরে ক্লাসের কেউই ধূমপানে ছিল না। ওপরের ক্লাসের কোনো ছেলেকেও ছুটিছাটায়, কি দুষ্টুমি করে সিগারেট টানতে সে দেখেনি। বয়স হলে কেবল বড়দের কেউ কেউ বিড়ি-সিগারেট খায়, এমন ধারণা চালু ছিল। কলেজে পড়াকালে তাও বিএ পড়ার সময় বন্ধুরা আড্ডা মারতে মারতে একটা সিগারেট ধরিয়েছিল। ঘুরে ঘুরে তার আঙুলে এলে জোরে টান দিয়েছিল সুনীল। ব্যস, কণ্ঠার কাছে ধোঁয়া আটকে গেলে শুরু হয় বেজায় খকখক কাশি, জল জমে যায় চোখে। ওই প্রথম ওই শেষ তার সিগারেট টানা। মফস্বলবাসী তার বড় ভাই, সত্তরের কাছাকাছি যার বয়স, এখনো শক্তসমর্থ, আজো বাসার বাজার সে নিজ হাতে করে, রান্নার কাঠ ফাড়তে কুড়াল তুলে সে খাড়া হয়ে দাঁড়ায়। কই, তার সিগারেট কেন, শখ করে হুক্কা টানার কথাও কখনো শোনা যায়নি। তাহলে? তার বড়-ছোট দুই ছেলে কি বাপ-জ্যাঠা থেকে কিছুই শেখেনি? নাকি তার ভুল – ঠিকঠাক চালচলন, জীবনযাপনের শিক্ষা দিতে সে ব্যর্থ হয়েছে?

সুনীলের খুব ভেতরে, দৃষ্টির অগোচর বিভিন্ন কোটরে টান পড়ে। তাৎক্ষণিক জখমবোধ জেগে উঠতে উঠতে থমকে যায়। তার বদলে মন দখল করা জিদের উদয় হয়। ছেলের সঙ্গে কি ঝাঁজালো বাক্যে বোঝাপড়া করবে? নাকি এবারের মতো এড়িয়ে হাতেনাতে সিগারেট ধরার জন্য সে অপেক্ষা করবে? নাকি কিছুই দেখিনি, কিছুই বুঝিনি গোছের মুখ তার নিরীহ রাখবে? আপত্তি করার ভঙ্গিতে নিজে নিজে মাথা নাড়ে সুনীল – না, চুপ থাকার সুবাদে ছেলের সাহস ক্রমাগত বেড়ে যেতে পারে। দেখা গেল, হাত নামমাত্র আড়ালে রেখে কিংবা বাবা যখন বাসাতে নেই দীপু তখন রুমেই সিগারেট টানছে। অবস্থা হচ্ছে, ও সিগারেট খায়, বাবা তো জানে। আর মা, ধুস কোনো ব্যাপার হলো।

সুনীল টের পায় তার মেজাজে উষ্ণতা ক্রমশ জ্বাল পাচ্ছে। না, কিছুতেই ছেড়ে দেওয়া যায় না। চূড়ান্ত হেস্তনেস্ত হওয়া দরকার। শাসনে না-রাখলে এমন কাঁচা বয়স থেকেই ছেলেপেলে উচ্ছন্নে যায়। এখুনি লাগাম না পরালে সর্বনাশ, কালে কালে আরো মন্দ আচরণে ছেলে সাহসী হতে পারে। পুরোপুরি নেশাভাংয়ে জড়িয়ে গেলে ছেলে নিজের ভবিষ্যৎ পয়মাল করে ফেলবে। তাহলে উড়নচন্ডী স্বভাবের বড় ছেলে নিপু, যে এখন পূর্ণ যুবক, যার সর্বাঙ্গে সিগারেটের গন্ধ, যার গা-ঘেঁষে কেবল হেঁটেই গেলে যে কারো নেশা হয়ে যাবে, এই তাকে কেন সদয় প্রশ্রয় দেওয়া? ভেন্টিলেটরের গস্নাসভাঙা বারান্দার বাথরুমে রাতে ফস করে ম্যাচকাঠি জ্বলে কোন হিম্মতে? বারিধারার ওদিকে পরিচ্ছন্ন বাড়ির এক অ্যাড ফার্মে তার চাকরি। ঘাড়ে ব্যাগ ঝুলিয়ে সে শান্তিনগর থেকে সকালে যায় – রাতে ফেরে। কোনো কোনো রাতে সুনীল ঘুমিয়ে পড়ার পর ছেলে আসে। পরদিন আরতির থমথমে মুখ দেখে সে পরিষ্কার অনুমান করে – বেসামাল ছিল নিপু। মাসের পয়লা সপ্তাহে মায়ের স্নেহময় হাতে, হাজার দশেক টাকা দিচ্ছে বলে তার নেশা-চড়ানো আরাম দেখে-শুনে-বুঝে নীরবে অনুমোদন করা ন্যায্য কথা নয়। এই এলোমেলো চালচরিত্র নিয়ে বড়ভাই কেমনে তার বছর পাঁচেকের ছোটভাইকে গাইড করবে? ভাইকে করবে সে দেখভাল? অসম্ভব। পারে তো তিনতলা থেকে দৌড়ে নেমে ফুটপাথের টং দোকান থেকে রাতে সিগারেট আনতে ছোটভাইকে সে অর্ডার দেয়। অসাধ্য কিছু না, জ্বলন্ত অর্ধেক সিগারেট নিপু ছোটভাইয়ের ঠোঁটে গুঁজে দিতে পারে।

খুব ভেতরের নিবিড় জখম বোধে সুনীল সহসা উতলা হয়ে ওঠে। অবশ্যই তারও অনুচিত হচ্ছে, নিপুর আয়ের অংশে সংসার খরচের সংস্থান হয় জেনে ছেলের তৈরি করা ত্র‍ুটি মুখ বন্ধ রেখে দেখে যাওয়া। সন্তানের জন্মদাতা সে, এদের ভরণপোষণ শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে বড় করে তোলার দায়িত্ব তার। তুমুল টানাটানির কারণে ক্লান্ত হলেও এই গুরুভার বহনে পারতপক্ষে সুনীল কার্পণ্য করেনি। সন্তানের সাধ-আহ্লাদ-দাবি-চাহিদা সব আবদার পূরণ করলে তাদের  কার্যকলাপের জবাবে ন্যায্যকথা শুনিয়ে দেওয়ারও অভিভাবক সে।

সুনীল বোঝে, নিপু তার দোষ ওয়াকিফ বলে আগে থেকেই বাবার মুখোমুখি হওয়ার সাহস সে হারিয়েছে। কখনো সামনে পড়লে এমন দৌড়চালে বাবার নজরের বাইরে সরে যায় যেন বাথরুমে যাওয়ার চাপে আছে সে। ছেলের রুম দিয়ে যেতে যেতে সুনীল থমকে কখনো দৃষ্টি দিলে দেখা গেল নিপু কম্পিউটারে এমন মনোযোগ ধরে রেখেছে যে, কোনো মানুষের উপস্থিতি আদৌ সে টের পাচ্ছে না। চোখ কম্পিউটারের টার্মিনালে স্থির। বাকি থাকে যে দুই কান তাও গান বা সিনেমার সাউন্ড উপযুক্তভাবে শোনার জন্য হেডফোন দিয়ে ঢাকা। কোনো ডাকাডাকি ছেলের কর্ণকুহরে পৌঁছে না। সময় যায়, খেতে আসার জন্য মায়ের এতো নরম-গরম, সরু-মোটা চেঁচামেচি করা স্বর, কীসের কী, সব বৃথা। হেডফোন লাগিয়ে এমন মানুষ অগ্রাহ্য সুনীলের কাছে রীতিমতো বেয়াদবি মনে হয়।

ভাবতেই তার মাথা থেকে গরমের চড়া আঁচ নেমে আসে। খানিক ঝিম মেরে নিজের ত্রাণ নিজে ধরে রাখতে সে কৌশল নেয়। তার পজিশন নস্যাৎ করে গোঁয়ার অশিষ্টতা সে দেখাতে যাবে কেন? হোক তার সন্তান, এই জামানার কা-জ্ঞানহীন ছেলেপেলের সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া আলাপ না-করাই উত্তম। এর ফল হয়েছে : বড় ছেলের সঙ্গে সুনীলের বাক্যালাপ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। উভয়ের মধ্যে পাতলা হলেও অদৃশ্য একটা দেয়াল উঠেছে। ছেলে ভাবছে, এটা বুঝি তার জন্য দারুণ সুবিধার – বাবা তো কিছু বলছে না। ইচ্ছামতো রাতে সে বাসায় ফিরছে। তার যাওয়া-আসা দিনযাপনের সঙ্গে বাবার কোনো সম্পর্ক নেই। কী মজা! যত ঘোরালো-প্যাঁচালো কথা হোক, কি স্বর মোলায়েম করে কিছু আদায় করার মতলব হোক, সব তার মায়ের সঙ্গে। মাও ছেলের পর্ব স্বামীর কাছে তোলে না। আরতি জানে, নিপু প্রসঙ্গে পেশ করলে সুনীলের এক কথা – ‘ভাত বন্ধ করে দাও।’ আরতি তখন কোন্দল করা অসমেত্মাষ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় – ‘তুমি দাও। তোমার বাসা। আমার কী, ছেলে তো আমার একার না।’ এরপরই আরতির স্বরে মেঘোদয় হয় – ‘গত জন্মে মনে হয় পাপ করেছিলাম। এ জন্মে তাই প্রায়শ্চিত্ত করছি।’ বোঝো এবার, ঘরের বউয়ের খেদ-আক্ষেপ, হা-হুতাশে যদি জোর বাড়ে, তার চিল-চেঁচানি আশপাশের জানালার ফাঁক দিয়ে উড়ে যায়, তবে মানুষজন ভাববে কী – স্বামীটা নির্ঘাৎ ইতর, বউয়ের সঙ্গে খালি দুর্ব্যবহার করে।

সুনীলের মানহীন মলিন ভাড়া বাসাটা শান্তিনগরের এক গলি রাস্তার ভেতর দিকের পুরনো তিনতলায়। সিলিং-দেয়াল-বাথরুম-রান্নাঘর সবখানে এখন বাসিগন্ধের প্রলেপ। স্বাস্থ্যহানিকর দাগি বাসাটা ছেড়ে অন্য কোথাও একখানা আরাম কুরসিতে বসবে এমন সামর্থ্য তার নেই। এদিকে পরিচয়দানে অযোগ্য যে চাকরির কলম পিষে কালো চুল সাদা করে এনেছে সেখানে বেতন বাড়ছে না। হাজার হাজার বেকার থেকে সুলভে অফিসে লোক পাওয়া দুষ্কর নয়। মালিক মহোদয় এখনো তাকে এই বয়সেও কাজে রেখে বেতন দিয়ে যেন ধন্য করছেন। তার মনোভাব এমন : পুরনো কর্মচারী, পয়লা থেকে আছে, কী আর করা।

সুনীলদের মুখোমুখি সামান্য দূরে নতুন একটা বিল্ডিংয়ের চারতলার ছিমছাম ফ্ল্যাটের ফর্সা ভদ্রলোক সম্প্রতি চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন। পেনশন বাবদ তিনি মোটা অংক – লাখ লাখ টাকা পাবেন। হাওয়ায় উড়ে আসা এমন লোভনীয় খবর শুনে আরতি স্বামীর কাছে জানতে চেয়েছিল, তার অফিসেও পেনশনের সুব্যবস্থা আছে কিনা। সুনীল দুর্বোধ্য চাহনি দেয়, যেন ব্যাপারটা সে বুঝতে পারছে না। বছরে দুবার তার চাকরিতে বেতনের সিক্সটি পার্সেন্ট বোনাস ছাড়া আর কোনো আর্থিক সুবিধা নেই। বউয়ের জিজ্ঞাসার সামনে ঠোঁটে আঠা জমিয়ে সে চুপ করে আছে দেখে শুরু হয় আরতির ঠেসবাক্য। তাহলে আগামী দিনগুলো সচল বলো কি জীবিত বলো নির্ভর করতে হচ্ছে ছেলের চাকরির ওপর। দাঁড়াচ্ছে কী, ছেলের পেছনে খরচ করেছি, এখন অন্নজলের জোগান দিক সে। ছেলে তখন চাটি মারলেও তা হজম করো। ধুর, তীব্র আপত্তি সুনীলের মাথার মধ্যে শোর তোলে। মেরুদ–বাঁকা জীবন তার কাম্য নয়। আচ্ছা, গড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা এই সংসারে মাত্র চারটি প্রাণী। দেখো, এদের চার চরিত্র। ভাবতেই বড়ছেলের আরেকটা দোষ সুনীলের সামনে খাড়া হয়। সবকিছুতেই ছেলের তাড়াহুড়ো। এতো ডাকাডাকি, আসে না আসে না, হঠাৎ খাওয়ার টেবিলে এসে হামলে পড়ে সে। টেবিলে খাওয়ার কী কী আছে সব ঢাকনা তুলে সে তদন্ত করে। মেঘবাদল না থাকলে ভোরে সুনীল হাঁটতে বের হয় – অনেক দিনের অভ্যাস। রমনা পার্কে চক্কর মেরে ফেরার সময় বেইলি রোডে বসা ভাসমান বাজারের মাছ-তরকারি সে প্রায়ই কিনে আনে। তরকারির দাম নাগালের মধ্যে থাকলেও তার মতো নির্দিষ্ট উপার্জনের মানুষের মাছ কেনার ক্ষমতা দিনে দিনে ক্ষয়ে আসছে। সাধারণ গুঁড়ো মাছের দাম পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে এখন। খদ্দেরদের ওপর মাছ-বিক্রেতার এমন দৃষ্টি – কিনবেন না, বেশ, মাছের ওপর চোখ দেওয়ার কারণে পারলে কিছু পয়সা দিয়ে যান। খরচের নাগালে থাকা মাছ ছাড়া কী কিনবে সে। দেখো, তেলাপিয়া মাছের রান্না, উঁহু, ধুস – মুখে ভেংচি রেখে নিপু নিজস্ব অপছন্দের আওয়াজ রুমে ছুড়েই যায় – ‘এসব হাবিজাবি খাওয়া যায়? হলিডে, কোথায় বেটার কিছু থাকবে।’ অসাধ্য এক উত্তেজনা মুহূর্তে সুনীলকে দখল করে; আর তা বেরিয়ে আসতে আসতে কণ্ঠে পাথুরে শব্দ হয়ে যায় – ‘ভালো কিছু বাজার থেকে আনলে হয়। কখনো তো দেখলাম না।’

শেষবাক্যের জবাবে জোর পদক্ষেপে নিপু রুম ছেড়ে যায়। এ-সময় ভাতের গামলা হাতে আরতি কেবল রুমে ঢুকেছে, বড়ছেলে অমন অন্ধকার মুখে চলে যাচ্ছে দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে স্বামীর ওপর সে বাঘাটে চাহনি তুলে ধরে। তার চালু খরখরে স্বরের ধারে সুনীল এবার চেরাই হতে থাকে – ‘ছেলেটার পেটে আছে কিছু, সেই সকালে এককাপ চা আর দুটো বিস্কুট খেয়েছে। এখন খাবে ভাত। তা না, ছেলেটাকে তিনি তাড়িয়ে ছেড়েছে।’ ভয়ংকরী রূপ ধারণে পায়ের শব্দ কিছুতেই আসেত্ম হয় না। হড়বড়ে পায়ে আরতি ভেতরে যায়।

এই ঘটনার সাত-আটদিন গেছে। বাবার মুখোমুখি পড়লে নিঃশব্দে নিপু পাশ কেটেছে – কথা বলেনি। হতে পারে, তার ভেতরে বলার মতো কোনো কথা জমেনি। কিন্তু চেহারাছবিতে পরিষ্কার সমেত্মাষ, আগের মতোই স্বাভাবিক। যথারীতি নিত্য অভ্যাসে ছোট পুত্তুর দীপু তার কথার ফোয়ারা চালু রেখেছে। আজগুবি থেকে নির্ভেজাল কত তার কথা। – ‘বুঝলে বাবা, আর দুদিন বাকি অ্যালান টিউরিংয়ের জন্মশতবার্ষিকীর।’

হঠাৎ ভিন্ন এক প্রসঙ্গ, আর টিউরিং বা কার নাম! সুনীল হা-মুখে স্থির চেয়ে থাকে। কোন কথা থেকে কোন কথায় যে ছেলেটা চলে যায়। বাবার অবুঝ ফাঁপা-চাহনি দেখে দীপু নরম করে হাসে – ‘মাই ওল্ড ড্যাড। অ্যালান টিউরিংকে তুমি কেমনে জানবে? হ্যান্ড্রেড ইয়ার্স হলো, লন্ডনের প্যাডিংটন হসপিটালে কম্পিউটার সায়েন্সের এই ফাদারের জন্ম। দুঃখ কী জানো, বয়স ফর্টি টু হওয়ার আগেই সুইসাইড করে সে। তার ডেডবডির পাশে কামড় দেওয়া একটা আপেল পাওয়া যায়। পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট : আপেলের সঙ্গে সায়ানাইড মেশানো ছিল।’

হঠাৎ দীপুর কম্পিউটার সায়েন্টিস্টের সুইসাইডের কথা কেন? আগেও কখনো কখনো কথাচ্ছলে জানা-অজানা মানুষের মৃত্যু নিয়ে সে বলেছে। ফিজিক্স হচ্ছে দীপুর প্রিয় বিষয়। এই ফিজিক্সের উদাহরণই সে বেশি বেশি টেনে আনে। তাহলে দাঁড়ালো কী, সুনীলের গত ও বর্তমান মিলিয়ে আটপৌরে জীবন, জানাজানি কম, শ্রোতা হওয়া ছাড়া কথকের খুব একটা সুযোগ তার হয় না। কিন্তু সুইসাইডের উদাহরণ তুলে প্রকারান্তরে সুনীলকে কি ভয় দেখায় দীপু? ছেলের মুখে আত্মহত্যার গল্প শুনলে ধীরে ধীরে শরীরে তার হিম ভেঙে আসে।

কেবল ছুটিছাটার দিনেই চার চেহারা খাওয়ার টেবিলে একত্র হয়। ছুটির কোনো কোনো ঝকঝকে দুপুরে টেবিলের একটা চেয়ার ফাঁকা থাকে। বড়ছেলের শখ নয়ন-নন্দন ছবি তোলার। ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে ফিরতে ফিরতে তার দুপুর গড়িয়ে যায়। কোথায় নিজের রুমে বসে বিশ্রাম করবে, তা না, ছোটভাইকে পেলে তো কথাই নেই, শুরু হয় তার অনর্গল উচ্ছ্বাস – ‘বুঝলি, অফিসার্স ক্লাবের চৌমাথায় দাঁড়িয়ে ক্যামেরা অন করেছি, ও মা, পাশে দেখি মানুষ, ক্যামেরা দেখলেই ভিড়।’

নিপু গ্রাফিকসে মাস্টার্স। তার এক্সট্রা যোগ্যতার জন্য ডিএসএলআর ক্যামেরা চাই। ভালো, তার বেতনের টাকা জমিয়ে সে ক্যামেরা কিনবে – কিনুক। কিন্তু দাঁড়ালো কী, সংসারের এ-খরচ ও-খরচ ছাঁটাই করে হাজার দশেক টাকা ছেলের ক্যামেরার জন্য সুনীলকে দিতে হলো। কষ্টের এই ভোগ ছেলে কি বোঝে? বাবার মন ভেজাতে কিছু টাকা মাসে মাসে সে ফিরিয়ে দেবে বললেও ছেলের প্রতিশ্রম্নতির ওপর সুনীল আস্থা রাখেনি।

দীপু ছোট হলেও তার কথায় থাকে বিভিন্ন মোচড়। চালচলনে কোথায় জানি তার সেয়ানা ভাব। তার চাহিদা সে গচ্ছিত রেখেছে ভবিষ্যতের কাছে। বড় কোনো আকাঙ্ক্ষা এখনো তৈরি হয়নি বলে বাবার ওপর বর্তমানে তার কোনো প্রেসার নেই। তবে এশিয়া-ইউরোপ না, উত্তর আমেরিকায় উড়ে যাবে, সেটেল সে ওখানে হতে চায়। ওয়ার্ক পারমিট জোগাড় হলে কাজের ফাঁকে লেখাপড়া করবে। কানাডার এডুকেশন নাকি বেটার। ভ্যালু আছে, লেখাপড়া জানলে সব সহজ ওখানে। খুশি খুশি ভাব নিয়ে সে একাধিকবার বাবাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে – ‘তুমি বলেছিলে তোমার কাস্টমসের রিটায়ার্ড কোন বন্ধু আছে, তার মেয়ে-জামাই দুজনে টরন্টো ইউনিভার্সিটিতে আছে, যোগাযোগ রেখো, কাজে লাগবে।’ দীপুর ধারণা, এদেশে এখন চরম ডার্ক পিরিয়ড চলছে। কোনো উন্নতির সম্ভাবনা নেই – ফিউচার জিরো।

বিস্ময়ে ছোটছেলের ওপর থেকে সুনীল চোখ সরাতে পারে না। এসব কি দীপুর নিজের কথা? দীপু জানে না ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর কোনো সামর্থ্য তার বাবার নেই। বড়লোকের ছেলেপেলে বন্ধু হলে তাদের যাবতীয় সঙ্গদোষ মধ্যবিত্তের মধ্যে চালান হয়ে আসে। মেজাজ-মর্জি, চালচলন তখন ফুলে-ফেঁপে ঢোল। নিজের সীমানা নিয়ে সঠিক ধারণা থাকে না।

টিভি অন করে সুনীল। সাউন্ড কমিয়ে খবর শুনতে শুনতে পেস্নটে সে ভাত তুলে নেয়। দীপু বড়ভাইয়ের মুখে রগড়ে চাহনি দিয়ে এবার বাবার মুখ পড়তে তৎপর হয়। তার মুখে যথারীতি মিঠেল হাসি জ্বলছে। নিপু তার স্বভাব মোতাবেক বিরক্ত, খাওয়া নিয়ে সেই খিটিমিটি আছেই – ‘হাইব্রিড কই মাছ মানুষ ক্যামনে খায়? টেস্ট নেই – কাঁটা শক্ত।’ পারলে কই মাছ, এই মাছের গুষ্টি-গোত্র, এমনকি এই মাছের ক্রেতার ওপর দিয়ে সে মনের ঝাল মিটিয়ে নেয়।

ডাইনিং টেবিলে কোনো ছুতানাতায় নিপু তার অসমেত্মাষ ছড়িয়ে খাওয়ার পরিবেশ বিস্বাদ করে দিতে পারে ভেবে সুনীল সতর্ক থাকে।

টিভিতে সরকারের খবরের পর এবার বিরোধীদলের সংবাদ পড়া হচ্ছে। দুর্নীতির কারণে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই সরকারের জনপ্রিয়তা এখন শূন্যের কোঠায়। সুনীলের পেস্নটে হাত, ঘাড়ে চাপ, চোখ টিভি স্ক্রিনের ওপর ধরা দেখে দীপুর বিরাগ স্বর উড়িয়ে বাবার মনোযোগ টলিয়ে দিতে চায়। – ‘বাজে প্যাঁচাল। ডার্টি পলিটিক্সের কী শোনো তুমি? বোর ফিল করো না?’ বড়ভাইয়ের সমর্থন আদায়ে দীপু তার আঙুলে টিপ দেয়।

নিপু অনেক অতলে বুঝি ডুবে ছিল, এতোক্ষণে তার হুঁশ ফিরেছে – ‘ও টিভি নিউজ রাবিশ’ বাবার উদ্দেশে এবার তার মোটা স্বর – ‘এত খবর দেখলে, নিজে কখনো খবর হলে না।’

পেস্নটে রাখা সুনীলের হাত এবার জমেই যায়। তাকে কি নিপু ব্যঙ্গ করছে? না এটা বাবার নিরুপদ্রব গোবেচারা জীবন নিয়ে সমব্যথী হওয়া ছেলের নিরীহ উক্তি – কোনটি? যেটাই হোক, একটা বিষয় পরিষ্কার – ছেলে বাবার পুরনো ডালে কিছুতেই বসার পক্ষপাতী নয়। ডানা সে ঝাপটাবে – উড়াল দেবে। ভালো ভালো।

– ‘টিভি বন্ধ করে দিই বাবা। কেউ তো দেখছে না।’ দীপু রিমোট টিপতে যাবে, তখুনি যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে খবর শুরু হলে সুনীল হাত তুলে ছোট ছেলেকে নিবৃত্ত করে।

– ‘এই আর এক সাবজেক্ট!’

দীপুর বাঁকা কণ্ঠে সুনীলের অবাক হওয়ার পালা। ছেলেটা কি অসময়ে সাবালক হয়ে গেছে, নচেৎ অত কথা, কিংবা ঘটনার সঙ্গে অত জড়িয়ে পড়া কেন। বয়স্কদের মতো মুখভঙ্গি, বিষয় জটিল করে তোলা এত তাড়াতাড়ি শিখল কীভাবে? একেই তবে ইঁচড়েপাকা বলে। উত্তম, এক ছেলে ওপরে ওঠার সিঁড়ি খুঁজছে, আরেক ছেলে এই বয়সেই স্নব – দেশের কোনো কিছু ভালো লাগে না। মাথার মধ্যে পরবাসী হওয়ার ভাবনা।

‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে হবেই। চক্রান্ত করে এই বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।’ – সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সচিত্র সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। দীপু এঁটো ডানহাত সামান্য তুলে হিসাব করে – ‘দুই হাজার উনিশ সাল এখন। যুদ্ধ হয়েছে উনিশশো একাত্তরে, আটচলিস্নশ বছর হলো, এতদিন আগের, এর ওপর তো ধুলো পড়ে গেছে বাবা -।’

দীপুর গাঢ় হিসেবি স্বর ও ধুলোর নির্যাতনের সম্ভাবনা টেবিলে-পেস্নটে-ফ্লোরে পড়ে ছড়িয়ে যায় – ‘তোমরা যারা ফ্রিডম ফাইটার, এখন কি মনে হয় যুদ্ধ করে ভুল করেছো?’

সুনীলের কশেরুকায় ঝাঁঝাঁ বেগে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। যুদ্ধ করে ভুল? কিসের ভুল? বলে কী ছেলে! মুক্তিযুদ্ধ না-হলে সংখ্যালঘু হওয়ার অপরাধেই তো তাদের  উদ্বাস্ত্ত হতে হতো। কিংবা এতদিন পাকিস্তান নামের ব্যর্থ একটা রাষ্ট্রের থার্ড ক্লাস নাগরিকের হীন পরিচয়ে থাকতে হতো। যুদ্ধ করে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা না-হলে কোথায় জন্মাত এই ছেলেপেলে। মুক্তিযুদ্ধ, অমন শ্রেষ্ঠ কীর্তির ওপর কেমনে ধুলো পড়ে।

‘ইম্পসিবল’ সুনীলের কণ্ঠছেঁড়া আওয়াজের প্রতাপে নিপু-দীপুর দুজনই বিস্ময়ে বাবাকে দেখে। অমন বাঁচা-মরার যুদ্ধের ওপর ধুলো, উঁহু, হতেই পারে না। সুনীল তার নাগালের টেবিলের অংশে দুহাত এগিয়ে ধুলো সরাতে সক্রিয় হয়।

Tuesday, June 13, 2023

হিটলার ১৯৪৫ সালেই মারা যান, পালানোর গল্প ঠিক নয় - বলছেন ফরাসী বিজ্ঞানীদের দল

এডলফ হিটলার
নাৎসী জার্মানির স্বৈরশাসক এডলফ হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে মারা যান নি, তিনি পালিয়ে গিয়ে আরো অনেক দিন বেঁচেছিলেন - এরকম নানা তত্ত্বকে ভুল দাবি করে একদল ফরাসী বিজ্ঞানী বলছেন, তারা নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছেন যে তিনি ১৯৪৫ সালেই বার্লিনে মারা গিয়েছিলেন।
ফরাসী ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল রাশিয়ায় সংরক্ষিত হিটলারের দাঁত ও মাথার খুলির অংশ পরীক্ষা করে বলেছেন, হিটলার যে বুলেটের আঘাত ও সায়ানাইড পান করার ফলে মারা গিয়েছিলেন - এ ব্যাপারে তারা প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিত।
ইউরোপিয়ান জার্নাল অব ইন্টার্নাল মেডিসিন নামে এক সাময়িকীতে ওই পরীক্ষানিরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে।
প্রধান গবেষক ফিলিপ শার্লিয়ে বলছেন, তাদের এই জরিপের ফলে নাৎসী জার্মানির নেতার ভাগ্যে কি ঘটেছিল তা নিয়ে বহু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নস্যাৎ হয়ে গেছে।
হিটলার ও ইভা ব্রাউন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ১৯৪৫ সালের ৩০শে এপ্রিল বার্লিনে মার্টির নিচের বাংকারের ভেতর এডলফ হিটলার এবং তার সদ্যবিবাহিত স্ত্রী ইভা ব্রাউন আত্মহত্যা করেন।
ইভা ব্রাউন সায়ানাইড বিষ পান করেন, আর হিটলার নিজের মাথায় গুলি করেন এবং সম্ভবত সায়ানাইডও গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী ইভা ব্রাউনকে তার আগের দিন বাংকারের মধ্যেই বিয়ে করেন হিটলার।
তখন রুশ সৈন্যরা বার্লিন শহরের উপকণ্ঠে ঢুকে পড়েছে, এবং নাৎসী শাসকদের পতন নিশ্চিত হয়ে গেছে।
হিটলারের মৃতদেহ জার্মান সৈন্যরাই বাংকার থেকে বের করে রাইখ চ্যান্সেলরির বাগানে একটি গর্তে ফেলে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। কিন্তু তার মৃতদেহের কিছু অংশ রুশরা উদ্ধার করে এবং তা মস্কোয় নিয়ে যায়।
ফরাসী বৈজ্ঞানিকরা বলছেন, ১৯৪৬ সালের পর তারাই প্রথম হিটলারের দেহাবশেষের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন।
বার্লিনের রাইখ চ্যান্সেলরি, এরই নিচের বাংকারে আত্মহত্যা করেন হিটলার
হিটলারের মাথার খুলির একাংশের বাম দিকে একটি গর্ত দেখা গেছে - যা সম্ভবত বুলেটের আঘাতে সৃষ্ট।
এ ছাড়া হিটলারের বাঁধানো দাঁতের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে তারা নীলাভ আস্তরণ দেখতে পেয়েছেন - যা সম্ভবত ধাতব দাঁতের সাথে সায়ানাইডের বিক্রিয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে।
হিটলারের মৃত্যু নিয়ে বহু ষড়যন্ত্র তত্ব আছে।
কেউ বলেন, হিটলার ১৯৪৫ সালে মারা যান নি, তিনি জার্মানির পরাজয়ের পর একটি সাবমেরিনে করে আর্জেন্টিনা পালিয়ে যান। আরেক তত্ত্বে বলা হয়, হিটলার এ্যান্টার্কটিকায় এক গোপন ঘাঁটিতে চলে গেছেন।
প্রধান গবেষক ফিলিপ শার্লিয়ে এএফপি-কে বলেন, তাদের গবেষণার পর এখন সব ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব থেমে যাওয়া উচিত।
হিটলারের মৃত্যুর পরদিন ১লা মে জার্মান রেডিওতে খবরটি ঘোষণা করা হয়।
বাংকারের মধ্যে এই ঘরেই আত্মহত্যা করেন হিটলার
সেদিন লন্ডনের ৪০ মাইল উত্তরে রেডিং শহরের উপকণ্ঠে বিবিসি মনিটরিংএর দফতরে বসে জার্মান রেডিওর অনুষ্ঠান শুনছিলেন জার্মানি থেকে পালিয়ে আসা কর্মী কার্ল লিমান। তিনি বলছিলেন, শ্রোতাদের জানানো হলো যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসছে।
"এর পর তারা ভাবগম্ভীর সঙ্গীত বাজালো, এবং ঘোষণা করলো যে 'বলশেভিজমের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময়' হিটলার মারা গেছেন।"
"তারা বলে নি তিনি আত্মহত্যা করেছেন, বরং তাদের কথায় মনে হয় যে তিনি যুদ্ধ করতে করতে নিহত হয়েছেন - যা ছিল একটা বড় মিথ্যে।"
কয়েক দিন পর ৭ই মে জার্মানি আত্মসমর্পণ করে - ইউরোপে ৬ বছরের যুদ্ধের অবসান হয়।

Friday, June 9, 2023

গল্প- জায়গিরদার ও তার কুকুর by পান্নালাল প্যাটেল

ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর জায়গিরদার এই প্রথম আমাদের গ্রামে আসছেন। সবাই তার আগমনের প্রতীক্ষায়। গায়ের তালাতি (হিসাবরক্ষক) সপ্তাহ ধরে দুধের ভাণ্ড ঠিক রাখছে। কে জানে, কখন বাপুজির অভ্যুদয় ঘটবে। চারপেয়ে চৌকি এবং কাঁথা স্তূপ করা হয়েছে। মুখির (গ্রামের মাতবর) ওপর হুকুম জারি হয়েছে এসময় তার গ্রাম ছেড়ে যাওয়া চলবে না। মুচি, নাপিত, ভিস্তি সকলকেই প্রতি মুহূর্তের জন্য তৈরি থাকতে বলা হয়েছে। কয়েকজন পুলিশ দিনভর-রাতভর পাহারা দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি যখন তারা খেতে যাচ্ছে, বদলা পুলিশ মোতায়েন করে যাচ্ছে।
আজ খুব সকালে জায়গিরদারের বাবুর্চি, কয়েকজন ভৃত্য ও বডিগার্ড এসে পৌঁছাতেই গ্রামে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
বাবুর্চি রান্নাঘরের দায়িত্ব নিয়ে নিল, তাকে সাহায্য করার জন্য গ্রামের চারজন পুরুষ নিয়োগ হলো। জায়গিরদারের সফরসঙ্গীদের ব্যবস্থাপনায় মুখি সারাক্ষণই ব্যস্ত। পুলিশরা রান্নার হাঁড়ি-পাতিল জোগাড় করতে, দুধ ও দই জোগাড় করতে গ্রাম চষে বেড়াচ্ছে। যেসব জিনিস পাওয়া যাচ্ছে না বানিয়ার দোকান থেকে কেনা হচ্ছে। খরচ যেভাবেই হোক, তা সম্মিলিতভাবে গ্রামবাসীকে বহন করতে হবে। জায়গিরদারের পরিচারক যা কিছু প্রয়োজন তার জোগাড়যন্ত্র শুরু করে দিলো, যাতে সবকিছু ঠিকঠাক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। গ্রামের দর্জি দালাকে দিয়ে পাঁচ বছর আগে সেলাই করা কোট ও চোগা পরে মাথায় গোলাপি পাগড়ি চাপিয়ে তালাতি অধৈর্য হয়ে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে আর নজর রাখছে রাস্তার ওপর – বাপুজি যদি এসে পড়েন!
হঠাৎ কেউ একজন বলল, ‘আমার মনে হয় গাড়ি আসছে’, আর তাতেই ধাবমান গাড়ির শব্দ শোনার জন্য সবাই কান খাড়া করে রাখল। রাস্তার বাঁকে বহু মানুষের সমাগম হলো। ‘এ যে আসছে… দেখতে পাচ্ছো না ধূলি উড়ছে… কিছুক্ষণ পর তোমাদের চোখে পড়বেই।’
পুলিশ জনতা সামলাতে ছুটল। ‘শালা সব আহম্মকের বাচ্চা, রাস্তার ওপর দাঁড়িয়েছিস ক্যান্? লাইন করে দাঁড়া। বেটা শয়তানের বাচ্চারা, এত হইচই কিসের! শান্ত হ। শুনতে পাচ্ছিস গাধার বাচ্চা গাধা, যখন বাপুজি আসবেন, কথা কানে ঢুকছে মূর্খের দল, যখন বাপু আসবেন সবাই মাথা নুইয়ে সম্মান দেখাবি।’
বাপুর গাড়ি এসে গেল, গ্রামবাসীর আনত মাথা ধুলোয় ভরে গাড়ি মাঠের পাশে থামল।
দরজা খুলে গেল, বাপু গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। তার পরপরই নেমে এলো সাদা ধবধবে একটি জন্তু, খাটো পা, লম্বা কান, শরীরটা পশমে জড়ানো। পেছনের সিট থেকে নেমে এলেন বাপুর সেক্রেটারি।
জায়গিরদার একজন যুবক, বয়স আটাশের মতো। তার মুখমণ্ডল তেমন আকর্ষণীয় নয়, তবে শরীরটা সুগঠিত। আর তার পোশাকের স্টাইল অসাধারণ – ট্রাউজার্স, কোট, টাই, মোজা, জুতো, হাতঘড়ি, গগলস এবং চমৎকার একটি আংটি। তার এক হাতে লাঠি, অন্য হাতে শেকলের মতো একটা কিছু। দেখে মনে হয় যেন এইমাত্র তিনি স্টিমার থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
কিন্তু কেউই তার দিকে নজর দিচ্ছে না, যখন তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছে তখনও না, তাদের সবার দৃষ্টি নিবন্ধ তার পায়ের কাছের ছোট অদ্ভুত জন্তুটির দিকে।
এমনকি তারা যখন নিজেদের মধ্যে কথাবলাবলি করছে বিলাতফেরত জায়গিরদার কতটা বদলে গেছেন সে-আলাপে না গিয়ে জন্তুটির কথা বলছে। কেউ-কেউ বলেছে, এটা আসলে ইংরেজ খরগোশ। অন্যরা ভেবেছে, এটা সম্ভবত একটা কুকুর। বিস্মিত কেউ-কেউ অবশ্য এটাও বলেছে, এটা আবার ইংরেজ প্রজাতির চিতাবাঘ নয় তো! কেউ-কেউ মনে করেছে, এটা কুকুরও নয়, বিড়ালও নয়, খরগোশও নয়! কিন্তু এই অদ্ভুত জিনিসটা যে কী তাও নির্ধারণ করতে পারল না। আলোচনা প্রতিমুহূর্তেই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেউ-কেউ এমনকি এই অদ্ভুত জিনিসটাকে নিয়ে বাজি ধরেছে।
খবরটা যতই ছড়াচ্ছে ততই জনতার ঢল নামছে। প্রতিটি নতুন মানুষ এসে জিজ্ঞেস করছে, ‘এই অদ্ভুত জন্তুটা আসলে কী?’ কয়েকজন তো সত্যি-সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। তারা বলল, ‘বাপুজির উচিত জন্তুটাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা, নতুবা এই জন্তু কাউকে মেরেও ফেলতে পারে।’
এর মধ্যে কয়েকজন যুবক সুনির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে হাজির হলো। তারা জানালো, এটা আসলে একটা কুকুর। তারা এই কুকুরের নাম শুনে থাকলেও এখন তা গুলিয়ে ফেলেছে। একজন বলল, এই কুকুরের নাম শিভলার, অন্যজন  জোর দিয়ে বলল, এটার নাম শিভলো। তৃতীয়জন শিশু কিংবা ফিলু জাতীয় কিছু একটা বলল। অন্যদের কেউ-কেউ নাম নিয়ে মোটেও মাথা ঘামালো না, তারা কুকুরের বর্ণনা দিতে শুরু কলল, ‘কী সুন্দর একটা কুকুর। কান দুটো এত লম্বা যে মাটিতে লেগে যায়। আর পাগুলো কেমন খাটো-খাটো। হায় খোদা! চুলগুলো এমন কেন – সাধুদের জটপাকানো চুলের মতো! আবার কী ধবধবে সাদা।’ কেউ একজন বলল, ‘আমার মনে হয় এগুলো রুপালি চুল। একদিন শেঠজি বলেছেন ইংরেজ মহিলাদের নাকি সোনালি চুল। তাহলে কুকুরটার রুপালি চুলও হতে পারে। কেউ তো আর ঠিকঠাক বলতে পারে না। ইংল্যান্ডের মতো দেশে সবকিছুই সম্ভব!’
এসব নিয়ে সবাই হাসাহাসি করল আবার প্রত্যেকে নিজেকে এটাও শোনালো, ‘বাপুর মতো মানুষ তো আর বিদেশ থেকে নেড়ি কুত্তা নিয়ে আসার কথা নয়।’
সারাগ্রামের মানুষই কুকুর নিয়ে বলাবলি করছে, এমনকি মাঠের উলটোদিকে দাঁড়িয়ে মহিলারাও মজার-মজার মন্তব্য করছে।
কিন্তু মুখি এসে সকলকে সতর্ক করে দিলো, ‘বাপুর কুকুর নিয়ে কেউ কোনো বাজে কথা বলবে না। বাপু তার কুকুরকে নিজের ছেলের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন।’
অপর এক যুবক তাকে সমর্থন করে বলল, ‘জানু মিয়াও আমাদের একই কথা বলেছেন।’
বাপুর অবস্থান সম্পর্কে সচেতন অপর একজন বলল, ‘এটাকে শুধু কুকুর বলে অসম্মান করা ঠিক হবে না। মনে রাখা দরকার এটা বাপুর কুকুর।’ বাপুর পাশাপাশি হেঁটে আসা কুকুরের পেছনে শত-শত উৎসাহী চোখ তাকে অনুসরণ করছে।
বাপু খাটে বসতেই কুকুরটিও হাত-পা গুটিয়ে তার পেছনে এলো। বাপু ‘সিলাউন’ (সিট ডাউন) জাতীয় কিছু একটা বলতে কুকুরটিও শান্ত হয়ে খাটে বসল।  লোকজন অবাক হয়ে গেল। কেউ ভাবল কুকুরটির নাম ‘সিলাউন’, অন্যরা ভাবল শব্দটা আসলে বসার আদেশ।
যে যা-ই হোক, সকলেই ততক্ষণ বুঝে গেছে, এই কুকুরটিকে বাপুর সেক্রেটারির চেয়ে বেশি সম্মান করতে হবে। এমনকি তার ছেলের চেয়েও বেশি সম্মান করতে হবে।
কেবল তিন বছর আগে জায়গিরদার যখন এখানে এসেছিলেন, এত স্বাধীনতা নিয়ে তার নিজের ছেলেও লাফিয়ে খাটে উঠতে পারেনি।
কুকুরটির নাম আসলে শিলু, সিলভার থেকে সংক্ষেপ করতে করতে শিলু। গ্রামবাসী সবাই ডাকতে শুরু করল শিলুভাই। তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল যখন শুনল জায়গিরদার পাঁচশো টাকা দিয়ে কুকুরটিকে কিনেছেন। তারা বলাবলি করল, ‘এই টাকায় বাপুজি এক কুড়ি বলদ কিনতে পারত কিংবা পাঁচটা ঘোড়া।’ কেউ একজন বলল, ‘শিলুভাইর দাম তো হাতির দামের সমান।’ ‘এর যা ওজন, এই টাকায় সমান ওজনের রুপা কেনা যেত। ভাবো তো দেখি একবার।’ মন্তব্য করল অন্য কেউ একজন।
কিন্তু গ্রামের কুকুরগুলো তো আর সুবিবেচক নয়। রাস্তার নেড়ে কুকুর দেখলে এই কুকুরগুলো যেমন ঘেউ-ঘেউ করতে থাকে, শিলুকে দেখে একই রকম ঘেউ-ঘেউ জুড়ে দিলো। শিলুও তীব্রস্বরে ঘেউ-ঘেউ করে জবাব দিলো। আর সবাই তখন ভয়ে কাঁপা শুরু করল। ‘হায় খোদা, এটা কেমন করে চিৎকার করে? মনে তো হচ্ছে একেবারে বাঘের গর্জন।’
গ্রামের এক যুবক প্রতিবাদ করল, ‘এসব বাজে প্যাচাল ছাড়ো। আমাদের গ্রামের কুকুরগুলোর সাথে এটাকে লড়তে দাও, দেখবে মুহূর্তের মধ্যেই এটাকে হারিয়ে দেবে। চেহারা দেখে কথা বলতে যেও না। আমাদের সবচেয়ে বাজে কুকুরগুলোও এটার চেয়ে ভালো।’
তার এই যুক্তিতে গ্রামবাসী মোটেও সন্তুষ্ট হলো না। বরং তারা মনে-মনে চাইল, বাপু তার কুকুরটিকে একবার ছেড়ে দিন, শিলু এসে গ্রামের ম্যাদামারা কুকুরগুলোকে তার শক্তি দেখিয়ে দিক। কেউ কেউ গিয়ে জানু মিয়াকে ধরল। বলল, ‘জানুভাই, শিলুভাইকে একবার ছেড়ে দাও না, অন্তত একবার ছেড়েই দেখ না – আমরা তো নিশ্চিত এই কুকুরগুলো সাথে সাথে ছুটে পালাবে। দারুণ মজা হবে।’
জায়গিরদার চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আহম্মকের দল, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কী দেখছ? এইসব নেড়ি কুত্তাগুলোকে তাড়াচ্ছো না কেন?’ সাথে- সাথেই হাতে ইট-পাথর নিয়ে তারা কুকুরের পেছনে ছুটল।
কুকুরগুলো পালিয়ে গেল সত্যি, কিন্তু ঘেউ-ঘেউ থামল না, অন্য রাস্তা থেকে এদের ঘেউ-ঘেউয়ের প্রতিধ্বনি শোনা গেল। কুকুরেরা মানুষের চেয়ে আরও বেশি মরিয়া হয়ে নিজের বাড়িঘর আঁকড়ে থাকে। ধাওয়াকারী গ্রামবাসী ফিরে আসতেই একই জায়গায় কুকুরদের আবার অভ্যুদয় ঘটল, এবার সাথে যোগ হয়েছে অন্য  রাস্তার আরও কুকুর।
১০ মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি আবার উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠল। এবার মুখি জায়গিরদারের কাছে হাজির হয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতার বাসনা ব্যক্ত করল। ‘বাপুজি, শিলুভাইকে একবার ছেড়েই দেন না। এই কুকুরগুলোর একটিও আশেপাশে কোথাও দাঁড়াবার সাহস পাবে না।’
গোঁফে পাক দিয়ে বাপু বললেন, ‘না-না, তা কী করে হয়? এটা একবার ক্ষেপে গেলে নিয়ন্ত্রণ করাই তো অসম্ভব হয়ে পড়বে। এখানে বেশ চুপচাপ আমার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যান।’
মুখি বলল, ‘খাঁটি কথা বলেছেন – শিলুভাই তো খুবই সম্মানিত কুকুর।’ মুখে অবিবেচকের হাসি নিয়ে এক বুড়ো জিগ্যেস করলেন, ‘বাপুজি আপনার এই কুকুর কি বাঘের সাথে লড়াই করতে পারবে?’
অশালীনভাবে জায়গিরদারের কুকুরপ্রসঙ্গ উত্থাপনের বিষয়টি সংশোধন করার চেষ্টা করে অপর একজন বলল, ‘তার মানে আপনি শিলুভাইয়ের কথা বলতে চাচ্ছেন? শিলুভাইকে একবার দেখলেই তো সাধারণ চিতা দৌড়ে পালাবে।’
কিন্তু বুড়ো সহজে হারতে রাজি নন। বুড়ো বললেন, ‘বাপু, এটা কি ঠিক?’ উষ্ণ হাসি হেসে বাপু বললেন, ‘যাও একটা চিতা নিয়ে এসো, তারপর দেখি।’
আবার জায়গিরদারের দৃষ্টি পড়ল ঘেউ-ঘেউ করা কুকুরগুলোর ওপর। শিলুভাইও নিজের ক্ষমতা দেখাতে অস্থির হয়ে পড়ল। কিন্তু তার কী-ই বা করার  আছে? বাপুর সামনে তাকে তো ভদ্রই থাকতে হয়।
বাপু শিলুভাইর ঘাড় পেঁচিয়ে শিকল বাঁধলেন এবং যখন উঠে দাঁড়ালেন মুখি এক কাপ চা নিয়ে হাজির।
বাপু চায়ের কাপের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। তারপর হঠাৎ মন পরিবর্তন করে হাত গুটিয়ে নিয়ে বললেন, ‘তোমাদের কি টেবিল জাতীয় কিছু একটা নেই?’
মুখি কথা শুনে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। টেবিল যে কী জিনিস সে বুঝে উঠতে পারল না। জায়গিরদারের রাজধানী শহরে যখন সে গিয়েছিল তখনকার একটা হোটেলের কথা তার মনে পড়ল। বিচলিত হয়ে বলল, ‘আপনি চেয়ারের কথা বলছেন, তাই না? ঠিক আছে…’
‘তুই একটা আস্ত আহাম্মক। চেয়ার দিয়ে কী করব? আমি চায়ের কাপটা রাখতে চাই।’
গ্রামবাসী সবাই দিশেহারা হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর যেন হঠাৎ তারা আলোর নিশানা দেখতে পেয়ে টেবিলের খোঁজে দিগি¦দিক ছুটল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা কী নিয়ে আসবে? একটা ঝুড়ি এনে উলটে বসিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এটা তো নিচুই থেকে যাবে। এ কাজের জন্য একটা বড় পাথর যে তুলে আনবে, তাও পেল না। পেলে তা কোনো না কোনোভাবে জায়গিরদারের জন্য নিয়ে আসত।
হঠাৎ সেই বুড়ো জ্ঞানগর্ভ একটি পরামর্শ নিয়ে এলেন। বললেন, ‘তোমরা কোনো জায়গা থেকে একটা ড্রাম তুলে আনছো না কেন?’
বৃদ্ধের এত বুদ্ধি দেখে মুখি হিংসেতে জ্বলে উঠল। একসময় সে নিজেকেই শোনালো, ‘এরকম একটা সাধারণ ব্যাপার আমার মাথায় খেলল না কেন? অথচ আমার নাকের তলাতেই ড্রাম দেখতে পাচ্ছি। যদি একজন মানুষ কাজটা করতে যেত তাহলে এক মিনিটেই ড্রাম নিয়ে হাজির হতো। কিন্তু এ কাজে তিনজন ছুটে যাওয়াতে দেরি হতে তো বাধ্য।’
কিন্তু মুখি যখন ড্রামের ওপর চায়ের কাপ রাখতে যাচ্ছে জায়গিরদার চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘তোমরা কি সবাই গাধা না অন্য কিছু? আগে অন্তত ড্রামের ময়লাটা ঝাড়বে তো।’
কয়েকজন গ্রামবাসী উঠে দাঁড়িয়ে ড্রাম মুছতে শুরু করল; একজন যুবক তার কাপড় দিয়ে ড্রামের ধুলো ঝাড়তে শুরু করল। ধুলো কুকুরের গায়ে পড়ল এবং জায়গিরদার খুব বিরক্ত হলেন।
বুড়ো বললেন, ‘সাবধানে ধুলো ঝেড়ো, শিলুভাইয়ের গায়ে যেন না পড়ে।’ বাপুও বললেন, ‘আহাম্মক।’
অপর এক যুবক বলল, ‘আমি কি শিলুভাইকে পরিষ্কার করে দেব?’
পরিহাসের হাসি মুখে ধরে জায়গিরদার বললেন, ‘কেন? তোর কাপড়টা পরিষ্কার করতে?’
জনগণ আবার কিছুক্ষণের জন্যে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লে বুড়ো তাদের এই অবস্থা থেকে রক্ষা করলেন। তিনি বললেন, ‘শিলুভাইর গা তো কাপড়ের চেয়ে পরিষ্কার।’
সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল। যুবক লজ্জা পেল এবং বিরক্ত হলো। বিড়বিড় করে বলল, ‘এটা বরফের মতো সাদা হতে পারে, তাই বলে এটা যে কুকুর তা তো আর বদলাচ্ছে না।’
অসহায় কণ্ঠে মুখি জিজ্ঞেস করল, ‘শিলুভাইর চা-টা আমি কী করব?’
কড়া স্বরে বাপু বললেন, ‘কেন, আর চা নেই?’
‘বাপুজি, চা তো তৈরিই আছে।’
বিলেত থেকে আনা সাদা মানুষের কুকুর কেমন করে চা খায় তা দেখার কৌতূহল সবার।
‘বেশ আমি তাহলে কাপটা ধরি, কেউ একজন গিয়ে আর একটা ড্রাম নিয়ে আসুক।’
বাপু আবার চিৎকার করে উঠলেন, ‘গাধা কোথাকার! ড্রাম দিয়ে কাজ কী? ড্রাম তো আর চায়ের কাপ-পিরিচ থেকে চা খেতে যাচ্ছে না। আমার বদমাশ ভৃত্যগুলো কোথায়?’
ভেতরে ধূমায়িত চা-পানরত কজন ভৃত্য ও পুলিশ ভয় পেয়ে গেল। তবে তারা বেরিয়ে আসার আগেই যা কিছু বন্দোবস্ত করার হয়ে গেল।
শিলুভাইর জন্য মেঝেতে একটি বিছানা পেতে কাঁসার প্লেটে চা ঢেলে দেওয়া হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যে জনতা শিলুভাইকে নিয়ে তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। তারা মন্তব্য করল, ‘আমাদের কুকুরগুলোও তো একইভাবে পান করে।’
স্থানীয় কুকুরগুলো আবার উত্তেজিত হয়ে উঠল। পাহারাদাররা শিলুভাইর চা পান করা দেখায় ব্যস্ত, এই সুযোগে আবার কুকুরগুলোর অভ্যুদয় ঘটল এবং সাহস করে এবার কাছাকাছি চলে এলো।
জায়গিরদার বললেন, ‘আগে বসে চাটা শেষ করে তারপর যা খুশি তা-ই কর গিয়ে।’
নিজের কুকুরকে এই নির্দেশ দেওয়ায় গ্রামবাসীর উৎসাহ আবার বেড়ে যায়। গ্রামের কুকুর আর শিলুভাইর লড়াই দেখার আশায় তারা নিকটে দাঁড়ানো কুকুরগুলোকে তাড়ানোর প্রয়োজন বোধ  করল না।
শেষ পর্যন্ত বাপু তার কুকুর নিয়ে খোলা মাঠে এলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে গ্রামের চারদিক থেকে মানুষ এসে শিলুভাইর চারপাশে ভিড় জমালো। গলার শিকল রোদ্রালোকে রুপার মতো চকচক করে উঠল।
কুকুর নিয়ে ওত পেতে থাকা গ্রামবাসীকে বাপু সজোরে চেঁচিয়ে বললেন, ‘গাধা, পথ থেকে সরে দাঁড়া। শিলু যাও।’
শিলু গোঁ-গোঁ করতে শুরু করল এবং ডোরাকাটা কুকুরের দিকে ছুটল, সেই কুকুর কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
‘পালাচ্ছিস কেন? সামনে আয়।’
ঠিক তখনই জায়গিরদারের চোখে পড়ল ডোরাকাটা উলটোদিকে ছুটে গিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় ওত পেতে রইল। শিলু গোঁ-গোঁ শুরু করল কিন্তু ডোরাকাটা কুকুর অতটুকু ভয় পেয়েছে বলে মনে হলো না। হঠাৎ একজন চেঁচিয়ে উঠল, ‘বাপুজি, একটু সাবধানে থাকবেন।’
কিন্তু ততক্ষণে একটি কালো কুকুর বাপুর পায়ে কামড় বসিয়ে দিয়ে ছুটে পালালো।
পরবর্তী উত্তেজনা ও হইচইয়ের মুহূর্তে একসময় শিলু বাপুর হাত থেকে ছুটে গেল। সবাই তখন উত্তেজিত। কেউ বাপুর পা পরীক্ষা করছে। পাশের সব কুকুর মিলে চারদিক থেকে শিলুকে আক্রমণ করেছে; অন্যরা শিলুভাইকে উদ্ধার করতে ছুটল। তারা শিলুর করুণ কান্না শুনতে পেল কিন্তু তাকে খুঁজে পেল না। তারা গ্রামের কুকুরগুলোকে লাঠি দিয়ে পেটাল; পাথর ছুড়ে মারল। কয়েকটি কুকুর ভীষণ জখম হলো, কতগুলো কুকুর যতদ্রুত সম্ভব পালিয়ে গেল। কিন্তু কোথাও শিলুকে দেখা পেল না। বাপু-চেঁচিয়ে বললেন, ‘গাধার দল আমার বন্দুক নিয়ে আয়।’
মানুষ তখন সতর্ক। কেউ একজন বন্দুক নিয়ে এলো।
তিনি চেঁচালেন, ‘গাধা, এটা নয়, অন্য বন্দুক নিয়ে আয়।’
অন্য বন্দুক আনার আগেই গ্রামবাসী শ্বাসরোধ করে মারা বেশ কটি কুকুর সামনে এনে হাজির করল।
বাপু অসহায়ের মতো এই দৃশ্যটিতে চোখ রাখলেন। রক্তে ডুবে থাকা শিলু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, জীবিত কয়েকটি কুকুর পালিয়ে গেছে। শিলুর নীল চোখ বাপুর বন্দুকের চেয়েও ভয়াবহ দেখাচ্ছে। আর তার চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক ছিল ভয়াবহ নীরবতা এবং মৃত্যু-উন্মুখ কুকুরের যন্ত্রণার কান্না। এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য অনেকেই সহ্য করতে পারছিল না, তারা বাড়ি চলে গেল। এমনকি বাপুর খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনও দৃশ্যপট থেকে বিলীন হতে শুরু করল। কিন্তু কেউ কেউ এতোই আতঙ্কিত যে পা-ও নাড়াতে পারছিল না।
বাপু আর একবার চিৎকার করে বললেন, ‘গাধা! দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? যা, অলিগলির যত কুকুর ধরে নিয়ে আয়। এদিকে কোনো মানুষ যেন না আসে। আমার এই সতর্কবার্তার পর যদি কেউ এসে আমার বন্দুকের গুলি খেয়ে মারা যায় আমি তার জন্য দায়ী থাকব না।’
সবাই ভাবলো এখন সরে যাওয়াই নিরাপদ। কয়েক মিনিটের মধ্যে জায়গাটা জনশূন্য হয়ে গেল। থাকলেন কেবল জায়গিরদার।
প্রায় সবাই নিজেদের যার-যার বাড়িতে আটকে রাখে। যারা জায়গিরদারের ভৃত্য ও পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পায়নি, তারা কোনো না কোনো অজুহাতে তাদের কাছ থেকে গ্রামের কুকুরগুলোকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। আসলে জায়গিরদারের ভৃত্যরাও চায় না কুকুরগুলোর মৃত্যু হোক। কিন্তু যেহেতু জায়গিরদারকে শান্ত করতে কুকুর ধরার কোনো বিকল্প নেই, অনিচ্ছাতেই তাদের এ-কাজে নামতে হয়। তারা গ্রামবাসীকে বোঝানোর চেষ্টা করে, অন্তত কয়েকটা কুকুর ধরে দাও। তাতে গ্রামটা ঝামেলা থেকে রক্ষা পাবে।
প্রায় ১০টা কুকুরকে ঘিরে ধরলেও বন্দুক নিয়ে অপেক্ষমাণ বাপুর কাছে এর অর্ধেক কুকুর নিয়ে আসতে সমর্থ হয়। বাপু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পাঁচটা কুকুরকে গুলি করে হত্যা করেন। তারপর চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘আর সব কুকুর কোথায়?’
কেউ জবাব দেওয়ার সাহস পেল না। জানু মিয়া তার সকল সাহস সঞ্চয় করে বলল, ‘আমরা আর খুঁজে পাচ্ছি না। নিশ্চয়ই গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে।’
‘বাজে বকছো কেন? বদমাশগুলো নিশ্চয়ই কুকুরগুলোকে নিজেদের বাড়িতে লুকিয়ে ফেলেছে। যাও, আবার গিয়ে বাড়ি-বাড়ি খোঁজ করো। কোনো বাড়িতে কুকুর পেলে সে বাড়ির মালিকসুদ্ধ বেঁধে নিয়ে আসবে।’
আদেশ পেয়ে ভৃত্যরা আবার বেরিয়ে গেল।
কিন্তু জায়গিরদার আবার উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘থাক জানু, তোরা কোনো কাজেরই না। বরং একটা কাপড়ে শিলুকে পেঁচিয়ে গাড়িতে এনে তোল।’
যে যুবকের ঘাড়ের কাপড় এক ঘণ্টা আগেও জীবন্ত শিলুকে মোছার প্রশ্নে অত্যন্ত নোংরা বিবেচিত হয়েছে জানু মিয়া তার সেই কাপড়টি ছাড়া কুকুরের জন্য কারো কাছ থেকে এক টুকরো কাপড় উদ্ধার করতে পারল না।
যুবক ভাবল, ‘হায় খোদা! আমি কী এমন অপরাধ করেছি যে আমার ঘাড়ের কাপড়টিও নিয়ে নিচ্ছে।’ এমনকি গ্রামের পথে ধূলি উড়িয়ে বাপুর গাড়ি যখন চলে যায়, তখনও তার একই প্রশ্ন। গ্রামের সবাই জানে কুকুরের যে দাম ভাগাভাগি করে তাদের সবাইকে তা পরিশোধ করতে হবে। তবে এরই সঙ্গে তারা একটি দুশ্চিন্তা থেকেও মুক্তি পেল। জায়গিরদার চলে যাওয়ার পর তাদের পাণ্ডুর মুখমণ্ডল আরেকবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তাদের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন স্বাভাবিক হয়ে এলো। আধঘণ্টার মধ্যে জায়গিরদারের সকল সফরসঙ্গী গ্রাম ত্যাগ করল।
রাস্তাঘাট জনশূন্য। মৃত কুকুরের ছিন্নভিন্ন দেহ ভয়াবহ দেখাচ্ছে। সর্বত্রই নীরবতা। ব্যতিক্রম শুধু কাকের ডানা ঝাপটার শব্দ, মৃত্যু-উন্মুখ কুকুরের গোঙানি – এসব ভয়াবহতাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। গ্রামে তখন যে নীরবতা বিরাজ করছে তা অদ্ভুত, ত্রাস সঞ্চারক ও নিষ্পেষক – এ যেন মৃত্যুর নীরবতা, যাকে স্পর্শ করে, তাকেই ধ্বংস করে ফেলে।
ততক্ষণে ভাঙ্গি গ্রামে এসে পৌঁছেছে, প্রেতাত্মার মতো সে কবরে-কবরে ঘুরে বেড়াচ্ছে; নির্বিকারভাবে যখন পাইপ টেনে যাচ্ছে, কুকুরগুলোর মৃত্যুর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

----------------

লেখক পরিচিতি :
গুজরাটি কথাসাহিত্যিক পান্নালাল নানালাল প্যাটেল (৭ মে ১৯১২-৬ এপ্রিল ১৯৮৯)। ভারতে তাঁর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপিত হচ্ছে। তাঁর জন্ম রাজস্থানের একটি গ্রামে। গ্রামের নাম মান্দলি। পান্নালাল ১৯৮৫ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে : ফকিরো, লাভুন লোহি, মানকাভতার, নগদ নারায়ণ, আল্লাদ জাকড়ি, এক আনোখি প্রীত, কচ-দেবযানী, লোকগুঞ্জন, মালেলা জিভ, মানাভিনি ভাবে ইত্যাদি।
বিখ্যাত ভারতীয় ঔপন্যাসিক উমাশঙ্কর যোশী মনে করেন, পান্নালাল শেক্সপিয়রের চেয়ে কম নন। দারিদ্র্য তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কৃষিমজুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশায় জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করতে করতে শেষ পর্যন্ত লেখক নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেন। ৬ এপ্রিল ১৯৮৯ সালে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে পান্নালাল প্যাটেলের মৃত্যু হয়। জন্মশতবর্ষে পান্নালাল প্যাটেলের একটি গল্প ‘দ্য জায়গিরদার অ্যান্ড হিজ ডগ’ বাংলায় ভাষান্তরের মাধ্যমে লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।