Saturday, August 9, 2014

মায়ের লাশ মর্গে দুই সন্তান খুঁজছে আশ্রয় by শর্মী চক্রবর্তী

আমার আম্মু কোথায়? আম্মু আসছে না কেন? আমাকে আম্মুর কাছে নিয়ে যাও। আমার আম্মু-আব্বুকে কে নিয়ে গেল? আমি তাদের সঙ্গে বেড়াতে যাবো। এভাবেই ভাঙা ভাঙা গলায় কথাগুলো বলে চার বছরের শিশু মীম। পাশে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছোট বোন দু’বছরের আলিফ। তাদের নিষ্পাপ চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে বাবা-মাকে। অথচ তারা জানে না তাদের বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। আর কখনও মায়ের হাতে খেতে পারবে না। বাবার সঙ্গে বেড়াতে পারবে না। তাদের ধারণা, বাবা-মা একদিন ফিরে আসবে। মা-বাবা হারানো এই দুই শিশু এখন তেজগাঁয়ের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে। তাদের মায়ের নিথর দেহ এখনও পড়ে আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে। কেউ জানে না শিশু দু’টির ভবিষ্যৎ। কোথায় জায়গা হবে তাদের। একমাস আগে সড়ক দুর্ঘটনায় পিতাকে হারিয়েছে তারা। আর দু’দিন আগে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মা নাজমাও চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তেজগাঁয় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, শিশু দু’টি খেলা করছে। তাদের পাশে বসা পুলিশ কর্মকর্তা রেহানা। খেলায় মত্ত ছোট্ট দুই শিশু। দুপুরের খাবার নিয়ে আসা হলো। তখনই মীম মা মা বলে ডাকতে শুরু করলো। ভাঙা ভাঙা শব্দে পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করলো, মা কোথায়? মায়ের হাতে ভাত খাবো। পাশে বসে থাকা আলিফেরও একই প্রশ্ন। পুলিশ কর্মকর্তা সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, তোমাদের মা ডাক্তার দেখাতে গেছে একটু পরেই চলে আসবে। এখন তোমরা খেয়ে নাও। কর্মকর্তার সান্ত্বনায় খাবার খেয়ে আবারও খেলায় মেতে ওঠে তারা। এদিকে তাদের দত্তক নিতে অনেকে যোগাযোগও করেছেন ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে। তবে তারা কাউকেই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে সন্তানহীন এক পিতা মীমকে দত্তক নেয়ার জন্য আবেদন করেছেন। শিশুটিকে দেখতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা মীমকে তাদের সামনে নিয়ে আসেন। তার নাম জিজ্ঞেস করলে ভাঙা গলায় উত্তর দেয় ‘আমার নাম মীম।’ তিনি মীমের কাছে জানতে চাইলেন, তুমি যাবে আমাদের সঙ্গে? সঙ্গে সঙ্গে মীম বলে ওঠে না। আমি আমার মা-বাবার সঙ্গে থাকবো। মীম এখনও অপেক্ষায় আছে তার মা ডাক্তার দেখানোর পর তাদের নিতে আসবে। এ বিষয়ে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সিনিয়র সহ-পুলিশ কমিশনার আসমা বেগম রিটা বলেন, আলিফ ও মীম সম্পর্কে জানার পর অনেকেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন শিশু দু’টিকে দত্তক নেয়ার  জন্য। এক্ষেত্রে দত্তক যারা নিতে চান তাদের আবেদন করতে হবে আদালতে। আদালত তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেবেন কাদের কাছে তাদেরকে দেয়া যায়। তবে সমস্যা হচ্ছে শিশু দু’টি এখনও বাবা-মায়ের অপেক্ষায় আছে। তাদের কাছেই ফিরে যেতে চাইছে। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের কর্মকর্তারা যত্নসহকারে তাদের রাখার চেষ্টা করছেন বলেও তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, শিশু দু’টি ঢাকা মেডিকেলের বেডে শুয়ে থাকা মায়ের কথা বারবার বলছে। তারা এখনও মনে করছে তাদের মা ডাক্তার দেখাতে গেছে আর বাবা বাইরে কাজে গেছে। গত ২রা জুলাই পেটের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে মা নাজমা বেগম ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউনিট-৫ এ চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। সেই ওয়ার্ডে থাকা অন্য এক রোগীর স্বজন মোর্শেদা জানান, দু’সন্তান নিয়ে গুরুতর অবস্থায় তিনি ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি বলেন মাসখানেক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান নাজমার স্বামী। তাদের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে। বিস্তারিত কিছুই বলতে পারেননি তিনি। গত ৪ঠা আগস্ট ভোরে মারা যান নাজমা। তিনি মারা যাওয়ার পর আত্মীয়স্বজন কেউ খোঁজ নেয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। স্বজন না আসায় লাশটি মর্গেই রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যদি কেউ লাশ নিতে না আসে তাহলে লাশটি আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে দিয়ে দেয়া হবে। শিশু দু’টির কোন স্বজন না পাওয়ায় কর্তৃপক্ষ শাহাবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে। পরে শিশু দু’টিকে পুলিশ হেফাজতে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নেয়া হয়।

কান নিয়েছে চিলে... by তানভীর হাসান

সাভারে রানা প্লাজা ধসের ১৭ দিন পর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে রেশমার জীবিত উদ্ধারের ঘটনা দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ঘাটে লঞ্চডুবির পঞ্চম দিনে গতকাল শুক্রবার ‘জীবিত এক যাত্রীর সন্ধান’ ক্ষণিকের জন্য হলেও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল মাওয়া ঘাট এলাকায়। তাঁর নাম সারওয়ার হাওলাদার (২৫)। তবে সাংবাদিকদের অনুসন্ধিৎসু জিজ্ঞাসার বেড়াজাল পেরিয়ে নিজের দাবিকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি তিনি।
সারওয়ার হাওলাদারকে যে ব্যক্তি প্রথম দেখেন তাঁর নাম মো. সাগর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বেলা আড়াইটার দিকে মাওয়া ঘাটে পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে এক যুবককে কাঁদতে দেখেন তিনি। জিজ্ঞাসা করলে যুবক জানান, তিনি লঞ্চ দুর্ঘটনার পর গত পাঁচ দিন একটি চরে পড়ে ছিলেন। কিছু খাননি। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিয়ন্ত্রণকক্ষে নিয়ে যান সাগর।

>>সারওয়ার হাওলাদারের দাবি, ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রী ছিলেন তিনি। পাঁচ দিন কিছু না খেয়ে চরে পড়ে ছিলেন। নৌবাহিনী তাঁকে নিয়ে লঞ্চ শনাক্তের অভিযানেও নামে। পরে নিশ্চিত হওয়া গেল, তাঁর দাবি সত্যি নয়। গতকাল মাওয়া ঘাট থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো
এর পরই চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে, পাঁচ দিন পর একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ, প্রশাসনের কর্মকর্তারাসহ ঘাটে উপস্থিত শত শত লোক হুমড়ি খেয়ে পড়েন সেখানে। এরই মধ্যে দু-একটি টেলিভিশনে খবরও প্রচার করা হয়। এর মধ্যে লঞ্চ উদ্ধারে নিয়োজিত নৌবাহিনীর একটি দল তাঁকে নিয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি শনাক্ত করতে নদীতে নেমে পড়ে। ওই যুবকের দেখানো মতে ঘাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে লঞ্চ শনাক্তকারী জাহাজ জরিপ-১০ ও কান্ডারি-২ তল্লাশি চালায়।
নৌবাহিনীর যে জাহাজে করে তাঁকে দুর্ঘটনাস্থল চিহ্নিত করতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই অভিযানের নেতৃত্ব দেন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তাঁর কথাকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে লঞ্চটি শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। তিনি যেখানে দেখিয়েছেন, তার আশপাশে জরিপ-১০ দিয়ে তল্লাশি চালানো হয়েছে।’
সারওয়ার হাওলাদারকে নিয়ন্ত্রণকক্ষে আনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শারীরিক পরীক্ষা করেন চিকিৎসক নুরুন নাহার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর পালস (নাড়ি) স্বাভাবিক চলছিল। দেখে সুস্থই মনে হচ্ছিল। তবে তিনি বলছিলেন, আমি ক্ষুধার্ত। এই জন্য তাঁকে কিছু খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষের দায়িত্বে থাকা মুন্সিগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ছেলেটির মুখ দেখেই বোঝা যায় আজকে দাড়ি কেটেছে। তাহলে পাঁচ দিন নিখোঁজ থাকে কী করে। এর মধ্যে ঝড়বৃষ্টি হয়েছে। সেই ধকলও তাঁর চেহারায় নেই। তার পরও পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের নিখোঁজ ১৪৬ জনের নামের তালিকা দেখা হয়েছে। তাঁর নিজের বা তাঁর ভাই ও ভাবির নাম তালিকায় নেই।’
এর মধ্যে নৌবাহিনী সারওয়ারকে ঘাটে নিয়ন্ত্রণকক্ষে নিয়ে আসে।
সেখানে জানতে চাইলে সারওয়ার হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ও তাঁর ভাই মামুন হাওলাদার এবং ভাবি রোকসানা মোল্লা ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রী ছিলেন। তাঁদের বাড়ি মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায়। লঞ্চডুবির সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভেসে উঠলে একটি স্পিডবোট অন্যদের সঙ্গে তাঁকেও উদ্ধার করে পাশের একটি চরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে অন্য যাত্রীরা চলে গেলেও তিনি এক দিন ছিলেন। পরের দিন আরেকটি স্পিডবোট গিয়ে তাঁকে কাওড়াকান্দি ঘাটে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি এক বাড়িতে গেলে তারা তাঁকে খেতে দেয়। ওই বাড়িতে দুই দিন থাকেন। তারা তাঁকে দাড়ি কামিয়ে দেয়। গতকাল ভাই ও ভাবির খোঁজেই নিয়ন্ত্রণকক্ষে যোগাযোগ করতে তিনি মাওয়া ঘাটে আসেন।
সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সারওয়ারকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে।
গতকাল দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই যুবককে নিয়ে হেপা সামলাতে হয়েছে পুলিশকে। মাওয়া ঘাট পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষের দায়িত্বরত পুলিশ পরিদর্শক মজিবুর রহমানের কথায়ও তা স্পষ্ট, ‘চিলে কান নিয়ে গেছে, সবাই চিলের পেছনে ছুটছে।’

শোকের মাসে এরশাদের ঢিলতত্ত্ব by সোহরাব হাসান

আগস্ট শোকের মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপালিত ও সামরিক পোশাক পরিহিত কতিপয় দুর্বৃত্ত বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। পরবর্তীকালে এই দুর্বৃত্তরা ক্ষমতা টেকসই করতে না পারলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে যে ভয়াবহ ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তার দায় এখনো গোটা জাতি বয়ে চলেছে। ১৫ আগস্টের পর হারিয়ে যাওয়া ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি শেখ হাসিনা ফিরিয়ে আনতে পারলেও রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি পুনর্বহাল করতে পারেননি। রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা একসঙ্গে চলতে পারে না। যেমন একসঙ্গে চলতে পারে না গণতন্ত্র ও স্বৈরাচার।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনই দেশ পরিচালনার একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট কুচক্রীরা প্রথম বন্দুকের নলে ক্ষমতা দখল করে জনগণের ওপর জবরদস্তির শাসন চাপিয়ে দেয়, পরবর্তী দেড় দশক হত্যা, অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রধান হাতিয়ার। নব্বইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হলেও তাঁর শাসনামলের সব অনাচারই আবার জেঁকে বসেছে।
আগস্ট একই সঙ্গে আমাদের শোক ও আত্মোপলব্ধির মাস। এই মাসে বাংলাদেশ স্বাধীনতার মহানায়ককে হারিয়েছে। ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায়ই জেলখানায় চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়। আর এ কারণে আত্মোপলব্ধির প্রয়োজন যে, সেদিন শত্রু-মিত্র চিনতে ভুল করেছিলাম। আমরা ইতিহাসের ট্র্যাজেডি রুখতে পারিনি। এই ব্যর্থতা কেবল আওয়ামী লীগের নয়, যারা আওয়ামী লীগের চেয়ে উন্নত শাসন দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল, তাদেরও। পঁচাত্তর-পূর্ব রাজনীতিতে যত সংঘাত-বিরোধই থাকুক না কেন, রাজনীতিটা রাজনীতিকদের হাতে ছিল। কিন্তু পরবর্তী রাজনীতি যে রাজনীতিকদের হাতে নেই, তার প্রমাণ আজকের সংসদ ও আজকের বিরোধী দল।
সহকর্মী সেলিম জাহিদ ঠিক জায়গাটিতেই আঘাত করেছেন। তিনি গত বুধবার প্রথম আলোতে লিখেছিলেন, ‘চতুর্মুখী ঢিল ছুড়ছেন এরশাদ’। আর তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন এই সাবেক স্বৈরশাসক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ক্ষমতা দখলের নানা তত্ত্ব আছে। বাংলাদেশের নব্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরশাদ ঢিলতত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তিনি ঢিল ছুড়ে একবার ক্ষমতায় এসেছিলেন। বন্দুকের নল থেকে উৎসারিত সেই ঢিল বহু ছাত্র-তরুণের প্রাণ নিয়েছে। বহু রাজনীতিককে কারাগারে পাঠিয়েছে। বহু নারীর জীবনকে করেছে দুর্বিষহ। জিয়াউর রহমানের শুরু করা কেনাবেচার রাজনীতি তাঁর আমলে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। শিল্পী কামরুল হাসান তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘বিশ্ববেহায়া’। বিশ্ববেহায়া থেকে এখন তিনি বিশ্বদূতে পরিণত হয়েছেন গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রীর বদৌলতে।
নব্বইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও এরশাদ সেনাবাহিনীতে ঢিল ছুড়ে ক্ষমতা আরও দীর্ঘস্থায়ী করার কোশেশ করেছিলেন। লে. জেনারেল নূরউদ্দিন খানের অনড় ভূমিকার কারণে তাঁর সেই চেষ্টা সফল হয়নি। এরপর ১৯৯৬ সালে সংসদে কেউ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে ফের তিনি দুই দলের সঙ্গে দর-কষাকষি করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় যেতে সহায়তা করলেও মধুচন্দ্রিমা স্থায়ী হয়নি। পরে এরশাদ বিএনপির সঙ্গে মিলে চারদলীয় জোট করেন। ২০০৭ সালে ফের আমরা তাঁর দ্বিচারী ভূমিকা দেখতে পাই। একবার তিনি বাবর-তারেকের সঙ্গে ডাল-ভাত খান। আরেকবার শেখ হাসিনার প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন ঘোষণা করেন।
এরশাদ ঢিলতত্ত্বের নিকৃষ্টতর উদাহরণ দেখান ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের আগ মুহূর্তে। তিনি দলের একাংশকে বলেন, ‘নির্বাচন করো,’ অপরাংশকে পরামর্শ দেন ‘নির্বাচন বর্জন’ করার জন্য। কয়েক মাস ঝানু দাবাড়ুর মতো দুই দিকেই চাল দিয়ে যাচ্ছিলেন এই একদা উর্দিধারী রাজনীতিক। শোনা যায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের সঙ্গে টাকার অঙ্ক ও আসনসংখ্যা নিয়ে দর-কষাকষির মাঝখানে রাজনৈতিক অসুখে তাঁকে সিএমএইচে ভর্তি হতে হয়। বিনিময়ে নির্বাচন না করেও তাঁর দল ৩৪টি আসনে জয়ী হয় এবং জাতীয় পার্টিতে বিএনপিপন্থী বলে পরিচিত রওশন এরশাদ হন বিরোধী দলের নেতা।
এরশাদ সংসদে ও সংসদের বাইরে নিয়ত পরস্পরবিরোধী কথা বলে চলেছেন। কখনো সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার কথা বলেন, কখনো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
কয়েক দিন আগে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, এই সরকারের আর ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতায় থাকার অধিকার না থাকলেও তাঁর বিশেষ দূত থাকার পূর্ণ অধিকার রয়েছে এরশাদের।
রাজনৈতিক ভণ্ডামি আর দ্বিচারিতা কাকে বলে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

‘শত্রুকে কীভাবে বিশ্বাস করব?’ -খালেদ মেশাল

ফিলিস্তিনের গাজায় গত ৮ জুলাই শুরু হওয়া ইসরায়েলি অভিযানে ইতিমধ্যে নিহত হয়েছেন এক হাজার ৭০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষ ও শিশু। ইসরায়েল বলছে, ফিলিস্তিনের জঙ্গি সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে তাদের এই অভিযান। এ ব্যাপারে মার্কিন সাংবাদিক ও টেলিভিশন উপস্থাপক চার্লি রোজ সম্প্রতি হামাসের প্রধান খালেদ মেশালের সঙ্গে কথা বলেছেন। ব্লুমবার্গ বিজনেসউইক সাময়িকীতে সম্প্রতি ওই আলাপচারিতা প্রকাশিত হয়েছে। কথোপকথনের পুরোটাই এখানে তুলে ধরা হলো

রোজ: ভয়াবহ পরিণতি সত্ত্বেও গাজার জনগণ কি হামাসের প্রতি সমথর্ন দিয়েই যাবে?
খালেদ মেশাল: গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা বলছে, ‘আমরা ইসরায়েলের অপরাধের কারণে যন্ত্রণা ভোগ করছি।’ এমনকি হত্যাকাণ্ড ও তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তারা বলছে, ‘খালেদ মেশাল সাহেব, দখলদারি থেকে মুক্তি নিশ্চিত হওয়া না পর্যন্ত আমরা এই যুদ্ধের অবসান চাই না। আমরা তিলে তিলে মারা যাচ্ছিলাম। এফ-সিক্সটিনসহ ইসরায়েলি ও আমেরিকান অন্যান্য প্রযুক্তির কারণে এখন আমরা তাৎক্ষণিকভাবে মরছি।’ ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর অনেক নিপীড়ন হয়েছে। তারা এখন ধীরে ধীরে মৃত্যু ও তাৎক্ষণিক মৃত্যুর মধ্যে তফাত পর্যন্ত খুঁজে পায় না। তারা বলে, ‘আমাদের বাড়িঘর ও পরিবার লক্ষ্য করে হামলা হচ্ছে। তবে, আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাই এবং দখলমুক্ত হতে চাই।
রোজ: কীভাবে এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে? আপনারা কী চান?
মেশাল: মানুষকে আত্মরক্ষা করতে হয়। আমরা যদি অনাহারে মরি, অবরুদ্ধ থাকি; নিজেদের রক্ষা করতে হবে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন শান্তি প্রতিষ্ঠার সব ধরনের প্রচেষ্টা বন্ধ করে দেন, বাকি বিশ্ব তখন পশ্চিম তীর ও গাজায় বিস্ফোরণের প্রত্যাশা করে। হামাস কী চায়, সেটা জানতে চাইছেন? শান্তি। কিন্তু আমরা চাই, কোনো ধরনের দখলদারি, বসতি স্থাপন, ইহুদীকরণ ও অবরোধ ছাড়াই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। আমরা আর সব দেশের মানুষের মতো বাঁচতে চাই। আমরা ফিলিস্তিনে বেঁচে থাকতে চাই।
রোজ: আপনি কি চান না ইসরায়েল নির্মূল হোক? নাকি দেশটির সঙ্গে সহাবস্থান চান?
মেশাল: আমি জবরদখল ও বসতি স্থাপনের মতো বিষয়ের পাশাপাশি সহাবস্থানের পক্ষে নই। আপনি কি মনে করেন দখলদারি ও বসতি নির্মাণের কারণে নিপীড়িত ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলকে নির্মূল করতে পারবে? না, এটা বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার... আমরা, হামাসের সবাই ইসলামের উদারতায় বিশ্বাসী। আমরা ধর্মান্ধ নই। ধর্মীয় কারণে আমরা ইহুদিদের বিরুদ্ধে লড়াই করি না। আমরা দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। আমি ইহুদিদের সঙ্গে, খ্রিষ্টানদের সঙ্গে, আরবদের সঙ্গে, অনারবদের সঙ্গে পাশাপাশি অবস্থানের জন্য প্রস্তুত। আমি অন্যান্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে থাকতে রাজি...। যখন আমাদের একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের মতামত জানাতে পারবে। এখানে অসামঞ্জস্য রয়েছে, কিন্তু আমাদের দাবিটা বেশি জোরালো। প্রতিটি দখলদারির অবসান ঘটে এবং জনগণই জয়ী হয়।
রোজ: ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কীভাবে আপনি আস্থার সম্পর্ক তৈরি করবেন?
মেশাল: আপনি মনে করছেন, আস্থার ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আসলে শত্রুপক্ষ। আর তারা জবরদখলকারী। সমাধানের বিষয়টি তাই আস্থার মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পরিপূর্ণ অভিযান হচ্ছে ইসরায়েলি দখলদারির উদ্দেশে বলা, ‘বন্ধ করো। যথেষ্ট হয়েছে।’ তাদের উচিত ইসরায়েলকে দখল ছেড়ে যেতে বাধ্য করা। শত্রুকে কীভাবে বিশ্বাস করব? তাদের সঙ্গে আমাদের বেশ কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো ব্যর্থ হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের উত্থান অবশ্যই রুখতে হবে। কেন বিশ্ব সম্প্রদায় শুধু ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবে এবং ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা নিয়ে মোটেও মাথা ঘামায় না? একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র পেতে হলে কী কারণে সেই রাষ্ট্রে কোনো সামরিক বাহিনী থাকতে পারবে না? নিরস্ত্র একটি রাষ্ট্রকে কে মেনে নেয়? তখন এটি অন্যের আগ্রাসনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। আমি অন্য কারও অভিভাবকত্ব মেনে নিতে পারব না। যদি আপনি বলেন, ‘আসুন, আপনি ফিলিস্তিনি। আমরা আপনাকে এখানে এক খণ্ড, ওখানে আরেক খণ্ড জায়গা দেব একটু একটু করে’—না। তা হবে না।
রোজ: কোনো চুক্তির ব্যাপারে আপনাদের কি হামাসের সামরিক শাখার অনুমোদন প্রয়োজন পড়ে?
মেশাল: এমন তো নয় যে আমাদের দুই মাথা বা দুই শরীর। আমরা একটিমাত্র লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন করছি। যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো বিষয়ে অঙ্গীকার করে, তখন সামরিক শাখাও একই অঙ্গীকার করে। যদি নেতারা কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তখন প্রত্যেকে—সামরিক বা বেসামরিক যে শাখার সদস্যই হোক—তা মেনে নেন।
রোজ: আপনি গাজায় না থেকে কাতারে অবস্থান করছেন কেন?
মেশাল: এটি অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন। আপনি শুধু খালেদ মেশালকেই নন, ভিনদেশে বসবাসরত ৬০ লাখ ফিলিস্তিনিকে এ কথা জিজ্ঞেস করতে পারেন। কেন তারা পশ্চিম তীরে অবস্থান করছে না? কেন তারা গাজায় বসবাস করছে না? কারণ, সেখান থেকে ফিলিস্তিনিদের ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালে বের করে দিয়েছে ইসরায়েল। আমি পশ্চিম তীর থেকে এসেছি। সেই ১৯৬৭ সাল থেকে আমি বিতাড়িত। জর্ডান ও কুয়েতে থেকেছি, যখন ছাত্র ছিলাম। তারপর সিরিয়ায় চলে যাই এবং এখন কাতারে আছি। আপনি আমেরিকায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে পাবেন। তারা দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনে ফিরে যেতে চায়। মার্কিন নাগরিক হলেও তারা মাতৃভূমি ফিলিস্তিনে ফেরার জন্য গভীর তাগিদ অনুভব করে। আর সে কারণেই আমরা শরণার্থীদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন চাই। এটাই আমার ও অন্যদের আকাঙ্ক্ষা। আমার অস্তিত্বের শিকড় পড়ে আছে ফিলিস্তিনে, অথচ আমি এখানে থাকতে বাধ্য হচ্ছি।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আশিস আচার্য

গণতন্ত্রের লক্ষ্য বিঘ্নিত হবে by মাহফুজ আনাম

মুক্ত মিডিয়া ও সরকারের মধ্যে যে কোন দ্বন্দ্বে স্বল্প সময়ের জন্য বিজয়ী হয় সরকার। পরিশেষে বিজয়ী হয় মুক্ত মিডিয়া। কিন্তু জাতি গঠনের মূল্যবান অনেক সময় নষ্ট হয় হস্তক্ষেপ করার সময়টাতে। প্রাথমিকভাবে সরকার বিজয়ী হয়। এর কারণ, তাদের কাছে থাকে সব রকম তহবিল ও কাউকে জোর করে কিছু করানো, ঘুষ, ভয়ভীতি, হুমকি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনগণকে জেলে নেয়ার মতো সব রাষ্ট্রযন্ত্র। চূড়ান্ত জয় হয় স্বাধীনতা ও মুক্ত মিডিয়ার। এর কারণ, তাদের পক্ষে থাকে জনগণ, তবে তা এক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ইতিহাসের এ শিক্ষা থেকে আমাদের সরকার দৃশ্যত কোন শিক্ষা নেয় নি। আমরা যদি তুলনামূলক উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো মুক্ত মিডিয়া ও সমৃদ্ধি এসেছে অঙ্গাঙ্গিভাবে। পক্ষান্তরে এর উল্টো সম্পর্ক যেখানে বিদ্যমান, যে দেশগুলো মুক্ত মিডিয়ার অনুমোদন দেয় না তারা তাদের জাতীয় প্রয়োজনের অনেক নিচে অবস্থান করে। বর্তমানের পুরো আফ্রিকা ও ১৯৭০-এর দশকের লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে ঘানা, বতসোয়ানা, বুরুন্ডি, অ্যাঙ্গোলা, তাঞ্জানিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় এখন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এসব দেশের গণমাধ্যমের চিত্র স্বাধীনতার ক্রমব্যাপ্তিরই বহিঃপ্রকাশ। এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তাদের সহ পুরো দুর্নীতির বিরুদ্ধে চায়না ডেইলিতে রিপোর্ট করা নিকট অতীতেও ছিল অকল্পনীয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন ব্যর্থ হয়েছে তার পেছনে অবশ্যই অনেকগুলো কারণ আছে। আমাদের দৃষ্টিতে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো- সেখানে মুক্ত মিডিয়ার উপস্থিতি ছিল না। সাইবেরিয়া (উদাহরণ হিসেবে) পাঠিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হতো সাংবাদিকদের। ফলে তোষামোদি সাংবাদিকতার কারণে শাব্দিক অর্থে আকাশ ভেঙে পড়ে নেতাদের মাথার ওপর। এর আগে তারা বুঝতেই পারেন নি যে, কখন তাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যেতে শুরু করেছিল। এক পর্যায়ে এ বিশাল রাজত্ব তার নিজস্ব জনগণ ও বিশ্বকে বিস্ময়ের মধ্যে রেখেই পতিত হয়। তারা কি করতে পারতেন ও এসব ক্ষমতালিপ্সু নেতা কি করেছেন তা নিয়েই এ বিস্ময়। সুতরাং যখন চারদিকে এসব ঐতিহাসিক শিক্ষা রয়েছে তার পরও কেন শেখ হাসিনার সরকার মুক্ত মিডিয়ার পেছনে লেগেছে? জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরপরই তা বৃহস্পতিবার গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এটিও সেই একই কাজ করছে।
কি কারণে নতুন জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা এত অগ্রাধিকার পেলো?
প্রতি বছর আমাদের দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনায় হাজার হাজার প্রাণহানি হচ্ছে। যদি আমাদের সর্বশেষ এ ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করি তাহলে দেখতে পাবো এখনও এ ক্ষেত্রে যথাযথ নীতি, যা লঞ্চ নির্মাণের সময় যথাযথভাবে মানতে হবে, এর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে কোন উদ্যোগ এখনও নেয়া হয়নি। কিচেন মার্কেট থেকে খাদ্যে যে প্রিজার্ভেটিভের নামে বিষ মেশানো হচ্ছে তাতে জনগণ আতঙ্কে বসবাস করছে। এখনও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য কোন নীতি নেই। ভেজাল ওষুধে সয়লাব হচ্ছে বাজার। কিন্তু এখনও ভাল ওষুধ কোম্পানিগুলোকে পুরস্কৃত করা ও ত্রুটিপূর্ণ কোম্পানিগুলোকে শাস্তির কোন নীতি গ্রহণ করা হয় নি। যখন ভেজাল প্যারাসিটামল ব্যবহার করে গত ১০ বছরে কমপক্ষে ২০০০ শিশু মারা গেছে তখন মান্ধাতা আমলের আইন কার্যকর হতে ১৫ বছর সময় নিয়েছে, যার ফলে শাস্তি হয়েছে নাম কা ওয়াস্তে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যে আবার ঘটবে না তা ঠেকানোর কোন কিছুই নেই। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে আমাদের দেশের সড়কগুলোতে। কিন্তু জনগণের জীবনরক্ষা বা প্রতিকারের কোন নীতি নেই। ঢাকাকে ঘিরে আছে যে নদীগুলো তা ভীষণভাবে দূষিত। এতে এখন আর কোন জলজ প্রাণী বেঁচে নেই। দূষণ এখন ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। এতে মিঠাপানির মাছের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়েছে। দশকের পর দশক ধরে ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য ছেড়ে দেয়া হচ্ছে নদীতে। এ ক্ষেত্রে সরকার হয় নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করেছে নয়তো লোকদেখানো পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থেকেছে। এসব দূষণকারী ও ভূমিগ্রাসীর কোন জবাবদিহি নেই। সুতরাং যখন কোন সরকার তার অত্যন্ত মৌলিক দায়িত্বগুলো, নিরাপদ খাদ্য, ওষুধ, পানি ও নাগরিকদের পরিবহন দিতে ব্যর্থ হয় এবং মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণে নেয় তখন আমাদের আর কি বলার আছে? তাহলে কি বলতে হবে কোনটা সত্য তা জানতে চায় না সরকার?
বিড়ম্বনা হলো তথাকথিত ‘খারাপ’ খবরগুলো জনগণের কাছে পৌঁছানো রোধ করা হলে প্রতিকারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্য তা কোন কাজে আসবে না। এটা আসবে আইনভঙ্গকারীদের উপকারে। ফলে তারা জনগণ ও সরকারকে ধোঁকা দিয়ে চলবে। ক্ষতি করবে উভয়েরই। এখানে প্রকাশিত গেজেটের ‘ধারা’গুলোর কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো আমাদের মন্তব্যসহ।
১. সেনাবাহিনী, বেসামরিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে তা সম্প্রচার করা যাবে না।
এ ধারাটি এমনিতেই বিতর্কিত ও অযৌক্তিক। যদি কোন কিছু হয় ‘পাবলিক ইনফরমেশন’ তাহলে কেন তা সম্প্রচার করা যাবে না? এরপর, কিভাবে বেসামরিক বিভাগের কোন কিছু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সমঝোতা করবে? সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে, মিডিয়া স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সচেতন। সাধারণত সেনাবাহিনীর কোন গোপনীয় বিষয় কখনও প্রকাশ করা বা সম্প্র্রচার করা হয় না।
২. সেনাবাহিনী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সরকারি কর্মকর্তা যারা অপরাধীদের অপরাধের জন্য শাস্তি দিতে পারেন তাদের অবমাননা হয় এমন কোন কিছু সম্প্রচার করা যাবে না।
এ নীতির অযৌক্তিকতা কল্পনা করুন। এ নীতি যদি কার্যকর থাকতো তাহলে তো আমরা ১০০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ঘাটনের বিষয়ে কিছু লিখতে পারতাম না। যেখানে (অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী) এনএসআই ও ডিজিএফআই-এর কর্মকর্তারা সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এমনকি আমরা ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিষয়েও কিছু লিখতে পারতাম না। ওই হামলা চালানো হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে, এতে জড়িত সাবেক তিন আইজিপি, এনএসআই-এর সাবেক দুই কর্মকর্তা, সিআইডির সাবেক তিন কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনও করা হয়েছে। অনুমোদিত নীতি অনুযায়ী, পুলিশ হেফাজতে বা নির্যাতনে মৃত্যু, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, ডিজিএফআই, গোয়েন্দা সংস্থা ও সরকারি কর্মকর্তা, যারা শাস্তি দিতে পারেন, তাদের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে কোন রিপোর্ট লিখতে বা সম্প্রচার করতে পারব না। এ নীতি কার্যকর হলে আমরা নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক ৭ খুন অথবা সাম্প্রতিক গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসায়ীকে হত্যা (তাকে মিরপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর নির্যাতন করে হত্যা করেছে)- এমন সব ঘটনার খবর লিখতে পারবো না, যেখানে জড়িত র‌্যাব কর্মকর্তা বা পুলিশ। ক্রসফায়ার, রিমান্ডে নির্যাতন ইত্যাদি এসব নিয়ে আমরা কোন রিপোর্ট লিখতে পারবো না। সম্প্রতি লিমন নামে যে নিরপরাধ ছাত্রটিকে র‌্যাব বুলেটবিদ্ধ করেছিল, পরে তাকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে।  যদি মিডিয়া র‌্যাবের কর্মকাণ্ড প্রকাশ না করতো তাহলে কি লিমন ন্যায়বিচার কোন দিনও পেতো?
৩. বিদ্রোহ, বিশৃঙ্খলা, সহিংস ঘটনা... প্রচার করা যাবে না?
আমরা জানি বিদ্রোহ কি এবং এটা কিভাবে প্রচার করা যায় তা নিয়ে আমরা আলোচনা করতে পারি। (এক্ষেত্রে আমরা মেনে নেবো যে, বিডিআর বিদোহের ঘটনা যেভাবে সম্প্রচার করা হয়েছে তাতে সম্প্রচার মিডিয়া পুরোপুরি পেশাদারিত্বের প্রমাণ দিয়েছে)। কিন্তু বিশৃঙ্খলা ও সহিংস ঘটনা বলতে কি বোঝানো হয়েছে? এই নীতি অনুযায়ী আমরা সহিংস কোন অস্থিরতা ও এর ফুটেজ  দেখতে পারবো না। এই নীতি দেখে মনে হচ্ছে, যখন দুষ্কৃতকারীরা রেললাইন উপড়ে ফেলে, আমাদের কলকারখানায় আগুন দেয় তখন টেলিভিশন স্টেশনগুলো নাচ আর গান সম্প্রচার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত যেভাবে চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা ছুড়েছে তা তুলে ধরা হয়েছে ব্যাপক আকারে ফুটেজে। ওই সহিংসতা ছিল অন্যায়। এর অর্থ হলো ভবিষ্যতে এমন দৃশ্য সম্প্রচার করা যাবে না? আমাদের কাছে এই নীতির অর্থ হলো- ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সরকার পুলিশি সহিংসতা ব্যবহার করবে আর মিডিয়া তা প্রচার করতে পারবে না, কারণ এতে বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা হবে। তোবা গার্মেন্টের শ্রমিকদের ওপর বৃহস্পতিবার যেভাবে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে তা কি বর্তমান নীতির অধীনে সম্প্রচার করা অনুমোদিত?।
৪. বিদেশী কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোন কিছু সম্প্রচার করা নিষিদ্ধ।
২০০৭-০৮ সালে যখন আমাদের নৌসীমা প্রহরায় ছিল আমাদের নৌবাহিনী তখন মিয়ানমার আমাদের নৌবাহিনীকে হুমকি দিয়ে সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজ পাঠায়। বিদ্যমান আইনে আমরা এ কথা লিখতে বা সম্প্রচার করতে পারবো না। আমরা লিখতে পারবো না ‘ফেলানি’ হত্যাকাণ্ড অথবা বিএসএফের হাতে সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের কথা? তিস্তায় আমাদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে লেখা এবং ভারত তাতে সাড়া না দেয়ায় তাদের সমালোচনা কি অনুমোদন পাবে? নাকি আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্টের নামে তা নিষিদ্ধ? সৌদি আরব, কুয়েত, মালয়েশিয়া অথবা অন্য কোন দেশে আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ অথবা অবৈধভাবে আটক করার বিষয়টিও বিদ্যমান একই আইনে প্রচার করা যাবে না। ওই সব দেশে তারা কাজ করেন ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে’র নামে। তাহলে আমাদের যে সব প্রবাসীর পাঠানো রেমিটেন্সে আমাদের বিশাল রিজার্ভের গল্প বলি তাদেরকে কি স্বাগতিক দেশের করুণা এবং আমাদের ভীরু ও দুর্নীতিগ্রস্ত বানিজ্যিক অ্যাটাচিদের ওপর ছেড়ে দেবো?
৫. পরিবেশবান্ধব নয় এমন কোন দৃশ্য প্রকাশ করা যাবে না বিজ্ঞাপনে।   
কিন্তু একটি দূষিত নদী, যত্রতত্র পড়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা, গাছ কাটা যদি বিজ্ঞাপনে দেখানো হয় এবং জনগণকে যদি এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয় তাহলে তাতে অন্যায় কি?
৬. ভুলভাবে ও অসত্য তথ্য এড়িয়ে চলতে হবে অবশ্যই।
অসত্য তথ্য অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে। যদি ঘটনাক্রমে যাচাই ছাড়াই তথ্য সম্প্রচার করা হয় তাহলে দীর্ঘদিন ধরে তা অবিলম্বে সংশোধনের প্রক্রিয়া চালু রয়েছে এবং এ জন্য যথাযথ ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। ‘ভুল তথ্যের সঙ্গে কি আমরা পার্লামেন্টে বিতর্কের নামে যা চলে তার তুলনা করতে পারি? বেশির ভাগ সময়ই পারি না। সম্প্রচারকারীরা নয়, সরকারই অর্ধসত্য তথ্য ও একেবারেই ভুল তথ্য দিয়ে থাকে। তবে সত্য কথা হলো, এই সম্প্রচার নীতিমালা পাস করেছে মন্ত্রীপরিষদ। এর পিছনে দু’টি লক্ষ্য কাজ করেছে। একটি হলো, আমলাতন্ত্র, যারা কখনই অবাধ মিডিয়ায় স্বস্তি পান না। এখন তারা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি দলীয় হয়ে পড়েছেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ বেশি দেখছেন যোগ্যতায় নয় খোসামুদিতে। তারা দমিয়ে রাখা মিডিয়াকেই বেশি পছন্দ করেন। তাদের এই প্রবণতায় আসবে কম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। অন্যপক্ষ হলো রাজনৈতিক দল, যারা প্রশ্নবিদ্ধ পদ্ধতিতে ক্ষমতায় এসেছে, তারা সবাই সমালোচক সব কণ্ঠকেই শত্রু মনে করে। মুক্ত মিডিয়ার সংস্কৃতিতে নিজেদের তারা সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মনে করে। তাই তারা বোকামি করে মিডিয়ার কণ্ঠরোধের চেষ্টা করে।
নীতিমালায় বর্ণিত মুক্ত গণমাধ্যমের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাস ও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্লান্তিহীন মানব উদ্যমের বিপরীত যেটা শুধুমাত্র স্বাধীনতা পূরণ করতে পারে। গণতন্ত্রের অধীনে বিগত তিন দশকে মুক্ত গণমাধ্যম বাংলাদেশের অগ্রগতিতে কি অবদান রেখেছে প্রধানমন্ত্রী সেটা সম্পূর্ণরূপে ভুল বিচার করছেন আর খাটো করে দেখছেন। আমি এখানে অমর্ত্য সেনের লেখার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। যাকে তিনি অনেক পছন্দ করেন। বারবার তাকে আমন্ত্রণ জানানোটাই এর প্রমাণ। স্বাধীনতা (গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত) কিভাবে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে- সে ব্যপারে তিনি লিখেছেন। ‘স্বাধীনতা ও উন্নয়ন’ (‘ফ্রিডম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’) শীর্ষক তার ক্লাসিক লেখাটি এই নীতিমালা প্রণয়নকারীদের চোখ খুলে দেয়া উচিত।
আমরা এটা বলে শেষ করতে চাই যে, আমরা একটি সম্প্রচার নীতিমালার বিপক্ষে নই। আমরা যেটা চাই সেটা হলো, এমন একটি আইন যা স্বাধীনতাকে লালন করবে। আর আমাদেরকে আরও পরিণত একটি শিল্পে উন্নত হতে সহায়তা করবে যেখানে নৈতিক ও মুক্ত একটি গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ নৈতিক মানদণ্ড সমুন্নত রেখে সর্বোচ্চ জনসেবা দেয়া যাবে।
এমন একটি আইন পেতে হলে আমরা মনে করি সর্বপ্রথম আমাদের একটি স্বতস্ত্র সম্প্রচার কমিশন থাকতে হবে যারা নতুন একটি আইনি কাঠামো দাড় করাবে। যেখানে স্টেকহোল্ডাররা থাকবে অংশীদার হিসেবে, ভিকটিম হিসেবে নয়। এসোসিয়েশন অব ব্রডকাস্টার্স (অ্যাকটো)-ও সেটা মনে করে।
অবিলম্বে স্বতন্ত্র কমিশন গঠন করুন আর নীতিমালা তাদের প্রণয়ন করতে দিন। সরকার ঘোড়ার আগে গাড়ি যুতে দিয়েছে। যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেভাবেই শেষ করছি। সরকার এখনকার মতো মিডিয়ার কণ্ঠরোধ করতে পারে কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে মুক্ত গণমাধ্যম।

যুদ্ধবিরতি শেষ হতেই ফের হামলা

গাজায় গতকাল নতুন করে চালানো ইসরায়েলি বিমান
হামলায় নিহত শিশু ইব্রাহিম আল-দাওয়াওয়াসার মায়ের
শোক। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে মিসরে
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ওই বিমান হামলা চালানো হয়। রয়টার্স
ফিলিস্তিনের গাজায় গতকাল শুক্রবার ৭২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই আবার দুই পক্ষের সংঘাত শুরু হয়েছে। ৭২ ঘণ্টা পার হওয়ার পর ইসরায়েলে রকেট ছোড়া শুরু করে হামাস। জবাবে গাজায় আবার বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গতকাল বিকেল পর্যন্ত ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক ফিলিস্তিনি শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছে। খবর এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসির। টানা চার সপ্তাহের ইসরায়েলি অভিযানে গাজায় প্রায় দুই হাজার বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির পর গত মঙ্গলবার থেকে ৭২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ইসরায়েল ও গাজা শাসনকারী ইসলামপন্থী সংগঠন হামাস। উভয় পক্ষকে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত করতে মিসরের মধ্যস্থতায় আন্তর্জাতিক কূটনীতিকেরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অন্তত আরও ৭২ ঘণ্টা বাড়ানোর জন্য কায়রোতে চলমান আলোচনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, গতকাল স্থানীয় সময় সকালে ৭২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই গাজা থেকে ইসরায়েলের ভেতরে রকেট ছোড়া শুরু করেছে হামাস। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত ১৮টি রকেট ছুড়েছে তারা। ইসরায়েলের একটি সেনাসূত্র যুদ্ধবিরতির মেয়াদের মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতে গাজা থেকে দুটি রকেট এসে পড়ার দাবি করলেও হামাস সেগুলো ছোড়ার কথা অস্বীকার করে। গাজার যোদ্ধারা গতকাল মোট ১০টি রকেট ছুড়েছে বলে দাবি করে। এর মধ্যে দুটিকে ভূপাতিত করে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’। রকেটের আঘাতে দুজন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি পুলিশ। এদিকে ইসরায়েল হামাসের রকেট হামলার জবাব দিয়েছে বিমান হামলার মাধ্যমে।
এর প্রথম শিকার হয়েছে ফিলিস্তিনি এক শিশু। ১০ বছর বয়সী ওই শিশুটি গাজা সিটির একটি মসজিদের কাছে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়। অন্যত্র নিহত হয় আরও চারজন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা গাজাজুড়ে বিভিন্ন ‘সন্ত্রাসী অবস্থান’-এ হামলা চালিয়েছে। গাজা সিটিতে দৃশ্যত ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রকাণ্ড এক বিস্ফোরণের পর সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটন্যান্ট কর্নেল পিটার লার্নার বলেন, ইসরায়েলে সন্ত্রাসীদের আবার রকেট হামলার বিষয়টি অগ্রহণযোগ্য, অসহনীয় এবং অদূরদর্শী। যুদ্ধবিরতি ভাঙার ব্যাপারে হামাসের সিদ্ধান্তের জবাব দেবে আইডিএফ। এদিকে ইসরায়েলি সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, রকেট হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আর ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিসংক্রান্ত কোনো আলোচনায় যাবেন না। যদিও ৭২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি চলাকালে দেশটি বলেছিল, তারা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে রাজি আছে। অন্যদিকে হামাস বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে রাজি না হলেও কায়রোতে আলোচনা চালিয়ে যেতে চায়। গাজার আরেক প্রভাবশালী ইসলামপন্থী সংগঠন ইসলামিক জিহাদ বলেছে, কায়রো আলোচনা শেষ হয়ে যায়নি। তারা আগ্রাসন ঠেকাতে এবং নিজেদের জনগণের দাবি অর্জনের লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। হামাসের মূল দাবি হচ্ছে, গাজার ওপর থেকে ইসরায়েলের আট বছর ধরে চলমান অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দেওয়া। তবে এসব বিষয়ে ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত খুব সামান্যই আগ্রহ দেখিয়েছে। বরং তারা হুঁশিয়ার করে আসছিল, হামাস নিঃশর্তভাবে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ না বাড়াতে রাজি হলে এবং রকেট হামলা শুরু করলে তার কড়া জবাব দেওয়া হবে। গতকাল সকালে গাজা থেকে ইসরায়েলের ভেতরে আবার রকেট ছোড়া শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির সেনাবাহিনীকে কড়া জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেন।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিলেন চাক হেগেল

চাক হেগেল
রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে তুলে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পর্ক স্থাপনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল তাঁর তিন দিনের ভারত সফরে এই কথাটিই স্পষ্ট করে দিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে গতকাল শুক্রবার বৈঠক করেছেন তিনি। মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটা দ্বিতীয় মার্কিন মন্ত্রীর ভারত সফর। সমরাস্ত্র কেনাবেচা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যুগ্মভাবে সমরাস্ত্র উৎপাদন এবং উন্নয়ন ছাড়াও এই সফরে ২০১৫ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য প্রতিরক্ষা চুক্তি চূড়ান্ত করা হেগেলের লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্র চায়, সে দেশে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে নির্ধারিত নরেন্দ্র মোদির সফর ফলপ্রসূ করার কাজগুলো হেগেলের এই সফরে সেরে ফেলতে। রাজীব গান্ধীর আমলের বোফর্স কেলেঙ্কারির পর বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সমরাস্ত্র কেনাবেচায় অনাবশ্যক রাশ টানা হয়েছে।
তবে কেন্দ্রে পালাবদলের পর প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগের হার ২৬ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করার সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই পরিবর্তনে উৎসাহিত। হেগেল বলেছেন, ভারতকে তাঁরা প্রতিরক্ষা ‘সহযোগী’ হিসেবে পেতে আগ্রহী। ভারতের সঙ্গে তাঁরা প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছেন। ভারতও বিভিন্নভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে, এখন আর তারা স্রেফ অস্ত্র কেনায় আগ্রহী নয়। তারা চায় প্রযুক্তি হস্তান্তর। সেই চাহিদা মেটাতেই হেগেল জানিয়েছেন, তাঁরা যৌথ উদ্যোগে ভারতে সমরাস্ত্রের উৎপাদন ও উন্নয়নে আগ্রহী। মনমোহন সিংয়ের আমলে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য ও প্রযুক্তি উদ্যোগের যে চুক্তি হয়েছিল, এই আমলে তা বাস্তবায়িত করা সম্ভব হচ্ছে না ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে শিবশঙ্কর মেনন না থাকায়। অরুণ জেটলির সঙ্গে বৈঠকে মেননের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে প্রতিরক্ষা উৎপাদন সচিবকে।তিনি ও তাঁর সমমর্যাদার মার্কিন কর্মকর্তা ঠিক করবেন, কী ধরনের সমরাস্ত্রের উন্নয়ন ও উৎপাদন যৌথভাবে করা যায়। জ্যাভলিন ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র আলোচনায় উঠে এসেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আড়াই কিলোমিটার দূরের ট্যাঙ্ক ধ্বংস করা যায়। গত ৭ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতে তিনি প্রযুক্তিসহ এই ক্ষেপণাস্ত্র দিতে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ভারত তিন হাজার ৬০০টি জ্যাভলিন ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে আগ্রহী। সেই সঙ্গে ৯০০টি উৎক্ষেপণ যন্ত্র। কাঁধে রেখে হাতে ধরে এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া যায়। এ জন্য খরচ হবে চার হাজার ২৮৪ কোটি রুপি। এ ছাড়া আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে হেলফায়ার ও স্টিঙ্গার ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত অ্যাপাশে ও চিনুক হেলিকপ্টার।

ইরাকের আইএস কারা, তাদের লক্ষ্যই বা কী

আইএস প্রধান আবু বকর আল বাগদাদী
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অনুমোদনের পর মার্কিন বিমানবাহিনী গতকাল শুক্রবার উত্তর ইরাকে সুন্নি আরব জঙ্গিদের সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর গোলন্দাজ অবস্থানের ওপর হামলা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীসহ সংখ্যালঘুদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করা ও ইরাকের সরকারকে সহায়তা করা এ ‘মানবিক সহায়তা’ হামলা লক্ষ্য। ইরাক ও সিরিয়ার বেশ কয়েকটি অঞ্চলজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করেছে সুন্নি আরব জঙ্গিদের সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা থেকে বেরিয়ে এসে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।কিছুদিন আগেও সংগঠনটির নাম ছিল ইসলামিক স্টেট অব দি ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট/সিরিয়া(আইএসআইএল/আইএসআইএস)। ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান ও লেবাননের অংশবিশেষ নিয়ে একটি অঞ্চলজুড়ে ‘খিলাফত’ পদ্ধতির ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে আইএস। তারা বাগদাদের শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে ইতিমধ্যে ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছে। সিরিয়ায় সরকারবিরোধী লড়াইয়েও সংগঠনটি প্রভাব বিস্তার করছে। আইএসের নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি নিজেকে তাঁদের অধিকৃত অঞ্চলের ‘খলিফা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আইএসের যোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ্যা অজানা হলেও সংগঠনটির পক্ষে হাজার হাজার জিহাদি ইরাকে লড়াই করছে বলে ধারণা করা হয়। তাদের মধ্যে বিদেশি মুসলিমের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। আইএসের নেতা আবু বকর ইরাকে ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শুরুর পরপরই জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত হন বলে ধারণা করা হয়। তিনি ২০১০ সালে আল-কায়েদার ইরাক শাখার নেতৃত্বে আসেন। আবু বকর যখন আইএসআইএলের দায়িত্ব নেন, তখন সেটি আল-কায়েদার একটি শাখা হিসেবে পরিচিত ছিল।পরে তিনি একে পুনর্গঠন করে আল-কায়েদার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন। সুন্নি আরব মিলিশিয়াদের সম্মুখ বাহিনী হিসেবে পরিচিত আইএস গত ১০ জুন ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল দখল করে নেয়। এরপর ২৯ জুন ইরাকে ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় তারা। সে সময় তাদের নেতার পরিচিতি প্রকাশ করা হয় ‘খলিফা ইব্রাহিম’ হিসেবে। সূত্র: বিবিসি।

জন্মদিনে ৪ কেজি সোনার শার্ট!

জন্মদিনে ৪ কেজি সোনার শার্ট!
নিজের জন্মদিনে পরার জন্য পাক্কা চার কেজি সোনা দিয়ে শার্ট তৈরি করিয়েছেন ভারতের মহারাষ্ট্রের রাজনীতিক পঙ্কজ প্রকাশ।শার্টটি তৈরিতে খরচ হয়েছে দেড় কোটি রুপি। মুম্বাইয়ের ২০ জন কারিগর নিয়ে গঠিত বিশেষ একটি দল এই শার্ট তৈরি করতে তিন হাজার ২০০ ঘণ্টা কাজ করেছে।খবর এনডিটিভির।  মহারাষ্ট্র রাজ্যের ইয়েলোয়া মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পঙ্কজ প্রকাশ।
তিনি রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শারদ পাওয়ারের দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির সঙ্গে যুক্ত। মাত্র অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বিদ্যালয় ছেড়ে দেন পঙ্কজ। পেশায় তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী পঙ্কজের ৪৫তম জন্মদিন ছিল গতকাল শুক্রবার।জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তিনি নিমন্ত্রণ করেন মহারাষ্ট্রের পর্যটনমন্ত্রীসহ অন্তত ১২ জন বিধায়ককে। পঙ্কজ মহামূল্য শার্টটি পরে ইতিমধ্যে মুম্বাইয়ের সিদ্ধিবিনায়ক মন্দিরে গিয়েছিলেন। এ সময় দেড় কোটি রুপির সোনার শার্ট দেখতে কৌতূহলী অনেকেই ভিড় জমান। প্রকাশ বলেন, ‘সোনার প্রতি আমার দুর্বলতা শিশুকাল থেকেই। তাই জন্মদিন উপলক্ষে এই শার্ট তৈরি করিয়েছি।’

যশোবন্ত হাসপাতালে

যশোবন্ত সিং
ভারতের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিজেপির বিতাড়িত নেতা যশোবন্ত সিং সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে তাঁকে গতকাল শুক্রবার দিল্লিতে সামরিক বাহিনীর রিসার্চ অ্যান্ড রেফারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, ৭৬ বছরের এই প্রবীণ রাজনীতিকের শারীরিক অবস্থা গুরুতর।
আপাতত তিনি কোমায়। যশোবন্ত পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছেন। তবে কীভাবে পড়ে গেলেন সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। যশোবন্ত সিং উচ্চ রক্তচাপের রোগী।