Showing posts with label দৈনিক ইত্তেফাক. Show all posts
Showing posts with label দৈনিক ইত্তেফাক. Show all posts

Monday, February 15, 2021

ফড়িংবন্ধু by অরণ্য প্রভা

স্কুলে যাবার সময় আম্মু তালহাকে অনেক বুঝিয়েছেন, কিচ্ছুতেই গলে নি সে। তার একটাই কথা—আগে কাশবনে বেড়াতে যাবে তারপর...।

দিন গড়িয়ে বিকেল এলে তালহার আনন্দ দেখে কে? বাড়ির অদূরেই কাশবন। কাশবন তো নয় এটা গড়। এটা ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়েরই অংশবিশেষ। এই গড়ের নিচ দিয়েই বয়ে গেছে করতোয়া নদীপুত্র। স্থানীয়রা তার নাম দিয়েছে সুবিল। এই সুবিল এসেছে শিলাদেবীর ঘাট থেকে। শিলাদেবী ছিলেন পরশুরামের বোন। যাকগে সেসব, আজ এখানে এমন ইতিহাস জানতে আসে নি তালহা।

তালহা যখন আম্মুর সঙ্গে গড়ের ওপর এসে দাঁড়াল, তখন আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ প্যাঁচানো তুলার মতো। আর অদূরের কাশফুলগুলো যেন মেঘের সঙ্গে মিশে গেছে। এমন দৃশ্যে তালহার প্রবল ইচ্ছে জাগে ছবি আঁকবার। পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো ফিকে হয়ে এলে তালহা বলে, আম্মু দেখ দেখ, গঙ্গাফড়িং আর ঘাসফড়িং কীভাবে খেলা করছে। ফড়িং নাকি খুব বুদ্ধিমান। আম্মু ফড়িং আমার বন্ধু হতে পারে না?

আম্মু বলেন, পশুপাখিকে পোষ মানানো যায়, কিন্তু পোকামাকড়, কীটপতঙ্গকে পোষ মানানো যায় কি-না আমার জানা নেই।

কাশবনে দুলে ওঠা হাওয়ায় দুজনেরই মন ভরে ওঠে। এরই মধ্যে তালহা এক পা, দু পা করে এগিয়ে যায় গঙ্গাফড়িং ধরতে। খুব ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে যেই-না ফড়িংয়ের ল্যাজটা ধরবে—অমনি ফড়িংটা ফুড়ুত করে উড়ে গিয়ে বসে অন্য কাশফুলে।

ফড়িং ধরার নেশায় চিত্কার দিয়ে পড়ে যেতে থাকে নিচে। অল্পের জন্য সুবিলের পানি থেকে রক্ষা পায়। চিত্কার শুনে আম্মু দ্রুত নিচে নেমে তালহাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। তালহা আলতো করে আম্মুর বাহুডোর  থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, তুমি ঠিকই বলেছ আম্মু। আর যা-ই হোক কীটপতঙ্গের সঙ্গে বন্ধু হয় না। ওই ফড়িংটার জন্যেই তো আমাকে পড়তে হলো।

-----২.-----

সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে এসে বাম হাঁটুতে ব্যথার সঙ্গে জেগে উঠেছে ফড়িংটাকে না-ধরতে পারার কষ্ট। ক্ষোভের সঙ্গে তালহা বলে, ফড়িংয়ের বাচ্চা, ধরতে পারলে বুঝিয়ে দিতাম, আর কেমন মজা দেখাতাম। আজ না হোক অন্য কোনোদিন তোকে নিশ্চয় ধরে ফেলব।

আম্মু তালহার পড়ার টেবিল হরলিক্স দিয়ে যাবার পরপরই কোত্থেকে একটা ফড়িং এসে ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র... করে উড়তে থাকে। তখন তার কী আনন্দ! আম্মু আম্মু দেখে যাও, তাড়াতাড়ি আসো, আবার বেরিয়ে যাবে।...

আম্মু দৌড়ে এলে তালহা বলে, আজ বিকেলে কাশবনে যে ফড়িংটাকে ধরতে গিয়ে গড় থেকে পড়ে গিয়েছিলাম ঠিক সেই ফড়িংটাই এসেছে।

ফড়িং আবার বাল্বের চারপাশ দিয়ে উড়তে থাকে ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র...।

ফড়িংটা এই মুহূর্তে পড়ে আছে লাইটের ওপরে ঝুলে থাকা হাওয়া চুপসে যাওয়া বেলুনে—বেশ ক’দিন আগে জন্মদিনের জন্য যে বেলুনগুলো ঝোলানো হয়েছিল।

ফড়িংটা পড়ামাত্র দেয়ালের অন্যপাশ থেকে টিকটিকি দ্রুত এগিয়ে আসে বেলুনের দিকে। ক্যা..ট.. ক্যা..ট.. করতে করতে টিকটিকি দুটো বেলুনের কাছাকাছি এলেই ফড়িংটা আবার উড়াল দেয়—ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র...।

তালহা ফড়িংটা ধরবার ফন্দি আঁটে। নখ দিয়ে ল্যাজটাকে ধরলে কামড়ে দিলে কেমন ব্যাথা পাবে? ফড়িংয়ের দাঁত কেমন তাও সে জানে না। ভয় পেয়ে নখ দিয়ে না ধরে সুতা দিয়ে ল্যাজটা বাঁধবার পরিকল্পনা করে।

টিকটিকিটা এবার ফড়িংয়ের খুব কাছে চলে এসেছে। তালহা তখন আফসোস করে বলতে থাকে—এই বুঝি ধরেই ফেলল। তাহলে কি ফড়িংটাকে ধরেই ফেলবে?

আবার ফড়িংটা ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র... করতে করতে তালহার সাদা খাতার ওপর টপাস করে পড়ে। তালহা ধরতে চায়, সাহস পায় না। ফড়িংটার নড়াচড়া আস্তে করে বন্ধ হয়ে গেলে তার মনটাও ভারী হয়ে ওঠে। সে কারণে বলে—ইস! ফড়িংটা মরে গেল।

আবার চিত্কার করতে থাকে। এবার আম্মু এসে ধমক দিয়ে তালহাকে অন্যঘরে নিয়ে যান। এ মুহূর্তে ফড়িং নিয়ে কোনো কথাই শুনতে চান না আম্মু। শাসনের সুরে বলেন—এমনিতে আজ স্কুলে যাও নি, স্কুল আছে, কাল সকালে উঠতে হবে, ঘুমিয়ে পড়ো।

------৩.------

ঘুমের মধ্যে চিত্কার দিয়ে লাফিয়ে ওঠে তালহা। আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বলে, আম্মু তুমি তো বলেছ পশুপাখিকে পোষ মানিয়ে বন্ধু বানানো যায়, কিন্তু কীটপতঙ্গ পোষা যায় না। যে ফড়িংটা আমাদের বাসায় এসেছে সেটা বলল, আমি তোমার বন্ধু হতে এসেছি, বিকেলে কাশবনে আমাকে ধরতে গিয়ে তুমি যে ব্যথা পেয়েছ তার জন্য অনুতাপ প্রকাশ করতে এসেছি। বন্ধুত্ব গড়ার আরো অনেক সব কথা, স্বপ্নে কি এত কথা মনে থাকে!

তালহা যেখানে পড়ছিল সেখানে আম্মুকে টেনে নিয়ে যায়। আম্মু লাইটের সুইচ অন করলে তালহা দেখতে পায় দেয়ালে শত শত পিপড়ার সারি। কতকগুলো পিপড়া ফড়িংয়ের মস্তক, আবার কতকগুলো পাখা, কতকগুলো আবার ফড়িংয়ের ল্যাজ নিয়ে সারিবেঁধে যাচ্ছে। এমন দৃশ্যে কী এক অবর্ণনীয় ব্যথায় তালহার চোখ দুটো টলমল করে, আর ঠোঁট দুটোও থির থির করে কাঁপতে থাকে।

Friday, August 21, 2020

গ্রেনেড হামলা :দেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র by ড. এম এ মান্নান

ঘটনাটি একেবারেই অকল্পনীয়। রাজনীতিতে যে বিশাল ঘুণপোকা ধরেছিল তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল এ ঘটনায়। রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে প্রতিপক্ষ রাজনীতিবিদদের উপর দমন-নিপীড়ন চালাতে পারে তার নজিরবিহীন প্রমাণ সেদিন সৃষ্টি করেছিল তত্কালীন সরকার যার নেতৃত্বে ছিল আক্ষরিক অর্থেই স্বাধীনতাবিরোধীরা। এমন প্রতিহিংসাপরায়ণ আর মানবতাবিরোধী ঘটনা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ ঘটাতে পারে তা একেবারেই অকল্পনীয়। কিন্তু অকল্পনীয় ঘটনাই ঘটে গেল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় আওয়ামী লীগ আহূত সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে, যার সামনের সারিতে ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যিনি তখন আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী। বিশ্বে নজিরবিহীন এ ঘটনাটি দৃশ্যতই ঘটানো হয়েছিল শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ তথা বিরোধী দলকে নেতৃত্ব শূন্য করে দেওয়ার লক্ষ্যে, যেমনটা তারা চেয়েছিল পঁচাত্তরে। সে বছরের ১৫ আগস্ট তারাই শেষ করে দিয়েছে জাতির জনককে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকারকে, এ দেশের ভবিষ্যত্ বিনির্মাণের উদ্যোগকারীকে। বিশ্বের কেউ ভাবতে পেরেছে বলে মনে হয় না এমন বর্বরোচিত আর নারকীয় ঘটনা কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থেকে ঘটাতে পারে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তরা এদেশে সেরূপটা ঘটিয়েছে; তাও ঘটিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে এবং তাদের পেছনের ইন্ধনদাতা আর সরাসরি সাহায্যকারী পাকিস্তান থেকে সমরাস্ত্র আর্জেস গ্রেনেড এনে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এরূপ বিধ্বংসী আর্জেস গ্রেনেড নামক বোমা-অস্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচারে মেরে ফেলা হলো চব্বিশ জনকে আর আহত করা হলো পাঁচ শতাধিক মানুষকে। শরীরে স্প্লিন্টারের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে এখনও ১৫ বছর পরেও বহু আহত হওয়া নাগরিক যারা দেশকে ভালোবেসে গিয়েছিল স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির দলের কর্মপরিকল্পনার কথা শুনতে সেদিনের জনসভায়। তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রীকে হত্যাসহ তারা চেয়েছিল দেশে একটা অরাজক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে যাতে মানুষ তখনকার দেশবিরোধী শক্তির তৈরি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো টু শব্দটিও না করে। গণতন্ত্র তো অনেক আগেই তাদের পূর্বসুরি সামরিক সরকার হত্যা করে শুধু কঙ্কালটা রেখে গিয়েছিল।

তবে বিগত ১৯১৮ সালের ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় বোমা হামলা সংক্রান্ত মামলার রায়ের বিষয়টি শোনার পর স্বস্তি পেলাম এই ভেবে যে, যাকে মূল টার্গেট বানানো হয়েছিল সেই বঙ্গবন্ধুর যোগ্য কন্যার হাতেই হামলাকারী আর ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার হয়েছে, সকল আইন মেনে, দেশের প্রচলিত আইনের আওতায়।

অনেক দেরিতে হলেও বিচার হয়েছে এ মর্মান্তিক, পৈশাচিক ঘটনার। প্রমাণ হয়েছে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে সব সময় কাঁদে না। বিচার হয় এবং হবে এমন ধরনের হামলার, নৃশংসতার। তবে সে সময়কার সরকার কোনোভাবেই চায়নি বিচার হোক। কারণ তারাই তো ছিল নাটেরগুরু, তারাই তো ঘটিয়েছে পুরো ঘটনা, স্বেচ্ছায়, অবলীলায়। বরং মামলা না নিয়ে এবং জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে সরকার পক্ষ ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে; এক সদস্যবিশিষ্ট কমিশন তৈরি করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসতে না পারলে তারা সফল হতো নিঃসন্দেহে। দুর্ভাগ্য তাদের। তাদের ইচ্ছা মাটিতে ডেবে গেল। ১৪ বছর পরে বিচার হয়েছে সেই শেখ হাসিনার আমলেই, যাকে তারা নির্মূল করতে চেয়েছিল। একেই বলে ম্যান প্রপোজেস, গড ডিসপোজেস। ষড়যন্ত্রকারীদের গডফাদার ও বোমা হামলার নির্দেশকারী তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্যেষ্ঠ সন্তান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন আর ১৯ জনের ফাঁসির রায় দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছে।

হামলাকারীরা চেয়েছিল তারা সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেবে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে। আছেই তো মাত্র দুই জন। এ দুই জনকে শেষ করতে পারলেই তো তাদের পোয়াবার। ১৯৭৫ সালের একই মাসের সাত দিন আগেই তো শেষ করে দিয়েছে তাদেরই দোসররা জাতির জনককে। আসলে আগস্ট মাসটিই যেন দেশ বিরোধীদের আঁচলে বাঁধা একটি মাস। এ মাসকেই কেন তারা সব সময় বেছে নেয়? এজন্যই কি যে, এ মাসের চৌদ্দ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস, ব্রিটিশদের সৃষ্ট একটি আজগুবি রাষ্ট্রের জন্মদিবস। পরবর্তীকালেও তারা এ মাসটিকে বেছে নিয়েছিল সারা দেশের সব জেলায় বোমা হামলার জন্য। সিরিজ বোমা হামলা। ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল সারা দেশের মেরুদণ্ড। জঘন্য মনোবৃত্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সারা দেশের মানুষের ওপর। কারো জানের মায়া নেই তাদের মধ্যে। আসলে তারা জনসাধারণের তোয়াক্কা করে না, কদর করে শুধু তাদের হীনস্বার্থকে। দেশকে তাদের কবজায় নিয়ে আসা, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টাকেই তারা গুরুত্ব দেয় সব সময়, জনমানুষের স্বার্থ নয়। তারা এখনো ভুলতে পারেনি তাদের একাত্তরের পরাজয়ের গ্লানি। এরা কিন্তু কখনোই চুপ করে থাকবে না। সুযোগ পেলেই তারা ফণা তুলবে। এদের ব্যাপারে সাবধানতা সব সময়ের জন্য। নতুবা সর্বনাশ হয়ে যাবে দেশের। বিপন্ন হবে জনমানুষের ভবিষ্যত্। সময় এসেছে এসব বর্বর ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার।

বিচার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা অনেকেই সবকিছু বিস্তারিত জানতাম না। বিচারের রায়ের বিবরণ থেকে জানতে পারি, ভালো মানুষের উর্দি গায়ে দেওয়া ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের জঘন্য আর নোংরা মনের পরিচয়। পত্রিকা থেকেই জানতে পারলাম, ষড়যন্ত্রকারী আর হামলাকারীদের মধ্যে ছিল তত্কালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, হুজির আমির ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং দেশ-বিদেশ থেকে জঙ্গিপনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক জঙ্গি। এরা সবাই পঁচাত্তরে জাতির জনককে হত্যার পর থেকে তাদের ষড়যন্ত্র আরো প্রসারিত করার লক্ষ্যে চক্রান্তের জাল বুনতেই থাকে। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তারা অনেক বেশি তত্পর হয়ে উঠে। আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করার পর যখন তিনি সামনের দিকে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই তারা দিশেহারা হয়ে শুরু করে গভীর ষড়যন্ত্র।

বিচার হয়েছে। তাই বলে ষড়যন্ত্র থেমে যায়নি। বোমা হামলার কুশীলবরা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। এরাই দেশে জঙ্গিপনাকে উসকে দিচ্ছে, নিজেরাও জঙ্গিদের সঙ্গে মিলেমিশে অরাজকতার জন্য ঘোঁট পাকাচ্ছে। তারই নজির আমরা পেয়েছি রায় দেওয়ার পরপরই। মাস্টারমাইন্ডের বাপের বাড়ির এলাকায় বগুড়াতে ষড়যন্ত্রকারীদের দোসররা নীলফামারী থেকে ঢাকাগামী বাসে পেট্রোলবোমা হামলা করে তিন জনকে আহত করে এবং অন্যান্য নাশকতার চেষ্টা চালায়। নারায়ণগঞ্জের তিনটি এলাকায়ও বোমা ছুঁড়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করে। পরের বছরই অর্থাত্ ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টে দেশের ৪৫০টি স্পটে চালানো হয় বোমা হামলা। এ হামলার ঘটনায় জড়িত ৫০ জন জঙ্গিকে এখনও ধরা হয়নি এবং বিচার কার্যক্রম ১৪ বছরেও শেষ হয়নি। ৩৩টি মামলা এখনও বিচারাধীন। এসব দুর্বৃত্তরা বিগত কয়েক মাসের মধ্যে রাজধানীতে ট্রাফিক পুলিশসহ অন্যান্য পুলিশের ওপর বোমা হামলা করেছে।

আমরা চাই, এ দেশে এমনতরো নৃশংস বর্বরোচিত রাজনৈতিক হামলা চিরতরে নিপাত হোক; সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে রাজনীতির প্রতি শ্রদ্ধাভাব তৈরি হোক; আজকের এবং আগামীর প্রজন্ম রাজনীতির প্রতি উত্সাহী হয়ে উঠুক। আমরা মনেপ্রাণে কামনা করি, রাজনীতি করা মানুষদের প্রতি অশ্রদ্ধার ভাব দূর হোক; জনগণের মন থেকে রাজনীতি-আতঙ্ক সরে যাক। আমরা আরো চাই, দুর্বৃত্ত শ্রেণির লোকেরা রাজনীতিতে না আসুক, রাজনীতির নদীটার স্বচ্ছ পানিকে ঘোলা করে আপন স্বার্থসিদ্ধির জন্য জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় আর অর্থের যোগান দিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট করার মতো পরিবেশ তৈরি না করুক; আর্জেস গ্রেনেডের মতো সমরাস্ত্র সরবরাহ করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী আর জনগণকে হত্যার ধারা চালু রাখার সংস্কৃতি চিরতরে বিদূরিত হোক এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা জনগণের কাছে আকর্ষণীয় ভাবমূর্তি নিয়ে হাজির হোক। আমরা সর্বান্তকরণে কামনা করি, জনগণ নিশ্চিন্ত মনে রাজনৈতিক সমাবেশে, সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করুক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ, উদ্দেশ, কর্মসূচি ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানলাভ করুক। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি, সে দেশের মাটি থেকে চিরতরে লুপ্ত হোক সকল প্রকার হানাহানি, অপরাজনীতি, জঙ্গিপনা আর সাধারণ মানুষ হত্যার ঘৃণ্য খেলা। আলো ছড়িয়ে পড়ুক বাংলার আকাশে, মেধাবী তরুণরা এগিয়ে আসুক রাজনীতিতে এবং তৈরি করুক উজ্জ্বল আলোদীপ্ত রাজনীতির পুষ্পধাম। প্রত্যাশা করি, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করুক, চাকরিজীবীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করুক, কৃষকরা মাঠে থাকুক, শ্রমিকরা কলকারখানায় নির্বিঘ্নে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাক, মাঝি তার নৌকায় পাল তুলে দিয়ে মনের আনন্দে ভাটিয়ালী সুরের ঝলক তুলুক, আলেম-মাশায়েখরা মানুষের অন্তরে মহান সৃষ্টিকর্তার নুরানী আলোর দীপ্তি ছড়িয়ে দিক আর রাজনীতির ময়দানে থাকা ব্যক্তিরাই শুধু রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকুক, ঠিক যেমনটি হয় উন্নত দেশগুলোতে। এ দেশের জনগণ উন্নয়ন চায়; চায় দেশ এগিয়ে যাক চলমান প্রগতির পথ ধরে আর প্রতিষ্ঠিত হোক সুশাসনের সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ।

>>>লেখক :কলামিস্ট, উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

২১ আগস্ট ও শেখ হাসিনা by অধ্যাপক ড. নাসিম বানু

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি নিষ্ঠুরতম এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি বর্হিভূত বর্বরোচিত ঘটনা হলো— ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ওপরে গ্রেনেড হামলা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা করার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা এবং স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে পুনর্বাসন করা। বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কারণ স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির কাছে অন্যতম প্রধান বাধার নাম হলেন শেখ হাসিনা। কখনো তার নিজ বাসভবনে, কখনো জনসভায়, আবার কখনো তার গাড়িবহরে হামলা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে আর এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয় এবং ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ করে তাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রা করার কথা ছিল। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে একটি ট্রাক এনে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার আগে সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ভাষণ শেষে তিনি “জয় বাংলা” “জয় বঙ্গবন্ধু” বলার সঙ্গে সঙ্গে পর পর দুটি আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়। এরপর সামান্য বিরতি দিয়ে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ শুরু হয়, শুরু হয় গুলির আওয়াজ। হামলায় আহত নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীরা সাহায্য করতে গেলে পুলিশ তাদের ওপরে টিয়ারসেল ছুড়ে উদ্ধার কাজে সাহায্য না করে ব্যাহত করার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয় পুলিশ সেই সময় মামলার আলামত সংরক্ষণ না করে তা নষ্ট এবং বিলীন করে দিতে উদ্যোগী হয় বলেও অভিযোগ উঠে আসে। মঞ্চে উপস্থিত নেতাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে সেদিন আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে গ্রেনেড হামলার হাত থেকে রক্ষা করেন। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। অপূরণীয় ক্ষতি হয় ২১ শে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের। দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন।

এদের মধ্যে আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জালড়ে ২৪ আগস্ট মারা যান। এবং প্রায় দেড় বছর পরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জালড়ে ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের মৃত্যু হয়। প্রায় কয়েকশ জন নেতাকর্মী আহত হন যারা হয় শরীরে স্প্লিন্টার বহন করে যন্ত্রণায় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে অথবা পঙ্গু জীবনযাপন করছে। যার ফলশ্রুতিতে কয়েকশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রেনেড হামলার বিচারক তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ২১ শে আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার যে ষড়যন্ত্র তার মূল পরিকল্পনা হয়েছিল হাওয়া ভবনে। ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র দেশে শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার ২৩ বছর দুই মাস পর জাতি, জাতির পিতা হত্যার দায় থেকে কলঙ্কমুক্ত হয় বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ জাতির পিতাকে হত্যা করার পর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে না গিয়ে বহমান থাকে। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট শনিবার আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়। শেখ হাসিনাকে হালকা নাসতা করানো হবে: এই উদ্ধৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় হামলা করে। তত্কালীন রাষ্ট্রযন্ত্রীয় সহায়তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটনাস্থল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ-এর সম্মুখে যুদ্ধে ব্যবহূত স্পেশালাইজড মরণাস্ত্র, আর্জেন্ট গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটনা ঘটানো হয়। প্রশ্ন ওঠে কেন এই মরণাস্ত্রের ব্যবহার? রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? শুধু আক্রমণই নয় দলকে নেতৃত্বশূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা। রাজনীতিতে অবশ্যম্ভাবীভাবে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে এটা কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকবে। বিরোধীদলীয় নেতাদের হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করা মোটেও গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়।

আমাদের জাতির পিতার কন্যা বেঁচে গেলেন, বেঁচে গেলেন আমাদের জন্য, বাঙালি জাতিকে নেতৃত্ব দেবার জন্য, মুক্তি যুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য, তারুণ্যের বাংলাদেশ গড়ার জন্য, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য।

>>>লেখক : ডিন, ফ্যাকাল্টি অব স্যোশাল সায়েন্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Monday, August 3, 2020

মাতৃদুগ্ধের প্রসার বাড়াতে যা করণীয় by মো. রহমত উল্লাহ

শিশু বিশেষজ্ঞ বো ভালকুইস্টের মতে স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজনন চক্র আবর্তিত হয় দুটো ধাপে। একটি গর্ভধারণ আরেকটি বুকের দুধ খাওয়ানো। যেকোনো একটি ধাপের চর্চা ব্যতিরেকে কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমানে মানবশিশু জন্মের পরে অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ধাপটির চর্চা অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটি সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত যে জন্মের পরে মাতৃদুগ্ধের চেয়ে শিশুর জন্য উত্কৃষ্ট খাবার আর হতে পারে না। মাতৃদুগ্ধ প্রদানে সঠিক চর্চা করার মাধ্যমে যেমন শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব হয় তেমনি সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও প্রত্যক্ষ কল্যাণ বয়ে আনে।

বুকের দুধে বাচ্চার জন্য প্রয়োজনীয় সকল খাদ্য উপাদান সঠিক মাত্রায় বিদ্যমান, পাশাপাশি বুকের দুধ সর্বাধিক নিরাপদ খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। শিশুকে প্রক্রিয়াজাত দুধ খাওয়াতে মাকে খাবার তৈরি করতে যেমন কষ্ট পোহানোর দরকার পড়ে বুকের দুধ খাওয়াতে তেমনি কষ্টের কোনো বালাই থাকে না। এতে করে মায়ের কষ্ট ও সময় উভয় যেমন বাঁচে তেমনভাবে শিশু তার উপযুক্ত খাবার পেয়ে বেড়ে উঠতে পারে।

বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা শিশুর মৃত্যুঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি শিশুকে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

বুকের দুধ খাওয়ানোর সঙ্গে নানা সূচক জড়িত। এর মধ্যে অন্যতম হলো জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ পান করানো এবং ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো। বিশ্বব্যাপী জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানোর (Early Initiation of Breastfeeding) হার ৪৪ শতাংশ এবং ইউনিসেফ গ্লোবাল ডাটাবেজ ২০১৮ অনুযায়ী বাংলাদেশে এ হার ৫০.৮ শতাংশ। ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানোর (Exclusive Breastfeeding) হার ৪০ শতাংশ এবং ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশন-এর রিপোর্ট অনুয়ায়ী ২০১৮ সালে বাংলাদেশে এ হার ৫৫ শতাংশ। ইউনিসেফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী মাত্র ২৩টি দেশ ৬০ শতাংশের ওপর এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং বা ছয় মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করতে পেরেছে। বুকের দুধ খাওয়ানোর বৈশ্বিক সূচকের চেয়ে দৃশ্যত বাংলাদেশ খানিকটা এগিয়ে থাকলেও এসব সূচকে আরো উন্নতি করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

দ্য কস্ট অফ নট ব্রেস্টফিডিং শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে বিশ্ব জুড়ে প্রতিবছর ৬৯৪৩২২ মৃত্যুর পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত নিয়মে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা না করা। আর্থিক হিসেবে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ইউনিসেফের তথ্য বলছে এদের মধ্যে ৫৯৫৩৭৯টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুর ক্ষেত্রে। ৯৮২৪৩ নারীর মৃত্যু ঘটে সঠিক উপায়ে সন্তানকে দুধ না খাওয়ানোর কারণে স্তন, জরায়ু ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায়। বিশ্বব্যাপী শিশু স্থূলতার পেছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ মাতৃদুগ্ধ না খাওয়ানো। ইউনিসেফের মতে ৯৭৪৯৫৬টি স্থূলতার ঘটনার পেছনে দায়ী সঠিক উপায়ে বুকের দুধ না খাওয়ানো।

ল্যানসেট ব্রেস্টফিডিং সিরিজের এক গবেষণায় দেখা গেছে সঠিক উপায়ে বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা শুরু করতে পারলে প্রতিবছর বিশ্বে ৮২৩০০০ শিশুমৃত্যু এবং ২০০০০ মাতৃমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব এবং ৩০০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ ক্ষতি রোধ করা সম্ভব। অ্যালাইভ এন্ড থ্রাইভের গবেষণা বলছে সঠিক নিয়মে বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫৯৪৮টি শিশু এবং ৬১০ জন মায়ের মৃত্যু রোধ করতে সক্ষম। তাদের হিসেবে আরো বলছে বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাবার কিনতে অভিভাবকদের বার্ষিক খরচ ৫৩৪ মিলিয়ন ডলার এবং স্বাস্থ্যখাতে বুকের দুধ না খাওয়ানোজনিত রোগের চিকিত্সায় সরকারের ব্যয় প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার।

বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ানোর দায়িত্ব শুধুমাত্র মায়ের ওপর বর্তায় না। এটি একটি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। বিশ্বব্যাংকের ফ্রেমওয়ার্ক ফর নিউট্রিশন অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী বুকের দুধ খাওয়ানোর হারকে প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্জন করতে হলে ৫.৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার কমিউনিটি পর্যায়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাতৃদুগ্ধের প্রসার বাড়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নতিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এটি একটি মাইলফলক হিসেবে হাতছানি দিবে।

>>>লেখক :শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

Monday, April 20, 2020

ভ্রমণ- সুলু সাগরের সান্দাকানে by জাকারিয়া মন্ডল

মেঘের ভেতর সেঁধিয়ে গেল বিশাল বপুর বাসটা। দু পাশের পাহাড়ের সারি হারিয়ে গেল তুলোর মতো মেঘের আড়ালে। গত মাসে চাঁদের গাড়িতে থানচি-আলীকদম সড়ক পাড়ি দেওয়ার কথা মনে পড়ল। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ওই রাস্তাটার উচ্চতা ছিল প্রায় দুই হাজার ৮০০ ফুট। এ রাস্তার উচ্চতা তার প্রায় দ্বিগুণ।

অলটিমিটারে রিডিং ঠেকেছে ৫ হাজার ৪৩৬ ফুটে। এত উঁচুতে কেমন অনায়াসে মেঘ ফুঁড়ে এগিয়ে যাচ্ছে স্ক্যানিয়ার চাকা! প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি, মালবাহী ট্রাক, এমনকি মোটরসাইকেলও চলছে। মাউন্টেন বাইকে পেডেল চেপে পাহাড় পাড়ি দিচ্ছে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা।

আকাশছোঁয়া চূড়াগুলোকে জড়িয়ে রেখেছে কুয়াশার মতো মেঘ। উপত্যকার সবুজ ঢাকা পড়েছে মেঘের চাদরে। রাস্তার ওপরেও ভেসে আছে মেঘের ভেলা। গাড়িগুলোকে তাই ফগ লাইট জ্বালাতে হয়েছে। এর ভেতরেই গাড়িতে ঝোলানো স্ক্রিন কাঁপাচ্ছে জ্যাকি চান। মঙ্গোলিয়ার মরুভূমিতে বিশাল বপু এক পালোয়ানের সামনে পড়েছে। এ পথের নিয়মিত যাত্রীরা তাতেই মত্ত। পাশের ভারতীয় ইলেকট্রিশিয়ান অনবরত বাটন টিপছে মোবাইলে। গোটা বাসে কেবল এক ইউরোপীয় যুবক জানালার কাচ গলে পাহাড়, আকাশ, মেঘের কুয়াশা দেখছে গভীর মনোযোগে।

১৩ হাজার ফুট উঁচু কিনাবালু পাহাড় ছুঁয়ে এগিয়ে চলল গাড়ি। খানিক পর পাতলা হতে শুরু করল মেঘের ভেলা। হুট করে সূর্যটা উদয় হলো পশ্চিম পাহাড়ের মাথায়। যেন সুইস টিপে জ্বালিয়ে দিল কেউ। মেঘ ধোঁয়া ট্রান্স বোর্নিও এক্সপ্রেসওয়েতে তারই ঝিলিক।

এ রাস্তার দৈর্ঘ্য ১২৩৬ কিলোমিটার। জন্ম বোর্নিওর পশ্চিমপ্রান্ত সারাওয়াকের কুচিং শহরে। সেখান থেকে ব্রুনাই পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে সাবাহর রাজধানী কোটা কিনাবালুতে। তারপর কিনাবালু পাহাড় পেরিয়ে সান্দাকান হয়ে এগিয়েছে ইন্দোনেশিয়া সীমান্তের শহর সেমপরনার দিকে।

পাহাড়ের পাশে পাশে ঝুলেই এগিয়েছে রাস্তাটা। যেখানে জায়গা কম সেখানে পাহাড় না কেটে গড়া হয়েছে কংক্রিটের সেতু। লোহার জালে পাথর ভরে বসিয়ে রাখা হয়েছে পাহাড়ের গায়ে। প্লাস্টিকের মোড়কে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পাহাড়ি বন ছুঁয়ে এগিয়ে যাওয়া ইলেকট্রিক লাইন।

বোর্নিওর চায়ের রাজ্যখ্যাত রানাও এলাকা পাশ কাটাল স্ক্যানিয়া। পাহাড়ের শরীরে ঝুলে থাকা বৃক্ষলতার মধ্যে সেগুনগাছের সারি আবারো স্মৃতির পাতায় ফিরিয়ে আনল বান্দরবানের পাহাড়গুলোকে। তবে এখানকার পাহাড়গুলোতে জুম চাষের চিহ্নও নেই। জনবসতির ঘনত্বও কম। মাঝেমধ্যে দূরে দূরে পাহাড়ি গ্রাম চোখে পড়ে। ওসব গ্রাম লাগোয়া পাহাড়ে হিমালয়ের মতো ধাপ পদ্ধতির চাষাবাদ। এ পাহাড়ের কলাগাছগুলো বেশ ছোটই বটে। বাঁশগুলোতে পাতা কম। তবে আকাশছোঁয়া রেইনট্রি-এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সটান উঠে গেছে আকাশ পানে। বাংলাদেশের পাহাড়ি পথের পাশে দেখা ঝাড়ু ফুলের গাছ চোখে পড়ল এখানেও। রক্তজবা অবশ্য দেখা গেল না, তবে ছোট ছোট নীল আর গোলাপি ফুল নয়ন জুড়িয়ে দিল।

হাইওয়ের পাশের রেস্তোরাঁয় গলাকাটা দাম হাঁকল না কেউ। রাজধানী শহরের মতো এক রিঙ্গিতই থাকল আধা লিটার পানির দাম।

ঘণ্টা দেড়েক পর শেষ হলো পাহাড়ের সঙ্গ। তবে সমতল ভূমিতে নামতেই শুরু হলো আর এক বিস্ময়! দুপাশে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পাম বন। তার ওপরে ঝুলে আছে গোধূলির আকাশ। বাস ছুটছে তো ছুটছেই। এ ছোটার বুঝি শেষ নেই। একসময় তো মনে হলো, পাম বন ছাড়া আর কিছুই নেই এদেশে।

টানা ঘণ্টা দেড়েক ছোটার পর শেষ হলো পাম বন। ততক্ষণে সাঁঝ নেমেছে। বনের পাশে ফুটতে শুরু করেছে একটা দুটা আলো জ্বলা বাড়ি, ফার্ম হাউস। সামনে সাবাহ রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সান্দাকান।

-----দুই-----

সহযাত্রী নবীন পাটনের টানা ঘুম শেষ হয়েছে। উড়িষ্যার এই যুবক একটা পাইভেট বিদ্যুত্ কোম্পানির ট্রান্সমিশনকর্মী। যাচ্ছেন নতুন কর্মস্থল সান্দাকানে। স্বাভাবিকের চেয়ে ঢের বড় তার সঙ্গের লাগেজটা। ওটাকে বক্সে ঢোকাতে গলদঘর্ম সুপারভাইজর খানিক ধাতানিই দিয়েছিল বেচারাকে। তখন থেকেই মুখ গোমড়া ছিল তার। মন খারাপ দেখে যাত্রাবিরতিতে যেচেই একটা বার্গার আর লাল চা সেধেছিলাম নবীনকে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে নবীন জানিয়েছিলেন, এবার দেশে গেলে বিয়ে হবে তার। হবু বউ ভুবনেশ্বরের একটা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কর্মী। যেমন রূপবতী, তেমনই গুণবতী। গাড়িতে ফেরার পর হবু বউ-এর গল্প করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নবীন। সান্দাকান টার্মিনালে ঢোকার খানিক আগে ঘুম ভাঙল তার।

এমনিতেই বাসটা আধাঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে। বছরের এ সময়টায় পর্যটক কম থাকে বলে দূরপাল্লার বাসের ট্রিপ সংখ্যা কমে যায় সাবাহতে। তুঙ মা এক্সপ্রেসের আজকের একমাত্র বাসটা ছেড়েছে বেলা ১টায়। সান্দাকান টার্মিনালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাই সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বেজে গেল। টাউন সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেছে সেই ছ টাতেই। ট্যাক্সিস্ট্যান্ডটাও খাঁ খাঁ করছে।

এবার কিন্তু ভালোই খেল দেখালেন নবীন! তাঁকে নিতে আসা প্রুটন গাড়িটায় চড়ে হুঁশ করে টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমার গন্তব্য সান্দাকান শহরেই যাবেন তিনি। এখান থেকে চার কিলোমিটার দূরে।

নিজেকে এবার বড় অসহায় মনে । অস্থির মনে টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে সামনের যাত্রী ছাউনিটায় এসে বসলাম। পাশেই পাইপ ফুঁকছেন এক মধ্যবয়সী মালয়। একটা পা পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কাভার্ড ভ্যানের পাদানিতে। সান্দাকানের মানুষ যে কত অতিথিপরায়ণ তার যেন জলজ্যান্ত মূর্তি হয়ে উদয় হলেন তিনি।

পরিচয় পর্ব সেরে নিজেই ট্যাক্সি খুঁজলেন এদিক ওদিক। আজ আর দূরপাল্লার গাড়ি আসবে না বলে অপেক্ষারত ট্যাক্সিগুলো এরই মধ্যে চম্পট দিয়েছে। অগত্যা গাড়ির পেছনের দরোজা খুলে উঠতে বললেন দরাজ মালয়ী। সামনে তার পাশের সিটে তারই ছয় বছরের ছেলে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে।

এমনিতেই এ শহরে মানুষ কম। তার ওপর রাতের আঁধারে বড্ড বিপাকেই পড়া গিয়েছিল। এই মানুষটাকে তাই মনে হলো সাক্ষাত্ দেবদূত। জানতে চাইলেন, তুমি কি বুদ্ধিস্ট?

গত রাতে কোটা কিনাবালুতে মালয় তরুণী দিদ্দ ননয় আমাকে ভেবেছিলেন শিখ। কারণটা বোধগম্য হয়নি। ইনি কেন বুদ্ধিস্ট ভাবলেন সেটাও বোধগম্য হলো না। উত্তরের জন্য খানিক অপেক্ষা করে বললেন, আমি মুসলিম। তবে আমার অনেক বুদ্ধিস্ট বন্ধু আছে। তাদের সঙ্গে তোমার চেহারার মিল আছে।

দেখতে দেখতে শহরে ঢুকল গাড়ি। হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন দরাজ দিলের মানসুর মুরাদ। রাস্তা পেরুতেই হোটেলের রিসিপশন। ডেস্কে বসে থাকা মেয়েটা যেন সাক্ষাত্ এক পরী। নিখুঁত চেহারা। নরম আলোর রিসিপশন রুম যেন তার আলোতেই আলোকিত হয়ে আছে! এখানকার আদিবাসী কাদাজান মেয়েরা যে সুন্দরী হয় তা এক বন্ধু বলে রেখেছিলেন আগেই। কিন্তু তাই বলে এতটা! চোখে না দেখলে এ রূপের বর্ণনা করা মুশকিলই বটে!

সুন্দরীর কণ্ঠস্বরও সুরেলা। কিন্তু যে খবর দিলেন, তাতে রূপ উপভোগের তৃষ্ণা পুরোপুরিই উবে গেল। কাদাজান সুন্দরী বললেন, ভুল হোটেলে এসে পড়েছ ভাই। এ হোটেলটার নাম সিটি স্টার। তোমাকে যেতে হবে সিটি ভিউতে।

এরই মধ্যে আরো দুজন বোর্ডার হাজির তার সামনে। অতীব দক্ষতায় তাদের সামলে ম্যাপ এঁকে কোথায় যেতে হবে বুঝিয়ে দিলেন তিনি। বুক করা হোটেলটা খুঁজে পেতে খুব বেশি সময় লাগল না।

-----তিন-----

জঙ্গি হানার ভয়ে বছরের পর বছর ধরে এ শহরটা তাড়াতাড়িই ঘুমায়। আজও রাত নটাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে সান্দাকান। দোকানপাট সবই বন্ধ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে চেক পোস্ট বসিয়েছে পুলিশ। তবে গাড়ি চলাচল নেই বললেই চলে। রোড ডিভাইডারে বসানো ল্যাম্পপোস্টগুলো যেন লণ্ঠনের মতো ধুঁকছে। গলি রাস্তাগুলো নিষিদ্ধপল্লীর মতো আলো-আঁধারিতে ঢুলুঢুলু। গোটা শহরের মধ্যে কেবল ওসব গলিতেই মানুষের আনাগোনা।

সেলুনের সাইনবোর্ডগুলোর নিচে অন্ধকার সিঁড়িতে আদিম রসের আহবান। সামনে দেহের ফাঁদ পেতে বসে আছে টিশার্ট-ট্রাউজারপরা তরুণীরা। চারতলার হোটেল রুমে বসেও ওদের হাসি-ঠাট্টার কোলাহল কানে আসছে। নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে খদ্দের খুঁজছে ওরা। ঘুমন্ত শহরটাকে যেন ওরাই জাগিয়ে রেখেছে।

------চার------

সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়া সান্দাকান জাগল পাখি ডাকা ভোরে। সাত সকালেই জমে উঠল রাস্তাঘাট। বাসস্ট্যান্ডে গলা হাঁকিয়ে যাত্রী ডাকছে হেলপাররা। ছাউনি লাগোয়া অস্থায়ী হোটেলগুলো গাবতলী বাস টার্মিনালের হোটেলগুলোর কথা মনে করিয়ে দিল। ছাউনির ভেতরের হোটেলগুলো তুলনামূলক পরিষ্কার। নাস্তা খাওয়ার জন্য একটাতে ঢুকে পড়লাম। খিচুরি মতো দেখতে একটা খাবার আছে বটে, কিন্তু ওটা ঠিক খিচুরি নয়। আবার ভাতভাজাও নয়। খিচুরি আর ভাতভাজার মাঝামাঝি কিছু একটা। খেতে হবে টমেটো সস আর সিদ্ধ ডিম দিয়ে। অপরিসর খুপরির মতো দালান ঘরে দেয়ালে ঝোলানো তাকে প্লেট রেখে টুলে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা। মাত্র দু-আড়াই রিঙ্গিতে উদোর পূর্তির সুলভ আয়োজন।

মা আর মেয়ে মিলে সামলাচ্ছে খুপড়ি দোকানটা। মায়ের পরনে স্কার্ফ আর বোরখা। মেয়ের কেবল স্কার্ফ বাঁধা মাথায়। কৌতূহলী চোখে বারবার আমাকে মাপছে। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক আলাপ চালালাম ওর সঙ্গে। জানাল, এ হোটেলে স্থানীয়রা খেতে আসে। পরিবহন শ্রমিকই বেশি। বিদেশিরা খুব একটা আসে না।

মায়ের তাগাদায় নতুন আসা খদ্দের সামলাতে ছুটল মেয়েটা। বিল মেটানোর সময়ে বলল, আমার দেখা তুমিই প্রথম বাংলাদেশি।

প্রাতরাশের পাট চুকিয়ে রাস্তায় নামতেই জোর ধাক্কা। ২৩ কিলোমিটার দূরের সেপিলক বনে যাওয়া আসার বিল শত রিঙ্গিত হাঁকছে ট্যাক্সিওয়ালা। তবে হতাশ হওয়ার আগেই সেপিলকের একটা পাবলিক মাইক্রোবাস পাওয়া গেল। যাওয়া-আসার খরচ ছয় দ্বিগুণে ১২ রিঙ্গিত। ১৪ সিটের আরামদায়ক আসন। ভেতরের একমাত্র যাত্রী গতকাল বাসে দেখা সেই ইউরোপীয়। চিনতে পেরে হাত বাড়াল ফিলিপ। প্রাণবন্ত এক সুইস তরুণ। জেনেভার এক সুপার শপে কাজ করে। টাকা জমিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছে। এখান থেকে থাইল্যান্ড ঘুরে সুইজারল্যান্ড ফিরবে।

যে হোটেলে উঠেছি, সেটারই নিচের তলায় ডেরা বেঁধেছে ফিলিপও। এক বাস, এক হোটেল, আজকের এক যাত্রা। পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই অচেনা মানুষ যেন পরস্পরের আপনজন বনে গেল অচেনা দেশে এসে।

গোটা বাসে কেবল আমরা দুুজনই যাত্রী। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা ধরে নির্ধারিত সময়েই ছাড়ল গাড়ি। রাস্তায় আরো ক জন যাত্রী উঠল বটে, কিন্তু সেপিলক পর্যন্ত যাত্রী রইলাম আমরা দুজনই।

এক সময় শেষ হলো শহরের সীমানা। নির্জন বনের ভেতর দিয়ে পিচঢালা রাস্তাটা শেষ হলো ওরাংওটাং স্যাঙচুয়ারির সামনে। বেশ পরিপাটি করে সাজানো জায়গাটা। শখের ক্যামেরার জন্য বাড়তি ৩০ রিঙ্গিত গুনতে হলো ফিলিপকে। ছবি তোলার জন্য টাকাটা একটু বেশিই মনে হলো। ভাগ্যিস, মোবাইলে ছবি তোলার কোনো চার্জ নেই!

------পাঁচ-----

কানের কাছে বিকট চিত্কারে পা পিছলে উল্টে পড়ার দশা। ধুপধাড় করে ছুটে এল কজন দর্শনার্থী। কাছেই দাঁড়িয়ে এক নিরাপত্তাকর্মী হাসছে। তার হাসিতে অভয় পেয়ে শুরু হলো ক্যামেরার ক্লিক। এদিক-ওদিক মুখ ঘুরিয়ে কিছু হয়তো পর্যবেক্ষণ করল ওরাংওটাংটা। তারপর গাছের ঠিক মাঝখানটায় ডালে হেলান দিয়ে যেন ইজি চেয়ারে বসল। এমনিতেই এরা মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকে। কী করে যেন মানুষঘেঁষা হয়ে গেছে এটা।

একটু দূরেই একটার পর একটা গাছে ঝাঁকুনি শুরু হলো। বিশাল বপু নিয়ে কেমন অনায়াস ছন্দে গাছের শাখায় শাখায় লাফিয়ে লাফিয়ে আরেকটা ওরাংওটাং এসে বসল আগেরটার সামনে। শুরু হলো দুজনের গলাগলি। এ এক অদ্ভুত দৃশ্য! দুটোরই লালচে বাদামি চুল। লেজ নেই একটারও।

৪ হাজার ২৯৪ হেক্টর বিস্তৃত সংরক্ষিত এলাকার প্রবেশ মুখেই এমন দৃশ্যে তাক লেগে যাওয়ার জোগাড়। কানে হেডফোন লাগানো নিরাপত্তাকর্মী তখন বলছে—ইউ আর লাকি, লাকি, লাকি।

একটু পরই চার হাত পায়ে গাছের ডালে ডালে হারিয়ে গেল ওরা। ক্যানোপি স্টাইলে বনের ভূমি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে গড়া ওয়াকওয়েটা সামনে এগিয়ে ডানে বেঁকেছে। মাথার ওপরে রেইন ফরেস্টের সবুজ ছাদ। মোড় নিতেই অদ্ভুত দৃশ্যটা চোখে পড়ল।

উঁচু গাছের গোড়ায় গড়া ফ্লাটফর্মটায় ঝুড়ি হাতে এক বনকর্মী। ছুড়ে দিচ্ছে কলা, ডুমুর, ডুরিয়ান, কাটা পেঁপে। বিপরীতে রোমশ শরীরের বিশাল দেহী এক মানুষ বসে আয়েস করে ফল খাচ্ছে যেন! তাকে ঘিরে বাচ্চা ওরাংওটাং আর বিভিন্ন প্রজাতির বানরের মেলা বসেছে।

একটা দুষ্টু প্রজাতির বাচ্চা ছুঁ মেরে নিয়ে গেল বিশাল বপুর হাতের পেঁপের টুকরোটা। আর একটা এগিয়ে আসতেই দাঁত খিঁচে একটা ধমকানি দিল বিশাল বপু। ঠিক যেন কোনো মেজাজি মানুষ বসে ফল খাচ্ছে।

আসলেই তো মানুষের জাতভাই ওরা। মালয়েশিয়ান শব্দ ওরাং মানে মানুষ। আর ইন্দোনেশিয়ার শব্দ ওটাং মানে অরণ্য। দুয়ে মিলে হয় অরণ্যের মানুষ। জেনেটিক্যালি মানুষের খুব কাছের প্রজাতি এরা।

বনকর্মী ঝুড়ি উল্টিয়ে বিদায় নিতেই এক এক করে সটকে পড়তে থাকল বানরের দল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শূন্য হয়ে পড়া প্লাটফর্মটায় একটা কালো কাঠবিড়ালী এল দড়ি বেয়ে।

এখন আর কোনো ওরাংওটাং বা বানর দেখা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে দূর থেকে ভেসে আসছে বিকট চিত্কার।

এদের প্রিয় খাদ্য ডুমুর। আরো খায় গাছের ফুল, ফল, কচি পাতা, নরম বাকল। তাই বলে এদের নিরামিষাসী ভাবার কারণ নেই। পাখির ডিম আর কীটপতঙ্গও দারুণ পছন্দ তাদের। মাছ ধরে খায় অগভীর জলাশয় থেকে। অদ্ভুত কৌশলে ভেঙে খায় বাদাম জাতীয় ফল। ছাড়ে না মধু পেলেও।

পুরুষগুলোর গড় ওজন ৭৫ কেজি। স্ত্রী ওরাংওটাংয়ের গড় ওজন ৪০ কেজির নিচে। পুরুষদের উচ্চতা হয় সাড়ে চার ফুট, স্ত্রীদের চার ফুটের নিচে। অর্ধশত বছরেরও বেশি আয়ু পায় একেকটা ওরাংওটাং।

এখন ফলের মৌসুম নয় বলেই এত সহজে দর্শন মিলেছে তাদের। ফলের মৌসুমে নিজের খাবার নিজেই জোগাড় করে ওরা। আসে না বিনে পয়সার খাবার খেতে। আবার ফলের মৌসুম না হলেই যে আসে তাও নয়। রুচি বদলাতে চাইলে খাবার খোঁজে গভীর বনেই।

ওরা বাসা বাঁধে প্রতিদিনই। ডাল, লতা, পাতা দিয়ে ছাতার মতোই ছাদ বানিয়ে নেয় নিজের মতো। দিনভর জঙ্গলের লতাপাতা আর মাটিতে দাপিয়ে রাতে ঘুমায় নিজের গড়া গাছের বাসায়। ওরাংওটাং তাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৃক্ষবাসী স্তন্যপায়ী।

এই ওরাংওটাংয়ের বসবাস কেবল এই বোর্নিও দ্বীপেই। এদের তাই বলা হয় বোর্নিয়ান ওরাংওটাং। তাদের জাতিভাই হিসেবে সুমাত্রান ওরাংওটাং নামে আরেকটি প্রজাতি কেবল আছে পাশের দ্বীপে। এছাড়া দুনিয়ার আর কোনো বনে ওরাংওটাং নেই। উল্লুক প্রজাতির মধ্যে আফ্রিকায় গরিলা, শিম্পাঞ্জি আর বেবুনের দেখা মিললেও ওরাংওটাং আছে কেবল এ এলাকাতেই। কিন্তু আশঙ্কার কথা, পাম চাষের কারণে এদের সংখ্যা দিন দিন কমছেই। এ দেশের মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পাম বাগান ওদের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে। কাঁটা থাকায় পাম গাছে মোটেই চড়তে পারে না এরা।

------ছয়-----

মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে গাছের খোঁড়লে সেঁধিয়ে গেল রোমশ কালো শরীরটা। আহা! আর একটু সময় কেন থাকল না! আরে, ওই তো আরেকটা। দিঘল গাছগুলোর গোড়ায় জমিয়ে বসা গুল্মঝোপের ভেতর থেকে আরেকটা বেরিয়ে এল। গাট্টাগোট্টা শরীর। কালো রোমে ছাওয়া দেহ। ছোট্ট লেজ। হাঁটাচলা আয়েশি। দূর থেকেও বোর্নিয়ান সান বিয়ারের বোঁটকা গন্ধ নাকে এল।

একটু দূরে আরেকটা কালো শরীর উঁচু গাছ বেয়ে তরতরিয়ে নামছে। এদিকে আরেকটা এসে যোগ দিল আগেরটার সঙ্গে। অবজার্ভেশন টাওয়ারে দাঁড়ানো জনা ছয় মানুষের দিকে খেয়ালই নেই তাদের। আপনমনে মাটি শুঁকতে শুঁকতে গুটিগুটি পায়ে চরছে।

টাওয়ারে বসানো বায়নোকুলারটায় একটু আগেও চোখ গলিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছিল সবাই। লাইনে সিরিয়াল পাওয়াই মুশকিল ছিল। এখন আর ওতে আগ্রহ নেই কারো। চোখের সামনেই তো জ্যান্ত ভল্লুক আপনমনে চরে বেড়াচ্ছে। গাছের মাথাছোঁয়া প্লাটফর্মে দাঁড়ানো মানুষগুলোর দিকে মন নেই তাদের।

পড়ে থাকা একটা গাছের খোঁড়লে মাথা সেঁধিয়ে বোধহয় পোকা-মাকড় খুঁজল একটা। আরেকটা মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে মাথা চুলকালো কিছুক্ষণ। একটু পরই একটা ঝোপের ভেতর ঢুকে বিশ্রামে বসল বুঝি। আর বেরুল না।

বোর্নিয়ান সান বিয়ার নামে বিশেষ প্রজাতির এই ভল্লুকের বাস কেবল এই বোর্নিও মুলুকেই। ওরাংওটাংয়ের চেয়ে এদের দেখেই বেশি মজা পেল সুইস তরুণ ফিলিপ। সাবজেক্ট কাছে হওয়ায় অতিকায় লেন্সটা খুলে রেখেছে অনেক আগেই। শার্টারে ক্লিক করতে আরো বেশি মনোযোগী হলো সে।

বোর্নিয়ান এই সানবিয়ারের উচ্চতা ৪ থেকে ৫ ফুট। পুরুষগুলোর ওজন হয় ৩০ থেকে ৬০ কেজি। মেয়েগুলোর ২০ থেকে ৪০ কেজির মধ্যে। লেজের দৈর্ঘ্য ইঞ্চি দুয়েকের বেশি নয়। চাপ দিয়ে ধরতে পারলে নিমিষে মানুষ পিষে ফেলতে পারে এরা।

এদের আরেকটা প্রজাতি আছে মালয়ান সানবিয়ার নামে। ওদের দেখা মেলে পূর্ব ভারত, দক্ষিণ চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয় উপদ্বীপ আর সুমাত্রার উপকূলীয় বনে। ওদের তুলনায় বোর্নিয়ান সান বিয়ারের আকৃতি অর্ধেক। খাদ্য ঘাটতির কারণেই এদের আকার এমন ছোট হয়ে এসেছে বলে মতবাদ আছে।

অধিকাংশ সময়ে গাছে গাছে ঘুরতেই পছন্দ করে সানবিয়ার। পোকা-মাকড় ছাড়াও বিছা, শুয়োপোকা আর মধু ভীষণ পছন্দ তাদের। মাটি খোঁড়ে বলে ওরা বনের কৃষক। আবার পোকা-মাকড় খেয়ে বাঁচিয়ে দেয় অনেক গাছকে। মৌচাকে হানা দিয়ে মধু খেয়ে চাক ফেলে রাখে কাঠবিড়ালী বা আর কোনো বন্যপ্রাণীর জন্য। একটা পুরুষ সান বিয়ারের খাবার খুঁজে বেঁচে থাকার জন্য অন্তত ১৫ বর্গকিলোমিটার বন প্রয়োজন হয়। যদিও এই অভয়ারণ্যে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সানবিয়ারের খাবার খাওয়ার কোনো ধরাবাঁধা সময় নেই। এরা নিজের ইচ্ছামতো সময়ে খায়।

------সাত------

শতবর্ষী মসজিদ জামেক থেকে শুরু হলো ঐতিহাসিক অতীতের পথে হাঁটা। মসজিদটা টিলার ওপরে। অষ্টভূজাকার ছাদের ওপরে পঞ্চভুজী গম্বুজ। নারীদের নামাজের জন্যও পৃথক কক্ষ। টিলার নিচে বিশাল এক সাইনবোর্ডে হেরিটেজ ট্রেইলের বিবরণসহ পুরো ম্যাপ। তার সামনে তামার পাতে মুড়ে পদচিহ্ন এঁকে ট্রেইলের দিক-নির্দেশনা।

নির্দেশনা মেনে সামনে পা বাড়াতেই সিটি কাউন্সিলের সামনে গ্রানাইট পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ। সান্দাকানের প্রতিষ্ঠাতা ইউলিয়াম বি প্রায়োরের নামাঙ্কিত পাতটা ক্ষয়ে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। পেছনে রাস্তার ওপাশে পাহাড়ের ওপরে উঠে গেছে বাঁধানো সিঁড়ি। বাঁশবনের ভেতর দিয়ে গড়া সিঁড়িটায় টিনের ছাদ। জায়গাটা নির্জন বলে কয়েক জোড়া টিনএজার প্রেমে মত্ত। ভিনদেশী এই আগন্তুককে দেখল বটে, সতর্ক হওয়ার গরজ দেখাল না। মনে পড়ল ক্রীতদাসের হাসির কথা। গ্রন্থটিতে কালজয়ী কথা সাহিত্যিক শওকত ওসমান অভিসারে মত্ত হয়ে ওঠা যুগলের বর্ণনায় হাল ছেড়ে দিয়ে বলেছেন, প্রেমিক প্রেমিকার কুহর শুনেছ কখনো? যদি না শুনে থাকো, লেখক তোমাকে আর কিছু বোঝাতে পারবে না।

শ দুই সিঁড়ি বাওয়ার পর ওই কুহর এলাকা শুরু হলো। পাহাড়ে উঠে বায়ে মোড় নিতেই শহর প্রশাসকের বাসভবন। বিপরীতে অর্ধবৃত্তাকার ফ্লাটফর্মটা ঝুলে আছে পাহাড়ের গায়ে। এবার পায়ের নিচে সান্দাকান শহর। চোখের সামনে সুলু সাগরের উন্মুক্ত পোতাশ্রয়।

সাগরটাকে এখানে বৃত্তের মতো বেড় দিয়ে রেখেছে মিন্দানাওয়ের বর্ধিত অংশ সুলু দ্বীপপুঞ্জ। আর প্রশান্ত মহাসাগরের অংশ এই সুলু সাগরের এখানটায় সৈকত ছুঁয়ে অর্ধবৃত্তাকারে গড়ে উঠেছে সান্দাকান শহর। উন্মুক্ত জলরাশির দৃষ্টিসীমায় ওই বড় দ্বীপটার নাম টার্টেল আউল্যান্ড। নানা প্রজাতির কচ্ছপ ওখানে এসে ডিম দেয়। কিন্তু সারি সারি দ্বীপ আর আশপাশের জলরাশিতে কারফিউ চলে সন্ধ্যা সাতটা থেকে ভোর পাঁচটা অবধি। দক্ষিণ ফিলিপাইনের জঙ্গি ঠেকাতেই এ আয়োজন সাবাহ সরকারের।

প্লাটফর্মের উল্টোদিকে আরেকটা উঁচু টিলার ওপরে বিখ্যাত মার্কিন লেখিকা অ্যাঙস কেইথের হাউস। বিশাল বিশাল গাছঘেরা বাড়িটা এখন সান্দাকান মিউজিয়াম।

পাহাড় বেয়ে আরেকটু নামতেই ক্লক টাওয়ারের উল্টোদিকে অনেকগুলো পাথর। ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকা এসব পাথর আসলে আরেক ঐতিহাসিক ভবনের ধ্বংসাবশেষ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে সান্দাকান ছিল ব্রিটিশ চার্টারড নর্থ বোর্নিও কোম্পানির রাজধানী। জাপানিরা সে শহর গুঁড়িয়ে হত্যা করেছিল ২ হাজার ৪০০ অস্ট্রেলীয় ও ব্রিটিশ বন্দিকে। শহরের বাইরে সারি সারি কবর এখনো সেই গণহত্যার ইতিহাসের সাক্ষী।

ধ্বংসাবশেষ পেরিয়ে বিশাল এক গাছের গোড়ায় ছোট্ট এক চাইনিজ খুপরি। ওটাকে দেবীর দয়া বলে থাকে চাইনিজরা। একটু দূরে আরো একটা মন্দির আছে তাদের। তারপর একটা চার্চ।

শহরের একমাত্র স্টেডিয়ামে মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ চলছে। পুরনো অংশটায় মোটর গ্যারেজের মতো শার্টারের ভেতরে বোর্নিও পোস্টের আঞ্চলিক অফিস। আরেকটু এগুতেই সারি সারি তাঁবুতে রাতের বাজার বসেছে। মূলত নারীরাই দোকানি এখানে। পেছনে সৈকত ছুঁয়ে গড়া রানওয়ের মতো রাস্তাটায় ইয়ংস্টারদের মোটরবাইক মহড়া চলছে।

ফিলিপাইন সাগরের টাইফুন প্রায়ই আঘাত হানে এদিকটায়। জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে শহর রক্ষায় তাই সাগর তীরে বুক সমান উঁচু কংক্রিটের দেয়াল। ওপাশে পাথর ফেলে ঢেকে দেওয়া হয়েছে সাগর তীর। এখানে তাই সমুদ্র সৈকত বলে কিছু নেই। কেউ এখানে সমুদ্র স্নানেও নামে না। বিশাল বিশাল বোল্ডারগুলোর ওপরে বসে ছিপ ফেলেছে শখের মাছ শিকারিরা।

সুলু সাগরের ওপরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চোখের সামনে অন্ধকারে হারিয়ে গেল টার্টেল আইল্যান্ড। কারফিউ বলে ওদিকটায় কোনো আলোও নেই। আজ রাতে আর এই সাগরে টহল বোট ছাড়া অন্য কোনো নৌযান ভাসবে না।

বন্দর হারবারে বিশাল এক জাহাজ নোঙর ফেলা। এখানে তীরের কাছেই গভীর পানি। সেই পানির পাড়ে সি ফুড রেস্টুরেন্ট। ওপাশের শপিংমলটাই সম্ভবত সান্দাকানের সবচেয়ে বড় ভবন। সারি সারি রেস্টুরেন্টগুলোতে ফিলিপিনো মেয়েদের মেলা। ডাটা রিচার্জের জন্য রাস্তার পাশের খুপড়ি দোকানে গিয়েও ফিলিপিনি সুন্দরীরই দেখা মিলল। এজন্যই বুঝি মিনি ফিলিপাইন বলা হয় সান্দাকানকে!

হারবার জেটির কাছে ফিলিপের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ফের। সাগরের পাড়ে বসে আমরা কফি খেলাম। ঘোরাঘুরি আর ছবি তোলাটাকে ব্যয়বহুল শখ বলে হাসল ফিলিপ। যত ব্যয়বহুলই হোক, এই শখের তাড়ায় সে যে আরো অনেক দেশে দেশে উড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কাঁধে হাত রেখে ফিলিপ বলল, বিদায় বন্ধু। এ ক দিনে তো বন্ধুই হয়ে গেছিলাম আমরা।

Tuesday, February 11, 2020

শৈশব বনাম গ্যাজেট by হাসান ইমাম

ডিজিটাল বিশ্ব এখন বাস্তবতা। এ এমন এক বাস্তবতা, যাকে আঁকড়ে ধরা বা এড়িয়ে যাওয়া—কোনোটাই আর কারো ইচ্ছাধীন নয়; মেনে নেওয়াই নিয়তি। এই ‘বিরাট’ বাস্তবের ছোট্ট উদাহরণ বুঝি হাতের মুঠোয় থাকা কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিন (বা পর্দা), যাতে ঠিক এঁটে গেছে গোটা বিশ্ব মায় বহির্বিশ্ব! আক্ষরিক অর্থেই দুনিয়া আজ হাতের মুঠোয়। মানুষে মানুষে যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন, খবরাখবর, তত্ত্বতালাশ থেকে শুরু করে নিখাদ বিনোদন—এমন কিছুই নেই, যার দায়িত্ব স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপকে দেওয়া হয়নি।

প্রযুক্তি জীবনকে কতটা সহজ-সাবলীল, গতিশীল করেছে, তা নিক্তিতে হয়তো পরিমাপযোগ্য নয়। তবে তার ব্যাপকতা এতটাই যে, এখন জীবন অনেকটাই নির্ভার করেছে প্রযুক্তি। তাই বলে শিশুদের ভবিষ্যত্ গড়ার ভারও কি গ্যাজেটের ওপর ছেড়ে দেওয়া চলে? সমাজ যেন সেই কাজটিই করছে; শৈশব সাজানোর দায়িত্ব গছিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তির কাঁধে।

প্রযুক্তিময় বিশ্বে এটা বলা অন্যায় হবে না যে, চোখ ফোটার পর থেকেই শিশু আসক্ত হচ্ছে গ্যাজেটে। তা সে অক্ষর চেনার জন্যই হোক, ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাখা বা খাবার গলাধঃকরণের জন্যই হোক। ভাবনা কী, আছে নির্ভাবনার গ্যাজেট! কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মুশকিল-আসানের সহজ তরিকা কি অন্য কোনো জটিল মুসিবত ডেকে আনছে না?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যা বলছে, তাতে শঙ্কিত হওয়ার কারণ ষোলো আনা ছাড়িয়ে আঠারো আনা। সম্প্রতি সংস্থাটি তাদের হালনাগাদ পর্যালোচনায় সাফ বলেছে, দুই থেকে চার বছরের শিশুদের দিনে এক ঘণ্টার বেশি ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে থাকতে দেওয়া চলবে না; কোনো অজুহাতেই না। স্ক্রিন আছে এমন যে কোনো ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেওয়া ঠিক হবে না আরো কমবয়সিদের, নাড়াচাড়া তো দূরের কথা। ডব্লিউএইচও তাদের গবেষণায় বলছে, বিশ্বের একটি বড়ো অংশের শিশুদের হাতে কোনো না কোনোভাবে স্মার্টফোনের মতো সহজলভ্য গ্যাজেট সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে। যেকোনো সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে সমাধানের পথে তো হাঁটছেই না, উলটো মনোযোগ দিচ্ছে হাতে থাকা স্ক্রিনে। ফলে শৈশব থেকে বিদায়ঘণ্টা বাজছে আবেগের; মনোজগতের দুয়ার বন্ধই থাকছে।

শিশুর মানসিক বিকাশের এই পর্বে বিষয়টি যে অত্যন্ত উদ্বেগের, তাতে বোধ করি কারো ভিন্নমত থাকার কথা নয়। উপরন্তু, স্ক্রিনের সামনে টানা বসে থাকার প্রবণতায় বাড়ছে স্থূলতা। অনিদ্রার মতো সমস্যার বাড়বাড়ন্তও ঘটছে সমানতালে, যা একইসঙ্গে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অর্থাত্, সমস্যা এতটাই প্রকট যে, চোখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। আমাদের উপেক্ষার মাশুল গুনবে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম।

মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা বা শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে তবু কিছু আলাপ-আলোচনা হয় বিভিন্ন ফোরাম, প্ল্যাটফরমসহ গণমাধ্যম বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। কিন্তু সমাজবিচ্ছিন্নতায় স্মার্টফোনের অবদান নিয়ে তেমন কোনো আওয়াজ কালেভদ্রেও তোলা হয় না। অথচ দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাবের কথা ভাবলে গা শিউরে ওঠে।

প্রযুক্তির রমরমা এই ‘আধুনিক-প্লাস’ বিশ্বে শিশুরা বড়োই একা। যৌথ পরিবারের ধারণা আমাদের মনোজগত্ থেকে এখন ‘মাইনাস’ হয়েছে। ছোটো হতে হতে পরিবার এখন স্রেফ মা ও বাবায় সীমাবদ্ধ। তার ওপর তাদের উভয়ের কর্মজীবন, উদয়াস্ত ব্যস্ততা, ক্যারিয়ার গ্রাফ। যে নিরাপদ পারিবারিক বেষ্টনী শিশুকে এযাবত্ কাল ঘিরে রাখত পরম যত্নে, তা ক্রমে ভেঙে পড়ছে। এমন ‘অরক্ষিত’ শিশুই শিকার হচ্ছে গ্যাজেটের। অর্থাত্, গ্যাজেটে মগ্ন-মত্ত শিশু আরও বেশি সমাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, নিঃসঙ্গ হচ্ছে।

দুটি কারণ পাশাপাশি একটি অন্যটিকে পুষ্টি জুগিয়ে চলেছে। দরকারি সাহচর্য, বিনোদন, শিক্ষা—সবকিছুই স্ক্রিনে পেয়ে পারস্পরিক মেলামেশা ও লেনাদেনার তাগিদ হারাচ্ছে শিশু। কোনো কিছুই আর অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শিখছে না সে। অন্যদিকে, তার বৌদ্ধিক বিকাশও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সঙ্গে ফাউ হিসেবে শারীরিক ক্ষতি তো আছেই।

স্ক্রিনসর্বস্ব জীবনে শিশু নিজের কল্পনা ঝালিয়ে নেওয়ার অবসর পায় না, সুযোগও ঘটে না। স্ক্রিনটিই নানা রঙিন মোড়কে তার কল্পনাটিকে বাস্তবে এনে ফেলে। ফলে স্ক্রিনে দেখা গল্পকে, ভাবনাকেই সে নিজস্ব কল্পনা বলে ভাবতে থাকে। বছর কয়েক আগেও ঠাকুমার ঝুলি, দৈত্যদানো বা লালকমল-নীলকমলের গল্প শুনে সে নিজের মনে কতগুলো অবয়ব রচনা করত। যে কোনো গল্পের সার্থকতাও সেখানে।

কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে সেই গল্পের বাহারি ভিডিও শিশুর নিজস্ব কল্পনার জগিটকে স্রেফ গুম করে ফেলছে। শিশুমন কল্পনা আর বাস্তবের ফারাক করতে পারছে না। কাগুজে ধারণা হয়ে থাকছে শিশুর কল্পনাশক্তির উন্মেষ, মনোজগতের বিস্তার। আগামী প্রজন্মের একটা বড়ো অংশকে কি আমরা এমন ‘জড়ভরত’ হিসেবে দেখতে চাই?

>>>লেখক :সাংবাদিক

Sunday, December 1, 2019

দেশ নিয়ে চাওয়া-পাওয়া by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমি খুব আশাবাদী মানুষ। আমি জানি আমার এই আশাবাদ নিয়ে আমার আশপাশের অনেকেই আমাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করেন—আমি কিছু মনে করি না। আমার পিএইচডি সুপারভাইজারের কাছে শোনা একটি গল্প মনে পড়ে। তিনি আমাকে একজন আশাবাদী ছেলের গল্প শুনিয়েছিলেন। গল্পটি অনেকবার অনেক জায়গায় শুনিয়েছি, আরো একবার শুনতে পাঠকেরা নিশ্চয়ই আপত্তি করবেন না। গল্পটি এরকম: একটা বাচ্চা ছেলে খুবই আশাবাদী, কোনো কিছুই তাকে নিরুত্সাহিত করতে পারে না। সে সবসময় লাফাচ্ছে, ঝাঁপাচ্ছে, হাসছে, খেলছে। তার মা-বাবা এই বাচ্চা ছেলেটার ভবিষ্যত্ নিয়ে রীতিমতো চিন্তায় পড়ে গেলেন। তারা ভাবলেন ছেলেটা যখন বড়ো হবে, কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হবে তখন সে নিশ্চয়ই একটা ধাক্কা খাবে। তাই তারা ভাবলেন ছেলেটাকে রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি করতে হবে। মা-বাবা অনেক ভেবেচিন্তে রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা ঘোড়ার গোবর এনে বাচ্চা ছেলেটার ঘরে ফেলে রাখলেন। ভাবলেন ছেলেটা যখন স্কুল থেকে বাসায় এসে তার ঘরে এই গোবর দেখবে সে নিশ্চয়ই খুবই ঘাবড়ে যাবে। ঘর থেকে ঘোড়ার গোবর পরিষ্কার করতে গিয়ে তার এক ধরনের শিক্ষা হবে। হাসিখুশি, আনন্দ একটুখানি হলেও কমবে। বাবা-মা তাদের ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। ছেলে স্কুল থেকে বাসায় এসে নিজের ঘরে ঢুকেছে এবং একটু পরেই মা-বাবা তাদের ছেলের একটা বিশাল আনন্দধ্বনি শুনতে পেলেন। ছেলে আনন্দে লাফাতে লাফাতে বলতে লাগল, ‘ঘরের ভেতরেই যেহেতু ঘোড়ার গোবর তার মানে আশপাশে নিশ্চয়ই ঘোড়াটা আছে! কী মজা!’

আমার অবস্থা অনেকটা এই ছেলের মতো, সব সময়েই সব জায়গায় আমি আশার আনন্দ খুঁজে পাই। আমার ধারণা শুধু আমি নই, আমার মতন যারা ১৯৭১-এর সেই ভয়াবহ সময় পার করে এসেছে তাদের সবাই এই দেশ নিয়ে আশাবাদী। আমরা মানবতার সবচেয়ে নৃশংস রূপটি দেখেছি, একই সঙ্গে এই দেশের মানুষের সাহস, শক্তি এবং আত্মত্যাগের রূপটিও দেখে এসেছি। আমরা কীভাবে এই দেশ নিয়ে আশাবাদী না হয়ে পারব?

আমি স্বীকার করছি খবরের কাগজ দেখলে যে কেউ এক ধরনের হতাশা অনুভব করবেন। কিছুদিন আগেও সেখানে ছিল ধর্ষণ, গণধর্ষণ আর শিশু ধর্ষণের খবর। মনে হচ্ছিল মাদ্রাসা শিক্ষকরা বুঝি একজনের সঙ্গে আরেকজন এই ব্যাপারে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এখন হচ্ছে ডেঙ্গুর খবর। সারাজীবন দেখে এসেছি বেঁচে থাকতে হলে মানুষের রোগ-শোক হয়, কিছুদিন ভুগে আবার ভালো হয়ে যায়। এখন কথা নেই, বার্তা নেই দুধের শিশুটি থেকে বড়ো মানুষ ডেঙ্গুতে হঠাত্ করে মারা যাচ্ছে—কী ভয়ংকর একটা পরিবেশ। ঈদের আগে আর পরে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের খবর, এত অল্প সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষ মারা যেতে পারে নিজের চোখে দেখলেও বিশ্বাস হয় না। ঈদের সময়টিতে হঠাত্ দেখি চামড়া কেলেঙ্কারির খবর, রাতারাতি বিচিত্র সিন্ডিকেট গড়ে উঠে চামড়া ব্যবসায়ীদের পথে বসিয়ে দিচ্ছে। তার আগে ছিল বন্যার খবর। মাঝখানে দুধ নিয়ে বিশাল হইচই—গবেষকরা দুধের মাঝে অ্যান্টিবায়োটিক পেয়েছেন, মুখ ফুটে সেই কথাটি বলা মাত্র মনে হলো সরকারি কর্মকর্তারা গবেষকদের টুঁটি চেপে ধরবেন। কিন্তু একটা সমস্যাকে অস্বীকার করলেই কী সমস্যাটা চলে যায়? এমনিতে সারা বছরই রোহিঙ্গাদের নিয়ে খবর থাকে, ইয়াবার বড়ো বড়ো চালান নিয়ে খবর থাকে। ক্রসফায়ারে, বিনাবিচারে মানুষ মেরে ফেলার খবর থাকে, বাংলাদেশ বিমানে করে যাত্রী আনা-নেওয়ার খবরের বদলে সোনা আনা-নেওয়ার খবর অনেক বেশি থাকে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার ছিল ছেলেধরা সন্দেহে একেবারে নিরীহ নারী-পুরুষকে নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা। হঠাত্ করে মনে হতে থাকে আমরা বুঝি সভ্য মানুষ নই, আমরা বুঝি মধ্যযুগের বর্বর মানুষ।

কাজেই খবরের কাগজ পড়ে কারো যদি মন খারাপ হয়, কেউ যদি হতাশা অনুভব করেন আমরা তো তাকে দোষ দিতে পারি না। আমি তার মাঝেও নিজের আশাবাদকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করি। দাঁতে দাঁত চেপে খবরগুলো পড়ি, তারপর নিজেকে বোঝাই পৃথিবীর সব জাতি কোনো না কোনো সময় এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গিয়েছে। আমরাও যাচ্ছি, একসময় আমরা শক্ত অর্থনীতির ভিত্তির ওপর দাঁড়াব। এখনই আমাদের ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরা সমান তালে লেখাপড়া করছে সেই লেখাপড়ার মান আরো ভালো হবে। দেশের ছেলেমেয়েরা আধুনিক মানুষ হিসেবে বড়ো হবে। সরকার ঠিকভাবে চলবে, আইনের শাসন দৃঢ় হবে, দুর্নীতি কমে আসবে, বায়ু দূষণ বন্ধ হবে, খাবারে ভেজাল থাকবে না। নদীগুলো মুক্ত হবে, সবুজ দেশটি আরো সবুজ হয়ে উঠবে। আমি এসব নিয়ে আশা করতে একটুও ভয় পাই না। আশাবাদী হয়ে বেঁচে থাকার একটা অনেক বড়ো সুবিধা আছে, ভয়ংকর দুঃসময়টিও সাহস নিয়ে পার করে দেওয়া যায়! আমি জানি, কারণ আমি তা পার করেছি!

মানুষ খুবই বিচিত্র একটি প্রাণী। একজন মানুষ হয়তো নিজের জীবন নিয়েই হিমশিম খাচ্ছে, তারপরেও সে পুরো দেশ নিয়ে চিন্তাভাবনা করে। শুধু দেশ নয়, পৃথিবী নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে। কেউ কেউ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে মাথা ঘামায়। যেকোনো মানুষের সঙ্গে কথা বললে দেখা যাবে তার দেশ নিয়ে কিছু একটা পরিকল্পনা আছে। দেশটাকে কীভাবে ঠিক করা যাবে সেটা নিয়ে তার নিজের চিন্তা-ভাবনা আছে। আমিও চিন্তা করি। তবে আমার ধারণা অন্যরা যে রকম অল্পতে কাতর হয়ে যান আমি তত সহজে কাতর হই না। আশাবাদী হওয়ার কারণে যেটুকু পেয়েছি তাতেই মহাখুশি হয়ে যাই, যেটুকু পাইনি তার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করি। ভবিষ্যতে পেয়ে যাব সেটা আশা করে বসে থাকি। আমি কী পেয়েছি? যাদের জন্মই হয়েছে বাংলাদেশে তারা বুঝবে না কিংবা অনুভব করবে না কিন্তু আমাদের প্রজন্ম জানে যে আমরা বাংলাদেশটি পেয়েছি। যদি না পেতাম তাহলে আমাদের কী অবস্থা হতো আমি কল্পনাও করতে পারি না। যদিও বামপন্থি অধ্যাপকরা ক্রমাগত আমাদের যুক্তি প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন এই দেশের উন্নয়নের পুরো ব্যাপারটিই একটা ভাঁওতাবাজি কিন্তু আমি তো দেখতে পাচ্ছি পাকিস্তানের ইমরান খান একটা ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমানে সমান হয়ে একটা মর্যাদার আসনে বসে নানা দেশের প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে কথা বলছেন। আমি আমার ইউনিভার্সিটিতে পঁচিশ বছর অধ্যাপনা করে অবসরে গিয়েছি, পুরো সময়টুকু কীভাবে কম খরচে একটা ডিপার্টমেন্ট চালানো যায় তার কলাকৌশল আবিষ্কার করে দিন কাটিয়েছি। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় বছরে মাত্র কয়েক কোটি টাকা পেয়েছে সেটা দিয়ে কোনোমতে একটা বিল্ডিং তোলা হয়েছে, কয়েকটা ক্লাসরুম বানানো হয়েছে। অথচ এখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার কোটি টাকার কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। বামপন্থি অধ্যাপকরা নিশ্চয়ই আমাকে বোঝাতে পারবেন এই হাজার কোটি টাকার মাঝে রয়েছে বিশাল শুভংকরের ফাঁক—কিন্তু যতক্ষণ বোঝাতে না পারছেন ততক্ষণ এই বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে আনন্দ পেতে চাই। আমি অল্পতেই খুশি হই, বেশি হলে আমি কী পাগলামো করে ফেলব কে জানে !

যাই হোক দেশের উন্নয়নের ব্যাপারটা আমার পাওয়ার মূল বিষয় নয়। আমার মূল পাওয়া হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীর বিচার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দীর্ঘদিন একটা গ্লানি নিয়ে বেঁচে ছিলাম। বিশেষ করে যখন যুদ্ধাপরাধীরা এই দেশের মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়াত সেই জ্বালা সহ্য করা খুব সহজ ছিল না। যখন ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা জানতে চাইত যারা এই দেশটাকে চায়নি তারা কেমন করে এই দেশের মন্ত্রী হয়, আমি তাদের এই অতি সহজ-সরল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম না। আমাকে এখন আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় না উলটো সুযোগ পেলে (কিংবা না পেলেও) তাদের মনে করিয়ে দিই চল্লিশ বছর পরে হলেও আমরা যুদ্ধাপরাধীর বিচার করেছি।

দেশ নিয়ে আমার কী আর কিছু চাওয়ার আছে? আমি যখন এটা নিয়ে চিন্তা করি তখন আমার মনে হয় আমি দেশ থেকে আর মাত্র দুটি জিনিস চাই, তারপরে আমার আর কিছু চাওয়ার থাকবে না। আমি যে দুটি বিষয় চাই তার একটি হচ্ছে রাজনৈতিক দল সংক্রান্ত। আমি চাই এই দেশে যেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক দল না থাকে। আরো সহজ করে বলা যায় সংসদে সরকারি দল যেরকম হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি রাজনৈতিক দল ঠিক সেরকম বিরোধী দলও হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক কলাকৌশল নিয়ে দুই দলের মাঝে দ্বন্দ্ব থাকবে কিন্তু দেশের মূল আদর্শ নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব থাকবে না। আরো সোজাসুজি বলা যায় জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গী করে আর কোনো দল কোনোদিন রাজনীতি করবে না, নির্বাচন করবে না।

আমার অন্য চাওয়াটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। ১৫ই আগস্ট bd news 24 এ সৈয়দ বদরুল আহসানের একটি লেখা বের হয়েছে (All those men...on 15 August 1975 and after) এই দেশের সবার সেই লেখাটিতে একটিবার হলেও চোখ বুলানো উচিত। তাহলে আমাদের এক ধরনের বোধোদয় হবে। এখন সবাই উঠতে-বসতে বঙ্গবন্ধুর নাম জপ করছে কিন্তু ১৯৭৫ সালে কারা কী করেছিল? কেন করেছিল?

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার বিষয়টি অবিশ্বাস্য রকম হূদয়বিদারক, আমার মাঝে-মাঝেই মনে হয় একুশটি বছর বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের বুক থেকে মুছে ফেলার চেষ্টাটুকু কোনো অংশে কম হূদয়বিদারক নয়। এই দেশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড়ো হয়েছে যাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর নামটি পর্যন্ত উচ্চারণ করা হয়নি অথচ বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক। কেউ যদি মাত্র একটি লাইন ব্যবহার করে বাংলাদেশের ইতিহাস বলতে চায় সেখানেও বঙ্গবন্ধুর নামটি উচ্চারণ করতে হবে। অথচ সেই বঙ্গবন্ধুর নামটি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কী ভয়ংকর!

কাজেই দেশ নিয়ে আমার দ্বিতীয় চাওয়াটি হচ্ছে এই দেশের সকল রাজনৈতিক দল বঙ্গবন্ধুকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিয়ে রাজনীতি করবে। আরো সহজ করে বলা যায় বঙ্গবন্ধু সব সময় থাকবেন এই দেশের সব ধরনের রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তিনি কোনো দলের মানুষ হবেন না, তিনি হবেন এই দেশের সবার হূদয়ের মানুষ।

আমার এই দুটি চাওয়া মোটেও বেশি চাওয়া নয়—দুটি খুবই “একটুখানি” মাত্র চাওয়া। আমি এটা আইন করিয়ে করাতে চাই না, জোর করে করাতে চাই না। আমি চাই এটা এই দেশের মানুষের হূদয় থেকে আসুক, দেশের জন্য ভালোবাসা থেকে আসুক।

আসবে, নিশ্চয় আসবে। আমি আশাবাদী মানুষ।

>>>লেখক :শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক

Thursday, October 31, 2019

যে দেশে প্রেম-বিয়ে নির্ভর করে জিন পরীক্ষার ওপর

পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই মানুষ নিজের পছন্দ অনুযায়ী প্রেম কিংবা বিয়ের মতো সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। কিন্তু নাইজেরিয়ায় বর্তমানে প্রেম কিংবা বিয়ে করার আগে বিবাহযোগ্য নারী-পুরুষকে চিন্তা করতে হয় ভবিষ্যত প্রজন্মের বিষয়টি। জিন পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে বিয়ের মতো সম্পর্কের বিষয়ে ভাবতে হয়। কারণ দেশটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের শরীরে এমন কিছু জিন রয়েছে যেগুলো ভবিষ্যতে সিকল সেল ডিজেজের (এসসিডি) জন্য দায়ী হতে পারে।
নাইজেরিয়ার যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ডেমিলোলা ওগুনপেবি সম্প্রতি বিয়ে করেছেন। কিন্তু এই বিয়ে করার জন্য তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ এক পথ। বিয়ের উপযোগী পাত্রীর সন্ধানে তাকে অনেক অনুসন্ধান করতে হয়েছে। এমন অনেককে পছন্দ হলেও দুই জনের জিন পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফল না আসায় বিয়ে করা হয়নি। ডেমিলোলা বলেন, আমি আমার বর্তমান সঙ্গীকে খুঁজে পাওয়ার আগে দীর্ঘদিন খোঁজখবর করেছি। উপযুক্ত জিনোটাইপের সমস্যা ছিল। যখনই কারো সঙ্গে ‘ডেটে’ যেতাম প্রথমেই আমাকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো—তোমার জিনোটাইপ কি? এইভাবে অনেকের সঙ্গে দেখা করলেও দুই জনের জিনোটাইপের সমন্বয় না হওয়ায় সেসব সম্পর্ক আর সামনে এগোয়নি। মূলত যাদের জিনে সিকল সেল ডিজেজের গুণাগুন থাকে তাদের সঙ্গে বিয়ের মতো সম্পর্ক তৈরিতে অনীহা প্রকাশ করে মানুষ।
সিকল সেল ডিজেজ মূলত উত্তরাধিকারী রক্তের ব্যাধি। অর্থাত্ বাবা-মায়ের রক্তের মাধ্যমে এটি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যায়। এসসিডিতে আক্রান্তদের রক্তের কোষের গঠন সাধারণত সি আকারের হয়। সুস্থ রক্তের হিমোগ্লোবিন শরীরে অক্সিজেন পরিবহন করে। সুস্থ ব্যক্তির রক্তের হিমোগ্লোবিন সাধারণত মসৃণ, গোলাকার এবং নমনীয় হয়। কিন্তু এসসিডিতে আক্রান্তদের রক্তের হিমোগ্লোবিনের আকার অস্বাভাবিক হয়। এই ধরনের রোগীদের শরীরে অ্যানিমিয়া, অসম্ভব ব্যথা এবং অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয়। এই কারণে জিনোটাইপ পরীক্ষা না করে যখন এই ধরনের ব্যক্তিরা বিয়ে করে সন্তান জন্ম দেয় তখন ওইসব সন্তানের সিকল সেল ডিজেজে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। প্রতিবছর নাইজেরিয়াতে দেড় লাখের বেশি শিশু এসসিডি রোগ নিয়ে জন্ম হয় যা কি না বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০০৬ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটিতে গড়ে ২৪ শতাংশ মানুষ সিকল সেল জিন বহন করে। আর প্রতি হাজারে অন্তত ২০টি শিশুর জন্ম হয় সিকল সেল নিয়ে। >>-সিএনএন

Tuesday, October 15, 2019

বিশ্ববাজারে আমাদের দেশের শুঁটকির কদর by আবুল কাসেম ভূঁইয়া

আমাদের দেশে উত্পাদিত শুঁটকি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের লোকদের কাছে শুঁটকি অতি প্রিয় খাবার হিসেবে সমাদৃত। শুধু বাংলাদেশের লোকের কাছেই শুঁটকি প্রিয় খাবার নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছেও শুঁটকি প্রিয় খাবার। আমাদের দেশের রপ্তানি পণ্য তালিকায় শুঁটকি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় আমাদের দেশে উত্পাদিত বিভিন্ন প্রজাতির শুঁটকি মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, হংকং, ভিয়েতনাম, মালেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, বার্মাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। আমাদের দেশ থেকে শুঁটকি রপ্তানি শুরু হয় কয়েক দশক আগে থেকে। প্রাথমিক অবস্থায় স্বল্প পরিমাণে শুঁটকি রপ্তানি হতো। এখন ব্যাপক পরিমাণে শুঁটকি রপ্তানি হচ্ছে। তবে এসব শুঁটকি সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে রপ্তানি হয়ে থাকে। বেসরকারি উদ্যোগে শুঁটকি রপ্তানি করতে গিয়ে রপ্তানিকারকদের নানা দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। বিদেশের বাজারে যে পরিমাণ শুঁটকির চাহিদা রয়েছে সেই পরিমাণ শুঁটকি রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদেশে শুঁটকি রপ্তানিতে যদি সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যেত, তাহলে ব্যাপক ভিত্তিতে আমাদের দেশ থেকে শুঁটকি রপ্তানি করা সম্ভব হতো।

আমাদের দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা কক্সবাজার, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, রাঙ্গাদিয়া, মহেশখালী, সোনাদিয়া, খুরুশকূল, ঘোরকঘাটা, চকোরিয়া, সেন্টমার্টিন, বাংলাবাজার কক্সবাজার এয়ারপোর্ট বিচসহ খুলনার বিভিন্ন এলাকায় শুঁটকি উত্পন্ন হয়ে থাকে। সমুদ্র্র উপকূলবর্তী এলাকার লোকদের উল্লেখযোগ্য পেশা হচ্ছে সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ করে শুঁটকি উত্পন্ন করা। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকার প্রায় ১০ লাখ লোক শুঁটকি উত্পাদন কাজে নিয়োজিত আছে। সারা বছর ধরে সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ করা হলেও শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে। শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় হলো অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত। এই সময়ে আমাদের দেশের সমুদ্রসীমানা থেকে হাজার হাজার টন মাছ ধরা হলেও সব মাছ দিয়ে শুঁটকি করা হয় না। কিছু কাঁচা মাছ বাজারে বিক্রি করা হয়। অবিক্রীত অথবা নির্ধারিত পরিমাণের মাছ দিয়ে শুঁটকি করা হয়ে থাকে। এসব সামুদ্রিক মাছকে প্রাকৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে শুঁটকি উত্পাদন করা হয়ে থাকে। প্রাকৃতিকভাবে অর্থাত্ রৌদ্রে শুকিয়ে এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে অর্থাত্ বৈদ্যুতিক তাপে শুঁটকি উত্পাদন করা হয়। প্রাকৃতিকভাবে উত্পাদিত শুঁটকির মান বৈজ্ঞানিক উপায়ে উত্পাদিত শুঁটকির গুণমান অপেক্ষা অনেক নিম্নমানের। বৈজ্ঞানিক উপায়ে উত্পাদিত শুঁটকির মান অনেক উন্নত এবং স্বাস্থ্যসম্মত হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন জাতের অপ্রচলিত শুঁটকি বিদেশে যথেষ্ট চাহিদা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ সমন্বয়ের অভাবে এসব শুঁটকি বিদেশে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাপক ভিত্তিতে শুঁটকি রপ্তানির ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের শুঁটকি-শিল্পে বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতো। শুঁটকি-শিল্পকে যথাযথ শিল্পের মর্যাদা দিয়ে অবাধে বিদেশে শুঁটকি রপ্তানির ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করলে দেশের অর্থনীতিতে সুফল আসত।

>>>লেখক :বীমা কর্মকর্তা

Tuesday, October 1, 2019

সমাজ এবং আমাদের দায়িত্ববোধ by মাহবুব এ রহমান

বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন ‘মানুষ সামাজিক জীব’। মানুষ কখনো একা বাস করতে পারে না। মানবসভ্যতার আদিকাল থেকেই মানুষ একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে বা সংঘবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে সমাজের। কিছুসংখ্যক মানুষ একই উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে একত্রিত হয়ে বসবাসের নামই হলো সমাজ।

সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার সমাজের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সামাজিক সম্পর্কের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ‘যে সব সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে আমরা জীবনধারণ করি, সেসব সম্পর্কের সংগঠিত রূপ হলো সমাজ।’

সমাজবিজ্ঞানী জিসবার্টের সংজ্ঞানুযায়ী, ‘সমাজ হলো সামাজিক সম্পর্কের জটিল জাল, যে সম্পর্কের দ্বারা প্রত্যেক মানুষ তার সঙ্গীদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত’ মোটকথা আমরা এসব কথা বিশ্লেষণ করলে পাই যে, মানুষের পক্ষে একা বাস করা বা জীবনযাপন করা সম্ভব নয়। ফলে ধীরে ধীরে মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য সমাজ সভ্যতা গড়ে তুলেছে। সমাজে মানুষ এমন সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ থাকা উচিত যাতে একজনের সুখে-দুখে অন্যজন অংশীদার হতে পারে। একজনের বিপদে অন্যজন পাশে এসে সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে পারে। সমাজের এবং দেশের একজন সুনাগরিক হতে হলে সমাজের প্রতি রয়েছে দায়-দায়িত্ব বা কর্তব্যবোধ। একজন সুনাগরিক শুধু নিজের জন্য বা নিজের ভালোর জন্য চিন্তা করেন না, শুধু নিজের অগ্রগতি কিংবা উন্নতি চিন্তা করে না বরং নিজের অগ্রগতির পাশাপাশি সমাজের অন্য মানুষদেরকেও এগিয়ে নেওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালান। পুরো সমাজকে এগিয়ে নিতে, উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে চেষ্টা করেন। আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সমাজে বসবাস করি। প্রত্যেকই কোনো না কোনো সমাজের নাগরিক। একটি সমাজের নাগরিক হিসেবে সেই সমাজের প্রতি আমাদেরও রয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ। সমাজের একজন নাগরিক হিসেবে সবার উচিত শুধু নিজের কথা না ভেবে, শুধু নিজের ভালোর কথা চিন্তা না করে সমাজের ভালো চাওয়া এবং সমাজের উন্নতি কামনা করা। অনেক সময় সমাজের সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে নিজের একার ভালো বা উন্নতি বিসর্জন দিতে হয়। সমাজের জন্য ত্যাগ করতে হয়। তবেই একজন সুনাগরিক হওয়া সম্ভব। নচেত্ আমরা যে যেই সমাজেই বসবাস করি না কেন সমাজের প্রতি যদি দায়বোধ না থাকে তাহলে কোনোক্রমেই একজন সুনাগরিক কিংবা সামাজিক হওয়া সম্ভব নয়। একটি সমাজে সব ধরনের লোক থাকে। উঁচু-নিচু, চেনা-অচেনা কিংবা বিত্তবান বা বিত্তহীন। সকলের প্রতি বিবেক জাগ্রত রেখে কাজ করে যেতে পারলে তবেই সমাজের উন্নতি সম্ভব। সমাজের একজন নাগরিক হিসেবে সমাজের সবাইকে নিয়ে ভাবা উচিত। সবার উন্নতি এবং মঙ্গলের কথা চিন্তা করা কর্তব্য। নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যদেরও এগিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করা উচিত। সমাজের সকল মানুষ এগিয়ে গেলে তবেই সমাজ এগুবে। সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখার মাধ্যমেই আমাদের পক্ষে একজন প্রকৃত সামাজিক হয়ে ওঠা সম্ভব।

>>>লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে

Monday, September 23, 2019

নগর কৃষি ও পরিবেশ সংক্ষরণে ছাদবাগান by অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুব ইসলাম ও সফিউল আযম

আমাদের দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও প্রাকৃতিক সম্পদ অধিক ব্যবহারের ফলে পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে অধিক জনসংখ্যা, অতিরিক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইডও পার্টিকুলেট ম্যাটারস ইত্যাদি বিশ্ব উষ্ণায়ন তথা তাপমাত্রা বৃদ্ধির মূল কারণ। ফলে গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং শহরে তাপদ্বীপ প্রভাব (Urban Heat Island Effect) সৃষ্টি করছে। এছাড়া শহর এলাকায় অধিক দালান কাঠামো, জলাধার ও সবুজায়ন হ্রাস, অপরিকল্পিত শহরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে শহরের পরিবেশ দূষণ ক্রমাগত বাড়ছে। তাই শহরে বাড়ির ছাদ উপযুক্ত জায়গা যেখানে বাগান তৈরির মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য বিশুদ্ধ বাতাস, বাস্তুু সংস্থানের উন্নয়ন, খাদ্য, ওষুধ ইত্যাদির নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা সম্ভব। কিন্তু খোদ রাজধানী ঢাকা শহরে টেকসই কৃষির চর্চা কম; এর কারণ হলো মানুষের সচেতনতার অভাব, সীমিত দক্ষতা, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের অভাব ও বাগানের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্কের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীষ্মকালে ছাদবাগান সংশ্লিষ্ট দালানের কক্ষের ভেতরের তাপমাত্রা ১.০-১.২৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত কমায়, যা বিদ্যুতের চাহিদা কমায়। এছাড়া ছাদবাগান এলাকায় কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমান ৭০ পিপিএম পর্যন্ত কমায়। যদি ঢাকা শহরে ব্যাপকভাবে ছাদবাগানের প্রসার করা যায়, তবে এটি কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অন্যান্য বায়ু দূষণকারী উপাদানের মাত্রা কমিয়ে শহরে তাপদ্বীপ প্রভাব ও পরিবেশ দূষণ কমাবে। এছাড়া এর মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। ছাদে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে গৃহস্থালি ও বাগানের সেচ কাজে ব্যবহার করার সুযোগ আছে।

আমরা সবসময় লক্ষ করি, অনেকেই বাগান করেন কিন্তু একটা সময় পর এটার অস্তিত্ব আর পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো সামনে উঠে আসে সেগুলো হলো, গবেষণা ও কারিগরি সহায়তার অভাব, নগর কৃষি ও ভার্টিকেল ফার্মিং সম্পর্কে নগরবাসীর জ্ঞানের অভাব, মডেলভিত্তিক ছাদবাগানের অপ্রতুলতা, ছাদকৃষি সফলতায় গবেষণা ও সম্প্রসারণে সংযোগের ঘাটতি, নগরবাসী, মালি ও সম্প্রসারণে নিয়োজিত জনবলের প্রশিক্ষণের অভাব, বাগান মনিটরিংয়ের অভাব, বাগানের প্রয়োজনীয় উপাদান সহজলভ্য নয়, ছাদকৃষিতে ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষির কারিগরি জ্ঞানের অভাব, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত জ্ঞানের অভাব, বিল্ডিংয়ের ক্ষতিসহ মূল্যমান কমে যাওয়ার ভয়ের আশঙ্কা ইত্যাদি। এজন্য শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাদবাগানভিত্তিক ইকো-সেন্টার (Eco-Centre) স্থাপন করেছে। এই ইকো সেন্টারের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেছে যেমন: ছাদে বাগানকরণ, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার, কম্পোস্টিং, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, কার্বন শোষণ ও বায়ুদূষণ কমানো ইত্যাদি। ছাদবাগান আগ্রহীদের নিয়মিত পরামর্শ প্রদান ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে এই ইকো সেন্টারে।

কীভাবে ছাদবাগান করবেন, আসলে সঠিকভাবে ছাদে বাগান করার কতগুলো পর্যায় ক্রমিক ধাপ রয়েছে, যেমন প্রকৌশলী দ্বারা ছাদের সুরক্ষা পরীক্ষা করা, প্রকৌশলীর মতে ছাদবাগানের ওজন বিতরণ, ছাদবাগানের লে-আউট, ছাদে সেচ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, গাছ রোপণ কাঠামো ও মাধ্যম, ছাদবাগানের নিরাপত্তা, বাগানের প্রয়োজনীয় ছোটো যন্ত্রপাতি ক্রয়, গাছ, বীজ, সার, চারা গাছ ইত্যাদি। সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন, তাহলো ছাদবাগানের রক্ষণাবেক্ষণ। ছাদবাগান করতে হলে ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তি যেমন, উপযোগী ফসল ও জাত, মাটির পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবস্থাপনা, শস্য বহুমুখীকরণ প্রভৃতি জানতে হবে। এছাড়া যে বিষয়গুলো খুব বেশি জরুরি, তা হলো— ছাদবাগান টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে বেশ কিছু ব্যবহূত কৌশল নিতে হবে। যেমন: গাছ উত্পাদন মাধ্যম, কেঁচো সার, বায়োচার, ভার্মিকোলাইট, পারলাইট ও জিওলাইট, হিউমিক এসিড ও নারিকেলের ছোবড়া, বিশেষ সেচ/ড্রিপ সেচ, বায়োস্টিমুলেটর, অক্সিন, জিব্রেলিন, স্যালিসাইলিক এসিড সম্পর্কে কিছুটা ধারণা অর্জন করা প্রয়োজন।

জাতীয় কৃষি নীতি-২০১৮ তে বিশেষায়িত কৃষির আওতায় ছাদকৃষির প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের উপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। ছাদবাগান স্থাপনের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ ও আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা বেশ জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ছাদবাগান সম্প্রসারণের কৌশল নির্ধারণ করাও প্রয়োজন। আর্থিক ও সামাজিক চাহিদা বিশ্লেষণ করে ছাদবাগান প্রকল্প নেয়া উচিত। বৃষ্টির পানি ও সেচের অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা এবং ছাদবাগানে ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসল উত্পাদন করা বাঞ্ছনীয়।

>>>লেখকদ্বয় : অধ্যাপক, এগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা এবং সমাজসেবা সম্পাদক, গ্রিন এনভায়রনমেন্ট মুভমেন্ট

Saturday, September 21, 2019

সন্ধ্যা হলেই আলোকিত হয় ধরন্তির হাওর by অর্পিতা চৌধুরী

পশ্চিমে মেঘনা, পূর্বে তিতাস। মাঝে সুবিশাল হাওর। সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে জলরাশি। হাওরের পেট কেটে চলে গেছে সরাইল-নাসিরনগর সড়ক। ধরন্তি গ্রামে এই সড়কটিতে দাঁড়ালে দিন শেষে দেখা যাবে সূর্য লুকাচ্ছে পানির নিচে। সেই সূর্যের আলো নিয়ে আলোকিত হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ধরন্তির হাওর। প্রতিদিন বিকেলে নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখার জন্য হাওরের ওপর দিয়ে চলমান সরাইল-নাসিরনগর সড়কের দুই পাশে ভিড় করে অসংখ্য মানুষ। এই পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও হাওরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত টিআর/কাবিটা প্রকল্পের আওতায় বিনা মূল্যে দেওয়া হয়েছে সৌরবাতি।

সন্ধ্যা হলেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ধরন্তির হাওরসহ উপজেলা সরাইল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দুই পাশ স্বয়ংক্রিতভাবে জ্বলে ওঠে সৌরবিদ্যুত্-চালিত সড়কবাতি। আবার সকাল হলেই স্বয়ংক্রিতভাবে নিভে যায় বাতিগুলো। কিন্তু রাতে দিনের মতো ঝলমলে আলো দিয়ে থাকে। দৃষ্টিনন্দন এসব সৌরবাতির আলো হাওরের শোভা বাড়িয়ে তুলেছে অনেকগুণ। বিদ্যুত্সাশ্রয়ী এই প্রকল্প ইতিমধ্যেই উপজেলায় প্রশংসা অর্জনেও সক্ষম হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় সৌরবিদ্যুত্-চালিত সড়কবাতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হাওরবাসী। শুধু তা-ই নয়, এসব সড়কবাতির ব্যবহারে উপজেলা চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপকর্মকাণ্ড কমে আসছে। স্থানীয়রা জানায়, আগে হাওরের দুই পাশে বাতি না থাকার কারণে অনেক সময় চুরি, ছিনতাই হতো। মাদকসেবীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মাদক সেবন করত। তবে এই সৌরবাতি স্থাপনের পর এই চিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। চুরি-ডাকাতি কমে আসছে। রাতে হাওরের দুই পারের মানুষ নির্ভয়ে চলতে পারে। ধরন্তি হাওরপারের চায়ের দোকানদার আনোয়ার হোসেন বলেন, বিগত দিনে হাওরের এই দীর্ঘ সড়কে কোনো আলোর ব্যবস্থা ছিল না। এখানে অনেক ডাকাতির ঘটনা ঘটত। রাতে এই সড়কে কোনো মানুষ চলাচল করত না। সৌরবিদ্যুতায়িত সড়ক বাতি স্থাপনের পর আমরা নিরাপদে চলাচল করতে পারছি। এখন রাতের বেলায় সার্বক্ষণিক আলোকিত থাকে। তবে দীর্ঘ এই সড়কের এই কিছু অংশ এখনো অন্ধকার রয়ে গেছে। সরকার যদি বাকি অংশটুকু সৌরবাতির ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে এই এলাকার মানুষের জন্য অনেক উপকার হবে। এই এলাকার বাসিন্দা হাতিম বলেন, এক বছর আগে বসানো হয়েছে এই সৌরবাতিগুলো এবং এখন পর্যন্ত কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় নাই। এখন আর রাতে চলাচল করতে কোনো অসুবিধা হয় না। আগে ডাকাতির ভয়ে রাত হলে এই সড়ক দিয়ে কোনো মানুষ চলাচল করতে পারত। এখন এই ভয় আর নেই।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার সরাইল গ্রামের অন্নদা সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, সৌরবিদ্যুতের গ্রামের মানুষের অনেক উপকার হয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিদ্যুত্ নেই। এ ছাড়া এই আলো নিতে সাধারণ মানুষের কোনো টাকা দিতে হয় না। অন্যদিকে পরিবেশের কোনো ক্ষতি সাধন করে না। আমার বিদ্যালয়ের সামনে আগামী মাসে বসানো হবে দুই সৌরবিদ্যুত্ বাতি, যা ছাত্রছাত্রীসহ গ্রামের মানুষের উপকারে আসবে আশা করি। শুধু হাওরের নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সারাইল উপজেলায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এসব সৌরবাতি বসানো হয়েছে। সোলার কোম্পানির পক্ষে থেকে জানানো হয়েছে, গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ/ সংস্কার (টিআর/কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় চার অর্থবছরে মসজিদে ও মাদ্রাসা স্কুল ও কলেজ, সরকারি কার্যালয় ও বসতবাড়িতে ৩ হাজার ২৪৭টি সোলার হোম সিস্টেম বসানো হয়েছে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে ৫৯২টি সোলার ও সড়কবাতি এবং ৪০টি সোলার এসি/ডিসি সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এতে টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের ৮ কোটি ৫৮ লাখ ১৪ হাজার ৯৪৬ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। রুরাল সার্ভিসেস ফাউন্ডেশন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, ২০০৬ সাল থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সচেতনতা তৈরি এবং সম্প্রসারণে কাজ করে আসছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলকে আলোকিত করার পাশাপাশি এ প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ, বিনামূল্যে সোলার বিদ্যুত্’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় নিরলসভাবে কাজ করে এই প্রকল্পকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সরকারের টিআর/কাবিটা কর্মসূচির আওতায় সোলার বিদ্যুত্ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে গ্রামীণ জনপদের কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বেকার সমস্যা দূরীকরণসহ সার্বিকভাবে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। আমরা সরকারের টিআর/কাবিটা প্রকল্পের সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।

>>>লেখক : উন্নয়নকর্মী

Sunday, September 15, 2019

রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরা by হাসনাত আবদুল হাই

সবাই ঘরে ফিরতে চায়, রোহিঙ্গারাও চায়। শরণার্থীর জীবন যত নিরাপদ হোক—সেখানে স্বস্তিও নেই, শান্তিও নেই। যত ভালো ব্যবস্থাই করা হোক, থাকা-খাওয়া আর চিকিত্সার জন্য শরণার্থীর মধ্যে ছিন্নমূল হওয়ার কারণে অস্থিরতা কাজ করে সর্বক্ষণ। তারা পুনর্বাসন নয়, প্রত্যাবর্তন করতে চায় নিজ দেশে, স্বগৃহে। সপরিবারে, পাড়াপ্রতিবেশী নিয়ে যে জীবন আর দয়ার সাহায্য নয়, নিজ শ্রমে উপার্জিত আয় দিয়ে জীবনযাপনে যে মর্যাদা আর সন্তুষ্টি তার আকর্ষণ দুর্নিবার। সব শরণার্থী সর্বকালে সব দেশে এভাবেই ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখে, তাদের কেউ ঘরে ফেরে, কেউ ফেরে না।

বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কতজন ফিরে যাবে স্বদেশে, স্বগৃহে তা ভবিষ্যতই বলতে পারে। কিন্তু এখন কিন্তু অনুমান করে বলা যায় কোন পরিস্থিতিতে তারা শরণার্থী শিবির ত্যাগ করে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। শরণার্থী হয়ে মিয়ানমার সীমান্ত পার হয়ে আগেও দলে দলে রোহিঙ্গা নর-নারী ও শিশুরা এসেছে। কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকায় বলতে গেলে তাদের স্থায়ী শরণার্থী শিবির গড়ে উঠেছে নব্বইয়ের দশকে থেকে। কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে সুনামির মতো একসঙ্গে যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী নাফ নদী পার হয়ে টেকনাফে এসে পৌঁছায় তাদের সংখ্যা এর আগে আসা শরণার্থী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ছাপিয়ে যায় রাতারাতি। সেখানে আগে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় সাড়ে ৭ লাখ। আর কোনো দেশে একসঙ্গে এই বিপুল সংখ্যায় শরণার্থী উপস্থিত হয়নি। বাইরের বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে কীভাবে ঘন বসতিপূর্ণ বাংলাদেশ সরকার মানবিক বিবেচনায় এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। নিজ দেশের মানুষ অনেক কষ্টে থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর তার উদার দৃষ্টিতে সহানুভূতিশীল হয়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে ইতস্তত করেনি, এর জন্য অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক কোনো খাদ্যাভাব ও মহামারি ঘটতে না দিয়ে দুই বছরের ওপর নতুন ও পুরাতন শরণার্থী প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর থাকা-খাওয়া এবং চিকিত্সার ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ শরণার্থী ব্যবস্থাপনার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা মিয়ানমার সরকারের বর্বরোচিত এবং অমানবিক আচরণের শিকার রোহিঙ্গাদের ওপর নজিরবিহীন নিপীড়নে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জেনোসাইড সংঘটিত করেছে সে দেশের সেনা-সমর্থিত সরকার। তিনি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রধান হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগে রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগের নীতিকে এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নির্মূলকরণ নীতি বলে অভিহিত করে এর তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা করেছে। মিয়ানমারের সেনা-সমর্থিত অগণতান্ত্রিক সরকার দীর্ঘকাল এইসব সমালোচনা ও নিন্দা উপেক্ষা করে বলে এসেছে যে এসব তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু যখন একটি দেশের ১০ লাখের ওপর নাগরিক প্রাণভয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেয় তখন তার অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়ে থাকে না। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল নীতি আন্তর্জাতিক সব মহলে ও সংস্থার গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে এবং হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ এর সংস্থা ইতোমধ্যে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ দিয়ে ব্যবস্থা ও গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও মিয়ানমার সামরিক গুরুত্বপূর্ণ পণ্য রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ব্যবস্থা নিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার আদালত থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মানবতার অধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ সংঘটনের জন্য মামলা দায়েরের প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই সব আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখে মিয়ানমার সরকার বাধ্য হয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু তাদের এই আগ্রহের সঙ্গে সরেজমিনে গৃহীত পদক্ষেপের কতটুকু মিল রয়েছে। তা এখনো বিষদভাবে জানা যায়নি। কেননা রাখাইনের প্রদেশে বাইরের কেউ এখনো প্রবেশ করতে পারে না। রাখাইনদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকারের ক্রেকডাউনের পর সে অঞ্চলের সঙ্গে বাইরের টেলিযোগাযোগ এবং যাতায়াত ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হয়নি। ফলে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় পূর্ব-ইউরোপে যে আয়রন কার্ডেন বা লৌহ যবনিকা ছিল তার মতো রাখাইন প্রদেশেও বহিরাগতদের জন্য দুর্ভেদ্য, দুর্গম এলাকা হয়ে গিয়েছে যার পরিবর্তন হয়নি আজ পর্যন্ত।

সম্প্রতি মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছিল। তাদের এই প্রস্তুত কোন ধরনের, সে সম্বন্ধে বিশদ কিছু তথ্য তারা দেয়নি। তবে সম্প্রতি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যেসব ছবি পাওয়া গিয়াছে তা থেকে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা যেসব গ্রামে বাস করত সেগুলো গুঁড়িয়ে মাটির সঙ্গে সমান করে দেওয়া হয়েছে। এ থেকে মনে হয় তাদেরকে নিজ গ্রামে না নিয়ে ক্যাম্পে রাখা হবে। অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা বলা হলেও এই সব ক্যাম্পে যে স্থায়ী হয়ে যাবে সে আশঙ্কা রয়েছে রোহিঙ্গাদের। ২০০৫ সালে জাতিগত দাঙ্গার পর মিয়ানমারে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বছরের পর বছর ক্যাম্পে বন্দির মতো বাস করছে। সেখানকার জীবন নািস জার্মানির কনসেন ক্যাম্পের চেয়ে কম নয়। তফাত শুধু এই যে, সে ক্যাম্প হত্যার জন্য গ্যাস চেম্বার নেই। কিন্তু প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহের অভাবে ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের তিলে তিলে মৃত্যুর ব্যবস্থা বেশ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গ্রহণ করেছে। শরণার্থী হয়ে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তারা মিয়ানমার সরকার পরিচালিত মৃত্যু শিবির এই ক্যাম্প সম্পর্কে অবহিত। জেনেশুনে তারা ঐ ধরনের ক্যাম্পে যাবে না, এটা অনেকটা নিশ্চিত। তারা নিজ গ্রামে প্রত্যার্বতন করে পুরোনো জীবনের হাল আবার ধরতে চায়। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের সিটিজেনশিপ বা নাগরিকত্বের প্রশ্ন। তারা পুরোনো নাগরিক হয়ে অন্যান্য নাগরিকের মতো অধিকার ভোগে নিরাপত্তা পেতে চায়। এখন পর্যন্ত মিয়ানমার দ্ব্যর্থহীনভাবে এই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি মন্ত্রী পর্যায়ে তাদের যে প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে এসেছিল তারা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বিদেশি বসবাসকারী হিসাবে সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। এই অমর্যাদাকর এবং অনিশ্চিয়তাপূর্ণ পরিচিতি নিয়ে কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন করবে বলে মনে হয় না। এটা জেনেও মিয়ানমার সরকার নাগরিত্ব সম্পর্কে এ কথা বলেছে তার অর্থ কি, এই যে তারা প্রকৃত পক্ষে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে খুব আগ্রহী নয়। রোহিঙ্গাদের জন্য নাগরিকত্বের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা তারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়, বহিরাগত। এই যুক্তিতেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, পুলিশ, মিলিশিয়া এবং উগ্র বৌদ্ধ নেতারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চরম নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে হত্যা করেছে এবং তাদেরকে নিজ বাসস্থান থেকে বিতাড়িত করেছে। পূর্ণ নাগরিকের অধিকার না পেয়ে প্রত্যাবর্তন করলে তারা শুধু নিকৃষ্ট শ্রেণির অধিবাসী হয়ে থাকবে না, ভবিষ্যতেও নিপীড়ন ও নিষ্ঠুরতার শিকার হবে। এই আশঙ্কা রোহিঙ্গাদের দূর করা না হলে তারা আগ্রহ নিয়ে দেশে ফিরে যাবে না। এ কথা বলা যায়।

গত বছর নভেম্বর মাসে রোহিঙ্গাদেরও প্রত্যাবর্তনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারকে দ্বিপাক্ষিক সম্মতির ভিত্তিতে একটা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। সে সময় কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে চায়নি। এই কারণে যে, তাদের নাগরিকত্ব বিষয়টা নিষ্পত্তি করা হয়নি বলে। ২০১৮ সালের জুন মাসে মিয়ানমার সরকার জাতিসংঘের ইউএসডিপি এবং শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার মধ্যে একটি ত্রিপাক্ষিক চুক্তি হয়। যার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সরেজমিনে দেখার এবং পুনর্বাসনের অনুকূল কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা এখনো উপসংহারে আসতে পারেনি যে, রাখাইনে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে এবং সেখানে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ব্যবস্থার জন্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিবারকে ইন্টারভিউ করে জেনে নেওয়া হবে তারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে ইচ্ছুক কি না। এখানে যে সমঝোতা হয়েছে তাহলো এই যে, জোর করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফেরত পাঠানো হবে না।

গত বছরের নভেম্বর মাসে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য দ্বিতীয়বারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার সরকারের কাছে ৫০ হাজার শরণার্থীর নাম পাঠালেও তারা বর্তমানে মাত্র ৩ হাজার ৭৫০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছিল। এভাবে মিয়ানমার যদি বাংলাদেশের দেয়া শরণার্থীর তালিকা কাটছাঁট করে নিজেদের পছন্দমতো ক্ষুদ্র সংখ্যায় রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায় তাহলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুধু বিলম্বিত হবে না, তাদের সবার ফিরে যাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়াবে। সে যা-ই হোক, যেসব শরণার্থীকে ফেরত দেওয়া হবে তাদের তালিকা জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক প্রতিনিধিকে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী তারা শরণার্থীদের মত গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। সংস্থা প্রতিনিধি জানিয়েছেন যে, স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে ইচ্ছুক এমন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনে তারা সমর্থন জানাবে। এই পর্যন্ত কোনো শরণার্থী পরিবার স্বেচ্ছায় যেতে রাজি বলে মত প্রকাশ করেনি। তাদের নাগরিকত্ব প্রদানের মাধ্যমে নিজ গ্রামে পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা না দিলে তারা যে ফিরে যেতে উত্সাহী হবে না তা তাদের কথায় প্রমাণ পাওয়া যায়।

শুধু নাগরিকত্ব আর নিজ গ্রামে ফেরত যাওয়ার নিশ্চয়তা নয়, প্রত্যাবর্তনের পর তাদের নিরাপত্তার বিষয়েও রোহিঙ্গারা নিশ্চিত হতে চায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একসময় রাখাইন অঞ্চলে সেফটি জোন বা নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেখানে নিরাপত্তা বিধানের জন্য অন্তত কিছুকাল জাতিসংঘের শান্তিবাহিনী থাকা প্রয়োজন। নিরাপত্তা বিধানের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সংস্থা, মিডিয়া এবং সাহায্যকারী এনজিও সংস্থার প্রতিনিধিদের রাখাইনে অবাধে যাতায়াত নিশ্চিতকরণ নিরাপত্তা বিধানের অংশ হিসেবে দেখাতে হবে। এখন পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার নাগরিকত্ব, নিজ গ্রামে প্রত্যাবর্তনসহ নিরাপত্তা বিধানের বিষয়ে নীরব। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ রাখাইনে প্রত্যাবর্তনে খুব আগ্রহ না দেখালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

>>>লেখক :কথাশিল্পী ও সাবেক সচিব

Saturday, September 7, 2019

কোথায় যাচ্ছে কাশ্মীর! by সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

হানাদারি থেকে সন্ত্রাসবাদ। স্বাধীনতার উষালগ্ন থেকেই কাশ্মীর উত্তাল। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে সাত দশকে ছবির মতো সুন্দর ডাল লেকের শীতল জল বারবার গরম রক্তের স্রোতে লাল হয়েছে, ঝিলমের স্রোতে ভেসে গেছে অজস্র মৃতদেহ। আজ আর ভূস্বর্গ নয়, কাশ্মীরকে সবাই জানে তার বাতাসে বারুদের গন্ধের জন্য আর অবিরাম রক্তক্ষয়ের জন্য, দমবন্ধ করা আতঙ্কের পরিবেশের জন্য।

১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর কাশ্মীর ভারতে আসার পর পাকিস্তান সামনে হানাদার বাহিনী পেরিয়ে পেছনে ব্রিটিশ মিলিটারি ফৌজকে দিয়ে কাশ্মীর দখল করার চেষ্টা করে। কাশ্মীরের রাজা হরিসিং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে চিঠি লিখে ভারতীয় সৈন্যদের সাহায্য চান। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় যেসব ব্রিটিশ সৈন্য ভারতে ছিল ভারত তাদের সবাইকে তাড়িয়ে দেয়, তারা গিয়ে যোগ দেয় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর হরি সিংয়ের রাজত্বের এলাকা জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ সম্পূর্ণভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন হিন্দু রাজা হলেও সমগ্র জম্মু-কাশ্মীরে জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশ ছিল ইসলাম ধর্ম অবলম্বনকারী মুসলমান। কাশ্মীরের রাজা তার প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন শেখ আবদুল্লাহকে। রাজার অনুরোধে ভারতের সংবিধানে ৩৭০ ধারাযুক্ত করে বলা হয়—জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখ ভারত থেকে এই ‘বিশেষ’ সুযোগ-সুবিধা পাবে। আর ভারতের সংবিধানে ৩৫-এর (ক) ধারায় বলা হয়—কাশ্মীরের বাইরের কোনো রাজ্যের এবং বিদেশের কোনো লোক কাশ্মীরে জমি কিনতে পারবে না। কাশ্মীর জোর করে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ১৯৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান কাশ্মীরকে অধিগ্রহণ করার জন্য তিনবার ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং প্রতিবারই ব্যর্থ হয়।

সম্প্রতি ভারতের বিজেপি সরকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সংবিধান সংশোধন করে জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের প্রশাসনিক দায়িত্ব সরাসরি কেন্দ্রের হাতে নিয়ে নেয়, এবার বিজেপির অত্যাচারের সীমা ৭২ বছরের ইতিহাস ছাপিয়ে গেছে। শুধু ভারতেই নয়, কাশ্মীরকে কার্যত পৃথিবী থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে গত ৩ সপ্তাহ ধরে। স্কুল, কলেজ, অফিস সব বন্ধ হয়ে গেছে। আর দিল্লিতে বসে অমিত শাহরা টিভিতে বলছে—কাশ্মীর সম্পূর্ণ সচল, বাস্তবিক কি তাই? বিবিসি রয়টার্স নিউ ইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে সংবাদ মাধ্যমগুলো দেখিয়ে আসছে জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের মানুষগুলোর করুণ অবস্থা।

নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেন এক ইংরেজি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাত্কারে অভিযোগ করেছেন—কাশ্মীরি নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা না করে মোদি সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি, তাদের উচিত ছিল কাশ্মীরের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা আর সেটাই গণতন্ত্রর নিয়ম। অমর্ত্যসেন আরো বলেছেন—শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে কাশ্মীরের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াল? তিন সপ্তাহ পরে দেখা গেল—মোদি আমিত শহের হঠকারী সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো বাঙালিরা। সুযোগ পেলেই বাঙালিরা বেড়াতে যায়। আগামী ৪০-৪৫ দিন পর বাঙালির জাতীয় উত্সব দুর্গাপূজা। হাজার হাজার মানুষ এপ্রিল মাস থেকেই আগাম কাশ্মীরে হোটেল ও শিকারা বুক করে, এবারও করেছিল। জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখে কোনো শিল্প নেই। তাদের একমাত্র শিল্প হলো পর্যটকশিল্প। কাশ্মীরিরা অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকেই কলকাতায় শাল ও নানারকম গরম জামা-কাপড় বিক্রি করতে আসে। তাদেরও পথে বসিয়ে দিয়েছেন অমিত শাহরা। কলকাতায় শতাধিক ভ্রমণসংস্থা আগাম টাকা দিয়ে বসে আছে, তারা অগ্রিম টাকা দিয়ে পর্যটকদের জন্য হোটেল ও শিকারা বুক করেছে। হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ল। এমনিতেই জম্মু, কাশ্মীর, লাদাখ ও পশ্চিমবঙ্গে কোনো কর্মসংস্থান নেই। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অমর্ত্যসেনের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলছেন যে, আগাম আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। কেন বর্ষীয়ান নেতা ফারুক আব্দুল্লাহকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে? কেন কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহকে জেলে পাঠানো হয়েছে? আরেক মুখ্যমন্ত্রী পিডিপি মেহেবুবা মুফতি ও তার মেয়েকে কেন গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে? মেহেবুবা মুফতি টাকার লোভে এই প্রথমবার বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধেছিল। বিজেপিকে তিনি কাশ্মীরে নিয়ে গেলেন কেন—এ প্রশ্ন উঠেছে।

সংবিধানের ঐ দুটি ধারা সংশোধনের পর সদ্য আরএসএসে যোগ দেওয়া আমার পরিচিত একজন কেন্দ্রীয় সরকারি আমলা দ্রুত ছুটে এসেছেন আমার বাড়িতে। লাফাতে লাফাতে বললেন—তিনি কাশ্মীরে গিয়ে ২০-২৫ মিটার জমি কিনবেন। এই পরিচিত সরকারি আমলা জানেন না সংবিধান সংশোধন হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মোদি অমিত শাহের বন্ধু ধনকুবের মুকেশ আম্বানি সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন—তিনি জম্মু-কাশ্মীরে গিয়ে কয়েক হাজার একক জমি কিনবেন। সেখানে তিনি শিল্প গড়বেন। কোন স্বার্থে গুজরাটি ব্যবসায়ীদের জমি কিনতে দেওয়া হচ্ছে—তা এখন ভালো লেকের জলের মতো পরিষ্কার। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ১৯৪০ সালে লাহোরে মুসলিম লীগের সম্মেলনে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। তীব্র আপত্তি করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সেই জন্যই জনসংখ্যা মুসলমান বেশি হওয়া সত্ত্বেও কাশ্মীর ভারতে যোগ দিয়েছিল। আরেক ধাপ এগিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে পূর্ব বাংলার মানুষরা ইন্দিরা গান্ধীর সহায়তায় ঐ দ্বিজাতিতত্ত্ব ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। আর এটাই হলো ইতিহাস। ইতিহাস কোনো দিন কাউকে ক্ষমা করে না। মোদি, অমিতশাহ ও মোহন ভগবত ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করেছে। আমার পরিচিত বন্ধু তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে কাশ্মীরে জমি কেনার স্বপ্ন দেখছে।

>>>লেখক : ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক

Friday, September 6, 2019

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বাংলাদেশ by এম এ খালেক

চলতি অর্থ বছরে (২০১৯-২০) বিশ্বের অধিকাংশ দেশের প্রবৃদ্ধির হার আগের বছরের তুলনায় হ্রাস পেলেও বাংলাদেশ বিস্ময়করভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে। তারা বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি সঠিক এবং গতিশীল ধারায় প্রবহমান রয়েছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশের মর্যাদা লাভ করবে। বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অতি সম্প্রতি প্রকাশিত তাদের এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকের সম্পূরক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। এডিবি বলেছে, সদ্যসমাপ্ত অর্থ বছরে (২০১৮-১৯) প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ অতিক্রম করেছে। এই উচ্চ মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পেছনে মূলত শিল্প ও সেবা খাতই মূল ভূমিকা পালন করেছে। এই দুটি খাতের গতিশীলতার কারণেই সার্বিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের বছর বাংলাদেশ ৭ দশমিক ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। সদ্যবিদায়ি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অতিক্রম করে যাবে বলে সরকারিভাবে সাময়িক প্রাক্কলন করা হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। উল্লেখ্য, উন্নয়ন সহযোগীরা সাধারণত অত্যন্ত রক্ষণশীলভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করে থাকে। ফলে সরকারি হিসাবের সঙ্গে তাদের দেয়া পরিসংখ্যানের প্রায় ১ শতাংশ ব্যবধান থাকে। এডিবি প্রথমবারের মতো ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করল।

বিশ্ব অর্থনীতিতে সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান দেশ চীনের অর্থনৈতিক অবস্থাও এই মুহূর্তে খুব একটা ভালো নয়। বছরের শুরুতেই চীনের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। চলতি পঞ্জিকা বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আগের প্রান্তিকে চেয়ে দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। গত ২৯ বছরে এটাই চীনের সর্বনিম্ন জিডিপি প্রবৃদ্ধি। কয়েক দশক ধরে চীন উচ্চ মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছিল। তারা মুক্ত বাজার অর্থনীতি অনুসরণ করলেও মার্কিনি ধাঁচের মুক্তবাজার অর্থনীতি তারা গ্রহণ করেনি। বরং তারা মুক্ত বাজার অর্থনীতিকে নিজেদের দেশের উপযোগী করে বাস্তবায়ন করেছে। অনেকের মনেই বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে এটা ভেবে যে, চীনের মতো জনবহুল একটি দেশ কীভাবে এত উচ্চ মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, চীনের এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উচ্চ মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পেছনে তাদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিশেষ ভাবে কাজ করেছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধা সঠিকভাবে এবং পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারা। একটি দেশের যখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সূচনা হয় তখন সেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ বছর স্থায়ী হয়। বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপান বেশ কয়েক দশক আগে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা অতিক্রম করে এসেছে। জাপানে এখন বৃদ্ধ বা প্রবীণ লোকের সংখ্যা বেশি। তারা ক্রমশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর এক আদেশে চীনকে দেয়া শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা বাতিল করেন। চীনা পণ্যের ওপর বর্ধিত হারে শুল্কারোপ করা হয়। পালটা ব্যবস্থা হিসেবে চীনও মার্কিন পণ্যের ওপর ব্যাপক হারে শুল্কারোপ করে। ফলে দেশ দুটির মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়। ইতিমধ্যেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চীনা অর্থনীতির ওপর। চীনের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে এ বাণিজ্যযুদ্ধ কাজ করছে বলে অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন। যেসব মার্কিন কোম্পানি চীনে বিনিয়োগ করেছিল তারা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করছেন, চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীনের প্রবৃদ্ধির এ শ্লথ গতি আগামীতেও অব্যাহত থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এটাই চেয়েছিল। চীন বাণিজ্য যুদ্ধে চাপে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করুক—এটাই যুক্তরাষ্ট্রের কাম্য। চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে শুধু যে এই দুটি দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নয়, আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে এই বাণিজ্য যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য। সেটাই হচ্ছে মূল আশঙ্কার কারণ। উল্লেখ্য, ১৯২৯-১৯৩৩ সময়কালে সৃষ্ট বাণিজ্যযুদ্ধের সময় ২০ হাজার পণ্যের ওপর ব্যাপক মাত্রায় শুল্কারোপ করা হয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অবস্থা কী? বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করে চলেছে। বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন অনেক দেশের জন্যই ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা। বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের বয়স এখন ১৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে।

জনসংখ্যা এমনই এক অর্থনৈতিক উপকরণ যা একই সঙ্গে ‘সম্পদ’ এবং ‘দায়’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদি সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ করে তোলা যায় তাহলে জনসংখ্যা হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কারণ যে কোনো উন্নয়ন কাজের জন্যই দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত লোকবল প্রয়োজন। আবার জনসংখ্যা যদি অপ্রশিক্ষিত হয় এবং অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠে, তবে তা হবে সবচেয়ে বড় একটি রাষ্ট্রীয় দায়। বাংলাদেশের জন্য সংখ্যাকে এখনো আমরা জনসম্পদে পরিণত করতে পারিনি। বাংলাদেশের ১ কোটিরও বেশি শ্রমিক বিদেশে কর্মসংস্থান করছে। তারা বছরে প্রচুর পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রেরণ করছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১ হাজার ৬৪২ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স প্রেরণ করেছে। এটা এ যাবত্কালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ যদি প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ পেশাজীবীদের বিদেশে প্রেরণ করতে পারত তাহলে বিদ্যমান প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমেই কয়েক গুণ বেশি রেমিট্যান্স আহরণ করা যেত। প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতি বছর যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করছে তার একটি বড় অংশই আবার বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি এক্সপার্টদের বেতন-ভাতা পরিশোধে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন কলকারখানায় যেসব বিদেশি এক্সাপার্ট কাজ করছেন তাদের পেছনে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। আমরা যদি দক্ষ জনশক্তির জোগান দিতে পারতাম তাহলে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশেই থেকে যেত। চলতি অর্থবছর থেকে কারিগরি শিক্ষার ওপর ব্যাপকভাবে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। এ ছাড়া আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকার সমস্যা দূরীকরণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যেসব তরুণ-তরুণী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে চান তাদের স্টার্ট আপের জন্য ১০০ কেটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলার জন্য বাজেটে গবেষণার জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চাকরিজীবী নয়, উদ্যোক্তা সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছেন। কয়েক বছর ধরে কৃষি ও পল্লি ঋণ নামে এক বিশেষ ধরনের ঋণকার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে—পল্লি এলাকায় কৃষিনির্ভর ছোটো ছোটো শিল্প গড়ে তোলা। কিন্তু পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই বিশেষ ঋণ উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে তেমন একটা অবদান রাখতে পারছে না। অনেকেই এ ঋণ নিয়ে তা অন্য খাতে প্রবাহিত করছেন।

বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে সত্য, কিন্তু এই জিডিপি প্রবৃদ্ধি কতটা মানসম্পন্ন, টেকসই এবং উত্পাদনশীল খাত থেকে আসছে তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। বাংলাদেশ ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের রেটিং অনুযায়ী, বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী ১২ বছরে আমাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় দ্বিগুণ করতে হবে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ১ হাজার ৭৫০ মার্কিন ডলার। উচ্চ আয়ের দেশ হতে হলে এই মাথাপিছু জাতীয় আয়কে অন্তত পক্ষে ৩ হাজার ৯৯৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে হবে। একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১০ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কিন্তু শুধু রেকর্ড মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেই চলবে না। সেই প্রবৃদ্ধির সুফল ন্যায্যতার ভিত্তিতে সবাই পাচ্ছে কি না তা ভেবে দেখতে হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির অভাব এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল ন্যায্যতার ভিত্তিতে বণ্টিত না হওয়ায় দারিদ্র্য বিমোচনের হার কমছে।

>>>লেখক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

Wednesday, August 28, 2019

দুধ পরীক্ষা নিয়ে কার কথা সঠিক

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উত্পাদিত দুধের পরীক্ষা সঠিকভাবে করা হয়নি। তাহলে যারা পরীক্ষা করেছেন, তারা কেমন পরীক্ষা করলেন? এ ব্যাপারে টেলিফোন ও ই-মেইলে প্রাপ্ত পাঠকের অভিমত...
ঢাকায় বসে গরুর দুধ সরাসরি পাওয়াটা তো আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো বিষয়। সেক্ষেত্রে বাচ্চাদের জন্য গরুর পাস্তুরিত প্যাকেটজাত দুধই শেষ ভরসা। এখন যেসব কথা গণমাধ্যমে পড়ছি বা দেখছি তাতে এটাও খাওয়ানো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কার ওপর নির্ভর করবে সাধারণ মানুষ! এত দিন বিএসটিআইয়ের কথা বিশ্বাস করেছি। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের কথাও তো ফেলনা নয়। এই মুহূর্তে আমি আমার পরিবারে বাজার থেকে কেনা দুধ খাওয়ানো বন্ধ রেখেছি। আমরা এর দ্রুত সমাধান চাই। আমরা নিরাপদ খাদ্য চাই। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কড়া হস্তক্ষেপ চাই।
মেনহাজুল ইসলাম তারেক
মুন্সিপাড়া, পার্বতীপুর, দিনাজপুর
গরুকে বাঁচাতে হলে তাকে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে। তার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক নির্দিষ্ট করা আছে। কিন্তু মানুষের অ্যান্টিবায়োটিকগুলো প্রাণীর দেহে দেওয়া যাবে না। কিন্তু এটা তারা মানছে না। কোনো কোনো কোম্পানি না মেনে ফিড তৈরি করে। ব্যবসার খাতিরে তারা বাংলাদেশের মানবপ্রজাতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তারা বলছে, ফিডের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দিলে গরু মোটা হবে, তাজা হবে, অসুখ হবে না। এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এটা বন্ধ করা দরকার।
মোছা. বিলকিছ আক্তার
সরকারি ম্যাটস, টাঙ্গাইল।
বিএসটিআই কোম্পানিগুলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যে কোনো নমুনা দিয়ে যেতে বললে তখন কোম্পানিগুলো চালাকি করে ভালোমানের পণ্যই দিয়ে যায়। তাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ভালো ফলাফলই আসে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরাসরি বাজার থেকেই দুধ সংগ্রহ করেছে। সেক্ষেত্রে আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গায় এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে আছে।
অমিত বণিক
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক, উত্তরা, ঢাকা।
গবাদি পশুকে রোগমুক্ত রাখতে হলে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াতে হয়। কিন্তু এই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানোর কত দিন পর ওই পশুকে জবাই করতে পারবে বা এর মাংস ও দুধ মানুষের ব্যবহারের জন্য ক্ষতিকর নয়, তা অবশ্যই দেখতে হবে। তবে কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতি মুনাফার আশায় দুধের সঙ্গে ডিটারজেন্ট, আটা, ময়দা ও পানি মিশিয়ে তা বাজারজাত করে থাকে। তাই দুধ পরীক্ষা নিয়ে গবেষকদের পরীক্ষা যদি সঠিক হয়, তাহলে যারা অন্যায় করেছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
মোহাম্মদ শহীদউল্যা
হকভিলা, মেরাদিয়া, সিপাহীবাগ, ঢাকা।
এ দেশের ডেইরি ফার্মের মালিক, পাস্তুরিত দুধ ব্যবসায়ী এবং গুঁড়াদুধ আমদানিকারকরাও ধোয়া তুলসি পাতা নয়। পাস্তুরিত দুধ নিয়ে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে তা কতটুকু সত্য তা প্রমাণ সাপেক্ষ বিষয়। মাঠপর্যায় থেকে দুধের নমুনা সংগ্রহ করে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সঠিক নিয়মে ও সঠিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে অ্যান্টিবায়োটিক ও জীবাণু উপস্থিতি পাওয়া গেলে তার প্রমাণ অবশ্যই জনসম্মুখে প্রকাশ করা একান্ত আবশ্যক বলে মনে করি।
মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ,
সর্দারপাড়া, মুন্সীগঞ্জ।
দেশি গরুর দুধ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন গবেষকের গবেষণার ফল প্রকাশের পর এ বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন। আসলে গবেষণার বিষয়টি পুরোপুরি জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়নি। তাই বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। উক্ত গবেষণার প্রতি যদি আস্থা না থাকে তাহলে বিষয়টি নিয়ে পুনরায় গবেষণা করা যেতে পারে এবং সরকারই এর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। তা না হলে এর কোনো সমাধান হবে বলে মনে হয় না।
মাখরাজ খান,
সাঠুরিয়া, মানিকগঞ্জ।
আমরা মনে করি, দুধ পরীক্ষায় সঠিক তথ্য নিয়ে এগিয়ে যাবেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তাহলেই এর সঠিক সমাধান হবে।
মো. ওয়াহীদউল্লাহ,
স্টেডিয়াম সড়ক, সদর, ফেনী।
বিদেশ থেকে গুঁড়া দুধ আমদানিকে নিরুত্সাহ করে দেশি শিল্পকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলেই দেশি দুগ্ধশিল্পের সঠিক মূল্যায়ন করা হবে। সেজন্য প্রত্যেক দুগ্ধ উত্পাদনকারী ব্যক্তি বা পরিবারকে নিবন্ধনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া অবশিষ্ট চিকিত্সার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আনতে হবে।
পারভীন সুলতানা
রামচন্দ্রপুর, শৈনকুপা, ঝিনাইদহ
আমরা মনে করি, এই দুধের সঠিক পরীক্ষা বিদেশে গিয়ে হলেও এখনই করা জরুরি। সাধারণ মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। পরীক্ষা না হলে বিষয়টি আমলে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
মো. আরিফুর রহমান
দেলপাড়া, নারায়ণগঞ্জ।
প্রাণিজ আমিষ হিসেবে দুধের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে অন্তত এক কাপ দুধ খাওয়া উচিত প্রত্যেকের। এখন সরকার এ বিষয়টিতে নজর দিয়েছেন এবং বাজারে খোলা ও প্যাকেটজাত দুধের ভেজাল বন্ধ করতে নিরাপদ দুধের জোগান নিশ্চিত করতে শুরু করেছেন। তাই তিনি আবার দুধের নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে বলেছেন। প্রথমবারের মতো এবারও নতুন নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি একই নিয়মে একই উন্নত ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। এর ফলাফল আগের মতোই উদ্বেগজনক। তাই এতে কোনো সন্দেহ নেই—দুধে ভেজাল আছে। অন্যদিকে দুধে ভেজাল বন্ধে এখন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে সামাজিক সচেতনতা ও আন্দোলন গড়ে তোলার। ভেজাল দুধ ও গাভিকে ভিটামিন নামক বিষাক্ত ওষুধ খাওয়া বন্ধে সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না বলেই প্রতীয়মান হয়। আমরা আশা করব, সরকার ও জনগণ যৌথভাবে দুধে ভেজাল মেশানোর প্রক্রিয়া বন্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। তা না হলে প্রতি বছর বিশ্ব দুগ্ধ দিবস পালনের কোনো তাত্পর্য থাকবে না।
সাদিয়া সুলতানা মাহি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
স্কুল অ্যান্ড কলেজ,
সাভার, ঢাকা।
দুধ নিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার মধ্যে গড়মিল থাকার জন্য এ ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে বলা যায়, প্রফেসরের পরীক্ষা ঠিক। কারণ, ঢাকা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ফারুক সাহেব তার গবেষণার ফলাফল বিস্তারিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরতে তার সাক্ষাত্ চেয়েছেন, এতে তার সত্ সাহস আছে বলে ধরা যায়। ঢাকা ইউনিভার্সিটির গবেষকরা গত জুন মাসে বাজার থেকে দুধের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করলে তাতে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এর পর ২৫ জুন ইউনিভার্সিটির ঔষধ প্রযুক্তি বিভাগ ও বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার থেকে জানানো হয় দুধের নমুনায় তারা ডিটারজেন্ট ও তিন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের সন্ধান পান। পরে একটি রিট করার ফলে বিএসটিআই-কে পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিএসটিআইয়ের প্যারা মিটারে বিষয়টি ধরা না পড়ায় কোর্ট আরো চারটি ল্যাবরেটরিকে নির্দেশ দেয়। দুধ নিয়ে করা কোন পরীক্ষাটি সঠিক তা প্রমাণ করতে হলে পৃথিবীর যেখানে সঠিক পরীক্ষা হয়, সেখানে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করালে আমরা সঠিক ফলাফল পাব।
ইমরান আলী বাবু
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
গরু আমাদের গৃহপালিত প্রাণী। গরুর আহরিত দুধ থেকে আমরা পুষ্টি পাই এবং অর্থ উপার্জন করি। এখন এই গরু বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে প্রচুর পরিমাণ দুধ আহরণ করা হচ্ছে। দুধের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে যদি হয় গরুর খাঁটি দুধ। দুধ পরীক্ষা করার কথা কতটুকু সত্য আমরা জানি না। দুধে ভেজালকারীর অবশ্যই শাস্তি হতে হবে।
ফারুক আহমেদ
বাঘমারা, রাজশাহী।
দুধ পরীক্ষার সঠিকতা এখনো স্পষ্ট হয়নি। দুধে ক্ষতিকর পদার্থের পরিমাণ সহনীয় মাত্রায় আছে কি না, তা দেশবাসীকে পরিষ্কারভাবে অবশ্যই জানানো প্রয়োজন।
অ্যাডভোকেট এস কে মো. রমিজউদ্দিন
কাজী পাড়া, মিরপুর, ঢাকা।
কয়েক বছর যাবত্ ইউরোপসহ অন্যান্য দেশের সরকারি ভর্তুকি প্রদান করায় সেখানে দুগ্ধ উত্পাদন, বিশেষ করে গুঁড়া দুধ উত্পাদন অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের দেশে তার আমদানি বেড়েছে। ফলে শুরু হয়েছে অনেক অনিয়ম। আর এই অনিয়মের মধ্যে পড়েছে আমাদের দুগ্ধশিল্প। সেজন্য দেখা দিয়েছে দুধ পরীক্ষায় সঠিক নিয়মের বিষয়টি। আমরা চাই সঠিক পরীক্ষা হলে নিশ্চয়ই তার প্রমাণ দিতে এগিয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সবার আগে আমাদের দুগ্ধশিল্পকে রক্ষা করতে হবে।
বজলুল
রিক, ধানমন্ডি, ঢাকা
দুগ্ধশিল্পের বিরাজমান যে সংকট, তা দ্রুত কাটিয়ে উঠা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের ডেইরি ফার্মকে জাতীয় ডাটাবেইজের আওতায় আনা আবশ্যক।
সুগন্ধী আক্তার
মতিঝিল, ঢাকা
আল্লাহ যেখানে গৃহপালিত পশুর দুধকে মানুষের খাদ্য হিসেবে হালাল করেছেন, সেখানে একজন গবেষক দুধের গুণাগুণ সঠিকভাবে পরীক্ষা না করে খামারের দুধের ভেতরে অসত্ উদ্দেশ্যে খুঁত বের করেছেন। তাই আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একমত।
হাজী খায়রুল কবীর
সভাপতি, বয়স্ক কল্যাণ সমিতি
মিরপুর-১০, ঢাকা।
এক্ষেত্রে আমাদের একান্ত সহযোগিতা প্রয়োজন। কেননা, এত বড়ো সমস্যার সমাধান করা শুধু একা আমাদের কিংবা সরকারের কারোরই পক্ষে সম্ভব নয়। এ কারণে আমরা সকলে একত্রিত হয়ে দুধের পরীক্ষা/ভেজাল দুধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চাই—আর যাতে কখনোই এই দুধ নিয়ে ষড়যন্ত্র না হয়।
অ্যাডভোকেট মো. রবিউল হোসেন রবি
সভাপতি, বাংলাদেশ মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা
মতিঝিল, ঢাকা।
সম্প্রতি দুধ পরীক্ষা নিয়ে সঠিক তথ্য আছে বলে সাফ জানিয়েছেন সরকার। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বলছেন অন্যকথা। অতএব, বিদেশে গিয়ে উন্নত ল্যাবে এর পরীক্ষা করা হোক।
রিফাত
শান্ত-মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়,
উত্তরা, ঢাকা।
দুধে ভেজাল যারা করে তারা অপরাধী। সুতরাং দুধ ভেজাল মুক্ত করা আবশ্যক। ভেজাল দুধ পরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানকে সঠিকভাবে পরীক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। এটি একটি জাতীয় সমস্যা, প্রতিকার আবশ্যক।
শাহ্ মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন হিরো
কালিহাতি, টাঙ্গাইল।
দুধ পরীক্ষা নিয়ে মতানৈক্যের ধূম্রজালে পড়ে জনগণও বিভ্রান্তিতে হাবুডুবু খাচ্ছেন। ফলে বিশেষভাবে শিশুদের ওপর এর বিরূপ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সুতরাং এ পক্ষ ও অন্যপক্ষের ওপর দোষারোপের অভ্যাস পরিহার করে যত দ্রুত সম্ভব সরকার ও দুগ্ধমান নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ সামনা-সামনি একত্রে বসে বিষয়টি সমস্যা সমাধান করবে বলে আশা করি। তা না হলে দুধের মতো এতো পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবারের অভাবে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম যে পুষ্টিহীনতায় ভুগবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
আলহাজ মো. হাফিজুল ইসলাম চৌধুরী (হিফজু)
সেক্রেটারি,
পরিবেশ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটি
হাউজিং স্টেট, ২নং সেক্টর,
রাজশাহী