Monday, April 20, 2015

খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা পূর্বপরিকল্পিত : মওদুদ

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনাকে পূর্বপরিকল্পিত আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদে আগামীকাল মঙ্গলবার দেশজুড়ে বিক্ষোভ মিছিল এবং পরের দিন বুধবার সারাদেশে সকাল সন্ধ্যা হরতালের কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। তবে নির্বাচনের কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে। আজ রাত পৌনে আটটায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার উচ্চারণ করে বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখে আমাদেরকে ভিন্ন চিন্তা করতে বাধ্য করবেন না। খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় কাওরান বাজারে বিএনপি চেয়ারপারসনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গাড়িবহরে ভাঙচুর ও সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে সরকারের লোকজন। তারা অ্যাম্বুলেন্সও ভাঙচুর করেছে। এটি সরকারের ফ্যাসিবাদী ও অগণতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি।
বাধা সত্ত্বেও খালেদা জিয়া সিটি নির্বাচনে প্রচারভিযান অব্যাহত রেখেছেন মন্তব্য করেন মওদুদ আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা পুলিশের সহায়তায় বেগম জিয়ার প্রচারাভিযানের প্রতিটি স্থানে বাধা দেয়া সত্ত্বেও তিনি তার প্রচারভিযান অব্যাহত রেখেছেন।
বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) বাসার সামনে থেকে পুলিশি পাহারা প্রত্যাহার এবং তার গাড়িবহর থেকে পুলিশি নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা থেকেই বুঝা যায় চেয়ারপারসনের ওপর হামলা সরকারের পূর্ব পরিকল্পনার অংশ।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সিটি নির্বাচনে পরাজয় নিশ্চিত জেনেই সরকার এ ধরনের ফ্যাসিবাদী ও সন্ত্রাসী তাণ্ডবের আশ্রয় গ্রহণ করেছে। এটি সরকারের দুর্বলতারই প্রতিফলন।
দলের স্থায়ী কমিটির এই প্রবীণ সদস্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীরা অতি সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসনকে নির্বাচনী প্রচারণায় বের হলে প্রতিহত করার যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটাই তাদের সশস্ত্র গুণ্ডাদের আজকের সন্ত্রাসী হামলায় উসকানি দিয়েছে। পুলিশের আইজিপিও নির্বাচন কমিশনে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সভায় তার বক্তব্যে ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে প্রতিহত করতে প্রয়োজনে আইন প্রণয়নের জন্য খোলাখুলি বক্তব্য দিয়েছেন। এ সবই উসকানি দিয়েছে আওয়ামী গুণ্ডা বাহিনীকে খালেদা জিয়ার ওপর হামলার জন্য।
বিএনপি চেয়ারপারসনের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা দেন মওদুদ আহমদ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আগামীকাল সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল এবং পরের দিন বুধবার সারাদেশে সকাল সন্ধ্যা সর্বাত্মক হরতাল। তবে সিটি নির্বাচনের কারণে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম মহানগরী কর্মসূচিরর আওতামুক্ত থাকবে।
মওদুদ আহমদ আরো বলেন, শত বাধা সত্ত্বেও খালেদা জিয়া প্রচারণা চালাবেন। তার প্রচারণা চলছে। ঢাকার দুই সিটিতেই তিনি প্রচারণা চালাবেন। সরকার যতই ঘটনা ঘটাবে তাদের ভোট কমবে। ২৮ এপ্রিল জনগণ ভোটের মাধ্যমে নীরব বিপ্লব ঘটাবে এবং বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হবে বলে প্রত্যাশা করেন ব্যারিস্টার মওদুদ।
রাজধানীর নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ, যুগ্ম-মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা আসাদুজ্জামান রিপন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
‘খালেদা জিয়ার গাড়িতে গুলি করা হয়েছিল’
কাওরান বাজারে গাড়ি বহরে হামলার সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় নিয়োজিত ‘সিএসএফ’ এর প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর। সোমবার রাতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, গাড়ি বুলেট প্রুফ থাকায় আল্লাহর রহমতে তিনি বেঁচে গেছেন। বিকালে তৃতীয় দিনে মত কাওরান বাজারে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা চালায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মীরা। হামলায় খালেদা জিয়ার গাড়ির কাচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এদিকে রাতে হামলার ঘটনায় আহত সিএসএফ সদস্যদের দেখতে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে যান খালেদা জিয়া।

ঘটনা ঘটেই চলেছে, প্রতিকার কোথায় by মালেকা বানু

ধর্ম-গোত্র-বর্ণ, ছোট-বড় সবার সর্বজনীন উৎসব বৈশাখী উৎসব। মানুষ নানান আয়োজনে নববর্ষের প্রথম দিনটি উদ্‌যাপন করে। অথচ সেই উৎসবে পরিকল্পিতভাবে, সংঘবদ্ধ হয়ে প্রায় ঘণ্টা খানেক সময় নিয়ে নারীদের ওপর যৌন হামলা চলেছে। এ ধরনের হামলা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যারা নারীর স্বাধীনতা, বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করে না, তারাই এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। মৌলবাদী চিন্তা-চেতনা নিয়েই ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে তার চেয়েও ভয়াবহ হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এ ধরনের যৌন হামলা যখন চলছে, তখন সেখানে সহস্রাধিক মানুষ ছিল। তারা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে। তারাও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। এ ধরনের ঘটনা প্রতিহত করা বা প্রতিবাদ করার প্রয়োজনীয়তা আছে বলেই মনে হয়নি তাদের। গুটিকয়েক তরুণ শুধু এগিয়ে এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নারীর ওপর যৌন হামলা, নিপীড়ন বা নির্যাতনের ঘটনা এবারই প্রথম ঘটেছে, তা নয়। ঘটনা ঘটেই চলেছে। তবে তার প্রতিকার পাওয়া যায়নি। যে গুটিকয়েক তরুণ এবারের ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল, তাদের কাছে ভরসার জায়গা ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে ভরসার জায়গায় গিয়ে তাদের হতাশ হতে হয়েছে। কেননা তারা সহায়তার হাত বাড়ায়নি। তারাও পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব থেকে মনে করেছে কি-ই বা এমন ঘটেছে। ভিড়ের মধ্যে একটু-আধটু এমন ঘটনা ঘটেই থাকে। নারীর প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি তারই প্রতিফলন ঘটেছে এখানে। তাই যত আইন, বিধি, নীতিই থাকুক না কেন, কোনো লাভ হবে না। তথ্য প্রযুক্তির যুগে এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, সেই ছেলেদের ছবি, অঙ্গভঙ্গি দেখা সম্ভব হচ্ছে। যাঁদের ছেলেরা এ ধরনের কাজ করছে, সেই অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। সন্তানের বিষয়ে কঠোর হতে হবে। অভিভাবকেরা সন্তানকে না ঠেকালে বা উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি কঠিন হবে।
সরকার নারী নির্যাতন প্রতিরোধে মাল্টিসেক্টরাল প্রকল্প শীর্ষক একটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম এটি। প্রশ্ন জাগে, এ কার্যক্রমের ফলাফল কী? ফলাফল হচ্ছে, নববর্ষের দিন নারীর ওপর যৌন হামলা। নববর্ষের দিন রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এই ক্যামেরাগুলো দেখার দায়িত্ব ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তবু ভালো যে এই ফুটেজগুলো ছিল। তা না হলে এ বাহিনীর সদস্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেত। সব ঘটনা হজম করে দিত।
যারা ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধেই নানান অভিযোগ তোলার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টিকে আমলেই নেওয়া হচ্ছে না। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, রিকশা থেকে টেনে নামানো হচ্ছে, কয়েকজন মিলে ঘিরে ধরে নারীর ওপর যৌন হামলা চালাচ্ছে। তারপরও তাদের কাছে এ ধরনের আচরণ যৌন হামলার পর্যায়ে পড়ছে না। তারা নারীকে বিবস্ত্র করে ফেলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইছে। ঘটনার পর হাইকোর্টের রায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এ বিষয়ে ফোকাস করতে বাধ্য করেছে।
এ ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। যাদের দায়িত্বে অবহেলার জন্য এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। যারা ঘটনাটিকে ছোট করে দেখতে চাইছে, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

কেন এই নিষ্ক্রিয়তা, সমবেদনাহীনতা? by আলী রীয়াজ

‘আমরা পুলিশ ও প্রক্টরকে ঘটনা জানালেও তাঁরা কেউ যথাসময়ে আসেননি। ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা পরে প্রক্টরের কার্যালয়ে গিয়ে দেখেন, “তিনি কম্পিউটারে গেমস খেলছেন”।...সোহরাওয়ার্দী গেটে যখন এই ঘটনা ঘটছিল, তখন সেখানে পুলিশের মাত্র দুজন সদস্য ছিলেন। টিএসসির ডাচ্-বাংলা বুথের দিকে পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য ছিলেন। আমরা তাঁদের এগিয়ে আসতে বললে তাঁরা তখন রাজি হননি। ঘটনাস্থল থেকে আমরা দুজনকে ধরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ পরে তাদের ছেড়ে দিয়েছে বলে জানতে পারি।’ কার্যত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকে বাংলা নববর্ষের দিনে নারীদের ওপরে একাধিক যৌন নির্যাতনের ঘটনার সময়ে যাঁরা তা প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করেছেন, এটি তাঁদের ভাষ্য। এই হচ্ছে পুলিশ ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা।
আমরা কি একে দায়িত্ব পালনে অবহেলা বলব? একে কী আমরা নিষ্ক্রিয়তা বলব? বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, আমি একে গাফিলতি বলতে নারাজ। পুলিশের কোনো গাফিলতি হয়নি, কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা হয়নি। আপনি আমার সঙ্গে একমত না হলে অভিজিৎ রায়ের হত্যার ঘটনার পর পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন পড়ে দেখতে পারেন। পুলিশের প্রতিবেদনে আছে পুলিশের গাফিলতি হয়নি। অভিজিতের হত্যার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আদৌ কোনো তদন্ত করেছিল বলে শুনিনি। করলেও তাদের ফলাফল ভিন্ন হতো বলে মনে হয় না। বিশেষ করে এই খবর জানার পর যে ‘প্রক্টরের কার্যালয়ে গিয়ে [ছাত্ররা] দেখেন, তিনি কম্পিউটারে গেমস খেলছেন’। কম্পিউটার বা কম্পিউটারের বাইরের ‘গেমস’ খেলায় ব্যস্ত মানুষেরা কেবল তদন্তের কারণে দায়িত্ব নেবেন, এমন মনে করার মতো কারণ ঘটেনি।
প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলায় আহত লিটন নন্দী
এমন তো নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে এমন ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি, ফলে এই নিয়ে উদ্বেগের কারণ ছিল না। বইমেলার পর সম্ভবত এটাই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় ধরনের জনসমাবেশের ঘটনা, যা আগে থেকেই জানার কথা। ঘটনার প্রাথমিক বর্ণনা শুনে গত মঙ্গলবার আমার মনে হয়েছিল, ‘নিষ্ক্রিয়তাও একটা ক্রিয়া হতে পারে।’ সেটা অভিজিতের হত্যার সময় হতে পারে, নারীদের ওপরে প্রকাশ্যে যৌন নির্যাতনের সময় হতে পারে, অন্য সময়েও হতে পারে। কেননা, আইন রক্ষাকারীদের কী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটার খোঁজ নেওয়া দরকার সবচেয়ে আগে। যদি না জেনে থাকেন, তবে খোঁজখবর নিন; আমরা চাইলে গতকাল বৃহস্পতিবারের সংবাদপত্র ভালো করে পাঠ করে দেখতে পারি। আরও উৎসাহ থাকলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রকাশিত জানুয়ারি-মার্চের হিসাব দেখতে পারেন। ১ এপ্রিল প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘বন্দুকযুদ্ধে পুলিশ এগিয়ে’। খবরে জানা গিয়েছিল, তিন মাসে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে ৬৪ জন, তার মধ্যে ২৪ জন মারা যায় পুলিশের হাতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসি সহ আরো অনেক স্থানে নারীকে
বিবস্ত্র করে যৌন নির্যাতন করা হয়। হরণ করা হয় নারীর সতীত্বকে।
বর্ষবরণের নামে যা করা হয়েছে তার দায়ভার কে নেবে? এভাবে
বাংলা উৎসব গুলি বা নববর্ষতে যদি নারীর শ্লীনতাহানি,
নারীর প্রতি পাশবিক অত্যাচার,নববর্ষ মানে যদি হয়
আমার দেশের ধর্ষিতা মা-বোনদের করুন আর্তনাদ!
অভিজিতের ওপরে হামলার সময়কার বর্ণনা আমরা শুনেছি, পুলিশ মনে করেছে যে একটা ঝামেলা চলছে সেখানে, তাদের কোনো ভূমিকা নেই। এ ক্ষেত্রেও সম্ভবত তার কোনো অন্যথা হয়নি। পুলিশ ঝামেলায় জড়াতে চায়নি, যদিও ঘটনা ঘটেছে ঘণ্টা খানেক ধরে। পুলিশ কেন ঝামেলায় যায় না, সেটাও কমবেশি সবার জানা আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার-সমর্থক সংগঠকেরা ছাড়া আর কারও পক্ষে বীরদর্পে কিছু করা সম্ভব, এটা কেউই মনে করেন না। পুলিশ ভিন্ন কিছু ভাববে, তা বিশ্বাস করার কারণ নেই। ফলে এই ধরনের ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব কী, সেটা আমি-আপনি বুঝতে না পারলেও পুলিশ ঠিকই বোঝে। এখন অভিজিতের হত্যা কিংবা এই যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলার সময় আপনি কি এসব বিষয় এড়িয়ে যেতে পারেন? দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকাকে আর সবকিছু থেকে বিযুক্ত করে ভেবে আত্মতৃপ্তি মিলতে পারে, আমরা মনে করতে পারি যে সমাজে জবাবদিহির আর সব ব্যবস্থাকে অস্বীকার করে কেবল একটি ঘটনায় আমরা চাইব প্রশাসন দায়িত্ববান হবে; কিন্তু সেটা যে আদৌ সম্ভব নয়, তা বিবেচক মানুষ মাত্রই বোঝেন। এই ধরনের চাওয়ার নৈতিক জোর কতটা, সেটাও ভাবা দরকার।
শুধু তা-ই নয়, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের প্রশ্নে কেবল রাজধানীতে কী ঘটল, সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার, সম্মান ও নিরাপত্তা কতটা বিঘ্নিত হলো, তাই নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশকে যদি নিজের একমাত্র করণীয় বলে বিবেচনা করি, তবে এই ধরনের ঘটনা আরও ঘটবে, যেমন অতীতে ঘটেছে। এসব ন্যক্কারজনক ঘটনার আগেই যখন খাগড়াছড়িতে বৈসাবি মেলায় হামলা হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু জনগোষ্ঠীর বাড়িঘর বা মন্দিরে হামলা এবং তাদের উচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে, তখনো একইভাবে আমাদের প্রতিক্রিয়া হয় না। আমার বিবেচনায় নাগরিকের অধিকারের সমতা বিধান, তার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সংগ্রাম থেকে এগুলো কোনো আলাদা বিষয় নয়। রাষ্ট্র, ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবহির্ভূতরা যখন শক্তির জোরে সবকিছু সমাধানের চেষ্টা করবেন, তখন সমাজের সর্বত্রই শক্তির জোরই প্রতিষ্ঠিত হবে। সেখানে সংখ্যালঘুরা যেমন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হবে, তেমনি নারীরাও হবেন। দায়মুক্তির ব্যবস্থা থাকলে তাতে ক্ষমতাসীনেরা বিভিন্নভাবেই পার পাবে; হত্যা করেও পার পাবে, ধর্ষণ করেও পার পাবে।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পাশে (গোল চিহ্নত)
পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতা
নিশাত ইমতিয়াজ বিজয়।
পুলিশ ও কর্তৃপক্ষের এসব ভূমিকার মৌলিক দিকের পাশাপাশি আমার মনে প্রশ্ন রয়েছে অন্যান্য বিষয়েও। এই ঘটনার পর অনেকেই, বিশেষ করে যাঁরা বাংলা নববর্ষের উদ্যাপন ও উদ্যাপনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি করেন, একে অনৈসলামিক বলে দাবি করেন, পাবলিক স্পেসে নারীদের উপস্থিতি বিষয়ে একধরনের কূপমণ্ডূকতায় ভোগেন, তাঁরা এই সুযোগে তাঁদের এজেন্ডা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। তাঁদের কথা শুনলে মনে হয় দায় ওই সব নারীর, যাঁরা ‘জেনেশুনে’ এই অবস্থার শিকার হতে স্বেচ্ছায় যথাসময়ে যথাস্থানে হাজির হয়েছেন। এই ধরনের বক্তব্যের পেছনের রাজনীতি আমাদের বোধগম্য। ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের এসব প্রতিনিধির রাজনীতির বিরুদ্ধে আদর্শিক সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে; কিন্তু সেটা করতে হবে শক্তিশালী নৈতিক অবস্থান থেকে। তাঁদের এসব পশ্চাদমুখী ধারণাকে নাকচ করে দেওয়ার, তার আবেদনকে দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য করে দেওয়ার উপায় এটা নয় যে এই ধরনের ঘটনার জন্য তাঁদের নির্বিচারে দায়ী করা। বরং উত্তর হচ্ছে নাগরিক হিসেবে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা।
আগের ঘটনার বিচার কি হয়েছিল? এবারের ঘটনার বিচার ও কি হবে?
বস্ত্রহরণরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল ছাত্রলীগ নেতা রাসেল ও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিত বিভাগের ছাত্র ছাত্রলীগ নেতা আলম
যতক্ষণ পর্যন্ত তা করা যাচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত অঙ্গুলি-সংকেত করার ফল ইতিবাচক হবে না। উল্টো এই ধরনের ঘটনা ওই সব পশ্চাদমুখী চিন্তাকেই সাহায্য করবে। এসব ঘটনাই কেবল নয়, এই ঘটনার পরে সেগুলোকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা যেমন অগ্রহণযোগ্য, ঠিক তেমনি এর জন্য দায়িত্ব না নেওয়ার চেষ্টাও ক্ষতিকারক। এসবের কুফল আপনার ইচ্ছা নিরপেক্ষ বলেই ধরে নিতে পারেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান, সর্বক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে বাধ্যবাধকতার রাজনৈতিক পরিবেশ এবং জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির দাবি থেকে বিচ্ছিন্ন করে সুনির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিবাদ করলে তাঁর পরিণতি কী হয়, সেটা বুঝতে হলে কেবল সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। তার অর্থ এই নয় যে এসব ঘটনার প্রতিবাদ করা নিরর্থক; বরং একে আরও বৃহত্তর সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
যখনই এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে, প্রকাশ্যে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে, তখনই একটা প্রশ্ন ওঠে-সাধারণ মানুষ, যারা দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে, তারা কেন তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয় হলো না। অভিজিৎ রায়ের হত্যার ঘটনার পর অনেকেই এই প্রশ্নের অবতারণা করেছিলেন। কিন্তু তার কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর আমরা পাই না। এর একটা উত্তর সম্ভবত পুলিশের ‘নিষ্ক্রিয়’ ভূমিকার ব্যাখ্যার মধ্যেই আছে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট বলে আমার মনে হয় না। বাংলাদেশের সমাজ মানসে কী এমন পরিবর্তন ঘটেছে, যা মানুষকে সমবেদনাহীন, নিষ্ক্রিয় করে তুলছে?
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

খালেদা জিয়ার ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর

তাবিথ আউয়ালের নির্বাচনী প্রচারে নেমে হামলার মুখে পড়েছে
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহর। হামলায়
একটি গাড়ি এভাবেই ভাঙচুর করা হয়েছে
তাবিথ আউয়ালের নির্বাচনী প্রচারে নেমে হামলার মুখে পড়েছে
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহর
রাজধানীর কাওরানবাজারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা করেছে সরকার সমর্থকরা। সোমবার বিকালে সরকার সমর্থকরা খালেদা জিয়াকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ওই সময় কাওরান বাজারের কাঁচা বাজারের সামনে একটি পথসভায় হ্যান্ড মাইকে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তিনি। ইটের মুখে তার নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে নিরাপদে গাড়িতে উঠিয়ে কাওরান বাজার থেকে সরিয়ে নেন। তবে ইটের আঘাতে খালেদার গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। খালেদা জিয়া অক্ষত থাকলেও তার নিরাপত্তাকর্মী ও কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন। ইটের আঘাতে বহরে থাকা প্রায় সব গাড়ির কাচ ভেঙেছে। শ্রমিক লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের একদল কর্মী লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল হাতে এ হামলা চালায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
‘খালেদা জিয়ার প্রচারে বিঘ্ন সৃষ্টি উসকানিমূলক’ - বিএনপি
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সিটি করপোরেশন নির্বাচনী প্রচারণায় বিঘœ সৃষ্টি করা হচ্ছে উল্লেখ করে তা অনভিপ্রেত, উদ্দেশ্যমূলক ও উসকানিমূলক বলে অভিহিত করেছে দলটি। সোমবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপির আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আজ সকাল থেকে তাদের দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসার সামনে থেকে নিয়মিত নিরাপত্তায় থাকা পুলিশ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালের পক্ষে প্রচার চালাতে গিয়ে গতকাল রোববার উত্তরায় কয়েক দফায় আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের কালোপতাকা বিক্ষোভের মুখে পড়েন খালেদা জিয়া। আসাদুজ্জামান বলেন, এ ধরনের আচরণ নির্বাচনের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলছে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এখন সরকারী কোন পদে নেই। তাই আইন অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচারে তার কোন বাধা নেই। আসাদুজ্জামান অভিযোগ করেন, আজ সকাল থেকে খালেদা জিয়ার বাসার নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এটি ইঙ্গিতপূর্ণ। তবে তারা ঠিক নিশ্চিত নন রুটিন মাফিক পুলিশ সদস্যদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে কি না।

জেতার নয়, হারানোর নির্বাচন by সোহরাব হাসান

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই প্রার্থী ও দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তাপ বাড়ছে। প্রতিদিন প্রার্থীদের পারস্পরিক দোষারোপ, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পাশাপাশি অঘটনের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। নির্বাচন কমিশন তথা রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে একের পর এক নালিশ আসছে। সাধ্যমতো ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকারি দলের প্রার্থীরা অভিযোগ করলে যেভাবে ত্বরিত গতিতে প্রতিকার হয়, বিরোধী দলের প্রার্থীদের বেলায় তা ঘটে না।
গত তিন দিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান ঘুরে যে জিনিসটি লক্ষ করলাম, তা হলো নির্বাচন নিয়ে নগরবাসীর একধরনের নিস্পৃহতা। অফিসে, রেস্তোরাঁয় কিংবা পেশাজীবীদের আড্ডায় নির্বাচন নিয়ে যাঁদের সঙ্গেই আলাপ করেছি, তাঁরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। অনেকে বলেছেন, ইতিমধ্যে যেসব আলামত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটি সুষ্ঠু হবে কি না, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সংশয় আছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও চট্টগ্রামবাসী তার সুবিধা পাবে কি না? অতীতের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। কেউ সিটি নির্বাচনের বিজয়কে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করতেও দ্বিধা করেননি। কেউ ‘দুই কুল’ রক্ষা করতে গিয়ে সিটি করপোরেশনকেই অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। চট্টগ্রামবাসী নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
১৫ এপ্রিল সকালে বিএনপি জোটের ‘অবরোধ’ আন্দোলন কর্মসূচির মধ্যে যখন চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছায়, চারদিকের পরিবেশ ছিল নিরুত্তাপ, থমথমে। ১৩ এপ্রিল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দিন সরকার বলেছেন, ‘দেশের কোথাও অবরোধ নেই। আমরা এখন নির্বাচনে আছি।’ পরদিন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, আন্দোলনের অংশ হিসেবেই তাঁরা সিটি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
সে ক্ষেত্রে আমরা ধরে নিতে পারি, বিএনপি আন্দোলনেও আছে, নির্বাচনেও আছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আন্দোলনে থাকাটা অন্যায় নয়। অন্যায় হলো সেই আন্দোলনকে ঘিরে যদি মহাপ্রলয় ঘটে, যদি জনগণের জানমালের ক্ষতি হয়। আমাদের অতি বিজ্ঞ নেতা-নেত্রীরা আন্দোলন করতে গিয়ে সম্ভবত দেশের ও জনগণের ক্ষতির কথাটি ভাবেন না। সে কারণেই একজন হরতালে রেকর্ড সৃষ্টি করেন, আরেকজন অবরোধে।
বিএনপি শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন না করলেও স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর নির্বাচনে ঠিকই অংশ নিচ্ছে এবং এর আগে অনুষ্ঠিত বেশির ভাগ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে তারা জয়ী হয়েছে। এটি ভালো দিক। তবে এটাও অস্বীকার করার জো নেই যে বাংলাদেশে পূর্বাপর সরকারের আমলে জাতীয় নির্বাচনগুলো যতটা ‘কলঙ্কিত’ হয়েছে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো ততটা কলঙ্কিত হয়নি। তাই চট্টগ্রামবাসীর উদ্বেগের বিপরীতে আশার কথা হলো, এই নির্বাচনে যেহেতু ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ নেই, সেহেতু যেকোনো মূল্যে ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের প্রার্থীকে জয়ী করতে মরিয়া হয়ে না-ও উঠতে পারেন। সিটি নির্বাচনে হারের চেয়ে জোর করে জয়ী হতে গেলে সরকারের বিপদ বেশি। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে কোনো রকম অনিয়ম না করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানালেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশ প্রতিপালিত হবে কি না, সেটি দেখার জন্য আমাদের আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে। দুই পক্ষই জয়ের বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত এবং দুই লাখ ভোটের ব্যবধানে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেবে বলে আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। এসব আগাম ঘোষণা নির্বাচনী পরিবেশ ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
বুধবার ভোরে দামপাড়া বাস টার্মিনাল থেকে যে রিকশায় আমি প্রবর্তকের মোড় হয়ে চট্টগ্রাম প্রথম আলো অফিসে যাই, তার চালককে জিজ্ঞেস করি, আগামী ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন হচ্ছে। কাকে ভোট দেবেন? তিনি বললেন, নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু আমি এখানকার ভোটার নই। আমার বাড়ি নোয়াখালী।
চট্টগ্রাম শহরে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনীর প্রচুর লোক থাকেন। তাঁদের কাছে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের চেয়ে আকর্ষণীয় হলো জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু গত জাতীয় নির্বাচনে তাঁরা ভোট দিতে পারেননি। আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের জন্য যে গত তিন মাসে ১৩৪ জন মানুষ জীবন দিয়েছেন, সে খবর হয়তো এই রিকশাচালকের মতো আরও অনেকে জানেন না। আমাদের বৈরী ও বিদ্বেষক্লিষ্ট রাজনীতি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য সাধারণ মানুষকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করলেও নির্বাচনের পর তাঁদের কথা ভুলে যান। ক্ষমতার স্বাদ যে রাজনীতিকেরাই পুরোপুরি ভোগ করেন, সেটি আরও একবার প্রমাণিত হলো মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের সম্পদের হিসাবে। প্রায় সব প্রার্থীর অঢেল সম্পদের সঙ্গে সঙ্গে ধারদেনার অঙ্কটাও বেড়ে গেছে। ফলে আয়কর ফাঁকির এও এক কৌশল বটে। চট্টগ্রামে প্রার্থীদের সুলুকসন্ধানে দেখা গেছে, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ৭৬ জন স্কুলের গণ্ডিই পার হননি। সংরক্ষিত ১৪টি নারী কাউন্সিলর পদে যে ৬২ জন লড়ছেন, তাঁদের অর্ধেক এসএসসি পাস করেননি। এই পরিসংখ্যান এটাই ইঙ্গিত দেয় যে জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য জ্ঞানার্জন জরুরি নয়, জরুরি হলো দলীয় আনুগত্য ও ধনসম্পদ।
চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ সিটি নির্বাচন নিয়ে তেমন আগ্রহ না দেখালেও দুই দলের শীর্ষ নেতারা এটিকে নিয়েছেন বাঁচা-মরার লড়াই হিসেবে। তাই উভয় শিবিরে কমবেশি উত্তেজনা ও অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অরাজনৈতিক নির্বাচনটি শতভাগ দলীয় কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। মোহাম্মদ মনজুর আলম চট্টগ্রাম উন্নয়ন এবং আ জ ম নাছির নাগরিক কমিটির প্রার্থী হলেও দলীয় নেতৃত্ব কোনোটির কর্তৃত্ব অদলীয় ব্যক্তিদের হাতে ছেড়ে দেয়নি। বিএনপি-সমর্থিত উন্নয়ন কমিটির প্রধান হয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান এবং সদস্যসচিব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আর আওয়ামী লীগ-সমর্থিত নাগরিক কমিটির প্রধান হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ ইসহাক মিয়া ও সদস্যসচিব এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এই নির্বাচনে যে নগরবাসীর সমস্যা ও সম্ভাবনার চেয়ে জাতীয় রাজনীতি গুরুত্ব পেয়েছে, তার আরেক প্রমাণ দলীয় নেতাদের নিয়ে নাগরিক কমিটি গঠন। দুই দল দুই সপ্তাহ ধরে নির্বাচনী প্রচার চালালেও এখন পর্যন্ত নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেনি। কেন করেনি? এই প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রামের এক সাংবাদিক বন্ধু বললেন, এদের প্রতি ভোটাররা ভরসা পাচ্ছেন না বলেই ইশতেহার দেননি।
আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী আ জ ম নাছিরের সাফ কথা, মনজুর আলম পাঁচ বছরে সিটি করপোরেশনের মান একেবারে নিচে নামিয়ে দিয়েছেন। তিনি নগরবাসীর জন্য কোনো কাজ করেননি। অতএব তাঁকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আর বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী পাল্টা আক্রমণ না করলেও তাঁর প্রধান নির্বাচনী প্রচারকেরা বলেছেন, যে ব্যক্তির নাম শুনলে মানুষ ভয় পায়, নগরবাসী কখনোই তাঁকে মেয়র পদে বসাতে পারেন না। স্থানীয় সরকার নিয়ে কাজ করেন, এ রকম নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি বললেন, নির্বাচনে তিনিই জয়ী হবেন, যিনি প্রতিপক্ষের দুর্বলতা, ব্যর্থতা ও দোষের বিষয়টি জনগণের সামনে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে পারবেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ এখন চট্টগ্রামে। মন্ত্রীরা আসছেন ‘অনির্বাচনী’ কাজে, তাঁদের এই আসা-যাওয়া নিয়ে বিরোধীপক্ষ আপত্তি তুলেছে। আনুষ্ঠানিক প্রচারের শুরুতে পূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন এসে এক কর্মিসভায় বক্তব্য রেখে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন। এরপর মন্ত্রীরা সতর্ক। চট্টগ্রামে এলেও নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন না। কেন্দ্রীয় নেতারা দফায় দফায় এসে ‘পরামর্শ’ দিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপির নেতারা চাইছেন, খালেদা জিয়াও নির্বাচনী প্রচারে চট্টগ্রামে আসুন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাঁর আসাকে কীভাবে নেয়, সেটাও ভাবার বিষয়। এ সময়ে তাঁর চট্টগ্রাম সফর নিয়ে কোনো অঘটন ঘটলে সেই দায় বিএনপির ওপরই বর্তাতে পারে।
প্রধান দুই মেয়র প্রার্থী নাগরিক কমিটির আ জ ম নাছির ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের মোহাম্মদ মনজুর আলম এখন সারা শহর চষে বেড়াচ্ছেন, তাঁরা নগর নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনার চেয়েও বেশি বলছেন প্রতিপক্ষের ত্রুটি ও দুর্বলতার কথা। ভোটাররা বিভ্রান্ত। তাঁরা মনে করেন, এই নির্বাচনে প্রার্থীর গুণাগুণ বিচার হবে না, বরং দুই দলের জনপ্রিয়তা যাচাই হবে। তাই প্রার্থীর চেয়ে তাঁদের নেপথ্যের নায়কদেরই মাথাব্যথা বেশি। দুই দলই বলছে, এটা কেবল সিটি করপোরেশন নির্বাচন নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু। আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি: এই নির্বাচনে বিরোধীপক্ষের প্রার্থীরা জয়ী হলে স্বাধীনতার চেতনা ভূলুণ্ঠিত হবে। জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটবে। আন্দোলনের নামে ফের পেট্রলবোমার রাজনীতি শুরু হবে। বিএনপির নেতাদের ভাষ্য হলো: সিটি নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীরা জয়ী হলে দেশ থেকে গণতন্ত্র চিরদিনের জন্য নির্বাসিত হবে।
কিন্তু চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ স্থানীয় সরকার সংস্থার এই নির্বাচনে স্থানীয় ইস্যুকেই সামনে রাখতে কিংবা দেখতে চান। যে প্রার্থী নগরের উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন, যিনি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করবেন, তাঁকেই তাঁরা ভোট দিতে চান। তাঁরা এমন মেয়র চান না, যিনি নির্বাচিত হয়ে নাগরিক এজেন্ডা বাদ দিয়ে দলীয় এজেন্ডা নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন কিংবা নির্বাচিত হয়ে নগরবাসীর সুযোগ–সুবিধার কথা বেমালুম ভুলে যাবেন।
চাঁদের যেমন নিজস্ব আলো নেই, তেমনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিজ গুণে জয়ের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। এ কারণেই চট্টগ্রামের সাধারণ ভোটাররা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না। এমনকি দলের কর্মী-সমর্থকেরাও মনে করেন, প্রার্থীদের কেউ নিজ গুণে জিতবেন না। তাঁরা জিতবেন প্রতিদ্বন্দ্বীর অদক্ষতা কিংবা নেতিবাচক ভাবমূর্তির জন্য। নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি জোর দিয়ে বললেন, প্রধান দুই প্রার্থীর মধ্যেই তিনিই জয়ী হবেন, যিনি প্রতিপক্ষের দুর্বলতা ও ত্রুটিগুলো বেশি বেশি তুলে ধরতে পারবেন। কেননা, দলের সমর্থন ছাড়া তাঁদের ব্যক্তিগত পুঁজি সামান্যই।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

সেনা মোতায়েনে সরকারের ভয় কেন : আফরোজা আব্বাস

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের পক্ষে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস। এ সময় সেনা মোতায়েনের দাবি পুণর্ব্যক্ত করে তিনি প্রশ্ন তোলেন- সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলে সেনা মোতায়েনের সরকারের এত ভয় কেন। নির্বাচনে জয়ী হলে মির্জা আব্বাসের পক্ষ থেকে ঢাকাকে বিশ্বমানের রাজধানীতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। আজ জাতীয় প্রেস ক্লাবে মির্জা আব্বাসের ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন 'আদর্শ ঢাকা আন্দোলন'-এর আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ। উপস্থিত ছিলেন বিএফইউজে সভাপতি শওকত মাহমুদ, ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ, সুপ্রিম কোর্ট বারের সেক্রেটারি মাহবুব উদ্দিন খোকন, অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ এবং সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন।
আধুনিক ঢাকা গড়ে তুলতে নির্বাচনী ইশতেহারে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। ইশতেহারের প্রধান ব্ক্তব্যগুলি এখানে তুলে ধরা হলো :
নাগরিক সেবা
১. ঢাকাবাসীর ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে সবার জন্য বাসযোগ্য মহানগর গড়ে তোলা।
২. নির্বাচিত হলে ভবিষ্যতে ঢাকাবাসীর সাথে আলোচনা সাপেক্ষে তাদের মতামতের ভিত্তিতে সিটি কর্পোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করা।
নাগরিক বিনোদন
১. বুড়িগঙ্গা দুষণমুক্ত করা ও নদীতীরে ওয়াকওয়ে নির্মাণ। এবং একে ঘিরে বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা।
২. সিটি কর্পোরেশনের অধীন বিদ্যমান বিনোদনকেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন।
যানজট নিরসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
১. ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বিভিন্ন ওয়ার্ডের অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাটের সংস্কার ও প্রয়োজনীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
২. রাস্তাপারের প্রতিটি ফুটওভার ব্রিজে পর্যায়ক্রমে এসকেলেটর স্থাপন এবং সার্বক্ষণিক প্রহরাসহ নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা।
স্বাস্থ্যসেবা
১. পথচারী ও বাসযাত্রীদের জন্য নারী-পুরুষ সকলের জন্য আধুনিক টয়লেট স্থাপন।
২. প্রতিটি পার্কে একটি করে অত্যাধুনিক প্রাইমারি হেলথ চেকআপ সেন্টার স্থাপন।
শিক্ষাখাত
১. বিভিন্ন স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে নৈশকালীন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ওয়ার্ডভিত্তিক শতভাগ স্বাক্ষরতা কার্যক্রম চালু করা।
২. সিটি কর্পোরেশনের অধীন স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসাসমূহের আধুনিকায়ন ও সুষ্ঠূ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা
পরিবেশ উন্নয়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
১. আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্যানিটারি ল্যান্ডফেরি গড়ে তোলা।
২. আধুনিক নগরীর মতো ডোর-টু-ডোর ওয়েস্ট কালেকশন পদ্ধতিতে বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ।
প্রযুক্তির ঢাকা
১. পাবলিক প্লেসে ফ্রি ইন্টারনেট সেবা প্রদানের মাধ্যমে সেবা বর্ধিতকরণ।
২. সকল ধরণের ট্যাক্স অনলাইনে প্রদানের ব্যবস্থা করা।
সমাজসেবা
১. সরকার ও মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য হাসপাতাল ও গার্মেন্টস অধ্যুষিত এলাকায় ডর্মিটরি তৈরির ব্যবস্থা করা।
২. উন্নত নাগরিক সেবা প্রদানে প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করা।
জননিরাপত্তা
১. পর্যায়ক্রমে প্রতিটি সড়ক ও লেন সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা।
২. ওয়ার্ডভিত্তিক অপরাধপ্রবণ জায়গাসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং সব ধরণের অপরাধ দমনে কর্যকর পদ্ক্ষেপ গ্রহণ করা।
নগর পরিকল্পনা ও প্রশাসন
১. ওয়ার্ডভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন ও বাজেট প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদগণের মতামত গ্রহণ।
২. নগরের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদে ১৮০ দিনের কর্মসূচী গ্রহণ করা।

সবার সামনে যে চ্যালেঞ্জ by ইনাম আহমেদ চৌধুরী

সিটি করপোরেশন নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে নিজ নিজ দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির তিনজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকের লেখা প্রকাশ করছে প্রথম আলো। গত সোম ও মঙ্গলবার জাতীয় পার্টির গোলাম মোহাম্মদ কাদের এবং আওয়ামী লীগের নূহ–উল–আলম লেনিনের নিবন্ধ প্রকাশের পর আজ ছাপা হলো বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরীর লেখা ঢাকা ও চট্টগ্রামে আসন্ন পৌর নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক দলগুলো, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্যই চ্যালেঞ্জ নয়, আমার মনে হয় এটা জাতি ও রাষ্ট্রকে নিয়ে একটি সামগ্রিক চ্যালেঞ্জ। এর সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণোপযোগী অনুষ্ঠানই জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব ও অগ্রযাত্রার পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে পারে। নির্বাচনে কে জেতে, তার চেয়ে অনেক বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে জেতে।
দুর্ভাগ্যবশত, এযাবৎ যেসব চিহ্ন, সংকেত বা পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে, তা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের অতীব প্রশ্নবিদ্ধ সাধারণ নির্বাচন, যেখানে অধিকাংশ সাংসদই অনির্বাচিত এবং অন্যদেরও ভোট প্রাপ্তি ছিল খুবই কম, জন্ম দিয়েছে প্রতিবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনের। এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে সরকারের দমন-পীড়ন নীতি এবং বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির সুযোগে সন্ত্রাসীরা যে কীভাবে সক্রিয় ও বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে, তা আমরা লক্ষ করেছি।
দেখেছি, বাস্তবসম্মত ও সত্যিকার অর্থে সন্ত্রাস দমনে এবং রাজনৈতিকভাবে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে সরকার ও সরকারি দলের অনীহা, অপারগতা বা অসামর্থ্য। সরকারি দলের (এখানে আমি ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টি ও জাসদকেও অন্তর্ভুক্ত ধরছি) একটিমাত্র ইচ্ছাই প্রবল, কী করে আর কতকাল ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতাধর হিসেবে থাকা যায়। তাই সমস্যা সমাধানের একটিমাত্র পন্থা ‘সংলাপ’ শব্দটিতেও তাদের এতটা ঘোর আপত্তি। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে—সংলাপ ছাড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন–প্রক্রিয়ায় বিএনপি ও তার সহযোগী বিরোধী দলগুলোর মোকাবিলা করা। কিন্তু এই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা নির্বাচন কমিশন বা সরকার কোনো আলাপ-আলোচনা, অন্ততপক্ষে ঘর গোছানোর ন্যূনতম সময় দেওয়ার ব্যবস্থা রেখে নির্ধারিত করেনি। বরং পুলিশপ্রধানের সুপারিশ মোতাবেকই হয়েছে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ। গোড়াতেই গলদ।
বিএনপি বিগত সব সিটি নির্বাচনেই অংশ নিয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী জিতেছেন। সুতরাং নীতিগতভাবে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিএনপির জন্য একটি স্বাভাবিক কার্যক্রম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণে উৎসাহ প্রদানের বদলে সরকার বিএনপি এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভীত, আতঙ্কিত, সন্ত্রস্ত করারই চেষ্টা করছে, যাতে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারেন। মিছে অজুহাত এবং অকারণে বিএনপির হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ হয়েছেন গুম। উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ। তাঁর এবং আরও অনেকের গাড়ি পোড়ানো, কার্যালয় তালাবদ্ধ, মহাসচিবসহ প্রায় সব সক্রিয় নেতা-কর্মী কারারুদ্ধ বা হুলিয়াপ্রাপ্ত। দলীয় নেত্রী নিজেই নিগৃহীত ও অবরুদ্ধ। পারস্পরিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাস্তব অর্থে প্রায় নিষিদ্ধ। এমতাবস্থায়ও বিএনপি সিটি নির্বাচনে বাছাই করা প্রার্থীকে ঘোষিত সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক। সরকারি দল প্রাজ্ঞ ও সুবিবেচক হলে তো এই সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করা উচিত এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া যাতে একটি হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে গ্রহণযোগ্য ও প্রশ্নাতীত হতে পারে, তার নিশ্চয়তা বিধানে সচেষ্ট থাকা উচিত। সরকারি দলগুলোর নেতাদের, মন্ত্রীদের, এমনকি কতিপয় সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ডে তা মোটেই মনে হচ্ছে না। বরং সেগুলো হচ্ছে বিপরীতধর্মী।
নির্বাচনে যে প্রথম থেকেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করা হচ্ছে, তা অনস্বীকার্য। প্রার্থীরা শহর দুটির বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করেছেন অসংখ্য বিলবোর্ড। নির্দেশ সত্ত্বেও অনেকগুলো এখনো অপসারিত হয়নি। মন্ত্রীদের অনেকেই তো প্রকাশ্যে এবং প্রচার করেই নির্বাচনী কর্মকাণ্ড ও তৎপরতায় অংশ নিচ্ছেন। জনৈক মন্ত্রী তো ঘোষণাই করেছেন, ‘যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, আমাদের নির্বাচনে জিততেই হবে।’ তাঁরা কেউ কি কর্মীদের এমনকি ভোটারদের নিয়েও সভা-সমিতি করেছেন? এমতাবস্থায়, এমনকি একজন রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক প্রতিবেদন দেওয়া সত্ত্বেও, নির্বাচন কমিশন একদম নিশ্চুপ। তারা কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই নিচ্ছে না, শাস্তিমূলক তো দূরের কথা। এগুলো শুধু গর্হিত নয়, শাস্তিযোগ্য নির্বাচন আইন ভঙ্গের অপরাধ। তবু কেনো প্রতিকার নেই।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে আবার ঘোষণা করা হয়েছে, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে হুলিয়া থাকলে এবং তিনি দৃষ্টিগোচর হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। বিএনপির প্রায় সব সক্রিয় নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধেই তো আজেবাজে কারণে জারি আছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। সক্রিয় হলে আরও জারি হবে। এমতাবস্থায় শুধু মেয়র পদপ্রার্থী নয়, অধিকাংশ প্রার্থীর তো মাঠে নামাই অসম্ভব। তা ছাড়া নির্বাচনে সহায়তাকারী, পোলিং এজেন্ট পাওয়া তো হয়ে দাঁড়াবে দুষ্কর। কোথায় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’, শুধু ‘ফিল্ড’ই তো পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
প্রতিপক্ষকে চাপে রেখে যেনতেন প্রকারে যদি আওয়ামী লীগ তাদের মনোনীত প্রার্থীর বিজয় ঘোষণা করাতে সমর্থ হয় এবং এ প্রক্রিয়ায় যদি বর্তমানের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কমিশন তাদের যথারীতি সহযোগিতা করে যায়, তাহলে নির্বাচনটি শুধু যে অফলপ্রসূ হবে তা নয়, সরকারের অধীন নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পর্কে যে বিরূপ ও অগ্রহণযোগ্য মনোভাব দেশে-বিদেশে রয়েছে, তা দৃঢ়তর হবে। তাহলে তো সরকারি দলের কোনো ফায়দাই হচ্ছে না। উপরন্তু সরকারি সংস্থাগুলো ও নির্বাচন কমিশন জনশত্রুতে পরিণত হতে পারে। মোগলরা সারা ভারতবর্ষ সফলভাবে শাসন করে গেছেন কয়েক শতাব্দী। বলা হয়ে থাকে, একক ভৌগোলিক ইউনিট হিসেবে ভারতের প্রতিষ্ঠা এবং এর সমাজ-সংস্কৃতির ভিত রচনা মোগল সম্রাটদের এবং তাঁদের প্রশাসনের অনবদ্য ও অমর কীর্তি। এই মহান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর লিখিত আত্মজীবনী ‘বাবরনামা’য় উল্লেখ আছে, তাঁর উত্তরাধিকারী প্রিয় পুত্র হুমায়ুনের প্রতি তাঁর প্রদত্ত একটি উপদেশ। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রিয় পুত্র, তুমি যদি দীর্ঘকাল এ দেশে ফলপ্রসূ রাজত্ব করতে চাও, তাহলে পরাজিত শত্রুর সঙ্গে তিক্ত বিরোধিতায় লিপ্ত না হয়ে তার সঙ্গে সদ্ভাব সৃষ্টি কোরো।’
রাষ্ট্রক্ষমতা এখন আওয়ামী লীগের করায়ত্ত। সুতরাং একটি বশংবদ নির্বাচনী কমিশনের পদলেহিতায় তাদের পক্ষে প্রতিপক্ষকে বিভিন্ন দিকে ঘায়েল করে বিজয়ের ঘোষণা অর্জন যে সম্ভব হতে পারে, তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তাই এবারও যদি তা-ই হয়, তাহলে নির্বাচনই যে আসলে অগ্রহণযোগ্য হবে তা নয়, দেশে-বিদেশে কেউ একে সুস্থ মস্তিষ্কে মেনে নেবেন না। আজ তাই প্রশ্ন, সরকারি দল কি এটা অনুধাবন ও উপলব্ধি করতে পারবে?
এই মহাপরীক্ষার দিনে যে সংস্থাটির নিজ ভূমিকা যথার্থরূপে পালন করার কথা এবং যার কর্তব্যপরায়ণতা ও সক্ষমতার ওপর সাফল্য-ব্যর্থতা বহুলাংশে নির্ভরশীল, সেই নির্বাচন কমিশনকে সক্রিয় ও দায়িত্ববান হয়ে উঠতে হবে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন একটি অকেজো, অথর্ব, অপটু এবং একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা হিসেবে দুর্নাম কুড়িয়েছে। এটাকে পরিবর্তন করতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু তা তো এখন সম্ভব নয়। আমরা আশা করব, দেশ-জাতি এমনকি নিজেদের আপন স্বার্থে নির্বাচন কমিশনের বোধোদয় হবে।
আমরা পার্শ্ববর্তী দেশগুলো, ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা, এমনকি নেপাল-ভুটানেও নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ও ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে দেখেছি। পাকিস্তানের বিগত নির্বাচন সফল করতে পেরেছিল নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্য ভূমিকা। ভারতে গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য যে সংস্থা এবং যার কার্যক্রম বহুলাংশে কৃতিত্বের দাবিদার, তা হচ্ছে নিরপেক্ষ কর্মক্ষম দুর্নীতিমুক্ত নির্বাচন কমিশন এবং নিরপেক্ষ প্রশাসন। আমাদের নির্বাচন কমিশনের ওপর অনেক দায়িত্ব রয়েছে, তাদের ওপর অনেক ক্ষমতাও অর্পিত রয়েছে। তারা যদি তাদের নিরপেক্ষতা বা কর্মক্ষমতা কিছুটাও দেখাতে পারত এবং হাস্যকরভাবে একটি পদলেহী বশংবদের ভূমিকা পালন না করতে চাইত, তাহলে আমার কাছে মনে হয় সারা দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং জটিল সমস্যার অবসান বা সমাধান হতে পারত। অথচ একটি সাংবিধানিক স্বাধীন কমিশন হিসেবে কোনো কাজেই তারা সেই প্রবণতা দেখাচ্ছে না। বিএনপি দলের অনেক নেতাই এ বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন।
নির্বাচনে যখন বিএনপি অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে, দলটাকেও সুসংহত এবং যথাসম্ভব সক্রিয় হতে হবে। এ ব্যাপারে যখন অন্যায় প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা বা বিরোধিতার সৃষ্টি সরকারি দল করবে, কিংবা কারচুপি এবং বিধিবহির্ভূত অন্যায় কর্মকাণ্ডের আশ্রয় গ্রহণ করবে, তা জাগ্রত ও সচেতন জনসমাজের চোখে ধরা পড়বে। তাহলে সরকারিভাবে যে ফলাফলই ঘোষণা করা হোক না কেন, ওইজাতীয় কর্মকাণ্ডজনিত তথাকথিত বিজয় সম্পূর্ণ নিরর্থক হয়ে দাঁড়াবে। সে অবস্থায় পরাজিত হলেও সত্যিকারভাবে তা নৈতিক ও রাজনৈতিক বিজয় হয়ে দাঁড়াবে।
সন্ত্রাস ও সহিংস কর্মকাণ্ড সর্বদাই পরিত্যাজ্য। উসকানির মুখেও তা পরিহার করতে কিংবা সে রকম কিছু করার সুযোগ না দিতে সচেতন থাকতে হবে। সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। জাতির জন্য তা সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক। সব দলকেই ঐক্যবদ্ধভাবে সন্ত্রাসবিরোধী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে। আগামী পৌর নির্বাচন জাতিকে একটি মহাসুযোগ দিচ্ছে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার মূল দায়িত্ব ক্ষমতাসীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। আমরা আশা করব, তারা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবে।
ইনাম আহমেদ চৌধুরী: অর্থনীতিবিদ ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা।

আমরা কি মধ্যযুগে ফিরে যাচ্ছি? by রাশেদা কে চৌধূরী

নববর্ষের দিন বৈশাখী উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় নারী ও শিশু নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়েছে। তাহলে আমরা কি মধ্যযুগে ফিরে যাচ্ছি? প্রথম কথা হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনা শুধু লজ্জার না, বিষয়টি ক্ষোভের। সেই দিন যে নারী ও শিশুরা নিপীড়নের শিকার হয়েছে, শুধু তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়নি, এ ঘটনায় দেশের সব নারী-শিশুর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসি সহ আরো অনেক স্থানে নারীকে
বিবস্ত্র করে যৌন নির্যাতন করা হয়। হরণ করা হয় নারীর সতীত্বকে।
বর্ষবরণের নামে যা করা হয়েছে তার দায়ভার কে নেবে? এভাবে
বাংলা উৎসব গুলি বা নববর্ষতে যদি নারীর শ্লীনতাহানি,
নারীর প্রতি পাশবিক অত্যাচার,নববর্ষ মানে যদি হয়
আমার দেশের ধর্ষিতা মা-বোনদের করুন আর্তনাদ!
অন্যদিকে ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেভাবে রাখঢাক চালাচ্ছে, তা মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। কোনো অভিযোগ উঠলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব তা আমলে নেওয়া। কিন্তু এখানে একধরনের ‘ব্লেম গেম’ চলছে। একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে চাইছে।
রাস্তায়, কর্মক্ষেত্র কোনো জায়গাতেই নারীরা নিরাপদ নয়। আমাদের সংস্কৃতির গৌরবের জায়গা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বৈশাখী উৎসবেও নারী নিরাপদ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ বলতে চাচ্ছেন নারী বা মেয়েদের রাত নয়টার পরে বাইরে থাকার প্রয়োজনটা কী। তাই বলা যায় দেশের নারীরা এগিয়েছে, তবে ক্ষমতায়ন হয়নি। শুধু উন্নয়ন দিয়ে ক্ষমতায়ন হবে না। ক্ষমতায়ন হবে তখনই যখন নারী নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারবে।
বলা হচ্ছে যে নারীরা নিপীড়নের শিকার, তারা অভিযোগ করছে না। সেই নারীকেই কেন অভিযোগ জানাতে হবে? যে নারী কাপড় ঠিক করার জন্য রোকেয়া হলে ঢুকতে বাধ্য হয়েছে, সে নারীই বুক ফুলিয়ে অভিযোগ করবে, এ ধরনের পরিবেশও তৈরি হয়নি। সবার ঘরেই মা, মেয়ে বা বোন আছে। অর্থাৎ সবার ঘরেই নারী আছে। নীতিনির্ধারকেরা কেন এ দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে না? যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। যে বা যারা এ অপরাধ করেছে, অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলায় আহত লিটন নন্দী
ঘটনার পর হাইকোর্ট একটি নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা সবাই হাইকোর্টের কাছে কৃতজ্ঞ।
রমনার বটমূলে বোমা হামলা সংস্কৃতিমনা বাঙালিদের রুখতে পারেনি। তবে এবার যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে বৈশাখী উৎসবসহ এ ধরনের উৎসবে সন্তানকে যেতে দেওয়ার আগে তিনবার ভাবতে বাধ্য হবেন অভিভাবকেরা। এ ধরনের নারী নির্যাতনকারীরা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠলেও দল সেভাবে বিব্রতবোধ করছে বলে মনে হচ্ছে না। এ ধরনের পরিবেশে যে বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই, তা দেখতে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না। পরিকল্পিত ও দলবদ্ধভাবে নির্যাতনের যে চিত্র আমরা সিসিটিভির ফুটেজে দেখেছি, তাতে করে বলা যায় সামাজিক বিপর্যয় ঘটেছে।
তাই সোচ্চার দাবি তুলতে হবে, রাষ্ট্রকে নাগরিকের নিরাপত্তা দিতেই হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তরুণ প্রজন্মও বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার। এটি একটি ইতিবাচক দিক। গণমাধ্যমকেও এ ঘটনার ফলোআপ করতে হবে, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই পার পেতে না পারে।
রাশেদা কে চৌধূরী: গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক

আফগানিস্তানে আইএসের প্রথম বড় ধরনের হামলা

আফগানিস্তানের জালালাবাদ শহরে শনিবার আত্মঘাতী বোমা হামলায় কমপক্ষে ৩৭ জন নিহত এবং আরও শতাধিক আহত হয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। বার্তাসংস্থা এএফপির কাছে টেলিফোনে এর দায়স্বীকার করেছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইএসের এক স্থানীয় মুখপাত্র। অন্যদিকে, মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পরে দেয়া এক বিবৃতিতে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি বলেন, গোয়েন্দাদের তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে আইএসই এ হামলার জন্য দায়ী, তাহলে আফগানিস্তানে এটাই আইসের প্রথম বড় ধরনের হামলা। স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন,
শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পূর্বাঞ্চরীয় নানগরহর প্রদেশের জালালাবাদ শহরে একটি ব্যাংকের কাছে প্রথম হামলাটি হয়। প্রদেশের পুলিশ প্রধান ফজল আহমেদ শেরজাদ জানিয়েছেন, শহরের ‘নিউ কাবুল ব্যাংক’-এর শাখা অফিসের ফটকের কাছে এক আত্মঘাতী হামলাকারী নিজের শরীরে লুকিয়ে রাখা বিস্ফোরক দ্রব্যে বিস্ফোরণ ঘটান। ওই হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দ্বিতীয় বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে। প্রথম হামলাস্থলের মাত্র ৬০ মিটার দূরে ফের হামলা চালানো হয়। শহরের এক মাজারের বাইরে তৃতীয় বোমা হামলাটি হয়। আহতদের পার্শ্ববর্তী হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে। শনিবার ব্যাংকের ওই শাখাটিতে বেতন নিচ্ছিলেন সরকারি কর্মচারীরা। লাইন ধরে দাঁড়িয়ে বেতন নেয়ার সময় আত্মঘাতী হামলার ঘটনাটি ঘটে বলে শেরজাদ জানিয়েছেন।

কাশ্মীরে পাকসেনাদের জিহাদকে সমর্থন করে জামাত-উদ-দাওয়া

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে হুরিয়ত নেতা মাসারত আলমের পর এবার নতুন করে বিতর্ক তৈরি করলেন ২৬/১১ মুম্বাই সন্ত্রাসের মূলচক্রী হাফিজ সাঈদ। শুক্রবার একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে তার নেতৃত্বে চালিত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য করে বলে স্বীকার করেছেন তিনি। সেই সঙ্গে কাশ্মীর ভারতের অংশ নয় বলেও দাবি করেছেন তিনি।
গত সপ্তাহেই কাশ্মীরে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের পতাকা তোলায় গ্রেফতার করা হয়েছে কট্টরপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মাসারত আলমকে। এদিন একটি টিভি সাক্ষাৎকারে মাসারতকে পূর্ণ সমর্থন করে হাফিজ সাঈদের বক্তব্য, মাসারত তো দিল্লিতে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ায়নি। কাশ্মীর একটি বিতর্কিত এলাকা। ভারতের নয়। তাই মাসারত কোনো ভুল কাজ করেনি। কাশ্মীরসহ ভারতে নানা জঙ্গি কার্যকলাপ প্রসঙ্গে জঙ্গি নেতার বক্তব্য, ‘পাকিস্তান ও জামাত-উদ-দাওয়া কাশ্মীরবাসীকে সাহায্য করে। একেই আমরা জিহাদ বলি। যদি ভারত তাদের (কাশ্মীর) প্রাপ্য অধিকার না দিতে চায়, সংঘর্ষের পথ নেয়, তাহলে আমরাও জিহাদের রাস্তায় হাঁটব। কাশ্মীরবাসীকে স্বাধীনতা দেয়ার জন্য পাকিস্তান সব সময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।’ এদিকে, ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে হুরিয়ত সমর্থকদের বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের গুলিতে এক তরুণ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও দুজন।
শনিবার বাদগাম জেলার নরবলে এ ঘটনা ঘটে। এক সমাবেশে ভারতবিরোধী স্লোগান দেয়ায় এবং পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানোর অভিযোগে শুক্রবার হুরিয়ত নেতা মাসারত আলমকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর আগে পুলওয়ামা জেলার ত্রালে সেনাবাহিনীর গুলিতে দুই যুবক নিহত হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার হুরিয়ত নেতা গিলানি শ্রীনগর থেকে ত্রাল পর্যন্ত এক বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু, পুলিশ সেই মিছিলের অনুমতি দেয়নি। অনুমতিহীন সেই মিছিল এ দিন নরবলে পৌঁছতেই পুলিশ এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। মিছিল আটকাতেই পুলিশের দিকে পাথর ছুড়তে শুরু করে বিক্ষোভকারীরা। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। গুলিতে আহত হন তিন যুবক। তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সুহেল নামে একজনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জে চীনের রানওয়ে

দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জে রানওয়ে বানাচ্ছে চীন। রানওয়ের নির্মাণ কাজ শেষ হলে যুদ্ধবিমান ওঠানামা করতে পারবে এখানে। স্যাটেলাইটে ধারণা করা ছবিতে বিষয়টি ধরা পড়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরের জলসীমা নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধ রয়েছে চীনের। স্পার্টলির দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা দাবি করে কমপক্ষে তিনটি দেশ (ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স)। এই অবস্থায় সেখানে রানওয়ে নির্মাণের খবর আঞ্চলিক রাজনীতিতে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
স্যাটেলাইটের ভিডিও ফুটেজে রানওয়ে চিহ্নিত হয়েছে ধূসর রিবনের আকৃতিতে। রানওয়ের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১০ হাজার ফুট। এই দৈর্ঘ্যরে রানওয়েতে সহজেই যুদ্ধবিমান ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত বিমান ওঠানামা করতে পারবে। নির্মাণাধীন রানওয়ের পাশে তৈরি করা হচ্ছে বিমান পার্কিয়ের স্থান। এসব কাজ শেষ হলে স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জে চীনের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। এদিকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জে এই রানওয়ে নির্মিত হলে দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্ষমতা প্রদর্শনের যে প্রতিযোগিতা চলছে, তাতে কৌশলগত জয় হবে চীনের। কারণ সাগরের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকারি হল আকাশসীমায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
করা। বিবিসি

শিক্ষানবিশকালেই চুরি ও আত্মসাৎ by আলী ইমাম মজুমদার

সমাজের অন্যান্য অংশের পাশাপাশি বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেও দুর্নীতির প্রবণতা ক্রমবর্ধমান বলেই বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগের ঊর্ধ্বে থাকছেন না বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারের সদস্যরাও। এমনকি ক্যাডারে যোগ দিয়েই কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও মাঝেমধ্যে গণমাধ্যম থেকে পাওয়া যায়। হয়তোবা এগুলো বেদনাদায়ক আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কেননা, কনিষ্ঠরাই একসময় জ্যেষ্ঠ হবেন। নিয়োজিত হবেন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। তাই এ ধরনের প্রবণতা সম্পর্কে জানা গেলে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আবশ্যকতা দেখা যায়। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু প্রতিকারও করা হয়। তবে সেটা পর্যাপ্ত ও বাস্তবসম্মত কি না, ক্ষেত্রবিশেষে এ প্রশ্ন দেখা দেয়। কিছু ক্ষেত্রে দায়ী কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন তাঁদের কিছু অগ্রজ বা সহকর্মী কর্মকর্তা। এমনকি বাইরের প্রভাবও যুক্ত হয়। এসব কিছু সত্ত্বেও যথাযথ কর্তৃপক্ষ সময়োচিত সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে বেসামরিক চাকরিগুলোর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বড় অংশ ক্লেদে আচ্ছাদিত হয়ে পড়বে।
অতিসম্প্রতি কোনো কোনো পত্রিকায় দুটো খবর এসেছে। খবরগুলোর গুরুত্ব হয়তো সবার কাছে তেমন নেই। তবে সচেতন মহলের ভাবনার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। একটি খবরে আছে, গত ফেব্রুয়ারিতে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে আমাদের এক তরুণ শিক্ষানবিশ কূটনীতিক একটি ইলেকট্রনিক দোকান থেকে মুঠোফোন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। ডাচ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। কূটনৈতিক দায়মুক্তির জোরে ছাড়া পেয়েছেন। তবে তাঁকে ৩৫০ ইউরো জরিমানা দিতে হয়েছে। ঘটনার পরপরই ডাচ কর্তৃপক্ষ কূটনৈতিক চ্যানেলে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানায়। তারা দাবি করে, সেই তরুণ কূটনীতিক ডাচ পুলিশের কাছে বলেছেন, তাঁর কয়েকজন সহকর্মীর পথ অনুসরণ করেই তিনি এমনটা করেছেন। ডাচ কর্তৃপক্ষ এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করতে আমাদের সরকারকে অনুরোধ করে। সংবাদপত্রের সূত্রে আরও জানা যায়, তিনি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার দায়ভার অস্বীকার করেছেন এবং তাঁকে সহায়তা করতে জোর লবিং চলছে।
অন্য ঘটনাটিও সাম্প্রতিক কালের। যমুনার অন্য পারের এক জেলার। গণমাধ্যমসূত্রে জানা যায়, একজন শিক্ষানবিশ সহকারী কমিশনার কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন পেশকারকে না নিয়ে। বিচার করে দণ্ডিত করেছেন কিছু ব্যক্তিকে। জরিমানার টাকা তিনি নিজেই গ্রহণ করেছেন। আর রসিদে করেছেন কারচুপি। জরিমানাদাতাকে দেওয়া রসিদে পরিমাণ সঠিক লেখা হলেও সরকারি অংশে অনেক কম লিখে প্রায় দুই লাখ টাকা করেছেন আত্মসাৎ। এখন তিনি ঢাকায় একটি প্রশিক্ষণে আছেন। ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন বলেও খবরে উল্লেখ রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী সেই বিচারকের বিচার এখন সরকারের হাতে।
উভয় ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দুজন কর্মকর্তাই এখনো চাকরিতে স্থায়ী হননি। শিক্ষানবিশকাল চলছে। নিয়োগের শর্তানুসারে এ সময়কালে অসন্তোষজনক কাজের জন্য তাঁদের বরখাস্ত করার মতো সর্বোচ্চ দণ্ড দিতেও তেমন কোনো আনুষ্ঠানিকতার আবশ্যকতা থাকে না। একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ডাচ সরকার। তিনি ঘটনাস্থলেই জরিমানা দিয়েছেন। অপরাধ স্বীকার করেছেন তাদের কাছে। অন্যজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাঠিয়েছেন জেলা প্রশাসক স্বয়ং। তিনি প্রাথমিক তদন্ত করে নিজে সন্তুষ্ট না হয়ে একজন তরুণ সহকর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাঠানোর কথা নয়। আর দণ্ডিত ব্যক্তিদের দেওয়া রসিদ আর এর সরকারি অংশ পরীক্ষা করলেই সত্য প্রমাণিত হয়। নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কোনো একটি ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। লবিং হবে তাঁর পক্ষেও। আর চলমান সংস্কৃতিতে এটাই তো স্বাভাবিক।
এখন কথা থাকে, সরকার তাঁদের চাকরিতে রাখবে কেন? বলা হবে, এ ধরনের ঘটনার চেয়ে অনেক বড় কিছু করেও তো অনেকেই পার পেয়ে যান। কিছু হয় না তাঁদের। হয়তোবা তা-ই। তাঁদেরও সম্ভব হলে শনাক্ত করা এবং অযৌক্তিক অজুহাত আমলে না নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়াই তো সংগত। যে তরুণ কূটনীতিক এমনটা ঘটালেন, তিনি একবারও ভাবলেন না দেশের ভাবমূর্তির কথা। এমনকি নিজের অর্জিত মর্যাদা কিংবা গৌরবময় ভবিষ্যতের হাতছানিকেও তিনি দেখলেন না। কূটনৈতিক দায়মুক্তির সুযোগে তিনি কারাবাস হয়তো এড়াতে পেরেছেন। কিন্তু তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখানোর কি কোনো বিন্দুমাত্র সুযোগ আছে? তরুণ কর্মকর্তা কাজ করতে গিয়ে বিধিবিধান সম্পর্কে ভুল করে বসলে ঊর্ধ্বতনেরা সে বিষয়টা হয়তো গৌণভাবে দেখেন। মৃদু তিরস্কারের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয় এ ধরনের ঘটনার। তবে আলোচিত ঘটনায় তা হওয়ার জো নেই। উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই কর্মকর্তার স্থায়ীকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। তবে এটাই যথেষ্ট নয়। একটি মুঠোফোনের মতো সামান্য বিষয়ে যিনি লোভ সামলাতে পারেন না, তিনি লবিংয়ের জোরে পার পেয়ে গেলে ভবিষ্যতে সংশোধন হয়ে যাবেন, এমনটা বিশ্বাস করার মতো কারণ নেই।
এরপর আসে সেই সহকারী কমিশনারের কথা। এটাও তো সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ। এতে তো চাকরিচ্যুতির মতো গুরুদণ্ডেরই বিধান রয়েছে। তদুপরি তিনি শিক্ষানবিশ। কাজটি করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে গিয়ে। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রসঙ্গ আলোচিত হতে থাকলে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ধার্যকৃত জরিমানা সরকারি কোষাগারে যথাযথভাবে জমা হয় কি না, এটা নিয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে। হয়তোবা সর্বত্রই তা নয়। খুব কম ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটতে পারে। তবে তা যে ঘটে, এটা তো দেখাই গেল। ভ্রাম্যমাণ আদালত একটি সংক্ষিপ্ত বিচারিক প্রক্রিয়া। শাসনব্যবস্থার সহায়ক হিসেবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে এটা পরিচালনা করা হয়। আইনত বাধা না থাকলেও শিক্ষানবিশ ম্যাজিস্ট্রেটদের এ কাজের দায়িত্ব বিশেষ প্রয়োজন না হলে না দেওয়াই সংগত। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন বলে আশা রইল। তাঁদের ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত তদারক করা আবশ্যক।
উল্লেখ্য, বাল্যবিবাহ রোধ, ইভ টিজিং, পরিবেশ বিপর্যয় রোধ, ভেজাল প্রতিরোধ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস চুরিসহ বেশ কিছু অপরাধ দমনেও ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কও রয়েছে। এই আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ খুবই সীমিত। তাই দণ্ড বিধান কিংবা এর মাত্রা সম্পর্কে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যথেষ্ট সংযম আশা করা অসংগত হবে না। অপরাধ তাঁদের সামনে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত হতে হবে। আর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে করতে হবে দোষ স্বীকার। এ দুটো বিষয়ে নিশ্চিত করেই ভ্রাম্যমাণ আদালত দণ্ড বিধান করতে পারেন।
নচেৎ সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করে তঁাকে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিতে হবে। সে জন্যই এ ধরনের বিচারকাজে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কিছুটা পরিপক্বতা আবশ্যক। এ বিবেচনাতেই শিক্ষানবিশ ম্যাজিস্ট্রেটদের এ দায়িত্ব দেওয়া যথাসম্ভব পরিহার করা সংগত। ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে উপরিউক্ত আলোচনা প্রাসঙ্গিক। তবে এই ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত জরিমানা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক স্বয়ং আত্মসাৎ যেকোনো বিবেচনায় গুরুতর অপরাধ। এটা তঁার অসদাচরণের শামিল। আগেই আলোচিত হয়েছে শিক্ষানবিশকালে কোনো কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করতে দীর্ঘ কোনো প্রক্রিয়ার আবশ্যকতা থাকে না। ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হলে অতি সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে তা করা যায়। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ নিশ্চয়ই অবগত আছে। তারা সুবিবেচনাপ্রসূত ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেবে, এমন প্রত্যাশা সংগত। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনও বিবেচনায় নিতে পারে। উল্লেখ্য, অধীনস্থ কর্মকর্তাদের অকারণ হয়রানি থেকে রক্ষা করা যেমন শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব, তেমনি তাঁদের অপরাধমূলক কাজের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করাও তাঁদের দায়িত্ব।
বেসামরিক চাকরিগুলোর প্রায় সব ক্ষেত্রেই আজ যে দুর্বলতা বিরাজ করছে, তার কারণ নানাবিধ। তবে এ ধরনের প্রমাণিত দুর্নীতিবাজদের কোনো না কোনো ফাঁকে দায়মুক্তি পাওয়া সেসব কারণের গুরুত্বপূর্ণ একটি, এমনটি বললে ভুল হবে না। এগুলো করতে করতে আমরা দেশের শাসনব্যবস্থাকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে ফেলেছি। যারা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের মর্যাদা আর সরকার ও ক্ষেত্রবিশেষে দেশের ভাবমূর্তি সম্পর্কে নিরাসক্ত থাকে, তাদের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য দেখানো কেবল অযৌক্তিক নয়, অন্যায্যও বটে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

কালো পতাকা, গাড়ি লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়ে খালেদার গতিরোধের চেষ্টাঃ কোন বাধাকে ভয় পাই না -খালেদা জিয়া

দ্বিতীয় দিনের মতো সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় নেমে আওয়ামী লীগ কর্মীদের বাধার মুখে পড়েন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। রাস্তায় তার গাড়ি বহরের গতিরোধ ও গাড়ি লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়া হয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কালো পতাকা প্রদর্শন করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বাধা পেলেও প্রায় পাঁচ ঘণ্টা নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন খালেদা জিয়া। এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন,  কোন বাধায় তিনি ভয় পান না। প্রচারে নেমে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। বিকাল চারটায় গুলশানের বাসা থেকে বের হয়ে উত্তরা, কুড়িল বিশ্বরোড, শাহজাদপুর এলাকায় গণসংযোগ করেন। তার গাড়িবহর গুলশান, বনানী, বিশ্ব রোড, খিলক্ষেত, বিমানবন্দর হয়ে উত্তরা জসিম উদদীন মোড়, ১ নম্বর সেক্টরের ৬ নম্বর সড়কে থামে। প্রচারণার  শুরুতেই ওই মোড়েই আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরের সামনে কালো পতাকা হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এরপর পুলিশ তাদের সরিয়ে নেয়। খালেদা জিয়ার গাড়িবহর ধীরে  ধীরে সামনে এগুতে থাকে। এরপর তিনি গাড়ি থেকে লন্ডন প্লাজায় প্রচারণা চালান। উত্তরার এসবি টাওয়ার, আমীর কমপ্লেক্স, রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের বিভিন্ন দোকানে উত্তরা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের পক্ষে লিফলেট বিতরণ করে ভোট চান। এসবি টাওয়ারের এক নারী বিক্রয় কর্মীকে খালেদা জিয়া বলেন,‘তাবিথ আউয়ালকে আপনারা ভোট দেবেন। আমরা নতুন প্রজন্মের প্রার্থী দিয়েছি।’ জবাবে নারী বিক্রয়কর্মী বলেন, ‘আমরা তাবিথ আউয়ালকে ভোট দেবো। কারণ আমরা পরিবর্তন চাই।’
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আজ রোববার বিকেলে
উত্তরায় তাবিথ আউয়ালের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালান
এরপর খালেদা জিয়া এস আর টাওয়ারের সামনে যান। এখানে গাড়িতে উপস্থিত শত শত নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। এসময় উৎসুক জনতার ভিড় বাড়তে দেখা যায়। সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে খালেদা জিয়া নর্থ টাওয়ারের নিচতলায় প্রচারণা চালান। সেখান থেকে সাড়ে ৬টার দিকে তার গাড়িবহর হাউজ বিল্ডিং মোড় দিয়ে ঘুরানোর সময় সেখানে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ৬০/৭০ জন নেতাকর্মী কালো পতাকা হাতে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিতে থাকে। এক পর্যায়ে খালেদা জিয়ার জিপের সামনে পুলিশের গাড়ির ওপর কালো পতাকাসহ লাঠি ছুড়ে মারে। এ সময় পুলিশ তৎপর হয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কর্মীরা পুলিশের গাড়ির সামনে এসে গতিরোধ করে স্লোগান দিতে থাকে। ওই সময় কয়েক শ’  নেতাকর্মী খালেদা জিয়ার গাড়ি ঘিরে এস্কট করে নানা স্লোগান দিয়ে নিরাপদে গাড়ি ঘুরিয়ে দেন। খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সামনে ছিল একদল কর্মীর মোটর এস্কট। খালেদার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীদেরও এ সময়ে বেগ পেতে দেখা যায়। এরপর বিএনপির চেয়ারপারসনের গাড়িবহর ধীরগতিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এগিয়ে যায়। এ সময় রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনকে তিনি হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। এরপর খালেদা জিয়ার গাড়িবহর খিলক্ষেত মোড়ে আসলে আওয়ামী লীগের গোটা পঞ্চাশেক নেতাকর্মী কালো পতাকা হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একই স্থানে বিএনপির বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানিয়ে স্লোগান দিতে দেখা যায়। এ সময় তিনি কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাইওভার হয়ে যমুনা ফিউচার পার্কে প্রবেশ করেন। মিনিট দশেক মার্কেটের নিচ তলায় বেশ কয়েকটি দোকানে প্রচারণা চালান। ওই মার্কেট থেকে বের হয়ে এরপর তিনি শাহজাদপুর সুবাস্তু নজর ভ্যালি মার্কেটে প্রবেশ করেন। নিচ তলায় প্রচারণাকালে সিকদার অপটিক্সের বিক্রয়কর্মী খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, সেনাবাহিনী মোতায়েন না করলে তো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, জনগণসহ সবাই সেনাবাহিনী চায়। সিটি নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য আমরা সেনাবাহিনী মোতায়েন চাই। কারণ সেনাবাহিনী ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। কিন্তু ভোটচুরি করবে বলে তারাই (আওয়ামী লীগ) সেনা মোতায়েন চায় না। এরপর মার্কেটের সামনে সাংবাদিকদের খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের বাধা সত্ত্বেও  নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। যেখানেই যাচ্ছি বিপুল মানুষের সমাগম হচ্ছে। এই জনসমাগম দেখে তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় আমাকে বাধা দিচ্ছে। সন্ত্রাস করছে। তবে আমি কোন বাধাকে ভয় পাই না।  জনগণ আমার সঙ্গে আছে, আমি নির্ভয়ে তাদের কাছে যেতে চাই। তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তিন সিটিতেই আমাদের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে। এরপর খালেদা জিয়া উত্তর বাড্ডা হয়ে আমেরিকান দূতাবাস মোড় ঘুরে শাহজাদপুর, নর্দ্দা, বিশ্বরোড ফ্লাইওভার, বনানী, গুলশান-২ হয়ে রাত ৯টার দিকে বাসায় ফিরেন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রচারণাকালে ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, মহিলা নেত্রী শিরিন সুলতানা, শ্যামা ওবায়েদ, সুলতানা রহমান প্রমুখ।

বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের গুপ্তচরবৃত্তি- তথ্য পায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ, ভারত

বাংলাদেশে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছে নিউজিল্যান্ড। দেশটির গভর্নমেন্ট কমিউনিকেশনস সিকিউরিটি ব্যুরো (জিসিএসবি) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে গোপন এ নজরদারি কার্যক্রম চালায়। মোবাইল যোগাযোগে আড়ি পাতার জন্য রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে বিশেষ এক স্থাপনা। এছাড়া তারা গোয়েন্দাগিরিতে প্রাপ্ত তথ্য আদান-প্রদান করেছে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সঙ্গে। অপরদিকে আবার র‌্যাবের নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও আড়ি পাতে সংস্থাটি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এনএসএ’র গোপন নজরদারি কার্যক্রম ফাঁস করে দেয়া অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেনের নতুন ফাঁস করা নথিতে উঠে এসেছে এসব তথ্য। এ নিয়ে নিউজিল্যান্ডের গণমাধ্যমগুলো গতকাল ছিল সরব। নিউজিল্যান্ডের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড মার্কিন সংবাদ ওয়েবসাইট দ্য ইন্টারসেপ্টের সঙ্গে যৌথভাবে ফাঁস হওয়া নতুন নথিপত্রগুলো বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন ছেপেছে। নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকা সত্ত্বেও নিউজিল্যান্ড গোপন নজরদারিতে প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য তাদের সঙ্গে আদান-প্রদান করেছে। এ নথিতে স্পষ্ট  হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট এ দেশটিতে জিসিএসবি তাদের ইলেক্ট্রনিক গোয়েন্দা অভিযান চালাতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাস বিরোধী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করার জন্য এ নজরদারি চালানো হয়। ২০০১ সালে ৯/১১ হামলার পর চালু করা হয় ওই নজরদারি ব্যবস্থা। বাংলাদেশে গোয়েন্দাগিরির বিষয়টি উঠে এসেছে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, এনএসএ’র এপ্রিল, ২০১৩’র এক রিপোর্টে। রিপোর্টের বিষয়বস্তু ছিল নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে এনএসএর পারস্পরিক সম্পর্ক। ‘এনএসএ-কে অংশীদাররা কি সরবরাহ করে’ (হোয়াট পার্টনার প্রোভাইডস টু এনএসএ) শীর্ষক একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘২০০৪ সাল থেকে বাংলাদেশ সন্ত্রাসবিরোধী টার্গেটের ওপর গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের জন্য নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকায় রয়েছে জিসিএসবি। সংস্থাটি বাংলাদেশ সন্ত্রাসবিরোধী বিষয়ক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংকেতিক গোয়েন্দা তথ্যসূত্র যারা মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের কাছে রিপোর্ট করে।’ জিসিএসবি সদস্যদের সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাসহ পাঠানো হয়েছে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে। বাংলাদেশী গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে নির্যাতন প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অবহেলা করা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ডের জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবাধিকার সংস্থাগুলো একাধিক রিপোর্ট নথিভুক্ত করেছে। এ যাবৎ কালে ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে বাংলাদেশে জিসিএসবির নজরদারি অভিযানের বিষয়টি সব থেকে আশ্চর্যজনক বলে হেরাল্ডের প্রতিবেদনে আখ্যা দেয়া হয়। নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান তেমনটা নেই বললে চলে। নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বলা আছে, ‘নিউজিল্যান্ড এবং বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ যদিও পারস্পরিক সম্পৃক্ততা সীমিত। তবে, নিউজিল্যান্ড সরকারের এক সূত্র হেরাল্ডকে জানিয়েছেন যে, জিসিএসবির চারটি বিশ্লেষণ বিভাগের একটির প্রধান মনোযোগ হলো বাংলাদেশ। আর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এমনটাই রয়েছে। বিভাগটিকে আইসিটি বলা হয় যা আন্তর্জাতিক অভিযান সংক্রান্ত ইস্যুগুলোর বিভাগ। ৯/১১ হামলার পর সন্ত্রাসী হুমকির বিষয়ে মনোযোগ দিতে ২০০২ সালের এপ্রিলে বিভাগটি স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ প্রকল্পটি ২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্কের অধীনে শুরু হয় বলে প্রতীয়মান হয়। ইরাকে মার্কিন অভিযানে যোগ দেয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার পর যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের বিষয়ে সে সময় ইতিবাচক মনোভাব ছিল তার সরকারের। ‘নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে এনএসএর সম্পর্ক’ শীর্ষক ওই নথিতে গোয়েন্দা তৎপরতা শুরুর সময় ২০০৪ উল্লেখ করা আছে। কিন্তু এনএসএর এক কর্মকর্তা ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে জিসিএসবি নিয়ে সংক্ষিপ্ত একটি নিবন্ধ লেখেন। সেখানে বলা হয়েছে, এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে বিশেষ করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে ইসলামি উগ্রপন্থিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে রির্পোট করার মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অবদান রেখেছে জিসিএসবি। ২০০৯ সালের আরেকটি গোয়েন্দা নথিতে কিভাবে বাংলাদেশে গোয়েন্দাগিরি হয়েছে তার বিস্তারিত দেয়া আছে। ওই নথিতে বলা হয়েছে, জিসিএসবির ‘ওসিআর’ নামক ইউনিটের একটি দল-  সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স ডেভেলপমেন্ট টিম ওই গোয়েন্দাগিরি পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত। জিসিএসপি সরাসরি নজরদারি করেনি বলে প্রতীয়মান হয়। এর পরিবর্তে তারা মিত্র একটি সংস্থার নজরদারি সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে। ২০০৯ সালের ওই নথিতে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থায় আড়ি পাতার জন্য রাজধানী ঢাকায় বিশেষ একটি স্থাপনা রয়েছে। উল্লেখ্য, গোপন একটি আড়ি পাতার স্থান লুকানোর জন্য নিউজিল্যান্ডের বাংলাদেশে কোন দূতাবাস বা অন্য কোন আনুষ্ঠানিক ভবন নেই। স্নোডেনের নথিতে ইঙ্গিত মেলে ঢাকা ইউনিটটি মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ভবনের ভেতরে অবস্থিত। সেখানের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করে এনএসএ এবং সিআইএ। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা এফ-৬ পরিবেশ জরিপের বর্ধিত অংশের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ জিএসএম (মোবাইল ফোন) যোগাযোগ সংগ্রহের কাজ অব্যাহত রয়েছে। এফ-৬ সংকেতটি ব্যবহার করা হয় স্পেশাল কালেকশন সার্ভিস নামক সিআইএ-এনএসএ যৌথ একটি ইউনিটের জন্য যারা মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেট থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থায় আড়ি পাতে। রিপোর্টে বলা হয়, মোবাইল ফোনে আড়ি পাতার ওই স্থাপনাটি বেশিরভাগ জিসিএসবি ব্যবহার করে। নিউজিল্যান্ডের গ্রিন পার্টির সহ-দলপতি রাসেল নরম্যান মনে করেন নিউজিল্যান্ডের উচিত বাংলাদেশকে গোয়েন্দা সহায়তা দেয়া বন্ধ করা। তিনি বলেন, জিসিএসপি নিউজিল্যান্ডকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থার সবগুলো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘতে জড়িত হয়েছে। কাজেই এটা নিশ্চিত করা অসম্ভব যে তাদের কাছে দেয়া তথ্য নিরপরাধ মানুষকে হত্যা বা নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। ২০১৩ সালের এনএসএ রিপোর্টে জানা গেছে জিসিএসবি তাদের বাংলাদেশে প্রাপ্ত তথ্য দিয়েছে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে। এতে বলা হয়, জিসিএসবির বাংলাদেশ সন্ত্রাসবিরোধী রিপোর্টে নতুন সব গোয়েন্দা সূত্র পাওয়া গেছে যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা, সিআইএ এবং ভারতকে গত এক বছরে সফল সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালাতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কোনটি তা সেখানে উল্লেখ করা হয়নি। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে বাংলাদেশের একাধিক সংস্থা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইনটেলিজেন্স (ডিজিএফআই), ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই) আর পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ। আর দেশটিতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করার ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় সংস্থা হলো র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাব। এসব সংস্থাগুলোর প্রতিটির বিরুদ্ধে কয়েক বছর ধরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে। উদাহরণস্বরূপ ২০০৮ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করে যে ঢাকার মগবাজারে স্পেশাল ব্রাঞ্চের সদর দপ্তরটি আটক ব্যক্তিদের নির্যাতনে ব্যবহার করা হয়। ২০১০ সালে একজন ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী অভিযোগ করেন যে, এনএসআই তাকে গ্রেপ্তার, নির্যাতন করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। দুবছর পর ওই কর্মীকে রহস্যময় পরিস্থিতিতে মৃত পাওয়া যায়। তার পা আর পায়ের আঙুল ছিল ভাঙা। সারা শরীরে ছিল নির্যাতনের চিহ্ন। বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আর প্রধান পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। সব থেকে উল্লেখযোগ্য হলো, টাস্কফোর্স ফর ইন্টেরোগেশন সেল নামক কুখ্যাত এক সেলের অংশ হিসেবে তারা একসঙ্গে কাজ করে। র‌্যাবের নিয়ন্ত্রণাধীন ঢাকার উত্তরে একটি ভবনের ভেতর তা অবস্থিত। ২০১১ সালে বৃটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকা প্রতিবেদন করে, ওই ইন্টেরোগেশন সেলকে ‘রাষ্ট্রের শত্রুদের কাছ থেকে তথ্য আর স্বীকারোক্তি বের করে নিতে ব্যবহার করা হয়েছিল। এটাকে একটি ‘টর্চার সেন্টার’ বলে উল্লেখ করা হয় যা আটক ব্যক্তিদের ওপর ‘ইচ্ছাকৃত এবং নিয়মতান্ত্রিক’ অন্যায় ব্যবহার চালানোর জন্য ব্যবহার করা হতো। ২০০৯ সালে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত অভিযোগে সেখানে আটক এক বৃটিশ নাগরিককে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ আসে। তার মুখ ঢেকে ও  চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে ডান কাঁধে ও মেরুদণ্ডের নিম্নভাগে ড্রিল চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য মতে বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষ অন্য যেসব নির্যাতনের পদ্ধতি ব্যবহার করে তার মধ্যে রয়েছে, এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া, আঙুলে পেরেক গেঁথে দেয়া, বৈদ্যুতিক শক দেয়া, লোহার রড দিয়ে পায়ে মারধর, পিঠে বালি ছড়িয়ে দিয়ে লাঠি দিয়ে প্রহার, বরফ দিয়ে নির্যাতন, আঙুল ছিদ্র করে দেয়া আর মৃত্যুদণ্ডের নকল মহড়া। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সরকার র‌্যাব সদস্যদের দ্বারা গর্হিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণ উল্লেখ করে র‌্যাবের জন্য তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। একই মাসে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। এতে দেশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও নিয়মবদ্ধ নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের নির্মম কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ আনা হয় যেসব অপরাধ মানবতা বিরোধী অপরাধের সামিল। এনএসএ নথি থেকে এটা স্পষ্ট হয়নি, বাংলাদেশকে দেয়া গোয়েন্দা তথ্য কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিয়ে কার্যকর কোন তত্ত্বাবধান ব্যবস্থা ছিল কি না। এসব তথ্য ব্যবহার করে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে কি না সে বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে নিউজিল্যান্ড নিশ্চয়তা চেয়েছে বা পেয়েছে কি না তাও স্পষ্ট নয়। তবে এতে এতটুকু স্পষ্ট হয়েছে যে, জিসিএসবি দ্বিমুখী পন্থা অবলম্বন করেছে। একদিকে তারা যেমন বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সঙ্গে গোয়েন্দা দিয়েছে। অপরদিকে তারা গোপনে র‌্যাবের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করেছে। ২০০৯ সালের একটি জিসিএসবি রিপোর্টে বলা হয়, এফ-৬ আড়ি পাতার ইউনিট র‌্যাব সদরদপ্তর থেকে বিভিন্ন র‌্যাব ইউটিটে তাদের নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় সফলভাবে আড়ি পাততে সক্ষম হয়। আর র‌্যাবের ওপর আড়ি পাতা সংগ্রহশালায় এমনকি র‌্যাব সদর দপ্তর ও র‌্যাব- সদরদপ্তরের একটি পরীক্ষামূলক ভিডিওকনফারেন্স। ওই রিপোর্টে র‌্যাবের অভ্যন্তরীণ ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলা এক র‌্যাব কর্মকর্তার আড়ি পাতা ছবিও সংযুক্ত ছিল। রিপোর্টে বলা হয়, ‘র‌্যাব অতীতেও জিসিএসবির জন্য একটি সক্রিয় টার্গেট ছিল। আর বাংলাদেশের স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির যদি অবনতি হয় তাহলে এ তথ্য ভবিষ্যৎ অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।’ নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের প্রতিবেদনে শেষে বলা হয়, বাংলাদেশে সন্ত্রাসী তৎপরতা ওই অঞ্চলের অনেক দেশের তুলনায় অনেক কম। দেশটি নিউজিল্যান্ড থেকে অনেক দূরে। আর জিসিএসবি এ কাজ যে নিউজিল্যান্ডের প্রতি সরাসরি কোন হুমকির জবাবে ছিল তেমন কোন ইঙ্গিতও নেই। এদিকে, রেডিও নিউজিল্যান্ডের খবরে বলা হয়েছে, দেশটির প্রধামনন্ত্রী জন কি জিসিএসবি’র বিরুদ্ধে নতুন এসব অভিযোগ নিয়ে কোন আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানান।

বিচারহীনতা ও নৈতিকতার অভাবে নারী লাঞ্ছনা ঘটছে -বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে অভিমত

অতীতের ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং নৈতিকতার অভাবে নারী লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটছে। এ ঘটনার জন্য শুধু নারীর পোশাককে দায়ী করলে হবে না। বরং পুরুষের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। তবে পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নারী লাঞ্ছনার ঘটনায় পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য সংবেদনশীল। এতে করে নাগরিকের মনে সংশয় তৈরি হবে। অপরাধী যেই হোক তাকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আজ রোববার দুপুরে রাজধানীতে বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে অংশ নেয়া প্যানেল আলোচক ও দর্শকেরা এ কথাগুলো বলেন।
আগের ঘটনার বিচার কি হয়েছিল? এবারের ঘটনার বিচার ও কি হবে?
বস্ত্রহরণরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল ছাত্রলীগ নেতা রাসেল ও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিত বিভাগের ছাত্র ছাত্রলীগ নেতা আলম
রাজধানীতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) মিলনায়তনে বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপের ১১৩তম পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্যানেল আলোচক ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, বাংলাদেশ অ্যালায়েন্স ফর উইমেন লিডারশিপ’র নির্বাহী পরিচালক নাসিম ফিরদৌস ও বাংলাদেশ পরিবেশবাদী আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন।
অনুষ্ঠানে এক দর্শক প্রশ্ন তোলেন- পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষের দিনে প্রকাশ্যে নারীদের লাঞ্ছনার সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার কি হবে?
এমন প্রশ্নের জবাবে গওহর রিজভী বলেন, এখানে সরকার কোনো ছাড় দেবে না। এ ধরনের ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়। এদের আইনের সামনে আনতে তথ্য প্রমাণ করতে হয়। এ জন্য কিছু সময় লাগবে। এর পাশাপাশি আমাদের নাগরিকদেরও কিছু করার আছে। আমরা যদি এর প্রতিবাদে সক্রিয় অংশ না নেই, তবে এ ধরনের ঘটনা সব সময়ই ঘটতে থাকবে। এ ঘটনায় পুলিশ যদি সত্যিই নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নেয় তবে সে বিচারও করতে হবে বলেন তিনি। এ নিয়ে ধৈর্য্য ধরতে বলেন তিনি।
এ সময় এক দর্শক মন্তব্য করেন- অতীতে থার্টি ফার্স্ট নাইটে বাঁধন নামে এক নারীর বস্ত্রহরণ হয়েছিল। ওই ঘটনার বিচার হয়নি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের এক নেতা ধর্ষণের সেঞ্চুরি করেছিলেন। তারও বিচার হয়নি। এসব ঘটনার জন্য প্রশাসনই দায়ী।
ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, নারী লাঞ্ছনার বিষয়টি অত্যন্ত গর্হিত কাজ এবং জঘন্য অপরাধ। এ নিয়ে পুলিশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য দু:খজনক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জড়িতরা কোমরের জোরে দোষ করে পার পেয়ে যায়।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বিচারের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য সংবেদনশীল। বিচার না হতে পারে, তবে বিচারের দাবি থেকে সরে আসা যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসি সহ আরো অনেক স্থানে নারীকে
বিবস্ত্র করে যৌন নির্যাতন করা হয়। হরণ করা হয় নারীর সতীত্বকে।
বর্ষবরণের নামে যা করা হয়েছে তার দায়ভার কে নেবে? এভাবে
বাংলা উৎসব গুলি বা নববর্ষতে যদি নারীর শ্লীনতাহানি,
নারীর প্রতি পাশবিক অত্যাচার,নববর্ষ মানে যদি হয়
আমার দেশের ধর্ষিতা মা-বোনদের করুন আর্তনাদ!
নাসিম ফিরদৌস বলেন, আমাদের সচেতনতার অভাব কেনো? নারীকে তার স্বাধীনতা দিতেই হবে। তবে, এখানে প্রশাসনের যে দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা আমরা কখনোই আশা করি না। অতীতের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আরেক দর্শক প্রশ্ন করেন- যৌন হয়রানীর জন্য নারীর পোশাককে দায়ী করার সংস্কৃতির শেষ কোথায়? জবাবে নাসিম ফিরদৌস বলেন, নারী কিন্তু নিজেই শালীনতা বজায় রাখতে চায়। তবে নারীদের পোশাককে দায়ী করা বন্ধ করার জন্য ঘরে থেকে পুরুষদের বুঝাতে হবে। নারীর পোশাক নিয়ে কথা বলা হচ্ছে নারীর ওপর আঘাত।
ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, নারীর পোষাককে দায়ী করা মানে ঘটনাকে এড়িয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা। অস্থির রাজনীতি ও নৈতিকতার অভাবে এসব ঘটনা ঘটছে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে নারীর পোষাককে দায়ী করা হচ্ছে। কে কী পোশাক পড়বে তা না শিখে, পুরুষ কিভাবে দৃষ্টি দিবে তা শিক্ষার দরকার। মূলত বিচারহীনতা এবং নৈতিকতার অভাবে নারী লাঞ্ছনা ঘটছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তৃতীয় প্রশ্ন ছিলো- মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ফাঁসির রায় কার্যকর না করতে জাতিসংঘসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ আহবান জানিয়েছে। বাংলাদেশের কি উচিত এসব পরামর্শ বিবেচনা করা?
জবাবে নাসিম ফিরদৌস বলে, সবচেয়ে উচ্চ আদালত ফাঁসির রায় দিয়েছে। বাইরে থেকে যেসব প্রতিক্রিয়া আসে সেটা শোনা ছাড়া আর কিছু করার নেই। দেশের নাগরিক কি চায় তা বুঝতে হবে।
ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, তারা তাদের মতামত ব্যক্ত করেছে। আমাদের দেশের আইন আমরা পালন করবে। আইন যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কি না তা ভাবতে হবে। তবে বহির্বিশ্বের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এলে, আইন আমরা রাখবো কিনা সেটা দেখতে হবে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, কোনো সংগঠন বলতেই পারে, বিবেচনায়ও নেয়া যেতে পারে, তবে আমাদের দেশের আইন আমরা পালন করবো।
গওহর রিজভী বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, আমাদের আইন আমরা পালন করবো। এখানে কিছুটা হিপোক্রেসি আছে। যারা নিজেরা ফাঁসি দেয় আর অন্যদেরকে বলে ফাঁসি না দিতে তাদের কথা গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই।
অনুষ্ঠানে চতুর্থ প্রশ্ন ছিলো- ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন কি সবার জন্য সমান সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছে?
ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, কিছু প্রার্থী অভিযোগ করছে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকছে না। ভয়-ভীতি শঙ্কার উর্দ্ধে উঠে, নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে যে, সবাই যেন নির্বিঘ্নে অংশ নিতে পারে।
নাসিম ফিরদৌস বলেন, সমান সুবিধা নেই এমন কথা গণমাধ্যমের মাধ্যমে বলে লাভ নেই। অভিযোগ করার একটি পদ্ধতি আছে। সেভাবে করতে হবে। তবে এবারে সত্যিকারের নির্বাচন হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগের স্তূপের কথা শোনা যাচ্ছে। আইন আচমকা জোরে চলা শুরু করলে একটু সমস্যা হয়। কিছু বিষয় যেগুলো নির্বাচন কমিশন বলবে, সেগুলো মন্ত্রীদের কাছ থেকে শুনতে পাই। যেমন নির্বাচনে সেনাবাহিনী থাকবে কি না?
গওহর রিজভী বলেন, নির্বাচন কমিশনকে সরকার থেকে পৃথক করতে হবে। নির্বাচন কমিশন নিজে তার ক্ষমতা ব্যবহার না করলে সেটা দেখার দায়িত্ব সরকারের না।

সংবিধান সমুন্নত রাখতে হবে by কুলদীপ নায়ার

জোর করে হোক আর সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে হোক
পূণরায় হিন্দু বানানো হবে: RSS নেতা মোহন ভগবত
নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বেড়ে গেছে। যদিও তিনি সব ধর্মের জন্য প্রযোজ্য অভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছেন, তবু নানা ক্ষেত্রেই সংকীর্ণতার নোংরা দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি। একমাত্র বিচার বিভাগই এই দূষণ থেকে মুক্ত রয়েছে। তথাপি সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক কুরিয়ান জোসেফ যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন, তা আসলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরই ক্ষোভের বিস্ফোরণ।
কুরিয়ান জোসেফ যা বলেছেন, তার কোনো ব্যতিক্রম হতে পারে না: ‘ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব আমাদের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধে প্রাণ সঞ্চার করেছে। সারা বিশ্ব ঈর্ষাভরে আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং সাংস্কৃতিক ঐক্য ও অখণ্ডতার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই কঠিন সময়ে ভারতকে অবশ্যই তার এই সদ্গুণগুলো রক্ষা করতে হবে, অন্য জাতির মডেল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’
যদিও আমি মনে করি, বিচারকদের সম্মেলনের দিনক্ষণ পরিবর্তন করে গুড ফ্রাইডের দিন ফেলায় কুরিয়ান জোসেফ কিছুটা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ভারতের প্রধান বিচারপতি এইচ এল দত্ত অত্যন্ত সততার সঙ্গেই বিশ্বাস করেন, দীর্ঘ ছুটির কারণে আদালতের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় তিনি এই দীর্ঘ ছুটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। ফলে গুড ফ্রাইডের দিন বিভিন্ন রাজ্যের উচ্চ আদালতের বিচারকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি খ্রিষ্টান বিচারক ও সম্প্রদায়ের সংবেদনশীলতা তিনি ঠিকঠাক ঠাহর করতে পারেননি।
আর ব্যাপারটা এমনও নয় যে গুড ফ্রাইডের দিন এই প্রথম বিচারকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। কিন্তু তখন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে বৈষম্যের অনুভূতি এতটা প্রখর ছিল না। কিন্তু বিজেপি যেভাবে খোলাখুলি হিন্দুত্বের প্রচারণায় নেমেছে, তাতে বহুত্ববাদের আবহ অনেকাংশেই বিঘ্নিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই যে হাওয়ায় আমরা নিশ্বাস নিচ্ছি।
ভারতের জনগণ লোকসভায় বিজেপিকে চূড়ান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে, এটা সত্য। এতে বোঝা যায়, জনগণের চিন্তাধারায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। এই জনগণই কিছুদিন আগেও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে এটা মনে রাখতে হবে, সংবিধানের মৌল কাঠামো সর্বোচ্চ আদালত নির্ধারণ করেছেন, এটা পরিবর্তন করা যাবে না। এই কাঠামোর একটি অংশ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা, এই বৈশিষ্ট্য আমাদের সংবিধানকে প্রাণ দিয়েছে।
চরমপন্থীরা আমাদের জাতিসত্তার মৌল বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনে নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে, বিচার বিভাগের কাছে এটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর ব্যাপার হওয়া উচিত। ঘর ওয়াপসি (পুনরায় হিন্দু হওয়া) স্লোগানটি বানানোই হয়েছে বহুত্ববাদের গোড়ায় কুড়াল মারার জন্য। আবার হরিয়ানার স্কুলের কারিকুলামে গীতা যুক্ত করা হয়েছে।
লক্ষাধিক মুসলিম ও খ্রিস্টানকে ধর্মান্তরিত করবে আরএসএস
দিল্লি, মুম্বাইয়ের নাওয়াই ও মধ্যপ্রদেশের জাবালপুরে গির্জায় হামলা চালানো হয়েছে। হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রে গো-মাংসে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এদিকে অনেক স্তুতিবাক্যের পর মোদি শেষমেশ গির্জায় হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। কিন্তু জনমনে সাধারণ ধারণা হচ্ছে, দেশে যে নরমপন্থী হিন্দুত্ব ছড়িয়ে পড়ছে, তিনি তার বিরুদ্ধে নন।
বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর অবস্থা আরও করুণ, কারণ সেগুলো জাতীয় পরিসরে আলোচনার বিষয়বস্তু নয়, এদের সম্বন্ধে মানুষের আকর্ষণও কম। যেকোনোভাবেই হোক, এসব রাজ্য হিন্দুত্ববাদী সংকীর্ণতার দ্বীপে পরিণত হয়েছে। অনেক মুসলিমকেই আমি বলতে শুনেছি, তারা জান আউর মাল (জীবন ও সম্পদ) সম্পর্কে ভীত।
আরএসএস নেতারা দিব্যি বহাল তবিয়তেই আছেন। এমনকি বিজেপির উদার মানুষেরাও নীরব আছেন। বিজেপি হয়তো চায় হিন্দুত্ববাদের জয়জয়কার হোক। কিন্তু এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে তারা মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করতে চায়, এটা সংবিধানের মৌলিক বিচ্যুতি। সংবিধানমতে, আইনের চোখে সবাই সমান, এক মানুষের এক ভোট।
রাষ্ট্রীয় স্ময়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত
মোদি সরকারকে এটা নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে সাম্প্রদায়িক হয়ে না যায়। কারণ, তারাই বেশির ভাগ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। বিশেষ করে, বিচার বিভাগের দিকে কেউ আঙুল তুলুক, সেটা নিশ্চয়ই তারা চাইবে না। এদিকে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, ‘পাঁচ তারকা কর্মীরা’ আদালত পরিচালনা করছেন, এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
ভারতের প্রধান বিচারপতি এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে সঠিকভাবেই বলেছেন, বিচার বিভাগ ও সংসদ ভাইবোনের মতো। ‘প্রকৃত অর্থে কার্যকর বিচার প্রশাসন’ নিশ্চিত করতে তাদের একত্রে কাজ করতে হবে। বিচার বিভাগ ও সংসদ উভয়েই গণতন্ত্রের সন্তান। ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে তাদের হাতে হাত রেখে কাজ করতে হবে। একজন ভুল করলে আরেকজনকে তা শুধরে দিতে হবে।
কিন্তু কর্মীদের চাপে আদালতের রায় প্রভাবিত হয়—এমন ধারণা দূর করা দরকার। ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিটি বিচারক নিয়োগের কলেজিয়াম ব্যবস্থা দূর করবে, এমনটা আশা করা হচ্ছে, যাতে বিচারক নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় নির্বাহী বিভাগ আরও অধিকহারে যুক্ত হয়। একসময় তা ছিলও বটে। কিন্তু দেখা গেল যে বিচারক নিয়োগ ও বদলির প্রক্রিয়ায় সরকারের হস্তক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ফলে ব্যাপারটা পুরোপুরি বিচারকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ভারত হিন্দু রাষ্ট্র, হিন্দুত্বই পরিচয়, ফের ঝড় তুললেন ভাগবত
তার পরও কলেজিয়াম ও নির্বাহী বিভাগ উভয়েই বিচারক নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। সে কারণে আইন কমিশনকে আরও ভাবতে হবে, কীভাবে বিচার বিভাগকে যেকোনো প্রভাবের বাইরে রাখা যায়। আর নির্বাহী বিভাগ কী বলে, তা-ও আমলে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবেই বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের সংবেদনশীলতা আমলে নেওয়া হয়, কারণ তারা উভয়েই জনগণের প্রতিনিধি।
উদাহরণস্বরূপ, যেকোনো সিদ্ধান্তের কারণ জানার ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এটা দাপ্তরিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা এনেছে, গণতন্ত্রকে গভীরতর করেছে। সত্য প্রকাশিত হলে সরকার হয়তো বিব্রত হতে পারে। কিন্তু একটি উন্মুক্ত সমাজের দাবির প্রসঙ্গে আপস হতে পারে না।
এ পর্যন্ত বিবেচনা করলে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিরীক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁকে বুঝতে হবে, সরকারি কর্মচারীরা তাদের কাজ করে। অনেক দুর্নীতির তদন্তের প্রতিবেদনই আলোর মুখ দেখত, যদি সেগুলোয় দাপ্তরিক সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করা না হতো।
মোদি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগকেও নির্বাহী বিভাগের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন থাকতে হবে। সময়-সময় নানা নীতি প্রণয়ন করা তাদের অধিকার। শেষ বিচারে উভয়কেই সংবিধানের সীমা অনুসারে কাজ করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।