Friday, December 25, 2015

গ্রেনেডের উপকরণ আসছে দেশের বাইরে থেকে by গোলাম মর্তুজা

নিষ্ক্রিয় করার পরে একটি গ্রেনেডের
খোল দেখাচ্ছেন এক কর্মকর্তা। ছবি: প্রথম আলো
পাইপ কেটে ঘরে বসেই জঙ্গিরা তৈরি করছিল হাতে তৈরি গ্রেনেড। মোটা দাগে গ্রেনেডের মূল পাঁচটি অংশ বা উপকরণ। এর তিনটিই এ দেশে পাওয়া যায় না। দেশের বাইরে থেকে এসব উপাদান জঙ্গিরা সংগ্রহ করছে বলে পুলিশের বোমা বিশেষজ্ঞরা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর-১ এর এ ব্লকের নয় নম্বর সড়কের একটি ছয়তলা বাড়িতে দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে ছয়জনসহ মোট সাতজনকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ওই বাড়ি থেকে ১৬টি হাতে তৈরি গ্রেনেড ও দুটি ককটেল উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়। বাড়িটি থেকে প্রচুর হাতে তৈরি গ্রেনেডের উপকরণ উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, পানির ধাতব (জিআই) পাইপের খোল কেটে মূলত গ্রেনেডের খোল বা বডি তৈরি করছিল। এর ভেতরে বিস্ফোরক ঢুকিয়ে আনুষঙ্গিক বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ভরে তৈরি হচ্ছিল গ্রেনেড। ওই বাড়িতে যে পরিমাণ গ্রেনেড তৈরির সরঞ্জাম মজুত করা হয়েছে তা দিয়ে অন্তত দুশোটি গ্রেনেড তৈরি সম্ভব।
কয়েকজন উর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, মোটা দাগে গ্রেনেডের পাঁচটি অংশ। এগুলো হলো খোল, বিস্ফোরক, সার্কিট, প্রেশার রিলিজ সুইচ ও পিন। স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত পাইপ কেটে খোল তৈরি হয়। কয়েক ধরনের বিস্ফোরকও খোলা বাজারেও পাওয়া যায়। তবে এদের ব্যবহৃত বিস্ফোরকগুলো দেশের বাইরেও থেকে আনা বলে মনে হচ্ছে। তবে ব্যবহৃত সার্কিট ও প্রেশার রিলিজ সুইচগুলোও এ দেশে পাওয়া যায় না। সুইচ খোলার পিন এখন জঙ্গিরা নিজেরাই বানাচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানান। পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলোর পিন স্থানীয়ভাবেই ঝালাই করে তৈরি করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলেন, এর আগে একই রকম গ্রেনেড উদ্ধারের পরে জঙ্গিরা জানিয়েছিল নিজেদের জঙ্গি নেটওয়ার্কে পাশের একটি দেশ থেকে তারা এসব সার্কিট ও প্রেশার রিলিজ সুইচ সংগ্রহ করছেন। আগে বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা গ্রেনেডেও একই ধরনের সার্কিট ও প্রেশার রিলিজ সুইচ ব্যবহার করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, গতকাল মিরপুর থেকে উদ্ধার করা প্রতিটি গ্রেনেডে একটি করে নম্বর বসানো ছিল। এসব গ্রেনেড দিয়ে জঙ্গিরা রাজধানী ও এর আশপাশে গির্জায় ও মাজারে হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করলে সবকিছু জানা যাবে।
এই ঘটনায় আজ রাজধানীর শাহ আলী থানায় ৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নম্বর ৩৬।

লাহোরে শরিফকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন মোদি

আকস্মিক লাহোরে নেমে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালের ভারতের নরেন্দ্র মোদি। কাবুল থেকে ভারত ফেরার আগে এই ঘটনা ঘটিয়ে গোটা বিশ্বকে চমকে দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি। নওয়াজের লাহোরের বাসভবনে দুই নেতা বৈঠকও করেছেন। এতে করে উপমহাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলেও অনেকে মনে করছেন।
শুক্রবার কাবুল থেকেই আচমকা ঘোষণা করলেন, সরাসরি দিল্লি নয়, ফিরবেন লাহোর হয়ে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন শুক্রবার। শরিফকে এই বিশেষ দিনের শুভেচ্ছা জানাতেই লাহোর বিমানবন্দরের রানওয়ে ছোঁয় মোদির বিমান।
নওয়াজ শরিফের এ দিন ৬৬ বছর বয়স হলো। সকালেই মোদি ফোন করে নওয়াজকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। তার পর কাবুলে ঠাসা কর্মসূচি ছিল তার। আফগান পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় পাকিস্তানের উদ্দেশে নাম না করে কড়া বার্তাও দেন মোদি। আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক অনেকে চায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভাষণ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নরেন্দ্র মোদর টুইট, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে কথা বললাম, তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালাম।’’ এই টুইটের এক মিনিট পরই আবার টুইট করেন মোদি। লেখেন, ‘‘আজ বিকেলে লাহোরে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দিল্লি ফেরার পথে আমি সেখানে নামব।’’
জন্মদিন উপলক্ষে পরিবারের সঙ্গেই রয়েছেন নওয়াজ। ইসলামাবাদ ছেড়ে তিনি এ দিন পৈতৃক বাড়ি লাহোরে ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদির এটাই প্রথম পাকিস্তান সফর। শুধু তাই নয়, ১২ বছর পর কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পা রাখছেন পাকিস্তানের মাটিতে। ২০১৬-তে মোদির পাকিস্তান সফর নির্ধারিত হয়েছিল আগেই। তবে তার আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বিমান পাক বিমানবন্দরের রানওয়েতে নামলেন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। টুইটারে সুষমা লেখেন, ‘‘এই হলো প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক। প্রতিবেশীদের সঙ্গে এই রকমই সম্পর্ক হওয়া উচিত।’’
তবে কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। মোদি ভারতের পররাষ্টনীতিকে হাস্যকর করে তুলছেন বলে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মণীশ তিওয়ারি মন্তব্য করেন।

নৃশংসভাবে সাংবাদিককে হত্যা

রংপুরে গতকাল বৃহস্পতিবার মসিউর রহমান ওরফে উৎস নামের এক সাংবাদিকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মাথা থেঁতলে যাওয়া লাশটি মহাসড়কের পাশে একটি গাছে বাঁধা ছিল। আঘাতের চিহ্ন রয়েছে ঘাড় ও পিঠের বিভিন্ন স্থানে।
পুলিশ বলছে, হাতুড়ি বা এ-জাতীয় ভারী বস্তু দিয়ে পিটিয়ে মসিউরকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। মাদক ব্যবসা নিয়ে লেখালেখির কারণে তিনি খুন হয়ে থাকতে পারেন বলে পুলিশ ও সহকর্মীদের ধারণা। স্থানীয় সাংবাদিকেরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
৩২ বছর বয়সী মসিউর রহমান রংপুর শহরের পীরপুর এলাকার শামসুল হুদা মণ্ডলের ছেলে। তাঁর স্ত্রী ও দেড় বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। তিনি স্থানীয় যুগের আলো পত্রিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ছিলেন। প্রায় দুই বছর আগে পত্রিকাটিতে যোগ দেন মসিউর। এর আগে ২০০৭ সালে দৈনিক পরিবেশ নামে আরেক স্থানীয় পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা শুরু। তিনি উৎস রহমান নামে লিখতেন।
পুলিশ ও সহকর্মী সূত্রে জানা যায়, মসিউর একটি দাওয়াতের কথা বলে গত বুধবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে পত্রিকা কার্যালয় থেকে মোটরসাইকেলযোগে বের হন। তিনি এক ঘণ্টার জন্য বেরোনোর কথা বললেও পরে আর ফেরেননি। কর্মস্থল ও পরিবারের পক্ষ থেকে রাতভর খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান মেলেনি। পরে গতকাল সকাল সাড়ে আটটার দিকে শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কাছে শেখপাড়া এলাকায় মসিউরের লাশ পাওয়া যায়। গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বাঁধা লাশ দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেন। এরপর পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। থানায় লাশটি শনাক্ত করেন স্ত্রী তহমিনা বেগম।
থানায় শোকে মুহ্যমান তহমিনা বলছিলেন, ‘আমার সন্তান আর কাকে বাবা বলে ডাকবে। আমি কাকে নিয়ে বাঁচব।’ নিহত সাংবাদিকের বাবা শামসুল হুদা বলেন, ‘মানুষ এভাবে মানুষকে খুন করতে পারে! আমার ছেলের মাথা থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। আমি আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই।’
কী কারণে এই নৃশংস খুন, তা বুঝে উঠতে পারছে না পরিবারটি। সহকর্মীরাও অন্ধকারে। যুগের আলো পত্রিকার বার্তা সম্পাদক আবু তালেব বলেন, ‘কী কারণে মসিউরকে হত্যা করা হলো, তা ভেবে উঠতে পারছি না। তবে অতিসম্প্রতি তিনি মাদক-সংক্রান্ত কয়েকটি প্রতিবেদন করেছিলেন। এর পর থেকে কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন মসিউর।’ প্রসঙ্গত, গতকালও যুগের আলো পত্রিকায় মাদক নিয়ে তাঁর লেখা একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
রংপুরের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল কাদের জিলানী বলেন, পুলিশ গাছে বাঁধা অবস্থায় মসিউরের লাশ উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গতকাল সন্ধ্যায় মসিউরের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। রাত আটটায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এশার নামাজের পর পীরপুর জামে মসজিদে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে লাশ দাফনের প্রস্তুতি চলছিল।
আন্দোলনে সাংবাদিকেরা: এদিকে সাংবাদিক মসিউর হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন রংপুরের সাংবাদিকেরা। গতকাল বিকেল চারটায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের প্রধান সড়কে সিটি প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে মানববন্ধন করা হয়। এ সময় বক্তব্য দেন একুশে টিভির সাংবাদিক লিয়াকত আলী, এনটিভির মইনুল ইসলাম, যুগের আলোর আফজাল হোসেন প্রমুখ। বক্তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন তাঁরা।
এ ছাড়া রংপুর জেলা ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন গতকাল থেকে তিন দিনব্যাপী কালো ব্যাজ ধারণ কর্মসূচি শুরু করেছে বলে সংগঠনের সভাপতি জাহিদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন। আর রংপুরের সাংবাদিক সমাজ কাল শনিবার রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে। প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আলী আশরাফ এ তথ্য জানিয়েছেন।

বার্মিংহামের প্রাচীন কোরআন ‘প্রথম খলিফা আবু বকর (রাঃ) এর’

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে খুঁজে পাওয়া প্রাচীন কোরআনের পাতা দুইটি খুব সম্ভবত প্রথমবারের মত সম্পূর্ণরুপে সংকলিত কোরআনের অংশ। যেটি প্রথম খলিফা আবু বকর (রাঃ) এর ছিল বলেই ধারণা বিশেষজ্ঞদের। গত জুলাইয়ে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় কোরআনের সবচেয়ে প্রাচীন সংস্করণের কিছু অংশ পাওয়া যায়। হাতে  লেখা ওই পা-ুলিপিটির রেডিওকার্বন পরীক্ষার পর সেটি কমপক্ষে ১ হাজার ৩শ ৭০ বছর আগে লেখা হয়েছিল বলে জানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাদের এ দাবি বিশ্বজুড়ে  তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। অনেকে দাবির সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু এখন মধ্যপ্রাচ্য সূত্রও বিশ্ববিদ্যালয়টির দাবিকে সমর্থন করছে। ওই সূত্রের দাবি, মহানবী হজরত মোহাম্মদের (সা.) সঙ্গী খলিফা আবু বকর কোরআনের প্রথম যে সংস্করণটি সংকলন করেছিলেন, ওই পাতা দুইটি তার অংশ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম ইসলামিক স্টাডিজ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল বিন হুয়ারেব বলেন, এত প্রাচীন পান্ডুলিপি খুব কম মানুষই লিপিবদ্ধ করতে পারে। এর মধ্যে খলিফা আবু বকরই এটি লিপিবদ্ধ করে থাকতে পারেন বলে জানিয়েছে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকা। মহানবীর পরিবারের বাইরে আবু বকরেরই প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা এবং প্রথম খলিফা হওয়ার ইতিহাস সর্বজনবিদিত। বিন হুয়ারেব বলেন, এ কোরআন আবু বকরের বলেই তার বিশ্বাস। কোরআনের ওই সংস্করণ একসময় মিশরের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ আমর ইবন আল-আস এ ছিল বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া, প্যারিসের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত কোরআনের প্রচীনতম পাা-ুলপির সঙ্গেও বার্মিংহামে খুঁজে পাওয়া পা-ুলিপির নির্ভুলভাবে মিলে গেছে। ফ্রান্সের অধ্যাপক ও গবেষক ফ্রাঁসোয়া দোহশ কোরআনের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, প্যারিসে সংরক্ষিত অংশগুলো যে কোরআনের, বার্মিংহামের পাত দুটিও সেই একই কোরআনের অংশ। বার্র্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর লেখা কিছু বইয়ের সঙ্গে কোরআনের ওই পাতা দুইটি পড়ে ছিল। পিএইচডি গবেষক আলবে ফেডেলি পাতা দুইটি খুঁজে পান এবং  রেডিওকার্বন পরীক্ষার জন্য পাঠান। তিনি নিশ্চিত করে বলেন, বার্মিংহামে খুঁজে পাওয়া পাতা দুইটি সঙ্গে প্যারিসে সংরক্ষিত প্রাচীনতম কোরআনের অংশের পুরোপরি মিল রয়েছে। ফ্রান্সের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত কোরআনের প্রাচীনতম পা-ুলিপির অংশটি সেখানে আনেন কুটনীতিক অ্যাসলাঁ দ্যু শেহভিল। ১৯ শতকের প্রথম দিকে মিশরের উপরাষ্ট্রদূত ছিলেন তিনি। ওই সময় মিশর নেপোলিয়নের সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অধ্যাপক দোহশ বলেন, খুব সম্ভবত ১৮২০ সালের দিকে শেহভিলের বিধবা স্ত্রী তার কাছে থাকা কোরআনের অংশ এবং অন্যান্য প্রাচীন ইসলামিক পা-ুলিপি যুক্তরাজ্যের গ্রন্থাগারে বিক্রি করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলো ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের হাতে পড়ে এবং তারপর থেকে সেগুলো সেখানেই রয়েছে। ১৯ শতকে কায়রোর জাতীয় গ্রন্থাগার থেকে প্রাচীনতম কোরআনের পা-ুলিপিগুলো আমর ইবন আল-আস মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয় বলেও জানান তিনি। নিশ্চয়ই এসব করতে গিয়ে পা-ুলিপির কিছু অংশ বেহাত হয়েছে এবং সেগুলো প্রাচীন জিনিস কেনাবেচার বাজারে গিয়ে পড়েছে। ১৯২০ সাল নাগাদ সেগুলো কয়েকবার হাত বদল হয়েছে। পরে সেগুলো ইরাকের আলফন্স মিঁগানার হাতে পড়ে। যিনি সেগুলো বার্মিংহামে নেন। অধ্যাপক দোশেহ বলেন, নিশ্চিতভাবেই এই হাত বদলের কোন রেকর্ড নেই। থাকার কথাও না। বার্মিংহামে খুঁজে পাওয়া পাতা দুইটির রেডিওকার্বন পরীক্ষায় দেখা গেছে, সেগুলো লেখার সময়কাল ৫৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) মৃত্যু হয় ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে। খলিফা আবু বকরের শাসনকাল ছিল ৬৩২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এখন পর্যন্ত পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া না গেলেও বেশির ভাগ কোরআন বিশেষজ্ঞ একে খলিফা আবু বকরের সংকলিত কোরআনের প্রথম সংস্করণ বলেই মনে করছেন।

এক যে ছিল ফেসবুক by পিয়াস মজিদ

শায়লা আর রিমনের কথা হতো ফেসবুকে। এতটাই হতো যে আগেকার দিনে হলে এতবার প্রত্যক্ষ দেখাসাক্ষাৎ করে করে হয়তো কুলিয়েও উঠতে পারত না তারা। ফেসবুকে পরিচিত হয়ে নিজেদের ভালোলাগা-মন্দলাগা চ্যাটে কয়েক সপ্তাহ শেয়ার করতে করতে তাদের অবস্থা এমন যে এর মধ্যে কেউ কারও ফোন নম্বরটা নিতেও ভুলে গিয়েছিল। এই ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগটা ‘প্রেম’ নামক পরিণতির দিকেই যাচ্ছিল হয়তো। জাকারবার্গ মহাশয় তাঁর ফেসবুক-কেরামতির দ্বারা শায়লা আর রিমনের দ্বিধাথরথর চূড়াকে যেন সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার মতোই সাতটি অমরাবতীতে প্রায় ভর করিয়েই ফেলেছিল। বেঁচে থাকুন মার্ক জাকারবার্গ, বেঁচে রহো ফেসবুক। এদিকে যেদিন ওরা দুজনেই ভাবছে কথাকে দেখায় রূপ দেবে, সেদিনই হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল ফেসবুক! দুজনের কারও কাছেই কারোর মোবাইল নম্বর নেই যে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। এমন নয় যে সম্ভাব্য প্রেমটা চিরতরে মুছে গেল। কিন্তু যেখানে এক মিনিটও শায়লা আর রিমন চ্যাটে কথা না বলে থাকতে পারত না, সেখানে অবশ্যই একটা ফেসবুকজনিত শূন্যতা তৈরি হলো। ফেসবুক নিশ্চয়ই আবার চালু হবে। ততক্ষণে শায়লা আর রিমনের মনে দুজনের জন্য তৈরি হলো আকুলিবিকুলি। এত দিন যেন এই অনুভূতিটাই গাঢ় হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু মুহুর্মুহু এফবি ম্যাসেজ বিনিময় হওয়ায় সেই সুযোগ ছিল না। যাক, তবে ফেসবুক সামান্য বন্ধের কল্যাণে শায়লা আর রিমনের দেখা হওয়ার আগে একটা বাঞ্ছিত নীরবতার অবকাশ তো পাওয়া গেল। তারা তাদের প্রেমের প্রস্তুতিতে থাকার সুযোগে ফেসবুকও একটু বিশ্রাম নিয়ে নিল যেন।
দুই.
বন্ধুমহলে শর্মির নাম ‘সেলফিশর্মি’। অফিশিয়াল কিংবা পারিবারিক যে অনুষ্ঠানই হোক, সবার আগে তার সেলফি তোলা চাই। কদিন আগে বন্ধুরা মিলে কক্সবাজারে গেল ঘুরতে। ইরা, পিঙ্কি, মেঘলা—সবাই ঝিনুক কুড়াচ্ছিল সাগরবেলায়। সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করেই সমুদ্রের নানা বিভঙ্গে নিজেকে বন্দী করতে ব্যস্ত আমাদের শর্মি। ঢেউভীতি আছে তার। হঠাৎ এক জোর-ঢেউয়ের ধাক্কায় তাল না রাখতে পেরে কদিন আগে কেনা দামি মোবাইলটির সলিলসমাধি ঘটাল সে। এ নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ লক্ষ করা গেল না; বরং মোবাইলটির ডুবে-ভেসে ক্রমশ নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার দৃশ্যের সঙ্গে পারলে সে যেন একটা সেলফি তুলতে চায়—এমন অবস্থা। এহেন শর্মি এই হালকা শীতের প্রথম ভাগে অফিসের পিকনিকে এসে সম্পূর্ণ আশাহত। না না, আয়োজনের কোনো ঘাটতি বা অন্য কিছু নয়। হঠাৎ ফেসবুক বন্ধ হওয়ায় সে কোনো সেলফিই আপলোড দিতে পারছিল না। ঢাকা থেকে তারা যাচ্ছে সোনারগাঁ। অন্যদিন হলে বাসে উঠতে গিয়ে সেলফি দিত এফবিতে। বাসের সদ্য পাওয়া সিটটার সঙ্গে তাকে কেমন মানিয়েছে, সেটাও জানান দিত তার সাম্প্রতিকতম ছবি। বাসে বসে নাশতা খাওয়ার বাহারি ছবি, বাস থেকে নেমে পানামনগরের দালানকোঠা কিংবা লোকশিল্প জাদুঘরের ঐতিহ্যবাহী সংগ্রহ—কোনো কিছুই বাদ যেত না শর্মির সেলফি-আগ্রাসন থেকে। তবে এর মধ্যেও ছবি সে তুলছে। জমিয়ে রাখছে। ফেসবুক খুললেই অ্যালবাম আকারে সেলফিসমগ্র ঢালা হবে। কিন্তু একটা সিঙ্গেল ছবিকে ঘিরে আলাদাভাবে কোনো আলোচনা হবে না ভেবে ভীষণ বিষণ্ন শর্মি। ছবি তোলার গতিতে তাই আজ কিছুটা ক্ষান্তি দিয়ে শর্মি চারপাশের গাছপালা, নদী-নালা আর ওপরের আকাশটা ভালো করে দেখল। হঠাৎই তার মনে পড়ল, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কোনো এক ফটোগ্রাফিক সোসাইটির বিজ্ঞাপনে সাঁটা বিনয় মজুমদারের সেই কবিতা—‘আরও কিছু দৃশ্যাবলি দেখেছি জীবিতকালে যারা চিত্রায়িত হতে পারতো’। আজ সেলফি তোলার শ্লথ গতিতে শর্মি হঠাৎ ভাবার সুযোগ পেল, এত সুন্দর সকাল-দুপুরময়, নিসর্গ-মানুষময় পৃথিবীর কতটুকুই আসে সেলফি কিংবা যেকোনো আলোকচিত্রে! সেলফির মোহে পড়ে সে নিজের মনের ক্যামেরাটা এত দিন যেন নিজের অজান্তেই বন্ধ রেখেছিল। আজ ফেসবুক বন্ধ হওয়ার সুবাদে সেটা খোলার সুযোগ পেল যেন। সেলফি কিংবা ফেসবুক তো চলে গিয়েই ফিরে আসবে, কিন্তু এই যে নদীর জলের কাঁপন, পাখির কলতান, বাতাসের নাচন, সৌন্দর্যে ভরা এই মুহূর্তেরা তো আর ফিরে আসবে না। ফেসবুকের ছুটি কাটানোর সুযোগে এক অনন্য অনুভবের মুখোমুখি হয়ে আনশিডিউলি ভালোলাগায় ভরে গেল শর্মির মন।
তিন. স্ট্যাটাস সুমন। স্ট্যাটাস তো অনেকেই দেয় ফেসবুকে। তবে সুমনকে কেন এই বিশেষ বিশেষণে ভূষিত করা? কেউ কেউ আবার সুমনের স্ট্যাটাস দেওয়াকে ব্যঙ্গ করে ওর ওয়ালে লেখে, ‘আমার কোনো স্ট্যাটাস নেই, সুমনের আছে।’ কথাটা শুনে হাসি পেলেও সুমনের নামের আগে ‘স্ট্যাটাস’ শব্দ যোগ হওয়ার একটা বাস্তব ভিত্তি নিশ্চয়ই আছে। সুমনের সকালের আলো ফোটে ফেসবুকের পাতায়। ঘুম থেকে উঠেই সুমনের প্রথম স্ট্যাটাস, ‘শুভ সকাল। জীবনের আরেকটা সকাল তবে শুরু...’
এরপর হয়তো মা নাশতা খেতে ডাকছে। দ্বিতীয় স্ট্যাটাস, ‘যাই, নাশতা খাব—পরোটা, ভাজি, হালুয়া।’ আর ফেসবুক বন্ধুরা একটু ভাগ্যবান হলে প্রভাতি এই স্ট্যাটাসের সঙ্গে নাশতার চেহারা-ছবিও দেখে উঠতে পারেন। একটু পরে মুভি দেখতে শুরু করে সুমন। কিছুক্ষণ দেখার পর তার স্ট্যাটাস, ‘প্রেম কেন বিপন্ন ছবিটা দেখছি। নায়িকার এক্সপ্রেশন ভালো না। নায়কের ডায়ালগ মোটের ওপর। ছবির স্টোরিটা এককথায় বোগাস।’ তার এই স্ট্যাটাস নিয়ে ফিল্মবোদ্ধা বন্ধুরা কিছুক্ষণ বাদানুবাদে ব্যস্ত রইল। হঠাৎ সুমনের মনে হলো, একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এই ইস্যুটাকে। নতুন কিছু দরকার। তাই স্ট্যাটাসে নতুন এক কমেন্ট দিল, ‘এনাফ ইজ এনাফ। এই বিষয়টা এখানেই শেষ হলো।’ কিছুক্ষণ পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হলো। চেক ইন দিল ফেসবুকে, ‘নাউ ইন তরঙ্গ বাস।’ পাবলিক বাসে যাত্রী-কন্ডাক্টর ভাড়া নিয়ে গন্ডগোল, সিটে বসা কিংবা দাঁড়ানো; এইসবের মাঝেই সিট না পাওয়া সুমন স্ট্যাটাস আকারে লিখে ফেলল নগর ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে এক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনে গিয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে কাপযুক্ত সচিত্র স্ট্যাটাস, ‘কফিটা দারুণ ছিল কিন্তু!’
তারপর ক্লাসে বসে নতুন স্ট্যাটাস, ‘টিউটোরিয়াল-ক্লাস টেস্ট-নোট-ল্যাব ইত্যাদি ইত্যাদি...এই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়া আমরা কী করিব?’ এবার তার স্ট্যাটাসে হামলে পড়ল শিক্ষানুরাগী বন্ধুবান্ধব। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরতি পথে পুরান ঢাকায় গিয়ে নান্নার মোরগ-পোলাও খেতে খেতে যথারীতি মোরগ-পোলাও এবং আনুষঙ্গিক খাবার নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিল। স্ট্যাটাসে জনৈক ভোজনরসিক বন্ধুর কমেন্ট, ‘সুমন, মোরগ-পোলাও যখন খেয়েছিস, তখন বেচারাম দেউড়ি থেকে জনসন রোডে গিয়ে বিউটির ফালুদা খেয়ে আসলে মন্দ হতো না।’ তারপর আবার সুমনের স্ট্যাটাস—নতুন ও পুরান ঢাকার ফালুদার তুলনামূলক পর্যালোচনাবিষয়ক। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক ফালুদার ফলে কী পরিমাণ ফরমালিন থাকে, সে বিষয়ে একটা পরিসংখ্যানও দেওয়া গেল। যা হোক, খানাপিনার পর্ব পেরিয়ে বাসায় গিয়ে একটু ঘুম দিল। ঘুম থেকে জেগেই স্ট্যাটাস-বিরহের অনলে পুড়তে লাগল সুমন। পরমুহূর্তে স্ট্যাটাস, ‘দিবানিদ্রা স্বাস্থ্যের পক্ষে লাভজনক নাকি ক্ষতিকর? বন্ধুরা কী বলেন?’ এই স্ট্যাটাস দিতে দিতে ফোনে কথা হলো শিলুর সঙ্গে, ‘তুমি আছ তোমার স্ট্যাটাস আপডেট নিয়ে। শেষ কবে ঘুরতে বেরিয়েছি মনে পড়ে তোমার?’ শিলুর সঙ্গে আজ কোথাও ঘুরতে যাবে কি না, সেই মীমাংসা হওয়ার আগেই স্ট্যাটাস, ‘প্রেমে শুধু পড়লেই হয় না, প্রেমিকার সঙ্গে ঘুরতেও বের হতে হয়।’
স্ট্যাটাস দেখে রেগে শিলুর ফোন, ‘তোমার স্ট্যাটাস আমি বের করছি প্রেমিকপ্রবর। তোমার সঙ্গে এই আমার ব্রেকআপ ঘোষণা করলাম।’ বেচারা সুমনের ব্রেকআপ-পরবর্তী আপডেট, ‘প্রেম করলে ব্রেকআপ ডিক্লারেশন শোনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।’ এই নিয়ে কিছুক্ষণ যুগপৎ প্রেম ও বিরহ-অভিজ্ঞ বন্ধুবান্ধবের কমেন্ট বিনিময় চলল আগের আপডেটে। তারপর শিলুর বিরহ ভুলতে সন্ধ্যায় দলবেঁধে ঘুরতে গেল মিউজিক ফেস্টে। গিয়ে দেশের সমৃদ্ধ সংগীত ভান্ডার নিয়ে স্ট্যাটাস দিল। তারপর এই ফেস্টিভ্যালের ভালোমন্দ নিয়ে নিজের অভিমত যুক্ত করে সংগীতানুরাগী বন্ধুমহলের ব্যাপক প্রশংসা কুড়াল স্ট্যাটাস সুমন। মিউজিক ফেস্ট থেকে রাত করে বাসায় ফিরল। মা বলল, ‘এই তোর আসার সময় হলো? নে, খেয়ে নে।’ সারা দিনের এত কিছুর পর মায়ের অনাবিল স্নেহঝরা মুখ বিষয়ে একটা নৈতিক স্ট্যাটাস দিতে না দিতেই বাবার হুংকার, ‘সুমন, পড়াশোনা কিছু করছিস? নাকি সারা দিন ফেসবুক আর ফেসবুক?’ বাবার প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পারার দুঃখে নৈশকালীন স্ট্যাটাস, ‘জেনারেশন গ্যাপটা খুব ভয়াবহ। আজকালকার বাবারা বুঝতেই পারে না ছেলের মন।’ যাক, বাবার উত্তর সরাসরি দেওয়া না গেলেও স্ট্যাটাসে তো এক হাত নেওয়া গেল। এরপর ঘুমাতে গিয়ে মশার কামড় খেতে খেতে দিনের শেষ স্ট্যাটাসটি পড়ল ফেসবুকে, ‘মশা জ্বালাচ্ছে বড়। ভালো না লাগলেও মশারি টাঙাতে হবে। নয়তো ডেঙ্গু হবে হয়তো। হায় মশা! হায় ডেঙ্গু!! হায় প্রিয় ঢাকা নগরীর পরিচ্ছন্নতা!!!’
স্ট্যাটাস দিতে দিতে ঘুমিয়ে গিয়ে সুমন স্বপ্ন দেখে কয়েক দিনের জন্য ফেসবুক বন্ধ থাকবে। ফেসবুক বন্ধ থাকলে দেশের কী অবস্থা হতে পারে, এই নিয়ে ঘুমের ঘোরেই একটা স্ট্যাটাসের খসড়া তৈরি করে ফেলল সে। ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠে ফেসবুকবিহীন কয়েক দিনের আশঙ্কাবিষয়ক স্বপ্নে পাওয়া স্ট্যাটাসটি দিতে গিয়ে দেখে কোনোভাবেই আর কাজ করছে না তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। নেট তো আছেই। তাহলে?
পাশের ঘর থেকে বাবার কথা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম। বাবা মাকে বলছে, ‘শুনছ সুমনের মা? খুব ভালো হলো। কয়েক দিনের জন্য ফেসবুক বন্ধ থাকবে। এইবার যদি তোমার ছেলের মতি ফেরে। সারা দিন খালি ফেসবুক আর ফেসবুক।’ ফেসবুকবিষয়ক বাবার এই বিকৃত বক্তব্য নিয়ে জেনারেশন গ্যাপকেন্দ্রিক একটা শাণিত স্ট্যাটাস দেবে ভাবতেই মনে পড়ল ফেসবুক আপাতত বন্ধ!
চার. বাহাত্তর ঘণ্টা পরে ফেসবুক আবার ফিরে এল। শায়লা, রিমন, শর্মি, সুমনের কী হলো, আমাদের জানা নেই। তবে আমাদের বন্ধু হিমেল সৌরভ এই নিয়ে একটা কবিতাই লিখে ফেলল। বলা বাহুল্য, কবিতাটিতে বহু পূর্বজ কবির প্রভাব থাকলেও বিষয়টা ইউনিক বলে তাকে একটা বাহবা দেওয়াই যায়। কবিতাটি সবার জন্য নিচে দিয়ে দিচ্ছি—
ফেসবুক
মানবের আশ্চর্য আবিষ্কার!
ডিজিটালি কদিন না থেকে
তুমি দিয়ে গেলে
অ্যানালগ বিরহের ধ্রুপদি ধারণা।

অবসরে যাচ্ছেন দাউদ ইব্রাহিম আসছেন আনিস!

একসময়ের মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের কথিত ‘দেবতা’ পলাতক গ্যাংস্টার দাউদ ইব্রাহীম আগামী শনিবার তার ৬০তম জন্মদিনে আন্ডারওয়ার্ল্ড রাজত্ব থেকে অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দিতে পারেন। তার উত্তরসূরি নিয়োগ করবেন তারই আপন ভাই আনিস আহমেদকে। দাউদ ইব্রাহীম বর্তমানে ভারত থেকে পালিয়ে পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থান করছেন। দেশটির নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে সার্বক্ষণিক পাহারা দিয়ে রাখে বলে ভারতের গোয়েন্দারা জানিয়েছেন।
একটি সূত্র জানিয়েছে, দাউদের অন্যতম সহকারী ছোটা শাকিলকে এরই মধ্যে তার গ্যাঙের প্রধান নির্বাহী বা সিইও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ডি-কোম্পানির উত্তরাধিকারীর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ডি-কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুম্বাইয়ের অনেকে এই আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাং সম্পর্কে ভালো তথ্য রাখলেও নতুন উত্তরসূরি নিয়োগের ব্যাপারে তারাও কোনো কিছু জানাতে পারেননি। অনেকেই বলেছেন, ‘ভাইয়ের পদক্ষেপের ব্যাপারে আমরা এখন পর্যন্ত কিছুই শুনিনি।’ টাইমস অব ইন্ডিয়া।

লটারিতে ৪ লাখ ইউরো জিতলেন শরণার্থী

কাঠের নৌকায় ভেসে ইউরোপে আসা সেনেগালের এক শরণার্থী লটারিতে ৪ লাখ ইউরো জিতেছেন। স্পেনে বার্ষিক ‘ক্রিসমাস লটারি’ জয় করে এই অর্থ পাচ্ছেন তিনি। বৃহস্পতিবার দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট এ খবর দিয়েছে। নাগামি নামের ওই শরণার্থী নৌকা করে ইউরোপে এসেছিলেন। স্পেনের আলমেরি অঞ্চলে স্ত্রীসহ বাস করেন তিনি। সেখানে বিক্রি হওয়া লটারির টিকিট কেনেন নাগামি। তার টিকিট নম্বর ৭৯১৪০। ‘এল গরদো’ নামে স্পেনিশ ওই জনপ্রিয় লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হয় ২২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার। লটারির মোট পুরস্কার ছিল ৬৩ কোটি ইউরো। লটারি জয় প্রসঙ্গে নাগামি বলেন, বিশ্বাস হচ্ছে না আমি লটারিটি জিতেছি। শুনলে হয়ত আপনারা বিশ্বাস করবেন না,
কিন্তু কখনও কখনও আমাদের দু’জনের কাছে ৫ ইউরো থাকে না। এ সময় তিনি স্পেন সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমরা ৬৫ জন সেই নৌকায় ছিলাম। সেখান থেকে আমাদের উদ্ধার করার জন্য স্পেনের সরকারকে ধন্যবাদ। ২০০৭ সালে অভিবাসীদের নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ পাড়ি দেয়ার পথে তাকে এবং তার স্ত্রীকে সাগর থেকে উদ্ধার করে স্পেনের কোস্টগার্ড। পরে তাদের টেনেরিফ দ্বীপে নেয়া হয়। তিনি বলেন, স্পেনে পৌঁছানোর পর আমরা টিকে থাকার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে কোনো একটি ফার্মে কাজ জুটিয়ে নিতে চেষ্টা করি। চেষ্টা করি কোনো সবজির ক্ষেতে কাজ পাওয়ার। নাগামে বলেন, সম্প্রতি একটি গ্রিনহাউসের কাজ থেকে তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে।

মেরুদণ্ড সোজা হতে কত দেরি পাঞ্জেরি? by ডক্টর তুহিন মালিক

এক. নিজের স্বাধীনতা কে না চায়? এটা চায় না, এমন মানুষ বোধহয় তাবৎ বিশ্বে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রাণিকুলও কভু খাঁচায় বন্দিজীবনের পরাধীনতাকে মেনে নিতে পারে না। জীবজগতের প্রধান জৈবিকত্বই হচ্ছে তার আত্মস্বাধীনতা। সে কারণেই হয়তো কবি বলে গেছেন ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে; কে বাঁচিতে চায়? পরাধীনতার শৃঙ্খল কে পরিবে পায় রে; কে পরিবে পায়?’ কবি যদি বেঁচে থাকতেন তবে কবিচক্ষুতে নির্ঘাত অবলোকন করে যেতেন যে, আমাদের নির্বাচন কমিশনই সৃষ্টিকুলে একমাত্র যারা নিজেদের স্বাধীনতাকে চায় না। আশরাফুল মাখলুকাতের ১৬ কোটি বঙ্গসন্তান যতই তাদেরকে স্বাধীনতা ঘোষণার আবেদন জানাক না কেন, তারা নিজেদের পরাধীনতাকেই শ্রেষ্ঠতর বলে মেনে নিয়েছে। ২০১৫ সালের পুরো ডিসেম্বর মাসে জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বহুল প্রচলিত শব্দ ’মেরুদণ্ডহীনতা’ যাদের জন্য প্রযোজ্য, সেই ইসি তাদের মেরুদণ্ডহীনতার দণ্ডকে মাথা পেতে নিতেও কোনো রকম কার্পণ্য করছে না। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবারো নির্বাচন কমিশনকে মেরুদণ্ডহীন আখ্যা দিয়েছেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, এরশাদের মতো সদা-পরিবর্তনীয় মানুষও আজ ইসিকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছেন, আপনাদের মেরুদণ্ড আছে কি না প্রমাণ দিতে হবে। গণমাধ্যমে আচরণবিধি ভঙের নিত্যনতুন অভিযোগ প্রচারিত হলেও ইসি এগুলোর কোনো ‘সত্যতা খুঁজে পাচ্ছে না’। এরশাদ সাহেবের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশন এবার পৌর নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাই করে একসাথে ১৫৭ জন মেয়র প্রার্থীসহ ৮৯৭ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেখিয়ে দিলো তারা এতটাই ক্ষমতা রাখে। অথচ তাতেও তাদের কোনো সুনাম হয়নি! মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া প্রার্থীরা যদি বিএনপির হয়ে যায় তাতে খামাখা ইসি একা কেন দোষী হবে? তারা তো আওয়ামী লীগের ’বিদ্রোহী’ প্রার্থীদেরও মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে, কই তাতে তো আওয়ামী লীগ কোনো টুঁ শব্দ পর্যন্ত করল না। ইসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন তাকে বিনাযুদ্ধে জয়ী হতে দেবে না। কঠিন শপথ। সময় থাকুক আর নাই থাকুক, ব্যালট পেপার নতুন করে ছাপাতে হোক আর পুড়িয়ে ফেলা হোক, হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে দেখাতে হবে কতটা শক্ত তাদের মেরুদণ্ড। ইসি নির্বাচনী আইন-কানুন প্রয়োগ করল সেগুলো আবার নাকি সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষেই যাচ্ছে বলে অভিযোগ। এ দিকে ইসির কোনো নোটিশের জবাব দেয়ার কোনো প্রয়োজন দেখছেন না সরকারের এডিসি, রিটার্নিং অফিসার, ইউএনও, এসপি, ওসিরা। প্রশাসন পর্যন্ত তাদেরকে মেরুদণ্ডহীন ভাবছে নাকি? ইজ্জত বাঁচাতে অসহায় ইসি এবার দ্বারস্থ হলেন খোদ প্রধানমন্ত্রীর। বিধি ভঙ্গের অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীকে একটু দেখার জন্য না হয় অনুরোধই জানানো হলো। তাতেও এত সমালোচনা! যদিও বিধি ভঙ্গের অভিযোগ দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, প্রধানমন্ত্রীর নয়। তাতে কী, প্রধানমন্ত্রী তো খেলার মাঠ থেকে শুরু করে সব কিছুই একক সিদ্ধান্তেই করছেন। সর্বক্ষমতা তো দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতেই ন্যস্ত। আর সামান্য একটা পৌর নির্বাচনের আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়টা প্রধানমন্ত্রী যদি অনুগ্রহ করে একটু দেখে দেন তাতে কী-বা আসে যায়?
দুই. নির্বাচন কমিশন যে কতটা উদার এটা কিন্তু কারো চোখে পড়ল না। সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তারা বেশি উদ্বিগ্ন বলে প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের জানায় ইসি। নিজেদের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারাটা চাট্টিখানি কথা নয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ইসির ভাবমূর্তির ‘ভাব’ আর ‘মূর্তি’ যেভাবে হারিয়ে গেছে তা পুনরুদ্ধারের অযথা চেষ্টা না করে বরং সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ায় দোষটা কিসের? সুশীলসমাজ খামাখা বলে যে, ইসি একটা সাংবিধানিক পদ ও সংবিধান প্রদত্ত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। নিজের সর্বময় ক্ষমতা প্রয়োগ না করে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার অভিযুক্ত আরেকটি দলের সভানেত্রীর কাছে এহেন আত্মসমর্পণ স্পষ্টত সংবিধান লঙ্ঘন। অযথা ইসির কমিশনারদের সাংবিধানিক শপথের কথাগুলো মনে করিয়ে দিয়ে কেন এভাবে বিব্রত করা হচ্ছে? কমিশনাররা কোনো ধরনের রাগ, ভয়, লোভ, অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে নির্বাচন কমিশনারের মতো সাংবিধানিক একটি পদে দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছেন সত্য, কিন্তু তাই বলে এত দিন পর কেন ‘সাংবিধানিক দোহাই’ দেয়া হচ্ছে? তাও আবার সংবিধান লঙ্ঘনের মতো মৃত্যুদণ্ডতুল্য অপরাধের কথা এভাবে প্রকাশ্যে বলতে হবে? ওরে বাবা, দণ্ডহীনতার জন্য মৃত্যুদণ্ড? এ আবার কেমন আইন? পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন করে এ দণ্ড যদিও আরোপ করা হয়ে থাকে, তবু এটা নিশ্চিতভাবেই নির্বাচন কমিশন বা সরকারি দলের জন্য প্রযোজ্য নয়, সেটা কি সুশীলরা জানে না?
তিন. সংবিধান না হয় ইসিকে সর্বময় ক্ষমতা অর্পণ করেছে, তাই বলে ইসিকে এত চাপ দিলেই কি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়ে যাবে? যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর। সরকারি দলের হানিফ সাহেব বলছেন, ‘নির্বাচন কমিশন বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল, সরকারি দলের প্রতি কঠোর।’ আর এ দিকে বিএনপিও বলছে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের দলীয় সংগঠন। অথচ নির্বাচন কমিশন এত কষ্ট করে মাঠপর্যায়ে যেসব তদন্ত চালাচ্ছে তার ফল যদি বিএনপির প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে চলে যায় তার জন্য ইসি কেন দোষী হবে? সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের সামাল দেয়ার কথা মুখে বললেই হলো, সামাল দেয়া তো দূরের কথা একটু সালাম না দিয়ে দেখুন, অবস্থা কী দাঁড়ায়! তারপরও কেন বলা হচ্ছে, কমিশনের কাছে এত সর্বময় ক্ষমতা ও যথেষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও সেটার প্রয়োগ করা হচ্ছে না? ফেনী, চাঁদপুর, সিলেট, শরীয়তপুর, কুমিল্লাসহ অসংখ্য পৌরসভায় বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র নিয়মবহির্ভূতভাবে বাতিল কি ইসি নিজেদের স্বার্থে করেছে? সরকারি দলের লোকজনের চাপও যে তাদেরকেই সইতে হয়। এটার জন্য তো কেউ তাদের কোনো প্রশংসা করে না। আইনে আছে পৌরসভার নির্বাচন করতে হলে মনোনয়নপত্র জমার আগে উপজেলা থেকে পদত্যাগ করতে হবে। এই অপরাধে নির্বাচন কমিশন আমিনুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলেও আবুলকে তো বরখাস্ত করেছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে পারলেও ভোট গ্রহণ, ভোট গণনা, ব্যালট ছিনতাই, নির্বাচনী সহিংসতা, প্রার্থী হতাহতের বিষয়ে কিভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেটা নিয়ে এত আগে ভাবতে কে বলেছে? এত টেনশন কেন? নির্বাচনের সময় ঠিকই দেখতে পারবেন ৪ শতাংশ ভোট কী করে ৪০ শতাংশ হয়ে যায়। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ-নিরপেক্ষ ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ বিটিভিতে ঠিকই দেখতে পাবেন আপনারা। এবার সাংবাদিকেরা ভোটারশূন্য ভোটকেন্দ্রে কুকুরের ছবি যাতে ছাপতে না পারেন তার জন্য ‘জনস্বার্থে’ ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করে দেয়া হয়েছে। জনগণ ঘরে বসেই আরামে ভোটের সব খবরাখবর জানতে পারবে বিটিভি আর দলীয় নেতাদের চ্যানেলগুলোতে।
চার. নির্বাচন কমিশন তো ‘কঠোর’ ব্যবস্থা নিয়েছেই। সাতক্ষীরার কলারোয়ার রিটার্নিং অফিসারকে সাময়িক বরখাস্ত পর্যন্ত করা হয়েছে। অথচ বলা হচ্ছে ‘অনিয়ম প্রশ্রয় দেয়ায় এই কর্মকর্তাকে শাস্তি দিলেও অনিয়মের সুবিধাভোগী সরকারদলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’ নির্বাচন পরিচালনাবিধির ৯০ ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে কমিশন তাৎক্ষণিক ওই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে বলা হলেও এটা যে করতেই হবে, সেটা কে বলল? রিটার্নিং অফিসারকে বরখাস্ত কি অনিয়মের প্রমাণ হতে পারে? এত আইন-কানুন দেখালে তো আর শান্তিমতো ‘দায়িত্ব পালন’ করা যাবে না। আর আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বাস্থ্যমন্ত্রী আর তথ্যমন্ত্রীর মতো ভিআইপিদের বিরুদ্ধে উঠলেই কি আর ব্যবস্থা নেয়া যায়? জনগণ কি দেখে না ময়মনসিংহের ফুলপুরের রিটার্নিং অফিসার সুন্দর করে প্রতিবেদন লিখে দিলেন যে, ‘দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।’ শুধু দুদক একাই কেন দায়মুক্তির প্রতিষ্ঠান হবে? নির্বাচন কমিশনেরও অধিকার আছে দুদকের এই রেকর্ডে ভাগ বসানোর। তাই ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ চিন্তা না করে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত মন্ত্রী-এমপিদের দায়মুক্তি দিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ক্ষমতাসীন দলের তিন এমপির আচরণবিধি লঙ্ঘনের অপরাধও ক্ষমা করে দিয়েছে ইসি। এর আগে তথ্য ও ধর্মমন্ত্রীকেও ‘মানবিক কারণে’ ক্ষমা করে দেয় তারা। অথচ তাদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান আছে। প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও আছে ইসির। আর চাঁদপুরের ছেংগারচরের রিটার্নিং অফিসার না হয় বিএনপি প্রার্থীর শিক্ষাসনদ ছিঁড়ে দিয়ে মনোনয়নপত্রকে বাতিল করেছে, তাতে এমন কী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন হয়ে গেল? স্থানীয় নির্বাচনে কি ক্ষমতার বদল হয়?
পাঁচ. বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং প্রধানমন্ত্রীর অধীনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি যদি যেত তাহলে এ রকমই যে অবস্থা হতো এটা কিন্তু ভাবা ঠিক নয়। জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতা পরিবর্তন হয় বলে এর চেয়ে আরো বেশি ভয়াবহ অবস্থা হতো বলে কেন অযথা ভয় দেখাচ্ছেন? তা ছাড়া এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে গত বছরের উপজেলা নির্বাচন এবং এ বছরের ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ইসির সমালোচনা করেই বা কে কী করতে পেরেছে? ইসি নিজেদের পর্যাপ্ত জনবলকে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগের বদলে জনপ্রশাসনের লোকদের রিটার্নিং অফিসার বানিয়ে কি অপরাধ করেছে? জনপ্রশাসনের নিয়োগ, বদলি বা পদোন্নতিসহ চাকরির সব শর্ত সরকার নিয়ন্ত্রণ করলে ইসির কথা তারা শুনবেই বা কেন? পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কথা না শুনে কি ইসির কথা শুনবে? তা ছাড়া জনপ্রশাসনের কোনো কর্মকর্তাকে শাস্তি দিতে চাইলেই তো আর শাস্তি দেয়া যাবে না। খুব বেশি হলে ইসি তাদেরকে প্রত্যাহার করতে পারবে। বড় শাস্তি দিতে হলে তো সরকারের সমর্থন লাগবে। আর সরকার নিজের ক্ষতি করে নিজের কর্মকর্তাকে শাস্তিই বা কেন দিতে যাবে? কাগজে কলমে নির্বাচন কমিশন পরাশক্তি হলেও বর্তমান ইসি যে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতোই সরকারের ‘চাকরি’ করে চলেছে, সেই কমিশনাররা বিশ্বাস করলেও আপনারা কেন বিশ্বাস করতে চাচ্ছেন না? এরশাদ সাহেব বলেছেন, সকাল ৯টার মধ্যেই ভোট শেষ হয়ে যাবে। বিএনপি জানতে চেয়েছে, এটা প্রধানমন্ত্রীর বার্তা কি না? এরশাদ সাহেব তো প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। তার মানে তিনি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বার্তাবাহক। তার কথা তো আর ফেলনা হওয়ার নয়। বার্তাবাহক তো নিজে থেকে কোনো কথা বলতে পারেন না। আসলে এরশাদ সাহেব মনের দুঃখেই এই রকম কথা বলে থাকেন। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তাকে যেভাবে সিএমএইচে বন্দী করে গলফ খেলানো হলো সেই একই প্রক্রিয়ায় এবারের নির্বাচনেও ১৫০টি পৌরসভায় জাতীয় পার্টি প্রার্থী দেয়ার পরও ১০০টিতে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হলো। তাই এরশাদ সাহেবের শারীরিক ও মানসিক অবস্থাটাও বিবেচনাযোগ্য হওয়া উচিত।
ছয়. ইতোমধ্যেই দুই ডজনেরও বেশি পৌরসভায় প্রতিপক্ষের ওপর হামলা ও বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী সস্ত্রীক হামলার শিকার হয়েছেন। নির্বাচনী সহিংসতায় মাটিরাঙ্গায় বিএনপি নেতাসহ একাধিক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। বিএনপির মেয়র প্রার্থীকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্র, রামদা, চাপাতি, হাতুড়ি নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা প্রচারণায় অংশ নিচ্ছে। সরকারদলীয়দের হাতেই মার খাচ্ছে দলীয় বিদ্রোহীরা। আবার বিদ্রোহীরাও সমানে পিটাচ্ছে দলীয় প্রার্থী-সমর্থকদের। কুষ্টিয়ায় আওয়ামী কোন্দলে দলীয় প্রার্থীকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হয়েছে। চৌদ্দগ্রামে আওয়ামী দুই পক্ষের সংঘর্ষে গাড়ি ভাঙচুর ও মহাসড়ক অবরোধ করা হয়েছে। সোনারগাঁওয়ে দলীয় সংঘর্ষে একজন মারা গেছে। অথচ পুলিশ এখনো নির্বিচারে বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকেই গ্রেফতার করে যাচ্ছে। বিএনপি দলবল নিয়ে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সেনা মোতায়েনের দাবি জানালে সিইসি তাৎক্ষণিকভাবে দাবি প্রত্যাখ্যান করলেন। সেনা মোতায়েন করা হলে দলীয় সেনাদের কী হবে? মাঠে সেনাবাহিনী নেমে গেলে কখন কী ঘটে যায়, এর দায়ই বা কে নিতে যাবে? ইসির মেরুদণ্ড নেই তো কী হয়েছে? শুধু নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ হলেই কি সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে? প্রশাসন-পুলিশ-র‌্যাব কি বিএনপির পক্ষে? ইসি কি একাই মেরুদণ্ডহীন? স্বয়ং দেশের রাষ্ট্রপতিও তো ক্ষমতাহীন। দেশ গণতন্ত্রহীন। অর্থনীতি বিনিয়োগহীন। র‌্যাব-পুলিশ বাধাহীন। মানুষ নিরাপত্তাহীন। সরকার ভোটবিহীন। বিরোধীরা আন্দোলনহীন। মজলুমরা বিচারহীন। দুর্নীতি সীমাহীন। সুশীলরা প্রতিবাদহীন। জনগণ গুরুত্বহীন। তাই সর্বক্ষেত্রেই এখন একই প্রত্যাশা, মেরুদণ্ড সোজা হতে কত দেরি পাঞ্জেরি?
লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
e-mail: drtuhinmalik@hotmail.com

সন্ত্রাসী ও অপরাধীর মধ্যে পার্থক্য কী?

পুলিশ ও সাংবাদিকদের মধ্যে অনেক মিল আছে। তাঁরা উভয়ই মানবীয় ভুলের শিকার হন। তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক যেন অনেকটা মূল গাছ ও পরজীবী উদ্ভিদের সম্পর্কের মতো। আর আমি মনে করি, এটা একরকম স্বাভাবিক যে অপরাধের ব্যাপারে তাঁদের উভয়ের অবস্থানও এক। কয়েক বছর ধরে দেখছি, অপরাধ দুই ধরনের হয়, একটি সাধারণ অপরাধ, আরেকটি ‘সন্ত্রাসী অপরাধ’। ধরুন, কোনো বন্দুকধারী যদি হঠাৎ করে গুলি করে মানুষ মেরে ফেলে, তাহলে সেটা সাধারণ অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। আর ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হচ্ছে সেই প্রকৃতির হামলা, যেখানে হামলাকারীদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষুব্ধ ও কোনো ধর্মের দলছুট গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক থাকতে হয়। সন্ত্রাসী অপরাধীদের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়, তাদের নিপীড়ক, অসুস্থ বা কোনো ‘মৃত প্রথার’ মধ্যযুগীয় সদস্য হতে হয়। এটা বলার প্রয়োজন নেই যে এই দ্বিতীয় প্রকৃতির মানুষেরা ‘ঘরেই বেড়ে ওঠা চরমপন্থী’, মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তি হস্তক্ষেপ করেছে বলে যারা যেকোনো ধর্মের মানুষকে কতল করতে প্রস্তুত। বাস্তবে এই বিভাজনের কারণে মনে হয়, ‘সাধারণ’ অপরাধ একরকম স্বাভাবিক ব্যাপার, মানুষ পয়সা, লোভ, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ ও মাদকের কারণে মানুষকে হত্যা করে। কিন্তু ‘সন্ত্রাসী’ অপরাধের মাজেজা হচ্ছে, মুসলমানরা সব সময় অপরাধী। অন্য কথায়, অপরাধীরা তো আমাদের ভাই-ব্রাদার, যেখানে সন্ত্রাসীরা হচ্ছে অশ্বেতাঙ্গ মুসলমান, যারা আমাদের মূল্যবোধ ঘৃণা করে, ওরা আমাদের মাথা কাটতে চায়, যারা দৃশ্যতই পাগলাটে। ক্যালিফোর্নিয়াতে ১৪ জন নিরপরাধ মার্কিনকে হত্যা করার পর আমরা এই অর্থহীন ধারণার নড়বড়ে প্রকৃতিটা দেখলাম। প্রথমত, মার্কিন পুলিশ বলল যে তারা জানে না, এটা ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সম্পর্কিত’ অপরাধ কি না। তারা এটার নাম দিল গণ-গুলিবর্ষণ। বিভিন্ন তরফ থেকে আমাদের বলা হলো,
এই হত্যাকাণ্ডটি একটি বাদবিসংবাদের ফল হিসেবে ঘটেছে। বন্দুকধারী এই ১৪ জন খুন হওয়া মানুষের একজনের হাতে নিগৃহীত হয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু এরপর দেখা গেল, নামে তিনি মুসলমান, আর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাড়িতে এক অস্ত্রভান্ডারও গড়ে তুলেছিলেন। আর দৃশ্যত তিনি আইএসের প্রতি ‘আনুগত্যও’ প্রদর্শন করেছেন। এই গণ-গুলিবর্ষণের ঘটনা তখন ‘সন্ত্রাসী কাণ্ডের’ আখ্যা পেল। এই নতুন সংজ্ঞাকে আরও বিভ্রান্ত করে দিতে পুলিশ বলল, তারা বিশ্বাস করে না যে এই দম্পতির সঙ্গে আইএসের কোনো যোগাযোগ আছে, যদিও গোষ্ঠীটি সেই দায় স্বীকার করেছে। এরপর দেখা গেল, এই দম্পতি হত্যাকাণ্ডের কয়েক বছর আগে ‘চরমপন্থায়’ দীক্ষিত হয়েছিল, মাফিয়াদের বেলায় যেটা ঘটে না। কয়েক সপ্তাহ আগে লন্ডনের টিউব স্টেশনে যে ছুরিকাঘাতের ঘটনা সংঘটিত হলো, তখন যে কথা বলা হলো তা-ও একইভাবে বিভ্রান্তিকর। প্রথমত, পুলিশ লেটনস্টোনে একটি ‘ছুরিকাঘাতের ঘটনার’ তদন্ত করছিল, কিন্তু তারা যখন একটি ভিডিওতে শুনতে পেল যে একজন মানুষ জোরে জোরে বলছে, ‘এটা সিরিয়ার জন্য’ এবং একজন বেসামরিক নাগরিক বলছেন, ‘ভাই, তুমি মুসলমানও নও’, তখন পুলিশ বলে বসল, এটা ‘সন্ত্রাসী ঘটনা’। এরপর একজন মানুষের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু এসবই কিছুটা উদ্ভট ব্যাপার। সেই ১৯৮০-এর দশকে যখন ব্রিটিশ সেনা ও আইআরএ উত্তর আয়ারল্যান্ডে প্রাণপণ যুদ্ধ করছিল, তখন যুক্তরাজ্য সরকার আইআরএকে অপরাধী, মারাত্মক সন্ত্রাসী, বেপরোয়া সন্ত্রাসী ও এমনকি সন্ত্রাসী অপরাধী হিসেবে আখ্যা দিতে তৎপর ছিল। কিন্তু সর্বোপরি সাধারণ অপরাধীদের তো আইনের মুখোমুখি করে বহু বছরের জন্য জেলে পুরতে হবে, সে তাদের সহিংস প্রচারণার কারণ যা-ই হোক না কেন। তখন আইআরএ সিদ্ধান্ত নিল, তারা নিজেদের ‘রাজনৈতিক বন্দী’ হিসেবে আখ্যা দেবে, যেটা কিনা ‘সন্ত্রাসীর’ ভদ্রোচিত রূপ। কারণ, তারা চেয়েছিল নিজেদের ডাকাতি, খুন, ভীতি প্রদর্শন—প্রভৃতি অপরাধ সাধারণ অপরাধের বাইরে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাক। আইআরএ ‘রাজনৈতিক’ মর্যাদা লাভ করতে এতটা উৎসাহী ছিল যে তারা আমরণ অনশন শুরু করে। কিন্তু থ্যাচারের শীতল মনোভাবের কারণে তাদের ১০ জন সহযোদ্ধা মারা যায়। কিন্তু তখন ব্রিটিশ সরকার আইআরএর প্রায় সব দাবিই মেনে নেয়। ফলে আইআরএর বন্দীরা ‘রাজনৈতিক’ তকমা পেয়ে যায়, আর যখন ‘শান্তি’ ঘোষিত হলো, তারা তখন বন্দিদশা থেকে মুক্ত হলো। তবে খুনি ও অসৎ মানুষেরা রানির আতিথ্যেই থাকল।
তাহলে ‘সন্ত্রাসী’ বা সাধারণ অপরাধী হলে কি কোনো লাভ আছে? আমার মনে হয়, এটা নির্ভর করে আপনার জীবনের মূল্য কতটা। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত আইএস যোদ্ধা রেয়াদ খান ও রুহুল আমিন যে ড্রোন হামলায় নিহত হলেন, তাঁদের যে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, তা মারাত্মক প্রমাণিত হয়েছে। তাঁদের মৃত্যু আসলে মৃত্যু নয়, হত্যাকাণ্ড, যেটা ডেভিড ক্যামেরনের মতে, ‘যুক্তরাজ্যের ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ও যথাযথ’ ছিল। তাঁরা ব্রিটেনে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছিলেন। অন্য কথায় বললে, ডেভ তো আর লেস্টারে স্কুলছাত্রদের খুনিকে মারার জন্য ড্রোন হামলার আদেশ দিতেন না, বা লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের কাউকে মারার জন্য তিনি হামলার নির্দেশ দিতেন না, এমনকি তাঁরা যদি ব্রিটেনে হামলার পরিকল্পনা করেও থাকেন। তারপরও এই অপরাধী/সন্ত্রাসী দ্বি-বিভাজন চলছেই। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের বিরোধীরা সর্বশেষ দাবি করেছেন, বাশার আইএসের চেয়েও বড় সন্ত্রাসী। কারণ, তিনি এই ইসলামি গোষ্ঠীর চেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করেছেন (চ্যানেল ফোর–এর ভাষ্য অনুসারে, আইএসের চেয়ে ছয় গুণ বেশি মানুষ)। এতে বোঝা যায়, আপনার হাতে কত মানুষ মরল, তার সংখ্যা দিয়েই নির্ধারণ করা হবে আপনি সন্ত্রাসী নাকি অপরাধী। অথবা এর মাজেজা এ রকম হতে পারে যেকোনো ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীর খুনের আকাঙ্ক্ষা যদি ‘পরিমিত’ হয়, তাহলে তারা অত ভয়ংকর নয়, যাদের বন্দুকের নলে বেশি খাঁজ আছে, তাদের তুলনায়। কিন্তু পাঠক, ক্ষণিকের জন্য দাঁড়ান। বাশারের বিরোধীদের কথার যৌক্তিক সারসংক্ষেপ দাঁড় করালে আমাদের এই সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে বুশ ও ব্লেয়ার আইএস ও বাশারের চেয়ে বেশি বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছেন। ২০০৩ সালে অবৈধভাবে ইরাক আগ্রাসন করে তাঁরা এ কাজ করেছেন। তাহলে বুশ ও ব্লেয়ারকে কি অতি-সন্ত্রাসী আখ্যা দেবেন, নাকি শুধু অপরাধী হিসেবে? যদিও তাঁরা যুদ্ধাপরাধী হিসেবেও আখ্যায়িত হতে পারেন, যাঁদের হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে তোলা যেতে পারে। তাঁরা কিন্তু ড্রোন হামলার আশঙ্কা থেকে একেবারেই মুক্ত, আর তাঁদের কখনোই ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া হবে না।
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হোক

শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে সারা বিশ্বের খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ব্যক্তিরা আজ এক মহিমান্বিত ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিচ্ছেন। তবে এর কল্যাণময় আনন্দ সর্বজনীন। সব জাতি ও ধর্মাবলম্বী এটি ভাগাভাগি করে নেবে। ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও উদারতার মতো অমোঘ শান্তির বাণী যিশুর মহান শিক্ষা। হিংসা-দ্বেষ পরিহার করে উন্নততর মানবিক সম্পর্ক ও সুসমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান নিয়ে আবার এসেছে বড়দিন। বাংলাদেশেও বড়দিন উদ্যাপনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, ধর্মবর্ণ–নির্বিশেষে সবার কাছেই যিশুখ্রিষ্ট মহামানব হিসেবে গভীর শ্রদ্ধার পাত্র। বাংলাদেশের উন্নয়ন- অগ্রগতিতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। বিশেষভাবে সেবাধর্মী কাজে তারা মানবিকতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বজায় রেখে চলেছেন। তবে এবারে বড়দিনের প্রাক্কালে বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। কয়েকজন যাজককে হুমকিও দেওয়া হয়েছে; যা খুবই উদ্বেগজনক। সরকারের কর্তব্য হবে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় যাতে আনন্দময় ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বড়দিনটি উদ্যাপন করতে পারে,
সে জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে তাঁদের ওপর হামলা ও হুমকি প্রদানকারীদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সংযম-সহিষ্ণুতা, ভালোবাসা ও সেবার পথ ধরে মানুষকে সত্য ও কল্যাণের পথে আনার প্রয়াসে যিশুকে অবর্ণনীয় নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছিল। কিন্তু সত্য ও কল্যাণের পথ থেকে কোনো কিছুই তাঁকে বিচ্যুত করতে পারেনি। নিপীড়কের বিরুদ্ধে তিনি পাল্টা আঘাতের কথা বলেননি; তিনি অকাতরে ক্ষমা করেছেন, আর সমগ্র মানবজাতির হয়ে সব দুঃখ-যন্ত্রণা যেন একাই আত্মস্থ করতে চেয়েছেন। আজ সবকিছু ছাপিয়ে সর্বত্র এই অঙ্গীকারই ফুটে উঠুক—আর বিভেদ নয়, সম্প্রীতির বন্ধনে আমরা পরস্পরকে বেঁধে রাখব। সেবাধর্মে নিজেকে উৎসর্গ করব। আর সেটা সম্ভব হলে এই ভূখণ্ডে যিশুর শিক্ষা সত্যিকার মহিমায় উদ্ভাসিত হবে। আমরা আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের অকৃত্রিম শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।

শক্ত-সোজা মেরুদণ্ড! আছে? নাকি নেই? by গোলাম মাওলা রনি

মেরুদণ্ডী প্রাণীর কথা বলতে গেলে প্রসঙ্গক্রমে অমেরুদণ্ডী প্রাণীর নাম চলে আসবেই। মানুষ ছাড়াও আরো অনেক জন্তু-জানোয়ারের মেরুদণ্ড রয়েছে। বাঘ, হাতি, গরিলা, বান্দর, হায়না-ময়না থেকে শুরু করে হাজার হাজার প্রাণীর নাম বলা যাবে। অন্য দিকে সাপ, কেঁচো, চ্যাল্লা, বিছা, কুইচ্যা, কৃমি, ভাইরাস প্রভৃতি নামে অসংখ্য মেরুদণ্ডহীন প্রাণী রয়েছে। আমাদের সমাজে মেরুদণ্ড নামক শব্দটি প্রায়ই রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। মানুষের ব্যক্তিত্ব, রুচি, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কাজ করার ক্ষমতার মাত্রার ওপর লোকটির মেরুদণ্ডের বিশেষণ নির্ভর করে। সৎ, সাহসী, উদ্যমী, পরিশ্রমী ও স্বাধীনচেতা মানুষের প্রশংসা করতে গিয়ে প্রায়ই বলা হয়- মিয়ার ব্যাটার মেরুদণ্ড আছে বটে। অন্য দিকে মিনমিনে স্বভাবের ব্যক্তিত্বহীন, লোভী, স্বার্থপর, অসৎ, অলস ও পরগাছা প্রকৃতির লোকজনকে ঠাট্টা করে বলা হয়, লোকটার মেরুদণ্ড বলতে কিছু নেই।
২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এসে হঠাৎ করেই মেরুদণ্ডের কথা মনে হলো ভিন্ন একটি কারণে। দেশে এখন পৌর নির্বাচনের মওসুম চলছে। প্রায় পৌনে তিন শ’ পৌরসভার নির্বাচন নিয়ে সারা দেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কয়েকটি পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত গিনেস বুকে রেকর্ড লাভের জন্য বিরাট কিছু করে ফেলার হম্বিতম্বি এবং তাদের অতীত ইতিহাসের জ্বালাময়ী দৃষ্টান্ত বিবেচনায় মনে হচ্ছে আমরা হয়তো নির্বাচন নামক যত রঙ, ঢঙ ও সঙ সৃষ্টি হয়েছে তা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তো দূরের কথা, দেশের প্রথিতযশা নাট্যকার, অভিনেতা ও কলাকুশলীরাও করতে পারেননি। দেশের সবচেয়ে বড় কমতি, সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, সবচেয়ে বড় প্রহসন, সবচেয়ে বড় উত্তেজনাকর দৃশ্য, সবচেয়ে সাঙ্ঘাতিক আপত্তিকর দৃশ্য এবং সবচেয়ে বড় কলিজা কাঁপানো ভয়ঙ্কর দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে লাল ইটের তৈরি ওই নির্বাচন কমিশন ভবন থেকেই।
বিগত ৩৫ বছরে বাংলাদেশে বহু অঘটন ঘটেছে। বহু অঘটনের নায়ক-নায়িকার কথা আমরা জানি। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের লোকজনকে কেউ টেক্কা দিতে পারেনি। আজো সাদেক আলী মার্কা নির্বাচন, মাগুরা এবং ঢাকার তেজগাঁও মার্কা নির্বাচন, আজিজ মার্কা ব্যক্তিত্ব, মাহফুজ মার্কা নির্বাচন ও সাইদ মার্কা দুষ্টের দলের পালিয়ে যাওয়ার কীর্তি কাহিনী ও উপাখ্যানকে কেউ টেক্কা দিতে পারেনি। অতীতের সেসব সফলতার ধারাবাহিকতায় বর্তমান কমিশন আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে মেরুদণ্ডের শক্ত-সোজা এবং বাঁকা থেরাপির তত্ত্ব বাস্তবায়নের জন্য। আজ যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়- এই কাজ করার জন্য আপনার মেরুদণ্ড আছে কি? তবে লোকটি একটুও বিব্রত না হয়ে জনৈক বর্তমান নির্বাচন কমিশনারের মতো দাঁড়িয়ে যাবেন। তারপর বলবে- এই দেখুন! আমি দাঁড়িয়েছি- আমার মেরুদণ্ড আছে। ‘লোকটির কথা শুনিয়া যদি আপনার হাস্য করিবার হাজত চাপিয়া বসে তাহা হইলে মহাত্মন হয়তো মনে করিবেন- আপনি তাহার মেরুদণ্ড সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করিয়াছেন। এ অবস্থায় আপনার বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করিবার জন্য তিনি হয়তো আপনার হাতখানা টানিয়া লইয়া নিজের শিরদাঁড়ার ওপর রাখিবেন এবং আপনার হুকুম মোতাবেক মাথা সামনে-পেছনে, ডানে ও বামে নোয়াইয়া প্রমাণের চেষ্টা করিবেন- ওগুলো হুকুম মোতাবেক বাঁকা করা যায় এবং বাঁকা করিতে গিয়া মহাত্মনের শরীরে একটুও বেদনা অনুভব হয় না।’
আজকের শিরোনামটি মূলত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কার্যাবলি পর্যালোচনার জন্যই নির্বাচন করা হয়েছে। বাংলাদেশে এযাবৎকালে যতবার নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে তার মধ্যে বর্তমান কমিশন সবচেয়ে দীর্ঘসময় ধরে একটি অসহনীয় নাজুক ও বিব্রতকর সময় পার করছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, পরবর্তীকালের উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন যে মন্দ নজির স্থাপন করেছে, তা হয়তো সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিতব্য পৌর নির্বাচনের ফলাফল দ্বারা ষোলকলা পূর্ণ করবে। তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ এবং কর্মের জন্যই দিনকে দিন নির্বাচন নিয়ে মানুষের অস্থিরতা, হতাশা ও আশঙ্কার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কতটুকু নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা নিয়ে সর্বমহলেই কানাঘুষা শুরু হয়েছে। সবারই এক কথা- বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ডের শক্তির রিমোট কন্ট্রোলটি তাদের হাতে নেই। সাম্প্রতিককালে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সহযোগিতা চাওয়ার মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো বিরাট এক সিল-ছাপ্পর মেরে প্রমাণ করে দিলেন- ‘ইহা সত্য বটে। ইহাতে মিথ্যার লেশমাত্র নাই।’
বিরোধী দল জোরগলায় অভিযোগ তুলে বলেছে- বর্তমান নির্বাচন কমিশন একটি অথর্ব প্রতিষ্ঠান। সরকারি দলের প্রার্থীদের বিনা ভোটে জয় লাভ করিয়ে আনার জন্য যত ফন্দিফিকির ও ছলাকলার আয়োজন, সেগুলো ছাড়া কমিশন কর্তাদের অন্য কোনো যোগ্যতা নেই। তারা যে মেরুদণ্ডহীন এবং তাদের যে কোনোই ক্ষমতা নেই, তা আরেকবার প্রমাণিত হলো কমিশন কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্য চাওয়ার মাধ্যমে। জাতীয় পার্টির সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বেশ দৃঢ়তার সাথেই বলেছেন, এবারের নির্বাচনে সকাল ৯টার মধ্যেই ভোট গ্রহণ শেষ হয়ে যাবে। বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কোনো কোনো কেন্দ্রে দুপুর পর্যন্ত ভোট চললেও বেশির ভাগ কেন্দ্রে সকাল ১০টার মধ্যেই ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছিল। অভিযোগ ছিল- ভোটের ফলাফল তৈরি করে আগের রাতেই রাখা হয়েছিল। ভোটের দিন বিকেলে সেই ফলাফলপত্রে স্বাক্ষর করা হয় এবং সে মতে ব্যালট বাক্স ভরা হয়।
বিরোধী দল যেমন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উত্থাপন করে চলেছে, তেমনি সরকারি দলও কিন্তু বসে নেই। তারাও এবার বিভিন্ন কারণে নির্বাচন কমিশনের ওপর নাখোশ। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্য চাওয়াকে এক ধরনের নির্বুদ্ধিতা এবং সরকারের জন্য বিব্রতকর বলে মন্তব্য করেছেন সরকারি দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। একান্ত আলাপচারিতায় অনেকেই আক্ষেপ করে বলেছেন, পর্যাপ্ত মেধা, দক্ষতা, সাহস ও কৌশল জানা না থাকলে দালালিও করা যায় না। অথর্ব লোক যদি সরকারের দালালি শুরু করে তবে পতন হতে কোনো সরকারেরই খুব বেশি সময় লাগে না। বর্তমান কমিশন কর্তাদের অতি ভক্তি, খোলাখুলিভাবে সরকারের পক্ষাবলম্বন, বিদঘুটে ও কদর্য প্রক্রিয়ায় সরকারি ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করার অপচেষ্টার কারণে বর্তমানে সরকার দেশ-বিদেশে মারাত্মক ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে। অথচ পরিকল্পনা সহকারে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে কৌশলে কাজ করলে অনেক বদনাম এড়ানো যেত।
বাংলাদেশের নির্বাচন, রাজনীতি ও সামাজিক অবস্থা নিয়ে কাজ করেন, এমন লোকজনের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, বর্তমান কমিশনের পক্ষে ভালো কিছু করার আশা প্রকারান্তে দুঃস্বপ্ন বই অন্য কিছু নয়। তারা কোন আক্কেল বা বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্য চাইলেন, তাও বোঝা যাচ্ছে না। যদি বলা হয়, একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে রাজনৈতিক সহযোগিতা আশা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মতো অন্যান্য দলীয় প্রধানের কাছ থেকেও অনুরূপ সাহায্য-সহযোগিতা চাওয়া হবে এবং এটি কমিশনের একটি রুটিন ওয়ার্ক। কমিশন যদি এমন যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করে, তাও শেষাবধি ধোপে টিকবে না। কমিশনের বোঝা উচিত, নির্বাচনকালীন সময়ে ছোট-বড় সব রাজনৈতিক দলকে কতগুলো সাধারণ সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়। পৌর নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশের বড় দু’টি দলই মারাত্মক বেকায়দায় পড়েছে নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে। দলীয় সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশ অমান্য করে যেসব লোকজন পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য শত চেষ্টা-তদবির, হুমকি-ধমকি এবং বল প্রয়োগ করেও দলগুলো কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। যেখানে দলীয় প্রধান নিজ দলের গুটিকয়েক স্থানীয় নেতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, সেখানে তিনি বা তারা কী করে কমিশনকে সাহায্য করবেন, তা কারো বোধগম্য না হলেও শক্ত মেরুদণ্ডওয়ালারা ঠিক একের পর এক লোক হাসানো কাজকর্ম করেই যাচ্ছেন।
অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান হারে হ্রাস এবং ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধির সূত্র রয়েছে। অন্য দিকে হ্রাস-বৃদ্ধির দু’টি নিয়মও আছে। একটিকে বলা হয় গাণিতিক এবং অন্যটির নাম জ্যামিতিক। কোনো কিছুর বৃদ্ধি, উত্থান ও প্রবৃদ্ধি যেমন গাণিতিক হারে হতে পারে, তেমনি অস্বাভাবিক দ্রুততার সাথে বিস্ময়করভাবে অর্থাৎ জ্যামিতিক হারেও হতে পারে। অন্য দিকে পতন, ক্ষয়, ধ্বংস, নিঃশেষ ও রোগাক্রান্ত হওয়ার বেলায়ও গাণিতিক ও জ্যামিতিক নীতি প্রয়োজন। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেছেন- সমাজ ও সংসারের নৈতিক অধঃপতন এবং মন্দকাজের প্রবৃদ্ধি ঘটে জ্যামিতিক হারে। কোনো একটি মন্দকাজ, মন্দ তৎপরতা কিংবা নিকৃষ্ট উদাহরণ একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে এবং সম্পূর্ণ শেষ পরিণতি ছাড়া ওই প্রবৃদ্ধি ঠেকানো যায় না।
বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য কয়েক লাখ ক্ষমতার বলয় রয়েছে। হাট, মাঠ, ঘাট, পথপ্রান্তর, গ্রাম-গ্রামান্তর, শহর জনপদ কিংবা মহানগরী- সব স্থানেই রয়েছে একাধিক ও বহুমুখী ক্ষমতার বলয়। এসব ক্ষমতার বলয়ের রয়েছে প্রধানত তিনটি বিভাগ। যথা- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সরকারদলীয় ক্ষমতা এবং স্থানীয় পরিবারকেন্দ্রিক ক্ষমতা। এ তিন শ্রেণীর ক্ষমতার আবার দু’টি প্রকারভেদ রয়েছে। যথা- বৈধ ক্ষমতা ও অবৈধ ক্ষমতা। যারা ক্ষমতাবান, তারা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকতে চান। অন্য দিকে ক্ষমতা প্রত্যাশীরাও যেকোনো মূল্যে তা ছিনিয়ে নিতে চান। রাষ্ট্রীয় আইনকানুন, নিয়মনীতি এবং মানুষের সততা, দক্ষতা ও নীতিবোধ- কেবল ক্ষমতাবান ও ক্ষমতা প্রত্যাশীদের অবৈধ আকাক্সক্ষা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই নির্মূল করতে পারে না।
বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ক্ষমতার বলয়গুলোতে কেবলই মন্দ প্রকৃতির উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে অনেকটা জ্যামিতিক হারে। নিয়মনীতি মেনে যথাযথ পরিশ্রম করে ও মেধা খাটিয়ে কেউ আর ক্ষমতায় যেতে চায় না। অন্যের দয়া, মায়া, করুণা কিংবা প্রতিপক্ষকে হুমকি, ধমকি, হত্যা-গুম অথবা মিথ্যাচার, অনাচার, প্রতারণা, মুনাফেকি, অধর্ম ইত্যাদি নরাধম মার্কা কর্ম দ্বারা ক্ষমতায় টিকে থাকা অথবা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়াকে লোকজন জীবনের পরম পাওনা হিসেবে বিবেচনা করছে। এসব নোংরা কাজ করতে গিয়ে তারা পিতামাতা, আত্মীয়স্বজনের রক্তের সম্পর্ক, ধর্মীয় অমিয় বাণী এবং মানবিক গুণাবলি বিসর্জন দিচ্ছে। মানবিকতাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে পাশবিকতাকে হাতিয়ার বানিয়ে নিচ্ছে। শালীনতা, নম্রতা ও ভদ্রতাকে বাদ দিয়ে অশ্লীলতা, উগ্রতা ও ইতরজাত আচরণগুলোকে অলঙ্কার বানিয়ে সদর্পে দম্ভ করে বেড়াচ্ছে। নির্বাচন কমিশনকে যদি এসব বাধা অতিক্রম করতে হয় তবে অবশ্যই কোমর, মেরুদণ্ড ও হাড়ে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে।
একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য প্রত্যেক প্রার্থীকে তৃণমূলে ঘাম ঝরানো অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। শুধু নির্বাচনকালীন সময় নয়, যুগ যুগ ধরে জনকল্যাণ করে নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হয়। মানুষের সমর্থন লাভ এবং ভোটের দিন ভোটপ্রাপ্তির মতো কঠিন কর্ম জগৎ সংসারে খুব কমই আছে। প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের পথে হাঁটার জন্য একজন প্রার্থীকে যে কারাভোগ করতে হয়, বলতে গেলে সে সবের কিছুই করতে হয় না সাদেক আলী বা মাগুরা মার্কা নির্বাচনের ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীর অবস্থা হয় ভিনি-ভিডি-ভিসির মতো অর্থাৎ আসলাম দেখলাম ও জয় করলাম। বর্তমান নির্বাচন কমিশন গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতিকে ভিনি-ভিডি-ভিসির পর্যায়ে নিয়ে গেছে। যেখান থেকে পুনরায় নির্বাচনকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য কমিশনকে মহাবীর আলেকজান্ডার অথবা জুলিয়াস সিজারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। বর্তমান কর্তাব্যক্তিরা সে কাজটি করতে পারবেন কি না তা বোঝার জন্য যে কেউ আলেকজান্ডার ও জুলিয়াস সিজারের চেহারা-সুরোতের দিকে তাকাতে পারেন এবং পরক্ষণেই কমিশনের গুণধর কর্তাদের বদনে দৃষ্টিপাত করতে পারেন!!!

নিষ্পাপ ফিলিস্তিনি শিশু হত্যা উদযাপন ইসরাইলিদের, নিন্দার ঝড়

১৮ মাস বয়সী ফিলিস্তিনি শিশুকে নির্মমভাবে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল ইসরাইলিরা। বর্বরতা সেখানেই থেকে থাকেনি। ইহুদিদের এক বিয়ের ভিডিওতে দেখা গেছে, সদলবলে ওই শিশু হত্যা উদযাপন করছে আমন্ত্রিতরা। এ নিয়ে তীব্র নিন্দার ঝড় বইছে বিশ্বজুড়ে। বুধবার রাতে ইসরাইলের চ্যানেল ১০ ভিডিওটি প্রচার করে। তিন সপ্তাহ আগে ভিডিওটি ধারণ করা। এতে দেখা যায়, জেরুজালেমে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে বন্দুক, ছুরি নিয়ে নেচে গেয়ে উদযাপন করছে একদল ইসরাইলি তরুন। মুখোশধারী এক তরুনকে দেখা গেছে একটি পেট্রোলবোমা উচিয়ে ধরতে। আর অপর তরুন আলি দাওয়াবশেহ নামের ওই শিশুর ছবিকে ছুরিকাঘাত করছে। ১৮ মাসের আলিকে জুলাই মাসে অগ্নিসংযোগ করে জীবিত পুড়িয়ে হত্যা করেছিল ইসরাইলি দখলদারেরা। দখলিকৃত পশ্চিম তীরের দুবা গ্রামে তারা দাওয়াবশেহ পরিবারের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই হামলায় আলি ও তার পিতা-মাতা নিহত হন। আলির চার বছরের ভাই গুরুতর আহত হন। নৃশংস ওই হামলায় একমাত্র বেচে যাওয়া ব্যক্তি সে। ওই ভিডিওর এক পর্যায়ে দেখা যায়, সামরিক মানের রাইফেল আর পিস্টল একজনের হাত থেকে আরেক জনের হাতে দেয়া হচ্ছে। এমনকি শিশুদের হাতেও। চ্যানেল ১০ এর রিপোর্টে বলা হয়, দখলদারদের কাছে অস্ত্রগুলো ইস্যু করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। বাইবেলের আয়াত বিকৃত করে তারা গান গেয়েছে ফিলিস্তিনকে কটাক্ষ করে। আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, ইসরাইলি রাজনীতিকরা দ্রুতই ওই ভিডিও ও বিয়ের অনুষ্ঠানের যোগ দেয়া মানুষদের নিন্দা জানায়। অনেক ফিলিস্তিনি আর ইসরাইলি মানবাধিকার গ্রুপ বলছে, ইসরাইলি নেতাদের উস্কানি আর দেশটির নীতিই এমন গোষ্ঠীগুলোর জন্য দায়ী। জায়োনিস্ট ইউনিয়ন ইলেক্টোরাল কোয়ালিশনের নেতা আইজ্যাক হেরজগ ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া ব্যক্তিদের সমালোচনা করে বলেছেন, তারা ভুলে গেছে একজন ইহুদি হওয়ার অর্থ কি। হেরজগ তার টুইটারে লিখেছেন, বিয়েতে যারা নেচে গেয়ে ঘুমন্ত একটি শিশু হত্যা উদযাপন করেছে, তারা ইহুদিও নয়, ইসরাইলিও নয়। তাদের যত দ্রুত সম্ভব কারাগারে পাঠানো উচিত।

খালেদা কেন ইতিহাসকে অস্বীকার করছেন? by সোহরাব হাসান

খালেদা জিয়ার মন্তব্য কেবল আমাদের শহীদ পরিবারগুলোকে অপমান করেনি, গোটা জাতিকেও অসম্মান করেছে। যদিও আমি তাঁর বক্তব্যে মোটেই বিস্মিত হইনি। কেননা আমাদের দেশে ইতিহাস বিকৃতির ধারা চলে আসছে। তবে তাঁর কথায় আমরা বিভ্রান্ত হব না। কারণ সত্যেরই জয় হবে।
—মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে খালেদা জিয়ার দেওয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শহীদ মুনীর চৌধুরীর সন্তান আসিফ মুনীর
ইতিহাস বিকৃত করতে তাঁরাই মেতে ওঠেন, ইতিহাস নির্মাণে যাঁদের ন্যূনতম ভূমিকা থাকে না। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখতে না পারলেও স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরাচারের পতন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর ভূমিকার পুরস্কারস্বরূপ জনগণ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করেছেন। জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপির বাঘা বাঘা সব নেতাকে এরশাদ ভাগিয়ে নিলেও একদা গৃহবধূ খালেদা জিয়া সাহস ও কর্মীদের ওপর ভর করে দলকে পুনর্গঠিত করে ক্ষমতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন আরও পাঁচ বছর পর, ১৯৯৬ সালে।
গত আড়াই দশকের রাজনৈতিক সমীকরণে দেখা যায়, স্বৈরাচারী এরশাদের দল জাতীয় পার্টি যেমন শেখ হাসিনার কাঁধে ভর করেছে, তেমনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতে ইসলামী খালেদা জিয়ার ঘাড়ে চেপে বসেছে। তাই দুই নেত্রীর রাজনৈতিক কর্মপন্থা নির্ধারণে অনেক সময় মূল চরিত্রের চেয়ে পার্শ্বচরিত্রের ভূমিকা প্রাধান্য পেয়ে থাকে। গত সোমবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত সমাবেশে খালেদা জিয়া ‘আজকে বলা হয় এত লাখ লোক শহীদ হয়েছেন; এটা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে’ বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা সেই পার্শ্বচরিত্রকে খুশি করার জন্য কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শহীদের সংখ্যা তো কেবল একটি সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে সমগ্র জাতির স্পর্ধা ও ভালোবাসা জড়িত। এর সঙ্গে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া লাখ লাখ শহীদের স্বজনদের আবেগ ও বেদনা জড়িত। এর সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের অহংকার জড়িত। আসিফ মুনীর যে অপমানের কথা বলেছেন, সেটি তাঁর একার নয়। প্রতিটি শহীদ পরিবারের কথা। একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের নেত্রী, যিনি তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তিনি কী করে লাখ লাখ শহীদ পরিবারকে অপমান করলেন? ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কিংবা সরকারের ওপর খালেদা জিয়ার যত রাগই থাক না কেন, সেই রাগ ঝাড়তে শহীদদের টানতে পারেন না। ‘আজকাল এত লাখ বলা হয়’ বলেও তিনি শহীদদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে পারেন না।
খালেদা জিয়া সেদিনের সমাবেশে আরও অনেক কথা বলেছেন। তিনি পৌরসভা নির্বাচনে সরকারি দলের জোরজবরদস্তির কথা বলেছেন। তিনি বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতনের কথা বলেছেন। সরকারের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন। এসব অভিযোগের সবটাই ভিত্তিহীন তা-ও বলব না। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ পদ্মা সেতু করতে পারবে না। তিনি ক্ষমতায় এসে দুটি পদ্মা সেতু করবেন। খুবই ভালো কথা। বাংলাদেশের মানুষ দুটি পদ্মা সেতু পাবে। এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কী হতে পারে?
কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপির নেত্রী আওয়ামী লীগের ওপর তাঁর রাগ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ পরিবারের ওপর ঝাড়লেন কেন? খালেদা কারও নাম না নিয়ে বলেছেন, ‘তিনি স্বাধীনতা চাননি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন।’ এই তিনি কে, স্পষ্ট না করলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বিএনপির নেত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই ইঙ্গিত করেছেন। শেখ মুজিব যদি স্বাধীনতা না চেয়ে থাকেন, স্বাধীনতাটা এল কীভাবে? একাত্তরের ১ থেকে ২৫ মার্চ বাংলাদেশ কার নির্দেশে চলেছে—শেখ মুজিব না পাকিস্তান বাহিনীর? জিয়াউর রহমান কার নামে ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন? একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় যে সরকারটি গঠিত হয়েছিল, সেটিই বা কার নেতৃত্বে?
খালেদা জিয়া সেদিন যেসব মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে সমাবেশ করেছিলেন, তাঁদের বর্তমান অবস্থান যাই হোক না কেন, তাঁরাও স্বীকার করবেন শেখ মুজিবের নামেই তাঁরা যুদ্ধ করেছেন। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে পাকিস্তানি শাসকেরা কেন তাঁকে কারাগারে রাখবে? কেন দেশদ্রোহের অভিযোগে ফাঁসির দণ্ড দেবে? সেই দণ্ড ইয়াহিয়া খান কার্যকর করতে পারেননি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায়। একাত্তরে জিয়াউর রহমান যে সেক্টর কমান্ডার ও পরে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, সেটিই বা কোন সরকারের অধীনে? বিএনপির চেয়ারপারসন যেভাবে এ কে খন্দকার ও শারমীন আহমদের বইয়ের ব্যাখ্যা করেছেন, সেটিও সঠিক নয়। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু কোন প্রকৌশলীর সহায়তায় খুলনা থেকে আনা একটি ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেছিলেন, শারমীন আহমদের বইয়ে তার বিস্তারিত বিবরণ আছে। শুনে নয়, বইটি পড়েই তাঁর কথা বলা উচিত ছিল।
তাই খালেদা জিয়াকে বলব, আজকের রাজনৈতিক বিবাদে একাত্তরকে টেনে আনবেন না। শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁদের পরিবারকে অপমান এবং মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করবেন না। আপনার এসব বক্তব্য স্বাধীনতার বিরোধীদের খুশি করলেও ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করেছে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের স্বজনদের। আপনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ৩২ বছর ধরে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কখনোই শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। আজ কেন তুলছেন? সেদিনের সভায়ও আপনি বলেছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার আপনারাও চান, তবে সেটি আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। তাহলে ক্ষমতায় থাকতে কেন সেই বিচার করলেন না? আপনি আরও বলেছেন, আওয়ামী লীগও নাকি রাজাকারের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিল। তাহলে সেই রাজাকারের বিচার করলেন না কেন? আপনি দ্বিতীয়বার যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে সরকার গঠন করলেন। আর প্রথমবার জামায়াতের নেতা গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে শহীদজননী জাহানারা ইমামসহ যে ২৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক গণ–আদালত গঠন করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন।
একাত্তরকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা কিংবা বাস্তববোধের প্রতিফলন হতে পারে না। যে কথাগুলো এত দিন পরাজিত পাকিস্তানের জেনারেল, আমলা, সেখানকার লেখক, বুদ্ধিজীবীরা বলতেন, সেই কথা বাংলাদেশের একজন রাজনৈতিক নেত্রী করতে পারেন না বলেই আমাদের মনে দৃঢ় প্রত্যয় ছিল। অথচ খালেদা জিয়া সেটাই করেছেন। তাও এই বিজয়ের মাসে। সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধের দায়ে বাংলাদেশে দুই রাজনীতিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের সরকার ও রাজনৈতিক মহল যেসব মন্তব্য করেছে, তা ছিল খুবই উসকানিমূলক। এর মাধ্যমে একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তান নিজেদের অপরাধই শুধু আড়াল করছে না, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটাকেও তারা অস্বীকার করছে।
কিন্তু বিএনপির মতো একটি জনপ্রিয় দলের নেত্রী কী করে তাদের কথায় সুর মেলালেন? তিনি বলেছেন, ‘আজকাল বলা হয় এত লাখ লোক শহীদ হয়েছেন।’ এটি কি আজকাল বলা হওয়ার বিষয়? মুক্তিযুদ্ধে কত মানুষ শহীদ, কত নারী ধর্ষিত হয়েছেন, কত মানুষ নির্যাতিত ও দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, কত পরিবার সবকিছু হারিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের পর সে সবের একটি সরকারি ভাষ্য প্রকাশ করা হয়, যা আজ ইতিহাসের অংশ। কিন্তু এও সত্য যে নয় মাস ধরে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের যে অপরিমেয় ক্ষতি, তা কোনো পরিসংখ্যানেই তুলে আনা সম্ভব নয়। পরাজিত পাকিস্তান শুরু থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার আলবদরদের হাতে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা কমিয়ে দেখাতে উঠেপড়ে লেগে যায়। খ্যাতনামা পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মির কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ সফরকালে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা যে ভাড়াটে লেখকদের দিয়ে মনগড়া ইতিহাস লেখাচ্ছে, তা অকপটে স্বীকার করেছেন। এদের মধ্যে কোনো কোনো গবেষক নাকি ডাবল এজেন্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। কিন্তু তাদের এই সব অপপ্রচারের জবাবে একটি কথাই বলব, মিথ্যে দিয়ে কখনো সত্যকে আড়াল করা যায় না, সত্যের জয় হবেই।
মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনা, অনেক কাহিনি এখনো অনুদ্ঘাটিত। অনেকে চুয়াল্লিশ বছর পরও হারিয়ে যাওয়া স্বজনের অপেক্ষায় আছেন। সেই স্বজনহারা মানুষদের কী বার্তা দিলেন খালেদা জিয়া?
ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রধান ডা. এম এ হাসান বলেছেন, কিছু কিছু জাতীয় বিষয় আছে যা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে না। জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীতের মতো শহীদের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায় না। শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে খালেদা জিয়া নিজের মর্যাদা ও সততাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাঁর মতে, শহীদের সংখ্যাটি কারও রান্নাঘরের আলোচনার বিষয় নয়, যে তার ওপর আপনি প্রশ্নচিহ্ন বসিয়ে দিতে পারেন। তাঁর এই মন্তব্য পাকিস্তান ও দালালদের স্বার্থ হাসিল করবে।
শহীদের সংখ্যা নিরূপণের সর্বজন স্বীকৃত পদ্ধতির কথা উল্লেখ করে এম এ হাসান বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী পক্ষ দাবি করেছে নাৎসি বাহিনী ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেছে, নাৎসি বাহিনীর আইনজীবীরা এটিকে অতিরঞ্জিত বললেও তা গ্রাহ্য হয়নি। ইতিহাসের বিকৃতি রোধে ১৪টি ইউরোপীয় দেশ গণহত্যা অস্বীকার আইন অনুমোদন করে, যাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা অস্বীকারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হয়।
বাংলাদেশেও মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যাটিও নিরূিপত হয়েছে অনেক আগেই। এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তোলা বা প্রশ্ন করার সুযোগ নেই।
তাই মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিএনপির নেত্রী যে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অযাচিত প্রশ্ন রেখেছেন, আশা করি, সেটি তিনি প্রত্যাহার করে নেবেন। অন্যথায় সমালোচেকরা ‘পাকিস্তানিেদর খুশি করতে তিনি এই মন্তব্য করেছেন’ বলে যে অভিযোগ এনেছেন, সেটাই সত্য বলে মানুষ ধরে নেবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

আরো ৪ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলো ইসরাইলি সেনারা

আরো চার ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরাইলি সেনারা। বৃহস্পতিবার বেথেলহেমের পশ্চিম তীরে পৃথক চারটি ঘটনায় ওই চার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়।
ইসরাইলের দাবি, এদের মধ্যে তিনজন ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বহু ঘটনায় নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের গুলি করে হত্যার পর মরদেহের পাশে একটি ছুরি রেখে দেয় ইসরাইলিরা। পরে প্রচার চালায় যে ইসরাইলিদের ওপর ছুরিকাঘাতের চেষ্টাকালে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
গত তিন মাস ধরে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ১২৯ ফিলিস্তিনি নাগরিক ও ২২ জন ইসরাইলি নিহত হয়েছে।
সূত্র : এপি, পিএনএন

ইনটেনসিভ কেয়ারে মুমূর্ষু গণতন্ত্র বাঁচবে তো? by নূরে আলম সিদ্দিকী

কিছুদিন আগে রাষ্ট্রের একক ক্ষমতার অধিকারী শেখ হাসিনা বলেছেন, “গণতন্ত্র নয়, উন্নয়নই আমাদের লক্ষ্য”। তার এই উক্তি গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনের আঙ্গিকে উক্তিটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে। এমনিতেই ক্ষমতার নির্লজ্জ প্রলোভন দেশ, জাতি, স্বাধীনতার প্রশ্নে মানুষের হৃদয়ের স্পন্দনকে আদৌ উপলব্ধি না করে প্রতিহিংসাপরায়ণতা এতটাই তীব্র হয়েছে যে, মানুষ আজ রাজনীতি ও রাজনীতিকদের প্রতি নিরাশ, হতাশ ও বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। রাজনীতি ও রাজনীতিকদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ শুধু মুখ ফিরিয়েই নেননি  (দুয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে); তারাই একদিকে গণতন্ত্রকামী দেশটিকে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের গভীর অতলান্তে নিক্ষেপ করেছেন, অন্যদিকে মানুষ ও সমাজের স্বস্তি ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে ব্যারোমিটারের তলানিতে এনে ঠেকিয়েছেন। একটি প্রশ্নে সাধারণ মানুষের মনে কোনো দ্বিধা-সংকোচ নাই, দুই জোটের ক্ষমতার প্রতি উদগ্র লালসা, দুর্নীতি, দুর্বিচার; বিশেষ করে দুর্নীতির প্রতি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় সমাজের দুর্ধর্ষ দুর্নীতিবাজরা অমিত বিক্রমে, দাম্ভিকতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সমাজে হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি করেছেন। এ কথাটি আমি বহুবার বলেছি; কিন্তু এর প্রতিকার তো দূরে থাক, রাজনীতিকদের কর্ণকুহরে কখনোই আমার সেই ফরিয়াদ পৌঁছে নাই। রাষ্ট্রের নাগরিকদের হৃদস্পন্দন বোঝার আগ্রহ ও মানসিকতা আজ রাজনীতিকদের মধ্যে একেবারেই অনুপস্থিত।
আসন্ন পৌর নির্বাচনটিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উচ্ছ্বাস এই চিরসত্যটি প্রতিভাত করেছে যে, মানুষ গণতন্ত্র-পিয়াসী। অন্যদিকে রাজনীতিকদের অন্তরের পুরো ক্যানভাস জুড়ে শীর্ষ-নেতৃত্বের স্তাবকতা, অর্চনা, বন্দনা ছাড়া অন্যকিছুর বালাই নেই। উভয় জোটেই আজ এটি নির্মম বাস্তবতা।
দেশের মোট ২৩৬টি পৌরসভায় প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দুই জোটে আতি, পাতি, মহারথীদের আমি বিদগ্ধ চিত্তে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, রাজনীতিতে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার একমাত্র নিয়ামক শক্তি হলো সহনশীলতা; সহনশীলতা ছাড়া কখনোই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল যার যার আঙ্গিকে দেশের কল্যাণে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রস্তুত করে, আবার জাতীয় স্বার্থে দলীয় আবর্ত থেকে বেরিয়ে এসে একাট্টা হয় এবং জাতীয় স্বার্থকে রক্ষা করে।
এই নির্বাচনে গণতন্ত্রের নিয়ামক শক্তি সহনশীলতা প্রদর্শন করতে পারলে দেশ এক মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে অনেকখানি রক্ষা পাবে। শেখ হাসিনাকে প্রমাণ করতে হবে, তার সরকার তার একচ্ছত্র আধিপত্যের মধ্যেও নির্বাচন কমিশন পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে জাতিকে একটি গ্রহণযোগ্য(!) নির্বাচন দিতে সক্ষম হয়েছে। তার চারপাশে যারা সুদৃঢ় অবস্থান নিয়েছে তাদের অনেকেই বিধ্বস্ত বামের অপভ্রংশ। এই স্তাবক, তোষামোদকারী এবং আদর্শ-বিবর্জিত বামেরা শেখ হাসিনাকে কুমন্ত্রণা দিচ্ছে যে, কোনভাবেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেয়র পদ বিরোধী জোটকে দেয়া যাবে না। তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি সোচ্চার ও শক্তিশালী হবে। তবে দেশবাসী মনে করে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে গণতন্ত্র প্রাথমিক ভিত্তি পাবে। তাতে তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি খুঁজে পাবে।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থা এতটাই করুণ যে, তারা শক্ত ও নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন- এটা কেউই বিশ্বাস করেন না। তিনি ইতিমধ্যেই তার পক্ষপাতিত্বের অসংখ্য দৃষ্টান্ত প্রতিস্থাপন করেছেন। সরকারি জোটের অনেকেই তাকে মেরুদণ্ডহীন আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি ক্ষমতাসীন জোটের এরশাদ তাকে “ভাঁড়” বলেছেন। একটা উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক, বিরোধী জোট পৌর নির্বাচনের আগে ক্ষেত্রবিশেষে সামরিক বাহিনী প্রদানের দাবি তুলেছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেটাকে তো আমলে নেয়ই নি বরং জ্যোতিষীর মতো ভবিষ্যৎকে নির্বিঘ্নে অবলোকন করে বলেছেন, সেনা নিয়োগের প্রয়োজন নাই। ভাবখানা, তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করার অলৌকিক শক্তির অধিকারী। এটা পৌর নির্বাচন হতে পারে, কিন্তু এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সফল করার সমস্ত দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতার মানদণ্ড। একটু জটিল সিদ্ধান্ত আসলেই তিনি অপ্রতিরোধ্য শক্তির অধিকারী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চান লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে। এতে বিরোধী জোটের জন্য প্রমাণ করতে সহজ হয় যে, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ও শক্তিধর তো নয়ই, বরং ক্ষমতাসীন জোটের কাছে একান্তভাবে নতজানু।
আমাকে ভুল বোঝার অবকাশ না রাখার লক্ষ্যে আমি জনান্তিকে জানিয়ে রাখি, একমাত্র সেনাবাহিনী সার্বভৌমত্বের প্রতীক এবং দলমতের ঊর্ধ্বে। দেশের মানুষেরও তাদের নিরপেক্ষতার প্রশ্নে বিশ্বাস ও আস্থা প্রগাঢ়। আমি তাদের সঙ্গে একমত, যারা বলছেন, পুলিশসহ প্রশাসনের অংশ সবসময়ই সরকারের কাছে অনুগত থাকতে বাধ্য। অভিশংসন আইনের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। তবুও বিরোধী রাজনৈতিক জোটের কাছে আমার বক্তব্য কোনো অজুহাতেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন না (৫ জানুয়ারির নির্বাচনটিকে আমি অদ্যাবধি সমর্থন করি না)। বিস্মৃত হবেন না, আজকে যে দলীয়করণ, দুর্নীতি ও দুর্বিচার- সেটির প্রসূতিকাগার “হাওয়া ভবন”। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের নৃশংসতার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিরল। যদিও এটি বাস্তব, দলছুট ও সুবিধাবাদীদের দ্বারা গড়ে ওঠা বিএনপির পক্ষে তাদের কোনো আন্দোলনের সঙ্গেই তারা জনসম্পৃক্ততা তৈরী করতে পারেন নি। তবুও পৌর নির্বাচনে তাদের কর্মীদের মধ্যে যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে, রাজনীতির মাঠে টিকে থাকতে হলে সেটাকে তাদের ধরে রাখতে হবে। আমি পূর্বেও বলেছি যে, খালেদা জিয়াকে নিঃসংশয় চিত্তে ঘোষণা দিতে হবে যে, তিনি এবং তার পরিবার কোনভাবেই ক্ষমতায় আসীন হবেন না। নইলে তোতাপাখির মতো তিনি এবং তার স্তাবক, মোসাহেবরা গণতন্ত্র উদ্ধারে যে বক্তব্যটির চর্বিতচর্বণ করছেন, তা মানুষ শুনছে কিন্তু বিশ্বাস করছে না। অধিকার কখনো অনুনয়, বিনয় বা ভিক্ষা চেয়ে পাওয়া যায় না। বোমা বিস্ফোরণ বা মানুষ হত্যার মধ্য দিয়ে তো প্রশ্নই আসে না। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেগম খালেদা জিয়ার লক্ষ্য হওয়া উচিত, প্রতিটি সাংগঠনিক জেলা থেকে স্বেচ্ছাকারাবরণ ও নির্যাতন-নিগ্রহ মোকাবিলা করার মতো মৃত্যুভয়কে পরোয়া না করা অকুতোভয় অন্তত ৫০০ কর্মী খুঁজে বের করা। সেটি করতে না পারলে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের বিস্তৃত পথপরিক্রমণে- বিশেষ করে ৬ দফা প্রদানের পর বাঙালি জাতীয় চেতনার উৎস ছাত্রলীগকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার প্রশ্নে যে চেতনার গৌরবগাঁথায় বঙ্গবন্ধু তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বে সমগ্র জাতিকে একটি মিলনের মোহনায় এনে দাঁড় করিয়েছিলেন, সেখান থেকে রাজনীতিকদের অন্তত কিছু শিক্ষাগ্রহণ করা উচিত।
এই পৌর নির্বাচনটি সষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে দেশের মুমূর্ষু গণতন্ত্র কিছুটা অক্সিজেন পাবে। গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকারবিহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা সমাজে দুর্বিচার ও দুর্নীতিপরায়ণদের দৌরাত্ম্য বাড়ায় এবং সামাজিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা সৃষ্টি করে। দুই নেত্রী বিষয়টি যত দ্রুত অনুধাবন করবেন, জাতির জন্য ততই মঙ্গল।

জনমতকে উপেক্ষা করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টায় সরকার by ডয়চে ভেলে

জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে, দমন-পীড়ন ছাড়া উপায় থাকে না৷ আর এই দমন-পীড়ন শুরু হয় মূলত বিরোধীদলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের উপর৷ তারপর তা সমাজের অন্যান্য শ্রেণি ও পেশার মানুষের উপর প্রয়োগ হতে থাকে৷
এমন অনাচারের ফলে সমাজে নানা রকমের বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়৷ বেড়ে যায় গুম ও খুনের ঘটনা৷ সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, এই গুম-খুনের অভিযোগ উঠতে থাকে রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধে৷ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, দলের অঙ্গ সংগঠন, ছাত্র সংগঠন নানা রকমের অন্যায়-অনিয়ম, দুর্নীতি, ঠিকাদারি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে৷ অন্যদিকে দমন-নিপীড়নে বিরোধীদল দূর্বল হয়ে পড়ায়, এ সবের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ থাকে না৷ সামগ্রিকভাবে দেশে আইনের শাসন বলতে কিছু থাকে না৷ জনমানুষের জীবন হয়ে পড়ে চরম নিরাপত্তাহীন৷ ক্ষমতাসীনদের আচার-আচরণ-দাম্ভিকতায় মানুষ অতীষ্ট হয়ে ওঠে৷ কিছু অবকাঠামোগত দৃশ্যমান উন্নয়নের কথা বলে ক্ষমতাসীনরা তাঁদের যাবতীয় অপরাধ আড়াল করতে চান৷
গত সাত-আট বছরে মোটামোটিভাবে বাংলাদেশে এমনই একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে৷ এমন অবস্থায় সাধারণত প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন সমাজের অগ্রসর মানুষেরা৷ এর মধ্যে লেখক-শিল্পী-শিক্ষক-সাংবাদিক – অনেকেই থাকেন৷ তবে গণমাধ্যমই এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিশালী নাগরিক সমাজের ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছে৷
নাগরিক সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার মোক্ষম পন্থা
দমনে-নিপীড়নে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিয়ন্ত্রণে আনার পর, সরকারের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই নাগরিক সমাজ৷ তাঁরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন৷ যেহেতু নাগরিক সমাজ বিবেকবান মানুষ হিসেবে পরিচিত থাকেন, সেহেতু তাঁদের প্রতিবাদের প্রভাব মানুষের উপর পড়ে৷ মানুষ সাহসী হয়ে উঠতে থাকে৷
বাংলাদেশে বর্তমানে বিরোধী দল বলতে কিছু নেই৷ দমনে-পীড়নে বিএনপি ছন্নছাড়া৷ এরশাদের জাতীয় পার্টি কোনো দলের পর্যায়েই পড়ে না৷ এদের ‘তোষামোদী দল বলা যেতে পারে৷ তাছাড়া সরকারের নেতিবাচক, খারাপ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কোনো প্রতিবাদ নেই৷ প্রতিবাদ একমাত্র আসছিল নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে৷ বিশেষ করে সরকারের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সাংবাদিক, তথা গণমাধ্যম৷ এর মধ্যে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল টেলিভিশনের রাজনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠান ‘টকশো৷
তাই বিরোধী দল নিয়ন্ত্রণের পর, সরকারের দায়িত্ব হয়ে পড়ে গণমাধ্যম তথা নাগরিক সমাজ নিয়ন্ত্রণ, টকশো নিয়ন্ত্রণ৷ সরকার মনে করে, নাগরিক সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার এটাই সবচেয়ে উত্তম পন্থা৷
বর্তমানে দেশে প্রতিটি মানুষের জীবনই নিরাপত্তাহীন৷ আর গণমাধ্যম কর্মীদের জীবন আরও বেশি নিরাপত্তাহীন৷ একের পর এক ব্লগারের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই নিরাপত্তাহীনতার কিছুটা প্রকাশ দেখা গেছে৷ বাস্তবে গণমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর৷ ব্লগারদের উপর ক্ষিপ্ত সমাজের ছোট ধর্মীয় উন্মাদ একটি অংশ৷ সত্যি কথা বলতে কি, গণমাধ্যম কর্মীদের উপর এই ধর্মীয় উন্মাদরা তো ক্ষিপ্তই, তার চেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত সরকার, সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী৷ ফলে তাদের বিপদ বহুবিধ৷ ব্লগার, প্রকাশকদের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার অন্যদের ভয় দেখাতে চেয়েছে যে, পরিণতি এমন হলে কিছু করার থাকবে না৷
এর সঙ্গে সাংবাদিক, সম্পাদকদের হত্যার হুমকি, গুমের হুমকি-প্রচেষ্টা তো আছেই৷ ফলে কিছু গণমাধ্যম কর্মী অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছেন৷ গণমাধ্যম মালিকদের যেহেতু আরও অন্য ব্যবসা আছে, ফলে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে-হচ্ছে ভিন্ন পন্থায়৷ কাউকে কাউকে অন্য ব্যবসায় সুবিধা দেয়া হয়েছে-হচ্ছে৷ আবার কারো অন্য ব্যবসায় সমস্যা তৈরি করে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে-হচ্ছে৷ যে সব গণমাধ্যম কর্মী এত প্রতিকৃলতার মধ্যেও সত্য লিখছিলেন, সত্য বলছিলেন, তাঁদেরও নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে নানা পন্থা অবলম্বণ করা হচ্ছে৷ এছাড়া দলীয় মাস্তানদের দিয়ে অনেকের চরিত্রহনন করানো হচ্ছে, মৌখিকভাবে মালিকদের চাপ দিয়ে টকশোতে অনেককে নিষিদ্ধ করানো হয়েছে, অনেকের লেখা পত্রিকাগুলো ছাপাও হচ্ছে না৷ এমনকি বিপদে পড়ার ভয়ে অনেক পত্রিকা নিজেরাই ‘সেন্সর করছে৷ প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের বিজ্ঞাপণ বন্ধ করিয়ে দিয়ে অন্যদের ভয় দেখানো গেছে৷ এখানেই শেষ নয়৷ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বন্ধ করে দিয়ে কারো কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে এক ধরণের ভিতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে৷ তারপরও পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না৷ সরকার অবশ্য নানা উপায়ে এই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা অব্যহত রেখেছে৷
ঘুস দিয়ে অথবা ভয়-ভিতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
লেখক-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের নিয়ন্ত্রণের জন্যে স্বৈরশাসকরা দুটি উপায় অবলম্বন করে থাকে৷ এক. সুযোগ-সুবিধা, অর্থ-সম্পদ দিয়ে৷ দুই. ভয় দেখিয়ে৷ অর্থ-সম্পদ দিয়ে নাগরিক সমাজের অনেককে পক্ষে নেয়ার প্রবণতা আইয়ুব খানের সময় থেকে দেখা গেছে৷ বাংলাদেশে সামরিক শাসক জিয়াউর রাহমানও নাগরিক সমাজের অনেককে পদ-পদবি দিয়ে পক্ষে নিয়েছিলেন৷ তবে নাগরিক সমাজের বড় একটি অংশের চরিত্র দুষিত করে দিয়েছেন সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ৷ মন্ত্রীত্ব, পদ-পদবি, ঢাকায় প্লট বাঅর্থ দিয়ে নাগরিক সমাজের অনেককে কাছে টেনে নিয়েছিলেন এরশাদ৷ যাঁদের নিতে পারেননি, তাঁদের উপর জুলুম-নির্যাতন করেছেন৷
বর্তমানে সুযোগ-সুবিধা পেয়ে বা পাবেন এই লোভে নাগরিক সমাজের বড় একটি অংশ সরকারের দুর্নীতি-অন্যায়-অনৈতিক কর্মকাণ্ড সমর্থন করছেন৷ যাঁরা এখনও সত্য কথা বলছেন, লিখছেন, তাঁদের নানা রকমের ভয়-ভিতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলছে৷ কেউ একজন নিজে ভয় না পেলে, সন্তানদের কথা বলে ভয় দেখানো হচ্ছে৷ দেশে যেহেতু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বলতে কিছু নেই, নেই আইনের শাসন, বিপদে পড়লে আশ্রয়ের জায়গাও নেই, সেহেতু অনেকে নিজে থেকেও সতর্ক হয়ে গেছেন৷ হিসেব করে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করছেন৷ চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখছেন, কিন্তু বলছেন না, প্রতিবাদ করছেন না৷ আর যিনি বলতে চান, তাঁকে বলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না৷ পত্রিকাগুলিও তাঁর লেখা ছাপতে অপারগতা প্রকাশ করছে৷
লোভি-নীতিভ্রষ্ঠ একদল তোষামোদকারী ভোটারবিহীন নির্বাচন থেকে শুরু করে, গুম-খুন, সন্ত্রাস, ব্যাংক-শেয়ার বাজার লুট – এ সব অপকর্মকে ভালো কর্ম বলে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন৷ সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত খারাপ সময় অতিক্রম করছে৷

স্থানীয় নির্বাচন নাকি রাজনীতির লড়াই?

সাত বছর পর দলীয় প্রতীক নিয়ে ভোট যুদ্ধে নামা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা আসন্ন পৌর নির্বাচনকে সাধারণ কোন ভোট হিসেবে দেখছেন না। বরং তাদের মতে এটি রাজনৈতিক লড়াই। ভোটারদের অনেকে বলেছেন, ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত সংসদ নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একটা ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তারা রাজনৈতিকভাবে পৌর নির্বাচন করছেন। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি ভুল করেছিল বলে অনেক ভোটারের ধারণা। তারা মনে করেন, সেই উপলব্ধি থেকে দলটি পৌর নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নরসিংদী পৌরসভায় প্রধান সড়কের পাশে একটি মার্কেটে কয়েকজন ভোটার বলছিলেন, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি স্ব স্ব রাজনৈতিক চিন্তা নিয়ে মাঠে নেমেছে। ফলে এবার পৌর নির্বাচন পুরোপুরি রাজনৈতিক চেহারা পেয়েছে। আইনজীবী এম এম খোকন বলেছেন, “বিএনপি ভুল বুঝতে পেরে এই নির্বাচনে অংশ নেয়ায় তাদের নেতাকর্মীরা মানুষের কাছে যাওয়ার একটা সুযোগ পেলো। আর আওয়ামী লীগও তাদের জনসমর্থন যাচাই করার সুযোগ পেলো।” গৃহিণী সুমনা হক মনে করেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় বিএনপি এতে অংশ নিয়েছে। দলীয় প্রতীক নিয়ে প্রধান দুই দল সর্বশেষ মুখোমুখি হয়েছিল বিগত সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি সংসদের বাইরে রয়েছে। যদিও এর মাঝে উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা অংশ নিয়ে অনেকে বিজয়ী হন। কিন্তু সেই নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হয়নি। নরসিংদী উপজেলার চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় বিএনপি নেতা মঞ্জু এলাহী বলছিলেন, দীর্ঘ সময় পর দলীয় প্রতীক নিয়ে তারা মাঠে নেমেছেন। এটি রাজনৈতিকভাবে তাদের দলের সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাও এই পৌর নির্বাচনকে রাজনৈতিকভাবে নিয়েছেন। ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগকে যে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। সেখানে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এই ভোটে বিএনপির অংশগ্রহণকে আওয়ামী লীগের জন্য একটা বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন। নরসিংদী আওয়ামী লীগের নেতা আমজাদ হোসেন বাচ্চু বলছিলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের প্রতি মানুষের আস্থার বিষয়টা যেনো উঠে আসে, এখন সেটিই তারা চাইছেন। দুই দলের তৃণমূলের নেতারাই তাদের এখনকার দলীয় পদক্ষেপকে সঠিক বলে বর্ণনা করছেন। নরসিংদীতে বেসরকারি একটি কলেজের অধ্যক্ষ মশিউর রহমান মৃধা মনে করেন, নির্বাচনের ফলাফলের আগেই রাজনৈতিক দিক থেকে দুই দলেরই একটা ইতিবাচক অর্জন হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘ সময় নির্বাচনের বাইরে থাকায় বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পিছিয়ে পড়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি আরও বলেছেন,অন্যতম একটি প্রধান দল বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নেয়ায়, সেটি আওয়ামী লীগের জন্যই ইতিবাচক হয়েছে। তবে দল দু’টি এই নির্বাচনকে রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে নিলেও প্রচারণায় কিন্তু স্থানীয় সমস্যাগুলোই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। নরসিংদীতে অলিগলি পর্যন্ত প্রার্থীদের পোষ্টারে পোষ্টারে ছেয়ে গেছে। মিছিল-মিটিং, অভিনব মাইকিংসহ প্রচারণা এখন তুঙ্গে। দলীয় ভিত্তিতে পৌর নির্বাচন রাজনৈতিক নির্বাচনে পরিণত হয়েছে।এ নিয়ে বাড়তি উৎসাহ থাকলেও ভোটারদের অনেকের মধ্যে এক ধরণের ভয়ও কাজ করছে। শেষপর্যন্ত দুই দলের এই ভোট যুদ্ধে পরিবেশ যেন সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ থাকে,সেটাই ভোটারদের প্রত্যাশা।- বিবিসি

গাছের সাথে বেঁধে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সাংবাদিক উৎসকে by সরকার মাজহারুল মান্নান

‘মাত্র ১০ জন লোক নিয়ে ধুকে ধুকে চলছে রংপুর মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’ শিরোনামের নিজের বাইলাইনে ছাপা হওয়া রিপোর্ট আর পড়া হলো না সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎসের। তার আগেই দুর্বৃত্তরা তাঁকে রংপুর মহানগরীর ধর্মদাস শেখপাড়া এলাকায় গাছের সাথে রশি দিয়ে বেঁধে মুখে মাফলার পেচিয়ে মাথায় কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় তার বৃদ্ধ মা বাবা শোকে পাথর হয়ে গেছেন। অবুঝ সন্তানকে বুকে নিয়ে স্ত্রীর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে রংপুরের আকাশ বাতাস। বিক্ষুব্ধ সাংবাদিক সমাজ দাবি তুলেছেন খুনিকে অবিলম্বে গ্রেফতারের। তারা হতভম্ব উদ্বিগ্ন। এ ঘটনায় পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে। ডিআইজি পুলিশ সুপারসহ উর্ধতন পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে কী কারণে তাকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে তা তদন্তের পরই বলা যাবে বলছেন পুলিশ। তদন্তে জমিজমা-সংক্রান্ত এবং মাদকবিষয়ক রিপোর্টিংকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
দৈনিক যুগের আলোর সহকারী বার্তা সম্পাদক নজরুল মৃধা নয়া দিগন্তকে জানান, বুধবার মশিউর রহমান উৎস রাত ৯টা পর্যন্ত অফিস করেছিলেন। এরপর তিনি বৈরিগঞ্জে খালার বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার জন্য ১ ঘন্টার ছুটি নিয়ে তার মোটরসাইকেলটি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে যান। নজরুল মৃধা আরো জানান, রাতে তার পিতা সামসুল হুদা মন্ডল রাতে ফোন করে জানান, উৎস বাড়ি আসেননি। সকালে পুলিশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের সামনে সিএনজি স্টেশনের পাশ দিয়ে যাওয়া শেখপাড়া সড়কের পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
লাশ উদ্ধারকারী পুলিশের কর্মকর্তা কোতয়ালী থানার এসআই নবাব আলী জানান, লাশটি কৃষিক্ষেতের জমিতে ইউকিলিপটাস গাছের সাথে রশি দিয়ে হাত পা বাধা এবং মুখে মাফলার পেচানো অবস্থায় ছিল। জায়গাটি নির্জন হওয়ায় খুব ভোরে সেটি কারো চোখে আসে নি। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা স্থানীয়রা লাশটি দেখে পুলিশকে খবর দেয়। আমরা লাশটি উদ্ধার করে মর্গে পাঠাই। যুগের আলোর কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিশ্চিত হই লাশটি সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎসের। তার ব্যবহৃত ফ্রিডম কালো রংয়ের মোটরসাইকেল, ক্যামেরা এবং মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ সুপার আব্দুর রাজ্জাক জানান, দুপুরে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সাংবাদিক উৎস দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হয়েছেন। বিষয়টি আমরা খুবই গুরুত্বের সাথে দেখছি। ইতোমধ্যেই জোর তদন্ত শুরু করেছি। নিশ্চিত করে বলা যাবে না কী কারণে খুনের ঘটনাটি ঘটেছে। তবে তার ব্যাক্তিগত কোন শত্রুতা ছিল না কিনা, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধসহ আগের স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স সংক্রান্ত কোনো কিছু ছিল কি না। পুলিশ সুপার জানান, মিঠাপুকুরের বৈরিগঞ্জে খালার বাসায় যাওযার কথা বলে অফিস থেকে বের হলেও আমরা তিনি খালার বাসায় যাননি বলে আমরা জানতে পেরেছি।
কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল কাদের জিলানী জানান, উৎস রহমানের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। লাশ পোস্ট মোটেম শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
উৎসর বন্ধু আনছার আলী জানান, সাংবাদিক উৎস আমাকে নানা বলে ডাকতেন। আমি তার সাথে একাধিকবার বৈরিগঞ্জ স্কুলের পাশের ওই খালার বাড়িতে গেছি। ওই খালার একটি জমি নিয়ে কিছু লোকের বিরোধ ছিল । উৎস নাতি আমার খালার পক্ষে ছিল। তার আশংকা ওই জমি নিয়ে বিরোধীয় প্রতিপক্ষ এবং বৈরিগঞ্জের মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিলেই এই খুনের অনেক রহস্য বেরিয়ে আসবে।
সাংবাদিক উৎস রহমানের পিতা সামসুল হুদা মন্ডল জানান, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার মধ্যেই সে বাড়িতে আসবে বলে জানালেও আসেনি। পরে তাকে আমরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করি। কিন্তু পাইনি। সকালে তার লাশ পাই। তিনি বলেন, আমার ছেলে মাদক এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব সময় লিখতো। তারাই আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। অবিলম্বে খুনীদে গ্রেফতার করে ফাঁসি দিতে হবে। তিনি বলেন, মিঠাপুকুরের বৈরিগঞ্জের কথিত খালা এবং তার মোবাইল ট্রাকিং করলেই আমার ছেলের খুনি ধরা পড়বে।
উৎস রহমানের মা জানান, আমার একটি মাত্র ছেলে । ওর বাবা প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় শয্যাশয়ী। যারা আমার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে। তাদের আমি ফাঁসি চাই। আমি এর ন্যায়বিচার চাই। আমার ছেলে সৎ। তার সাথে কারো কোনো শত্রুতা ছিল না। তবে সে মাদক ও অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে সব সময় রিপোর্ট লিখতো।
উৎস রহমানের স্ত্রী তাহমিনা রহমান ‘আমার স্বামীর ভালো মানুষ। ও কখনও মানুষের অন্যায় করে না বলে’ ডকুরে ডুকরে কেঁদে উঠেই বারবার মুর্ছা যাচ্ছিলেন। তার কান্নার শব্দে সেখানকার আকাশবাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তিনি আরো বলেন, হে আল্লাহ একি হলো। এখন আমি ১৫ মাসের সন্তানকে নিয়ে কোথায় গিয়ে দাড়াবো। তিনি এই হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্তমুলক বিচার দাবি করেন।
সাংবাদিক উৎস রহমান দৈনিক আখিরায় ১০ বছর ক্রাইম রিপোর্টার পদে কর্মরত ছিলেন। এরপর বছর পাচেক আগে তিনি দৈনিক যুগের আলোতে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন। তিনি পত্রিকাটির ক্রাইম বিট করতেন।
সাংবাদিক উৎস রহমানের বাড়ি নগরীর স্টেশন রোডের পীরপুরে। তার গ্রামের বাড়ি পীরগাছার কান্দি ইউনিয়নে। তারা ২ বোন এক ভাই। তার দুই বোনের ঢাকায় বিয়ে হয়েছে।
গতকাল রাতে পীরপুর জামে মসজিদে তার প্রথম নামাজে জানাযা শেষে তাকে তার শেষ কর্মস্থল যুগের আলোতে আনা হয়। পরে তাকে পীরপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। বাবা মা, স্ত্রী ও ১৫ মাসের কন্যা মালিয়া আক্তার উর্ম্মি নামের ১৫ মাসের এক কন্যা সন্তান আছে।
এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে রংপুরের সাংবাদিক সমাজ। বৃহস্পতিবার সন্ধায় ডিসি অফিসের সামনে ন রংপুরে কর্মরত সাংবাদিকরা মানববন্ধন করে এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ জানান। এসময় বক্তারা তার হত্যাকারীদের গ্রেফতার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বলেন, সাংবাদিক সমাজ উদ্বিগ্ন ও আতংকিত। এ ঘটনায় রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন, রংপুর প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ক্লাব, সিটি প্রেসক্লাব, টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরাম, ফটো জার্ণালিষ্ট এসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দ তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
রিপোর্টার্স ক্লাবের সেক্রেটারী মোজাফফর হোসেন জানান, সাংবাদিক উৎস খুনের ঘটনায় আমরা স্তম্ভিত হয়েছি। সংবাদ প্রকাশের কারণেই তাকে খুন করা হয়েছে। অবিলম্বে খুনিদের গ্রেফতার করা না হলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহবান জানান তিনি।
প্রেসক্লাবের সেক্রেটারি আলী আশরাফ ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, খুন করে সাংবাদিকদের কলমকে থামানো যাবে না। তিনি বলেন আমরা সকল সাংবাদিক সংগঠন নিয়ে বসে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষনা করার জন্য কাজ করছি। তিনি খুনিদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহবান জানান পুলিশের কাছে।