Saturday, January 24, 2015

খালেদার সঙ্গে দেখা হল না প্রধানমন্ত্রীর

(আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে শোকাহত মা খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শনিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের সামনে পৌঁছান। কার্যালয়ের ফটকটি ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় সেখানে দুই মিনিট অপেক্ষা করে ফিরে যান তিনি। ছবি: ফোকাস বাংলা) সমবেদনা জানাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ের সামনে গেলেও ভেতরে প্রবেশ করেনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতারাও সেখানে ছিলেন। রাত আটটা ৩৫মিনিটের দিকে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি বহর সেখানে পৌঁছে। তবে প্রধানমন্ত্রী সেখানে পৌঁছার কিছুক্ষণ আগে খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস জানান, খালেদা জিয়া অসুস্থ হওয়ায় তাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘূম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। খালেদা জিয়া ঘূম থেকে জাগলে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জানানো হবে এবং তখন প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছা পোষণ করলে আসতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ে পৌঁছার পর তার গাড়িবহর সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। এসময় প্রধানমন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এসময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপরই প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি বহর গণভবনের উদ্দেশে রওনা হয়। গাড়ি বহর ওই এলাকা ত্যাগ করার পর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, সম্পূর্ণ মানবিক কারণে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে এসেছিলেন। কিন্তু তার কার্যালয়ের ফটকটি খুলে দেয়া হয়নি। বিএনপির কেউ প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনাও জানাননি। এটি সম্পূর্ণ শিষ্টাচার বিবর্জিত।

খালেদার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

(বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে গুলশানে তাঁর রাজনৈতিক কার্যালয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে গুলশানে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয় এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ছবি: জি্যা ইসলাম) বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে গুলশানের কার্যালয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাত আটটায় তিনি সেখানে যাবেন বলে নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারি প্রেস সচিব আসিফ কবির। আজ দুপুরে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মালয়েশিয়ায় মারা যান। এ খবর পেয়ে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে যান বিএনপি ও ২০ দলের নেতাকর্মীরা। সেখানে অন্যন্য দলের নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনরাও সমবেদনা জানাতে যান। প্রধান দুই জোটের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে দুই শীর্ষ নেত্রীর সাক্ষাতে রাজনীতিতে বরফ গলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ধানমন্ডির সুদাসদনে গিয়েছিলেন।

রাজনীতিবিদরা অসুস্থ, চিকিৎসা দরকার : এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বলেছেন, দেশে এখন অসুস্থ রাজনীতি চলছে। আমরা রাজনীতিবিদরা অসুস্থ। জনগণ অসুস্থ রাজনীতির শিকার। আমাদের চিকিৎসা প্রয়োজন। একইসঙ্গে তিনি দেশের বর্তমান সঙ্কটকে মহাদুর্যোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্যা, সাইকোনে নয়, দেশ আজ ভয়াবহ রাজনৈতিক দুর্যোগে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির অপরাজনীতি আমরা চাই না। এজন্যই দেশের রেজিস্টার্ড রাজনৈতিক দলগুলোকে শনিবার আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দিয়েছি। আসুন আমরা সবাই এক টেবিলে বসি। এই দুই দলের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। শনিবার রাজধানীর ভাটারা থানার পাশে জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর উত্তর আয়োজিত চলমান সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও অরাজকতা বন্ধের দাবিতে এক শান্তি সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এস এম ফয়শল চিশতীর সভাপতিত্বে এ সমাবেশে পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য এম এ হান্নান এমপি, সুনীল শুভরায়, সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভুইয়া, যুগ্ম-মহাসচিব বাহাউদ্দিন বাবুল, নুরুল ইসলাম নুরু, কোষাধ্য মেজর (অব.) খালেদ আখতার, শ্রমিক পার্টির সভাপতি শাহ আলম তালুকদার, ছাত্র সমাজের সভাপতি সৈয়দ ইফতেকার আহসান হাসান, জাপার কেন্দ্রীয় নেতা তারেক এ আদেল প্রমুখ বক্তৃতা করেন।
রাজনৈতিক দলগুলোকে এক টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়ে এরশাদ বলেন, আসুন একটেবিলে বসে নির্ধারণ করি কিভাবে আগামীর রাজনীতি নির্ধারিত হবে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কেমন হবে। কিভাবে রাজনীতি পরিচালিত হবে। আমরা শান্তি চাই, সন্ত্রাস চাই না। আমরা বাঁচতে চাই, মরতে চাই না। তিনি বলেন, আসুন, প্রতিরোধ গড়ে তুলি। মানুষ এগিয়ে এলে পেট্রোল বোমা বন্ধ হবে। এরশাদ যাদের চিঠি দিয়েছেন তাদের নিয়ে শান্তির দাবিতে কনভেনশন করারও তার আগ্রহের কথা জানিয়ে বলেন, জনগণের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার জনগণের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। সবার মুখে একটাই কথা, সামনের দিনে কী হবে। আমরা এই অবস্থা চাই না। আমরা পরিবর্তন চাই।
এরশাদ বলেন, আমরা মানুষকে ভালোবাসতে ভুলে গেছি। আমাদের সংবিধানে বলা আছে, সমস্ত ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু আমরা সব ভুলে গেছি। আমরা নিজেকে মনে করি, দেশের মালিক। সব সম্পদ আমাদের। দেশের মানুষ আমাদের প্রজা। অথচ দেশের মালিককে আমরা পুড়িয়ে মারছি। গণতন্ত্র হয় একদিনের জন্য। তা হচ্ছে ভোটের দিন। ভোট শেষ, গণতন্ত্র শেষ। আমরা সব ভুলে যাই। নির্বাচনী ইশতেহারে অনেক ভালো কথা লেখা থাকে। কিন্তু জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না।
এরশাদ বলেন, সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার শপথ নেয়। কিন্তু, কতজন মারা যাচ্ছে! কিন্তু বড় বড় বক্তব্য দিচ্ছে তারা। তারা লজ্জাবোধ করছে না। মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। সবার একটাই কথা সামনের দিকে কী হবে? সরকার জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যদি শান্তি চান তাহলে জাতীয় পার্টিকে মতা দিন।
জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, মানুষ এখন ঘর থেকে বের হতে পারছে না। প্রতিদিন আগুন দিয়ে মানুষ মারা হচ্ছে। আমরা আগুন চাই না। পেট্রোল বোমা চাই না। সরকার এই অরাজকতা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার দায় সরকারকে নিতে হবে। তিনি বলেন, একদিকে ব্যর্থ সরকার, অন্যদিকে ব্যর্থ ২০ দলীয় জোট। আমরা এই দুই ব্যর্থ থেকে মুক্তি চাই। মানুষ মুক্তি চায় ব্যর্থ সরকারের হাত থেকে। মানুষ মুক্তি চায় ২০ দলের হাত থেকে।
এরশাদ অনশনে বসবেন মঙ্গলবার
রাজনৈতিক সহিংসতা, জ্বালাও-পোড়াও, দমন নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে দুই দফা শান্তি সমাবেশ করার পর এবার অনশনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। রাজধানীর কাকরাইলে দলটির দলীয় কার্যালয়ের সামনে মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে ৪টা পযর্ন্ত এ প্রতীকী গণঅনশন কর্মসূচি পালন করবে ঢাকা মহানগর দণি জাতীয় পার্টি। পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচিতে এরশাদ নেতৃত্ব দেবেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর দণি জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি কোনো ধরনের সহিংস রাজনীতি বিশ্বাস করে না। বর্তমানে দেশে রাজনীতি নামে জ্বালাও-পোড়াও সহিংসতা আর দমন-নিপীড়ন চলছে। এ সহিংস রাজনীতি বন্ধ করার জন্য আমাদের পার্টির চেয়ারম্যান দুই দফা শান্তি সমাবেশ করেছেন। একই সঙ্গে আমাদের বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদও এ সব বন্ধ করার জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন।

আরাফাত রহমান কোকোর ইন্তেকাল

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা গেছেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আজ দুপুরে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান জানিয়েছেন, দুপুরে কোকো হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান।
আরাফাত রহমান কোকোর বাবা বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ, একজন ব্যবসায়ী। এছাড়া আরাফাত রহমান বাংলাদেশ ক্রিকেট  বোর্ড ও সিটি ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
২০০৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর ভোরে সেনানিবাসের মঈনুল রোডের বাসভবন  থেকে খালেদা জিয়া ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তার করা হয়।  এরপর ২০০৮ সালের ১৭ই জুলাই জামিনে মুক্তি পান কোকো। পরদিন স্ত্রী শর্মিলী রহমান ও দুই কন্যা জাফিয়া রহমান, জাহিয়া রহমানকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড যান। ২০১২ সালে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়া সিঙ্গাপুরে গেলে সেখানে মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় কোকোর। এদিকে একটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর থাইল্যান্ড থেকে মালয়েশিয়ায় চলে আসেন কোকো। এরপর থেকে সেখানেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি।

আহাজারিতে ভারি বার্ন ইউনিট

‘বাবা আমি বাঁচবো না। অনেক যন্ত্রণা হচ্ছে। আমি সহ্য করতে পারছি না’। দগ্ধ দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র নাজমুলের এ বিলাপ ‘দগ্ধ’ করছে তার স্বজনদের। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হারিছ মিয়া। তার দুই হাত এখন আগুনের দখলে। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, এ দুই হাতে কামাই করে আমি বৌ-বাচ্চারে খাওয়াই। আমার সব শেষ। আল্লাহ তুমি বিচার কর। কষ্ট শুধু নাজমুল আর হারিছ মিয়ারই না, ঝলসে যাওয়া মুখ দেখে স্বজনদের অনেকেই মুর্ছা যাচ্ছেন। চারদিকে চিৎকার, আর্তনাদ, আহাজারি। এ চিত্র এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের। পেট্রলবোমার আগুনে দগ্ধ বাস যাত্রী এবং তাদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে ঢামেকের বার্ন ইউনিট। গতকাল শুক্রবার রাত সোয়া ৯টার দিকে যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুল এলাকায় গ্লোরি পরিবহনে (ঢাকা মেট্রো-ব ১৪-৪৮৮৬) পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। এতে অন্তত ২৯ জন যাত্রী দগ্ধসহ মোট ৪৭ জন আহত হন। তাদের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ঢামেক বার্ন ইউনিটের সাবেক পরিচালক ডা. সামন্তলাল সেন ও প্রফেসর সাজ্জাদ খন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, আমরা তিনজন নারীসহ ২৯ জন দগ্ধ রোগী পেয়েছি। এর মধ্যে নয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। তারা আরও বলেন, এ ঘটনার পরে বার্ন ইউনিটে স্থান সংকুলান না হওয়ায় সেখানে আরও ওয়ার্ড বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে রোগীদের স্থানন্তর করা হবে সিএমএইচে।

অভিশংসিত হলেন ইংলাক

থাই পার্লামেন্টের আইন প্রণেতারা শুক্রবার দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রাকে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তাকে পাঁচ বছরের জন্য রাজধানীতিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চালে ভর্তুকির বিতর্কিত প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষে ভোট দেন পার্লামেন্ট সদস্যরা। খবর এএফপির। শুক্রবার দিনের প্রথমভাগে দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ঘোষণা দিয়েছেন, ওই প্রকল্পে তার ভূমিকার জন্য তাকে অপরাধের অভিযোগ মোকাবিলা করতে হবে। এদিকে থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা শুক্রবার সামরিক জান্তা প্রভাবিত পার্লামেন্টে তাকে অভিশংসনের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছেন। ইংলাক সিনাওয়াত্রার প্রশাসনের বিতর্কিত চাল ক্রয়ে ভর্তুকি কর্মসূচির কারণে ইংলাককে অভিশংসনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অভিশংসনের পর ইংলাক তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘থাইল্যান্ডে আইনের শাসনের সঙ্গে আজ গণতন্ত্রেরও কবর হয়েছে।
আমাকে ধ্বংস করার চেষ্টা এখনো চলমান এবং আমি এখন তা মোকাবেলা করছি।’ দেশটির সেনাসমর্থিত পার্লামেন্টের ২১৯ আইনপ্রণেতার মধ্যে ১৯০ জন তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেন। মাত্র ১৮ জন আইনপ্রণেতা এর বিপক্ষে ভোট দেন। একজন ভোটদানে বিরত থাকেন। বাকি আইনপ্রণেতারা অনুপস্থিত ছিলেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের মহাপরিচালক সুরাসাক থ্রিরাত্তারাকুল বলেন, ‘ওয়ার্কিং টিম ও জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী কমিটির কাছ থেকে প্রাপ্ত সাক্ষীদের সব সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এ বিষয়ে সম্মত হয়েছে যে, ইংলাকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হতে পারে।’ অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। ২০১৪ সালের মে মাসে আদালতের নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারিত হন ইংলাক। আর এর কয়েকদিনের মাথায় সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। ইংলাক ও তার ভাই ধনকুবের ও সাবেক থাই প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। তবে শহুরে ও মধ্যবিত্ত গণ্যমান্য শ্রেণীর মানুষ তাদের অপছন্দ করে। ইংলাক ও থাকসিনের বিরুদ্ধে তারা দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনেছে। থাইল্যান্ডে তাদের রাজনৈতিক দল সর্বাধিক জনপ্রিয়। ২০০১ সাল থেকে দেশের প্রতিটি নির্বাচনে তাদের দল জয়লাভ করে। এএফপি

সংস্কারক ছিলেন বাদশাহ আবদুল্লাহ

চলে গেলেন সৌদি আরবের বাদশা আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ। রেখে গেলেন অনেক স্মৃতি। সৌদি সাম্রাজ্যের একজন সংস্কারক হিসেবে বাদশা আবদুল্লাহ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন রাজ্যের ইতিহাসে। বিশেষ করে তার বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের মানসিকতা ও নারীর ক্ষমতায়ন প্রচেষ্টার জন্য চিরদিন মনে রাখবে সৌদি আরবের মানুষ। ১ আগস্ট ১৯২৪ সালে জন্মগ্রহণ করা বাদশা আবদুল্লাহ শুক্রবার প্রথম প্রহরে মারা গেলেন। সৌদি পরিবারের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, শুক্রবার দিবাগত রাত ঠিক ১টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। বাদশা আবদুল্লাহর পিতা বাদশা আবদুল আজিজ বিন আবদুল রহমান ও তার ভাই বাদশা ফয়সাল সংস্কারপন্থী রাজা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু বাদশা আবদুল্লাহ তাদের ছাড়িয়ে গেছেন অনন্য কিছু কাজের মধ্য দিয়ে। বাদশা আবদুল্লাহর সংস্কারের মধ্যে সবচেয়ে প্রাধান্য পেয়েছিল মানবিক উন্নয়ন। তিনি বলেছিলেন, তেলের জন্য নয়, এখন থেকে সৌদি আরব পরিচিত হবে মানুষের গুণে।
নারী-পুরুষের কাজের মধ্য দিয়ে। ২০০৭ সালে বাদশা আবদুল্লাহ একান্ত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় অ্যালিগিয়েন্স এজেন্সি। এই এজেন্সির কাজ নতুন রাজা হাতে রাজ্যের দায়িত্ব তুলে দেয়া। এর মধ্য দিয়ে রাজতন্ত্রের এক জটিল সমস্যার সমাধান হয়েছে। আঞ্চলিক ও বিশ্ব রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সৌদি আরবের অবস্থান আগের চেয়ে অনেক স্পষ্ট। এ জন্য বাদশা আবদুল্লাহর দ্ব্যর্থহীন নীতিই বেশি কাজ দিয়েছে। সুন্নি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে পশ্চিমা প্রযুক্তিনির্ভর সমাজের আদলে সৌদি সমাজকে ঢেলে সাজানোর প্রচেষ্টা ছিল বাদশা আবদুল্লাহর। ২০০৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবের বাদশার দায়িত্ব নেয়ার পর বাদশা আবদুল্লাহ সাম্রাজ্য পরিচালনায় সংস্কার আনেন। তিনি এক অলিখিত অ্যাজেন্ডা নিয়ে কাজ শুরু করেন। এর ফল দেখা যায় ২০১১ সালে। প্রথমবারের মতো ৩০ নারীকে মনোনীত করে মজলিস আল শূরার সদস্য করেন তিনি। রাজ্য পরিচালনায় নারীদের সম্মানের সঙ্গে নীতিনির্ধারণের আসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য বাদশা আবদুল্লাহ বহির্বিশ্বে সমাদৃত হন। ২০১০ সালে বাদশা আবদুল্লাহ ও তার উত্তরাধিকারী সুলতান একজন ঘোমটাহীন নারীর সঙ্গে ছবি তোলেন। পরের দিন সৌদি আরবের প্রধান সংবাদপত্রগুলোর প্রচ্ছদে সেই ছবি প্রকাশিত হয়। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত নারীদের জন্য পোশাকি কড়াকড়ি অনেকটাই শিথিল করা হয়। নারীদের চলাফেরার স্বাধীনতাও প্রসারিত হয় বাদশা আবদুল্লাহ শাসনামলে। ২০০৯ সালে সৌদি আরবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাদশা আবদুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এএফপি।

ইয়েমেনে বিদ্রোহ, সরকারের পদত্যাগ

দেশজুড়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে অবশেষে পদত্যাগ করেছেন ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মুনসর হাদি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী খালেদ বাহাসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরাও পদত্যাগ করেছেন। দেশজুড়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পদত্যাগ করেছেন ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বুল মুনসর হাদি ও প্রধানমন্ত্রী খালেদ বাহা। রাজধানী সানাসহ বিভিন্ন স্থানে হুথি বিদ্রোহীদের অব্যাহত বিক্ষোভের মুখে বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট মুনসর ও প্রধানমন্ত্রী খালেদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন। দেশটির আরেক গুরুত্বপূর্ণ শহর এডেন এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় চারটি প্রদেশের প্রশাসকরা দেশজুড়ে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছিলেন। তবে ইয়েমেন পার্লামেন্ট তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট বলেছেন, হুথি বিদ্রোহীরা শান্তি চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করায় তার পক্ষে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগের খবরকে স্বাগত জানিয়েছেন শিয়া বিদ্রোহীদের এক সিনিয়র নেতা। এর আগে ২ দিনের যুদ্ধ শেষে মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ভবনের দখল নেয় হুতি যোদ্ধারা। এ সময় তারা প্রেসিডেন্টকে ভবনে অবরুদ্ধ করে প্রাসাদের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
পরে ক্ষমতা ভাগাভাগির শর্তে ইয়েমেন সরকার ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সাময়িক চুক্তি হয়েছে। বুধবার বিদ্রোহী যোদ্ধাদের কাছে কার্যত অবরুদ্ধ থাকে প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মুনসর হাদী ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে এ চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী সানার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ, প্রধানমন্ত্রী ভবন ও প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত কম্পাউন্ড থেকে হুথি যোদ্ধাদের সরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছিল শিয়াপন্থী মিলিশিয়া বিদ্রোহীরা। কিন্তু তারপরও তারা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ অবরুদ্ধ রাখে। বিবিসি। এর আগে, বুধবার প্রেসিডেন্ট ও আনসারুল্লাহ বাহিনীর মধ্যে দেশের চলমান সহিংসতা বন্ধের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। ১৭ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট চিফ অব স্টাফ আহমাদ আওয়াদ বিন মুবারককে গ্রেফতার করে আনসারুল্লাহ বাহিনী। এরপর থেকে দেশটিতে প্রচণ্ড উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং মারাত্মক রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। মার্কিন সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত রাব্বু মুনসর হাদি সরকারের সমর্থনেই ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্র আল কায়দা বিরোধী অভিযান চালাচ্ছিল। কিন্তু মানসুর হাদি সরকারের পদত্যাগের পর দেশটিতে আল কায়দা বিরোধী অভিযানের ভবিষ্যত নিয়ে এখন শংকা দেখা দিয়েছে। আল-জাজিরা, রয়টার্স।

স্মিথ মানেই সেঞ্চুরি

একেবারে অব্যর্থ ফর্মুলা। স্টিভেন স্মিথ + অধিনায়কত্ব = সেঞ্চুরি! নেতৃত্বের গুরুভার কাঁধে চাপলে স্মিথকে সেঞ্চুরিবঞ্চিত করা ও অস্ট্রেলিয়াকে হারানো অসম্ভব। সম্প্রতি বোর্ডার-গাভাস্কার সিরিজের যে তিন টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্মিথ, প্রতি ম্যাচেই তার ব্যাট থেকে এসেছে ঝলমলে সেঞ্চুরি। যার একটিও বিফলে যায়নি। প্রতিপক্ষের মতো ফরম্যাটও বদলেছে, কিন্তু বদলাননি অধিনায়ক স্মিথ। কাল প্রথমবারের মতো ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিলেন এবং সেঞ্চুরি করে দলকে জেতালেন। সিডনি ও মেলবোর্নে দাপুটে জয়ের পর হোবার্টেও চেনা রূপে অস্ট্রেলিয়া। শুক্রবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন উইকেটের রোমাঞ্চকর জয়ে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের ফাইনালে উঠে গেছে স্বাগতিকরা। স্মিথের দুরন্ত শতকে মাঠে মারা গেছে ইয়ান বেলের ক্যারিয়ারসেরা ইনিংসটি। বেলের মহাকাব্যিক ১৪১ রানে ভর করে আট উইকেটে ৩০৩ রানের বড়সড় সংগ্রহ পেয়েছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু স্মিথের দৃঢ়তায় এক বল ও তিন উইকেট হাতে রেখেই তা টপকে যায় অস্ট্রেলিয়া। শেষ দুই ওভারে নাটকীয় পরিস্থিতির জš§ হলেও স্মিথ ছিলেন অবিচল। ১০২ রানে অপরাজিত থেকে ইংল্যান্ডের হার নিশ্চিত করেন তিনি। স্লো ওভার রেটের কারণে নিয়মিত অধিনায়ক জর্জ বেইলি নিষিদ্ধ হওয়ায় রঙিন পোশাকে নেতৃত্বের অভিষেক হয়ে গেল স্মিথের। তবে টস জিতে তার ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্তটা এক পর্যায়ে ভুলই মনে হচ্ছিল। শুরু থেকেই সাবলীল ছিলেন ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা। মাত্র ১৭.৩ ওভারে ১১৩ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েন মঈন আলী (৪৬) ও বেল। তৃতীয় উইকেটে জো রুটের সঙ্গে ১২১ রানের আরেকটি বড় জুটি গড়েন বেল। ১২৫ বলে ১৫ চার ও এক ছক্কায় ১৪১ রানের ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস খেলার পথে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে পাঁচ হাজার রানের মাইলফলক পেরিয়ে গেছেন বেল। তার বিদায়ের পরই পথ হারায় ইংল্যান্ড। বেল ছাড়া ৭০ বলে ৬৯ রান করেন রুট।
৪১ ওভারে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ ছিল দুই উইকেটে ২৫৩। লোয়ারঅর্ডারের ব্যর্থতায় শেষ নয় ওভারে মাত্র ৫০ রান যোগ হয় স্কোরবোর্ডে। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বোচ্চ দুই উইকেট নেন সান্ধু। ৩০৪ তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার শুরুটাও খারাপ হয়নি। অ্যারন ফিঞ্চ (৩২) ও শন মার্শের (৪৫) উদ্বোধনী জুটিতে আসে ৭৬ রান। এরপর ৯২ রানে তিন উইকেট পড়ে গেলেও গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (৩৭), জেমস ফকনার (৩৫) ও ব্র্যাড হ্যাডিনকে (২৯ বলে ৪২) নিয়ে লড়াই চালিয়ে যান স্মিথ। শেষ ৭৬ বলে প্রয়োজন ছিল ৮৮ রান। ষষ্ঠ উইকেটে ৬১ বলে ৮১ রানের ঝড়ো জুটি গড়ে সমীকরণটা সহজ করে ফেলেন স্মিথ ও হ্যাডিন। শেষ দুই ওভারে দরকার মাত্র পাঁচ রান। কিন্তু হ্যাডিনের বিদায়ের পর ক্রিজে আসা হেনরিকস গোটা কয়েক ডট বল খেলে চাপে ফেলে দেন স্বাগতিকদের। শেষ ওভারের তৃতীয় বলে তার রানআউট রক্ষা করে অস্ট্রেলিয়াকে! স্টার্ককে নিয়ে বাকি পথটুকু পাড়ি দিতে আর সমস্যা হয়নি স্মিথের। ৯৫ বলে ছয় চার ও এক ছয়ে অপরাজিত ১০২ রানের ইনিংসটির সুবাদে স্মিথই পেয়েছেন ম্যাচসেরার স্বীকৃতি। ইংল্যান্ডের পক্ষে দুটি করে উইকেট নেন ক্রিস ওকস, মঈন ও স্টিভেন ফিন। ইংল্যান্ড ৩০৩/৮, ৫০ ওভারে (মঈন আলী ৪৬, ইয়ান বেল ১৪১, জো রুট ৬৯, জস বাটলার ২৫। গুরিন্দর সান্ধু ২/৪৯)। অস্ট্রেলিয়া ৩০৪/৭, ৪৯.৫ ওভারে (অ্যারন ফিঞ্চ ৩২, শন মার্শ ৪৫, স্টিভেন স্মিথ ১০২, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ৩৭, জেমস ফকনার ৩৫, ব্র্যাড হ্যাডিন ৪২। ক্রিস ওকস ২/৫৮, মঈন আলী ২/৫০, স্টিভেন ফিন ২/৬৫)। ফল : অস্ট্রেলিয়া ৩ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ : স্টিভেন স্মিথ (অস্ট্রেলিয়া)। ক্রিকইনফো।

গুঞ্জন শুনি

বিয়ের পর কারিনার সঙ্গে পর্দায় শহিদ কাপুরকে আবার দেখা যাবে সেটা ভাবাই যায়নি। সিনে দুনিয়ায় আবারও তারা মুখোমুখি হলেন। জুটি না বাঁধলেও ‘উড়তা পাঞ্জাব’ ছবিতে একসঙ্গে লেন্সের ওপারে দাঁড়িয়ে কারিনা-শহিদ। এ খবর অনেক আগেই শুনেছেন ও দেখেছেন সবাই। পাঠক মনে প্রশ্ন উঠতে পারে কারিনা-শহিদকে নিয়ে ফের কেন এই খবর! হতাশ হওয়ার কারণ নেই। নতুন খবরও আছে। শোনা যাচ্ছে, কারিনা নাকি এ ছবিটি নিয়ে খুব ‘এক্সাইটেড’। ইদানীং এই ছবির জন্য নিজেকে তৈরি করতে পাঞ্জাবি ভাষা শিখছেন তিনি। জন্মসূত্রে যদিও তিনি একজন পাঞ্জাবি।
কিন্তু তা সত্ত্বেও নবাব পরিবারের এই বেগম নাকি একেবারেই পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলতে পারেন না। এ ছবিতে একজন পাঞ্জাবি মহিলার চরিত্রে দেখা যাবে। সে কারণে তার অধিকাংশ সংলাপ পাঞ্জাবিতে। তাই আপাতত নিরুপায় হয়ে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রজত সিংয়ের কাছে পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলা শিখতে শুরু করে দিয়েছেন কারিনা। তবে এ ভাষা শেখা ছাড়াও অন্য একটি কারণেও এক্সাইটেড বেবো। সাবেক প্রেমিকের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর আবারও পর্দায় রসায়ন হবে কারিনার। আর এ কারণেই ছবিটিতে অভিনয় করার ব্যাপারে আগ্রহের মাত্রা অনেকটাই বেশি দেখাচ্ছেন বলে গুঞ্জন উঠেছে।

ফের গুম আতঙ্ক

দেশব্যাপী ফের দেখা দিয়েছে গুম আতঙ্ক। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বেশ কয়েকজন নিখোঁজ হয়েছেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে। নিখোঁজের পর লাশ পাওয়া গেছে কারো কারো। এতে বিরোধী নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে এক ধরনের আতঙ্ক। গুমের শিকার হচ্ছেন নারী সদস্যরাও। হয়রানির ভয়ে অনেকে গণমাধ্যমকে জানাচ্ছেন না স্বজন নিখোঁজের তথ্য। টানা অবরোধের ১৯ দিনে রাজধানীসহ সারা দেশে গুম হয়েছেন ১৬ জন। এর মধ্যে গুম হওয়ার কিছুদিন পর লাশ পাওয়া গেছে ৬ জনের। বাকিরা এখনও রয়েছেন নিখোঁজ। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকে তাদের তুলে নেয়া হলেও স্বীকার করছেন না প্রশাসনের কেউ। একইভাবে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন-পূর্ব আন্দোলনে সারা দেশে বিরোধী জোটের ৬৫ নেতাকর্মী গুম হয়েছিলেন। এর মধ্যে রাজধানীতেই গুম হয়েছিলেন ২২ জন।
এদিকে ২০শে জানুয়ারি ঢাকায় ডিবি পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হন খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নূরুজ্জামান জনি। তার সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মনিষা জানান, মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে জনি জানিয়েছিলেন, খিলগাঁও থানার বিএনপি-ছাত্রদলের চার-পাঁচজনকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হবে। এ রকম একটি তালিকা তৈরি করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তালিকাভুক্তদের যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই গুলি করে হত্যা করবে ডিবি। গত ১৯শে জানুয়ারি রাজধানীর মতিঝিলে ডিবি পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হন নড়াইলের জামায়াত নেতা ও পৌর কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট ইমরুল কায়েস (৪০)। ১৬ই জানুয়ারি রাতে ওয়ারী থানার ৬১, দক্ষিণ মৈশুন্ডিতে কায়েসের শ্যালক অ্যাডভোকেট সোহেলের বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে সাদা পোশাকে কয়েকজন লোক তাকে আটক করে। পরদিন পরিবারের পক্ষ থেকে থানা, ডিবি ও র‌্যাব অফিসে যোগাযোগ করা হলে সবাই আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে। এর একদিন পর ১৯শে জানুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে তার লাশ পাওয়া যায়। এদিকে জামায়াত এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিকল্পিতভাবে ইমরুল কায়েসকে হত্যা করেছে। ১৬ই জানুয়ারি পুলিশের নির্যাতনে নিহত হন মিরপুরের স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা মোহন বেপারি (৫৮)। তার শ্যালক আল-আমিন অভিযোগ করেন, গত ১১ই জানুয়ারি মোহন বেপারিকে চিড়িয়াখানা গেট এলাকা থেকে আটক করে শাহ আলী থানা পুলিশ। এরপর থানায় অমানবিক নির্যাতনের পর তাকে আদালতে পাঠানো হয়। ১৪ই জানুয়ারি অসুস্থ মোহন বেপারিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ই জানুয়ারি তিনি মারা যান। এদিকে ১২ই জানুয়ারি রাতে জামায়াতের কাফরুল থানার একটি ওয়ার্ডের সভাপতি একেএম তৌফিকুল হককে শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে আটক করা হয়। এরপর থেকে তৌফিকুলের কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। জামায়াতের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে সরকারি নীলনকশার অংশ হিসেবে তৌফিকুলকে আটকের পর গুম করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক দপ্তর নেতা টুটুল অভিযোগ করেন, গত ১৮ই জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকে রাজধানীর খিলগাঁও থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সহসভাপতি জাহিদুর রহমান দিপুকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তার খোঁজ মিলছে না।
এদিকে ১৬ই জানুয়ারি র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে শ্যামপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহসভাপতি মতিউর রহমান। জানা গেছে, গত ১৫ই জানুয়ারি দুপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকের কয়েকজন লোক চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কল্যাণপুর স্কুল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে মতিউর রহমান, মোজাম্মেল হোসেন মোজা, মো. আবু তাহের শিশির, শ্যামল কুমারসহ ৫ জনকে। এর মধ্যে মতিউর রহমানকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়। মোজাম্মেল হোসেন মোজা, মো. শিশির এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। বাকি দু’জনকে থানায় হস্তান্তর করে পুলিশ। এ ব্যাপারে শিশিরের পিতা মুজিবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, ১৫ই জানুয়ারি বিকাল ৩টায় আমার বাড়ির সামনে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকের কয়েকজন লোক আমার ছেলেসহ পাঁচজনকে ধরে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে মতিউর রহমানের লাশ পাওয়া যায়। তবে আমার ছেলের সন্ধানের জন্য থানা ও র‌্যাবের কাছে গিয়েছি। তারা স্বীকার করেনি। এখনও আমার ছেলের খোঁজ পাইনি। শিবগঞ্জ থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। তিনি বলেন, আমার ছেলে কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল না। সে স্থানীয় বাজারে ডেউটিনের ব্যবসা করতো। আমার স্ত্রী ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে পাগলপ্রায় হয়ে গেছে। এছাড়া ৫ই জানুয়ারি চাঁপাই নবাবগঞ্জে যৌথবাহিনীর গুলিতে নিহত হন মো. জামশেদ নামের এক বিএনপিকর্মী।
এদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, গত ১৫ই জানুয়ারি রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলায় অভিযান চালিয়ে উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নেতা আল-আমীন ও তার স্ত্রী বিউটি বেগম এবং তাদের প্রতিবেশী মৌসুমীকে তুলে নিয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আল-আমীনকে থানায় নিয়ে তাকে গুলি করে আহত করেছে এবং তার হাত ভেঙে দিয়েছে। তাদের তুলে নেয়ার ৮ দিন পর কোথাও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরও এ ব্যাপারে তারা কোন কিছু জানাতে অস্বীকার করছে। ওদিকে ৫ই জানুয়ারি পুলিশ পরিচয়ে হাফিজুর রহমান (৪০) ও সাগর আলী (২৫) নামে দু’জনকে আটক করে কুষ্টিয়ার মিরপুর থানা পুলিশ। এরপর থেকে তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সাগরের ফুফাতো ভাই রবিউল ইসলাম ৭ই জানুয়ারি মিরপুর থানায় একটি জিডি করেছেন। ১৭ই জানুয়ারি ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার বাটপাড়া গ্রাম থেকে কৃষক নাসির উদ্দিনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পরে ১৯শে জানুয়ারি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় স্থানীয় মোহনপুর বিল এলাকায় রাস্তার পাশে একটি মাঠে নাসিরের লাশ পাওয়া যায়। তার পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছে, পোশাকধারী পুলিশ ও র‌্যাব নাসিরকে আটক করলেও পরে যোগাযোগ করলে তারা অস্বীকার করেছে।
৯ই জানুয়ারি কবি নজরুল সরকারি কলেজের ছাত্রদল নেতা জসিমউদ্দিন, সুজন চন্দ্র দাস, রোমান আহমেদ, কেএম নজরুল হাসান ও ইরফান আহমেদ ওরফে ফাহিমকে ডিবি পরিচয়ে আটক করা হয়। পরে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে পুরান ঢাকা থেকে সংগঠনটির পাঁচ নেতাকে আটক করলেও পুলিশ স্বীকার করছে না। এরপর ১৩ই জানুয়ারি তাদের মিরপুর থানায় একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। এ বিষয়ে মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, যেভাবে সারা দেশে গুম-খুন, ক্রসফায়ার ও বিভিন্ন জেলায় যৌথবাহিনীর তাণ্ডব চলছে সেটা খুবই উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানবতা বিপন্ন হবে।

অবরোধে সরকারি বাস-ট্রাকও চলে না by মোল্লাহ রাশিম

বিরোধী জোটের ডাকা টানা অবরোধে মহাসড়কে চলছে না সরকারি বাস-ট্রাক। যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে দূরপাল্লার বাস চলাচল করছে না বলে জানিয়েছেন বিআরটিসি’র কর্মকর্তারা। নিরাপত্তার কারণে সরকারি এ সংস্থার ট্রাক এবং লরিও চলছে না মহাসড়কে। পরিবহন না চলায় বেকার সময় পার করছেন সংস্থাটির কর্মীরা। মহাসড়কে যান চলাচলে সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা দেয়ার কথা বলা হলেও খোদ সরকারি সংস্থার যানবাহন নিরাপত্তাহীনতায় বন্ধ রাখায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বেসরকারি পরিবহন মালিকদের মধ্যে। বিভিন্ন রুটে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরাপত্তায় কিছু গাড়ি চালানোর উদ্যোগ নিলেও অবরোধকারীদের হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হওয়ায় এখন বেসরকারি পরিবহন মালিকরা রাস্তায় গাড়ি নামাতে ভরসা পাচ্ছেন না। গত ৫ই জানুয়ারির পর থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)’র কোন গাড়ি দূরপাল্লায় চলাচল করছে না। ফলে দূরপাল্লার যাত্রীসাধারণ ডিপোতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। মতিঝিল ডিপোর কাউন্টারে আসা যাত্রী রাজীব হোসেন বলেন, গত তিন চার দিন ধরে বাড়িতে যাওয়ার জন্য ডিপোতে আসছি। কিন্তু টিকিট কাউন্টারে তালা। কোন নির্দেশনাও নেই যে, গাড়ি ছাড়বে কি ছাড়বে না। ডিপোর আশপাশের দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে যানা যায়, প্রতিদিন অনেক লোক গ্রামে যাওয়ার জন্য এখানে আসছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ গাড়ি না ছাড়ার কারণে ফিয়ে যায়। বিআরটিসি’র মতিঝিল বাস ডিপোর ম্যানেজার নায়েব আলী জানান, যাত্রী না থাকায় আমরা দূরপাল্লার বাস ছাড়ছি না। শুক্রবার থেকে কিছু বাস চলাচল করছে। বিআরটিসি সূত্র জানায়, দূরপাল্লার ১৩টি রুটের প্রায় ৪৭০টি বাস ও ১শ’ ১৮টি ট্রাক প্রতিদিন চলাচল করে। কিন্তু গত ১৫দিন ধরে এসব বাস-ট্রাক চলাচল বন্ধ রয়েছে। এসব বাস-ট্রাক চলাচল করলে প্রতিদিন ৭০ লাখ টাকা আয় হয় সংস্থাটির।  গত ১৫ দিনে রাষ্ট্রীয় এ পরিবহন সংস্থাটির ১০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
বিআরটিসি’র সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির মোট ২০টি বাস ডিপোর মধ্যে মতিঝিল থেকে ৮টি রুটে, কল্যাণপুর থেকে ৪টি রুটে, রংপুর থেকে ২২টি রুটে, কুমিল্লা থেকে ৫টি রুটে, পাবনা থেকে ১৯টি রুটে, বগুড়া থেকে ২৫টি রুটে, চট্টগ্রাম থেকে ৫টি রুটে, বরিশাল থেকে ১২টি রুটে, সিলেট থেকে ২টি রুটে, খুলনা থেকে ৯টি রুটে, নরসিংদী থেকে ৩টি রুটে নারায়ণগঞ্জ থেকে ২টি রুটে দূরপাল্লার বাস চলাচল করে। এসব রুটে এসি, ননএসি, টিসিসহ সব মিলিয়ে মোট ৪শ’ ৭০টি বাস রয়েছে। অবরোধের কারণে বিআরটিসি’র দূরপাল্লার কোন রুটেই বাস চলাচল করছে না বলে অফিস সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিআরটিসি’র পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন) মো. শামসুল আলম বলেন, আমরা গাড়ি চালাতে প্রস্তুত। কিন্তু পরিবহনের নিরাপত্তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে যাত্রীদের নিরাপত্তা। নিরাপত্তার কারণে চালাতে পারছি না।
সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির ২টি ট্রাক ডিপোতে মোট ১শ’ ১৮টি ট্রাক রয়েছে। এই ট্রাকগুলোও চলাচল করছে না নিরাপত্তার কারণে। অবরোধে প্রথম ১০ দিনে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিআরটিসি’র ৩০টি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে বলে প্রধান কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ৪টি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বাকিগুলোতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যে ১০টিতে মামলা হয়েছে ও অন্যগুলোর জন্য সাধারণ ডায়েরি করা হয়। বিআরটিসি’র ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের হিসাব অনুযায়ী এসব ভাঙচুরে ৮৪ লাখ ৮৪ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে বিআরটিসি’র সর্বমোট প্রায় ৩ হাজার কর্মচারী রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই দৈনিক বা রুট ভিত্তিক বেতন পান। বতর্মানে দূরপাল্লার গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় ওইসব শ্রমিক বিপাকে আছে। এ বিষয়ে ‘বিআরটিসি শ্রমিক কর্মচারী লীগ’ এর সাধারণ সম্পাদক মো. হারুণ-অর-রশিদ জানান, যারা সরকারি বেতন পায় তাদের সমস্যা নাই। কিন্তু যারা দৈনিক মজুরি পায় তারাতো খুবই সমস্যায় আছে।

তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখের দিন by কাজী আনিস আহমেদ

আমি বন্ধুদের সঙ্গে খুব আশনাই রেখে চলার চেষ্টা কখনো করিনি। তাই আমার কাছে আমজাদের চিঠি এসেছে দেখে একটু অবাকই হলাম। তা-ও আবার সে চিঠি এসেছে তার আত্মহত্যার পর। তার আত্মহত্যার সময় আমি দেশের বাইরে ছিলাম। ফলে কী ঘটেছিল, তা বাদলই বলল, যখন সে চিঠিগুলো আমাকে দিতে এল। বাদল সবারই খোঁজখবর রাখত। বাদল এমনটাই ছিল। এখন মুটিয়ে গিয়েও বেশ কর্মঠ। তবে একটু অগোছাল ও ছটফটে। বাদল আড্ডা জমিয়ে পুরোনো দিনের গল্প করতে বেশ পছন্দ করত। সেই দিনগুলোর গল্প, যখন দিনগুলো বেশ ভালো ছিল। আমার কাছে এসব আড্ডাফাড্ডা একদম বিরক্তিকর মনে হতো। আমি মনে করতাম না আমার সুখের দিনগুলো পেছনে চলে গেছে। আমি তো বরং স্কুল-কলেজের ওই দিনগুলোয় বেশ কষ্টে ছিলাম। টাকা ছিল না, স্বাধীনতা ছিল না। তখন তো মূলত কষ্টই করছিলাম আজকের এই পদস্থ ভালো দিনগুলোর আশায়। আমার ভালো দিনগুলো তো আজকেরগুলো। আমি আজ কাইলার নামের নবাগত একটি বহুজাতিক কোম্পানির মার্কেটিং শাখার জেনারেল ম্যানেজার। আমরা চকলেট ও মিষ্টিদ্রব্য বিপণন করি। আমরা এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদনও শুরু করেছি। মাঝেমধ্যে আমি কোম্পানির সদর দপ্তর জুরিখে যাই, আবার বম্বে যাই নতুন বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে। লালমাটিয়ায় নিজের ফ্ল্যাটে থাকি আমি। আমার স্ত্রী রিতা সহৃদয়, সুনিপুণ ও সুহাস্যময়। সে একজন চমৎকার গৃহিণী ও চমৎকার মা। আমার পাঁচ বছরের ছেলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে এবং ড্রাগন নিয়ে ভাবে। আমি কেন হাপিত্যেশ করা একদল মাঝবয়সী লোকের সঙ্গে বসে সময় নষ্ট করতে থাকব আর ভণিতা নিয়ে বলব সুখ তো ছিল সেই স্কুল-পালানো দিনগুলোয়? আমি কেন তাদের সঙ্গে অর্থহীন লং ড্রাইভে যাব কিংবা যার বাসায় লোক নেই, তার বাসায় গিয়ে পর্নো দেখতে বসব?
তার পরও আমি বাদলের আড্ডাগুলোয় মাঝেমধ্যে যেতাম—কখনোবা কোনো নতুন-খোলা রেস্টুরেন্টে আবার কখনোবা নদীতে নৌকায়। বাদল ছিল নাছোড়বান্দা। কখনো বিরক্ত হতো না, কোনো গালমন্দ ওর দাওয়াত আর ফোনকল থামানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। তা ছাড়া অনেক দিন পর পর হলে তাদের সঙ্গে দেখা হতে আমারও খুব খারাপ লাগত না। বাদলের এমন এক আড্ডায়ই আমজাদের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল। দুবাই থেকে আসার পরপরই বাদল একদিন এল খবরটি দিতে। অন্যান্য দিনের মতো ঘামছিলও না, হাঁপাচ্ছিলও না, তবে তাকে একটু বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। হাতে একটি শ্রীহীন প্যাকেট বা মোড়ক। সেটিকে টেবিলের এক কোণে রাখল। রাখার পরও কয়েকবার যেন আরও ঠিকমতো রাখার চেষ্টা করল। লোমহর্ষক ঘটনাটি আদ্যোপান্ত বলল—বাস, এয়ারপোর্ট রোড ইত্যাদির পূর্ণ টুকিটাকিসহ। সত্যিকারে এত বিশদ আমি জানতে চাইছিলাম না। আত্মহত্যা হয়তো আত্মহত্যাকারী সম্পর্কে কিছু জানায়। আত্মহত্যাটি কীভাবে হয়েছে, তা কিছুই জানায় বলে আমার মনে হয় না। বারবার বলে হলেও, দেখা গেল পুরো ঘটনা বলায় বাদলের একটা নিপুণতা অর্জিত হয়েছে। মনে হলো বারবার বলে বাদল তার দুঃখটাও একটু লাঘব করতে পেরেছে। একটু বন্ধুত্ব সরিয়ে বলা যায়, বারবার বলার মধ্য দিয়ে বাদল পুরো আখ্যানটির এক বিশ্বস্ত আমানতদারের গুরুত্ব অর্জন করছিল। সে বসেছিল আমার শান্ত এয়ারকন্ডিশন্ড রুমে, আমার টেবিলটার ঠিক আড়াআড়ি সামনে। টেবিলটা ছিল আমার বলিভিয়ান এমডির হলঘরের ঠিক আড়াআড়ি সামনে। আর সেখানে বসে বাদল তার এখনো অব্যাখ্যাত মোড়কটি মাঝেমধ্যেই হাতে নাড়াচাড়া করছিল। বাদল একটু রাগের সঙ্গেই বলল, ‘বুঝতে পারি না, কেন আমজাদ আমাদের কারোর কাছে একবার এল না?’
আমি বললাম, ‘সে হয়তো বুঝতে পারেনি সমস্যাটি এত মারাত্মক পরিস্থিতিতে তাকে নিয়ে যাবে।’ ‘না বুঝে কেমনে পারে? সে বাসের তলে ঝাঁপ দিল যে!’, আরও রাগের সঙ্গে বলল বাদল। ‘অবশ্যই কোনো তাৎক্ষণিক খেয়ালে ঝাঁপ দেয়নি সে। ধীরে ধীরেই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।’ ‘হয়তো পুরোটাই একটা ডিপ্রেশন। মাঝেমধ্যে কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই এমনটা হয়’, বলতে চাইলাম আমি। ‘তুমি কি করে জানবে? তুমি তো তার কোনো খবরই রাখতে না। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগেও তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তার কোনো ডিপ্রেশন ছিল না’, বাদল জোর দিয়ে বলল। ‘তাহলে তোমার কী মনে হয়?’, আমি জানতে চাইলাম। ‘সেটাই তো সমস্যা। বোঝার কোনো সূত্র নেই। আমজাদ এক নীরব জীবন যাপন করত। তার এমন কী হতে পারে?’, বাদল দিশাহীনের মতো বলল। ‘ওটা কী?’, মোড়কটিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘এটাই হতে পারে এ রহস্যভেদের একমাত্র সূত্র’, বাদল বলল এবং আমার টেবিলের চকচকে কাচের ওপর দিয়ে ঠেলে মোড়কটি সে আমার কাছে দিল। একটা ছোট্ট মোড়ক। লাল-সাদা সুতায় বাঁধা একটি প্রায়-ছেঁড়া বাদামি খাম। এমন জিনিস এখন আর সরকারি অফিস ছাড়া কোথাও দেখা যায় না। আমজাদ এক সরকারি অফিসেই তার নিরানন্দ সময়গুলো পার করেছে। খামটিতে মনে হলো কিছু চিঠিই আছে। দেখে মনে হলো ভেতরে ১০-১২টি কাগজের বেশি থাকার কথা না। ‘এটি খোলোনি কেন?’, জিজ্ঞেস করলাম, কারণ খামের এক কোণে কালো মার্কার দিয়ে লেখা আমার ডাকনামটি তখনো দেখিনি। আমার সে নাম এখন আর আমার বন্ধুরাও খুব একটা ব্যবহার করে না। ‘এটা তো ও তোমাকে পাঠিয়েছে। মোনেম ওর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। আমরা এমনটাই ভাবতাম। আমাদের চেয়ে মোনেমের সঙ্গেই ওর যোগাযোগটা বেশি দেখতাম। এটা কিন্তু ও মোনেমের জন্য পাঠায়নি। আমার নামেও না। এটায় ও তোমার নামই লিখেছে।’ বাদল এ কথা বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, মনে হলো ও জিজ্ঞেস করছিল কাজটা আমজাদ ঠিক করেছে কি না। বাদল আমার সামনে অনুগতের মতো বসে আছে এবং প্রত্যাশা করছে আমি প্যাকেটটি খুলে তাকে দেখাব ভেতরে কী আছে। কিন্তু আমি মিথ্যে করে বললাম যে, এমডির সঙ্গে আমার জরুরি একটি মিটিং আছে। এই বলে প্যাকেটটি আস্তে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দিলাম আমি। বললাম, এর ভেতরে কোনো ক্লু পাওয়া গেলে আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব। কৌতূহল একটা বিদ্ঘুটে জিনিস। এটি কখনো এগিয়ে নেয় আবার কখনো থামিয়ে দেয়। বেশ কয়েক দিন চলে গেল তার পরও আমি আমজাদের প্যাকেটটি খুললাম না। ব্যাখ্যা করতে পারব না কেন আমি এমনটা করছিলাম। আমি কি ভয় পাচ্ছিলাম যে হয়তো এখান থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু বেরিয়ে পড়বে আমার এই বন্ধু সম্পর্কে, যাকে আমি একসময় অনেক আপন জানতাম আর শেষ পর্যন্ত যার খববরও রাখিনি? একটা মারাত্মক কোনো খবর আমার একদম হাতের মুঠোয়, যা আমি যখন খুশি জেনে ফেলতে পারি—এমন একটি অবস্থা আমার স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহকেই যেন নড়িয়ে দিচ্ছিল। আমার ঘুম ভালো হচ্ছিল না। সেলস-সংক্রান্ত মিটিংগুলোয়ও একাগ্রতা ছিল না আমার। আমার স্ত্রীর দৃষ্টি এড়াল না। বললাম, শিগগিরই একটি নতুন প্রোডাক্ট বাজারে ছাড়তে যাচ্ছি, এ নিয়ে একটু চিন্তিত। স্ত্রী বিশ্বাস করল। অফিসে আসা-যাওয়ার পথে যে সময়টায় আগে খবরের কাগজ দেখতাম, সে সময়টায় এখন আমি আমজাদকে নিয়ে ভাবি। আমি জানি আত্মহত্যাগুলোকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যারা জীবনের প্রতি পর্বে সুখী ও সফল তাদের আত্মহত্যাগুলো একটি রহস্য। আর যাদের জীবন ডিপ্রেশনের এবং বঞ্চনার, তাদের আত্মহত্যাগুলো জীবন থেকে পালানোর এক চরম চেষ্টা। আমজাদকে এই দুই ভাগের কোনোটিতেই ফেলা যাচ্ছিল না। তার এই চলে যাওয়ার ধরনের ওপর দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে আসলে আমি তাকে চিনতামই না। এভাবে ভাবাটাও অবশ্য ঠিক না। আমি তাকে সেই বয়সে ততখানিই চিনতাম, যতখানি একজন বন্ধু আরেক বন্ধুকে চিনতে পারে। মানুষ পাল্টায়। সে পাল্টিয়ে কোন মানুষটি হয়েছিল, সেটিই আমি জানতে পারিনি। তবে আমি মনে করি না বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, ঋণ ইত্যাকার সুনির্দিষ্ট প্রদর্শনযোগ্য কোনো কারণে সে আত্মহত্যাটি করেছে। এটা ছিল অবশ্যই অন্য কিছু। সেই অন্য কিছুটাই শুধু বুঝতে পারছিলাম না। অফিস থেকে আমি সবার শেষেই যেতাম, অবশ্য আমার পিয়নের আগে। এক সন্ধ্যায় যখন সবাই চলে গেল, আমার টেবিলে বসে ড্রয়ার থেকে আমজাদের খামটি বের করলাম আমি। ভেতরে দশটা বা বারোটা কাগজ। কাগজের ধরন ও আকারের বিভিন্নতা দেখে এবং কোনোটা ফ্রেশ আর কোনোটা ক্ষয়ে যাওয়া দেখে মনে হলো এগুলো দীর্ঘ বিরতিতে বিভিন্ন সময়ে লেখা। কোনো কাগজেই কোনো তারিখ নেই, কোনো কাগজেই পৃষ্ঠাজুড়ে লেখা নেই। লেখার ধরন দেখে মনে হচ্ছিল হয় কবিতা, নয় উদ্ধৃতি। প্রথম কাগজটিতে লেখা ছিল: ‘গত সপ্তাহে অফিস থেকে ফেরার সময় খেয়াল চাপল বাসে যাব না। বাসে না উঠে নদীর উদ্দেশে হাঁটা শুরু করলাম। নদীটা কতদূর এবং কোন পথে, তা পুরোটা জানা ছিল না। হাঁটতে হাঁটতে শহরের এমন একটা জায়গায় হাজির হলাম যেটা একেবারেই চেনা কোনো জায়গা নয়। আকাশটা অন্ধকার হয়ে এল, রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠল। জীবনে প্রথমবার অনুভব হলো আমি হারিয়ে গেছি। অনেক বাস-স্কুটার বদলিয়ে মধ্যরাতেরও পরে বাসায় পৌঁছালাম। মনে হলো সারা রাত বাইরে থাকলেই তো মজা হতো। হারানো অবস্থায় যে কয়টা ঘণ্টা আমি ছিলাম, একটি একতলা দালানের জানালার লিন্টেলের ওপর বসে দেখছিলাম রাস্তা দিয়ে মানুষগুলো আসছে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে অনেক দিন ধরে এমন সুখের সময় আমার আর যায়নি।’ লেখাগুলো এত বেখাপ্পা ও বেহুদা মনে হলো, পুরোটা না পড়ে আমি লাফিয়ে লাফিয়ে এগোলাম কাজের কোনো তথ্য পাওয়ার আশায়। কিছুই পেলাম না। সবটাই ডায়েরিকথা অথবা নিজের কাছে নিজের চিঠি কিংবা খেয়ালখুশির কাহিনি। সব লেখারই বিষয় আমজাদের নিজের জীবন থেকে নেওয়া কিছু অদ্ভুত মুহূর্ত, যে মুহূর্তগুলোতে এক ঝুলে থাকা অন্ধকার থেকে সে নিজেকে মুক্ত ভেবেছে। আমি কখনো ভাবিনি আমজাদের ভেতরে এমন অবদমিত কষ্টবোধ ছিল। আমার মনে হয়, অন্য কেউও ভাবেনি। লেখাগুলোয় কোথাও তার বউ-বাচ্চার কোনো উল্লেখ নেই। নিজের কীর্তিকর্মের কোনো উল্লেখ নেই। কীর্তিকর্ম তার খুব ছিল না। তবে গ্র্যাজুয়েশন, চাকরি, প্রোমোশন ইত্যাদি তো ছিল। মনে আছে সে একবার মাদ্রাজ গিয়েছিল এবং আমার জন্য খোদাইচিত্র এনেছিল। এ জাতীয় কোনো ভ্রমণ বা অবসরযাপনের কথা লেখাগুলোয় নেই। কোনো বিশেষ দিন যেমন বিবাহবার্ষিকী, জন্মদিন কিংবা কোনো দুর্যোগের দিন ইত্যাদিরও কোনো উল্লেখ লেখাগুলোয় নেই। জীবনের যেটুকু সে দেখতে চেয়েছে, তাতে এসবের কোনো স্থান ছিল না। জীবনের উত্থান-পতনের পরিচিত খানাখন্দগুলো সে যথেষ্ট বেখেয়ালের সঙ্গেই পার করেছে। তার খেয়াল ছিল অন্যদিকে। যা কিছুর দিকে তার খেয়াল, যেটুকু তার সাধনা; স্পষ্টতই সেটুকু সে পায়নি। সেটুকু কী ছিল, তা সবাইকে বাদ দিয়ে আমাকে কেন খুঁজতে হচ্ছে?
একটি কাগজে সে লিখেছে: ‘মাঝেমধ্যে আমি ভাবি, আমার বন্ধুদের কাছে তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখী দিনটি সম্পর্কে জানতে চাইব। অবশ্য তারা বলবে বলে মনে হয় না।’ এই প্রশ্ন নিয়েই কি সে মাঝেমধ্যে আমার অফিসে আসত? কী হাস্যকর! আমরা আধুনিক বাস্তববাদী মানুষ। আমাদের আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই এগুলো আসার নয়। জীবনের মান-অপমান ও রাগ-বিরক্তি নিয়ে আমরা কথা বলি, জীবনের বড় আঘাতগুলোতে দুঃখ প্রকাশে আমাদের মুখস্থ তেজস্বী ভাষা আছে। কথা বলায় আমরা প্রতিষ্ঠিত রীতির বাইরে যাই না। বেশ বিরক্তির সঙ্গেই টেবিলের ওপর প্যাকেটটি প্রায় ছুড়ে মারলাম আমি। এই চিঠি আমজাদ কী অধিকারে আমার কাছে পাঠাল? এমন মারাত্মক একটি ঘটনার ক্লু হিসেবে এক পুরোনো বন্ধুর জন্য এমন অর্থহীন সব কাগজ রেখে যাওয়া একটি মশকরা, একটি অভদ্রতা। বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে ঠান্ডা পানির ছিটা দিলাম। নিচে নেমে ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিলাম। ভাবলাম নিজেই গাড়ি চালাব। রাস্তায় উঠে বাসার দিকে যেতে ইচ্ছা হলো না। লক্ষ্যহীনভাবে গাড়ি চালাতে লাগলাম শহরের যে দিকটায় ভিড় কম সেদিকে। পুরো শহর ছেড়ে বেরোতে সাহস হলো না। আমি জানি অকারণে বাসায় যেতে দেরি করলে রিতা কতটা মন খারাপ করে। তার পরও গাড়ির কাচ নামিয়ে, গলার টাই খুলে, অক্টোবরের মৃদু বাতাসে চুল উড়িয়ে অনেকক্ষণ গাড়ি চালালাম। বাদলকে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে এড়িয়ে চলেছি। দেখা হলে কী বলব সেটিই ঠিক করতে পারছিলাম না। আমি চিঠিগুলো আবার পড়েছি। দ্বিতীয়বার পড়ার সময় আমজাদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব বিষয়ে অনেক কিছু মনে পড়েছে। আমজাদ, মোনেম ও আমি অন্যদের চেয়ে একটু বেশি চিন্তাশীল ছিলাম। ওই বয়সে ছেলেরা যে বইগুলো পড়ে আমরাও তার কিছু পড়েছি এবং পড়া শেষে একে অপরের কাছে জানতে চেয়েছি: কী জিনিস একটি জীবনকে সুন্দর কিংবা অর্থময় করে তোলে? একটি সুখী জীবন কি একই সঙ্গে অর্থময়? বিষয় দুটো কি দুমুখো? বেশির ভাগ সামলে নেওয়া বয়স্কদের মতোই আমিও এ প্রশ্নগুলো পেছনে ফেলে আসতে পেরেছি। আমজাদ পারেনি। বাদল একদিন আমাকে ঠিকই অফিসে ধরে ফেলতে পারল। বেগুনি জামার হাতায় কপাল মুছতে মুছতে সে বলল, ‘তোমার তো নাগালটিই পাওয়া যায় না’। আমরা নিজেদের কাজকর্ম নিয়ে কথা বলছিলাম। কথাগুলো অবশ্য কেটে কেটে যাচ্ছিল। বাদল বলছিল সে উজবেকিস্তান থেকে একটি নাচের দল আনবে। ব্যাপারটি দারুণ হিট করবে, তার ভাবনা। শীতকালটা সে এই মারাত্মক আয়োজন দিয়ে শুরু করবে। আধঘণ্টা কথাবার্তায়ও আমি আমজাদ প্রসঙ্গ না টানায় ধৈর্যের পরীক্ষায় ফেল করে বাদলকেই শেষ অবধি বলতে হলো, ‘ওই বেকুব স্বার্থপর হারামজাদা শেষ পর্যন্ত কী লিখে রেখে গেল?’
ধৈর্যের পরীক্ষার এই অকৃতকার্যতায় ও রাগে অবশ্য বাদলকে দোষ দেওয়া যায় না। আমজাদের বিধবা স্ত্রীকে আমজাদের উত্তরাধিকার থেকে খারিজ করার আইনি ঝামেলা থেকে উদ্ধার করতে প্রয়োজনীয় অর্থ বাদলই জোগাড় করেছিল। আমি বললাম, ‘না, তেমন কিছুই না। ওগুলো ডায়েরিকথার কিছু টুকরা। কোনো ক্লু তার মধ্যে নেই।’
‘আমি কি একটু দেখতে পারি?’
আমি মিথ্যা করে বললাম, ‘না, তার সুযোগ নেই। ওগুলো পড়ার পরে ও পুড়িয়ে ফেলতে বলেছে।’ বাদল কিছুটা হতাশার সঙ্গেই বলল, ‘কীসব লিখে গেছে, যার চার আনারও কোনো উপযোগ নেই।’ ‘একেবারে ঠিক বলেছ’, আমি বললাম। বাদল উঠে দাঁড়াল। আমি ওর সঙ্গে দরজা পর্যন্ত গেলাম। দরজার পাশে হঠাৎ আমি ওর হাতটা চেপে ধরলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা বাদল, তুমি কি সুখী?’
হা হা করে হেসে উঠল বাদল, ‘আরে, একের পর এক যা ব্যস্ততা তাতে সুখী না অসুখী, তা দেখার সময় আছে? কিন্তু হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন? তুমি ঠিক আছ তো?’
আমি হাতের চাপটা হালকা করে বললাম, ‘আরে কি বলো? আমি ঠিক থাকব না কেন?’
‘তো, আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না। আমি ধারের মাথায় কখনো যাব না। তুমিও আবার হঠাৎ রওনা দিয়ো না। এক মৌসুমে একজনই কি যথেষ্ট নয়?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, যথেষ্টর চেয়েও বেশি’, বাদলের সঙ্গে হাসতে হাসতে বললাম আমি। বাদল জোরে বেরিয়ে গেল হয়তো আমার মতোই অন্য কারোর কাছে। ওই দিনও অনেক রাতে বাসায় ফিরলাম। আমি আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। এটি এখন আমার প্রায় অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। আমি জানি না কেন রিতাকে বিষয়টি আমি বলছিলাম না। আমি দোষের তো কিছু করছিলাম না। আমি যখন বাসায় ফিরলাম, জানতাম সবাই ঘুমিয়ে গেছে। আমার রাতের খাবার ঢাকা আছে এবং পাশে লেখা আছে ‘খেয়ে নিয়ো’। জানতাম এটা আমার জন্য কষ্টের। আমি মোজা পায়েই আমাদের বেডরুমের দিকে গেলাম। দেখলাম সেখানে রিতা নেই। দেখলাম রিতা তার ছেলের রুমে ছেলেকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। দরজা থেকে দাঁড়িয়ে দেখলাম নীল ডিমলাইটের নিচে দুটি মানুষের মতো শরীর গভীর ঘুমে। শ্বাস নিচ্ছে আর শরীরটাও একটু উঠছে নামছে। আমি জানতাম এরা আমার ভালোবাসার মানুষ। কিন্তু তার পরও, সব ভালোবাসা সত্ত্বেও, ওই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল, এদের কি আমি চিনি?
কাজী আনিস আহমেদের গুড নাইট মি. কিসিঞ্জার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ গল্পগ্রন্থ থেকে ‘দ্য হ্যাপিনেস ডে অব হিস লাইফ’ গল্পের সংক্ষেপিত অনুবাদ
অনুবাদ: মুহম্মদ মুহসিন

লক্ষ্মীপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান দাউদকান্দিতে ক্রসফায়ারে নিহত

লক্ষ্মীপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী হত্যাসহ ৪৪ মামলার পলাতক আসামি সোলাইমান উদ্দিন জিসান  বাহিনীর প্রধান জিসান কুমিল্লার দাউদকান্দিতে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। লক্ষ্মীপুর চন্দ্রগঞ্জ থানা পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত ভোররাতে এ ঘটনা ঘটে।  নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে জিসানের লাশ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে কুমিল্লায় দাফন করা হয়েছে। নিহত জিসান লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়নের লতিফপুর গ্রামের মৃত আবু বক্করের ছেলে। পুলিশ জানায়, জিসান বাহিনীর প্রধান জিসান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে মোটরসাইকেল করে লক্ষ্মীপুর আসার পথে কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায় রাতে পৌঁছে। ওই সময় র‌্যাব তল্লাশি চালিয়ে তার মোটরসাইকেলটি থামানোর জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু সোলাইমান উদ্দিন জিসান মোটরসাইকেলটি না থামিয়ে দ্রুত চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় র‌্যাবের সদস্যরা তাকে ধাওয়া করে। এ সময় জিসান র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। শুরু হয় দু-পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি গোলাগুলি। একপর্যায়ে বন্দুকযুদ্ধে সোলাইমান উদ্দিন জিসান ঘটনাস্থলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
সূত্রে জানায়, এক সময় সোলাইমান উদ্দিন জিসান বিএনপির অঙ্গসংগঠন ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। চন্দ্রগঞ্জ কফিল উদ্দিন ডিগ্রি কলেজে ছাত্র থাকাকালীন লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রদল নেতা থাকাকালীন জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। এতে ছাত্রদলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। ফলে সন্ত্রাসী ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ২০০৪ সালের তাৎকালীন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাইন উদ্দিন হামীম ও সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান সোহেল স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সোলাইমান উদ্দিন জিসানকে জেলা ছাত্রদলের পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ছাত্রদল থেকে বহিষ্কারের পর জিসান ২০০৬ সালের শেষের দিকে চলে যান সৌদি আরবে। চার বছর বিদেশে থেকে ২০১০ সালের শেষের দিকে ফিরেন নিজ জেলা লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ লতিফপুর গ্রামের বাড়ি। ২০১১ সালে পুনরায় শুরু করেন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। দুই বাহিনীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী জেলার প্রায় ৩ লাখ মানুষ। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চল, চন্দ্রগঞ্জ, দেওপাড়া, লতিফপুর, পাচপাড়া, নোয়াখালী জেলার চাটখিল ও বেগমগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে গড়ে তোলেন একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। বাহিনীর সদস্য  ছিল ১৫০ জন। সম্প্রতি আধিপত্য বিস্তার, ভাগবাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে জিসান বাহিনী থেকে বের হয়ে আলাদা বাহিনী গড়ে তোলেন ডাকাত নাছির বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা অন্তত দেড়শত। এরপর শুরু হয় দুই বাহিনীর মধ্যে হামলা, চাঁদার দাবিতে বাড়ি বাড়ি অগ্নিসংযোগ ও বন্দুকযুদ্ধ।
এলাকাবাসী, ব্যবসায়ী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ডাকাত নাছির ও জিসান বাহিনীর সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি, অপহরণ ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ ছিল লক্ষ্মীপুরের পূর্বাঞ্চলের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, স্কুল শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ। রেহাই পায়নি পার্শ্ববর্তী জেলার নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও চাটখিল উপজেলার সাধারণ  মানুষও। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নাছির ও জিসান বাহিনীর মধ্যে প্রায়ই বন্দুকযুদ্ধ হতো। এছাড়া গত এক বছরে দুই বাহিনীর সন্ত্রাসীদের মধ্যে পুলিশের অসংখ্যবার গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। নাছির ও জিসানকে ধরতে চন্দ্রগঞ্জ এলাকায় অভিযানে গেলে পুলিশের সঙ্গে রাত ব্যাপী বন্দুকযুদ্ধ হয়। এর পরে নাছির এলাকায় থেকে গা-ঢাকা দেয়। কিন্তু সোলাইমান উদ্দিন জিসান এলাকায় অবস্থান করে। সম্প্রতি দুই বাহিনীর বন্দুকযুদ্ধের বলি হয়েছে সাধারণ মানুষ, স্কুল ছাত্রসহ অনেকেই। পঙ্গু হয়েছে নিরীহ অনেক মানুষ। জিসান বাহিনীর মৃত্যুর খবর শুনে তার সমর্থকদের মধ্যে যেমন চলছে শোকের মাতম, তেমনি তার হাতে নির্যাতিত মানুষের মধ্যে চলছে আনন্দ উল্লাস। তবে এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কোন নেতাই মুখ খুলতে নারাজ। অপরদিকে নাছির বাহিনীর প্রধান নাছিরকে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান স্থানীয় এলাকাবাসী। এছাড়া, জিসান বাহিনীর সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন, লক্ষ্মীপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মহসিন, প্রতাবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর স্কুলছাত্র রবিউল ইসলাম, কফিল উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের ছাত্রলীগ নেতা মুন্না, চন্দ্রগঞ্জ ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আবু নোমান, সর্বশেষ দেওপাড়ায় আব্বাছ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে গুলি ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। পঙ্গুত্ব বরণ করেন সাবেক ছাত্রদল নেতা ফরিদুল ইসলাম দিপুসহ অসংখ্য মানুষ। লক্ষ্মীপুর পুলিশ সুপার (এসপি) শাহ মিজান শাফিউর রহমান  বলেন, পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সোলাইমান উদ্দিন জিসান। তার বিরুদ্ধে লক্ষ্মীপুর সদর থানা, চন্দ্রগঞ্জ, নোয়াখালীর সুধারাম, বেগমগঞ্জ, চাটখিল থানাসহ বিভিন্ন স্থানে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ ৪৪টি মামলা রয়েছে। জিসান বাহিনীকে গেপ্তারের জন্য একাধিক বার পুলিশ অভিযান চালালে তাদের সঙ্গে বহুবার গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। এতে পুলিশসহ অসংখ্য মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়।

গাড়ি আমদানি শিল্পে কোটি টাকার ধস by মহিউদ্দীন জুয়েল

কাঁচাবাজার, ভোগ্যপণ্যের পর এবার হরতাল-অবরোধের প্রভাব পড়েছে দেশের গাড়ি আমদানি শিল্পে। দেশের চলমান অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে গত ৬ মাসে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত গাড়ি সরবরাহ করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।  বর্তমান পরিস্থিতির ভাল কোন সমাধান না হলে আগামীতে গাড়ি শিল্পে ভয়াবহ ধস নেমে আসার আশঙ্কা করছেন তাদের অনেকে। বলেছেন, বিএনপি ও জামায়াতসহ ২০ দলের লাগাতার অবরোধে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী কোটি টাকার বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অনেকে আগাম টাকা দিয়ে বন্দরে গাড়ি নিয়ে এলেও পরিস্থিতির কারণে তা খালাস করতে পারেননি। অন্য সময়ে গাড়ি বিক্রিতে ধুম পড়লেও গত ২০ দিনের চিত্র ছিল তার বিপরীত। গাড়ি আমদানির সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যবসায়ী জানান, স্বাভাবিক সময়ে দেশে প্রতিবছর ২০ শতাংশ হারে গাড়ি আমদানি বৃদ্ধি পায়। গত ১০ বছরের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ২০০৮ ও ২০০৯ সালে গাড়ি শিল্পে রিকন্ডিশন্ড সার্ভিসের ভাল ব্যবসা হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যেসব গাড়ি বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে তার বেশির ভাগই রিকন্ডিশন্ড।
প্রতিমাসে যেখানে একজন ব্যবসায়ী গাড়ি বিক্রি করে ৩০ ইউনিট, সেখানে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তা নেমে ৫ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা) নামের একটি সংগঠনের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিমাসে গাড়ি বিক্রি করে একেকজন ব্যবসায়ী কয়েক কোটি টাকা লাভ করেছেন এমন নজিরও রয়েছে তাদের কাছে। সেই সময় প্রতিমাসে ৭০ ইউনিট পর্যন্ত গাড়ি আমদানির পর শোরুমে সরবরাহ করা হয়েছে। তবে হরতালের অবরোধের সঙ্গে ২০১৪ সালের শেষের দিকে জাপানের মুদ্রা ইয়েনের খানিক অবমূল্যায়নের কারণে প্রতিমাসে বিভিন্ন গাড়ির দাম কমে আসছে বলে তারা যোগ করেন। তবে সব সমস্যা কাটিয়ে গাড়ি শিল্পকে ফের চাঙ্গা করা যেত যদি দেশের পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের অনুকূলে থাকতো। বর্তমানে ১৫০০ সিসির টয়োটা এক্সিও গাড়ির দাম ২২ লাখ টাকা থেকে কমে ১২ লাখে নেমে এসেছে। এভাবে কমে এসেছে আরও মূল্যবান বেশ কিছু ব্র্যান্ডের গাড়ি।
জানতে চাইলে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক চৌধুরী বলেন, গাড়ি আমদানি শিল্প দেশের অন্যতম একটি বড় খাত। প্রতি বছর চট্টগ্রামের কয়েকজন শো-রুম ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে হরতাল-অবরোধের কারণে তাদের ব্যবসায় মন্দা চলছে। ২০১৪ সালে সরকারি ছুটি ছাড়াই ৬০ দিন বন্ধ ছিল গাড়ির বেশির ভাগ শো-রুম। নতুন বছরের শুরুতে আবারও রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে টানা ১০ দিন ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়েছে। এখনও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তাদের বিক্রি চালিয়ে যেতে হচ্ছে। মাসুদুর রহমান নামের আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের একজন গাড়ি আমদানিকারক বলেন, দেশের বেশির ভাগ গাড়ি নিয়ে আসা হয় চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দর দিয়ে। কিন্তু ২০ দলের ডাকা হরতাল-অবরোধে এখন গাড়ি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কেননা আমরা গাড়ি খালাস করতে পারলেও পরিস্থিতির কারণে তা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারছি না। ফলে বন্দরের ভাড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, হরতাল-অবরোধে ব্যবসা বন্ধ থাকায় ব্যাংক থেকে নেয়া চড়া সুদ দিনদিন দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে একজন গাড়ি ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা নিলে তাকে প্রতিদিন ৫০ টাকা সুদ হিসেবে দিতে হয়। একইভাবে এককোটি টাকা ধার নিলে দিন হিসেবে তা ৫০০০-এ গিয়ে দাঁড়ায়। একজন ব্যবসায়ীকে গাড়ি বিক্রি করে সুদসহ ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করতে হয়।  আগ্রাবাদ দেওয়ানহাট মোড়ের ক্রিস্টাল কার নামের একটি গাড়ি শো-রুমের মালিক ও আমদানিকারক শোহেবুল হাসান বলেন, গাড়ি শিল্পে ধস নেমে এসেছে। আমি গত ১৮ বছর ধরে এই ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত রয়েছি। কিন্তু কখনোই এমন পরিস্থিতি দেখিনি। গত বছরও আমরা লসের মুখে ছিলাম। এবারও একই পরিস্থিতি। তিনি আরও বলেন, দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি ভাল থাকলে যে ব্যবসা হয় এখন তা হচ্ছে না। এতে করে আমাদের ওপর ব্যাংক সুদ অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। গাড়ি শিল্পের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিকল্প নেই।

বগুড়ার ৬৫ কিলোমিটারে একের পর এক নাশকতা by আনোয়ার পারভেজ

(সড়কের গতিরোধকের সামনে যানবাহন ধীরে চলে। এ সুযোগে দুর্বৃত্তরা যানে পেট্রলবোমা ছুরে মারে বা অগ্নিসংযোগ করে। এ ধরনের নাশকতা এড়াতে বগুড়া-রংপুর সড়কের হাস্থান এলাকায় গতিরোধক তুলে দিচ্ছে সড়ক ও জনপথ। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তোলা ছবি l প্রথম অালো) রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের বগুড়ার ৬৫ কিলোমিটার অংশ এখন পরিবহনচালক-যাত্রীদের কাছে আতঙ্কের পথে পরিণত হয়েছে। অবরোধ শুরুর পর মহাসড়কের ওই অংশের ১৪টি স্থানে যানবাহনে পেট্রলবোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগে এ পর্যন্ত দুজনের মৃত্যু হয়েছে। দগ্ধ হয়েছেন চারজন। ইটের আঘাতে আহত হয়েছেন অর্ধশত যাত্রী ও চালক। পুড়ে গেছে কোটি টাকার সম্পদ। পরিবহনচালক, শ্রমিক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের চলমান অবরোধকে কেন্দ্র করে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের বগুড়া অংশ, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী ও রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকা চরম ‘নাশকতাপ্রবণ’ হয়ে উঠেছে। তবে চালক ও যাত্রীদের কাছে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের জায়গা হচ্ছে বগুড়া অংশ। এই অংশে প্রতিদিনই যানবাহনে হামলার ঘটনা ঘটছে।
যাত্রী ও চালকদের দেওয়া তথ্যমতে, মহাসড়কের বগুড়ার চান্দাইকোনা, মহিপুর, নয়মাইল, ফটকিব্রিজ, বনানী লিচুতলা, শহরতলির মেডিকেল কলেজ-সিলিমপুর এলাকা, চারমাথা-নিশিন্দারা, ঝোপগাড়ি, বারপুর, মাটিডালি, গোকুল, মহাস্থান, চণ্ডীহারা এবং মোকামতলা-ফাঁসিতলা এলাকায় ওত পেতে থাকছে দুর্বৃত্তরা। সন্ধ্যা নামলেই তারা ইটপাটকেল ও ককটেল ছুড়ে গাড়ি ভাঙচুর করছে। পেট্রলবোমা ছুড়ে ও অগ্নিসংযোগ করে যানবাহন পুড়িয়ে দিচ্ছে। এ পর্যন্ত দুর্বৃত্তরা শতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করেছে। পেট্রলবোমা, গানপাউডার ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ২৮টি ট্রাক-বাস। সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ঝোপগাড়ি ও বারপুর এলাকায়।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অবরোধ শুরু হওয়ার দুই দিন আগে ৪ জানুয়ারি রাতে যানবাহনে পেট্রলবোমা হামলা শুরু হয়। ওই রাতে বারপুর এলাকায় আলুবোঝাই ট্রাকে পেট্রলবোমা ছোড়া হয়। এতে দগ্ধ হন ট্রাকচালক পটল মিয়া। এরপর প্রায় প্রতিদিনই পণ্যবাহী ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। পেট্রলবোমায় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী দুটি বাসও। ১০ জানুয়ারি রাতে চণ্ডীহারা এলাকায় একটি ট্রাকে দুর্বৃত্তদের হামলায় হাসপাতালে মারা যান ট্রাকচালক ইমাদুর রহমান। তবে ইমাদুরের মৃত্যু সড়ক দুর্ঘটনায় হয়েছে বলে দাবি করছে পুলিশ।
১৭ জানুয়ারি ঝোপগাড়ি এলাকায় চিনিবোঝাই ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। একই দিন সন্ধ্যায় ঝোপগাড়ি, শাকপালা, গোকুল ও ফটকিব্রিজ এলাকায় আরও চারটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। গত বুধবার রাতে শহরের স্টেশন সড়কের প্রেসক্লাবের সামনে চালবোঝাই একটি ট্রাকে পেট্রলবোমা ছুড়ে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। প্রায় একই সময়ে মহাস্থান এলাকায় ধানবোঝাই ট্রাকে ও শহরের দ্বিতীয় বাইপাস সড়কের নিশ্চিন্তপুর-সাবগ্রাম এলাকায় মুরগির খাদ্যবাহী দুটি ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর এক দিন আগে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সাতটি গাড়ি পোড়ানোর ঘটনা ঘটে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে নুনগোলা এলাকায় আসবাববাহী একটি ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলায় চালকসহ তিনজন দগ্ধ হন। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শুক্রবার মারা যান চালকের সহকারী আবদুর রহিম (৩০)।
বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. মোজাম্মেল হক জানান, অবরোধের নামে ১০ থেকে ১২টি স্থানে যানবাহনে পেট্রলবোমা হামলা ও নাশকতা চালানো হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব স্থানে সার্বক্ষণিক পুলিশি টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

সমঝোতা চায় সাধারণ মানুষ by উৎপল রায়

অবরোধে বিপর্যস্ত জনজীবন। একদিকে সহিংসতা, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান। চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ। প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণহানি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুই জোটের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান চান তারা। রাজধানীর তিতুমীর কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সম্মান তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সবুজ মুন্সি। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে বীতশ্রদ্ধ এ তরুণ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ চায় বিএনপিকে দমন করতে। বিএনপি চায় আওয়ামী লীগকে দমন করতে। জনগণ হয়ে গেছে ফুটবল। রাজনীতিবিদরা হচ্ছে খেলোয়াড়। এ থেকে যেন নিস্তার নেই। তিনি বলেন, দিনের পর দিন দেশজুড়ে অচলাবস্থা চলছে। শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে। এগুলো কে দেখবে? সাধারণ মানুষ নিয়েই তো তাদের রাজনীতি। অন্তত সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে হলেও দুই নেত্রী সমঝোতায় আসুক। গুলিস্তান জিপিওর প্রধান শাখায় কর্মরত কাকলি সরকার। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় দলকেই নমনীয় হতে হবে। আরও সহনশীল হতে হবে। বিশেষ করে সরকারকে যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি বিএনপিকেও ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ফার্মগেট ইন্দিরা রোডের চা দোকানদার সুজন মিয়াও রাজনীতি নিয়ে ভাবেন। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শঙ্কিত খেটে খাওয়া এ মানুষটি। নিকট বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে সে আশা নেই তার। তিনি বলেন, দু’দলের কেওয়াজে জনগণের অবস্থা খুবই খারাপ। অবরোধ শুরু হইছে পর থেইক্কা দোকান খুলছি হাতেগোনা কয়দিন। এর মধ্যে আবার সন্ধ্যা হইতে রাস্তাঘাটে মানুষ থাকে না। চা খাওয়ার লোক নাই। এমুন চললে পরিবার চলবো কি কইরা? সুজন বলেন, দু’দল একজন আরেকজনকে ছাড়ে না। সামনের দিনগুলা ভাল হইবো সেই আশাও দেখি না। ফার্মগেটের পত্রিকা বিক্রেতা সুমন বলেন, রাজনীতিবিদরা নিজেরটা ভাল বোঝে। কিন্তু জনগণেরটা বোঝে না। দিনে-রাইতে ঘর থেইক্কা বাইর হইতে ভয় লাগে। কখন কি হয়। পুরানা পল্টনের ফুটপাথের বই বিক্রেতা সুমন বলেন, দেশের পরিস্থিতি ভাল না। ক্ষতি হইতাছে সাধারণ মাইনষের। কিন্তু আমরা তো কোন দোষ করি নাই। নিজের কামাই নিজে খাই। রাজনীতি বুঝি না। হেরপরও ভোগান্তি আমাগোর। সাধারণ মাইনষের কথা চিন্তা কইরা দুই নেত্রী নিজেগো মইধ্যে আলাপ-আলোচনা করতে পারে না? বায়তুল মোকাররম মার্কেটের উর্মি জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী পলাশ বলেন, রাজনীতির নামে যা হচ্ছে তা কারও কাম্য নয়। এ রাজনীতি কোন রাজনৈতিক সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। পেট্রলবোমা মেরে মানুষ মারছে। কেউ কেউ গুলি করার কথা বলছে। আবার একদল আরেক দলকে দুষছে। অবরোধের নামে দেশ অচল করে দেয়া হচ্ছে। ব্যবসার কোন ভবিষ্যৎ নেই। সারা দিনে কোন লেনদেন নেই। রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান হিসেবে তিনি বলেন, সরকার ধরপাকড়, গুলি বন্ধ করুক। একটু সহনশীল হোক। আর বিএনপি একটু নমনীয় হয়ে ছাড় দিয়ে আলাপ-আলোচনায় বসুক। এতে হয়তো দু’দলের সামান্য ক্ষতি হবে। কিন্তু এ ক্ষতি দেশবাসীর বর্তমান ক্ষতির কাছে কিছুই নয়। গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট এলাকায় কথা হয় রিকশাওয়ালা মো. আনিসের সঙ্গে। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, নেতারা কি সাধারণ মাইনষের কথা চিন্তা করে? যদি তারা আমগর কথা চিন্তা করতো তাইলে কি আর দেশের পরিস্থিতি এইরহম থাকে। তিনি বলেন, পেটের দায়ে জানডারে হাতে কইরা রিকশা নিয়া বাইর হইছি। আবার সন্ধ্যা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরবো। ভয় লাগে কখন কি ঘটনা ঘটে। বেসরকারি সিটি ইউনিভার্সিটির বিবিএ পঞ্চম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী শিমুল বলেন, কি এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে যে আছি! বাসে যখন যাই জানালা বন্ধ করে যাই। যত কাজই থাক সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় বাসায় ফিরি। এ থেকেই বোঝা যায় দেশে বর্তমানে কি অবস্থা বিরাজ করছে।

নারায়ণগঞ্জের নেতারা কে কোথায়? by বিল্লাল হোসেন রবিন

২০-দলীয় জোটের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ও দফায় দফায় হরতালকে ঘিরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোট ও বিএনপি দলীয় জোটের মধ্যে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করলেও নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রহস্যজনক তৎপরতা নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে উভয় দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে। সারা দেশে বিএনপির আন্দোলন হালে পানি পেলেও রাজধানী লাগোয়া নারায়ণগঞ্জের চিত্র ভিন্ন। প্রথম দিকে দলের দু-চারজন নেতা সাহস নিয়ে  ফটোসেশন মার্কা তৎপরতা নিয়ে মাঠে নামলেও একটি অংশ শুরু থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। সর্বশেষ ১৩ই ডিসেম্বর সোনারগাঁয়ের কাঁচপুরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জনসমাবেশ ঘিরে অতি তৎপর নেতাদেরও এখন আর মাঠে দেখা যাচ্ছে না। আবার আইনশৃঙ্খাবাহিনীর তৎপরতার মধ্যে বেশ কয়েকজন নেতার এলাকায় অবস্থান, তৃণমূল নেতাকর্মীমের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের তৎপরতা নিয়েও মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। তাদের মতে, মহানগর আওয়ামী লীগ ও মহানগর যুবলীগের ব্যানারে অবরোধ ও হরতালবিরোধী দু-একটা মিছিল হলেও বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ একাধিক নেতার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় বর্তমানে বিএনপির একটি অংশ লাপাত্তা হলেও আরেকটি অংশ বহাল তবিয়তে রয়েছে আওয়ামী লীগের ওই নেতাদের আশীর্বাদে। তাছাড়া ৯ই জানুয়ারি থেকে ২২শে জানুয়ারি পর্যন্ত একের পর এক যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটলেও সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি। বিশেষ করে ৯ই জানুয়ারি প্রথমবারের মতো শহরের ভেতর প্রাইভেট কার দিয়ে বিএনপি নেতার মালিকানাধীন বন্ধন পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের গতিরোধ করে তাতে আগুন দেয়ার ঘটনাটি নিয়েও নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াতের এত সাহস হয়নি যে, তারা প্রাইভেট কারে চড়ে এসে শহরের প্রধান সড়কে বাসের গতিরোধ করে তাতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে বীরদর্পে চলে যাবে? পুলিশও সেই প্রাইভেট কারটির কোন হদিস বের করতে পারেনি। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, কেউ হয়তো পরিকল্পিতভাবে নারায়ণগঞ্জকে অশান্ত করে নিজের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করছেন। তারই অংশ হয়তো শহরের ভেতরে বাসে আগুন দেয়ার ঘটনাটি।
এদিকে ২১শে জানুয়ারি সাবেক এমপি আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান জাতীয় সংসদের বলেছেন, নির্দেশ দেন। বিএনপি-জামায়াতকে নিঃশেষ করতে আওয়ামী লীগের লাখ লাখ নেতাকর্মীই যথেষ্ট। অথচ তার ওই বক্তব্যের ১৫ ঘন্টার মাথায় তারই নির্বাচনী এলাকায় ২২শে জানুয়ারি ফতুল্লার ভোলাইলে  ট্রাক ও মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনাটিকে অনেকেই বলছেন, শামীম ওসমানকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার মতো ঘটনা। তাছাড়া ২৩ জানুয়ারি অবরোধের ১৮তম দিন অতিবাহিত হলেও এই সময়ের মধ্যে শামীম ওসমানকে অবরোধ ও হরতালের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের রাজপথে দেখা যায়নি। অভিযোগ উঠেছে, শহর, বন্দর, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ের বিএনপির একটি অংশের নেতাকর্মীরা ওই এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি অংশের আশীর্বাদে এলাকায় বহাল তবিয়তে রয়েছে। মোটকথা বিএনপি-জামায়াতকে প্রতিরোধে আওয়ামী লীগের তেমন কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। এ বক্তব্য আওয়ামী লীগের তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মীর।
ওদিকে অবরোধের শুরুর দিকে বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমূর আলম খন্দকার, সাধারণ সম্পাদক কাজী মনিরুজ্জামান, শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ টি এম কামাল, বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান ও বন্দর থানা বিএনপির সভাপতি (কালাম গ্রুপ) আতাউর রহমান মুকুল,্‌ মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মাকসুদুল আলম খন্দকার, জেলা ছাত্রদল আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজিব গংদের ইঁদুর-বিড়াল খেলার মতো রাজপথে তৎপরতা দেখা গেলেও তার সিংহভাগ ছিল ফটোসেশন। তবে ২১শে জানুয়ারি এ টি এম কামাল গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিএনপির সকল তৎপরতা থেমে যায়। এছাড়া চলমান অবরোধে মাঠে দেখা যায়নি, সাবেক মন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিম, সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন, সাবেক এমপি আতাউর রহমান খান আঙ্গুর, শহর বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, আড়াইহাজার উপজেলা বিএনপির সভাপতি বদরুজ্জামান খসরু, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম ফকির, রূপগঞ্জ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান হুমায়ুন, সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু জাফর, বন্দর উপজেলা বিএনপির সভাপতি (তৈমূর গ্রুপ) হাজী নুরুদ্দিন, ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি মো. শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস, সিনিয়র সহসভাপতি ও কুতুবপুর ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টু, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির আহ্বায়ক সফর আলী ভূঁইয়া, সদস্য সচিব অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল হাই রাজু, সাধারণ সম্পাদক এম এ হালিম জুয়েল প্রমুখ।
এদিকে প্রকাশ্যে রাজপথে তৈমূর আলম খন্দকারকে পেয়েও পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি। অথচ পরে তার বাড়িতে পুলিশ একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে তাকে গ্রেপ্তারের জন্যে। তাছাড়া অবরোধ চলাকালে দ্রুত বিচার আইনসহ সবগুলো মামলায় এ টি এম কামাল আসামি হলেও তৈমূর আলম খন্দকার মাত্র একটি মামলায় আসামি হয়েছেন। মাঠে থাকলেও দ্রুত বিচার আইনে দায়ের করা মামলায় তিনি আসামি হননি। এছাড়া তৈমূর আলম সমর্থিত জেলা বিএনপির প্রস্তাবিত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস, বন্দর উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাজী নুরুদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন নেতা বহাল তবিয়তে রয়েছেন। অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় বিএনপির নেতারা লাপাত্তা।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপি একাধিক নেতা মানবজমিনকে জানান, মূলত জেলা বিএনপির অযোগ্য নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অদূরর্শিতার কারণে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির সাংগঠনিক ভীত মজবুত হয়নি। ফলে আন্দোলনে মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে তারা। তাছাড়া দলের ভেতর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও শীর্ষ নেতাদের নিজেদের মধ্যে মত পার্থক্য এবং বিরোধের প্রভাব পড়েছে আন্দোলনে। যতটুকু আন্দোলন হয়েছে, তা জামায়াত-শিবিরের তৎপরতায়। তারা আরও জানান, সর্বশেষ কাঁচপুরে দলের চেয়ারপারসনের জন সমাবেশে দিন স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা পুরো সমাবেশ মঞ্চ দখল করে নেয়। তাদের উপস্থিতিতে মঞ্চে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। অনেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে পেয়ে নারায়ণগঞ্জে ‘এই করবো, সেই করবো’ বলে বক্তব্য দিয়ে মাইক গরম করলেও ওই নেতাদের অবরোধে মাঠে দেখা যাচ্ছে না।

যাত্রাবাড়ীতে বাসে বোমা, দগ্ধ ২৮- ঢাকা মেডিকেলে হৃদয়বিদারক দৃশ্য

(যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুল এলাকায় গতকাল রাতে বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ কয়েকজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে l ছবি: প্রথম আলো) রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় গতকাল শুক্রবার রাতে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা। এতে দুই নারীসহ ২৮ যাত্রী দগ্ধ হয়েছেন। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে আহত হয়েছেন আরও একজন। দগ্ধদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। ঘটনার পর দগ্ধ ব্যক্তিদের একে একে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে কারও পুড়ে গেছে মুখ, কারও হাত, কারও পা। কারও নাক-মুখ থেঁতলে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। তীব্র যন্ত্রণা আর ব্যথায় ছটফট করছিলেন অনেকেই। খবর পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসেন স্বজনেরা। কারও কারও কণ্ঠে তখন তীব্র ক্ষোভ। দগ্ধ যাত্রী ও যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ জানায়, রাত পৌনে ১০টার দিকে গুলিস্তান থেকে যাত্রীবাহী গ্লোরি পরিবহনের একটি বাস নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে যাচ্ছিল। বাসটি ডেমরা রোডের কাঠেরপুল এলাকায় পৌঁছালে কে বা কারা বাসের বাঁ পাশে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে। এতে বিকট শব্দ হয়ে পুরো বাসেই আগুন ধরে যায়। এতে দগ্ধ হন ২৮ জন। নামতে গিয়ে আহত হন আরও একজন। অন্য যাত্রীরা দরজা ও জানালা দিয়ে কোনো রকমে নেমে প্রাণে রক্ষা পান।
আহত ব্যক্তিরা হলেন শরীফ খান, তকবীর ইসলাম, সালাউদ্দিন পলাশ, সালমান, মোশারফ হোসেন, মোশারফের ভাতিজা সালাউদ্দিন, জয়নাল আবেদীন, খোকন, ইসতিয়াক আহমেদ, নাজমুল হোসেন, ইয়াসির আরাফাত, ইয়াসিরের স্ত্রী শাহীদা ফাতেমা, রাশেদুল ইসলাম, নূর আলম, ওসমান গনি, মো. সুমন, ফারুক হোসেন, মো. রুবেল, মোমেন, রফিকুল ইসলাম, তানভীর, আরিস মিয়া, মো. জাবেদ, আবু মিয়া, শহীদুল ইসলাম, মোজাফফর মোল্লা, শাহজাহান, আবুল হোসেন ও আফরোজা বেগম। এঁদের মধ্যে আফরোজা ছাড়া বাকি সবাই দগ্ধ। দগ্ধদের ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। বার্ন ইউনিটের অধ্যাপক সাজ্জাদ খন্দকার সাংবাদিকদের জানান, ২৯ জনের মধ্যে নয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের প্রত্যেকের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। বাকি ২০ জনের সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ ভাগ পুড়ে গেছে। রাত ১০টার দিকে বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, দগ্ধদের ধরাধরি করে আনা হচ্ছে। চারদিকে চিৎকার, আর্তনাদ, আহাজারি। গণমাধ্যমের কর্মী ছাড়াও স্বজনদের ভিড়। খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন বার্ন ইউনিটের ঊর্ধ্বতন চিকিৎসকেরাসহ অনেকেই। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে একে একে আহত ব্যক্তিদের পাঠানো হচ্ছে পর্যবেক্ষণকক্ষে।
বার্ন ইউনিটের ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, আগুনে মুখ আর হাত পুড়ে গেছে ইয়াসিরের। একটি বেঞ্চে বসে হাঁপাচ্ছিলেন তিনি। কথাও বলতে পারছিলেন না। অন্য পাশে শয্যায় কাতরাচ্ছিলেন তাঁর স্ত্রী শাহীদা। মুখ আর চুল পুড়ে গেছে তাঁর। শাহীদার পাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন খবর পেয়ে ছুটে আসা শ্বশুর আবু বকর।
জানতে চাইলে আবু বকর বলেন, তাঁর ছেলে ইয়াসির ও ছেলের বউ শাহীদা দুজনই ফার্মাসিস্ট। মাতুয়াইলে থাকেন তাঁরা। ইয়াসির গাজীপুরের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। শাহীদা ডেমরায়। দুজনই বাসায় ফিরছিলেন।
দগ্ধ তকবীর একসময় বাস্কেটবল খেলতেন। বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে থাকেন। মিরপুরে বোনের বাসা থেকে নারায়ণগঞ্জে ফিরছিলেন। আগুনে পুড়ে গেছে তাঁর নাক। পুড়েছে চুল। তকবীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘হঠাৎ দেখলাম, বাসের বাঁ পাশে কে বা কারা যেন কী একটা ছুড়ে মারল। এরপর শুধুই আগুন আর আগুন। আমি জানালার কাচ ভেঙে নেমে যাই।’
বার্ন ইউনিটের সামনে আল আমিন নামের এক ব্যক্তি সাংবাদিকদের জানান, তিনি ওই বাসের যাত্রী ছিলেন। দগ্ধ মোজাফফর ও শাহজাহান তাঁর খালু। তিনি, তাঁর বাবা, দুই খালু ও এক বন্ধুসহ মিলে বিশ্বরোড এলাকায় তাঁর (আল আমিন) বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে যাচ্ছিলেন।
আল আমিন বলেন, ‘বাসটা চলন্ত অবস্থায় ছিল। যেখানে ঘটনা সেখানে ছিল কিছুটা অন্ধকার। আমি বাসের বাঁ পাশের সিটে জানালার পাশে ছিলাম। হঠাৎ কইরা বাসের সামনের লাইটের আলোতেই দেখলাম দুইটা ছেলে কী যেন একটা ছুইড়া মাইরা দৌড় দিছে। সঙ্গে সঙ্গে দেখি আগুন আর আগুন। আমি জানালা দিয়া নাইমা পড়ি। তয় আমার ওই দুই খালু পুড়ে যায়। আমার বাবা ও বন্ধু সামান্য আহত হইছে।’ ছেলে দুটো অল্পবয়সী, বয়স ১২ কি ১৩ হতে পারে বলে জানান আল আমিন। এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে কেরানীগঞ্জে গিয়েছিলেন নাজমুল হোসেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তাঁর বাসা। সেখানকার স্থানীয় একটি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফিরছিলেন তিনি। বার্ন ইউনিটের পর্যবেক্ষণ কক্ষের বাইরে জানালা দিয়ে ছেলের পোড়া মুখ দেখে চোখের পানি ফেলছিলেন বাবা আবদুল লতিফ। জানতে চাইলে আবদুল লতিফ বলেন, ‘বাবা, কার কাছে বিচার দিমু?’
পাশেই হাউমাউ করে কাঁদছিলেন দগ্ধ নূর আলমের স্ত্রী চম্পা বেগম। তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন স্বজনেরা। আরেক স্বজন ক্ষোভে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘এ দেশে কোনো বিচার নাই, বিচার নাই।’ স্বজনেরা জানান, নূর আলম ঠিকাদারি ব্যবসা করেন। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে থাকেন। মিরপুরে বোনের সঙ্গে দেখা করে বাসায় ফিরছিলেন তিনি। বার্ন ইউনিটের ভেতরে পাশাপাশি বসে ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ করেছিলেন দগ্ধ সালাউদ্দিন ও তাঁর চাচা মোশারফ। সালাউদ্দিনের মুখের বেশির ভাগ অংশ পুড়ে গেছে। মুখ পুড়ে গেছে মোশারফের। তাঁদের দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন সালাউদ্দিনের বড় ভাই আবদুর রহমান। সালাউদ্দিন ও মোশারফ দুজনই এলিফ্যান্ট রোডে এক দোকানে চাকরি করেন। নারায়ণগঞ্জে বাসায় ফিরছিলেন তাঁরা। ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দীন মোহাম্মদ নূরুল হক বার্ন ইউনিটে যান। তিনি পরে সাংবাদিকদের জানান, এটা বীভৎস ঘটনা। শুধু এদেরকেই পোড়ানো হয়নি, তাদের পরিবারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। যারা এ কাজ করেছে, তারাও জানে না কত বড় ক্ষতি করেছে তারা।

অবরোধের ১৮তম দিনে ভাঙচুর আগুন, আড়াই শতাধিক গ্রেপ্তার

(রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ডেমরা রোডে কাঠেরপুল এলাকায় যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় দগ্ধ ৩০ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। শুক্রবার রাত সোয়া ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।   পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। রাত সাড়ে ১১টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও একই ঘটনায় দগ্ধ হওয়া রোগী আসছিল ঢাকা মেডিকেলে।   দগ্ধ হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন- খোকন, ইশতিয়াক, জয়নাল আবেদিন, আরিফ, নুরে আলম, আলাউদ্দিন, তাকবির ইসলাম, নাজমুল, সালমান, রাশেদ, ইয়াসিন, শাহিদা, সালাহ উদ্দিন, মোশাররফ, মোমেন ও আফরোজাসহ অনেকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের অধ্যাপক সাজ্জাদ খন্দকার নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “রোগীদের বেশিরভাগই অবস্থা গুরুতর। এর মধ্যে আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সবার চিকিৎসা চলছে।” প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গ্লোরি পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো-ব ১৪-৪৮৮৬) দুর্বৃত্তরা এ হামলা চালায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দু’টি ইউনিট গিয়ে প্রায় আধাঘণ্টার চেষ্টায় আগুন পুরোপুরি নেভায়।) দেশব্যাপী ২০ দলের টানা অবরোধের ১৮তম দিনে গতকাল সারা দেশে আড়াই শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আগের দিনে বগুড়ায় ট্রাকে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আহত একজন গতকাল মারা যান। সিলেটে পেট্রলবোমায় আহত একজনের মৃত্যু হয়েছে একই দিনে। এদিকে দিনে পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ হলেও রাতে বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রাজধানীতেও কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ঘটে ককটেল বিস্ফোরণ। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তায় যান চলাচল কমে যায়। এদিকে অবরোধের ১৮তম দিনেও সড়ক-মহাসড়কে দুরপাল্লার যান চলাচল ছিল একেবারেই নগন্য। ঝুঁকি নিয়ে কিছু যানবাহন চললেও যাত্রীর সংখ্যা ছিল কম। রাতে চট্টগ্রামের চক বাজার থানার ভেতরে ককটেল হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। রাজশাহীর পবা ও তানোরে বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনায় দগ্ধ হন ৯জন। বাস থেকে নামতে দিয়ে আহত হন কয়েকজন। হামলাকারী সন্দেহে দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ। এদিকে নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে নোয়াখালীতে শনিবার ছাত্র শিবির ও চট্টগ্রামে রোববার হরতাল ডেকেছে ছাত্রদল। বগুড়ায় ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলার অভিযোগে সদর থানায় ১০৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও অসংখ্য জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হয়েছে। শ্রীমঙ্গলে পুুলিশ প্রহরার মধ্যেই চলন্ত ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলা  করেছে দুর্বৃত্তরা। ফেনীতে জামায়াতের শহর আমিরসহ বিএনপি-জামায়াতের ১৮ নেতাকর্মী আটক করা হয়েছে। লক্ষ্মীপুরে বিএনপি,জামায়াত ও শিবিরের ১০নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেনবাগে ২০ টি গাড়ি ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা।
রাজধানীতে তিনটি গাড়িতে আগুন
রাজধানীর পৃথকস্থানে তিনটি গাড়িতে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। আগুনে লিটন আলী নামে এক যুবক আহতের খবর পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর পৌনে ২ টায় যাত্রাবাড়ির কাজলায় মূল রাস্তায় পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় গুলিস্থানগামী একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রল ঢেলে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে ওই বাসটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ২ টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে আটক করতে পারেনি। সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় নিউমার্কেট থানাধীন নীলক্ষেত মোড়ে সেফটি পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। এদিকে, গতকাল সকাল ৭টায় যাত্রাবাড়ির  কোনাপাড়ার কাঠেরপুল এলাকার রাস্তায় একটি যাত্রাবাহী লেগুনায় পেট্রলবোমা ছুঁড়ে দৃর্বৃত্তরা। এতে ওই লেগুনায় আগুন ধরে যায়। আগুনে লেগুনার যাত্রী লিটন নামে এক যুবক আহত হন। অন্যদিকে, সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় নয়াপল্টনে অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ের গলিতে দুর্বৃত্তরা দুইটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী থেকে জানান, নাশকতার আশঙ্কায় শুক্রবার সকালে নোয়াখালী শহরের মাইজদী হাউজিং এস্টেট এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকারি পরিষদের সদস্য ও নোয়াখালী শহর সভাপতিসহ ৫জনকে আটক করেছে সুধারাম থানা পুলিশ। এসময় তাদের কাছ থেকে ২টি এলজি, ৫টি পেট্রলবোমা ৬টি ককটেল উদ্ধার করে। আটককৃতদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকারি পরিষদের সদস্য ও নোয়াখালী শহর সভাপতি গিয়াস কামাল সাজু, নোয়াখালী শহর সেক্রেটারী মাহবুবে এলাহি, নোয়াখালী শহর দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন, প্রচার সম্পাদক আহসান উল্লাহ, কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক শামীম, অর্থ সম্পাদক ইমতিয়াজ আহম্মেদ বুলবুল ,এছাড়াও বিএনপির জি এস হারুন রয়েছেন। নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএসএম আশরাফুজ্জামান জানান, নাশকতার পরিকল্পনার সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে পাঁচ জনকে আটক করে। সুধারাম মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ  মো. আনোয়ার হোসেন জানান আটকৃতদের বিরুদ্ধে নাশকতারসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি  জানান, পুলিশ প্রহরার মধ্যেই  মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ভৈরব বাজার এলাকায় ঢাকা- সিলেট সড়কে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে চলন্ত ট্রাকে অবরোধকারীদের ছুড়ে মারা পেট্রলবোমার আঘাতে ট্রাক চালকের সহকারী গুরুতর আহত হয়েছেন। আহত চালকের সহকারী সাজ উদ্দিন সাজুকে (৫০) মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শ্রীমঙ্গল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জালাল উদ্দিন জানান, চার পুলিশ সদস্যের প্রহরায় ট্রাকটি মৌলভীবাজার পুলিশ লাইন থেকে ঢাকার বিজি প্রেসে যাচ্ছিল। রাত সাড়ে ১১ টার দিকে ভৈরববাজার অতিক্রমকালে অবরোধকারীরা কাঁচের বোতলে তৈরী একটি পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে। এতে ট্রাকের বামদিকে বসা চালকের সহকারী সাজুর গাল ও মুখমন্ডল ঝলসে যায়।
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, অবরোধে নাশকতার আশঙ্কায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা, রায়পুর, রামগতি, কমলনগর, রামগঞ্জ ও চন্দ্রগঞ্জ থানাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বিএনপি,জামায়াত ও শিবিরের ১০  নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ফেনী প্রতিনিধি  জানান, ফেনীতে নাশকতার আশঙ্কায় পুলিশ  অভিযান চালিয়ে জামায়াতের শহর আমির আবদুল হান্নানসহ বিএনপি-জামায়াতের ১৮ নেতাকর্মীকে আটক করেছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানায়, শুক্রবার সকালে জামায়াত অধ্যুষিত আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া মাদ্রাসা এলাকায় অভিযান চালায়। এসময় শহর জামায়াতের আমিরসহ ৪ জনকে আটক করা হয়। এছাড়া গত কয়েক দিনে জেলায় নাশকতার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামিদের আটকের জন্য পুলিশ অভিযান চালায়। এসময় সন্দেহভাজন হিসেবে বিএনপি-জামায়াতের আরও ১৪ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। শুক্রবার বিকালে তাদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি জানান, কুষ্টিয়ায় পুলিশের বাধায় পণ্ড হয়ে গেছে অবরোধের সমর্থনে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় কুষ্টিয়া মজমপুর গেট থেকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হলে মিছিলটি পুলিশের বাধায় পণ্ড হয়ে যায়। এসময় মিছিলকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেয়।
সিলেট অফিস  জানায়, সিলেটে পেট্রলবোমায় দুইটি ট্রাক পুড়ে যায়। এ সময় চলন্ত  ট্রাকের ধাক্কায় এক সিএনজি অটোরিক্সা চালক নিহত হয়েছেন। অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন ট্রাক চালকসহ ৪জন। দগ্ধ ৪জনকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমা এলাকাধীন তেতলী বদিকোনা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত অটোরিক্সা চালকের নাম শাহাজাহান মিয়া (৩০) । তিনি সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেতলী উত্তরপাড়া গ্রামের আক্তার  হোসেনের পুত্র। অগ্নিদগ্ধরা হলেন ট্রাকচালক কুমেন দাশ ও তার সহকারী নিরঞ্জন সিংহ। তাদের সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সেনবাগ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালী-ফেনী মহাসড়কের সেনবাগ উপজেলার সেবারহাট বাজার ও ছমিরমুন্সিরহাট বাজারে গতকাল বিকাল চারটার দিকে ১৫/১৭টি সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও ৫টি ট্রাক ভাঙচুর করেছে অবরোধ সমর্থকরা। তারা এসময় ১০/১২টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটনায়। খবর পেয়ে সেনবাগ থানার ওসি মো. মমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ৩০ রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

অবরোধের মধ্যে আবার হরতাল দেওয়ার চিন্তা by সেলিম জাহিদ

চলতি সপ্তাহটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে বিএনপি। তাই চলমান অবরোধ কর্মসূচিকে জোরদার করতে সারা দেশে আবারও হরতাল দেওয়ার চিন্তা করছে দলটি। এরপর অসহযোগ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হতে পারে বলে বিএনপি ও ২০-দলীয় জোটের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী এক সপ্তাহ রাজপথে থেকে কঠোরভাবে কর্মসূচি পালন করার জন্য ইতিমধ্যে বিএনপি ও জোটের শরিক দলের নেতা-কর্মীদের বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ অন্যান্য সড়ক-মহাসড়কে অবরোধ বাড়াতে সংশ্লিষ্ট জেলা ও থানার নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বিএনপি আগামী সপ্তাহটি কেন গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে, তা জানা যায়নি। যদিও কয়েক দিন ধরে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতারা বলে আসছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, অবরোধ কর্মসূচি চলছে। এর সঙ্গে কয়েক দফা হরতালও পালিত হয়েছে। প্রয়োজন হলে বিএনপির চেয়ারপারসন আবার হরতালের ডাক দিতে পারেন। তবে রবি-সোমবার হরতাল ডাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানান তিনি। এদিকে কাল রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তিন দিনের সফরে ভারত আসছেন। এ সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ওবামার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বিএনপি অতীতের মতোই বিদেশের দিকে তাকিয়ে আছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের ধারণা, বস্তুত ওবামা-মোদি বৈঠকের পর দেশের চলমান সংকটের সমাধান কোন পথে হবে অথবা দেশের পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে—তার একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভারত সফরে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা হবে। আর বাংলাদেশের বিষয়ে আমেরিকা ও ভারত দুই দেশেরই উৎসাহ আছে। সে কারণে ওবামা-মোদি বৈঠকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ থাকা স্বাভাবিক। আর তাঁরা যদি বাংলাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একমত হন, তাহলে এর প্রভাব পড়তে বাধ্য।
বিএনপির নেতারা মনে করছেন, ৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া টানা ১৮ দিনের অবরোধের পর এ মুহূর্তে আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। যেকোনো সময় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে পারে। এ অবস্থায় সরকারের পাশাপাশি বিএনপিও আন্তর্জাতিক মহলে তৎপরতা বাড়িয়েছে। দলের কূটনৈতিক শাখার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম ওসমান ফারুক যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। বৃহস্পতিবার রাতে খালেদা জিয়ার আরেক প্রতিনিধি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বিজিপির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন নেতা।
বিএনপির কাছে তথ্য আছে, সরকার আন্দোলন বানচাল করতে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করাসহ সারা দেশে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে বড় ধরনের সাঁড়াশি অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সফরের শেষ না দেখে এ অভিযান শুরু করছে না। সরকারও মনে করছে, এ অঞ্চলে রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি কী হবে, তা এ সফরে স্পষ্ট হতে পারে। বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের মনোভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ দেওয়ার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জনসংখ্যা, শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি অ্যান রিচার্ড বলেছেন, মিয়ানমারের দায়িত্ব অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়া তাদের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়া। তাই রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মিয়ানমারের ওপর চাপ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। শুক্রবার বিকেলে মার্কিন এ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রাজধানীর আমেরিকান ক্লাবে গণমাধ্যমের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধানের বিষয়ে এ মন্তব্য করেন। চার দিনের বাংলাদেশ সফর শেষ করার আগে অ্যান রিচার্ড গণমাধ্যমের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। বাংলাদেশ সফরের আগে তিনি মিয়ানমার সফর করেন। ওই সফরের সময় তিনি সেখানকার সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কথা বলেন। এ ছাড়া তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সর্বশেষ অবস্থা বুঝতে রাখাইন প্রদেশ সফর করেন। আর চার দিনের বাংলাদেশ সফরে তিনি সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ও অস্থায়ী ছাউনি ঘুরে দেখেন।
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফরে এসে মার্কিন সহকারী সেক্রেটারি কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ও অস্থায়ী ছাউনি পরিদর্শনের পর বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেন। অ্যান রিচার্ড বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিয়ে বাংলাদেশ যে উদার ভূমিকা রাখছে, তা বিশ্বের যেকোনো দেশের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। টেকনাফ সফরের সময় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেও বাংলাদেশের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতার বিষয়টি তিনি বুঝতে পারেন বলে জানান।
রাখাইন প্রদেশ ও কক্সবাজার সফরের পর রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার সমাধানের উপায় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে অ্যান রিচার্ড বলেন, ‘রাখাইন প্রদেশের পরিস্থিতির সমাধান করতে হলে মিয়ানমারের ওপর আমাদের দেশের সরকারের মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ দিতে হবে। ’ তিনি মনে করেন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি এমন আচরণ হওয়া উচিত, যাতে তারা মাতৃভূমিতে নির্ভয়ে ফিরে যেতে পারে। তবে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়া এসব লোকজনের একটি ক্ষুদ্র অংশ এত নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়েছে, তারা কখনোই মিয়ানমার ফিরবে না। তাদের তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন করাটা যথার্থ।
তবে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনকেই সমাধানের চূড়ান্ত উপায় হিসেবে মানতে রাজি নন মার্কিন সহকারী সেক্রেটারি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুনর্বাসনের বিষয়টি অধিকাংশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সমাধানের উপায় নয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোই সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দেখার পর অ্যান রিচার্ড মনে করেন, বর্তমানে মানবেতর জীবন যাপন করলেও রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কারণ তারা বাংলাদেশে কিছুটা হলে স্বাধীনতা ভোগ করে। অ্যান রিচার্ড বলেন, ‘আমাদের স্বপ্ন, রোহিঙ্গারা রাখাইন প্রদেশে নিজেদের প্রতিবেশীদের নিয়ে শান্তিতে বসবাসের সুযোগ পাবে।’
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। অ্যান রিচার্ড রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সাহায্য সংস্থার ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনের জীবনযাত্রার উন্নয়নে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে তাদের প্রত্যয় প্রশংসার দাবি করে। কাজেই তাদের কাজে লাগানোর বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারে।

সরকারের ‘বিপদের বন্ধু’ হতে চায় জাপা

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের পাশে থাকবে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। তাই সরকারের সমালোচনা করা থেকে আপাতত বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। জাপার নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘বিপদে বন্ধুর পরিচয়’—অনেকটা এ নীতি থেকে জাপা বর্তমান সংকটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা করে ‘সত্যিকার’ বিরোধী দলের ভাব দেখানোর পুরোনো কৌশল অনুসরণ করা হবে। এরই মধ্যে জাপার চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ও মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর জাতীয় সংসদের কার্যালয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা বৈঠক করেন। বৈঠক-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, চলমান রাজনৈতিক সংকটে সরকারের পাশে থাকা এবং আন্দোলন দমনে বিএনপির যেকোনো পর্যায়ের নেতাকে গ্রেপ্তার করাসহ সব ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপে জাপার সর্বাত্মক সমর্থন থাকবে বলে বৈঠকে কথা দেন এরশাদ। বৈঠকের একপর্যায়ে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীও সেখানে যান। অবশ্য জাপার মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু দাবি করেন, ‘এটি ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎ।’ হাই-হ্যালো করা আর কি।’
চলমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে কথা হয়েছে কি—এ প্রশ্নের জবাবে জাপা মহাসচিব প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যেহেতু রাজনীতি করি, দেশের অবস্থা, রাজনীতি, এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতেই পারে।’
তবে জাপার উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, গত বছর ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের পর থেকে জাপার শীর্ষ নেতৃত্বের শেষ কথা হচ্ছে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা। এ কারণে কোনো রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব কখনো দোদুল্যমান অবস্থান গ্রহণ করেন। আবার কখনো দলে বিভক্তির ভাব দেখিয়ে এরশাদ ও তাঁর স্ত্রী রওশন দ্বিমুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, গত বছরের মতো এবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচি ঘিরে সৃষ্ট সংকটের নিরসন প্রশ্নেও শুরুতে এরশাদ ও তাঁর স্ত্রী সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বিপরীত অবস্থান নিয়েছিলেন। এরশাদ ১ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দলীয় সমাবেশে চলমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তাব করেন। এরপর তিনি প্রয়োজনে আলোচনার উদ্যোগ নিতে আগ্রহ দেখান। অন্যদিকে রওশন এরশাদ চলমান সংকট নিরসনের জন্য কোনো সংলাপ বা সমঝোতার কথা বলেননি। বরং তিনি গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ২০-দলীয় জোট সারা দেশে হরতাল অবরোধের নামে নৈরাজ্য চালাচ্ছে। এটা কঠোর হস্তে দমন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে রওশন বলেন, ‘দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী যে পদক্ষেপই নেবেন আমরা তার সাথে থাকব।’
রওশনের ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা জানান, জাপা একই সঙ্গে সংসদে বিরোধী দল ও সরকারে থাকা নিয়ে সমালোচনা থেকে রেহাই পেতে এরশাদ অনেক দিন ধরে চাচ্ছিলেন মন্ত্রিসভা থেকে তাঁর দলের নেতারা পদত্যাগ করুক। কিন্তু রওশন সায় দেননি। কিন্তু সম্প্রতি সরকারের দিক থেকে ইঙ্গিত পেয়ে এ বিষয়ে স্বামীর সঙ্গে রওশনও একমত হন। যার ফলে কিছুদিন আগে রওশন দলীয় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, মন্ত্রিসভা থেকে জাপা নেতাদের পদত্যাগ সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় জাপা নীতি-নির্ধারকেরা মনে করছেন, এখন মন্ত্রিসভা থেকে জাপা নেতারা পদত্যাগ করলে সরকার চাপে পড়বে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরে এ বিষয়ে দলের সভাপতিমণ্ডলী ও সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে।
এর আগে গত বছর ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে এরশাদ গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি হয়েছিলেন। তখন রওশন দলের একটি অংশকে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। পরে বিরোধীদলীয় নেতা হন। এরশাদও সিএমএইচে থেকে সাংসদ এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে নিযুক্ত হন। জাপার সভাপতিমণ্ডলী ও যুগ্ম মহাসচিব পদের চারজন নেতার সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলে জানা গেছে, এরশাদের নির্দেশ অমান্য করে যাঁরা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা এখন এরশাদের ঘনিষ্ঠজন। আর যাঁরা নির্দেশ মেনে মনোনয়নপত্র তুলে নিয়েছিলেন, তাঁরা এখন কোণঠাসা।
এই চার নেতা দাবি করেন, এখন সরকারের আনুকূল্য পাওয়া ও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার কৌশল নিয়েছেন এরশাদ দম্পতি। চলমান আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আশঙ্কা থেকে রওশন সহিংসতা দমনে কঠোর হতে সরকারের পক্ষে, আর সংলাপ-সমঝোতার কথা বলে এরশাদ প্রতিপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন বলে নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন। অবশ্য দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুর দাবি, এরশাদ ও রওশনের অবস্থান বিপরীতমুখী নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কী হওয়া উচিত সে ব্যাপারে স্যার (এরশাদ) আলোচনার কথা বলেছেন। আর উনি (রওশন) হয়তো সহিংসতা দমনকে হাইলাইট করেছেন। কিন্তু তিনি সংলাপের বিরোধিতা করেননি।’

ট্রাকে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হেলপার রহিমের মৃত্যু

‘আপনারা কেউ রহিমকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না। দয়া করে আপনারা আলোচনা করে এই পরিস্থিতির সমাধান করুন। এ অস্থিরতা চলতে থাকলে আরও অনেক রহিমকে জীবন দিতে হবে। এটা চলতে পারে না। কি অপরাধ করেছে রহিম, কেন তাকে এভাবে জীবন দিতে হলো?’ দুই নেত্রীর উদ্দেশে এই আর্তনাদ আগুনে দগ্ধ হয়ে নিহত আব্দুর রহিমের বড় ভাই রমযান আলীর। বগুড়ায় পণ্যবাহী ট্রাকে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে দগ্ধ রহিম গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় মারা গেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। রহিমের বড় ভই রমজান আলী জানান, দীর্ঘ ৮ বছর মালয়েশিয়া ছিলেন রহিম। দেশে ফিরে কৃষি পণ্যের পাইকারি ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ব্যবসার কাজে গিয়েই এ ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, দরিদ্র পরিবার। তারা সাত ভাই নিজেদের সংসার নিয়েই ব্যস্ত। এর মধ্যে অনেক কষ্ট করে দুই সন্তানকে লেখাপড়া করাতেন আবদুর রহিম। তার মৃত্যুতে এ পরিবারের সামনে এখন অন্ধকার। নিহতের লাশের ময়না তদন্ত শেষে গতকাল দুপুর ১টায় লাশ গ্রহণ করেন তার আত্মীয় সাখাওয়াত হোসেন সুজন। সুজন জানান, রহিমের বাড়ি সাতক্ষীরা সদরে তাকে দাফন করা হবে। রহিমের মৃত্যুর খবর শুনে তার বাড়িতে ভিড় করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ স্বজনরা। সাতক্ষীরা সদরের বোমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসাদুল ইসলাম জানান, দরিদ্র পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আব্দুর রহিম। ক্ষুদ্র ব্যবসা করে তিনি সংসার চালাতেন। বুধবার ব্যবসার কাজে বগুড়া যান আবদুর রহিম। সেখান থেকে বৃহস্পতিবার ফার্নিচার ব্যবসায়ী বন্ধু সাজু খলিফার সঙ্গে ট্রাকে করে ফিরছিলেন তিনি। তখনই ঘটে এই ঘটনা ঘটে। বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল বাসার জানান, রাত ৮টার দিকে বগুড়া-নামুজা সড়কের নুনগোলায় তাদের ট্রাকে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এতে আবদুর রহিম, ফার্নিচারের মালিক সাজু মিয়া ও চালকসহ তিনজন দগ্ধ হন। ট্রাকটির অধিকাংশই পুড়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে আবদুর রহিম ও সাজু মিয়াকে ভোর ৫টার দিকে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. পার্থ শংকর পাল জানান, শ্বাসনালী পুড়ে যাওয়ায় আব্দুর রহিমকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আগুনে তার শরীরের ৩৩ শতাংশ পুড়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এছাড়া ওই ট্রাকে থাকা সাজু মিয়ার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান তিনি। এছাড়া দগ্ধ ট্রাক চালককে বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিহতের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন তার সন্তানদের জড়িয়ে ধরে তিনি আর্তনাদ করে বলছিলেন, আমার স্বামীকে কেন এভাবে খুন করা হলো। এখন এই বাচ্চাদের কি হবে, কে এদের লেখাপড়া করাবে? নিহত আবদুর রহিম সাতক্ষীরা জেলা সদরের শ্রীরামপুরের বাসিন্দা। তার পিতা মৃত মালেক মোড়ল। তিনি এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। তার পুত্র সানজিদ আহমেদ সম্রাট নবম শ্রেণীর ছাত্র এবং কন্যা সুমাইয়া তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী।