Friday, August 14, 2026

যুদ্ধের ক্ষত শুকায়, পরিবেশের ক্ষত থেকে যায় শতাব্দীজুড়ে

যুদ্ধ থেমে গেলেও তার ক্ষত থেকে যায় বহু বছর। কখনো তা ধ্বংসস্তূপে, কখনো অর্থনীতিতে, আবার কখনো নীরবে প্রকৃতির বুকের ভেতর। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় অঞ্চলে পরিবেশের ওপর এমনই এক দীর্ঘমেয়াদি বিষাক্ত উত্তরাধিকার তৈরি হচ্ছে। ওমানের উপকূলে একটি তেলবাহী ট্যাংকার দুর্ঘটনায় ব্যাপক তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সেই আশঙ্কা এখন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জুনের শেষ দিকে ৮ লাখের বেশি ব্যারেল তেলবাহী ট্যাংকার ক্যারোলিন বেজেঙ্গি দক্ষিণ ওমানের উপকূল থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের একটি দ্বীপে আটকে যায়। রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর নভোরোসিস্ক থেকে এপ্রিল মাসে তেল নিয়ে জাহাজটি ৩০ মে সুয়েজ খাল অতিক্রম করে। এর আগে ৮ জুন ইয়েমেন উপকূলের কাছে বিস্ফোরণের শিকার হয় এটি। হামলার দায় এখনো কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠন স্বীকার করেনি।

বিস্ফোরণের চার দিন পর জাহাজটির নাবিকদের উদ্ধার করা হলেও উত্তাল সাগরে ট্যাংকারটি হালানিয়াত দ্বীপপুঞ্জের আল-কিবলিয়াহ দ্বীপের পাথরে গিয়ে আটকে যায়। দ্বীপটি ওমানের একটি প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকার অংশ। সেখানে সোকোত্রা করমোর্যান্টসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও হাম্পব্যাক তিমির বিচরণ রয়েছে। দুর্ঘটনার পর ট্যাংকার থেকে বিপুল পরিমাণ তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা ইতোমধ্যে ওমানের মূল ভূখণ্ডের ‘টার্টল কোস্ট’ এলাকার সৈকতে পৌঁছাতে শুরু করেছে।

ওমানের ন্যাশনাল কমিটি ফর ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট জানিয়েছে, তারা ট্যাংকার আটকে যাওয়ার ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতি ও এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছে। দেশটির সরকারের হিসাবে তেলের ছড়িয়ে পড়া এলাকা প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার—যা নিউইয়র্ক শহরের আয়তনের প্রায় অর্ধেক।

যুদ্ধের কার্বন নিঃসরণও ভয়াবহ

তেল ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষতির সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক হলেও এর প্রভাব আরো অনেক গভীর। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি ও ক্লাইমেট অ্যান্ড কমিউনিটি ইনস্টিটিউটের গবেষকদের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ বলছে, ইরান যুদ্ধের প্রথম ১৪ দিনেই ৫০ লাখ টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ হয়েছে।

গবেষকদের হিসাবে, এই পরিমাণ নিঃসরণ আইসল্যান্ডের এক বছরের মোট কার্বন নিঃসরণের সমান। একই সময়ে উৎপন্ন কার্বনের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ পেট্রোলচালিত গাড়ি এক বছরে যে পরিমাণ নির্গমন করে তার সমতুল্য। এর ফলে জলবায়ুর যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে।

গবেষণায় সামরিক অভিযান, অবকাঠামো ধ্বংস, জ্বালানি ও তেল স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব ধরনের নিঃসরণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির মানব ভূগোলবিদ ও রাজনৈতিক পরিবেশবিদ বেঞ্জামিন নেইমার্ক বলেন, সশস্ত্র সংঘাত থেকে সৃষ্ট নিঃসরণ বৈশ্বিক জলবায়ু নীতিতে এখনো অনেকটাই অদৃশ্য। এগুলো খুব কমই হিসাব করা, প্রকাশ করা বা আলোচিত হয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত চালিকাশক্তি সম্পর্কে বিশ্ব বাস্তবের তুলনায় কম ধারণা পাচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের কারণে সরাসরি নিঃসরণ মোট কার্বন নিঃসরণের মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি। সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে বিমানবন্দর, সামরিক স্থাপনা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন ধ্বংসের ফলে সৃষ্ট ‘এম্বডিড কার্বন’ থেকে।

ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনা ধ্বংসের কারণে প্রায় ১৮ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ হয়েছে। যুদ্ধ ও সহায়তা কার্যক্রমে ব্যবহৃত বিমানের জ্বালানি থেকে আরও প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টন এবং ধ্বংস হওয়া জাহাজ ও বিমানের ‘এম্বডিড কার্বন’ থেকে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার টন নিঃসরণ হয়েছে।

এর আগে একই গবেষকরা জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে ৩ কোটি টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, যা ২০২৪ সালে জর্ডানের মোট কার্বন নিঃসরণের কাছাকাছি।

সমুদ্রতলে শতবর্ষের বিষ

যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষতির কিছু চিহ্ন আবার এত দীর্ঘস্থায়ী যে, সংঘাতে অংশ নেওয়া মানুষের মৃত্যুর বহু দশক পরো তার প্রভাব থেকে যায়। ২০১১ সালে ইরাকের যুদ্ধবিধ্বস্ত তেলশিল্পকে সমুদ্রবন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার জন্য নতুন একটি পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চলছিল। পারস্য উপসাগরের সমুদ্রতলে পাইপলাইনের পথে কয়েকটি অস্বাভাবিক স্তূপ শনাক্ত করেন জরিপকারীরা।

ডুবুরিরা সেখান থেকে মরিচায় ঢাকা একটি ধাতব বস্তু উদ্ধার করলে জানা যায়, সেটি একটি বিস্ফোরিত আর্টিলারি শেলের অংশ। পরে ন্যাটোর সহায়তাপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনে তৈরি সাদা ফসফরাসের একটি গোলা।

তদন্তে জানা যায়, সমুদ্রতলে এমন আরো প্রায় ৪ হাজার গোলা পড়ে রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত হিসেবে থাকা এসব গোলা প্রায় এক শতাব্দী আগে আরব উপসাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সেগুলো প্রবালের স্তরে আবৃত হয়ে সমুদ্রতলের অংশে পরিণত হয়েছে।

সাদা ফসফরাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় বাতাসের সংস্পর্শে এলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জ্বলে উঠতে পারে। ফলে পুরোনো গোলাগুলো সরিয়ে ফেলার পরিবর্তে পাইপলাইনের পথ পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই বিষাক্ত অস্ত্রের স্তূপ আজও সমুদ্রতলে পড়ে আছে।

১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ, ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ২০০৩-২০১১ সালের ইরাক যুদ্ধের বিস্ফোরক ও ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে ছোড়া বা বাধা পাওয়া অসংখ্য রকেট, ডুবে যাওয়া জাহাজ ও বিধ্বস্ত উড়োজাহাজও এখন উপসাগরের সমুদ্রতলে যুক্ত হচ্ছে। এগুলো সামুদ্রিক প্রাণী ও উপকূলীয় পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করতে পারে।

তেল পরিষ্কারে বড় আন্তর্জাতিক অভিযান

এদিকে ক্যারোলিন বেজেঙ্গি থেকে ছড়িয়ে পড়া তেল নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্ধার ও পরিষ্কার অভিযান শুরু হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রে জানিয়েছে, জাহাজটি উদ্ধার এবং তেল ছড়িয়ে পড়ার ক্ষতি মোকাবিলায় তাদের নিয়োগ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, উদ্ধারকারী জাহাজ, উড়োজাহাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক অভিযান চলছে। ১০০ টনের বেশি সরঞ্জাম নিয়ে বিশেষজ্ঞ দলও মোতায়েন করা হয়েছে। ওমানের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সহায়তায় বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে জাহাজে উঠে পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও ট্যাংকার এবং এর কার্গো স্থিতিশীল করার কাজ শুরু করেছেন।

অ্যামব্রের গ্লোবাল রেসপন্স বিভাগের পরিচালক এড উলাস্টন বলেন, খারিফ মৌসুমের প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে তারা দিন-রাত কাজ করছেন।

পরিবেশবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল উপকূলে পৌঁছানোর আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য সমুদ্র থেকে তেল সংগ্রহে বুম ও পাম্প ব্যবহার এবং প্রয়োজন হলে আকাশপথে তেল ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক প্রয়োগের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

এডিনবার্গের হেরিয়ট-ওয়াট ইউনিভার্সিটির পরিবেশগত মাইক্রোবায়োলজি ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক টনি গুতিয়েরেজ সতর্ক করে বলেছেন, তেল যদি উপকূলের অগভীর পানিতে পৌঁছে যায়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে যেতে পারে। এমনকি বছরের পর বছর ধরে সেখানে তেলের অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে।

১৯৮৯ সালে আলাস্কার উপকূলে এক্সন ভ্যালডিজ ট্যাংকার দুর্ঘটনায় ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি ব্যারেল তেল ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই দুর্ঘটনার এক দশক পরও সমুদ্র ও উপকূলে তেলের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

যুদ্ধ থামলেও থেকে যাবে পরিবেশগত ক্ষত

ক্যারোলিন বেজেঙ্গি দুর্ঘটনা ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধ এবং হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির অবরোধের কারণে জাহাজ চলাচলের বীমা ব্যয় এমনিতেই বেড়েছে। নতুন করে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় এই ব্যয় আরো বাড়তে পারে।

তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। যুদ্ধের সময় ধ্বংস হওয়া স্থাপনা, পোড়া জ্বালানি, ডুবে যাওয়া জাহাজ, বিধ্বস্ত উড়োজাহাজ, সমুদ্রতলে পড়ে থাকা গোলাবারুদ এবং তেল ছড়িয়ে পড়া—সব মিলিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিবেশের ওপর তৈরি হচ্ছে এক জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী চাপ।

অর্থাৎ যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অস্ত্রের শব্দ থেমে যাওয়ার পরও এর কার্বন নিঃসরণ, বিষাক্ত বর্জ্য ও সমুদ্রদূষণের প্রভাব বহু বছর, এমনকি শতাব্দী ধরেও টিকে থাকতে পারে। ওমানের উপকূলে চলমান তেল দূষণ সেই দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত বিপর্যয়েরই আরেকটি দৃশ্যমান উদাহরণ।

সূত্র: আরাব নিউজ

যুদ্ধের ক্ষত শুকায়, পরিবেশের ক্ষত থেকে যায় শতাব্দীজুড়ে

হরমুজ নয়, সেনাদের বিশৃঙ্খলা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্র

দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনে মানসিক স্বাস্থ্য ও রসদ সংক্রান্ত সমস্যার খবরের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠাচ্ছে। আব্রাহাম লিংকন রণতরীটি এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধে সহায়তা করে আসছিল। খবর এনডিটিভির।

নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ওয়াশিংটন বর্তমানে প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী মালাক্কা প্রণালিতে রয়েছে। সেখান থেকে রণতরীটিকে ভারত মহাসাগরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর একটিকে আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে।

লিঙ্কন জাহাজে থাকা সৈন্যদের মনোবল নিয়ে উদ্বেগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে হরমুজ প্রণালীর ওপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তিনি তা ‘রক্ষা করবেন’।

মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্বেগ

সাধারণত, মার্কিন নৌবাহিনীর মোতায়েন ছয় থেকে নয় মাসের জন্য হয়ে থাকে, কিন্তু সংঘাতের সময় তা বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু এই সপ্তাহ পর্যন্ত লিঙ্কন ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে রয়েছে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘতম বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন। এই জাহাজে মোতায়েন থাকা সৈন্যদের পরিবার এবং মার্কিন আইনপ্রণেতারা জাহাজে ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যার ফলে জানা গেছে যে একাধিকবার সেনাসদস্যরা জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে লিংকন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়, এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়।

মার্কিন নৌবাহিনী স্বীকার করেছে যে এই সংঘাত একটি ‘অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ’ তৈরি করেছে, যেখানে ‘মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী সরবরাহ কেন্দ্রগুলো যুদ্ধকালীন কার্যকলাপের কারণে ব্যাহত হয়েছিল।’ নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, এর ফলে বিমানবাহী রণতরীটিতে ঘাটতি দেখা দেয় এবং চিঠিপত্র হারিয়ে যায়।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘নেতৃত্ব মিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিয়েছে—প্রথমে খাবার, এরপর স্বাস্থ্যবিধির সামগ্রী এবং সবশেষে ডাক। এরপর আশ্বাস দেওয়া হয় যে, জাহাজের নাবিকরা এখন বিশুদ্ধ পানি এবং ‘স্বাস্থ্যকর খাবারের বিকল্প’ পাচ্ছেন।

উদ্বেগ খারিজ করে দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ লিঙ্কন জাহাজের খারাপ পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো খারিজ করে দিয়েছেন এবং সেগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’ বলে অভিহিত করেছেন।

পানামা সফরের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি ক্রু এবং প্রতিটি ক্যাপ্টেনকে প্রতিটি মুহূর্তে যতটা সম্ভব সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করি। কিছু অভিযান অন্যগুলোর চেয়ে দীর্ঘ হয়, এবং আমি সেই নাবিকদের প্রতি অন্য সবার চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা পোষণ করি। উত্তাল সমুদ্রে, সেই কঠোর পরিস্থিতিতে এবং কম বন্দরে নোঙর করে তারা যা করে—তা অবিশ্বাস্য।’

তার এই মন্তব্যটি এসেছে দুটি সামরিক-কেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম, নেভি টাইমস এবং স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস-এর প্রতিবেদনের পর। যেখানে ৫,০০০ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজটিতে আত্মহত্যার চেষ্টা এবং কর্মীদের মনোবল হ্রাসের খবর প্রকাশিত হয়। জাহাজটি ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে সমুদ্রে রয়েছে।

জবাবদিহির দাবি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের

হেগসেথের মন্তব্যের পর বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতা বিমানবাহী রণতরীটির ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে পেন্টাগনের কাছে জবাবদিহিতার আহ্বান জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতারা জাহাজটির ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত, আরও তথ্য এবং স্বচ্ছতার আহ্বান জানাচ্ছেন। জাহাজটির মূলত মে মাসে দেশে ফেরার কথা ছিল।

সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্য, কানেকটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল নৌবাহিনীর নেতৃত্বকে লেখা এক চিঠিতে বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব চেয়ে লিখেছেন, ‘লিঙ্কনের এই দীর্ঘায়িত মোতায়েন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ঘটছে এবং এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিপুল সংখ্যক মার্কিন নৌবাহিনীর প্রয়োজন হতে পারে।’

অ্যারিজোনার সিনেটর রুবেন গ্যালেগো, যিনি মেরিন কোরের একজন সাবেক সৈনিক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন তিনি দুই দলের আইনপ্রণেতাদের নিয়ে জাহাজটিতে আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের পরিকল্পনা করছেন। তিনি আরো বলেন নাবিকদের সাথে যে আচরণ করা হচ্ছে তা ‘শুধু জঘন্যই নয়, বিপজ্জনকও।’

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ি থেকে দূরে থাকা সামরিক সদস্যদের উপর এর প্রভাব এবং সেইসাথে জাহাজ ও এর সরঞ্জামের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনী আবারও অবরোধ আরোপ করেছে। যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা জানায়নি। এমনকি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘অনির্দিষ্টকাল’ এই অবরোধ বজায় রাখতে পারবে।

হরমুজ নয়, সেনাদের বিশৃঙ্খলা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাজ্যকে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ বললেন নেতানিয়াহু

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাজ্যকে কটাক্ষ করে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ বলে মন্তব্য করেছেন। ইসরাইল নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও দেশটির সরকারের নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বৃহস্পতিবার প্রচারিত ইসরাইলি পডকাস্ট ‘মেলেখ ব্লিৎসার হাইম’-এ দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু ব্রিটিশ লেখক র‍্যান্ডলফ চার্চিলের উদাহরণ টানেন। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের সময় ইসরাইল সম্পর্কে চার্চিলের ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, আজকের ব্রিটেনে এ ধরনের কভারেজ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এরপর ব্যঙ্গাত্মক সুরে নেতানিয়াহু বলেন, আপনি আজকের ব্রিটেনকে ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন বলতে পারেন।

পডকাস্টের পরবর্তী অংশে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের ২০২২ সালের একটি মন্তব্যেরও উল্লেখ করেন। ভ্যান্স সে সময় ব্রিটেনকে ভবিষ্যতের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রধারী ‘ইসলামপন্থী দেশ’ হিসেবে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন নেতানিয়াহু।

নেতানিয়াহু বলেন, কেউ একজন বলেছিলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রথম ইসলামিক রিপাবলিক হবে ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন। এরপর ইরানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা নিশ্চিত করছি, এখানে ইরানের মত আরেকটি এমন দেশ হবে না।

ব্রিটিশ ইহুদি নেতাদের সমালোচনা

নেতানিয়াহুর মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে ব্রিটিশ ও আইরিশ ইহুদিদের একটি সংগঠন। মুভমেন্ট ফর প্রগ্রেসিভ জুডাইজমের সহ-নেতা রাবাই চার্লি বাগিনস্কি ও রাবাই জশ লেভ বলেন, দেশে যখন ইহুদিবিদ্বেষ, মুসলিমবিদ্বেষ ও সামাজিক বিভাজন মানুষের মধ্যে বাস্তব ভয়ের সৃষ্টি করছে, তখন এ ধরনের ভাষা ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’। তারা আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ব্রিটিশ ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তার বক্তব্য আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।

সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের সময় ডাউনিং স্ট্রিটের চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা গ্যাভিন বারওয়েলও নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে ‘স্পষ্ট ইসলামবিদ্বেষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, আশা করা যায়, এখন সবাই বুঝতে পারবেন—কেউ কেউ যে ভান করে আসছেন, নেতানিয়াহু ব্রিটেনের বন্ধু—তা আর ধরে রাখার সুযোগ নেই।

ইসরাইল-যুক্তরাজ্য সম্পর্কে বাড়ছে টানাপোড়েন

ঐতিহাসিকভাবে ইসরাইল ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। সাবেক লেবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের সময়ে ইসরাইলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করা হয় এবং দেশটিতে অস্ত্র রপ্তানির কয়েকটি লাইসেন্সও স্থগিত করে যুক্তরাজ্য। ফ্রান্সের মতো যুক্তরাজ্যও ইসরাইল সরকারের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোটরিচের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

এ ছাড়া গত বছর ফ্রান্স ও কানাডাসহ কয়েকটি মিত্র দেশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়।

সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম গাজায় ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে লেবার পার্টির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া নিয়েও দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে দলটি খুব ধীরগতির ছিল।

বার্নহ্যাম আরো বলেন, গাজায় সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের ওপর আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং অবৈধ ইসরাইলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা প্রয়োজন। ইসরাইল সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রদওয়ান আবুহারব নেতানিয়াহুর মন্তব্যকে যুক্তরাজ্য-ইসরাইল সম্পর্কের ‘নতুন নিম্নস্তর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে তার মতে, ইরান ইস্যুতে দুই দেশের নীতিগত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে এখনও উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।

আবুহারবের ভাষ্য, নেতানিয়াহুর এই মন্তব্যের পেছনে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে। তার মতে, ভঙ্গুর হয়ে পড়া ক্ষমতাসীন জোটকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যেও নেতানিয়াহু এমন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারেন।

সূত্র: আল জাজিরা

যুক্তরাজ্যকে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ বললেন নেতানিয়াহু
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

রাশিয়ার যে কৌশল প্রয়োগ করে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাঙছে ইরান

জর্ডানে ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় এটি স্পষ্ট যে, পেন্টাগনের বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার বিপরীতে তেহরান দ্রুতই তাদের যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করেছে। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে রাশিয়া প্রায়ই ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করে। ইরানও এখন একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করছে। কোনো একটি একক অস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে একসঙ্গে ড্রোন ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে তারা।

টানা পাঁচ দিন ধরে জর্ডানে থাকা তিনটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর উদ্দেশ্য ছিল ওয়াশিংটনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং মার্কিন বাহিনীকে তাদের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্য করা।

ইরান এমন কিছু ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করেছে, যেগুলো হঠাৎ দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম। ফলে সেগুলোকে আকাশে শনাক্ত করে ভূপাতিত করা মার্কিন বাহিনীর জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথম চার দিন মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। তবে ১৭ জুলাই একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে একটি মার্কিন ঘাঁটির অস্থায়ী আবাসনে আঘাত হানে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘আমরা প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্রই ভূপাতিত করেছি। একটি ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছিল।’

ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হন। একই সপ্তাহে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় কয়েকটি বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দুজন মার্কিন অস্ত্র মজুত-সংক্রান্ত তথ্য সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তির বরাতে জানা গেছে, যুদ্ধ চলাকালে পেন্টাগন ১ হাজার ৫০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলেছে। আর এখন তাদের হাতে ১ হাজার ৭০০টিরও কম ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট রয়েছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রেসিডেন্ট সেথ জি. জোন্স বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন একসঙ্গে আসায় ইরান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলছে।’

ইউক্রেন যুদ্ধও ইরানের এই কৌশলকে প্রভাবিত করেছে। ইউক্রেনে রাশিয়া বারবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহার করেছে।

যুদ্ধের প্রথম পাঁচ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালায়। এসব স্থাপনার অনেকগুলোই ছিল ভূগর্ভস্থ। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ইরান কয়েকটি স্থাপনা পুনরুদ্ধার করে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করতে সক্ষম হয়।

জোন্স বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা আরও কঠিন করে তুলতে তারা কার্যকরভাবে রাশিয়ার কৌশল কাজে লাগিয়েছে।’

ইরান তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখতে ভূগর্ভস্থ ও গোপন অবস্থান ব্যবহার করছে। দেশটির সেনা সদস্য এবং শীর্ষ নেতারাও বিভিন্ন গোপন আশ্রয়স্থলে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু অংশ ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় রাখা হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। স্থাপনাটি একটি পাহাড়ের ৩০০ ফুটেরও বেশি গভীরে অবস্থিত বলে ধারণা করা হয়।

এসব কারণে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সূত্র: এনডিটিভি।

রাশিয়ার যে কৌশল প্রয়োগ করে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাঙছে ইরান
ছবি: সংগৃহীত।

ট্রাম্পকে বাঁচাতে এয়ারফোর্স ওয়ানের যাত্রীদের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে প্রশ্ন

দ্য গার্ডিয়ানঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্প্রতি তুরস্ক থেকে ফেরার সময় গোপনে একটি উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা এখন পর্যন্ত দেশটির কংগ্রেসকে জানানো হয়নি। গত মঙ্গলবার এই ঘটনায় কংগ্রেসে ব্রিফিং দাবি করেছেন দেশটির বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতারা। ওই ঘটনায় সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে কেন ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্ন তুলছেন।

গত মাসে মার্কিন গোয়েন্দারা জানতে পারেন, ইরান ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে এবং হুমকিটি বিশ্বাসযোগ্য। এই খবর জানার পর ট্রাম্পকে একটি খাবার সরবরাহ বা ক্যাটারিংয়ের ট্রাকে করে এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে বের করে নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথমে এই খবর প্রকাশ করে। পরে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসও এ ঘটনা নিয়ে খবর প্রকাশ করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ানের একটি সাইড ডোর (এক পাশের দরজা) দিয়ে ট্রাম্পকে গোপনে বের করে নেওয়া হলেও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সহকারী ও সাংবাদিক মিলিয়ে শতাধিক মানুষ ওই উড়োজাহাজে ছিলেন। হুমকির বিষয়টি তাঁদের না জানিয়ে উড়োজাহাজটি যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে যাত্রা করে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাবিষয়ক অ্যাডভোকেসি গ্রুপ স্টেডি স্টেটের নির্বাহী পরিচালক এবং সিআইএর সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও মার্কিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা শাখার সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিভেন ক্যাশ বলেন, ‘এ ঘটনায় মনে হচ্ছে, ভাবনাটা এমন ছিল যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জায়গায় ১০০ বা তার বেশি মানুষকে ইরানিদের হত্যার সুযোগ দিয়ে আমরা তাঁর বিপদ কমাতে পারি।’

ট্রাম্প গোপনে বিমান বদলের কথা মঙ্গলবার নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, শেষ পর্যন্ত তিনি যে উড়োজাহাজে চড়ে যাত্রা করেছিলেন, সেটি এয়ারফোর্স ওয়ানের চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এ ঘটনা নিয়ে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমি যে বিমানে উড়াল দিয়েছিলাম, সেটিই আসলে বেশি ঝুঁকিতে ছিল। কারণ আমার মনে হয়, ইরানিরা ওই উড়োজাহাজটিকেই আক্রমণের জন্য বেশি উপযুক্ত বলে মনে করতে পারত।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ঠিক আছে, এটা পুরোপুরি সিক্রেট সার্ভিসের বিষয়। তারা যা করতে চায়, আমি শুধু সেটা অনুসরণ করি। তাই সিক্রেট সার্ভিস ও সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলি।’

যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে গোপনে অন্য উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন ও অদ্ভুত’ এবং ‘চরম ভীতিকর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে কংগ্রেসকে অবশ্যই ব্রিফ করতে হবে। কারণ, এটি শুধু প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার বিষয় নয়। আমি জানতে চাই যে এয়ারফোর্স ওয়ানকে প্রেসিডেন্টের জন্য খুব ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছিল, সেই উড়োজাহাজে থাকা কর্মী ও সাংবাদিকদের নিরাপদ রাখতে কী ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?’

৮ জুলাই ট্রাম্প তুরস্ক ত্যাগের আগে হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, প্রেসিডেন্ট এয়ারফোর্স ওয়ানে চড়ে যুক্তরাজ্যে যাবেন। কাতার সরকারের উপহার দেওয়া নতুন উড়োজাহাজ নয়; বরং পুরোনো সংস্করণের এয়ারফোর্স ওয়ানেই তিনি সেখানে যাবেন।

টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পকে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী নির্ধারিত এয়ারফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা যায়। কিন্তু ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁকে গোপনে সেখান থেকে সরিয়ে বিমানবাহিনীর সি-৩২এ উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়া হয়।
পুরো ঘটনাটি এতটাই গোপনীয়তা বজায় রেখে করা হয়েছিল যে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সফররত সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মীও বিশ্বাস করেছিলেন, ট্রাম্প তাঁদের সঙ্গে এয়ারফোর্স ওয়ানেই রয়েছেন। যাত্রার সময় সাংবাদিকদের বলা হয়েছিল, তাঁরা যেন জানালার পর্দা টেনে রাখেন।

ঘটনার দিন ট্রাম্পকে বহনকারী সি-৩২এ সামরিক উড়োজাহাজটি ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের ঘাঁটি আরএএফ মিলডেনহলে গিয়ে স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১০টা ২০ মিনিটে অবতরণ করে। অন্যদিকে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান এবং তাতে ভ্রমণকারী সাংবাদিকদের দলটি কয়েক মিনিট পর সেখানে পৌঁছায়। তখন আলোকচিত্রীরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে ট্রাম্পের নামার ছবি তোলেন। ধারণা করা হচ্ছে, গোপনে তাঁকে আবার ওই উড়োজাহাজে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

এরপর ট্রাম্প ঘাঁটিতে সেনাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে কাতারের দেওয়া বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজে ওঠেন তিনি এবং সেই উড়োজাহাজেই ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা হন।

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রদূত নেড প্রাইস বলেন, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হোয়াইট হাউস নজিরবিহীন কোনো পদক্ষেপ নিলে তাতে তাঁর আপত্তি নেই। তবে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি ‘নিরেট মিথ্যা’ প্রচার চালিয়েছে এবং সাংবাদিকদের তাঁদের অজান্তেই সেই মিথ্যা প্রচারের সহযোগী বানিয়েছে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদবিষয়ক বিশেষ সহকারী প্রাইস আরও বলেন, ‘এটি এমনভাবে করা সম্ভব ছিল, যাতে তাঁদের মিথ্যা বলতে হতো না। তাঁরা [ট্রাম্পের] সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের জানাতে পারতেন। আমি নিশ্চিত, নিরাপত্তার কিছু ব্যবস্থা সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ তাঁরা খুব স্বেচ্ছায় মেনে নিতেন।’

নেড প্রাইস বলেন, ‘একবার সবকিছু বলে কাজটি শেষ হলে এবং প্রেসিডেন্ট নিরাপদে যুক্তরাজ্যে বা অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর তাঁদেরকে বলা যেত, আমরা এ কাজটি করেছি এবং এ কারণে এটা করতে হয়েছে।...কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সত্য বলার প্রতি তাঁদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। সত্যের প্রতি তাঁদের কোনো আনুগত্যও নেই। বরং এক মাস ধরে বিষয়টি নিয়ে শুধু মিথ্যা বলা ও মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছে।’

সাংবাদিকেরাও এ ঘটনায় উদ্বগ প্রকাশ করেছেন। সিএনএনের উপস্থাপক জেক ট্যাপার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘অবশ্যই প্রেসিডেন্টের জীবন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রেসিডেন্টের জীবন রক্ষায় আগের [সরকারের] হোয়াইট হাউসের [কর্মকর্তারাও] প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু আমি যেসব কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের কেউই আগে কখনো এমন ঘটনা শোনেননি, যেখানে আসন্ন হুমকি মোকাবিলায় হোয়াইট হাউসের কর্মী ও সাংবাদিকদের নিয়ে পুরো এয়ারফোর্স ওয়ানকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।’

সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের আমেরিকা অঞ্চলের পরিচালক হোসে জামোরা বলেছেন, সাংবাদিকেরা যে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিলেন, সেটা যেন না হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল প্রশাসনের। তিনি বলেন, ‘বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানানো উচিত, যাতে তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে জেনেবুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যেকোনো প্রশাসনের জন্যই স্বচ্ছতাই স্বাভাবিক নিয়ম হওয়া উচিত, বিশেষ করে যখন নিরাপত্তার প্রসঙ্গ আসে।’

এই তথ্য প্রকাশের পর কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটির নিরাপত্তা নিয়ে আগে থেকে ওঠা প্রশ্ন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ট্রাম্প ন্যাটো সম্মেলনে কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটি নিয়ে গিয়েছিলেন। এটিই ছিল উড়োজাহাজটির প্রথম আন্তর্জাতিক যাত্রা। কিন্তু ফেরার পথে প্রথম ধাপে তিনি সেটি ব্যবহার না করে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান ব্যবহার করবেন বলে হঠাৎ ঘোষণা দেন।

তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, নতুন উড়োজাহাজটি মিলডেনহলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাতে সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা সেটি পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে দেখতে পারেন। পরে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও সিবিএস নিউজ জানায়, ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়তে থাকায় ট্রাম্প বা তাঁর উড়োজাহাজে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।

তুরস্কে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে বড় ধরনের হামলা চালাচ্ছিল। ফলে ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। তবে নতুন তথ্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, হুমকি যতটা ছিল, বাস্তবে সেটাকে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু ওই হুমকি পরবর্তী সময়ে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটাকে ন্যায্যতা দেয় এমনটা সবাই মনে করছেন না। কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের পারমাণবিক নীতি কর্মসূচির ফেলো অঙ্কিত পান্ডা বলেন, ‘ইরানের দিক থেকে এত গভীরে গিয়ে প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজে হামলার চেষ্টা চালানো খুবই অসম্ভব। এর জন্য মানুষ বয়ে নিতে পারে এমন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাছাকাছি এলাকায় গোপনে অবস্থানকারী হামলাকারীদের প্রয়োজন হতো।’

পান্ডার মতে, তুরস্কের ভেতরে নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো হুমকি ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নিয়মিতভাবেই ‘জানা যায় না এমন ঝুঁকি’ মাথায় রেখে পরিকল্পনা করেন।

ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডিস্টিংগুইশড ফেলো জেফরি লুইস বলেন, ‘আঙ্কারা থেকে কোনো উড়োজাহাজ উড্ডয়নের সময় সেটিকে নিশানা করার মতো ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের নেই।’ তবে তাত্ত্বিকভাবে রানওয়েতে থাকা উড়োজাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালাতে পারে ইরান। তিনি বলেন, ‘কিন্তু সেটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে হয়।’

জেফরি লুইস ধারণা, মার্কিন কর্মকর্তারা সম্ভবত ‘সন্ত্রাসী ধরনের হামলা’ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। এ ধরনের হামলায় কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করা হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি চীনের তৈরি কিউডব্লিউ-১২ বা এফএন-১৬, অথবা রাশিয়ার ইগলা ক্ষেপণাস্ত্রের উত্তর কোরীয় সংস্করণের কথা উল্লেখ করেন।

তুরস্কে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেমস জেফরি মনে করেন, ট্রাম্পকে অন্য একটি উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গোপন রাখার ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, হুমকির বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে গুরুতর তথ্য ছিল। বর্তমানে ইসরায়েলপন্থী ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট ফেলো জেফরির এয়ারফোর্স ওয়ানে ভ্রমণেরও বহু অভিজ্ঞতা রয়েছে।

জেফরি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা। এটি ইঙ্গিত দেয়, হুমকির বিষয়ে তাঁদের কাছে খুব ভালো গোয়েন্দা তথ্য ছিল এবং যে উড়োজাহাজে তিনি ছিলেন, সেটির ওপর তাঁরা আস্থা রাখেননি।’

জেফরি মনে করেন, ওই গোয়েন্দা তথ্য ইসরায়েল থেকে আসতে পারে। ইরানকেন্দ্রিক গোয়েন্দা তৎপরতায় ইসরায়েলের ব্যাপক সক্ষমতা রয়েছে। তাঁর ভাষ্যমতে, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা কখনো কখনো শুধু তথ্য দেওয়াই নয়, মার্কিন নীতিতেও ‘প্রভাব বিস্তার’ করতে চান। তবে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত কোনো হুমকি বানিয়ে বলার ঝুঁকি তাঁরা নেবেন না।

জেফরি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার মতো গুরুতর বিষয় নিয়ে তাঁরা খেলা করবেন না।’ তিনি মনে করেন, এ ধরনের কোনো সতর্কবার্তা পেলে মার্কিন সরকার গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করবে, হুমকি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করবে এবং পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে।

উড়োজাহাজের জানালার পর্দা কেন টেনে দিতে বলেছে, সে বিষয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে ট্রাম্প তার উত্তরে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনারা সম্ভবত একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে আছেন। তবে আমি গেলে আপনারাও যাবেন। ঠিক তো?’

পরে এয়ারফোর্স ওয়ানকে লক্ষ্য করে ইরানের কোনো বিশ্বাসযোগ্য হুমকি ছিল কি না, এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তো সব সময় হুমকির মধ্যে আছি। তাদের [ইরান] তালিকায় আমি এক নম্বরে—আপনাদের আগে।’

তবে প্রেসিডেন্টকে অন্য উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা এবং বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে হোয়াইট হাউস পরেও ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকায় এসব প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

তুরস্ক ছাড়ার সময় লুকোচুরির নাটকীয়তা শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট অ্যান্ড্রুস বিমানঘাঁটিতে পৌঁছায় তাঁর নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান। ৯ জুলাই ২০২৬, মেরিল্যান্ড
তুরস্ক ছাড়ার সময় লুকোচুরির নাটকীয়তা শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট অ্যান্ড্রুস বিমানঘাঁটিতে পৌঁছায় তাঁর নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান। ৯ জুলাই ২০২৬, মেরিল্যান্ড। ছবি: রয়টার্স

যদি আমি মরি, আপনারাও মরবেন—কেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন ট্রাম্প

রয়টার্সঃ শুরু থেকেই কোথাও যেন গরমিল ছিল। গত জুলাই মাসে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে বলেন, তিনি নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানে করে দেশে ফিরবেন না। অথচ সেটিতে করেই তিনি আঙ্কারায় গিয়েছিলেন।

ট্রাম্পের সঙ্গে সফরে সাংবাদিকদের যে দলটি ছিল, তাদের মধ্যে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাংবাদিক গ্রাম স্ল্যাটারিও ছিলেন। তিনি বলেন, সম্মেলন শেষে ট্রাম্পের আঙ্কারা ছাড়ার আগে দিয়ে পূর্বনির্ধারিত সফরসূচিতে যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনা হয়, তা নিয়ে সাংবাদিকদের মনে অজানা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

গত ৮ জুলাই ট্রাম্পের দেশে ফেরা নিয়ে নাটকীয় মুহূর্তগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন স্ল্যাটারি।

গত বছর কাতারের রাজপরিবার থেকে ট্রাম্পকে যে উড়োজাহাজটি উপহার দেওয়া হয়, সেটির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করার পর সম্প্রতি ট্রাম্প নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান হিসেবে সেটিতে ভ্রমণ শুরু করেন। তুরস্কেও তিনি সেটিতে চেপেই গিয়েছিলেন।

অথচ হঠাৎ করেই ৮ জুলাই ট্রাম্প নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানে করে দেশে না ফেরার কথা জানান। কারণ হিসেবে বলেন, উড়োজাহাজটি আগেভাগেই ইংল্যান্ডের মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি, যাতে সেখানে কর্মরত মার্কিন সামরিক সদস্যরা সেটি ঘুরে দেখতে পারেন।

ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প আরও লেখেন, তিনি একটি পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে করে মিলডেনহলে যাবেন। যদিও শেষ পর্যন্ত কীভাবে ওয়াশিংটনে ফিরবেন, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।

স্ল্যাটারি বলেন, সফরসূচির এ পরিবর্তন ছিল বিভ্রান্তিকর, আর ট্রাম্পের ব্যাখ্যাও খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল না। সাংবাদিকেরা নিজেদের মধ্যে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, ইরান কি প্রেসিডেন্টকে হত্যার কোনো সুনির্দিষ্ট ষড়যন্ত্র করেছে?

স্ল্যাটারি আরও বলেন, ‘প্রথমত, আমাদের কাছে সেদিনের সফরসূচিই ছিল রহস্যময়। তবে যুক্তরাজ্যে যাত্রাবিরতির পর আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা ওয়াশিংটনের দিকেই ফিরছি বলে ধরে নিয়েছিলাম।’

সাংবাদিকেরা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়টি আগেই ধারণা করতে পেরেছিলেন বলেও জানান স্ল্যাটারি। তিনি বলেন, ‘যদি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়ে আমাদের প্রাথমিক ধারণা সঠিক হয়ে থাকে, তবে কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটি হয়তো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা মান পূরণ করছিল না। সেটিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সুবিধার অভাব এখনো রয়েছে বলে জানা যায়।’

হোয়াইট হাউস কেন ট্রাম্পের উড়োজাহাজ পরিবর্তন করতে চেয়েছিল, তা থেকে এটির একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এমনটা হলে এর অর্থ দাঁড়ায়, আমরা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ একটি উড্ডয়নের মুখোমুখি হতে যাচ্ছিলাম।’

৮ জুলাই ন্যাটো সম্মেলনের শেষ দিন ট্রাম্প অনিচ্ছাকৃতভাবেই সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে জল্পনাকল্পনা উসকে দিয়েছিলেন বলে মনে করেন স্ল্যাটারি। ট্রাম্প সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা থেকে শুরু করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করার সময় বারবার সাংবাদিকদের কাছে করা মন্তব্যে তাঁকে হত্যার ইরানের দীর্ঘদিনের কথিত চেষ্টার কথা তুলে ধরছিলেন।

স্ল্যাটারি বলেন, ‘তুরস্ক ছাড়ার ঠিক আগে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উড়োজাহাজ পরিবর্তন নিয়ে করা প্রশ্নগুলোর বেশির ভাগই এড়িয়ে যান। এতে কিছু একটা যে স্বাভাবিক নয়—এমন অনুভূতি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

‘যে উড়োজাহাজকে আমরা প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ বলে মনে করেছিলাম, তাতে ওঠার সময় হোয়াইট হাউসের কর্মীরা সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলেন। কারণ জানতে চাইলে আমাদের বলা হয়, এটি সিক্রেট সার্ভিসের অনুরোধ।

‘এর আগে প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজে ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানতাম, এমন নির্দেশনা অস্বাভাবিক। তবে কি এটি কোনো গোপন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি আড়াল করার চেষ্টা ছিল?

‘মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই আমরা জানতে পারি, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ট্রাম্প একটি গোপনীয় অভিযানের অংশ হিসেবে ক্যাটারিং ট্রাকে করে ওই উড়োজাহাজ থেকে নেমে অন্য একটি সামরিক উড়োজাহাজে উঠেছিলেন। জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশটি ছিল সেই অভিযান গোপন রাখার জন্য।

‘এয়ারফোর্স ওয়ানে থাকলে তথ্য পাওয়া আশ্চর্যজনকভাবে কঠিন। নিরাপত্তার কারণে সাংবাদিকদের ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগও সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে।

‘আঙ্কারা থেকে মিলডেনহল পর্যন্ত উড়োজাহাজযাত্রা নির্বিঘ্নেই কেটেছিল, যদিও স্বস্তিতে থাকা কঠিন ছিল। আমরা ভুলভাবে বিশ্বাস করছিলাম যে প্রেসিডেন্ট যেকোনো মুহূর্তে উপস্থিত হতে পারেন। আর আমাদের এ যাত্রাকে ঘিরে পরিস্থিতি তখনো রহস্যে ঢাকা ছিল।

‘তখন ট্রাম্প সাংবাদিকদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপে কেন যোগ দেননি, এখন সেই কারণগুলো স্পষ্ট। তবে তাঁর অনুপস্থিতিকে আমি তখন তেমন গুরুত্ব দিইনি। কারণ, এয়ারফোর্স ওয়ানে ভ্রমণের সময় তিনি প্রায়ই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা এড়িয়ে যান। কিন্তু ভর সন্ধ্যায় যখন আমরা ইংল্যান্ডে অবতরণ করলাম, তখন যাত্রাটি আরও অস্বাভাবিক অবস্থায় মোড় নিল।

‘উড়োজাহাজ থেকে নামার সময় আমরা দেখলাম, ট্রাম্প এ উড়োজাহাজেরই অন্য একটি অংশ থেকে নেমে আসছেন। পরে বোঝা যায়, এটি ছিল পুরো ছলনারই একটি সুচিন্তিত ও জটিল অংশ।

‘এরপর হোয়াইট হাউসের কর্মীরা আমাদের ট্রাম্পকে অনুসরণ করতে বলেন। তিনি হেঁটে কাতার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের দিকে যাচ্ছিলেন। আমরা যে উড়োজাহাজ থেকে সবে নেমেছি তার কয়েক শ গজ সামনে সেটি পার্ক করা ছিল।

‘প্রেসিডেন্টের দুই পাশে সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা অবস্থান নিয়েছিলেন। আর আমাদের ডানে একটি কালো সরকারি এসইউভি ধীরে ধীরে সামনে এগেচ্ছিল।

‘এটি এমন এক কৌশল, যার মতো কিছু আমি হোয়াইট হাউস কভার করার সময় আগে দেখিনি। আমার কাছে সঙ্গে সঙ্গেই দৃশ্যটি বেশ নাটকীয় ও চলচ্চিত্রসুলভ মনে হয়েছিল। বিশেষ করে যখন এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ছিলাম।’

নতুন উড়োজাহাজে উঠে হোয়াইট হাউসের এক সহকারী সাংবাদিকদের ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের একটি পোস্টের ছাপা কপি দেন। পোস্টে কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজের সামনে জড়ো হওয়া সামরিক সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ছবি ছিল।

পোস্টে ট্রাম্প বলেন, বিমানঘাঁটির ‘পুরো’ কর্মীবাহিনী উড়োজাহাজটি দেখতে চেয়েছিল এবং মিলডেনহলে যাত্রাবিরতি করতে আঙ্কারা থেকে ওয়াশিংটনের স্বাভাবিক উড্ডয়নপথের সূচিতে ‘প্রায় কোনো বিচ্যুতিই’ করতে হয়নি।

স্ল্যাটারি বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের কেবিনে আসেন। তখন আমরা তাঁকে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকি—ইংল্যান্ডে আসার জন্য তিনি কেন কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজ ব্যবহার করেননি। এর প্রকৃত কারণ কী ছিল তা জানতে চাই।

‘সেই ঘটনার আরও এক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর আমরা জানতে পারি, ট্রাম্প আসলে মিলডেনহলে যাওয়ার পথে আমাদের সঙ্গে ছিলেনই না এবং এ ঘটনায় তৃতীয় একটি উড়োজাহাজও জড়িত ছিল।

‘অথচ, ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প এ ঘটনার পেছনে নিরাপত্তাজনিত কোনো উদ্বেগ থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন।

‘তবে আমি যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করি, কেন আমাদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল, তখন তিনি ইরানের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের হুমকির বিষয়টি স্বীকার করেন।

‘ট্রাম্প আমাদের বলেছিলেন, “কিন্তু যদি আমি (মারা) যাই, আপনারাও যাবেন। তাই তো? হয়তো কোনো এক দিন আপনারাও পেশা বদলাতে চাইবেন।”’

তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ট্রাম্পের উড়োজাহাজে ওঠার আগে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানের পাশে একটি ক্যাটারিং ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ৮ জুলাই ২০২৬, আঙ্কারা
তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ট্রাম্পের উড়োজাহাজে ওঠার আগে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানের পাশে একটি ক্যাটারিং ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ৮ জুলাই ২০২৬, আঙ্কারা। ছবি: রয়টার্স

বাদাখশানে বিস্ফোরণে মেয়র নিহত, দুই সপ্তাহে দ্বিতীয় তালেবান কর্মকর্তা খুন

আফগানিস্তানের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশের মেয়র হাবিব উর রহমান মনসুর বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন। গত দুই সপ্তাহে এ অঞ্চলে হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে নিহত হওয়া তালেবান প্রশাসনের দ্বিতীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তিনি।

প্রাদেশিক রাজধানী ফয়জাবাদে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে গাড়িতে থাকা অবস্থায় বিস্ফোরণে নিহত হন হাবিব উর রহমান মনসুর। আফগানিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তবে হামলার ধরন বা কারা এর সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

আজ শুক্রবার নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও হাবিব উর রহমানের নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেছেন, প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তিনি পরিচয় প্রকাশ করতে চান না।

তালেবান ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পঞ্চম বার্ষিকী পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর দ্রুত দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান।

হাবিব উর রহমান নিহত হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে বাদাখশানের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক জাবিহুল্লাহ আমিরিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্থানীয় এক এলাকা থেকে ফয়জাবাদে যাওয়ার পথে বন্দুকধারীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমিরির নিরাপত্তারক্ষীরা সঙ্গে সঙ্গে হামলাকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। এতে একজন নিহত হন ও অন্যজনকে আটক করা হয়।

তবে দুটি হামলার কোনোটিরই উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কাবুলে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন আফগানিস্তানের শরণার্থীবিষয়ক মন্ত্রী খলিল হাক্কানি। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানির চাচা ছিলেন। সিরাজউদ্দিন হাক্কানি তালেবানের ভেতরে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দেন।

এর আগে ২০২৩ সালের জুনে বাদাখশানের ডেপুটি গভর্নর নিসার আহমদ আহমাদি গাড়িবোমা বিস্ফোরণে নিহত হন। একই হামলায় তাঁর গাড়িচালকও নিহত হন। সে সময় ইসলামিক স্টেটের আঞ্চলিক শাখা ইসলামিক স্টেট ইন খোরাসান প্রভিন্স (আইএস–কে) ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।

ডেপুটি গভর্নরের মৃত্যুর কয়েক দিন পর তাঁর স্মরণসভায়ও আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়। ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হন। আইএস–কে এই হামলারও দায় স্বীকার করেছিল।

২০২৩ সালের মার্চে উত্তরাঞ্চলীয় বালখ প্রদেশের গভর্নরও তাঁর কার্যালয়ে বোমা হামলায় নিহত হন।

গাড়িতে বিস্ফোরণে বাদাখশান প্রদেশের মেয়র হাবিব উর রহমান মনসুর নিহত হয়েছেন
গাড়িতে বিস্ফোরণে বাদাখশান প্রদেশের মেয়র হাবিব উর রহমান মনসুর নিহত হয়েছেন। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ইসরাইলি সেনার পূর্ণ প্রত্যাহার চান ফিলিস্তিনিরা, হামাসের নিরস্ত্রীকরণে আপত্তি

গাজা থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহার ছাড়া হামাসকে নিরস্ত্র করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন অধিকাংশ ফিলিস্তিনি। ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চ পরিচালিত নতুন এক জনমত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

জরিপে অংশ নেওয়া অনেক ফিলিস্তিনি মনে করেন, ইসরাইলি দখল ও সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত থাকা অবস্থায় হামাসের অস্ত্র সমর্পণ গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের মতে, নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নটি গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়া উচিত।
বিজ্ঞাপন

জরিপে দেখা গেছে, হামাসকে নিরস্ত্র করার বিরোধিতা পশ্চিম তীরে বেশি। সেখানে ৭৮ শতাংশ উত্তরদাতা এর বিরোধিতা করেছেন। গাজায় এ হার ৫৫ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে ৬৯ শতাংশ ফিলিস্তিনি যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার শর্ত হিসেবেও হামাসের নিরস্ত্রীকরণের বিপক্ষে মত দিয়েছেন।

জরিপে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও গাজা শাসনব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে বলে অধিকাংশ উত্তরদাতা মনে করেন না।

এদিকে হামাসের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা ছাড়া তারা অস্ত্র সমর্পণ নিয়ে আলোচনা করতে রাজি নয়।

জরিপের ফলাফল এমন সময় সামনে এলো, যখন গাজায় যুদ্ধের অবসান, ভবিষ্যৎ প্রশাসন এবং হামাসের অস্ত্র সমর্পণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। ফিলিস্তিনি জনমতের এই অবস্থান গাজা সংকটের রাজনৈতিক সমাধানকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই ও জেরুজালেম পোস্ট

ইসরাইলি সেনার পূর্ণ প্রত্যাহার চান ফিলিস্তিনিরা, হামাসের নিরস্ত্রীকরণে আপত্তি
দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনের তল্ল গ্রামটির কাছে ইসরাইলি সেনারা। ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে তোলা ছবি। এএফপি

কলকাতার বহু মসজিদে জুমার আজান শোনা যায়নি, আতঙ্কে মুসলিমরা

পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। একসময় কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতে জুমার দিন মসজিদে জায়গা না হলে রাস্তায় নামাজ পড়তেন অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষ। কিন্তু বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার সেই পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এখন সরাসরি মসজিদ থেকে মাইক খুলে নেওয়ার মতো গুরুতর ঘটনাও সামনে আসছে। এর জেরে শুক্রবার কলকাতা ও সংলগ্ন বহু মসজিদে জুমার আজান শোনা যায়নি। আজানের ধ্বনি না পৌঁছানোয় বহু মুসল্লি ঠিকমতো নামাজেও যোগ দিতে পারেননি। সব মিলিয়ে চারদিকে এক অজানা আতঙ্ক ও হতাশার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

এদিন কলকাতার পার্ক সার্কাসের এক ইমামের কণ্ঠে এই করুণ পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। চরম অসহায়তার সুরে তিনি বলেন, ‘মাইক কেড়ে নিয়ে আমাদের ওপর নানাভাবে জুলুম করা হচ্ছে। আমরা সব সহ্য করব, কারণ আমাদের আর কিছু করার নেই। শনিবার (১৫ আগস্ট) আমাদের স্বাধীনতা দিবস। আমি সবাইকে অনুরোধ করছি, সবাই নিজের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করুন। না হলে এই সরকার মুসলমানদের গায়ে খুব সহজেই দেশদ্রোহীর তকমা সেঁটে দেবে।’ তার এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, রাজ্যের মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে বর্তমানে কতটা ভীতির সঞ্চার হয়েছে।

এরইমধ্যে মসজিদের মাইক খুলে নেওয়ার এই বিতর্কিত বিষয়টি গড়িয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি অতরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে এ-সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানি হয়। আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের লিখিত নোটিশ ছাড়াই শুধু মৌখিক নির্দেশে পুলিশের সহায়তায় রাজ্যের প্রায় ৪ হাজার মসজিদের মাইক খুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি বিচারপতি ভগবতী প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেঞ্চের পুরোনো রায়ের প্রসঙ্গ টেনে সব মসজিদে পুনরায় মাইক লাগানোর অনুমতির আবেদন জানান। পাশাপাশি, ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে কেন এমন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করা হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তিনি জানান, শুধু হুগলির চাঁপদানি থেকেই অন্তত ১০০টি মসজিদের পক্ষ থেকে এমন আবেদন আসতে পারে।

অন্যদিকে, রাজ্যের অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল (এএজি) আদালতে এই মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই পাল্টা প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে মাইক খোলার কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি এবং কোন পুলিশ কর্মকর্তা এমন নির্দেশ দিয়েছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা নাম মামলাকারী দিতে পারেননি। এ ছাড়া, ৪ হাজার মাইক খোলার অভিযোগ উঠলেও কোনো ইমাম নিজে থেকে এগিয়ে এসে মামলা করেননি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এএজি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী নির্দেশ না দিয়ে রাজ্যকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ দেওয়া হোক।

পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জানতে চান, ঠিক কোন জেলার কোন কোন মসজিদ থেকে মাইক খোলা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য আদালতে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি, আজান দেওয়ার ক্ষেত্রে মাইক ব্যবহারের শব্দবিধি মানা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। আগামী ১৮ আগস্ট মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। তার আগে রাজ্যকে নিজেদের অবস্থান জানানোর নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট।

এই তীব্র আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের আবহে গত সপ্তাহে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, সরকার কোনো নতুন আইন আনছে না; বরং ২০২০ সালের হাইকোর্টের নির্দেশিকাই কার্যকর করছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ধর্মীয় স্থান বলতে মন্দির ও মসজিদ—উভয়ই বোঝায় এবং সেই অনুযায়ী ৪২০০টি মসজিদ ও ১০৯৬টি মন্দির থেকে মাইক খোলা হয়েছে।

কিন্তু সরকারের এই পরিসংখ্যানে বিন্দুমাত্র আশ্বস্ত হতে পারছেন না সংখ্যালঘু সমাজ। তারা জানান, এই পদক্ষেপ আসলে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনে বাধা দেওয়ার একটি সুকৌশলী প্রয়াস মাত্র। সব মিলিয়ে এক দমবন্ধ করা ভয়ের আবহে শনিবার স্বাধীনতা দিবস পালন করতে চলেছেন পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মুসলিম নাগরিকরা।

কলকাতার বহু মসজিদে জুমার আজান শোনা যায়নি, আতঙ্কে মুসলিমরা

ইরান যুদ্ধে ৪৫টি রিপার ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে অন্তত ৪৫টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির যুদ্ধের আগের মোট রিপার ড্রোনের প্রায় ২৫ শতাংশই এতে হারিয়েছে। এ ঘটনায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে ড্রোনের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এ তথ্য জানিয়েছে।
বিজ্ঞাপন

মার্কিন কর্মকর্তাদের একজন জানিয়েছেন, সব কটি ড্রোন ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার হামলায় ধ্বংস হয়নি। কয়েকটি ক্ষেত্রে ড্রোনের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকক্ষে থাকা পরিচালনাকারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে এসব ঘটনার বিস্তারিত কারণ জানা যায়নি।

প্রতিবেদন সম্পর্কে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

গত জুলাইয়ে এক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ইরান প্রায় ৩০টি রিপার ড্রোন ভূপাতিত করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান নিয়মিত এসব ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করে আসছে।

যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল রিপারের

এমকিউ-৯ রিপার যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ চালকবিহীন সামরিক বিমান বা ড্রোন। একটি রিপারের দাম সর্বোচ্চ প্রায় ৫ কোটি ডলার হতে পারে। তবে ব্যবহৃত সরঞ্জামের ধরন অনুযায়ী কোনো কোনো ড্রোনের দাম এর চেয়ে কম।

রিপার একটানা দীর্ঘ সময় উড়তে পারে। একই সঙ্গে এতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০০ কেজি পর্যন্ত অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম বহন করা যায়। ফলে শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে রিপার ড্রোন ব্যবহার করেছে। মে মাসে হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল কেনেথ এস. উইলসবাখ বলেছিলেন, যুদ্ধে রিপার সম্ভবত ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’ পালন করেছে। তিনি জানিয়েছিলেন, যুদ্ধের সময় ড্রোনটি ‘অনেক অনেক হামলায়’ ব্যবহার করা হয়েছে।

অস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ

রিপার ড্রোন হারানোর এই তথ্য এমন সময়ে সামনে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত নিয়েও নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।

চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্ত্রের ঘাটতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন বলে সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়। মন্ত্রিসভার বৈঠকেও তিনি বিষয়টি তুলেছিলেন বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল।

তবে প্রকাশ্যে অস্ত্রের ঘাটতির কথা অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে বলে দাবি করেন। প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান পিট হেগসেথকে অস্ত্রের ঘাটতির জন্য দায়ী করে ট্রাম্প সমালোচনা করেছেন—এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে হোয়াইট হাউস তা অস্বীকার করে। পরে ট্রাম্প নিজেও হেগসেথের প্রশংসা করেন।

অন্যদিকে, প্রকাশ্য এসব অস্বীকৃতির মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর সম্প্রতি দেশটির অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর হাতে আসা একটি স্মারকে উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে অস্ত্র উৎপাদনের কর্মসূচি ‘নাটকীয়ভাবে দ্রুত’ করতে হবে এবং এখনই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

এত দিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের সম্ভাব্য ঘাটতি নিয়ে প্রকাশিত অধিকাংশ প্রতিবেদনে ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে রিপার ড্রোনের সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দিলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আবার পূর্ণমাত্রায় শুরু করা হবে, নাকি সংঘাতের অবসানের চেষ্টা করা হবে—ওয়াশিংটন যখন সেই সিদ্ধান্তের কথা ভাবছে, তখন ড্রোনের মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট

ইরান যুদ্ধে ৪৫টি রিপার ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: রয়টার্স

কুকুরকে খাইয়ে নিজে খেতেন নিরামিষ, অর্জুন রামপালের কঠিন দিনগুলো

মডেলিং দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন অর্জুন রামপাল। সেখান থেকে ধীরে ধীরে পথ বদলে বলিউডে পা রাখেন তিনি। কিন্তু রুপালি পর্দায় উঠে আসার সেই পথ মোটেও সহজ ছিল না। মডেলিং ছাড়ার পর অভিনয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করতে গিয়ে তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে কঠিন আর্থিক অনিশ্চয়তার সময়। জেনে নেওয়া যাক সে গল্প। ২৬ নভেম্বর অভিনেতার জন্মদিন।

পপ ডায়েরিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্জুন রামপাল জানান, যে ছবিটি দিয়ে তাঁর অভিনয়ে অভিষেক হওয়ার কথা ছিল, সেটির মুক্তি পেতে লেগে যায় প্রায় ছয় বছর। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর ছিল না কোনো নিশ্চিত আয়ের উৎস।

তখন অর্জুন রামপাল সফল এক মডেল, কিন্তু চিত্রগ্রাহক অশোক মেহতার পরিচালনায় প্রথম ছবি ‘মোক্ষ’র প্রস্তাব পেয়ে দ্বিধা না করেই রাজি হয়ে যান। মনীষা কৈরালার বিপরীতে শুটিং শুরু হলেও ক্যামেরায় নিজের উপস্থিতি দেখে সন্তুষ্ট হতে পারেননি তিনি। মডেলিংয়ের অভ্যাসের কারণে তাঁর অঙ্গভঙ্গি, দেহভাষা—কিছুই তাঁকে অভিনেতার মতো মনে করাচ্ছিল না। তাই হঠাৎই সিদ্ধান্ত নেন পুরোপুরি মডেলিং ছেড়ে দিয়ে অভিনয়কে সময় দেওয়ার। কিন্তু তখন তিনি ভাবতেও পারেননি, কী সংগ্রাম অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য।

ছবিটি মুক্তি পেতে সময় লাগে ছয় বছর। এই দীর্ঘ সময়ে অর্জুনের হাতে কোনো কাজ বা আয়ের উৎস ছিল না। সে সময় তিনি সেভেন বাংলোজ এলাকায় থাকতেন। বাড়িভাড়াও ঠিকমতো দিতে পারতেন না। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে বাড়িওয়ালা তাঁর পাশে দাঁড়ান। স্মৃতিচারণা করে অভিনেতা বলেন, ‘ওই সময়ে আমার আয়ের কোনো উৎস ছিল না। প্রতি মাসের এক তারিখে আমার বাড়িওয়ালা আসতেন, আর আমি তাঁর দিকে তাকাতাম। তিনি বলতেন, ‘‘টাকা নেই, তাই তো?’’ আমি মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” বলতাম। তিনি বলতেন, ‘‘কিছু মনে কোরো না, তুমি ঠিক পরিশোধ করে দেবে।”’ অর্জুন বলেন, জীবনের এই ধরনের সহায়তা খুব দরকার।
অর্জুন জানান, একসময় ভাড়া দিতে না পারায় তাঁকে বাড়ি বদলাতে হয়। সেই সময় তাঁকে নিজে নিরামিষ খেয়েও দুটি কুকুরকে আমিষ খাবার খাওয়াতে হতো। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি ‘দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তবে এ ঘটনাই তাঁকে জীবনে কৃতজ্ঞ হতে শিখিয়েছে বলে জানান অভিনেতা।

অর্জুন পরে সেই বাড়িওয়ালার সব টাকা শোধ করে দেন। বাড়ি পরিবর্তন করার পরও তিনি সেই উদার বাড়িওয়ালাকে তাঁর ছবির প্রিমিয়ারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

অর্জুন রামপাল
অর্জুন রামপাল। ছবি:ইনস্টাগ্রাম

ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতম বছর ২০২৬, সাত মাসে ৪৪ হত্যা

ভারতে বিভিন্ন সময়ই সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ঘটে আসছে। চলতি বছর এ সহিংসতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মানবাধিকার পরিস্থিতি তদারককারী সংগঠন সাউথ এশিয়ান জাস্টিস ক্যাম্পেইনের সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া টর্চার ট্র্যাকার’ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ভারতে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত অন্তত ৪৪ মুসলমান নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জনের হত্যার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সংস্থার সংযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ২৫ জন উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রাণ হারান।
বিজ্ঞাপন

শুধু হত্যা নয়, ভারতীয় মুসলমানরা ধর্মীয় উগ্রবাদের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারি, বাড়িঘর ও ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া, আবাসভূমি থেকে উচ্ছেদসহ বিভিন্ন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশটির মুসলমান নাগরিকদের বিরুদ্ধে ‘পূর্ণমাত্রায় বলপ্রয়োগকারী উপকরণ’ ব্যবহার করছে।

প্রতিবেদনের অন্য অংশে বলা হয়, মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে ভারতের আট রাজ্যে ২১টি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় মুসলমানদের এক হাজারের বেশি বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে চলতি বছর তিন হাজারের বেশি বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দুই মাসে ছয়টি রাজ্যে মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাহসহ ২৩টি ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

এতে আরো জানানো হয়, গত মাসে ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে এ সশস্ত্র হামলার ঘটনায় ৪৮ ঘণ্টায় স্থানীয় ২,৫০০-এর বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ অঞ্চলে দুই পরিবারের বাড়ি বিস্ফোরক ব্যবহার করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জুলাইয়ে ভারতজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় বেছে বেছে মুসলমানদেরই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে কলকাতায় বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জনই মুসলমান।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলতি বছর কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রাদেশিক নির্বাচনে জয় লাভের পর এ অঞ্চল মুসলিমবিদ্বেষী তৎপরতার নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রদেশে মসজিদ, মুসলমানদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং মুসলিম ফেরিওয়ালাদের লক্ষ্য করে হামলা বেড়েছে। এর মধ্যে মসজিদে হামলার এক ঘটনায় এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই রাজ্যের সংখ্যালঘু কল্যাণ তহবিলের ৬২ শতাংশ অর্থ কর্তন করেছে। একই সঙ্গে গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

এতে জানানো হয়, আইন ও বিচার কাঠামোতে মুসলমানদের অধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে না। ভারতের আসাম ও মধ্যপ্রদেশে মুসলমানদের নিজস্ব পারিবারিক আইনকে বাতিল করে ‘অভিন্ন পারিবারিক আইন’ চালু করা হয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রদেশে ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদকে প্রাদেশিক হাউকোর্ট হিন্দু মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের সহিংসতার বিভিন্ন পুরোনো মামলায় অভিযুক্তদের খালাস দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, চলতি বছর ভারতে ভোটার তালিকা থেকে ৬ কোটি লোককে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের বেশির ভাগ মুসলমান। এছাড়া বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশি ট্যাগ দিয়ে ভারত থেকে বহিষ্কারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, দুই বছরে এ প্রদেশ থেকে ১,৬২৯ ‘বাংলাদেশি’কে বহিষ্কার করা হয়েছে।

ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতম বছর ২০২৬, সাত মাসে ৪৪ হত্যা
ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতম বছর ২০২৬, সাত মাসে ৪৪ জনকে হত্যা। ছবি: সংগৃহীত

বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাসী বললেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের ঘেরাও ও অবরোধকে ‘সন্ত্রাস’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি। ইসরাইলের একজন কট্টর মিত্র এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনের প্রতি সমর্থনকারী হাকাবি বৃহস্পতিবার এই অস্বাভাবিক সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার থেকে নাবলুসের কাছে ফিলিস্তিনিদের বেশ কয়েকটি বাড়ি অবরুদ্ধ করে রেখেছে চরমপন্থি বসতি স্থাপনকারীরা।

অবরুদ্ধ ঘরগুলোর একটির মালিক একজন মার্কিন নাগরিক। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানিয়েছে, তাদের খাদ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং চারপাশ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।

মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের ‘স্থবিরতা’ নিয়ে ওঠা সমালোচনার জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে হাকাবি লেখেন, ‘একটি পরিবারকে ভয় দেখানো ও চরম হয়রানি করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অত্যন্ত ঘৃণ্য। এ ধরনের গুন্ডামির কোনো অজুহাত হতে পারে না।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এসব ‘ইসরাইলি সন্ত্রাসীদের’ সেখান থেকে সরিয়ে দিতে কাজ করছে দেশটির সরকার।

হাকাবির মতো একজন ব্যক্তির মুখে এমন বক্তব্য পাওয়া বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান যাজক হাকাবি অতীতে পশ্চিম তীরে বিতর্কিত ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে ছিলেন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে ইসরাইল।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও সহিংসতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে পশ্চিম তীরে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির পাশাপাশি ৫ লক্ষাধিক ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব বসতি সম্পূর্ণ অবৈধ।

বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাসী বললেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত
বামে ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি।

লেবাননে ইসরাইলের উপস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি পরিকল্পনাকে ক্ষুণ্ন করছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি চুক্তিতে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’ একই সঙ্গে এটি দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও উপযোগী নয়।

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে একটি কাঠামো চুক্তিতে স্বাক্ষর করে লেবানন ও ইসরাইল। চুক্তিতে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলি সেনাদের পুরোপুরি প্রত্যাহার এবং ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের কথা বলা হয়েছে।

এর আগে ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ জানিয়েছিলেন, দক্ষিণ লেবাননের তথাকথিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চলে’ ইসরাইলি সেনারা অবস্থান করবে। এই বক্তব্যের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আশা করে যে সব পক্ষই তাদের সম্মত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করবে এবং ইসরাইল এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে লেবাননে তাদের কোনো ভূখণ্ডগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই।’

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড

লেবাননে ইসরাইলের উপস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা
ছবি: সংগৃহীত।

মার্কিন রণতরীতে নাবিকদের আত্মহত্যাচেষ্টার হিড়িক

বিস্ফোরক রিপোর্টঃ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত থাকার কারণে রেকর্ড সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থান করছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। জাহাজটিতে থাকা প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিনের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন সামরিক পরিবারের সদস্য ও মার্কিন কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য।

দুটি প্রধান সামরিক সংবাদমাধ্যম নেভি টাইমস ও স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস জানিয়েছে, আব্রাহাম লিংকনে থাকা কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা, কঠিন জীবনযাপন এবং মানসিক চাপ পরিস্থিতিকে সংকটজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আব্রাহাম লিংকনের প্রায় ৫ হাজার সদস্যের ক্রু বর্তমানে সমুদ্রে অবস্থানের নবম মাসে রয়েছে। এর মধ্যে টানা ২৫০ দিন তারা কোনো বন্দরে নোঙর করেনি, যা আধুনিক সময়ে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর জন্য রেকর্ড দীর্ঘ সময় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার সান দিয়েগোতে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত এক আবেগঘন টাউন হল বৈঠকে জাহাজে থাকা স্বজনদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রায় ২০০ পরিবারের সদস্য।
স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক নারী জানান, সেদিন তার স্বামী তাকে মেসেজ করে লিখেছিলেন, “তিনি আশা করছেন, আগামীকাল যেন ঘুম থেকে না ওঠেন।”
ইতিমধ্যে পরিবারগুলোর উদ্বেগ সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরা হয়। বৈঠকে নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাওসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এক নারী হাং কাওকে বলেন, নৌবাহিনী ও নেতৃত্বের মধ্যে “আস্থার সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছে”।
চলমান মোতায়েনের সময় লিংকনে আত্মহত্যার চেষ্টা ঠেকানোর কয়েকটি ঘটনার বিস্তারিতও প্রকাশ করেছে নেভি টাইমস।
আনাবেল লোমা নামের এক নারী সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, সমুদ্রে অবস্থানের মেয়াদ বারবার বাড়তে থাকায় তার স্বামী একপর্যায়ে জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

তিনি বলেন, সে ভয় পেয়েছে। সে মনে করছে, তাকে অসম্মানজনকভাবে বরখাস্ত করা হবে। শুধু অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ার কারণে তার ১৩ বছরের ক্যারিয়ার এভাবে শেষ হয়ে যাবে।
আরেক নাবিকের স্ত্রী জানান, তার স্বামী লিংকনে ঘটে যাওয়া পৃথক একটি ঘটনায় এক সহকর্মীকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া থেকে আটকান। তিনি ওই ব্যক্তিকে ধরে জাহাজের ডেকে ফিরিয়ে আনেন।

এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিনও লিংকনে থাকা নাবিকদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক্স-এ জাহাজটির অবস্থাকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সেখানে রয়েছে ছত্রাকধরা গোসলখানা, নষ্ট টয়লেট, কয়েক সপ্তাহ ধরে অচল লন্ড্রি ব্যবস্থা এবং দীর্ঘ সময় গরম পানির সংকট। খাবারের অবস্থাও ভয়াবহ বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, একপর্যায়ে একটি খাবারে ছিল মাত্র আধা কাপ ভাত ও দুটি টর্টিলা। এমনকি সাবান, ডিওডোরেন্ট ও টুথপেস্টেরও ঘাটতি ছিল।
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রোও পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছেন। সাবেক আর্মি রেঞ্জার হিসেবে আফগানিস্তান ও ইরাকে দায়িত্ব পালন করা ক্রো বলেন, লিংকনে থাকা সেনাসদস্য এবং তাদের পরিবারের ওপর চাপ “সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে বাড়ছে”।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। লিংকন গত ২১ নভেম্বর সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে। প্রথমে জাহাজটির গন্তব্য ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়।

এমএস নাউ-এর তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে ৫ হাজারের বেশি সদস্যের ক্রু মাত্র দুই দিন স্থলভাগে কাটানোর সুযোগ পেয়েছে। ডিসেম্বরে গুয়ামে এবং জুলাইয়ে ওমানে। তাদের মোতায়েনের মেয়াদ প্রথমে মে মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চলমান যুদ্ধের কারণে তা একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে।
এপ্রিল মাসেও বিমানবাহী রণতরীটির জীবনযাত্রার নিম্নমান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সে সময় নিম্নমানের ও সীমিত খাবারের ছবি প্রকাশ্যে আসে। পাশাপাশি পানির সংকট, ছত্রাকধরা গোসলখানা এবং নষ্ট লন্ড্রি মেশিনের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব অভিযোগকে “আরও কিছু ভুয়া খবর” বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ সপ্তাহে হেগসেথের ওই মন্তব্যের জবাব দেন মাইক লেভিন।
তিনি বলেন, এই নারী-পুরুষরা দেশের সেবা করার জন্য নিজেদের নিয়োজিত করেছেন। তাদের দেশের কাছ থেকে অন্তত গরম পানি, সচল টয়লেট এবং যথাযথ খাবার পাওনা। হেগসেথ সেটুকুও নিশ্চিত করতে পারছেন না, অথচ তাদের পরিবারের সদস্যদের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের মিথ্যাবাদী বলার সাহস করছেন।
লিংকনে নাবিকদের সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টার খবর নিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে জানতে চাওয়া হলে পরে একজন নৌ কর্মকর্তা প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন যে সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারের ওপর “গুরুতর চাপ সৃষ্টি করে”, নৌবাহিনী তা জানে এবং তাদের সহনশীলতা ও ত্যাগের জন্য কৃতজ্ঞ।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, লিংকনের প্রত্যেক নাবিকের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নৌবাহিনীর অগ্রাধিকার। কমান্ডের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটিতে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টার রিপোর্টে কোনো বৃদ্ধি শনাক্ত করা হয়নি।
মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধর্মীয়, চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি “সমন্বিত সহায়তা নেটওয়ার্ক” রয়েছে। এর মধ্যে জাহাজে থাকা মোতায়েনকালীন মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বিষয়ক পরামর্শদাতা ও চ্যাপলিনরাও রয়েছেন।

নৌ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, যুদ্ধের কারণে প্রচলিত সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। তবে তার দাবি, জাহাজ থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নিরবচ্ছিন্ন বিশুদ্ধ পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের সুযোগ থাকার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।
সক্রিয় দায়িত্বে থাকা মার্কিন নৌসেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ অবশ্য নতুন নয়। গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের সময় নাবিকদের ওপর থাকা বিশেষ ধরনের চাপ বিশ্লেষণ করা হয়। এতে সবচেয়ে সাধারণ চাপের কারণ হিসেবে প্রচণ্ড শব্দ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং অপর্যাপ্ত মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যসেবা উঠে আসে।
গবেষকরা মোতায়েন থাকা নাবিকদের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখেন, প্রায় অর্ধেক নাবিক সমুদ্রে মানসিক চাপ মোকাবিলায় তারা পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন।
গবেষণার উপসংহারে বলা হয়, মার্কিন সামরিক বাহিনীতে- বিশেষ করে নৌবাহিনীর মধ্যেও আত্মহত্যার হার বেশি হওয়ায় জাহাজে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ উন্নত করার উদ্যোগ “জরুরি ভিত্তিতে” নেওয়া প্রয়োজন।

মার্কিন রণতরীতে নাবিকদের আত্মহত্যাচেষ্টার হিড়িক

ট্রাম্পের গোপন বিমান বদলের নেপথ্যে

কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ানকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে- এমন হুমকির কারণে গত মাসে তুরস্ক সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে গোপনে ছোট একটি সরকারি বিমানে তুলে দেয়া হয়। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত এক ব্যক্তি বুধবার এই তথ্য জানিয়েছেন। সূত্রটি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্পের আঙ্কারা সফরের শেষ দিনে ওই হুমকির উদ্ভব হয়। তখন ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে। সিক্রেট সার্ভিস হুমকিটিকে বিশ্বাসযোগ্য ও আসন্ন বলে মনে করে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের গতিবিধি গোপন রাখতে নজিরবিহীন এক অভিযান চালানো হয়।

গোয়েন্দা তথ্যটি কোথা থেকে এসেছিল, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ওই সূত্র। তবে তিনি বলেছেন, কর্মকর্তাদের প্রস্তুতির জন্য হাতে খুব বেশি সময় ছিল না এবং শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনাটি করা হয়। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত দ্বিতীয় একটি সূত্র জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বিরোধীদের পক্ষ থেকে কীভাবে ওই হুমকি বাস্তবায়ন করা হবে, তার কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। বরং শুধু হামলার অভিপ্রায় ছিল। এ কারণেই বিমানগুলোকে উড্ডয়ন করতে দেয়া হয়েছিল। প্রথম সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ই জুলাই তুরস্ক থেকে উড্ডয়নের আগে ট্রাম্প ও তার অল্প কয়েকজন সহযোগী একটি ক্যাটারিং ট্রাকের আড়ালে গোপনে বড় নীল-সাদা প্রেসিডেন্টের বিমান থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট ও সাধারণ দেখতে সি-৩২এ বিমানে চলে যান। একই সময়ে এয়ার ফোর্স ওয়ান আলাদাভাবে উড্ডয়ন করে। ওই বিমানে ছিলেন প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা, হোয়াইট হাউসের কর্মীরা এবং সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের দল।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানিয়েছেন, সিক্রেট সার্ভিসের নির্দেশেই তিনি বিমান বদল করেন। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এই সংস্থার নির্দেশে তিনি আঙ্কারা থেকে বৃটেনে জ্বালানি নেয়ার জন্য একটি বিরতিস্থলের উদ্দেশ্যে উড়াল দেন। পুরো যাত্রাই কোনো ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, আমার মনে হয়, আমি যে বিমানে উড়েছিলাম, সেটিই আসলে বেশি ঝুঁকির মধ্যে ছিল। কারণ আমার ধারণা, তারাই সম্ভবত ওই বিমানটিকেই লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করতো। তবে এ বক্তব্যের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।

মিচেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যারোস্পেস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ডগলাস বার্কি বলেছেন, হুমকিটি হয়তো নতুন ধরনের তাপ-সন্ধানী ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ছিল। এসব ক্ষেপণাস্ত্র উড়োজাহাজের উত্তপ্ত ইঞ্জিনকে অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং সামরিক পরিকল্পনাবিদদের কাছে এগুলো নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। প্রচলিত রাডার-নির্দেশিত হুমকির তুলনায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা কঠিন। কারণ এগুলো কোনো শনাক্তযোগ্য রেডিও তরঙ্গ পাঠায় না। ফলে হঠাৎ করেই যেকোনো দিক থেকে চলে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বার্কি। তিনি জানান, ইরানের এসএ-৬৭ ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সংস্করণে সাধারণ রেল-লঞ্চার ব্যবহার করা হয় এবং এটি তাপ-সন্ধানী ও লেজার-নির্দেশনা- দুই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বলে ধারণা করা হয়। আর কাঁধে বহনযোগ্য তাপ-সন্ধানী অস্ত্র ৯কে৩৩৩ ভারবা রাশিয়ায় তৈরি। নিরাপত্তার স্বার্থে যুদ্ধক্ষেত্র বা উচ্চঝুঁকির এলাকায় সফরের সময় ট্রাম্পসহ মার্কিন প্রেসিডেন্টরা মাঝে মাঝে গোপনে ভ্রমণ করেন। তবে সাধারণত এসব সফরের বিষয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকা সাংবাদিকদের আগেই জানানো হতো।

২০০৩ সালের থ্যাংকসগিভিংয়ের সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের বাগদাদ সফরের আগেও কয়েকজন সাংবাদিককে আগাম জানানো হয়েছিল। তবে বুশের থ্যাংকসগিভিং ছুটি কাভার করতে টেক্সাসের ক্রফোর্ডে থাকা অন্য সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। তাদের বলা হয়েছিল, বুশ পরিবারের সঙ্গে ছুটির দিনটি কাটাবেন। কিন্তু হঠাৎ বুশ ইরাকে উপস্থিত হলে তারা বিস্মিত হয়ে যান। বুধবার প্রথম সূত্রটি জানিয়েছে, তুরস্কে সিক্রেট সার্ভিসের হাতে সেই ধরনের সময় ছিল না। সূত্রটি বলেছেন, তারা এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য ও আসন্ন হুমকি ঠেকাতে মরিয়া হয়ে কাজ করছিল, যা তারা মনে করেছিল খুব শিগগিরই ঘটতে পারে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট চলতি সপ্তাহে প্রথমবারের মতো এই অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে- ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পর। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, আঙ্কারায় ট্রাম্প কোথায় অবস্থান করছেন, এমনকি তার হোটেলের ঠিক কোন তলায় তিনি ছিলেন- ইরানিরা তাও জানতে পেরেছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

যে এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানটিকে এখন প্রেসিডেন্টের জন্য একটি ‘ডিকয়’ বা বিভ্রান্তিমূলক বিমান হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেটিতে ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। প্রথম সূত্র জানিয়েছে, পুরো কৌশল সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়েছিল। ওই বিমানে আরও ছিলেন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং এবং আরও কয়েকজন সহযোগী। পাশাপাশি ছিলেন নিয়মিত ১৩ সদস্যের প্রেস পুল, যার মধ্যে রয়টার্সের একজন সংবাদদাতা ও একজন আলোকচিত্রীও ছিলেন।

প্রথম সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের উপ-প্রধান কর্মকর্তা ড্যান স্ক্যাভিনো, নির্বাহী সহকারী ন্যাটালি হার্প এবং ওভাল অফিসের কার্যক্রম পরিচালক ওয়াল্ট নাউটাও ট্রাম্পের সঙ্গে ক্যাটারিং ট্রাকে করে বিমান বদল করেছিলেন। কয়েকজন গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও আইনপ্রণেতা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রেসিডেন্টকে বহন করছে বলে ধারণা করা বিমানটিতে ট্রাম্পের সহযোগী ও সাংবাদিকদের রেখে যাওয়ার ফলে তাদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছিল কিনা। প্রথম সূত্রটি জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে শত্রুতা যখন আরও বাড়ছিল, তখন ট্রাম্পের নিরাপত্তার স্বার্থেই এই কৌশল গোপন রাখা সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হয়েছিল। তুরস্ক ইরানের সঙ্গে সীমান্তবর্তী হওয়ায় পরিস্থিতির ঝুঁকিও ছিল বেশি।

ট্রাম্পের গোপন বিমান বদলের নেপথ্যে

ফিলিস্তিনিদের একের পর এক বাড়ি দখলে নিচ্ছে ইহুদি সেটেলাররা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়ি অবৈধভাবে দখলে নিচ্ছে ইহুদি বসতি স্থাপনাকারীরা। সর্বশেষ, ইহুদি সেটেলাররা পশ্চিম তীরে তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ি-ঘর দখলে নিয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অভিযানের অংশ হিসেবে ইহুদি সেটেলাররা ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের পানি ও বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।

বুধবার দক্ষিণ নাবলুসের কুসরা গ্রামে এক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ইসরাইলি সেটেলাররা একটি বাড়ি ঘিরে রেখেছে। ওই বাড়িতে আটকা বাসিন্দারা বলেন, ইসরাইলি বাহিনী এসব সেটেলারদের ছত্রভঙ্গ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইসরাইলি সেটেলারদের কাছে বাড়ি হারানোর শঙ্কায় থাকা আইশা আবু রিদা আল জাজিরাকে বলেন, রোববার এই দখলদারিত্ব শুরু হয়। প্রথমে দখলদাররা তার বাড়ির প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেয়।

তিনি আরও বলেন, সেটেলাররা আমাদের ঘিরে রাখে কিন্তু আমরা অটল আছি। যাই ঘটুক না কেন আমরা আমাদের বাড়ি ছাড়ব না। তিনি অভিযোগ করেছেন, ইহুদিরা তাদের বাড়িত পানি ও বিদ্যুতের লাইন কেটে দিয়েছে।
এদিকে আনাদোলু এজেন্সি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, কুসরার মেয়রকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে রোববার সকাল পর্যন্ত সামরিক অভিযান চলবে।

লোয়াই রিদি নামে একজন আমেরিকান-ফিলিস্তিনি জানান, ওই গ্রামে তার ভাই কুসাই আবু রিদা এবং ১৮ বছর বয়সী ভাগ্নে আহমেদ ইসরাইলি সেটেলারদের কাছে আটকা পড়ে আছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের টলেডো থেকে লোয়াই আল জাজিরাকে বলেন, তার পরিবার এখন অস্থায়ীভাবে সোলার পাওয়ার ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে আছে এবং গ্রামে তার পরিবারের কাছে অল্প পানি অবশিষ্ট রয়েছে।
লোয়াই আল জাজিরাকে আরও বলেন, কুসাই তার বাড়ি কোনোভাবেই ছাড়তে চায়না। কারণ সে যদি একবার বাড়ি ছাড়ে তাহলে ইহুদি সেটেলাররা শিগগিরই সেটি দখলে নেবে।

ইসরাইলি সেনারা এসব সেটেলারদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না বলে অভিযোগ লোয়াইয়ের।
ইসরাইলি সেটেলমেন্ট ওয়াচডগ পিস নাও জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে বর্তমানে ১৪৬টি অবৈধ বসতি রয়েছে। এ ছাড়া সেখানে আরও ছোট আকারে ৩৯০টি চৌকি রয়েছে। 

ফিলিস্তিনিদের একের পর এক বাড়ি দখলে নিচ্ছে ইহুদি সেটেলাররা

লেভিটের বিকল্প খুঁজে পাওয়া ট্রাম্পের জন্য কেন কঠিন?

সিএনএনের বিশ্লেষণঃ ডনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে কথা বলার জন্য তার খুব বেশি কাউকে প্রয়োজন হয় না। আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে সরব প্রেসিডেন্টদের একজন হিসেবে ট্রাম্প প্রতিদিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, সাক্ষাৎকার এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের মাধ্যমে নিজের বার্তা পৌঁছে দেন। তবু প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটের বিদায় ট্রাম্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বুধবার লেভিটের পদ ছাড়ার ঘোষণা আসে। তার বিদায়ের পরই স্পষ্ট হবে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা দলের কতটা গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি।
তবে লেভিট কেবল একজন মুখপাত্র ছিলেন না। তিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক মানসিকতা ও তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (এমএজিএ) দর্শন খুব ভালোভাবে বুঝতেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটনের বিভিন্ন জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে আক্রমণ চলছে, তাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এর মধ্যে গণমাধ্যমও ছিল অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সাংবাদিকদের নিয়মিত আক্রমণ ও বিদ্রূপের মাধ্যমে লেভিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে প্রচলিত সাংবাদিকতার ভেতরের বিভাজনও সামনে এনেছেন।

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেভিট জানান, গত ১ মে তার দ্বিতীয় সন্তান জন্ম নেওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেছেন, চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় “নিরবচ্ছিন্ন সময়, শক্তি ও মনোযোগ” দেওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের প্রাপ্য মা হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
ট্রাম্পও অবশ্য লেভিটের বিদায়ের ধাক্কা কিছুটা সামলানোর চেষ্টা করেছেন। ২৮ বছর বয়সী লেভিটকে তিনি তার “সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন” হিসেবে প্রশংসা করেছেন এবং জানিয়েছেন, পদ ছাড়ার পরও তিনি বাইরের পরামর্শক হিসেবে ট্রাম্পকে সহযোগিতা করবেন।

ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি হওয়া কতটা কঠিন?
ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি হওয়া সহজ কোনো দায়িত্ব নয়। তার প্রশাসনে ‘বার্তার ধারাবাহিকতা’ বজায় রাখাই যেন এক ধরনের স্ববিরোধিতা। প্রেসিডেন্ট নিজেই পরের মুহূর্তে কী বলবেন, তা অনেক সময় কেউ জানেন না।
তিনি মুহূর্তের মধ্যে নীতি পরিবর্তন করতে পারেন, নিজের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মন্তব্য করতে পারেন, এমনকি নিজের আগের বক্তব্যও অস্বীকার করতে পারেন।
গণমাধ্যমকে কীভাবে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়, ট্রাম্প সেটিও ভালোভাবেই জানেন। কয়েক দশক ধরে তিনি সাংবাদিকদের কখনো আক্রমণ করেছেন, কখনো প্রশংসা করেছেন, আবার কখনো নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
১৯৮০-এর দশকের নিউইয়র্কের ট্যাবলয়েড সংবাদমাধ্যমে বিতর্কিত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও তারকা হিসেবে নিজের যে পরিচিতি তৈরি করেছিলেন, সেটিও তিনি রাজনৈতিক জীবনে কাজে লাগিয়েছেন। গণমাধ্যমের সবসময় নতুন শিরোনামের প্রয়োজন- এই বিষয়টি তিনি বুঝেছিলেন এবং সেটিকে মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণের সময় ট্রাম্পের সংঘাতপ্রিয়তা, প্রচলিত রাজনৈতিক শিষ্টাচারের প্রতি অবজ্ঞা এবং বিতর্কিত মন্তব্য করার প্রবণতা এক ধরনের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে তিনি প্রচলিত গণমাধ্যমকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি নিজের ব্যক্তিত্ব ও বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
তাই প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্পের আদৌ আর কোনো প্রেস সেক্রেটারির প্রয়োজন আছে কি না।

লেভিটকে সহজে প্রতিস্থাপন করা কঠিন
লেভিটের দক্ষতার সমন্বয় খুঁজে পাওয়া ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না। ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পের ‘এমএজিএ’ ভাষা তার চেয়ে সাবলীলভাবে আর কেউ বলতে পারেন না- এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
তার নিয়মিত ব্রিফিংগুলো নীতির ব্যাখ্যা দেওয়া কিংবা বিদেশি নেতাদের উদ্দেশে কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেয়ে ট্রাম্পের মতোই দৃঢ়তা ও সংঘাতের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছিল।
ট্রাম্পের সমর্থকেরা লেভিটকে অত্যন্ত পছন্দ করেন। বিখ্যাত সাংবাদিকদের আক্রমণ করার তার ধরন ট্রাম্পের প্রথম নির্বাচনী প্রচারের সময়কার বিদ্রোহী সুরের কথা মনে করিয়ে দেয়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়ার বদলে তিনি প্রায়ই প্রশ্নকারীর উদ্দেশ্য বা মানসিকতা নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতেন। ফলে সাংবাদিকেরাও অনেক সময় ট্রাম্পের রাজনৈতিক নাটকের পার্শ্বচরিত্রে পরিণত হতেন।
গত মাসে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নৈশভোজে ট্রাম্পের পাশে বসেছিলেন লেভিট। এপ্রিলে এক বন্দুকধারী ওই অনুষ্ঠানে ঢোকার চেষ্টা করার পর অনুষ্ঠানটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেদিন ট্রাম্প সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত ও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। লেভিটের দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ওই ঘটনাটি এখন তার মেয়াদের এক ধরনের প্রতীকী সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের গোপন ফ্লাইট এবং সেই যাত্রায় এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিকদের ‘ডিকয়’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না- এ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই লেভিট তার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
লেভিটের মেয়াদকে মনে রাখা হবে প্রেসিডেন্টকে জবাবদিহির আওতায় রাখার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ধারণাকে দুর্বল করার সময় হিসেবে। তার দপ্তর দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীন সংবাদদাতা সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত প্রেস পুল ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠানে কারা প্রবেশ করবেন এবং কারা এয়ার ফোর্স ওয়ানে ভ্রমণ করবেন, সে বিষয়েও তার দপ্তর সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করে।

একই সঙ্গে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, স্থানীয় রক্ষণশীল রেডিও উপস্থাপক, পডকাস্টার ও এমএজিএ-সমর্থক ব্যক্তিত্বদের স্থায়ী প্রেস কোরের অংশ করা হয়।
সমালোচকদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে ট্রাম্পের প্রতি নরম মনোভাবাপন্ন প্রচারকদের জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের সমর্থকেরা এটিকে তথাকথিত ‘উদারপন্থী এলিট’ গণমাধ্যমের একচেটিয়া প্রভাব কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানান।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি ছিল অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) হোয়াইট হাউসের কয়েকটি প্রেস ইভেন্টে নিষিদ্ধ করা। ট্রাম্পের নির্দেশে লেভিটের দপ্তর এ সিদ্ধান্ত নেয় এবং এপি’র একজন প্রতিবেদককে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকেও বাদ দেওয়া হয়।
এর আগে ট্রাম্প মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘গালফ অব আমেরিকা’ করার নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। এপি তাদের স্টাইল গাইড পরিবর্তন করে সেই নতুন নাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

লেভিটের ব্রিফিংগুলোও দ্রুত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মিডিয়া টিমের প্রচারিত তথাকথিত ‘অলটারনেটিভ ফ্যাক্টস’-ও তুলনামূলকভাবে নিরীহ মনে হতে পারে। তিনি অনেক সময় ব্রিফিং শুরু করতেন ট্রাম্পের সাফল্যের অতিরঞ্জিত প্রশংসা দিয়ে। তার বক্তব্য অনেকটা রক্ষণশীল টেলিভিশনের প্রাইম-টাইম অনুষ্ঠানের মতো হয়ে উঠেছিল।

ট্রাম্পের সঙ্গে গণমাধ্যমের সংঘাত নতুন নয়
প্রতিটি মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গেই গণমাধ্যমের কোনো না কোনো পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্কও অনেক সময় টানাপোড়েনপূর্ণ ছিল। বারাক ওবামার সহযোগীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরোধও ছিল। জো বাইডেনের প্রেস দপ্তরও সাংবাদিকদের সঙ্গে বিশেষভাবে কঠোর আচরণের জন্য সমালোচিত হয়েছে।

তবে সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের আমলে সংবাদমাধ্যমের সাংবিধানিক ভূমিকা এর আগে কখনো এত বড় হুমকির মুখে পড়েনি। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জেমস ওয়াকশ বলেন, লেভিট পারিবারিক কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন- এ বিষয়ে তার আন্তরিকতা নিয়ে তিনি সন্দেহ করেন না। তবে তিনি বলেন, ট্রাম্পের মুখপাত্র হওয়া কঠিন একটি কাজ, যেখানে প্রতিদিন বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে হয়।
তার মতে, লেভিটের উত্তরাধিকার হবে হোয়াইট হাউস ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ককে আরও দুর্বল করে দেওয়া।

লেভিট চলে গেলে কী হবে?
ক্যামেরার সামনে লেভিটের ব্রিফিংগুলো যতটা সংঘাতপূর্ণ ছিল, ক্যামেরার বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনেক সময় ততটাই সহযোগিতামূলক ছিল। তিনি সাধারণত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য সময় দিতেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি প্রেসিডেন্টের পাশে থাকার সুযোগ পেতেন। সাংবাদিকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এতে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো এবং একজন শীর্ষ মুখপাত্রের বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়ত।

লেভিটের বিদায়ের পর তাই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, একজন অনিয়মিত ও প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাংবাদিকদের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাম্প যদি তার অভ্যন্তরীণ বলয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কাউকে নতুন প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ না দেন, তাহলে লেভিটের মতো প্রশাসনের প্রতি এমন স্বাভাবিক ও কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠ খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে।
সাধারণত হোয়াইট হাউসগুলো এক বা একাধিক ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারিকে ভবিষ্যতের শীর্ষ মুখপাত্র হিসেবে তৈরি করে। কিন্তু লেভিটের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো উত্তরসূরি পরিকল্পনা নেই। ফলে জল্পনা তৈরি হয়েছে- ট্রাম্প হয়তো প্রেস সেক্রেটারির পুরো দায়িত্ব নিজেই নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
ট্রাম্পের সমর্থকদের কাছে লেভিট সম্ভবত দীর্ঘদিন একজন নায়িকা হিসেবেই থাকবেন। তার প্রভাব দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের পরও টিকে থাকতে পারে। কারণ হোয়াইট হাউসের পরবর্তী প্রশাসনগুলো প্রায়ই আগের প্রশাসনের কৌশল অনুসরণ করে।

আর ভবিষ্যতের কোনো প্রেসিডেন্ট- তিনি ডেমোক্র্যাটই হোন কিংবা রিপাবলিকান- সংবাদমাধ্যমের হাতে আগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে অনিচ্ছুক হতে পারেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বারবার মনে হচ্ছে, তিনি এমনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন যেন ভবিষ্যতে কিছুই আর আগের মতো না থাকে।
এই অভিযাত্রায় তার পাশে ছিলেন একজন বিশ্বস্ত ও কার্যকর সহযোগী- ক্যারোলিন লেভিট।

লেভিটের বিকল্প খুঁজে পাওয়া ট্রাম্পের জন্য কেন কঠিন?

শীতে শরীর ব্যথার আগাম প্রস্তুতি কেমন হবে?

পরামর্শ দিয়েছেন—কোমর ব্যথা, হাড় ক্ষয় ও বাতরোগ (রিউমাটোলজি) বিশেষজ্ঞ ও ল্যাবএইড আইকনিকের (কলাবাগান) কনসালট্যান্ট ডা. মো. আহিদ ইকবাল

প্রশ্ন: শীতকালে আমার মায়ের সারা শরীরে তীব্র ব্যথা হয়। গরমের সময় অন্য সমস্যা থাকলেও ব্যথার সমস্যায় খুব একটা ভোগেন না। মায়ের বয়স এখন ৬৫ বছরের মতো। বেশি ঠান্ডা পড়লে বিছানা থেকেও নামতে পারেন না। আগাম প্রস্তুতি হিসেবে কী করতে পারি?

রিফাত, কানাইপুর

পরামর্শ: এই বয়সে বিভিন্ন কারণে শরীরে ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে আর্থ্রাইটিস বা বাত রোগ, ভিটামিন ডি ঘাটতিজনিত সমস্যা। হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার কারণেও হাড় ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা হয়। তবে কিছু সচেতনতা অবলম্বন করলে শীতকালে এই ব্যথার সমস্যাকে অনেকটাই সহনীয় করে তোলা সম্ভব।

প্রথমেই ব্যথার সঠিক কারণ নির্ণয় করা জরুরি। তাই যত দ্রুত সম্ভব আপনার মাকে নিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ডি এবং হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করিয়ে নিন। ভিটামিন ডির অভাব থাকলে কিংবা হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলে চিকিৎসকের নির্দেশনায় ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করুন। বাতজনিত ব্যথা, অস্টিওআর্থ্রাইটিস কিংবা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় থেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।

খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর এবং ভিটামিন ডিসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। আপনার মাকে গরম পোশাক ও গরম পরিবেশে রাখার চেষ্টা করুন। ঘর গরম রাখতে দরজা-জানালা বন্ধ রাখুন। খুব শক্ত বা খুব নরম বিছানা পরিহার করুন। ব্যথার জায়গায় কুসুম গরম পানি বা হিটিং প্যাড দিয়ে সেঁক দিতে পারেন। বাতজাতীয় ব্যথা রাতে ও সকালে বেশি অনুভূত হয়। হাঁটাচলায় কিছুটা কমে। দীর্ঘ সময় শুয়ে-বসে থাকলে তা আরও বেড়ে যায়। শীতকালে রাত দীর্ঘ হওয়ায় বাত রোগীরা ব্যথা ও জড়তা বেশি অনুভব করেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম কিংবা কিছু সময় হাঁটাহাঁটির অভ্যাস গড়ে তুললে, ১৫-২০ মিনিট রোদে থাকলে উপকার পাবেন।

আশা করি, এই বিষয়গুলো মেনে চললে এই শীতে আপনার মায়ের ব্যথার সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে।

ব্যথা উপশমে সেঁক দেওয়ার প্রচলন অনেক পুরানো
ব্যথা উপশমে সেঁক দেওয়ার প্রচলন অনেক পুরানো। ছবি: পেক্সেলস