Wednesday, May 21, 2025

‘শখের বশে’ গাজায় শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে : ইসরায়েলের বিরোধী নেতা

ইসরায়েলি সেনারা অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ‘শখের বশে’ ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা করছে এবং ইসরায়েল দেশটি দ্রুত একটি ‘অযোগ্য ও একঘরে’ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা ইয়ার গোলান।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২০ মে) এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের বিরোধী দলের এই শীর্ষ নেতা।

সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইসরায়েলের পাবলিক ব্রডকাস্টার কেএএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বামপন্থি বিরোধীদল ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলান বলেন, যদি আমরা সুস্থ রাষ্ট্র হিসেবে আচরণে ফিরতে না পারি, তবে ইসরায়েল দক্ষিণ আফ্রিকার মতো একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

তিনি বলেন, একটি সুস্থ রাষ্ট্র কখনো সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না, শখের বশে শিশুদের হত্যা করে না এবং জনগণকে জোরপূর্বক বিতাড়নের লক্ষ্য গ্রহণ করে না।

ইসরায়েলি সরকারের কঠোর সমালোচনা করে গোলান বলেন, এই সরকার প্রতিহিংসাপরায়ণ ও নীতিহীন লোকদের দ্বারা পূর্ণ, যাদের সংকট মোকাবিলার কোনো যোগ্যতা নেই। তাদের নেতৃত্বে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।

বিরোধী নেতা গোলানের বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পর ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন মহলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গোলানের মন্তব্যকে ‘রক্তপাতের অপবাদ’ ও ‘বন্য উসকানি’ বলে আখ্যায়িত করেন।

এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, আমি ইসরায়েলের সাহসী সেনা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইয়াইর গোলানের এই উগ্র উসকানির তীব্র নিন্দা জানাই। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক বাহিনী।

চরম ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেনগাভির গোলানকে ‘ইহুদিবিরোধী রক্ত-অপবাদ ছড়ানো’ ব্যক্তিত্ব হিসেবে অভিহিত করে দাবি করেন, তিনি ‘ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের ন্যায়’ কথা বলছেন।

এছাড়া যোগাযোগমন্ত্রী শ্লোমো কারহি গোলানকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করেন এবং অভিযোগ করেন, তিনি ইসরায়েলের সেনাদের নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন।

প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সরকারের প্রাক্তন মিত্র এবং বর্তমান বিরোধী জোটের অন্যতম নেতা বেনি গ্যান্টজ গোলানের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। তিনি গোলানকে বক্তব্য প্রত্যাহার ও দুঃখ প্রকাশের আহ্বান জানান।

গোলানের এই মন্তব্য এমন এক সময় এসেছে, যখন চরমপন্থি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা এবং গাজায় যুদ্ধ বন্ধের বিপক্ষে থাকা কিছু ইসরায়েলি জনগণ আরও উগ্র ভাষায় কথা বলছে।

ইসরায়েলের প্রভাবশালী পত্রিকা হারেটজ এক প্রতিবেদনে জানায়, দখলকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ একটি বসতিতে বসবাসকারী রিভকা লাফেয়ার নামের এক চরমপন্থি নারী প্রকাশ্যে গাজা উপত্যকার লাখ লাখ মানুষকে ধ্বংস ও উৎখাত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এক বক্তব্যে তিনি বলেন, আমরা প্রতিশোধ নিতে এবং গাজাকে ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর- শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ নারী পর্যন্ত কাউকেই ছাড়া হবে না।

তিনি আরও বলেন, গাজা ধ্বংসের জন্য তিনি বাইবেলের ‘আমালেক’ জাতির ধ্বংসের কাহিনি উল্লেখ করেছেন- যেটি ছিল একটি পুরনো ধর্মীয় কাহিনি যেখানে একটি জাতিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার কথা বলা হয়েছিল।

এই ধরনের বক্তব্য ইসরায়েলের ভেতরে যুদ্ধকে আরও সহিংস ও নিষ্ঠুর করে তুলছে। একইসঙ্গে এসব চরমপন্থী মতাদর্শ গাজায় সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।

প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের বর্বর হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৩,৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরতির আহ্বান উপেক্ষা করে ইসরায়েল তাদের অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

এছাড়া, গাজায় গণহত্যার অভিযোগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলাও চলছে।

প্রতীকী ছবি।
প্রতীকী ছবি।


ইসরায়েলের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের, কী বলেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা

গাজা উপত্যকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষ্যে সেখানে অভিযান জোরদার করেছে ইসরায়েল। দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ওই অভিযানের জেরে যুক্তরাষ্ট্রসহ ঘনিষ্ঠ মিত্ররা ইসরায়েলের ওপর থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় যুদ্ধ শেষ করতে ব্যর্থ হলে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই সতর্কবার্তা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে দেওয়া হয়েছে।

আলোচনার বিষয়ে জানেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট বলেছে, ট্রাম্পের প্রতিনিধিরা ইসরায়েলকে জানিয়েছেন, যদি তারা গাজা যুদ্ধ শেষ না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে পরিত্যাগ করবে।

ওই সূত্র বলেছে, ট্রাম্পের লোকজন ইসরায়েলকে জানিয়ে দিয়েছে, ‘যদি আপনারা এই যুদ্ধ শেষ না করেন, তাহলে আমরা আপনাদের পাশে থাকব না।’

হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিটও বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও গাজা যুদ্ধের অবসান চান।’

গত সপ্তাহে ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত মার্কিন সেনা এডান আলেকজান্ডারকে মুক্তি দেওয়ার পর এ কথা বলেছিলেন প্রেস সচিব লেভিট।

পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই হঠাৎ করে এডান আলেকজান্ডারকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-হামাস সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এডানের মুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। ওই আলোচনায় ইসরায়েলকে রাখা হয়নি।

গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়েছিলেন। এবারের সফরে তিনি সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরব দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় ট্রাম্প বলেছেন, গাজায় বহু মানুষ অনাহারে রয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘লোকজন অনাহারে ধুঁকছে। সেখানে ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটছে।’

অন্য মিত্রদের থেকেও চাপ বাড়ছে

গাজায় নতুন করে শুরু করা সামরিক অভিযান বন্ধ না করলে এবং ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ত্রাণ প্রবেশে বাধা সরিয়ে না নিলে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ফ্রান্স। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর প্রকাশ করেছে।

    ‘প্রেসিডেন্টও গাজা যুদ্ধের অবসান চান।’
....ক্যারোলিন লেভিত, হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব

গতকাল সোমবার ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল সরকার (গাজার) বেসামরিক জনগণের জন্য অত্যাবশ্যক মানবিক সহায়তা দিতে অস্বীকার করছে, এটি অগ্রহণযোগ্য এবং এতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি রয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা পশ্চিম তীরে (ইহুদি) বসতি সম্প্রসারণের যেকোনো প্রচেষ্টারও বিরোধিতা করছি... প্রয়োজনে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পিছপা হব না, যার মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সত্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপও অন্তর্ভুক্ত।’

নেতানিয়াহু কী বলেছেন

যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকির জবাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘লন্ডন, অটোয়া ও প্যারিসের নেতারা ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর চালানো হামলার জন্য বিশাল পুরস্কারের প্রস্তাব দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা ভবিষ্যতে এমন আরও নৃশংসতাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।’

নেতানিয়াহু আরও বলেন, ইসরায়েল ন্যায়সংগত উপায়ে আত্মরক্ষা করবে, যতক্ষণ না পূর্ণ বিজয় অর্জিত হয়। তিনি যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইসরায়েলের শর্তগুলোর কথা পুনরায় উল্লেখ করেন, যার মধ্যে বাকি জিম্মিদের মুক্তি এবং গাজা উপত্যকার নিরস্ত্রীকরণের দাবি রয়েছে।

‘লন্ডন, অটোয়া ও প্যারিসের নেতারা ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর চালানো জাতিগত নিধনমূলক হামলার জন্য বিশাল পুরস্কারের প্রস্তাব দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা ভবিষ্যতে এমন আরও নৃশংসতাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।’
....বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী

হামাসকে চাপে ফেলে বাকি জিম্মিদের মুক্ত করার কৌশল হিসেবে মার্চের শুরু থেকে ইসরায়েল গাজায় চিকিৎসা, খাদ্য, জ্বালানিসহ সব ধরনের ত্রাণ প্রবেশ বন্ধ করে দেয়।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন নিয়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কী বলছে

ইসরায়েল গাজা যুদ্ধ শেষ না করলে যুক্তরাষ্ট্রের দেশটিকে পরিত্যাগ করার হুঁশিয়ারি নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট যে প্রতিবেদন করেছে, তার পাল্টা প্রতিবেদন করেছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম।

একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে টাইমস অব ইসরায়েলের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে ‘আমরা ইসরায়েলকে ত্যাগ করব’, এই ধারণা একেবারেই অমূলক।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করল যুক্তরাজ্য, বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা

ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করেছে যুক্তরাজ্য। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটি। ইসরায়েল নতুন করে শুরু করা হামলা বন্ধ ও ত্রাণ যেতে না দিলে দেশটির বিরুদ্ধে ‘পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার এমন হুমকির পরই এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো।

৫ মে থেকে গাজায় নতুন করে অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল। গতকাল সোমবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘পুরো গাজার নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে তাঁর সরকার। দীর্ঘ ১১ সপ্তাহ অবরোধের পর এদিনই উপত্যকাটিতে পাঁচ ট্রাক ত্রাণ ঢুকতে দিয়েছে ইসরায়েল। তবে গাজা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন সেখানে ৫০০ ট্রাক ত্রাণ প্রয়োজন।

আজ মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর দেশটির আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাজ্য। তবে এই সংঘাত এখন এক ‘কালো অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে’। ১১ সপ্তাহ ধরে গাজা অবরোধ করে রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে উপত্যকাটিতে কাজ করা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) হাতে খাবারের মজুত শেষ হয়ে গেছে।

যুক্তরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের ডেভিড ল্যামি আরও বলেন, আজ পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে তিনজন ব্যক্তি ও চারটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। যারা নৃশংসভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে যাবে ব্রিটিশ সরকার।

এর মধ্যে আজ যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের হামলা, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বৃদ্ধি এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনার জেরে যুক্তরাজ্যে ইসায়েলের দূত জিপুরা হোতোভেলিকে তলব করেছে ব্রিটিশ সরকার।

বসতি স্থাপনকারীদের ওপর যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞাকে ‘বিভ্রান্তিকর, অযৌক্তিক ও দুঃখজনক’ বলেছে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় বলেছে, নিজেদের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার জন্য ইসরায়েলের ধ্বংস চাওয়া শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। বাইরের চাপের কারণে এই সংগ্রাম থেকে সরে যাবে না ইসরায়েল।

আর বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করা নিয়ে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘ইসরায়েলবিরোধী আবেগ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কারণে যুক্তরাজ্য যদি নিজেদের অর্থনীতির ক্ষতি করতে চায়, তাহলে সেটি তাদের সিদ্ধান্ত।’

ইসরায়েলকে নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ফ্রান্সের

গাজায় নতুন করে শুরু করা সামরিক অভিযান বন্ধ না করলে এবং ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডটিতে ত্রাণ প্রবেশে বাধা সরিয়ে না নিলে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ফ্রান্স।

গাজা যুদ্ধ বন্ধ করতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। গতকাল সোমবার এই তিন দেশের নেতাদের নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি সেই চাপ আরও বাড়াবে।

যদিও সব ধরনের চাপ উপেক্ষা করে গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ। গত শুক্রবার আইডিএফ গাজায় নতুন করে স্থলাভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে।

তিন দেশের নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি আসার আগে সোমবার নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইসরায়েল পুরো গাজার নিয়ন্ত্রণ নেবে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই গাজায় আসন্ন দুর্ভিক্ষের বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল সরকার (গাজার) বেসামরিক জনগণের জন্য অত্যাবশ্যক মানবিক সহায়তা দিতে অস্বীকার করছে, এটি অগ্রহণযোগ্য এবং এতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি রয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা পশ্চিম তীরে (ইহুদি) বসতি সম্প্রসারণের যেকোনো প্রচেষ্টারও বিরোধিতা করছি... প্রয়োজনে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পিছপা হব না, যার মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সত্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপও অন্তর্ভুক্ত।’

এর জবাবে নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘লন্ডন, অটোয়া ও প্যারিসের নেতারা ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর চালানো জাতিগত নিধনমূলক হামলার জন্য বিশাল পুরস্কারের প্রস্তাব দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা ভবিষ্যতে এমন আরও নৃশংসতাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।’

নেতানিয়াহু আরও বলেন, ইসরায়েল ন্যায়সংগত উপায়ে আত্মরক্ষা করবে, যতক্ষণ না পূর্ণ বিজয় অর্জিত হয়। তিনি যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইসরায়েলের শর্তগুলোর কথা পুনরায় উল্লেখ করেন, যার মধ্যে বাকি জিম্মিদের মুক্তি এবং গাজা উপত্যকার নিরস্ত্রীকরণ রয়েছে।

হামাসকে চাপে ফেলে বাকি জিম্মিদের মুক্ত করার কৌশল হিসেবে মার্চের শুরু থেকে ইসরায়েল গাজায় চিকিৎসা, খাদ্য, জ্বালানিসহ সব ধরনের ত্রাণ প্রবেশ বন্ধ করে দেয়।

এক যৌথ বিবৃতিতে তিন পশ্চিমা দেশের নেতারা বলেছেন, ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের সুরক্ষায় ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে আমরা সব সময় সমর্থন করেছি। কিন্তু বর্তমান সহিংসতা সম্পূর্ণরূপে অসংগত।’

নেতারা আরও বলেন, নেতানিয়াহু সরকারের ‘এই জঘন্য কর্মকাণ্ড’ চালিয়ে যাওয়া তাঁরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে দেখে যেতে পারেন না।

ওই তিন দেশের নেতারা গাজায় এখনই একটি যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিসরের নেতৃত্বে চলমান উদ্যোগগুলোর প্রতিও তাঁদের সমর্থন প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি তাঁরা বলেছেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের অংশ হিসেবে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

হামাস তিন পশ্চিমা দেশের যৌথ বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘সঠিক পথের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ৫৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই সাধারণ ফিলিস্তিনি।

ইসরায়েলি পণ্য বর্জন করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের বৃহৎ খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান কো-অপ

যুক্তরাজ্যের অন্যতম বৃহৎ সুপারমার্কেট ব্র্যান্ড কো-অপ শিগগিরই ইসরায়েলের সব পণ্য বর্জন করে একটি নজির গড়তে পারে। যদি এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, তবে কো-অপ প্রথম কোনো ব্রিটিশ খুচরা পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হবে, যারা ইসরায়েলি পণ্য সম্পূর্ণভাবে বর্জন করবে। এ সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার অভিযোগ।

গত শনিবার অনুষ্ঠিত কো-অপের বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রস্তাবটি বিপুল সমর্থন পেয়ে গৃহীত হয়। ৭৩ শতাংশ ভোটার প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন। এতে বোর্ডকে ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ‘নৈতিক সাহস ও নেতৃত্ব’ প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়। সদস্যদের ভাষায়, এটি গাজার ওপর ইসরায়েলের ‘ধ্বংসযজ্ঞ’-এর বিরুদ্ধে একটি জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ।

প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক না হলেও কো-অপের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহ নীতিমালা পর্যালোচনা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত সরবরাহ নীতিগুলো পর্যালোচনা করি, যাতে আমাদের মূল্যবোধ, নীতিমালা এবং সদস্যদের ইতিমধ্যে স্পষ্ট করা মতামত সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়।’

গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ এ পর্যালোচনা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তখনই কো-অপ তাদের দোকান থেকে ইসরায়েলি পণ্য সরিয়ে ফেলতে পারে।

এ প্রস্তাবের পক্ষে কাজ করেছে প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইন (পিএসসি) নামের একটি সংগঠন। ভোটের ফলাফলকে তারা ফিলিস্তিনের প্রতি যুক্তরাজ্যের ব্যাপক জনসমর্থনের প্রতিফলন হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির মুখপাত্র লুইস ব্যাকন বলেন, ‘এই ভোট দেখিয়েছে, যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষ ফিলিস্তিনের ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার পক্ষে আছেন এবং তাঁরা ইসরায়েলের বর্ণবৈষম্যমূলক অর্থনীতিকে সমর্থন করতে চান না। কো-অপকে এখন তাদের সদস্যদের কথা শুনতে হবে এবং সব ইসরায়েলি পণ্য তুলে নিতে হবে।’

কো-অপ সব সময় নৈতিক অবস্থানের কারণে যুক্তরাজ্যের অন্যান্য সুপারমার্কেট থেকে আলাদা। ২০০৭ সালে তারা প্রথম ব্রিটিশ খুচরা বিক্রেতা হিসেবে দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিতে তৈরি পণ্য বর্জন করে। নতুন প্রস্তাবের পক্ষে থাকা সদস্যরা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলার পর কো-অপ রুশ পণ্য বিক্রিও বন্ধ করেছিল। তাই ইসরায়েল ইস্যুতেও একই ‘নৈতিকতা ও মূল্যবোধ’ অনুসরণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এমন এক সময়ে এ ভোট অনুষ্ঠিত হলো, যখন গাজায় ইসরায়েলের হামলায় করপোরেট সহযোগিতা থাকার বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠছে। অক্টোবর ২০২৩ থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি আগ্রাসনে ৫৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। কো-অপ সদস্যরা যুক্তি দিয়েছেন, এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটির মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রতিশ্রতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

উল্লেখ্য, প্রস্তাবটি পাস হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন ইউকে লইয়ার্স ফর ইসরায়েল নামের একটি বিতর্কিত আইনি সংগঠন এটিকে প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিচ্ছিল। তারা কো-অপের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো’ এবং ‘মিথ্যা ও মানহানিকর’ বক্তব্য প্রচারের অভিযোগ তোলে। তবে কো-অপ তাদের সদস্যদের এ প্রস্তাবের ওপর ভোট দেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল, যা তাদের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রমাণ।

যদিও এ ভোটের ফলে কো-অপের পরিচালনা পর্ষদ কোনো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য নয়, তবু বহু সদস্য ও অধিকারকর্মীদের মতে, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর না করলে কো-অপের মূল্যবোধভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি মারাত্মকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়বে।

ডেভিড ল্যামি
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি। ছবি: রয়টার্স

ত্রাণ না পৌঁছালে গাজায় ৪৮ ঘণ্টায় ১৪ হাজার শিশুর মৃত্যুর শঙ্কা

ফিলিস্তিনের গাজায় নৃশংস হামলার পাশাপাশি ইসরায়েলি অবরোধের কারণে খাবার-পানির মতো জরুরি পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে চরম দুর্দশায় রয়েছেন উপত্যকার বাসিন্দারা। অসহায় এই মানুষগুলোর কাছে যদি ত্রাণ না পৌঁছায়, তাহলে ৪৮ ঘণ্টায় গাজায় ১৪ হাজার শিশুর মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রমবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার।

১৯ মাস ধরে চলমান হামলার মধ্যে গত ২ মার্চ থেকে গাজায় ত্রাণ প্রবেশ বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। এর প্রায় ১১ সপ্তাহ পর সম্প্রতি উপত্যকাটিতে খাদ্যপণ্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নেতানিয়াহু সরকার। পরে আজ মঙ্গলবার জাতিসংঘ জানিয়েছে, প্রতিদিন গাজায় ১০০ ট্রাক ত্রাণ সরবরাহের অনুমতি পেয়েছে তারা, যদিও দিনে উপত্যকাটিতে ৫০০ ট্রাক ত্রাণের প্রয়োজন।

বিবিসির ‘রেডিও ফোরস টুডে’ অনুষ্ঠানে আজ জাতিসংঘের মানবিক প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, আগের দিন সোমবার গাজায় মাত্র পাঁচটি ত্রাণের ট্রাক ঢুকেছে। পরিমাণটা ‘সাগরে এক ফোঁটা পানির মতো’। ওই ট্রাকগুলোয় শিশুদের খাবার রয়েছে। এই খাবারগুলো যদি গাজার বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছানো না যায়, তাহলে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় উপত্যকাটিতে ১৪ হাজার শিশুর মৃত্যু হতে পারে।

গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোরব থেকে নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। মাঝখানে মাস দুয়েকের যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গত ১৮ মার্চ আবার নৃশংস হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। এরই মধ্যে সম্প্রতি গাজায় ‘অপারেশন গিডেয়নস চ্যারিওটস’ নামে অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয় তারা। এর পর থেকে উপত্যকাটিতে হামলার বিস্তৃতি বাড়িয়েছে ইসরায়েল।

আজও গাজার বিভিন্ন প্রান্তে তুমুল হামলা চালানো হয়েছে। এতে শিশুসহ অন্তত ৭৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, গতকাল ইসরায়েলের হামলার পর ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে গাজা নগরীর মুসা বিন নুসাইর স্কুলে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এ সময় মানুষের আর্তনাদ শোনা যায়। স্কুলটিতে হামলায় অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

গাজার চিকিৎসাকর্মীদের বরাতে আজ রয়টার্স জানিয়েছে, আগের আট দিনে উপত্যকাটিতে ইসরায়েলের হামলায় পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। আর গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ১৯ মাস ধরে চলা ইসরায়েলি নৃশংসতায় উপত্যকাটিতে ৫৩ হাজার ৫৭৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ফিলিস্তিনি। বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ।

দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে ‘নজিরবিহীন হামলার’ হুঁশিয়ারি দিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের সরে যেতে বলেছে ইসরায়েল। প্রাণ বাঁচাতে সেখান থেকে ফিলিস্তিনিরা এখন পাশের আল-মাওয়াসি এলাকায় পালিয়ে যাচ্ছেন। ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকেই গাজার প্রায় ২৩ লাখ বাসিন্দার বেশির ভাগই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

এমন নৃশংসতার মধ্যে ইসরায়েলকে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ফ্রান্স। গত সোমবার দেশ তিনটি বলেছে, গাজায় নতুন করে শুরু করা সামরিক অভিযান বন্ধ না করলে এবং ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে ত্রাণ প্রবেশে বাধা সরিয়ে না নিলে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে তারা।

জবাবে আজ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘যুদ্ধ আগামীকালই থামতে পারে, যদি হামাস জিম্মিদের মুক্তি দেয়, অস্ত্র পরিত্যাগ করে, তাদের হত্যাকারী নেতাদের নির্বাসিত করে এবং গাজাকে বেসামরিকীকরণ করে।’

ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজায় দেখা দিয়েছে খাবার ও পানির তীব্র সংকট। পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বাস্তুচ্যুত অসহায় ফিলিস্তিনিদের। আজ গাজা নগরীর একটি আশ্রয়শিবিরে
ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজায় দেখা দিয়েছে খাবার ও পানির তীব্র সংকট। পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বাস্তুচ্যুত অসহায় ফিলিস্তিনিদের। আজ গাজা নগরীর একটি আশ্রয়শিবিরে। ছবি: এএফপি

ভারত হামলা চালিয়ে যেভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি বাড়িয়ে দিল by আবিদ হুসেইন

২০২৩ সালের ৯ মে পাকিস্তানের বড় বড় শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তাঁরা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা পর্যন্ত করেছিলেন।

লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল রাওয়ালপিন্ডিতে সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর, লাহোরে একজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডারের বাসভবন (যেটি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়) এবং আরও কিছু স্থাপনা ও স্মৃতিস্তম্ভ।

ওই বিক্ষোভকারীরা মূলত পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সমর্থক ছিলেন। তাঁরা তাঁদের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন।

ইমরান খানকে ইসলামাবাদ হাইকোর্টে দুর্নীতির অভিযোগে আটক করা হয়েছিল।

ইমরান খানকে ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে মুক্তি দেওয়া হলেও ওই বিক্ষোভগুলোকে সেনাবাহিনীর আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।

পাকিস্তানে সেনাবাহিনীকে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যারা প্রায় সব ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব বজায় রেখে আসছে।

এর ঠিক দুই বছর পর, ২০২৫ সালের ১১ মে, হাজার হাজার মানুষ আবার রাস্তায় নামেন। কিন্তু এবার তাঁরা মাঠে নামেন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নয়, বরং তাদের প্রশংসা করতে ও তাদের সমর্থন জানাতে।

গত সপ্তাহে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র সামরিক সংঘর্ষ হয়। উভয় পক্ষই একে অপরের স্থাপনাগুলোয় আক্রমণ চালায়।

১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর দুই দেশের মধ্যে এত বড় সংঘাত আর দেখা যায়নি।

প্রায় যুদ্ধের পর্যায়ে পড়া এই সংঘাতে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ প্রভাব স্পষ্ট। সেটি হলো সেনাবাহিনীর প্রতি জনসমর্থন তীব্রভাবে বেড়েছে। সেনাবাহিনীকে ভারতীয় আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গ্যালাপ পাকিস্তানের একটি জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১১ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত ৫০০ জনের বেশি উত্তরদাতার মধ্যে ৯৬ শতাংশ মনে করেন, পাকিস্তান এই সংঘর্ষে জয়ী হয়েছে।

আল–জাজিরাকে দেওয়া প্রাথমিক তথ্য ও জরিপের প্রবণতা অনুযায়ী, ৮২ শতাংশ মানুষ সেনাবাহিনীর কার্যক্রমকে ‘অত্যন্ত ভালো’ বলে মূল্যায়ন করেছেন। আর মাত্র ১ শতাংশের কম মানুষ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ৯২ শতাংশ মানুষ বলেছেন, এই সংঘর্ষের কারণে তাঁদের সেনাবাহিনীর প্রতি ধারণা আরও ইতিবাচক হয়েছে।

‘কালো দিবস’ থেকে ‘ন্যায্য যুদ্ধের দিন’-এ রূপান্তর

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরের দিন, ১১ মে পাকিস্তানের শহরগুলোয় মানুষ গাড়ি ও মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।

তাঁরা জাতীয় পতাকা ওড়ান এবং সেনাবাহিনী, বিশেষ করে সেনাপ্রধান জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনিরের প্রশংসা করে পোস্টার বহন করেন। বাতাসে ছিল উল্লাস আর স্বস্তির আবেশ।

এর আগের চার দিন ধরে পাকিস্তান তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে এক উত্তেজনাপূর্ণ সামরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে ছিল।

৭ মে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্র হামলাকারীদের হাতে ২৬ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার দুই সপ্তাহ পর ভারত এই হামলার জন্য ইসলামাবাদকে দায়ী করে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর এবং পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

এতে কমপক্ষে ৫১ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে ১১ জন সেনাসদস্য ও বেশ কয়েকটি শিশু ছিল।

পরের তিন দিন ধরে এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ একে অপরের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আর্টিলারি নিক্ষেপ করে। এটি উপমহাদেশের ১৬০ কোটি মানুষকে সর্বাত্মক যুদ্ধের কিনারায় নিয়ে যায়।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পাকিস্তান সরকার ১০ মে তারিখটিকে ‘ন্যায্য যুদ্ধের দিন’ হিসেবে ঘোষণা করে। এটি ২০২৩ সালের ৯ মের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।

ওই দিনকে সরকার ‘কালো দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। কারণ, সেদিন ইমরান খানের সমর্থকেরা সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছিল।

যুদ্ধবিরতির ছয় দিন পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডকে ‘সামরিক ইতিহাসের স্বর্ণালি অধ্যায়’ বলে অভিহিত করেন।

প্রধানমন্ত্রী শরিফ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এটি পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর বিজয়, সেই সঙ্গে স্বনির্ভর, গর্বিত ও মর্যাদাশীল পাকিস্তানি জাতির বিজয়। সমগ্র জাতি সিসার প্রাচীরের মতো সশস্ত্র বাহিনীর পাশে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি এখানে ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের নাম ‘বুনইয়ান মারসুস’-এর উল্লেখ করেন, যা একটি আরবি বাক্যাংশ [‘বুনইয়ান মারসুস’ নামটি মূলত পবিত্র কোরআনের সূরা আস্-সাফ (৬১: ৪)-এর একটি আয়াত থেকে নেওয়া হয়েছে], যার অর্থ ‘সুদৃঢ়ভাবে গাঁথা সিসার প্রাচীর’ বা ‘অটলভাবে দাঁড়ানো সিসার প্রাচীর’।

২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাঁর আইনজীবীদের মাধ্যমে একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলে, সেনাবাহিনীর এখন আগের চেয়ে বেশি জনসমর্থন প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তাঁর অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা এক বার্তায় ইমরান খান বলেন, ‘জাতির মনোবলই সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি। এ জন্যই আমি সব সময় জোর দিয়ে বলেছি, আমাদের জনগণকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না এবং আমাদের বিচারব্যবস্থায় নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনতে হবে।’

২০২৩ সালের মে মাসে গ্রেপ্তারের পর দ্রুত মুক্তি পেলেও একই বছরের আগস্ট মাসে ইমরানকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এখনো তাঁর স্ত্রী বুশরাসহ কারাগারে।

শ্রদ্ধা থেকে ভয়

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই দেশটির সেনাবাহিনী সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (এসওএএস) রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক মারিয়া রশিদ বলেন, সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ‘পাকিস্তানের ভৌগোলিক সীমানা এবং আদর্শিক সীমানার রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

এই আধিপত্য চারটি সামরিক অভ্যুত্থান এবং দশকজুড়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শাসনের মাধ্যমে সুদৃঢ় হয়েছে।

২০২২ সালে ছয় বছরের দায়িত্ব শেষে অবসর নেওয়ার আগে পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া তাঁর বিদায়ী ভাষণে স্বীকার করেছিলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে।

তিনি ভবিষ্যতে সেনাবাহিনী পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

গত কয়েক বছরে জনসাধারণের সমর্থনে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ২০১৮ সালে ইমরান খান প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় বলেছিলেন, তাঁর সরকার এবং সেনাবাহিনী ‘একই লাইনে’ আছে।

কিন্তু ইমরানের পূর্বসূরিদের মতোই সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে।

২০২২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে খানকে পদচ্যুত করা হয়। তবে আগের নেতাদের থেকে ভিন্নভাবে ইমরান খান প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেন এবং তাঁর অপসারণে সরাসরি সেনাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার অভিযোগ তোলেন। সেনাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্র বারবার জোরালোভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে।

২০২২ সালের নভেম্বরে জেনারেল আসিম মুনির সেনাপ্রধান হওয়ার পর এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়। খান ও তাঁর দল পিটিআই প্রতিবাদ শুরু করে।

এর ফলে তাঁর ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ কয়েক ডজন ফৌজদারি মামলা করা হয়।

২০২৩ সালের ৯ মে দাঙ্গার পর পিটিআইয়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু হয়। পুলিশ পিটিআইয়ের হাজার হাজার কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মধ্যে ১০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে সামরিক আদালতে বিচার করা হয় এবং অনেককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

যদিও এর আগেও সেনাবাহিনী অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের অভিযোগের মুখে পড়েছে; তবে মারিয়া রশিদ বলেছেন, ইমরান খানের অপসারণের পর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছে, তা অভূতপূর্ব ছিল। তিনি বলেন, ‘এটি সেনাবাহিনীর মর্যাদাহানিকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দিয়েছিল।

এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থানের সময় ঘটে, যার ফলে সেনাবাহিনীর জন্য ন্যারেটিভ বা ভাষ্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।’ তিনি যোগ করেন, ‘যদি আগে সেনাবাহিনীর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা থেকেও থাকে, ওই সময় তা কেবল ভয়ে পরিণত হয়েছিল।’

‘অপরিহার্য সামরিক বাহিনী’

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় ভূমিকা গড়ে উঠেছে ভারতের সঙ্গে বারবার যুদ্ধের মধ্য দিয়ে (১৯৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১ ও ১৯৯৯ সালে) যার মূল ইস্যু ছিল কাশ্মীর।

উভয় দেশই সম্পূর্ণ কাশ্মীর দাবি করে। বাস্তবে কাশ্মীরের একটি অংশ পাকিস্তান এবং অপর অংশ ভারত নিয়ন্ত্রণ করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুহাম্মদ বদর আলমের মতে, ভারত থেকে আসা নিরন্তর হুমকির অনুভূতি সেই ‘মৌলিক কারণগুলোর’ একটি, যা সামরিক বাহিনীকে সমাজ, রাজনীতি ও শাসনে প্রাধান্য দিয়েছে।

১৯৯৯ সালে শেষ প্রচলিত যুদ্ধের পর থেকে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছড়ানোর অভিযোগ করেছে। বিশেষ করে ভারত অভিযোগ করে আসছে, পাকিস্তান ভারত-শাসিত কাশ্মীরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে।

পাকিস্তান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং বলে আসছে, তারা কাশ্মীরিদের শুধু নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দেয়।

গত ২৫ বছরে ভারতে বহু হামলা হয়েছে। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলায় ১৬০ জনের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন। ভারত বলেছে, পাকিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছিল।

ইসলামাবাদ স্বীকার করেছিল, হামলাকারীরা পাকিস্তানি হতে পারে, কিন্তু পাকিস্তান সরকার বা সামরিক বাহিনীর মদতেই মুম্বাই হামলা হয়েছিল—ভারতের এই অভিযোগ পাকিস্তান বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।

২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে আরও অবনতি হয়।

এর পর থেকে ভারত নিজ ভূখণ্ডে সশস্ত্র হামলার জবাবে ২০১৬, ২০১৯ এবং এখন (২০২৫ সালে) পাকিস্তান ও পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের ভেতরে হামলা চালিয়েছে।

লাহোরভিত্তিক বিশ্লেষক বদর আলম আল–জাজিরাকে বলেছেন, মোদির কঠোর অবস্থান পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে তাদের ক্ষমতার ন্যায্যতা প্রমাণ করতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, ‘যত দিন পূর্ব দিক থেকে হুমকি থাকবে, তত দিন সামরিক বাহিনী অপরিহার্য থাকবে।’

বিবেকের যুদ্ধ?

উভয় পক্ষই সাম্প্রতিক চার দিনের সংঘর্ষ সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী দাবি করেছে। পাকিস্তান পাঁচটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধবিরতির গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প কাশ্মীর ইস্যুর সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন, যা ভারতের মতে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই শুধু ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা যেতে পারে।

ভারত দাবি করেছে, তারা পাকিস্তানি ভূখণ্ডে গভীর আঘাত হেনেছে এবং এসব আঘাত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আস্তানা ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

ইসলামাবাদভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরিফা নূর বলেছেন, ‘প্রতিবেশী দেশের’ সঙ্গে সংঘর্ষ নাগরিকদের রাষ্ট্র ও তার সশস্ত্র বাহিনীর পাশে দাঁড় করায়।

এটি পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও যেমন সত্য, তেমনি অন্য যেকোনো দেশের জন্য সত্য।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রচুর সমর্থন পাচ্ছে সত্যি, কিন্তু এই জনসমর্থন দেশের ভেতরের রাজনীতিতে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনই সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘সীমান্তে অবস্থিত পাঞ্জাবে সবচেয়ে বেশি সমর্থন দেখা গেছে। কিন্তু খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানের মতো প্রদেশগুলো ভিন্নভাবে দেখতে পারে।’

খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান উভয়ই দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা দেখেছে। সেখানকার সমালোচকেরা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ করেছেন, যা কিনা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী অস্বীকার করে আসছে।

আরিফা নূরের মতামতের প্রতিধ্বনি করে বদর আলম বলেছেন, জনসমর্থন প্রধানত পাঞ্জাব ও দেশের অন্যান্য শহুরে এলাকায় দৃশ্যমান ছিল।

আলম আরও বলেছেন, ইমরান খান এখনো জেলে থাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মূল সমর্থকদের চোখে সামরিক বাহিনীর ইমেজ কতটা পরিবর্তিত হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
জনপ্রিয়তা কি স্থায়ী হবে

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, আন্তর্জাতিক উত্তেজনার সময় ‘পতাকার চারপাশে একত্র হওয়ার’ প্রভাব স্পষ্ট হলেও নেতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনসমর্থন সাধারণত স্বল্পস্থায়ী হয়।

নিউইয়র্কের আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক নিলুফার সিদ্দিকি আল–জাজিরাকে বলেন, বর্তমান সংকট থেকে সামরিক বাহিনী কত দিন জনগণের সমর্থন উপভোগ করবে, তা স্পষ্ট নয়।

তিনি আরও বলেন, এটি অনেকটাই নির্ভর করছে ভারতের বক্তব্যের ওপর এবং তা উত্তেজনাপূর্ণ থাকবে কি না, তার ওপর।

সিদ্দিকি আরও যোগ করেছেন, পিটিআই আগে খুব কঠোর ভাষায় সেনাবাহিনীর সমালোচনা করত। এখন প্রশ্ন হলো, সেনাবাহিনীর এই জনপ্রিয়তা বাড়ার পর ভবিষ্যতে পিটিআই তাদের বক্তব্য কীভাবে সাজাবে?

যদি পিটিআই সেনাবাহিনীর সমালোচনা কমিয়ে দেয়, তাহলে সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের সমর্থন বজায় থাকতে পারে।

কিন্তু যদি তারা আগের মতোই কঠোর সমালোচনা চালিয়ে যায়, তাহলে বর্তমান জনসমর্থন কমে যেতে পারে।

লন্ডনভিত্তিক লেখক রশিদ বলছেন, পাকিস্তানিদের জন্য আগামী দিনে বড় প্রশ্ন হবে, তারা সীমান্তে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের সম্পৃক্ততার মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে কি না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রাজনীতিতে জড়িত থাকাকে সমালোচনা করতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে, সীমান্তে তাদের কর্মক্ষমতা এই মুহূর্তে প্রশংসনীয়।’

বদর আলম বলেন, ভারতের সঙ্গে এই সংকট থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকেও শিক্ষা নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘সামরিক বাহিনীকে বুঝতে হবে, সাফল্যের জন্য জনসমর্থন প্রয়োজন। আমরা ভারতের সঙ্গে চিরস্থায়ী যুদ্ধে থাকতে পারি না। আমাদের অর্থনীতি ঠিক করতে হবে, না হলে এটি পাকিস্তানের অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।'

* আবিদ হুসেইন আল–জাজিরা ইংলিশের ডিজিটাল সংবাদদাতা হিসেবে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে কর্মরত

- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

শ্রীনগরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলার পর ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সেনা পাহারা জোরদার করা হয়। ওই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারত। ২৮ এপ্রিল ২০২৫
শ্রীনগরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলার পর ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সেনা পাহারা জোরদার করা হয়। ওই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারত। ২৮ এপ্রিল ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

ভারত কেন যুদ্ধ করে পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের সমাধান করতে পারবে না -নিউইয়র্ক টাইমস

সামরিক দিক বিবেচনায় চলতি মাসে অর্ধশতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষে জড়িয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান। এ সংঘাতে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের স্পর্শকাতর বিমানঘাঁটিগুলোর হ্যাঙ্গারে ফাটল এবং রানওয়েতে গর্ত তৈরি করতে সক্ষম হলেও দীর্ঘদিনের শত্রুর সঙ্গে তাদের আকাশযুদ্ধে কিছু যুদ্ধবিমান হারাতে হয়েছে।

তবে কৌশলগত দিক বিবেচনা করলে, যুদ্ধক্ষেত্রের এ ফলাফলটা ভারতের জন্য স্পষ্টত একটি ধাক্কা। কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উদীয়মান এই দেশ এখন নিজেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সমপর্যায়ের অবস্থানে দেখতে পাচ্ছে। সেই পাকিস্তান যেটি আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট, শক্তিতে দুর্বল এবং যাকে ভারতীয় কর্মকর্তারা সন্ত্রাসবাদের ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

চার দিনের এ সংঘর্ষ আবারও বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে, ভারত তার প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে ৭৮ বছর ধরে চলা সংঘাতের মীমাংসা করতে অক্ষম। সংঘাতপূর্ণ যেকোনো কর্মকাণ্ডই পাকিস্তানকে সুবিধা দেয়। কারণ, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাত তাদের অন্যতম জীবনীশক্তি।

দুই দেশের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারকে বিবেচনা করলে, কোনো পক্ষের পূর্ণাঙ্গ সামরিক জয় প্রায় অসম্ভবই বলা চলে।

ভারতের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন বলেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমরা ভারতীয়রা যেটির জন্য এত সময় ও শ্রম নষ্ট করছি, তা আসলে কৌশলগত বিভ্রম: পাকিস্তান থেকে হওয়া সন্ত্রাস। তবে এটি একটি বাস্তবতা এবং আমাদের উচিত যতটা সম্ভব দক্ষতার সঙ্গে এটাকে সামাল দেওয়া।’

কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায়, সে চিন্তাটি সেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত বিভক্ত হওয়ার পর থেকেই ভারতীয় নেতাদের মাথায় ঘুরছে। কয়েকজন কূটনীতিক, বিশ্লেষক এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ভারতের চিরস্থায়ী দুশ্চিন্তার একটি স্পষ্ট  চিত্র পাওয়া গেছে।

ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ হয়েছে। তাদের বিরোধ মেটাতে কয়েকটি তৎপরতা ব্যর্থ হয়েছে। দুই দেশের সমস্যা ক্রমাগত জটিলতার দিকেই এগিয়েছে।

কাশ্মীরের পেহেলগামে একটি প্রাণঘাতী হামলার জন্য ইসলামাবাদকে দায়ী করে চলতি মাসে পাকিস্তানে হামলা চালায় ভারত। দুই দেশই প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে ড্রোন এবং অন্য আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করায় উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়। পাশাপাশি ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন এবং পাকিস্তানের পক্ষে চীনের অবস্থানের কারণে বিশ্বশক্তির রাজনৈতিক সমীকরণ নতুন মাত্রা পায়।

ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশের নেতারাই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাকে আগলে রেখেছেন। দুই দেশই একে অপরের প্রতি অনমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকে। আর এ কারণে কোনো ধরনের আপস বা শান্তিপূর্ণ উদ্যোগ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ভারতে হিন্দু-জাতীয়তাবাদী শাসনের উত্থান হওয়ার পর দেখা গেছে যখনই উত্তেজনা তৈরি হয়, তখনই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ডানপন্থী সমর্থক গোষ্ঠী রক্তপাতের দাবি তোলে।

আর অভ্যন্তরীণ এই চাপের কারণে এবার ভারত ২০০৮ সালের মতো সংযম দেখাতে পারেনি। ওই বছর মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলায় ১৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। তখন ভারত দায়িত্বশীলতা ও সংযমের পরিচয় দিয়েছিল। ওই সময় তারা উপলব্ধি করেছিল, যুদ্ধ ভারতের উত্থানকে থামিয়ে দিতে পারে। আর এ উপলব্ধিটি ছিল প্রতিশোধ নেওয়ার অভ্যন্তরীণ চাপের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার সময় ভারত সরকার পাকিস্তানে সামরিক হামলার পথ নেয়নি। সেই সময় ভারতের লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসী হামলার ভয়াবহতার ওপর সারা বিশ্বের দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত রাখা এবং সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা হিসেবে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করা। তখন যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানকে সমপর্যায়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখাতে চায়নি ভারত।

১৭ বছর পর, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা আবারও নিরীহ মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে। গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের এক মনোরম উপত্যকায় তারা হামলা চালিয়ে দুই ডজনের বেশি পর্যটককে হত্যা করেছে। তবে এবার পাকিস্তানে সামরিকভাবে হামলা চালিয়ে জবাব দিয়েছে ভারত। দুই দেশ সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।

ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, ছায়াযুদ্ধের নীতি অবলম্বনের জন্য মূল্য চুকাতে হবে—এমন বার্তাই পাকিস্তানকে দিতে চেয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলো একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই কৌশলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অভিন্ন নদীগুলোর পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও রয়েছে।

এমনকি শিবশঙ্কর মেননের মতো সমালোচকেরা পর্যন্ত স্বীকার করছেন, এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না বললেই চলে।

এক অনড় প্রতিবেশী

বছরের পর বছর ধরে ভারত ও পাকিস্তান একেবারে ভিন্ন পথে হাঁটছে।

ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চীনের প্রভাব ঠেকাতে দেশটিকে একটি ভূরাজনৈতিক অংশীদার এবং বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে আপন করে নিয়েছে। বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় নেতারা ‘ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয়’ অঞ্চল নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী। পূর্ব এশিয়ার উন্নত অর্থনীতির বিষয়টি এ আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে পুরোনো ‘ইন্দো-পাকিস্তান’ সমস্যা তাঁদের আলোচনায় ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে।

সম্প্রতি এক আলোচনায় হোয়াইট হাউসের সাবেক উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন ফাইনার বলেন, বর্তমানে চীনসংক্রান্ত উদ্বেগকে পাকিস্তানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় ভারত।’

ফাইনার আরও বলেন, হিমালয় সীমান্তে চীনের বারবার অনুপ্রবেশ এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি হওয়ার প্রেক্ষাপটে চীনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত ভারত। এ সময় পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে শক্তিক্ষয় করতে চায় না দেশটি।

তবে জন্ম থেকেই সেনাবাহিনীর প্রভাব–প্রতিপত্তিতে পরিচালিত পাকিস্তান সব সময় এক অদৃশ্য ছায়ার মতো পেছনে লেগে থাকে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদের আকার ও প্রভাব বিস্তারের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতকে ‘চিরশত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে।

ভারতের অর্থনীতি পাকিস্তানের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে যাওয়ার পর ১৯৯৮ সালে ভারত বিশ্বশক্তির কাতারে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেয়। তারা ভূগর্ভে পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। দুই সপ্তাহের মধ্যে পাকিস্তানও নিজস্ব পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশই পারমাণবিক সক্ষমতার দিক থেকে সমকাতারে চলে আসে।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন দ্রুতই এই অঞ্চলকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক’ অঞ্চল হিসেবে অভিহিত করেন। ভারত যা চেয়েছিল, ফল হলো তার উল্টো। ভারত চীন, রাশিয়া ও পশ্চিমাদের সঙ্গে নিজেকে বিশ্বশক্তির ক্লাবে যুক্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তা না হয়ে ভারত এক ভয়াবহ নতুন জটিল সংকটে আটকা পড়ে গেল।

তবে পারমাণবিক সমতা শান্তি আনতে পারেনি। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে জিহাদি মিলিশিয়াদের পরিচালিত করার নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরিসর আরও বিস্তৃত করে পাকিস্তান।

কঠোর অবস্থান

আগের নেতাদের মতো করে ভারতের হিন্দু-জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও একসময় শান্তির পথ খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। ২০১৪ সালে বিপুল জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসার পরের বছর তিনি হঠাৎ করেই পাকিস্তান সফরে যান। এক দশকে কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এটাই ছিল প্রথম পাকিস্তান সফর। মোদি ভারতকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার অঙ্গীকার করেছিলেন। সম্পদ বিনষ্টকারী সংঘাতের সমাধান করা যায় কি না, সে পথ খুঁজছিলেন তিনি।

এর ৯ মাস পর ভারতের একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা হয়। ভারত তখন অভিযোগ করে, এ হামলার জন্য পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো দায়ী। এরপরেই দুই দেশের মধ্যে শান্তিসংক্রান্ত যেকোনো আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়।

হামলার জবাবে ভারত যে সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তার মধ্য দিয়ে নতুন এক ধারা তৈরি হয়। আর তা হলো, প্রতিবার হামলার পর পাল্টা কড়া জবাব দেওয়ার ধারা। ২০১৯ সালে ভারতীয় বাহিনীর ওপর হওয়া হামলা এবং গত মাসে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার জবাবও একইভাবে দিয়েছে ভারত।

ভারত একই সঙ্গে পাকিস্তানকে শাস্তি দেওয়ার একটি কৌশলও নিয়েছে। এর মধ্যে আছে—আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া, কূটনৈতিকভাবে দেশটিকে একঘরে করে ফেলা, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং গোপনে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে আরও উসকে দেওয়া।

মোদির জাতীয় নিরাপত্তা নীতির স্থপতি হিসেবে পরিচিত অজিত দোভাল বলেছেন, পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কায় ভারতের আগের সরকারগুলো অত্যন্ত প্রতিরক্ষামূলক হয়ে পড়েছিল। তিনি একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক আক্রমণ’ কৌশল অবলম্বনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা মূলত পাকিস্তানের ছায়াযুদ্ধ কৌশলেরই প্রতিচ্ছবি।

বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের মতে, ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূলের চেষ্টায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নয়াদিল্লি লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার অভিযান চালিয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ভারতের হাত থাকার অভিযোগও উঠেছে—বিশেষ করে ইরান ও আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী বেলুচিস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে ভারতের ভূমিকা থাকার অভিযোগ আছে।

২০১৪ সালে অজিত দোভাল বলেছিলেন, ‘আপনারা যদি মুম্বাইয়ের মতো আরেকটি ঘটনা ঘটান, তাহলে আপনাদের বেলুচিস্তান হারাতে হতে পারে। এতে কোনো পারমাণবিক যুদ্ধ হবে না। সেনাদের সম্পৃক্ততা থাকবে না। আপনারা যদি কৌশল জানেন তো আমরা আপনাদের চেয়েও ভালো কৌশল জানি।’

সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ভারত আরও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তারা বলে দিয়েছে, ভবিষ্যতে যেকোনো সন্ত্রাসী হামলাকেই যুদ্ধ তৎপরতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এমন অবস্থায় দুই দেশের মধ্যকার সামরিক সংঘর্ষের নিয়মিত ঘটনাগুলোই হয়তো নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে সামরিক শক্তি দিয়ে ভারতের অর্জনের সুযোগ সীমিত।

ভারতের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেনন বলেন, ‘প্রতিরোধমূলক কৌশলের বিষয়টি আপেক্ষিক। একেকজনের দৃষ্টিতে তা একেক রকম—এটা অনেকটা মন বোঝার খেলার মতো।’

মেননের মতে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চালিকা শক্তিগুলো ভারত বদলে দিতে পারবে কি না, সেটাই এখন প্রশ্ন।

চলতি মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে চার দিনের উত্তেজনা ও অনিশ্চিত সংঘাতের ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে ভারতের আকাঙ্ক্ষা এবং সেগুলো পূরণের সীমাবদ্ধতাগুলোর মধ্যে ব্যবধান আছে।

নয়াদিল্লিতে অবস্থানকারী পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, ভারত এখন এতটাই কূটনৈতিক শক্তি অর্জন করেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়েছে যে দেশটি তাদের ভাবমূর্তি অনেকটা অক্ষুণ্ন রেখেই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে।

তবে সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানি বলেছেন, ‘কোনো না কোনো ক্ষেত্রে ভারতীয় নেতাদের স্বীকার করতে হবে যে তাঁদের পক্ষে প্রতিবেশী দেশকে উপেক্ষা করে এবং নিজের পথে এগিয়ে গিয়ে বিশ্বশক্তি হওয়া সম্ভব নয়। প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের শত্রু হোক, মিত্র হোক অথবা কেবল পাশেই থাকুক—কোনো না কোনো সহাবস্থানের পথ খুঁজে বের করতেই হবে।’

কাশ্মীরের ডাল লেক এলাকায় ভারতীয় সেনাদের অবস্থান
কাশ্মীরের ডাল লেক এলাকায় ভারতীয় সেনাদের অবস্থান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইসরাইলকে কি ত্যাগ করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প?

ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড গাজা উপত্যকায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার লক্ষ্যে হামলা জোরালো করায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাতে পারে ইসরাইল। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, গাজায় প্রবল খাদ্য সংকটের বিষয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধে ইসরাইলের ব্যর্থতার জন্য সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে জ্ঞাত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ট্রাম্পের প্রতিনিধিরা জানিয়েছে যে, যুদ্ধ শেষ না করলে ইসরাইলকে ‘পরিত্যাগ’ করবে আমেরিকা।

সূত্র আরও জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলকে বলেছে, যদি যুদ্ধ শেষ না করো তাহলে তোমাদের আমরা ত্যাগ করব। এদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট চান গাজার যুদ্ধ শেষ হোক। গত সপ্তাহে ইসরাইল-আমেরিকান সৈন্য এডান আলেকজান্ডারের মুক্তির পর এ কথা জানান লিভিট। এখানে বলে রাখা ভালো, সর্বশেষ জিম্মির মুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছে হামাস। এক্ষেত্রে ইসরাইলের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি সংগঠনটি। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের মধ্যকার সম্পর্কে চাপা উত্তেজনার বিষয়টি সামনে আসে গত সপ্তাহে ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরের পর। কেননা সেসময় নেতানিয়াহুকে তার পাশে দেখা যায়নি।
ওই সফরে প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুকে বাদ দেয়ার পর ইসরাইলের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। কেননা সফরের সময় গাজা ইস্যুতে কথা বলেন ট্রাম্প। তার মন্তব্যে গাজার পক্ষে সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, গাজার বহু মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। সেখানে ভয়াবহ সব কাণ্ড ঘটছে। এপ্রিলে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলার সময়ও গাজায় আরও মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দেয়ার ওপর বিশেষ জোর দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তখন বলেন, গাজার মানুষ কষ্টে আছে, উপত্যকাটির প্রতি আমাদের আরও সদয় হওয়া প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি গাজার যুদ্ধ বন্ধে অন্যান্য মিত্র দেশের পক্ষ থেকেও ইসরাইলের ওপর চাপ বাড়ছে। গাজায় হামলা বন্ধ না করলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ফ্রান্স, কানাডা ও বৃটেন। এ বিষয়ে যৌথ বিবৃতিও দিয়েছে দেশ তিনটির নেতারা। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র পক্ষের কাছ থেকে ক্রমাগত এমন চাপের পর গত সোমবার সুর কিছুটা নরম করেছেন নেতানিয়াহু। বাকি জিম্মিদের ছেড়ে দেয়া হলে গাজায় যুদ্ধ বন্ধে তেল আবিবের সম্মতির কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি হামাসকে অস্ত্র ত্যাগ করার শর্তও দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ‘কূটনৈতিক কারণে’ হলেও গাজার দুর্ভিক্ষ রোধ করা ইসরাইলের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ফলে উপত্যকাটিতে সীমিত আকারে খাদ্য সহায়তার অনুমতি দিয়েছে তার প্রশাসন। নেতানিয়াহু বলেছেন, (গাজার) জনগণকে ব্যবহারিক এবং কূটনৈতিক উভয় কারণেই দুর্ভিক্ষে ডুবে যেতে দেওয়া উচিত নয়। টেলিগ্রাম চ্যানেলের এক পোস্টে একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন নেতানিয়াহু। সেখানে বলেছেন, ইসরাইলের মিত্ররাও এমন গণদুর্ভিক্ষের চিত্র সহ্য করবে না।
তবে ওয়াশিংটন পোস্টের ওই প্রতিবেদন অস্বীকার করেছেন মার্কিন এক কর্মকর্তা। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়া আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টাইমস অব ইসরাইল। সেখানে একজন মার্কিন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃতি করা হয়েছে। যিনি বলেছেন, ওয়াশিংটন এবং ইসরাইলের মধ্যে মতবিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু আমরা তেল আবিবকে পরিত্যাগ করব এই ধারণাটি হাস্যকর।

ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে জিতল কি চীন -বিবিসি

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই মাসে চার দিনের সংঘর্ষ যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়েছে এবং উভয় পক্ষই বিজয় দাবি করেছে। তবে দেখা যাচ্ছে, চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পও এ সংঘর্ষে থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে বিজয়ী বা লাভবান হতে পারে।

সাম্প্রতিকতম এ সংঘর্ষের শুরু ৭ মে। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র পেহেলগামে গত ২২ এপ্রিল বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হন, যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন পর্যটক। এ ঘটনার জেরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে হামলা চালায় ভারত।

পেহেলগামের ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের অনেকে তাঁদের স্ত্রী ও পরিবারের অন্য স্বজনদের সামনে নিহত হন। নয়াদিল্লি এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন গোষ্ঠীগুলোর পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ইসলামাবাদকে দায়ী করে, যা পাকিস্তান অস্বীকার করে।

‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে ভারতের চালানো এ হামলার পরপরই উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান শুরু করে। এসব অভিযানে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তান তার পাল্টা অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন বুনইয়ান-উন-মারসুস’।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘর্ষে ভারত ফরাসি ও রুশনির্মিত যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে। অন্যদিকে, পাকিস্তান ব্যবহার করে চীনের সঙ্গে তাদের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত জে-১০ ও জে-১৭ যুদ্ধবিমান। ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের দাবি, তাদের যুদ্ধবিমান সীমান্ত অতিক্রম করেনি ও দূরত্ব বজায় রেখে একে অপরের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

ইসলামাবাদ দাবি করে, তাদের যুদ্ধবিমান অন্তত ছয়টি ভারতীয় যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছে, যার মধ্যে নতুন করে কেনা ফরাসি রাফালও রয়েছে। দিল্লি এ দাবির কোনো জবাব দেয়নি।

‘ক্ষতি যুদ্ধের অংশ’—ভারতীয় বিমানবাহিনীর (আইএএফ) এয়ার মার্শাল এ কে ভারতি ওই দাবি প্রসঙ্গে গত সপ্তাহে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন। তবে পাকিস্তান ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করেছে, নির্দিষ্ট এ দাবি নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

‘আমরা আমাদের নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো অর্জন করেছি এবং আমাদের সব পাইলট ঘরে ফিরে এসেছেন’, যোগ করেন এ কে ভারতি।

ভারত দাবি করে যে তারা পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবা ও জইশ-ই-মুহাম্মদের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে অন্তত ১০০ ‘সন্ত্রাসী’ হত্যা করেছে।

এ আকাশযুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা এখনো স্পষ্ট নয়। কিছু সংবাদমাধ্যম পাঞ্জাব ও ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর দিয়েছে। তবে ভারত সরকার এসবের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সম্ভবত চীনা-নির্মিত জে-১০ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ভারতীয় যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে আকাশ থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এ সক্রিয় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ব্যাপকভাবে চীনা অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে পাকিস্তানের বিজয় দাবি করাকে কিছু বিশেষজ্ঞ বেইজিংয়ের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন, যদিও অনেকে এ দাবির সঙ্গে একমত নন।

কিছু বিশেষজ্ঞ এটিকে চীনের অস্ত্রশিল্পের জন্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেন। এ বক্তব্যের মাধ্যমে চলতি বছরের জানুয়ারিতে একটি চীনা এআই স্টার্টআপ তাদের সাশ্রয়ী প্রযুক্তি দিয়ে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টদের চমকে দেওয়ার ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে।

‘এ আকাশযুদ্ধ ছিল চীনা অস্ত্রশিল্পের জন্য এক বিশাল বিজ্ঞাপন। এখন পর্যন্ত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজের প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষার কোনো সুযোগ চীনের হয়নি’, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র কর্নেল ঝৌ বো বলেন বিবিসিকে।

কর্নেল ঝৌ বো বলেন, এ আকাশযুদ্ধের ফলাফল এটিই দেখিয়েছে, ‘চীনের এমন কিছু ব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলো তুলনাহীন।’ ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে জে-১০ যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর গত সপ্তাহে এ বিমান নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান অ্যাভিক চেংদু এয়ারক্রাফট নামের প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়।

তবে অন্য কয়েকজন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চীনা অস্ত্র ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করার সময় এখনো আসেনি।

লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক ওয়াল্টার ল্যাডউইগ বলেন, চীনা যুদ্ধবিমানগুলো প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিমানগুলো, বিশেষ করে রাফালকে কৌশলে হার মানিয়েছে কি না, তা এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।

‘সামরিক কৌশলের সাধারণ নীতি হলো, স্থলভাগের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগে শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আক্রমণ করে আকাশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় বিমানবাহিনীর অভিযানের লক্ষ্য স্পষ্টতই পাকিস্তানকে কোনো সামরিক জবাব দিতে উসকানি দেওয়া ছিল না’, বলেন ল্যাডউইগ।

এই অধ্যাপক মনে করেন, পাকিস্তানের পুরো বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যখন সর্বোচ্চ সতর্কতাবস্থায় ছিল এবং তাদের যুদ্ধবিমান আকাশে ছিল, তখন ভারতীয় পাইলটদের অভিযানে যাওয়ার নির্দেশে দেওয়া হয়। ভারতীয় বিমানবাহিনী তাদের মিশনের বিস্তারিত বা কৌশলগত তথ্য প্রকাশ করেনি।

জে-১০ যুদ্ধবিমান রাফালসহ ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, এমন প্রতিবেদনগুলোর বিষয়ে বেইজিং এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। তবে জে-১০ একটি পশ্চিমা অস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে, এ অনিশ্চিত খবরাখবর চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজয়োল্লাস তৈরি করেছে।

ইতালির ভেরোনাভিত্তিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষণা দল ‘স্টাডি অব সিকিউরিটি’র চীনবিষয়ক গবেষক কার্লোত্তা রিনাউডো বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য থেকে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে (জে-১০ দিয়ে পশ্চিমা অস্ত্রব্যবস্থা ধ্বংস করা) পৌঁছানো কঠিন হলেও চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জাতীয়তাবাদী বার্তায় ভরে গেছে।

‘এ মুহূর্তে বাস্তবতার চেয়ে ধারণাই বেশি প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে উঠেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রকৃত বিজয়ী আসলে চীনই’, বলেন এই গবেষক।

পাকিস্তান চীনের একটি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক মিত্র। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের অংশ হিসেবে চীন পাকিস্তানে অবকাঠামো নির্মাণে পাঁচ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করছে। অতএব, দুর্বল পাকিস্তান চীনের স্বার্থ নয়।

ভারত-পাকিস্তান এই সাম্প্রতিক সংঘাতে চীন গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য গড়ে দিয়েছে বলে মনে করেন পাকিস্তানি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইমতিয়াজ গুল। তিনি বলেন, ‘ভারতীয় পরিকল্পনাকারীদের জন্য এটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তারা সম্ভবত পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এতটা গভীর সহযোগিতার বিষয়টি কল্পনাও করেননি।’

বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চীনা যুদ্ধবিমানগুলোর নৈপুণ্য পশ্চিমা দেশগুলোতে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কারণ, এর প্রভাব বিশ্ব অস্ত্রবাণিজ্যে পর্যায়ক্রমিকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ, আর চীন রয়েছে চতুর্থ স্থানে।

চীন সাধারণত মিয়ানমার ও পাকিস্তানের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি করে। এর আগে চীনা অস্ত্রব্যবস্থাকে নিম্নমান ও কারিগরি সমস্যার জন্য সমালোচিত হতে হয়েছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে চীন ও পাকিস্তানের যৌথ নির্মিত জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানগুলোর বেশ কয়েকটি কারিগরি ত্রুটির কারণে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনীও চীনের তৈরি এফ-৭ যুদ্ধবিমান নিয়ে একাধিক কারিগরি সমস্যার অভিযোগ করেছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবারই প্রথম নয় যে ভারত পাকিস্তানের কাছে যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। ২০১৯ সালে পাকিস্তানে সন্দেহভাজন ‘সন্ত্রাসী’ ঘাঁটির ওপর ভারতের বিমান হামলার পর সংক্ষিপ্ত আকাশযুদ্ধে রুশনির্মিত একটি মিগ-২১ যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের ভূখণ্ডে গুলি করে ভূপাতিত এবং এর পাইলটকে আটক করা হয়। কয়েক দিন পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

যা–ই হোক, ভারতের জন্য এ পুরো ঘটনা (যুদ্ধবিমান খোয়ানো ও পাকিস্তানের পাল্টা হামলা) একটি সতর্কবার্তা বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে বেইজিং হয়তো সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের বিস্তারিত নিয়ে মন্তব্য না করতে পারে, কিন্তু তারা এটা দেখাতে আগ্রহী যে তাদের অস্ত্রব্যবস্থা দ্রুত পশ্চিমা দেশের সমকক্ষ হয়ে উঠছে।

দিল্লি জানে, চীন পাকিস্তানকে যে যুদ্ধবিমান দিয়েছে, সেগুলো তুলনামূলকভাবে আগের মডেলের। বেইজিং ইতিমধ্যে আরও উন্নত জে-২০ স্টিলথ যুদ্ধবিমান নিজেদের বাহিনীতে যুক্ত করেছে, যা রাডার এড়াতে সক্ষম।

ভারত ও চীনের মধ্যে হিমালয় অঞ্চলজুড়ে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে এবং ১৯৬২ সালে এক সংক্ষিপ্ত সীমান্ত যুদ্ধে ভারত পরাজিত হয়। ২০২০ সালের জুনে লাদাখে আবারও এক সংক্ষিপ্ত সীমান্ত সংঘর্ষ ঘটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করছে যে তাদের দেশি প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং আন্তর্জাতিক কেনাবেচার প্রক্রিয়াও দ্রুত করতে হবে।

তবে এ মুহূর্তে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে চীনের একটি যুদ্ধবিমানের সাফল্য দাবি করার পর দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প যেন আলোর কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের শুভেচ্ছা বিনিময়
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের শুভেচ্ছা বিনিময়। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া