Saturday, August 20, 2016

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পের নগ্ন মূর্তি

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ
ধরনের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে -ইউএসএ টুডে
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঢপ সাইজের নগ্ন মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে। মোটা পেট, ছোট আঙ্গুল ও বিশেষ কিছু অঙ্গ ছাড়া ট্রাম্পের মূর্তিগুলো বিশ্বব্যাপী আলোচনার খোরাকে পরিণত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মূর্তিগুলো শহরের উম্মুক্ত স্থানে দেখা যাচ্ছে বলে জানায় দ্য ইউএসএ টুডে। নিউইয়র্ক, সানফ্রান্সিসকো, লস অ্যাঞ্জেলস, ক্লিভল্যান্ড এবং সিয়াটলের জনারণ্যে স্থাপিত মূর্তিগুলোকে কেন্দ্র করে হাসি-তামাশা ও ফটোশেসনে মেতে উঠেছে লোকজন। ইনডেকলাইন নামক একটি সংগঠন এগুলো স্থাপন করেছে। সংগঠনটির একজন মুখপাত্র বলেন, রূপকথার ‘সম্রাটের নতুন কাপড়’ শীর্ষক গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মূর্তিগুলো তৈরি করা হয়েছে। ‘নপুংশক সম্রাট’ শিরোনামের একটি ব্যানারের আওতায় তারা ট্রাম্পের মূর্তিগুলো নির্মাণ করেছে।
রয়টার্স জানায়, নগ্ন ও বিকৃতভাবে উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পদপ্রত্যাশী এ সাবেক ক্যাসিনো ব্যবসায়ীকে সর্বোচ্চ হেনস্তা করা হয়েছে। ইনডেকলাইনের এক মুখপাত্র বলেন, ‘ট্রাম্প নিজেকে যতটা বৈপ্লবিক ব্যক্তি বলে দাবি করেন তিনি আসলে ততটাই পশ্চাদপদ চিন্তার অধিকারী।’ জিনজার নামে পরিচিত লাস ভেগাসের এক ভাস্কর এগুলো তৈরি করেন। ট্রাম্পের মূর্তিগুলো তৈরির জন্য তিনি ৩০০ পাউন্ড কাদামাটি এবং সিলিকন ব্যবহার করেছেন। কিছুদিন আগে বিভিন্ন দানবের ভাস্কর্য তৈরি করে দেশজুড়ে খ্যাতি পেয়েছেন জিনজার। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে তিনি বলেন, ‘দানবীয় অবয়ব তৈরিতে আমার পারদর্শিতার জন্য ইনডেকলাইনের পক্ষ থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ট্রাম্পকেও আমরা একটা দানব বলে মনে করি। এ কারণেই আমি দানবের আদলে তার মূর্তিগুলো তৈরি করে দিয়েছি।’ বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো নিউইয়র্কের ইউনিয়ন স্কয়ারে ট্রাম্পের কাপড়বিহীন মূর্তি স্থাপন করেছে ইনডেকলাইনের সদস্যরা। এরপর বাকি চার শহরেও দেখা যায় এ ধরনের মূর্তি। তবে বিকাল নাগাদ নিউইয়র্ক কর্তৃপক্ষ সরিয়ে ফেলেছে ইউনিয়ন স্কয়ারের মূর্তিটি। তাদের মুখপাত্র মায় ফার্গুসন বলেন, ‘অননুমোদিতভাবে পার্ক এলাকায় মূর্তি স্থাপন করায় তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া খুব ছোট কোনো ভাস্কর্য স্থাপন করাটাও এখানে অবৈধ।’
এদিকে অনলাইনে মূর্তিগুলোর ভিডিও প্রকাশ করেছে ইনডেকলাইন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে তা। মানুষের হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছে ট্রাম্প-মূর্তির ছবিগুলো। ৫৮ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বোনট বোরক্স জানান, ট্রেন থেকে নেমেই এমন কিছু দেখবেন বলে ধারণাই করেননি তিনি। মূর্তিগুলো অনেকের জন্য মজার উপাদান যোগাচ্ছে এবং বিস্ময় উপহার দিচ্ছে অনেক মানুষকে। বিভিন্ন ভঙ্গিতে মূর্তিগুলোর সঙ্গে সেলফি তুলতেও মেতে উঠেছেন অনেকে। এদিকে ট্রাম্পকে নিয়ে বিদ্রূপ শুরু হলেও বৃহস্পতিবার নর্থ ক্যারোলিনায় নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি। জনসভায় বক্তব্য দেয়ার সময় উল্টো নিজের ভুল স্বীকার করেছেন ট্রাম্প। বিভিন্ন সময় ব্যক্তিগতভাবে মানুষকে আক্রমণ করার জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে এবং উত্তপ্ত পরিবেশে বিতর্কের সময় অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক শব্দটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেক সময় ভুল শব্দ প্রয়োগ করেছি আমি। সেজন্য আমি অনুতপ্ত। তবে আপনারা নিশ্চিত থাকবেন যে আমি সবসময় সত্য কথাই বলব। সেটা কারও ভালো লাগুক অথবা না লাগুক।’
‘মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ নিষদ্ধি করা উচিত’, ‘মিডিয়া অসৎ’ ‘ওবামা আইএসের প্রতিষ্ঠা’, ‘কুটিল হিলারি’, ‘হিলারি দুর্নীতির রানী’ এবং সাংবাদিকদের উদ্দেশে নানা কটূক্তিসহ বিভিন্ন মন্তব্য করে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন এ বিলিওনিয়ার বিজনেস ম্যাগনেট। অন্যদিকে হ্যাকিংকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মার্কিন নির্বাচনী প্রচারণা। ডোনাল্ড ট্রাম্প, রিপাবলিকান দল এবং ডেমোক্রেটিক দলের কম্পিউটার সিস্টেম নেটওয়ার্ক হ্যাকাররা নষ্ট করার পাঁয়তারা করেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। রয়টার্স জানায়, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্বপ্রাপ্ত একজনের ই-মেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের শিকার বা ম্যালওয়ার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। তার সহকর্মীদেরও ভাইরাস আক্রান্ত মেইল পাঠানো হয়েছিল। রিপাবলিকান প্রার্থীদের এক প্রচারণাকারী এবং বাইরের একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এ তথ্য জানিয়েছেন।

৫ ডলার ভিক্ষা দিয়ে বিপাকে অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক ভিক্ষুককে ৫ ডলার (৩ পাউন্ড) ভিক্ষা দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল। প্রধানমন্ত্রীর এমন ক্ষুদ্র দানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো সমালোচনার ঝড় বইছে। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত এক ছবিতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী ভিক্ষুকের সামনে থাকা কফি কাপে পাঁচ ডলার গুঁজে দিচ্ছেন। এরপরই সমালোচকদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। খবর বিবিসির। এ ঘটনায় অনেকেই তাকে ‘কুঞ্জুস’ আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, টার্নবুলের মতো এমন ধনী ও ক্ষমতাধরের পক্ষে ভিক্ষুককে মাত্র পাঁচ ডলার দেয়া শোভা পায় না।
সমালোচকদের কারও কারও মতে, প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরার সামনে নিজের মহত্ব প্রচার করার জন্যই এ কাজ করেছেন। ডেইলি মেইলের খবরে টার্নবুলকে ‘কৃপণ ম্যাল (ম্যালকমের সংক্ষিপ্ত) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে সমালোচকদের আরেক দল বলছে, এভাবে ভিক্ষুককে অর্থ দেয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী দারিদ্র্যকে সমর্থন জানিয়েছেন। মেলবোর্নের মেয়র রবার্ট ডয়লি বলেছেন, ভিক্ষুককে সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের মাদক নেয়ার অভ্যাস ও দারিদ্র্যকে সমর্থন করা হয়। এমনকি ভিক্ষা দেয়ার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীকে দাতব্য সংস্থা খুলে বসার পরামর্শ দিয়েছেন রবার্ট। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার সমালোচকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন টার্নবুল। ‘থ্রিএডব্লিউ’ নামে মেলবোর্নের একটি রেডিওকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি ওই লোকটির প্রতি দুঃখবোধ করছিলাম। মানবিক কারণে তাকে ভিক্ষা দিয়েছিলাম। আমার আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’

আইএসের প্রতিষ্ঠাতা ওবামা-হিলারি?

গলাবাজ ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের নামোল্লেখ করেছেন। বস্তুত এ আবিষ্কারের কৃতিত্ব তার একার। আর এতে মুগ্ধ হয়ে অন্যের স্বীকৃতি লাভের আশায়ই হয়তো তিনি একই অভিযোগ পৃথকভাবে তুললেন তিনবার, তিন অনুষ্ঠানে। উপরন্তু তিনি যেভাবে কথাগুলো বলেছেন, তাতে ভদ্রলোকের মানসিক সুস্থতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে অনেকের। মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিরা বুদ্ধিদীপ্ত সমালোচনা গায়ে মাখেন না সাধারণত। তবে মজার বিষয় হল, ট্রাম্প যতবারই এ ধরনের কথা বলেছেন আর যতবারই তার বক্তব্যগুলোকে ধোলাই করা হয়েছে, তার নির্বিকার উত্তর ছিল- আরে, ওসব তো আমি আক্ষরিক অর্থে বলিনি; ওগুলো আমার বিদ্রূপ বাণ। সমালোচনা থেকে আত্মরক্ষার এ এক কৌশল বটে! ট্রাম্পের অভিযোগ ভিত্তিহীন হলেও এক্ষেত্রে বাস্তবতা হল, যুক্তরাষ্ট্র আইএসের মতো জঙ্গিদের সহায়তা দিচ্ছে বলে সন্দেহ অনেকের। সেজন্য কিছু ক্ষেত্রে এমন বিভ্রান্তিও ছড়িয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রই বুঝি আইএসের চালক। অভিযোগটি অবশ্যই মিথ্যা। তবে সংশয়টি সৃষ্টির কারণ মূলত কয়েকটি পক্ষের সঙ্গে ওয়াশিংটনের মাখামাখি সম্পর্ক। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অভিযোগ আছে, সিরিয়া ও ইরাকে জঙ্গিবাদে মদদ দিচ্ছে ওবামা প্রশাসন; তাও আবার এমন সব গ্রুপকে,
কাজেকর্মে যাদের নৃশংসতা এরই মধ্যে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে স্বপ্রতিশ্রুত ‘মধ্যপন্থা’কে। অভিযোগটির প্রধান ভিত্তি ওয়াশিংটন টাইমসের এই প্রতিবেদন : ‘২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে সিংহাসনচ্যুত করতে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক এক প্রতিরক্ষা কোম্পানি থেকে কিছু সশস্ত্র লিবীয় গোষ্ঠীকে অস্ত্র-গোলাবারুদের চালান পাঠানোর অনুমতি দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর; যদিও সে সময় দেশটির ওপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল।’ তাছাড়া জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের দাবি, ‘উইকিলিকসের ১৭০০ ই-মেইল প্রমাণ করে, বেনগাজির সিআইএ অপারেটরদের মাধ্যমে লিবিয়া থেকে সিরিয়ায় পাঠানো অস্ত্রের চালান বিষয়ে পূর্ণ সচেতন ছিলেন হিলারি এবং অস্ত্রগুলো আইএসের হাতে পড়া অস্বাভাবিক নয়।’ অথচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কংগ্রেসের সামনে তিনি অঙ্গীকারনামা দিয়েছেন এর উল্টোটা। এ অবস্থায় শপথপূর্বক মিথ্যা বলার অপরাধে হিলারিকে জেলে দেখতে চান সিনেটর র‌্যান্ড পল! এই গেল একদিক। অন্যদিকে প্রধান ইরাকি শহর বিশেষত মসুল থেকে আইএস দমনে ইরাকি সেনাবাহিনী ও ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধে ইউএস স্পেশ্যাল ফোর্স ও মেরিন। এদের মধ্যে অনেকেই মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ে আসছে ২০০২ সাল থেকে। আবার আমেরিকান বদান্যতায় ঠিক কৃতজ্ঞবোধ করেন না সব ইরাকি শিয়া।
যেমন- প্রভাবশালী শিয়া নেতা মুকতাদা আল সদরের সন্দেহ, কাজ শেষে আমরাই হয়তো তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হব। লক্ষণীয়, স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে তোলা সন্দেহজনক এসব সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই মার্কিন নিন্দার মূল কারণ। একই দৃষ্টান্ত মেলে মিসরেও। ওবামা ও হিলারি উভয়ে মিসরে হস্তক্ষেপ করেন সম্মিলিতভাবে; প্রথমে হোসনি মোবারকের সরকার উৎখাতে সহায়তা করে এবং পরে দেশ পরিচালনায় মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসিকে আশীর্বাদ দিয়ে। কারও কারও ধারণা, ব্রাদারহুডের চুক্তি হয়েছিল ওয়াশিংটনের সঙ্গে; নইলে ৩০ মিলিয়ন জনসমর্থনের বাইরে গিয়ে এমন নির্লজ্জভাবে ব্রাদারহুডের পক্ষ নিত না তারা। লক্ষণীয়, বর্তমান প্রেসিডেন্ট আল সিসি’র সরকার ক্ষমতায় আসার পরপর এফ-১৬ ও অ্যাপাচি যুদ্ধবিমানের একটি চালান আটকে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। শোনা যায়, এমনকি মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যান পিটারসন জেলে গিয়ে মুরসিকে আশ্বাস দিয়ে আসেন, চিন্তা কর না! ব্রাদারহুডের প্রতি সহানুভূতিপরায়ণ একাধিক ব্যক্তি রয়েছে মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে (হিলারির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হুমা আবেদীনের সঙ্গে ব্রাদারহুডের সম্পর্ক প্রায় কয়েক প্রজন্মের)। মুসলিম ব্রাদারহুডের সাবেক মুখপাত্র জিহাদ আল হাদ্দাদ ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের সাবেক কর্মী। প্রেসিডেন্টের গোপন নথি দেখার সুযোগ রয়েছে এমন একজন বলেছিলেন, ব্রাদারহুডকে ক্ষমতাসীন রাখাই ছিল ওবামার মিসর নীতি। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্র দফতরকে ব্রাদারহুডের সঙ্গে বেশি মাখামাখির জন্য তীব্র নিন্দা করেছেন কয়েকজন প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর। তাদের বক্তব্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসরের মতো একাধিক মিত্র দেশ দ্বারা চিহ্নিত একটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে দেয়া যায় না লাল গালিচা অভ্যর্থনা।
মনে করিয়ে দিচ্ছি, সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা পেতে যেসব যোগ্যতার প্রয়োজন হয় সেগুলো মুসলিম ব্রাদারহুডের রয়েছে কিনা, না থাকলে কোন কোন যোগ্যতা নেই তা জানতে চেয়ে গত বছর মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে বিল পাঠান সিনেটর টেড ক্রুজ। ওই বিলই আটকে দেয়া হয়েছে চলতি বছর মে’তে। একই রকম মাখামাখি সম্পর্ক যুক্তরাজ্যেরও রয়েছে কয়েকটা। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন একবার কমিশন গঠন করেন যুক্তরাজ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের উৎপত্তি-বিকাশ, সংগঠনটির আদর্শ ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে। যদিও ওই কমিশন গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্রাদারহুডের প্রকৃত পরিচয় উদ্ঘাটনে ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা। প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, ব্রিটেনে এক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনকে মদদ দিচ্ছে মুসলিম ব্রাদারহুড এবং তাদের গোপন কর্মকাণ্ডগুলো ব্রিটিশ মূল্যবোধ এবং ব্রিটেনের স্বার্থ ও নিরাপত্তা পরিপন্থী। এর ভিত্তিতে ব্রাদারহুডকে যেন আবার নিষিদ্ধ করা না হয় সেজন্য নাকি ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের একরকম শাসানোই হয় যে, সংগঠন নিষিদ্ধ হলে চোরাগোপ্তা হামলা হবে। বলা বাহুল্য, তাতে ভালোই কর্ণপাত করেছিলেন ক্যামেরন। এখন ব্রিটিশ সরকার আলগা খাতির করতে তথা লন্ডনে আশ্রয় নিতে পরোক্ষভাবে মুসলিম ব্রাদারহুড কর্মী-সমর্থকদের উসকাচ্ছে। আশ্চর্য ব্যাপার! এ ব্রিটেনই না কয়েকদিন আগে অভিবাসন ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে পৃথক হয়ে গেল; এরাই না মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থী নিতে অনিচ্ছুক; এরাই না এমনকি ইউরোপীয় অভিবাসীদেরও নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে ধীরে ধীরে! কীভাবে তারা ব্রাদারহুডকে বলতে পারল, ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই কর,
লন্ডনের দুয়ার তোমাদের জন্য খোলা! কয়েকটি কারণে এ আহ্বান আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়। সিনিয়র ব্রাদারহুড নেতারা এখনও মিসরের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিআইপি মর্যাদা পান। সেসব ছেড়ে ট্রলারে চড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর তারা পাড়ি দিতে যাবেন কোন দুঃখে? সাম্প্রতিক সময়ে যতগুলো দেশের বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে, প্রতিটি দেশকে সহায়তা ও সহানুভূতি জুগিয়েছে যুক্তরাজ্য। অথচ শারম আল শেখের ঘটনায় মিসর আপ্যায়িত হল ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দ্বারা। ওদিকে মিসরীয় মুসলিম ব্রাদারহুড নেতাকর্মীদের নিয়ে দুঃখে কতিপয় ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকের প্রাণ যায় যায়। অবশ্যই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের লড়াই নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই আমার। এটাও পরিষ্কার যে, ওবামা বা হিলারি কেউই আইএস সৃষ্টির জন্য দায়ী নন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে যে, সে সম্পর্কগুলো হয়ে উঠেছে একেকটা জটিলতার গুদাম। সেখান থেকে সরল অথচ ভ্রান্ত অনুমান অস্বাভাবিক নয়। এতে সাময়িক অন্ধত্বও সৃষ্টি হতে পারে। সেজন্যই হয়তো ব্রিটিশ সরকার দেখছে না, লন্ডনে সর্বসমক্ষে সারাক্ষণ আইএসের কালো পতাকার ছায়া উড়ছে পতপত করে।
গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : জায়েদ ইবনে আবুল ফজল
লিন্ডা এস হার্ড : ব্রিটিশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শিক্ষাব্যবস্থা নালন্দা থেকে কতটা এগোলো?

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ অব্দে প্রাচীন ভারতবর্ষের মাটিতে গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবের পর বৌদ্ধ ধর্মদর্শন ও বৌদ্ধ মতবাদের জন্ম হয়। গৌতম বুদ্ধ ধর্ম প্রচারের পর বিহারগুলোকেই নির্ধারণ করেছিলেন বিদ্যা ও জ্ঞানচর্চার প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে। শুধু ধ্যান-সমাধি কিংবা অধ্যাত্মচর্চা নয়, মানববিদ্যার সব গুণাবলি অর্জনের জন্য তিনি এ বিহার বা সংঘারামকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ওইসব বিহার বা সংঘারামেই পালিভাষা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং ধর্মদর্শনসহ নানাবিধ শাস্ত্র ও বিদ্যাচর্চা করা হতো। গুরুর সান্নিধ্যে থেকেই এ পাঠ গ্রহণ করা হতো। ক্রমান্বয়ে ওইসব বিহার, সংঘারাম ও মঠ-মন্দিরগুলো এক একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়রূপে পরিগণিত হয়, যার মধ্যে নালন্দা অন্যতম। বৌদ্ধ বিদ্যাচর্চা ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে প্রাচীন নালন্দার প্রভাব অতুলনীয়। বৌদ্ধ বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞানচর্চার খ্যাতিতে এ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সে সময়ের একটি সেরা শিক্ষাকেন্দ্র। শিক্ষার্থীদের পদচারণায় আবার মুখর হয়ে উঠেছে ভারতের বিহার রাজ্যে অবস্থিত সেই প্রাচীন নালন্দা। প্রায় ৮০০ বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রাচীন এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। ১ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে এ ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম আবার চালু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন যাত্রা বর্তমান ভারত সরকার ও পূর্ব এশিয়া সম্মেলনভুক্ত (ইএএস) ১৮টি দেশের একটি মহৎ উদ্যোগের ফসল। ২০১৩ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ব্রুনাই সফরকালে অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ ইএএসভুক্ত ৭টি দেশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন।
এছাড়া ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামেরও বড় ভূমিকা ছিল এ বিষয়ে। তিনি চেয়েছিলেন তার জীবদ্দশায় প্রাচীন এ বিশ্ববিদ্যালয় যেন আবার নতুনভাবে জ্ঞান বিতরণে জেগে ওঠে। ভারতের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্ষদের পুনঃপ্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন। নালন্দা শুধু প্রাচীন ভারতবর্ষের নয়, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বিদ্বৎসমাজকে অভিভূত করেছে তার শিক্ষা পাঠক্রম ও জ্ঞান শিক্ষার মাধ্যমে। এজন্যই এখনও এ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের পণ্ডিত ও বিদ্বৎসমাজকে প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি ও ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন শাখার শাস্ত্রশিক্ষা ও ধর্মদর্শনকে প্রাধান্য দেয়া হলেও জ্ঞানমুখী অন্যান্য বিষয়কে সমান মর্যাদা দিয়েছে। তাই সেখানে পড়ানো হতো বৈদিক, ব্রাহ্মণ্য ও তৎকালীন ব্যবহারিক বিষয়গুলো। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং নালন্দার পাঠক্রমের কথা বলতে গিয়ে পাঁচটি বিদ্যার কথা উল্লেখ করেছেন : ক. শব্দবিদ্যা (ব্যাকরণ ও দর্শন), খ. চিকিৎসাবিদ্যা (ভেষজ ও আয়ুর্বেদ), গ. হেতুবিদ্যা (যুক্তি ও তর্কশাস্ত্র), ঘ. শিল্পবিদ্যা (শিল্পকলা ও চারুকলা), ঙ. অধ্যাÍবিদ্যা (ধ্যান-সমাধিস্থ বিদ্যা ও অধিবিদ্যা)। এছাড়াও সেখানে পড়ানো হতো বেদ, সংখ্যাদর্শন, অর্থশাস্ত্র ও অথর্ববিদ্যা। পরবর্তীকালে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ১৮টি বিদ্যাশিক্ষার প্রবর্তন হয়েছিল। এর মধ্যে বেদ, উপনিষদ ও অর্থশাস্ত্র তো ছিলই, আরও যুক্ত হয় পুরাণ, দর্শন, স্মৃতি, ধনুর বেদ, গান্ধর্ব বেদ, তর্কশাস্ত্র, হেতুবিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, গজশাস্ত্র, ধর্মশাস্ত্র, ন্যায়শাস্ত্র, ব্যাকরণশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিত, চিত্রাংকন ইত্যাদি।
পরবর্তী সময়ে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয় অভিধর্মকোষ ও জাতকমালা। এর আরও পরে, বিশেষ করে পাল শাসনামলে প্রাচীন নালন্দায় মহাযান বৌদ্ধধর্মের তন্ত্রযান, মন্ত্রযান, বজ যানসহ সে সময়কার বৌদ্ধধর্মের জ্ঞানচর্চার নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। প্রাচীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন জনপদের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সঙ্গে এশীয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, প্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি ইউরোপ থেকেও শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জনের জন্য নালন্দায় এসেছেন। উল্লেখ্য, এ বিদ্যাপীঠে যে ব্যাকরণ শিক্ষা দেয়া হতো তা ছিল অতি উচ্চমার্গীয়। যেমন- এখানে পাণিনির সূত্র, উপনিষদ সূত্র, ধাতুপাঠ, অষ্টধাতু, বেদ্বৃত্তি, কচ্চায়ন, বুত্তোদয়সহ নানা ব্যাকরণের পাঠদান করা হতো। প্রাচীন শিক্ষা পদ্ধতিতে গুরু-শিষ্য নিকটবর্তী শিক্ষা প্রচলন ছিল। গুরু ছিলেন শিষ্যদের অভিভাবক, বন্ধু, পথপ্রদর্শক এবং চিন্তা ও দার্শনিক তত্ত্বের সমাধানকর্তা। গুরুগৃহে ধর্মগ্রন্থ ও বুদ্ধবাণীর চর্চা হতো। তাই প্রাকবৌদ্ধ যুগে এবং বুদ্ধ সমকালীন কিংবা এর পরবর্তী সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল গুরুগৃহ অথবা বিহার, মঠ ও আশ্রমভিত্তিক। শুধু বৌদ্ধ শিক্ষাপদ্ধতি নয়, বৈদিক শিক্ষাপদ্ধতিও ছিল সেরকম। এ শিক্ষা পদ্ধতিতে নৈতিক, আদর্শিক ও অন্তর্মুখী শিক্ষার উৎকর্ষকেই প্রাধান্য দেয়া হতো। ওই শিক্ষাব্যবস্থাতেই, বিশেষ করে বৌদ্ধধর্মের শিক্ষাপদ্ধতিতে উঁচু-নিচু, জাতপাত এবং ধর্ম ও বর্ণ বৈষম্যের প্রথা বিলুপ্ত হয়েছিল। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত ছিল বিহারের নালন্দা নগরে। মাটি খুঁড়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের নথিভুক্ত প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যে পাঠাগারটি ছিল সেটি বিশ্বের সেরা ১১টি প্রাচীন পাঠাগারের অন্যতম। পাঠাগারটি সে সময়ের জগদ্বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিদের পদচারণায় মুখর হয়ে থাকত।
বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে ছিল ‘পুস্তক সংগ্রহশালা’। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে পুস্তক ও পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ছিল কয়েক লাখ। পাণ্ডুলিপি ও পুস্তকবিন্যাস এমনভাবে সজ্জিত ছিল যাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার বিঘ্ন না ঘটে। পাণ্ডুলিপিগুলো পাথরের তাকের ওপর সুসজ্জিত ছিল। পাণ্ডুলিপিসহ গ্রন্থাগারের নানা দায়িত্বে ছিলেন বিভিন্ন বিভাগের পণ্ডিত শিক্ষকরা, যাতে শিক্ষার্থীরা সহজে তাদের গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপিগুলো শনাক্ত করতে পারে। নালন্দায় তিন ধরনের পাণ্ডুলিপি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। যেমন- নেপালের অষ্টসহসি কা প্রজ্ঞাপারমিতা, বুডলিয়ান লাইব্রেরিতে রক্ষিত একই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি, রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটিতে রক্ষিত একই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির অনুলিপি। এখানে চামড়া ও তালপত্রের নানা লিপির পাণ্ডুলিপিও ছিল। এমনকি পণ্ডিতদের হস্তলিপির পাণ্ডুলিপিও ছিল। সে সময় পণ্ডিতদের মৃত্যু হলে তাদের হস্তলিপি ও পাণ্ডুলিপিগুলো ওই লাইব্রেরিতেই দান করে দেয়া হতো। হিউয়েন সাং তার ভ্রমণ বিবরণীতে নালন্দায় সাতটি বিহার ও আটটি হলের কথা উল্লেখ করেছেন। এ বিহারগুলো ছিল বহুতলবিশিষ্ট এবং বিভিন্ন সারিবদ্ধ কক্ষে সুবিন্যস্ত। পরিব্রাজক ইৎসিং বলেছেন, তিনি তার ভ্রমণকালে সেখানে ৩০০টি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট দেখেছেন। চারতলাবিশিষ্ট সাতটি ছাত্রাবাসও ছিল, যেখানে ভিক্ষু-শ্রমণসহ শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার এবং শিক্ষক সংখ্যা ছিল ২ হাজারের বেশি। ৪২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় ১১৯৭ সাল পর্যন্ত উপমহাদেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বৌদ্ধধর্মচর্চার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্ত রাজাদের সময়ে এ মহাবিহারের প্রতিষ্ঠা হয়। গুপ্তযুগের পাঁচজন রাজা নালন্দায় পাঁচটি বিহার নির্মাণ করেন। হিউয়েন সাং নালন্দার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গুপ্তযুগের প্রথম রাজা শক্রাদিত্যের নাম উল্লেখ করেছেন। সে সময় আটটি শিক্ষায়তন নিয়ে বিশ্ববিখ্যাত এ মহাবিহার গড়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা সেখানে সহজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেত না। প্রথমে দ্বার পণ্ডিতের কাছে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে তবেই ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেত। শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায়ও অংশগ্রহণ করতে হতো। এমনকি তাদের পোশাক-পরিচ্ছদসহ বাহ্যিক আচার-আচরণও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতো। প্রকৃত শিক্ষার্থী বাছাইয়ের এ পদ্ধতি বর্তমান সময়েও প্রয়োগ করা উচিত।
আজকাল এসব রীতি ও নিয়ম কানুন মানা হয় না বলেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে নৈতিক অবক্ষয় দেখা যায়। সে সময়ে ২০ বছরের নিচে কোনো শিক্ষার্থীকে নালন্দায় পড়াশোনার সুযোগ দেয়া হতো না। এতে প্রমাণ হয়, স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই এখানে ভর্তির সুযোগ পেত। এমনকি রাজপরিবারের সন্তানও যোগ্যতার অভাবে প্রত্যাখ্যান হতো। এখানে ছাত্রত্ব লাভ করা অতি গৌরবের বিষয় ছিল। শিক্ষার ব্যাপারে ছাত্রদের স্বাধীনতা ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক ও আলোচনা হতো যুক্তিতর্কের মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে ছাত্রদের জ্ঞান ও বিদ্যার গভীরতা নির্ণয় করা হতো। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীর জীবন যাতে পরিপূর্ণ জ্ঞান, যুক্তি-তর্ক, নিয়মানুবর্তিতা ও সময়জ্ঞানে আদর্শিকভাবে গড়ে ওঠে, সেটাই ছিল নালন্দার শিক্ষাপদ্ধতির অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমানে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে কঠোর নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষাপদ্ধতি দেখা যায়, তা প্রাচীন নালন্দার শিক্ষাপদ্ধতিরই আধুনিক রূপ। শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিদ্যা ও শাস্ত্রচর্চায় নালন্দা ছিল ভারতীয় জ্ঞানভাণ্ডারের এক মহান বিদ্যাপীঠ, যার আলোকরশ্মি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে আধ্যাত্মিক শিক্ষার পাশাপাশি বৌদ্ধশাস্ত্র ও ধর্মদর্শন, পালি, প্রাকৃত, সংস্কৃতসহ চারু ও কারুকলা, শরীরতত্ত্ব, গণিত, জোতির্বিদ্যা, রাজনীতি ও সমরনীতি চর্চায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সারা বিশ্বে অগ্রগামী ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষদিকে অর্থাৎ ১১৯৭ সালে তুর্কি বিজেতা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ভারতবর্ষে অভিযানের সময় এ বিশ্ববিদ্যালয়কে যুদ্ধশিবির মনে করে ধ্বংস করে দেন। কিংবদন্তি আছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির পাঠাগার পুড়ে শেষ হতে প্রায় এক মাস সময় লেগেছিল। বহুদূর থেকে এ আগুন চোখে পড়ত বলে বিভিন্ন প্রামাণ্য পুস্তকে উল্লেখ আছে। উল্লেখ্য, এ বিশ্ববিদ্যালয় যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তখন ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড, ইতালির বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয় সবেমাত্র যাত্রা শুরু করে।
প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন বাংলাদেশ চ্যাপ্টার
skbaruadu@gmail.com

৪০০ মিটার হার্ডলসের স্বর্ণ ডালিয়াহ মুহাম্মাদের

মেয়েদের ৪০০ মিটার হার্ডলসে স্বর্ণ জিতেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালিয়াহ মুহাম্মাদ। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ডেনমার্কের সারা স্লট পিটারসেন রুপা ও যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাশলি স্পেন্সার ব্রোঞ্জ পেয়েছেন। রিও গেমসের ত্রয়োদশ দিন বাংলাদেশ সময় শুক্রবার সকালে বৃষ্টির মধ্যে দৌড় শুরুর পর প্রথম হার্ডল সবার আগেই পার হন মুহাম্মদ। দৌড়ের কোনো সময়ই মনে হয়নি প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে টপকাতে পারবে। মুহাম্মাদ সময় নেন ৫৩.১৩ সেকেন্ড,
যা পিটারসেনের চেয়ে ০.৪২ সেকেন্ড কম। এ বছর দ্রুততম টাইমিং নিয়েই রিওতে এসেছিলেন ২৬ বছর বয়সী মুহাম্মাদ। তাই স্বপ্ন দেখছিলেন অলিম্পিক স্বর্ণের। স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পর তিনি বলেন, ‘জয়ের বাস্তবতা স্বপ্নের চেয়েও মধুর। আমার নামের আগে এখন থাকবে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন।’ ওয়েবসাইট।

এবার মিউজিক ভিডিওর মডেল হলেন বাঁধন

টিভি পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরি হক বাঁধন। নাটক নিয়ে সারা বছরই ব্যস্ততা তার। এর বাইরে নিয়মিত টিভি অনুষ্ঠানও উপস্থাপনা করছেন তিনি। সম্প্রতি প্রথমবারের একটি গানের মিউজিক ভিডিওতে অংশ নিলেন এ তারকা। শিশুশিল্পী আতিকা রহমান মম’র ‘আমি শিশু হয়ে থাকবো’ গানের ভিডিওতে মডেল হিসেবে দেখা যাবে তাকে। এ প্রসঙ্গে বাঁধন বলেন, ‘গানটির কথা দারুণ লেগেছে আমার কাছে। মিউজিক ভিডিওটির গল্পটিতেও কিছুটা বৈচিত্র্য রয়েছে। এ কারণেই এতে অভিনয় করা। একজন মা তার মেয়ের জন্য যেরূপ মমতা অনুভব করেন,
তেমনি একটি মেয়ের মধ্যেও তার মায়ের জন্য ভালোবাসা জন্মায়। এই গানটির ভিডিওতে মা-মেয়ের মধ্যকার মধুর সম্পর্ক দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।’ গানটিতে বাঁধনের মেয়ের চরিত্রে শিল্পী নিজেই অভিনয় করেছে। মনিরুজ্জামান মনিরের কথায় গানটির সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন আলাউদ্দিন আলী। মিউজিক ভিডিওটি নির্মাণ করেছেন মো. আতিকুর রহমান। ভিডিওটির নৃত্য পরিচালনা করেছেন মাসুম বাবুল ও চিত্রগ্রহণ করেছেন আনোয়ারুল ইসলাম। গানের ভিডিওটি চলতি সপ্তাহেই ইউটিউবসহ দেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রকাশ করা হবে।

রূঢ় কথায় মানুষকে আহত করার জন্য দুঃখিত: ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প
দুঃখপ্রকাশের মতো বিরল ঘটনার জন্ম দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বিতর্কিত ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যে এক জনসভায় ট্রাম্প বলেছেন, রূঢ় বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষকে আহত করার জন্য তিনি দুঃখিত। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ইরানকে বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি আবারও ‘মুক্তিপণ দেওয়ার’ জন্য প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নিন্দা করেন। এদিনই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ওই অর্থ দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও বলেছে, তা মুক্তিপণ নয়; বরং ইরানের পাওনা অর্থ। এদিকে গতকাল শুক্রবার পদত্যাগ করেছেন ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা দলের চেয়ারম্যান পল ম্যানাফোর্ট। আগের দিন শার্লট শহরে আয়োজিত সভায় ট্রাম্প বলেন, ‘অনেক সময় উত্তপ্ত তর্কবিতর্কের মধ্যে কিংবা অনেকগুলো বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ভুল শব্দ প্রয়োগ করা হয়ে যায়।... আমিও তা করেছি। বিশ্বাস করুন আর না-ই, আমি এতে দুঃখিত।’ এ সময় দর্শকসারি থেকে হাসি ও প্রশংসাধ্বনি শোনা যায়। এ বছর জানুয়ারিতে একটি বন্দিবিনিময় চুক্তির অধীনে ইরান সে দেশের কারাগারে আটক পাঁচ মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দিয়েছিল।
ঠিক প্রায় একই সময় যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে মার্কিন ব্যাংকে জব্দ থাকা ইরানি অর্থের মধ্যে ৪০ কোটি ডলার ফেরত পাঠিয়েছিল। সভায় ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও অভিযোগ করেন, ওই অর্থ ইরানকে মুক্তিপণ হিসাবেই দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ইরানকে এই অর্থ দেওয়ার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইতিপূর্বে মিথ্যা বলেছেন। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, এই ‘মুক্তিপণ’দেওয়ার ফলে বিদেশে অবস্থানরত মার্কিন সেনাসদস্য ও সাধারণ নাগরিকদের বিপদ আরও বেড়ে গেল। ইরানকে এই অর্থ দেওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্পের দলের নেতারা এর আগেও অভিযোগ করেছেন। দুদিন আগে প্রভাবশালী ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকায় জানানো হয়, মুক্তি পাওয়া মার্কিন নাগরিকেরা বিমানে না চড়া পর্যন্ত ওই অর্থ ইরানের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি। একটি বিশেষ বিমানে করে ৪০ কোটি ডলার সমমূল্যের অর্থ ইউরো ও অন্যান্য মুদ্রায় পাঠানো হয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আরও লিখেছে, এ থেকে প্রমাণিত হয়—যুক্তরাষ্ট্র ওই অর্থ মুক্তিপণ হিসাবেই ব্যবহার করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এ কথা উল্লেখ করেই ওবামা প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন। সমালোচনার জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জন কারবি বলেছেন, সর্বাধিক চাপ বজায় রাখার জন্য বন্দী মার্কিনরা বিমানে না ওঠা পর্যন্ত অর্থ হস্তান্তর করেনি যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, যে অর্থ ফেরত পাঠানো হয়েছে, তা ইরানেরই প্রাপ্য; ইসলামি বিপ্লবের আগে অস্ত্র কেনা বাবদ দেশটি ওই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছিল। কিন্তু সেই অস্ত্র কখনোই ইরানকে পাঠানো হয়নি। জন কারবি বলেন, হেগ-এর আন্তর্জাতিক সালিস আদালতের দেওয়া রায়ের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র সুদসহ সব মিলিয়ে ১৭০ কোটি ডলার ফেরত দিতে সম্মত হয়েছে। বন্দী মুক্তির সময় দেওয়া অর্থ তারই অংশ। একই দিন ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে নতুন করে আক্রমণের শিকার হয়েছেন হিলারি ক্লিনটন। ট্রাম্প ও বিভিন্ন রিপাবলিকান নেতা অভিযোগ করেছেন, হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় তাঁর মাধ্যমে মার্কিন সরকারের সুনজর পাওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার ক্লিনটন ফাউন্ডেশনকে মোটা অঙ্কের অনুদান দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এক ঘোষণায় এই ফাউন্ডেশন জানায়, হিলারি ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তারা বিদেশি সরকারের কাছ থেকে কোনো অনুদান নেবে না। এই সংস্থার প্রধান প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেছেন, এখন থেকে নভেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত তিনি নিজেও অর্থের বিনিময়ে কোনো ভাষণ দেবেন না। 

ভিক্ষা দিয়ে বিপাকে প্রধানমন্ত্রী!

টার্নবুলের ভিক্ষা দেওয়ার সেই দৃশ্য
‘এমন কোনো ভালো কাজ নেই যার জন্য খেসারত দিতে হয় না’—এই প্রবাদ খেটে গেল অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলের বেলায়। এক ভিখিরিকে পাঁচ অস্ট্রেলীয় ডলার দেওয়ার পর তিনি এমন সমালোচনার মুখে পড়লেন যে শেষমেশ তাঁকে দুঃখপ্রকাশ করতে হয়েছে। ঘটনা গত বৃহস্পতিবারের। মেলবোর্নের একটি অনুষ্ঠানে দেশের অর্থনীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দিতে যাচ্ছিলেন টার্নবুল। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী। রাস্তার পাশে বসে থাকা এক ভিক্ষুকের দিকে হাত বাড়িয়ে তাঁর সঙ্গে হাত মেলালেন। এরপর ভিক্ষুকের সামনে রাখা কফির কাপে পাঁচ অস্ট্রেলীয় ডলারের (বাংলাদেশি তিন শ টাকা) একটি নোট রাখলেন। এ সময় তাঁর বাঁ হাতে ছিল একতাড়া ডলার। শিগগিরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল এ ঘটনার ছবি।
শুরু হয়ে গেল সমালোচনা আর নিন্দার ঝড়। টার্নবুলের পক্ষেও দুয়েকটি মন্তব্য পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘হাড়কিপটে’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ডেইলি মেইল পত্রিকার অস্ট্রেলিয়া সংস্করণ টার্নবুলকে ‘অর্থগৃধ্নু চণ্ডাল’ আখ্যা দিয়েছে। আবার অনেকে বলেন, লোকটিকে ভিক্ষা দিয়ে তিনি ভিক্ষাবৃত্তিকে উৎসাহিত করেছেন। একজন আবার টার্নবুলের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলেন, ‘আপনারা দেখেন কে বেশি দিলেন, আর আমি দেখি কে দিলেন।’ এসব আলোচনা-সমালোচনার জবাবে টার্নবুল গতকাল শুক্রবার বলেন, ‘লোকটিকে দেখে আমার খারাপ লেগেছিল। নেহাত মানবিক কারণে আমি কাজটি করেছি। এতে কারও মনে আঘাত লাগলে আমি দুঃখিত।’

তুরস্ককে গুরুত্ব দিতে হবে

তুরস্কের পশ্চিম অংশে অবস্থিত ইস্তাম্বুল ইউরোপের বৃহৎ মহানগরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি যখন কনস্ট্যান্টিনোপল নামে পরিচিত ছিল, তখন রোমান ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। ১৪৫৩ সালে দ্বিতীয় মেহমেদ এই শহরটি দখল করে নতুন নামকরণ করার পর এটি ৫০০ বছর অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। বসফোরাস প্রণালির পশ্চিম পাশে অবস্থিত এই শহরটি ইউরোপ ও এশিয়াকে বিভক্ত করেছে। ইতিহাসের সব কালপর্বেই এটি পূর্ব ও পশ্চিমের ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করেছে। ইস্তাম্বুল খুব সম্ভবত এই ভূমিকা পালন করে যাবে খ্রিষ্টান পশ্চিমের সঙ্গে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে। আজকের তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপ থেকে গড়ে উঠেছে। দেশটির রাজনৈতিক জীবন প্রায়ই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ থাকে, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বিরোধ আছে। তুরস্কের যেমন সফলতা আছে, তেমনি ব্যর্থতাও আছে। তা সত্ত্বেও দুই শতক ধরে সংস্কারকামীরা দেশটির আধুনিকায়নের জন্য ইউরোপের দ্বারস্থ হয়েছেন। তুরস্কের প্রথম প্রেসিডেন্ট মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য, যিনি ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ করার জন্য কিছু সংস্কার করেছিলেন, যার জন্য তাঁকে কর্তৃত্বপরায়ণ হতে হয়েছিল। কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠার এই বিষয়টি দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ক্ষেত্রেও খাটে।
এরদোয়ান ১৩ বছর ধরে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ও পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রবল ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এরদোয়ান ও তাঁর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) প্রথম দশকে এমন কিছু অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কার করেছে, যা মানুষের হৃদয়ে ছাপ ফেলেছে। তুরস্ক ইতিমধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কাস্টমস ইউনিয়নের সদস্য, তাঁর সরকারের সংস্কার কর্মসূচি তাঁকে ওই সদস্যপদ পেতে সহায়তা করেছে। এর ফলে তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার কাছাকাছি চলে গেছে। তাই দেশটি গণতান্ত্রিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে আরও আগ্রহী হয়েছে। মানুষের আশার পালে হাওয়া লেগেছিল, দেশটি হয়তো শেষমেশ সামরিক একনায়কতন্ত্রের খপ্পর থেকে মুক্ত হতে চলেছে। তবে গত কয়েক বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে। দেশটির ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির আলোচনা প্রায় থমকে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু সদস্যদেশের বৈরিতার কারণে এমনটি হয়েছে। এদের সবার উদ্দেশ্য এক নয়, কিন্তু এতে অনেক তুর্কি নাগরিকই বিচ্ছিন্ন বোধ করছে; তারা মনে করছে সেই ইউরোপই তাদের পরিত্যাগ করল, যে ইউরোপ তাদের একসময় অনুপ্রাণিত করেছিল। ফলে অনেক তুর্কিই যে এখন অনুপ্রেরণার জন্য অন্যত্র যাচ্ছে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। এ ছাড়া সম্প্রতি তুরস্কে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির অনেক অবনতি হয়েছে। তা ছাড়া, ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে তুর্কি সমাজে মারাত্মক মেরুকরণ ঘটছে। দীর্ঘ যুদ্ধবিরতির পর কুর্দিরা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
ওদিকে ইসলামিক স্টেট ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারায় একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে। এত কিছু সত্ত্বেও যে তারা ৩০ লাখ অভিবাসীকে আশ্রয় দিয়েছে, তাতে বোঝা যায়, দেশটির ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে। আবার ২০১৩ সাল থেকে একেপির সঙ্গে গুলেনবাদীদের নীরব গৃহযুদ্ধ চলছে, যার আংশিক নেতৃত্বে আছেন মার্কিনপ্রবাসী ধর্মনেতা ফেতুল্লা গুলেন। অথচ একেপি ও গুলেনবাদীরা একসময় জোট বেঁধে কামালের ‘গভীর রাষ্ট্রের’ উপাদান দূর করার চেষ্টা করেছেন। অভিযোগ আছে, কামাল আতাতুর্ক ধর্মনিরপেক্ষ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য গণতন্ত্রবিরোধী ও জাতীয়তাবাদীদের নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ঢুকিয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাঁরা তুরস্কের জ্যেষ্ঠ জেনারেলদের লোকদেখানো বিচার করেছিলেন। অনেকেই মনে করেন, এ কারণেই তুরস্ক গোল্লায় যেতে বসেছে। এরপর গুলেনবাদীরা পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনীতে ঢুকেছে বলে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকার ধীরে ধীরে কর্তৃত্বপরায়ণ হয়েছে। আর জুলাইয়ের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই নীরব গৃহযুদ্ধ সরব হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষকই মনে করেন, গুলেনবাদীরা এই অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন। যদিও গুলেন সে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অভ্যুত্থান সফল হলে তুরস্কে এক দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেত, যার কূলকিনারা দেখা যেত না। গণতন্ত্রের সব আশা নির্বাপিত হতো। এই অভ্যুত্থানচেষ্টার একটি ভালো দিক হলো, বহু বছরের বিভাজনের পর তুরস্কের গণতন্ত্রকামী শক্তিগুলো একত্র হতে পেরেছে। পশ্চিম এ সময় তুরস্কের পাশে দাঁড়ায়নি,
ব্যাপারটা বিস্ময়কর। কিন্তু ভ্লাদিমির পুতিনের তুরস্কের পাশে দাঁড়ানোর ব্যাপারটা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য ভালো হবে না। তুরস্ক যে এখন গুলেনবাদীদের ক্ষমতা থেকে সরাতে চাইছে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। অন্য কোনো রাষ্ট্রও ভেতর থেকে বিদ্রোহের সম্মুখীন হলে একই কাজ করত। এখন সেখানে অন্যায় হচ্ছে তা ঠিক, কিন্তু আমাদের উচিত, নিজেদের শাসকের আসনে বসিয়ে ব্যাপারটা চিন্তা করা। তবে তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কাউন্সিল অব ইউরোপ সেক্রেটারি জেনারেলের সঙ্গে বৈঠকে বলেছেন, ‘কাউন্সিলের সদস্যপদের বিধান অনুসারে আমরা আইনের শাসন বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর অস্থির পরিস্থিতির অবসান হলে কাউন্সিল যেকোনো সময় ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে পারে।’ তুরস্ক এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। কিন্তু দেশটি কোথায় যাচ্ছে, তা বলার সময় এখনো আসেনি। মেরুকরণ ও কর্তৃত্ববাদের ধারা যদি চলতে থাকে, তাহলে দেশটির ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকার নিয়ে যদি জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে, তাহলে তুরস্কের রাজনৈতিক পরিবেশের উন্নতি হবে। ইউরোপের সঙ্গে একত্র হওয়ার নতুন আশা তৈরি হবে। তুরস্কের ব্যাপারে পশ্চিমের মনোভাবের গুরুত্ব আছে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের জোর তৎপরতা শুরু করতে হবে, যাতে এমন ফলাফল বের করে আনা যায়, যার গণতান্ত্রিক মূল্য আছে, যা পশ্চিমা ও তুর্কি স্বার্থ একইভাবে রক্ষা করতে পারে। গণতান্ত্রিক ও আধুনিক তুরস্ক মুসলিম বিশ্বের সংস্কার ও আধুনিকতার সূত্রপাত করতে পারে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ও কর্তৃত্বপরায়ণ তুরস্ক ইউরোপের পূর্ব সীমান্তে গোলযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।
কার্ল বিল্ড: সুইডেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

‘ওমরানদের জন্য শুধু অশ্রুপাত যথেষ্ট নয়’

শিশুর চোখে যুদ্ধ হেলিকপ্টার থেকে ফেলা হচ্ছে বোমা।
মৃত স্বজনের পাশে কাঁদছে দুই শিশু। মর্মস্পর্শী এই ছবিটি
হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই এঁকেছে আলেপ্পোতে বিমান
হামলায় আহত এক শিশু। চিকিৎসক জাহের শাহলুল
নিজেই বাচ্চাটির এই ছবিটি তুলেছিলেন। গার্ডিয়ানের সৌজন্যে
বিমানের গোলায় বিধ্বস্ত ভবন থেকে উদ্ধার করা সিরীয় শিশু ওমরান দাকনিশের ছবি গতকাল বিশ্বের গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়ে ঝড় তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোড়ন তুলেছে আলেপ্পো শহর থেকে ধারণ করা ভিডিওচিত্রটি। তবে ওমরান দাকনিশের ওই ভিডিওচিত্রকে সিরিয়ার ‘অতি সাধারণ নৈমিত্তিক ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছেন আলেপ্পোতে কাজ করে এসেছেন এমন একজন চিকিৎসক। চিকিৎসক জাহের শাহলুল বলেছেন, আলেপ্পোতে প্রতিদিন তাঁকে বহু ক্ষতবিক্ষত শিশুর চিকিৎসা করতে হয়েছে। অনেকেই তাঁর হাতের ওপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। তিনি বলেছেন, ওমরানের ছবি বিশ্ববাসীর হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু অশ্রুপাত যথেষ্ট নয়।
হামলা বন্ধ না হলে এই অশ্রুপাত অর্থহীন। যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ানপত্রিকায় গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত একটি নিবন্ধে জাহের শাহলুল এসব কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী চিকিৎসক শাহলুল যুদ্ধাহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য কয়েক দফা আলেপ্পোতে গেছেন। নিবন্ধে শাহলুল ওমরানের আলোচিত ছবিটির বিষয়ে বলেন, ‘শিশুদের রক্ষায় এই ছবিটি কি আদৌ অর্থবহ কোনো পদক্ষেপে রূপান্তরিত হবে? প্রত্যেকেই ছবিটি দেখেছে, কিন্তু তাদের জন্য কিছু একটা করবেন এমন কে আছেন?’ তিনি লিখেছেন, রাশিয়া ও সিরিয়ার সরকারি বাহিনী বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা শুরু করার পর আলেপ্পোর কয়েক শ চিকিৎসক নিহত হয়েছেন। অবিলম্বে সেখানে যুদ্ধ বন্ধ করা দরকার।