Tuesday, April 22, 2025

ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের কেনার চেষ্টা, কারা আছে পেছনে?

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা গোপনে ত্যাগ ও নিরস্ত্রীকরণের জন্য ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন হামাসকে দুই বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

লোভনীয় এই প্রস্তাবে ছিল হামাস গোষ্ঠীর পরিবারসহ নিরাপদে বিদেশে চলে যাওয়ার সুযোগও। কিন্তু একবাক্যে সেই ‘লোভনীয়’ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন হামাসের শীর্ষ নেতারা।

এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় শুধু সামরিক অভিযান নয়, চালাচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও। হামাসকে নির্মূল করতে ব্যর্থ হয়ে এখন অর্থের মোহ দেখিয়ে সংগঠনটির অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। এর পেছনে কাজ করছে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু বিতর্কিত রাষ্ট্র।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি গোপন প্রস্তাব পৌঁছে যায় হামাসের কাছে। বলা হয়, নিরস্ত্রীকরণের পর যদি সংগঠনটির নেতারা যুদ্ধ ত্যাগ করে পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান, তাহলে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মূলত এটি ছিল এক প্রকার আত্মসমর্পণের বিনিময়ে মোটা অর্থের প্রস্তাব।

এই প্রস্তাবের টার্গেটে ছিলেন গাজার প্রতিরোধের তিন গুরুত্বপূর্ণ নেতা—মোহাম্মদ সিনওয়ার, মোহাম্মদ শাবানেহ ও আজ আল দিন আল হাদ্দাদ। এদের প্রত্যেকেই প্রতিরোধ সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

মোহাম্মদ সিনওয়ার, শহীদ নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ভাই, গাজার প্রতিরোধ নেতৃত্বে রয়েছেন। ইসরায়েল বহুবার তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে, ঘোষণা করেছে মাথার দামও। শাবানেহ চারটি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার, যিনি নিজের সন্তানদের হারিয়েও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। আর আল-হাদ্দাদ ৭ অক্টোবরের ঐতিহাসিক হামলার আগের দিন যোদ্ধাদের সম্মুখ প্রতিরোধে ডাক দিয়েছিলেন।

তাদের সামনে এই প্রস্তাব তুলে ধরা হয়—চুপচাপ চলে যান, সংগঠনকে নিষ্ক্রিয় করে দিন, বিনিময়ে পেয়ে যাবেন বিলিয়ন ডলারের জীবন। কিন্তু প্রত্যুত্তর আসে একবাক্যে—আমরা বিক্রি হই না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েল এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা বুঝতে পারছে, শুধু গোলাবারুদ দিয়ে এই প্রতিরোধ দমন করা সম্ভব নয়। তাই চলছে ‘সফট টার্গেটিং’—মনস্তত্ত্ব, পরিবার, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎকে হাতিয়ার করে যোদ্ধাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা।

এখানে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, জড়িত রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু বিতর্কিত দেশও, যারা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের কৌশলের অংশীদার। তাদের উদ্দেশ্য, হামাস, ইসলামিক জিহাদসহ অন্যান্য প্রতিরোধ সংগঠনের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ঐক্য ভাঙা।

হামাসের এক মুখপাত্র বলেন, এই প্রস্তাব শুধু আমাদের আত্মার অবমাননা নয়, এটি আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে অসম্মান করার ষড়যন্ত্র। আমাদের অস্ত্র আমাদের গর্ব, আত্মরক্ষা আর স্বাধীনতার প্রতীক। এটা বিক্রি হয় না।

গাজার জনগণ বলছেন, এই প্রস্তাব আসলে দখলদারদের ভয় এবং হতাশার বহিঃপ্রকাশ। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে তারা এখন অর্থের মাধ্যমে প্রতিরোধ ভাঙার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই কৌশল তাদের মনোবল ভাঙতে পারছে না, বরং আরও চেতনাসম্পন্ন করে তুলছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট জানায়, কে এই প্রস্তাবের অর্থায়ন করছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে এতে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে ধারণা করছে তারা।

উল্লেখ্য, যুদ্ধ এখন আর শুধু বুলেট আর বোমার নয়। এটি এক মনস্তাত্ত্বিক সংঘর্ষ—যেখানে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের ‘আত্মা’ কেনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতার আন্দোলনে বিশ্বাসী যোদ্ধাদের আত্মা কখনো বিক্রি হয় না।

সূত্র : ওয়াইনেটনিউজ.কম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি গোপন লোভনীয় প্রস্তাব পৌঁছে যায় হামাসের কাছে। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি গোপন লোভনীয় প্রস্তাব পৌঁছে যায় হামাসের কাছে। ছবি : সংগৃহীত



তুরস্কের ভয়ংকর ড্রোনের জনক কে এই সেলচুক বায়রাকতার

সামরিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সাড়া জাগানো ড্রোন হলো বায়রাকতার টিবি-২। এটি রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধেও ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। এছাড়া আজারবাইজান, লিবিয়াসহ আরও অনেক দেশেও সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে।

সাড়া জাগানো এ ড্রোনের জনক হলেন সেলচুক বায়রাকতার নামের এক তুর্কি প্রকৌশলী। কেবল প্রকৌশলী নন, একাধারে তিনি পাইলট এবং ব্যবসায়ীও। তুরস্কের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বায়কারেরর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) এবং পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান সেলচুক বায়রাকতার। তিনি বায়রাকতার টিবি২ ড্রোন এবং তুরস্কের প্রথম মানববিহীন যুদ্ধবিমান বায়রাকতার কিজিলেলমার প্রধান ডিজাইনার হিসেবে পরিচিত।

তিনি ১৯৭৯ সালে ইস্তাম্বুলের সারিয়ের জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার ১৯৮৪ সালে সেলচুকের পিতা ওজদেমির বায়রাকতার বায়কার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। রুতে এটি অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ নির্মাণ করলেও পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা খাতে প্রবেশ করে। সেলচুক ইস্তাম্বুল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে (এমআইটি) উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।

তুর্কি এ তরুণ দেশে ফিরে ড্রোন প্রযুক্তির গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। তার নেতৃত্বেই বায়রাকতার টিবি২ ড্রোনটি তৈরি হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি পেয়েছে। তার গবেষণা মূলত মানববিহীন বিমান ব্যবস্থাপনা ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল। ​ সেলচুক বায়রাকতার তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের জামাতা। তিনি তুরস্কের জাতীয় প্রযুক্তি উদ্যোগের (ন্যাশনাল টেকনোলজি ইনিশিয়েটিভ) একজন প্রধান পৃষ্ঠপোশক। এছাড়া তিনি তরুণদের প্রযুক্তি শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।

বায়রাকতার টিবি২ ড্রোন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম কার্যকর ও জনপ্রিয় ড্রোন হিসেবে বিবেচিত। এটি তুরস্কের পাশাপাশি ইউক্রেন, আজারবাইজান, লিবিয়া, ইথিওপিয়া, সিরিয়া, নাগোরনো-কারাবাসহ আরও অনেক দেশে সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ড্রোনের কার্যকারিতা আধুনিক যুদ্ধনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে। ​

বায়রাকতার টিবি-২ সঠিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষমতা এবং তুলনামূলক কম খরচের জন্য বিখ্যাত। এই ড্রোন তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পকে বৈশ্বিক মানচিত্রে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে নিয়ে গেছে এবং রপ্তানি বাজারে তুরস্কের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। 

আকাশে বায়রাকতার ড্রোন ও তার জনক সেলচুক বায়রাকতার। ছবি : সংগৃহীত
আকাশে বায়রাকতার ড্রোন ও তার জনক সেলচুক বায়রাকতার। ছবি : সংগৃহীত

চিকিৎসাকর্মীদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইসরায়েলি বক্তব্য মিথ্যা: গাজা কর্তৃপক্ষ

গাজায় চিকিৎসাকর্মী, উদ্ধারকারী দলের সদস্যসহ ১৫ জনকে হত্যার ঘটনা ‘ভুল–বোঝাবুঝি’ থেকে হয়েছিল বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। তবে তা মানতে নারাজ উপত্যকাটির সিভিল ডিফেন্স সংস্থা। তাদের অভিযোগ, ওই ১৫ জনকে ‘তাৎক্ষণিক নির্বিচার হত্যা’ করেছেন ইসরায়েলি সেনারা। তাঁরা আন্তর্জাতিক আইন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

হত্যাকাণ্ডের ওই ঘটনা ঘটেছিল ২৩ মার্চ গাজার দক্ষিণে রাফা এলাকার কাছে। সেদিন ওই চিকিৎসাকর্মী ও উদ্ধারকারীরা উদ্ধারকাজে যাচ্ছিলেন। গাজা রেডক্রসের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, তাঁদের নিয়ে সাইরেন বাজিয়ে এবং হেডলাইট ও ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছিল। তা সত্ত্বেও গুলি চালিয়ে সবাইকে হত্যা করেন ইসরায়েলি সেনারা।

গাজা সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল–মুগাইর আজ সোমবার বলেন, চিকিৎসাকর্মীদের একজনের ধারণ করা ভিডিও এটাই প্রমাণ করে যে ইসরায়েলি দখলদারেরা যে বয়ান সামনে এনেছে, তা মিথ্যা এবং ভিডিওটি এটাই দেখিয়েছে যে তাৎক্ষণিক নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

জাতিসংঘের ত্রাণ ও মানবিক সহায়তাসংক্রান্ত সংস্থা (ওসিএইচএ) এবং ফিলিস্তিনি উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের শিকার ওই ১৫ জনের মধ্যে ৮ জন রেড ক্রিসেন্টের সদস্য, ৬ জন গাজার সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী বাহিনীর সদস্য এবং ১ জন জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর কর্মকর্তা ছিলেন।

যা বলছে ইসরায়েল

১৫ জনকে হত্যার পর আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দার ঝড় ওঠে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের ঘটনা ঘটেছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক। পরে গতকাল রোববার ওই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইসরায়েল। তাতে বলা হয়, ইসরায়েলি বাহিনী হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে বা নির্বিচার গুলি করেছে—এমন অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইসরায়েলের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সেদিন ১৫ জনের নিহত হওয়ার ঘটনা ‘ভুলের’ কারণে হয়েছে। এ ঘটনায় সামরিক বাহিনীর একজন ‘ফিল্ড কমান্ডারকে’ চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আর নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য। যদিও এর আগে ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকেই দাবি করা হয়েছিল, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে নয়জন যোদ্ধা ছিলেন।

গুলিতে নিহত সবার মরদেহ বালুর নিচে চাপা দেয় ইসরায়েলি বাহিনী। কিছুদিন পর মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। একে ‘গণকবর’ বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘের সংস্থা ওসিএইচএ। আর ইসরায়েলি বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদন ‘মিথ্যায় ভরপুর’ বলে উল্লেখ করেছে রেড ক্রিসেন্ট। সংস্থাটির মুখপাত্র নেবাল ফারসাখ এএফপিকে বলেছেন, ‘এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।’

২৪ ঘণ্টায় নিহত ৩৯

গাজায় আজও নির্বিচার হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগের ২৪ ঘণ্টায় সেখানে অন্তত ৩৯ জন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে ১৮ মার্চ থেকে যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ১ হাজার ৯০০ জন নিহত হলেন। মানবাধিকার সংস্থা প্যালেস্টিনিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের হিসাবে, তাঁদের মধ্যে ৫৯৫ জন শিশু ও ৩০৮ জন নারী।

এ নিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় চালানো ইসরায়েলের হামলায় ৫১ হাজার ২৪০ ফিলিস্তিনি নিহত হলেন। এই ১৮ মাসে উপত্যকাটিতে আহত হয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৩১ জন। অপর দিকে গাজার জনসংযোগ কার্যালয়ের হিসাবে, উপত্যকাটিতে মোট নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৬১ হাজার ৭০০। তাঁদের মধ্যে নিখোঁজ ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

এদিকে ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞের শিকার এবং বাস্তুচ্যুত হওয়া গাজার ২৩ লাখ ফিলিস্তিনি আরও ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। গতকাল সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের অবরোধের শিকার গাজায় জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণসহায়তা প্রবেশ করতে দিতে হবে।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত এক চিকিৎসকের মুঠোফোন থেকে উদ্ধার করা ভিডিওতে দেখা গেছে, আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা
ইসরায়েলি হামলায় নিহত এক চিকিৎসকের মুঠোফোন থেকে উদ্ধার করা ভিডিওতে দেখা গেছে, আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা। ছবি বিবিসির সৌজন্যে

গাজাবাসীও কি সুবর্ণরেখার মতো ঘরের স্বপ্ন দেখে by সুজন সুপান্থ

নতুন বাড়ির প্রতি দুর্নিবার টান ছিল ছোট্ট সীতার। স্বপ্ন ছিল ঘরের। তাই সে একদিন দাদার কাছে জানতে চেয়েছিল, ‘দাদা সারা দিন কোথায় ছিলে? তোমার খালি খালি লাগত না?’ দাদার জবাব, ‘আমাদের নতুন বাড়িটা খুঁজছিলাম রে।’ ‘পাওয়া গেছে?’—এ প্রশ্নের কাছে অনেক্ষণ নির্বিকার থেকে দাদা নিচু স্বরে শুধু বললেন, ‘চল।’ কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক কুমার ঘটকের দেশভাগ নিয়ে সিনেমা ‘সুবর্ণরেখা’র এ দৃশ্যের কথা মনে আছে?

বাড়ির প্রতি, ঘরের প্রতি মানুষের যে টান, তা ‘সুবর্ণরেখা’ সিনেমা দেখলে স্পষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি দৃশ্যে দেখা যায়, ছাতিমপুর স্টেশন থেকে নতুন বাড়ি যাওয়ার পথে সীতা মুখুজ্জেবাবুর কাছে জানতে চেয়েছিল, ‘কোথায় সেই নতুন বাড়ি?’ মুখুজ্জেবাবু নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। দূরে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘উই যে দূরে নীল নীল পাহাড় আকাশে পিঠটি মেলে দেইছে, তার পাশ দিয়ে নদীটি এঁকেবেঁকে চলে গেছে। ঠিক উইখানটিতে তোমাদের নতুন বাড়ি। কত ফুল, কত পাখি, কত প্রজাপতি, কত বড় বড় শূন্য ঘর, কত গান, কত বাজনা—সুবর্ণরেখা। সোনার রেখাটি, তার পাশেই তোমার বাড়িটি।’ এরপর সীতার হৃদয়ে এই বাড়ির দৃশ্য গাঁথা হতে থাকে। কল্পনায় সে এই বাড়িতে ঘোরাফেরা করে। ফুল-পাখি-প্রজাপতিদের সঙ্গে খেলা করে সীতা। কিন্তু বাস্তবে এই বাড়ি পৌঁছানোর দিশা খুঁজে পায়নি সে।

বাস্তবে বাড়ির দিশা খুঁজে না পেলেও সে সময় হৃদয়ে একটা বাড়ির ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিল সীতার। ওটাই মূলত তার বাড়ি। বাড়ি তাহলে কী? এ প্রশ্নের একটাই জবাব, হৃদয় যেখানে থাকে, সেটাই বাড়ি। হয়তো এ কারণে ১৯৬২ সালে কিংবদন্তি সংগীত তারকা কিং অব রক অ্যান্ড রোল এলভিস প্রিসলিও গেয়েছিলেন—‘হোম ইজ হয়্যার দ্য হার্ট ইজ’।

আমার মনে হয়, নিজের কাছে নিজে ফেরার নামই ঘর বা বাড়ি। কারণ, ঘর বাঁধতে বাঁধতে মানুষ আশ্চর্য আটনে নিজেকেই বেঁধে রাখে তার চারপাশে। এক অপরিমেয় মমতায় সেই ঘরে নিজেকে হারিয়ে ফেলে যাপন করে মানুষ। নইলে কাজ ফুরানো বিকেলে ঘরের দাওয়ায় বা আধভাঙা জলচৌকিতে কেন কথাহীন বসে থাকে মানুষ!

এই বহুদূর শহর থেকে দীর্ঘ অপেক্ষা পেরিয়ে বাড়ি ফিরে একটু দূর থেকে দেখি, সেই কবে বাড়িতে রেখে যাওয়া আরেকটি বয়সের আমি—হাফপ্যান্ট পরা আরেকটা আমি তাকিয়ে আছে এই আমির দিকে। এই চোখে দেখি তার টলটলে চোখ। দুজনের চোখের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে একই পৃথিবীর রং। চোখ বুজে আলতো করে তার চুলে বিলি কেটে দেখি, হেসে উঠছে দুজনের বুকের জখম। তাহলে এবার বলুন, বাড়ি মানে কি নিজের কাছেই নিজের ফেরা নয়!

তাহলে ফিলিস্তিনের বাস্তুচ্যুত, ঘরহারা মানুষেরা কীভাবে, কোথায় ফিরছে? আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধ হওয়ার পর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয়শিবিরে থেকে নিজের বাড়ির কথা মনে হয়নি ১১ বছর বয়সী কারেম সামরার। তার বারবার শুধু মনে হয়েছে স্কুলের কথা। তার মন পড়ে ছিল শ্রেণিকক্ষের জানালার কাছে, যে জানালার শিক ধরে সে ক্লাসের ফাঁকে আকাশ দেখত। দেখত স্কুলের বাগানে ফুটে থাকা ফুল, ফুলে উড়ে বসা প্রজাপতি আর পাখিদের কিচিরমিচির। শ্রেণিকক্ষের এক কোনায় রাখা থাকত সব শিক্ষার্থীর বই-খাতা আর ক্রেয়ন। নিজেদের ঘরের বদলে কারেম সামরার ওই ক্রেয়নগুলোর কথা খুব মনে পড়ত। ভাবত, স্কুলে গিয়ে কি আর খুঁজে পাবে নিজের আঁকিবুঁকি করার ওই ক্রেয়নগুলো!

যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর কারেম সামরা পরিবারের সঙ্গে ফিরে নিজের ঘর ও ক্রেয়নগুলো খুঁজে পেয়েছিল কি না, জানা যায়নি। ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া গাজায় তা খুঁজে পাওয়ার কথাও নয়। তার হৃদয় যেখানে পড়ে ছিল, বিধ্বস্ত হয়ে গেছে সেই স্কুলঘর। অথচ কারেম সামরার কাছে এই স্কুলঘরই ছিল ঘরের বাইরে আরেক আপন ঘর।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হামাস হামলা চালায়। ওই দিন থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ মাস ধরে চলা যুদ্ধে গাজা উপত্যকায় নারী ও শিশু মিলিয়ে ৫১ হাজার ২৫ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে বাড়ি ফেরা অবরুদ্ধ গাজার ফিলিস্তিনিদের ভেতরে–ভেতরে যেন বেজে উঠেছিল পুরোনো শুশ্রূষার সুর। খান ইউনিস, গাজাছবি: রয়টার্স

জাতিসংঘ বলছে, গত ১৮ মার্চ হামাসের সঙ্গে সই হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে দেয় ইসরায়েল। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ গাজাবাসী নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর আগে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরও লাখো মানুষ।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে হামাসের সঙ্গে সই হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর আশপাশে আশ্রয় নেওয়া মানুষেরা হোক ভাঙা, তবু ঘরের টানে ফিরতে শুরু করে। বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া আস্ত এক উপত্যকায় ফিরলেও আদতে ঘরে ফেরা হয়নি তাঁদের। কারণ, বাড়িতে যে কিছুই নেই। ইসরায়েলি হামলায় সবই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

দেইর আল বালা এলাকার এমনই এক বাসিন্দা আবদুল ফাত্তাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা বাড়ি ফিরে দেখি, কিছুই নেই। ঘর নেই, বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। এমন ঘরে ফিরলাম, পোশাকও বদলাতে পারি না। জন্মের সময়ের মতো নিঃস্ব আমি। আমার আর কিছুই নেই। ঘরের খোঁজ নিতে বাড়ি ফিরে দেখছি ধ্বংসস্তূপ। কোথায় আমার ঘর?’

দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে বাড়ি ফেরা অবরুদ্ধ গাজার ফিলিস্তিনিদের ভেতরে–ভেতরে যেন বেজে উঠেছে পুরোনো শুশ্রূষার সুর। এই সুরে মানুষের ভিড় ঠেলে একজন মানুষ কি একা হয়ে নিজের ঘরের দরজার চিহ্ন খুঁজে তার পাশে বসতে চেয়েছে কিছুক্ষণ? জিরেন চেয়েছে কিছুটা? আর পর মুহূর্তে যেন ভীষণ জ্বরের শেষে নিজেদের ভেতর জেগে উঠেছে সূর্যধোয়া ঘর।

জানালার শিক গলে আকাশ, ফুল, প্রজাপতি, পাখি দেখবে বলে ঘরহীন শিশুটির ছিল সেই কত দিনের পিত্যেশ! অথচ সেই হা-পিত্যেশের ওপারে দাঁড়িয়ে আছে বিধ্বস্ত শহর। কল্পনায় অসহায় ওই শিশুটির ভাষাহীন চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, নিজের বুকের ভেতর এঁকে দিই তার চৌকো জানালার আলো।

ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে হয়ে গেছে বাড়ি। ধ্বংসস্তূপের ভেতর যতটুকু পেয়েছেন, তা–ই নিয়ে বের হয়েছেন এই ব্যক্তি। খান ইউনিস, গাজা
ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে হয়ে গেছে বাড়ি। ধ্বংসস্তূপের ভেতর যতটুকু পেয়েছেন, তা–ই নিয়ে বের হয়েছেন এই ব্যক্তি। খান ইউনিস, গাজা। ছবি: রয়টার্স

শেষ ভাষণে ফিলিস্তিনিদের নিয়ে যা বলেছিলেন পোপ ফ্রান্সিস

পোপ ফ্রান্সিস মারা যাওয়ার আগে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার বারান্দায় তাঁর শেষ বার্তায় গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। ইস্টার সানডের ওই বার্তা উচ্চ স্বরে পড়েছিলেন তাঁর সহযোগী।

পোপ ফ্রান্সিস গতকাল সোমবার সকাল ৭টা ৩৫ মিনিটে ভ্যাটিকানে নিজ বাসভবন কাসা সান্তা মার্তায় মারা গেছেন।

৮৮ বছর বয়সী পোপ চিকিৎসকদের নির্দেশে তার কাজের চাপ সীমিত রেখে ইস্টারের জন্য ভ্যাটিকানের প্রার্থনায় সভাপতিত্ব করেননি। তবে অনুষ্ঠানের শেষে ‘উরবি অ্যাট অরবি’ নামে পরিচিত বার্ষিক আশীর্বাদ এবং বার্তার জন্য উপস্থিত হন।

নিউমোনিয়ার জন্য পাঁচ সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার আগে পোপ ফ্রান্সিস গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা জোরদার করে তুলছিলেন। গত জানুয়ারি মাসে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের গাজায় মানবিক পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর এবং লজ্জাজনক।

ইস্টারের বার্তায় পোপ বলেন,  গাজার পরিস্থিতি নাটকীয় ও শোচনীয়। একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের কাছে থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান।

পোপ তাঁর বার্তায় বলেন, ‘আমি সমস্ত ইসরায়েলি জনগণ এবং ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশার প্রতি আমার একাত্মতা প্রকাশ করছি। আমি যুদ্ধরত পক্ষগুলোর কাছে আবেদন করছি, যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করুন, জিম্মিদের মুক্তি দিন এবং শান্তির ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা পোষণকারী ক্ষুধার্ত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসুন।’

গত সপ্তাহে হামাস আরেকটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য ইসরায়েলি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এর পরিবর্তে জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি চুক্তি দাবি করেছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু শনিবার বলেছেন, তিনি হামাসের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়। এতে এক হাজার ২০০ জন নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এরপর থেকে ইসরায়েল গাজায় হামলা চালিয়ে আসছে। এতে ৫১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে যার অধিকাংশ নারী ও শিশু।

পোপ ফ্রান্সিস
পোপ ফ্রান্সিস। ফাইল ছবি

যুদ্ধের বিপক্ষে ইসরায়েলের ৭০ শতাংশ মানুষ, তবুও হামলা চালাবেন নেতানিয়াহু

ফিলিস্তিনের গাজায় এত মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞের পরও নৃশংসতা থামাতে রাজি নন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গতকাল শনিবার তিনি বলেছেন, উপত্যকাটিতে হামলা চালানো ছাড়া ইসরায়েলের সামনে ‘আর কোনো পথ খোলা’ নেই। প্রতিবেশী দেশ ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

গাজায় ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে চরম নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসকে নির্মূল করতেই এ হামলা চালানো হচ্ছে বলে দাবি ইসরায়েলের। তবে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা গাজায় বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত উপত্যকাটিতে ৫১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।

শনিবার রাতে এক ভিডিও বক্তৃতায় নেতানিয়াহু বলেন, বিজয়ের আগপর্যন্ত নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ইসরায়েলের সামনে লড়াই চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তিনি আরও বলেন, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব হামাস প্রত্যাখ্যান করাটা, উপত্যকায় বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাওয়ার একটি কারণ।

সম্প্রতি গাজায় আংশিক যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব দিয়েছিল ইসরায়েল। তাতে উপত্যকাটিকে অস্ত্রমুক্ত করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। তবে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা হয়নি। এই শর্ত মানতে নারাজ হামাস। নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল যদি হামাসের দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করে, তাহলে দেশটির সেনা, নিহত ও আহত ‘বীরেরা যে অসাধারণ অর্জন করেছেন’, তা হারিয়ে যাবে।

ভিডিও বক্তৃতায় ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়েও কথা বলেন নেতানিয়াহু। শনিবার এই প্রকল্প নিয়ে ইতালির রাজধানী রোমে বৈঠক করেছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইরানের পরমাণু অস্ত্র হাতে পাওয়া ঠেকাতে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই (প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে) আমি হাল ছেড়ে দেব না। আমি এটি হতে দেব না।’

‘আমি মারা গেলে ভালো হতো’

গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরু হয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। দীর্ঘ ১৫ মাস পর ১৯ জানুয়ারি থেকে সেখানে যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও ১৮ মার্চ থেকে আবার তীব্র হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। শনিবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগের ৪৮ ঘণ্টায় উপত্যকাটিতে ইসরায়েলের হামলায় ৯০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া শনিবার রাতে ইসরায়েলের হামলায় নারী-শিশুসহ আরও ১৫ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে দক্ষিণে খান ইউনিসে চালানো হামলায়। এই ফিলিস্তিনিদের অনেকে মুয়াসি এলাকায় আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত। হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়েছেন, এই এলাকাকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছিল ইসরায়েল।

নিহতদের মধ্য এক শিশুও রয়েছে। মরদেহ ব্যাগে ভরার সময় এক ভাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘ওমর চলে গেল...আমি ওর জায়গায় থাকলে ভালো হতো।’ শনিবার রাতে অন্য চারজন নিহত হয়েছেন দক্ষিণে রাফায়। স্থানীয় ইউরোপীয় হাসপাতালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে এক নারী ও তাঁর শিশুসন্তান রয়েছেন।

এদিকে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শনিবার উত্তর গাজায় তাদের এক সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। ১৮ মার্চ যুদ্ধবিরতি ভাঙার পর এই প্রথম গাজায় দেশটির কোনো সেনা নিহত হলেন বলে জানিয়েছে তারা। এদিন উত্তরে গাজা নগরীর আল-তুফা এলাকার উপকণ্ঠে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর খবর জানিয়েছে হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসেম ব্রিগেড।

যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের হামলা হামাসের হামলার পরই মূলত গাজায় হামলা শুরু করে দেশটি। সেদিন ইসরায়েল থেকে প্রায় আড়াই শ ব্যক্তিকে জিম্মি করে হামাস। সংগঠনটির হাতে এখনো ৫৯ জিম্মি রয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েল সরকার। তাঁদের ফেরাতে এবং গাজায় হামলা বন্ধের জন্য ইসরায়েলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে।

জিম্মিদের ফেরানোর জন্য যুদ্ধবিরতির দাবিতে এরই মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনীর হাজার হাজার সাবেক ও বর্তমান সদস্য এক খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগ থেকে এমন চিঠি প্রকাশের সংখ্যা বাড়ছে। আর গত মাসে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভ নিউজের জরিপে দেখা যায়, জিম্মিদের ফেরানোর জন্য যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির পক্ষে দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ।

এদিকে শনিবার রাতেও জিম্মিদের ফেরাতে একটি চুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ইসরায়েলের নাগরিকেরা। তেল আবিবে এক বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন জিম্মি অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া ওমের শেম তোভ। তিনি বলেন, ‘তাঁদের (জিম্মি) এখনই ফেরত আনুন। একটি চুক্তি করুন। এর জন্য যদি যুদ্ধ বন্ধ করতে হয়, তা-ই করুন।’

ইসরায়েলি হামলায় ঘরবাড়ি হারিয়ে ধ্বংসস্তূপের মাঝে শিশুসন্তানকে নিয়ে বসে আছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। ফিলিস্তিনের গাজায়
ইসরায়েলি হামলায় ঘরবাড়ি হারিয়ে ধ্বংসস্তূপের মাঝে শিশুসন্তানকে নিয়ে বসে আছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। ফিলিস্তিনের গাজায়। ফাইল ছবি: এএফপি

দুই কন্যার বাইরে পড়ানো নিয়ে অনেক কথা শুনেছি: অভিনেত্রী ছন্দা by মনজুরুল আলম

দুই মেয়ে তখন ঢাকার একটি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। ব্যস্ততায় তাদের দেখাশোনা নিয়ে বেশ বিপাকেই পড়ে যান অভিনেত্রী গোলাম ফরিদা ছন্দা। অনেক সময় শুটিং বাতিল করতে হতো। কখনো শুটিং থেকে বিরতি নিয়ে স্কুলে যেতে হতো বাচ্চাদের আনতে। এমনও হয়েছে, মায়ের শুটিংয়ের জন্য যমজ বাচ্চা দুটি নানির বাড়িতে। এভাবে মেয়েদের নিজের মনের মতো সময় দিতে পারছিলেন না। তাই সিদ্ধান্ত নেন, তাদের দেশের বাইরের কোনো বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করাবেন। সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে পরিবার, সহকর্মীসহ অনেকের মুখে নানা কথা শুনতে হয়েছে।

অভিনেত্রী ছন্দার দুই মেয়ে টাপুর ও টুপুর। তাঁরাও মায়ের মতো অভিনয়ের জগতে এসেছেন। নাম লিখিয়েছেন সিনেমায়। তবে শখের বসে এই অভিনয় শুধুই পড়াশোনার ফাঁকে। ছুটিতে দেশে এলেই তাঁদের বড় বা ছোট পর্দায় পাওয়া যেত। পড়াশোনায় ব্যস্ত সেই টাপুর ও টুপুর এবার ভারত থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন অপেক্ষা রয়েছেন ফলাফলের। বর্তমানে তাঁরা দেশেই রয়েছেন। তাঁদের মা ছন্দা জানালেন, তাঁদের আপাতত ভারতে পড়াশোনার পর্ব শেষ। এই সময় তিনি ফিরে গেলেন মেয়েদের দেশের বাইরে পড়াশোনা করানোর ‘কঠিন’ দিনগুলোতে।

ছন্দাকে তখন নিয়মিত ছুটতে হতো শুটিংয়ে। যে কারণে চাইছিলেন মেয়েদের ভালো কোনো বোর্ডিং স্কুলে পাঠাতে। সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে শুরুতেই হোঁচট খেলেন। কারণ, অনেকেই তাঁর এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন। ছন্দা বলেন, ‘আমার পরিবারের অনেকে আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা কথা বলতে শুরু করলেন। মেয়েদের পড়াশোনার জন্য দেশের বাইরে পাঠাব, এটা কেউ কেউ মানতেই পারেননি। আমার সহকর্মীদেরও অনেকেই বলছেন, কেন ভারতে পড়াশোনা করতে পাঠাচ্ছি মেয়েদের। অনেকেই মনে করত, ভারতে কেন পাঠাচ্ছি। তারপরে ছোট মেয়ে। সবকিছু মিলিয়ে নানান কথা শুনতে হয়েছে। সময়টা ছিল অনেক কঠিন।’

সবার কাছ থেকে নানা কথা শুনলেও নিজের ইচ্ছাতেই মেয়েদের দার্জিলিংয়ের একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। তখন দেশে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত দুই মেয়ে। কঠিন সেই সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে ছন্দা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি খুঁজছিলেন এমন একটা স্কুল, যেখানে একসঙ্গে পড়াশোনা করানো হয়, সঙ্গে গান, ড্রয়িং, সাঁতার-নাচ-অভিনয় শেখানো হয়, আবার থাকার ব্যবস্থা আছে, তেমন একটি স্কুলে ভর্তি করাতে।

‘দেখলাম, এই স্কুল, এই কোচিং—এগুলো করানো তো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যাঁরা গৃহিণী, তাঁরা হয়তো সন্তানদের নিয়ে দৌড়াতে পারেন, আমার তো সেই উপায় ছিল না। একটি করতে গিয়ে অন্যটি হচ্ছিল না। তখন তাদের বাইরে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দিই। তারপরে যা দেখলাম, সেটা আমার জন্য সুবিধা হয়েছে।’

সেই সুবিধাটা কেমন ছিল, সেই প্রসঙ্গে এই অভিনেত্রী বলেন,‘দেখা যেত, আমি বিরতি নিয়ে এক–দুই মাসের জন্য মাঝেমধ্যেই তাদের কাছে যেতাম। তখন পুরোটা সময় তাদের দিতে পারতাম। আবার দেশে এলেও তাদের কোয়ালিটি সময়টা দিতে পারতাম। তখন কাজ কম করতাম। আমি তাদের জন্য যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেটা সঠিক ছিল। যে কারণে, অনেকের কথা শুনেছি, কিন্তু দুই মেয়েকে নিয়ে আমার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসিনি। শুরু থেকেই আমি ফলাফলটা ঠিকমতো পাচ্ছিলাম।’—কথাগুলো বলেন টাপুর ও টুপুরের মা।

কালিম্পং, দার্জিলিংয়ের একটি স্কুল থেকে বর্তমানে তাঁরা এ লেভেল শেষ করেছেন। এখন ঢাকাতেই রয়েছেন। পরীক্ষার ফলাফল হলেই সিদ্ধান্ত নেবেন অন্য কোনো দেশে পড়তে যাওয়ার। তবে সেই সিদ্ধান্ত মেয়েরাই নেবেন। টুপুর জানান, মায়ের সংগ্রামের সঙ্গে তাঁরা দুই বোন শুরু থেকেই পরিচিত। সেটা তাঁরা কখনোই ভোলেননি।

টাপুর বলেন, ‘আমরা যখন বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি হই, তখনো তো অনেক ছোট ছিলাম। মায়ের এমন সিদ্ধান্তে অনেক শকড হয়েছিলাম। অনেক মন খারাপ হয়েছিল। ওই বয়সে পরিবার থেকে দূরে থাকাটা যেকোনো শিশুর জন্য কষ্টের। পরে অভ্যস্ত হয়ে যাই। তখন বুঝতে পারি মা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমাদের আর বাইরে পড়াশোনা করতে খুব বেশি সমস্যা হয় না। সব সময়ই মায়ের স্ট্রাগলের কথাগুলো মনে থাকত। ভালো করতে হবে, সেই চেষ্টাই সব সময় করেছি।’

দেশের বাইরে পড়াশোনা করলেও টাপুর-টুপুর ছুটি পেলেই দেশে চলে আসতেন। তাঁদের বাবা নাট্যপরিচালক সতীর্থ রহমান। মা অভিনেত্রী। বলা যায়, শৈশব থেকেই তাঁরা লাইট–ক্যামেরা দেখে বড় হয়েছেন। কখনো বাড়িতে হতো শুটিং। আবার বাবা-মায়ের সঙ্গে চলে যেতেন শুটিংয়ে। একসময় আফসানা মিমি এই যমজ বোনকে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। মেয়েদের না নেই। এভাবেই ২০১৬ সালে বাবার ‘খোলস’ নাটক দিয়ে শুরু। তারপর অমিতাভ রেজা চৌধুরী, মাতিয়া বানু শুকু, চয়নিকা চৌধুরী, শুভ্র খানসহ অনেকের নাটক ও বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন। কিন্তু পড়াশোনার জন্য দার্জিলিংয়ে থাকার কারণে অভিনয়ে নিয়মিত হওয়া হতো না। টাপুর প্রথম আলোচনায় আসেন অনুদানের ছবি ‘দেশান্তর’-এ নাম লিখিয়ে। পরবর্তী সময় দুই বোনই একাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন।

টাপুর জানান, পড়াশোনার জন্য তিন সিনেমা ছাড়তে হয়েছে। ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘দাগি’ সিনেমায় অভিনয় করার কথা ছিল। ‘এখন আমরা আপাতত টুয়েলভ গ্রেডের পড়াশোনা শেষ করেছি। রেজাল্ট হয়নি। এখন কিছুটা সময় হাতে রয়েছে। বেশ কিছু কাজ নিয়ে কথা হচ্ছে, সেগুলোতে অভিনয় করব।’

মেয়েদের চাওয়াকেই সব সময় প্রাধান্য দিতে চান ছন্দা। দুই মেয়ে পরবর্তী সময় কোন দেশে পড়াশোনার জন্য যেতে চায়, সেখানেও পূর্ণ সহায়তা ও স্বাধীনতা দিতে চান। সবশেষে এই অভিনেত্রী বলেন, ‘দুই মেয়ে নিয়ে একা কতটা যুদ্ধ করেছি, তা কেবল আমিই জানি। সেটা আমার কন্যারাও অন্তর দিয়ে ধারণ করতে পেরেছে। কারণ, তারা সহযোগিতা না করলে ১০ বছরের বোর্ডিং লাইফ শেষ হতো না। এই পথচলায় আমার একটা চ্যালেঞ্জ ছিল নিজের সঙ্গে। সেখানে আমি পেরেছি। এই পারাটা সহজ ছিল না, পথ ছিল অনেক কঠিন।’

মায়ের সঙ্গে টাপুর টুপুর। ছবি: ফেসবুক
মায়ের সঙ্গে টাপুর টুপুর। ছবি: ফেসবুক

জুঁইকে ধর্ষণের পর হত্যা: লোমহর্ষক বর্ণনা চার কিশোর ও এক যুবকের

নাটোরের বড়াইগ্রামের আলোচিত মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির ছাত্রী আকলিমা আক্তার জুঁই (৭)কে ধর্ষণ ও হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে পুলিশ। পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপনের জন্য যৌনকর্মী ও নর্তকী না পেয়ে ৪ কিশোর ও ১ যুবক জুঁইকে বেছে নেয়। বিকাল ৫টার দিকে বাড়ির পাশে আম বাগানে আম কুড়াতে গেলে বাগানের মধ্যেই নেশার আসরে থাকা ওই ৫ জন জুঁইকে দেখতে পায়। তারা জোরপূর্বক জুঁই’র মুখ চেপে ধরে কোলে উঠিয়ে পাশের কলা বাগানে নিয়ে যায়। মধ্য রাত পর্যন্ত তারা পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এক পর্যায়ে জুঁই অজ্ঞান হয়ে পড়লে পরনের প্যান্ট গলায় পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। লাশ যেনো কেউ চিনতে না পারে তার জন্য ট্রাক্টর থেকে আনা ব্যাটারির এসিড দিয়ে মুখমণ্ডল পোড়ানোর চেষ্টা করে। নির্মম ও পৈশাচিক এই ঘটনার ৫ দিনের মাথায় বড়াইগ্রাম থানা, চাটমোহর থানা ও নাটোর ডিবি পুলিশের যৌথ অভিযানে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ৫ জনকে আটক করা হয়। আটককৃতরা পুলিশের কাছে উপরোক্ত বিবরণ তুলে ধরে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছে বলে জানান চাটমোহর থানার অফিসার ইনচার্জ মঞ্জুরুল আলম। 

অফিসার ইনচার্জ মঞ্জুরুল আলম আরও জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ও গ্রেপ্তারকৃত ৫ জন হলো- বড়াইগ্রাম উপজেলার দিয়াড়গাড়ফা গ্রামের শাহীন আলীর ছেলে সিয়াম হোসেন (১৩), গাড়ফা উত্তরপাড়া গ্রামের আয়নাল হোসেনের ছেলে শেখ সাদী (১৬), শফিকুল ইসলামের ছেলে আব্দুল্লাহ (১৬), সুলতান হোসেনের ছেলে সোহেল রানা (২৫) এবং গাড়ফা দক্ষিণপাড়া গ্রামের দুলাল হোসেনের ছেলে সাকিব হোসেন (১৬)। এদের মধ্যে সিয়াম স্থানীয় ডিকে উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, শেখ সাদী ও আব্দুল্লাহ অপকর্মের দায়ে স্থানীয় মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কৃত। সোহেল বিবাহিত ও দিনমজুর এবং সাকিব ট্রাক্টর চালকের সহকারী।

তিনি আরও বলেন, যুবক সোহেল ও ৩ কিশোর শেখ সাদী, আব্দুল্লাহ, সাকিব পহেলা বৈশাখের আনন্দ করার পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে নিজেরা টাকা তুলে যৌনকর্মী ও নর্তকী ভাড়া করার চেষ্টা করে এবং নেশাদ্রব্য গাঁজা কিনে। তারা যৌন উত্তেজক ওষুধও সেবন করে। ঘটনার দিন বিকালে তারা জুঁইয়ের বাড়ির পাশের আমবাগানে বসে গাঁজা সেবন করছিল। হঠাৎ জুঁই দাদীর বাড়ি থেকে বেড়ানো শেষে সেখানে আম কুড়াতে যায়। এ সময় শেখ সাদী জুঁইকে জোরপূর্বক কোলে তুলে পাশেই দুলালের কলাবাগানে নিয়ে যায় এবং চারজন মিলে তাকে ধর্ষণ করে। এরপর তারা শিশুটিকে ধরাধরি করে পাশের ভুট্টার জমিতে নিয়ে যাওয়ার সময় জুঁই’র বাড়ির পাশে নানাবাড়িতে বেড়াতে আসা সিয়াম বিষয়টি দেখে ফেলে। পরে তারা সিয়ামকেও প্রলুব্ধ করে শিশুটিকে পুনরায় ধর্ষণ করায়। তারা দীর্ঘসময় জুঁই’র শরীর নিয়ে আদিম অসভ্যতায় মেতে ওঠে। এরপর তারা জুঁইয়ের লাল রঙের প্যান্ট গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করে এবং ঘাড় মটকে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর এসিড জাতীয় দাহ্য পদার্থ দিয়ে তার মুখ ঝলসে দেয়। পরে তারা ভুট্টার জমিতে বিবস্ত্র লাশটি উপুড় করে ফেলে রেখে চলে যায়।

উল্লেখ্য, গত ১৪ই এপ্রিল দাদীর বাড়িতে যাওয়ার জন্য বের হয়ে নিখোঁজ হয় বড়াইগ্রামের চান্দাই ইউনিয়নের গাড়ফা প্রবাসী জাহিরুল ইসলামের শিশুকন্যা জুঁই। পরদিন বাড়ি থেকে ৩০০ গজ দূরে চাটমোহরের রামপুর বিলের একটি ভুট্টা ক্ষেতে তার বিবস্ত্র ও মুখমণ্ডল ঝলসানো লাশ পাওয়া যায়। রাতে জুঁইয়ের মা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন। জুঁই’র ওপর এই নির্মমতা ও পৈশাচিকতার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে নাটোরের সর্বস্তরের মানুষ। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলাতেও এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হয়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে ও অপরাধীদের চিহ্নিত করতে থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশ মাঠে নামে। ব্যাপক অনুসন্ধানের পর ঘটনার ৫ দিনের মাথায় ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ৫ জনকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পাবনা জেল হাজতে প্রেরণ করে পুলিশ।

mzamin

ভারতের নির্বাচন কমিশন অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করে চলেছে -রাহুল গান্ধী

অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করে চলেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। আমেরিকার বস্টনে প্রবাসী ভারতীয়দের সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই অভিযোগ করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। গোটা নির্বাচন ব্যবস্থাতেই বড়সড় গলদ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির পরিসংখ্যান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গান্ধী বলেছেন যে ভারতের নির্বাচন কমিশনকে (ইসিআই) অবশ্যই এই সংখ্যা সম্পর্কে স্পষ্টতা প্রদান করতে হবে।

প্রবাসী ভারতীয়দের সভায় গিয়ে রাহুল বলেন, “মহারাষ্ট্রের যত জনসংখ্যা, তার চেয়ে বেশি মানুষ ভোট দিয়েছে। বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ নির্বাচন কমিশন আমাদের ভোটের হার জানায়। সন্ধে সাড়ে সাতটার সময়ে জানা যায়, মাত্র দু’ঘণ্টার মধ্যে আরও ৬৫ লক্ষ ভোট পড়েছে। বাস্তবে এমনটা অসম্ভব।” রাহুলের কথায়, রাত পর্যন্ত ভোটারদের দীর্ঘ লাইন না থাকলে এতো ভোট পড়া সম্ভব নয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে ভোটকেন্দ্রে ভিডিওগ্রাফির অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে নির্বাচনী আইনের পরিবর্তনের ফলে এই ধরণের সিস্টেমের অ্যাক্সেস সীমিত করা হয়েছিল।

গান্ধী বলেন, ‘একজন ভোটারের ভোট দিতে প্রায় ৩ মিনিট সময় লাগে। আর যদি আপনি গণিত বোঝেন, তাহলে বোঝা যাবে যে যদি ৬৫ লক্ষ ভোট পরে তার অর্থ রাত ২টা পর্যন্ত ভোটারদের লাইন ছিল। কিন্তু তা ঘটেনি... যখন আমরা তাদের কাছে ভিডিও গ্রাফি চেয়েছিলাম, তারা কেবল প্রত্যাখ্যানই করেনি বরং আইনও পরিবর্তন করেছে। যাতে এখন আমাদের ভিডিও গ্রাফি চাইতেই  না হয়।’ সোমবার বিজেপি রাহুল গান্ধীকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তার কথিত মন্তব্যের জন্য "বিশ্বাসঘাতক" বলে অভিহিত করেছে। সেইসঙ্গে ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের উপর তার হতাশা প্রকাশ করার অভিযোগ এনেছে।

রাহুলের মন্তব্যের সমালোচনা করে বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বলেন, “আপনি নির্বাচন কমিশনের উপর এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায়) রাগ উগরে দিচ্ছেন। এতে কিছুই হবে না। ইডি আপনাকে রেহাই দেবে না কারণ এজেন্সিগুলো তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করে।আপনাকে এবং আপনার মাকে হাতেনাতে ধরা হবে এবং জেলে পাঠানো হবে।” বিজেপি মুখপাত্রের কথায়, ‘আপনি (রাহুল) একজন বিশ্বাসঘাতক, শুধু বিদেশের মাটিতে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এবং ভারতীয় গণতন্ত্রকে অপমান করার জন্যই নয়, বরং ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় আপনি এবং আপনার মা দেশের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই অপরাধ থেকে কেউ রেহাই পাবে না।’

সূত্র : নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

mzamin


বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণতম স্থান যেখানে তাপমাত্রা ৫৭ ডিগ্রি

গ্রীষ্মের মৌসুম শুরু হতেই মানুষের প্রাণান্তকর অবস্থা। কিন্তু জানেন কি বিশ্বের এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।

ফার্নেস ক্রিক, ডেথ ভ্যালি, ক্যালিফোর্নিয়া (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র): ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তর মোজাভে মরুভূমির পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই মরুভূমি উপত্যকাকে গ্রীষ্মকালে পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯১৩ সালের ১০ জুলাই, ডেথ ভ্যালির ফার্নেস ক্রিকের তাপমাত্রা ছিল ৫৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

কেবিলি (তিউনিসিয়া): দক্ষিণ তিউনিসিয়ার এই শহরটি গ্রীষ্মকালে একটি অগ্নিকুণ্ডে রূপান্তরিত হয় যেখানে তাপমাত্রা প্রায়শই ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়ে যায়। কেবিলিতে ৭ জুলাই, ১৯৩১ তারিখে সর্বোচ্চ ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।

আহভাজ (ইরান): ইরানের মরুভূমি এবং বিশ্বের অন্যতম উষ্ণতম স্থান, আহভাজে ২০১৭ সালে তাপমাত্রা ছিল ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

তিরাত জভি: বেইত শেয়ান উপত্যকায় ইসরায়েল-জর্ডান সীমান্তের কাছে অবস্থিত একটি ধর্মীয় স্থান কিবুটজ, তিরাত জেভিতে ১৯৪২ সালের ২১ জুন তাপমাত্রা পৌঁছে গেছিল ৫৪ ডিগ্রিতে।

বসরা (ইরাক) : দক্ষিণ ইরাকের এই বন্দর শহরটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম উষ্ণতম স্থান, যেখানে ২১ জুলাই, ২০১৬ তারিখে ৫৩.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিলো,  যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

মিত্রিবাহ (কুয়েত): কুয়েতের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি আবহাওয়া কেন্দ্র, মিত্রিবাহে ২১ জুলাই, ২০১৬ তারিখে ৫৩.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল, যা পৃথিবীতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

তুরবত (পাকিস্তান): কোয়েটার পর পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, তুরবাতে ২৮ মে, ২০১৭ তারিখে ৫৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।

আল জাজিরা বর্ডার গেট (সংযুক্ত আরব আমিরাত): মধ্যপ্রাচ্য একটি শুষ্ক মরুভূমি যেখানে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায়শই ৫০ ডিগ্রির সীমা অতিক্রম করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) আল জাজিরা বর্ডার গেটে ২০০২ সালের জুলাই মাসে ৫২.১ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।

মেক্সিকালি (মেক্সিকো): উত্তর মেক্সিকোতে, মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্তে অবস্থিত, মেক্সিকালিতে ২৮ জুলাই, ১৯৯৫ তারিখে তাপমাত্রা ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল।

জেদ্দা (সৌদি আরব): মধ্যপ্রাচ্যর উষ্ণতম অঞ্চলগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের মরুভূমিও   ব্যতিক্রম নয়। ২০১০ সালের ২২ জুন, সৌদি আরবের জেদ্দা শহরে সর্বোচ্চ ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।

সূত্র : ইন্ডিয়া ডট কম

mzamin