Friday, September 25, 2026

ফিলিস্তিনিদের গণহত্যা আড়ালের চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু, বললেন মামদানি

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ পুনরাবৃত্তি করে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ‘গণহত্যাকে আড়াল করার’ চেষ্টা করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি।

বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর এক বিবৃতিতে মমদানি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, নেতানিয়াহু এর আগেও বারবার একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।

মমদানি বলেন, নেতানিয়াহু জাতিসংঘের ভাষণে এমন কিছু ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ পুনরাবৃত্তি করেছেন, যার উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে তার সরকারের কর্মকাণ্ডকে আড়াল করা। তার দাবি, কোনো বক্তব্যই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি পরিবর্তন করতে পারে না।

জাতিসংঘের ভাষণে নেতানিয়াহু মামদানিরও সমালোচনা করেন। তিনি নিউইয়র্কের মেয়রকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বলে উল্লেখ করেন এবং অভিযোগ করেন, মামদানির বক্তব্যের কারণে নিউইয়র্কে অনেক ইহুদি নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না।

নেতানিয়াহু গাজায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন। তার ভাষায়, ইসরাইল গণহত্যা করেনি; বরং গণহত্যা ঠেকিয়েছে। তিনি মামদানির বিরুদ্ধে ইসরাইল সম্পর্কে ‘মিথ্যা’ অভিযোগ ছড়ানোরও অভিযোগ করেন।

এর পরই মামদানি নেতানিয়াহুর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, বক্তব্যের মাধ্যমে কোনো অভিযোগ বা বাস্তবতা বদলে দেওয়া সম্ভব নয় এবং নেতানিয়াহু এখনো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আওতায় রয়েছেন।

এদিকে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের শুরুতেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের হল থেকে কয়েক ডজন দেশের প্রতিনিধি বেরিয়ে যান। ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়। একই সময়ে জাতিসংঘের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৪ সালে নেতানিয়াহু ও সাবেক ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আদালতের অভিযোগে গাজা যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা বলা হয়। ইসরাইল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই, আল-জাজিরা ও ডন

ফিলিস্তিনিদের গণহত্যা আড়ালের চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু, বললেন মামদানি
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে হতাশ ট্রাম্প

জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত দুই নেতার শীর্ষ বৈঠকে সৌজন্য ও আনুষ্ঠানিকতার কমতি ছিল না। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বাণিজ্য, তাইওয়ান কিংবা ইরান ইস্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল বিষয়গুলোতে বড় কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকের পর দুই নেতা ও তাদের স্ত্রীদের সম্মানে হোয়াইট হাউসে আয়োজন করা হয় রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের। কালো টাইয়ের আনুষ্ঠানিক পোশাকে আয়োজিত ওই নৈশভোজে তিলের আবরণে পরিবেশিত শি-বাসসহ বিভিন্ন পদ রাখা হয়। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের অনেক শীর্ষ নির্বাহী।

হোয়াইট হাউসের বাইরে অবশ্য ছিল ভিন্ন দৃশ্য। একদল বিক্ষোভকারী চীনবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। লালগালিচা পাতা সিঁড়িতে দুই নেতা ছবি তোলার সময়ও তাদের স্লোগান শোনা যাচ্ছিল।

নৈশভোজে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প দুই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্যের কথা উল্লেখ করলেও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দুই নেতা ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করলেও দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে এবং তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো।

এরপর অতিথিদের নির্মাণাধীন নতুন বলরুম ঘুরিয়ে দেখান ট্রাম্প। এর কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি শিকে হোয়াইট হাউস কমপ্লেক্সে তৈরি করা একটি নতুন হেলিপ্যাড দেখিয়েছিলেন। ওয়াশিংটনের অবকাঠামো ও স্থাপনা পুনর্গঠনে ট্রাম্পের আগ্রহের বিষয়টি এসব আয়োজনেও প্রতিফলিত হয়।

অন্যদিকে শি জিনপিং বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি বিষয়ে দুই পক্ষ অভিন্ন বোঝাপড়ায় পৌঁছেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব আলোচনা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তবে কোন কোন বিষয়ে কী ধরনের সমঝোতা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।

শি বলেন, বিশ্বের বড় দেশ হিসেবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। একই সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক পরিচালনায় নতুন ধরনের পদ্ধতি অনুসরণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আলোচনায় তাইওয়ান ইস্যু

বৃহস্পতিবার বিকেলে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যু উত্থাপন করেন শি জিনপিং। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তিনি ওয়াশিংটনকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানান। তবে বৈঠক নিয়ে হোয়াইট হাউসের নিজস্ব বিস্তারিত বিবরণ তখনও প্রকাশ করা হয়নি।

ধারণা করা হচ্ছিল, শি জিনপিং ট্রাম্পের কাছে তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধের বিষয়টি তুলতে পারেন। এর আগে মে মাসে চীন সফরের পর ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন না দিয়ে তিনি তা স্থগিত রেখেছেন। সে সময় তিনি এটিকে চীনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

ট্রাম্পের ওই অবস্থান নিয়ে এশিয়ার কয়েকটি মার্কিন মিত্রদেশের পাশাপাশি তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কিছু সদস্যও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন কমিয়ে দিতে পারে।

তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও বেইজিং নাকচ করেনি।

বাণিজ্যযুদ্ধ ও বদলে যাওয়া সুর

ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক এমন এক সময়ে হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের বক্তব্যে আগের কঠোর অবস্থানের বদলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও দুই দেশের বাণিজ্যিক অগ্রগতির বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়।

ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পর শিকে স্বাগত জানিয়ে ট্রাম্প তার সঙ্গে ‘দারুণ বন্ধুত্বের’ কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, মে মাসে তার চীন সফরের পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।

শি অবশ্য ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে দুই দেশের জাতীয় স্বার্থের পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর বেশি জোর দেন। তার মতে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা স্বাস্থ্যকর হওয়া উচিত। মার্কিন কোম্পানিগুলোকে চীনে স্বাগত জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্রেও চীনা কোম্পানিগুলো ন্যায্য আচরণ পাবে।

দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন শি। তার মতে, এ ধরনের যোগাযোগ সংকট তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

পূর্ব এশিয়া বিষয়ে হোয়াইট হাউসের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এডগার্ড কাগান মনে করেন, দুই নেতার বক্তব্যে তাদের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। বর্তমানে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে (সিএসআইএস) কর্মরত কাগানের মতে, ট্রাম্প বিষয়টিকে মূলত শির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করছেন। বিপরীতে শি বেশি সতর্ক এবং জাতীয় পর্যায়ের সম্পর্কের দিকটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

ইরান ও এআই নিয়েও মতপার্থক্য

বৈঠকের সময় ইরান ইস্যুও আলোচনায় আসে। এর আগে জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন এবং দেশটিকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার হুমকিও দিয়েছিলেন। তবে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় তার বক্তব্য ছিল তুলনামূলকভাবে ভিন্ন সুরের।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, শি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার যুদ্ধবিরতির পথে ফিরতে এবং শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির জন্য আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিতে রাজি করানোর বিষয়ে চীনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও দুই নেতা কথা বলেন। শি বলেন, এআইয়ের বিকাশ এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে, যাতে এর নিয়ন্ত্রণ সবসময় মানুষের হাতে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। ফলে এ বিষয়ে প্রতীকী কিছু সমঝোতার বাইরে বড় ধরনের চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ নয়। বিশেষ করে মার্কিন প্রযুক্তিপণ্যের ওপর আরোপিত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার বিষয়ে চীনের আগ্রহ থাকলেও ওয়াশিংটন সেগুলো কঠোরভাবে বজায় রাখার পরিকল্পনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

এক দশকের বেশি সময় পর ওয়াশিংটনে সি

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের নেতাদের মধ্যে এ বছর এটি দ্বিতীয় বৈঠক। এক দশকেরও বেশি সময় পর শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফর হওয়ায় বৈঠকটি কূটনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

আনুষ্ঠানিকতা ও ক্ষমতাধর নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া ট্রাম্পের কাছে শির এই সফর কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি জাতীয় মর্যাদার বিষয় হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তবে বৈঠকের সরাসরি সম্প্রচার নিয়েও তৈরি হয় বিতর্ক। হোয়াইট হাউস সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোকে নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে ওই নেটওয়ার্কগুলো ট্রাম্প ও শির বক্তব্য সরাসরি সম্প্রচার করেনি।

রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। অতিথি তালিকায় ছিলেন অ্যাপলের টিম কুক, অ্যামাজনের জেফ বেজোস, অ্যালফাবেটের সুন্দর পিচাই, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, টেসলার ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং।

তবে প্রযুক্তি খাতের এত বড় প্রতিনিধিদল উপস্থিত থাকলেও এআই ও প্রযুক্তি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিরোধগুলোতে তাৎক্ষণিক বড় কোনো সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ফলে আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন ও উষ্ণ কূটনৈতিক বার্তার বিপরীতে ট্রাম্প–শি বৈঠক থেকে বড় ধরনের বাস্তব সমঝোতা কতটা বেরিয়ে এসেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

সূত্র: রয়টার্স 

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে হতাশ ট্রাম্প

কূটনৈতিক দুর্বলতায় বেরিয়ে এলো ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দাম্ভিক সুরের বক্তব্য থেকে শুরু করে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক; বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই চলতি সপ্তাহে ব্যস্ত কূটনৈতিক কর্মসূচি সাজিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সপ্তাহজুড়ে তার নানা তৎপরতা ঘরে-বাইরে ক্রমবর্ধমান সমস্যার মুখে পড়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাই বরং স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত যুদ্ধের প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, কমতে থাকা জনপ্রিয়তা, মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চীনের অগ্রগতি। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট; বিভিন্ন ইস্যুতে বিশ্বনেতাদের কাছ থেকেও ট্রাম্প প্রশাসন আগের তুলনায় বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রগতি থমকে গেছে কি না, এমন প্রশ্নও উঠছে। এর সঙ্গে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিসর আরও সংকুচিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

জাতিসংঘে কঠোর বার্তা

মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে তার পররাষ্ট্রনীতির কঠোর অবস্থান আবারও তুলে ধরেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে গড়ে ওঠা বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও স্পষ্ট হয় বক্তব্যে।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইরান সমঝোতায় রাজি না হলে দেশটিকে ধ্বংস করার হুমকি দেন ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলার মতো তেল উৎপাদনকারী দেশের ক্ষেত্রে তার চাপ প্রয়োগের নীতিও সমর্থন করেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।

তবে কঠোর বক্তব্যের বিপরীতে বৃহস্পতিবার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্পকে তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থানে দেখা যায়।

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে সীমিত ফল


শির রাষ্ট্রীয় সফরকে ঘিরে হোয়াইট হাউসে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন হলেও বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান ও ইরানসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। বৈঠকের সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল ছিল দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত।

চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে শি ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত এই দ্বীপটিকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে চীন। তাইওয়ান ইস্যু ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি।

চীনের বিরল খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণও ট্রাম্পের আগের কঠোর অবস্থানকে প্রভাবিত করেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। প্রযুক্তি ও গাড়ি শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ এসব খনিজ সরবরাহ প্রয়োজনে চীন সীমিত করতে পারে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ট্রাম্প এমন এক বিশ্বব্যবস্থায় ফিরতে চাইছেন যেখানে শক্তিই প্রধান নিয়ামক। তবে শি জিনপিং ও চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি থমকে যাওয়ার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্য বিশ্বজুড়ে মার্কিন স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন সাফল্য তুলে ধরেছে।

ইরান যুদ্ধেই বড় অচলাবস্থা

ট্রাম্পের ব্যস্ত কূটনৈতিক সপ্তাহের ওপর সবচেয়ে বড় ছায়া ছিল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরুর পর প্রায় সাত মাস ধরে সংঘাত চলছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে।

ইরানের প্রতিরোধ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম জটিল পররাষ্ট্রনীতি সংকটে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের ভাষণে ট্রাম্প ইরানে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে আগের চেয়ে শক্তিশালী বলে দাবি করলেও যুদ্ধটি মার্কিন রাজনীতিতেও বিভাজন তৈরি করেছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

মিত্ররাও এখন প্রকাশ্যে ভিন্নমত জানাচ্ছেন

ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাওয়ার ট্রাম্পের আহ্বান ইউরোপ ও এশিয়ার বেশির ভাগ মিত্রই প্রত্যাখ্যান করেছে। এ নিয়ে জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনেও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মিত্র পরোক্ষভাবে ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেছেন।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বিশ্বকে ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে শক্তি ও জবরদস্তিনির্ভর একটি বিশ্ব এবং সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজের মধ্যে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন রয়েছে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও বিদেশি হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, তার দেশের পানিসীমায় বিমানবাহী রণতরী নয়, বরং অপরাধে অর্থ ও অস্ত্রের প্রবাহ বন্ধে সহযোগিতা প্রয়োজন।

হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা অবশ্য এসব বক্তব্যকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান হিসেবে দেখতে রাজি নন। তার দাবি, ট্রাম্প দেখনদারি নয়, ফলাফল নিয়ে বেশি আগ্রহী এবং অনেক বিশ্বনেতার প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনার অবস্থানের মিল নেই।

রাশিয়া-ইউক্রেন ও গ্রিনল্যান্ডেও প্রতিরোধ

রাশিয়া ও ইউক্রেনকে সীমিত জ্বালানি অবকাঠামো যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর ট্রাম্পের উদ্যোগও প্রত্যাশিত অগ্রগতি পায়নি।

গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করলেও সেটি ট্রাম্পের প্রাথমিক দাবি ‘গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নেওয়া’ থেকে অনেক দূরের বিষয়। সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটি দখলের হুমকিও তিনি বিভিন্ন সময়ে দিয়েছিলেন।

ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এক বছর আগে যে দেশগুলো ট্রাম্পের বিরোধিতা করতে ভয় পেত, এখন কানাডা, ইউরোপ, চীন, ইরান ও রাশিয়াসহ অনেক দেশই তাকে ‘না’ বলতে বেশি আগ্রহী।

এমনকি জাতিসংঘে নিজের বক্তব্যের এক পর্যায়ে ট্রাম্প নিজেই প্রশ্ন তোলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার ক্ষমতা কতটা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ হিসেবে পুনর্নামকরণের কথা বলার পর তিনি বলেন, ‘দেখা যাক আমার কোনো ক্ষমতা আছে কি না। হয়তো আছে, হয়তো নেই। খুব শিগগিরই আমরা তা জানতে পারব।’

সূত্র : রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স

‘ব্রাজিলকে উপনিবেশ বানিয়ে সম্পদ লুটতে চান ট্রাম্প’

লুলার নির্বাচনি শিবিরের অভিযোগঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রাজিলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করতে এবং ব্রাজিলকে ‘উপনিবেশে’ পরিণত করতে চান। এমন অভিযোগ করেছে প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নির্বাচনি প্রচার শিবির। অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) প্রচারিত এক টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে এ অভিযোগ করা হয়।

এক মিনিটের ওই বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ট্রাম্পের স্বার্থ এগিয়ে নিতে ব্রাজিলের ডানপন্থি প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে মার্কিন প্রশাসন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘ফ্লাভিও বলসোনারো ট্রাম্পের প্রার্থী। ট্রাম্প যা চান, তা হলো ব্রাজিলকে উপনিবেশে পরিণত করা, আমাদের সম্পদ নিয়ে যাওয়া এবং আমাদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নেওয়া।’

লুলা নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অভিযোগ করেন, বলসোনারো ব্রাজিলের প্রাকৃতিক সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে চান। তার ভাষ্য, এমনটা হলে ব্রাজিল আবারও উপনিবেশে পরিণত হবে।

তবে ব্রাজিলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। গত মাসে এক বিবৃতিতে তারা বলেছিল, একটি গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনকে দুর্বল করার কোনো পরিকল্পনার ইঙ্গিত ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’।

৪ অক্টোবর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোট হবে। নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ব্রাজিলে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লুলা ও তার সমর্থকরা। এর মধ্যে ব্রাজিলের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কও রয়েছে। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপের পর ব্রাজিলের নির্বাচনি রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়।

চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণেও বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করেন লুলা। কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, দেশের ভেতর ও বাইরের কোনো ‘গণতন্ত্রের শত্রুকে’ ব্রাজিলের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে দেওয়া হবে না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ৩১ ডেমোক্র্যাট সদস্যও ব্রাজিলের নির্বাচনে ট্রাম্প প্রশাসনের কথিত হস্তক্ষেপ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে চিঠি দিয়েছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে ব্রাজিলের নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। রুবিওর কাছে তারা ব্রাজিলের নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে সম্মান করার বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান জানতে চেয়েছেন এবং ১ অক্টোবরের মধ্যে জবাব দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।

লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক এডেন ভ্যালাদারেস বলেন, বিজ্ঞাপনটি ব্রাজিলের জনগণকে কথিত মার্কিন হস্তক্ষেপ সম্পর্কে সতর্ক করার প্রচেষ্টার অংশ। তার ভাষ্য, বিষয়টি মোকাবিলায় দেশজুড়ে কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তবে শুধু লুলার বামপন্থি শিবিরই নয়, ডানপন্থি প্রার্থী রেনান সান্তোসও ট্রাম্পের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিরল খনিজসম্পদ নিয়ে লাভজনক চুক্তির স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। একই সঙ্গে তিনি ব্রাজিলকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অধীনস্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত করার বিরোধিতা করেন।

ব্রাজিলের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে লুলা ও ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘিরে প্রচারও তীব্র হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তা প্রত্যাখ্যান, দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি ব্রাজিলের নির্বাচনি রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ছবি: রয়টার্স
লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ছবি: রয়টার্স

হরমুজ খুলে দিলে ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত অবসানে ধাপে ধাপে একটি সমঝোতার পথ নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের সুযোগ করে দেবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করবে। বিষয়টি নিয়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে দুই দেশের আলোচকরা কাজ করছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স। এ বরাতে শুক্রবার খবর প্রকাশ করেছে আরব নিউজও।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইরানি, আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, প্রায় সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে হরমুজ প্রণালি এখন আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। ইরান মার্কিন অবরোধের কারণে অর্থনৈতিক চাপ কমাতে চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হোক।

একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, সংকট সমাধানের সম্ভাব্য পথ হতে পারে ধাপে ধাপে একটি ব্যবস্থা নেওয়া। এর প্রথম ধাপে অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি থাকতে পারে। এর পাশাপাশি ইরান বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ব্যবহারের সুযোগও পেতে পারে।

তবে বড় বাধা হলো, দুই পক্ষই আলোচনার আগে নিজেদের হাতে থাকা চাপ প্রয়োগের উপায় ছেড়ে দিতে চাইছে না। ওয়াশিংটনের হাতে রয়েছে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ, আর তেহরানের হাতে রয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। ফলে কোনো পক্ষই বিনিময়ে দৃশ্যমান সুবিধা ছাড়া নিজেদের অবস্থান দুর্বল করতে রাজি নয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ৩ নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি হতে পারে। এর আগে জুলাইয়ে দুই পক্ষের মধ্যে একটি অস্থায়ী সমঝোতা ভেঙে পড়েছিল। তাই এবারের আলোচনায় শুধু চুক্তির কাঠামো তৈরি নয়, দুই পক্ষের ছাড়গুলো দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান চুক্তির জন্য মরিয়া হলেও ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনা করছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ ইরানের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে ট্রাম্প সঠিক পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত বলেও ওই কর্মকর্তা জানান।

সাবেক মার্কিন আলোচক ডেনিস রস বলেছেন, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত। তবে তার মতে, নির্বাচনের আগে দুই পক্ষেরই সমঝোতায় পৌঁছানোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে। রস বলেন, মার্কিন অবরোধই ইরানের ওপর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের ট্রানজিট ফি আদায়ের দাবি মূল চুক্তি থেকে সরিয়ে আলাদা সংযুক্তিতে রাখার বিষয়ে তেহরান নমনীয় হতে পারে। কারণ বর্তমানে তাদের কাছে অবরোধ প্রত্যাহার করাই বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো অবশ্য ট্রানজিট ফি দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে এর অর্থ হরমুজের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি থেকে ইরান সরে যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য, তেহরান প্রণালির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। ফলে ট্রানজিট ফি নিয়ে আপসের সুযোগ থাকলেও হরমুজের ওপর ইরানের কর্তৃত্বের প্রশ্নটি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে। এর মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোতে চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্পও সতর্ক করেছেন, চুক্তি না হলে ইরানের অর্থনীতি আরও সংকটে পড়তে পারে।

অন্যদিকে ইরান আলোচনার পাশাপাশি নতুন করে সংঘাতের প্রস্তুতিও রাখছে। এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক শক্তির হুমকি দিয়ে চাপ প্রয়োগ করছে। তার ভাষ্য, কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা কম হলেও তেহরান আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করছে না।

হরমুজ নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থানও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্কে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে উপসাগরীয় নেতারা হরমুজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষেও জোর দিচ্ছেন।

আবুধাবিভিত্তিক এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ইবতেসাম আল-কেতবি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তার মতে, ইরান হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে ঘিরে নিজেদের কৌশল নির্ধারণ করছে, কিন্তু ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখনো পরিষ্কার নয়।

সাবেক মার্কিন আলোচক অ্যালান আইরও বলেছেন, অবরোধ ইরানের ওপর চাপ বাড়ালেও এতে তেহরান আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। কারণ ইরানের আশঙ্কা, অবস্থান নরম করলে তারা আরও বড় চাপের মুখে পড়বে।

এক পশ্চিমা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু মূলত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যে রয়েছে এবং এই বাস্তবতা আলোচনাকে প্রভাবিত করছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে খবর প্রকাশের পর তেলের বাজারেও এর প্রভাব দেখা যায়।

সূত্র: আরব নিউজ ও রয়টার্স

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ। ওমানের মুসান্দাম থেকে ড্রোনের সাহায্যে ছবিটি তুলেছে রয়টার্স
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ। ওমানের মুসান্দাম থেকে ড্রোনের সাহায্যে ছবিটি তুলেছে রয়টার্স

প্রশংসার আশায় জাতিসংঘে পেজার এনে উপহাস পেলেন নেতানিয়াহু

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বেতার টেলিযোগাযোগ যন্ত্র পেজার তুলে ধরেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের পেজার হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরতে তিনি এটি প্রদর্শন করেন। তবে তার বক্তৃতার শুরুতেই জাতিসংঘের বিভিন্ন দেশের কয়েক ডজন প্রতিনিধি হল ছেড়ে বেরিয়ে যান। এ সময় নেতানিয়াহুর বক্তব্যের বিরুদ্ধে শোনা যায় দুয়োধ্বনি ও প্রতিবাদ। খবর এনডিটিভির।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু গত তিন বছরে ইসরায়েলকে ‘সাতটি ফ্রন্টে’ যুদ্ধ করতে হয়েছে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, নিউ জার্সির সমান আয়তনের একটি দেশ কীভাবে তিন বছর ধরে সাতটি ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে পারে; এমন প্রশ্নও তোলেন।

বক্তৃতার শুরুতেই অনেক প্রতিনিধি হল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ায় অধিবেশনকক্ষের বড় একটি অংশ ফাঁকা হয়ে যায়। নেতানিয়াহুর নিজস্ব প্রতিনিধিদলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে করতালি দিয়ে সমর্থন জানান। অধিবেশন পরিচালনাকারীকে বারবার শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানাতে দেখা যায়। পরে যারা হল ছেড়ে যান, তাদের ‘নৈতিকভাবে কাপুরুষ’ বলে মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু।

বক্তৃতায় ইরানকে ‘হত্যাকারী একনায়কতন্ত্র’ বলে অভিহিত করেন নেতানিয়াহু। তার দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা থেকে দূরে রেখেছে।

তিনি বলেন, ইসরায়েলকে ধ্বংসের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে ইরানকে এগোতে না দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানের নেতৃত্বের পতন খুব বেশি দূরে নয় বলেও মন্তব্য করেন।

তবে ইরান সরকার এখনো ক্ষমতায় রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান অব্যাহত রেখেছে।

হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের হামলার প্রসঙ্গে নেতানিয়াহু তার বক্তব্যের সময় একটি পেজার হাতে তুলে ধরেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার অভিযানের অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহ সদস্যদের ব্যবহৃত পেজারে বিস্ফোরক সংযোজন করা হয়েছিল বলে ব্যাপকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। পরে এসব ডিভাইস বিস্ফোরিত হলে হিজবুল্লাহর সদস্যদের পাশাপাশি বেসামরিক লোকজনও হতাহত হন।

পেজারটি তুলে ধরে নেতানিয়াহু বলেন, ‘বিপারগুলোর কথা মনে আছে? আমি আপনাদের বলতে পারি, হিজবুল্লাহ অবশ্যই সেগুলো মনে রেখেছে।’

বক্তৃতায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে ‘স্বৈরশাসক’ বলে আক্রমণ করেন নেতানিয়াহু। তুরস্ক ইরান-সমর্থিত হামাসকে সমর্থন করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও তীব্র আক্রমণ করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। মামদানিকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে নেতানিয়াহু দাবি করেন, তিনি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নিউইয়র্কে অনেক ইহুদি নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। মামদানি এর আগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।

এছাড়া যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উপনিবেশবাদের অভিযোগ তোলার সমালোচনা করে তিনি দেশ দুটির নিজেদের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন।

নেতানিয়াহুর এবারের নিউইয়র্ক সফর ছিল সংক্ষিপ্ত। ইসরায়েলে নির্বাচনি প্রচারণা জোরদার হওয়ার মধ্যেই তিনি জাতিসংঘে বক্তব্য দিতে নিউইয়র্কে আসেন। তার সফরে শীর্ষ মার্কিন নেতাদের সঙ্গে কোনো বৈঠক নির্ধারিত ছিল না।

সূত্র : এনডিটিভি

জাতিসংঘে বক্তৃতা দিতে গিয়ে পেজার প্রদর্শন করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এএফপি
জাতিসংঘে বক্তৃতা দিতে গিয়ে পেজার প্রদর্শন করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এএফপি

দোয়া: সহজ সমাধানের জন্য প্রার্থনা by ইসমত আরা

মানুষ জীবনে কখনো না কখনো এমন অবস্থায় পড়ে, যখন তার কাছে ইবাদত, দায়িত্ব, শিক্ষা বা জীবনের চাপ—এগুলো অনেক কঠিন মনে হয়। যদিও আল্লাহ প্রদত্ত কোনো সমস্যাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একটি নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর সমস্যাগুলো মিটে যায়, নতুবা হালকা হয়ে যায়।

তাই যিনি সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আগেই আমাদের সব সমস্যার সমাধান জানেন, আমাদের কাজগুলো সহজ করে দেওয়ার জন্য, আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান করে দেওয়ার জন্য তাঁর কাছেই প্রার্থনা করতে হবে।

বিভিন্ন কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া ও রাসুলের শিখিয়ে দেওয়া প্রার্থনা করা মুমিনের শক্তি বাড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠিন কাজে পতিত হলে একটি দোয়া পড়ার শিক্ষা দিয়েছেন। এটি মানসিক ভার, কাজের জটিলতা দূর করার জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি দোয়া।

যাদের কাছে কোরআন শেখাটা কঠিন লাগে, ফজরে জেগে উঠতে কষ্ট হয় কিংবা জীবনের নানান দায়িত্ব ভারী মনে হয়—তারা এই দোয়া নিয়মিত পড়তে পারে।

নামাজের সিজদায়, তাশাহুদের বৈঠকে অথবা যেকোনো কষ্টের মুহূর্তে তাওয়াক্কুল নিয়ে বেশি বেশি পড়া যেতে পারে।

দোয়াটি হল:
‘আল্লাহুম্মা লা সাহলা ইল্লা মা জা’আলতাহু সাহলান, ওয়া আনতা তাজ’আলুল হাযনা ইযা শি’তা সাহলান।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি যা সহজ করেন, তা ছাড়া কোনো কিছুই সহজ নয়। আর আপনি যখন ইচ্ছা করেন, তখন কঠিনকেও সহজ করে দেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ২,৪২৭)

দোয়া করার পাশাপাশি নিজ দায়িত্বে চেষ্টা করাও ইমানদারের বৈশিষ্ট্য। যে চেষ্টা করেন, আল্লাহ তাঁকেই সাহায্য করেন। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সব কাজ, দায়িত্বগুলো সহজ করে দেন। আমিন।

* ইসমত আরা, শিক্ষক, লেখক
- writerismat@gmail.com

সহজ সমাধানের জন্য প্রার্থনা
ছবি: রয়টার্স

প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধে নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইক যে সিদ্ধান্ত নিল by হাসান ইমাম

প্রকাশ ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকের মঞ্চে এখন থেকে ফার (প্রাণীর পশমে তৈরি উপকরণ) ব্যবহার নিষিদ্ধ। এই নিয়ম ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে।

নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকের আয়োজক দ্য কাউন্সিল অব ফ্যাশন ডিজাইনারস অব আমেরিকা (সিএফডিএ) দাপ্তরিকভাবে বিষয়টি ঘোষণা করেছে। সিএফডিএর সঙ্গে এই উদ্যোগে শামিল হয়েছে হিউম্যান ওয়ার্ল্ড ফর অ্যানিমেলস অ্যান্ড কালেকটিভ ফ্যাশন জাস্টিস।

সিএফডিএ জানিয়েছে, তাদের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অংশগ্রহণকারীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার জন্যই স্প্রিং/সামার ২০২৭ কালেকশনের মৌসুমটি (সেপ্টেম্বর ২০২৬) বেছে নেওয়া হয়েছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হতে যাওয়া নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকের রানওয়েতে ফারের ব্যবহার দেখা গেলেও যেতে পারে।

যদিও বেশ কয়েক বছর ধরে এই মঞ্চে ফারের ব্যবহার খুবই কম দেখা গেছে। তারপরও দাপ্তরিক সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছে প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। মনে করা হচ্ছে, এতে নিরীহ প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা কমবে।

সিএফডিএ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আশা করছি এ সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন ডিজাইনারদের প্রাণিকুল সম্পর্কে আরও গভীরভাবে ভাবতে সাহায্য করবে।’

নতুন এই নিয়মে (ফারের ব্যবহার–সংক্রান্ত), যেসব প্রাণীকে কেবল পশমের জন্য মেরে ফেলা হয় (যেমন মিঙ্ক, শিয়াল, খরগোশ, কারাকুল ভেড়া, চিনচিলা, কায়োটি, কমন র‍্যাকুন ডগ), সেসব প্রাণীর পশমসহ চামড়ার আবরণ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে।

তবে আদিবাসীদের যাঁরা ঐতিহ্যবাহী শিকারপদ্ধতির মাধ্যমে প্রাণীর চামড়া সংগ্রহ করেন, তাঁদের জন্য কিছুটা ব্যতিক্রম নীতি থাকবে।

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরেই প্রাণীর পশমসহ নির্দয়ভাবে চামড়া সংগ্রহ করে ফ্যাশন পণ্য তৈরির বিষয়ে সমালোচনা করে আসছেন প্রাণিপ্রেমীরা। তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে সেরা চার ফ্যাশন উইকের মধ্যে প্রথমেই লন্ডন ফ্যাশন উইক ২০১৮ সাল থেকে ফার ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। এবার সেই পথে পা বাড়াল নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইক।

গুচি, কোচ, শ্যানেলের মতো লাক্সারি ব্র্যান্ডগুলোয়ও সাত বছর ধরে বন্ধ আছে ফারের ব্যবহার। তবে মিলান ও প্যারিস ফ্যাশন উইকে এখনো ফারের ব্যবহার চোখে পড়ে।
বিশ্বখ্যাত মিডিয়া প্রতিষ্ঠান কোড নেস্ট (যাদের মালিকানায় আছে ‘ভোগ’, ‘গ্ল্যামার’ ও ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’–এর মতো ম্যাগাজিন), ‘এল’ ও ‘ইনস্টাইল’ ম্যাগাজিন সম্পাদকীয় নীতি তৈরি করে ফারের প্রচারণা এবং বিজ্ঞাপন বন্ধ রেখেছে।

সূত্র: ভোগ

প্রাণীর পশমে তৈরি পোশাকে রানওয়েতে মডেল
নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন উইকের মঞ্চে আর এমন পোশাক দেখা যাবে না। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে