Saturday, March 29, 2014

‘নির্ভরযোগ্য তথ্যে’ নতুন অঞ্চলে তল্লাশি

স্পেনের গ্রান ক্যানারিয়া দ্বীপের কাছে সাগরে এই
ছবিটি ধরা পড়ার পর রটে যায়—মালয়েশিয়ার
নিখোঁজ বিমানটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। দ্রুত
সেখানে পাঠানো হয় উদ্ধারকর্মীদের। পরে জানা যায়,
জিনিসটি আসলে একটি টাগ বোট। এতে বহন
করা হচ্ছে বড় আকৃতির কোনো কিছু। বিবিসি
মালয়েশিয়ার নিখোঁজ উড়োজাহাজ অনুসন্ধানে গতকাল শুক্রবার ভারত মহাসাগরের নতুন এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি আগের অনুসন্ধান এলাকা থেকে প্রায় ৭০০ মাইল উত্তরে। অভিযানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ‘নির্ভরযোগ্য তথ্যের’ ভিত্তিতেই নতুন অনুসন্ধান এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এদিকে অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র নিরাপত্তাবিষয়ক কর্তৃপক্ষ (এএমএসএ) গতকাল জানিয়েছে, নিউজিল্যান্ডের বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ থেকে তোলা ছবিতে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে ১১টি বস্তু দেখা গেছে, যা মালয়েশীয় বোয়িং বিমানটির ধ্বংসাবশেষ হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে আজ শনিবার পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অনুসন্ধান অভিযানের সমন্বয়কারী এএমএসএ গতকাল এক বিবৃতিতে জানায়, আন্তর্জাতিক তদন্ত দলের কাছ থেকে পাওয়া নতুন তথ্যের ভিত্তিতে নতুন অনুসন্ধান এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই তদন্ত দল রাডারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে উড়োজাহাজটির গতি আগের ধারণার চেয়ে বেশি ছিল। এর ফলে এর জ্বালানির ব্যবহার যেমন বেড়ে যায়, তেমনি সম্ভাব্য গন্তব্যের দূরত্বও কমে যায়। ওই সময় উড়োজাহাজটির অবস্থান ছিল ভারত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চলে। বিবৃতিতে বলা হয়, এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আগের এলাকা থেকে ৬৮৪ মাইল উত্তরে নতুন অনুসন্ধান এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে।
নতুন অনুসন্ধান এলাকার অবস্থান হবে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ বন্দর থেকে এক হাজার ৮৫০ মাইল পশ্চিমে, যা আগের অনুসন্ধান এলাকার চেয়ে স্থলভাগের বেশি কাছে। নতুন এলাকা সাগরের সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল ‘গর্জনশীল চল্লিশা’র বাইরে হওয়ায় অনুসন্ধান অভিযান আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এদিকে মালয়েশিয়ার ভারপ্রাপ্ত পরিবহনমন্ত্রী হিশামুদ্দিন হুসেইন গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, নিখোঁজ উড়োজাহাজ নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত দলের দেওয়া নতুন তথ্য ‘বিবেচনার’ দাবি রাখে। যদিও অনুসন্ধান অভিযান এখন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন, নতুন অনুসন্ধান এলাকা চিহ্নিত করার মানে এটা নয় যে সম্ভাব্য ধংসাবশেষ হিসেবে বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইটে পাওয়া কয়েক শ বস্তুর বিষয় একেবারেই অবজ্ঞা করা হচ্ছে। মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর উড়োজাহাজটি ২৩৯ জন আরোহী নিয়ে গত ৮ মার্চ নিখোঁজ হয়। মধ্যরাতের পর কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করে এক ঘণ্টা পরই রাডারের সঙ্গে এর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিবিসি, এএফপি ও সিএনএন।

কোনো দলে নেই আমির খান

আমির খান
ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের দৌড়ে বলিউডের তারকাদের লম্বা লাইন পড়ে গেছে। প্রার্থী হয়েছেন অনেক। এর মধ্যে অভিনেতা আমির খানকে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়ে জানাতে হলো তিনি কোনো দলের সঙ্গে নেই। চিঠিতে আমির খান জানান, তিনি অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির (এএপি) সমর্থক নন।
ওই দলের সমর্থক বলে তাঁকে নিয়ে যে গুজব রটেছে, সেটি বন্ধ করতে তিনি নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানান। আমির খানের ছবিসংবলিত একটি ‘পোস্টার’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই পোস্টারে লেখা হয়েছে, এবার আমির এএপিকে ভোট দেবেন। এএপিই ওই প্রচারণা চালিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। এনডিটিভি।

সৌদি আরবের পাকিস্তানমুখী যাত্রা by মাই ইয়ামানি

কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সুরক্ষাদাতা যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব ক্রমেই বেড়েছে। মিসরে হোসনি মোবারকের পতনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিম ব্রাদারহুড সরকারকে মেনে নেওয়ার বিষয়টিকে সৌদি আরব বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেছে। তারপর এল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকারের বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নিজের ঘোষিত ‘লাল রেখা’ বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি। তবে চূড়ান্ত আঘাতটি হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে সাম্প্রতিক সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন। যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, যখনই সৌদি আরব তার অস্তিত্বের প্রতি হুমকি অনুভব করেছে (দেশটি ইরানের আঞ্চলিক উচ্চাভিলাষকে সেই রকম একটি হুমকি মনে করে), তখনই সে নিজেকে রক্ষার জন্য বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তিস্তার পানি by মিজানুর রহমান খান

ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে অন্তত আলোচনায় টিকে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা নিয়ে মুখ খুলেছেন। তবে রংপুরে তিস্তা আরও শুকাচ্ছে। সেখানকার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বললেন, ২০ মার্চ তাঁরা ৫০০ কিউসেক পানি মেপেছেন। সেখানে থাকার কথা কমপক্ষে তিন হাজার কিউসেক। ঢের সময় বাদে তিস্তার পানিবণ্টন প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খবরের শিরোনাম হতে দেখা গেল। ভারতে নির্বাচন কড়া নাড়ছে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু কলকাতায় তিস্তা চুক্তি না হওয়া নিয়ে সরাসরি মমতাকে অভিযুক্ত করেন। বামদের এমন অকপট অবস্থানও নতুন। বিমান বসু যথার্থই বললেন, ‘তিস্তা ও ছিটমহল চুক্তি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালেই হতে পারত। মমতা তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করে বাংলাদেশের ভারতবিরোধী মৌলবাদীদের উৎসাহ জুগিয়েছেন।’

পণ্য নয়, মর্যাদায় ধন্য হোন by উম্মে মুসলিমা

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাক্জীবীরা (টক শোয় অংশগ্রহণকারী) বিভিন্ন চ্যানেল সরগরম রাখলেন এ দিবসের তাৎপর্য বা করণীয় নিয়ে। সভা, সেমিনার, শোভাযাত্রা, পত্রপত্রিকার অবদানও কম নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, মানসিক অত্যাচার, নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অনেক কথা হলো। বিজ্ঞাপনে নারীর অবস্থানকেও আলোচনায় আনা হলো। কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীকে কেন পণ্য করা হবে, যেমন গাড়ির বিজ্ঞাপনে নারীকে কেন বিশেষ পোশাকে বিশেষ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে—এসব নিয়ে বাগিবতণ্ডা। বিজ্ঞাপননির্মাতাদের নারীর মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে বা নারীকে সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপন করতে হবে ইত্যাদি।

ও ক্রিকেট, ভালোবাসা ফিরিয়ে দাও by শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

এ চ্যানেল সে চ্যানেল ঘুরে বিটিভি ওয়ার্ল্ডে আটকে গেল চোখ। চিরচেনা জার্সি পরে বল নিয়ে ছুটোছুটি করছে দুই দলের খেলোয়াড়েরা। নিমেষে আবিষ্কার করলাম, দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল আবাহনী ও মোহামেডানের খেলা চলছে। কিন্তু গ্যালারিতে দর্শক কোথায়?

তারেক রহমানের অভিনব ‘রাষ্ট্রপতিতত্ত্ব’ by সোহরাব হাসান

ইতিহাস যাঁরা নির্মাণ করেন, তাঁরা কখনোই ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক করেন না। করার প্রয়োজনও হয় না। ইতিহাস নিয়ে তাঁরাই অহেতুক বিতর্ক করেন, ইতিহাসে যাঁদের অবদান রাখার ন্যূনতম সামর্থ্য ও সাহস নেই।

সামনের লড়াই আরও কঠিন হবে by আবদুল মান্নান

ছাব্বিশে মার্চ ছিল বাংলাদেশের ৪৪তম স্বাধীনতা দিবস। আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ এদিন বেলা ১১টায় ঢাকার জাতীয় প্যারেড ময়দানে সমবেত হয়ে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেছেন। এ ছাড়া দেশের সব জেলায় যে যেখানে আছেন, এই সময়ে সেখানে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গেয়েছেন। দেশের বাইরেও বাঙালিরা এই সময়ে একই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন।

বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে লিভ টুগেদার by শর্মী চক্রবর্তী

আমি আমার বাবা-মাকে ছেড়ে এসেছি, সবকিছু ভুলে তোমাকে নিয়ে বাঁচতে চাই, আমার বাবা-মাও এখন আমাকে নিতে চাইবে না, এখন তুমি যদি আমাকে বউ হিসেবে স্বীকৃতি না দাও তাহলে আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না- গত বুধবার রাতে এ কথাগুলোই ছিল রানার সঙ্গে বর্ণির শেষ কথা। বিয়ে করার প্রতিশ্রুতিতে রানার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল বর্ণি। তার সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিল রানাকে। সম্পর্কের গভীরতা যখন বাড়তে শুরু করে তখন বর্ণি রানাকে বিয়ে করার কথা বলে, তখন সে ‘না’ বলে দেয়।

ক্রিকেট: মা, তোর বদনখানি মলিন হলে...

খুব মন খারাপ করে শেরেবাংলা স্টেডিয়াম থেকে ফিরছিলাম। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল হেরে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে। রাতের অন্ধকার চিরে গাড়ি করে বাড়ি ফিরছি। হাতে একটা পতাকা-স্ট্যান্ড। সেটা কামড়াচ্ছি। নানা কথা মনে হচ্ছে। আমরা কেন এত ক্রিকেট নিয়ে মেতে আছি? আমরা কেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে এত সমর্থন দিই? কেন দল হারলে আমরা মুষড়ে পড়ি। ভেবে ভেবে বের করি, ক্রিকেটাররা আমাদের বেশ কিছু জয় দিয়েছেন। আমরা জানি, আমাদের ফুটবল দল বিশ্বকাপের ফাইনাল রাউন্ডে খেলবে না। আমরা আসলে জাতীয় ও ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন স্তরে মার খেতে খেতে জয়ের জন্য তৃষিত হয়ে আছি; কেউ যদি কোথাও আমাদের একটু জয় এনে দেয়! আমরা বিজয়ীর সঙ্গে থাকতে চাই। যেহেতু নিজের জীবনে জয় নেই, জাতীয় জীবনেও জয় নেই, তাই আমরা আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলকে আঁকড়ে ধরি। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইতালি আমাদের জয় এনে দেবে, এই আশায় বিশ্বকাপ ফুটবলে আমরা মাতোয়ারা হয়ে থাকি। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল হেরে গেছে, আমাদের ভীষণ রাগ, ভীষণ হতাশা! কেন তোরা আমাদের জয় এনে দিতে পারিস না? না পারলে খেলতে যাস কেন? আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটা কথা বলেন। সক্রেটিসকে প্লেটো জিজ্ঞেস করেছিলেন, সর্বোচ্চ দেশপ্রেম কী? সক্রেটিস জবাব দিয়েছিলেন, সবচেয়ে ভালোভাবে নিজের কাজটুকুন করা। সাকিব বা তামিমকে দোষ দেওয়ার আগে আমি আমার নিজের বুকে হাত রেখে প্রশ্ন করি, তুমি কি তোমার কাজটা সবচেয়ে ভালোভাবে করছ? তুমি কি এমন কিছু করেছ, যাতে দেশের মুখোজ্জ্বল হয়? দেশের উপকার হয়?
এই প্রশ্ন আজ আমাদের প্রত্যেককে করতে হবে। আমার ধারণা, আমাদের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বেশির ভাগ নাগরিকই দেশের জন্য এমন কিছু করে না, যা নিয়ে গর্ব করা যায়। আমরা বিদেশে যাওয়ার সময় ডলার নিয়ে যাই, আর কাঁড়ি কাঁড়ি শপিং করে আনি। আমরা বিদেশে নাগরিকত্ব নিই, দেশের ফ্ল্যাট, জমিজমা বিক্রি করে হুন্ডি করে টাকা নিয়ে বিদেশে স্থায়ী হই। আর দুর্নীতি করি, দুর্নীতির টাকা বিদেশে পাঠাই। আমরা আমাদের বন-নদী-জমি ধ্বংস করি। উপকার যদি দেশের কিছু হয়ে থাকে, তা করছেন প্রবাসী শ্রমিকেরা, যাঁরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ডলার আয় করেন আর তা দেশে পাঠান। করছেন আমাদের গার্মেন্টস-শ্রমিকেরা, শরীরের রক্ত পানি করে তাঁরা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা দিচ্ছেন। আমাদের জন্য করছেন কৃষকেরা, ১৬ কোটি মানুষকে অন্ন জোগাচ্ছেন। আর আমরা তথাকথিত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত দুর্নীতি করি। দুর্নীতিপোষক ব্যবস্থাকে কায়েম রাখি আর তার ননি-মাখন তুলে তুলে খাই। আর টেলিভিশনের সামনে বসে মন্তব্য করি, খেলতে পারিস না, খেলতে যাস কেন? অন্যের সমালোচনা করার আগে নিজের চেহারাটা যেন আমরা আয়নায় দেখে নিই। আমি এমন কী করেছি যা বিশ্বসভায় আমাদের দেশের মুখ উজ্জ্বল হতে খানিকটা সাহায্য করেছে? আমার চেয়ে ঢের ভালো ভেড়ামারার রাসেল আহমেদ, যিনি ওই গ্রামে বসে আউটসোর্সিং করছেন, মাসে মাসে ডলার আনছেন, যাঁর সঙ্গে কাজ করছে গ্রামের হাজার যুবক। বিনা পয়সায় স্কুলে পড়েছি, কলেজে পড়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি আর দেশের টাকা বাইরে পাচার করছি। দেশের জল-মাটি-বনানী ধ্বংস করছি।
আমি আবারও বলি, সর্বোচ্চ দেশপ্রেম হলো সবচেয়ে ভালোভাবে নিজের কাজ করা। একটা কথা প্রচলিত আছে, খালি মুরগি কেনার বেলায় আমরা দেশপ্রেম দেখাই, আমরা দেশি মুরগি খুঁজি; তবে আমার মনে হচ্ছে, শুধু মুরগি কেনার বেলায় নয়, আমরা ক্রিকেট দেখার সময় দেশপ্রেমিক হয়ে যাই। এটা সাকিব বা তামিমের দোষ নয় যে তারাই আমাদের দেশের সেরা খেলোয়াড়! আমাদের গরিব দেশ। আমরা মারকুটে স্বভাবের নই। আমরা পররাজ্যে হামলা করিনি। উপনিবেশ স্থাপন করিনি। এখানে ১৭ জন ঘোড়সওয়ার এসে রাজ্য দখল করে নিয়েছে, এখানে কয়েকজন বণিক বাণিজ্য করতে এসে দুই শ বছর শাসন করেছে। আমরা আকারে ছোটখাটো, মনটা মায়ায় ভরা, এখানে কবি আছে, যোদ্ধা কম। কেবল ১৯৭১ সালেই আমরা জেগে উঠেছিলাম বিপুল বিক্রম নিয়ে। ক্রিকেট শারীরিক সক্ষমতারও খেলা। আমরা অপুষ্টির শিকার। শৈশব আমাদের কাটে দারিদ্র্যে, তারপর টাকার মুখ দেখলেই আমরা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ি। তবু আশার কথা যে শচীন টেন্ডুলকার কিংবা ম্যারাডোনা-মেসি কেউ লম্বা নন। কেবল শারীরিক বল দিয়ে ক্রিকেট বা ফুটবল হয় না। খেলায় ভালো করার জন্য লাগে প্রতিভা, প্রশিক্ষণ, নিরলস সাধনা, জিগীষা, মানসিক দৃঢ়তা, খেলোয়াড় তৈরির অবকাঠামো ও ব্যবস্থা, অনুকূল পৃষ্ঠপোষকতা, নেতৃত্ব, প্রতিজ্ঞা, সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব। তবে আমাদের টিমের অবস্থা এখন বোধ করি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ।
শ্রীলঙ্কার সঙ্গে নানা ফর্মে একটা খেলাতেও জিতিনি, এশিয়া কাপেও হোয়াইটওয়াশ হয়েছি, এমনকি আফগানিস্তানের কাছেও হেরেছি খারাপভাবে। টি-টোয়েন্টি প্রথম পর্বে হংকংয়ের কাছে খেলার দিনও কি প্রত্যাশার চাপ ছিল? এই প্রশ্ন নিশ্চয়ই করতে পারি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে খেলার দিন মনে হয়েছে, সাকিব কেন তিন ওভার বল করবেন, সোহাগ গাজী কেন চার ওভার। আরেকটা প্রশ্নও আছে, ধরলাম, আমরা খেলতে পারি না, আমাদের সক্ষমতাই নেই। কিন্তু আমরা পিচও কেন আমাদের মতো করে বানাতে পারি না? পিচ কেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য সহায়ক হয়? এখন একটু ভাবি, যাঁরা বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে সমর্থন দেন তাঁদের কথা। সুসময়ে অনেকেই বন্ধু বটে হয়, দুঃসময়ে হায় হায় কেউ কারও নয়। মঙ্গলবারে বাংলাদেশ জিতলে আমি বলতাম, আমার জন্যই জিতেছে। আমি যে গ্র্যান্ড-স্ট্যান্ডে বসে ছিলাম। হারার সময়ও অবশ্য বলছি, অনেকেই বলছেন, দূর আমি গেলেই হারে। বা আমি অমুক শার্ট পরলে হারে। এই সব কোনো অজুহাত মাত্র নয়। আপনি-আমি তো আর মাঠের মধ্যখানে গিয়ে ব্যাট বা বল করে দিয়ে আসতে পারব না। সমালোচনা করতে পারব, সেটা তো আমরা পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, রোনালদোরও করি। কাজেই এখন ১৬ কোটি ক্রিকেট বিশেষজ্ঞের পরামর্শের ঝড় বয়ে যাবে। বিশেষ করে আমার মতো নিধিরাম সর্দারদের তো আছেই ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার। আমরা তো বলবই—মুশফিকের খেলা দেখলে মনে হয়, এই একটা ছেলেরই মাত্র দায়িত্ব দলটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া।
আর কারও কোনো দায়দায়িত্ব নেই। এটা কেন মনে হয়। মুশফিক যদি ধরে খেলতে পারেন, অন্যরা কেন পারেন না? যা-ই হোক, এর চেয়েও খারাপভাবে মিরপুর থেকে ফিরে এসেছিলাম। গত বিশ্বকাপের আসরে, ৪ মার্চ ২০১১। ৫৮ রান নিয়ে। এবার তো তবু ৯৮। তারপর পরের খেলায় আমরা জিতেছিলাম। ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিলাম। পরে এশিয়া কাপে ভালো করেছিলাম। আমাদের এগোতেই হবে। আমরা আবার আশায় আশায় বুক বাঁধব। বাংলাদেশের ক্রিকেট-ভক্তরা পৃথিবীর সেরা। তাদের দল চ্যাম্পিয়ন নয়, কিন্তু তাতে দলের প্রতি তাদের ভালোবাসা কমে না। সামাজিক মাধ্যমগুলোতেই তো আওয়াজ উঠেছে, আমরা দলের সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব। হারুক জিতুক। আর ‘চার-ছক্কা হইহই’ গানটা নিয়ে যতগুলো ফ্ল্যাশ মব হয়েছে, তা নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যমে পর্যন্ত লেখালেখি হচ্ছে। একক একটা গান নিয়ে এর আগে এত ফ্ল্যাশ মব আর হয়নি বলেই শোনা যাচ্ছে। নিউইয়র্ক থেকে কাতার, টরন্টো থেকে প্যারিস, লন্ডন থেকে সিডনি, নোয়াখালী থেকে রংপুর, বিয়েবাড়ি থেকে সুপার মল—সর্বত্রই হচ্ছে ফ্ল্যাশ মব, হঠাৎ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে একটা গানের তালে নাচ। সেটাও তো ক্রিকেটের প্রতি আমাদের অকুণ্ঠ ভালোবাসারই প্রতিফলন। আমাদের টিমের দরকার তাদের সক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা। আমরা পারব। আমরা তো অতীতে পেরেছি।
গত এশিয়া কাপেই আমরা ভারতকে হারিয়েছি। বিশ্বকাপে আমরা ভারতকে হারিয়েছি। আবারও পারব। আর দরকার দলের মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য। আমাদের টিমটা যেন সব সদস্য মিলে এক দেহ, এক মন হয়ে ওঠে। এই সব বিষয়ে কাজ করতে হবে কাউন্সেলরদের, থিঙ্কট্যাংককে। ক্রিকেট মনেরও খেলা। মনের খেলায় যেন আমরা না হারি। বনের বাঘ আসার আগে যেন মনের বাঘে আমাদের না খেয়ে ফেলে। আমাদের ক্রিকেটাররা স্বাধীনতা দিবসে লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে মিলে জাতীয় সংগীত গেয়েছেন। সেই ছবি দেখে খুব ভালো লাগল। জাতীয় সংগীতে একটা লাইন আছে, ‘মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি।’ সুমনা শারমীন, আমাদের সহকর্মী সাংবাদিক, একটা ঘটনার কথা বলেছিলেন। তাঁরা কয়েকজন নারী সাংবাদিক গেছেন আমেরিকায়। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওরা বলল, এই, তোমরা গান গেয়ে শোনাও একটা। সবাই জানেন, এমন গান কী আছে? মেয়েরা গাইতে শুরু করলেন জাতীয় সংগীত। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ গাইতে গিয়ে প্রত্যেকের চোখে জল গড়াতে লাগল, তাঁরা হাউমাউ করে কাঁদছেন আর গাইছেন। আমেরিকানরা অবাক। তোমরা কাঁদো কেন?
আমরা যে জাতীয় সংগীত গাইছি!
জাতীয় সংগীত গাইতে গেলে বুঝি মানুষ কাঁদে? কই, আমরা তো কাঁদি না?
তোমরা এটা বুঝবে না। আমাদের দেশ নিয়ে, আমাদের পতাকা নিয়ে, আমাদের জাতীয় সংগীত নিয়ে আমাদের কী যে আবেগ, কী যে বেদনা, কী যে ভালোবাসা, বাইরের মানুষকে আমরা তা বোঝাতে পারব না। আমাদের ক্রিকেটাররাও নিশ্চয়ই সেটা খুব ভালো করে জানে। তারাও তো এটা উপলব্ধি করে, তাদের জীবনেও এটা সত্য হয়ে ওঠে—‘মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি।’ গত এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে দুই রানে হারার পরে সাকিবের কোলে মুশফিকের মাথা, সাকিবের চোখে জল টলমল করছে, এই দৃশ্য আমরা ভুলব না। ইংল্যান্ডের সঙ্গে বিশ্বকাপে চট্টগ্রামে জেতার পরেও সাকিবের চোখ জল চিকচিক করছিল। প্রিয় ক্রিকেটারগণ, তোমরা হারো জেতো, আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি। তবে তোমরা সবচেয়ে ভালোভাবে নিজের কাজটুকু করছ, সে জন্য যতটা পরিশ্রম, সাধনা, আত্মত্যাগ দরকার, তোমরা তা স্বীকার করছ, আমরা তা বিশ্বাস করি। একইভাবে আমার কর্তব্য হলো সবচেয়ে সুন্দরভাবে নিজের কাজটুকু করা। নিজের কাজে ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেটারদের সমালোচনা করাটা বোধ হয় ততটা কাজের কাজ হবে না।
জয় বাংলাদেশের হবেই।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

দেশটার মালিক কারা?

জীবনে যাদের কিছুই হয়নি, তাদেরও বলার মতো অনেক কথা থাকে। যার কিছু নেই, তার কেবলই আছে অভিজ্ঞতা, স্মৃতির বুদ্বুদ তাদের মনে ওঠে আর ফেটে পড়ে। আমাদের স্বাধীনতার গৌরবমাখা ইতিহাস আছে, অমর আত্মদানের শোক আছে, কিন্তু স্বাধীনতার সোনালি হাসি দেখি না তো ১৬ কোটি মানুষের মুখে। স্বাধীনতা তাহলে কি আসেনি? জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত আর একটি রাষ্ট্র আমাদের আছে। আমরা দেশের মানুষ থুয়ে গিনেস বুকে রেকর্ড গড়ি। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের সত্যিকার রেকর্ড তো গড়া হয় মানুষের মনে। সেখানে কোন রেকর্ড গঠিত হচ্ছে, কোন হতাশার রেকর্ড বাজছে, সে খবর রাখে কে? রেকর্ড, ব্র্যান্ডিং—এগুলো বাজারি শব্দ। দেশ মানে ব্র্যান্ড না, দেশ মানে ঠিকানা, দেশ মানে গর্বের পরিচয়। বাজারের মহাজনেরা স্বাধীনতার চেতনাকে একদিকে উৎসবের জ্বালানি বানাচ্ছেন, অন্যদিকে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ অপব্যবহারে অপব্যবহারে নিজেই চেতনানাশক হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতা অতীতের ব্যাপার নয়, স্বাধীনতা প্রতিদিনের যাপনের বিষয়। এই চেতনার প্রয়োজন ভবিষ্যতের জন্য। ভবিষ্যতে কেমন দেশ চাই, তার নিরিখ হলো মুক্তিযোদ্ধাদের ঘোষিত-অঘোষিত আকাঙ্ক্ষা। সমতাভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, জনমানুষের সুখী দেশ আমাদের প্রাপ্য ছিল। এত ছোট দেশে এত বড় গণহত্যার প্রতিদান এর চেয়ে কম হতে পারে না। স্বাধীনতা দিবস এলেই তাই কবি আবুল হাসানের ‘উচ্চারণগুলি শোকের’ কবিতাটা মনে পড়ে। বিজয়ের পরপরই তিনি কেন এমন কবিতা লিখেছিলেন,
তাই ভাবি। কবিতাটি শুরু হয় এভাবে: লক্ষ্মী বউটিকে আজ আর কোথাও দেখি না/ হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে কোথাও দেখি না/ কতগুলো রাজহাঁস দেখি/ নরোম শরীর ভরা রাজহাঁস দেখি/ কতোগুলো মুখস্থ মানুষ দেখি, বউটিকে কোথাও দেখি না/ শিশুটিকে কোথাও দেখি না। কবিতাটি শেষ হয় এই আক্ষেপ নিয়ে: কেবল পতাকা দেখি/ কেবল পতাকা দেখি/ স্বাধীনতা দেখি। লক্ষ্মী বউটি বা নরম নোলক পরা বোন বা ছোট ভাই বা শিশুটি আর ফিরবে না। তাদের অন্তিম নিঃশ্বাসের কষ্টে বাংলার আকাশ আজও নীল। কিন্তু শহীদদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ‘সোনার বাংলার’ স্বপ্নটিও কি হারিয়ে গেল? রাজহাঁসের মতো গর্বিত একদল ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষ দেখি। মুখস্থ ইতিহাসের জিকির আর মুখস্থ স্লোগানের জয়জয়কার দেখি। আর কেবল পতাকা দেখি, কেবল স্বাধীনতা দেখি। ২৬ মার্চে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে ক্লান্ত পায়ে অজস্র কিশোর-কিশোরীকে দেখি পতাকা হাতে ফিরে যাচ্ছে। ওরা কি স্বাধীনতা পেয়েছে? যে শ্রমিকদের সেখানে আনা হয়েছিল, তারা কি স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে? আজকের বাংলাদেশে মানুষের স্বাধীনতা, জবানের স্বাধীনতা, নিরাপদ মৃত্যুর স্বাধীনতা, রুটিরুজির নিশ্চয়তার স্বাধীনতা কতজনের? আমরা লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। কিন্তু সেই বিজয়ের ফল খেয়ে গেল কোন ইঁদুরেরা? একাত্তরে যত মানুষ দেশে ছিল, তত মানুষ এখনো দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। জাতির সবচেয়ে কর্মঠ আর শ্রমপ্রাণ অংশের অপচয়ের শেষ নেই। পোশাকশিল্প আর প্রবাসী শ্রমশিবিরগুলোতে যে বাংলাদেশিরা কাজ করে,
তারা বিশ্বায়িত পুঁজিবাদের শ্রমদাস। সোনার বাংলার যত সম্পদ, তার একাংশ পাচার হয়, অন্য অংশ ব্যয় হয় ভোগবিলাস আর অনুৎপাদনশীল খাতে। শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের ৪৭ শতাংশই বেকার। যে সবুজ-শ্যামল নদীমাতৃক বাংলাদেশের ছবি আমাদের জাতীয় সংগীতে আঁকা, সেই বাংলাদেশের নদী-পাহাড়-অরণ্য দখলে আর লুণ্ঠনে মুমূর্ষু। বিশ্বব্যবস্থায় এই কাবু বাংলাদেশ নিয়ে দেশবাসীর কতজন গর্বিত বোধ করে? ইতিহাস অমূল্য সম্পদ, কিন্তু বর্তমানের সার্থকতা ছাড়া সেই ইতিহাসকে অক্ষয় রাখার তো আর উপায় নেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেবল ইতিহাস শুনে শান্ত হবে না, তারা চাইবে বর্তমানে তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার দাবির স্বীকৃতি। চাইবে সম্মানজনক সমৃদ্ধ জীবন। এই তরুণেরা দুনিয়াদারি দেখে ফেলেছে, উন্নত দেশের তরুণদের কাছে তারা হীনম্মন্য হয়ে থাকতে চায় না। অনেকের মুখেই শুনি, এই দেশে আর থাকা যাবে না। এর থেকে বড় পরাজয় আর কী হতে পারে! তরুণ বললে কেবল সচ্ছল চমক আর চুমকি নর-নারীদের বুঝলে চলবে না। যারা কারখানায় কাজ করে, যারা মাঠে শ্রম ঢেলে জাতির অন্ন জোগায়, যারা সড়কের সব রকমের বাহন চালায়; সংখ্যায় তারাই বেশি। তারা তাজরীনে পোড়ে, তারা রানা প্লাজায় ধসে মরে, তাদের ফসল পানির দরেও বিকায় না। কীভাবে ১০ বছরে স্বাধীন দেশের ২০ হাজার শ্রমিক প্রবাসে শ্রমের চাপে মারা যায়?
তাদের রেমিট্যান্স কার কাজে লাগে? মধ্যবিত্ত তরুণেরাও হতাশ। সৎ ব্যবসায়িক উদ্যোক্তারা দুর্নীতির পাকে-চক্রে হয়রান হয়ে যান। আর গরিবেরা হয়তো পাকিস্তান আমলের চেয়ে উন্নত-গরিব হয়েছে, কিন্তু বৈষম্য অতীতের যেকোনো আমলের চেয়ে বেশি। সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের হাতে ক্ষমতা আসেনি। ২২ পরিবারের জায়গায় ২২ শ পরিবার এখন দেশ চালায়। তাই বঙ্গবন্ধুর সেই অমর ভাষণ যখন শুনি, মনে হয় এখনো তিনি ক্ষমতাসীনদের সামনে আঙুল উঁচিয়ে বলছেন, ‘আর দাবায়া রাখবার পারবা না...’। শুনি তিনি বলছেন, ‘এ দেশকে আমরা গড়ে তুলব। এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ২৩ বৎসরের করুণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস...মুমূর্ষু নর-নারীর আতর্নাদের ইতিহাস।...এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।’ পাকিস্তানের ২৩ বছরের জায়গায় স্বাধীনতার ৪৩ বছর বসালে আজকের সময়ে ৭ মার্চের প্রাসঙ্গিকতাটা আমরা ধরতে পারব। তিনি হুঁশিয়ার করেছিলেন, ‘মনে রাখবেন, শত্রু বাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে।’ আমরা কি সেই শত্রুদের চিনি?
চিনি না বলেই আত্মকলহে লিপ্ত দেশে চলছে হানাহানি আর লুটের কারবার। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় তাই বলতে চাই, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কী অন্যায় করেছিলাম?...’ কী অন্যায় বাংলাদেশের মানুষের? তারা তো জীবন দিতে পিছপা হয় না। তারা তো গতর খাটাতে নারাজ নয়। তারা তো ভোট দিতে দ্বিধা করে না। তারা তো ভক্তি-ভালোবাসায় কৃপণ নয়। তাহলে কেন জীবনদান বৃথা যায়? কেন শ্রমিক তার যোগ্য সম্মান আর প্রতিদান পায় না? কেন কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পায় না? কেন ভোটের অধিকার বারবার হাতছাড়া হয়? কেন জনগণের দেশপ্রেমের আলো শাসকদের ক্ষমতাপ্রেমের অন্ধকারে হারিয়ে যায়? কেন শাসকদের দোষে দেশ দুই পা এগোয় তো তিন পা পেছায়? ২৬ মার্চ অতীত হয়ে যায়নি। ৭ মার্চের ভাষণ এখনো মুক্তির ডাক দিয়ে যায়। একাত্তরের তরুণ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, আজকের তরুণেরা কি কেবলই বিষাক্ত রাজনীতির গোলকধাঁধায় চক্কর খাবে, নাকি আত্মমর্যাদা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে! দেশ একটাই আমাদের, সুযোগও কিন্তু একটাই। একে সার্থক করতে হলে দেশের মালিক যে জনগণ, সংবিধানের সেই ঘোষণাকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বাধীনতা তখন মুক্ত হবে, মুক্ত হবে দেশ।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

স্বাধীনতা জন্মগত অধিকার

স্বাধীনতা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য বিশেষ নিয়ামত; স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। আল্লাহ তাআলা মানুষকে স্বাধীনভাবে বিচরণের অধিকার দিয়েছেন, নিয়ামতের ভান্ডার উন্মুক্ত করেছেন এবং জ্ঞান ও অধিকার বরাদ্দ করেছেন। যারা এসব কাজে লাগিয়ে বিশ্বকে জয় করার সংগ্রাম-সাধনা করে, স্বাধীনতা তাদেরই জন্য। স্বভাবগতভাবেই মানুষ স্বাধীনচেতা জীব। সে পরাধীন বা অন্যের অধীনে থাকতে চায় না। প্রয়োজনে স্বাধীনতার জন্য সে নিজের জীবনও বিসর্জন দেয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মানবসন্তান প্রকৃতি বা ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে।’ (মিশকাত) প্রত্যেক মানুষই স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে চায়, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে চায়। স্বাধীনতাই মানুষের অস্তিত্বে লালিত সুপ্ত প্রতিভা ও শক্তিকে ক্রমাগত উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে বিকশিত করতে সহায়তা করে। এ চিরন্তন সত্য উপলব্ধি করে গণতান্ত্রিক জীবনবোধে উজ্জীবিত হয়ে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যুগে যুগে অনেক জাতি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ-সংগ্রাম করেছে। মানুষ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন থাকতে চায় না। ইসলামও এমন পরাধীনতা সমর্থন করে না। পরাধীনেরা তাদের স্বীয় মাতৃভূমি উদ্ধার ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করবে—এটাই ইসলামের বিধান। রাসুলুল্লাহ (সা.) অনেক ত্যাগ স্বীকার করে মদিনায় হিজরত করে একটি স্বাধীন ইসলামি প্রজাতন্ত্র গঠন করেন। তিনি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিতকে মজবুত করার নিমিত্তে মদিনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলমান, ইহুদি ও পৌত্তলিকদের নিয়ে সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানবিক ও ধর্মীয় অধিকার সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেন,
যা ‘মদিনা সনদ’ নামে খ্যাত। বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করে নিয়ে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের মহতী লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি এ সমঝোতা সনদ প্রণয়ন করেন। একটি স্বাধীন জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এটিই পৃথিবীর প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র বা সংবিধান, যাতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মতনির্বিশেষে সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এ ছাড়া চিন্তা ও মতামত প্রকাশের পরিপূর্ণ সুযোগ প্রদান করে মহানবী (সা.) ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বতোরূপে প্রতিষ্ঠা করেন। আরব দেশে আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নাগরিকদের মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখাসহ নানা দিক বিবেচনা করে প্রণীত সনদে মদিনায় বসবাসরত সব ধর্মাবলম্বীর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের যথোপযুক্ত স্বীকৃতি ছিল। এভাবে মদিনায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মতনির্বিশেষে সবার ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত হয়েছিল। ফলে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর লোকদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব হয়। নবী করিম (সা.) মদিনা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এমনকি অনেক আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন। নির্যাতিত-নিপীড়িত অধিকারবঞ্চিত মানুষের স্বাধীনতার জন্য জনগণের প্রতিরোধ আন্দোলন ও সংগ্রাম করাকে তিনি শুধু উদ্বুদ্ধই করেননি, বরং সার্বভৌমত্ব অর্জন ও দেশ রক্ষায় জীবনদানকে শহীদের সম্মানজনক মর্যাদা দিয়েছেন। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও আক্রমণ প্রতিহত করে কার্যত বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে, বিনা ধ্বংসে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি জালিম, সন্ত্রাসী ও পৌত্তলিকদের কবল থেকে মক্কাকে স্বাধীন করলেন।
মক্কাবাসী কর্তৃক দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হয়েও মক্কা বিজয়ের পর আজাদির সুমহান আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করে তিনি পরাজিত সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘হে আমার দেশবাসী! তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই। তোমরা মুক্ত, স্বাধীন।’ স্বদেশবাসীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বিশ্বের ইতিহাসে তিনি অতুলনীয় দেশপ্রেম, উদারতা ও মহানুভবতার অনুপম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন স্থাপন করেন। অতঃপর সামান্য সময়ের ব্যবধানে স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্রের পরিধিকে বিস্তৃত করে পুরো আরব ভূখণ্ডকে অবারিত শান্তি ও নিরাপত্তায়, অভূতপূর্ব শৃঙ্খলায়, অপূর্ব সুষম বণ্টনে, অবর্ণনীয় ভ্রাতৃত্ববোধে ও স্বপ্নাতীত জনকল্যাণে ভরে দিয়েছিলেন। মহানবী (সা.) স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সব বিষয়কে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান। ফলে সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেক জনগণই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে থাকে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফলতা পেতে থাকে। স্বাধীনতার সুমহান আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পরাধীনতা আর গোলামির শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৭১ সালে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা। যে স্বাধীনতার জন্য শোকর আদায় করে শেষ করা যায় না। যাঁদের সুমহান আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের বিনিময়ে আমরা মাতৃভূমির স্বাধীনতা লাভ করেছি, যাঁদের অশেষ অবদানে বাঙালি জাতি গৌরব অনুভব করে, আমরা কখনোই তাঁদের ভুলতে পারি না। তাই কষ্টার্জিত স্বাধীনতার মর্যাদা সমুন্নত রাখা আমাদের ইমানি দায়িত্ব এবং পবিত্র কর্তব্য। স্বাধীনতা সুরক্ষায় জাতীয় ঐকমত্য ও জনসংহতি খুবই প্রয়োজন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত আত্মনির্ভরশীল দেশ গড়ার লক্ষ্যে উন্নয়নের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এ জন্য দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার পাশাপাশি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অর্থবহ করতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মতনির্বিশেষে সব নাগরিকের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করা উচিত।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com