Sunday, March 7, 2010

আর্থসামাজিকভাবে নারীর সম-অধিকার অপরিহার্য

আর্থসামাজিকভাবে নারীর সম-অধিকার অপরিহার্য। কন্যাশিশু ও নারীরা দারিদ্র্য ও অবিচার থেকে যত দিন মুক্তি না পাবে, তত দিন আমাদের শান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন অর্জনের লক্ষ্য ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস, ২০১০ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন এ কথা বলেন।
মুন বলেন, সবার জন্য সম-অধিকার ও মর্যাদা অর্জনে জাতিসংঘের বৈশ্বিক কর্মসূচির মূল বিষয় হচ্ছে লৈঙ্গিক সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন। তিনি বলেন, কন্যাশিশু ও নারীর জন্য সমতা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবেও অপরিহার্য।
১৫ বছর আগে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে সরকারগুলো বিশ্বের সব জায়গার সব নারীর জন্য সমতা, উন্নয়ন ও শান্তি—এই লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেদিনের বেইজিং ঘোষণা ছিল একটি মাইলফলক। এর প্রভাব ছিল গভীর ও ব্যাপক-বিস্তৃত; যা নীতিমালা প্রণয়নে সরকারগুলোকে পথ প্রদর্শন করেছে এবং নতুন জাতীয় আইন তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, অগ্রগতির অনেক উদাহরণ রয়েছে। অধিকাংশ কন্যাশিশু এখন শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে; বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে। তিনি বলেন, তা সত্ত্বেও অনেক কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে। মাতৃমৃত্যুর হার এখনো অগ্রহণযোগ্য উচ্চমাত্রায় রয়ে গেছে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনো বৈশ্বিক লজ্জার কারণ; বিশেষ করে সহিংসতার সময় নারীর ওপর যৌন সহিংসতা ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে গত বছর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ দুটি জোরালো প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। ওই অপরাধ মোকাবিলায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে একত্র করার জন্য একজন বিশেষ দূত নিয়োগ করা হয়েছে।
বান কি মুন বলেন, ‘জাতিসংঘকে অবশ্যই উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে নেতৃত্ব দিতে হবে। আমাদের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে আরও নারী সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

অর্থবছরের প্রথমার্ধে লেনদেনের ভারসাম্যে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত

চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রথমার্ধে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় ধরনের উদ্বৃত্তাবস্থা দেখা দিয়েছে। ছয় মাসের এই উদ্বৃত্ত গত অর্থবছরের পুরো সময়ের সার্বিক উদ্বৃত্তকে ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়কালে লেনদেনের সার্বিক ভারসাম্য দাঁড়িয়েছে ২০৯ কোটি ১০ লাখ ডলার, যেখানে ২০০৮-০৯ অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
তবে গত অর্থবছরে লেনদেনের সার্বিক ভারসাম্য ছিল ২০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি হিসাব ও আর্থিক হিসাবে বড় ধরনের উদ্বৃত্তাবস্থা লেনদেনের ভারসাম্যকে উল্লেখযোগ্য হারে ইতিবাচক পর্যায়ে ধরে রেখেছে।
আলোচ্য সময়কালে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১৬৮ কোটি ডলার, যেখানে গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এর পরিমাণ ছিল ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আর ২০০৮-০৯ অর্থবছরের পুরো সময়ে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত ছিল ২৫৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
একইভাবে মূলধনী ও আর্থিক হিসাবেও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে মূলধনী ও আর্থিক হিসাবের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১৬ কোটি ৭০ লাখ ও ৬১ কোটি ১০ লাখ ডলার, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এ দুইয়ের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৩ কোটি ডলার ও সাড়ে আট কোটি ডলার।
তবে অর্থবছরের প্রথমার্ধে লেনদেনের ভারসাম্যের চিত্রটি বাংলাদেশের গতানুগতিক চিত্র নয়, বরং কিছুটা অস্বাভাবিক বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমদানি-ব্যয় কমে যাওয়ার একটি প্রতিফলন লেনদেনের ভারসাম্যের চিত্রে পড়েছে। বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য কম থাকা এবং দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা কমে যাওয়া আমদানি-ব্যয় কমিয়েছে।’
পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে পণ্য-বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৭৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৯০ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
লেনদেনের ভারসাম্য সারণি অনুসারে এই সময়কালে আমদানি বাবদ ব্যয় করতে হয়েছে এক হাজার চার কোটি ডলার, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় করতে হয়েছিল এক হাজার ৬৮ কোটি ডলার।
একই সময়ে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে ছিল ৭৭৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
আহসান মনসুর বলেন, ‘একদিকে আমদানি ব্যয় কমেছে, অন্যদিকে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর ফলে আমাদের হাতে প্রচুর অর্থ জমে গেছে, অন্য সময় যা আমদানির জন্য ব্যয় করে ফেলতে হতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে যা স্বস্তিদায়ক ব্যাপার। অন্যদিকে রয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শ্লথগতি, যা উদ্বেগের বিষয়।’
আহসান মনসুর অবশ্য আশা প্রকাশ করেন যে অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার হবে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াবে। ইতিমধ্যে এর লক্ষণও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারেও পণ্যমূল্য বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকেও দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসের তুলনায় জানুয়ারি মাসে আমদানি ঋণপত্র খোলার হার বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। ডিসেম্বরে যেখানে ২০৩ কোটি ডলারের আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছিল, সেখানে জানুয়ারিতে এই আমদানি ঋণপত্র খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩৪ কোটি ডলার।
এ দুইয়ের যুগপত্ প্রভাবে দ্বিতীয়ার্ধে আমদানি-ব্যয় বাড়বে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এর ফলে লেনদেনের ভারসাম্য পরিস্থিতি সাধারণত যে রকম অবস্থায় থাকে, সে রকম অবস্থায় ফিরে যাবে।’ অর্থাত্ বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে, চলতি হিসাব ও সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত কমবে।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
আবার এই সময়কালে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণপ্রবাহ বেড়ে হয়েছে ১১২ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

লাফার্জের এশিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট আসছেন আজ

বিশ্বের অন্যতম সিমেন্ট প্রস্তুতকারক লাফার্জের এশিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট মার্টিন ক্রিগনার আজ সোমনার বাংলাদেশ সফরে আসছেন।
সফরকালে ক্রিগনার বাংলাদেশে লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট লিমিটেডের (এলএসসি) ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও নীতিমালা পর্যালোচনা করবেন। তিনি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও সাক্ষাত্ করবেন।
মার্টিন ক্রিগনার ১৯৮৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনা থেকে ডক্টরেট অব ল এবং ১৯৯০ সালে ভিয়েনার ইউনিভার্সিটি অব ইকোনমিক্স থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৯০ সালে অস্ট্রিয়ার লাফার্জ পার্লমুজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সহকারী পদে লাফার্জ গ্রুপে যোগ দেন। ২০০২ সালে ক্রিগনার লাফার্জ ইন্ডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। এরপর ২০০৫ সালে তিনি লাফার্জ এশিয়ার রিজিওনাল প্রেসিডেন্ট এবং ২০০৮ সালে পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের রিজিওনাল প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পান। এ ছাড়া তিনি লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।

আট মাসে বিকেবির তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে মোট তিন হাজার ১১ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৭৮ কোটি টাকা বেশি।
একই সময়ে কৃষি ব্যাংক এক হাজার ৯০৭ কোটি টাকার ঋণ আদায় করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫৭১ কোটি টাকা বেশি।

বাদ পড়া দুজনকে সুযোগ দিতে হাইকোর্টের নির্দেশ

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নির্বাচনে বাদ পড়া দুই প্রার্থীকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে হাইকোর্ট যে আদেশের বলে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছিল তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) প্রতি রুল জারি করেছেন।
বিচারপতি মো. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও নাঈমা হায়দারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ দুটি পৃথক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে এ নির্দেশ দেন। বাদ পড়া দুই প্রার্থী ডিএসইর সাবেক সভাপতি আহমেদ ইকবাল হাসান ও সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আহমেদ রশীদ লালী এসইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট করেন।
এসইসি কোনো ধরনের ব্যাখ্যা ছাড়াই এই দুজনসহ তিনজন প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। অভিযোগ রয়েছে, ডিএসইকে দলীয়করণের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সরকার এসইসিকে এ কাজে ব্যবহার করেছে।
এদিকে হাইকোর্টের আদেশ পেয়েই দুই প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। গতকালই ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। তবে অপর বাদ পড়া প্রার্থী আনোয়ার সিকিউরিটিজের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন আদালতে রিট না করায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
উল্লেখ্য, পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গত ৩ মার্চ ডিএসইর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। আর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শেষ দিন। কিন্তু এর ঠিক আগের দিন এসইসির জারি করা একটি আদেশে বলা হয়, নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ন্যূনতম পাঁচ দিন আগে এসইসির কাছ থেকে অনাপত্তি নিতে হবে।
এ আদেশের পরপরই ডিএসইর নির্বাচন কমিশন নির্বাচন স্থগিত করে নতুন তফসিল ঘোষণা করে যেখানে ২১ মার্চ নির্বাচনের নতুন তারিখ নির্ধারিত হয়।
নির্বাচনে অংশ নিতে ১৩ জন সম্ভাব্য প্রার্থী এসইসির অনাপত্তি চান। এসইসি ১০ জনকে ছাড়পত্র দিলেও কোনো ধরনের ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনজনকে অযোগ্য ঘোষণা করে।
এ ব্যাপারে আহমেদ ইকবাল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়া আমার অধিকার। কিন্তু আমি জানলামই না কেন এসইসি আমাকে বাদ দিল। ডিএসইর ৫০ বছরের ইতিহাসে নির্বাচন নিয়ে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। এটা একটা ন্যক্কারজনক ঘটনা। এ জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। মহামান্য আদালতের আদেশ নিয়েই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি।’
আহমেদ রশীদ বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম নির্বাচন হোক এবং এ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করেই আমরা তাতে অংশ নিতে চাই।’
শেষ দিনে এ দুজন ছাড়া ১০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। তাঁরা হলেন আদিল সিকিউরিটিজের দস্তগীর মো. আদিল, জিকিউ সিকিউরিটিজের গোলাম কাদের, প্রুডেনশিয়াল সিকিউরিটিজের মুজিবুর রহমান, রয়েল গ্রিন সিকিউরিটিজের আবদুল হক, এসএআর সিকিউরিটিজের শরীফ আতাউর রহমান, খাজা ইক্যুইটি সার্ভিসেসের খাজা গোলাম রসুল, সুরমা সিকিউরিটিজের এম এ মুমিন ও মিডওয়ে সিকিউরিটিজের রকিবুর রহমান। রকিবুর রহমান বর্তমানে ডিএসইর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে পুনরায় সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করার জন্যই এ পুরো ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে।

দাম বাড়ার পেছনে জোগান সংকট ও সিন্ডিকেশন দায়ী

দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ চাহিদার তুলনায় স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত পণ্যের জোগান অনেক কম হওয়া।
পাশাপাশি অপ্রতুল পণ্য পরিবহনব্যবস্থা ও মাত্রাতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়, মালামাল পরিবহনে চাঁদাবাজি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও তাদের অতিরিক্ত মুনাফা লাভের চেষ্টায় পণ্য সামগ্রীর দর বেড়ে যায়। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেশন ও আমদানি করা পণ্য থেকে অতি মুনাফা অর্জন দাম বাড়ানোয় ভূমিকা রাখে।
‘নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি’ নিয়ে বেসরকারি খাতের আর্থিক প্রতিষ্ঠান মাইডাসের এক সমীক্ষায় এসব কথা বলা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আর্থিক এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সহযোগিতায় এ সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়।
গতকাল রোববার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআইয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সভায় সমীক্ষার খসড়া প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এফবিসিসিআই ও মাইডাস যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আনিসুল হক সভাপতিত্ব করেন। সমীক্ষাটি উপস্থাপন করেন মাইডাসের বিশেষজ্ঞ ফিরোজ ইকবাল ফারুক।
আলোচনায় অংশ নেন প্রথম সহসভাপতি আবুল কাশেম আহমেদ, এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ও সাংসদ গোলাম দস্তগীর গাজী, বিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ, মাইডাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল করিম, এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ফারুক আহমেদ, সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান, মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম মওলা, ডিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক কে এইচ এম শহীদুল হক, ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
সমীক্ষায় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উত্পাদক, ভোক্তা, আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। উত্তরে তারা সরবরাহ স্বল্পতা, সিন্ডিকেশন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, উচ্চ পরিবহন ব্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সরকারি নীতি ও ঘুষ প্রভৃতিকে দায়ী করেছেন।
সমীক্ষার জন্য পরিচালিত জরিপে দাম বাড়ার কারণ হিসেবে সরবরাহ স্বল্পতাকে দায়ী করেছেন ১৬ শতাংশ উত্পাদক, ১৭ শতাংশ ভোক্তা, ১৮ শতাংশ আমদানিকারক, ২০ শতাংশ পাইকারি ব্যবসায়ী ও ১৭ শতাংশ খুচরা ব্যবসায়ী।
ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেশনের কারণে দাম বাড়ছে বলে মনে করেন ১৭ শতাংশ উত্পাদক, ১৬ শতাংশ ভোক্তা, ৯ শতাংশ আমদানিকারক, ১৭ শতাংশ পাইকারি ব্যবসায়ী ও ২০ শতাংশ খুচরা ব্যবসায়ী।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ে বলে জানিয়েছেন ১৬ শতাংশ উত্পাদক, ৯ শতাংশ ভোক্তা, ১৬ শতাংশ আমদানিকারক, ১৭ শতাংশ পাইকারি ব্যবসায়ী ও ১৬ শতাংশ খুচরা ব্যবসায়ী।
অবশ্য আলোচনায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা সমীক্ষায় ব্যবহূত বিভিন্ন তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা বলেছেন, দেশে ব্যবসায়ীদের কোনো সিন্ডিকেশন নেই। তাই সমীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
কেউ কেউ বলেন, প্রচুর পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে এ ধরনের নিম্নমানের একটা সমীক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে সঠিক তথ্য পাবে বলে তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

রাইট-বোনাস প্রদানের প্রস্তাব বাতিল

এইমস ফার্স্ট গ্যারান্টিড মিউচুয়াল ফান্ডের রাইট ও বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব বাতিল হয়ে গেছে। ফলে মিউচুয়াল ফান্ডটির ইউনিটধারীরা ঘোষণা অনুযায়ী রাইট-বোনাসের সুবিধা পাবেন না।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) সভায় গতকাল রোববার ফান্ডটির ট্রাস্টি বোর্ডের এ সংক্রান্ত প্রস্তাব বাতিল করা হয়।
বৈঠক শেষে এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আনোয়ারুল কবীর ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘কমিশন এইমসের ট্রাস্টি বোর্ডের কাছে রাইট-বোনাস ঘোষণার যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা যে যুক্তি দেখিয়েছে, তা এসইসির কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।’
তিনি জানান, আগামীকাল (আজ সোমবার) থেকে দুই স্টক এক্সচেঞ্জে এইমসের লেনদেন আবার শুরু হবে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এইমসের ট্রাস্টি বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিজিআইসি) ফান্ডটির ইউনিটধারীদের জন্য ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ আর্থিক বছরের জন্য ৭০ শতাংশ বোনাস ও ১৩০ শতাংশ রাইট ঘোষণা করে। কিন্তু পরের দিন এসইসি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের কথা বলে ঘোষণাটি অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত এইমসের লেনদেন স্থগিত রাখে।
এর আগে ২০০৮ সালের মাঝামাঝি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের বিপরীতে রাইট ও বোনাস দিয়ে ফান্ডের আকার বাড়ানোর যাবে না বলে সংশ্লিষ্ট বিধি সংশোধন করে। এসইসির এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তখন আদালতে রিট করেন তিনজন বিনিয়োগকারী।
সম্প্রতি আদালতের দেওয়া রায়ে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট সংশোধনীটি আনার আগে তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে সংশোধনীটি প্রযোজ্য হবে না। অর্থাত্ ওই সংশোধনী আনার আগে তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডের রাইট-বোনাস ঘোষণায় কোনো বাধা নেই। তবে রাইট-বোনাস অনুমোদন করা না করার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা এসইসির।
এদিকে গতকালের বৈঠকে মিউচুয়াল ফান্ডের বিপরীতে ঋণসুবিধার সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এসইসি।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো ফান্ডের বাজারমূল্য তার ইউনিটপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্যের (এনএভি) সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ বেশি হলে তাদের গ্রাহকদের ঋণসুবিধা দিতে পারবে না।
অর্থাত্ কোনো মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটপ্রতি এনএভি যদি ১০০ টাকা হয় তাহলে ফান্ডটির বাজারমূল্য ১১৫ টাকার নিচে হলেই কেবল ঋণসুবিধা পাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে এনএভি হিসাব করতে হবে সংশ্লিষ্ট ফান্ড যেসব শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে তার বাজারমূল্যের ভিত্তিতে। এর আগে ফান্ডের বাজারমূল্য এনএভির সাড়ে সাত শতাংশের বেশি হলে ঋণসুবিধা পাওয়া যেত না।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের অর্থ নিয়ে এসইসি যে তামাশায় লিপ্ত, এটি তার আরেকটি বড় দৃষ্টান্ত। এ সুবিধাটি দেওয়ার ফলে অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ডই ঋণসুবিধার আওতায় আসবে না।

ক্লুজনার আর স্ট্রিক

কটুর জন্য দলকে জেতাতে পারেননি, কিন্তু ৪৯ বলে ৭০ রান করে গত পরশু ইডেন পার্কে নিজের ব্যাটিং সক্ষমতার প্রমাণ আরেকবার দিয়েছেন ড্যানিয়েল ভেট্টোরি। এই নিয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ারে চারটি ফিফটি করলেন, চারটিই আট নম্বরে নেমে। আট নম্বরে নেমে চারটি করে ফিফটি আছে আরও তিনজনের—সাবেক শ্রীলঙ্কান স্পিনার ও বর্তমানে আম্পায়ার কুমারা ধর্মসেনা, পাকিস্তানি অলরাউন্ডার আবদুল রাজ্জাক এবং সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়ক শন পোলক। তবে এঁদের চেয়েও তিনটি করে ফিফটি বেশি আছে দুজনের। শুরুতে স্রেফ বোলারই ছিলেন, পরে ব্যাট হাতেও দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠা সাবেক জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক হিথ স্ট্রিক ক্যারিয়ারের ১৩ ফিফটির ৭টিই করেছেন আটে নেমে। ক্যারিয়ারে দুটি সেঞ্চুরির পাশাপাশি ১৯টি ফিফটি করেছেন ল্যান্স ক্লুজনার, স্ট্রিকের মতোই সাতটি আটে নেমে।

এফএ কাপের সেমিতে চেলসি

ল্যাম্পার্ড ও টেরির গোলে স্টোক সিটিকে ২-০তে হারিয়ে এফএ কাপের সেমিফাইনালে উঠেছে গতবারের চ্যাম্পিয়ন চেলসি। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ অ্যাস্টনভিলা। কারেউর হ্যাটট্রিকে রিডিংকে ৪-২ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে ভিলা।

ভারত-পাকিস্তানের বিদায়

‘ফির দিল দো হকি কো’—টিভি বিজ্ঞাপনে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার এই আহ্বানও জাগাতে পারল না ভারতের হকিকে। সেমিফাইনালের আগেই বিশ্বকাপ হকির দর্শক হয়ে গেল আটবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন এবং একবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারত। নিজেদের মাটিতে আয়োজন, প্রথম ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে ৪-১ গোলে হারিয়ে তারা উড়তে শুরু করেছিল। হয়তো ৩৫ বছর পর আবারও বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন উঁকি দিয়েছিল চোখের তারায়। সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। আকাশ থেকে ধপাস করে বাস্তবতার রুক্ষ জমিতে পড়ে গেছে প্রভজ্যোত-সন্দীপদের দলটি। সেখান থেকে বড় জোর সপ্তম হওয়ারই আশা করতে পারে তারা এখন।
তবে শুধু ভারতই নয়, টুর্নামেন্টের দর্শক হয়ে পড়েছে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানও। তবে এশিয়া থেকে সেমিফাইনালের আশা বাঁচিয়ে রেখেছে শুধু দক্ষিণ কোরিয়া। কাল জ্যাং জু হিউনের হ্যাটট্রিকে তারা ৯-২ গোলে হারিয়েছে কানাডাকে।
পরশু ভারতকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ‘বি’ গ্রুপ থেকে সেমিফাইনালে উঠে গেছে ইংল্যান্ড। ভারত সর্বশেষ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছিল ২৪ বছর আগে, ১৯৮৬ সালে। ইংল্যান্ডের পরে গ্রুপের দ্বিতীয় দল হয়ে সেমিফাইনালে ওঠার দৌড়ে স্পেনকে পেছনে ফেলে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ৪ ম্যাচে ৯ পয়েন্ট তাদের। ইংল্যান্ডের ১২। ৬ পয়েন্ট নিয়ে তিনে স্পেন। পরশু ৩-৪ গোলে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে যাওয়া পাকিস্তানের পয়েন্ট ৩। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতেরও পয়েন্ট ৩, একটা মাত্র জয়ের সুবাদে। ওয়েবসাইট।

রাজশাহীর খেলা: ক্রিকেট: রাজশাহী কলেজ মাঠে জিয়া স্মৃতি ক্রিকেটে কাল বিনোদপুর ক্রিকেট একাডেমি (১০২/৮) ২ উইকেটে কোট একাডেমিকে (১০১) এবং রাজেসের ব্যাটিংয়ে (৯৯*) অ্যালাইড ক্লাব (১৮৫/৪) ৮৪ রানে এক্সট্রিম জুনিয়রকে (১০১) হারিয়েছে। ভলিবল: প্রথম বিভাগ ভলিবলে বন্ধন ক্রীড়া চক্র ৩-০ সেটে কলোনি ক্লাবকে এবং একই ব্যবধানে ব্রাইট স্টার জাগ্রত সংঘকে হারিয়েছে।—রাজশাহী অফিস
নোয়াখালীতে ফুটবল: মাইজদীর শহীদ ভুলু স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপে নোয়াখালী পৌরসভা ২-০ গোলে জিতেছে রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার বিপক্ষে।

আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট শুরু

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল মাঠে কাল থেকে শুরু হয়েছে আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী ম্যাচে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ১০৪ রানে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে পরাজিত করে। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ২০ ওভারে ৪ উইকেটে ২১৬ রান করে। জবাবে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ১৯.১ ওভারে ১১২ রানে অলআউট হয়।
দুটি গ্রুপে ১১টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে।

বাফুফের ১৩ কোটি টাকার পরিকল্পনা

আগামী দুই মাসের মধ্যে সারা দেশে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে স্কুল টুর্নামেন্ট শুরু করতে যাচ্ছে বাফুফে। প্রথমে উপজেলা, তারপর জেলা হয়ে বিভাগ। সবশেষে ঢাকায় চূড়ান্ত পর্ব।
পরিকল্পনা করা সহজ, বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ। এটা মেনে নিয়ে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন বলছেন, ‘সমস্যা আছে অনেক। তবে ফুটবল এগিয়ে নিতে হলে তৃণমূলে যেতে হবে। সে জন্যই উপজেলা থেকে স্কুল ফুটবল শুরু করতে চাই। ঢাকা মহানগরী স্কুল ফুটবল আছে এবং থাকবে। উপজেলা পর্যায় থেকে এবার আমরা শুরু করতে চাই। প্রায় ১৩ কোটি টাকার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।’
এই টুর্নামেন্ট থেকে বাছাই করা খেলোয়াড়দের একাডেমিতে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বলে জানালেন বাফুফে সভাপতি। তবে একাডেমি কবে পাওয়া যাবে তা এখনো বলা যাচ্ছে না। সিলেট বিকেএসপি বাফুফেকে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলেও এখনো কাগজে-কলমে সিলেট বিকেএসপি পায়নি বাফুফে।

ফরাশগঞ্জকে জিততে দিল না শুকতারা

পরাজয়ের কিনারে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ড্র করে ফেলল নারায়ণগঞ্জ শুকতারা। ৫২ মিনিটের সবুজের গোল ধরে রেখে যখন তিন পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ফরাশগঞ্জ, তখনই অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে তাদের বিপক্ষে পেনাল্টি। রেজাউল করিম (লিটন) পেনাল্টি থেকে গোল করে ১-১ করে ফেললেন। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম দেখল নাটকীয় এক ড্র।
৯ ম্যাচে ২ জয় আর ৪ ড্রয়ে ফরাশগঞ্জের পয়েন্ট ১০। সমান ম্যাচে শুকতারার পয়েন্ট ৭। তারা একটি ম্যাচ জিতেছে এবং ড্র করেছে চার ম্যাচ।
আজকের খেলা: রহমতগঞ্জ-মুক্তিযোদ্ধা (বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, ৫টা)।

গেইলদের স্বস্তির এক জয়

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সর্বশেষ ম্যাচ জিতেছিল গত আগস্টে। বাংলাদেশের বিপক্ষে একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে ওই জয়ের পর আরও ৩টি টি-টোয়েন্টি খেলেছে তারা, খেলেছে ৯টি ওয়ানডে ও ৩টি টেস্ট। কিন্তু জয় তাদের কাছে ছিল সোনার হরিণ। তবে পরশু কাঙ্ক্ষিত সেই জয়ের দেখা পেল ক্রিস গেইলের দল। সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪ উইকেটে হারিয়েছে জিম্বাবুয়েকে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বুকের ওপর চেপে বসা বড়সড় একটা পাথরই যেন সরিয়ে দিয়েছে এই জয়। গায়ানার প্রভিডেন্স স্টেডিয়ামে ম্যাচ শেষে সে রকমই বললেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক ক্রিস গেইল, ‘এ জয় বড় স্বস্তির। আশা করি অনাগত অনেক জয়ের শুরুও।’
জয়ের ধারায় ফিরতে পারার ‘স্বস্তি’র সঙ্গে ম্যাচ বাঁচাতে পারার আনন্দও আছে গেইলের। আগের ম্যাচে শেষ ওভারে হেরে গিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পরশু ১৩ বল হাতে রেখে জিতলেও জিম্বাবুয়ের ২০৬ রান তাড়া করে ৮৫ রানে হারিয়ে ফেলেছিল ৪ উইকেট। তবে উইকেটের এক প্রান্ত আগলে রেখে গেইল এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে রেখেছেন বড় ভূমিকা। ৭টি চার ও ২ ছয়ে করেছেন ৮৮ রান। ক্রেমারের অফ স্পিনে তিনি যখন বোল্ড হলেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৬৮/৫। জয় থেকে দূরত্ব তখন মাত্র ৩৯ রান। বাকি কাজটা দায়িত্বের সঙ্গেই করেছেন নরসিং দেওনারায়ণ। গেইলের সঙ্গে ৮৩ রানের জুটি গড়া দেওনারায়ণ শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন ৬৫ রানে (৬টি চার ও ১টি ছয়)।
এর আগে জিম্বাবুয়ে দুশ পেরোনো স্কোর গড়ে এলটন চিগুম্বুরা ৫০ এবং ব্রেন্ডন টেলরের ৪৭ রানের সুবাদে। ৪৩ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং করেছেন বাঁহাতি স্পিনার নিকিতা মিলার।
পরশুর জয়ে ৫ ওয়ানডের সিরিজে ১-১-এ সমতা আনল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তৃতীয় ম্যাচ আগামী পরশু, সেন্ট ভিনসেন্টে। ওয়েবসাইট।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
জিম্বাবুয়ে: ৪৯.৫ ওভারে ২০৬ (চিগুম্বুরা ৫০, টেলর ৪৭, টাইবু ৩১, ল্যাম্ব ২৩, ক্রেমার ১৭, মাসাকাদজা ১৪; মিলার ৪/৪৩, রোচ ৩/৩৭, গেইল ১/২৫)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৪৭.৫ ওভারে ২০৮ (গেইল ৮৮, দেওনারায়ণ ৬৫*; প্রাইস ২/৩১, ক্রেমার ২/৪৪, ল্যাম্ব ১/২৩, টেলর ১/৬)।
ফল: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪ উইকেটে জয়ী।
মান অব দ্য ম্যাচ: নরসিং দেওনারায়ণ।

আবারও প্রেসিডেন্টস কাপের আয়োজক আবাহনী

আবারও এএফসি প্রেসিডেন্টস কাপের নিজেদের গ্রুপ পর্বের খেলার আয়োজক হতে যাচ্ছে ঢাকা আবাহনী। আগামী ১২-১৬ মে ঢাকায় হবে এই পর্বের খেলা।
‘এ’ গ্রুপে আবাহনীর সঙ্গে আছে আরও তিনটি দল—নেপালের লিগ চ্যাম্পিয়ন (এখনো চূড়ান্ত হয়নি), কিরগিজস্তানের দরদই বিশকেক, চীনা তাইপের ইয়োয়েদি। খেলা হবে ১২, ১৪ ও ১৬ মে। আবাহনীর প্রথম ম্যাচ নেপালের চ্যাম্পিয়ন দলের সঙ্গে, ১৪ মে দরদই বিশকেক ও শেষ ম্যাচের প্রতিপক্ষ ইয়োয়েদি।
তাজিকিস্তানের ভাক্স্ক, কম্বোডিয়ার নাগাকর্প, পাকিস্তানের খান রিচার্স ল্যাবরেটরিজ ও শ্রীলঙ্কার রিনাউন স্পোর্টস ক্লাব নিয়ে ‘বি’ গ্রুপের খেলার ভেন্যু ও সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মিয়ানমারের ইয়াদানারবন, তুর্কমেনিস্তানের আইটিটিইউ ও ভুটানের ড্রুকস্টার্স ক্লাব আছে ‘সি’ গ্রুপে। ৯-১৩ মে খেলা হবে মিয়ানমারে।
তিন গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন আর সেরা রানার্সআপ দল যাবে পরবর্তী রাউন্ডে।
প্রেসিডেন্টস কাপে এবার নিয়ে তৃতীয়বার খেলছে বাংলাদেশের পেশাদার লিগ চ্যাম্পিয়ন আবাহনী। আগের দুবারও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে। প্রথমবার নিরপেক্ষ ভেন্যু কুয়ালালামপুরে, দ্বিতীয়বার ঘরের মাঠে গোল-গড়ে। তবে আয়োজক হওয়া মানেই আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এবারও আয়োজক হতে আবেদন করেছিল আবাহনী, সেই আবেদনে সাড়া দিয়েছে এএফসি।

বাঁধা আছে সূর্যের কাছে -মানুষের মুখ by আকমল হোসেন

সূর্যের কাছে বাঁধা পড়ে আছেন একজন হরদেব পাঁশি। সেই ভোরবেলা যখন পুবের আকাশ লাল করে সূর্য ওঠে, কাজের জায়গায় তাঁর চলে আসা। আবার যখন গোধূলির আলো ছড়িয়ে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে, তবেই তাঁর ছুটি, তাঁর ঘরে ফেরা। না, এ জন্য কোনো আফসোস নেই। বরং পোড়খাওয়া মুখের বলিরেখায় আলোর উচ্ছ্বাস ফুটিয়েই বলেন, ‘খারাপ লাগবে কেন বাবু। ভালো লাগে। এ জন্যই তো কাজ করছি।’
ফাল্গুনের মাঝামাঝি সময়, বাতাসে গরমের আঁচ। পথে পথে শুকনো ঝরাপাতা। চা-গাছের রং কেমন হালকা খয়েরি। ছায়াবৃক্ষও পুরোনো পাতা ঝরানোর খেলায় মেতেছে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুগাছ চৌমোহনা থেকে ভানুগাছ-ধলই সীমান্ত সড়কের চা-বাগানের ভেতর দিয়ে পিচঢালা পথে এগিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়ে দুই পাশে চা-বাগানের এ রকমই ছবি। এই পথ পার হয়ে যেখানে গাড়ি থামল, সেই স্থানটি বাংলাদেশ আর ভারতের সীমানারেখার প্রান্ত, ধলই সীমান্ত। স্থানটি পড়েছে কমলগঞ্জ উপজেলায়। সেখানে একপাশে বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) ফাঁড়ি, অন্য পাশে চা-বাগানের টিলার ঢালুতে একটি স্মৃতিসৌধ। স্মৃতিসৌধটি বাংলার অকুতোভয় এক মুক্তিযোদ্ধা—পাকিস্তানি হানাদারদের শিবির তছনছ করে দিতে জীবন যাঁর কাছে ছিল তুচ্ছ—বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমানের।
বিডিআরের অনুমতি নিয়ে স্মৃতিসৌধের দিকে অগ্রসর হতেই এগিয়ে এলেন ৫০ পার হওয়া এই তামাটে মানুষ। একটা শ্রমজীবী জীবন ঘাঁটানোর ছাপ যাঁর পুরো মুখে। বললেন, ‘স্মৃতিসৌধে জুতা খুলে উঠবেন বাবু।’ কেন জানি চমকে উঠলাম, ফিরে তাকালাম তাঁর মুখের দিকে। প্রান্তিক এক মানুষ, সভ্যতার আলো-আঁধারি রং থেকে যে অনেক অনেক দূরে থাকে। সেই এক মানুষের কাছে স্মৃতিসৌধটি এখন এক পবিত্রতম স্থান। মনে পড়ল, এই তো কিছুদিন আগে পার করে আসা একুশে ফেব্রুয়ারিতে জুতা নিয়ে স্মৃতিসৌধে ওঠা কতিপয় ওজনদার মানুষের চেহারা!
আগে এই স্মৃতিসৌধটি ছিল না। ২০০৬ সালে স্মৃতিসৌধটি হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ রাইফেলসের উদ্যোগে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছিল বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের রণাঙ্গনের স্মৃতিবিজড়িত এ স্থানটিতে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাঙালির শ্রেষ্ঠসন্তানদের একজন হামিদুর রহমান ধলই সীমান্ত ফাঁড়িতে অবস্থান করা পাকিস্তানি হানাদারদের ঘাঁটি দখলে নিতে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জীবনের মায়া তাঁকে একবারের জন্যও পিছু টানেনি। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর গুলি করতে করতে কখন ঢুকে পড়েন শত্রুর ঘেরাটোপের ভেতর। যুদ্ধ করতে করতে এখানেই শত্রুর গুলিতে প্রাণ হারান। পরে সতীর্থরা তাঁকে কাঁধে করে বয়ে এনে সীমান্তের ওপারে ভারতের আমবাসা গ্রামে কবর দেন। ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর কবর ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়।
হরদেব পাঁশি বললেন, ‘আমি এখন বাবু এই স্মৃতিসৌধ দেখাশোনা করি। এখানে ফুল লাগিয়েছি। ঘাস কাটি। ফুলগাছে পানি দিই। ঝাড়ু দিই।’ হরদেব পাঁশি জানান, প্রতিদিনই এখানে ছোট-বড় গাড়ি নিয়ে অনেকেই ছুটে আসেন। কোনো কোনো দিন পঞ্চাশ-ষাটজনও হয়ে যায়। এখন এই সবকিছুরই দেখাশোনা করতে হয় তাঁকে। জানালেন, সেই যে সকালবেলা যখন দিনের আলো ফোটা শুরু হয়, হরদেব পাঁশি বাগানের বস্তির ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। এসেই স্মৃতিসৌধে পতাকা উঠান। সেই পতাকা ওড়ে সারাটা দিন। সূর্য নিভে গেলেই পতাকা নামিয়ে তাঁর ঘরে ফেরার কথা মাথায় আসে। এর জন্য কি টাকা-পয়সা পান? হরদেব পাঁশি জানান, ২০০৭ পর্যন্ত তিনি এই কাজের জন্য মাসে এক হাজার ৮০০ টাকা পেতেন। ২০০৮ থেকে সেটা বন্ধ আছে। তবে ২০০৯ সালে বিডিআরের মহাপরিচালক তাঁকে থোক ৪৩ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। তা দিয়ে ঋণটিন শোধ করেছেন। ২০০৭ সালে ছেলে প্রদীপ পাঁশি এসএসসি পাস করেছিল। কলেজে ভর্তি করিয়েছিলেন। কিন্তু টাকার অভাবে কলেজে নিয়মিত পড়াতে পারেননি। স্ত্রী, তিন ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। এই সংসার চলে কীভাবে? হরদেব পাঁশি বলেন, ‘পরিবার (স্ত্রী) বাগানে কাজ করে। এটা দিয়ে কোনো মতে চলি।’
এর পরও কাজ করছেন কেন? বললেন—‘এখানে কাজ করতে ভালো লাগে। এই ভালো লাগারও কারণ আছে বাবু। বাবার অনেক সম্পদ ছিল। মুক্তিযুদ্ধে সব গেছে। সাতটা গরু ছিল। দেড় টাকা হালিতে বিক্রি করছি। মায়ের সোনাদানা বেচে তামাদি করে বিলাইয়া গেল। আমরার ঘর-দুয়ার সব খালি হইয়া গেল।’ স্মৃতিসৌধের প্রতি টানের শেষ এখানেই না। তাঁর এক বড় ভাই রামজনম পাঁশি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। হরদেব পাঁশি হয়তো এসব কারণে নিজের বেঁচে থাকার যুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধকে একাকার করে ফেলেছেন। যা চলছে তো চলছেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল ১৫ বছর। উদ্বাস্তু হওয়া যুদ্ধের সেই সময়টিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। মানুষের দুর্ভোগ, কষ্ট, সব হারানোর বেদনা তাঁকে হয়তো এখনো প্লাবিত করে। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান যেন তাঁরই এক ভাই, যাঁর স্মৃতিসৌধ আগলে রাখা এখন তাঁর পরম কাজ। এখানে চাওয়া-পাওয়ার কথা বড় নয়।
হরদেব পাঁশি বলেন, ‘উনারা (দর্শনার্থী) আসেন। ফটো তোলেন। দেখি। এভাবে চলে আরকি। সারা দিনই এখানে কাটাই। আগে এখানে টয়লেট ছিল না। তখন ফাঁকে-ফুকে কাজ করতাম। এখন চাবি আমার কাছে। তাই কোথাও যাই না। লোকে যদি চাবি না পায়। আমার তো বদনাম হইব!’
আরও একবার চমকানোর পালা। যার কাজ সে যদি ঠিকমতো পালন না করে, তাহলে বদনাম হবে। এই প্রান্তিক মানুষটিকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি, বলে দেয়নি। নিজের অন্তরের তাগাদা থেকে, দায়বোধ থেকে তিনি এ উপলব্ধিটুকু অর্জন করে নিয়েছেন।

অধিকৃত দেশে গণতন্ত্র by ওয়াহিদ নবী

অনেক দরকষাকষি, অনেক ভুল বোঝাবুঝি আর অনেক বাগিবতণ্ডার পরে ইরাকের পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানসংক্রান্ত আইন পাস করেছিল। কথা ছিল, ২০১০ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু ইরাকের ভাইস প্রেসিডেন্ট তারিখ আল হাশেমী ভেটো দিয়ে দিলেন। তিনি সুন্নি। এখানে উল্লেখযোগ্য, ইরাকের বর্তমান যুদ্ধের সময় অনেককে গৃহত্যাগ করতে হয়েছে। তাদের মধ্যে সুন্নিদের সংখ্যাই বেশি। হাশেমী গৃহত্যাগীদের জন্য পার্লামেন্টে শতকরা ১৫ ভাগ আসন দাবি করেছিলেন। এসব কারণে নির্বাচন ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। মুরব্বি আমেরিকা নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তারা বলতে পারে, তারা ইরাকে গণতন্ত্র দিয়েছে। তারা গোটা পৃথিবীকে বলতে চায় যে ইরাককে স্বৈরতন্ত্রমুক্ত করে গণতন্ত্র উপহার দেওয়ার জন্যই তারা ইরাকে হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়েছে। আফগানিস্তানের নির্বাচনে ‘হ-য-ব-র-ল’ হওয়ার পর মাকির্িনরা ইরাকে একটা ‘সর্বাঙ্গীণ সুন্দর নির্বাচন’ করে পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিতে আগ্রহী। মুরব্বিরা যখন গণতন্ত্র দিতে চায়, তখন ইরাকিদের আর কী বলার থাকতে পারে! নির্বাচন তাদের করতেই হবে। কিন্তু ইরাকের তো অন্যান্য সমস্যা রয়েছে।
ইরাকের শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ শিয়া আর ৩০ ভাগ সুন্নি। সুন্নিদের মধ্যে রয়েছে আরব ও কুর্দি। এ ছাড়া রয়েছে তুর্কি, আর্মেনিয়ান ও এসিরিয়ান বংশোদ্ভূত মানুষ। তাদের সবার মধ্যে সব সময় সুসম্পর্ক ছিল না। বিশেষ করে সাদ্দাম হোসেনের শাসনকালে সুন্নি আরবরা অতিরিক্ত প্রাধান্য উপভোগ করে। ফলে শিয়া ও কুর্দিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কুর্দিরা অবশ্য বহু বছর থেকেই স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৯১ সালের কুয়েত যুদ্ধের পর শিয়া সম্প্রদায় মনে করে যে বিজয়ী পাশ্চাত্য শক্তি সাদ্দাম হোসেনের পতন চায়। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা সুন্নিদের হত্যা করে। সাদ্দাম হোসেন নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করেন। কুর্দিদের দমন করতে সাদ্দাম হোসেন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করেন।
ইরাকের সাম্প্রতিক ইতিহাস অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ ইরাক ছিল মানবজাতির আদি সভ্যতার পীঠস্থান। ইরাকের সুমেরিয় সভ্যতা মানবজাতিকে লিখতে শিখিয়েছে। তাদের আবিষ্কৃত ‘কিউনিফর্ম বর্ণমালা’ মানুষের ব্যবহূত প্রথম বর্ণমালা। আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে এই বর্ণমালা প্রচলিত হয়েছিল। আব্বাসীয় বংশের রাজত্বকালে তাদের রাজধানী ছিল বাগদাদ। বাগদাদ জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা, শিক্ষা-দীক্ষায় প্রভূত উন্নতি লাভ করে। যদিও হালাকু খানের ধ্বংসলীলার শিকার হয়েছিল বাদগাদ সে যুগে। কিন্তু ইরাকের বর্তমান দুঃখের ইতিহাস শুরু হয় প্রথম মহাযুদ্ধের সময়। তুর্কি অটোমান সাম্রাজ্য অধিকৃত ইরাক দখল করে ইংরেজরা। ১৯২০ সালে ইরাকিরা বিদ্রোহ করলে নির্মম হাতে তা দমন করে ইংরেজরা। এরপর থেকে গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের শেষ পর্যন্ত ইরাকের ইতিহাস একটা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ইতিহাস। শিখণ্ডীদের মাধ্যমে ইরাক শাসনের চেষ্টা করেছে ইংরেজরা। চুক্তির পর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে কিন্তু ঝড় থামেনি। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪০ সালের ভেতর সাতটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে।
ইরাক আক্রমণের অজুহাত হিসেবে বুশ সরকার দুটি লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেছিল। একটি হচ্ছে সাদ্দাম কর্তৃক সংগৃহীত বিশাল অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস করা এবং অন্যটি হচ্ছে স্বৈরাচারী সাদ্দাম হোসেনের অপসারণ। খুব কম মানুষই এ দুটি অজুহাত গ্রহণ করেছে। বুশ সাহেবের নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারটিই একটা সন্দেহজনক ব্যাপার। কাজেই তাঁর নেতৃত্বে ঘটা যেকোনো ব্যাপারকেই মানুষ সন্দেহের চোখে দেখবে, এটাই স্বাভাবিক। ইরাক দখলের পর অনেক চেষ্টা করেও দখলদারেরা কোনো অস্ত্রভান্ডার খুঁজে পায়নি। আমেরিকার অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে, যার দ্বারা তারা সাদ্দামের অস্ত্রভান্ডার অনায়াসেই খুঁজে পেতে পারত। এ ছাড়া তাদের পক্ষে অনেক ইরাকি কাজ করেছে, যারা অস্ত্রভান্ডারের খোঁজ দিতে পারত। দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্রভান্ডারের কথা বলে তারা ইরাক আক্রমণ করেছে কিন্তু অস্ত্রভান্ডার খুঁজে পায়নি। অর্থাত্ তারা জেনেশুনে নির্জলা মিথ্যা কথা বলেছে।
স্বৈরাচার দূর করার জন্য আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করেছে; এটা একটা খাঁটি পরিহাস। পৃথিবীতে তো অনেক স্বৈরাচারী রয়েছেন। আমেরিকা শুধু সাদ্দাম হোসেনের ব্যাপারে উত্সাহী কেন? ইরাক ও ইরানের আট বছরব্যাপী যুদ্ধের সময় আমেরিকা সাদ্দামকে মদদ জুগিয়েছে। ১৯৬৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রায় তিন দশক পর্যন্ত সাদ্দাম হোসেন স্বৈরাচারী ছিলেন না আমেরিকার চোখে। কিন্তু হাঠাত্ করে তাদের চোখে সাদ্দাম এত খারাপ হয়ে গেলেন কেন? সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে ইসলামি জঙ্গিদের যোগাযোগ ছিল কি? এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সাদ্দাম হোসেনের যত দোষ থাকুক না কেন, ধর্মকে তিনি কাজে লাগিয়েছেন—এ অপবাদ তাঁকে কেউ দিতে পারবে না।
এসব মিথ্যা কথা বলে আমেরিকা তবে ইরাক আক্রমণ করল কেন?
তেলের জন্য? উড়িয়ে দেওয়া যায় না কথাটা।
একটি শক্তিশালী আরব দেশ ইসরায়েলের জন্য বিপজ্জনক? কথাটার পেছনে যুক্তি আছে।
আমার সহকর্মী ও বন্ধু ইরাকিদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি। তাঁদের অনেকেই বিশ্বাস করেন যে সাদ্দামকে উত্খাত করার জন্য আমেরিকার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। তাঁদের অনেকের ধারণা, গণতন্ত্রের শুরুতে আমেরিকার সাহায্য ইরাকের দরকার ছিল। তাঁদের কেউ আমাকে এমন কথাও বলেছেন যে ব্রিটিশদের দেওয়া বিচারব্যবস্থা ও সিভিল সার্ভিস ইত্যাদি পাক-ভারত উপমহাদেশের দেশগুলোকে সাহায্য করেছে। কথাগুলো ভেবে দেখার মতো। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রে অধিকৃত দেশ কি আক্রমণকারী দেশের দ্বারা উপকৃত হয়েছে? যদিও অধিকৃত দেশের উপকারের জন্য নয়, বরং নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আক্রমণকারীরা অন্য দেশ আক্রমণের মতো ঘৃণ্য কাজ করে থাকে।
আরও একটি কথা মনে পড়ে এ প্রসঙ্গে। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা আক্রমণকারীদের সাহায্য করে। দেশের ভেতর অবিচার চরম আকার ধারণ করলে এবং জাতির একটি দুর্বল অংশ বিচারের কোনো সম্ভাবনা না দেখলে অনেক সময় পূর্বাপর চিন্তা না করে অবাঞ্ছিত বহিঃশত্রুর সাহায্য নেয়। কাজটা ভালো নয়। এতে করে কেউ লাভবান হয় না। তবে পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল নয়।
আমেরিকা যখন ইরাক আক্রমণ করে, তখন কুর্দিরা সৈন্য দিয়ে তাদের সাহায্য করেছে। তারা কিছু লাভবানও হয়েছে। এখন কুর্দিস্তান প্রায় স্বাধীন। কিন্তু তারা নির্বাচন বর্জনের হুমকি দিচ্ছে শিয়াপ্রধান সরকারের কাছ থেকে প্রচুর হিস্যা না পাওয়ার জন্য।
এতকালের শক্তিশালী সুন্নিরা কি শিয়াপ্রধান সরকারের কাছ থেকে আশানুরূপ হিস্যা পাবে?
আমেরিকা কি চিরদিন ইরাকে থেকে মুরব্বির ভূমিকা পালন করতে পারবে? রাস্তা থেকে আমেরিকান সেনা ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার পর ইরাকে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। চুক্তি অনুযায়ী ২০১১ সালে আমেরিকার সব সেনা চলে গেলে ইরাকে কী ঘটবে?
মৃতদেহ গণনার পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় দেড় লাখ ইরাকি প্রাণ হারিয়েছে। নেতাদের দরকষাকষি দেখার জন্য আরও ইরাকি কি হাসিমুখে প্রাণ দেবে? ইরাকের নতুন এই ‘এক্সপেরিমেন্টের’ জন্য আরও কতজনকে প্রাণ দিতে হবে? মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি আর কত দিন আমেরিকাবাসী চুপ করে দেখবে?
এত কাঠখড় পুড়িয়ে নির্বাচন হলেই কি ইরাকের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? বিশেষ করে তিনটি প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক যখন সুমধুর নয়।
ওয়াহিদ নবী: লন্ডন প্রবাসী। গবেষক ও মনোরোগবিশেষজ্ঞ।

সংখ্যাগুরুর দখল-মানসিকতা -যুক্তি তর্ক গল্প by আবুল মোমেন

বাঘাইছড়ি ও খাগড়াছড়ির ঘটনার পর মনে হচ্ছে এ দেশের ধর্মীয় সংখ্যাগুরু মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিবেশী ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীসমূহের প্রতি মনোভাব ও তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনের মান সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা যায়। ১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে ধরলে সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু সম্পর্ক ও দায়িত্ব গ্রহণের প্রশ্নটি জরুরি ও জোরালোভাবে উঠে আসবে। কারণ, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ভেদনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান তার জন্মকালীন এই ধর্মীয় পক্ষপাত ও বিপক্ষতার আদর্শিক ভূমিকার জন্যই সংখ্যালঘুর আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়নি।
১৯৪৬-এ কলকাতা ও নোয়াখালীর দাঙ্গার পর বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে সন্দেহ ও আস্থাহীনতা জোরদার হয়। সাধারণত প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ধর্ম-নির্বিশেষে মানুষের সহাবস্থানের সংস্কৃতি অনেক জোরালো ও বিকাশমান থাকে এবং বাংলায় তার ঐতিহ্যও সুদীর্ঘ। কিন্তু নোয়াখালীর দাঙ্গা সে ধারায় ক্ষত সৃষ্টি করে। কেবল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পটভূমিতে এক বছরেই প্রায় ১১ লাখ হিন্দু এ দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। এদের অধিকাংশই ছিল আতঙ্কিত, সর্বস্ব হারানো ছিন্নমূল উদ্বাস্তু—যদিও এদের মধ্যে সাড়ে তিন লাখ ছিল গ্রামীণ মধ্যবিত্ত, দুই লাখের মতো স্বচ্ছল কৃষক ও কারিগর শ্রেণীর মানুষ। দেশভাগের সময় পূর্ববঙ্গে (অর্থাত্ বাংলাদেশে) শতকরা ২৯ ভাগ সংখ্যালঘুর বসবাস ছিল। কিন্তু ১৯৫১ সালের জনসংখ্যা জরিপে দেখা যায় সে সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে শতকরা ২২ ভাগে। এভাবে দশকওয়ারি জনসংখ্যা জরিপগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তাতে সংখ্যালঘুর অনুপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে। কমতে কমতে সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা এখন শতকরা ১২ ভাগের মতো। এই পরিসংখ্যানগুলো বিশ্লেষণ করে গত ৬০ বছরে এ দেশ থেকে কত সংখ্যালঘু দেশত্যাগ করেছে তার মোট হিসাব বের করা সম্ভব এবং তা যে বিরাট একটি সংখ্যা হবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দুঃখের বিষয় হলো, সংখ্যালঘুর দেশত্যাগ এখনো অব্যাহত রয়েছে। রাষ্ট্র এবং সমাজ এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়, প্রতিকারে সচেষ্ট নয় এবং অবস্থার শিকার যারা, তাদের প্রতি প্রয়োজনীয় সংবেদনশীল নয়।
এ বিষয়টিকে ভারতের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সংখ্যাগত ও ব্যাপকতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দাঙ্গা-পরিস্থিতির বিচারে মূল্যায়ন করার মানসিকতা দেখা গেছে। ভারতবর্ষে রাষ্ট্র যেহেতু সাম্প্রদায়িক নয়, আইন ও প্রতিষ্ঠান যেহেতু সবার সমানাধিকার রক্ষায় স্পষ্টভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ, তাই সামাজিক যে সাম্প্রদায়িকতা, তাকে মোকাবিলা করার মতো সাহস ও উদ্দীপনা মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘুরা পেয়ে থাকে। তাতে দেখা যায়, ভারতবর্ষে গত ৬০ বছরে ছোট-বড় অনেক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলেও ’৪৭ ও ’৫০ এবং ’৬৪-র দাঙ্গা ব্যতীত অন্য সময়ে ধারাবাহিক দেশত্যাগের ঘটনা ভারতের দিক থেকে ঘটেনি। বাংলাদেশের বহির্মুখী ও দেশমুখী অভিবাসনের পরিসংখ্যান পেলে তা থেকে বিষয়টি সহজেই পরিষ্কার হবে। তবে সমাজের দিকে চোখ রাখলেও প্রবণতা কোন দিকে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সাম্প্রদায়িক ভেদনীতির ওপর সৃষ্টি হয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সংখ্যালঘুর আস্থা ও মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য সরকারের বহু পদক্ষেপকেই দায়ী করা যাবে। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পটভূমিতে পাকিস্তান ও ভারতের তত্কালীন দুই প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ও লিয়াকত আলী খানের মধ্যে উভয় রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের ধর্ম-নির্বিশেষে নাগরিক সমানাধিকারের নিশ্চয়তা দিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও পাকিস্তান সরকার সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়নি। বরং বিপরীত ব্যবস্থাই গ্রহণ করেছে, যাতে এ দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মনোবল আরও ভেঙে পড়ে। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের আইনসভায় এমন দুটি আইন পাস করা হয়, যাতে সংখ্যালঘুদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হুমকির সম্মুখীন হয়। এ দুটো আইন হচ্ছে—ইস্ট বেঙ্গল ইভাকুই প্রোপার্টি (রেস্টোরেশন অব পোজেশন) অ্যাক্ট অব ১৯৫১ এবং ইস্ট-বেঙ্গল ইভাকুইস (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব ইমমুভেবল প্রোপার্টি) অ্যাক্ট অব ১৯৫১।
এখানে একটা কথা স্মরণ করা দরকার যে বাংলায় (এবং ভারতবর্ষেও) ইংরেজের সঙ্গে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করার ফলে চাকরি, আয়-উপার্জন ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানার দিক থেকে হিন্দুসমাজ মুসলমানদের চেয়ে এগিয়ে ছিল। ফলে সংখ্যাগত দিক থেকে পূর্ববঙ্গে হিন্দু সংখ্যালঘু হলেও তার হাতে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল আনুপাতিক এবং সামগ্রিক উভয় হিসেবেই বেশি।
এদিকে দেশভাগের ফলে অনাস্থা ও আতঙ্কের মধ্যে ভিটেমাটি ছেড়ে দেশত্যাগ এবং সহায়-সম্পত্তি নিয়ে চরম ভোগান্তির অশনিসংকেত প্রদানকারী এই দুটি আইন তথা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখে অসহায় মানুষের দেশত্যাগ সংখ্যাগুরু সমাজের মধ্যে একশ্রেণীর উচ্চাভিলাষী নৈতিকতাবর্জিত মানুষেরও জন্ম দেয়, যারা সস্তায় কিংবা গায়ের জোরে সংখ্যালঘুর সম্পত্তি দখলের দিকে মনোযোগী হয়।
এখানে আরেকটি কথা সবিনয়ে জানাতে চাই। বাংলাদেশে একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে—তারা সংখ্যায় বাড়ছে—কেন, কখন, কীভাবে একটি দখলদারির মনোবৃত্তি ও তাদের ভূমিকার ফলে রাজনীতি-প্রশাসনসহ সমাজে একটি দখলদারির সংস্কৃতি গড়ে উঠল, তা আমাকে অনেক দিন ধরে ভাবাচ্ছে। এ প্রবণতা মজ্জাগত হয়ে পড়েছে কি না এবং তার ব্যাপকতা কতখানি তা আরও গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয়, তবে তা যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে ও মাত্রায় পৌঁছেছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এ প্রবণতা বজায় রেখে যেমন গণতন্ত্র চর্চা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব নয় স্বাধীনতার মতো কোনো অর্জনকে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ফলপ্রসূ করে তোলা।
রাষ্ট্রের সহযোগিতায় প্রধানত হিন্দুদের এ দেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, প্রান্তিক অভাজন এবং অসহায় সংখ্যালঘুতে পরিণত করা হয়েছে। ১৯৫২ ও ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের আইনসভা এমন দুটি আইন পাস করে, যাতে সংখ্যালঘুদের মনোবল একেবারেই ভেঙে পড়ে। এ আইন দুটি হলো—ইস্ট বেঙ্গল প্রিভেনশন অব ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি অ্যান্ড রিমুভেবল ডকুমেন্টস অ্যান্ড রেকর্ডস অ্যাক্ট অব ১৯৫২ এবং ইস্ট পাকিস্তান ডিস্টার্বড পারসনস (রিহ্যাবিলিটেশন) অর্ডিন্যান্স অব ১৯৫৪। এ আইনগুলোর ফলে সরকারি অনুমতি ছাড়া সংখ্যালঘুরা তাদের নিজস্ব সম্পত্তি বিক্রির অধিকার হারায়। ১৯৫৭ সালে জারিকৃত ‘পাকিস্তান (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব ইভাকুইজ প্রোপার্টি) অ্যাক্ট XII অব ১৯৫৭’ এবং ১৯৫৯ সালে সামরিক শাসক আইউব যখন ছয়জন বিশিষ্ট সংখ্যালঘু নেতাকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করেন (EBDO) তখন আরেকবার হিন্দুরা উপলব্ধি করে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা তাদের প্রতি কতটা বৈরী ও আক্রমণাত্মক।
১৯৬৫ সালের স্বল্পস্থায়ী পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের প্রতিফল হিসেবে প্রণীত হয় দীর্ঘস্থায়ী শত্রু সম্পত্তি আইন, যা প্রায় নির্বিচারে হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বার্থের পরিপন্থীভাবে ব্যবহূত হয়েছে। এই কালাকানুন এখনো অর্পিত সম্পত্তি আইন নামে বহাল রয়েছে। ’৬৪ সালের দাঙ্গা এবং ’৬৫ সালের যুদ্ধ ও পরবর্তীকালের এই কালাকানুনের কারণে হিন্দুদের দেশত্যাগ বেড়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সরকার, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসরদের দিক থেকে নির্বিচারে সম্প্রদায় হিসেবেই হিন্দুমাত্রই শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়ে তাদের সম্মিলিত সর্বাত্মক হামলার সম্মুখীন হয়। তাই সেদিন প্রায় ৭০ লাখ হিন্দু উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়।
এত বৈরিতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও পাকিস্তান আমলে কি রাজনীতি কি সাংস্কৃতিক সংগ্রামে হিন্দুসহ সব সংখ্যালঘু মূলধারায় যুক্ত ছিল। সেটি ক্রমহ্রাসমান হলেও প্রভাবক ভূমিকায় তখনো ছিল তারা। সবার মতো তাদেরও স্বাধীন বাংলাদেশে সব অন্যায়-অবিচারের অবসান হয়ে সমানাধিকারের ভিত্তিতে কারও অনুকম্পা ব্যতিরেকে মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশও সেই স্বপ্ন রক্ষা তো করেইনি, বরং তাকে ফিকে করেছে, এমনকি ভেঙে দিয়েছে। স্বাধীনতার পরপর পূজামণ্ডপে ব্যাপকভাবে প্রতিমা ভাঙার বিষয়টিকে আমি স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারকে নাকাল করার জন্য পরাজিত পাকিস্তানিপন্থীদের অপতত্পরতা হিসেবে দেখতে রাজি আছি। কিন্তু রাষ্ট্র কী করল? ’৭৫-এর পর আবার পাকিস্তানের পথ ধরল, কেবল যে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দেওয়া বা রাষ্ট্রধর্ম বিল পাস হলো তা নয়, কুখ্যাত কালাকানুন অর্পিত সম্পত্তি আইনের মাধ্যমে সংখ্যালঘুর সম্পত্তির বিষয়টি সুরাহা না হয়ে আরও মারাত্মক জটিলতায় পড়ল। ১৯৮৯ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর এবং ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের প্রাক্কালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রান্ত হয়।
এখন দেশভাগ ও তত্পরবর্তীকালের ইতিহাস বিচার করলে দেখা যায় রাষ্ট্র—প্রথমে পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ—কখনো সংঘ্যালঘুর স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো আইন তথা ধর্মীয় বিভেদমূলক অবস্থান থেকে ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিকদের জন্য সমানাধিকার ও সমান সুযোগ-সুবিধার অবস্থানে আসতে পারেনি। পাশাপাশি যখন দেখি সমাজে দুর্বলের সম্পত্তি ভোগদখলের মানসিকতা অব্যাহত রয়েছে, এমনকি তা জাতিগত ব্যাধি হয়ে দাঁড়ানোর উপক্রম হচ্ছে তখন শঙ্কিত না হয়ে পারি না।
বিষয়টা এভাবে কড়া ভাষায় প্রকাশ করার কারণ, দীর্ঘ ৬০ বছরের অবিচার ও অন্যায় সম্পর্কে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় উদাসীন, প্রতিবেশীর নীরব দেশত্যাগ কিংবা সহায়-সম্পত্তি চাকরি-ব্যবসা নিয়ে বৈষম্যের শিকার হওয়া ও নিত্য অপদস্ত হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে সংখ্যাগুরু উদাসীন, অসচেতন, নিষ্ক্রিয়। লাখ লাখ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অশ্রুজল ও বুকভাঙা হাহাকার পুঞ্জীভূত হতে থাকলে কীভাবে একটি জাতি গর্ব ও আত্মমর্যাদায় সামনে এগোবে। এটা কি সম্ভব?
সব ধরনের ভ্রান্তিরই খেসারত দিতে হয়। ঔদাসীন্য, অসচেতনতা, নিশ্চেষ্টতার ফল এই দাঁড়ায় যে আমাদের নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দল (তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের মাধ্যমে) বিজয়কে দখলে রূপান্তরিত করে ছাড়ে এবং রাজনীতি ক্রমে দেশগড়া ও জাতির সেবার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ক্ষমতার বৈভব অর্জনের হাতিয়ার হয়। ছাত্র-যুবকর্মীরা দিকে দিকে হল, টেন্ডার, এলাকা, মার্কেট, ভূমি দখলের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। রঙ্গমঞ্চে নতুন নতুন অধিকতর চতুর ও নিষ্ঠুর দখলদারেরা নেমে পড়েছে, যাদের দুঃসাহস, বেপরোয়া মনোভাব, দুর্বৃত্তপনা সকল সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
নতুন দিন আনতে হলে, দিন বদলাতে হলে একটি বড় কাজ হলো—সকল নাগরিকের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক নিরপেক্ষভাবে সমানাধিকার ও সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। বাঘাইছড়িতে দরিদ্র মুসলিমরাও পাল্টা হামলা ও আঘাতের শিকার হয়েছে। তাদের উসকানি না দিয়ে পার্বত্য শান্তিচুক্তির আলোকে ভূমি সমস্যার সমাধান করে সবার মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতি সৃষ্টির লক্ষ্যেই সবাইকে কাজ করতে হবে। তবে তার আগে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে আমাদের জানতে হবে, এ অঞ্চলে কীভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবিচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে আর কীভাবে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ দিনে দিনে দখলদারের মানসিকতায় পরিপুষ্ট হচ্ছে ও দখলদারির সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাচ্ছে।
ভুলগুলো স্বীকার করতে হবে এবং শোধরাতে হবে আমাদের।
আবুল মোমেন: কবি, সাংবাদিক।

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক ও মনস্ত্তাত্ত্বিক বাধা by মহিউদ্দিন আহমদ

পাকিস্তানের সিভিল সমাজের প্রতিনিধি, অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও রাজনীতিক, যাঁদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ হয়েছে, তাঁদের কাছে আমার একটি প্রশ্ন ছিল: বাংলাদেশে যখন গণহত্যা চলে, তখন তোমরা কেন প্রতিবাদ করনি। পাঞ্জাবি, পাঠান, সিন্ধি, মোহাজের—সবার কাছেই আমি এ প্রশ্ন রেখেছি। বেশির ভাগ উত্তরই ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং অনুতাপসুলভ বা অ্যাপোলোজেটিক। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও ছিল। একাত্তরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভূমিকার প্রতিবাদ করে জেল খেটেছেন, এমন মানুষের সঙ্গেও দেখা হয়েছে।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের যখন জন্ম হয়, এর পেছনে বাংলার প্রায় সব মুসলমান নেতাই এক কাতারে শামিল ছিলেন। জিন্নাহকে নেতা মেনে এ দেশের প্রধান নেতাদের মধ্যে ভাসানী, ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান চেয়েছিলেন বলেই তা হতে পেরেছিল। কিন্তু ওই সময় বালুচিস্তান পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হয়নি। কেননা বালুচিস্তান (কালাত) ইংরেজ-শাসিত ভারত সাম্রাজ্যের আওতাধীন ছিল না। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর চাপে পড়ে জনমত উপেক্ষা করে ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ কালাতের শাসক আহমেদ ইয়ার খান পাকিস্তান রাষ্ট্রে অঙ্গীভূত হওয়ার চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর দেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দাপটের কাছে বালুচদের সার্বভৌম সত্তা বিলীন হয়ে যায়।
পরবর্তী ইতিহাস আরও করুণ। ১৯৫৮ সালের ৫ অক্টোবর ব্রিগেডিয়ার টিক্কা খানের নেতৃত্বে কালাতে সেনা অভিযান শুরু হয়। কালাতের ‘খান’কে গ্রেপ্তার করে লাহোরে এনে অন্তরীণ করা হয়। টিক্কা খানের আবির্ভাব ঘটে নতুন নামে—বালুচিস্তানের কসাই। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে একই সেনাপতির নেতৃত্বে এই নাটকের পুনর্মঞ্চায়ন হয়েছিল। আর প্রযোজকের ভূমিকায় ছিলেন মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জার উত্তরসূরি জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। ১৯৫৮ সালে বালুচদের সমর্থনে ঢাকায় কোনো প্রতিবাদ মিছিল হয়নি। কেন হয়নি, এক বালুচ যুবকের এই প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারিনি। ১৯৭১ সালে যখন একই কসাই বাংলাদেশে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল, পশ্চিমে এটা নিয়ে তেমন একটা প্রতিবাদের ঝড় ওঠেনি। এটাই নিশ্চিতভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমাদের উভয়ের মনোজগতেই অন্যের উপস্থিতি নেই। আমরা উভয়েই স্বতন্ত্র, আলাদা। এটা বুঝতে বুঝতেই ২৩ বছর গড়িয়ে গেছে।

দুই.
১৯৯৭ সালে আমি যখন দ্বিতীয়বার পাকিস্তান সফরে যাই, তখন ঘটা করে সেখানে পাকিস্তানের সুবর্ণজয়ন্তী উত্সব চলছিল। এ উপলক্ষে একটি গণমাধ্যমে মতামত জরিপ চালানো হয়। প্রশ্ন ছিল দুটি। পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রধান ঘটনা কী এবং সম্পূরক প্রশ্নটি ছিল, এ ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী। প্রথম প্রশ্নের উত্তরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জবাব ছিল, ‘ঢাকার পতন।’ দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ৩৩ শতাংশ মানুষ বলেছিল, ভুট্টো দায়ী। ২৬ শতাংশ মানুষ অভিযুক্ত করেছিল জেনারেল ইয়াহিয়াকে। এবং মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ দায়ী করেছেন শেখ মুজিবকে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ে যখনই কোনো বৈঠকের আয়োজন করা হয়, তখনই আমরা গণমাধ্যমে একটা প্রচার দেখি এজেন্ডা নিয়ে। এই এজেন্ডার মধ্যে অবধারিতভাবে থাকে ‘আটকে পড়া পাকিস্তানিদের’ ফিরিয়ে নেওয়া এবং যুদ্ধ-পূর্ববর্তী রাষ্ট্রীয় সম্পদের ন্যায়সংগত অংশ বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু এ বিষয়গুলো নিয়ে কী আলোচনা হয়, কী সিদ্ধান্ত হয়, তা আমরা বিস্তারিত কিছুই জানতে পারি না। শীর্ষ বৈঠক শেষ হয়ে গেলে আরেকটি বৈঠকের আয়োজন না হওয়া পর্যন্ত এর কোনো ফলোআপ থাকে না। আসলেই কি এ দুটি বিষয় এই দুই দেশের আন্তসম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা?
ইতিমধ্যে একটি বিষয়ের মীমাংসা হয়ে গেছে। ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ প্রশ্নের সম্মানজনক সুরাহা হয়েছে তাঁদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে নেওয়ার রাজনৈতিক ও মানবিক সিদ্ধান্তে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁদের সমন্বয়ের বিষয়টি সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। পক্ষান্তরে পাকিস্তানে যে লাখ লাখ বাঙালি বসবাস করছেন, তাঁদের পাকিস্তানের নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার আছে। করাচির কোরাঙ্গি এলাকায়ই ১০ লাখেরও বেশি বাঙালির বসবাস বলে ধারণা করা হয়। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণও এ রকমই ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ তাঁদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করে। তাঁরা এখন রাষ্ট্রবিহীন মানুষ এবং প্রায় প্রতিদিন পুলিশ ও কর্মস্থলে নিয়োগকর্তার হয়রানির শিকার হচ্ছেন। করাচির কয়েকটি এনজিও তাঁদের সঙ্গে কাজ করে এবং সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে, যাতে তাঁরা হয়রানির বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। সার্ক সোশ্যাল চার্টারের আওতা পরিমার্জন করে এসব ‘অননুমোদিত’ শ্রমিককে ‘অভিবাসী শ্রমিক’ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার জন্যও দাবি করছে করাচির কয়েকটি এনজিও। যাঁরা বাংলাদেশে বসবাস করতে চান, তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক হবেন এবং যাঁরা পাকিস্তানে রুটি-রুজির আশায় গেছেন এবং সেখানেই থাকতে চান, তাঁদের পাকিস্তানের নাগরিকত্ব দিতে হবে। এই দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ রকম সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার।
আমাদের স্মৃতিতে ১৯৭১ একটা বড় রকমের ক্ষত তৈরি করেছে। আমরা চাই, পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চাক। পাকিস্তানের সিভিল সমাজ থেকেও এ দাবি উঠেছে এবং গত ২৫ বছরে অনেকেই প্রকাশ্যে এ দাবির প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। এ দুই দেশের সিভিল সমাজের প্রতিনিধিরা যখন বিভিন্ন আঞ্চলিক ফোরামে একত্র হন, তখন এ আশাবাদ জাগে, এ রকম একটি দাবির প্রতি পাকিস্তানের সর্বস্তরের নাগরিক একদিন না একদিন সমর্থন দেবেনই। এ জন্য একটা অনুকূল আবহ দরকার, প্রয়োজন সিভিল সমাজের আরও অগ্রণী ভূমিকা পালন। জেনারেল পারভেজ মোশাররফই প্রথম পাকিস্তানি সরকারপ্রধান, যিনি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আমাদেরও একটু ধৈর্য ধরতে হবে এবং আমাদের কাজগুলোও করতে হবে। একটি বিভক্ত জাতির পক্ষে এ ধরনের একটি অর্জন হবে সময়সাপেক্ষ ও কষ্টকর। আমাদের জাতীয় ঐক্য দরকার সবার আগে।
রাজনৈতিক সমঝোতা ও স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তা বজায় রাখার পথটি সহজ নয়। এটিকে সহজতর করা যায়, যদি সম্পর্কের অন্য জানালাগুলো আমরা খুলে দিই। নাগরিকদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য বাড়ানোর মধ্য দিয়ে আমরা সম্পর্কের সিঁড়িগুলো তৈরি করতে পারি। এখন ঢাকা থেকে কলকাতা রেলগাড়িতে যাতায়াত করা যায়। অমৃতসর থেকে লাহোর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ আছে এবং তা বেশ জনপ্রিয়। আমরা কি পারি না ঢাকা-লাহোর সরাসরি রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে? রেললাইন তো আছেই।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক, গবেষক।
mohi2005@gmail.com

এশিয়াজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ ও বাংলাদেশ by আসজাদুল কিবরিয়া

বিশ্বমন্দার একটা ভালো দিক অন্তত ছিল। বিশ্ববাজারে জিনিসপত্রের দাম কমে গিয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের আমদানি ব্যয়ও কিছুটা কমে যায়। এর প্রভাবে দেশের ভেতর মূল্যস্ফীতির চাপ অনেকটা সহনীয় হয়ে আসে। এটা একটা সুযোগও তৈরি করেছিল। আর তা হলো, তুলনামূলক কম দামে কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করে শিল্পের উত্পাদন জোরদার করা। বাংলাদেশ প্রথম সুবিধাটা নিতে পেরেছিল। তবে তা নিজস্ব ক্ষমতায় নয়, পরিস্থিতির চক্রে। দ্বিতীয় সুবিধাটা কাজে লাগানো যায়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতি-নির্ধারকদের অদূরদর্শিতাই এর কারণ।
তার মানে এই নয় যে মন্দাকে সমর্থন করতে হবে অথবা বারবার মন্দা ফিরে আসার প্রত্যাশা করতে হবে। কেননা, মন্দার সময় মূল্যস্ফীতির চাপ কম থাকে—এটা পুরো চিত্রের খণ্ডিত অংশমাত্র। পুরো চিত্রটি দেখলে বোঝা যায়, মন্দা শেষ পর্যন্ত সুখকর কিছু বয়ে আনতে পারে না। বিশেষ করে কোনো সুযোগ থাকার পরও তা যদি কাজে লাগানো না যায়।
পরিস্থিতি এখন অবশ্য অন্যদিকে ঘুরে গেছে। ২০০৮ সালের শেষ ভাগে যে মন্দার যাত্রা শুরু, তা ২০০৯ সালের প্রথম ভাগে গভীর হয়। উন্নত দেশগুলোতে শিল্পের উত্পাদন হ্রাস পায়। বহু মানুষ কাজ হারায়। আর্থিক খাতের কর্মকাণ্ড শ্লথ হয়ে পড়ে। আমেরিকা ও ইউরোপ ছাড়িয়ে এ মন্দার ধাক্কা এশিয়াতেও এসে লাগে। অবশ্য মন্দা মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢেলেছে। আর তা এসেছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। উদ্দেশ্য ছিল, অর্থ ব্যয় করে চাহিদা জাগিয়ে রাখা, যেন তা মেটাতে পণ্য ও সেবা জোগানের জন্য উত্পাদকেরা এগিয়ে আসেন। এ ছাড়া আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অন্যভাবে বললে, মন্দা মোকাবিলায় সরকারগুলো যে ধরনের সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব ও সংকুলানমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ করে। এসব নীতির আওতায় মন্দার সময় জনগণকে খরচ করতে উত্সাহিত করা এবং উদ্যোক্তাদের উত্পাদন ধরে রাখার জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের কর ছাড় ও নগদ ভর্তুকি দিয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমিয়েছে। বলা যায়, এসব পদক্ষেপ এখনো বহাল আছে।
এর সমন্বিত ফল হিসেবে দেখা যায়, ২০০৯ সালের শেষ ভাগ থেকে বিভিন্ন দেশ মন্দা কাটিয়ে উঠছে—বিশেষ করে এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিগুলোর অর্থনীতি আবার জোরালো হতে শুরু করে। দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়তে থাকে। আর চাহিদা বাড়ার জের ধরে আবার মূল্যস্ফীতি ভালোভাবেই মাথাচাড়া দিয়েছে।
এশিয়ার প্রধান অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রমাণ মেলে শিল্পের উত্পাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে। জাপানকে বাদ দিয়ে এশিয়ার প্রধান দেশগুলোর সমন্বিত শিল্পের উত্পাদন অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৯০ শতাংশ ও ১৫ দশমিক ৩০ শতাংশ হারে বেড়েছে, যেখানে সাধারণভাবে ৯ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধিকেই জোরালো বিবেচনা করা হয় (দ্য ইকোনমিক টাইমস, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১০)। নীতি পদক্ষেপের কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক নীতিনির্ধারক আবার এ রকমও ভাবছেন যে যদি এসব নীতি-সহায়তা প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে হয়তো চাহিদা আবার কমে যাবে। ফলে এসব উদ্দীপনামূলক কর্মসূচি কত দিন বহাল রাখা হবে বা কত দ্রুত সীমিত করা হবে, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। যদিও গত দুই মাস ধরে চীন ব্যাংকপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে সুদের হার বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়ে আভাস দিয়েছে যে তারা নিয়ন্ত্রণমূলক মুদ্রানীতির দিকে অগ্রসর হবে। অন্যদিকে ভারত সরকার ২০১০-১১ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট ঘোষণা করেছে, তাতেও খুব দ্রুত প্রণোদনা গুচ্ছ থেকে সরে আসার আভাস মেলেনি।
সমস্যা হলো, অভ্যন্তরীণ চাহিদা যে হারে বেড়েছে, সে হারে বাড়ার প্রত্যাশা নীতিনির্ধারকদের ছিল বলে মনে হয় না। ফলে মূল্যস্ফীতিও যে এতটা দ্রুতহারে বেড়ে যাবে, তাও ঠিক পূর্বাভাসে মেলেনি। বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ। এটা আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বাদে এশিয়ার প্রধান অর্থনীতির সবই জ্বালানি তেল ও তেলসামগ্রীর নিট আমদানিকারক।
আরেকটি বিষয় হলো, বাড়তি তারল্য—যাকে মোটাদাগে বলা যায়, ব্যাংকে প্রচুর পরিমাণ নগদ অর্থ জমে যাওয়া। এটা বেড়ে গিয়ে স্থাবর সম্পত্তির, বিশেষত জমি ও বাড়ির দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। একদিকে সুদের হার কম, অন্যদিকে ব্যাংকে প্রচুর অর্থ জমে আছে। তার মানে কম খরচে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে ভোক্তারা ঋণ নিয়ে জমি ও বাড়ি কেনার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এটা জমি ও বাড়ির দাম অস্বাভাবিকহারে বাড়িয়ে দিচ্ছে। চীনের ৩৬টি শহরের সম্পত্তির একটি সূচক আছে, যা এক বছরের ব্যবধানে ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে চাল, চিনি, দুধ, ভোজ্যতেল ইত্যাদির দাম প্রায় সব দেশেই বিভিন্ন হারে বাড়ছে। চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড—সর্বত্রই মোটামুটি একই চিত্র (ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১০)। ২০০৯ সালে বড় ধরনের খরার মধ্যে পড়ায় ভারতে খাদ্যের মূল্যস্ফীতির হার বছর শেষে দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। আর এ বছর ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভারতে খাদ্যের মূল্যস্ফীতির হার ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ফিলিপাইনে অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হওয়ায় দেশটিকে ২০ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়েছে। ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশে শুধু চালের দামই মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এইচএসবিসির হিসাব অনুসারে, এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলোয় সমন্বিতভাবে চালের দাম ২০ শতাংশ বাড়লে তা মূল্যস্ফীতির হার দেড় শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে দেয়। অর্থাত্ মূল্যস্ফীতির হার পাঁচ শতাংশ থাকলে তা হয়ে যাবে সাড়ে ছয় শতাংশ। আবার চালের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে গেলে তা মূল্যস্ফীতির হার তিন দশমিক ৭০ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ায়।
এশিয়াজুড়ে মূল্যস্ফীতির যে চাপ, তা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। আর যেসব কারণে এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিগুলোয় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, এর কয়েকটি বাংলাদেশের জন্যও সত্য। তার মানে এই নয় যে এগুলোই বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির প্রধান নিয়ামক। এটা ঠিক বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি তারল্যজনিত চাপ। ব্যাংকগুলোয় প্রচুর অর্থ জমে আছে। প্রবাসী আয়ের উচ্চপ্রবাহ আসছে। শেয়ারবাজারও ক্রমেই স্ফীত হচ্ছে, যেখানে বাড়ছে ফটকা কারবার। এতে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের হাতে প্রচুর অর্থ আসছে। এভাবে বাজারে বাড়ছে অর্থপ্রবাহ। অন্যদিকে বিনিয়োগে রয়েছে শ্লথগতি। ফলে অনেকেই জমি ও বাড়ি কেনার দিকে ঝুঁকছে, যা এসবের দাম বাড়াচ্ছে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি সামনের দিনগুলোয় আরও বাড়বে বলেই মনে হয়, যা যথেষ্ট শঙ্কার বিষয়।
সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাবে কি না। সুদের হার বাড়াবে কি না। সুদের হার বাড়াতে গেলে আবার তা বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকেই দেখা যায় যে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণপ্রবাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৪১ শতাংশ। এ সময়ে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি শিল্পঋণ বিতরণ করা হয়েছে। তার মানে, অর্থপ্রবাহে কিছুটা রাশ টেনে ধরার সুযোগ আছে। কিন্তু এটা সমস্যা মোকাবিলার সীমিত একটি পদক্ষেপ।
সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। পর্যাপ্ত জোগান থাকার পরও বাজারে চালের দাম বেড়ে গেছে। অর্থাত্ বাজারপ্রক্রিয়া ঠিকমতো কাজ করছে না। রয়েছে পরিবহনব্যয়জনিত সমস্যা। রেলপথে পণ্য পরিবহন বাড়ানো গেলে এ ব্যয় অনেকটাই কমতে পারে। পথে পথে চাঁদাবাজির উপদ্রবও কঠোর হাতে নির্মূল করা দরকার।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, চালের দাম সহনীয় রাখতে সরকার খোলাবাজারে ২২ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে তেমন সাড়া মিলছে না। অন্যদিকে বাজারে চালের দাম বাড়তি। তাহলে কি মানুষ বাজার থেকে চড়াদামে চাল কিনে খেতেই বেশি আগ্রহী? নাকি যে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে এ উদ্যোগ—তারা কি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাদের আয় সমন্বয় করে ফেলছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাটা প্রয়োজন। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার রিকশাভাড়া ও সিএনজিভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি এখানে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
আসজাদুল কিবরিয়া: সাংবাদিক।
asjadulk@gmail.com

সরকারি দপ্তরে দুর্নীতির স্বরূপ -বিলুপ্ত ট্রুথ কমিশন by মনজুর রশীদ খান

২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে সত্য ও জবাবদিহিতা অধ্যাদেশ-২০০৮ বলে গঠিত পাঁচ মাস স্থায়ী সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনে (ট্রুথ কমিশন নামেও পরিচিত) দায়িত্ব পালন করে যে অপূর্ব অভিজ্ঞতা হলো, তা আগ্রহী পাঠকদের জানানোর প্রবল ইচ্ছা নিয়ে এই লেখার ধৃষ্টতা। যা শুনেছি, দেখেছি ও উপলব্ধি করেছি, সেই বিরল অভিজ্ঞতা তুলনাহীন ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমাদের সমাজে দুর্নীতি, অসাধুতা ও অনৈতিকতার বিস্তৃতি যে সর্বত্র, তা আবারও উপলব্ধি করলাম। উপস্থিত হওয়া কুশীলবদের মুখ থেকে কেচ্ছাকাহিনী শুনে বোঝা গেল দুর্নীতির শেকড় উত্পাটন খুবই কঠিন। সব সরকারেরই নেতা-নেত্রীরা ক্ষমতায় বসে প্রায়ই দুর্নীতি নির্মূল বা উত্পাটনের কথা বলেন কিন্তু তাঁদের সদিচ্ছার যে দারুণ ঘাটতি রয়েছে, তা ক্রমেই আরও পরিদৃশ্যমান হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের মতৈক্য, সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও পক্ষপাতহীন কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া দুর্নীতি দমন যে সম্ভব নয়, তা সবাই স্বীকার করে থাকেন বটে, তবে বাস্তবতা ভিন্ন। ২০০৬ সালের ভয়াবহ রাজনৈতিক সংঘাত-সংকট পরবর্তী পটপরিবর্তনের পর দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) কয়েকটি সংস্থার পরিচালিত অভিযানে দুর্নীতি ও দুর্নীতিমূলক কার্যকলাপের ব্যাপকতা ও গভীরতার যে মারাত্মক চিত্র ধরা পড়ে, তা শুধু শিক্ষিত-সচেতন নাগরিক সমাজকে নয়, সাধারণ মানুষকেও বিস্মিত করে তোলে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে বিপুল জনসমর্থন দেখা যায়। দেশবাসী আশান্বিত হলো যে, এবারের ধাক্কায় দুর্নীতিবাজদের সমুচিত শিক্ষা হবে। চুনোপুঁটি থেকে আরম্ভ করে রাঘববোয়ালদের অনেকেই হয় আটক হলেন, নয় পালিয়ে রইলেন। কিন্তু দুই বছর শেষ হওয়ার আগেই যা দেখা গেল, তা দুর্নীতির যে মারাত্মক চিত্র ধরা পড়ে, তার চেয়েও বিপজ্জনক ও অনিষ্ট সাধনের ক্ষমতাসম্পন্ন। সেটি হলো দুর্নীতি নামক ব্যাধিকে গ্রহণীয় ও সহনীয় করে তোলার প্রচ্ছন্ন সংকেত। এককথায় বলতে হয়, দুর্নীতির সঙ্গে সহাবস্থানের মনোভাব সৃষ্টি। অসাধু-অসত্ কার্যকলাপের পরিণাম যেকোনো দিন ভয়ংকর হয়ে দেখা দিতে পারে, সেই ভয় কমে যাচ্ছে। তবে পটপরিবর্তনের পর সেই ভয়ংকর পরিণতির কিছুটা ছোঁয়া অনেকের গায়ে সাময়িক হলেও লেগেছে। তাঁদেরই একটি অংশকে দেখার ও শোনার সুযোগ হয়েছিল।
কয়েকটি সরকারি-আধাসরকারি দপ্তর ও সংস্থায় যে অসাধুতা-দুর্নীতি পাকাপাকি অবস্থান নিয়েছে, তার কিছু বর্ণনা আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শোনালেন। অসাধু উপার্জনের বিস্তৃতি শুধু যে বেড়েছে তা নয়, কোনো কোনো দপ্তরে যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ছোট-বড় যার যেখানে সুযোগ আছে ক্ষমতা খাটিয়ে কিছু বাগিয়ে নিচ্ছেন। যেসব অফিসে একসময় ঘুষ-উেকাচের সুযোগ সীমিত ছিল, সেখানেও বিস্তার ঘটে চলেছে। যা শুনেছি ও জেনেছি তার বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া কঠিন, সময়সাপেক্ষ এবং সম্ভবও নয়। সময়স্বল্পতা, নানা বাধ্যবাধকতা, সীমাবদ্ধতা ও সময় সময় প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ট্রুথ কমিশন দায়িত্ব সমাপ্ত করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয়ে পেশ করেছে। এই লেখায় আমি যেসব দিক তুলে ধরেছি, পর্যবেক্ষণ করেছি ও মন্তব্য রেখেছি, তা নিতান্ত নিজস্ব হলেও এর সঙ্গে দুই সদস্য মহোদয় একমত পোষণ করবেন বলেই আমার বিশ্বাস। এখানে পাঁচ মাসের অভিজ্ঞতারই চুম্বক অংশ।
আমরা সর্বমোট ৪৫২ জনের শুনানি গ্রহণ করেছিলাম। বলে রাখতে চাই যে, প্রধানত অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের উদ্দেশ্যে কমিশন গঠিত হলেও হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া প্রায় সবাই সরকারি, আধাসরকারি দপ্তর/সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কিছু সাধারণ পেশার ব্যক্তি। আরও উল্লেখ্য যে, কয়েকটি মাত্র সরকারি দপ্তর/সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী অনুকম্পাপ্রার্থী হয়েছিলেন। তাঁদের সবাই যৌথ বাহিনী পরিচালিত দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্সের অভিযানের ফলে বা কোনো সংস্থা কর্তৃক অপকর্ম ধরা পড়ায় এ-মুখি হয়েছিলেন। বেশির ভাগই এসেছেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা, ডেসা, দুটি গ্যাস কোম্পানি, সাব-রেজিস্ট্রার, ডাক বিভাগ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারী। এসব দপ্তরের দুর্নীতির খবর সমাজে অজানা ছিল না। কয়েকটি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, তাঁদের দপ্তরগুলোতে পিসি (পার্সেনটেজ) নামের ছদ্মাবরণে ঘুষ নেওয়ার প্রথাকে কেউ দুর্নীতি মনে করেন না। সংস্থার শীর্ষে পৌঁছেন এমন এক কর্মকর্তা জানান, নবীন বয়সে তিনি এই টাকা নিতেন না। কিন্তু পরে নেওয়া শুরু করেন। শীর্ষ পদে অবস্থানকালেও নিয়েছেন। অনেক সংস্থায় বিশেষ করে প্রকৌশল সংস্থাগুলোতে পিসি নেওয়াটা একটা সাধারণ ব্যাপার। কেউ যে নেন না, এমন হয়তো অতি বিরল, থাকলেও তিনি চাকরির সিঁড়ির ধাপে বেশি দূর উঠবেন না। এই সংস্থাগুলোর অনুকম্পাপ্রার্থীর বেশির ভাগই ছিলেন মধ্যম থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
৩৩ বছর চাকরিতে ছিলেন এমন এক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা দাবি করেন, দপ্তরে উন্নয়নমূলক কাজের সময় পিসি নেওয়া, উপঢৌকন হিসেবে কন্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে যা নেওয়া হতো তা নাকি ‘প্রচলিত নিয়মেই’ নেওয়া হতো। অর্থাত্ তিনি অবৈধ মনে করেন না। তিনি আরও দাবি করেন, এতে সরকারের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়নি। (উল্লেখ্য, বিগত আয়কর বছরে তিনি এক কোটির অধিক টাকা জমা দিয়ে কালো টাকা সাদা করেছেন বলে জানান)। উপরিউক্ত উপরি ছাড়াও আরও আছে ছোট-বড় নানা রকম অবৈধ সুযোগ-সুবিধা। বড় কন্ট্রাক্ট দেওয়ার সময় বড় লেনদেন, ফিল্ডে কাজ চলাকালে কন্ট্রাক্টরদের থেকে নেওয়া, বিয়েশাদি ও সামাজিক অনুষ্ঠানের খরচপাতি গ্রহণ ইত্যাদি। ছোট-বড় অফিসের (বিশেষত বিল পাসের সঙ্গে যারা সংযুক্ত) প্রায় সবাই ভাগ পান। কন্ট্রাক্টর বিল নিতে এসে সংশ্লিষ্ট সব টেবিলেই কিছু না কিছু দিয়ে যান। বড় প্রকল্পের কন্ট্রাক্ট বিতরণে যে টাকার খেলা চলে, তাতে শীর্ষ কর্মকর্তা, মন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের অনেকেই ভাগ পান। একটি সংস্থার প্রকৌশলীরা কীভাবে বাসায় গিয়ে মন্ত্রীকে টাকা হস্তান্তর করতেন, সে বর্ণনা শুনেছি। মন্ত্রী নিজের অতি ঘনিষ্ঠজনকে সংস্থার প্রধান করে নিয়েছিলেন। এই কেসে তাঁর ঘনিষ্ঠজনসহ (যাঁদের অনেকেই পলাতক) কয়েকজন প্রকৌশলী আসামি ছিলেন। আরেকজন খুবই প্রভাবশালী রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তি (যিনিও পলাতক) এক চতুর ব্যক্তিগত সহকারীকে দিয়ে অর্থ সংগ্রহের কাজটি করাতেন এবং তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই জমা রাখতেন (দস্তখত করা চেকবইটি নিজের হেফাজতে থাকত)। সেসব বর্ণনা শুনেছি। তার ধরনটা ব্ল্যাকমেইলিংয়ে অভ্যস্ত অপরাধীদের সঙ্গে তুলনা করা যাবে। এমন আরও একজনের কথা শুনেছি। তিনি চাপ দিয়ে কৌশলে প্রকল্প বানিয়ে অর্থ জোগানের ব্যবস্থা করেন। অনেক সময়ই আমরা পত্রপত্রিকায় পড়ে থাকি যে অমুক নেতার আত্মীয়স্বজন ত্রাস সৃষ্টি করে উন্নয়নকাজ বাগিয়ে নেন এবং কর্মকর্তারা বাধ্য হয়ে চাহিদামতো কাজ করেন। এর সত্যতাও দেখলাম। তবে কর্মকর্তারা বাধ্য হয়ে নয়, অনেকে খুশি মনেই চাহিদামতো কাজ করে দেন। কারণ, তাঁরাও ভাগ পান। দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ঊর্ধ্বতনদের খুশি করে ভবিষ্যতের আরও প্রাপ্তির পথটা সুগম করে রাখেন।
একটি সেবা সংস্থায় (বাণিজ্যিক) যেভাবে সরকারি অর্থ আত্মসাত্ কাজটি বছরের পর বছর নির্বিঘ্নে চলে আসছিল, তার যে নজির দেখলাম তা অবিশ্বাস্য। এই সংস্থার রাজস্ব বিভাগের কিছু অপকর্ম একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হলে সিআইডি কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলে থলের বেড়াল বের হয়ে পড়ে। মামলাটি দুদকে পাঠালে ট্রুথ কমিশনের মাধ্যমে অনুকম্পা পাওয়ার সুযোগ নিতে অভিযুক্ত নয়জনের মধ্যে চারজন আবেদন করেন। (অধ্যাদেশ বিধি মোতাবেক আবেদন গ্রহণ করা ও শোনা বাধ্যতামূলক ছিল)। এখানে কী কৌশলে ও কী নির্ভয়ে অর্থ আত্মসাতের প্রক্রিয়া চলে আসছিল, তা বিস্তারিত না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁদের একজন বললেন, তিনি ২৯ বছর যাবত্ এসব চলে আসতে দেখে আসছেন। সংস্থার এই বিভাগে বড় মাপের কাজের কন্ট্রাক্ট দেওয়ার সুযোগ ছিল না। অন্য বিভাগগুলোতে উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করার মাধ্যমে প্রতিবছরই কোটি কোটি টাকা লোপাটের সুযোগ রয়েছে। রাজস্ব বিভাগে সে সুযোগ ছিল না বলে এঁরা পিছিয়ে থাকবেন কেন। তাঁরাও অর্থ পকেটস্থ করার কৌশল বের করে নেন। নিজেরাই বাজেটের অর্থ বরাদ্দ থেকে শুরু করে বিল পাস, বিতরণ প্রভৃতির জন্য এমনভাবে চিঠিপত্র-নথি জালিয়াতি করছিলেন যে, তাই প্রচলিত নিয়ম হয়ে পড়েছিল। বখরার বিনিময়ে অডিট দলকেও ম্যানেজ করা হতো। বিশ্বাস করতে হলো যে, আত্মসাত্ করা অর্থের একটি বড় অংশ সর্বোচ্চ স্তরের কর্মকর্তারাও (কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে) পেয়ে আসছিলেন। তাঁরা নিয়মিত অনারিয়াম বা সম্মানী নামে এই ভাতা নিতেন। প্রতি মাসে কাকে কত দেওয়া হতো, সেসব বর্ণনা শুনেছি ও কাগজি কিছু প্রমাণ আমাদের দেখানো হয়েছে। শুনানিতে যা শুনেছি, তাতে ওই সংস্থার অন্য বিভাগের অবস্থা আরও শোচনীয় বলে মনে হলো। উল্লেখ্য, এই অনুকম্পাপ্রার্থীদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
মনজুর রশীদ খান: অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল। সদস্য, বিলুপ্ত সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন।

মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক -টেন্ডারবাজদের জন্য আনুকূল্য কেন

গত মঙ্গলবার আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নের যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে, এর সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ নেই। এ বৈঠকে তৈরি পোশাকশিল্পের দুর্ঘটনা, টেন্ডারবাজি থেকে বিরোধীদলীয় নেত্রীর নিরাপত্তা পর্যন্ত সব বিষয়েই আলোচনা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। সমস্যার চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়া সমাধানের পথ বেরিয়ে আসবে কীভাবে।
তবে এও মনে রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রে আলোচনা বা নির্দেশ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। সেসব নির্দেশ পালিত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে ১৪ মাস বয়সী মহাজোট সরকার সফল হয়েছে বলা যাবে না।
আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে অনেক বৈঠক হয়েছে, আদেশ-নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেসব বাস্তবায়িত হয়েছে খুবই কম। বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সরকারকে যতটা কঠোর মনে হয়েছে, টেন্ডারবাজি বন্ধে ততটাই নমনীয়। এর কারণ কি টেন্ডারবাজেরা সরকারি দলের লোক বলে? মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত দলীয় নেতা-কর্মীদের বোঝানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মন্ত্রী-নেতাদের। এর চেয়ে হাস্যকর কী হতে পারে! দলীয় টেন্ডারবাজেরা কি দুগ্ধপোষ্য শিশু যে তাদের বোঝাতে হবে? টেন্ডারবাজি যে অতিশয় খারাপ কাজ, এ কথা তাদের অজানা নয়। জেনেশুনেই তারা এ অপরাধ করে চলেছে।
ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া টেন্ডারবাজেরা দৌরাত্ম্য দেখাতে পারত না। অতীতে টেন্ডারবাজি নিয়ে বহু সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এখনো ঘটছে। যারা টেন্ডারবাজির মতো গর্হিত কাজ করতে পারে, তাদের বুঝিয়ে কোনো লাভ হবে না। আইনের যথাযথ প্রয়োগই পারে এ ধরনের অপরাধীদের নিবৃত্ত করতে। দ্বিতীয়ত, টেন্ডারবাজদের বোঝানোর কথা বলে মন্ত্রিসভা কমিটি ক্ষমতাসীন দলে তাদের উপস্থিতি স্বীকার করে নিল। কোনো গণতান্ত্রিক দলে টেন্ডারবাজ-চাঁদাবাজেরা থাকে কী করে? আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের দল থেকেও বহিষ্কার করতে হবে।
বিরোধী দলের ষড়যন্ত্রকারীদের চেয়ে সরকারদলীয় টেন্ডারবাজেরা যে কম বিপজ্জনক নয়, তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিকে বুঝতে হবে। কেউ ষড়যন্ত্র করলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে একজনকে পাকড়াও করা এবং অন্যজনকে বোঝানো—এই দ্বৈত নীতি চলতে পারে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বর্ণিত ষড়যন্ত্রকারীরা ধরা পড়ুক, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, তা সবার কাম্য। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের যেসব নেতা-কর্মী টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের ছাড় দেওয়া যাবে না। তারা দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন -শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে

যেকোনো প্রতিষ্ঠান সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য আইন যে হালনাগাদ ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু গেল শতকের নব্বইয়ের দশকে। এ জন্য ১৯৯১ সালে একটি আইনও প্রণয়ন করা হয়েছিল। সে সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। বর্তমানে অর্ধশতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। সে ক্ষেত্রে নতুন আইন জরুরি হয়ে পড়ছে। তবে তা হতে হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে। এই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনটি পর্যালোচনা ও বিবেচনার দাবি রাখে।
প্রস্তাবিত আইনে উপাচার্যের ক্ষমতা বাড়ানো এবং তাঁকে সিন্ডিকেটের প্রধান করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানই এই দায়িত্ব পালন করেন। এতে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া ইচ্ছামতো শিক্ষার্থীদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করতে পারবে না। এ ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকার প্রয়োজন আছে। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত বেতন আদায় করলেও শিক্ষার ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও দিচ্ছে না। এ নিয়ে পত্রিকায় বহু লেখালেখি হয়েছে। ইউজিসির উদ্যোগে একাধিকবার তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।
ইউজিসি যেসব বিশ্ববিদ্যালয়কে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল, নানা চেষ্টা-তদবির চালিয়ে সেগুলোরও কোনো কোনোটি অনুমোদন আদায় করে নিয়েছে। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব ভবন, মুক্ত আঙিনা ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণ নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও শিক্ষার মানোন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। প্রস্তাবিত আইনে অনেক সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা এর বিরোধিতা করে আসছে। তাঁদের দাবি, প্রস্তাবিত আইন কার্যকর করলে সরকারের হস্তক্ষেপ বাড়বে। প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না।
বেসরকারি উদ্যোগে সরকার অযথা নাক গলাক, সেটা কারও কাম্য নয়। আবার একই সঙ্গে এটাও মানতে হবে যে খেয়ালখুশিমতো কোনো প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব সরকারকে অবশ্যই নিতে হবে। সে কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবশ্যই নিয়মনীতির আওতায় আনতে হবে। মালিকপক্ষের যুক্তিসংগত বক্তব্য থাকলে তাও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজনে প্রস্তাবিত আইন সংশোধনও করা যেতে পারে। তবে কোনো অজুহাতেই আইনটিকে হিমাগারে রাখা চলবে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট যাতে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত না নিতে পারে, সে জন্য তদারকির প্রয়োজন আছে। তবে সরকারি প্রতিনিধি মনোনয়নের নামে অযাচিত হস্তক্ষেপ যেন না হয়, সে নিশ্চয়তাও থাকা প্রয়োজন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকার ও উদ্যোক্তাদের মুখোমুখি অবস্থান কোনোভাবেই কাম্য নয়। সংসদে বিলটি পেশ করার আগেই দুই পক্ষ আলোচনায় বসে এ ব্যাপারে একটা সমঝোতায় আসতে পারে। পারস্পরিক সহযোগিতাই পারে এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে।

আগে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ সামলাতে হবে: মনমোহন

ভারত বলেছে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় তাদের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু যতক্ষণ না পাকিস্তান তার ভূখণ্ডে ভারতবিরোধী ‘সন্ত্রাসী তত্পরতা’ বন্ধে উদ্যোগ নিচ্ছে, ততক্ষণ শান্তি আলোচনায় অর্থবহ অগ্রগতি হওয়ার কোনো আশা নেই। গতকাল শুক্রবার লোকসভায় রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব দিয়ে রাখা বক্তব্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এ কথা বলেন। পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সর্ম্পকোন্নয়নে আলোচনা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আলোচনা পুনরায় শুরু করার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানানোর পরের দিনই মনমোহন সিং এ ঘোষণা দিলেন। এএফপি ও জিনিউজ অনলাইন।
গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে ভারত-পাকিস্তান বৈঠক হয়। মনমোহন বলেন, ওই বৈঠক কোনো ‘আচমকা’ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়নি বরং তা কূটনৈতিক পূর্বপরিকল্পনা মেনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং অভিযোগ করে বলেন, পাকিস্তান যদি তার ভূখণ্ডে সন্ত্রাসীদের ভারতবিরোধী তত্পরতা বন্ধে ব্যর্থ হয়, তাহলে এসব আলোচনার উদ্যোগ মোটেও ফলপ্রসূ হবে না। অর্থবহ আলোচনা করতে হলে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসছে বলে লোকসভায় বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন মনমোহন সিং। এ ছাড়া দুই দেশের আলোচনায় সৌদি আরব মধ্যস্থতা করছে বলেও বিরোধী দলের দেওয়া বক্তব্য অস্বীকার করেন তিনি।
মনমোহন বলেন, তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের সমস্যার সমাধান সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাক, এমন তত্ত্বে তিনি বিশ্বাস করেন না। তিনি মনে করেন, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা আরও বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শীতলযুদ্ধের সময়ও তাদের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার পর ভারত-পাকিস্তান শান্তি আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর প্রথমবারের মতো গত সপ্তাহে দিল্লিতে দুই দেশের দুই পররাষ্ট্রসচিব বৈঠক করেন।

আরববিশ্বের সমর্থনকে স্বাগত পশ্চিমাদের

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় আরববিশ্বের সমর্থনকে স্বাগত জানিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। গত বুধবার মিসরের রাজধানী কায়রোতে আরববিশ্বের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে তাঁরা পরোক্ষ আলোচনার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এ পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এএফপি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন আরববিশ্বের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘কায়রোয় আরব পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সিদ্ধান্তে আমরা খুশি। আশা করি, ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শিগগির শুরু হবে।’ তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত মার্কিন দূত জর্জ মিশেল দুই পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার প্রস্তাব দেন। মিশেল ওই আলোচনাপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
এক মার্কিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, জর্জ মিশেল শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যে যাবেন। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী সোমবার ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে জর্জ মিশেল বৈঠক করবেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ড বলেন, ওই অঞ্চলের জনগণের শান্তির জন্য দুই পক্ষের সাহস, অঙ্গীকার ও সমঝোতা প্রয়োজন। আর এই অঙ্গীকার ও সমঝোতার মানসিকতা দেখানোর এটাই উপযুক্ত সময়। তিনি আরও বলেন, দুই পক্ষের পরোক্ষ আলোচনা অবশ্যই দ্রুত শুরু করতে হবে। বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়ে দুই পক্ষকে সরাসরি সমঝোতায় আসতে হবে।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল মোরাসনস বলেন, গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল আলোচনার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল বা সিরিয়া-ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনা শুরু করা জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কূটনীতিকেরা আগামী ১৯ মার্চ মস্কোয় এক বৈঠকে মিলিত হবেন। তাঁরা মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করবেন।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি সেনা অভিযানের পর থেকে দুই পক্ষের আলোচনা বন্ধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কয়েক মাস ধরেই ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে আলোচনার টেবিলে আনার চেষ্টা করছে। আরবভূমি থেকে ইহুদি বসতি সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন ফিলিস্তিনি নেতারা, তবে পরোক্ষ আলোচনার উদ্যোগকে দুই পক্ষই স্বাগত জানিয়েছে।

ইরাক যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন বলেছেন, ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। ইরাক আগ্রাসন বিষয়ে লন্ডনে এক তদন্ত কমিশনের সামনে ব্রাউন গতকাল শুক্রবার এ কথা বলেন। তিনি বলেন, সঠিক কারণেই ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। টেলিভিশনে সরাসরি প্রচারিত ওই তদন্তে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, গোয়েন্দা সংস্থার যেসব প্রতিবেদন তিনি পেয়েছিলেন তাতে ইরাককে তার হুমকি বলে মনে হয়েছিল। ইরাক যুদ্ধের সময় ব্রাউন ছিলেন ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী। খবর বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্স অনলাইনের।
কিছু দিন আগে তদন্ত কমিশনের সামনে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ারও ইরাক যুদ্ধে যাওয়া সঠিক ছিল বলে জানিয়েছিলেন। গর্ডন ব্রাউন বলেন, তখন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর মনে হয়েছিল, ইরাক একটা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং যাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মোকাবিলা করতে হবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, গোয়েন্দা বিভাগ যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়েছিল, সেগুলো নিয়ে তিনি ২০০২-০৩ সালের গোড়ার দিকে গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে বেশ কয়েকবার কথা বলেছেন।
ব্রাউন বলেন, তাঁর ওই বিশ্বাসের কারণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনেক দিন ধরে সাদ্দাম হোসেনকে বলে আসছিল তিনি যেসব আন্তর্জাতিক আইন ও দায়দায়িত্ব মেনে নিয়েছিলেন, সেগুলো যেন মেনে চলেন। জাতিসংঘে ১৪টি প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, তাঁকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে রাজি করানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত আশা করেছিলেন কূটনৈতিক প্রয়াস সফল হবে এবং যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে। ব্রাউন আরও বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে। যখন দেখা যায়, সব কূটনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে তিনি সব সময় তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।
অর্থায়নের অভাবে ব্রিটিশ সেনারা যথেষ্ট অগ্রগতি ছাড়াই যুদ্ধে গিয়েছেন বলে প্রায় অভিযোগ আনা হয়। তদন্তে ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ব্রাউন।
ইরাক যুদ্ধের জন্য কোনো অনুতাপ নেই বলে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। তবে গর্ডন ব্রাউন জেরার শুরুতেই ইরাক যুদ্ধে নিহত ইরাকি ও ব্রিটিশ সেনাদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
ব্রাউন বলেন, ‘কেউ যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কেউ নিরীহ মানুষের মৃত্যু চায় না। কেউ তাঁদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলতে চান না। পরিস্থিতি যুদ্ধের মতো গুরুতর বা সঠিক মনে না হওয়া পর্যন্ত কেউ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে চাইবেন না।

কিরগিজ বিমান থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় রিগিকে

গেরিলা সংগঠন জুন্দুল্লাহর প্রধান আবদুল মালেক রিগিকে গ্রেপ্তারের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে ইরান। দেশটি জানিয়েছে, রিগিকে একটি কিরগিজ বিমান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিমানটি দুবাই থেকে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে যাওয়ার সময় সেটিকে ইরানের বন্দর আব্বাসে জোর করে নামানো হয়। আর ওই বিমান থেকেই রিগি ও তাঁর সহকারী মোল্লাহ মোহাম্মদ জানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রিগিকে কিরগিজ বিমান থেকে গ্রেপ্তারের ইরানের দাবি অস্বীকার করায় কিরগিজ রাষ্ট্রদূতকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রামিন মেহমানপারাস্ত জানিয়েছেন, রিগিকে কিরগিজ বিমান থেকে গ্রেপ্তারের সুস্পষ্ট প্রমাণ তাঁদের হাতে আছে। ইরান কর্তৃপক্ষ রিগিকে গ্রেপ্তারের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে। ওই ভিডিও ফুটেজে বিমানবন্দরে একটি কিরগিজ বিমানকে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার কিরগিজস্তান তার কোনো বিমান থেকে কোনো বিদেশিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করে।

হাইতির দাতা দেশগুলোর সম্মেলন ৩১ মার্চ শুরু

দাতা দেশগুলো ভূমিকম্প বিধ্বস্ত হাইতির জন্য সাহায্যদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার লক্ষ্যে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কার্যালয়ে ৩১ মার্চ মিলিত হবে ওই সম্মেলনে দেশটির পুনর্গঠনের সহায়তাদানের নির্দেশনার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
হইতি এই সম্মেলনে তার দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার একটি রূপরেখা উপস্থাপন করবে। ১২ জানুয়ারির ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর থেকে দেশটি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ভূমিকম্পে দুই লাখ ২০ হাজারেরও বেশি লোকের প্রাণহানি ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই সম্মেলনের লক্ষ্য হলো, হাইতির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহায়তার অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংগ্রহ করা। এই সহায়তার মাধ্যমে হাইতির দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের জন্য ভিত্তি নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ হাইতির সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে ব্রাজিল, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স ও স্পেনের সহযোগিতায় এ সম্মেলনের আয়োজন করবে।

দালাই লামার উত্তরসূরি নির্বাচনে চীনের হস্তক্ষেপ পরিস্থিতি বিরূপ করবে

দালাই লামার জন্মস্থানের আশপাশে বসবাস করা তিব্বতিদের মনে এখন ঘুরেফিরে একটাই প্রশ্ন—নির্বাসিত বয়োবৃদ্ধ আত্মাধিক নেতা দালাই লামা মারা যাওয়ার পর কে হবেন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি?
বেশির ভাগ তিব্বতি যে কথা ভেবে শঙ্কিত এবং যে আশঙ্কা খুবই বেশি তা হচ্ছে, বেইজিংয়ের কমিউনিস্ট সরকার তাদের পছন্দের একজনকেই ওই পদে বসিয়ে দেবে, প্রথা ও ধর্মীয় ভাবধারাকে আড়াল করে।
দালাই লামা মারা যাওয়ার পর তিব্বতের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়ে তীব্র বাগিবতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ার একটি ক্ষীণ আশঙ্কা রয়েই গেছে।
চীন যদি একতরফাভাবে পরবর্তী দালাই লামা নিয়োগ করে, তাহলে দেশজুড়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে বলে অনেক তিব্বতি মনে করে।
১৯৯৫ সালে দালাই লামা তাঁর পছন্দ অনুযায়ী একজন উত্তরসূরি নিয়োগ করেন। এর পরই চীন ওই উত্তরসূরির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিব্বতি বৌদ্ধদের দ্বিতীয় ধর্মগুরু প্রয়াত দশম পানচেন লামার উত্তরসূরির নাম ঘোষণা দেয়।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ কিনঘাইয়ের তিব্বতি অঞ্চল টংগ্রেনের বৌদ্ধ ভিক্ষু জিগমে বলেন, ‘আমরা মনে করি পানচেন লামার মতো চীন তার নিজের পছন্দের দালাই লামারও নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করবে। যদি এটা হয়, তবে আমরা এর প্রতিবাদ করব।’

চীন সামরিক শক্তি জোরদারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে

চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও বলেছেন, তাঁর দেশ সামরিক শক্তি জোরদারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। গতকাল শুক্রবার ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনপিসি) বার্ষিক অধিবেশনে উদ্বোধনী বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এএফপি।
ওয়েন জিয়াবাও বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করা হবে। বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে আমাদের প্রভাবের সঙ্গে সংগতি রেখে সামরিক শক্তিও বাড়াতে হবে। আমাদের সেই সংকল্প অটুট রয়েছে। এ জন্য জাতীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা হবে। অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে গবেষণা বাড়ানো হবে।’
এবারের বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে সাত হাজার ৬০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। তবে প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধির এ হার বিগত কয়েক বছরের তুলনায় কম।
সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এ ব্যয় সংকোচন করা হয়েছে। তবে তাঁরা বলেন, সত্যিকার ব্যয় এর চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি হতে পারে। কেননা অনেক প্রতিরক্ষা কর্মসূচি এ বাজেটে উল্লেখ করা হয়নি।

উত্তর কোরিয়া আলোচনায় ফিরবে: চীনের আশাবাদ

চীনের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেছেন, তিনি আশা করছেন জুনের শেষ নাগাদ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ-সংক্রান্ত অচল হয়ে পড়া আলোচনা আবার শুরু হবে। তবে তিনি এও বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে কি না সে ব্যাপারে তিনি এখনো নিশ্চিত নন।
প্রায় ১১ মাস আগে পিয়ংইয়ং আলোচনা থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর থেকে ছয় জাতি আলোচনায় তাদের ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক প্রয়াস জোরদার হয়েছে।
কোরিয়াবিষয়ক চীনের দূত উ দাওয়েই চায়না ডেইলিকে বলেছেন, ‘চীনের লক্ষ্য হচ্ছে এ বছরের প্রথমার্ধেই ছয় জাতি আলোচনা আবার শুরু করা। এটাই আমরা আশা করছি। তবে তা বাস্তবায়িত হবে কি না সেটি বলা কঠিন।’
চীন হচ্ছে কমিউনিস্ট-উত্তর কোরিয়ার একমাত্র বৃহত্ মিত্র দেশ এবং তারা ২০০৩ সাল থেকে পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত আলোচনার আয়োজন করে আসছে।
উত্তর কোরিয়া আলোচনায় ফিরে আসার জন্য দুটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। শর্ত দুটি হচ্ছে, তাদের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং কোরীয় উপদ্বীপে আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে একটি আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার।
ওয়াশিংটন, সিউল ও টোকিও বলেছে, উত্তর কোরিয়াকে প্রথমে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে যে তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রত্যাহারের ব্যাপারে আন্তরিক।

ইরানের ওপর অবরোধ আরোপের প্রস্তাব

পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করার ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। গত বৃহস্পতিবার এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। তবে নিরাপত্তা পরিষদের কিছু সদস্য তেহরানের বিরুদ্ধে চতুর্থ দফা অবরোধ আরোপের ব্যাপারে সমর্থন জানাতে অনীহা প্রকাশ করেছে।
নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত মার্ক লিয়াল গ্রান্ট বলেন, নতুন অবরোধ থেকে প্রতীয়মান হবে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সুসান রাইসও ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করার আহ্বান জানান। রাইস বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানি একটি দ্বিবিধ কৌশলের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। অর্থাত্ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অবরোধ আরোপের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি। তিনি জানান, এবার নিরাপত্তা পরিষদের চতুর্থ অবরোধ সিদ্ধান্তের কোনো লিখিত অনুলিপি পরিষদে বিলি করা হচ্ছে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন প্রস্তাবিত অবরোধের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য ব্রাজিলের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হওয়ার এক দিন পর রাইস এ মন্তব্য করলেন।
কূটনীতিকদের ধারণা, নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যদের মধ্যে তুরস্ক ও লেবানন অবরোধ আরোপের ব্যাপারে তেমন আগ্রহী নয় এবং তারা এর পক্ষে ভোট নাও দিতে পারে। এদিকে চীন এখনো ইরানের ওপর অবরোধ আরোপের প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানায়নি।

জেনারেল ম্যাকক্রিস্টালের ক্ষমতা বাড়ানো হল

আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল স্ট্যানলি ম্যাকক্রিস্টালের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল ডেভিড পেট্রস গত বৃহস্পতিবার এ কথা জানান।
পেট্রস বলেন, তিনি জেনারেল মাকক্রিস্টালের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছেন। এর ফলে তিনি আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাবাহিনীর তত্পরতা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পেলেন।
কর্মকর্তারা বলেছেন, ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে আফগানিস্তানে মেরিনবাহিনীর এবং স্পেশাল অপারেশনাল ফোর্সের ওপর জেনারেল ম্যাকক্রিস্টালের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পাবে। এর ফলে তিনি সামরিক অভিযান এবং কৌশলগত ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবেন।
জেনারেল ম্যাকক্রিস্টাল আফগানিস্তানে মার্কিনবাহিনী এবং ন্যাটোবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর ক্ষমতা বাড়ানো হলেও সেখানে বন্দীদের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত মার্কিন জয়েন্ট টাস্কফোর্স এবং অপর একটি সেনাদল ন্যাটো কমান্ডার হিসেবে তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান হিসেবে জেনারেল পেট্রস আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধের বিষয়গুলো দেখভাল করেন। তিনি বলেন, মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্সের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই ম্যাকক্রিস্টালের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
দুই ন্যাটো সেনা নিহত
আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে তালেবান জঙ্গিদের সঙ্গে লড়াইয়ে আরও দুই ন্যাটো সেনা নিহত হয়েছে। এ নিয়ে যুদ্ধে এ বছর নিহত বিদেশি সেনার সংখ্যা ১১১ জনে দাঁড়াল। গত বছর একই সময়ে বিদেশি সেনার প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ৫০।
ন্যাটো জানায়, সামরিক বাহিনীর এক সদস্য গত বৃহস্পতিবার বোমা হামলায় এবং আরও এক সৈন্য সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। তাদের জাতীয়তা ও পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
আফগানিস্তানে বর্তমানে ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের এক লাখ ২১ হাজার সেনা অবস্থান করছে। সামনের মাসগুলোয় এ সেনা সংখ্যা বাড়িয়ে দেড় লাখ করা হবে।
যৌথ বাহিনী পরবর্তী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে জঙ্গিদের দমন করার একটি পরিকল্পনা করেছে, যাতে করে বিদেশি সৈন্যদের প্রত্যাহার শুরু করা যায়। এই পরিকল্পনাটি প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে হেলমান্দকে ঘিরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

উত্তর মহাসাগরে নিঃসরণ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ মিথেন

উত্তর মহাসাগরে ‘পারমাফ্রস্টের’ আবরণ ভেদ করে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। পারমাফ্রস্ট বা পারমাফ্রস্ট সয়েল হলো শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে কম তাপমাত্রায় দুই বছরের বেশি সময় থাকা এক ধরনের মাটি। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছেন, উত্তর মহাসাগরে তাঁদের ধারণার চেয়ে দ্রুত হারে মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ হচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা ফেয়ারব্যাংকস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নাতালিয়া শাখোভা ও ইগর সেমিলেতভের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত উত্তর মহাসাগরের পূর্ব সাইবেরিয়া অঞ্চলে গবেষণা চালায়। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স-এ তাদের এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
ওই গবেষণা থেকে জানা গেছে, স্থলভাগ নয়, বরং পানির নিচে থাকা পারমাফ্রস্টের আবরণ ভেদ করে মিথেন গ্যাস নির্গত হচ্ছে। এই নিঃসরণের পরিমাণ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে বিশ্বে উষ্ণতা বাড়ার ক্ষেত্রে নাটকীয় প্রভাব পড়বে। সাইবেরিয়ায় আগের গবেষণাগুলোয় স্থলভাগের পারমাফ্রস্ট থেকে মিথেন নিঃসরণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা অনেক দিন থেকেই ধারণা করে আসছিলেন, পূর্ব সাইবেরিয়ার বরফ স্তরের নিচে থাকা পারমাফ্রস্ট মিথেন গ্যাস আটকে রাখার ক্ষেত্রে একটি বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বরফের স্তরের ওপরে চলে আসা পারমাফ্রস্ট আবরণের বিভিন্ন স্থানে ছিদ্র রয়েছে। এতে মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ বাড়ছে এবং বিশ্বে তাপমাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মিথেন একটি গ্রিনহাউস গ্যাস এবং বিশ্বে তাপমাত্রা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, উত্তর মহাসাগরের তলদেশের এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের শতকরা ৮০ ভাগের বেশি পানিতে মিথেনের মাত্রা সাধারণ সমুদ্রের পানিতে মিথেনের মাত্রার চেয়ে আট গুণ বেশি। গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, বরফের নিচে জমা থাকা মিথেন রাশির সামান্য অংশও বায়ুমণ্ডলে নিঃসরিত হলে তা জলবায়ু পরিবর্তনে বড় প্রভাব ফেলবে।