Thursday, April 9, 2026

খলিফার পরিকল্পনা ও চার সেনাপতির অগ্রযাত্রা by নাসরুল্লাহ ইবনে ইলিয়াস

প্রকাশ ১৬ মার্চ ২০২৬ঃ ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে (হিজরি ১৩ সন) আবু বকর (রা.) শাম অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। মদিনার মসজিদে নববিতে একটি সাধারণ সভা আহ্বান করা হয়। মুসলিমদের মধ্যে জিহাদের প্রেরণা জাগাতে খলিফা জ্বালাময়ী ভাষণ দেন।

আবু বকর (রা.) চারজন সুদক্ষ সেনাপতিকে নির্বাচন করেন এবং প্রত্যেককে শামের নির্দিষ্ট অঞ্চলে অভিযানের দায়িত্ব দেন। এটি ছিল খলিফার অত্যন্ত সুচিন্তিত রণকৌশল। এর মাধ্যমে তিনি বাইজেন্টাইন বাহিনীকে বিভক্ত করে ফেলেন, ফলে তারা সম্পূর্ণ শক্তি নিয়ে মুসলিম বাহিনীর ওপর একযোগে আক্রমণ করতে অক্ষম হয়। খলিফা সেনাপতিদের এইভাবে পাঠানÑআমর ইবনুল আসকে ফিলিস্তিনে, ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ানকে দামেস্কে, আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে হোমস ও মধ্য সিরিয়ায়, শুরাহবিল বিন হাসানাহকে জর্ডানে।
বিজ্ঞাপন

যুদ্ধের নৈতিক নীতিমালা


মুসলিম বাহিনী যখন মার্চ করে মদিনা থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল, খলিফা আবু বকর (রা.) তখন চার ফ্রন্টের একটির সেনাপতি ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানের ঘোড়ার পাশেপাশে হাঁটছিলেন। এ সময় খলিফা ইয়াজিদকে কয়েকটি উপদেশ ও যুদ্ধের কিছু নীতিমালা উল্লেখ করে দেন। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধের নৈতিক নীতিমালা হিসেবে যা এখনো অমর হয়ে আছে।

ইয়াজিদকে দেওয়া খলিফার কয়েকটি অমর নির্দেশনা—

১. নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপত্তা : কোনো অবস্থাতেই বয়োবৃদ্ধ, নারী বা শিশুকে হত্যা করা যাবে না। এটি ছিল তৎকালীন অমানবিক যুদ্ধনীতিকে পরিশোধনের নতুন উদ্যোগ।

২. প্রকৃতির সুরক্ষা : যুদ্ধের সময়ও প্রকৃতির প্রতি সংযম দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কোনো ফলদার গাছ কাটা যাবে না এবং শস্যক্ষেত বা বাগান জ্বালিয়ে দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। যুদ্ধের ময়দানেও যেন পরিবেশের ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে খলিফা আবু বকর (রা.) বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।

. ধর্মীয় সহিষ্ণুতা : সন্ন্যাসী বা ধর্মগুরু, যারা উপাসনালয়ে নিভৃতে উপাসনা করে, তাদের বিরক্ত করা যাবে না এবং কোনো গির্জা ও মন্দির ধ্বংস করা যাবে না।

৪. নিষ্ঠুরতা বর্জন : শত্রুদের মৃতদেহ বিকৃত (Mutilation) করা যাবে না এবং কোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা বা বর্বরতা প্রদর্শন করা যাবে না।

৫. সম্পদের সুরক্ষা : প্রয়োজনীয় খাদ্য ছাড়া কোনো গবাদি পশুÑযেমন উট, গরু বা ছাগল জবাই করা যাবে না। মালে গনিমত খেয়ানত বা লুটপাট করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।

বিজয়ের ঝান্ডাবাহিরা

খলিফা আবু বকর (রা.)-এর এই সাহসী পদক্ষেপ শুধু আরবের জন্যই নয়, বরং পুরো পৃথিবীর জন্য ছিল নতুন ভোরের সূচনা। চারটি সুশৃঙ্খল বাহিনী যখন ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে উত্তরের দিকে যাত্রা শুরু করল, তখন মদিনার ধূলিধূসরিত আকাশে লেখা হতে থাকল ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। একদিকে আমর ইবনুল আস (রা.) গাজার উপকূল ধরে এগোচ্ছিলেন, অন্যদিকে আবু উবাইদাহ ও ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) তাবুক ও জর্ডান উপত্যকার মধ্য দিয়ে শামের হৃৎপিণ্ডের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এটি শুধু সামরিক সংঘাতের সূচনা ছিল না, ছিল এক জরাজীর্ণ ও শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নতুন ও ইনসাফভিত্তিক জীবন দর্শনের লড়াই।

শাম অভিযানের প্রথম ধাপটি ছিল পরবর্তী বড় বিজয়গুলোর ভিত্তি। পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখব, কীভাবে এই ক্ষুদ্র বাহিনীগুলো বিপুল শক্তিধর পরাশক্তি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রাচীরে ফাটল ধরিয়াছিল।

বাজে রণডঙ্কা

মদিনার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত ‘জুরফ’ নামক স্থানে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। আবু বকর (রা.)-এর জন্য এই অভিযান ছিল অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। একদিকে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের পর ক্লান্ত এক সেনাবাহিনী, অন্যদিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। কিন্তু মদিনার পরিবেশে তখন ভয়ের চেয়েও বেশি ছিল খোদার প্রতি নিবেদন ও আত্মবিশ্বাস। এই আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল নবীজি (সা.)-এর সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যদ্বাণী এবং উসামা ইবনে জায়দ (রা.)-এর সফল অভিযানের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে।

জুরফের সামরিক ক্যাম্পে তাঁবু খাটিয়েছেন আরবের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধারা। আবু বকর (রা.) নিজে তদারকি করছিলেন প্রতিটি বাহিনীর প্রস্তুতি। মদিনায় সবার মুখে মুখে এই যুদ্ধের আলোচনা। বাইজেন্টাইন সীমান্ত অভিমুখে অভিযানের অর্থ ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্বপরাশক্তির মুখোমুখি হওয়া। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মুহূর্তটি ছিল খেলাফত রাষ্ট্রের জন্য সন্ধিক্ষণ, যা পরবর্তী শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল।

চার সেনাপতি নির্বাচন ও কৌশলগত পরিকল্পনা

আবু বকর (রা.)-এর সামরিক প্রজ্ঞার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ছিল, শাম অভিযানের জন্য একাধিক ফ্রন্ট উন্মুক্ত করে চারজন আলাদা ব্যক্তিকে সেনাপতি নির্বাচন করা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শাম অঞ্চলটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে খুব বৈচিত্র্যময়। এই বিশাল ভূখণ্ড জয় করতে হলে এমন নেতৃত্বের প্রয়োজন, যারা রণকৌশলে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতি ও ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কেও সম্যক জ্ঞান রাখেন বা দ্রুত সময়ে তা অর্জন করতে পারবেন।

সেনাপতি নির্বাচনে খলিফার দৃষ্টিভঙ্গি

ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান : ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) ছিলেন কুরাইশ বংশের প্রভাবশালী নেতা আবু সুফিয়ানের জ্যেষ্ঠ পুত্র। মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করলেও তার একাগ্রতা ও সামরিক নিষ্ঠা আবু বকর (রা.)-এর নজর কেড়েছিল। তাকে ইসলামের ইতিহাসে ‘ইয়াজিদ আলখায়র’ বা কল্যাণময় ইয়াজিদ বলা হয়। নবীজি (সা.)-এর যুগে তিনি হুনাইনের যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন এবং পুরস্কার হিসেবে ১০০ উট পেয়েছিলেন।

শাম অভিযানের জন্য তাকে মনোনীত করার প্রধান কারণ ছিল, তার পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতা। কুরাইশদের সঙ্গে সিরিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে ইয়াজিদ সেখানকার ভূ-প্রকৃতি এবং গোত্রীয় বিন্যাস সম্পর্কে জানতেন। তার ব্যক্তিত্ব ছিল গম্ভীর ও ধীরস্থির, যা দামেশকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত শহর দখলের অভিযানে অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। আবু বকর (রা.) তাকে দামেস্ক ফ্রন্টের দায়িত্ব দেন।

শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ
: শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের সাহাবি। তিনি হাবশায় দ্বিতীয় হিজরতের সময় দেশত্যাগ করেছিলেন এবং পরে নবীজি (সা.)-এর ওহি লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্দাহ গোত্রের এই সন্তান ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং সংযত। ধর্মদ্রোহ বিরোধী যুদ্ধে তিনি খালিদ (রা.)-এর অধীনে ইয়ামামার যুদ্ধে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন।

শুরাহবিলের বিশেষত্ব ছিল, ধৈর্য, সংযত আচরণ ও সামরিক শৃঙ্খলাবোধ। জর্ডানের রুক্ষ ও পাহাড়ি এলাকায় অভিযানের জন্য আবু বকর (রা.)-এর প্রথম পছন্দ ছিল দক্ষ সেনাপতি।

আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ : আবু উবাইদা (রা.)-এর নাম শুনলে মদিনার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। নবীজি (সা.) তাকে ‘আমিনুল উম্মাহ’ উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

আবু উবাইদা ছিলেন খেলাফত রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ। চারিত্রিক দৃঢ়তা, বিনয় এবং উচ্চ নৈতিকতা তাকে অন্য সেনাপতিদের চেয়ে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল। আবু বকর (রা.) জানতেন, যদি কোনো কারণে চার বাহিনী সমবেত হওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে আবু উবাইদার মতো একজন সর্বজনমান্য নেতাই হতে পারেন তাদের প্রধান সমন্বয়ক। তাকে সিরিয়ার কেন্দ্রীয় অঞ্চল হোমস অভিমুখে প্রেরণ করা হয়।

আমর ইবনুল আস : আমর ইবনুল আস (রা.) ছিলেন সেই সময়ের আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কূটনীতিবিদ। ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি কুরাইশদের হয়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনে সফল হয়েছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর নবীজি (সা.) তাকে ‘জাতুস সালাসিল’ অভিযানে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন, যেখানে আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর মতো বড় বড় সাহাবি তার নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছিলেন।

আমরের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষমতা। ফিলিস্তিন মতো মাল্টিপল ফ্রন্ট ও অত্যন্ত কৌশলগত এবং সংরক্ষিত এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য আমর ইবনুল আসের বিকল্প কেউ ছিল না।

শাম অভিযানে অংশ নেওয়া চার বাহিনীর সম্মিলিত সৈন্য সংখ্যা ছিল সাত থেকে আট হাজারের মধ্যে।

খলিফার পরিকল্পনা ও চার সেনাপতির অগ্রযাত্রা

পাহাড়, সমুদ্র, চা–বাগান—একসঙ্গে দেখা যায় যে উপজেলায় by মোহাম্মাদ মোরশেদ হোসেন

পাহাড়ের কোলঘেঁষা ঝাউবন। একটু দূরে চোখ রাখলে দেখা যায় নীল সমুদ্রের ঢেউ। এর সঙ্গে রয়েছে চা–পাতায় ভরপুর সবুজ উপত্যকা। পাহাড়, সমুদ্র আর চা–বাগানের এ রূপের দেখা মিলে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায়।

উপজেলাটির অবস্থান চট্টগ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে। শঙ্খ নদের তৈলারদ্বীপ সেতু পার হয়ে এতে প্রবেশ করতে হয়। প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে অনেকেই এখানে ছুটে আসেন। এ উপজেলার পরেই পর্যটনের রাজধানী–খ্যাত কক্সবাজারের অবস্থান।

চা–বাগান

চট্টগ্রাম থেকে তৈলারদ্বীপ সেতু পার হয়ে এক কিলোমিটার ভেতরে যেতেই দেখা মিলবে উপজেলার চাঁনপুর বাজারের। এ বাজার থেকে হাতের বাঁয়ে রামপুর ডিসি সড়ক দিয়ে পুকুরিয়া চৌমুহনী গেলেই বেলগাঁও চা–বাগান। দক্ষিণ চট্টগ্রামের এটিই একমাত্র চা–বাগান। সপ্তাহজুড়েই এ বাগান দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

চা–বাগানটির মূল ফটকের কাছে যানবাহন রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এরপরই ভেতরে ঢুকতে পারেন দর্শনার্থীরা। বিস্তীর্ণ বাগানে চা–পাতা তোলা, চা–পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ, চা–শ্রমিকের জীবনধারা, বাংলো—সবকিছুই ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।

১০ অক্টোবর চা–বাগানটিতে গিয়ে দেখা যায়, নিরিবিলি পরিবেশের এ বাগান দেখতে দূরদূরান্ত থেকে অনেকেই ছুটে এসেছেন। তাঁদের কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ চা–পাতা পরখ করে দেখছেন। জানতে চাইলে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে ঘুরতে আসা সাইদুল ইসলাম প্রথম আলোকে  বলেন, ‘আমাদের এলাকায় চা–বাগান রয়েছে। এরপরও বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিতে পাঁচ বন্ধু ঘুরতে এসেছি। এখান থেকে সমুদ্রসৈকতেও যাবে। একসঙ্গে বহু কিছু দেখা হবে, এ আশায় বাঁশখালীতে ঘুরতে আসা।’

বেলগাঁও চা–বাগানের ব্যবস্থাপক আবুল বাশার বলেন, ১৯৮৫ সালে ৬৪০ একর জমির ওপর চা–বাগানটি গড়ে তোলা হয়েছিল। এখন এটির আয়তন ৮৩৩ একর। এ বছর বাগানটি থেকে চার লাখ কেজি চা–পাতা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিদিনই বাগানে দর্শনার্থীরা আসেন।

সৈকতে মুগ্ধ পর্যটক

বাঁশখালীর সমুদ্রসৈকত বালিয়াড়ি, বেড়িবাঁধ আর ঝাউবন দিয়ে সাজানো। এটিই কক্সবাজারের পর দেশের বৃহত্তম সৈকত। উপজেলার খানখানাবাদ থেকে বাহারচরা, ছনুয়া, গণ্ডামারা ও সরল ইউনিয়নের ৩৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ সৈকত বিস্তৃত।
আয়তনে বিশাল এ সৈকতকে পৃথক তিনটি নামে ডাকেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এর একটি কদমরসুল সৈকত। উপজেলার গুনাগরী খাসমহল থেকে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে গেলে এর দেখা মেলে। এটি উপজেলার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন সৈকত হিসেবে পরিচিত। ঝাউবন কিংবা বালিয়াড়িতে বসে সূর্যাস্ত ও লাল কাঁকড়ার লুকোচুরি দেখা এ সৈকতের মূল আকর্ষণ।

বন বিভাগ জানায়, ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর সৈকতটিতে ঝাউগাছ লাগানো হয়। এর পর থেকে এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। পরে সেখানে অবকাশযাপনের জন্য একটি রিসোর্ট, কংক্রিটের ছাতা ও বৈঠকখানা নির্মাণ করে পর্যটন করপোরেশন। বর্তমানে রিসোর্টটি বন্ধ থাকলেও কংক্রিটের ছাতা ও বৈঠকখানায় বসে থাকা যায়।

কদমরসুল সৈকত থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দক্ষিণে খানখানাবাদ সমুদ্রসৈকতের অবস্থান। এখানে চোখে পড়বে বেড়িবাঁধে সারি সারি দোলনা ও কংক্রিটের সিসি ব্লক। নিচের দিকে তাকালে এসব ব্লকে বসে আড্ডা দিতে মন চাইবে অনেকের। এসব ব্লক ধরে দক্ষিণ দিকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ ঝাউবন দেখা যায়। ২০০৬ সালে এসব গাছ লাগিয়েছিল বন বিভাগ।

দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় তৃতীয় সৈকতটির নাম বাহারছড়া। বাঁশখালীর প্রধান সড়কের কালীপুর ইউনিয়নের সালেহার বাপের পুল থেকে পশ্চিম দিকে বশিরুল্লাহ মিয়াজির বাজার হয়ে এ সৈকতে যেতে হয়। বেড়িবাঁধের সিসি ব্লক আর স্থানীয় কিছু ছোট দোকানের কারণে এ জায়গা পর্যটকদের জন্য আকর্ষণের। বেড়িবাঁধে সূর্যাস্ত দেখার আয়োজন হিসেবে চেয়ার, টেবিল ও বড় ছাতা বসিয়ে রেখেছেন স্থানীয় দোকানিরা। এ ছাড়া মাঝারি ও ছোট সাইজের ঝাউগাছ দেখতেও সৈকতে অনেকে আসেন।

সৈকতের উত্তর পাশে এক কিলোমিটারজুড়ে বেড়িবাঁধে বসানো হয়েছে সিসি ব্লক। ওই ব্লকে বসে সমুদ্র দেখার পাশাপাশি সূর্যাস্ত উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা। ওই এক কিলোমিটারজুড়ে সৈকতে দোকানিরা চেয়ার–টেবিল আর বড় ছাতা বসিয়েছেন। সেখানে খাওয়ার পাশাপাশি সময় আড্ডায় মেতে ওঠেন বিভিন্ন বয়সী লোকজন। বাহারছড়া সৈকতের দক্ষিণ দিকের আধা কিলোমিটার সৈকতে লাগানো হয়েছে ঝাউগাছ।

রয়েছে পাহাড়-ইকোপার্ক

উপজেলার প্রধান সড়কের পূর্ব দিকজুড়েই বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চল। পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালীপুর, বৈলছড়ি, জলদি, শীলকূপ, চাম্বল ও পুইছড়ি—এই আট ইউনিয়নের পূর্বাঞ্চলই পাহাড়ঘেরা। এর মধ্যে কালীপুর ইউনিয়নেই রয়েছে উপজেলার সর্বোচ্চ পাহাড়। সেই পাহাড়চূড়া থেকে শঙ্খ নদ আর গণ্ডামারা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দৃশ্য দেখা যায়।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে চাম্বল ইউনিয়নের ‘মিনি কাশ্মীর’। বাঁশখালীর প্রধান সড়ক থেকে তিন থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার ভেতরে চাম্বলের পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি এলাকা আম্বাঘোনা, ছিবাজিল্লা ঝিরি, গৌরাণিতা ঝিরি ও বন্বিতার ঝিরি—এ চার অঞ্চল ‘বাঁশখালীর মিনি কাশ্মীর’ নামে পরিচিত। চট্টগ্রাম শহর থেকে উত্তর চাম্বল হয়ে সিকদার দোকান পর্যন্ত রিকশায় এসে প্রায় ২০ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছানো যায় সেখানে।

এ ছাড়া উপজেলায় পাহাড়ের সৌন্দর্যের আরেক আকর্ষণ ‘বাঁশখালী ইকোপার্ক।’ শীলকূপ ইউনিয়নে ২০০৩ সালে পার্কটি করা হয়। প্রায় এক হাজার হেক্টর উঁচু-নিচু পাহাড়, লেকের স্বচ্ছ পানি আর ঘন বনাঞ্চলের এ পার্কেও আসছেন অনেকে। এতে প্রায় ৩১০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। বাঁশখালীর প্রধান সড়কের মনসুরিয়া বাজার থেকেই পার্কে যাওয়া যায়।

বাঁশখালীর বাসিন্দা ও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আলমগীর মোহাম্মদ বলেন, ভৌগোলিকভাবে বাঁশখালী বিচিত্র এলাকা। পর্যটন করপোরেশনের যথাযথ মনোযোগ পেলে বাঁশখালী হয়ে উঠবে পর্যটনশিল্পে এক নতুন সম্ভাবনার সংযোজন।

চা বাগান ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছেন কয়েকজন দর্শনার্থী। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বেলগাঁও চা বাগানে
চা বাগান ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছেন কয়েকজন দর্শনার্থী। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বেলগাঁও চা বাগানে। ছবি: প্রথম আলো

যুদ্ধে কেউ জেতেনি, হেরেছেন নেতানিয়াহু by পিটার বিউমন্ট

যে যুদ্ধে কোনো পক্ষ জিততে পারেনি, সেখানে ইরানের সঙ্গে একটি ভঙ্গুর ও অস্পষ্ট যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে হয়েছে ইসরায়েলকে। এর মধ্য দিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সবচেয়ে বেশি হেরেছেন বলে মনে হচ্ছে।

নেতানিয়াহু বছরের পর বছর ধরে ইরানকে হুমকি দিয়ে এসেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নানা নাটকীয় ভঙ্গি করেছেন, বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের সামনে একের পর এক সন্দেহজনক নথিপত্র তুলে ধরেছেন। এমনকি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার জন্য একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরি করেছেন। কিন্তু দিন শেষে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের এই সংঘাত পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন ও বিপ্লব নিয়ে ইসরায়েলের করা বিভিন্ন ভবিষ্যদ্বাণীকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা। এসব মন্তব্য শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। ইসরায়েলের ধারণা ছিল, এই যুদ্ধ বড়জোর কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে। কিন্তু তাদের সেই হিসাব ছিল চরম ভুল।

ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর তথ্যমতে, এমনকি মাত্র দুই দিন আগেও ট্রাম্প যাতে যুদ্ধবিরতিতে রাজি না হন, সেই চেষ্টা নেতানিয়াহু করছিলেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট তেহরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরেই ট্রাম্প সেই পথ থেকে সরে আসেন। সূত্র বলছে, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ইসরায়েলকে পাত্তাই দেননি ট্রাম্প।

ইসরায়েলের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের পুরো ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক বিপর্যয় আর কখনো ঘটেনি। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার মূল বিষয়গুলো নিয়ে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, তখন ইসরায়েল আলোচনার ধারেকাছেও ছিল না।’

ইয়ার লাপিদ আরও বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে যা করতে বলা হয়েছিল, তারা তার সবই করেছে এবং জনগণও অসাধারণ সহনশীলতা দেখিয়েছে। কিন্তু নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি নিজের নির্ধারণ করা লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জন করতে পারেননি। অহংকার, অবহেলা ও কৌশলগত পরিকল্পনার অভাবের কারণে নেতানিয়াহু যে ক্ষতি করলেন, তা কাটিয়ে উঠতে আমাদের বহু বছর লাগবে।’

ইসরায়েলের বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলানও যুদ্ধবিরতিকে নেতানিয়াহুর ‘কৌশলগত ব্যর্থতা’ বলেছেন। ইয়ার গোলান এক্সে লিখেছেন, ‘তিনি (নেতানিয়াহু) ঐতিহাসিক বিজয় এবং আগামী কয়েক প্রজন্মের জন্য নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বাস্তবে আমরা ইসরায়েলের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ কৌশলগত পরাজয় পেলাম। এটি একটি চরম ব্যর্থতা, যা আগামী অনেক বছর ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।’

বাস্তবতা হলো, নেতানিয়াহু এই যুদ্ধে সবকিছু বাজি ধরেছিলেন। কিন্তু তিনি ইরানের ধর্মভিত্তিক শাসনের পতন ঘটাতে পারেননি, তেহরানের সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের মজুত দখল করতে পারেননি এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারেননি। উল্টো গাজায় জাতিগত হত্যার (জেনোসাইড) অভিযোগে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি সারা বিশ্বে আগেই ক্ষুণ্ন হয়েছিল, এখন তা আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

নিরাপত্তার দিক থেকে ট্রাম্পের দাবি যা-ই হোক না কেন, ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরস (আইআরজিসি) আরও শক্তিশালী হয়েছে। কারণ, বিশ্বের প্রধান দুই সামরিক শক্তির মাসব্যাপী আক্রমণে টিকে থাকাই ছিল তেহরানের মূল লক্ষ্য, যা তারা অন্তত আপাতত অর্জন করতে পেরেছে।

এই হামলার পর ইরানের শাসনব্যবস্থা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা এখনো অটুট আছে এবং তাদের সামরিক সম্পদও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অবশিষ্ট আছে। তারা এখন প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজবে এবং দ্রুত নিজেদের সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নেতানিয়াহু। এই একগুঁয়েমিকে তাঁর চরম দম্ভ বলেই মনে হচ্ছে। ইসরায়েল সেখানে একটি নতুন নিরাপত্তা অঞ্চল (বাফার জোন) তৈরি করতে চায়। এটা করতে গিয়ে তাদের স্থলবাহিনী হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করছেন। অথচ নিজেদের পরিচিত এই এলাকায় লড়াইয়ে হিজবুল্লাহ অত্যন্ত দক্ষ বলে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত।

এই প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে দেখলে, লেবাননে ইসরায়েলের ভয়াবহ ও আকস্মিক বিমান হামলাগুলোকে স্রেফ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ বলেই মনে হয়। মনে হয়, ইরানে ব্যর্থ হওয়ার পর তারা এখন লেবাননের সাধারণ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে ক্ষোভ মেটাচ্ছে।
কূটনীতি ও জনমতের দিক থেকে দেখলে এ যুদ্ধের পরিণতি নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের জন্য আরও ভয়াবহ হতে পারে। আমেরিকায় ১৯৬০-এর দশক থেকে চলে আসা ইসরায়েলপন্থী রাজনৈতিক ঐক্যের ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে সত্য। এখন সেই ঐক্য দৃশ্যত ভেঙে পড়ছে। ট্রাম্পকে ইরান যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ায় প্রগতিশীল ও কট্টর ডানপন্থী (মাগা) দুই পক্ষই এখন নেতানিয়াহুর সমালোচনা করছে। এমনকি ইহুদি ভোটারদের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

ইসরায়েলে নির্বাচনের বছরে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধাক্কা হয়ে উঠছে এই যুদ্ধ। দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। কিন্তু তা রক্ষায় তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

নেতানিয়াহু সাধারণত তাঁর সমসাময়িক সাফল্যগুলোকে ফলাও করে প্রচার করতে পটু। কিন্তু এবার ইসরায়েলের জনগণের কাছে একটা বিষয় দৃশ্যমান হয়ে যাবে, তা হলো তিনি ‘অস্তিত্ব রক্ষার হুমকির’ যে কথা সব সময় বলতেন, তা আসলে দূর হয়নি। বরং পরিস্থিতি আগের মতোই রয়ে গেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হয়তো নেই, কিন্তু তাঁর কট্টরপন্থী ছেলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার বদলে তেহরানের ১০ দফা, যাকে ট্রাম্প সমঝোতা আলোচনার ভিত্তি হিসেবে মেনে নিয়ে সামনে এগোতে রাজি হয়েছেন, তার মধ্য দিয়ে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারকে মেনে নেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। অবশ্য ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের ইউরোনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ বলে স্বীকার করেননি।

অন্তত এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা আলোচনার বিষয়গুলো বারাক ওবামার সেই আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তির রূপরেখার কাছাকাছি রয়েছে। অথচ ওই চুক্তি ভন্ডুল করতে নেতানিয়াহু জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন এবং ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন।

ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজের সামরিক বিশ্লেষক আমোস হারেলের মতে, নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিকল্পনাতেই ব্যর্থতা বিষয়টি ছিল। তিনি বলেন, ‘বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলের ব্যবস্থার (সরকারের) দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এসব দুর্বলতার মধ্যে রয়েছে ভিত্তিহীন কল্পনার ওপর ভিত্তি করে বাজি ধরা, অগভীর ও আধাখেঁচড়া পরিকল্পনা, বিশেষজ্ঞদের অবজ্ঞা করা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইচ্ছা অনুযায়ী মত পাল্টাতে বিশেষজ্ঞদের ওপর প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা।’

ইসরায়েলের জনগণের কাছে আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট হয়ে যাবে, তা হলো গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থনে এই বিশাল পরিসরে সামরিক অভিযান চালানোর সুযোগ জীবনে একবারই আসে। সামনে হয়তো ছোটখাটো সংঘাত হবে। কিন্তু এমন দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক যুদ্ধের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা খুবই কম।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক উত্তেজনার মুহূর্তে ট্রাম্প পিছিয়ে এসেছেন। তার মধ্যে ইরানে স্থল সেনা পাঠানোর বিষয়টিও রয়েছে, যেটা মার্কিন ভোটারদের কাছে অত্যন্ত অজনপ্রিয় এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে উঠত।

ইরানের বিষয়টি বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতির প্রধান তুরুপের তাস ছিল। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে, এখন তাঁর (নেতানিয়াহুর) আরও টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তা কোথায়?

হারেৎজের বিশ্লেষক হারেল লিখেছেন, ‘গাজায় একবার, লেবাননে একবার এবং ইরানে দুইবার—এই নিয়ে টানা চতুর্থবার তাঁর পূর্ণাঙ্গ বিজয় এবং অস্তিত্ব রক্ষার হুমকি নির্মূলের আস্ফালন ফাঁকা বুলি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।’

ইসরায়েলের বিমান হামলার পর ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে। ৮ এপ্রিল ২০২৬
ইসরায়েলের বিমান হামলার পর ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে। ৮ এপ্রিল ২০২৬। ছবি: রয়টার্স


বনে গ্রাম্য সড়কের পাশে পড়ে ছিল মেছো বিড়াল

প্রকাশ ১৮ মার্চ ২০২৬ঃ বিস্তৃত ভাওয়াল সবুজ বন। পাশ দিয়ে চলে গেছে গ্রাম্য সড়ক। এমন নির্মল পরিবেশে সড়কের পাশে দেখা গেল মরে পড়ে আছে একটি মেছো বিড়াল। সেটি ঘিরে গ্রামবাসীর কৌতূহল। পরে জানা গেছে, রাতের কোনো এক সময়ে অজ্ঞাত গাড়িচাপায় প্রাণ গেছে প্রাণীটির। আজ বুধবার সকাল ৯টায় গাজীপুরের শ্রীপুরের মাওনা ইউনিয়নের ভেরামতলী গ্রামে বনের পাশের সড়কে এই গ্রাণীর মরদেহ পাওয়া যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক শিক্ষক জয়নাল আবেদীন এ সম্পর্কে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি মাওনা যাওয়ার সময় তাঁর বাড়ির পাশের একটি বনের অদূরে সড়কে মরে পড়ে থাকতে দেখেন মেছো বিড়ালটিকে। এর শরীরে ছোপ ছোপ কালো দাগ। কিছু অংশে বাদামি রঙের পশম। বিড়ালের চেয়ে বড় আকারের এই প্রাণী তাঁদের এলাকায় ‘মেছো বাঘ’ নামে পরিচিত। তিনি পরে জানতে পেরেছেন, গতকাল মঙ্গলবার রাতে একটি গাড়িতে চাপা পড়ে প্রণীটির প্রাণ গেছে।

বনাঞ্চলের বাসিন্দা হিসেবে এই শিক্ষকের ধারণা, খাবারের সন্ধানে মেছো বিড়ালটি লোকালয়ের দিকে যাচ্ছিল। এরপর হয়তো এটি গাড়িচাপায় পড়ে। সম্প্রতি এই সড়কে বেজি, গুইসাপসহ নানান প্রাণী মারা পড়তে দেখা গেছে। বনে পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় এসব প্রাণী লোকালয়মুখী হচ্ছে।

ওই এলাকার বনবেষ্টিত দক্ষিণ বারোতোপা গ্রামের বাসিন্দা কবিরুল ইসলাম জানান, বনের প্রাণীগুলো বিভিন্ন কারণে প্রায়ই মারা যাচ্ছে। এই বনগুলো একসময় প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ছিল। এগুলো রক্ষা করতে জনসচেতনতা দরকার। তিনি বলেন, সবাইকে সচেতন করতে পারলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।

গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরের মাওনা-কালিয়াকৈর আঞ্চলিক সড়কের শালদহপাড়া গ্রামে সড়কে একটি গর্ববতী হরিণের মৃত্যু হয়েছিল। ধারণা করা হয়, হরিণটি রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়িচাপায় পড়েছিল। এ ছাড়া ওই বনাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বনে খাবারের সংকটের কারণে বিভিন্ন সময় অনেক প্রাণী বাইরে বের হয়ে আসে। সড়কে যানবাহনচাপায় অনেক প্রাণীর মৃত্যু ঘটে।

এ প্রসঙ্গে বন বিভাগের শ্রীপুর উপজেলা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, তাঁরা ভেরামতলী গ্রামে একটি মেছো বিড়ালের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছেন। পরে খোঁজ নেওয়ার জন্য সেখানে বন বিভাগের লোক পাঠানো হয়েছে।

বনের পাশের সড়কে এই মেছো বিড়ালটির মরদেহ পাওয়া যায়। বুধবার সকালে গাজীপুরের শ্রীপুরের মাওনা ইউনিয়নের ভেরামতলী গ্রামে
বনের পাশের সড়কে এই মেছো বিড়ালটির মরদেহ পাওয়া যায়। বুধবার সকালে গাজীপুরের শ্রীপুরের মাওনা ইউনিয়নের ভেরামতলী গ্রামে। ছবি: সংগৃহীত


মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবা: বর্তমান পরিস্থিতি ও সতর্কতা by ডা. কাকলী হালদার

মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবা বা নিগ্লেরিয়া ফাউলেরি একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক পরজীবী, যা মানুষের মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এটি সাধারণত উষ্ণ মিঠাপানিতে থাকে; যেমন পুকুর, হ্রদ, নদী বা অপরিষ্কার সুইমিংপুলে।

সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ভারতের কেরালায় এই অ্যামিবার সংক্রমণে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।

ফলে উষ্ণ মিঠাপানিতে বেড়ে ওঠা প্রাণঘাতী জীবাণুটি নিয়ে স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে ‘ব্রেন ইটিং অ্যামিবা’র প্রথম স্বীকৃত রোগী হিসেবে ১৫ বছরের এক কিশোরকে শনাক্ত করা হয়েছিল।

কীভাবে ছড়ায়

এই অ্যামিবা উষ্ণ পানির মাধ্যমে ছড়ালেও সরাসরি পানি পান করার ফলে বা একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে বা হাঁচি–কাশি দিয়ে ছড়ায় না। বরং নাক দিয়ে দূষিত পানি প্রবেশ করলে অ্যামিবাটি ঘ্রাণ স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং দ্রুত সংক্রমণ ঘটায়।

লক্ষণ

প্রাথমিকভাবে তীব্র মাথাব্যথা, জ্বর, বমি ও ঘাড় শক্ত হয়ে যায়। চিকিৎসা শুরু না হলে বা অনেক ক্ষেত্রে হলেও দ্রুত অবস্থা খারাপ হয়ে খিঁচুনি, ভারসাম্যহীনতা, হ্যালুসিনেশন, ঘ্রাণ না পাওয়া, ঝাপসা দৃষ্টি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, কোমায় চলে যাওয়া, এমনকি কয়েক দিনের মধ্যে রোগীর মৃত্যু হতে পারে। চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুহার ৯৬-৯৮ শতাংশ।
চিকিৎসা

সংক্রমণ অত্যন্ত মারাত্মক হলেও কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিবায়োটিকের যৌথ প্রয়োগে রোগী সুস্থ হয়। সাধারণত অ্যামফোটেরিসিন বি, মিল্টেফোসাইন, ফ্লুকোনাজোল, রিফাম্পিন ইত্যাদি ওষুধের যৌথ ব্যবহার করা হয়। তবে দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা শুরু করাই একমাত্র ভরসা।

প্রতিরোধ

* অজানা বা অপরিষ্কার উষ্ণ পানিতে সাঁতার না কাটা।

* নাক দিয়ে পানি প্রবেশ এড়াতে নাক ক্লিপ ব্যবহার বা হাত দিয়ে নাক বন্ধ করা।

* নাক পরিষ্কারে ফুটানো বা ফিল্টার করা পানি ব্যবহার করা।

* সুইমিংপুলে নিয়মিত পরিমাণমতো ক্লোরিন দেওয়া।

বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি

বাংলাদেশের আবহাওয়া উষ্ণ ও আর্দ্র এবং অনেক জায়গায় অপরিষ্কার জলাশয় বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যদিও এখনো এ সংক্রমণ খুব বিরল, তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে এর ঝুঁকি বাড়তে পারে। সতর্কতা অবলম্বন করলেই মারাত্মক এই সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব।

মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবা বা নিগ্লেরিয়া ফাউলেরি একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক পরজীবী, যা মানুষের মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটাতে পারে
মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবা বা নিগ্লেরিয়া ফাউলেরি একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক পরজীবী, যা মানুষের মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। ছবি: ফ্রিপিক