Showing posts with label ড. আবু এন এম ওয়াহিদ. Show all posts
Showing posts with label ড. আবু এন এম ওয়াহিদ. Show all posts

Sunday, February 21, 2016

‘বাঙালি, আমাকে বাঁচাও’ by আবু এন এম ওয়াহিদ

ভাষা শহীদদের স্মরণে কলকাতায় স্মারক প্রতিষ্ঠা
মারা যাওয়ার মাত্র ৯ মাস আগে, জানুয়ারি ২৫, ২০১২ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল। বাংলা ভাষার এই স্বনামধন্য এবং সুপরিচিত কবি ও ঔপন্যাসিক প্রবন্ধটা লিখেছিলেন কন্নড় ভাষার এক মহাকবির গুণকীর্তন করে। সুনীল যার সম্পর্কে লিখেছিলেন তিনি সাহিত্য জগতে কুয়েমপু ছদ্মনামে পরিচিত। তার আসল নাম যেমনি অনেকের কাছে অজানা তেমনি উচ্চারণে বড়ই কঠিন- কুপ্পালি ভেঙ্কাটাপাগোডা পুট্টাপা। সম্ভবত পিতামাতার দেয়া এ রকম একটা দাঁতভাঙা নামের কারণেই কবি একটা সহজ ছদ্মনাম বেছে নিয়েছিলেন। আসলে এ নামেও একটা জটিলতা আছে। ইংরেজিতে কুয়েমপু লিখতে গেলে শুরুতে একটা ‘ভি’ অক্ষর আছে, কিন্তু উচ্চারণে সেটা উহ্য থাকে। কুয়েমপু কর্নাটকের একজন অত্যন্ত খ্যাতিমান কবি। কন্নড় ভাষায় এম গোবিন্দ পাইর পরেই তার স্থান।
কুয়েমপু সম্পর্কে তার সে লেখার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, কুয়েমপু কন্নড় ভাষায় লিখলেও বাংলা ও বাংলা ভাষার সাথে ছিল তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, যোগাযোগ ও মনের টান। রবীন্দ্র যুগে জন্মে, রবীন্দ্রভক্ত হয়েও তিনি ছিলেন স্বকীয়তায় পরিপূর্ণ। কুয়েমপুর সাহিত্যকর্ম এতই নিখাদ ও নিখুঁত যে, নিজের সাথেই কেবল তার তুলনা চলে; অন্য কারো সাথে নয়। ঘরকুনো এ মানুষটা ১৯২৯ সালে কলকাতায় এসেছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাথে তার দেখা হয়েছিল কি না, তা কেউ জানে না। কুয়েমপু স্বীকার করেছেন যে, সাহিত্য চর্চায় তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করতেন। তার ওপর রবিঠাকুরের প্রভাব এতই প্রবল ছিল যে, রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনের অনুকরণে কুয়েমপু তার গ্রামের বাড়িতে একটা আশ্রমের মতো বানিয়েছিলেন।
কুয়েমপুর জন্ম ১৯০৪ সালে এবং মৃত্যু ১৯৯৪ সালে। দীর্ঘ ৯০ বছরের জীবদ্দশায় তিনি লিখেছেন প্রচুর। কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ, শিশু সাহিত্য, জীবনী প্রভৃতি ক্ষেত্রে তার ছিল বিস্তর ও স্বচ্ছন্দ বিচরণ। সাহিত্যের এসব ক্ষেত্রে তিনি সফলতার উজ্জ্বল নজির রেখে গেছেন। কুয়েমপুর অনেক লেখা ভারতীয় বিভিন্ন এবং বিদেশী ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। তার যে গ্রন্থটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তা হলো, ‘রামায়ণ দর্শন’। এ বিশাল বইটাও ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। এখানে তিনি সীতার অগ্নিপরীক্ষার মতন রামকেও অগ্নিপরীক্ষায় ফেলেছেন। কুয়েমপু খুব প্রচারবিমুখ মানুষ ছিলেন। বিদেশ যাওয়া তো দূরের কথা, নিজের কর্মস্থল ছাড়া ভারতবর্ষের ভেতরেও অন্য কোনো রাজ্যে তিনি সহজে যেতে চাইতেন না। তাই সাধারণ পাঠকের মধ্যে তার পরিচিতি একটু কম বৈকি। কিন্তু জনপ্রিয় না হলেও অন্য এক দিক থেকে কুয়েমপু ছিলেন খুবই ভাগ্যবান। জীবনে তিনি উদার ও পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক এবং সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে ধন্য হয়েছেন। জ্ঞানপীঠ ও ভারতরত্ন উপাধি পাওয়া সে দেশের যেকোনো কবি-সাহিত্যিকের জন্য চাট্টিখানি কথা নয়! অন্য আরো অনেক স্বীকৃতির সাথে কুয়েমপু এ দুটো গৌরবেরও অধিকারী।
কথা বলতে বলতে অনেক বলা হয়ে গেল। আমার আজকের নিবন্ধের বিষয়বস্তু কিন্তু কুয়েমপু নন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও নন। ভিন্নধর্মী, সম্পূর্ণরূপে অন্য এক বিষয় নিয়ে এ লেখায় আলোকপাত করার ইচ্ছা আছে। তবে কেন এখানে কুয়েমপুকে নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এ রচনার ভূমিকা টানলাম, এক্ষুনি পাঠকদের কাছে তা খোলাসা করে বলছি। কুয়েমপুকে নিয়ে আলোচ্য প্রবন্ধের শেষে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘বিমানবন্দরে অলস চিন্তা’ শিরোনামে মাত্র ছোট্ট একটা প্যারা লিখেছেন। ওই প্যারার সাথে তার মূল রচনার কী সম্পর্ক এবং কী তাৎপর্য অনেক কসরত করেও আমি তার কোনো হদিস পাইনি। পাঠকদের সুবিধার জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতিটা হুবহু তুলে ধরছি-
‘কর্নাটকের মানুষ তাদের ভাষাকে খুব ভালবাসে। রাজ্য পরিচালনার অনেক ক্ষেত্রে কন্নড় ভাষার প্রয়োগ হয়। বেঙ্গালুরুর অতি আধুনিক, অতি সুদৃশ্য বিমানবন্দরে বসে কফি খেতে খেতে দেখতে পাচ্ছি, সমস্ত লিখিত নির্দেশিকাতেই ইংরেজি হিন্দির সঙ্গে কন্নড় ভাষাও স্থান করে নিয়েছে। বাইরে অলসভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি লাগল। আমাদের কলকাতায় তো খুব শিগগিরই সম্পূর্ণ আধুনিক এবং বেশ বড় আকারের বিমানবন্দরের উদ্বোধন হবে। সেখানে কি একটাও বাংলা অক্ষর থাকবে? সন্দেহ হচ্ছে কেন? মনে কেন কুডাক ডাকছে! কাউকে তো দাবি জানাতে হবে। সবাই যেন কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে বাংলা ভাষার অপব্যবহার দেখি, কেউ কোনও প্রতিবাদ করে না। তাই আমি আবার এই প্রশ্ন তুলছি : কলকাতার নতুন বিমানবন্দরে কি একটাও বাংলা অক্ষর দেখা যাবে?’
পাঠকেরা এবার বুঝতে পারছেন, কত বড় আফসোস নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো একজন বড় মাপের বাঙালি লেখক এমন প্রশ্ন তুলতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গ একটা স্বাধীন দেশের স্বশাসিত স্বাধীন রাজ্য। বাংলা ভারতবর্ষের একটা অতি উন্নত ও সমৃদ্ধ ভাষা। বাংলা ছাড়া ভারতের অন্য কোনো ভাষার লেখক নোবেল পুরস্কার আনতে পারেননি, কিংবা অন্য কোনো উপায়েও এত বড় বিশ্বস্বীকৃতি কেউ পাননি। তারপরও ভারতের বাঙালিরা গোটা দেশে দূরে থাক, খোদ পশ্চিমবঙ্গে, এমনকি তার রাজধানী কলকাতাতেও দীর্ঘ ৬৪ বছরেও বাংলা ভাষাকে মর্যাদার সাথে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। আমি কখনো কলকাতা যাইনি। যারা গিয়েছেন তাদের দেখায়, তাদের লেখায়, তাদের কথায় হরহামেশাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
দৈনিক আমার দেশের সিনিয়র সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরী কলকাতা থেকে ফিরে এসে নিজ পত্রিকায় ডিসেম্বর ১৭, ২০১১ সালে ‘এপারে বাংলা ওপারে হিন্দি’ শিরোনামে একটা উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখেছেন। ওই নিবন্ধে সঞ্জীব চৌধুরীর মূল বক্তব্য একটাই। অর্থাৎ, দিনে দিনে কলকাতায় বাংলা ভাষা এবং বাঙালি কণ্ঠ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। আর বাংলার জায়গাটা হিন্দি দ্রুত দখল করে নিচ্ছে। তার মতে, কলকাতায় এখন বাংলার চেয়ে ইংরেজির প্রচলন বরং বেশি। এখনো কলকাতায় যেটুকু বাংলা শোনা যায়, তার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের ভিজিটর, যারা লেখাপড়া, চিকিৎসা, ব্যবসাবাণিজ্য কিংবা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের দেখতে যান তাদের জন্য। কলকাতায় বাংলা ভাষার হাল যে এমন হবে, তার আলামত অনেক আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল। সঞ্জীব চৌধুরী তার নিবন্ধের শুরুতে তা খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন। ১৯৭৪ সালে তার এক বন্ধু দীপক কলকাতায় বেড়াতে গিয়ে বন্ধুদের নিয়ে এক পানশালার আড্ডায় কাটিয়েছিলেন কিছুক্ষণ। যতক্ষণ তিনি সেখানে বসেছিলেন, ঠাণ্ডা-গরম পানীয় পরিবেশনের সাথে গিটারের সুরে একের পর এক চলছিল হিন্দি সঙ্গীতের সুর। একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে দীপক একটা বাংলা গান শোনার আরজি পেশ করেছিলেন। তখন গিটার বাদক জবাবে বলেছিলেন, ‘দাদা আপনি কি জয় বাংলার লোক?’ দীপক মুচকি হেসে হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ালে ওই বাদক গিটারে নতুন সুর তুলেছিলেন, ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান...’। উনিশ শ’ চুয়াত্তরে কলকাতায় দীপকের অভিজ্ঞতা এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সে দিনকার আফসোস থেকে বোঝা যায়, হিন্দির দৌরাত্ম্যে কলকাতার ‘বাংলা’ শরীরে বিষের ক্রিয়া পুরো মাত্রায় শুরু হয়ে গেছে। সীমান্ত পেরিয়ে মাত্র ক’মাইল দূরে সে বিষের যন্ত্রণা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মন-মগজে অনুভূত হতে কি খুব বেশি দেরি? বাংলা ভাষার মুখে যদি কোনো ভাষা থাকত তাহলে আজ কেঁদে কেঁদে চিৎকার করে বলত, ‘বাঙালি, আমাকে বাঁচাও’!
লেখক : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ
Email : wahid2569@gmail.com

Sunday, March 8, 2015

আই অ্যাম নট অ্যা সায়েনটিস্ট by আবু এন এম ওয়াহিদ

বিজ্ঞান নয়, আজকের নিবন্ধের বিষয়বস্তু রাজনীতি, খাঁটি রাজনীতি। তবে কেন এমন শিরোনাম, একটু ধৈর্য ধরলেই বিষয়টি খোলাসা হয়ে যাবে আপনাদের কাছে। আমি অনেক দিন ধরে আমেরিকায় থাকি এবং এ দেশেরই একজন ন্যাচারালাইজড সিটিজেন, অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৈনন্দিন রাজনীতি সম্পর্কে খুব একটা খোঁজখবর রাখি না। তবে এর মানে এই নয় যে তাৎপর্যপূর্ণ বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনা আমি জানি না বা আমার কানে আসে না। কীভাবে আসে, সে কাহিনী লিখতে গেলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে, তাই সেদিকে যাচ্ছি না। আসলে এ দেশের চলমান রাজনীতিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানা ও বোঝার ব্যাপারে কোনোকালেই আমার তেমন কোনো উৎসাহ জন্মায়নি। তবে মজার ব্যাপার হল, আমেরিকার রাজনীতিতে আমি যতটা গাফেল, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আবার ততটাই ওয়াকিবহাল থাকার চেষ্টা করি। আপাত দৃষ্টিতে এটি একটি বৈপরীত্য বৈকি। তবে এরও একটি কারণ আছে। সে কথায় পরে আসছি।
বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিদিনকার খবর জানতে আমার প্রতিদিন কমসেকম ২ ঘণ্টা সময় লাগে। সকালে ঘুম থেকে ওঠে চা-নাস্তা খাওয়ার আগেই আরটিএনএন, শীর্ষ নিউজ, আমাদের সময় ডটকমসহ ঢাকার প্রধান প্রধান জাতীয় দৈনিকের পাতায় একবার চোখ বোলাতেই হয়। দুপুরের পর থেকে পরদিনের ঢাকার কাগজের আপডেট আসতে শুরু করে। আমিও সুযোগ করে দেখতে থাকি। আবার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আরেকবার সর্বশেষ খবর দেখে নেই। বিছানায় গিয়ে মনে মনে বলি, হে আল্লাহ্, সকালে উঠে যেন দেশের কোনো খারাপ খবর দেখতে না হয়।
আমি কিংবা আমার কোনো ঘনিষ্ঠজন সরাসরি বাংলাদেশী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। অদূর ভবিষ্যতে তেমন আশাও দেখি না। দেশীয় রাজনীতি থেকে কোনো ধরনের ফায়দা হাসিল করার ইচ্ছাও নেই, সেই সুযোগ-সম্ভাবনাও নেই। তথাপি দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে এত গভীর আগ্রহ কেন, অনেক চিন্তা করেও এর কোনো হদিস পাইনি। তবে আমেরিকার রাজনীতিতে কেন আমার উৎসাহ নেই তার একটি সম্ভাব্য কারণ হয়তো বা বের করতে পেরেছি। উইক এন্ডের দাওয়াত পার্টিতে এ দেশের চেয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয় ঢের বেশি। তাছাড়া অফিস-আদালতে, দোকানপাটে বা অন্য কোথাও আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে আলাপের বলতে গেলে কোনো সুযোগই নেই। এ দেশের লোকজন মনে করে ধর্মের মতো রাজনীতি এবং রাজনৈতিক বিশ্বাস নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটি পরিচিত কিংবা অপরিচিত কারও সঙ্গে শেয়ার করার বিষয় নয়। জানা ও বোঝার জন্য তারা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আলোচনার চেয়ে টিভি ও নিউজ মিডিয়াকেই বেশি পছন্দ করে। আর কথায় কথায় রাজনৈতিক বিতর্ক তাদের রক্তের মধ্যেই নেই। অপরিচিত লোকজনের সঙ্গে কোথাও একত্রে বসে অলস সময় কাটাতে হলে তারা রাজনীতি বা ধর্মের মতো স্পর্শকাতর বিষয় সচেতনভাবে এড়িয়ে চলে। বরফ গলানোর জন্য কথা বলে দিনের আবহাওয়া, খেলাধুলা, সিনেমা, সঙ্গীত ইত্যাদি নিয়ে। এগুলোকে বলে সফ্ট টক। এ জ্ঞান আমি কোনো বই-পুস্তকে পাইনি। শিখেছি আমার মেয়ের কাছে, যখন সে ইউনিভার্সিটিতে পড়ত।
অবশ্য এ দেশের ছেলেমেয়েদের এসব জানতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয় না। স্কুলের চৌহদ্দি পেরোবার আগেই তারা আমেরিকার জীবন-সংস্কৃতি বুঝে ফেলে।
শুরুতে ভাবতে পারিনি আজকের ভূমিকা এতটা লম্বা হয়ে যাবে। কোনো কিছু অপ্রাসঙ্গিক লিখে থাকলে পাঠকরা নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন। ফিরে আসি শিরোনামের বিষয়ে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর জাতির উদ্দেশে কংগ্রেসের জয়েন্ট সেশনে প্রাইম টাইমে (রাত ৮টা থেকে ৯টা) একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়ে থাকেন। প্রধান প্রধান টিভি চ্যানেল বক্তৃতাটি লাইভ ব্রডকাস্ট করে থাকে। এটাকে বলে স্টেইট অব দি ইউনিয়ন অ্যাড্রেস। এটি আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আমার যেহেতু ইন্টারেস্ট নেই, তাই বছর বছর জানুয়ারি আসে জানুয়ারি যায়, আমি এর কোনো খোঁজখবর রাখি না। প্রেসিডেন্টের স্টেইট অব দি ইউনিয়ন অ্যাড্রেসও শুনি না। এবার কী মনে করে জানুয়ারির ২০ তারিখ সন্ধ্যায় টিভির সামনে অবসর বসেছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, ওহ! আজ তো প্রেসিডেন্টের স্টেইট অব দি ইউনিয়ন অ্যাড্রেস, শুনি তো তিনি কী বলেন।
এই ভেবে টিভির রিমোট টিপে শুনতে লাগলাম। বিসমিল্লাহতেই বুঝতে বাকি রইল না, বক্তৃতার প্রথম কয়েক মিনিট আমি এরই মধ্যে মিস করে ফেলেছি। শুনতে গিয়ে বুঝলাম বেশ ভালোই লাগছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অনেক সুন্দর সুন্দর কথা মন্ত্রের মতো বলে যাচ্ছেন। আমেরিকার বিদেশনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, স্বাস্থ্যনীতি, পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি একজন নোবেল বিজয়ী প্রফেসর কিংবা বিশ্বনন্দিত দার্শনিকের মতো জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিচ্ছেন। মাঝে মধ্যে তিনি যে ধমক-ধামক দেননি তা নয়। তবে এগুলো যে কথার কথা, পলিটিক্যাল রেটোরিক সেটা যেমন তিনি জানেন তেমনি তার শ্রোতারাও বোঝে। এখানেই রাজনীতিকদের সঙ্গে একজন প্রফেসর বা দার্শনিকের পার্থক্য। তবে আমার বুঝতে একটুও অসুবিধা হয়নি যে, তার মূল বক্তব্যের বাণীগুলো একজন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কের কথার মতো কানে এসে লাগছে, হৃদয় স্পর্শ করে যাচ্ছে। তিনি প্রফেসর না হলেও নোবেল বিজয়ী তো বটে। আর দার্শনিক না হলে চলবে কী করে। ইংরেজিতে একটি কথা আছে না, অল কিংস মাস্ট বি ফিলোসফারস, অ্যান্ড অল ফিলোসফারস মাস্ট বি কিংস। বারাক ওবামা কিং নন বটে, কিন্তু কমই বা কী!
এবারকার বক্তৃতায় তিনি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ, গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব কথা আউড়েছেন, যা কি-না নোট করে রাখার মতো। কিন্তু যে বক্তব্যটি আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে তাই আজকের শিরোনাম। আই অ্যাম নট অ্যা সায়েনটিস্ট...। অবশ্য তিনি শুধু একথা বলেই তার বাক্যটি শেষ করেননি। একটু পোজ দিয়ে যুক্ত করেছেন আরেকটি অংশ। ...বাট আই নো সায়েনটিস্টস। দুই অংশ যোগ করলে পুরো বাক্যটি দাঁড়ায় এরকম- আই অ্যাম নট অ্যা সায়েনটিস্ট, বাট আই নো সায়েনটিস্টস। আমার বিদ্যা-বুদ্ধি যাই থাক, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কণ্ঠে উচ্চারিত এ বাক্যটি যতই হালকা শোনাক না কেন, এর ব্যাপ্তি ও গভীরতা যে অনেক বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী, তা বুঝতে আমার একটুও অসুবিধা হয়নি। মনে মনে ভাবলাম, কোথায় তারা আর কোথায় আমরা! অর্থাৎ বারাক ওবামা কী বলেন, আর বাংলাদেশের নেতা-নেত্রীরা কী বলেন! আরও মনে হল, বাংলাদেশ ইদানীং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে অনেক দূর এগিয়েছে; কিন্তু যে রাজনীতি সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে সংস্কৃত ও পরিশীলিত করতে আমার প্রিয় মাতৃভূমিকে আরও অনেক দূর হাঁটতে হবে, অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে এবং দুঃখজনক হলেও সত্য, সে পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, বরং নিদারুণ কণ্টকাকীর্ণ।
এবার দেখা যাক বারাক ওবামার কথাটার মানে কী। তিনি বলেছেন, আই অ্যাম নট অ্যা সায়েনটিস্ট, বাট আই নো সায়েনটিস্টস। বারাক ওবামা একজন আইন বিশারদ, তিনি রাজনীতিক, তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট, তিনি রাষ্ট্রনায়ক। জাতির কাছে তিনি অকপটে স্বীকার করছেন তিনি বিজ্ঞান জানেন না, তিনি বিজ্ঞানী নন। এখানেই শেষ নয়, তিনি আরও বলছেন, তিনি বিজ্ঞানীদের জানেন, বিজ্ঞানীদের চেনেন। এর মানে কী? এর অর্থ, তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের কাছ থেকে জানেন, তাদের কথা ধৈর্য ধরে শোনেন, তাদের থেকে শেখেন, তাদের বুদ্ধি পরামর্শ নেন। তার চেয়ে বড় কথা, তাদের পরামর্শ মতো তিনি দেশের বিজ্ঞানবিষয়ক নীতিনির্ধারণ করে থাকেন। এটা শুধু মুখের কথা নয়, বাস্তবে এর প্রতিফলন আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে শুধু বিজ্ঞান বিষয়েই নয়, বরং সব বিষয়েই তিনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে থাকেন এবং সেই মতো কাজও করেন।
পক্ষান্তরে বাংলাদেশে কী হয়, নেত্রী কমিটি করে দেন। কমিটি অলোচনা করে বিতর্ক করে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কোনো কোনো সময় মাসের পর মাস। কমিটি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদেরও পরামর্শ নেয়। সবশেষে রিপোর্ট তৈরি হয়। অনেক সময় সে রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না। যাও বা দু-একটা রিপোর্ট বের হয়, চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত রিপোর্ট অনুযায়ী হয় না, হয় মহাশক্তিধর এক ব্যক্তির গায়েবি হুকুমে। যতদিন গায়েবি হুকুমে দেশ চলবে, ততদিন ভূতের আগুনে দেশ জ্বলবে, পুড়বে মানুষ, ধ্বংস হবে অর্থনীতি, ভেঙে পড়বে যাতায়াত ব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষা কার্যক্রম, দুর্বল হবে সামাজিক বন্ধন, আরও কতকিছু। প্রতিকারের জন্য দেশবাসী লড়বে ভূতের সঙ্গে, যেন বাংলাদেশের সব অঘটনের জন্য ভূতই দায়ী! আজ দেশে যে আগুন জ্বলছে তার দায় কেউ নিচ্ছে না। যারা প্রতিদিন খুন-গুম হচ্ছে তাদেরও দায় নেয়ার কেউ নেই। যেমন নেই মীমাংসিত নির্বাচন ব্যবস্থাকে অমীমাংসিত করার দায় নেয়ার কেউ। আবু এন এম ওয়াহিদ : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেইট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
wahid2569@gmail.com

Wednesday, February 11, 2015

এটাও কি কম কথা! by আবু এন এম ওয়াহিদ

পার্কিংলটে গাড়ি রেখে বিল্ডিংয়ের এলেভেটারে চড়ে চারতলায় উঠে একটি লম্বা হলওয়ে ধরে হেঁটে গিয়ে আমার অফিসে ঢুকতে হয়। অফিস থেকে যখন কাসে যাই, সেই একই পথ মাড়িয়ে নিচতলায় নেমে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করি। প্রতিদিন এই হলওয়ে দিয়ে আমাকে অন্তত চার-পাঁচবার যাওয়া আসা করতে হয়। প্রায় দুই যুগ হতে চলল, এ আমার নিত্যদিনের চলার পথ, বড় পরিচিত পথ, বড় প্রিয় পথ। হলওয়ের ডানে বামে ছোট বড় অনেক অফিস রুম আছে। বাঁ দিকে কিছু অংশে একটি ‘ওপেন টু বিলো’ লবিও। লবির এক পাশে আছে বড় অডিটরিয়াম, যেখানে সব সময় অনুষ্ঠানাদি লেগেই থাকে। লবিতে হয় অংশগ্রহণকারী ও অতিথিদের আপ্যায়ন ও খাওয়াদাওয়া। হলওয়ে দিয়ে যাওয়া আসার সময় প্রায়ই শোনা যায় মানুষজনের হৈচৈ আর বাসনকোসনের টুংটাং আওয়াজ। অনুষ্ঠান না হলেও ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনায় লবি এবং হলওয়ে সব সময় গমগম করে। জীবনের ও তারুণ্যের উচ্ছ্বাসই এ কোলাহলের নির্যাস। ছুটির দিনে অফিসে এলে কাজ হয় বটে, কিন্তু জীবনের সজীবতা ও প্রাণচাঞ্চল্যের ছোঁয়া পাওয়া যায় না।
একদিন দোতলা কী তিনতলায় কাস শেষ করে ওই হলওয়ে ধরে অফিসে ফিরছি। ‘ওপেন টু বিলো’ লবি পার হওয়ার পর ডান দিকে নজর পড়ল এক অফিস কক্ষে। কাচের দরজা দিয়ে দেখতে পেলাম দেয়ালে আনুমানিক আট ইঞ্চি বাই তিরিশ ইঞ্চি একটি ছবি হরাইজোন্টালি ঝুলছে। এটি আগে কখনো চোখে পড়েনি। কে, কখন, কেন ছবিটি টাঙিয়েছে তারও হদিস পাইনি। ছবিটি সে দিন আমাকে কেন আকর্ষণ করল তা-ও জানি না। কী মনে করে কাছে গিয়ে ওটা একনজর দেখার জন্য দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। ঠিক সামনে গিয়ে বুঝতে পারলাম, আমি একটি বিশেষ ছবির বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছি। অতি সাধারণ ফ্রেমে বাঁধানো একটি সাদা-কালো ছবি। ধারণ করে আছে পাঁচজন বিশ্ববিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্বের অবয়ব। প্রথমে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, তারপর বারাক ওবামা, তৃতীয়জন ম্যালকম এক্স, তারপর নেলসন ম্যান্ডেলা। এ পর্যন্ত আমার কোনো অসুবিধা হয়নি। ধাক্কা খেলাম শেষেরজনে এসে। তার চেহারাটা কোনোভাবেই চিনতে পারলাম না। মনে মনে ভাবলাম, ‘এই চারজনের পাশে যে তার নিজের জায়গা করে নিয়েছে, সে কোনো সাধারণ ব্যক্তি হতে পারে না! আমারই কসুর, আমি তাকে জানি না, তাকে চিনি না।’
ছবিটির দিকে আমি বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছি। এমন সময় ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো আমারই এক পুরনো ছাত্র। ছেলেটি বলল, ‘হোয়াট আর ইউ লুকিং অ্যাট ড. ওয়াহিদ?’ আমি বললাম, ‘ক্যান ইউ টেল মি, হু দিস ম্যান ইজ।’ সে অবাক হয়ে বলল, ‘ও! ইউ ডোন্ট নো হিম! হি ইজ বব মার্লি।’ এখানেই শেষ নয়, সে আমাকে বব মার্লির একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও দিলো। আমি আমার অফিসে ফিরে এলাম। আসতে আসতে ভাবলাম, ‘আমি কত বড় বেকুব, এত বড় একজন গুণী মানুষের নাম কেনো দিন শুনিনি।’ অফিসে বসে গুগুল সার্চ দিয়ে বব মার্লির জীবনী পড়লাম এবং অনেক অজানা বিষয় জানলাম।
কয়েক দিন পর এ নিয়ে একদিন আমার ইংল্যান্ড প্রবাসী বন্ধু মাহবুবের সাথে অনেকক্ষণ কথাও হলো। দু’জন দু’জনের কাছ থেকে বব মার্লি সম্বন্ধে আরো শিখলাম, আরো জানলাম। মাহবুবের সাথে আলাপের সময় দেয়ালে ঝুলানো ছবি এবং বব মার্লির অবস্থান নিয়ে আরেকটি প্রাসঙ্গিক ভাবনা হঠাৎ আমার মনে উঁকি মারে এবং এ নিয়ে তার সাথে আমার বেশ কথাও হয়। হঠাৎ ভাবনাটা কী এবং কী আলাপ হয়, সে প্রসঙ্গে একটু পরেই আবার ফিরে আসব। ওই হঠাৎ ভাবনাটি মাঝে মধ্যে আমাকে নাড়া দেয়। আমি ভাবতে থাকি, ‘এ নিয়ে একটা কিছু লেখা দরকার।’ লিখব লিখব করেও আলসেমিতে আর লেখাটা হয়ে ওঠেনি। না লেখার পেছনে অবশ্য আরেকটি কারণও ছিল। ঘটনার কিছু দিন আগেই ভাইরাসজনিত কারণে আমার কম্পিউটার ক্র্যাশ করে। এর সাথে স্বাভাবিকভাবেই আমার বিজয় সফটওয়্যারও হারিয়ে যায়। এতে আমার বাংলা লেখালেখি বন্ধ থাকে বহু দিন।
সম্প্রতি আমার এক তরুণ বন্ধু ঢাকার ইবনে আয়াজ রানার বদৌলতে আমি আমার কম্পিউটারে বিজয় সফটওয়্যার নতুন করে ইনস্টল করি। রানার সাথে এ দৈব পরিচয় না হলে আমার বাংলা লেখালেখি এখনো বন্ধই থাকত। তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই! এর মধ্যে আরেকটি ঘটনা ঘটে, যা কিনা আমাকে এ লেখার জন্য চূড়ান্তভাবে উদ্বুদ্ধ করে। সকালে অফিসে যাওয়ার সময় গাড়ি চালাতে চালাতে আমি বিবিসি রেডিও শুনি। ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত এই এক ঘণ্টা খবর এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের চুলচেরা বিশ্লেষণ হয় বিবিসিতে। এমনি একদিন বিবিসি রেডিওতে একটি সংবাদভাষ্য শুনতে পেলাম। বিষয়বস্তু, ‘সৌদি আরবে বব মার্লির গানের রেকর্ড বিক্রি হচ্ছে’ এ খবরকে কেন্দ্র করে। সে দিন নতুন করে বুঝলাম মার্লির জনপ্রিয়তা ও প্রভাব তার দেশের সীমানা পেরিয়ে অনেক দূর বিস্তৃত। এরপর এ নিয়ে লেখার তাগিদটা আরো জোরেশোরে অনুভব করলাম।
আজকের নিবন্ধের মূল বিষয়ে আসার আগে আমার মতো বব মার্লি সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণা নেই, তাদের জন্য ওই ক্ষণজন্মা পুরুষ, তার জীবন ও কর্মপরিসর নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বয়ান তুলে ধরছি। বব মার্লির পুরো নাম রবার্ট নেস্টা মার্লি। কৃষ্ণাঙ্গ পিতা-মাতার ঘরে তার জন্ম ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫ সালে জ্যামাইকার (ওয়েস্ট ইন্ডিজ) সেইন্ট অ্যানের নাইন মাইল নামক স্থানে। তার বাবা নোরভাল সিনকেয়ার মার্লি। বব মার্লির বয়স যখন মাত্র দশ, তখন তার বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। বব মার্লি প্রাইমারি ও জুনিয়র হাইস্কুল পর্যন্ত পড়েন নাইন মাইলেই। তারপর ১২ বছর বয়সে মার সাথে চলে যান কিংস্টনের ট্রেঞ্চ টাউনে। স্কুলে থাকতে মার্লি তার বন্ধু নেভিল লিভিংস্টোনের (পরে তিনি বানি উয়েইলার নামে পরিচিতি পান) সাথে গান গাইতে শুরু করেন। মার্লির সাথে তার বন্ধু ওয়েইলারও ট্রেঞ্চ টাউনে চলে আসেন। সেখানে তারা দুই বন্ধু একই বাড়িতে থাকতেন। কী কারণে এবং কী ব্যবস্থায় দুই বন্ধু একই বাড়িতে থাকতেন, মার্লির জীবনী থেকে সে রহস্য আমি উন্মোচন করতে পরিনি। এ সময় মার্লি এবং উয়েইলার আরো কয়েকজন সাথী নিয়ে একটি গানের গ্রুপ তৈরি করেন। এ গ্রুপের নাম তারা কয়েকবার পরিবর্তন করেন। যে নামে এটা থিতু হয় এবং বিশ্ব পরিচিতি পায়, তা হলো ‘দ্য উয়েইলারস’। এভাবে শুরু হয় মার্লির গান লেখা, গান গাওয়া ও গান নিয়ে গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পালা। প্রথমে মার্লি শুধু গান লিখতেন এবং গাইতেন। পরে তিনি গিটার শিখেছিলেন এবং ভালোই শিখেছিলেন। ১৯৬২ সালে প্রথমবারের মতো ‘উয়েইলারসের’ চারটি গানের রেকর্ড বের হয়। সবই ভীষণভাবে হিট করে। এর পর শুরু হয় তাদের বিরামহীন সামনে পথ চলা। শুরু হয় ম্যাজিকের মতো একটার পর একটা সফলতা। এর মাঝে তাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
কোনো একসময় মার্লির মা চলে আসেন আমেরিকার উলমিংটন ডেলওয়ারে। মার্লি ১৯৬৬ সালে রিটা অ্যান্ডারসনকে বিয়ে করে অল্প কিছু দিনের জন্য মায়ের কাছে উলমিংটন ডেলওয়ারে এসে থাকতে শুরু করেন। ওই সময় তিনি ডুপন্ট ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ক্রাইসলার করপোরেশনে অল্প দিন চাকরিও করেন। হলেইবা কী, গানপাগল মার্লিকে কি ক্রাইসলার ধরে রাখতে পারে! গানের টানে তিনি ঠিকই চাকরি ছেড়ে আবার জ্যামাইকা ফিরে যান। ক্যাথলিক খ্রিষ্টান হিসেবে বড় হলেও ওই সময় মার্লি রাস্টাফারিয়ান খ্রিষ্টানে ধর্মান্তরিত হন। এরপর তার নতুন ধর্মীয় অনুশাসন মোতাবেক তিনি চুল কাটা বন্ধ করে দেন।
ষাট দশকের শেষ এবং পুরো সত্তর দশককে বলা যায় মার্লির জীবনের স্বর্ণযুগ। এ সময় তিনি স্বল্প সময়ের জন্য ইংল্যান্ডের লন্ডনবাসী হয়ে যান। লন্ডনকে বেস করে তিনি গোটা ইউরোপে গান গেয়ে বেড়ান। লন্ডনে থাকলেও আমেরিকার সাথে ছিল তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তিনি জিমি হ্যান্ডরিক্স, লেসলি কঙ্গ, জিমি নরম্যান, রোজার স্টেফেনের মতো গুণী সঙ্গীত প্রযোজক এবং সঙ্গীত বিশারদদের সাথে নিবিড় যোগসূত্র গড়ে তোলেন এবং রেকর্ড করেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। সত্তর এবং আশির দশকের গোড়ার দিকে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন বড় শহরে অত্যন্ত সফলতার সাথে একের পর এক লাইভ পারফরম্যান্স করতে থাকেন। ইটালির মিলানে তার এক লাইভ শোতে এক লাখেরও বেশি দর্শকশ্রোতা উপস্থিত ছিল। এটা ছিল তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সফল পারফরম্যান্স।
১৯৭৭ সালে বব মার্লি মেলোনোমা জাতীয় স্কিন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং ১৯৮১ সালের ১১ মে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি ফোরিডার মায়ামিতে মারা যান। বব মার্লি একজন সমাজসচেতন গীতিকার ও সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। তার জীবনে তিনি সঙ্গীতের মাধ্যমে জ্যামাইকায় বসবাসকারী অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কথা তুলে ধরার চেষ্টা করে গেছেন। তিনি তাদের উন্নয়নের জন্যও অনেক কিছু করেছেন। সঙ্গীত এবং সমাজসেবা ছাড়াও তিনি রাস্টাফারিয়ান খ্রিষ্টান আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন।
আমার আজকের নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু বব মার্লি, তার জীবনজীবিকা কিংবা জীবনদর্শনও নয়। ফিরে আসি আসল কথায়। শুরু করেছিলাম যেখান থেকে, সেই ছবির প্রসঙ্গে। দেয়ালের ছবিটি দেখে আমার মনে তাৎক্ষণিক যে প্রতিক্রিয়াটি হয়েছিল তা হলো, বব মার্লির মতো একজন মানুষকে আমি কেন জানলাম না। পরবর্তীকালে আমার মনে এসে বাসা বাঁধলো আরো একটি প্রশ্ন। তারপরে দেখা দিলো সেই হঠাৎ অনুভূতি, যার কথা আগে আপনাদের বলেছি। প্রশ্নটি হলো, ছবির ফ্রেমে যে পাঁচ ব্যক্তিত্ব ধরা পড়েছেন, তার একজন আফ্রিকান, একজন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান। বাকি তিনজনই জন্মগতভাবে আমেরিকার নাগরিক। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের প্রায় সবারই পূর্বপুরুষরা এসেছেন আফ্রিকা থেকে। আফ্রিকাই কৃষ্ণাঙ্গদের আদি জন্মভূমি। অধিকাংশ কালো মানুষ হাজার হাজার বছর ধরেই বাস করছেন এই প্রাচীন মহাদেশেই। আমার প্রশ্ন, তার পরেও আফ্রিকা কেন আরেকজন নেলসন ম্যান্ডেলা বা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র অথবা বারাক ওবামা, কিংবা ম্যালকম এক্স অথবা বব মার্লির জন্ম দিতে পারল না? এ প্রশ্নের কী উত্তর হতে পারে তা আমার জানা নেই। পাঠক ভাবতে থাকুন।
এবার আসি আমার অনুভূতি বা শেষ প্রসঙ্গে। এটা শুধু আমার অনুভূতিই নয়, আমার মতো আরো অনেকেই এমন মতামত পোষণ করে থাকেন। এটা বলা যায়, আমার একটি ব্যক্তিগত অপিনিয়ন বা জাজমেন্ট। আমার এই জাজমেন্ট পাঠকদের পছন্দ হতে পারে আবার না-ও হতে পারে। তাই আগেই আপনাদের সবার কাছে মাফ চেয়ে নিচ্ছি। প্রসঙ্গটা বব মার্লিকে নিয়েই। বব মার্লিকে কোনোক্রমেই ছোট না করেই যে কথাটি আমি বলতে চাই, তা হলো, আমার বিচারে উল্লিখিত ছবির মিলনমেলায় বব মার্লি একেবারেই বেমানান। আমার মতে, তার পরিবর্তে ওইখানে স্থান পাওয়ার কথা ছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বক্সার মোহাম্মদ আলীর। এটা শুধু আমার একার মতামতই নয়। এর সাথে আমার বন্ধুবান্ধবের অনেকেই সহমত ব্যক্ত করেছেন। জানি না, আপনাদের মতামত কী। আর তাই যদি হতো তাহলে আমার একটি অনুভূতি আছে। অনুভূতিটি হলো, বারাক ওবামার ধমনীতে মুসলমানের যেটুকু রক্ত বহমান, তা বিবেচনায় না নিলেও ম্যালকম এক্সের সাথে মোহাম্মদ আলীকে যোগ করলে দেখা যায় আধুনিক বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ পাঁচজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্বের দু’জনাই মুসলমান। এটা কি কম কথা!
লেখক : অধ্যাপক-টেনেসি স্টেইট ইউনিভার্সিটি;  এডিটর, জার্নাল অফ ডেভেলপিং এরিয়াজ;
Email: wahid2569@gmail.com

Saturday, January 31, 2015

অকৃতজ্ঞ মানুষ! by আবু এন এম ওয়াহিদ

ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ড সেইন্ট লুশার রডনি বে ভিলেজে এক নাগাড়ে তিন দিন সম্মেলন-ব্যস্ততার পর স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, কান্তি এসে শরীরে ভর করছে। মনের অবস্থাও একটু বিষণœ বৈকি। বেশ ক’দিন ধরে বাড়ির বাইরে। ই-মেইল মারফত জানতে পারছি, অফিস ও সংসারের না-করা কাজের ফর্দ দিনে দিনে লম্বা হচ্ছে। প্রতিদিন বিকেলে যেখানে ছেলেমেয়েদের খোঁজখবর নিতাম, সেটাও আর হয়ে উঠছে না। ফিরে গেলেই কাস শুরু হবে। সেমিস্টারের সূচনা-প্রস্তুতি কিছুটা বাকি রয়েছে। হাতে পাবো মাত্র দুই দিন। এ অল্প সময়ে সব কিছু গুছিয়ে উঠতে পারব তো! এসব নিয়ে হোটেলের লবিতে দিনদুপুরে একা একা বসে ভাবছি আর হৈ হুল্লোড়রত মানুষের বিরামহীন আনাগোনা দেখছি।
কেউ চেক ইন করছে, কেউবা চেক আউট। কেউ বসে চা-কফি খাচ্ছে। এক হাতে কাপ, আরেক হাতে কানের কাছে সেলফোন ধরে কানাকানিÑ কত কথা! যেন তার শেষ নেই! কেউ আমার মতোই গম্ভীর হয়ে একাকী বসে আছে। কেউ প্রিয়জনের ঘাড়ে মাথা রেখে আদরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কোনায় বসে দুই বান্ধবী চুটিয়ে গল্প করছে। আর মাঝে মাঝে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। একজন কালো আরেক জন সাদা। বিষয়বস্তু কী, জানার কিংবা বোঝার উপায় নেই যতই কৌতূহল থাকুক না কেন। কিছুক্ষণ পরপর স্বল্পবসনা অল্প বয়সী নারীরা কাঁধে টাওয়েল ঝুলিয়ে ফিপফপ পরে সাঁতার কাটতে সি বিচে যাচ্ছে। রুম সার্ভিস ও মেইন্টেন্যান্সের লোকজন আসছে, যাচ্ছে, ফ্রন্টডেস্ক থেকে নির্দেশনা নিচ্ছে। সেন্ট লুশায় এখন টুরিস্টদের মওসুম। তাই হোটেল লবির এই রমরমা অবস্থা দিনরাত বলতে গেলে একই রকম।
হঠাৎ দেখি ডেভিড আমার সামনে। পায়ে স্যান্ডেল, পরনে হাফপ্যান্ট, খালি গায়ে টাওয়েল জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বলল, ‘আবু, চল যাই বিচে।’ বললাম, ‘আমি পানিতে নামব না। তা ছাড়া আমার চেক আউটের সময় বেশি বাকি নেই। তুমি যাও।’ ডেভিড কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান অধ্যাপক। এসেছে নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে। পরিচয় মাত্র দুই দিনের। অত্যন্ত বন্ধুবৎসল ভদ্রলোক। অতি সহজেই না জানা, না চেনা মানুষকে কাছে টেনে নিতে পারে। ও নাছোড়বান্দা। আমাকে না নিয়ে সে যাবে না। বলল, ‘তোমার চেক আউটের এখনো দুই ঘণ্টা বাকি। বিচে যেতে সময় লাগে মাত্র পাঁচ মিনিট। আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে চলে আসব। এত কাছে এসে এত সুন্দর বিচ না দেখে গেলে ভবিষ্যতে পস্তাবে। আবার কবে এখানে আসবে তার কি কোনো ঠিক আছে?’ চল, চল, বলে আমাকে হাত ধরে টেনে তুলে নিলো। বিচ যে সুন্দর সেটা ভালো করেই জানে। কারণ সে প্রতিদিন একবার সেখানে যায়।
লবি থেকে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর হোটেলের শাটল সার্ভিস এলো। ভ্যানে উঠে বসলাম, সত্যি সত্যি পাঁচ মিনিটে চলে গেলাম বে গার্ডেনস রিসোর্টে। বিল্ডিংয়ের পেছনেই সেন্ট লুশার বিখ্যাত রডনি বে বিচ। ছোট্ট, কিন্তু সৌন্দর্যে অতুলনীয়। সত্যিই না গেলে পস্তাতাম! ডেভিড সরাসরি গিয়ে পানিতে নামল এবং আমি ঘন চেপ্টা পাতার একটি ঝাঁকড়া ছোট্ট শালগাছের নিচে গিয়ে হেলান দিয়ে বসলাম খালি বিচ চেয়ারে। চেয়ারগুলো হেলিয়ে পুরোদস্তুর শোয়া যায়। বিচের দুই পাশে খাড়া উঁচু পাহাড়। এদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বিচের তপ্ত বালুতে তরুণ-তরুণীদের প্রাণচাঞ্চল্য উপভোগ করার মতো! সামনে সীমাহীন সাগর। দিগন্তরেখায় আসমান মিশে গেছে দরিয়ার নীল পানিতে। অলস বসে বসে দেখছি, একটার পর একটা ঢেউ তীরে এসে আছড়ে পড়ছে। কোনোটার পানি ফুলেফেঁপে অনেক দূর ওপরে ওঠে, কোনোটা নিচেই থেকে যায়। একই সময়, একই হাওয়া, মাধ্যাকর্ষণের টানও ভিন্ন হওয়ার কথা নয়, কিন্তু ঢেউগুলোর শক্তিমত্তায় এই তারতম্য কেন, অনেক চিন্তা করেও জবাব পাইনি।
ছোট বড় অসংখ্য নৌকা এলোপাতাড়ি ছোটাছুটি করছে। কোনোটা ইঞ্জিনচালিত। কোনোটা চলছে পালের হাওয়ায়। কোনোটা আবার বৈঠা বাওয়া কাঠের নাও। মিস্ত্রিরা গাছ কেটে বানিয়েছেন। একটু দূরে দুই-একটি জেলে নৌকা। দৃষ্টি আরেকটু প্রসারিত করলে বেশ দূরে দেখা যায় ক্রুজ শিপ। মনে হয় যেন একটি বিশাল ১২ তলা দালান পানির ওপর দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছে। গাংচিল কিচিরমিচির শব্দ করে ওড়াউড়ি করছে। স্মার্ট ফোন বের করে কয়েকটি ছবি তুললাম। কিছুটা ভিডিও করার কোশেশ করলাম, কিন্তু পারলাম না। একে তো আনাড়ি ক্যামেরাম্যান, তার ওপর নতুন স্মার্ট ফোন, ব্যবহারে অভ্যস্ত হইনি, হয়তোবা তাই। বাড়িতে ফিরে এ কথা যখন আমার মেয়েদের বলব, তখন তারা হাসাহাসি করবে, আর বলবে, ‘আব্বু, ইউ আর কিউট’! তন্ময় হয়ে সাগরের দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ একটি মাছি উড়ে এসে বসল বাঁ হাতে। মাছি তাড়াতে গিয়ে দৃষ্টি ফিরে এলো মাটিতে শালগাছের নিচে।
বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি, একটি লোক বালুতে বসে ছুরি দিয়ে ঝুনো নারিকেল কেটে কেটে পাখির বাসা এবং পাখি বানাচ্ছে। একটু ওপরে তাকিয়ে দেখি, সে তার পণ্যসামগ্রী শালগাছের চ্যাপ্টা পাতার সাথে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। তার বানানো পাখি আর পাখির বাসাগুলো বাতাসে দুলছে। দেখতে বেশ ভালোই লাগছে। সে পাখির ছবি তুললাম। অনুরোধে তারও একটি ছবি তুলে নিলাম। তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী? লোকটি বলল, মাইকেল। কী জাতের পাখি বানাচ্ছ? হামিং বার্ড। ওই মুহূর্তে লোকটি কাজ ফেলে একদৃষ্টিতে সাগরের দিকে তাকিয়েছিল। প্রশ্ন করলাম, তুমি কী দেখছ? সে বলল, তুমি যা দেখছ আমিও তাই দেখছি। বললাম, সাগর পাড়ে এলে তুমি কী দেখো? কী বোঝো? কী ভাব? তোমার কী অনুভূতি হয়? মাইকেল বলল, তোমার ধৈর্য আছে? শুনবে আমার কথা? বললাম, অবশ্যই।
মাইকেল বলল, ‘আমার পাখির মুখ আছে, ঠোঁটও আছে, কিন্তু সে ডাকে না, কিচিরমিচির করে না। আর ওই যে দেখছ বিশাল সাগর, সীমাহীন মহাসাগর, তার বুকে আছে অফুরন্ত জলরাশি তার তো কোনো মুখ নেই, কিন্তু খেয়াল করে শোনো, কী ভয়ঙ্কর কানফাটা তার গর্জনের আওয়াজ।’ মাইকেল আরো বলল, ‘আমার পাখির দুটো ডানা আছে, কিন্তু সে ওড়ে না, উড়তে পারে না। আর সামনে চেয়ে দেখ, সাগরের অথৈ নীল পানি, তার তো কোনো পাখনা নেই, কিন্তু বাষ্প হয়ে সে দিব্যি ওপরে উঠে যায়, বাতাসে ভেসে বেড়ায় পাখির মতো, চলে যায় দেশ থেকে দেশান্তরে, দূর-দূরান্তরে! কে তার ঠিকানা রাখে! সময় হলে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির বেশে ঝরে পড়ে পৃথিবীর গায়ে। সিক্ত শীতল করে দেয় উষ্ণ ভূমিকে। ফুলে ফলে ভরে তোলে আমাদের এই মায়াবী পৃথিবীকে।’
বললাম, ‘বা! মাইকেল, তুমি তো চমৎকার বলেছ! এর ওপর আর কোনো কথা চলে না!’ মাইকেল এখানে থেমে যেতে পারত এবং আমিও আজকের মতো আমার বয়ানের সমাপনী টেনে দিতে পারতাম। কিন্তু না, তা হলো না। মাইকেল এখানে থামল না। সে বলেই চলল। বলল, ‘আমার পাখি গান করে না, ওড়েও না, তবু মানুষ তা টাকা দিয়ে কেনে। আমার ব্যবসায় হয়, মুনাফা হয়, এতে আমার সংসার চলে। আর ওই সাগরের নোনা পানি, যা না থাকলে তো আমরা ডাঙায় মিষ্টি পানি পেতাম না।
মানুষ, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, গাছপালা, লতাগুল্ম সব মরে ছারখার হয়ে যেত। অথচ এই সাগর যে তৈরি করল, পানি দিয়ে তার বুক ভরে দিলো, যে তামাম জীবকুলকে বাঁচিয়ে রাখল, অনেক মানুষ আছে এর বিনিময়ে তো কিছু দেয়ই না, জীবনে হয়তো একটিবারও স্মরণ করে না, কালেভদ্রে একটা ধন্যবাদও দেয় না। কী হারামি না আমরা মানুষের জাত! আচ্ছা, বলতে পারো, মানুষ কেন এত অকৃতজ্ঞ হয়!’
wahid2569@gmail.com

Wednesday, November 21, 2012

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক ধাপ এগোল by আবু এন এম ওয়াহিদ

প্রাচীনকালে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক কেমন হবে তা নির্ভর করত রাজায় রাজায় সম্পর্কটি কেমন তার ওপর। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশের রাজপরিবারের মধ্যে বিয়েশাদিরও চল ছিল। রাজতন্ত্র যে আজকাল একেবারে উঠে গেছে তা নয়, তবে ওই ধরনের আন্তর্জাতিক বিয়েটিয়ে খুব একটা হয় বলে জানা যায় না।

Wednesday, November 7, 2012

ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক ও বাংলাদেশের ব্যবসায়ী by আবু এন এম ওয়াহিদ

ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক অর্থশাস্ত্রের আওতাভুক্ত একটি বিষয়। অর্থনীতির ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে এটা বোঝা ও বোঝানো আমার দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু এটা যে পত্রিকার পাঠকদের জন্য কলামের একটি বিষয়বস্তু হতে পারে, তা কখনো ভাবিনি।

Friday, October 12, 2012

'তোমার যুদ্ধ আর আমার যুদ্ধ এক নয়!' by আবু এন এম ওয়াহিদ

১৯৯০ সালের শেষদিক। আমি তখন চার্লসটনে ইস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। ওই বছরের মাঝামাঝিতে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে ইরাকের অঙ্গীভূত করেছেন। বুশ (সিনিয়র) প্রশাসন ইরাককে কুয়েত ছেড়ে আসার আলটিমেটাম দিচ্ছে, তর্জনগর্জন করছে, যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে।

'তোমার যুদ্ধ আর আমার যুদ্ধ এক নয়!' by আবু এন এম ওয়াহিদ

১৯৯০ সালের শেষদিক। আমি তখন চার্লসটনে ইস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। ওই বছরের মাঝামাঝিতে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে ইরাকের অঙ্গীভূত করেছেন। বুশ (সিনিয়র) প্রশাসন ইরাককে কুয়েত ছেড়ে আসার আলটিমেটাম দিচ্ছে, তর্জনগর্জন করছে, যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে।

'তোমার যুদ্ধ আর আমার যুদ্ধ এক নয়!' by আবু এন এম ওয়াহিদ

১৯৯০ সালের শেষদিক। আমি তখন চার্লসটনে ইস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। ওই বছরের মাঝামাঝিতে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে ইরাকের অঙ্গীভূত করেছেন। বুশ (সিনিয়র) প্রশাসন ইরাককে কুয়েত ছেড়ে আসার আলটিমেটাম দিচ্ছে, তর্জনগর্জন করছে, যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে।

'তোমার যুদ্ধ আর আমার যুদ্ধ এক নয়!' by আবু এন এম ওয়াহিদ

১৯৯০ সালের শেষদিক। আমি তখন চার্লসটনে ইস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। ওই বছরের মাঝামাঝিতে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে ইরাকের অঙ্গীভূত করেছেন। বুশ (সিনিয়র) প্রশাসন ইরাককে কুয়েত ছেড়ে আসার আলটিমেটাম দিচ্ছে, তর্জনগর্জন করছে, যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে।

'তোমার যুদ্ধ আর আমার যুদ্ধ এক নয়!' by আবু এন এম ওয়াহিদ

১৯৯০ সালের শেষদিক। আমি তখন চার্লসটনে ইস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। ওই বছরের মাঝামাঝিতে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে ইরাকের অঙ্গীভূত করেছেন। বুশ (সিনিয়র) প্রশাসন ইরাককে কুয়েত ছেড়ে আসার আলটিমেটাম দিচ্ছে, তর্জনগর্জন করছে, যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে।

Tuesday, September 18, 2012

রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি কি আসন্ন? by আবু এন এম ওয়াহিদ

অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি মোটামুটি একটি গণতান্ত্রিক ধারায় এসে পড়ে ১৯৯০-এর পটপরিবর্তনের পর। দুর্বল গণতন্ত্রের এ পথচলা এখনো নিষ্কণ্টক ও নিরাপদ হয়নি। তবু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন তো হচ্ছে, এটা নিশ্চয়ই একটি ভালো দিক, যদিও এটাই গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়।

Tuesday, August 28, 2012

চাঁদের আর্মস্ট্রং ও মানবজাতির প্রত্যাশা by আবু এনএম ওয়াহিদ

নিল আর্মস্ট্রং হার্ট সার্জারি-পরবর্তী জটিলতায় ২৫ আগস্ট মারা গেছেন। শেষ জীবন তিনি কাটিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সিনসিনাটি শহরে। একই রাজ্যের আরেকটি ছোট শহর ওয়াপাকোনেটাতে তার জন্ম হয়েছিল ৮২ বছর আগে ৫ আগস্ট।

Monday, August 27, 2012

'এন্ড ডাজ নট জাস্টিফাই মিনস' by আবু এন এম ওয়াহিদ

আমরা কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় এন্ড (অ্যান্ড নয়) বা চূড়ান্ত লক্ষ্যের দোহাই দিয়ে মিনস অর্থাৎ পদ্ধতিকে গুলিয়ে ফেলি। যার ফলে ভালো এবং নৈতিক কাজ করার সময় দেখা যায়, ভুল ও অনৈতিক পথ অনুসরণ করি এবং মনে মনে এটাকে জায়েজ করে নিই এই ভেবে যে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তো সঠিক এবং সৎ, না হয় একটু বাঁকা পথে

Thursday, August 16, 2012

একটি বিদায় সংবর্ধনা এবং কৃষি ও শিক্ষার সম্পর্ক by ড. আবু এন এম ওয়াহিদ

কৃষি ও শিক্ষার মধ্যে এক বা একাধিক সম্পর্ক থাকতেই পারে; তবে এ সম্পর্কের সঙ্গে কারো বিদায় সংবর্ধনার যোগসূত্র কী হতে পারে, তা নিয়ে পাঠকদের যে কেউ বড় ধরনের প্রশ্ন তুলতেও পারেন। আসলে দুটি বিষয়ই আলাদা। কোনো এক ঘটনাচক্রে আমি তাঁদের এক লাইনে নিয়ে এসেছি।

Wednesday, August 1, 2012

পাশ্চাত্যের দৃষ্টিতে অন্য জাতিগোষ্ঠী? by আবু এন এম ওয়াহিদ

আমার আজকের এ লেখার একটি যোগসূত্র বা ছোট্ট ইতিহাস আছে। শিরোনামের বিষয়টি যেমন পাঠকদের কাছে কৌতূহল সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি আমার দৃঢ়বিশ্বাস নিবন্ধটি কেন লিখছি, সেটাও তাদের কাছে একটি আগ্রহের বিষয় হতে পারে। আর তাই ঘটনাটি সংক্ষেপে খুলে বলছি।

Tuesday, July 24, 2012

রোজার বাজার : এমনটি তো হওয়ার কথা নয়! by আবু এন এম ওয়াহিদ

এবারকার রোজার প্রথম দিনের ঢাকার বাজারদরের খবর উঠেছে পরদিন, অর্থাৎ জুলাইর ২২ তারিখ দ্বিতীয় রোজায় প্রায় সব কয়টি জাতীয় দৈনিকে। একেক কাগজ খবর ছেপেছে একেক রকম, কিন্তু সবার মূল সুর একই, অর্থাৎ দাম বেড়েছে। পাঠক, ওই দিনের সংবাদপত্রে মূল্যসংক্রান্ত শিরোনামগুলোর দিকে একটু নজর দিন- 'সরকার কঠোর, তবু

Saturday, July 21, 2012

পোলিও সচেতনতার প্রয়োজন এখনো ফুরায়নি by ড. আবু এন এম ওয়াহিদ

বিশ শতকের সত্তরের দশকে যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়তাম, তখন ভূগোল বিভাগে ছিল আমার এক প্রিয় বন্ধু। তার নাম খন্দকার মাহবুব ইলাহী রঞ্জু। রঞ্জুর বাড়ি উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরে। ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে হলেও তার সঙ্গে আমার সখ্যের একটি বিশেষ কারণ ছিল।

Monday, July 9, 2012

'আই অ্যাম মি. লিলি' by আবু এনএম ওয়াহিদ

সেদিন এক নেফ্রোলজিস্টের ওয়েটিং রুমে বসে আছি। হাতের কাছে পেয়ে পুরনো ম্যাগাজিনে চোখ বুলাচ্ছি। দরজায় আওয়াজ শুনে দেখি দু'জন ঢুকছেন। বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে রোগী একজনই, অন্যজন নিছক সঙ্গ দিচ্ছেন। তারা দু'জনই বৃদ্ধ, দম্পতি, বয়স আশির বেশি বৈ কম হবে না।

Tuesday, June 12, 2012

অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন by ড. আবু এন এম ওয়াহিদ

উন্নয়ন অর্থনীতির অভিধানে 'এশীয় উন্নয়ন কৌশল' বলে একটি কথা চালু হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। এখানে এই কৌশল বলতে এশিয়ার চারটি তেজি অর্থনীতির দেশ তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন কৌশলকে বোঝায়।