Showing posts with label জ্বালানী সম্পদ. Show all posts
Showing posts with label জ্বালানী সম্পদ. Show all posts

Friday, October 9, 2009

জ্বালানি ও জাতীয় স্বার্থের তর্ক-বিতর্ক কার পক্ষে by কল্লোল মোস্তফা

১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখের প্রথম আলোতে জুবায়ের জামান লিখিত ‘জ্বালানি ও জাতীয় স্বার্থের তর্ক-বিতর্ক’ শীর্ষক নিবন্ধটিতে লেখক দুটি বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে পিএসসি চুক্তি স্বাক্ষর প্রসঙ্গে যা বলেছেন তাঁর প্রতিক্রিয়ায় কিছু কথা পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি। কেননা বিষয়টি নিজেই জরুরি ও জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন।
এক. জনাব জুবায়ের জামান লিখেছেন: ‘... এক দশক ধরে বিপুল ব্যয়ে পরিচালিত অনুসন্ধান আমাদের গ্যাস সম্পদে নতুন কোনো কিছু যোগ করতে পারেনি। বর্তমান পিএসসির আওতায় পরিচালিত অনুসন্ধানেও দ্রুত গ্যাসপ্রাপ্তির আশা করা যায় না, অন্তত আগামী সাত-নয় বছরের মধ্যে তো নয়ই।’
তাহলে আমাদের প্রশ্ন হলো, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ‘মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে’ এ অঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আগ্রহী হলো কি কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে উদ্ধার করার অনুরূপ গ্যাস দায়গ্রস্ত (!) বাংলাদেশকে দয়া করতে, নাকি নিশ্চিত মুনাফার গন্ধ পেয়েই? উত্তরে আমরা প্রথম আলোতেই প্রকাশিত এ কে এম জাকারিয়ার ‘বঙ্গোপসাগর এখন এক লোভনীয় ক্ষেত্র’ (২০ নভেম্বর ২০০৮) লেখার কয়েকটি লাইন পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেব: ‘বঙ্গোপসাগর এখন তেল-গ্যাসের জন্য লোভনীয় ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে ভারত সমুদ্রে ১০০ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। মিয়ানমার সাত টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।... মিয়ানমার তাদের যে তিনটি ব্লকে গ্যাস পাওয়ার কথা ঘোষণা করেছে, সেই ব্লকগুলো বাংলাদেশের ঘোষণা করা ব্লকগুলোর কাছাকাছি এবং অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্লকগুলোর মধ্যে পড়েছে।’ তাহলে জুবায়ের জামান কিসের ভিত্তিতে এবং কার স্বার্থে বলছেন এ অঞ্চল থেকে গ্যাসপ্রাপ্তি অনিশ্চিত এবং বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক?
দুই. মডেল পিএসসিতে এলএনজি করে রপ্তানি করার বিধান রাখা প্রসঙ্গে তিনি ‘ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ’ এই অনুসন্ধানের কাজে বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারজাত করার নিশ্চয়তা প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন:
‘... তাই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে গ্যাস বাজারজাতকরণ/রপ্তানি একটি যৌক্তিক প্রস্তাব। তবে তাও আবিষ্কৃত গ্যাসের আকারের ওপর নির্ভরশীল। সাধারণত গভীর সমুদ্র এলাকায় চার থেকে পাঁচ টিসিএফের নিচের কোনো গ্যাসক্ষেত্রের জন্য এলএনজি প্লান্ট স্থাপন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক বলে বিবেচিত হয় না। এখানে উল্লেখ্য, পিএসসি মোতাবেক গ্যাসের যেকোনো রপ্তানির ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা বা দেশে তৃতীয় কোনো ব্যবহারকারী/পক্ষ গ্যাস কিনতে অপারগতা প্রকাশ করলেই কেবল পেট্রোবাংলার সম্মত শর্তে এলএনজি হিসেবে রপ্তানির সুযোগ আসবে।’
প্রথম কথা হলো, মিয়ানমার যেখানে আমাদের ব্লকগুলোর পাশেই তিনটি ব্লক থেকে সাত টিসিএফ গ্যাসপ্রাপ্তির ঘোষণা দিয়েছে, তাহলে জুবায়ের জামান সাহেব কেন মনে করছেন এলএনজি প্লান্ট লাভজনক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্র চার থেকে পাঁচ টিসিএফ গ্যাস আমরা আমাদের তিনটি ব্লক থেকে পাব না? আবারও বলি, কার স্বার্থে?
দ্বিতীয় কথা হলো, পেট্রোবাংলা প্রথম দাবিদার ঠিকই, কিন্তু তার জন্য মডেল পিএসসির আর্টিক্যাল ১৫.৫.৪ অনুসারে তাকে দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এক. তাকে গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস পরিবহন করে আনতে পারতে হবে এবং দুই. উত্তোলিত গ্যাস ব্যবহার করতে পারতে হবে।
এখন আবিষ্কৃত গ্যাসের পরিমাণ দেখে বহুজাতিক কোম্পানি যদি এলএনজি প্লান্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং যদি বাংলাদেশ দৈনিক যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করতে পারবে তার চেয়ে বেশি পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন শুরু করে, তাহলে পরিবহনের পাইপলাইনহীন অবস্থায় এবং আমাদের অবদমিত শিল্প খাত সেই পরিমাণ গ্যাস সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার করতে অক্ষম হবে। এই দুটি কারণে চুক্তি অনুসারে আমরা বাধ্য হব বহুজাতিক কোম্পানিকে এলএনজি বানিয়ে গ্যাস বিদেশে রপ্তানি করার অনুমতি দিতে।
এই রপ্তানি কিন্তু আমরা করছি না, করছে কোম্পানি। এবং করছে আমাদের প্রাপ্য গ্যাস থেকেই। রপ্তানির বিষয়টি ছাড়াও, আর্টিক্যাল ১৫.৫.৪ অনুসারে বাজারজাতযোগ্য গ্যাসের ২০ শতাংশের বেশি আমরা পাব না অর্থাত্ অন্তত ৮০ ভাগ গ্যাসের মালিকানা বহুজাতিক কোম্পানির। অথচ আমাদের মতো দেশ বলিভিয়ার হাইড্রোকার্বন আইন ২০০৫-এ বলা আছে, বলিভিয়ার মালিকানা কোনোভাবেই উত্তোলিত হাইড্রোকার্বনের ৫০ শতাংশের কম হওয়া চলবে না এবং বাজারজাত করার অধিকার ও সিদ্ধান্ত পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় কোম্পানি ওয়াইপিএফবির। আমাদের বেলায় যা হতে পারত পেট্রোবাংলার এখতিয়ারের বিষয়।
কিন্তু চুক্তিতে যদি গ্যাসের শত ভাগ মালিকানা আমাদের হাতে থাকত এবং বহুজাতিক কোম্পানি যেমন সাবকনট্রাক্ট দিয়ে কাজ করায়, বাপেক্স বা পেট্রোবাংলা যদি সেভাবে সাবকনট্রাক্টর দিয়ে কাজ করাত তাহলে কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ গ্যাস একসঙ্গে উত্তোলন করে কস্ট রিকভারি করে নেওয়ার সুযোগ থাকত না, প্রয়োজনও পড়ত না। একই সঙ্গে গ্যাস রপ্তানি করে সোনার ডিম পাড়া হাসকে বিক্রি করার কথাও উঠত না।
প্রশ্ন আসতে পারে দেশে নিশ্চিত বাজার থাকা সত্ত্বেও বহুজাতিক কোম্পানি কেন শুধু শুধু কোটি কোটি ডলার খরচ করে এলএনজি প্লান্ট বানাতে যাবে? বহুজাতিক কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনলে দেশীয় উত্পাদন খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে আমাদের গ্যাস কিনতে হবে, এ কথা যেমন সত্য, তেমনি চুক্তি মোতাবেক ১৮০ ডলার সিলিং থাকার কারণে তাদের আন্তর্জাতিক মূল্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মূল্যে পেট্রোবাংলার কাছে গ্যাস বিক্রি করতে হবে (অধ্যাপক নূরুল ইসলাম, ৭ জুলাই, প্রথম আলো)। ফলে পেট্রোবাংলার কাছে বিক্রি করলে প্রতি হাজার কিউবিক ফিটে তার ‘ক্ষতি’ সাত-আট ডলার করে প্রতি টিসিএফে ক্ষতি সাত-আট বিলিয়ন ডলার। এই টাকা বিনিয়োগ করেই তারা একবার এলএনজি প্লান্ট বানিয়ে ফেলতে পারলে পরবর্তী সময়ে আর এই ক্ষতিটুকু স্বীকার করতে হবে না। কারণ, যদি চার টিসিএফ গ্যাস মেলে এবং তা দেশীয় বাজারে বিক্রি করতে হয়, তাহলে ২৮ থেকে ৩২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি স্বীকার করতে হয়। কাজেই তাদের পক্ষে সাত-আট বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চাওয়াই স্বাভাবিক। এবং দেশীয় শিল্পের প্রয়োজনাতিরিক্ত গ্যাস উত্পাদন করলেই পেট্রোবাংলা বাধ্য হবে তাদের এলএনজি আকারে গ্যাস রপ্তানি করতে দিতে!
তিন. ‘এ অবস্থায় সাগরবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু না করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে বরং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর স্বার্থই সংরক্ষিত হবে, বাংলাদেশের নয়।’
অথচ তেল-গ্যাস কমিটি অথবা যারা বর্তমান পিএসসিকে জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে বলে মনে করছে তারা কিন্তু হাত-পা গুটিয়ে রাখার কথা বলছে না, বরং সরকারই ঘোষণা দিয়েছে বিরোধপূর্ণ ব্লক থেকে গ্যাস উত্তোলন না করার। (সূত্র: সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান: পেট্রোবাংলা-টাল্লো প্রাথমিক আলোচনা, ৩০ সেপ্টেম্বর, প্রথম আলো) কাজেই গ্যাস রপ্তানি ও মালিকানার ইস্যু নিয়ে তর্ক-বিতর্কের ফলে ভারত-মিয়ানমারের স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে, কথাটি ঠিক নয়। বরং তর্ক-বিতর্ক না করলে একদিকে বিরোধহীন ব্লকের গ্যাস নিয়ে যাবে বহুজাতিক কোম্পানি, অন্যদিকে বিরোধপূর্ণ ব্লকগুলোর গ্যাস নিয়ে যাবে ভারত বা মিয়ানমার অর্থাত্ আম-ছালা দুই-ই যাবে।
বিরোধহীন ব্লকগুলোকে ৮০ শতাংশ বিদেশি মালিকানা ও রপ্তানির সুযোগ রেখে বরাদ্দ বা ইজারা দেওয়ার খোয়াবে মগ্ন থাকলে এবং সমুুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ মীমাংসার কার্যকর উদ্যোগ নিতে না চাইলে গণনজরদারি ও বিতর্কের প্রয়োজন নেই। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ রক্ষার নজরদারি ছাড়া আমরা আমাদের সম্পদ রক্ষা করতে ও কাজে লাগাতে পারব না। দুশ্চিন্তার কারণটি সেখানেই।
কল্লোল মোস্তফা: প্রকৌশলী।

Wednesday, October 7, 2009

জ্বালানী সম্পদ -গভীর সমুদ্র কি গ্যাসের নতুন দিগন্ত হতে পারে by বদরূল ইমাম

বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র অঞ্চলে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার একটি বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা এ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। এ আলোচনা সম্প্রতি পাওয়া কিছু নতুন ভূতাত্ত্বিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। এ তথ্যগুলো ভারতীয় সমুদ্র অঞ্চলে পরিচালিত অনুসন্ধান কার্যক্রমের সূত্রে পাওয়া গেছে। এর কিছু অংশ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সভায় আলোচিত ও প্রকাশিত এবং কিছু অংশ অপ্রকাশিত ও গোপনীয় বলে বিবেচিত। পাঠকের সুবিধার্থে আলোচনায় ভূতাত্ত্বিক তথ্যের জটিল অংশগুলোতে সহজ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও এতে বক্তব্য অতি সহজীকরণের প্রভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
বিশ্বে অগভীর সমুদ্র অঞ্চলে বহু বছর ধরেই তেল-গ্যাস কার্যক্রম চলে আসছে, কিন্তু গভীর সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে নতুন। তবুও গভীর সমুদ্রবক্ষ পৃথিবীর অনেক দেশে তেল-গ্যাস ভাণ্ডারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ তার গভীর সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র অঞ্চলের ওপর ভূতাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজনের তুলনায় নেই বললেই চলে। এমতাবস্থায় এর গ্যাস সম্ভাবনার ওপর বাস্তবধর্মী যুক্তি উপস্থাপন করা অসম্ভব না হলেও কঠিন। তবে এর সংলগ্ন ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাবনার একটি চিত্র দাঁড় করা যেতে পারে। এর আগে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার উভয়েই বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্র অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করে এবং বিগত বছরগুলোতে উভয়েই গ্যাসের বিরাট মজুদ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র অঞ্চলও কি গ্যাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে?
বঙ্গোপসাগর ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কা—এই চারটি দেশের উপকূল ছাড়িয়ে বিশাল এলাকাব্যাপী বিস্তৃত এবং এ সাগরের গভীরতা প্রায় এক শ মিটার থেকে চার হাজার মিটার। তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে সাধারণত সমুদ্রে পানির গভীরতা ৪০০ মিটারের কম হলে তাকে অগভীর সমুদ্র এবং এর বেশি হলে তা গভীর সমুদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। গভীর সমুদ্রে সাধারণত পানির গভীরতা ২০০০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হয়ে থাকে। গভীর সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমে ভারত ও পূর্বে মিয়ানমার উভয় দেশেরই সীমানা চিহ্নিতকরণ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে এবং বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বাংলাদেশ দাবি করে, এ দুটি দেশই সমুদ্রবক্ষে এর সীমানার ভেতর অনুসন্ধানকাজ চালাচ্ছে।
গভীর সমুদ্রে ভারত: বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিমে ভারতের গভীর সমুদ্র ব্লক ডি-৬, আর এখানেই পাওয়া গেছে বিরাট গ্যাসের মজুদ, যা কিনা ভারতের অন্য যেকোনো এলাকার গ্যাস মজুদের চেয়ে বেশি। উল্লেখ্য, ভূখণ্ডে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের তুলনায় সমুদ্রবক্ষে অনুসন্ধান কারিগরিভাবে অনেক জটিল ও আর্থিকভাবে বহুগুণে ব্যয়বহুল এবং গভীর সমুদ্রে তা আরও বেশি। গভীর সমুদ্রে এই ব্লকটিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাচ্ছে ভারতের দেশীয় কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। শিল্পপতি ধীরুভাই প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি ভারত তথা বিশ্বে অন্যতম বৃহত্ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপরিচিত হয়েছে। কোম্পানির বর্তমান কর্ণধার তাঁর পুত্র মুখেশ আদভানির সময়ে গভীর সমুদ্র ব্লক ডি-৬-এ একের পর এক আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলো (নাম দেওয়া হয় ধীরুভাই-১, ধীরুভাই-৩ ইত্যাদি) ভারতের গ্যাসচিত্রে আমূল পরিবর্তন বহন করে আনে। এ ছাড়া নিকটবর্তী একাধিক সমুদ্র ব্লকেও আশানুরূপ গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি কানাডার ভ্যানকুভার শহরে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক গ্যাস সম্মেলনে রিলায়েন্স কোম্পানির ভূবিজ্ঞানীরা ভারতের গভীর সমুদ্রে বিশাল গ্যাস মজুদ সৃষ্টির এক ভূতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন। তাঁদের মতে, এটি সনাতনী প্রথায় সৃষ্ট থারমোজেনিক (thermogenic) প্রাকৃতিক গ্যাস নয় বরং এটি অসনাতনী বায়োজেনিক (biogenic) প্রাকৃতিক গ্যাস। গুণে ও মানে একই প্রকারের হলেও এরা উত্পত্তিগতভাবে ভিন্ন। সনাতনী থারমোজেনিক গ্যাস সৃষ্টি হয় ভূগর্ভে অনেক গভীরতায় শিলাস্তরের জৈবিক পদার্থগুলো উচ্চ তাপের প্রভাবে গ্যাসে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীতে পাওয়া বেশির ভাগ প্রাকৃতিক গ্যাসই থারমোজেনিক প্রকৃতির। অপরপক্ষে বায়োজেনিক গ্যাস সৃষ্টি হতে তাপ দরকার হয় না, বরং এ ক্ষেত্রে অতি অল্প গভীরতায় এক ধরনের জীবাণু দ্বারা জৈবিক পদার্থ গ্যাসে পরিণত হয়। বাংলাদেশে তেল-গ্যাসের উত্স নিয়ে যে ভূবিজ্ঞানীরা কাজ করে থাকেন, তাঁদের কাছে এ দেশের ভূগর্ভে পর্যাপ্ত তাপ (ভূবিজ্ঞানের ভাষায় thermal maturity বা তাপজনিত পরিপক্বতা) না থাকাটা পর্যাপ্ত গ্যাস সৃষ্টি হওয়ার পথে একটি বাধা। আর এ কারণেই গভীর সমুদ্রে থারমোজেনিক গ্যাসের পরিবর্তে বায়োজেনিক গ্যাসের (যা তৈরি হতে তাপ লাগে না) আবিষ্কার একটি আশাপ্রদ লক্ষণ।
ভারতীয় ভূবিজ্ঞানীরা এই গ্যাস সৃষ্টির পর তা মজুদ হওয়ার পদ্ধতিরও একটি নতুনতর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, এই গ্যাস তৈরি হয়ে তা সরাসরি এসে মজুদ হয়নি বরং তা প্রথমে সাগরতলে গ্যাস হাইড্রেট (gas hydrate—গ্যাস ও পানিমিশ্রিত বরফসম পদার্থ) হিসেবে অবস্থান করেছে ও পরবর্তীকালে অল্প তাপে গ্যাস হাইড্রেট অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে ‘বরফ’ থেকে গ্যাস আলাদা হয়ে সুবিধাজনক স্থানে জমা হয়েছে। এ ব্যাখ্যাটি পুরোপুরি অসনাতনী অর্থাত্ গ্যাসবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারার বাইরে। তবে এটি একাধিক কারণে বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। প্রথমত, গ্যাস সৃষ্টি হয়ে তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু বরফসম গ্যাস হাইড্রেট গ্যাসকে সমুদ্রতলে আটকে রাখে। দ্বিতীয়ত, গ্যাস হাইড্রেট সম্প্রতিকালে ভূবিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন আগ্রহের জন্ম দিয়েছে এ কারণে যে বরফসম এ পদার্থটি বিশ্বের বহু সমুদ্রের গভীরে আবিষ্কৃত হয়েছে এবং এর সঙ্গে গ্যাসবিজ্ঞানের নানা সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে চলেছে। সুতরাং ভারতীয় গভীর সমুদ্র ব্লকে প্রাপ্ত গ্যাসের মজুদ নিয়ে রিলায়েন্স কোম্পানির ভূবিজ্ঞানীদের দেওয়া সূত্র যদি ঠিক হয়ে থাকে, তবে সে ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশ বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবক্ষে থাকার সম্ভাবনার কারণে এটিকেও গ্যাস সম্ভাবনাময় মোক্ষম এলাকা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
অন্যরা কী বলে: অনেকটা একই ধারণা পোষণ করেন ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানির ভূবিজ্ঞানী জনাথন এভান। এই কোম্পানি কিছুদিন আগে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধান করার আগ্রহ প্রকাশ করে এ দেশে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ সফরে পাঠায় কোম্পানির দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক এই ভূবিজ্ঞানীকে। তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে এক সাক্ষাতে জানান, তাঁদের ধারণা, বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র অঞ্চলে নতুন অসনাতনী প্রকৃতির বায়োজেনিক গ্যাস পাওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ইতিমধ্যে আফ্রিকা মহাদেশে মিসরের গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান চালিয়ে আশানুরূপ বায়োজেনিক গ্যাসের সন্ধান পায়। তারা মনে করে, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে সে রকম পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে বঙ্গোপসাগরের গ্যাস ব্লকগুলোর সীমানা নিয়ে বিরাজমান আন্তর্দেশীয় বিরোধের কারণে কেবল ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানিই নয়, অনেক বড় কোম্পানি এ মুহূর্তে এখানে আসতে আগ্রহ হারিয়েছে। যা-ই হোক, একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র অঞ্চলে গ্যাস সম্ভাবনার ব্যাখ্যায় ব্রিটিশ ভূবিজ্ঞানীর ধারণার সঙ্গে ভারতীয় ভূবিজ্ঞানীদের মতের মিল রয়েছে।
কেবল তা-ই নয়, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের পূর্ব দিকে মিয়ানমার সমুদ্র অঞ্চলে সম্প্রতি যে বিরাট গ্যাসের মজুদ (সুউ, সুউফিউ ও মিয়া গ্যাসক্ষেত্রগুলো) পাওয়া গেছে, তার ভূবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় একই ধরনের সূত্রের কথা বলা হচ্ছে। অর্থাত্ বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মাত্র ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে মিয়ানমার সমুদ্রে আবিষ্কৃত গ্যাসগুলোও বায়োজেনিক প্রাকৃতিক গ্যাস বলে জানা গেছে। এই গ্যাসের মজুদ এতটাই উল্লেখযোগ্য যে এটা কিনতে ভারত ও চীন উভয়েই তীব্র প্রতিযোগিতায় নামে এবং শেষ পর্যন্ত চীনেরই জয় হয়।
উপসংহার: বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের দুটি প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার নিজ নিজ সমুদ্রবক্ষে (যদিও তারা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে) অনেক বড় আকারের গ্যাসক্ষেত্রের আবিষ্কার করে গ্যাসসম্পদের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পেরেছে। ফলে এ সাগর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে নতুনভাবে আকৃষ্ট করেছে। বিজ্ঞানীরা এখানে গ্যাসসম্পদের উত্স নিয়ে নতুন সূত্র ব্যাখ্যা করে এর ব্যাপ্তি ও সম্ভাবনার নানা বিষয় নিয়ে মত দিচ্ছেন। গ্যাসবিজ্ঞানের প্রচলিত সূত্রে নয়, বরং স্বল্প গভীরতায় তাপের প্রভাব ছাড়াই জীবাণুর দ্বারা সৃষ্ট বায়োজেনিক গ্যাস শীতল সাগরতলে ‘বরফসম’ গ্যাস হাইড্রেটে পরিণত হওয়া এবং পরে ‘বরফ’ গলে গ্যাস বের হয়ে সুবিধাজনক স্থানে মজুদ আকারে জমা হওয়া—এ সবই গ্যাস-ভূবিজ্ঞানে নতুনতর অসনাতনী ব্যাখ্যা। এ সূত্র যথার্থ প্রমাণিত হলে তা গ্যাসবিজ্ঞানে যেমন, তেমনি গভীর সমুদ্রে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবক্ষ ভূতাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞাত এলাকা। এই অঞ্চল গ্যাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে কি না, এটি বাস্তবিক পক্ষে মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, যার উত্তর এখন পর্যন্ত কারও জানা নেই। তবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাফল্য বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রকে সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এ সম্ভাবনার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করতে হলে প্রয়োজন ব্যাপক আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান। বহুসংখ্যক অজ্ঞাত বৈজ্ঞানিক উপাদানকে ব্যাপক অনুসন্ধান-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রথমে সত্যায়িত করা এবং এর ওপর ভিত্তি করে কার্যপন্থা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করাই উপরিউক্ত প্রশ্নের উত্তরের সন্ধান পাওয়ার একমাত্র পথ।
বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, রেজাইনা বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা