Friday, April 17, 2015

লেভেল প্লেয়িং by মাহবুব তালুকদার

চাচা জিজ্ঞাসা করলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড মানে কী?
বললাম, সবার জন্য সমান সুযোগ। মানে, নির্বাচনের মাঠে সবাই যাতে সমানভাবে খেলতে পারে, তার সুযোগ সৃষ্টি করা।
কিন্তু বিএনপি কিভাবে তা আশা করতে পারে? চাচা বললেন, ‘নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা’ বলে বাংলায় একটা প্রবাদ আছে। বিএনপি এখন উঠোন বাঁকা বলে চেঁচাচ্ছে। নিজেরা নাচতে না পারলে উঠোনের দোষ দিয়ে লাভ কি?
উভয়ের জন্য সমতল ভূমি হওয়া কি উচিত নয়? আমি বললাম।
তুমি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে এক পাল্লায় মাপতে চাচ্ছ। আর শুধু স্বাধীনতা বিরোধীই বা বলি কেন? ওরা নাশকতাকারী ও মানুষ হত্যাকারী। যারা পুড়িয়ে মানুষ মারে, তাদেরকে যে নির্বাচনে আসতে দেয়া হয়েছে, এই তো বেশি।
নির্বাচনে সবাইকে প্রার্থী হতে ও ভোট দিতে সমান সুযোগ দিতে হবে।
সে তো দেয়া হচ্ছেই। আমাদের নির্বাচন কমিশনের মতো এমন উদার প্রতিষ্ঠান বিশ্বের আর কোথাও দেখাতে পারবে না। তবে তারা নিরপেক্ষ নয়।
আমি তো সেই কথাই বলতে চাচ্ছি।
তুমি কি বলতে চাচ্ছ তা জানি না। কিন্তু নির্বাচন কমিশন বিএনপির প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাচ্ছে। চাচার বক্তব্য।
সে কি! এর কোন প্রমাণ আছে কি?
অবশ্যই আছে। তারা মন্ত্রীদের ওপর পর্যন্ত শোকজ নোটিশ জারি করতে চায়।
মন্ত্রী হয়ে কেউ কোনো প্রার্থীর জন্য ভোট চাইতে পারেন না।
কে বললো পারেন না! মত প্রকাশের স্বাধীনতা তার অবশ্যই আছে।
নির্বাচনী বিধিতে প্রার্থীর পক্ষে মন্ত্রীর প্রচারণা চালানোর অধিকার খর্ব করা হয়েছে।
নির্বাচনী বিধি! সেটা কি সংবিধানের ওপরে? সংবিধান যেখানে প্রতিটি নাগরিককে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে, সেখানে একজন মন্ত্রী মত প্রকাশ করতে পারবেন না কেন? কাকে ভোট দিতে হবে, তা জনগণকে চিনিয়ে দেয়া বা গাইড করা একজন মন্ত্রীর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। দেশের মানুষকে দিকনির্দেশনা দেয়া তার দায়িত্ব।
চাচা! আপনার এ কথার পর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আর আশা করা যায় না।
আবার তুমি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলছো? আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাকে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে দেবে না। অন্যদিকে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া ইচ্ছামতো নির্বাচনী প্রচারণা চালাবেন, এটা কেমন লেভেল প্লেয়িং?
চাচার সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলে কোন লাভ নেই। মন্ত্রী মহোদয়রা নির্বাচনী প্রচারণা চালালে নির্বাচন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না। তারা দায়সারা গোছের নোটিশ দেয়া আর কাউকে কাউকে সামান্য জরিমানা করা ছাড়া আর কি করতে পারছে? এতে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার আশা সুদূরপরাহত।
আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়। অভিযোগ আছে, বিরোধী দলের যেসব নেতাকর্মী আত্মগোপন থেকে প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা করছিল, তাদেরকে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে থেকে আটক করা হচ্ছে। বিএনপির নির্বাচন প্রচারণা মিছিল থেকেও নেতাকর্মীদের তুলে নেয়া হচ্ছে। এতে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মনে উদ্বেগ ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অবস্থা এমন যে, ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে যদি তাদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাহলেও বলার কিছু থাকবে না। অনেক প্রার্থী নিজের ভোটটি দেয়ার জন্য ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন বলে মনে হয় না।
আমার সবচেয়ে দুঃখ লাগে ঢাকাকে দু’ টুকরো করা হলো বলে। দ্বিখণ্ডিত করার সময় বলা হয়েছিল, এতে নাকি নাগরিক সেবার মান বাড়বে। এ রকম তুঘলকি সিদ্ধান্তে এক ফোঁটা নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি।  আসলে তা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার কৌশল ছাড়া আর কিছু ছিল না। বরং প্রশাসক দিয়ে মেয়রের কাজ করাতে গিয়ে সিটি করপোরেশন জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আজ যদি রাজধানী ঢাকা দিল্লি বা অন্যান্য বড় শহরের মতো আলাদা স্বকীয়তা নিয়ে দাঁড়াতে পারতো, তাহলে তার চেহারা পাল্টে যেতে পারতো। খণ্ডিত বা দ্বিখণ্ডিত ঢাকা দিয়ে তা কখনোই সম্ভব নয়। চারশত বছরের এই মহানগরীর বুকে ছুরি মারার আগে আমাদের হাত এতটুকু কাঁপলো না!
আমি যখন এসব কথা ভাবছি, তখন চাচা বললেন, কী ব্যাপার, এতো চুপচাপ কেন?
বললাম, ভাবছি।
নির্বাচনের কথা তো? এবার নির্বাচনে ঢাকাবাসীর উচিত আনিসুল হক আর সাঈদ খোকনকে জয়যুক্ত করা।
কেন?
বিএনপি বা তাদের সমর্থিত কোন প্রার্থী মেয়র হলে কাজ চালাতে পারবে না।
কেন?
এর খুব সহজ উত্তর। মির্জা আব্বাস আত্মগোপনে থেকে জয়ী হলে লাভ কি হবে? উনি তো মেয়রের চেয়ারে বসতে পারবেন না।
উনি আত্মগোপন থেকে প্রকাশ্যে বেরিয়ে এলে?
প্রকাশ্যে এলে উনি জেলে যাবেন। মেয়রের চেয়ার তার কাছে দূর অস্ত!
কিন্তু ঢাকা উত্তর? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
সেখানে তো বিএনপির উল্লেখযোগ্য কোন প্রার্থীই নেই। অন্য দল থেকে হায়ার করে প্রার্থী যোগাড় করে কি আর নির্বাচনে জয়ী হওয়া যাবে?
বিএনপি ইতিমধ্যে নিজেদের প্রার্থী দিতে যাচ্ছে।
সেটা হবে কানা-খোঁড়া প্রার্থী।
কেন এ কথা বলছেন?
কানা এ জন্য যে, উপযুক্ত প্রার্থী না হলে তিনি কোন ভোটার খুঁজে পাবেন না। মানে, ভোটারদের দেখা পাবেন না। আর খোঁড়া বলছি এ কারণে যে, তিনি ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারবেন না। অর্থাৎ তার তেমন সচলতা থাকবে না।
চাচা! আপনি খুব কঠোর কথা বলেছেন। বিএনপি আপনার ভাষায় কোন ‘উপযুক্ত’ প্রার্থী দিতে পারলে কি হবে?
উপযুক্ত প্রার্থীরা সবাই নাশকতার সঙ্গে জড়িত ইনক্লুডিং খালেদা জিয়া। তাদের ব্যবস্থা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেয়ার জন্য বদ্ধপরিকর। তাদের ভবিষ্যৎ কি, তা আশা করি বুঝতে তোমার অসুবিধা হবে না। তবে যদি মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ দায়ের করা না যায়, তাহলে তার নির্বাচন প্রচারণা দলের লোকজন বা কাউন্সিলর পদের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ আনা অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত।
এই পর্যায়ে চাচি ঘরে ঢুকলেন। চাচিকে দেখে আমি আশ্বস্ত হলাম এ কারণে যে, তার উপস্থিতিতে চাচার কথাবার্তায় কিছুটা ভারসাম্য আসবে। চাচি জিজ্ঞাসা করলেন, সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তো?
হ্যাঁ। আমি বললাম, চাচা আওয়ামী লীগের সব প্রার্থীকে একচেটিয়াভাবে জিতিয়ে দিচ্ছেন।
নির্বাচন করে, না নির্বাচন না করে?
চাচা ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন, নির্বাচন না করে মানে?
মানে খুব সোজা। আওয়ামী লীগের একটা কৌশল আছে না? বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যাওয়া। এখানেও কি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার কথা বলা হচ্ছে?
সেটা সম্ভব নয়। বিএনপি নির্বাচন বয়কট করলে তা সম্ভব ছিল। নির্বাচনে বিএনপি থাকবেই। আমি জানালাম।
তাহলে নির্বাচনের ফলাফল আগাম ঘোষণা করা সম্ভব নয়। ক্রিকেটের ফলাফলই আগাম বলা যায় না। আর এতো নির্বাচন! চাচি বললেন।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, চাচি! আপনি কী মনে করেন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে?
এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে- এমন আশা করা নিতান্ত দুরাশা।
চাচা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এবার বিরক্ত স্বরে বললেন, নির্বাচন কমিশনের দোষটা কি?
তারা সরকারের মন্ত্রী বা বিধিবিধান ভঙ্গকারী কারও বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না। রিটার্নিং অফিসার মন্ত্রীদের ব্যাপারে বিধিবিধান ভঙ্গের চিঠি লিখলেও নির্বাচন কমিশন মুখ বন্ধ করে বসে আছে।
কেন? নির্বাচন কমিশন তো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছে যে, মন্ত্রীসহ অন্যান্য সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। চাচার বক্তব্য।
ঐসব চিঠি চালাচালির মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের কাজ সীমিত। তাদের কার্যকলাপ দেখে মনে হয়, কমিশন সরকারের একটি অনুগত অফিস মাত্র। তারা আওয়ামী লীগের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব দেখাচ্ছে।
চাচির কথা শুনে চাচা তীব্র প্রতিবাদ জানালেন, হ্যাঁ। তারা পক্ষপাতিত্ব যদি দেখায়ই সেটা বিএনপির পক্ষে। কারণ খালেদা জিয়া যেখানে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন, শেখ হাসিনা সেখানে কেন নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন না?
খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন, কে বললো? মন্ত্রী শাজাহান খান তো বলে দিয়েছেন, ‘খালেদা জিয়া একজন খুনি। জামায়াত-বিএনপি মানুষ হত্যাকারী। এইসব খুনিদের রাজপথে নামার কোন সুযোগ দেয়া হবে না।’ এরপর খালেদা জিয়া কিভাবে নির্বাচনী প্রচারে নামবেন, তা দেখার বিষয়। চাচি জানালেন।
আমি বললাম, দেশটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারছে না কিছু উস্কানিমূলক বক্তব্যের কারণে।
উস্কানিমূলক বক্তব্য কেবল দেখছো। উস্কানিমূলক কার্যকলাপ তো দেখছো না।
বললাম, নতুন করে আর কিছু ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। আমি মনে করি, নির্বাচনী আবহ তৈরির জন্য সবারই শান্ত থাকা উচিত। এ জন্য দু’পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে।
নির্বাচন যদি নিরপেক্ষ হয় তোমার আপত্তি আছে? চাচি জিজ্ঞাসা করলেন চাচাকে।
নিরপেক্ষতা অর্থ কি তা জানি না। যে কোনভাবেই হোক আওয়ামী লীগকে জিততে হবে।
কি বলতে চাও তুমি?
আওয়ামী লীগকে জিততে হবে এ জন্য যে, গত ৩ মাসে দেড়শ’ মানুষ পেট্রলবোমায় নিহত হয়েছেন। নির্বাচনে বিএনপি জিতে গেলে দেশে পেট্রলবোমার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। প্রমাণিত হবে আন্দোলনের নামে নাশকতা জনগণ মেনে নিয়েছে।
এটা তো মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের কথা। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা নয়।
না। শুধু মন্ত্রীর কথা নয়। এটা সকল জনগণের কথা। চাচা বললেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড মানে হচ্ছে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়যুক্ত হওয়া।

ইলিয়াসের অপেক্ষায় তিন বছর by কাফি কামাল

অপেক্ষায় কেটে গেছে তিনটি বছর। পরিবার, স্বজন ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের কাছে এখনও ফিরে আসেনি বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলী। কেউ জানে না তিনি জীবিত না মৃত। তবুও তাকে ফিরে পেতে এখনও আশাবাদী তার পরিবার। ২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল রাত সাড়ে ১১টায় দীর্ঘদিনের আড্ডাস্থল হোটেল রূপসী বাংলা থেকে বনানীর বাড়িতে ফেরার পথে নিখোঁজ হন তিনি। তার নিখোঁজের ৩ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ইলিয়াস আলী কি বেঁচে আছেন? তার সন্ধান কি আর কোন দিনই পাওয়া যাবে না? এমনটাই প্রশ্ন সবার মনে। সেদিন নিজের বাড়ি থেকে মাত্র কয়েকশ’ মিটার দূরে মহাখালীর আমতলী মোড় থেকে তাকে চালকসহ অপহরণ করা হয়। জানা যায়, হঠাৎ পেছন থেকে একটি গাড়ি তার গাড়িতে আঘাত করে। গাড়ি থেকে নেমেছিল চালক আনসার। দ্রুত তাদের মারধর করে দুটি গাড়িতে তুলে নেয়া হয় অজানার উদ্দেশে। পরিত্যক্ত অবস্থায় তার গাড়িটি পড়ে থাকে সেখানে। ঘটনার অন্তত দুইঘণ্টা পর রাত দেড়টায় পুলিশ ফোন করে পরিত্যক্ত গাড়ির কথা জানায় ইলিয়াসের পরিবারকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা নানা সময়ে গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন, ইলিয়াস আলীকে যখন তুলে নেয়া হয় তখন তাদের চ্যালেঞ্জ করেছিলেন কাছেই ডিউটিরত এক পুলিশ কর্মকর্তা। চিৎকার চেঁচামেচি শুনেছিল পাশের নির্মাণাধীন ভবনের প্রহরীরা। নিজের চোখে দেখেছেন মোড়ের ডাব বিক্রেতা। ঘটনার বিহ্বলতা কাটিয়ে পরদিন গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলার চেষ্টা করেছিলেন তাদের কেউ কেউ। কিন্তু তারপর থেকে তাদের আর কোন খোঁজ নেই। প্রথম কয়েকদিন গুমের বিষয়টিকে পাত্তাই দেয়নি সরকার। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কেউ বলেছেন, খালেদা জিয়ার পরামর্শে আত্মগোপনে গেছে ইলিয়াস। কেউ বলেছেন, দলের লোকজনই তাকে অপহরণ করেছে। গুমের চারদিনের মাথায় প্রথম র‌্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে ইলিয়াসের স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের পুবাইল এলাকায় নিষ্ফল অভিযান চালায়। এরপর ইলিয়াসের খোঁজে আর কোন অভিযান দৃশ্যমান হয়নি। জানা গেছে, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, সিলেটের ভারতীয় সীমান্তবর্তী কিছু চা-বাগানে কয়েকটি অভিযান চালানো হয়েছে। প্রথম থেকেই বিএনপির তরফে অভিযোগ ইলিয়াসকে তুলে নিয়ে গেছে সরকারি কোন বাহিনীর সদস্যরা। ইলিয়াসের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বিএনপি হরতাল ডাকে। ২০১২ সালের ২৩শে এপ্রিল হরতালের দিন বিশ্বনাথ থানা ঘেরাও করতে উপজেলার বিভিন্নস্থান থেকে এলাকাবাসী মিছিল নিয়ে এগোতে থাকে বিক্ষুব্ধ জনতা। পুলিশের গুলিতে সেখানে তিনজন প্রাণ হারান। সারা দেশে প্রাণ দেন ৮ জন। ইলিয়াসের সন্ধান চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তার পরিবার। প্রধানমন্ত্রী সান্ত্বনা দিয়েছেন তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীরকে। মাথায় হাত বুলিয়েছেন তার সন্তানদের। উদ্ধারে সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাসও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঈদের উপহার হিসেবে বাবাকে ফেরত চেয়েছিল তার ছোট্ট মেয়ে সাইয়ারা নাওয়াল। ইলিয়াস ইস্যুতে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে চিঠি দেয় বিএনপি। বাংলাদেশ সফররত তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে পিতার সন্ধানে সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছিল ইলিয়াসের মেয়ে সাইয়ারা নাওয়াল। বাংলাদেশ সরকারকে স্বাধীন তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যুক্তরাজ্য সরকার ও ইইউ’র ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরাও অনুরোধ জানিয়েছেন। ইলিয়াসকে উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের কাছে আহ্বান ও অনুরোধ জানিয়েছেন অসংখ্য দেশী ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। কিন্তু এখনও সন্ধান মেলেনি ইলিয়াসের। গুম হওয়ার পর নানা সময়ে ইলিয়াসের মোবাইল নাম্বার থেকে ফোন আসার দাবি করেছেন অনেকেই। ইলিয়াসের ব্যাপারে তদন্তের অগ্রগতি জানাতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। প্রথম কিছুদিন তা জানানো এবং গণমাধ্যমে সংবাদও হয়েছিল। কিন্তু এখন তদন্তের অগ্রগতি জানানো হয় কিনা জানা যাচ্ছে না। ইলিয়াস এবং তার গাড়িচালক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় একটি মামলা পর্যন্ত হয়নি। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ইলিয়াসের স্ত্রী এ ঘটনায় বনানী থানায় একটি জিডি করেন। পুলিশ এখনও সেই জিডির সূত্র ধরেই মামলার তদন্ত করে যাচ্ছে।
আল্লাহর উপর ভরসা করে আছি: লুনা
ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, তিনটি বছর পেরিয়ে গেল কিন্তু আমাদের অপেক্ষার শেষ হলো না। এখন আল্লাহর ওপর ভরসা করা ছাড়া আমাদের আর কিইবা আছে। ইলিয়াস নিখোঁজ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে উনার সহযোগিতা চেয়েছিলাম। তিনি আমাদের সান্ত্বনাও দিয়েছিলেন। যদিও কোন অগ্রগতি হয়নি। পরে কয়েকবার চেষ্টা করলেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ আর পাইনি। তিনি বলেন, প্রথম কয়েক মাস আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী খোঁজ-খবর করতেন। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় ধরে তাদের কোন উদ্যোগ দেখিনি। আমাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেনি। লুনা বলেন, পুলিশ কয়েকমাস আদালতে রিটের জবাব দিয়েছিল। কিন্তু সেখানেও ইতিবাচক কোন উদ্যোগ দেখিনি। বছর খানেক আদালতের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়েছি। সবখানেই কেবল অনিশ্চয়তা। তিনি বলেন, প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্ত ইলিয়াসের অপেক্ষা পার করেছি আমরা। আমাদের তিন সন্তানকে বুকে জড়িয়ে দিন কাটাচ্ছি। আমাদের বড় ছেলেটি এবার এলএলবি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। উচ্চ শিক্ষার জন্য তার বৃটেনে যাওয়ার কথা আছে। মেঝ ছেলেটি এবার নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে। মেয়েটি ক্লাস ফাইভে পড়ছে। ইলিয়াসের অনুপস্থিতি তাদের সবসময় মানসিকভাবে বেদনার্ত করে রাখে। তিনি বলেন, ইলিয়াস নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের জগৎ সীমিত হয়ে পড়েছে। আমি একটি চাকরি করি, সামান্য আয়ে অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে দিয়েই চলে সংসার। লুনা বলেন, ইলিয়াসের সন্ধান দাবিতে বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগরে প্রতি মাসের ১৭ তারিখে কর্মসূচি পালন করে ইলিয়াস মুক্তি পরিষদ। মাঝে মধ্যে দলের নেতারা তাদের বক্তব্যে ইলিয়াসের নাম স্মরণ করে, তার সন্ধান ও মুক্তি দাবি করে এটুকুই এখন আমাদের সান্ত্বনা। ইলিয়াসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পদটি থাকলেও সিলেট জেলা কমিটি ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে। সেখানে অবশ্যই আমাকে প্রথম সদস্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে মাঝে-মধ্যে সাক্ষাৎ করি। সর্বশেষ তিনি অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় জানুয়ারি মাসে গুলশান কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। মাঝে মধ্যে নেতারা খোঁজ-খবর নেন। ইলিয়াসের নিখোঁজের দিন আজ দলের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপনের নেতৃত্বের একটি প্রতিনিধি দল আমাদের বাসায় আসার কথা আছে। ওদিকে এখনও থামেনি ইলিয়াসের মা সূর্যবান বিবির চোখের জল। সন্তান হারা বৃদ্ধা মাকে সান্ত্বনা দিতে প্রতিদিন তাদের গ্রামের বাড়িতে যান নেতাকর্মীসহ এলাকার মানুষ।

ইট বেঁধে স্কুলছাত্রের লাশ ফেলা হয় নদীতে

নিখোঁজের চার দিন পর মেধাবী স্কুলছাত্র সাজেদুর রহমান সাহিদের (১১) বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় অভয়নগর উপজেলার চোমরডাঙ্গা এলাকায় মুক্তেশ্বরী নদীতে বস্তাবন্দি লাশ ভাসতে দেখে পথচারীরা। পরে থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। নিহত সাহিদ মনিরামপুর উপজেলার পাঁচাকড়ি গ্রামের সাইফুর রহমানের ছেলে ও নেহালপুর এডাস আইডিয়াল স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। তবে সন্দেহের তীর চাচাতো ভাইয়ের পরিবারের দিকে।
এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী। হত্যার বিচার দাবিতে বৃহস্পতিবার স্থানীয় বালিদহ পাঁচাকড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার : নিহত সাহিদের পিতা সাইফুর রহমান জানান, ১১ এপ্রিল সন্ধ্যার আগে স্থানীয় ট্যাকারঘাট ব্রিজের পাশ থেকে তার ছেলে সাজেদুর রহমান সাহিদ নিখোঁজ হয়। ওই দিন মনিরামপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি। দু’দিনেও কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্য, শিক্ষক ও এলাকাবাসী বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। ১৩ এপ্রিল যশোর র‌্যাব ক্যাম্পে অভিযোগ দেয়া হয়। কিন্তু তারাও সন্ধান মেলাতে পারেনি। র‌্যাব পুলিশের পাশাপাশি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেয়া হয়। কিন্তু তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। বুধবার সন্ধ্যার দিকে অভয়নগর উপজেলার চোমরডাঙ্গা এলাকায় মুক্তেশ্বরী নদীতে একটি বস্তা ভেসে যেতে দেখেন পথচারীরা। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় তাদের সন্দেহ হয়। তারা স্থানীয় ভবদহ পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেন। পুলিশ এসে লাশ নদী থেকে উত্তোলন করে। এরপর আমরা গিয়ে লাশটি শনাক্ত করি। লাশের কোমরে ও বাম হাতের ক্ষত চিহ্ন রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে তাকে হত্যা করে বস্তাবন্দি করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। তিনি জানান, বস্তার মুখে রশিতে দুটি ইট বাধা রয়েছে। দুটি ইট মনিরামপুরের সুন্দলী এলাকার দিপ্র বিকসের তৈরি।
অভয়নগর থানার ভবদহ পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই আসাদ যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে বুধবার সন্ধ্যায় লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বস্তাবন্দি লাশের সঙ্গে দুটি ইট পাওয়া গেছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য বৃহস্পতিবার সকালে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। বিকালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
হুমকি ও ফ্লেক্সিলোড দাবি করা মোবাইল নম্বরটি সাইফুরের চাচাতো ভাইয়ের : কী কারণে কেন স্কুলছাত্রকে হত্যা করা হল তা নিয়ে এলাকায় আলোচনার ঝড় বইছে। এলাকাবাসী এ বিষয়ে মুখ খুলছে না। তবে নিহতের পরিবার ও অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, সাইফুর রহমানের চাচাতো ভাই আসাদ গাজীর সঙ্গে বিরোধ ছিল ঘেরের হারি নিয়ে। কয়েক মাস আগে তাদের মধ্যে ঝগড়াও হয়। সেই সময় আসাদ গাজী সাইফুরকে দেখে নেয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। ছেলে নিখোঁজের পর থেকে তার সন্দেহ চাচাতো ভাইয়ের দিকেই। রোববার একটি বাংলালিংক ও অপর একটি রবি নম্বর থেকে ফোন করে সাইফুর রহমানকে হুমকি দেয়া হয়। একই সঙ্গে দুই হাজার টাকাও দাবি করা হয়। বাংলালিংক ০১৯১০-১৫২৮০৮ নম্বরের গ্রামের একটি ফ্লেক্সিলোডের দোকান (যার নম্বর ০১৭২০৩৭৬৫৮৬) থেকে দুই হাজার টাকা পাঠান সাইফুর রহমান। এছাড়াও ০১৮৬৭-৭০৯৬৯৬ নম্বর থেকে হুমকি দেয়া হয়। ওই নম্বরের মোবাইল ফোন সাইফুর রহমানের চাচাতো ভাই আসাদ গাজীর ছেলে আলামিনের ব্যবহৃত বলে জানা গেছে।
শোকের মাতম গ্রামজুড়ে : দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে সাইফুর রহমান ও তাহেরা দম্পতির সুখের সংসার। বড় ছেলে সাজেদুর রহমান সাহিদ পঞ্চম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র। তাকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল তাদের। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তারা দু’জনই। তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা কারও জানা নেই। গ্রামের নারী-পুরুষ শিশু সবাই সাহিদের জন্য কাঁদছে। খুনিদের বিচারের দাবিতে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বালিদহ পাঁচকড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অভিভাবকের অংশগ্রহণে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা নানা স্লোগানসংবলিত প্লাকার্ড নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।
নেহালপুর এডাস আইডিয়াল স্কুলের অধ্যক্ষ আলমগীর সাজ্জাদ বলেন, সাজেদুর রহমান সাহিদ পঞ্চম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র। আমার স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে দশজন বৃত্তি পাওয়ার মতো তার মধ্যে সাহিদ ছিল অন্যতম।
অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার বিকালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।

আ.লীগের ১৬ প্রার্থীকে মামলা থেকে রেহাই by হারুন আল রশীদ ও মোশতাক আহমেদ

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ১৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে ২২টি হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা থেকে বিভিন্ন উপায়ে রেহাই দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নয়জনের পাঁচটি হত্যা ও সাতটি হত্যাচেষ্টার মামলা আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়।
২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৯৩টি সাধারণ ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। অন্য ১০টি মামলা কবে প্রত্যাহার করা হয়েছে, তা হলফনামায় উল্লেখ নেই। তাঁরা এসব মামলাকে মিথ্যা হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেছেন, ষড়যন্ত্র বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শত্রুতা করে এসব মামলা করেছিল।
স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন নির্দলীয় হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে দলীয়ভাবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই দলের পক্ষ থেকে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে সমর্থন দিয়েছে। ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপি-সমর্থিত ৫৪ জন প্রার্থীর নামে বর্তমানে ফৌজদারি মামলা আছে। এঁদের মধ্যে অন্তত ১৭ জন হত্যা মামলা এবং ২২ জন হত্যাচেষ্টার মামলার আসামি। এসব মামলার বেশির ভাগই ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা। কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে করা মামলাও রয়েছে।
উত্তর সিটি: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩৬টি সাধারণ ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা বা হত্যাচেষ্টার মামলা হলেও চারজনই হয় অব্যাহতি অথবা খালাস পেয়েছেন। বাকি দুজনের মামলা বিচারাধীন।
এ ছাড়া চারজনের বিরুদ্ধে অন্য ধারায় মামলা থাকলেও সেগুলো প্রত্যাহার, খালাস বা নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে ২৫ জনের বিরুদ্ধে বর্তমান ও অতীতে কোনো মামলা ছিল না।
হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী সলিম উল্লাহ সলুর বিরুদ্ধে ৩০২/৩৪ দণ্ডবিধিতে চারটি মামলা ছিল। এর মধ্যে সব কটি থেকেই অব্যাহতি বা খালাস পেয়েছেন তিনি।
৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী জামাল মোস্তফার বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা ছিল। কাফরুল থানায় ৩০৭ ধারায় করা একটি মামলা (২৮ নম্বর মামলা) তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে তাঁকে অব্যাহতি দিয়েছেন। বাকি চারটি মামলার তিনটি প্রত্যাহার ও একটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে জামাল মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করতে এসব মামলা করেছিল, যা মিথ্যা। তাঁর ভাষায় প্রতিপক্ষ ‘শয়তানি’ করে এসব মামলা করেছিল।
৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুর রউফও দুটি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।
২৪ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী সফিউল্লার বিরুদ্ধে ৩০২/৩৪ দণ্ডবিধিতে ২০০২ সালে তেজগাঁও থানায় মামলা হলেও তাঁকে অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্য ধারায় আরও দুই মামলায় অব্যাহতি ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ফোনে যোগাযোগ করা হলে একজন ফোন ধরে জানান, সফিউল্লা জনসংযোগে ব্যস্ত।
২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ঢাকা উত্তরের আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফরিদুর রহমান খানের বিরুদ্ধে ৩০৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারায় একটি মামলা সাক্ষী পর্যায়ে আছে। তবে মোহাম্মদপুর থানায় করা ৩০২/৩৪ ধারায় করা আরেকটি মামলা থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে ফরিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় ১৫ বছর আগে তাঁদের মহল্লায় একজন ছিনতাইকারীকে পিটিয়েছিল মহল্লাবাসী। তখন বিরোধী দলে থাকায় রাজনৈতিকভাবে তাঁকে ওই মামলায় জড়ানো হয়।
ঢাকা উত্তর সিটির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী কাজী জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৩০৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারায় পল্লবী থানায় একটি মামলা আছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।
এর বাইরে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী মোবাশ্বের চৌধুরীর নামে অতীতে বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি এবং অন্যান্য ধারায় আরেকটি মামলায় প্রত্যাহার করা হয়।
দক্ষিণ সিটি: আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ৫৭ জন প্রার্থীর মধ্যে নয়জন প্রার্থীর পাঁচটি হত্যা ও সাতটি হত্যাচেষ্টার মামলা আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়।
মামলা প্রত্যাহার, অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি ও আদালত থেকে খালাস পাওয়ায় ১২ জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা নেই। পাঁচজনের বিরুদ্ধে এখনো মামলা আছে। ৪০ জনের বিরুদ্ধে অতীতে কোনো মামলা ছিল না, বর্তমানেও নেই।
২ নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষমতাসীন দলের কাউন্সিলর প্রার্থী আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে ৩০২ ধারায় একটি হত্যা মামলা হয়। এ ছাড়া ২০০৭ সালে বিস্ফোরক আইনে ও অন্য ধারায় দুটি মামলা হয়। তিনটি মামলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করেছে বলে তিনি হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মোহাম্মদ আসরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে একটি হত্যা মামলাসহ দুটি মামলা হলেও তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। একইভাবে প্রত্যাহার করা হয় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী সুলতান মিয়ার মামলা। এই হত্যা মামলা হয়েছিল ২০০৬ সালে। ১২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী গোলাম আশরাফের প্রত্যাহার করা মামলাটি ছিল হত্যাচেষ্টার (৩০৭ ধারা)। ৫২ ওয়ার্ডের নাছিম মিয়ার প্রত্যাহার করা মামলাটি হয়েছিল ২০০৩ সালে অস্ত্র আইনে।
জানতে চাইলে সুলতান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে লগি-বইঠার মিছিলের ওপর হামলায় কয়েকজন মারা যান। তখন রাজনৈতিক উদ্দেশে খুনের মামলা হয়। তাঁকেও সেই মামলার আসামি করা হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশে মামলাটি হওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মামলাটি প্রত্যাহার করেছে।
১৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী হোসেন হায়দার হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, ১৯৯৯ সালে তাঁর নামে হত্যা মামলা হয়েছিল। মামলাটি ২০১০ সালে প্রত্যাহার করা হয়। ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী গোলাম মোস্তফার মোট চারটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়। এর মধ্যে একটি হত্যাচেষ্টার। বাকিগুলো বিস্ফোরক আইনসহ দণ্ডবিধির অন্যান্য ধারায়।
দুটি মামলায় পুলিশের অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মোহাম্মদ সাহিদকে। ৫০ ওয়ার্ডের সায়েম খন্দকারের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা ছিল। সবকটি থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি হত্যা ও তিনটি হত্যাচেষ্টার মামলা।
৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী ইলিয়াস রশীদের নামে ২৩টি মামলা ছিল। এর মধ্যে একটি হত্যা ও দুটি হত্যাচেষ্টার। এগুলোর মধ্যে আটটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাকিগুলো থেকে তিনি অব্যাহতি অথবা খালাস পেয়েছেন। তবে তাঁর নামে ২০০৭ সালের একটি হত্যা মামলা এখনো বিচারাধীন।
জানতে চাইলে ইলিয়াস রশীদ বলেন, ২০০১ সালের আগে তাঁর নামে থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) ছিল না। বিএনপির নেতারা খুন করে তাঁর নামে মামলা করেছেন।
৪০ নম্বর ওয়ার্ডের মো. আসাদুল্লাহর বিরুদ্ধে বর্তমানে একটি হত্যা মামলাসহ চারটি মামলা আছে। অতীতে দুটি মামলা ছিল। এর মধ্যে একটি হত্যা মামলা থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চেয়ে তাঁকে ফোন করলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে সংযোগ কেটে দেন।
৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাসান আসকারীর নামে বর্তমানে একটি হত্যা মামলা আছে। একটি হত্যা মামলাসহ তিনটি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের আবুল কালাম। তবে তাঁর নামে এখনো দুটি মামলা আছে। ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের ময়নুল হকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা হয় ২০১৪ সালে। মামলাটি শুনানির অপেক্ষায় আছে।

‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ মন্ত্র কই? by কামাল আহমেদ

গত শতকের শেষ দশকে আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে মোড় ঘোরানো পরিবর্তন আনায় ভূমিকা রেখেছিল ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ স্লোগানটি। ওই স্লোগানটিকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল আমাদের সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ। ওই স্লোগানটি বাস্তবায়নের সবচেয়ে বেশি সুফলও পেয়েছে আওয়ামী লীগ। আবার সেই ভোটের ফল যাতে না পাল্টায়, সে জন্য আরও একধাপ এগিয়ে গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোটগুলো পাহারার ব্যবস্থাও করেছিলেন চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। মহিউদ্দিন চৌধুরী এখন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। কিন্তু দলের ভেতরে ওই স্লোগানের মন্ত্র এখন কেউ উচ্চারণ করেন কি না, সে প্রশ্নের কোনো জবাব তাঁর কাছে নেই। ভোটের লড়াইয়ে এ ধরনের মূল্যবোধ কিংবা ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা গৌণ বিষয়। ‘যেকোনো মূল্যে মেয়র নির্বাচনে জিততে হবে’—একজন মন্ত্রীর এই সদম্ভ ঘোষণার প্রভাবেই এমনটি ঘটছে কি না, সে প্রশ্ন নাহয় না-ই করলাম।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর কথা দিয়ে লেখাটি শুরু করছি এ কারণে যে সপ্তাহ খানেক আগে আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে চট্টগ্রামে গিয়ে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে যে ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা লক্ষ করেছি, তা আমাকে অবাক করেছে। এমনটি মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না। বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর পর যে গাড়িটিতে আমি শহরে গেলাম, তার চালকের কাছ থেকে নির্বাচনের হাওয়া বোঝার চেষ্টা করেই কিছুটা ধাক্কা খেলাম। চালক গফুরের প্রথম কথাতেই আমাদের রাজনৈতিক আলোচনা আর বেশিদূর এগোয়নি। তাঁর কথায় ভোটের হাওয়া কার দিকে, সেটা ভেবে লাভ নেই। ভোট দিতে পারবেন কি না, সেটা নিয়েই তিনি চিন্তিত। তাঁর আশঙ্কা, ভোটকেন্দ্র দখল হবে অথবা ভোটাররা কেন্দ্রেই যেতে পারবেন না। অথচ সন্ধ্যা নাগাদ শোনা যাবে বিপুল হারে ভোট পড়েছে।
চট্টগ্রামে দুই দিনের অবস্থানকালে একদিন সন্ধ্যায় একের পর এক তিনজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকের সঙ্গে আলাদা করে দেখা করি। বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও আবদুল্লাহ আল নোমান, আর আওয়ামী লীগের এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ভোটাররা নিরাপদ-নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারবেন কি না, সাধারণ মানুষের এই উদ্বেগ সম্পর্কে তাঁদের মতামত জানতে চাইলে কেউই তা দৃঢ়তার সঙ্গে নাকচ করতে পারেননি। বরং তাঁরাও বলেছেন যে কেন্দ্র দখলের চেষ্টা হলে রক্তারক্তি হয়ে যাবে। চট্টগ্রামে ‘যাঁর ভোট তিনি দিতে পারবেন’ কি না, সেই শঙ্কা আরও জোরদার হয়েছে সেখানকার একটি হাউজিং কো-অপারেটিভ সোসাইটির নির্বাচনের পর। ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত দ্য চিটাগাং হাউজিং কো-অপারেটিভ সোসাইটির নির্বাচনে সভাপতির পদে প্রতিদ্বন্দ্বীরা অজ্ঞাত এক কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ালেও সেখানে ব্যাপক জাল ভোট পড়ার ঘটনা ঘটে (দুই সভাপতি প্রার্থী সরে গেলেন, তবু জাল ভোট; প্রথম আলো, ৫ এপ্রিল, ২০১৫)। সংগঠনটির বিদায়ী সভাপতি, দৈনিক আজাদীর সম্পাদক আব্দুল মালেক এবং চৌধুরী মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন কী কারণে ভোটের আগে আগে সরে দাঁড়ালেন, তা অবশ্য এখনো রহস্যাবৃত। স্থানীয় মানুষের ধারণা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী আ জ ম নাছির উদ্দিন পুরো সমিতিতে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চান বলেই অন্য পদগুলোতেও ভিন্নমতাবলম্বী কারও জেতার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। এই ধারণাটিকে তাঁর দল আওয়ামী লীগের নেতারাও নাকচ করে দিতে পারেননি। তিনি এখন এ মাসে তাঁর দ্বিতীয় নির্বাচনে মেয়র পদের জন্য লড়ছেন। ছোট নির্বাচনটি যে বড় নির্বাচনের মহড়া ছিল না, সেটা প্রমাণ করা অবশ্য এখন তাঁরই দায়িত্ব।
চট্টগ্রামের নির্বাচনে আপাতদৃশ্যে একটি বড় ইস্যু হচ্ছে জলাবদ্ধতার সংকট। পুনর্নির্বাচনপ্রত্যাশী মোহাম্মদ মনজুর আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ যে গত পাঁচ বছরে তিনি এই জলাবদ্ধতা দূর করায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেননি। গত সপ্তাহের আগাম কালবৈশাখীর দিনে অল্পক্ষণের বৃষ্টিতে মহানগরের রাস্তাঘাটের কোথাও কোথাও বুকসমান পানি জমে যাওয়ায় নাগরিক ভোগান্তির যেসব ছবি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ফলাও করে ছাপা হয়েছে, ভোটের দিন অথবা তার আগের কয়েক দিনে সে রকম ভোগান্তির পুনরাবৃত্তি নিঃসন্দেহে তাঁর জন্য শুভ হবে না। তাঁর বিরুদ্ধে করপোরেশনকে দলীয় আখড়ায় রূপান্তরের কোনো অভিযোগ নেই, এটা সত্য। কিন্তু গাড়িচালক গফুরের চোখে তাঁর ভাবমূর্তিটা একজন অক্ষম মেয়রের রূপক। হতে পারে উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার তাঁর প্রতি অবিচার করেছে। কিন্তু সাধারণ নাগরিকেরা তা সেই রাজনীতির গভীরে যাবেন না। তাঁদের কাছে নগরের দৃশ্যমান চেহারাটিই মেয়রের সামর্থ্য বা অসামর্থ্য এবং যোগ্যতা বা অযোগ্যতার স্মারক নমুনা।
অবশ্য সেখানকার রাজনীতিকদের বিশ্বাস, জাতীয় রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এই নির্বাচনে ভোটারদের অনেকটাই প্রভাবিত করবে। বিএনপির দুই নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও আবদুল্লাহ আল নোমান এবং আওয়ামী লীগের মহিউদ্দিন চৌধুরী—তাঁরা সবাই অন্তত এই একটি বিষয়ে একমত। মহিউদ্দিন চৌধুরী অবশ্য এই নির্বাচনে তাঁর মনোনয়ন না পাওয়ার বিষয়ে আমার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, এই নির্বাচনে চট্টগ্রামের আসল সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। তাঁর মতে, চট্টগ্রামের সমৃদ্ধি যে বন্দরের ওপর নির্ভরশীল, সেই বন্দর রক্ষার বিষয়টি নির্বাচনে উপেক্ষিত থেকে যাওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদের জন্য বিশেষ পরিচিতি পাওয়া মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিশ্বাস, গভীর সমুদ্রে একাধিক বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা চট্টগ্রামের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে। তিনি মনে করেন যে মেয়র হলে তিনি সরকারের ওই পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়াবেন বলেই ক্ষমতাসীন দল তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি। তাঁর এই মর্মপীড়া কিংবা ক্ষোভ আপাতদৃশ্যে তিনি ঝেড়ে ফেললেও তাঁর ভক্ত-সমর্থকেরা যে সেটা মানতে পারছেন না, তা বেশ ভালোই টের পাওয়া যায়। মহিউদ্দিন-ভক্তরা যে সবাই আবার দলের লোক, তা-ও নয়। তাঁরা আ জ ম নাছিরের অতীতের প্রতি ইঙ্গিত করে যে আশঙ্কার কথা বলছেন, তা সম্ভবত উপেক্ষণীয় নয়। তাঁর বিরুদ্ধে যে হত্যাচেষ্টার মামলা রয়েছে, সেটি হচ্ছে নিজ দলের কর্মীর ওপর হামলার অভিযোগ এবং তা-ও ঘটেছিল ১৯৯৩ সালের ২৪ জানুয়ারি দলীয় প্রধানের এক জনসভায়। এখন প্রায় ২২ বছর পর তিনি দলীয় মনোনয়নে প্রার্থী হওয়ার পর মামলার বাদী সুফিয়ান সিদ্দিকী পুরো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছেন। তিনি এখন আর এজাহারের সই চিনতে পারেন না এবং আসামির গাড়িতে করে আদালত ছাড়েন। হাউজিং সোসাইটির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরে যাওয়ার মতো একের পর এক সব বাধা অপসারিত হয়ে যাওয়াটা কি কোনো ইঙ্গিত বহন করে?
আমার ভোটটি আমি দিতে পারব কি না, সেই শঙ্কাটি যে শুধু চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। বেসরকারি সংগঠন, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) এক সভায় ৫ এপ্রিল ঢাকায় তরুণেরা সে রকম আশঙ্কাই প্রকাশ করেছেন (প্রথম আলো, ৬ এপ্রিল, ২০১৫)। পিপলস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আলোচনায় ওই সব তরুণ ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং পরে উপজেলা নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নিজেদের ভোট নিজেরা দিতে পারবেন কি না, সেই আশঙ্কার কথা বলেছেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, যিনি আগের মেয়াদে ছিলেন প্রশাসনের দায়িত্বে, ছাত্রলীগের এক সভায় তাঁর বহুল আলোচিত বেফাঁস স্বীকারোক্তির কথাই-বা কীভাবে উপেক্ষা করা যায়? এবারে চট্টগ্রামের রাজনীতির বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন সাংবাদিক নির্বাচন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ওই উপদেষ্টার আরেকটি কীর্তির কথা আমাকে শোনালেন। তিনি জানালেন, ২০১০ সালের মেয়র নির্বাচনের সময়েও ওই উপদেষ্টা চট্টগ্রামে কয়েকটি ভোটকেন্দ্র দখলে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু মহিউদ্দিন চৌধুরী তা নাকচ করে দিয়ে তাঁকে বলেছিলেন যে ভোটকেন্দ্র দখলের রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাস করেন না এবং শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজিত হন। অবশ্য, বিষয়টি সম্পর্কে ওই উপদেষ্টার কাছে জানতে চাইলে প্রথম আলোর কাছে তিনি তা স্রেফ অপপ্রচার বলে নাকচ করে দিয়েছেন।
ভোট, ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণরায়ের যথাযথ প্রতিফলন ঘটার বিষয়গুলো নিয়ে সবাই যখন এক অনিশ্চয়তার দোলাচলে, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ মন্ত্রটির উচ্চারণ কি আবারও আমরা শুনতে পাব? নাকি ভোট দখলের কোনো প্রহসন রাজনীতিকে আবারও রক্তারক্তির পথে ঠেলে দেবে?
কামাল আহমেদ, সাংবাদিক।

‘গরু ধরাছোঁয়ার বাইরে’ by কমল জোহা খান

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গরুর মাংসের দোকানে ব্যস্ত
এক বিক্রেতা্ । ১৭এপ্রিল, এর ছবি । ছবি: জাহিদুল করিম
বড় আকারের গরুর রান কাটছিলেন মাংস বিক্রেতা মো. বিপ্লব। সামনে গোমড়ামুখে দাঁড়িয়ে ক্রেতা আতিকুর রহমান। অসহায়ভাবে তিনি বলে ওঠেন, ‘মাছের দিকে তো তাকানোই যাচ্ছে না। এখন মাংসও প্রায় ৪০০ টাকা কেজি!’
তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই বিপ্লব চটপট বলেন, ‘ভাই, কি আর করমু, ইন্ডিয়া থাইক্কা গরু আইতাছে না। ৩৮০ টাকার নিচে এক কেজি গোস (মাংস) বেচতে পারুম না।’ তিনি বলে ওঠেন, ‘ভাই, গরু ধরাছোঁয়ার বাইরে। কয়দিন পর ৪০০ টাকাও গোস পাইবেন না।’
আজ শুক্রবার রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের মাংস বাজারে গিয়ে দেখা যায় এই দৃশ্য। শুধু মিরপুর নয়, সারা দেশেই গরুর মাংসের দাম হু হু করে বাড়ছে। ক্রেতা-বিক্রেতারা বলছেন, তিন মাসের ব্যবধানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম বেড়ে গেছে ১৫০ টাকারও বেশি।
বিক্রেতারা প্রথমে বলেছিলেন, হরতাল-অবরোধের কারণে দাম বাড়ছে মাংসের। এখন তাঁরা বলছেন, ‘ভারত থেকে গরু আসছে না।’
পয়লা বৈশাখের দিন ইলিশ মাছের দিকে হাত বাড়াতে সাহস পাননি মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষ। বিকল্প হিসেবে গিয়েছিলেন মাংসের বাজারে। মুখ গোমড়া করে ফিরে আসতে হয়েছে তাঁদের। সেদিন এক কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল ৪০০ টাকা।
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলমের ভাষ্য, ‘তিন মাসে দেশি গরু দিয়া বাজার চলতাছে। ইন্ডিয়ায় বর্ডার বন্ধ কইরা দিছে। গরু আনতে গেলে গুলি করে। সিটি করপোরেশন, প্রশাসন সবাইরে কইতাছি কিছু করনের লইগ্যা। কিন্তু কেউ কিছু কয় না।’ তিনি বলেন, এক সপ্তাহের জন্য সীমান্ত থেকে গরু আনার অনুমতি দিলে বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
এ ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম মাসুদ আহসান বলেন, ‘আমরা মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি। সীমান্ত দিয়ে কিংবা অন্য কীভাবে গরু আসবে, এ ব্যাপারে আমরা কিছু করতে পারব না। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি জানাব।’
গরুর দাম বাড়ার বিরূপ প্রভাব পড়েছে খাসি ও মুরগির মাংসে। রাজধানীর একাধিক বাজার ঘুরে জানা গেছে, খাসির মাংস ৬০০ টাকার নিচে নয়। ব্রয়লার মুরগির মাংস একলাফে বেড়েছে ৪০ টাকা। মার্চ মাসের প্রথম দিকে এক কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৩০ টাকা। আজ সকালে এর দাম উঠেছে ১৭০ টাকা। দেশি মুরগি কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ থেকে ৩৮০ টাকায়। সোনালি জাতের মুরগির দাম ২৪০ টাকা থেকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়ে হয়েছে ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা।
মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের মুরগি-বিক্রেতা সোহেল রানা বলেন, ‘অবরোধের সময় বিয়া-শাদীর মতো অনুষ্ঠান কম ছিল। তহন মুরগির দামও কম ছিল। অহন অবরোধ নাই। তাই অনুষ্ঠান বেশি হইতাছে, মুরগির দামও বাড়ছে।’
শুকনা মৌসুমের অজুহাতে মাছের দামও যেন টগবগ করছে। বলা হচ্ছে, খালবিল শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এক কেজি কাচকি মাছ সাড়ে ৩০০ টাকা। মাঝারি আকারের রুই-কাতল মাছ ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। বড় মাগুর মাছ এক হাজার ২০০ টাকা। ছোট শিং ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। ইলিশের দাম শুনলে ক্রেতাদের প্রাণবায়ু যায়-আসে। রাজধানীর সুপারশপগুলোতে এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম আড়াই হাজার টাকা হাঁকা হচ্ছে। বাজারে ৫০০ গ্রাম ওজনের চারটি ইলিশের দাম হাঁকা হচ্ছে এক হাজার ৬০০ টাকা।

ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থীদের ১৩ অঙ্গীকার

হাতে হাত রেখে ঢাকা দক্ষিণের মেয়রপ্রার্থীরা জনতার সামনে ১৩টি অঙ্গীকার করেছেন। নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা, নির্বাচিত হলে সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত, কার্যকর ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ঢাকাকে যানজটমুক্ত, মাদকমুক্ত, ভেজাল খাবারমুক্ত একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন নগরীতে পরিণত করারও অঙ্গীকার করেন তারা। গতকাল বিকালে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স-বাংলাদেশে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম (নাসফ)-এর যৌথ উদ্যোগে জনগণের মুখোমুখি হন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থীরা। তারা উপস্থিত ভোটারদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন এবং নিজ নিজ বক্তব্যে সিটি করপোরেশনকে ঘিরে নিজেদের প্রত্যাশা ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। মেয়রপ্রার্থীদের অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে নির্বাচনে টাকার প্রভাব খাটানো ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকা, সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত, কার্যকর ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা, সকল নির্বাচিত কাউন্সিলরকে নিয়ে যৌথ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সিটি করপোরেশন পরিচালনা করা, সম্পদ বৃদ্ধিসহ স্থানীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা, খাদ্য, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা প্রভৃতি মৌলিক মানবিক চাহিদা নিশ্চিত করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা, সকল কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি পরিহার করা, দখলকৃত ভূমিসহ সকল ধরনের জলাশয় দখলমুক্ত করা এবং নির্বাচিত হলে প্রতিবছর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পদ, আয়-ব্যয় ও দায়-দেনার হিসাব প্রকাশ করার ঘোষণা দেন তারা। আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী সাঈদ খোকন বলেন, ঢাকা নানা সমস্যায় জর্জরিত ও বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। তবুও আমরা প্রিয়জনদের টানে ঢাকাতেই থাকি। এরকম অসাম্প্রদায়িক নগরী পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন তিনি। হকারদের কিভাবে পুনর্বাসন করবেন- একজন ভোটারের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হকারদের জন্য পথচারীদের সমস্যা হয়। কিন্তু তাদেরও প্রয়োজন আছে। তাই মেয়র নির্বাচিত হলে পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে হকারদের সমস্যার সমাধান করব। ঢাকা দক্ষিণের আরেক মেয়রপ্রার্থী ও সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনি বলেন, প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্কট রয়েছে। এই সঙ্কট দূর করতে হবে। আমি নির্বাচিত হলে নগরবাসীর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক তৈরি করবো। নাগরিকরা সরাসরি মেয়রের কক্ষে গিয়ে তাদের সমস্যার কথা বলতে পারবেন। বাজেট সমস্যাসহ সকল সমস্যা সমাধানে উন্নত দেশের নগরগুলো থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবো। একজন ভোটারের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব ও বিশুদ্ধ খাবার সরবরাহের দায়িত্ব মেয়রদের। কিভাবে মোবাইল কোর্টের সংখ্যা বাড়িয়ে এটা নিশ্চিত করতে হয় তা আমার জানা আছে। অনুষ্ঠানে মেয়রপ্রার্থী এস এম আকরাম নির্বাচিত হলে ভাসমান নাগরিকদের ফ্ল্যাট বানিয়ে দেয়ার অঙ্গীকার করেন। সিপিবিসমর্থিত প্রার্থী বজলুর রশিদ ফিরোজ মেয়র নির্বাচিত হলে নগর কাউন্সিল গঠন করবেন বলে জানান। মেয়র প্রার্থী শফিউল্লাহ চৌধুরী নির্দলীয় হওয়ার মাধ্যমে টেন্ডার সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার করেন। জাসদ সমর্থিত প্রার্থী শহিদুল ইসলাম ঢাকার সব বাড়িতে সিসিটিভি ও ওয়াইফাই সংযোগের ওয়াদা করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ‘নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ (নাসফ)-এর সভাপতি মু. হাফিজুর রহমান ময়না। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জনগণ হলো দেশের মালিক। তাই নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের সম্পর্কে জেনে-শুনে-বুঝে ভোট দেয়া। আজকের এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমরা নাগরিকরা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্র্থীদের যাচাই-বাছাই করে নিতে চাই। আপনারা জানেন, ঢাকা শহর বসবাসের দিক থেকে নিচের দিকে রয়েছে। আমরা চাই এমন একজন মেয়র, যিনি ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করে তুলবেন। সুজনের তৈরি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করায় মেয়রপ্রার্থীদের ধন্যবাদ জানিয়ে ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন আশা করি তারা নির্বাচিত হলে এ অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করবেন। উপস্থিত ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কোন দল না দেখে প্রার্থীর যোগ্যতা দেখে ভোট দিতে হবে। তাই ভোট দেয়ার আগে প্রার্থীদের আয়, পেশা, সম্পদ, মামলা ইত্যাদি জেনে নিতে হবে। অনুষ্ঠানের শেষে ভোট প্রদানকে পবিত্র দায়িত্ব মনে করে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীর স্বপক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার অঙ্গীকার করেন উপস্থিত ভোটারগণ। নাসফের সভাপতি মু. হাফিজুর রহমান ময়নার সভাপতিত্বে, সাধারণ সম্পাদক তৈয়ব আলী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার পাঁচ শতাধিক ভোটার উপস্থিত ছিলেন।

তুমি আমার সন্তানের মতো আমাদের কাজ করতে দাও

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাঈদ খোকনকে ‘সন্তানতুল্য’ আখ্যায়িত করে নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালানোর সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস। খোকনের চাচি সম্বোধনের জবাবে তিনি বলেন, তুমি আমার সন্তানের মতো। তুমি তোমার মতো কাজ করো। আমাদের আমাদের মতো কাজ করতে দাও। গতকাল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রচারণা চালানোকালে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। নির্বাচনী প্রচারণাকালে বাধা দেয়ার অভিযোগ করে আব্বাসপত্নী বলেন, সব সময় সাদা পোশাকের লোকজন আমাদের পাশে ঘোরাঘুরি করে। লোকজনকে ডেকে নিয়ে হুমকি দেয়া হচ্ছে। পোস্টার লাগাতে গেলে হয়রানি করা হয়। পোস্টার লাগানোর পরে তা ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার বলেছে- তারা সুষ্ঠু নির্বাচন চায়, আমরাও তা-ই চাই। কেন্দ্রে কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা লাগানো হোক-মানুষ দেখুক কেমন নির্বাচন হচ্ছে। এ সময় দেয়ালে পোস্টার লাগিয়ে সাঈদ খোকন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন বলে অভিযোগ করেন আফরোজা আব্বাস। মির্জা আব্বাসের জনপ্রিয়তায় সরকার ভীত মন্তব্য করে তিনি বলেন, এজন্য সরকার তাকে জামিন দিচ্ছে না। আমার প্রচারণায়ই জনগণের ব্যাপক সাড়া। তিনি থাকলে কেমন হতো বুঝতেই পারছেন। আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে মির্জা আব্বাসের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হবে বলে জানান তার স্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের হয়রানি করার জন্য নানাভাবে নানা ছুতোয় প্রশাসনের মাধ্যমে চাপ দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য আমাদের সমানভাবে প্রচারণা চালানোর ও গণসংযোগের সুযোগ দিতে হবে। আমাদের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নানা অজুহাতে করা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। কিংবা মামলায় জামিন দিতে হবে। প্রার্থীকে নির্বাচনী মাঠে আসার সুযোগ না দিলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে কি করে? এর আগে সকালে সায়েদাবাদের ৪৮নং ওয়ার্ড এলাকার আর কে চৌধুরী ডিগ্রি কলেজসংলগ্ন রোড থেকে মির্জা আব্বাসের পক্ষে নবম দিনের মতো গণসংযোগ শুরু করেন আফরোজা আব্বাস। এরপর ব্রাহ্মণচিরণ সায়েদাবাদ, উত্তর যাত্রাবাড়ী, মীরহাজীরবাগসহ বেশ কিছু এলাকায় গণসংযোগ করেন। এ সময় আফরোজা আব্বাসের সঙ্গে ছিলেন মির্জা আব্বাসের ছোটবোন সাঈদা মির্জা পাসু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম পটু, ৪৮নং ওয়ার্ড কমিশনার প্রার্থী আতিক উল্লাহ আতিকের স্ত্রী নূজহাত আরা, ৫০নং ওয়ার্ড কমিশনার প্রার্থী রায়সুল হাসান হবি, মহিলা কমিশনার প্রার্থী রাশিদা বেগম হীরা, অধ্যক্ষ মাহবুব আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে গতকাল দুপুরে শান্তিনগর বাজার রোড, পীরসাহেব গলি, বেইলি রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক দলের উদ্যোগে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ করা হয়। ওদিকে মাওলানা নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী ওলামা দল রাজধানীর লালবাগ, চকবাজারে মির্জা আব্বাসের পক্ষে গণসংযোগ করেন। এদিকে আজ সকাল ৯টায় কামরাঙ্গীরচর ৫৫নং ওয়ার্ড, ঝাউলাহাটি, খোলমুড়া, ইসলামনগর, আলীনগর, আশ্রাবাবাদ, নূরবাগ, মুসলিমবাগ, ব্যাটারিঘাট, খলিফাঘাট হয়ে হাক্কুল এবাদ সেতু এলাকায় গণসংযোগ করবেন আফরোজা আব্বাস।
এদিকে মির্জা আব্বাসের পক্ষে পুরান ঢাকায় প্রচারণা চালিয়েছে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল। সংগঠনের সভাপতি ইসতিয়াক আজিজ উলফাতের নেতৃত্বে সাদেক আহমদ খান, মিজানুর রহমান খান, কর্নেল (অব.) মনীষ দেওয়ান, মেজর (অব.) আসাদুজ্জামান, সানোয়ার হোসেন, শহীদুল ইসলাম চৌধুরী মিলন, ইঞ্জিনিয়ার নজরুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক রাজা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বর্ষবরণে শ্লীলতাহানি, তোলপাড়- সিসিটিভির ফুটেজ গোয়েন্দাদের হাতে

বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে নারীদের শ্লীলতাহানির ঘটনায় তোলপাড় চলছে সর্বত্র। ন্যক্কারজনক এই ঘটনার দুই দিন অতিবাহিত হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর বুধবার রাতে পুলিশ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা সিসি ক্যামেরাগুলোর ফুটেজ দেখে বখাটেদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। যে কোনভাবে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে পুলিশের অবহেলার বিষয়, কাউকে আটকের পর ছেড়ে দিয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে ও তদন্তে সহযোগিতার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত  কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও টিএসসিতে পুলিশের বিপুল উপস্থিতি ছিলো। ঘটনাস্থল রাজু ভাস্কর্য ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দুই নম্বর গেইট সংলগ্ন এলাকা। সেখানে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করছিল পুলিশ। ঘটনাস্থলের দায়িত্বে ছিলেন সহকারী পুলিশ কমিশনার শামসুল আরেফিন। ঘটনাস্থল থেকে ২৫ গজ দূরে দায়িত্ব পালন করছিলেন শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইদুল হক ভূঁইয়া, মিলন চত্বরে ছিলেন আরও এক দল পুলিশ। এ ছাড়াও সহকারী পুলিশ কমিশনার মেহেদি হাসানও ছিলেন টিএসসি এলাকায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে শুরু থেকেই দুইজন পুলিশ সদস্যকে দেখা গেলেও কোন কর্মকর্তার দেখা মেলেনি। তবে ঘটনাস্থলের পাশে ডাচ বাংলা ব্যাংকের বুথের কাছে এবং মিলন চত্বরে পুলিশ কর্মকর্তারা অবস্থান করলেও তাদের ভূমিকা ছিলো নিষ্ক্রিয়। এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তুহিন কান্তি দাশ জানান, নির্যাতিতা নারীদের উদ্ধার করার জন্য বারবার ওই দুই পুলিশ সদস্যকে অনুরোধ করা হলেও শুরুতে তারা কোন ভূমিকা পালন করেননি। তবে ঘটনার একপর্যায়ে ওই দুই পুলিশ সদস্য লাঠিচার্জ করে বখাটেদের সরিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে থেমে থাকেনি বখাটেরা। এ অবস্থায় নির্যাতিতা নারীদের উদ্ধার করার চেষ্টা করছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লিটন নন্দী, অমিত দে ও তুহিন। পরে তাদের অন্যান্য সহকর্মীরাও নির্যাতিতাদের উদ্ধারে সহযোগিতা করেন। এ সময় ‘পুলিশকে ডাকেন’ বলে বারবার চিৎকার করছিলেন লিটন নন্দী। তখন মিলন চত্বরে থাকা কয়েক পুলিশ সদস্যকে সাহায্য করার অনুরোধ করেছিলেন তুহিন। তুহিন জানান, ওই পুলিশ সদস্যরা তাকে জানিয়েছিলেন, এটি তাদের দায়িত্ব না। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা শুধু এখানেই থেমে থাকেনি। লিটন নন্দী, অমিত ও তুহিন জানান, তারা পাঁচ বখাটেকে ধরে শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আশরাফের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। কিন্তু কিছু সময় পরে এ বিষয়ে আশরাফকে জিজ্ঞাসা করলে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে এসআই আশরাফের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে তার বক্তব্যের জন্য শাহবাগ থানায় গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে পুলিশের উপস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষের সামনে এ ঘটনায় সর্বত্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। নিন্দার ঝড় বইছে সারা দেশে। প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন সংগঠন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অনেকে।
গতকাল ডিএমপি সদর দপ্তরে এক বৈঠকে সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ঘটনাস্থলের বিভিন্ন দৃশ্য নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় যে কোনও মূল্যে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বর্ষবরণ উৎসব উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী ও টিএসসি এলাকা ১৯টি সিসি ক্যামেরা ধারা নিয়ন্ত্রিত ছিলো। উদ্যানের ভেতরে পুলিশ কন্ট্রোলরুমে ছিলো মনিটর। ঘটনার সময় বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত এসব ক্যামেরায় ধারণকৃত দৃশ্যে যৌন হয়রানির কয়েকটি দৃশ্য দেখা গেছে। একটি দৃশ্যে দেখা গেছে,  একজন তরুণীকে চার পাশে ঘিরে যৌন হয়রানি করছিলো এক দল বখাটে। এরমধ্যে এক যুবক ওই তরুণীকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। এ ছাড়াও পেছন থেকে কয়েক যুবককে তরুণীর শরীরে হাত দিয়ে নির্যাতন করতে দেখা গেছে। ধারণকৃত ফুটেজে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি সভাপতি লিটন নন্দীকে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ফুটেজে বস্ত্র হরণের কোন দৃশ্য নেই বলে জানান রমনা জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ইব্রাহিম খান। গতকাল দুপুরে ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, পুলিশের রমনা জোনের উপ-কমিশনার আবদুল বাতেন, অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ইব্রাহিম খান, শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ। লিটন নন্দীসহ প্রত্যক্ষদর্শীরা পুলিশ কর্মকর্তাদের পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন। লিটন নন্দী অভিযোগ করে বলেন, ঘটনাস্থলে দুই পুলিশ সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি স্থানে আরও পুলিশ থাকলেও তারা কেউ এগিয়ে যাননি। এমনকি বখাটেদের ধরে দেয়ার পর তাদের ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তাদের তিনি জানান, প্রথমে তিনি যে তরুণীকে উদ্ধার করেন তার বস্ত্র হরণ করেছিল বখাটেরা। এ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে নিজের পাঞ্জাবি খুলে পড়তে দেন তিনি। বর্বর বখাটেদের অসভ্য আচরণের বর্ণনা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা। এ সময় পুলিশের রমনা জোনের উপ-কমিশনার আবদুল বাতেন সাংবাদিকদের বলেন, সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত দৃশ্য দেখে বখাটেদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ছাত্র  এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সহযোগিতা গ্রহণ করা হবে। কারও কাছে এ ঘটনার কোন আলোকচিত্র, ভিডিও এবং তথ্য থাকলেও তা দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার অনুরোধ করেন তিনি। যৌন হয়রানির এ ঘটনার পর বুধবার রাতে শাহবাগ থানায় অপারেশন অফিসার এ কে আজাদ বাদি হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি মামলা করেছেন। এ কে আজাদ জানান, নির্যাতিতাদের খোঁজ না পেয়েই পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করা হয়েছে। এদিকে যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদে আজ বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে সমাবেশ করবে ছাত্র ইউনিয়ন।

তুহিন মালিকের ২ ও মান্নার ১ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা অনুমোদন

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও টক শো আলোচক ড. তুহিন মালিকের বিরুদ্ধে দুটি ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার বিরুদ্ধে একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার বিচারকাজ শুরু করার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। দেশের গুলশান ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এসব মামলা করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলার নথি এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসেছে। মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে এসব মামলার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গত তিন মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা অনুমোদন দেয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সিএমএম আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে নিয়ে কটূক্তি এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগ ড. তুহিন মালিকের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়। সিএমএম আদালতে দুটি মামলা করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় উপ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক গোলাম রব্বানী। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুল হক রাষ্ট্রের অনুমতি সাপেক্ষে মামলা দুটি এজাহার হিসেবে গণ্য করার জন্য শাহবাগ থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ৩০শে নভেম্বর লন্ডনের ওয়াটার লিলি গার্ডেন অডিটরিয়ামে এক আলোচনা সভায় সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ নিয়ে কটূক্তি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এনে বক্তব্য দিয়েছেন ড. তুহিন মালিক। এসব অভিযোগেই তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়। এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে গুলশান থানায় মাহমুদুর রহমান মান্নার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়। এরপর ৩রা মার্চ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার অনুমোদন দেয় সরকার। বেআইনি পন্থায় সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে এ মামলা করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এসব মামলা এখন আইন অনুযায়ী চলবে।

মিছিলে পাকিস্তানি পতাকা ওড়ানো : কাশ্মীরের দুই মুসলিম নেতা গৃহবন্দী

গৃহবন্দী করা হল কাশ্মীরের দুই মুসলিম নেতা সঈদ আলি শাহ গিলানি ও মাসারত আলম। বৃহস্পতিবার থেকে দু'জনের বাড়ির বাইরেই পুলিস মোতায়েন করেছে জম্মু-কাশ্মীর সরকার। আজ দক্ষিণ কাশ্মীরের ত্রালে একটি জনসভা করার কথা এই দুই নেতারই।
''গিলানিকে গৃহবন্দী করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আগে থেকেই হায়দারপোরায় হুরিয়ত চেয়ারম্যানের বাড়ির বাইরে পুলিস মোতায়েন করা হয়েছে।'' জানিয়েছেন কাশ্মীরের এক পুলিস আধিকারিক। আলমের বাড়ির বাইরেও একই ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে।
আর এক হুরিয়ত নেতা উমর ফারুকের চলাফেরার উপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে, তাঁকেও গৃহবন্দী করা হবে কিনা সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি।
উপত্যকার সরকার পুলওয়ামা জেলায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জনসভার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
বৃহস্পতিবার জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী সঈদ আলি শাহ জানিয়েছিলেন পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানো ও পাকিস্তানপন্থী স্লোগান কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
গতপরশু কাশ্মীরে একটি মিছিলে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মাসারাত আলম। এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন ''হুরিয়ত নয়, পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে ছিল বাচ্চা কিছু ছেলে। তবে এই ঘটনা নতুনতো নয়, আগেও বহুবার এমনটা ঘটেছে।''
গতকাল এই মিছিলের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় কেন্দ্র সরকার। জম্মু-কাশ্মীর সরকারকে অবিলম্বে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। যদিও এখনও পর্যন্ত মুফতি সরকার এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের কথা দেয়নি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তায় হানিকর কিছুর সঙ্গে আপোস করা চলবে না। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রীকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরণ রিজ্জু মুফতি সরকারকে আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। কাশ্মীরের বিজেপি নেতা রাম মাধব জানিয়েছেন ''এ বিষয়ে আমদের অবস্থান খুব স্পষ্ট। কোনও অবস্থাতেই পাকিস্থানপন্থী স্লোগান বরদাস্ত করা হবে না। ইতিমধ্যেই মাসারাতের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। শীগগিরি গ্রেফতার করা হবে ওনাকে। এটা আমাদের সহ্যশক্তির পরীক্ষা নয়। রাজ্য সরকারের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।''
২০০৮ ও ২০১০ সালে কাশ্মীর উপত্যকায় সেনার সঙ্গে সাধারণ মানুষের তীব্র সংঘর্ষ বাঁধে। রাস্তায় যত্র তত্র সেনাকে লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ে আম জনতা। পাল্টা লাঠি ও গুলি চালায় সেনাও। এই সংঘর্ষে কম বেশি ১০০ জনের মৃত্যু হয়। যার মধ্যে অধিকাংশই কিশোর-কিশোরী। অভিযোগ, জনতাকে খেপিয়ে তুলেছিলেন মাসারাত আলমই। পরে তৎকালীন জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর নির্দেশে এই হুরিয়ত নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।
সূত্র : জি-নিউজ।

খালেদা জিয়া ঘরে ফিরেছেন, ‘ওঁরা’ ফিরবেন না by নূহ-উল-আলম লেনিন

‘হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে বিদায় না করে আমি আর ঘরে ফিরব না।’ হাসিনা সরকার বিদায় নেয়নি। কিন্তু তিনি ঘরে ফিরেছেন। ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা ছিল, ধনুর্ভঙ্গপণ করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। ধনুক ভাঙেনি, ভেঙেছেন প্রতিজ্ঞা। তিনি হারেননি, হেরেছে অশুভ বুদ্ধি। তিনি শুভাশুভ, ভালো-মন্দ জ্ঞান হারিয়েছিলেন। তিনি অশুভ শক্তির ওপর ভর করেছিলেন। তারা তাঁকে লঙ্কা জয়ের প্ররোচনা দিয়েছে; তিনি সেই প্ররোচনার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। অশুভ শক্তির এই প্ররোচনার ফাঁদ ভেঙে তিনি যদি অন্ধকার গলি-ঘুপচি বাদ দিয়ে রাজনীতির আলোকোজ্জ্বল মহাসড়কে ফিরে থাকেন, তাহলে তাঁকে পরাজিত বলব কেন? আমি বলব, সত্যিই যদি তিনি অন্ধকারের শক্তির রাহুগ্রাস থেকে নিজেকে বের করে নিয়ে আসতে পারেন, তাহলে আত্মঘাতিনী হওয়ার ‘পাপ’ থেকে রক্ষা পেয়েছেন।
দীর্ঘ তিন মাসের ভয়ভীতি, আতঙ্ক ও অস্বাভাবিক পরিবেশের অবসান শেষে বাংলাদেশ এখন নির্বাচনী যুদ্ধে মাতোয়ারা। সারা দেশ না হোক, রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। নির্দলীয় ভিত্তিতে হলেও এসব নির্বাচনে শাসক দল আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং সিপিবি-বাসদের মতো ক্ষুদ্র বাম দলগুলোর সমর্থিত প্রার্থীরা অংশ নিয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হরতাল-অবরোধের মতো চরমপন্থা বাদ দিয়ে বিএনপি সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারায় সাংবিধানিক নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় ফিরে এসেছে। বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও যদি তাঁরা অংশ নিতেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপট হয়তো ভিন্নতর হতে পারত। ‘সংলাপ সংলাপ’ বলে রাস্তায় চিৎকার না করে জাতীয় সংসদই হতে পারত গণতন্ত্র ও বহুমতচর্চার প্রাণকেন্দ্র। যা হোক, নিঃসন্দেহে এবারের করপোরেশন নির্বাচন সুস্থ গণতান্ত্রিক বিকাশের চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, কোনো অজুহাতে বিএনপি বা অন্য কোনো পক্ষ নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেবে না। নির্বাচনে হার-জিত আছে। হার-জিতের সম্ভাবনাকে মেনে নিয়েই চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। শুনেছি খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবেন। আমরা তাঁকে স্বাগত জানাব। জনগণকে সম্পৃক্ত করার এবং লক্ষ্য অর্জনের এটাই যথার্থ পথ। সন্ত্রাস ও গণবিচ্ছিন্ন অপরাজনীতির পথ থেকে ফিরে এসে, আবার গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার এই সুযোগ তিনি নষ্ট করবেন না বলেই সবার প্রত্যাশা।
টানা ৯০ দিন খালেদা জিয়া যে পথ অনুসরণ করেছেন, সেটা ছিল রাজনৈতিক আত্মহত্যার পথ। এবার অবাস্তব প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ না করলে, কল্যাণবোধের সঙ্গে ‘আপস’ না করলে তো তাঁর রাজনৈতিক অপমৃত্যু হতো। বেগম জিয়া পুত্রশোক, আন্দোলনে ব্যর্থতার গ্লানি এবং প্রতিজ্ঞাভঙ্গের বেদনাবোধ নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। তবু আমরা তাঁকে স্বাগত জানাই।
কিন্তু যাঁরা ঘরে ফেরেননি, আর কোনো দিন ঘরে ফিরবেন না, তাঁদের ঘরের মানুষদের বেগম জিয়া কী জবাব দেবেন? তাঁর ছোট ছেলের অকালমৃত্যু হয়েছে, অপমৃত্যু নয়। বুকে পাষাণ বেঁধে কী অসীম ধৈর্য নিয়ে তিনি পুত্রশোকেও ভেঙে পড়েননি; রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আন্দোলন থেকে একচুল সরে আসেননি। কিন্তু ৯০ দিনে যে ১৩৮ জন মা সন্তান হারালেন, ক্ষমতার লড়াইয়ের বলি হলেন, খালেদা জিয়া তাঁদের কী সান্ত্বনা দেবেন? সাংবিধানিক ধারায় রাজনীতি করলে বেগম জিয়া আবার হয়তো দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ ফিরে পাবেন। কিন্তু এই ১৩৮টি পরিবার কী পাবে? মৃত্যুর ওপার থেকে তাদের স্বজনদের কাউকে তো তিনি ফিরিয়ে দিতে পারবেন না।
খালেদা জিয়াকে এখন গভীরভাবে ভাবতে হবে, যে পথে তিনি হেঁটেছেন, সে পথ সঠিক ছিল কি না। জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরীক্ষিত গণ-আন্দোলনের পথ পরিহার করে অশুভ শক্তিকে লেলিয়ে দিয়ে চোরাগোপ্তা হামলা, পেট্রলবোমা, ককটেল, অগ্নিসংযোগ ও গোলাগুলি করে ১৩৮ জনকে হত্যা, ৩৫০ জনকে অগ্নিদগ্ধ ও ১ হাজার ৫০০ জনকে গুরুতরভাবে আহত করে তাঁর কী লাভ হলো? সম্ভবত ২০১৩ সালে বগুড়ার এক জনসমাবেশে বেগম জিয়া বলেছিলেন, আন্দোলনের জন্য রক্ত দিতে হবে। মানুষ তো রক্ত দিল, কিন্তু তাতে দেশের কী লাভ হলো? সত্য বটে বাংলাদেশের অতীতের অনেক গণ-আন্দোলনে অনেক মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আত্মদান ছাড়া কোনো মহৎ অর্জন হয়নি। তবে কোনো গণ-আন্দোলনেই এত মানুষ নিহত হয়নি। চোরাগোপ্তা হামলা, পেট্রলবোমা মেরে বাসযাত্রী, ট্রেনযাত্রী হত্যা অথবা নাশকতা তো গণ-আন্দোলনের পথ নয়। এটা নিছক সন্ত্রাস। বস্তুত গত ৯০ দিনে তো কোনো গণ-আন্দোলন হয়নি। বিএনপি ও ২০-দলীয় নেতা-কর্মীরা কেউ রাজপথে নামেননি। মানুষ হরতাল-অবরোধে সাড়া দেয়নি।
দেশের প্রধান বণিক সভা এফবিসিসিআই হরতালে ৮১ দিনের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির একটা খতিয়ান দিয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, হরতাল-অবরোধের জন্য দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ২৭৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এ হিসাবে ৯০ দিনে মোট ক্ষতির পরিমাণ ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। আবার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, সিপিডির হিসাবে উৎপাদনের ক্ষতি ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। পোশাকশিল্পের ক্ষতি ১ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। কৃষি খাতে ক্ষতি ৩৯৮ কোটি টাকা। পোলট্রি খাতে ক্ষতি ৬০৬ কোটি টাকা। চিংড়ি খাতে ৭৪১ কোটি টাকা। পরিবহন খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৭৪৪ কোটি টাকা, পর্যটনে ৮২৫ কোটি, ব্যাংক-বিমায় ১৫৬ কোটি এবং ক্ষুদ্র ও পাইকারি ব্যবসায় ক্ষতির পরিমাণ ৪৪৮ কোটি টাকা। অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই স্কুলগুলো বন্ধ ছিল প্রায় আড়াই মাস। ৩৯ দিনে সমাপ্য মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে ৫৭ দিনে।
বেগম জিয়াকে আমি বলব, নিজ গৃহে স্থিত হয়ে, শান্ত হয়ে ভেবে দেখুন তো এত প্রাণহানি, জাতীয় অর্থনীতির বিপুল ক্ষতি ও শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত করে তিনি কী পেলেন? নিজের নাক কাটা গেল বটে, কিন্তু পরের যাত্রা ভঙ্গ তো করা গেল না।
বেগম জিয়া প্রথম থেকেই ভুল করেছেন। প্রথম ভুল জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা। তিনি তরুণ সমাজের মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারেননি। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যখন বিপুল গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, আন্দোলিত হয়েছে বিএনপি-সমর্থক তরুণ ও জনগোষ্ঠী; যখন দলের ভেতর থেকেই জামায়াতের সংস্পর্শ ত্যাগ করার চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তখনো খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ না করার প্রশ্নে অটল ছিলেন। আইনজীবী রফিক–উল হক যথার্থই বলেছেন, বিএনপি জামায়াতকে ছাড়লেই অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় ভুল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়া। খালেদা জিয়া বলেছেন, ৫ জানুয়ারির পর আন্দোলন মুলতবি রেখে তিনি ভুল করেছেন। আমরা বলব, অংশ না নেওয়াটাই ছিল বড় ভুল। বিএনপির কোনো কোনো উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ চায়নি ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও ২০-দলীয় জোট অংশ নিক। বেশ তো, এটা যদি বুঝেই থাকেন, তাহলে পাল্টা চাল হিসেবে যেকোনোভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের কৌশল বানচাল করলেন না কেন? তখন বলেছেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি জোট অংশ নেবে না। এখন কী বলছেন? বিএনপির থিঙ্কট্যাংক এবং এ যাত্রায় ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ১২ এপ্রিল প্রথম আলোয় দেওয়া সাক্ষাৎকারে যা বলেছেন, তার নির্গলিতার্থ এবং নির্বাচনকালে দেওয়া শেখ হাসিনার প্রস্তাবের মধ্যে তো মৌলিক কোনো পার্থক্য দেখছি না।
শেখ হাসিনার কৌশল থেকেই তিনি শিক্ষা নিতে পারতেন। ২০০৬ সালে খালেদা জিয়ার পরামর্শে তাঁরই বশংবদ রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বলে একতরফা ঘোষণা দেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সাংবিধানিক সংকট ও সংঘাত এড়াতে ইয়াজউদ্দিনকে মেনে নেয়। সে সময় শেখ হাসিনা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে তাঁর নিরপেক্ষতা প্রমাণের সুযোগ দিতে চাই।’ ইয়াজউদ্দিনের অধীনেই নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এনেছিল আওয়ামী লীগ ও মহাজোট। কিন্তু ইয়াজউদ্দিন তাঁর নিরপেক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ হন। ফলে কয়েকজন উপদেষ্টা পদত্যাগ করেন। দেশবাসীও ইয়াজউদ্দিনের ওপর আস্থা হারায়। শেষ পর্যন্ত মহাজোট ইয়াজউদ্দিনের অধীনে নির্বাচন না করার ঘোষণা দেয়। পরের ইতিহাস সবার জানা।
প্রসঙ্গত আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা বলি, ১৯৭২ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে কংগ্রেসের কাছে বামফ্রন্ট পরাজিত হয়। বামফ্রন্ট নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও জোর-জবরদস্তির অভিযোগ উত্থাপন করে। স্বয়ং জ্যোতি বসুকে পর্যন্ত জিততে দেওয়া হয়নি। নির্বাচনের পর বামফ্রন্ট শপথ না নিয়ে বিধানসভা বয়কট করে। চরম নির্যাতন ও দমন-পীড়নের মধ্যেও তারা গণ-আন্দোলনের পথে অনড় থাকে। তারা নকশালদের সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেয়নি, তেমনি কংগ্রেসের মোকাবিলায় কোনো সহিংস সন্ত্রাসের পথও গ্রহণ করেনি। ফলে দীর্ঘ গণ-আন্দোলন পটভূমিতে ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে বামফ্রন্ট নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।
এত সব অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা থাকা সত্ত্বেও বেগম জিয়া গণ-আন্দোলনের পথ পরিহার করে সন্ত্রাসের পথ গ্রহণ করলেন কেন? তিনি চেয়েছিলেন অব্যাহত সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড, জ্বালাও-পোড়াও করে দেশে এমন একটা অস্থিতিশীল ও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবেন, যার সুবাদে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করবে। অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতার পালাবদল হবে। অশুভ শক্তি সম্ভবত এটাই তাঁকে বুঝিয়েছিল। তিনি ভুলে গেছেন, এটা সত্তর বা আশির দশক নয়। আমাদের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যে বদলে গেছে, দেশবাসী যে আর পাকিস্তানি ধারায় প্রত্যাবর্তন করবে না—এই সত্যটুকু তাঁকে উপলব্ধি করতে হবে। পলাতক পুত্র তারেকের হিংসাশ্রয়ী সন্ত্রাসের পথ পরিহার করতে হবে। জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করে দলকে নতুন প্রজন্মের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। সর্বোপরি বেগম জিয়াকে সাংবিধানিক ধারায়, অহিংস ও জনসম্পৃক্ত রাজনীতির পথে ফিরে আসতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ নিরপেক্ষ আরেকটি নির্বাচনের জন্য তাঁকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
নূহ-উল-আলম লেনিন: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য।

হাজী দানেশে নিহতেরা ‘বহিষ্কৃত’, পরিস্থিতি শান্ত

দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত দুই শিক্ষার্থীকে আগেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও পরামর্শ বিভাগের পরিচালক এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। গতকাল রাতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. জাকারিয়া ও ভেটেরিনারি অনুষদের মাস্টার্স শ্রেণির ছাত্র মিল্টন নিহত হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষে এই সংঘর্ষ হয়েছে। এক পক্ষে ছিলেন ইফতেখারুল ইসলাম ও অরুণ কান্তি রায়ের সমর্থকেরা। ইফতেখারুল ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অরুণ কান্তি। চার মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইফতেখারুল বিতাড়িত ও অরুণ কান্তি বহিষ্কৃত হন। অপর পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী আসাদুজ্জামান জেমী ও নাহিদ আহমেদ নয়ন।
পরামর্শ বিভাগের পরিচালক শাহাদাৎ হোসেন খানের ভাষ্য, গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর মিলনায়তনে ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আলোচনা সভা, নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বহিরাগতদের সঙ্গে মিলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত একদল সাবেক ছাত্র হামলা চালান। এতে তিনজন শিক্ষক ও ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। অনুষ্ঠান পণ্ড করে হামলাকারীরা শেখ রাসেল হল দখল নেন। এরপর সাধারণ ছাত্রদের ওপরে হামলা চালিয়ে জখম করেন। পরে ক্ষুব্ধ সাধারণ ছাত্ররা জোট বেঁধে রাতে শেখ রাসেল হলে প্রবেশ করতে চাইলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের বাধে। এতে ওই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
শাহাদাৎ হোসেন খানের তথ্যমতে, ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে চার মাস আগে নিহত ওই দুই শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. রুহুল আমিন বলেন, সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিহত হওয়া দুঃখজনক। উপাচার্যের অভিযোগ, একদল বহিরাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করার অপচেষ্টা করেছিল। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে অনেক আগেই তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এরপরও ক্যাম্পাসে রক্তপাত, শিক্ষার্থী নিহত বা শিক্ষক-শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনা সমর্থন করা যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ টি এম শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর একাডেমিক কাউন্সিলের এক জরুরি সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ শান্ত রাখা এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আগামীকাল শনিবার কমিটিকে উপাচার্যের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
শফিকুল ইসলামের তথ্য, বর্তমানে ক্যাম্পাসের পরিবেশ শান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা চলছে। সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।
দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক আহমদ শামীম আল রাজী বলেন, হাজী দানেশের ঘটনা সহজভাবে দেখার বিষয় নয়। ক্যাম্পাসের পরিবেশ শান্ত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিন বলেন, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ শান্ত। ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রীতিপূর্ণ প্রাণে করি শুভ আবাহন by সৈয়দ আবুল মকসুদ

গ্রীষ্ম ঋতুর বৈশাখ আসে বসন্তের শেষে। বসন্ত আসে শীতের শেষে। শীত একটি দুর্বিষহ ঋতু। প্রাণহীন ঋতু। শীতে প্রকৃতিতে জীবন থাকে না। প্রকৃতি মরতে মরতে কোনোরকমে বেঁচে থাকে। শীতে যেটুকু প্রাণ থাকে, তা-ই আবার মাঘের শেষে ফাল্গুনে সতেজ হতে থাকে। শীতের ঝরা পাতার শাখা-প্রশাখায় ফাল্গুনে গজায় কিশলয়। চৈত্রসংক্রান্তি একটি বছরের বিদায়বার্তা নিয়ে আসে। পয়লা বৈশাখ সূচনা করে নতুন একটি বছরের। বাঙালির নববর্ষ। বাঙালির প্রধানতম ও মহত্তম উৎসব।
বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয় উৎসব রয়েছে। বাঙালি বৌদ্ধদের আছে। বাঙালি মুসলমানদেরও আছে ধর্মীয় উৎসব। হিন্দুর ধর্মীয় উৎসবে কোনো মুসলমান অংশ নিতে চাইলে তাতে কোনো বাধা নেই। মুসলমানের উৎসবে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানরা যোগ দিতে চাইলে তাতেও বিধিনিষেধ নেই। কিন্তু বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ সর্বজনীন উৎসব বাংলা নববর্ষই। সেখানে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান-খ্রিষ্টান-আদিবাসী সব এক। এবং তাৎপর্যের বিষয় হলো, বাংলা নববর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবে সব ধর্মের উপাদানই আছে। তবে তা যে আছে, তা কোনো ঘোষণা দিয়ে নয়। তা যদি থাকত, তাহলে প্রতিটি ধর্মের মানুষই দাবি করতে পারত তার ধর্মের উপাদানই বেশি।
বাংলা নববর্ষ নিয়ে কিছু বলতে বা লিখতে গেলেই মন চলে যায় দূর অতীতে, আমার শৈশবের দিনগুলোতে। প্রকৃতির বিধান অনুসারেই যেমন আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে আমার অমূল্য শৈশব-কৈশোর, তেমনি আমার সেই শৈশব-কৈশোরের বাংলাও নেই। সেই অভাবী বাংলায় ছিল অন্য রকম গ্রামীণ অর্থনীতি। অন্য রকম শাশ্বত বাঙালি সংস্কৃতি, যা ধর্মীয় উপাদান গ্রহণ করেও একেবারেই ধর্মনিরপেক্ষ। সেকালের বাংলায় ছিল অন্য রকম নিসর্গ। অনেকটাই অন্য রকম খাদ্যাভ্যাস। সবচেয়ে যা মূল্যবান তা হলো, এখনকার চেয়ে একেবারেই অন্য রকম সামাজিক বন্ধন এবং সামাজিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতি। ঝগড়াঝাঁটি, কলহ, মারামারি ছিল না, তা নয়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সামাজিক বন্ধনটা ছিল সুদৃঢ়। সে সমাজ ছিল সব ধর্মের মানুষের বাঙালি সমাজ।
আমার শৈশব-কৈশোরের বৈশাখে বাংলার মাঠ-ঘাট-জনপদ-নদ-নদী নয়, বাংলার আকাশও যেন ছিল অন্য রকম। বৈশাখে সে আকাশে উড়ত রংবেরঙের ঘুড়ি। চৈত্র-বৈশাখে আউশ-আমন ও পাটখেতে কাজ করতে গিয়ে রাখালেরা ওড়াত ঘুড়ি। পাখিদের মধ্যে চিল এখন বিলুপ্তপ্রায়। সেকালে সোনালি চিলের চিকন মধুর সুর শোনা যেত বাংলার আকাশে। কত রকম পাখি ও বন্য প্রাণী যে বৈশাখে দেখা যেত, তার দশ ভাগের এক ভাগও আজ নেই।
মানুষের ঘরবাড়িতে তখন নানা রকম দেশীয় ফুলের গাছ ছিল। বনবাদাড় ও ঘরবাড়ির আনাচকানাচে বৈশাখে ফুটত বেলি, জুঁই, চামেলি, মল্লিকা, কাঁঠালিচাঁপা, ভাটফুল প্রভৃতি। মনে পড়ে, পঞ্চাশের দশকে এক বাংলা নববর্ষের ভোরে প্রতিবেশী এক কিশোরীর ঘন চুলে গুঁজে দিয়েছিলাম একগুচ্ছ বেলি। মেয়েটি মৃদু লজ্জায় রক্তিম হয়েছিল। তার পর থেকে ওড়না পরা শুরু করে।
সেকালের বৈশাখে হিজল আর গাবগাছের এক টুকরো ছায়ায় বসে আরাম পেতাম। শুধু গ্রামে নয়, ঢাকার আজিমপুরের রাস্তার পাশেও ছিল কয়েকটি বয়স্ক গাবগাছ। বৈশাখে গ্রামগুলোর পুকুরপাড় ম-ম করত হিজল ফুলের স্নিগ্ধ সৌরভে। স্বর্ণচাঁপায় চৈত্র-বৈশাখে ফুটত সাদা ও হলুদমিশ্রিত ফুল। সে ফুলেও সুগন্ধ। তবে উৎকট নয়, হালকা ঘ্রাণ। এখন আর বৈশাখের ভাটফুল ও ব্রহ্মলতাও দেখি না। থোকা থোকা ব্রহ্মলতার ফুলের মৃদু ঘ্রাণ। স্বাধীনতার মাস তিনেক পরে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে গিয়েছিলাম তাঁর কাপাসিয়ার গ্রামের বাড়িতে। ওই এলাকায় ছিল তখন অসংখ্য পারিজাত। পথে যেতে যেতে দেখি, পারিজাতের ডালগুলোতে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। আসলে আগুন নয়, রক্তের চেয়ে লাল ফুল। পারিজাতের ফুলের রং সীমাহীন লাল। সেকালে শ্রীপুর, কাপাসিয়া এলাকায় প্রচুর পারিজাত, শিমুল, পলাশ, কাঞ্চনগাছ ছিল। ওগুলো সবই বৈশাখী ফুলের গাছ।
বৈশাখী গরমে মানুষের তেষ্টা পায় বেশি। সে তেষ্টা মেটানোর ব্যবস্থাও বাঙালি করেছে। শীতের সকালে ঘোষেরা কাঁচা দুধের মাঠা-মাখন নিয়ে বের হতেন। বৈশাখে ঘোষেরা বানাতেন পাতলা দুধের ঘোল। বৈশাখী গরমে ঘোলের চাহিদা ছিল খুব বেশি। হাটবাজারে ও গ্রামের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাঁরা ঘোল বিক্রি করতেন। এক চিমটি নুন দেওয়া এক গেলাস ঘোল এতই সস্তা ছিল যে তা এখনকার যুবক-যুবতীর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে। খুব বড় এক গেলাস ঘোল চার পয়সা। ওই দর স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত ছিল।
বাংলা নববর্ষের প্রধান বিষয় বৈশাখী মেলা ও হালখাতা। মেলা বলতে আমি যা বুঝি, তা হলো মিলন, এলাকার পরিচিত-অপরিচিত সব মানুষের সম্মিলন। বৈশাখী মেলা হলো মিলনমেলা। তবে বৈশাখী মেলার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বিরাট। তাতে গ্রামীণ বাঙালির মননশীলতা ও সৃষ্টিশীলতার পরিচয় পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পায়। কাঠ, বাঁশ, বেত, শোলা ও মাটির তৈরি কুটিরশিল্পে বাঙালির সৃষ্টিশীলতার যে প্রকাশ, তা বিস্ময়কর। শত শত বছর ধরে গ্রামের মানুষের তৈরি চারু ও কারুশিল্প বৈশাখী মেলায় বিকিকিনি হয়। গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব অসামান্য। বৈশাখী মেলায় যেসব খাদ্যদ্রব্য বেচাকেনা হয়, তারও বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
আজ নগর, বিশেষ করে নগরের উচ্চবিত্ত শ্রেণিটি সবকিছু গ্রাস করতে চাইছে। গত কয়েক দিন যাবৎ পাড়ায় পাড়ায়, বাড়ি বাড়ি লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে, বৈশাখী মেলার বিজ্ঞাপন। একটি প্রচারপত্র ট্রাফিক সিগন্যালে আমার হাতেও ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হচ্ছে, অমুক জায়গায় চার দিনব্যাপী ‘বিশাল ইন্ডিয়ান জুয়েলারি ও বৈশাখী মেলা’। তাতে পাওয়া যাবে ‘আন্তর্জাতিক বাজারে এক্সপোর্ট কোয়ালিটি জুয়েলারি পণ্য—ডায়মন্ড কাট ঝুমকি, ডায়মন্ড কাট কানের দুল, ডায়মন্ড কাট প্যান্ডেন্ট সেট, মাইক্রো গোল্ড প্লেটেড লকেট সেট, গোল্ড প্লেটেড ফিঙ্গার রিং, কাশ্মীরি ঝুমকা, অ্যান্টি-অক্সিডাইজড কানের দুল, বোম্বাই গোল্ড প্লেটিং বাঙ্গলস’ প্রভৃতি। আমার অলংকার শিল্পী, তাঁতশিল্পী, কামার, কুমার ভাতে মরবেন।
কে বলে যে পশ্চিম দেশীয়রা ব্যবসা-বাণিজ্যে পাকা। একশ্রেণির বাঙালি ব্যবসাবুদ্ধিতে পাকাতর। বাংলা নববর্ষে পান্তা-ইলিশ খামাখা চালু হয়নি আশির দশকে। গরিবে তো নয়ই, নিম্নমধ্যবিত্তও ভরা মৌসুমে ইলিশ মাছ খেতে পারে না। মৌসুমে যে ইলিশটির দাম পাঁচ শ টাকা। পয়লা বৈশাখের আগে সেটির দাম হাঁকে আড়াই হাজার টাকা। গত হপ্তায় এক ব্যক্তি আমাকে জানালেন এক ব্যবসায়ী রাজনীতিকের বৈশাখী ইলিশ ব্যবসার কথা। মৌসুমে তিনি তাঁর নিজের কোল্ডস্টোরেজে হাজার হাজার ইলিশ কিনে রেখেছিলেন। এখন বাজারে ছাড়বেন। ভোটারবিহীন নির্বাচনে জিততে যতটা টাকা খরচা হয়েছিল, তার কয়েক গুণ উঠে যাবে পান্তা-ইলিশের কল্যাণে। মৎস্যজীবীরা এক বেলা অনাহারে কাটান আর বাংলার জনপ্রতিনিধিরা রাতারাতি বনে যান রকেফেলার বা বিল গেটস। স্বার্থপর ও সুবিধাবাদী বাঙালি উচ্চমধ্য শ্রেণি আইনকানুনের তোয়াক্কা করে না। যখন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ, তখন পান্তা-ইলিশ উৎসব! মৎস্য অধিদপ্তর মার্চ-এপ্রিল দুই মাস ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। জাতির অর্থনীতির স্বার্থের চেয়ে অধিপতি শ্রেণির স্বার্থ বড়।
বাঙালি হওয়াটাই আমাদের জন্য আবশ্যক, তবে প্রতি দশকে বা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি আমরা বাঙালিতর হই, তাতে আসল বাঙালিত্ব হারিয়ে যাবে। হাজার বছর ধরে বাঙালি ও সংখ্যালঘু নৃজাতির মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের সামঞ্জস্য করে উৎসব ও পরব পালন করে আসছে। চৈত্রসংক্রান্তি বা চৈত্রপরব এবং নববর্ষ বরণের একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে হাজার বছরে। সেই জিনিসটিকে তছনছ করা ঘোরতর অন্যায়।
৪০ বছর আগেও পল্লির হাটবাজারে বা বটতলায় চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলা বসত। মেলার আনন্দ ও আমেজটা আজ আর নেই। কারুশিল্পী ও লোকশিল্পীরা জীবিকার জন্য অন্য পেশায় ঝুঁকেছেন। একবার এক মেলায় গিয়ে দেখি এক লোকশিল্পী বাঁশের বাখারি ও রঙিন কাগজ দিয়ে এক মস্ত ঘোড়া বানিয়েছেন। তাতে চড়ে তিনি গাইছেন, আমি টুকে এনেছিলাম: ‘হেকমত আলি নামটি আমার রাইখাছেন বাপজান/ হেকমতের জোরে আমি সওয়ার করি যান।’ বাংলার নিম্নবর্গের মানুষকে বিধাতা যথেষ্ট হেকমত দিয়েছেন। সেই হেকমত বিকাশের সুযোগ যদি রাষ্ট্র করে দিত, আমাদের সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হতো। ভণ্ড, পদলেহী ও সুবিধাভোগী নাগরিক ভদ্রলোকদের সঙ্গে গ্রামীণ জ্ঞানীদের তফাত বিরাট। তাঁরা তাঁদের ভাব ও ভাষা কারও থেকে ধার বা চুরি করেন না। পল্লিকবিদের ভাব অন্তর থেকে উৎসারিত।
চৈত্রপরব ও বৈশাখী মেলা উৎসব একেবারেই গ্রামীণ মানুষের উৎসব। বাংলা নববর্ষ নিয়ে বহুদিন যাবৎ যাঁরা রচনা লেখেন, তাঁরা অবধারিতভাবে আকবর বাদশাহর উল্লেখ করেন। এখন দেখছি কোনো কোনো প্রসিদ্ধ লেখক বলছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা নববর্ষ সমার্থক’। কোমলমতি অনেকের মনে হবে কবিগুরুর আগে নববর্ষ বলে কিছু ছিল না। বিশ্বকবির সঙ্গে বৈশাখের সম্পর্ক এইটুকু যে তিনি অন্য কোনো মাসে নয়, বৈশাখে জন্মগ্রহণ করেছেন; যেমন নজরুল আষাঢ়-শ্রাবণে নয়, জ্যৈষ্ঠে ভূমিষ্ঠ হন।
মধ্যযুগ থেকেই বাংলার কবিরা বাংলা নববর্ষকে করেছেন তাঁদের কবিতার উপজীব্য। বাংলাদেশের একজন প্রধান কবি ভাওয়ালের গোবিন্দচন্দ্র দাস। ১৩০ বছর আগে ‘নববর্ষ ১২৯১’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছিলেন:
এস বর্ষ! আশাপূর্ণ হৃদয়ে তোমায়
প্রীতিপূর্ণ প্রাণে করি শুভ আবাহন,
কাতরে কাকুতি করি, করুণা কৃপায়
প্রাণের একটি আশা করিও পূরণ।

এক স্বার্থে পরস্পর না হলে জড়িত,
এক দুঃখে না করিলে ব্যথা অনুভব,
এক কার্যে না হইলে চিত্ত উৎসারিত,
অমর-অদৃষ্টে ঘটে অনন্ত রৌরব।

দেও বর্ষ ভক্তি শিক্ষা জন্মভূমি প্রতি;
ভ্রাতৃভাবে সকলেরে কর সম্মিলিত,
দ্বেষ হিংসা পরস্পর ঈর্ষা পাপমতি,
মনের মালিন্য যত কর প্রক্ষালিত।
রৌরব নরক হলো মুসলমানদের যা জাহান্নাম। বেশি হিংসা-বিদ্বেষ নিয়ে থাকলে দেশের এক ধর্মের লোক যাবে রৌরব নরকে, আরেক ধর্মের লোক যাবে জাহান্নামে। প্রিয় জন্মভূমিতে আমরা তা হতে দিতে পারি না। আগের বছরের হিংসা-বিদ্বেষ-মিথ্যাচার এবং প্রতিপক্ষ সম্পর্কে অপবাদ দেওয়া থেকে বিরত থাকার শপথ নেওয়ার দিন পয়লা বৈশাখ। কলহ ও শত্রুতা কোনো স্থায়ী ব্যাপার নয়, স্থায়ী হলো সহমর্মিতা, সহ-অবস্থান ও ভ্রাতৃভাব। সেটাই নববর্ষের শিক্ষা ও দর্শন।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

ওদের শৈশব-কৈশোর ফিরিয়ে দিতে হবে by প্রতীক বর্ধন

ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিনথিয়া (ছদ্মনাম) চারটি কোচিং সেন্টারে পড়ে। আবার বাসায় এসে তাকে পড়ান আরও দুজন শিক্ষক। প্রতিদিন সকাল আটটায় বাসা থেকে বেরোয় সে, দুটি জায়গায় কোচিং শেষে স্কুলে যায়। মাঝে একবার বাসায় আসে ১৫ মিনিটের জন্য, শুধু খাওয়ার জন্য। এত হাঙ্গামা সেরে সে বাসায় ফেরে সন্ধ্যা ছয়টায়। এসেই আবার গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে বসে।
হ্যাঁ, এ রুটিন শুধু এক দিন, এক সপ্তাহ বা এক মাসের নয়। দিনের পর দিন ধরে চলছে তার এ জীবনযাত্রা। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই শিক্ষা তার কাছে কখনোই আনন্দময় মনে হয়নি। ইঁদুর দৌড়টা শুরু হয়েছে পিএসসি দিয়ে, তার পর এসেছে জেএসসি। আর এখন শুরু হয়েছে এসএসসির প্রস্তুতি। তার বিনোদনও বলতে গেলে এখন কোচিংয়ে আসা-যাওয়া। জীবন যেন ঘুরপাক খাচ্ছে স্কুল, বাসা আর কোচিং সেন্টারকে কেন্দ্র করে। এর বাইরে সে আর কিছু করতেও পারে না। অথচ তার কিশোরী মনে কত ভাবনা ছিল, তার সবই যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
মেয়েটির সঙ্গে তার মাকেও একইভাবে ঘোরাঘুরি করতে হয়। দিনকাল যা পড়েছে তাতে তো মেয়েকে আর একা ছেড়ে দেওয়া যায় না। এই করতে গিয়ে তাঁকেও জীবনের অনেক সাধ-আহ্লাদ ছাড়তে হয়েছে। তাঁর মতো অন্য অনেক মায়েরও একই অবস্থা।
স্কুলে এখন পড়ানো হয় না বললেই চলে, তার ওপর আবার পিএসসি, জেএসসিসহ নতুন নতুন পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সারা দিন ব্যস্ত রাখা হচ্ছে। এতে অসাধু শিক্ষকেরা লাভবান হলেও জাতির ভবিষ্যৎ হিসেবে এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যে উপকৃত হচ্ছে না, সেটা বলাই বাহুল্য। আবার অনেক অভিভাবকও স্রেফ ভালো ফলাফলের আশায় সন্তানকে স্বেচ্ছায় এমন ইঁদুর দৌড়ে শামিল করছেন।
আরও বিপদের কথা হচ্ছে, এই ছেলে-মেয়েরা সারা দিন এভাবে ব্যতিব্যস্ত থাকার পর বিনোদন হিসেবে বেছে নিচ্ছে শুধু টেলিভিশন-ফেসবুক-ইন্টারনেট প্রভৃতি বৈদ্যুতিন মাধ্যমকে। তাদের কৈশোর নেই বললেই চলে। সেই যে দুরন্ত কৈশোর আমাদের ছিল, তা এখন ওদের কাছে রূপকথার গল্পের মতোই মনে হয়। আবার যারা ঘর থেকে পড়াশোনা ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে বেরোচ্ছে, তারাও যে কৈশোরের স্বাদ পাচ্ছে, তাও নয়। তাদেরও দেখা যায়, স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে আছে বা তাদের বয়সের সঙ্গে মানানসই নয়, এমন আচরণ করতে। কথা হচ্ছে, পাড়া-মহল্লায় মাঠ নেই, খেলাধুলা নেই, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নেই, নেই কোনো পাঠাগার। আর মাদুর পেতে তাদের গল্প শোনানোর মানুষও আর নেই, সেই সময়ও নেই। গল্পের বই এখন আর তাদের তেমন টানে না, যদিও এটা শুধু তাদের একার দোষ না। এর ফলে নানারকম দুর্ঘটনাও ঘটছে। কথা হচ্ছে, বই না পড়লে মানুষের কল্পনার সীমা প্রসারিত হয় না। আর জ্ঞানের জন্য কল্পনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।
ওদের শৈশব-কৈশোর জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়ার কারণে সমাজে নানা রকম দুর্ঘটনাও ঘটছে। কিশোরী ঐশী যে ওর বাবা মাকে মেরে ফেলল, তার মধ্যেও এই হারিয়ে যাওয়া কৈশোরের প্রভাব রয়েছে। একজন মানুষের সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে হলে জীবনের বিভিন্ন বয়সের নানা রূপ-রস উপভোগ করতে হবে, তা না হলে শক্তি ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে।
শিক্ষার উৎস হিসেবে জীবন, সমাজ বা বাস্তবতা-এসবের কোনো মূল্যই আজ আর শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের কাছে নেই। সবকিছু যেন কোচিং সেন্টারেই পাওয়া যায়, এমন এক ধারণার বশে সবাই ছুটছে কোচিং সেন্টারে। বলা বাহুল্য, হাতে গোনা দু একটি স্কুল-কলেজ ছাড়া দেশের বিভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই লেখাপড়া হয় না। এই কোচিং সেন্টারের খরচ, যাতায়াত খরচ-এসব বাবদও বাবা-মায়ের ব্যাপক খরচ হচ্ছে। অথচ সংবিধান আমাদের মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা দিয়েছে! স্কুলে পড়াশোনা না হলেও সেই স্কুলেরই শিক্ষকদের কাছেই শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছে। এ নিয়ে সম্মানিত শিক্ষকের মধ্যেও কোনো লাজ-লজ্জা বা অনুতাপের বালাই নেই। আবার তারা যে বেতন পান, তাতে সংসার চালানোও দায়। এটা কোনো সবল রাষ্ট্রের চরিত্র নয়।
সরকারের নীতি নির্ধারকেরা যদি বিষয়টি অনুধাবন করতে না পারেন, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা কোথায় যাব, তা বলা মুশকিল। কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেই ফেলেছেন, এই শিক্ষা ব্যবস্থা দেশে বুদ্ধিজীবী-চিন্তক তৈরি করতে পারবে না। আর এখন তো মনে হচ্ছে, চিন্তক তো দূরের কথা, আমরা বোধ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই পাব কি না, সেটাই চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রিকশা চালিয়ে লেখাপড়া by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

রিকশা চালাচ্ছেন সানোয়ার হোসেন l ছবি: প্রথম আলো
ঘড়িতে সময় রাত প্রায় নয়টা। রাজশাহী নগরের নিউমার্কেট এলাকা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক আনিসুজ্জামান রিকশায় উঠবেন। পাশ থেকে একজন রিকশাওয়ালা ডাক দেন, ‘স্যার আসেন, কোথায় যাবেন?’ রিকশায় উঠতে গিয়ে তিনি থমকে দাঁড়ান। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেন না। রিকশাওয়ালা তাঁর বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র!
আনিসুজ্জামান বিব্রত হচ্ছেন দেখে ছাত্রটি এগিয়ে এসে বলেন, ‘স্যার, পড়াশোনার খরচ জোগাড় করার জন্য আমি রাতে রিকশা চালাই। আজ রিকশার মালিককে জমা দেওয়ার টাকাই এখনো পাইনি। তাই ডাকছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন?’
এ ঘটনা ১ এপ্রিল রাতের। আনিসুজ্জামান তাঁর রিকশায় উঠে সোজা প্রথম আলোর রাজশাহী কার্যালয়ে আসেন। ওই ছাত্রের নাম সানোয়ার হোসেন (২৪)। বাবার নাম আমিনুল হক। বাড়ি দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার বোয়ালদার গ্রামে। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে সানোয়ার দ্বিতীয়। এসএসসি পাস করার পর বড় বোনের বিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছোট ভাইটি এবার জেএসসি পরীক্ষা দেবে। গ্রামের বাজারে সানোয়ারের বাবার একটি ছোট্ট চা-মিষ্টির দোকান আছে। আবাদি জমি আছে আড়াই বিঘার মতো।
সানোয়ার জানালেন, ২০০৯-১০ সেশনে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে ভর্তি হন। সংসার চালাতে গিয়ে বাবা পৌনে দুই লাখ টাকায় জমিগুলো বন্ধক রাখেন। এ ছাড়া চারটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। সেই ঋণ চার বছরে বেড়ে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা হয়েছে। সপ্তাহে ঋণের কিস্তি দিতে হয় তিন হাজার টাকা। তার ওপর রাজশাহীতে তাঁর পড়াশোনার খরচ। বিশেষ করে মাস্টার্সে এসে বাড়ি থেকে পাঠানো টাকার পরিমাণ একবারেই কমে যায়। তাই তিনি আর কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। গত বছর ধরেছেন রিকশার হাতল।
প্রায় প্রতিদিনই রিকশা চালান সানোয়ার। মাঝে মাঝে শরীর সায় দেয় না। সেদিন বিশ্রাম নেন। দিনে রিকশার মালিককে ৩৫ টাকা করে জমা দিতে হয়। সাধারণত রাত দুইটার পর যাত্রী পাওয়া যায় না। তবু ভোরের ট্রেনের যাত্রীর জন্য বসে থাকেন সানোয়ার। জমার টাকা বাদ দিয়ে রাতে গড়ে তাঁর ৮০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। রিকশা চালানো শুরু করার আগে টিউশনি ও খণ্ডকালীন চাকরির খোঁজ করে সফল হননি সানোয়ার। অনেক চেষ্টা করে একটি টিউশনি জোগাড় করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল, ওই বাড়িতে যাতায়াত করতেই তাঁর আয়ের বেশ কিছু অংশ চলে যায়।
সানোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের হবীবুর রহমান হলের আবাসিক ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দিকে একটি মাসিক পত্রিকা বিক্রি করতেন। সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। সহপাঠী, বন্ধু ও হলের কোনো কোনো বড় ভাই তাঁকে সহযোগিতা করেন।
সানোয়ার জানান, তাঁর ২০ মাসের হলের সিট ভাড়া দুই হাজার টাকা বাকি পড়ে গেছে। হলের ডাইনিংয়ে খাওয়ার বিলও এক মাসের বাকি পড়েছে। এ মাসের শেষের দিকে মাস্টার্স পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। হলের সিট ভাড়া শোধ করতে না পারলে মাস্টার্সের ফরম পূরণের সময় হলের ছাড়পত্রও পাওয়া যাবে না। এসব নিয়ে চিন্তায় আছেন।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সানোয়ারের বাবা বলেন, ‘অনেক ধারদেনা হয়ে গেছে। ছেলেকে সব মাসে সমান টাকা আর দিতে পারি না।’
শিক্ষক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ছেলেটিকে প্রতিদিন ক্লাসে দেখি। ১০ দিন শিক্ষাসফরে একসঙ্গে ছিলাম। কিন্তু কখনোই ছেলেটির এই দৈন্যের কথা বুঝতে পারিনি। তাঁকে রিকশা হাতে দেখে প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি।’
রাত ১০টার দিকে প্রথম আলোর রাজশাহী কার্যালয় থেকে বের হয়ে সানোয়ার আবার রিকশার হাতল ধরলেন। পা রাখলেন প্যাডেলে। হলের সিট ভাড়া ও ডাইনিংয়ের খাওয়ার বিল শোধ করে মাস্টার্সের ফরম পূরণের টাকাটা জোগাড় করতে হবে যে!

নববর্ষে ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনায় জাবিতে ৫ ছাত্রলীগ কর্মী বহিষ্কার

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পাশে (গোল চিহ্নত)
পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতা
নিশাত ইমতিয়াজ বিজয়।
নববর্ষে ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন ও তার সহপাঠীকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। পয়লা বৈশাখের সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌরাঙ্গী এলাকায় ছাত্রলীগের সালাম-বরকত হলের কর্মীদের হাতে এ ঘটনা ঘটে।
এতে বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর শহীদ সালাম-বরকত হলের ছাত্রলীগের পাঁচ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নিপীড়নের শিকার ওই শিক্ষার্থী। এরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কার্যকরী সদস্য নিশাত ইমতিয়াজ (৪২ তম ব্যাচ, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ), হল শাখা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক নাফিস ইকবাল (৪২ তম ব্যাচ, রসায়ন বিভাগ), ছাত্রলীগকর্মী আব্দুর রহমান ইফতি (৪৩ তম ব্যাচ, নৃবিজ্ঞান বিভাগ), রাকিব (ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ) এবং নুরুল কবির (ইতিহাস বিভাগ)। এরা সবাই ছাত্রলীগ জাবি শাখার সেক্রেটারি রাজিব আহমেদ রাসেলের আবাসিক হল শহীদ সালাম-বরকত হলের নেতাকর্মী।
অভিযোগকারী ওই ছাত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পয়লা বৈশাখের দিন সন্ধ্যায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে বিভাগের অনুষ্ঠান শেষে হলের দিকে যাচ্ছিলাম। চৌরাঙ্গী মোড়ে আসার পর সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াই। এসময় সালাম বরকত হলের পাঁচজন ছাত্র এসে আমাদের সাথে কথা বলার জন্য দাঁড় করায়। কথা বলার এক পর্যায়ে কেউ একজন আমার ব্যাগ কেড়ে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে চলে যায়। আমরা ব্যাগ ফেরত আনতে গেলে তারা আমাদের ঝোপের আড়ালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। এসময় তারা আমাদের দুইজনকে মারধর ও গালিগালাজ করে।’
এ ঘটনায় নিপীড়নের শিকার ওই শিক্ষার্থীর সহপাঠী উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের নাদিহ আহমেদ সবুজ বলেন, ‘কথা বলার সময় ইফতি আমার বান্ধবীর ব্যাগ কেড়ে নিয়ে মোবাইল ও টাকা নিয়ে যায়। আর রাকিব তার শাড়ী ধরে টান দেয়। এরপর আমরা চিৎকার শুরু করলে তারা চলে যায়।’
দোষীদের শাস্তি দাবি করে অভিযোগকারী ওই ছাত্রী বলেন, ‘এ ঘটনার পর আমি আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। অবিলম্বে এই সন্ত্রাসীদের ছাত্রত্ব বাতিলের দাবি জানাই।’
অভিযোগের বিষয়ে প্রক্টর তপন কুমার সাহা বলেন, ‘আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। এটা যেহেতু যৌন নিপীড়নের ঘটনা, তাই আমরা এটাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন অভিযোগ সেলের কাছে হস্তান্তর করেছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন অভিযোগ সেলের প্রধান অধ্যাপক রাশেদা আক্তার বলেন, আমরা অভিযোগ পেয়েছি। এরপর সেলের সভা আহ্বান করে পরবর্তী সিন্ধান্ত নেয়া হবে।’

পর্যবেক্ষণ করবে যুক্তরাষ্ট্র

আসন্ন ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওই ৩ সিটি নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণও করবে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে নির্বাচন প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করেন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র মেরি হার্ফ। বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে নতুন বছরের শুরু থেকে আন্দোলন করছে ৫ই জানুয়ারির এক তরফা নির্বাচন বর্জনকারী ২০ দলীয় জোট। তারা রাজপথে টানা ৯২ দিনের আন্দোলন-কর্মসূচি পালন করেছে। ওয়াশিটনের প্রেস ব্রিফিংয়ে সেই প্রসঙ্গ ওঠে। তখনকার রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতো উদ্বেগ প্রকাশ করে। তবে সেই অচলাবস্থার পর সিটি নির্বাচনের আয়োজন এবং সেখানে রাজনৈতিক দল সমর্থিত প্রার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ২৮শে এপ্রিলের নির্বাচনকে ঘিরে এখানকার রাজনীতিতে যে উৎসবের আমেজ শুরু হয়েছে, তাতে সন্তোষ প্রকাশ করেন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনের এখনও কয়েক (দুই) সপ্তাহ বাকি আছে। তাই আমি খুশি যে, ‘আমার দলকে নিয়ে সেখানে পর্যবেক্ষণ করতে পারবো এবং কিছু বিশ্লেষণও করতে পারবো।’
এখানে প্রশ্নোত্তর আকারে মেরি হার্ফের ব্রিফিং তুলে ধরা হলো
প্রশ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ। আমার নাম শরাফত হুসেইন। আমি উইকলি বাংলাদেশ এর প্রতিনিধি।
উত্তর: খুবই ভাল। এখানে আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনাকে কিছু জানাতে পারবো বলে আশা করি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ ইস্যুতে?
প্রশ্ন: প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ নিয়ে আমার একটি প্রশ্ন আছে।
উত্তর: আমাদের সামনে আরও অনেক কিছু পড়ে আছে। কিন্তু আপনি বাংলাদেশ নিয়ে আরও প্রশ্ন করবেন!
উত্তর: সপ্তাহান্তে আপনি একটি বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে...
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: তাতে যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর না করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আমি জানি না যে, এটা তার এক ঘণ্টার মধ্যে নাকি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে...
উত্তর: আমার মনে হয় কয়েক ঘণ্টা।
প্রশ্ন: সরকার রায় কার্যকর করেছে এবং তাকে ফাঁসি দিয়েছে। এক. এ বিষয়ে আপনি কি ভাবছেন? দুই. বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিষয়টি এতে কতটা ফুটে উঠেছে?
উত্তর: ওই বিবৃতির বাইরে আমার কিছু বলার নেই। এ বিষয়ে আমরা যে নীতি পোষণ করি তা বলা হয়েছে। আমরা অবশ্যই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে নৃশংসতা হয়েছিল তার সুবিচারের প্রতি সমর্থন পোষণ করি। আমরা বুঝতে পারি, এমন একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিবৃতিতে আপনি দেখেছেন, আমরা বলেছি বিচার হওয়া উচিত সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানদ- অনুসারে, যেসব মানদ-ের প্রতি বাংলাশে নিজেও একটি অংশ। আমরা এসব বিষয়ে অগ্রগতি দেখতে পেয়েছি। আমি মনে করি, এটা একটা ভাল কাজ। কিন্তু আমরা এখনও বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কর্মকা-ের মান আরও উন্নত করতে হবে, যাতে এ রকম বিচার প্রক্রিয়া দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করে। আমরা বাংলাদেশ নিয়ে এটাই বলতে চাই। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলবো। যা ঘটেছে তার বাইরে আমার কাছে আর কোন ব্যাখ্যা নেই।
প্রশ্ন: কিন্তু আপনারা তাদেরকে যা করতে বলেছেন তারা তা করে নি বলে আমার মনে হয়। এর কি কোন পরিণতি আছে অথবা আরও কোন কঠোর প্রতিবাদ আছে?
উত্তর: আমরা অব্যাহত রাখবো। আমরা মনে করি এটা একটি জটিল ইস্যু। এ বিষয়ে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাব।
প্রশ্ন: মৃত্যুদন্ড যেহেতু পরিবর্তনযোগ্য নয় তাই কিভাবে তা রহিত করা যেতে পারে তা নিয়ে আপনার বিবৃতি আছে।
উত্তর: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: হয়তো হতে পারে তারা এটা পড়েনি অথবা এটা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় নি, অথবা বাংলাদেশ সরকার কি করলে প্রশাসন সন্তুষ্ট হবে সে বিষয়ে সরাসরি কিছু বলা হয় নি। তাই তারা ফাঁসি কার্যকর করেছে।
উত্তর: আমার তা মনে হয় না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমরা পরিষ্কার করেছি। যেসব দেশে মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে এবং কিভাবে তা কার্যকর করা উচিত রাষ্ট্রদূত র‌্যাপ সরাসরি প্রকাশ্যে তা নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু দেখুন, বাংলাদেশ তার নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি খোলাসা করেছি। এর চেয়ে বেশি আমার কাছে নেই।
প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয় যে, কামারুজ্জামানের সুষ্ঠু বিচার হয়েছে?
উত্তর: আমরা যেমনটি বলেছিÑ আমি হয়তো বিশেষ করে এই বিচার নিয়ে কথা বলবো না। তবে আমরা বিশ্বাস করি, বিচারও হওয়া উচিত সুষ্ঠু ও স্বচ্ছতার সঙ্গে। বাংলাদেশ কিছু অগ্রগতি করেছে। তবে তাদেরকে এখনও অনেক কিছু করতে হবে। আমরা এটা নিয়েই তাদের সঙ্গে কথা বলছি।
একই দিন ব্রিফিং করেন জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক। এখানে তা প্রশ্নোত্তর আকারে তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: আমার দুটি প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশের ঢাকায় মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘ কি মনে করছে বিচার বিভাগ নিরপেক্ষভাবে দ-াদেশ (অস্পষ্ট)? জাতিসংঘ কর্মকর্তারা কি এ ফাঁসি ঠেকাতে চেষ্টা করেছিল?
উত্তর: আমি মনে করি, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, নীতগতভাবে মহাসচিব ও জাতিসংঘ মৃত্যুদ-ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আমরা বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাসের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে কথা বলেছি। 
প্রশ্ন: মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী এক সদস্য নিহত ও ১২ সদস্য আহত হওয়ার খবর রয়েছে। এরা বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী। আপনারা কি এমন কোন খবর পেয়েছেন?
উ: না। আমি পাইনি।