Tuesday, December 2, 2025

ক্ষমা চেয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে চিঠি, তেল আবিবে নেতানিয়াহু-বিরোধী বিক্ষোভ

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুর্নীতির মামলায় পূর্ণ ক্ষমা চেয়ে প্রেসিডেন্টকে চিঠি দিয়েছেন। এর জেরে দেশটির রাজধানী তেল আবিবে বিক্ষোভ করেছে দেশটির জনগণ। রোববার রাতে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জগের ব্যক্তিগত বাড়ির সামনে বহু মানুষ জড়ো হয়ে এই আবেদন প্রত্যাখ্যানের দাবি জানান। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এতে বলা হয়, বিক্ষোভে বিরোধী দলীয় এমপি নাআমা লাজিমিসহ অনেকেই  উপস্থিত ছিলেন। এক বিক্ষোভকারী আবার নেতানিয়াহুর সাজে কমলা রঙের বন্দির পোশাক পরে ব্যঙ্গাত্মকভাবে অংশ নেন। অন্যরা কলার স্তূপের পাশে ‘পার্ডন’ লেখা ব্যানার তুলে ধরেন।

আন্দোলনকারী শিকমা ব্রেসলার বলেন, নেতানিয়াহু নিজের বিচার বন্ধ করে যেতে চান, কিন্তু কোনো দায় নিতে চান না। তিনি দেশকে গভীরভাবে বিভক্ত করেছেন।

গত পাঁচ বছর ধরে ঘুষ, জালিয়াতি এবং বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখী রয়েছেন নেতানিয়াহু। একটি মামলায় তিনি ও তার স্ত্রী সারা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিলিয়নিয়ারদের কাছ থেকে ব্যয়বহুল উপহার—সিগার, গয়না ও শ্যাম্পেন নেওয়ার অভিযোগ আছে। অন্য দুই মামলায় দুটি সংবাদমাধ্যম থেকে অনুকূল সংবাদ কাভারেজ আদায়ের চেষ্টা করার অভিযোগ রয়েছে।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে নেতানিয়াহুর আইনজীবীরা প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে ১১১ পৃষ্ঠার চিঠি পাঠিয়ে বলেন, বিচার শেষ হলে তিনি সম্পূর্ণ খালাস পাবেন বলে এখনো বিশ্বাস করেন। এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, বিচার চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তার ছিল, কিন্তু নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা সম্ভব হচ্ছে না। তার দাবি, বিচার চলতে থাকলে দেশ আরও বিভক্ত হয়ে পড়বে।

mzamin

ট্রাম্পের ‘মাগা’ যেভাবে পশ্চিমাদের ভাগ করে ফেলছে by ইয়োশকা ফিশার

ইউরোপ বহু দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ঋণী। যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপ ও পশ্চিম বার্লিনে দীর্ঘদিন স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের অর্থায়নে এখানে পুনর্গঠন সফল হয়েছিল। শীতল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় এবং ন্যাটোর সুরক্ষার অধীন ইউরোপের একীকরণ হয়েছে। এসবই ইউরোপের জন্য বড় অর্জন।

এ সময়গুলো ইউরোপের জন্য সফল, সুখের ও স্বস্তির ছিল। কিন্তু এ স্বস্তি আমাদের মাত্রাতিরিক্ত আত্মতুষ্ট করে তুলেছিল। আমরা খেয়াল করিনি যে আমেরিকান সাম্রাজ্যের কেন্দ্র থেকে পৃথিবীকে দেখা এক রকম, আর আমাদের ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে আরেক রকম। যত দিন গড়িয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তত নিজেকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে অনুভব করছিল। সাম্রাজ্যের স্বার্থে তারা ব্যয়বহুল যুদ্ধ করছিল। আর আমরা এদিকে কল্যাণরাষ্ট্র তৈরিতে ব্যস্ত ছিলাম।

ইরাক যুদ্ধ, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, শিল্পক্ষেত্রের পতন এবং মার্কিন অভিজাত ব্যক্তিদের গ্রামীণ ও শ্রমজীবী মানুষকে অবহেলা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে একজন ক্ষমতালোভী নেতা সহজেই ক্ষমতায় চড়ে বসতে পারেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ২০১৬ সালের নির্বাচনে জিতে ঠিক সে ঘটনাই ঘটান। প্রথমবার তাঁর জয় সবাইকে এতটাই অবাক করে দিয়েছিল যে সম্ভবত তিনি নিজেও পুরো ঘটনাটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। কিন্তু এক বছর আগে দ্বিতীয়বার তাঁর নির্বাচিত হওয়ার পর বিষয়টি আর নতুন কোনো ব্যাপার ছিল না। গত জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার শপথ নেওয়ার পর থেকে ট্রান্স-আটলান্টিক বিশ্ব সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

ট্রাম্প সম্পর্কে অনেক কিছু বলা যায়, কিন্তু তাঁকে কখনোই ‘ভাবাদর্শিক’ বলা যাবে না। তাঁর একমাত্র আদর্শ হলো তিনি নিজে। তবে তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, তাঁর হোয়াইট হাউসের পরামর্শকেরা এবং পুরো ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। তাঁদের কাছে মাগা আন্দোলন একটি আদর্শিক মতাদর্শ।

এ আন্দোলনের প্রধান ভাবাদর্শীদের একজন স্টিভ ব্যানন। তিনি পুরো দুনিয়াকেই এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখেন, যেখানে জুডিও-খ্রিষ্টান ঐতিহ্য (জুডিও-খ্রিষ্টান ঐতিহ্য বলতে মূলত জুডাইজম বা ইহুদিধর্ম এবং খ্রিষ্টধর্ম থেকে গড়ে ওঠা একটি যৌথ সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় ভিত্তিকে বোঝানো হয়। পশ্চিমা সভ্যতার অনেক মূল্যবোধ, আইন, নীতি ও সমাজব্যবস্থা এ ঐতিহ্য থেকে এসেছে বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়) একদিকে, আর তার শত্রুরা অন্যদিকে।

এ জুডিও-খ্রিষ্টান ঐতিহ্যের শত্রুর তালিকায় পশ্চিমা উদার চিন্তাধারাও আছে। ব্যানন মনে করেন, এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে জিততে মিত্র দরকার। আর তিনি বিশ্বাস করেন, ইউরোপের ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী দলগুলো এমন মিত্র হতে পারে। এখন যেহেতু মাগা যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায়, ব্যানন মনে করছেন ইউরোপের ‘পতনশীল’ সমাজগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়ে এ আন্দোলনকে আরও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

জেডি ভ্যান্সও গত ফেব্রুয়ারিতে মিউনিখ প্রতিরক্ষা সম্মেলনে তাঁর কুখ্যাত বক্তৃতাটি দেওয়ার সময় এ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ওই বক্তৃতায় তিনি ইউরোপীয় নেতাদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জার্মানির ডানপন্থী ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি) দল নাকি সেন্সরশিপের শিকার। অথচ তিনি যখন ওই বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, ঠিক সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছিল। আসলে ব্যানন ও তাঁর সহযোগীরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল আদর্শকেই প্রত্যাখ্যান করেন।

মনে রাখা দরকার, ইইউ গড়ে উঠেছে উদার মানসিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর। এর লক্ষ্য হলো জাতীয়তাবাদকে অতিক্রম করে ধীরে ধীরে আরও গভীর সংহতির পথে যাওয়া। কিন্তু মাগা আন্দোলন স্পষ্টভাবেই জাতীয়তাবাদী। তারা রাজনৈতিকভাবে যারা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে, তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে আগ্রহী। তাই ট্রাম্পের আমলে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক পুরোপুরি উল্টে গেছে। এটি আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নয়; বরং জাতীয়তাবাদের রূপ নিচ্ছে।

হ্যাঁ, স্বীকার করতে হবে, ইউরোপ বহু দশক যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাছাতার নিচে বেশ স্বচ্ছন্দে থেকেছে। কিন্তু এখনকার মার্কিন প্রশাসনের চাপের কাছে তার নত হওয়া উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আমাদের অনেক ঋণ থাকলেও আমাদের নিজেদের প্রতিও দায়িত্ব আছে। যে মূল্যবোধ ও নীতির ওপর আমরা এত দিন চলেছি, তা রক্ষা করা আমাদের জন্য খুবই জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র উদার মূল্যবোধ থেকে সরে গিয়ে জনতুষ্টিবাদী জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকেছে বলে আমাদেরও যে একই পথে যেতে হবে, এমন নয়।

* ইয়োশকা ফিশার, ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ডেপুটি চ্যান্সেলর ছিলেন।
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

মাগা আন্দোলনের প্রধান ভাবাদর্শীদের একজন স্টিভ ব্যানন
মাগা আন্দোলনের প্রধান ভাবাদর্শীদের একজন স্টিভ ব্যানন। ছবি : রয়টার্স

চীন কি আরব আমিরাতে সামরিক ঘাঁটি বানাচ্ছে, কী বলছে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) একটি সামরিক ঘাঁটিতে চীনের সামরিক সদস্যরা ছিলেন। কারণ, ওই ঘাঁটির একটি অংশে যুক্তরাষ্ট্রকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। দুজন সাবেক উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দুই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, আবুধাবির জায়েদ মিলিটারি সিটিতে চীনের গণমুক্তি ফৌজের (পিএলএ) সদস্যদের ইউএই আতিথ্য দিচ্ছিল।

ওই কর্মকর্তারা জানান, ২০২০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এমন ধারণা করেছিলেন।

ঘটনাটি সম্পর্কে জানেন এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা যখন জায়েদ মিলিটারি সিটির একটি অংশে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছিলেন, তখন তা নাকচ করা হয়েছিল। তারপরই যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটিটি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে চীনা সামরিক সদস্যদের উপস্থিতির বিষয়টি জানতে পারল বা ওই ঘাঁটিতে তাদের কী ভূমিকা ছিল, সে সম্পর্কে সাবেক এ দুই কর্মকর্তার কেউ কিছু জানাননি।

দুই সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, পিএলএ হয়তো জায়েদ মিলিটারি সিটি ব্যবহার করে আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন বাহিনীর সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছে।

আরব আমিরাতের আল–ধাফরা এয়ার বেজে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮০তম এয়ার এক্সপেডিশনারি ফোর্স মোতায়েন রয়েছে এবং এটি আবুধাবি থেকে মাত্র ২০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত।

মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেছেন, আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে পূর্ব এশীয় কিছু দেশ পিএলএকে তাদের দেশে থাকার সুযোগ দিয়েছে বলে মার্কিন গোয়েন্দারা জানতে পেরেছিলেন। আরব আমিরাতের জায়েদ মিলিটারি সিটিতে পিএলএর উপস্থিতির সঙ্গে এর মিল খুঁজে পায় যুক্তরাষ্ট্র।

আবুধাবির জায়েদ মিলিটারি সিটিতে চীনা সামরিক বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে এর আগে কোনো খবর প্রকাশিত হয়নি।

চীন-আমিরাত সামরিক সম্পর্ক

বর্তমানেও পিএলএর সদস্যরা ওই ঘাঁটিতে আছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। চীন সামরিকভাবে আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করায় যুক্তরাষ্ট্র বারবার তাদের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরব আমিরাতের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েনও রয়েছে।

২০২১ সালে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীন আবুধাবির কাছে একটি সামরিক বন্দর তৈরি করছে। ওই খবর প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ পর অন্য একটি নিবন্ধে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে আরব আমিরাত সেই প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে।

তবে ডিসকর্ড মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে ফাঁস হওয়া গোপন নথিতে বলা হয়েছে, এক বছর পর চীন সেই ঘাঁটিতে আবারও কাজ শুরু করেছে। এ খবর দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল।

আরব আমিরাত ও চীন তাদের সামরিক সম্পর্ক গোপন করছে না। ২০২৪ সালে তারা চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলে বিমানবাহিনীর যৌথ মহড়া করেছিল।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মিডল ইস্ট আই ওয়াশিংটনে অবস্থিত আরব আমিরাত এবং চীনের দূতাবাসে যোগাযোগ করেছিল। তবে কোনো পক্ষই সাড়া দেয়নি। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগও কোনো জবাব দেয়নি।

এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও এআই চিপস

আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদার। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিংয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। কাতার ও সৌদি আরবের মতোই আরব আমিরাতও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর পরিবারকে, বিশেষ করে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে খুশি করার চেষ্টা করেছে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) কোম্পানি জি৪২ এবং তাদের সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বী হিউমেইনের কাছে হাজার হাজার উন্নত এআই চিপস রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে এনভিডিয়ার মতো প্রযুক্তি সংস্থাগুলো স্বাগত জানিয়েছে। কারণ, তাদের চিপস বিক্রি বৃদ্ধির জন্য রপ্তানির বাজার দরকার। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব নিয়ে চিন্তিত মার্কিন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের কিছু কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট।

সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘সৌদিরা হয়তো কিছুটা ভালো। কিন্তু আমি মনে করি না, আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে।’

গত অক্টোবরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল, আরব আমিরাতের জি৪২ কোম্পানি চীনের হুয়াওয়েকে এমন প্রযুক্তি দিয়েছে, যা চীনের গণমুক্তি ফৌজ তাদের আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বৃদ্ধি করার জন্য ব্যবহার করেছিল।

ব্যবসায়িক চুক্তি ছাড়াও ওই অঞ্চলে ক্ষমতা দেখানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরব আমিরাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিডল ইস্ট আই সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, সোমালিয়ায় ইসলামিক স্টেট জঙ্গিগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আমিরাতের লোহিত সাগরের ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করেছে।

ওয়াশিংটনের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আরব আমিরাত ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আরব অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে।

২০২০ সালে আরব আমিরাত ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ স্বাক্ষর করেছিল। চলতি বছরের শুরুতে ইসরায়েল যাতে অধিকৃত পশ্চিম তীরের এলাকা দখলে না রাখে, সে জন্য আমিরাত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে তদবির করেছিল। তবে গাজায় নৃশংস ইসরায়েলি হামলা শুরুর পরও আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক মোটামুটি টিকে আছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিনিময়ে আরব আমিরাতকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রথম মেয়াদের ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণে বাইডেন প্রশাসনের সময় সেই চুক্তি আটকে যায়।

২০২২ সালের আগস্টে সিনেটের এক শুনানিতে বাইডেন প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ কূটনীতিক বারবারা লিফ বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চীন ‘যা খুশি তাই করে পার পেয়ে যাচ্ছে’।

আরব আমিরাতের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি কেন আটকে গেছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে লিফ চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক–সংক্রান্ত ‘অনেকগুলো বিষয়ের’ কথা উল্লেখ করেছিলেন, যা এই চুক্তিকে ব্যাহত করেছে।

সম্প্রতি সৌদি যুবরাজের ওয়াশিংটন সফরের সময় ট্রাম্প বলেছেন, তিনি সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল–মাকতুন জায়েদ মিলিটারি সিটিতে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাঁটছেন। আবুধাবি
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল–মাকতুন জায়েদ মিলিটারি সিটিতে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাঁটছেন। আবুধাবি। ছবি: এএফপি

গাজায় ইসরায়েলের হামলা চলছেই, নিহতের সংখ্যা ছাড়াল ৭০ হাজার

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। এ উপত্যকায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা এখন ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল শনিবার এ তথ্য জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত সেখানে অন্তত ৭০ হাজার ১০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ৯০০ জনের বেশি মানুষ।

চিকিৎসকেরা গতকাল বলেছেন, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের পূর্বে বনি সুহেইলা শহরে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় দুই ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আল-জাজিরাকে বলেছেন, গতকাল সকালে আল-ফারাবি স্কুলের কাছে একদল বেসামরিক মানুষের ওপর ড্রোন থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতে জুমা ও ফাদি তামার আবু আসসি নামের দুই ভাই নিহত হয়।

এ ছাড়া গতকাল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজার বেশ কয়েকটি স্থানে স্থল, নৌ ও বিমান হামলা চালিয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, খান ইউনিসের উত্তর-পূর্বে আল-কারারা শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। গতকাল সকালে গাজা শহরের পূর্বে তুফাহ এলাকাতেও ইসরায়েল বিমান হামলা চালায়। দক্ষিণ গাজার রাফা শহরের পূর্বাঞ্চলেও হামলা হয়েছে।

এর এক দিন আগে নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্স ঘোষণা করেছিল, বনি সুহেইলা শহরে ইয়েলো লাইনের বাইরে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গাজার সরকারি গণমাধ্যম অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা গত শুক্রবার বলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৫৩৫ বার ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এক বিবৃতিতে আল-থাওয়াবতা বলেন, ‘গাজায় মানবিক পরিস্থিতি নজিরবিহীনভাবে খারাপ হচ্ছে এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।’

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। ছবি: রয়টার্স

গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশ ও বেহাত বিপ্লব by সাব্বির রহমান

বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত গণমানুষের জাগরণের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান—প্রতিটি অধ্যায়ে তৃণমূল মানুষের আত্মত্যাগ, রক্ত ও স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রতিটি বিজয়ের পর ইতিহাস যেন এক অপ্রিয় বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। বিপ্লব হয়, পরিবর্তনের সুর বাজে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ফিরে যায় ভিন্ন মুখোশধারী একই গোষ্ঠীর হাতে। যেন—যে যায় লঙ্কায়, সে-ই হয় রাবণ।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—আমাদের গণ-অভ্যুত্থানগুলো কি সত্যিই জনগণের জন্য, নাকি সাধারণ মানুষের রক্তের ওপর দিয়ে রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার পালাবদলের হাতিয়ার?

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক মহান সামাজিক বিপ্লবের সামগ্রিক ফসল। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েই সেই বিপ্লবের নেতৃত্ব চলে যায় রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এক এলিট শ্রেণির হাতে। যাদের ওপর আস্থা রেখে জনগণ শাসনক্ষমতা অর্পণ করেছিলেন, কালের পরিক্রমায় তারাই শাসক থেকে শোষকে রূপান্তরিত হলেন। হয়ে উঠলেন রক্ষক থেকে ভক্ষক। অথচ জনতার স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাস্তবে তার সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র পরিলক্ষিত হলো—যেখানে আদর্শ হার মানল লোভের কাছে, আর রাজনীতি পরিণত হলো স্বার্থ চরিতার্থ করার যন্ত্রে। ফলস্বরূপ, জনমনে জন্ম নিল নতুন অসন্তোষ।

এরপর এল ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান। ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণ একত্র হয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে রচনা করল এক নতুন ইতিহাস। সবাই ভেবেছিল, এবার হয়তো সত্যিকারের গণতন্ত্রের সূর্যোদয় হবে। কিন্তু না—ইতিহাস আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্ত করল। আন্দোলনের সুফল ভোগ করল রাজনীতির পুরোনো খেলোয়াড়েরা, আর যারা রাস্তায় রক্ত দিল, যাদের পরিবারের সদস্যরা জীবন বিপন্ন করল, তারাই রইল মঞ্চের বাইরে। শাসক বদলাল, কিন্তু চরিত্র বদলাল না। আবারও বিপ্লব বেহাত হলো।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানেও দৃশ্যপট প্রায় অভিন্ন। হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ আর অসংখ্য মানুষের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে উদিত হয়েছিল এক নতুন সূর্য। কিন্তু বছর না ঘুরতেই দেখা গেল সেই পুরোনো পরিচিত চিত্র—চাঁদাবাজি, বদলি বাণিজ্য, রাজনৈতিক কোন্দল এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনে বিপ্লবের চেতনা ক্ষয় হতে শুরু করল। সংস্কার নিয়ে ঐকমত্যে বিরোধ, ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে তর্ক—সব মিলিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা আজ প্রায় বিপর্যস্ত। যাদের আত্মত্যাগে এই আন্দোলন সফল হয়েছিল, তাদের প্রতি দেখা যাচ্ছে অবহেলা। অন্যদিকে পরাজিত শক্তিও আবার মাথা তুলছে—নাশকতা, ককটেল বিস্ফোরণ, রাজনৈতিক সহিংসতা—সবকিছু যেন ফিরে এসেছে পুরোনো চিত্রে।

সব মিলিয়ে আজকের বাংলাদেশ যেন তাসের ঘরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক বেহাত বিপ্লবের নাম। দুই দিন পর হয়তো নির্বাচন হবে, সরকার গঠিত হবে, কিন্তু তারপর? হয়তো দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নেই ব্যস্ত থাকবে রাজনৈতিক দলগুলো। জনগণকে তখন মনে পড়বে কেবল ভোটের দিনে, আর বাকিটা সময় তারা হয়ে থাকবে নিছক এক ‘সংখ্যা’।

ইতিহাস সাক্ষী—প্রয়োজনে যতবারই ক্রান্তিকাল এসেছে, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ জনতা রক্ত দিয়েছে। অথচ ক্ষমতার স্বাদ নিয়েছেন রাজনীতিবিদেরা ও মুষ্টিমেয় এলিট শ্রেণি। বিপ্লবের চেতনা রাস্তায় জন্ম নেয়, কিন্তু ফল ভোগ করে চৌহদ্দিতে বন্দী কিছু সুযোগসন্ধানী। এই চক্র ভাঙতেই হবে—এবং ভাঙতেই হবে। তবে এর জন্য কেবল বিপ্লব বা সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার গভীর পরিবর্তন। বিপ্লবীদেরও বুঝতে হবে—অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হস্তান্তরই চূড়ান্ত দায়িত্ব নয়; নিজেদের হাতে নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করাও তাদের কর্তব্য। জনগণকে নিজেদের ক্ষমতা, অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সচেতন হতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে রাজনীতি-সচেতন, নেতৃত্ব নির্বাচনে সজাগ ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

তবেই হয়তো এই হতভাগ্য রাষ্ট্রের ভাগ্য আকাশে সুবাতাস বইবে; নয়তো এই অন্ধকার চক্র চলবে শেষনিশ্বাস পর্যন্ত।

* সাব্বির রহমান, শিক্ষার্থী, রাজনীতিবিজ্ঞান, ঢাকা কলেজ।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের এই গ্রাফিতি
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের এই গ্রাফিতি। ছবি: প্রথম আলো

বন্দীদের পোশাকে কলার স্তূপে ‘নেতানিয়াহুকে বসিয়ে’ বিক্ষোভ

দুর্নীতিসহ তিন মামলার বিচার থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি চেয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমার আবেদনের পর তেল আবিবে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের বাসভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন।

দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চলছে। তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতি, ঘুষ এবং আস্থাভঙ্গের অভিযোগে তিনটি মামলা রয়েছে। তবে তিনি বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।

এর মধ্যে গতকাল রোববার ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু বিচার কার্যক্রম থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি চেয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমার আবেদন করার কথা জানান। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ছয় বছর ধরে বিচার চলছে। তা আরও অনেক বছর ধরে চলার সম্ভাবনা রয়েছে।’

এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, ‘এই বিচার অব্যাহত থাকায় আমরা (ইসরায়েল) ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছি, তীব্র বিভাজন তৈরি হচ্ছে, বিভেদের মাত্রা বাড়ছে।’

ক্ষমার আবেদন করলেও দোষ স্বীকার কিংবা অনুশোচনা—কোনোটাই করেননি নেতানিয়াহু। এতে ক্ষুব্ধ হন তাঁর দেশের অনেকে। খবরটি প্রকাশ্যে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তেল আবিবে গতকাল রাতে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত বাসভবনের সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়।

কয়েকজন বিরোধী আইনপ্রণেতাও অধিকারকর্মীদের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দেন। তাঁরা নেতানিয়াহুর আবেদন বাতিল করে দিতে প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানান।

কারাবন্দীদের কমলা রঙের পোশাক পরে, নেতানিয়াহুর আদলে সেজে বিক্ষোভে শামিল হন একজন। সেখানে কলার স্তূপের পেছনে অনেকে দাঁড়িয়ে ‘পারডন=ব্যানানা রিপাবলিক’ স্লোগান দেন। কলার স্তূপের মধ্যে ‘ক্ষমা’ লেখা প্ল্যাকার্ড ঝুলছিল। ব্যানানা রিপাবলিক বলতে এমন একটি দেশকে বোঝানো হয়, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকে। শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়। বিদেশি একচেটিয়া গোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে কোনো দেশকে শোষণ করে।

সরকারবিরোধী অধিকারকর্মী শিকমা ব্রেসলের বলেন, ‘তিনি (নেতানিয়াহু) কোনো ধরনের দায়দায়িত্ব না নিয়ে বরং মামলা থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছেন। তিনি দেশটাকে কীভাবে ছিন্নভিন্ন করেছেন, সেটার মূল্য না চুকিয়ে বিচার পুরোপুরি বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন।’

এদিকে প্রেসিডেন্ট হারজগের কার্যালয় এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহুর আবেদনকে ‘নজিরবিহীন’ বলে মন্তব্য করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এই আবেদনের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। প্রাসঙ্গিক সব মতামত পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে এ আবেদনের বিষয়ে বিবেচনা করবেন।’

নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯৬ সালে তিনি সর্বপ্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এরপর তিন মেয়াদে তিনি ১৮ বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ডানপন্থী লিকুদ পার্টির নেতা নেতানিয়াহু ২০২৬ সালের নির্বাচনেও লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন।

একটি স্মরণসভায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁ থেকে দ্বিতীয়), তাঁর স্ত্রী সারা (সর্ববাঁয়ে), প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ এবং ফার্স্ট লেডি মিশেল হারজগ
একটি স্মরণসভায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁ থেকে দ্বিতীয়), তাঁর স্ত্রী সারা (সর্ববাঁয়ে), প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ এবং ফার্স্ট লেডি মিশেল হারজগ। ফাইল ছবি: এএফপি

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও তারেকের ফেরা নিয়ে বিতর্ক by জাহেদ উর রহমান

বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি অসুস্থ, কিন্তু এবারের অসুস্থতা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা খুব সংকটাপন্ন। দীর্ঘদিন তাঁর অসুস্থতার কারণে তাঁর পুত্র তারেক রহমান কার্যত দলের প্রধান হলেও তিনি এখনো দলের চেয়ারপারসন। খালেদা জিয়ার বর্তমান অসুস্থতা এক অসাধারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির নজির তৈরি করেছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করা রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে বিতর্কে নেমেছে। বর্তমান পটভূমিতে সবাই চায় তার রাজনৈতিক বয়ান যতটা সম্ভব প্রতিষ্ঠিত করতে। দীর্ঘদিন একটা স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের অধীন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা–কর্মীদের মধ্যেও একধরনের স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা দেখা গেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক বিতর্ক গণতান্ত্রিক পরিবেশের সীমা ছাড়িয়ে রীতিমতো কলহে রূপ নিয়েছে। একে অপরের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো আচরণ না করে ক্ষেত্রবিশেষে শত্রুর মতো আচরণ করছে।

কিন্তু এমন রাজনৈতিক পটভূমিতেও প্রতিটি রাজনৈতিক দল বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি তাদের সম্মান দ্ব্যর্থহীনভাবে দেখিয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান হওয়ার পরও এমন জাতীয় অভিভাবকত্বের জায়গা অর্জন করতে পারা বাংলাদেশের মতো দেশে এক অভাবনীয় ঘটনা। সেটি হওয়ারই কথা।

শেখ হাসিনার প্রতিষ্ঠিত স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর লড়াই করেছে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন দলটি। এর মাশুল দলের অসংখ্য নেতা–কর্মীর মতো দিয়েছেন খালেদা জিয়া স্বয়ং। অত্যন্ত খারাপ শারীরিক অবস্থায়ও দীর্ঘদিন তিনি অন্যায়ভাবে জেলে আটক ছিলেন। যে অসুস্থতার কারণে তিনি আজ মৃত্যুর মুখোমুখি, সেটি বেড়ে যাওয়ার পেছনে হাসিনা সরকারের ষড়যন্ত্র ক্রিয়াশীল ছিল—এ অভিযোগও আছে।

অথচ সরকারের সঙ্গে কিছু সমঝোতা মেনে নিলে অনেক আগেই বিদেশে গিয়ে সুচিকিৎসা নিয়ে জীবিত একমাত্র সন্তানের সঙ্গে বাকি জীবন সুন্দরভাবে কাটাতে পারতেন। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে ভয়ংকর মাশুল দিয়েছেন তিনি, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর এ আপসহীনতা এখন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নিয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার পটভূমিতে আলোচনায় এসেছে তাঁর বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান তারেক রহমান কেন দেশে ফিরছেন না। একটি রাষ্ট্রে, সমাজে ঘটে চলা প্রতিটি বিষয়ই রাজনৈতিক। আর সেটি যদি হয় দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, যে দলটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে আগামী নির্বাচনে বিজয় লাভ করবে বলেই ধারণা করা হয়, সেই দলটির প্রধান নেতৃত্বের অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে তাঁর সন্তানের ফিরে আসা নিয়ে প্রশ্ন ঘিরে, রাজনীতি হওয়াটা স্বাভাবিক।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে অনেকের বক্তব্য ‘হেইট স্পিচের’ (ঘৃণা সৃষ্টিকারী বক্তব্য) পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, যা আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য অনিবার্যভাবেই ক্ষতিকর হবে।

কেন তারেক রহমান দেশে আসছেন না? কবে তিনি দেশে আসবেন?— চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে প্রশ্নগুলো দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ক্রমাগত আলোচিত হয়েছে। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে মানুষ এটা ধারণা করেছিল, দীর্ঘকাল দেশের বাইরে থাকা মানুষটির জন্য এবার অনুকূল সময়ে এসেছে, তাই তিনি দেশে এসে দলের হাল ধরবেন। তাই তারেক রহমান দেশে ফেরা নিয়ে মানুষের কৌতূহল খুব স্বাভাবিক।

কিন্তু মায়ের সাংঘাতিক অসুস্থতার সময়েও দেশে ফিরে না আসাকে কেন্দ্র করে রীতিমতো তারেক রহমানের মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও কর্তব্যপরায়ণতাকেই প্রশ্ন করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটি নিয়ে এতটাই হইচই তৈরি হয়েছে যে এ মুহুর্তে নিজের দেশে না ফেরার কারণ নিয়ে তারেক রহমানকে কিছু কথা বলতে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন,“...কিন্তু অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়ামাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।”

এর আগে তারেক রহমান নানা সময়ে ‘দ্রুতই দেশে ফিরবেন’ ধরনের বক্তব্য দিলেও এই প্রথম কিছুটা স্পষ্ট করলেন, তিনি কেন দেশে ফিরে আসছেন না। বলা বাহুল্য তাঁর এ বক্তব্যেও বেশ অস্পষ্টতা আছে এবং এটি আরও নতুন কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছে। মানুষ খোঁজার চেষ্টা করছে, ‘অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’ এমন একটা সিদ্ধান্তের পেছনে আসলে কে আছে।

প্রশ্ন এসেছে, তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ‘অপর নিয়ন্ত্রক’ কারা? তারা কি দেশি, নাকি বিদেশি? যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এর মধ্যেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানিয়েছেন, সরকারের দিক থেকে তারেক রহমানের ফেরার পথে কোনো বাধা নেই। তাহলে এ ক্ষেত্রে কি বিদেশি কোনো শক্তি ক্রিয়াশীল, যারা তাকে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে কোনো দর–কষাকষি করছে?

নির্বাচন সামনে রেখে দেশে ফেরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিশ্চয়ই আছে তারেক রহমানের। তাঁর দেশে না ফেরা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন তাঁকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, এটিও তাঁর না বোঝার কারণ নেই। এসব বিতর্ক–সমালোচনার পরও তাঁর ফিরে না আসা প্রমাণ করে, সমস্যা সমাধান করা ছাড়া তাঁর ফেরাটা বিপজ্জনক হতে পারে।

তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রশ্নে তাঁর নিরাপত্তার ইস্যু দীর্ঘদিন থেকে আলোচিত হচ্ছে। এটা সত্যি, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো নয়। তিনি দেশে ফিরলে একটি দলের প্রধান হিসেবে যে নিরাপত্তা পাবেন, সরকারের পক্ষ থেকে সেটি কি যথেষ্ট হবে? দেশে ও দেশের বাইরে অনেকেই আছে, যারা তাঁর নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, বাংলাদেশের মতো দেশে নিরাপত্তাঝুঁকি থাকবেই। এ দেশে রাজনীতি করতে হলে এ ঝুঁকি মাথায় নিয়েই করতে হবে। এই সরলীকরণের বাইরে গিয়ে আমরা এটা বলতে পারি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিশালী হয়ে ওঠার বিপরীতে একটা মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সেই দলের প্রধান যদি এমন কোনো পরিস্থিতিতে বড় নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়েন, সেটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনার ওপরে বড় আঘাত তৈরি করবে। এমনকি বাংলাদেশ খুবই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার মধ্যে প্রবেশ করবে—এ শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তাই এমন শঙ্কা যদি সত্যিই থেকে থাকে, সেটি বিবেচনায় নেওয়া ভুল হবে না।

দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রশ্নে বিএনপি যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেখানে খালেদা জিয়ার বড় গুরুত্ব আছে শুধু দলের প্রধান হিসেবেই নয়, দলের ঊর্ধ্বে উঠেও। আমাদের এই গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে (নির্বাচনের আগে কিংবা পরে) যদি কোথাও কোনো শঙ্কা তৈরি হয়, কোথাও যদি সরকার, রাজনৈতিক দল কিংবা শক্তির অন্যান্য ভরকেন্দ্রের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, সে ক্ষেত্রে জাতির অভিভাবকে পরিণত হওয়া খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন; সমঝোতার জন্য মধ্যস্থতা করতে পারবেন।

রাজনৈতিক জীবনে কিংবা সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার ছোট-বড় ভুল আছে। কিন্তু শেষ বিচারে তিনি আমাদের গণতন্ত্রের লড়াইয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর আরও বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকা এই জাতি এবং রাষ্ট্রের স্বার্থেই জরুরি। আমি নিশ্চিত, এই জাতির প্রার্থনা তাঁর সঙ্গে আছে।

* জাহেদ উর রহমান, শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদায় জানান বড় ছেলে তারেক রহমান। লন্ডন, ৫ মে
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদায় জানান বড় ছেলে তারেক রহমান। লন্ডন, ৫ মে। ছবি: বিএনপির ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি হয়েছে। রোববার দিবাগত রাতে ভোরের দিকে তাঁকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয় বলে জানা গেছে। সেখানে চিকিৎসকেরা খালেদা জিয়াকে ভেন্টিলেশনে রেখে চিকিৎসা দিচ্ছেন।

সোমবার সন্ধ্যায় এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছেন, এমন একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁর অবস্থা সংকটজনক। তবে তিনি ভেন্টিলেশনে আছেন। লাইফ সাপোর্টে আছেন, এটা ঠিক নয়।’

এর আগে সোমবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়া ‘খুব ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে’ চলে গেছেন। গত রোববার রাত থেকে তিনি এ অবস্থায় গেছেন বলে আহমেদ আজম জানান।

আহমেদ আজম খান এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে দেখতে গিয়েছিলেন, তবে দেখার সুযোগ পাননি। বাইরে এসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বর্তমানে খালেদা জিয়া ভেন্টিলেশন সাপোর্টে আছেন। সিসিইউ থেকে আইসিইউ, এরপরে ভেন্টিলেশন বা লাইফ সাপোর্ট, যা-ই বলেন। আমি এগুলোর বাইরে বলব যে ম্যাডাম খুব ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে আছেন। ফাইট করছেন আমাদের মাঝে ফিরে আসার জন্য। বলার মতো কোনো কন্ডিশনে এখনো তিনি আসেননি।’

গুরুতর অসুস্থ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত বুধবার থেকে প্রায় সাড়াহীন ছিলেন। তিন দিন পর গত শনিবার তিনি সামান্য কথা বলেন। তবে সেদিনও সামগ্রিক সংকট কাটেনি। সেদিন চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ছিল, আগামী কয়েকটি দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি কার্যক্ষমতায় স্থিতিশীলতা ছাড়া তাঁর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থায় স্থায়ী উন্নতি আসা কঠিন।

চীনা চিকিৎসক দল

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সহায়তায় চীন থেকে আসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল এভারকেয়ার হাসপাতালে গেছে। তারা সন্ধ্যা সাতটার দিকে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে মিলিত হয়।

খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক আল মামুন সাংবাদিকদের বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সহায়তার জন্য চীনের পাঁচ সদস্যের একটি চিকিৎসক দল এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছেছে। মূল চিকিৎসক দল মঙ্গলবার (আজ) পৌঁছাবে।
দেশের একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আমেরিকার জনস হপকিনস হাসপাতালের চিকিৎসক এবং লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের অধীন খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। এতে সহায়তা দিতে চীনের চিকিৎসকেরাও যুক্ত হয়েছেন।

গুরুতর অসুস্থ হয়ে গত ২৩ নভেম্বর থেকে হাসপাতালে শয্যাশায়ী খালেদা জিয়া। তাঁর লিভারজনিত সংকট, কিডনির কর্মক্ষমতা হ্রাস, শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিসসহ একাধিক শারীরিক জটিলতা একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় তাঁর চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক দিনে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে আইসিইউ সমমানের হাইডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) রাখা হয়েছিল। রোববার ভোরে এইচডিইউ থেকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র আইসিইউতে নেওয়া হয়।

বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত খবর নিয়ে নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ করেছেন বিএনপির নেতারা। এ পরিস্থিতিতে দলটি খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সংবাদ তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেনের বক্তব্য ছাড়া অন্য কোনো সূত্র বা কারও বক্তব্য ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে।

সোমবার বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান গণমাধ্যমে এ তথ্য পাঠান।

বিকেলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেছেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল, চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তাঁর চিকিৎসা চলছে।

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে ম্যাডামকে নিয়ে সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে, এটা সঠিক নয়। কেউ এতে, বিভ্রান্ত হবেন না।’

খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা এবং দীর্ঘায়ু কামনায় সোমবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের আয়োজনে দোয়া ও বিশেষ মোনাজাত হয়েছে। রোগ মুক্তি কামনায় ছাদকায়ে জারিয়া হিসেবে কেউ কেউ পশু জবাই করে গরিব দুস্থদের মধ্যে দান করেন।

দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে দলের কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুব ইসলামের বাসভবনে এক দোয়ার অনুষ্ঠানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সিসিইউতে আগের মতোই বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। তিনি কারও বক্তব্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি