Wednesday, January 29, 2020

মায়েরা যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন

মা হবার অনুভূতি তুলনাহীন। নিজের শিশুর যত্ন নিতে ভালবাসেন মায়েরা। খাওয়ানো, গোসল করানো, ঘুম পাড়ানো, বাচ্চার ব্যবহার্য জিনিসপত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মতো কাজ করতে করতে বারবার মনে হয়, যা করছি তা ঠিকঠাক মতো করতে পারছি তো? কোনোভাবে বাচ্চাকে ব্যথা দিয়ে ফেলব না তো? এরকম নানা প্রশ্ন, নানা দ্বিধা কাটিয়ে ওঠার জন্য রইল কিছু পরামর্শ।
সব সময় মনে রাখুন আপনার সন্তানের কাছে কিন্তু আমাদের জগতের সবকিছুই নতুন, অপরিচিত। তাই শিশুর যত্ন ও যেকোন কাজ যেমন: গোসল করানো, খাওয়ানো, পোশাক পরানোর সময় যতটা সম্ভব ধীরেসুস্থে করুন। ওকে প্রত্যেকটি অনুভূতির সাথে ধীরে ধীরে পরিচিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিন।
শিশুর কোনো ব্যবহারের মধ্যে নির্দিষ্ট ছক খুঁজতে যাবেন না। বড়রা ঘড়ি ধরে ঘুম, খাওয়া বা অন্যান্য কাজ করতে পারেন। কিন্তু নিজেদের সুবিধামতো সেই নিয়মানুবর্তিতা শিশুদের কাছ থেকে আশা করা উচিত নয়। তারা একবারে পেট ভরে নাও খেতে পারে। সারারাত না ঘুমিয়ে জেগেও থাকতে পারে। অনেক সময় কোনো কারণ ছাড়া জেগেও থাকতে পারে, কোনো কারণ ছাড়াই কান্না শুরু করতে পারে বা থামিয়ে দিতে পারে। এই এসব মেনে নেয়াই ভালো। শিশুর যে সময়ে যা প্রয়োজন তার একটা আন্দাজ করে নিয়ে নিজেদের তৈরি রাখুন শিশুর যত্ন নিতে ।
জন্মের প্রথম ৩-৪ মাস শিশুর প্রয়োজন খুবই সীমিত। ঝকমকে জামাকাপড়, নানা ধরনের খেলনাপাতি, দামি ব্র্যান্ডের প্রসাধনী কিনতে হয়তো আপনার ভালো লাগছে। কিন্তু এর মধ্যে কোনোটাই আপনার শিশুর যত্ন নিতে তেমন দরকার নেই। শুধু খেয়াল রাখুন যাতে ওর প্রাথমিক প্রয়োজন যেমন দুধ, উষ্ণতা, পরিচ্ছন্নতা সঠিক সময়ে দেয়া হয়।
শিশুকে সঙ্গ দেয়া দেখাশোনার একটি অন্যতম অঙ্গ। নিজের মুখ বাচ্চার থেকে এক ফুট দূরত্বে এনে ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করুন। শান্ত, ধীর লয়ে কথা বা ছড়া অথবা গান করুন যাতে আপনার গলার স্বর শুনে সে স্বস্তি বোধ করে।
তথ্যসূত্র: কিডস অ্যান্ড মম জোন

জেনে নিন মুসলিম বিজ্ঞানীদের যতো আবিষ্কার by সাইফুর রহমান তুহিন

প্রাচীনকালে মুসলিম বিজ্ঞানীরা অনেক কিছু আবিষ্কার করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে মুসলিমদের আবিষ্কারসমূহ মানব সভ্যতাকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আবিষ্কারের সেসব কাহিনিতে পাওয়া যাবে অনেক চমকপ্রদ তথ্য। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইফুর রহমান তুহিন

কফি: আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ ইথিওপিয়ার কাফা অঞ্চলের খালিদ নামের এক আরব বাসিন্দা ছাগল চরানোর সময় খেয়াল করেন যে, জামের মতো এক ধরনের ফল খাওয়ার পর প্রাণীগুলোকে অনেক সতেজ দেখাচ্ছে। খালিদ ওই ফলগুলোকে সেদ্ধ করে সর্বপ্রথম কফি তৈরি করেন। এরপরই পানীয়টি ইথিওপিয়া থেকে ইয়েমেনে রফতানি করা হয়। সেখানে সুফি-সাধকরা বিশেষ উপলক্ষে রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য এটি পান করেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষদিকে কফি পৌঁছে যায় মক্কা ও তুরস্কে। সেখান থেকে ১৬৪৫ সালে এটি যায় ইতালির ভেনিস নগরীতে। ১৬৫০ সালে পাস্ক রোসি নামের এক তুর্কীর হাত ধরে এটি ইংল্যান্ডে প্রবেশ করে। তিনি লন্ডন নগরীর লোম্বার্ড স্ট্রিটে সর্বপ্রথম কফির দোকান দেন। এরপরই বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসার লাভ করে পানীয়টি।

ক্যামেরা: প্রাচীন গ্রীকরা মনে করতো যে, আমাদের চোখে লেজার রশ্মির মতো আলোকরেখা রয়েছে। যা আমাদের দেখতে সাহায্য করে। দশম শতাব্দীতে মুসলিম গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী ইবনে আল-হাইতাম সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেন যে, চোখ থেকে যতোটা আলো বেরোয় তার চেয়ে বেশি আলো চোখে প্রবেশ করে। আলো উইন্ডো শাটারের মাধ্যমে একটি বিন্দুতে প্রবেশ করতে পারে—এটি বুঝতে পারার পর তিনি প্রথম পিনহোল ক্যামেরা আবিষ্কার করেন। আল-হাইতাম বুঝতে পারেন যে, বিন্দু যতো ছোট হবে ছবি ততো ভালো হবে। এ উপলব্ধি থেকে তিনি প্রথম অবসকিউরা (ডার্করুম) স্থাপন করেন। একটি পরীক্ষণের মাধ্যমে পদার্থবিদ্যার দার্শনিক রূপ তুলে ধরার জন্য তিনি বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী।

প্যারাস্যুট: আমরা জানি, অরভিল রাইট ও উইলভার রাইট উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেন। তবে এর এক হাজার বছর আগেই স্পেনের মুসলিম কবি, জ্যোতির্বিদ, সুরস্রষ্টা ও প্রকৌশলী আব্বাস ইবনে ফিরনাস আকাশে ওড়ার একটি বাহন তৈরির প্রচেষ্টা চালান। ৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি একটি পুরনো আলখাল্লায় কাঠের পাত সংযোজন করে কর্ডোবার গ্র্যান্ড মসজিদের মিনার থেকে লাফিয়ে পড়েন। তিনি আশা করেছিলেন, এভাবে তিনি পাখির মতো মসৃণ গতিতে উড়বেন কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তবে মাটিতে পড়ার আগে আলখাল্লার গতি কমে যাওয়ায় আব্বাস মারাত্মক কোন আঘাত পাননি। তার ওই বাহনটিকেই ইতিহাসের প্রথম প্যারাস্যুট বলে গণ্য করা হয়। ৮৭৫ সালে ৭০ বছর বয়সে তিনি সিল্কের কাপড়ের সাথে ঈগল পাখির পালক যুক্ত করে পর্বতের ওপর থেকে ঝাঁপ দেন। এভাবে তিনি উল্লেখযোগ্য উচ্চতায় ওড়েন। দশ মিনিট ভেসে বেড়াতে সক্ষম হলেও নিরাপদে মাটিতে নামতে ব্যর্থ হয়ে মারা যান আব্বাস। পরে তার নামে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চাঁদের একটি গর্তের নামকরণ করা হয়।

রসায়ন শাস্ত্র: ৮০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ইসলামের সর্বপ্রথম বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান ডিস্টিলেশন অর্থাৎ সিদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তরল পদার্থের একটিকে আরেকটি থেকে পৃথক করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। জাবিরই অনেক মৌলিক প্রক্রিয়া ও যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের মাধ্যমে আলকেমিকে কেমিস্ট্রি বা রসায়ন শাস্ত্রে রূপ দেন। তার আবিষ্কৃত তরলীকরণ, স্ফটিকীকরণ, সিদ্ধকরণ, শুদ্ধকরণ, অক্সিজেনের সাথে যুক্তকরণ, বাষ্পীভবন ও ফিল্টারেশন প্রক্রিয়া এখনো বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে ব্যবহার করা হয়। সালফিউরিক ও নাইট্রিক অ্যাসিড আবিষ্কারের পাশাপাশি তিনি চোলাইযন্ত্র আবিষ্কার করেন, যার মাধ্যমে বিশ্বের সর্বত্র তৈরি হচ্ছে গাঢ় গোলাপ জল, বিভিন্ন সুগন্ধি দ্রব্যাদি ও অ্যালকোহল (যদিও ইসলাম ধর্মে এটি হারাম)। জাবির ইবনে হাইয়ান সঠিক প্রক্রিয়া অনুসারে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতেন। রসায়ন শাস্ত্রের জনক হিসেবে তার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

শল্যচিকিৎসার সরঞ্জাম: আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অপারেশন করার জন্য যেসব সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়, তার অনেকগুলোই দশম শতাব্দীতে মুসলিম শল্যবিদ আল-জাওয়াহিরির উদ্ভাবিত দ্রব্যাদির মতো। তার উদ্ভাবিত হালকা ছুরি, অস্থি কাটার ছুরি, ছোট সাঁড়াশি, চোখের অপারেশনে ব্যবহৃত সূক্ষ্ম কাঁচিসহ ২০০ প্রকার শল্যচিকিৎসার যন্ত্রপাতি আধুনিক যুগের যে কোন শল্যবিদের অতি পরিচিত জিনিস। তিনিই প্রাকৃতিকভাবে অদৃশ্য হয়, এমন সুতা আবিষ্কার করেন। যা অপারেশনের পর সেলাইয়ের জন্য সার্জনরা ব্যবহার করে থাকেন। ক্যাপসুল তৈরির জন্যও এর ব্যবহার রয়েছে। এছাড়া উইলিয়াম হার্ভে রক্ত পরিসঞ্চালন পদ্ধতি আবিষ্কারের ৩০০ বছর আগেই ইবনে নাফিস নামে এক মুসলিম মেডিকেল ছাত্র এ প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, আফিম ও অ্যালকোহলের মিশ্রণের মাধ্যমে যে চেতনানাশক ব্যবহার করা হয়, তা-ও আবিষ্কার করেন মুসলিম চিকিৎসকরা। তারা নীডলেরও উন্নতি সাধন করেন, যা ছোখের ছানি অপসারণে আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।

উইন্ডমিল বা বায়ুকল: ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের এক খলিফার জন্য শস্য গুঁড়া করা এবং সেচকার্যে পানি উত্তোলনের উদ্দেশে উইন্ডমিল আবিষ্কৃত হয়। মরুময় আরব অঞ্চলে যখন মৌসুমী পানির প্রবাহগুলো শুকিয়ে যেতো, তখন শক্তির একমাত্র উৎস ছিল বাতাস। যা প্রায় মাসখানেক ধরে একদিক থেকে প্রবাহিত হতো। তখনকার দিনে ৬ থেকে ১২টি পাখাবিশিষ্ট উইন্ডমিল অট্টালিকা বা তালপাতার ওপর দেখা যেতো। এর ৫০০ বছর পর ইউরোপে উইন্ডমিলের প্রচলন হয়।

রকেট: বারুদ তৈরিতে ব্যবহৃত নোনতা গানপাউডার চীনারা আবিষ্কার করে আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু আরবরা সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য গানপাউডার বিশুদ্ধকরণের বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিল। ক্রুসেড যুদ্ধে মুসলিমদের আবিষ্কৃত আগ্নেয়াস্ত্র প্রতিপক্ষ শিবিরে ভীতির সঞ্চার করে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে মুসলিমরা রকেট (যাকে তারা বলতো স্বয়ংক্রিয় দাহ্য ডিম) এবং টর্পেডো (নাশপাতি সদৃশ সম্মুখে অগ্রসরমান বোমা, যার অগ্রভাগ ছিল বর্শার মতো) আবিষ্কার করে। টর্পেডো শত্রুজাহাজকে ধ্বংস করে অদৃশ্য হয়ে যেতো।

ফাউন্টেন পেন: ৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের সুলতানের প্রয়োজনে ফাউন্টেন পেন আবিষ্কৃত হয়। তিনি এমন কলম চাইছিলেন, যা তার হাত কিংবা পরনের পোশাককে নষ্ট করবে না। এই কলমের মধ্যে কালি জমিয়ে রাখার জায়গা থাকতো। বর্তমান যুগের কলমের নিবের মধ্যে ফেড ইঙ্ক থাকে, যা তখনকার দিনের কালির আধুনিক সংস্করণ।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।

Saturday, January 25, 2020

শ্রীলংকা গৃহযুদ্ধ: এক সময়ের শত্রু এখন স্বামী-স্ত্রী

গৌরি আর রোশান এক সময় শত্রু, এখন সুখী পরিবার
গৌরি মালার আর রোশান জায়াথিলাকে তাদের ১১ মাস বয়সী মেয়ের সাথে খেলা করতে দেখলে মনে হবে না যে মাত্র ১০ বছর আগেও একে অপরের শত্রু ছিলেন তারা।
২৬ বছর বয়সী গৌরি ছিলেন বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল টাইগার্সদের শিশু যোদ্ধা। তাদের মতে, যারা লড়াই করতো রোশানের মতো মানুষদের দ্বারা সৃষ্ট অত্যাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
তিনি বলেন, "সিংহলীদের দেখা বা তাদের সাথে কথা বলিনি আমি। আমরা ভাবতাম তারা খারাপ মানুষ এবং আমাদেরকে হত্যা করবে।"
আর রোশানের জন্য বিদ্রোহীরা ছিল ঘৃণিত শত্রু। ২৬ বছর ধরে চলা যুদ্ধে যাদের বোমা হামলা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে নিষ্পাপ মানুষের।
"আমরা একে অপরকে শত্রু ভাবতাম," বলছিলেন ২৯ বছর বয়সী রোশান।
তিনি বলেন, "কিন্তু এখন আমরা সুখী দম্পতি। আমাদের মেয়ে আমাদের ভালোবাসার প্রতীক।"
তাহলে কোন পরিবর্তন তাদের এক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল? তারা এখন নিজেদের একটা বাড়ি তৈরি, একটা গাড়ি কেনা আর ছোট্ট সেনুলি চামালকাকে স্কুলে পাঠানোর স্বপ্ন দেখে।
কেন্দ্রীয় শহর দাম্বুলার মতো এ ধরণের বাসে বোমা হামলা দেখেই নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেন রোশান
শ্রীলংকায় সহিংসতা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলীদের একটা অংশের মধ্যে বাড়তি জাতীয়তাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার ক্ষোভে তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীরা হামলা চালিয়ে ১৩ সেনাকে হত্যা করে।
এই ঘটনা তামিল বিরোধী দাঙ্গার জন্ম দেয়। যাতে প্রাণ হারায় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীটির কয়েক'শ সদস্য।
গৌরির জীবনে যুদ্ধ ছিল নিয়মিত বিষয়ের মতোই। তবে এটা স্থায়ীভাবে বদলে যায় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। যখন গৌরি জানতে পারে, তার বড় ভাই শুভ্রমানিয়াম কান্নান ট্রাক্টর চালানোর সময় গোলার আঘাতে আহত হয়েছেন।
ভাঙা মন নিয়ে বড় ভাইকে খুঁজতে গিয়ে বিদ্রোহীদের হাতে অপহৃত হন তিনি। ১৬ বছর বয়সী গৌরিকে এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে পাঠায় তারা।
"আমি দেখলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে মানুষ" বলেন গৌরি।
তিনি বলেন, "আমার এক বান্ধবী বোমার আঘাতে আহত হয়। আমরা তাকে ওঠানোর চেষ্টা করি। কিন্তু সে একটি সায়ানাইড ক্যাপসুল চিবিয়ে খেয়ে আত্মহত্যা করে। কারণ তার ক্ষতগুলো এতই মারাত্মক ছিল যে বেঁচে থাকাটা তার কাছে নিরর্থক ছিল।"
"আমাদের গোসল এবং খাবারের কোন সুব্যবস্থা ছিল না। এক সময় আমার মনে হতে লাগলো যে বেঁচে থেকে লাভ কী?"
জাতিসংঘের মতে, গৃহযুদ্ধের শেষের দিকে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে উত্তরাঞ্চলে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা
২০০৪ সালে ১৪ বছর বয়সে যুদ্ধ তার থাবা বিস্তার করে রোশানের জীবনে।
বিচ্ছিন্নতাবাদী আর সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকার মাঝে অবস্থিত ভাবুনিয়া জেলায় রোশানের পারিবারিক গ্রামে হিন্দু নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে আঘাত হানে বিদ্রোহীদের ছোড়া একটি বোমা।
এর পরপরই বোমা হামলায় সামরিক-বেসামরিক মানুষদের মৃত্যুর ক্ষোভে বাবা আর চাচাত ভাই-বোনদের মতোই সরকারি নিরাপত্তা বিভাগে যোগ দেন রোশান।
"আমরা প্রায় প্রতিদিনই হামলার খবর শুনতাম।" বলেন রোশান।
তিনি জানান, সংঘাতে নিজের এক ভাইকে হারান তিনি।
"মানুষ ভীত ছিল। মারা পরার ভয়ে এক সাথে কোথাও ঘুরতেও যেতো না কেউ।"
২০০৯ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রায় এক লাখ মানুষ প্রাণ হারায় এই সহিংসতায়।
২০১৫ সালে এক প্রতিবেদনে, অন্যায় হত্যাকান্ডের জন্য দুপক্ষকেই দায়ী করে জাতিসংঘ।
এতে বলা হয়, নির্যাতন আর ধর্ষণের মতো অপরাধের সাথে জড়িত নিরাপত্তা বাহিনী। আর বয়স্ক ও শিশুদের জোর করে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করেছে বিদ্রোহীরা।
প্রায় এক মাস যুদ্ধ করেছে গৌরি। হৃদযন্ত্রে ত্রুটি থাকার কারণে গৌরিকে মুক্ত করে দেন তার দলনেতা।
এর পরেই শ্রীলংকার সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে গৌরি।
সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচীতে পাঠানো আরও অনেক বিদ্রোহীদের সাথে ছিলেন তিনি।
বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব থাকলেও সিংহলীদের সাথে মিশে গৌরি অনুভব করে যে, তারাও "মানুষ"। এরপর সরকারি নিরাপত্তা বিভাগে যোগ দেন তিনি।
রোশানের ইউনিফর্মে একটি ব্যাজ ঠিক করছেন গৌরি
উত্তরাঞ্চলে কিছু খামার প্রতিষ্ঠা করেছিলো সরকার। আর উদয়নকাট্টুতে এরকমই একটি খামারে পরিচয় হয় গৌরির হবু স্বামীর সাথে।
২০১৩ সালে সেখানে নিয়োগ পান গৌরি। আর সেখানে এক বছর আগে থেকেই কাজ করছিলেন রোশান।
তবে তামিল-ভাষী মানুষদের সাথে যোগাযোগ করতে না পারায় বেশ ঝামেলায় ছিলেন তিনি।
রোশানের দোভাষী হিসেবে কাজ করতেন গৌরি। যে তার জীবন বদলে দিয়েছিলেন।
গৌরি বলেন, "তিনি নিশ্চয়ই একা হয়ে পড়েছিলেন। আমি চাইতাম তিনি যেন ভাল থাকেন। তাই বাসা থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে আসতাম।"
খুব দ্রুতই তারা পরস্পরের প্রতি অনুভূতি বুঝতে পারেন।
"আমি তাকে বলেছিলাম, আমি তাকে তার মায়ের চেয়েও বেশি ভালোবাসি" গৌরি বলেন।
রোশান বলেন, "আমি যখন ছুটিতে যেতাম যখন গৌরি কান্নাকাটি করতো। সে নিশ্চিত হতে চাইতো যে টিকে থাকার মতো পর্যাপ্ত অর্থ আমার কাছে আছে কী না।"
নিজেদের সম্পর্কের কথা প্রকাশ করলে প্রচলিত নানা কুসংস্কারের মুখে পড়তে হয় তাদের। রোশানের এক আত্মীয় বলেন, "সিংহলী অনেক মেয়ে থাকতে তামিল কোন মেয়ের পেছনে কেন পড়ে আছিস?"
রোশানের মা তাদের বিয়ের বিপক্ষে ছিলেন। সাবেক তামিল টাইগার যোদ্ধা গৌরির বোনও বিপক্ষে ছিলেন।
তার ধারণা ছিল সিংহলী কাউকে বিয়ে করলে সম্প্রদায় থেকে বের করে দেয়া হবে গৌরিকে। আর তার স্বামীও তাকে মারপিট করবে।
যুদ্ধের কারণে শুধু বোমা হামলার শিকার গাড়ির ধ্বংসাবশেষই নয়, অনেক কুসংস্কারও মোকাবেলা করতে হয়েছে এই দম্পতিকে
তারা বলেন, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা দেখে দুই পরিবার তাদেরকে মেনে নিতে রাজি হয়।
"ধীরে ধীরে সব কিছু ঠিক হয়ে যায়", গৌরি বলেন।
এমনকি রোশানের মাও মৃত্যুর আগে সেনুলি চামালকার আগমনে অনেক বেশি খুশি হয়েছিলেন।
"আমাদের ছোট্ট ফেরেশতা আমাদেরকে আরও বেশি কাছে এনেছে" তিনি বলেন।
এখন গৌরির পরিবারের সাথে থাকেন এই দম্পতি। গৌরি বলেন, রোশান আমার বোনের "সবচেয়ে পছন্দের দুলাভাই" হয়েছেন।
২০১৪ সালে বিয়ে করেন এই দম্পতি। সেনুলি চামালকারকে হিন্দু আর বৌদ্ধ দুই ধরণের মন্দিরেই নিয়ে যান তারা। তাদের কাছে বিভক্তি এখন শুধুই অতীত।
যাই হোক, ইস্টার সানডে হামলায় আড়াই'শ মানুষের প্রাণহানি এবং এর জেরে মুসলিম বিরোধী মনোভাব দেশটিকে নতুন করে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এই দম্পতি।
গৌরি বলেন, "যেকোনো যুদ্ধে কোন এক পক্ষের মানুষ মারা যায় না। ধর্ম আর বিশ্বাসের বাইরেও অনেক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় যুদ্ধ।"
"আমরা আরেকটা যুদ্ধ চাই না," গৌরি বলেন।

Friday, January 24, 2020

আলসারেটিভ কোলাইটিস : উপসর্গ ও চিকিৎসা by ডা: এ কে এম ফজলুল হক

আলসারেটিভ কোলাইটিস:উপসর্গ ও চিকিৎসা
পূর্বে ইউরোপ ও আমেরিকায় এ রোগ দেখা গেলেও উপমহাদেশের জনগণের মধ্যে ছিল কদাচিত। তবে বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোর খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতি অনুকরণের ফলে আমাদের দেশের জনগণের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে আলসারেটিভ কোলাইটিস। এ রোগটি সাধারণত ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সের মাঝামাঝি লোকজনের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। আলসারেটিভ কোলাইটিস ঠিক কাদের হয় তার কারণ সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে মামাতো, চাচাতো, খালাতো ও ফুফাতো ভাই-বোনদের সন্তানদের মধ্যে এ রোগ দেখা দিতে পারে। কেউ কেউ মনে করেন কোলনের অন্ত্রগাত্রের আবরণ যদি দুর্বল হয় তবে এ রোগ হতে পারে।
কেউ যদি খুবই দুশ্চিন্তায় ভোগে, দুধ কিংবা দুগ্ধজাতীয় খাবার খায় অথবা আমাশয়ে ভোগে তবে আলসারেটিভ কোলাইটিসের উপসর্গগুলো বারবার দেখা দিতে পারে।
উপসর্গ :
১. ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়া;
২. পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া;
৩. অনেক সময় এমনিতেই মলদ্বার দিয়ে মিউকাস কিংবা আমজাতীয় পদার্থ বের হওয়া;
৪. রক্ত যাওয়া;
৫. তলপেটে মোচড় দেয়া এবং সাথে সাথে প্রচণ্ড পায়খানার বেগ অনুভব হওয়া;
৬. সময় মতো বাথরুমে যেতে না পারলে;
৭. পায়খানা হয়ে কাপড় নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং
৮. ঘন ঘন পাতলা পায়খানা ও রক্ত যাওয়া ফলে রোগীর পানি, লবণ এবং রক্তশূন্যতা দেখা দেয়া ইত্যাদি।
সময় মতো চিকিৎসা না করলে কী হতে পারে :
১. কোলনে ক্যান্সার হতে পারে
২. দেহের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা হতে পারে, যেমন-কোমর, মেরুদণ্ড, হাঁটু, পায়ের গোড়ালি, হাতের জয়েন্টে;
৩. চামড়ার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লাল দাগ অথবা আলসার হতে পারে;
৪. চোখের বিভিন্ন ধরনের প্রদাহজনিত রোগ হয়ে অন্ধ হয়ে যেতে পারে;
৫. মুখ, হাত ও পায়ে পানি এসে শরীর ফুলে যেতে পারে এবং
৬. জন্ডিস হতে পারে, লিভারের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হয় লিভার নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
চিকিৎসা :
ওষুধ : সাধারণত স্টেরয়েড ও সালফাসেলজিন জাতীয় ওষুধ দিয়ে এ রোগের চিকিৎসা করা হয়। তবে মাঝে মধ্যে হাইড্রোকরটিসন, এজাথায়েপ্রিন অথবা সাইক্লোসপোরিন ব্যবহার করলে অনেকের মুখ ও শরীর ফুলে যেতে পারে, মাথার চুল পড়ে যেতে পারে, অনিদ্রা, অরুচি, হাতে-পায়ে জ্বালাপোড়া, বমি বমিভাবসহ নানাবিধ শারীরিক অসুবিধা হতে পারে।
অপারেশন : আলসারেটিভ কোলাইটিসের স্থায়ী চিকিৎসা হতে পারে অপারেশন, তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশনের দরকার হয় না।
যেসব ক্ষেত্রে অপারেশন প্রযোজ্য :
১. রোগীর অবস্থা খুবই সঙ্কটাপন্ন হলে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ ব্যবহারের পরও কোনো উন্নতি হয় না;
২. রোগী যদি ঘন ঘন পায়খানায় যেতে যেতে হাঁপিয়ে ওঠেন, পায়খানা ধরে রাখতে পারেন না কিংবা রক্তশূন্যতায় ভোগেন;
৩. দীর্ঘমেয়াদি স্টেরয়েড ব্যবহার করার পরও, যখন স্টেরয়েড আর কাজ করে না বরং স্টেরয়েড ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন;
৪. কোলনোস্কপি বা সিগময়ডোস্কোপি করার পর যখন ক্যান্সার ধরা পড়ে।
এ অপারেশনের পর পেটে স্থায়ীভাবে মলত্যাগের ব্যাগ লাগাতে হবে কিনা এটি একটি বড় প্রশ্ন। আজকাল জটিল বিশেষ ধরনের অপারেশন করে পেটে স্থায়ী মলত্যাগের ব্যাগ (আইলিওস্টমি) না লাগিয়েও অপারেশন করা যায়। এ অপারেশন করতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং বিশেষভাবে পারদর্শিতার প্রয়োজন হয়।
লেখক : বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ বিশেষজ্ঞ।
চেম্বার : ইডেন মালটিকেয়ার হাসপাতাল, ৭৫৩, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা।
ফোন : ৫৮১৫০৫০৭, ০১৭৫৫৬৯৭১৭৫

Thursday, January 23, 2020

মৃণাল সেন সম্পর্কে নন্দিতা দাস: ‘আমার বন্ধু, দার্শনিক ও পথ প্রদর্শক’ by নন্দিতা দাস

মৃণাল সেনের সঙ্গে নন্দিতা দাস
মৃণাল দা’র মৃত্যু নিয়ে আমাকে কিছু লিখতে হবে তা আমি ভাবতেই পারছি না। গত নভেম্বরে যখন দেখা হলো তখন তাকে বেশ দুর্বল মনে হলো। আমি জানতাম এই মেধাবী শিল্পী আমাদের ছেড়ে শিগগিরই চলে যাচ্ছেন। এমন একটি দিন আসবে জানা থাকলেও কেউ এর জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে না। আমার প্রতিক্রিয়া জানতে টেলিফোন করা এক সাংবাদিকের কাছ থেকে আমি প্রথম খবরটি জানতে পারি। আমি শোকে স্তব্ধ হয়ে যাই। ২০ বছরের সম্পর্কটিকে মাত্র একটি বাক্যে বলে ফেলা কি কারো পক্ষে সম্ভব? এমন মুহূর্তে আমাকে বিরক্ত করার জন্য এক সাংবাদিক আন্তরিক ক্ষমাও চেয়েছেন। একজনতো বললেন যে রোববার বন্ধের দিন হওয়ার পরও এই ‘ব্রেকিং নিউজের’ জন্য তাকে কাজ করতে হচ্ছে! ঘনিষ্ঠ কারো মৃত্যু যখন ‘সংবাদ চক্রে’র অংশ হয়ে যায় তখন বুঝা যায় আমাদের জীবনযাত্রাটি কতটা নি:সঙ্গ হয়ে পড়েছে।
আমি কলকাতায় গিয়েছি আর মৃণালদার সঙ্গে দেখা হয়নি এমনটি কখনো হয়নি। সেখানে অনেকে ছিলো, সবাইকে আমি স্নেহ করি। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগদানের উদ্দেশ্যে ছেলেকে নিয়ে কলকাতা যাওয়ার পর ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়। তাকে বেশ দুর্বল মনে হচ্ছিল। কিন্তু আমি যতক্ষণ ছিলাম উনি আমার হাতটিকে শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। দীর্ঘসময় মমতাপূর্ণ নিরবতা বিরাজ করছিলো। মাঝে মধ্যে সেই নীরবতা ভাঙ্গছিলো আমাদের টুকটাক কথায়। তিনি আমার ছবি মান্টো নিয়ে কথা বললেন, সন্তানের স্কুল সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আরো তাচ্ছিল্যের সঙ্গে এই বলে আক্ষেপ করেন যে চলচ্চিত্র উৎসবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যদিও তিনি জানতেন যে আমন্ত্রণ পেলেও তার যাওয়া হতো না, কিন্তু এই অসম্মান তাকে বেশ কষ্ট দিয়েছে।
ছবি: নন্দিতা দাস
বিদায়ের আগে আমরা কিছু ছবি তুলি। এটাই আমাদের শেষ দেখা হবে সেটা কি জানতাম? কাউকে শেষ বিদায় জানানো সবসময়ই বেদনার। কিন্তু তাকে নীরবতার মধ্যে বিবর্ণ হয়ে যেতে দেখা আরো বিষণ্নের। অনেক কথা, অনেক আইডিয়া, এমনকি অনেক বেশি কর্মতৎপর মানুষটি এখন তার ডাইনিং টেবিলে নি:সঙ্গ বসে আছে।
আমি ২০ বছরের বেশি সময় ধরে মৃণালদাকে চিনি। কাঠখোট্টা ধরনের মনে হওয়া অত্যন্ত সৎ মানুষটির কিন্তু কৌতুকরসের অভাব ছিলো না। তার স্ত্রী গীতাদী সবসময় পাশে থেকে তাকে শক্তি জুগিয়েছেন। তাদের সঙ্গে অনেক সন্ধ্যা কেটেছে তাদের গল্প শুনে। অনেক সময় তাদেরকে আত্মবিনয়ী দেখেছি। তখন দিদির দৃষ্টিটি বেশি ভালো মনে হতো। দিদি হেসে দিয়ে মৃণালদার চাটুকারিপূর্ণ গল্প বাতিল করে দিয়ে পাল্টা গল্প শোনাতেন। তাদের হাস্য-পরিহাস, নি:শর্ত ভালোবাসা এবং পারস্পরিক সম্মান সত্যিকারের ভালোবাসার প্রতি আমার বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করেছে। দিনের পর দিন আমাদের শোয়ার ঘরের আলাপচারিতা খাবারের টেবিল পর্যন্ত গড়িয়েছে। তাদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে সেই আলাপচারিতার তাদের বিছানায় পর্যন্ত পৌছে যায়। দুই বছর আগে গীতাদি আমাদের ছেড়ে গেলে মৃণালদা তার আসল সত্তাটি হারিয়ে ফেলেন।
আমার ভূবন ছবি সেটে, ছবি: নন্দিতা দাস
পরিচয়ের পর থেকেই মৃণালদা আমাকে বলতেন যে আমাকে নিয়ে তিনি ছবি বানাবেন। ২০০২ সালের কথা, সেটা ছিলো তার শেষ ছবি – আমার ভূবন। বাংলার একটি গ্রাম্য মুসলিম পরিবারের কাহিনী। এটা ছিলো ত্রিভুজ প্রেম। আমি সখিনার চরিত্রে অভিনয় করি। আমার দুই ভাই ছিলো। তাদের সঙ্গে কোন মনোমালিন্য ছিলো না। সংঘাতটি চাপা ছিলো কিন্তু সমাধানটি আমাদের আসল মূল্যবোধটিকেই চ্যালেঞ্জ করে বসে। শুটিংয়ের দিন পনের আগে মৃণালদা ফোন করে বলে কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কারণ বিনিয়োগকারীরা কোন মুসলিম পরিবারকে নিয়ে বানানোর ছবির পেছনে টাকা ঢালতে রাজি নয়! অবিশ্বাস্য মনে হলো। এটা গুজরাট রায়টের কিছু দিনের পরের ঘটনা। সাম্প্রদায়িক অশান্তি ও পক্ষপাতিত্বের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আমি তাকে বললাম যে মুসলিম কাহিনী আসলে প্রকল্প বাতিলের কোন কারণ নয়। এরপর তিনি যখন বললেন, ঠিক আছে আমার কাছে অল্প যে কিছু টাকা আছে তাই দিয়ে ছবি বানাবো, তবে তোমার ফি এখন দিতে পারবো না’, তখন আমি অবাক হইনি।
এরপর আমরা চব্বিশ পরগনা জেলার টাকি নামে একটি গ্রামে যাই। মনি রত্নমের তামিল ছবি কান্নাথিল মুথামিত্তাল-এর শুটিং শেষ করে আমাকে আমার ভূবন ছবির শুটিয়ের জন্য যেতে হয়েছিলো। একটি ‘ধর্মীয় ছবি’ করার জন্য আমি এমন জায়গায় গিয়েছি যেখানে কখনো যাইনি। আমি নানা ধরনের খাবার খেয়েছি, বহুরকম মানুষের সঙ্গে মিশেছি। কিন্তু এই দুই পরিচালকের মধ্যে ছিলো দুস্তর ব্যবধান। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টানা একঘেয়ে শুটিং থেকে আমি অনেক বেশী নমনীয় শিডিউলে কাজ করতে যাই। গিয়ে দেখি গোটা গ্রামটিই যেন ছবির কাজে নেমে পড়েছে। মৃণালদা, আমরা নায়ক-নায়িকা ও ক্ররা মিলে পাঁচজন একটা গেস্ট হাউজে থাকতাম। এর সামনে দিয়ে ইছামতি নদী বইছিলো। এর ওপারে বাংলাদেশ। মৃণালদা বলতে বাংলাদেশে সূর্য ওঠে, আর ভারতে এসে ডোবে। বাংলাদেশকে নিয়ে তার আলদা টান ছিলো। তিনি ফরিদপুরে জন্মেছিলেন, যা আজ নদীর ওপারে।
আমার ভূবন, ছবি: নন্দিতা দাস
সেটের ভেতর-বাইরে মৃণালদা তার জীবনের অনেক গল্প আমাদের বলতেন। তিনি বলতেন সৌমিত্র চ্যাটার্জি ও শাবানা আজমির মতো অভিনেতাদের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা, জিয়ান-লুক গোদার্দ ও সত্যজিৎ রায়ের মতো পরিচালকদের কথা। সবকিছুর জন্যই তার দরদ ছিলো। এমনকি রাতে আমরা যে মাছ খেতাম তার জন্যও। তিনি সবসময় খোলামনে কথা বলতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে তার ছবিটি দর্শকরা গ্রহণ করবে। তারা সেটা গ্রহণও করেছে। এমন এমন হাতে গোনা কয়েকজনের মধ্যে ছিলেন যারা শিল্প ও শিল্পীকে আলাদা করতেন না।
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য আমার ভূবন মনোনীন হয়। ছবিটি স্বল্প পরিসরে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেয়া হয়। এরপর আমরা পুরষ্কার গ্রহণের জন্য কায়রো চলচ্চিত্র উৎসবে একসাথে যাই। আমি অভিনয়ের জন্য আর মৃণালদাকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হয়। সেবারই সম্ভবত শেষবার ছবিটি বড় পর্দায় দেখানো হয়েছিলো। ছবিটি কয়েকবার টিভিতেও দেখানো হয় কিন্তু এর থিয়েটার প্রিন্টের কোন হদিস এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। তখন থেকে আমি এটি খুঁজছি। আমাদের মহান শিক্ষকদের প্রতি আমরা কতটা শ্রদ্ধাহীন, খুবই মর্মান্তিক একটি বিষয়।
তিনি জীবনে যেমন সাধারণ ছিলেন, মরনেও। তিনি খুব বেশি প্রচার চাইতেন না। তার মাপেক চিত্র নির্মাতাকে এখন গান-স্যালুট দেয়া হয়, পুষ্পস্তবক অর্পনের জন্য ভক্তদের ভীড় জমে যায়। তিনি এর কিছুই চাননি। তাকে যার ভালোবাসে তারা তার ইচ্ছাকে সম্মান করেছে। মৃণালদার শেষযাত্রায় মানুষের ঢল নামে। তারা নি:শব্দ পদযাত্রায় অংশ নেয়। সাধারণ মানুষের মতোই বিদায় নিতে চেয়েছিলেন তিনি।
আমার ভূবন ছবি সেটে, ছবি: নন্দিতা দাস
আমি যখন তার বাড়িতে যাই, সেখানে গীতাদিকে না দেখে বিসন্ন হয়েছিলাম। গিয়েছিলাম শুধু তাকে নয়, তার ছেলে কুনাল সেনকে দেখার জন্যও। সেও তার পিতার সততা ও মায়ের শক্তি পেয়েছে। কুনালদা তাকে বন্ধু ডাকতো এবং সেও অনেকের বন্ধু ছিলো। তবে সবার নয়। ভণ্ড ও মুনাফিকদের সে একদম দেখতে পারতো না মৃণালদা।
সে ছিলো আমার বন্ধু, দার্শনিক ও পথ প্রদর্শক। তার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো হবে কঠিন প্রশ্নগুলো করে যাওয়ার মাধ্যমে। আমাদের বিবেকের ডাকে সারা দিতে হবে, সাধারণ মানুষের কাহিনী ‍তুলে ধরতে হবে, যারা ক্রমেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
আমার এক ছবি দেখে তিনি বলেছিলেন, তুমি অসাধারণভাবে সাধারণ। কেরালায় যখন থাকো তখন মালয়ী। আর বাংলায় থাকলে বাঙ্গালী। আমি সেরকমই সাধারণ থাকতে চাই।
মৃণালদার সঙ্গে একটি যুগের একটি বিদায় নিয়েছে। তার সঙ্গে আমার ঘনঘন সাক্ষাত না হলেও সান্তনা ছিলো যে তার মতো কেউ আছে আমার। স্বার্থপরের মতো বলতে হয়, আমি যদি চিরকাল তার সঙ্গে থাকতে পারতাম। কিন্তু তার মতো একটি মানুষকে দিনে দিনে নিস্প্রভ হয়ে যেতে দেখা কঠিন হতো। আজ সময় এসে তাকে ও তার কাজগুলোকে সম্মান জানানোর সময় এসেছে। তিনি জীবনে  অনেক যুদ্ধ করেছেন, অনেক গল্প বলেছেন এবং আমাদের অনেককে অনেক কিছু দিয়েছেন। এখন শান্তিতে থাকুন তিনি।

Wednesday, January 22, 2020

মৃত্যুর পর দান করা মানুষের মৃতদেহ দিয়ে কী হয়?

আলঝেইমার্স রোগের গবেষণার জন্য নিজের মায়ের মৃতদেহ দান করেছিলেন এক ব্যক্তি।
কিন্তু সেটি গবেষণার কাজে ব্যবহৃত না হয়ে বিস্ফোরক পরীক্ষা করার কাজে ব্যবহার করা হয়।
সম্পতি আমেরিকার অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে একটি বায়োলজিক্যাল রিসোর্স সেন্টারের বিরুদ্ধে মামলার বিস্তারিত প্রকাশ পেয়েছে।
২০১৪ সালে সেই সেন্টারটিতে মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআই অভিযান চালিয়ে মানবদেহের কয়েকশত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পেয়েছে।
এই সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, মৃতদেহ দানকারী ব্যক্তিদের ইচ্ছা অনুযায়ী সেগুলো গবেষণার কাজে ব্যবহার না করে অবৈধভাবে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে।
আদালতের কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, মৃতদেহ দানকারী ব্যক্তিদের পরিবারগুলো বলছে যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য মৃতদেহ দান করা হয়েছিল।
একটি মামলার বাদী জিম স্টফার বলেন, তাঁর মা আলঝেইমার্স রোগের চিকিৎসার গবেষণার জন্য মৃতদেহ দান করেছিলেন।
যেহেতু তিনি নিজে আলঝেইমার্স রোগে ভুগছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে মি: স্টফার জানতে পারেন যে বিস্ফোরকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য সেনাবাহিনী তার মায়ের মৃতদেহ ব্যবহার করেছিল।
শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ বা দেখভাল করে যুক্তরাষ্ট্রের হেলথ এন্ড হিউম্যান সার্ভিসেস বিভাগ।
কিন্তু মৃতদেহ দান করার বিষয়টি দেখভালের কেউ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে মৃতদেহ কেনা-বেচা একটি অপরাধ। কিন্তু মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া, সংরক্ষণ করা, পরিবহন করা এবং ফেলে দেয়ার জন্য কিছু যৌক্তিক অর্থ নেয়া আইনসিদ্ধ কাজ।
কিন্তু এই 'যৌক্তিক অর্থ' বলতে কী বোঝায় সেটি অবশ্য পরিষ্কার নয়।
চিকিৎসা গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর কত মৃতদেহ দান করা হয় সেটির কোন পরিসংখ্যান নেই।
তবে ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর কয়েক হাজার মানুষ শিক্ষা এবং চিকিৎসার জন্য মৃতদেহ দান করে।
তারা মনে করে, এই মৃতদেহ গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হবে।
মেডিকেল শিক্ষার্থীদের শেখানোর জন্য এই মৃতদেহ ব্যবহার করা হয়। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা কাজটি স্বচ্ছ উপায়ে করে।
ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি অ্যানথ্রোপলজিক্যাল রিসার্চ ফ্যাসিলিটি বলছে, মানুষের মৃতদেহ কিভাবে পঁচে যায় সেটি নির্ণয় করার জন্য ফরেনসিক দলকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যানাটমিক্যাল সার্ভিসেস-এর এক কর্মকর্তা জানালেন, মৃতদেহগুলো কোথায় যাচ্ছে সেটি নির্ণয় করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তিনি বলেন বর্তমানে যেসব নিয়মকানুন আছে সেগুলো যথেষ্ট নয়।
সুনির্দিষ্ট আইনের অভাবে দানকরা মৃতদেহগুলো যে উদ্দেশ্যে দেয়া হচ্ছে, সেটি পুরোপুরি পালন করা হচ্ছে না। এগুলোর অপব্যবহার হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যেসব প্রতিষ্ঠানে মৃতদেহ দান করা হয় সেগুলোকে সনদ দেয় আমেরিকান এসোসিয়েশন অব টিস্যু ব্যাংকস।
যদিও এ ধরণের সনদ বাধ্যতামূলক নয়। অ্যারিজোনার যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মৃতদেহ অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে তাদের কোন সনদ ছিল না এবং তারা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক-ভিত্তিতে পরিচালিত।
এই প্রতিষ্ঠানটি বিনা খরচে মৃতদেহ নিয়ে আসা এবং সমাহিত করার ব্যবস্থা করে। ফলে বিষয়টি নিম্ন আয়ের মানুষকে আকৃষ্ট করে।

অন্যান্য দেশে মৃতদেহ দান


ইংল্যান্ড, ওয়েলস এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে হিউম্যান টিস্যু অথরিটি নামে একটি সংস্থা আছে।
যেসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা গবেষণার জন্য মৃতদেহ দান করা হয়, সেখানে নিয়মিত পরিদর্শন করে টিস্যু অথরিটি।
ব্রিটেনে ১৯টি প্রতিষ্ঠান আছে যারা দান করা মৃতদেহ গ্রহণ করে।
অনেক দেশ আছে যেখানে ধর্মীয় কারণে চিকিৎসা গবেষণার জন্য মৃতদেহ দান করার বিষয়টি বাধাগ্রস্ত হয়।
আফ্রিকার অনেক দেশে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করার ক্ষেত্রেও নানা ধরণের সামাজিক বিধি-নিষেধ আছে।
কাতারে একটি হাসপাতাল আছে যেখানে চিকিৎসা গবেষণার জন্য মানব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমদানি করা হয়। এই হাসপাতালটি ১২ বছর যাবত কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় বায়োলজিক্যাল রিসার্চ সেন্টারে যে ঘটনা ঘটেছে সেটি মৃতদেহ দানকারী শিল্পে অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে।
কিন্তু তারপরেও মৃতদেহ দানকরা চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মানবদেহকে বোঝার জন্য এটি অমূল্য একটি বিষয়।
মৃতদেহ দানকরা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভারের সুসান পর্টারের ঘটনা।
২০১৫ সালে এই বৃদ্ধ নারী তার মৃতদেহ দান করেন কলোরাডো ইউনিভার্সিটির ভিজিবল হিউম্যান প্রজেক্ট-এর ড. ভিক স্পিটজারের কাছে।
এই প্রজেক্টর মাধ্যমে মানবদেহকে ভার্চুয়াল নমুনায় রূপান্তর করা হয়।
সুসান পর্টারের মৃতদেহ কেটে ২৭০০০ টুকরা করা হয়। প্রতিটি টুকরার ছবি নিয়ে সেগুলোর ভার্চুয়াল স্তূপ করা হয় এবং সেগুলোর মাধ্যমে তার শরীরের থ্রিডি ইমেজ তৈরি করা হয়।

ইউরোপে ধার্মিক বেশি কোন দেশে?

ধর্মচর্চার দিক থেকে ইউরোপের দেশগুলো খুব একটা পিছিয়ে নেই। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনুন্নত দেশগুলোর থেকে সমৃদ্ধশালী দেশগুলোতে ধার্মিকের সংখ্যা অনেক কম। একইসঙ্গে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে ধার্মিক লোকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ডয়েচে ভেলে জানিয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইউরোপের ৩৪টি দেশে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। মূলত তিন ক্যাটেগরিতে এটি করা হয়। এগুলো হলো: অত্যন্ত ধার্মিক, মাঝারি পর্যায়ের ধার্মিক ও কম ধার্মিক। নাগরিকদের মধ্যে যাঁরা ধর্মকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন, মাসে একবার ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন, দিনে অন্তত একবার প্রার্থনা করেন ও সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন, তাঁদের ‘অত্যন্ত ধার্মিক’ ক্যাটেগরিতে রাখা হয়েছে।
কোন কোন দেশে ধার্মিক বেশি?
গবেষণা বলছে, ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধার্মিকের বাস রোমানিয়াতে। দেশটির শতকরা ৫৫ ভাগ লোক অত্যন্ত ধার্মিক।
তবে নিয়মিত প্রার্থনার ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থান তৃতীয়। গবেষণা বলছে, দেশটির ধার্মিকদের শতকরা ৪৪ ভাগ প্রতিদিন উপাসনা করে থাকেন।  ইউরোপের দেশগুলোতে ধার্মিকের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আর্মেনিয়া। দেশটির শতকরা ৫১ ভাগ লোক অত্যন্ত ধার্মিক বলে দাবি করছে গবেষণাটি। এর মধ্যে শতকরা ৪৫ ভাগ লোক প্রতিদিন প্রার্থনা করেন, যা ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়। এছাড়া, জর্জিয়ার শতকরা ৫০ ভাগ লোক অত্যন্ত ধার্মিক। সে হিসেবে, ধার্মিকের সংখ্যার দিক থেকে ইউরোপের দেশগুলার মধ্যে জর্জিয়ার অবস্থান তৃতীয়। তবে প্রতিদিন প্রার্থনা করার সংখ্যার দিক থেকে দেশটির অবস্থান পঞ্চম (শতকরা ৩৮ ভাগ উপাসনাকারী)।
তালিকার চতুর্থ স্থানে আছে গ্রীস। দেশটির শতকরা ৪৯ ভাগ অত্যন্ত ধার্মিক। তবে প্রতিদিন প্রার্থনা করার সংখ্যার দিক থেকে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে গ্রীসের অবস্থান নবম। পিউ রিসার্চ বলছে গ্রীসে ধার্মিকদের শতকরা ২৯ ভাগ লোক প্রতিদিন প্রার্থনা করেন। অত্যন্ত ধার্মিক ক্যাটেগরিতে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে মলদোভা। দেশটির শতকরা ৪৭ ভাগ লোক অত্যন্ত ধার্মিক। তবে এ ধার্মিকদের মধ্যে শতকরা ৪৮ ভাগ লোক প্রতিদিন প্রার্থনা করেন বলে জানায় পিউ রিসার্চ।
ধার্মিকের সংখ্যা কম কোন দেশগুলোতে?
উত্তর ইউরোপের দেশ এস্তোনিয়াতে ধার্মিকের সংখ্যা সবচেয়ে কম। পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির শতকরা সাত ভাগ লোক অত্যন্ত ধার্মিক। এর মধ্যে শতকরা নয় ভাগ লোক প্রতিদিন প্রার্থনা করে থাকেন। কম ধার্মিকের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডেনমার্ক ও চেক প্রজাতন্ত্র। দেশ দুটিতে প্রতি এক’শ জনে আট জন অত্যন্ত ধার্মিক। ডেনমার্কে বসাবাসকারী ধার্মিকদের শতকরা ১০ ভাগ ও চেক প্রজাতন্ত্রের শতকরা নয় ভাগ প্রতিদিন প্রার্থনা করেন।
ইউরোপের দুই সমৃদ্ধরাষ্ট্র জার্মানি ও ফ্রান্সে অত্যন্ত ধার্মিকের সংখ্যা শতকরা ১২ ভাগ। সে হিসেবে গবেষণায় এই দুটি দেশের অবস্থান ২৬তম। একই অবস্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ডও। গবেষণা বলছে, জার্মানির ধার্মিকদের শতকরা নয়ভাগ ও ফ্রান্সের ধার্মিকদের শতকরা ১১ ভাগ প্রতিদিন প্রার্থনা করেন। ধার্মিকতার দিক থেকে বৃটেনের লোকজন অনেক পিছিয়ে। দেশটির শতকরা মাত্র ১১ ভাগ লোক অত্যন্ত ধার্মিক। আর ধার্মিকদের শতকরা ছয় ভাগ প্রতিদিন প্রার্থনা করেন বলে গবেষণা বলছে।

শহুরে কল্পকথা by আফিয়া আসলাম

আমার মাথাটা একটা আবর্জনার ভাঁগাড়ের মতো। আবর্জনা একটু নাড়াচাড়া করলে চালু একটা টোস্টারও পেয়ে যেতে পারো।‘ এই ঘোষণা দিয়েছেন আবদুল্লা কে। তিনি হলেন এইচ এম নাকভির দি সিলেক্টেড ওয়ার্কস অব আবদুল্লাহ দি কোসাকের কেন্দ্রীয় চরিত্র।
নাকভির বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় উপন্যাস প্রমাণ করেছে যে আবদুল্লাহ কের আত্ম-মূল্যায়ন ঠিক ছিল এবং সেজন্যই এটি পড়তে ভালো লাগে। তিনি তার কথার সত্যতা প্রমাণ করে আলতা-ফালতু কাজ করেন, বোকার মতো কথা বলেন। তার এসব কাণ্ডকারখানা একদিকে যেমন মজাদার, আবার বিজ্ঞ পাঠকদের কাছে গ্রহণযোগ্যও। আমরা টোস্টার না পেলেও এই রচনা থেকে দারুণ কিছু পেয়ে যাই।
আব্দুল্লাহ কে (আকা দি কোসাক) এক ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য। তবে তাদের মা-বাবার মৃত্যুর পর পরিবারটির সদস্যরা আলাদা হয়ে যায়। ৫ ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। স্বজনেরা তাকেই তাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মনে করতেন। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তিনি কুঁড়ের বাদশাহ হিসেবে সানসেট লজে দিন গুজরান করতেন। সেখানে তার সাথে থাকতেন তার ধার্মিক রক্ষণশীল ছোট ভাই ও একেবারেই সাদামাটা ওই ভাইয়ের স্ত্রী বাবু ও নার্গিস।
আবদুল্লাহ কের নির্বাচিত রচনাবলী আসলে একটি আত্মজীবনী। তিনি তার ৭০তম জন্মদিনে তিনি তার জীবনে ঘটা নানা কথা লিখতে শুরু করেছিলেন। বইটি তারই ধারাবাহিকতা।
অন্যান্য বই থেকে তার গ্রন্থটিকে যে বিষয়টি আলাদা করেছে তা হলো তিনি সারা জীবনে ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম ও শিল্পকলা নিয়ে যে জ্ঞান সঞ্চয় করেছিলেন, তাই তিনি পরিণত বয়সে নিজের বিশ্লেষণে উপস্থাপন করেছন। এটিই বইটিকে আকর্ষণীয় করেছে। তিনি নিজেকে ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সামনে আনতে পেরেছেন।
বর্তমান ইংরেজিতে লেখালেখি করেন, এমন দুই বিখ্যাত পাকিস্তানি লেখকের একজন হলেন নাকভি। অপর জন হলেন মোহসিন হামিদ। তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে, অর্থ খাতে। পরে তিনি পাকিস্তানে থিতু হন, লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন। তার লেখালেখির উপর ৯/১১-পরবর্তী ঘটনাবলীর প্রভাব রয়েছে। হামিদের দি রেলাকট্যান্ট ফান্ডামেন্টালিস্ট প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। আর নাকভি ওই বছরই দেশে ফিরে আসেন। দুই বছর পর তার প্রথম উপন্যাস হোম বয় প্রকাশিত হয়। নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিরোধী যে ভাবাবেগের সৃষ্টি হয়েছিল, তাই তিনি তুলে ধরেছেন এই উপন্যাসে।
তবে দেশেও তিনি শান্তি পাচ্ছিলেন না। ওয়ার অন টেররের কারণে তিনি করাচিতেও সহিংসতা আর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন।
করাচির এই দুরাবস্থার কথা কেবল তিনি নন, আরো অনেকের লেখাতেই ফুটে ওঠছে। মোহাম্মদ হানিফের ২০১১ সালের আওয়ার লেডি অব অ্যালিস ভাট্টি, বিলাল তানবিরের ২০১৪ সালের দি স্কটার হেয়ার ইজ টু গ্রেট, শানদানা মিনহাজের ২০১৬ সালের ড্যাডিস বয়েস ওইসব দিনের কথাই তুলে ধরেছে।
নাকভির হোম বয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত পাকিস্তানি অভিবাসীদের ওপরই জোর দেয়া হয়েছে। তবে সমসাময়িক অন্যান্য পাকিস্তানি লেখক কিন্তু করাচির বাস্তবতা তুলে ধরার দিকে মনোযোগী হয়েছেন। হোম বয়ে করাচির ভূমিকা খুব বেশি বিস্তৃত নয়, তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি ২০০৯ সালে ফর্বেস ম্যাগাজিনে স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন, তিনি তার বন্ধুদের নিয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে করাচিতে কিভাবে গিয়েছিলেন। একই ধরনের সফর করা হয়েছে দি সিলেক্টেড ওয়ার্কস অব আবদুল্লাহ দি কোসাকে। এই সফর জিন্নাহর সমাধি থেকে শুরু হয়ে একটি হিন্দু মন্দিরে শেষ হয়েছে। তার বইয়ের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো করাচির সাংস্কৃতিক জীবন।
তার বইটির সফলতা তাকে করাচির সাহিত্যিক সমাজে স্থায়ী আসন নিশ্চিত করে। এরপর থেকে তিনি বার্ষিক করাচি লিটারেচার ফেস্টিভ্যালে (কেএলএফ) নিয়মিত সদস্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সেখানে অনেকেই তার সাথে সাক্ষাত করতে বেশ আগ্রহী থাকে। তাছাড়া সন্ধ্যায় এই প্রিয় লেখকের সন্ধান অনেকেই পেয়ে থাকেন রোডসাইড ক্যাফেতে।
সময়ের পরিক্রমায় তার লেখার বিষয়বস্তুও পাল্টে যাওয়ার বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই দৃষ্টিগোচর হয়। তার হোম বয় ছিল ৯/১১-এর উপন্যাস। আর দি সিলেক্টেড ওয়ার্কস অব আবদুল্লাহ দি কোসাকে ছিল চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরকে কেন্দ্র করে।
অবশ্য তার লেখার ধারাটি নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, তিনি একটু জটিলভাবেই লেখালেখি করছেন। আবার ধর্ম, রাজনীতি, খাবার ইত্যাদি নিয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দেয়ায় অনেকেই ধৈর্যচ্যুতির শিকার হয়েছেন।
কিন্তু তারপরও নাকভির রচনা কাছে টানবেই। সময়ের পরিক্রমায় করাচির সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনে যে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে, তিনি সে দিকে নজর দিয়েছেন ভালোমতোই। পাঠককে এই পরিবর্তনকে ভালোভাবেই দেখিয়ে দিতে পেরেছেন তিনি। তিনি বৃদ্ধ, ধনী ও হেরে যাওয়া লোক। রোদের সময় বাইরে বের হলে তিনি সঙ্গে ছাতা নেন। তিনি শিশুদের ভালোবাসেন। তিনি সঙ্ঘাত এড়িয়ে চলেন, ব্যবসায়ের সিদ্ধান্তও নিজে নিতে যান না। অন্য কথায় বলা যায়, তিনি কারো প্রতি, এমনকি পাঠকের প্রতিও কোনো ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেন না। আর সেটাই বোঝা যায় বাবু আর নার্গিসকে কিভাবে তিনি কাছে টেনে নিয়েছেন তা দেখে।
লেখক: সাবেক সম্পাদক, পেপারকাটস ম্যাগাজিন, সহ-প্রতিষ্ঠাতা, দেশি রাইটার্স লঞ্জ

ধর্মের চেয়ে জাতীয়তাবাদই চরমপন্থাকে বেশি উদ্দীপ্ত করে: ফাতিমা ভুট্টো by ইন্তিফাদা পি বাশির

চরমপন্থা, বিচ্ছিন্নতা ও অ-সার্বজনীনতা হলো ফাতিমা ভুট্টোর নতুন উপন্যাস দি রানওয়েজের প্রধান থিম। উপন্যাসটি অনিতা, মন্টি ও সানি নামের তিন তরুণের জীবনরেখার ওপর ভিত্তি করে এগিয়েছে। তারা ইসলামি স্টেটের অগ্রযাত্রার সময় পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ইরাক পাড়ি দিয়েছিলেন।
ফাতিমা ভুট্টো ইতোমধ্যেই একটি কাব্য গ্রন্থ, দুটি নন-ফিকশন (এর মধ্যে তার স্মৃতিকথা সংস অব ব্লাড অ্যান্ড সোর্ডও রয়েছে), দুটি ফিকশন রচনা করেছেন। দি ওয়্যারের সাথে সাক্ষাতকারে তিনি চরমপন্থী দলে যাওয়া তরুণদের কেন এভাবে উপস্থাপন করলেন তা জানান। তিনি মনে করেন, এসব তরুণের ভয়াবহ ভুল পথে যাওয়ার আগে তাদের সাথে সহানুভূতিসূচক আচরণ করা উচিত ছিল।
প্রশ্ন: আপনার গ্রন্থের মূল থিম হলো চরমপন্থা। আইএসআইএসের আকস্মিক উত্থানের কারণেই নাকি পাকিস্তানের ঘরের কাছে এর উত্থান ও অনেক পাকিস্তানি তাতে যোগ দেয়ার কারণে আপনি এই বিষয়টি বেছে নিয়েছেন?
ফাতিমা: এ নিয়ে বেশ ঝামেলার মধ্যে পড়েছি বলেই আমি এ নিয়ে লিখেছি। আমার বয়স এখন ৩৬। ফলে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ আগেকার ঘটনাবলী মনে আছে। ওই সময় আমার পাসপোর্টের রং বা আমার ধর্ম বেশির ভাগ লোকের মধ্যে কোনো ধরনের হুমকি সৃষ্টি করত না। তবে তরুণ প্রজন্ম এই নির্যাতনমূলক ছায়ার যুগকে দেখতে পাচ্ছে।
পাকিস্তান অবশ্যই দুর্ভোগ পুহিয়েছে। এই দেশের মাটির ওপর যেসব তরুণের রক্ত পড়েছে, তাদের মা-বাবাকে কী বলবেন? আইতজাজ হাসানের পরিবারকে কী বলবেন? একটি আত্মঘাতী বোমা হামলা থেকে দুই হাজার ছাত্রকে রক্ষার জন্য মানবঢাল হিসেবে নিজেকে ব্যবহার করে সে প্রাণ দিয়েছে। তরুণ ও নির্দোষ লোকজনের বারবার আত্মত্যাগ করার ঘটনা আমার কাছে হৃদয়বিদারক মনে হয়েছে।
অপাশ্চাত্য দেশের ব্যথা পাশ্চাত্য বুঝতে পারে না। তারা চরমপন্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ মিথ্যা ভাষ্য নির্মাণ করেছে। আর তাই তাদেরকে তাদের যুদ্ধ, তাদের দখলদারিত্বের অজুহাত তৈরি করে দিয়েছে। অনেক কারণেই উপন্যাস রচনা করা যায়। তবে লিখতে যখন বসেছি, তখন মাত্র কয়েকটি বিষয়ই মাথায় ছিল।
প্রশ্ন: তিন মুখ্যচরিত্র এসেছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট থেকে। আপনি কি বিশ্বাস করেন, আজকের কোনো ধনী মুসলিম কিশোর অনিতার মতো গরিব খ্রিস্টান মেয়ের মতো ইসলামি চরমপন্থী হওয়ার প্রবণতায় থাকবে?
ফাতিমা: আমি একে মোটেই ইসলামি চরমপন্থা বলছি না। আজকের দুনিয়ার দিকে তাকান। চরমপন্থা কোনো এক ধর্মের লোকজনের তালুক নয়। তরুণরা বিশ্বজুড়ে থাকা ক্রোধ ও সহিংসতার কাছে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।
যেকোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে জাতীয়তাবাদের মাধ্যমেই চরমপন্থা সবচেয়ে বেশি উদ্দীপ্ত হয়। গবেষণায় বিষয়টি বারবার দেখা গেছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক ২০০০-এর প্রথম দিকের প্রতিটি আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বিশ্বাসে উদ্দীপ্ত ছিল তারা, ধর্মীয় নয়। নিউজিল্যান্ডে ২৮ বছরের সন্ত্রাসীর ৫০ জন মুসলিমকে হত্যার ঘটনাটি দেখুন। রাজনীতি ও তার জাতীয়তাবাদের ঘৃণাপূর্ণ ব্যাখ্যাই তাকে এ পথে ঠেলে দিয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার প্রথম তিন চরিত্রের কাহিনী অনেকটাই ইসলামিক স্টেটে যোগ দেয়া ব্রিটিশ কিশোরী শামিমা বেগমের মতো। ব্রিটেনের অনেকে তার প্রত্যাবর্তনের অধিকারের বিরোধিতা করে বলছে, সে কোনো ধরনের ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নয়। রানওয়েজে সানি তার সিদ্ধান্তের চরম প্রকৃতি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে শামিমার পথই বেছে নিয়েছে। আপনি কি মনে করেন, এসব তরুণের ব্যাপারে এটিই সঠিক পথ?
ফাতিমা: দেখুন, শামিমা জন্মগ্রহণ করেছে ব্রিটেনে, শিক্ষাগ্রহণ করেছে ব্রিটেনে, চরমপন্থীও হয়েছে ব্রিটেনে। ব্রিটেন থেকেই সে বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে গেছে। তাহলে কিভাবে ব্রিটেন তার হাত মুছে ফেলবে। সে নাগরিক, তার অধিকার আছে। সে যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তবে তার বিচার হতে পারে, তাকে পুনর্বাসন করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, ১৫ বছরের একজনকে কিভাবে পাসপোর্ট ছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হলো? কর্তৃপক্ষ কেন জিজ্ঞাসা করেনি, তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে এখন অনুশোচনা করছে, সে তিনটি মাসুম শিশু হারিয়েছে। আমি মনে করি, সে তার সিদ্ধান্তের জন্য অবিশ্বাস্য রকমের যন্ত্রণা ভোগ করেছে।
এসব তরুণ একাকিত্ব ও ক্রোধের কারণে দুনিয়ার বিরুদ্ধেই অবস্থান গ্রহণ করেছ। এসব ভয়াবহ ভুলের আগেই তাদের সাথে সহানুভূতিশীল আচরণ করা উচিত ছিল। রানওয়েজে সানি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি তার প্রথম বিকল্প ছিল না। সে একটা আশ্রয় চেয়েছে। কিন্তু পায়নি। এ কারণেই সে ভয়ঙ্কর পথটি বেছে নিয়েছে।
প্রশ্ন: আপনি ইরাকের একটি জিহাদি ক্যাম্প বেছে নিয়েছেন কেন? কেন তা বাড়ির আরো কাছে হলো না? আপনি কি পাকিস্তানের সন্ত্রাসী উপস্থিতি এড়াতে এ কাজ করেছেন?
ফাতিমা: আমার উপন্যাস দায়েস সম্পর্কে, পাকিস্তান সম্পর্কে নয়।
প্রশ্ন: নরেন্দ্র মোদি ও ইমরান খানের মতো প্রধানমন্ত্রীদের এ ধরনের চরমপন্থা ও নিঃসঙ্গতা দূর করতে কী ভূমিকা পালন করা উচিত বলে মনে করেন?
ফাতিমা: যেকোনো নেতার কাজ হলো তার দেশের তরুণদের কাছে একটি ভিশন উপহার দেয়া, এবং তরুণরাও যে ওই ভিশনের অন্তর্ভুক্ত তা নিশ্চিত করা। লোকজন যখন মর্যাদাপূর্ণ কাজ পায়, বাড়ি পায়, সহানুভূতি পায়, তখন তারা মারার জন্য কোথাও যায় না। দেশে যদি তাদের সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা দেয়া হয়, তবে তারা কোনো অবস্থাতেই অস্ত্র হাতে তুলে নেবে না।
লেখক: দিল্লিভিত্তিক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

কোয়েটার বই বিক্রেতাদের দিন শেষ! by মোহাম্মদ আকবর নতিজাই

সাজিদ বালুচ। বয়স ২২। হাতে দুটি বই। একটি ড. মুবারক আলীর নির্বাচিত প্রবন্ধের সঙ্কলন, নাম ‘ইন দি শ্যাডো অব হিস্টরি।’ অপরটি ‘ইন সার্চ অব সলুউশন : অ্যান অটোবায়োগ্রাফি অব মির গাউস বখম বিজেনজো।’ সাজিদ বেলুচিস্তানের কেচ জেলার লোক। তিনি বেলুচিস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্র। তিনি ক্যাম্পাসের বুক পয়েন্টে এসেছেন এর মালিক মোহাম্মদ এশার কাছ থেকে কিছু ডিসকাউন্টের আশায়।
আমুদে ধরনের এশার বয়স মাত্র ৩৫ হলেও এর মধ্যে মাথায় বিশাল টাক গজিয়েছে। আর তা ঢাকার জন্য সবসময় টুপি পরে থাকেন। তিনি সাজিদকে ২৫ ভাগ কমিশন দিতে রাজি হলেন। ছাত্রদের ছাড় দেয়ার পক্ষপাতী তিনি। আর এই সাজিদের মতো ছাত্ররাই তার ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে।
নিউজ উইক টাইম বুকল্যান্ডের মতো নগরীর বইয়ের দোকানগুলো এই সৌভাগ্য পায়নি।
৭২ বছর বয়স্ক সোহাইল আহমদ শিশুসুলভ হাসিমাখা মুখের জন্য পরিচিত। তিনি কোয়েটার সবচেয়ে প্রাচীন একটি বইয়ের দোকানের মালিক। নাম নিউ কোয়েটা বুক স্টল। ১৯৩৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত। তার জায়গাটি ভাড়া নেয়ার জন্য ব্যাংকগুলো ৫ লাখ রুপি দিতে রাজি। কিন্তু তিনি দোকান গুটিয়ে ফেলতে নারাজ। তিনি যে কোনো মূল্যে বইয়ের দোকানটি চালু রাখতে চান।
তিনি বলেন, ‘নিউজ উইক টাইম বুকল্যান্ডের মালিক সালিম বুখারি বলেছেন, আমি যেন কোনোভাবেই দোকানটি বন্ধ না করি। তবে তিনি নিজে আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি তার দোকানটি বিক্রি করে দিতে চান।’
তিনি অবশ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। নিজে নিজেই বলেন, এছাড়া তিনি আর কীই বা করতে পারেন। তিনি নিজে বুড়ো হয়ে পড়েছেন। তার ছেলেদের একজন ইংল্যান্ডে, আরেকজন লাহোরে থাকেন। তার স্ত্রী মারা গেছেন। তবে সবচেয়ে বড় কথা, বই বিক্রি করে চলা যায় না।
এখনকার দিনে, আহমদের দোকানে ক্রেতা আসার ঘটনা বিরল। অথচ নগরীর একেবারে কেন্দ্রস্থলে তার দোকানটি।
আহমদ অবশ্য কয়েকটি কারণে এখনো দোকানটি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী। দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার বাবা মোহাম্মদ আইয়ুব। ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ারও আগে। ফলে এই দোকানটি তার পারিবারিক ঐতিহ্য। এই দোকানেই তার পুরনো বন্ধুরা আর সহকর্মীরা আসেন দেখা-সাক্ষাৎ করতে। এই কারণেই তিনি ব্যাংকের প্রলোভনেও ধরা দেননি।
এক সময় বেলুচিস্তানের বিভিন্ন অংশ থেকে ছাত্ররাও আসতো এই দোকানে। এখন তাদের সাক্ষাৎ পাওয়া বিরল ব্যাপার।
আসলে বেলুচিস্তানে পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ায় বই বিক্রিও কমে গেছে।
তবে বিষয়টি মানতে নারাজ ড. শাহ মোহাম্মদ মারি। তিনি উর্দু ভাষায় বেশ কয়েকটি গ্রন্থ লিখেছেন। তার মতে, লোকজন পড়ে ঠিকই। তবে তাদের পড়ার ধরনটি বদলে গেছে। লোকজন এখন ইন্টারনেট আর সামাজিক মাধ্যমে পড়াশোনা করে। এগুলোই এখন বই পুস্তকের নতুন উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে স্বীকার করেন, বইয়ের দোকানের জন্য এখন কঠিন সময়। বেলুচিস্তানে বই বিক্রি কমে যাওয়ার জন্য তিনি তিনটি কারণের কথা বলেন। একটি হলো আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, দ্বিতীয়ত ইন্টারনেটের মতো অনেক মাধ্যমের আবির্ভাব হয়েছে বিকল্প উৎস হিসেবে এবং তৃতীয়টি হলো বইয়ের মূল্য বেড়ে যাওয়া।

কাঠমান্ডুর দরবারে by গাজী মুনছুর আজিজ

নেপালের কাঠমান্ডুতে অবস্থিত হনুমান ধোকা দরবার ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। এটি ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত নেপালের রাজপ্রাসাদ ছিল। ঘুরে এসে লিখেছেন- গাজী মুনছুর আজিজ
দরবারে প্রবেশ পথের এক প্রান্তে বেশ বড় আকৃতির হনুমান মূর্তি। এ মূর্তির জন্যই দরবারটির পোশাকি নাম হনুমান ধোকা দরবার স্কয়ার। নেপালের কাঠমান্ডু শহরের এ দরবার কাঠমান্ডু দরবার স্কয়ার নামেও পরিচিত। ১৫০ রুপির টিকিট কেটে কাঠমান্ডুর প্রাচীন এ রাজপ্রাসাদে যখন প্রবেশ করি তখন সূর্য মাথা বরাবর। অবশ্য বরফের দেশ বলে সূর্যের তেজ খুব একটা গায়ে লাগছে না। তবে দরবারে প্রবেশ করে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। কারণ, দরবারের অনেক স্থাপনা ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে ভেঙে গেছে। এ ভূমিকম্পের প্রায় বছর দুই পর প্রথমবার এসেছিলাম এ দরবারে। এক বছরের মাথায় আবারও এলাম। এবারের ভ্রমণসঙ্গী সাইক্লিস্ট আবুল হোসেন আসাদ।
দরবারের অন্যতম আকর্ষণ বসন্তপুর টাওয়ার। ভূমিকম্পের আঘাতে এ টাওয়ারও ভেঙে গেছে। এ টাওয়ারসহ পুরোপুরি ভেঙেপড়া দরবারের স্থাপনাগুলো আবার নতুন করে আগের আদলে সংস্কার করা হচ্ছে। এছাড়া যেসব স্থাপনা বেশি বা অল্প ক্ষতি হয়েছে, সেগুলোরও সংস্কার চলছে আগের আদলে। কিছু কিছু স্থাপনার দেওয়াল কাঠ ও লোহার পাইপ দিয়ে ঠেক দেওয়া হয়েছে, যাতে ভেঙে না পড়ে।
দরবারের খোলা চত্বরে অস্থায়ী অনেক দোকানে নানা পণ্য সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। আমরা ঘুরে ঘুরে এসব দোকানের পণ্য দেখি। এসব পণ্যের মধ্যে আছে কাঁসা-পিতলের বৌদ্ধমূর্তিসহ বিভিন্ন দেব-দেবির মূর্তি, নেপালের ঐতিহ্যবাহী খুরকি বা নকশা করা খাপঅলা ছুরি, কাঁসা-পিতলের বিভিন্ন পাত্র, উজ্জ্বল রঙের পাথর, পুঁতি বা কাঠের মালা, চুড়ি, নানা গহনাসহ বিভিন্ন পর্যটন-স্মারক। কিছুক্ষণ এসব পণ্য দেখি।
দরবারের ইতিহাস ঘেঁটে জানি, ১৪৮২ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীন কাঠমান্ডুর প্রথম রাজা ছিলেন রতœ মল্লা। মূলত তার নির্দেশেই দরবারের নির্মাণ কাজ শুরু। ১৬ শতকেও কিছু নির্মাণ হয়েছে। ১৬৭২ সালে দরবারের প্রধান গেটের সামনে হনুমানের মূর্তি স্থাপন করা হয়। তবে ১৭ শতকে রাজা প্রতাপ মল্লার দ্বারা দরবারের অধিকাংশ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। মূলত ১৫ থেকে ২০ শতকের মধ্যে নির্মিত হয় রাজকীয় এ প্রাসাদ। রতœ মল্লা থেকে পৃথিবী বীরবিক্রম শাহ পর্যন্ত প্রত্যেক রাজাই প্রাসাদে কিছু না কিছু নির্মাণ বা সংস্কার করেন। এ দরবার ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত নেপালের রাজকীয় প্রাসাদ ছিল। ১৯৭৯ সালে এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।
দরবারে একাধিক চৌক বা আঙিনা আছে। প্রতিটি চৌকের আলাদা আলাদা নাম। এসব চৌক বা আঙিনায় যেসব ভবন বা মন্দির আছে, তার নামও আলাদা আলাদা। একেকটি ভবন একেক রকমের। কোনোটি দোতলা, কোনোটি তিনতলা, আবার কোনোটি চারতলা বা তারও বেশি তলা বিশিষ্ট। তবে সব ভবনই নান্দনিক কারুকাজে নির্মিত এবং প্রায় একই ধাঁচের।
ঘুরে ঘুরে একে একে আসি দরবারের দখ চৌক, সুন্দরী চৌক, মহাখালী চৌক, মাসান চৌক, মহা বিষ্ণু মূর্তি, নরসিংহের মূর্তিসহ বিভিন্ন চৌক। সব চৌক বা আঙিনার সব ভবনই অনেকটা একই নকশায় নির্মিত। এছাড়া অধিকাংশ ভবনের ওপরের অংশ চৌচালা আকৃতির। কিছু আছে গোলাকার। তবে সব ওপরের অংশই পর্যায়ক্রমে নিচেরটার চেয়ে ওপরেরটা ছোট হয়ে উঠে গেছে। অনেকটা পিরামিডের মতো। অবশ্য প্রত্যেক ভবনেরই দরজা ও জানালা কাঠের। শুধু কাঠের নয়, এসব দরজা ও জানালায় নিখুঁতভাবে খোদাই করে নকশা করা ফুল, পাখিসহ বিভিন্ন দেব-দেবির মূর্তি। কাঠের এসব কারুকাজ সত্যিই বিস্ময়কর। শত শত বছর আগে যেসব কারিগর বা শিল্পী কাঠের এসব কারুকাজ করেছেন, তারা আসলেই অনেক মেধাবী ও সৃজনশীল জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। কাঠের কারুকাজ ছাড়াও দরবারের বিভিন্ন আঙ্গিনা বা ভবনের দরজার দুই পাশে আছে বড় আকৃতির সিংহসহ বিভিন্ন মূর্তি।
দরবারের একটি আঙিনায় দেখি অনেক কবুতর। দরবারে আসা দর্শনার্থীরা এসব কবুতরকে খাবার ছিটিয়ে খেতে দেন। ভ্রমণসঙ্গী আসাদও কিছু খাবার ছিটিয়েছেন। এছাড়া দরবারের খোলা চত্বরের অস্থায়ী দোকানের পাশাপাশি বিভিন্ন ভবনের নিচেও ছোট ছোট দোকান আছে। এসব দোকানে আছে বিভিন্ন গরম কাপড়, চিত্রকর্মসহ নানা ধরনের পণ্য ও পর্যটন স্মারক।
বিভিন্ন আঙিনা ঘুরে প্রবেশ করি দরবারের জাদুঘরে। মূলত এটিও একটি আঙিনা বা ভবন। এ আঙিনায় এক সময় নেপালের রাজ পরিবারের বসবাস ছিল। আঙিনার বারান্দার দেওয়ালজুড়ে সাজানো নেপালের রাজপরিবারের ছবি। এছাড়া এ জাদুঘরে আছে শাহ সিংহাসন। শাহ রাজারা এ সিংহাসন ব্যবহার করতেন। আরও আছে রাজকীয় পরিবারের সদস্যদের বহন করার পালকি। পিতলসহ নানা ধাতুর মাধ্যমে কারুকাজ করা এ পালকি রাজপরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানেও ব্যবহার হতো।
পালকির পাশাপাশি রাজপরিবারের সদস্যদের লাশ বহন করার জন্য ব্যবহৃত স্ট্রেচারও আছে। এছাড়া জাদুঘরের আরেক আকর্ষণ মল্লা সিংহাসন। কাঠের নির্মিত এ সিংহাসন নান্দনিক কারুকাজে অলঙ্করিত।
বিকালের দিকে বের হই দরবার থেকে। আগের বছর যখন এসেছিলাম, তখন এ দরবার দেখে ললিতপুরের পাটান দরবারেও পা রাখি। কাঠমান্ডুর এ দরবারও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। সে গল্প আরেক দিন।
ছবি : লেখক

বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে কি যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি হয়েছে by সায়েদুল ইসলাম

ঢাকায় নেশাখোরদের এক আড্ডা
কলেজে পড়ার সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মাধ্যমে ইয়াবায় আসক্ত হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের বিশ বছরের এক তরুণী।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "প্রথম প্রথম ওরা ফ্রি ইয়াবা দিতো, খাওয়ার ব্যবস্থাও বন্ধুরাই করে দিতো। তখন আমি বুঝতেও পারছিলাম না, আমার কোন ধারণাও ছিল না যে, কী ভয়াবহ বিপদে জড়িয়ে পড়ছি!"
তিনি বলছেন, ইয়াবা খেলে কী হয়, এর ক্ষতির দিকগুলো কী - এ সম্পর্কে তাকে কেউ কখনো সচেতন করেনি।
তবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পর যখন পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বুঝতে পারেন, তখন তারা তাকে ভালো করার অনেক চেষ্টা করেন। নানা ভাবে বোঝান। রিহ্যাবে ভর্তি করেন।
কয়েক দফা রিহ্যাবে চিকিৎসার পর তিনি এখন সুস্থ হয়েছেন। বিয়ে হয়েছে, একটি সন্তানও রয়েছে।
কিন্তু এই তরুণীর মতো বাংলাদেশের আরো অনেক তরুণ-তরুণী বলছেন, তারা যখন মাদকে আসক্ত হন, তখন এর অপকারিতা বা ক্ষতির দিক সম্পর্কে তারা জানতেন না। নিছক আগ্রহ বা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে তারা এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
গবেষণায় কী আছে
বাংলাদেশের নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক অধ্যাপক এমদাদুল হক ২০১৮ সালে একটি গবেষণায় বলেছেন, দেশটিতে প্রায় ৭০ লক্ষ মাদকাসক্ত রয়েছে, যাদের অধিকাংশই ইয়াবাসেবী।
এছাড়া আছে ফেন্সিডিল, হেরোইন এবং অন্যান্য মাদক।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এতদিন এ বিষয়টা খোলামেলা ভাবে আলোচিত হয় নি, কিন্তু পরিস্থিতি সত্যি ভয়াবহ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকাসক্তদের নিয়ে পারিবারিক বা সামাজিকভাবে লুকোছাপার কারণে একদিকে যেমন আসক্তদের চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি মাদকাসক্তি ঠেকাতেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সচেতনতা তৈরি হয়েছে কতটা
মুক্তি ক্লিনিক নামের একটি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক ড. আলী আশকার কোরেশী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, এটা ঠিক যে, মাদক নিয়ে পারিবারিক, সামাজিকভাবে সচেতনতার ব্যাপারে একটা ঘাটতি আছে।
"মাদক দ্রব্যের ভয়াবহতা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে তা এখনো অনেক অপ্রতুল বলা যায়। কারণ শহর এলাকা ছাড়িয়ে মাদক এখন তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে গেছে এবং তরুণরা ব্যবহার করছে"।
"যতটুকু প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে, তাও হচ্ছে বড় শহর এলাকায়, তৃণমূল পর্যায়ে আসলে সেরকম প্রচারণা নেই। কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে মাদক পাওয়া যাচ্ছে এবং অনেক তরুণ-তরুণী আসক্ত হয়ে পড়ছে" - বলছেন মি. কোরেশী।
"শিক্ষা কার্যক্রমে ইদানীং কিছু কিছু প্রচারণা বা সচেতনতার উদ্যোগ শুরু হয়েছে, কিন্তু তাও পর্যাপ্ত নয়। কারণ প্রতিটি স্কুল-কলেজে এ ব্যাপারে সচেতনতার উদ্যোগ থাকা দরকার" বলছিলেন তিনি।
তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন, "যখন আমরা মাদকাসক্ত রোগীর চিকিৎসা করতে যাই, তখন দেখি তাদের অভিভাবকদেরই এ সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। এমনকি সন্তান মাদকে আসক্ত জানার পরেও তাদের মনোভাব থাকে, দেখি না কী হয়। এভাবে কয়েক বছর পার হয়ে যায়, আর তাদের সন্তান মাদকে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে"।
"শুধু মাদকে আসক্ত নয়, তাদের পরিবার, পিতামাতার আগে সচেতন হওয়ার দরকার। যখনি কেউ সন্তানের মধ্যে আচার-আচরণের পরিবর্তন দেখতে পাবেন, তখনই তার উচিত হবে একজন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া" তিনি বলেন।
মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক ড. আলী আশকার কোরেশী বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান বা সচেতনতা শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। সামাজিকভাবে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, না হলে শুধু সরকার বা এনজিওর ওপর নির্ভর করে মাদকের এই বিপুল বিস্তৃতি ঠেকানো যাবে না।
মাদকবিরোধী অভিযানে কি কাজ হচ্ছে?
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১১ সালে মাদক সংক্রান্ত মামলা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৩৯৫টি, আসামি ছিল ৪৭ হাজার ৪০৩ জন। ২০১৭ সালে মামলার সংখ্যা ১ লাখ ছয় হাজার ৫৩৬ জন, আসামি এক লাখ ৩২ হাজার ৮৮৩ জন।
তারা বলছেন, ইয়াবা পরিবহনে সুবিধাজনক, দামও কম আর মিয়ানমার থেকে প্রচুর যোগান আসছে, এসব কারণে এই মাদকটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসায় রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে নানা পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, ছাত্র-ছাত্রীরা জড়িয়ে পড়েছে। সরকারের মাদক বিরোধী অভিযানে অনেক সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী নিহত বা গ্রেপ্তার হয়েছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মসমর্পণ বা অভিযান অব্যাহত রাখার ঘটনার পরও ইয়াবাসহ অবৈধ মাদক পাচার বা এর ব্যবসার প্রত্যাশা অনুযায়ী কমেনি।
এর কারণ হিসাবে তারা বলছেন, মাদক বিরোধী অভিযান চললেও, এখনো মাদকে আসক্ত তরুণদের এ থেকে পুরোপুরি সরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে এর ব্যবসাও বন্ধ হচ্ছে না।
তবে বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ জামাল উদ্দীন আহমেদ বলছেন, মাদকের ক্ষতি ও অপব্যবহার নিয়ে তাদের প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে একসময় ঘাটতি থাকলেও, এখন তারা সেসব কর্মকাণ্ড অনেক বাড়িয়েছেন।
"এটা ঠিক যে, এসব কার্যক্রম সম্প্রতি বিস্তৃত করা হয়েছে। এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মাদক নিয়ে এতো কথা বা চর্চা অতীতে কখনো হয়নি। মাদক একটি অবহেলিত বিষয় ছিল, ভেতরে ভেতরে মাদক যে আগ্রাসন চালাচ্ছে, আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেই সচেতনতা আমাদের ছিল না" - বলছিলেন মি. আহমেদ।
তিনি আরো বলছিলেন "অভিযান চালানোর পাশাপাশি আমরা মাদকের চাহিদা হ্রাস করার নানা কর্মসূচী নিয়েছি। সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ব্যানার ফেস্টুন ঝুলিয়ে, বিতর্ক কর্মসূচী, র‍্যালি, নানা ধরণের কর্মসূচীর মাধ্যমে মাধ্যমের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছি। গত বছরে সারাদেশে আমরা ছোটবড় মিলিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে প্রায় ৯ হাজার সমাবেশ করেছি"।
''বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায় থেকে সামাজিকভাবে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির একটি চেষ্টা আমরা করছি।''
এর মধ্যে ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদক বিরোধী একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। সেখানে মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
মহাপরিচালক মোঃ জামাল উদ্দীন আহমেদ বলছেন "এখনো এটা সত্যি যে, সমাজের সবাই যে সমানভাবে জাগ্রত হয়েছে তা নয়। তবে তাদের জাগিয়ে তোলার কাজটা শুরু হয়েছে"।
নেশার কবলে ঝড়ে পড়ছে অনেক সুস্থ প্রাণ।

Tuesday, January 21, 2020

মোবাইল কেনার সামর্থ্য নাই আমার, আর মোবাইল ফোন দিয়ে আমি কি করবো? বলছেন বাংলাদেশের একজন নারী by মুন্নী আক্তার

বাংলাদেশের অনেক নারীরই মোবাইল ফোন কেনার সক্ষমতা নেই, অন্যের উপহার দেয়া ইন্টারনেট-বিহীন ফোন ব্যবহার করেন অনেকেই, আবার এমন নারীও আছেন - যারা এটির তেমন প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেন না।
যেমন সুনামগঞ্জের সোনাপুরের রুনা বেগম, তিনি সম্মান চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। মাত্র চার বছর হল মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে শুরু করেছেন তিনি। তবে সেই ফোনে ইন্টারনেট নেই।
তিনি জানান, জীবনের প্রথম ও একমাত্র এই মোবাইল ফোনটি তিনি পেয়েছেন দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের কাছ থেকে।
জরিপে বলা হচ্ছে মোবাইল ফোন এবং মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। এর কারণ হিসেবে শিক্ষা, দারিদ্র্য এবং পশ্চাৎপদতার মতো একাধিক কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মিজ রুনার সাথে কথা বলে তার একটা দৃষ্টান্ত পাওয়া গেল।
তার কথায়, পড়াশুনা করতে বাড়ি থেকে অনেক দূরে যেতে হয় বলে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নেয়ার জন্যই মোবাইল ফোন ব্যবহারে বাধা দেয় নি তার পরিবার।
মিজ রুনা বলেন, "আমরা যে এলাকায় থাকি সেখান থেকে নদী পার হয়ে সদরে কলেজে আসতে হয়। যাতায়াতে দূরত্বের একটা সমস্যা আছে। যেজন্য মোবাইল ব্যবহারে পরিবারের কেউ নিষেধও করে নাই।"
তবে পুরনো হওয়ার কারণে এটিতে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন না তিনি। রয়েছে, ইন্টারনেটের খরচ বহনের বিষয়টিও।
"ইন্টারনেট ব্যবহার করার প্রবলেম হচ্ছে নেটওয়ার্ক প্রবলেম। তারপরে ফোন তো অনেক বছর হইছে। ফোনেও সমস্যা," তিনি বলেন।
মিস রুনা বলেন, "স্টুডেন্ট মানুষ তো আমি। তাই সব সময় ইন্টারনেটের যে খরচ সেটা যোগার করা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না।"
রুনা ছাড়াও বাংলাদেশের আরও অনেক নারী রয়েছেন যাদের কাছে, ইন্টারনেট তো দূরের কথা মোবাইল ফোন ব্যবহারটাও বেশ সীমাবদ্ধ। এমনই একজন তানিয়া বেগম।
তিনি বলেন, "মোবাইল কেনার সামর্থ্য নাই আমার। আর মোবাইল ফোন দিয়ে আমি কি করবো? আমার বাবা-মা, ভাই বোন সবাই আমার সাথে থাকে।"
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মোবাইল ফোন এবং ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীদের পিছিয়ে থাকার হার ব্যাপক। 
গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে পুরুষদের তুলনায় নারীরা ইন্টারনেট ব্যবহারে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অনেক নারী বলছেন, তারা যেকোনো মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে কিংবা পাবলিক পোস্টে কমেন্টের ক্ষেত্রে নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়েন, নানা মন্তব্যের শিকার হতে হয়। (ফাইল ফটো)
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশন-জিএসএমএ এক গবেষণায় বলছে, বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নারী-পুরুষের লিঙ্গ বৈষম্য বা জেন্ডার গ্যাপ ৩৩ ভাগ।
আর মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই হার ৫৮ ভাগ।
গবেষণায় বলা হচ্ছে, মোবাইল ফোন কেনার সক্ষমতা থাকে না বেশিরভাগ নারীর। এছাড়া অনেকেই এটিকে তেমন প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেন না।
মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হলে, দরকার হয় সাক্ষরতা এবং ডিজিটাল দক্ষতার।
বাংলাদেশে শহর অঞ্চল ছাড়া গ্রামাঞ্চলে নারীদের মধ্যে শিক্ষার হার কম হওয়ায় তাদের মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার কম। তবে শিক্ষিত হওয়ার পরও নিরাপত্তা ও সুরক্ষার কারণেও ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে বিরত থাকেন অনেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, "শহরাঞ্চলে পুরুষের তুলনায় নারীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার ও এতে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার কম। বাজার অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ায় বাইরে কাজের পাশাপাশি সংসারের কাজও তারা করছে। ফলে সময় কম পাচ্ছে।"
"আর গ্রামাঞ্চলে নারীদের হাতে মোবাইল ফোন তেমনিভাবে পৌঁছায়নি। কারণ এর জন্য ক্রয়ক্ষমতা থাকতে হবে।"
"পরিবারে একটি মোবাইল ফোন থাকলেও সেটি থাকে একজন পুরুষের কাছে। যা ব্যবহার করতে হলে নারীকে অপেক্ষা করতে হয়," - বলেন তিনি ।
ড. সাদেকা হালিম বলেন, "ইন্টারনেট যেটা আধুনিক জায়গা নারীদের জন্য সেখানে শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে।"
"তার কোন প্রশিক্ষণ আছে কিনা, সে কোন পাঠ গ্রহণ করেছে কিনা সে ইন্টারনেট চালাতে পারছে কিনা - সেটার উপরও নির্ভর করে।"
সাদেকা হালিম বলছেন ফেসবুকে ছবি বা ভিডিওকে কেন্দ্র করে এ ধরনের হয়রানি বেশি হচ্ছে
তিনি বলেন, "আমরা অভিভাবকরা মনে করি, পুরুষ ছেলের হাতে আমরা খুব তাড়াতাড়ি মোবাইল ফোন দিতে পারি। কিন্তু সে তুলনায় একজন নারীকে দিতে পারছি না।"
"অভিভাবকরা মনে করেন যে, নারীদের কেউ অহেতুক জ্বালা-যন্ত্রণা করতে পারে, তারা কারো সাথে চলে যেতে পারে কিংবা পড়াশুনায় অমনোযোগী হতে পারে।"
"এগুলো ঠেকাতে সার্বিকভাবে সমাজে সচেতনতা প্রয়োজন। পুরুষের হাতে ফোন থাকবে, কিন্তু নারীদের হাতে থাকবে না - সেটা হবে না," তিনি বলেন।
তার মতে, "স্কুল-কলেজের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে।"
মোবাইল ফোন ও এতে ইন্টারনেট ব্যবহারে এই লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে সরকারের কি কি প্রচেষ্টা রয়েছে - এমন প্রশ্নে কথা হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা সারওয়ার জাহানের সাথে।
তিনি বলেন, "মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য শিপআওয়ার নামে একটি প্রকল্প রয়েছে। যেখানে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।"
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ছাড়াও এতো বড় বৈষম্যের হার রয়েছে পাকিস্তানে। তারপরেই আছে ভারত।
তবে, চীনে এই হার আশ্চর্যজনকভাবে কম। দেশটিতে মোবাইল ফোন ব্যবহারে জেন্ডার গ্যাপ শূন্যের কোটায়।
আর মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে জেন্ডার গ্যাপ মাত্র ১%।
জিএসএমএ-এর প্রতিবেদন বলছে, মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে লিঙ্গ বৈষম্য কমানো গেলে, ২০২৩ সালের মধ্যে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে ৭০ কোটি ডলার জিডিপি বাড়ানো সম্ভব।

ইতিহাস বাঁচাতে ভুয়া ট্যাংক

আরব বসন্তের সময়কার ঘটনা। মিসরে তখন টালমাটাল পরিস্থিতি। এমন মুহূর্তে প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু লুটপাটের হাত থেকে রক্ষায় মিসরের একটি সমাধিক্ষেত্রের ব্যবস্থাপক অভিনব এক কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি ভুয়া আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার বা এপিসি ট্যাংক হাজির করেন ইতিহাস বাঁচাতে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক পিটার হেসলার তাঁর দ্য বারিড: দ্য আর্কিওলজি অব দ্য ইজিপশিয়ান রেভল্যুশন বইয়ে এই দাবি করেছেন। চলতি মাসেই বইটি প্রকাশ হয়েছে। এতে বলা হয়, আরব বসন্তের সময় মিসরের আবিদুস শহরের আল-মাদফুনা সমাধিক্ষেত্রের ব্যবস্থাপক ছিলেন আহমেদ রজব। তিনিই ওই ভুয়া ট্যাংক হাজির করেছিলেন। ওই সমাধিক্ষেত্রে মিসরের প্রাগৈতিহাসিক আমলের অনেক পুরাকীর্তি ও মমি আবিষ্কার হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রটি ২ হাজার ৬৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ সময়ের। এর চারদিক ৪০ ফুট উঁচু দেয়ালে ঘেরা।
আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পদত্যাগ করেন। সাংবাদিক পিটার হেসলার লিখেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পর আবিদুস সমাধিক্ষেত্রে চোরের উৎপাত শুরু হয়। চুরি ঠেকাতে আহমেদ রজব সমাধিক্ষেত্রের মাঝ বরাবর কাঠের চৌকোনা ঘর নির্মাণ করেন। ১৩ ফুট দীর্ঘ ও ৬ ফুট উঁচু বাক্সের মতো ঘরটি তিনি গাঢ় নীল রং করান। মধ্যখানে একটি গোল ছিদ্র করেন। এতে এপিসি বসানো রয়েছে বলে গুজব ছড়ায় চোরদের মধ্যে। তাঁর ওই কৌশল বেশ ভালো কাজে দিয়েছিল।

Monday, January 20, 2020

গিবত একটি ধর্মীয় ও সামাজিক পাপ by জুবায়ের রশীদ

ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ সর্বত্র আজ গিবতের ছড়াছড়ি। কোরআন ও হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী, জঘন্যতম এ পাপ মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। জেনে-বুঝে কখনও নিজের অজান্তে গিবতে জড়িয়ে পড়ছে মানুষ। বাজার, হাট, দোকান, মার্কেট থেকে শুরু করে পবিত্র মসজিদ, সাধারণত চাষাভুষা, অজ্ঞ-মূর্খ থেকে আলেম বিদ্বান কেউ মুক্ত নয়। এটি নিত্যনৈমিত্তিক একটি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। তা যে মহা অন্যায়, কবিরা গোনাহ সে বোধটুকুও হারিয়ে গেছে। যেসব কারণে সমাজের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বিনষ্ট হয়, সমাজ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়, সামাজিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হয়, পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়, তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো গিবত, যা মানুষকে নিকৃষ্টতম প্রাণীতে পরিণত করে। মহান আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) মানুষকে এ নিকৃষ্ট স্বভাব থেকে বিরত থাকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, ‘আর তোমরা কেউ কারও গিবত করো না, তোমরা কি কেউ আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? একে তোমরা অবশ্যই ঘৃণা করবে।’ (সূরা হুজুরাত : ১২)।
গিবতের পরিচয় : গিবত শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দোষ বর্ণনা করা, পরচর্চা করা, পরনিন্দা করা, কুৎসা রটনা করা, পিছে সমালোচনা করা ইত্যাদি। পরিভাষায় গিবত বলা হয় ‘কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ বর্ণনা উল্লেখ করা, যা সে গোপন রেখেছে অথবা যা জনসম্মুখে বলাকে সে অপছন্দ করে। গিবতের বাস্তবসম্মত পরিচয় দিয়েছেন স্বয়ং রাসুল (সা.), যা নিম্নের এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুসুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে একদা জিজ্ঞেস করেছেন, গিবত কাকে বলে, তোমরা জান কি? জবাবে সাহাবায়ে কেরাম বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। অতঃপর নবীজি বলেন, তোমার কোনো ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, তা-ই গিবত। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি যে দোষের কথা বলি, তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তাহলেও কি গিবত হবে? উত্তরে তিনি বললেন, তুমি যে দোষের কথা বল, তা যদি তোমার ভাইয়ের থাকে; তবে তুমি অবশ্যই তার গিবত করলে আর তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে না থাকে; তবে তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছ।’ (মুসলিম : ৬২৬৫)।
গিবতের ভয়াবহ পরিণাম : গিবত ইসলামি শরিয়তে হারাম ও কবিরা গোনাহ। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা অগ্র-পশ্চাতে দোষ বলে বেড়ায়।’ (সূরা হুমাজাহ : ১)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মিরাজের সময় আমাকে এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো, যাদের নখ ছিল তামার। তারা তাদের মুখম-ল ও দেহ আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরাইল (আ.) কে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা নিজ ভাইদের গিবত করত ও ইজ্জতহানি করত।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৩/২২৪)। হজরত কায়স বলেন, ‘আমর ইবনুল আস (রা.) তার কতিপয় সঙ্গী-সাথিসহ ভ্রমণ করছিলেন। তিনি একটি মৃত খচ্চরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, যা ফুলে উঠেছিল। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! কোনো ব্যক্তি যদি পেট পুরেও এটা খায়; তবু তা কোনো মুসলমানের গোশত খাওয়ার চেয়ে উত্তম।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ : ৭৩৬)। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসুল (সা.) কে সাফিয়্যাহ (রা.) এর উচ্চতা সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন। রাসুল (সা.) প্রত্যুত্তরে বলেন, ‘তুমি এমন এক কথা বলেছ, তা যদি সাগরের পানির সঙ্গে মেশানো হতো; তবে সাগরের পানি কালিমাযুক্ত হয়ে যেত।’ (আবু দাউদ : ৪৮৭৫)। গিবতের ক্ষতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, যে ব্যক্তির গিবত করা হয় তার আমলনামায় গিবতকারীর গিবত পরিমাণ নেকি চলে যায় এবং গিবতকারীর আমলনামায় যার গিবত করা হয় তার সে পরিমাণ গোনাহ চলে আসে। এজন্যই হজরত হাসান বসরি (রহ.) যখন শুনতে পেতেন তার সম্পর্কে কেউ গিবত করেছে, তখন তিনি সেই ব্যক্তির জন্য অনেক ফল ও বিভিন্ন মিষ্টান্ন দ্রব্য হাদিয়া হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন এবং বলতেন, মাশাআল্লাহ তিনি আমার অনেক উপকার করেছেন। গিবত হচ্ছে গোনাহে কবিরা বা বড় গোনাহ।
ইসলামের দৃষ্টিতে গিবত করা যেমন নিষেধ, তেমনি গিবত শোনাও নিষেধ। যে গিবত শোনে, সে-ও পাপের অংশীদার হয়ে যায়। হাদিসে আছে, যখন কেউ তোমার সঙ্গে বসে অন্যের গিবত করে তখন তাকে থামতে বলো। আল্লাহর হুকুমের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাবধান করো। আর যদি তাতেও কাজ না হয় সেখান থেকে উঠে চলে আসো। কোনোভাবেই গিবত শোনা যাবে না।
শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যদি কারও গিবত করে ফেলা হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার তথা ক্ষমা চাইবে। কাফফারা তথা ক্ষতিপূরণস্বরূপ যার গিবত করা হয়েছে তার জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি করে দোয়া করবে। হাদিসে এসেছে, তুমি যার গিবত করেছ তার জন্য আল্লাহর কাছে মাগফেরাতের দোয়া করবে। এভাবে বলবে, হে আল্লাহ! আপনি আমার ও তার গোনাহগুলো মাফ করে দিন।
যাদের গিবত করা জায়েজ : সাধারণত গিবত হারাম ও কবিরা গোনাহ। তবে কয়েকটি ক্ষেত্র এমন রয়েছে, যেখানে প্রয়োজনবোধে গিবত করা জায়েজ। তার মধ্যে মজলুম ব্যক্তি জালেমের বিরুদ্ধে শাসক, বিচারক অথবা এমন কারও কাছে অভিযোগ করতে পারে, যে তাকে জালেম ব্যক্তির বিরুদ্ধে ন্যায় পাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কোনো খারাপ কাজ বন্ধের উদ্দেশ্যে এবং ত্রুটি সংশোধনের জন্য কোনো ব্যক্তির দোষ এমন ব্যক্তির কাছে বলা, যে তা সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে। মুফতির কাছে মাসআলা জানতে গিয়ে প্রয়োজনে কোনো ব্যক্তির দোষত্রুটি বলা যাবে।
যেমন- ‘আমার ভাই’, ‘আমার স্বামী’ অথবা ‘অমুক’ আমার সঙ্গে ‘এই’ অন্যায় করেছে; তার কি এমন করার অধিকার আছে? বিয়ে, ব্যবসায় ইত্যাদি বিষয়ে কারও কাছে পরামর্শ চাইলে তার দোষ-গুণ স্পষ্টভাবে বলে দেবে, যা সে জানে। সমাজে প্রকাশ্যে পাপ কাজ, বেদাত বা গোমরাহির প্রসার ঘটাচ্ছে যারা, তাদের দোষত্রুটির সমালোচনা করা জায়েজ। কেউ যদি নির্দিষ্ট উপনামে অথবা ছদ্মনামে সমাজে পরিচিত হয়; তবে তাকে চেনার উদ্দেশ্যে ছদ্মনাম বা খারাপ উপনামে ডাকতে পারবে।

সারপোলে জাহাব শহরের সুন্দর দর্শনীয় নিদর্শন

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান।
গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দর প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ শহর কেরমানশাহে। কেরমানশাহ প্রদেশের দুটি ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গেও আমরা খানিকটা পরিচিত হয়েছিলাম। একটি ঐতিহাসিক শাফেয়ী জামে মসজিদ। তুর্কিদের মসজিদের ডিজাইনে তৈরি করা হয়েছে এই মসজিদটি। এই মসজিদের বিশাল বিশাল মিনার পুরো শহরের সৌন্দর্য ব্যাপক বৃদ্ধি করেছে।
আরেকটি হলো কেরমানশাহ বাজার। এই বাজারের ভেতরে আবার শাখা বাজারও রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সোনার বাজার, ইসলামি বাজার এবং তোপখানা বাজারের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বাজারটির কাঠামো বেশ দৃষ্টিনন্দন। প্রাচীন কাঠামোর সঙ্গে আধুনিকতার সংমিশ্রণে গড়ে তোলা হয়েছে এর স্থাপত্যশৈলী। যার ফলে যে কোনো পর্যটকই প্রথম দেখাতেই বাজারের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে পারেন না। যাই হোক এরকম আরো একটি স্থাপনা হলো সারপোলে জাহাব শহর। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে এই শহরটিরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বলাবাহুল্য এই শহরটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও সারপোল জাহাব শহরের সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক অনাবিল দৃশ্য নান্দনিক মনের লোকদেরকে এখনও আকৃষ্ট করে। পর্যটকদের ভিড় তাই এই শহরে একটুও কমে নি। কেরমানশাহ প্রদেশ সফরে গিয়ে কেউ যদি সারপোলে জাহাব শহরে বেড়াতে না যায় সেটা হবে খুবই দু:খজনক। কেননা এই শহর এবং শহরের আশেপাশে যেসব সুন্দর সুন্দর এবং দর্শনীয় নিদর্শন রয়েছে সেগুলো না দেখাটা ঠিক হবে না। সারপোলে জাহাব শহরটি গড়ে উঠেছে প্রাচীন হালাভন শহরের ধ্বংসাবশেষের কাছে। এরই পাশে রয়েছে শাসানীয় শাসনামলের ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গটি। সারপোলে জাহাব ছিল সীমান্ত ঘাঁটি এবং কেল্লা। এর অবস্থান ছিল পাকিস্তান-ইরান সীমান্তবর্তী এলাকায়। আরবরা যখন ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল তখন কেল্লাটি ধ্বংস হয়ে যায়। এই শহরটি এখন তেহরান-বাগদাদ মহাসড়কের কাছে পড়েছে। সারপোলে জাহাব শহরের আরেক প্রান্ত মিলেছে পার্বত্য এলাকা এবং তার পার্শ্ববর্তী সমতল ভূমির সঙ্গে। এখানেই রয়েছে বিখ্যাত দালাহু পর্বতগুলো এবং রিজাব নামক সুন্দর এলাকা।
সারপোলে জাহাব শহরের উপকণ্ঠেই রয়েছে 'পিরন' নামে একটি গ্রাম। এই গ্রামটি দালাহু পর্বতগুচ্ছের সবুজের সমারোহপূর্ণ উপত্যকার ওপরে গড়ে উঠেছে। গ্রামটি এতোই সুন্দর যে যে-কোনো ইরান-পর্যটককেই আকর্ষণ না করে পারে না। এই গ্রামের পাশেই রয়েছে সবুজ উদ্ভিদময় জঙ্গল। এইসব জঙ্গলে রয়েছে সুন্দর সুন্দর এবং বড় বড় চেনর গাছ, তাব্রিজি বৃক্ষ, আখরোট ও ডুমুর এবং অন্যান্য গাছের সমাহার। চমৎকার উপভোগ্য এই পরিবেশে অবকাশ যাপন করতে আপনি খুবই প্রশান্তি উপলব্ধি করবেন নি:সন্দেহে। এই গ্রামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিসটি হলো ঝরনা। অনেক উপর থেকে এই ঝরনার জলপতনের দৃশ্য বেশ দূর থেকেও দেখা যায়। ওই ঝরনার কাছে যেতে হলে সারপোলে জাহাব শহর থেকে আনুমানিক নয় কিলোমিটার গেলে শলন নামে একটি গ্রাম পড়বে। ওই গ্রাম থেকে পণেরো মিনিট হেঁটে গেলে ঝরনা সমৃদ্ধ গ্রামের দেখা মিলবে।
পিরন ঝরনার কথা বলছিলাম আমরা। সম্ভবত বিদেশি পর্যটক তো বটেই এমনকি ইরানি ভ্রমণবিদরাও হয়তো ভাবতেও পারেন না যে ইরানের ভেতর এক শ মিটার লম্বা কোনো ঝরনা থাকতে পারে। তাদের জন্য আশার কথা হলো এই যে, এই ঝরনাটি সত্যিই শতাধিক মিটার লম্বা। বেশ দ্রুত গতিতেই এই ঝরনার পানি নীচে পড়ে। এখানে গেলে আরও দেখা যাবে পর্বতারোহীদের ডিগবাজি খেলা। সেই উঁচু চূড়া থেকে পর্বতারোহীদের নীচে নেমে আসার দৃশ্য যে কাউকেই আকর্ষণ না করে পারে না। কেবল এই ঝরনাই নয়, মূলত সারপোলে জাহাবের আশেপাশের এলাকা দর্শনীয় বহু নিদর্শনে পূর্ণ বলা যায়। এখানে রয়েছে অবকাশ যাপনের জন্য উপযোগী জঙ্গল বা বনাঞ্চল। পতক নামক গ্রামের ভেতরে বিদ্যমান এই বনের নাম হলো ইমাম আব্বাস। এই পতক গ্রামটিকে পবিত্র গ্রাম নামেও অভিহিত করা হয়।
এর কারণ হলো এই গ্রামের প্রাকৃতিক সকল উৎসকে খুব যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই গ্রামে সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে গ্রামের সকল পরিবারের ঘরে ঘরে। তাই এরকম নাম। এখানে রয়েছে 'জিয মানিযেহ' নামক একটি প্রাচীন দূর্গ। হাজার বছর আগের এই দূর্গটি পাথর দিয়ে বানানো হয়েছে। এটি একটি শাহী দূর্গ। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও মন কেড়ে নেয়া সুন্দর। সব মিলিয়ে পতক গ্রামটি পরিণত হয়েছে একটি পর্যটক আকর্ষণীয় স্পটে। পুরো কেরমানশাহ প্রদেশের মধ্যে এই গ্রামটি অনন্য সাধারণ একটি স্থান। যেখানে গেলে কেরমানশান প্রদেশ বেড়াতে যাওয়াটা সার্থক বলে মনে হবে যে-কোনো পর্যটকের কাছে।
সারপোলে জাহাব শহরের কথা বলছিলাম আমরা। এই শহরের পাশ্ববর্তী মহাসড়কগুলোও আমাদেরকে অসম্ভব সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিকে নিয়ে যাবে খুব সহজেই। উদাহরণ হিসেবে রিজব মহাসড়কের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এই রিজব মহাসড়ক ধরে যেতে যেতে পথেই পড়বে চমৎকার আবহাওয়াময় সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো গোছানো সবুজ গ্রামের পর গ্রাম। এই গুচ্ছগ্রামই রিজব নামে পরিচিত। এই রিজব মহাসড়কের শেষ প্রান্তে রয়েছে একটি কবর। বাবা ইয়দেগারের কবর এটি। বিখ্যাত এই কবরে যেতে হলে কিংবা এখানকার বিনোদন কেন্দ্রে যেতে হলে একটু হাঁটতে হবে। বর্ণনা থেকে নিশ্চয়ই আঁচ করা যায় যে বাবা ইয়দেগার হলো একটি পবিত্র কবরস্থান এবং এর পাশেই রয়েছে একটি অবকাশ যাপন কেন্দ্র। কবরটি আকাশচুম্বী পাথুরে পাহাড়ের উচ্চতায় অবস্থিত। চারদিকে রয়েছে অনেক বড় বড় প্রাচীন গাছ গাছালি। সব মিলিয়ে পুরো দৃশ্য বেশ আকর্ষণীয়। এখানকার হিম শীতল হাওয়া অতিথি পর্যটকদের জন্য সর্বোত্তম উপহার।