Wednesday, March 4, 2026

বোমার আগুন কি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ঘরেই লাগবে by আজিজ হক

ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধেই ভয়াবহ দমননীতি চালিয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাব বলছে, কেবল গত কয়েক মাসেই নিহত হওয়ার সংখ্যা ৩০ হাজার ছুঁতে পারে। এমন এক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্ষোভের আবেগে ভেসে আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক আকাশপথে হামলার দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত বিচার না করি, তা হলে বড় ভুল হবে।

কারণ, এই হামলা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়; এটি এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের সীমা, সাংবিধানিক কর্তৃত্ব, তথ্যের সত্যতা—সবই রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কাছে গৌণ হয়ে উঠছে। একবার যদি এই দরজা খুলে যায়, তা হলে সহিংসতার সেই নজির আর কেবল বিদেশের মাটিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা কে দেবে? আমেরিকানদের, আর যারা বিশ্বরাজনীতিতে নিজেদের আমেরিকার বন্ধু বলে মনে করে, তাদের শুধু আজকের ‘খারাপ’ শত্রুকে আক্রান্ত দেখে খুশি হলে চলবে না। তাঁদের ভাবতে হবে আজ যে শক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, কাল সেটা কার বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে?

যে প্রেসিডেন্ট তথ্য বা আইনের ধার ধারেন না, তাঁর হাতে এই ক্ষমতা থাকলে বিষয়টি চিন্তার হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশে কোনো স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ এক কথা। কিন্তু একই ক্ষমতা যদি দেশের ভেতরে নিজের বিরোধীদের ‘দেশের শত্রু’ বলে দমন করতে ব্যবহার করা হয়, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এখন সেই আশঙ্কাও সামনে চলে এসেছে।

ঘটনাচক্র কখনো কখনো ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। যেদিন তেহরানের মাটিতে বোমা পড়তে শুরু করল, সেদিনই ওয়াশিংটন পোস্ট জানাল, হোয়াইট হাউস নাকি খুব শিগগির একতরফা নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারে, যাতে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কে, কখন, কীভাবে ভোট দেবে, তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট নিজের হাতে টেনে নিতে পারেন। যুক্তি? উত্তর হলো জাতীয় নিরাপত্তা; বিশেষত কথিত চীনা হস্তক্ষেপের আশঙ্কা। লক্ষ্য? উত্তর হলো এমন বিধিনিষেধ আরোপ, যা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য প্রকাশ্যে বলেননি, তিনি এমন আদেশ দিতে চলেছেন। কিন্তু কয়েক দিন আগে দেওয়া তাঁর স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ইরান আক্রমণের পরিকল্পনাও তিনি গোপন রেখেছিলেন। ফলে অস্বীকারের রাজনৈতিক ভাষা দিয়ে বাস্তব সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার ওপর সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ৬ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে, এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের প্রলোভন বাড়তেই পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা জেরিম্যান্ডারিংয়ের (জেরিম্যান্ডারিং হলো নির্বাচনী সীমান্ত বা কংগ্রেসিয়াল/ভোটকেন্দ্রের সীমানা এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করা, যাতে রাজনৈতিক সুবিধা একটি বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর জন্য নিশ্চিত করা যায়) চেষ্টাও যে খুব সফল হয়েছে, তা নয়। টেক্সাসে রিপাবলিকানদের সীমানা-কারচুপি ক্যালিফোর্নিয়ায় ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা আক্রমণের মুখে থমকে যায়। এমনকি প্রবল রিপাবলিকান ঘাঁটি ইন্ডিয়ানাও নিজেদের রাজ্যে নতুন করে সীমানা সাজাতে অনীহা দেখায়। এর সঙ্গে যদি সামনের মাসগুলোতে শেয়ারবাজারে বড়সড় সংশোধন বা ধস নেমে আসে, তা হলে হোয়াইট হাউসের ওপর নির্বাচনী ‘অলৌকিক ঘটনা’ ঘটানোর চাপ বাড়বে, এতে সন্দেহ নেই।

কিন্তু সংবিধান কী বলে? মার্কিন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১ স্পষ্ট জানায়, কংগ্রেসীয় নির্বাচনের নিয়ম নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে, যদিও কংগ্রেস তা অতিক্রম করতে পারে। প্রেসিডেন্টের হাতে একতরফাভাবে ডাকযোগে ভোট নিষিদ্ধ করা বা বাধ্যতামূলক ভোটার পরিচয়পত্র চালু করার ক্ষমতা নেই। রিপাবলিকানদের প্রস্তাবিত ‘সেভ অ্যাক্ট’-এ ভোটার আইডির কথা থাকলেও তা এখনো আইন হয়ে ওঠেনি। তা হলে উদ্বেগ কোথায়? উদ্বেগ এই যে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ঐতিহাসিকভাবে ঢিলেঢালাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইরানে হামলার ঘটনাই তার উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান আন্তর্জাতিক সংঘাত শুরু করার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসকে দিয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদ একতরফা শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে, তবু আইনি কর্তৃত্বের ঘাটতি হামলা ঠেকাতে পারেনি।

ইরানে হামলার পক্ষে ট্রাম্প যে যুক্তি দেখিয়েছেন, তা নিউইয়র্ক টাইমস–এর ভাষায় ‘প্রমাণহীন ও অতিরঞ্জিত’। আরও সরাসরি বললে, প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস করেন, তিনি দায়মুক্তভাবে মিথ্যা বলতে পারেন এবং সেই মিথ্যার ভিত্তিতে শত বা সহস্র প্রাণহানির ঝুঁকি নিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন। এ এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। আর এই প্রবণতা কেবল পররাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, বিদেশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিস্তৃত ক্ষমতার দাবি কীভাবে ঘুরিয়ে দেশের ভেতরেও প্রয়োগ করা যায়।

ইরান-সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় (যার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না), তা হলে বোমাবর্ষণ ও পাল্টা হামলার আবহকে সামনে রেখে নতুন দেশি বিধিনিষেধ আরোপের যুক্তি তৈরি করা আরও সহজ হবে। জাতীয় নিরাপত্তার জরুরি অবস্থা একবার ঘোষিত হলে, তা প্রায়ই ক্ষমতার প্রসার ঘটায়, সংকোচন নয়। আজ জাতীয় নিরাপত্তার ছুরি ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসকদের দিকে তাক করা। তাঁদের প্রতি সহানুভূতি না থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—রাষ্ট্রীয় শক্তি দূরের শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করাকে আমরা স্বাগত জানাই, কিন্তু সেই শক্তিই একদিন আমাদের দিকে ঘুরে আসতে পারে।

প্রশ্ন তাই ইরানকে ঘিরে নয়, প্রশ্ন আমেরিকার গণতন্ত্রকে ঘিরে। বোমা কি শেষ পর্যন্ত বাইরের যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তার প্রতিধ্বনি একদিন ভোটকেন্দ্র, আদালত ও শহরের রাস্তায়ও শোনা যাবে? সেই আশঙ্কাই আজ সবচেয়ে বড় ‘ব্লো-ব্যাক’।

* আজিজ হক, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের বোমা হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের সামনে ইরানের পতাকা
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের বোমা হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের সামনে ইরানের পতাকা। ছবি: এএফপি

ঠিক এই সময়ে কেন ইরানে হামলা, কী চায় ইসরায়েল

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণঃ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বড় ধরনের যৌথ হামলা চালানোর পর প্রতিশোধ হিসেবে দেশটি উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে পুরো অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ফার্স সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার ইরান সরকার নিশ্চিত করেছে যে তারা কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা রয়েছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তিশালী হামলার মুখে পড়েছে।

আইআরজিসি বলেছে, তারা এ অভিযান ‘শত্রুকে স্থায়ীভাবে পরাজিত না করা পর্যন্ত বিরামহীনভাবে চালিয়ে যাবে’। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সব স্থাপনা ও স্বার্থকে ইরানের সেনাবাহিনীর জন্য ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গণ্য করা হবে।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হামিদ ঘানবারি আল–জাজিরাকে বলেন, ইরান নিজেকে রক্ষা করার অধিকার রাখে এবং চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে কোনো ধরনের মানবিক ক্ষতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করছে।

ইরানের ছোড়া বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার পর আবুধাবিতে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা।

বাহরাইন জানিয়েছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের সদর দপ্তরে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল। এ ঘটনাকে বাহরাইনের সরকার ‘বিশ্বাসঘাতক হামলা’ এবং ‘দেশটির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার মুখে পড়েছিল। এগুলোকে কুয়েতের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দ্বারা ভূপাতিত করা হয়েছে।

কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা দেশের ওপর একাধিক হামলা ‘প্রতিহত’ করেছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে, ইরান রিয়াদ ও দেশটির পূর্বাঞ্চলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দ্বারা প্রতিহত করা হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এসব হামলা কোনো অজুহাতেই সমর্থনযোগ্য নয়, বিশেষ করে সৌদি আরব তার আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ইরানে হামলা চালাতে ব্যবহৃত হতে দেবে না ইরানি কর্তৃপক্ষ এটা জানার পরও।

কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে এবং তাদের ভূখণ্ডে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

আল–জাজিরার একজন সংবাদদাতা জানিয়েছেন, শনিবার উত্তর ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের এরবিল বিমানবন্দরে দুবার হামলার চেষ্টা করা হয়। বিমানবন্দরটিতে ড্রোন হামলার চেষ্টা হলে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এটিকে ভূপাতিত করেছে।

সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সুয়াইদার একটি শিল্প এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণে চারজন নিহত হয়েছেন এবং বহু ব্যক্তি আহত হয়েছেন। যদিও প্রতিবেদনে ক্ষেপণাস্ত্রের উৎস উল্লেখ করা হয়নি।

আল–জাজিরার দোহা প্রতিনিধি বলেছেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যদেশগুলোর মধ্যে শুধু ওমানেই এখন পর্যন্ত ইরান কোনো হামলা চালায়নি ইরান।

ওমান বছরের পর বছর ধরে ইরান ও এই অঞ্চলের অন্য দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। দেশটি সম্প্রতি ওমানে এবং জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছে।

জিসিসি আরব উপদ্বীপের ছয় দেশের জোট। দেশগুলো হলো বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। জিসিসি ১৯৮১ সালে আর্থিক, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-02%2F00min99p%2FC-1.JPG?rect=0%2C0%2C5499%2C3666&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখি। ইরানের রাজধানী তেহরান, ২ মার্চ ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেনের পর এবার মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ইরানের শাহেদ ড্রোন

ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি ‘শাহেদ–১৩৬’ ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে আসছে রাশিয়া। সেই ড্রোন এখন মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যবহার করছে ইরান। ৫০ হাজার ডলার মূল্যের এই ড্রোনগুলো ইঞ্জিনের কর্কশ শব্দের জন্য আলাদা করে চেনা যায়।

গত ৪৮ ঘণ্টায় বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছে কয়েক শ শাহেদ ড্রোন। যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি ও ভয় দেখাতে তেহরান এই কৌশল নিয়েছে।

বাহরাইন থেকে পাওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, রাতের আঁধারে একটি ডেল্টা-উইং ড্রোন ঘাস টাকার মেশিনের মতো (লনমাওয়ার) কর্কশ শব্দে একটি বহুতল ভবনের দিকে ধেয়ে আসছে এবং সজোরে সেটিতে আঘাত হানছে। এতে ভবনের ব্যালকনি দিয়ে জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ পড়তে দেখা যায়। সম্ভবত অ্যাপার্টমেন্টটি সরাসরি আঘাত থেকে রক্ষা পায়নি।

গত শনিবার সকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটির উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের লক্ষ্য করে এক হাজারের বেশি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর একটি বড় অংশই শাহেদ–১৩৬ মডেলের।

সোমবার বিকেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের ওপর ৬৮৯টি ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪৫টি ড্রোন তারা ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও ৪৪টি ড্রোন (মোট ড্রোনের প্রায় ৬ শতাংশের বেশি) লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

যেভাবে কাজ করে শাহেদ ড্রোন

শাহেদ–১৩৬ ড্রোন ৩ দশমিক ৫ মিটার দীর্ঘ এবং এর ডানার বিস্তার ২ দশমিক ৫ মিটার। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি সস্তা এবং তৈরি করা সহজ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইরান বছরে কয়েক ডজন তৈরি করতে পারত। ফলে কিছু সময়ের জন্য চলমান সংঘাতের একটি অংশজুড়ে থাকতে পারে এসব ড্রোনই।

একটি শাহেদ ড্রোন প্রায় ৫০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে পারে, যা একটি আকাশচুম্বী ভবন ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথেষ্ট হলেও তা ধসিয়ে দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়।

এই ড্রোনগুলো তুলনামূলক ধীরগতির (যদিও ইউক্রেনে অবশ্য এর দ্রুতগতির জেট ইঞ্জিন সংস্করণও দেখা গেছে), কিন্তু এগুলোর বড় আকৃতি, ইঞ্জিনের উচ্চ শব্দ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে লক্ষ্যবস্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ধরন সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

বাহরাইন থেকে পাওয়া দ্বিতীয় একটি ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গেছে, মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তরের ঠিক ওপর দিয়ে একটি ডেল্টা-উইং ড্রোন উড়ে যাচ্ছে। ড্রোনটি সফলভাবে নিচের দিকে নেমে একটি রাডার ডোমে আঘাত হানে এবং সেটি ধ্বংস করে দেয়।

এ ছাড়া কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও শাহেদ ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। সাইপ্রাসের আক্রোতিরিতে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর (আরএএফ) একটি ঘাঁটিতেও সম্ভবত এই ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।

এই ড্রোনগুলোর পাল্লা সর্বোচ্চ দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এগুলো সাধারণত আগে থেকেই ঠিক করে দেওয়া জটিল পথ ধরে উড়তে সক্ষম। রাডার ফাঁকি দেওয়ার জন্য এগুলো নিচ দিয়ে উড়ে যায়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে এই ড্রোনগুলো দূর থেকে অপারেটরের মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যার ফলে একদম শেষ মুহূর্তেও এগুলো দিক পরিবর্তন করতে পারে।

শাহেদ–১৩৬ ড্রোনগুলো গত দশকের শেষের দিকে ইরানে নকশা করা হয়েছিল। ২০২১ সালের জুলাই মাসে ইসরায়েলি মালিকানাধীন তেলবাহী জাহাজ ‘মার্সার স্ট্রিট’-এ হামলার মাধ্যমে প্রথম এই ড্রোনের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়। ওই হামলায় একজন ব্রিটিশ ও একজন রোমানিয়ার নাগরিক নিহত হয়েছিলেন।

এর আগে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলায়ও সম্ভবত এই ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, ইরানের ‘শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ সেন্টার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান মূলত এই ড্রোনের নকশা করে। প্রতিষ্ঠানটি দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অধীনস্থ। তবে ২০২২ সালের শরৎকাল থেকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ব্যাপক ব্যবহারের ফলেই এই ড্রোন বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়।

শুরুতে ইরান থেকে রপ্তানি করা হলেও পরবর্তী সময়ে এই ড্রোনের প্রযুক্তি রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করে তেহরান। এরপর রাশিয়ার ভোলগা নদীর তীরে অবস্থিত ইয়েলাবুগা শহরের একটি কারখানায় বিপুল পরিমাণে এই ড্রোন তৈরি করা হচ্ছে।

রাশিয়া সাধারণত ইউক্রেনে হামলার সময় একসঙ্গে প্রায় ৮০০টি শাহেদ–১৩৬ ড্রোন, একই রকম দেখতে ‘জেবেরা’ ডেকয় (ধোঁকা দেওয়ার ড্রোন) এবং অল্পসংখ্যক ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। মূলত ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতেই ‘ঝাঁক বেঁধে’ এই হামলা চালানো হয়, যাতে ড্রোনের আড়ালে আরও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যে আঘাত হানতে সফল হতে পারে।

তবে গত সপ্তাহান্তে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শাহেদ ড্রোনের বেশির ভাগ ভিডিওতে দেখা গেছে, সেখানে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে ড্রোনের বিশাল কোনো ঝাঁক নয়, বরং বিচ্ছিন্নভাবে একেকটি ড্রোনকে আঘাত হানতে দেখা গেছে।

ইউক্রেনে শাহেদ ড্রোনগুলো স্থির লক্ষ্যবস্তুতে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে চলতি শীতে দেশটিতে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। লাখ লাখ ঘরবাড়িতে এর প্রভাব পড়েছে।

ইরান যদি এই একই কৌশল অবলম্বন করে তবে তারা সফল হতে পারে। সোমবার সকালে সৌদি আরবের বৃহত্তম শোধনাগার রাস তানুরায় ড্রোন হামলার পর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর ফলে শোধনাগারটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। যদিও এই হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি শাহেদ ড্রোন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে এর ধ্বংসক্ষমতা ছিল একই রকম।

ইউক্রেন যুদ্ধে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শাহেদ ড্রোনের ব্যবহার শুরু করে রাশিয়া
ইউক্রেন যুদ্ধে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শাহেদ ড্রোনের ব্যবহার শুরু করে রাশিয়া। ছবি: রয়টার্স

কাশ্মীর নিয়ে ইরান কীভাবে ভারতকে বাঁচিয়েছিল by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরান আক্রমণ ও সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা নিয়ে নয়াদিল্লির ‘অস্বস্তিকর’ নীরবতায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত এক নিবন্ধে সোনিয়া লিখেছেন, আন্তর্জাতিক আলোচনা চলাকালীন এক ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক গভীর ও গুরুতর ফাটল।

খামেনিকে হত্যা এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি নির্বিচার আক্রমণ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো শোকপ্রকাশ করেননি। সামরিক হানার নিন্দাও করেননি। এই নীরবতার সমালোচনা করতে গিয়ে সোনিয়া ওই নিবন্ধে মনে করিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তান যখন ১৯৯৪ সালে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাকে (ওআইসি) জোটবদ্ধ করে কাশ্মীর প্রশ্নে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নিয়েছিল, এই ইরানই তখন ভারতের পাশে দাঁড়িয়ে তা বানচাল করে দিয়েছিল। কাশ্মীর সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণ ঠেকাতে ইরান সেদিন ত্রাতার ভূমিকা নিয়েছিল। তাদের সেই ভূমিকা ছিল অতীব তাৎপর্যপূর্ণ।

সেই ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যার নিন্দা তো দূরের কথা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী এখনো শোক জ্ঞাপন পর্যন্ত করেননি। এই নীরবতা সোনিয়া গান্ধীকে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন, গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা ভারত যদি কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়, বিধিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেও ঠিক মুহূর্তে যদি বৃহৎ শক্তির জবরদস্তির বিরুদ্ধে সরব না হয়, তা হলে অন্যদের কাছেও ভারত তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। আস্থা হারাবে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর।

সোনিয়া খুবই সংক্ষেপে ১৯৯৪ সালের ভারতীয় কূটনীতির জয়ের প্রসঙ্গ টানলেও সে সময় যা ঘটেছিল, তা রীতিমতো থ্রিলার। ভারতীয় কূটনৈতিক সাফল্যের সে ছিল এক অভিনব দৃষ্টান্ত।

তার ঠিক আগের বছর দ্বিতীয়বারের জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন বেনজির ভুট্টো। ১৯৯৪ সালে তিনি উদ্যোগী হন ওআইসিকে জোটবদ্ধ করে কাশ্মীরে মানবাধিকার হরণ ও লঙ্ঘন নিয়ে এক প্রস্তাব গ্রহণ করে তা জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে পেশ করার। প্রস্তাবটি পাস হলে বহু দশক পর কাশ্মীর সমস্যা আরও একবার আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠত। আলোচিত হতো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন নরসিমা রাও। দুই বছর আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংস ঠেকাতে না পেরে তিনি তখন সমালোচনার কেন্দ্রে। বেহাল অর্থনীতি সামাল দিতে সোনা বন্ধক রাখা ভারত তখনো টালমাটাল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর চিরবন্ধু রাশিয়াও তখন থিতু নয়। এ অবস্থায় নরসিমা রাও বাজি ধরেছিলেন ইরানের ওপর। তিনি বুঝেছিলেন, ইরান রাজি না হলে সর্বসম্মতির অভাবে ওআইসি প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনেও প্রস্তাবটি পেশ হবে না। কাশ্মীরের আন্তর্জাতিকীকরণের পাকিস্তানি স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে।

নয়াদিল্লির ইরান দূতাবাস পর্যন্ত নরসিমা রাওয়ের এই প্রচেষ্টা আন্দাজ করতে পারেনি। এর মাত্র কয়েক দিন আগেই ইরানের রাষ্ট্রদূত কাশ্মীরের হুরিয়ৎ নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ওআইসিতে প্রস্তাব পাস করাতে ইরান যথাসাধ্য করবে। নরসিমা রাও কীভাবে অসাধ্য সাধন করেছিলেন, কাদের সাহায্য তিনি নিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে বরেণ্য নেতারা কীভাবে জোটবদ্ধ হয়েছিলেন এবং অসুস্থ শরীর নিয়ে সবার অলক্ষে কীভাবে কয়েক ঘন্টার জন্য তেহরান ঘুরে দিল্লি ফিরে এসেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং, সেই রোমহর্ষ কাহিনি টুকরা টুকরাভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে অভিষেক চৌধুরীর লেখা অটল বিহারি বাজপেয়ীর জীবনী ‘দ্য বিলিভার্স ডিলেমা’য়। ইরানবিশেষজ্ঞ সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এম কে ভদ্রকুমারও সেই থ্রিলার স্মৃতিচারণা করেছেন।

নরসিমা রাও যখন ঠিক করলেন, ওআইসিকে ঠেকাতে একমাত্র ইরানই হতে পারে তুরুপের তাস, সেই সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং অসুস্থ অবস্থায় দিল্লির অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (এইমস) ভর্তি। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাস। দিল্লিতে শীতের কামড়ের তীব্রতা কমলেও তেহরান তখনো বরফের চাদরের তলায়। সেই তীব্র ঠান্ডায় কাকপক্ষীকে জানতে না দিয়ে এইমস থেকে স্ট্রেচারে শুইয়ে বের করা হয় দীনেশ সিংকে। সেনা বাহিনীর বিশেষ বিমানে তিনি তেহরান পৌছান। হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাঁকে নামিয়ে আনা হয় বিমান থেকে। সফরসঙ্গী একজন চিকিৎসক ও তিনজন সহযোগী। ‘মিশন সাকসেসফুল’ হওয়ার অনেক পরে জানা গিয়েছিল, কৌতূহলী ব্যক্তিদের নজর এড়াতে দিল্লির এইমস হাসপাতালে দীনেশ সিংয়ের বিছানায় সেদিন অন্য একজনকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল।

দীনেশ সিংকে স্বাগত জানাতে তেহরান বিমানবন্দরে প্রটোকল ভেঙে হাজির হয়েছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর বেলায়েতি। হুইলচেয়ারবন্দী দীনেশ সিংকে দেখে বিস্মিত তিনি সফরের কারণ জানতে চাইলে স্মিত হেসে দীনেশ তাঁর হাতে প্রেসিডেন্ট আলী আকবর হাসেমি রাফসানজানিকে লেখা প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওয়ের ব্যক্তিগত অনুরোধপত্রটি তুলে দিয়েছিলেন।

এর পরের কয়েক ঘণ্টা ধরে প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলায়েতি ও ‘মজলিস’–এর (পার্লামেন্ট) স্পিকার নাতেক নৌরির কাছে কাশ্মীর পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছিলেন দীনেশ সিং। সন্ধ্যায় দিল্লি ফেরার আগে প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি তাঁর ইতিবাচক মনোভাবের কথা দীনেশ সিংকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে দীনেশ সোজা ফিরে গিয়েছিলেন এইমসে, প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওকে আশ্বস্ত করে। ভদ্রকুমারের কথায়, দীনেশকে রাফসানজানি বলেছিলেন, ভারতের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, ইরান তা নিশ্চিত করবে।

পরের ৭২ ঘণ্টা ছিল টেনশনে ভরা। অবশেষে জানা যায়, ওআইসির প্রস্তাব ঠেকিয়ে দিয়েছে ইরান। পাকিস্তানের প্রস্তাব পেশের সময় ইরান বাধা দেয়। ইরানি প্রতিনিধি জানান, তাঁরা ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেরই বন্ধু। তাঁরা চান বিবাদের মীমাংসা নিজেদের আলোচনার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। ঔপনিবেশিক শক্তিদের মধ্যস্থতার সুযোগ দেওয়া ঠিক নয়।

সেই তেহরানযাত্রা ছিল দীনেশ সিংয়ের শেষ বিদেশ সফর। পরের বছরের নভেম্বরে ৭০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। নরসিমা রাও অন্য খেলাও খেলেছিলেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতবিরোধীরা তখন সক্রিয়। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে রাজনৈতিক বিবাদ ও বিভেদ ভুলে ভারত যে এককাট্টা, তা বোঝাতে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে রাও বেছে নিয়েছিলেন বিরোধী দল বিজেপির শীর্ষ নেতা অটলবিহারি বাজপেয়ীকে। তাঁর সঙ্গে প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালমন খুরশিদ, জম্মু–কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ এবং অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং। জাতিসংঘকে রাও এই বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন, ভারতীয় গণতন্ত্র বিরুদ্ধস্বর রোধ করে না। প্রত্যেককে সম্মান দেওয়া হয়। এমনকি কাশ্মীরিদের আওয়াজকেও।

জাতিসংঘের আসরে ফারুক আবদুল্লাহর ভাষণ ছিল জ্বালাময়ী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর প্রতি ইঙ্গিত করে আবেগ মিশিয়ে তিনি বলেছিলেন, তাঁকে (বেনজির) কাশ্মীরে আসতে হবে আমার মৃতদেহ ডিঙিয়ে। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমি কাশ্মীর রক্ষা করে যাব।

পাকিস্তানের মদদপ্রাপ্ত সশস্ত্র জঙ্গিদের উদ্দেশে হুংকার দিয়ে তিনি বলেছিলেন, তোমরাই আমাদের সুন্দর দেশকে মৃত্যু উপত্যকা করে তুলেছ। ‘দ্য বিলিভার্স ডিলেমা’য় অভিষেক লিখেছেন, অলৌকিকভাবে ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল ইরান। তাদের আপত্তিতে কাশ্মীর নিয়ে ওআইসি সর্বসম্মত হতে পারল না। হতচকিত ও বিহ্বল পাকিস্তান প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়। ভোটাভুটির প্রশ্নই আর থাকল না।

সেই ভারত ও আজকের ভারতে আসমান–জমিন ফারাক।

আজকের ইরান থেকে ভারতের মুখ ফিরিয়ে থাকা বিস্মিত করেছে সোনিয়া গান্ধীকে। ১৯৯৪ সালে ইরানের ভূমিকা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, নীরবতার অর্থ দায়িত্ব এড়ানো। অথচ ভারত চেয়েছিল বিশ্ব বিবেকের কণ্ঠস্বর হতে!

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানি
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানি। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শিক্ষা দেয়ার’ হুমকি দেয়া কে এই আলি লারিজানি!

দশকের পর দশক ধরে আলি লারিজানি ছিলেন ইরানের শান্ত ও বাস্তববাদী মুখ। তিনি ১৮শ শতকের জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট-এর ওপর বই লিখেছেন। পশ্চিমাদের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। কিন্তু ১লা মার্চ ৬৭ বছর বয়সী এই সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিবের ভাষা আমূল বদলে যায়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও আইআরজিসি কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর লারিজানি তীব্র বার্তা দেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমেরিকা ও জায়নিস্ট শাসন [ইসরাইল] ইরানি জাতির হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়েছে। আমরা তাদের হৃদয় জ্বালিয়ে দেব। জায়নিস্ট অপরাধী ও নির্লজ্জ আমেরিকানদের তাদের কাজের জন্য অনুতপ্ত করব। ইরানের সাহসী সৈনিক ও মহান জাতি নারকীয় আন্তর্জাতিক অত্যাচারীদের এমন শিক্ষা দেবে, যা তারা কখনও ভুলবে না।’

এ নিয়ে অনলাইন আল জাজিরা দীর্ঘ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে আরও বলা হয়, লারিজানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ইসরাইলি ফাঁদে’ পা দেয়ার অভিযোগ করেন। তিনি এখন ১৯৭৯ সালের পর ইরানের সবচেয়ে বড় সংকট মোকাবিলায় তেহরানের প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। খামেনির মৃত্যুর পর দেশ পরিচালনাকারী তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী পরিষদের পাশাপাশি তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কথা। তাহলে কে এই ব্যক্তি, যিনি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের নিরাপত্তা কৌশল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন?

‘ইরানের কেনেডি’
১৯৫৮ সালের ৩রা জুন ইরাকের নাজাফে জন্ম নেয়া লারিজানি আমল শহরের এক ধনী পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। ২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাদের পরিবারকে ‘ইরানের কেনেডি’ বলে আখ্যা দেয়। তার পিতা মির্জা হাশেম আমোলি ছিলেন বিশিষ্ট ধর্মীয় পণ্ডিত। তার ভাইয়েরাও বিচার বিভাগ ও বিশেষজ্ঞ পরিষদসহ ইরানের প্রভাবশালী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। লারিজানির ব্যক্তিগত সম্পর্কও ১৯৭৯-পরবর্তী বিপ্লবী অভিজাতদের সঙ্গে গভীর। ২০ বছর বয়সে তিনি ফারিদে মোতাহারিকে বিয়ে করেন, যিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোর্তেজা মোতাহারির কন্যা।

গণিতবিদ ও দার্শনিক
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি লারিজানির রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ একাডেমিক পটভূমি। ১৯৭৯ সালে তিনি শরীফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ্চাত্য দর্শনে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ইমানুয়েল কান্ট।

রাজনৈতিক উত্থান
১৯৭৯ এর বিপ্লবের পর তিনি ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপসে যোগ দেন। পরে সরকারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানির সময় সংস্কৃতি মন্ত্রী ছিলেন। একই সময়ে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি)-এর প্রধান হিসেবে কাজ করেন। তার কড়া নীতির কারণে সংস্কারপন্থীরা অভিযোগ করেন, তরুণদের বিদেশি গণমাধ্যমের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি টানা তিন মেয়াদে পার্লামেন্টের (মজলিস) স্পিকার ছিলেন এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে বড় ভূমিকা রাখেন।

পারমাণবিক আলোচনায় ভূমিকা
২০০৫ সালে তিনি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব ও প্রধান পারমাণবিক আলোচক নিযুক্ত হন। পরে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের নীতির সঙ্গে মতভেদে পদত্যাগ করেন। স্পিকার হিসেবে তিনি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন পার্লামেন্টে অনুমোদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলেও গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাকে অযোগ্য ঘোষণা করে। ২০২১ সালে বিশ্লেষকদের মতে, কট্টরপন্থী ইব্রাহিম রইসির পথ পরিষ্কার করতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

যুদ্ধের মাঝেও কূটনীতি?
২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাকে আবার সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব নিযুক্ত করেন। এরপর থেকে তার অবস্থান কঠোর হয়েছে। অক্টোবর ২০২৫-এ তিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি বাতিল করেন বলে খবর আসে। তবুও অনেকেই তাকে বাস্তববাদী মনে করেন। কারণ তিনি অতীতে পারমাণবিক চুক্তির পক্ষে ছিলেন। সাম্প্রতিক উত্তেজনার আগে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনাতেও যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া বিমান হামলা কূটনৈতিক সম্ভাবনার জানালা কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এখন লারিজানি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনা করবে না। খামেনির মৃত্যুর পর ওই অঞ্চল যখন অস্থিরতার কিনারায়, লারিজানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এমন শক্তির জবাব পাবে ‘যা তারা আগে কখনও অনুভব করেনি।’

যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শিক্ষা দেয়ার’ হুমকি দেয়া কে এই আলি লারিজানি!

ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদে’ যোগ দিতে মিত্রদের অনীহা কেন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদ (বোর্ড অব পিস) থেকে দূরে থাকছে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদেশগুলো। তাঁর ঘনিষ্ঠ বিশ্বনেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—কেউই এতে খুব একটা উৎসাহ দেখাচ্ছেন না।

গত বছর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রস্তাবের মাধ্যমে এই পর্ষদ গঠিত হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত খামখেয়ালির কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন তখন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন।

চলতি মাসের শেষ দিকে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন এই শান্তি পর্ষদের প্রথম বৈঠক হবে। এতে বিশ্বের প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশগুলোর অধিকাংশই অংশ নিচ্ছে না। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এই বোর্ড থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মূলত এই শান্তি পর্ষদের যে সনদ তৈরি করা হয়েছে, সেটিই দেশগুলোকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। সেই সনদে ট্রাম্পকে একাধারে বিচারক, জুরি, দণ্ডদানকারী, অর্থ নিয়ন্ত্রক এমনকি গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে—অর্থাৎ তিনি যা চাইবেন, তা-ই করতে পারবেন।

গত জানুয়ারিতে এই পর্ষদ সম্পর্কে এক বক্তৃতায় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী সংস্থায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এই বোর্ডের।’

পর্ষদে কারা থাকছে

গত নভেম্বরে পর্ষদ গঠনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এতে যোগ দিতে প্রায় ৬০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বেলারুশ, বুলগেরিয়া, মিসর, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, ইসরায়েল, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম এতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে পর্ষদে যোগ দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক দেশ খুব কম।

জাতিসংঘের প্রতিদ্বন্দ্বী

গত বছর ট্রাম্পের ২০ দফার গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে এ শান্তি পর্ষদের পরিকল্পনা করা হয়। তবে ট্রাম্পের লক্ষ্য এখন কেবল গাজা পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রকৃতপক্ষে এই পর্ষদের সনদে এর লক্ষ্য ও সাংগঠনিক কাঠামো বর্ণনা করা হয়েছে—সেখানে ‘গাজা’ শব্দটির একবারও উল্লেখ নেই।

জাতিসংঘের আগের ঘোষণার সঙ্গে পর্ষদের সনদে মিল নেই। সম্ভবত জাতিসংঘ এমন কোনো শান্তি সংস্থার কথা কল্পনাও করেনি, যার আজীবন চেয়ারম্যান থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বোর্ডের সনদে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যানের পদ কেবল তখনই শূন্য হবে যদি তিনি নিজে পদত্যাগ করেন কিংবা বোর্ড তাঁকে সর্বসম্মতিক্রমে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করে। যেকোনো সংস্থায় ট্রাম্প নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে চাইবেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে বিশ্বনেতাদের চমকে দিয়েছে অন্য একটি বিষয়—জাতিসংঘের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিনি যেভাবে এই ‘শান্তি পর্ষদকে’ দাঁড় করাচ্ছেন।

মিত্রদের অনীহার কারণ

পর্ষদের সদস্য হতে হলে যেকোনো দেশকে গুনতে হবে ১০০ কোটি ডলার। সনদে বলা হয়েছে, এই সংস্থা ‘সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে’। একে জাতিসংঘের প্রতি প্রকাশ্য কটাক্ষ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই অনেক দেশ এর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে। ফ্রান্স এই সংস্থায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফরাসি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এটি জাতিসংঘের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাবে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ ও আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইতিহাস বেশ পুরোনো। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে তিনি দুই দেশের সংযোগকারী সেতু বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। এমন একজনের হাতে বিশ্বশান্তির চাবিকাঠি ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হবে? এমন প্রশ্নে দ্বিধায় পড়ে গেছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

খামেনির হত্যা আগ্রাসনের চূড়ান্ত প্রতীক: সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক পথই সমাধান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনা শুধু ইরান নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি সংকটজনক মুহূর্ত তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে চালানো আকস্মিক এই হামলা ও হত্যাকাণ্ডের আমরা নিন্দা জানাই। এই হত্যাকাণ্ড আগ্রাসনের চূড়ান্ত প্রতীক হয়ে থাকবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরায়েল আরেকবার প্রমাণ করল, চূড়ান্ত ক্ষমতার কাছে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল্য কতটা ঠুনকো। এমন হঠকারী হামলা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও চরমপন্থার কত বড় ঝুঁকি তৈরি করে, তার বহু নজির ইতিহাসে রয়েছে।

গত বছরের জুনে ইরান–ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলমান ছিল। এর মধ্যেই শনিবার রাজধানী তেহরানসহ ইরানের বেশ কয়েকটি জায়গায় বিস্তৃত পরিসরে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই হামলায় তেহরানে নিজ কার্যালয়ে নিহত হন ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর মৃত্যুতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে দেশটি।

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সামরিক বাহিনীর প্রধানসহ সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে বহু হতাহতের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরে মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৫০ শিশু নিহত হয়েছে। শিশু, নারীসহ বেসামরিক জনগণের ওপর নির্বিচার হামলা ও হত্যাকাণ্ড চূড়ান্তভাবে অগ্রহণযোগ্য ও নিন্দনীয়। উল্লেখ্য যে গাজায় নিরীহ জনগণের ওপর নিষ্ঠুর গণহত্যা চালানোর পরও ইসরায়েলকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে নিদারুণ ব্যর্থ হতে দেখেছি বিশ্বকে।  

ইরান পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলার অংশ হিসেবে ইসরায়েল এবং কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এসব হামলায় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের পক্ষ থেকেই আরও কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি এসেছে।

এটা সত্য যে ইরানের শাসকদের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণকে দমন–পীড়নের অজস্র অভিযোগ রয়েছে। জানুয়ারি মাসে দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নিষ্ঠুর বলপ্রয়োগে দমন করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বাইরে থেকে আগ্রাসন চালিয়ে ইরানে শাসনব্যবস্থা পাল্টানোর কোনো চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই চেষ্টা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি চূড়ান্ত অসম্মান। ইরানের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা ইরানি জনগণের হাতেই থাকতে হবে। এর আগে, জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। কাতার ও সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজনা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্স জরুরি ভিত্তিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বান করেছে। বর্তমান বিশ্বে যেকোনো যুদ্ধ ও সংঘাত কেবল নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে যে আটকে থাকে না, তার বড় দৃষ্টান্ত রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাণিজ্যে তার বড় ধরনের প্রভাব পড়বে এবং জ্বালানির সংকট তৈরি হবে। নতুন করে দুর্ভোগে পড়বে শতকোটি মানুষ। আমরা মনে করি, বিপজ্জনক এই সংঘাত বন্ধে জাতিসংঘ, ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। সামরিক নয়, কূটনৈতিক পদক্ষেপই উত্তেজনা প্রশমন ও সংঘাতের বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র পথ। সব পক্ষ সংযত ও দায়িত্বশীল হলেই কেবল বিশ্ব ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।

ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যের সব ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় ঢাকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলোতে আটকা পড়েছেন কয়েক হাজার বাংলাদেশি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং দূতাবাসগুলোকে তীক্ষ্ণভাবে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা এবং প্রবাসীদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো প্রয়োজন।  

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-02%2Fgu3vyahl%2Fkhameni.JPG?rect=0%2C9%2C579%2C386&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জের’ চেষ্টা যেভাবে উন্মোচিত হলো by জুলিয়ান বর্গার

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ইরানে এই হামলার ধরন ও উদ্দেশ্য নিয়ে লিখেছেন জুলিয়ান বর্গার

কর্মদিবস শুরু হয়ে রাস্তাঘাট ও অফিস জনাকীর্ণ থাকার সময়, সকাল প্রায় সোয়া ৯টার দিকে দিনের আলোতে তেহরানের ওপর বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র পড়তে শুরু করে। আধুনিক যুগে বোমা হামলা সাধারণত রাতে শুরু হয়, যাতে লক্ষ্যবস্তুকে বেশি বিভ্রান্ত করা যায় এবং তাদের আকাশ প্রতিরক্ষার কার্যকারিতা কমিয়ে দেওয়া যায়। তবে এবার ছিল ভিন্ন।

ইরানের রাজধানীর রাস্তাগুলো থেকে যে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছিল, তা সরকারি এলাকার ভবন এবং অভিজাত আবাসিক এলাকার ভিলা থেকে তৈরি হয়েছিল। পরে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রাথমিক হামলাটি ছিল একটি ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করা এবং একই সঙ্গে যতটা সম্ভব সরকারি কাঠামো ধ্বংস করা। এত তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের জন্য কর্মকর্তারা নিজ নিজ দপ্তরে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করাই যৌক্তিক ছিল।

সকাল ১০টা ৩০ মিনিট নাগাদ তেহরানের বাসিন্দারা পাস্তুর স্ট্রিটে দুই দফা বিস্ফোরণের খবর দেন, যেখানে বহু সরকারি ভবন একত্রে অবস্থিত। এর মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, জাতীয় নিরাপত্তা দপ্তর এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদের কার্যালয়; এই পরিষদই বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মৃত্যুবরণ বা অবসর নিলে নতুন নেতা নির্বাচন করে।

স্যাটেলাইটের ছবিতে সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ডকে ধূসর ধুলা ও ছাইয়ের স্তূপ হিসেবে দেখা যায়, তবে ইরানি সংবাদ সংস্থাগুলো দাবি করে, খামেনি অজ্ঞাত স্থানে নিরাপদে আছেন এবং পেজেশকিয়ানও অক্ষত রয়েছেন। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো প্রমাণ ছাড়াই ঘোষণা দেন যে খামেনি নিহত হয়েছেন। কয়েক ঘণ্টা পর (ইরানের) রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করে—আয়াতুল্লাহ নিহত হয়েছেন।

শুধু বর্তমান নেতৃত্বই লক্ষ্যবস্তু ছিল না। তেহরানে সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বাসভবনও ধ্বংস করা হয়; তাঁর পরিণতি তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

পাস্তুর এলাকা থেকে আহত ব্যক্তিদের বহন করে অ্যাম্বুলেন্স চলে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়; একই সঙ্গে দেশজুড়ে কুম, তাবরিজ, কেরমানশাহ, লোরেস্তান খোররামাবাদ, কারাজসহ বিভিন্ন শহরে হামলার সংবাদ আসে।

একই সময়ে বেসামরিক হতাহতের প্রথম খবর আসে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাবে একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসরায়েলি হামলায় ১০৮ জন নিহত হয়েছে। ঘটনাস্থলের একটি ছবিতে দেখা যায়, উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় মানুষেরা ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছেন আর এক ব্যক্তি একটি শিশুর ব্যাগ তুলে ধরেছেন।

শহরটিতে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের একটি ঘাঁটি রয়েছে, যা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে; তবে কর্মস্থলে লোকজন আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করে হামলা শুরু করলে স্কুলে আসা শিশু এবং একত্রে থাকা অন্যান্য বেসামরিক মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।

নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা যদি রেজিম চেঞ্জের (সরকার পরিবর্তন) উদ্দেশ্যের যথেষ্ট প্রমাণ না হয়, তবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ফারসি ভাষায় টুইট করে বিদ্রোহের যে আহ্বান জানায়, তাতে সেটা স্পষ্ট। বার্তায় বলা হয়, ‘আমাদের ইরানি ভাই ও বোনেরা, আপনারা একা নন! আমরা আপনাদের জন্য একটি বিশেষ, অতি সুরক্ষিত টেলিগ্রাম চ্যানেল চালু করেছি।’

এতে আরও বলা হয়, ‘আমরা একসঙ্গে ইরানকে তার গৌরবময় দিনে ফিরিয়ে নেব। সরকারের বিরুদ্ধে আপনাদের ন্যায্য সংগ্রামের ছবি ও ভিডিও আমাদের সঙ্গে শেয়ার করুন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিজেদের খেয়াল রাখুন! আমরা আপনাদের পাশে আছি।’

সরকার উৎখাতে ইরানিদের আহ্বান জানানো মোসাদের ভাষা খুব শিগগির ডোনাল্ড ট্রাম্পও পুনরাবৃত্তি করেন। তবে সেটা সরাসরি নয়, বরং শুক্রবার রাতে ওয়াশিংটনে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ধারণ করা একটি রেকর্ডিংয়ে। এটা ওয়াশিংটন সময় রাত ২টা ৩০ মিনিটে (তেহরান সময় আনুমানিক বেলা ১১টা) তাঁর (ট্রাম্প) নিজস্ব ট্রুথ সোশ্যাল চ্যানেলে প্রচারিত হয়।

সাদা ‘ইউএসএ’ বেজবল ক্যাপ পরে একটি পােডিয়ামে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প ‘ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দেন। আট মিনিটের ভাষণটি শুরু হয় এই দাবি দিয়ে যে হামলাটি করা হয়েছে ‘ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি’ থেকে আমেরিকান জনগণকে রক্ষার জন্য, যাদের তিনি বলেন ‘অত্যন্ত নিষ্ঠুর, ভয়ংকর মানুষদের একটি দল’।

ভাষণটি শেষ হয় ইরানি জনগণকে উঠে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে, ‘এখনই সময়, নইলে আর কখনো নয়।’ তিনি (ট্রাম্প) বলেন, ‘আমি আজ রাতে বলছি, আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। আশ্রয়ে থাকুন। ঘর থেকে বের হবেন না। বাইরে খুব বিপজ্জনক। চারদিকে বোমা পড়বে। আমরা শেষ করলে আপনারা সরকার দখল করুন। সেটি আপনাদেরই নেওয়ার জন্য থাকবে। সম্ভবত বহু প্রজন্মের মধ্যে এটাই হবে আপনাদের একমাত্র সুযোগ।’

ট্রাম্প বলতে থাকেন, ‘এখন আপনাদের এমন একজন প্রেসিডেন্ট আছেন, যিনি আপনাদের যা চান, তা দিচ্ছেন। তাই দেখা যাক, আপনারা কীভাবে সাড়া দেন। এখনই সময় আপনাদের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার এবং আপনাদের নাগালের ভেতরে থাকা সমৃদ্ধ ও গৌরবময় ভবিষ্যৎকে মুক্ত করার। এটাই পদক্ষেপ নেওয়ার মুহূর্ত। এটি হাতছাড়া করবেন না।’

অল্প সময়ের মধ্যেই পেন্টাগন জানায়, ইরানের ওপর হামলার সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘এপিক ফিউরি’। ইসরায়েল নতুন এই যুদ্ধের জন্য নিজস্ব নাম ঘোষণা করে ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’। তারা এর জন্য একটি লোগোও তৈরি করে, যেখানে নীল-সাদা ডেভিডের তারকাখচিত পতাকার সামনে মুখ খোলা অবস্থায় একই নামের সিংহ দাঁড়িয়ে আছে।

দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ধারাবাহিকতায়, ট্রাম্পের ভাষণের প্রায় একই সময়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি (নেতানিয়াহু) তাঁর (ট্রাম্প) নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে ‘ইরানের সন্ত্রাসী শাসনের তৈরি অস্তিত্বগত হুমকি দূর করার’ বিষয়টি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন।

সকালের বিভিন্ন ব্রিফিংয়ে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, যৌথ হামলার প্রস্তুতিতে দুই দেশের সেনাবাহিনী মাসের পর মাস ঘনিষ্ঠভাবে একসঙ্গে কাজ করেছে। নানা উপাদান একসঙ্গে মিলিত হওয়ার ফল হিসেবে হামলার সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ হয়েছে বলে মনে হয়।

ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বাধীন একটি ইরানি প্রতিনিধিদলের মধ্যে জেনেভায় বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই মুলতবি হয়।

আরাগচি বলেন, ‘ভালো অগ্রগতি’ হয়েছে এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা ওমানি কর্মকর্তারা জানান, আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা আবার শুরু হবে।

আমেরিকানরা কিছুই বলেনি। এখন স্পষ্ট যে উইটকফ ও কুশনারকে জেনেভায় পাঠানো হয়েছিল এই আশায় যে তাঁরা ইরানকে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করাতে পারবেন; শুধু দেশটির (ইরান) পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনও বন্ধ করার শর্তে। ট্রাম্পের নৌবহর একত্র হয়ে গেলে কোনো ইরানি প্রস্তাবই হয়তো যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট হতো না।

ওয়াশিংটনে ফিরে ট্রাম্প ‘খুব সন্তুষ্ট নই’ বলে ঘোষণা করেন। পরদিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ট্রাম্পকে সামরিক বিকল্পসমূহ নিয়ে চূড়ান্ত ব্রিফিং দেন; আর প্রায় একই সময়ে বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড দুই সপ্তাহের যাত্রা শেষে হাইফায় পৌঁছায় পশ্চিম আটলান্টিক থেকে, যেখানে গত মাসে এটি ওয়াশিংটনের আরেক প্রতিপক্ষ ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোকে উৎখাতে অংশ নিয়েছিল।

ফোর্ড এবং তার সঙ্গে থাকা ডেস্ট্রয়ারগুলোর (যুদ্ধজাহাজ) উপস্থিতিতে ট্রাম্পের ঘোষিত ‘আর্মাডা’ পূর্ণতা পায়—২৩ বছর আগে ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সমর সমাবেশ। এটি বৃহৎ আকাশযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি অনিবার্য ইরানি পাল্টা হামলা থেকে ইসরায়েলকে রক্ষায়ও সহায়ক ছিল।

শুক্রবার ফোর্ড যখন নোঙর করে, তখন ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত তাঁর কর্মীদের একটি মেমো পাঠিয়ে জানান, তাঁরা যদি দেশ ছাড়তে চান, তবে সেদিনই টিকিট কিনে যেকোনো বিদেশি গন্তব্যে চলে যেতে পারেন।

সময় ফুরিয়ে আসছে বুঝতে পেরে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি জরুরি সফরে ওয়াশিংটনে যান। সেখানে তিনি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কূটনীতির জন্য আরও কিছু সময় দেওয়ার আবেদন জানান। শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের মিশন ব্যর্থ এবং বোমা হামলা শুরু হয়েছে—এ খবর পেয়ে আলবুসাইদি হতাশা প্রকাশ করেন।

বদর আলবুসাইদি এক্স বার্তা পাঠান, ‘সক্রিয় ও গুরুতর আলোচনা আবারও ভেস্তে দেওয়া হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কিংবা বৈশ্বিক শান্তির উদ্দেশ্য—কোনোটিই সুরক্ষিত হচ্ছে না। আর যেসব নিরপরাধ ভুক্তভোগী হবেন, তাঁদের জন্য আমি প্রার্থনা করছি। আমি যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করছি, যেন তারা আরও গভীরে জড়িয়ে না পড়ে। এটি আপনাদের যুদ্ধ নয়।’

আলবুসাইদির কথাগুলো খুব দেরিতে এসেছিল। যুক্তরাষ্ট্র তার অস্থির স্বভাবের প্রেসিডেন্টের কারণে ইতিমধ্যেই একটি বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, যা দ্রুত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়।

ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি শনিবার সকালে ঘোষণা দেন, ‘আমরা আপনাদের সতর্ক করেছিলাম, কিন্তু এখন আপনারা এমন এক পথে হাঁটা শুরু করেছেন, যা আপনাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার অঞ্চলজুড়ে সব দিকে নিক্ষেপ করা হয়—ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও কুয়েতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।

বাহরাইনের রাজধানী মানামার ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি থেকে ধূসর ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে থাকে এবং সরকার ওই এলাকা থেকে জনগণকে সরিয়ে নেয়। দুবাইয়ের অভিজাত পাম জুমেইরাহ এলাকায় আঘাত হানার পর পাঁচতারা ফেয়ারমন্ট হোটেলে আগুন ধরে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।

সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, তারা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে, তবে আবুধাবিতে প্রতিহত করা একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যায়।

ওয়াশিংটনে কংগ্রেস সদস্যরা যখন ঘুম থেকে ওঠেন, ততক্ষণে উপসাগর অঞ্চল জ্বলছে—এমন এক যুদ্ধের কারণে, যার বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি; শুধু মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ‘গ্যাং অব এইট’ হিসেবে পরিচিত কংগ্রেস নেতাদের একটি ব্রিফিং দিয়েছিলেন।

সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট জ্যাক রিড বলেন, ‘আমেরিকান জনগণের স্পষ্ট ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের দেশকে ইরানের সঙ্গে এক বড় যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছেন। এর পক্ষে তিনি কখনো যুক্তি তুলে ধরেননি, কংগ্রেসের অনুমোদন চাননি এবং যার কোনো শেষ লক্ষ্যও নির্ধারণ করেননি।’

তেহরানে রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে কোন নেতা নিহত হয়েছেন আর কে বেঁচে আছেন—এ নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে; আর ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যখন অঞ্চলের (মধ্যপ্রাচ্য) ভবিষ্যৎ নিয়ে পাশা খেলেছেন, তখন ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

* জুলিয়ান বর্গার, দ্য গার্ডিয়ান–এর জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা। এর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ এবং বলকান অঞ্চলে সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-02%2Fl7owzgc6%2FWhatsApp-Image-2026-03-02-at-3.20.32-PM.jpeg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর যৌথ পরিকল্পনায় ইরানে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে। কোলাজ: প্রথম আলো