Sunday, January 10, 2016
জেনারেল মইন কি সত্য লিখেছেন?
‘শান্তির স্বপ্নে- সময়ের স্মৃতিচারণ’ শীর্ষক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে মইন উ আহমেদ অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে ওয়ান ইলেভেনের প্রসঙ্গেরও অবতারণা করেছেন। যদিও তার লেখার অনেক তথ্যেরই বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ বইতে এমন অনেক তথ্যই রয়েছে যার সঙ্গে সত্যের সংশ্লিষ্টতা নেই। জেনারেল মইন তার সেনাপ্রধান হওয়ার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন। বারবারই তিনি বলতে চেয়েছেন, সেনাপ্রধান হওয়ার জন্য তিনি কোন লবিং-তদবির করেননি। যদিও কে না জানে, জ্যেষ্ঠতা লঙ্গন করেই তাকে সেনাপ্রধান নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। অন্য এক জ্যেষ্ঠ সেনাকমকর্তাকে সেনাপ্রধান নিয়োগের ব্যাপারে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রায় মনস্থির করেছিলেন। ফাইলও চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ এস্কান্দারের ভূমিকার কারণেই সে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়েছিল। সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আবার সম্পর্কে সাঈদ এস্কান্দারের ভায়রা।
ওয়ান ইলেভেনের পূর্ববর্তী সময়ে সংঘাতের রাজনীতি কিভাবে তাকে মর্মাহত করতো তার বিস্তারিত বয়ান লিখেছেন জেনারেল মইন উ আহমেদ। যার সঙ্গে অবশ্য তেমন কেউই দ্বিমত পোষন করবেন না। তবে সেসময়কার তান্ডবে জড়িতদের কাউকে তিনি বিচারের মুখোমুখি করেছেন এমন বিবরণ পাওয়া যায় না। মইন উ আহমেদ লিখেছেন, একসময় ক্ষমতাধর কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি আমার সাথে দেখা করে জানালো, ‘সবদলের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী সহায়তা করলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংরাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহারের জন্য তারা জাতিসংঘকে অনুরোধ করবে।’ এ কথা সত্য কয়েকজন রাষ্ট্রদূত ওয়ান ইলেভেনের অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে জাতিসংঘের তৎপরতার নামে যা বলা হয়েছিল, তার আর পরে সত্যতা মিলেনি। ওয়ান ইলেভেনের দিনে বঙ্গভবনের সংঘটিত অনেক সত্য জেনারেল মইন এড়িয়ে গেছেন বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু যুদ্ধ মোকাবিলায় উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমা!
উত্তর কোরিয়া গত বুধবার প্রথমবারের মতো সফলভাবে হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার দাবি জানায়।
পিয়ইয়ংয়ের এ পরীক্ষা নিশ্চিত হলে এটা হবে দেশটির চতুর্থ পারমাণবিক ও প্রথম হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ক্ষুব্ধ হয়েছে এবং প্রতিবেশী দ. কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বেড়েছে। আণবিক বোমার চেয়েও আরো শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমা। তবে তাদের হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সন্দেহ থাকলেও এ কর্মকান্ডের নিন্দা জানানো হয়েছে।
কিম বলেন, কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি রক্ষা ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পারমাণবিক যুদ্ধের বিপদ থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিধানে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এই হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
তিনি বলেন, একটি সার্বভৌম দেশের এটা বৈধ অধিকার এবং এ ধরণের বৈধ কর্মকান্ডের কেউ সমালোচনা করতে পারে না। দ. কোরিয়ার সরকারি সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সির (কেসিএনএ) খবরে এ কথা বলা হয়েছে।
কেসিএনএ জানায়, সফল পরীক্ষার জন্য পিপলস আর্মড ফোর্সেস মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের অভিনন্দন জানাতে ওই মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের পর কিম এ মন্তব্য করেন। তবে কিম কবে মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন তার বিস্তারিত জানানো হয়নি।
উ. কোরীয় নেতা কিম জং-উন ব্যক্তিগতভাবে হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে ইতোমধ্যে খবর বেরিয়েছে। কিমের জন্মদিনের দুই দিন আগে গত বুধবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম থেকে এ বোমার পরীক্ষা চালানোর ঘোষণা দেয়া হয়। উত্তর কোরিয়া আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই ‘গুরুত্বপূর্ণ ও অধিকতর শক্তিশালী অস্ত্র’ আসছে।
উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালানোর দিনই নিউইয়র্কে এক জরুরি বৈঠকে বসে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য দেশ। বৈঠকে পিয়ংইয়ংয়ের পরীক্ষা চালানোর কড়া নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ‘আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা’ সংবলিত একটি নতুন জাতিসংঘ খসড়া প্রস্তাবের কাজ শুরু করা হবে বলে জানান পরিষদের প্রতিনিধিরা।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
বন্দিত্ব থেকে বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত by তোফায়েল আহমেদ
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে যাওয়ার সময় লাহোরের রাস্তার দুই পাশে লাখ লাখ লোক দাঁড়িয়েছিল। তারা বঙ্গবন্ধুকে লক্ষ করে স্লোগান তুলেছিল, ‘জীয়ে মুজিব, জীয়ে মুজিব’ অর্থাৎ মুজিব জিন্দাবাদ, মুজিব জিন্দাবাদ। বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। বঙ্গবন্ধু যখন অতিথিশালায় পৌঁছলেন, তখন সেখানে স্যুট-টাই পরা ছোটখাটো একজন ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে আলিঙ্গন করেন। বঙ্গবন্ধুও পরমাদরে তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলেন, ‘হাবীব আলী, ইউ আর হেয়ার।’ জানতে পারলাম লোকটির নাম হাবীব আলী। বঙ্গবন্ধু যখন মিয়ানওয়ালী কারাগারে বন্দি তখন তিনি ছিলেন সেই কারাগারের প্রিজন গভর্নর। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপের পর তিনি আমাদের কক্ষে আসেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু মিয়ানওয়ালী কারাগারে কীভাবে জীবনযাপন করেছেন, কীভাবে তিনি মুক্তিলাভ করেছেন- সবিস্তারে তার বর্ণনা দেন। গভীর শ্রদ্ধায় স্মৃতি তর্পণ করে একটানা বলে যান মিয়ানওয়ালী কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে বঙ্গবন্ধুর নয় মাস চৌদ্দ দিনের কঠিন কারাজীবনের কথা। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আগের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি আমাদের বলেছিলেন- “বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরের ১০ দিন পর ২৬ ডিসেম্বর রাতে মুজিবকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশের পরপরই একটা ট্রাক নিয়ে মিয়ানওয়ালী কারাগারের দিকে যাই। কারা ফটক খুলে তার সেলের কাছে গিয়ে দেখি তিনি একটা কম্বল জড়িয়ে বিছানার ওপর ঢুলছেন। এমন সময় সেখানে যারা কয়েদি ছিল তারা শেখ মুজিবকে ফিসফিস করে বলছিল যে, ‘ওরা এসেছে।’ মুজিবও ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি মাথানত করব না।’ তার আগে মিয়ানওয়ালী কারাগারেই সেলের সামনে একটা কবর খনন করা হয়েছিল। শেখ মুজিব যখন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এটা কী?’ তখন তাকে বলা হয়েছিল যে, ‘যুদ্ধ চলছে, এটা বাংকার। শেল্টার নেয়ার জন্য।’ আসলে ছিল কবর। মুজিবকে একজন কয়েদি বলছিল, ‘আসলে এটা কবর। আপনি যদি আজ বের হন আপনাকে মেরে এখানে কবর দেয়া হবে।’ তখন মুজিব আমাকে বলেছিল, ‘কবরকে আমি ভয় পাই না। আমি তো জানি ওরা আমাকে ফাঁসি দেবে। কিন্তু আমি জানি আমার বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে এবং আমি এও জানি, যে বাংলার দামাল ছেলেরা হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে, সেই বাঙালি জাতিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ সেদিন তিনি মিনতি করে বলেছিলেন, ‘আমাকে হত্যা করে এই কবরে না, এই লাশটি আমার বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও। যে বাংলার আলো-বাতাসে আমি বর্ধিত হয়েছি- সেই বাংলার মাটিতে আমি চিরনিদ্রায় শায়িত থাকতে চাই।’
যা হোক, ওইদিন ২৬ তারিখে আমি ট্রাকে করে মুজিবকে নেয়ার জন্য মিয়ানওয়ালী কারাগারে আসি। কারণ এরই মধ্যে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। ক্ষমতা হস্তান্তরকালে ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর কাছে প্রার্থনা করেছিল, ‘আমার ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে শেখ মুজিবকে হত্যা করার অনুমতি দাও। আমি আমার জীবনে যদি কোনো ভুল করে থাকি তা হল শেখ মুজিবকে ফাঁসি কাষ্ঠে না ঝোলানো।’ তখন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো আমার কাছে এই মর্মে জরুরি বার্তা প্রেরণ করেন যে, ‘শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে দ্রুত নিরাপদ কোনো স্থানে সরিয়ে ফেলা হোক।’ তখন আমি মুজিবকে মিয়ানওয়ালী কারাগার থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে ট্রাক নিয়ে কারা ফটকে আসি এবং সেলের মধ্যে গিয়ে শেখ মুজিবকে আমার সঙ্গে যেতে অনুরোধ করি। কিন্তু তিনি আমাকে বাধা দেন। তখন আমি তাকে বলি, ‘শেখ, আমি আপনার একজন শুভাকাক্সক্ষী, বন্ধু। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমি আপনাকে এখান থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে এসেছি। কারণ এখানে কমান্ডো আসতে পারে। তারা আপনাকে হত্যা করবে। আমার ওপর আপনি আস্থা রাখুন।’
তারপর মুজিবকে ট্রাকে তুলে, ট্রাকের মধ্যে লুকিয়ে, আমার চশমা ব্যারাজ নামক বাড়িতে নিয়ে যাই। সেখানে গিয়েই তিনি একটা টেলিফোন করতে চান। মুজিব আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি কি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারি?’ তখন আমি তাকে বলেছিলাম, ‘না, আমার একমাত্র কাজ হল আপনার জীবন রক্ষা করা। আপনি টেলিফোন করতে পারবেন না।’ তখন তিনি বললেন, ‘আমি কি খবরের কাগজ পড়তে পারি?’ আমার উত্তর ছিল, ‘না।’ এরপর বললেন, ‘আমি কি এক কাপ চা পেতে পারি?’ তখন তাকে এক কাপ চা দেয়া হয়। আমার বাড়িতে তিনি দুই দিন থাকেন। দিনদুই পর শেখ মুজিবকে নিয়ে যাই শাহুল্যা নামক স্থানে, যেটা একসময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর রেস্ট হাউস ছিল। পিণ্ডি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে এ শাহুল্যাতে প্রেসিডেন্ট ভুট্টো মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। ভুট্টো যখন আসেন তখন একজন কর্নেল এসে মুজিবকে বলেছিল, ‘পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসবে।’ তারপর সেখানে ভুট্টো এলেন এবং মুজিবকে সালাম দিয়ে বললেন, ‘নাউ আই অ্যাম দ্য প্রেসিডেন্ট অব পাকিস্তান অ্যান্ড চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর।’ তারপরই শেখ মুজিবের প্রশ্ন ছিল, ‘ভুট্টো, টেল মি ফার্স্ট, হোয়েদার আই অ্যাম এ ফ্রিম্যান অর প্রিজনার।’ তখন ভুট্টো উত্তর দিয়েছিলেন, ‘নাইদার ইউ আর এ প্রিজনার, নর ইউ আর এ ফ্রিম্যান।’ তখন শেখ মুজিব বললেন, ‘ইন দ্যাট কেইস আই উইল নট টক টু ইউ।’ তখন জুলফিকার আলী ভুট্টো বলতে বাধ্য হলেন, ‘ইউ আর এ ফ্রিম্যান।’ এরপর শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। তারপর তিনি অনেক রকমের প্রস্তাব দিলেন। কীভাবে একটা কনফেডারেশন করা যায়, কীভাবে একসঙ্গে থাকা যায় ইত্যাদি। কিন্তু শেখ মুজিব কোনো কথাই বললেন না। চুপ করে থেকে শুধু বললেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আমার প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে না পারব, ততক্ষণ আমার পক্ষে কিছুই বলা সম্ভবপর নয়।’ এরপর শেখ মুজিবকে একটা যৌথ ইশতেহার দেয়া হয়েছিল স্বাক্ষর করার জন্য। মুজিব সেটাও প্রত্যাখ্যান করলেন। পরিশেষে শেখ মুজিব বললেন, ‘আমি কি এখন দেশে যেতে পারি?’ ভুট্টো বললেন, ‘হ্যাঁ, যেতে পারেন। কিন্তু কীভাবে যাবেন? পাকিস্তানের পিআইএ ভারতের ওপর দিয়ে যায় না।’ তখন মুজিব বললেন, ‘সেক্ষেত্রে আমি লন্ডন হয়ে যাব।’ এরপর ৮ জানুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি পেয়ে পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমানে লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করেন।’’
কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি লাভ এবং ভুট্টোর সঙ্গে কথোপকথনের স্মৃতিচারণ শেষে হাবীব আলী আমাদের বলেছিলেন, ‘তোমরা বাঙালিরা গর্বিত ও মহাসৌভাগ্যবান যে, শেখ মুজিবের মতো একজন নেতা তোমরা পেয়েছ।’ সেদিন হাবীব আলীর স্মৃতিকথা ও মন্তব্য শুনে বিস্মিত হইনি; কিন্তু গর্বে বুক ভরে উঠেছিল। আমরা তো জানতাম আমাদের নেতার ইস্পাত-কঠিন দৃঢ় সংকল্পের কথা।
প্রতি বছর যখন আমাদের জীবনে ১০ জানুয়ারি ফিরে আসে, তখন জাতির জনককে ঘিরে কত কথা হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে। কারণ ১০ জানুয়ারি বাঙালি জাতির জীবনে চিরস্মরণীয় এক অনন্য ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭২-এর এই দিনটিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষ বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করেছিল। যদিও ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয়েছিল; কিন্তু বাংলার মানুষ স্বাধীন দেশে বিজয়ের পরিপূর্ণ স্বাদ পায়নি। পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠের নারকীয় বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্বের নিপীড়িত-মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম মুখপাত্র বঙ্গবন্ধু মুজিব জানুয়ারির ৮ তারিখে পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমানে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছান। বঙ্গবন্ধুর লন্ডন আগমনের সংবাদ শোনামাত্র জামুরকাই নামক অবকাশ যাপন কেন্দ্রে ছুটিতে থাকা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড হিথ ছুটে আসেন ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে অবস্থিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এবং ব্রিটিশ রীতি-ঐতিহ্য অনুযায়ী সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্বাগত জানান।
পরদিন ৯ জানুয়ারি লন্ডনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু একটি বিবৃতি প্রদান করেন। ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলার মুক্তি সংগ্রামে স্বাধীনতার অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এ মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছে, তখন আমি রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছি। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন ও সহযোগিতা দানের জন্য ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে আমি ধন্যবাদ জানাই। স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এখন একটি বাস্তব সত্য। এদেশকে বিশ্বের স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশ অবিলম্বে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য অনুরোধ জানাবে।’ পরিশেষে তিনি বলেন, ‘আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই। আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই।’ তিনি জনগণের কাছে ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘ সময়ের বন্দি জীবনের নিঃসঙ্গতা তাকে কাবু করতে পারেনি। জনগণের আরাধ্য প্রিয় নেতা তার মানস জগতে জনতার সাহচর্য লালন করেছেন প্রতিনিয়তই।
যেদিন, ৮ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির সংবাদ জানলাম, সেদিন এক অনির্বচনীয় আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল সারা দেশে। মানুষের যে কী আনন্দ তা ভাষায় ব্যক্ত করার নয়। সমগ্র দেশবাসী অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে কখন প্রিয় নেতা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করবেন। অবশেষে পরমাকাক্সিক্ষত সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি এলো। সেদিন ছিল সোমবার। সকাল থেকেই লাখ লাখ মানুষ ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে দশদিক মুখরিত করে মিছিল নিয়ে বিমানবন্দর অভিমুখে যাচ্ছে। কোটি কোটি হৃদয় রুদ্ধবাক মুহূর্ত গুনছে, প্রতি নিঃশ্বাসে অধীর আগ্রহে কালক্ষেপণ করছে- কখন, কখন আসবেন প্রিয় নেতা? কী দিয়ে তারা বরণ করে নেবে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে, বাঙালির হৃদয়ের শ্রেষ্ঠ গর্বকে। রণক্লান্ত যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধা, শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সংগ্রামী জনতা, অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে সন্তানহারা জননী, স্বামীহারা পত্নী, পিতৃহারা পুত্র-কন্যা সব দুঃখকে জয় করে স্বজন হারানোর বিয়োগ ব্যথা ভুলে গর্বোদ্ধত মস্তকে সবাই অধীর আগ্রহে আজ অপেক্ষমাণ দু’হাত বাড়িয়ে জাতির জনককে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করার জন্য।
ঢাকায় যখন সাজসাজ রব, তখন সকাল থেকে দিল্লির রাজপথ ধরে হাজার হাজার মানুষের মিছিল পালাম বিমানবন্দর ও প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। দিল্লির জনসাধারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে এক অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান রাষ্ট্রপতি শ্রী ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ও সরকারের পদস্থ কর্মকর্তারা। ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট জেটটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অবতরণ করলে তার সম্মানে ২১ বার তোপধ্বনি করা হয়। ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ তাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন।
দিল্লি থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট বিমানটি ঢাকার আকাশ সীমায় দেখা দিতেই জনসমুদ্র উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। দুপুর ১-৫১ মিনিটে বিমানটি অবতরণ করে। বিমানে সিঁড়ি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্য নেতারা, আমরা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ছুটে যাই নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে। আমার হাতে ছিল পুষ্পমাল্য। জাতির জনককে মাল্যভূষিত করার সঙ্গে সঙ্গেই তার সংযমের সব বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিমানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু জনতার মহাসমুদ্রের উদ্দেশে হাত নাড়েন। তার চোখে তখন স্বজন হারানোর বেদনা-ভারাক্রান্ত অশ্রুর নদী, আর জ্যোতির্ময় দ্যুতি ছড়ানো মুখাবয়বজুড়ে বিজয়ী বীরের পরিতৃপ্তির হাসি। বিমানের সিঁড়ি বেয়ে জাতির জনক তার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনি করে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি সম্মান জানানো হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশ সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানকে গার্ড অব অনার প্রদর্শন করে। মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু সালাম গ্রহণ করেন।
রেসকোর্স ময়দানে যাওয়ার জন্য জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপেক্ষমাণ ট্রাকে উঠে রওনা দিই। সুদৃশ্য তোরণ, স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি দিয়ে সজ্জিত রাজপথের দুই পাশে দাঁড়ানো জনসমুদ্র পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যখন ময়দানে পৌঁছলাম তখন বিকাল সাড়ে ৪টা। অর্থাৎ বিমানবন্দর থেকে ময়দান পর্যন্ত আসতে সময় লেগেছে ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিট। নেতাকে নিয়ে যখন ময়দানে প্রবেশ করি, কোনো দিকে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আবালবৃদ্ধবনিতার মুহুর্মুহু করতালিতে চারদিক মুখরিত। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠে ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে চতুর্দিকে তাকালেন এবং রুমালে চোখ মুছে চিরাচরিত ভঙ্গিতে ‘ভায়েরা আমার’ বলে উপস্থিত জনসমুদ্রের উদ্দেশে নিবেদন করলেন তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা। হৃদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য ঢেলে আবেগঘন ভাষায় বললেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘ভায়েরা, তোমাদের একদিন বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। আজকে আমি বলি, আজকে আমাদের উন্নয়নের জন্য আমাদের ঘরে ঘরে কাজ করে যেতে হবে। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই, বাংলাদেশ একটি আদর্শ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। আমার বাংলায় আজ বিরাট ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। ৩০ লাখ লোক মারা গেছে। আপনারাই জীবন দিয়েছেন, কষ্ট করেছেন। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, খেয়ে-পরে সুখে থাকবে, এটাই ছিল আমার সাধনা।’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে বলেন, ‘গত পঁচিশে মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাসে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এদেশের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে। বিশ্বকে মানব ইতিহাসের জঘন্যতম কুকীর্তির তদন্ত অবশ্যই করতে হবে। একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এসব কুকীর্তির বিচার করতে হবে।’ বিশ্বের সব রাষ্ট্র ও জাতিসংঘের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘আমি বিশ্বের সব মুক্ত দেশকে অনুরোধ জানাই, আপনারা অবিলম্বে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন। জাতিসংঘেরও উচিত অবিলম্বে বাংলাদেশকে আসন দিয়ে তার ন্যায়সঙ্গত দাবি পূরণ করা।’ পরিশেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা থেকে উদ্ধৃত করে তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।’ কবিগুরু, তুমি এসে দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।’
কী অসাধারণ রাষ্ট্রনায়কোচিত বক্তৃতা! রাষ্ট্রের আশু করণীয় কী হবে, তা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত, ইঙ্গিতবহ অথচ তাৎপর্যপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বক্তৃতা দিলেন বঙ্গবন্ধু। লাখ লাখ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে এবং পরম পরিতৃপ্ত হয়েছে এই ভেবে যে, আজ থেকে আমরা প্রকৃতই স্বাধীন। সভামঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু ধানমণ্ডির ১৮নং বাড়িতে গেলেন। যেখানে পরিবারের সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। সেই বাড়ির সামনে আরেকটি বাড়ি তখন তার জন্য রাখা হয়েছিল। কেননা ধানমণ্ডির ৩২নং বাসভবনটি শত্র“বাহিনী এমনভাবে তছনছ করে দিয়েছিল যে তা বসবাসের অনুপযোগী ছিল। ১১ জানুয়ারি প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ১২ জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন এবং আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করলেন। ১৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আমাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তার রাজনৈতিক সচিব করেন। দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় সংসদীয় গণতন্ত্র।
আজ জাতির জনকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অবিস্মরণীয় এই ঐতিহাসিক দিনটিতে কেবলই মনে পড়ে সাতই মার্চের ভাষণের শেষাংশ- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ রাজনৈতিক মুক্তি আমাদের অর্জিত হয়েছে। আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, সংবিধান, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা এবং বহু ত্যাগের বিনিময়ে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র পেয়েছি। কিন্তু জাতির জনকের স্বপ্নের শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে আর তার ভালোবাসার হতদরিদ্র দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তি আজও অর্জন করতে না পারলেও আমরা সেই লক্ষ্য পরিপূরণে এগিয়ে চলেছি। আন্তর্জাতিক জরিপকারী বিভিন্ন সংস্থার মতে, আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির অধিকাংশ সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি এক কথায় বিস্ময়কর। যদিও আমরা এখনও স্বল্পোন্নত, তথাপি আমরা জনসাধারণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমাদের আশাবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘রূপকল্প’ অনুযায়ী ২০২১ সালে আমরা মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরিত হব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত সরকার অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে সক্ষম হবে।
তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য; বাণিজ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
বন্দিত্ব থেকে বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত by তোফায়েল আহমেদ
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে যাওয়ার সময় লাহোরের রাস্তার দুই পাশে লাখ লাখ লোক দাঁড়িয়েছিল। তারা বঙ্গবন্ধুকে লক্ষ করে স্লোগান তুলেছিল, ‘জীয়ে মুজিব, জীয়ে মুজিব’ অর্থাৎ মুজিব জিন্দাবাদ, মুজিব জিন্দাবাদ। বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। বঙ্গবন্ধু যখন অতিথিশালায় পৌঁছলেন, তখন সেখানে স্যুট-টাই পরা ছোটখাটো একজন ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে আলিঙ্গন করেন। বঙ্গবন্ধুও পরমাদরে তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলেন, ‘হাবীব আলী, ইউ আর হেয়ার।’ জানতে পারলাম লোকটির নাম হাবীব আলী। বঙ্গবন্ধু যখন মিয়ানওয়ালী কারাগারে বন্দি তখন তিনি ছিলেন সেই কারাগারের প্রিজন গভর্নর। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপের পর তিনি আমাদের কক্ষে আসেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু মিয়ানওয়ালী কারাগারে কীভাবে জীবনযাপন করেছেন, কীভাবে তিনি মুক্তিলাভ করেছেন- সবিস্তারে তার বর্ণনা দেন। গভীর শ্রদ্ধায় স্মৃতি তর্পণ করে একটানা বলে যান মিয়ানওয়ালী কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে বঙ্গবন্ধুর নয় মাস চৌদ্দ দিনের কঠিন কারাজীবনের কথা। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আগের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি আমাদের বলেছিলেন- “বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরের ১০ দিন পর ২৬ ডিসেম্বর রাতে মুজিবকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশের পরপরই একটা ট্রাক নিয়ে মিয়ানওয়ালী কারাগারের দিকে যাই। কারা ফটক খুলে তার সেলের কাছে গিয়ে দেখি তিনি একটা কম্বল জড়িয়ে বিছানার ওপর ঢুলছেন। এমন সময় সেখানে যারা কয়েদি ছিল তারা শেখ মুজিবকে ফিসফিস করে বলছিল যে, ‘ওরা এসেছে।’ মুজিবও ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি মাথানত করব না।’ তার আগে মিয়ানওয়ালী কারাগারেই সেলের সামনে একটা কবর খনন করা হয়েছিল। শেখ মুজিব যখন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এটা কী?’ তখন তাকে বলা হয়েছিল যে, ‘যুদ্ধ চলছে, এটা বাংকার। শেল্টার নেয়ার জন্য।’ আসলে ছিল কবর। মুজিবকে একজন কয়েদি বলছিল, ‘আসলে এটা কবর। আপনি যদি আজ বের হন আপনাকে মেরে এখানে কবর দেয়া হবে।’ তখন মুজিব আমাকে বলেছিল, ‘কবরকে আমি ভয় পাই না। আমি তো জানি ওরা আমাকে ফাঁসি দেবে। কিন্তু আমি জানি আমার বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে এবং আমি এও জানি, যে বাংলার দামাল ছেলেরা হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে, সেই বাঙালি জাতিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ সেদিন তিনি মিনতি করে বলেছিলেন, ‘আমাকে হত্যা করে এই কবরে না, এই লাশটি আমার বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও। যে বাংলার আলো-বাতাসে আমি বর্ধিত হয়েছি- সেই বাংলার মাটিতে আমি চিরনিদ্রায় শায়িত থাকতে চাই।’
যা হোক, ওইদিন ২৬ তারিখে আমি ট্রাকে করে মুজিবকে নেয়ার জন্য মিয়ানওয়ালী কারাগারে আসি। কারণ এরই মধ্যে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। ক্ষমতা হস্তান্তরকালে ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর কাছে প্রার্থনা করেছিল, ‘আমার ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে শেখ মুজিবকে হত্যা করার অনুমতি দাও। আমি আমার জীবনে যদি কোনো ভুল করে থাকি তা হল শেখ মুজিবকে ফাঁসি কাষ্ঠে না ঝোলানো।’ তখন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো আমার কাছে এই মর্মে জরুরি বার্তা প্রেরণ করেন যে, ‘শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে দ্রুত নিরাপদ কোনো স্থানে সরিয়ে ফেলা হোক।’ তখন আমি মুজিবকে মিয়ানওয়ালী কারাগার থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে ট্রাক নিয়ে কারা ফটকে আসি এবং সেলের মধ্যে গিয়ে শেখ মুজিবকে আমার সঙ্গে যেতে অনুরোধ করি। কিন্তু তিনি আমাকে বাধা দেন। তখন আমি তাকে বলি, ‘শেখ, আমি আপনার একজন শুভাকাক্সক্ষী, বন্ধু। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমি আপনাকে এখান থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে এসেছি। কারণ এখানে কমান্ডো আসতে পারে। তারা আপনাকে হত্যা করবে। আমার ওপর আপনি আস্থা রাখুন।’
তারপর মুজিবকে ট্রাকে তুলে, ট্রাকের মধ্যে লুকিয়ে, আমার চশমা ব্যারাজ নামক বাড়িতে নিয়ে যাই। সেখানে গিয়েই তিনি একটা টেলিফোন করতে চান। মুজিব আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি কি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারি?’ তখন আমি তাকে বলেছিলাম, ‘না, আমার একমাত্র কাজ হল আপনার জীবন রক্ষা করা। আপনি টেলিফোন করতে পারবেন না।’ তখন তিনি বললেন, ‘আমি কি খবরের কাগজ পড়তে পারি?’ আমার উত্তর ছিল, ‘না।’ এরপর বললেন, ‘আমি কি এক কাপ চা পেতে পারি?’ তখন তাকে এক কাপ চা দেয়া হয়। আমার বাড়িতে তিনি দুই দিন থাকেন। দিনদুই পর শেখ মুজিবকে নিয়ে যাই শাহুল্যা নামক স্থানে, যেটা একসময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর রেস্ট হাউস ছিল। পিণ্ডি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে এ শাহুল্যাতে প্রেসিডেন্ট ভুট্টো মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। ভুট্টো যখন আসেন তখন একজন কর্নেল এসে মুজিবকে বলেছিল, ‘পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসবে।’ তারপর সেখানে ভুট্টো এলেন এবং মুজিবকে সালাম দিয়ে বললেন, ‘নাউ আই অ্যাম দ্য প্রেসিডেন্ট অব পাকিস্তান অ্যান্ড চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর।’ তারপরই শেখ মুজিবের প্রশ্ন ছিল, ‘ভুট্টো, টেল মি ফার্স্ট, হোয়েদার আই অ্যাম এ ফ্রিম্যান অর প্রিজনার।’ তখন ভুট্টো উত্তর দিয়েছিলেন, ‘নাইদার ইউ আর এ প্রিজনার, নর ইউ আর এ ফ্রিম্যান।’ তখন শেখ মুজিব বললেন, ‘ইন দ্যাট কেইস আই উইল নট টক টু ইউ।’ তখন জুলফিকার আলী ভুট্টো বলতে বাধ্য হলেন, ‘ইউ আর এ ফ্রিম্যান।’ এরপর শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। তারপর তিনি অনেক রকমের প্রস্তাব দিলেন। কীভাবে একটা কনফেডারেশন করা যায়, কীভাবে একসঙ্গে থাকা যায় ইত্যাদি। কিন্তু শেখ মুজিব কোনো কথাই বললেন না। চুপ করে থেকে শুধু বললেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আমার প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে না পারব, ততক্ষণ আমার পক্ষে কিছুই বলা সম্ভবপর নয়।’ এরপর শেখ মুজিবকে একটা যৌথ ইশতেহার দেয়া হয়েছিল স্বাক্ষর করার জন্য। মুজিব সেটাও প্রত্যাখ্যান করলেন। পরিশেষে শেখ মুজিব বললেন, ‘আমি কি এখন দেশে যেতে পারি?’ ভুট্টো বললেন, ‘হ্যাঁ, যেতে পারেন। কিন্তু কীভাবে যাবেন? পাকিস্তানের পিআইএ ভারতের ওপর দিয়ে যায় না।’ তখন মুজিব বললেন, ‘সেক্ষেত্রে আমি লন্ডন হয়ে যাব।’ এরপর ৮ জানুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি পেয়ে পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমানে লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করেন।’’
কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি লাভ এবং ভুট্টোর সঙ্গে কথোপকথনের স্মৃতিচারণ শেষে হাবীব আলী আমাদের বলেছিলেন, ‘তোমরা বাঙালিরা গর্বিত ও মহাসৌভাগ্যবান যে, শেখ মুজিবের মতো একজন নেতা তোমরা পেয়েছ।’ সেদিন হাবীব আলীর স্মৃতিকথা ও মন্তব্য শুনে বিস্মিত হইনি; কিন্তু গর্বে বুক ভরে উঠেছিল। আমরা তো জানতাম আমাদের নেতার ইস্পাত-কঠিন দৃঢ় সংকল্পের কথা।
প্রতি বছর যখন আমাদের জীবনে ১০ জানুয়ারি ফিরে আসে, তখন জাতির জনককে ঘিরে কত কথা হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে। কারণ ১০ জানুয়ারি বাঙালি জাতির জীবনে চিরস্মরণীয় এক অনন্য ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭২-এর এই দিনটিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষ বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করেছিল। যদিও ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয়েছিল; কিন্তু বাংলার মানুষ স্বাধীন দেশে বিজয়ের পরিপূর্ণ স্বাদ পায়নি। পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠের নারকীয় বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্বের নিপীড়িত-মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম মুখপাত্র বঙ্গবন্ধু মুজিব জানুয়ারির ৮ তারিখে পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমানে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছান। বঙ্গবন্ধুর লন্ডন আগমনের সংবাদ শোনামাত্র জামুরকাই নামক অবকাশ যাপন কেন্দ্রে ছুটিতে থাকা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড হিথ ছুটে আসেন ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে অবস্থিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এবং ব্রিটিশ রীতি-ঐতিহ্য অনুযায়ী সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্বাগত জানান।
পরদিন ৯ জানুয়ারি লন্ডনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু একটি বিবৃতি প্রদান করেন। ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলার মুক্তি সংগ্রামে স্বাধীনতার অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এ মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছে, তখন আমি রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছি। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন ও সহযোগিতা দানের জন্য ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে আমি ধন্যবাদ জানাই। স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এখন একটি বাস্তব সত্য। এদেশকে বিশ্বের স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশ অবিলম্বে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য অনুরোধ জানাবে।’ পরিশেষে তিনি বলেন, ‘আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই। আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই।’ তিনি জনগণের কাছে ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘ সময়ের বন্দি জীবনের নিঃসঙ্গতা তাকে কাবু করতে পারেনি। জনগণের আরাধ্য প্রিয় নেতা তার মানস জগতে জনতার সাহচর্য লালন করেছেন প্রতিনিয়তই।
যেদিন, ৮ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির সংবাদ জানলাম, সেদিন এক অনির্বচনীয় আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল সারা দেশে। মানুষের যে কী আনন্দ তা ভাষায় ব্যক্ত করার নয়। সমগ্র দেশবাসী অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে কখন প্রিয় নেতা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করবেন। অবশেষে পরমাকাক্সিক্ষত সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি এলো। সেদিন ছিল সোমবার। সকাল থেকেই লাখ লাখ মানুষ ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে দশদিক মুখরিত করে মিছিল নিয়ে বিমানবন্দর অভিমুখে যাচ্ছে। কোটি কোটি হৃদয় রুদ্ধবাক মুহূর্ত গুনছে, প্রতি নিঃশ্বাসে অধীর আগ্রহে কালক্ষেপণ করছে- কখন, কখন আসবেন প্রিয় নেতা? কী দিয়ে তারা বরণ করে নেবে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে, বাঙালির হৃদয়ের শ্রেষ্ঠ গর্বকে। রণক্লান্ত যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধা, শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সংগ্রামী জনতা, অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে সন্তানহারা জননী, স্বামীহারা পত্নী, পিতৃহারা পুত্র-কন্যা সব দুঃখকে জয় করে স্বজন হারানোর বিয়োগ ব্যথা ভুলে গর্বোদ্ধত মস্তকে সবাই অধীর আগ্রহে আজ অপেক্ষমাণ দু’হাত বাড়িয়ে জাতির জনককে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করার জন্য।
ঢাকায় যখন সাজসাজ রব, তখন সকাল থেকে দিল্লির রাজপথ ধরে হাজার হাজার মানুষের মিছিল পালাম বিমানবন্দর ও প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। দিল্লির জনসাধারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে এক অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান রাষ্ট্রপতি শ্রী ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ও সরকারের পদস্থ কর্মকর্তারা। ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট জেটটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অবতরণ করলে তার সম্মানে ২১ বার তোপধ্বনি করা হয়। ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ তাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন।
দিল্লি থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট বিমানটি ঢাকার আকাশ সীমায় দেখা দিতেই জনসমুদ্র উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। দুপুর ১-৫১ মিনিটে বিমানটি অবতরণ করে। বিমানে সিঁড়ি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্য নেতারা, আমরা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ছুটে যাই নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে। আমার হাতে ছিল পুষ্পমাল্য। জাতির জনককে মাল্যভূষিত করার সঙ্গে সঙ্গেই তার সংযমের সব বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিমানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু জনতার মহাসমুদ্রের উদ্দেশে হাত নাড়েন। তার চোখে তখন স্বজন হারানোর বেদনা-ভারাক্রান্ত অশ্রুর নদী, আর জ্যোতির্ময় দ্যুতি ছড়ানো মুখাবয়বজুড়ে বিজয়ী বীরের পরিতৃপ্তির হাসি। বিমানের সিঁড়ি বেয়ে জাতির জনক তার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনি করে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি সম্মান জানানো হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশ সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানকে গার্ড অব অনার প্রদর্শন করে। মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু সালাম গ্রহণ করেন।
রেসকোর্স ময়দানে যাওয়ার জন্য জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপেক্ষমাণ ট্রাকে উঠে রওনা দিই। সুদৃশ্য তোরণ, স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি দিয়ে সজ্জিত রাজপথের দুই পাশে দাঁড়ানো জনসমুদ্র পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যখন ময়দানে পৌঁছলাম তখন বিকাল সাড়ে ৪টা। অর্থাৎ বিমানবন্দর থেকে ময়দান পর্যন্ত আসতে সময় লেগেছে ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিট। নেতাকে নিয়ে যখন ময়দানে প্রবেশ করি, কোনো দিকে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আবালবৃদ্ধবনিতার মুহুর্মুহু করতালিতে চারদিক মুখরিত। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠে ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে চতুর্দিকে তাকালেন এবং রুমালে চোখ মুছে চিরাচরিত ভঙ্গিতে ‘ভায়েরা আমার’ বলে উপস্থিত জনসমুদ্রের উদ্দেশে নিবেদন করলেন তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা। হৃদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য ঢেলে আবেগঘন ভাষায় বললেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘ভায়েরা, তোমাদের একদিন বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। আজকে আমি বলি, আজকে আমাদের উন্নয়নের জন্য আমাদের ঘরে ঘরে কাজ করে যেতে হবে। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই, বাংলাদেশ একটি আদর্শ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। আমার বাংলায় আজ বিরাট ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। ৩০ লাখ লোক মারা গেছে। আপনারাই জীবন দিয়েছেন, কষ্ট করেছেন। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, খেয়ে-পরে সুখে থাকবে, এটাই ছিল আমার সাধনা।’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে বলেন, ‘গত পঁচিশে মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাসে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এদেশের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে। বিশ্বকে মানব ইতিহাসের জঘন্যতম কুকীর্তির তদন্ত অবশ্যই করতে হবে। একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এসব কুকীর্তির বিচার করতে হবে।’ বিশ্বের সব রাষ্ট্র ও জাতিসংঘের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘আমি বিশ্বের সব মুক্ত দেশকে অনুরোধ জানাই, আপনারা অবিলম্বে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন। জাতিসংঘেরও উচিত অবিলম্বে বাংলাদেশকে আসন দিয়ে তার ন্যায়সঙ্গত দাবি পূরণ করা।’ পরিশেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা থেকে উদ্ধৃত করে তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।’ কবিগুরু, তুমি এসে দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।’
কী অসাধারণ রাষ্ট্রনায়কোচিত বক্তৃতা! রাষ্ট্রের আশু করণীয় কী হবে, তা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত, ইঙ্গিতবহ অথচ তাৎপর্যপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বক্তৃতা দিলেন বঙ্গবন্ধু। লাখ লাখ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে এবং পরম পরিতৃপ্ত হয়েছে এই ভেবে যে, আজ থেকে আমরা প্রকৃতই স্বাধীন। সভামঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু ধানমণ্ডির ১৮নং বাড়িতে গেলেন। যেখানে পরিবারের সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। সেই বাড়ির সামনে আরেকটি বাড়ি তখন তার জন্য রাখা হয়েছিল। কেননা ধানমণ্ডির ৩২নং বাসভবনটি শত্র“বাহিনী এমনভাবে তছনছ করে দিয়েছিল যে তা বসবাসের অনুপযোগী ছিল। ১১ জানুয়ারি প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ১২ জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন এবং আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করলেন। ১৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আমাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তার রাজনৈতিক সচিব করেন। দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় সংসদীয় গণতন্ত্র।
আজ জাতির জনকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অবিস্মরণীয় এই ঐতিহাসিক দিনটিতে কেবলই মনে পড়ে সাতই মার্চের ভাষণের শেষাংশ- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ রাজনৈতিক মুক্তি আমাদের অর্জিত হয়েছে। আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, সংবিধান, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা এবং বহু ত্যাগের বিনিময়ে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র পেয়েছি। কিন্তু জাতির জনকের স্বপ্নের শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে আর তার ভালোবাসার হতদরিদ্র দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তি আজও অর্জন করতে না পারলেও আমরা সেই লক্ষ্য পরিপূরণে এগিয়ে চলেছি। আন্তর্জাতিক জরিপকারী বিভিন্ন সংস্থার মতে, আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির অধিকাংশ সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি এক কথায় বিস্ময়কর। যদিও আমরা এখনও স্বল্পোন্নত, তথাপি আমরা জনসাধারণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমাদের আশাবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘রূপকল্প’ অনুযায়ী ২০২১ সালে আমরা মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরিত হব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত সরকার অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে সক্ষম হবে।
তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য; বাণিজ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
tofailahmed69@gmail.com
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
জাহিন মিয়া খুব আনন্দে আছে by মোকাম্মেল হোসেন
কোনো কোনো রমণীর হাসি এমন- মনে হয় যেন শিশির ঝরছে। এমন শিশিরের রূপ-মাধুর্য উপভোগ করার সময় নেই যে পুরুষের, নিঃসন্দেহে সে হতভাগা। হতভাগাদের তালিকায় নিজের নাম দেখতে চাচ্ছি না- চিনি বেগম কি তা বুঝতে পারল? পারলে পারুক; কোনো সমস্যা নেই। দৃষ্টি যদি হয় নিষ্পাপ, মন যদি হয় নিষ্কলুষ, তাহলে সৌন্দর্য উপভোগ করার মধ্যে কোনো পাপ নেই। তারপরও মানুষের মন বলে কথা! আমার মনে পাপ-পুণ্যের দ্বন্দ্ব চলছে, চিনি বেগম বলে উঠল-
: বাপ-ছেলে একসঙ্গে সাইজ্যা-গুইজ্যা কই রওনা হইছেন?
চিনি বেগমের মুখের কথা কি তার হাসির চেয়েও মধুর? আমার মনে হল, তার হাসি যদি শিশিরকণা হয়; তাহলে কথা হচ্ছে, জলের বুকে আছড়ে পড়া বৃষ্টিধারা। শিশির ও বৃষ্টির ভেজা গন্ধ গায়ে মেখে উত্তর দিলাম-
: স্কুলে যাইতেছি।
- ছেলেরে ভর্তি করাইতে?
: না। লটারির ফলাফল জানতে।
- কিসের লটারি?
: প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার লটারি।
আজ লটারিতে জাহিন মিয়ার ভাগ্য নির্ধারিত হবে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে সে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সুযোগ পাবে। আর ভাগ্য যদি পিছলা মারে, তাহলে পাবে না। জাহিন মিয়া ভর্তি-লটারি জিতলে আমার ‘রি-কন্ডিশন’ মার্কা চেহারায় এক ধরনের স্বস্তি ফুটে উঠেবে, আর লটারি জিততে না পারলে চেহারা ভসকাবে- এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ভসকানো চেহারা নিয়ে তখন দৌড়াতে হবে বেসরকারি কোনো স্কুলে। বেসরকারি বিদ্যাপীঠের কথা মনে হতেই শরীরে জ্বর-জ্বর ভাব অনুভূত হল। জাহিন মিয়ার জন্য বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অত্যন্ত চড়ামূল্যে বিদ্যা কেনার প্রয়োজন যাতে না পড়ে, সেজন্য আল্লাহপাকের দরবারে আর্জি পেশ করতে করতে সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছলাম।
সামান্য দূরে লবণ বেগম দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে, একখণ্ড বরফ। গা ঘেঁষে দাঁড়াতেই বরফখণ্ডের শীতলতা টের পেলাম। আগুনের তাপে বরফ গলে পানি হবে ভেবে হাসি-আগুন প্রজ্বলিত করলাম। কোনো লাভ হল না। বরফখণ্ড হিমশীতল কণ্ঠে বলল-
: চাইরতলা থেইকা নিচতলা পর্যন্ত আসতে কতগুলা সিঁড়ি ডিঙ্গাইছ তুমি?
লবণ বেগম কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছে? এটা কী রকম প্রশ্ন! মুখে ফ্যাকাসে হাসির উদগিরণ ঘটিয়ে উত্তর দিলাম-
: এইটা তো গুনি নাই!
- যাও, গুইন্যা আস।
: মানে?
- মানে চাইরতলা থেইকা নিচতলা পর্যন্ত কয়টা সিঁড়ি আছে, তোমারে সেইটা গুইন্যা আসতে বলছি।
: কী আশ্চর্য! আমি সিঁড়ি গুনতে যাব কোন দুঃখে!
- মানুষ কি সংসারের সব কাজ শুধু দুঃখে করে? আনন্দেও করে। আমি চাই, সিঁড়ি গুনার কাজটা তুমি আনন্দের সঙ্গে করবা।
: তাসিনের আম্মু! এইটা কিন্তু চূড়ান্ত রকমের বাড়াবাড়ি হইয়া যাইতেছে!
- মোটেই না।
থুম ধরে দাঁড়িয়ে আছি। কী করা উচিত- সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে লবণ বেগম বলল-
: কী হইল! দাঁড়াইয়া রইছ কেন? যাও।
সংসার জটিল রণাঙ্গন। এ রণাঙ্গনে যারা সবসময় জয়ী হওয়ার আশা করে, তারা ভুল করে। আমি এ ভুলটা করতে চাই না বলে ব্যাকগিয়ার মেরে সিঁড়িতে পা রাখলাম। প্রতি তলায় ১১ দু’গুণে ২২টা সিঁড়ি। চার তলায় সিঁড়ির সংখ্যা ৪ বাইশে ৮৮। রিপোর্ট পেশ করার পর লবণ বেগম বলল-
: ৮৮টা সিঁড়ি আপ-ডাউন করতে এইবার তোমার সময় লাগছে সাড়ে চাইর মিনিট। অথচ আগের বার শুধু ডাউন করতেই সময় নিছ ১৬ মিনিট। এর রহস্য কী?
এতক্ষণে ফোঁড়ার মুখ খুঁজে পেলাম। বললাম-
: তুমি তো দুম-দুম কইরা নিচে নাইমা আসলা। এদিকে তোমার ছেলে কয়েকটা সিঁড়ি ডিঙ্গানোর পর বইলা বসল...
- কী বইলা বসল?
: আব্বু, থিস করব। তখন আবার বাসায় ঢুকলাম। তারে লইয়া টয়লেটে গেলাম।
- আর?
: আর কী!
- আর কিছু না?
: অঃ। মাঝপথে চিনি বেগমের দেখা হইছে। উনি জানতে চাইলেন, বাপ-বেটা মিইল্যা কই রওনা হইছেন? আমি বললাম, লটারির ফলাফল জানতে।
- শুধু এইটুকই?
: না। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের একটা প্রেমের কবিতার পুরাটা তারে শুনাইছি।
- ঠিক আছে, চল।
স্কুল প্রাঙ্গণে বিশাল আব্বা-আম্মা সমাবেশ। তাদের সঙ্গে আসা বাচ্চারা নিরুদ্বেগ-নিশ্চিন্তে এটা-ওটা খাচ্ছে, ছুটছে, দৌড়াচ্ছে, লাফাচ্ছে। পরিবেশ দেখে স্বর্গের বাগান বলে ভ্রম হয়। কয়েক বছর আগেও শহরের সরকারি স্কুলগুলোয় প্রথম শ্রেণীতে ছেলে-মেয়েদের ভর্তি করানোর ক্ষেত্রে এ রকম পরিবেশ ছিল না। তখন বাচ্চা-কাচ্চারা হাঁটতে শিখলেই ভর্তিযোদ্ধা হিসেবে খাতায় তার নাম উঠে যেত। সে সময়কার কথা। আমার বড় ছেলে ৪ বছরে পা দিতেই তার ভর্তির প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। কেবল সকাল-সন্ধ্যার রুটিন পড়ালেখা নয়, লবণ বেগম রান্না করতে করতে ছেলেকে শব্দার্থ শেখায়, গোসল করাতে করাতে নামতা মুখস্থ করায়, হাগু করাতে করাতে জোড়-বিজোড়ের তালিম দেয়। এক পর্যায়ে লবণ বেগম নিজের ওপর আর ভরসা রাখতে পারল না। বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল। একদিন এক কোচিং সেন্টারে গেলাম। এর নাম হচ্ছে, বাদল স্যারের সাফল্য এক্সপ্রেস। বাদল স্যারের সাফল্য এক্সপ্রেসের টিকিট কাউন্টারে লম্বা লাইন। সিরিয়াল মেইনটেন করে স্যারের সামনে যেতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন-
: আপনের কোন স্কুল?
নিরীহ ভঙ্গিতে বললাম-
: অষ্টধার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
বাদল স্যার চোখ কুঁচকালেন। বললেন-
: এই ধরনের স্কুলের নাম তো জীবনে শুনি নাই!
- এইটা ময়মনসিংহ সদরের গ্রামের একটা স্কুল। আমি এই স্কুলেই পড়ছি।
- আরে! আপনের স্কুলের কথা জানতে চাইছে কে? বাচ্চারে কোন স্কুলে ভর্তি করাইতে চান- সেইটা বলেন।
: চাই তো একটা ভালো স্কুলেই ভর্তি করাইতে।
- নির্দিষ্ট কইরা বলতে হবে।
: কেন!
- স্কুল অনুযায়ী আমাদের কোচিংয়ের রেট নির্ধারণ করা হয়।
: বুঝলাম না।
- না বোঝার মতো কিছু বলি নাই। ট্রেনের ফার্স্টক্লাসে ভ্রমণ করলে আপনে যে টাকা দিয়া টিকিট কাটবেন, অন্য ক্লাসে ভ্রমণ করলে কি সেই টাকা লাগবে?
: জ্বি-না।
- সাফল্য এক্সপ্রেসের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম। টপ-ওয়ান, টপ-টু, টপ-থ্রি- এইভাবে স্কুলগুলারে সিরিয়াল করা হইছে। সিরিয়াল অনুযায়ী বাচ্চাদের টেক-কেয়ার করা হয়; টাকাও সেইভাবে নেয়া হয়...
বাইরে বের হওয়ার পর লবণ বেগমকে বললাম-
: এইসব এক্সপ্রেস-ফেকপ্রেস সব ভোগাস।
লবণ বেগম আমার কথায় কর্ণপাত করল না। ফার্স্টক্লাসের টিকিট কেটে ছেলেকে সাফল্য এক্সপ্রেসে তুলে দিল।
ভর্তি পরীক্ষার নির্ধারিত তারিখে সাফল্য এক্সপ্রেসের পুচকে যাত্রীকে নিয়ে স্কুলে গেলাম। শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিতদের বাঁশির হুইসেল, বাচ্চাদের কান্না, অভিভাবকদের চিৎকার-চেঁচামেচি, হুড়োহুড়ি- সব মিলিয়ে বিভীষিকাময় পরিবেশ। একটা বাচ্চাকে দেখলাম, বেঁকে বসেছে- মাকে ছাড়া সে পরীক্ষার হলে ঢুকবে না। মা নানাভাবে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। কাজ হচ্ছে না। এরই মধ্যে ঘণ্টা পড়ে গেল, ভদ্রমহিলার তখন মাথার চুল ছেঁড়ার মতো অবস্থা। তিনি ঠাস করে মেয়ের গালে চড় বসিয়ে দিলেন।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার আরও বড় আকারের হুজ্জত সৃষ্টি হল। মাইকে অভিভাবকদের বাঁশের নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে থাকার জন্য বারবার অনুরোধ করা হচ্ছিল। কে শুনে কার কথা! ভিড়ের মধ্যে একটা বাচ্চাকে একজন অভিভাবকের কোলে তুলে দিতেই তিনি বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন-
: এইটা তো আমার বাচ্চা না! আপনে কার বাচ্চারে আমার কাছে গছাইয়া দিলেন?
অল্পক্ষণের মধ্যেই বাঁশের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে পড়ল। যে যেভাবে পারছে- সামনের দিকে দৌড়াচ্ছে। দৌড়াদৌড়ি শেষ হওয়ার পর শুনি, এক ভদ্রলোক তার স্ত্রীর নাম ধরে ডাকাডাকি করছেন। পাশ থেকে একজন বললেন-
: নাম ধইরা ডাকাডাকির প্রয়োজন কী? মোবাইলে ফোন করেন।
- ফোন বন্ধ পাইতেছি।
পাশ থেকে একজন রসিকতা করল-
: ভাই, টেনশনের কিছু নাই। পুরান গেলে নতুন পাবেন।
কিছুক্ষণ পর আরেক ভদ্রলোককে দেখা গেল, তিনি বৌ-বাচ্চা দু’জনকেই খুঁজে পাচ্ছেন না। একজন অভয় দিলেন-
: শুধু বউ মিসিং হইলে চিন্তার বিষয় ছিল। সঙ্গে যেহেতু বাচ্চা আছে, চিন্তার কিছু নাই। পাবেন।
ভিড়ের মধ্যে সহজে খুঁজে পাওয়ার জন্য অনেক বাবা-মা বাচ্চাদের হাতে লাল-নীল ফিতা বেঁধে দিয়েছেন। কেউ কেউ মাথায় নির্দিষ্ট রঙের ক্যাপ পরিয়েছেন। আমার মাথায় এ ধরনের বুদ্ধি কেন আসেনি, তা নিয়ে আফসোস করছি- হঠাৎ ভিড়ের মাঝখানে চিড়ে-চ্যাপ্টা অবস্থায় ছেলেকে আবিষ্কার করলাম। তাকে সেই অবস্থা থেকে উদ্ধার করে কোলে তুলে নিয়ে দৌড় দিলাম, যেন সোনার সিন্দুক খুঁজে পেয়েছি। আহ! কী স্বস্তি। সেই করুণ দৃশ্যের অবতারণা এবার আর নেই।
প্রশাসনের লোকজন চলে এসেছেন। তারা প্রধান শিক্ষকের কক্ষে চা-সিঙ্গারা দিয়ে আপ্যায়িত হচ্ছেন। আপ্যায়ন পর্ব শেষ হলেই লটারি পর্ব শুরু হবে। অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছিল বলে আমি আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। মা-ছেলেকে স্কুল প্রাঙ্গণে রেখে চলে এলাম।
দুপুরের দিকে লবণ বেগমের ফোন পেলাম। তার গলায় খুশির ঝিলিক। কোনোমতে সে বলল-
: তোমার ছেলে তো লটারিতে টিইক্যা গেল!
- আলহামদুলিল্লাহ। ফোনটা জাহিনরে দেও তো।
ফোন হস্তান্তরিত হওয়ার পর জাহিনের উদ্দেশে বললাম-
: আব্বু, রেজাল্ট পাইছ?
- হুঁ।
: কেমন লাগতেছে?
- ভালো।
: আনন্দ হচ্ছে না?
- হচ্ছে। আব্বু...
: কও।
: তুমি পেপারে লেইখ্যা দেও, জাহিন খুব আনন্দে আছে...
জাহিনের এ আনন্দের পেছনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অবদান রয়েছে। তার সরকারের একটা সিদ্ধান্ত অতীত ভর্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় পরিবেশই শুধু বদলে দেয়নি, সেইসঙ্গে অভিভাবকদের হাজার হাজার টাকার সাশ্রয়ও হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বাচ্চাদের ব্যাপারে আরও একটি মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি তাদের বইয়ের বোঝা কমানোর কথা বলেছেন। সমস্যা হল, প্রধানমন্ত্রীর সব কথা রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে ধরে নিয়ে তা পরিপালন করার ব্যাপারে উদাসীনতা প্রদর্শন করা হয়। বাচ্চাদের বইয়ের বোঝা কমানোর পরামর্শের ক্ষেত্রেও একই উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটা ঠিক না। একজন প্রধানমন্ত্রীকে আইন করে সবকিছু বাস্তবায়ন করতে হবে কেন? তার আদর্শ, জীবনাচার এবং পরামর্শও অবশ্য পালনীয় হওয়া উচিত।
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক
mokammel@live.com
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
পাঠানকোটে ‘জায়শে মোহাম্মদের’ জঙ্গি হামলা by বদরুদ্দীন উমর
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের কোনো উন্নতি যাতে না হয় তার প্রতি পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা Inter Services Intelligence (ISI) সব সময় সতর্ক দৃষ্টি রাখে। আইএসআই-এর দ্বারা গঠিত কতগুলো সাম্প্রদায়িক জঙ্গি সংগঠন এবং পাকিস্তান সামরিক বাহিনী এক্ষেত্রে হাত ধরাধরি করে কাজ করে। সে কারণে বেসামরিকভাবে ধর্মীয় জঙ্গি সংগঠনগুলো একদিকে সাম্প্রদায়িকতা জিইয়ে রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে, নানা ধরনের ঘটনা ঘটায় এবং সামরিক বাহিনী কাশ্মীর সীমান্তে মাঝে মাঝেই সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করে। অন্যদিকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা Research and Analysis Wing (RAW) ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ’ বা আরএসএস এবং তার নিয়ন্ত্রণাধীন সংঘ পরিবারের ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’, বজরং দল, শিবসেনা ইত্যাদি চরম সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে সাম্প্রদায়িক প্রচারণা ও কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করে। ভারত সরকারও তাদের সাম্প্রদায়িক নীতি পরিকল্পিতভাবে অব্যাহত রাখে। এর ফলে পাকিস্তান ও ভারতের সাধারণ মানুষ এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী হলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রে তাদের চেষ্টা বিশেষ ফলপ্রসূ হয় না। কারণ সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতার জন্য পাকিস্তান ও ভারতে কোনো সুসংগঠিত দল নেই। সংগঠিত কোনো প্রচেষ্টাই নেই। সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোর কার্যকলাপের জন্য যেখানে সুসংগঠিত দল আছে, সেখানে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধের জন্য কোনো সুসংগঠিত দল নেই। তাছাড়া যেসব সংগঠন সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী তারাও এ ক্ষেত্রে কোনো শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে আন্দোলন করে না। কাজেই সাম্প্রদায়িক শক্তি তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে। কংগ্রেস নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অসাম্প্রদায়িক বললেও ১৯৪৭ সাল থেকে সুযোগ-সুবিধা ও প্রশাসন ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক নীতি কার্যকর করে যাওয়ার ফলে তারা ভারতে সাম্প্রদায়িকতার পৃষ্ঠপোষক ও রক্ষক হিসেবেই কাজ করে এসেছে। তাদের এই কাজের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ভারতে আরএসএস তার শক্তি সঞ্চয় করেছে এবং বিজেপি প্রথমে বাজপেয়ি ও পরে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ক্ষমতায় এসেছে। তারা আকাশ থেকে পড়েনি।
কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর হলেও কোনো কংগ্রেস সরকার নয়, বিজেপির প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়িই ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। দ্বিতীয়বার এই চেষ্টা করছেন নরেন্দ্র মোদি। চরম সাম্প্রদায়িক হওয়া সত্ত্বেও ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির তাগিদেই তারা কংগ্রেসের ঐতিহ্যের বাইরে বের হয়ে দুই দেশের পারস্পরিক বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটাতে চেয়েছেন। কিন্তু এক্ষেত্রেও যা বিস্ময়কর তা হল, বিজেপির মাতৃসংগঠন আরএসএসই তাদের এই প্রচেষ্টা নস্যাতের ব্যবস্থা আগে করেছে এবং এখনও করছে। দেখা যায়, এ ধরনের চেষ্টা যখনই হয় তখন ভারত ও পাকিস্তানে এমন সব ঘটনা ঘটানো হয়, যার ফলে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নতি না হয়ে তারা আগের জায়গাতেই ফিরে যায়। এমনকি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। লাহোরে বাজপেয়ির বাসযাত্রার পরই পাকিস্তানের আইএসএস ও সামরিক বাহিনী কাশ্মীরে বড় রকম সামরিক অভিযান চালিয়ে কারগিল দখল করেছিল। শেষ পর্যন্ত ভারত তাদেরকে কারগিল থেকে বহিষ্কার করলেও দুই দেশের সম্পর্কের আর কোনো উন্নতি হয়নি।
কয়েকদিন আগে নরেন্দ্র মোদি তার বিদেশ সফর শেষে কাবুল থেকে দেশে ফেরার পথে হঠাৎ করে লাহোরে তার যাত্রাবিরতি করেন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বাড়িতে গিয়ে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। তাদের মধ্যে সৌহার্দ্যমূলক কথাবার্তা হয়। যার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নতির সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু এ সময় আরএসএস অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গার ওপর রামমন্দির নির্মাণের কর্মসূচি নতুন করে কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়ে সেখানে পাথর জমানো শুরু করে। অন্যদিকে ৪ জানুয়ারি পাঞ্জাবের পাঠানকোটে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর স্থাপনার ওপর বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বেশ কয়েকজন সামরিক লোক নিহত হয় এবং বিমান ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটা যে পাকিস্তানে অবস্থিত জায়শে মোহাম্মদের কাজ এতে এখন আর কারও সন্দেহ নেই। এই সংগঠনটি পাকিস্তানের আইএসআইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
বাজপেয়ির প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। তিনি সামরিক বাহিনীর লোক হলেও ভারত-পাকিস্তান সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য বাজপেয়ির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু অবিশ্বাস্য ব্যাপার এই যে, দেশের প্রেসিডেন্টের কাছেও কোনো খবর ছিল না যে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে কারগিলে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছে! পরে এ স্বীকারোক্তি পারভেজ মোশাররফ নিজেই করেছিলেন। কাজেই স্বয়ং প্রেসিডেন্টের এখতিয়ারের বাইরেই ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন প্রচেষ্টা বানচাল করা হয়েছিল। এসবের পেছনে কার হাত?
এবার নরেন্দ্র মোদির এই চেষ্টা শুরুর পরই প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের এখতিয়ারের বাইরে আবার আইএসআই পাঠানকোটে বিমান ঘাঁটির ওপর আক্রমণ চালিয়ে একইভাবে তা বানচালের চেষ্টা করছে। দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। ভারত পাকিস্তানকে তথ্য সরবরাহ করেছে এবং নওয়াজ শরিফ এই হামলার বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু এর ফল কী দাঁড়াবে এবং নওয়াজ শরিফ ও নরেন্দ্র মোদি তাদের সমঝোতা আলোচনা চালিয়ে যেতে পারবেন কি-না অথবা কতদূর নিতে পারবেন- এটা এখন দেখার বিষয়।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
সীমান্তে মাইক বাজিয়ে উত্তরকে উসকে দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
শত শত মানুষের সামনে নিজের মাকে হত্যা করল আইএস জঙ্গি
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
‘গালগল্পে’ ক্ষোভ ওবামার
![]() |
| বারাক ওবামা |
আগ্নেয়াস্ত্রের বেচাকেনা ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ওবামার উদ্যোগ যে প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছে, এ সভার এক দর্শনার্থীর কথায় সেটার প্রমাণ মেলে। ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন—দর্শকদের মধ্যে এমন একজন নারী প্রশ্ন তুলে বলেন, ওবামা কেন তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিতে চান। তাঁর সঙ্গে অস্ত্র থাকলে তিনি বেশি নিরাপদ বোধ করেন। এদিকে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় স্বনামে লিখিত এক উপসম্পাদকীয়তে ওবামা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে বলেন, দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির আগে ক্রেতার পরিচয় নির্ণয়ের পক্ষে। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে বেশি সতর্কতার কথা উল্লেখ করে ওবামা বলেন, ‘ওষুধের বোতল যাতে শিশুরা খুলতে না পারে, আমরা সে ব্যবস্থা নিই। অথচ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সতর্কতাই নেই।’ উপসম্পাদকীয়তে ওবামা আরও বলেন, আসছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান মনোনয়নপ্রত্যাশী হিলারি ক্লিনটন একসময় আগ্নেয়াস্ত্র প্রশ্নে তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তবে চলতি দফা নির্বাচনে তিনি তাঁর প্রস্তাবের পক্ষে জোর সমর্থন দিয়েছেন।
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
১৫ জানুয়ারির বৈঠক হচ্ছে!
![]() |
| নরেন্দ্র মোদি ও নওয়াজ শরীফ |
এদিকে, ভারতের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য হাতে পাওয়ার পরপরই বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলি খান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নাসির জানজুয়া, পররাষ্ট্রসচিব ইজাজ আহমেদ চৌধুরীসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন। বৈঠকের পর পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, সেখানে ‘অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক’ বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। নওয়াজ শরিফ সেখানে দিল্লি থেকে পাওয়া তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে যত দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ নিতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। এর আগে বেশ কয়েক দফা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে নওয়াজের টেলিফোনে কথা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আলোচনা যাতে থমকে না যায়, সে জন্য মোদি ও নওয়াজ দুজনই আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকা বলেছে, ভারতকে আপাতত প্রশমিত করতে পাকিস্তান ভারতের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করার পর জইশ-ই-মুহাম্মদ সংগঠনটির প্রধান মাসুদ আজহারকে সাময়িকভাবে গ্রেপ্তার করতে পারে।
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1330)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
-
▼
2016
(3416)
-
▼
January
(576)
-
▼
Jan 10
(10)
- জেনারেল মইন কি সত্য লিখেছেন?
- যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু যুদ্ধ মোকাবিলায় উত্তর কোরিয়া...
- বন্দিত্ব থেকে বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত by তোফায়েল আ...
- বন্দিত্ব থেকে বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত by তোফায়েল আ...
- জাহিন মিয়া খুব আনন্দে আছে by মোকাম্মেল হোসেন
- পাঠানকোটে ‘জায়শে মোহাম্মদের’ জঙ্গি হামলা by বদরুদ্...
- সীমান্তে মাইক বাজিয়ে উত্তরকে উসকে দিচ্ছে দক্ষিণ কো...
- শত শত মানুষের সামনে নিজের মাকে হত্যা করল আইএস জঙ্গি
- ‘গালগল্পে’ ক্ষোভ ওবামার
- ১৫ জানুয়ারির বৈঠক হচ্ছে!
-
▼
Jan 10
(10)
-
▼
January
(576)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...







