Monday, March 10, 2025

আপা, খুব জানতে ইচ্ছে করে by শামীমুল হক

আচ্ছা, হাসু আপা- খুব জানতে ইচ্ছে করে, কোন শক্তির বলে আপনি বলতেন আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাবে এমন কোনো শক্তি নেই। অথচ বাণী চিরন্তনে একটা কথা আছে-ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আপনার দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়াও এটাই প্রমাণ করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো- কোনো ক্ষমতাবানরাই বাণী চিরন্তনের এ বাণীকে বিশ্বাস করেন না। যেমনটা আপনিও করতেন না। তবে, আপা- গত ছয় মাসে আপনি একটি বাহাস এ দেশে সুন্দর করে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। এজন্য আপনাকে বাহবা দিতেই হয়। আপনার পক্ষে এখন মাঝে মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ ঘেউ ঘেউ করেন। আপনার পালিয়ে যাওয়াকে তাড়িয়ে দেয়া উপাধি দিয়েছেন তারা। আর বলছেন, এটা ঠিক হয়নি। খুব সূক্ষ্মভাবে তারা ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলেন। কিন্তু তারা একবারও চিন্তা করেন না আপনার দীর্ঘ প্রায় ষোল বছর শাসনামলে দেশ পরিণত হয়েছিল রাক্ষসপুরীতে। কথা বললেই গুম, খুন। নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছেন নিজ হাতে। যাতে করে পাঁচ বছর পর পর ভোট হবে। কিন্তু আপনি ও আপনার দল থেকে যাবে ক্ষমতায়। হাসিমুখে আপনি বঙ্গভবনে গিয়ে শপথ নিবেন। ফের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সংখ্যা বাড়বে। মানে কতোবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন সেটা মানুষ আঙ্গুলের কড়ায় গুনবে। প্রধানমন্ত্রী হয়ে শপথ ভাঙার কার্যক্রমে নামবেন। রাগ-অনুরাগের বশবর্তী হয়ে একের পর এক কাজ করবেন। যাকে খুশি ধরে এনে শাস্তি দেবেন।

আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল দেশে থাকতে পারবে না- এমন হুংকার দিবেন। অসংখ্যবার এমন হুংকার দিয়েছেন। আজও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার ভাইরাল বক্তব্য শুনে এলাম। যেখানে আপনি বলছেন- পাড়া-মহল্লা থেকে একটা একটা বিএনপিকে ধরে এনে শাস্তি দিতে হবে। বিএনপি’র এদেশে রাজনীতি করার অধিকার নেই। হাসু আপা, ও আপা- নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গের কথা তো আমরা সবাই শুনেছি। আপনিও ঠিক তেমনই। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে সব সময় চেষ্টা করেছেন। আখেরে কোনো লাভ হয়নি। শুধু নিজের কাটা নাক নিয়েই এখন ভিনদেশে বাস করছেন। বড় আফসোস হয় নিজের দেশ থেকেও আজ আপনি বিশ্বের মধ্যে এক নরাধম, যার কোনো দেশ নেই। যে রিফিউজির মতো অন্যের দেশের গলগ্রহে থাকছেন। ক্ষমতার লোভ আপনাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল যে, আপনি নিজেকে গড ভাবতে শুরু করেন। তাই তো এদেশে যখন মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা প্রবেশ করতে থাকে তাদের বাধা দেননি। বরং বলেছেন, আমার বোন রেহানা আমাকে বলেছে দেশের ষোল কোটি মানুষকে তুমি খাওয়াতে পারছো আর এই ১০ লাখ মানুষকে খাওয়াতে পারবে না। নাউজুবিল্লাহ। আপা নিজেকে গড না ভাবলে এভাবে কোনো মানুষ বলতে পারে? একটি কথাই ধরুন না। এই যে আপনি জোর গলায় বলতেন, এমন কোনো শক্তি নেই আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামানো। আচ্ছা এখন তো দেখছি শক্তি আছে। জানি আপনি বিশ্বাস করবেন না। কারণ আপনি এখনো জুলাই-আগস্টকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। কিন্তু ষোল বছর যে অত্যাচার, নির্যাতন চালিয়েছেন দেশবাসীর ওপর। বিরোধী দলের ওপর। বিরোধী মতের ওপর। সেটার কথাতো বলেন না। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বাড়িতে থাকতে দিয়ে বলেছেন, দয়া করে দিয়েছেন। আবার তার পুত্র তারেক রহমানের প্রতি রুষ্ট হয়ে বলেছেন, বেশি বাড়াবাড়ি করলে জেলে পুরে দেবো। আপনার এই কথায় প্রমাণ হয় ইচ্ছে করে খালেদা জিয়াকে জেল দিয়েছেন। আবার খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার পণ করেছিলেন বহু আগেই- সেই কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন। অথচ আপনি শপথ নিয়েছিলেন রাগ-অনুরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করবেন না। ওইদিনই তো আপনার প্রধানমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করা উচিত ছিল।


হাসু আপা, এই লেখা যখন লিখছি- তখন আমার সামনে আওয়ামী লীগপন্থি শীর্ষ এক সাংবাদিক নেতা বসা। তিনি বলছিলেন, শেখ হাসিনার বড় ভুল তিনি এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলেন যে কাউকেই পাত্তা দিতেন না। নিজে যা মনে করতেন সেটাই করতেন। আর যাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন তারাও সঠিক পরামর্শ দিতে সাহস করেন নি। কারণ এ স্বাধীনতাও তাদের ছিল না। পরামর্শ দিতে গিয়ে যদি শেখ হাসিনার মতের বিরুদ্ধে যায় তাহলে তো তার ওপর ঝড় বইয়ে যাবে। তিনি বলছিলেন, আমরা আওয়ামী লীগ করি বঙ্গবন্ধুকে দেখে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ছিটেফোঁটাও ছিল না শেখ হাসিনার মাঝে। শেখ হাসিনার পতনের জন্য শেখ হাসিনা নিজেই দায়ী। তিনি কেন সর্বশেষ নির্বাচনটা করতে গেলেন এভাবে? পরপর তিনবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আর কি থাকে? চতুর্থবারের নির্বাচনটা সবাইকে নিয়ে সুষ্ঠুভাবে করলে আজ তার এই দশা হয় না। বিরোধী দল হয়ে সংসদে থাকতে পারতো। পরের বার তো ক্ষমতায় আসতো? আসলে সবই হলো লোভ।

হাসু আপা, আপনাকে এখন সুসংবাদ দিতে চাই। আপনিবিহীন বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নরম গরম বাহাস চলছে। সরকারের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে নতুন রাজনৈতিক দল হয়েছে। এ রাজনৈতিক দল নিয়ে চারদিকে এখন শোরগোল। আসলে কী হতে যাচ্ছে? বিএনপি চাইছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জামায়াত চাইছে আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আর বৈষম্যবিরোধীরাও চাইছে আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তাদের এই মতানৈক্য আপনার দলের কিছুটা হলেও লাভই হচ্ছে মনে হয়। এমনিতেই বাঙালি আত্মভোলা জাতি। গত ষোল বছর যে জুলুম চালিয়েছেন জাতির ওপর- মাত্র ছয় মাসে তা অনেকেই ভুলে বসে আছে। এটা আপনার জন্য মঙ্গল বলেই মনে হয়। দেশের রাজনৈতিক বাহাসে বিএনপি মনে হয় একা হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় অনেকে বলছেন, জামায়াত আর বৈষম্যবিরোধীরা এক কাতারে থাকবে। কেউ কেউ বলছেন, বিএনপি’র ওপর ষোল বছর নির্মম নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানোর পরও ওরা আওয়ামী লীগকে হাত ধরে টেনে তুলবে। আবার আওয়ামী লীগও তাদের স্বার্থে বিএনপি’র সঙ্গে এক হওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। অর্থাৎ দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে গেল। এসবই কিন্তু আন্দাজ। বাস্তবে কী ঘটে আল্লাহ মালুম। তবে, আপা জীবনে আপনি যে ভুল করেছেন তা থেকে শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। এ মুহূর্তে আপনি কিন্তু একা হয়ে পড়েছেন। আপনার পাশে কেউ নেই। যতই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হম্বিতম্বি করে মানুষকে জানান দিলেও মানুষ কিন্তু সব বোঝে। তাই বলছি, হম্বিতম্বি নয়, দেশবাসীর কাছে ষোল বছরের কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করুন। ক্ষমা চান। তাহলে যদি জনগণ কিছুটা হলেও আপনাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে। কিন্তু আপনি দেশ থেকে পালানোর দিনও যেভাবে আপনার নির্দেশে একের পর এক গুলি ছুড়েছে পুলিশ ও আপনার লেলিয়ে দেয়া গুণ্ডাবাহিনী- এ দৃশ্য মানুষ ভুলবে কীভাবে? দেশের প্রধানমন্ত্রী মানে ওই দেশের অভিভাবক। আপনি অভিভাবক হয়ে কী করে জনতার বুকে তীর বিদ্ধ করলেন। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে বিখ্যাত সেই গানটি- মারিয়া ভুজঙ্গ তীর কলিজা করিল চৌচির/কেমন শিকারি তীর মারিল/বিষ মাখাইয়া তীরের মুখে/মারিল তীর আমার বুকে/দেহ থুইয়া প্রাণটা লইয়া যায়/আমার অন্তরায়, আমার কলিজায়/ আমার অন্তরায়, আমার কলিজায়...।

হ্যাঁ আপা, দেশের মানুষের কলিজা এখন তীর মাখানো বিষের যন্ত্রণায় অস্থির। তাদের দেহ আছে। কিন্তু সেই দেহে প্রাণ নেই। রাজনীতি তাদের নিঃস্ব করে গেছে। যাকে বিশ্বাস করেছে সেই বিষ মাখানো তীর মেরেছে জনতাকে লক্ষ্য করে। এখন মানুষ কাউকে বিশ্বাস করতেও ভয় পায়। তাই তারা ক্ষুব্ধ, বিক্ষুব্ধ। দেশের মালিক যাদের বলা হয় সেই জনতাকে পিষ্ট করতে আপনি যেমন ছাড়েননি আপা, অন্যরাও একটু হলেও এ দোষে দোষি। তাই তো কেউ কেউ বলছে আগামী নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামী দলগুলো এগিয়ে যাবে। কারণ তাদের সঙ্গে যাবে বৈষম্যবিরোধীরা। এমনটা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তারপরও বলবো রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই।
আপা, ভালো থাকুন। দূর-দূরান্তে আপনার অতিশয় পাগল ভক্তদের জন্য দোয়া করবেন। কারণ তারা কখন কি করে বসে তা বুঝা মুশকিল। চারদিক খেয়াল করে চলবেন। হিসাব করে, মেপে মেপে কথা বলবেন। নিশ্চয় আল্লাহ আপনার মঙ্গল করবেন। 

সূত্র- জনতার চোখ

সিরিয়ায় ঘরে ঘরে ঢুকে হত্যা, মরদেহ পড়ে আছে খোলা মাঠে

‘বানিয়াসে আমার বন্ধুর বাগ্‌দত্তাকে গুলি করা হয়েছে। তারা [অস্ত্রধারীরা] কাউকে তাঁকে সহায়তা করতে দেয়নি। ফলে রক্তক্ষরণ হয়ে তিনি মারা যান। তাঁকে এখনো কবর দেওয়া যায়নি।’ সিরিয়ার লাতাকিয়া শহরের তারতুসের কাছাকাছি এলাকায় চলমান হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী।

অস্ত্রধারীরা ঘরে ঘরে ঢুকে মানুষ হত্যা করছে জানিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘বুস্তান আল-বাশা গ্রামে আমার চাচি থাকেন। তাঁর সব প্রতিবেশীকে হত্যা করা হয়েছে।’

নিজেদের সিরিয়ার বর্তমান শাসকগোষ্ঠী হায়াত আল-শামের (এইচটিএস) যোদ্ধা দাবি করা এসব অস্ত্রধারী ওই প্রত্যক্ষদর্শীর বাসায়ও তল্লাশি করেন। তাঁদের মহল্লা থেকে সাকল্যে ২০টি গাড়ি নিয়ে যান।

এই নারী প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, অস্ত্রধারীরা নিজেদের এইচটিএসের যোদ্ধা দাবি করলেও তা সত্যি নয়। তারা ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর’ সদস্য।

‘যে ব্যক্তিই পালাতে চেষ্টা করেছেন বা যাঁকে সন্দেহজনক মনে করছে, তাঁকেই তারা হত্যা করছে,’ বলেন তিনি।

কিছু সাধারণ নাগরিক লাতাকিয়ায় অবস্থিত রাশিয়া পরিচালিত হমেইমিম বিমানঘাঁটিতে পালিয়ে আশ্রয় নিতে সক্ষম হন। কিন্তু বিমানঘাঁটিতে যাওয়ার পথে তল্লাশিচৌকিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর লোকজন অবস্থান করছিলেন। এই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘তল্লাশিচৌকিতে তাঁদের কাছে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁরা আলাউইত সম্প্রদায়ের কি না।’

গত বৃহস্পতিবার সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় শহর লাতাকিয়া ও তারতুসে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অনুগত যোদ্ধারা সমন্বিতভাবে হামলা শুরু করে। বর্তমান সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর গুপ্ত হামলা চালানো হয়।

সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো দ্রুত পাল্টা হামলা শুরু করে। সঙ্গে নতুন সরকারের প্রতি অনুগত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদেরও এই অভিযানে যুক্ত করা হয়।

গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলের দিকে হাজার হাজার সরকারি বাহিনীর সদস্য পাঠানো হয়েছে। বাশারপন্থীদের দমনে তাঁরা হেলিকপ্টার গানশিপ, ড্রোন ও কামান ব্যবহার করছেন। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা হামলা ‘প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডে’ রূপ নিয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটসের (এসওএইচআর) তথ্যমতে, শুক্রবার পর্যন্ত দুই দিনে সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে এক হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

এসওএইচআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাতাকিয়া ও তারতুসে তিন দিনে আলাউইত সম্প্রদায়ের অন্তত ৭৪৫ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে বাশারপন্থী ১৪৮ যোদ্ধাকেও হত্যা করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সিরিয়ার নতুন সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন প্রায় ১২৫ জন।

বাশারপন্থী যোদ্ধারা আলাউইত সম্প্রদায়ের সদস্য। এটি শিয়া ধর্মাবলম্বীদের একটি শাখা। সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলেই এই সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ মানুষ বাস করেন। বাশার আল-আসাদের পরিবারও এই সম্প্রদায়ের। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের অধিকাংশের সঙ্গে বাশার পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই। গত বছরের ৮ ডিসেম্বর বাশার সরকারের পতনের পর থেকে এই সম্প্রদায়ের মানুষকে হামলার লক্ষ্য বানানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংঘাত এখনো পুরোপুরি থামেনি। রোববার সংঘাত চতুর্থ দিনে প্রবেশ করেছে। এদিন রাজধানী দামেস্কের মাজ্জাহ পাড়ায় একটি মসজিদে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান আহমেদ আল-শারা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের জাতীয় ঐক্য ও দেশের শান্তি রক্ষা করতে হবে। আমরা মিলেমিশে বাস করতে পারি। সিরিয়ায় বর্তমানে যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলো যেসব চ্যালেঞ্জ আসবে বলে আগে ধারণা করা, হয়েছিল তারই অংশ।’ সাধারণ মানুষকে যারা নিশানা করছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আল-শারা।

সংঘাতের সময় লাতাকিয়ায় ছিলেন, এমন একজন নারীও মিডল ইস্ট আইয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। বর্তমানে তিনি জার্মানিতে বসবাস করেন। তাঁর পরিবার থাকে তারতুস শহরের বানিয়াসে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমি তাঁদের [পরিবারের সদস্যদের] প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু এখন তাঁরা পারমায়ার দিকে চলে গেছেন। সেখানে তাঁরা মাঠে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন।’

‘তারা [অস্ত্রধারীরা] আমার খালার এক বন্ধুকে তাঁর বাসায় হত্যা করেছে। ওই মেয়ের নাম জিনা। তারা আমাদের দুটি বাসা পুড়িয়ে দিয়েছে। আল্লাহর রহমতে উভয় বাসার মানুষজন লুকিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন।’

অস্ত্রধারীরা বানিয়েতে ফারশ কাবিহ গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। কিছু সুনির্দিষ্ট ঘরের সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে হত্যা করা হয়েছে। একটি বাড়িতে এক পরিবারের কয়েক প্রজন্মের সদস্যরা জড়ো হয়েছিলেন। গত শুক্রবার সেখানে অস্ত্রধারীরা হানা দেয়।

ওই পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে এই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘তারা [অস্ত্রধারীরা] এক নারীর পায়ে গুলি করে, তাঁর ভাই ও স্বামীকেও গুলি করে। আজ পর্যন্ত তাঁদের কবর দেওয়া যায়নি।’

সিরিয়ায় চলমান এই সংঘাতের নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। দেশটি সিরিয়ার সংঘাতকে ‘বেআইনি গোষ্ঠী’ কর্তৃক সংগঠিত ‘অপরাধ’ বলে বর্ণনা করেছে। পাশাপাশি নতুন সরকারের প্রতি নিজেদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

সিরিয়াবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত গেইর পেডারসেন সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘সব পক্ষকে কালবিলম্ব না করে সংযম দেখানো এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষার প্রতি পূর্ণ সম্মান দেখানো জরুরি হয়ে পড়েছে।’

রোববার সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সরকারি সংবাদ সংস্থা সানাকে জানান, তারতুসের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেতানিতা গ্রামে লড়াই অব্যাহত রয়েছে।

অন্যান্য স্থানেও নাশকতামূলক ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। দারা ও দামেস্ক শহরকে সংযুক্তকারী একটি বৈদ্যুতিক সংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দারা ও সেওয়াইদার টেলিফোন যোগাযোগব্যবস্থা ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আঘাত করে পালিয়ে যাওয়া (হিট অ্যান্ড রান) কৌশলের অংশ হিসেবে বাশারপন্থীরা এসব করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগেও তারা সরকারি সম্পত্তিতে এই ধরনের হামলা চালিয়েছে।

অনেকগুলো পানির পাম্প স্টেশন ও জ্বালানি ডিপোতেও হামলা চালানো হয়েছে। সানার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সাবেক সরকারের অবশিষ্টদের’ হামলার পর বানিয়াস গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রে সংঘর্ষ হয়েছে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় অনেকগুলো ধর্মীয় গোষ্ঠী রয়েছে। দেশটির নাগরিক সমাজও বেশ বড় ও বৈচিত্র্যময়। কিন্তু নতুন অন্তর্বর্তী সরকারে এসব ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং নাগরিক সমাজের সব পক্ষকে স্থান দেওয়া হয়নি। তাই তা যথেষ্ট অন্তর্ভুক্তিমূলক না হওয়ায় বর্তমান সরকার নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশটিতে ‘ট্রানজিশনাল’ সরকার ঘোষণা করা হবে। এই সরকার কতটা বহুত্ববাদী হয় হয়, সেটা সিরিয়ার বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

অস্ত্র হাতে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অনুগত নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক জন সদস্য। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী পশ্চিম সিরিয়ার লাতাকিয়া শহরে। ৯ মার্চ ২০২৫
অস্ত্র হাতে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অনুগত নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক জন সদস্য। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী পশ্চিম সিরিয়ার লাতাকিয়া শহরে। ৯ মার্চ ২০২৫ ছবি: এএফপি

গাজার জন্য ‘বাস্তবসম্মত’ আরব পরিকল্পনায় সমর্থন ৪ ইউরোপীয় দেশের

ইউরোপের প্রধান দেশগুলো বলেছে, তারা ফিলিস্তিনের গাজা পুনর্গঠনে আরব-সমর্থিত পরিকল্পনাকে সমর্থন করে।

আরব-সমর্থিত পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত না করেই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

গাজা পুনর্গঠনে মিসরের পরিকল্পনাটি আরব নেতারা অনুমোদন করেছেন। কায়রোতে গত মঙ্গলবার আরব লিগের সম্মেলনে মিসরের প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়। এর তিন দিন পর গতকাল শনিবার জেদ্দায় ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) বৈঠকে প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়।

কিন্তু আরব-সমর্থিত পরিকল্পনাটি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী গাজায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গাজা জোর করে খালি করার পরিকল্পনা রয়েছে ট্রাম্পের।

ট্রাম্পের প্রস্তাবে গাজাবাসীকে জর্ডান ও মিসরে সরিয়ে দিতে বলা হয়েছে। গাজাকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভেরা’য় (ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল বরাবর একটি রিসোর্ট এলাকা) পরিণত করার বিষয়ে ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। ট্রাম্পের পরিকল্পনা ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি আরব নেতারা নাকচ করেছেন।

গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে আরব-সমর্থিত পরিকল্পনাটি ট্রাম্পের ধারণার একটি বিকল্প। গতকাল শনিবার ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আরব-সমর্থিত পরিকল্পনাটিকে ‘বাস্তবসম্মত’ বলে স্বাগত জানিয়েছেন। এই পরিকল্পনায় পাঁচ বছরের মধ্যে গাজা পুনর্গঠনের কথা বলা আছে।

এক বিবৃতিতে ইউরোপের এই দেশগুলো পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেছেন, আরব-সমর্থিত প্রস্তাবটিতে গাজার বিপর্যয়কর জীবনযাত্রার দ্রুত ও টেকসই উন্নতির প্রতিশ্রুতি আছে।

ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত গাজা
ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত গাজা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

যাঁর গানে শুনে মুগ্ধ সংগীতশিল্পীরাও, কে এই মমতাজ বেগম

হারমোনিয়ামের তালে ঘরোয়া আসরে গাইছেন, ‘খুঁজবে আমায় সেদিন, যেদিন আমি থাকব না’। এক প্রৌঢ় শিল্পীর কণ্ঠে গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ছড়িয়ে পড়েছে।

৭ মার্চ গানের ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন গিটারিস্ট রায়হান পারভেজ। সাধারণ শ্রোতারা যেমন তাঁর গায়কির প্রশংসা করছেন, সংগীতশিল্পীরাও তাঁর গায়কিতে লীন।

জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কনকচাঁপা গানের ভিডিওর মন্তব্যের ঘরে লিখেছেন, ‘আহা! কী অসাধারণ কণ্ঠ। অসাধারণ কারুকাজ। সুরের গিরিখাতের পথে ওঠানামা। আমি অভিভূত।’

সেই পৌঢ় শিল্পী মমতাজ বেগম। অনেকটা আড়ালেই ছিলেন তিনি। ৭২ বছরে পা দিয়েছেন, তবু কণ্ঠের ধারটা ধরে রেখেছেন।

ভারতীয় সংগীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লার গাওয়া ‘খুঁজবে আমায় সেদিন, যেদিন আমি থাকব না’ গানটি মমতাজের খুব প্রিয়; সেই গান গেয়ে শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পেলেন মমতাজ।

দুই দিনের ব্যবধানে মমতাজের গানের ভিডিওটি ৩ হাজার ৮০০ বার শেয়ার হয়েছে। ১১ হাজারের বেশি রিঅ্যাক্ট এসেছে, ১ হাজার ৩০০–এর বেশি মন্তব্য জমা পড়েছে। সংগীতশিল্পী স্বপ্নীল সজীব লিখেছেন, ‘কী অসাধারণ, আপনাকে অতলান্ত শ্রদ্ধা।’ পল্লবী সরকার নামের আরেক শ্রোতা লিখেছেন, ‘প্রাণটা জুড়িয়ে গেল।’

মমতাজ বেগমের ভাতিজা সরোদশিল্পী তানিম হায়াত খান মন্তব্যের ঘরে জানান, মমতাজ বেগমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়। সারা জীবন কলকাতায় কাটিয়েছেন। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে থাকছেন তিনি।

মমতাজ বেগমের বাবা সেতারশিল্পী ওস্তাদ আলী আহমেদ। আলী আহমেদ ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর সরাসরি শিষ্য ছিলেন। মমতাজের ভাই চঞ্চল খান কণ্ঠশিল্পী হৈমন্তী শুক্লার সঙ্গে দীর্ঘদিন তবলা বাজিয়েছেন।

তানিম হায়াত খান লিখেছেন, ‘অসাধারণ ভালো মানুষ মমতা পিসি। ওনার কলকাতার তোপসিয়ার বাসাতেও গেছি আমি। আর আমরা কলকাতায় গেলেই হোটেলে চলে আসতেন গল্প–আড্ডা দেওয়ার জন্য।। কী যে দারুণ সময় কাটিয়েছি ওনার সাথে।’

শিল্পী মমতাজ বেগম
শিল্পী মমতাজ বেগম। ভিডিও থেকে নেওয়া

ট্রাম্প কি ইতিহাসের গতি বদলে দেবেন, কী করবে ইউরোপ? by প্রতীক বর্ধন

কী নেশায় পেয়েছে ইউরোপকে, সে কেবল তারাই বলতে পারে। এত দিন বাইডেন প্রশাসনের কথায় উঠেবসে ইউক্রেন তেলজল জুগিয়েছে। এবার ট্রাম্পের চপেটাঘাতে ইউক্রেন ও জেলেনস্কি ক্ষতবিক্ষত হলেও ইউরোপ যেন আগের জায়গা থেকে সরছে না। যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে অপমানিত জেলেনস্কিকে বুকে টেনে নিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে নিতে ইউক্রেনকে ২২৬ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছেন।

এই হচ্ছে বাস্তবতা। রাশিয়ার সঙ্গে তিন বছর ধরে অসম যুদ্ধ টেনে নিয়ে যেতে ইউক্রেনের চেয়ে ইউরোপের বড় দেশগুলোর আগ্রহই বেশি। ফলে যুদ্ধটা যে কেবল ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার নয়, বরং ইউরোপ ও সামগ্রিকভাবে পশ্চিমের, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না; সবাই কমবেশি জানেন। কিন্তু ইউরোপকে বুঝতে হবে, রাশিয়ার সঙ্গে তাদের থাকতে হবে। রাশিয়ার জ্বালানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তারাই যে বিপদে পড়েছে, সে কথা বুঝেও না বুঝে থাকার ভান করে তারা কত দিন পার পাবে।

বাইডেন প্রশাসনকে একধরনের পাগলামিতে পেয়ে বসেছিল। সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্রের হৃত সাম্রাজ্যবাদী গৌরব ফিরিয়ে আনা। ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্যপদ দেওয়ার মুলা ঝোলানো তারই অংশ। দেশটির কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া একধরনের রীতি।

এই ন্যাটোর সম্প্রসারণ ও শেষমেশ ইউক্রেনকে তার অন্তর্ভুক্ত করা—এ পরিকল্পনা ১৯৯৭ সালে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ম্যাগাজিন ফরেন অ্যাফেয়ার্সে অনুপুঙ্খভাবে বিবৃত করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একসময়ের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্বিগনিভ ব্রেজিনস্কি; এমনকি সেই রচনায় তিনি দিনক্ষণ পর্যন্ত উল্লেখ করেছিলেন। ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা সেখানে বিবৃত করা হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করার প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এটি মার্কিন-রাশিয়া প্রক্সি যুদ্ধ—ন্যাটোর সম্প্রসারণ নিয়ে যে বিবাদের সূত্রপাত।

বাইডেন প্রশাসনের তীব্র সমালোচক জেফরি ডি স্যাক্স সামরিকায়নের ঘোরতর বিরোধী। তাঁর ভাষ্য এ রকম: যুক্তরাষ্ট্রের ইস্ট কোস্টভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন সামরিক শিল্প কমপ্লেক্সের নিয়ন্ত্রণে; এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আমি পড়াচ্ছি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ বছর পড়িয়েছি; এখন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এখন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যে প্রভাব, অতীতে তা কখনোই দেখা যায়নি। এ সবকিছু ঘটছে মানুষের অলক্ষ্যে; একরকম নীরব অভ্যুত্থানের মতো। এ নিয়ে তর্কবিতর্ক, প্রকাশ্য রাজনীতি, সততা বা নথিপত্র প্রকাশের বালাই নেই; সবকিছুই যেন গোপনে ও কিছুটা রহস্যজনক উপায়ে ঘটেছে। অর্থনীতিবিদ হওয়ার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র–সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার সুযোগ হয় আমার। সেই সূত্রে অনেক কিছু দেখতে ও শুনতে পাই, ফলে দাপ্তরিক ভাষ্য ও সর্বব্যাপক মিথ্যার মর্মমূলে ঢুকতে পারি আমি।

এই যুদ্ধ যে হবে, সে বিষয়ে আগে থেকেই অনুমান করা গেছে বলে মনে করেন জেফরি ডি স্যাক্স। সেই ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো সম্প্রসারণে মাধ্যমে নিজ আধিপত্য বজায় রাখার যে পরিকল্পনা করেছিল, সেই পরিকল্পনার ফসল হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল হলো, ইউক্রেনকে নিজের সামরিক পক্ষপুটে নিয়ে আসা। ব্রেজিনস্কি সেই ১৯৯৭ সালে তাঁর ‘দ্য গ্লোবাল চেস বোর্ড’ শীর্ষক বইয়ে এই কৌশল প্রণয়ন করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ইউক্রেন ছাড়া রাশিয়া কিছুই নয়। তিনি আরও লেখেন, ইউরেশিয়ার ভৌগোলিক কেন্দ্র হচ্ছে ইউক্রেন।

১৯৯০-এর দশক থেকে মার্কিন নিরাপত্তাকাঠামোর চিন্তা ছিল পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একপক্ষীয় ব্যবস্থা কায়েম করা। অর্থাৎ মার্কিন আধিপত্য কায়েম করা। ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ও পরবর্তীকালে রুশ অর্থনীতিকে সহায়তা করার যেকোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। এরপর জার্মানি ও তারা গর্বাচেভ ও ইয়েলেৎসিনকে যে অঙ্গীকার করেছিল, তা ভঙ্গ করে ন্যাটোর সম্প্রসারণ শুরু করে। ফলে ন্যাটো সম্প্রসারণ ও পরবর্তীকালে সেখানে ইউক্রেনকে অন্তর্ভুক্ত করা—এসবই যুক্তরাষ্ট্রের খেলার কৌশল। ১৯৯০-এর দশকে এটি শুরু হয় এবং তার পরিণতি হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

মানচিত্রের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই পরিকল্পনা আর কিছু নয়—কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার ব্রেজিনস্কির চিন্তা। ইউক্রেন, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, তুরস্ক, জর্জিয়া সব দেশকে ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সেই মেধাবী ‘নিরাপত্তা’ কর্মকর্তারা ভেবেছিলেন, এর মধ্য দিয়ে ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার ক্ষমতা প্রদর্শনের অবসান ঘটবে। কিন্তু তারা ঠিক রাশিয়াকে বুঝতে পারেনি, রাশিয়া কখনো পরাভব মানে না। যে হিটলার মানবসভ্যতার সব অর্জন ধ্বংস করার পাঁয়তারা করেছিলেন, সেই হিটলারের অজেয় বাহিনীকে তারাই ঠেকিয়েছে। সম্প্রতি ট্রাম্প সে কথা স্বীকার করেছেন।

ট্রাম্প ও ন্যাটো

এবারের নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই জোরগলায় ট্রাম্প বলে আসছেন, ন্যাটোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বড় সিদ্ধান্ত নেবে। ন্যাটোর অর্থায়ন কমিয়ে দেওয়া বা একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। এরপর শপথ নেওয়ার পর ন্যাটোর সদস্যভুক্ত দেশগুলোর চাঁদার হার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এসব দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ ন্যাটোর পেছনে ব্যয় করার পরামর্শ দিয়েছেন।

ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ প্রসঙ্গেও তিনি বারবার বলেছেন, ইউরোপের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে বেশি অর্থ দিচ্ছে। এই অর্থ ব্যয় নিয়ে তিনি বারবার জেলেনস্কিকে খোঁচা দিয়েছেন। বাস্তবতা হলো, বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ট্রাম্পের নেই। ফলে তিনি বিভিন্ন বহুপক্ষীয় বন্দোবস্ত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বারবার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে ইতিমধ্যে নির্বাহী আদেশে সই করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সেই সুদিন আর নেই। মাতব্বরি করার জন্য যে সামর্থ্য থাকা দরকার, সেটা তার নেই। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে চীন তাকে ধরে ফেলছে। সেই সঙ্গে সামরিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়া ও চীন তার চেয়ে অগ্রগামী। এ দুই দেশের অস্ত্র নির্মাণ ব্যয় অনেক কম। সেই সঙ্গে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র তেমন কিছু লাভ করতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়ায় দীর্ঘদিন যুদ্ধে লিপ্ত ছিল তারা। শেষমেশ বাইডেন যাওয়ার আগে সিরিয়া থেকে আসাদ সরকার উৎখাত হয়। আরেক দিকে গাজার যুদ্ধের যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশে। অর্থাৎ এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র দুটি যুদ্ধে লিপ্ত। এ পরিস্থিতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদী অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র যতটা উদ্‌গ্রীব, গাজার যুদ্ধ থামাতে অতটা নয়।

ইউরোপ কী করবে

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, ইউরোপের নিজস্ব কোনো পররাষ্ট্রনীতি নেই। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পাপেট হিসেবে কাজ করছে। এ সমস্যা রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেন বা ইউরোপের। সুতরাং তাদের উচিত রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করা। এখন ট্রাম্পের জমানা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে চায়।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইউরোপ যেন এক ঘোরের মধ্যে আছে। যুদ্ধ থেকে তারা বেরিয়ে আসতে চায়—এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এখন বাস্তবতা হলো, ইউরোপ যদি এই ধারায় চলতে তাকে, তাহলে তারা একরকম একঘরে হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক তো খারাপ আগে থেকেই। আবার তার সামরিক সক্ষমতা এতটা নেই যে রাশিয়ার সঙ্গে প্রক্সি বা সরাসরি যুদ্ধে তারা লিপ্ত হতে পারে এককভাবে।

নতুন জমানা

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভাষ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পর পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার সঙ্গে রীতিমতো প্রতারণা করেছে। রাশিয়া অনেকবার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পশ্চিমারা সে কথা শোনেনি। মার্কিন সাংবাদিক টাকার কার্লসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পুতিন আরও বলেছিন, রাশিয়া তো আর কমিউনিস্ট দেশ নয়, তারপরও পশ্চিমাদের বিদ্বেষ যেন শেষ হওয়ার নয়। সর্বশেষ সেটা তারা করেছে, সেটা হলো ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে ন্যাটোর সম্প্রসারণ। এ ঘটনা যেন কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। সেই সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দেওয়ার সময় তৎকালীন নেতারা প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেননি বলেও সমালোচনা করেন পুতিন।

বাস্তবতা এটাই। রাশিয়া নিজ মর্যদা নিয়ে দাঁড়াক—পশ্চিমা বিশ্ব তা কখনোই চায়নি। ফলে রুশ নেতারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধের স্বেচ্ছাবসান ঘটালেও পশ্চিমারা তাদের সহায়তা করেনি। উল্টো ন্যাটোর সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি এই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

ইতিহাসের সেই গতি বদলে দেওয়ার সুযোগ ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে। তিনি খ্যাপাটে; কূটনৈতিক রীতিনীতির ধার তেমন একটা ধারেন না, সবই ঠিক আছে। সর্বশেষ হোয়াইট হাউসে ডেকে নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে যা করেছেন, তা–ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেট বা রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্রের দুরভিসন্ধি নস্যাৎ করতে পারেন, যে অঙ্গীকার তিনিসহ তাঁর সহযোগীরা করেছেন, সেটাই হবে বড় পাওয়া। রাশিয়াকে তিনি একভাবে আস্থায় নিয়েছেন। তার সঙ্গে যদি চীন ও ভারতকে নিয়ে বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থার গোড়াপত্তন করতে পারেন, তাহলে অনেকটাই স্বস্তি। তিনি রাশিয়া বা চীনকে শত্রু মনে করেন না। যদিও নিজের হিস্যা বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ষোলো আনা সঠিক; সেখানে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান কতটা পারবেন, সে প্রশ্ন রয়েই যায়। ইহুদি লবির প্রভাব তিনি কতটা কাটাতে পারেন, সেটা দেখার বিষয়।

* প্রতীক বর্ধন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

ট্রাম্প কি ইতিহাসের গতি বদলে দেবেন, 
কী করবে ইউরোপ?

ধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল দেশ

নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল বিক্ষোভ হয়েছে সারা দেশে। প্রতিবাদ বিক্ষোভ, লাঠি মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এসব কর্মসূচি থেকে ধর্ষণে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিক্ষোভকারীরা বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসন উৎখাত করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছেন। অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এই পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়।

সারা দেশে অব্যাহত ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাঠিমিছিল হয়েছে। ‘ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ প্ল্যাটফরমের ব্যানারে বেলা পৌনে তিনটার দিকে টিএসসি’র রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। বাঁশের ছোট ছোট লাঠি হাতে রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু করে ভিসি চত্বর, নীলক্ষেত, কাঁটাবন, শাহবাগ মোড় ঘুরে মিছিলটি আবার রাজু ভাস্কর্যে এসে শেষ হয়। কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফাসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্য ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। মিছিলে ‘জান, মালের নিরাপত্তা দে নইলে গদি ছেড়ে দে’, ‘খুন, ধর্ষণ, নিপীড়ন রুখে দাঁড়াও জনগণ’, ‘অবিলম্বে ধর্ষকদের বিচার করো করতে হবে’, ‘ধর্ষকরা ধর্ষণ করে প্রশাসন কী করে?’, ‘ বেগম রোকেয়া শিখিয়ে গেছে লড়াই করে বাঁচতে হবে,’ ইত্যাদি স্লোগান দেয়া হয়। এর বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠনসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ ধর্ষণ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। সারা দেশব্যাপী ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করায় সরকারও এ নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে। ধর্ষণ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি, নির্যাতন, নিপীড়নের অভিযোগের জন্য টোল ফ্রি হটলাইন চালু করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।  

একের পর এক ঘটনা: শনিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে স্বামীর সঙ্গে রাগ করে চাঁদপুর থেকে লঞ্চে ঢাকার সদরঘাটে আসেন এক নারী। পরে তিনি থাকার জন্য বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় খুঁজছিলেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে পোস্তগোলা এলাকায় অজ্ঞাত চার যুবক তাকে আশ্রয়ের কথা বলে নয়াবাড়ী এলাকার নির্জন জায়গায় নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে ওই নারীর চিৎকারে আশপাশের লোকজন টের পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দু’জনকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। বাকি দুইজন পালিয়ে যায়। ওই নারী চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। রোজার মধ্যে বাড়তি ক্লাসের কথা বলে পঞ্চম শ্রেণির এক নারী শিক্ষার্থীকে স্কুলে ডেকে নিয়ে যান ওই স্কুলের শিক্ষক মানিক। দুপুরে তিনি অন্য শিক্ষার্থীদের চলে যেতে বলেন। সবাই চলে গেলে শ্রেণিকক্ষের দরজা বন্ধ করে ওই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করেন। পরে মানিক নিজের মোটরসাইকেলে করে ছাত্রীকে বাড়ির পাশে রেখে যান। বাড়িতে গিয়ে মেয়ে কান্নাকাটি করে পরিবারকে বিষয়টি জানায়। স্কুলে যাওয়ার আধা ঘণ্টা পরেই সে বাড়ি চলে আসে। তখন পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে। শুধু পঞ্চম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী ও বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা ওই গৃহবধূই নন। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের সঙ্গে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে অহরহ। এ ছাড়া দেশজুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতা পাশবিকতা আচমকা বেড়েছে। এখনো সিএমএইচের লাইফ সাপোর্টে বাঁচা-মরার লড়াই করছে মাগুরার ৮ বছর বয়সী তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। বোনের বাসায় বেড়াতে এসে পাশবিকতার নির্যাতন হয়েছে শিশুটি।

সাম্প্রতিক সময় ছাড়াও অন্যান্য বছরগুলোতেও বিভিন্ন সময় আলোচনায় ছিল ধর্ষণকাণ্ড। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সারা দেশে ৬ হাজার ২৭২ জন নারী ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সারা দেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৯ জন। এরমধ্যে একক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮ জন ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ১৩ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩ জনকে এবং আত্মহত্যা করেছেন ১ জন। এসব ঘটনায় ২৯টি মামলা হয়েছে থানায়। আসকের তথ্য মতে ২০২৪ সালে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪০১ জন। এরমধ্যে একক ধর্ষণ ২৯৬ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১০৫ জন। ৩৪ জন ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন। থানায় মামলা হয়েছে ৩৩৪টি। ২০২৩ সালে ৫৭৪ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ৪৩৬ জন ধর্ষণ ও ১৩৮ জনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ৩৩ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। ৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। ৪৩৩টি ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ২০২২ সালে ৯৩৬ জনকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৭০৬ জনকে ধর্ষণ ও ২২৭ জনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে। ৪৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ৬৫৯টি ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ২০২১ সালে সারা দেশে ১ হাজার ৩২১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ১ হাজার ৬৬ জনকে ধর্ষণ ও ১৪১ জনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৪৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ৯১৬টি ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ২০২০ সালে ১ হাজার ৬২৭ জন নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ১ হাজার ৩০২ জনকে ধর্ষণ ও ৩১৭ জনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। ৫৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ১ হাজার ১৪০টি ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ১ হাজার ৬৬ জন ধর্ষণ ও ৩২৭ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৭৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ৯৯৯টি ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে ২০১৯ সালে সারা দেশে ২১ হাজার ৭৬৪ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে থানায় মামলা করেছেন। ২০২০ সালে সেটি আরও বেড়ে ২২ হাজার ৫১৭ জন ভুক্তভোগী মামলা করেন। এভাবেই ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬ জন। ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬ জন। ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১ জন। ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১ জন মামলা করেন। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ১ হাজার ৪৪০ জন মামলা করেছেন। সমাজ ও অপরাধ বিজ্ঞানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, নারী ও শিশুদের  ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বলছে তাদের সুরক্ষার জন্য আইন করা হয়েছে, বিভিন্ন সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুরক্ষার জন্য কি কি আছে সেদিক দিয়ে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে আছে। নারীদের সুরক্ষার জন্য সবই আছে। কিন্তু সেটি ঠিকমতো কাজ করছে না। শাস্তিভিত্তিক বিচারব্যবস্থায় যদি বিচার না হয় দ্রুত সময়ের মধ্যে তাহলে ভুক্তভোগীর সংখ্যা বাড়বেই। মোটাদাগে পুরুষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আইন কাজ করে না। তাই পুরুষরা কেন আইন মানবেন? যখনই আইন কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে না সেই আইন কেউ মানবে না। তিনি বলেন, নারী ও শিশুকে সুরক্ষিত রাখার জন্য রাষ্ট্র যে প্রাথমিকভাবে আইন, অন্যান্য সেবা ও নিরাপত্তা কাঠামো যে তৈরি করলো সেটি বাস্তবায়নের মধ্যে তাদের সুরক্ষিত রাখাই প্রধান দায়িত্ব।

দিন-রাত মাঠে বিক্ষুব্ধ ঢাবি শিক্ষার্থীরা: মাগুরায় নৃশংস ধর্ষণের শিকার শিশুসহ সম্প্রতি সংগঠিত সকল ধর্ষণের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা শনিবার রাতে বাইরে বেরিয়ে আসেন। একাত্মতা ঘোষণা করে শহীদুল্লাহ হলের শিক্ষার্থীরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন।  এ সময় তারা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘আমার সোনার বাংলায়, ধর্ষকদের ঠাঁই নাই’, ‘তুমি কে আমি কে, আছিয়া আছিয়া’, একটা একটা ধর্ষক ধর, ধরে ধরে কবর দে’, ধর্ষকদের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’- ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন। কিছুক্ষণ পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনান্য হল থেকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থী বেরিয়ে আসলে মুহূর্তেই লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে টিএসসি এলাকা। এ সময় শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী স্লোগানে প্রকম্পিত হয় সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য। রাত ২টার দিকে একই স্থানে ‘ধর্ষণবিরোধী মঞ্চ’-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের ঢাবি মুখপাত্র রাফিয়া রেহনুমা হৃদি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা এই আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেন এবং দুই দফা দাবিসহ ধর্ষকদের আদালতে উপস্থাপন করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। এই দুই দফা হলো ১. অনতিবিলম্বে ধর্ষণবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে সকল ধর্ষণের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ২. আছিয়ার হত্যাচেষ্টাকারী এবং ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে এবং যতদিন পর্যন্ত  দাবি বাস্তবায়ন না হচ্ছে ধর্ষণবিরোধী মঞ্চ তাদের কর্মসূচি বহাল রাখবে বলেও জানানো হয়। গতকাল সকালেও একাধিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের খণ্ড খণ্ড মিছিল করতে দেখা গেছে। একইসঙ্গে ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করেছে একাধিক বিভাগের একাধিক ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। প্রায় ২০টিরও অধিক   বিভাগের বিভিন্ন ব্যাচ ধর্ষকদের বিচার না হওয়া অবধি তাদের ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। এসব বিভাগের মধ্যে আছে ইংরেজি, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র অধ্যয়ন, দর্শন, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন বিভাগ, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, সংগীত, আইআর, ভূগোল এবং পরিবেশ, ইতিহাস, বাংলা ও বিজ্ঞান অনুষদের কয়েকটি বিভাগ রয়েছে। সহিংসতার ঘটনায় ছাত্রসংগঠনগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অব্যাহতভাবে ধর্ষণের প্রতিবাদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সারা দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের পক্ষ থেকে দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলমকে বার্তা প্রেরক করে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এমনটা জানানো হয়। দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদলের এই কর্মসূচি পালিত হয়।

উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি এস এম ফরহাদ ও সেক্রেটারি মহিউদ্দীন খান দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীরা ছিলেন সম্মুখ সারির যোদ্ধা। তথাপি ফ্যাসিবাদ পরবর্তী বাংলাদেশে এখনো নারীরা প্রতিনিয়ত নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিবছর নারী দিবস আসলে নারী নিরাপত্তা নিয়ে অনেক আলোচনা শুনলেও কার্যত সমাজে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করে নারীদের জন্য নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। তাই ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে প্রথম নারী দিবসের মূল লক্ষ্যই হোক নারীদের অধিকার নিশ্চিত করে একটি নিরাপদ সমাজ গঠন। নারী নির্যাতনসহ সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই আমরা সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করুন এবং নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার বলেন, ফ্যাসিবাদী প্রশাসনিক কাঠামো ভাঙতে না পেরে আমাদের রাষ্ট্র নারীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বয়স, পেশা, ধর্ম নির্বিশেষে নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে, তাদের হত্যা করা হচ্ছে। নারীরা নিজের ঘরে নিরাপদ না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ না, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নারীর প্রতি ঘটা সহিংসতাকারীদের শনাক্ত করতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়, আটক করলেও জামিনে ছেড়ে দেয়া হয়। আইন মোতাবেক সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড লিখিত থাকলেও তা কার্যকর করা হয় না। আমরা মনে করছি কাঠামোগতভাবে এই রাষ্ট্র ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম না, আমরা মনে করি আইনগত দুর্বলতা বাংলাদেশে ধর্ষক তৈরি করে। আমরা এখানে দাঁড়িয়েছি ধর্ষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে, নারীবিদ্বেষী আগ্রাসী মব, বিচারহীনতার বিরুদ্ধে। এমতাবস্তায়, আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে ধর্ষকদের শ্রেণি, বয়স, পেশা, ক্ষমতা নির্বিশেষে দ্রুততম সময়ে শনাক্তকরণ  করতে হবে, আটক করতে হবে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমাবেশ করেছে ঢাবি শিক্ষকদের একাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন ও সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের আয়োজনে এই সমাবেশ হয়। এতে ঢাবি’র বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যোগ দেন। কাছাকাছি সময়ে রাজু ভাস্কর্যে মিছিল করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ সমাবেশে ঢামেকের অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব বলেন, যারা ধর্ষণ করে এবং যারা এদের মদত দেয় তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এর আগে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় ধর্ষণের সেঞ্চুরি করা হয়েছে। ধর্ষককে রাজনৈতিক দল এবং নির্বাহী ক্ষমতা যারা ছিল তারা তাকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে। ভোট না দেয়া কারণে উলঙ্গ করে ভিডিও বানিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। এমনটা আর হতে দেয়া যাবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি  শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল উদ্বেগ জানিয়েছে। সাদা দল বলেছে, এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় দেশবাসীর ন্যায় আমরাও গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছি। মাগুরার আট বছরের মেয়ে শিশুর ধর্ষক ও ধর্ষণের সহযোগিতাকারীদের অপরাধ এক ও অভিন্ন। এদের সর্বোচ্চ শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। এরকম ধর্ষক নামের নিকৃষ্টদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিভাগগুলোর মিছিলে যোগ দিয়েছেন শিক্ষকরাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ, সারা দেশে নারীদের ওপর ধর্ষণের নামে যে নারকীয় নির্যাতন চলছে তার জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

mzamin

বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল শোধনাগার স্থাপনে কুয়েতকে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

কুয়েতের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এসইজেড) বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ ছাড়াও আগামী ৭ থেকে ৯ই এপ্রিল ঢাকায় অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলনে দেশটির বিনিয়োগকারীদের অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানান তিনি। গতকাল ঢাকায় নবনিযুক্ত কুয়েতের রাষ্ট্রদূত আলি তুনইয়ান আবদুল ওয়াহাব হামাদাহ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আহ্বান জানান। এসময় কুয়েতি রাষ্ট্রদূতকে ড. ইউনূস বলেন, বিনিয়োগ সম্মেলনে কুয়েত থেকে বিনিয়োগকারীদের নিয়ে আসুন। এটি উভয় দেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। সাক্ষাৎকালে তারা বিনিয়োগ, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অভিবাসী কল্যাণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে কূটনৈতিক, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্রদূতকে স্বাগত জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশ ও কুয়েতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে আরও সহযোগিতার আহ্বান জানান। ড. ইউনূস বলেন, কুয়েত ও বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের বন্ধু।

এখানে বিনিয়োগের অনেক সুযোগ রয়েছে, বিশেষ করে হালাল খাদ্য শিল্প একটি সম্ভাবনাময় খাত। হালাল খাদ্যের বৈশ্বিক বাজার অনেক বড়। আমি আপনাকে এই উদ্যোগে তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করতে উৎসাহিত করছি। রাষ্ট্রদূত হামাদাহ কুয়েতের প্রধানমন্ত্রী শেখ আহমেদ আবদুল্লাহ আল-আহমদ আল-সাবাহ এবং কুয়েতের জনগণের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। তিনি বলেন, আমরা একসঙ্গে কাজ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। উভয় পক্ষ বাংলাদেশে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বাড়ানো নিয়ে আলোচনা করেন, যা দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে।

প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশে একটি যৌথ উদ্যোগে অপরিশোধিত তেল শোধনাগার স্থাপনের জন্য কুয়েতকে বিনিয়োগের আহ্বান জানান এবং উপসাগরীয় তেল-সমৃদ্ধ দেশটিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধানের পরামর্শ দেন। তিনি কুয়েতে বাংলাদেশি শ্রমিক বিশেষ করে নারী কর্মীদের জন্য আরও ভালো কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি কুয়েতের সঙ্গে বাংলাদেশের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং কুয়েতে কর্মরত বাংলাদেশি সামরিক সদস্যদের পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেন। উভয় পক্ষ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের অংশীদারিত্ব পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আমরা বাণিজ্য, জ্বালানি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সমপ্রসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

mzamin

মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে হেলিকপ্টারে উড়লেন জুলহাস by রিপন আনসারী

জুলহাস মোল্লা। বর্তমানে টক অব দ্য মানিকগঞ্জ। সমপ্রতি নিজের তৈরি করা আরসি বিমান আকাশে উড্ডয়ন করার মধ্যদিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন দেশ জুড়ে। শিক্ষাগত যোগ্যতায় এসএসসি পাস করা জুলহাস বিমান আবিষ্কার করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের ষাটঘর তেওতা গ্রামের এই যুবক এরই মধ্যে গ্রামের মানুষের মাথার মুকুট হয়ে উঠেছেন। যাকে নিয়ে গ্রামবাসীর গর্বের অন্ত নেই। এলাকাবাসীও বুঝতে পারেনি তাদের গ্রামে এমন রত্ন রয়েছে যে কিনা বিমান আবিষ্কারের মাধ্যমে অসাধ্যকে সাধন করতে পেরেছেন।

সরজমিন প্রতিভাবান যুবক জুলহাসের গ্রামে গিয়ে দেখা গেল অন্যরকম এক চিত্র। বিমান তৈরি করে ইতিহাস সৃষ্টি করা জুলহাসের গ্রামের বাড়ির ঠিকানা নিজ এলাকার বেশির ভাগ মানুষেরই অজানা ছিল। কিন্তু তার এই কারিশমা প্রকাশ পাওয়ায় ছোট্ট শিশুটিও এক বাক্যে বলে দিতে পারে জুলহাসের বাড়ির ঠিকানা। ৮০ বছরের ওসমান মোল্লা বলেন, আমি অবাক হয়ে গেছি ছোট্ট একটি ছেলে কীভাবে একটি বিমান আবিষ্কার করতে পারলো। আমার ৮০ বছরের জীবনে আমি এমনটা কখনোই দেখিনি। তেওতা  সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শরৎচন্দ্র হালদার বলেন, এমন মেধাবী ছেলে আমাদের এলাকায় লুকিয়ে ছিল সেটা এতদিন জানতাম না। সামান্য এসএসসি পাস করা জুলহাসের অবিশ্বাস্য এই আবিষ্কার নতুন প্রজন্মকে আরও বেশি উৎসাহিত করবে। আসলে প্রতিভা কখন কার ভেতর ফুটে ওঠে সেটা নির্ভর করে আল্লাহর ওপর। জুলহাসের বিমান আবিষ্কার এবং আকাশে উড্ডয়নের কথা শুনে শুধু আশপাশের এলাকার মানুষজনই নন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসে।

স্বপ্ন পূরণ হলো জুলহাসের: অবশেষে সত্যিকারে  বিমানে ওঠার স্বপ্ন পূরণ হলো যমুনা নদীর পাড়ঘেঁষা  ষাটঘর তেওতা গ্রামের তরুণ উদ্ভাবক জুলহাসের। রোববার দুপুরে তার সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন বিমান বাহিনীর সাবেক পাইলট ক্যাপ্টেন আব্দুল আল ফারুক। শুধু জুলহাসই নন তার মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে কিছু সময়ের জন্য আকাশে উড্ডয়ন করেন ক্যাপ্টেন আব্দুল আল ফারুক। এ সময় হাজার হাজার উৎসুক মানুষ যমুনার পাড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এ সময় বিমান বাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আল ফারুক সাংবাদিকদের বলেন, এই মুহূর্তে জুলহাসের কোনো ঝুঁকি নেয়া যাবে না। আপাতত ছোট ছোট ফ্লাই সে করতে পারে। প্রথমে তার টেকনিক্যাল জ্ঞান দরকার। তা না হলে এটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তাই আবিষ্কারটা নিয়ে তাকে সিস্টেম ওয়েতে এগিয়ে যেতে হবে। জুলহাস যেহেতু বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেছে। সে তো প্রাইভেট পড়াশোনার মাধ্যমে বিমান চালানোর লাইসেন্স পেতে পারে। এ সময় তরুণ উদ্ভাবক জুলহাস মোল্লা বলেন, আমি প্রথমে রিমোট কন্ট্রোল বিমান বানিয়েছিলাম। এরপর আমার ইচ্ছা হলো আরসি বিমান আবিষ্কার করার। টানা চার বছর গবেষণা করেছি। মাঝে একটি বিমান বানিয়ে ছিলাম কিন্তু সেটি সফল হয়নি। তারপরও হাল ছাড়িনি। টানা এক বছর চেষ্টার পর আমার স্বপ্নের আরসি বিমানটি আবিষ্কার করি এবং আকাশে উড্ডয়ন  করতে সক্ষম হই। এ বিমানটি তৈরি করতে নগদ দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বিমানটি সর্বোচ্চ ৫০ ফিট উপরে উঠতে পারে। এর চেয়ে বেশি উড়তে গেলে ঝুঁকিপূর্ণ হবে। জুলহাস বলেন, আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে আরও গবেষণা করে জ্ঞান অর্জন করা। দেশের মানুষের জন্য এমন কিছু আবিষ্কার করতে চাই; যা মানুষের কাজে লাগবে। 

mzamin

আ'লীগের দু’পক্ষের দ্বন্দ্ব: প্রতিশোধ ও প্রভাব বিস্তার করতেই তিন ভাইকে খুন by মো. আলিউল আহসান কাজল

নিহত সাইফুল সরদার ছিলেন মাদারীপুরের খোয়াজপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। এই পদ ব্যবহার করে এলাকায় হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিরোধ্য। নিজের চাচা হোসেন সরদারকে গত বছর হাতুড়িপেটা করে পঙ্গু করে দেন। হোসেনও ছিলেন আওয়ামী লীগের লোক। শনিবার দুপুরে দু’পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে সাইফুলসহ তিনজন নিহত হয়। এ ঘটনায় শনিবার রাতেই মাদারীপুর সদর থানায় নিহতের মা সুফিয়া বেগম বাদী হয়ে হোসেন সরদারকে প্রধান আসামি করে ৪৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

সরজমিন জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে সদর উপজেলার খোয়াজপুরে কীর্তিনাশা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছিল সাইফুল। গত বছর খোয়াজপুর এলাকার বালু ব্যবসায়ী হোসেন সরদারকে (৬০) প্রকাশ্যে পিটিয়ে দুই পা ভেঙে দেন তিনি। এলাকায় সালিশ মীমাংসায় প্রভাব বিস্তার করতেন সাইফুল। অভিযোগ রয়েছে- মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনা ও প্রভাব বিস্তার করে হাটের ইজারা নিয়েছিলেন তিনি। এলাকায় হিটার সাইফুল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সদর থানায় এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ৭টি মামলা রয়েছে। কিছুদিন জেল খেটে আবার শুরু করতেন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। এসব ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই হোসেনের নেতৃত্বে সাইফুল গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান। শনিবার সাইফুল (৩৫), তার ভাই আতাউর সরদার (৪০) এবং চাচাতো ভাই পলাশ সরদারকে (১৫) কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দু’ভাগে বিভক্ত ছিল জেলা আওয়ামী লীগ। এক পক্ষের নেতৃত্ব দিতেন সাবেক নৌ-পরিবহন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শাজাহান খান এবং অপরপক্ষের নেতৃত্ব দিতেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাসিম। সাইফুল নাসিম সমর্থিত খোয়াজপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। আর হোসেন ছিলেন শাজাহান খান সমর্থিত আওয়ামী লীগ নেতা। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সিন্ডিকেট ও খোয়াজপুর-টেকেরহাট বাজারের ইজারা দখল নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। গত বছরের পা ভাঙার প্রতিশোধ ও পুরো সিন্ডিকেট দখলে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন হোসেন সরদার। এ নিয়ে মাসখানেক আগে দু’গ্রুপের মধ্যে হামলা ভাঙচুরেরও ঘটনা ঘটে। শনিবার সাইফুল ও তার ভাই আতাউর সরদারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে হোসেন সরদারের লোকজন। গুরুতর আহত হয় আরেক ভাই অলিল সরদার ও চাচাতো ভাই পলাশ সরদার (১৫)সহ আটজন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পলাশের মৃত্যু হয়।

সাইফুলের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় জানান, এক সময় এলাকায় খুব প্রভাব ছিল সাইফুলের। বিভিন্ন বিচার সালিশিও করতেন তিনি। মানুষ তার কথা মানতো। সম্প্রতি সাইফুল লোকজন নিয়ে হোসেনের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে তার লোকজনকে মারধর করে। হোসেনের লোকজন আবার সাইফুলের এক মামাকে তুলে নিয়ে মারধর করে। সেই ঘটনা মাসখানেক আগে মীমাংসাও হয়ে গেছে। নিহতের স্ত্রী জানান, আমার স্বামী ড্রেজারের ব্যবসা করতো। সরকারের কাছ থেকে হাট ইজারা নিয়েছিল। হাট ঘাট ব্যবসা-বাণিজ্য দখল করে নেয়ার জন্য তারা তাকে হত্যা করেছে। হোসেন জমি বিক্রি করে এলাকার সমস্ত লোকজন নিয়ে রামদা, সেনদা-অস্ত্রশস্ত্র্ত্র নিয়ে আমাদের বাড়ির তিন দিক থেকে আক্রমণ করে। আমরা পালানোর চেষ্টা করি। পরে আমাদের বাড়ি-ঘর লুটপাট করে আগুন দিয়ে দেয়। আমার স্বামীসহ আমার দুই ভাসুরকে মেরে ফেলে। ছোট ভাই পলাশকেও মেরে ফেলে।

এ বিষয়ে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ভাস্কর সাহা জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি বালু ব্যবসা ও পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই ঘটেছে। এই মামলার ভিকটিম সাইফুল তার বংশীয় চাচা হোসেন সরদারকে পিটিয়ে পা ভেঙে দেন। সেই ঘটনায় মামলা হলে জেলা পুলিশ তাকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সাইফুলের মা সুফিয়া বেগম বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। আসামিদের গ্রেপ্তার করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মূলত বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতেই এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। 

mzamin

ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড!

এক কিলোগ্রাম মাদক দ্রব্য (৩, ৪ মিথালেনিডাই অক্সিমেথামফেটামিন) এমডিএমএ সরবরাহ দেয়ার অভিযোগে মৃত্যুর ঝুঁকিতে এক বৃটিশ। তিনি পেশায় একজন ইলেকট্রিশিয়ান। যদি আদালতে অভিযুক্ত প্রমাণিত হন তাহলে তাকে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ আসতে পারে। ওই বৃটিশ ইলেকট্রিশিয়ানের নাম টমাস পার্কার (৩২)। তার বাড়ি কামব্রিয়াতে। ওয়াকিংটনের কাছে সিয়াটন গ্রামে তার বসত। এ বছর জানুয়ারিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মাদক সরবরাহ দেয়ার অভিযোগে। এরপর বিশ্ব মিডিয়ার সামনে তাকে হাজির করা হয় কমলা রঙের জাম্পস্যুট পরিহিত অবস্থায়। পুলিশ বলেছে, তিনি ‘এ শ্রেণির’ মাদক ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। ওই মাদক ডাকে আসা একটি প্যাকেজে পাওয়া গেছে। যদি অভিযুক্ত প্রমাণ করা যায় তাহলে ফায়ারিং স্কোয়াডে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল। পার্কারের একজন সদস্য বলেছেন, টমাস পার্কার এখন যে করুণ অবস্থায় আছেন সে সম্পর্কে তাদের বলার কিছু নেই।  কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি নীরব কামব্রিয়ান গ্রামটিতে। স্থানীয় একজন ব্যক্তি বললেন, সিয়াটন একটি ছোট্ট ভালোবাসাময় গ্রাম। সেখানকার অনুগত একজন মানুষ পার্কার। টমাস পার্কারের বিষয়ে আসলে কী হয়েছে সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। ওই ব্যক্তি পরিবারটির জন্য বেদনা বোধ করেন। বলেন, তাদের এমন প্রাপ্য হওয়ার কথা ছিল না। কি এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার!

উল্লেখ্য, স্টেনিবার্ন স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন টমাস পার্কার। পরে তিনি লিভিহলে লেকস কলেজে পড়াশোনা করেন। তারপর একজন ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। অস্ট্রেলিয়াতে অভিবাসী হন। উল্লেখ্য, পার্টিতে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী মাদক হিসেবে এমডিএমএ প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। জানুয়ারিতে একটি বাসার বাইরে থেকে গ্রেপ্তার করা হয় টমাস পার্কারকে। কিন্তু বিষয়টি এতদিন কেউ জানতে পারেনি। এ সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলনে মাত্র পার্কারকে হাজির করা হয়। এ সময় তার মুখ ছিল সেভ করা। হাতে ছিল হ্যান্ডকাফ পরানো। এ সপ্তাহে বৃটেনের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের এক মুখপাত্র বলেছেন, বালিতে একজন বৃটিশকে আটক করা হয়েছে। তাকে আমরা সাপোর্ট দিচ্ছি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখছি আমরা।

কর্তৃপক্ষ বলছে, টমাস পার্কারকে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার বিষয়টি নজরে আসে কর্মকর্তাদের। ২১শে জানুয়ারি একজন মোটরসাইকেল ট্যাক্সিচালকের কাছ থেকে তিনি একটি প্যাকেজ সংগ্রহ করেন। এরপর তার আচরণ সন্দেহজনক দেখা যায়। এরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার আগে পার্কারের দিকে অগ্রসর হয় পুলিশ। কিন্তু ওই প্যাকেজটি ফেলে ভয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালাতে থাকেন পার্কার। পরে তাকে নর্থ কুতা’য় ‘৭ সিস ভিলায়’ শনাক্ত করা হয়। পুলিশ দেখতে পায়, ফেলে যাওয়া প্যাকেজটি পার্কারের। আটকের পর তিনি স্বীকার করেন এই প্যাকেজ তারই ছিল। পুলিশ বলেছে, তারা ওই প্যাকেজটি খুলে তার ভেতর হালকা বাদামি পাউডার দেখতে পায়। পরে সেটা এমডিএমএ হিসেবে শনাক্ত হয়। টমাস পার্কারকে জানুয়ারিতে রিমান্ডে নেয়া হয়।

বর্তমানে অভিযোগ, তিনি মাদক আমদানি করেন। পাচার করেন। মাদক রাখেন। এসব অভিযোগে অভিযুক্ত হলে পার্কারের মৃত্যুদণ্ড হতে পারে ইন্দোনেশিয়ার আইনে। তার বিরুদ্ধে মাদকের বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। ওদিকে টমাস পার্কারের ফোন ও অন্য জিনিসপত্র একটি প্লাস্টিকের সিল করা ব্যাগে রাখা হয়েছে। প্রমাণ হিসেবে এসব উপস্থাপন করার কথা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রুডি বলেন, অনুসন্ধান ও গ্রেপ্তার অভিযানের পর টমাস পার্কার ও তার সঙ্গে তথ্যপ্রমাণ আরও তদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে বালি প্রভেন্স ন্যাশনাল নারকোটিকস এজেন্সির অফিসে। এই এজেন্সির প্রধান বলেছেন, আন্তর্জাতিক মাদকের ডিলারদের অন্যতম সদস্য পার্কার। এই সংগঠনটি হাঙ্গেরিভিত্তিক। টমাস পার্কার বলেছেন, তার বস তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, থাইল্যান্ড থেকে একটি প্যাকেজ যাবে বালিতে। তা যেন তিনি সংগ্রহ করেন।

কর্তৃপক্ষ বলছে, যে পার্সেল গ্রহণ করেছেন পার্কার তাতে আছে এমডিএমএ। এ জিনিসটি ইন্দোনেশিয়ায় বেআইনি এবং শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। পার্কারকে রিমান্ডে নিরাপদ হেফাজতে রাখা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে সেখানেই থাকতে হবে তাকে। এর মধ্যে ওই প্যাকেজটি কে পাঠিয়েছিল, তা জানার চেষ্টা করে বালি কর্তৃপক্ষ। এ জন্য তারা পার্কারকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করবে। যদি জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সহযোগিতা করেন, তাহলে তার শাস্তি লঘু হতে পারে।

mzamin

অনলাইনে প্রেম, সাবধান!

অচেনা মানুষের সঙ্গে অনলাইনে পরিচয়ের ফল কখনো কখনো এত্ত ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে তার এক বাস্তব উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্যের  বালিকা মিরান্ডা করসেট (১৬)। তার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে স্টিফেন গ্রেস (৩৫) ও তার সঙ্গী মিচেল ব্রান্ডেস (৩৭) হত্যা করেছে মিরান্ডাকে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। অনলাইনে পরিচয়ের সূত্রে মিরান্ডাকে অপহরণ করে তারা। এরপর কৌশলে ফেলে তার মুখের ভিতর বল প্রবেশ করিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এতে জড়িত থাকার অভিযোগে স্টিফেন গ্রেস ও তার সঙ্গী ব্রান্ডেসকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উল্লেখ্য,  গাল্ফপোর্টে নানীর সঙ্গে বসবাস করতেন মিরান্ডা। ২৪শে ফেব্রুয়ারি থেকে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। তদন্তকারীরা পরবর্তীতে জানতে পারেন, গ্রেস নামের এক ব্যক্তি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে মিরান্ডাকে প্রলুব্ধ করে। ১৪ই ফেব্রুয়ারি প্রথম গ্রেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মিরান্ডার। তার বসবাস ছিল এসটি পিটার্সবার্গের অ্যাপার্টমেন্টে। সেখানে সারাদিন এক সঙ্গে অতিবাহিত করে তারা।

এরপর মিরান্ডাকে তার নানীর বাড়ি রেখে আসে গ্রেস। পরের দিন পুনরায় গ্রেসের বাড়ি চলে যায় মিরান্ডা এবং সেখানে এক সঙ্গে সময় কাটায়। এক সপ্তাহের মতো তাদের সঙ্গে সময় কাটায় মিরান্ডা। তবে ২০শে ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। গ্রেস ও ব্রান্ডেস একটি আংটি চুরির অভিযোগ আনে মিরান্ডার বিরুদ্ধে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাক-বিতণ্ডা শুরু হয় তাদের মধ্যে। কর্তৃপক্ষ বলছে, মিরান্ডা’কে তার মতের বিরুদ্ধে এক সপ্তাহের বেশি সময় আটকে রাখা হয়। তদন্তে জানা যায়, গ্রেস ও ব্রান্ডেস তাকে লাগাতার প্রহার করে। এক পর্যায়ে তার মুখে জোরপূর্বক বিলিয়ার্ড বল ঢুকিয়ে দিয়ে মুখ বেঁধে দেয়। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, মিরান্ডা’কে ২০-২৪ শে ফেব্রুয়ারির মধ্যেই হত্যা করা হয়। হত্যার পর তার মৃতদেহটি গাড়িতে করে একটি বাড়িতে রেখে আসে গ্রেস। মৃতদেহটি সেখানে কয়েক খণ্ড করা হয় বলে জানায় তদন্তকারীরা। মৃতদেহের কিছু অংশ হিলসবরো কাউন্টির রাসকিনে একটি ডাম্পস্টারে (বর্জ্য ফেলার পাত্র) ফেলে আসা হয়। তদন্তের সাপেক্ষে গ্রেসের নামে খুন ও অপহরণের মামলা দায়ের করা হয়। এদিকে শনিবার সকালে আত্মসমর্পণ করে ব্রান্ডেস। তার বিরুদ্ধেও একই মামলা করা হয়।

mzamin

সহায়তা কমলে তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বলছেন, আগামী মাস থেকে অর্ধেক রেশন কমানোর মার্কিন সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন তারা। কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা কমানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং এতে সামাজিক ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। এ খবর দিয়েছে এবিসি নিউজ।

এতে বলা হয়, ক্ষমতায় এসেই বেশিরভাগ বিদেশি সহয়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এছাড়া তিনি মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি’র কার্যক্রমও ভেঙে দিয়েছেন। যার ফলে বিশ্বব্যাপী মানবিক খাতগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ২০ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের পর এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ৯০ দিনের জন্য ওই তহবিল স্থগিত করেছেন ট্রাম্প।

জাতিসংঘের প্রধান খাদ্য সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) সম্প্রতি জানিয়েছে, বাংলাদেশের কক্সবাজারে আগামী ১লা এপ্রিল থেকে রেশন কমানো হবে। এতে তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালের আগস্টের শেষের দিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিধন অভিযান শুরু হওয়ার পর একসঙ্গে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আসেন। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে মুসলিম রোহিঙ্গারা জাতিগত বৈষম্যের সম্মুখীন হয়। তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয় হয়।

পরে ২০২১ সালে দেশটিতে সামরিক শাসন জারি হয়। এরপর থেকে সেনা সরকারের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে দেশটির বেশ কয়েকটি বিদ্রোহী গ্রুপ। এতে সেখানে এখনও গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান। ডব্লিউএফপি যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কিনা তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। বাংলাদেশের অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শামসুদ দৌজা বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, আমরা একটি চিঠি পেয়েছি। যেখানে বলা হয়েছে যে, রোহিঙ্গাদের জন্য আগে যে বরাদ্দ ছিল তা কমিয়ে অর্ধেক করতে হবে।

প্রতিমাসে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের বরাদ্দ ছিল ১২ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার। কমিয়ে সেটা ৬ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে ডব্লিউএফপি। এতে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, খাদ্য সহায়তা কমানোর ফলে তাদের পুষ্টিকর খাবার কমে যাবে। যাতে পুষ্টির অভাব দেখা দিতে পারে।

এর ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সামাজিক ও মানসিক চাপ তৈরি হবে। এখন তাদের জন্য খাবারের বিকল্প খুঁজতে হবে বলেও মনে করেন শামসুদ দৌজা। খাদ্য সহায়তা কমানোর সাথে সাথে অন্যান্য খাতেও বরাদ্দ কমানো হয়েছে। তবে ডব্লিউএফপি’র খাদ্য সহায়তা কমানোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন তহবিল স্থগিতের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা সে বিষয়ে কিছুই বলেননি সংস্থাটির ওই কর্মকর্তা।  

mzamin