Saturday, January 29, 2011

গল্প- বট মানে গরুর ভুঁড়ি by নাসিমা আনিস

দ্বিতীয় বিয়েটা করেছিল একটা কারণেই, পরিষ্কার হাতে ভুঁড়ি ধুয়ে খাওয়াবে। এমনভাবে পরিষ্কার করবে যেন পরিষ্কার করার পরই কাঁচা ভুঁড়ি কচকচ করে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা হয়। বিয়ে করার সময় শর্তও দিয়েছিল—সিগরেট খাই না, বিড়ি খাই না, পানও খাই না, খাই একটু বট। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন গরুর বট পরিষ্কার করন লাগব, গাইগুই করলে চলবে না।

তদন্ত কমিটির কার্যক্রম শুরু

পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার কমিটি তাদের পরিচিতি পর্ব শেষ করেছে।
গতকাল বিকেলে কমিটির প্রধান ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ কমিটির অপর দুই সদস্যকে নিয়ে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতি পর্ব শেষ করেন। এসইসি এই কমিটিকে সাচিবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেবে।
কমিটির প্রধান ইব্রাহিম খালেদ টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার বলেছে, এসইসি আমাদের সাচিবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেবে। এসইসির অনেকের সঙ্গে আমাদের ভালো পরিচয় নেই। তাই আমরা আজ তাঁদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরিচয় পর্ব শেষ করেছি।’
কমিটির প্রধান জানান, পরিচিতি বৈঠকে তাঁরা এসইসির কর্মকর্তাদের কাছে রোববার থেকে কাজ শুরুর আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। প্রয়োজনীয় সহায়তাও চেয়েছেন। তিনি আরও আশা করছেন, রোববার থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করা যাবে।
জানা গেছে, তদন্ত কমিটির দপ্তর হবে এসইসিতে। একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে কমিটি তাদের কাজ শুরু করবে। আগামী রোববারের মধ্যেই এই কর্মপরিকল্পনা তৈরি হতে পারে বলে কমিটির প্রধান জানান।
গত বুধবার বিকেলে সরকারের নির্দেশে এসইসি তিন সদস্যের কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে তদন্তকাজের জন্য কমিটিকে ১১টি কার্যপরিধি ঠিক করে দেওয়া হয়। এর বাইরে কমিটি চাইলে বাজারসংশ্লিষ্ট যেকোনো ব্যক্তির (সুশীল সমাজের সদস্যসহ) সাক্ষ্য নিতে পারবে। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, সরকার চাইলে কমিটিতে অন্য যেকোনো সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
বাজার পরিস্থিতি: গতকাল সপ্তাহের শেষ দিনে শেয়ারবাজার কিছুটা স্বাভাবিক ধারায় ফিরেছে। আগের দুই দিন অনেকাংশে বিক্রেতাশূন্য ছিল বাজার। মঙ্গল ও বুধবার লেনদেনের শুরুতেই বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম দিনের সর্বোচ্চ সীমায় (সার্কিট ব্রেকার) পৌঁছে যায়। এতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাধারণ সূচক বাড়ে প্রায় ৯৫৪ পয়েন্ট। বাজার বিশ্লেষকেরা বলেছেন, একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বাজারের ওই আচরণ ছিল স্বাভাবিক।
তবে গতকাল বাজার যে আচরণ করেছে, সেটিকে অনেকটা পরিণত আচরণ বলে মনে করেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) নেতারা। তাঁরা বলেন, বৃহস্পতিবার বাজারে পর্যাপ্ত ক্রেতা-বিক্রেতা ছিল, যে কারণে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে।
ডিএসই: আগের দুই দিন যথাক্রমে ২০৬ ও ৫৮৮ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। আর গতকাল লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৩০ কোটি টাকার বেশি। ঢাকার বাজারে এদিন ২৫৭টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ১৩৯টির ও কমেছে ১১৫টির। অপরিবর্তিত ছিল তিনটির দাম। দিন শেষে সাধারণ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে প্রায় ১০৬ পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে সাত হাজার ৩৮৬।
সিএসই: চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) গতকালও কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রেতাশূন্য ছিল। দিন শেষে সিএসইর সার্বিক সূচক প্রায় ৯০ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৯৬৫ পয়েন্টে।
গতকাল সিএসইতে ১৮৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয়। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৭৬টির এবং কমেছে ১০০টির। অপরিবর্তিত ছিল ১৩টির দাম। এদিন ১২৬ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। আগের দিনের তুলনায় তা ১৭ কোটি টাকা বেশি।
বিএমবিএর সভা: এদিকে গত কয়েক দিনের শেয়ারবাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গতকাল বিকেলে সভা করেছেন মার্চেন্ট ব্যাংকার্সদের সংগঠন বিএমবিএর নেতারা। রাজধানীর মতিঝিলের পূর্বাণী হোটেলে অনুষ্ঠিত সভা শেষে এক সংবাদ সম্মেলনও করা হয়। তাতে বিএমবিএর নেতারা বলেন, বর্তমান বাজার আশানুরূপ আচরণ করছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে। গতকালের বাজার বেশ পরিপক্ব আচরণ করেছে বলেও দাবি করেন সংগঠনটির নেতারা। এভাবে চলতে থাকলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলেও মত দেন তাঁরা।

আলু রপ্তানিতে ২০% নগদ সহায়তা প্রদানের সুপারিশ

চাহিদার অতিরিক্ত আলু বিদেশে রপ্তানিতে উৎসাহিত করতে ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থের পাশাপাশি নীতিগত সহায়তা দেবে সরকার।
গতকাল বৃহস্পতিবার আলু রপ্তানিতে নগদ সহায়তা প্রদানসংক্রান্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এই সুপারিশ করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে।
সভায় আগামী পাঁচ বছরের জন্য আলু রপ্তানিতে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া আলুর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে পটেটো ফ্লেক্স শিল্প চালুর উদ্যোগ, টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বিশেষ ধরনের আলুর উৎপাদন ও আলুর রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের সভাপতিত্বে সভায় বাণিজ্য সচিব গোলাম হোসেন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (রপ্তানি) মনোজ কুমার রায়, বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন, ভাইস চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী, আলু রপ্তানিকারক ও গবেষক ফেরদৌসী বেগমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, গত অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৮৪ লাখ মেট্রিক টনের বিপরীতে প্রায় ৯০ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়। এ বছরও একই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এবার আলুর ফলন এক কোটি মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগারের ধারণক্ষমতা আগের চেয়ে ১০ লাখ মেট্রিক টন বেড়েছে। অর্থাৎ বর্তমান ধারণক্ষমতা ৩৬ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সরকারের সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে রপ্তানি কয়েক গুণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সভায় ব্যবসায়ীরা আশা প্রকাশ করেন।
২০০৯-১০ অর্থবছরে ২০ হাজার মেট্রিক টন আলু রপ্তানি করে ৩৫ লাখ ডলার আয় হয়েছে। প্রধানত মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাইয়ে আলু রপ্তানি হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও ইউরোপে বাংলাদেশের আলুর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। প্রতিবছর যে পরিমাণ আলু বিদেশে রপ্তানি করা হয়, তার মধ্যে গ্রানুলা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া রয়েছে আটলান্টা, স্পুন্টা, ডায়মন্ড ও মাল্টা।

বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী পথে তিন দিন পর বাণিজ্য শুরু

টানা তিন দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে বাংলাদেশের পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা ও ভারতের ফুলবাড়ী স্থলবন্দর দিয়ে আবার আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ভারতীয় শ্রমিকেরা ধর্মঘট ডাকায় আগের তিন দিন এই পথে ভারত ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ ছিল। নেপালি পণ্যবাহী ট্রাকগুলো থেকে জিরো পয়েন্টে লোড-আনলোড করার দাবিতে ভারতীয় শ্রমিকেরা গত সোমবার থেকে ধর্মঘট পালন করে আসছিলেন।
নেপালি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ভারতীয় কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলে বাংলাদেশি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা সাংবাদিকদের জানান, ভারত ও নেপালি কাস্টমস, স্থানীয় কংগ্রেস ও সিপিএম নেতা, আমদানি-রপ্তানিকারক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও শ্রমিকদের নিয়ে ফুলবাড়ীতে গতকাল বৃহস্পতিবার সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এই বৈঠকে শ্রমিকদের জানানো হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী ভারতীয় ও নেপালি পণ্যবাহী সব ট্রাক বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ওয়্যারহাউসে আনলোড হওয়ার কথা। তা করা না হলে চুক্তির বরখেলাপ হবে। এই বক্তব্য শুনে ভারতীয় শ্রমিকেরা কোনো রকম শর্ত ছাড়াই ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন বলে জানা গেছে।
বাংলাবান্ধা বন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজাউল করিম রেজা প্রথম আলোকে জানান, ভারতীয় শ্রমিকেরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিলে বেলা তিনটায় নেপাল থেকে আসা ৩০০ টন মসুর ডালবাহী ১৭টি ট্রাক বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ওয়্যারহাউসে প্রবেশ করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে চার ট্রাক ব্যাটারি ও এক ট্রাক তুলা ভারতের ফুলবাড়ী ওয়্যারহাউসে প্রবেশ করে।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ইন্সপেক্টর আল আহসান হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা থেকে স্থলবন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পণ্য আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক হয়েছে।
নেপালের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নবীন দাহাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে জানান, ভারত ও নেপালের কাস্টমস, স্থানীয় কংগ্রেস ও সিপিএম নেতা, আমদানি-রপ্তানিকারক-সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে ফুলবাড়ীতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শ্রমিকেরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এর ফলে তিন দিন বন্ধ থাকার পর বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা থেকে বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

ঢাকায় তিন দিনের ইন্দো-বাংলা বাণিজ্য মেলা ৫ মে থেকে

ঢাকায় ভারত ও বাংলাদেশের পণ্য নিয়ে ‘ইন্দো-বাংলা বাণিজ্য মেলা (আইবিটিএফ-২০১১)’ শীর্ষক একটি মেলা আগামী ৫ মে শুরু হবে। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠেয় এ মেলাটি ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (আইবিসিসিআই) আয়োজন করছে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন মেলা আয়োজন সহায়তায় করেছে।
মেলার বিস্তারিত জানাতে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি স্থানীয় হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ।
এ সময় আইবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি দেওয়ান সুলতান আহমেদ, ট্রিউন এক্সিবিশন অ্যান্ড ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের (টিমস) প্রধান নির্বাহী ও মেলার প্রধান সমন্বয়ক কাজী ওয়াহিদুল আলম ও টিমসের নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ কামাল উপস্থিত ছিলেন।
আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, এ বছর মেলার নাম পরিবর্তন করে ‘ইন্দো-বাংলা ট্রেড ফেয়ার’ করা হয়েছে। যাতে বেশিসংখ্যক স্থানীয় কোম্পানি অংশগ্রহণে উৎসাহিত হয়। এ বাণিজ্য মেলা কেবল দুই দেশের সম্পর্ককেই দৃঢ় করবে না, উপরন্তু বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
আইবিসিসিআইয়ের সভাপতি আরও বলেন, আগের মেলার মতো এবারও এ মেলাটি হবে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের প্রস্তুতকারী কোম্পানি ও রপ্তানিকারকের জন্য নিজস্ব পণ্য ও সেবা প্রদর্শনের একটি ভালো সুযোগ। এর মাধ্যমে উভয় দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে।
আইবিসিসিআইয়ের সভাপতি জানান, গত বাণিজ্য মেলার ফলে দুটি ভারতীয় কোম্পানি—এসআরএফ গ্রুপ ও অরভিন্দ ট্রেনিং প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে আরও এক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
গতবারের মতো এবারও মেলার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে টিমস। এবারের মেলায় কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিআইআই) ও ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনস (এফআইইও) সার্বিক সহায়তা করছে।

সংগীতগুরুর প্রয়াণে by দিঠি হাসনাত

যখন আমরা একজন গুণী শিল্পীর কাছে যাই, তখন শুধু সেই ব্যক্তির একটা নির্দিষ্ট পারফরম্যান্সই দেখি না; নির্দিষ্ট পারফরম্যান্সের সঙ্গে লুকিয়ে থাকে একজন ব্যক্তির বহু বছরের সাধনা, অভিজ্ঞতা।
আর এই উপলব্ধিটা অনেক বেশি সত্য উচ্চাঙ্গসংগীতের দিকপাল গুরু পণ্ডিত ভীমসেন যোশির মতো ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে। একটা এক ঘণ্টার রাগের খেয়াল গাওয়ার পেছনে তাঁর প্রতিদিনের ১৬-১৮ ঘণ্টার অদম্য সাধনা, অথবা সংগীতকে ভালোবেসে গুরুর খোঁজে ঘর ছেড়ে অনেক কষ্ট মেনে নেওয়া গুরুকে সন্তুষ্ট করার আপ্রাণ চেষ্টা লুকিয়ে থাকে।
আর তাঁর মৃত্যু তাই ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতজগতের জন্য অপূরণীয়। ২৪ জানুয়ারি সকালে তিনি পুনে শহরের শাহাদ্রি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। ১৯২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি কর্ণাটকে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই সংগীত তাঁকে এমনভাবে আকর্ষণ করে যে মাত্র ১১ বছর বয়সে গুরুর খোঁজে বাড়ি ছাড়েন। অনেক দোর ঘুরে তিনি রামপুরে পৌঁছান। সেখানে ওস্তাদ মুশতাক হুসেন খানের কাছে বছর খানেক কাটিয়ে লক্ষেৗতে ঠুমরির আন্দাজ নিতে তালিম নেন। তখন ডিসি দত্ত বলে আমিনাবাদের এক চায়ের দোকানের মালিকের গীত-গজল গাইয়ে হিসেবে খুব নামডাক ছিল। তাঁরই চেষ্টায় ভীমসেন রেডিওর স্টাফ আর্টিস্ট হন এবং ২৫ টাকা ফি-তে খেয়াল ও প্রধানত ভজন গাইতেন। তাঁকে পাওয়া যায় কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং পাহাড়ি সান্যালের কথোপকথনে... কুমারপ্রসাদ বলছেন তাঁর কুদরতি রঙ্গীবিরঙ্গী বইয়ে। এক অনুষ্ঠান শেষে ভীমসেনজি এসে পাহাড়ি সান্যালকে বলছেন, ‘আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি ওই ভীমসেন, যে আপনার বসন্ত রায় রোডের বাসায় থাকতাম।’ চলে গেলে পাহাড়ি সান্যাল কপাল চাপড়ে কুমারপ্রসাদকে বলছেন, ‘হা ভগবান, এই সেই ভীমসেন! জানিস, এই ব্যাটার তখন চাল নেই চুলা নেই, কলকাতা শহর বিদেশবিভূঁই, গান শেখার অসম্ভব শখ। বেশ কিছুদিন আমার বাড়িতে ছিল, ফাইফরমাশ খাটত। গানের গলা মোষের বাচ্চার মতো। আমি শুনেটুনে বললাম, তোমার বাছা হবে না। ভগবান তোমায় গলা দেননি, তুমি থাকো, খাও আমার বাড়িতে, চেষ্টাচরিত্র করে স্টুডিওতে একটা ছোটখাটো কাজের চেষ্টা করে দেখব। তা এই সেই ভীমসেন!’
এই গল্পটা থেকে বোঝা যাবে ভীমসেন যোশি কত পরিশ্রম করে আজকের অবস্থানে এসেছেন, অসাধারণ কণ্ঠ তৈরি করেছেন। একনিষ্ঠ সাধনার রেওয়াজের ফসল তাঁর এই গলা। দৈনিক ১০ ঘণ্টারও বেশি রেওয়াজ করেছেন তিনি। তাঁর রেওয়াজের নিয়মটা ছিল—সকালে মোষের দুধ খেয়ে খরজে পুরো একটি রাগ গেয়ে সেই রাগ বিকেলে মধ্য ও তার সপ্তকে তানের সঙ্গে নিয়মিত অভ্যাস করতেন।
যোশি কিরানা ঘরানার জন্য গর্ব ছিলেন। কিরানা ঘরানার দিকপাল শিল্পী ওস্তাদ আবদুল করিম খানের শিষ্য সওয়াই গন্ধর্বের কাছে তালিম নেন। ওস্তাদ আবদুল করিম খান হিন্দুস্তানি উচ্চাঙ্গসংগীত নান্দনিকতার ওপর প্রয়োগ করে উত্তর ভারতীয় সংগীতে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছেন। গোয়ালিয়র ঘরানার সংগীতগুরু ওস্তাদ হাফিজ আলী খান ভীষণ ভালোবাসতেন ভীমসেন যোশিকে। সওয়াই গন্ধর্বের কণ্ঠও একটু অন্য রকম ছিল। বংশগতভাবে তাঁর গলার নেতিবাচক দিকটিকেই তিনি ইতিবাচক শক্তিতে পরিণত করেছেন। ভীমসেন যোশিরও আওয়াজ লাগানোর পদ্ধতি একটু আলাদা ছিল। তাঁর আওয়াজ অনেক বলিষ্ঠ ছিল, তিনি চমৎকার ভলিউম কন্ট্রোল করতে পারতেন। ২০০৮ সালে ভারতের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘ভারতরত্ন’ পান তিনি। তাঁর প্লাটিনাম ডিস্ক বের হয় ১৯৮৬ সালে। ১৯৭২ সালে তিনি ‘পদ্মশ্রী’ পান, ‘সংগীত নাটক একাডেমি’ পান ১৯৭৬ সালে। ১৯৮৫ সালে তিনি ‘পদ্মভূষণ’ পান। তিনি শুধু খেয়ালই গাননি, ভজনও গেয়েছেন। তানসেন আখে, বসন্ত বাহার, ব্রাইডাল মাই ব্রাদার প্রভৃতি চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন। দূরদর্শনের জন্য তাঁর সংগীত আয়োজন মিলে সুর তুমহারা মেরা,
যেখানে পণ্ডিত রবিশংকর, হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, ওস্তাদ আমজাদ আলী খান প্রমুখ সংগীতের মহারথীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই আয়োজনটা বেশ জনপ্রিয় হয়।
ভীমসেনের জনপ্রিয় রাগ শুদ্ধ কল্যাণ, শংকরা ইমন, মূলতানি, পুরীয়, পুরিয়া ধানেশ্রী, মালকোষ, দরবারি। তিনি নিজেই ছিলেন একটা প্রতিষ্ঠানের মতো; নিজস্ব একটা স্টাইলের প্রবর্তন করেছিলেন। পণ্ডিত ভীমসেন যোশির মৃত্যু তাই পাঁচ দশকের তাঁর সংগীত সাধনার, পরম্পরার অবসান।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অব্যবস্থাপনা

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে এসবের প্রতিকার চেয়ে অবশেষে অর্থমন্ত্রীর শরণাপন্ন হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে লেখা এক দাপ্তরিক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান ঋণ অনুমোদন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদোন্নতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালকদের অযাচিত হস্তক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর এই উদ্বেগ মোটেই অমূলক নয়।
দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা চলছিল। এর জন্য পূর্বাপর সরকারের ভুল নীতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। সামরিক সরকারগুলো রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে মোটা অঙ্কের ঋণ মঞ্জুর করে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে।
আশা করা গিয়েছিল, গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ঘোষণাপত্রে যখন দিনবদলের কথা ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিল, দেশবাসী সত্যিকারভাবে দিনবদলই চেয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে, তাতে মনে হয় রথ উল্টো দিকেই ধাবিত হচ্ছে। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। নতুন সরকার এসে নতুন পর্ষদ করবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে ব্যাংকিং বিষয়ে অনভিজ্ঞ সদস্যের সংখ্যা বেশি হলে তা প্রতিষ্ঠানের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। যেকোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব আইন বা বিধি দ্বারাই নির্ধারিত। পর্ষদ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে। কাকে ব্যাংক-ঋণ দেওয়া হবে, কাকে দেওয়া হবে না, কাকে কোথায় বদলি করা হবে, কাকে পদোন্নতি দেওয়া হবে, সেসব ব্যাপারে পরিচালকদের কিছু বলার থাকতে পারে না। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া পরিচালকেরা এসব আইন-কানুনের তোয়াক্কা করেন না। তাঁরা গায়ের জোরে সবকিছু চালাতে চান। কোনো কোনো পরিচালক সদলবলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কক্ষে গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে কাজ আদায় করিয়ে নেন বলেও অভিযোগ আছে। এ ধরনের জবরদস্তি কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতে পারে না। অতীতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে অনেক লোকসান গুনতে হয়েছে জবরদস্তির কারণে। এখন এসব প্রতিষ্ঠানকে দেশি-বিদেশি বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকতে হবে।
অতএব, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। যাঁরা ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞ, কেবল তাঁদের নিয়েই পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। দলীয় লোকদের দিয়ে আর যা-ই হোক, ব্যাংক চলতে পারে না। আশা করি, অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সমস্যাটি অনুধাবন করবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। ব্যাংকিং খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সরকার দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির যে কুদৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, তার পুনরাবৃত্তি হবে দুর্ভাগ্যজনক। অতএব, সব দলীয় লোক বাদ দিয়ে পেশাদারি ব্যক্তিদের নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের বিকল্প নেই। যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। ব্যাংক চালাতে হবে আইন ও বিধি অনুযায়ী, কারও খেয়ালখুশি মতো নয়।

যে তাহেরকে আমি জানতাম ব্য লরেন্স লিফশুলজ

তাহেরের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭৪ সালে। আমি তখন বাংলাদেশেই বাস করছি। ওই বছরে প্রচণ্ড বন্যায় দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় শস্য। রংপুর এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল বেশি। পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে জমির ফসল ছিল পানির নিচে। এর ফলে ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষক কাজের অভাবে খুব বিপাকে পড়েন। নিজেদের ক্ষুধা নিবারণেও তাঁরা চাল কিনতে পারেননি।
ওই শরতেই হাজার হাজার ক্ষুধার্ত চাষি খাদ্য, কাজ ও ত্রাণের আশায় শহরে ভিড় জমাতে শুরু করেন। আমি যখন অক্টোবরে রংপুরে পৌঁছাই, দুর্ভিক্ষ তখন শহর ও তার আশপাশের এলাকা গ্রাস করেছে। দৃশ্যটি দান্তের ইনফারনোর সঙ্গে তুলনীয়, যেখানে হাজার হাজার নারী ও শিশু খাদ্যের জন্য ভিক্ষা করছে। তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কাজ কিংবা ত্রাণ ও বাড়িতে টাকা পাঠানোর আশায় বহু আগেই দূরবর্তী শহরে চলে গেছেন। অনেকেই তাঁদের কোনো খোঁজখবর পাচ্ছিলেন না।
এমনই একটি পরিবেশে আমি ঢাকায় আমার সহকর্মীদের কাছে জানতে চাইলাম, তাঁরা এমন কারও কথা জানেন কি না, বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে যাঁর উন্নত ধারণা রয়েছে। এমন কেউ কি আছেন, যিনি বুঝতে পারেন, কেন বছরের পর বছর ধরে বারবার বন্যা হচ্ছে।
একজন সম্পাদক সহকর্মী আমাকে বললেন, তিনি এমন একজন সেনা কর্মকর্তাকে জানেন, যিনি সদ্য সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। তাঁর লেখায় যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে, তা হলো তাঁর উদ্ভাবনীমূলক ধারণা, যাতে মনে হচ্ছে তিনি সমস্যা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন এবং কেন পৌনঃপুনিক বন্যা হচ্ছে তার সঠিক কারণও তাঁর জানা। এই কর্মকর্তার নাম আবু তাহের।
আমি তাহেরের সঙ্গে তাঁর অফিসে সাক্ষাৎ করি। তিনি সম্প্রতি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেছেন এবং বর্তমানে সি-ট্রাক ইউনিট নামে এক অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সংস্থার কর্তাব্যক্তি হিসেবে কাজ করছেন। আমি তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলে চমৎকৃত হলাম। তিনি জানতেন, দেশের পৌনঃপুনিক বন্যা সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধান না করে ভবিষ্যতের উপর্যুপরি দুর্ভিক্ষ প্রতিহত করা যাবে না। মোগল আমল থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের যেসব কলাকৌশল ব্যবহার করা হয়েছে, তাহের সে সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা করেন। এমনকি ঔপনিবেশিক যুগের বন্যা-পরিস্থিতির বিষয়েও তাঁর ছিল ব্যাপক অধ্যয়ন। স্পষ্টতই ইতিহাসের এসব পর্ব থেকে এমন অনেক কিছু শিক্ষা নেওয়ার ছিল, যে সম্পর্কে আধুনিক বিশেষজ্ঞরা একেবারেই ওয়াকিবহাল ছিলেন না।
শুধু এই চিন্তাভাবনা দিয়ে তাহেরকে চেনার সুযোগ নেই। কিন্তু আমি একটি বিষয় পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম, আমি এমন একজন ব্যক্তির সাক্ষাৎ পেয়েছি, যিনি ছিলেন একজন ‘বিজ্ঞ সৈনিক’। যিনি ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে আজকের সমস্যার বাস্তব সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছেন। আমি ঢাকায় অনেককেই জানতাম। একজন রিপোর্টার হিসেবে সেটাই ছিল আমার কাজ। কিন্তু এবারে আমি এমন একজন তাহেরকে জানলাম, যিনি অবিস্মরণীয়, বুদ্ধিদীপ্ত, বাস্তববাদী এবং বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও অনুন্নয়ন দূরীকরণের চিন্তায় সমৃদ্ধ। আমি এরপর তাঁর সঙ্গে বহু সন্ধ্যা কাটিয়েছি এবং কথা বলেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
আমি তাঁর কাছ থেকে জেনেছি গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল, যা তিনি ১১ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাস্তবায়ন শুরু করেছিলেন। আমি তাঁর কাছ থেকে আরও জানলাম, কুমিল্লা ব্রিগেডের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর তিনি কীভাবে সেনাবাহিনীর জন্য একটি ‘নতুন দৃষ্টান্তের’ বাস্তবায়ন শুরু করেছিলেন। তাহের মনে করেছিলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি সংযোগস্থলে দাঁড়ানো। এই সেনাবাহিনী হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাঠামো ও সাংগঠনিক প্রকৃতিতে গঠিত হবে অথবা তার নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তি খাটিয়ে এমন একটি সেনাবাহিনী গড়ে তুলবে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় আগে কখনো দেখা যায়নি। যদি এই সেনাবাহিনী আদর্শগত ও কাঠামোগতভাবে পাকিস্তানি মডেল গ্রহণ করে, যেখানে প্রায় সব সেনাসদস্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন, সে ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীও ভবিষ্যতে কোনো একপর্যায়ে একটি সামরিক কিংবা একটি সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্রের এজেন্সিতে পরিণত হবে।
তাহের মনে করতেন, যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা হয়ে থাকে হতদরিদ্র ও নিরন্ন মানুষের জীবনের মৌলিক পরিবর্তনের জন্য, সে ক্ষেত্রে এমন একটি সেনাবাহিনীর প্রবর্তন দরকার হবে, যারা দরিদ্র মানুষের স্বপ্ন পূরণে সচেষ্ট থাকবে। তাঁর ভাবনা ছিল, এটা সম্ভব হতে পারে, সেনাবাহিনী যদি গ্রামবাসী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন আলাপ-আলোচনায় নিজেদের সম্পৃক্ত করে। এটা হবে এমন একটি সেনাবাহিনী, যারা অস্ত্র বহনকারী শক্তির চেয়ে অধিকতর কিছু। সে কারণেই তাহের সেনাবাহিনীর এই পর্যায়ের নামকরণ করেছিলেন, ‘উৎপাদনশীল সেনাবাহিনী’।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী অন্যান্য প্রথাগত সেনাবাহিনীর মতোই দেশের মূল্যবান সম্পদ অপচয়ের কান্ডারি ছিল। বিপুল অর্থ ব্যয় হতো প্রতিরক্ষা খাতে। এর ফলে স্কুল, হাসপাতাল ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগে সম্পদের ব্যবহার সংকুচিত হতো। দশকের পর দশক ধরে বিরাজমান সামরিক একনায়কতন্ত্র ও আধিপত্য বজায় রাখার কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কার্যত দেশের অর্থনীতির জন্য গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাহের মনে করতেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছিল এক দানবীয় পরগাছা, যা সবকিছু শুষে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে গরিব ও পশ্চাৎপদ রেখেছিল।
তিনি নিজেকেই জিজ্ঞেস করতেন, একটি স্বাধীন বাংলাদেশে এ রকম একটি দানব গড়ে তোলার জন্যই কি লাখ লাখ মানুষ স্বাধীনতার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিল? তার জবাব ছিল, না এবং একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি তা ঘটতে দিতে পারেন না। কীভাবে একটি নতুন দৃষ্টান্তে উত্তরণ ঘটানো যায়, তার পথ দেখাতে তিনি সচেষ্ট হন।
কুমিল্লা ব্রিগেডে তাহের তাঁর সেনাসদস্যদের ‘উৎপাদনশীল সৈন্য’ হিসেবে সংগঠিত করেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিগেড তার খাদ্যের জোগান নিজেই নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হয় এবং এ ক্ষেত্রে অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। এ প্রয়াসের লক্ষ্য ছিল সমাজের ওপর তারা যাতে কোনো অর্থনৈতিক বোঝার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। এই ব্রিগেডের সদস্যরা আশপাশের গ্রামগুলোতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তাঁরা স্থানীয় কৃষকদের চাষাবাদ, ফসল কাটা এবং সেচব্যবস্থার কাজে সহায়তা করতেন। তাঁরা সেনাবাহিনীর অবশিষ্ট অংশের কাছে ‘লাঙল সেনা’ হিসেবে পরিচিতি পান। অনেকে ভাবতেন, এটা মজার বিষয়। কিন্তু অন্যরা দেখেছেন, এর পেছনে নিশ্চয় গুরুতর উদ্দেশ্য রয়েছে।
তাহের দেখেছিলেন, এভাবে সেনা ও সাধারণ লোকদের দৈনন্দিন আলোচনা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের সংস্কৃতি পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সেনাদের ‘কর্তৃত্বের মানসিকতাই’ প্রকারান্তরে একটি সামরিক স্বৈরাচারের জন্মদানের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়। তাহেরের এই নীতিই আসলে পরবর্তী সময়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য গণবাহিনী গঠনের দর্শন হয়ে ওঠে। তাহের আমার কাছে ব্যাখ্যা করেছিলেন, তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেছিলেন এই কারণে যে তাঁর মতো যাঁরা সমমনা কর্মকর্তা, যাঁরা দুর্নীতির ভ্রূণের বিরুদ্ধে এবং একটি নতুন কাঠামোর প্রতি একটি আন্দোলন সৃষ্টির জন্য উদ্গ্রীব, তাঁরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। প্রথাগত ধ্যান-ধারণাই তাঁদের পুনরায় আচ্ছন্ন করতে বসেছে। পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত কর্মকর্তা, বাংলাদেশের যুদ্ধের আদর্শগত প্রভাব যাঁদের স্পর্শ করেনি, ক্রমবর্ধমানভাবে তাঁরাই বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।
তাহেরের সঙ্গে বৈঠকে মুজিব বিষয়টিতে সায় দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আসলে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি। কর্তৃত্বপরায়ণতা ও সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বীজ বপন হচ্ছিল। কিন্তু মুজিব তা দেখতে পাননি। পাকিস্তানি ঐতিহ্য অনুযায়ী একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটবে। তাহের সেই দিনটি আসার আগেই একটি বিকল্প তৈরির প্রস্তুতি নিতে সেনাবাহিনীর বাইরে এলেন। সর্বশেষ বৈঠকে তাহের তাঁকে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা না বুঝতে পেরে মুজিব চড়া মূল্য দিলেন।
১৯৭৪ সালের শেষের দিকে আমি বাংলাদেশ ত্যাগ করি। আমাকে ফার স্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ পত্রিকার দিল্লিভিত্তিক সংবাদদাতা নিয়োগ করা হয়। সুতরাং আমাকে গোটা দক্ষিণ এশিয়া কভারে মনোযোগী হতে হয়। আমি যখন তাহেরের কাছে বিদায় জানাতে গেলাম, তখন আসলে আমার কোনো ধারণাই ছিল না যে তিনি জাসদের একজন গোপন সদস্য। কিংবা তিনি সেনাবাহিনীর ভেতরে ও বাইরে একটি মোর্চা গঠনে সক্রিয়, যারা সেই মুহূর্তের জন্য নিজেদের তৈরি করছিল, যখন বাংলাদেশি সমাজের সবচেয়ে রক্ষণশীল অংশ একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন এবং যা একই সঙ্গে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকারের কবর দিতে হুমকি সৃষ্টি করবে।
তাহেরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা থেকে আমি যা বুঝতে পেরেছি তা হলো, তিনি বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে নিজেকে একজন বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীতে পরিণত করেছিলেন। তিনি মাঝেমধ্যে আমাকে এ বিষয়ে বিদেশ থেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট বই বা সাময়িকী এনে দিতে বলতেন। স্পষ্টতই সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বিতর্ক এবং উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁর দারুণ আগ্রহ ছিল। আমাদের আলোচনায় তাহেরের অন্তর্দৃষ্টি ও যুক্তিবাদী মননের প্রতিফলন ঘটত।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহের পর তাহেরের সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে পারি, তিনিই ছিলেন সেই বিদ্রোহের সামরিক অধিনায়ক। এটা আমাকে বিস্মিত করলেও একই সঙ্গে আমার কাছে তা ছিল যৌক্তিক। তাহের আসলে তাঁর ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে চেয়েছিলেন।
তাহেরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণরূপে পেশাগত। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ। তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। এ অবস্থায় আমরা পুনরায় আলোচনা করি। ৭ নভেম্বরে যদিও তাহের জিয়ার জীবন রক্ষা করেন (জিয়া প্রকাশ্যেই এ কথা উল্লেখ করেছিলেন)। জিয়ার অবস্থান সম্পর্কে তাহের এবং জাসদের ইতিবাচক মূল্যায়ন ছিল ভুল। যদিও ঘরোয়াভাবে জিয়া দাবি করেছিলেন, একমাত্র সমাজতান্ত্রিক নীতি বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য ঘোচাতে পারে।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তাহেরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সক্ষম হই। তাহেরের বড় ভাই আবু ইউসুফ খান এ ব্যাপারে সাহায্য করেন। আমরা প্রায় ৯০ মিনিট আলোচনা করেছিলাম। সেখানে আমি ৭ নভেম্বর সম্পর্কে তাহেরের বক্তব্য জানতে পারি। আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিতে চাইলে তিনি বললেন, আবার তাঁকে স্বাগত জানাতে পারলে তিনি খুশি হবেন। তাহের ছিলেন আশাবাদী। তাঁর ভাবনা ছিল, তাঁদের দিন আসছে।
আমি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলাম, যদি তাঁরা ক্ষমতায় আসেন, তাহলে তাঁকে ও তাঁর সহকর্মীদের ভিড় থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে অবলোকন করবেন। আমি বললাম, তাঁরা বিষয়টিকে কীভাবে নেন, তার ওপর নির্ভর করবে আমাকে তখন ‘স্বাগত’ জানানো হবে কি না। আমি তাঁকে বললাম, যদি গ্রেপ্তার কিংবা তার চেয়ে খারাপ কিছু ঘটে, তা রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে আমিই হব প্রথম। তেমন পরিস্থিতিতে আমাকে স্বাগত নাও জানানো হতে পারে। তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিই, আমি আসলে সব ক্ষমতা সম্পর্কেই সন্দিগ্ধ। তিনি মাথা ঝাঁকালেন, হাসলেন এবং বললেন, তিনি আমার ইঙ্গিত বুঝতে পেরেছেন। আমি বললাম, আপনি যদি আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন, তাহলে সে সম্পর্কে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রেও আমি হাজির থাকব। নতুন সেনাবাহিনী গঠন করুন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ সমস্যা সমাধান করুন, দরিদ্রকে সাহায্য করুন, তাদের দারিদ্র্যের অবসান ঘটান—আমি সবকিছুরই বৃত্তান্ত লিখব।
আমরা বিদায় নিলাম। সেটাই ছিল তাহেরের সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আমি এরপর তাঁকে আর দেখিনি। এরপর আমি অবশ্য তাঁর নিকট দূরত্বে উপস্থিত হয়েছিলাম। সেই দিনটিতে, যেদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁর গোপন বিচার শুরু হয়েছিল। আমি দাঁড়িয়েছিলাম কারাগারের সামনে।
২০০৬ সালের ২১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত আলোচনায় মূল বক্তৃতার শুরুতে প্রদত্ত স্মৃতিচারণা, ইংরেজি থেকে অনূদিত।
লরেন্স লিফশুলজ: প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক।

নারীর মর্যাদাহানির জন্য বেরলুসকোনিকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে

নারীর মর্যাদাহানির জন্য ইতালির প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বেরলুসকোনিকে ক্ষমতা ছাড়া হতে হবে। গত বুধবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ডেপুটি স্পিকার রোজি বিন্দি এ কথা বলেছেন।
বেরলুসকোনিকে ‘সুলতান’ অভিহিত করে তিনি বলেন, যৌন কেলেঙ্কারির জন্য বেরলুসকোনিকে ক্ষমতা ছাড়া হতে হবে। তাঁর এ কেলেঙ্কারির জন্য ইতালির নারীদের সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। সুলতানের কারণে দেশের নারীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তিনি নারীদের দেহসর্বস্ব ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত করেছেন। নারীদের মধ্যে আগে যাঁরা ভোট দিয়ে বেরলুসকোনিকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেছিলেন, তাঁরাই পরবর্তী নির্বাচনে তাঁকে আর ভোট দেবেন না। রোজি বিন্দি বলেন, গত নির্বাচনে বেরলুসকোনির সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন নারীরা। তবে এখন নিঃসন্দেহে নারীদের মধ্যে বেরলুসকোনির জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে এবং নারীরাই তাঁর অভিসার জীবনের সমাপ্তি ঘটাবেন। গত বুধবার বিকেলে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে তাঁর কার্যালয়ে রয়টার্সকে তিনি এ সাক্ষাৎকারটি দেন।

ইরানের বিরোধী দলকে অর্থ দিতে চেয়েছিলেন মাহমুদ আব্বাস

ইরানে ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর সে দেশের বিরোধী দলকে একটি বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার দিয়ে সহযোগিতা করার ব্যাপারে একজন ফিলিস্তিনি ব্যবসায়ীকে প্রভাবিত করেছিলেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। সম্প্রতি ফাঁস হয়ে যাওয়া এক গোপন নথি থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
আল-জাজিরার প্রকাশিত নথির উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, ২০০৯ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত জর্জ মিশেলের সঙ্গে ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার (পিএলও) মুখ্য আলোচক সায়েব এরাকাতের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে এরাকাত মিশেলকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এখন এক কঠিন সময় চলছে। গাজা ও লেবাননে আহমাদিনেজাদের একচেটিয়া প্রভাব। আরব রাষ্ট্রগুলোও তেমন কিছু করছে না। আপনি জানেন, মুসাভিকে (ইরানের বিরোধীদলীয় নেতা) বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতে মাহমুদ আব্বাস (ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট) একজন ফিলিস্তিনি ব্যবসায়ীকে প্রভাবিত করছেন। পরে জানা গেছে, আব্বাস ফিলিস্তিনি ওই ব্যবসায়ীকে ইরানের বিরোধীদলীয় নেতা মির হোসেন মুসাভিকে পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার দিতে বলেছিলেন। গাজায় হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাকে ইরান অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করে থাকে। পিএলওকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইরানকে প্রতিরোধের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আব্বাস ওই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গোপন নথি থেকে জানা যায়, এরাকাত আরেক বৈঠকে মার্কিন কর্মকর্তাদের বলেন, আলজাজিরা টেলিভিশনের মালিক কাতারের আমির ব্যক্তিগতভাবে আব্বাসের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ২০০৯ সালের মে মাসে আরেক বৈঠকে এরাকাত জানান, তিনি ইরাকের কুর্দিস্তান সফর করেছেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রভাব খুব বেশি।
হামাস প্রসঙ্গে এরাকাত বলেন, ইরান হামাসকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আল-কায়েদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিকায়নের জন্য ইসরায়েলের পাশে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রয়োজন। তিনি বলেন, আজ যদি কায়রোতে ইসরায়েলের দূতাবাস না থাকত তাহলে আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন হয়তো মিসরেই থাকতেন। তাঁর সহকারী আয়মান আল জাওয়াহিরিকেও সেখানে কোনো দোকান গড়ে বসে থাকতে দেখা যেত।

‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন গত বুধবার বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও ফিলিস্তিন-সংক্রান্ত গোপন আলোচনার নথিপত্র প্রকাশ হওয়ার পরও এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় এখনো শীর্ষে। হিলারি জানান, তিনি মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক চার মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে আলোচনার জন্য আগামী সপ্তাহে মিউনিখ যাবেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসের জুদাহর সঙ্গে এ নিয়ে তাঁর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
জুদাহর সঙ্গে ওয়াশিংটনে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে হিলারি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা আমাদের উভয় দেশের কাছে এখনো অগ্রাধিকারের তালিকায় শীর্ষে।’ তিনি জানান, দুই দেশের (ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন) মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে ইহুদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ আকাঙ্ক্ষাও বাস্তবায়িত হবে।
হিলারি বলেন, জর্ডান ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে, এ ধরনের একটি চুক্তি দুই দেশে শুধু শান্তি ও সমৃদ্ধিই আনবে না, সন্ত্রাসবাদমুক্ত বিশ্ব গড়ার ক্ষেত্রে এটি হবে একটি বড় ধরনের পদক্ষেপ। কাতারভিত্তিক আল-জাজিরা স্যাটেলাইট টেলিভিশন রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ইসরায়েলকে ব্যাপক ছাড় দেওয়ার হাজার হাজার গোপন নথিপত্র প্রকাশ শুরু করার পর ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক নিজ দেশে ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে পড়েছেন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহ-সমর্থিত শক্তি সরকার গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে।

লেবাননে ঐকমত্যের সরকার গঠনের আহ্বান সিরিয়ার

লেবাননের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিকাতির নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের জন্য সিরিয়া সে দেশের দ্বিধাবিভক্ত নেতাদের প্রতি গতকাল বৃহস্পতিবার আহ্বান জানিয়েছে।
সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল-মুয়ালেম সাংবাদিকদের বলেন, লেবাননে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে সরকার গঠিত হবে বলে তাঁরা আশাবাদী। সে দেশের সব দল এতে অংশ নেবে। নাজিব মিকাতি লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার পর এটাই প্রভাবশালী প্রতিবেশী সিরিয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।

২০ বছরে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়বে দ্বিগুণ হারে

আগামী ২০ বছরে বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যা অমুসলিমদের চেয়ে দ্বিগুণ হারে বাড়বে। সে হিসাবে ২০৩০ সালে মুসলমানদের সংখ্যা হবে ২২০ কোটি, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। মার্কিন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিউ ফোরামের নতুন একটি সমীক্ষায় এ তথ্য জানা গেছে।
‘দ্য ফিউচার অব দ্য গ্লোবাল মুসলিম পপুলেশন’ বা বিশ্বজুড়ে মুসলিম জনসংখ্যার ভবিষ্যৎ নামে ওই সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০৩০ সালে মুসলিম জনসংখ্যা ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বেশি হবে পাকিস্তানে। আর ভারত হবে তৃতীয় মুসলিমপ্রধান দেশ। সন্তান জন্ম দেওয়ার সক্ষমতা, মৃত্যু ও অভিবাসনের হারকে বিবেচনায় নিয়ে এই সমীক্ষা চালানো হয়।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১০ সালে বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১৬০ কোটি। পরবর্তী দুই দশকে প্রতিবছর গড়ে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়বে ১ দশমিক ৫ শতাংশ হারে, আর অমুসলিম জনসংখ্যা বাড়বে দশমিক ৭০ শতাংশ হারে।
এতে বলা হয়, ২০৩০ সালে ৬০ শতাংশ মুসলিম এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে, ২০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যে, ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলে, ২ দশমিক ৭ শতাংশ ইউরোপে এবং দশমিক ৫ শতাংশ লোক বাস করবে আমেরিকায়।

‘যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি’ উজ্জ্বল হয়েছে

হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ওবামা প্রশাসনের বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগের কারণে বহির্বিশ্বে গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তির বেশ উন্নতি হয়েছে।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গতকাল বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র মাইক হ্যামার বলেন, তাঁরা যতটা মনে করছেন তাতে মনে হচ্ছে, গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা অন্যান্য দেশে অনেক বেড়েছে। আর এটা হয়েছে ওবামা প্রশাসনের বিভিন্ন তৎপরতার কারণে।
হ্যামার বলেন, ওবামা দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের হারানো মর্যাদা আবার ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে মনোযোগী হন। এ লক্ষ্যে তিনি কাজও শুরু করেন নিষ্ঠার সঙ্গে। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করেন। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে মনোযোগী হন। এ ক্ষেত্রে তিনি পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন। আর এ বিষয়গুলো অন্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়নে এবং ভাবমূর্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা বলেন, এ সময় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের কাছে এ বার্তাও পৌছে দেয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অংশীদার বা সহযোগী দরকার। তারা অন্যদের নিয়ে কাজ করতে চায়। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ও চীনের মতো বড় শক্তির দিকে যেমন সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে, তেমনি ভারতের মতো উদীয়মান শক্তির দিকেও বন্ধুত্বের হাত সম্প্রসারণ করেছে।

১০০ লাগেজ নিয়ে পালালেন মোবারকের ছেলে গামাল

বিক্ষোভের মুখে দেশ ছেড়ে পালানোর সময় সঙ্গে দেড় টন সোনা নিয়ে গেছেন তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট জয়নুল আবেদিন বেন আলীর স্ত্রী লায়লা আলী। আর এবার দেশে বিক্ষোভ শুরু হতে না-হতেই ১০০ লাগেজ নিয়ে পালিয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের ছেলে গামাল মোবারক।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবসাইট আখবার আল-আরব জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর দুই দিনের মাথায় বুধবার গামাল দেশ ছেড়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে তিনি একটি ব্যক্তিগত বিমানে করে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হন। সঙ্গে নিয়ে গেছেন প্রায় ১০০টি লাগেজ। তবে লাগেজগুলোতে কী ছিল, সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।
৩০ বছর ধরে ক্ষমতাসীন হোসনি মোবারকের বয়স এখন ৮২ বছর। সম্প্রতি তাঁর স্বাস্থ্য বেশ ভেঙে পড়েছে। অনেকে ধারণা করছেন, ক্ষমতার উত্তরসূরি হিসেবে তিনি ছেলে গামালকেই (৪৮) বেছে নেবেন। যদিও দেশের ক্ষমতাধর সেনাবাহিনী তা মেনে নেবে বলে মনে হয় না।
দরিদ্রতা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও বেকারত্বসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গত মঙ্গলবার থেকে মিসরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে প্রায় এক হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে এবং জানিয়ে দিয়েছে, কোনো রকম বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। একই সঙ্গে সব ধরনের বিক্ষোভ-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। এর পরও বিক্ষোভে নেমে বুধবার নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে চারজন।

গ্যাবনের বিরোধীদলীয় নেতার নিজেকে ‘প্রেসিডেন্ট’ ঘোষণা

গ্যাবনের বিরোধীদলীয় এক নেতা আদ্রেঁ এমবা ওবাম নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর স্বীকৃতির দাবিতে বর্তমানে দেশটির জাতিসংঘের একটি দপ্তরে অবস্থান করছেন। এদিকে গ্যাবন সরকার দেশের রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করেছে এবং আদ্রেঁ এমবাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ মোকাবিলা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
আদ্রেঁ এমবা ওবাম মঙ্গলবার নিজেকে দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেন এবং সরকারের একটি রূপরেখা প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় ৫৩ জাতির আফ্রিকান ইউনিয়ন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
এ ঘোষণার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে আদ্রেঁ এমবা ওবামের ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। এ ছাড়া তাঁকে ও তাঁর সমর্থকদের বিভিন্ন সরকারি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি এবং তাঁদের রাষ্ট্রদ্রোহ অভিযোগের সম্মুখীন করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
এমবা গত বুধবার আবারও বলেন, ‘আমিই গ্যাবনের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।’ এক বিবৃতিতে তিনি ‘অবৈধ ক্ষমতাধারীদের উৎখাতে’ গ্যাবনবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
সাবেক এ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০০৯ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বরাবরই নিজেকে বিজয়ী হিসেবে দাবি করে আসছেন। তবে সরকারি ফলাফলে আলী বংগো ওদিমবাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

আইটিএফ অনূর্ধ্ব-১৪ টেনিস

আইটিএফ অনূর্ধ্ব-১৪ এশিয়ান টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশের দেলোয়ার হোসেন। ইয়াঙ্গুনে অনুষ্ঠানরত টুর্নামেন্টে শেষ চারে দেলোয়ার হোসেন ৩-৬, ২-৬ গেমে হেরে গেছেন ইয়েমেনের আল আনসি ঘাসানের কাছে। বালক দ্বৈতের কোয়ার্টার ফাইনালেও হেরেছে বাংলাদেশের দেলোয়ার-ওয়াই মং মারমা জুটি। সিরিয়ার আলাফ করিম ও মোহাম্মদ আজহারি জুটির কাছে তারা হেরেছে ৩-৬, ৫-৭ গেমে।

অনূর্ধ্ব-১৯ দলের জয়

জুবায়েরের দারুণ বোলিংয়ে (৫/১২) নেপাল অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে প্রথম এক দিনের ম্যাচে ১৪৫ রানে হারিয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। সিলেটে প্রথমে ব্যাট করে ৯ উইকেটে ২১১ রান করে বাংলাদেশ। তৌহিদ ৫৫ ও সৈকত ৪৫ রান করেন। জবাবে ২৯ ওভারে ৬৬ রানেই গুটিয়ে যায় নেপাল।

এবারও পারলেন না ওজনিয়াকি

গত বছর মেয়েদের টেনিস র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানটা দখল করেছিলেন ক্যারোলিন ওজনিয়াকি। নতুন বছরও শুরু করেছিলেন এক নম্বর হিসেবেই। কিন্তু শীর্ষস্থানে পৌঁছলেও এখন পর্যন্ত একটিও গ্র্যান্ডস্লাম না জেতার জন্য মাঝেমধ্যেই নানা রকম কটু মন্তব্য সহ্য করতে হয় ডেনমার্কের এই তারকাকে। সুযোগ ছিল এবারের মৌসুমের প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেই সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার। সেই ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছিল ওজনিয়াকির পারফরমেন্স থেকে। দাপটের সঙ্গেই পৌঁছেছিলেন সেমিফাইনালে। কিন্তু শেষ চারের লড়াইয়ে চীনের লি নার কাছে ৩-৬, ৭-৫, ৬-৩ গেমে হেরে আরও একবার সেমিফাইনালেই শেষ হলো ওজনিয়াকির প্রথম গ্র্যান্ডস্লামের স্বপ্ন।
প্রথম সেটটা ৩-৬ গেমে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয় সেটে খুব চমত্কারভাবে ঘুরে দাঁড়ান অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের নবম বাছাই লি না। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দ্বিতীয় সেটটা জিতে নেন ৭-৫ গেমে। এরপর শেষ সেটটা ৬-৩ গেমে জেতার পরই গড়ে ফেললেন ইতিহাস। প্রথম চীনা খেলোয়াড় হিসেবে পৌঁছালেন গ্র্যান্ডস্লামের ফাইনালে।
ফাইনালে ভেরা জভোনরেভা বা কিম ক্লাইস্টার্সের মুখোমুখি হবেন লি না।

সোহরাওয়ার্দীর বিশ্বকাপ-দর্শন

রংপুর ক্রিকেট গার্ডেনে নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটের ম্যাচ খেলতে গেছে আল-হেরা স্কুল। খেলার আগে হঠাৎ জানা গেল একজন খেলোয়াড় আসেনি। মাঠে ছিল ওই স্কুলেরই ষষ্ঠ শ্রেণীর এক ছাত্র। বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে নামিয়ে দেওয়া হলো তাকেই। আকস্মিক দলে ঢুকে খুদে ক্রিকেটারটি কিন্তু খারাপ খেলল না—৫ ওভার বল করে ১০ রানে ৫ উইকেট!
মাঠে বসে খেলা দেখা অনেকের উৎসাহে ছেলেটির মা-বাবা তাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন বিকেএসপিতে। সেদিনের সেই খুদে ক্রিকেটারই আজকের মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী—সোহরাওয়ার্দী শুভ। চোখে যাঁর বিশ্বকাপ-স্বপ্ন পূরণের ঝিলিক।
বিশ্বকাপ নিয়ে স্বপ্নের আঁকিবুঁকি বাংলাদেশ দলের ১৫ ক্রিকেটারের চোখেই। তবে সোহরাওয়ার্দীর স্বপ্নটা একটু অন্য রকম। ২০০৯ সালে হজ পালন তাঁর জীবনদর্শন এতটাই বদলে দিয়েছে যে, বিশ্বকাপ-স্বপ্ন অন্যদের সঙ্গে মেলে না, ‘দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ হবে। আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া, তিনি যেন আমাদের মানসম্মান রাখেন। আমরা যেন ভালো খেলতে পারি। সারা দুনিয়ার মানুষ যেন জানে, এই মুসলিম দেশটা ভালো ক্রিকেট খেলে।’
যেদিন থেকে বল-ব্যাট নিয়ে নাড়াচাড়া, সেদিন থেকেই বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন। ২০০৭ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলকে ভালো খেলতে দেখে স্বপ্নপূরণের তাড়নাটা বেড়েছে। তবে হজ করে আসার পর স্বপ্ন কিংবা বাস্তবতা—সবকিছুই সমান তাঁর কাছে। স্বপ্নপূরণের দরজায় দাঁড়িয়ে বরং সোহরাওয়ার্দীর মনে হচ্ছে, বিশ্বকাপটাই সব না। জীবনের প্রতিটি অণু-পরমাণুর অর্থই দুই বছর আগের চেয়ে ভিন্ন, ‘আগে সব সময় একটা অভাববোধ থাকত। মনে হতো আরেকটু করলে, আরেকটু পেলে বোধ হয় ভালো হয়। কিন্তু এখন সবকিছু খুব শান্তিপূর্ণ, খুব পরিপূর্ণ মনে হয়। আগে মৃত্যু নিয়েও ভাবতাম না। হজের পর এ ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে পারি এখন।’ উপলব্ধির পরিবর্তন আছে ক্রিকেটীয় বিষয়েও, ‘আগে বলতাম, আল্লাহ আমাকে অনেক সম্মান দাও, টাকা-পয়সা দাও। হজের পর এসব বদলে গেছে। আল্লাহর কাছে এখন একটা জিনিসই চাই, তিনি আমাকে ভালো খেলতে সাহায্য করুন। অন্য তরুণ ক্রিকেটাররা যেন বুঝতে পারে নামাজ পড়েও ভালো খেলা যায়।’
নামাজের প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকে। কিন্তু হজ করে এসে ধর্মের সবকিছুকেই জীবনের অংশ করে নিয়েছেন, ‘হজে গিয়ে কিছু জিনিস দেখে আশ্চর্য হয়েছি। কী দেখেছি বলব না, এসব একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। আসলে হজ এমন একটা জিনিস, ওখানে গেলে মানুষের একটা না-একটা দিক খুব শক্তিশালী হয়।’ বদলে যাওয়া সোহরাওয়ার্দীর যেমন মনে হয়, আগের জীবনটা খুবই অনিশ্চিত ছিল। জাগতিক মোহে এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন যে, এই জীবনটাকেই মনে হতো সবকিছু। নতুন উপলব্ধি, ‘পৃথিবীতে আসার সিরিয়াল আছে, যাওয়ার কোনো সিরিয়াল নেই...।’
সোহরাওয়ার্দী অদৃষ্টবাদী বিশ্বকাপ নিয়েও, ‘আল্লাহ চাইলে বিশ্বকাপ খেলব। তিনি না চাইলে আর সবাই চাইলেও খেলতে পারব না। হয়তো ইনজুরিতে পড়ে যাব, কিছু করার থাকবে না। সব ক্ষমতাই তাঁর হাতে।’ অনেকে বলেন, সাকিব-রাজ্জাক থাকতে সোহরাওয়ার্দীর মতো আরেকজন বাঁহাতি স্পিনার না হলেও তো চলত বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দলে! সোহরাওয়ার্দী প্রতিবাদ করেন, তবে পাল্টা আঘাত করে নয়, ‘আমার মনে হয়, আমার খেলার প্রয়োজন আছে বলেই খেলছি। প্রয়োজন না থাকলে আমাকে কেউ নিত না। নিশ্চয়ই দলে আমার প্রয়োজন আছে।’
ধর্মের মধ্যে থেকেই তিনি জেনেছেন, ধর্মের সঙ্গে বিরোধ নেই ক্রিকেটের। ইসলাম বরং পরিপূর্ণ ক্রিকেটার হয়ে উঠতেই সাহায্য করে। হয়তো এই বিশ্বাস থেকেই সোহরাওয়ার্দীর মতো ধর্মভীরু-শ্মশ্রুমণ্ডিত ক্রিকেটার আজকাল অনেকেই আছেন। পাকিস্তানের মোহাম্মদ ইউসুফ, দক্ষিণ আফ্রিকার হাশিম আমলা কিংবা ইংল্যান্ড ‘এ’ দলের মঈন আলী। তাঁদেরও আগে আছেন সাঈদ আনোয়ার। পাকিস্তানের সাবেক এই ওপেনার বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে ঢাকায় এসে যাঁদের খোঁজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে সোহরাওয়ার্দীও ছিলেন। সোহরাওয়ার্দীর মাধ্যমে আজ তাঁর সঙ্গে দেখা করার কথা সাকিব-তামিমসহ বাংলাদেশ দলের আরও কয়েকজন ক্রিকেটারের। কিন্তু দেখা হলে তাঁদের কী বলবেন সাঈদ আনোয়ার! বিশ্বকাপ সামনে বলে ক্রিকেটীয় পরামর্শই দেবেন, নাকি শোনাবেন ধর্মের কথা? হয়তো সোহরাওয়ার্দীকে যেটা বলেছেন, তাঁদেরও বলবেন সেটাই, ‘খেলার সঙ্গে ধর্মের বিরোধ নেই। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে খেলো।’
কথাটা অক্ষরে অক্ষরে মানেন। সোহরাওয়ার্দী বিশ্বকাপ-স্বপ্নের মধ্যে থেকেও তাই বিশ্বাস করেন, ‘আল্লাহ পাশে ছিলেন বলেই এত কিছু সম্ভব হয়েছে। নইলে আমি হয়তো আজ কোথাও থাকতাম না...।’

আরেকটা এল ক্লাসিকোর অপেক্ষা

এ মৌসুমে আলমেরিয়ার নিয়তি কি বার্সেলোনার হাড়িকাঠে গলা পেতে দেওয়া? না হলে এই দলটিকে সামনে পেলেই কেন বার্সেলোনার গোলতৃষ্ণা বন্যার বেগে ধেয়ে আসবে? লিগে ৮-০ গোলে জয়ের পর পরশু স্প্যানিশ কাপের সেমিফাইনালের প্রথম লেগে আলমেরিয়াকে ৫-০ গোলে হারাল কাতালানরা। রিয়াল মাদ্রিদের অবস্থা বার্সার ঠিক উল্টো। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন সেভিয়ার বিপক্ষে কোনো রকমে বিতর্কিত এক জয় পেয়েছে তারা (১-০)।
এটাও যেন নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে, বার্সেলোনার বড় জয় আসবে মেসির অবদানে। আলমেরিয়ার বিপক্ষেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ১৫ মিনিটের মধ্যে বার্সা ৩-০-তে এগিয়ে গেছে মেসির জোড়া গোলেই। মেসির গোল দুটি ৯ ও ১৫ মিনিটে। ৩ গোলের আরেকটি ডেভিড ভিয়া করেছেন ১০ মিনিটে। ৩০ মিনিটে পেদ্রো করেন ৪-০।
আলমেরিয়ায় তখন হয়তো আরেকটি ৮-০ গোলের শঙ্কাই ছড়িয়ে পড়েছে। সেটা হয়তো হয়েও যেত, যদি না মেসি-ভিয়াদের গোলপোস্ট বঞ্চিত না করত। আলমেরিয়ার গোলরক্ষক সুয়ারেজ করেছেন দারুণ কিছু সেভ। তবে ব্যবধানটা ৫-০ হয় সেইডু কেইটার শেষ মুহূর্তের গোলে। এটি ছিল মেসির দুর্দান্ত এক পাসের ফসল।
রিয়াল মাদ্রিদের সবচেয়ে বড় তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দলের জয়ে তেমন কোনো অবদানই রাখতে পারেননি। পরশু ছিল রিয়াল কোচ হোসে মরিনহোর ৪৮তম জন্মদিন। জন্মদিনে কোচ সবচেয়ে বড় উপহারটি পেয়েছেন তাঁর কাছে একদা ‘ব্রাত্য’ করিম বেনজেমার কাছ থেকে। ফরাসি এই স্ট্রাইকারের গোলেই সেভিয়া থেকে জয় নিয়ে ফিরতে পেরেছে রিয়াল।
তবে রিয়ালের এই জয় আর মরিনহোর জন্মদিনের উপহারে লেগেছে বিতর্কের আঁচড়। সেভিয়ার লুইস ফ্যাবিয়ানোর একটি শট দৃশ্যত গোললাইন অতিক্রম করলেও রেফারি গোল দেননি। কোচ মানজানোর দাবি, ‘ওটা গোলই ছিল। এই পরাজয় আমার খেলোয়াড়দের প্রাপ্য নয়।’
স্প্যানিশ লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ বা কিংস কাপ, যে প্রতিযোগিতাই হোক; রিয়াল-বার্সার মধ্যে আরেকটা লড়াই চলে। লড়াইটা মেসি-রোনালদোর। সেই লড়াইয়ে পরশু মেসির কাছে হেরে গেছেন রিয়ালের রোনালদো। মেসি এ মৌসুমে তাঁর গোলসংখ্যা নিয়ে গেছেন ৩৫-এ (৩১ ম্যাচ)। আর রোনালদো ৩২ ম্যাচ খেলে গোল পেয়েছেন ৩২টি।
গোল করানোর দিক দিয়েও দুজনের বিস্তর ব্যবধান। মেসি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ১৮ গোল, রোনালদোর সংখ্যা ঠিক এর অর্ধেক। রোনালদো অবশ্য এসব নিয়ে ভাবেন না। রিয়াল স্প্যানিশ কাপের ফাইনালে ওঠার পথে এক পা এগিয়ে আছে, এতেই তাঁর আনন্দ, ‘আমরা আরও গোল করতে পারতাম। তবে এটাই যথেষ্ট।’
শেষ পর্যন্ত রিয়াল ফাইনালে উঠলে এ মৌসুমে ফুটবল রোমান্টিকরা আরেকটা এল ক্লাসিকোর দেখা পাবেন। দেখতে পাবেন আরেকটা মেসি-রোনালদো মুখোমুখি লড়াই।
দেখা যাক, সেটা যদি হয় তাহলে রোনালদো কী করতে পারেন। সর্বশেষ এল ক্লাসিকোতে ৫-০ গোলে উড়ে গেছে রিয়াল মাদ্রিদ। মেসির কাছে হেরে গেছেন রোনালদো। স্প্যানিশ কাপেও মেসির বার্সাকে এগিয়ে রাখতে হয়। এই টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ২৫ বারের চ্যাম্পিয়ন তো তারাই।
ইতালিয়ান কাপের সেমিফাইনালে উঠেছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইন্টার ও এসি মিলান। নির্ধারিত সময়ের খেলা গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে নাপোলিকে ৫-৪-এ হারিয়েছে ইন্টার। ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার আলেসান্দ্রে পাতোর জোড়া গোলে মিলান আন্তোনিও কাসানোর সাবেক ক্লাবের বিপক্ষে জিতেছে ২-১ ব্যবধানে। এদিকে জার্মান কাপের সেমিফাইনালে উঠেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখ।

অস্ট্রেলিয়ায় চীনা ইতিহাস

আগের রাতে ভালো ঘুম হয়নি। স্বামী বড্ড জ্বালাতন করছিলেন। না, রোমান্টিক কিছু নয়, স্বামী বেচারার আবার নাক ডাকার ধাত। লি নার ঘুম আজ এবং কালও ভালো হওয়ার কথা নয়। ইতিহাস গড়ার ধুকপুকানি বুকে নিয়ে বেঘোরে ঘুমাতে চাইলে কুম্ভকর্ণের বংশধর হতে হয়। লি অবশ্যই তা নন।
চীনের ২৮ বছর তরুণী অবশ্য এরই মধ্যে ইতিহাস গড়ে ফেলেছেন। ওপেন যুগে প্রথম এশিয়ান নারী হিসেবে উঠে এসেছেন কোনো গ্র্যান্ড স্লাম এককের ফাইনালে। সেটিও টুর্নামেন্টের এক নম্বর বাছাই ক্যারোলিন ওজনিয়াকিকে ৩-৬, ৭-৫, ৬-৩ গেমে হারিয়ে। ফাইনালে তাঁর প্রতিপক্ষ প্রত্যাবর্তন-রানি কিম ক্লাইস্টার্স। ২০০৯ সালের শেষাশেষি ফিরে আসার পর তৃতীয় শিরোপার সন্ধানে শনিবার রড লেভার অ্যারেনায় ক্লাইস্টার্স মুখোমুখি হবেন লির। কাল আরেক সেমিফাইনালে বেলজিয়ান তারকা সরাসরি সেটে (৬-৩, ৬-৩) হারিয়েছেন ভেরা জনারেভাকে।
কালকের দিনটা ‘এশিয়ার দিন’ হয়ে গেল পুরুষ দ্বৈতের ফাইনালে ভারতীয় জুটি মহেশ ভূপতি আর লিয়েন্ডার পেজ ওঠায়। ফাইনালে তাঁদের প্রতিপক্ষ ব্রায়ান ব্রাদার্স বব আর মাইক।
চীনের অনেক ‘প্রথম’-এর জন্ম দিয়েছেন লি। প্রথম ডব্লুটিএ শিরোপা জেতা চীনা নারী, র‌্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে ওঠার দিক দিয়েও প্রথম। প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠে এসে মজা করেই বললেন, ‘প্রথম চীনা নারী হিসেবে ফাইনালে উঠতে পেরে আমি গর্বিত। আসলে আমি সব সময়ই প্রথম দৃষ্টান্ত গড়তে চাই।’
লির রসবোধের পরিচয় কোর্টেও পাওয়া গেছে। প্রথম সেটে খুব একটা জমিয়ে লড়াই করতে পারেননি। দ্বিতীয় সেটেও পিছিয়ে পড়েছিলেন। ওজনিয়াকি ম্যাচ পয়েন্টের জন্য সার্ভ করছিলেন, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এর মধ্যে কোচ জিয়াং শানের দিকে তির্যক চোখে তাকাচ্ছিলেন বারবার। না, পরামর্শ চাইতে নয়, জিয়াং যে তাঁর স্বামীও, তাঁর কারণেই তো ভালো ঘুম হয়নি।
পরে কোর্টে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়ও মজা করে বলেছেন, ‘সেমিফাইনাল বলে নার্ভাস তো ছিলামই। তবে কালকে ভালো ঘুম হয়নি। ও বারবার নাক ডাকছিল। প্রায় প্রতি ঘণ্টায় আমার ঘুম ভেঙে গেছে।’
গতবারও অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে দুর্দান্ত খেলেছিলেন। ওজনিয়াকি, ভেনাসকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিলেন। আফসোস, সেখানে তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন সেরেনা, টুর্নামেন্টের ভাবী চ্যাম্পিয়ন। এবার আর কোনো হতাশায় পুড়তে চান না। কাল শিরোপা জিতেই দিতে চান শান্তির ঘুম!

এবার ফেদেরারেরও বিদায়

২০০৮ যেন ফিরে এল ২০১১-তে। সেবারও অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের সেমিফাইনালে গোলিয়াথ বধ করেছিল এক ডেভিড। শেষ পর্যন্ত পুরুষ এককের শিরোপাও উঠেছিল তাঁর হাতে। সেই ডেভিড গায়ে-গতরে বেড়ে উঠলেও গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপার সংখ্যায় সেই ২০০৮-ই সবেধন। তবে কাল নোভাক জোকোভিচ যেভাবে সরাসরি সেটে পত্রপাঠ বিদায় করে দিলেন রজার ফেদেরারকে, বাজি ধরতে চাইলে এই সার্বিয়ানের ওপরই ধরুন!
হারলে ‘ফেদেরারের শেষ’ অনেকেই দেখে। অনেকবারই দেখেছেও। কালকেও ৭-৬ (৭/৩), ৭-৫, ৬-৪ গেমের পরাজয়ের পরও হয়তো আবারও আলোচনাটা জমে উঠবে। বিশেষ করে টানা চারটি গ্র্যান্ড স্লামেই যে খালি হাতে ফিরলেন ফেদেরার। গত আট বছরে এমনটা আর হয়নি!
আগের দিন বিদায় নিয়েছেন রাফায়েল নাদাল। তখন হয়তো অনেকেই ভেবেছিলেন, ফেদেরারের সামনে ১৭ নম্বর গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা জয়ের পথের কাঁটা দূর হয়ে গেল। কিন্তু পরদিনই ফেদেরারকেও বিদায় জানাতে হলো অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের দর্শকদের। ২০০৮ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেও এমনটাই হয়েছিল। তিন বছর পর এই প্রথম কোনো গ্র্যান্ড স্লাম ফাইনাল হবে, যেখানে ফেদেরারও নেই, নাদালও নেই।
২০০৮-এ জো-উইলফ্রায়েড সোঙ্গাকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিলেন জোকোভিচ। এবার এই তিন নম্বর বাছাইয়ের প্রতিপক্ষ বেছে নেবে আজকের দ্বিতীয় সেমিফাইনাল। যেখানে অ্যান্ডি মারে মুখোমুখি হবেন নাদালকে কোয়ার্টার ফাইনালে হারিয়ে আসা ডেভিড ফেরার।
আলোচনা একটা শুরু হয়ে গেছে এরই মধ্যে। নাদালের ফিটনেস নিয়ে সংশয়, ফেদেরারের ভাটার টান এই ইঙ্গিতই নাকি দিচ্ছে, দুই ‘আর’-এর আধিপত্য আর থাকবে না। জোকোভিচও আকারে-ইঙ্গিতে সে কথাই বললেন, ‘ওদের দুজনকে চ্যালেঞ্জ জানানো আসলেই কঠিন। সেটি আরও কঠিন বড় টুর্নামেন্টে, যেখানে তারা নিজেদের সেরা খেলাটা খেলে। তবে এখন কিন্তু পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টাতে শুরু করেছে। সেদিক দিয়ে দেখলে এটা খেলাটার জন্যই একটা সুখবর।’
এ ধরনের মন্তব্য করা বাঘের গলায় হাত ঢোকানোর মতোই। গত ২৩টি গ্র্যান্ড স্লামে ফেদেরার-নাদালই জিতে নিয়েছেন ২১টি শিরোপা। জোকোভিচ তাই পরক্ষণেই সতর্ক, ‘রজার কিন্তু এখনো ক্ষুধার্ত, এক নম্বর জায়গাটি ও ফিরে পেতে উন্মুখ। নাদাল এখনো অদম্য। আমরা আসলে এখনো ওদের চেয়ে পিছিয়েই আছি। তবে এখন এমন অনেক খেলোয়াড় উঠে এসেছে, যাদের পক্ষেও গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা জেতা সম্ভব। এটাই শুভ লক্ষণ।’
জোকোভিচের এই পূর্বাভাসের পাল্টা জবাব অবশ্য কালই দিয়ে রেখেছেন ফেদেরার। বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছেন, ‘এটাই শেষ নয়। আমি ফিরে আসবই।’ অবশ্য এদিন জোকোভিচ যে তাঁর চেয়ে অনেক ভালো খেলেছেন, নির্দ্বিধায় সেটিও স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘নোভাক আমার চেয়ে আজ ভালো খেলেছে। এটা মেনে নিয়েই আমাকে এগিয়ে যেতে হবে। এখানে পঞ্চমবারের মতো শিরোপা জিততে পারলে ভালোই লাগত। কিন্তু সেটা আজ আর সম্ভব হলো না।’

আফ্রিদিই হতে পারেন পাকিস্তানের অধিনায়ক

অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল পাকিস্তান ক্রিকেট দলের জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো একটা বড় আসর শুরুর মাত্র ২১ দিন আগেও যে তারা এই বিতর্কের ঘেরাটোপেই আটকে থাকবে, সেটা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি বলে মনে হচ্ছে। চূড়ান্ত প্রস্তুতি ভালোভাবে নেওয়া তো দূরে থাক, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলের জন্য এখনো পর্যন্ত অধিনায়কই ঘোষণা করতে পারেনি পিসিবি। মিসবাহ-উল-হক নাকি শহীদ আফ্রিদি—কার হাতে তুলে দেওয়া হবে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ মিশনের নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব, তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। তবে পিসিবির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বিশ্বকাপের জন্য শেষ পর্যন্ত আফ্রিদিকেই অধিনায়ক হিসেবে নির্বাচন করতে পারে পিসিবি।
ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে আফ্রিদিই পাকিস্তানের বিশ্বকাপ দলের অধিনায়ক হবেন, এটাই ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে অধিনায়ক হিসেবে মিসবাহ যে অসাধারণ পারফরমেন্স দেখিয়েছেন, তাতেই নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন পিসিবির কর্মকর্তারা। এ ছাড়া নির্ভরযোগ্য সূত্র মারফত জানা গেছে, পিসিবি সভাপতি ইজাজ বাট নাকি আফ্রিদির চেয়ে মিসবাহকেই অধিনায়ক হিসেবে দেখতে বেশি আগ্রহী। পিসিবির সেই সূত্র বলেছে, ইজাজ বাট এই মুহূর্তে অধিনায়ক হিসেবে আফ্রিদির চেয়ে মিসবাহকেই বেশি সমর্থন করছেন। এমনকি ইউনুস খানও অধিনায়ক হিসেবে মিসবাহকেই চান। কিন্তু অন্য অনেকের সুপারিশ, পরামর্শ মাথায় রেখে শেষ সময়ে ওয়ানডে দলের অধিনায়ক পরিবর্তন করার ঝুঁকিটা পিসিবির প্রধান নিতে চাচ্ছেন না।
নিউজিল্যান্ডে অবস্থানরত পাকিস্তানের ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং পিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করেই ইজাজ বাট এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দলটা পাকিস্তান বলেই নাম ঘোষণার আগ পর্যন্ত কোনো কিছু অনুমান করা যাচ্ছে না।

স্বপ্ন পূরণ হবে মিসবাহর

তরুণদের ভিড়ে জাতীয় দলে ঠাঁই হচ্ছিল না। এভাবে চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন মিসবাহ-উল-হক। গত বছরের জুলাইয়ের ঘটনা এটি। সেই মিসবাহ এখন পাকিস্তানের টেস্ট দলের অধিনায়ক। আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপেও নেতৃত্ব যেতে পারে তাঁর কাঁধে। তবে অধিনায়কত্ব করার সুযোগ আসুক আর না আসুক, বিশ্বকাপে খেলতে পারলে স্বপ্ন পূরণ হবে বলে জানিয়েছেন মিসবাহ।
‘বিশ্বকাপে খেলা যেকোনো পেশাদার ক্রিকেটারের জন্য বিরল সম্মানের। প্রশ্নাতীতভাবে এখানে খেলা যেকোনো ক্রিকেটারের স্বপ্ন। আমি সেই স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায় আছি’—এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়া মিসবাহর বরাত দিয়ে এ খবর প্রকাশ করেছে দ্য নেশন।
বিশ্বকাপে পাকিস্তান দলের অধিনায়কত্ব নিয়ে বিতর্ক চলছে। কেউ বলছেন, ওয়ানডে দলের অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদির ওপরই বিশ্বকাপে আস্থা রাখা হোক। কেউ আবার বলছেন, আফ্রিদিকে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হোক মিসবাহর ওপর। এ প্রশ্ন্নে ৩৬ বয়সী মিসবাহর প্রতিক্রিয়া, ‘বাকিটা দলের ম্যানেজমেন্টের ওপর নির্ভর করছে। তাঁরা যদি মনে করেন দলে আমার কোনো ভূমিকার প্রয়োজন আছে, তাহলে আমি কাউকে আশাহত করব না।’