Tuesday, December 22, 2009

ব্রিটেনে জরিপে এগিয়ে রক্ষণশীলেরা

ব্রিটেনের প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। গতকাল রোববার প্রকাশিত পৃথক দুটি জনমত জরিপে এ কথা বলা হয়েছে। জরিপে লেবার পার্টির চেয়ে রক্ষণশীলেরা বেশি জনসমর্থন পেয়েছে। খবর এএফপির।
আইপিএসওএস-এমওআরআই পরিচালিত একটি জরিপ প্রতিবেদন গতকাল স্থানীয় দ্য অবজারভার পত্রিকায় ছাপা হয়। এতে বলা হয়, জনমত জরিপে অংশ নেওয়া ৪৩ শতাংশ নাগরিক ডেভিড ক্যামেরোনের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ পার্টির পক্ষে তাদের সমর্থন দিয়েছে। গত মাসের জরিপের তুলনায় এবার কনজারভেটিভ পার্টির পক্ষে ছয় শতাংশ সমর্থন বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের লেবার পার্টি পেয়েছে ২৬ শতাংশ জনসমর্থন। গত মাসের তুলনায় তাঁর সমর্থন কমেছে পাঁচ শতাংশ। এ জরিপে দেখা যায়, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি পেয়েছে ২০ শতাংশ সমর্থন।
আগামী জুনে ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

তাইওয়ানে চীনবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল

তাইওয়ানের তাইচুং শহরে গতকাল রোববার প্রায় ৩০ হাজার লোক চীনবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল করেছে। চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্কোন্নয়নের বিরোধিতা করে এই মিছিল করে তারা। চীন ও তাইওয়ান কর্তৃপক্ষের মধ্যে চলতি সপ্তাহেই ওই শহরে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা। তাইওয়ানের দুই কোটি ৩০ লাখ অধিবাসীর বেশির ভাগই চীনের তাইওয়ান নীতি নিয়ে অসন্তুষ্ট। তারা তাইওয়ানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে।
গতকালের বিক্ষোভের আয়োজন করে তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি)। পুলিশ জানিয়েছে, ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ৫০০ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা ‘গো তাইওয়ান গো’ বলে স্লোগান দেয়। এ সময় তারা ‘তাইওয়ান-চায়না—ওয়ান কান্ট্রি ইচ সাইড’ লেখা হেডব্যান্ড পরে ছিল।
বিক্ষোভ শুরুর আগে ডিপিপি সভানেত্রী সাই ইং-ওয়েন সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিজেদের দাবি প্রকাশ করার জন্য এই সমাবেশে সবাইকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আশাকরি সরকার নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান জানাবে। চীনের সঙ্গে আরও বেশি চুক্তি হলে, চীনারা আরও বেশি আসবে এখানে। এতে আমাদের কাজ পাওয়া কষ্টকর হয়ে যাবে এবং প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হবে।’
চীন তাইওয়ানকে নিজের অংশ হিসেবে দাবি করে। গত অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে দুই অংশের মধ্যে বৈরিতা চলার পর সম্প্রতি চীন ও তাইওয়ান কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। গত বছরের মে মাসে মা ইং-জো তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর আসন্ন বৈঠকটি হবে চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে চতুর্থ বৈঠক।

ইরানের ভিন্নমতাবলম্বী নেতা মোনতাজেরি মারা গেছেন

ইরানের শীর্ষস্থানীয় ভিন্নমতাবলম্বী নেতা আয়াতুল্লাহ হোসেন আলী মোনতাজেরি মারা গেছেন। রোববার স্থানীয় বার্তা সংস্থাগুলো এ কথা জানায়। তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের একজন কট্টর সমালোচক ছিলেন।
বার্তা সংস্থা আইএসএনএ বলেছে, মোনতাজেরি ৮৭ বছর বয়সে শনিবার রাতে মারা গেছেন। তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে নানা রোগে ভুগছিলেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির এক সময়ের মনোনীত উত্তরাধিকারী ছিলেন তিনি।

গড়কারি বিজেপির নতুন সভাপতি

 ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন নিতিন গড়কারি। রাজনাথ সিংয়ের ইস্তফার পর গতকাল রোববার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এ দায়িত্ব নেন। বিজেপির সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে গড়কারিকেই দলটির সভাপতি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ ঘোষণার পর গড়কারি (৫২) বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা আদভানি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ির আশীর্বাদ চান। এ সময়গড়কারি বলেন, এ পদে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তাই সামলে নিতে খানিকটা সময় লাগতে পারে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বিজেপির সভাপতির পদে গড়কারিকে নির্বাচন করায় দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই অসন্তুষ্ট। তাঁর এ উত্থানকে অনেকেই সহজে মেনে নিতে পারছেন না।

মেগরাহির স্বাস্থ্যের অবনতি

স্কটল্যান্ডের লকারবি শহরে বিমানে বোমা হামলার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একমাত্র ব্যক্তি এবং পরে বিশেষ বিবেচনায় মুক্তি পাওয়া লিবীয় নাগরিক আবদেল বাসেত আলি আল-মেগরাহির শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। তাঁর শরীরে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।
ত্রিপলি চিকিত্সাকেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সর্বশেষ স্ক্যানে ধরা পড়েছে মেগরাহির সারা শরীরে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি হয়েছে। শনিবার তাঁর কাশি বেড়ে যায়। তিনি ঘনঘন বমি করতে থাকেন। একপর্যায়ে ওই দিনই মেগরাহিকে ত্রিপলির ওই হাসপাতালে নেওয়া হয়।
স্কটল্যান্ডের লকারবি শহরে ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে নিউইয়র্কগামী প্যান অ্যাম বোয়িং-৭৪৭ বিমানে বোমা হামলায় ২৭০ জন নিহত হন। ওই হামলার দায়ে স্কটল্যান্ডের আদালত মেগরাহিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। স্কটল্যান্ডের কারাগারে সাজাভোগের একপর্যায়ে তাঁর শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর ২০ জন চিকিত্সকের একটি দল গত আগস্টে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলে, মেগরাহি আর বড়জোর তিন মাস বাঁচবেন। ওই মাসেই মেগরাহিকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়।

জেলায়ার সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকের সাক্ষাত্

হন্ডুরাসের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সে দেশে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক গত শনিবার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল জেলায়ার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন। খবর এএফপির।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত হুগো লরেন্স জেলায়ার সঙ্গে দেখা করতে তেগুচিগালপায় ব্রাজিলের দূতাবাসে যান। ২৮ জুন সেনাসমর্থিত এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারান জেলায়া। এরপর বিদেশে সাময়িক নির্বাসনে থাকার পর তিনি সেপ্টেম্বরে দেশে ফিরে ব্রাজিলের দূতাবাসে আশ্রয় নেন।
জেলায়ার উপদেষ্টা রাসেল টম বলেন, হুগো লরেন্স ব্রাজিলের দূতাবাসে গিয়েছিলেন। তিনি জেলায়াকে বলেছেন, বড়দিন উপলক্ষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন। এরপরই সংকট সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংকটের সমাধানে মধ্য আমেরিকা পর্যায়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
হন্ডুরাসে গত ২৯ নভেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পোরফিরিও লোবো জয়ী হয়। জানুয়ারিতে তাঁর ক্ষমতা নেওয়ার কথা। ওয়াশিংটন এই নির্বাচনের আগে জেলায়াকে ক্ষমতায় পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সে দাবি উপেক্ষা করে নির্বাচন সম্পন্ন করে।

গাজায় এক বছরেও ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত শুকায়নি

গাজায় ইসরায়েলি সেনা অভিযানের প্রায় এক বছর পূর্ণ হতে চলল। কিন্তু এত দিনেও সেখানে ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত শুকায়নি। শেষ হয়নি গাজাবাসীর লাঞ্ছনা। কমেনি দুর্ভোগ। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে, দাতা সংস্থার দেওয়া তাঁবুতে দিন যাপন করছে লাখো মানুষ। দুই মুঠো অন্নের জন্য, একটু ত্রাণের জন্য তীর্থের কাকের মতো এখনো তাদের তাকিয়ে থাকতে হয়। এক করুণ মানবেতর জীবন তাদের।
গাজার উত্তরাঞ্চলে কামাল আওয়াজা পরিবারের বাস। ইসরায়েলি সেনারা পরিবারটির ঘর-বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। সেনাদের গুলিতে নিহত হয় কামাল আওয়াজার আট বছর বয়েসী ছেলে ইব্রাহিম। আকাশ থেকে তখন বোমা ফেলা হচ্ছিল। আর ভূমিতে ট্যাংক নিয়ে সাক্ষাত্ যমের মতো এগিয়ে আসছিল ইসরায়েলি সেনারা। আহত হয়েছিলেন আওয়াজা ও তাঁর স্ত্রী। চার দিন পায়ে হেঁটে তাঁরা একটা হাসপাতালে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপের ওপর একটা তাঁবুতে পরিবারটি এখন বাস করছে। তাঁবুতে ঝোলানো আছে ইব্রাহিমের একটা ছবি। কোঁকড়া চুলের ছেলেটি যেন এখনো হাসছে। এক বছর আগে ইসরায়েলি সেনারা যার প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।
যুদ্ধাহত কামাল আওয়াজা ও তাঁর স্ত্রীকে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ প্রতিমাসে সামান্য অর্থ দেয়। তা দিয়ে কোনো রকমে তাঁদের দিন চলে।
কয়েক কিলোমিটার দূরে বাস সওয়াফিয়েরি পরিবারের। হাঁস-মুরগির একটা খামার আবার দাঁড় করাতে পরিবারটি দিন-রাত খাটছে। গত বছর ইসরায়েলি হানাদারেরা তাঁদের হাজার হাজার মুরগির ছানা মেরে ফেলেছিল। বুলডোজার দিয়ে তাঁদের খামারটি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। ২০০৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর গাজা আক্রমণ করে ইসরায়েলি বাহিনী। টানা তিন সপ্তাহ বিমান থেকে বোমা হামলা চালানো হয়। কামান থেকে ছোড়া হয় গোলা। তছনছ করে পদাতিক বাহিনীও। এই অভিযানে প্রায় এক হাজার ৪০০ ফিলিস্তিনি ও ১৩ জন ইসরায়েলি নিহত হয়।
গাজায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বাস। তাদের অধিকাংশকেই এখন নির্ভর করতে হয় দাতা সংস্থাগুলোর সরবরাহ করা ত্রাণের ওপর। এদিকে ইসরায়েল ২০০৭ সাল থেকে গাজা অবরোধ করে রেখেছে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সর্বশেষ ইসরায়েলি সেনা অভিযানে প্রায় ছয় হাজার ৪০০ ঘর-বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গাজা পুনর্গঠন থমকে আছে। মিসর থেকে সুড়ঙ্গ পথে সামান্য পরিমাণ লোহা ও সিমেন্ট গাজায় আনে চোরাকারবারিরা। সেগুলোর দামও আকাশছোঁয়া।

মুম্বাইয়ের মতো লন্ডনেও ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হতে পারে -স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হুঁশিয়ারি

ব্রিটেনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড পুলিশ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, মুম্বাইয়ের মতো লন্ডনেও জঙ্গি হামলা হতে পারে। নতুন বছরের গোড়ার দিকে লন্ডনের ব্যবসা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ হামলা হতে পারে। সানডে টাইমস এ খবর দিয়েছে।
পত্রিকাটি জানায়, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের একজন জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, ‘মুম্বাইয়ের মতো লন্ডনেও সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে।’ তিনি বলেন, বন্দুকধারীদের একটি ছোট দল অত্যাধুনিক অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরঞ্জামসহ লন্ডনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে। সন্ত্রাসীরা লোকজনকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গুলি করে হত্যা করতে পারে।
সানডে টাইমস জানায়, দুই সপ্তাহ আগে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ওয়েবসাইট থেকে এ হামলার পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। সন্ত্রাসীরা লন্ডনের নৈশক্লাব, খেলার মাঠ ও ইহুদিদের স্থাপনার ওপর হামলা চালাতে পারে।
স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সতর্কতা এটাই প্রমাণ করে যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি লন্ডনে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রিটেনের হাউস অব কমন্সের সন্ত্রাসবিরোধী উপকমিটির চেয়ারম্যান প্যাট্রিক মার্সার বলেন, ‘সন্ত্রাসী হামলার এ হুমকি পুরোপুরি বাস্তব।’
একজন নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেছেন, কয়েক দিন ধরে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার ব্যাপারে বারবার সতর্কতা জারি করে আসছে। তারা জানায়, সন্ত্রাসীরা হামলার ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই উপদেষ্টা আরও বলেন, আগে লন্ডনে সন্ত্রাসী হামলার ব্যাপারটিকে গুঞ্জন ভাবা হতো। কিন্তু এখন এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ষড়যন্ত্রের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ তাদের নেটওয়ার্ক ‘সিকিউরিটি ফোরাম’-এর মাধ্যমে সেখানকার ব্যবসায়ী নেতা, স্থানীয় সরকার ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলোর কাছে সতর্কমূলক বার্তা দিয়েছে।
২ ডিসেম্বর সন্ত্রাসীদের অনলাইন যোগাযোগ থেকে জানা যায়, তারা গেরিলা হামলা ও পুলিশ স্টেশনে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে। এক সন্ত্রাসী প্রস্তাব করে, যেখানে শিশুরা থাকবে না, সেখানেই হামলা চালানো হবে। বিশেষ করে যে সময়ে মুসলিম বা শিশুরা যেখানে থাকবে না, সেখানে হামলা চালানো হবে। এ সময় অপর সন্ত্রাসী বলে, যদি মেশিনগান ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ না থাকে, সে ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই ভালো পরিকল্পনা। সে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার কথা উল্লেখ করে বলে, লন্ডনে হামলার জন্য মুম্বাই হামলাই আদর্শ হতে পারে। এ সময় তৃতীয় আরেক সন্ত্রাসী বলে, সবকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তবেই হামলার লক্ষ্যস্থল নির্ধারণ করা উচিত।
২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলা হয়। এতে ১৬৬ জন নিহত হয়।

খসড়া শিল্পনীতিতে ১৭টি খাতে বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে

খসড়া শিল্পনীতিতে ১৭টি খাতকে নিয়ন্ত্রিত শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাত্ এসব শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধিনিষেধ থাকছে।
সরকার শিল্পনীতি-২০০৯ চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে এর মধ্যে খসড়ার ওপর মতামত দেওয়ার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সংযোজন করেছে। আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এটি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া যেসব শিল্প স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল হিসেবে সরকারি বিনিয়োগের জন্য সংরক্ষিত, সেসব শিল্পকে সংরক্ষিত শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এসব শিল্প খাত সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। সংরক্ষিত শিল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে অস্ত্রশস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি, পারমাণবিক শক্তি, সিকিউরিটি প্রিন্টিং ও টাঁকশাল এবং বনায়ন ও সংরক্ষিত বনভূমির সীমানায় যান্ত্রিক আহরণ। এসব খাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সংরক্ষিত শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও নিয়ন্ত্রিত শিল্পের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে বিনিয়োগ করা যাবে।
শিল্পনীতিতে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক বা খনিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে, দেশের স্বার্থে সেবামূলক বা বিনোদনমূলক কিছু শিল্প স্থাপনের বিষয়ে সরকারের যথাযথ সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণকল্পে এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও সংস্কৃতির প্রতি হুমকির কারণ হতে পারে বা অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন সব শিল্প সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বা কমিশনের অনুমোদন বা অনাপত্তি গ্রহণ সাপেক্ষে বেসরকারি খাতে স্থাপন করা যাবে। তবে সরকার পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে নিয়ন্ত্রিত শিল্পের তালিকা তৈরি করবে। বেসরকারি অবকাঠামো প্রকল্প যেমন ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মনোরেল, আন্ডারগ্রাউন্ড রেল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ইত্যাদির ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত অবকাঠামো নির্দেশিকায় উল্লিখিত নিয়ম অনুসরণপূর্বক অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে।
গভীর সমুদ্রে মত্স্য আহরণ শিল্প, বেসরকারি খাতে ব্যাংক ও আর্থিক শিল্প, বেসরকারি খাতে বিমা কোম্পানি, বেসরকারি খাতে বিদ্যুত্ উত্পাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ প্রকল্পসমূহ, প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল অনুসন্ধান, উত্তোলন ও সরবরাহকরণ শিল্পকে নিয়ন্ত্রিত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া কয়লা অনুসন্ধান, উত্তোলন ও সরবরাহকরণ শিল্প, অন্যান্য প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, উত্তোলন ও সরবরাহকরণ শিল্প, বৃহত্ অবকাঠামো প্রকল্প যেমন—ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মনোরেল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো বা কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন ইত্যাদি স্থাপন, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত অপরিশোধিত তেল পরিশোধন, ব্যবহূত লুব অয়েল রিসাইক্লিং ও রিফাইনিং, কাঁচামাল হিসেবে দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস বা কনডেনসেট ও অন্যান্য খনিজ ব্যবহূত মাঝারি ও বৃহত্ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, টেলিকমিউনিকেশন সেবা শিল্প মোবাইল, সেলুলার এবং ল্যান্ডফোন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, কার্গো বা যাত্রী পরিবহন বিমান, সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচল, সমুদ্রবন্দর ও গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন, ভিওআইপি, আই টেলিফোন ও সৈকতের বালি থেকে আহরিত ভারী খনিজনির্ভর শিল্প স্থাপন ও আহরণ।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রিত শিল্পের ক্ষেত্রে সরকার যৌথ বিনিয়োগ প্রকল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মূলধনের হার নির্ধারণ করতে পারবে। জাতীয় শিল্প উন্নয়ন পরিষদ যৌক্তিক কারণে উল্লিখিত তালিকা সময় সময় সভা করে সংকোচন বা সম্প্রসারণ করতে পারবে। নিয়ন্ত্রিত তালিকাভুক্ত কোনো শিল্প প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বা কমিশনের অনুমোদন বা অনাপত্তি না পাওয়া পর্যন্ত শিল্পের পোষক কর্তৃপক্ষ যেমন বিনিয়োগ বোর্ড, বিসিক, বেপজা শিল্প স্থাপনের জন্য নিবন্ধন দিতে পারবে না।

চট্টগ্রামে বিআইএফসির শাখা উদ্বোধন

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় সম্প্রতি বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফসি) প্রথম শাখা উদ্বোধন করা হয়।
বিআইএফসির চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবদুল মান্নান শাখাটির উদ্বোধন করেন। এতে কোম্পানির পরিচালকেরাসহ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ মালিক, সিএফও এহসানুল বারী এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, চট্টগ্রামের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক বিকাশে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যে বিআইএফসি এ শাখা খুলেছে।

পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পাঁচ হাজার টাকা করার দাবি -বিএনসির মতবিনিময় সভা

বাংলাদেশ ন্যাশনাল কাউন্সিল (বিএনসি) অব টেক্সটাইল গার্মেন্টস অ্যান্ড লেদার ওয়ার্কার্স আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় দেশের পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি পাঁচ হাজার টাকা ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়েছে।
ঢাকার লেবার হলে গতকাল রোববার দিনব্যাপী এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় শ্রমিকনেতা রায় রমেশ চন্দ্র সভাপতিত্ব করেন। এতে আলোচনায় অংশ নেন বদরুদ্দোজা নিজাম, হেদায়েতুল ইসলাম, কুতুব উদ্দিন আহম্মেদ, সাকী রেজওয়ানা, লতিফা বেগম, তৌহিদুর রহমান, নাজমা আক্তার, নুরুল ইসলাম, আশরাফ উদ্দিন প্রমুখ।
সভায় শ্রমিকদের ওপর চালানো এক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিএনসির নেতা জেড এম কামরুল আনাম। এতে জানানো হয়, যেখানে চীনের শ্রমিকেরা ১০০ ডলার, ভিয়েতনামে ৬০, ইথিওপিয়ায় ৩০, পাকিস্তানে ৮২, শ্রীলঙ্কায় ৬৭, ভারতে ৬৫, ইন্দোনেশিয়ায় ৮০ এবং কম্বোডিয়ায় ৫০ ডলার ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছেন, সেখানে বাংলাদেশের শ্রমিকদের দেওয়া হচ্ছে ২৫ ডলার, যা বর্তমান বাজারদর বা আন্তর্জাতিক প্রাপ্য মজুরির সঙ্গে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কেরানীগঞ্জে এসআইবিএলের এসএমই সেন্টার চালু

ঢাকার কেরানীগঞ্জে সম্প্রতি সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের (এসআইবিএল) ৪২তম শাখার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এসআইবিএলের ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে এ শাখার উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্যাংকের পরিচালক কামালউদ্দিন আহমেদ ও হুমায়ুন কবির খান। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এম আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাদেক মো. সোহেল, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল শাহজাহান, ঊর্ধ্বতন নির্বাহী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

তিন হাজার কোটি টাকার মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের প্রস্তাব আটকে রয়েছে -এসইসির সিদ্ধান্তহীনতায় কর্মহীন নতুন সম্পদ-ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলো by হাসান ইমাম

প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ৩০টির মতো মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের প্রস্তাব সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (এসইসি) দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্পদ-ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলো এসব ফান্ড গঠনের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করলেও এসইসির পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে না।
এসইসি সূত্র বলছে, গত ৫ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের সিদ্ধান্তের কারণে আপাতত নতুন কোনো মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। এসইসির চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ‘একসঙ্গে অনেকগুলো মিউচুয়াল ফান্ড বাজারে ছাড়ার কারণে পুঁজিবাজারে যাতে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য মিউচুয়াল ফান্ড ধাপে ধাপে বাজারে ছাড়ার অনুমোদন দিতে হবে।’ মূলত এর পর থেকেই এসইসি নতুন মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের অনুমোদন দেওয়া বন্ধ রেখেছে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুঁজিবাজারকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে যখন বেশি বেশি মিউচুয়াল ফান্ড দরকার, তখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত হঠকারি হতে পারে। সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের যৌথ সংবাদ সম্মেলনেও এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রভাব বেশি হলে অস্থিতিশীলতার মাত্রা বাড়ে। কারণ বেশির ভাগ সময় তারা গুজবতাড়িত হয়ে বিনিয়োগ-সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এর বিপরীতে পেশাদার সম্পদ-ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে দূরদর্শিতার সঙ্গে। কিন্তু নতুন এ সিদ্ধান্ত সম্পদ-ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশ রুদ্ধ করবে।
এসইসি এ পর্যন্ত মোট ১২টি সম্পদ-ব্যবস্থাপনা কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে গত দু-তিন মাসের ব্যবধানে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে পাঁচটি কোম্পানির। এসব সম্পদ-ব্যবস্থাপনা কোম্পানির একমাত্র কাজ মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনা করা। পেশাদারিত্বের সঙ্গে এ কাজ করার জন্য কোম্পানিগুলো উচ্চবেতনে বিদেশ থেকে ডিগ্রি নেওয়া বিশ্লেষকদের নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু ফান্ডের অনুমোদন না পাওয়ায় কোনো আয় করতে পারছে না তারা। এ অবস্থায় সম্পদ-ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোর টিকে থাকাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে নতুন মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো কোনো সম্পদ-ব্যবস্থাপনা কোম্পানি জনবল নিয়োগ করা থেকে বিরত রয়েছে।
এ ব্যাপারে প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন আল কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের মেয়াদি ও বে-মেয়াদি মিলে মোট পাঁচটি মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের আবেদন এসইসিতে জমা রয়েছে। কিন্তু একটির ব্যাপারেও কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা ব্যয় হলেও আমাদের কোম্পানির কোনো আয় নেই। এ পরিস্থিতিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিয়ে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
মঈন আল কাশেমের মতে, বাজারকে স্থিতিশীল রাখতেই বেশি বেশি মিউচুয়াল ফান্ড প্রয়োজন। মিউচুয়াল ফান্ড একই সঙ্গে বাজারে চাহিদা ও জোগানের সৃষ্টি করে। অতিমূল্যায়িত বাজারে মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট যেমন জোগান হিসেবে কাজ করে, তেমনি আবার বাজারমূল্য সংশোধনের ধারায় ফিরলে মিউচুয়াল ফান্ড চাহিদা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। তাই বলা যায়, এ মুহূর্তে মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন দেওয়া হলে বাজার আরও অতিমূল্যায়িত হয়ে যাবে এ ধারণা সঠিক নয়। কারণ সাধারণত কোনো পেশাদার সম্পদ-ব্যবস্থাপনা কোম্পানি অতিমূল্যায়িত বাজারে বিনিয়োগ করে না।
বর্তমানে দেশে মোট ১৯টি মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে। মোট বাজার মূলধনে এসব মিউচুয়াল ফান্ডের অবদান এক শতাংশেরও কম। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারতে মোট বাজার মূলধনের ১৫ শতাংশ ও পাকিস্তানে প্রায় ৯ শতাংশই মিউচুয়াল ফান্ড। বে-মেয়াদি ও মেয়াদি মিলে ভারতে তিন হাজার ৬০০টির বেশি মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে এবং প্রতি মাসে গড়ে আট থেকে ১০টি ফান্ড নতুন যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে করা হচ্ছে ঠিক উল্টো।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে এসইসির চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকার বলেন, ‘যেসব আবেদন জমা রয়েছে সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। দ্রুতই এগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।’

এশিয়ান দলগত দাবা

এশিয়ান দলগত দাবায় অংশ নিতে কাল ঢাকা ছেড়েছে বাংলাদেশ দাবা দল। ছেলেদের দলে খেলবেন গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ, জিয়াউর রহমান, ফিদে মাস্টার আবদুল মালেক, মাহতাবউদ্দিন ও জামালউদ্দিন। মেয়েদের দলে আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার রানী হামিদ, জাকিয়া সুলতানা, নাজরানা খান ও জাহানারা হক। টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, ইয়েমেন ও বাংলাদেশ।

সেঞ্চুরিয়ন দেখল রোমাঞ্চকর ড্র

মাঠটার নাম যখন সেঞ্চুরিয়ন, আর মুখোমুখি যখন দক্ষিণ আফ্রিকা-ইংল্যান্ড, টেস্টের ফলাফল তো ড্র-ই হবে! রেকর্ড বলছে সেটাই। সেঞ্চুরিয়নে এই দুদলের আগের তিন ম্যাচের দুটোই ড্র। অন্যটির ফলও একই হতো। বৃষ্টিতে তিন দিন ভেসে যাওয়ার পরও ম্যাচটা ফল দেখেছিল। কারণ, ২০০০ সালের ওই ম্যাচে একটা ফলাফল এনে দেওয়ার জন্য ‘বাজিকর’দের কথা দিয়েছিলেন হানসি ক্রনিয়ে!
এই ম্যাচটিও ড্র হলো। তবে কাল শেষ বিকেলে তা ছড়িয়ে দিল অনেক উত্তেজনা। দক্ষিণ আফ্রিকার জয়টা থেকে গেল একটা মাত্র উইকেটের দূরত্বে। পল কলিংউড শেষ ব্যাটসম্যান গ্রাহাম অনিয়নসকে (১*) নিয়ে ১৯ বল অবিচ্ছিন্ন থেকে নিশ্চিত হারের মুখ থেকে বাঁচিয়েছেন ইংল্যান্ডকে। মাখায়া এনটিনির করা ম্যাচের শেষ বলটি ঠেকিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত হাওয়ায় ভাসিয়ে যেন ‘যুদ্ধ জয়ে’র ঘোষণাই দিলেন অনিয়নস। হ্যাঁ, ইংল্যান্ডের জন্য ম্যাচ ড্র করাটাও ছিল ‘যুদ্ধ জয়ে’র উপলব্ধি।
অথচ কাল চা-বিরতির পরও মনে হচ্ছিল, ম্যাচটি নিষ্প্রাণ ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছে। ৩ উইকেটে ১৭২ রান, উইকেটে জমে গেছেন কেভিন পিটারসেন ও জোনাথন ট্রট। কীভাবে এই জুটি ভাঙবেন, সেই চিন্তায় রীতিমতো দিশেহারা দেখাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথকে। এমন সময়ই দৃশ্যপটে এলেন অভিষিক্ত পেসার ফ্রিডেল ডি ওয়েট। না বোলার ওয়েট নন, ফিল্ডার ওয়েট।
পিটারসেনের ভুল বোঝাবুঝির সুযোগে ওয়েট তাঁকে করেছেন রানআউট। সঙ্গীর দিকে না তাকিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ একটা রান নিতে দৌড় দিয়েছিলেন। ফল: ১৯ রানের জন্য জন্মভূমিতে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটাই শুধু হাতছাড়া করেননি, ভেঙে যায় ট্রটের সঙ্গে তাঁর ১৪৫ রানের জুটিটাও। পিটারসেন যখন আউট হন, তখনো দিনের খেলার ৩৪ ওভার বাকি। তবে ম্যাচের মোড় ঘোরাতে এর পর জ্বলে ওঠেন বোলার ওয়েট। ৬ ওভারের মধ্যে ট্রট (৬৯), ইয়ান বেল (২) ও ম্যাট প্রিয়রকে (০) আউট করেন ডান হাতি পেসার। পরে স্টুয়ার্ট ব্রডকে (০) উইকেটের পেছনে ক্যাচ বানান বাঁহাতি স্পিনার পল হ্যারিস, গ্রায়েম সোয়ানকে (২) এলবিডব্লু করেন মরনে মরকেল। ৩ উইকেটে ১৭২ থেকে ইংল্যান্ড মুহূর্তেই পরিণত হয় ৯ উইকেটে ২১৮ রানে। এরপর ম্যাচের বাকি ছিল ১৯ বল। কিন্তু অনিয়নসকে নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে জয়-বঞ্চিত করেন কলিংউড (২৬)।
শুরুর দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা অবশ্য সুবিধাজনক জায়গাতেই ছিল। ৯৬ ওভারে ৩৬৪ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নামা ইংল্যান্ড আগের দিনই মাত্র ৫ রানের মাথায় হারায় অধিনায়ক স্ট্রাউসকে। কাল ১২ ওভারের মধ্যেই জেমস অ্যান্ডারসন আর অ্যালিস্টার কুকের বিদায়ে ইংল্যান্ড পরিণত হয় ২৭/৩, চাপে পড়ে যায় সফরকারীরা। এরপরই ‘দুই দক্ষিণ আফ্রিকান’ ট্রট ও পিটারসেনের লড়াই।
দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে আসার আগে এই দুজনকে নিয়ে অনেক শোরগোল হয়েছে। কারণ, পিটারসেন-ট্রট দুজনই দক্ষিণ আফ্রিকানদের চোখে ‘বিশ্বাসঘাতক’। দুজনই বেড়ে উঠেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। কিন্তু শেষে জাতীয় দল হিসেবে বেছে নিয়েছেন ইংল্যান্ডকে। সেই দুজনের ব্যাটেই প্রতিরোধ।

স্পেনে রিয়ালের গোল-উৎসব, ইংল্যান্ডে অঘটন

বার্সেলোনা যখন মরুর বুকে আরেকটি সাফল্য-তিলক আঁকল, স্প্যানিশ লিগে রিয়াল মাদ্রিদ রিয়াল জারাগোজাকে ৬-০ গোলে হারিয়ে ভাসল আনন্দসাগরে। বিশ্বজয়ী বার্সাকে হয়তো একটা বার্তাই পাঠাল ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনির দল—পথ চলতে চলতে পিছিয়ে পড়তে পারি কিংবা এ বছরে তোমাদের একের পর এক শিরোপা উত্সবের দর্শক হতে পারি; তবে নতুন মৌসুমে শিরোপা ঘরে তোলার পথেই আছি আমরা!
‘দলের লক্ষ্য ছিল, রক্ষণটা জমাট করে যত পারি আক্রমণ এবং গোল করে যাব। পরিকল্পনা কাজে লেগেছে বলে আমরা খুব খুশি’—রিয়াল মাদ্রিদ কোচ পেলেগ্রিনির ম্যাচ শেষের প্রতিক্রিয়া ছিল এমনই। এক ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকার পর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আবার স্প্যানিশ লিগে খেলতে নেমেছেন। এটির একটি প্রতিক্রিয়া আছে না!
তবে গোলবন্যার শুরুটা রোনালদোর মাধ্যমে নয়, করে দিয়েছেন তা আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার গঞ্জালো হিগুয়েইন। ম্যাচের মিনিট তিনেক যেতে না-যেতেই দারুণ এক গোল করে নিজেদের এগিয়ে নেন হিগুয়েইন। এর পর রাফায়েল ফন ডার ভার্ট ২ মিনিটের মধ্যে (২৬ ও ২৮) করেন দুই গোল। ৬ মিনিট পর গোলের জোড়া পূর্ণ করেন হিগুয়েইনও। ৪-০-তে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধের খেলা শেষ করে রিয়াল।
লিগে ফেরার একটা স্মারক না থাকলে কেমন দেখায়, এরপর তাই জারাগোজার রক্ষণকে তছনছ করে ৫০ মিনিটে দলের পঞ্চম গোলটি করেন রোনালদো। ৭১ মিনিটে ৬ নম্বর গোলটি করেন বদলি খেলোয়াড় করিম বেনজেমা। এই জয়ে শীর্ষে থাকা বার্সার সঙ্গে পয়েন্ট ব্যবধানটা ২-এ নামিয়ে এনেছে রিয়াল। ১৫ ম্যাচে ৩৯ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে বার্সেলোনা, রিয়ালের পয়েন্ট ৩৭। পয়েন্ট তালিকার এই অবস্থান এবং পরশুর ম্যাচের পারফরম্যান্স রিয়াল কোচ পেলেগ্রিনিকে জুগিয়েছে আত্মবিশ্বাস, ‘জারাগোজার বিপক্ষে পুরো ৯০ মিনিটই অসাধারণ খেলেছি। আমার কাছে মনে হচ্ছে ঠিক পথেই আছি আমরা।’
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে লিভারপুল পথ হারিয়েছে অনেক আগেই। নিজেদের হারিয়ে খুঁজছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও। পরশুর অঘটনের রাতে শিকার হয়েছে এই দুদলই। লিভারপুল পোর্টসমাউথের কাছে হেরেছে ০-২ গোলে। ফুলহামের কাছে ম্যানইউ উড়ে গেছে ৩-০ গোলে। হাল সিটির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে আর্সেনাল।

ধোনিকে হারিয়ে ভারতের অস্বস্তিই বেশি

‘আশা করি, ধোনির অনুপস্থিতি ভারতকে ভোগাবে। সে দারুণ ফর্মে আছে, তাকে হারানোটা ভারতের জন্য অবশ্যই বড় আঘাত’—স্লো ওভার রেটের কারণে মহেন্দ্র সিং ধোনির দুই ম্যাচ নিষিদ্ধ হওয়ায় কুমার সাঙ্গাকারার প্রতিক্রিয়া। তবে সবচেয়ে বড় ‘শত্রু’দের একজনের না থাকাটা শ্রীলঙ্কানদের জন্য অবশ্যই স্বস্তির, তবে খুব একটা সুখে নেই তারাও। নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ একটি অস্ত্র যে হারাতে হয়েছে তাদেরও!
ডান পায়ের পেশির ইনজুরির কারণে ইতিমধ্যেই দেশে ফিরে গেছেন অ্যাঞ্জোলো ম্যাথুস। এই অলরাউন্ডারকে হারানোয় নিশ্চিতভাবেই শ্রীলঙ্কার ‘টিম ব্যালান্স’ নষ্ট হবে। ম্যাথুসের জায়গায় দলে আসতে পারেন সনাত্ জয়াসুরিয়া। শ্রীলঙ্কা দলে আজ পরিবর্তন আসতে পারে আরও দুটি। নাগপুরে অভিষিক্ত সুরাঙ্গা লাকমলের জায়গায় ফিরতে পারেন নুয়ান কুলাসেকারা, অজন্তা মেন্ডিসের জায়গায় লাসিথ মালিঙ্গা।
তবে ভারতীয় দলে ধোনিকে হারানোর প্রভাবটা পড়বে আরও বেশি। শুধু দলের সবচেয়ে সফল ব্যাটসম্যান (৭৩ ও ১০৭) বলেই নয়, অনুপ্রেরণাদায়ী অধিনায়ক হিসেবেও। ভারত শঙ্কিত হতে পারে ধোনির বদলে দায়িত্ব পাওয়া বীরেন্দর শেবাগকে নিয়েও। ৫টি ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়ে তিনটিতেই হেরেছেন, এর চেয়ে বড় কারণ ওই ৫ ম্যাচে তাঁর রান ৯৮। সর্বোচ্চ বাংলাদেশের বিপক্ষে ৪৩। ভারতের জন্য অবশ্য সুখবরও আছে, ইনজুরি কাটিয়ে দলে ফিরতে পারেন যুবরাজ সিং। সে ক্ষেত্রে আগের ম্যাচে ৫৪ রান করার পরও মাঠের বাইরে থাকবে হবে বিরাট কোহলিকে। ভারত চিন্তিত নতুন বলে পেসারদের পারফরম্যান্স নিয়েও। তবে পুরোনো বলে ভালো করায় জহিরের সঙ্গে হয়তো টিকে যাবেন নেহরাও। প্রাভিন কুমারের জায়গায় আসতে পারেন ইশান্ত শর্মা।
আগের দুই ম্যাচের মতো আজ রান-উত্সব না দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কটকের বারাবতি স্টেডিয়ামে ১৫ ম্যাচে ৩০০ ছাড়ানো ইনিংস আছে একটিই, ১৯৯৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ভারতের ৩১০।

অস্ট্রেলিয়াতেই ফিরতে চান শোয়েব

অবশেষে মুখ খুলেছেন শোয়েব আখতার। দীর্ঘদিন ধরে কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না পাকিস্তানি এই ফাস্ট বোলারের। মাস দুয়েক আগে খবর রটেছিল শরীরের মেদ কমানোর জন্য অস্ত্রোপচার করিয়েছেন শোয়েব। তবে এ খবরটাও উড়িয়ে দিয়েছেন ৩৪ বছর বয়সী এই বোলার, ‘সবাই এটা নিয়ে অনেক কথা বলেছে। কিন্তু আমি এই প্রথম এটা নিয়ে মুখ খুলছি। আমি মোটা নই, কাজেই আমার মেদ ঝরানোর প্রয়োজন নেই। আর ওজন কমানোর প্রয়োজন হলে তো দৌড়ানোর মাধ্যমেই তা করতে পারি।’ লন্ডনে ডেইলি টেলিগ্রাফকে দেওয়া এই সাক্ষাত্কারে শোয়েব জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ দিয়েই ফিরতে চান পাকিস্তান দলে।

জাতীয় দলের অনুশীলন ২৬ ডিসেম্বর থেকে

প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ আজ শেষ হলেও জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ব্যস্ততা কমছে না। ভারত-শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে আগামী ৪ জানুয়ারি থেকে শুরু ত্রিদেশীয় হোম সিরিজের জন্য বাংলাদেশ দলের মূল প্রস্তুতি শুরু হবে আগামী ২৬ ডিসেম্বর থেকে। এর আগে লিগ শেষ হওয়ার পর ২৫ তারিখ পর্যন্ত চার দিনের ছুটি কাটাবেন ক্রিকেটাররা।
ত্রিদেশীয় সিরিজের সব ম্যাচই যেহেতু দিবারাত্রির, অনুশীলন এবার ফ্লাডলাইটের আলোতেই হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় দলের সহকারী কোচ খালেদ মাহমুদ। অনুশীলন-সূচিতে আছে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচও। ২৬ ডিসেম্বর ফ্লাডলাইটের আলোয় হওয়ার কথা ৫০ ওভারের প্রস্তুতি ম্যাচ, ২৮ ডিসেম্বরের ম্যাচটি ৩০ ওভারের। প্রাথমিক দলে থাকা ক্রিকেটাররাই দুদলে ভাগ হয়ে খেলবেন ম্যাচ দুটি।
বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুতি ম্যাচ দুটিতে খেলার সম্ভাবনা আছে ইনজুরি-আক্রান্ত মাশরাফি বিন মুর্তজার। কয়েক দিন ধরেই প্র্যাকটিসে পূর্ণ রানআপ আর গতি নিয়ে বল করছেন মাশরাফি। ত্রিদেশীয় সিরিজে খেলানোর শেষ চেষ্টার অংশ হিসেবেই প্রস্তুতি ম্যাচে তাঁকে খেলানোর চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানা গেছে।
ত্রিদেশীয় সিরিজের জন্য ২৬ সদস্যের প্রাথমিক দল দেওয়া হয়েছে আগেই। দু-এক দিনের মধ্যে ১৪ সদস্যের চূড়ান্ত দলও দেওয়ার কথা। সূত্র জানায়, চূড়ান্ত দলে চলে আসতে পারেন আইসিএল-ফেরত এক বা একাধিক ক্রিকেটার। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ত্রিদেশীয় সিরিজ।

ভারত বা বাংলাদেশ নয়, মিয়ানমারের গ্যাস পাবে চীন by বদরূল ইমাম

সম্প্রতি বাংলাদেশ মিয়ানমারের সাগরবক্ষে অবস্থিত গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস পরিবহনের জন্য মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত ত্রিদেশীয় পাইপলাইন প্রকল্প প্রস্তাবটি পুনর্জীবিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ মনে করছে, মিয়ানমার থেকে ত্রিদেশীয় এই পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প দুভাবে বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হতে পারে। প্রথমত, এই পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সঞ্চালন চার্জ বাবদ বাংলাদেশ প্রতিবছর অর্থ অর্জনের সুবিধা লাভ করবে, যা কিনা ডলারে বা সমমানের গ্যাস পাওয়ার মাধ্যমে হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ওই পাইপলাইন কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানি করতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর আগে প্রথমত প্রকল্পটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় কিছু বিষয়ে মতৈক্য না হওয়ার কারণে তা আর বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। ইতিমধ্যে মিয়ানমার ভারতের পরিবর্তে চীনের কাছে গ্যাস বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এ বিষয়ে এক পশ্চিমা পর্যবেক্ষক মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ যে ট্রেনটি ধরতে চাইছে, তা ইতিমধ্যেই স্টেশন ছেড়ে চলে গেছে।
বাংলাদেশে কোনো কোনো মহল মনে করে, ত্রিদেশীয় পাইপলাইন বাংলাদেশের জন্য তেমন সুবিধা বয়ে আনবে না; বরং ভারতের সঙ্গে গ্যাস পাইপলাইন যোগসূত্র স্থাপন করলে তা ভবিষ্যতে সময় ও ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বিরোধমূলক সংকট সৃষ্টির আশঙ্কাকে বাড়াতে পারে। আবার অন্য মহল মনে করে, আন্তদেশীয় গ্যাস পাইপলাইন বিশ্বের অন্যান্য দেশের মধ্যে যে রকম পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে এনেছে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত ত্রিদেশীয় পাইপলাইনও দেশ তিনটির মধ্যে সেভাবে লাভ বয়ে নিয়ে আসবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো স্বল্প জ্বালানি সম্পদের দেশে বর্তমানের গ্যাসের ঘাটতি ও আসন্ন ভবিষ্যত্ জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জ্বালানি মজুদ ব্যবহারের সুবিধা ভোগ করতে ত্রিদেশীয় গ্যাস পাইপলাইন মোক্ষম ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই এ প্রশ্ন এসে পড়ে যে বাংলাদেশ কি একটি সুযোগ হাতছাড়া করছে?
মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরবক্ষে আবিষ্কৃত হয় বিরাট আকারের গ্যাসক্ষেত্র সুউ, সুউফু এবং মিয়া। কোরিয়ার তেল কোম্পানি দেওউ ইন্টারন্যাশনাল আবিষ্কৃত এই গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে ভারতীয় কোম্পানিরও অংশীদারি রয়েছে (দেওউ ৫১%, ভারতের ওএনজিসি ১৮.৫%, ভারতের গেইল ৮.৫%)। আবিষ্কারের পর থেকেই ভারত এই গ্যাস আমদানি করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। বাংলাদেশের একটি প্রাইভেট কোম্পানি মোহনা হোল্ডিং লিমিটেড মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারত পর্যন্ত একটি পাইপলাইন স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে তিন দেশের সরকারের কাছে পেশ করে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন এ প্রস্তাবে কোনো আগ্রহ প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। পরবর্তী সময়ে তিন দেশের সরকারই এ প্রস্তাব গ্রহণে নীতিগতভাবে সম্মত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ গ্যাসসংকটের প্রেক্ষাপট এবং মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির সম্ভাবনা বাংলাদেশকে ওই পাইপলাইন প্রকল্পে আগ্রহী করে।
পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার মন্ত্রী পর্যায়ে সমঝোতামূলক সভার পর সিদ্ধান্ত হয় যে, একটি ত্রিদেশীয় কারিগরি কমিটি বিষয়টির বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়ন করবে। ২০০৫ সালে মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুনে কারিগরি কমিটি সভায় মিলিত হয়। বাংলাদেশ প্রস্তাব করে যে ১. পাইপলাইনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে নয়, টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে তা চট্টগ্রাম হয়ে ভারতের দিকে এগোবে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভবিষ্যতে গ্যাস সরবরাহের সুযোগ বাড়ানো ছিল এ প্রস্তাবের লক্ষ্য, ২. চুক্তি সাপেক্ষে বাংলাদেশ পাইপলাইনে নির্ধারিত পয়েন্ট থেকে গ্যাস নেওয়ার অধিকার রাখবে, ৩. ভারতের তত্ত্বাবধানে নয়, বরং পাইপলাইনটি নির্মাণ করবে একটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম এবং ৪. বাংলাদেশের ভেতর পাইপলাইন অপারেটর হিসেবে বাংলাদেশি সংস্থা নিয়োজিত থাকবে, যার জন্য বাংলাদেশকে চার্জ দিতে হবে। এসব প্রস্তাবে ভারত ও মিয়ানমার উভয়েই আরও আলোচনা সাপেক্ষে সম্মতিসূচক প্রতিক্রয়া ব্যক্ত করে।
বাংলাদেশ ভারতের প্রতি আরও দুটি শর্ত দেয় যে, নেপাল ও ভুটান থেকে বিদ্যুত্ আমদানির জন্য ভারত করিডর-সুবিধা দেবে এবং উপরিউক্ত দুটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশকে বাণিজ্য-পণ্য বিনিময়ের জন্য ভারত করিডর দিয়ে যাতায়াত করার অধিকার দেবে। ভারত এই শেষোক্ত শর্ত দুটি মানতে রাজি না হলে বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা সভা ব্যর্থ হয়। এভাবে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ প্রস্তাবিত ত্রিদেশীয় পাইপলাইন প্রকল্প কার্যক্রম থেকে সরে আসে ।
এদিকে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে ভারত নতুন পাইপলাইন পথ খুঁজতে সচেষ্ট হয়। নতুন পথ হিসেবে মিয়ানমার থেকে মিজোরাম, ত্রিপুরা, আসাম হয়ে পশ্চিমে শিলিগুড়ি; অতঃপর দক্ষিণে ঘুরে কলকাতার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু যেখানে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পাইপলাইন গেলে তা ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে ও চার হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নির্মাণ করা যাবে, অন্য পথটি বেছে নিলে পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য আরও ৫০০ কিলোমিটার বেশি হবে ও তাতে খরচ হবে আরও দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তা ছাড়া ত্রিপুরা-আসাম এলাকার বিদ্রোহীদের কাছ থেকে পাইপলাইনটির নিরাপত্তা বিশেষ উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা দেয়। এসব কারণে ভারত পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে আর অগ্রসর হতে পারেনি।
ইতিমধ্যে মিয়ানমার তার গ্যাস বিক্রি-বাণিজ্যে স্থগিত অবস্থার অবসান ঘটিয়ে চীনের কাছে গ্যাস বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে দেওউ কোম্পানি মিয়ানমার সরকারের সম্মতিক্রমে চীনের সরকারি তেল কোম্পানি চায়না পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কাছে গ্যাস বিক্রি করার চুক্তি করে। দেওউ ও তার কনসোর্টিয়াম এই গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন প্রকল্পে ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করবে। চুক্তি অনুযায়ী এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে চীনকে ৩০ বছর গ্যাস সরবরাহ করা হবে। ২০১৩ সালে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে ও প্রতিদিন ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাইপলাইনে সরবরাহ করা হবে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে কিছু দূরত্বে অবস্থিত মিয়ানমারের সাগরবক্ষে নব-আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলো প্রমাণ করেছে, এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলোর বিরাট গ্যাস-চাহিদা মেটাতে তাদের নিজস্ব গ্যাস ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে গ্যাস জোগাড় করতে কতটা তত্পর। এ ক্ষেত্র থেকে গ্যাস আমদানি করার প্রতিযোগিতায় ভারত, চীন, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ পরস্পর প্রতিযোগী। বর্তমান প্রতিযোগিতায় ভারত যেমন জয়ী হতে পারেনি, তেমনি বাংলাদেশের গ্যাস আমদানির প্রস্তাবও মিয়ানমার সরকার নাকচ করেছে। তবে মিয়ানমার জানিয়েছে, ভারত ও বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আবিষ্কৃত নতুন ক্ষেত্র থেকে গ্যাস আমদানি করতে পারবে। ভারতের বর্তমান গ্যাসের চাহিদা বিশাল, আর ভবিষ্যতের চাহিদা ততোধিক এবং তা মেটাতে গ্যাস আমদানি আবশ্যক হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই গ্যাস-ঘাটতির দেশ হয়ে পড়েছে আর ভবিষ্যতের গ্যাস-চাহিদার তুলনায় নিজস্ব সম্ভাব্য সরবরাহ অপ্রতুল। সে কারণে বাংলাদেশকে এখন থেকে ভবিষ্যত্ চাহিদা মেটানোর পন্থা ও পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
বাংলাদেশকে বিশেষ করে ভবিষ্যত্ জালানিসংকট মেটানোর জন্য গ্যাস আমদানির প্রয়োজনীয় ছক বা পথ মানচিত্র আকারে নির্ধারণ করতে হবে। যেহেতু ভারত কখনোই গ্যাস রপ্তানি করবে না, বাংলাদেশের গ্যাস আমদানির একমাত্র উত্স হবে মিয়ানমারের আরাকান উপকূলে সমুদ্রবক্ষে আগামী দিনে আবিষ্কৃত নতুন গ্যাস, যা বাংলাদেশ থেকে সুবিধাজনক দূরত্বে অবস্থিত হবে এবং বাংলাদেশে রপ্তানি করতে মিয়ানমার রাজি হবে বলে জানিয়েছে। বাংলাদেশ হয় ভারত-বাংলাদেশ-মিয়ানমার ত্রিদেশীয় পাইপলাইন দিয়ে অথবা মিয়ানমার-বাংলাদেশ দ্বিদেশীয় পাইপলাইন কাজে লাগিয়ে গ্যাস আমদানির পরিকল্পনা করতে পারে।
ত্রিদেশীয় পাইপলাইনের সুবিধা হবে যে, তা আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম কর্তৃক নির্মাণ করতে বাংলাদেশকে অর্থ জোগান দিতে হবে না; বরং তা রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি বাবদ বাংলাদেশ অর্থ অর্জন করতে পারে এবং পাইপলাইন দিয়ে ভারতে গ্যাস সঞ্চালন বাবদ প্রতিবছর নির্দিষ্ট হারে অর্থ পাবে, যা নগদের পরিবর্তে গ্যাস হিসেবে নিতে পারে। একটি ত্রিদেশীয় পাইপলাইন স্থাপনে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য ও চুক্তির প্রাথমিক শর্ত হওয়া উচিত মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে গ্যাস আমদানি। অন্য বিকল্প পন্থা হলো, বাংলাদেশ নিজস্ব উদ্যোগে ও অর্থায়নে মিয়ানমার-বাংলাদেশ দ্বিদেশীয় পাইপলাইন নির্মাণ করে গ্যাস আমদানি করা, যে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিনামূল্যে কোনো গ্যাস পাবে না; বরং সব গ্যাসই বাংলাদেশকে ক্রয় করতে হবে। ত্রিদেশীয় বা দ্বিদেশীয় উভয় ক্ষেত্রেই গ্যাস পাইপলাইন মিয়ানমার থেকে টেকনাফ পথে বাংলাদেশে ঢুকে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম হয়ে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশের বেশি লাভ হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ জ্বালানিসংকটের রূপ কতটা ব্যাপক হতে পারে তা অনেকে যথার্থ অনুধাবন করেন না। কিন্তু দেশের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বাস্তবায়ন করতে হলে তা যে পাহাড়সম, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটাতে স্বল্প আয়তনের ও বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশকে জ্বালানি সম্পদের ভবিষ্যত্ রূপরেখা তৈরি করতে অভ্যন্তরীণ সম্পদের অতিরিক্ত বাইরের জ্বালানি সম্পদ কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা আবশ্যক।
বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, রেজাইনা বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা

বাংলাদেশের নিয়তি কি কেবলই ডুবে যাওয়া -জলবায়ু সম্মেলন by জোনাথন হারি

শেষ পর্যন্ত এই-ই হলো। দুনিয়াকে যারা বিষিয়ে তুলেছে, যারা জলবায়ুর বিপর্যয় ঘটিয়েছে, তারা কোপেনগেহেনে জড়ো হয়েছে এটাই বলার জন্য যে, বৈজ্ঞানিক হুঁশিয়ারির তোয়াক্কা না করে তারা তাদের জ্বালানো-পোড়ানো চালিয়ে যাবে। বিশ্ব রক্ষায় তারা কোনো চুক্তিতে সই করতে না পারলেও বিশ্বের নিচু দ্বীপগুলো, হিমবাহগুলো, উত্তর মেরু এবং কোটি কোটি মানুষের ভাগ্যে তারা মৃত্যুর সিলমোহর মেরে দিয়েছে।
আমরা যারা খোলা চোখে জলবায়ু সম্মেলনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তারা অবাক হইনি। প্রতিদিনই বিজ্ঞানীমহল, উন্নয়নশীল দেশ ও বিক্ষোভকারীরা পৃথিবীকে তাতিয়ে তোলা গ্যাস নিঃসরণ কমানোয় অনেক বাস্তব ও চৌকস সমাধানের কথা তুলেছে। কিন্তু উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের সরকারগুলো ভেটো দিয়ে সেগুলোকে এক দাগে বাতিল করে দিয়েছে। কিন্তু বিশ্বকে বাঁচাতে আমাদের প্রয়োজন সেগুলো আবার তুলে ধরা।
বাতিল হওয়া প্রথম সমাধান: একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা করা। কোপেনহেগেনে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়টি দেশগুলোর মর্জির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো সরকার প্রতিশ্রুতি না রাখলে কোনো শাস্তি হবে না, কেবল মৌখিক কিছু নিন্দা ছাড়া। কিয়োটো প্রটোকলে স্বাক্ষর করেও কানাডা নিঃসরণ বাড়িয়েছিল ২৬ শতাংশ। কিন্তু কেউ তাদের কিছু বলেনি। কোপেনহেগেনের পর এ জাতীয় ঘটনা শত শত ঘটতে থাকবে।
কিন্তু বলিভিয়ার সাহসী প্রতিনিধিরা এটা মানতে পারেননি। তাঁরা দেখেছেন, কীভাবে তাঁদের হিমবাহগুলো ভয়ঙ্কর গতিতে গলছে। তাঁরা প্রতিবাদ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য হলো, সত্যিকারভাবে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হলে আন্তর্জাতিক পরিবেশ আদালত এবং পরিবেশ পুলিশ সৃষ্টি করতে হবে; তাদের হাতে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। কিন্তু এমন প্রস্তাব অবাস্তব। আমাদের নেতারা কেবল একটা বিষয়েই নাছোড়, সেটা হলো বাণিজ্য, টাকা। কপিরাইট লঙ্ঘন করলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা যেকোনো দেশকে কঠিন শাস্তি দিতে পারে। কিন্তু পৃথিবীকে ধ্বংস করতে থাকলেতা বাধা দেওয়ার কেউ নেই, এই হলো আজব দুনিয়ার আজব নিয়ম। নিরাপদ জলবায়ু থেকে তাদের কাছে ট্রেড মার্কের মূল্য অনেক বেশি।
দ্বিতীয় সমাধান: জীবাশ্ম জ্বালানি তথা গ্যাস-তেল-কয়লাকে মাটির তলাতেই রেখে দেওয়া। উন্নত দেশের সরকারগুলোর ভণ্ডামি এখানেই যে, একদিকে তারা বলছে, তারা ব্যাপক হারে জ্বালানি পোড়ানো কমাতে চায়, অন্যদিকে নতুন নতুন খনি থেকে জ্বালানি তুলতে তারা মরিয়া। তাদের এক হাতে আগুনের অস্ত্র আর আরেক হাতে অগ্নিনির্বাপক—এ দুইয়ের কোনো একটি জিতবে। নেচার পত্রিকা বলছে, দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকা তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে চূড়ান্তভাবে আমরা কেবল আবিষ্কৃত তেল-গ্যাস-কয়লার ৬০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করতে পারব না। সুতরাং যেকোনো জলবায়ু চুক্তির গোড়াতেই চিরতরে নতুন করে জীবাশ্ম জ্বালানি অনুসন্ধান নিষিদ্ধ করে দিতে হবে। ফ্রেন্ডস অব দি আর্থ সংগঠনের আন্তর্জাতিক সভাপতি নিমো বাসী যেমন বলেছেন, ‘কয়লা গহ্বরের ভেতরই থাকুক, তেল থাকুক মাটির তলায়।’ আমাদের নেতারা এই বিষয়টি আলোচনাতেই আনেননি।
তৃতীয় সমাধান: জলবায়ু ঋণ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য ৭০ শতাংশ দায়ী ধনী দেশগুলো। কিন্তু দুর্ভোগের ৭০ শতাংশই ভোগ করতে হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। হল্যান্ড সমুদ্রের প্লাবন ঠেকাতে বিরাট বিরাট বাঁধ বানাতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের নিয়তি কি কেবলই ডুবে যাওয়া? যে দায়ী, সে খেসারত দেবে না, নির্দোষই শাস্তি পাবে—এ কেমন নিষ্ঠুর বিধান?
আমাদের জলবায়ুর ঋণ তাই শুধতে হচ্ছে গরিব দেশগুলোকে। জলবায়ু সম্মেলনে এই প্রথমবারের মতো গরিব দেশগুলো ক্ষোভে উঠে দাঁড়াল। তাদের সম্মিলিত প্রতিনিধি ঘোষণা করলেন, ‘যে ক্ষতিপূরণের কথা বলা হচ্ছে, তা দিয়ে আমাদের লাশগুলোর দাফনের খরচও উঠবে না।’ এত দিন বলা হতো পরিবেশবাদী আন্দোলন ধনীদের শৌখিনতা কিন্তু এবার তা গরিবদের বাঁচার আন্দোলনে পরিণত হলো। অন্যদিকে কোপেনহেগেন সম্মেলনের প্রধান বিতর্ক হয়ে উঠল, সামান্য যেটুকু গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবী সহ্য করতে পারবে, সেটুকু ব্যবহারের অধিকার কার হবে? ধনী দেশগুলোকে বুঝতে হবে, তারা তাদের কোটা শেষ করে ফেলেছে। এর পরও জলবায়ু ঋণের ধারণা তারা মানতে রাজি নয়। কীভাবে তারা আশা করে, যেখানে তারা ন্যায়বিচারের প্রাথমিক যুক্তিটিও মানতে চাইছে না, সেখানে কীভাবে গরিব দেশগুলো তাদের তৈরি ঘোষণায় আস্থা রাখবে? কেন গরিবেরাই সব সইবে?
যারা ওপরে বলা এই সমাধানগুলো অবাস্তব বলে আখ্যা দেয়, তারা নিজেরাই অবাস্তবতার মধ্যে আটকে আছে। পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলব, কিন্তু সভ্যতা হেসে-খেলে চলতে থাকবে, তা হয় না। ধনী দেশগুলোর পছন্দের ‘পুষিয়ে নেওয়া’, কার্বন-বাণিজ্য কিংবা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন সংগ্রহ করার মতো পদ্ধতিগুলো কোনো কাজেই আসবে না। সত্যিকার ওই সমাধানগুলোই পারে পৃথিবীকে আবার শীতল করতে। তার জন্য আমাদের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। আমাদের পিতা-পিতামহরা এর চেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন।
জলবায়ু সম্মেলন চলার পুরোটা সময় নিচুভূমির দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এসব বাস্তব সমাধান জীবনরক্ষার ভেলার মতো আঁকড়ে ধরে ছিলেন। কারণ, তাঁরা জানেন, সমুদ্রের ঢল থেকে তাঁদের দেশ ও মানুষকে বাঁচানোর এটাই পথ। এই দেশগুলোর প্রতিনিধিদের দিকে তাকিয়ে অস্বাভাবিক অনুভূতি হয়। তাঁরা সবাই ছিলেন গম্ভীর ও শান্ত প্রকৃতির মানুষ, তাঁদের চোখে ছিল বিষণ্নতা। নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচানোর দাবি নিয়ে তাঁরা কোপেনহেগেনে এসেছিলেন। তাঁরা প্রবল চেষ্টা করে গেছেন, নিজেদের দাবির পক্ষে ব্যবহার করেছেন জটিল বৈজ্ঞানিক তথ্য ও তত্ত্ব এবং মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাময় কবিতা ও গান। কিন্তু সবকিছুই উপেক্ষিত হলো।
পৃথিবীকে বাঁচাতে নতুন জ্বালানি-ব্যবস্থায় আমাদের বেশি কর দিতে হবে আর কম চড়তে হবে প্লেনে। এর পরও আমরা সুখী ও প্রাচুর্যময় জীবন যাপন করতে পারব। জলবায়ু বিপর্যয়মুক্ত পৃথিবীতে সত্যিকারভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কেবল তেল-গ্যাস করপোরেশনগুলো আর পেট্রো-ডলারপুষ্ট স্বৈরতন্ত্রগুলো।
কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদেরা এই সুস্থ পথে হাঁটলেন না। ভবিষ্যতে টিকে থাকার নিশ্চয়তার বদলে তাঁরা বেছে নিলেন কম কর আর তেলের মুনাফার পথ।
ব্রিটেনের দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে নেওয়া: ইংরেজি থেকে অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ
জোনাথন হারি: ব্রিটিশ সাংবাদিক

রাজনীতির চক্করে ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় -অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন করুন

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে ছাত্রলীগ ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ব্যানারে আন্দোলনের একপর্যায়ে গত রোববার কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়টি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এটা উদ্বেগের বিষয়। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার কথা। এ ধরনের পরিস্থিতি তাঁদের শিক্ষাজীবন হুমকির মধ্যে ফেলবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্রুত এ অচলাবস্থার অবসানে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন সরকারের সময় ভীষণভাবে দলীয়করণের শিকার হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা দেখা যায়। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির সঙ্গে এসবের কোনো যোগসূত্র নেই। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিই এ ক্ষেত্রে প্রধান। এ রাজনীতির চক্করে পড়ে ভোগেন শিক্ষার্থীরা।
ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে যে অভিযোগে আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেটা তদন্ত করে নিয়মতান্ত্রিক পথে ব্যবস্থা নেওয়া বাঞ্ছনীয়। একটি নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য এটা বিশেষভাবে প্রয়োজন। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব কর্মকাণ্ডে বাইরে থেকে প্রভাবশালী রাজনীতিকদের হস্তক্ষেপের চেষ্টা শিক্ষার পরিবেশের জন্য কখনো সহায়ক হতে পারে না। সম্প্রতি এক জনসভায় চট্টগ্রামের মেয়র বলেছেন, উপাচার্যকে যেতে হবে, নইলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমন হুমকি দেওয়ার অধিকার মেয়রের নেই। ক্ষমতার জোরে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করার এ মানসিকতার পরিবর্তন যদি রাজনীতিবিদেরা না ঘটান, তবে ক্ষমতাসীন দলের দিনবদলের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক বুলি মনে হবে। দলের নেতারা এভাবে তাঁদের ক্ষমতার প্রদর্শনী করতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করা যাবে কীভাবে?
অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা দূর করে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করুন, কিন্তু সে জন্য যাতে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ না থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

পরীক্ষার মুখে দুদক নয়, সরকার স্বয়ং -দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান

টিআইবির সেমিনারে দুদকের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান কিছু সত্য উচ্চারণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্পেইন ফিন্যান্স অ্যাক্টের আদলে বাংলাদেশে একটি বিন্যস্ত আইন দরকার। এ কথা আমরা বহুবার বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু যাঁদের উদ্দেশে এসব বলা, তাঁদের শোনার আগ্রহ বা ধৈর্য কোনোটিই আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। গোলাম রহমান বলেছেন, ‘উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির সঙ্গে রাজনীতি জড়িত থাকে। রাজনীতি ছাড়া ক্ষমতায়ও যাওয়া যায় না। অন্যদিকে টাকা ছাড়া রাজনীতি হয় না। ব্যবসায়ীরা রাজনীতির জন্য চাঁদা দেন এবং বিনিময়ে সুবিধা নেন।’ দুদক চেয়ারম্যানের এই মন্তব্যের একটি সর্বজনীন দিক আছে। অনেক দেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার প্রশ্নে কমবেশি এ রকম কথা প্রযোজ্য। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যা অতীব উদ্বেগজনক, তা হলো, জাতীয় রাজনীতিতে এই সরল সত্যের পুরোপুরি অস্বীকৃতি এবং সে কারণেই প্রতিকার বা প্রতিরোধের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ বা চেষ্টা চোখে না পড়া।
দুর্নীতি দমনের বড় মাপকাঠি হলো, ডাকসাইটে সরকারি কর্মকর্তা বা নেতার বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে দুর্নীতি দমন মামলা পরিচালনা করতে সক্ষম হওয়া। কিন্তু দুদক এখন পর্যন্ত নতুন করে বড় কোনো মামলা দায়েরে সক্ষম হয়নি। দুদক বরং এ মুহূর্তে জরুরি অবস্থার পুরোনো বোঝা বয়ে চলতেই ধুঁকছে। এবং সে ক্ষেত্রেও পথ চলতে তার বাধার শেষ নেই। ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত দুদকের কাছে পাঠানো ৯৯টি মামলার একটিও দুদক প্রত্যাহার করেনি সত্য। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্র ওই মামলাগুলো যাতে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হয়, তা দেখতে চাইছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর এবং আইনমন্ত্রীর ভূমিকা পর্যালোচনায় আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি, সরকার দ্বিধাগ্রস্ত, পলায়নপর ও স্ববিরোধিতায় বিদীর্ণ।
দুদকের কার্যকর অবস্থানের প্রমাণ দিতে দুদক চেয়ারম্যান সেমিনারে বলেন, সরকারদলীয় সাংসদ হাবিবুর রহমান মোল্লা ও একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে করা দুটি পৃথক মামলা জেতার জন্য দুদক আপিল করেছে। দুদক প্রাণপণ চেষ্টা করছে এ দুটি মামলা জেতার জন্য। এ দুটিতে জিতলে অন্য মামলার জট কমে যাবে। দুদক চেয়ারম্যান ও তাঁর কমিশনকে আমরা ধন্যবাদ জানাই যে এই গড্ডলিকাপ্রবাহের মধ্যেও তাঁরা স্বকীয়তা বজায়ের চেষ্টা করছেন। কিন্তু জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দুর্নীতিবাজ ও টাকা পাচারকারীদের ছাড়া হবে না। আমরা তাঁকেও সাধুবাদ জানাব, এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলব না। এ জন্য আপাতত দুটি শর্ত পূরণ করা হোক। দুদক চেয়ারম্যান যে দুটি মামলায় আপিল করার কথা জানিয়েছেন, সে দুটিতে সরকার তার অবস্থান পরিষ্কার করুক। সরকার প্রমাণ করুক যে তারা এই দুজনকে রক্ষার চেষ্টা করছে না। মামলাগুলো স্বাভাবিক ধারায় চলতে দেওয়া হোক।
আমরা দুদক চেয়ারম্যানের এই বক্তব্য জোরালোভাবে সমর্থন করি যে ওই দুটি মামলায় দুদক জয়ী হলে জরুরি অবস্থায় দায়ের করা দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য মামলাগুলো একটি বিচারিক পরিণতি লাভ করবে। আর দুদকের জন্য পরীক্ষা হলো, ক্ষমতাসীন মহল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত ও মামলা দায়েরে সক্ষম হওয়া। এসব না হলে টিআইবির সূচকের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ধন্য তাঁর জীবনসাধন -শ্রদ্ধাঞ্জলি by বিপ্লব বালা

‘সমাজসংস্কারক’ কথাটার কী মানে আজ? আমাদের মনে ঠিক কী বা কী কী সব অর্থ ভাব আনে, তা বলা শক্ত। সমাজ বা মানবকল্যাণ জীবনের ব্রত করেছিলেন একদিন নাকি কেউ কেউ। আমরা সে কথা আজ কতটা আর বিশ্বাস করতে বা বুঝতে পারি? এমনই নাকি হতো, স্কুল-কলেজের পাঠ চুকিয়ে নেমে পড়লেন কেউ অন্য কোনো কাজে, যা কেবল নিজের জন্য নয়, সবার জন্য, সমাজের সব মানুষের জন্য।
কবি জসীমউদ্দীনের সহপাঠী ছিলেন সৈয়দ আবদুর রব। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের গেরদায়। পূর্বপুরুষ এসেছিলেন আরব থেকে। সাধক পীর ছিলেন তাঁরা। আবদুর রবের বাবা ইংরেজি শিক্ষা নিয়ে ছিন্ন করেন সেই ধারা। তিনি স্কুল ইন্সপেক্টর হয়েছিলেন। ফরিদপুরের মহাগৌরব সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতা অম্বিকা মজুমদারের বন্ধুস্থানীয় ছিলেন। তাহলে বলা যায়, আবদুর রব দেশ-সমাজ থেকেই পেয়েছিলেন অন্যতর এক দীক্ষা। বহুজন হিতায়, মানবকল্যাণ ব্রতে ব্যক্তিগত জীবন-জীবিকা ছেড়ে দেওয়া। সমমনা বন্ধুজন নিয়ে ফরিদপুরেই গঠন করেন ‘খাদেমুল এনছান’ মিশন—মানব সেবক সংঘ (১৯২৮)। আরবি শব্দের এই নামকরণে স্পষ্ট হয় তাঁর কাজের মতিগতি, ভাবনা আর চারিত্র। মুসলমান সমাজের ভেতরের একজন হয়েই তাঁকে উত্তীর্ণ করা মানবে। সাম্প্রদায়িকতার ঘেরাটোপ পার হওয়া। ইংরেজি-বাংলায় দুই হাতে লিখেছেন তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায়—এই চেতনহুঁশ ফেরাতে। ইসলাম না হয়ে ইনসানের সেবক হওয়ার অঙ্গীকারের কারণে শুরুতেই তাঁকে ছেড়ে যান নাকি কেউ কেউ।
বোঝা যায়, ‘মিশন’ কথাটা ইংরেজের কাছ থেকে পাওয়া ছিল। কাজটাকে ‘মিশন’ করার প্রণোদনা আমাদের সমাজেও তো ছিল। কোনো শুভকর্মে ‘দীক্ষা দেওয়া’ হতো ব্যষ্টি থেকে উন্নীত, উত্তীর্ণ হতেই। ‘খাদেমুল এনছান’ মিশনের কাজের তিনটি বড় ক্ষেত্র ছিল—শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের সহায় হওয়া। দুই বাংলায় পাঁচ শতাধিক স্কুলের শাখা, প্রতিষ্ঠান গঠন, ইংরেজি ও বাংলায় দুটি পত্রিকা প্রকাশ কলকাতা থেকে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় ‘রামকৃষ্ণ মিশন’-এর সমকক্ষতা অর্জন—বাংলা, বিহার, আসাম ও উড়িষ্যায়। মোয়াজিজন ১৩৩৫-এ ও Servant of Humanity (১৯৩৫) পত্রিকায় উপমহাদেশের অগ্রগণ্য কবি, লেখক, রাজনীতিবিদ লিখতেন নিয়মিত। রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে সুভাষ চন্দ্র, শরত্চন্দ্র, নজরুল, বেগম রোকেয়া কিংবা মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, হুমায়ুন কবীর, সুফিয়া কামাল, আবুল ফজল—যাকে বলে উপমহাদেশীয় সর্বভারতীয় গুণীজনের সমাবেশ ঘটেছিল। রবীন্দ্রনাথ এ মিশনের মানবব্রতকর্মের সাধুবাদে পঞ্চমুখ ছিলেন। বন্ধুস্থানীয় নজরুল তাঁর স্বভাবের স্বধর্মে সর্বদা যুক্ত ছিলেন পত্রিকায়। তখন পত্রবিনিময় ছিল কাজের ও ভাবনার অঙ্গাঙ্গিকৃত্য। উপর্যুক্ত জনের সঙ্গে নিয়মিতই হতো তাঁর পত্রালাপ। বিরাট এই কর্মযজ্ঞ কলকাতাকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছিল। কলেজ স্ট্রিটে ছিল অফিস, যেখানে নজরুলের ছিল নিত্য যাতায়াত। ‘আদর্শ নগর’ গঠনকর্মে উল্টাডাঙ্গায় অবিভক্ত বাংলা সরকার বরাদ্দ করে সাড়ে আট বিঘা জমি। যেখানে জীবনকর্ম সম্পাদনের সমগ্রতার এক স্বপ্ন কল্পনা ডানা মেলেছিল। ’৪৬-এর দাঙ্গার ডাইরেক্ট অ্যাকশন যা গুঁড়িয়ে দেয়। শারীরিকভাবেও আহত হন তিনি। কেবল কি শরীরেই লাগে সে আঘাত? তা তো নয়। রাজনীতির কলুষিত বাস্তবতা থেঁতলে দেয় এই মানবব্রতীর অমল ধবল মনটিও যে। পরাস্ত, পর্যুদস্ত হয়ে ফরিদপুরেই ফিরে আসেন তিনি। ভাঙাচোরা মনপ্রাণ নিয়ে। সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি—ভাইসরয় প্রদত্ত ‘গোল্ড মেডেল’ সমাজকর্ম সম্পাদনায় (১৯৩৭)। ইউরোপের কয়েক দেশে বক্তৃতার আমন্ত্রণ তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বাতিল হয়। তত্কালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা দিয়েছিলেন ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব—স্বাভাবিক বিনয়ে আর কাণ্ডজ্ঞানেই তা প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
এই বুঝি এক রেনেসাঁ-কল্প মানবের বাস্তব আদল। শ্রেয়তর এক মানবকর্ম নীতির এষণায় যিনি ব্যক্তিগত জীবনের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা অনিশ্চিত করেছিলেন আমৃত্যু। গোটা পরিবার পতিত হয়েছিল কঠিন কঠোর গদ্যময় দারিদ্র্যে। তবুও নত হয়নি উন্নত সে শির।
আমরা আজ তাহলে কোন বিবেচনায় শনাক্ত করতে পারি তাঁকে? বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত তাঁর জীবন কাজ, বাংলা একাডেমীর জীবনী গ্রন্থমালায়ও আছেন তিনি। তবু এই বিস্মৃত প্রত্ন ইতিহাস মানবেরে কী পরিচয়ে জেনে-বুঝে নেব আমরা? এই যে ছিলেন তিনি এহেন এক রূপকথাপ্রতিম মানব—কোথায় তাঁকে স্থান দেব আমরা আজকের এই উদরসর্বস্ব আত্মপরায়ণ বাজারকালে? বিপণন-যোগ্যতায় পরিমাপ্য যেখানে একেক সেলিব্রেটি, তা তিনি জীবিত বা মৃত যা-ই হোন না কেন। মঞ্চ-মিডিয়ায় যার উত্পাদন বিকাশ-নির্মাণ চলে, বাজারেরই নিত্য ক্রয়-বিক্রয় নিমিত্তে। সেখানে কিসের দেশ। কিসের কাল, কিসের সমাজ। চাই না যেন কোনো মানব আজ। যার থাকে এক জীবনযাপন অভিযাত্রা—ব্যক্তিগত জীবিকা উত্তীর্ণ বহুজন হিতাব্রত।
সৈয়দ আবদুর রব জন্মেছিলেন ১৯০৩ সালে। আজ তাঁর মৃত্যু দিন। তাঁকে স্মরণ থেকে যদি মেলে কোনো শরণবোধের সামান্য ভাবও।
‘মানুষের জীবনপ্রবাহে জিজ্ঞাসা সৃষ্টি এবং সত্য, সমাজ ও সাহিত্যের বিভিন্ন-পন্থী সমস্যা সমাধানমূলক এই অদ্বিতীয় সর্বজনীন মুক্তি আন্দোলন’ সূচিত করতেই একদিন খাদেমুল এনছান সমিতি প্রতিষ্ঠার এবং তাঁর মুখপত্র হিসেবে মোয়াজিজন ও Servant of Humanity প্রকাশ করা হয়। সমিতির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও নীতি বলে ঘোষিত হয়—সেবা, শিক্ষা, সত্য ও নীতি, শান্তি ও একতা, কুসংস্কার-মোচন, স্বাস্থ্য, সংগঠন ও পত্রিকা পরিচালনা। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা-আসামে ৩২৮টি শাখা সমিতি, ২১৩টি সাহিত্য-সংস্কৃতিকেন্দ্র, ১১৫ শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পত্রিকা দুটি সর্বভারতীয় সেরা পত্রিকাসমূহের মর্যাদায় গৃহীত হতো। তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির মধ্যে ১. বাংলা সাহিত্যে ফরিদপুরের দান, ২. মহানবীর সাধনা, ৩. বিশ্ব-ভাস্কর, ৪. জীবন ও সাহিত্য, ৫. বাস্তববাদী সাহিত্য, ৬. বিশ্ব-মুসলিমের সমস্যা, ৭. ধর্ম-সাহিত্য, ৮. সাহিত্য ও সমসাময়িক সমাজচিত্র, ৯. আত্মচরিত প্রভৃতি। জীবনের এক সমগ্রতার সন্ধিত্সায় এই মানবকল্যাণব্রতী ধর্ম-সমাজ-সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তিনি ধন্য। ধন্য তাঁর জীবনসাধন।

সংবিধান সংশোধন, না ’৭২-এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তন? -শাসনব্যবস্থা by এমাজউদ্দীন আহমদ

১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। পঞ্চম সংশোধনী সম্পর্কে হাইকোর্টের এক ডিভিশন বেঞ্চে একটি রায়ের পরই বিষয়টি আলোচনায় আসে ব্যাপকভাবে। যাঁরা ’৭২-এর সংবিধানে ফিরতে চান, তাঁদের মূল বক্তব্য প্রধানত একটি এবং তা হলো, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে রচিত সংবিধানকে নির্মমভাবে কাটাছেঁড়া করে তার চরিত্রটাই পাল্টে দেওয়া। এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এই অভিযোগের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক মহল আবার ফিরে যেতে চায় ’৭২-এর সংবিধানে এবং ফিরিয়ে আনতে চায় ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয় ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সংসদীয় গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। পঞ্চম সংশোধনীতে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত হয় ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ এবং সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার’। যারা ’৭২-এর সংবিধানের প্রতি এত দুর্বল তাদের গভীর দুর্বলতা ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের প্রতি। তাই পঞ্চম সংশোধনীর প্রতি তাদের এত উষ্মা, এত ক্রোধ, এত বিদ্বেষ। এই নিবন্ধে এ সম্পর্কে ছোট্ট এক পর্যালোচনা রয়েছে।
এক. আমার মতো যাঁরা ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন ও সংবিধানের কার্যকারিতা সম্পর্কে চোখ খুলে রেখেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই খুশি হয়েছিলেন এই দেখে, যে ক্ষেত্রে পাকিস্তানের লেগেছিল নয় বছর, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মাত্র নয় মাসেই এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল, হোক সে সংবিধান ত্রুটিপূর্ণ, অবিন্যস্ত অনুকরণ। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এই সংবিধানের গায়ে এমন নির্মম ছুরি-কাঁচি চালানো অনেকেই পছন্দ করেননি। তবে এই না-পছন্দের ঝালটা শুধু পঞ্চম সংশোধনীর দিকে ছুড়ে দিয়ে তাঁরা এক ভয়ানক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছেন। পঞ্চম সংশোধনীর আগেই যে ’৭২-এর সংবিধান বিধ্বস্ত হয়েছে, অর্থাত্ ’৭২-এর সংবিধানে বিধৃত সরকারের কাঠামো, সরকার পরিচালনার মূলনীতি, মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী বিধ্বস্ত হয়ে গেছে, সে সম্পর্কে তাঁরা কিছু বলছেন না। দ্বিতীয় ও চতুর্থ সংশোধনীর দিকে তাকান, অনুধাবনে এতটুকু অসুবিধা হবে না, কেমন অবলীলাক্রমে মাত্র বছর দুয়েক আগে প্রণীত সংবিধানে সুনির্দিষ্ট সরকারের মূল কাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে ’৭২-এর সংবিধানের আদলটা পুরোপুরি পাল্টে দেওয়া হলো। যে সংসদীয় গণতন্ত্রের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ তার জয়যাত্রা শুরু করেছিল, মাত্র আড়াই-তিন বছরের মাথায় সেই সংসদীয় ব্যবস্থা বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হলো। সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে প্রবর্তিত হয় রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার। সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার প্রবর্তিত হলেও চলত, কেননা দুই-ই গণতান্ত্রিক, কিন্তু দেশের সব দলকে নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশাল) মতো একদলীয় জগদ্দল বা কর্তৃত্বব্যঞ্জক দৈত্যরূপী এক প্রাণীর (authoritarian leviathan) সৃষ্টি হয়।
দ্বিতীয় সংশোধনীর দিকে দৃষ্টি দিন। দেখবেন মুক্তিযুদ্ধের মূল সুর যে গণ-অধিকার, তা কীভাবে হারিয়ে গেল। সংবিধানে জরুরি বিধানের সংযোজন জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকেই গণ-অধিকার সংরক্ষণের দাবি ছিল এই সমাজের দাবি। দাবি ছিল সমাজব্যাপী আইনের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনীতে সেই দাবি হারিয়ে যায়। সুতরাং পঞ্চম সংশোধনী যদি সত্যি বাতিল হয়ে যায়, তাহলেই কি বাহাত্তরের সংবিধান ফিরে পাওয়া যাবে? আর ফিরে পেলেই কি সব অভিযোগের অবসান ঘটবে? কাটাছেঁড়ার কথা বললে তো দেখা যায়, পঞ্চম সংশোধনীর আগেই তা ঘটে গেছে। পঞ্চম সংশোধনীতে কিছু কাটাছেঁড়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কিছু কাটাছেঁড়ার মেরামতও হয়েছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি, গণতন্ত্র্রের অন্যান্য অনুষঙ্গ যেমন—সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্ব ও স্থানীয় শাসনের পুনঃপ্রবর্তন পঞ্চম সংশোধনীর অবদান।
দুই. দেশের বাম পন্থার রাজনীতিকদের প্রত্যাশা, ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে গেলে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হবে। সমাজতন্ত্রের নীতি ’৭২-এর সংবিধানের একটি উল্লেখযোগ্য মূলনীতি। কোনো জনপদে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় যখন সেই জনপদে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি সুসংহত সমাজতান্ত্রিক দল সংগঠিত হয়, উত্পাদনের উত্সগুলো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে, উত্পাদনের সুষম বণ্টনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং ‘পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উত্পাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন’ ঘটায় যেমন—অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিত্সাসহ প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদার সন্তুষ্টি বিধান সম্ভব হয়। এর যেমন রয়েছে রাষ্ট্রিক-সামাজিক দিক, তেমনি রয়েছে মানবিক দিকও।
১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সর্বপ্রথম বৃহত্ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের নীতি ঘোষণা করেন। ফলে দেশের বৃহত্ শিল্পগুলোর শতকরা ৮৬ ভাগ এবং ব্যাংক-বিমাগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শতকরা ৬০ ভাগ ছিল সাবেক ইপিআইডিসির নিয়ন্ত্রণে, শতকরা ২৫ ভাগ ছিল পরিত্যক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শতকরা ১৫ ভাগ ছিল দেশীয়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ মাত্রা স্থির করা হয় ২৫ লাখ টাকা। বিদেশি বিনিয়োগ হয় নিষিদ্ধ। যেহেতু ক্ষমতাসীন দলের সমাজতন্ত্রে কোনো দীক্ষা বা বিশ্বাস ছিল না, ছিল না কোনো আদর্শিক অঙ্গীকারও, তাই অচিরেই শিল্পক্ষেত্রে দেখা দেয় নৈরাজ্য। উত্পাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। চোরাচালান ও দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার ঘটে। এক কথায়, অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সরকার পাশ্চাত্য ও তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে সহায়তার জন্য হাত পাততে বাধ্য হয়। তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ১৯৭৪ সালের ১৬ জুলাই তখনকার শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম সমাজতন্ত্রে পরিবর্তন এনে নতুন বিনিয়োগ নীতি ঘোষণা করেন। এর ফলে সদ্য প্রতিষ্ঠিত সমাজতন্ত্র পড়ে রিভিশনের মুখে। এক. বেসরকারি বিনিয়োগের মাত্রা ২৫ লাখ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয় তিন কোটি টাকা। দুই. বিদেশি বিনিয়োগের পথ আবার খুলে দেওয়া হয়। তিন. জাতীয়করণ প্রক্রিয়া ১৫ বছরের জন্য স্থগিত হয়। চার. ঘোষিত হয়, ১৫ বছর পর যদি জাতীয়করণের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন যথোপযুক্ত ভর্তুকি দেওয়া হবে।
অন্য কথায়, ’৭২-এর সংবিধানে সমাজতন্ত্র যে কয়েক দিন টিকে ছিল, তা ছিল শুধু আকাঙ্ক্ষায়, বাস্তবতায় নয়। ভারী শিল্প, ব্যাংক-বিমার অবদান সামগ্রিক জাতীয় উত্পাদনে ছিল শতকরা ২০ ভাগের নিচে। অর্থনীতির মৌল ভিত্তি যে ভূমিব্যবস্থা সে ক্ষেত্রে এক ধরনের সমবায়ের কথা ভাবা হচ্ছিল বটে, কিন্তু তা দিয়ে যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না, তা সর্বজনস্বীকৃত। সর্বজনস্বীকৃত এটিও যে সমাজতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন সমাজতান্ত্রিক দল। এখন যদি ’৭২-এর সমাজতন্ত্র ফিরে আসে, তাহলে ১৯৭২-৭৫ সময়কালে বাংলাদেশে যা ঘটেছিল, তা থেকে কি আমরা দূরে থাকব? তবে সমাজতন্ত্র আদর্শ হিসেবে টিকে থাকবে চিরদিন। প্লেটো থেকে যার সূচনা, মার্ক্স-অ্যাঙ্গেলস মাও-এ যার পূর্ণতা, তা মানবসমাজকে চিরদিন হাতছানি দিতে থাকবে। সেই হাতছানির জবাব কি আজকে ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা?
ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে কোনো একজন পর্যালোচক কয়েক দিন আগে লিখেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতা হলো মুক্তিযুদ্ধের ফসল। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ যদি হয় সম-সাম্প্রদায়িকতা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহনশীলতা, তাহলে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা বসবাস করছে কয়েক হাজার বছর ধরে। মুসলমানের কুঁড়েঘর এবং হিন্দুর ছাপরা হাজার বছর ধরে সখ্য বজায় রেখে দিনাতিপাত করছে। পদ্মা-যমুনা-মেঘনাবিধৌত অঞ্চলে সাম্প্রদায়িকতার আবর্জনা কোনো দিন সঞ্চিত হয়নি। আমার অনুভবে ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক চেতনা। অন্য কথায়, সংবিধানে উল্লিখিত হয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির গৌরব অর্জন করেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালেও এর জন্ম হয়নি। ১৯৪৮-৫২-এর ভাষা আন্দোলনেও ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপক ব্যাপ্তি আমাদের জাতীয় জীবনে বিরাট অর্জনে সহায়ক হয়ে উঠেছে। আমাদের জাতীয় নেতাদের কর্মকাণ্ডে সাম্প্রদায়িকতা সব সময় পরিত্যাজ্য রয়েছে। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে বিভিন্ন আন্দোলন-বিক্ষোভে শতধারায় তা প্রকাশিত।
সাম্প্রদায়িকতা এক সামাজিক ব্যত্যয়। সংবিধানের দিকে তাকিয়ে কেউ সাম্প্রদায়িক হয় না, অথবা কেউ সাম্প্রদায়িক হতে চাইলে সংবিধান তাকে ঠেকাতেও পারে না। আমাদের সৌভাগ্য, এই মাটির কোনো সুযোগ্য সন্তানকে সাম্প্রদায়িকতার নোংরা আবর্জনা স্পর্শ করেনি। ’৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয়। পঞ্চম সংশোধনীতে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ সন্নিবেশিত হয়। সংবিধান শুরু হয় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ দিয়ে। তার পরও কিন্তু বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িকতার কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়নি। অন্যদিকে ভারত ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে ১৯৭৭ সালে। সামাজিক জীবনকে আলোকিত না করে শুধু সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা সংযোজন করলে যে কোনো ফল হয় না, তার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে ভারতেই। বিচারপতি লিবারহান কমিশনের রিপোর্টটিতে দেখবেন, কীভাবে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং, সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী এবং বেশ কিছু জাতীয় নেতা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং কীভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নৃশংসতার কথা উল্লেখ না-ই বা করা হলো। ভারতের সবচেয়ে প্রগতিবাদী পশ্চিম বাংলার বাম সরকারের তিন দশকের শাসনামলে সেখানকার বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে মুসলিমরা কোন পর্যায়ে নেমে এসেছে, সাচার কমিশনের রিপোর্ট তার প্রমাণ।
’৭২-এর সংবিধানের আরেকটি মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সংবিধান যখন গৃহীত হয় তখন গণপরিষদের সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নিজেই এর প্রতিবাদ করেছেন। শুধু তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেই ক্ষান্ত হননি, প্রতিটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বীকৃতি দাবি করেছিলেন সংবিধানে। বাংলাদেশ একক কোনো জাতির বাসস্থান নয়। বহু জাতির মোজায়েকে গড়া এই সমাজ। শুধু একই ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে কোনো জনসমষ্টির জাতীয়তা চিহ্নিত হতে পারে না। বিশ্বে এর কোনো নজিরও নেই। ভৌগোলিক এলাকাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ অর্থাত্ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কোনো বিকল্প আছে কি? বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে সংকীর্ণতা, তার বোঝা আর কত দিন বহন করবেন?
তিন. যাঁরা ’৭২-এর সংবিধান ফিরিয়ে আনতে চান, তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে ওই সময় এই সংবিধান রচনা এবং সংবিধানের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে কে কী বলেছিলেন গণপরিষদে এবং গণপরিষদের বাইরে, পত্রপত্রিকায়। বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন ড. আবুল ফজল হকের বাংলাদেশের রাজনীতি: সংঘাত ও পরিবর্তন বইটির ৮০—৯২ পৃষ্ঠা। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী গণপরিষদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বলেন, গণপরিষদের সদস্যরা ইয়াহিয়া খানের আইনগত কাঠামোয় (১৯৭০) ইসলামিক প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ছয় দফাভিত্তিক আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন আদায়ের ম্যান্ডেট লাভ করেন। তিনি বলেন, এ জন্য সব রাজনৈতিক দলের যৌথ সংগ্রামের মাধ্যমে যে সার্বভৌম বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে, সেই বাংলাদেশের সংবিধান রচনার অধিকার তাঁদের নেই (দৈনিক বাংলা, ২১ অক্টোবর ১৯৭২)। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য ছিল অভিন্ন। তাদের সুপারিশ ছিল, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংগঠিত জাতীয় কনভেনশনে সংবিধান প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
সংবিধানের বিভিন্ন দিক সম্পর্কেও মত প্রকাশ করেন বিভিন্ন জন। সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজনের দাবি করেন আওয়ামী লীগের একজন গণপরিষদ সদস্য। ইসলাম-পছন্দ ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো যুদ্ধের অব্যবহিত পরে নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশের সুযোগ ছিল না। তবে জানা যায়, বাম পন্থার রাজনীতিকদের সুরেই তা প্রতিধ্বনিত হয়।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা শুধু প্রতিবাদ এবং সঙ্গে সঙ্গে উপজাতীয়দের স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানিয়েই ক্ষান্ত হননি, ১৯৭৩ সালের জানুয়ারি থেকে শান্তিবাহিনীকে সংগঠিত করে বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করেন সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে। তিনি সংবিধানের হস্তলিখিত ও অলংকৃত বাংলা ও ইংরেজি কপিতে স্বাক্ষরও দেননি।
গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র সংবিধানের খসড়ায় যেভাবে সন্নিবেশিত হয়, সে সম্পর্কে প্রতিবাদ উত্থাপিত হয় সর্বাধিক। গণপরিষদে বিরোধী দলের ন্যাপ সদস্যের পক্ষ থেকে সর্বাধিক প্রতিবাদ আসে। মানবেন্দ্র বলেন, সংবিধানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় বিধান করা হয়নি। গণতন্ত্রে নাগরিকের মৌলিক অধিকার যেভাবে সংরক্ষিত হয়ে থাকে, এই সংবিধানে তারও ব্যবস্থা নেই। মৌলিক অধিকার, তাঁর কথায়, ‘অস্পষ্ট’ ও ‘অপর্যাপ্ত’; কেননা মৌলিক অধিকারের ওপর বিভিন্ন ধরনের বাধানিষেধ আরোপ করা হয়। তিনি আরও বলেন, সংবিধানের দ্বিতীয় অংশে বর্ণিত অর্থনৈতিক অধিকারগুলো ‘সাধু ইচ্ছা’ ছাড়া অন্য কিছু নয়; কারণ সেগুলো আদালতের মাধ্যমে বলবেযাগ্য নয়। মানবেন্দ্র বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা (৫৭.২ অনুচ্ছেদ), ৭০ অনুচ্ছেদের অধীন সংসদ সদস্যপদ বাতিল, রাষ্ট্রপতির সরকারি কর্মচারীদের অপসারণ করার ক্ষমতা (১৩৫ অনুচ্ছেদ) সংবিধানকে অগণতান্ত্রিক করে তুলেছে (বাংলাদেশ গণপরিষদ, বিতর্ক, ২য় খণ্ড সংখ্যা ৮, ১৯৭২-২২১-৩৫)।
গণপরিষদের বাইরের সমালোচনা ছিল আরও তীব্র। শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দল সংবিধানে পরিকল্পিত সমাজতন্ত্রকে ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তির সমাজতন্ত্র’ বলে চিহ্নিত করে। এই দলের নেতা বলেন, সরকার সমাজতন্ত্রের নামে কেবল পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত করেছে, কিন্তু সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য, যেমন ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ এবং শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কোনো ব্যবস্থা সংবিধানে রাখেনি। মূলনীতিগুলো কার্যকর করার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই সংবিধানে উঠতি ধনিক শ্রেণী ও জোতদারদের শাসন পাকাপোক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র (দৈনিক বাংলা, ১৯ অক্টোবর ১৯৭২)। তাদের মতে, এই সংবিধান সংশোধনেরও অযোগ্য।
বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির মতে, এই সংবিধানে কিছু ‘ভালো ভালো কথা ও সাধু ইচ্ছা’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সন্নিবেশিত হলেও নাগরিকদের খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, চিকিত্সা ও কর্মসংস্থানের কোনো নিশ্চয়তা নেই। সংসদে কৃষক-শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বের কোনো ব্যবস্থা নেই। ‘বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি’ বাজেয়াপ্ত এবং ‘সামন্তবাদ’ বিলোপের কোনো ব্যবস্থা সংবিধানে নেই। তাঁরা আরও বলেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনস্বার্থ, নৈতিকতার অজুহাতে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে (দৈনিক বাংলা, ১৯, ২৩, ২৯ অক্টোবর ১৯৭২)। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা বলেন, সংবিধানটি একটি ‘বাজে সংবিধান’। মৌলিক অধিকারগুলোর ওপর বাধানিষেধ আরোপ করে গণতন্ত্রকে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রে’ পরিণত করা হয়েছে। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ‘কাগজি বুলিতে’ পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতিকে ‘শো বয়’ এবং প্রধানমন্ত্রীকে সর্বেসর্বা করা হয়েছে (ইত্তেফাক, ২১, ২২ ও ২৩ অক্টোবর ১৯৭২)।
শুধু বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ (মুজাফফর) এবং তাদের সমর্থিত ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা বলেন, সংবিধানটি সমাজতান্ত্রিক নয়, তবে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করা যায় (দৈনিক বাংলা ও সংবাদ, ১৭ অক্টোবর ১৯৭২)। তাদের প্রধান অভিযোগ ছিল, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধান প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে ‘দেশপ্রেমিক’ রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ করেনি।
চার. তার পরও বলা যায়, ’৭২-এর সংবিধান এই জাতির এক মূল্যবান সম্পদ, হোক না তা অসম্পূর্ণ অথবা ত্রুটিপূর্ণ। তা ছিল নতুন রাষ্ট্রে চলত্শক্তি সরবরাহের উত্তম মাধ্যম। তত্কালীন সামাজিক মানসের প্রতিচ্ছবি। এক ঐতিহাসিক দলিল। এভাবেই ’৭২-এর সংবিধানকে গ্রহণ করতে হবে। গ্রহণ করতে হবে একটি সেরা জাতীয় অর্জন হিসেবে। কিন্তু প্রায় চার দশক আগের সেই সেরা অর্জনকে জাতির প্রাত্যহিক ব্যবহারের উপযোগী ভাবা ঠিক কি? যাঁরা ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে চান, তাঁদের মনন-চিন্তন কি সেই বাহাত্তরেই আটকে রয়েছে? নাকি তা করতেই হবে—এমন অনমনীয় জেদ? আর ’৭২-এ ফিরে যেতে চাইলে যাবেন কীভাবে? আইনমন্ত্রী অবশ্য বলে ফেলেছেন, পঞ্চম সংশোধনী প্রসঙ্গে যদি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন, তবে ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে কোনো সংশোধনীর প্রয়োজন হবে না। স্বাভাবিকভাবেই আমরা ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাব। এ বক্তব্য কি গ্রহণযোগ্য? পঞ্চম সংশোধনী যদি বাতিল ঘোষিত হয়, তাহলেও তার আগের চারটি এবং পরের সংশোধনীগুলোর কী হবে? কোনো কথা বলা যত সহজ, তা বাস্তবায়ন তত সহজ নয়। এ সম্পর্কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা কি ফেলে দেওয়ার মতো কিছু? পঞ্চম সংশোধনীতে বাংলাদেশের সংবিধানে এমন কতকগুলো উপাদান সংযোজিত হয়েছে, যা জাতির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলোকে প্রধানমন্ত্রী ‘স্পর্শকাতর’ বলে চিহ্নিত করেছেন। যে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ জিয়ারত করেন এবং দরগাহে মোনাজাত করে সাধারণ নির্বাচনের প্রচারকাজ শুরু করেন, সেই দেশে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত উপাদানগুলোকে অপসারণ করা কি সম্ভব? ’৭২-এর সংবিধানে এগুলো ছিল অনুপস্থিত। পরিবর্তিত সময়ের দাবিতেই তা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে কি না, সময় তা বলে দেবে, তবে জনস্বার্থে ও গণতন্ত্রের স্বার্থে বাংলাদেশের সংবিধানের বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদকে অর্থপূর্ণ করে দেশের শাসনব্যবস্থাকে কল্যাণমুখী করার লক্ষ্যে সংশোধন করার কোনো বিকল্প দেখি না।
ক. বাংলাদেশ সংবিধানের সর্বোত্তম বাক্যটি হলো ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’—অনুচ্ছেদ ৭ (১)। অনেকের মতে, সবচেয়ে অর্থহীন হলো এই বাক্যটি। কেননা নির্দিষ্ট সময়ে কিছুসংখ্যক ব্যক্তির ভোটদানের অধিকার ছাড়া এই মালিকানার কোনো অর্থ নেই। এটাকে অর্থপূর্ণ করার লক্ষ্যে, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে এই মালিকানার যোগসূত্র থাকতে হবে।
খ. গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মৌলিক অধিকার অলঙ্ঘনীয়। জনস্বার্থের অজুহাতে, জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের বা নৈতিকতার অজুহাতে মৌলিক অধিকারের সীমারেখা নির্ধারিত হওয়া ঠিক নয়। এমনকি আইনের দোহাই দিয়েও তা সীমিত করা সঠিক নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, সংবিধানের ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১ অনুচ্ছেদে নাগরিকের মৌলিক অধিকার এভাবে সীমিত করার প্রয়াস দেখা যায়। সংবিধানের এই অংশগুলো সংশোধনযোগ্য।
গ. নিয়মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল কথা হলো সামষ্টিক সরকার, ব্যক্তির ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রয়োগযোগ্য কর্তৃত্ব এবং সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সীমিত সরকার। এই আলোকে সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদের সংশোধন জরুরি। সংসদীয় ব্যবস্থার ইতিহাসে সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ ব্যতিক্রর্মী এবং নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরোধী। কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে কোথাও কোনো শাসকের হস্তে দেশের নির্বাহী কর্তৃত্ব ন্যস্ত হয়েছে কি?
ঘ. সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সাংসদদের দ্বারা পরোক্ষ নির্বাচন গণতন্ত্রসম্মত নয়। মহিলা সদস্যদের জন্য তা মর্যাদাকরও নয়। এই অনুচ্ছেদ সংশোধন করে মহিলা সদস্যদের প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থাই উত্তম।
ঙ. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বর্তমানে যেভাবে কার্যকর হচ্ছে, তা দলীয় সদস্যদের দলীয় নেতৃত্বের প্রতি শুধু আনুগত্যই সৃষ্টি করছে, সৃষ্টি করছে না এতটুকু সৃজনশীলতা, মৌলিকত্ব বা স্বাতন্ত্র্যবোধ। এ অবস্থা অনাকাঙ্ক্ষিত। দলীয় শৃঙ্খলার সঙ্গে সদস্যদের স্বাতন্ত্র্যবোধের সমন্বয় সাধন করে এই অনুচ্ছেদের সংশোধন জরুরি।
চ. ৭২ অনুচ্ছেদ সংশোধনও অত্যন্ত জরুরি। জাতীয় সংসদের কার্যকাল পাঁচ বছরের পরিবর্তে চার বছর হওয়া প্রয়োজন এ জন্য যে ক্ষমতার প্রতি আমাদের রাজনীতিকদের দুর্বলতা এবং এ কারণে হিংসা-প্রতিহিংসার রাজনীতি; ফলে দলীয়করণ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির ব্যাপকতা থেকে জাতি অনেকটা মুক্ত হতে পারবে।
ছ. সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থেকে একজন স্পিকার এবং একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পরে বিরোধী দল থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যায়। যেন জাতীয় সংসদকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিরোধী দলেরও একটা সুনির্দিষ্ট দায় সৃষ্টি হতে পারে।
জ. সংবিধানের ১৩৫ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সরকারি কর্মকর্তাদের বরখাস্তের বিবরণ দেওয়া হয়েছে কিন্তু যাঁদের তিনি বরখাস্ত করতে পারবেন, তাঁদের যেন তাঁরই কর্তৃত্বে নিয়োগদানের ব্যবস্থা হয়, তা নিশ্চিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
[লেখাটির ওপর আমরা মতামত ও প্রতিক্রিয়া ছাপতে আগ্রহী। সর্বোচ্চ ৮০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান। বিভাগীয় সম্পাদক। ]
এমাজউদ্দীন আহমদ: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ফের অচলাবস্থায় বিশ্ব জলবায়ু রাজনীতি -কোপেনহেগেনে ব্যর্থতা by মার্কাস বেকার

কোপেনহেগেন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ব্যর্থ হয়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকল না। উন্নয়নশীল দেশগুলোর আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়নি শিল্পোন্নত দেশগুলো। ভারত ও চীনের মতো নব্য শিল্পোন্নত দেশকে তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের দিকে দৃষ্টি না দিলেও চলবে।
শুরুর আগে সারা দুনিয়ার বিজ্ঞানী, পরিবেশবাদী ও রাজনীতিকেরা এক সুরে বলেছেন, এটা ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন। কিন্তু এখন সে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এ ধরনের সম্মেলন আর আদৌ হবে কি না, তা বলা কঠিন।
কোপেনহেগেনে এই সম্মেলনে একত্র হতে সারা দুনিয়ার সরকারগুলোর সময় লেগেছে প্রায় ১৭ বছর। এত দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ-আলোচনা, আপাত নিষ্পত্তিহীন দেনদরবার, মতাদর্শিক বিতর্ক, বিলম্ব আর নানা কৌশল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে গেছে এ সময়। ১৯৯২ সালে রিও ডি জেনিরোতে প্রথম জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলনের পর আবার একত্র হতে ১৭ বছর লেগেছে। ১৯৯২ সালের পর ধীরে ধীরে যে আশা জাগছিল, সেখানে অনেক আশাভঙ্গের বেদনায় পুড়তে হলো।
সম্মেলন শেষ হওয়ার কিছু সময় আগে মনে হচ্ছিল, এ সম্মেলন ব্যর্থ হওয়া হয়তো ঠেকানো যাবে। চূড়ান্ত ঘোষণার শেষ দিককার খসড়াগুলোতে ২০৫০ সাল নাগাদ শিল্পায়নপূর্ব স্তরের থেকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ করার পাশাপাশি কীভাবে এ লক্ষ্য অর্জিত হবে, তার বিধানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০৫০ সাল নাগাদ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ৮০ শতাংশ কমানো এবং ২০২০ সাল নাগাদ মধ্যমেয়াদি লক্ষ্যের সম্ভাবনার উল্লেখও এতে ছিল।
অবশেষে যে ছোট খসড়া চুক্তিতে ৩০টি শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্র সম্মত হয়, তাতে কেবল দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বিধান রাখা হয়। আগামী দশকগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনার উল্লেখ তাতে আর থাকেনি। জলবায়ু বিপর্যয় রোধে বিজ্ঞানীরা যে হারে নিঃসরণ কমানোর কথা বলেছেন, সে বিষয়ে অঙ্গীকারে আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি রাখা হয়নি। কোপেনহেগেনে যে চরম ব্যর্থতা দেখা গেছে, তাতে হয়তো দুই ডিগ্রির সীমাও মেনে চলা হবে না।
৩০টি দেশের গ্রুপ আপসের এ পরিকল্পনা মূল হলে উপস্থাপন করলে ১৯২টি দেশের বাকি দেশগুলোর অনেকে প্রায় তত্ক্ষণাত্ তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তাদের পক্ষে এটাকে কোনো সমাধান হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন।
আমরা এখন বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতিতে অচলাবস্থার হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে। এর পরিণতিতে গরিবের মধ্যে যারা গরিব, তারাই প্রথম আক্রান্ত হবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী ঝড় ও বন্যার মুখে তারা পড়বে। তাদের ফসল মরে যাবে। হিমবাহ গলে কোটি কোটি মানুষ তাদের পানির জোগান ও জীবিকা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
শিল্পোন্নত দেশগুলোও রেহাই পাবে না। কিন্তু তাদের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সম্পদের কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
কোপেনহেগেনের ব্যর্থতা বারাক ওবামারও ব্যর্থতা। তিনি এ সম্মেলনে একটি ছাড় দিয়েছেন: তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, গরিব দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তাকারীর ভেতর তাঁর দেশও থাকবে। গরিব দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি মোকাবিলায় আরও ভালোভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে এবং আরও প্রতিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সচেষ্ট হতে সহায়তার জন্য এই তহবিল। এই তহবিল ২০২০ সালে শুরু করে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বড়াই করে বলেছেন, এই পরিমাণটা ‘অনেক’। কিন্তু এ তহবিলের কতটুকু যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসবে, সে বিষয়ে কোনো কথা তিনি বলেননি। এমনকি বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশগুলো ‘কোপেনহেগেন অ্যাকর্ড’ নামে যে খসড়া সমঝোতা তৈরি করেছে, তাতেও এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র কতটা উদার তার বিস্তারিত বর্ণনাও মিলবে এই সমঝোতায়। দরিদ্র দেশগুলোকে তাত্ক্ষণিক সহায়তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ২০১০ ও ২০১২ সালের মধ্যে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার দিতে চায়। অন্যান্য অঞ্চল যে পরিমাণ সহায়তা দেবে, সে তুলনায় এ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কার্পণ্যের প্রমাণ মেলে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন গুণ। এমনকি জাপান দিচ্ছে ১১ বিলিয়ন ডলার। গরিব দেশের লোকজন হয়তো দ্বিধায় পড়তে পারে—তারা যুক্তরাষ্ট্রের এ সহায়তায় হাসবে না কাঁদবে।
১৭ বছর ধরে যে দেশগুলো জলবায়ু সুরক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্যতম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ৩০ দেশের গ্রুপের সঙ্গে আলোচিত আপস পরিকল্পনার সমালোচনা করে বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় এটা যথেষ্ট নয়।
নব্য শিল্পোন্নত দেশগুলোর, বিশেষত চীনের আচরণও এর চেয়ে ভালো ছিল না। মানবজাতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ চীনের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির জলবায়ু সুরক্ষাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের অধীন করতে অস্বীকৃতি জানানোর মাধ্যমে চীন হয়তো এ সম্মেলন ব্যর্থ হতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।
যারা জলবায়ু পরিবর্তনকে বিজ্ঞানী, বামপন্থী রাজনীতিক ও আতঙ্কে-ইন্ধনদাতা গণমাধ্যমের অবাস্তব ভাবনা বলে মনে করে, তাদের মতকে দৃঢ় করেছে কোপেনহেগেনের বিপর্যয়। মানবজাতি বহুপক্ষীয়, সামষ্টিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির কোনো সমাধান খুঁজে বের করতে অক্ষম—এমন মতকেও শক্তিশালী করেছে। এমন অবস্থান কোনোভাবেই শুধু বিশুদ্ধ নৈরাশ্যবাদ নয়। আসলে মানুষের স্বভাবগত কিছু বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে এগুলো তৈরি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই মানুষ নিজের ভূমিকা নেয়। উদাহরণস্বরূপ, অনেকের পক্ষে কল্পনা করাই কঠিন যে, মহামারির ফলে বিস্তৃত এলাকার পুরো জনগোষ্ঠী ধ্বংস হতে পারে—যদিও বহু জায়গায় বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাত বা উল্কাপাতের প্রভাব বিষয়েও একই কথা খাটে। এসবের ফলে পুরো অঞ্চল, এমনকি মহাদেশ পর্যন্ত মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন আরও বেশি ভয়াবহ। কারণ, এটি অনেকাংশে আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরের বিষয়।
কোনো যুদ্ধ বা মহামারি একই সঙ্গে অল্পসংখ্যক দেশের বাইরে প্রভাব ফেলেনি। পারমাণবিক যুদ্ধের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন সারা দুনিয়ার মানুষকে প্রভাবিত করে। দ্রুত একে মোকাবিলা করতে হবে। মানবজাতির বড় অংশের জীবনযাপনের বর্তমান ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসা প্রয়োজন। তা ছাড়া বিভিন্ন সমাজকে একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ উপলব্ধি করার চেতনা না থাকার কারণে প্রায়ই মানুষ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর স্থান দেয় স্বল্পমেয়াদি সাফল্যকে। সাধারণ, দৈনন্দিন কাজকর্মে স্পষ্টভাবে এর দেখা মিলবে। তাদের হয়তো জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয়কর পরিণতি দেখার জন্য খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না।
স্পিগেল অনলাইন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
মার্কাস বেকার: জার্মান সাংবাদিক।

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার এবং ওবামা, ওসামা-ওমর যুদ্ধ -গতকাল সমকাল by ফারুক চৌধুরী

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট ওবামা, আফগানিস্তান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিলেন। প্রথমটি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক একাডেমিতে, আফগানিস্তানে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ ঘোষণা করে এবং দ্বিতীয়টি নরওয়ের অসলোতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার গ্রহণকালে আফগানিস্তানেরই প্রাসঙ্গিকতায়, যুদ্ধ ও শান্তি সম্বন্ধে তার ধারণাবাহী। প্রেসিডেন্ট ওবামা একজন সুবক্তা, তদুপরি আফগানিস্তানে তাঁর ভবিষ্যত্ কর্মকাণ্ড এবং পরিণতি সম্বন্ধে বিশ্বজুড়ে রয়েছে বিপুল আগ্রহ। তাই তাঁর দুটি ভাষণই এখন বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
এক অর্থে, তাঁর দ্বিতীয় ভাষণটিতে রয়েছে প্রথমোক্ত ভাষণে ঘোষিত আফগানিস্তানে অতিরিক্ত ৩০ হাজার সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তেরই ব্যাখ্যা।
প্রেসিডেন্ট ওবামা তাঁর ১০ ডিসেম্বর ২০০৯-এর অসলো বক্তৃতায় অকপটে স্বীকার করেছেন যে দুটি যুদ্ধে লিপ্ত (আফগানিস্তান আর ইরাক) একটি দেশের সামরিক সর্বাধিনায়ক হিসেবেই তিনি শান্তি পুরস্কারটি গ্রহণ করছেন এবং তাঁর শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির কারণ যতটা তাঁর ওপর প্রত্যাশার, ততটা তাঁর অর্জনের নয়। তিনি অবশ্য এও বলেছেন, নরওয়েসমেত আরও ৪২টি রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের পাশে রয়েছে আফগানিস্তানের এই যুদ্ধে। যা তিনি বলেননি, তা হলো, ভিয়েতনামের যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রসংখ্যা কম ছিল না এবং আফগানিস্তানে অন্যান্য দেশের সেনাসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসংখ্যার আনুপাতিক হিসাবে খুবই কম। তদুপরি তাঁদের অনেককেই আসল সমর অঙ্গন (Theatre of war) থেকে দূরেই রাখা হয়েছে। এই যুদ্ধটি ভিয়েতনামের মতোই যে সর্বোপরি ওবামার যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তাঁর দ্বিতীয় ভাষণটিতে প্রেসিডেন্ট ওবামা শান্তি অর্জনে প্রয়োজনবোধে যুদ্ধের অনিবার্যতার কথা বলেছেন; এও বলেছেন, এমনও সময় আসতে পারে যখন একটি জাতি এককভাবে অথবা অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে, যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার নৈতিক যাথার্থ্যতা খুঁজে পাবে। প্রেসিডেন্ট ওবামা এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে ‘আলোচনার মাধ্যমে আল-কায়েদাকে অস্ত্র সমর্পণ করানো যাবে না।’ আবার এও তিনি বলেছেন, ‘আমাদের জীবদ্দশায় আমরা সশস্ত্র সংঘাতকে নির্মূল করতে পারব না।’ তাঁর মতে, শান্তি অর্জনের জন্য কখনো কখনো যুদ্ধের প্রয়োজন রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ওবামার উপরোক্ত মন্তব্যগুলোর সঙ্গে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করবেন না। বস্তুত যুক্তরাষ্ট্রে ওবামার অসলো ভাষণ ব্যাপকভাবেই সমাদৃত হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু এখানে কিছু মন্তব্যের প্রয়োজন রয়েছে, প্রয়োজন রয়েছে কিছু সাবধানবাণী উচ্চারণ করার। প্রেসিডেন্ট ওবামা ভালো করেই জানেন যে তিনি যে যুদ্ধটি পরিচালনা করার দায়িত্ব নিয়েছেন, সেখানে যুদ্ধটিকে আফগানিস্তান আর পাকিস্তানে পৃথকভাবে বিবেচনা করা দুরূহ। সেই অঞ্চলটিকে মানচিত্রে ব্রিটিশ কূটনীতিক মর্টিমার ডুরান্ড ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলমের আঁচড়ে পৃথক করেছিলেন। কিন্তু সেই অঞ্চলের অধিবাসী যাঁরা, যাঁদের এক কথায় পাশ্তুন বলা হয়, তাঁদের কাছে মর্টিমার ডুরান্ড কোনো প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি নন এবং ডুরান্ড লাইন কোনো জাতীয়তাবাদের স্বীকৃতিই বহন করে না। বস্তুত সেই তথাকথিত ডুরান্ড লাইনটির দুই পাশে প্রায় চার কোটি পাশ্তুন বাস করে, যাঁরা ডজন ডজন উপজাতিতে বিভক্ত, কিন্তু যাঁদের ভাষা ‘পাশ্তু’ এবং যাঁদের সামাজিক রীতিনীতি এবং রাজনৈতিক ব্যবহারবিধিকে ‘পাশ্তুন ওয়ালি’ বলে অভিহিত করা হয়। আতিথেয়তা সেই সামাজিক সংস্কৃতির একটি অংশ, যা তাঁদের রাজনৈতিক ব্যবহারবিধি থেকে অবিচ্ছেদ্য। যুক্তরাষ্ট্রের বোমার তুলনায়, পাশ্তুনরা তাঁদের রীতিনীতিকে বেশি সমীহ করেন বলেই আজ পর্যন্ত কেউ ওসামা বিন লাদেন অথবা মোল্লা ওমরের টিকিটিরও (তাঁদের আবার টিকি!) সন্ধান পায়নি।
কিন্তু আসলে অবস্থাটি তার চেয়েও বেশি জটিল। পাশ্তুনরা ডুরান্ড লাইন স্বীকার করে না সত্যি, কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান লাইনটিকে অবজ্ঞা করতে পারে না। পাকিস্তান একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র (বর্তমানে) এবং ডুরান্ড লাইন প্রায় এক হাজার মাইল ধরে সে দেশের পশ্চিম সীমারেখা। পাকিস্তান এখন সোয়াত আর দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে তালেবানবিরোধী সামরিক অভিযান চালাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু আফগানিস্তানে সক্রিয় তালেবান সম্বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানের মনোভাব কি এক? এটা কি সত্য নয় যে আফগানিস্তানের কারজাই সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের চেয়ে ভারতের সম্পর্ক নিবিড়তর। আর এদিকে আফগানিস্তানের তালেবানদের সঙ্গে পাকিস্তানের সহমর্মিতার নজির রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। অনেকে এও মনে করেন যে আফগানিস্তানে পাকিস্তান আর ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার যে ক্ষেত্রটি তৈরি হয়েছে, তাতে পাকিস্তান সে দেশে তালেবাননির্ভরই রইবে—বিশেষ করে ভবিষ্যতে, যখন সে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি হ্রাস পাবে।
আরেকটি কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র বলছে আল-কায়েদার নেতৃত্বের অবস্থান হচ্ছে পাকিস্তানে। তা-ই যদি হয়, তাহলে ওবামা আফগানিস্তানে অতিরিক্ত ৩০ হাজার সেনা পাঠাচ্ছেন কেন? পাকিস্তান, অর্থাত্ মানচিত্রে চিহ্নিত পাকিস্তানের মাটি যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দুর্জয় ঘাঁটি হবে, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো জনপ্রিয়তা নেই বললেই চলে। শিক্ষিত পাকিস্তানিরাও মনে করে যে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনবোধে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। পাইলটবিহীন যুদ্ধবিমানে, আল-কায়েদা নেতাদের হত্যা এবং তার সঙ্গে শত শত নিরস্ত্র সাধারণ পাকিস্তানির মৃত্যু সহজভাবে মেনে নিতে পারে না বিপাকে পড়া অসহায় পাকিস্তান। ইসরায়েল ও মিসর বাদ দিলে পাকিস্তান এখন যুক্তরাষ্ট্রের খয়রাতের তৃতীয় শীর্ষ প্রাপক। দুর্নীতিবাজ রাষ্ট্রের লিগ টেবিলের মতো, এও তো কোনো সম্মানজনক অবস্থান নয়। ইসরায়েল অবশ্য এই লিগ টেবিলে আপনা-আপনি বিকশিত একটি বিশেষ অবস্থানে—যুক্তরাষ্ট্রের অতিদূরে থেকেও অতি কাছের। অতএব সত্যিকার অর্থে মিসরের পরেই খয়রাতি লিগ টেবিলে এখন পাকিস্তান রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে এতই নিন্দিত যে এই খয়রাতি লিগে পাকিস্তান শিরোপা লাভ করুক তা সে দেশের শিক্ষিত আধুনিকমনা মানুষ চায় না। আর আফগানিস্তানের তালেবানেরা তো আকারে-ইঙ্গিতে বলেই থাকে যে কারজাই আর জারদারি যাঁদের মিত্র তাদের শত্রুর কীই বা প্রয়োজন?
আফগানিস্তান আর পাশ্তুনদের নিয়ে যতই ভাবি, ততই মনে পড়ে আমারই মতো একজন ভেতো বাঙালি (সমতার এখানেই শেষ!) সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা। তিনি তাঁর দেশে বিদেশেতে লিখেছেন,
‘...আফগানিস্তানের ইতিহাস না লিখে ভারত-ইতিহাস লেখবার জো নেই, আফগান রাজনীতি না জেনে ভারতের সীমান্ত প্রদেশ ঠান্ডা রাখবার কোনো মধ্যমনারায়ণ নেই। গোদের ওপর আরেক বিষফোঁড়া—আফগানিস্তানের উত্তর ভাগ, অর্থাত্ বল্খ বদখশানের ইতিহাস সীমান্ত নদী আমুদরিয়ার ওপারের তুর্কিস্তানের সঙ্গে, পশ্চিম ভাগ অর্থাত্ হিরাত অঞ্চল ইরানের সঙ্গে, পূর্বভাগ অর্থাত্ কাবুল জালালাবাদ খাস ভারতবর্ষ ও কাশ্মীরের সঙ্গে মিশে গিয়ে নানা যুগে নানা রং ধরেছে।’
তাঁর সেই বর্ণনার প্রায় আট যুগ পর সৈয়দ মুজতবা আলী ফিরে এলে দেখতে পেতেন কারা এখন সেই ‘নানা রঙের’ বাহক? তিনি দেখতে পেতেন তাঁর অচেনা ওবামা বনাম ওসামা-ওমরের স্বার্থ এবং আদর্শগত সংঘাত, তিনি আঘ্রাণ লাভ করতেন, ইরান, তুরস্ক (তাঁর মারফত ন্যাটো), ভারত, পাকিস্তান আর কাশ্মীর নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত কাবুলি পোলাওয়ের, তিনি গভীর বেদনায় অনুধাবন করতেন সেই অঞ্চল থেকে সুদূরের, তাঁর নবীন স্বদেশ বাংলাদেশে অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের সহিংস তত্পরতা।
এসবের মাঝে ওবামার ভাষণের উক্তিটি হয়তো বা তাঁর কানেও ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতো, ‘আমাদের জীবদ্দশায় আমরা সশস্ত্র সংঘাতকে নির্মূল করতে পারব না।’
ফারুক চৌধুরী: কূটনীতিবিদ। সাবেক পররাষ্ট্রসচিব।

ভোজ্যতেল ও ডালের মূল্যবৃদ্ধি -বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঘুম ভাঙবে কবে?

দফায় দফায় ভোজ্যতেল ও ডালের মূল্যবৃদ্ধির যে চাপ ক্রেতাদের নিতে হচ্ছে, তা সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ভোজ্যতেল নিয়ে তেলেসমাতি কারবার চলে আসছে বহুদিন থেকেই। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তো কথাই নেই, না বাড়লেও আমদানিকারকেরা তেলের দাম দফায় দফায় বাড়িয়ে থাকেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে আমদানিকারকেরা দাম কমান না, আগে আনা পণ্য গুদামে আছে—এই অজুহাত দেখিয়ে। চলতি বছরের মাঝামাঝি ভোজ্যতেলের দাম নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আমদানিকারকদের বৈঠকে যে ন্যূনতম দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তাও কেউ মানছে না। গত এক মাসে চারবার বোতলজাত ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার ঘটনা শুধু অস্বাভাবিক নয়, উদ্বেগজনকও।
শনিবার প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভোজ্যতেল বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে চলেছে। যেকোনো পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে উত্পাদনকারী বা বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানকে দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ভোক্তাকে আগে জানানোর যে আইন আছে, তাও মানা হয়নি। এটি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ওজন এবং পরিমাপ (পণ্যসামগ্রী মোড়কজাতকরণ) বিধিমালা ২০০৭-এর ২০(৪) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিএসটিআইকেও জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। এ ব্যাপারে ভোজ্যতেল বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তাও অগ্রহণযোগ্য। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলেছেন, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলে যে বাড়তি খরচ হবে, তাও ভোক্তাদের ওপর বর্তাবে। ভোক্তাদের নাম করে ব্যবসায়ীরা সবকিছু জায়েজ করে নিতে চান।
এভাবে ডালের দামও যে হারে বেড়েছে তা স্বাভাবিক নয়। প্রতি কেজি ডালের আমদানি মূল্য যেখানে ৭২ টাকা, সেখানে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা দরে। প্রতি কেজিতে আমদানি দামের সঙ্গে খুচরা মূল্যের ফারাক ৪৮ টাকা! শুধু বৈঠক করে, সুমধুর বচন আউড়ে কিংবা বাজারে মূল্যতালিকা টাঙিয়ে ব্যবসায়ীদের এ স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করা যাবে না। ব্যবসায়ীরা যাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারে, সে ব্যাপারেও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
বর্তমানে ভোজ্যতেলের বাজার কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকায় তারা ইচ্ছামতো দাম বাড়ায় বলে যে অভিযোগ আছে, তাও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। কথিত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার জন্য টিসিবিকে সচল করে বাজারে স্থিতিশীল রাখা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জোর আওয়াজ তোলা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি। এক মাসের ব্যবধানে চার দফা ভোজ্যতেলের দাম কেন বাড়ল, কারা বাড়াল, তাও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সিন্ডিকেটের কারসাজি আছে কি না, খুঁজে বের করতে হবে।

জলবায়ু সম্মেলন ও বাংলাদেশ -ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে স্বীকৃতি মিললেও ক্ষতিপূরণ নগণ্য

শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। কিন্তু কোপেনহেগেনের জলবায়ু সম্মেলন গোড়ায় যত আড়ম্বর ও উচ্চাশা সৃষ্টি করেছিল, শেষ দিনের ঘোষণায় সেই আশার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। পৃথিবীর জলবায়ু বাঁচাতে দরকার ছিল একটি কার্যকর চুক্তি, কিন্তু নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ সম্মেলনের শেষে পাওয়া গেল কেবল একটি মৌখিক ঘোষণা। কূটনৈতিক ভাষায় একে বলা হয় ‘নীতিগত সমঝোতা’। এতে শিল্পায়নপূর্ব সময়ের চেয়ে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার প্রয়োজন স্বীকৃত হলেও কী পদ্ধতিতে, কবে নাগাদ তা নিশ্চিত করা হবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধি রাখা হয়নি। বিজ্ঞানীদের হুঁশিয়ারি সবাই স্বীকার করে নিলেও সেই অনুযায়ী কাজ করার কোনো নিশ্চয়তা বিশ্বনেতারা দেখাতে পারেননি। হতাশা লুকানোর কোনো জায়গা তাই নেই। পৃথিবীকে রক্ষার চেষ্টায় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো মানবজাতি।
কোপেনহেগেনে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলন ঘিরে সৃষ্টি হওয়া উচ্চাশা পূরণ না হওয়ার প্রধান কারণ, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে টানাটানি, অন্যদিকে শিল্পোন্নত দেশগুলোর সঙ্গে ভারত-ব্রাজিল-দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশের মতৈক্য না হওয়া। ধনী দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থে ছাড় না দেওয়ায় জলবায়ু সম্মেলন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারল না। তবে সত্যিকার জলবায়ু-ঐক্য সৃষ্টির সূচনাবিন্দু হিসেবে কোপেনহেগেনকে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ বলা যাবে না। কেননা, শিল্পোন্নত দেশগুলো দুটি বিষয় প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছে—১. মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণে তাদের দায় এবং ২. বিপর্যয় মোকাবিলায় দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। কার্বন নিঃসরণ বিষয়ে আলাদাভাবে বিভিন্ন দেশ যে অঙ্গীকার করেছে, আশা করা যায়, আগামী বছর মেক্সিকোয় অনুষ্ঠেয় কোপ-১৬-তে কোপেনহেগেনের অঙ্গীকার বাধ্যতামূলক আইনে পরিণত হবে। অভিযোজন তহবিলে আপাতত তিন বছরের জন্য প্রতিবছর ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি এসেছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ভাগাভাগি হওয়ার কথা। কিন্তু ২০২০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণ কমানোয় (মিটিগেশন) যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল হবে, তা চলে যাবে মূলত অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণকারী দেশ তথা ভারত-চীন-ব্রাজিলের মতো দেশের কাছে। সুতরাং জলবায়ু-বিপন্নতার স্বীকৃতি ছাড়া বাংলাদেশের ঝুলিতে আপাতত কিছু জোটেনি।
এ সম্মেলনে বাংলাদেশের সাফল্য একটিই—বিশ্বে জলবায়ু-বিপর্যস্ত দেশগুলোর শীর্ষে থাকা দেশের স্বীকৃতি। এখানে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতিটি এল, তাতে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ এলাকা ডুবে যাওয়া কিংবা প্রায় তিন কোটি মানুষের উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়ার ভয় মোটেই কাটেনি, বরং আরও বেড়েছে। যদিও বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বিপত্সীমার নিচে আসার কোনো নিশ্চয়তা এ সম্মেলন সৃষ্টি করতে পারেনি; তবে এ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে, সেটা কাজে লাগিয়ে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় স্তরে সহযোগিতা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের বন্দোবস্ত করতে হবে। ক্ষতিপূরণ আদায়ের শর্ত হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে সব সরকারি উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন বাংলাদেশের জনগণের দুশ্চিন্তা দূর করতে পারেনি। কিন্তু এ দেশের নির্বাচিত সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে জলবায়ু-বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। কোপেনহেগেন সম্মেলনের সমর্থন কাজে লাগিয়ে দেশে-বিদেশে তত্পরতা বজায় রাখার এটাই মোক্ষম সময়।