Friday, November 15, 2019

৬২ বছরে মানবসভ্যতার গতি পাল্টে দেয়া স্পুটনিক-১ by অনিম আরাফাত

এখন থেকে ৬২ বছর পূর্বে মহাকাশে উৎক্ষেপিত হয় পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক-১। তৎকালীন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পাঠানো ওই কৃত্রিম উপগ্রহের মধ্য দিয়ে মহাকাশ জয়ে একধাপ এগিয়ে গিয়েছিলো মানবসভ্যতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নামে তৎকালীন দুই সুপারপাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। গোটা দুনিয়ায় নিজেদের শক্তি প্রদর্শন শেষে মহাকাশেও নতুন এক প্রতিযোগিতায় নামে দেশদুটি। আর স্পুটনিক-১ পাঠানোর মধ্য দিয়ে এই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে দেয় সোভিয়েন ইউনিয়ন।
১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর মহাকাশে সফলভাবে স্পুটনিক-১ প্রেরণ করে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা। এটি ছিলো একটি গোল বলের মত দেখতে। ২৩ ইঞ্চি ব্যাসের এই ছোটো উপগ্রহটির ওজন ছিলো ৮৩ কেজি।
এটি পাঠানো হয়েছিলো পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতে। এই দিনটির আগে মানব ইতিহাসে কোনো বস্তুই অভিকর্ষ ছিন্ন করে মহাকাশে যেতে পারেনি। এটির সফলভাবে প্রেরণের মধ্য দিয়ে আমাদের কৃত্রিম উপগ্রহের সফল যাত্রাও শুরু হয়।
উপগ্রহটি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতো অবিশ্বাস্য গতিতে। ঘন্টায় ২৯ হাজার কিলোমিটার গতিতে চলতে থাকা স্পুটনিক-১ এর পৃথিবীর চারদিকে একবার আবর্তন করতে সময় লাগতো মাত্র ৯৬ মিনিট। গোলাকৃতির এই উপগ্রহটির একদিকে ছিলো ৪টি এন্টেনা। এগুলো লম্বায় ছিলো ২৩ ইঞ্চি করে। এর নকশা করেছিলেন সের্গেই করালিওভ নামের এক বিজ্ঞানী। মহাকাশে পৃথিবীর চারদিকে এটি পরিভ্রমন করেছে ৩ মাস। এরপর এটিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। এর আগে প্রথম ২১ দিন লাগাতার তথ্য পাঠায় স্পুটনিক-১। এরপর এর কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় তথ্য প্রেরণ বন্ধ করে দেয়। এটিই আমাদের প্রথম ধারণা দিয়েছিলো যে, মহাকাশে রেডিও তরঙ্গ কেমন কাজ কাজ করবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে নভচারী প্রেরণ করলে তারা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে কিনা সেটিও এর মাধ্যমে জানা যায়। যাত্রাপথে পৃথিবী থেকে এটি ২১৫ কিলোমিটার থেকে সর্বোচ্চ ৯৩৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিলো।
যুক্তরাষ্ট্র মনে করে সোভিয়েত ইউনিয়ন তারাহুরো করে স্পুটনিক-১ পাঠিয়েছিলো। নইলে যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর কৃতিত্ব ছিনিয়ে নিতে পারতো। দাবিমতে, সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা এর সঙ্গে তেমন কোনো যন্ত্রপাতি প্রেরণ করেননি। যত দ্রুত সম্ভব একটি অতি-সাধারণ কৃত্রিম উপগ্রহ হিসেবে স্পুটনিককে পাঠানো হয়েছিলো। এটি সোভিয়েত বিজ্ঞানিদের মাঝে অবজেক্ট ডি কোড নামে পরিচিত ছিলো।
যতদূর জানা যায়, স্পুটনিক-১ মিশনটি প্রায় ব্যর্থ হতে চলেছিলো। উপগ্রহটিকে একটি আর-৭ রকেটে করে মহাকাশে পাঠানো হয়। কিন্তু উৎক্ষেপণের পরপরই রকেটের ইঞ্জিন ঠিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। অনেকটা ভাগ্যক্রমেই কিছুক্ষনের মধ্যেই এটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। উৎক্ষেপণের পর অনেকেই দাবি করেছেন তারা পৃথিবী থেকেই স্পুটনিক-১ দেখতে পেয়েছেন। স্বাভাবিক অবস্থায় এটিকে সাধারণ দুরবীন দিয়েই দেখা যেতো। স্পুটনিকের ধ্বংসাবশেষ পরেছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে। লস এঞ্জেলসের এনকিনোতে এক ব্যাক্তি ঘুম থেকে উঠে দেখেন তার বাড়ির পেছনে কিছু একটা জ্বলছে। ধারনা করা হয় এটি ছিলো স্পুটনিকের একটি অংশ।
যাইহোক, সোভিয়েত ইউনিয়নের এই সফলতাকে মানবজাতির জন্য এক বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হলেও খুশি হতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। এই অগ্রগতিকে তারা নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরণের হুমকি হিসেবে নেয়। ওই অবস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রে স্পুটনিক ক্রাইসিস নামে পরিচিত। সোভিয়েতের ওই সফলতার পর মহাকাশ প্রতিযোগিতায় গতি সঞ্চারিত হয়। কৃত্রিম উপগ্রহ প্রেরণ করতে উঠেপরে লাগে যুক্তরাষ্ট্র। শীঘ্রই সফলও হয় তারা। ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি নিজেদের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ এক্সপ্লোরার-১ পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র।
তবে এর আগেই ১৯৫৭ সালের ২ নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে পাঠায় স্পুটনিক-২। এই কৃত্রিম উপগ্রহেই ছিলো লাইকা নামের সেই বিখ্যাত কুকুরটি। মহাকাশে প্রথম প্রাণী পাঠানোর কৃতিত্বটাও নিয়ে নেয় মস্কো। এরপর ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে আরো একধাপ এগিয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। সে বছর পাঠানো ভস্তক মহাকাশযানে প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশে গিয়েছিলেন ইউরি গ্যাগারিন। এছাড়া, প্রথম নারী মহাকাশচারী হিসেবে ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভাকে প্রেরণের রেকর্ডটিও সোভিয়েত ইউনিয়নেরই। তবে এতসব জয়যাত্রার সূচনা হয়েছিলো সেই স্পুটনিক-১ এর মধ্য দিয়েই। যেটি পাল্টে দিয়েছিলো মানব সভ্যতার গতিপথ।

আতঙ্কে বিলিয়নিয়াররা! by নাজমুল আহসান

আটলান্টিকের দু’ পাড়ে অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যে শ’ শ’ কোটি ডলারের মালিক ধনকুবেরদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে! যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেট দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ক্রমেই অবস্থান পোক্ত হচ্ছে প্রগতিশীল দুই মনোনয়ন প্রত্যাশী বার্নি স্যান্ডার্স ও এলিজাবেথ ওয়ারেনের। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই জনের অবস্থানে এতটাই মিল যে তাদেরকে পৃথক করা খুব কঠিন। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে ওয়ারেন আর মধ্যমপন্থী মনোনয়ন প্রত্যাশী ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যে শীর্ষস্থানের লড়াই হচ্ছে। খানিকটা পেছনেই আছেন বার্নি স্যান্ডার্স। তবে স্যান্ডার্স ও ওয়ারেন একে অপরকে আক্রমণ করছেন না বললেই চলে। ব্যক্তিজীবনেও ঘনিষ্ঠ বন্ধু এই দুই মার্কিন সিনেটর।
নিউ ইয়র্ক থেকে নির্বাচিত আলোচিত কংগ্রেস সদস্য আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও কোর্তেজ যখন বার্নি স্যান্ডার্সকে সমর্থন দিলেন, তখন এলিজাবেথ শিবিরের এক শীর্ষ কর্তা বললেন, আমাদের খুব হিংসে হচ্ছে! কিন্তু এ-ও সত্য, দিনশেষে আমরা এক শিবিরেরই।
কোর্তেজ কংগ্রেস সদস্য হওয়ার আগে বার্নি স্যান্ডার্সের গত বারের নির্বাচনী শিবিরের সদস্য ছিলেন।
তাদের মধ্যে রসায়ন তুঙ্গে। তিনি জবাবে লিখলেন, ওয়ারেন খুবই চমৎকার একজন প্রার্থী। আমরা ভাগ্যবান যে আমরা একসঙ্গে স্যান্ডার্স ও তাকে পেয়েছি। দিনশেষে আমরা আসলে এক শিবিরের হয়েই লড়বো।
দুই শিবিরের এমন মনোভাব থেকে ইঙ্গিত মিলছে যে, নির্বাচনী প্রচারণার শেষের দিকে ওয়ারেন বা স্যান্ডার্স - দু’ জনের একজন হয়তো সরে যাবেন। আর সমর্থন দেবেন অপরজনকে। সেই হিসাবে দেখলে বলা চলে, বাইডেনের চেয়ে অনেকখানিই এগিয়ে আছে প্রগতিশীল শিবির। ফলে এই দুই প্রগতিশীল প্রার্থীর মধ্যে একজন ডেমোক্রেট দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন, এমন সম্ভাবনা প্রবল। আর বর্তমান জরিপ অনুযায়ী, ডেমোক্রেট দলের যেকোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধেই নির্বাচনে পরাজিত হবেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। অবশ্য পরে এই চিত্র পালটে যেতে পারে। কিন্তু স্যান্ডার্স বা ওয়ারেনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা আমেরিকার শীর্ষ ধনীরা মোটেই হালকাভাবে নিচ্ছেন না।
স্যান্ডার্স ও ওয়ারেনের অসংখ্য অভিন্ন নীতিমালার মধ্যে একটি হলো ‘ওয়েলথ ট্যাক্স’। অর্থাৎ, আয়ের ওপর নয়, সম্পদের ওপর করারোপ। যারা শ’ শ’ মিলিয়ন ডলার থেকে বিলিয়ন ডলারের মালিক তাদের সম্পদের ওপর কর আরোপের কথা বলছেন স্যান্ডার্স ও ওয়ারেন। সেখান থেকে যেই বিপুল পরিমাণ কর আদায় হবে, তা দিয়ে ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার বা সকল নাগরিকের জন্য সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালুর কথা বলছেন তারা। আর তাতেই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে বিলিয়নিয়ারদের কপালে।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও মাইক্রোসফটের চেয়ারম্যান বিল গেটস সেদিন বললেন, শীর্ষ ধনীদের ওপর ওভাবে করারোপ করা হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী লিও কুপারম্যানও বললেন একই কথা। তবে আরও চাঁছাছোলা ভাবে। তার মতে, ওয়ারেনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ‘আমেরিকান ড্রিম’ ধ্বংস হয়ে যাবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর একটি জেপিমরগ্যান চেজ-এর প্রধান নির্বাহী জেমি ডিমন টেলিভিশনে এসে বললেন, ধনীদের সম্পর্কে ওয়ারেনের মন্তব্য অনেক কর্কষ। অনেকে হয়তো বলবেন, ওয়ারেন রীতিমতো ধনীদের বিরুদ্ধে দ্বেষ জাগিয়ে তুলছেন। এ নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা সম্পাদকীয় লিখেছে, যার শিরোনাম: ‘দ্য বিলিয়নিয়ার্স আর গেটিং নার্ভাস’।
ওদিকে সিএনবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়ারেন যদি মনোনয়ন পেয়ে যান, তাহলে ডেমোক্রেট দলকে অর্থ বন্ধ করা, এমনকি ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়ার কথাও চিন্তা করছেন ওয়াল স্ট্রিট ও বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ডেমোক্রেট দাতারা। 
বিলিয়নিয়াররা ডেমোক্রেট দলীয় এই দুই প্রার্থীকে নিয়ে কতটা আতঙ্কে আছেন, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় পরিসংখ্যান থেকে। ওয়ারেন ও স্যান্ডার্স ছাড়া আরেক প্রার্থী উদারপন্থী শিবিরে জনপ্রিয় হচ্ছেন। তিনি হলেন প্রথম সমকামী মনোনয়ন প্রত্যাশী পিট বুটিগেগ। সমকামী অধিকার সহ কিছু ইস্যুতে জনপ্রিয় হওয়া বুটিগেগ আবার ধনীদের ওপর করারোপ ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ইস্যুতে ওয়ারেন ও স্যান্ডার্সের সঙ্গে একমত নন। মার্কিন কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের উপাত্তের বরাতে ফোর্বস জানিয়েছে, উদীয়মান প্রার্থী বুটিগেগের নির্বাচনী তহবিলে অর্থ ঢেলেছেন ২৩ জন বিলিয়নিয়ার! আরেক মধ্যপন্থী প্রার্থী করি বুকারের তহবিলে দিয়েছেন ১৮ জন, কামালা হ্যারিসকে ১৭ জন, বাইডেনকে ১৩ জন, অ্যামি ক্লোবুচারকে ৮ জন। সেই তুলনায় ওয়ারেনকে দিয়েছেন ৩ জন বিলিয়নিয়ার। আর স্যান্ডার্সকে একজনও দেননি! স্যান্ডার্সের পুরো তহবিল চলছে স্বল্প অঙ্কের অনুদানের ভিত্তিতে। লাখ লাখ দাতার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুদানের অর্থে তৃণমূল প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন স্যান্ডার্স।
ওদিকে শোনা যাচ্ছে নিউ ইয়র্ক শহরের সাবেক মেয়র ও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধনকুবের বিলিয়নিয়ার মাইকেল ব্লুমবার্গ প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে নামার কথা চিন্তাভাবনা করছেন। অথচ, ব্লুমবার্গ এ বছরের শুরুতেই প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের কথা নাকচ করে দিয়েছিলেন। খবর প্রকাশ হয়েছে যে, ব্লুমবার্গকে নাকি একবার নির্বাচন করতে উৎসাহিত করেছিলেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও অ্যামাজনের মালিক জেফ বেজস। এক বিলিয়নিয়ারকে আরেক বিলিয়নিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করতে বলছেন, এ নিয়ে খোঁচা দিতে একদমই দেরি করেননি স্যান্ডার্স। ব্যাঙ্গ করে বলেছেন, এ হলো তাদের মধ্যে ‘শ্রেণী সংহতি।’
জেফ বেজস ও অ্যামাজন নিয়ে অনেকদিন ধরেই সোচ্চার ছিলেন স্যান্ডার্স। অ্যামাজনের কর্মীদের স্বল্প বেতন নিয়ে তার আন্দোলনের কারণেই বেতন বাড়াতে বাধ্য হয় প্রতিষ্ঠানটি। আজীবন বামপন্থী রাজনীতি করে আসা স্যান্ডার্স সবসময়ই ধনীদের ওপর আয়কর বৃদ্ধির কথা বলে এসেছেন। আমেরিকায় বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিলিয়নিয়াররা তাদের আয় ও সম্পদের তুলনায় অনেক কম আয়কর দিয়ে থাকেন। অনেক বিলিয়নিয়ার নাকি একজন মধ্যবিত্তের চেয়েও কম আয়কর দেন!
স্যান্ডার্সের মতে, কোনো সমাজে বিলিয়নিয়ারদের অস্তিত্বই থাকা উচিৎ নয়। তিনি এই স্লোগান নির্বাচনী পোস্টারেও ব্যবহার করছেন! এ নিয়ে আমেরিকায় বিতর্ক শুরু হয়েছে যে, একটি অর্থনীতিতে বিলিয়নিয়ারদের অস্তিত্ব থাকা উচিৎ কিনা। অপরদিকে উদারপন্থী বলে পরিচিত ওয়ারেন দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকার বৃহৎ ব্যাংক ও ধনীদের নাস্তানাবুদ করে আসছেন সিনেট শুনানিতে। এছাড়া ওয়ারেন বলে আসছেন যে, অত্যন্ত বৃহৎ যেসব ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাজারে মনোপলি বা একাধিপত্য ভোগ করে, তাদেরকে কয়েকভাগে ভাগ করা উচিৎ। এই তালিকায় ছিল ফেসবুকও। আর এ নিয়ে ওয়ারেনের ব্যাপারে এক অভ্যন্তরীণ বৈঠকে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী ও পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ ধনী মার্ক জাকারবার্গ।
ওদিকে আটলান্টিকের অপর পাড়ে যুক্তরাজ্যেও শান্তিতে নেই বিলিয়নিয়াররা। সেখানে ইতিমধ্যেই আগাম নির্বাচনের প্রচার শুরু হয়েছে। বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। নিজের বন্ধু স্যান্ডার্সের মতো এই বৃদ্ধ বামপন্থী নেতাও বলছেন, ধনীদের ওপর ট্যাক্স বাড়ানো হবে বহুগুণ। আয়কর এড়ানোর ফাঁকফোকরও বন্ধ করা হবে। স্যান্ডার্সের সঙ্গে সুর মিলিয়েই তিনি টুইট করে বললেন, ‘যুক্তরাজ্যে ১৫০ জন বিলিয়নিয়ার আছেন। অথচ, এই যুক্তরাজ্যেই ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যে বসবাস করে। সমাজ যদি সাম্যের হতো, তাহলে কোনো বিলিয়নিয়ারই থাকতো না। আর কাউকেই দারিদ্র্যে বসবাস করতে হতো না।’
আর সেদিনই গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, করবিন নির্বাচিত হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজেদের ব্যবসা-সম্পত্তি যুক্তরাজ্যের বাইরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শীর্ষ ধনীরা।

পরমাণু প্রযুক্তি: মার্কিন গুণ্ডামি ও ইরানি জবাব

ড. সোহেল আহম্মেদ: ইউরেনিয়াম হচ্ছে পরমাণু বোমার অপরিহার্য উপাদান। খনি থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহের পর ইয়েলো কেকে পরিণত করে ধাপে ধাপে এই ধাতুকে সমৃদ্ধ করে এর মাত্রা ৯০ শতাংশে নিয়ে যেতে পারলেই বানানো যায় পরমাণু বোমা।

তাই সবার মধ্যেই ইউরেনিয়াম নিয়ে একটা আতঙ্ক কাজ করে। তবে পরমাণু প্রযুক্তি বা ইউরেনিয়াম মানেই পরমাণু বোমা নয়। এই প্রযুক্তির রয়েছে নানা ধরণের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার। পরমাণু প্রযুক্তিতে ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধির মাত্রা একটা বড় বিষয়।

----এক.----

এক সপ্তাহ হলো ইরান ৫ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করেছে। এই মাত্রায় সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইরানের দু’টি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার একটি হচ্ছে ‘ফোরদু’। এখানেই শুরু হয়েছে এই সমৃদ্ধকরণ। এর ফলে ‘ফোরদু’ আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তি সইয়ের পর এই কেন্দ্রটি অনেকটা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল। কারণ ইরান চুক্তি অনুযায়ী ‘ফোরদু’ স্থাপনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ রেখেছিল। এর আগে সেখানে ২০ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ হচ্ছিল।

‘ফোরদু’ কারো কারো কাছে ইংরেজি শব্দ মনে হতে পারে। কিন্তু এটি ইরানের কোম প্রদেশের একটি গ্রাম। নামটির উৎপত্তি হয়েছে ফেরদৌস শব্দ থেকে। সবুজে ঘেরা ছোট্ট গ্রামটির প্রশান্তিময় পরিবেশের কারণে বেহেশতের নামের সঙ্গে মিল রেখেই এই নামকরণ। প্রথমে ছিল ফেরদৌস, পরে ফেরদো। এরপর আরেকটু পরিবর্তিত হয়ে ফোরদু-তে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮০’র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধে এই গ্রামেই শহীদ হয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি মানুষ। ফোরদু স্থাপনা প্রতিষ্ঠার কথা ২০০৯ সালে সবাইকে জানায় ইরান।

ইরানের অপর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রটি ইস্ফাহান প্রদেশের নাতাঞ্জে অবস্থিত। পরমাণু চুক্তি অনুযায়ী সেখানে সীমিত পরিমাণে ৩ দশমিক ৬৭ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজ চলছিল। এখনও চলছে। নাতাঞ্জ ও ফোরদু-দু’টি স্থাপনাই নির্মিত হয়েছে ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক গভীরে। শক্তিশালী বোমা মেরেও এ দু’টি স্থাপনা ধ্বংস করা কঠিন হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হুমকির কারণে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণেও ইরানকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

ইরান ৬২ বছর ধরে পরমাণু তৎপরতা চালাচ্ছে। ১৯৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় পরমাণু প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু করে তেহরান। এ পর্যন্ত ইরান এ খাতে বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করেছে। এর একটি উদ্দেশ্য হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন। আগামী আট বছরের মধ্যে ইরান পরমাণু প্রযুক্তির সাহায্যে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ইরানের আগ্রহের একটি কারণ হলো এই প্রযুক্তির বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি কম। প্রতি এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে গ্রিন হাউস গ্যাস নিগর্মন কম হয় ৭০ লাখ টন। এছাড়া ইরানের রয়েছে নিজস্ব ইউরেনিয়াম খনি। নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্রিও করতে চায় তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম বিক্রি করে বিপুল অর্থ আয় করছে।

নিজে সমৃদ্ধ করার আগে ইরানও চড়া দামে উচ্চ মাত্রার ইউরেনিয়াম কিনেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত পারমাণবিক গবেষণা চুল্লিতে কিছু সংস্কার এবং ২০ মাত্রার প্রায় ১১৬ কেজি ইউরেনিয়াম কিনতে ১৯৮৭ সালে ইরানের ব্যয় হয়েছিল ৫৫ লাখ ডলার। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই চুল্লিতে পারমাণবিক ওষুধ তৈরি করা হয় এবং এই চুল্লির জ্বালানি হচ্ছে ২০ মাত্রায় ইউরেনিয়াম। ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর মার্কিন চাপের কারণে এই গবেষণা চুল্লির জন্য ইউরেনিয়াম পেতেও ইরানকে বেগ পেতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নিজেই ২০ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে ইরান।

ইসলামি বিপ্লবের আগে তেহরান রিঅ্যাক্টর বা পরমাণু চুল্লিটি বিপুল অর্থের বিনিময়ে নির্মাণ করে দিয়েছিল খোদ আমেরিকা। ১৯৬৭ সালে চুল্লি নির্মাণের পর ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হয় এবং আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলো এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। অসহযোগিতার জবাবে ইরান নিজেই পরমাণু সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জনে কাজ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ইরান পরমাণু প্রযুক্তি সংক্রান্ত সার্বিক জ্ঞান আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়।

এখন ইরান বলছে ৬০ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করাও তাদের কাছে কোনো বিষয়ই নয়। আর বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব দেশ ইউরেনিয়ামকে ২০ মাত্রায় সমৃদ্ধ করতে পারে তাদের পক্ষে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তা ৯০ মাত্রায় উন্নীত করাও সম্ভব। ইরান ৬০ মাত্রার কথা কেন বলে? এর কারণ হলো, পারমাণবিক সাবমেরিন ও জাহাজ চালাতে ৬০ মাত্রার ইউরেনিয়াম লাগে। এটাও শান্তিপূর্ণ তৎপরতার মধ্যেই পড়ে এবং ইরান সে পর্যায়েও যেতে চায়।

----দুই.----

ইরান পরমাণু প্রযুক্তি আয়ত্ত করার পর এখন আমেরিকা, ইসরাইল ও ইউরোপের উদ্বেগের সীমা নেই। তারা বলছে, ইরান পরমাণু বোমা বানিয়ে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। যদিও ইরান বারবারই বলছে তারা পরমাণু বোমা বানাবে না। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীও পরমাণু বোমা তৈরি, সংরক্ষণ ও ব্যবহারকে হারাম ঘোষণা করেছেন। ইরান শুধু পরমাণু বোমা নয়, সব ধরণের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিরোধী। গণবিধ্বংসী অস্ত্র ইসলাম ধর্ম অনুমোদন করে না। কারণ এর ধ্বংস ক্ষমতা এতটাই বেশি যে, তা নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষকেও নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। আর ইসলাম ধর্ম একজন নিরপরাধ মানুষ হত্যাকেও গোটা মানব জাতিকে হত্যার সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছে। জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু বোমা মারার কারণে লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখনও সেই তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব রয়ে গেছে।

বার বার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও চাপ ও উদ্বেগ অব্যাহত থাকায় ২০১৫ সালে পরমাণু চুক্তি সই করে ইরান। এই চুক্তিতে ১৫ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ মাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দেয় তেহরান। কিন্তু ২০১৮ সালে অন্যায়ভাবে এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায় আমেরিকা। এখন ইউরোপও সে চুক্তি বাস্তবায়ন করতে গড়িমসি করছে। ইরান এখন এই চুক্তিতে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে ধাপে ধাপে সরে আসছে। কারণ তেহরান প্রতিশ্রুতি মেনে নিজের বিপুল বাজেটের কর্মসূচির একটা অংশ স্থগিত রাখলেও তাতে কোনো লাভ হয় নি। মার্কিন গুণ্ডামি থেমে থাকেনি। ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সময়ই ইরানের ওপর আগের নিষেধাজ্ঞাগুলো পুনর্বহালের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ২০১৫ সালে চুক্তি সইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও কার্যত সেগুলো অব্যাহতই ছিল। ব্যাংকিং খাতে তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার পরও পরোক্ষভাবে বিশ্বের প্রধান ব্যাংকগুলোকে চাপের মধ্যে রেখেছিল যাতে ইরানি আর্থিক লেনদেন স্বাভাবিক না হয়। ট্রাম্প এখন বলছে, ইরানকে তার পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। সীমিত পর্যায়েও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে দেওয়া হবে না।

ইরান এখন পর্যন্ত আইএইএ’র কোনো নীতিমালা লঙ্ঘন করেনি। তাহলে দেশটিকে কেন শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত করা হবে?  বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এই প্রযুক্তির সাহায্যে। প্রযুক্তিতো কারো একক সম্পত্তি নয়। কিন্তু আমেরিকা বলছে, ইরানের ওপর আস্থা রাখা যায় না, ইরানকে শান্তিপূর্ণ কাজেও পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না। এটা আমেরিকার প্রকাশ্য গুণ্ডামি।

ইরান এনপিটিতে সই করেছে এবং তাদের সব পারমাণবিক কার্যক্রম আইএইএ’র পুরোপুরি পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এছাড়া বর্তমান ইরান কখনোই আগ্রাসী তৎপরতা চালায়নি। দখলদারিরও কোনো ইতিহাস নেই। অন্যদিকে ইসরাইল অন্যের জমি দখল করে অবৈধভাবে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। এনপিটিতে সই করেনি। এরিমধ্যে পরমাণু অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে দুইশ’র বেশি। কোনো পর্যবেক্ষককে এখন পর্যন্ত পরমাণু স্থাপনায় ঢুকতে দেয়নি তারা। এ অবস্থায় ইসরাইলের ওপর আস্থা রাখতে আমেরিকার সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু আইএইএ’র তত্ত্বাবধানে ইরানের শান্তিপূর্ণ কার্যক্রমেও তাদের আস্থা নেই। এটা আস্থার সংকট নয়, প্রকাশ্য গুণ্ডামি; গায়ের জোরে ন্যায্য অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করা।

দুঃখজনকভাবে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও গোটা বিশ্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই গুণ্ডামি নীরবে দেখছে, কোনো কোনো রাষ্ট্র এতে উৎসাহ যোগাচ্ছে। আমেরিকা নিজেকে গোটা বিশ্বের একক নিয়ন্ত্রক ভাবছে দীর্ঘ বহু বছর ধরে। তবে ইরান আমেরিকার অহংবোধে মাঝে মাঝেই কালি লেপে দিচ্ছে যা সত্যিই প্রশংসনীয়। গত জুনে ইরানের আকাশে গুণ্ডামি করতে এসে এক হাজার একশ' কোটি ডলার মুল্যের অত্যাধুনিক ড্রোন 'গ্লোবাল হক' হারিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

সম্প্রতি ফোরদু স্থাপনায় আবারও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার মাধ্যমেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী দেশগুলোকে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ৫ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে তেহরান বুঝিয়ে দিয়েছে, পরমাণু তৎপরতা সীমিত রাখলেও পরমাণু জ্ঞান মোটেও হ্রাস পায় নি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়ানো কেবল সিদ্ধান্তের ব্যাপার। সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার পরও ইরান পরমাণু কর্মসূচিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সাহস দেখাবে তা ট্রাম্পের মতো দাম্ভিক ব্যক্তির জন্য সত্যিই অবিশ্বাস্য।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তার সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইরান যে সাহস ও শক্তি দেখাচ্ছে তাতে দেশটির প্রতি বিশ্বের ন্যায়কামী মানুষের সমর্থন ও আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। ইরানের এই শক্তি ও সাহস ক্রমেই অন্যদের মধ্যেও সঞ্চালিত হচ্ছে। ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের চলমান প্রতিরোধই এর প্রমাণ।

>>>লেখক: রেডিও তেহরানের সিনিয়র সাংবাদিক।
shohelahmed@yahoo.com

সৌদি আরবে নারীত্ববাদ, সমকামিতা, নাস্তিক্যবাদ উগ্রপন্থিদের ধারনা

নারীত্ববাদ, সমকামিতা ও নাস্তিক্যবাদকে উগ্রপন্থিদের আইডিয়া বা ধারণা বলে আখ্যায়িত করেছে সৌদি আরব। দেশটির রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা প্রকাশিত একটি প্রোমোশনাল বা প্রচারণামুলক ভিডিওতে ওই তিনটি ধারণাকে ক্যাটেগরি করা হয়েছে। এখানে সমকামিতা ও নাস্তিক্যবাদ দীর্ঘদিন যাবত অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য। এর শাস্তি মৃত্যুদন্ড। সৌদি আরবে জনবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ। মিডিয়ার ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে রাজতন্ত্র শাসিত সৌদি আরবে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

রক্ষণশীল মুসলিম প্রধান সৌদি আরবে সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ানো হয়েছে সহনশীলতা।
আকৃষ্ট করা হয়েছে বিদেশীদের। এক্ষেত্রে বিধিবিধান শিথিল করা হয়েছে। সপ্তাহান্তে টুইটারে একটি এনিমেশন করা ক্লিপ প্রকাশ করা হয়েছে স্টেট সিকিউরিটি প্রেসিডেন্সি’র একাউন্টে। এ একাউন্টটি ভেরিফায়েড। এতে বলা হয়েছে, যেকোনো রকম উগ্রপন্থা এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতা অগ্রহণযোগ্য। এতে বলতে শোনা যায়, দেশের স্বার্থ বিরোধী যেকোন কিছুকে উগ্রপন্থা হিসেবে বিবেচনা করা হবে- এটা ভুলে যাবেন না। উল্লেখ্য, সৌদি আরবের অর্থনীতি তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রকে আরো বিস্তৃত করতে সম্প্রতি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। অনেকটা উন্মুক্ত করে দিয়েছেন সমাজ ব্যবস্থাকে। সামাজিক বিধিনিষেধকে শিথিল করেছেন। চালু করেছেন পর্যটক ভিসা। আগামী বছরে রিয়াদে বসছে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন। পুরুষের ওপর নির্ভরশীলতার ক্ষেত্রে নারীদের অনুমোদন দেয়া হয়েছে বেশ কিছু সুবিধা।

এতসব সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে দমন পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় নেতা, বৃদ্ধিজীবী ও অধিকারকর্মী সহ বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনকে গ্রেপ্তার করছে। নারীদের গাড়ি চালানোয় নিষেধাজ্ঞার কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ডজনখানেক নারী অধিকারকর্মীকে। তবে গত বছর ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। অধিকারকর্মী এবং কূটনীতিকরা এতে আশঙ্কা করছেন যে, এর মধ্য দিয়ে একটি বার্তা দেয়া হচ্ছে। তা হলো, শুধু সরকারের উদ্যোগেই হবে সংস্কারমূলক কর্মকান্ড। তবে যেসব নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সে সম্পর্কে কথা বলেছেন পাবলিক প্রসিকিউটর। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের স্বার্থের ক্ষতি করছিলেন এবং বিদেশী শত্রু রাষ্ট্রগুলোর প্রতি সমর্থন রয়েছে এমন সন্দেহে ওইসব নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সৌদি আরবের আইনের অধীনে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি সংগঠন হিসেবে ঘোষিত গ্রুপের প্রতি সমর্থন দিলে তার শাস্তি জেল হতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিখোঁজ মার্কিন সাবমেরিন উদ্ধারের বিস্ময়কর কাহিনী

অবশেষে সমাধা হলো ৭৫ বছর পুরোনো এক রহস্যের। সমুদ্রে নিখোঁজ হওয়া মার্কিন সাবমেরিন ইউএসএস গ্রেব্যাক-এর খোঁজ মিলেছে। সবচেয়ে বড় কথা, এত বছর ধরে এই সাবমেরিন পাওয়া না যাওয়ার জন্য দায়ী করা হচ্ছে কেবল একটি সংখ্যাকে!
নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, গ্রেব্যাক ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সবচেয়ে সফল মার্কিন সাবমেরিনগুলোর একটি। ১৯৪৪ সালের ২৮শে জানুয়ারি পার্ল হারবার থেকে রওনা দেয় গ্রেব্যাক। সেই বছরের মার্চের শুরুতে অপারেশন শেষে ফিরে আসার কথা ছিল সাবমেরিনটির। কিন্তু ৩ সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও কোনো সন্ধান পাওয়া গেলো না। ফলে মার্কিন নৌবাহিনী এই সাবমেরিনটিকে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করলো।
যুদ্ধের পর দেখা গেলো মার্কিন নৌবাহিনী মোট ৫২টি সাবমেরিন হারিয়েছে। এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস দাঁড় করানোর চেষ্টা করে নৌবাহিনী।
১৯৪৯ সালে এ ব্যাপারে বিস্তারিত উপাত্তের মাধ্যমে জানানো হয় প্রত্যেক সাবমেরিন আনুমানিক কোন স্থানে নিখোঁজ হয়ে থাকতে পারে। গ্রেব্যাকের ক্ষেত্রে ধারণা করা হয়েছিল ওকিনাওয়া থেকে পূর্ব-দক্ষিণপূর্ব দিকে ১০০ মাইল দূরে এটি হারিয়েছে। কিন্তু মার্কিন নৌবাহিনী অজ্ঞানতাবশত জাপানি যুদ্ধ নথির ত্রুটিপূর্ণ অনুবাদের ওপরই এতদিন নির্ভর করেছে। আর এতে দেখা যাচ্ছে, অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশে একটি সংখ্যা ভুল হয়েছে। এই ভুল এতদিন কারও চোখে পড়েনি। ফলে গ্রেব্যাকের সন্ধানে এতদিন ভুল জায়গায় অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল।
গত বছর একজন সৌখিন গবেষক ইউতাকা ইওয়াসাকির চোখে এই ভুল ধরা পড়ে। তিনি সাসেবোতে অবস্থিত তৎকালীন জাপানি সাম্রাজ্যবাদী নৌবাহিনীর যুদ্ধকালীন রেকর্ড যাচাইবাছাই করছিলেন। ওই নথির মধ্যে ছিলো ওকিনাওয়ার নৌ বিমান ঘাঁটির রেডিও থেকে প্রাপ্ত দৈনিক তথ্যও। ১৯৪৪ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারিতে লিপিবদ্ধ তথ্য থেকে পাওয়া গেলো একটি সূত্র।
জাপানি নৌবাহিনীর সেইদিনের প্রতিবেদনে বলা হলো, নাকাজিমা বি৫এন বোমারু বিমান থেকে ৫০০ পাউন্ডের একটি বোমা ফেলা হয়েছে একটি ভাসমান সাবমেরিনের ওপর। এতে করে ওই সাবমেরিন বিস্ফোরিত হয় ও সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যায়। জীবিত কাউকে উদ্ধার করা যায়নি।
ইওয়াসাকি বলেন, ‘ওই রেডিও রেকর্ডে সাবমেরিনের ওপর হামলার অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ লিপিবদ্ধ করা ছিল বেশ স্পষ্টভাবে।’ আর এই অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর ১৯৪৯ সালের ইতিহাসে গ্রেব্যাকের সম্ভাব্য অবস্থানের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের বৈসাদৃশ্য পাওয়া যায় মাত্র একটি সংখ্যায়। আর একটি সংখ্যার কারণেই ব্যবধান হয়ে যায় কয়েকশ মাইল!
ইওয়াসাকির এই আবিষ্কার চোখে পড়ে টিম টেইলরের। টেইলর একজন সমুদ্রতল অভিযাত্রী। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংস হওয়া প্রত্যেকটি মার্কিন সাবমেরিনের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের মিশন হাতে নিয়েছেন। ২০১০ সালে তিনি খুঁজে পান প্রথম সাবমেরিন। সেটি ছিল ইউএসএস আর-১২। এটি পাওয়া গিয়েছিল কী ওয়েস্ট-এ। সেখানে ইউএসএস আর-১২ প্রশিক্ষণের সময় ১৯৪৩ সালে ডুবে গিয়েছিল। টিম টেইলর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অর্থায়নে লস্ট ৫২ প্রজেক্ট নামে ওই প্রকল্প হাতে নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া ৫২টি সাবমেরিনের মধ্যে যেগুলোর সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি, সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করাই ছিল এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এই প্রকল্পে এমন সব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে যা সবে গত ১০-১৫ বছর হলো এসেছে। টেইলর বলেন, ৫২টি নিখোঁজ সাবমেরিনের মধ্যে ৪৭টিই উদ্ধারের যোগ্য বলে ভাবা হয়। বাকি ৫টি ধ্বংস হওয়ার স্থান জানা আছে। এই ৪৭টি সাবমেরিন উদ্ধারের জন্য বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করছেন টেইলর ও তার স্ত্রী ক্রিস্টাইন ডেনিসন। তারা এখন নজর দিয়েছেন জাপানের আশেপাশে যেগুলো ডুবে থাকতে পারে সেগুলোর ওপর।
সাগরতলের অভিযানে ঝোঁক থাকায় টেইলরের সঙ্গে পরিচয় হয় ডন ওয়ালশ নামে নৌবাহিনীর সাবেক এক সাবমেরিনারের সঙ্গে। ১৯৬০ সালে ডন ওয়ালশ লেফটেন্যান্ট হিসেবে পৃথিবীর গভীরতল সমুদ্র তল হিসেবে বিবেচিত মারিয়ানা ট্রেঞ্চ ছুয়েছিলেন। ওয়ালশই ১৯৪৯ সালের নৌবাহিনীর ওই ইতিহাসের একটি কপি টেইলরকে দেন।
এই বইয়ের তথ্য ও ইওয়াসাকির নতুন আবিষ্কার- এই দুই মিলিয়ে টেইলর ও লস্ট ৫২ দল সিদ্ধান্ত নেয় গ্রেব্যাকের অবশিষ্টাংশ উদ্ধারের প্রচেষ্টা চালানো হবে।
গ্রেব্যাকের শেষ অভিযান ছিল লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জন এ মুরের নেতৃত্বে তৃতীয় অভিযান। আগের দুইটি অভিযানের জন্য নৌবাহিনীর সম্মানজনক ক্রস পদক পেয়েছিলেন মুর। তৃতীয় ক্রস পদক পান মরনোত্তর। গ্রেব্যাক এক ডজনেরও বেশি জাপানি জাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়।
৭৫ আগে কমান্ডার মুর যেভাবে শুরু করেছিলেন, টেইলরও হাওয়াই থেকে ওকিনাওয়ার দিকে রওনা দেন। জুন মাসে তারা জাপানি নৌসীমায় প্রবেশ করলেও মেকানিক্যাল ও ইলেক্ট্রিক্যাল সমস্যার কারণে তাদের মিশন ভেস্তে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। তারা এমন এক স্থানে খুঁজছিলেন যেখানে সাগরের গভীরতা ১৪০০ ফুট। অনুসন্ধানের জন্য টেইলরের দলের প্রধান যন্ত্র ছিল ১৪ ফুট লম্বা স্বয়ংক্রিয় যান। এটি যেন অনেকটা সমুদ্রতলের ড্রোন। ২৪ ঘণ্টা ধরে সমুদ্রের গভীরে ও ১০ বর্গ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সোনার পাঠিয়ে উপরে উঠে আসে ওই যান। এরপর ওই যানের সংগ্রহ করা উপাত্ত সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডাউনলোড করেন টেইলরের দল।
পরেরদিনেই ওই ড্রোনে সমস্যা দেখা দেয়। পুরো দল ভেবে নেয় এই সমস্যা সমাধান করা যাবে না। ফলে ফিরে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। কিন্তু টেইলর ড্রোনের তোলা ছবি পর্যালোচনা করতে শুরু করেন। খুব দ্রুতই তিনি দেখতে পান সমুদ্র তলে দুইটি অসামঞ্জস্য আছে। এরপর আরেকটি যন্ত্র পাঠানো হয় সমুদ্রতলে। তবে এটি সোনার নয়, নিজেই সমুদ্রতলে যেতে সক্ষম। এছাড়া এই যন্ত্রে ছিল উচ্চধারণক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই টেইলরের হাতে চলে আসে গ্রেব্যাকের ধ্বংসাবশেষের ছবি। ৪০০ ফুট নিচে পড়ে আছে গ্রেব্যাকের ডেক গান।
পরদিন নিহত ৮০ জনের জন্য বিশেষ স্মরণসভা আয়োজন করেন টেইলর ও তার দল। প্রত্যেকের নাম সেখানে উচ্চারণ করা হয়। এদের একজন ছিলেন জন প্যাট্রিক কিং। তার ভাইয়ের ছেলে জন বিন, যার নাম রাখা হয়েছিল জন প্যাট্রিক কিং-এর আদলে। তার জন্ম হয়েছিল প্যাট্রিক কিং শেষ অভিযানে যাওয়ার ৩ বছর আগে। বিনের দাদা-দাদী তাদের সন্তানের দেহবাশেষ খুঁজে না পেয়ে নিজেরাই একটি এপিটাফ বানিয়ে তাকে স্মরণ করতেন।
বিন দুই সপ্তাহ আগে তার বোন ক্যাথেরিনের কাছ থেকে একটি বার্তা পান যে, গ্রেব্যাক খুঁজে পাওয়া গেছে। ক্রিস্টাইন ডেনিসনের কাছ থেকে ক্যাথেরিন ওই বার্তা পেয়েছিলেন। ওই কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যান বিন। তিনি যেনো বিশ্বাসই করতে পারেননি। তার ভাষ্য, ‘আমার পিতামাতা যদি বেঁচে থাকতে এটি দেখে যেতে পারতেন! তারা অনেক খুশি হতেন।’
টেইলরের ওই যন্ত্র থেকে তোলা একটি ভিডিওতে সাবমেরিনের একটি টাওয়ার দেখা যাচ্ছিল। সেখানে স্পষ্ট লেখা ‘ইউএসএস গ্রেব্যাক।’ বিন বলেন, ‘কেউ যেন এই অংশটা পরিষ্কার করে রেখেছে। মনে হলো, গ্রেব্যাকই চেয়েছিল যেন তাকে খুঁজে পাওয়া যায়।’

দুঃস্বপ্ন অথবা নীলচোখের মেয়েটি by মঈন মুরসালিন

বোশেখের অশান্ত বাতাসের ঝাপটা বারবার আছড়ে পড়ছে চোখেমুখে, জানালার রঙিন পর্দাটাও পত্পত্ করে উড়ছে। বোশেখের শেষ দিকে ক্লান্ত দুপুরে বিছানায় গড়াগড়ি আর বুকে জড়ানো শাদা কোল বালিশ নিয়ে এপাশ-ওপাশ করছি। চোখের পাতা ভারি হয়ে যাচ্ছে তবু কেন যেন ঘুমোতে ইচ্ছে করছে না। চারটা বাজতেই আড়মোড়া দিয়ে উঠে বসি, চোখ চলে যায় জানালা গলে পাশের বাড়ির দ্বিতীয় তলার মিলিদের বারান্দায় এবং চোখ আটকে যায় একটি নীলাভ চোখে। হ্যাঁ, সত্যি সত্যি সুন্দরী-রূপসী একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর তাকিয়ে আছে আমার দিকেই, কিন্তু এ মেয়েকে এ বাড়িতে আর কখনো দেখিনি। আমি বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম, মেয়েটি তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। আমি গভীরভাবে নির্লোভ চোখে তার দিকে তাকালাম। মনে হলো এমন নীলাভ চোখের মেয়ে বুঝি আর কখনো দেখিনি। তার চোখ আয়নার মতো স্বচ্ছ, সমুদ্রের মতো গভীর, আমার মন তার নাম দিলো নীলিমা। ধীরে ধীরে অন্ধকারের গিলাফ ঢেকে দেয় পৃথিবীকে, নীলিমা চলে যায় ঘরে কিন্তু তার চোখ হৃদয়ের আয়নায় ভেসে উঠলো এবং আমার সাথে কথা বলতে লাগলো, অনেক অনেক কথা…।

দুই....
পরদিন বিকেলে ছাদে উঠলাম, টবে পানি দিতে গিয়ে দেখি পাশের বাড়ির ছাদে মিলির হাত ধরে হাঁটছে সেই নীলাভ চোখের সুন্দর মেয়েটি। যাকে নীলিমা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে। আমি সবগুলো টবে পানি দিয়ে একটি চেয়ারে বসলাম, তাকিয়ে দেখতে লাগলাম নীলিমা ও মিলিকে। মিলি কি যেন বলতেই নীলিমা হাসতে লাগলো, তার চোখের পলক মাঝে মাঝে কেঁপে উঠে, আমি অভিভ‚ত হলাম তার মোহনীয় আকর্ষণীয় চাহনি দেখে। হয়তো ইমরাউল কায়েস উনায়জার এমন চোখকেই বন্য গাভীর নীলাভ চোখের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। মিলির হাত ধরে নীলিমা নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে, আমি তাকিয়ে থাকলাম চলে যাওয়া সিঁড়ির দিকে। আমার মন বলতে লাগলো আমি আজ সত্যি সত্যি তার চোখের প্রেমে পড়ে গিয়েছি।

তিন....
কিছুদিন পর দুপুরে খেয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করছি। বোশেখের আকাশে থমথমে ভাব, গুড়–ম গুড়–ম আওয়াজে মেঘে মেঘে সংঘর্ষ হচ্ছে, ধীরে ধীরে আকাশ কালো হতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরেই ঝিরঝির করে নামলো বৃষ্টি, ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গেল সামনের রাস্তা, বাড়ির বারান্দা এবং জানালার পার্টগুলো।
বৃষ্টিটা হঠাৎ থেমে গেল মেঘ চলে যাচ্ছে দ্রুত উত্তরাকাশে। শীতল বাতাস বইতে লাগলো, খুলে গেল পাশের বাড়ির দরজা নীলিমা বেরিয়ে এল। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে তাকালো নিষ্পলক দৃষ্টিতে। আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি বইতে লাগলো। নীলিমা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে, ভিজে যাচ্ছে তার সর্বাঙ্গ; আমিও ভিজে যাচ্ছি। তবুও তার চোখ আমাকে চুম্বকের আকর্ষণের মতো দাঁড় করিয়ে রাখলো। কত সুন্দর মসৃণ চেহারা, নীলাভ চোখ। তার চোখ দেখে আমার মনে হতো মরুভ‚মিতে সবুজ ঘাস তাকে আমি ইশারা করলাম সরে যেতে বৃষ্টি তাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যা হয়ে গেল বলে মা ডাকতে লাগলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘরে চলে এলাম। কারণ দেরি হলে মা বারান্দায় এসে দেখতে পারেন।

চার....
পরেরদিন সন্ধ্যা হয়ে গেল নীলিমা আসছে না, বুকের ভেতর মুচড়ে উঠলো কষ্ট। সন্ধ্যায় আর পড়তে বসতে পারলাম না। শুধু তাকিয়ে থাকলাম বন্ধ দরজার দিকে। বই খুলে তাকিয়ে আছি পড়তে ইচ্ছে করছে না। অনেকক্ষণ খেয়াল করে ছোট বোন লতা বললো, কি ভাবছো ভাইয়া? বই খুলে পড়ছো না যে?
আমি হঠাৎই বলে ফেললাম লতা, মিলিদের বাড়িতে কিছুদিন হলো একটি মেয়ে দেখছি, সে কে রে?

লতা বললো, ও তুমি নীলা আপার কথা বলছো, সেতো মিলিদের খালাতো বোন। জানো ভাইয়া তার মনে অনেক কষ্ট, তার না দুটো চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখন পাথরের চোখ লাগানো, এসেছিল বেড়াতে দেশে চলে গিয়েছে, কথাগুলো বলেই লতা থামলো। কথাগুলো শুনতেই আমার হৃদয়ে বোশেখের ঝড়ের চেয়েও প্রচণ্ড বেগে ঝড় বইতে লাগলো। বারবার যেন বজ্রপাত হচ্ছিল, ভেঙে যাচ্ছিল হৃদয়ের খিড়কি দরজা। এত সুন্দর চোখ মিথ্যে হতে পারে আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না, তবে কি পৃথিবী এত নিষ্ঠুর?