Thursday, July 30, 2020

বেশি মাংস খাওয়ায় ইউরিক অ্যাসিড এবং কোলেস্টেরল বাড়লে তা কমাবেন যেভাবে

ঈদুল আযহা বা কুরবানি ঈদের মৌসুমে খাবার টেবিলে 'রেড মিট' অর্থাৎ গরু বা খাসির মাংসের আয়োজন একটু বেশিই থাকে।
নিজের বাড়িতো বটেই কারো বাড়িতে সৌজন্য সাক্ষাত বা দাওয়াতে গেলেও একই অবস্থা। তবে রেড মিট খুব বেশি খেলে তা নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা তৈরি করার সম্ভাবনা থাকে।

বেশি 'রেড মিট' খেলে যেসব সমস্যা হতে পারে

প্রাভা হেলথ নামে একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের পুষ্টিবিদ নূর-ই-জান্নাত ফাতেমা বলছেন, অতিরিক্ত গরু বা খাসির মাংস একজন সুস্থ সবল মানুষের শরীরেও নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে।
কুরবানি ঈদে গরু বা খাসির মাংস এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই।
তিনি বলছেন, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক সুস্থ ব্যক্তি দৈনিক ৪০ গ্রাম পর্যন্ত গরুর মাংস খেতে পারেন।
অর্থাৎ দুই ইঞ্চি সমপরিমাণ দুই টুকরো, বলছেন জান্নাত ফাতেমা।
কিন্তু কুরবানি ঈদের মৌসুমে তো বটেই এমনকি সাধারণ সময়েও অনেকে এই পরিমাণের অনেকগুণ বেশি খেয়ে থাকেন।
জান্নাত ফাতেমা বলছেন, কুরবানির মৌসুমে যে পরিমাণ সাধারণত খাওয়া হয় এতে করে একজন সুস্থ লোকেরও কোলেস্টেরল বেড়ে যেতে পারে, উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে।
এমন মাংসে সোডিয়ামের পরিমাণও বেশি থাকে। প্রাণীজ প্রোটিনে ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে গিয়ে গিটে ব্যথা হতে পারে।
এতে কিডনির উপরও চাপ পড়ে। রেড মিটে প্রচুর পরিমাণে 'ট্রান্স ফ্যাট' থাকে। বেশিরভাগ সময় পেটের দিকে গিয়ে এসব চর্বি জমে যায়।
রেড মিট খুব বেশি খেলে তা নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা তৈরি করে।
বেশি গরুর মাংস হজমে সমস্যা করে, গ্যাস্ট্রিক হতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো বিরক্তিকর সমস্যা হতে পারে।
যাদের পাইলস রয়েছে তাদের জন্যে সমস্যা আরও বেশি হতে পারে।

যেভাবে রান্না করবেন

নূর-ই-জান্নাত ফাতেমা বলেছেন কম বয়সী গরুর মাংস অপেক্ষাকৃত ভালো।
মাংস কীভাবে রান্না হচ্ছে সেটিও একটি বিষয়। কম তেলে রান্না করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
গরু বা খাসির মাংসে অনেক সময় এমনিতেই চর্বি জাতীয় উপাদান বেশি থাকে।
তাই রান্নায় বাড়তি ঘি ব্যাবহার নিরুৎসাহিত করছেন তিনি। কারণ এতে চর্বির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।

প্রতিকারের উপায় কী?

কিন্তু যদি বেশি খেয়েই ফেলেন বা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না হয় তাহলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে বেশ কিছু উপায় জানালেন জান্নাত ফাতেমা।
কম তেলে রান্না করাই ভালো।
*খাবারের মেন্যুতে প্রচুর পরিমাণে সালাদ ও সবজি জাতীয় খাবার রাখতে হবে। শর্করা কম খেতে হবে।
*মাংস খাওয়ার পর এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে একটু লেবু চিপে দিয়ে সেই পানি ধীরে ধীরে খান তাতে চর্বি কমবে।
*টক দই দিয়ে লাচ্ছি খেতে পারেন। টক দই চর্বি কমাতে সাহায্য করে।
*ইউরিক অ্যাসিড বা কোলেস্টেরল হঠাৎ বাড়লে সকালবেলা এক চা চামচ অ্যাপল সাইডার ভিনেগার একটু পানির সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন। আজকাল ঢাকার বড় সুপার শপে এটি পাওয়া যায়। এটি ইউরিক অ্যাসিড কমাতে সাহায্য করে।
*দিনে ৪৫ মিনিটের মতো ব্যায়াম করুন। অথবা হাটতে পারেন। বাইরে বের হতে না পারলে ঘরের মধ্যেও ১০ থেকে ১৫ মিনিট দ্রুত পায়চারি করতে পারেন। যোগ ব্যায়ামও ভালো কাজে দেয়।
*কুসুম গরম পানি পান করুন। তিন থেকে সাড়ে তিন লিটার পানি পান করুন।

রাতারাতি সমাধান হবে না

তবে মনে রাখবেন রাতারাতি চর্বি কমে তলপেট আকর্ষণীয় হয়ে যাবে তেমনটা ভাবলে কিন্তু চলবে না।
এসব প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে।
আর যাদের এমনিতেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, লিভার সিরোসিস, হৃদযন্ত্রের ও ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা রয়েছে তাদের উচিত রেড মিট যতটা সম্ভব এড়িয়ে যাওয়া।
প্রচুর সালাদ ও সবজি খেতে ভুলবেন না।

Wednesday, July 29, 2020

ক্যান্সারের কয়েকটি প্রাথমিক লক্ষণ

ক্যান্সার। জীবনের হিসেব কষতে বসলে এই একটা শব্দই ভয়ে আঁতকে ওঠার জন্য যথেষ্ট। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় এই রোগের কিছু কিছু পর্যায়ের সঙ্গে লড়াই করা সম্বব হলেও, আজও পরিবারের কেউ এই রোগের শিকার হয়েছেন শুনলে যেন মাথায় বাজ ভেঙে পড়ে। তার অন্যতম কারণ অবশ্যই, এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে ওঠার চাবিকাঠি এখনো অধরা। তাই ক্যান্সার আতঙ্কও সহজেই জাঁকিয়ে বসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সার যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে ততই তার চিকিৎসায় সেরে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। মেটাস্টেসিস হোক বা নন মেটাস্টেসিস, ক্যান্সারের সঙ্গে প্রাথমিক লড়াইটা যত দ্রুত শুরু হবে ততই রোগী অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবেন। তবে বেশির ভাগ ক্যান্সারের ক্ষেত্রেই উপসর্গ ধামা চাপা পড়ে থাকে দীর্ঘ দিন। প্রকাশ্যে আসেই অনেকটা দেরিতে, তাই চিকিৎসা শুরু হতেই সময় লেগে যায়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, একটু সচেতন হলে কিছু কিছু ক্যান্সারের কয়েকটি প্রাথমিক লক্ষণ বুঝতে পারা সম্ভব। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো অন্য অনেক সাধারণ অসুখের উপসর্গ হওয়ায় আমরা তাকে অতটা গুরুত্ব দিই না। কিন্তু এই লক্ষণগুলোকেই প্রথম দিন থেকে গুরুত্ব দিলে আগাম সাবধান হওয়া যায়। অন্য অসুখ ধরা পড়লেও প্রাথমিক সচেতনতা কিন্তু দাবি রাখে এই উপসর্গগুলো। দেখে নিন কোন কোন ক্ষেত্র আপনার বাড়তি সতর্কতা দরকার।
হঠাৎ তীব্র হাড়ের ব্যথাকে অবহেলা নয়।
হাড়ে বা গাঁটে ব্যথা হলে তাকে সব সময়ে বাতের ব্যথা বলে ফেলে রাখবেন না। বিশেষ করে গা-হাত-পা ব্যথা ইত্যাদি হলে তা এড়িয়ে যাবেন না। এখন থেকেই সাবধান হোন। নিয়মিত হাড়ের ব্যথা কিন্তু বোন ক্যান্সারের ইঙ্গিত দেয়।
হঠাৎ হঠাৎ পা ফুলে যাওয়া কিন্তু সবসময় ছোট সমস্যা না-ও হতে পারে। তাই এই ধরনের সমস্যা লেগে থাকলেও চিকিৎসকের কাছে যান।
শরীরে প্রায়ই কি লাল র‍্যাশ বেরোয় এবং চুলকুনি হয়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো পোকার কামড় বা অ্যালার্জি বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু নিয়মিত এগুলো হতে থাকলে এক বার অন্তত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এই সমস্যা ব্লাড ক্যান্সারের ইঙ্গিত দেয়। ব্লাড ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণই হলো শরীরে লাল, বেগুনি, ব্রাউন র‍্যাশ।
মাথার যন্ত্রণা হলে সব সময়ে ভাববেন না চোখের সমস্যা, ঠান্ডা লাগা, সাইনাস বা মাইগ্রেন। সব সময়ে এমনটা কিন্তু হয় না। প্রায়ই প্রবল মাথার যন্ত্রণায় ভুগতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। অতিরিক্ত মাথার যন্ত্রণা ব্রেন টিউমরের ইঙ্গিত দেয়।
মহিলারা প্রায়ই লক্ষ্য করবেন স্তনবৃন্ত খুব বেশি ভিতরে ঢুকেগেছে বা আকৃতিতে পরিবর্তন হয়েছে কি না। এটিও কিন্তু ক্যান্সারের অন্যতম লক্ষণ।
অণ্ডকোষের আকৃতি হঠাৎ বৃদ্ধি পেলে বা ফুলে গেলে সাবধান হোন। এই ধরনের সমস্যা ফেলে না রেখে শিগগিরই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
হঠাৎ করে ওজন কমে গেলে তা এড়িয়ে যাবেন না। অস্বাভাবিক ভাবে হঠাৎ ওজন কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ওজন কমে যাওয় স্টমাক ক্যান্সারের অন্যতম লক্ষণ।
প্রায়ই কি গ্যাসের সময়ে কষ্ট পেতে হয়? অনেকেই মনে করেন খাবার হজমের কারণেই এমন হয়ে থাকে। কিন্তও এই লক্ষণ বলে দিতে পারে আপনি ওভারির ক্যান্সারে আক্রান্ত কি না।

Tuesday, July 28, 2020

কলম্বোর ব্লু সোয়ান: কফি, স্ন্যাকসের সাথে পুরনো সৌন্দর্য ও ঘরভর্তি মজার মানুষের সঙ্গ উপভোগ

কলম্বোর ক্যাফে দৃশ্যপট অনেকটাই মাশরুমের মতো। সবসময় গজিয়েই চলছে। তবে কফি শপ এখন নতুন জিনিস হলেও প্রায় দুই শ’ বছর আগে ব্রিটিশদের প্রবর্তিত উপনিবেশ আমলের পানীয় চা কিন্তু এখনো তার অবস্থান ধরে রেখেছে। অবশ্য এখানেও ব্যতিক্রম রয়েছে। আবার কফি শপগুলোতেও চায়ের আয়োজন রয়েছে। কফির দূর সম্পর্কের কাজিন হিসেবেই চা পরিবেশন করা হয় এসব স্টলে।
শ্রীলংকায় স্থানীয় ও বিদেশী সবাই কাজ করার পাশাপাশি এক কাপ কফি সবসময়ই কামনা করে। এমন অনেক ব্যবসায়িক হাব আছে যেখানে লোকজন দিন চুক্তিতে চা বা কফি পান করে থাকে। এমনই একটি হাব হলো হানসা ক্যাফে। সম্প্রতি এর নাম হয়েছে ব্লু সোয়ান ক্যাফে। কলম্বোর থিমবিরিগ্যাসিয়ারার ফিফে রোডে এর অবস্থান।
স্বস্তিদায়ক পরিবেশে কফি আর কাজ দুটিই চলানো যায়। বিশেষ করে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তারা এখানে সমবেত হতে বেশ ভালোবাসেন। এর ২৬ বছর বয়স্ক ম্যানেজার লনি ও তার তরুণ সহকর্মীরা সাধারণ রুটিকেও জাদুমন্ত্র দিয়ে সুপারক্লাস চিপ টোস্ট বানিয়ে ফেলতে পারেন। আর সাধারণ কফি তাদের হাতের ছোঁয়ায় হয়ে যায় জীবনদায়িনী অমৃত।
ফলে সঙ্গীতজ্ঞ, শিল্পী, গবেষকসহ নানা ধরনের লোকজন তাদের হ্যাঙ্গ-ওভার কাটাতে ভিড় করেন এখানে। মাঝে মাঝে রাজনীতিবিদদেরও দেখা মিলবে।
কফি শপে কিন্তু আরো অনেক কিছু মেলে। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এটি বিশেষ স্থান। কফির উৎস হলো শ্রীলংকার বনের বাগান। আর এখানে অর্গ্যানিক ফল ও পণ্য পাওয়া যায়। সাবান, টি ওয়াইন, এনার্জি ফ্রুট স্ন্যাকস এবং এমনকি চারকোল সাবান, টুথপেস্ট সবাই বিজ্ঞাপন হিসেবে কাউন্টারে সাজানো থাকে।
ব্লু সোয়ান ক্যাফে আরেকটি কারণে খ্যাতিমান। তা হলো সারপ্রাইজ ডিনার আর মিউজিক্যাল নাইটস। স্থানীয় গ্রুপ ছাড়াও নানা সংগঠন এখানে তাদের সেরাটা দিয়ে যায়। তখন কিন্তু ক্যাফে হয়ে যায় হাউস ফুল। আর অনুষ্ঠান চলে মধ্য রাত ছাড়িয়েও।
ব্লু সোয়ানের মালিক শানি হুলুগ্যালে বলেন, লোকজন এই ক্যাফেকে তাদের বাড়ি মনে করায় তা আনন্দের ব্যাপার। এখানে এসে তারা স্বস্তিতে থাকে, তা জেনে খুশিই লাগে। তিনি তার ক্যাফের মান রক্ষার ব্যাপারে খুবই সচেতন। তিনি জানান, তিনি খাবারের মান পরীক্ষা করতে এবং সহকর্মীদের উৎসাহিত করতে দিনে অন্তত একবার ক্যাফেতে আসেন। তার বন্ধুপ্রতীম আচরণ প্রথমবারের মতো আসা লোকজন যেমন খুশি হয়, একইভাবে আনন্দিত হয় পুরনো কাস্টমারেরা।
তিনি বলেন, কলম্বোতে অনেক ক্যাফে আছে, আছে অনেক ওয়ার্ক স্টেশন। তবে তার ক্যাফের বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির লোকজন তাদের ভাববিনিময় করতে পারে।
তরুণ উদ্যোক্তা ইহতিশাম লাই বলেন, এটি অনন্য একটি স্থান। এখানে একটি সমাজ সৃষ্টি হয়।
তবে সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হবে এটি অতি সাধারণ ক্যাফে। দেয়ালগুলো কালো নীল কালার করা, তাতে শ্রীলংকার শিল্পীদের ছবি আঁকা রয়েছে। একটি দেয়ালে শ্রীলংকার প্রাচীন মানচিত্রও আছে। আরেকটি প্রাচীরে নোটিশ বোর্ড রয়েছে। তাতে প্যাট্টনদের বিভিন্ন কমপ্লিমেন্ট রয়েছে। চেয়ার-টেবিলগুলোও সাধারণ মানের।
আসলে বাড়ির পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্যই এমন সাজসজ্জা আর আসবাবপত্রের আয়োজন করা হয়েছে।
এই ক্যাফের একটি বড় দিক হলো এটি কার্যত শ্রীলংকার বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম, হিন্দু, মালয় ও বার্গাহারদের মিলনমেলা। একটি বহুত্ববাদী সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করা হয় এখানে। প্রত্যেকেই খোলা মনে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। আর সবাই হয় শ্রীলংকার কফির বদান্যতায়।

Saturday, July 25, 2020

ঈদ সংস্কৃতির রূপান্তর by স্বকৃত নোমান

বাংলাদেশের মুসলমান সমাজে ধর্মকেন্দ্রিক প্রধান প্রধান উৎসবগুলো হচ্ছে- ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, আশুরা, শবেবরাত প্রভৃতি। দুইশ বছর আগে এসব উৎসবকেন্দ্রিক সংস্কৃতির যে রূপ ছিল তার মৌলিক পরিবর্তন না ঘটলেও কিছু কিছু সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটেছে। ঈদসংস্কৃতির কথাই ধরা যাক। শত বছর আগের ঈদসংস্কৃতির সঙ্গে বর্তমানের ঈদসংস্কৃতির ফারাক একেবারে কম নয়। উদাহরণ হিসেবে গত শতকের আশির দশকের গ্রামীণ ঈদসংস্কৃতির একটা চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে।
রমজানের বিশ তারিখ রাতে যখন গ্রামের দু-একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুসল্লি এতেকাফ আদায়ের লক্ষ্যে দশদিনের জন্য মসজিদে অন্তরীণ হতো, সেদিন থেকেই ঈদের দূরায়ত হাতছানি টের পাওয়া যেত। ঈদের আরো দশদিন বাকি থাকলেও একটা চাপা উত্তেজনা দেখা যেত ছোট-বড় সবার মধ্যে। আসন্ন ঈদের বিশেষ দিনটিকে উদযাপনের জন্য সবার ভেতর দেখা যেত এক ধরনের ব্যস্ততা। ছাব্বিশে রমজান রাতে তো শবেকদর। সাতাশে রমজান থেকে সেই ব্যস্ততা তুঙ্গে উঠত। ঈদকে বরণ করে নেওয়ার জন্য সবাই চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করত। হাতে আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরেই তো ঈদ। শুরু হতো হাটেবাজারে কেনাবেচার ধুম। হাটের মুদি দোকানগুলো ভরে উঠত সেমাই-চিনি-নারিকেল-বাদাম-কিশমিশ ইত্যাদি জিনিসপত্রে। মা-বাবারা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিতো এসব জিনিস। জামাতাকে উপহার দিত পায়জামা-পাঞ্চাবি-টুপি। ছেলেমেয়েদের কিনে দিত নতুন জামা-কাপড়। ঈদের আগের রাত পর্যন্ত চলত ধুম বেচাকেনা। শবেকদরের পরদিন থেকে গ্রামের ফকির-মিসকিনরা গেরস্তবাড়িগুলোতে ধরনা দেওয়া শুরু করত জাকাত-ফিতরার আশায়। ছেলেমেয়েরা পাঁচ-দশ টাকা দামের ঈদকার্ড পাঠিয়ে শুভেচ্ছা ও আমন্ত্রণ জানাতো বন্ধু-বান্ধবদের। ঈদের আগের দিন বিকেলে মেহেদি পাতা সংগ্রহের ধুম পড়ে যেত। ইফতারির সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে ইফতার খাওয়া ফেলে খোলা মাঠেঘাটে চলে যেত ঈদের নতুন বাঁকা চাঁদ দেখার জন্য। পশ্চিমের আকাশে সন্ধ্যাতারার আশপাশে নখাকৃতির বাঁকা চাঁদ দেখা গেলে হৈ-হৈ রৈ-রৈ পড়ে যেত দিকে দিকে। পড়ে যেত মেহেদি বাটার ধুম। গভীর রাত পর্যন্ত হাতে আর নখে নানা আলপনায় মেহেদি লাগাত ছেলেমেয়েরা। সারারাত কাটত উত্তুঙ্গ উত্তেজনায়। পরদিন যথারীতি খুব ভোরে সবার ঘুম ভেঙে যেত। মুয়াজ্জিনের আজানকে প্রতিদিনকার আজানের মতো মনে হতো না। এই বিশেষ দিনের প্রারম্ভের আজানটা দেওয়ার জন্য মুয়াজ্জিন যেন সারা বছর কণ্ঠটাকে প্রস্তুত করে রাখত। কী যে সুরের মূর্ছনা!
তারপর ভোর। গ্রীষ্মকাল হলে তো কথা নেই, পৌষ-মাঘ মাসের কড়া শীত হলেও গ্রামের পুকুর ঘাটে তিল ঠাঁই থাকত না। কসকো কোম্পানির সুগন্ধি সাবান, নতুন লুঙ্গি আর গামছা নিয়ে সবাই ঘাটে হাজির হতো। পুকুরের পানি ঘোলা হয়ে উঠত অসংখ্য মানুষের গোসলের কারণে। কারো মুখে বিষাদের এতটুকু ছাপ থাকত না, সবাই কেমন প্রাণখোলা হাসিখুশি। বিষণ্ন বুড়োদেরও ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকত হাসির রেখা। গোসল করে বাড়ি ফিরে নতুন কিংবা ধুয়ে ইস্ত্রি করে রাখা পুরনো জামা-কাপড় গায়ে দেওয়ার পালা। ঈদ উপলক্ষে গ্রামের দোকান থেকে কেনা দু-চার টাকা দামের সুগন্ধী আতর পায়জামা-পাঞ্জাবিতে লাগাত সবাই। তারপর নকশাদার জায়নামাজ বা নলখাগড়ার তৈরি পাটিটা বগলদাবা করে ঈদগাঁহের দিকে রওনা হতো।
ঈদের আনন্দটা বড়দের চাইতে ছোটদেরই ছিল বেশি। ঈদগাঁহে গিয়ে নামাজ পড়ার চাইতে তারা বেশি ব্যস্ত থাকত বাঁশি, বেলুন আর হরেক রকমের খেলনা নিয়ে। দোকানিরা ঈদের দিন দোকানের বাইরে চাটাই বিছিয়ে নানা খেলনা সামগ্রী নিয়ে বসতো। সেসব খেলনার মধ্যে অন্যতম ছিল বিশেষভাবে তৈরি বাঁশের বাঁশি। এই বাঁশির পেছনের দিকটা রাজা কনডমের ভেতর ঢুকিয়ে সুতা দিয়ে ভালো করে বেঁধে নিতে হতো। তারপর ফুঁ দিয়ে কনডমটাকে ফুলিয়ে লাউ কি কুমড়ার মতো করে বহিরাংশের ছিদ্রটি ছেড়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে শুরু হতো স্টিমারের সাইরেনের মতো ভোঁ-ওঁয়া ভোঁ-ওঁয়া শব্দ। শিশু-কিশোরদের কাছে ঈদের দিনে এই বিশেষ খেলনাটি ছিল খুবই প্রিয়। খেলনার মধ্যে আরো ছিল রেফারি-বাঁশি, প্লাস্টিকের তৈরি প্রাইভেট কার ইত্যাদি। কারটির সামনের সরু ছিদ্রটাতে মোটা একটা সুতা বেঁধে টেনে টেনে চালাতে হতো। অনেকটা দুধের স্বাধ ঘোলে মেটানোর মতো। আর লাটিম তো ছিল খুবই জনপ্রিয় খেলনা। পুরনোটা ফেলে দিয়ে ঈদের দিন কেনা হতো নতুন লাটিম।
ঈদগাঁহে নামাজ শেষে শুরু হতো পারস্পরিক কোলাকুলি। তারপর মুসল্লিরা দলবেঁধে চলে যেত গ্রামের বড় গোরস্তানে। মৃত আত্মীয়-স্বজনদের রুহের মাগফেরাত কামনায় সার বেঁধে পশ্চিমমুখী দাঁড়িয়ে মোনাজাত করত। মোনাজাত শেষে আবার শুরু হতো কোলাকুলি। এরপর দলে দলে ভাগ হয়ে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি বাড়ি সেমাই খেতে যেত। সেমাই বলতে তখন গ্রামের মানুষদের ভাষায় ‘বাংলা সেমাই’ বা ‘আলবা সেমাই’ ছিল প্রধান। চিনি-নারিকেল-বাদাম-কিশমিশ ও দুধ সহযোগে রান্না হতো এ সেমাই। চিনামাটির ছোট ছোট পিরিচে করে পরিবেশন করা হতো মেহমানদের। ছোটরা বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করে শ্রদ্ধা জানাতো। খুশি হয়ে বড়রা দু-চার টাকা বখশিশ না দিয়ে পারত না।
ঈদের দিন বিকেলবেলা কারো হাতে কোনো কাজ থাকত না। পার্থিব যাবতীয় কর্মযজ্ঞ থেকে আজ একেবারেই মুক্ত। অখ- অবসরতা কেবল। গ্রামের চা দোকানে ব্যাটারিচালিত টেলিভিশনে ঈদের সিনেমা দেখার ভিড় লেগে যেত। যাদের বাড়িতে ক্যাসেট প্লেয়ার থাকত তারা চড়া আওয়াজে গান বাজাতো। কিশোররা গ্রামের নির্জন রাস্তাঘাটে পয়সা আর মার্বেল খেলায় মেতে উঠত। মেয়েরা নতুন নতুন জামা-কাপড় পরে ঘুরে বেড়াত সারা গ্রাম। রাতের প্রথম প্রহর পর্যন্ত লেগে থাকত এসব আনন্দ।
ঈদের পরের দিন শুরু হতো অন্য আয়োজন। তরুণ-যুবকরা দলবেঁধে চলে যেত জেলাশহর। ঈদ উপলক্ষে রাজ্জাক-ববিতা বা ইলিয়াস কাঞ্চন-চম্পার নতুন মারদাঙ্গা কি বিরহকাতর সিনেমা মুক্তি পেত। রেডিওতে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ভরাট কণ্ঠে সেসব সিনেমার বিজ্ঞাপন শুনতে শুনতে সিনেমাটি দেখার জন্য তীব্র আগ্রহ তৈরি হতো তাদের মধ্যে। তাই দলবেঁধে জেলাশহরের সিনেমা হলে সেটি দেখতে যাওয়া। সিনেমা দেখা শেষে চলে যেত দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি। মামা-মামি, খালা-খালু, ফুপা-ফুপিদের সঙ্গে দেখা না করলে তো ঈদ-আনন্দ অপূর্ণ থেকে যায়।
এবার আসা যাক সমকালীন ঈদসংস্কৃতি প্রসঙ্গে। কিছু কিছু ব্যাপার আগের মতো থাকলেও অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটে গেছে। উপরে যেমন ঈদের দিন শিশু-কিশোরদের যেসব খেলনার কথা বলা হলো, বর্তমানে সেসব খেলনার গুণগত মান উন্নত হয়েছে। রাজা কনডমের বদলে এখন এসেছে বড় বড় মজবুত সব বাহারি বেলুন। এসেছে ব্যাটারিচালিত নানা খেলনা গাড়ি, প্লাস্টিকের পুতুল, পশু-পাখিসহ কত কি। এখন মেহেদি গাছ থেকে মেহেদি পাতা সংগ্রহ করে কষ্ট করে বেটে হাতে লাগাতে হয় না, বিভিন্ন কোম্পানি এনেছে নানা প্যাকেটজাত মেহেদি। নাগরিক জীবন তো বটেই, গ্রামীণ জীবনেও লেগেছে এই পরিবর্তনের ছোঁয়া। এখনও ঈদকার্ডের প্রচলন আছে বটে, কিন্তু তাতে লেগেছে প্রযুক্তির হাওয়া। এখন নানা ডিজাইনের ঈদকার্ড বাজারে পাওয়া যায়। আবার ঈদকার্ডের মধ্যে বাতিও জ্বলতে দেখা যায়। সুইস অন করলে বেজে ওঠে নানা মিউজিক। এখন ঈদের শুভেচ্ছা পাঠানো হয় মোবাইলে এসএমএস করে, ই-মেইল কিংবা ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসআপ বা ইমোর ইনবক্সে। বিশই রমজানের পর থেকে হাটে-বাজারে এমনকি নগরে টাঙানো হয় ‘ঈদ-শুভেচ্ছা’ লেখা বড় বড় ব্যানার। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা বড় বড় তোরণ বানায় জনগণকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে।
ঈদসংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেছে খাবার-দাবারের ক্ষেত্রেও। গত শতকের শেষের দিকে ‘লাচ্ছা সেমাই’ প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আগে এ সেমাই খোলা বিক্রি হতো। এখনো হয়। তবে এখন খোলা লাচ্ছা সেমাইর চাইতে বাহারি প্যাকেটজাত আধুনিক লাচ্ছা সেমাইর কদর বেশি। লাচ্ছা সেমাইয়ের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে নুডুলস। মাংস বা ডিম দিয়ে রান্না করা এ মুখরোচক খাবারটি ঈদের দিন সেমাইর সঙ্গে পরিবেশিত হয়। একটু অবস্থাসম্পন্ন গেরস্তরা আরো একধাপ এগিয়ে। তারা সেমাই বা নুডুলসের পরিবর্তে মাংসে পাকানো খিচুরি পরিবেশন করে থাকে। সকাল বেলায় সেমাই খাওয়া হলেও দুপুরে সামর্থ্য অনুযায়ী মুরগি, গরুর মাংস বা খাসির মাংসের ভোজ চলে। অবস্থাসম্পন্নদের ঘরে তৈরি হয় হালিম, কাবাব, বিরিয়ানি ইত্যাদি।
ঈদসংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রেও। ঈদকে সামনে রেখে নতুন নতুন আদরার কাপড়-চোপড় বাজার আনার প্রতিযোগিতায় নামে ব্যবসায়ীরা। এখন ঈদ উপলক্ষে জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ঈদ এলে যে যেভাবে পারে অন্যকে ঠকিয়ে দুই পয়সা আদায় করে নেওয়ার ধান্দায় থাকে অনেক ব্যবসায়ী। তিনশ টাকার শাড়ি ছয়শ টাকায়, এক হাজার টাকার জামা দুই হাজারে গিয়ে ঠেকে। বিপণি বিতানে গিয়ে কাপড়-চোপড়ের দাম দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ছাড়া উপায় থাকে না। ঈদ এলে বিক্রেতারা এতই ব্যস্ত থাকে যে, ক্রেতার সঙ্গে ভালোমতো কথা বলারও সময় পায় না। তাই কাপড়ের গায়ে দাম লিখে রাখে। দরাদরি করার কোনো সুযোগ নেই। এক দাম। যার ইচ্ছে হয় সে কিনবে। ঈদকে কেন্দ্র করে পরিবহন ভাড়া বেড়ে যায় দ্বিগুণ। পাড়ায়-মহল্লায় চাঁদাবাজিও কম চলে না। রাজধানী ঢাকা শহরে দ্বিগুণ বেড়ে যায় ছিনতাই। যদিও ঈদের তাৎপর্য এসব নয়। নিঃসন্দেহে এসব মানুষের ভেতর থেকে পারস্পরিক সহমর্মিতা বিনষ্টির ফল।
আজকের ঈদসংস্কৃতি অনেকটা প্রতিযোগিতামুখর। সমাজের সর্বস্তরে চলে এই প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, পরিবারের সঙ্গে পরিবারের এমনকি সমাজের গ-ি পেরিয়ে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। ছাত্র, শিক্ষক, আমলা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীরাও এই প্রতিযোগিতার বাইরে নয়। প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে টিকতে গিয়ে এখন কেউ আর সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দের বাছ-বিচার করে না।
মিডিয়া জগতেও লক্ষ করা যায় এই প্রতিযোগিতা। ঈদসংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে। ঈদকে কেন্দ্র করে টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয় বিশেষ নাটক, টেলিফিল্ম, সিনেমাসহ বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। তাও এক-দুদিন নয়, টানা ছয়-সাত দিন ধরে প্রচারিত হয় এসব বিশেষ অনুষ্ঠান। ঈদের পনেরো দিন আগ থেকে শুরু হয় এসব অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচার। কে কত ভালো অনুষ্ঠান বানাতে পারে তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। আবার বিজ্ঞাপন দাতারাও নির্মাণ করে ঈদ-কেন্দ্রিক বিশেষ বিজ্ঞাপন। দর্শকরাও এই আয়োজনের সঙ্গে এখন সম্পৃক্ত হয়ে গেছে অনেকটা। সারা বছর যারা টিভি দেখার মতো সময় পায় না, ঈদ এলে তারা প্রাণভরে এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করে।
প্রিন্ট মিডিয়াতেও এসেছে ঈদসংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন। দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করে ঈদ বিশেষ সংখ্যা। সেসব সংখ্যা তিনশ থেকে ছয়শ পৃষ্ঠা পর্যন্ত হয়ে থাকে। ছাপা হয় নবীন-প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকদের নানা বিষয়ের লেখা, থাকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নানা বিজ্ঞাপন। এর মাধ্যমে তাদের ক্রেতা-গ্রাহকদের ঈদ শুভেচ্ছা জানানো হয়। এই বিশেষ সংখ্যাটি কার আগে কে বাজারে ছাড়বে থাকে সেই প্রতিযোগিতাও। হালে প্রিন্ট মিডিয়ায় ঈদ উপলক্ষে প্রকাশিত হয় ফ্যাশন পাতা বা ফ্যাশন ক্যাটালগও। শহরের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলো তাদের নতুন আদরার কাপড়গুলো জমা দেয় পত্রিকার অফিসে। মডেলদের সেসব পোশাক পরিয়ে ফটোগ্রাফারকে দিয়ে ছবি তোলা হয়, আর সেই ছবি ছাপানো হয় পত্রিকার ফ্যাশন ক্যাটালগে। এ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে পত্রিকার বিশেষ রান্না পাতা বা রান্না সংখ্যাও প্রকাশিত হচ্ছে। রন্ধনশিল্পীরা ঈদের বিভিন্ন রেসিপি দিয়ে থাকে এসব সংখ্যায়। ঈদ বিশেষ সংখ্যা ছাড়াও ঈদের ছুটির আগে দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করে পত্রিকার বর্ধিত পাতা। সেখানেও থাকে যথারীতি গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি।
বিশ বছর আগের ঈদসংস্কৃতির সঙ্গে বর্তমানের ঈদসংস্কৃতির কত না ফারাক। ভবিষ্যতে যে এই ঈদসংস্কৃতির আরো রূপান্তর ঘটবে তাতে সন্দেহ নেই।

Friday, July 24, 2020

বিশ্বকে যেভাবে বদলে দিয়েছে ইসলাম by আবদুল মাননান আসযাদ

বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে ইসলামি সভ্যতা অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বিশ্বে তার এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আগেই উল্লেখ করেছি যে, প্রাক ইসলামি যুগে বিশ্বে বিরাজমান ছিল এক নৈরাজ্যকর ও ভয়ানক পরিস্থিতি। মানবজাতি আল্লাহ বিস্মৃতি হয়ে নিমগ্ন ছিল পৌত্তলিকতার মোহে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য থেকে তারা ছিল অনেকটাই দূরে। কুসংস্কার আর অপসংস্কৃতিতে সয়লাব ছিল তাবৎ দুনিয়া।
ইসলাম আবির্ভূত হওয়া এবং বিশ্বনেতৃত্বের আসনে তার সমাসীন হওয়ার পর বিশ্বে দেখা দেয় এক আমূল পরিবর্তন। পরিলক্ষিত হয় তার এক সুমহান প্রভাব প্রতিপত্তি। যে খ্রিস্টান জাতি ইসলামকে দেখত চরম অবজ্ঞার চোখে, এর প্রতি তারা তাদের হৃদয়ে লালন করতো হিংসা-বিদ্বেষ আর শত্রুতা; সে খ্রিস্টান জাতিই ইসলামের সোনালী শাসন, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা সর্বোপরি মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলকে সুরক্ষা প্রদান দেখে তারা ইসলামকে শুধু স্বাগতই জানান নাই, মুসলিম শাসকদের বিয়োগান্তে তারা চরম ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন হতেন।
বিশ্ব নেতৃত্বে ইসলামি সভ্যতা সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিশ্বব্যাপি তা এক সংস্কারমূলক আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। ধর্ম, সাহিত্য, আত্মিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিশ্বের সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয় তার বহুমুখী প্রভাব ও প্রতিপত্তি। সবকিছুতেই সাধন করে এক নবসংস্কার।
যে ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতার প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হয় তা হলো তাওহীদ তথা একত্ববাদের ক্ষেত্রে। আগেই উল্লেখ করেছি যে, প্রাক ইসলামি যুগে আরবসহ গোটা পৃথিবীই নিমজ্জিত ছিল মূর্তিপূজার রমরমা ব্যবসায়। আল্লাহ প্রদত্ত দুটি ধর্ম ইহুদি-খ্রিস্টান ধর্মেও প্রবিস্ট হয়েছিল মূর্র্তির পূজা-অর্চনা। ফলশ্রুতিতে দুটি ধর্ম থেকে তার নিজস্ব সত্তা ও স্বকীয়তার বিচ্যুতি ঘটেছিল। ইসলামি সভ্যতা সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ওই ধর্ম দুটি যেভাবে মূর্র্তিসত্তার সাথে একীভূত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল তা থেকে কিছুটা হলেও আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল।
৮ম শতাব্দীর গোড়ার দিকে মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের ফলে মুসলমানরা যখন সেখানে তাওহীদ তথা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের আহ্বান জানালেন এবং মূর্র্তি পূজা-অর্চনা পরিহারের আহ্বান জানালেন এর প্রভাব শুধু স্পেনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি পুরো ইউরোপে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। সেখানে সূচীত হয় এক মূর্র্তিবিরোধী আন্দোলন। পুরো ইউরোপেই মূর্র্তিকে ধর্মবিরোধী কাজ বলে আখ্যায়িত করে মূর্র্তিবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। ওই আন্দোলন সম্পর্কে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রা:) বলেন :
“এই আন্দোলন এত প্রবল শক্তি সঞ্চয় করে যে, তৃতীয় লুই, কনস্টান্টাইন ৫ম ও ৪র্থ লুই এর মত প্রবল প্রতাপান্বিত রোমক সম্রাটরা পর্যন্ত একে সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করেন। প্রথমোল্লিখিত সম্রাট ৭২৬ খ্রিস্টাব্দে এক রাজকীয় ফরমান জারি করে সরকারীভাবে চিত্র ও মূর্র্তির পবিত্রতার প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ৭৩০ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় ফরমানে একে তিনি মূর্তিপূজা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। খ্রিস্টান ও মূর্র্তি পূজক ইউরোপ এবং রোমক ও গ্রীক সভ্যতায় (যার চিত্রশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা ও মূর্তি নির্মাণ পৃথিবী বিখ্যাত) চিত্র ও মূর্র্তির বিরুদ্ধে এই অনীহা ও জিহাদ নিশ্চিতই ইসলামের মূর্তিভাঙ্গা ও তৌহিদী ঘোষণার উচ্চকিত নাদই ছিল যা পাশ্চাত্যে মুসলিম স্পেনের মাধ্যমে ইসলামের প্রচারÑপ্রসার ও প্রভাবাধীনে পৌছে। এর সমর্থন এ থেকেও পাওয়া যাবে, তুরিযানের প্রধান পাদ্রী পুরোহিত এবং এই আন্দোলন ও দাওয়াতের বিরাট এক উৎসাহী সমর্থক ও পতাকাবাহী ক্লডিয়াস (যিনি তার প্রভাবাধীন এলাকাতে চিত্র ও ক্রুশ কাষ্ঠ পুড়িয়ে ফেলতেন) সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, তাঁর জন্ম ও লালন-পালন স্পেনে হয়েছিল এবং এটা হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর কথা যখন সেখানে মুসলিম শাসন ও মুসলিম সভ্যতা উন্নতির শীর্ষে অবস্থান করছিল।”
শুধু ইউরোপেই নয় এশিয়ার ভারত উপমহাদেশেও মূর্র্তির ক্ষেত্রে ইসলামের সুস্পষ্ট প্রভাব বিদ্যমান। পৃথিবীর মধ্যে ভারতই একমাত্র দেশ যেখানে প্রাচীন কাল থেকেই মূর্র্তির আধিক্যতা প্রচুর ছিল। পৌরাণিক যুগে সেখানে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর সংখ্যা ছিল। সেখানে ৭ম শতাব্দীতে সাহাবী ও তৎপরবর্তীতে আরব বণিকদের আগমনের ফলে সেক্ষেত্রে তা অনেকটাই হ্রাস পায়। সাহাবীদের ইসলামের প্রতি দাওয়াত ও আরববণিকদের ব্যবসার পাশাপাশি তাওহীদের প্রতি আহ্বানের ফলে ভারত অনেকটাই মূর্র্তির আধিক্য থেকে মুক্তি পায়। শেষ পর্যন্ত সেখানেও মূর্র্তিকে ধর্মবিরোধী কাজ বলে সেখানকার অনেক বুদ্ধিজীবী দার্শনিকগণ মত প্রকাশ করেন।
আজ ভারতে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর সংখ্যা কমে যে স্বল্প পরিমাণে এসে পৌছেছে এর পেছনেও মূলত ইসলামি সভ্যতারই সুস্পষ্ট প্রভাব বিদ্যমান।
বিশ্বব্যাপি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায়ও ইসলামের সুস্পষ্ট প্রভাব বিদ্যমান। প্রাক ইসলামিক যুগে আরব, ইউরোপ ও এশিয়ার কোথাও ঐক্য-সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ফলশ্রুতিতে ভূলুন্ঠিত ছিল মানবতা, মানবিকতা ও মানবাধিকার। পারস্পরিক অনৈক্য, দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে সমাজ ও রাষ্ট্র প্রবল বিশৃঙ্খল প্রবণ হয়ে উঠার কারণে শান্তি ও শৃঙ্খলা ছিল সুদূরপরাহত। ফলে শান্তির বাণী কাঁদছিল নিরবে-নিভৃতে। ইসলামি সভ্যতাই মানবজাতি থেকে জাহিলিয়্যাতের এই অপকর্মকে দূরীভূত করে তাদের মাঝে ঐক্য ও শৃঙ্খলা সুপ্রতিষ্ঠিত করে সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং গোটা মানবজাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَاذكُرُوْا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ اِذْ كُنْتُمْ اَعْدَاءً فَالفَ بَيْنَ قُلُوْبِكُمْ فَاَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِه اِخْوَانًا .
তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে তোমরা এখন তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছে।
প্রাক ইসলামিক যুগে মানবজাতির মাঝে যে অধঃপতন নেমে এসেছিল, ওই সময় ইসলামি সভ্যতা যদি দিগি¦জুড়ে আলো না ছড়াতো, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে ঐক্য ও সংহতির বাণী প্রচার না করতো, তাহলে এটা অতি সুস্পষ্ট যে মানবজাতির ধ্বংসের জন্য কোনো অদৃশ্য শক্তির প্রয়োজন হতো না। বরং তারা নিজেরাই পরস্পর মারামারি, ও হানিনাহিতে লিপ্ত থেকে দ্বন্দ্ব ও সঙ্ঘাতে জড়িয়ে নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যেত। মানবজাতিকে এই অনিবার্য ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছে একমাত্র ইসলামি সভ্যতাই।
জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যে আজ ইউরোপ যে উন্নতির শিখরে পৌছেছে সেখানেও রয়েছে একমাত্র ইসলামি সভ্যতারই প্রভাব। আজ ইউরোপসহ তাবৎ পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যের যে উন্নতির সোপান পরিলক্ষিত হচ্ছে, আধুনিক বিশ্বসভ্যতার যে অগ্রগতি ও উন্নতি অবলোকন করা যাচ্ছে এর পেছনে মূলত অবদানই হলো ইসলামি সভ্যতার। মুসলিম স্পেনের পথ ধরে ও ক্রসেডের মাধ্যমে ইসলামের অমূল্য রত্নভাণ্ডার জ্ঞান-বিজ্ঞান ও স্থাপত্য শিল্পের কলা কৌশল ইউরোপের কাছে পাচারের ফলেই আধুনিক বিশ্ব সভ্যতার অস্তিত্ব তৈরী হয়েছে। একারণে আধুনিক বিশ্বসভ্যতা অবশ্যই ইসলামি সভ্যতার কাছে ঋণী।
আধুনিক বিশ্ব সভ্যতার সমাজ গঠন, রাষ্ট্র গঠন, আইন বিজ্ঞান ও দর্শনেও রয়েছে ইসলামি সভ্যতার অভূতপূর্ব প্রভাব। এরিষ্টটলকে যদিও সমাজ ও রাষ্ট্রের জনক বলা হয়, কিন্তু পাশ্চাত্যরা আধুনিক সমাজ বিজ্ঞান ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানের যে ধারণা ও তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেছে তার পেছনেও রয়েছে মুসলিম প্রথিতযশা জ্ঞানী-বিজ্ঞানী ইমাম গাজ্জালী, ইবনে খালদুন ও আবু নাছের আল ফারাবীর প্রত্যক্ষ অবদান। একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে জন্ম নেয়া এসব কালজয়ী মুসলিম মনীষীগণই সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার পথ উন্মোচন করে দিয়েছেন। রচনা করেছেন এতদ্বসংক্রান্ত মূল্যবান গ্রন্থ। আদৌ তাদের বহু গ্রন্থ পাশ্চাত্যে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে বেশ সমাদৃত এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যের অর্ন্তভুক্ত হয়ে আছে।
আধুনিক আইন ও দর্শন শাস্ত্রেও ইসলামি সভ্যতার সুস্পষ্ট প্রভাব দৃশ্যমান। আজ পাশ্চাত্যে আইন শাস্ত্রে ও দর্শনে উন্নতির যে ছোঁয়া প্রতীয়মান হচ্ছে এবং আইন তৈরীতে তারা যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে তা মূলত মুসলিম মনীষীদেরই অবদান। নবম ও দশত শতাব্দীতে এমন কতিপয় মুসলিম মনীষীর আবির্ভাব ঘটে যারাই প্রথমে বিশ্বে আইন শাস্ত্রের উদ্ভব ঘটান। ইমাম আবুহানিফা, শাফেঈ, মালেক, হাম্বলী, মুহামম্মদ ও আবু ইউসুফ প্রমুখ মনীষীগণই মুসলিম আইনের ভিত রচনা করেন এবং পশ্চিমারা তাদের গ্রন্থাবলী থেকেই আইন শাস্ত্রের জ্ঞান আহরণ করে আইন বিজ্ঞানের জন্ম দেন। মুসলিমদের কালজয়ী আইন গ্রন্থ “হিদায়া” আজো পাশ্চাত্যে সমান সমাদৃত এবং তাদের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও সংরক্ষিত। দর্শন শাস্ত্রের জ্ঞানও তারা আহরণ করেছেন মুসলিম মনীষীদের প্রতীকৃৎ ইবনে রুশদ থেকে। পাশ্চাত্যে রয়েছে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা।
মোদ্দাকথা, বিশ্ব সভ্যতায় রয়েছে ইসলামি সভ্যতার ব্যাপক প্রভাব ও প্রতিপত্তি। বিশ্বে ইসলামি সভ্যতা সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলেই আধুনিক বিশ্ব সভ্যতার জন্ম হয়েছে। মানুষ আল্লাহকে চিনতে পেরেছে। মানবতা, নৈতিকতা ও মানবাধিকারের ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বব্যাপি ইসলামি সভ্যতার প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও গবেষক স্যার টমাস আর্নল্ড তার ঞযব ঞবধপযরহম ড়ভ ওংষধস” নামক গ্রন্থে বলেন, “ইসলাম একটি রাজনৈতিক শক্তি, যার প্রভাব দুনিয়া ব্যাপৃত, যতই নিকট থেকে নিকটতর হবে, ততই অনুভব করবে পৃথিবী। জগতের সকল অমঙ্গলের একমাত্র সমাধানই হচ্ছে ইসলাম”।
লেখকের সভ্যতার দ্বন্দ্ব ও আগামী দিনের পৃথিবীতে ইসলাম গ্রন্থ থেকে

আল্লাহর কুদরত জমজম by জাব্বার করিম

আল্লাহর কুদরতের কোনো সীমা পরিসীমা নেই। তিনি যেমন অসীম ও অনন্ত, তাঁর নিদর্শনাবলির শেষ বলতে কিছু নেই। আল্লাহর কুদরতের বিস্ময়কর নিদর্শন হলো জমজমের পানি। পৃথিবীর জমিনের সর্বোৎকৃষ্ট পানি হলো জমজমের পানি। এ পানি যেমন পবিত্র, তেমনি বরকতময় ও সুস্বাদু। জমজমের পানি খাওয়ার স্বাদ কখনো মিটে না। জমজমের পানি পানে শুধু তৃষ্ণাই মিটে না; বরং ক্ষুধা নিবারণ হয়, রোগবালাই থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। হজরত রাসূল সা: সব সময় জমজমের পানি সাথে রাখতেন। তিনি নিজে জমজমের পানি পান করতে পছন্দ করতেন। রোগ বিমারের দাওয়াই হিসেবে অন্যদের জমজমের পানি পান করতে বলতেন। হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- ‘রাসূল সা: জমজমের পানি পান করতেন। সফরে বের হলে জমজমের পানি সাথে রাখতেন। এ পানি অসুস্থদের ওপর ছিটিয়ে দিতেন এবং তাদের পান করাতেন’ (সুনানে তিরিমিজি ও বায়হাকি)।

পবিত্র কাবাঘর থেকে মাত্র ২১ মিটার দক্ষিণ-পূর্বে জমজম কূপের অবস্থান। আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে হজরত ইবরাহিম আ: আল্লাহর নির্দেশে নিজের স্ত্রী হাজেরা আ: এবং শিশুপুত্র ইসমাঈল আ:-কে মক্কার ফারান পাহাড়ের পাদদেশে এক জনমানবহীন স্থানে নির্বাসন দেন। হজরত ইবরাহিম আ: প্রিয়তমা স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে বিরান মরুভূমির পাহাড়ের পাদদেশে রেখে সামান্য আহার সামগ্রী সাথে দিয়ে ফেরত চলে আসেন। ওই সময়কালে আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত বিবি হাজেরা আ: এবং হজরত ইসমাঈল আ:-এর আশপাশে দ্বিতীয় কেউ ছিল না। হজরত ইবরাহিম আ:-এর রেখে যাওয়া সামান্য আহার সামগ্রী শেষ হয়ে যাওয়ার পর; কোনো একসময় হজরত ইসমাঈল আ: পানির পিপাসায় কান্নাকাটি করতে থাকেন। বিবি হাজেরা শিশুপুত্রের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য পানির খোঁজে চারিদিক ছুটাছুটি করতে থাকেন। বিবি হাজেরা আ: পানির খোঁজে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সাতবার ছুটাছুটি করেছেন। কোথাও কোনো পানির সন্ধান পাননি। অবশেষে পানির খোঁজে ব্যর্থ হয়ে শিশুপুত্রের কাছে ফিরে আসেন। হঠাৎ করে বিবি হাজেরা দেখতে পান, শিশুপুত্রের পায়ের গোড়ালির ঘষাতে আল্লাহর হুকুমে নিচ থেকে পানি উঠছে এবং একটি ঝর্ণার সৃষ্টি হচ্ছে। এ ঝর্ণাটি পরবর্তীকালে জমজম কূপ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

জমজম কূপের পানি আল্লাহর কুদরতের এক বিস্ময়কর নিদর্শন। প্রতি বছর বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব হাজী সাহেবরা হজ করতে যান, তারা নিজেরা জমজমের পানি পান করে থাকেন এবং দেশে ফেরার পথে পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনের জন্য জমজমের পানি নিয়ে আসেন। আল্লাহ তায়ালার তৌহিদের বিস্ময়কর নিদর্শন এ কূপের পানি উত্তোলন শেষে, মাত্র ১১ মিনিটে কূপটি পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। জমজম কূপের সৃষ্টি থেকে আজো পানির স্বাদ, গন্ধ ও গুণাগুণের কোনো পরিবর্তন হয়নি। জমজমের পানিতে ফ্লুরাইডের পরিমাণ বেশি থাকায় এ পানিতে কোনো জীবাণুু জন্মাতে পারে না। আজ পর্যন্ত জমজমের পানিতে একটি ছত্রাক কিংবা শৈবালও জন্মায়নি। অলৌকিকভাবে জমজমের পানি পরিশোধন হয়ে যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা জমজম কূপের পানি রহস্যে উদঘাটনের জন্য গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কোনো কূলকিনারা করতে পারছেন না।

জমজমের পানি সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিস এবং বর্ণনায় এসেছে, যে উদ্দেশ্যে নিয়ে জমজমের পানি পান করবে, আল্লাহ তায়ালা ওই ব্যক্তির ইচ্ছা পূরণ করে দেন। হাজী সাহেবদের অনেকে জমজমের পানি রোগ-বিমার থেকে আরোগ্য উদ্দেশে পান করে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা হাজী সাহেবদের অনেকেরই শেফা দান করেছেন। তাদের ইচ্ছা পূরণ করে দিয়েছেন।
>>>লেখক : প্রবন্ধকার

হায়দ্রাবাদের ঐতিহাসিক চারমিনার

দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদ শহরের চারমিনার বিশ্বখ্যাত ভারতীয় স্থাপত্যগুলির অন্যতম৷ আগ্রার তাজমহলের মতোই পরিচিত স্থাপত্য এই চারমিনার৷ এ নামের একটি ব্র্যান্ডের সিগারেটও বহু বছর ধরে ভারতে জনপ্রিয়, বিশেষ করে বাঙালিদের মধ্যে৷
শাহী স্থাপত্য: একসময় কুতব শাহী সাম্রাজ্যের রাজধানী হায়দ্রাবাদ শহরের চারমিনার তৈরি হয়েছিল ১৬ শতকে৷ মধ্যে এক মসজিদকে ঘিরে চার কোণে অনুচ্চ চারটি মিনার, যার থেকে এর নাম হয় চারমিনার৷
ব্যস্ত বাজার: ভারতের নবগঠিত তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী শহর হায়দ্রাবাদের পুরনো অংশে এই চারমিনার, যার পাশেই বহু পুরনো এবং জনপ্রিয় লাদ বাজার, যা হামেশাই ব্যস্ত৷
রঙিন চুড়ি: চারমিনারের লাগোয়া এই বাজার বিখ্যাত তার রংবেরঙের চুড়ির পশরা, আর ঝুটো পাথরের গয়নার জন্যে, যার মূল খদ্দের অবশ্যই মহিলারা৷
ধর্মীয় আবহ: চারমিনার বাজারে নমাজ পড়ার নকশাদার কার্পেট থেকে ধর্মগ্রন্থ, তসবি, পোশাক, নানা ধরনের উপকরণ বুঝিয়ে দেয়, হায়দ্রাবাদ ঐতিহ্যগতভাবেই ধর্মপ্রাণ শহর৷
ফলের বাজার: হায়দ্রাবাদের অন্যতম বড় ফলের বাজারটিও চারমিনারের সামনে৷ ঈদের রোজা ভাঙার আগে সেখানে ভিড় লেগেই থাকে৷
প্লেগ বিজয়ের স্মারক: শহরের মাঝখানে কেন এই স্থাপত্য গড়া হয়েছিল, সে সম্পর্কে অনেক তত্ত্ব আছে৷ তবে ঐতিহাসিকভাবে সবথেকে প্রামাণ্য তথ্য হলো, দক্ষিণ ভারতের এই অঞ্চলে প্লেগ রোগ দূরীকরণে সাফল্যের স্মারক এই চারমিনার৷
বাগমতীর স্মৃতি: তবে লোকপ্রিয় প্রচলিত কাহিনি হলো, বাদশা মহম্মদ কুলি কুতব শাহ হায়দ্রাবাদের যেখানে তাঁর হবু বেগম, রানি বাগমতীকে প্রথম দেখেছিলেন, সেখানেই তৈরি হয়েছিল এই ভালোবাসার স্মারক৷
জোড়া বারান্দা: চারমিনারের বিশেষত্ব হলো তার জোড়া বারান্দা, যা ঠিক খিলানের ওপরের অংশে, চার কোণের চারটি মিনারকে জুড়ে রয়েছে৷
স্থাপত্য স্বকীয়তা: গ্র্যানাইট পাথর, চুনা পাথর, শ্বেতপাথরের গুঁড়ো এবং সুরকির মিশ্রণে তৈরি এই অনুপম স্থাপত্য, যা প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ করে৷
মক্কা মসজিদ: পবিত্র মক্কা থেকে মাটি আনিয়ে চারমিনারের অদূরে অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর এই মসজিদটি গড়েছিলেন কুতব শাহ, যা আজও সারা ভারতের মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র ধর্মস্থান হিসেবে সম্মানিত৷

অর্থনীতিতে কোরবানি ঈদের ইতিবাচক ভূমিকা by সাজ্জাদ আকবর

কোরবানিকৃত পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার শুমারি ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- চাঁদা, টোল, বখশিশ, চোরাকারবার, ফড়িয়া, দালাল, পশুর হাট ইজারা, চাদিয়া, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি ও বানানো এমনকি পশুর সাজগোজ বাবদও এক বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়ে থাকে। কতটা বিপুল সে হাতবদল? অন্তত কয়েক হাজার কোটি টাকা। সংক্ষেপ কথায় অর্থনীতিতে ফর্মাল-ইনফর্মাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ প্রচুর বেড়ে যায়। অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ তার এক রচনায় ঈদে চাঙ্গা অর্থনীতির বর্ণনায় পাঁচটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, কোরবানির বহুমুখী অর্থনৈতিক তাৎপর্য। হজ, কোরবানির পশু, পশুর চামড়াসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় কীভাবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবদান রেখে চলে।
বছরঘুরে আমাদের মাথার ওপর ওঠে একফালি চাঁদ। ঈদের চাঁদ। আমাদের জীবনে নিয়ে আসে আনন্দ ও ত্যাগের মিশ্র অনুভূতি। সব আবিলতা, বিভেদ ভুলে গিয়ে ঐক্যের বন্ধনে আমাদের আবদ্ধ করে ঈদ। ত্যাগের মহিমায় করে ভাস্বর। ঈদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক আবেদন আমাদের ভেতরটাকে করে পরিশুদ্ধ। ঈদগাহ মানেই ধনী-গরিব, ইতর-ভদ্র শ্রেণিবিভেদের দেয়াল ভেঙে অসীম সাম্যের পতাকায় সমবেত হওয়া। ঈদ মানে ধনীর সম্পদে গরিবের ন্যায়সংগত অধিকার। বছরঘুরে ঈদ আসে আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিশুদ্ধিকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান নিয়ে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা, শ্রেণিবিভেদের অবৈধ দেয়াল, অন্যায়, ধোঁকাবাজি, কালোবাজারি, গরিবের হক মেরে খাওয়া পুঁজির পাহাড় গুঁড়িয়ে দিয়ে অনাবিল সাম্য-সম্প্রীতিতে সমাজকে ভরিয়ে দেওয়ার আহ্বান নিয়ে ঈদের আগমন। ঈদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এ তাৎপর্যের বাইরে আছে বহুমুখী অর্থনৈতিক তাৎপর্য, যা ঈদকে করে তোলে আরও অর্থবহ, আরও সামাজিক, আরও সর্বজনীন।
বিশেষত ঈদুল আজহা উদযাপনে পশু কোরবানির মধ্যে রয়েছে বিশেষ আর্থসামাজিক তাৎপর্য। হজরত ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক পুত্র ইসমাইল (আ.) কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার ইচ্ছা প্রকাশের মহান স্মৃতি স্মরণ করে ইতিহাসের ধারাবাহিতায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজের পাশব-প্রবৃত্তি, অসৎ উদ্দেশ্য ও হীনম্মন্যতারই কোরবানি করা হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই বিশেষ ঈদ-উৎসবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তির সংশোধন করার সুযোগ আসে। এজন্য জীবজন্তু কোরবানি করাকে নিছক জীবের জীবন-সংহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আত্মশুদ্ধি ও নিজের পাশব-প্রবৃত্তি অবদমনের প্রয়াস প্রচেষ্টারই প্রতীকী প্রকাশ। সামাজিক কল্যাণ সাধনে সংশোধিত মানব চরিত্র বলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কোরবানির মাংস গরিব আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তার মধ্যে নিহিত রয়েছে সামাজিক সমতার মহান আদর্শ।
হজ পালন ঈদুল আজহা উৎসবের একটি বিশেষ অংশ। পবিত্র হজ অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে বিশ্বের সব দেশের মুসলমানরা সমবেত হন এক মহাসম্মিলনে। ভাষা ও বর্ণগত, দেশ ও আর্থিক অবস্থানগত সব ভেদাভেদ ভুলে সবার অভিন্ন মিলনক্ষেত্র কাবা শরিফে একই পোশাকে, একই ভাষায়, একই রীতি-রেওয়াজের মাধ্যমে যে ঐকতান ধ্বনিত হয় তার চেয়ে বড় ধরনের কোনো সাম্য-মৈত্রীর সম্মেলন বিশ্বের কোথাও অনুষ্ঠিত হয় না। হজ পালনের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন রং ও গোত্রের মানুষের মধ্যে এক অনির্বাচনীয় সখ্য সংস্থাপিত হয়। বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের যা অনুপম আদর্শ বলে বিবেচিত হতে পারে। এ হজকে কেন্দ্র করে অর্থনীতির ব্যাপক তারল্য দেখা দেয়, যা সচল অর্থনীতির অনিবার্য প্রয়োজন। এ বছর প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ হজে যাচ্ছেন। প্রতিজনে গড়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা ব্যয় নির্বাহ করলে এ খাতে মোট অর্থব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। এর সঙ্গে হজের ব্যবস্থাপনা ব্যয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাংলাদেশি টাকা ও বিদেশি মুদ্রা ব্যয়ের সংশ্লেষ থাকে। ফলে ব্যাংকিং সেক্টরে এ উপলক্ষে লেনদেন ও সেবা-সূত্রে ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়।
কোরবানির ঈদের মূল অর্থনৈতিক অনুষঙ্গ হলো পশু। পশু কোরবানি উপলক্ষে জাতীয় অর্থনীতিতে ঘটে মহাআয়োজন সমারোহ। গত বছর ঈদে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর মোট সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ এবং কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৫ লাখের মতো। এ বছর সেটা আরও অনেক বেড়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ বছর দেশীয় কোরবানির পশুর সংখ্যা ১ কোটি ১৮ লাখ। এর মধ্যে রয়েছে ৪৫ লাখ ৮২ হাজার গরু-মহিষ, ৭২ লাখ ছাগল-ভেড়া এবং ৬ হাজার ৫৬৩টি অন্যান্য পশু। এখন গরুপ্রতি গড় মূল্য ৪০ হাজার টাকা দাম ধরলে ৪৬ লাখ গরু-মহিষের দাম দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং ৭২ লাখ খাসি-ভেড়ার দাম গড়ে ২ হাজার টাকা ধরলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। মোটকথা পশু কোরবানিতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হবে।
এছাড়া কোরবানিকৃত পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার শুমারি ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়Ñ চাঁদা, টোল, বখশিশ, চোরাকারবার, ফড়িয়া, দালাল, পশুর হাট ইজারা, চাদিয়া, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি ও বানানো এমনকি পশুর সাজগোজ বাবদও এক বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়ে থাকে। কতটা বিপুল সে হাতবদল? অন্তত কয়েক হাজার কোটি টাকা। সংক্ষেপ কথায় অর্থনীতিতে ফর্মাল-ইনফর্মাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ প্রচুর বেড়ে যায়।
অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ তার এক রচনায় ঈদে চাঙ্গা অর্থনীতির বর্ণনায় পাঁচটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, কোরবানির বহুমুখী অর্থনৈতিক তাৎপর্য। হজ, কোরবানির পশু, পশুর চামড়াসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় কীভাবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবদান রেখে চলে। চামড়া শিল্পের বার্ষিক সংগ্রহ ও বেচাকেনার অর্ধেকের বেশি জোগান আসে শুধু কোরবানির ঈদে। কোরবানিকৃত পশুর চামড়া রপ্তানি বাণিজ্যে, পাদুকা শিল্পে, পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলক্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের কর্মযোজনা সৃষ্টি হয়। এ চামড়া সংগ্রহ সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে ২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত। এর বাইরে আছে কোরবানি উপলক্ষে দা, বটি, পশুর হাড়গোড়, মাংসের মশলাসহ নানা আসবাব ও পণ্যের জমজমাট ব্যবসা। তার মধ্যে শুধু মশলার ব্যবসা হয় তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকার। পশুর হাড়গোড়, শিং ও অন্যান্য অংশের ব্যবসায় হাতবদল হয় অন্যূন শতকোটি টাকা।
আর এসব লেনদেনে দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে যায়। এসবের সঙ্গে যোগ হয় ঈদ উপলক্ষে বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ সারা বছরের তুলনায় আশাব্যঞ্জক হারে বেড়ে যায়। প্রবল হয় অর্থনীতির চাকা। অন্যদিকে ঈদের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সৃষ্টি হয় নানা কর্মসংস্থান। ফলে দেখা যায়, ঈদকে কেন্দ্র করে দোকানে দোকানে নতুন কর্মচারী নিয়োগ হয়।
ঈদকেন্দ্রিক পরিবহন ব্যবস্থায় ঘটে আরও বড় এলাহি কা-। শহরের মানুষ আপনজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামে ছোটে। এক মাস আগে থেকে ট্রেন, বাস, লঞ্চের টিকিট বিক্রির তোড়জোড় দেখে বোঝা যায় এর প্রসার ও প্রকৃতি। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ দামে ফর্মাল টিকিট আর ইনফর্মাল টাউট, দালাল ও বিবিধ উপায়ে টিকিট বিক্রির সার্বিক ব্যবস্থা বোঝা যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পরিবহন খাতে সাকুল্যে ২ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসা বা লেনদেন হয়ে থাকে। এটিও অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
মোদ্দাকথা, ঈদকেন্দ্রিক মুদ্রা লেনদেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য গোটা দেশের অর্থনীতির উজ্জীবন ঘটায়। দুই ঈদে যত কেনাবেচা ও লেনদেন হয়, সারা বছরেও তা হয় না। বলা যায়, ঈদে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ। দারিদ্র্য মোচনে ঈদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কোরবানির পশুর গোশতের একটা অংশ দরিদ্রদের প্রাপ্য। সারা বছর যারা সামর্থ্যরে অভাবে গোশত কিনে খেতে পারে না, এ সময় তারাও অন্তত কয়েক দিন গোশত খেতে পারে। তাছাড়া কোরবানির পশুর চামড়ার বিক্রয়লব্ধ অর্থের হকদার দরিদ্র, এতিম ও অসহায় মানুষ। কোরবানির পশুর চামড়ার অর্থে দেশের বহু মাদ্রাসা ও এতিমখানার সারা বছরের খরচ চলে।
সামগ্রিক বিবেচনায়, অন্যান্য ধর্মীয় জাতি-সম্প্রদায়ের আনন্দ-উৎসবের তুলনায় মুসলমানদের আনন্দ-উৎসব যে আধ্যাত্মিক, সামাজিক, মানবিক, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভিন্নতর তাৎপর্যে মহিমাময় ও কল্যাণবহ তাতে কোনো সন্দেহ আছে কি?

>>>তথ্যসূত্র : ১. প্রথম আলো ১৬ জুলাই ২০১৯; ২. নয়া দিগন্ত, ২৩ এপ্রিল ২০১৯; ৩. ইত্তেফাক ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫; ৪. বিবিসি বাংলা ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬।
>>>লেখক : রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট অ্যান্ড রিসার্চ, ঢাকা

পা ফোলার বিভিন্ন কারণ ও প্রতিকার

পা ফুললেই অনেকে ভয় পেয়ে যায়। অনেকে ভেবে বসেন কিডনী নষ্ট হয়ে জীবন বুঝি শেষ হয়ে গেল। পা ফোলা অবশ্যই একটি সমস্যা। কিন্তু সব সময়ই এটি যে খুব জটিল কোন কারণে হয় তা নয়। সুতরাং পা ফুলে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে ভাল একজন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিৎ।

পা ফোলার কারণ:

. হার্ট ফেইলিউর হলে পা ফুলতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু যে পা ফোলে তা নয়। শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় এবং বুক ব্যাথাও থাকে।

. কিডনীর অসুখে পা ফোলে। তবে প্রথমে মুখ ফোলে এবং শেষের দিকে পা ফোলে।

. অনেক্ষণ পা ঝুলিয়ে বসলে পা ফুলতে পারে।

. অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পা ফুলে যায়।

. লিভার ফেইলিউরে পা ফোলে। তবে অন্যান্য উপসর্গও থাকে।

. উচ্চ রক্তচাপ ব্যবহৃত এমন কিছু ওষুধ গ্রহণ করলে পা ফুলে যেতে পারে। এমলোডিপিন বহুল প্রচলিত একটি উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ। এটি গ্রহণ করলে পা ফোলে।

. গর্ভাবস্থায় অনেকেরই পা ফোলে। এ নিয়ে ভয়ের কিছু নেই।

. পেটে বড় টিউমার হলে পা ফুলতে পারে। টিউমার রক্তনালীর উপর চাপ তৈরি করে। ফলে পা থেকে রক্ত হৃদপিন্ডে অসতে পারেনা এবং পা ফুলে যায়।

. ভেরিকোস ভেন হলে পা ফুলে যায়।

১০. হাইপোথাইরয়ডিজমে পা ফোলে। তবে এক্ষেত্রে চাপ দিলে চামড়া বসে না। অভিজ্ঞ চিকিৎসক এটি সহজেই ধরতে পারেন।

১১. মারাত্মক রক্তাল্পতা বা অপুষ্টিতে পা ফোলে। থায়ামিন ভিটামিনের অভাবে বেরি বেরি হয়। তখন পা ফোলে।

১২. ফাইলেরিয়া রোগ হলে পা ফুলতে পারে। ফাইলেরিয়া পরজীবী দিয়ে হয়।

১৩. গর্ভবস্থায় এক্লাম্পসিয়া ও প্রিএক্লাম্পসিয়া হলে পা ফুলে যায়। এমন হলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। না হলে প্রান হারাতে হতে পারে।

১৪. ডিপ ভেন থ্রম্বসসি হলে একদিকের পা ফোলে। দুদিকে নয়।

পা ফুলে গেলে একজন ভাল চিকিৎসকের নিকট যাওয়া উচতি। কারণ খুব সামান্য কারণে যেমন পা ফোলে আবার ডিপ ভেন  থ্রম্বসসি এর কারণেও কিন্তু পা ফোলে। বিমানে দীর্ঘক্ষণ ভ্রমণ করলে এবং বহুদন শয্যাশাযী থাকলে বা বড় অপারেশনের পরে এক পা ফুলে গেলে ডিপ ভেন থ্রম্বোসিসের কথা মাথায় রাখা উচিৎ। এ রোগ পুষে রাখলে পায়ের শিরায় জমে থাকা রক্তের ডেলা ফুসফুসে চলে গিয়ে পালমোনরী এম্বলিজম তৈরি করে। এর ফলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।
>>>ডা. মো. ফজলুল কবির পাভেল, সহকারী সার্জন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

Thursday, July 23, 2020

হিউম্যানস অব আসাম- পর্ব ১

জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) প্রক্রিয়ার কথা শুনে বেশ খুশিই হয়েছিলেন আব্দুল জুব্বা। ভেবেছিলেন এই নিবন্ধনের মাধ্যমে নিজের নামের সাথে থাকা ‘অভিবাসী’ তকমা মুছে ফেলতে পারবেন। তার মতো বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে অবৈধ অভিবাসী হিসেবেই দেখে আসছে আসামের সবাই। সারাজীবন তাকে এ অভিযোগ সহ্য করে যেতে হয়েছে। কিন্তু তিনি জানতেন না, এই এনআরসি তার পরিচয় নিয়ে ফের প্রশ্ন তুলবে, তাকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করবে।

১৯৫১ সালের পর এই প্রথম ভারতে এনআরসি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য, ভারতকে অবৈধ অভিবাসী মুক্ত করা। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর বাংলাদেশ থেকে যারা অবৈধভাবে শরণার্থী হিসেবে হিসেবে ভারতে অভিবাসন করেছিলেন তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওইসব অভিবাসীদের বিতাড়িত করাটা এই এনআরসি প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্যগুলোর একটি।

আসামের বাংলাভাষীদের প্রায় আজীবনই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। যদিও তাদের অনেকেই গত কয়েক দশক ধরে সেখানে বাস করছেন। জুব্বা বলেন, সারাজীবন এখানকার সবাই আমাদের বাংলাদেশী নামে ডেকে এসেছে। মনে হয় এটা গলায় বিধে থাকা কোনো কাটা, সবসময় যন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছে।

৩৩ বছর বয়সী জুবা আসামের দারাং জেলার বিলপারের বাসিন্দা। গৃহস্থ পরিবারের এই সদস্য এনআরসি শুরু হওয়ার খবরে বেজায় খুশি হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, এবার এতদিন ধরে না পাওয়া সম্মান অর্জন করতে যাচ্ছেন তিনি। কেননা, তার পূর্বপুরুষরা যে ১৯৭১ সালের আগেই আসামি গিয়েছিল। তার কাছে সে বিষয়ক সকল নথিপত্র রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম এনআরসি’র মাধ্যমে আমাদের পরিচয় থেকে বাংলাদেশী তকমা অবশেষে মুছতে যাছে।
তবে জুব্বার আশানুযায়ী ঘটেনি কোনকিছুই।  ২০১৮ সালের জুলাই মাসে পাস হওয়া এনআরসি’র খসড়া তালিকায় নাম ওঠলেও গত মাসে তাকে বলা হয়, তার নথিপত্রে ভুল রয়েছে। ২৬ জুন তালিকা থেকে নতুন করে বাদ দেয়া ১ লাখ ২ হাজার মানুষের নামের সাথে জুড়ে যায় তার নামও।

জুব্বাকে বলা হয়, তার পূর্বপুরুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য নয়। তার দাদাই ছিলেন আসামে অভিবাসন করা প্রথম ব্যক্তি। ১৯৭১ সালের আগেই সেখানে যান তিনি। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় তার নাম রয়েছে। তবে এনআসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দাদার সঙ্গে জুব্বার সম্পর্ক বিশ্বাসযোগ্য নয়। নিজের দাদার সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে তিনি তার স্কুলের পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও তার দাদার নির্বাচনি পরিচয়পত্রও জমা দেন। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি।

২০১৮ সালের খসড়া তালিকায় জুব্বার নাম ওঠার মানে হচ্ছে, তখনই তার জমা দেয়া সকল নথিপত্রের সত্যতা যাচাই করেছিল এনআরসি কর্তৃপক্ষ। কেবল যাচাই নয়, সেগুলো যথাযথ হিসেবে বিবেচনাও করেছিল তারা। তাহলে আচমকা পূর্বপুরুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রমাণ অগ্রহণযোগ্য হয়ে গেল কিভাবে?

২০১৮ সালের খসড়া তালিকায় জুব্বার নাম ওঠলেও তার পরিবারের অন্যান্য অনেকের নামই ওঠেনি। তারা নিজেদের নাগরিকত্বের দাবি জানিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে তার ভিত্তিতে শুনানি শুরু হয়। তাদের পক্ষে এনাআরসি কর্তৃপক্ষের শুনানিতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন জুব্বা। এরকম এক শুনানিতে এনআরসির কোনো এক কর্তৃপক্ষ হয়তো কোনো অসামঞ্জস্যতা দেখেছিলেন জুব্বার নথিপত্রে। ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি নিজেকে যে ব্যক্তি হিসেবে দাবি করেন, আদতে সে ব্যক্তি নন।
কিন্তু জুব্বা দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, কোনো কর্মকর্তাই তাকে কোনরকমের অসামঞ্জস্যতার ব্যাপারে কিছু বলেনি। নিজের পরিচয় প্রমাণের জন্য তাকে কোনো অতিরিক্ত নথিপত্র জমা দিতেও বলেনি। তিনি জানান, তাকে তালিকা থেকে বাদ দেয়ার আগে তার কাছ থেকে কিছু জানতে চাওয়া হয়নি। এটা একটি নিয়মবহির্ভ’ত সিদ্ধান্ত ছিল।

এই ঘটনার পর এনআরসির প্রতি তার মনোভাব বেশ তিক্ত হয়ে গেছে।  জুব্বা বলেন, ধীরে ধীরে আমার মনে হচ্ছে, এটা সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করার একটি ষড়যন্ত্র। এখন সবকিছুতেই উত্তেজনা জড়িয়ে রয়েছে।
নিজের নাগরিকত্বের দাবি নিয়ে ফের নতুন অভিযোগ দায়ের করেছেন জুব্বা। এনাআরসির চ’ড়ান্ত তালিকায় যোগ হওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার। এইবার কোনো ফাঁক-ফোকর রাখবেন না তিনি। তিনি বলেন, এবার আমি আমার প্যান কার্ড, পাসপোর্ট ও ভোটার পরিচয়পত্রও জমা দেবো।

চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম ওঠেছে কিনা তা জুব্বা ৩১ জুলাইয়ের দিনই জানতে পারবেন। এর আগ পর্যন্ত তাকে বাঁচতে হবে একজন বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয় নিয়ে। যদিও তিনি ভেবেছিলেন, এই মিথ্যা পরিচয়ের খোলস তিনি ঝেড়ে ফেলতে যাচ্ছেন।
(‘হিউম্যানস অব আসাম’ হচ্ছে আসামে নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে থাকা মানুষের গল্প নিয়ে লেখা ‘স্ক্রল ডট ইন’ এর কয়েকটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন। এটি এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের ‘দ্য ফাইনাল কাউন্ট’ নামের একটি প্রকল্পের অংশ।)

প্রতিদিন অতিরিক্ত মদ্যপানে আয়ু কমতে পারে, বলছে এক গবেষণা

প্রতিদিন মদ্যপানে আয়ু কমতে পারে
ছয় লক্ষ মানুষের উপর করা এক গবেষণা করে দেখা গেছে প্রতি সপ্তাহে ১০ থেকে ১৫ বার 'অ্যালকোহলিক' পানীয় পান করলে একজন মানুষের জীবনের এক থেকে দুই বছরের আয়ু কমে যেতে পারে।
তারা আরো সতর্ক করে বলছে, যারা সপ্তাহে ১৮ বারের বেশি মদ্যপান করেন তাদের আয়ু চার থেকে পাঁচ বছর কমে যেতে পারে।
২০১৬ সালে ইউকে গাইডলাইন অনুযায়ী এক সপ্তাহে ১৪ ইউনিটের বেশি মদ্যপান করা উচিত না - যা ছয়টি ছোট আকারের ক্যানের বিয়ার অথবা সাত গ্লাস ওয়াইনের সমান।
ল্যানসেট এর করা সেই গবেষণা বলছে, যারা হালকা মদ্যপান করেন তাদের মৃত্যুর ঝুঁকির মাত্রা বাড়ার কোন আশঙ্কা তারা দেখেন নি।
গাইডলাইন অনুযায়ী হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া প্রতি ১২,৫ ইউনিট অ্যালকোহল সেবন করলে নিম্নোক্ত রোগগুলোর ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
১. স্ট্রোক ১৪%
২. মারাত্মক উচ্চ রক্তচাপ জনিত রোগ ২৪%
৩. হৃদযন্ত্র বিকল হওয়া ৯%
৪. মারাত্মক অ্যারোটিক এনিইউরিয়াস ১৫%
মারাত্মক হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর সাথে অ্যালকোহল সেবন করাকে এক সময় সম্পর্কিত বলে মনে করা হতো।
কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, এতে অন্যান্য ধরণের রোগ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
আগের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, রেড ওয়াইন হার্টের জন্য ভালো - কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধারণাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে।
অন্য একটি ড্যানিশ গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সপ্তাহে তিন থেকে চার বার মদ্যপান করলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার স্বল্প মাত্রায় ঝুঁকি রয়েছে।
এক গবেষণায় বলা হয়েছিল রেড ওয়াইন হার্টের জন্য ভালো কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন এই ধারণাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে

Wednesday, July 22, 2020

থাইরয়েড সমস্যায় ভোগছেন কি-না বুঝবেন কিভাবে?

থাইরয়েড শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। থাইরয়েডের প্রধান কাজ হলো মেটাবলিজম এবং মস্তিষ্ক পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন তৈরি করা। সমস্যার শুরুটা হয় যখন থাইরয়েড গ্রন্থির গোড়ায় ছোট একটি মাংসপিণ্ড বেড়ে ওঠে, যা হরমোনের স্বাভাবিক উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায়।
থাইরয়েডে সমস্যার লক্ষণগুলো কিছুটা অস্পষ্ট থাকে। শুরুতে এর লক্ষণগুলো অবহেলা করার কারণে পরবর্তিতে এটি বড় আকার ধারণ করে থাকে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি  ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, রক্তচাপ অনিয়মিত হওয়া ইত্যাদি সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে অন্যতম।
এছাড়া থাইরয়েডের আরও কিছু উপসর্গ আছে যা মানুষ জানেন না কিংবা গুরুত্ব দেন না।
১. হতাশা: থাইরয়েডে সংক্রমণ দেখা দিলে হরমোনের উৎপাদন বেড়েও যেতে পারে। এই হরমোনের তারেতম্যের কারণে মন-মেজাজ এই ভালো তো এই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছায়। আর হতাশাগ্রস্ততার প্রথম উপসর্গই এটি। আক্রান্ত ব্যক্তির পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে এই হরমোনের তারতম্য অস্বস্তি এবং মানসিক অশান্তিও তৈরি করতে পারে।
২. ঘাম: গরমে ঘাম যেমন স্বাভাবিক এবং উপকারী তেমনি ঠাণ্ডা পরিবেশে ঘাম হওয়া আশঙ্কাজনক। কর্মশক্তি নিয়ন্ত্রক হরমোন যখন পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হয় না তখন অস্বাভাবিক মাত্রায় এবং অস্বাভাবিক পরিবেশ ঘাম হতে পারে।
৩. শুষ্ক ত্বক: মানুষ ভেদে ত্বক এবং ত্বকের সমস্যার ধরন ভিন্ন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুষ্ক ত্বকের জন্য মানুষ ঋতু পরিবর্তনকেই দায়ী করে। তবে এখানেও থাইরয়েডের হাত আছে। কারও ক্ষেত্রে থাইরয়েডের সমস্যা হয়ত অতিরিক্ত ঘামের কারণ হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে ঘাম নিয়ন্ত্রণে সমস্যার কারণে ঘাম হওয়ার মাত্রা কমে যেতে পারে। ঘাম কম হওয়ার কারণে আর্দ্রতার অভাবেও শুষ্ক ত্বকের সমস্যা দেখ দিতে পারে।
৪. অবসাদ: প্রতিদিনই যদি নিজেকে অবসাদগ্রস্ত মনে হয় তবে এর সঙ্গে থাইরয়েডের সম্পর্ক থাকতে পারে। স্বাভাবিকের চাইতে কম সক্রিয় থাইরয়েড বা ‘হাইপোথাইরয়ডিজম’ পর্যাপ্ত হরমোন উৎপাদনের পথে বাধা দেয়। ফলে কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় এবং অবসাদগ্রস্ত মনে হয়। এমনকি পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও এবং সারাদিন কোনো কাজ না করলেও নিজেকে ক্লান্ত মনে হয়।
৫. অনিয়মিত ঋতুস্রাব: ঋতুস্রাবের সঙ্গে থাইরয়েডের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে ঋতুস্রাবের স্বাভাবিক চক্র নষ্ট হতে পারে। একজন নারী থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত হলে খাওয়ার রুচি কমে যায়। ফলে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়; যা লোহিত রক্তকণিকার মাত্রা কমায় এবং পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হয় ঋতুস্রাব। তাই যেকোনো ধরনের অনিয়মকে গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।
৬. কোষ্ঠকাঠিন্য: মলত্যাগের অস্বস্তি বা কোষ্ঠকাঠিন্য মাঝেমধ্যে হওয়া স্বাভাবিক। তবে তা নিয়মিত হয়ে গেলে বুঝতে হবে থাইরয়েডেরও সেখানে প্রভাব আছে।
থাইরয়েড গ্রন্থির প্রধান কাজ ‘মেটাবলিজম’ নিয়ন্ত্রণ করা, তাই সেখানে সমস্যা দেখা দিলে বিপাক পক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলবে। হরমোন উৎপাদন কমে গেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। তাই দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগতে থাকলে থাইরয়েড পরীক্ষা করানো উচিত।
৭. স্বাদ-গ্রন্থির সমস্যা: খাবারের স্বাদ বোঝার ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে থাইরয়েড। যে খাবারগুলো একসময় আপনার অত্যন্ত পছন্দ ছিলো সেগুলোতে এখন আপনার অনাগ্রহ তৈরি হওয়ার পেছনে দায়ী হতে পারে থাইরয়েডের সমস্যা। এর ফলে কিছু হরমোন অতিমাত্রায় তৈরি হতে পারে যা খাওয়ার রুচি নষ্ট করে দেয়।

পারমানবিক বোমা মেরে চাঁদকে কেন উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল আমেরিকা: চাঁদ সম্পর্কে ৯টি অজানা তথ্য

রাতের আকাশে চাঁদ
চাঁদকে ঘিরে এখনও অনেক রহস্য। পৃথিবীর এই উপগ্রহটি সম্পর্কে শোনা যায় নানা কথা। অনেক রোমান্টিক নামও আছে তার- ব্লু মুন, ক্রিসেন্ট মুন, ফুল মুন...
রাতের আকাশে খালি চোখে দেখা এই উপগ্রহটি সম্পর্কে এখানে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো:

১. চাঁদ গোলাকার নয়

চাঁদের আকৃতি আসলে ডিমের মতো। আপনি যখন এর দিকে তাকান তখন কিন্তু এর ছোট দুই প্রান্তের কোন একটিকে দেখতে পান। চাঁদের ভরের কেন্দ্র ঠিক এর জ্যামিতিক কেন্দ্রে অবস্থিত নয়। এটি জ্যামিতিক কেন্দ্র থেকে ১ দশমিক ২ মাইল দূরে।

২. সবসময় আমরা চাঁদের পুরোটা দেখতে পাই না

আমরা যখন চাঁদের দিকে তাকাই তখন এর ৫৯ শতাংশ দেখতে পাই। পৃথিবী থেকে চাঁদের বাকি ৪১ শতাংশ কখনোই দেখা যায় না। আপনি যদি এই তথ্য বিশ্বাস না করেন এবং এটা সত্য কিনা সেটা যাচাই করে দেখতে চাঁদের লুকিয়ে থাকা ওই ৪১ শতাংশের উপরে গিয়ে দাঁড়ান তাহলে কিন্তু সেখান থেকে আপনি এই পৃথিবীকে দেখতে পাবেন না।

৩. ব্লু মুন হয়েছে আগ্নেয়গিরি কারণে

ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্নুৎপাতের পর ১৮৮৩ সালে 'ব্লু মুন' পরিভাষার জন্ম হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সেসময় অগ্নুৎপাতের ফলে বায়ুমণ্ডলে এতো বেশি ধুলো ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছিল যে মানুষ যখন পৃথিবী থেকে চাঁদের থেকে তাকিয়েছিল তখন তাকে দেখতে নীল মনে হয়েছিল। আর এ থেকেই তৈরি হয়েছে 'ওয়ান্স ইন এ ব্লু মুন' কথাটি। বিরল কোন ঘটনা বলতে এই বাক্যটি ব্যবহার করা হয়।

৪. চাঁদকে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্র একবার সত্যিই সত্যিই চাঁদের উপর পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণের কথা চিন্তা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করা। বিশেষ করে রাশিয়াকে ভয় দেখানো। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অত্যন্ত গোপনীয় এই পরিকল্পনার নাম ছিল 'এ স্টাডি অফ লুনার রিসার্চ ফ্লাইটস' অথবা 'প্রজেক্ট এ১১৯।'

৫. ড্রাগনের কারণেই গ্রহণের ঘটনা

সূর্য এবং পৃথিবীর মাঝে চাঁদ এসে পড়লে অথবা সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে চাঁদ এসে দাঁড়ালে তখন সূর্য বা চাঁদের আলো সাময়িকভাবে ম্লান হয়ে যায়। একে বলা হয় চন্দ্রগ্রহণ কিম্বা সূর্যগ্রহণ। একটি প্রাচীন চীনা বিশ্বাস হচ্ছে- একটি ড্রাগন যখন সূর্যকে গিলে খেয়ে ফেলে তখন সূর্যগ্রহণ হয়। তখন চীনারা তাদের পক্ষে যতোটা সম্ভব আওয়াজ সৃষ্টি করতে থাকে যাতে ড্রাগনটি ভয় পেয়ে দূরে চলে যায়।
চীনারা একসময় আরো বিশ্বাস করতো যে চাঁদের গর্তের ভেতরে একটি বিশাল আকৃতির ব্যাঙ বসবাস করতো। চারশো কোটি বছর আগে মহাকাশ থেকে ছুটে যাওয়া একটি পাথর চাঁদকে আঘাত করলে ওই গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল।

৬. চাঁদের কারণে পৃথিবীর গতি ধীর হয়

চাঁদ যখন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে চলে আসে, তখন জোয়ারের সৃষ্টি হয়। নতুন কিম্বা ফুল মুনের পরপরই এরকম হয়ে থাকে।
তখন পৃথিবীর ঘূর্ণন শক্তিও চাঁদ চুরি করে নেয়। আর সেকারণে পৃথিবীর গতিও প্রতি ১০০ বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলি-সেকেন্ড করে শ্লথ হয়ে যাচ্ছে।

৭. চাঁদের আলো

সূর্য একটি পূর্ণ চাঁদের চেয়েও ১৪ গুণ মাত্রায় বেশি উজ্জ্বল। সূর্যের মতো সমান উজ্জ্বলতায় জ্বলতে হলে প্রায় চার লাখ পূর্ণ চাঁদের প্রয়োজন।
চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ যখন পৃথিবীর ছায়ার ভেতরে চলে যায় তখন চন্দ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দেড় ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ৫০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটও কমে যেতে পারে।

৮. লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বুঝেছিলেন ক্রিসেন্ট কি জিনিস

চাঁদকে আমরা যখন ক্রিসেন্টের আকারে বা অর্ধচন্দ্রাকৃতির মতো দেখি তখন আমরা চাঁদ থেকে ছিটকে আসা সূর্যের আলোকেই দেখতে পাই। চাঁদের বাকি অংশটা খুব অস্পষ্ট দেখা যায়। সেটাও নির্ভর করে আবহাওয়ার উপরে। শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চিই হলেন প্রথম কোন ব্যক্তি যিনি উপলব্ধি করতে পারছিলেন যে চাঁদ আসলে সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হচ্ছে না, বরং এর কিছু অংশ লুকানো থাকে।

৯. চাঁদ পনির দিয়ে তৈরি

চাঁদের আরো অনেক কিছুই আছে যা এখনও আমাদের অজানা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় এনিয়ে একটি জরিপ চালানো হয়েছিল। তাতে দেখা গেছে জরিপে অংশ নেওয়া লোকজনের ১৩ শতাংশ বিশ্বাস করেন যে চাঁদ চীজ বা পনির দিয়ে তৈরি।
ভারত থেকে তোলা চন্দ্রগ্রহণের ছবি

বসনিয়ার কসাইয়ের বিচারের সময় পরিক্রমা by সৈয়দ সাব্বির আহমেদ

নেদারল্যান্ডসের হেগে জাতিসংঘের ট্রাইব্যুনালে রাদকো ম্লাদিচের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের  মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পরে বিচার পেল বসনিয়ার স্রেব্রেনিকা ও সারায়েভোতে গণহত্যার শিকার হওয়া মুসলিমরা। বসনিয়ার কসাই বলে খ্যাত ম্লাদিচের বিচারের সম্মুখীন হওয়ার সময় পরিক্রমাটা সংক্ষেপে পাঠকের জন্য তুলে ধরা হল-
জুন ১৯৯১, যুগোস্লাভিয়ায় ভাঙন
স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্যে যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের শুরু হয়। সার্ব নেতৃত্বাধীন যুগোস্লাভিয়ান সেনাবাহিনী ১০ দিনের যুদ্ধ শেষে স্লোভেনিয়া ত্যাগ করে, তবে ক্রোয়েশিয়ার যুদ্ধটি ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
এপ্রিল ১৯৯২, বসনিয়ায় যুদ্ধ শুরু
বসনিয়ার দুই তৃতীয়াংশ এলাকার দখল নেয়ায় বসনিয়ায় থাকা সার্বীয়রা এবং রাদকো ম্লাদিচের নেতৃত্বে সারায়েভো অবরোধ শুরু হয়। এর এক মাস পরেই বসনিয়াতে সার্ব বাহিনীর কমান্ডার হন ম্লাদিচ। ৪ বছরব্যাপী অবরোধে ১১ হাজার ৫শ মানুষের মৃত্যু হয়।
জুলাই ১৯৯৫, স্রেব্রেনিকা গণহত্যা
ম্লাদিচের নেতৃত্বে তার সেনাবাহিনী স্রেব্রেনিকা দখল করে। সেখানে ৭ হাজারেরও বেশি মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে স্রেফ হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে সার্ব বাহিনীর উপর বিমান হামলা করে ন্যাটো। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফরমার যুগোস্লাভিয়া ম্লাদিচ ও সাবেক বসনীয়-সার্ব নেতা রাদোভান কারাদিচের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ গঠন করে।
১ নভেম্বর, ১৯৯৫ ডেটন চুক্তি সাক্ষর
১৯৯৫ সালে ডেটন চুক্তির মাধ্যমে বসনিয়া যুদ্ধের অবসান হয় এবং সেখানে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্ট হয়। একটি বসনীয় ও সার্বদের নিয়ে, আরেকটি মুসলিম ও ক্রোয়েশীয়দের নিয়ে।
১৯৯৭, ম্লাদিচের পলায়ন
ম্লাদিচের সন্ধানে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা এবং ন্যাটোর শান্তিরক্ষী বাহিনীর অভিযান জোরদার হয়। কিন্তু পরিবার ও সার্বিয়ায় তার সমর্থকদের সহায়তায় তাদের চোখে ফাঁকি দিয়ে পলাতক থাকেন ম্লাদিচ। তাকে ফুটবল খেলার মাঠে দেখা যায়, এমনকি সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের জনপ্রিয় রেস্তোরাতে তোলা তার ছবিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
২৬ মে, ২০১১ ম্লাদিচ গ্রেফতার
সার্বিয়ার উপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে ম্লাদিচ গ্রেফতার হন। ওই বছরের জুনে জাতিসংঘ ট্রাইবুনালের সম্মুখীন হন তিনি।
১ ডিসেম্বর, ২০১৬ অভিযোগের শুনানির সমাপ্তি
ইউরোপে ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ গণহত্যা বিষয়ক অভিযোগের শুনানির শেষ হয়। জাতিসংঘ ট্রাইব্যুনাল ৫৩০ দিনব্যাপী শুনানিতে ৫৯১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে এবং ১০৬টি ভিন্ন অপরাধের ১০ হাজার প্রমাণ যাচাই বাছাই করে।
২২ নভেম্বর, ২০১৭ ম্লাদিচ দোষী সাব্যস্ত
স্রেব্রেনিকা হত্যাকাণ্ডের ২০ বছর পর ৭৪ বছর বয়সী ম্লাদিচকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।
>>>ইত্তেফাক

Tuesday, July 21, 2020

অবহেলিত মহাকবি কায়কোবাদ

মহাকবি কায়কোবাদ
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে ১৮৫৭ সালের ২৫ ফেরুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মহাকবি কায়কোবাদ। কায়কোবাদ কবির সাহিত্যিক নাম হলেও প্রকৃত নাম মোহাম্মদ কাজেম আল কোরায়শী। তার পিতা ঢাকা জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী শাহামাতুল্লাহ আল কোরায়শী। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৮৭০ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিরহ বিলাপ’ প্রকাশ হলে বাংলা সাহিতাঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ১৯০৪ সালে তার মহাকাব্য মহাশ্মশান প্রকাশ হলে তিনি মহাকবি উপাধি লাভ করেন। কবিতা লেখার পাশাপাশি দীর্ঘদিন আগলা ডাকঘরে চাকরি করেছেন।

১৯৫১ সালের ২১ জুলাই পরলোকগমন করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এই কবি। আজ রোববার মহাকবিরর প্রয়াণ দিবস। বাংলা সাহিত্যে কায়কোবাদের অসাধারণ অবদানের জন্য সারাদেশের মানুষের কাছে কবি সমাদৃত হলেও তার জন্মভূমিতেই এখন অবহেলিত তিনি।

মহাকবির বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিজ গ্রামে কবির স্মৃতিচিহ্ন বলতে তেমন কোনো কিছু  নেই। মহাকবির ব্যবহৃত একটি ভাঙা ঘর ও একটি আম গাছ ছাড়া আর কিছু নেই কবির স্মৃতি হিসেবে। কবির বাড়িতে যারা বসবাস করছেন তারা কবির তথ্য দিতে নারাজ। তবে রান্না কাজে ব্যস্ত একজন গৃহিণী বলেন, কবির কোনো চিহ্ন এখন আর ওই বাড়িতে নেই। কবির বংশধররা সম্পূর্ণ জমি বিক্রি করে চলে গেছেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কবির বংশধররা কিছু জমি বিক্রি করেছিলেন। কিন্ত প্রতিবেশিরা সম্পূর্ণ জমিই দখল করে নিয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, ২০০৬ সালে জেলা পরিষদের উদ্যোগে কবির বাড়ির সামনের রাস্তাটি কবির নামে নামকরণ করে একটি ফলক নির্মাণ করা হলেও ফলকটি রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা ভেঙে ফেলেছে। ফলে রাস্তাটি যে কায়কোবাদের নামে করা হয়েছে সেটিও এলাকার অনেকে জানে না। ১৯৭২ সালে সাবেক এমপি সুবিদ আলী খান কায়কোবাদের সম্মানে তার কর্মস্থল আগলা ডাকঘর-সংলগ্ন জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন কায়কোবাদ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়।

এছাড়া কবির বাড়ির পশ্চিমে ১৯৮৩ সালে আগলা মাছপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় কায়কোবাদ যুব ক্লাব ও গণপাঠাগার। গত ১০/১২ বছর ধরে পাঠাগারটির সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোনো দর্শনার্থী আগলা গ্রামে গেলে কবি সর্ম্পকে কিছ্ইু জানতে পারেন না। পাঠাগারটি পূনরায় চালু করার ব্যাপারে বারবার উদ্যোগের কথা বলা হলেও স্থানীয়দের মধ্যে জটিলতা থাকায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

নবাবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলার চৌরাস্তায় কায়কোবাদের নামে গোল চত্বর নির্মাণ করা হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চত্বরটি সরিয়ে ফেলা হয় এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতা চত্বর স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে চত্বরটি পুনঃস্থাপনের দাবি জানালেও কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মহাকবি শুধু আগলা না নবাবগঞ্জের গর্ব। তবে আমরা তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে পারি না। কবি সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্ম কিছুই জানে না। নিজ ভূমিতেই কবি আজ অবহেলিত।

কায়কোবাদের নাতি টুটুল আলম কোরায়শী বলেন, কবির বাড়িটি দখলমুক্ত করে কবির নামে একটি পাঠাগার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হলে তার সর্ম্পকে নতুন প্রজম্ম অনেক কিছু জানতে পারবে। মহাকবি কায়কোবাদ নবাবগঞ্জের গর্ব। কবির বাড়ির সামনে যে মসজিদের আযান শুনে আযান কবিতাটি লিখেছিলেন সেটি এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলা ১৩০০ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন জমিদার মজিদ মিয়া। মসজিদে নামাজ পড়তে আসা কাজল চৌধুরী বলেন, এই মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তেন কবি কায়কোবাদ। মহাকবিকে মূল্যায়ন করতে না পারাটা আমাদের জন্যে লজ্জার।
মহাকবি কায়কোবাদ (মৃত্যু : ২১ জুলাই ১৯৫১)

কথা এনেছ, দাও by কচি রেজা

---১---

আমার পৃথক আকাশ, আমি শেষ রাতের নক্ষত্র

সৌর ঝড়ে নিভে গিয়ে

অথবা ছিলাম বালুর নিচে

শাদা হয়ে গিয়েছে হাড়

ফুটে উঠব হয়ত কোনো আয়নায়

কেউ তার মতো, আমি কারো মতো

ভিন্ন ভিন্ন গাছের নামে

একরাশ পাতার মধ্যে অহংকারী আমি

কোনো এক সুস্বাদু ফলের আশ্চর্য প্রতিভার কাছে

চুপ করে বসে থাকি।



----২----

একমাত্র নিখুঁত অভিনয় জানে অন্ধরা

যারা বধির উপনিষদ শোনে তারা

বাদামী গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে বিপুল হর্ন দিয়ে,

আধেক কুঁকড়ে বরফের ছবি তুলছে ঘুলঘুলি



দূরের স্টেশন থেকে উঠছে পোড়া গন্ধ

একচাঙড় শাদা বরফ পিষছে শীতপ্রধান দেশের কেউ

জুতোর সাথে যাবার ইচ্ছে কিন্তু খুঁজে পাচ্ছি না,



নাভীর দোষ নেই

আত্মহত্যার চামচে আটকে গেছে পার্পল দাঁত।



----৩----

আমাকে চঞ্চল করে আমার নাম! ভিতরে স্নাত করে এই উচ্চারণ! দাবদাহে যার জন্ম তার নাম নীরজা কেন রেখেছ, বাবা!

মাছের কাঁটার মত জীবন বিঁধে আছে গলায়! এখন ঢোক গিলতে গেলে যে যন্ত্রণা, সে আমি

তোমার জামার আস্তিন দিয়ে, তোমার



পকেটে হাত ঢুকিয়ে মুছে ফেলি!



----৪----

শেষ পর্যন্ত সস্তা নেশাটাই বেছে নিই

হাঁটতে থাকি যেসব পথে হাঁটিনি এযাবত

সূর্যাস্ত পর্যন্ত বরাদ্দ ছিল

ফুল

তুমি

না হেঁটে ভেসেই গেলাম

ভাসতে ইচ্ছে হল আমার



----৫----

তোমার দাঁড়িয়ে থাকা ভাবাচ্ছে না

যেভাবে গঠন নিয়ে

সামান্য দূর থেকেও এই হেলান দেওয়ার গাছটুকু

তার অভিনয়টুকু ঝরে পড়া এবং তারপর যা কিছু তোমার আমার

বোঝার ভুলে আমরা যা করেছি বহুবার...



কথোপকথনের দোলাচলে হিম হয়ে

আঁকড়ে ধরেছি নিজেই নিজেকে

কম্পন দেখোনি



রক্ত ঝরে পড়া এবং হৃদয় মুছতে মুছতে



পাথর ভুল করেনি

লক্ষ্যভেদ নিয়ে।

Monday, July 20, 2020

সুস্থতার জন্য সহজে ঘুমিয়ে পড়ার কিছু সহজ উপায়

সময়মত ঘুমোতে যাওয়া, ক্যাফেইন পরিত্যাগ আর সকালের রোদটিকে উপভোগ- এই কয়েকটি অভ্যাস বদলে দিতে পারে জীবন। যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের ঘুমের অভ্যাসটি বদলে দিয়ে পরিবর্তন করা যায় তার দেহ ঘড়ি বা বডি ক্লক-এর। আর এতে করে বাড়বে তাদের সুস্থতা।
রাতের পেঁচারা কিভাবে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জেগে থাকে, সেটিকেই তারা উল্লেখ করছেন। গবেষকরা বলছেন যে, তাদের পদ্ধতি মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আনতে পারে। প্রত্যেক মানুষের ভেতর একটি জৈব ঘড়ি বা বডি ক্লক কাজ করে যা সূর্যের ছন্দ মেনে চলে। এর কারণেই মানুষের রাতে ঘুম পায়।
কিন্তু কিছু মানুষের এই জৈব ঘড়ি বা দেহ ঘড়িটি অন্যদের তুলনার ধীরে চলে। কিছু মানুষ আছেন যারা ভোরে ঘুম থেকে জাগেন, কিন্তু রাত জেগে থাকা তাদের জন্যে হয় কষ্টকর। আবার এমন অনেক রাত জাগা ব্যক্তি আছেন যাদের জন্যে নয়টা-পাঁচটার কর্মজীবন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
তাদের হয়তো অ্যালার্ম ঘড়ির সাহায্যে এমন সময় ঘুম থেকে জাগতে হয় যখন তাদের শরীর কাজের জন্যে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে ওঠে না। গবেষকরা এমন ২১জন রাত জাগা মানুষের ওপর গবেষণা চালিয়েছেন যারা গড়ে রাতে ঘুমোতে যান আড়াইটায় এবং সকাল ১০টার আগে জাগতে পারেন না।
তাদের জন্যে যেসব নির্দেশ :
১. স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে জেগে উঠুন এবং বাইরে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে সকালের আলো উপভোগ করুন।
২. যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রাতরাশ বা সকালের নাস্তা করুন।
৩. ব্যায়াম করুন শুধুই সকালে।
৪. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে দুপুরের খাবার খান এবং সন্ধ্যা ৭টার পর আর কিছুই খাবেন না।
৫. দুপুর ৩টা পর আর কোনও ক্যাফেইন (চা, কফি) নয়।
৬. দুপুর ৪টা পর কোনও ঘুম বা তন্দ্রা বা ন্যাপ (স্বল্প ঘুম) নয়।
৭. সচরাচর সময়ের ২-৩ ঘণ্টা আগে ঘুমোতে যান এবং সন্ধ্যার পর থেকে ঘরের আলো কমিয়ে রাখুন।
৮. প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমোতে যান ও একই সময়ে সকালে উঠুন।
তিন সপ্তাহ পর, এই অভ্যাস চর্চাকারী সফলভাবে তাদের দেহ ঘড়ি-কে অন্তত দুই ঘণ্টা এগিয়ে স্থানান্তর করতে পেরেছেন।
এই বিশ্লেষণ পাওয়া গেছে ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম, ইউনিভার্সিটি অব সারে এবং মনাশ ইউনিভার্সিটি-র গবেষণায়। ফলাফলটি প্রকাশ পায় স্লিপ মেডিসিন নামে এক জার্নালে।
এই অভ্যাস চর্চার ফলে দেখা গেছে যারা দেরী করে ঘুমোতে যান বা অনিদ্রায় ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে নিদ্রা ভাব, চাপ ও বিষণ্ণতা কমেছে এবং রিঅ্যাকশন টাইমের উন্নতি ঘটেছে।
ইউনিভার্সিটি অব সারে'র অধ্যাপক ডেবরা স্কিন বলেন, "সামান্য কিছু অভ্যাস চর্চার মাধ্যমে অধিক রাত জেগে থাকা ব্যক্তি তার জৈব ঘড়ি সংশোধন করতে পারেন এবং তার সার্বিক শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারেন।"
তিনি বলেন যে, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং শরীরের জৈব ঘড়ির বিচ্যুতি ঝুঁকি বাড়ায় হৃদরোগ, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের। এর অন্যতম কারণ হল শরীর অনেক বেশী সূর্যের প্রতি ক্রিয়াশীল- অর্থাৎ দিনে শরীর অনেক বেশি কার্যক্ষম থাকে রাতের তুলনায়।
অনিয়মিত ঘুম এবং জেগে ওঠা তাই শরীরের নিজস্ব নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায়। এই কৌশলগুলো ঘুমের স্বাস্থ্যবিধির মতো মনে হতে পারে, তবে ব্যক্তি বিশেষে সবাই যেন নিজের শরীরকে তার স্বাভাবিক নিয়মে অভ্যস্ত করে তোলে। সূত্র : বিবিসি।

আ’লীগ নেতার ৫২ কর্মী দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর পাহারাদার

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর ১৫০০ যৌনকর্মীর নিরাপত্তায় রয়েছে ৫২ পাহারাদার।
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম ২০১২-০১-২৮
রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর ১৫০০ যৌনকর্মীর নিরাপত্তায় রয়েছে ৫২ পাহারাদার।  
নীল রংয়ের শার্ট গায়ে কারো কারো হাতে লাঠি মানুষগুলো চোখে পড়ে যৌনপল্লীতে ঢোকার পরপরই।
পল্লীর বাসিন্দা এবং যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করছে মহিলা ও শিশু উন্নয়ন সংস্থা নামের একটি সংগঠনের সভানেত্রী মনি বেগম বাংলানিউজকে বলছিলেন, এই যৌন পল্লীর নিরাপত্তাহীনতার কথা।
তিনি জানান, নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সব সময় শঙ্কায় থাকি। আগে কমিউনিটি পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও এক অজানা কারনে এখন কমিউনিটি পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে না।
জানা গেলো, কমিউনিটি পুলিশ তুলে দিয়ে তাদের পরিবর্তে এখন ৫২ জন পাহারাদার এই এলাকার দায়িত্বে রয়েছে। যাদের নিয়ন্ত্রণ করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা।
মনি বেগম বলেন, এতে নিরাপত্তা কিছুই নিশ্চিত করা যায়নি। আমরা বার বার স্থানীয় থানায় এ নিয়ে অভিযোগ করেও কোনো সাড়া পাইনি। কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সূত্র জানায়, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিটি পুলিশ উঠে যায় এবং দৌলতদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি ও দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম মন্ডল হয়ে উঠেন এই যৌনপল্লীর দ-মু-ের কর্তা। এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও চলে আসে তার কব্জায়। গঠন হয় নিজস্ব নিরাপত্তা দল। নীল শার্টে লাঠি হাতে যাদের দেখা যায় দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে।
প্রতিদিন পল্লীতে আসা খদ্দেরদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা তোলে এই দলের কর্মীরা। টোকেন সিস্টেম। জন প্রতি ২০ টাকা হারে নেওয়া হচ্ছে খদ্দেরের কাছ থেকে।
দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে ঢুকতে পাঁচটিট গেট রয়েছে। এই সব গেটে বসে থাকে পাহারাদাররা। সেখান থেকেই তোলা হয় টাকা। ভিতরে ঘুরে ঘুরেও টাকা তুলতে দেখা যায় অনেককে।
পল্লী ঘুরে দেখা যায়, দুপুর দুইটার পর লাল মিয়া, মানিক, নিজাম, রশিদ, মফিজ ও স্বপনের পরিচালনায় ৫২ জন পাহারাদার গ্রুপে গ্রুপে ভাগ হয়ে বিভিন্ন রংয়ের টোকেন দিয়ে জন প্রতি ২০টাকা করে তুলছে।
সংশ্লিষ্টদের হিসেবে প্রতিদিন কমপক্ষে দুই হাজার টোকেন বিক্রি হয় যার মূল্য ৪০হাজার টাকা।
অভিযোগ, সরকারি নিয়ম নীতি না মেনে পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে শ্রেফ চাঁদাবাজি করছে এরা। এবং যৌনপল্লীতে যেকোন ঘটনার বিচারও তাদের হাতে। সবকিছুই তাদের ইচ্ছামতো চলে। যৌনপল্লীর বাড়ীওয়ালী ও সাধারন যৌনকর্মীরা এদের কাছে জিম্মি এবং অসহায় হয়ে আছেন।
পাহারাদারদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় রয়েছে। কোন খদ্দের যদি এদের কথা না মানে তাহলে তাকে নির্যাতন করা হয়। তাই ভয়ে বাধ্য হয়ে এই পাহারাদার গ্রুপের কথামত চলতে হয় সবাইকে।
যৌনপল্লীতে প্রবেশ করার প্রধান গেটে এদের একটি অফিস আছে এবং সেখান থেকেই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ হয়।
পাহারাদার গ্রুপের নেতা মফিজ, স্বপন ও মানিকের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, মো. নুরুল ইসলাম মন্ডল আমাদের চাকরি দিয়েছে। আমরা যা করি তার নির্দেশ মত করি। আমরা দিন মজুর মাত্র। সারা রাত ৩০০টাকা বেতনে চাকরি করি। দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে টিকিট বিক্রি করে যা আয় হয় তার সর্ম্পূণ টাকা আমরা তার কাছেই দিয়ে দেই। এই পল্লীতে যা আয় তার সব কিছুর হিসাব তাকে দিতে হয়। যাকে যাকে ম্যানেজ করার দরকার সে করে। আমরা তা বলতে পারবো না।
স্থানীয় কয়েকজন নাম না প্রকাশ করার শর্তে বাংলানিউজকে বলেন, এই পদ্ধতিতে পল্লীতে প্রতিদিন অবৈধভাবে অর্ধলক্ষাধিক টাকা আয় হয়। পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায় বসেই এই গ্রুপ গত তিন বছর ধরে এমন চাঁদাবাজী করছে। এমনকি তাদের কোনো দায়িত্ব নিতেও রাজি নয় পুলিশ।
এই পাহারাদারদের বিষয়ে স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা থেকে বলা হয়, ‘তারা আমাদের কেউ না।’
তবে অনেকেরই অভিযোগ, পুলিশের সঙ্গেই সারাক্ষণ দেখা যায় তাদের।
এর আগে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকা কালে এই দ-মু-ের কর্তা ছিলেন আরেকজন। নাম সাঈদ। তার নেতৃত্বেই সেসময় চাঁদাবাজী চলতো। মাঝে জরুরি অবস্থার মধ্যে বন্ধ হয় চাঁদাবাজী। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার শুরু  হয় চাঁদা নেওয়া এবং এখন সেটা নিচ্ছেন নুরুল ইসলাম মন্ডল।
এ দিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোয়ালন্দঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল বাশার বাংলানিউজকে বলেন, ‘নুরুল ইসলাম মন্ডলের পাহারাদার বাহিনী গঠিত হয়েছে আমি এখানে আসার অনেক আগেই। তারা কীসের ভিত্তিতে কার কাছ থেকে কতো টাকা নিয়ে থাকে আমি সঠিক বলতে পারবো না। তবে যে কোন অপরাধের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখি।
এ পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে আবুল বাশার বলেন.  কোনো অভিযোগ পেলে তার ভিত্তিতে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবো।
অপর দিকে নুরুল ইসলাম মন্ডলের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, ‘অভিযোগ পুরোটাই মিথ্যা। যৌন পল্লীর নিরাপত্তার স্বার্থেই এই পাহারাদার নিয়োগ করা হয়েছে। এরা কতো করে টাকা পায় তাও আমি জানি না।’
পাহারাদার সবাইকে আপনি নিয়োগ করেছেন এমন  প্রসঙ্গে কিছুটা এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ইউনিয়ন এবং এর আশেপাশের ইউনিয়নের লোকও এখানে আছে। মূলত, পল্লীর নিরাপত্তার জন্যই এই পাহারাদার নিয়োগ করা।’
খদ্দেরদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এরা এই টাকা দিয়েই সংসার চালায়।
চাঁদার টাকার বড় অংশ তাকে দেওয়া হয় এমন অভিযোগের প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম ম-ল বলেন, ‘এই ধরনের টাকা আমি খাই না এবং চিন্তাও করি না। না জেনে এবং আমাকে বিপদে ফেলতেই এ অভিযোগ করা হয়েছে।’