Monday, August 12, 2024

ভারতীয় গণমাধ্যমের ‘প্রোপাগান্ডা’ কাউন্টার করতেই হবে: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

মানবজমিনঃ ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার বিষয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে যে নেতিবাচক প্রচারণা চালছে তা মোকাবিলার তাগিদ দিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বলেছেন, যে প্রোপাগান্ডাগুলো হচ্ছে তার কাউন্টার করতে হবে। এ বিষয়ে দেশীয় গণমাধ্যম কর্মীদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে গ্রাউন্ড রিয়েলিটি তুলে ধরার অনুরোধ জানান তিনি। মি. হোসেন বলেন, তারা গ্রাউন্ডে না থেকে একটা পজিশন নিয়েছে। এখান থেকে অনেক ক্ষেত্রে কিছু ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। এটা কাউন্টার করতেই হবে। সোমবার বিকেলে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মা’য় প্রায় অর্ধশতাধিক বিদেশি কূটনীতিকের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া প্রধানমন্ত্রী (সদ্য সাবেক) শেখ হাসিনাকে ভারত দীর্ঘদিন আশ্রয় দিলে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উঠানামার আশঙ্কা নাকচ করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাকে হাইপোথিক্যাল (অনুমানমূলক) কোয়েশ্চন উল্লেখ করে উপদেষ্টা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে পাল্টা প্রশ্ন রাখেন। বলেন, একজন যদি কোনো এক দেশে গিয়ে থাকেন, তাহলে ওই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হবে কেন? এর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্যানভাসটি ‘অনেক বড়’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেকোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে স্বার্থই মুখ্য। বন্ধুত্বটাও স্বার্থ বিবেচনায় হয়ে থাকে। এখানে ভারতের স্বার্থ আছে; ভারতেও আমাদের (বাংলাদেশের) স্বার্থ আছে। কাজেই সেই স্বার্থকে আমরা অনুসরণ করবো। বিদ্যমান সুসম্পর্ক বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
কূটনৈতিক ব্রিফিং এবং সংবাদ সম্মেলন উভয় অনুষ্ঠানে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের সহিংসতা, মানুষের ক্ষতি, অগ্নিসংযোগ কিংবা অত্যাচার অন্তবর্তীকালীণ সরকার বরদাশত করতে বলে বলে সাফ জানান তিনি। উপদেষ্টা বলেন, সম্প্রতিক সময়ের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করা হবে। সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে, কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। অত্যাচারের কারণ রাজনৈতিক বা ধর্মীয় যাই হোকÑ অপরাধকে অপরাধ হিসাবেই দেখা হবে। মিস্টার হোসেন বলেন, যার মতাদর্শ যাই হোক, কারও প্রতি অত্যাচার করলে শাস্তি পেতেই হবে। কোন অবস্থাতেই কারও প্রতি বিরূপ বা বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না, করলে আইন সেটা দেখবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, উপস্থিত বিদেশি কোন কূটনীতিক আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেননি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ নিয়েও তাদের কোন জিজ্ঞাসা ছিলো না। উপদেষ্টা বলেন, আমরা নিজে থেকে বলেছি, যারা পরিবর্তনটি এনেছে, জীবন দিয়েছে তাদের দাবিগুলো যৌক্তিক। তারা পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য এতোগুলো জীবন বিসর্জন দেয়নি। আমরাও অনুধাবন করি রাষ্ট্র, সমাজে জরুরি কিছু রিফর্মের প্রয়োজন। এ রিফর্মের জন্য ঠিক যেটুকু সময় থাকা দরকার সেটুকু সময়ই আমরা (অন্তর্বতী সরকার) থাকবো। এর বেশি থাকবো না, কমও না। দেশে সর্বজনীন মানবাধিকার নিশ্চিতে বিদেশি বন্ধু-উন্নয়ন সহযোগীদের সুপারিশ সরকার আমলে নিয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। বিদায়ী সরকারের পরিকল্পনায় থাকা বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন এনগেজমেন্ট আটকে যাওয়া প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ঠিক এই মুহূর্তে আমরা কোনো কিছু থেকে সরে যাবো এমন না। যার সঙ্গে যে চুক্তি আছে বা কমিটমেন্ট আছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বা দ্বিপক্ষীয় ব্যাপারে সেগুলো কিন্তু যে কমিটমেন্ট বাংলাদেশ করেছে অবশ্যই আমাদের রক্ষা করতে হবে। যেখানে আমাদের মনে হবে স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে সেখানে আমাদের স্বার্থটা সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিবো। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়ন্ত্রণ বিদেশি কোনো শক্তির হাতে কিনা? এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সাফ জবাব দেন। বলেন, বাইরের কারও নিয়ন্ত্রণে সরকার নেই। বরং উপদেষ্টা কাউন্সিলই দেশ পরিচালনা করছে। তিনি এটাকে ‘ক্ষমতা’ না বলে দায়িত্ব বলা সমীচীন বলে উল্লেখ করেন। দেশে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার দিনরাত কাজ করছেন বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। কূটনীতিক ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ভারত, চীন রাশিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারসহ প্রায় ৬৪ জন কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন সেগুনবাগিচা।

জনগণ এখনো গ্রহণ করতে আসেনি, বরং দল পুনর্গঠন করুন: আওয়ামী লীগকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

প্রথম আলোঃ আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘লোক জড়ো করুক, আর যা–ই করুক, আমি আপনাদের একটা অনুরোধ করি, এমন কিছু করবেন না যে আপনাদের (আওয়ামী লীগ) জীবন বিপন্ন হয়। এ দেশের পাবলিক এখনো আপনাদের গ্রহণ করতে আসেনি। আমি বরং মনে করি, আপনারা আপনাদের পার্টি রি–অর্গানাইজ (পুনর্গঠন) করুন।’

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আহত আনসার সদস্যদের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) দেখতে গিয়ে আজ সোমবার সকালে এম সাখাওয়াত হোসেন এ কথা বলেন।

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অনেক অবদান আছে উল্লেখ করে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এটা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। দলকে পুনর্গঠন করুন, রাজনৈতিক দলের মতো যেভাবে থাকে, নির্বাচন এলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, জনগণ ভোট দিলে ভোটে যাবেন।’

এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আপনারা (আওয়ামী লীগ) এই দেশকে আরেকজনের হাতে তুলে দেবেন? তাহলে আমরা যে মুক্তিযুদ্ধ করলাম, ৩০ লাখ লোক মারা গেল, সেই ৩০ লাখ লোকের ওপর দাঁড়িয়ে দেশটা আপনি আরেকজনের হাতে তুলে দেবেন? এ দেশের লোক এত তাড়াতাড়ি ভোলেনি। কারণ, যাঁকে ধরছিলেন নেতা, সেই নেতারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যাঁকে ধরছে, সেই নেতাকে আমরা বাঁচাতে পারছি না। অনেক নেতাকে অনেকে বাঁচিয়েছেন, আমরা জানি না এ কথা।’

মারামারি করে কোনো লাভ নেই উল্লেখ করে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এখানে আরও কিছু লোকের মৃত্যু আমরা চাই না। ইতিমধ্যে ৫০০, হয়তো আরও বেশি মারা গেছেন উভয় পক্ষের। পুলিশের এই অবস্থা হয়েছে। আনসারের এই অবস্থা হয়েছে। আমরা যদি উসকানি দিতাম, আপনারা টিকতে পারতেন না। আমরা আর্মিকে মানা করেছি। কারণ, কাকে মারবেন আপনি? পুলিশকে দিয়ে কাকে মারিয়েছেন? পুলিশকে দিয়ে মারিয়েছেন আপনার সন্তানকে। একজন পুলিশের সদস্য কী বললেন যে, স্যার, কয়টা গুলি লাগে, তাঁর ছেলে লাশ। এটা করবেন না। অনুরোধ করছি, প্ররোচনায় আসবেন না। ব্যক্তিগত স্বার্থে আপনারা এত বড় একটা দলকে নষ্ট করবেন না। এটা (আওয়ামী লীগ) আমাদের গর্ব। এটা নষ্ট করার কোনো অধিকার নেই।’

প্রতিবিপ্লবের জন্য হাজার হাজার মানুষের রক্তের প্রয়োজন উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আর কেউ যদি মনে করেন যে আবার একটা কাউন্টার রেভল্যুশন (প্রতিবিপ্লব) করে আসবেন, কাউন্টার রেভল্যুশন করতে হলে হাজার হাজার লোকের রক্তের প্রয়োজন। যদি আপনারা সেই দায়িত্ব নিতে চান, তাহলে আমার কিছু করার নেই।’

কোনো রাজনৈতিক দল নয়, দেশের তরুণ প্রজন্ম এবার বিপ্লব করেছে উল্লেখ করে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘দে হ্যাভ গিভেন দেয়ার লাইভস (তাঁরা তাঁদের জীবন দিয়েছেন), যেটা আপনারা কোনো দিন দিতে পারতেন না। পুলিশের গুলি খাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের কোনো দুঃখ নেই। তাঁরা (তরুণ) আপনাদের (প্রতিবিপ্লবকারীদের) মোকাবিলা করবেন। অনুরোধ করছি, দয়া করে দেশকে স্বাধীন রাখেন।’
৭ দিনের মধ্যে অস্ত্র জমা দিতে হবে

বেসামরিক মানুষের হাতে নিষিদ্ধ ৭.৬২ এমএম রাইফেল পাওয়া গেছে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, যেটা বেসামরিক মানুষের হাতে যাওয়ার কথা নয়। সেটার বৈধতা পুলিশ ও র‍্যাবকে দেওয়া হয়েছিল। সেই অস্ত্র কীভাবে সাধারণ মানুষের হাতে গেল?

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘যাঁদের হাতে অবৈধ অস্ত্র আছে, তা তাঁরা সাত দিনের মধ্যে থানায় জমা দেবেন। যদি জমা না দেন, তাহলে দুইটা চার্জ লাগবে। একটা হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র, আরেকটা হচ্ছে সরকারি নিষিদ্ধ অস্ত্র আপনাদের হাতে। সেটার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতেও যাওয়া যেতে পারে যে এটা কোথা থেকে পেয়েছেন। এসব রাইফেল ফেরত দিতে হবে সাত দিনের মধ্যে। আগামী সোমবারের মধ্যে ফেরত দিতে হবে। তা না হলে অস্ত্র হাতে কাউকে পেলে তাঁর বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ আনা হবে। থানায় জমা দিন। নিজেরা না দিলেও অন্যের মাধ্যমে দিন। যেভাবেই হোক, রাইফেলগুলো ফেরত দিতে হবে। না হলে আমরা অনুসন্ধান শুরু করব।

এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আমাদের সাহায্য চাইতে হবে যে এই ঘটনা কেন ঘটল বাংলাদেশে! আমি ইতিমধ্যে অনুমোদন দিয়েছি। সামনে যে মিটিং হবে, সেখানে বলব যে কীভাবে, কারা হুকুমদাতা, কেন হয়েছেন?’

কোনো গণমাধ্যম বন্ধ করার পক্ষে নন বলেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমি গতকাল একটা কথা বলেছি। সে জন্য দুঃখিত। রাগের মাথায় বলেছি যে আবার চাটুকারিতা করলে বন্ধ করে দেব। এটা আমার কাজ নয়।’

সব পুলিশ সদস্য খারাপ নন বলেও উল্লেখ করেন এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, তাঁদের উপলব্ধি হয়েছে। তাঁরা নিজেরাই এখন আগের পোশাক পরে আসতে চান না। অপরাধগুলো তাঁঁরা করেননি, তাঁদের দিয়ে করানো হয়েছে।
‘গন্ডগোল পাকিয়ে লাভ হবে না, লোকজন আবার খেপে উঠবে’

আজ সোমবার সচিবালয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে দেখা করে। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সরকার থেকে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নিয়েও বিভিন্ন কথা বলেন এম সাখাওয়াত হোসেন । তিনি এ সময় নতুন মুখ ও নতুন অঙ্গীকার নিয়ে দল গোছাতে আওয়ামী লীগকে পরামর্শ দেন।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বড় রাজনৈতিক  দল। এখানে ভালো ভালো নেতা আছেন। এই দল একসময় মধ্যবিত্তের সেক্যুলার দল ছিল। মুসলিম লীগ ছিল উচ্চবিত্তের। মধ্যবিত্তের দল ছিল আওয়ামী লীগ। এত বড় মানুষের দলের নেতা (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) এ দেশ  স্বাধীন করেছেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। তাঁর নামে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, স্বাধীনতা হয়েছে। সেই দল এভাবে ভেঙে পড়ে যাবে যে নেতা–কর্মীদের লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়াতে হচ্ছে!

নতুন নেতৃত্বে দল গোছানোর পরামর্শ দিয়ে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আপনারা দল গুছিয়ে নিন, আপনাদের দলকে তো কেউ নিষিদ্ধ করেনি। যেকোনো দল নিষিদ্ধ করা বাজে সংস্কৃতি।’

আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে যাওয়া শেখ হাসিনার উদ্দেশে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, 'আপনি আসবেন, আপনার দেশ। আপনি আসেন না কেন? নাগরিকত্ব তো যায়নি। ২১ বছর প্রধানমন্ত্রিত্ব করেছেন। আপনি স্বেচ্ছায় চলে গেছেন, কেউ তো যেতে বলেননি। স্বেচ্ছায় আসেন, ভালো থাকবেন, আবার আসবেন। আমরা সবাই আপনাকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু গন্ডগোল পাকিয়ে কোনো লাভ হবে না। বরং লোকজন আবার খেপে উঠবে।’

এ সময় জাতীয় পার্টির উদাহরণ তুলে ধরেন এম সাখাওয়াত হোসেন। এইচ এম এরশাদ কারাগারে যাওয়ায় দলটি বেঁচে যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন সংঘাত বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আপনারা আপনাদের এলাকা ঠিক করুন। যদি সংসদীয় এলাকা অনুযায়ী হিসাব নিতে থাকি, আপনারা আমাকে ভালো করে জানেন। আমি নতুন লোক নই। আমি নিশ্চিত করব, (সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায়) নির্বাচন যাতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘দয়া করে দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেবেন না। ইনক্লুডিং সদ্য যে পার্টি (আওয়ামী লীগ), আপনারা দল গোছান, আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আপনাদের সাহায্য করব। আপনারা গোছান নতুন মুখ (নতুন নেতৃত্ব), নতুন অঙ্গীকার নিয়ে। আশা করি, রাজনৈতিক দল আইন অনুযায়ী হবে।’

গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সুদূরপ্রসারী সংস্কার জরুরি: ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজের ওয়েবিনারে বক্তারা

গণ-অভ্যুত্থানের  বাস্তবায়নে সুদূরপ্রসারী সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। গতকাল ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ আয়োজিত ‘গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ: এখন কী করতে হবে’ শীর্ষক বিশেষ ওয়েবিনারে তারা এ কথা বলেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশে একটি অসহনীয় অবস্থা তৈরি হয়েছিল। তার ফল এই গণ-অভ্যুত্থান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসেছে ক্রান্তিকালীন সরকার হিসেবে-এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেয়ার জন্য। তিনি আন্দোলন থেকে দুটি বার্তা পেয়েছেন। প্রথমত, যারা অন্যায় করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, ওই অবস্থার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য সুদূরপ্রসারী সংস্কার করতে হবে। সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে। এগুলো সময়সাপেক্ষ ও জরুরি। তিনি বলেন, এই সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন।

কিছু সংস্কার পরবর্তী সময়ে করতে হবে, যারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসবেন, তারা সেটি করবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে যেতে হবে, যাতে একটি জাতীয় সনদ তৈরি করা যায়। সুজন সম্পাদক বলেন, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ নয়, লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ছাত্রদের নেতৃত্বে যে গণবিস্ফোরণ হয়েছে, যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা নস্যাৎ করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। এদিকে সতর্ক থাকতে হবে। আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অনেক চেষ্টা হবে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার চেতনা থেকে দেশ যোজন যোজন দূরে। ১৯৯১ সালে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, এবার যেন ব্যর্থতা না আসে, সেজন্য ছাত্রসমাজ ও নাগরিক সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, জন-আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকার গঠিত হয়েছে। দুটি আকাঙ্খা-একটি হলো এই সরকার দ্রুত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। অন্যটি হলো বড় রকমের পরিবর্তন আনতে হবে। সামগ্রিক কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। যারা সরকারে আছেন, তারা বলুক এই দুটি স্বপ্নের মধ্যে তারা কী করতে চান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে এই সরকারের মামলা করা জরুরি মন্তব্য করে আলী রীয়াজ বলেন, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যাওয়া যেতে পারে। যারা হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন-আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, এই সংবিধান রেখে জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব নয়। এই সংবিধানেই স্বৈরতন্ত্রের বীজ বপন করা আছে। এই সংবিধান রেখে চিরস্থায়ীভাবে স্বৈরতন্ত্রের বিলোপ হবে না। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে জন-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে হবে। ১৫ বছরে জঞ্জাল তৈরি হয়েছে। কাঠামো ভেঙে পড়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, পুনর্গঠন করতে তাড়াহুড়া কেন, দেশ বদলাতে চান না?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহুমুখী ঘটনা ঘটেছে। দায়ীদের জবাবদিহি করতে হবে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে জাতিসংঘের সহায়তা নেয়া দরকার। তিনি বলেন, বাক্স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সব কালো আইন বাতিল করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করে সংস্কার পরিকল্পনা করতে হবে। জনপ্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ, সংসদ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য কমিশন, মানবাধিকার কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতির ঘটনাগুলো নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের মধ্যে জবাবদিহি সম্পন্ন করতে হবে। শিক্ষা ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনের দাবি রাজনৈতিক দিক থেকে যৌক্তিক তবে ডকট্রিন অব নেসেসিটি থেকে এখনই তা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে ভাবতে হবে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের রিসার্চ ফেলো মির্জা এম হাসান বলেন, এখন যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলোর দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোর ভিত্তি ২০০৭-০৮ সালে করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনেক কিছু ধুয়েমুছে ফেলা হয়। এখন এমন কিছু করতে হবে, যাতে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক নতুন করে দাঁড়াতে পারে। গণতন্ত্র নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ম তামিম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ আসতে পারে রাজনৈতিক দল থেকে। রাজনৈতিক কর্তৃত্বের জন্য যেসব ব্যবস্থা আছে, সেগুলো তারা সহজে পরিবর্তন করতে চান না। ১৯৯১ ও ২০০৭-০৮ সালেও এ ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল; কিন্তু পরিবর্তন আসেনি। এর অন্যতম প্রধান কারণ বিচারহীনতা। অপরাধীদের বিচার করা যায়নি।
সাংবাদিক মনির হায়দারের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে ‘গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ, এখন কী করতে হবে’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। প্রবন্ধে তিনি রাষ্ট্র সংস্কার, রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, পরিসংখ্যান জালিয়াতি থামানো, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিস্থিতি, ডিজিটাল অর্থনীতির নিরাপত্তা, মেধাভিত্তিক নিয়োগ বিষয়ে তার চিন্তাভাবনা তুলে ধরেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বারুদ হয়ে ওঠা স্লোগানগুলো by সাদিয়া মাহ্‌জাবীন ইমাম

প্রথম আলো: আন্দোলনের ভাষা হলো স্লোগান। তবে স্লোগান আগে থেকে ঠিক করা থাকে না। মিছিল ও সমাবেশ থেকে স্লোগান জন্ম নেয়। হয়ে ওঠে আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতীক।

সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে গত ১ জুলাই আন্দোলনে নামে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। আন্দোলনে নানান ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে বদল আসে স্লোগানে। এসব স্লোগান আন্দোলনকারীদের মধ্যে বারুদের মতো কাজ করে। জোগায় ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের প্রেরণা।

শুরুতে আন্দোলন অহিংসই ছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চড়াও হলে ১৫ জুলাই আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। এরপর ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন প্রবল আন্দোলনের রূপ নেয়। বাড়তে থাকে সহিংসতা। শেষে সরকার পতনের এক দফা দাবি তুলে ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলন সফল হয়। ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের।

কোটা সংস্কার থেকে সরকার পতনের দাবি—৩৬ দিনের এই আন্দোলনের শেষ তিন সপ্তাহে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন স্লোগান। বদলেছে দাবির ভাষাও।

‘আমি কে তুমি কে, রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’—এর মতো শ্লেষের প্রতিবাদ একপর্যায়ে রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফা এক দাবিতে। ‘এক দুই তিন চার, শেখ হাসিনা গদি ছাড়’-এর মতো বজ্রকঠিন কিছু স্লোগান ওঠে।

মাঝের তিন সপ্তাহে যে স্লোগানগুলো শোনা গিয়েছিল, সেখানে আছে ‘চাইলাম অধিকার হয়ে, হয়ে গেলাম রাজাকার’; ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’ এবং ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’-এর মতো আরও অনেক স্লোগান।

তবে আন্দোলনের গতি আর এসব স্লোগান তীব্র হয়ে ওঠে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর। গত ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। এর পর থেকেই স্লোগান শুরু হয়, ‘আমার খায়, আমার পরে, আমার বুকেই গুলি করে’; ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাই ফিরিয়ে দে’; ‘বন্দুকের নলের সাথে ঝাঁজালো বুকের সংলাপ হয় না’ এবং ‘লাশের ভেতর জীবন দে, নইলে গদি ছাইড়া দে’—এসব স্লোগান। যেখানে কয়েকটি শব্দেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে জনতার এই দাবির সঙ্গে আছে প্রাণ হারানোর যন্ত্রণা।

এরপর পরিস্থিতি যত বদলেছে, তত যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন স্লোগান। বর্তমান প্রজন্মের মুখে উঠে এসেছে আগের প্রজন্মের শব্দ-বাক্যও। যেমন ২ আগস্ট রাজধানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’; ‘একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে ওঠো আরেকবার’; ‘যে হাত গুলি করে, সে হাত ভেঙে দাও’ এবং ‘অ্যাকশন অ্যাকশন ডাইরেক্ট অ্যাকশন’।

৩ আগস্ট ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ থেকে শোনা যায়, ‘আমার ভাই কবরে, খুনিরা কেন বাইরে’; ‘আমার ভাই জেলে কেন’ এবং ‘গুলি করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’—এসব স্লোগান।

সায়েন্স ল্যাব মোড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল থেকে শোনা যায়, ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’; ‘জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালো’ এবং ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত’—এর মতো স্লোগানগুলো।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আরও অনেকের মতো একাত্ম হয়েছিলেন রিকশাচালকেরা। ৩ আগস্ট দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ‘গুলি করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’; ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’; ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ এবং ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়েছিলেন রিকশাচালকেরা।

১৫ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘আমি কে তুমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ স্লোগানটি আন্দোলনে নতুন গতি দিয়েছিল।

তবে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলে, ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’ স্লোগানটি। আর এসব স্লোগানের সঙ্গে সমান গতিতে লংমার্চ করেছে শব্দে লেখা স্লোগানগুলো। মানুষের হাতে হাতে ছিল সেসব।

মিছিলে প্ল্যাকার্ড, পোস্টার, ব্যানারে মানুষ লিখে নিয়ে এসেছিল কবিতার পঙ্‌ক্তি। সেখানে ছিল জহির রায়হান থেকে শুরু করে হেলাল হাফিজের লেখা কবিতা। উঠে এসেছিল কার্টুনে কার্টুনে ব্যঙ্গচিত্রও।

তবে স্লোগানের বিপরীতেও স্লোগান থাকে। থাকে প্রতিবাদের প্রতিবাদ। যেমন ১৭ জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও উসকানিমূলক’ স্লোগানের তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানিয়ে ৪২৩ জন সাবেক ছাত্রনেতা বিবৃতি দিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা স্লোগান দেন, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, রাজাকারের ঠাঁই নাই’।

ছাত্র-জনতার মুখের স্লোগানগুলো শুধু মুখেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেসব স্লোগান লেখা ছিল প্ল্যাকার্ডেও। ‘অনাস্থা অনাস্থা, স্বৈরতন্ত্রে অনাস্থা’; ‘চেয়ে দেখ এই চোখের আগুন, এই ফাগুনেই হবে দ্বিগুণ’; ‘তবে তাই হোক বেশ, জনগণই দেখে নিক এর শেষ’; ‘আমরা আম-জনতা, কম বুঝি ক্ষমতা’; ‘তোমারে বধিবে যে গোকূলে বাড়িছে সে’; ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’; ‘হাল ছেড় না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড় জোরে’; ‘ফাইট ফর ইওর রাইটস’; ‘নিউটন বোমা বোঝো মানুষ বোঝো না’ লেখার মতো শ্লেষাত্মক প্ল্যাকার্ডও ছিল হাতে হাতে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মিছিলে স্লোগান দেন রিকশাচালকেরা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগে অসংখ্য আন্দোলনকারীর প্রাণহানিতে পরিস্থিতি যত অবনতির দিকে যাচ্ছিল, ততই জোরালো হচ্ছিল স্লোগানের ভাষা।

গুলিতে শত শত মানুষের প্রাণহানির পর শেষ দিকে এসে শেখ হাসিনার পতনের এক দফা দাবিতে নানা স্লোগান শোনা যায়। এর মধ্যে ব্যাপক আলোচিত হয় আঞ্চলিক একটি স্লোগান, ‘আঁর ন হাঁইয়্যে, বৌতদিন হাঁইয়্য’ (আর খেয়ো না, অনেক দিন খেয়েছ)। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার এই স্লোগান শোনা গেছে ২ আগস্ট থেকে।

ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ের সাড়া জাগানো ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ থেকে ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ‘যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমিই বাংলাদেশ’-এর মতো শত শত স্লোগান সাক্ষী হয়ে আছে মানুষের দাবি আর আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে। শুধু রাজনীতি নয়, স্লোগানে স্লোগানে লেখা থাকে সমাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশের কথা।

আন্দোলনে স্লোগান কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে শত বছর আগের একটি ঘটনার উল্লেখ করা যাক। সে সময় আইন করে এই বাংলায় ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগান নিষিদ্ধ করেছিল ব্রিটিশরা। এর প্রতিবাদ জানাতে তৎকালীন বাখেরগঞ্জ জেলার (বর্তমানের বরিশালের অংশ) নারীরা চুল বাঁধা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অভিনব এই প্রতিবাদের কথা ইতিহাসে লেখা আছে। শিশির কর সম্পাদিত ‘ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত বাংলা বই’-এ এক প্রবন্ধে পাওয়া যাবে এই ঘটনার বর্ণনা।

হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশে নয়া পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজন -নিক্কেই এশিয়ার বিশ্লেষণ

টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর জনবিক্ষোভের তোপে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গোটা হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন এক সময়কার গণতন্ত্রের মানসকন্যা হাসিনা। এভাবে তার চলে যাওয়া বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে যে শূন্যতা তৈরি করেছে তা নিরসনে কাজ শুরু করেছে প্রধান উপদেষ্টা নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তবে হাসিনা যে পররাষ্টনীতির উপর ভিত্তি করে তার স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতাকে স্থায়ী করার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন তা এখন পরিবর্তন করা সময়ের দাবি।

১২ আগস্ট জাপানি গণমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া ‘আফটার হাসিনা, বাংলাদেশ নিডস এ ফরেইন পলিসি রিসেট’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। যেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নেত্রী শেখ হাসিনার এমন পতন চমকপ্রদ হলেও ৫ আগস্ট তিনি পালিয়ে যাওয়ার পর তার বাসভবন তথা গণভবনে বিক্ষুব্ধ জনতার ঢল মোটেও আশ্চর্যের ছিল না। কেননা দেশটির অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি জনগণকে বছরের পর বছর ধরে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। যদিও হাসিনা সরকার আসার পর আগের তুলনায় দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে কিছুটা পরিবর্তন হয়, কিন্তু তার দলীয় লোকজনের দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারে দেশটির অর্থনীতি দারুণভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। এছাড়া তার আমলে প্রতিটি নির্বাচন নিয়ে কারচুপির অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণিত। ভিন্ন মত দমনে হাসিনা এতটাই কঠোর ছিলেন যে, তার শাসনামলে কেউ কথা বলার সাহস করত না। কেননা তিনি অনেক গুম, খুনের সুষ্ঠু তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি এবং রাজনীতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। দুর্নীতি এবং অব্যস্থাপনা অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়ায় দেশটির রাজনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে পড়ে। যাতে জনগণের আস্থা এবং বিশ্বাস দুটিই হারিয়েছেন হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের শেষ নির্বাচন বিএনপি এবং সমমনা দলগুলো বর্জনের পর হাসিনা বিশাল জয় নিয়ে ক্ষমতা শুরু করেছিলেন। কিন্তু মাত্র ৭ মাসের মাথায় তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। জুলাইয়ের প্রথম থেকে শান্তিপূর্ণভাবে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু হাসিনার একটি অহংকারী মন্তব্যের ফলে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের ডাকে রাস্তায় নেমে আসে দেশের লাখ লাখ জনতা। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং হাসিনা পদত্যাগ এবং দেশ ত্যাগে বাধ্য হন।
তার পদত্যাগের তিন দিন পর ৮ আগস্ট বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে। যার নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী ব্যক্তি ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার অঙ্গিকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং আগের সকল বৈষম্যপূর্ণ আইন বাতিল করে দেশে জনগণের ইচ্ছার বাস্তব রূপ দিতে কাজ শুরু করেছেন। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এখনও ভবিষ্যত নিয়ে অস্বস্তির রেশ কাটেনি। কেননা অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশাল চ্যালঞ্জ রয়েছে। তবে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনে বৈচিত্র থাকায় তাদের পদক্ষেপ প্রশংসার দাবিদার। অন্তর্বর্তী সরকারের অস্থায়ী প্রকৃতি এবং ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ৮৪ বছর বয়সী ইউনূসের এখন বড় বড় পরিবর্তনগুলো অনুসরণ করে কাজ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাচ্ছে, ইউনূস এক বা দুই বছর তার সরকার স্থায়ী করতে পারেন। কেননা তাকে সংস্কারের একটি ধারাবাহিক প্রথা থেকে বের হয়ে এসে কাজ করতে হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের চাপ সামলে ইউনূসকে নতুন একটি কার্যকরী ব্যবস্থা চালু করতে হবে যার মাধ্যমে দেশে স্থায়ী রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতির আকস্মিক পট পরিবর্তনে সবচেয়ে চিন্তায় পড়েছে ভারত। যেহেতু তারা বাংলাদেশের সবচেয়ে নীকটবর্তী প্রতিবেশী দেশ। সাম্প্রতিক ঘটনার পর ভারতের পরিস্থিতি দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা ভালোই বেকায়দায় পড়েছে। গত ১৫ বছরে হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সমর্থক ছিল ভারত। তবে ৫ আগস্ট যেন সকল হিসাব নিকাশ পাল্টে গেছে। ভারত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ভয়াবহরকমের চিন্তায় পড়ে গেছে। একজন অজনপ্রিয় স্বৈরাচারী নেতাকে এভাবে অন্ধভাবে সমর্থন করে ভালোই বিপাকে পড়েছে দিল্লি। কেননা হাসিনার প্রতি ক্ষোভ থেকেই বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের জনমনে ভারত বিরোধীতা কতটা প্রকট হয়েছে। এক্ষেত্রে দিল্লিকে এখনই সাবধান হতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এবং তার জনগণের ইচ্ছার ওপর।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভারত বাংলাদেশে আগের শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সোচ্চার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দিল্লি মসনদ সমর্থিত অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানকে বিদেশী হস্তক্ষেপ দ্বারা পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে বলে মনে করেন। তাদের ভাষ্য, বিদেশী কোনো শক্তি এই গণঅভ্যুত্থানে ইন্ধন যুগিয়েছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে ভরতের এসব প্রোপাগণ্ডা সত্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। কেননা হাসিনার প্রতি ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ হচ্ছে তিনি বাংলাদেশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। দেশটির স্বাধীনতার পর থেকে কোনো শাসক এভাবে দেশ পরিচালনা করেনি যেভাবে হাসিনা করেছেন। তার আমলে গুম, খুন মামুলি বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। অন্যদিকে হাসিনা তীব্র ভারত ঘেঁষা হলেও তিনি আন্তর্জাতিক বিশ্বে নিজের অবস্থান নিয়ে কাজ করেছেন। হাসিনা সরকারের ভারত প্রীতির পরেও তারা চীনের সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। যেখানে চীন এবং ভারত নানা ইস্যুতে দ্বন্দ্বে লিপ্ত রয়েছে।

অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো ঢাকার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ককে বজায় রেখ হাসিনা সরকারের গণতান্ত্রিক ত্রুটি, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে নজর দেয়। পশ্চিমাদের এমন নীতি হাসিনার অপশাসনকে দীর্ঘ হতে সহায়তা করেছে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের অভিযোগ রয়েছে। তবে বিষয় হচ্ছে, দেশের জনগণ এ সবকিছু উপেক্ষা করে হাসিনা সরকারতে বিতাড়িত করেছে।
এখন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব দেশটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয়া। বিভিন্ন দাতা দেশগুলোর সাথে নতুন আঙ্গীকে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাবেন ড. ইউনূস। যেহেতু পশ্চিমারা ইউনূসকে সমর্থন করেছে তাই পোশাক খাতকে শক্তিশালী করতে তিনি যথেষ্ঠ সহযোগীতা পাবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। ঢাকা ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আঞ্চলিক সম্পর্ক পুননির্মাণেও মনযোগী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীন এবং জাপানের মতো বড় দাতা দেশগুলোর সাথেও নতুন নীতি অনুযায়ী সম্পর্ক উন্নয়ন করবে বাংলাদেশ। যেহেতু দেশটিতে এখন রিজার্ভ ঘাটতি আছে সেক্ষেত্রে ইউনূস এখন স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আর্থিক সহায়তা সন্ধান করবেন। এক্ষেত্রে ভারতের সম্পর্কের হিসাবটা উল্টে যেতে পারে। যেহেতু ঢাকা এখন সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তার কূটনৈতিক সম্পর্ক সেট করবে, সেক্ষেত্রে দিল্লিকে একটু সতর্ক না হলে চলবে না। কেননা স্বভাবতই বাংলাদেশ এখন ভারত ঘেঁষা মনোভাব থেকে দূরে সরে আসবে।

‘ঘুষ চাইলেই ঘুষি’ by ইমরান হোসেন সুজন

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা মোকাবিলায় মাঠে নেমেছে ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আর তাদের সহযোগিতা করছেন সর্বস্তরের জনগণ। তরুণ এ স্বপ্নবাজরাই স্বপ্ন দেখছেন নতুন করে দেশ গড়ার। ‘ঘুষ চাইলে ঘুষি’ এমন স্লোগানে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে মাঠে নেমেছে তারা।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন শিক্ষার্থীরা। দুর্নীতিমুক্ত সুন্দর একটি বাংলাদেশ গড়বে এমন প্রত্যয় প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে। বিভিন্ন রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের কাজও করছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্কাউটের সদস্যরা। শিক্ষার্থীদের সার্বিক সহযোগিতা করছেন সচেতন নাগরিকরা। শুধু রাস্তা পরিষ্কার ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে বসে নেই শিক্ষার্থীরা। ইতিমধ্যে সরকারি হাসপাতাল ও ভূমি অফিসকে দালাল ও ঘুষমুক্ত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শনিবার কয়েকজন দালালকে নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বিতাড়িত করেছে তারা। কাউকে চাঁদা না দিতে মাইকিংয়ের পাশাপাশি রাস্তাঘাটে আল্পনা এঁকে জনগণকে সচেতন করছে শিক্ষার্থীরা।

রোববার সকালে দোহার ও নবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দোহার থানা মোড়, কলেজ মোড়, কার্তিকপুর বাজার, লটাখোলা বাজার, করমআলী মোড়, জয়পাড়া ওয়ান ব্যাংক মোড়, বাঁশতলা, পালামগঞ্জ ও নবাবগঞ্জ সদর চৌরাঙ্গি, বাগমারা বাজার, বান্দুরা ব্রিজসহ বিভিন্ন জায়গায় ট্রাফিকের কাজ করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিভিন্ন হাটবাজারে মাইকিং করে কাউকে চাঁদা না দিতে ব্যবসায়ীদের আহ্বান করেন তারা। সেই সঙ্গে সবাইকে যত্রতত্র ময়লা না ফেলতে এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার অনুরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন লেখনীর মাধ্যমে সচেতন করা হচ্ছে জনসাধারণকে।
দুই উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ও সড়কে ‘পানি লাগবে পানি’, ‘স্বাধীনতা এনেছি, সংস্কারও আনবো’, ‘ঘুষ চাইলেই ঘুষি’সহ বিভিন্ন সচেতনমূলক লেখা লিখে জনগণকে সচেতন করছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের এমন কাজে খুশি সাধারণ মানুষ। শিক্ষার্থীদের হাতেই আপাতত বাংলাদেশ নিরাপদ এমনটাই মনে করছে তারা।

বান্দুরা ব্রিজের ট্রাফিকের কাজে ব্যস্ত আতিক, নবীন, নিঝুমসহ প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী। তারা বলেন, আজ বান্দুরা বাজারের ব্যবসায়ীদের বলে দিছি কাউকে চাঁদা দিবেন না। একটু পর ভূমি অফিসে যাবো। ছাত্রদের স্পষ্ট বার্তা ভূমি অফিসসহ প্রতিটি অফিস দালালমুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি কাজের বিনিময়ে কেউ ঘুষ চাইলে ঘুষি দিয়ে তাকে প্রতিহত করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, ছাত্রদের হাত ধরে নবাবগঞ্জের প্রতিটি সেক্টর ঘুষ ও দালালমুক্ত হবে।

তারা আরও বলেন, প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা সরকার থেকে বেতন পায়। তাহলে তারা কেন ঘুষ খাবে। বিশেষ করে ভূমি অফিস হলো ঘুষের আখড়া। ভূমি অফিসে দেখা যায় অনেক বেসরকারি কর্মকর্তা। তাদের কাজ কি? তাদের বেতন দেয় কে? এসবও আমরা দেখবো। আজ বলে আসবো কাল যদি অফিসে দালাল দেখা যায় আর কোনো কর্মকর্তা ঘুষ চায় তাহলে তাকে নবাবগঞ্জ ছাড়তে হবে।
দোহারের পালামগঞ্জ বাজারেও সড়কে বড় করে ‘ঘুষ চাইলেই ঘুষি’ ট্রাফিক আইন মেনে চলুনসহ নানা আল্পনা করা হচ্ছে। লেখায় ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা জানান, শুধু স্বাধীন করলেই হবে না, স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। যেকোনো সরকারি অফিসে যাবেন, ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। আমরা এটা পরিবর্তনে মাঠে নেমেছি। এখন থেকে কোনো কর্মকর্তা বা দালালরা ঘুষ চাইলে সবাইকে প্রতিহত করতে হবে। ঘুষ বাণিজ্যের কারণে সাধারণ সেবা প্রত্যাশীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাই আমরা সচেতনতা সৃষ্টি করার জন্যই বিভিন্ন দেয়াল ও সড়কে বড় করে লিখছে ঘুষ চাইলে ঘুষি। তারা আরও বলেন, কেউ কাজের বিনিময়ে ঘুষ চাইলে আমাদের জানাবেন। আমরা প্রতিহত করবো এবং তাকে দোহার নবাবগঞ্জ থেকে বিতাড়িত করবো।

শিক্ষার্থীদের এমন কর্মকাণ্ডে খুশি সাধারণ জনগণ। বান্দুরার আওয়াল হোসেন বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করছে শিক্ষার্থীরা। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই সুন্দরভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছে। শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিয়েছে, মনেপ্রাণে চাইলে সহজেই দেশটা পরিবর্তন করা সম্ভব।
শিকারীপাড়ার আসিফ শেখ বলেন, বিভিন্ন স্থানে লেখা দেখলাম ঘুষ চাইলে ঘুষিসহ একাধিক সচেতনতামূলক লেখা। আসলে ওদের কাছে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আমরা এ কয়দিনে বিশ্বাসও করে ফেলেছি শিক্ষার্থীরাই চেষ্টা করলে সুন্দর ও দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে পারে। আশা করি সর্বস্তরের মানুষ তাদের সহযোগিতা করবে।

বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান এবং কাঙ্ক্ষিত করণীয় by ড. তারেক ফজল

‘বীরশ্রেষ্ঠ’ আবু সাঈদই ‘বাংলাদেশ’

শনিবার ১০ আগস্ট, ২০২৪ প্রথম বেলায়ই পুরো বাংলাদেশ ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ আবু সাঈদের সাথে ‘সাক্ষাৎ’ করেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই বাংলাদেশের প্রতীক। ‘অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাহী বিভাগের’ (সবাই ‘সরকার’ বলছি বটে) প্রধান (প্রধান উপদেষ্টা) ড. ইউনূস বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি শহীদ আবু সাঈদের (কবর) জিয়ারত (‘জিয়ারত’ আরবী শব্দ, বাংলায় ‘সাক্ষাৎ’ বলি) করেছেন। তাঁর সাথে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের নেতা ‘নাহিদেরা’ ছিলো। ড. ইউনূস সাঈদের মা-বাবা-ভাই-বোনদের জড়িয়েছেন পরম স্নেহে, তাদের কথা শুনে তিনি আবেগে ভেঙে পড়েছেন, অসহায়-অক্ষম সান্ত্বনার শব্দাদি উচ্চারণ করেছেন। তিনি তাদেরকে বাংলাদেশের পতাকায় বরণ করেছেন। এই সকালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে থাকবে। ’বীরশ্রেষ্ঠ আবু সাঈদ অতপর বাংলাদেশ’। ইতিহাস বলে, ‘মরে গিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে’। সক্রেটিস ‘বেঁচে আছেন’। সক্রেটিসের খুনিরা সবাই ‘মরে গেছে’।

‘ছাত্র আন্দোলনের’ ‘গণঅভ্যুত্থান হয়ে যাওয়া’
৫ আগস্ট (অরফে ৩৬ জুলাই) ২০২৪ বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান ‘সফল’ হয়েছে, বিজয়ী হয়েছে। এই অভ্যুত্থানের নেতা ‘নাহিদেরা’ এর নাম দিয়েছেন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। এক সঠিক, শুদ্ধ উচ্চারণ বটে। ছাত্ররা ‘আন্দোলনটি’ শুরু করেছিলো। এবং নানান নির্যাতন সয়ে এগিয়ে নিয়েছিলো। কিন্তু শাসকদের সীমাহীন অহঙ্কার-ঔদ্ধ্যত্ব আর মি. ওবায়দুল কাদেরের ‘ছাত্রলীগ থ্যারাপি’ আন্দোলনটিকে ‘শহীদী কাফেলায়’ পরিণত করে। ‘বুক চিতানো আবু সাঈদের শাহাদাত’ ও ‘মুগ্ধদের নিরস্ত্র প্রাণদানের’ প্রেক্ষাপটে ‘নাহিদেরা’ জনতার অংশগ্রহণ ও সাহায্যের আবেদন করে। জনতা ক্রমশ: আন্দোলনে যোগ দেয়। এর মাঝে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কথিত ‘ফার্মের মুরগীছানারা’ বীরের শৌর্য নিয়ে রাজপথ দখল ও ছাত্র-যুবলীগসহ খুনি বাহিনীগুলোকে প্রাণের বিনিময়ে রুখে দাঁড়ায়। আন্দোলনটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। কারফিউ আর দেখামাত্র গুলির নির্দেশও ছাত্র-জনতা উপেক্ষা করে। গণঅভ্যুত্থানে জন্ম নেয়া এক যুবা বিপ্লবী স্মিত হেসে স্পষ্ট উচ্চারণে শুনিয়ে দেয় ‘পেছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা’। আহ্ কী সেই বলার ভঙ্গী! বিপ্লবী সব অস্তিত্ব! তাই গণঅভ্যুত্থান আর ‘পেছনে হটেনি’। ঘোষিত তারিখ একদিন এগিয়ে এনে ‘৩৬ জুলাই’ নির্ধারণ করা হয় ‘মার্চ টু গণভবন’, দুপুর দুটোয়। ‘গণভবন মার্চ’ শুরুর আগেই ‘চিহ্নিত স্বৈরাচার’ ‘গণভবন ত্যাগ করার’ দলিলে স্বাক্ষর করে। ৪৫ মিনিট সময় দেয়া হয় তাকে হেলিকপ্টারে ওঠার জন্য। হেলিকপ্টারে ওঠেন এবং দেশ ছাড়েন। গণঅভ্যুত্থানের বিজয় ঘোষিত হয়। কিছু ছাত্র-জনতা জানিয়ে দেয়, এটি কেবল গণঅভ্যুত্থানের বিজয় নয়, এটি দ্বিতীয় স্বাধীনতা, স্বাধীনতা ২০২৪।

বিপ্লব আর গণঅভ্যুত্থান প্রশ্ন
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সফল হবার পর জানা গেলো, এতে ‘সেনাদেরও’ কিছু অবদান আছে। তা স্বীকার করা উচিৎ। স্বৈরাচারের হুকুম মেনে সেনারা ছাত্র-জনতাকে গুলি করতে পারতো। তেমন ক্রুদ্ধ আদেশ ছিলো। সেনারা সবিনয়ে-সকৌশলে তা এড়িয়ে যায়। না হলে, আরো জীবন যেতো, হাজার হাজার। হয়তো তবুও ছাত্র-জনতা সফল হতো। কারণ জনসমুদ্রে তখন বাধাহীন উর্মি। সেনারা নিজদেশের সন্তানদের খুন করা থেকে বিরত থেকেছে, থাকতে পেরেছে। তাদেরও স্বীকৃতি পাওনা। তাই এই গণঅভ্যুত্থানের নাম ছাত্র-জনতা-সেনা গণঅভ্যুত্থান। উপযুক্ত নাম বটে। বিজয়ী গণঅভ্যুত্থানকে এখন ‘স্বৈরাচারী সরকারের’ ‘শুন্যস্থান’ পূরণ করতে হবে। ‘আধুনিক সরকার’ মানে তিনটি ‘বাহু’ (উইং) বা অঙ্গের (অর্গান) মিলিত রূপ: আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ। গণঅভ্যুত্থান বিজয়ী হবার অনতিবিলম্বে আইন বিভাগ-জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে। নির্বাহী বিভাগের প্রধান শেখ হাসিনাসহ সব সদস্য (মন্ত্রী ইত্যাদি) পালিয়েছেন বা লুকিয়েছেন। এটি শুন্য এখন। বিচার বিভাগ ‘দাঁড়িয়ে আছে’  অংশত। দাবি উঠেছে, স্বৈরাচারের সমর্থক উচ্চ আদালতের (হাইকোর্টের) বিচারকদের সরে দাঁড়াতে হবে, স্বেচ্ছায় অন্যথায় ‘সরিয়ে দেয়া’ হবে। ‘সরিয়ে দেয়া’ বিচারকদের জন্য বেশি অবমাননাকর হবার কথা।
প্রধান মনোযোগ এখন নির্বাহী বিভাগের দিকে। পতিত স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া ‘নির্বাহী কাঠামোর অংশ বিশেষ’ এখনো বহাল আছে। প্রশ্ন তা নিয়ে আছে। তবে প্রশ্ন এগিয়েছে আরো: ‘যা ঘটলো’ তা ‘গণঅভ্যুত্থান’ না ‘বিপ্লব’? কেউ কেউ একে ‘বিপ্লব’ নাম দিয়েছেন। তারা উল্লেখযোগ্য অস্তিত্ব বটেন। তাই তাদের দাবি আমলে নেয়ার দরকার আছে। যারা একে বিপ্লব বলছেন না, তাদের যুক্তি কী, তা-ও ‘শোনা’ দরকার। ‘বিপ্লব’ যদি মানি, তবে ইতোমধ্যেই বিপ্লব ‘আংশিক বেহাত’ হয়ে গেছে। আরো বেহাত-বিফল হবার ধারায় আছে। বিপ্লব মানে, আগে যা ছিলো, সবই ‘নাই হয়ে’ যাওয়া আর সেখানে নতুনের প্রতিস্থাপন। ‘সবতো নাই’ হয় নি। ‘সংবিধান’ নাই হয় নি, ‘প্রেসিডেন্ট’ নাই হয় নি, বিচার বিভাগ ‘অংশত’ দাঁড়িয়ে আছে। তা হলে বিপ্লব ‘হলো’? হয় নি বলে উচ্চারণ আছে, ‘উল্লেখযোগ্য কণ্ঠ’ থেকে।

রাজনীতি বিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে আমার কিঞ্চিত ভিন্নমত আছে। যা ঘটলো, যা ‘বিজয়ী’ হলো, সেটিকে আমি ‘বিপ্লব’ মনে করি না। বলি, এটি একটি গণঅভ্যুত্থান, মহান-সফল গণঅভ্যুত্থান। কারণ কী? কারণ, গণঅভ্যুত্থানের যে সংজ্ঞা রাজনীতি বিজ্ঞান দেয়, এখানে ঠিক তা-ই ঘটেছে। ছাত্ররা জেগে উঠেছে, জনতা জেগে উঠেছে, সেনারা শেষ মুহূর্তে তাতে ‘যোগ দিয়েছে’। এই ‘জেগেওঠা ও যোগদান’ এক মহান অভিজ্ঞতা, এক মহা উত্থান-‘ওঠার’ ঘটনা। ছাত্র-জনতা-সেনা ‘উঠেছে’ আর তার ভয়ে স্বৈরাচার পালিয়েছে। স্বৈরাচারের অভিজ্ঞতায় চসেস্কু ছিলো, গাদ্দাফী ছিলো। ছিলো প্রাণের মায়া। তাই পালিয়েছে। উত্থান-অভ্যুত্থান সফল হয়েছে, বিজয়ী হয়েছে। আরো দুটো ‘নোক্তা’ বিবেচনায় রাখা দরকার। বৈষম্যবিবোধী ছাত্র আন্দোলন মানে এর সংগঠক ‘নাহিদেরা’ কি একটি বিপ্লব করতে চেয়েছিলো? ওরা কোথাও ‘বিপ্লব’ উচ্চারণ করেছে? দুই প্রশ্নের জবাবই ‘না’ । সমন্বয়কেরা-বাইরেরা-নাহিদেরা যেখানে এটিকে ‘বিপ্লব’ বলে নি, ওরা যেখানে ‘বিপ্লব’ চায় নি, সেখানে ওদের ‘অর্জনকে’ আমি ‘বিপ্লব’ বললে তা কি সঠিক হবে, আরো অর্থপূর্ণ হবে, বেশি মহান হবে? সম্ভবত না।

দ্বিতীয় নোক্তা: সমন্বয়কেরা-বীরেরা-নাহিদেরা নিজেরা কি বিপ্লবী? ওদের ‘বিপ্লবী’ হবার কোনো প্রেক্ষাপট আছে? উত্তর ‘না’। ওরা ‘আন্দোলনটি’ শুরু করেছিলো একটি ‘বৈষম্যমুক্ত কোটা ব্যবস্থার’ দাবিতে, হাইকোর্ট বিভাগের ‘দুই অবিবেচক, অন্ধ বিচারকের এক অশুদ্ধ, অগ্রহণযোগ্য রায়’-এর সূত্রে। ওদের দাবি ‘পলাতক স্বৈরাচার’ তখনই মেনে নিলে আন্দোলনটি আর এগুতো? জবাব ‘না’ হবার ‘গ্রহণযোগ্য সম্ভাবনা’ বিদ্যমান। মি. ওবায়দুল কাদেরের ‘ছাত্রলীগ থ্যারাপি’-র পর তার পদত্যাগ ও ‘কথিত বিকৃত রাজাকারের নাতিপুতি’উচ্চারণের পর ‘ক্ষমা চাওয়ার দাবি’ পূরণ হলে আন্দোলনটি আর এগুতো? ‘এগুলে’ সেটি এমন জনসমর্থন’ পেতো? জবাব ‘না হবার গ্রহণযোগ্য সম্ভাবনা’ ছিলো। তার মানে আন্দোলনটি একটি ‘গণঅভ্যুত্থানে পরিণত’ হবার ক্ষেত্রে পলাতক স্বৈরাচার ও দোসরদের ‘অবদান’ বেশি। তাই এই অর্জনকে ‘ছাত্র-জনতা-সেনার গণঅভ্যুত্থান’ মানাই বেশি সঙ্গত।

বিপ্লব দাবি করার সমস্যা
‘বিপ্লব’ দাবি করায় সমস্যা আছে, জটিলতাও আছে। অভিজ্ঞতাও তা-ই বলে। ১৯৭১-এ বাংলাদেশি জনগণ যা অর্জন করেছিলো, উল্লেখযোগ্য গবেষক-পণ্ডিতদের কেউ কেউ তার নাম ‘বিপ্লব’ দিয়েছিলেন। ‘বাংলাদেশ রেভুলিউশন এণ্ড ইটস আফটারম্যাথ’ নামে আমার ডক্টরাল সুপারভাইজার প্রফেসর তালুকদার মনিরুজ্জামানের গবেষণাকর্ম আছে। রাজনীতি বিজ্ঞানের পণ্ডিত হিসেবে তাঁর জুড়ি কম আছে বিশ্বব্যাপী। মরহুম ড. তালুকদার স্যারের মাগফিরাত কামনা করি, এই সুযোগে। শ্রদ্ধাও কৃতজ্ঞতা জানাই তার তাৎপর্যময় সব গবেষণার জন্য। আমাদের আরেক মোহময়ী বক্তা-পণ্ডিত ড. সলিমুল্লাহ খান লিখেছেন ‘বেহাত বিপ্লব’। শব্দবন্ধ হিসেবে ‘বেহাত বিপ্লব’ শ্রুতিমধুর ও আকর্ষণীয়।

আমি বলি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে কোনো ‘বিপ্লব’ ঘটে নি। তা ছিলো একটি ‘রাজনৈতিক মুক্তিযুদ্ধ’, যার সাথে ‘ঘোষিত স্বাধীনতা’কে সফল করার প্রশ্ন জড়িয়ে ছিলো। সেই রাজনৈতিক মুক্তিযুদ্ধ সফল হওয়ায় ঘোষিত স্বাধীনতাও সফল হতে পেরেছিলো। তাই বাংলাদেশ নামের দেশ ৫৩ বছর পথ চলতে পেরেছে, চিরকাল চলবে এ প্রতিজ্ঞায়। কিন্তু যারা সেটিকে ‘বিপ্লব’ বলেছিলেন, ‘বিপ্লব’ ভেবে সব ‘বিপ্লবী’ ও ‘সমাজতন্ত্রী’ কর্ম পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, তার ‘সবই ব্যর্থ’ হয়েছে, মুখ থুবড়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদ প্রফেসর রেহমান সোবহান সেই সব ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করার জন্য এখনো বেঁচে আছেন। তিনি জীবিত থাকায় আমরা শান্তি-আনন্দ অনুভব করি। ‘প্রফেসর রেহমান সোবহানদের’ যাবতীয় বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছিলো। কেনো হয়েছিলো? কারণ সেটি কোনো ‘বিপ্লব’ ছিলো না, ছিলো কথিত ‘বুর্জোয়া ক্ষমতার পালাবদল’। ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছিলো,স্পষ্টতই এবং সঠিকভাবেই। বিপ্লব ঘটেনি, কোথাও। কারণ সেটি বিপ্লব ছিলো না, সেটির নেতা-কর্মীরা বিপ্লবী ছিলেন না, বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতও ছিলেন না।
আজ তবে কী?

আজ বাংলাদেশে একটি ছাত্র-জনতা-সেনার গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। এটিকে সংহত করতে হবে। এর অর্জন ও সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে হবে। কী করতে হবে, তা আমার আগের লেখায় বলেছি, সংক্ষেপে যদিও। পাঠক বিস্তারিত পড়তে চান না। নতুন ভাব-ভাবনাও কম চান। ধীরস্থির ও নতুন ভাবনা শোনা-গ্রহণ-ধারণের পাঠক-জনতা গড়া এক দীর্ঘ মেয়াদী দায় বটে।

ড. তারেক ফজল রাজনীতি বিজ্ঞানের শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

tareqfazal@gmail.com

(লেখকের নিজস্ব মত)

সফল গণঅভ্যূত্থান, পতিত সরকারের প্রেসিডেন্ট ও তাদের কাটাছেঁড়া করা সংবিধানের অবস্থান by ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশে সংঘঠিত হয়ে গেল সফল এক গণঅভ্যূত্থান। এটি ঘটিয়েছেন দেশের আপামর ছাত্র-জনতা। তাদেরকে আন্তরিক অভিনন্দন। যে প্রজন্মকে অনেকে দেশ ও সমাজবিচ্ছিন্ন ভেবেছিলেন, সেই প্রজন্মই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বেশি জীবন দিল। যারা বর্তমান প্রজন্মকে ফেসবুক আর টিকটক প্রজন্ম বলে ঠাট্টা করতেন তাদের লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া উচিৎ। সুকৌশলে জাতিকে বহুধা বিভক্ত করে রাখা দুর্নীতিবাজ প্রবীণ রাজনীতিবিদদের চেয়ে তরুণ প্রজন্মের হাতে বাংলাদেশ নিরাপদ। সংগঠিত গণঅভ্যূত্থানকে আমি বিবেচনা করি এশিয়ার মধ্যে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ট গণঅভ্যূত্থান। এই গণঅভ্যূত্থানের পর দায়িত্ব নেয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করা শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার টিমের দিকে জাতি চেয়ে আছে। আপনাদেরকে সফল হতেই হবে।

গত ১৬ বছরে পতিত স্বৈরশাসক সংবিধানকে নিজে ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে ও চূড়ান্ত কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠতে কাটাছেঁড়া করে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে এসেছিল যে একজন নাগরিক চাইলেও সংবিধানটি সঠিকভাবে অনুসরণ করে চলতে পারবেন না সেটা না ভেঙে (one cannot follow the constitution properly without breaking it)। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও দায়িত্ব নিয়ে পড়েছেন বেশ ঝামেলায়।

তারাও দৃশ্যত: সংবিধানের কিছু অংশ মানছেন বা মানতে পারছেন আবার অন্য অংশ কিংবা বহু অংশ মানছেন না বা মানতে পারছেন না।

সঙ্গত: কারণে প্রশ্ন উঠছে স্বৈরশাসকের পতনের পর তাদের স্বার্থে কাটাছেঁড়া  করে রেখে যাওয়া সংবিধান ও সেটিং থাকে কিভাবে? কেনই বা থাকবে? কেনই বা মানতে হবে? স্বৈরশাসকের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টকেও মানতে হবে বা রাখতে হবে কেন? মনে করিয়ে দেয়া দরকার চরম কর্তৃত্বপরায়ণ স্বৈরশাসনের প্রধান ব্যক্তির একক ইচ্ছায় প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট হওয়া ব্যক্তি তো বটেই, নিয়োগের একদিন আগেও দেশের কেউ জানতো না কে প্রেসিডেন্ট হবেন। তাছাড়া প্রেসিডেন্টকে যে সংসদ নির্বাচিতে করেছিল সে সংসদ কিভাবে গঠিত হয়েছে তা জাতির জানা। জাতির প্রকৃত কোনো মেন্ডেট ছিল না সে সংসদে। এখন প্রশ্ন উঠেছে যে, সংসদের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন তার অবস্থানটা কতোটা বৈধ তাও স্পষ্ট নয়। যেহেতু সংসদ ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত হয়েছে।

একটা ill motive ও mala fide intention থেকে প্রেসিডেন্টকে পদে উনাকে বসানো হয়েছিল, যেমনটি করা হয়েছিল প্রধান বিচারপতিকে কেন্দ্র করে। আরো একটু সময় পেলেই সদ্য পদত্যাগ করা প্রধান বিচারপতি তো সফল গণঅভ্যূত্থানকে প্রায় নস্যাত করেই ফেলছিলেন।

সফল গণঅভ্যূত্থানের পর গণঅভ্যূত্থান থেকে অনুসৃত ক্ষমতা বা প্রাপ্ত মেন্ডেটই হয় নতুন সরকারের ক্ষমতার বা চলার পথের ভিত্তি। সফল গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গঠিত হয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সেই প্রতিষ্ঠিত থিউরি “social contract” (সামাজিক চুক্তি)। তাই গণঅভ্যূত্থান থেকে জন্ম নেয়া নতুন সরকারকে তাদের বৈধতার জন্য অন্য দিকে তাকাতে হয় না। গণঅভ্যূত্থানের পর সাধারণত গঠিত হয় ‘বিপ্লবী সরকার’। কিন্তু প্রফেসর ড. ইউনূস ও তার টিম গঠন করলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারপরও তারা সংবিধানের কিছু অংশ মানছেন আবার কিছু অংশ মানছেন না বা মানতে পারবেন না। কিছু অংশ মানতে গিয়েও তালগোল পাকানো হচ্ছে। এতে বিপদে পড়ার আশঙ্কা আছে বা দিন দিন তা বাড়ছে। এভাবে করতে থাকলে অনেক সমস্যায় তারা পড়তে পারেন বা পড়ে থাকবেন। ইতিহাসে বিপ্লব হবার পর প্রতিবিপ্লব, কাউন্টার বিপ্লব বা ক্যু হবার পর কাউন্টার ক্যু বা অভ্যূত্থানের পর পাল্টা অভ্যূত্থান ইতিহাসে অজানা নয়। বাংলাদেশেও অতীতে হয়েছে। বিশ্বে তো বহু উদাহরণ আছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিৎ ছিল সফল গণঅভ্যূত্থানে স্বৈরশাসনের যেহেতু পতন হয়েছে এবং সংবিধানে যেহেতু তাদের ক্ষমতা নেয়ার বিধান (provision) নেই তারা প্রেসিডেন্টকে চাপ দিয়ে পদত্যাগ করানো এবং এরপর একটি শক্তিশালী “বিপ্লবী সরকার” গঠন করা। গণঅভ্যূত্থান থেকে অনুসৃত মেন্ডেট দিয়ে ঝড়ের বেগে দেশ ও সরকার চালাতে পারতেন এবং সংবিধানসহ সবকিছু সংস্কার ও রিপেয়ার করতে পারতেন। পদচ্যুত হওয়া সরকারের কোনকিছুর মুখাপেক্ষি হওয়া লাগতো না। যেমনটা সামরিক শাসন জারির পর সংবিধান নয় বরং সামরিক আইনের বিধিমালা দিয়ে দেশ শাসন করা হয়।
“বিপ্লবী সরকার” গঠন না করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করলেও তাদের মেন্ডেটকৃত সংস্কার করে দুটি উপায়ে বৈধতা নিশ্চিত করে ক্ষমতা ছাড়তে পারেন। প্রথমত: একটি গণভোট দিয়ে তাদের করা সংস্কারের ও ক্ষমতায় থাকার বৈধতা নিতে পারেন। দ্বিতীয়ত: তারা যদি নতুন সংবিধান রচনায় হাত দেন অথবা বর্তমান সংবিধানের বেশিরভাগ বা মূল বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে সংস্কার করে প্রায় নতুন সংবিধান রচনায় অগ্রসর হন তাহলে একটি Constituent Assembly গঠন করবেন শুধুমাত্র তাদের আমূল পরিবর্তন বা সংস্কারকৃত সংবিধানের অনুমোদনের জন্য। এর সাথে সাথে চাইলে একসাথে গণভোটেরও ব্যবস্থা করতে পারেন।

 “বিপ্লবী সরকার” গঠন না করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে যেভাবে এগুচ্ছেন সেভাবে এগুতে থাকলে প্রতি পদে পদে বাঁধার পাহাড় ডিঙ্গাতে হবে। কোন সময় বাঁধা এমনভাবে আসতে পারে যে তা হয়তো ডিঙ্গানো সম্ভব নাও হতে পারে। মনে রাখবেন মানুষের আবেগ, উচ্ছ্বাস ও স্বত:স্পূর্ততা সব সময় সমান বা একই ডিগ্রীতে থাকে না। সময়ের ব্যবধানে তা ভাটা পড়ে, পড়তে বাধ্য। নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতা ইন্তেকাল করলেও যে শোক ও বেদনা প্রথম দিন থাকে ছয় মাস বা এক বছর পর তো সে মাত্রায় থাকে না।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাষ্ট্রচিন্তক, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk