Tuesday, May 13, 2025

গাজা যুদ্ধ নিয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি মার্কিন দূতের

গাজা যুদ্ধ ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত করছে ইসরায়েল- এমন চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।

তিনি বলেছেন, ইসরায়েল জিম্মি মুক্তি সংক্রান্ত আলোচনায়ও বাধা দিচ্ছে। উইটকফের মতে, এখন যুদ্ধবিরতি ও বন্দিমুক্তির চুক্তিই সবচেয়ে যৌক্তিক ও মানবিক পদক্ষেপ। সোমবার (১২ মে) তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা আনাদোলুর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হাতে আটক ইসরায়েলি বন্দিদের পরিবারের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব কথা বলেন উইটকফ। ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, রোববার (১১ মে) ওই বৈঠকে তিনি ইসরায়েলি সরকারের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন। তবে বৈঠকটি কবে ও কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি চ্যানেলটি।

বৈঠকে উইটকফ বলেন, আমরা চাই বন্দিরা ফিরে আসুক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ইসরায়েল এখনো যুদ্ধ থামাতে প্রস্তুত নয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র তার এমন মন্তব্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনা কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলে উইটকফ বলেন, ইসরায়েল সরকার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে, অথচ বাস্তবতা হলো- এই যুদ্ধ থেকে আর কোনো কার্যকর অগ্রগতি আসছে না।

তিনি আরও বলেন, এখনো একটি সুযোগ রয়েছে, যা আমরা আশা করি ইসরায়েল ও মধ্যস্থতাকারীরা কাজে লাগাবে। আমরা বন্দিদের ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি এবং এ লক্ষ্যে সব পক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছি।

স্টিভ উইটকফের এমন মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা গোষ্ঠী হামাস জানিয়েছে, তারা মার্কিন-ইসরায়েলি দ্বৈত নাগরিক সৈনিক আলেকজান্ডার ইদানকে মুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই আলোচনা যুদ্ধবিরতির সম্ভাব্য পথ খুলে দিতে পারে।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ দূতের এমন বক্তব্য সামনে এলো তার আসন্ন সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের প্রাক্কালে। এই সফর চলবে মঙ্গলবার (১৩ মে) থেকে শুক্রবার (১৬ মে) পর্যন্ত। সফরে ট্রাম্পের ইসরায়েল যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি মার্কিন ও ইসরায়েলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে টানাপোড়েন বেড়েছে। ট্রাম্প তার নিজস্ব মধ্যপ্রাচ্যনীতি বাস্তবায়নে দলীয়ভাবে এগোচ্ছে, যা ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে তুলতে পারে।

ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, এখনো গাজায় ৫৯ ইসরায়েলি বন্দি রয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তত ২১ জন জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। অপরদিকে ইসরায়েলের কারাগারে প্রায় ৯ হাজার ৯০০ ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন বলছে, এসব বন্দির অনেকেই নির্যাতন, অনাহার ও চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন।

এই পরিস্থিতিতে স্টিভ উইটকফের মন্তব্য শুধু গাজা যুদ্ধ নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া নিয়েই নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ছবি : সংগৃহীত


যুদ্ধ করল ভারত-পাকিস্তান, পোয়াবারো চীনের

দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের হঠাৎ সংঘাতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশ। ৭ মে দিবাগত রাতে স্থানীয় সময় রাত ১টা ৫ মিনিট থেকে ১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালায় ভারতের বিমানবাহিনী।

পাল্টা জবাবে পাকিস্তান আকাশে তোলে তাদের সর্বাধুনিক চীনা প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান, শুরু হয় এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র আকাশযুদ্ধ। তবে এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও সবচেয়ে বেশি লাভবান হলো যে দেশটি, সেটি হলো- চীন।

পাকিস্তান দাবি করেছে, এই সংঘাতে তারা প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে চীনের তৈরি জে-টেন-সি ‘ভিগারাস ড্রাগন’ যুদ্ধবিমান এবং এর মাধ্যমে গুলি করে ভূপাতিত করেছে ভারতের দুটি ফ্রান্সের তৈরি রাফাল জেট। যদিও ভারত এই দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে, তবে মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে- পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান দুটি ভারতীয় জেট ধ্বংসে সফল হয়েছে।

এটি ছিল চীনা চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশনের তৈরি জে-টেন-সি যুদ্ধবিমানের প্রথম যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা। আর এই অভিষেক যুদ্ধেই চীন কুড়িয়ে নেয় অভাবনীয় অর্থনৈতিক লাভ। যুদ্ধ শুরুর মাত্র তিন দিনের মাথায় চেংদু করপোরেশনের শেয়ারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়।

৬ মে যার মূল্য ছিল ৫৯.২৩ ইউয়ান, তা ৯ মে-তে গিয়ে দাঁড়ায় ৮৮.৮৮ ইউয়ানে। অন্যদিকে, ভারতের ব্যবহৃত রাফাল জেটের নির্মাতা ফরাসি প্রতিষ্ঠান ডেসল্ট এভিয়েশন-এর শেয়ারে ধস নামে ; কমে যায় ৫ শতাংশেরও বেশি।

সোমবার (১২ মে) প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট পোর্টাল বুলগারিয়ান মিলিটারির প্রকাশিত এক নিবন্ধ থেকে এ তথ্য জানা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এটাই প্রমাণ করে যে আসল যুদ্ধক্ষেত্রেই পরীক্ষিত অস্ত্র সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। জে-টেন-সি এর সফল ব্যবহার চীনকে বিশ্ব অস্ত্রবাজারে নতুন আস্থার জায়গায় নিয়ে গেছে। পাকিস্তান ছাড়াও ইতোমধ্যেই মিশর, আলজেরিয়া ও সৌদি আরবের সঙ্গে চীন আলোচনা চালাচ্ছে এই যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে।

জে-টেন-সি যুদ্ধবিমানটি চীনের ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল ফাইটার। এতে রয়েছে এএসএ রাডার, পিএল-১৫ দূরপাল্লার মিসাইল এবং অত্যাধুনিক ডাব্লিউএস-১০বি ইঞ্জিন- যা একে আধুনিক যুদ্ধে কার্যকর একটি অস্ত্রে পরিণত করেছে।

চীন ও পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনের অস্ত্র রপ্তানির ৬০ শতাংশই গেছে পাকিস্তানে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, পাকিস্তান এখন কার্যত চীনের সামরিক পরীক্ষাগার। সেই পরীক্ষার বাস্তব ফল এখন চীন ঘরে তুলছে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে।

চীন এই পুরো পরিস্থিতিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছে তাদের ‘ডিফেন্স ইকোনমি’ কৌশল বাস্তবায়নে। যুদ্ধ না করেই তাদের অস্ত্র বিক্রি বেড়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে, আর প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রমাণ মিলেছে বাস্তব যুদ্ধে।

অন্যদিকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ করে পেয়েছে শুধু ক্ষয়ক্ষতি- প্রাণহানি, ব্যয়বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই পরিণতি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে-আধুনিক যুগে যুদ্ধ কি কেবল সংঘর্ষ, নাকি তা হয়ে উঠেছে বড় শক্তিগুলোর লাভের মঞ্চ?

চীনা প্রযুক্তির জে-টেন-সি যুদ্ধবিমান। ছবি : সংগৃহীত
চীনা প্রযুক্তির জে-টেন-সি যুদ্ধবিমান। ছবি : সংগৃহীত


পাকিস্তানের প্রতি তুরস্কের প্রকাশ্য সমর্থনের নেপথ্যে কী?

ভারত এবং পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও গত কয়েক দিনে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষের পর তুরস্ক খোলাখুলিভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়েছে, আর অন্যদিকে ইসরায়েল সমর্থন দিয়েছে ভারতকে।

তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর তুরস্ক এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে সুস্থ ও সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।

এটা আকর্ষণীয় যে, যখন বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এই সংঘর্ষে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছে, তখন তুরস্ক এবং ইসরায়েল নিজেদের পক্ষ অবলম্বন করেছে। ভারত শুক্রবার অভিযোগ করেছে যে, পাকিস্তান তুর্কি ড্রোন ব্যবহার করছে এবং পাকিস্তানও পাল্টা দাবি করেছে যে, ভারত ইসরায়েলি ড্রোন ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালিয়েছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান উল্লেখ করেন, পাকিস্তানকে নিজের ভাইয়ের মতো মনে করেন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। এরদোয়ান পাকিস্তানের প্রতি একাধিক বন্ধুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেমন তুরস্কের বিমানবাহিনীর একটি সি-১৩০ জেট পাকিস্তানে জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য অবতরণ করেছে এবং তুরস্কের যুদ্ধজাহাজ করাচি বন্দরে নোঙর করেছে, যা বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে, ভারতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে, পাকিস্তান ভারতের বিভিন্ন শহরে ৩০০ থেকে ৪০০ তুর্কি ড্রোন ব্যবহার করেছে। তুরস্কের সাথে ভারতের সম্পর্কের অস্বস্তি আরও বাড়ছে, কারণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পরও কখনো তুরস্ক সফর করেননি।

তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে একটি গভীর মতাদর্শিক সম্পর্ক রয়েছে, যা স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে শুরু। তুরস্ক ও পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, এছাড়া দেশ দুটি নিরাপত্তা বিষয়ক সহযোগিতা অনেক গভীর এবং পরীক্ষিত।

পাকিস্তানের অনেক সেনা জেনারেলের তুরস্কের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বেড়েছে। এরদোয়ান পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে ধর্মীয় ভিত্তিতে আরও গভীর করেছেন, বিশেষত কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি পাকিস্তানের পক্ষ নিতে পিছপা হন না।

সৌদি আরবে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত তালমিজ আহমেদ বলেছেন, তুরস্ক পাকিস্তানের সাথে তার পুরোনো বন্ধুত্ব ঝালাই করছে এবং ধর্মীয় সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে। তুরস্কের এই মনোভাবের পেছনে এমন একটি লক্ষ্যও রয়েছে, যেখানে এরদোয়ান ইসলামী বিশ্বের নেতৃত্ব নিতে চান, যা সৌদি আরবের সঙ্গে সঙ্ঘাত সৃষ্টি করতে পারে।

প্রসঙ্গত, তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি বিশ্বের নেতৃত্বে আগ্রহী। এরদোয়ান তার ক্ষমতায় আসার পর ইসলামি ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। পাকিস্তানকে তুরস্কের সমর্থন, বিশেষত কাশ্মীর ইস্যুতে, এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়িত করার অংশ হতে পারে। এছাড়া, তুরস্ক পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে এবং একে ইসলামী বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখছে।

এদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ় হলেও সৌদি আরবও পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। তবে, সৌদি আরবের ভারতের সাথে সম্পর্ক গভীর হওয়ায় পাকিস্তানের জন্য তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মধ্যে কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

তুরস্ক ও পাকিস্তান, দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব এবং মতাদর্শিক সম্পর্ক থাকার পরও তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক এবং সামরিক সহযোগিতাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তুরস্ক ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানকে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখে।

তুরস্ক এবং পাকিস্তান উভয়ই কাশ্মীর ইস্যুতে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। এরদোয়ান কাশ্মীরের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অবস্থানকে স্পষ্টভাবে সমর্থন করেছেন এবং ভারতের বিরুদ্ধে তুরস্কের রাজনৈতিক অবস্থানও যথেষ্ট দৃঢ়। এভাবে, তুরস্কের প্রকাশ্য সমর্থন পাকিস্তানকে কেবল সম্পর্কের সীমারেখায় নয় বরং ইসলামিক বিশ্বের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ এক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে।

তবে, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মতাদর্শিক সম্পর্কের পাশাপাশি, পারস্পরিক সুবিধা এবং সহযোগিতা কতটুকু দৃঢ় হতে পারে তা নির্ভর করবে সময়ের ওপর।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি : সংগৃহীত
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি : সংগৃহীত

আপনি সেনাদের গাজায় যুদ্ধাপরাধ করতে পাঠাচ্ছেন: নেতানিয়াহুকে ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান

গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়েছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান মোশে ইয়ালোন। তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সেনাপ্রধান এয়াল জামিরের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়নেটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোশে ইয়ালোন বলেন, বর্তমান সেনাপ্রধান ‘তাঁর সেনাদের গাজায় যুদ্ধাপরাধ করতে পাঠাচ্ছেন’ এবং ইসরায়েলি সরকার ‘ইহুদি নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হয়েছে’।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্যে দেশটির সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘আপনি সৈনাদের যুদ্ধাপরাধ করতে পাঠাচ্ছেন’।

ইয়ালোন বলেন, ইসরায়েল হামাসের কাছে বন্দীদের পরিত্যাগ করেছে। দেশটি গাজায় ‘জাতিগত নিধন’ অভিযান চালাচ্ছে।

মোশে ইয়ালোন ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি দেশটির সেনাবাহিনীর বর্তমান প্রধান এয়াল জামিরকে আক্রমণ করে বলেন, তিনি ‘স্পষ্টভাবে কোনো অবৈধ আদেশ’ প্রতিহত করছেন না। বরং তাঁর অধীনে ‘সেনাদের যুদ্ধাপরাধ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন।’

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও ইতামার বেন গাভির-এর গাজা পুরোপুরি দখল ও ফিলিস্তিনি জনগণকে সেখান থেকে সরিয়ে ইহুদি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে ইয়ালোন বলেন, ‘জাতিগত নিধন, স্থানান্তর, নির্বাসন—যা–ই বলেন না কেন, এটা যুদ্ধাপরাধ।’

মোশে ইয়ালোন আরও বলেন, স্মোট্রিচ ও ইতামার বেন গাভির হামাসের জায়গায় নতুন কাউকে আনতে চায় না। তারা সেখানে সামরিক শাসন ও ইসরায়েলি বেসামরিক প্রশাসন চায়।’

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ তুলে ইয়ালোন বলেন, ‘এই যুদ্ধ ১৯ মাস ধরে চলছে, যা ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ। আর প্রধানমন্ত্রী যা করছেন, তা কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা।’ তিনি আরও বলেন, ‘নেতানিয়াহু এখনো ৭ অক্টোবরের দায় স্বীকার করেননি, যদিও সেটি মূলত তারই দায়িত্ব।’

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্যে দেশটির সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘আপনি সৈনাদের যুদ্ধাপরাধ করতে পাঠাচ্ছেন, আর বলছেন আপনি শান্তিতে ঘুমান? এই যুদ্ধের দায় কার? আপনি কি সত্যিই নির্ভার বিবেকে ঘুমাতে পারেন?’

সরকারের উদ্দেশ্যে কড়া বার্তা দিয়ে ইয়েলোন বলেন, ‘এ সরকার আমাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটি বদলানো এখন সময়ের দাবি।’

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান মোশে ইয়ালোন
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান মোশে ইয়ালোন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরের আগে এক জিম্মিকে মুক্তি দিল হামাস

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরের আগেই দেশটির এক নাগরিককে জিম্মিদশা থেকে মুক্তি দিয়েছে হামাস। ওই জিম্মির নাম এডান আলেকজান্ডার। তিনি ইসরায়েলি বাহিনীর একজন সদস্য। সোমবার তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে হামাস।

হামাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এইমাত্র আল কাসেম ব্রিগেড (হামাসের সামরিক শাখা) জায়নবাদী সেনাসদস্য ও মার্কিন নাগরিক এডান আলেকজান্ডারকে মুক্তি দিয়েছে। একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর জন্য মধ্যস্থতাকারীরা যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হামাসের যোগাযোগের পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হলো।’

হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন একটি সূত্র জানিয়েছে, গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিসে রেডক্রসের হাতে এডান আলেকজান্ডারকে তুলে দেওয়া হয়। পরে তাঁর ইসরায়েলের ভূখণ্ডে পৌঁছানোর খবর নিশ্চিত করে দেশটির সরকার। যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হামাস সরাসরি যোগাযোগ করছে—এমন তথ্য সামনে আসার পরই এডানকে মুক্তি দেওয়া হলো।

মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্য সফরের অংশ হিসেবে সৌদি আরবে পৌঁছানোর কথা ছিল ট্রাম্পের। এডান আলেকজান্ডারকে মুক্তি দেওয়ার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত অ্যাডাম বোয়েলার বলেছিলেন, মুক্তি দেওয়ার খবরটি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। জিম্মি অপর চার মার্কিন নাগরিকের মরদেহ ফেরত দেওয়ার জন্য হামাসের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। ইসরায়েলি হিসাবে ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। এ ছাড়া ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ৫৮ জন এখনো গাজায় বন্দী রয়েছেন। এই জিম্মিদের ৩৪ জনই মারা গেছেন বলে দাবি ইসরায়েলের।

হামাসের হামলার দিন থেকেই গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, তখন থেকে ইসরায়েলের হামলায় গাজায় প্রায় ৫৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ফিলিস্তিনি। এদিকে ইসরায়েলি সব জিম্মি মুক্ত না হওয়ায় ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরায়েলিদের ক্ষোভ বাড়ছে।

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরে যেসব বিষয় গুরুত্ব পাবে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আজ মঙ্গলবার চার দিনের মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশ সফরে যাচ্ছেন। এই সফরে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে একাধিক বৈঠকে যোগ দেবেন তিনি। ট্রাম্প এমন সময় এই সফর করছেন, যখন মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই সফরে গাজায় যুদ্ধবিরতি, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, বাণিজ্য ও তেলের দাম কমানো নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। এসব দেশে তাঁর সন্তানদের একাধিক ব্যবসা ও আবাসন প্রকল্প আছে। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে দুটি দেশ সৌদি আরবে বৈঠকে বসেছে। এ কারণে সৌদি আরব ওয়াশিংটনের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি বিনিময় সংক্রান্ত আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে কাতার।

ট্রাম্পের সফরের প্রথম দিনেই সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র বিনিয়োগ ফোরাম অনুষ্ঠিত হবে। চলতি সপ্তাহেই এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এতে অতিথি হিসেবে থাকার কথা রয়েছে ব্ল্যাকরকের সিইও ল্যারি ফিঙ্ক, প্যালান্টিয়রের সিইও অ্যালেক্স কার্প এবং সিটি গ্রুপ, আইবিএম, কোয়ালকম, অ্যালফাবেট ও ফ্রাঙ্কলিন টেম্পলটনের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা। এ ছাড়া হোয়াইট হাউসের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্রিপ্টোবিষয়ক উপদেষ্টা ডেভিড স্যাকসও এই ফোরামে অংশ নেবেন।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে ঘিরে বৈশ্বিক কেন্দ্র হতে চাইছে। এ জন্য তারা এআই অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। এ কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সেমিকন্ডাক্টর কিনতে চাইছে। বাইডেনের আমলে এ বিষয়ে আইনি জটিলতা থাকলও ট্রাম্প প্রশাসন সে বিষয়টি সহজ করতে চাইছে।

পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। অন্যদিকে সৌদি আরব নিজস্ব বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালু করতে চায়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ও সহায়তা চেয়েছে দেশটি।

ইসরায়েল-গাজা আলোচনা

ট্রাম্পের সফরের আরেকটি প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎ। তিনি এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে গাজা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যও করেছেন তিনি। সম্প্রতি বলেছিলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। শুধু তা-ই নয়, তিনি গাজাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ আবাসন প্রকল্প’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।’

তেলের দাম এবং অর্থনীতি

সিরিয়ার নতুন সরকারের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয় নিয়েও এই সফরে আলোচনা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ব্রাঞ্চ। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন পারস্য উপসাগরের নাম পাল্টে ‘আরব উপসাগর’ হিসেবে ঘোষণা দিতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে। আরব দেশগুলো নতুন নাম উত্সাহের সঙ্গে গ্রহণ করলেও ইরান কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

তেলের দাম নিয়ে আলোচনাও গুরুত্ব পাবে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে (ওপেক) তেলের উৎপাদন বাড়াতে চাপ দিয়ে আসছিলেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের জন্য দাম কমানো যায়। তাই এই সফরে তেলের উৎপাদন বাড়ানো নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে।

জিম্মি এডার আলেক্সান্ডারের মুক্তির পর তাঁর ছবি নিয়ে ইসরায়েলিদের উচ্ছ্বাস। সোমবার ইসরায়েলে তেল আবিবের
জিম্মি এডার আলেক্সান্ডারের মুক্তির পর তাঁর ছবি নিয়ে ইসরায়েলিদের উচ্ছ্বাস। সোমবার ইসরায়েলে তেল আবিবের। ছবি: এএফপি

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি যেভাবে হলো by কারিশমা মেহরোত্রা, রিক নোয়াক ও নাটালি এলিসন

চার রাত দুই দেশের মধ্যে দোষ চাপানোর খেলা চলল। ভারত আর পাকিস্তানের বড় বড় শহরের আকাশ দিয়ে পাল্টাপাল্টি উড়ে গেল মিসাইল আর ড্রোন। মনে হচ্ছিল পারমাণবিক অস্ত্রধর প্রতিবেশী দুই দেশ বোধ হয় সর্বাত্মক যুদ্ধে নেমেই গেল! এরপর হঠাৎ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করলেন।

শনিবার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প পোস্ট করলেন, ‘ভারত আর পাকিস্তান সম্পূর্ণ আর তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’ তিনি জানান যে সিদ্ধান্তে আসতে ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাতব্যাপী দীর্ঘ আলোচনা’ করতে হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির এই হঠাৎ ঘোষণার আগে চার দিন দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েই চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র এখানে কোনো ভূমিকা রাখবে কি না মধ্যস্থতায়, তা নিয়ে ধোঁয়াশা বজায় ছিল।

শনিবার ভারত ও পাকিস্তানে যখন স্বস্তির আবহ চলছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র তৃপ্ত ছিল আত্মতুষ্টি নিয়ে। কিন্তু কাশ্মীর আরও এক সহিংসতার রাত কাটাল। দুই দেশই যুদ্ধবিরতির পরপরই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। আসলে এটাই বাস্তবতা। এই যুদ্ধবিরতি বোধ হয় এক সাময়িক স্বস্তি। স্থায়ী কিছু নয়।

শুক্রবার ওয়াশিংটনের সময় দুপুর নাগাদ ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করেন। তখন যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিলেন পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিতে। ভ্যান্স মোদিকে একটি সম্ভাব্য ‘প্রস্থান পথ’ প্রস্তাব করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আশা করছিলেন যে পাকিস্তানিরাও এই ঝামেলা থেকে বের হয়ে আসতে সম্মত হবে। পরবর্তী ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা উভয় দেশের সমকক্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ চালিয়ে যান।

একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়, পররাষ্ট্রসচিব মার্কো রুবিও শুক্রবার রাতের বেশির ভাগ সময় ভারত ও পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটানা যোগাযোগ রেখে চুক্তিটি চূড়ান্ত করেন। ‘আমরা প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং প্রধানমন্ত্রী শরিফের প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্তের প্রশংসা করি, কারণ তাঁরা শান্তির পথ বেছে নিয়েছেন।’ শনিবার এক্সে (টুইটারের নতুন নাম) এক পোস্টে লেখেন রুবিও। তিনি যোগ করেন, এই উদ্যোগে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের ভূমিকা ছিল বিস্ময়কর। এর ঠিক আগের দিনই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা একপ্রকার নাকচ করে দিয়েছিলেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেছিলেন, ‘আমরা এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছি না, যা মূলত আমাদের ব্যাপারই নয় এবং যার ওপর আমেরিকার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’ তিনি সেই সঙ্গে আরও বলেছিলেন, ‘আমরা এসব দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি না।’

শনিবার ইসলামাবাদ দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার স্বীকৃতি দেয়। এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, এই চুক্তির ভিত্তি ছিল দুটি প্রধান বিষয়—এক, গুরুতর যুদ্ধবিস্তার বা সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা, এবং দুই, হোয়াইট হাউস প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, অর্থাৎ বাইরের চাপে সমাধান।’

পাকিস্তানের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মঈদ ডব্লিউ ইউসুফ এক্সে লিখেছেন, ‘উত্তেজনা প্রশমন শেষ পর্যন্ত পুরোনো ছক অনুযায়ীই হয়েছে—তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা, যার নেতৃত্বে ছিল যুক্তরাষ্ট্র।’

তবে ভারতীয় কর্মকর্তারা এই প্রসঙ্গে অনেকটাই নিশ্চুপ ছিলেন। নয়াদিল্লির কয়েকজন বিশ্লেষক প্রকাশ্যে রুবিওর বক্তব্য নিয়ে আপত্তি জানান। রুবিও বলেছিলেন যে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে ‘খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা’তে রাজি হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে সহায়তা এই প্রথম নয়। এর আগে ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে কারগিল যুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানান এবং ভারত–নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।

ইউক্রেন আর গাজায় যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন। সেই হিসেবে যত ঝামেলাই থাকুক, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এই যুদ্ধবিরতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বিজয় তাতে সন্দেহ নেই। বৃহস্পতিবার রুবিও ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে কথা বলেন। এরপরই এই কূটনৈতিক উদ্যোগ গতি লাভ করে।

এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে তখন উত্তেজনা বাড়ছিল। দুই দেশ পরস্পরের দিকে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। রুবিও তখন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলেন। রুবিওর সঙ্গে মুনিরের এই কথোপকথন এই সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটা রেখেছে।

সেদিনই পরে রুবিও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে কথা বলেন। দার পরে জিও নিউজকে বলেছেন যে রুবিও তাঁকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে বলেন, কারণ ‘দুই দেশই পরমাণু অস্ত্রের মালিক। পৃথিবী এটা সমর্থন করবে না।’ দার তখন রুবিওকে বলেন, ‘বল এখন ভারতের কোর্টে।’ রুবিও এরপর জয়শঙ্করকে ফোন করেন।

ঘণ্টাখানেক পর, বেলা সাড়ে তিনটায় পাকিস্তানের মিলিটারি অপারেশনসের ডিরেক্টর জেনারেল ফোন করেন ভারতের একই পদে থাকা ব্যক্তিকে। এই কথা জানিয়েছেন ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি। তবে এই যোগাযোগ পাকিস্তান শুরু করেছে, তা মানতে রাজি নন পাকিস্তানি একজন কর্মকর্তা।

যা হোক, শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ বিকেল ৫টা থেকে ভূমি, বায়ু ও জলপথে সব রকম গোলাগুলি ও সামরিক কার্যক্রম বন্ধে রাজি হন। এ কথা জানা গেছে মিশ্রির বয়ানে।
তবে যুদ্ধবিরতির এই ক্ষণিকের সুযোগটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সম্ভাবনার জন্ম দেওয়ার আশা দ্রুতই ভেঙে পড়ল।

শনিবার সন্ধ্যায় ভারতীয় গণমাধ্যমে এক সরকারি বিবৃতি ছড়িয়ে পড়ে। টেলিভিশন উপস্থাপকরা হুবহু তা পড়ে শোনান—‘ভারত ঘোষণা করছে, ভবিষ্যতে যেকোনো সন্ত্রাসী হামলাকে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি জানান, ভারত তার ‘যুদ্ধনীতি পুনঃসংজ্ঞায়িত করছে’ এবং যদি আরেকটি সন্ত্রাসী হামলা হয়, তাহলে ভারত ‘আরও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের পথ খোলা রাখছে।

এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারত ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিভাজক রেখার আশপাশে বিস্ফোরণের শব্দ ও ড্রোনের গুঞ্জন শোনা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। নয়াদিল্লি অভিযোগ তোলে, পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তবে ইসলামাবাদ দৃঢ়ভাবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে।

ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রোগ্রামের নন–রেসিডেন্ট ফেলো ক্রিস্টোফার ক্ল্যারির মতে, ‘আমরা হয়তো এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছি। এর সঙ্গে গত তিন দশকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল যে অবস্থায় আছে তার মিল আছে।’ ক্ল্যারির কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে এর মানে, ভবিষ্যতেও ভারত আর পাকিস্তানের মাঝে অনবরত হামলা ও পাল্টা হামলা চলতেই থাকবে।

* কারিশমা মেহরোত্রা ওয়াশিংটন পোস্টের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সংবাদদাতা
* রিক নোয়াক ওয়াশিংটন পোস্টের আফগানিস্তান ব্যুরো প্রধান
* নাটালি এলিসন ওয়াশিংটন পোস্টের হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি
- ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ

যুদ্ধ বিরতি উদযাপন করছে পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিকেরা, হায়দারাবাদ, সিন্ধ, পাকিস্তান
যুদ্ধ বিরতি উদযাপন করছে পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিকেরা, হায়দারাবাদ, সিন্ধ, পাকিস্তান। ছবি: এএফপি

গণসার্বভৌমত্ব ও গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ কেন জরুরি by ফরহাদ মজহার

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’ শিরোনামে একটি খসড়া আইন নিয়ে আলোচনা শুরু করছে। আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই। কারণ, ফ্যাসিস্ট শক্তি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম এবং শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল নাগরিকদের ‘গুম’ (এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স) করার বিরুদ্ধে লড়াই। মানবিক অধিকার লঙ্ঘনের ক্রূর অভিজ্ঞতাই মূলত জনগণকে গণ-অভ্যুত্থানের শামিল হতে এবং অকাতরে প্রাণ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বিভিন্ন দাবি আদায়ে এখনো তাদের বিক্ষোভ ও রাজপথে আন্দোলন করতে হচ্ছে।

কিন্তু ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও গণদাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ও আইনি মর্ম বুঝতে হবে। এই ক্ষেত্রে গণ-আন্দোলনের মারাত্মক ঘাটতি আছে। যার ফলে জনগণের তরফ থেকে কী ধরনের ঘোষণা বা দাবি আমাদের একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের দিকে নিয়ে যেতে পারে, তার রণনীতি ও রণকৌশল সম্পর্কে ছাত্র-তরুণেরা এখনো অতিশয় অস্পষ্ট। ছাত্র-তরুণদের আত্মত্যাগ সে কারণে ইতিবাচক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। পড়াশোনা, বিশেষত বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে তাঁদের আগ্রহ দুঃখজনকভাবে কম। তাই আমরা এখনো পরিষ্কার বুঝতে পারছি না যে আমাদের লড়াই বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

এই বিষয়গুলো আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে। জনগণকে দমন-পীড়ন করা, আইনবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াইয়ের মর্ম না বুঝলে আমরা আমাদের বাস্তবসম্মত কর্তব্যগুলো সঠিকভাবে ধরতে পারব না। ইউরোপে ১৬৪৮ সালে স্বাক্ষর করা ওয়েস্টফিলীয় চুক্তির জেরে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র নিজে সার্বভৌম। মানুষ সেখানে সার্বভৌম নয়। আমরা এখনো পুরোনো সেই ওয়েস্টফিলীয় রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিপরীতে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা বা গণ-সার্বভৌমত্বের (পপুলার সভরেন্টি) ধারণা সম্পর্কে কিছুই প্রায় জানি না।

জনগণকে দমন-পীড়ন, আইনবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াই চলছে। এই লড়াইয়ের প্রধান মর্ম হচ্ছে তথাকথিত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে জনগণের সার্বভৌম সামষ্টিক কর্তাসত্তার প্রতিষ্ঠা, যা একই সঙ্গে গণতন্ত্রেরও মর্ম; অর্থাৎ গণতন্ত্র হচ্ছে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে তথাকথিত ‘রাষ্ট্র’ নয়; বরং জনগণই রাষ্ট্রের সব নীতি প্রণয়ন, প্রশাসনিক পরিচালনাসহ সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী।

জনগণের ক্ষমতার বিপরীতে রয়েছে রাষ্ট্রের নামে সামরিক-বেসামরিক আমলা, রাষ্ট্রের নামেই গড়ে ওঠা নানা পরজীবী প্রতিষ্ঠান, লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণির করপোরেট ক্ষমতা, নানা কিসিমের গণবিরোধী রাজনৈতিক দল ইত্যাদি। অথচ ক্ষমতাকে হতে হবে জনগণের ক্ষমতা। যার দ্বারা ব্যক্তির অধিকার ও ব্যক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সেই অধিকার ও মর্যাদা সামষ্টিক গণরাজনৈতিক শক্তির বলে টিকিয়ে রাখাই গণতন্ত্রের কাজ। এ ছাড়া গণতন্ত্র কায়েম অসম্ভব।

সেই ক্ষেত্রে নাগরিকদের ‘গুম’ করা চরম গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের অতি কুৎসিত ও দৃশ্যমান উপদংশ। যে কারণে মানবাধিকার রক্ষার বিবিধ আন্তর্জাতিক আইন থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘ আলাদা করে গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ ঘোষণা করেছে। তথাকথিত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিপরীতে জনগণের সামষ্টিক গণতান্ত্রিক অভিপ্রায়ের মর্ম বুঝতে হবে। আর এর জন্য সারা দুনিয়ার নিপীড়িত মজলুম জনগণের লড়াইয়ের ফসল হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স (আইসিপিপিইডি) সনদটি আমাদের পাঠ ও পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক ২০০৬ সালে সনদটিও গৃহীত হয় ২০১০ সালে সনদটি বলবৎ হয়। এটা বিশ্বব্যাপী গণসার্বভৌমত্ব কায়েমের লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট সনদটি স্বাক্ষর করেছে।

আন্তর্জাতিক সনদ হিসেবে আইসিপিপিইডি এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এর ইতিবাচক তাৎপর্য এবং সীমাবদ্ধতা বুঝতে হলে গণসার্বভৌমত্বের (পপুলার সভরেনটি) আলোকে সনদটি পর্যালোচনা করতে হবে। তা ছাড়া এর মর্ম বুঝতে এবং বাংলাদেশে তা প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে আমরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর কতটা প্রস্তুত? কীভাবে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া তৈরির ক্ষেত্রে আইসিপিপিইডিকে আমরা কাজে লাগাব, সেটা বোঝার জন্য গণসার্বভৌমত্বের আলোকে এই আন্তর্জাতিক সনদের একটি পর্যালোচনা এখানে পেশ করছি।

আমরা প্রশ্ন করতে পারি, আইসিপিপিইডি সনদটি কি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার ধারণাকে কেন্দ্র করে গঠিত, নাকি এটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক মানবাধিকারের সুরক্ষার একটি চুক্তিমাত্র?

আইসিপিপিইডির মৌলিক নীতিমালা পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আমরা তা অনুধাবনের চেষ্টা করতে পারি।

১. এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সের সংজ্ঞা (আর্টিকেল ২): ‘ ...বাই এজেন্টস অব দ্য স্টেট অর বাই পারসন্স অ্যাক্টিং উইথ দ্য অথরাইজেশন, সাপোর্ট অর অ্যাকুয়েসেন্স অব দ্য স্টেট...’; অর্থাৎ এই সনদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারকে গুমের অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে। এটি জনগণের নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে রক্ষার চেষ্টা করে।

২. অস্বীকার ও তথ্য গোপনের বিরুদ্ধে অধিকার (আর্টিকেল ১৮, ২০): আন্তর্জাতিক সনদে পরিবারের সদস্যদের ডিটেইনির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি একটি নাগরিক-কেন্দ্রিক (পিপল-সেন্টার্ড) দৃষ্টিভঙ্গি।

৩. প্রতিরোধের সাংগঠনিক কাঠামো (আর্টিকেল ২৩): আন্তর্জাতিক সনদে রাষ্ট্রকে এমন আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে, যা গুমের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করবে।

৪. ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (আর্টিকেল ১৫-১৬): গুমের মতো অপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে, বহুরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও বিচারব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।

গণসার্বভৌমত্বের আলোকে যদি আন্তর্জাতিক সনদের ধারাগুলো আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আইসিপিপিইডি গণসার্বভৌমত্বের ধারণাকে ধারণ করে।

ক. আইসিপিপিইডি রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণ করে। এর দ্বারা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত প্রচলিত ধারণার বিপরীতে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে সামনে আনে। সনদটি মূলত রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত রাখার একটি ব্যবস্থা, যেন রাষ্ট্র জনগণের ওপরে নয়; বরং জনগণের অধীনে জনগণের পক্ষের ক্ষমতা হিসেবে  ভূমিকা রাখতে পারে।

খ. জনগণের জানার ও প্রতিবাদের অধিকার আইসিপিপিইডিতে স্বীকৃত। পরিবার, নাগরিক সমাজ ও আইনি প্রতিনিধিদের অধিকার ও তথ্যপ্রাপ্তি সনদে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা গণনিয়ন্ত্রণমূলক চিন্তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

গ. সনদটি আন্তর্জাতিক স্তরে জনগণের পক্ষ থেকে ন্যায়সংগত দাবি উত্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে। সনদ অনুযায়ী ভুক্তভোগীরা জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ বা অপর আন্তর্জাতিক ফোরামে অভিযোগ জানাতে পারেন। এটি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের একটি রূপ। যার চর্চার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় গণসার্বভৌমত্বের ধরন কী হতে পারে, তা আমরা স্পষ্ট করে তুলতে পারি। কিন্তু আইসিপিপিইডির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, যা গণসার্বভৌমত্বকে সীমিত করে। এই সীমাবদ্ধতাগুলোর দিকে তাকানো যাক।

ক. এখনো রাষ্ট্রই প্রধান কর্তা, জনগণ নয়। যদিও সনদটি রাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতার অধীনস্থ করে; তবু আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ ও প্রতিকারব্যবস্থায় জনগণের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা অংশগ্রহণের কথা বলা হয়নি; অর্থাৎ সনদটি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ নয়; বরং রাষ্ট্রের ওপর ‘নৈতিক নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী।

খ. প্রচলিত ওয়েস্টফিলিয়ান সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই ন্যায়ের সন্ধান করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর বিচার পাওয়ার পথটি রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। এতে জনগণের প্রতিরোধ বা গণ-আন্দোলনের ক্ষমতা স্বীকৃত নয়।

গ. আন্তর্জাতিক সনদে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুমের পরিপ্রেক্ষিত উপেক্ষিত। গুমকে প্রায়ই ‘আইনি’ এবং ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে দেখা হয়েছে, কিন্তু এর রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত, যেমন গণ-আন্দোলন দমন, জাতিগোষ্ঠী নিধন, শাসকগোষ্ঠীর কর্তৃত্ব বজায় রাখার প্রকল্প অনুপস্থিত।

সংক্ষেপে বলা যায়, আইসিপিপিইডি আংশিকভাবে গণসার্বভৌমত্ব ধারণাকে ধারণ করে, বিশেষত যেখানে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে জনগণের তথ্য, সুরক্ষা ও বিচার চাওয়ার অধিকারের স্বীকৃতি আছে। তবে এটি মূলত একটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক মানবাধিকার প্রতিরক্ষাকাঠামো। এই কাঠামো গণতন্ত্র বা জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে (কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার) কেন্দ্র করে কাজ করে না। এটি বরং রাষ্ট্রীয় শাসনকে নৈতিকভাবে পরিশুদ্ধ করার প্রচেষ্টামাত্র।

অতএব গণসার্বভৌমত্বের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য আইসিপিপিইডির পাশাপাশি যা প্রয়োজন তা হলো:

১. জনগণের নেতৃত্বে সত্য নির্ণয় ও ইনসাফ কায়েম কমিশন

২. জনগণের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার ফোরাম (ট্রানজিশনাল জাস্টিস ফোরাম)

৩. আইন প্রণয়নে সরাসরি গণ-অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের বাইরে থেকেও গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচারের ক্ষমতা নির্মাণ।

ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে অবিলম্বে ‘গুম প্রতিরোধ ও গণসুরক্ষার ঘোষণা’ হাজির করা জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া গণসার্বভৌমত্বের আলোকেই আমাদের পর্যালোচনা করতে হবে।

* ফরহাদ মজহার কবি ও চিন্তক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

নাগরিকদের ‘গুম’ করা চরম গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের অতি কুৎসিত ও দৃশ্যমান উপদংশ
নাগরিকদের ‘গুম’ করা চরম গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের অতি কুৎসিত ও দৃশ্যমান উপদংশ। ছবি: প্রথম আলো

ভারত-পাকিস্তান আরও বিপজ্জনক এক যুগে ঢুকে পড়েছে by আসফান্দয়ার মির

(ভারত–পাকিস্তান সংঘাতের নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে। আসফান্দয়ার মিরের এই নিবন্ধে সংঘাতের নতুন এই ধরনের পেছনে ভারত ও পাকিস্তান কার কতটা দায় রয়েছে তা তুলে ধরা হয়েছে। নিবন্ধটি যুদ্ধবিরতির আগে প্রকাশিত। এরপরও প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এর বাংলা ভাষান্তর প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো।)

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যখন সংঘর্ষ বাধে, তখন বিশ্ব সেটিকে ধর্ম ও কাশ্মীরকে ঘিরে বহুদিন ধরে চলে আসা মীমাংসাহীন দ্বন্দ্বযুদ্ধের আরেকটি নতুন পর্ব হিসেবে দেখে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি যেমন এটিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘কাশ্মীরে তারা হাজার বছর ধরে যুদ্ধ করে আসছে’ এবং ‘সম্ভবত তার চেয়েও বেশি সময় ধরে’।

এই যুক্তিটা বোধগম্য। কেননা, মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান এবং হিন্দুপ্রধান ভারত কয়েকটি যুদ্ধ ও বহুবার সংঘর্ষে জড়ালেও দুই দেশের মধ্যকার সংঘর্ষ শেষ পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা ও কূটনীতির টেবিলে মীমাংসা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তাতে মধ্যস্থতা করেছে। এমনকি দুই দেশের মধ্যে যখন ভীষণ লড়াই বেধেছে, সে সময়েও এই প্রতিষ্ঠিত প্রহরীরা দুই পক্ষকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো অকল্পনীয় জায়গায় পৌঁছাতে দেয়নি।

ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পরিচিত এই চক্রকে এখন অতীত বলে মনে হচ্ছে। গত মাসে কাশ্মীরে হিন্দু পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, যাতে ২৬ জন নিহত হয়েছেন, পর দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিকতম সামরিক উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। কিন্তু এই উত্তেজনা দ্রুত সামরিক সংঘাতে রূপ পাওয়ায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ও বিপজ্জনক দিকে মোড় নিয়েছে। দুই প্রতিবেশীকে ধ্বংসাত্মক সংঘর্ষে জড়ানো থেকে নিবৃত্ত রাখার মতো কূটনৈতিক তৎপরতার পরিসর সীমিত হয়ে গেছে।

এই পরিবর্তনটা দুই দেশের একেবারে ভিন্নমুখী পথচলার মধ্যে শনাক্ত করা যায়।

ভারত এখন ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতকে শুধু একটি মহান দেশ হিসেবে নয়, এক সুমহান প্রাচীন সভ্যতার এমন এক গৌরবময় উত্তরসূরি হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতে চান, বিশ্বমঞ্চে যেটি কিনা তার পদচিহ্ন রেখেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটা আপসহীন মনোভাব তৈরি করেছে।

এতে করে পাকিস্তানকে শুধু ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী প্রতিবেশী হিসেবে নয়, বরং ভারতের ন্যায়সংগত জাগরণে বিশাল হুমকি সৃষ্টিকারী দেশ হিসেবে দেখার প্রবণতা বেড়েছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের (মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল, দুই দেশই তাদের নিজেদের অংশ বলে) ওপর পাকিস্তানের দাবি এবং ভারতবিরোধী সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের সমর্থন—ভারত আর সহ্য করবে না।

অন্যদিকে পাকিস্তান দুই দশক ধরে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংকটে জর্জরিত। পাকিস্তানে একটি প্রতিষ্ঠানই সর্বময় ক্ষমতাধারী। দেশটির শক্তিশালী সেনাবাহিনী নীতিনির্ধারণে কর্তৃত্ব করে এবং তাদের হাতে রয়েছে উল্লেখ করার মতো প্রচলিত যুদ্ধ ও পারমাণবিক সামরিক শক্তি। বিপর্যয়ের পরও, আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখনো রয়েছে পাকিস্তানের। কাশ্মীরের মতো বিষয়গুলো পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয়ের একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয়, এসব বিষয়ে ইসলামাবাদ দিল্লির সঙ্গে আপস করতে রাজি নয়।

গত কয়েক দশকে, পাকিস্তানের নানা উসকানির মুখেও ভারতকে সাধারণত সংযম প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। একটা সাম্যাবস্থা বজায় রাখতে সেটা সহায়তা করত। এমনকি ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীদের হামলায় ১৬৬ জন নিহত হওয়ার পরও, ভারত শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।

মোদির আমলে ভারতের আগের অবস্থানটা বদলে গেছে। গত এক দশকে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক পরিসরে একঘরে করার কৌশল তিনি নিয়েছেন। এর পাশাপাশি গোপন অভিযান, অন্তর্ঘাত ও লক্ষ্যবস্তু করে হত্যার ঘটনাও ভারত ঘটাচ্ছে। একই সময়ে পাকিস্তান এবং নির্দিষ্ট করে দেশটির সেনাবাহিনী তাদের ঐতিহ্যের বাইরে বেরিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছিল। ২০১৯ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর পাকিস্তান অনেক বেশি সংযত আচরণ করে, ২০২১ সালে যুদ্ধবিরতি পুনরায় চালু করে। কিন্তু এর পর থেকে ভারত তার পথ বদল করে।

এমনকি যদি দুই পক্ষ বর্তমান উত্তেজনা থেকে সরে আসে, এরপরও ভারত খুব স্পষ্টভাবে পাকিস্তানকে দীর্ঘমেয়াদি চাপের মধ্যে রাখার কৌশল অবলম্বন করবে। ভারতের লক্ষ্য হচ্ছে পাকিস্তানের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেওয়া এবং শক্তির মূল কেন্দ্র সেনাবাহিনীর অপূরণীয় ক্ষতি করা। গত মাসে কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে, ভারতের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের চূড়ান্ত ধরনের কঠোর অবস্থান নিতে দেখা গেছে। তাঁরা বলেছেন, পাকিস্তান একটি ব্যর্থ ও উচ্ছৃঙ্খল রাষ্ট্র। ভারতকে অবশ্যই পাকিস্তানকে ধ্বংসের পথ কার্যকরভাবে খুঁজে বের করতে হবে।

ভারতের কৌশলগত এই পরিবর্তন পাকিস্তান বুঝতে পেরেছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আশা ছেড়ে দিয়ে তারা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অশুভ বিষয় হচ্ছে, এই সংঘাত সেই গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচের ওপর হুমকি তৈরি করছে, এত দিন ধরে যেটা সংঘাতের বৃত্ত তৈরি করতে বাধা দিয়ে এসেছে। গত মাসে ভারত ১৯৬০ সালের করা পানিচুক্তি স্থগিত করে। সিন্ধু নদী পাকিস্তানের পানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। পাকিস্তান চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে ‘যুদ্ধ ঘোষণার শামিল’ বলে ঘোষণা দিয়ে ১৯৭২ সালের চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার হুমকি দেয়। এই চুক্তির বলে ভাগ হয়ে যাওয়া কাশ্মীরে একটা সীমান্ত প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

দক্ষিণ এশিয়ার সংকট সমাধানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ক্রমেই কমে আসছে। একসময় ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশের কাছেই যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী। ভারত-পাকিস্তানকে কয়েকবার যুদ্ধের প্রান্তসীমা থেকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল ওয়াশিংটন। ১৯৯৯ সালে, কাশ্মীরে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ থামাতে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ২০০১ সালে ভারতের আইনসভায় সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ত্বরিত কূটনীতিতে উত্তেজনা প্রশমিত হয়েছিল। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দুই দেশের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা প্রশমনে এবং এ ঘটনার পেছনে দায়ীদের কয়েকজনকে বিচারের আওতায় আনতে সহায়তা করেছিল।

কিন্তু আজ সেই ‘সৎ মধ্যস্থতাকারী’ ভূমিকার সম্ভাবনা ক্রমেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। বাইডেন প্রশাসন মূলত বেইজিংয়ের প্রভাব মোকাবিলায় নয়াদিল্লিকে আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ হিসেবে পাশে পেতে চাওয়ায় ভারত-পাকিস্তান ইস্যু থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানালেও, তাদের মনোযোগ সীমাবদ্ধ থেকেছে বাণিজ্যযুদ্ধ, ইউক্রেন ও গাজায় সংঘাত এবং ইরানের সঙ্গে কূটনীতিতে। তদুপরি নয়াদিল্লি এখন তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতাকে পাকিস্তানের পক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করে এবং ইসলামাবাদও পশ্চিমা দেশের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতায় সন্দিহান। ফলে একসময়কার কার্যকর যোগাযোগ চ্যানেলগুলোও এখন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।

কিন্তু বর্তমানে সেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার সম্ভাবনা ক্রমেই ফিকে হয় গেছে। বাইডেন প্রশাসন দিল্লিকে প্রশান্ত রাখার জন্য ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনায় নিজেদের দূরে রেখেছিল। এর কারণ হলো চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ওয়াশিংটন ভারতকে পাশে চেয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন নরেন্দ্র মোদির প্রতি জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করলেও তাদের মূল মনোযোগের কেন্দ্র বাণিজ্যযুদ্ধ, ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে কূটনীতি।

এ ছাড়া তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতাকে ভারত আর স্বাগত জানাবে না, কারণ সেটাকে পাকিস্তানের প্রতি পক্ষপাত বলে মনে করবে। ভারতের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্ককে পাকিস্তান অবিশ্বাসের চোখে দেখে। ফলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমটাও (যেটা একসময় গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হিসেবে ভূমিকা পালন করত) এখন অকেজো হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে এখন এটা বুঝতে হবে যে তার গুরুত্বপূর্ণ একটা স্বার্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এশিয়াতে আমেরিকার ভবিষ্যতের জন্য ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহে এটা সত্য। মার্কিন প্রশাসনের কেউ কেউ হয়তো ভারতকে আরও একপাক্ষিকভাবে সমর্থন দেওয়ার এবং পাকিস্তানের সঙ্গে পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়ার অবস্থান নিতে পারেন। কিন্তু চীনের সঙ্গে ভারসাম্য, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় বড় অবদানকারী এবং বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে ভারতের কার্যকারিতা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়বে; যদি ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যয়বহুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনন্তকাল ধরে আটকে থাকে।

অন্যদিকে পাকিস্তান তাতে করে চীনের প্রভাব বলয়ে আরও বেশি ঝুঁকে যাবে। এতে করে ২৫ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশ পাকিস্তানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ আরও কমে যাবে। আর এই জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশটিই এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব পোষণ করে। সেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাজে ফলাফল নিয়ে আসবে এবং ভারতের চ্যালেঞ্জগুলো আরও গভীর হবে।

* আসফান্দয়ার মির যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অবস্থিত স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ ফেলো।

- নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে

সীমান্তে ভারত–পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষীদের যৌথ মহড়া। ২০১৯ সালের ঘটনা
সীমান্তে ভারত–পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষীদের যৌথ মহড়া। ২০১৯ সালের ঘটনা। ছবি : রয়টার্স

প্রসিকিউশনে তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন: ১৫০০ মানুষ হত্যার নির্দেশদাতা শেখ হাসিনা

জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ১৫০০ মানুষকে হত্যা, মরণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ২৫০০০ মানুষকে আহত, নারী ও শিশুদের টার্গেট করে আক্রমণ করাসহ নানা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। হেলিকপ্টার-মারণাস্ত্র দিয়ে গুলি করে আন্দোলনকারীদের নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশসহ ৫টি অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। এসব অপরাধ সংগঠনে শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশ ও বিভিন্ন উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লেলিয়ে দেয়ার প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। গতকাল তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন পাওয়ার পর এক  প্রেস ব্রিফিংয় এসব কথা বলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

আনসার উদ্দিন খান পাঠানের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের তদন্ত দল মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এ প্রতিবেদন জমা দেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এই প্রথম কোনো মামলায় তদন্ত শেষ হলো।

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, গণহত্যায় সরাসরি নির্দেশ দেয়ার বিষয়ে হাসিনার একাধিক ফোনালাপের সত্যতা পাওয়া গেছে। আমাদের তদন্ত সংস্থা শেখ হাসিনার কিছু টেলিফোনিক কনভারসেশন জব্দ করেছেন। এসব কনভারসেশনে সুস্পষ্টভাবে তদন্ত দল নিশ্চিত হয়েছে যে, তিনি রাষ্ট্রীয় সকল বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়াও হেলিকপ্টার, মারণাস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশসহ ৫টি অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রায় ১৫০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫০০০ মানুষকে আহত করা হয়েছে। টার্গেট করে শিশু হত্যা, নারীদের ওপর হামলা, আহতদের হাসপাতালে নিতে ও চিকিৎসা নিতে বাধা, নিজে গিয়ে এসব রোগীকে চিকিৎসা দেয়া যাতে না হয় সেই নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। এমন সব তথ্য প্রমাণ মিলেছে।

তিনি বলেন, হেলিকপ্টার, ড্রোন, এপিসিসহ মারণাস্ত্র ব্যবহার করে নিরস্ত্র, নিরীহ আন্দোলনকারী যে সিভিলিয়ান পপুলেশন, যারা বাংলাদেশে একটি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত ছিল, তাদেরকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন বা নির্মূল করার জন্য তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন। চিকিৎসক, ভুক্তভোগী, শহীদ পরিবারের লোক, ভিডিও, অডিও, নিহত আহতদের শরীর থেকে পাওয়া গুলি, হেলিকপ্টারের ফ্লাইট শিডিউল, অনেক সাক্ষীদের জবানবন্দি, আসামিদের জবানবন্দি এই তদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে।

জুলাইয়ে আন্দোলন চলাকালে গত ১৪ই জুলাই রাজাকারের বাচ্চা বলে উস্কানি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অস্ত্র নিয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের ওপর লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল। তার উস্কানিমূলক বক্তব্যের পরই এসব অপরাধীরা আন্দোলন দমনে নৃশংস হামলা চালায়। তিনি বলেন- মূলত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ৫টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলেও ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ২টি অভিযোগের ব্যাপারে ব্রিফিং করেছে। এসব অভিযোগগুলো হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠনে শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশ দেয়া এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে গণহত্যায় লেলিয়ে দেয়া। বাকি অভিযোগগুলো পরে জানানো হবে।

চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে কিনা, সে বিষয়ে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের যে সংশোধন হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন যদি অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, সে ক্ষেত্রে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা যাবে এবং বিচারে কি কি শাস্তি দেয়া যাবে, তা বলা হয়েছে। শনিবার রাতে মাত্র আইনটি করা হয়েছে। এখন আমরা ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেবো যে, কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয়ে তদন্ত করা হবে কিনা। বিচারের মুখোমুখি করা হবে কিনা।
তাজুল ইসলাম বলেন, রাজপথের চাপের ভিত্তিতে কোনো বিচার হবে না, সুষ্ঠু বিচার করতে হলে সময় একটু প্রয়োজন। তাই তাড়াহুড়ো করে মামলা বিপথে নিতে চান না তারা। অঞ্চলভিত্তিক তদন্ত যেগুলো হয়েছে সেগুলোর তদন্ত চলছে।

mzamin

যুদ্ধবিরতি কার্যকর: যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা উল্লেখ করে না কেন ভারত by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। খুবই আশা ও স্বস্তির কথা। কারণ, তারা পারমাণবিক যুদ্ধের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা গোপন গোয়েন্দা তথ্য পান। কি সেই গোয়েন্দা তথ্য সে বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়নি। শুধু জানা গেছে, সেসব তথ্য খুবই স্পর্শকাতর। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া যায়, এক্ষেত্রে পারমাণবিক হামলার হুমকি বা প্রস্তুতি ছিল হয় ভারত বা পাকিস্তানের। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চাপে’ পড়ে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে তা কতোক্ষণ বা কতোদিন স্থায়ী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েক দশক ধরে বিতর্কিত কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে দুই দেশের সঙ্গেই একত্রে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এ বিষয়ে ভারতের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তারা এ সমস্যার সমাধানে তৃতীয় কোনো পক্ষের মধ্যস্থতার বিরোধিতা করে এসেছে সব সময়। এখন কথা হলো এই যে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত এসেছে, এটা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান একরকম প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে সবার আগে ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা জানিয়েছেন। এতে পাকিস্তান একরকম প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। ভারত যুদ্ধবিরতিতে গেলেও তাদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের, ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকার কোনো উল্লেখ নেই। ওদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে ভারত ৫টি যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। পাকিস্তান দাবি করেছে এগুলো গুলি করে ভূপাতিত করেছে তারা। এর মধ্যে আছে ফ্রান্সে তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান। বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ মিডিয়াকে দেখিয়েছে পাকিস্তান। তা যাচাই করেছে বিবিসি সহ বিভিন্ন মিডিয়া। এরপর তারা বলেছে, ওই ধ্বংসস্তূপ রাফাল বিমানের। অনেকে বলেন, এই যুদ্ধবিমান হারানো ভারতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি এই লড়াইয়ে। তবে এ বিষয়ে ভারত টুঁ-শব্দটি উচ্চারণ করেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিমান হারানোর কারণে  ভেতরে ভেতরে বেশ চাপে আছে মোদি সরকার। বিশেষ করে বিরোধীদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে চাপে পড়তে পারে সরকার। যুদ্ধের কৌশলই হলো যতক্ষণ শ্বাস থাকে ততক্ষণ লড়াই করতে হয়। এ জন্য যে বা যারা দুর্বল হয়ে পড়ে, তারা তা স্বীকার করে না। এক্ষেত্রে প্রচার প্রপাগান্ডায় তারা এগিয়ে থাকে। ওদিকে পাকিস্তানের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয় চীন, তুরস্ক ও আজারবাইজান। এর ফলে তাদের শক্তি আরও বেড়ে যায়। অনেকে বলেন, চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এবার অনেক ভালো বলে তারা ২০২৫- এর এই যুদ্ধে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে।

এমন অবস্থায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, গোলাগুলি এবং সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে ভারত ও পাকিস্তান। যেকোনো রকম সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোনো আপস নয় এবং কঠোর অবস্থানে থাকবে ভারত। এটা অব্যাহতভাবে ভারত বলে আসছে। অব্যাহতভাবে তা করে যাবে ভারত। ওদিকে তার পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেছেন, শনিবার বিকালে পাকিস্তানের সামরিক অপারেশনের মহাপরিচালক ভারতের মিলিটারি অপারেশন্সের মহাপরিচালককে ফোন করেছিলেন এবং একমত হয়েছেন তারা। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কোনো উল্লেখ নেই। পক্ষান্তরে বিক্রম মিশ্রি যে তথ্য দিয়েছেন, তাতে ভারতের উদ্যোগকে বড় করে দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক অপারেশন্সের মহাপরিচালক ভারতের মিলিটারি অপারেশন্সের মহাপরিচালককে ফোন করেছিলেন এবং তারা একমত হয়েছেন। অর্থাৎ নতি স্বীকার করেছে পাকিস্তান। তারা ভারতের কাছে যুদ্ধবিরতির জন্য ফোন করে কথা বলেছে এবং দুই পক্ষ তারপর একমত হয়েছে। তাহলে মার্কো রুবিও যে বললেন, তারা ৪৮ ঘণ্টা ধরে দুই পক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ করেছেন। তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং এরপর যুদ্ধবিরতি হয়েছে। তার কী হবে? একটু পেছন ফিরে যদি আমরা ঘটনাকে দেখি তাহলে দেখতে পাবো, পারমাণবিক অস্ত্রের লড়াই শুরু হলে তাতে শুধু ভারত-পাকিস্তানের যে অসীম ক্ষতি হতো, তা-ই নয়। একই সঙ্গে ভারতীয় এই উপমহাদেশ এমনকি বিশ্ব জুড়ে এর বিরাট প্রভাব পড়তো। গাজা-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাব যতটা পড়েছে, তার চেয়ে বেশি হতো এর প্রভাব। কারণ, ইসরাইল নৃশংস যুদ্ধ করছে কার্যত একটি নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। তাদের স্বল্পসংখ্যক সদস্য হামাসে যোগ দিয়েছেন। অস্ত্র বলতে তাদের কাছে আছে কিছু রকেট, ইটপাটকেল। এটা দিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ইসরাইলের বিরুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন। তবু হামাস সাহসের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভারত পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। যদি এই পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার একবার হতো, তাহলে অগণিত মানুষের প্রাণহানি হতো। হয়তো সৃষ্টি হতে পারতো আরেকটা হিরোশিমা-নাগাসাকির উদাহরণ। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস হতো উভয় পক্ষে। এর ভার পৃথিবী সইতে পারতো না। আন্দাজ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যে স্পর্শকাতর গোয়েন্দা তথ্যের সন্ধান পেয়েছে তা ছিল এই পারমাণবিক অস্ত্র। এমন ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফোন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। তাকে বলেন পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপে পড়ে মোদি সরকার হয়তো যুদ্ধবিরতি করতে রাজি হয়েছে।

ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ১০ই মে তীব্র লড়াইয়ের পর সকালে কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ, সেনাপ্রধান জেনারেল অসিম মুনিরের সঙ্গে। এ সময় তাদেরকে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানান। এ কথা বলা হয় মিডিয়ায়। কিন্তু আসলে পর্দার আড়ালে তখন উভয় পক্ষকে একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছিল। শনিবার বিকালে যখন অবশেষে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলো। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করলেন- যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে ভারত-পাকিস্তান। তিনি লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে শুক্রবার দিবাগত রাতে দীর্ঘসময় আলোচনার পর আমি সন্তুষ্টির সঙ্গে এ ঘোষণা দিচ্ছি যে, ভারত ও পাকিস্তান অবিলম্বে এবং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। সাধারণ জ্ঞান এবং ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহারের জন্য উভয় দেশকে অভিনন্দন জানাই। এ বিষয়ে আপনাদের মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ। এ ঘোষণায় সন্তোষ প্রকাশ করেন ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। নিরপেক্ষ কোনো স্থানে এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা শুরুর করতে রাজি হওয়ার জন্যও অভিনন্দন জানান তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রুবিও বলেন, ৪৮ ঘণ্টা ধরে তিনি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারত ও পাকিস্তানের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এর মধ্যে আছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল অসিম মুনির, দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও অসিম মলিক। রুবিও লিখেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে আমরা প্রধানমন্ত্রী মোদি ও শেহবাজ শরীফের প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকার প্রশংসা করি। ওদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, পাকিস্তান ও ভারত যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। তা অবিলম্বে কার্যকর হবে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে বলেছেন, গোলাগুলি এবং সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে ভারত ও পাকিস্তান। যেকোনো রকম সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোনো আপস নয় এবং কঠোর অবস্থানে থাকবে ভারত। এটা অব্যাহতভাবে ভারত বলে আসছে। অব্যাহতভাবে তা করে যাবে ভারত।

ওদিকে তার পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেছেন, শনিবার বিকালে পাকিস্তানের সামরিক অপারেশনের মহাপরিচালক ভারতের মিলিটারি অপারেশন্সের মহাপরিচালককে ফোন করেছিলেন এবং একমত হয়েছেন তারা। তিনি সংক্ষিপ্ত এক বিবৃতিতে বলেছেন, ভারতের স্থানীয় সময় শনিবার বিকাল ৫টা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে উভয় পক্ষই স্থল, আকাশ এবং সমুদ্রপথে সব রকম লড়াই বন্ধ রাখবে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা সচিব কারও প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকার কথা বলা হয়নি। 

mzamin

ইসরাইল থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে নরওয়ে

দখল করে নেয়া পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের  জ্বালানি সরবরাহ দেয়ার অবকাঠামোর মালিক এবং তা অপারেট করে বলে ইসরাইলের পাজ রিটেইল অ্যান্ড এনার্জি’তে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে নরওয়ের সার্বভৌম সম্পদ বিষয়ক তহবিল। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তহবিলের এথিকস ওয়াচডগ বলে পরিচিত কাউন্সিল অন এথিকস ব্যবসার মানদণ্ড বজায় রাখা নিয়ে কঠোরতা অবলম্বন করে গত আগস্টে। তারপর রোববারের এই অর্থ প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘটনা দ্বিতীয়। ফিলিস্তিনের দখল করে নেয়া ভূখণ্ডে ইসরাইল যেসব অপারেশন চালাচ্ছে তার প্রতিবাদে এভাবে অর্থ বা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে দেশটি। প্রথমে তারা গত ডিসেম্বরে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয় ইসরাইলি টেলিযোগাযোগ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান বেজেক থেকে। ওই তহবিলের বিশ্বজুড়ে নয় হাজার কোম্পানিতে শেয়ার আছে। তার মধ্যে তারা শতকরা ১.৫ ভাগের মালিক। নরওয়ের পার্লামেন্টের নির্দেশনা অনুসরণ করে তারা এই ব্যবসা পরিচালনা করে। একই সঙ্গে নিজেদেরকে পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসনের ক্ষেত্রে নিজেদেরকে নেতৃস্থানীয় হিসেবে দেখে তারা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইল থেক যেসব কোম্পানি তাদের সম্পর্ক কর্তন করেছে তার মধ্যে ইউরোপিয়ান এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি অন্যতম। উল্লেখ্য, ইসরাইলে গ্যাস স্টেশন বিষয়ক সবচেয়ে বড় অপারেটর পাজ রিটেইল। দখল করে নেয়া পশ্চিম তীরে আছে তাদের নয়টি স্টেশন। সর্বশেষ বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুপারিশের বিষয়ে কাউন্সিল অন এথিকস বলেছে, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিতে জ্বালানি সরবরাহ করে এমন অবকাঠামো পরিচালনায় জড়িত পাজ রিটেইলার। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এসব বসতি স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া তাদেরকে টিকিয়ে রাখার মধ্য দিয়েও আন্তর্জাতিক আইন অব্যাহতভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত বছর জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, অবৈধভাবে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে আছে ইসরাইল এবং সেখানে তারা বসতি নির্মাণ করেছে। এসব বসতি যত দ্রুত সম্ভব প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত। তবে আদালতের সেই নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে তেল আবিব। তারা এ রায়কে ভুল এবং পক্ষপাতী বলে অভিযোগ করেছে।
mzamin

নয়া বিতর্কে এনসিপিতেই চাপান-উতোর

নয়া রাজনীতির বন্দোবস্তের স্বপ্ন দেখিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটলেও স্বস্তিতে নেই জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি। রাজনীতিতে আলোচিত-সমালোচিত সব ইস্যুতে জড়িয়ে যাচ্ছে দলটির নাম। অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর সঙ্গেও বাড়ছে দূরত্ব। এক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা কী হবে সেটিও স্পষ্ট নয়। সব মিলিয়ে তর্ক-বিতর্কের বৃত্তে আবদ্ধ এনসিপি। বিষয়গুলো নিয়ে আত্মসমালোচনা আছে দলটির অন্দরেও। কার্যকর কৌশল নিয়ে আগাতে না পারলে এনসিপি’র ভবিষ্যৎ রাজনীতি শঙ্কায় পড়বে বলে মনে করেন দলটির কোনো কোনো নেতা।

টানা তিনদিনের আন্দোলনের পর শনিবার সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এনসিপি’র দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহর আহ্বানে এ আন্দোলন শুরু হলেও এটি ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যের ব্যানারে অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে এনসিপিসহ জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের সব শক্তি অংশ নেয়। কিন্তু আন্দোলন সফলের পরপরই উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের দু’টি ফেসবুক স্ট্যাটাস ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে শাহবাগে চলা আন্দোলনের সময়ের কয়েকটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা এবং মাহফুজের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে বিভাজনের রাজনীতি শুরু হয়। এসব ঘটনায় জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম অংশীদার জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি ও এর ছাত্র সংগঠনের মধ্যে চরম বিরোধ তৈরি হয়েছে। দল দু’টির নেতাকর্মীদের মাঝেও দেখা দিয়েছে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া।

এ বিরোধ এমন এক সময় সামনে আসে যখন জুলাই অভ্যুত্থানে নৃশংস গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। দলটির বিচার কার্যক্রম নিয়ে সোচ্চার হওয়ার কথা জুলাইয়ের শক্তিগুলোকে। কিন্তু তারা সেটি না করে পুরনো আলোচনা সামনে এনেছেন বলে মনে করেন দলটির কেউ কেউ। তাদের মতে এ বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হওয়ার সময় ছিল, এমন সময় এটি সামনে এনে আওয়ামী লীগের গণহত্যাকে বৈধতা দেয়া ও বিচার কার্য থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে।

বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথার লড়াইয়ে এনসিপি ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস)-এর নেতারা। একে অপরের উদ্দেশ্যে তীর্যক বাক্য ছুড়ছেন তারা। এনসিপি ও বাগছাস নেতারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জামায়াতের ভূমিকা সামনে আনছেন। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের কর্মসূচিতে গোলাম আযমের নামে স্লোগান দেয়ার সমালোচনা করে ফেসবুকে বক্তব্য দিচ্ছেন অনেকে। সমালোচনা করতে গিয়ে শিষ্টাচার বহির্ভূত বক্তব্যও দিচ্ছেন কেউ কেউ। বিষয়গুলো নিয়ে অস্বস্তি এনসিপি’র অন্দরে। দলটির অনেক নেতা মনে করেন, বিএনপি, জামায়াত, গণঅধিকারসহ সব দলকে আমরা দূরে ঠেলে দিচ্ছি এটি কীভাবে সম্ভব। এমনটা হলে আমাদের বন্ধু কে? এভাবে রাজনীতি হয় না। এনসিপি’র অভ্যন্তরীণ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও বিষয়গুলো নিয়ে সমালোচনা চলছে। এমনকি ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যের ব্যানারের কর্মসূচি নিয়ে এনসিপি’র বিবৃতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

এনসিপি’র সিনিয়র যুগ্ম সমন্বয়কারী আব্দুল হান্নান মাসুদ এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, এমন বিভাজন আর বিভক্তি কারও জন্যেই কল্যাণ বয়ে আনবে না। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে যে বিভক্তি কিংবা বিভাজনকে আপনারা উস্কে দিচ্ছেন, এর পরিণতি পুরো জাতিকেই ভোগাবে। শুধুই বলবো আপনারা ফাঁদে পড়েছেন, অথবা অজান্তে নিজেরাই নিজেদের জন্যে ফাঁদ তৈরি করছেন। বলে রাখলাম। এবার অন্তত থামেন।

দলটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও অনেকে এসব বিষয়ে কথা বলছেন। তারা বলেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে রাজপথের আন্দোলন সফল হয়েছে। যে আন্দোলন জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি’র না হলেও পুরো স্টেক নিজের দাবি করতে গিয়ে অন্যদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। কেউ কেউ বলেন, আওয়ামী লীগ বয়ানে প্রতিপক্ষ ঘায়েল করার পচা রাজনীতি না করে নতুন কিছু করতে হবে। কারণ চেতনা ব্যবসা ছুড়ে ফেলেছে এ দেশের মানুষ। বয়ান হবে জুলাই কেন্দ্রীয়। বাগছাস নেতা আবু বাকের মজুমদারের ও আব্দুল কাদেরের কথা উল্লেখ করে একজন বলেন, ডাকসু’র রাজনীতিও শেষ এদের। শিবিরের সঙ্গে ক্যাচাল করলেই এক্স ছাত্রলীগ ভোট দেবে না। তারা বামকে ভোট দেবে। আত্মসমালোচনাও আছে কারও কারও। একজন তো এমনও বলেছেন যে, এনসিপি বিপুল ভোটে সরকার গঠন করলেও ৬ মাসও টিকতে পারবে না। কারণ রাজনৈতিক বোঝাপড়া, শিষ্টাচার, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা সব বিভাগেই আমরা জিরোর কাছাকাছি।

শাহবাগে জাতীয় সংগীত ইস্যুকে যে ধর্মীয় ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে এনসিপি’র বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন একজন। শিবিরের কিছু লোকজন গায়ে পড়ে ঝামেলা তৈরির চেষ্টা করছেন বলে মন্তব্য কারও কারও। একজন বলেন, যার নিজস্ব কোনো রাজনীতি নেই সে খোঁচাখুঁচি করে প্রাসঙ্গিক হতে চাচ্ছে। ফলে গণরাজনীতির মাঠ নষ্ট হচ্ছে। যাদের মাঠে বন্ধু নেই তারা প্রাসঙ্গিক হতে চাচ্ছে।

এ ছাড়াও হাসনাতের ডাকে যারা মাঠে এসেছে তাদের দূরে ঠেলে দেয়া ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন একজন। ভোটের লড়াই নিয়ে বলা হয়, বাম কখনো এনসিপিকে ভোট দেবে না। এদের ফাঁদে পড়লে রাজনীতি শেষ। আর জাতীয় সংগীত বিরোধীতা করা ছেলেটি শিবিরের ছিল না। কিন্তু বাকের এর দায় শিবিরকে দেয়ার চেষ্টা করবে? এটা হাসিনা স্টাইল মন্তব্য করে একজন বলেন, বাকের একেবারে সব শেষ করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রধানের ভার নিতে পারছে না।

এনসিপি’র বিবৃতি: এদিকে একাত্তর ও শাহবাগের আন্দোলনে গোলাম আযমের নামে স্লোগান ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছে এনসিপি। গতকাল এক বিবৃতিতে বলা হয়, আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে আওয়ামী লীগের দলগত বিচারের বিধান যুক্ত করা, এবং জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র জারি করার দাবিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মত, পক্ষ এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করলেও একটি পক্ষ সচেতনভাবে দলীয় স্লোগান এবং বাংলাদেশের জনগণের ঐতিহাসিক সংগ্রামবিরোধী স্লোগান দিয়েছে। যা জুলাই পরবর্তী সময়ে সাম্প্রতিক আন্দোলনে জাতীয় ঐক্য নবায়নের সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টিতে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। এনসিপি’র কোনো সদস্য সাম্প্রতিক আন্দোলনে দলীয় স্লোগান কিংবা এই জনপদের মানুষের সংগ্রাম ও ইতিহাসবিরোধী কোনো স্লোগান দেয়নি। ফলে যেসব আপত্তিকর স্লোগান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, তার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পক্ষটিকেই বহন করতে হবে। এনসিপিকে এর সঙ্গে জড়ানো সম্পূর্ণ অহেতুক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। এনসিপি মনে করে বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহাসিক সংগ্রামের অধ্যায়সমূহ তথা, ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ এর যথাযথ স্বীকৃতি এবং মর্যাদা বাংলাদেশে রাজনীতি করার পূর্বশর্ত। যারা ১৯৭১ সালে এই জনপদের মানুষের জনযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিল এবং যাদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে, আমরা চাই তারা নিজেদের সুস্পষ্ট  রাজনৈতিক অবস্থান জাতির সামনে ব্যাখ্যা করে জাতীয় সমঝোতা ও ঐক্যকে সুদৃঢ় করবে এবং চব্বিশের অভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নে সহযোগী হবে। 

mzamin

মির্জা আব্বাসের প্রশ্নঃ শাহবাগে হঠাৎ করে এই নাটক কেন

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, শাহবাগে হঠাৎ করে এই নাটক কেন? যে শাহবাগ আপনারা বন্ধ করেছেন, এখানে মিছিল-মিটিং করা যাবে না, সেখানে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারের দল এনসিপি’র লোকেরা মিছিল-মিটিং করে কীভাবে?’ গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে ‘সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে’ এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন আয়োজক সংগঠনের সভাপতি সাইদ হাসান মিন্টু।

তিনি বলেন, আরও জানি কি কি ঘটাচ্ছে। নইলে শাহবাগের এই নাটক কেন হঠাৎ করে। যে শাহবাগ আপনারা বন্ধ করেছেন, যে শাহবাগের এই সমস্ত এলাকাতে মিছিল-মিটিং করা যাবে না, সেখানে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়, সরকারের দল এনসিপি’র লোকেরা ওখানে মিছিল-মিটিং করে কীভাবে? আর কোন দাবিতে মিছিল-মিটিং করলো। কি দাবি? আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করতে হবে। তো আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করতে না করছে কে ভাই? কে না করছে? বিএনপি না করছে? খুব চেষ্টা করছে চালানোর জন্য বিএনপি নাকি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করতে চায়। আমাদের ঠেকায় পড়ে গেছে, বড় ঠেকায় পড়ে গেছে।
মির্জা আব্বাস বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি, এই দেশে অনেক বিদেশির আগমন ঘটেছে, সন্দেহভাজন বিদেশিদের আগমন ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে তারা বিভিন্ন মিশন নিয়ে আসতেছে। আজকে ফেসবুকে আপনারা সার্চ দিলে পাবেন এক ভদ্রলোক বলছিলেন, এখন বলতে পারছি না। তবে আমার ধারণা এই সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এই অপকর্মগুলো করছে। এই মুহূর্তে আমি এই সরকারকে অন্তত আমি আমার কথা বলছি, নিরপেক্ষ ভাবতে পারছি না। তারা কোন উদ্দেশ্যে কারও পারপাস সার্ভ করছে। এই সরকার কোনো অবস্থাতেই গণবান্ধব কিংবা দেশপ্রেমিক সরকার নয়। আমি পরিষ্কার ভাষায় এটা বলতে চাই- আমার দেশ, দেশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কেন?

তিনি বলেন, আমার প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়ে এই সরকারকে প্রমাণ করতে হবে তারা দেশপ্রেমিক সরকার। আমার প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব পাওয়ার পরে আমাকে যে শাস্তি যেখান থেকে দেয়া হয় সেটা মাথা পেতে নেবো। আমি আমার কথা বললাম, আমি জানি- এটা যথাযথ ফোরাম নয়, হয়তো আরও বড় কোনো জায়গায় বলা উচিত ছিল। কিন্তু আমি আমার মনের ক্ষোভ ধরে রাখতে পারিনি, আমি আপনাদের সামনে প্রকাশ করলাম। আমার কথাটা একটু আপনারা মনে ধারণ করবেন এবং দেশবাসীর কাছে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন। এখন কিন্তু আমরা খুব ভালো অবস্থানে নাই।

দেশে সার্কাস হচ্ছে মন্তব্য করে আব্বাস বলেন, আজকে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি রাজনৈতিক অবস্থানে, আমরা কয়েকদিন যাবৎ দেখতে পারছি, বাংলাদেশে একটা সার্কাস হচ্ছে, নাটক জাতীয় কিছু একটা হচ্ছে, আমার কাছে মনে হচ্ছে আরকি। আমি আবার কথাগুলো আটকিয়ে রাখতে পারি না, আমার একটা বাজে অভ্যাস। আমার কাছে সাধারণত নাটক-ফাটক মনে হচ্ছে। আগে আমরা দেখতাম যে, শেখ হাসিনা কিছু করার আগে কোথাও একটা অপকর্ম ঘটাতো, আমরা বুঝতাম সে কিছু একটা ঘটাবে। একদিকে আমাদের দৃষ্টি নিয়ে যেতো আর কাজ এদিক দিয়ে করতো।
তিনি বলেন, দেখেন হামিদ সাহেব চলে গেলেন কি সুন্দর। হামিদ সাহেব কোন দিক দিয়ে চলে গেলেন? ভিআইপি দিয়ে। পত্র-পত্রিকায় দেখলাম উনি নাকি গেঞ্জি পরে, লুঙ্গি পরে, মাস্ক লাগিয়ে গিয়েছেন, লুঙ্গি পরুক, গেঞ্জি পরুক, ভিআিইপিতে ঢুকলেন কীভাবে, যদি একান্ত পরিচিত না হয় কিংবা ভিআইপি লোক না হয়। সেই ভিআইপি সুবিধা নিয়ে এয়ারপোর্ট দিয়ে উনি পার হয়ে গেলেন, আর আমার সরকার বলে কিছু জানি না। ৬২২ জন আওয়ামী লীগের লোক পার হয়ে গেল, এই সরকার বলে আমরা কিছু জানি না। জানেন কি?

আব্বাস বলেন, প্রশাসনে বিভিন্ন এলাকায় পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে। বিএনপি কর্মকর্তাদের বাতিল করে সেখানে কমপক্ষে জামায়াতের লোকজনকে দিতে হবে, জামায়াত না হলে আওয়ামী লীগ দিতে হবে। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, থানা-পুলিশ-কোর্ট-কাচারি, সচিবালয়ের ভেতরে এই কর্মকাণ্ডগুলো শুরু হয়ে গেছে, বিএনপিকে রাখা যাবে না। এই যে বিএনপি নিধন আন্দোলন শুরু হয়েছে তারই একটি বিষয় হলো ৬২২ জন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগারদের পালিয়ে যেতে দেয়া, খুনির আসামি আবদুল হামিদ সাহেবকে পালিয়ে যেতে দেয়া, এটা হলো একটি বিষয়। এই সরকারের মধ্যে অবস্থানরত অনেক উপদেষ্টা যারা বাংলাদেশের নাগরিকই নন। তারা এই দেশ পরিচালনা করছেন। এসব থেকে নজর ফিরিয়ে নিতে সরকার নানা কিছু ইস্যু করছে।

আব্বাস বলেন, তিনটা এলাকার নাম বলছি, সেন্টমার্টিন, সাজেক, বাঘাইছড়ি, এই সমস্ত এলাকা আমাদের যাওয়াটা দুরূহ হয়ে গেছে। আবার শুনি, একটা জায়গায় নাকি করিডোর দেয়া হবে। কিসের করিডোর? মানবিক করিডোর। আরে ভাই, বিশ্বের কোনো ডিকশনারিতে মানবিক করিডোরের নামে কোনো শব্দ আছে কি, কোথায় থেকে এসব আবিষ্কার করেন? আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনো করিডোর কিংবা প্যাসেজ দেয়ার কোনো সুযোগ নাই জনগণের মতামত ছাড়া। জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার সিদ্ধান্ত নেবে তারা কি করবে?

mzamin

পাক-ভারত সংঘাত: ভারতের শক্তির জায়গায় ধরা পড়ল দুর্বলতা

টানা কয়েক দিনের সংঘাতের পর ১০ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় থেমে যায় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ঝুঁকি। তিনি জানান, তার প্রশাসনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে ‘পূর্ণাঙ্গ ও তাৎক্ষণিক’ যুদ্ধবিরতি হয়েছে। যদিও এতে উপমহাদেশে স্বস্তি আসে, ভারতের ভেতরে প্রশ্ন ওঠে- এ বিজয় না পরাজয়?

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ স্যুজি ওয়াইলস জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে এই সংঘাত ঠেকান। জেডি ভ্যান্স সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে দেন।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় বিশ্ববাসী হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও, ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে এ নিয়ে উঠেছে তীব্র বিতর্ক। ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান ভেদ প্রকাশ মালিক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমরা আসলে কী পেলাম?’ সংসদ সদস্য আসাদুদ্দিন ওয়াইসির প্রশ্ন, তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ তো ভারতের নীতির পরিপন্থি- এবার কেন ব্যতিক্রম?

এই ক্ষোভের পেছনে যুক্তি আছে। ট্রাম্প শুধু যুদ্ধবিরতির ঘোষণাতেই থামেননি; কাশ্মীর ইস্যুতে সমাধানের কথাও তুলেছেন। আর এটিই ভারতের দীর্ঘদিনের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ নীতিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।

কাশ্মীরের পেহেলগামে ২২ এপ্রিলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ভারতের ‘অপারেশন সিঁধুর’ দেখাতে চেয়েছিল শক্তি, কিন্তু তা আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তান পাল্টা হামলায় ৫টি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে- তাও আবার চীনের গোয়েন্দা সহায়তায়। ভারতীয় পক্ষ এসব দাবি অস্বীকার করলেও মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে ভিন্ন তথ্য।

রাফাল জেট নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের উচ্ছ্বাসও ধাক্কা খেয়েছে বাস্তবতার দেয়ালে। করাচিতে ‘ধ্বংসাত্মক হামলা’র প্রচারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, যেটি ভারতীয় ভাবমূর্তির ক্ষতি করেছে।

উল্টো, পাকিস্তানও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ভারতের ভেতরেও আঘাত হেনেছে- সামরিক ঘাঁটি ও বেসামরিক এলাকায়। যা স্পষ্ট করে দেয়, এই সংঘাতে ভারতের একতরফা কৌশল ব্যর্থ হয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিষয়, চীনের প্রযুক্তি ও সহায়তায় পাকিস্তানের নজরদারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ভারতের তুলনায় বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ভারতের নিজস্ব বিশ্লেষকরাও বহুদিন ধরে সতর্ক করে আসছিলেন- পাক-চীন জোটের বিরুদ্ধে দিল্লি প্রস্তুত নয়। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা এসব সাবধানবাণীকে গুরুত্ব দেননি।

এই পুরো পরিপ্রেক্ষিত ভারতের আঞ্চলিক নেতৃত্বের ভাবমূর্তি, তার সামরিক সক্ষমতা ও কূটনৈতিক নীতিকে একসঙ্গে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণাটা ট্রাম্প দিলেও- আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি যেন ভারতের সীমাবদ্ধতা ও পরনির্ভরতার এক অনিবার্য স্বীকৃতি।

এখন দিল্লি প্রতিক্রিয়ায় সামরিকীকরণ বাড়াতে পারে, কিন্তু তা বাস্তব সমস্যার সমাধান নয়। বরং পাকিস্তান ও ভারতের মতো পারমাণবিক শক্তিধর কিন্তু অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর জন্য সংযমই একমাত্র দায়িত্বশীল পথ। নয়তো রাজনৈতিক আত্মম্ভরিতা ও সংঘাতের অঙ্কচিত্রে ডুবে যাবে দুই জাতির ভবিষ্যৎ।

বিশ্বের প্রতি চারজন দরিদ্র মানুষের একজন এবং ৩৫ কোটির বেশি নিরক্ষর প্রাপ্তবয়স্ক যে দুটি দেশে বাস করে, সেই ভারত ও পাকিস্তানের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ কিংবা সামরিক উত্তেজনা ধরে রাখা বাস্তবসম্মত নয়।

চলমান সংঘাত একদিকে যেমন ভারতের উন্নয়নযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, অন্যদিকে পাকিস্তানের নাজুক অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে—আর এই ক্ষতির মাত্রা হবে তাদের যেকোনো অর্জনের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ।

আল জাজিরায় ইউসুফ নজরের প্রবন্ধ থেকে অনুবাদকৃত
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত

আমাদের সন্তানরা আর ফিরবে না

৭ই মে ভোরের আলো ফোটার আগেই মুহূর্তের মধ্যেই বদলে গেল মারিয়া খানের পরিবার। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলার বাসিন্দা মারিয়া হারিয়েছেন তার ১২ বছর বয়সী ভাগ্নে ও ভাগ্নিকে। যমজ এই ভাইবোনের একজন জাইন আলি ও অন্যজন উরওয়া ফাতিমা। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সশস্ত্র উত্তেজনায় সীমান্তবর্তী জনপদে নেমে আসে মৃত্যুর ছায়া। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, ৭ই মে সকালে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের একাধিক স্থানে হামলা চালায় ভারত। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানও পাল্টা হামলা শুরু করে। যা ওই দিন থেকে এ সপ্তাহের শনিবার পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছে। এসময়ের মধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে চলতে থাকে গোলাগুলি, ড্রোন ও বিমান হামলা। বিশেষ করে সীমান্তে প্রচুর গোলাগুলি হয়। এতে ভারত-পাকিস্তানকে বিভক্ত করা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলওসি) বরাবর অবস্থিত গ্রামগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে। পাকিস্তানের দাবি, ভারতের হামলায় কমপক্ষে ৩০ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। অন্যদিকে পাকিস্তানের পাল্টা হামলায় কমপক্ষে ১৬ জন ভারতীয় নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দিল্লি। পুঞ্চ শহরের কাছে নিয়ন্ত্রণরেখা ঘেঁষা গ্রামে বসবাস করেন খান পরিবার। সংঘাত শুরুর আগের দিন যাদের জীবন ছিল স্বাভাবিক। স্কুল থেকে ফিরে পড়াশোনা, খেলা আর রাতের খাবারের পর ঘুমিয়ে পড়েছিল নিহত ওই যমজ ভাইবোন। ভোরে যখন গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়, আতঙ্কে তারা বাড়ির ভেতরে লুকিয়ে পড়ে। পরে এক আত্মীয়ের সাহায্যে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
মারিয়া বলেন, আমার বোন উরসা উরওয়ার হাত ধরে ছিল, আর দুলাভাই রামিজ জাইনকে ধরে ছিল। তারা বাসা ছেড়ে বের হওয়ার পরপরই তাদের কাছাকাছি একটি শেল বিস্ফোরিত হয়। যাতে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় উরওয়া। আর বিস্ফোরণের প্রবল ধাক্কায় ছিটকে পড়ে জাইন। পরে জাইনকে সিআরপি দেয়ার চেষ্টা করা হলেও তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

রামিজ খান। যিনি একজন শিক্ষক। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে পুঞ্চ, তারপর রাজৌরি ও পরে জম্মু শহরের হাসপাতালে স্থানান্তরিত হন তিনি। গুরুতর অবস্থায় কাতরাতে থাকা এই মানুষটি এখনো জানেন না ওই বিস্ফোরণে তার দুই সন্তানই প্রাণ হারিয়েছেন। রামিজ ও উরসার জীবন জুড়ে তাদের সন্তানরা ছিল আশার আলো। সন্তানদের ভালো শিক্ষার জন্য তারা তাদের বসবাসের স্থানও বদলে নিয়ে আসে। ৯ই মে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি জানান, একটি পাকিস্তানি শেল ক্রাইস্ট স্কুলের পেছনে পড়ে বিস্ফোরিত হয়।

৭ই মে’র ঘটনার পর শত শত মানুষ পুঞ্চ ও আশপাশের এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। যুদ্ধবিরতির পর অনেকে ধীরে ধীরে ফিরছেন। তবে মারিয়ার হৃদয়ে রয়ে গেছে অপূরণীয় ক্ষত। যদি সরকার আগেই সীমান্তবর্তী লোকজনকে সতর্ক করতো, তাহলে আমরা সরে যেতে পারতাম। হয়তো আমাদের বাচ্চারা আজ বেঁচে থাকতো, বলেন মারিয়া। তার কণ্ঠে ভেসে আসে ব্যথা ও ক্ষোভ। তিনি বলেন, যদি দেশের নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধ দরকার হয়, আমরা তা মেনে নিই। আমরাও পেহেলগাম হামলায় নিহতদের জন্য কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু সীমান্তে বসবাসকারী মানুষের জীবন কি জীবন নয়?
mzamin

এবার ভারত–পাকিস্তানের আকাশপথের সংঘাত ছিল চমকে দেওয়ার মতো :নিউইয়র্ক টাইমস

ভারত ও পাকিস্তান আবারও যুদ্ধের কিনারা থেকে ফিরে এসেছে। কিন্তু পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের এবারের চার দিনের বিশৃঙ্খল সংঘর্ষে অনেক নতুনত্ব ছিল এবং অভ্যন্তরীণ উত্তেজনার নানা বিষয় এখনো অস্থিতিশীল রয়ে গেছে। এসব কারণে চলমান যুদ্ধবিরতি পর দুই দেশের পুরোনো ‘আত্মসংযমের’ ধাঁচে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।

এবারের যুদ্ধে নতুন প্রজন্মের সামরিক প্রযুক্তির ব্যবহার আকাশপথের সংঘাতকে চমকে দেওয়ার মতো উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ধারাবাহিক বিমান হামলা ও যুদ্ধবিমান বিধ্বংসী পাল্টা আঘাত এবারের সংঘর্ষের মঞ্চ প্রস্তুত করে দিয়েছিল। এই সংঘাতে প্রথমবারের মতো কাশ্মীরের পুরোনো নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ব্যাপকহারে অস্ত্রসজ্জিত ড্রোন ব্যবহার করা হয়। কোনো পাইলটকে ঝুঁকিতে না ফেলে উভয় দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং নিশানায় আঘাত হানতে একযোগে মোতায়েন করা হয় শত শত ড্রোন।

এরপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। সরাসরি আঘাত হানে বিমানঘাঁটি ও প্রতিরক্ষা স্থাপনায়। এতে দুই পক্ষ থেকেই ভয়াবহ হুমকি উচ্চারিত হয় এবং সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে চলে যায়।

যখন বিপর্যয়ের চূড়ান্ত মুহূর্ত চলে আসল, তখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করে। অতীতেও যা ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে এবারের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। বিপজ্জনক সংঘাতে ঘেরা নতুন বৈশ্বিক অধ্যায়ে উদাসীন নেতৃত্ব এবং শান্তিরক্ষায় আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধের ঘাটতির ভেতরে বিশ্বকূটনীতির রক্ষাকবচ এতটা দুর্বল আগে দেখা যায়নি।

সামরিক ইতিহাসবিদ ও কৌশলগত বিশ্লেষক শ্রীনাথ রাঘবন বলেন, ‘ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত থেমেছে বাইরের দেশের হস্তক্ষেপে।’

রাঘবন আরও বলেন, ভারত বা পাকিস্তান কোনো দেশেই উল্লেখযোগ্য সামরিক শিল্পকাঠামো নেই। ফলে বিদেশি অস্ত্র সরবরাহের ওপর দুই দেশের নির্ভরশীলতা থাকে, যাতে অনেক সময় আন্তর্জাতিক চাপ কার্যকর হয়।

তবে এবার দুই পক্ষের অবস্থান আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর বলেই মনে হয়েছে। বিশেষ করে ভারত যেন দেখতে চাইছে, পূর্ববর্তী সংঘাতগুলোর চেয়ে ভিন্ন কোনো ফলাফল আদায় করা সম্ভব কি না।

শ্রীনাথ রাঘবন বলেন, ‘ভারত সরকারের মধ্যে এবার প্রবলভাবে একটি মনোভাব দেখা যাচ্ছে। সেটি হলো তারা নিশ্চিত করতে চায়, পাকিস্তান যেন এমন না মনে করে যে, তারা সহজে পার পেয়ে যাবে বা পাল্টা জবাব দিতে পারবে। এটা নিঃসন্দেহে উত্তেজনা বৃদ্ধির একটি কারণ। দুই পক্ষই মনে করছে, সংঘাত এমনভাবে শেষ হতে দেওয়া যাবে না, যাতে অন্য পক্ষ ভাবতে পারে তারা কোনোভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছে।’

ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের জালে আবদ্ধ ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই সংঘাতের পর অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। আর এটা সম্ভবত এমন এক সংঘর্ষের সম্ভাবনা তৈরি করছে, যা আবারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

পাকিস্তান এখনো সামরিক কর্তৃত্বে পরিচালিত একটি রাষ্ট্র যেখানে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দমনের শিকার হয়ে আসছে। এমন শাসনব্যবস্থার নেতৃত্বে রয়েছেন কট্টরপন্থী একজন জেনারেল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দীর্ঘদিন ধরে বয়ে আসা ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার ফসল তিনি।

অন্যদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের জয়োল্লাস দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রকে ক্রমে একটি হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করছে। ফলে পাকিস্তান ইস্যুতে ভারতের নরম হওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে না।

গতকাল রোববার পর্যন্ত এমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি যে পাকিস্তান ও ভারত তাদের ইতিমধ্যে শীতল হয়ে পড়া কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের কোনো উদ্যোগ নিয়েছে, কিংবা পরস্পরের নাগরিকদের ভিসা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ভারতের পক্ষ থেকেও দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সিন্ধু পানিচুক্তি মেনে চলার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানের জন্য যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, নদীর পানি আটকে দেওয়ার যেকোনো পদক্ষেপকে তারা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হিসেবে বিবেচনা করবে।

২২ এপ্রিল ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে এক সন্ত্রাসী হামলার পর দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল। ওই হামলায় ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। ভারত এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করলেও  ইসলামাবাদ সেই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে।

‍এই সংকটের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার ছয় বছরের তুলনামূলক এক শান্তিপূর্ণ পর্বের পরিসমাপ্তি ঘটল। এ সময়জুড়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানকে ঘিরে একটি দ্বিমুখী কৌশল অনুসরণ করেছেন। তা হলো একদিকে ন্যূনতম কূটনৈতিক যোগাযোগ রেখে প্রতিবেশী দেশটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে বিচ্ছিন্ন রাখা এবং অন্যদিকে নিজ দেশে বিশেষ করে কাশ্মীর উপত্যকায় সামরিকীকরণ আরও জোরদার করা।

২০১৬ ও ২০১৯ সালে সন্ত্রাসী হামলার পর সামরিক জবাব দিয়ে ভারত এক ধরনের কড়া প্রতিক্রিয়ার রীতি গড়ে তোলে। এর ফলে গত মাসের হামলার পর তাৎক্ষণিকভাবে শক্তিশালী সামরিক জবাব দেওয়ার রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়।

তবে ভারতের সামরিক বাহিনীর জন্য এ পথ সহজ ছিল না। সর্বশেষ ২০১৯ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষে ভারতের অবস্থান ছিল বিব্রতকর। সেবার ভারতের একটি পরিবহন হেলিকপ্টার ভেঙে পড়ে এবং পাকিস্তানি বাহিনী সোভিয়েত যুগের একটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে তার পাইলটকে আটক করে।

তখন থেকে মোদি ভারতের সেনাবাহিনী আধুনিকায়নের চেষ্টা করে চলেছেন। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সরবরাহ–সংকটে বিলিয়ন ডলারের এসব বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে হিমালয় সীমান্তে চীনের সঙ্গে চার বছরের টানটান উত্তেজনায় ভারত চাপের মুখে পড়ে যায়। এ অঞ্চলে কিছুদিন আগপর্যন্ত যুদ্ধ প্রস্তুতিতে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন ছিল।

গত সপ্তাহে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারত তার হারানো মর্যাদা এবং অতীতের সব বাধাবিপত্তিকে হামলার মাধ্যমে আড়াল করতে চেয়েছিল। একই সঙ্গে দেশটি বিশ্বমঞ্চে নতুন এবং আরও শক্তিশালী একটি দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে চেয়েছিল। যেন শুধু অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক শক্তি নয়, ভারতের সামরিক ক্ষমতাও কার্যকরভাবে জানান দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল।

পশ্চিমা কূটনীতিক, সাবেক কর্মকর্তা এবং ভারত–পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের রসায়ন অধ্যয়ন করা বিশ্লেষকেরা বলেছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে ভারত আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেছে এবং সম্ভবত পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন একপর্যায়ের প্রতিরোধক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছে।

তবে বিশ্লেষকেরা এটাও বলেছেন, যেভাবে যুদ্ধের পরিস্থিতি এগিয়েছে, তাতে প্রায়োগিক বা কৌশলগত স্তরে উন্নতির কোনো ইঙ্গিত দেখা যায়নি।

গত বুধবার আকাশপথে প্রথম ধাপের হামলায় ভারত শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে এমন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, গত দশকগুলোতে যেমনটা তারা কখনোই করেনি। সব সূত্র অনুযায়ী, এসব হামলা ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর’ সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনার খুব কাছাকাছি আঘাত হানে। এর মাধ্যমে তাদের পক্ষে বিজয়ের দাবি করা সম্ভব হয়।

পরবর্তী সময়ে প্রতিদিনই ভারত ও পাকিস্তানের উভয় পক্ষের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত থাকত যেন তারা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং সংযত হওয়ার জন্য আগে থেকে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু প্রতিরাতই ছিল হানাহানি ও হামলায় পরিপূর্ণ। সীমান্তজুড়ে দূরপাল্লার প্রচলিত গোলাবর্ষণ আরও তীব্র হতে থাকে। এ কারণে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে।

ড্রোন ও বিমান হামলা ক্রমে তীব্রতর হয়ে ওঠে। এমনকি উভয় দেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র কূটনৈতিক চাপ সক্রিয় হওয়ার পেছনে মূল বিষয় শুধু এটুকুই ছিল না যে, হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলো ক্রমেই সংবেদনশীল এলাকায় পৌঁছাতে শুরু করেছে। বরং বড় আশঙ্কা ছিল এই যে, পরমাণু অস্ত্রধারী দুই সতর্ক প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের জন্য দ্রুত উত্তেজনা বৃদ্ধির সিঁড়ির পরবর্তী ধাপটি কী ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র কূটনৈতিক চাপ সক্রিয় হওয়ার পেছনে মাঠপর্যায়ে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের ভূমিকা ছিল স্পষ্ট।

এই চাপের কারণ শুধু এটা নয় যে হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলো ক্রমেই সংবেদনশীল বিভিন্ন এলাকার কাছাকাছি চলে আসছিল। বরং তার থেকেও বড় আশঙ্কা ছিল, উত্তেজনা আরও বাড়লে পরমাণু অস্ত্রধারী এই সতর্ক দুই রাষ্ট্র পরবর্তী ধাপে কী ধরনের ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে এগোতে পারে—সেটি।

গত শনিবার রাতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার কিছুক্ষণ আগে থেকে ভারতীয় কর্মকর্তারা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন, ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে আরেকটি সন্ত্রাসী হামলা হলে পাল্টা জবাবও হবে ততটাই কঠোর।

ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল বেদ প্রকাশ মালিক বলেন, ‘আদৌ কোনো রাজনৈতিক বা কৌশলগত সুবিধা পাওয়া গেল কি না—সেটি আমরা ভারতের ভবিষ্যৎ ইতিহাসের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’

ফ্রান্স নির্মিত ভারতীয় যুদ্ধবিমান রাফাল এবং চীন নির্মিত পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান জে-১০সি ফাইটার জেট। ছবি : সংগৃহীত
ফ্রান্স নির্মিত ভারতীয় যুদ্ধবিমান রাফাল এবং চীন নির্মিত পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান জে-১০সি ফাইটার জেট। ছবি : সংগৃহীত

সরজমিন কুমিল্লা: সাক্কু-কায়সার দলে ফিরতে চান by মারুফ কিবরিয়া

২০২২ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মেয়র প্রার্থী হন কুমিল্লা জেলা বিএনপি’র তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক সাক্কু। তখনই দল তাকে বহিষ্কার করে। এখনো বিএনপি’র বাইরে সাক্কু। অন্যদিকে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় একই সময় বহিষ্কার হন কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের তৎকালীন সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার। বহিষ্কার হলেও দুজনই ফিরতে চান দলে। গত ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর দলে ফেরার চেষ্টা আরও বেগবান হয়েছে। দলে ফিরে সাক্কু আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে চান। অপরদিকে বরাবরের মতো সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা নিজাম উদ্দিন কায়সারের। অবশ্য দুজনই বলছেন- তারা সবসময় বিএনপি’র সঙ্গে ছিলেন, এখনো আছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়েই তাদের ওঠাবসা। মহানগরে যাবতীয় দলীয় কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা।

কুমিল্লার বিএনপি রাজনীতিতে সুখ্যাতি রয়েছে মনিরুল হক সাক্কুর। জনপ্রিয়তাও কোনো অংশে কম নেই। ভোটের মাঠে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মেয়র হয়েছেন একাধিকবার। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রথম মেয়রও মনিরুল হক সাক্কু। ২০১২ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রার্থী আফজল খানকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৭ সালেও তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০২২ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে মেয়র প্রার্থী হলে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। ওই নির্বাচনে তাকে কারচুপি করে হারানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অবশ্য এখনো ভোটের রাজনীতিতে তার প্রভাব ও গুরুত্ব রয়েছে। অতীতের ভুল ক্ষমা করে বিএনপি কবে তাকে আপন করে নেবে, সেই জল্পনা চলছে স্থানীয় রাজনীতিতে।

মনিরুল হক সাক্কুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রয়েছে। দল তাকে পরিত্যাগ করলেও তিনি দল ছেড়ে অন্য কোথাও যাননি। ১৯৯৩ সালে সাক্কু কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সভাপতি হন। ২০১০ সাল পর্যন্ত সেই পদে বহাল ছিলেন। ২০২২ সালে বহিষ্কার হওয়ার আগে তিনি কুমিল্লা জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০৫ সালে উপনির্বাচনে কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে পৌর চেয়ারম্যান হন। এরপর পৌরসভা সিটি করপোরেশনে রূপান্তর হলে তিনি ২০১২ ও ২০১৭ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে মেয়র হন। ২০২২ সালের জুনের তৃতীয় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাকে ভোট গণনায় জোর করে হারিয়ে দেয়া হয়। এক বছর পর আওয়ামী লীগের মেয়র আরফানুল হক রিফাতের মৃত্যু হলে ২০২৪ সালের ৯ই মার্চ উপনির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে নানা কারচুপি ও কেন্দ্র দখল করে বাহারকন্যা তাহসিন বাহার সূচনা মেয়র নির্বাচিত হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সবশেষ সংসদ নির্বাচনে সাক্কুকে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি মনোনয়ন দিতে মাঠে নামেন গোয়েন্দারা। বাহারের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্য বলা হয়। প্রলোভন দেখানো হয় ভোটে জিতিয়ে আনার। কিন্তু সাক্কু তা প্রত্যাখ্যান করে আত্মগোপনে চলে যান।

কুমিল্লার রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি মানবজমিনকে বলেন, দল আমাকে বহিষ্কার করলেও আমি দল ছাড়িনি। দলের সঙ্গেই আছি। সবসময় নাগরিক সমস্যা নিয়ে কাজ করছি। ২৭টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে। তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে যাচ্ছি।

দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করে ভুল হয়েছে উল্লেখ করে সাক্কু বলেন, আমার হয়তো দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করাটা ভুল হয়েছে। আমি ভুল করেছি। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন না করলে হয় না। এখানে আওয়ামী লীগ একটা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের হাতে ক্ষমতা ছিল। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন সবই তাদের দখলে ছিল। এমন অবস্থায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাটা চ্যালেঞ্জের বিষয় ছিল। তার মধ্যেও আমাকে আমার নেতাকর্মী ও  সাধারণ ভোটার সমর্থক সবার অনুরোধে নির্বাচনের মাঠে থাকতে হয়েছে। মানুষ চেয়েছে যেন আমি ভোটে অংশ নিই। হয়তো হেরে গেছি। হেরে যাওয়াটাও তো কারচুপির কারণে। আর ২০২২ সালে আমার দলেরই এক নেতার আত্মীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমার ভোট কেটেছে। যে কারণে আমাকে হারতে হয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে মনিরুল হক সাক্কু বলেন, এ মুহূর্তে আমি দলে ফিরতে চাই। দলীয় চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন  করেছি।
এদিকে কুমিল্লা নগরীতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নিজাম উদ্দিন কায়সার ছাত্রদলের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসেন। তিনি একসময় সংগঠনটির কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ শাখার সভাপতি ছিলেন। পরে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রায় আড়াই দশক ধরে রাজনীতির মাঠে থাকা নিজাম উদ্দিন কায়সার ২০২২ সালের ১৫ই জুনের আগে কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। নির্বাচনে আসার পর ওই বছরের ১৯শে মে তাকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়। তবে দল বহিষ্কার করলেও কায়সার অন্য কোথাও যাননি। বরং সবসময় বিএনপি’র পক্ষেই নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন এবং বিএনপি’র নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখেছেন। ফলে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের একটি অংশ কায়সারের ভোটের সময় ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালিয়েছেন।

পরবর্তীতে সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে কায়সার মানবজমিনকে বলেন, যেহেতু কুমিল্লার মানুষ আমাকে আগের দুটি নির্বাচনে ভালোবাসা দিয়েছেন সেহেতু সামনেও আমি মনে করি মানুষ আমাকেই এগিয়ে রাখবেন। তাদের ভালোবাসা নিয়ে কুমিল্লা শহরের কাজ করার দায়িত্ব নিতে চাই।

বহিষ্কারাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি বিএনপিরই সৃষ্টি। মানুষ আমাকে বিএনপি হিসেবেই চেনে। স্থানীয় রাজনীতির মেরূকরণ ও নেতাকর্মীদের চাহিদায় সে সময় একটা সিদ্ধান্ত নেয়া লেগেছে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েও নির্বাচন করতে হয়েছে। তারপরও কুমিল্লার যত আন্দোলন হয়েছে দলীয় কর্মকাণ্ড আছে সবকিছুর সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ততা রয়েছে। বহিষ্কার হওয়া সত্ত্বেও আন্দোলন চলাকালীন সময়ে চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে আমার একাধিকবার কথা হয়েছে। ফোন দিয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আমি মনে করি সাংগঠনিক যে সিস্টেম রয়েছে সেই সিস্টেমের কারণে আমাকে দলের বাইরে থাকতে হয়েছে। আমি মনে করি দল আবার সিস্টেম অনুযায়ী আমাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে।

দলে ফেরা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও কুমিল্লা জেলা বিএনপি’র সাবেক আহ্বায়ক আমিন-উর রশীদ ইয়াছিন মানবজমিনকে বলেন, এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করা যাবে না। যখন যে রকম পরিস্থিতি হবে সে অনুযায়ী বক্তব্য রাখবো। 

mzamin

কূটনীতি: ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি by মিজানুর রহমান

চির বৈরী ভারত-পাকিস্তান। বহু বছর পর ফের যুদ্ধের মহড়া দিলো। তবে তারা আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণের মধ্যে এখনো সীমাবদ্ধ। দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের চলমান সংঘাত বড় আকারে বা দীর্ঘস্থায়ী হবে কিনা- তা এখনো অনুমান করা মুশকিল। তবে এটা সর্বজনবিদিত যে, পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে সেই উত্তাপ নিজ বাড়ি অবধি আসে। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি ‘যুদ্ধ’ হলে বাংলাদেশসহ গোটা অঞ্চলেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এক্ষেত্রে কোনো পক্ষাবলম্বন না করে পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেটাকে এখনো কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি। ভারত, পাকিস্তান বা ভিনদেশিদের প্রতি বাংলাদেশে আনুগত্যশীল মানুষ অনেক। বিশেষ করে এ দেশের মূলশক্তি ‘মধ্যবিত্ত’ যাদের জ্ঞানী-গুণী ভেবে একটু কদর করে সেই তথাকথিত সুশীলদের ব্যবসা এটাই!

তারা যতটা না বাংলাদেশপন্থি তারচেয়ে ঢের দিল্লি, ইসলামাবাদ, মস্কো বা আমরিকাপন্থি বলে নিজেকে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। দেশমাতৃকার প্রতি ভালবাসা তথা তাদের ন্যূনতম দরদটা যদি থাকতো তাহলে বাংলাদেশের আজ এই চেহারা হতো না!

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে না জড়ানোর যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান। রেশিও হিসেবে এটি ৭০-৩০। কিন্তু সেই আশঙ্কা যত কমই থাকুক না কেন এটি বেঁধে গেলে বাংলাদেশের ক্ষতি অপূরণীয়। বিশেষ করে অর্থনীতি, রাজনীতি, মধ্যবিত্ত সমাজ তথা দেশের সর্বত্র এর বহুমুখী প্রভাব পড়বে। বুধবারের মহড়া থেকে সেটা অন্তত অনুমেয়। বিদ্যমান উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নতুন করে বড় ধাক্কা খেয়েছে। সেই সংঘাতের প্রত্যক্ষ অংশীদার না হয়েও এর উত্তাপ থেকে রেহাই পায়নি বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়া। পরোক্ষ অভিঘাতে অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়ে গেছে এরইমধ্যে। উত্তেজনার ক্ষতি আর যাই হোক- দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য পরিবেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। আন্তঃসীমান্ত তথা আকাশ, জল ও স্থলপথে তৈরি হয়েছে অজানা আতঙ্ক। মানুষ এবং পণ্যের অবাধ চলাচল ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। বুধবার নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারত-পাকিস্তান গোলাগুলি চলাকালে দেশ দু’টির আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে হয়েছে বাংলাদেশকে। শুধু তা-ই নয় পাকিস্তানকে লক্ষ্যবস্তু করে আরব সাগরে অভিযান চালিয়েছে ভারত। ফলে এ অঞ্চলের সমুদ্রগামী পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে তখন বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়েছে। খেলাধুলাসহ অন্য রুটিন অনেক এক্টিভিটিসে প্রভাব পড়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে ভারতের ২৪টি বিমানবন্দরে বেসামরিক সেবা বন্ধ। নিরাপত্তা শঙ্কায় অনেক ম্যাচ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। স্থগিত করা হয় ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ আসর আইপিএল। ভারত-পাকিস্তান এই সংঘাত বন্ধে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস যে আহ্বান জানান, সেখানে তিনি বলেন, দুই প্রতিবেশীর সামরিক সংঘাতের ভার বিশ্ব বহন করতে পারবে না। সাম্প্রতিক ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে চলা ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে ফ্লাইট বাতিল ও রুট পরিবর্তনে হিমশিম খায় আন্তর্জাতিক বিমানসংস্থাগুলো। ভারত ও পাকিস্তানে প্রায় পাঁচ শতাধিক ফ্লাইট বাতিল হয়।

পাকিস্তানে আক্রমণের ক’ঘন্টার মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে শেয়ারের দরপতন শুরু হয়। তড়তড়িয়ে নামতে থাকে সূচক। যুদ্ধ লেগে যাওয়ার আশঙ্কায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রতিবেশী দেশ দু’টি সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়ালে পুঁজিবাজারের চিত্র  কি হতে পারে তা বুঝতে গবেষণা জরুরি নয়। তারপরও চূড়ান্ত বিচারে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আগামী কী ধরনের সম্পর্ক হবে? বিশেষত: পরিস্থিতি কতটা অবনতি ঘটবে? যুদ্ধ লেগে গেলে সার্বিক ভাবে কী কী সমস্যা হবে? তা নিয়ে নিশ্চয়ই বাংলাদেশে সরকারিভাবে গবেষণা হচ্ছে এবং হবে। তবে হ্যাঁ, সার্বিক একটি চিত্র পেতে ‘প্রাক্কলন’টা জরুরি। সেই সঙ্গে এর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় এখনই দেশের নীতিনির্ধারকদের কৌশল ঠিক করতে হবে। দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় সম্প্রতি এ নিয়ে বেশক’টি পর্যালোচনা ছাপা হয়েছে। তাতে বলা হয়, ঠিক যুদ্ধ না হয়ে যদি দেশ দু’টির মধ্যে যুদ্ধ, যুদ্ধ ভাব থাকে তাতেও বাংলাদেশের অর্থনীতি, যোগাযোগসহ বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে। আমদানি-রপ্তানি তথা সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তাই এখনই এর বিকল্প ভাবতে হবে। সে ক্ষেত্রে ‘প্ল্যান বি’ তৈরির সুপারিশ এসেছে। বলা হয়েছে- ঐতিহাসিক কারণেই ভারতের পশ্চিম সীমান্ত অস্থির হলে পূর্ব সীমান্ত অর্থাৎ বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়ে। যেকোনো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে কাছের এবং দূরের দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার এই সংঘাতকে অব্যাহতভাবে নিরুৎসাহিত করে যেতে হবে। কোনো ফর্মে কোনোভাবেই নয়াদিল্লি বা ইসলামাবাদ- কারও পক্ষাবলম্বন দূরে থাক, ন্যূনতম ঝুঁকে পড়া বা ফুয়েলও দেয়া যাবে না।

রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে বিদায় নেয়া শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে ছিল অতিরিক্ত মাখামাখি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছিল যে, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে প্রার্থিতার প্রশ্নেও ভারতীয় প্রভাবের বিষয়টি আলোচনায় আসতো। আমরা যেন দিল্লির বাইরে কিছুই চিন্তা করতে পারতাম না। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক চলে গিয়েছিল ডিপ ফ্রিজে। ৫ই আগস্টের পর থেকে দেশ দু’টির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের রসায়ন বদলেছে। দিল্লি ইউনূস সরকারের ওপর গোস্সা। তারা অনেক কিছু থেকে দূরে। যদিও ঢাকা কাছাকাছি থাকার এবং সম্পর্ক অটুট রাখার বার্তা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। সম্পর্কে সবচেয়ে ক্ষতি করছে ভারতীয় মিডিয়া। একটি অংশ অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অসত্য প্রচারণায় ব্যস্ত। দেশটির সরকার এবং রাজনীতিবিদরা হাসিনার শোচনীয় পরাজয় ও পলায়নকে এখনো মেনে নিতে পেরেছেন বলে দৃশ্যমান কোনো সাইন নেই।

অন্যদিকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তান বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে চাইছে। ঢাকাও সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পক্ষে। উভয়ের মধ্যে একটি বোঝাপড়া শুরু হয়েছে। সফর বিনিময়, আলাপ-আলোচনা বেশ দূর এগিয়েছিলো। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সমুদয় উদ্যোগ আটকে গেছে। বরং উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশে পুশইন করেছে ভারত। সীমান্তের জমি নিয়ে নতুন করে বিরোধিতা শুরু হয়েছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে গেছে। সম্পর্কের টানাপড়েন সত্ত্বেও প্রতিবেশী দেশ থেকে আমাদের অনেক খাদ্যপণ্য আমদানি করতে হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংঘাত স্থায়ী হলে নিশ্চিতভাবে আমদানীনির্ভর সেসব পণ্যের দাম বাড়বে। ফলে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়বে। সার্বিক মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে। যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলবে। শুধু তাই নয়, এটি গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।

উল্লেখ্য, ভারত-পাকিস্তান বহুবার মুখোমুখি হয়েছে। ’৪৮, ’৬৫, ’৭১ এবং সর্বশেষ কারগিল যুদ্ধ, যদিও এটি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। দু’-চার সপ্তাহ স্থায়ী ছিল। কিন্তু তখন কারো হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র ছিল না। এখন তো দু’দেশের মজুতেই ভয়াবহ এই মারণাস্ত্র রয়েছে। ফলে কোন এক পক্ষ ট্রিগারটা চাপলেই হয়!

সূত্র: জনতার চোখ
mzamin

প্রত্যাবর্তন by লুৎফর রহমান

বেগম খালেদা জিয়া। নিতান্তই একজন গৃহবধূ থেকে রাজনীতির মাঠে পদার্পণ করেছিলেন। দলের কঠিন এক সময়ে নেতৃত্ব তুলে নিয়ে ছিলেন কাঁধে। রাজনীতিতে পা রাখার ১০ বছরের মাথায় দায়িত্ব পান দেশ পরিচালনার। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন সফল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পত্নী খালেদা জিয়া। এরশাদের স্বৈরশাসন থেকে গণতন্ত্রে ফেরার যুদ্ধে তিনি ছিলেন অগ্রসেনানী। মাঝে একদফা বিরতি দিয়ে ২০০১-এ দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। ’৯৬ সালের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হয়েও দ্বিতীয় দফা নির্বাচন দিয়ে ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতি অবাধ বিশ্বাসের কারণে। আওয়ামী লীগের লগি- বৈঠার আন্দোলনের ফল হিসেবে আসা এক- এগারোর সরকারের সময় থেকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে পড়া খালেদা জিয়া আপসহীন থেকেই লড়েছেন পুরোটা সময়। কারাবরণ করলেও আপস করেননি ক্ষমতার সঙ্গে। মাইনাস টু ফর্মুলার আওতায় তাকে বিদেশ পাঠানোর চেষ্টায় একবারের জন্যও সায় দেননি। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে না দেয়ার চেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করেছেন, প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে নানা প্রতিকূলতার কাছে হেরে যাওয়ার পর সেই নির্যাতন-নিপীড়নের মাত্রা আরও ঘোরতর হয়ে আসে। বিনা ভোটে একের পর এক সংসদ গঠন করে ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করা আওয়ামী লীগ প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে খালেদা জিয়াকে। একের পর এক মামলা, দুই সন্তানের ওপর নির্যাতন, বড় ছেলে তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবন, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে জোর করে বের করে দেয়ার ঘটনায় আঘাতগ্রস্ত খালেদা জিয়া একবারের জন্যও ভেঙে পড়েন নি। জারি রেখেছিলেন প্রতিবাদ। নেতাকর্মীদের মধ্যে আশা জাগিয়ে গণতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনের সারি থেকে। খালেদা জিয়াকে দমাতে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সব কৌশল যখন ব্যর্থ তখনই কথিত দুর্নীতির মামলায় সাজা দিয়ে তাকে জেলে ঢুকানো হয়। ২০১৮ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়ার পর থেকে গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে আপসহীন নেত্রী হয়ে ওঠা খালেদা জিয়ার জন্য নতুন এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি হাজির হয়। নাজিম উদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারের স্যাঁতসেঁতে প্রকোষ্ঠে দীর্ঘদিন থাকায় নানা রোগ শোকে কাবু হয়ে পড়েন তিনি। শারীরিক অসুস্থতা গুরুতর হয়ে পড়ায় আওয়ামী লীগ সরকার বাধ্য হয় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে। বর্তমান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের (পিজি) কক্ষে বন্দি থাকা খালেদা জিয়া গুলশানের বাসায় ফেরার অনুমতি পান করোনাভাইরাস মহামারির সুবাদে। শর্তে বন্দি খালেদা জিয়া প্রয়োজন হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারেননি তখন থেকে। চিকিৎসকরা বাবার পরামর্শ দিলেও তা গ্রাহ্য করেনি হাসিনা সরকার। রাজনীতি বোদ্ধারা বলে আসছিলেন শেখ হাসিনার চরম আক্রোশের শিকার হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছিলেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই নেত্রী।

কিন্তু বিধাতার নিখুঁত পরিকল্পনায় সেই নেত্রীর রাজকীয় প্রত্যাবর্তন হয়েছে দেশের রাজনীতিতে। জটিল রোগ, বয়সের ভার চাপা দিয়ে দেশের রাজনীতিতে তিনি ফের আবির্ভূত হয়েছেন এক শক্তিশালী চরিত্র হয়ে। দেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে ওঠা খালেদা জিয়া এখন গণতন্ত্রকামী কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন। তাই তো আপসহীন এই নেত্রীর সুস্থতা কামনায় যেমন কোটি হাত একসঙ্গে মোনাজাত ধরে তেমনি সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার সময় কোটি মানুষ উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হয়। ৬ই মে লন্ডনে প্রায় চার মাস চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। নানা সময়ে তাকে নিয়ে শঙ্কা আর উদ্বেগে থাকা নেতাকর্মীরা তার সুস্থ হয়ে এই ফেরাকে রাজসিকভাবে বরণ করেছেন। উচ্ছ্বাস- আবেগে, ভালোবাসায় সিক্ত করেছেন প্রিয় নেত্রীকে। বিমানবন্দর থেকে গুলশানের বাসা ফিরোজা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পথে পথে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন দলের লাখো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এখন এক মহীরুহ। গণতন্ত্রে ফেরার লড়াইয়ে তাকে ঘিরে এখন ডান-বাম রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে। বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, বেগম খালেদা জিয়া এখন অনেকটা সুস্থ। মানসিকভাবে সাবলীল। হুইলচেয়ারে করে ফিরোজা ছাড়া খালেদা জিয়া অবশ্য দুই পুত্রবধূর হাত ধরে হেঁটেই এবার ফিরোজায় ফিরেছেন। খালেদা জিয়ার এই সাবলীল ফেরায় শক্তি সঞ্চার করেছে বিএনপি’র নেতাকর্মী ও গণতন্ত্রকামী দেশবাসীর মনে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও খালেদা জিয়ার এই ফেরাকে দলের জন্য দেশবাসীর জন্য নয়া বার্তা হিসেবেই বর্ণনা করেছেন। গণ- অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর এখন গণতন্ত্রে ফেরার যে চেষ্টা চলছে তা গতিশীল রাখতে বেগম খালেদা জিয়া কেন্দ্রভূমে থাকবেন বলেই মনে করা হচ্ছে।

গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে খালেদা জিয়া: ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তখন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। তিনি দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে তখন ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন। জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর দল হিসেবে বিএনপি তখন বিপর্যস্ত এবং দিশাহারা। দলের হাল কে ধরবেন? এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলে নানা আলোচনা। দলের নেতারা তখন দ্বিধাগ্রস্ত। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব  নেন। তৎকালীন সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সাত্তারকে পছন্দ করতেন। কারণ তারা জানতেন যে, তিনি রাজনৈতিকভাবে দক্ষ নন এবং শারীরিকভাবে দুর্বল। তখন বিএনপি’র একটি অংশ চেয়েছিল কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্বের কাঠামো ঠিক করতে। আরেকটি অংশ, যারা রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের সরকারে ছিলেন তারা ওই চেষ্টার বিরোধী ছিলেন।
বিএনপি’র প্রয়াত নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তার ‘চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা’ বইতে লিখেছেন, সামরিক এবং শাসকচক্রের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় ছিল খালেদা জিয়াকে নিয়ে। কারণ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য খালেদা জিয়াই সে সময় সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হতে পারতেন। কিন্তু তড়িঘড়ি করে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আব্দুস সাত্তারের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হলো। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ চেয়েছিলেন, আব্দুস সাত্তার যাতে হোন। 

বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের বার্ধক্য এবং দল পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষের কারণে তৎকালীন বিএনপি’র একাংশ খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু রাজনীতির প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না তখন। এর কারণ হিসেবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, প্রথমত জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তার মনে গভীর দাগ কেটেছিল এবং তিনি মানসিকভাবে সে ধকল কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না। দ্বিতীয়ত খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে পরিবারের দিক থেকে তেমন কোনো উৎসাহ ছিল না। এ ছাড়া রাজনৈতিক ভাগ্য তাকে কোথায় টেনে নিয়ে যায় সেটি নিয়েও হয়তো খালেদা জিয়ার মনে চিন্তা ছিল। এসময় দলের নেতাকর্মীরা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন তিনি দলের হাল না ধরলে দল টিকবে না। দলের নেতাদের এই অনুরোধ গ্রহণ করেই ১৯৮২ সালের ৩রা জানুয়ারি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খালেদা জিয়া আত্মপ্রকাশ করেন। সেদিন তিনি বিএনপি’র প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন। একই বছর ৭ই নভেম্বর জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে খালেদা জিয়া প্রথম বক্তব্য রাখেন।

‘বিএনপি: সময়-অসময়’ বইয়ে লেখক মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, বিএনপিতে যোগ দেয়ার পর থেকে খালেদা জিয়া বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া শুরু করেন। ১৯৮২ সালের ২৮শে জানুয়ারি শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার এবং প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের সঙ্গে খালেদা জিয়াও উপস্থিত ছিলেন।
১৯৮২ সালের ২১শে জানুয়ারি বিএনপি’র চেয়ারম্যান নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। দলের মধ্যে তখন এনিয়ে বিভক্তি। দলের তরুণ অংশ চেয়েছিল খালেদা জিয়া দলীয় প্রধান হবেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তারকে বিএনপি’র প্রধান হিসেবে দেখতে আগ্রহী ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ। বিএনপি’র চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য একইসঙ্গে প্রার্থী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া এবং রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার। এর ফলে এক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিচারপতি সাত্তার দু’বার বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় যান। বেগম খালেদা জিয়া তাকে তরুণ নেতৃত্বের মনোভাবে কথা জানান। এসময় বিচারপতি সাত্তার বেগম খালেদা জিয়াকে দলের সহ-সভাপতির পদ এবং দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। কিন্তু বেগম জিয়া ব্যক্তিগত কারণে তা গ্রহণ করেননি। অবশেষে বিচারপতি সাত্তারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর বেগম খালেদা জিয়া চেয়ারম্যান পদ থেকে তার প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তখন রাজনীতিতে সাত্তারের আর কোনো মূল্যই থাকেনি। তার বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং নিষ্ক্রিয়তার কারণে দল থেকে তিনি আড়ালে পড়ে যান। আর আব্দুস সাত্তার আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি’র চেয়ারম্যান থাকলেও দল পরিচালনায় খালেদা জিয়ার প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং এপ্রিল মাসের প্রথমে বিএনপি’র এক বর্ধিত সভায় তিনি ভাষণ দেন। সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের কয়েক মাস পরেই খালেদা জিয়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। এরপর থেকেই সামরিক শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠেন তিনি। আন্দোলনের সময় তাকে কয়েকবার আটক করা হলেও আন্দোলন থেকে সরে যাননি বিএনপি চেয়ারপারসন। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে বিএনপি জয়লাভ করে। রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। পরে খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে যত আসনে অংশ নিয়েছেন তার সবগুলোতেই জয়লাভ করেছেন।

১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি’র অধীনে একটি বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে খুব অল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা বাদ দিলে খালেদা জিয়া পূর্ণ মেয়াদে সরকার পরিচালনা করেছেন দুই বার। প্রথমবার যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন দেশ পরিচালনায় তিনি ছিলেন একেবারেই অনভিজ্ঞ। এমনকি সংসদেও তিনি ছিলেন নতুন। কিন্তু জীবনের প্রথম নির্বাচনেই খালেদা জিয়া পাঁচটি আসন থেকে লড়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন। তার রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তার কোনোটিতেই পরাজিত হননি তিনি।

১৯৯১-৯৬ সালে সফলভাবে সরকার পরিচালনার পর ১৯৯৬ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারির বাধ্যবাধকতার নির্বাচন নতুন জটিলতা তৈরি করে। বাস্তবতা মেনে নিয়ে বেগম জিয়া নতুন করে নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই আবার ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার দল বিএনপি’র ব্যাপক ভরাডুবির পেছনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল বলে দলের অনেকে মনে করে থাকেন।  এরপর থেকে দলটি রাজনৈতিকভাবে একের পর এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি রাজনৈতিকভাবে অনেকটা চাপে পড়ে যায়। তবে খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তে এই নির্বাচন বর্জন করায় নির্বাচনটি বিনা ভোটের নির্বাচন হিসেবে আখ্যা পায়। অর্ধেকের বেশি এমপি ভোট ছাড়া এমপি হওয়ায় ওই সংসদের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠে। খালেদা জিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এসে হাজির হয় তার বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির মামলা। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ার কারণে ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশ নিতে পারেননি। এই নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের সমমনা দল অংশ নিলেও আওয়ামী লীগের ভোট চুরির নয়া কৌশলের কাছে দাঁড়াতেই পারেনি। পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে দিনের  ভোট রাতেই হয়ে যায়। এ কারণে এই নির্বাচন আখ্যা পায় রাতের  ভোটের নির্বাচন হিসেবে।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি সাজানো দুর্নীতি মামলায় সাজা দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। ওদিনই বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়। নাজিম উদ্দিন রোডের কারাগার আর পিজি হাসপাতাল এই দুই জায়গায় বন্দি ছিলেন খালেদা জিয়া। করোনা মহামারি আসার পর ২০২০ সালের ২৫শে মার্চ সরকার নির্বাহী আদেশে তার সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ছয় মাস পরপর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার সাজা স্থগিত করে মুক্তির মেয়াদ বাড়াচ্ছিল সরকার। কিন্তু দুই শর্তের কারণে তিনি কার্যত বন্দি ছিলেন বাসায়। শুধু হাসপাতালে যেতে পারতেন। পরিবার এবং দলের পক্ষ থেকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার জন্য বার বার অনুমতি চাইলেও তাতে সাড়া দেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। দল এবং স্বজনরা বারবার আবেদন জানালেও তাতে কর্ণপাত করেনি ফ্যাসিস্ট সরকার।

৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারের একদিন পরেই বিএনপি’র চেয়ারপারসনকে নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেয়া হয়। এদিন বঙ্গভবনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানেরা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়া হয়েছে।

গত ৭ই জানুয়ারি রাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য কাতারের আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি নিজের রাজকীয় এয়ারলাইন্সের বিশেষ এয়ার এম্বুলেন্সে ঢাকা ছাড়েন বেগম খালেদা জিয়া। ৮ই জানুয়ারি সকালে হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসনকে লন্ডনে ডেভেনশায়ার প্লেসে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ‘লন্ডন ক্লিনিকে’ ভর্তি করা হয়। সেখানে লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জন প্যাট্রিক কেনেডির তত্ত্বাবধানে তিনি চিকিৎসাধীন আছেন। ঢাকা ছাড়ার দিনে গুলশানের বাসা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ সড়কে অবস্থান নিয়ে বিপুল শুভেচ্ছা জানান। বিদেশ যাত্রার আগে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
৮ই জানুয়ারি সকালে হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছালে খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানান ছেলে তারেক রহমানসহ স্বজনরা। সেখানে তারেক রহমানের মা’কে জড়িয়ে ধরার আবেগঘন ছবি খবরের শিরোনাম হয়। তারেক রহমান বরাবরের মতো নিজে গাড়ি চালিয়ে খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সর্বশেষ ২০১৭ সালের জুলাইয়ে মা-ছেলের সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল।

রাজসিক ফেরা: লন্ডনে চার মাস চিকিৎসা নিয়ে গত ৬ই মে দেশে ফিরেন খালেদা জিয়া। তার সঙ্গে ফিরেছেন দুই পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান ও সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি। জুবাইদা রহমান দেশে ফিরলেন ১৭ বছর পর। লন্ডনে চিকিৎসা নিয়ে খালেদা জিয়া এখন অনেকটাই সুস্থ আছেন। তিনি সুস্থ হয়ে দেশে ফিরছেন এ বার্তায় ওদিন সকাল থেকে বিমানবন্দর থেকে গুলশান ফিরোজায় পথে লাখো নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণকে তাকে শুভেচ্ছা জানান। আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে বিএনপি চেয়ারপারসনকে স্বাগত জানায় তারা। খালেদা জিয়ার আগমনে উচ্ছ্বসিত ছিল নেতাকর্মী। পথে পথে তাকে অভ্যর্থনা জানান লাখো নেতাকর্মী। সিক্ত হন তাদের শুভেচ্ছায়। খালেদা জিয়া সাধারণত গাড়ির সামনে না বসলেও এদিন তাকে সেখানে আসন নিতে দেখা গেছে। পেছনের আসনে বসেন তার দুই পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান ও সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি। শুভেচ্ছা বিনিময় করে তার বাসায় পৌঁছাতে লেগে যায় ২ ঘণ্টারও বেশি সময়। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে হুইলচেয়ারেই চলাচল করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এদিন সবাইকে অনেকটা বিস্মিত করে দিয়ে গুলশানে নিজ বাসায় ফিরোজায় ঢোকার সময় গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া। সড়কের পাশে অবস্থান নেয়া হাজার হাজার নেতাকর্মী জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা হাতে নিয়ে খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানায়। বিএনপি নেত্রী গাড়ি থেকে হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। খালেদা জিয়ার এই রাজসিক প্রত্যাবর্তনে উচ্ছ্বসিত দলের নেতাকর্মীরা। আগামী দিনে গণতন্ত্রে ফেরার লড়াইয়ে, ’২৪- এর গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যুদ্ধে খালেদা জিয়ার এই প্রত্যাবর্তন নতুন আশার সঞ্চার করেছে বলেও মনে করা হচ্ছে।

সূত্র- জনতার চোখ

mzamin