Sunday, November 2, 2025

কেমন ছিল লুভ্যরের চুরির ঘটনা

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অবস্থিত বিশ্ব বিখ্যাত মিউজিয়াম ল্যুভরে ঘটে গেল এক বিস্ময়কর চুরির ঘটনা। দিবালোকে শত শত দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে মাস্ক পরা একদল চোর ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের রাজকীয় গহনা চুরে করে পালিয়ে গেছে। যা ১৯১১ সালে মোনালিসা চুরির পর এটিই ল্যুভরের সবচেয়ে বড় চুরি। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এখনও তাদের কাছ থেকে চুরি হওয়া গহনার হদিশ পায়নি তদন্তকারীরা। বলা হচ্ছে ইতিমধ্যেই চুরির গহনা বিক্রির চেষ্টা শুরু হয়ে গেছে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, ঘটনাটি ঘটেছে ১৯ অক্টোবর সকাল ৯টা ৩৪ মিনিটে। প্যারিসে অবস্থিত ল্যুভর মিউজিয়ামের অ্যাপোলো গ্যালারিতে ঢুকে চোরের একটি দল। মিউজিয়ামের এই গ্যালারিতেই রয়েছে ফ্রান্সের রাজপরিবারের মূল্যবান গয়না। যার মধ্যে নেপোলিয়নের দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্য উপহার দেওয়া একটি এমেরাল্ড ও হীরার হারও ছিল।

ফরাসি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চারজন চোর একটি ট্রাক ও দুইটি মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থলে আসে। ট্রাকের ওপরে চুরি করা একটি বৈদ্যুতিক মই স্থাপন করে তারা জাদুঘরের দ্বিতীয় তলায় উঠে যায়। চোরেরা নির্মাণশ্রমিক সেজে হলুদ সেফটি ভেস্ট পরে আসে। যেন তাদের দেখে কেউ সন্দেহ করতে না পারে। এরপর তারা বিশেষ ইলেকট্রিক ডিস্ক গ্রাইন্ডার ব্যবহার করে শক্তিশালী কাচ কেটে ঢোকে গ্যালারিতে।

দুইজন চোর সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে এগিয়ে যায়। যেখানে কাচের বাক্সে ছিল নেপোলিয়নের উপহার হিসেবে দেওয়া বিখ্যাত এমেরাল্ড নেকলেস ও রানী মেরি-আমেলির টায়ারা। ল্যুভরের নিরাপত্তা নির্দেশিকাতেই উল্লেখ আছে- আগুন লাগলে এই ধরণের ডিস্ক কাটার দিয়ে কাচ কাটা হয়। চোরেরা সেই কৌশলই ব্যবহার করেছে।
ল্যুভর মিউজিয়ামের পরিচালক লরেন্স দে কার্স ফরাসি সিনেটকে জানিয়েছেন, জাদুঘরের বাইরের নিরাপত্তা ক্যামেরাগুলোর অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল ও পুরোনো। যেখানে চোরের দল প্রবেশ করেছিল, সেখানে কেবল একটি ক্যামেরা ছিল। কিন্তু সেটির দৃষ্টি ছিল পাশের দিকে, ফলে চোরদের মই বেয়ে ওঠার দৃশ্য ধরা পড়েনি। পুলিশের তরফেও স্বীকার করা হয়েছে যে তাদের নিজস্ব রাস্তার ক্যামেরায় চোরদের ট্রাক ধরা পড়লেও কেউ বিষয়টি খেয়াল করেনি।

চোরদের ঢুকতে সময় লাগে মাত্র চার মিনিট, কিন্তু পুলিশের হাতে খবর পৌঁছায় যখন তারা কাচ কেটে গয়না বের করতে শুরু করেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশের পৌঁছাতে সময় লাগে তিন মিনিট। কিন্তু ততক্ষণে চোরেরা পালিয়ে যায়। চোরেরা পালানোর সময় তাড়াহুড়ো করে প্রচুর প্রমাণ রেখে যায়। ঘটনাস্থলেই পাওয়া যায় গ্লাভস, মোটরসাইকেল হেলমেট, ব্লোটর্চ, হলুদ ভেস্ট, এমনকি একজোড়া গয়না ও সম্রাজ্ঞী ইউজেনির মুকুটও।

পুলিশ জানিয়েছে, ফেলে যাওয়া জিনিস থেকে সংগৃহীত ১৫০টির বেশি ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ করেছে তারা। যার মধ্যে ডিএনএ ও আঙুলের ছাপও রয়েছে। এ কারণেই দ্রুত দুই অভিযুক্তকে পাকরাও করতে পেরেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে চার্ল দ্য গোল বিমানবন্দর থেকে এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন তিনি একমুখী টিকিট নিয়ে আলজেরিয়া পালাতে চাচ্ছিলেন। ৪০ মিনিট পর তার সহযোগীকেও ধরা হয়। তবে আরও দুইজন এখনো পলাতক। গত বুধবার রাতে প্যারিস থেকে আরও পাঁচ সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। যাদেরকে এখন জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়নি।

পুলিশ আশঙ্কা করছে, চুরি হওয়া গয়নাগুলো ইতিমধ্যেই টুকরো করে রত্ন আলাদা করা বা ধাতু গলিয়ে বিক্রির চেষ্টা চলছে। এখনো কোনো সম্পদ উদ্ধার করা যায়নি। ল্যুভরের অলঙ্কার বিভাগীয় পরিচালক অলিভিয়ে গাবে বলেন, রাতের বেলায় আমি যখন গ্যালারিতে ঢুকেছিলাম, চারদিকে এক ভয়ানক নীরবতা। কাচের বাক্সগুলো ফাঁকা পড়ে ছিল। যেন ইতিহাসের এক অংশ হারিয়ে গেছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানাপোলিসের শিক্ষক হোলি বার্কার বলেন, আমি নেপোলিয়নের সেই হারটির ছবি তুলেছিলাম। মুহূর্তের মধ্যেই গর্জন শুনে আমরা দৌড়ে বেরিয়ে আসি। এখন ভাবলে মনে হয়, আমি হয়তো সেই হারটি শেষবার দেখেছিলাম।

মিউজিয়ামের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ: ল্যুভরের ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুলটি ছিল নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা। বিশেষ করে দেয়ালের বাইরের ক্যামেরায়। গত সপ্তাহে ফরাসি সিনেটে এমনটাই স্বীকার করেছেন জাদুঘরের পরিচালক লরঁস দে কার। তিনি শুনানিতে বলেন, বাইরের ক্যামেরাগুলো খুব পুরোনো, আর এত কম যে পুরো এলাকা কাভার করে না। সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদক জাদুঘরে গিয়ে দেখেছেন, বাইরের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ২৫টি ক্যামেরা আছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র পাঁচটি বাইরের দেয়ালে, বাকিগুলো ভেতরের প্রাঙ্গণে। সেই তুলনায় আকারে অনেক ছোট বৃটিশ মিউজিয়াম বলছে, তাদের বাইরে কয়েক ডজন ক্যামেরা রয়েছে।

বাইরের এত কম ক্যামেরা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ল্যুভর কর্তৃপক্ষ মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। জাদুঘরের পরিচালক বলছিলেন, সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চোরের দল যে স্থানে লক্ষ্য করেছিল, সেই প্রান্তে বাইরে মাত্র একটি ক্যামেরা ছিল। সেটিও আবার ব্যালকনির পশ্চিম দিকে তাক করা ছিল। ফলে চোরের দলের কর্মকাণ্ড বা জানালা ভাঙচুরের দৃশ্য ধরা পড়েনি। ক্যামেরাটি অন্যভাবে বসানো থাকলে জাদুঘরের কন্ট্রোল রুমে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা দেখতে পারতেন, কীভাবে চোরের দল বৈদ্যুতিক মই বেয়ে ব্যালকনিতে উঠছে। চোরের দলের জানালা কাটতে যে কয়েক মিনিট লেগেছিল, তাতে আগে থেকে প্রহরীরা জানলে চুরি ঠেকানোর প্রস্তুতি নিতে পারতেন। কিন্তু সেই সময়ে প্রহরীরা কার্যত অন্ধকারে ছিলেন। ফলে পুলিশকে খবর দিতে তাদের দেরি হয়।

গত বুধবার সিনেটে সাক্ষ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেন, জাদুঘরের বাইরের প্রান্ত পাহারায় তাদেরও দায়িত্ব ছিল। তারাও গাফিলতি করেছে। প্যারিস পুলিশের ক্রাইম প্রিভেনশন সার্ভিসের প্রধান ভিনসাঁ আনরো বলেন, ল্যুভরের চারপাশে পুলিশের সাতটি স্ট্রিট ক্যামেরা আছে। একটি ক্যামেরায় চোরের দলের উপস্থিতি ধরা পড়েছিল। তবে কেউ সেটি খেয়াল করেনি বা সন্দেহ করেনি। জাদুঘর থেকে চুরির অ্যালার্ট আসার পর সবার হুঁশ হয়। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্যারিসে নির্মাণকাজ নিত্যদিনের বিষয়। ক্যামেরা মনিটরিংয়ে পুলিশের কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নেই। জাদুঘরের পরিচালকসহ বিভিন্ন কর্মকর্তার দেওয়া সময়সূচি মিলিয়ে মনে হচ্ছে, এক মিনিটের কম সময়ের ব্যবধানে চোরের দল পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে। প্যারিসের পুলিশপ্রধান বলেন, জাদুঘরকর্মীদের ফোন ও এক সাইকেল আরোহীর খবর পাওয়ামাত্র তিন মিনিটের মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল; কিন্তু তাদের খবর দেওয়া হয়েছিল তখন, যখন চোরের দল প্রদর্শন বক্সের কাচ কাটাকাটি শুরু করে দিয়েছে। তিন মিনিটের কম সময়ের মধ্যে চোরের দল আটটি মূল্যবান জিনিস নিয়ে ছিটকে পড়ে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/187391_Kaium-9.webp

মওদুদ আহমদের স্বস্তি-অস্বস্তির আত্মজীবনী by এম এম খালেকুজ্জামান

মওদুদ আহমদ একজন আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। প্রয়াত এই রাজনীতিকের আত্মজৈবনিক বই চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন। বইটি নিয়ে লিখেছেন এম এম খালেকুজ্জামান

মওদুদ আহমদ হতে পারতেন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ভূমিপূত্র’। আগরতলা মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আইনজীবী, তারপর তাঁর সচিব, জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, এরশাদ আমলে উপরাষ্ট্রপতি—ঐতিহাসিক সংশ্লিষ্টতায় ঈর্ষণীয় এক ক্যারিয়ার তাঁর। কিন্তু রাজকাহিনিতে প্রিয় পুত্র যেমন ত্যাজ্যপুত্র হয়, তেমনি তাঁর কপালেও জুটেছিল প্রিয় থেকে অপ্রিয় হওয়ার ঘটনা। সম্প্রতি প্রথমা প্রকাশন থেকে বের হওয়া মওদুদ আহমদের আত্মজীবনী চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা ১৯৯১ থেকে ২০১৯ বইটি এসবেরই এক অম্লমধুর ধারাবিবরণী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং এরপর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যক্ষদর্শীর এক মহাবিবরণী যেন তাঁর আত্মজীবনীর শেষ পর্ব। শুরুতে যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অবিভক্ত ভারতের কলকাতার স্মৃতি পাওয়া যায়। খিদিরপুর ডকে দেবেন্দ্র ম্যানশনে থাকার সময় জাপানিদের বোমাবর্ষণের স্মৃতি আর বইটি শেষ করেছেন শেখ হাসিনার শাসনামলের বর্ণনা দিয়ে।

চিন্তাচর্চায় স্বতন্ত্র

মওদুদ আহমদের জীবন ও সমসাময়িক কাল ও স্থান সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা ছিল এবং তা মেনেই তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেছেন। তাঁর এই অনুশীলনের কেন্দ্রে ছিল দেশ ও দেশের মানুষ। অনেক রাজনীতিক ও আমলাকে দেখা যায়, অবসরে যাওয়ার পর তাঁরা লেখালেখিতে ব্যস্ত হন। আইন ও রাজনীতি পেশার অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য মেনে তিনি অবসর নেননি।

মওদুদ আহমদের প্রথম বইয়ের প্রকাশকাল বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, নিজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পেশাজীবনের অভিজ্ঞতাকে লেখায় অনুবাদ করেছেন মধ্যজীবন থেকে। লেখালেখি তাঁকে অন্য রাজনীতিকদের চেয়ে পৃথক করেছে।

রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী মওদুদ আহমদ তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় সক্রিয় ছিলেন চিন্তাচর্চাকারী হিসেবে, যা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জীবনব্যাপী যা কিছু লিখেছেন, তা বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে বলা যায় ‘বাংলাদেশের রাজনীতির ধারাভাষ্যকার’।

মওদুদ আহমদের একাধিক বইয়ের সঙ্গে অনুসন্ধানী পাঠক তাৎপর্যপূর্ণভাবে তাঁর শেষ বইটিকে আলাদা করতে পারবেন। কারণ, এখানে তিনি পাঠককে তাঁর একান্ত ব্যক্তিজীবন সম্পর্কেও জানাতে চেয়েছেন। এর আগে তাঁর অন্য লেখার প্রধান ক্ষেত্র ছিল রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি। আর শেষ বইতে তিনি ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে জড়িত ইতিহাসের ওপরও আলো ফেলেছেন।

আত্মজীবনীর ‘অস্বস্তি’

আত্মজীবনী কখনো কখনো অস্বস্তি উৎপাদন করে। যে কারণে অনেকেই জীবদ্দশায় এর প্রকাশ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকেন না। অছিয়ত করে যান, মৃত্যুর পর প্রকাশের। মওদুদ আহমদ তাঁর এই বই প্রথমা প্রকাশনকে দেওয়ার আগে আরও দুটি প্রকাশনীর কাছে দিয়েছিলেন। ‘ঝুঁকি’ বিবেচনায় তাঁরা অপারগতা দেখায়; কিন্তু প্রথমা এ ব্যাপারে সাহসিকতা ও পেশাদারত্ব দেখিয়ে তা প্রকাশের দায়িত্ব পালন করেছে। তবে বিপুলায়তন বইটির নির্ঘণ্ট যুক্ত হলে তা আরও পূর্ণতা পেত।

২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় হয় মওদুদ আহমদের বাংলাদেশ: ইমার্জেন্সি অ্যান্ড দ্য আফটারম্যাথ: ২০০৭-২০০৮ বইটি। এতে তিনি ‘এক-এগারো’র সময়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন। আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রশমনে প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের অভাব নিয়ে।

মওদুদ আহমদের এমন পর্যবেক্ষণে তাঁর দলেরই নেতা-কর্মীরা প্রতিবাদ করেছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় মওদুদ বলেন, ‘সমস্ত বইয়ে চেষ্টা করেছি বস্তুনিষ্ঠভাবে দেশের ইতিহাস তুলে ধরতে। আমি তো এই বই বর্তমানের জন্য লিখিনি। এটা তো ভবিষ্যতের জন্য লিখেছি।’ (প্রথম আলো, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪)

এর আগে তাঁর লেখা আ স্টাডি অব পলিটিক্যাল অ্যান্ড মিলিটারি ইন্টারভেনশন ইন বাংলাদেশ বইটি নিয়েও ২০১৩ সালে তাঁর দলের মধ্যে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মওদুদ আহমদ। ওই সময় বইটির অংশবিশেষ আলোচনায় এনে তাঁর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল দলের নিজের একটি অংশ।

অন্য অনেক রাজনৈতিক নেতার কপটতার বিপরীতে মওদুদ আহমদ তাঁর লেখালেখিতে অন্তত অকপট ছিলেন—রাজনীতিসচেতন পাঠকেরা এমনটাই বলে থাকেন। চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা ১৯৯১ থেকে ২০১৯ বইটিও ব্যতিক্রম নয়।

অখণ্ড সময়ের খণ্ড স্মৃতিচিহ্ন

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও লেখকদের একটি সাধারণ প্রবণতা হলো, আন্দোলন–সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, ঘটনা ও বিশ্লেষণে বিশেষ কোনো ব্যক্তি কিংবা নিজের ভূমিকাই প্রকট হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে আমরা কদাচ ভারসাম্য দেখি। আর আত্মজীবনী হলে আমিত্বকে দূরে রাখা যায় না; বরং সেটিই চালক হয়ে ওঠে। তবে মওদুদ আহমদ তাঁর এই ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছেন।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত সব বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে মওদুদ আহমদ অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছিলেন। এ ছাড়া একজন কৃতবিদ্য আইনবিদ ও সংবিধানবেত্তা হিসেবে তিনি সমকালীন বিশ্ব, সমাজ, রাজনীতি ও উন্নয়ন চিন্তা–সম্পর্কিত নানা বইয়ের নিয়মিত পাঠক ছিলেন তিনি। চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা ১৯৯১ থেকে ২০১৯ বইটি পড়লে পাঠকেরা সেগুলোর একটি দারুণ অভিজ্ঞতা পাবেন।

বিখ্যাত সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মতোই জেলজীবন ও মুক্তজীবনের মধ্যে শাটল কর্কের মতো আসা-যাওয়া ছিল মওদুদ আহমদের। ১৫ বছর বয়সে প্রথম তিনি জেলজীবন বরণ করেন; সেটি ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অব্যবহিত পর একুশে ফেব্রুয়ারি কর্মসূচিতে পতাকা উত্তোলনের জন্য।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে জরুরি আইন ঘোষণার পর জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে গঠিত হয়েছিল কমিটি ফর সিভিল লিবার্টিজ অ্যান্ড লিগ্যাল এইড। তিনি ছিলেন এ সংগঠনের সম্পাদক। পরিহাস হলো, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি নিজেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

এরপর ১৯৯৬ সালের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছাড়া ১৯৮২-৮৩, ১৯৯১, ২০০৭-০৮ ও ২০১৩-১৪ সালে নিজের কারাভোগকে মওদুদ আহমদ প্রতিহিংসামূলক, রাজনৈতিক উদ্দেশপ্রণোদিত বলে মনে করেন। তিনি এ বইয়ে লিখেছেন, সেসব কারাবরণে কোনো পাবলিক কজ ছিল না, কোনো গৌরব বা কোনো স্বপ্ন জড়িত ছিল না; বরং ছিল অপমান ও লাঞ্ছনায় ভরা।

মওদুদ আহমদের এই আত্মজীবনীর ব্যাপ্তি প্রায় আট দশক। তিনি তুলে এনেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা চরিত্র ও ঘটনা। তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল রাজনীতি ও আইন পেশা। স্বভাবতই এই দুটি বিষয় তাঁর আত্মজীবনীর বেশ বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। অন্য বিষয়গুলো তিনি কেবল ছুঁয়ে গেছেন।

ফলে এ বইয়ে ইতিহাসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ খুঁজতে না যাওয়াই শ্রেয়; কিন্তু বিষয়-বর্ণনায় লেখকের নির্মোহ ও মানবিক দৃষ্টি আমাদের মুগ্ধ করে। তিনি কুশলী ন্যারেটরের মতো ঘটনার সত্যনিষ্ঠ বিবরণ দিয়ে গেছেন। মাঝেমধ্যে দু–একটি মন্তব্য করেছেন; নিজেকে ঘটনার আড়ালে না নিয়ে উপস্থিত রাখতে সচেষ্ট থেকেছেন। এ বইয়ে এটাই সম্ভবত তাঁর এক অসাধারণ শৈলী, যা আগের বইগুলোর চেয়ে ভিন্ন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মূল্যয়ন

মওদুদ আহমদ লিখেছেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল মূলত একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে। প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত ছিল, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনো ব্যক্তিকে দলের কোনো পদে আসীন করা হবে না। সময়ের বিবর্তনে ও রাজনীতির চক্রখেলায় বিএনপি ক্রমে সেখান থেকে অনেক দূরে সরে আসে।

১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জিয়াউর রহমান নিজেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শাহ আজিজকে সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। মওদুদ আরও লেখেন, সাত্তার ও শাহ আজিজদের ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিএনপি একটি ডানপন্থী রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকে। (পৃষ্ঠা ৬০)

মওদুদ আহমদ আফসোস করেছেন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠনের পর বিএনপিকে জামায়াতের ‘স্থায়ী রাজনৈতিক পার্টনার’ হিসেবে প্রচার–প্রচারণা করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। ২০১১-১২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সময় তিনি অনেকবার ‘বিএনপির রাজনীতি কী’ এমন অপ্রিয় প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন।

মওদুদ আহমদ বিষয়টি দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে জানিয়েছেনও। খালেদা জিয়া বিষয়টি অনুধাবন করলেও বিএনপি সেই সময় বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেনি। জামায়াত প্রশ্নে বিএনপির এই দোদুল্যমানতায় নিদারুণ মনোবেদনায় ভুগছেন মওদুদ আহমদ।

মওদুদ আহমদ তাঁর নিজ দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চরিত্র চিত্রণে অকপট ছিলেন। তাঁর বৌদ্ধিক সততার ব্যতিক্রমী উদাহরণ রয়েছে আত্মজীবনীর পাতায় পাতায়। তিনি বলেছেন, ক্ষমতার রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অনৈতিকতা ও স্ববিরোধিতার চরম দৃষ্টান্ত হলো, রাজনৈতিক অঙ্গনে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অবস্থান এবং স্বীকৃতি। (পৃষ্ঠা-৩২৭)

মওদুদ আহমদ আপাদমস্তক গণতন্ত্রী ছিলেন, যে স্বভাবের কারণে তিরি তাঁর নিজ দলের কাছেও অপাঙ্‌ক্তেয় ছিলেন এবং তা দলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই। ঢাকার ড্যাফোডিল হোটেলে যুবদলের এক সম্মেলনে ‘দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে’ এমন কথা বলার পর তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। (পৃষ্ঠা ৫৪৬)

মওদুদ আহমদ তাঁর মেধা, যোগ্যতা আর অভিজ্ঞতা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব থেকে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়েছিলেন, আর এরশাদ তো তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি পর্যন্ত বানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে আর কেউ সঠিকভাবে মূল্যয়ন করেননি বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন।

১৯৭৪ সালে মওদুদ আহমদ কিছুদিন কারাগারে আটক থাকলেও শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উদারতা নিয়ে লিখেছেন কৃতজ্ঞচিত্তে। তবে শেখ হাসিনার শাসনামল যে চূড়ান্ত কতৃর্ত্বপরায়ণ সেটি বলেছেন নির্দ্বিধায়।

সম্ভাবনাকে পরিণতিতে রূপান্তর করতে না পারার ব্যর্থতা তাঁকে দারুণ পুড়িয়েছে। এখানে ইতিবাচক সমাজ রূপান্তরের সব শর্তই উপস্থিত ছিল বলে মনে করতেন মওদুদ আহমদ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির টানাপোড়েনে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বপ্ন, সামাজিক ঐক্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হয়েছে মনে করতেন তিনি।

বিচারপতিদের অবসরের বয়স বৃদ্ধি নিয়ে ‘আক্ষেপ’

চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা ১৯৯১ থেকে ২০১৯ বইয়ের চতুর্দশ অধ্যায় আসলে বিচার বিভাগ নিয়ে মওদুদ আহমদের হতাশার সালতামামি। গণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসনে বিচার বিভাগের ভূমিকা, রাজনীতি ও আইনের শাসন, বিচারিক সংস্কৃতির অবনতি—এই রকম কিছু বিষয় নিয়ে তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অবসরের বয়স বৃদ্ধি করতে আনা সংবিধান সংশোধনীর জন্য সব দায় তাঁর ওপর চাপানো অন্যায্য মনে করেন মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, নানা রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশ করে বিএনপির জে্যষ্ঠ নেতারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জানিয়ে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত একরকম নিজেরাই নিয়েছিলেন।

শুরুতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কোন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন, সেই বিবেচনায় কেবল আপিল বিভাগের বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোর চিন্তা করা হয়েছিল। মওদুদ আহমদ দাবি করেছিলেন, তিনি বরং উভয় বিভাগের (হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ) বিচারপতিদের অবসরের বয়স বৃদ্ধি করতে ভূমিকা রাখেন।

মন্ত্রিসভার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চতুর্দশ সংশোধনী পাস হয়েছিল। অথচ সব দোষ আর দায় তাঁর একার নিতে হয়েছে বলে আক্ষেপ করেছেন মওদুদ আহমদ। তাঁর আরও আক্ষেপ হলো, বিচারপতিদের অবসরের বয়স দুই বছর বাড়ানো হলেও তিনি নূ৵নতম ধন্যবাদও পাননি উপকারভোগীদের কাছ থেকে।

ইতিহাসের পথরেখায়

সুপ্রিম কোর্টের করিডরে মওদুদ আহমদকে বহুবার হেঁটে যেতে দেখেছি। মামলার শুনানিতে তিনি যখন জটিল আইনের সহজ ব্যাখ্যার মাধ্যমে নিজেকে মেলে ধরতেন, সেসব মুহূর্ত ছিল তরুণ আইনজীবীদের জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা। আইনজীবী হিসেবে তিনি ছিলেন উচ্চ মার্গের।

মওদুদ আহমদের রাজনৈতিক আদর্শের কম্পাস বারবার দিক পরিবর্তিত হয়েছে—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁর এই আদর্শিক দোদুল্যমানতা আমাদের প্রথাগত রাজনৈতিক দুরবস্থার একটি প্রতিফলন কি না, এমন প্রশ্নও করা যেতে পারে। সবকিছুর পরেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে দূরে কখনো সরে যাননি।

* এম এম খালেকুজ্জামান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
- মতামত লেখকের নিজস্ব

মওদুদ আহমদের স্বস্তি-অস্বস্তির আত্মজীবনী

‘শাপলা কলি’ নিচ্ছে এনসিপি, ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা

নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে ‘শাপলা কলি’ নিতে রাজি হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সেই সঙ্গে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দলটি।

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ ঘোষণা দেন।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা শাপলা কলি নেব। এখন এখানে আপনাদের একটা বিষয় থাকতে পারে, শাপলা নিয়ে কিন্তু আমরা এখনো ব্যাখ্যা পাইনি। নির্বাচন কমিশনের যে স্বেচ্ছাচারী আচরণ, কিন্তু এখন কি তাইলে আমরা প্রতীক নিয়ে পড়ে থাকব? আমরা কি ইলেকশন ফেজে (পর্যায়ে) ঢুকব না? তো সে জন্য আমরা বৃহত্তর স্বার্থটা চিন্তা করেই এই ডিসিশনটা (সিদ্ধান্ত) নিচ্ছি।’

শাপলা কলি প্রতীক নিয়েও দেশজুড়ে এনসিপি ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে বলে দাবি করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, ‘দেশবাসীর কাছে আমরা শাপলা কলি নিয়েও কিছু পজিটিভ সাড়া পেয়েছি। এটা শাপলার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে শাপলা কলি হয়েছে। অর্থাৎ শাপলাও আছে, কলিও আছে। সে জায়গায় নির্বাচন কমিশন আমরা যতটুকু চিন্তা করেছি, তারা একধাপ একটু বাড়িয়ে চিন্তা করে সেখানে কলি ও শাপলা যুক্ত করেছে।’

এনসিপি নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে জানিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষ নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী হয়ে তাঁদের অফিসে এলে তাঁরা সেটা বিবেচনা করবেন।

নির্বাচন কমিশন যাতে দ্রুততম সময়ে এনসিপির নিবন্ধনসংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করেন, সেই আহ্বান জানিয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

সিইসির সঙ্গে বৈঠকে এনসিপির প্রতিনিধি দলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং পলিসি ও রিসার্চ লিড খালেদ সাইফুল্লাহ এবং যুগ্ম সদস্যসচিব জহিরুল ইসলাম মুসা উপস্থিত ছিলেন।

আস্থার প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনকে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং কমিশন’ বলে মন্তব্য করেন এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী। তিনি বলেন, ‘এখনো নির্বাচন কমিশনকে যদি সংক্ষিপ্ত ওয়ার্ডে বলতে বলেন, আমরা এটাকে নির্বাচন কমিশন বলতে পারি না। এটাকে ইঞ্জিনিয়ারিং কমিশন বলতে পারি আমরা। এই ইঞ্জিনিয়ারিং কমিশনে এসেছি আমরা, এখানে অনেক কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে। সো ইঞ্জিনিয়ারিং কমিশনে আমরা আমাদের ফাইটটা করে যাচ্ছি।’

ভবিষ্যতেও নির্বাচন কমিশন দেশের মানুষের সঙ্গে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপি কত আসন পাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, ‘আমরা তো বলেছি যে ৩০০ আসনেই আমরা ইলেকশন করব।’

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানান, সকালে একটি রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে এক ব্যক্তির কাছ থেকে জানতে পারেন, একটি নির্দিষ্ট দলের মনোনয়নের জন্য তাঁর কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে দেশে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে। আর বিএনপির নেতৃত্বে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস হচ্ছে।’

নাসীরুদ্দীন বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর যে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ, এই ফ্যাসিবাদের তো আমরা সঙ্গী হতে পারব না। আবার বিএনপির যে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, এটারও সঙ্গী হতে পারব না।’ 

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-02%2Fxw9bar4b%2FWhatsApp-Image-2025-11-02-at-16.52.08.jpeg?rect=87%2C0%2C903%2C602&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী। আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে। ছবি: প্রথম আলো

সাকিব আল হাসান: বাংলাদেশের ক্রিকেটনায়ক যেভাবে নিজের ক্যারিয়ার কবর দিলেন by মুবাশার হাসান

দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধঃ একসময় সাকিব আল হাসান ছিলেন বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পরিচিত নাম। তিনি ছিলেন একজন নায়ক, যিনি লাখো মানুষের, বিশেষত তরুণদের, আশা-ভরসা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। কেনই বা হবেন না?

সাকিব ছিলেন ক্রিকেটার, তাও আবার জাতীয় দলের অধিনায়ক। দারিদ্র্য, রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত একটি দেশে সাকিব বাংলাদেশের জন্য গৌরব ও সম্মান বয়ে এনেছিলেন। এজন্যই তিনি ছিলেন মানুষের প্রিয়। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পর সাকিবই হয়তো সবচেয়ে পরিচিত বাংলাদেশি ছিলেন। কিন্তু ১৫ বছরেরও বেশি সময় দেশ শাসন করা স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর, অনেক বাংলাদেশির কাছেই সাকিব আর নায়ক নন।

ক্রিকেটার অবস্থায়ই সাকিব তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগ দেন ২০২৩ সালে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। সেই নির্বাচনকে দেশ-বিদেশে একপক্ষীয় ও কারচুপিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। এখন হাজারো আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর মতো সাকিবও নির্বাসিত জীবনে আছেন। বাংলাদেশের এক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, সাকিব আর কখনো জাতীয় দলের জার্সি পরতে পারবেন না। বাংলাদেশের হয়ে ক্রিকেট খেলার উপরও তার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই সিদ্ধান্তের প্রতি জনগণের মধ্যেও সমর্থন আছে।

বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাকিব, তার মা শিরিন আখতার এবং আরও ১৩ জনের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজার কারসাজির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ তদন্ত করছে। সাকিবের বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে। এই অভিযোগগুলোর কিছু শেখ হাসিনার আমলেই উঠেছিল, তবে তখন তদন্ত হয়নি। সাংবাদিকরা আরও খুঁজে পেয়েছেন, সাকিবের পিতা ছাত্রনেতা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। সব মিলিয়ে সাকিব ও তার পরিবার এখন গভীর বিপদে।

সাকিবের উত্থান ও পতনের গল্প এক অদ্ভুত মিশ্রণ- ক্রিকেট, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এক রঙিন কেলেইডোস্কোপ। ১৯৮৭ সালে মাগুরার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম সাকিবের। ২০০৪ সালে বিভাগীয় লিগে খেলা শুরু করেন এবং দ্রুত নিজের সুনাম গড়ে তোলেন। ২০০৬ সালে জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে তার। প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি ৪৪৭টি ম্যাচ খেলেছেন। করেছেন ১৪,৭৩০ রান। নিয়েছেন ৭১২টি উইকেট। ইএসপিএন ক্রিকইনফো তাকে বর্ণনা করেছে, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সহজভাবে সেরা ক্রিকেটার।’ ক্রিকেট মাঠের সাফল্য তাকে এনে দেয় খ্যাতি ও অর্থ। দেশি-বিদেশি বহু বিজ্ঞাপনে তিনি মুখপাত্র হন। ২০১৩ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত তিনি ইউনিসেফের জাতীয় শুভেচ্ছা দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে বিতর্ক কখনোই সাকিব থেকে দূরে ছিল না। তিনি একাধিকবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং আইসিসির শাস্তির মুখে পড়েন। একবার গ্রাউন্ডসম্যানকে হুমকি দেয়ার জন্য, আবার একবার টেলিভিশনে অশোভন অঙ্গভঙ্গির কারণে তাকে শাস্তি পেতে হয়। ‘অশোভন আচরণ’-এর অভিযোগে বিসিবি তাকে ৮ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করে। ২০১৯ সালে আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিট এক বুকির সঙ্গে গোপন যোগাযোগের জন্য তাকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে, যার এক বছর স্থগিত রাখা হয়। এই সময়েই সাকিব তার ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে থাকেন, যার মধ্যে স্বর্ণ ব্যবসাও ছিল। কিন্তু যখন সাকিব আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন দলটির সরকার ভোট কারচুপি, দুর্নীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, গোপন কারাগার পরিচালনা এবং হাজার হাজার বিরোধী কর্মীকে বন্দি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচিত।

দেশের মানুষও জানতো ক্ষমতায় টিকে থাকতে শেখ হাসিনা কী ভয়ঙ্কর কৌশল নিয়েছেন। তবুও সাকিব সেই দলে যোগ দেন। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সাকিব এক পক্ষ বেছে নেন। সেটা এমন এক পক্ষ, যেটি বহু বাংলাদেশির কাছে দমন, নির্যাতন ও হত্যার প্রতীক। জাতিসংঘ পর্যন্ত বলেছে, শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণবিক্ষোভে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করে থাকতে পারে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সাকিব নিজের সামাজিক মাধ্যমে শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ছবি প্রকাশ করতেন। এমনকি ক্ষমতাচ্যুতির পরও তিনি সেই অভ্যাস ছাড়েননি- যা এখন তার জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

বর্তমানে সাকিব যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন। সম্প্রতি তিনি শেখ হাসিনার জন্মদিনে সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন- ‘শুভ জন্মদিন, আপা।’
এই পোস্টের কিছুক্ষণের মধ্যেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, সাকিব আর কখনো বাংলাদেশের হয়ে খেলতে পারবেন না। একজন সত্যিকার প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের এক স্বৈরশাসকের সঙ্গে রাজনৈতিক আঁতাতে জড়ানোই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের উজ্জ্বলতম ক্রিকেট নক্ষত্রের ক্যারিয়ার ধ্বংস করেছে। শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে শুভেচ্ছা জানানোয় সাকিব প্রকাশ করেছেন এক ধরনের নির্মম সংবেদনশীলতার অভাব। কারণ অসংখ্য বাংলাদেশির কাছে হাসিনা মানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও নিপীড়ন, যা তাদের জীবন ও পরিবার ধ্বংস করেছে। নিজের রাজনৈতিক অন্ধ আনুগত্য ও বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থতার কারণেই সাকিব নিজ হাতে তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের কবর রচনা করেছেন।

(লেখক সিডনিভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভূরাজনীতি বিশ্লেষক ও গবেষক। তার এ লেখাটি অনলাইন দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ)

mzamin

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা: সুদানে ‘গণহত্যা’ হয়েছে

সুদানের এল-ফাশের শহর ও এর আশপাশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা চলছে। কৃত্রিম ভূ–উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এমন দাবি করেছেন। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানকার পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন।

২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে দেশটির আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সসের (আরএসএফ) লড়াই চলছে। গত রোববার তারা এল-ফাশের দখল করে। এর মাধ্যমে প্রায় দেড় বছরের দীর্ঘ অবরোধের পর পশ্চিম দারফুর অঞ্চলে সেনাবাহিনীর সর্বশেষ শক্ত ঘাঁটিটিও ছিনিয়ে নেয় তারা।

শহরটি পতনের পর থেকে সেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যা, যৌন সহিংসতা, ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলা, লুটপাট এবং অপহরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেখানকার যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

এল-ফাশের থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী তাওইলা শহরে জীবিত বেঁচে ফেরা কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে এএফপির সাংবাদিক কথা বলেছেন। সেখানে গণহত্যা হয়েছে জানিয়ে তাঁরা বলেন, শহরটিতে মা-বাবার সামনেই শিশুদের গুলি করা হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে পালানোর সময় সাধারণ মানুষকে মারধর করে তাঁদের মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয়েছে।

পাঁচ সন্তানের মা হায়াত শহর থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের একজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে থাকা তরুণদের আসার পথেই আধা সামরিক বাহিনী থামিয়ে দেয়। আমরা জানি না, তাদের কী হয়েছে।’

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাব বলেছে, গত শুক্রবার পাওয়া কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে ‘বড় ধরনের কোনো জমায়েত চোখে পড়েনি।’ এ কারণে মনে করা হচ্ছে, সেখানকার জনগণের বড় একটি অংশ হয় ‘মারা গেছে, বন্দী হয়েছে কিংবা লুকিয়ে আছে।’ সেখানে গণহত্যা অব্যাহত থাকার বিভিন্ন ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আল-ফাশের থেকে এখন পর্যন্ত ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ পালিয়েছে। এখনো কয়েক হাজার মানুষ শহরটিতে আটকা পড়েছে। আরএসএফের সর্বশেষ হামলার আগে সেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বসবাস করত।

শনিবার বাহরাইনে এক সম্মেলনে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাডেফুল বলেন, সুদান একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। আরএসএফ নাগরিকদের সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু তাদের এই কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-01%2Fc9npn6vk%2F2025-10-31T122958Z2112661870RC2ZMHAKCGN1RTRMADP3SUDAN-POLITICS-MISSING.JPG.JPG?rect=236%2C0%2C2526%2C1684&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সুদানে চলমান সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষ অস্থায়ী তাবুতে বসবাস করছে। ছবি: এএফপি