Friday, April 18, 2014

এপ্রিল নিষ্ঠুরতম মাস by আনিসুল হক

এপ্রিল নিষ্ঠুরতম মাস। কবি টি এস এলিয়ট লিখেছিলেন ওয়েস্টল্যান্ড নামের কবিতায়। আমাদের দেশে নিষ্ঠুরতম মাস আরও আছে। আগস্ট খুব শোকাবহ। ১৯৭১ সাল বিচারে মার্চ আমাদের কাছে নিষ্ঠুর মনে হবে, যেমন নভেম্বরে ঘটেছিল সত্তরের জলোচ্ছ্বাস।

পদকে ভেজাল- সেই স্বর্ণপদক এখনো জ্বলজ্বল করছে by জুলিয়ান ফ্রান্সিস

ঢাকায় আমার বনানীর বাসার বসার ঘরের দেয়ালে একটা ফটো ঝোলানো আছে। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সুন্দর একটা ক্রেস্ট আমার হাতে তুলে দিচ্ছেন। দুই বছর আগে, ২০১২ সালের ২৭ মার্চ আমাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু সম্মাননা’ পদক দেওয়া হয়। ছবিটির নিচে ফ্রেমে বাঁধা একটা সার্টিফিকেট। ওটাও দেওয়া হয়েছিল সম্মাননার অংশ হিসেবে; তাতে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা, যার নিচে স্বাক্ষর করেছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই। আর তার নিচে একটা আসবাবের ওপর রাখা সেই ক্রেস্টটি। ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট দুটোই খুব সুন্দর করে নকশা করা। এই উপমহাদেশে আমার ৪০ বছরের জীবনে এর থেকে মূল্যবান আর কোনো সম্পদ আমি অর্জন করিনি। এই ৪০ বছরের ২৩ বছরই কেটেছে আমার বাংলাদেশে, যে দেশটিকে এখন আমি আমার স্বদেশ মনে করি।

শান্তি ও উন্নয়নের এক রূপকার by সাইফুর রহমান

গত শুক্রবার দুপুর ১২টা। সবাই হাঁটছেন বিভিন্ন সড়ক ধরে। বেলা একটায় সদর রোড, বাংলাবাজার, জীবনানন্দ দাশ সড়ক, পুলিশ লাইন, বান্দ রোডসহ আশপাশের সব সড়কে মানুষের ঢল। লক্ষ্য, বঙ্গবন্ধু উদ্যান। না, কোনো জনসভা নয়। বদলে দেওয়া বরিশালের রূপকার শওকত হোসেন হিরনের জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য। মানুষকে ভালোবেসে হিরন যেন হিরণ্ময় জ্যোতি ছড়িয়েছেন বরিশাল নগরজুড়ে।

মোদি-জ্বরে বঙ্গবীর by হাসান ফেরদৌস

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে ঠিক বৈদেশিক নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বোধ হয় বলা যায় না। তবে তিনি কয়েক বছর ভারতে কাটিয়েছেন, কাজেই নিজেকে ভারত বিশেষজ্ঞ বলে দাবি তো করতেই পারেন। তো, সম্প্রতি কাদের সিদ্দিকী জানিয়েছেন, ভারতে মোদি আসছে, আর সে ভয়ে আওয়ামী লীগের হাঁটুতে কাঁপুনি শুরু হয়েছে।

রাজনীতিক ও তাঁদের গুরুরা by শশী থারুর

ভারতের চলমান সাধারণ নির্বাচন কেবল পদাকাঙ্ক্ষী রাজনীতিক, প্রচারণা ব্যবস্থাপক, প্রচারকর্মী আর ভোটের তদবিরকারীর চিরচেনা দলটিকেই সামনে তুলে আনেনি, সেই সঙ্গে আলোচনায় এনেছে একঝাঁক জ্যোতিষী, সংখ্যাতাত্ত্বিক আর পণ্ডিতকে। প্রার্থীরা ঝাঁকে ঝাঁকে এসব গণকের কাছে হাজির হচ্ছেন। ঠিক কোন লগ্নে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া উচিত, তা থেকে শুরু করে প্রচারণা অফিসের দরজার বিন্যাস পর্যন্ত হেন বিষয় নেই, যা নিয়ে গুরুজির পরামর্শ চাইছেন না তাঁরা।

প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর মানুষটি by কাজী মদিনা

নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ ও বাঙালির সৃজনশীল মননজগতের একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। এ দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজ, পরিবেশ ও নগরায়ণ বিকাশের ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছেন নিরন্তর। পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের সার্থক নিদর্শন। সততা ও নিষ্ঠার সাধক, শিল্প-সাহিত্যের অসামান্য বোদ্ধা, মানুষ গড়ার কারিগর—এ রকম কত অভিধায় তাঁকে ডাকা যায়।

মুসলমানরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে by কুলদীপ নায়ার

জেনে দুঃখ পেলাম যে অটল বিহারি বাজপেয়ি ও আদভানি উভয়ই বাবরি মসজিদ ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এর জন্য যে পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে যা যা করা হয়, সেসব সম্পর্কেও। সত্যি কথা বলতে, বাজপেয়ির যুক্তিতে আমি ধরাশায়ী হয়ে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন, এটা কোনো পরিকল্পিত ঘটনা নয়, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের কারণে এটা ঘটেছে।

যখন মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে

রাজীব সরকারের রম্য রচনা মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে এ বছর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। লেখক বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক। পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করলেও বিতর্কের সূত্রটি এখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি। লেখালেখি অনেক আগে থেকেই শুরু করেছেন। মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে লেখকের চতুর্থ গ্রন্থ। এ বইটিতে লেখক সহজ ও সরস ভঙ্গিতে অনেক কঠিন কথা বলেছেন। বাংলা সাহিত্যে রম্য বা রস রচনার ধারাটি ঐতিহ্যবাহী। শিবরাম চক্রবর্তীর কথা আমরা জানি যিনি রম্য লেখক হিসেবেই বিখ্যাত। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু থেকে শুরু করে হালের সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়- কার হাত দিয়ে না রম্য রচনা বের হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রম্য লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন আনিসুল হক। উচ্চশিক্ষার সূত্রে লেখক কিছুদিন ইউরোপে অবস্থান করেছেন। এ বইয়ের রচনাগুলোর অধিকাংশই সেই সময়ে লেখা। তাই কয়েকটি লেখায় পাশ্চাত্যে লাভ করা অভিজ্ঞতার উল্লেখ রয়েছে।
এ বইয়ে মোট ২০টি রচনা রয়েছে। লেখাগুলোর পরিসর তেমন বড় নয়। ভারমুক্ত হয়ে মাথা খোলাসা করে এক বসাতেই পড়ে ফেলা সম্ভব বইটি। বইয়ের প্রথম লেখাটির শিরোনাম হচ্ছে মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে। কবি শঙ্খ ঘোষের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক শুরু করেছেন এভাবে- “কবি শঙ্খ ঘোষ বিজ্ঞাপনের সর্বত্রগামিতা দেখে লিখেছেন মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে। বিজ্ঞাপন এমন মুখের সীমানা ছাড়িয়ে শরীরের অন্যান্য প্রত্যঙ্গও ঢাকতে শুরু করেছে। কাজেই শরীর ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে- এমন কথা অনায়াসে বলা যায়।” (পৃষ্ঠা ১১)।
বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির এ যুগে ব্যক্তিস্বার্থই যে মুখ্য তা বোঝা যায় বিজ্ঞাপনের ভাষা থেকে। লেখক বলছেন, একটি চিপসের বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, একটি শিশু তার ভাই-বোনদের লুকিয়ে দরজা বন্ধ করে চিপস খাচ্ছে আর বলছে- একা একা খেতে চাও তো দরজা বন্ধ করে খাও। কী চমৎকার শিক্ষা। সবাইকে ফাঁকি দিয়ে নিজে খেতে না পারলে শিশুরা দেশের সুনাগরিক হয়ে উঠবে কীভাবে? (পৃষ্ঠা-১১)।
একবিংশ শতাব্দীর নারী স্বাধীনতার এ যুগেও এসে যখন আমাদের শুনতে হয় একটি বিজ্ঞাপনের ভাষা থেকে এবার একজন আসল রাঁধুনী (বৌ) নিয়ে আয়- তখন আসলে নারীর অবস্থানটি পরিষ্কার হয়ে যায়। বিজ্ঞাপনে এসব ভাষার প্রয়োগ চিহ্নিত করার মাধ্যমে লেখক আসলে সমাজের সত্যিকার অবস্থানটি নির্ণয় করতে চেয়েছেন।
লেখক ভালোবাসা বিষয়ে বেশ কটি লেখা লিখেছেন যা পড়ে তরুণদের ভালো লাগবে। যারা প্রেম করছেন বা করবেন বলে ভাবছেন অথবা কিছুদিন বিরতির পর আবারও ভালোবাসায় মনোনিবেশ করতে যাচ্ছেন তাদের জন্য এসব লেখা উপযুক্ত পথের সন্ধান দেবে।
ভালোবাসা একটি মৌলিক অধিকার, ডিজিটাল ভালোবাসা, ভালোবাসার বিশ্বায়ন, স্বামী-স্ত্রী-দ্বন্দ্ব সমাস (আসলে এটিও ভালোবাসা), বিরহের জয় হোক (এটিও ভালোবাসার একুশ কলার এক কলা), নারীর মন (ভালোবাসার সূত্র খোঁজা), ঘরকীয়া ও পরকীয়া প্রেম, এ সবগুলো লেখাতেই লেখক ভালোবাসার জয় জয়কারের কথা বলেছেন। যেমন ভালোবাসা একটি মৌলিক অধিকার- এ বলেছেন, হঠাৎ দেখি এক পুলিশ কনস্টেবল একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকাকে রাস্তা থেকে উঠিয়ে নিচ্ছে। অভিযোগ তারা সেখানে অসামাজিক কাজ করছে। তারা সেখানে যা করছিল এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সামাজিক কাজ কি আছে? (পৃষ্ঠা ৩৫)।
ডিজিটাল ভালোবাসাকে লেখক পণ্যকেন্দ্রিক বলেছেন। সে কারণেই এক ব্যর্থ প্রেমিক কাম কবি লিখেছেন, মেয়েটি বাদাম ছিলিল, ছেলেটি বাদাম গিলিল। বাদাম হইল শেষ, মেয়েটি নিরুদ্দেশ। (পৃষ্ঠা ৩৯)। মেয়েটি নিরুদ্দেশ হলেও ছেলেটি কিন্তু প্রেমিকার শোকে পাগলা হয়ে মদের বোতল নিয়ে পড়ে থাকার পাত্র নয়। ডিজিটাল ভালোবাসায় দেবদাস-পার্বতী তৈরি হয় না।
চিত্তসুখ বনাম বিত্তসুখ লেখায় রাজীব সরকার চমৎকারভাবে রূঢ় সত্য কথা বলেছেন, বিত্তসুখ থাকলেই যে চিত্তে সুখ আসবে এমন কোনো কথা নেই, তবে বিত্ত না থাকলে চিত্তে যে সুখ আসবে না এটা নিশ্চিত। রসায়নের ভাষায় বলা যায়- সকল বিত্তসুখই চিত্তসুখ, কিন্তু সকল চিত্তসুখই বিত্তসুখ নয়। (পৃষ্ঠা ৩৩)।
বাংলা সিনেমা ও অশ্বডিম্ব রচনায় শুধু মন্দ সিনেমার কথাই বলেছেন। কিন্তু আমাদের দেশে যে কিছু অসাধারণ চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে তার উল্লেখ থাকলে ভালো হতো। লেখক হাস্যরসের ছলে দৈনন্দিন জীবনের ও সিস্টেমের অনেক গলদের কথাই বলেছেন। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থিত আমলাতন্ত্রের কথা লেখক কিছুই বলেননি। আগামী সংস্করণে নিশ্চয়ই এসবের দেখা আমরা পাব।
প্রতিশ্র“তিশীল তরুণ লেখক রাজীব সরকার বিতর্কিত বলেই হয়তো তার লেখায় যুক্তির ধার খুঁজে পাওয়া যায়। এ বইতেও তার উপস্থিতি লক্ষণীয়। আগ্রহী পাঠকের মননশীলতায় চিন্তার নতুন খোরাক যোগাবে এ বই। বইটির পাঠকপ্রিয়তা ও সাফল্য কামনা করি।
শিব শংকর কারুয়া

মরার খালের মরা লাশেরা by জয়া ফারহানা

মাস দেড়েক হল মরার খাল গ্রামে আনজুমানারাকে নিয়ে কেচ্ছার শেষ নেই। কেচ্ছা হয় ফিসফিসিয়ে। বলা তো যায় না কোথায় কেন জয়বাংলার লোক ঘাপটি মেরে আছে। গ্রামের লোকের ধারণা মিলিটারি সাহেবরা আনজুমানারার শরীর ছেনে-ছুঁয়ে বহুত খুশ। মরার খাল ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসে তেনারা ক্যাম্প বসিয়েছেন। সেই ক্যাম্পেরই পাহারাদার সোমেদ গাজী সময় অসময়ে আনজুমানারার ভাঙা বেড়ায় ঠোনা দিয়ে বলে তলব কিয়া, আভিযানে হোগা। ফওরন আইয়ে। মাঝে মধ্যে আনজুমানারা তেড়েই ওঠে। এ্যাই ছ্যাড়া কিয়ের ফরওন আইয়ে, বাংলায় কনা কেন? মাঝে মধ্যে বিলাপ করে অভাব আমার মরণডারে ঘনাইলোরে সোমেদ। ক চান সোমেদ বাঁচনের কী উপায় ওই জল্লাদ ব্যাটাত হাতেথ থন। যুইদ্ধ মাঠিত তন ইব্রাহিমের বাপ ফিরত আয়া যুদিল আমার মিহি সন্দ লইয়া চায়...। সোমেদ গাজী ঠোঁট ওল্টায়। হেই ব্যাডারে বটারে (বার্ডার) ফুটাই দিছে; হ্যায় আর আইছে! থোও তুনার সোমসার আর সোয়ামী... তুমার সবই গেইছে। মাঝে মধ্যে সেই মানুষটার তক্তপোষের সামনে দাঁড়িয়ে আনজুমানারা মরা কান্না কাঁদে। আমাক তুমি কনে থুয়া গিলা। আনজুমানারার মরা কান্নায় একটা জীবনের ঢেউ ওঠে তবু... বাকি সময় মরার খাল মরেই থাকে। কী এক মরার যুদ্ধ শুরু হল ভাবে ময়মুরব্বীরা। শহর থেকে খবির সাহেব এসেছেন। তিনি রেডিও শোনেন নানান জায়গার। গলা খাঁকারি দিয়ে কামলা শ্রেণীর এক দঙ্গল মানুষকে সেদিন বোঝাচ্ছিলেনও আম্রিকা, আম্রিকা সেই খানকার বড় সাহেব বলছেন, সব নর্মাল মানে ঠিকঠাক আছে বুইচ্ছো? মানুষগুলো তার মুখের দিকে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে। ঘরের মধ্যে বউ-ঝিরা ব্যস্ত তাদের গৃহস্থালির কাম কাজ নিয়ে। অবশ্য বৈকালিক আসরে উকুন আর জট ছাড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে আটপৌরে আনজুমানারার মিলিটারি ক্যাম্পে গিয়ে বেশ্যা বনে যাওয়ার কেচ্ছা-কাহিনী যুদ্ধ দিনেও কম রঙিন নয়। রাত বাড়লে আনজুমানারার পাগলামিও বাড়ে। বাঁশ ঝাড়ের মাথায় চাঁদের ঘোলাটে আলোর সঙ্গে ভেসে আসে তার ডাক-চিৎকারও। তুমরা আমার মগজটিরে টাইন্যা ধর... আল্লারে আল্লা আমার বেবাকটি মগজ ট্যাইন্যা ধর...। গেরামে পরথম যেদিন মিলিটারি আইল বিলের মইদ্যে হুদাই গুলি কইরা মারল আমার ইব্রাহিমেরে... ক্যা, ক্যা সব গজব আমার জান খানের উপর দিয়া যায়... গেরামে আর কেউ-ই কি নাই? কেউরে কি আল্লা চউক্ষে দ্যাহে না? আমার আল্লায় ক্যামনে সয় আমার রসূল ক্যামনে সয়...। চেয়ারম্যান বাড়ির পৈঠা পর্যন্ত আনজুমানারার সেই মিহি বিলাপের সুরে কেঁপে কেঁপে ওঠে। কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ার বিরক্তি নিয়ে খবির সাহেব পাশ ফিরে স্ত্রীকে বলেন, মাগির চিল্লানির ঠেলায় মিলিটারি সাহেবদের ঘুম হইবার জো নাই। এক ছটাক ঘিলু যদি থাকে মাথায়। মায়মূনা সতর্ক কণ্টে বলে আপনে চুপ যান। এসব ঝুট ঝামেলা আপনের মতো মাইনষের পরতায় পড়েনি? কখনও কখনও তাকে ধমকাতে ছুটে আসে আসগর মেম্বার। সেই শাসানিতে আনজুর শ্বাস-প্রশ্বাসের স্পন্দন পর্যন্ত থেমে যাবার দশা হয়। মাঝে মাঝে সেও পাল্লা দিয়ে চেঁচায় আমনের কথায়, আমি টাসকি মারা যামো? বিড় বিড় করে বলে ইব্রাহিম উড বাপধন... তোমার বাপে ট্যাকা দিলে আমি মিলিটারি সাহেবগো সব খাইদ্য-খাবারের দাম শোধ দিয়াম। আসগর মেম্বার যেতে যেতে বলে বেডির মাতাডা হাছাই গ্যাছে গা। ক্যাম্পের ভেতর এ আনজুই আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। মরার খাল হাইস্কুলের মিলিটারিদের আস্তানার বিশাল খোলা উনুনে যখন সে দুধ জ্বাল দেয়, ব্লাউজ কামড়ে ধরা হাত দিয়ে যখন ক্রমাগত হাতা ঠেলে তখন সোমেদ গাজীরও বুকের মধ্যে শিরশিরানি ওঠে। এখন সে ভাউড়া রাজাকার বটে তবে মনে মনে তারও একটা স্বপ্ন আছে। সে স্বপ্ন দেখে মিলিটারিরা যেই সব অকাম করল এর তো একটা পরিণাম ফল আছে, যেদিন তারা মরার খাল থেকে বিদায় নেবে সেদিনই সে দখল নেবে আনজুর। আনজু যতই খলবলাক সোমেদ গাজীর বুকের মধ্যে এসে একদিন তাকে বাকুম বাকুম করতেই হবে। তলে তলে সে খোঁজও নিয়েছে। বর্ডার ক্রস করার প্রথম দিনেই আনজুর স্বামীর খেল খতম। থাকার মধ্যে ছিল ইব্রাহিমটা। তা গেরামে যেদিন পরথম মিলিটারি ঢুকল অকারণেই মেরে ফেলল ইব্রাহিমকে। ছয় বছরের পিচ্চি পোলাপাইন, মিলিটারি দেইখ্যা পরনের প্যান্ট খুলে মাথার ওপর পতাকার মতো দুলাতে দুলাতে দৌড়াচ্ছিল আর চিক্কারও অবশ্য কিছু কম দেয়নি। কিন্তু সে তো খুশিতে। ইব্রাহিমের ধারণা ছিল মিলিটারি গ্রামে ঢুকলেই বুঝি সব মুশকিল আসান। আনজুর কপালই মন্দ। তবু এই মন্দ কপালকেই বুঝি ভালোবেসে ফেলল সোমেদ তার নিজের মন্দ কপালের সঙ্গে মিলিয়ে। মন্দে মন্দে কাটাকাটি। নিজের মন্দ কপালের কথা ভাবতে বসলেও সোমেদের, মিহি সুরে কাঁদতে ইচ্ছে করে আনজুর মতো। কিন্তু যেহেতু সে ব্যাটা ছেলে কাঁদতে পারে না তাই। সোমেদ স্বপ্ন দেখে তবু একদিন এই যুদ্ধ শেষ হবে। মাঠের পর মাঠ বাওয়া ধানের সবুজ শিষ গজাবে। শেয়াল খাওয়া লাশের বুকের পাঁজরা আর দেখা যাবে না। মিলিটারিদের হুকুম তামিল করার জন্য গেরামের সরকার কি তাকে মেরে ফেলবে? না তা কেন? সে তো জান বাঁচানোর গরজে কেবল সামান্য কিছু ফুটফরমাস খাটছে। এই গ্রামে যে দশঘর গন্ধ বণিক আর বাড়ুই আছে সে কি কোন ফাঁকে মিলিটারিদের বলে দিয়েছে?
মুক্তি কী ধার বোলো বললে সে কি মুহূর্ত মাত্র দেরি না করে মুক্তিদের বাড়িঘর চিনিয়ে দিয়েছে? এসব চিন্তায় সোমেদ ভাবে, গ্রাম ছাড়বার আগে মিলিটারিরা বুঝি তাকে মেরে রেখে যাবে। তা যাক। গত দেড় মাসে চোখের সামনে কত মানুষকেই তো মরতে দেখল সোমেদ।
ফাঁকা ক্লাস করে মাথা পাগলা শঙ্কর মাস্টার খড়ি মাটি দিয়ে আঁক কষছিল। যুদ্ধ দিনের আগে থেকেই অবশ্য মাস্টারের মাথা খারাপ। মাথা খারাপ না হলে ফাঁকা ক্লাস ঘরে বসে কেউ অংক কষে? সোমেদের অঙ্গ-ই কী আর বাংলা-ই কী সবই সমান তারপরও সোমেদকে দেখলে শঙ্কর মাস্টার ডেকে নিয়ে ক্লাসে বসাবে। বিড় বিড় করে নামতা পড়বে অংক মেলাবে। তো সেই মাস্টারকেও দুম করেই বন্দুকের নল উঁচিয়ে মেরে ফেলল মিলিটারিরা। মাস্টারের আধা কষা অংক এখনও রয়ে গেছে ব্ল্যাক বোর্ডে, কিন্তু মাস্টার নাই। যাক দুঃখের প্যাচাল আর ভালো লাগে না। তার চে বরং কিছু সুখের ভাবনা ভাবা যাক।
সুখের ভাবনা মানেই তো আনজু। সংসার মানে একটা ঝাপড়ানো জাম গাছ, হাঁস, মুরগি পায়রায় উঠোনময় আদার খাওয়া দুই কানি জমি, বেগুন মুলার ক্ষেত, আনাজপাতির কোটা কুটোনি, সংসার মানে একখান পয়মন্ত মেয়েছেলে আনজুর মতো। আনজু অবশ্য এখন খেকুরে হয়েছে। তা এ যুদ্ধ দিনের কথা ধরলে চলবে কেন? বেচারি আনজুর স্বামীটা গেছে, কোলের পোছা ছেলেটা গেছে এই আকালে কার-ই বা মাথা ঠিক থাকে। মাঝে মাঝে তার খুব ইচ্ছে করে এ খাটাশগুলোকে বান মারতে। কালা বিদ্যা তারও কিছু কম জানা নেই। গেরামের সব্বাই জানে
সেই পোয়াতি কাল গেল, ইব্রাহিমরে বিয়ানোর কাল গেল কুনসমই পোলাক অবহেলা করে নাইকো আনজু। সোমেদ ভাবে সে একটা জোয়ান মর্দ ব্যাটা অথচ তার সামনেই মিলিটারিরা মরার খালের বউ-ঝিগো দিকে আ-চোখে, কু-চোখে তাকা তাগো ইজ্জত মারনের চেষ্টা করে সে ভাউড়া হইলেও তার রক্ত মাংসে তোলপাড় তোলে সেই যমদূতগুলোর পাপ। আর মিলিটারিরা আসমার (আসবার) পর থিক্কাই ব্যামাক প্রল্লাদ নারায়ণ হাইস্কুলডা হই গিল একখান শ্মশান। সোমেদ গর্তে গর্তে লাশ চাপা দেয় আর মিলিটারিরা নাক চোখ কুঁচকে বলে হাওয়ান-কা লাশ। ইদানীং তার আবার হয়েছে এক রোগ। রাতের দুই প্রহরে আনজুমানারা যখন মিহি সুরে আমপারা পড়ার মতো কাঁদে তখন পাকুড় গাছের নিচে সে এক জ্যান্ত পত্মা দ্যাখে। ওই খবিসের দীঘল হাত থেকে উদ্ধার পেতে সোমেদ গাজী কী না করেছে। প্রথম সে গেছে ধারে কাছের গফুর মওলানার কাছে। নিয়ে এসেছে সুপারি পানি পড়া- গনি মৌলভী দিল পড়া তেল। প্রায় দুই ক্রোশ পথ হেঁটে ইউনিয়ন বোর্ডের সদর রাস্তা পার হয়ে শিবু কবরেজের কাছ থেকে নিয়ে এলো অষ্ট ধাতুর মাদুলি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না সমস্ত শরীর জোড়া চোখওয়ালা পেত্নী দেখা বন্ধ হয় না তার। পেত্নীটা কি আনজু কিনা কে জানে। আনজু মরে নাই বটে কিন্তু সোমেদের ধারণা ছেলের শোকেই হোক আর স্বামীর প্যাদানির ভয়েই হোক রাতের দুই প্রহরে আজুমানারা শর্ষে ফুলের মতো হলুদ রং ধরে ওই পাকুড় গাছের ওপর বসে মিহি সুরে আমপারা পড়ে। পেত্নী ছাড়া কী? যে বিটি রাত নিই (নেই) দিন নিই, মরা ছুওয়াল পাওয়েলর কিচ্ছা কয়, সে পেত্নী ছাড়া আর কি বা! হাঁ করা নির্জনতার মুখে পড়লে সোমেদের সেই গা ছম ছমে শিরশিরানি ফেরত আসে। দিনের বেশি অংশটাই এখন তার কাটে একটা শ্যাওলা পড়া ঘাসি নৌকার পিঠে হেলান দিয়ে। এদিকে লাশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। মরার খাল সত্যি সত্যি এত দিনে মরার খাল হয়ে উঠেছে। সোমেদ গালে হাত দিয়ে ভাবে একটা গেরাম মাত্র কটা দিনে কীভাবে আগাগোড়া বদলে গেল। এখন যেখানে সেখানে পড়ে থাকে হলুদ মগজের ঘিলু আর পিতাভ নাড়ি ভুঁড়ি। ডোবার পাশে ছিটকে পড়া জমাটবাঁধা মানুষের রক্ত চেটে খায় কুকুর।
টানাটানির সময় গঞ্জে গিয়ে মহাজনদের হাতে পায়ে ধরে কেঁদে পড়লে দুচার টকা পাওয়া যেত এখন তাও পাওয়া যায় না। সমস্ত গেরাম খ্যান (যেন) খিঁচুনি রোগী, ভয়ডরে কেবল কাঁপতিছে আর কাঁপতিছে, এর মইদ্যে ওই পেতœী আনজু আবার খবর বয়ে আনে, মিলিটারিরা যেসব লাশ মাইরে রাইখে যাইচ্ছে সেসব লাশের কলাম, গন্ধ নেই কো। কী আজিব কথা! গন্ধ থাকপে না ক্যালা? মানুষ পইচে গিলিপার গন্ধ বাইর বে না এইডে একটা ফ্যাচাল। আজিব কতা। যতদিন যায় সোমেদের মাথার আউলা পানা তত বাড়ে।
দেখতে দেখতে তার, মাথার ব্যারাম এতটা বেড়ে যায় যে মিলিটারি ক্যাম্পের ভেতর গিয়ে সে তাদের বড় সাহেবকে জিজ্ঞেস করে স্যার আমি গ্রেনেড বন্দুকের নলে লাগাই? আপনেরে মাইরে দেহি চ্যান গান্দা বাইর হয় কিনা।
সোমেদ গাজীর মাথা আউলা হউক আর যাই হোক এই কথা শোনার পর মিলিটারিদের কাছে তাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো প্রশ্নই নাই। ক্যাপ্টেন নবুওয়াত খানের ইশারায় একজন সেপাই চোয়াল শক্ত করে চিৎকার করে চেপে শালা চিড়িয়াকা বাচ্চা...। তেরা কেল্লা আভি হাম খায়েগা। ক্যাপ্টেনের ইশারায় এক সেপাই আরেক সেপাই তাগাদা দেয় ইস কো আভি লে চলো...।
রাইফেলের বাঁট পিঠে ঠেকিয়ে পাকুড় গাছের ঠিক নিচে গুলি করা হল সোমেদকে। ওঁৎ পেতে থাকা আনজু মুহূর্তে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল সোমোদের লাশের ওপর। বাজখাই গলায় সেপাইটি বলল আরেকজনকে আরে ইয়ে তো বহুত বড়িয়া চিজ হ্যায়। আজনুর সেদিকে খেয়াল নেই। সে আরও উবু হয়ে ডাক-চিৎকার দিচ্ছে দ্যাখেন স্যার দ্যাখেন লাশ পচে নাই তবু ইন্দুর পচা গান্দা। দুজন সেপাই পরপর মুখ চাওয়া চাওয়ি করে পরীক্ষা করতে আসল সত্যি সত্যি লাশের শরীরে গন্ধ আছে কিনা।
রুমাল মুখে চেপে অবশেষে তারা স্বীকার করল, গান্দা হ্যায় বহুত গান্দা হ্যায়। সে রাতে এত জোর বৃষ্টি নামল। তবু মরার খালের পচা দুর্গন্ধ কাটল না। আর পাকুড় গাছের আড়ালে বসে আনজু বিড় বিড় করে বলতে থাকল
মুক্তি মরলে গান্দা হয় না, তয় সোমেদ মরলে এত গান্দা ক্যা?

জার্নাল অব এ্যান আর্টিস্ট : রফি হকের চিত্রভ্রমণ by মোস্তাফিজ কারিগর

পেইন্টিং তার কাছে আবেগ জাগানিয়া কোনো বিষয় নয়, যাপিত জীবনের যাবতীয় ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় হয়ে ওঠে ক্যানভাসে প্রধান অনুরণন। প্রতিদিনের দিনলিপির মতো করেই স্কেস খাতাই, ডায়েরির পাতায়, এচিং প্লেটে বা ক্যানভাসে প্রতিরূপ লাভ করে শিল্পীর সব অবলোকন। অতীত বা ভবিষ্যতের দিকে একবার দৃষ্টি ফেরালে যে দৃশ্য মনের ভেতরে নির্মাণ হয়, যা মুছে যায় না- এভাবে কল্পিত বা গঠিত কোনো মূর্তি বা প্রতিমূর্তিকেই ইমেজ আকারে প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন শিল্পী রফি হক। পৃথিবীর কত না দেশে দেশে ভ্রমণ, হাজারও মানুষের মুখের প্রকার, আনন্দ-বেদনার বিচিত্র মেলবন্ধন, প্রকৃতি, নদী, শৈশবের পাঠশালা, বন্ধুদের আবেগঘন স্মৃতি- অপার্থিব মরমি সঙ্গীতের মতো, কখনও বা টুকরো টুকরো কবিতা হয়ে মূর্ত হয়। শিল্পী রফি হক এভাবেই নির্মাণ করে চলেছেন একের পরে এক ইমেজ, হয় তা বাস্তবে ছিল; না হয় তাকে প্রতিস্থাপনের জন্যই গড়ে তুলেছেন- যা, দৃশ্যশিল্পের বিশেষ কোনো নিয়ম না মেনে সম্পূর্ণভাবে মানুষের বোধের স্তরে পৌঁছে দিতে পেরেছেন। শিল্পী রফি হক তার যাপিত জীবনের সব অনুষঙ্গের একটা ইউনিভার্সেল ইমেজ নির্মাণ করছেন, যা একান্তই ব্যক্তির ভেতরের গভীর বোধ বা আবেগ- একটা সময় তা আর কেবল একার থাকছে না, ছড়িয়ে পড়ছে অন্যের বোধের সীমানায়। এভাবেই তার কাছে প্রতিদিনের দিনলিপি, কবিতা আর চিত্রকর্ম একাকার হয়ে একটা মাধ্যমে পৌঁছায়। পিকাসো ঠিক যেভাবে কবিতাকে গুরুতর বিষয় বলে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বা পল ক্লীর ছবিতে সঙ্গীতের সিম্ফনি যেই প্রধান মাত্রা এনে দিয়েছে রফি হকেরও যাত্রা সেই অনাস্বাদিত আলোকের দিকে, যেখানে ভৌগোলিক কোনো সীমারেখা থাকে না, একটা মিথ্যা আবহ তৈরি করে ভেতরের নিবির মরমি সত্যকেই সবার করে তুলতে পারেন। কেন না চিত্রকলা, কবিতা, সঙ্গীত- একটা ইউনিভার্সাল চিহ্ন ছাড়া কিছুই নয়। একটা স্বতন্ত্র চিহ্ন আবিষ্কার করাই একজন শিল্পীর শিল্পভ্রমণ। চিহ্নই তো একসময় ভাষা হয়ে ওঠে। কেন না চিহ্নের ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা থাকে, শিল্পী সেই শূন্যতার দিকে ধাবিত হয়েছেন। শিল্পী রফি হক সুজিত সরকারের কবিতার এ সত্যের কাছে পৌঁছে যেতে পেরেছেন
এক হাজার মানে এক তারপর তিনটি শূন্য
এক লাখ মানে এক তারপর পাঁচটি শূন্য
এক কোটি মানে এক তারপর সাতটি শূন্য
শূন্য মানে কিছু নয়
শূন্য মানে কিছু নেই...
চিত্ররীতির কোনো বিশেষ একাডেমিক শৈলীর কাছে হাত জোর করে বসে থাকতে চাননি রফি হক। একাডেমিকভাবে তার শিক্ষণের বিষয় ছিল ছাপচিত্র। তিনি ছাপা মাধ্যমেই কাজ করেন, কিন্তু নিজের মতো করে- নিজের ডায়েরির ছেঁড়া পাতা, পুরনো সাহিত্যপত্রিকার কবিতার পাতা, রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া বিস্কিটের প্যাকেট কোলাজ আকারে সেঁটে দেন কাগজে, প্রিন্ট মেশিনের ভেতরে ঢুকিয়ে দেন। ১৯৭১-এ পাকিস্তানি আর্মিরা তাদের কুষ্টিয়ার বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিলে বাড়ির বেড়াতে যে ফাঁকফোকর তৈরি হয়- ভাইবোন মিলে তখন বিভিন্ন সচিত্র ম্যাগাজিনে পৃষ্ঠা কেটে ফাঁকফোকর বন্ধ করার সময় থেকেই তার ভেতরে হয়তো এ কোলাজের ব্যাপারটি গভীরভাবে রয়ে গেছে। ম্যানুয়ালি প্রেসারের মাধ্যমে তৈরি করেন কিছু স্বকীয় টেক্সার। প্রিন্টের রঙের পরিবর্তে তেল রঙের ব্যবহারে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত। ক্যানভাসেও তিনি একইভাবে গভীর ও নিয়মিত। তার এ নিজস্বতা এরই মধ্যে তাকে বিশেষভাবে পরিচিত দান করেছে দেশে এবং দেশের বাইরে। তারই ধারাবাহিতকায় ৭ এপ্রিল শিকাগো ইউনিভার্সিটির, ফস্টার হলের ১০৩ নং কক্ষে শুরু হয়েছে জার্নাল অব এ্যান আর্টিস্ট শিরোনামে শিল্পী রফি হকের একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর, চলবে ২৩ মে ২০১৪ পর্যন্ত- যা আমাদের দেশের শিল্পকলা জগতের জন্য বিশেষ অহংকারের। ১০ এপ্রিল তাকে নিয়ে আর্টিস্ট টকেরও আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলার স্বরূপ ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে একটা বক্তৃতাও প্রদান করেন শিল্পী রফি হক।
শিল্পী রফি হকের জন্ম কুষ্টিয়া জেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে ছাপচিত্রে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণ। দেশে এবং দেশের বাইরে একাধিক একক ও দলীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার।

ইস্পানো-আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রতিকৃতি by রাজু আলাউদ্দিন

লেখক, অধ্যাপক, অনুবাদক ও বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার চারজন চিত্রশিল্পীর নামও জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। এদের একজন আর্হেন্তিনার ফেদেরিকো স্চিফ্। ইনি আর্হেন্তিনা থেকে এরিবের্তো চার্লসের অনুবাদে রবীন্দ্রনাথের আবেস এররান্তেস (ইংরেজি Stray Birds-এর স্পানঞ্জল অনুবাদ)-এর একটি প্রচ্ছদ করেছিলেন। সেই প্রচ্ছদে তার আঁকা রবীন্দ্রনাথের একটি প্রতিকৃতি ব্যবহৃত হয়েছে বা হতে পারে এ বইয়ের জন্যই তিনি এটি এঁকেছিলেন। স্চিফ্ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। তিনি বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করতেন; কিন্তু এর বাইরে চিত্রশিল্পী হিসেবে তার চর্চা বা খ্যাতি ছিল কিনা জানা নেই।
তবে অন্য তিনজন শিল্পীই- কেবল মেহিকোতেই নয়, গোটা লাতিন আমেরিকাতেই তাদের অসামান্য শিল্পকৃতির জন্য পরিচিত এবং বিখ্যাত। সেই তিনজনের একজন চিত্রশিল্পী রবের্তো মন্তেনেগ্রো। মুরাল চিত্রকর্মের জন্য আজ মেহিকোর যে স্বাতন্ত্র্য ও পরিচয় দাঁড়িয়ে গেছে তিনি সেই মুরাল আন্দোলনের আদি শিল্পীদের একজন। সহপাঠী দিয়েগো রিবেরাও ছিলেন সেই আন্দোলনে। তবে রিবেরা তার মুরালে নাটকীয় গুণের কারণে মুরাল শিল্পী হিসেবে প্রবল খ্যাতি অর্জন করলেও মন্তেনেগ্রো সেই পরিচয় থেকে দূরে সরে পড়েন। তবে মেহিকোর সংস্কৃতির এমন কিছু ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে যুক্ত করলেন যেখানে তার প্রতিভা স্বতন্ত্র পরিচয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে। বিশেষ করে পুস্তক সচিত্রকরণ, হস্তশিল্প এবং লোকশিল্পকে তিনি এমন এক শৈল্পিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, এক্ষেত্রে তার তুল্য প্রতিভা খুব কমই আছে। আরও একটি ক্ষেত্রে তিনি অনন্য, আর তা হল বিশিষ্টজনদের প্রতিকৃতি। বহু বিশিষ্টজনের সঙ্গে তার কাজ করার সুযোগ যেমন হয়েছে তেমনি এঁকেছেন বহুজনের প্রতিকৃতি। রবীন্দ্রনাথও ছিলেন সেই বহুজনের একজন। তবে তার সঙ্গ তিনি পেয়েছিলেন কিনা জানি না।
১৯০৭ থেকে ১৯১০ সালে যখন প্যারিসে ছিলেন তখন তার সঙ্গে পরিচয় হয় পাবলো পিকাসো, জর্জ ব্রাক এবং হুয়ান গ্রিসের শিল্পীদের সঙ্গে। রেবিস্তা মুন্দিয়াল (Revista mundial) নামে এক পত্রিকায় তিনি কাজ করেছেন রুবেন দারিওর মতো বিখ্যাত কবির সঙ্গে। দেশী-বিদেশী প্রথম সারির লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে কাজের সূত্রে যেমন, তেমনি বন্ধুত্বের সূত্রেও তাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন মন্তেনেগ্রো। আঁকাআঁকির বাইরে তিনি, এমনকি স্মরণীয় হয়ে আছেন বিখ্যাত রুশ চলচ্চিত্রকার সের্গেই আইজেনেস্টাইনের নির্মিত মেহিকো জিন্দাবাদ (Que viva Mexico)-এর চলচ্চিত্রায়নের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেও। মেহিকোর প্রধান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হোসে বাসকনসেলোস বিশের দশকে তার গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (ঝঊচ) প্রকাশনা প্রকল্পে প্রধান শিল্পীর মর্যাদায় নিয়োগ দিয়েছিলেন। এ প্রকল্পের অধীনে যেসব গ্রন্থ প্রকাশিত হয় তার মুদ্রণসৌকর্য এবং সচিত্রকরণের দায়িত্ব ছিল মন্তেনেগ্রো আর তার সহযোগী শিল্পী গাব্রিয়েল ফের্নান্দেস লেদেসমার। প্রকল্পের অধীনে প্রধান দুটো সিরিজের একটা ছিল শিশু-কিশোরদের জন্য চিরায়ত পাঠ (Lecturas Clasicas Para Nios) আর অন্যটি ছিল বিশ্বজনীন চিরায়ত পাঠ(Lecturas Universales)। প্রথম সিরিজের একটি খণ্ড ছিল দূর প্রাচ্যের কিংবদন্তি(Leyendas del Lejano orientes) । এ খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ১২টি কবিতা, বেদ, উপনিষদ ও রামায়নের অংশ বিশেষ, বুদ্ধের জীবনী, সহস এক আরব্য রজনীর অংশ বিশেষ এবং দূর প্রাচ্যের কিছু কিংবদন্তি। এ সিরিজের সব বইয়ের অলংকরণের দায়িত্ব ছিল তার এবং লেদেসমার। বিশ্বজনীন চিরায়ত পাঠ-এর সিরিজ হিসেবে প্রকাশিত ১৮টি খণ্ডেরও দায়িত্বে ছিলেন এ দুজন। অন্যত্র বলেছি, চিরায়ত পাঠ-এর একটি খণ্ড ছিল রবীন্দ্রনাথের। এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল The Criscent moon, Nationalism, Personalit এবং Sadhana গ্রন্থগুলো। প্রায় পাঁচশ পৃষ্ঠার এ বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে অলংকরণ। এ সিরিজের অন্তর্ভুক্ত রবীন্দ্রনাথের আরও একটি বইয়েরও অলংকরণ করেছিলেন মন্তেনেগ্রো, সেটার নাম ছিল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম (Obras de Tagore)। এ বইটি বেরিয়েছিল ১৯২৪ সালে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বলতে এতে কেবল Criscent moon-এর কবিতাগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। মোট ৬৩ পৃষ্ঠার এ বইটিতে মন্তেনেগ্রোর প্রচ্ছদ ও অলংকরণতো ছিলই, আমাদের জন্য বাড়তি বিস্ময় হিসেবে যুক্ত হয়েছিল তারই করা রবীন্দ্রনাথের একটি প্রতিকৃতি। গোটা ইস্পানো-আমেরিকান জগতে এটিই রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রতিকৃতি যা কোনো লাতিন আমেরিকান শিল্পীর আঁকা এবং এঁকেছেন মেহিকোর প্রথম সারির একজন শিল্পী। রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও তিনি মেহিকোর চিত্রশিল্পী এবং চলচ্চিত্রের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতিও এঁকেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকজন হচ্ছেন দলোরেস দেল রিও, ফ্রিদা কালো, এলিয়াস নান্দিনো, রুফিনো তামাইয়ো প্রমুখ।
রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিটি তিনি কোন মাধ্যমে এঁকেছিলেন তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই; কারণ মূল কপি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি, গ্রন্থে মুদ্রিত কপিটিই আমার একমাত্র ভরসা। তবে ছবিটিতে রবীন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গোড়ালি পর্যন্ত ঝুলানো জোব্বা, দাড়িসহ রবীন্দ্রনাথকে চিনে নেয়া যায় সহজেই। তবে একটা খটকা তবু থেকেই যায়- প্রতিকৃতিটি মন্তেনেগ্রোরই আঁকাতো। এ সংশয়ের কারণ ছবিটির কোথায়ও তার নাম নেই, যেমনটা আছে ফেদেরিকো স্চুলস্-এর আঁকা ছবিতে কিংবা গাব্রিয়েল ফের্নান্দেস লেদেসমার আঁকা ছবিতে। সন্দেহটিকে আরও সীমিত করে প্রশ্ন করা যায় এভাবে যে ছবিটি মন্তেনেগ্রো নাকি লেদেসমার আঁকা? কারণ এ দুজনই ছিলেন প্রচ্ছদ ও অলংকরণের দায়িত্বে। তবে এও ঠিক যে দুজন এক সঙ্গে কাজ করলেও দুজনেরই শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য ছিল আলাদা। একজনের আঁকা শিল্পকর্মের সঙ্গে আরেকজনের শিল্পকর্মকে গুলিয়ে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু লেদেসমার আঁকা ছবিটিও আমাদের হাতের নাগালেই আছে, তাই মিলিয়ে দেখলেই আমরা তা নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সহজে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারব। লেদেসমা বইয়ের অলংকরণের কাজগুলো ছাড়াও কাঠ খোদাই মাধ্যমে প্রচুর কাজ করেছেন। কিন্তু মন্তেনেগ্রো কাঠ খোদাইয়ের কাজ করেছেন- এমনটা জানা যায় না। এবং প্রতিকৃতিটি লেদেসমার মতো কাঠ খোদাইয়ের যে নয়,
তা দেখলেই বুঝা যায়। এটাকে আমার কাছে একটা প্রধান যুক্তি বলে মনে হয়। আর দ্বিতীয় আরেকটা যুক্তি হচ্ছে, লেদেসমা তার কাজগুলোয় নিজের স্বাক্ষর ব্যবহার করতেন। সুতরাং এটাতে লেদেসমার স্বাক্ষর যেহেতু নেই, অতএব মন্তেনেগ্রোরই হবে। মন্তেনেগ্রোর চিঠিপত্র ঘাটতে গিয়ে জানা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের আরও একটি প্রতিকৃতিও তিনি এঁকেছিলেন। তার হদিস আমরা পাচ্ছি ১৯২৭ সালে কবিবন্ধু কার্লোস পেইয়িসেরকে লেখা মন্তেনেগ্রোর একটা চিঠিতে। সেই চিঠির পাদটীকায় রবীন্দ্রনাথের পরিচয় দিতে গিয়ে সম্পাদক জানাচ্ছেন যে :
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ভারতীয় কবি ও লেখক। ১৯১৩ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। পরে ১৯২২ সালে হোসে গরোস্তিসা কর্তৃক নির্বাচিত ও ভূমিকাসহ তার গল্পের একটি সংকলন১ (মন্তেনেগ্রোর আঁকা একটি প্রচ্ছদসহ) কুলতুরা প্রকাশনী (Editorial cultura) বের করে। ১৯৬৪ সালে মন্তেনেগ্রো কুয়াদের্নোস দে বেইয়াস আর্তেস (Cuadernos de Bellas Artes) পত্রিকার প্রচ্ছদের জন্য রবীন্দ্রনাথের একটি প্রতিকৃতি আঁকেন।
মন্তেনেগ্রোর আঁকা এ প্রতিকৃতিটি আমি দেখিনি। তাহলে তথ্য আকারে মন্তেনেগ্রোর আঁকা রবীন্দ্রনাথের অন্তত দুটো প্রতিকৃতির কথা আমরা জানতে পারছি। এ দুই প্রতিকৃতির কালগত ব্যবধান ৪০ বছরের। স্বতপ্রণোদিত হয়ে নাকি অনুরুদ্ধ হয়ে তিনি এ ছবি দুটো এঁকেছিলেন তা নিশ্চিত করে জানার উপায় নেই। তবে যেভাবেই হোক না কেন, এটাতো ঠিক যে লাতিন আমেরিকার প্রথম সারির একজন শিল্পী তার প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন। আর মন্তেনেগ্রোই হচ্ছেন সেই শিল্পী যিনি গোটা লাতিন আমেরিকায় প্রথম রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন। তথ্যের এ ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছাড়াও আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে এ লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ও বিস্তার কেবল বর্ণনির্ভর জগতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, চিত্রকলার জগতকেও তা ছুঁয়ে গিয়েছিল।
এ সংকলনটি ছিল সেনোবিয়া কামপ্র“বি দে হিমেনেথের অনুবাদ-এ কুয়েন্তোস (Cuentos)নামক গল্পগ্রন্থ।

আদালতে জবানবন্দি দিলেন রিজওয়ানার স্বামী- বিকেলে নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন

নারায়ণগঞ্জ মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক। আজ শুক্রবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি শেষে আদালত থেকে বেরিয়ে আসেন আবু বকর।

তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ আদালতের

নরেন্দ্র মোদি
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির বৈবাহিক অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন পেশ করতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদের একটি আদালত। সত্য গোপনের অভিযোগে মোদির বিরুদ্ধে আম আদমি পার্টির (এএপি) কর্মী নিশনাত ভার্মার এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এএপির কর্মী নিশনাত আদালতে অভিযোগ দায়েরের আগে মোদির বিরুদ্ধে ২০১২ সালে গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচনের হলফনামায় বৈবাহিক অবস্থার তথ্য গোপন করার অভিযোগ এনে রানিপ থানায় এফআইআর করার চেষ্টা করেন। এবারের লোকসভা নির্বাচনে ভাদোদরা আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় মোদি প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন, তিনি বিবাহিত। মনোনয়নপত্রের হলফনামায় তিনি বৈবাহিক অবস্থানের ঘর পূরণ করেন এবং এতে তাঁর স্ত্রীর নাম যশোদাবেন বলে উল্লেখ করেন। পিটিআই।

ভারতে আসছেন আরেক ইন্দিরা?

দাদি-নাতনি: চুলের একই স্টাইল, একই হাসি
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও তাঁর দাদি ইন্দিরা গান্ধী। প্রিয়াঙ্কার সবকিছুই দাদির মতো। কথা বলা, হাসি, চুলের ছাঁট, পোশাক-পরিচ্ছদ—সবকিছুই। এমনকি, দুই হাত তুলে মানুষকে নমস্তে জানানোর ভঙ্গিটাও। সবকিছু দেখে মনে হতেই পারে, প্রিয়াঙ্কা খুব সযত্নে দাদিকে অনুসরণ করেন। দাদির মতো হতে চান। কিন্তু তা কতটা সম্ভব, সেটা ভিন্ন কথা। ইন্দিরা প্রায় ১৮ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাফল্যের সঙ্গে। নেতৃত্বগুণের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল দারুণ চোখা।
প্রিয়াঙ্কা এখনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সেভাবে জড়াননি। তাঁর মা সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের সভানেত্রী, ভাই রাহুল গান্ধী দলের সহসভাপতি। কিন্তু প্রিয়াঙ্কা দলের কোনো পদে নেই। রাজনৈতিক উচ্চাশা আছে বলেও কখনো বোঝা যায়নি। চলমান লোকসভা নির্বাচনে সোনিয়া উত্তর প্রদেশের রায়বেরিলি থেকে এবং রাহুল একই রাজ্যের আমেথি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নিজে নির্বাচন না করলেও মা ও ভাইয়ের জন্য প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভারতবিখ্যাত নেহরু-গান্ধী পরিবারের রক্ত যাঁর শরীরে, তিনি কত দিন সক্রিয় রাজনীতির বাইরে থাকতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়। এমনও হতে পারে, তিনি নিজেকে প্রস্তুত করছেন। তৈরি করছেন আরেকজন ‘ইন্দিরা’ হওয়ার জন্য। হিন্দুস্তান টাইমস।

এপ্রিল নিষ্ঠুরতম মাস

এপ্রিল নিষ্ঠুরতম মাস। কবি টি এস এলিয়ট লিখেছিলেন ওয়েস্টল্যান্ড নামের কবিতায়। আমাদের দেশে নিষ্ঠুরতম মাস আরও আছে। আগস্ট খুব শোকাবহ। ১৯৭১ সাল বিচারে মার্চ আমাদের কাছে নিষ্ঠুর মনে হবে, যেমন নভেম্বরে ঘটেছিল সত্তরের জলোচ্ছ্বাস। এপ্রিলকে এলিয়ট নিষ্ঠুর বলেছিলেন, কারণ ওই মাসে লাইলাক ফুল ফোটে। বিরানভূমিতে ফুলও নিষ্ঠুরতার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে কবিকে, কিন্তু আমাদের আছে বাস্তব কারণ। অথচ বাংলা নববর্ষ আমাদের উজ্জীবিত করেছে, জাগিয়ে দিয়ে গেছে, আশ্বস্ত করেছে যে এই জাতির পরাজয় নেই। লাখ লাখ মানুষ পথে নেমে এসেছিলেন, যোগ দিয়েছিলেন উৎসবে। সারা দেশে। প্রথম আলোয় খবর ছাপা হয়েছে, বৈশাখ এখন অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্যের এক বিশাল উপলক্ষ। মানুষ নতুন কাপড় কেনে, ভালো রান্নাবান্না করে। যতই দিন যাচ্ছে, পয়লা বৈশাখ উৎসব হিসেবে ততই বড় হচ্ছে, ব্যাপক হচ্ছে। এটা শুধু সংস্কৃতিকেই ঋদ্ধ করছে না, চাঙা করছে অর্থনীতিকেও। নববর্ষ উদ্যাপনের আনন্দের মধ্যেই আসতে লাগল সেই দুঃসংবাদগুলো। সেন্ট মার্টিনে সমুদ্রের জলে ডুবে মারা গেছে আহ্ছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্র, খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না আরও চারজনের। তাঁরা সবাই ভালো ছাত্র, স্নাতক পরীক্ষা শেষ করে তাঁরা গিয়েছিলেন সেন্ট মার্টিনে। তাঁদের মধ্যে একজন খুব ভালো ছবি তোলেন। একজন সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন। যাওয়ার আগে ফেসবুকে একজন লিখেছেন, দূরে চলে যাচ্ছি, অনেক দূরে। বন্ধুরা কমেন্টস করেছেন, যত দূরেই যাও, ফিরে আসতেই হবে। তার জবাবও দিয়েছেন তিনি, যদি মরে যাই! আরেকজনের ফেসবুক স্ট্যাটাস ছিল, চলে যাচ্ছি দোস্ত, একদম নেটওয়ার্কের বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষাটাও দিয়ে ফেলেছেন, এই সময় এভাবে কেউ যায়! ফেসবুকে তাঁদের ছবি দেখি, সাব্বিরের তোলা ফটোগ্রাফগুলো দেখি, কী সুন্দর ছবি তুলতেন সাব্বির হাসান। কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ছাত্র ছিলেন তাঁরা, বিদ্যায়তনের সবচেয়ে মেধাবী হিসেবে গণ্য করা হতো এই ব্যাচটিকে। এই সব সোনার ছেলে সমুদ্রের জলে ডুবে প্রাণ হারাবেন? প্রায় প্রতিবছরই এ ধরনের খবর আমাদের শুনতে হয়। সমুদ্রে বেড়াতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা ভেসে গেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এঁরা হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। এর নিচের বয়সের যেমন হন না,
এর চেয়ে বড় বয়সেরও হন কমই। কারণ একটাই, ছোটরা গেলে সঙ্গে বাবা-মা থাকেন, তাঁরা চোখে চোখে রাখেন। বড়রা নিজেরাই দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন হন, জীবনের ঝুঁকি নিতে চান না। আর তরুণেরা হন ভয়ভীতিহীন, বাঁধনহারা। ক্লোজআপ বিজয়ী রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী আবিদের কথা আমাদের পক্ষে ভোলা মুশকিল। প্রথম আলো বন্ধুসভার সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি, মুখে হাসিটি লেগেই থাকত। মেধাবী তরুণ। এই রকম গুণী, এই রকম অমায়িক, এই রকম ইতিবাচক ছেলে আমি কমই দেখেছি। কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে সমুদ্রের পানিতে ডুবে মারা গেলেন আবিদ। সঙ্গীও মারা পড়লেন তাঁর সঙ্গে। আমাদের মনে আছে, কয়েক বছর আগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সুন্দরবন যাওয়ার পথে কটকায় জাহাজ থেকে নেমে বিপদে পড়েছিলেন। সেবার মারা গেছেন ১১ জন। নয়জন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের, দুজন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের। আহা, কী অপূরণীয় ক্ষতি, সম্ভাবনার কী অকাল অবসান! আর যদি আমরা ওই ছেলেমেয়েদের বাবা-মা, ভাইবোন, বন্ধুদের কথা বিবেচনা করি। কীভাবে একজন মা সহ্য করবেন এই বিয়োগব্যথা! হয়তো যাওয়ার আগে ছেলে ভাত খাচ্ছিলেন, মা তাঁর পাতে তরকারি তুলে দিয়ে ছেলের মুখের দিকে নীরবে চেয়ে ছিলেন। যাওয়ার আগে বলেছেন, বাবা, সাবধানে থাকিস। পানিতে নামিস না। আহ্ছানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের ট্র্যাজেডির শিকার ঠাকুরগাঁওয়ের ইভানের বাবা মকছুদুল আলম বলেই দিয়েছিলেন, সমুদ্রে যাচ্ছ ভালো কথা, গোসল করতে পানিতে নেমো না। অকালপ্রয়াত এসব তরুণের বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন বলছেন, সেন্ট মার্টিনের ওই জায়গায় আগেও দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ওখানে খাদ আছে, স্রোতের টান আছে, তাহলে ওই জায়গায় কোনো সতর্কতাবাণী নেই কেন? কেন ঘোষণা করা হবে না, এই জায়গাটা বিপজ্জনক? পর্যটন কর্তৃপক্ষ কিংবা স্থানীয় সরকারগুলোর কি কোনো দায়িত্ব নেই? কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই সক্রিয় হতে হবে, নিরাপত্তাই যে প্রথম, সেটা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। তবে প্রত্যেককেই সাবধানও হতে হবে। প্রতিবছর এ ধরনের পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর আর শুনতে চাই না। যাঁরা এই লেখা পড়ছেন, তাঁদের উদ্দেশে কি কতগুলো পরামর্শ দিতে পারি? আমি ছোটবেলায় জুনিয়র রেডক্রস করতাম, আমাদের একটা প্রশিক্ষণ হয়েছিল, সেখান থেকে আর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে কতগুলো কথা বলে ফেলি।
১. সাঁতার না জানা থাকলে পানিতে নামার দরকার নেই। আর প্রত্যেকেরই উচিত সাঁতার শিখে রাখা।
২. ভাটার সময় সমুদ্রে নামা উচিত নয়। কক্সবাজারের সৈকতে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানো হয়। সবুজ পতাকা থাকলেই কেবল নামা যেতে পারে। যাঁরা সাঁতার জানেন না, তাঁরা বড়জোর পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ভেজাতে পারেন। এর চেয়ে গভীরে যাওয়া উচিত নয়। যাঁরা সাঁতার জানেন, তাঁরা কোমর পানি পর্যন্ত যেতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, কক্সবাজারের আপাত নিরাপদ জায়গায়ও ভেতরে ভেতরে বেশ গভীর খাদের মতো আছে। আর ঢেউ নেমে যাওয়ার সময় পায়ের নিচের মাটি সরে যায়। হঠাৎ করে পা খাদে পড়লে অতলে ডুবে যাওয়ার অনুভূতি হয়। যিনি সাঁতার জানেন না, তিনি কিন্তু হাঁটুপানিতেও পড়ে গিয়ে ভয় পেয়ে মারা পড়তে পারেন।
৩. সুইমিংপুলে কিংবা পুকুরে সাঁতার কাটা আর নদীতে ও সমুদ্রে সাঁতার কাটা একদমই এক নয়। খুব ছোট নদীর সামান্য স্রোতেও সাঁতার কাটা খুব মুশকিল। স্রোত ভাসিয়ে ভাটির দিকে নিতে থাকে। উত্তাল সমুদ্রে বড় সাঁতারুর পক্ষেও ভেসে থাকা কঠিন। কাজেই সাঁতার জানা থাকলেও খরস্রোতা নদীতে কিংবা উত্তাল সমুদ্রে নামা উচিত নয়। আসলে সমুদ্র জিনিসটা স্নানের জন্য বা সাঁতারের জন্য নয়। আর সমুদ্রের যেখানে ইচ্ছা সেখানে নামতে ইচ্ছা করল আর নেমে গেলাম, এটাও ঠিক নয়।
৪. মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের মতো জায়গায় পানিতে নামার একদমই প্রয়োজনীয়তা নেই।
৫. ঘুমের ওষুধ, কাশির ওষুধ, অ্যালকোহল, নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের পর পানিতে নামা বিপজ্জনক। এমনকি স্নানাগারের চৌবাচ্চায়ও ডুবে মানুষ মারা যেতে পারে।
৬. যিনি সাঁতার জানেন না, তাঁকে উদ্ধার করতে যাওয়া বিপজ্জনক। এটা আমাদের রেডক্রসের প্রশিক্ষণে শেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, বাঁশ বা দড়ি এগিয়ে দেবে, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কাছে যেতে পারেন, কিন্তু তুমি গেলে ডুবন্ত ব্যক্তি তোমাকে জড়িয়ে ধরবে এবং সাঁতার কাটতে দেবে না। সে নিজেও মারা যাবে, তোমাকেও মারবে। বলা হয়েছিল, যিনি সাঁতার জানেন না, তাঁর কপালের পাশে বাড়ি মেরে তাঁকে অজ্ঞান করে তারপর তুলতে হবে। আর কর্তৃপক্ষের উচিত, বিপজ্জনক এলাকা, বিপজ্জনক সময় ইত্যাদি চিহ্নিত করে দেওয়া। সমুদ্রের পর্যটন এলাকায় উদ্ধারকারী দল সদা প্রস্তুত রাখা। তবে আবারও বলি, সাঁতার না জানা থাকলে পানিতে নামার দরকার নেই। সাঁতার জানা থাকলেও খরস্রোতা নদী বা উত্তাল সমুদ্রে বা অচেনা জায়গায় হঠাৎ করে পানিতে নামা উচিত নয়। মানুষ শ্বাস না নিয়ে ছয় মিনিটের বেশি বাঁচতে পারে না। কাজেই উদ্ধারকারীরা আছেন, আমার বিপদ হলেও কেউ এসে আমাকে বাঁচাবেন, এই ভরসা করা উচিত নয়। ছয় মিনিটের মধ্যে উদ্ধারকারী আসার সম্ভাবনা খুবই কম। কাজেই নিজের সাবধানতা নিজের কাছে। ঘটনা ঘটে গেলে কথা বলে আর লাভ নেই। যিনি গেছেন, তিনি আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু আমরা যারা আছি,
আমরা যেন নিজেদের বিপদ নিজেরা ডেকে না আনি। সুন্দরভাবে নববর্ষ উদ্যাপনের খবর মাটি হয়ে গেছে আরও একটা দুঃসংবাদে। ম্যাগসাইসাই পুরস্কার বিজয়ী পরিবেশ-আইনবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে ১৬ এপ্রিল দিনের বেলায় অপহরণ করা হয়েছে। যেভাবে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে, তার বর্ণনা সিনেমাকেও হার মানায়। বেলা আড়াইটায় সিদ্দিক সাহেবের গাড়িকে একটা নীল রঙের মাইক্রোবাস পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। তিনি ও চালক গাড়ি থেকে নেমে এলে কয়েকজন অস্ত্রধারী নেমে এসে তাঁকে মাইক্রোবাসে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যায়। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান অত্যন্ত সক্রিয় ও সোচ্চার পরিবেশকর্মী। তিনি অনেকের স্বার্থের পথে বড় বাধা হয়ে আছেন। ভূমিদস্যু, নদীখেকো, জলাধার-অপহারক, মাঠ দখলকারী—সবার বিরুদ্ধে তিনি লড়ে যাচ্ছেন। তাঁদের নেওয়া আইনি পদক্ষেপে কাজও হয়েছে অনেক জায়গায়। জানি না, কেন এবং কারা তাঁর স্বামীকে অপহরণ করেছে। কিন্তু এটা কেবল নাগরিকদের মনে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগই তৈরি করবে না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রমাণ হিসেবে দেখা দেবে। শুধু তা-ই নয়, সমগ্র পৃথিবীর কাছে সরকারের ও দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সরকারের উচিত, আবু বকর সিদ্দিককে উদ্ধারের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করা। আশা করি, আবু বকর সিদ্দিককে উদ্ধার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সফল হবে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

সমাজে অনৈতিকতা ও অসাধুতা

যা কিছু সত্য, সুন্দর ও চির কল্যাণকর, মহান তা-ই ধর্মের শিক্ষা। তাই প্রতিটি ধর্ম মানুষের আত্মোপলব্ধি ও পরম অনুভূতির দিগ্দর্শন। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাই মানুষের দেহ-মনকে পূতপবিত্র, উদার ও মহৎপ্রাণ করে তোলে। ধর্মের প্রকৃত মর্মবাণীর উদ্দেশ্য মানুষের আদর্শ জীবন গঠন। কেননা আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীতে অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়ে মানবজাতিকে তাদের মাধ্যমে দিয়েছেন নৈতিক শিক্ষা। এ জন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদর্শ আখলাক (চরিত্রাবলি) পরিপূর্ণ করার জন্যই প্রেরিত হয়েছি।’ (তিরমিজি) সমাজে নীতিনৈতিকতা ও আদর্শ চর্চার যে শুভ শিক্ষা বিরাজমান তা ধর্মের জ্ঞান, যা গুরুজনের মুখে ফিরছে এবং গ্রন্থাকারেও লিপিবদ্ধ রয়েছে। ইসলাম ধর্মের এ মহান শিক্ষাই সভ্যতার আলো, যা মানবসত্তাকে বিকশিত করে উন্নত জাতিতে পরিণত করেছে। সুতরাং কোনো সভ্য সমাজে ঢালাও অনাচার, পাপাচার, অনৈতিকতা ও অসাধুতা চলতে পারে না। মানুষের সৎভাবে জীবনযাপনের জন্য ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। জ্ঞান ছাড়া সচেতনতা আসবে না আর গণসচেতনতা ছাড়া সক্ষমতা আসবে না। ধর্মের শিক্ষা কর্মের জন্য; তা যদি মানুষকে অনৈতিকতা ও পাপ-পঙ্কিলতা থেকে বিরত রাখতে না পারে, তাহলে এতে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। বর্তমানে অনৈতিকতা ও অসাধুতা যে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে,
তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সুতরাং পাপের পথ থেকে দূরে থাকতে ও সত্য-ন্যায়ের পথে চলতে ধর্মের নীতি-আদর্শের আবশ্যকতা রয়েছে। সমাজের মেরুদণ্ডে যেন ঘুণ ধরছে। সামাজিক অবক্ষয়, মূল্যবোধহীনতা ও ক্ষয়িষ্ণুতা বৃদ্ধি করছে। যার যার ধর্মের প্রতি অনীহা এবং বিবেক-জ্ঞানবিবর্জিত হওয়ার কারণে অসৎ লোকেরা নানা ধরনের অন্যায় ও অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। কর্মক্ষেত্রে দক্ষ, অভিজ্ঞ, নীতিমান ও সৎ লোকের খুবই অভাব। নকল, ভেজাল, প্রতারণা আর কারচুপি হয়ে উঠেছে সামাজিক ও বাণিজ্যিক লেনদেনের পদ্ধতি। সমগ্র দেশবাসী নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, পণ্যদ্রব্য ও ওষুধপথ্য ক্রয়ের প্রাক্কালে প্রতারিত ও বিপদগ্রস্ত হওয়ার ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত। বাড়তি মুনাফার লোভেই অসাধু ভেজাল ব্যবসায়ীরা এমন সর্বনাশা বক্রপথে পা বাড়িয়েছেন। সমাজে কপট লোকদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, ‘তাদের অনেককে তুমি পাপাচার, সীমালঙ্ঘন ও অবৈধ ভক্ষণে তৎপর দেখতে পাবে; তারা যা করে নিশ্চয়ই তা কতই না নিকৃষ্ট!’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৬২) যারা মানুষের ক্ষতি সাধন করে বা সর্বনাশ ঘটিয়ে নিজেদের উদরপূর্তি করছে, তারা নিঃসন্দেহে জনশত্রু। জনস্বাস্থ্যকে বিপন্ন করে যারা অনৈতিকভাবে মুনাফা অর্জন করতে চায়, তারা দেশ ও জাতির শত্রু। তাদের কোনো রকম ছাড় নয়। এদের মূলোৎপাটন করতেই হবে। সীমিত সম্পদের এ দেশে হতদরিদ্র ও হতভাগ্য অসহায় মানুষদের নিয়ে এই যে জঘন্য অমানবিকতা, এর বিরুদ্ধে প্রবল জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। যারা আয়-উপার্জনের ক্ষেত্রে বৈধ-অবৈধ প্রশ্নে আন্তরিক প্রচেষ্টা, সততার চর্চা ও সাবধানতা অবলম্বন করে না, তাদের অসাধুতার ব্যাপারে নবী করিম (সা.) সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন,
‘যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করবে তার পরোয়া করে না, আল্লাহ তাআলা কোন্ দরজা দিয়ে তাকে জাহান্নামে ঢুকাবেন তার পরোয়া করবেন না।’ (বায়হাকি) সর্বোপরি, জনস্বার্থ বা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা কার্যকর হাতিয়ারটি হলো জনসচেতনতা। একমাত্র জনগণই জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সকল অপতৎপরতা কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন সচেতন ও সক্রিয় উদ্যোগ। সন্দেহ নেই যে, জনগণের মধ্যে সেই ধরনের সামাজিক সচেতনতা ও সক্রিয়তার মারাত্মক অভাব আছে বলেই অসাধু ব্যবসায়ীদের দাপট দিনে দিনে বেড়ে চলছে। সুতরাং সচেতন ও বিবেকবান সকল সংগঠন, ব্যক্তি, পরিবার ও আলেম সমাজের এ ক্ষেত্রে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করা আশু কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভেজালকারীদের কঠোরতম শাস্তির বিধান আর তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ ও সামাজিকভাবে তাদের বর্জন করার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। যারা এ ব্যাপারে অসচেতন, তাদের জাগিয়ে তোলাও আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। একই সঙ্গে যারা ওজনে কম দেয়, সেই সব অসাধু মানুষরূপী দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে চাই কার্যকর ব্যবস্থা। সমাজে প্রতারকদের স্বরূপ উন্মোচন করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘মন্দ পরিণাম তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়! যারা লোকের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং অন্যকে মেপে বা ওজন করে দেওয়ার সময় কম দেয়।’ (সূরা আল-মুতাফিফফিন, আয়াত: ১-৩) তাই আসুন, আমরা যেন সত্য ও মিথ্যার মাঝ দিয়ে না চলি। আমরা যেন সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলি। কেননা সত্যবাদিতা মানুষকে মুক্তি দেয় এবং অনৈতিকতা ও অসাধুতা মানুষকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

চার বছরে ২৬৮ জন অপহূত-আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য by শরিফুল হাসান

২০১০ সালের ২৫ জুন ঢাকার শেরেবাংলা নগর থেকে অপহূত হন ঢাকার ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার বিএনপির নেতা চৌধুরী আলম। চার বছর হলেও এখনো তাঁর খোঁজ নেই। দুই বছর ধরে নিখোঁজ বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলীও। এ ছাড়া পাঁচ মাস ধরে নিখোঁজ কুমিল্লা বিএনপির সাবেক সাংসদ সাইফুল ইসলাম।

৩০% নারী স্বামীর ভয়ে যৌন সম্পর্কে বাধ্য হন by মানসুরা হোসাইন

বাংলাদেশের বিবাহিত নারীদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি জীবনের কোনো না কোনো সময় স্বামীর মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ২০ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বিবাহিত নারীরা এ নির্যাতনের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছেন। শহরের তুলনায় গ্রামে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে। ৩০ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, স্বামীর ইচ্ছা অনুযায়ী যৌন সম্পর্ক না করলে স্বামী কী না কী করবে; সে ভয়ে শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য হন।

নারায়ণগঞ্জে পৌঁছেছেন রিজওয়ানা ও তাঁর স্বামী

অপহরণের ৩৫ ঘণ্টা পর অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসা আবু বকর সিদ্দিক নারায়ণগঞ্জে পৌঁছেছেন। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও রয়েছেন।