Saturday, June 24, 2017

দৃশ্যমান হচ্ছে সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক by আলফাজ আনাম

সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে যে গোপন যোগাযোগ চলে আসছিল তা এখন প্রকাশ্য রূপ নিতে যাচ্ছে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টাইমসের এক খবরে বলা হয়েছেÑ সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে বিমান যোগাযোগ চালু হচ্ছে। ইসরাইলের এল আল এয়ারলাইনস সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে ফ্লাইট চালু করার পরিকল্পনা করছে। এর আগে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নালের এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল- সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর লক্ষে বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে কয়েকটি আরব দেশের পক্ষ থেকে ইসরাইলের সাথে সরাসরি টেলিফোন সংযোগ প্রতিষ্ঠা ও বিমান যোগাযোগ স্থাপনের প্রস্তাবও ছিল। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট্র ট্রাম্পের সৌদি আরব ও ইসরাইল সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারের এসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও ইহুদি জামাই জ্যারেড কুশনার এবং সৌদি ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরের সময় দুইজন ইসরাইলের সাথে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক উন্নত করা ও ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করেন। ধারনা করা হচ্ছে- হামাসের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার জন্য কাতারের ওপর সৌদি আরব যেভাবে চাপ সৃষ্টি করছে তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে- ইসরাইলের আস্থা অর্জন করা।
নিউজ উইককে সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা সম্প্রতি বলেছেন, ইসরাইলের সাথে সন্ত্রাস দমন ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের মতবিনিময় বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ আছে। ইসরাইলের সাথে উপসাগরীয় দেশগুলোর এ যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে- সংযুক্ত আরব আমিরাত। দুবাইয়ে ইসরাইলের একটি কূটনৈতিক অফিসের মাধ্যমে আরব দেশগুলোর লিয়াজোঁ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এখন ইসরাইলের সাথে উপসাগরীয় দেশগুলোর এই যোগাযোগ প্রকাশ্য রূপ নেয়ার জন্য ব্যবসায়, বাণিজ্য ও গণমাধ্যমকে কাজে লাগানো হবে। কাতারের ওপর অবরোধ আরোপের তাৎপর্য ও প্রভাব নিয়ে একজন সৌদি সাংবাদিক এই প্রথম ইসরাইলের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে স্কাইপের মাধ্যমে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।
সৌদি-ইসরাইল গোপন যোগাযোগ দীর্ঘ দিন থেকে চলে আসছে। ২০১৫ সালে কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্সের এক অনুষ্ঠানে সৌদি জেনারেল আনোয়ার মাজেদ ইশকি ও জাতিসঙ্ঘে ইসরাইলের দূত দোরে গোল্ড রিভেলড জানান, ইরানকে মোকাবেলার জন্য ইসরাইল ও সৌদি আরবের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের অন্তত পাঁচটি গোপন বৈঠক হয়েছে। জেনারেল ইশকি সামরিক দায়িত্বের পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ সময় সৌদি আরবের গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি জেদ্দাভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। জেনারেল আনোয়ার মাজেদ ইশকি সৌদি বাদশাহ সালমানের একজন সিনিয়র উপদেষ্টা। ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক জোরদারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বলে মনে করা হয়। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে নিয়ে ২০১৫ এর মে পর্যন্ত ১৭ মাসে তিনি সৌদি সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে ওয়াশিংটনে ইসরাইলি প্রতিনিধিদের সাথে মোট পাঁচবার বৈঠকে মিলিত হন। ২০১৬ সালে জুলাই মাসে একটি উচ্চপদস্থ সৌদি প্রতিনিধিদল সাথে নিয়ে ইসরাইল সফর করেন এবং ইসারাইলি পার্লামেন্ট নেসেটের প্রভাবশালী বিভিন্ন সদস্য এবং মোসাদের উপরস্থ কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। কোনো সৌদি কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিকভাবে এটাই প্রথম ইসরাইল সফর। ইসরাইলের সাথে সৌদি আরবের কৌশলগত সম্পর্কের কিছু ভিত্তি তিনি তুলে ধরেন, যার মধ্যে রয়েছে- ১.আরব এবং ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, ২. ইরানের বর্তমান সরকারকে পরিবর্তন করা এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসের প্রভাব খর্ব করা, ৩. জিসিসিভুক্ত রাষ্ট্র্রগুলোর ঐক্য, ৪. ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি এডেনে একটি স্বাধীন কর মুক্ত নৌবন্দর প্রতিষ্ঠা করা, ৫. আমেরিকা এবং ইউরোপের সাহায্যে একটি সম্মিলিত আরব সেনাবাহিনী গঠন করা যাতে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, ৬. ধীরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাওয়া। ৭. বৃহত্তর কুর্দিস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। কুর্দিস্থান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ এলাকায় তুর্কি, ইরানি এবং ইরাকি কমানো সম্ভব হবে।
জেনারেল ইশকির আগে সাবেক সৌদি গোয়েন্দা প্রধান তুর্কি আল ফয়সালের সময় ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। এ সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি ছিল ইরানের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করা। সৌদি আরব ২০০৯ সালে ইরানে হামলার জন্য প্রয়োজনে সৌদি আকাশসীমা ইসরাইলকে ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার কথা জানিয়েছিল। এ ছাড়া ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি আরবের কাছে ইসরাইল আয়রন ডোম মিশাইল ডিফেন্স প্রযুক্তি বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিল। এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় হামাস, হিজবুল্লাহ ও মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সাথে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলো এক সাথে কাজ করতে যাচ্ছে। কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ করার পর ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান বলেন, আরব দেশগুলো কাতারের ওপর যে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে তাতে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তিনি কাতারের ওপর অবরোধ আরোপকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ বলে তাতে জোরালো সমর্থন জানান। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাতারের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের মাধ্যমে এটাই প্রমাণ হয় ইসরাইল কিংবা ফিলিস্তিন ইস্যু নয়, ইসলামী সন্ত্রাস প্রধান সমস্যা।
কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ, হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রকাশ্য অবস্থান ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিচ্ছে। হামাসের প্রতিরোধ আন্দোলনকে যখন সৌদি আরব সন্ত্রাসী আন্দোলন বলে উল্লেখ করে তখন হামাস নেতাদের হত্যা করা ইসরাইলের জন্য সহজ হয়ে যায়। হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দেয়ার জন্য কাতারের ওপর যখন অবরোধ আরোপ করা হয়েছে, একই সময় ইসরাইল হামাস শাসিত গাজায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। হামাসের ওপর চাপ সৃষ্টির সৌদি-ইসরাইল পরিকল্পনার অংশ বলে মনে করা হয়।

কাতার সঙ্কট ও আলজাজিরার পথপরিক্রমা by মো: বজলুর রশীদ

কাতারের সাথে যে ক’টি আরব দেশ ৫ জুন ২০১৭ সম্পর্ক ছিন্ন করে তারা সাথে সাথে আলজাজিরার নিউজ চ্যানেল এবং অফিসও বন্ধ করে দেয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় কাতারের চেয়ে আলজাজিরা নিউজ চ্যানেলই তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বা শত্রু! কাতার ব্লকেডের পর আলজাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের সব সিস্টেম, ওয়েবসাইট ও সামাজিক মিডিয়া প্লাটফর্মে সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। তবে সম্প্র্রচার মাধ্যমের কর্মকর্তারা হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন। সাইবার হামলার প্রাথমিক রিপোর্ট পাওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশের দর্শকেরা চ্যানেলটি দেখতে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন। আলজাজিরা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংবাদভিত্তিক টিভি চ্যানেল। এই চ্যানেল নিয়ে কাতারের সাথে দীর্ঘ দিন ধরে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরোধ চলছে। তারা এই চ্যানেলের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে সমস্যা উসকে দেয়ার অভিযোগ আনছে। ২০০৩ সালেই আলজাজিরার ওয়েবসাইট হ্যাক করে অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা। আলজাজিরার ওয়েবসাইটে ঢুকলেই লোকজন দেখত আমেরিকার পতাকা উড়ছে। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আলে সানি বলেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন ব্লকভুক্ত জাতিগুলো কাতারের ওপর কেন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেÑ সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই। তবে এটা কি মূলত আলজাজিরার জন্য ভবিষ্যতে হয়তো এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে।
আরবিতে জাজিরা মানে দ্বীপ। সে থেকে আলজাজিরা নেটওয়ার্কের নামকরণ। এর সদর দফতর কাতারের দোহায়। রাষ্ট্র এই স্যাটেলাইট চ্যানেলের খরচ বহন করে। কাতার সরকার এর মূল মালিক। থানি পরিবার আংশিক খরচ বহন করে এবং তাদের মালিকানাও রয়েছে। আলজাজিরা প্রথমে আরবি নিউজ চ্যানেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এখন বিভিন্ন ভাষায় বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার করে থাকে। আলজাজিরার সম্পাদকেরা সংবাদ সম্পাদনায় স্বাধীনতা ভোগ করেন। ১৯৯৬ সালের ১ নভেম্বর, বিবিসির আরবি ভাষার সম্প্রচার বন্ধ হলে আলজাজিরার পথচলা শুরু হয়।
আলজাজিরার বিশ্বব্যাপী ৮০টি ব্যুরো অফিস রয়েছে। আফগান যুদ্ধের সময় সেখান থেকে লাইভ সম্প্রচার করে বিশ্বব্যাপী সুনাম কুড়িয়ে আনে। আলজাজিরার যাত্রা শুরুর এক বছরের মধ্যে কর্মী সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০০। এখন তিন হাজারেরও অধিক। ১ জানুয়ারি ১৯৯৯ আলজাজিরা ২৪ ঘণ্টা সম্প্রচার শুরু করে। তখন বাজেট ছিল ২৫ মিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বে খুবই প্রভাবশালী নিউজ এজেন্সিতে পরিণত হয়। আরব দর্শকরা আলজাজিরার ভক্ত হয়ে পড়ে। ১৭ বছর আগে জরিপে দেখা যায় তখন আলজাজিরার দর্শক ছিল ৩৫ মিলিয়ন, যা আরব বিশ্বের সেরা চ্যানেলে পরিণত করে। আলজাজিরা সৌদি সহায়তাপুষ্ট এমবিসি বা গরফফষব ঊধংঃ ইৎড়ধফপধংঃরহম ঈবহঃৎব ও লন্ডনভিত্তিক অৎধন ঘবংি ঘবঃড়িৎশকে ছাড়িয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে ৭০টি আরবি ভাষায় সম্প্রচারিত স্যাটেলাইট চ্যানেল থাকলেও এখন আলজাজিরাই সেরা। আলজাজিরা এপ্রিল ২০০৪ সালে বিশ্বের সেরা পাঁচ নিউজ ওয়েবসাইটের জন্য ডবননু অধিৎফং লাভ করে। অন্য চারটি হলো, বিবিসি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, রকেট নিউজ ও দ্য স্মোকিং গান।
আরব বিশ্ব বিবিসি ও সিএনএন দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যায় যখন তারা দেখে যে, তাদের বিষয়ে সঠিক বিষয় উপস্থাপন করা হয়নি বা বিষয়টিকে টুইস্ট করা হয়েছে। আর অনেক বিষয় আছে যা প্রচারই করা হয় না। যেমন ফিলিস্তিন, গাজা, রোহিঙ্গা, মরো, কাশ্মির, লেবানন এসব বিষয়ে কচিৎ কোনো খবর পাওয়া যায়। আফ্রিকার দেশগুলোর রিপোর্টিংও উল্লেখ করার মতো। যেখানে পশ্চিমা বিশ্বের স্বার্থ আছে সেসব বিষয়ে রিপোর্ট করা হয়। আরব বিশ্বের এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, পশ্চিমা মাধ্যমের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং ঘটনার সঠিক বিশ্লেষণ করতে আলজাজিরা প্রকাশ। এখন বলতে গেলে আলজাজিরা বিশ্বের সেরা নিউজ নেটওয়ার্ক।
আলজাজিরার সম্প্রচার বড় বড় নিউজ চ্যানেল ও পশ্চিমাদের বিপক্ষে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঐঁময গরষবং এই বিষয়ে একটি বই লিখেন যার নাম অষ ঔধুববৎধ : ঞযব ওহংরফব ঝঃড়ৎু ড়ভ ঃযব অৎধন ঘবংি ঈযধহহবষ ঞযধঃ ওং ঈযধষষবহমরহম ঃযব ডবংঃ. আলজাজিরার পথপরিক্রমায় মধ্যপ্রাচ্যে শুধু আরবসেট স্যাটেলাইট চ্যানেল ছিল। ওই সময় ঈধহধষ ঋৎধহপব ওহঃবৎহধঃরড়হধষ আরব দর্শকদের জন্য বিশেষ করে সৌদি আরবের দর্শকদের জন্য ৩০ মিনিটের পর্নোগ্রাফি প্রচার করত। এমন এক সময়ে নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ট সংবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে আলজাজিরা কাজ শুরু করে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর একচোখা নীতির বিপরীতে আলজাজিরার সাহসী সংবাদ এ সময় জনপ্রিয়তা পায়। আলজাজিরাই মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার প্রথম কোনো টিভি চ্যানেল, যা পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈকিতভাবে স্বাধীন মত প্রচারের জন্য একমাত্র আলজাজিরাকে বিবেকবান মনে করা হয়। বলা হয় যে, ইসরাইলি-প্যালেস্টানি শান্তিচুক্তির রূপরেখা ফিলিস্তিনিরা কিভাবে গ্রহণ করবে সে ব্যাপারে মত প্রকাশকে আলজাজিরা প্রভাবিত করে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো বা পরিচালিত করার মতো ক্ষমতা ও দক্ষতাও আলজাজিরার রয়েছে। ফিলিস্তিনিরা বলতে গেলে ৬০ ভাগ আলজাজিরানির্ভর। প্যালেস্টাইন টিভি ও আল আরাবিয়া মাত্র ১০ শতাংশ দর্শক। তাই প্যালেস্টইনের রাজনীতিতে আলজাজিরা ‘মুভার ও শেকারের’ কাজ করছে।
ইরাক আক্রমণ কাভারেজের জন্য ও এ বিষয়ে ‘কন্ট্রোল রুম’ ডকুমেন্ট তৈরির জন্য আলজাজিরা ২০০৪ সালে পুরস্কার লাভ করে। ২০০৮ সালে মিসরের বিপ্লবের ওপর ‘মিসরে ২০১১ জনবিপ্লব’ প্রচার করে। ২০১৫ সালে ‘আইএসআইএল’ ও তালেবান নামে শক্তিশালী ডকুমেন্ট প্রচার করে। সম্প্রতি ঞযব ঈৎঁংধফবং-অহ অৎধন চবৎংঢ়বপঃরাব নামে চার পর্বের কালজয়ী ডকুমেন্ট তৈরি করেছে। জাপান থেকে আমেরিকা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়ের ওপর আলজাজিরা ডকুমেন্ট প্রচার করে, যা তাদের নিজেদের তৈরি ও কিছু বিভিন্ন মিডিয়া থেকে ক্রয় করা। এসব ডকুমেন্টের মান উন্নত হওয়ায় আলজাজিরা বৈশ্বিক শ্রোতা-দর্শক পেয়েছে। আলজাজিরার ইন্টারভিউগুলো এবং ফুটেজগুলো আমেরিকা, ব্রিটিশ ও অন্যান্য নিউজ মিডিয়ায় পুনঃপ্রচারিত হয়। সিএনএন ও বিবিসিতেও প্রচারিত হয়। ২০০৩ সালে বিবিসি আলজাজিরার সাথে তথ্য ও ফুটেজ বিনিময়ের জন্য চুক্তি করে।
আলজাজিরা লাদেনের প্রেরিত ভিডিও টেপ প্রচার করে বিশ্বে সাড়া জাগায়। ওসামা তখন ওয়ান্টেট ছিল। তখন সমালোচনা করা হয় যে আলজাজিরা ‘সন্ত্রাসীর’ বক্তব্য প্রচার করছে। এরপর টনি ব্লেয়ার আলজাজিরার টক শোতে অংশ নেয়। আফগান যুদ্ধের সময় আলজাজিরা সবার দৃষ্টি কাড়ে। কেননা আলজাজিরা কাবুলে যুদ্ধের আগ থেকেই অবস্থান করছিল এবং ফুটেজ ও সংবাদ সংগ্রহ করে ভিডিও ফুটেজ তৈরি করছিল। আলজাজিরার একটি ভিডিও ফুটেজের দাম ২৫০,০০০ ডলার পর্যন্ত ওঠে। এতে সহজেই প্রমাণিত হয় যে, কত মূল্যবান ভিডিও ফুটেজ তারা তৈরি করেছিল। গুরুত্বপূর্ণ সঠিক তথ্য প্রবাহের ফলে বুশ প্রশাসন ক্ষেপে যায় এবং আলজাজিরার কাজকর্ম বন্ধ করার জন্য কাবুল অফিসে ২০০১ সালে বোমা বর্ষণ করে। বুশ বলে বেড়ায় যে, প্রয়োজন হলে মূল কেন্দ্র ধ্বংস করে দেয়া হবে। বুশের এ কথা থেকে বোঝা যায় যে, আলজাজিরা কত শক্তি লাভ করেছিল। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের কভারেজের কারণে আলজাজিরা বৈশ্বিক দর্শকের নজর কাড়ে এবং জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করে। আলজাজিরা তখন ১৪০০ কর্মী, ৭০ জন বিদেশ প্রতিনিধি এবং ৪৫০ জন সাংবাদিক কাজ করেছিল। ইরাকে অপারেশন ডেজার্ট ফক্সের ১৯৯৮ সালে বোমা বর্ষণের সময় আলজাজিরাই ছিল একমাত্র নিউজ নেটওয়ার্ক। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো আলজাজিরায় প্রচারিত ভিডিও ক্লিপগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করে।
সমালোচকরা বলেন, আলজাজিরার উদ্দেশ্য হলো, পশ্চিমা বিশ্ব, আরব দেশ ও আরব সংস্কৃতি নিয়ে যা রিপোর্ট করে তাকে কাউন্টার করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। অনেকে অভিযোগ করেন যে, আলজাজিরা কাতারের প্রপাগান্ডা প্রচারদ্বার। ইসলামের জাগরণ এবং ব্রাদারহুডপন্থী। আঞ্চলিক ইস্যুতে সুন্নিপন্থী ও শিয়াবিরোধী পথ অবলম্বন করে। বাস্তবে আলজাজিরা ইরানি তথ্য এবং সব পক্ষের মতামত সব সময় তুলে ধরে এমনকি আরব স্রোতাদের জন্য ইহুদিদের মতামতও প্রচার করে। এ ছাড়া ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ যুদ্ধ, ইসরাইলি বাহিনীর আগ্রাসন, মিসরে ব্রাদারহুডের ওপর সিসি সরকারের দমন-পীড়ন তুলে ধরাসহ আরব বসন্তের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে চ্যানেলটি। আরব বিশ্বে গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলতে গিয়েই আরব শাসকদের অপছন্দের তালিকায় পড়ে আলজাজিরা। মিসরে মোবারকের আমলে গণরোষকে আলজাজিরা উসকে দেয় বলে সিসি অভিযোগ করেছে। তার মতে, আলজাজিরার কারণে মিসরে মুরসির বা ব্রাদারহুডের উত্থান হয়েছে। মিসর সে থেকে আলজাজিরার সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু করে। তিনজনকে গ্রেফতার করে এবং একজন এখনো জেলহাজতে দিন কাটাচ্ছে। এসব কারণে সৌদি ব্লকেডের সাথে মিসরও সমর্থন জানায়।
আরব বসন্তের সময় আলজাজিরারই এক রাজধানীতে থেকে আরেক রাজধানীতে ঢেউ লাগানোর কাজ করে মর্মে নিউ ইয়র্ক টাইমস ২০১১ সালের জানুয়ারিতে মতপ্রকাশ করে। তিউনিসিয়া ও মিসরের বিপ্লবকে এগিয়ে নিতে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। জজ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কলিংক বলেন, ‘তারা প্রত্যক্ষ কোনো কাজে অংশ নেয়নি, কিন্তু আলজাজিরা ছাড়া এসব হয়েছে তা কল্পনাও করা যায় না।’
আলজাজিরার সম্প্রচার আরব দর্শকের মন মানসিকতাকে প্রভাবিত করতে থাকে। কথা বলার স্বাধীনতা ও সত্য ঘটনার স্বাদ পেতে থাকে এবং সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা করতে থাকে। আলজাজিরা আরব দেশগুলোয় সরকার ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রচার করতে থাকে। বাস্তবতা ও রাজনীতির মধ্যে যে বিস্তর ফারাক রয়েছে তা তুলে ধরতে থাকে। বিশেষ করে সৌদি আরব, বাহরাইন, সিরিয়া ও লেবাননের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর এবং বিরোধীয় বিষয়ের ওপর বক্তব্য সম্প্রচার করতে থাকে। এসব বক্তব্য, ঘটনা ও ইন্টারভিউ সম্প্রচারের কারণে কোনো কোনো সময় আরব দেশগুলোতে এক দিনের মাথায় প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি হতো। এর তালিকা অনেক দীর্ঘ।
আলজাজিরা আরবি চ্যানেলে জনপ্রিয় প্রভাব বিস্তারকারী ‘আল শারিয়া ওয়া আলহায়া’ বা শরিয়ত ও জীবনযাপন বিশেষ শো প্রচার করে যার দশর্ক সংখ্যা ৬০ মিলিয়ন। ইউসুফ আল কারজাভিকে আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে সেখানে দেখানো হয়। অনুষ্ঠানটি বারবার দেখানো হয় ও সমালোচনাও চলতে থাকে। শোতে তিনি বলেছেন, ‘ইহুদিদের আল্লাহ শাস্তি দিবেন তাদের দুর্নীতির জন্য। হিটলারের মাধ্যমে তাদের শেষবার সাজা দেয়া হয়েছে।’ তিনি ধ্বংসের জন্য নয় শত্রুদের ভীতি প্রদর্শনের জন্য মুসলমানদের পরমাণু শক্তির অধিকারী হওয়াকে বৈধতা দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ২০ বছর ধরে তিনি নিয়মিত ‘শরিয় অ্যান্ড লাইফ’ নামক প্রশ্নোত্তরপর্ব অনুষ্ঠানটিতে জবাব দিয়েছেন লাখ লাখ দর্শক-শ্রোতার বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব। ধর্ম, পারিবারিক সমস্যা, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের বিধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার কাছে প্রশ্ন করতেন বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা। অনুষ্ঠানটিতে কারজাভির বিভিন্ন স্পষ্ট বক্তব্য তাকে ইউরোপ, আমেরিকাসহ আবর বিশ্বের অনেকে দেশের শাসকদের কাছেও তাকে শত্রুতে পরিণত করে। ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ আন্দোলনে সমর্থন দেয়ার কারণে তাকে নিষিদ্ধ করে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র। মিসরের ব্রাদারহুডের সাথে তার সম্পৃক্ততা ও ইসলামপন্থী সব আন্দোলনের প্রতি সমর্থনের কারণে মিসরসহ আরব বিশ্বের অনেক দেশই তার বিরোধী। গত সপ্তাহে সৌদি আরব বিশিষ্ট ইসলামি ব্যক্তিত্ব কারজাভিকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করে। কুয়েতের সাথে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাম্প্রতিক সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে আরব শাসকেরা আলজাজিরাকে ধ্বংসের একটি উপলক্ষ যেন খুঁজে পেয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ইসরাইল মূলত সিরিয়া সমস্যাসহ আরব বিশ্বের ঘটনাবলিকে এত জটিল করার জন্য দায়ী। সবকিছু যেন ইসরাইল নিয়ন্ত্রণ করছে। বিদ্রোহী গ্রুপ তৈরি করা থেকে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ সব কিছুই করছে। এসব কাজে মিডিয়া মোঘল হিসেবে হেইম সাবানকে ব্যবহার করছে। মিসরে জন্মগ্রহণকারী এক আমেরিকান-ইসরাইলি। মধ্যপ্রাচ্য সমস্যাকে উসকে দেয়ার জন্য তিনটি পথ নির্দেশনা দিয়েছে। (১) রাজনৈতিক দলগুলো, বিদ্রোহী ও সিরিয়ার ওহাবি সংগঠনকে তহবিল সরবরাহ করা; (২) থিংক ট্যাংক বসানো, যেমন ওয়াশিংটন ও দোহায় হেইম সাবান কেন্দ্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান বসানো, এটা খুবই অবাক করার ব্যাপার যে, ইহুদি গ্রুপগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করে যাচ্ছে। (৩) মিডিয়া-সম্প্রচারকে কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ। সঠিক সংবাদ যেন পরিবেশিত না হয়, যেন বিভ্রান্তকর বা মিথ্যা সংবাদ ছড়ানো যায়। যার উদাহরণ আমরা হৌলা ধ্বংসযজ্ঞে দেখেছি। হেইম সাবানের অফিস কাতারের দোহায়ও গোপনে কাজ করছে। এসব কাজে ইহুদি এজেন্টারা রাত দিন ব্যস্ত।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আলজাজিরা ও স্থানীয় অফিস বন্ধ করার উপায় খুঁজছেন। জর্ডান ও সৌদি আরব আলজাজিরার স্থানীয় অফিস বন্ধ করে দিয়েছে, চ্যালেলও বন্ধ করে দিয়েছে। আমিরাত, মিসর ও বাহরাইনও বন্ধ করে দিয়েছে। ইসরাইল দীর্ঘ দিন ধরে বলে আসছে আলজাজিরা তাদের বিরুদ্ধে প্রচার চালায়। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী এভিগডর লিবারম্যান বলেন, আলজাজিরার প্রচার ‘নাজি জার্মানি স্টাইল’ প্রপাগান্ডা। ইসরাইলি পত্রিকায় সংবাদ বের হয়েছে যে, নেতানিয়াহু নেতাদের নিয়ে আলজাজিরা বন্ধ করার বিষয়ে গোপন সভা করেছেন; কিন্তু সভার সিদ্ধান্তের বিষয়ে নেতানিয়াহুর অফিস কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করে। তারা স্থানীয় অফিসও বন্ধ করেনি। অথচ আলজাজিরাই একমাত্র চ্যানেল যেখানে ইহুদিরা হিবরু ভাষায় কথা বলেন এবং আরব জনগণকে কিছু বলার থাকলে আলজাজিরার মাধ্যমেই বলেন। এখানেও আলজাজিরার নিরপেক্ষ-স্বাধীন প্রচারনীতি দেখা যায়। কাতারের সাথে বিরোধের জের ধরে টুইটার আলজাজিরার অ্যাকাউন্ট ইতোমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছে।
অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও জনকণ্ঠ প্রকাশে আলজাজিরা বিশ্বকে নতুন পথ দেখিয়েছে। বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহের ভারসাম্যহীনতাকে প্রতিহত করেছে। চলমান সঙ্ঘাত নিরসনে কোনো বৈঠক হলে আলজাজিরা ইস্যুতে কোনো ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছে কাতার। মনে করা হচ্ছে আলোচনায় এই গণমাধ্যমটিও উঠে আসবে এবং সংস্কারের জন্য চাপ দেয়া হবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব, বাংলাদেশ সরকার ও গ্রন্থকার

অগ্নিগর্ভ কাশ্মীর by এ জি নুরানি

সম্প্রতি ইউনিফর্ম পরিহিত মেয়েরা একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল থেকে বের হয়ে হাতে যা কিছু পেয়েছে, তা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিয়ে পুলিশ ভ্যান লক্ষ করে ছুড়ে মেরেছে। শ্রীনগরের ব্যস্ততম বাণিজ্যকেন্দ্র লালচক এলাকায় এই দৃশ্য দেখা গেছে। কাশ্মিরের সাধারণ মানুষ বন্দুকের গুলির ভয়ভীতি উপেক্ষা করে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসছে। তারা পুলিশভ্যানে হামলা চালাচ্ছে; পুলিশ দেখলেই টিটকারি দিচ্ছে এবং ‘আজাদী’ বলে স্লোগান দিচ্ছে।
আগে কখনো এ ধরনের ঘটনা দেখা যায়নি। সাংবাদিক তৌফিক রশীদ এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করে মন্তব্য করেছেন, ‘এই কিশোরী বালিকারা তাদের সমবয়সী ছেলেদের মতোই মৃত্যুকে পরোয়া না করে পুলিশের প্রতি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছে’। তিনি আরো বলেন, তাদের প্রচণ্ড ক্রোধ বা বেপরোয়াভাব ও সাহস শুভ লক্ষণ নয়।
এই সঙ্কটের সমাধান না করা পর্যন্ত কাশ্মিরে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটতে থাকবে এবং তার প্রতিচ্ছবি ও প্রতিক্রিয়া চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়বে।
বিদ্রোহ বা বিপ্লবের জন্য বড় বা তুচ্ছ যেকোনো ঘটনাই যথেষ্ট। ১৯৮৯-৯০ সালের উত্থান অবস্থার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। সত্য কথা বললে বলতে হয়, এ ধরনের ঘটনা ঘটার প্রকৃত কারণ হচ্ছে- কাশ্মিরের জনগণ কখনো চায় না যে, ভারত তাদের শাসন করুক।
১৯৪৮ সালের ১৪ মে একজন প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীনগর থেকে পপুলার মুড-এ লেখেন, ‘তারা বলে একমাত্র শেখ সাহেবই (আবদুল্লাহ) গণভোটে জয়লাভ করার ব্যাপারে আস্থাশীল।’ ওই প্রত্যক্ষদর্শী হলেন ইন্দিরা গান্ধী- যিনি তার পিতা প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি অর্থনৈতিক সংস্কার বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো হলে সব ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান হয়ে যাবে। কারণ প্রকৃতপক্ষে মানুষ একটিমাত্র বিষয়ে উদ্বিগ্ন। সেটা হলো, তারা তাদের পণ্য বিক্রি করে খাদ্য এবং লবণ সংগ্রহ করতে চায়। তাদের কোনো আত্মা নেই।’
কাশ্মিরের ব্যাপারে নয়াদিল্লি কী বলে?
৭০ বছর পর এখনো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিকাশ (উন্নয়ন)-এর ব্যবস্থাপত্র বা নির্দেশ দিচ্ছেন। এতে সুবিধা হচ্ছে, বিদ্রোহী জনতা যে স্বাধীনতার দাবিতে ফুঁসে উঠেছে, সেই বাস্তব অবস্থাকে চাপা দিয়ে রাখা যায়। পাকিস্তান সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্ররোচিত করছে- বলে অভিযোগ এনে সচেতনভাবে নিজেরা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে প্রকৃত পরিস্থিতিকে ধামাচাপা বা আড়াল করে রাখা যাবে না। এই কিশোরী স্কুল ছাত্রীরাও অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। তারাও অন্যদের মতো মৃত্যুকে পরোয়া করছে না। তারা সন্ত্রাসী নয়; তারা মুক্তিযোদ্ধা। তারা মাতৃভূমির স্বাধীনতা চায়।
ভারত কাশ্মিরিদের স্বাধীনতার দাবিকে কিছুতেই স্বীকৃতি দিতে চায় না। তারা চায়, কাশ্মির ভারতের অধীনে থাকুক। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্যাতন, হত্যা, গুম ও বর্বরতা সত্ত্বেও কাশ্মিরি স্বাধীনতাকামীরা দমে যায়নি। তারা কাশ্মিরের আজাদীর জন্য হাসিমুখে প্রাণ দিতে প্রস্তুত। পাকিস্তান এ ব্যাপারে বারবার আলোচনা ও আপসরফার চেষ্টা করলেও মোদি সরকার পাকিস্তান এবং কাশ্মিরি স্বাধীনতাকামী, উভয়ের সাথে আপসরফার বিরোধী। সরকার সেনাবাহিনী দিয়ে জনগণের এই বিপ্লবের মূলোৎপাটন করতে চায়। কাশ্মিরের পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (পিডিপি) সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মির উপত্যকায় দমনাভিযান চালাতে আরো উৎসাহিত হয়েছে। বিজেপির সিনিয়র মন্ত্রী চন্দ্রপ্রকাশ গুপ্ত গত মাসে শ্রীনগরে বলেন, ‘লাটুন কি বহুত বাতুন সো নেহি মানথি; ইনকা ইল্জ জ্যোতি হ্যায়।’ তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্যের বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, তারা পাকিস্তান থেকে আসুক অথবা এখানে বসবাস করুক- যেটাই হোক না কেন, তারা হচ্ছে বিশ্বাসঘাতক। বুলেটই হচ্ছে তাদের জন্য একমাত্র সমাধান। চাপের মুখে দুঃখ প্রকাশ করে বিজিপির সত্যিকারের দৃষ্টিভঙ্গিকে আড়াল করা যাবে না। গত মাসে ২৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে ভোটের দিন সেনাবাহিনীর জিপের সামনে বেঁধে রেখে ‘মানব ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিক্ষোভকারীরা যাতে প্রতিবাদ জানাতে না পারে, সে জন্য নির্যাতনের এই অভিনব পদ্ধতি বেছে নেয়া হয়। এর পক্ষে সাফাই গেয়ে তারা বলেছে- কাশ্মিরের জনগণের সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় সব কিছু করা যায়। বিজেপি সাধারণ সম্পাদক নিজেদের বর্বরতার পক্ষে এ কথা বলেছেন।
কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি কাশ্মিরে দমন অভিযান চালানোর পরিবর্তে স্বাধীনতাকামীদের সাথে সমঝোতার উদ্যোগ নেয়ার কথা বললে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে তিরস্কার করেন।
শ্রীনগরের একটি সরকারের কাশ্মিরিদের অধিকার নিয়ে নয়াদিল্লির সাথে আলাপ-আলোচনা করার কোনো অভিন্ন ভিত্তি নেই। বিজেপির সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করায় পিডিপি এমনিতেই ব্যাপক আলোচনা ও চাপের মুখে আছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংলাপ বা আলাপ-আলোচনার উদ্যোগ নেয়াটা অর্থহীন।
ইন্দিরা গান্ধী ১৯৪৮ সালে মনে করেছিলেন, কাশ্মিরের জনগণকে অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে খুশি করা যাবে। এখনো সেই ধরনের চিন্তাভাবনা ও আকাশকুসুম কল্পনার মধ্যে মোদি সরকার হাবুডুবু খাচ্ছে। কাশ্মিরি জনগণ ভারতীয় শাসন প্রত্যাখ্যান করেছে- এই বাস্তবতা মেনে নেয়া না হলে জনগণকে খুশি করার কোনো পদক্ষেপ বা আলাপ-আলোচনা কাজে আসবে না।
ভারত সরকার ২৮ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টে সরাসরি ঘোষণা দিয়েছে ‘তারা হুররিয়ত নেতাদের সাথে ‘আজাদীর’ ব্যাপারে কোনো আলোচনাই করবে না। তারা চূড়ান্তভাবে এই কথা জানিয়ে দিয়েছে। তাদের সুস্পষ্ট কথা হলো, আলাপ-আলোচনা অবশ্যই ভারতীয় সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে হতে হবে।
শ্রীনগর থেকে লোকসভার উপনির্বাচনে ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ফারুক আবদুল্লাহ জয়লাভ করেছেন। তবে ১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ওই উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। এই নির্বাচনের বিরুদ্ধে কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামীরা সক্রিয় ছিল। সেনাবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও স্বাধীনতাকামীরা সেখানে অত্যন্ত তৎপর ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
মোদি সরকার মনে করছে, তারা বর্বরোচিত নির্যাতনের মাধ্যমে কাশ্মিরিদের আজাদী আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম হবে এবং কাশ্মিরের পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে ‘উন্নতি’র দিকে যাবে। আর এভাবে সেনাবাহিনী দিয়ে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করা গেলে বলবে, কাশ্মির সঙ্কটের সমাধান হয়ে গেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, এ ধরনের বর্বরতা ও নৃশংসতার পরিণতি কখনো শুভ হয় না। এই অপকৌশল কখনো সফল হয় না। ভারত ১৯৪৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত একই ধরনের শঠতা, প্রবঞ্চনা ও বর্বর কৌশল প্রয়োগ করে এলেও সফলতার মুখ দেখেনি। ‘তারা সৃষ্টি করেছে নির্জনতা এবং সেটাকে শান্তি বলে আখ্যা দিয়েছে।’
লেখক : গ্রন্থ প্রণেতা এবং মুম্বাইভিত্তিক আইনজীবী
দৈনিক ডন থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

যানবাহনের ছাদ বোঝাই যাত্রী : দেখার কেউ নেই

উত্তরাঞ্চলীয় রংপুরের কাছে একটি মহাসড়কে আজ ভোরবেলা একটি মালবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গিয়ে ১৬ জন নারীপুরুষ নিহত হয়েছে। নিহতরা প্রায় সবাই গার্মেন্টস শ্রমিক, ঈদের ছুটিতে তারা গ্রামে বাড়িতে যাচ্ছিল এবং কিছু অর্থ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে মালবাহী ট্রাকটিতে চড়েছিল বলে জানা যাচ্ছে।
বাস-ট্রেনের ছাদে কিংবা পণ্যবাহী যানবাহনে চড়ে চলাচলের প্রবণতা নতুন নয়। বিশেষ করে ঈদের মতো উৎসবের মৌসুমে যখন বিভিন্ন গন্তব্যে মানুষের চলাচল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন এই প্রবণতাটা বেড়ে যায়, যার ফলাফল হিসেবে প্রায় প্রতিবছরই দেখা যায় ঈদের মৌসুমে এমন প্রাণঘাতী সব সড়ক দুর্ঘটনা।
রংপুরের পীরগঞ্জ থানার পুলিশ বলছে, শনিবার ভোর পাঁচটার দিকে ঢাকা রংপুর মহাসড়কের কলাবাগান নামক স্থানে সিমেন্ট বোঝাই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। ট্রাকের মালামালের উপর ২৫ থেকে ৩০ জন মানুষ বসে ছিল দূরপাল্লার যাত্রী হিসেবে, ট্রাক উল্টে গেলে এই মানুষগুলো সিমেন্টের বস্তায় চাপা পড়ে এবং ঘটনাস্থলে ১১ জন প্রাণ হারায়, হাসাপাতালে নেয়ার পর মারা যায় আরো পাঁচজন।
পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলছিলেন, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ওই ট্রাকের আরো আটজন যাত্রী এখন ভর্তি রয়েছেন।
ঈদের মতো লম্বা ছুটির সময়টায় পরিবহন স্বল্পতার কারণে দূরপাল্লার যাত্রীদের পণ্যবাহী যানবাহনে ওঠানোর প্রবণতা নিয়মিতই দেখা যায়। গত কয়েকদিন ধরেই উত্তরাঞ্চল অভিমূখে যাওয়া প্রতিটি বাস ট্রেনেরই ছাদে বোঝাই যাত্রী থাকছে।
দেশে ঈদসহ বিভিন্ন বড় উৎসবের সময় যখন ঘরে ফেরা মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায় তখন পরিবহণ খাতে এই অনিয়মগুলো প্রকট হয়ে দেখা দেয়। এমনকি দেখা যায় সরকারের পরিচালিত যানবাহণগুলোও অনিয়মটাকে প্রশ্রয় দেয়।
আজও বেশ কটি জাতীয় দৈনিকে এমন ছবি ছাপা হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালিত ট্রেনগুলোতে পর্যন্ত ছাদে যাত্রী বোঝাই করে নেয়া হচ্ছে।
সড়ক পরিবহণমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অবশ্য আজ টেলিভিশনে দেয়া এক বক্তব্যে জনগণকে বাস ট্রেন বা লঞ্চের ছাদে না চলার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। একই আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির পুলিশ প্রধানও।
রংপুরের ওই দুর্ঘটনা কবলিত মালবাহী ট্রাকটিতে কেন যাত্রী তোলা হয়েছিল এবং দীর্ঘ যাত্রার মধ্যেও সেটা কেন কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ল না- তা খতিয়ে দেখতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিশ্ব কুদস দিবস: ইহুদিবাদের আতঙ্ক

ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ইহুদিবাদীদের দখলে যাবার প্রায় ৭০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে ফিলিস্তিনিদেরকে প্রতিদিনই নতুন নতুন অত্যাচার-নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ফিলিস্তিন জবর দখলের ছয় দশক পার হবার পরও ইসরাইল বিপর্যয়কর নির্যাতনের ধারা অব্যাহত রেখেছে।
তাদের এই ন্যক্কারজনক আগ্রাসনের প্রতি অকুণ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা শক্তিগুলো। তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের মজলুম জনতা তাদের দেশের ভূখণ্ডকে স্বাধীন করার তথা ইহুদিবাদী দখলমুক্ত করার দৃঢ় ইচ্ছা বাস্তবায়নে বিন্দুমাত্রও হাল ছাড়ে নি। ইরানের জনগণ সেই বিপ্লব বিজয়ের আগে থেকেই ফিলিস্তিনের মজলুম জনগোষ্ঠীকে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে।
এই পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের ঘটনা স্বৈরাচারী শাহ বিরোধী বিপ্লবী গণ-আন্দোলনের সময় এবং ইসলামী বিপ্লব বিজয় পরবর্তীকালে ইসলামী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয় ছিল ইহুদিবাদী ইসরাইলের গালে মারাত্মক চপেটাঘাত। কেননা ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ফলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ইসরাইলী স্বার্থে মারাত্মক আঘাত আসে বলে সে সময় বলা হয়েছিল। বিপ্লব বিজয় পরবর্তীকালের ঘটনাপঞ্জী এর সত্যতা ও যথার্থতা প্রমাণ করেছে। কেননা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) কেবল ইরানের জনগণকেই নয় বরং বিশ্বের সকল মুসলমান ও স্বাধীনচেতা মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন ফিলিস্তিনদের সাহায্যে এগিয়ে আসার।
ইরানে ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ) ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বিষাক্ত টিউমার বা ক্যান্সার বলে অভিহিত করেছেন। ফিলিস্তিনের সংগ্রামী জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের অধিকারের প্রতি সাহায্য-সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার জন্যে রমযানের শেষ শুক্রবারে বিচিত্র কর্মসূচি, অনুষ্ঠান ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনীদের প্রতি পরিপূর্ণ সমর্থন ঘোষণার আহ্বান জানান।
বিশ্ববাসী বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব তাঁর এই আহ্বানে ব্যাপক সাড়া দেয় এবং এই দিনকে কুদস দিবস হিসেবে পালন করতে থাকে। প্রায় তিন দশক হতে চললো বিশ্বের মুসলমানরা রমযান মাসের শেষ শুক্রবারে মিছিল, মিটিং, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনীদের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে আসছে। একই দিনে বিশ্বজুড়ে জনগণের এই ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ফিলিস্তিনীদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত রাখা এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রতি বিশ্ব মুসলমানের ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
ইহুদিবাদী ইসরাইল এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানকারী শক্তিগুলো ভালো করেই জানে যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কুদস দিবস পালনের ঘটনা প্রমাণ করে ফিলিস্তিনী জনগণের অধিকারের প্রতি বিশ্ব মুসলমানের সমর্থন আছে এবং ইসরাইলের প্রতি রয়েছে তাদের তীব্র ঘৃণা। বিশ্ব মুসলমানের এই সমর্থন ফিলিস্তিনীদের প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা আন্দোলনকে উজ্জীবিত ও প্রাণিত করে। তবে কোনো কোনো আরব এবং মুসলিম দেশ কুদস দিবস পালনের ব্যাপারে তেমন একটা সন্তুষ্ট নয়। এমনকি কোনো কোনো দেশ তো কুদস দিবসের কর্মসূচি পালনে বাধাই দেয়। মনে হয় কুদস দিবস পালনে বাধাদানকারী দেশগুলো এ বিষয়ে অসন্তুষ্ট যে,ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ফিলিস্তিনী জনগণের সমর্থনে বিশ্বব্যাপী এই গণসচেতনতা সৃষ্টিকারী ও গণজাগরণমূলক পদক্ষেপ বা আন্দোলনের ঝাণ্ডা উত্তোলনকারী। কোনো কোনো আরব দেশ মনে করে ফিলিস্তিন সমস্যাটি একান্তই আরবদের ব্যাপার। তাই ফিলিস্তিনী জনগণের সমর্থনে ইরানের এই উদ্যোগকে তারা মেনে নিচ্ছে না। কিন্তু এই দেশগুলো যদি সত্যি সত্যিই ফিলিস্তিনী জনগণের মুক্তির চিন্তা করতো তাহলে তাদের উচিত ছিল ফিলিস্তিনীদের সমর্থনে এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে যে-কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন,সেই পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো এবং সেইসব কর্মসূচিকে আরো বেশি শক্তিশালী করে তোলার চেষ্টা করা।
অবশ্য কোনো কোনো আরব দেশের কুদস দিবস পালনের বিরোধিতার আরো একটি কারণ আছে তাহলো ইসরাইলের সাথে তাদের গোপন ও প্রকাশ্য যোগসাজশ। তারা মনে করে, ইসরাইলকে কিছুটা সুবিধা বা ছাড় দিলে দখলদার ইসরাইল ফিলিস্তিন ভূখণ্ড থেকে পিছু হটে যাবে এবং ফিলিস্তিনের ওপর তারা তাদের দমন অভিযান বন্ধ করে দেবে। কিন্তু ইসরাইলী আধিপত্যবাদীদের বিগত দিনের স্বভাব বা আচরণ প্রমাণ করেছে, তারা যে কেবল ফিলিস্তিনী জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারেই নারাজ তাই নয়,বরং তারা চায় ফিলিস্তিনে বিভিন্ন প্রকার ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে বংশনিধন করতে। এছাড়াও ইসরাইলী নেতারা বিভিন্ন আরব দেশ এবং ফিলিস্তিনী স্বাধীনতাকামী দলগুলোর সাথে যেসব চুক্তি করেছে সেগুলোকে ঠাণ্ডামাথায় পদদলিত করেছে।
আসলে ইসরাইল আন্তর্জাতিক কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কাই করে না। অসলো চুক্তি অনুযায়ী ফিলিস্তিন সরকারের অস্তিত্বকেই ইসরাইল আজ পর্যন্ত স্বীকার করে নি। এমনকি যেসব ফিলিস্তিনী ইসরাইলীদের অত্যাচারে নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোনো দেশে শরণার্থী হিসেবে জীবনযাপন করছে,তাদেরকে পর্যন্ত তাদের স্বদেশ ভূমিতে প্রত্যাবর্তন করতে দিচ্ছে না। উল্টো তারা অধিকৃত ভূখণ্ডে আরো বেশি ইহুদিবাদী বসতি গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইহুদিবাদী ইসরাইলের নির্যাতনের ইতিহাসের কালো পাতাগুলো উল্টালে দেখা যাবে যে, আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে কখনোই দমানো যায় নি,বরং কুদস দিবস পালন কিংবা মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ চাপের মাধ্যমে তাদেরকে কিছুটা দমানো সম্ভব হয়েছে।
মাসজিদুল আকসা হলো মুসলমানদের পবিত্রতম স্থানগুলোর একটি। কারণ এটি ছিল মুসলমানদের প্রথম কেবলা। অথচ ইহুদিবাদী ইসরাইল বেশ কবছর ধরে চেষ্টা চালাচ্ছে মাসজিদুল আকসাকে ধ্বংস করে দিয়ে ঐ ধ্বংসাবশেষের ওপর তাদের উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করতে। সম্প্রতি মসজিদুল আকসা ধ্বংসের এ কার্যক্রম অনেক বেড়ে গেছে। পর্যটন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করাসহ বিভিন্ন অজুহাতে তারা মাসজিদুল আকসার নীচে দিয়ে টানেল তৈরির জন্যে খননকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ইহুদিবাদীরা কুদসকে তাদের রাজধানী মনে করে। তাই তারা সেখান থেকে যে-কোনো উপায়ে ফিলিস্তিনী মুসলমানদের বিতাড়িত করে ইহুদিবাদীদেরকে স্থলাভিষিক্ত করাতে চাচ্ছে। এরিমাঝে বায়তুল মুকাদ্দাসের সাংস্কৃতিক পরিচয় পরিবর্তনের লক্ষ্যে সেখানকার মুসলমানদের কবরগুলো ধ্বংস করতে শুরু করেছে । বর্ণবাদী প্রাচীর নির্মাণের কাজও দ্রুততার সাথে চলছে।
এতোসব ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম সত্ত্বেও কোনো কোনো আরব দেশ আধিপত্যবাদী ইসরাইলের সাথে সমঝোতাকে সম্ভব বলে মনে করে এবং চেষ্টা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইহুদিবাদী ইসরাইলের সাথে সম্পর্ককে স্বাভাবিক করতে। অথচ বাস্তবতা হলো ইসরাইল, আরব কিংবা ফিলিস্তিনীদের সাথে কোনো চুক্তিই এখন পর্যন্ত রক্ষা করে নি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইসরাইলীদের সাথে চুক্তির ফলে ফিলিস্তিনীদের জন্যে আজ পর্যন্ত কোনো কিছুই অর্জিত হয় নি। তাই যথার্থ উপায় হলো অধিকৃত অঞ্চলে ফিলিস্তিনীদের সুদৃঢ় উত্থান এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে কুদস দিবসের মতো বিভিন্ন উপলক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মুহূর্মুহু প্রতিবাদ জ্ঞাপন। এরকম প্রতিবাদের ফলে বিশ্বব্যাপী জনমত সৃষ্টি হবে এবং জনমতের চাপের মুখে ইসরাইলের অবস্থান আগের চেয়ে দুর্বল হবে।

কাতারকে তাবেদার রাষ্ট্র বানাতে চায় সৌদি আরব: নাসির আল-ওমারি

সৌদির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান
সৌদি নেতৃত্বাধীন দেশগুলো কাতারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার শর্ত হিসেবে ১৩ দফা দাবি দোহার কাছে হস্তান্তর করেছে। এদিকে এসব দাবিকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছে দোহা। এছাড়া, কাতারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলেই কেবল চারটি আরব দেশের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে বলে দোহার পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলেছেন নিউইয়র্ক থেকে লেখক এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার নাসির আল- ওমারি।
রাজনৈতিক ভাষ্যকার ওমারি বলেছেন, 'কাতারের ওপর সৌদি আরবের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই রিয়াদ এবং তার মিত্রদেশগুলো দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টির  চেষ্টা করছে। কাতারকে তার স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে। তাদেরকে তাদের অত্যন্ত প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বন্ধের জন্য নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কোন্ কোন্ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে এবং কোন্ কোন্ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার সৌদি আরবের ওপর ছেড়ে দিতে  রিয়াদ সরকার দোহার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।' 
ওমারি বলেন, কাতারি জনগণ সৌদি আরব এবং তার মিত্রদেশগুলোর অযৌক্তিক দাবি প্রত্যাখ্যান করলে তা মোটেও আশ্বর্চজনক হবে না এবং এর ফলে আরব দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরো বেড়ে যাবে।
তিনি আরো বলেন, সৌদি আরবের নগ্ন হস্তক্ষেপে উদ্বিগ্ন হয়ে কাতার আরব অঞ্চলে তার মিত্র খোঁজার চেষ্টা করছে। তাই রিয়াদকে মোকাবেলা করার লক্ষ্যে দোহা মুসলিম ব্রাদারহুড এবং তুরস্কের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করছে।কারণ কাতার ভাল করেই জানে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব বিস্তার লাভ করুক রিয়াদ তা মোটেই চায় না।
অন্যদিকে, রিয়াদ এবং দোহার মধ্য সম্পর্কের মারাত্মক অবনতির জন্য প্রখ্যাত এ রাজনৈতিক ভাষ্যকার সৌদির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান জটিলতা ও সংকট মোকাবেলার জন্য প্রিন্সের কোনো  অভিজ্ঞতা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ঝাড়খন্ডে মুসলিম যুবককে ঘর থেকে বের করে গুলি করে হত্যা, ৫ পুলিশ সাসপেন্ড

ভারতের বিজেপিশাসিত ঝাড়খণ্ডের পুলিশ এক মুসলিম যুবককে ঘর থেকে বের করে গুলি করা হত্যা করেছে। গতকাল (শুক্রবার) দিবাগত রাতে ঝাড়খণ্ডের চাতরায় পুলিশের গুলিতে নিহত ওই যুবকের নাম মুহাম্মদ সালমান(১৯) ওরফে রাজা।
সালমানের বাবা আব্দুল জব্বার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কয়লা খাদানে শ্রমিকের কাজ করত সালমান। শুক্রবার রাতেই সে পারিশ্রমিক পেয়েছিল। ঈদ উপলক্ষে এদিনই সে নিজের জন্য নতুন পোশাক, বেল্ট, জুতো ইতাদি কিনেছিল।
আব্দুল জব্বার বলেন, ‘রমজানের শেষ জুমার পর সকলেই ঈদের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু পুলিশ তার ছেলেকে ঘর থেকে টেনে বের করে বুকে তিনটি গুলি চালিয়েছে। তারা সালমানের অপরাধ কী জানতে চাইলেও পুলিশ কিছুই জানায়নি। তাকে ঘর থেকে প্রায় ৫০ মিটার টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।’  
আব্দুল জব্বার বলেন, ‘গুলির আওয়াজ শুনতেই আমরা সকলেই ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি আমার ছেলে সালমান রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।’
মুহাম্মদ আসলাম নামে এক গ্রামবাসী বলেন, ‘বিশ্বাস করুন পুলিশ অপরাধীর মত ওই ঘটনা ঘটিয়েছে। কোনো মামলাও দায়ের করেনি। গুলি চালানোর পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে জিপে করে পালিয়ে গেছে।’ 
ওই ঘটনার পরে আজ (শনিবার) নিহত সালমানের লাশ নিয়ে গ্রামবাসীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায়। স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের ট্রিগারে হাত লেগে গুলি ছিটকে সালমানের বুকে লাগে বলে পুলিশ সাফাই দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু গ্রামবাসীদের দাবি যদি তাই হয় তাহলে আহত সালমানকে হাসপাতালে না নিয়ে গিয়ে পুলিশ পালিয়ে গেল কেন?
চাতরার পুলিশ সুপার মদন মোহনলাল আজ ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলতে  চাইলেও তারা কোনো কথায় রাজি হয়নি। তাদের দাবি- আগে অভিযুক্ত পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে তারপরেই কথা হবে। পরে পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তারা গ্রামবাসীদের বুঝিয়ে সালমানের লাশ সড়ক থেকে সরাতে সক্ষম হন।
জেলা পুলিশ কর্মকর্তা ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পিপারওয়ার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে  অন্যত্র বদলি এবং এক উপ-পরিদর্শকসহ ৫ পুলিশ কর্মীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত  করেছেন। তদন্তে প্রকাশ, পুলিশের উপ-পরিদর্শক প্রেম চন্দ্র মিশ্র ওই এলাকায় এক অপরাধমূলক ঘটনার তদন্তে গিয়ে তল্লাশি চালানোর সময় সালমান ওরফে রাজাকে গুলি করে হত্যা করে। পুলিশের মুখপাত্র ও আইজি আশীস কোনোভাবেই দোষী পুলিশ কর্মীদের রেহাই দেয়া হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট এলাকায় কঠোর পুলিশি প্রহরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ট্রাম্প–মোদি বৈঠক: নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত? by আলী রীয়াজ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফর একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ ও ২৬ জুন দুই দিনের এই সফরের প্রধান দিক হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, যা অনুষ্ঠিত হবে সফরের দ্বিতীয় দিনে। নির্বাচিত হওয়ার পরেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছিলেন, কিন্তু সেটা যে নেহাতই সৌজন্য কথোপকথন, তা বোধগম্য। আনুষ্ঠানিক এই বৈঠক একাদিক্রমে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক, এশিয়ার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও আঞ্চলিক সম্পর্কের বিষয়ে যাঁরা উৎসাহী, তাঁদের কাছে এই বৈঠকের গুরুত্ব আলাদা। সেখানে উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর বাইরে আরও কোনো বার্তা আছে কি না, সেটাই তাঁরা দেখতে চাইবেন।
প্রায় ছয় মাস ধরে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন তার পররাষ্ট্রনীতির কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্ক সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেনি বা এই বিষয়ে আগ্রহী হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে তারা একধরনের অ্যাডহক বা সাময়িক পদক্ষেপ দিয়েই আপাতত পররাষ্ট্র সম্পর্ক বহাল রাখবে। বড় আকারের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে যেগুলো ঘোষিত হয়েছে, তা হচ্ছে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিটিপি) এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তি (প্যারিস চুক্তি) থেকে প্রত্যাহার, যা ‘একলা চলো’ নীতির প্রতিফলন ঘটায়। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের উদ্যোগে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সামরিক জোট গঠনে উৎসাহ প্রদান ও কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপে সমর্থন থেকে ইঙ্গিত মেলে যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ও কূটনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের চেয়ে শক্তি প্রদর্শনকেই ট্রাম্প প্রশাসন যথাযথ মনে করে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসন যতটা সুস্পষ্টভাবে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অন্য দেশগুলোকে উসকানি দিচ্ছে, সেটা নিঃসন্দেহে সহজেই দৃষ্টিগ্রাহ্য। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপে যে তাঁর প্রশাসনের সবার সমর্থন আছে, তা মনে হয় না। কাতার প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের বক্তব্য এবং হোয়াইট হাউসের অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব সহজেই প্রকাশিত হয়েছে, কাতারে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পদত্যাগও একই ধারণা দেয়। ইতিমধ্যেই আমরা এ-ও দেখেছি যে ইউরোপের সঙ্গে ট্রাম্পের দূরত্ব বেড়েছে বৈ কমেনি, ন্যাটোর ব্যাপারে প্রশাসনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানও দেখা গেছে। বিশ্বরাজনীতির বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এ ধরনের অবস্থানের পটভূমিকায়ই মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হবে।
এটা আলাদা করে বলার দরকার হয় না যে ভারত এখন নিজেকে আর কেবল দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় দেশ বলেই বিবেচনা করে না, আচরণের দিক থেকে নিজেকে সে এশিয়ার একটি প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে এবং আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে সে নিজেকে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবেই দেখতে চায়। ফলে এশিয়া, বিশেষত দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। সহযোগিতার দিকটি প্রধানত এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব-বলয় বিস্তারের চেষ্টা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কারণেই। এই সহযোগিতা গত দশকে বৃদ্ধি পেয়েছে। এশিয়া বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সে কারণেই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের একটি প্রধান পটভূমি।
এশিয়ার ব্যাপারেও আমরা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই ধরনের পদক্ষেপ দেখতে পাই। নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় চীনের ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ সমালোচনার ধারই যে এখন কমে এসেছে তা নয়, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়কেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের দাবি করা বিভিন্ন দ্বীপের কাছে যে নৌ মহড়া চালানো হয়, সেটি নিয়ে মে মাসে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ (ফোনপোস) নামের এই মহড়া নতুন কিছু নয়, কিন্তু বারাক ওবামার প্রশাসন ঘোষণা দিয়েই এই মহড়া চালাত, যাতে করে অন্যান্য মিত্র বুঝতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পাশে আছে। কিন্তু মে মাসের পর মার্কিন নৌবাহিনী এই মহড়ার বিষয়ে ‘লো-কি’ বা কম প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চীনের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের পাশাপাশি মনে রাখা দরকার যে টিটিপি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের ফলে গোটা এশিয়ায় চীনের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর অন্যতম প্রভাব পড়বে ভারতের ওপর। প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার কারণে এই চুক্তি বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন ও ভারত বায়ুমণ্ডলে কার্বন গ্যাস নিঃসরণের ক্ষেত্রে যারা প্রথম ও তৃতীয় অবস্থানে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এশিয়ায় চীনের সঙ্গে ভারতের প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই আরও বেশি জোরদার হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী মোদি নিশ্চয় বুঝতে চাইবেন ট্রাম্প প্রশাসন চীনের ব্যাপারে নমনীয় অবস্থান নেবে কি না। ভারত যেমন চাইবে ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিক, তেমনি চাইবে না যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরে বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তার সামরিক উপস্থিতিটি বাড়াক বা এমন পদক্ষেপ নিক, যাতে এখানে উত্তেজনা বাড়ে।
চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ অবকাঠামোগত প্রকল্পে ভারত যোগ দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র অতীতে এই বিষয়ে যথেষ্ট আপত্তি দেখালেও প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পরে যুক্তরাষ্ট্র একটি ছোট প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিল। এই প্রকল্পের আপাত লক্ষ্য যদিও অর্থনৈতিক, এটা বুঝতে কারোরই কষ্ট হয় না যে, এ হচ্ছে চীনের প্রভাব বিস্তারের কৌশল। কিন্তু ভারত তা থেকে সরে থেকে লাভবান হবে এমন মনে করার কারণ নেই। চীনের এই প্রকল্পের সূত্রেই ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে আরও বেশি টানাপোড়েনের সূচনা হয়েছে। চীন শিনজিয়াং থেকে পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরে যুক্ত হওয়ার পথ হিসেবে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের ‘চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর’ (সিপ্যাক) স্থাপনের কাজ করছে এবং ভারত তাকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবেই দেখছে। কেননা এর একটি অংশ যাবে কাশ্মীরের এমন এক অংশের মধ্য দিয়ে, যা ভারত নিজের বলে দাবি করে।
এই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন কোনো রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তবে পাকিস্তান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সব সময়েই ভারতের কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র এবং আফগানিস্তানে মার্কিন উপস্থিতির কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিবাদে জড়াতে রাজি নয়। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানিতে কংগ্রেসের সদস্য টেড পো দাবি করেছেন, এ–যাবৎ যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে ৩৩ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছে। ওবামা প্রশাসনের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে অনেক রকম টানাপোড়েন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সাহায্য অব্যাহত রাখলেও এই সম্পর্ক আগের মতো ঘনিষ্ঠ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশীয় নীতিতে পাকিস্তানের প্রতি পক্ষপাতের কার্যত অবসান ঘটেছে জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলেই। সেই সময়ে ভারতের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা স্বাক্ষরিত হয়। তবে ওবামার আমলে তা ধীরগতিতে এগিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালের জুন মাসের মধ্যে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। বিভিন্ন জটিলতার কারণে এটা আরও দেরি হবে বলেই মনে হচ্ছে। তবে এটা ঠিক যে ওবামার আমলে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সহযোগিতায় ভাটা নামার কারণ এখনো তৈরি হয়নি।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে ভারতের আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে আফগানিস্তান নীতি। ভারত মনে করে যে পাকিস্তান আফগানিস্তানে অস্থিতিশীলতার কারণ। পাকিস্তানে তালেবানের হাক্কানি নেটওয়ার্কের উপস্থিতি এবং পাকিস্তানের সরকারের মধ্যে তাদের প্রতি সমর্থন ভারতের উদ্বেগের উৎস। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের কোনো কোনো সদস্য এই মতের সঙ্গে একমত। সম্প্রতি সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির এক শুনানিতে নিরাপত্তাবিষয়ক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাব ক্রমাগতভাবে বেড়ে যাওয়ায় পাকিস্তান উদ্বিগ্ন। এ–যাবৎ যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপে ভারত খুব খুশি নয়, ট্রাম্প প্রশাসন এই বিষয়ে আর কী পদক্ষেপ নেবে, সেটা নিশ্চয় ভারত জানতে চাইবে বলে ধারণা করা যায়। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান ছাড়াও অন্যান্য প্রতিবেশীর সম্পর্কে যে টানাপোড়েন আছে, সেই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উৎসাহ রয়েছে। চীনের প্রভাববলয়ের মোকাবিলার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে ভারত তার প্রতিবেশীদের ব্যাপারে কী দৃষ্টিভঙ্গি নিচ্ছে, সেটা গুরুত্ব পাচ্ছেন না বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। এই বিশ্লেষকেরা এই দিকটি বিবেচনায় নেওয়া দরকার বলে মনে করেন এই কারণে যে এতে করে অনেক দেশ ভবিষ্যতে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও সম্প্রতি কিছু বিষয়ে ভারত মোটেই খুশি নয়। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন যে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করার জন্য ভারত উন্নত দেশগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি ডলার নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ভারত কেবল তার প্রতিবাদই করেনি, দেখিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের পাওয়া সাহায্যের পরিমাণ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ভারতের কেনা কাজুবাদামের চেয়েও কম। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, সাম্প্রতিককালে চাকরি–সংক্রান্ত মার্কিন ভিসার (এইচ১-বি) ক্ষেত্রে পরিবর্তন। এই ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের ফলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে চাকরিতে ভারতীয় নাগরিকেরা যেসব সুবিধা পেতেন, তা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ের পাশাপাশি ট্রাম্প-মোদি আলোচনায় সন্ত্রাসবাদের কথা আলোচিত হবে। ভারতের নেতারা মনে করেন, ভারত যত বেশি ‘সন্ত্রাসী’ হামলার শিকার হয়, সেই তুলনায় তা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। এই প্রশ্নকে ভারত স্থানে আনতে চায় এই কারণেও যে তাতে করে এর দায় অনেকটাই তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের ওপর চাপানো যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে আরও দূরত্ব তৈরি করা যাবে।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

সেই প্রধান শিক্ষক হেলালের আরো যত অপকীর্তি by মহিউদ্দিন অদুল

একের পর এক অভিযোগ। অপরাধের পর অপরাধ। তাতে বারে বারে হয়েছে ‘কৈফিয়ত তলব’। কিংবা ‘সাময়িক বহিষ্কারও’। তবে প্রভাবের জোরে বার বার অভিযোগের দোষ স্বীকার, কৈফিয়তের জবাব, ক্ষমা প্রার্থনা ও শাস্তি প্রত্যাহারের ফাঁক-ফোকরে পার পেয়ে গেছেন তিনি। খিলগাঁও গভ. স্টাফ কোয়ার্টার হাই স্কুলের সেই প্রধান শিক্ষক সরদার মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। বার বার পার পেয়ে যাওয়ায় ক্রমেই বাড়তে থাকে তার অন্যায়, অত্যাচার, অসদাচরণ, বিকৃত রুচি, শিক্ষিকা-ছাত্রীর শ্লীলতাহানি, ইভটিজিং, গালাগালি, অর্থ লুট, শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা। গত ১৩ই জুন স্কুলের এক খণ্ডকালীন শিক্ষিকাকে ফাঁদে ফেলে দিনদুপুরে চলন্ত রিকশায় প্রকাশ্যে জড়িয়ে ধরে শ্লীলতাহানি করেন। তাকে নানাভাবে বিশ্রী কথাবার্তা ও অঙ্গভঙ্গিতে যৌন নিপীড়ন করেন। তখন বারবার বলতে থাকেন, ‘এসবে লজ্জা পেতে হয় না। কাউকে কিছু বলতে হয় না’। এছাড়া অন্তরঙ্গ সময় দেয়ার বিনিময়ে ওই শিক্ষিকাকে কু-প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। শ্লীলতাহানির ঘটনায় ১৪ই জুন খিলগাঁও থানায় ভিকটিমের মামলা দায়েরের পর গ্রেপ্তার হয়ে এখন শ্রীঘরে ওই প্রধান শিক্ষক।
ওই খণ্ডকালীন শিক্ষিকা মানবজমিনকে বলেন, আমার বাবার বয়সী একজন প্রধান শিক্ষক নানা অশ্লীল কু-প্রস্তাবের পাশপাশি নিবিড়ভাবে আমার শরীর স্পর্শ করেন। রাস্তায় প্রকাশ্যে বিকৃত যৌন নিপীড়ন করেন। আমার সঙ্গে যোগ দেয়া অপর দু’নারী শিক্ষকের প্রতিও ছিল কু-দৃষ্টি। বাদ যায়নি ছাত্রীরাও।
প্রধান শিক্ষক হওয়ার আগে তিনি একই স্কুলে শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। পরে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হন। কর্মরত রয়েছেন প্রায় দেড় যুগ। তখন থেকেই চলে আসছে শিক্ষিকা, কর্মচারী, বহিরাগত ও ছাত্রীর প্রতি তার বিকৃত রুচির যৌন নিপীড়ন ও শ্লীলতাহানি। বিকৃত রুচির ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অঙ্গভঙ্গি ও দেহ সৌষ্ঠব প্রত্যক্ষ করার জন্য প্রায় ছাত্রদের বাদ দিয়ে শুধু ছাত্রীদের দিয়ে নাচ, গানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করানোর অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। ২০১৫ সালে ব্যবহারিক শিক্ষার ক্লাসে তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছাত্রীদের ওড়না খুলে বুক ডাউন ও ডিগবাজি দিতে বাধ্য করেছিলেন। এতে কয়েকজন অসুস্থ হয়ে গেলে ওই বছরের ৩০শে মার্চ তৎকালীন প্রধান শিক্ষকের কাছে ছাত্রীরা লিখিত অভিযোগ করে। এর আগে ২০১১ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছাত্রদের পিতৃ পরিচয় তুলে অশালীন কথা বলার জন্য ওই ক্লাসের ১৩ শিক্ষার্থীও তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক এই হেলাল উদ্দিনের কাছে কৈফিয়ত তলব করেন। তাতে উল্লেখ করা হয় ‘আপনাকে বার বার মৌখিক সাবধান করার পরও ষষ্ঠ শ্রেণিতে অশালীন আলোচনা করেন...’। এ ঘটনায় পরবর্তী ১৯শে সেপ্টেম্বর ক্ষমা চেয়ে পার পান তিনি। একই বছরের সেপ্টেম্বরে অপর এক ছাত্রের সঙ্গেও অশালীন আচরণ করেন। এ ঘটনায় ওই ছাত্র ১৭ই সেপ্টেম্বর আরো একটি লিখিত অভিযোগ করেছিল। এ ছাড়া গত ১৪ জুন ওই শিক্ষিকার মামলার পর স্কুলটির ২০ ছাত্র-ছাত্রীও বিভিন্ন সময় নানাভাবে অশ্লীল আচার-আচরণ ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে খিলগাঁও থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। এ ছাড়া কারণে-অকারণে ছাত্রীদের গায়ে হাত দেয়া, স্কুলের সিসি ক্যামেরায় শিক্ষিকা ও ছাত্রীদের ছবি জুম করে দেখা ও যৌন ক্রিয়া-প্রসব বিষয়সহ অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে আলাপচারিতা তার প্রতিদিনের আচরণ।
শুধু যৌন নিপীড়নই নয়। স্বেচ্ছাচারিতা, অসদাচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গ তার নিত্য দিনের ঘটনা। অর্থ লুটের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০০৮ সালে বিদ্যালয় থেকে অব্যাহতি পাওয়া প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে তিনি বিদ্যালয়ের বাইরে গিয়ে ৩৮ জন এসএসসি পরীক্ষার্থীর ফরম পূরণের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে নোটিশ করেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। এ ছাড়া সম্প্রতি এক শিক্ষকের কাছ থেকে নিয়োগের নামে বড় অংকের টাকা উৎকোচ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
তার অসদাচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় বিব্রত শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ দিন বিনা অনুমতি বা ছুটিতে স্কুলে অনুপস্থিত থাকাসহ বিদ্যালয়ের স্বার্থ পরিপন্থি কাজ ও অসদাচরণের অভিযোগে পরিচালনা কমিটি তাকে ২০০৮ সালের ১৮ ও ২৯শে নভেম্বর  এবং ২০০৯ সালের ১২ই জানুয়ারি কারণ দর্শানোর নোটিশ ইস্যু করেছিল। কোনোটার জবাব না দেয়ায় ২৫ জানুয়ারি চূড়ান্ত নোটিশ ইস্যু। তারও জবাব না দিলে পরিচালনা কমিটির ১২ মার্চের সভায় তাকে বিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ২০১০ সালের ২৮শে জুলাই আর কোনো অপরাধ না করার অঙ্গীকার করে তিনি বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেন। সে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ২৫শে অক্টোবরের সভায় কমিটি তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে। তারপরও থামেনি তার দৌরাত্ম্য। অপরাধের মাত্রা। ২০১২ সালে আবার শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য তাকে নোটিশ করা হয়। জবাবে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ওই বছরের ২১শে এপ্রিলের সভায় তাকে আবার ক্ষমা দেয় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি।
২০১৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি তাকে প্রায় সময় কাউকে না জানিয়ে বিদ্যালয় ত্যাগের জন্য কৈফিয়ত তলব করা হয়। জবাবে ৩১শে জানুয়ারি দুঃখ প্রকাশ করে পার পান। বিদ্যালয় বা কমিটির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জন্য তাকে নোটিশ করা হয় একই বছরের ২১শে জুলাই। তাছাড়া বিদ্যালয়ে আসা ও যাওয়ায় মিথ্যা সময় লেখা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করা, নোটিশ গ্রহণ না করাসহ কয়েকটি অপরাধের জন্য ২০০৮ সালের ২৯শে নভেম্বর তাকে আরো একবার কারণ দর্শানোর নোটিশ ইস্যু করা হয়।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছাত্র ছায়ায় থেকে এতসব অপরাধের পরও তিনি বার বার পার পেয়ে গেছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও তিনি কমিটির যোগসাজশে নানা অপকৌশলে ও প্রভাব খাটিয়ে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের পদে আসীন হন। গত বছরের ১লা সেপ্টেম্বর তিনি প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেন। এখানেও রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি। এর আগে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রার্থী ছিলেন ৪০ শিক্ষক। আর স্কুল থেকে প্রার্থী ছিলেন সরদার মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। ৮০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ১৬ নম্বর। ৪০ জনের মধ্যে হন ৩৭ তম। তারপরও কমিটি ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায়। ৬৭ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অর্জনকারী প্রার্থী শহীদুল ইসলামকে টপকে অসদুপায়ে কৌশলে প্রথম করিয়ে দেয়া হলো হেলাল উদ্দিনকেই। এরপর সহকারী শারীরিক শিক্ষক থেকে তিনি স্কুলটির প্রধান শিক্ষক। আর নিয়োগ পরীক্ষার খারাপ ফলের প্রমাণ লোপাট করতে খাতাপত্রসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রগুলো স্কুল থেকেই সরিয়ে ফেলা হয়। প্রধান শিক্ষক হলেও সেই দায়িত্বপূর্ণ পদ তার মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারেনি। লোপ পায়নি চারিত্রিক নোংরামিও। বরং তা আরো বেপরোয়া আকার ধারণ করে।
ওই বিদ্যালয়ের সপ্তম ও দশম শ্রেণির ৮জন ছাত্রী মানবজমিনকে বলে, কারণে-অকারণে যখন তখন গায়ে হাত দেয়া, অশ্লীল ব্যবহার, অশালীন কথা-বার্তা, গালিগালাজ, সিসি ক্যামেরায় ছাত্রীদের ছবি জুম করে দেখা এসব তার প্রতিদিনের কাজ।
ওই বিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষক বলেন একই কথা। শিক্ষকের কোন গুণ নেই তার মধ্যে। তার বিকৃত রুচি ও অসদাচরণের কারণে সবাই অতিষ্ঠ। শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে চায় না। তবু তিনি প্রধান শিক্ষক। ‘গাঁয় না মানে আপনি মোড়ল’। তার অন্যায় আচরণ ও ব্যবহারের জন্য ছাত্র-ছাত্রীরা বহুবার তাকে মারতে উদ্ধত হয়েছে। তা থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য কক্ষের আগের ফটকে প্রায় সময় তালা দিয়ে রাখতে হয়।
বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি আলমগীর চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, আগে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তেমন কোনো অভিযোগ আমাদের কানে আসেনি। এখন বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শিক্ষিকার শ্লীলতাহানির পর তাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

কাবা মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে সৌদি আরব

মুসলিম উম্মাহর কেবলা পবিত্র কাবা বা গ্রান্ড মসজিদকে টার্গেট করে আত্মঘাতী হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সৌদি আরবের নিরাপত্তারক্ষীরা সেই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা বিষয়ক মুখপাত্র মেজর জেনারেল মানসুর আল তুরকি মিডিয়ার কাছে এ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, পবিত্র কাবা’কে টার্গেট করে শুক্রবার সন্ত্রাসী হামলা চালানোর চেষ্টা করে সন্ত্রাসীরা। এ খবর দিয়েছে সৌদি আরবের সরকারি মিডিয়া অনলাইন সৌদি গেজেট। মেজর জেনারেল মানসুর আল তুরকি বলেছেন, এই সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রে অংশ নেয় তিন সন্ত্রাসীর একটি গ্রুপ। এর মধ্যে দু’জন মক্কায় অবস্থান করছিল। তৃতীয়জন জেদ্দায় অবস্থান করছিল। তারা কাবা শরীফে নামাজ আদায় করতে যাওয়া মুসলিমদের টার্গেট করেছিল। কিন্তু তাদের সেই ষড়যন্ত্র বানচাল করে দেয়া হয়েছে। তাদের প্রথম অপারেশন নস্যাৎ করে দেয়া হয় মক্কার আসিলাহ এলাকায়। দ্বিতীয়টি পাশেই আজইয়াদ আল মাসাফি এলাকায় নস্যাৎ করা হয়েছে। এ স্থান দুটি পবিত্র মক্কা শহরের কেন্দ্রীয় স্থানে অবস্থিত। রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, আজইয়াদ আল মাসাফি এলাকায় একজন আত্মঘাতী হামলাকারী তিন তলা একটি ভবনে আত্মগোপন করে ছিল। নিরাপত্তা রক্ষীরা তাকে আত্মসমর্পণ করতে বললে সে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এক পর্যায়ে নিরাপত্তা রক্ষীরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাকে। তখন উপায় না পেয়ে সে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে নিজেকে উড়িয়ে দেয়। বোমা বিস্ফোরণে এ সময় ওই ভবনটি বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে ৬ জন বিদেশী নাগরিক আহত হয়েছেন। তাদেরকে দ্রুততার সঙ্গে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর ৫ সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় সন্দেহঝনকভাবে ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে একজন নারী।
তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তের জন্য আটক ব্যক্তিদের নাম, ঠিকানা প্রকাশ করা হচ্ছে না। ওদিকে অনলাইন বিবিসি জানায়, মুসলিমদের পবিত্র স্থান, মক্কার গ্রান্ড মসজিদে একটি সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেয়া হয়েছে বলে বলছে সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ। এখানেই মুসলমানদের পবিত্র ঘর কাবা অবস্থিত। একটি ভবন ঘিরে পুলিশের অভিযানের সময় একজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী নিজেকে বোমায় উড়িয়ে দিয়েছে। সৌদি স্বরাষ্ট্র দপ্তর বলছে, এ সময় ওই ভবনটি বিধ্বস্ত হয়ে ১১ জন আহত হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচ সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে কিভাবে বা কারা ওই হামলার পরিকল্পনা করছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু এখনো জানায় ়নি সৌদি কর্মকর্তারা। রমজান মাসের শেষের দিকে সারা বিশ্ব থেকে এখন মক্কায় সমবেত হয়েছেন লাখ লাখ মুসলমান। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে মদিনায় মসজিদে নববী’র কাছে একটি আত্মঘাতী বোমা হামলায় চারজন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছিলেন। সম্প্রতি সৌদি আরবে বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটেছে। তার বেশ কয়েকটি নিজেদের চালানো বলে দাবি করেছে ইসলামিক স্টেট। যদিও এর বেশিরভাগ হামলাই চালানো হয়েছে দেশটির শিয়া সংখ্যালঘু আর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্য করে। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জোটে রয়েছে সৌদি আরব এবং সিরিয়া ও ইরাকের অন্য জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেও দেশটি লড়াই করছে।

বৈরী আবহাওয়ায় চা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা by ইমাদ উদ দীন

ভরা মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া। ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। তাই এবছর আশানুরূপ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় চা শিল্পের লোকজন। এবছর মৌসুম শুরুর দিকে কয়েক সপ্তাহ অনূকুলে ছিল আবহাওয়া। তাই অনেকটা সম্ভাবনাও ছিল উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার। গেল বছর দেশে চা উৎপাদনে চা শিল্পের ১৩৬ বছরের রের্কড ভাঙ্গে। এবছর শুরুর দিকে এমন সম্ভাবনা আর স্বপ্ন ও প্রত্যাশায় উৎফুল্ল ছিলেন চা শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু হঠাৎ এমন সম্ভাবনায় পড়েছে ভাটা। কার টানা ভারীবর্ষণ, অতিবৃষ্টি, উচ্চতাপমাত্রা আর মেঘলা আবহাওয়ায় নানা রোগবালাই আর মশার উপদ্রবের ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেল এমন আবহাওয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের চা উৎপাদনের অন্যতম অব্জল মৌলভীবাজারের চা বাগানগুলোতে। চা গাছগুলোতে নতুন পাতা আসছে কম। আর যে গাছগুলোতে পাতা আসছে তার মানও তেমন ভালো থাকছে না। কারণ মৌসুমের প্রথমদিকে খরা ও টানা ভারী বর্ষণ হওয়াতে চা গাছগুলো ধকল সামলে উঠার আগেই আবারও একই আবহাওয়া। তাই দুর্বল হয়ে পড়া চা গাছগুলোতে নতুন পাতা (কুঁড়ি) কম আসায় বাড়ছে দুশ্চিন্তা। এবছর ভরা  মৌসুমে বাগানগুলোতে আশানুরূপ চায়ের পাতা সংগ্রহ করতে না পারায় এখন অনেকটাই হতাশ মালিক, শ্রমিকসহ এ শিল্পের সংশ্লিষ্টরা। জেলার বেশ ক’টি চাবাগানের ম্যানেজারদের সঙ্গে আলাপে তারা জানালেন গত বছরের তুলনায় এবছর এখন পর্যন্ত বাগান গুলোতে প্রায় ১৫%-২০% উৎপাদন পিছিয়ে রয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছা যাবে কিনা তা নিয়ে তারা সন্দিহান। তবে সময়ে সঠিক পরিচর্যা আর প্রতিকূল আবহাওয়া কাটিয়ে উঠলে উৎপাদনের পরিসংখ্যান ধরে রাখা সম্ভব বলে আশাবাদী চা গবেষকরা। এজন্য চা উৎপাদনের বিরূপ আবহাওয়ায় চা গাছগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও আরো অধিক যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ তাদের। তথ্য মতে দেশে ১৬৬ টি চা বাগানের মধ্যে ১৪৫টি চাবাগানের অবস্থান সিলেটে। এর মধ্যে ৯২টি চা বাগানের অবস্থান মৌলভীবাজারে। এখনাকার পাহাড়ি টিলা, মাটি, ভৌগলিক অবস্থান আর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় অগ্রসর হচ্ছে এ শিল্প। ধরে রাখছে তার ঐতিহ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিকাশমান এ শিল্পের অগ্রযাত্রা অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে। সে জন্য এ অঞ্চলে চা শিল্পের অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে নানাভাবে প্রাকৃতিক নির্ভরশীলতা কমানোর তাগিদ সংশ্লিষ্ট গবেষকদের। বাংলাদেশ চা বোর্ডের মহাব্যবস্থাপক, চা ব্যবস্থাপনা কোষ (নিউ সমনভাগ চা বাগান) মো. শাহজাহান আকন্দ বলেন, এ বছর চা উৎপাদনের ভরা মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া যথেষ্ট প্রভাব ফেলবে। তাই কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। এমন প্রাকৃতিক দূর্যোগ আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে বিস্তর ফারাক ঘটে। আবহাওয়ার এমন বিবর্তন আমাদের জন্য আগাম সতর্কবার্তা। তিনি বলেন, নানা কারণে এখন প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব লক্ষ্যণীয়। তাই এই শিল্পের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে অতিপ্রকৃতি নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। আর এজন্য চা বাগানগুলোতে নির্দিষ্ট ছায়াতরু, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সঠিক সময়ে সঠিক ওষুধ, ঝোপ-ঝাড় আর আগাছা পরিষ্কার রাখা, সময় উপযোগী রুপন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পানি সেচ ব্যবস্থা, মৌসুমের শুরুতে পোকামাকড় দমনে প্রতিষেধক ওষধ ছিটানো, পরিমাণ মতো সার ও বিশেষ কৌশলে চা গাছের গোড়ার যত্ন নেয়াসহ নানা পরামর্শ তার। জানা যায় এখন চলছে চা পাতা তুলার ভরা মৌসুম। বছরের এই সময়ে চা শ্রমিকরা হাতের মুঠি ভরে পাতা তুললেও এবছর ভিন্ন দৃশ্য। যে সময়ে একজন শ্রমিকের দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ কেজি পাতা তুলার কথা সেখানে একজন শ্রমিক ১৫/২০ কেজির উপরে পাতা তুলতে পারছেন না। আর অনেক সেকশনে পাতা সংগ্রহের কাজও রয়েছে বন্ধ। জেলার কয়েকটি চা বাগানের চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানালেন, বাগানে চা গাছগুলোতে মশা ও লাল মাকড়শা আক্রমণে নতুন পাতা গজাতে পারছে না। তাছাড়া অনেক গাছ কারণ ছাড়াই পাতা বিবর্ণ হয়ে ঝিমিয়ে পড়েছে। তারা জানান, এই সময়ে তাদের নিরিখ ৮৫ টাকা হাজিরার অনুকূলে ২৩ কেজি পাতা তুলার পরও তারা পাতা তুলতেন ৫০ থেকে ৬০   কেজি। অতিরিক্ত উত্তোলিত পাতার জন্য কেজি প্রতি ২-৪ টাকা হারে তারা দৈনিক দুই থেকে আড়াইশ’ টাকা আয় করেন। কিন্তু এই এ বছর হঠাৎ এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন তারা দৈনিক হাজিরার পাতাও তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ বিষয়ে হামিদিয়া চা বাগানের মহাব্যবস্থাপক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন বৃষ্টি ছাড়া যেমন চা উৎপাদন সম্ভব হয় না তেমনি অতি বৃষ্টিও চায়ের জন্য ক্ষতিকর। অতিবৃষ্টিতে সেকশনের উপরের মাটি ধুয়ে উর্বরতা কমিয়ে দেয়। তাছাড়াও অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও চায়ের জন্য খুব ক্ষতিকর। তিনি জানান এ বছর বাগানগুলোতে চা বাগানের মশা ও লাল মাকড়শা উপদ্রব কিছুতেই থামছে না। ওষুধ ছিটিয়েও কোনো উপকার পাওয়া যাচ্ছে না। চা গাছের পাতা কালচে হয়ে মাটিতে ঝরে পড়ছে। এ বছর চা  মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি ছিল কম। পওে যে বৃষ্টি পাওয়া  গেছে তা মাত্রারিক্ত। যা উপকারের চেয়ে ক্ষতি আশঙ্কাই বেশি। অতিবৃষ্টি হলে পানিবদ্ধতায় গাছের বাড়ার ক্ষমতা কমে যায়। আর ২৫-২৮ আর ডিগ্রি তাপমাত্রা হল চা গাছের জন্য সহনীয়। ২৮ ডিগ্রির উপরে তাপমাত্রা হলে বিরূপ প্রভাব পড়ে। স্থানীয় আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায় এ বছর বেশির ভাগ সময়ে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ছিল ৩২ থেকে ৩৯ ডিগ্রী  সেলসিয়ারস। চলমান জুন মাসে প্রথম সাপ্তাহে তারা বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছেন ৩৩২ মিলিমিটার আর মে মাসে বৃষ্টি রেকর্ড করেছিলেন ৩৫৫ মিলিমিটার। এমন বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাগানগুলোতে নতুন চা পাতার (কুড়ি) গজাতে পারেনি। এমন প্রতিকূল আবহাওয়াতে বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্রেরের পরামর্শ থাকছে বাগানগুলোতে নিয়ম মাফিক পানি নিষ্কাশন ও নিয়মমতো সঠিক মাত্রায় ওষুধ ব্যবহারের। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে আবহাওয়ার এমন পরিস্থিতে চা বাগানে চায়ের মশা ও লাল মাকড়সা দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে। লাল মাকড়সার আক্রমণে গাছের পাতা লালচে হয়ে যায়। তখন পাতা যে পরিমাণ খাদ্য তৈরী করার কথা তা করতে পাওে না ফলে বন্ধ হয়ে যায় নতুন সুট। আর মশা পাতার সবুজ অংশ (মেইন্টেনেন্স লিপ) খেয়ে ফেলে। আর এমন প্রতিকূল আবহাওয়ায় বেড়ে চলে মশা আর পোকা মাকড়ের উপদ্রব। এম আর খান চা বাগানের স্বত্বাধিকারী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, বালিশরা  ভেলীতে তার দু’টি চা বাগানে (নন্দ রানী ও এমআরখান) কোনো কারণ ছাড়াই সুট আসছে না। অনেক সেকশনে মাকড়সা বা মশার উপদ্রব নেই তবুও সুট নেই। তিনি বলেন, জুড়ী ভ্যালিতে তার অন্য দু’টি বাগানে নতুন পাতা এলেও ওই বাগান দু’টিতে পাতা না আসায় এ বছর উৎপাদনে লক্ষমাত্রা অর্জন নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ টি এস্টেট স্টাফ এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মো: জাকারিয়া ও কোষাধ্যক্ষ মো: আমিনুর রহমান বলেন, গেল কয়েক বছর থেকে দেশে চায়ের উৎপাদন অতীতের রের্কড ভেঙে অগ্রসর হচ্ছে। এটা এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের আশান্বিত করে। এবছর হঠাৎ আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে ব্যহত হচ্ছে চায়ের উৎপাদন। তবে আমাদের প্রত্যাশা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কাটিয়ে উঠে এ বছরও চায়ের উপাদন ভালো হবে।

কুমারীত্বের জন্য অস্ত্রোপচার!

তিউনিসিয়ার তরুণীরা বিয়ের আগে কুমারীত্ব নিশ্চিত করতে চান। তাই তাঁরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাইমেন বা সতীচ্ছেদ পর্দা প্রতিস্থাপন (হাইমেনোপ্লাস্টি) করে থাকেন। দিন দিন এর চাহিদা বেড়েই চলেছে। ফলে দেশটির চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে এই অস্ত্রোপচারের ব্যবসা।
হাইমেন হলো একধরনের পর্দা, যা নারী-অঙ্গ আংশিকভাবে বন্ধ রাখে। এর উপস্থিতিকে তিউনিসীয় সমাজে ঐতিহ্যগতভাবে কুমারীত্বের চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তিউনিসিয়ার একটি বেসরকারি ক্লিনিকের চারতলায় বেশ কয়েকজন নারীর সঙ্গে বসেছিলেন ইয়াসমিন (ছদ্মনাম)। তিনি তাঁর নখ কামড়াচ্ছিলেন এবং ক্রমাগত মুঠোফোন চেক করছিলেন। তিনি বিবিসির প্রতিবেদকের প্রতি আস্থা রাখেন। মেয়েটি ওই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেন যে তিনি এখানে এসেছেন হাইমেনোপ্ল্যাস্টি অস্ত্রোপচার করার জন্য।
২৮ বছর বয়সী ইয়াসমিন বলেন, ‘আমি একে প্রতারণা বলে মনে করি এবং সত্যিকার অর্থেই চিন্তিত।’ তিনি জানান, দুই মাসের মধ্যে তাঁর বিয়ে হবে। তিনি কুমারী নন—বিষয়টি তাঁর হবু স্বামী ধরে ফেলবেন, এটা ভেবে তিনি চিন্তিত। তাই এখানে তিনি কুমারীত্ব ফিরে পেতে এসেছেন। তবে এটা ভেবেও তিনি উদ্বিগ্ন যে ভবিষ্যতের কোনো একসময়ে যদি সত্য বের হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই হয়তো আমার হবু স্বামীকে অসাবধানতাবশত সত্য বলে বসব।’
তিউনিসিয়ায় কুমারীত্ব নিয়ে স্বামীর সন্দেহের কারণে বিয়ের পরপরই বিচ্ছেদের ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে থাকে।
উদারপন্থী একটি পরিবারে ইয়াসমিনের জন্ম। তিনি বেশ কয়েক বছর বিদেশে কাটিয়েছেন। ইয়াসমিনের বিবাহপূর্ব সংসর্গের কথা জানতে পারলে তাঁর হবু স্বামী বিয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করবেন—এ আশঙ্কায় তিনি উদ্বিগ্ন। ইয়াসমিন বলেন, ‘এক ছেলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। ওই সময় আমি কল্পনাও করতে পারেনি এই সম্পর্কের কারণে আমাদের সমাজে কী পরিমাণ চাপ ভোগ করতে হবে। কাজেই আমি ভীত। আমি যদি এসব কথা আমার হবু স্বামীকে বলে দিই, তবে আমি নিশ্চিত এ বিয়ে বাতিল হবে।’
হাইমেনোপ্লাস্টি অস্ত্রোপচারের জন্য ইয়াসমিনকে এখন প্রায় ৪০০ ডলার গুনতে হবে। এই অস্ত্রোপচারে সময় লাগে প্রায় আধা ঘণ্টা। পরিবারের অগোচরে কয়েক মাস ধরে তিনি ওই অর্থ জমিয়েছেন। ইয়াসমিনের এই অস্ত্রোপচার করবেন চিকিৎসক রশিদ (ছদ্মনাম)। তিনি প্রতি সপ্তাহে গড়ে দুটি করে এই অস্ত্রোপচার করেন।
চিকিৎসক রশিদ বলেন, তাঁর ৯৯ শতাংশ রোগীই তাঁদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের কাছে লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়ার হাত থেকে বাঁচতে এই অস্ত্রোপচার করে থাকেন। ইয়াসমিনের মতো বহু নারী তাঁদের কুমারীত্ব হারানোর বিষয়টিকে আড়াল করতে চান। তবে শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াও অন্য অনেক কারণে সতীচ্ছেদ ছিঁড়ে যেতে পারে। আর এখানে সেটা হলেও নারীরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কারণ, বিয়ের আগেই তাঁদের যৌন সম্পর্ক হয়েছে বলে মিথ্যা ধারণা তৈরি হয়।
রশিদ বলেন, ‘গাইনি চিকিৎসকেরা সতীচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করে থাকেন। অনেক চিকিৎসক এটা করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে আমি এটা করি। কারণ, যাঁরা কুমারীত্বকে পবিত্র জ্ঞান করে থাকেন, তাঁদের সঙ্গে আমি একমত নই। তবে আমি এতে বিরক্ত। কিছু ধর্মীয় নৈতিকতায় আবদ্ধ পুরুষশাসিত সমাজের কারণে এ ঘটনা ঘটছে।’
উত্তর আফ্রিকায় নারী অধিকারের দিক থেকে তিউনিসিয়াকে শীর্ষস্থানীয় দেশ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তবে ধর্ম এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী এখানকার তরুণীদের বিয়ের আগ পর্যন্ত কুমারী থাকতে হবে। বিয়ের পর কোনো নারী কুমারী নন—এটা প্রমাণিত হলে তিউনিসীয় আইন অনুযায়ী ওই নারীর স্বামী তাঁকে তালাক দিতে পারেন।
সমাজবিজ্ঞানী সামিয়া এলুমি বলেন, ‘এই তিউনিসীয় সমাজে আমরা দিন দিন ভণ্ডামি শিখছি। এখানে একধরনের সামাজিক রক্ষণশীলতা রয়েছে। এরপরও আমরা দাবি করি, আমরা আধুনিক সমাজে বাস করছি। তবে নারীর যৌনতা ও স্বাধীনতার কথা যখন আসে, তখন এখানে খুব একটা আধুনিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না।’
বিবিসির এই প্রতিবেদক কথা বলেন দেশটির সরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিচেমের সঙ্গে। হিচেম আগামী বছর বিয়ে করবেন। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, তাঁর হবু স্ত্রীর কুমারীত্বের বিষয়টিকে তিনি কীভাবে দেখেন। এর জবাবে হিচেম বলেন, ‘আমার কাছে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ের পর আমি যদি দেখি আমার স্ত্রী কুমারী নন, তবে আমি তাঁকে আর বিশ্বাস করব না। আমি এটাকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে বিবেচনা করব এবং আমি হাইমেনোপ্লাস্টি অস্ত্রোপচারে বিশ্বাস করি না। এই অস্ত্রোপচারে কাজ হয় বলে আমি মনে করি না।
হিচেমের পাশেই বসা ছিলেন আরেক ছাত্র রাধুয়াম। তিনি বলেন, ‘তিউনিসীয় সমাজ নারীদের জন্য অত্যন্ত কঠোর। আমার কাছে এটা পরিপূর্ণ ভণ্ডামি। এখানকার তরুণেরা বিয়ের আগেই যৌন-সংসর্গ গড়ে তুলতে পারেন। কাজেই যে দোষ আমরা নিজেরাই করি সেই দোষ কেন শুধু নারীদের ওপর চাপাই?’
সূত্র: বিবিসি। ভাষান্তর: কৌশিক আহমেদ

মৃত্যুর দিন গুনতে থাকা শিশুটির শেষ ইচ্ছে

স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিনে গত রোববার পরিবারের পক্ষ থেকে হ্যারিসন ও অ্যালেইয়ের বিয়ের আয়োজন করা হয়। ছবিটি টুইটার থেকে নেওয়া।
কনে পরেছে সাদা ও গোলাপি রঙের পোশাক। রাজকন্যার মতো মাথায় মুকুটও আছে। বরের গায়ে স্কটল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। দুজনই হাস্যোজ্জ্বল। কনের ফোকলা দাঁতের হাসি বিয়ের মুহূর্তটিকে করে তুলেছে আরও প্রাণবন্ত।
তবে এই বিয়ের পেছনের গল্পটি মধুর নয়। বরং তাতে আছে দুরারোগ্য মরণব্যাধির বিষাক্ত ছোবল। কনের নাম অ্যালেই প্যাটারসন। বয়স তার মোটে পাঁচ বছর। বর তার চেয়ে এক বছরের বড়। নাম তার হ্যারিসন গ্রিয়ার। বর-কনে একে-অপরের ‘সেরা বন্ধু’।
জন্মের কিছুদিন পরই নিউরোব্লাস্টোমা নামের দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয় অ্যালেই। এটি একধরনের ক্যানসার। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, অ্যালেইয়ের রোগ নিরাময়ের অবস্থায় নেই। এরপরই নিজের ইচ্ছের তালিকা বানাতে বসে সে। মৃত্যুর আগেই এসব ইচ্ছে পূরণ করতে চায় অ্যালেই। তালিকার প্রথমেই ছিল সেরা বন্ধু হ্যারিসনকে বিয়ে করার ইচ্ছে।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, গত রোববার পরিবারের পক্ষ থেকে হ্যারিসন ও অ্যালেইয়ের বিয়ের আয়োজন করা হয়। স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিনে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। এতে দুই পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি উপস্থিত বন্ধু ও পরিজনেরা।
মেয়ের জীবন নিয়ে এখন একটি রূপকথার গল্প লিখছেন অ্যালেইয়ের মা গেইল প্যাটারসন। তাতে ক্যানসার রোগটিকে দেখানো হয়েছে ‘অশুভ জন্তু’ হিসেবে। আর অ্যালেইয়ের চরিত্রটি হলো রাজকন্যার।
গেইল প্যাটারসন বলেন, ‘অ্যালেই ও হ্যারিসনের মধ্যে একটি জাদুকরী বন্ধন রয়েছে। হ্যারি সব সময়ই বলে যে সে অ্যালেইকে খুবই ভালোবাসে এবং বিয়ে করতে চায়। আর অ্যালেই হাসপাতালের সেবিকাদের বলত, তার একজন প্রেমিক আছে। শিগগিরই বিয়ে করবে তারা।’
বরের বাবা বিলি গ্রিয়ার বলেন, ‘হ্যারিসন আগে কখনো বিয়েতে আসেনি। সুতরাং এ সবই তার কাছে নতুন। কিন্তু আমার মনে হয়, অনুষ্ঠানটি কি নিয়ে তা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে সে। বেশ উপভোগও করেছে।’
অথচ বিয়ের আগের দিনই অ্যালেইকে রক্ত দিতে হয়েছে। ওই সময়ে কিছু শারীরিক জটিলতাও হয়েছিল তার। কিন্তু গেইল জানান, বিয়ের অনুষ্ঠানে সেই ক্লান্তির ছাপ ছিল না অ্যালেইয়ের মুখে। বরং নেচে-গেয়ে মাতিয়ে তুলেছিল অনুষ্ঠানটি। বিয়ের পর বর-কনে নেচেছিল সাইয়ের গ্যাংনাম স্টাইল গানের সঙ্গে।

অশান্ত দার্জিলিং ছাড়ছে আবাসিক শিক্ষার্থীরা

দার্জিলিংয়ের বিভিন্ন আবাসিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত দেশি ও বিদেশি শিক্ষার্থীরা আজ শুক্রবার সকাল থেকে পাহাড় ছাড়ছে। বিভিন্ন স্কুলের বাসে করে তাদের পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে সমতলের শিলিগুড়ি শহরে। এর মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও রয়েছে।
গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা গতকাল বৃহস্পতিবার এক নির্দেশে আজ শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ছেড়ে যেতে বলেছে।
রাজ্য সরকার পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যালয় পর্যায়ে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা ভাষা পড়ানোর নির্দেশ দেওয়ায় ক্ষুব্ধ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা ১২ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের বন্ধ পালন করছে।
জনমুক্তি মোর্চার পক্ষ থেকে আজ শুক্রবারের মধ্যে জিটিএ বা গোর্খা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ৪৫ জন সদস্যকে পদত্যাগ করতে ঘোষণা দেয়। এমনকি এই পদত্যাগপত্র আজই লালকুঠিতে জিটিএর সদর দপ্তরে প্রধান সচিবের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আগামী রোববার পদত্যাগ করবেন জনমুক্তি মোর্চার প্রধান বিমল গুরুং।
২০১১ সালে প্রথম ক্ষমতায় এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জুলাই মাসে দার্জিলিং সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে দার্জিলিং চুক্তি করেছিলেন। এই চুক্তিবলে গড়েছিলেন এই জিটিএ। পরে জিটিএর নির্বাচনে জয়ী হয়ে এই স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার চেয়ারম্যান হন বিমল গুরুং। এবার সেই জিটিএ থেকে বিমল গুরুং তাঁর দলবল নিয়ে সরে যাচ্ছেন।
কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আবেদন খারিজ করে জানিয়ে দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে দার্জিলিংয়ে আর বাড়তি কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী নিয়োগ করা হবে না। পশ্চিমবঙ্গ সরকার আরও ৪ কোম্পানি বাড়তি কেন্দ্রীয় বাহিনী চেয়েছিল। বর্তমানে এখানে ১০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়ে দিয়েছে, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এক প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে আরও বাহিনী নিয়োগ করলে দার্জিলিংয়ের পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। এই রিপোর্টের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানোর আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।
অন্যদিকে রাজ্য প্রশাসনের জারিকৃত নির্দেশে দার্জিলিংয়ে ২৭ জুন পর্যন্ত ইন্টারনেট ও কেব্‌ল পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।

কাশ্মীরে উত্তেজিত জনতার পিটুনিতে পুলিশ নিহত

ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের একটি মসজিদের সামনে উত্তেজিত জনতা এক পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। বৃহস্পতিবার রাতে প্রদেশের শীতকালীন রাজধানী শ্রীনগরের জামিয়া মসজিদের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানায়, ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট (ডিএসপি) আইয়ুব পণ্ডিত বৃহস্পতিবার জামিয়া মসজিদ এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। সন্ধ্যার দিকে উত্তেজিত জনতা তাঁকে ঘিরে ধরে। তিনি একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে গুলি ছোড়েন। এতে তিন ব্যক্তি আহত হয়।
ডিএসপি আইয়ুবের আগ্নেয়াস্ত্রটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
ঘটনার সময় পুলিশ কর্মকর্তা আইয়ুব সাদাপোশাকে ছিলেন। এ কারণে তাঁর পরিচয় প্রথমে শনাক্ত করা যায়নি। কয়েক ঘণ্টা পর পরিবারের সদস্যরা মুঠোফোনে কল করলে তাঁর পরিচয় জানা যায়। ঘটনার সময় আইয়ুবের সঙ্গে অন্য কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওই সময় তাঁর সঙ্গে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যরা কোথায় ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জামিয়া মসজিদ থেকে তিন কিলোমিটার দূরে পরিবার নিয়ে বাস করতেন আইয়ুব। ওই এলাকায় তিনি ও তাঁর পরিবার বেশ পরিচিত।
শ্রীনগর পুলিশ লাইনে গতকাল শুক্রবার সকালে ডিএসপি আইয়ুব পণ্ডিতকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করার মতো লজ্জাজনক কাজ আর কিছু হতে পারে না।’
একই দিন কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখায় আরও একজন ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়।

রাজনীতিতে শিষ্টাচার by শামীমুল হক

আধুনিক থেকে অত্যাধুনিক। সাদাকালো থেকে রঙিন। এনালগ থেকে ডিজিটাল। হাতের মুঠোয় বিশ্ব। সাইবার যুগ। ঘরে বসে দেখা যাচ্ছে গোটা পৃথিবী। আর বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে দেশ যেন দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছে। শিষ্টাচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌজন্যতা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাচ্ছে রাজনীতি থেকে। কমেছে সামাজিক মূল্যবোধও। এক দলের নেতার সঙ্গে আরেক দলের নেতানেত্রীর এখন আর আগের মতো হৃদ্যতা নেই। কবে কখন যে আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রধান দুই নেত্রীর দেখা হয়েছে মানুষ ভুলে গেছে। অথচ এক সময় দেশের রাজনীতিতে শিষ্টাচার উদাহরণ ছিল। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পরও বিএনপি আর আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে মধুর সম্পর্ক ছিল। কারো কারো সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সরকার গঠন করে বিএনপি। এর কিছু দিন পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিয়ে হয়। সেই অনুষ্ঠানে দাওয়াতি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ বিএনপির অনেক নেতা। রাতে বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে হাজির হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাকে দেখেই সেদিন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আপনি এসেছেন। আমি খুব খুশি হয়েছি। অন্যদিকে খালেদা পুত্র তারেক রহমানের বিয়েতেও যান শেখ হাসিনা। এর কিছুদিন পর থেকেই দূরত্ব বাড়তে থাকে নেতায় নেতায়। দলে আর দলে। এরই ধারাবাহিকতায় দেখা যায় সেনাকুঞ্জের দরবারে দুই নেত্রী পাশাপাশি বসলেও দুই জন ছিলেন দুই দিকে তাকিয়ে। এ ছবিই বলে দিয়েছিল তাদের সম্পর্ক কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। এ মুহূর্তে দুই দলের নেতারা যেন একে অন্যের শত্রু। অথচ স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তাকালে আমরা কি দেখতে পাই?
১৯৭৩ সালের ঘটনা। ভাসানী ন্যাপ-এর সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তখন বঙ্গবন্ধুর কট্টর সমালোচক। সরকারের বিরুদ্ধে তখন তিনি রাজপথে অনশন করেন। সেই অনশনও ভাঙান বঙ্গবন্ধু নিজেই। ভাসানীর মুখে শরবত তুলে দিয়ে সেদিনের অনশন ভাঙানোর কথা সবাই জানেন। আরেক ঘটনা। ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক তখন কাজী জাফর আহমদ। সামনে ঈদ। কাজী জাফর বহু খোঁজাখুঁজি করে মওলানা ভাসানীর জন্য তার পছন্দের পোশাক কিনেন। সঙ্গে ভাসানী পত্নীর জন্যও। ঈদের আগের দিন ভাসানীর বাড়িতে সেই পোশাক নিয়ে যান কাজী জাফর নিজে। পোশাক দেখে খুশি হন ভাসানী। আর মুখে বলেন, তোমার দেয়া পোশাক ঈদের দিন বিকালে পরব। কথা শোনে কাজী জাফরতো থ মেরে যান। এত খোঁজাখুঁজি করে আনা পোশাক মওলানা ভাসানী পরবেন বিকালে তা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। জাফরের ইচ্ছা এই পোশাক পরে মওলানা ভাসানী ঈদের জামাতে যাবেন। একপর্যায়ে ভাসানীর কাছে বিকালে এই পোশাক পরার কারণ জানতে চান। ভাসানী তাকে জানান, ঈদের জামাতে যাব মজিবরের পোশাক পরে। রাতেই মজিবরের পোশাক পেয়ে যাব। তাজ্জব বনে যান কাজী জাফর। বলেন, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আপনি রাজপথে আন্দোলন করছেন। তার সরকারের সমালোচনা করছেন। আর তার দেয়া পোশাক পরে আপনি ঈদের জামাতে যাবেন? মওলানা ভাসানী তখন কাজী জাফরকে বলেন, শোন জাফর, শুধু কালকের ঈদই নয়, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে মজিবরের দেয়া পোশাক পরে আমি ঈদের নামাজ পড়ি। পাকিস্তান আমলে মজিবর জেলে থাকলেও তার স্ত্রী ঈদের পারিবারিক বাজারের সঙ্গে আমার পোশাক কিনতে ভুলতো না। যথারীতি ঈদের আগের রাতে সেই পোশাক আমার কাছে পাঠিয়ে দিতো সে। ১৯৯২ সালে ঢাকা ক্রীড়া সংস্থার মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে দেশের রাজনৈতিক নেতাদের শিষ্টাচার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কাজী জাফর নিজে এসব কথা তার বক্তব্যে তুলে ধরেন।
অপরদিকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি আ স ম আব্দুর রব নিজে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছেন, ১৯৭৪ সালের দিকে আমরা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। আন্দোলনে পুলিশি হামলায় আহত হয়ে পিজি হাসপাতালে ভর্তি হই আমি। হঠাৎ রাতে দেখি বঙ্গবন্ধু এসে হাজির। আমাকে দেখে বঙ্গবন্ধু বললেন, কি হইছে তোর। আমি বিষয়টি দেখতেছি।
এমন কথাও প্রচলিত আছে, ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন মুসলিম লীগের নেতা। স্বাধীনতার পর তিনি কারান্তরীণ হন। বঙ্গবন্ধু তাকে জেলে চিঠি লিখতেন। টেলিফোন করে কথা বলতেন। খোঁজ-খবর রাখতেন। অন্যদিকে জেলে থাকা অবস্থায় মুসলিম লীগ নেতা সবুর খানের পরিবারের খোঁজ-খবর নিয়মিত রাখতেন বঙ্গবন্ধু। সেই সংস্কৃতি এখন আর নেই। এখন কে কার সম্পর্কে কত কটূক্তি করতে পারেন তার প্রতিযোগিতা চলছে। নবম সংসদের দিকে তাকালে লজ্জায় মুখ লুকাতে ইচ্ছে করে। মহান জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যদের মুখের ভাষা শুনে জাতি লজ্জিত হয়েছে। কিন্তু এমপিরা করেছেন উল্লাস। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। এক এগারো থেকে শিক্ষা নিয়ে গঠিত সংসদেই ঘটেছে এসব ঘটনা। কিন্তু এক এগারোর পর বৃহত্তম দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে উভয় দলের প্রতিনিধি উপস্থিত হয়েছিলেন। যা জাতির মনে আশার সঞ্চার করেছিল। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। যার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশবাসীকে। এখনও মাঝে মাঝে খবর হয়, ঈদ, নববর্ষে এক নেত্রী আরেক নেত্রীকে দাওয়াত দেয়ার। এটা শুধু দাওয়াত কার্ড বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তারপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার মৃতুর খবর শোনে ছুটে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়াসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। পক্ষান্তরে খালেদা জিয়ার পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সংবাদ শোনে ছুটে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু সেদিন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ের গেট খোলা হয়নি। বন্ধ গেটের বাইরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে প্রধানমন্ত্রীকে নিরাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। সার্বিক দিক বিবেচনায় দেখা যায় কোথায় যেন এক বাধা। সেই বাধাতো ভাঙতে হবে রাজনীতিবিদদেরই।

বিদেশের প্রলোভনে নারী শিকারের জাল by রুদ্র মিজান

ভয়ঙ্কর প্রতারণা। টার্গেট কম বয়সী সুন্দরী নারী। পারিবারিক, আর্থিক অবস্থা জানার পরই শুরু হয় আসল খেলা। শিকারির মতো জাল ছড়িয়ে দেয়া হয় তাদের ঘিরে। নানা কৌশলে বিদেশে পাচার করা হয় তাদের। অল্প শ্রমে, অল্প সময়ে বেশি আয়, বাসা কিংবা ক্লিনিকের কাজের কথা বলে আকৃষ্ট করা হয়। প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে বাধ্য করা হয় যৌনকর্মে। এতে বাধা দিলে মারধর করা হয়। ইলেকট্রিকের শক দেয়া হয়। এ চক্রের ফাঁদে পড়ে লাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে কোনো কোনো নারীকে। বাধ্য হয়েই বিদেশের মাটিতে যৌনকর্মকে ব্যবসা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন নারীদের অনেকে।
সূত্রমতে, প্রলোভনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারীদের পাচার করা হচ্ছে। বাসায় কাজের নামে তাদের অনেককেই যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করে। এমনকি একই পরিবারের বাবা, ছেলে, ভাইসহ সকল পুরুষ সদস্যদের কাছেই নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে নারীকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পতিতার দালালদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। আবাসিক হোটেলে রেখে যৌনকর্ম করানো হয় এই নারীদের দিয়ে। অনুসন্ধানে এরকম কয়েক নারীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজন দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। বাড়ি মাদারীপুরে। গত ১৪ই মার্চ সৌদি আরবে পাঠানো হয় তাকে। বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে করে একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওই বাসার কর্তা শুরুতেই তার দিকে অবাক দৃৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। তাকে গোসল করে বিশ্রাম নিতে বলা হয়। নতুন কাপড় দেয়া হয়। রাত নামতেই এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি। তার আগমন উপলক্ষে বাসায় জমে উঠে আড্ডা। একে একে ধর্ষণ করে পাঁচ জন। বাধা দিলে বেদম প্রহার করা হয়। অসুস্থ হয়ে যান তিনি। এভাবে একেক রাতে একেক বাসায়, হোটেলে পাঠানো হয় তাকে। বাধা দিলে তারা জানায়, ‘টাকার বিনিময়ে কেনা হয়েছে তোমাকে। আমরা যা বলি তাই করতে হবে।’ গত ৩০শে মে বড় বোনের কাছে ফোনে নির্যাতনের এই করুণ কাহিনী জানান তিনি।
দেশের দালালরা গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি পাঠানোর নামে বিক্রি করে দিয়েছে নারী শিকারি চক্রের কাছে। তাকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছেন স্বজনরা। কিন্তু দালালর দাবি করছে, ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই টাকা দিতে পারলে তাকে ফিরিয়ে দেবে তারা। এ বিষয়ে গত ১৩ই জুন তার বড় বোন বাদী হয়ে আদালতে মানবপাচার আইনে পিটিশন মামলা করেছেন।
ওই নারীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শিকারির মতো জাল ফেলেছিল চক্রের সদস্য মাদারীপুর সদরের খোয়াজপুরের জসিম। ওই নারীর মা, বাবা অসুস্থ। সংসারের হাল ধরতে চান তিনি। এর মধ্যেই প্রস্তাবটি দেয় জসিম। ‘দেশে এতো কষ্ট করার চেয়ে বিদেশে গেলে অনেক ভালো আয় করতে পারবে। বিদেশে যেতে বেশি টাকার দরকার হবে না। রাজি থাকলে অল্প টাকাতেই বিদেশে পাঠানো যাবে। অ্যারাবিয়ানের বাসায় কাজ। মাস শেষে শুধু টাকা আর টাকা। অল্প দিনেই বাড়িতে ঘর-বাড়ি হবে।’ প্রলোভনে পা দেন তিনি। জসিম, ফিরোজপুরের মঠবাড়ির ফুলবাড়িয়ার হুমায়ূন ও যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচার ফরিদ ওই তরুণীকে ঢাকায় নিয়ে আসে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড়ের বশির আহমেদের বাড়িতে তাকে আটকে রাখা হয়। ওই সময়ে বিমানের ভাড়া হিসেবে তার বড় বোনের কাছ থেকে আরো ৩৫ হাজার টাকা নেয় তারা। মতিঝিলের বিডিএক্স ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্সি থেকে টিকিটি নিয়ে সৌদি আরবে পাঠানো হয় তাকে।
একইভাবে প্রলোভনে পা দিয়ে ওমানে গিয়েছিলেন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার শান্তিনগরের এক নারী। শেষ পর্যন্ত লাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে। কুমিল্লার দাউদকান্দির আবদুল কাদিরের মাধ্যমে ওমানে গিয়েছিলেন তিনি। গত বছরের ২৪শে ডিসেম্বর ফোনে তার বোন হোসনে আরাকে বলেছিলেন, ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। প্রতি রাতেই আমার ওপর অমানবিক নির্যাতন করে। এক, দু’জন না। একের পর এক ওরা অনেকে...। আমি মরে যাব। আমাকে বাঁচাও বুবু।’ পরদিন ২৫শে ডিসেম্বর তার লাশ উদ্ধার করে ওমান পুলিশ।
২০১৪ সালের ২১শে অক্টোবর আট নারীকে বিদেশে পাচার করে শরিয়তপুরের সিরাজ শিকদার। লেবাননে পাঠানোর কথা বলে পাঠানো হয় সিরিয়ায়। মামুদ ও আবু আহমদ নামে চক্রের দুই সদস্য তাদের নিয়ে যায় একটি অফিসে। ওই অফিসে আরো ১৫ বাংলাদেশি নারী ছিল। ওই অফিসেই তাদের যৌনকাজে লিপ্ত হতে চাপ দেয়া হয়। হুমকি দিয়ে বলা হয়, তোমাদের টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে। কাজ না করলে প্রাণে মারা হবে। নির্যাতিতারা জানান, সুন্দরী ও কম বয়সীদের বেশি চাহিদা সেখানে। সুন্দরীদের পতিতালয়ে আর একটু বেশি বয়সীদের কৃতদাসী হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয় ছয় মাস ও এক বছরের জন্য। নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে গত বছরের ১১ই অক্টোবর দেশে ফিরেন এক নারী। পরে তিনি এই চক্রের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তিনি জানান, যৌনকাজে লিপ্ত হতে না চাইলে মারধর করা হতো, ইলেকট্রিক শক দেয়া হতো। লোহার রড গরম করে ছ্যাঁকা দেয়া হতো। প্রতিরাতেই একেক নারীকে পাঠানো হয় একেক স্থানে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি সহেলি ফেরদৌস বলেন, নানা প্রলোভন দেখিয়ে দালালরা নারীদের পাচার করে। সাধারণত প্রতারিত হওয়ার পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। এক্ষেত্রে অপরাধীরা যদি দেশে থাকে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু বিদেশে থাকলে তা দুষ্কর হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে বিদেশে যাওয়ার আগে বিদেশগামী নারীকে সচেতনভাবে খোঁজ নিতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান তাকে পাঠাচ্ছে তা সরকার অনুমোদিত কি-না। কোথায়, কিভাবে পাঠাচ্ছে তা জেনে বিদেশে যাওয়া উচিত। কোনো প্রকার সন্দেহ করলে পুলিশের সহযোগিতা নেয়া উচিত। এক্ষেত্রে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি।