Friday, February 24, 2023
ভারতীয় ডায়াসপোরা সাহিত্যের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপটে নাইপল by মোজাফ্ফর হোসেন

ভারতীয় ডায়াসপোরার প্রকারভেদ : ভারতীয় ডায়াসপোরাকে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে মোটা দাগে তিনটি ভাগে আলাদা করা যায়। যেমন –
ক. উপনিবেশ-পূর্ব ডায়াসপোরা : সমুদ্রপথে বাণিজ্য করার জন্য ভারতীয় বণিকেরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অনুরূপভাবে অন্য দেশের বণিকেরা ভারতবর্ষে আসে। এই কারণে তাদের ‘ম্যারিটাইন ডায়াসপোরা’ও বলা হয়। ১৮২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে ভারতীয় শ্রমিক চীন, পারস্যদেশ এবং ক্যারিবীয় দ্বীপাঞ্চলে বাণিজ্য করতে গেছে। পাশাপাশি এখানে অভ্যন্তরীণ ডায়াসপোরার ঘটনাও ঘটেছে। বৃহৎ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বণিক এবং শ্রমজীবী মানুষ শ্রীলংকা, বার্মা বা মিয়ানমারে গেছে। তবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই ম্যারিটাইম কিংবা দেশের ভেতরকার ভূমিভিত্তিক (ল্যান্ড-বেসড) ডায়াসপোরা-কালে সেই অর্থে সৃজনশীল বা মননশীল সাহিত্য সৃষ্টি হয়নি। এর কারণ, যাঁরা গেছেন তাঁদের অধিকাংশ ছিলেন অক্ষরজ্ঞানহীন ব্যবসায়ী বা শ্রমিক।
খ. ঔপনিবেশিক ডায়াসপোরা বা মধ্যযুগীয় ডায়াসপোরা : ভারতীয় ডায়াসপোরা সাহিত্য আমরা পাই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাল থেকে, যখন এ-অঞ্চলের মানুষ স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে ভারত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গেছে, বিশেষ করে ক্যারিবীয় দ্বীপাঞ্চলে। এ-সময় দুটি বড় ঘটনা ঘটে বিশ্ব-শ্রমবাজারে। এক. ১৮৩০ সালে বিশ্বে বৈধ দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয়; দুই. শিল্পবিপ্লব এবং পুঁজির বিকাশ ঘটতে শুরু করে পশ্চিমে। শহর তৈরি হতে থাকে বাণিজ্যনির্ভর দেশগুলোতে। বিশ্বের সম্প্রসারিত শ্রমবাজারে শ্রমিকের যে-শূন্যস্থান সৃষ্টি হয় সেটা পূরণ করার জন্য ভারতবর্ষ থেকে শ্রমিক আমদানি করা হয়। এ সময় থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত কয়েক মিলিয়ন দক্ষিণ এশীয় শ্রমিক বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে আফ্রিকার দ্বীপাঞ্চলে। এদের অনেকেই আর পরে স্বাধীন ভারতে ফিরে আসেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্থানীয় নারীদের বিয়ে করে তারা সেখানেই ঘর বসিয়েছে। পরে তারা সেখানে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নিজেদের প্রয়োজনে শিক্ষিত ভারতীয়দের চাকরি দিয়ে নিয়ে গেছে। যেমন মহাত্মা গান্ধীকে আফ্রিকায় আইনজীবী হিসেবে নিয়ে যান গুজরাটের এক ব্যবসায়ী। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে খ্যাতিমান ভারতীয় ডায়াসপোরা লেখক হলেন ভি এস নাইপল। তিনি দ্বৈত ডায়াসপোরা লেখক। পরবর্তী অংশে তাঁকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।
গ. উপনিবেশ-উত্তর ডায়াসপোরা/ আধুনিক ডায়াসপোরা : ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারতবর্ষ স্বাধীন হলে ডায়াসপোরা নতুন মাত্রা পায়। বৃহৎ-পরিসরে ইউরোপীয়-এশীয় এবং আমেরিকীয়-এশীয় ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। শিক্ষিত ভারতীয় জনগোষ্ঠী তখন বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। শ্রমবাজারের পাশাপাশি শিক্ষিত বা অ্যাকাডেমিক ডায়াসপোরার সৃষ্টি হচ্ছে। ডায়াসপোরা সাহিত্যের ভারতীয় তাত্ত্বিক বিজয় মিশ্র তাঁর ‘ডায়াসপোরাস’ প্রবন্ধে বলছেন, ‘যুদ্ধোত্তর দক্ষিণ এশিয়া, চীন, আরব এবং কোরিয়ার জনগণ ব্রিটেন, ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী হিসেবে বসতি শুরু করেছে।’ এই সময় দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো একইসঙ্গে ভারতবর্ষ স্বাধীন এবং ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হওয়া। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান (আজকের বাংলাদেশ ও পাকিস্তান) থেকে হিন্দুরা যেমন ভারতে গেছে, তেমনি ভারত থেকে মুসলমানরা তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। এভাবে ভারতে অভ্যন্তরীণ ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে।
দুটি বিশ্বযুদ্ধের পরে জাতীয়তাবোধের ভাবনাটি তীব্র হয়ে উঠলে ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর ভেতর অস্তিত্বের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। অনাবাসী ভারতীয় হিসেবে তাঁরা না হোন ভারতীয়, না হোন যে-দেশে বাস করছেন সে-দেশের স্থানীয়। যেমনটি ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নৃত্যশিল্পী আকরাম খান তাঁর ডায়াসপোরা নৃত্যনাট্য দেশে বলছেন, ‘আমি আর বাংলাদেশি নই, এবং, আমি কখনোই ব্রিটিশ হতে পারবো না।’ তাত্ত্বিক বিজয় মিশ্র এই কারণে বলছেন, দুটি সংস্কৃতির মাঝখানে পড়ে ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো সংস্কৃতিই তার আত্মশুদ্ধির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে না, ফলে জাতিসত্তার প্রশ্নে শিকড়হীন অবস্থা তৈরি হয়। এই কারণে ব্যক্তির সঙ্গে দু’দেশের একটা ট্রাবলড রিলেশন গড়ে ওঠে, যা মূলত উঠে আসে স্থানচ্যুত লেখকদের গল্প-কবিতা-উপন্যাসে; যাকে আমরা ডায়াসপোরা সাহিত্য বলছি।
ডায়াসপোরা সাহিত্য : ডায়াসপোরা পরিস্থিতিতে বাস করছেন অর্থাৎ কোনো কারণে নির্বাসনে থেকে বা জীবিকার অন্বেষণে নিজ দেশ ছেড়ে ভিনদেশে বাস করছেন – এমন পরিস্থিতিতে কোনো লেখক যে-সৃজনশীল সাহিত্য রচনা করেন সেটি ডায়াসপোরা সাহিত্য। অনুরূপভাবে ডায়াসপোরা থিয়েটার, চলচ্চিত্র, চিত্রকলাও এখন আলাদাভাবে স্টাডির বিষয় হয়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন হলো, ডায়াসপোরা অবস্থায় একজন লেখক যা লিখবেন সেটাই কি ডায়াসপোরা সাহিত্য বলে বিবেচিত হবে? যদি তিনি অভিবাসী জীবনের সংকট ও পিতৃ-মাতৃভূমির প্রতি যে-নস্টালজিয়া এবং ক্ষয়ে যাওয়া সময়ের জন্য হাহাকার কিংবা আগন্তুক হিসেবে নতুন জীবনের কথা উপজীব্য করে কিছু না লেখেন সেটি ডায়াসপোরা সাহিত্য হবে কিনা? এক অর্থে হবে, আবার আরেক অর্থে হবে না। প্রত্যক্ষ ডায়াসপোরা সাহিত্য হলো সেসব সাহিত্যসৃষ্টি যেখানে ডায়াসপোরা জীবনে থেকে স্বদেশ (হোমল্যান্ড) এবং আশ্রিত দেশের (হোস্টল্যান্ড) মধ্যকার টানাপড়েন উঠে আসবে। আর যদি কোনো লেখক যে-দেশে বাস করছেন সে-দেশের সংকট বা জনজীবন উপজীব্য করে কিংবা পিতৃ-মাতৃভূমির কোনো রাজনৈতিক-সামাজিক বিষয় নিয়ে কোনো গল্প-উপন্যাস-কবিতা লেখেন তাহলে সেই পার্টিকুলার টেক্সটটি প্রত্যক্ষ ডায়াসপোরিক টেক্সট হিসেবে গণ্য হবে না। তবে পরোক্ষভাবে হবে এই কারণে যে, কোনো লেখক স্বদেশ (প্রথম প্রজন্মের ডায়াসপোরা লেখকদের ক্ষেত্রে) বা পিত-মাতৃভূমির (দ্বিতীয় প্রজন্মের ডায়াসপোরা লেখকদের ক্ষেত্রে) প্রসঙ্গ ধরে যদি কোনো গ্রন্থ লেখেন তাহলে সেই গ্রন্থ বাইরের লেখক হিসেবে স্বদেশে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে সেটিও বিবেচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। যে-কারণে ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মুহূর্তের ইতিহাস নিয়ে ভারতীয় ডায়াসপোরা লেখক সালমান রুশদি যখন মিডনাইট চিলড্রেন লেখেন তখন ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে ‘ইতিহাস বিকৃতি’র অভিযোগ ওঠে। এবং রুশদিকে তখন ডায়াসপোরিক লেখক হিসেবে নিজ দেশের ইতিহাসের বিশ্বস্ত কথক রূপে ভারতীয় পাঠকরা বিবেচনা করেন না। ফলে মিডনাইট চিলড্রেন ডায়াসপোরিক টেক্সট না হলেও ডায়াসপোরিক লেখকের টেক্সট হিসেবে পঠিত হয়।
বেশ কয়েক বছর থেকে ইউরোপ এবং আমেরিকায় যে ডায়াসপোরিক লেখকদের রাজত্ব চলছে তার অধিকাংশই বৃহৎ-এশীয়। এক্ষেত্রে আমরা দেখছি স্বদেশ বা পিতৃ-মাতৃভূমের চেয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় এসব ডায়াসপোরিক লেখকের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। ডায়াসপোরিক লেখকদের এই গ্রহণযোগ্যতা তৈরির কারণ হিসেবে ২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী এশীয় ডায়াসপোরিক লেখক ইশিগুরো বলছেন : ‘আশির দশকে ঔপন্যাসিক হিসেবে ব্রিটেনে আমি যে দ্রুত জায়গা করে নিতে পেরেছি এর অংশত কারণ আমি এমন একটা সময় লিখতে শুরু করেছি যখন এই নব্যধারার আন্তর্জাতিকতাবাদের বড় রকমের চাহিদা তৈরি হয়েছিল। লন্ডনের প্রকাশক,
সাহিত্য-সমালোচক এবং সাংবাদিকরা এমন এক নতুন প্রজন্মের লেখকদের চেয়েছেন যারা প্রচলিত ইংরেজি সাহিত্যের ঐতিহ্য থেকে আলাদা – এবং আমি মনে করি, আমাকে সেখানে সাহিত্যমঞ্চের দৃশ্যপটে স্থান দেওয়া হয়েছে কারণ আমাকে আন্তর্জাতিক লেখক বলে তাঁরা ভেবেছেন।’
ভারতীয় ডায়াসপোরা সাহিত্যতত্ত্ব : শারীরিকভাবে স্বদেশ থেকে অন্যদেশে চলে গেলেও মনটা স্বদেশ এবং আশ্রিত দেশের মাঝখানে আটকে থাকে। বিষণœতার সৃষ্টি হয়। ছেড়ে আসা স্বদেশের সংস্কৃতি ও স্মৃতির জন্য বিলাপ প্রকাশের জন্য নয়া-নির্মিতি হিসেবে ইন্দো-ফিজিয়ান কবি সুদেশ মিশ্র হিন্দি কবিতার ‘বিদেশিয়া ট্র্যাডিশন’কে গ্রহণ করেছেন। ডায়াসপোরা মানুষের সংকটকে চিহ্নিত করে ডায়াসপোরা অ্যান্ড দি ডিফিকাল্ট আর্ট অব ডায়িং শিরোনামে তিনি কাব্যগ্রন্থও লিখেছেন। ডায়াসপোরা সাহিত্যতত্ত্বের বিবেচ্য বিষয় হিসেবে সুদেশ মিশ্র তাঁর ডায়াসপোরা ক্রিটিসিজম গ্রন্থে বলছেন, ‘ডায়াসপোরা সমালোচনা তত্ত্ব ‘ডায়াসপোরা’ ধারণাকে কেন্দ্র করে সমকালীন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে স্থানচ্যুত জনগোষ্ঠীর সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে।’
ভারতীয় ডায়াসপোরা সাহিত্যতাত্ত্বিক বিজয় মিশ্র তাঁর ‘দি লিটারেচার অব ইন্ডিয়ান ডায়াসপোরা : থিওরাইজিং দ্য ডায়াসপোরিক ইম্যাজিনারি’ প্রবন্ধে বলছেন, ‘সকল ডায়াসপোরা মানুষ অসুখী, তবে প্রত্যেকে তাদের নিজেদের মতো করে অসুখী। ডায়াসপোরা বলতে তাদের বোঝায় যারা তাদের পাসপোর্টে অন্বয়সাধিত (non-hyphenated) আত্মপরিচিতি নিয়ে সন্তুষ্ট না।’ এই Ônon-hyphenatedÕ শব্দবন্ধনীকে আমাদের সামনে আরো খোলাসা করেছেন তাঁর ‘দ্য ল অব দ্য হাইফেন অ্যান্ড দ্য পোস্টকলোনিয়াল কন্ডিশন’ গদ্যে। এখানে তিনি বলছেন, ÔThe hyphen — Indo-Americans, Indian-Americans, Hindu-Americans, Muslim-Britons — signals the desire to enter into some kind of generic taxonomy and yet at the same time retain, through the hyphen, the problematic situating of the self as simultaneously belonging ÔhereÕ and Ôthere.Õ তিনি আরো বলছেন, এই ‘হাইফেন’ একইসঙ্গে একজন লেখকের জন্য নেতিবাচক এবং ইতিবাচক অভিজ্ঞতা বয়ে আনে। দুটি সংস্কৃতির মেলবন্ধনে যেমন তৃতীয় এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির জন্ম হয়, তেমনি ভেতরে ভেতরে জন্ম হতে থাকে অতৃপ্তি ও অনিশ্চয়তার। মিশ্র এই পরিস্থিতিতে স্থানচ্যুত হওয়া লেখকদের স্মৃতির ভেতর দিয়ে নিজের স্বদেশকে খোঁজার প্রয়াসকে বলছেন ডায়াসপোরিক ইম্যাজিনারি।
এই নেতিবাচক এবং ইতিবাচক অভিজ্ঞতা কেবল ডায়াসপোরিক লেখকদের মধ্যে নয়, ডায়াসপোরিক লেখকদের কারণে স্বদেশি লেখক ও পাঠকদের ভেতরেও সৃষ্টি হয়। ভারতীয় ডায়াসপোরিক পণ্ডিত জাসবির জেইন তাঁর ‘দ্য ইন্ডিয়ান ডায়াসপোরিক এক্সপেরিয়েন্স’ প্রবন্ধে বলছেন, ইতিবাচক দিক হলো ডায়াসপোরিক লেখকেরা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় (বা স্বদেশি) ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরছেন। তাঁর ভাষ্যে, Ô…histories of diaspora act like myriad mirrors which reflect on our notions of Indianness, Indian history and identity|Õ অন্যদিকে এর মন্দ দিক হলো, ডায়াসপোরা লেখকদের আন্তর্জাতিক প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে ভারতীয় লেখকদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়। তাঁর ভাষায়, ‘ডায়াসপোরা লেখকরা আমাদের মতামত প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, আমাদের কণ্ঠস্বরকে রোধ করে। এবং সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে, ওরা কিভাবে আমাদের অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা ও ইতিহাসকে কাজে লাগায় সেটা নিয়ে আমাদের চিন্তিত থাকতে হয়।’
সুদেশ মিশ্র ডায়াসপোরা সাহিত্যকে তাত্ত্বিকভাবে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছেন; একটি ÔSugar DiasporaÕ অন্যটি ÔMasala DiasporaÕ । ফ্রম সুগার টু মাসালা : রাইটিংস বাই দ্য ইন্ডিয়ান ডায়াসপোরা’ গদ্যে তিনি বলছেন, ডায়াসপোরা সাহিত্য-প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে আমাদের ‘গৃহ’ (home) ধারণাটি নতুন করে নির্মাণ করতে হবে; যেহেতু Ôthis (home) occurs aginst the backdrop of the global shift from the centring or centripedal logic or monopoly capitalism to the decentering or centrifugal logic of transnational capitalism. Whereas for the Sugar Diaspora ÔhomeÕ signifies an end to itinerant wandering, in putting down the roots, ÔhomeÕ for the masala diaspora is linked to the strategic espousal of rootlessness, to the constant mantling and dismantling of the self in makeshift landscape.Õসুদেশ মিশ্র অবস্থানগতভাবে আবার ডায়াসপোরাকে দুভাবে ভাগ করছেন; একটি হলো পুরনো ডায়াসপোরা, অন্যটি নয়া ডায়াসপোরা। পুরনো ডায়াসপোরার ভেতর পড়ে যারা মনের দোটানার ভেতর ফিজি, ত্রিনিদাদ, মরিশাস, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়া এবং গায়ানার মতো কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোতে গেছেন। নয়া ডায়াসপোরার ভেতর পড়ে যারা অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যের মতো বাণিজ্যনির্ভর মহানগরগুলোতে গেছেন।
ভারতীয় নারীবাদী তাত্ত্বিক চন্দ্র মোহন্তী তাঁর ‘ডিফাইনিং জেনেলজিস : ফেমিনিস্ট রিফ্লেকশনস অন বিং সাউথ এশিয়ান ইন নর্থ আমেরিকা’ প্রবন্ধে হোম বা গৃহ বলতে প্রশ্ন করছেন : গৃহ আসলে কোনটা – যেখানে আমি জন্মেছি? যেখানে আমি বড় হয়ে উঠেছি? যেখানে আমি পেশাজীবী হিসেবে আছি? যেখানে আমি আমার নিজের লোকজনকে পাচ্ছি? এরপর তিনি প্রশ্ন করছেন, আমার নিজের লোকজন বলতে আমি কাদের বুঝব? গৃহ কি তবে ভৌগোলিক-আবেগযুক্ত স্থান? ডায়াসপোরা সাহিত্যতাত্ত্বিকদের জন্য এসব প্রশ্ন এখন বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। এবং এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁরা উপলব্ধি করছেন ‘গৃহ’ আসলে ব্যক্তির রাজনৈতিক-পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। এই ধারণার সঙ্গে আরো কতগুলো বিষয় যুক্ত; যেমন – আচ্ছন্নতা, স্মৃতিতাড়না, পূর্বপুরুষের ইতিহাস এবং আত্ম-অন্বেষণ; যার সম্পূর্ণ প্রকাশ ঘটে নাইপলের লেখায়। কিন্তু এভাবে ছবির ফ্রেমে বা স্মৃতিচিহ্ন দিয়ে আত্মপরিচয় নির্মাণ করতে গেলে সংকটও তৈরি হয়। তুলনামূলক সাহিত্যের শিক্ষক রুশ লেখক সভেতলানা বউম
যে-কারণে বলছেন, ডায়াসপোরা সাহিত্যে হারানো গৃহের প্রতি স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠার ভেতর দিয়ে একজন লেখক তাঁর ক্ষয়িষ্ণু আত্মপরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। একই কথা নাইপলও বলছেন তাঁর এ ওয়ে ইন দ্য ওয়ার্ল্ড উপন্যাসে। তিনি বলছেন, ‘আমরা (ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী) বংশানুক্রমে যা ধারণ করি, সবকিছু বুঝে করি না। ফলে কখনো কখনো আমাদের নিজেদের কাছে নিজেদের অপরিচিত মনে হয়।’
ভারতীয় ডায়াসপোরা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে নাইপল
এই মুহূর্তে বিশ্বে চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তর ডায়াসপোরিক সাহিত্যের দেশ ভারত। ভারতীয় কয়েক প্রজন্মের নারী-পুরুষ এখন সংকর (হাইব্রিড) ও অন্বয়সাধিত (হাইফেনেটেড) পরিচয় নিয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা তাঁদের সৃজনশীলতার ভেতর দিয়ে বৈশ্বিক মানবতাবাদের ওপর ভিত্তি করে নতুন মূল্যবোধের অনুসন্ধান করছেন। ভারতীয় ডায়াসপোরার সংকট ও সম্ভাবনাকে নিজেদের সাহিত্যের বিষয়বস্তু করে তুলেছেন সালমান রুশদি, রোহিনটন মিস্ত্রি, অমিতাভ ঘোষ, ঝুম্পা লাহিড়ী, অনিতা দেশাই, রাজা রাও, বিক্রম শেঠ, অমিত চৌধুরী, কিরণ দেশাই, অরুন্ধতী রায়, ভারতী মুখার্জী থেকে শুরু করে এমজি ভাসানজি, শ্যাম সেলভাদুরাই, বিক্রম চন্দ্র, ফারুক ঢোন্ডি, রমেশ গণেশকেরা, কেতকী কুশারী ডাইসন, ভেন বেগামুদ্রে, চিত্রা ব্যানার্জী, গীতা মেহতার মতো খ্যাতিমান লেখকরা। এমনকি রুপি কাউর, সাউনা সিং বাল্ডুইন, অখিল শর্মা, সন্ধ্যা মেনন, তনজ ভাটিয়া, নিশা শর্মা, সায়ন্তনী দাশগুপ্তের মতো নতুন লেখকরাও ভারতীয় ডায়াসপোরিক জীবনের সংকটকে উপজীব্য করে তুলেছেন তাঁদের গল্প-উপন্যাসে।
তবে ভারতীয় ডায়াসপোরা সাহিত্যে নানাদিক থেকে প্রতিনিধিত্বশীল এবং অনুকরণীয় লেখক হলেন সদ্যপ্রয়াত স্যার ভি এস নাইপল। এই প্রেক্ষাপটে একমাত্র সাহিত্যে নোবেলজয়ী লেখক তিনি। বুকার পুরস্কারও পেয়েছেন ডায়াসপোরিক গল্পসংকলন ইন এ ফ্রি স্টেটের (১৯৭১) জন্য। ডায়াসপোরিক জীবনে তাঁর মতো বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আর কোনো লেখক হননি। জন্ম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ত্রিনিদাদে। নিজের জাতিসত্তার প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন তাঁর ÔMany-Sided BackgroundÕ থেকে। নাইপলের পরিবার কাজের জন্য ব্রিটিশ ভারত থেকে ব্রিটিশ ত্রিনিদাদে যায়। এরপর আর ভারতে ফিরে আসেনি। নাইপল সেখানে হিন্দু সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠলেও মিশেছেন,পড়াশোনা করেছেন খ্রিষ্টান মহল্লায়। এরপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে লন্ডনে থেকে যান। এই অর্থে ত্রিজাতীয় সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট থেকে লেখক নাইপলের জন্ম। ডায়াসপোরা সাহিত্যতত্ত্বের বিবেচনায় তিনি দ্বৈত ডায়াসপোরিক লেখক – অর্থাৎ ভারতীয়-ত্রিনিদাদীয়-ব্রিটিশ লেখক তিনি। ফলে ডায়াসপোরিক চেতনা ও নির্বাসিত জীবনের সংবেদনশীলতা সম্পর্কে ধারণা না নিয়ে কোনো পাঠকের পক্ষে নাইপলের সাহিত্য সম্পূর্ণরূপে বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। বর্তমান গদ্যে ডায়াসপোরিক ফ্রেমওয়ার্ক থেকে নাইপলের কিছু লেখার মধ্যে দিয়ে তাঁকে ও তাঁর সাহিত্যে আত্মপরিচয় অন্বেষণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটবে।
নাইপল যখন প্রথম লেখালেখির কথা চিন্তা করেন তখন লেখার উপকরণ কোনো একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিচয়ে নির্ধারিত ছিল না। নাইপল দেখলেন, যে ইংরেজি ভাষায় তিনি লিখতে চাচ্ছেন সেই ইংরেজি সাহিত্য-ঐতিহ্য তাঁর নিজের নয়। আবার ত্রিনিদাদে তিনি যে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর ভেতর বেড়ে উঠেছেন সেখানে ভারতীয় সাহিত্য-ঐতিহ্য বলে কিছু দাঁড়ায়নি। তার চেয়ে বড় কথা, ত্রিনিদাদি বা ভারতীয় সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় মূল্যবোধ নাইপলের কোনোদিনই পছন্দ হয়নি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, ‘আমি জানতাম, বিশাল পৃথিবী পড়ে আছে বাইরে। আমি যা-কিছুর মধ্যে বেড়ে উঠেছি, সেই কৃষিজীবী ও ঔপনিবেশিক সমাজকে গ্রহণ করতে পারিনি।’ এমন পরিস্থিতিতে একজন নতুন লেখক কি নিয়ে লিখবেন? এই প্রশ্ন থেকেই যেন লেখক নাইপলের জন্ম। আত্মপরিচয়ের এই সংকট থেকে নাইপল বুঝে নেন প্রচলিত-প্রতিষ্ঠিত কোনো পথ তাঁর গন্তব্যযাত্রা নয়। নিজের প্রয়োজনেই তাঁকে নতুন পথ সৃষ্টি করতে হবে। এটাই যেন লেখক নাইপলের জন্য ভবিতব্য ছিল। এক্ষেত্রে তিনি কিছু নির্দেশনা পেয়ে যান তাঁর বাবার কাছ থেকে। বাবার গল্প থেকে নাইপল তাঁর লেখকজীবনের বিষয়বস্তু খুঁজে পান। ত্রিনিদাদে তখন অধিকাংশ ভারতীয় পেশায় শ্রমজীবী হলেও নাইপলের বাবা ছিলেন সাংবাদিক। বাবার লেখার ভেতর নাইপল তাঁর সাহিত্য-ঐতিহ্য খুঁজে পান। তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে সঞ্চয় করে আরো মহাবয়ানের দিকে ঝুঁকে পড়েন, প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহার করেন ঔপনিবেশিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক ত্রিনিদাদ ও ভারত। উপজীব্য হয়ে ওঠে ত্রিনিদাদ ও ইংল্যান্ডে বসবাসরত ভারতীয় ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক সংকট।
সাংস্কৃতিকভাবে নির্দিষ্টতাবোধের অভাব থেকে নাইপলের ভেতর জন্ম নেয় বিচ্ছিন্নতাবোধ ও অস্তিত্বের সংকট। নাইপলের শুরুর দিকের উপন্যাসগুলোতে দেখি ঔপনিবেশিক ত্রিনিদাদবাসী তাঁদের নিজস্বতার অন্বেষণ করছে। এবং আগন্তুক ভারতীয়দের জন্য নিজস্বতার বিষয়টি ‘গৃহ’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। যেমন এ হাউজ ফর মি. বিশ্বাস উপন্যাসে বিশ্বাস মনে করেন, পুরুষত্বের ধারণাটা একটা বাড়ির মালিকানার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তার যেহেতু নিজস্ব কোনো গৃহ নেই, ফলে তিনি নিজেকে পুরুষ মানুষ হিসেবে অযোগ্য ভাবেন। বাড়ির মালিকানার সঙ্গে তিনি ব্যক্তির পরিচয় যুক্ত বলে মনে করেন। এ বেন্ড ইন দ্য রিভার উপন্যাসে সেলিম তার অ্যাপার্টমেন্টকে নিজের বাড়ি বলে ভাবতে পারে না। আগের ভাড়াটিয়ার দেয়ালে সাঁটা নোংরা ছবিগুলো সে তুলে ফেলে না, সেগুলো সবসময়
তাকে মনে করিয়ে দেয় এটা তার গৃহ নয়। এভাবেই নতুন এক সাহিত্য-ঐতিহ্যের জন্ম হয় নাইপলের হাত দিয়েই। বন্ধুলেখক পল থেরক্স যথার্থই বলেছেন, ÔWith Naipaul, his tradition begins with him.Õ
নাইপলের সাহিত্যে ভারতীয় স্বদেশি, ভারতীয় অভিবাসী, ত্রিনিদাদবাসী ও ব্রিটিশ জনগণ চরিত্র হয়ে উঠলেও তিনি কখনো কারো একার লেখক হিসেবে চিহ্নিত হননি। তিনি কি ভারতীয়, নাকি ত্রিনিদাদীয়, নাকি ব্রিটিশ? এ-প্রশ্নের কোনো সরল উত্তর তাঁর ক্ষেত্রে আমরা খুঁজে পাই না। এর অংশত কারণ কোনো দেশের ইতিহাসই নাইপলের নিজের ইতিহাস হয়ে ওঠেনি। ইশিগুরো যেমনটি বলছেন, প্রকৃত ইতিহাস আবেগ থেকে আসে না, আসে ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতা থেকে। ইশিগুরো বলছেন, ‘জাপান সম্পর্কে আমার যে জানাশোনার ঘাটতি, দায়িত্ববোধের অভাব, এটা আমি মনে করি আমাকে গৃহহীন লেখক হিসেবে ভাবতে বাধ্য করেছে। আমাকে নির্দিষ্ট করে কোনো সামাজিক ভূমিকা পালন করতে হয়নি কারণ আমি বিশুদ্ধ ইংরেজ না, আবার জাপানিও না। ফলে আমাকে আক্ষরিক অর্থে কোনো দায়িত্ব পালন করতে হয়নি, কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সমাজ নিয়ে লিখতে হয়নি। কারো ইতিহাস আমার ইতিহাস হয়ে ওঠেনি।’ [সাক্ষাৎকার; কেনজাবুরো ওয়ে গৃহীত] এই ‘স্বদেশি’ বোধ ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে নিজেকে মুক্ত মনে করেছেন নাইপলও। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ÔI was born in Trinidad, I have lived most of my life in England and India is the land of my ancestors. That says it all. I am not English, not Indian, not Trinidadian. I am my own person.’ [টাইমস অব ইন্ডিয়া, ২০০২
কোনো জাতিগত দায়বদ্ধতা না থাকা বা জাতীয়তাবোধের আবেগ দ্বারা আক্রান্ত না হওয়ার একটা সুবিধাও আছে। নির্মম সত্যও অতি সহজে বলে ফেলা যায়। নাইপল এই সুবিধার চর্চাটা ভালোমতোই করেছেন। লেখক হিসেবে নিজেকে কঠোর সমালোচক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিজের জন্মস্থান ত্রিনিদাদকে তিনি বলছেন তাঁর জন্য Ôunimportant, uncreative and cynicalÕ (The middle passage, 1962)| তিনবার নিজের পূর্বপুরুষের দেশ ভারত-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন তিনটি বই : অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস (১৯৬৪), ইন্ডিয়া : অ্যান উনডেড সিভিলাইজেশন’ (১৯৭৭) এবং ইন্ডিয়া : এ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ (১৯৯০)। বইগুলোর শিরোনাম পড়েই বোঝা যায় ভারতীয়দের জন্য সুখকর কিছু লেখেননি তিনি। তিনি লিখেছেন : ‘ভারতে লোকে সর্বত্র মলত্যাগ করে। রেললাইনের ধারে, মাঠের ধারে, রাস্তার ধারে, নদীর ধারে, সমুদ্রতীরে কোথাও হাগতে বাকি রাখে না।’ ভারত বহুভাষাভাষী মানুষের দেশ। সব ভাষার সাহিত্য সম্পর্কে বিশদ না জেনেই মন্তব্য করেছেন : ‘ইংরেজি ছাড়া অন্য ভারতীয় ভাষায় এখন কোনো লেখালেখি হচ্ছে না।’ ভারতীয় বাঙালিদের সম্পর্কেও তাঁর মন্তব্য যথেষ্ট নেতিবাচক। এক জায়গায় লিখেছেন : ‘… লোকটা খারাপ। শুধু বাঙালি আর অপরাধীদের সঙ্গে মেশে।’ মুসলিম-বিশ্বে সমালোচিত হয়েছেন ইরান, ইরাক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে লিখিত অ্যামাং দ্য বিলিভারস : অ্যান ইসলামিক জার্নি (১৯৮১) এবং বিয়ন্ড বিলিফ : ইসলামিক এক্সকারশনস অ্যামাং দ্য কনভার্টেড পিপলস (১৯৯৮) গ্রন্থদুটির কারণে। ইসলাম সম্পর্কে নাইপল বলেন, ÔIt (Islam) has had a calamitous effect on converted peoples. To be converted you have to destroy your past, destroy your history. You have to stamp on it, you have to say Ômy ancestral culture does not exist, it doesnÕt matter.Õ (পাঠোন্মোচন, হাফ এ লাইফ, কুইন্স এলিজাবেথ হল, ইংল্যান্ড) আফ্রিকার উগান্ডা সফরকালে তিনি বলেন, ‘আফ্রিকানদের খালি লাথি মারা দরকার। লাথির ভাষাটাই কেবল তারা বোঝে।’ আফ্রিকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নাইপলকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আফ্রিকার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’
লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন, সেই অক্সফোর্ড সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য হলো ÔWhat I learnt from Oxford in 6 years, it took me 12 years to unlearn|Õ (ঢাকা লিট ফেস্ট, ঢাকা ২০১৭) এভাবে কেবল ভারত, আফ্রিকা কিংবা মুসলিমবিশ্ব নয়, সামগ্রিকভাবে নাইপল গোটা বিশ্ব নিয়েই চরমভাবে হতাশ একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর প্রমাণ আমরা পাই মার্কিন ভ্রমণলেখক ও কথাসাহিত্যিক পল থেরক্সকে যখন তিনি বলেন, ÔThe melancholy thing about the world is that it is full of stupid people; and the world is run for the benefit of the stupid and common.Õ
নাইপল এসব কথা হয়তো মিথ্যা বলেননি। কিন্তু এগুলো আংশিক সত্য। পুরোপুরি সত্য নয়। নাইপল নিজেকে কোনো পরিচয়ের সঙ্গে একাত্ম করতে না পারার কারণে নিজের মতো করে সত্যকে গ্রহণ ও নির্মাণ করেছেন। তিনি হয়ে উঠেছেন সীমানাহীন ভাসমান পৃথিবীর কথক। এর কারণ তাঁর ডায়াসপোরিক পরিচিতি। এই পরিচিতি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা না করে নাইপল এর একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেয়েছেন। না-ভারতীয় না-ত্রিনিদাদীয়, মাঝামাঝি একটা স্বতন্ত্র পরিচিতি নির্মাণের চেষ্টা তাঁর সাহিত্যজুড়ে আছে।
প্রথম উপন্যাস দি মিসটিক মসিউরে (১৯৫৭) আমরা দেখি গণেশ নামে একজন ভারতীয় গুরু ঔপনিবেশিক ত্রিনিদাদে রাজনৈতিকভাবে শক্তিমান হয়ে উঠছে। ত্রিনিদাদে বসবাসরত পূর্ব ভারতীয় জনগোষ্ঠীকে উপজীব্য করে উপন্যাসটি লেখা। উপন্যাসের কথক বলছেন যে, গণেশের (উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র) ইতিহাস, আমাদের সময়ের ইতিহাস। কাজেই আমরা ধরে নিতে পারি, গণেশের মধ্য দিয়ে ত্রিনিদাদে ভারতীয় জনগণের উত্থান-পর্বের ইতিহাস রচিত হয়। গণেশ হলো পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া পূর্ব ভারত থেকে আসা প্রথম প্রজন্মের প্রতিনিধি। প্রথম প্রজন্মের ভারতীয়দের জন্য সাংস্কৃতিকভাবে আত্মপরিচয় নির্মাণের কাজটি আরো কঠিন ছিল। গল্পের কথক কিশোর গণেশের প্রতি সহানুভূতির সঙ্গে তার সে-সময়ের সংগ্রামের কথা উঠিয়ে এনেছেন। স্কুলে প্রথম দিনই গণেশ সাংস্কৃতিকভাবে নিগৃহীত হয়। অন্যান্য শিক্ষার্থী তার ভারতীয় আচরণ ও পোশাক নিয়ে হাসিঠাট্টা করে। সেই প্রথম গণেশ ভারতীয় হিসেবে নিজেকে সমাজের প্রান্তিক মানুষ বলে মনে করে। সে লজ্জিত হয়ে ভারতীয় পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা করে। নাইপলের ভাষায় : ‘সে (গণেশ) তার ভারতীয় নাম নিয়ে এতটাই লজ্জায় পড়ে যায় যে একটা পর্যায়ে বলে বেড়ায় যে আসলে তাকে ডাকা হতো গরেথ নামে।’ গণেশ তখন অন্যদের সংস্কৃতি নকল করার চেষ্টা করে। সে ভারতীয় গুরুবিদ্যা প্রচার করলেও ভারতীয় তান্ত্রিকদের পোশাক না পরে, পরে ইউরোপীয়দের পোশাক। তার খাবারের টেবিলে ভারতীয় ডাল-ভাত-রুটির পাশাপাশি চলে আসে পশ্চিমা খাবার। এভাবেই নতুন দেশে পূর্ব ভারতীয়রা দ্বৈতজীবন যাপন করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা ভালো করে ইংরেজি বলতে পারে না, আবার অন্যদিকে হিন্দি ভাষা একেবারে ভুলে যায়। প্রাচ্যের সঙ্গে পশ্চিমের এই সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের মাঝে আটকা পড়ে গণেশ। সে যখন তার প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে পশ্চিমের জ্ঞানকে মেলাতে পারে, তখনই সে সফল হয়। সে যখন বলতে শেখে, ‘সব ধর্মই এক’, তখনই সে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান সকলের মানুষ হয়ে ওঠে। গণেশ ভারতীয় ত্রিনিদাদি হিসেবে নয়, কলোনিয়াল প্রোডাক্ট হিসেবে নির্বাচনে জয়লাভ করে। এরপর যখন গণেশকে আমরা লেখক হয়ে উঠতে দেখি তখন আমাদের বুঝে নিতে সমস্যা হয় না, গণেশ একইসঙ্গে নাইপলের জীবনী ও ইতিহাস।
মিগুয়েল স্ট্রিট (১৯৫৯) গল্পসংকলনে স্থান পাওয়া তিনটি গল্পে উপজীব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ত্রিনিদাদে বসবাসরত সংখ্যালঘু পূর্ব ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সংকট। ভাকু ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দি লিখতে পারে বলে তার স্ত্রী গর্বের সঙ্গে সেটি প্রচার করে বেড়ায়। ভাকুরা সংখ্যাগুরু নিগ্রোদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখে। এখানে প্রত্যেকে একে অন্যের থেকে আলাদা। নিগ্রোরা নারী ও শিশু নির্যাতনে অভ্যস্ত। বউ পেটানোটা ভাকুর জন্যও আচারে পরিণত হয়। সে ক্রিকেট খেলার ব্যাটকে এ-কাজে খুব উপযোগী মনে করে। তার স্ত্রীও ব্যাটটি যত্ন করে হাতের কাছে-কিনারে রেখে দেয়। দাসজীবন থেকে বের হয়ে এলেও সেই জীবনের কিছু বদঅভ্যাস নিগ্রোরা ছাড়তে পারেনি। উপন্যাসের অল্পবয়সী কথক পানশালা ও ব্রথেল গমনে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে তার সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মা তাকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়। মিগেল স্ট্রিট গল্পসংকলনে নাইপল একটি সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে আরেকটি সংস্কৃতিকে দেখার চেষ্টা করছেন। তখন তিনি ইংল্যান্ডে, ইউরোপীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় তিনি এক কিশোরের দৃষ্টি দিয়ে তাঁর জন্মশহর ত্রিনিদাদের বহু-সাংস্কৃতিক রীতিনীতি পর্যবেক্ষণ করছেন। দূর থেকে অন্য আলোয় নিজের অতীত খনন করছেন নাইপল।
গণেশের মতো মিগুয়েল স্ট্রিটের আর সব বাসিন্দা দ্বৈতজীবন যাপন করে, এটা তাদের ওপর আরোপিত বাস্তবতা, অন্যটা তাদের কল্পনা। পানশালা, বস্তি, ব্রথেল, অনাহার, নৃশংসতা তাদের যাপিত জীবনের অংশ। তারা হলিউডের সিনেমা দেখে ফ্যান্টাসি জগৎ তৈরি করে তাদের আশ্রয়ের জন্য। কবি বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ ইউরোপীয় কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘আত্মার ভাই’ হিসেবে নিজেকে ভাবেন। তিনি ইংরেজিতে তাঁর মহৎ কবিতাটি লিখবেন বলে প্রচার করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক লাইনের বেশি লিখতে পারেন না।
ব্যক্তির নাম আধুনিককালে একজন মানুষের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অথচ বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থের নামটি তাঁর নিজের নয়। একধরনের অস্তিত্বের সংকট থেকে চরিত্র নিজেই তাঁর জন্য অন্য একটি নাম নির্বাচন করেছেন। তিনি যে-নামটি বেছে নিয়েছেন সে-নামটি তাঁর নিজের দেশীয় সংস্কৃতির বা গোত্রের নাম নয়। তিনি বিখ্যাত ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের নামটি নিজের জন্য নির্বাচন করেছেন। তিনি কবি হতে চান, নিজের মতো করে নয়, ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো করে। কিন্তু তিনি যে সাদা চামড়ার ওয়ার্ডসওয়ার্থ হতে পারবেন না, এটিও তিনি তাঁর মাথায় রেখেছেন। এজন্যে তিনি নামের আগে ‘বি.’ অর্থাৎ ‘ব্ল্যাক’ শব্দটা যোগ করে রেখেছেন। লক্ষ করার বিষয়, গল্পটির কথক এক স্কুলপড়–য়া কিশোর। ধরে নিতে পারি নাইপল নিজেই। ফলে পাঠক সরাসরি বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থের ভাবনাটা জানতে পারছে না। এই বর্ণনাশৈলী থেকেও বোঝা যায়, বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থের অস্তিত্ব অন্যের কাছে গচ্ছিত। এভাবেই দীর্ঘদিন ব্রিটিশ উপনিবেশ থাকার কারণে ত্রিনিদাদে আগন্তুক ভারতীয় কিংবা আফ্রিকানদের ভেতর অস্তিত্বের সংকট দেখা দিয়েছে। তারা ভুল আলোয় নিজের চেহারা দেখার চেষ্টা করছে। এখন প্রশ্ন হলো, যে-দেশটি ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের উপনিবেশ ছিল তারা কেন অর্থনীতি ও শিক্ষা-দীক্ষায় এত পিছিয়ে? ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো তো তাদের নিজেদের ভাষায় ‘এনলাইট’ করতেই গিয়েছিল! মিগুয়েল স্ট্রিট এমন অনেক প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়।
আত্মপরিচয়ের সংকট, নিজস্বতার অনুসন্ধান, আগন্তুক-অনুভূতি, সাংস্কৃতিকভাবে পরাভূত যাবতীয় অনুষঙ্গের যথার্থ প্রকাশ ঘটেছে নাইপলের মহাকাব্যিক উপন্যাস এ হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস-এ (১৯৬১)। উপন্যাসের বর্ণনাকারী কিশোর আনন্দ তার ভূমিহীন-গৃহহীন বাবা মিস্টার বিশ্বাসের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছে। আমরা জানি, নাইপল তাঁর নিজের এবং বাবার জীবনের ছায়াচরিত্র হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এ-দুই চরিত্র। উপন্যাসের প্রথম অংশে নাইপল ত্রিনিদাদে আখ-চাষের শ্রমিক হিসেবে ভারতবর্ষ থেকে আসা লোকজনের হিন্দুধর্মীয় আচার, কুসংস্কার, দর্শন ও সংস্কৃতি চর্চা নিয়ে কথা বলেছেন। পিতৃমাতৃভূমি থেকে তারা হাজার হাজার মাইল দূরে নতুন দেশে এসে তাদের নিজস্ব কৃষ্টি যেন আরো প্রবলভাবে ধরে রাখতে চাইছে। ভিনদেশে এক টুকরো স্বদেশ তৈরি করার আকুতি থেকে তারা জোর দেয় তাদের ফেলে আসা সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু ঔপনিবেশিক শক্তি আরো প্রবল সামর্থ্য নিয়ে আঘাত করে। হিন্দুদের অনেকেই এখন মৃতদের শরীর শ্মশানে না নিয়ে কবরস্থ করে। শুরুতে হিন্দুসমাজে এক জাতের নারী-পুরুষের সঙ্গে অন্য জাতের নারী-পুরুষের বিয়ে মেনে নেওয়া না হলেও পরে এই
জাত-ভেদাভেদ উঠে যায়। তবে সাংস্কৃতিক ডিলেমা তাদের ভেতর থেকে যায়। যেমন, মিস্টার বিশ্বাসকে কানাডীয় মিশন স্কুলে ভর্তি করা হলেও পরে তাকে পণ্ডিত জয়রামের কাছে পাঠানো হয়। লোকের বাড়িতে থেকে কাজ শিখতে গিয়ে বিশ্বাস চোরের অপবাদ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। মাকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলে ÔI am going to get a job of my own. And am going to get my own house too.Õ মি. বিশ্বাস মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মারা যায়। কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত নিজে একটা বাড়ির মালিক হয়। ফলে গৃহের প্রশ্নে ভারতীয় ত্রিনিদাদিরা আর এশিয়ার পরিচয়ে পরিচিত থাকে না, তারা তখন নতুন পৃথিবীর অংশ হয়ে ওঠে। নাইপল বলছেন, ÔImmigrants are people on their own. They cannot be judged by the standards of their older culture. Culture is like language, ever developing. There is no right and wrong; no purity from which there is decline. Usage sanctions everything.Õ
দ্য মিমিক মেন (১৯৬৭) উপন্যাসে রঞ্জিত কৃপাল সিং নামে এক ক্যারিবিয়ান রাজনীতিক লন্ডনে রাজনৈতিক নির্বাসনে থেকে তাঁর আত্মজীবনী লিখছেন। তিনি এমন এক অতীত নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন যেখানে তাঁর নিজস্ব অস্তিত্ব গ্রন্থিত হওয়ার আগেই বলা হয়েছে, তুমি তোমার গৃহত্যাগ করো এবং আর কখনো ফিরে এসো না। এই অবস্থায় রঞ্জিত সিং কীভাবে লিখবেন তাঁর আত্মকথন? সিংয়ের বাবা-মা ভারত থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ক্যারিবীয় দ্বীপে আসে। এখানে তার জন্ম হয়। উপন্যাসে ইসাবেলা শহরে ভারতীয় যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠার দিনগুলোর কথা তুলে ধরে রঞ্জিত সিং। নাইপল এখানে ইসাবেলা এবং লন্ডনের মাঝে আটকে যাওয়া কৃপাল সিংয়ের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক ক্যারিবীয় অঞ্চলে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের সংকট তুলে ধরেছেন। সিং তাঁর আত্মজীবনী লিখছেন লন্ডনে বসে, যেটি তাঁর নিজের দেশ নয়, যে-দেশটি তাঁর জন্মভূমি সেটি আবার তাঁর পিতামাতার দেশ নয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রথম প্রজন্মের ভারতীয় হিসেবে তাঁকে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক সবধরনের সংকটের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে।
ইন এ ফ্রি স্টেট (১৯৭১) গ্রন্থে নামগল্পের পাশাপাশি বিষয়সংশ্লিষ্ট আরো দুটি গল্প স্থান পেয়েছে। ‘ওয়ান আউট অব ম্যানি’ গল্পে সন্তোষ বম্বেতে কাজ করে। যখন তার মালিক ওয়াশিংটন ডিসিতে চলে যাবেন বলে ঠিক হয়, তখন সন্তোষ গ্রামে তার দরিদ্র পরিবারের কাছে ফিরে না গিয়ে মালিকের সঙ্গে আমেরিকায় চলে আসে। এখানে আসামাত্রই সে নিজেকে বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে। দেশত্যাগের জন্য তার মনে অনুশোচনার জন্ম হয়।
এভাবেই নাইপল তাঁর প্রায় প্রতিটি গল্প-উপন্যাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজে বসবাসরত ভারতীয়দের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শারীরিক এবং মানসিক স্থানচ্যুতের বিষয়টি উঠিয়ে এনেছেন। তিনি নিজে মিশ্র সংস্কৃতির ভেতর আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করেছেন। মি. বিশ্বাসের নিজস্ব বাড়ির অন্বেষণ নাইপলের সেই প্রতীকী অন্বেষণ।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Friday, February 17, 2023
গল্প- বালথাজারের চমৎকার বিকেল by গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

বউ উরসুলা বলল, দাড়িটা কামাও। পাগলা পাদ্রির মত লাগছে।
দুপুরে খাওয়ার পর কেউ দাড়ি কাটে না।
দু-সপ্তাহের না-কামানো দাড়ি, ছোট ছোট, শক্ত, খরখরে। যেন খচ্চরের লোম। মুখটা দেখাচ্ছে ভয় পাওয়া ছোঁড়ার মত। ভাবটা মোটেই ঠিক নয়। ফেব্রম্নয়ারিতে ওর তিরিশ বছর পূর্ণ হল। চার বছর বিয়ে না করে, বাচ্চা পয়দা না করে উরসুলার সঙ্গে থেকেছে। জীবন ওকে সতর্ক থাকতে শিখিয়েছে বটে, সঙ্গে এটাও শিখিয়েছে যে, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এই খাঁচাটা, ও জানেই না যে, কিছু লোকের কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর খাঁচা। ছোটবেলা থেকে খাঁচা বানিয়ে-বানিয়ে এমনি সড়গড় হয়ে গেছে যে, এটা বানানো খুব শক্ত মনে হয়নি।
বউ বলল, তাহলে একটু ঘুমোও। তবে ওই দাড়ি নিয়ে লোকসমাজে বেরোতে পারবে না।
বিশ্রাম করতে-করতেও বারবার হ্যামক থেকে নেমে প্রতিবেশীদের খাঁচা দেখাতে হচ্ছিল। উরসুলা এতদিন এদিকে নজর দেয়নি। কারণ বালথাজার খাঁচা তৈরিতে এত মগ্ন ছিল যে, নিজের ছুতোরের কাজটায় একদম মন ছিল না। এটাতে উরসুলার খুব রাগ হত, বিরক্তি লাগত। দু-হপ্তা ভাল করে ঘুমোয়নি লোকটা। রাতে বিড়বিড় করত। সমানে এপাশ-ওপাশ করত। দাড়ি কামায়নি, বলা ভাল দাড়ি কাটার কথা ভাবেইনি। এখন তৈরি খাঁচাটা দেখে ওর রাগ গলে জল।
দিবানিদ্রা সেরে বালথাজার যখন উঠল ততক্ষণে ওর জামা-প্যান্ট ইসিত্মরি করে ফেলেছে উরসুলা। সেগুলো চেয়ারের ওপর রেখে খাঁচাটা টেবিলে তুলে চুপচাপ মন দিয়ে দেখতে লাগল।
এটার দাম কত নেবে?
জানি না। বালথাজারের জবাব। তিরিশ পেসো বলব ভেবেছি। যদি কুড়ি দেয়।
পঞ্চাশ পেসো চাও। গত দু-সপ্তাহে তুমি প্রচুর ঘুম নষ্ট করেছ। তার ওপর এটা বেশ বড়। জীবনে আমি যত খাঁচা দেখেছি এটা সেগুলোর চেয়েও অনেক বড়।
বালথাজার দাড়ি কামাতে শুরু করল।
তোমার কি মনে হয় ওরা আমাকে পঞ্চাশ পেসো দেবে?
হোসে মন্তিয়েলের কাছে এটা কোনো ব্যাপার নয়। আর খাঁচাটার দাম তাই হওয়া উচিত। উরসুলা বলল। তোমার ষাট পেসো চাওয়া উচিত।
বাড়িটা পড়েছিল দম বন্ধ করা ছায়ার মধ্যে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ। গরম সাংঘাতিক। আর অহর্নিশ একঘেয়ে ঝিঁঝির ডাক। অসহ্য। জামাকাপড় পরে বালথাজার বারান্দার দিকের দরজা খুলল, যাতে হাওয়া আসে। ঘরটা ঠান্ডা হয়। দরজা খোলা পেয়ে একদল বাচ্চা ঘরে ঢুকে পড়ল।
খবর ছড়ায়। বুড়ো ডাক্তার অক্টাভিও জিরান্দো – জীবনে সুখী, পেশায় ক্লান্ত। জিরান্দো পঙ্গু স্ত্রীর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজনে বসে বালথাজারের খাঁচার কথা ভাবছিলেন। ভেতরের বারান্দায় গরমের দিনে খাবার টেবিল পাতা হয়। সেখানে প্রচুর ফুলের টব আর দুটো ক্যানারি পাখির খাঁচা। ডাক্তারের বউ পাখি ভালবাসেন। এবং এতটাই ভালবাসেন যে, বেড়াল একদম দেখতে পারেন না। কারণ, বেড়াল পাখি খায়। বউয়ের কথা ভাবতে-ভাবতে ডাক্তার জিরান্দো রোগী দেখতে গেলেন। ফেরার পথে বালথাজারের বাড়ি, খাঁচাটা খুঁটিয়ে দেখতে।
বালথাজারের ঘরে প্রচুর লোক। খাঁচাটা খাবার টেবিলের ওপর। বিরাট খাঁচা। তারের গম্বুজ। তিনটে তলা। আসা-যাওয়ার রাসত্মা। খাওয়া আর ঘুমোনোর জন্য আলাদা-আলাদা ঘেরাটোপ। দোলনা। বিশাল বরফকলের মডেল যেন খাঁচাটা।
ডাক্তার অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে খাঁচাটা দেখলেন। খাঁচাটার নাম যা ছড়িয়েছে তার থেকেও শতগুণে উৎকৃষ্ট আসল বস্ত্তটি। বউয়ের জন্য যে খাঁচার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না ডাক্তারবাবু, এটি তার চেয়েও অনেক, অনেক গুণে সুন্দর।
অপূর্ব! কী বানিয়েছে, অ্যাঁ! কল্পনার একেবারে চরম উৎকর্ষ! ডাক্তার মুগ্ধ। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওকে খুঁজে পেলেন। মায়ের মত স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ, তারপর বললেন, তুমি একজন অসামান্য স্থপতি হতে পারতে।
ধন্যবাদ, লজ্জায় লাল হয়ে বলল বালথাজার।
অবশ্যই। বললেন ডাক্তার। ডাক্তারটি বেশ নাদুসনুদুস, মসৃণ ত্বক, যৌবন পার করা সুন্দরীদের মত। কণ্ঠস্বর লাতিন আওড়ানো পাদ্রির মত।
এমনকি এই খাঁচায় কোনো পাখি রাখারও দরকার নেই। নিলামে তোলার কায়দায় দর্শকদের দিকে খাঁচাটা ঘুরিয়ে বললেন ডাক্তার। গাছে ঝুলিয়ে দিলে এটা নিজেই গান গাইবে। টেবিলে আবার বসালেন খাঁচাটা, কিছু ভাবলেন, তারপর বললেন, আচ্ছা, ঠিক আছে। আমিই এটা নেব।
এটা তো বিক্রি হয়ে গেছে। উরসুলার ভাষ্য।
বালথাজার জানাল, এটা মন্তিয়েলের ছেলের জন্য বানানো। ও অর্ডার দিয়েছিল।
ডাক্তার গম্ভীর, খাঁচার নকশা কি ও দিয়েছে?
না। বলল, একজোড়া ট্রুপিয়েল পাখির জন্য একটা বড় খাঁচা দরকার। যেমন এইটে।
কিন্তু এটা তো ট্রুপিয়েলের জন্য নয়।
অবিশ্যি এটা ট্রুপিয়েলের জন্য, ডাক্তারবাবু। টেবিলের দিকে এগোতে-এগোতে বালথাজার বলল। বাচ্চারা ওকে ঘিরে রয়েছে। মাপগুলো খুব যত্ন করে নিয়েছি। খাঁচার কামরাগুলোর দিকে দেখাল। আঙুলের গাঁট দিয়ে গম্বুজে আঘাত করে সুরেলা ঝনঝন আওয়াজ তুলল।
এর থেকে শক্ত তার আপনি পাবেন না। বাইরে-ভেতরে দুদিকেই ঝালাই করা।
খাঁচাটায় কাকাতুয়াও রাখা যাবে আরামসে, একটা বাচ্চা বলল।
ঠিক বলেছিস।
বেশ। কিন্তু মন্তিয়েল তোমাকে নকশা তো দেয়নি। এমনকি খুব খুঁটিয়ে বলেও দেয়নি ঠিক কী চাই। শুধু বলেছে ট্রুপিয়েল পাখির জন্য একটা খাঁচা চাই। ঠিক কিনা?
ঠিক।
তাহলে তো কোনো সমস্যা নেই। ট্রুপিয়েল পাখির জন্য যথেষ্ট বড় খাঁচা এক জিনিস আর এই খাঁচাটা অন্য জিনিস। কোনো প্রমাণ নেই যে, ওর অর্ডার দেওয়া খাঁচা এটাই।
না, এটাই সেটা। বালথাজার একটু হকচকিয়ে গেল। সেই জন্যই তো আমি এটা বানিয়েছি।
ডাক্তার অধৈর্যে মাথা ঝাঁকালেন।
উরসুলা স্বামীর দিকে চেয়ে বলল, তুমি তো আর একটা বানাতে পার। ডাক্তারকে বলল, আর আপনারও কোনো তাড়া নেই।
আমি যে গিন্নিকে কথা দিয়েছি আজ বিকেলেই খাঁচা নিয়ে বাড়ি ফিরব।
ডাক্তারবাবু, আমার খুব খারাপ লাগছে, খুব দুঃখিত আমি। কিন্তু যে-জিনিস বিক্রি হয়েই গেছে তা আবার আমি বিক্রি করতে পারব না।
ডাক্তার, অগত্যা, কী আর করা যাবে, ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকালেন। রুমাল দিয়ে ঘাড়-গলা মুছলেন। তারপর বন্দর ছেড়ে যাওয়া জাহাজের দিকে লোকে যেমন করুণ চোখে চেয়ে থাকে, সেই চোখে খাঁচাটাকে অনেকক্ষণ চেয়ে-চেয়ে দেখলেন।
ওরা কত দিল এটার জন্য?
বালথাজার উরসুলার চোখদুটো খুঁজল।
ষাট পেসো, উরসুলার জবাব।
ডাক্তার নির্নিমেষ খাঁচাটাকে দেখতে-দেখতে বললেন, খুব সুন্দর, খুব সুন্দর। সত্যিই অসাধারণ। দরজার দিকে যেতে-যেতে রুমালটা জোরে-জোরে নেড়ে হাওয়া খেতে-খেতে হাসলেন। বললেন, মন্তিয়েল বিরাট বড়লোক।
আসলে, সত্যি বলতে, হোসে মন্তিয়েলকে যতটা মনে হয়, ততটা ধনী সে নয়। তবে পয়সার জন্য ও সবকিছু করতে পারে। এই বাড়ির দু-তিনটে গলির পরেই ওর বাড়ি। বাড়িটা জিনিসপত্রে ঠাসা। এমন কোনো গন্ধও নেই সে-বাড়িতে, যা বেচা যাবে না। খাঁচার খবরটা শুনেও মন্তিয়েল নির্বিকার। তার বউ সারাদিন মৃত্যুচিন্তায় জর্জরিত। দুপুরে দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘণ্টাদুয়েক ছায়ার দিকে চেয়ে শুয়ে রইল। হোসে মন্তিয়েল তখন দিবানিদ্রায় মগ্ন। অনেক কলরবে মন্তিয়েল অবাক হয়ে বসার ঘরের দরজা খুলল। বাড়ির সামনে রীতিমত ভিড়। মধ্যিখানে বালথাজার, খাঁচা হাতে। পরনে সাদা পোশাক, সদ্য কামানো দাড়ি – ঠিক যেমনটি সেজেগুজে গরিবরা বড়লোকের বাড়ি যায়।
ওঃ কী দারুণ! আবেগে মন্তিয়েল গিন্নি চেঁচিয়ে উঠল। এসো এসো ভেতরে এসো। আন্তরিকতার সঙ্গে বালথাজারকে নিয়ে গেল ভেতরে। আমি জীবনে এরকম অসাধারণ কিছু দেখিনি। দরজার কাছে জমা ভিড়টা দেখে বিরক্ত হয়ে যোগ করল, ওটা নিয়ে একদম ভেতরে চলে এস। বসার ঘরটা বাজার হয়ে গেল দেখছি।
বালথাজার হোসে মন্তিয়েলের বাড়িতে নতুন নয়। নানা উপলক্ষে, দক্ষতা আর অকপট স্বভাবের জন্য ছোটখাটো ছুতোরের কাজে সময়-সময় ওর ডাক পড়েছে। কিন্তু ও বড়লোকদের মধ্যে স্বচ্ছন্দবোধ করে না। প্রায়ই ও বড়লোকদের কথা ভাবে। তাদের কুৎসিত ঝগড়াটে বউদের কথা, ওদের ভয়ঙ্কর সব অস্ত্রোপচারের কথা – ওদের জন্য করুণা হয়। যখন কোনো বড়লোক বাড়িতে ঢোকে, তখন ওর হাঁটাটা আস্তে হয়ে যায়, পা টেনে-টেনে হাঁটে, নয়ত চলতে পারে না।
বালথাজার জিজ্ঞেস করল, পেপে বাড়ি আছে, খাঁচাটা টেবিলে রাখল।
মন্তিয়েল গিন্নি বলল, ও ইস্কুলে গেছে। তবে দেরি হবে না। আর কত্তা চান করছেন।
আসলে মন্তিয়েলের স্নান করার সময় নেই। বদলে দ্রুত শরীরে অ্যালকোহল ঘষছে। যাতে ব্যাপারটা কী ঘটছে তা দেখতে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরোতে পারে। এই গরমেও দুপুরে ফ্যান না চালিয়ে ঘুমোয়, যাতে ঘুমিয়ে-ঘুমিয়েও বাড়ির নানা আওয়াজ, কোলাহল ইত্যাদির ওপর নজর রাখতে পারে।
ভেতর থেকে মন্তিয়েল চেঁচাল, আদিলেইদ, বলি হচ্ছেটা কী?
শিগগির এসে দ্যাখ কী চমৎকার জিনিস!
মোটা লোমশ হোসে মন্তিয়েল, কাঁধে তোয়ালে, শোয়ার ঘরের জানালা থেকে বলল, ওটা কী?
বালথাজার বলল, পেপের খাঁচা।
মন্তিয়েলের বউ চমকে গেল, কার?
পেপের। পেপে বানাতে দিয়েছিল।
সেই মুহূর্তে অবিশ্যি কিছুই হল না। শুধু বালথাজারের মনে হল কেউ বাথরুমের দরজাটা ওর মুখের ওপর খুলে দিল। কেবল অন্তর্বাসটুকু পরেই মন্তিয়েল শোয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
পেপে!! মন্তিয়েল গর্জন ছাড়ল।
ও ফেরেনি। ফিসফিস করে বলল পেপের মা।
তখনই পেপে ঢুকল। বারো বছরের কিশোর। মায়ের মত বাঁকানো ভুরু আর বিষণ্ণ চোখ।
এদিকে আয়। তুই এটা অর্ডার দিয়েছিস?
বাচ্চাটা মাথা নিচু করে রইল। চুলের মুঠি ধরে মাথাটা পেছনে বাঁকিয়ে চোখে চোখ রেখে মন্তিয়েল আবার হুঙ্কার ছাড়ল, জবাব দে।
জবাব না দিয়ে বাচ্চাটা ঠোঁট কামড়াতে লাগল।
মন্তিয়েল!!! ওর বউ ডুকরে উঠল। মন্তিয়েল ছেলেটাকে ছেড়ে দিল। রাগী মুখে বালথাজারের দিকে ঘুরে বলল, আমি দুঃখিত। এটা বানানোর আগে আমার সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল। একটা বাচ্চা ছেলের কথায় কাজ ধরে বসলি, এমনটা তোর পক্ষেই সম্ভব। বলতে-বলতে শান্ত হচ্ছিল, বাইরের হাসিখুশি ভাবটা ফিরে আসছিল।
খাঁচাটা টেবিল থেকে তুলে, সেটার দিকে দৃকপাতও না করে, বালথাজারকে দিয়ে দিল।
এক্ষুনি ওটা নিয়ে চলে যা। যাকে হোক বিক্রি করগে যা। দ্যাখ হাতজোড় করছি তক্কো করবি না, তক্কো করবি না। বালথাজারের পিঠে হালকা চাপড় মেরে বলল, ডাক্তার আমাকে রাগতে বারণ করেছে।
ছেলেটা এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল, নড়েনি। চোখের পাতাও পড়েনি। অপ্রস্ত্তত বালথাজার যেই-না খাঁচাটা হাতে নিয়ে ওর দিকে তাকিয়েছে, তখনি ওর গলা থেকে একটা ভয়ঙ্কর জান্তব আওয়াজ নির্গত হল, অনেকটা কুকুরের গর্জনের মত। পরক্ষণেই মাটিতে আছড়ে পড়ে চিৎকার করতে শুরু করল ছেলেটা।
ছেলের চিৎকারে পাত্তাই দিল না মন্তিয়েল। ওর মা শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। মন্তিয়েল বলল, অ্যাই ওকে একদম তুলবে না। মেঝেতে ঠুকে ঠুকে মাথাটা ফাটাক, তারপর সেখানে ভাল করে
নুন-লেবু ঘষে দাও, যাতে আরো চেঁচায়, আরো লাফায়। কত রাগ ওর শরীরে আছে দেখি। ছেলেটা সমানে চেঁচাচ্ছিল, ফোঁপাচ্ছিল। হাত দুটো ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছে মা।
ছেড়ে দাও। ওকে ছেড়ে দাও। হোসে মন্তিয়েল ধমক লাগাল।
ছেলেটার আছাড়ি-পিছাড়ি দেখে বালথাজারের মনে হচ্ছিল যেন মৃত্যুযন্ত্রণায় তীব্র কষ্ট পাওয়া জলাতঙ্ক আক্রান্ত কোনো পশু। প্রায় চারটে বাজে। এই সময়ে তার বাড়িতে, পেঁয়াজ কাটতে-কাটতে উরসুলা খুব পুরনো একটা গান গাইছে।
বালথাজার ডাকল, পেপে। জলভরা চোখে পেপে তাকাল, ফোঁপাতে-ফোঁপাতে। হাসিমুখে বালথাজার খাঁচাটা ওর দিকে বাড়িয়ে ধরল। প্রথমে দ্বিধায়, অবিশ্বাসে, তারপর লাফিয়ে উঠে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরল খাঁচাটা। সেটা সাইজে প্রায় ওর মতই বড়। বুকের মধ্যে খাঁচাটা জাপটে তারের ফাঁকগুলোর মধ্য দিয়ে অনিশ্চিত দৃষ্টিতে বালথাজারের দিকে তাকিয়ে রইল পেপে। এখন আর ওর চোখে জল নেই।
মন্তিয়েল নরম সুরেই বলল, বালথাজার, তোকে বললাম না খাঁচাটা নিয়ে যা! পেপের মাও বলল, ওটা নিয়ে যাও।
না, থাক। পেপেকে বলল, তুমি ওটা রেখে দাও। মন্তিয়েলকে বলল, এটা তো ওর জন্যই বানানো।
বোকার মত কথা বলিস না বালথাজার, খিঁচিয়ে উঠল মন্তিয়েল, তোর এই ফালতু মালের পেছনে খরচা করার পয়সা আমার নেই।
ঠিক আছে। ওটা কোনো ব্যাপারই না। পেপেকে উপহার দেওয়ার জন্যই এটা বানিয়েছি। এর জন্য পয়সা চাইছি না, আশাও করছি না।
বাড়ির সামনের কৌতূহলী ভিড়টার মধ্য দিয়ে বালথাজার যখন চলে যাচ্ছে তখনো মন্তিয়েল চেঁচিয়ে যাচ্ছে, চোখদুটো লাল, মুখ ফ্যাকাশে, বিবর্ণ।
অ্যাই মাথামোটা, ছাগল। তোর ওই গয়না এক্ষুনি নিয়ে যা। আমার বাড়িতে আমার কথার ওপর কথা? কভি নেহি। কুত্তার বাচ্চা কোথাকার!
পুকুরপাড়ের আড্ডাঘরে বালথাজার ঢুকতেই হাততালি দিয়ে অভিনন্দনের ঝড় বইল। এতক্ষণ ও ভাবছিল যে, একটা ভাল খাঁচা বানিয়েছে, যেটা আগের চেয়ে অনেক ভাল। যেটা মন্তিয়েলের ছেলের কান্না থামানোর জন্য দিয়ে দিয়েছে। যাকগে, যা হয়েছে ভালই হয়েছে। মোটের ওপর ব্যাপারটাকে বিশেষ পাত্তা দেয়নি। কিন্তু এখানে এসে দেখল অনেকের কাছেই ব্যাপারটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এবার একটু উত্তেজনা অনুভব করল।
তাহলে তোকে ওরা পঞ্চাশ পেসো দিলো।
ষাট।
ওঃ, কি দাঁও মেরেছিস ভাই। তুই-ই পারলি একমাত্র চিপ্পুস মন্তিয়েলের থেকে পয়সা বের করতে। এটা তো সেলিব্রেট করতেই হচ্ছে। বিয়ার আন, বিয়ার আন।
বালথাজারের জন্য বিয়ার এল। বদলে ও সববাইকে এক পাত্তর করে খাওয়াল। আর জীবনে প্রথম মদ খেতে গিয়ে সন্ধ্যার মধ্যেই পুরো আউট। তখন নেশার ঘোরে বিরাট-বিরাট স্বপ্ন। কী? না, এক হাজার খাঁচা বানিয়ে ষাট পেসো করে একেকটা বিক্রি করবে। বাড়তে-বাড়তে সেটা হল লাখ-লাখ খাঁচা। বেচে ওর রোজগার হবে ষাট লাখ, ষাট কোটি। জড়ানো গলায় বলল, বড়লোকের বাচ্চাগুলো মরার আগে ওদেরকে অনেক-অনেক খাঁচা বেচতে হবে। সবকটা শালা রোগে পড়েছে, ধুঁকছে। মরবে, সবকটা মরবে। এমনই প্যাঁচে ওরা পড়েছে বাওয়া যে আর ভাল করে রাগ কত্তেও পারবে না।
জুকবাক্সে ঘণ্টাদুয়েক গান বাজল টানা, খরচা বালথাজারের। বালথাজারের স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, সৌভাগ্য আর বড়লোকদের মৃত্যু কামনা করে সববাই বেশ কয়েক পাত্তর টানল। তারপর যে-যার মত একে-একে কেটে পড়ল। আড্ডাঘরে পড়ে রইল একা বালথাজার।
ভাজা মাংসে পেঁয়াজ কুঁচো ছড়িয়ে উরসুলা একটা পদ রান্না করল। সন্ধ্যাবেলা কেউ একজন বলে গেল, ওর বর পুকুরপাড়ের আড্ডাঘরে, আনন্দে পাগল। সববাইকে মাল খাওয়াচ্ছে। উরসুলা বিশ্বাস করেনি। বালথাজার তো মদ খায় না। আটটা বেজে গেলে উরসুলার চিন্তা শুরু হল। অপেক্ষা করে-করে ক্লান্ত উরসুলা যখন মাঝরাতে ঘুমিয়ে পড়ল, বালথাজার তখন একটা আলোকিত ঘরে – যেখানে কয়েকটা টেবিল। প্রতিটি টেবিল ঘিরে চারটে চেয়ার। একটা নাচঘর। সেখানে তিতির পাখিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক বিছানায় দুটো মেয়ে নিয়ে বালথাজার, ওর মুখ রুজে রাঙানো। আসলে নেশায় চুরচুর, এক-পাও ফেলতে পারছে না। মদে এত খরচা করেছে যে, ঘড়িটাও বন্ধক রাখতে হয়েছে।
টলতে-টলতে বাড়ি ফেরার চেষ্টায় রাসত্মায় বেরোতেই হুড়মুড় করে উলটে পড়ল। পড়েই রইল হাত-পা ছড়িয়ে। উঠতে ইচ্ছা করল না। একসময় বুঝতে পারল যে, কেউ ওর জুতাটা খুলে নিচ্ছে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে সুখী, সুন্দর স্বপ্নটা ভাঙতে চাইছিল না বালথাজার। তাই ও কিছুই বলল না, নড়লও না।
ভোর পাঁচটার প্রার্থনায় যোগ দিতে যাওয়া মহিলারা ওর দিকে ফিরেও তাকাল না। ভাবল মরে গেছে।
The cage was finished. Balthazar hung it under the eave, from force of habit, and when he finished lunch everyone was already saying that it was the most beautiful cage in the world. So many people came to see it that a crowd formed in front of the house, and Balthazar had to take it down and close the shop.
"You have to shave," Ursula, his wife, told him. "You look like a Capuchin."
"It's bad to shave after lunch," said Balthazar.
He had two weeks' growth, short, hard, and bristly hair like the mane of a mule, and the general expression of a frightened boy. But it was a false expression. In February he was thirty; he had been living with Ursula for four years, without marrying her and without having children, and life had given him many reasons to be on guard but none to be frightened. He did not even know that for some people the cage he had just made was the most beautiful one in the world. For him, accustomed to making cages since childhood, it had been hardly any more difficult than the others.
"Then rest for a while," said the woman. "With that beard you can't show yourself anywhere."
While he was resting, he had to get out of his hammock several times to show the cage to the neighbors. Ursula had paid little attention to it until then. She was annoyed because her husband had neglected the work of his carpenter's shop to devote himself entirely to the cage, and for two weeks had slept poorly, turning over and muttering incoherencies, and he hadn't thought of shaving. But her annoyance dissolved in the face of the finished cage. When Balthazar woke up from his nap, she had ironed his pants and a shirt; she had put them on a chair near the hammock and had carried the cage to the dining table. She regarded it in silence.
"How much will you charge?" she asked.
"I don't know," Balthazar answered. "I'm going to ask for thirty pesos to see if they'll give me twenty."
"Ask for fifty," said Ursula. "You've lost a lot of sleep in these two weeks. Furthermore, it's rather large. I think it's the biggest cage I've ever seen in my life."
Balthazar began to shave.
"Do you think they'll give me fifty pesos?"
'That's nothing for Mr. Chepe Montiel, and the cage is worth it," said Ursula. "You should ask for sixty."
The house lay in the stifling shadow. It was the first week of April and the heat seemed less bearable because of the chirping of the cicadas. When he finished dressing, Balthazar opened the door to the patio to cool off the house, and a group of children entered the dining room.
The news had spread. Dr. Octavio Giraldo, an old physician, happy with life but tired of his profession, thought about Balthazar’s cage while he was eating lunch with his invalid wife. On the inside terrace, where they put the table on hot days, there were many flowerpots and two cages with canaries. His wife liked birds, and she liked them so much that she hated cats because they could eat them up. Thinking about her, Dr. Giraldo went to see a patient that afternoon and when he returned he went by Balthazar’s house to inspect the cage.
There were a lot of people in the dining room. The cage was on display on the table: with its enormous dome of wire, three stories inside, with passageways and compartments especially for eating and sleeping and swings in the space set aside for the birds' recreation, it seemed like a small-scale model of a gigantic ice factory. The doctor inspected it carefully, without touching it, thinking that in effect the cage was better than its reputation, and much more beautiful than any he had ever dreamed of for his wife.
"This is a flight of the imagination," he said. He sought out Balthazar among the group of people and, fixing, his maternal eyes on him, added, "You would have been an extraordinary architect."
Balthazar blushed.
"Thank you," he said.
"It's true," said the doctor. He was smoothly and delicately fat, like a woman who had been beautiful in her youth, and he had delicate hands. His voice seemed like that of a priest speaking Latin. "You wouldn't even need to put birds in it," he said, making the cage turn in front of the audience's eyes as if he were auctioning it off. "It would be enough to hang it in the trees so it could sing by itself." He put it back on the table, thought a moment, looking at the cage, and said: "Fine, then I'll take it."
"It's sold," said Ursula.
"It belongs to the son of Mr. Chepe Montiel," said Balthazar. "He ordered it specially."
The doctor adopted a respectful attitude.
"Did he give you the design?"
"No," said Balthazar. "He said he wanted a large cage, like this one, for a pair of troupials."
The doctor looked at the cage.
"But this isn't for troupials."
"Of course it is, Doctor," said Balthazar, approaching the table. The children surrounded him. "The measurements are carefully calculated," he said, pointing to the different compartments with his forefinger. Then he struck the dome with his knuckles, and the cage filled with resonant chords. "It's the strongest wire you can find, and each joint is soldered outside and in," he said.
"It's even big enough for a parrot," interrupted one of the children.
"That it is," said Balthazar.
The doctor turned his head.
"Fine, but he didn't give you the design," he said. "He gave you no exact specifications, aside from making it a cage big enough for troupials. Isn't that right?"
"That's right," said Balthazar.
"Then there's no problem," said the doctor. "One thing is a cage big enough for troupials, and another is this cage. There's no proof that this one is the one you were asked to make."
"It's this very one," said Balthazar, confused. "That's why I made it."
The doctor made an impatient gesture.
"You could make another one," said Ursula, looking at her husband. And then, to the doctor: "You're not in any hurry."
"I promised it to my wife for this afternoon," said the doctor.
"I'm very sorry, Doctor," said Balthazar, "but I can't sell you something that's sold already."
The doctor shrugged his shoulders. Drying the sweat from his neck with a handkerchief, he contemplated the cage silently with the fixed, unfocused gaze of one who looks at a ship which is sailing away.
"How much did they pay you for it?"
Balthazar sought out Ursula's eyes without replying.
"Sixty pesos," she said.
The doctor kept looking at the cage.
"It's very pretty." He sighed. "Extremely pretty." Then, moving toward the door, he began to fan himself energetically, smiling, and the trace of that episode disappeared forever from his memory.
"Montiel is very rich," he said.
In truth, Jose Montiel was not as rich as he seemed, but he would have been capable of doing anything to become so. A few blocks from there, in a house crammed with equipment, where no one had ever smelled a smell that couldn't be sold, he remained indifferent to the news of the cage. His wife, tortured by an obsession with death, closed the doors and windows after lunch and lay for two hours with her eyes opened to the shadow of the room, while Jose' Montiel took his siesta. The clamor of many voices surprised her there. Then she opened the door to the living room and found a crowd in front of the house, and Balthazar with the cage in the middle of the crowd, dressed in white, freshly shaved, with that expression of decorous candor with which the poor approach the houses of the wealthy.
"What a marvelous thing!" Jose Montiel's wife exclaimed, with a radiant expression, leading Balthazar inside. "I've never seen anything like it in my life," she said, arid added, annoyed by the crowd which piled up at the door: "But bring it inside before they turn the living room into a grandstand."
Balthazar was no stranger to Jose Montiel's house. On different occasions, because of his skill and forthright way of dealing, he had been called in to do minor carpentry jobs. But he never felt at ease among the rich. He used to think about them about their ugly and argumentative wives, about their tremendous surgical operations, and he always experienced a feeling of pity. When he entered their houses, he couldn't move without dragging his feet.
"Is Pepe home?" he asked.
He had put the cage on the dining-room table.
"He's at school," said Jose' Montiel's wife. "But he shouldn't be long," and she added, "Montiel is taking a bath."
In In reality, Jose Montiel had not had time to bathe. He was giving himself an urgent alcohol rub, in order to come out and see what was going on. He was such a cautious man that he slept without an electric fan so he could watch over the noises of the house while he slept.
"Adelaide!" he shouted. "What's going on?"
"Come and see what a marvelous thing!" his wife shouted.
Jose Montiel, obese and hairy, his towel draped around his neck, appeared at the bedroom window.
"What is that?"
'Tepe's cage," said Balthazar.
His wife looked at him perplexedly.
"Whose?"
"Pepe's," replied Balthazar. And then, turning toward Jose Montiel, "Pepe ordered it."
Nothing happened at that instant, but Balthazar felt as if someone had just opened the bathroom door on him. Jose Montiel came out of the bedroom in his underwear.
"Pepe!" he shouted.
"He's not back," whispered his wife, motionless.
Pepe appeared in the doorway. He was about twelve, and had the same curved eyelashes and was as quietly pathetic as his mother.
"Come here," Jose' Montiel said to him. "Did you order this?"
The child lowered his head. Grabbing him by the hair, Jose Montiel forced Pepe to look him in the eye.
"Answer me."
The child bit his lip without replying.
"Montiel," whispered his wife.
Jose' Montiel let the child go and turned toward Balthazar in a fary. "I'm very sorry, Balthazar," he said. "But you should have consulted me before going on. Only to you would it occur to contract with a minor." As he spoke, his face recovered its serenity. He lifted the cage without looking at it and gave it to Balthazar.
"Take it away at once, and try to sell it to whomever you can," he said. "Above all, I beg you not to argue with me." He patted him on the back and explained, "The doctor has forbidden me to get angry."
The child had remained motionless, without blinking, until Balthazar looked at him uncertainly with the cage in his hand. Then he emitted a guttural sound, like a dog's growl, and threw himself on the floor screaming.
Jose Montiel looked at him, unmoved, while the mother tried to pacify him.
"Don't even pick him up," he said. "Let him break his head on the floor, and then put salt and lemon on it so he can rage to his hearts content." The child was shrieking tearlessly while his mother held him by the wrists.
"Leave him alone," Jose Montiel insisted.
Balthazar observed the child as he would have observed the death throes of a rabid animal. It was almost four o'clock. At that hour, at his house, Ursula was singing a very old song and cutting slices of onion.
"Pepe," said Balthazar.
He approached the child, smiling, and held the cage out to him. The child jumped up, embraced the cage which was almost as big as he was, and stood looking at Balthazar through the wirework without knowing what to say. He hadn't shed one tear.
"Balthazar," said Jose Montiel softly. "I told you already to take it away."
"Give it back," the woman ordered the child.
"Keep it," said Balthazar. And then, to Jose Montiel: "After all, that's what I made it for."
Jose Montiel followed him into the living room. "Don't be foolish, Balthazar," he was saying, blocking his path. "Take your piece of furniture home and don't be silly. I have no intention of paying you a cent."
"It doesn't matter," said Balthazar. "I made it expressly as a gift for Pepe. I didn't expect to charge anything for it."
As Balthazar made his way through the spectators who were blocking the door, Jose Montiel was shouting in the middle of the living room. He was very pale and his eyes were starting to get red.
"Idiot!" he was shouting. "Take your trinket out of here. The last thing we need is for some nobody to give orders in my ,house. Son of a bitch!"
In the pool hall, Balthazar was received with an ovation.
Until that moment, he thought that he had made a better cage than ever before, that he'd had to give it to the son of Jose Montiel so he wouldn't keep crying, and that none of these things was particularly important. But then he realized that all of this had a certain importance for many people, and he felt a little excited.
"So they gave you fifty pesos for the cage."
"Sixty," said Balthazar.
"Score one for you," someone said. "You're the only one who has managed to get such a pile of money out of Mr. Chepe Montiel. We have to celebrate."
They bought him a beer, and Balthazar responded with a round for everybody. Since it was the first time he had ever been out drinking, by dusk he was completely drunk, and he was talking about a fabulous project of a thousand cages, at sixty pesos each, and then of a million cages, till he had sixty million pesos.
"We have to make a lot of things to sell to the rich before they die," he was saying, blind drunk. "All of them are sick, and they're going to die. They're so screwed up they can't even get angry anymore."
For two hours he was paying for the jukebox, which played without interruption. Everybody toasted Balthazar’s health, good luck, and fortune, and the death of the rich, but at mealtime they left him alone in the pool hall.
Ursula had waited for him until eight, with a dish of fried meat covered with slices of onion. Someone told her that her husband was in the pool hall, delirious with happiness, buying beers for everyone, but she didn't believe it, because Balthazar had never got drunk. When she went to bed, almost at midnight, Balthazar was in a lighted room where there were little tables, each with four chairs, and an outdoor dance floor, where the plovers were walking around. His face was smeared with rouge, and since he couldn't take one more step, he thought he wanted to he down with two women in the same bed. He had spent so much that he had had to leave his watch in pawn, with the promise to pay the next day. A moment later, spread-eagled in the street, he realized that his shoes were being taken off, but he didn't want to abandon the happiest dream of his life. The women who passed on their way to five- o'clock Mass didn't dare to look at him, thinking he was dead.
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Monday, February 13, 2023
প্রকৃতির সৌন্দর্য বাংলাদেশের পাখি by মোস্তফা কামাল গাজী

নানা রং আর রূপের বৈচিত্র্যময় পাখিরা বাংলাদেশকে করেছে রূপময়। ভোরের আলো ফুটতেই ঝোপঝাড় আর বন-জঙ্গল থেকে ভেসে আসে পাখিদের মিষ্টি-মধুর কলতান। সকালের হিমেল হাওয়া আর পাখিদের হৃদয়কাড়া গানে মনটা আরও সতেজ হয়ে ওঠে। বিকালে আকাশের দিগন্তে উড়তে দেখা যায় ঝাঁকে ঝাঁকে নাম না জানা পাখিদের। সন্ধ্যায় নীড়ে ফিরে কিচিরমিচির রব তোলে। এই পাখিদের কারণেই আমাদের দেশটা এত সুন্দর, এত মুগ্ধকর। অন্যসব প্রাণীর মতো পাখিরাও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা জানে এবং নিজ নিজ ভাষার পদ্ধতিজ্ঞানে তা পালন করে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘তুমি কি দেখো না যে আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যারা আছে, তারা এবং উড্ডীয়মান পক্ষিকুল তাদের পাখা বিস্তার করে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই জানে তার প্রার্থনার এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পদ্ধতি। তারা যা করে আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।’ (সূরা নুর : ৪১)।
আল্লাহর নবী হজরত সুলায়মান (আ.) কে পাখিদের ভাষা শিক্ষা দেওয়ার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘সুলায়মান হয়েছিল দাউদের উত্তরাধিকারী এবং বলেছিল, হে মানুষ! আমাকে পাখিকুলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে...এটা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।’ (সূরা নাহল : ১৬)।
নানা বর্ণ আর বহু প্রজাতির পাখির বসবাস রয়েছে এ দেশে। এর মধ্যে রয়েছে জলচর, স্থলচর, উভচর, গায়ক, কথক ইত্যাদি পাখি। বাংলাদেশে দেখতে পাওয়া যায় এমন কিছু পাখির পরিচিতি নিম্নে তুলে ধরা হলো।
দোয়েল
দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি। বাংলাদেশে প্রায় সব জায়গায় এদের দেখতে পাওয়া যায়। পুরুষ দোয়েলের উপরিভাগ চকচকে নীলাভ-কালো। ডানা স্পষ্ট সাদা লম্বা দাগসহ কালচে বাদামি রঙের। লেজ কালো তবে প্রান্ত অংশ সাদা। স্ত্রী দোয়েলের দেহের কালো অংশগুলো বাদামি এবং ময়লা বালির মতো দেখায়। গাছের প্রাকৃতিক খোঁড়লে কিংবা ঝোপঝাড়ে এরা বাসা বাঁধে। সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় ঝোপঝাড়যুক্ত বন, বাগান, গ্রাম তথা লোকালয়ে এদের দেখতে পাওয়া যায়। মিষ্টি মোলায়েম শিস দিয়ে লেজের ডগা নাচায়। স্থিরভাবে বসা অবস্থায় দোয়েলের লেজ মোরগের লেজের মতো দেখায়। প্রজনন ঋতুতে পুরুষ দোয়েল খুব ভোরে এবং পড়ন্ত দুপুরে সুরেলা গলায় অত্যন্ত জোরে গান গায়। অন্য পাখির ডাকও এরা নকল করতে পারে। দোয়েল প্রধানত পোকা-মাকড়, কীটপতঙ্গ খায়। এপ্রিল থেকে জুলাই মাস এদের প্রজনন ঋতু। স্ত্রী দোয়েল ৩ থেকে ৫টি ডিম দেয়। সাধারণভাবে ডিমগুলো ফ্যাকাশে মনে হয়। তবে দোয়েলের ডিমের রং লালচে-বাদামি আভা ও ছোপযুক্ত নীলাভ সবুজ হয়ে থাকে। স্ত্রী দোয়েল ডিমে তা দেয়। দোয়েল ১৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে।
কোকিল
কুহু কুহু ডাকা লাল চোখের কালো পাখিটি আমাদের অতি পরিচিত কোকিল। কুলি বা এশীয় কোকিল নামেও পরিচিত। ঠোঁটের আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত কোকিলের দৈর্ঘ্য ৪০ থেকে ৪৩ সেন্টিমিটার। ওজন ১৭০ গ্রাম। পুরুষের দেহের পালক কুচকুচে কালো ও তাতে সবুজ আভা রয়েছে। অন্যদিকে, স্ত্রীর বাদামি দেহে অসংখ্য সাদা ছিট ও রেখা আঁকা। পুরুষের ঠোঁট চকচকে সবুজ হলেও স্ত্রীর হালকা ধূসর। চোখ টকটকে লাল। পা, পায়ের পাতা ও নখ কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে মায়ের মতো।
কোকিল বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই দেখা যায়। মূলত একাকী থাকতে পছন্দ করে। প্রজননকাল ছাড়া সচরাচর জোড়ায় দেখা যায় না। ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের পাকা ফল এদের প্রিয়। গাছের ছায়ার পাতার আড়ালে থাকতেই ভালোবাসে। পুরুষ কোকিল গলায় মধুর সুর তুললেও স্ত্রী কোকিল নীরব থাকে।
মার্চ-আগস্ট কোকিলের প্রজনন মৌসুম। এ সময় পুরুষ স্ত্রীকে গলায় সুর তুলে আকৃষ্ট করে ও মিলিত হয়। এরা কিন্তু বাসাও বানায় না, ডিমেও তা দেয় না। ডিম পাড়ার সময় লুকিয়ে কাক, হাঁড়িচাঁচা বা শালিকের বাসায় ডিম পাড়ে। ধাত্রী পাখির ডিমের সঙ্গে মিল রেখে ডিম পাড়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালা এদের দিয়েছেন। বংশধর নিশ্চিত করতে একটি বাসায় ডিম না পেড়ে কয়েকটি বাসায় ডিম পাড়ে। বিভিন্ন বাসায় ডিমের সংখ্যা ৪ থেকে ৬টি। না বুঝে কাক ও অন্য পাখি এদের ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ১২ থেকে ১৩ দিনে। ছানা ১৮ থেকে ২০ দিনে বড় হয়ে উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।
ময়না
কথা বলতে পারে বলে অনেকে শখ করে ময়না পুষে থাকেন। এরা দেখতে বেশ দৃষ্টিনন্দন। ময়না পাখি পাহাড়-টিলাঘেরা বন পছন্দ করে। সিলেট ও চট্টগ্রামের বন-জঙ্গলে এ পাখি দেখতে পাওয়া যায়। রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী, গুলশান, বারিধারা ও ধানমন্ডির অনেক বাসা ও ফ্ল্যাটে এদের পুষতে দেখা যায়।
ময়না পাখির রং কালো। শরীরের কিছু অংশজুড়ে হলুদে রঙের। ঠোঁট কমলা-লাল। চোখের নিচে ও মাথার পেছনে হলুদ রঙের চওড়া রেখা রয়েছে। এ রেখার জন্য ময়নাকে খুবই সুন্দর দেখায়। পাখিটি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি মিষ্টি এদের গলা। এমনকি এরা অন্য পাখির ডাকও নকল করতে পারে। গলায় তুলতে পারে নানা রকম বিচিত্র শব্দ। শীতকাল ছাড়া অন্য যে কোনো সময় ময়না বাসা তৈরি করে। পাহাড়-টিলার ফাঁকফোকরে এবং উঁচু গাছের কোটরে ঘাস-লতা দিয়ে বাসা তৈরি করে। স্ত্রী ময়না একসঙ্গে দুই থেকে তিনটি ডিম পাড়ে, ডিমের রং নীলচে হয়। পুরুষ ও স্ত্রী ময়না পালাক্রমে ডিমে তা দেয়। ১৫ থেকে ১৭ দিন পর ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে। বাচ্চারা চোখ ফোটার ১৫ দিন পর উড়তে পারে। এরা দলবেঁধে থাকতে পছন্দ করে। প্রভুভক্ত হয় ময়না পাখি। প্রভুর যে কোনো বিপদে-আপদে চিৎকার করে শক্রপক্ষকে ব্যস্ত রাখে। এরা পোকা-মাকড়, ছোলা, কচি পাতা খেতে পছন্দ করে। অনেক ময়না কলা ও কামরাঙ্গা খেতে ভালোবাসে। ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানা ও গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে ময়না পাখির দেখা মেলে।
শালিক
শালিক বেশ কয়েক ধরনের হয়। সাদা-কালো শালিককে ডাকা হয় গো-শালিক বা গোবরে-শালিক নামে। এদের ঠোঁটের রং গাঢ় কমলা-হলুদ এবং চোখের মণি হালকা হলুদ রঙের। অন্যদিকে ঝুঁটি-শালিকও সাদা-কালো রঙের হয় কিন্তু এর মাথায় একটি ঝুঁটি রয়েছে। গাঢ় বাদামি শালিককে বলা হয় ভাত শালিক। এদের ঠোঁট ও পা উজ্জ্বল হলুদ রঙের। এর বাইরেও রয়েছে গাঙশালিক, বামন-শালিক ইত্যাদি।
শালিকের স্বরতন্ত্রী বেশ জটিল হওয়ায় এদের ডাক বিচিত্র ও বিভিন্ন স্বরে ওঠানামা করে। এরা খুব সহজেই আশপাশের আওয়াজ আর মানুষের কথা অনুকরণ করতে পারে। এরা মানুষের গলার স্বর শুনে নির্দিষ্ট কাউকে চিনতে সক্ষম হয়। বর্তমানে এরা মানব ভাষা বিষয়ক গবেষণার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। গায়ক পাখি হিসেবেও শালিকের সুনাম রয়েছে, তবে কাঠ-শালিক সবচাইতে ভালো গাইতে পারে। প্রায় সব প্রজাতির শালিকই বিভিন্ন স্বরে ডাকতে পারে এবং অন্য শালিকের কণ্ঠ নকল করতে পারে।
সামাজিক পাখি হিসেবে শালিকের সুনাম রয়েছে। এরা দলবেঁধে ডাকে ও বসবাস করে।
টিয়া
খুবই পরিচিত একটি পাখি টিয়া। সবুজ রঙ, লম্বা লেজ ও বড় চ্যাপ্টা ঠোঁট দেখলেই সবাই টিয়া পাখি চিনে ফেলে। বাংলাদেশে মোট ৬ প্রকার টিয়া পাওয়া যায়। যেমনÑ বাসন্তী লটকন টিয়া। লাল ঠোঁট ও সবুজ দেহের সুন্দর গোলগাল এই টিয়া। এর লেজ অন্য টিয়াদের মতো লম্বা নয় বরং খাট। এর কোমরের কিছু পালক লাল হয়ে থাকে। সচরাচর পারিবারিক দল বা ঝাঁকে এদের পাওয়া যায়। বাংলাদেশের কাপ্তাইয়ের ন্যাশনাল পার্কে বেশি দেখা যায়। এরা ডুমুর ফল, বট ফল, বাঁশ বীজ, ফুলের মিষ্টি রস খেয়ে থাকে। এরা গাছে উল্টো করে ঝুলে থাকতে, খাবার খেতে ও বিশ্রাম নিতে পছন্দ করে। খাঁচায় পালনের জন্য এই টিয়া অনেক জনপ্রিয়।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Sunday, February 12, 2023
ভি এস নাইপল : জীবন ও সাহিত্য by নুরুল করিম নাসিম

নাইপল পেয়েছিলেন ৮৬ বছরের (১৭ আগস্ট ১৯৩২-১১ আগস্ট ২০১৮) চড়াই-উতরাই পার হওয়া এক সংগ্রামমুখর জীবন। জন্ম ত্রিনিদাদে ১৯৩২ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) পরে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) প্রাক্কালে। তার পূর্বপুরুষরা বিশেষত প্রপিতামহ ছিলেন হতদরিদ্র। জন্মভূমি ভারত থেকে দারিদ্র্যের কারণে দেশত্যাগী হয়েছিলেন ১৮৮০ সালে। তাঁর মতো দরিদ্র ও ভাগ্যহত মানুষদের ব্রিটিশরা জাহাজভর্তি করে দক্ষিণ আমেরিকার কাছাকাছি ক্যারিবীয় অঞ্চলের এক ছোট দ্বীপে, যার নাম ত্রিনিদাদ সেখানে, নিয়ে গিয়েছিল। চাগুয়ানা নামে এক ক্ষুদ্র মফস্বল শহরে নানাবাড়িতে নাইপলের জন্ম। প্রপিতামহ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভুদের আখের খামারে দিনান্ত পরিশ্রম করে জীবনযাপন করতেন। সাত বছর বয়সে রাজধানী শহর পোর্ট অব স্পেনে চলে আসেন নাইপল। সেখানে তাঁর স্কুলজীবন অতিবাহিত হয়। সেটাও ছিল নানাবাড়ি। বিরাট একান্নবর্তী পরিবার। সবসময় কলহ আর কোলাহলে পরিপূর্ণ। এরকম জীবন তাঁর ভালো লাগেনি। অপরিসীম দারিদ্র্য আর অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত এরকম জীবন তাঁকে মানসিকভাবে পীড়িত করে তোলে। ১৮ বছর বয়সে একটা বৃত্তি পাওয়ার ফলে তিনি পড়াশোনা করতে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে চলে আসেন। জন্মভূমি ত্রিনিদাদকে বিদায় জানিয়ে কাক্সিক্ষত শহরে এসে তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁর পিছু পিছু আসে। ব্যয়বহুল শহর লন্ডনে তিনি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। সামাজিকভাবেও তাঁকে নিপীড়িত হতে হয়। অশ্বেতাঙ্গ নাইপলের, বর্ণবাদের কারণে, প্রতিষ্ঠিত হতে বেশ বিলম্ব হয়। নিজেকে তিনি অনাহূত এবং আগন্তুক হিসেবে আবিষ্কার করেন। প্যাট্রেসিয়া অ্যান হেইল নামে এক ব্রিটিশ সহপাঠিনীর সঙ্গে এই সময় তাঁর প্রেম হয়। প্রথম পরিচয় থেকে প্রণয় এবং প্রণয় থেকে বিয়ে (১৯৫৫)। শুরু হয় জীবনের এক নতুন পর্ব। প্যাট্রেসিয়া তাঁর জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসেন। নাইপল এ-সময় অর্থসংকটে ডুবেছিলেন। প্যাট্রেসিয়ার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে তাঁর জীবন চলে। বলা চলে, এই ইংরেজ শ্বেতাঙ্গ নারী শুধু স্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন নাইপলের অঘোষিত সেক্রেটারি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত (১৯৯৬) প্যাট্রেসিয়া তাঁর পাশে ছায়ার মতো ছিলেন।
নাইপল প্যাট্রেসিয়াকে স্ত্রী হিসেবে কতটুকু মর্যাদা দিয়েছেন, তা এক বিতর্কিত বিষয়। নাইপলের জীবনীকার প্যাট্রিক ফ্রেঞ্চ (Patrick French) তাঁর দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ হোয়াট ইট ইজ (The World is What it is)গ্রন্থে এ-প্রসঙ্গে অনেক কথা লিখেছেন : তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল বন্ধ্যা ও অসুখী। তিনি নিয়মিত বেশ্যাগমন করতেন। মার্গারেট গুডিং নামে এক অ্যাংলো আর্জেন্টাইন নারীর সঙ্গে প্রবল যৌনসম্পর্ক ছিল তাঁর। ব্যক্তিগত জীবনাচরণে ছিলেন অসহিষ্ণু, উদ্ধত, বদমেজাজি, দুর্মুখ ও অত্যাচারী। রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল।
১৯৫২ সালে নাইপল মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। বিপুল অর্থকষ্ট, বই ছাপার ব্যাপারে নতুন অশ্বেতাঙ্গ লেখক নাইপলের প্রতি প্রকাশকদের অসম্ভব অনীহা তাঁকে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করে ফেলে। এ-সময় তিনি আত্মহত্যার কথাও ভাবেন। কিন্তু মহীয়সী নারী প্যাট্রেসিয়া তখন তাঁর পাশে থেকে তাঁকে সাহস জোগান, তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন, তাঁকে সুস্থ করে তোলেন।
শুরু হয় জীবনের এক নতুন অধ্যায়। এ-সময় বিবিসি-তে সপ্তাহে একদিন ‘ক্যারিবিয়ান ভয়েস’ অনুষ্ঠানটি তিনি উপস্থাপন করতেন। একদিন বিবিসির ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিকদের কক্ষে বসে ‘বোগার্ট’ (Bogart) গল্পটি লেখেন, যা পরবর্তী সময়ে মিগুয়েল স্ট্রিট (Miguel Street) গল্পগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয় এবং পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। লন্ডনের এক সহৃদয় প্রকাশক তাঁকে উপন্যাস লিখতে উৎসাহিত করেন। কালক্ষেপণ না করে নাইপল দ্রুত দ্য মিস্টিক ম্যাসিউর (The Mystic Masseur) লিখে ফেলেন এবং তা ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয়।
এরপর তাঁর বাবা ও প্রপিতামহের জীবনের দরিদ্র ও করুণ কাহিনি নিয়ে আ হাউজ ফর মি. বিশ্বাস (A House for Mr. Biswas) লিখে অভূতপূর্ব খ্যাতি অর্জন করেন ১৯৬১ সালে। এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসে তিনি একটি পরিবারের সংগ্রামমুখর জীবনের চালচিত্র তুলে ধরেন।
এ-উপন্যাসটি লেখার পর তাঁর মনে হলো, এরপর তাঁর আর কিছু লেখার নেই। লেখার সব রসদ তাঁর ফুরিয়ে গেছে। তিনি ভ্রমণ শুরু করেন। তাঁর ধমনিতে ছিল ভ্রমণস্পৃহা ও অপরিসীম ভ্রমণতৃষ্ণা। তিনি নতুন জায়গা, ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন মানুষ দেখতে পছন্দ করতেন।
শুরু হলো তাঁর লেখক-জীবনের দ্বিতীয় পর্ব। ১৯৬২ সালে তিনি ভারত ভ্রমণে যান, যেখানে একদা তাঁর পিতামহ পরম দরিদ্রতার ভেতর বসবাস করতেন। তিনি ভীষণ হতাশ হন, তাঁর স্বপ্নভঙ্গ হয়। তিনি এই অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি প্রবন্ধের বই অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস (An Area of Darkness) লেখেন। ১৯৬৪ সালে বইটি প্রকাশের পর তিনি কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হন। ভারত সরকার বইটি নিষিদ্ধ করে।
তবু ভারত, তাঁর পিতামহের জন্মভূমি, তাঁকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে। তাঁর নিজস্ব কোনো স্মৃতি নেই, তবুও বারবার তিনি ভারত ভ্রমণ করেন, সর্বসাকল্যে ভারত বিষয়ে তিনটি প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেন।
১. অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস (১৯৬৪)
২. ইন্ডিয়া : এ ওন্ডেড সিভিলাইজেশন (১৯৭৭)
৩. ইন্ডিয়া : এ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাও (১৯৯০)
তিনটি বই-ই কঠোর সমালোচনার শিকার হয়।
নাইপলের প্রিয় বিষয় গৃহহীনতা, শেকড়হীনতা (rootlessness), সংস্কৃতির (conversion of culture) এবং ধর্মান্তরের রূপান্তর। ১৯৭৯ সালে, এই কৌতূহল ও আগ্রহ থেকে তিনি এশিয়ার চারটি অনারবীয় দেশ ইরান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তান ভ্রমণের পর লেখেন – অ্যামাং দ্য বিলিভারস : অ্যান ইসলামিক জার্নি © (Among the Believers : An Islamic Journey)। বইটি ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর এসব দেশের সাহিত্য-সমালোচকরা রুষ্ট হন। তিনি আবার সমালোচনার শিকার হন। সতেরো বছর পর এই চারটি দেশ আবার ভ্রমণ করে ১৯৯৫ সালে লেখেন বেয়ন্ড বিলিফ : ইসলামিক এক্সকারসন্স অ্যামাং দ্য কনভার্টেড পিপলস (Beyond Belief : Islamic Excursions among the Converted Peoples)।
অনারব এবং ধর্মান্তরিত মুসলমানদের বিষয়ে লেখা এই দুটো ভ্রমণকাহিনি নাইপল সম্পর্কে বিতর্কের সৃষ্টি করে। তিনি আবার প্রশ্নবিদ্ধ হন। দ্বিতীয় বইটি তিনি পাকিস্তানি সাংবাদিক ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী, ১৯৯৬ সালে যাঁর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়, তাঁর উদ্দেশে উৎসর্গ করেন।
সালমান রুশদী তাঁর এক প্রবন্ধে ভি এস নাইপল সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন : ‘একটি দেশ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতি সম্পর্কে এত অল্পসময়ে এরকম মতামত দেওয়া যায় না। বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকে দেখতে হয়।’
নাইপল গবেষক নন; তিনি আখ্যায়ক, খালি চোখে তিনি যা অবলোকন করেছেন, তা-ই বর্ণনা করেছেন। বেয়ন্ড বিলিফ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন : ÔThis is a book about people. It is not a book of opinion. It is a book of stories.’
বইটিতে তিনি ওই চারটি দেশের মানুষ সম্পর্কে লিখেছেন। গল্পের আঙ্গিকে সেসব দেশের মানুষের জীবনযাপনের কথা, প্রান্তিক মানুষদের কথা লিখেছেন। তিনি তাঁর সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছেন এভাবে : ÔThe theme of conversion was always there; but I didn’t see is as clearly as I saw it on this second journey.’
নাইপল তাঁর দ্বিতীয় ভ্রমণে, তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থে, Beyond Belief-এ অনেক বেশি সংযত, অনেক বেশি নৈর্ব্যক্তিক, অনেক বেশি সচেতন। তিনি লিখেছেন : ÔWhen I started on this journey in 1979 I knew almost nothing about Islam – it is the best way to start on a venture – and that first book was an exploration of the details of the faith…’
তাঁর এই অনুসন্ধান থেমে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি পরিণত হয়েছেন, ঋদ্ধ হয়েছেন।
নাইপল ১৯৭১ সালে বুকার পুরস্কার পান। ১৯৭৩ সাল থেকে নোবেল পুরস্কারের হ্রস্ব-তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়; কিন্তু তিনি সেই কাক্সিক্ষত এবং প্রত্যাশিত পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হন বিতর্কিত হওয়ার কারণে। তিনি যখন আফ্রিকা ভ্রমণ করেন ও সেই দেশ সম্পর্কে লেখেন দ্য মাস্ক অব (The Masque of Africa : Glimpses of African Belief), তখনো সমালোচনার ঝড় ওঠে। তিনি আসলে একটি দেশের নৃতত্ত্ব, সমাজ-কাঠামো, ইতিহাস এসব বিষয়ে গভীর হোমওয়ার্ক করেননি বলে সাহিত্য-সমালোচকরা মনে করেন।
নাইপলকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে বিশ্বের আন্তর্জাতিক সম্মাননা নোবেল পুরস্কারের জন্য এবং শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালে তিনি এই পুরস্কার পান। তাঁর বই প্রকাশের জন্য আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো এগিয়ে আসে।
তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্মকে দুভাগে বিভক্ত করা যায়। এক. সৃজনশীল উপন্যাস (fiction) এবং দুই. প্রবন্ধ (non-fiction)। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসগুলো :
১ A House for Mr. Biswas (১৯৬১)
২. A Bend in the River (১৯৭৯)
৩. A Way in the World (১৯৯৪)
৪. In a Free State (১৯৭১)
৫. The Enigma of Arrival (১৯৮৭)
এ-উপন্যাসগুলোতে তিনি শেকড়হীন মানুষের উন্মূল বেদনার মর্মান্তিক আখ্যান তুলে ধরেছেন। গৃহহীনতা ও স্থানচ্যুতি – এই বিষয়দুটি তাঁর প্রিয় বিষয় হিসেবে উল্লিখিত অধিকাংশ উপন্যাসে ঘুরেফিরে এসেছে। আত্মজৈবনিক আঙ্গিক ব্যবহার করে তিনি স্মৃতিময়তা, আত্মকথন এবং স্মৃতিচিত্রের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। উপন্যাসগুলোতে নৈরাশ্য, উন্নাসিকতা এবং হতাশার হাহাকার প্রতিটি পৃষ্ঠাকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে।
কিন্তু এতকিছুর পরও সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর গদ্য – তাঁর সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত বাক্যের চাতুর্যময় ব্যবহার, যা পাঠককে এক মায়াময় পৃথিবীতে নিয়ে যায়। পাঠক তাঁর উপন্যাস শুরু করলে শেষ না করে থামতে পারেন না। এই শিল্পচাতুর্য একজন শক্তিশালী লেখকের খুব শানিত এক অস্ত্র।
চরিত্রচিত্রণেও নাইপলের মুন্শিয়ানা আমাদের অভিভূত ও মুগ্ধ করে।
তিনি তিরিশটির অধিক বই লিখেছেন এবং এই বইগুলোতে অসংখ্য বৈপরীত্যের সমাহার আমাদের বিস্মিত করে।
নাইপল মূলত আখ্যায়ক এবং গাল্পিক। তিনি যখন ভ্রমণকাহিনি রচনা করেন সেখানেও গল্প খোঁজেন। সেই গল্প কিংবদন্তি ও ইতিহাসের ভেতর সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। তিনি তাঁর প্রবন্ধের বই A Writer’s People : Ways of Looking and Feeling-এ এসব কথা অবলীলাক্রমে আত্মজৈবনিক আঙ্গিকে বলেছেন।
নাইপলের বাবা সিপেরসাদ নাইপল ছিলেন ইংরেজি পত্রিকার সাংবাদিক এবং তাঁর স্বপ্ন ছিল একজন লেখক হওয়ার। ১৯২৯ সালে তিনি ত্রিনিদাদ গার্ডিয়ানে (Trinidad Guardian) নিয়মিত প্রদায়ক হিসেবে লেখা দিতে শুরু করেন। মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সে তিনি মারা যান (১৯০৬-৫৩)।
ভিএস নাইপল তাঁর ভ্রমণকাহিনিগুলোতে আত্মজৈবনিক উপাদানের পাশাপাশি ইতিহাসের খুঁটিনাটি বিষয় ব্যবহার করার প্রয়াস পেয়েছেন। ত্রিনিদাদের ওপর লেখা দ্য লস অব এলডোরাডো (The Loss of El Dorado) মূলত ত্রিনিদাদের ঐতিহাসিক আখ্যান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বর্ণনা, স্মৃতিময়তা এবং স্মৃতিকথন উপন্যাসটিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
গত চার বছরে নাইপলের বেশকিছু প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিক্ষিপ্তভাবে ছাপা হয়েছে। এগুলো গ্রন্থিত হয়ে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হলে পাঠক উপকৃত হবেন।
দুটি গল্পগ্রন্থ মিগুয়েল স্ট্রিট (Miguel Street) এবং আ ফ্ল্যাগ অন দ্য আইল্যান্ড (A Flag on the Island) অনেকটা নকশা-জাতীয়। তিনি গল্পের চেয়ে উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং ভ্রমণকাহিনির প্রতি বেশি সিরিয়াস ছিলেন, অধিকতর নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত প্যাট্রেসিয়া এবং নাইপল মিলে সাত হাজার দুশো পাউন্ডে লন্ডনের স্টকওয়েল পার্ক ক্রিসেন্ট এলাকায় তিন ফ্লোরবিশিষ্ট একটি অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় করেন। ত্রিনিদাদ থেকে লন্ডন এবং লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস, কিন্তু তারপরও নিজেকে তাঁর আগন্তুক বা outsider মনে হতো, এক উদ্বাস্তু চেতনা তাঁকে সারাজীবন কুরে কুরে খেয়েছে। তিনি ছিলেন নিজগৃহে পরবাসী, কোথাও তিনি মানসিকভাবে থিতু হতে পারেননি। তবে লন্ডন তাঁর জীবনদর্শন বদলে দিয়েছিল।
তিনি তাঁর আত্মজৈবনিক প্রবন্ধ সংকলন আ রাইটারস পিপল (A Writer’s People: Ways of Looking and Feeling) গ্রন্থে লিখেছেন :
I had lived all my writing life in England; that had to be acknowledged, had to be part of my world view. I had been a serious traveller; that had to be acknowledged as well.
এ-কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, তাঁর লেখালেখি-জীবনের সবটুকু সময় ইংল্যান্ডে কেটেছে এবং এই ইংল্যান্ড তাঁর জীবনদৃষ্টি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে, বলা চলে তাঁকে বিনির্মাণ করেছে, জীবন ও জগৎকে তিনি ভিন্নভাবে অবলোকন করতে শিখিয়েছে। সেটাই তাঁর world view,পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Thursday, February 9, 2023
ডাকাতি করতে ব্যর্থ, ক্ষমা চেয়ে নোট রেখে গেলো ডাকাতরা
ডাকাতরা চিরকুটে লিখেছিলো - ‘আমরা দুঃখিত, নিচে স্বাক্ষর করে নাম লেখা ছিলো ‘চুন্নু ও মুন্নু। সকালে দীপক কুমার নামে দোকানের মালিক ডাকাতির ঘটনার তদন্ত করতে পুলিশকে ফোন করেন। মজার বিষয় হলো, পুলিশরা তদন্ত করতে এসে দেখতে পান যে চোরেরা ভগবান কৃষ্ণের একটি ছবির সামনে অপরাধ করতে এতটাই অস্বস্তি বোধ করেছিল যে তারা এটিকে দেয়ালের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। ঘটনার কথা বলতে গিয়ে দোকানের মালিক হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, “বুধবার রাতে ডাকাতরা দোকানে ঢুকে গ্যাস কাটার দিয়ে ভল্ট ভাঙার চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়। চোরেরা ঠাকুরের ছবি দেখে অপরাধ করতে চায়নি এবং মূর্তিটি ঘুরিয়ে দিয়েছে। ''তবে , স্মার্ট ডাকাতরা দোকানের ভিতরে রেকর্ড করা সিসিটিভি ফুটেজের হার্ডডিস্ক সরিয়ে ফেলেছে। মিরাটের ব্রহ্মপুরী এলাকার সার্কেল অফিসার সুচিতা সিং বলেন -''সুড়ঙ্গটি অবশ্যই অনেক দিন ধরে খনন করা হয়েছে এবং আমরা সিসিটিভি ফুটেজে দেখে এলাকার লোকেদের গতিবিধি ট্র্যাক করে চোরদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। ''
সূত্র : টাইমস নাও
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Wednesday, February 8, 2023
লাল ফড়িঙের জন্মদিন by কামাল হোসাইন
![]() |
| অলংকরণ: মাসুক হেলাল |
আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নামল সে।
বাইরে বেরিয়ে বাতাসে কান পাতল। ফিসফিস করে কারা যেন কথা বলছে। গাছের পাতায়-ডালে কেবল ফিসফিসানি। কী বলছে ওরা?
শব্দটা আসছে বাড়ির সামনের ফুলের বাগান থেকে। পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল সে। জায়গাটা ফাবিহার খুব পছন্দের। প্রায়ই একা-একা এখানে চলে আসে সে। গাছ-ফুল-মৌমাছি-প্রজাপতির সঙ্গে কথা বলে। ওদের খোঁজখবর নেয়। দুষ্টু পোকামাকড়ের হাত থেকে ওদের বাঁচায়।
ওরাও ফাবিহাকে পেলে খুশিতে লুটোপুটি খায়। আহ্লাদে আটখানা হয়। আনন্দে কেউ কেউ তাকে ফুলের রেণু উপহার দেয়। কেউ মধু খেতে দেয়। কেউবা গুনগুন গান শোনায়। কেউ আবার গাছের রঙিন পাতা ঝরিয়ে ফাবিহাকে অভিবাদন জানায়।
ফাবিহা বাগানে ঢুকতেই সবার ভেতরে কেমন একটা চঞ্চলতা দেখা গেল। বাগানজুড়ে একটা সাজ সাজ রব। ঠিক অন্য দিনের মতো নয়। অন্য দিন বাগানটা কেমন শান্ত থাকে। কিন্তু আজ একেবারে ব্যতিক্রম।
কিন্তু কী হলো আজ এই বাগানটায়! ফিসফিস শব্দটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। কানে বাজছে। যেটা ও এর আগে কখনো শোনেনি। কেমন একটা গমগমে ভাব। সবাই নিজেদের মতো ব্যস্ত। হঠাৎ কোথা থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল হলুদ প্রজাপতি।
বলল, ‘ও তুমি এসেছ? খুব ভালো।’ বলেই প্রজাপতি আলতো করে তার গাল ছুঁয়ে দিল। ফাবিহার মজাই লাগল। একটু সুড়সুড়িও লাগল। খিলখিল করে হাসল ও। বলল, ‘সবাই ছোটাছুটি করছে কেন? কী হয়েছে?’
প্রজাপতিটি মিষ্টি করে হাসল। বলল, ‘তুমি জানো না? আজ আমাদের খুব মজার দিন। আজ আমরা আনন্দ করব। নাচব। গাইব।’
প্রজাপতি সব কথাই বলছে। কিন্তু আসল কথাটাই চেপে রাখছে, মানে সে রহস্যটা ভাঙতে চাইছে না এখনই। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ফাবিহাও আর জোর করল না। বলল, ‘ঠিক আছে। তোমরা আনন্দ করো। আমি এখন চলি। ভাবছিলাম, বিকেলটা বাগানেই কাটাব। কিন্তু তোমাদের যখন বিশেষ অনুষ্ঠান আছে, তাহলে থাক...।’
ফাবিহাকে কথা শেষ করতে দিল না প্রজাপতি। বলল, ‘ওমা! তুমি দেখছি রাগ করে বসে আছ। তুমি না থাকলে আজকের এই খুশির সময়টাই তো মাটি হয়ে যাবে।’
ফাবিহা বলল, ‘আমি রাগ করিনি। শুধু তোমাদের আনন্দের সময়ে বিরক্ত করতে চাইনি।’
ফাবিহার কথা শেষ হতেই আরও কয়েকটা প্রজাপতি, ফড়িং, মৌমাছি ছুটে এল। এসেই কেউ ফাবিহার গায়ে, কেউ মাথায় বসে পড়ল। মৌমাছি বলল, ‘হলদে বু দেখি আগেই তোমার কাছে এসে গেছে। কই তোমার তো এখানে আসার কথা ছিল না। হলদে বু, আমাদেরই তো এই সোনামুখো পাকা বুড়িটাকে নিয়ে আসার কথা ছিল!’
হলুদ প্রজাপতি একটু অপ্রস্তুত হলো। বলল, ‘আমি তো এখানে আসতে চাইনি মৌ। এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। এই পাকা বুড়ির সঙ্গে দেখা, তাই কথা বলছিলাম। জিজ্ঞেস করে দেখো, আমি গোপন কথার কিছুই বলিনি।’
ফাবিহা বলল, ‘হলুদ ঠিকই বলেছে। ও এখনো আমাকে তেমন কিছু বলেনি। তোমরাই বলো, আসল ব্যাপারটা কী? সেই কখন থেকে কেমন একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি!’
ফড়িং আর মৌমাছি মুখ টিপে হেসে উঠল। এরপর হলুদ প্রজাপতি, ফড়িং আর মৌমাছি প্রায় একসঙ্গেই বলল, ‘আজ আমাদের লক্ষ্মী মেয়ে লাল ফড়িঙের জন্মদিন।’
ফাবিহা হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল, ‘ওমা! তাই নাকি! এ তো দারুণ খবর। তোমরা যে ওর জন্মদিনের কথা মনে রেখে একটা উৎসবের আয়োজন করেছ, এটা জেনে খুব ভালো লাগছে।’
ফাবিহার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে হলুদ প্রজাপতি এবার বলল, ‘কেবল ভালো লাগলে চলবে না গো পাকা বুড়ি। আমাদের সঙ্গে তোমাকেও যেতে হবে। ফড়িং আর মৌমাছি তো এ জন্যই এসেছে।’
অন্যরাও বলল, ‘হ্যাঁ, তোমাকে আমাদের এই আয়োজনে থাকতেই হবে। থাকতেই হবে।’
ফাবিহা বুঝল, আর উপায় নেই। না থাকলে ওরা খুব মন খারাপ করবে। বলল, ‘ঠিক আছে। আর কোনো কথা নয়। চলো।’
প্রজাপতি, মৌমাছিরা উড়ে উড়ে পথ দেখিয়ে আগে আগে চলল। ফাবিহা চলল ওদের দেখানো পথে। বাগানের ঠিক মাঝখানটায় গিয়ে থামল ওরা।
ফাবিহা দেখল, চারদিকের ছোট ছোট ফুলের গাছগুলো দারুণ ঝকঝকে। তকতকে। মনে হচ্ছে এইমাত্র কেউ ওদের শ্যাম্পু মেখে গোসল করিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ করেই দলে দলে একঝাঁক ফড়িং, প্রজাপতি, মৌমাছি এসে হাজির। সবাই ফাবিহাকে ঘিরে উড়তে লাগল। আর গুনগুন করে গান করতে লাগল। সবাই রীতিমতো সেজেগুজে ফিটফাট হয়ে এসেছে। দেখে ফাবিহা মুগ্ধ হয়ে গেল। সামনে তাকিয়ে দেখতে পেল, একটা করমচার ঝোপ সুন্দর করে ফুলের পাপড়ি দিয়ে সাজানো। ফুলের রেণু মাখিয়ে আলাদা একটা পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
কিছুক্ষণ পর আরও কয়েকটা প্রজাপতি আর মৌমাছি ধরাধরি করে কী যেন একটা নিয়ে এল। রাখল ঝোপের ওপর সুন্দর করে সাজানো জট পাকানো পাতার ওপর।
এতক্ষণে ফাবিহা বুঝল, ওটা একটা কেক। খুব ছোট ছোট পোকা আর ফুলের মধু দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ওটাকে। ফাবিহার হাসি পেল। আবার ভালোও লাগল। বলল, ‘বাহ্, তোমরা তো ভারি সুন্দর জন্মদিন পার্টির আয়োজন করেছ! আমি এখানে না এলে তো এই মজার আয়োজনটাই মিস করতাম! কিন্তু যাকে ঘিরে এত আয়োজন, সে কোথায়?’
ফাবিহার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দুটো সোনালি রঙের প্রজাপতি একটা লাল ফড়িংকে নিয়ে হাজির। লাল ফড়িংকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। সারা শরীর উজ্জ্বল আলোয় যেন ঝলমল করছে। একদিকে বিকেলের চমৎকার সোনা-রোদের আনাগোনা। সেই রোদ গায়ে মাখার কারণে দিব্যি রোশনাই ছড়াচ্ছে চারদিকে।
লাল ফড়িংটা ফাবিহার দিকে চোখ পিটপিট করে তাকাল। ফাবিহা ওকে হাতে নিয়ে আলতো করে আদর বুলিয়ে দিল। লাল ফড়িং পাখা নাড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করল।
এরপর এল কেক কাটার সময়। সবাই হাজির। ফাবিহা ছোট্ট কেকটাকে হাতে তুলে নিল। ঘাসফড়িঙের লম্বা শুঁড় ছুরির ভূমিকা পালন করল। লাল ফড়িঙের মা-বাবা এলে কেক কাটা শুরু হলো।
সবাই গেয়ে উঠল—
হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ
হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ
হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ প্রিয় লাল ফড়িং।
হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ...
গানের তালে তালে সবাই নাচতে লাগল। আর একটু একটু করে কেক খেতে লাগল। ওদের এই আনন্দে শামিল হতে পেরে ফাবিহার খুব ভালো লাগল। ভাবল, জন্মদিনে তো উপহারও দিতে হয়। কালই একটু ভেবেচিন্তে একটা উপহার আনবে লাল ফড়িঙের জন্য।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1331)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

