Wednesday, July 16, 2025

ট্রাম্পকে বাদ দিয়ে যে বিশ্ব গড়তে চান নেতানিয়াহু by আলাঁ গাবোঁ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী আগ্রাসী যুদ্ধে একধরনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়েছে। তা সত্ত্বেও এর পরের পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে সেটা বলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি অস্থির প্রশাসন দায়িত্বে রয়েছে। স্ববিরোধিতা, বিভ্রান্তি ও নীতিগত ইউটার্ন বিবেচনায় ট্রাম্প প্রশাসন ভূরাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার এক শিল্পে উত্তীর্ণ হয়েছে।

এখন পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে তার অনেক কিছু নির্ভর করবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাটি সেখানে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভূমিকার দিক থেকে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর পেছনের আসনে চলে গেছেন।

ট্রাম্প মূলত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অনেক সময় নেতানিয়াহুর কৌশলগত চাল ও ঠান্ডা মাথার ষড়যন্ত্র দেখে অবাক ও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন, নেতানিয়াহুও সেটা করছেন।

সম্প্রতি নেতানিয়াহু ইরানে যে বোমা হামলা চালিয়েছেন, সেটা শুধু পশ্চিমা বিশ্বের ‘ইসরায়েল সমস্যা’-কে আরও জটিল করে তুলেছে। ওয়াশিংটন নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও ঘোষিত মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে বিশ্বাসহীন ও কেবলমাত্র স্বার্থান্ধ ইসরায়েলি ‘মিত্রের’ কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

ট্রাম্প নিজেকে একজন ‘যুদ্ধবিরোধী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে জাহির করেন। ২০১৯ সালে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, মহান জাতিগুলো কখনোই অনন্তকাল ধরে চলা যুদ্ধ শুরু করতে পারে না। তিনি বিদেশে উদারবাদ ও গণতন্ত্র রপ্তানিতেও আগ্রহী নন।

কিন্তু নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে পরাজিত করেছেন। এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, যেখানে ট্রাম্প রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মুখ রক্ষার জন্য হলেও হস্তক্ষেপ করার পথ বেছে নিয়েছেন।

নেতানিয়াহুর লাগাতার চাপের মুখে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সীমিত ‘সার্জিক্যাল’ হামলার সিদ্ধান্ত নেন। তবে তিনি খুব সতর্কভাবে জানিয়ে দেন যে, এই বোমাবর্ষণই এই অধ্যায়ের সমাপ্তি। ইরানের বিরুদ্ধে আর কোনো সামরিক অভিযানে যাওয়ার তাঁর ইচ্ছা বা পরিকল্পনা নেই।

কিন্তু ট্রাম্পকে বেশি দিনের জন্য সরে থাকতে দেবেন কি নেতানিয়াহু? এটা সত্যি যে মধ্যপ্রাচ্যে এখনো একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু চলমান রক্তক্ষয়ী পরিবর্তনগুলোর ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ন্ত্রক আর যুক্তরাষ্ট্র নয়, সেই ভূমিকা এখন পালন করছে ইসরায়েল।

গত মাসে যে সংঘাতের ঘটনা ঘটল তাতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের পারমাণবিক হুমকি দূর করার ঘোষিত লক্ষ্যের প্রায় কোনোটিই অর্জিত হয়নি। ঘটনাপ্রবাহ থেকে যেটা খোলাসা হয়েছে তা হলো, দীর্ঘ মেয়াদে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের জন্যও তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। এর কয়েকটি কারণ আছে।

প্রথমত, এই আক্রমণ অপ্রত্যক্ষভাবে ইরানের বর্তমান শাসকদের শক্তিকে সংহত করেছে। এর কারণ হলো, ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আক্রমণ মোকাবিলায় জাতীয় প্রতিরক্ষা ইস্যুতে ইরানের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইরান এখন হয়তো পারমাণবিক কর্মসূচি আরও জোরদার করবে এবং আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে পরমাণু বোমা তৈরির দিকে এগিয়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত, এই ঘটনার ফলে ইরান এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ–বিষয়ক চুক্তি থেকেও সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই চুক্তিতে ইসরায়েল স্বাক্ষর করেনি, কিন্তু ইরান করেছিল। বর্তমানে ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থাকে সহযোগিতার বিষয়টি স্থগিত করেছে এবং সংস্থাটির পরিদর্শকদের পরিদর্শনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

সবকিছুর পরও এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে নেতানিয়াহু অত্যন্ত কৌশলে এক ঢিলে কয়েকটি পাখি মেরেছেন।

নেতানিয়াহু অন্তত অল্প সময়ের জন্য হলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিলম্বিত করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক আলোচনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পেরেছেন। সম্ভাব্য ফ্রান্স-সৌদি সম্মেলন বানচাল করতে পেরেছেন। কেননা ওই সম্মেলন থেকে ইউরোপের দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে পারত।

নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক মনোযোগকে গাজা থেকে অন্যখানে সরিয়ে নিতে পেরেছেন। এর ফলে ইসরায়েলের পক্ষে গাজা ও দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধন ও গণহত্যা অব্যাহত রাখা আরও সহজ হয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, স্পেনসহ ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ যখন গাজা ইস্যুতে তীব্র সমালোচনা করছিল এবং ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি বা বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করেছিল, তখন নেতানিয়াহু ওই সমালোচনাগুলো স্তব্ধ করে দেন। রাতারাতি ইসরায়েলকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলোর ঐকমত্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। ফলে ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছিল, সেটা কিছুটা মজবুত হয়েছে।

সর্বোপরি, নেতানিয়াহু অবশেষে সেই লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছেন, যার জন্য তিনি কয়েক দশক ধরে চেষ্টা করে আসছিলেন। সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে ইরানে বোমাবর্ষণ করানো। এটি নেতানিয়াহুর জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে ধরা যায়।

একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিবেচনা করলে ইরানের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর যুদ্ধ ছিল তেহরানের মিত্রদের ওপর তার বহুমাত্রিক আক্রমণের সর্বশেষ পর্ব। গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনে হুতি—অক্টোপাসের শুঁড়গুলোকে নিশানা করার পর সরাসরি ‘প্রতিরোধের অক্ষের’ প্রধান ইরানকে আক্রমণ করে ইসরায়েল।

যদিও এসব সামরিক অভিযানকে নেতানিয়াহু ধারাবাহিকভাবে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করে চলেছেন। কিন্তু তাঁর মূল লক্ষ্য হলো গোটা অঞ্চলকে একটি স্থায়ী অস্থিতিশীলতার মধ্যে ফেলে দেওয়া। আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ার ওপর নেতানিয়াহুর আক্রমণ আরও একবার প্রমাণ করেছে যে ইসরায়েলের এই হিংস্র আগ্রাসনের প্রধান চালিকা শক্তি তথাকথিত ‘আত্মরক্ষা’ নয়।

শেষ পর্যন্ত, নেতানিয়াহুর লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যার কেন্দ্রবিন্দু হবে প্রশ্নাতীত ইসরায়েলি আধিপত্য ও প্রাধান্য।

যদি কেউ জানতে চায়, ইসরায়েলের আধিপত্যে পরিচালিত একটি নতুন বিশ্ব কেমন দেখতে হবে, উত্তরটা খুব সহজ। শুধু গাজার দিকে তাকালেই হবে।

* আলাঁ গাবোঁ, যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরাসি ভাষা অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেন হেরে গেলে তারপর কী হবে... by সাইমন টিসডাল

৪০ মাস ধরে ইউক্রেন রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মস্কো দেশজুড়ে বড় ধরনের আক্রমণ চালানোর পর থেকে ইউক্রেনকে বারবার ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক হামলার মুখে পড়তে হয়েছে।

এই ৪০ মাসে কয়েক হাজার মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন। কোটি মানুষ ঘরছাড়া। ইউক্রেনের শিল্পকারখানা, দোকানপাট, স্কুল, হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। উর্বর কৃষিজমি নষ্ট হয়ে গেছে। শিশুদের অনেকেই এতিম হয়েছে। অনেককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অথবা জোর করে অপহরণ করা হয়েছে।

ইউক্রেন বহুবার সাহায্যের জন্য বিশ্বের কাছে আবেদন করেছে, কিন্তু এই সহিংসতা থামানো যায়নি। সেনাসংখ্যায় কম ও অস্ত্রে দুর্বল ইউক্রেন তবু যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

এই ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যেও ইউক্রেনের সাহস আর প্রতিরোধ এতটাই সুবিদিত হয়ে গেছে যে অনেকে সেটাকে আর গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন না। যেন এটা স্বাভাবিক একটা ব্যাপার হয়ে গেছে। অথচ বাস্তবতা ভীষণ ভয়ানক। এখন প্রায় প্রতিদিনই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের বাহিনী ড্রোন দিয়ে কিয়েভসহ নানা শহরে হামলা চালাচ্ছে। এ কারণে সাধারণ মানুষ ভয়ে থাকছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য কমে গেছে, শান্তি আনার চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে, আর ইউক্রেনের সেনারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁরা ফ্রন্টলাইনে খুব অল্প গোলাবারুদ আর সরঞ্জাম নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

এই অবস্থায় যদি কেউ ইউক্রেনের সাহসের প্রশংসা না করে বা গুরুত্ব না দেয়, তাহলে সেটা বড় ভুল হবে। এখন যে প্রশ্নটা কল্পনার বিষয় নয়, বরং একদম বাস্তব, সেটি হলো: যদি ইউক্রেন হেরে যায়, তাহলে কী হবে?

এর উত্তর হলো: যদি ইউক্রেন ভেঙে পড়ে, তাহলে তা হবে পশ্চিমাদের জন্য একটি বড় কৌশলগত ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা আফগানিস্তান বা ইরাক যুদ্ধের চেয়েও বড় বিপর্যয়কর হতে পারে। ইউরোপ, ব্রিটেন, ট্রান্সআটলান্টিক জোট এবং আন্তর্জাতিক আইনের ওপর এর বিরূপ প্রভাব হবে ভয়াবহ। আমাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার জন্য এ চিন্তাই যথেষ্ট হওয়া উচিত।

২০২৩ সালের শেষ দিকে ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, ইউক্রেন জিতছে না। এ বছরজুড়ে রুশ বাহিনী দোনেৎস্কসহ ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।

নিজের যত ক্ষয়ক্ষতি হোক না কেন, তা রাশিয়া পাত্তা দিচ্ছে না। অনুমান করা হচ্ছে, রাশিয়ার হতাহত সেনার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তবু তারা থেমে নেই। যদিও রাশিয়া এখনো বড় কোনো জয় পায়নি, তবু ইউক্রেনের সেনাদের জন্য প্রতিটি দিন এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম। তাঁরা এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন; এটাও একধরনের বিস্ময়।

ইউক্রেন আর কত দিন যুদ্ধের ময়দানে, আকাশপথে এবং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে পারবে, এখন সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। দেশটি এখন সেনাসংখ্যা, গোলাবারুদ ও শত্রুপক্ষের হামলা ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সংকটে ভুগছে। তবে এখনো তারা পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম। রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলের একটি অংশে ইউক্রেনের দখল প্রতিষ্ঠা এবং গত মাসে রাশিয়ার গভীরে অবস্থিত কৌশলগত বোমারু ঘাঁটি ধ্বংস করা—এগুলো ছিল বিস্ময়কর ঘটনা। কিন্তু এ ধরনের কিছু অস্থায়ী সাফল্য আসল শক্তির ভারসাম্য বা যুদ্ধের সামগ্রিক গতিপথ বদলাতে পারছে না।

ইউক্রেন ধীরে ধীরে বিশ্বমঞ্চেও বিশ্বস্ত মিত্র হারাচ্ছে। অবশ্য অনেকেই মনে করেন, তাদের কখনোই সত্যিকারের নির্ভরযোগ্য মিত্র ছিল না। পুতিন তাঁর নিজের ‘মিত্রদের জোট’ গড়ে তুলেছেন। এই জোটে আছে চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ। তারা রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রকে সমর্থন দিচ্ছে। এর বিপরীতে পশ্চিমা দেশগুলোর জোট (যা মূলত ব্রিটেন ও ফ্রান্স নেতৃত্ব দিচ্ছে) কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ইউক্রেনকে আশ্বস্ত করতে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনাও এগোচ্ছে না।

পুতিনের একগুঁয়েমি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের অদক্ষতার কারণে কোনো যুদ্ধবিরতি সম্ভব হচ্ছে না। তেমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

গত সপ্তাহে লন্ডনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার আবারও আগের মতো ইউক্রেনের প্রতি ‘অটল সমর্থনের’ অঙ্গীকার করেছেন। এসব বলা সহজ, কিন্তু কার্যকর সামরিক সহায়তা দেওয়া অনেক কঠিন।

ইউরোপের অন্য দেশগুলোর মতো যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কাছেও এমন উন্নত অস্ত্র বা সরঞ্জাম নেই। এগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে কেবল যুক্তরাষ্ট্রই সরবরাহ করতে পারে।

এই ঘাটতি পূরণে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎস যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা কিনে তা কিয়েভকে উপহার দিতে প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও গত মাসের ন্যাটো সম্মেলনের মূল অগ্রাধিকার নিজেদের প্রতিরক্ষা। ইউক্রেনকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার পাশাপাশি জার্মানি নিজের সামরিক বাজেট তিন গুণ বাড়াচ্ছে। যুক্তরাজ্যও একই পথে হাঁটছে।

এদিকে ট্রাম্প (যাঁকে অনেকে বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘আত্মসমর্পণপ্রবণ নেতা’) এখন ইউক্রেনের কূটনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে বড় কারণ। তিনি যে একতরফা ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তা রাশিয়া প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে যে বাণিজ্যিক চুক্তি করতে চেয়েছিলেন, সেগুলোও ধোপে টেকেনি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অপমান করেছেন, আর পুতিনকে খুশি রাখতে চেয়েছেন। এখন সেই ‘অত্যন্ত স্থিতিশীল প্রতিভা’ ট্রাম্প নিজেই বলছেন, পুতিন ‘আজেবাজে’ কথা বলেন এবং তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখা যায় না।

ট্রাম্প এখন বলছেন, তিনি আবারও কিয়েভকে সীমিত পরিমাণ প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহ করবেন এবং নতুন করে কিছু নিষেধাজ্ঞাও সমর্থন করতে পারেন। কিন্তু এটি কোনো নীতিগত অবস্থান নয়, বরং এটি তাঁর ব্যক্তিগত আবেগপ্রবণ আচরণের ফল। তাঁর অহংকারে আঘাত লেগেছে এবং তিনি অপমানিত বোধ করছেন বলেই তিনি কিয়েভকে সমর্থন দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু ক্রেমলিনের কোনো নেতা যদি তাঁর একটু প্রশংসা করে কথা বলেন, তাহলে তিনি আবার হঠাৎই রাশিয়ার পক্ষে চলে যেতে পারেন। ক্ষমতা উপভোগ করতে পছন্দ করা সব নেতার মতো ট্রাম্পও স্বভাবতই শক্তিশালী পক্ষের পক্ষে থাকেন।

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। পুতিন মনে করছেন, তিনি ইউক্রেনকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে ফেলতে পারবেন, পশ্চিমা জোটকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল করে দেবেন এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ জিতবেন।

তবে এখনো সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। ট্রাম্প ইউক্রেনের পাশে থাকুন বা না থাকুন, ন্যাটো চাইলে আরও কড়া অবস্থান নিতে পারে। তারা ইউক্রেনকে অবরুদ্ধ না করে ইউক্রেনীয় অঞ্চলের ওপর বিমান উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করতে পারে এবং রাশিয়ার ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করতে পারে। সামরিকভাবে এটি করা সম্ভব। আইনি ও মানবিক দিক থেকেও এর যথেষ্ট ভিত্তি আছে।

রাশিয়া বারবার ন্যাটোর প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে। পুতিনের পারমাণবিক হুমকিগুলো (যেগুলোয় জো বাইডেন ভয় পেয়েছিলেন) আসলে হাস্যকর ছিল। ন্যাটোর যদি সাহস থাকত, তাহলে তারা পুতিনকে তার জায়গায় ফেরত পাঠাতে পারত।

পুতিনকে নিরস্ত্র করা যদি এখন সম্ভব না হয়, তাহলে অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। পশ্চিমা ব্যাংকগুলোতে রাশিয়ার সরকারের যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পড়ে আছে, সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র ও যুদ্ধ–পরবর্তী পুনর্গঠনের খরচ মেটানো উচিত। ভারতসহ যেসব দেশ এখনো রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়নি এবং যুদ্ধ থেকে মুনাফা করছে, তাদের উচিত ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধ নিয়ে সদ্য প্রকাশিত ভয়াবহ প্রতিবেদনটি পড়া এবং তারপর একটি পক্ষ বেছে নেওয়া।

এখন দুটি ফলাফলের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি: হয় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চলতে থাকবে, নয়তো ইউক্রেন পতনের দিকে এগোবে। যদি ইউক্রেন পরাজিত হয় এবং পুতিন নিজের শর্তে একটি সমঝোতা চাপিয়ে দিতে সক্ষম হন, তাহলে সেটি কেবল ইউক্রেন নয়; বরং গোটা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য একটি বিশাল কৌশলগত পরাজয় হবে। এর ফলে ইউরোপজুড়ে স্থায়ী, ক্রমবর্ধমান সংঘাতের যুগ শুরু হতে পারে।

তবে রাশিয়ার জন্যও এর কোনোটিই প্রকৃত বিজয় হবে না। এখন আরও জোরালোভাবে রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে এই যুদ্ধ তাঁদের জন্য প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ এবং আলোচনার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শেষ করা সম্ভব। যুদ্ধটি শেষ করা গেলে তাঁদের প্রকৃত নিরাপত্তার বিষয়গুলো সমাধান করা যেতে পারে। আর অন্য যেকোনো পথ তার চেয়েও ভয়াবহ হবে।

কিন্তু এর আগে একটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে, তা হলো: সবাইকে বোঝাতে হবে, রাশিয়ার এই বিপর্যয়ের মূল পরিকল্পনাকারী যিনি, সেই পুতিনকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে আন্তর্জাতিক বিচারের মুখে দাঁড় করাতে হবে। বিশ্বকে এই সিদ্ধান্তে আসতে হবে, ইউক্রেনের পতন নয়, অবিলম্বে পুতিনের পতন হওয়া উচিত।

* সাইমন টিসডাল, গার্ডিয়ানের বিদেশ নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

রাশিয়া সম্প্রতি ইউক্রেনে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে

বিজেপির রাজনীতি কীভাবে সুবিধা করে দিচ্ছে মমতার by শুভজিৎ বাগচী

কলকাতার একজন নামকরা প্রকাশক সম্প্রতি বলছিলেন তাঁর দুঃখের কথা। কীভাবে তাঁদের প্রায় ৭০ বছরের মিষ্টির দোকান পূর্ব মেদিনীপুরের দীঘায় বন্ধ করে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের এক পঞ্চায়েত নেতা। প্রকাশক বিজেপিবিরোধী, বিজেপির কাছে যেতে চান না। আবার প্রশাসনকে জানিয়েও লাভ হচ্ছে না। তারা পরামর্শ দিচ্ছে নেতার সঙ্গে ‘মিটমাট’ করে নিতে। যার অর্থ, দোকানের বেশ খানিকটা নেতাকে ছেড়ে দেওয়া। এভাবে জমি বা সম্পত্তি দখলের একাধিক অভিযোগ গত কয়েক মাসে এই ভাষ্যকার শুনেছেন।

১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার সুবাদে গায়ের জোরে সম্পত্তি-বাড়ি-জমি হাতিয়ে নেওয়াই নয়, নানা স্তরে দুর্নীতি, মানুষকে হুমকি থেকে প্রায় প্রকাশ্যে ধর্ষণ, তা–ও কলকাতার সরকারি কলেজে—এসবই চলছে ও মানুষ দেখছে। কিন্তু এসবের পরও আর আট মাস পরের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মানুষ আবার জমিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দেবেন এবং তারা জিতবে। শুধু জিতবেই না, হয়তো অতীতের চেয়ে বেশি আসন পেয়ে জিতবে। এর কারণ কী?

এর প্রধান কারণ কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনীতি। বিজেপি এমন এক নীতি ভারতজুড়ে নিয়েছে, যার ফলে অনেক জায়গায় মাথাচাড়া দিচ্ছে আঞ্চলিক জাতিভিত্তিক (এথনিক) জাতীয়তাবাদ।

একদিকে বিজেপি দৈনন্দিন জীবনে কার্যত অবলুপ্ত সংস্কৃত ভাষার প্রসারে গত ১০ বছরে অন্যান্য সব ভাষার তুলনায় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করেছে এবং অন্যদিকে হিন্দি ভাষার প্রচার ও প্রসার পূর্ণ উদ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে। এটা দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর পাশাপাশি এখন পশ্চিম বা পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর পক্ষেও মানা সম্ভব হচ্ছে না।

এর ফলে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ অর্থাৎ তামিল, মারাঠি, কন্নড় প্রভৃতি থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গসহ একাধিক রাজ্যে বিজেপির সমস্যা বাড়বে।

কেন বিজেপি এ কাজ করছে

বিজেপির যুক্তি হতে পারে, হিন্দিভাষী যেসব রাজ্যে তাদের প্রভাব বেশি, সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ এর ফলে আরও দৃঢ় হবে। এসব হিন্দিভাষী রাজ্যের মধ্যে প্রধান, যেমন উত্তর ভারতের উত্তর প্রদেশ, পূর্ব ভারতের বিহার ও ঝাড়খন্ড এবং মধ্যপ্রদেশে ভবিষ্যতে লোকসভা আসনের সংখ্যা অপেক্ষাকৃতভাবে বাড়বে। কারণ, এসব রাজ্যে জনসংখ্যার হার দক্ষিণ বা পূর্ব ভারতের থেকে বেশি—তুলনামূলক অনুন্নয়নের কারণে। ফলে তাদের লোকসভা আসনের সংখ্যাও আগামী দিনে বাড়বে। এতে লাভ বিজেপির।

আরও একটা কারণে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন উত্তর ভারতের নির্দিষ্ট ধরনের হিন্দু সংস্কৃতি (যেমন রাম বা হনুমানপূজা) ও হিন্দি ভাষার প্রচার–প্রসার ঘটাতে চাইছে অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে।

উত্তর প্রদেশ, বিহার বা ঝাড়খন্ডের অনুন্নয়ন, দারিদ্র্য ও জনসংখ্যার কারণে সেখান থেকে হিন্দিভাষী শ্রমিক বিরাট সংখ্যায় অ-হিন্দিভাষী ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত রাজ্যে কাজ করতে যান। এভাবে সেই রাজ্যের ‘ডেমোগ্রাফি’(জনবিন্যাস) তারা ধীরে ধীরে পাল্টে দিচ্ছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে অবাঙালি ভোট বাড়ছে। বিজেপি জানে, এই হিন্দিভাষী ভোট তাদের।

এভাবেই একদিকে উত্তর ও মধ্য ভারতের নিজেদের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে এবং অন্যদিকে অ–হিন্দি রাজ্যে জনবিন্যাসের পরিবর্তন ঘটিয়ে ভবিষ্যতে টিকে থাকতে চাইছে বিজেপি। এই লক্ষ্যে উত্তর ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দি ভাষার প্রচার ও প্রসার ঘটাতে চাইছে দক্ষিণ বা পূর্ব ভারতে। এর প্রতিক্রিয়ায় জোরালো হচ্ছে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ।

উত্তর ভারতীয় হিন্দুত্ব ও হিন্দি ভাষাকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের যে প্রসার বিজেপি শুরু করেছে, তার জেরে একাধিক রাজ্যে বিপরীতমুখী আঞ্চলিক শক্তি ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে একজোট হচ্ছে। যেমন দীর্ঘ কয়েক দশকের বিবাদ ভুলে মহারাষ্ট্রে জুলাই মাসে একজোট হয়েছেন বিশ শতকে মারাঠি জাতীয়তাবাদের প্রধান প্রবক্তা বালাসাহেব ঠাকরের ছেলে উদ্ধব ঠাকরে ও ভাইপো রাজ ঠাকরে। তাঁরা দুজনই একসময় মুখ্যমন্ত্রী হতে চাইতেন। সে কারণে নব্য হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানের সময় দুই ভাই বিজেপির ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টায় পরস্পরের শত্রু হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখন দেখছেন, হিন্দি-হিন্দুভিত্তিক জাতীয়তাবাদ মহারাষ্ট্রে তাঁদের জাতিভিত্তিক জনভিত্তি ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাঁরা এক হয়ে গেছেন।

তামিলনাড়ুতেও হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে বড় ধরনের আন্দোলন শুরু হয়েছে। একই জিনিস লক্ষ করা যাচ্ছে কর্ণাটকে, যেখানে কন্নড় জাতীয়তাবাদীরা সর্বভারতীয় সরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মচারীদের আঞ্চলিক এবং স্থানীয় ভাষায় কথা বলার দাবি তুলেছেন। এ রকমটা ঘটছে দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য রাজ্যসহ আরও একাধিক রাজ্যে।

তৃণমূলের সুবিধা

পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কারণ নেই যে উত্তর ভারতীয় হিন্দুত্ব ও ভাষার পূর্ব ভারতে প্রচার তাঁর জন্য কি বিশাল সুযোগ, বিশেষত ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর যখন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার হাওয়া তাঁর বিরুদ্ধে।

বিষয়টি ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পরই সম্ভবত লক্ষ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন থেকেই শুরু হয় ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ স্লোগান দিয়ে প্রচার। অর্থাৎ একদিকে যখন বিজেপি ‘হিন্দু বনাম মুসলমান’ লাইনে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটাতে চাইছে, তখন ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ লাইনে মেরুকরণ ঘটিয়ে নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। বহিরাগত বলতে এখানে মূলত বিহার ও উত্তর প্রদেশ থেকে আসা হিন্দিভাষী শ্রমিক এবং রাজস্থান থেকে আসা ব্যবসায়ীদের বোঝানো হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস নিষ্ঠার সঙ্গে বিজেপিকে হিন্দিভাষী এই সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলায় তুলে ধরেছে।

ইতিমধ্যে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় বাঙালিদের ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পাঠানো এবং তারপর ফেরত নেওয়া থেকে বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের ওপরে হামলা, বিশেষত বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের পরে তৃণমূল কংগ্রেসের বাড়তি সুবিধা করে দিয়েছে।

এর ফলে তৃণমূলের ওপরে অনেক ক্ষেত্রে অসন্তুষ্ট মুসলমান সমাজের একাংশ ইচ্ছা থাকলেও কংগ্রেস বা কমিউনিস্টদের ভোট দিতে ভয় পাচ্ছে। তারা ভাবছে, তাদের ভোট সিপিআইএম বা কংগ্রেসে গেলে সুবিধা হবে বিজেপির। মনে রাখা প্রয়োজন, পশ্চিমবঙ্গে এক–তৃতীয়াংশ ভোট সংখ্যালঘু মুসলমানের। অন্যদিকে হিন্দুদের মধ্যেও একটা বড় অংশ রয়েছে, যারা তৃণমূলের কাজে তিতিবিরক্ত, যেমন দীঘার ওই প্রকাশক; কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা কোনো দিনই বিজেপিকে ভোট দিতে পারবেন না।

তাঁরা ভয় পাবেন, কারণ পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইতিমধ্যে প্রায় সম্পূর্ণভাবে চলে গেছে অবাঙালিদের হাতে, এখন যদি বিজেপির কল্যাণে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও চলে যায়, তবে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির হাতে আর কী রইল? এটাই আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ—এই তাস খেলেই আগামী বছরে জিতবে তৃণমূল কংগ্রেস।

বিজেপির এই উত্তর ভারতীয় হিন্দু-হিন্দিভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কারণে বাংলায় ক্রমে জনপ্রিয়তা বাড়ছে বিভিন্ন বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠনের। তাদের প্রধান ‘বাংলা পক্ষ’। তাদের জনপ্রিয়তা ভালো রকম বেড়েছে গত কয়েক বছরে, জেলায় জেলায় তৈরি হয়েছে তাদের অফিস। এটাই প্রমাণ করছে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি ভারত রাষ্ট্রে তার অবস্থান সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। সে কারণেই সামাজিক স্তরে তারা জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে।

প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার হাওয়া সামলে রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে এর ইতিবাচক ফল পাবে একমাত্র তৃণমূল কংগ্রেস। আগামী নির্বাচনে তাদের জয়ও তাই একপ্রকার নিশ্চিত। বিজেপিই কার্যত তা নিশ্চিত করেছে।

* শুভজিৎ বাগচী, প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা
- মতামত লেখকের নিজস্ব
‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ লাইনে মেরুকরণ ঘটিয়ে অবস্থান মজবুত করেছে তৃণমূল কংগ্রেস
‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ লাইনে মেরুকরণ ঘটিয়ে অবস্থান মজবুত করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। ছবি: রয়টার্স