Tuesday, October 4, 2016

রাশিয়ান যুবতীর কুমারিত্ব নিলাম

কুমারিত্ব নিলামে তুলছেন রাশিয়ান যুবতী আরিয়ানা (২০)। এ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে তিনি বিদেশে পড়াশোনা করতে চান। এরই মধ্যে এ বিষয়ে তিনি রক্ষিতা সংক্রান্ত একটি ওয়েবসাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারাই তার কুমারিত্ব নিলামে তুলেছে। নিলাম শুরু হচ্ছে এক লাখ ৩০ হাজার ৫০০ পাউন্ড থেকে। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন দ্য সান। এতে বলা হয়েছে, আরিয়ানা পড়াশোনার খরচ যোগানোর জন্য অন্যান্য পন্থাও খুঁজেছেন। কিন্তু তার মধ্যে তিনি কুমারিত্ব বিক্রিকে সবচেয়ে দ্রুত ও সহজ মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ উপায়ে অল্প সময়ে অনেক অর্থ উপার্জন করা যায় বলে তার ধারণা। আরিয়ানা বলেছেন, বহু শিক্ষার্থীর পড়াশোনার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা রয়েছে। তাদের কাউকে নিজের পড়াশোনার খরচ যোগাতে কাজ করতে হয়। আমি মেডিসিন নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য অন্য কোনো দেশে যেতে চাই। কিন্তু বাইরের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ ছাড়া সেখানে থাকার খরচও অনেক। তাই অন্য দেশে অবস্থান করা খুব কঠিন হবে। এ জন্য আমি আর্থিক বাধাটি আগেই কাটিয়ে উঠতে চাই, যাতে পড়াশোনার দিকে মনোযোগ দিতে পারি। আরিয়ানা বলেছেন, কিভাবে তিনি অর্থের সংস্থান করছেন তা এখনও তার পিতামাতা জানেন না। তবে তাদের কাছে এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করা তার জন্য কোন সমস্যা নয়। কারণ, তারা তো এমনিতেই দেখতে পাবেন অনলাইনে কুমারিত্ব বিক্রির নিলাম। উল্লেখ্য, আরিয়ানা একাই এ পথে নামছেন না। তার বেস্ট ফ্রেন্ড ললিতাও কুমারিত্ব বিক্রি করছেন। তারও নিলাম শুরু হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার ৫০০ পাউন্ড থেকে। আরিয়ানা নিজেকে একজন ‘আত্মনির্ভরশীল নারী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বলেছেন, নিজের ইচ্ছায়ই তিনি কুমারিত্ব বিক্রি করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এ দিনটির জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, তাহলে এখন কেন আরও অপেক্ষা করবো?

বর্ষায় বিপন্ন হাওরের শিক্ষা

৮ জুন তারিখটি ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি স্বাভাবিক তারিখ হলেও সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার জন্য একটি অস্বাভাবিক ও বেদনাময় দিন ছিল। ২০১০ সালের ওই দিনে উপজেলার সেলবরষ ও পাইকুরাটি ইউনিয়নের শৈলচাপড়া হাওরের মধ্যবর্তী স্থানে ঝড়ো বাতাসের কবলে পড়ে ট্রলারডুবিতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে বাদশাগঞ্জ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩ জন, বাদশাগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫ জন শিক্ষার্থী এবং পাইকুরাটি ইউনিয়নের বালিজুড়ি গ্রামের ৩ মহিলা ও ৫ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছিল। নিহত শিক্ষার্থীদের বাড়িও বালিজুড়ি গ্রামে। ঘটনার দিন ট্রলারে থাকা যেসব যাত্রী প্রাণে বেঁচেছিলেন, সেই ঘটনা মনে হলে আজও তাদের গা ভয়ে শিউরে ওঠে। এখনও বালিজুড়ি থেকে ওই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের জন্য শুকনো মৌসুমে হেঁটে আর বর্ষায় হাওর পাড়ি দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। এত বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটার পরও এখন পর্যন্ত বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা চালু করা হয়নি। যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখন আমরা শুধু আপসোস করি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ ধরনের দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে সে ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করি না।
২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল দুপুরে উপজেলার বৌলাই (সুরমা) নদীতে গোলকপুর খেয়া ঘাটে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটলেও স্থানীয় লোকজন গোলকপুর হাজী আবদুল হাফেজ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩০ শিক্ষার্থীর প্রাণ বাঁচিয়েছিল। এসব শিক্ষার্থীর মতো ওই অঞ্চলের শত শত শিক্ষার্থী প্রতিদিন নদী পাড়ি দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। শুধু বালিজুড়ি বা গোলকপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার শিক্ষার্থীরা নয়, বরং উপজেলার হাওর পাড়ের সব শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। কখনও কখনও শিক্ষার্থীরা এলাকার অন্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে একটি বড় নৌকা ভাড়া করে বর্ষাকালে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করে। তবে সব শিক্ষার্থীই যে এ সুবিধা ভোগ করতে পারে তা নয়। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা অর্থাভাবে এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। হাওর পাড়ের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। বোরো ফসল ঘরে তোলার পর হাওরাঞ্চলের মানুষজন বিভিন্ন হাওরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। এ সময় অনেক শিক্ষার্থীই পরিবারের লোকজনের সঙ্গে হাওরে মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থাকায় বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। বর্ষাকালে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
কোনো কোনো শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের ম্যানেজ করে স্থানীয় ৮ম/৯ম শ্রেণী পাস করা যে কোনো একজন ছেলে বা মেয়েকে টাকার বিনিময়ে পাঠদানের জন্য নিয়োগ দেন। এ ক্ষেত্রে মাসের পর মাস ওই ফাঁকিবাজ শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি অজানাই থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দফতরের নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন করা উচিত হলেও তারা লোকবল সংকটের অজুহাত দেখান। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্ষাকাল যতটা না বিরূপ প্রভাব ফেলে তার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে হাওর পাড়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের বৈরী মনোভাব। তারা চাকরি করতে রাজি; কিন্তু কষ্ট স্বীকার করতে রাজি নন। তাই অনেকেই বিদ্যালয়ে না যাওয়ার বাহানা খোঁজেন। তবে ওইসব শিক্ষককে দোষ দিয়ে লাভ কী? হাওরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি করতে গেলে বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী কোনো বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়, যেখানে একজন শিক্ষককে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধাবিহীন কে জীবন কাটাতে চায়?
বিদ্যালয় বা বিদ্যালয়ের আশপাশে বসবাসের সুব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীর মতোই নিজ বাড়ি বা দূর-দূরান্ত থেকে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন। এতে করে ওই শিক্ষকদের জীবনও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাওরের বিশাল ঢেউ কখন কার প্রাণ কেড়ে নেয় বলা মুশকিল। পেটের তাগিদে হাওরের বিশাল বুক চিরে একজন শিক্ষক যখন হাওর পাড়ের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে রওয়ানা দেন, তখন হয়তো মনে মনে দোয়া পড়েন যেন সহিসালামতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। ফিরে এসে আবার পরিবার পরিজনের সঙ্গে আনন্দ-বেদনা উপভোগ করতে পারেন। বহু বছর ধরে শুনে আসছি হাওরাঞ্চলের শিক্ষকদের জন্য হাওর ভাতা চালু করা হবে; কিন্তু সেটি আলোর মুখ দেখছে না। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের জন্য বসবাস উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দফতরকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। নজরদারি জোরদার করতে হবে।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিদের (যাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) সততার পরিচয় দিতে হবে। আর যেন একটি বিদ্যালয়েও কোনো প্যারা শিক্ষক নামে কোনো শিক্ষক নিয়োগ না দেয়া হয়। শিক্ষকরা হাওরাঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে কখনও কখনও ভিলেজ পলিটিক্সের শিকার হন। এই ভিলেজ পলিটিক্সের অদৃশ্য শক্তির কবল থেকেও শিক্ষকদের সুরক্ষা দিতে হবে। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতায়াতের জন্য হাওর উপযোগী উপযুক্ত টেকসই যানবাহন চালুর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বর্ষাকালে ঝড়ো বাতাস বা বৈরী আবহাওয়ায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সভা-সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে। আমরা হাওরাঞ্চলে বিদ্যালয়গামী আর কোনো নৌযানের দুর্ঘটনার খবর শুনতে চাই না। এ অঞ্চলে ‘বালিজুড়ি ট্র্যাজেডি’র মতো কোনো বেদনাদায়ক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটুক। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্ষাকাল কোনো অন্তরায় না হয়ে শুভ ফল বয়ে আনুক।
এনামুল হক এনি : সাংবাদিক
enamulhaque.dps@gmail.com

ভারত-পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করে যারা

পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পর দু’দেশ এখন যুদ্ধংদেহী অবস্থায়। এ উত্তেজনার মধ্যে ফ্রান্সের কাছ থেকে কেনা ৩৬টি রাফালে যুদ্ধবিমান নির্ধারিত সময়ের আগেই হাতে পেতে চায় ভারত। অন্যদিকে, বরাবরের মতো পাকিস্তানের পাশে রয়েছে চীন। পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানকে যেসব দেশ অস্ত্র সরবরাহ দশদিগন্ত পাঠকদের জন্য তার বিবরণ উল্লেখ করা হল। সুইডেনভিত্তিক ‘দ্য স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সিটিউট’ ২০১৪ সালে বিশ্বের কোন কোন দেশ পাকিস্তান ও ভারতকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে তার তালিকা করে। এতে দেখা যায়- প্রধান অস্ত্র আমদানিকারক ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের নাম। ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ ভারত। অন্যদিকে, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সামরিক অস্ত্র খাতে ১২০০ কোটি ডলার ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান।
ইন্সটিটিউটের রিপোর্টে অনুসারে, কিছু দেশ আছে যারা দু’দেশকেই অস্ত্র সরবরাহ করে। এসব দেশ হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইতালি, সুইডেন, ইউক্রেন ও ব্রাজিল। অথচ পাকিস্তান এবং ভারত হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রতিবেশী দেশ। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে ভারত আমেরিকার সমর্থন পেয়ে থাকে। অন্যদিকে, কথিত সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে পাকিস্তানকে সঙ্গী হিসেবে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের অন্যতম দুই প্রধান অস্ত্র রফতানিকারক দেশ ফ্রান্স ও রাশিয়া ভারত-পাকিস্তানে অস্ত্র রফতানির দিকটাই প্রধানত বিবেচনায় নেয়; রাজনীতির বিষয়টি তেমন প্রাধান্য পায় না। তবে মজার বিষয় হল, অন্য প্রধান অস্ত্র রফতানিকারী দেশগুলো দু’দেশকেই অস্ত্র দিতে আগ্রহী নয়। দ্য স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, তুরস্ক, সার্বিয়া, চীন ও জর্ডান শুধু পাকিস্তানকে অস্ত্র দেয়। এসব দেশ ভারতকে অস্ত্র দিতে রাজি নয়। অন্যদিকে, ইসরাইল, কানাডা, স্পেন, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, পোল্যান্ড,
কিরগিজিস্তান ও দক্ষিণ কোরিয়া শুধু ভারতকে অস্ত্র দেয়; পাকিস্তানকে দেয় না। পাকিস্তান হচ্ছে এ মুহূর্তে চীনা অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা। চীনের অস্ত্র রফতানির ৬৩ ভাগই করা হয় পাকিস্তানে। পাঁচ বছর আগে পাকিস্তানের আমদানি করা অস্ত্রের ৩৯ ভাগ সরবরাহ করতো আমেরিকা এবং চীন করতো ৩৮ ভাগ। কিন্তু বর্তমানে চীন এককভাবে দেশটিকে ৬৩ শতাংশ অস্ত্র সরবরাহ করছে। একই সঙ্গে আমেরিকার কাছ থেকে আমদানি করা অস্ত্রের পরিমাণ কমে ১৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। বিজনেস ইনসাইডার পত্রিকার মতে, চীন মনে করছে ভবিষ্যতে ভারত মহাসাগর হবে সম্ভাব্য প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র। এ সন্দেহ থেকে চীন বাণিজ্যিক ও সামরিক বন্দর তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে যাতে ভারতকে ঘিরে ফেলা যায়। চীন ও ভারত সীমান্তের বেশকিছু ভূখণ্ড নিয়েও দ্বন্দ্বে লিপ্ত রয়েছে। ধারণা করা হয়, এ কারণে চীন ভারতকে কোনো অস্ত্র সরবরাহ করে না। মজার বিষয় হল বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অস্ত্র রফতানিকারক দেশ জার্মানি শুধু ভারতকে অস্ত্র সরবরাহ করে; পাকিস্তানের কাছে তারা কোনো অস্ত্র বিক্রি করে না।
২০০২ সালের তুলনায় ২০১২ সালে ভারত ও জার্মানির মধ্যে বাণিজ্যও বেড়েছে তিনগুণ হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানি করছে ভারত। ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান এ তালিকায় রয়েছে দশম স্থানে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র আমদানিতে শীর্ষে ও বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব। অস্ত্র আমদানির তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। এর পরের অবস্থানে রয়েছে মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, চীন, ভিয়েতনাম, গ্রিস ও পাকিস্তান। ২০১৫ সালে চীন পাকিস্তানের কাছে ৫৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে। আর আমেরিকার কাছ থেকে পাকিস্তান অস্ত্র আমদানি করেছে ছয় কোটি ৬০ লাখ ডলারের। ভারতের কাছে সবচেয়ে বেশি ১৯৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে রাশিয়া। এছাড়া ভারত ইসরাইলের কাছ থেকে ৩১ কোটি ৬০ লাখ ও আমেরিকার কাছ থেকে ৩০ কোটি ২০ লাখ ডলারের অস্ত্র কিনেছে বলে এসআইপিআরআই জানিয়েছে।

ইংল্যান্ড সিরিজের আগে আফগানদের পরে...

ইংল্যান্ড সিরিজের আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতি হল ভালো-মন্দে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে নিজেদের ব্যাটিং-বোলিং ঝালিয়ে নিতে চেয়েছিল বাংলাদেশ। জয় নিয়ে কারও মাথা ব্যথা ছিল না। ধরে নেয়া হয়েছিল, আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচেই সহজ জয় পাবে বাংলাদেশ। আর ফর্মে না থাকা বাংলাদেশের বোলার ও ব্যাটসম্যানরা নিজেদের ঝালাই করে নিতে পারবেন। প্রথম ম্যাচ থেকেই সিরিজ জয় নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। দ্বিতীয় ম্যাচে হারের পর সিরিজ জয়ের চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সামনে বড় হয়ে দেখা দেয়। শেষ ম্যাচে আফগানিস্তানকে উড়িয়ে দিয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের আগে আত্মবিশ্বাসের রসদ জুগিয়ে নিয়েছে টাইগাররা।
বাংলাদেশের রানমেশিন তামিম ইকবাল সিরিজের তিনটি ম্যাচেই দুর্দান্ত খেলেছেন। তিন ম্যাচে ২১৮ রান করে হয়েছেন সিরিজ সেরা। সিরিজ শেষে তামিম ইকবাল বলেন, ‘আমরা শেষ ম্যাচের মতো ওদের বিপক্ষে আগের দুটি ওডিআইতেও জয় আশা করেছিলাম। প্রথম দুই ম্যাচে ওরা ভালো ক্রিকেট খেলেছে। তবে আমাদের কিছু কিছু জায়গায় আরও উন্নতি করতে হবে।’ ব্যাটিংয়ে তামিম ও মাহমুদউল্লাহ ছাড়া আর কেউ ধারাবাহিক ছিলেন না। দীর্ঘদিন রানখরায় থাকা আরেক ওপেনার সৌম্য সরকার তিন ইনিংসে করেছেন ০, ২০ ও ১১ রান। ব্যাটিংয়ে তিন নম্বর জায়গাটা কার জন্য নির্ধারিত থাকবে এটা এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি টিম ম্যানেজমেন্ট। প্রথম ম্যাচে ইমরুল কায়েস, দ্বিতীয় ম্যাচে মাহমুদউল্লাহ ও তৃতীয় ম্যাচে ওয়ানডাউনে ব্যাটিং করেছেন সাব্বির রহমান। তিন ব্যাটসম্যানই এই পজিশনে রান পেয়েছেন। তবে জায়গাটা কার জন্য সুনির্দিষ্ট হবে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মাহমুদউল্লাহ ক্যারিয়ারে তিন থেকে সাত নম্বর সব পজিশনেই ব্যাট করেছেন। এই সিরিজেও তিন পজিশনে ব্যাট করে প্রমাণ করেছেন সব জায়গাতেই তিনি ফিট। প্রস্তুতির সিরিজে অভিষিক্ত মোসাদ্দেক হোসেনকে নিয়ে বড় পরিকল্পনা করতেই পারেন নির্বাচকরা। প্রথম ম্যাচে রাজকীয় অভিষেক হয়েছে মোসাদ্দেকের। দারুণ অলরাউন্ড পারফরম্যান্স করেছেন তিনি। দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যাটিংয়ে ভালো করতে না পারলেও বোলিংয়ে যেটুকু সুযোগ পেয়েছেন কাজে লাগিয়েছেন। সাকিব আল হাসান রানে আছেন।
তবে মুশফিকুর রহিম বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। সৌম্য ও মুশাফিকের ব্যাটিং কিছুটা চিন্তার কারণ হয়ে থাকল। দীর্ঘদিন পর ইনজুরি থেকে ফিরেছেন পেসার রুবেল হোসেন। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে পেসার তাসকিন আহমেদ আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলেছেন। রুবেল ভালো কিছু করতে পারেননি। কিন্তু তাসকিন জড়তা কাটিয়ে উঠে ভালো করেছেন। স্পিন আক্রমণে আরও শক্তিশালী করার জন্য মোশাররফ হোসেনের ফেরা ভালো খবর। পেস আক্রমণে মুস্তাফিজুর রহমানের অনুপস্থিতিতে মাশরাফি মুর্তজাকেই আক্রমণাÍক বোলিংয়ের দায়িত্ব নিতে হল। আফগানদের বিপক্ষে সিরিজে বাংলাদেশের বিরক্তিকর ফিল্ডিং চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মুশফিকুর রহিমের কিপিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছে। এই সিরিজে তার দৃষ্টিকটু স্টাম্পিং মিস তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। শেষদিনে মাশরাফি মুর্তজার চোট কিছু ভয় পাইয়ে দিলেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের আগে তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন বলে আশা করছেন চিকিৎসকরা। মাশরাফি বলেন, ‘সিরিজ জিততে পেরেছি এটা একটা ভালো দিক। দ্বিতীয় ম্যাচে হারের পর সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। এজন্য আরও ভালো লাগছে। সামনের সিরিজটা আরও চ্যালেঞ্জিং হবে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলতে পারলে সিরিজটা ভালো হবে আমাদের জন্য। এর আগেও আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলেছি।’

অবশেষে স্বীকারোক্তি

সোনম কাপুর
প্রেম নিয়ে কখনই প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি বলিউড তারকা সোনম কাপুর। গোপনে ঘটলেও তার সঙ্গে যে আনন্দ আহুজার প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে সেটা কারও অজানা ছিল না। তবে বিষয়টি এতদিন অস্বীকার করেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষতক আর পারেননি। লন্ডনে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ঘুরতে গিয়েই ঘটে যত বিপত্তি। ওখানে তাদের প্রকাশ্যেই আবিষ্কার করেছেন অনেকে। আর বিষয়টি নিয়ে সোশ্যাল মাধ্যমেও শোরগোল শুরু হয়েছে। আর সেটাকেই সামনে নিয়ে এলেন আনন্দ। খুব এক্সাইটেড হয়ে সোশ্যাল মাধ্যমে সোনমের সঙ্গে তার প্রেমের বিষয়টি প্রকাশ করে দিলেন।
সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে তারও সোনমের এক বৃষ্টিভেজা মুহূর্তের ছবি পোস্ট করেছেন আনন্দ। আর তাতেই বের হয়ে গেল আড়ালে রাখা সম্পর্কের রহস্য। এরপর আর যায় কোথায়। এ বিষয়ে সোনমকে প্রশ্ন করা হলে মুচকি হাসি দিয়েই এড়িয়ে গেলেন। এবার অবশ্য আর আগের মতো অস্বীকার করেননি। তার মৌনতাকেই স্বীকারোক্তি ধরে নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন গল্প। এ বিষয়ে আনন্দ কিন্তু মুখ খুলেছেন। বলেছেন, সোনমের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি কিছু আছে। তবে আনন্দ যে ছবিটি পোস্ট করেছেন সেটার সঙ্গে কিছুদিন আগে সোনমের পোস্ট করা পদগুলের একটি ছবির সঙ্গে মিল রয়েছে। আর সেখান থেকেই রহস্যের জট খুলতে শুরু হয়েছে।

আজহারকে সন্ত্রাসী চিহ্নিত করতে চীনা আপত্তির মেয়াদ বৃদ্ধি

মাসুদ আজহার
জইশ-ই-মোহাম্মদ নেতা মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে জাতিসংঘে ভারতের আবেদনের প্রতি চীনের আপত্তির মেয়াদ আরও বাড়ল। আপত্তির মেয়াদ আজ সোমবারই শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর আগেই গতকাল রোববার মেয়াদ বাড়ানোর কথা জানায় চীন। চীন আপত্তির মেয়াদ না বাড়ালে মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে আর কোনো বাধা থাকত না। এখন এই মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়াল চীন। গতকাল দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেং সুয়াং বলেন, গত মার্চে ভারতের আবেদনের বিষয়ে চীনের আপত্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
ভারতের এই আবেদনের বিষয়ে ভিন্নমত আছে। এখন এ নিয়ে আরও আলোচনা হবে। এ বছরের ৩১ মার্চ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে ভারতের আবেদনে বাধা দেয়। নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা কমিটিতে এ আবেদন করে ভারত। পাঁচটি স্থায়ীসহ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে একমাত্র চীনই ভারতের এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে। এ প্রস্তাব পাস হলে মাসুদ আজহারের সম্পত্তি জব্দ এবং তাঁর ভ্রমণ নিষিদ্ধ হবে। ভারতের মুম্বাই শহরে ২০০৮ সালের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পেছনে জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদের হাত রয়েছে বলে দেশটির অভিযোগ।

বিচারপতি অপসারণে বিভক্ত রায়ের পর্যবেক্ষণ

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, নির্বাচন কমিশনারসহ সব সাংবিধানিক সংস্থার পদধারীদের অপসারণ-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় ছিলাম। সেটা পেলাম এবং ২৯০ পৃষ্ঠার রায়টি পড়ে বিবিধ প্রতিক্রিয়া হলো। তবে যেটা স্বস্তির বিষয় বলে মনে হয়েছে তা হলো, হাইকোর্টের তিন বিচারপতি বিভক্ত রায় (২:১ ভোটে) দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু একটি বিষয়ে তাঁরা একমত যে সংসদ যে মেজাজে ষোড়শ সংশোধনীটি পাস করেছে, ঠিক সেই মেজাজে সেটির বাস্তবায়ন হওয়া উচিত নয়। গত ৫ মে তিন সদস্যের হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চের (বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত) সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ে সংসদের পাস করা ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হয়। বাতিল ঘোষণাকারী বিচারকদ্বয় বলেছেন, এর সঙ্গে সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত, তাই তাঁরা সনদ জারি করেছেন। আর ভিন্নমতদানকারী বিচারক রাষ্ট্রপতিকে রেফারেন্স পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন। রিট আবেদনকারীরাও স্বীকার করেছেন যে সংশোধনীর একটি অংশ হচ্ছে আইন। কিন্তু সেই আইনের একটি খসড়া,
যেটি সরকার থেকেই মতামতের জন্য সুপ্রিম কোর্টে প্রেরণ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত অপ্রকাশিত থাকতেই এই বিভক্ত রায় এল। মামলাটির দীর্ঘ রায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু উভয় তরফের কিছু পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌতূহলোদ্দীপক। তবে বিচারক অপসারণ বিষয়ে শুধু বিদেশি রাষ্ট্রের উদাহরণ দেখিয়ে বাংলাদেশকে কোনো একটি গন্তব্যে ঠেলা উচিত মনে করি না। কমনওয়েলথভুক্ত দেশের ৩৩ ভাগ, যারা সংসদীয় অপসারণ আর সাড়ে ৬২ শতাংশ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মতো ব্যবস্থা মানছেন, তাঁদের কারও দৃষ্টান্তই আমাদের সঙ্গে ঠিক শতভাগ খাপ খাবে না। যেমন সরকার বলেছে, ভারত ও ব্রিটেনের সংসদীয় অপসারণ রীতি আছে। কিন্তু তাদের কারও ভোটদানের স্বাধীনতা হরণকারী ৭০ অনুচ্ছেদ নেই। ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচনে জয়ী সাংসদও নেই। আবার যাদের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে, তারা নখদন্তহীন বা ঘুমন্ত নয়। ভিন্নমতদানকারী বিচারক বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ষোড়শ সংশোধনী পাসের জন্য সংসদকে অভিবাদন জানিয়েছেন। লিখেছেন, ‘আমি বর্তমান মহান জাতীয় সংসদকে বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ আবার উপসংহারে নির্দিষ্ট সুপারিশ করেছেন যে বিচারকদের অসদাচরণ বা অসমর্থ (তদন্ত ও প্রমাণ) বিলটি জনগুরুত্বপূর্ণ। তাই রাষ্ট্রপতি এটি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক উপদেষ্টামূলক মতামত নিতে সুপ্রিম কোর্টে প্রেরণ করতে পারেন।
এর আগে পিলখানা বিদ্রোহীদের সেনা আইনে বিচার করা না-করা প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি রেফারেন্স পাঠিয়েছিলেন। বিডিআর আইনে বিচার করতে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া পরামর্শ সরকার মেনেছিল। এবারও তা-ই হতে পারে। ষোড়শ সংশোধনী বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে আলোচনায় মনে হয়েছে, তিনি সুপ্রিম কোর্টের সংবেদনশীলতা রক্ষায় সতর্ক। ভারতের নির্বাহী বিভাগ কিন্তু ১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রপতির বিশেষ রেফারেন্স পাঠিয়েই বিচারক নিয়োগের দায় জ্ঞাতসারে সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যস্ত করেছিল। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে অ্যামিকাস কিউরিরা আবারও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার রক্ষাকবচ হিসেবে মাসদার হোসেন মামলার নিঃশর্ত প্রশংসা করলেন। অথচ ওই রায়ের বিরাট ত্রুটি হলো, এতে সামরিক ফরমানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবিধানের মৌলিক কাঠামো যে বিধ্বস্ত অবস্থায় আছে, তা স্বীকৃত হয়নি। উপরন্তু আবারও লেখা হলো, এই রাষ্ট্রের ক্ষমতার পৃথক্করণ নীতি সার্থক। অথচ তা সার্থক নয়। বিচার বিভাগের যে মৌলিক কাঠামোকে আমরা শ্রদ্ধা করব, বলব এটা অপরিবর্তনীয়, সেখানে জেনারেল জিয়ার কোনো একটি ফরমানও তো থাকা উচিত নয়। বাহাত্তরের সংবিধান পুনরুজ্জীবন কিংবা সংবিধান সংস্কারকে আমি একটি চলমান ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখি। কিন্তু মুখে বলা হবে এক, সাধারণ মানুষ জানবে এক, কিন্তু কাজে হবে আর এক, সেটা তো চলতে পারে না। বাহাত্তরের সংবিধানের বিরোধী তিন-চারটি সামরিক ফরমান কিংবা চতুর্থ সংশোধনীর কালো তিলক এখনো সংবিধানে লেপ্টে আছে। ৯৫ অনুচ্ছেদে বিচারক নিয়োগে ‘অতিরিক্ত’ যোগ্যতা নির্ধারণ,
৯৯ অনুচ্ছেদে অবসরের পরে বিচারকদের প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে চাকরির সুযোগ আর ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ ও অপসারণ সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে সরকারের কাছে ন্যস্ত থাকার কথা বলা আছে। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ড. কামাল হোসেন ও আমীর-উল ইসলাম অভিমত দেন যে, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের “ফাউন্ডেশন স্টোন” এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া অপসারণপ্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ অথচ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোবিনাশী ওই চার অনুচ্ছেদ, যা চতুর্থ ও পঞ্চম সংশোধনীতে বাহাত্তরের সংবিধান থেকে বিচ্যুত ও বিকৃত হয়ে এখনো টিকে আছে, সেসব অপনোদনের কথা রায়ে উল্লেখ নেই। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী অবশ্য ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ বাহাত্তরে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে রাষ্ট্রপক্ষের নীরবতায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেটা অপ্রতুল। কারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ে কোনো অসম্পূর্ণ ও খণ্ডিত মৌলিক কাঠামো আমি কল্পনা করতে অপারগ। তাই এই মামলায় আপিল বিভাগের শুনানিতে এসবের একটা স্থায়ী বিহিত আশা করি। হাইকোর্টের ভিন্নমত প্রদানকারী বিচারকের রায়ে বারবার শুধু ৯৬ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কাউন্সিল প্রজাতন্ত্রের ‘বেতনভুক কর্মচারীর’ (জিয়ার) ‘বেয়নেটের খোঁচায়’ এসেছে বলে মন্তব্য এসেছে। বিচারপতি আশরাফুল কামাল মন্তব্য করেছেন, ‘আপিল বিভাগ ২৯ মার্চ ২০১১–এর রায়ে জেনারেল জিয়ার আনা ৯৬ অনুচ্ছেদের কবর রচনা করে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন গণপরিষদের ৪০৩ সদস্যের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রণীত যে মূল সংবিধান তাকে রক্ষা করেন।’
তাঁর আরও মন্তব্য, ‘ষোড়শ সংশোধনীর ফলে “বিচার বিভাগের সত্যিকারের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা” পেয়েছে।’ কিন্তু চতুর্থ সংশোধনীতে দলিত ও বেয়নেটচর্চিত অনুচ্ছেদগুলো রেখে এই দাবি করা সংগত হবে কি? সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ে বিচার বিভাগের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো সংবিধান সংশোধন বিলের বৈধতা পরীক্ষা করতে বসে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং বাস্তব রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতন্ত্র অনুশীলনের অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ভাবতে পারলে খুশি হতাম যে ষোড়শ সংশোধনী মুক্তিযুদ্ধ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার চেতনার মশাল। সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ে দলত্যাগ বন্ধসংক্রান্ত ৭০ অনুচ্ছেদের প্রতি যথার্থই আলোকপাত করা হয়েছে। বিচারক অপসারণ প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে ৭০ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা স্থগিত রেখে এ-সংক্রান্ত উদ্বেগ প্রশমনের কথা ভাবা যায় বলেই মনে করি। ভিন্নমত প্রদানকারী বিচারকের রায়ে ‘রাজাকার বিচারপতিদের’ পদে বহাল থাকা নিয়ে যেসব প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তা দ্রুত বিচারিক ফোরামেই নিষ্পত্তির দাবি রাখে। এসব প্রশ্নের মধ্যে আছে, ‘৩০ লাখ মুক্তিযোদ্ধার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতি বিচারপতিরা কেন বহাল থাকবে? কেন রাজাকার বিচারপতি বহাল থাকবে? কেন স্বাধীনতাবিরোধী ও স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থানকারী বিচারপতি হিসেবে বহাল থাকবে?’ আরও লক্ষণীয় যে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, তাঁরা ‘এবার আমাদেরকে স্বাধীনতাবিরোধী ও জামায়াতমুক্ত সংসদ উপহার দিয়েছেন।’ আমরা দেখি, এই রায়ে বিচারক পদে থাকা না-থাকার বিষয়ে কতগুলো নতুন বিবেচ্য বিষয় এসেছে।
ভিন্নমত প্রদানকারীর রায়ে সংসদের প্রতি নির্দিষ্ট সুপারিশ হলো, ‘যারা জামায়াতের আদর্শে বিশ্বাসী, যারা স্বাধীনতা ও সংবিধানে বিশ্বাস করে না, সেই সব বিচারপতিকে অপসারণ করে বিচার বিভাগকে কলঙ্কমুক্ত করবেন। আর যাঁরা সংবিধানের প্রস্তাবনায় বর্ণিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অন্তরে ধারণ না করেন, তঁাদের বিচারপতি নিয়োগ না করা। যিনি সেই সব মহান আদর্শসমূহকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন, তিনিই কেবল এই সংবিধানকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন।’ বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী চমৎকার একটি মন্তব্য করেছেন, ‘সংসদীয় অপসারণ ব্যবস্থা যাদের আছে, সেখানে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়োগের বিষয় থাকে, অপসারণ নয়। কিন্তু আমাদের দেশের নির্বাহী বিভাগ কখনো ওই সব দেশের বিচারক নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে কোনো কথা বলেন না।’ তবে আমাদের রূঢ় বাস্তবতা হলো, ১০ বিচারকের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নিজেই এক মাইলফলক গাইডলাইন করলেন, কিন্তু তাঁরা তা কীভাবে মানছেন, তা স্পষ্ট নয়। সুপ্রিম কোর্ট নিজেদের রায়ে কিংবা বাধ্যতামূলক আইনে বর্ণিত ‘স্বচ্ছতা’ নিজেরাই মানছেন না বলে খোদ মূল রায়দানকারী আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি আবদুল মতিন অবসরে গিয়ে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তাই সমস্যাটা শুধুই নির্বাহী বিভাগ ও সংসদের নয়। এই বিষয়ে দ্রুত রাষ্ট্রপতির রেফারেন্স আশা করি। তবে আপিল বিভাগ বিষয়টি কী প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করবেন, সেটা তাঁর বিষয়। কিন্তু এই ৯৬ অনুচ্ছেদ প্রশ্নে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গেরই দ্বিধাদ্বন্দ্ব নতুন নয়। ভিন্নমতদানকারী বিচারক পঞ্চম সংশোধনীর রায়ের জন্য বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে ‘বিচার বিভাগের সূর্যসন্তান’ বলেছেন। কিন্তু এই রায়ের কয়েকটি তথ্যগত ত্রুটির উল্লেখ না করলেই নয়।
বিশেষ বেঞ্চের রায়ের উল্লেখমতে, পঞ্চম সংশোধনী মামলার হাইকোর্টের মূল রায়ে সুপ্রিম কাউন্সিলকে নির্দিষ্টভাবে বেআইনি বলা হয়নি। ২০১০ সালে আপিল বিভাগ এই ব্যবস্থার প্রশংসা করে বলেন, এটা যেমন ছিল, তেমন থাকবে। মাত্র ৫৫ দিন পর এর রিভিউ হয়। এবার এর আয়ুষ্কাল ৩১ ডিসেম্বর ২০১২ ঠিক হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংসদ একে বাঁচিয়ে ২০১৪ সালে ষোড়শ সংশোধনীতে তাকে মৃত ঘোষণা করে। আর বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত বিধান ৯৫(২ক) জিয়ার সামরিক ফরমানে ঢুকেছে, বাহাত্তরের সংবিধানে এটা ছিল না। অথচ সংবিধানপ্রণেতাদের বরাতে রায়ে সেভাবেই লেখা হয়েছে। ‘বড় রাষ্ট্রদ্রোহী’ বিচারপতি সায়েম ১৯৭৫ সালে যখন মূল ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন, তখন রাষ্ট্রপতির আদেশে বিচারক অপসারণের বিধান ছিল, যা চতুর্থ সংশোধনীতে আনা হয়েছিল। আমরা হয়তো বিশ্বে এখন এমন একটি রাষ্ট্র, যার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও তাঁদের মতো মর্যাদাসম্পন্ন কোনো সাংবিধানিক পদধারীর জবাবদিহির প্রক্রিয়া কী, তা অস্পষ্ট। সংসদে পাস করা কোনো আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয় এবং তা বহাল বা বাতিল হওয়াও যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এই মুহূর্তে দেশে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনরুজ্জীবিত অবস্থায় আছে কি নেই, তার কোনো কর্তৃপক্ষীয় উত্তর পাই না।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

রামপাল বনাম ত্রিনকোমালি

শ্রীলঙ্কার পূর্ব উপকূলবর্তী ত্রিনকোমালি শহরের কাছে ত্রিনকোমালি কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছিল দেশটির সরকার। কিন্তু পরিবেশবিদদের উদ্বেগ ও আপত্তির কারণে সে দেশের সরকার প্রকল্পটি বাতিল ঘোষণা করে। ইতিমধ্যে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। এই প্রকল্প ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) ও শ্রীলঙ্কার সিলন ইলেকট্রিক কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে (৫০: ৫০ অংশীদারত্ব) গঠিত ত্রিনকোমালি পাওয়ার কোম্পানির অধীনে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথম থেকেই পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানী মহল এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে তা থেকে নির্গত দূষিত গ্যাস, তরল ও কঠিন বর্জ্য পার্শ্ববর্তী স্থানগুলোর পরিবেশের ওপর যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও আপত্তি প্রকাশ করে। বিষয়টি আমলে নিয়ে শ্রীলঙ্কা সরকার প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাতিল ঘোষণা করে। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া এবং বহুল প্রচারিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কার বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী রণজিৎ শ্যামবালাপিটিয়া সাংবাদিকদের জানান যে পরিবেশবিদদের উদ্বেগ ও আপত্তির কারণে কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাতিল করা হলো।
বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে বাগেরহাট জেলার রামপালে একটি কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ভারতের এনটিপিসি এবং বাংলাদেশের পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড যৌথ উদ্যোগে (৫০: ৫০ অংশীদারত্ব) বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি গঠন করে। এই কোম্পানি চলতি বছরের ১২ জুলাই ভারত হেভি ইলেকট্রিক লিমিটেড কোম্পানির সঙ্গে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণ চুক্তি সম্পন্ন করে। দেশের পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানী মহল রামপাল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে তা থেকে নির্গত দূষিত গ্যাস তরল ও কঠিন বর্জ্য মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সুন্দরবনের পরিবেশের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে উদ্বেগ ও আপত্তি প্রকাশ করে, যার পক্ষে বিরাট জনগোষ্ঠীর সমর্থন গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ সরকার রামপাল প্রকল্পবিরোধীদের উদ্বেগ ও আপত্তি আমলে না নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায়। প্রস্তাবিত ত্রিনকোমালি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অবস্থান ছিল ত্রিনকোমালি শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। এটি একটি শুষ্ক, কৃষিজমিবিহীন ও কম বসতিপূর্ণ এলাকা। স্থানটির আশপাশে কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চল নেই, তবে অদূরে অবস্থিত ত্রিনকোমালি উপসাগর এলাকায় প্রাণী ও উদ্ভিদকুলের জীববৈচিত্র্য রয়েছে। পরিবেশবিদেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে ওই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা থেকে নির্গত দূষক ত্রিনকোমালি উপসাগরের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এখানে গভীর সমুদ্রের ক্ষুদ্র প্রাণিকুল অগভীর উপকূল এলাকায় এসে থাকে এবং এই এলাকায় কোরাল প্রজাতির বাস রয়েছে।
শ্রীলঙ্কা সরকার প্রাথমিকভাবে পরিবেশবিদদের আশঙ্কাকে অমূলক বলে নাকচ করে দিলেও পরবর্তী সময়ে তা গ্রহণযোগ্য মনে করে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকা খুলনা শহর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। সুন্দরবন অতি সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্যবহুল সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যার অনন্য প্রকৃতি তাকে জাতিসংঘের ইউনেসকো হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ও জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নদনদী ও শাখানদী তার মূল ‘শ্বাসযন্ত্র’ বটে। এর একটি পশুর নদের রামপাল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানী মহল আশঙ্কা প্রকাশ করে যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে এটি থেকে নির্গত দূষিত বায়ু, পানি ও ছাই অদূরে অবস্থিত সুন্দরবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ত্রিনকোমালি বিদ্যুৎকেন্দ্র ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। এর জন্য প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার টন কয়লা জ্বালানির প্রয়োজন হতো। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ঠান্ডা পানির চাহিদা পার্শ্ববর্তী সমুদ্র উপকূল থেকে নেওয়া হতো এবং ব্যবহারের পর অবশিষ্ট পানি এখানে ফেলা হতো। পরিবেশবিদেরা দূষিত গ্যাস ও ছাইয়ের দূষণ ছাড়াও কেন্দ্রটিতে ব্যবহারের জন্য সাগরের পানি নেওয়া ও ব্যবহারের পর অবশিষ্ট পানি এখানে ফেলে দেওয়াকে দূষণ হওয়ার অপর বড় উপাদান হিসেবে গণ্য করেন। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিকল্পনা অনুযায়ী ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন হবে।
এর জন্য প্রতিদিন ১২ হাজার টন কয়লা জ্বালানির প্রয়োজন হবে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদ দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার টন কয়লা পরিবহন পরিবেশদূষণের অপর কারণ ঘটবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ঠান্ডা পানির চাহিদা পার্শ্ববর্তী পশুর নদ থেকে নেওয়া হবে এবং ব্যবহারের পর অবশিষ্ট পানি এখানে ফেলা হবে, যা কিনা পশুর নদের দূষণ ঘটাবে বলে পরিবেশবিদেরা দাবি করেন।  ত্রিনকোমালি প্রকল্পের জন্য পরিবেশ-প্রভাব সমীক্ষা বা ইআইএ রিপোর্ট প্রণীত হয় ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে আর রামপালের জন্য ২০১৩ সালের জুলাইয়ে। উভয় ক্ষেত্রেই বায়ুদূষণ কমানোর লক্ষ্যে ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাইজেশন (এফজিডি) পদ্ধতি, ছাই ধরে রাখার জন্য উন্নত মানের ইলেকট্রোস্ট্যাটিক প্রেসিপিটেটর (ইএসপি) ইত্যাদি ব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই ছাই শুষ্ক অবস্থায় ধরে রেখে তা বাইরে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, ইট তৈরির স্থাপনায় সরবরাহের কথা বলা হয়। অব্যবহৃত ছাই রাখার জন্য ছাই-পুকুর তৈরির কথা বলা হয়, যেখানে ছাই পানিমিশ্রিত অবস্থায় জমা থাকবে। রামপালের ক্ষেত্রে প্রকল্প এলাকা ভরাট করার জন্যও ছাই ব্যবহারের কথা বলা হয়। ত্রিনকোমালি প্রকল্পের ইআইএ পরিবেশবিদদের সমালোচনার মুখে পড়ে। তাঁদের দাবি যে এ রিপোর্ট পরিবেশবিদদের চিহ্নিত প্রকল্পের ক্ষতিকর বিষয়গুলো পাশ কাটিয়ে গেছে। একইভাবে রামপাল ইআইএ রিপোর্টকে পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানী মহল ভ্রান্তিপূর্ণ ও অনিরপেক্ষ দাবি করে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ইউনেসকো ইতিপূর্বে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতির আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। পুরোপুরি দূষণমুক্ত কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র পৃথিবীর কোথাও নেই বা তা কোনো প্রযুক্তিতেই সম্ভব নয়। রামপালে উন্নততর টেকনোলজি ব্যবহার করে এর দূষণ তুলনামূলকভাবে কমানোর কথা বলা হয়। কিন্তু তা করতে গিয়ে যে বাড়তি কারিগরি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হবে, তা উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম অনেক বাড়িয়ে দেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক জ্বালানি অর্থনীতি সমীক্ষা সংস্থা আইইইএফএ কর্তৃক এক জরিপ অনুযায়ী রামপালে উত্পাদিত বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট নয় টাকা করে পড়বে, যা কিনা বাংলাদেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের তুলনায় অনেক বেশি। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি উদ্দেশ্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন, কিন্তু বাড়তি খরচ জোগান দিয়ে হলেও সুন্দরবনের কাছে রামপালেই কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র করতে হবে, এ যুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রামপাল ও ত্রিনকোমালি কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প দুটিকে তুলনায় আনলে দুটি বিষয় প্রাধান্য পায়। প্রথমত, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের আকার (মেগাওয়াট) ত্রিনকোমালি বাতিল-ঘোষিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিগুণেরও বড়। সে হিসেবে রামপালে প্রতিদিন কয়লা পোড়ানো হবে অপরটির তুলনায় দ্বিগুণের বেশি এবং কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গত দূষকের পরিমাণও হবে অপরটির তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। দ্বিতীয়ত, রামপালের খুব কাছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল অবস্থিত, যা কিনা অনন্যভাবে অতি সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্যকে ধারণ করে ইতিমধ্যেই বিশ্বনন্দিত। ত্রিনকোমালির বাতিল-ঘোষিত কয়লাবিদ্্যুৎেকন্দ্রের নিকটবর্তী কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চল নেই বা সুন্দরবনের মতো কোনো সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্যের আবাস নেই। তারপরও শ্রীলঙ্কা সরকার সে দেশের পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানী মহলের উদ্বেগ ও আপত্তি আমলে নিয়ে ত্রিনকোমালি কয়লা প্রকল্প বাতিল করেছে। তুলনায় বাংলাদেশ সরকার পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানী মহলের সব আপত্তি অগ্রাহ্য করে অনঢ়, একগুঁয়ে ও অযৌক্তিক অবস্থান নিয়ে স্থির।
এমনকি ইউনেসকোসহ অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগও সরকারকে তার একগুঁয়ে মনোভাব থেকে সরাতে পারেনি। প্রশ্ন হলো, কেন বাংলাদেশ সরকার রামপালের ব্যাপারে এতটা অনড়? অনেকে মনে করেন, সরকারের আস্থাভাজনদের কেউ কেউ হয়তো তাঁদের নিজস্ব স্বার্থে (রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক) সরকারপ্রধানকে সুন্দরবনের ওপর রামপালের ক্ষতিকর প্রভাবের তথ্যগুলো লঘু করে তার বিপরীতে রামপাল সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি করবে না, এই চিত্র উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে একশ্রেণির চাটুকার ব্যক্তি, যাঁদের প্রধান লক্ষ্য সরকারপ্রধানের যেকোনো মতকে নগ্নভাবে প্রশংসা করে তাঁর সুনজরে আসা, যদিও সে মত দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের জন্য নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। আবার কোনো কোনো মহলের মতে, রামপাল বাস্তবায়নের পক্ষে সরকারের ওপর ভারতীয় চাপ আছে। এ পক্ষ মনে করে যে শ্রীলঙ্কায় ত্রিনকোমালি কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পক্ষে ভারতীয় চাপ ছিল। বিষয়টি বোঝা যায় তখনই যখন শ্রীলঙ্কা সরকার ত্রিনকোমালি কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করার পর জানায় যে শ্রীলঙ্কা ভারতের সঙ্গে কোনো বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করতে চায় না, বরং কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবর্তে সেখানে ভারতের সহযোগিতায় পরিবেশবান্ধব এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে চায়। অনেকে মনে করেন, শ্রীলঙ্কার উদাহরণ বাংলাদেশের জন্যও গ্রহণযোগ্য পন্থা হতে পারে।
ড. বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।