Showing posts with label জীবন. Show all posts
Showing posts with label জীবন. Show all posts

Tuesday, June 30, 2026

ট্রাম্প-পুতিন-খামেনি-সি-মোদি–নেতানিয়াহু-এরদোয়ান, কার বিদ্যার দৌড় কত দূর

কারও শৈশব কেটেছে রেলস্টেশনে, কাউকে রুটি বিক্রি করতে হয়েছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কাউকে বিনিদ্র রাত কাটাতে হয়েছে পাহাড়ের গুহায়, কারও ব্যক্তিত্বের ভিত্তি গড়ে উঠেছে সামরিক একাডেমির কঠোর শৃঙ্খলায়। আজ তাঁরাই বিশ্বের প্রতাপশালী রাষ্ট্রনায়ক। তবে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর এই পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, জীবনের পাঠশালা থেকেই তাঁরা পেয়েছেন বিশ্বশাসনের রসদ।

বইয়ের পাতার পাঠ আর বাস্তবের রুক্ষ লড়াই—এই দুইয়ের মিশেলে কীভাবে তাঁরা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন, ছয় বিশ্বনেতার সেই সংগ্রামী শিক্ষাজীবন ও অজানা জয়গাথা নিয়েই এ বিশেষ আয়োজন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিক্ষাজীবন এককথায় বৈচিত্র্যময়। জন্ম তাঁর ব্যবসায়ী পরিবারে, ১৯৪৬ সালে নিউইয়র্কের কুইন্সে।

শৈশবে বেশ উদ্ধত স্বভাবের ছিলেন ট্রাম্প। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার ‘মিলার সেন্টার’-এর জীবনীসংক্রান্ত তথ্য জানাচ্ছে, তাঁকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ‘নিউইয়র্ক মিলিটারি একাডেমি’তে পাঠিয়ে দেন বাবা–মা, যা তাঁর পরবর্তী জীবনে শৃঙ্খলার ভিত্তি গড়ে দেয়।

উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি প্রথমে ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শুরু করলেও পরে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার বিখ্যাত ‘হোয়ার্টন স্কুল অব ফিন্যান্স অ্যান্ড কমার্স’-এ স্থানান্তরিত হন। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাফেজখানার তথ্য অনুযায়ী, সেখান থেকে ১৯৬৮ সালে তিনি অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের উত্তাল সময়ে চারবার শিক্ষাবিরতি এবং একবার পায়ের হাড়ের সমস্যার মেডিক্যাল সনদ দেখিয়ে বাধ্যতামূলক সামরিক চাকরিতে যাওয়া এড়িয়েছিলেন ট্রাম্প। ২০১৬ সালে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ট্রাম্পের এই ড্রাফট এড়ানোর বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে, যা নিয়ে পরে রাজনৈতিক মহলে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে।

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবনের একটি অনুপ্রেরণামূলক দিক হলো, তাঁর নেশামুক্ত জীবন। ট্রাম্প বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে (যেমন ২০১৭ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে কথা বলার সময়) জানিয়েছেন, তাঁর বড় ভাই ফ্রেড ট্রাম্প জুনিয়র অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে ১৯৮১ সালে অকালে প্রাণ হারান। ভাইয়ের সেই করুণ পরিণতি দেখে ট্রাম্প জীবনে কখনোই মদপান, ধূমপান কিংবা মাদক গ্রহণ না করার কঠোর শপথ নেন এবং তা আজ ৮০ বছর বয়সেও মেনে চলেন।

পড়াশোনা শেষে বাবার আবাসন ব্যবসায় যোগ দিয়ে তিনি সেটিকে ‘ট্রাম্প অর্গানাইজেশন’-এ রূপান্তর করেন। এ সময় তিনি ম্যানহাটানের আকাশচুম্বী অট্টালিকা থেকে শুরু করে আটলান্টিক সিটির ক্যাসিনো ব্যবসায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন। তবে ব্যবসায়িক জীবনের বাইরে তিনি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পান এনবিসির রিয়ালিটি শো ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’-এর সঞ্চালক হিসেবে, যেখানে তুমুল জনপ্রিয়তা পায় তাঁর ‘ইউ আর ফায়ার্ড’ সংলাপটি।

২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ট্রাম্প। এরপর ২০২০ সালে পরাজয়ের তিক্ততা থাকলেও ২০২৪ সালে কামব্যাক করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের দ্বিতীয় ব্যক্তি (প্রথম জন গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড) হিসেবে বিরতি দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

ইতিবাচকের পাশাপাশি নেতিবাচক রেকর্ডও রয়েছে তাঁর। মার্কিন কংগ্রেসের রেকর্ড অনুযায়ী, ট্রাম্পই আমেরিকার একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি প্রতিনিধি পরিষদে দুবার অভিশংসিত হয়েও দুবারই সিনেটে খালাস পেয়েছেন।

ভ্লাদিমির পুতিন

রাশিয়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ভ্লাদিমির পুতিনের শৈশব ও শিক্ষাজীবন পেরিয়েছে এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে। ১৯৫২ সালে তৎকালীন লেলিনগ্রাদে (বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গ) জন্ম তাঁর। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে তিনটি পরিবারের সঙ্গে একটি সাধারণ ‘কমিউনাল’ অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর বেড়ে ওঠা বলে সিএনএন-এর ‘ফাস্ট ফ্যাক্টস’-এ উল্লেখ করা হয়েছে।

পুতিন শৈশবে মোটেও শান্ত ছিলেন না, ছিলেন জেদি প্রকৃতির। পুতিন একবার অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়িতে একটি ইঁদুরকে কোণঠাসা করতে গিয়ে জীবনের বড় এক শিক্ষা পান। ইঁদুরটি একসময় পালানোর জায়গা না পেয়ে পুতিনকেই পাল্টা আক্রমণ করে বসে।

পুতিন তাঁর আত্মজীবনী ‘ফার্স্ট পারসন’–এ সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন এভাবে, ‘কাউকে কখনো এমনভাবে কোণঠাসা করো না যে তার পালানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, তখন সে মরণকামড় দেবেই।’

সিএএনের তথ্য বলছে, বিশৃঙ্খল জীবন থেকে নিজেকে ফেরাতে জুডোর শরণ নেন পুতিন। এরপর তিনি পড়াশোনায় গভীরভাবে মনোযোগী হন।

পুতিনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় লেলিনগ্রাদ স্টেট ইউনিভার্সিটিতে, যেখান থেকে তিনি ১৯৭৫ সালে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেন। আয়ারল্যান্ডের রুশ দূতাবাসের নথিপত্র অনুযায়ী, পরবর্তী জীবনে তিনি অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রিও লাভ করেন।

পড়াশোনা শেষ করেই তিনি তৎকালীন সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে যোগ দেন এবং ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পূর্ব জার্মানিতে গোয়েন্দা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পুতিনের রাজনৈতিক উত্থান অত্যন্ত নাটকীয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর তিনি তাঁর আইনের শিক্ষক আনাতোলি সোবচাকের অধীনে সেন্ট পিটার্সবার্গের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। সিএনএনের টাইমলাইন অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে তৎকালীন রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন তাঁকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন এবং ওই বছরেরই ৩১ ডিসেম্বর ইয়েলৎসিনের আকস্মিক পদত্যাগের পর তিনি রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন।

ব্যক্তিগত জীবনে পুতিন অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ। সিএনএনের তথ্যমতে, তিনি জুডোতে ব্ল্যাক বেল্টধারী এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করেন। ট্রাম্পের মতো তিনিও মদপান থেকে দূরে থাকাকেই প্রাধান্য দেন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় সিদ্ধহস্ত এই নেতার দুই মেয়ে মারিয়া ও কাতেরিনাও জনসমক্ষে খুব একটা আসেন না।

মোজতবা খামেনি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনিকে তাঁর বাবার উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে দীর্ঘ ও নিবিড় শিক্ষাজীবনের এক বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ইরানের জটিল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোতে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে তিনি কয়েক দশক ধরে নিভৃতে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন।

১৯৬৯ সালে ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে জন্ম নেওয়া মোজতবার বেড়ে ওঠা ছিল ইসলামি বিপ্লবের ডামাডোলের মধ্যে। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি পড়াশোনা করেন তেহরানের অভিজাত ‘আলাভি’ হাইস্কুলে। ১৯৮৭ সালে রেভোল্যুশনারি গার্ডসে (আইআরজিসি) যোগ দিয়ে ইরান-ইরাক যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাঁর এই নিবিড় সম্পর্ক ক্ষমতারোহণের পথে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোজতবা খামেনি তাঁর প্রাথমিক ও উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ইরানের পবিত্র শহর কোমের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন সেমিনারিতে। সেখানে তিনি প্রখ্যাত আলেমদের তত্ত্বাবধানে ইসলামি আইন (ফিকহ) এবং দর্শনের ওপর গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ইরানের ক্ষমতাকাঠামোয় সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই উচ্চপদস্থ ধর্মীয় আলেম হতে হয়। মোজতবা দীর্ঘ সময় ধরে পর্দার আড়ালে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাঁর ধর্মীয় পদমর্যাদায় এক নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে।

২০২২ সালের শেষের দিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তাঁকে প্রথমবারের মতো ‘আয়াতুল্লাহ’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়। এর আগে তিনি ‘হুজাতুল ইসলাম’ পদবিতে পরিচিত ছিলেন, যা মূলত মাঝারি স্তরের ধর্মীয় আলেমদের বোঝায়।

আয়াতুল্লাহ উপাধিটি পাওয়ার অর্থ হলো তিনি এখন ইসলামি আইনশাস্ত্রে স্বাধীনভাবে মতামত বা ‘ইজতিহাদ’ করার সক্ষমতা রাখেন। বর্তমানে তিনি কোম সেমিনারিতে ‘বাহথ আল-খারিজ’ বা উচ্চতর ফিকহ শাস্ত্রের পাঠদান করছেন। এই স্তরের শিক্ষকতা শুধু শীর্ষস্থানীয় আলেমরাই করতে পারেন।

মোজতবার প্রভাব শুধু ধর্মীয় বা সামরিক খাতে সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৫ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের অভাবনীয় জয়ের পেছনে তাঁর নেপথ্য ভূমিকা নিয়ে সংস্কারপন্থীরা ব্যাপক সমালোচনা করেছিলেন। এ ছাড়া রক্ষণশীল রাজনীতিক গোলাম-আলী হাদ্দাদ আদেলের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সংহত করেছে।

মোজতবার এই পাণ্ডিত্য ও শিক্ষকতা তাঁকে বাবার উত্তরসূরি হওয়ার পথে তাত্ত্বিকভাবে এবং আইনত বৈধতা দিয়েছে। ফলে ধর্মীয় উচ্চশিক্ষার এই পথ ধরে তিনি ইরানের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করছেন।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্ম ১৯৪৯ সালে তেল আবিবে হলেও তাঁর বৌদ্ধিক বিকাশের বড় অংশটি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর বাবা বেন-জিয়ন নেতানিয়াহু ছিলেন একজন ঐতিহাসিক ও ‘এনসাইক্লোপিডিয়া জুডাইকা’র সম্পাদক। হিব্রু ইউনিভার্সিটিতে বাবার শিক্ষকতা নিয়ে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হলে ১৯৬২ সালে নেতানিয়াহু সপরিবার আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় চলে যান। সেখানেই কিশোরের পড়াশোনা সম্পন্ন হয় তাঁর। বাবার পাণ্ডিত্য আর বাড়িতে গবেষণার পরিবেশ নেতানিয়াহুকে শৈশব থেকেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও কৌতূহলী করে গড়ে তোলে।

উচ্চশিক্ষার জন্য নেতানিয়াহু ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিকে (এমআইটি) বেছে নেন। তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত গতিশীল। ১৯৭২ সালে তিনি স্থাপত্যবিদ্যায় (আর্কিটেকচার) পড়াশোনা শুরু করেন। এমআইটির আর্কাইভ রেকর্ড অনুযায়ী, তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তাঁর কোর্সগুলো শেষ করতেন। ১৯৭৫ সালে তিনি স্থাপত্যে স্নাতক (বিএস) ডিগ্রি অর্জন করেন।

তবে স্থাপত্যেই তিনি থেমে থাকেননি। এমআইটির বিখ্যাত ‘স্লোন স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট’ থেকে মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৭৬ সালের জুনে তিনি ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর (এমএস) ডিগ্রি লাভ করেন। স্থাপত্যের নান্দনিক নকশা আর ব্যবস্থাপনার কঠিন গাণিতিক হিসাব—এই দুইয়ের সংমিশ্রণ তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে কৌশল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে।

এমআইটিতে পড়ার পাশাপাশি নেতানিয়াহুর প্রবল আগ্রহ ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং এমআইটি—উভয় প্রতিষ্ঠানেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে গভীর পড়াশোনা করেছেন। এই বহুমুখী জ্ঞানের কারণে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের কাছে কেবল একজন রাজনীতিক নন, তুখোড় তার্কিক ও কৌশলী কূটনীতিবিদ হিসেবেও পরিচিতি পান। তাঁর ইংরেজি উচ্চারণে মার্কিন ধাঁচ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও অর্থনীতির ওপর প্রখর দখল মূলত এই হার্ভার্ড-এমআইটি দিনগুলোরই ফসল।

নেতানিয়াহুর শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো বইয়ের পাতার সঙ্গে বারুদের গন্ধের সহাবস্থান। ১৯৬৭ সালে হাইস্কুল শেষ করেই তিনি ইসরায়েলে ফিরে গিয়ে এলিট স্পেশাল ফোর্স ‘সায়েরেত মাতকাল’-এ যোগ দেন। সেখানে পাঁচ বছর সামরিক জীবন কাটিয়ে ১৯৭২ সালে যখন এমআইটিতে পড়াশোনা শুরু করেন, তার এক বছর পরেই বেজে ওঠে ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধের দামামা।

একজন প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও তিনি পড়াশোনা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে পুনরায় রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধ শেষ করে আবার ক্যাম্পাসে ফিরে এসে তিনি দ্বিগুণ উদ্যমে তাঁর ডিগ্রিগুলো শেষ করেন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে দেশের প্রয়োজনে বন্দুক হাতে তুলে নেওয়ার এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ইসরায়েলি নাগরিকদের কাছে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

পড়াশোনা শেষে তিনি আমেরিকার বিখ্যাত ‘বোস্টন কনসালটিং গ্রুপ’-এ (বিসিজি) ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। সেখানে তাঁর সহকর্মী ছিলেন বর্তমানে মার্কিন রাজনীতির পরিচিত মুখ মিট রমনি। এমআইটি ও হার্ভার্ডের এই উচ্চতর শিক্ষা এবং বিসিজির করপোরেট অভিজ্ঞতা নেতানিয়াহুকে বিশ্বমঞ্চে স্থান করে নিতে সহায়তা করেছে।

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বাবা ছিলেন কোস্টগার্ডের একজন সাধারণ কর্মচারী। তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবন কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে। কাসিমপাশার মতো একটি রুক্ষ এলাকায় বড় হওয়া এরদোয়ানকে পড়াশোনার খরচ চালাতে শৈশবে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় লেবুর শরবত ও ‘সিমিত’ (একধরনের রুটি) বিক্রি করতে হতো। এই সংগ্রামী জীবনই মূলত তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক দর্শনে ‘সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি’ হওয়ার ভিত্তি গড়ে দেয়।

এরদোয়ানের শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ইস্তাম্বুল ইমাম হাতিপ স্কুলে। এটি ছিল একটি ধর্মীয় বৃত্তিমূলক উচ্চবিদ্যালয়। ১৯৬৩ সালে কাসিমপাশা পিয়ালে প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করার পর তিনি এই স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৭৩ সালে এখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

ইমাম হাতিপ স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি পবিত্র কোরআনের পাঠ, ইসলামি দর্শন এবং তাত্ত্বিক জ্ঞানে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তাঁর বাগ্মিতা বা চমৎকার ভাষণ দেওয়ার ক্ষমতার হাতেখড়ি হয়েছিল এই স্কুলেই। সেখানে তিনি এক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চমৎকার বক্তৃতার জন্য সবার নজর কেড়েছিলেন।

সেই সময় তুরস্কে ইমাম হাতিপ স্কুলের মতো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে অনেক আইনি বাধা ছিল। এই বাধা অতিক্রম করতে এরদোয়ান কঠোর পরিশ্রম করেন এবং আইয়ুপ হাইস্কুল থেকে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে একটি সাধারণ হাইস্কুল ডিপ্লোমা অর্জন করেন। এই জেদই প্রমাণ করে যে তিনি লক্ষ্য অর্জনে কতটা সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য এরদোয়ান ইস্তাম্বুলের আকসারায় স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড কমার্শিয়াল সায়েন্সে ভর্তি হন। এটি বর্তমানে মারমারা বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত। তিনি ১৯৮১ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও জনপ্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তাধারা এবং তুরস্কের বর্তমান ‘এরদোয়ানমিকস’ বা অর্থনৈতিক কৌশলের তাত্ত্বিক ভিত্তি মূলত এই মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতেই তৈরি হয়েছিল।

এরদোয়ানের ছাত্রজীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ফুটবল। তিনি কিশোর বয়স থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া পর্যন্ত স্থানীয় ক্লাব ‘কাসিমপাশা এরোকস্পোর’ এবং পরে ‘কামিয়ালতি স্পোর’-এ দাপটের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন। এমনকি তুরস্কের নামী ক্লাব ফেনারবাচে তাঁকে দলে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবার অনিচ্ছার কারণে তিনি পেশাদার ফুটবলার হতে পারেননি। তবে মাঠের সেই নেতৃত্ব এবং দলগত সংহতির শিক্ষা তিনি পরবর্তীকালে রাজনীতিতে প্রয়োগ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই এরদোয়ান ন্যাশনাল টার্কিশ স্টুডেন্ট ইউনিয়নে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এককথায়, তাঁর শিক্ষাজীবন কেবল ডিগ্রি অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইমাম হাতিপ স্কুলের ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক জ্ঞান—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তিনি আজকের তুরস্কের একচ্ছত্র নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

সি চিন পিং

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের জন্ম ১৯৫৩ সালে বেইজিংয়ে এক প্রভাবশালী পরিবারে। তাঁর বাবা সি ঝংশুন ছিলেন চীনের বিপ্লবী নেতা ও তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী। বেইজিংয়ের অভিজাত পরিবেশে বড় হওয়া সি চিন পিংয়ের শৈশব ছিল নিরাপদ ও রাজকীয়। কিন্তু ১৯৬২ সালে তাঁর বাবার রাজনৈতিক পতন ঘটলে ভাগ্যের চাকা উল্টে যায়। সি চিন পিংয়ের বয়স যখন মাত্র ৯ বছর, তখন তাঁর বাবাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং তাঁর পরিবার পড়ে চরম লাঞ্ছনায়।

মাও সে–তুংয়ের ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’-এর সময় ১৯৬৯ সালে ১৫ বছর বয়সী সি চিন পিংকে বেইজিং থেকে সুদূর উত্তর-পশ্চিমের শানসি প্রদেশের লিয়াংজিয়াহে গ্রামে পাঠানো হয়। সেখানে দীর্ঘ সাত বছর তিনি একটি পাহাড়ি গুহায় বাস করেন।

শিক্ষাজীবনের সেই সময়টি তাঁর জন্য ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা। গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সারা দিন কায়িক পরিশ্রম, সার বহন এবং চাষাবাদের কাজ করতে হতো তাঁকে। গুহার ভেতরে মাটির ওপর ঘুমাতেন তিনি, যেখানে পোকা-মাকড়ের উপদ্রব ছিল নিত্যসঙ্গী। সি চিন পিং পরবর্তীকালে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই সাত বছরের গুহাজীবনই তাঁকে ‘সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ বুঝতে শিখিয়েছে’ এবং তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের প্রকৃত ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অস্থিরতা কাটিয়ে ১৯৭৫ সালে সি চিন পিং বেইজিংয়ের ঐতিহ্যবাহী এবং চীনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। তখন তিনি ‘শ্রমিক-কৃষক-সৈনিক’ কোটায় রসায়ন প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন।

এবস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রকৌশলবিদ্যার এই পাঠ তাঁকে যেকোনো সমস্যাকে গাণিতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা দেয়, যা পরবর্তীকালে চীনের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে।

রাজনীতিতে প্রবেশ করার পরও সি চিন পিং তাঁর পড়াশোনা থামিয়ে দেননি। ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি আবার সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণায় যুক্ত হন। এবার তাঁর বিষয় ছিল ‘মার্ক্সীয় তত্ত্ব এবং আদর্শিক-রাজনৈতিক শিক্ষা’।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি এই গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করেন এবং আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর এই তাত্ত্বিক জ্ঞানই আজকের ‘সি চিন পিং থট’ বা তাঁর বিশেষ রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূল উৎস। এটি বর্তমানে চীনের সংবিধানেও অন্তর্ভুক্ত।

একদিকে শৈশবের আভিজাত্য, অন্যদিকে কৈশোরের চরম কষ্টের শিক্ষা সি চিন পিংকে অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও কঠোর নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে বলে মনে করা হয়। তিনি মদ্যপান বা বিলাসিতার চেয়ে শৃঙ্খলাপরায়ণ জীবনকেই প্রাধান্য দেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে বাবার প্রতি সম্মান এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি অবিচল আস্থা।

নরেন্দ্র মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শৈশব আক্ষরিক অর্থেই এক কঠিন জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। ১৯৫০ সালে গুজরাটের এক অতি সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। মোদির বাবা ভাদনগর রেলস্টেশনে একটি ছোট চায়ের দোকান চালাতেন। শৈশবে স্কুলে যাওয়ার আগে এবং পরে নরেন্দ্র মোদি তাঁর বাবাকে চা বিক্রিতে সাহায্য করতেন। পিএম ইন্ডিয়ার তথ্যমতে, অভাবের সংসারে বড় হলেও নরেন্দ্র মোদি কখনোই প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি। তাঁর এই শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তীকালে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম হয়েছে।

মোদির শিক্ষাজীবন ছিল জ্ঞানতৃষ্ণা এবং সমাজসেবার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। ভাদনগরের একটি স্থানীয় স্কুলে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। স্কুলের লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে বই পড়া ছিল তাঁর প্রিয় শখ। তাঁর শিক্ষকেরা জানান, নরেন্দ্র মোদি একজন তুখোড় বিতার্কিক ছিলেন। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীকালে তিনি গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তবে তাঁর শিক্ষা কেবল ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি রাজনীতির বিভিন্ন তাত্ত্বিক দিক শিখেছিলেন মাঠে থেকে।

মোদির জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় ও অনুপ্রেরণামূলক দিক হলো তাঁর গৃহত্যাগ। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি একাই ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। আধ্যাত্মিকতার খোঁজে তিনি হিমালয়ের বিভিন্ন আশ্রমে সময় কাটান, যা তাঁর চরিত্রে কঠোর শৃঙ্খলা ও বৈরাগ্যের বীজ বুনে দেয়। সি চিন পিং যেমন গুহায় থেকে মানুষের কষ্ট বুঝেছিলেন, মোদিও তেমনি হিমালয়ের জনশূন্য পরিবেশে থেকে নিজের আত্মিক শক্তিকে সংহত করেছিলেন।

দুই বছর পর ফিরে এসে তিনি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে নরেন্দ্র মোদি কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ ও নেশামুক্ত। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা পুতিনের মতো তিনিও মদ্যপান, ধূমপান বা কোনো প্রকার মাদক গ্রহণ থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। তিনি একজন নিরামিষাশী এবং প্রতিদিন নিয়ম করে যোগব্যায়াম করেন। এই কঠোর নিয়মানুবর্তিতাই তাঁকে দিনে প্রায় ১৮ ঘণ্টা কাজ করার শক্তি জোগায়। তাঁর বাগ্মিতা এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রাজনৈতিক উত্থানের ক্ষেত্রে মোদি এক অভাবনীয় নজির গড়েছেন। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর টানা ১৩ বছর তিনি সেই পদে ছিলেন। নানা বিতর্কের পরও ২০১৪ সালে তিনি প্রথমবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তারপর টানা দুবার জিতে এক যুগ ধরে ক্ষমতায়।

তথ্যসূত্র: প্রতিবেদনটি তৈরিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভ এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের দাপ্তরিক জীবনী থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প: ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার ‘মিলার সেন্টার’, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া আর্কাইভ এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর বিশেষ প্রতিবেদন।

ভ্লাদিমির পুতিন: পুতিনের আত্মজীবনী ‘ফার্স্ট পারসন’, সিএনএন ফাস্ট ফ্যাক্টস এবং আয়ারল্যান্ডের রুশ দূতাবাসের দাপ্তরিক নথি।

মোজতবা খামেনি: বিবিসি, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু: ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি আর্কাইভ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের রেকর্ড।

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান: মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক রেকর্ড এবং এরদোয়ানের দাপ্তরিক জীবনবৃত্তান্ত।

সি চিন পিং: সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় আর্কাইভ এবং এবস্কোর গবেষণাসংক্রান্ত তথ্য।

নরেন্দ্র মোদি: পিএম ইন্ডিয়ার দাপ্তরিক ওয়েবসাইট এবং গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য রেকর্ড।

ক্ষমতার শীর্ষে আসীন সাত বিশ্বনেতা (বাঁ থেকে) ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, মোজতবা খামেনি, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সি চিন পিং ও নরেন্দ্র মোদি
ক্ষমতার শীর্ষে আসীন সাত বিশ্বনেতা (বাঁ থেকে) ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, মোজতবা খামেনি, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সি চিন পিং ও নরেন্দ্র মোদি। কোলাজ

Saturday, May 29, 2010

দুঃখে যাদের জীবন গড়া... by মীর মাহমুদুল হাসান

পাথর ভাঙছে মনজুর। ছয় বছর বয়স ওর। স্কুলে যাওয়া হয় না। তাই বুকের জগদ্দল পাথরটি সরানোর চেষ্টায় পাথরের সঙ্গেই মিতালি পাতাতে হয়েছে ওকে। কোমল হাতে এই পাথর ভেঙেই চালাতে হয় পেট।
বাবা আবদুল বুদার পাথর পরিবহনের ট্রলিতে কাজ করেন। মা মনজিলাও ছেলের মতো পাথর ভাঙার কাজ করেন। নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলা সদরের গয়াবাড়ী ইউনিয়নের সুটিবাড়ী বাজারের অদূরে একটি পতিত জমিতে বসে পাথর ভাঙছিল বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ-শিশু।
গয়াবাড়ী গ্রামে মনজুরদের বাড়ি। জমিজমা বলতে কিছুই নেই তাদের। যা ছিল সব গ্রাস করেছে রাক্ষুসী তিস্তা।
‘তুমি স্কুলে যাও না?’
‘এবার স্কুলে ভর্তি হইছি। সারা দিন পাথর ভাঙ্গি ১০ টাকা পাই।’
‘স্কুলে না গিয়ে পাথর ভাঙছ কেন?’
‘হামার যে অভাব, এই জন্য মাও ভাঙ্গির কয়।’
‘পাথর ভাঙতে কষ্ট হয় না?’
‘আগে বেশি হতো, এখন কম হয়।’
হাতের বেশ কিছু জায়গায় হাতুড়ির আঘাতে থেঁতলে যাওয়ার চিহ্ন দেখিয়ে বলে, ‘এগুলো ব্যথা করে। কিন্তু কাম না কইরলে মাও গাইল দেয়।’
‘সারা দিনে কত টাকা আয় হয়?’
‘এক ফেরা ভাঙ্গির পাইরলে ১০ টাকা পাই।’
‘টাকা কী কর?’
‘মাও নিয়া চাউল আনে। মোর একটা বন্ধু আছে। অর নাম জহুরুল। তায়ও স্কুল না জায়য়া পাথর ভাঙ্গে।’
মনজুর গয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর ছাত্র। মনজুরের মা মনজিলা বেগম (৩৫) বলেন, ‘মনজুর মাঝেমধ্যে স্কুলেও যায় পাথরও ভাঙ্গে। গরিব মানুষ কাম না শিখলে খাবে কী?’
মনজিলা জানান, তাঁর স্বামী ট্রলিতে পাথর ওঠানো-নামানোর কাজ করে ৮০-৯০ টাকা পান। কাজ না থাকলে বসে থাকতে হয়। তিনি প্রতিদিন তিন-চার ফেরা পাথর ভেঙে ৩০-৪০ টাকা আয় করেন। যখন কাজ থাকে না তখন সবাই বসা। ঋণ-মহাজন করে অথবা আগাম কাজের জন্য মজুরি নিয়ে খেতে হয়। সঞ্চয় বলে তাঁদের কিছু থাকে না।
মনজিলা বলেন, ‘পাথর ভাঙার কাম তো সব সময় থাকে না। নদীর পানি শুকি গেইলেও হামার কষ্ট, আবার বেশি বাইরলেও হামার কষ্ট। তা ছাড়া এলাকার পাথর তোলা মেশিনগুলো মাঝেমধ্যে বন্ধ হয়। তখনো কাম থাকে না।’
এবার দুঃখের কথা বলতে অন্যরাও এসে যোগ দেয়। মিনি বেগম (৩৫) বলেন, ‘স্বামী রশিদুল ইসলাম ট্রলিতে লেবারি করে প্রতিদিন ৯০ থেকে ১০০ টাকা পান। যেখানে পাথর ওঠানোর মেশিন আছে সেখান থেকে পাথর আনেন। আর হামরা পাথর ভাঙ্গি ১০ টাকা করি ফেরা। সারা দিনে দুই-তিন ফেরার বেশি ভাঙ্গা যায় না। জমিজমা নাই। পাথর ভাঙ্গি খাই, মেশিন বন্ধ হইলে হামার কামও বন্ধ হয়।’
আছিয়া, কল্পনা, রশিদাসহ কয়েকজন জানান, তাঁদের স্বামীরা মজুরি পান ৭০ থেকে ১০০ টাকা আর তাঁরা ৩০ থেকে ৪০ টাকা। রশিদা বলেন, ‘৪০ টাকা কামাই কইরতে জুলুম হয়। সব জিনিসের এত দাম বাড়ে, কিন্তু হামার দাম বাড়ে না, আরও কমায়।’
চোখ ফেরাতেই দেখি তিন বছর বয়সী সুমিও পাথর ভাঙছে।
এ সময় পাথর ব্যবসায়ী আবদুল করিম বলেন, ‘এখানে প্রায় ২৫-৩০ জন পাথর কিনি বিক্রি করি। পাথরের সাইজ অনুযায়ী ২০ টাকা থেকে ২৯ টাকা সিএফটি কিনি। আবার ভাঙ্গার পর ২১ টাকা থেকে ৪২ টাকা পর্যন্ত সিএফটি বিক্রি করি।’ প্রতিটি সাইটে ৩০-৪০ জন শ্রমিক কাজ করেন বলে জানান তিনি।
ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ খান বলেন, ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত পূর্বছাতনাই, পশ্চিম ছাতনাই, খগাখরিবাড়ী, গয়াবাড়ী ইউনিয়নের নদীভাঙা প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক নদী থেকে পাথর তুলে ও পাথর ভেঙে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁদের মজুরি কম হওয়ার কারণে পরিবারের সব সদস্য কাজ করেও সচ্ছলভাবে চলতে পারেন না। তাঁদের অনেকের নিজের ভিটেটুকুও নেই। বাঁধের ধারে কোনোভাবে দিন যাপন করেন। এখানে আয়ের অন্য কোনো পথ না থাকায় এই শক্ত কাজটাই করতে হয় তাঁদের।
শিশু মনজুর আর সুমীর দিকে তাকাই। ওরা তখন আবার ফিরে গেছে পাথর ভাঙতে।

Saturday, September 26, 2009

ছুটি কী, কেন ও কাদের জন্য -জীবনযাপন by জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

প্রথম প্রশ্নটারই জবাব দেওয়া যাক—ছুটি কী। নিয়মিত কাজ থেকে অব্যাহতি পেয়ে বা অব্যাহতি নিয়ে, নিয়মিত কাজের জায়গা থেকে অন্য কোথাও কটি দিন কাটানো, সহজভাবে ছুটি বলতে আমরা এ-ই বুঝি। এ দিক দিয়ে, স্থান পরিবর্তন ছুটির একটা শর্ত হয়ে দাঁড়ায়।
গত তিন দিনের ঈদের ছুটি সে জন্য আমার কাছে ছুটি ছিল না, যেহেতু আমি ঢাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যাইনি। ইচ্ছে ছিল না, বলা যাবে না, তবে যাওয়া হয়নি। এর একটা কারণ, আমার প্রবাসী এক ছেলে নিজেই ছুটি কাটাতে এসেছিল ঢাকায় তার পিত্রালয়ে। ওদের ছুটি আমার ছুটিকে কেড়ে নিয়েছে তা-ও বলতে চাই না। ওদের ছুটির মধ্য দিয়ে আমি এভাবে ছুটির স্বাদ গ্রহণ করেছি। তবে ছুটির সঙ্গে স্থান পরিবর্তন যে কতটা অবিচ্ছেদ্য, তার প্রমাণ, কয়েক লাখ বঙ্গসন্তানের পড়ি কি মরি করে ঢাকা শহর থেকে বেরিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনে ট্রেনের ছাদে চেপে হলেও বেরিয়ে যাওয়া।
কয়েক লাখ ঢাকাবাসীর এই গ্রামযাত্রা তবু নির্ভেজাল ছুটির নাম দাবি করতে পারে না। এই গ্রামযাত্রার প্রধান লক্ষ্য পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়া। নির্ভেজাল ছুটির পেছনে এ ধরনের কোনো লক্ষ্য থাকে না। একটাই লক্ষ্য থাকে, প্রকৃতির সঙ্গে মিলিত হওয়া। সে জন্যই কক্সবাজার, সে জন্যই বান্দরবান, সে জন্যই কুয়াকাটা এবং অবশ্যই সুন্দরবন। অনেক কিছুই নেই আমাদের বাংলাদেশে, আবার আছেও। এই মাত্র যে নামগুলো করলাম, এর প্রতিটি প্রকৃতির এক বিশেষ রূপ নিয়ে মানুষকে টানছে। লাখ লাখ না হলেও হাজার হাজার বঙ্গসন্তান এই ঈদের অবকাশে ছুটে গিয়েছে কক্সবাজারে, বান্দরবানে, কুয়াকাটায় ও সুন্দরবনে। সংবাদপত্র জানাচ্ছে, কক্সবাজারের কোনো হোটেল-মোটেলে একটি শয্যাও খালি ছিল না ঈদের ছুটিতে, সব আগে থেকেই ‘বুক’ হয়ে গিয়েছিল। এ থেকে পরিষ্কার হচ্ছে একটা বিষয়, বাংলাদেশের বাঙালিও এখন ছুটির মর্ম বুঝে নিয়েছে। ওপার বাংলার বাঙালিদের খ্যাতি আছে, ছুটি উপভোগের বেলায় ওরা আছে সবার আগে, আমরা, বাংলাদেশে, পিছিয়ে ছিলাম। পাহাড়-বন-সমুদ্র-উপকূল সবই ছিল, তবে পর্যটনের সুযোগ-সুবিধা বলতে যা বোঝায়, যাতায়াত-ব্যবস্থা, থাকা-খাওয়ার সুবিধা—এ সবের ঘাটতি ছিল। এ ক্ষেত্রে প্রচুর অগ্রগতি হয়েছে বিগত বছরগুলোতে। পর্যটন করপোরেশন যা করেছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসরকারি উদ্যোগের ফসল—হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ। কক্সবাজারকে যদি ধরা হয় পর্যটনের জন্য বাংলাদেশের সর্বপ্রথম-সর্বপ্রধান আকর্ষণ, সেখানে সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক সম্প্রসারণের পরও, চাহিদা মেটানোর মতো সেটা হয়নি। অর্থাত্ অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে যে বিকাশ ঘটেছে, তা এককথায় বিস্ময়কর। শ্রেণী, পরিবার, উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তেরও বিকাশ ঘটেছে, কারণ পর্যটনের সঙ্গে সম্পর্ক আছে আর্থিক সংগতির।
এবার আসি দ্বিতীয় প্রশ্নটিতে—ছুটি কেন? যে কারণে দিনের বিশ্রাম, রাতের নিদ্রা, সেই একই কারণে সপ্তাহের পাঁচ বা ছয় দিনের শেষে সাপ্তাহিক ছুটি। বাইবেলে আছে, সৃষ্টিকর্তা ছয় দিনে তাঁর সৃষ্টির শেষে সপ্তম দিনে বিশ্রাম নিলেন। সে জন্য খ্রিষ্টান-জগতে রোববারের ছুটি স্যাবাটিক্যাল—অবশ্য পালনীয়। এ দেশে আমরাও শত বছরের অধিক কাল রোববারের ছুটিতে অভ্যস্ত ছিলাম। রোববারের জায়গা নিয়েছে শুক্রবার, বেশি দিনের কথা নয়। এখনো ছুটির দিন হিসেবে রোববারের দাবি ঘুরে ঘুরে আসছে। সরকার আছে দোটানায়, ইচ্ছে থাকলেও এগোতে পারছে না—পাছে ওরা কিছু বলে।
যারা যত বেশি কাজ করে, ছুটির প্রয়োজন তাদের তত বেশি। ছুটি শুধু বড়লোকের চিত্তবিনোদন নয়, ছুটি কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মানুষেরও ন্যায্য অধিকার। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই সত্যটাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন—কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী ছুটি কাটানোর জায়গাগুলোয় সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশের সবার জন্য এই ভাবনা এ মুহূর্তে এক অবাস্তব স্বপ্নবিলাস মনে হতে পারে। তবে সীমিত পর্যায়ে আমরা এখন থেকেই কাজটা কেন শুরু করতে পারব না? আমাদের পর্যটন করপোরেশনকে এ জন্য ভেঙে গড়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এ সংস্থা এ পর্যন্ত যা করেছে ও যাদের জন্য করেছে, সেটা এখন আর জরুরি কাজ নয়। বেসরকারি পর্যায়ে সে কাজের দায়িত্ব হয়তো অনেক বেশি যোগ্যতার সঙ্গে সম্পাদন করছে অন্যরা। যাদের জন্য প্রাইভেট সেক্টর কিছু করে না, তাদের জন্য কাজটি করবে সরকার। সরকারও করবে না, যত দিন না সরকারের বর্তমান ধনীবান্ধব চেহারা বদলাচ্ছে। দরিদ্রবান্ধব সরকার পেতে হলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে একজন বারাক ওবামার। বারাক ওবামা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সংকল্প গ্রহণ করেছেন। এই সংকল্প বাস্তবায়নে তিনি প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু সংকল্পে অটল আছেন এখন পর্যন্ত। এ দেশে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার যে ব্যবস্থা, সেটা এখনো ব্যবস্থা-পদবাচ্য হয়ে ওঠেনি। স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক দাবি পূরণেই যখন আমরা এত পিছিয়ে আছি, তখন সবার জন্য ছুটির বিনোদন-ব্যবস্থার কথা বলাও এক ধরনের বাতুলতা। তবু বলতে হবে।
ছুটি কেন-র কথা বলতে গিয়ে ছুটি কাদের জন্য—প্রসঙ্গটিও কীভাবে যেন এসে গিয়েছে। আবার ছুটি কেনর প্রসঙ্গে ফিরে যাই।
সরকারি কর্মসপ্তাহ কদিনের জন্য হবে, পাঁচ দিনের, সাড়ে পাঁচ দিনের, না ছয় দিনের—এই প্রশ্নে আমরা এ দেশে আজ পর্যন্ত এক দোলাচলের মধ্যে রয়েছি। দীর্ঘকাল আমরা অভ্যস্ত ছিলাম সাড়ে পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহে। শনিবারে অর্ধ দিবস, রোববারে পূর্ণ দিবস। কিছুদিন থেকে এ দেশে চালু রয়েছে শুক্রবার-শনিবার নিয়ে দুদিনের পূর্ণ দিবস ছুটি। বিশেষত ব্যবসায়ী মহলে এ নিয়ে রীতিমতো আপত্তি রয়েছে বলে আমার ধারণা। ব্যাংকিং মহলেও একই আপত্তি। সরকার একটি বিশেষ মহলের আপত্তিকে বরাবর প্রয়োজনের অধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছে, যে কারণে শত বছরের পরীক্ষিত ব্যবস্থায় ফিরে যেতে পারছে না। পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহের পেছনে যত যুক্তিই থাক না কেন, একটি অনুন্নত দেশে এ এক বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়। সমাজতন্ত্রী চীনে ওরা কিছুদিন আগেও ছয় দিনে সপ্তাহ ও সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজের নিয়ম চালু রেখেছিল। অবশ্য বিগত বছরগুলোতে চীনের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল রেখে সে ব্যবস্থার ইতি ঘটেছে কি না, আমার জানা নেই।
একদিকে পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহ, অন্যদিকে সরকারি ছুটির এক দীর্ঘ তালিকা, যা কোনো উন্নত দেশের তালিকার সঙ্গে মেলে না। দিনবদলের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে, সবকিছুই আগের মতো চলার এই ধারা মেলে না। আমাদের কর্মসংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া দিনবদলের লাখো কথায় এক ছটাক লাভ হবে না।
আমার তৃতীয় প্রশ্ন—ছুটি কাদের জন্য, এর আংশিক উত্তর দেওয়া হয়ে গেছে। পল্লীসমাজে গৃহবধূরা বছরের একটা সময়ে ‘নাইওরে’ যেত—পিতৃগৃহে যেত। গৃহবধূদের জন্য এ ছিল ছুটির এক ধরনের সামাজিক এবং মানবিক ব্যবস্থা। শ্বশুরালয়ে গৃহবধূদের জন্য বরাদ্দ থাকে একটা ব্যস্ত জীবন, সেই জীবনে কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই। থাকলে ভালো হতো। যা-ই হোক, বছরে একবার, এক মাসের ছুটি নিয়ে পিতৃগৃহে বাসকে প্রকৃত অর্থে ছুটি বলা যায় কি না আমি নিশ্চিত নই। পিতৃগৃহ কক্সবাজার, বান্দরবান, কুয়াকাটা নয় আমরা জানি। তবু পিতৃগৃহ যদি অবকাশ দেয়, আনন্দ দেয়, স্বস্তি দেয়, একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দেয়, তাহলে নাইওরের এক মাস কেন ছুটি হবে না! ছেলেবেলায় দেখেছি, আমার মা প্রতি বর্ষাকালে এক মাসের জন্য নানিবাড়িতে যেতেন। নাইওর শব্দটি বোধহয় শ্রেণিগন্ধযুক্ত, কেবল কৃষকসমাজের ব্যাপার। মায়ের এই এক মাসকে কখনো নাইওর বলা হয়নি। তবে সাংসারিক দায়িত্ব পালন থেকে এক মাসের মুক্তি যে তিনি মনে-প্রাণে চাইতেন, আমার বালক বয়সেও আমি সেটা জানতাম।
সবারই ছুটি আছে, শুধু কৃষকের ছুটি নেই, তা-ই বা বলি কেমন করে। যখন মাঠের কাজ থাকে না, তখন যে কর্মবিরতি, প্রকৃতির নিয়মে, ঋতুর নিয়মে, সেটাই কৃষকের ছুটি। তবে সেটা আনন্দদায়ক ছুটি না-ও হতে পারে। সবই নির্ভর করে ফসলের প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তির ওপর। হেমন্তে আমন ধানের ফলন ভালো হলে বাংলাদেশের গ্রামেও একটা ছুটির হাওয়া বয়ে যেত। যাত্রা, পালাগানের মৌসুম শুরু হতো। দেশের একেক অঞ্চল একেক চেহারা নিত এই ফসল ঘরে তোলার ঋতু। ধানের দেশ হিসেবে খ্যাত বরিশালে এ সময় কৃষকের মুখে যে হাসি দেখা গিয়েছে, বরিশালবাসী সে কথা কখনো ভোলে না।
লং ভেকেশন। লম্বা ছুটির ব্যবস্থা বলবত্ ছিল দুটি জায়গায়—এক. উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে, দুই. উচ্চ আদালতে। অধ্যাপকেরা, বিচারপতিরা এই লম্বা ছুটিতে কী করেন, অন্যদের এ বিষয়ে কৌতূহল আছে। তাঁরা কি ঘুমান, না বই পড়েন, না বই লেখেন, না কেবলই মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেন, অতিরিক্ত পরিশ্রমের পর?
তাঁরা যা-ই করুন না কেন, তাঁদের জন্য একটা লম্বা ছুটির প্রয়োজন নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেনি। সাংসদেরাও বছরে কয়েকবার লম্বা ছুটিতে যান। তবে তাঁদের এ ছুটি যে আসলে ছুটি নয়, আমাকে আশ্বস্ত করেছেন একজন সাংসদ। উমেদারদের জন্য তাঁদের দরজা খোলা রাখতে হয় মধ্যরাত পর্যন্ত, এটা জানার পর আশা করি কেউ ঈর্ষাবোধ করবেন না তাঁদের ঈর্ষণীয় সৌভাগ্য নিয়ে।
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী: শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।