Saturday, December 14, 2024

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন: সংসদে জয়শঙ্কর

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর, বিশেষ করে ‘হিন্দুদের ওপর হামলার’ বিষয়ে ভারত তার উদ্বেগের কথা পুনর্ব্যক্ত করলো। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর শুক্রবার লোকসভায়  জানিয়েছেন যে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রতিবেশী বাংলাদেশে  সংখ্যালঘুদের প্রতি যে আচরণ করা হচ্ছে তা যথেষ্ট উদ্বেগের। লোকসভায় প্রশ্নোত্তরের সময় জয়শঙ্কর বলেন, এই সপ্তাহের শুরুতে পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির ঢাকা সফরের সময় বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। তিনি বলেন, ভারত আশা করে যে বাংলাদেশ নিজেদের স্বার্থেই  সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা নেবে। জয়শঙ্কর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ও হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে এআইএমআইএম এমপি আসাদউদ্দিন ওয়াইসির উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ  উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। আমরা আমাদের উদ্বেগের প্রতি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। জয়শঙ্কর বলেন, সম্প্রতি পররাষ্ট্র সচিব ঢাকা সফর করেছেন। এই বিষয়টি তার বৈঠকের সময় উঠে এসেছে এবং এটা আমাদের প্রত্যাশা যে বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থে ব্যবস্থা নেবে যাতে সংখ্যালঘুরা সেখানে নিরাপদ থাকে। গত মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক ঘটনায় ৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবকে অভিহিত করা হয়। পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশ সফরের পর জয়শঙ্করের এই মন্তব্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন কেউ কেউ।

আশা করি বাংলাদেশ পারস্পরিক কল্যাণকর, স্থিতিশীল সম্পর্ক স্থাপন করবে: আগস্ট মাসে সরকার বিরোধী বিক্ষোভের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন।  প্রতিবেশী দেশ থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কর অবনতি ঘটে। ড. ইউনূস সরকারের অধীনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পের একটি ভালো ইতিহাস রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, আমরা যখন প্রতিবেশী প্রথম নীতির কথা বলি, পাকিস্তান এবং চীন বাদে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই আমাদের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই। আমরা আশা করি যে বাংলাদেশে একটি নতুন ব্যবস্থার সাথে, আমাদের  পারস্পরিক সম্পর্ক স্থিতিশীল এবং  স্থায়ী হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারতের ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে ওয়াইসির প্রশ্নের উত্তরটি আবার ছিল।
মিয়ানমার থেকে ভারতে মাদক ঢোকা বন্ধ করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সে বিষয়েও ভারত সরকারের কাছে জানতে চান সাংসদ ওয়াইসি। এর জবাবে জয়শঙ্কর বলেন, মিয়ানমারের অশান্ত পরিস্থিতির কারণে ভারতকে উন্মুক্ত শাসন নীতি পর্যালোচনা করতে হয়েছে। যাইহোক, ভারত সীমান্ত সম্প্রদায়ের প্রতি সংবেদনশীল, তাই বিষয়টি নিয়ে সরকার কাজ করছে। জয়শঙ্কর বলেন, মিয়ানমারে খুব অস্থির পরিস্থিতির কারণে, আমাদের সেখানে উন্মুক্ত শাসন নীতি পর্যালোচনা করতে হয়েছে, তবে আমরা সীমান্ত সম্প্রদায়ের প্রয়োজনের প্রতি সংবেদনশীল, তাই বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। এবং প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সীমান্তের ওপারে খুব কম সরকারী কর্তৃত্ব রয়েছে।

ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি চায়, তবে আগে সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করতে হবে: জয়শঙ্কর লোকসভাকেও জানিয়েছিলেন যে ভারত অন্য যে কোনো প্রতিবেশীর মতো পাকিস্তানের সাথে ভাল সম্পর্ক রাখতে চায়, তার আগে অবশ্যই সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করতে হবে। জয়শঙ্কর বলেন, আমরা এটা খুব স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই যে অতীতের আচরণ পরিবর্তন না করলে তার প্রভাব দুদেশের সম্পর্কর ওপর পড়বে । সুতরাং, আমি মনে করি এই বিষয়ে বলটি পাকিস্তানের কোর্টে অনেক বেশি। পাকিস্তানের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে,পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি ২০১৯ সালে পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে কিছু ব্যাঘাত ঘটেছিল।

জয়শঙ্কর ভারত-চীন বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি না থাকলে ভারত-চীন সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না। শান্তি পুনরুদ্ধারই হবে এই  সম্পর্কের অগ্রগতির ভিত্তি। সামরিক স্তরগুলি এলএসি বরাবর চ্যালেঞ্জগুলি পরিচালনা করতে এবং একটি স্থিতিশীল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী ডেপসাং-এর সমস্ত টহল পয়েন্টে যাবে এবং পূর্ব দিকের সীমান্তে যাবে যা ঐতিহাসিকভাবে  আমাদের টহল সীমা ছিল।
সূত্র: ফার্স্টপোস্ট

mzamin

ক্ষুধা দূরীকরণে বৈশ্বিক লড়াই ব্যর্থ কেন?

আজ থেকে নয় বছর আগে মোট ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নির্ধারণ করে জাতিসংঘ। যার মধ্যে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণ ছিল অন্যতম লক্ষ্যমাত্রা। বৈশ্বিকভাবে দরিদ্রতা ও ক্ষুধা মোকাবিলায় জাতিসংঘের এমন দৃঢ় পদক্ষেপের পরেও গত বছর বিশ্বের প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ ক্ষুধার মধ্যে জীবন কাটিয়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ১৫ কোটি ২০ লাখ বেশি মানুষ ক্ষুধায় ভুগেছেন বা পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে অভুক্ত থেকেছেন। এ বছরের নভেম্বরে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে জি-২০ ভুক্ত দেশগুলো। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জি-২০ এর শীর্ষ সম্মেলনে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র নির্মূল করার লক্ষ্যে এক হয়েছেন তারা। ‘২০৩০ স্প্রিন্টস’ নামে পরিচিত অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে আগামী ৬ বছরের মধ্যে ৫০ কোটি মানুষের কাছে নগদ অর্থ এবং ১৫ কোটি শিশুর কাছে পুষ্টিকর খাদ্য পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর এমন উদ্যোগ সত্ত্বেও কেন ক্ষুধা ও দরিদ্রতা মোকাবিলায় আশানুরূপ ফল পাচ্ছে না বিশ্ব- সে বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। তবে অনেকেই মনে করছেন, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং  উন্নয়নশীল দেশগুলোকে পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে ক্ষুধা মুক্ত বিশ্ব গড়তে বার বার হোঁচট খাচ্ছে বিশ্ব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্রহীনতাকেও দায়ী করেছেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম সিএনএন-এর সঙ্গে কথা বলেছেন ব্রাজিলের সামাজিক উন্নয়ন ও সহায়তা বিষয়ক মন্ত্রী ওয়েলিংটন ডায়াস। সাক্ষাৎকারে তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মোকাবিলার গুরুত্ব এবং করণীয় তুলে ধরেছেন তিনি। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জোট গঠনের প্রয়োজনীয়তা কী- এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়েলিংটন বলেছেন, ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিল বিশ্ব। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে দরিদ্রতা দূর করে ক্ষুধা মুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলবে দেশগুলো। তবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ব ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন ওয়েলিংটন। তিনি বলেন, দূর হওয়ার পরিবর্তে দরিদ্রতা, দুর্দশা এবং ক্ষুধা তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যা আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি। এর জন্য মূল কারণ হিসেবে অভিবাসন সংকটকে দায়ী করেছেন ব্রাজিলের ওই মন্ত্রী। তিনি মনে করেন, ক্ষুধা ও দরিদ্রতা একটি দেশের গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি স্বরূপ। এমন পরিস্থিতিতে ধনী দেশগুলোর পক্ষ থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করতে হবে। বুদ্ধি পরামর্শের পাশাপাশি আর্থিকভাবেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে ধনী দেশগুলোকে। এছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও অধিক ভূমিকা পালন করতে হবে তাদের।
mzamin

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দুর্বল হওয়া কি ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয়?

সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের শাসনের অবসানকে ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। কেননা, ইরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। তিনি সিরিয়া ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর সেখানে ইরানি দূতাবাসেও হামলা চালিয়েছে বিদ্রোহীরা। এর আগে লেবাননে ইরানের ছায়া সংগঠন হিজবুল্লাহকে দুর্বল করে দিয়েছে ইসরাইল। আর হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে লেবাননে ইরানের উপস্থিতিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইসরাইল হামাসের শীর্ষ নেতাকে হত্যা করে তাদের (হামাসের) ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প এবং গত মেয়াদে তাকে ইরানের প্রতি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিতে দেখা গিয়েছিল। এই সব মিলিয়ে ইরানের পরিস্থিতি এখন বেশ উদ্বেগজনক। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। এতে বলা হয়, সিরিয়ার সামপ্রতিক ঘটনাবলী ইরাকেও প্রভাব ফেলতে পারে। সিরিয়ার পর, ইরাক ও লেবাননে তুরস্ক তার প্রভাব বাড়াতে পারে বলেও অনুমান করা হচ্ছে। এই সমস্ত কিছুর প্রভাব পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিরিয়ায় ইরানের দুর্বল হয়ে পড়াটা সে দেশের ভাবমূর্তি এবং আঞ্চলিক কৌশলের জন্য মারাত্মক আঘাত। এই অঞ্চলে তুরস্কের অগ্রসর হওয়ার বিষয়টা ইরানের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।

প্রসঙ্গত, ইরান কিন্তু তুরস্ককে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করে। একদিকে তুরস্ক আজারবাইজানের সমর্থক আর অন্যদিকে ইরান সমর্থন করে আর্মেনিয়াকে। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে তুরস্কের সহায়তায় নাগোরনো-কারাবাখে জয় পেয়েছিল আজারবাইজান। অর্থাৎ, এখানেও ইরানকে পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছে। সিরিয়ায় সামপ্রতিক ঘটনাবলীর আবহে ‘উৎসাহিত’ হয়ে তুরস্ক জাঙ্গাজুর করিডোর বাণিজ্য রুট নিয়ন্ত্রণের জন্য আজারবাইজানকে সমর্থন করতে পারে। তারা যদি সেটা করে, তাহলে আজারবাইজান এবং আর্মেনিয়া সরাসরি তুরস্কের সঙ্গে যুক্ত হবে আর ইরান ককেশাস থেকে বেরিয়ে যাবে। এসব মিলিয়ে, এই মুহূর্তে সিরিয়া আগের মতো শক্ত পরিস্থিতিতে নেই বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর প্রভাব একাধিক দেশের উপর পড়তে পারে যে তালিকায় ভারতও রয়েছে। ইরানকে পশ্চিম এশিয়ার একটা শক্তি হিসাবে দেখা হয়- যা ওই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখে। কারণ, পশ্চিমা মিত্র সৌদি আরব, ইসরাইল ও তুরস্কের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে আসছে ইরান। সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তালমিজ আহমেদ সমপ্রতি করণ থাপারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ইসরাইল এখন পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘ যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। এমনটা যদি হয়, তাহলে সেটা কোনোভাবেই ভারতের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।’ কেন এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে তাও ব্যাখ্যা করেছেন তালমিজ আহমেদ। তার কথায়, ‘ভারতের উচিত ইসরাইলের উপর চাপ সৃষ্টি করে সেটা বন্ধ করা। যদি এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়তে থাকে, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাসকারী প্রায় ৮৫ লাখ ভারতীয় নাগরিককে দেশে ফিরে আসতে হবে।’ ‘ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি ওই অঞ্চলে ইরান দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে ভারতের স্বার্থও দুর্বল হয়ে পড়বে।’ এই বিষয়ে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ওয়েস্ট এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক অশ্বিনী মহাপাত্রকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, বর্তমানে ইরানের অবস্থান দুর্বল হয়েছে বটে তবে চিরকালের জন্য তারা দুর্বল হয়ে যায়নি। অধ্যাপক মহাপাত্র বলছেন, ‘ইরানকে পশ্চিম এশিয়ায় একটা শক্তি হিসেবে ধরে রাখা ভারতের স্বার্থের জন্যই প্রয়োজন। ইরান দুর্বল হলে সুন্নি শাসকদের আধিপত্য বাড়বে এবং তারা পাকিস্তানকে সমর্থন করবে।’ ‘তুরস্কের প্রভাব বাড়বে এবং সেটা পাকিস্তানকেও সাহায্য করবে। এই পরিস্থিতিতে ইরানই পশ্চিম এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য আনে।’ কীভাবে ভারতের স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে তা ব্যাখ্যা করেছেন অধ্যাপক মহাপাত্র। তিনি বলেছেন, ‘ইরানের মাধ্যমেই ভারত মধ্য এশিয়ার বাজারে পৌঁছায়। ইরানে চাবাহার বন্দর নির্মাণ করছে ভারত। এই পরিস্থিতিতে ইরান অস্থির হয়ে উঠলে নানান দিক থেকে ভারতের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ ‘কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ইরান এই ক্ষমতা আবার ফিরে পাবে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। ইরান প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। তারা নিজেদের পরমাণু কর্মসূচিও ত্বরান্বিত করবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ইরান জানে কীভাবে সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়।’
বাশার আল-আসাদের পরিবার ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরানের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র। শুধু তাই নয়, ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরান এবং ইরাকের মধ্যে যুদ্ধে সিরিয়াই একমাত্র আরব দেশ ছিল যারা ইরানকে সমর্থন করেছিল। বাকি আরব দেশগুলো কিন্তু ইরাকের সঙ্গে ছিল। এরপর ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বাড়তে থাকে, কিন্তু ইরান তার সঙ্গ ছাড়েনি। এদিকে, ইরান কিন্তু সিরিয়া হয়ে লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং গাজায় হামাসকে সহায়তা পাঠাতো।

আফতাব কমল পাশা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ওয়েস্ট এশিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক। অধ্যাপক পাশা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের সমস্যা হয়তো বেড়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক কিছুই সে দেশের অনুকূলে যাবে। অধ্যাপক পাশা বলছেন, ‘প্রথমত, ইরান দুর্বল হয়নি। ইরান হিজবুল্লাহকে ৩০০০ কোটি ডলার দিয়েছে। সিরিয়াকেও তারা ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। এখন এই সমস্ত অর্থ নিজেকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যয় করবে ইরান। এতে তাদের পরমাণু কর্মসূচি ত্বরান্বিত হবে।’ এর পাশাপাশি, অন্য একটা বিষয়ও উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক পাশা। তার কথায়, ‘এরদোগান হয়তো এখনো মনে করতে পারেন যে, তিনি জয়ী হয়েছেন, কিন্তু তার পুরো মনোযোগ ২০২৮ সালের নির্বাচনের দিকে। সিরিয়ায় কিন্তু এই অস্থির অবস্থা বজায় থাকবে। আমি মনে করি, সিরিয়াকে অনেক ভাগে ভাগ হতে পারে। কিছু এলাকা ইসরাইলের দখলে চলে যাবে।’ ইসরাইল ইতিমধ্যেই সেই কাজ শুরুও করে দিয়েছে। কিছু অংশ তুরস্কের দখলে চলে যাবে। সুন্নি ও আলবীয় একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে দেবে। কুর্দিরাও তাদের ভাগ দাবি করবে। এই অবস্থায় ইরানের পক্ষে সিরিয়ায় প্রবেশ করা কিন্তু কঠিন কাজ হবে না। পশ্চিম এশিয়ায় ইরান দুর্বল হলে ভারতের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক পাশা।

ইরান দুর্বল হওয়ার ফলে কী হতে পারে তা ব্যাখ্যা করেছেন অধ্যাপক পাশা। তিনি বলছেন, ‘ইরান দুর্বল হওয়ার অর্থ হলো তুরস্ক ও অন্যান্য সুন্নি দেশগুলোর শক্তিশালী হয়ে ওঠা। এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য আরও অনুকূল হবে। ভারত ও ইরান থেকে সস্তায় গ্যাস পেতে পারে, কিন্তু আমেরিকার ভয়ে তারা (ভারত) সেই সাহস দেখাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘ইরান বরাবরই অভিযোগ করে আসছে, তাদের বিষয়ে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মাথা নত করে। কিন্তু ভারত বুঝতে পেরেছে ইরান তার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ দেশ। মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী ইসরাইলের চাইতে শক্তিশালী ইরানকে বেশি প্রয়োজন ভারতের।’ ২০১৯ সালের নভেম্বরে ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ মন্তব্য করেছিলেন, ভারতের উচিত তার মেরুদণ্ড শক্ত করা, যাতে তারা মার্কিন চাপের কাছে মাথা নত না করে। জারিফ ভারত ও ইরানের সম্পর্কে সুফি ঐতিহ্যের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আগে তাদের আশা ছিল যে, ভারত ইরানের তেলের বৃহত্তম ক্রেতা হয়ে উঠবে। কিন্তু তা না হওয়ায়, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ জানিয়েছিলেন, মার্কিন চাপের মুখে ভারতের আরও প্রতিরোধ দেখানো উচিত। তিনি বলেছিলেন, ‘ইরান বুঝতে পেরেছে যে, ভারত তার (ইরানের) উপর নিষেধাজ্ঞা চায় না, কিন্তু একইভাবে তারা (ভারত) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করতে চায় না। আসলে অনেক সময় মানুষ কিছু একটা চায় অথচ তাকে অন্য কিছু করতে হয়।’ ‘এটা বৈশ্বিক স্তরে একটা কৌশলগত ভুল এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই একই কাজ করছে। আপনি ভুল জিনিস যত গ্রহণ করবেন তার সমাপ্তি হবে না। আমেরিকার চাপে ভারত ইতিমধ্যে ইরান থেকে তেল কিনছে না।’

mzamin

রাজনৈতিক দলগুলো ৫৩ বছরে সংস্কার করেননি কেন?

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক উপদেষ্টা উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রশ্ন রেখে বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো বলছে সংস্কার ওনারাই ভালো করতে পারবেন। এটাইতো গণতান্ত্রিক দেশের কথা। তাহলে ওনারা করেননি কেন ৫৩ বছর? রাজনীতিবিদরা দেশ সংস্কার করলে অন্তর্বর্তী সরকারকে ক্ষমতায় আসতে হতো না। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিও করতো না। শুক্রবার রাজধানীতে গুলশান সোসাইটি মসজিদের সামনে অনুষ্ঠিত শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বৃদ্ধি ও গাড়িচালকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যোগ দেন। এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার কারণেই আমাদের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। সংস্কারের কাজ শেষ হলে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবেন। দেশের জনগণ অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচনের আগে সংস্কারের দায়িত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদের বিচারের বিষয়টিও সামনে রয়েছে। তারা আমাদের কাছে বলছে যে, রোডম্যাপ দিতে হবে। তারা কী একটা রূপকল্প দিয়েছে? যে এই সংস্কারগুলো তারা কীভাবে সমাধান করবে?

উপদেষ্টা বলেন, আমাদের কেন কাজ ফেলে এসে দায়িত্ব নিতে হচ্ছে? আমরাতো আমাদের কাজ আনন্দের সঙ্গে, সফলতার সঙ্গে করছিলাম। উপদেষ্টা পরিষদে সকলেই যার যার কাজে সফল। তাহলে আমাদের কেন দায়িত্ব নিতে হলো? আমাদের একটা নির্বাচনের দিকে যেতেই হবে। এটাই হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের বড় প্রাধান্য। সে রকমভাবে সংস্কারও একটা বড় প্রাধান্য। সংস্কারের কথা আমরা বলিনি জনগণের কাছ থেকে উঠে এসেছে। আমাদের বিচারও করতে হবে। নির্বাচিত ছাড়া যারা দায়িত্বে এলো তারা কেন দায়িত্বে এলো এটাওতো একটা বিশ্লেষণের বিষয়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ভারতকে আমরাও বারবার বলেছি যে, সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চাই। ভারতও বলেছে তারা সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায়। বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করে পারস্পারিক সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ নেই। বিষয়টি যেহেতু তারা বিবেচনা করছে এবং স্বীকার করেছে। তারা এটাও বলছে অনেক রাজনৈতিক বক্তব্য তারা আর মানছে না। আমার মনে হয় সম্পর্ক উন্নয়নের একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, খেলার মাঠকে যাতে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার না করা হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাই। পার্ক মানে পার্কই। খেলার মাঠ মানে খেলার মাঠই। সেখানে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এসে খেলতে পারবেন। সেখানে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করা দরকার নেই। যেমনটা ধানমণ্ডিতে করা হয়েছে। সেখানে সবক’টি প্রাইভেট ক্লাবকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এই ক্লাবগুলো মুখে বলে, সকলের অ্যাকসেস আছে। আদতে সকলের অ্যাকসেস সেখানে নেই। আর এগুলো টাকা দিয়ে অ্যাকসেস পাওয়া যাবে কেন? এগুলোতো সবার জন্য ফ্রি থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। উপদেষ্টা বলেন, পার্ক-খেলার মাঠে সবার প্রবেশাধিকার আছে। সেখানে কোনোরকমের অসামাজিক কাজ যাতে না ঘটে, সেটার জন্যও ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সেখানে প্রবেশে বাধা দেয়া যাবে না। ঢাকার খালগুলোকে বাঁচানোর জন্য এনজিওগুলোর কাছ থেকে পরিকল্পনা চাওয়া হয়েছে। একটি ব্যবসাশ্রয় পরিকল্পনা এ মাসের মধ্যেই পাওয়া যাবে। সরকারের পক্ষে ধান লাগানো সম্ভব না, এটা কৃষককেই করতে হবে। সরকারের পক্ষে মাছ ধরা সম্ভব নয়, এটা জেলেকেই করতে হবে। পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, শব্দদূষণ আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। এটি নিয়ন্ত্রণে সবার সহযোগিতা দরকার। গাড়ি চালকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ভাবুন হর্ন নষ্ট, বাজাবেন না। গাড়ির গতি কমালে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমবে।

mzamin

গুলিতে মৃত্যু: অবলম্বন হারিয়ে অসহায় ইফতির বাবা

ইফতি আব্দুল্লাহ। ষোল বছরের এই কিশোর গত ১৯শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকার রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হন। পরে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বাবা-মায়ের একমাত্র পুত্রসন্তান ছিলেন ইফতি। পরিবারের সঙ্গে ঢাকার শাহজাহানপুরে বসবাস করতেন। তার বাবা গাড়ি চালিয়ে সংসার চালান। বাবা-মায়ের কষ্ট ঘোচাতে একটি গ্যারেজে মেকানিকের কাজ করতেন ইফতি। সেই কাজ করে অভাবের সংসারে বাবাকে সহযোগিতা করতেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন বাবা-মা। একমাত্র ভাইকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন তার বোন। পরিবারকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন ইফতি। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র ভরসাস্থল।

ইফতির বাবা ইউনুস সরদার মানবজমিনকে বলেন, ইফতি একটি গ্যারেজে মেকানিকের কাজ করতো। আমার এক মেয়ে এক ছেলে। দুই সন্তানের মধ্যে ইফতি ছোট। খুব অল্প বয়সে আমার বাবা মারা যায়। তারপর থেকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আমাদের। ভেবেছিলাম ছেলেকে নিয়ে সামনের দিনগুলোতে ভালো থাকবো। সে বৃদ্ধ বয়সে আমাদের দেখেশুনে রাখবে। ইফতিকে হারিয়ে তার মা একেবারে ভেঙে পড়েছে। আমার সন্তানকে কি আর ফিরে পাবো। ইফতি সবসময় আমাদের নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতো। সে বলতো, ‘বাবা আমি এখন অনেক বড় হয়েছি, তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। আমি তোমাদের সব কষ্ট দূর করে দিবো, আমি ছাড়া তোমাদের তো আর কোন ছেলে সন্তান নেই।’ আমাদের মন খারাপ হলে সবসময় সাহস দিতো, বুঝাতো। ইফতি কাজ করে যা আয় করতো সেটি থেকে কিছু খরচ সংসারের জন্য দিতো। সে সাত হাজার টাকা মাসে বেতন পেতো। তাকে কাজে আসা যাওয়ার সুবিধার জন্য একটা বাইসাইকেলও কিনে দিয়েছিলাম।

তিনি বলেন, এখনো রাতে সন্তানের কথা মনে পড়লে ঘুমাতে পারি না। সবসময় আমার সন্তানকে মনে পড়ে। মোবাইলে থাকা ওর ছবিগুলো দিনরাত দেখি। ইফতি প্রায়ই আমাদের না বলে তার বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে চলে যেতো। কাজের জন্য আমাকে তো সবসময় বাইরে থাকতে হতো। ও অনেক সাহসী ছিল। বাবা হয়ে সন্তানের লাশ দেখাটা কতটা কষ্টের তা বুঝাতে পারবো না। ওর মৃত্যুর পরে কিশোরগঞ্জ থেকে কিছু আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছে। ঢাকাতেও একটি সেমিনার থেকে অল্প কিছু সহযোগিতা পেয়েছি। জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে যোগাগের জন্য বলা হয়েছিল।

ইউনুস সরদার বলেন, ঘটনার দিন জুমার নামাজ শেষে সে আন্দোলনে যায়। আমি তখন কাজে ছিলাম। বিকালের দিকে আমার মেয়ে মোবাইলে কল করে বলে, বাবা রামপুরায় অনেকে মারা গেছে আমার ভাইতো এখনো বাসায় আসেনি। আমি ওর কথাটি তেমন গুরুত্ব দেইনি। পরবর্তীতে মেয়ে আবার কল করে বলে, বাবা ইফতি তো মারা  গেছে। এই কথা শুনে আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি বাসার সামনে রাখা আমার সন্তানের লাশ। সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাই। রামপুরা ব্রিজের কাছে গুলিবিদ্ধ হয়। রাতে মেডিকেলে নেয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সেদিন রাত তিনটার সময় রামপুরা থানায় ক্লিয়ারেন্সের জন্য যাই সেখানে গিয়ে দেখি কেউ নেই। একদিন পার হয়ে গেলেও লাশের ময়নাতদন্ত করতে পারিনি। কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তিনদিন পরে ময়নাতদন্ত শেষে ছেলের মরদেহ হাতে পাই। কিশোরগঞ্জে আমার স্ত্রীর বাবার বাড়িতে ইফতির মরদেহ দাফন করা হয়। তিনি বলেন, আমার গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ। গাড়ি চালিয়ে যে আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালাই। পরিবার নিয়ে ঢাকার শাহজাহানপুরে থাকি। আমরা ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় বসবাস করি। বাবা-মা অভাবের কারণে অনেক ছোট বয়সে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঢাকায় চলে আসার পর নদীতে ভেসে যায় আমাদের জায়গা-জমি। অল্প কিছু ভিটার জমি ছিল সেটিও লোকজন নিয়ে যায়। ভেবেছিলাম একমাত্র সন্তানের জন্য কিছু করে রেখে যাবো। সেও আমাদের  ছেড়ে চলে গেল। আজ আর কোনো আশা নেই, আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। 

mzamin

চাঁদাবাজি দখলের হাত বদল, ক্ষোভ by শুভ্র দেব

আগে তো মুখ খুলে কথা বলতে পারতাম না। কিছু বললেই আওয়ামী লীগের নেতারা সরকারবিরোধী বলে পুলিশে ধরিয়ে দিতেন।  একজন নিরীহ ব্যবসায়ী সরকারের বিরুদ্ধে বলায় তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কতো মারধর, অত্যাচার, নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। জমিজমা দখল  করে নেয়া হয়েছে। নিজের ভোটটা দিতে পারি নাই গত ১৬ বছর। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতে হতো। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এখন আমরা অনেক স্বস্তিতে আছি। মন খুলে কথা বলতে পারি। নিজের ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরতে পারি। কথাগুলো বলছিলেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়নের লাঙ্গলবন্দের চিড়াইপাড়া এলাকায় চা দোকানি নবীর হোসেন। একই এলাকার গাড়িচালক আব্দুস সালাম বলেন, সরকার পতন হওয়ার পর খুব শান্তিতে আছি। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি। কথা বলার আগে কোনো চিন্তা করতে হয় না। ইনকাম হয়তো বাড়ছে না, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে তবুও ভালো আছি। আর দ্রব্যমূল্য বাড়ার পেছনে কারণও আছে। যেমন দুই বারের বন্যায় সবজি উৎপাদন করতে পারেননি কৃষক। তাই আলুর ওপর চাপ পড়েছে। তবে আরও কিছুদিন গেলে দাম কমবে। অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম কমলে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তিতে থাকতে পারবে। মাংস বিক্রেতা আলিম উদ্দিন বলেন, ইউনূসের আমলে ভালো আছি। যদিও জিনিসপত্রের দাম বেশি। বাজারে গেলে হিমশিম খেতে হয়। তবে আগে মানসিকভাবে যে অশান্তিতে ছিলাম সেটা আর হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা জোর করে মানুষের জমি দখল করে নিতেন। চাঁদাবাজি করতেন। মানুষকে নির্যাতন করতেন। তাদের প্রভাবে কেউ কথা বলার সাহস পেতেন না। কোনো চায়ের দোকানে বসে আওয়ামী লীগ বা সরকার নিয়ে কিছু বলা যেতো না। এখন আর এসব নাই।

৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার মানুষ কেমন আছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনব্যবস্থা কেমন লাগছে, সাধারণ মানুষের জীবনমানে কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা এসব জানতে বুধবার জেলার কয়েকটি উপজেলা ঘুরে বিভিন্ন তথ্য মিলেছে। বেশির ভাগ মানুষের সঙ্গে কথা বলে মোটাদাগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মিশ্র প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে।

বন্দর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের চাঁনপুরের বাসিন্দা আব্দুল কাদের। ৬০ বছর বয়সী কাদের গত ১৪ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার যেই হউক আমি কখনো কোনো সুবিধা নেইনি। আমরা সাধারণ মানুষ। ছোটখাটো ব্যবসা বাণিজ্য করে খাই। আওয়ামী লীগের আমলে ব্যবসা নিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এখন আর সেই সমস্যা নাই। সব জিনিসের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে। কিনতে হয় বেশি দিয়ে অথচ বিক্রি করতে হয় আগের দামে। এতে করে লাভ কমে গেছে। যে হারে দাম বাড়ছে সেভাবে মানুষের আয় বাড়ছে না। তাই সরকারের জিনিসপত্রের দাম কমানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া দরকার। হাসিনা সরকারের আমলে ভোট দিতে পারি নাই ১৬ বছর। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজনই পড়েনি। মদনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এম এ সালাম ভোট জালিয়াতি করে ১৬ বছর ধরে চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনিই এই এলাকার সব নিয়ন্ত্রণ করতেন। শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সঙ্গে সখ্যতা রেখে দাপট দেখাতেন। তার বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ ছিল না। কতো মানুষের যে জমিজমা দখল করেছে তার হিসাব নাই।  কেওঢালা বাজারের জুতার ব্যবসায়ী ইয়াকুব দেওয়ান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে সব সমাধান করা সম্ভব না। কারণ এতগুলো মন্ত্রণালয় অথচ সব মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা নাই। অনেকগুলো মন্ত্রণালয় একজন উপদেষ্টা সামলাচ্ছেন। তাই এখন মানুষ যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন এসব সমাধানের জন্য সরকারপ্রধান ও উপদেষ্টাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিত। আর জনগণের নির্বাচিত সরকার যত দ্রুত আসবে ততই সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে অনেক পরিবর্তন এসেছে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরে। এই এলাকায় আওয়ামী নেতাদের প্রভাব কমেছে। সবাই পালিয়েছেন। এখন মানুষ চাচ্ছে দ্র্রব্যমূল্যর দাম নিয়ন্ত্রণে আসুক।

সোনারগাঁও উপজেলার কাঁচপুর ইউনিয়নের ললাটি গ্রামের বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী শাহেদ শাহ বলেন, দ্রব্যমূল্য এত বেশি হয়েছে আমাদের মতো মানুষের একেবারে নাগালের বাইরে। মানুষ আশাবাদী ছিল এই সরকার সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু এখনও সবকিছু বেড়েই চলছে। একই ইউনিয়নের সুখেরটেক গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন বলেন, কত বছর পরে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারছি গত কয়েকমাস ধরে। ভয় ছাড়া হাটাচলা করতে পারছি। পুলিশ এসে গ্রেপ্তার করার ভয় নেই। অকারণে বিনা অপরাধে অনেক মামলার আসামি হতে হয়েছে। এখন শান্তিতে নিশ্বাস নিতে পারি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারি। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান যেভাবে দেশে চালাচ্ছেন তাতে আমরা অনেক খুশি। এ ছাড়া জিনিসপত্রের দাম তিনি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন না। কারণ এখানে বড় একটা সিন্ডিকেট কাজ করছে। সিন্ডিকেট ভাঙা কষ্ট হবে। একই এলাকার অলি উল্লাহ বলেন, আমাদের এলাকায় শান্তি ফিরেছে। আমরা মিলেমিশে আছি। ধর্মীয় কোনো সংঘাত নাই। আলাউদ্দিন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, সবমিলিয়ে দেশের যা অবস্থা তাতে আমার কাছে ভালো মনে হচ্ছে না। অস্থির এক পরিবেশ বিরাজ করছে। বাজারে গেলে জিনিসপত্রের দাম শুনলে মন খারাপ হয়ে যায়। সোনারগাঁও উপজেলার পানামনগর সিটির পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচিত সরকার না আসলে দেশ এরকমই অস্থির থাকবে। কারণ নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহিতা করতে হয়। তারা খারাপ করলে মানুষ আর ভোট দিবে না। এই ভয় তাদের মনে কাজ করে। তাই এই সরকার কোনো কিছু না করলেও বলার মতো কিছু থাকবে না। তবে সরকারের উচিত মানুষ কী চায় সেটা  বোঝার। রিকশাচালক আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, আমার রিকশায় করে প্রতিদিন কতো যাত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে যাই। যাত্রীদের গল্প শুনে বোঝা যায়। সবাই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন।  

রূপগঞ্জের চনপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফিরোজ আহমেদ বলেন, ভেবেছিলাম হাসিনা সরকারের পতনের পর স্বস্তিতে থাকবো। কিন্তু কিছু পরিবর্তন আসলেও বেশির ভাগ সমস্যার সমাধান হয়নি। আগে চাঁদাবাজি, দখল, মাদক ব্যবসা আওয়ামী লীগের নেতারা করতো। তারা পালিয়ে যাওয়ার পর এখন হাতবদল হয়েছে। চিত্র আগের মতোই আছে। এ ছাড়া আমরা সাধারণ মানুষের দাবি-দাওয়াও নাই। আমরা চাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকুক। প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে দাম বাড়লেও আমাদের আয় একই জায়গায় বন্দি। তাই এসবের পরিবর্তন হওয়া দরকার। কায়েতপাড়ার বাসিন্দা সোলায়মান ভূঁইয়া বলেন, স্বৈরাচারের পতনে আমরা খুশি। দেশে এক দুঃশাসন ছিল। এখন আমরা স্বস্তিতে আছি।  

সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনানী নতুন মহল্লার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, লুটপাটের জমানা এখন আর নাই। সব মানুষ এখন ভালো আছে। আয় কম হলেও মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারছে। কোনো ভয় নাই মনে। আগে তো একটা ভয় নিয়ে চলতে হতো। কখন কার ওপর কোন বিপদ আসে। একই এলাকার বাহরাইন প্রবাসী মকবুল বলেন, আমি দীর্ঘদিন ব্যবসা করেছি দেশে। কিন্তু আওয়ামী লীগের আমলে ব্যবসা করতে গিয়ে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। আমরা দেশে কৃষিপণ্য উৎপাদন করেছি। অথচ ভারত থেকে পণ্য আনার কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। অনেক টাকা লোকসানের পরে আমি মধ্যেপ্রাচ্য চলে যাই। এখন ভালো আছি। তবে আওয়ামী লীগের সময় আমার পরিবারের সদস্যরা অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়েও হয়রানি করা হয়েছে আমার পরিবারকে। হাসিনা সরকারের পতনের খবর পেয়ে দেশে এসেছি। এখন আর কোনো সমস্যা নাই।

mzamin

জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান: চোখ হারানোদের কান্না চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে

জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে চোখে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে ৬৩ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। তাদের প্রায় সবাই একটি চোখ হারিয়েছেন। কেউ কেউ দু’টি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। গতকাল সরজমিন হাসপাতালের ৪ তলার অবস্থিত স্পেশালাইজড ডেডিকেটেড ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, ৬৪টি বেডের মধ্যে ৬৩ জন চক্ষুরোগী এখানে ভর্তি। এই ইউনিটটি শুধুমাত্র জুলাই-আগস্টে আহতদের চিকিৎসার জন্য রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় সবাই অন্তত একবার অপারেশন করিয়েছেন। দুই থেকে তিনবার চোখে অপারেশন হওয়া রোগীর সংখ্যাও অনেক। আবার অনেকেই আসছেন চেকআপ করাতে। চোখ হারিয়ে তারা ভেঙে পড়েছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে অথবা বিদেশ থেকে  ডাক্তার এনে তাদের চিকিৎসার দাবি জানান এসব রোগীরা।

জুলাই-আগস্ট স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে এখনো সাহায্য পাইনি: আমজাদ
৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিনে যাত্রাবাড়ী থানা থেকে পুলিশ বের হওয়ার সময়ে আন্দোলনকারীদের ওপরে নৃশংস গুলি চালায়। ওইদিন যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছিলেন মো. আমজাদ। পুলিশের গুলিতে দুই চোখই হারান তিনি। ওইদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ৫ই আগস্ট ২টার দিকে সেনাবাহিনী থানা পাহারা দিচ্ছিলেন। পুলিশকে তারা ভেতরে আটকে রাখে। বের হতে দেয়নি। কিন্তু সেনাবাহিনী সরে যাওয়ার পরে পুলিশ থানা থেকে বের হওয়ার জন্য এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রথমে আমাকে পায়ে গুলি করে, আমি সেখানেই শুয়ে পড়ি। তারপর পুলিশ আমার পেছনে ও সামনে এক রাউন্ড করে দুই রাউন্ড গুলি করে। সামনে গুলি করার সময়ে আমার চোখে ছররা গুলি লাগে। তখনই আমি অন্ধ হয়ে যাই। সেখান থেকে ছাত্র ভাইয়েরা আমাকে উঠিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওখানে অনেক সিরিয়াল থাকায় রাত ৯টায় আমাকে হেলথকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করে।

হেলথকেয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমজাদের পায়ের ভেতরে থাকা গুলি বের করে দেয়ার জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা চায়। এই ব্যয় বহন করতে না পেরে তার পরিবার নোয়াখালী নিতে বাধ্য হন। সেখানে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে তার পায়ের গুলি বের করা হয়। আমজাদ বলেন, সেখান থেকে চোখের চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম পাহাড়তলী গেছি। সেখানে আমাদের অবস্থা খারাপ দেখে ভর্তি নেয়নি। এরপর চকবাজার সরকারি মেডিকেলে পায়ের চিকিৎসা নেই। পরে তারা রেফার্ড করে ঢাকা মেডিকেলে পাঠায়।

ঢাকা মেডিকেল থেকে সমন্বয়করা ১৫ই আগস্ট আমজাদকে চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করিয়ে দেয়। ভর্তির ৩ দিন পরে তার অপারেশন হলেও চোখে আলো ফিরে আসে না। ১৫ দিন সেখানে ভর্তি থাকার পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে রিলিজ করে দেয়। আমজাদ বলেন, ৯ দিন হলো এখানে আছি। দুইটা ড্রপ দিয়েছে শুধু। আমি দুই চোখের এক চোখেও কিছু দেখি না। হাসপাতাল থেকে বলছে- বাইরে থেকে ডাক্তার আসলে আমাদের আবার ডাকবে। চোখের কর্নিয়া আর ভালো ডাক্তার পেলে হয়তো চোখটা একটু ভালো হবে। প্রথমে অপারেশন করার আগে একটু ঝাপসা দেখতাম, অপারেশনের পরে কিছুই দেখি না।

আমজাদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর কবিরহাটে। ক্লাস ফাইভ পাস করে পরিবারের হাল ধরেন তিনি। গুলিস্তানের নগর প্লাজায় গেঞ্জির দোকানে চাকরি করতেন তিনি। আমজাদ বলেন, আমার বাবা ৪ বছর আগে মারা গেছে। আমার ইনকামে আমিসহ মা, ছোট ভাই ও বোনের ভরণপোষণ হতো। ছোট ভাই এখন ওই দোকানে কাজ করে। আমজাদের মা আহাজারি করে বলেন, ওর জন্য আমি ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা লোন করছি। ওর বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের কোনো কষ্ট বুঝতে দেয় নাই। ওর কোনো ভবিষ্যৎ নাই।
সরকার থেকে এখনো আমজাদকে কোনো ধরনের সাহায্য করা হয়নি উল্লেখ করে আমজাদ বলেন, জুলাই-আগস্ট স্মৃতি ফাউন্ডেশনে আবেদন করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো অর্থ পাইনি।

স্যারেন্ডার করার পরও আনসার আমাকে গুলি করে: ওমর ফারুক
৪ঠা আগস্ট গাজীপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেয় ওমর ফারুক। ওইদিন আনসারের গুলিতে দু’টি চোখ হারান তিনি। জানান, ওইদিন ৭০০-৮০০ আনসার সদস্যের সঙ্গে প্রায় হাজার থেকে ১২০০ ছাত্র-জনতার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। তবে আশেপাশে ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষ দাঁড়িয়েছিল। ওইদিন আনসারের আগ্রাসন এতটাই তীব্র ছিল যে ছাত্ররাও তাদের স্যার বললে গালি দিচ্ছিলো। আমরা যখন শান্তিপূর্ণভাবে একাডেমির সামনে থেকে অতিক্রম করছিলাম, তখন ৭০০ থেকে ৮০০ জন আনসারের সবাই আমাদের ওপরে গুলি চালায়। প্রথম রাউন্ডের গুলি আমার ঘাড়ে ও পিঠে লাগে। আমি মনে করছি, পরে আর গুলি চালাবে না। আমি তখন দুই হাত উপরে করে সারেন্ডার করি। তাদের কমান্ডারকে আমি যখন ফেস করি তখন সবাই আমার দিকে গুলি ছোড়ে। আমি তখন মুখ থুবড়ে রাস্তায় পড়ে যাই। তখন মনে হয় আমার ৭ থেকে ১২ সেকেন্ডের মতো জ্ঞান ছিল। এখনো আমার দাঁতগুলো নড়ে। বুলেটের তীব্রতা এত ছিল যে, মনে হচ্ছিলো আমার গায়ে বৃষ্টিপাত হচ্ছিল।

ওইদিন ওমর ফারুককে জিরানীতে অবস্থিত শেখ ফজিলাতুন্নেছা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন, সেখানে আমাকে একদিন রাখা হয়। তারা শুধু আমার রক্তগুলো পরিষ্কার করে আর দুইটা স্যালাইন দেয়। কোনো ধরনের চিকিৎসা না করেই তারা ১০ হাজার ৮০০ টাকা বিল করে। সেখান থেকে এক বড় ভাই জীবনের বাজি নিয়ে আমার ছোট ভাইসহ আমাকে সাভারে নিয়ে আসে। ৪ঠা আগস্ট থেকে ৬ই আগস্ট পর্যন্ত  আমার চোখ থেকে অনবরত রক্ত পড়েছে। ৬ই আগস্ট এই হাসপাতালে আমার চোখে প্রথম সার্জারি হয়।

ওমর ফারুক বলেন, বুলেট লাগার পরে ২০শে আগস্ট পর্যন্ত আমার ডান সাইড প্যারালাইজড ছিল। হুইলচেয়ারে আমি যাতায়াত করতাম। বাথরুমে বসলেও আমাকে ধরে রাখতে হতো। ডাক্তাররা বললো- যে আমি যদি কষ্ট করে হাঁটতে পারি, তাহলে ধীরে ধীরে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। ৩০শে আগস্ট থেকে আমি মোটামুটি হাঁটতে পারি। ৩১শে আগস্ট আমাকে রিলিজ দেয়া হয়। তখন এই হাসপাতাল থেকে ডাক্তার আমাকে বলে যে, আমার চোখে আর কখনো আলো ফিরবে না। সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে আমি আবার সিএমএইচ-এ ভর্তি হই। এখন আমি আলো জ্বললে আর নিভলে বুঝতে পারি। তৃতীয় মেয়াদে চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ৭ই নভেম্বর আবারো ভর্তি হন তিনি।

ওমর ফারুক বলেন, আমার চোখে সবমিলিয়ে গুলি লাগছে ১২টা। বাম চোখে ৫টা, ডান চোখে ৭টা। আমার মাথায় অগণিত গুলি লেগেছে, এখনো সেখানে ৪২টা গুলি আছে। পুরো শরীরে প্রায় ১০০টার মতো ছররা গুলি আছে। ডাক্তার বলেছে- আমার ডান চোখে আর দেখতে পাবো না। বাম চোখে দৃষ্টি ফেরার সম্ভাবনা আছে। যদি বিদেশে উন্নত চিকিৎসা দেয়া হয় অথবা বাইরে থেকে ডাক্তার এনে চিকিৎসা দেয়া হলে চোখের দৃষ্টি বাড়তে পারে। আমরা চাই, দৃষ্টি না ফিরলে একটা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক। উন্নত চিকিৎসার জন্য আগস্ট মাস থেকে আমরা বলছি।
ওমর ফারুক বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের চতুর্থ সেমিস্টারে ইলেকট্রনিক্স ডিপার্টমেন্টে অধ্যয়ন করেন। তার গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জে। তিনি বলেন, আমার চিকিৎসার জন্য এনজিও থেকে লোন করা হয়েছিল। এখন এনজিও থেকে আমাদের অনেক চাপ দিচ্ছে। এটা মওকুফ করলে অনেক ভালো হতো।

এক চোখের সঙ্গে আমার মুখের আকৃতিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে: ইয়ামিন
১৯শে জুলাই পল্টনে বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে পুলিশের গুলিতে চোখে আঘাতপ্রাপ্ত হন ইয়ামিন শেখ। পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি তার এক চোখের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। ওইদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ইয়ামিন বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলাম। হঠাৎ সিভিল ড্রেস পড়ুয়া কেউ কেউ আমাদের টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। তারপর আমরা ছোটাছুটি শুরু করি। পেছনের গলি থেকে ছাত্রলীগ আমাদের ওপরে হামলা চালায়। এরপর অন্য একটি রোড দিয়ে বের হতে গিয়ে দেখি পুলিশ। তিন দিক থেকে তারা আমাদের ওপরে হামলা করে। সবাই সবার মতো সটকে পড়ি। একটা ব্যাংকের সিঁড়ি দিয়ে আমরা উঠে যাই। আমার সঙ্গে ৪ থেকে ৫ জন বন্ধু ছিল। একসঙ্গে নামার সময়ে পুলিশ আমাদের ওপরে দু’টি গুলি চালায়। আমার এক বন্ধুর মাথার পেছন দিয়ে বুলেট ঢুকে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই ও রাস্তায় পড়ে যায়। ওকে আমরা তুলতে গেলে পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে ইচ্ছামতো ছররা গুলি নিক্ষেপ করে। আমি সবার সামনে ছিলাম, পুলিশের গুলি আমার ডান চোখের মধ্যে ঢুকে যায়। এরপর ওইদিনই আমাকে বন্ধুরা এই হাসপাতালে নিয়ে আসে।

গুলিতে ইয়ামিনের ডান চোখের রেটিনা ৯৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। তার এই চোখের চিকিৎসা আর কোথাও সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। ইয়ামিন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, আমার চোখে ওয়েল দেয়া আছে। ডাক্তার বলেছেন- চোখ ভেতরে চলে যাবে। আমার মুখের আকৃতিও আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রথমদিকে আমাকে এই হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা দেয়া হয়নি। এখান থেকে ইসলামীয়া হাসপাতালে একবার ভর্তি হই। আমার মুখে অনেকগুলো গুলি ঢুকে আছে। এখানে আবারো ২০ দিনের বেশি সময় ভর্তি হয়েছি।
ইয়ামিনের পরিবার কেরানীগঞ্জে একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। এ বছরই তিনি এসএসসি পাস করেছেন। সুস্থ হওয়ার পরে আবারো কলেজে ভর্তি হবেন বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি। বলেন, ২১ তারিখে আমার বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। তার ওপেন হার্ট সার্জারির জন্য লাগবে অনেক টাকা। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি ফ্রিল্যান্সিং করতাম। এখন পরিবারের সব ইনকাম বন্ধ হয়ে গেছে।

mzamin

শীতে ওদের রাত কাটে যেভাবে by মেহনাজ শাহরিন অর্থি

তীব্র শীত। ওদের মাথাগোঁজার জায়গা নেই। কাওরান বাজারের ফুটপাথ ও মগবাজার ফ্লাইওভারের ফাঁকা জায়গাকে বেছে নিয়েছে ওরা। এখানেই রাত হলে চট বা কোনো পণ্যের কার্টন বিছিয়ে শুয়ে পড়ে। গরমের সময় কোনো সমস্যা না হলেও শীতে ওরা পড়ে বিপর্যয়ের মুখে। ওরা কেউ মিন্তি, কেউ কাওরান বাজার সিগন্যালে ভিক্ষে করে বেড়ায়। কেউবা কাওরান বাজারে পড়ে থাকা সবজি কুড়িয়ে তা বিক্রি করে। দিন এভাবে পার করলেও রাত যেন তাদের কাছে এক সমুদ্র পাড়ি দেয়া। সরজমিন এমন ক’জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের জীবন কাহিনী।

রাত ৯.২০ মিনিট। হোটেল সোনারগাঁওয়ের উল্টা পাশে ফ্লাইওভারের নিচে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন এক বৃদ্ধা। নাম হোসনেয়ারা।  বয়স ৬০ বছরের কাছাকাছি। বলেন, আগে আমি মানুষের বাসায় কাজ করতাম। দুই ছেলে আর এক মেয়েকে এভাবেই বড় করেছি। ওরা এখন  রিকশা চালায়। বিয়ে করেছে। কিন্তু আমাকে খেতে দেয় না। আর মেয়ে থাকে ময়মনসিংহে। এখন আমি একা মানুষ। ভিক্ষা করে খাই। রাতে কোনোদিন এখানে ঘুমাই। কখনো শাহবাগের দিকে ঘুমাই। গরমে সমস্যা না হলেও শীতে কাহিল হয়ে পড়ি। সম্বল মাত্র একটি কাঁথা। নিচে একটা মাদুর বিছিয়ে নেই। কিন্তু সমস্যা হয় এই বড় বড় বাস ট্রাকগুলোর আওয়াজে।

ফ্লাইওভারের নিচে এক কোণে শুয়ে আছেন সোয়েদ আলী নামে এক বৃদ্ধ।  বয়স প্রায় ৭০। সারা দিন রিকশা চালিয়ে সন্ধ্যার পর এখানে আসেন একটুখানি ঘুমানোর তাগিদে। তিনি বলেন, আমার বাড়ি নওগাঁ জেলায়। আমার তিন ছেলে। দুইজনের নওগাঁতে ছোট চায়ের দোকান। বাকি জন বড় ছেলের সঙ্গে দোকানেই থাকে। স্ত্রী মারা গেছে দুই বছর হলো। জীবিত থাকাকালীন বড় ছেলের সঙ্গে থাকতো  সে। আমি কারও দয়ায় বাঁচতে চাই না বলে খেটে খাই, রিকশা চালাই, দিন আনি-দিন খাই। রাতে এইখানে ঘুমাই। ঢাকা শহরে এসেছি প্রায় ১৩ বছর হলো। এই ধুলাতেই অভ্যাস হয়ে গেছে আমার। এখন আর ধুলায় কোনো সমস্যা হয় না। ভাত-ডালের সঙ্গে ধুলাও আমি তিনবার খাই।

এরপর চোখ পড়লো ফ্লাইওভারের পিলার ঘেঁসে বসে থাকা আসমা বেগমের দিকে। তিনি বললেন, আমার বয়স ৪২ বছর। ফুলের মালা বিক্রি করি। ঢাকা শহরে এসেছি এক বছরও হয়নি। তবে রাস্তাঘাট কম চিনিনি। জীবন আমাকে আজ এখানে নিয়ে এসেছে। এক মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে যখন চরম অভাবে পড়েছিলাম, তখন আমার স্বামী আরেকটা বিয়ে করে। ছেলে-মেয়ে দু’টোকে কষ্ট করে বড় করেছি, বিয়ে দিয়েছি। এখন আর তারা আমাকে দেখে না। এখন ফুল বিক্রি করেই খাই। আর রাতে এখানে ঘুমাই। কোনোদিন আবার একটু সামনে গিয়ে ঘুমাই। যখন যেখানে জায়গা পাই আর কি। এত ধুলার মধ্যে কীভাবে ঘুমান- জানতে চাইলে তিনি বলেন, যখন গ্রামে থাকতাম তখন এই রকম পরিবেশে ঘুমানোর অভ্যাস ছিল না। এখন বাধ্য হয়ে এই ধুলার মধ্যেই থাকতে হয়। এই পরিবেশে ঘুমানো যায় না। একটু পর পর বাতাসে যে ধুলাটা আসে এটা নাকেই ঢুকে, কখনো আবার ঢুকে কানে।
শুধু কাওরান বাজারই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে এইসব বাস্তুহারা মানুষের জীবনে প্রচণ্ড শীতে নেমেছে চরম দুর্গতি। জীবনের তাগিদে দিনের বেলা তারা পথের নানা প্রান্তে ছুটলেও দিনশেষে তাদের আশ্রয় মিলে পথের ধারে কোনো এক ফুটওভার ব্রিজের ওপরে বা ফ্লাইওভারের নিচে। আর এখানে শীতের মধ্যে দূষিত বায়ু আর শব্দদূষণে এক নাজেহাল পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা।

mzamin

বিদায় কবি হেলাল হাফিজ (১৯৪৮-২০২৪)

দ্রোহ আর প্রেমের কবি হেলাল হাফিজ। যিনি তার কবিতায় জাগিয়েছিলেন মুক্তির সুর, আন্দোলনের চেতনাকে অমর করে রেখেছিলেন শব্দের জাদুতে, গতকাল তিনি ৭৬ বছর বয়সে জীবনযুদ্ধের সমাপ্তি  ঘটিয়ে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। এদিন দুপুরে বাথরুমে পড়ে গিয়ে রক্তক্ষরণ হয় এই কবির। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিএসএমএমইউ পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজাউর রহমান বলেছেন, বেলা ২টা ৩৫ মিনিটে হাসপাতালে আনার আগেই কবির মৃত্যু হয়। কবি হেলাল হাফিজের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।

কবি হেলাল হাফিজ ১৯৪৮ সালের ৭ই অক্টোবর নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বড়তলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য কেটেছে নিজের শহরেই। ১৯৬৭ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। উত্তাল ষাটের দশক হয়ে ওঠে তার কবিতার উপকরণ। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় রচিত ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি তাকে কবিখ্যাতি এনে দেয়। তার কবিতা হয়ে ওঠে মিছিলের স্লোগান।

‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ কালজয়ী কবিতার এই লাইন দুটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পরবর্তীতে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও কবিতাটি মানুষের মাঝে তুমুল সাড়া জাগায়।

১৯৮৬ সালে প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কবিকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এরপর বইটির ৩৩টির বেশি সংস্করণ বেরিয়েছে। দীর্ঘসময় নিজেকে অনেকটা আড়ালে সরিয়ে নিয়েছিলেন হেলাল হাফিজ। আড়াই দশক পর ২০১২ সালে তিনি পাঠকদের জন্য আনেন দ্বিতীয় বই ‘কবিতা ৭১’। তৃতীয় এবং সর্বশেষ বই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা’ প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে।
কবিতায় অসামান্য অবদানের স্মারক হিসেবে হেলাল হাফিজকে ২০১৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেয়া হয়। এ ছাড়া তিনি পেয়েছেন যশোর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (১৯৮৬), আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৭), নেত্রকোনা সাহিত্য পরিষদের কবি খালেকদাদ চৌধুরী পুরস্কার ও সম্মাননা।

মৃত্যু যেভাবে: কবি হেলাল হাফিজ রাজধানীর শাহবাগের একটি হোস্টেলে মারা যান। ওই হোস্টেলের ওয়াশরুমে পড়েছিলেন কবি হেলাল হাফিজ। তখন তার মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল। পরে বিএসএমএমইউ-তে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজাউর রহমান বলেছেন, উনাকে কয়েকজন ব্যক্তি নিয়ে আসেন মৃত অবস্থায়। উনারা পরিবারের সদস্য নন, উনার হোস্টেলের প্রতিবেশী হতে পারে। বিষয়টি আমি শাহবাগ থানার ওসিকে জানিয়েছি। এদিকে এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ খলিল মনসুর বলেছেন, শাহবাগের একটি হোস্টেলে থাকতেন কবি হেলাল হাফিজ। দুপুরে তিনি হোস্টেলের একটি কমন ওয়াশরুমে যান। অনেকক্ষণ হলেও তিনি ওয়াশরুম থেকে বের হচ্ছিলেন না। পরে হোস্টেলের অন্য রুমের সদস্যরা ওয়াশরুমের সামনে এসে ডাকাডাকি করলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তারা বাধ্য হয়ে ওয়াশরুমের দরজা ভাঙেন। দরজা ভেঙে দেখতে পান কবি হেলাল হাফিজ ওয়াশরুমের ফ্লোরে পড়ে রয়েছেন এবং তার মাথা ফেটে অনেক রক্ত বের হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের প্রাথমিক ধারণা স্ট্রোক বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি বাথরুমে পড়ে যান। বাথরুমের বেসিনটিও ভাঙা ছিল। আমাদের ধারণা, তিনি বেসিনের ওপর পড়ে যান। তখন বেসিন ভেঙে যায় এবং উনার মাথা ফেটে যায়।

প্রধান উপদেষ্টার শোক: কবি হেলাল হাফিজের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল এক শোক বার্তায় মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দ্রোহ ও প্রেমের কবি হেলাল হাফিজের মৃত্যু বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। প্রধান উপদেষ্টা কবির পরকালীন জীবনের শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, কবি হেলাল হাফিজ ছিলেন তারুণ্যের শক্তি এবং স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক সাহসী কণ্ঠ। তার কালজয়ী কবিতার মতোই তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের ছায়া: প্রিয় কবির মৃত্যু যেন মেনে নিতে পারছেন না তার অজস্র পাঠক-ভক্ত। শোক ও ভালোবাসায় তাকে স্মরণ করছেন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা থেকে শুরু করে সব অঙ্গনের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পুরোটা যেন হেলাল হাফিজের কবিতা-স্মৃতির চাদরে ঢেকে গেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ফেসবুকে লিখেছেন, কবি হেলাল হাফিজ আর যৌবনের গান প্রায় সমার্থক হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি আরও নানা রকম কবিতাও লিখেছিলেন। যেমন: ‘কথা ছিল একটি পতাকা পেলে আমি আর লিখবো না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা’! কিন্তু আমাদের অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা এই জুলাইতেও লিখতে হয়েছে। কবির প্রয়াণে শোক এবং শ্রদ্ধা। আগামীকাল সকাল ১১টায় বাংলা একাডেমি এবং বাদ জোহর প্রেস ক্লাবে হেলাল হাফিজের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা।

mzamin