Showing posts with label কাতার. Show all posts
Showing posts with label কাতার. Show all posts

Saturday, October 24, 2026

দোহায় মকবুল ফিদা হুসেনকে নিবেদিত বিশ্বের প্রথম জাদুঘর উদ্বোধন

কাতারের রাজধানী দোহার উপকণ্ঠে যুক্ত হয়েছে একটি নতুন ধূসর-নীল স্থাপনা। সূর্যালোকে যার টালি ঝিলমিল করে ওঠে, দেয়ালে জ্যামিতিক ছায়া ফেলে। ভবনটি যেন সামনে ঝুঁকে গল্প বলার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। এটাই ‘লওহ ওয়া কলম’, ভারতীয় শিল্পের কিংবদন্তি মকবুল ফিদা হুসেনকে নিবেদিত বিশ্বের প্রথম জাদুঘর। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

কাতার ফাউন্ডেশনের এডুকেশন সিটির বিস্তৃত ক্যাম্পাসে অবস্থিত জাদুঘরটি গত সপ্তাহে উদ্বোধন করা হয়েছে। এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে ১৫০-এরও বেশি কাজ, চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, ট্যাপেস্ট্রি, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্রসহ নানা কর্ম। যা হুসেনের বৈচিত্র্যময় ও দীর্ঘ শিল্প–যাত্রার অনন্য মানচিত্র তৈরি করেছে। কিউরেটর নুফ মোহাম্মদ জানিয়েছেন, হুসেন চাইতেন তার জাদুঘর যেন বাড়ির মতোই ঘনিষ্ঠ অনুভূতি দেয়।

বিশ্বভ্রমণকারী বোহেমিয়ান শিল্পী হিসেবে পরিচিত হুসেনের ঘোড়ার চিত্র আজও সমকালীন শিল্পের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন কাজ। কিউবিস্ট ঘরানার প্রভাব, ভারতীয় ঐতিহ্য ও পুরাণ- সবকিছু মিশিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব উজ্জ্বল, সাহসী শৈলী।

তবে তার শিল্প-জীবনে ছিল নানা বিতর্ক। নগ্ন হিন্দু দেবীচিত্রের কারণে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন তিনি। এজন্য তাকে স্বেচ্ছানির্বাসনে যেতে হয়েছে। পরে কাতার তাকে নাগরিকত্ব দেয় এবং এখানেই তিনি কাটান নিজের শেষ সৃজনশীল বছরগুলো। কাতার-ভিত্তিক শিল্পী ইউসুফ আহমদ স্মরণ করেন, আরব সংস্কৃতি তাকে গভীরভাবে মোহিত করেছিল। এখানেই তিনি তার জীবনের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী কাজগুলি সম্পন্ন করেন মকবুল ফিদা হুসেন। তার উচ্চাভিলাষী কাজগুলোর অন্যতম ‘সিরু ফি আল-আর্দ’- গতি, শব্দ ও যান্ত্রিক কোরিওগ্রাফির মাধ্যমে সভ্যতার গল্প বলার একটি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্ট। যা হুসেনের শেষ বছরগুলোর প্রধান কর্মযজ্ঞ ছিল।

জাদুঘর-ভবনের অনুপ্রেরণা ২০০৮ সালের একটি স্কেচ- দুইটি ভাস্কর্য-ঘর এবং এক নলাকার টাওয়ার। স্থপতি মার্তান্ড খোশলা বলেন, একটি স্কেচ মানে উদ্দেশ্য, বাস্তব পরিমাপ নয়। সেই উদ্দেশ্যকে কার্যকর জাদুঘরে রূপ দেওয়া ছিল চ্যালেঞ্জ। ফলাফল একটি গোলকধাঁধার মতো। যার বিন্যাস দর্শককে হুসেনের তুলির আঁচড়ের মতোই প্রতিটি রেখা, আলো-ছায়া অনুসন্ধানের আমন্ত্রণ জানায়।

প্রতিটি গ্যালারি শুরু হয় হুসেনের একটি উক্তি দিয়ে। দীর্ঘ করিডোর ধরে দেখা যায় তার আঁকা ছবি, ভাস্কর্য, ব্যক্তিগত জিনিস। এমনকি তার পুরোনো ভারতীয় পাসপোর্টও। কেন্দ্রস্থলে স্থান পেয়েছে তার প্রিয় ঘোড়ার ছবি। জাদুঘর দল হুসেনের চালক, সহকর্মী ও বন্ধুসহ নানা ব্যক্তির কাছ থেকে মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করেছে, যাতে তার ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত দিকও উঠে আসে। শিল্পী ইউসুফ আহমদ বলেন, মানুষ তাকে বিতর্কিত, খালি-পায়ে ঘুরে বেড়ানো এক অদ্ভুত শিল্পী হিসেবে মনে রাখে, কিন্তু তার গভীরে ছিলেন এক গল্প-কথকের প্রতিভা।

২০০৮ সালে কাতারের শেখা মোজা বিন্ত নাসেরের অনুরোধে হুসেন আরব সভ্যতা নিয়ে বিশাল কর্মপরিকল্পনা হাতে নেন। দোহায় স্টুডিও থেকে তিনি আঁকেন ইসলামের ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও মরুভূমির পথিকদের- ভারতীয় শিল্পশৈলীর গতিময় রেখা। যার মধ্যে ‘দ্য ব্যাটল অব বদর’ অন্যতম। ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার শক্তিশালী মেলবন্ধন। তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন ৯৯টি কাজের। তবে জীবদ্দশায় সম্পন্ন করেন মাত্র ৩৫টি। এগুলো পর্যায়ক্রমে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।

স্থপতি খোশলা বলেন, হুসেন ছিলেন একাধিক পরিচয়ের শিল্পী। ভারত, আরব অঞ্চল, ইতিহাস, ধর্ম, আধুনিকতা- সব মিলেই তৈরি হয়েছিল তার অনন্য জগৎ। জাদুঘরটি সেই বহুত্বকে নতুন আলোয় তুলে ধরে ধরেছে। এম এফ হুসেন শুধুই ভারতীয় শিল্পীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক বহুজাগতিক, বহুভাষী, বহুসাংস্কৃতিক শিল্প-বিশ্বের অংশ। তাই দোহায় হুসেনের স্মরণে নির্মিত এই জাদুঘর একদিকে শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যদিকে তার উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে পুনঃপাঠের একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চ।

mzamin

Wednesday, October 21, 2026

‘বদর সমঝোতা স্মারক’ - তুরস্ক, কাতার, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সামরিক সক্ষমতা জোরদার করতে একটি যুগান্তকারী চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তুরস্ক, কাতার, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া। দোহায় চার দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ‘বদর সমঝোতা স্মারক’ নামের এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।

বুধবার এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, চার দেশের পারস্পরিক অংশীদারিত্বকে আরও গভীর ও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই চুক্তিটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করবে। এটি সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি গবেষণা ও উন্নয়ন এবং যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র তৈরি করবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রত্যেকটি দেশের নিজস্ব সামরিক উৎপাদন সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই উদ্যোগ তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও সংহত করবে। এর মাধ্যমে বন্ধুভাবাপন্ন ও মিত্র দেশগুলোর সামরিক চাহিদা পূরণ করা সহজতর হবে।’

ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী তুরস্ক সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। কাতার ছাড়াও বেশ কয়েকটি মিত্র দেশে তুর্কি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

এর আগে গত আগস্ট মাসে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল আঙ্কারা—যেখানে কোনো এক দেশের ওপর আক্রমণকে বাকিদের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করার অঙ্গীকার করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সামরিক শক্তি ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও তুরস্কের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে।

তুর্কি প্রতিরক্ষা শিল্প সংস্থার চেয়ারম্যান হালুক গোরগুন জানিয়েছেন, যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে এই ‘বদর সমঝোতা স্মারক’ টেকসই কৌশলগত সহযোগিতার শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে।

গোরগুন বলেন, ‘একটি টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি হলো প্রযুক্তি ভাগাভাগি এবং ঘরোয়া উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি। স্রেফ অস্ত্র কেনাবেচার বাইরে গিয়ে আমরা এমন একটি অংশীদারিত্বে বিশ্বাস করি, যা সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব মানবসম্পদ ও শিল্প কাঠামোর বিকাশ ঘটায়। আমরা আশাবাদী, এই চুক্তির মাধ্যমে চার দেশের পরিপূরক প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা বাস্তবমুখী নানা প্রকল্পে রূপান্তরিত হবে।’

তুরস্ক, কাতার, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই

Thursday, October 8, 2026

কাতারের উত্তর উপকূলে ট্যাংকারে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

কাতারের উত্তর উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এ তথ্য জানিয়েছে।

ইউকেএমটিও এর তথ্য অনুযায়ী, কাতারের মদিনাত আশ শামাল শহর থেকে প্রায় ৯৪ কিলোমিটার উত্তরে ট্যাংকারটিতে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে। তবে এতে কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়, হামলার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্ত করছে। জাহাজটির মালিকানা বা কোন দেশের পতাকা বহন করছিল, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানানো হয়নি। ঘটনাটি কাতারের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের (ইইজেড) মধ্যে ঘটলেও এখন পর্যন্ত দোহা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
কাতারের উত্তর উপকূলে ট্যাংকারে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
পুতিনের সঙ্গে পেজেশকিয়ানের ফোনালাপ, যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা

সামুদ্রিক বাণিজ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য মেরিটাইম এক্সিকিউটিভ জানিয়েছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উপসাগরের পশ্চিম অংশে এটি প্রথম ট্যাংকার হামলার ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজে হামলার প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি।

ইউকেএমটিও জানিয়েছে, চলতি মাসেই সেখানে ট্যাংকারে নয়টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এটি সেপ্টেম্বর মাসে হরমুজ প্রণালি ও উপসাগর মিলিয়ে নথিভুক্ত মোট হামলার প্রায় অর্ধেক। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ এ পথ ব্যবহার করত। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। তবে হামলা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

কেপলারের হিসাবে, ৩০ সেপ্টেম্বর সাত দিনের গড় রপ্তানি দাঁড়ায় প্রতিদিন ১ কোটি ৮৩ লাখ ব্যারেল, যা যুদ্ধের আগের ১২ মাসের গড় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেলের চেয়েও বেশি।

সূত্র: আল জাজিরা

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা বেড়েছ: ইউকেএমটিও
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা বেড়েছ: ইউকেএমটিও

Wednesday, September 30, 2026

ইরানে হামলার আধা ঘণ্টা আগে সতর্কবার্তা পান কাতারের প্রধানমন্ত্রী

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরুর মাত্র আধা ঘণ্টা আগে হোয়াইট হাউস থেকে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি। ২৮ ফেব্রুয়ারির ওই হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কতা পেয়েও যুদ্ধ ঠেকাতে কিছু করার সুযোগ প্রায় ছিল না বলে জানিয়েছেন তিনি।

সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা পাওয়ার পর তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘এটি ঠেকাতে কিছু করা সম্ভব কি না।’ তবে ততক্ষণে হামলা কার্যত শুরু হয়ে গিয়েছিল।

পিয়ার্স মরগান জানতে চান, আরও আগে সতর্ক করা হলে কাতার আরও কিছু করতে পারত কি না। জবাবে আল-থানি বলেন, আগে জানানো হলে যুদ্ধ ঠেকাতে তারা সম্ভাব্য সবকিছুই করতেন। কারণ কাতার সবসময় কূটনীতিকেই সামনে এগোনোর একমাত্র পথ এবং যে কোনো সংঘাতের সমাধান হিসেবে দেখে।

তবে এবারের পরিস্থিতি তাদের জন্য ‘বিস্ময়কর’ ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। হামলা শুরুর ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যেই কাতারও ইরানের হামলার শিকার হয় বলে জানান কাতারের প্রধানমন্ত্রী।

আল-থানি বলেন, তিনি দোহায় নিজের বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। সেখানেই হোয়াইট হাউস থেকে ফোন পেয়ে জানতে পারেন, প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে। হামলা শুরু হওয়ার এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে কাতারেও হামলা হয়।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী এ স্বল্প সময়ের সতর্কবার্তায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। তার মতে, এত অল্প সময়ের মধ্যে কোনো কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ ছিল না। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঠেকাতে কাতারের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দোহায় ইরানের হামলার নিন্দা জানান তিনি।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধকে ‘ভূমিকম্প’ হিসেবে বর্ণনা করেন আল-থানি। তার মতে, এই সংঘাত যুদ্ধের ধরন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুনভাবে বদলে দিচ্ছে।

তবে সরাসরি সংঘাতের পরও কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইরান সবসময় কাতারের প্রতিবেশী হিসেবে থাকবে। দুই দেশের মধ্যে সিরিয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেন তিনি। সিরিয়া ইস্যুতে ইরান বাশার আল-আসাদকে সমর্থন করলেও কাতার তার বিরোধিতা করেছিল।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে তার বা অন্য কোনো বিদেশি সরকারের সরাসরি যোগাযোগ নেই বলেও জানান আল-থানি। মোজতবা খামেনি জীবিত আছেন কি না, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন বলে মন্তব্য করেন।

তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে যোগাযোগ কার্যকরভাবে অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠান তেহরানের বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করে।

যুদ্ধের কারণে কাতারের অর্থনীতিতে নজিরবিহীন চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান আল-থানি। তার দেওয়া হিসাবে, দেশটির অর্থনীতি ৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, পর্যটন কমেছে ৮০ শতাংশ এবং হোটেলগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ কক্ষ খালি পড়ে আছে। এতে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারিয়েছে কাতার।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানিও ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তবে কিছু ক্রেতা হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনের দায়িত্ব নিতে রাজি হওয়ায় সীমিত পরিসরে রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।

নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক অথবা আইনি সমাধানের আহ্বান জানান কাতারের প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালেও কাতার প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছিল। তখন সরকারি কর্মীদের বেতন দিতে দেশটিকে সম্পদ বিক্রি করতে ও ঋণ নিতে হয়েছিল।

তবে গত কয়েক দশকে গড়ে তোলা সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার কারণে বর্তমান সংকটও কাতার সামলে উঠতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন আল-থানি। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে সাময়িক সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন।

সূত্র : পিয়ার্স মরগান আনসেন্সরড ও ওয়াইনেট

সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের সঙ্গে কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি। ছবি: ইউটিউব
সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের সঙ্গে কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি। ছবি: ইউটিউব

Tuesday, September 8, 2026

শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না: কাতার

সৌদি গেজেটঃ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক জোটের ওপর নির্ভর করতে পারে না। নিরাপত্তার জন্য নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য দেশগুলোকে আরও উদ্যোগী হতে হবে। আজ সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাজধানী আবুধাবিতে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এ কথা বলেছেন।

আজ আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হিলি ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে আল-আনসারি ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মতো হুমকির মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে এ অঞ্চলের জন্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ইরানের হামলাকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করে উপসাগরীয় দেশগুলো সেই হামলার ধাক্কা সফলভাবে সামাল দেওয়ায় তাদের প্রশংসা করেন আল-আনসারি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত জোট যথেষ্ট নয়।

হিলি ফোরামে আল-আনসারি বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বাহিনীর উপস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত জোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।’

আল-আনসারি আরও বলেন, ‘নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনই সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। হ্যাঁ, আমাদের অংশীদারদের প্রয়োজন আছে। হ্যাঁ, আমাদের মিত্রদের প্রয়োজন আছে। কিন্তু আমাদের নিরাপত্তার জন্য শুধু তাদের ওপর নির্ভর করতে পারি না।’

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে কাতার গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে দেশটি ইরানের ব্যাপক হামলার শিকার হয়েছে। বিশেষ করে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোতে কয়েক দফায় বড় ধরনের হামলা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি কাতারে অবস্থিত। পুরো যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং এ অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে ইরান।

ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলে বাধা দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে পাল্টা অবরোধ আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত মাসে মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি তেহরান সফর করেন।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Thursday, August 27, 2026

ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জাতিসংঘে কাতার

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে হবে বলে জানিয়েছে কাতার। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক অধিবেশনে এ কথা বলেছেন জাতিসংঘে কাতারের রাষ্ট্রদূত আলিয়া আহমেদ সাইফ আল-থানি। খবর আলজাজিরা।

গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে আয়োজিত ওই অধিবেশনে আরব গোষ্ঠীর পক্ষে বক্তব্য দেন আল-থানি। তিনি বলেন, ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান না ঘটালে ন্যায়সংগত, পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই শান্তি অর্জন করা সম্ভব নয়।

তিনি গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরাইলের চলমান ‘গুরুতর লঙ্ঘনের’ নিন্দা জানান। আল-থানি বলেন, এর মধ্যে রয়েছে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র এবং ২০২৫ সালের ব্যাপক পরিকল্পনা—যুদ্ধ বন্ধ, জিম্মিদের মুক্তি এবং গাজা উপত্যকা পুনর্গঠনের জন্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন একটি বহুপাক্ষিক চুক্তি—উভয়কেই ইসরায়েলের প্রত্যাখ্যান।

আল-থানি বলেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে মৌলিকভাবে দুর্বল করা হচ্ছে। এ কারণে তিনি পরিকল্পনাটির পূর্ণ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

তিনি আরো বলেন, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনাকে স্বাগত জানান কাতারের এই রাষ্ট্রদূত।

ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জাতিসংঘে কাতার

Wednesday, August 26, 2026

ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় মুখ খুলল চীন ও কাতার

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে চীন ও কাতার। দুই দেশই বলেছে, একতরফা নিষেধাজ্ঞা সংকটের সমাধান নয়; বরং কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখা প্রয়োজন। ইরাকি সংবাদমাধ্যম শাফাক নিউজ এ খবর প্রকাশ করেছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বেইজিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া কোনো একতরফা নিষেধাজ্ঞা চীন সমর্থন করে না। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে এবং বেইজিং নিজের বৈধ স্বার্থ রক্ষা করবে।

চীন বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রথম দফায় বড় কোনো চীনা ব্যাংককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।

একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনা করে কাতারও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, কাতার এখনো ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, উত্তেজনা আরও বাড়লে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, পুরো বিশ্বেই পড়বে।

গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক অভিযান শুরু করে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, এই অভিযানের লক্ষ্য ইরান এবং দেশটির অর্থনীতিকে সহায়তা করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়ানো।

এই পদক্ষেপের আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ, তেল খাত ও অন্যান্য নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৬০ জন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান পরিবহন ও নৌপরিবহন খাতেও সম্ভাব্য গৌণ নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ানো হয়েছে।

স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেন, যেসব দেশ বা কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকবে, ভবিষ্যতে তারা মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারাতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলার জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে।

এদিকে ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি দাবি করেন, চীন, রাশিয়াসহ ইরানের মিত্র দেশগুলো ওয়াশিংটনের এই চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।

অন্যদিকে পাকিস্তানও সমান্তরালভাবে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তেহরানে পাকিস্তান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বৈঠকের পর দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উত্তেজনা কমানো এবং হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

আইআরজিসির পাহাড়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করছে। ছবি : এএফপি
আইআরজিসির পাহাড়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করছে। ছবি : এএফপি > হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। এসব জাহাজকে জরিমানা, আটক এমনকি জব্দও করা হতে পারে। খবর রয়টার্সের। সোমবার (২৪ আগস্ট) পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে এ সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের নির্ধারিত ব্যবস্থা না মানা জাহাজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। ফলে ইরানের এ হুঁশিয়ারিতে এই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজের মালিক ও ভাড়াকারীদের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। প্রণালিটি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ইরান সম্প্রতি পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ নামে নতুন একটি সংস্থা গঠন করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরসংক্রান্ত যাত্রার ক্ষেত্রে নিয়ম না মানা হিসেবে চিহ্নিত জাহাজগুলোর হালনাগাদ তালিকা অনুসরণ করতে হবে পণ্য মালিকদের।

Sunday, August 16, 2026

কি ঘটেছে কাতারে নিখোঁজ ইরানের তিন পাইলটের ভাগ্যে?

চলতি বছরের মার্চে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত শুরুর পর কাতারের আকাশে ভূপাতিত হয়েছিল ইরানের দুটি সুখোই-২৪ যুদ্ধবিমান। ঘটনার দীর্ঘ ছয় মাস পার হলেও সেই অভিযানে অংশ নেওয়া তিন ইরানি পাইলটের ভাগ্য ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম রহস্য ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন। তেহরানের দাবি-বৈমানিকদের জীবিত বন্দি করে গোপন হেফাজতে রেখেছে কাতার। দোহার দাবি তাদের হাতে কোনো জীবিত পাইলট নেই। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে নিখোঁজ পাইলটদের পরিবারের। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি ও আল জাজিরা।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২ মার্চ, যখন কাতারের আল উদাইদ মার্কিন ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় ইরানের দুটি বোমারু বিমান ভূপাতিত করা হয়। চারজন বৈমানিকের মধ্যে মজিদ কাজেমি নামের একজনের মরদেহ উদ্ধার করে আগেই তেহরানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবে বাকি তিন পাইলট-জাওয়াদ সালেহি, আব্দুল মজিদ দাশতিয়ান ও ওমরান বেহরুশিয়ানকে নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) প্রধান মির্জানা স্পোলজারিকের কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরজাদেহ অভিযোগ করেছেন, বিমান থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসা (ইজেক্ট) এই তিন সেনাকে কাতার ছয় মাস ধরে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বন্দি করে রেখেছে। পরিবার কিংবা কোনো কূটনৈতিক প্রতিনিধির সাথে তাদের দেখা করতে না দেওয়াকে যুদ্ধবন্দি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে তেহরান।

তবে ইরানের এই অভিযোগকে স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে কাতার। শনিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ জানান, তাদের ভূখণ্ডে কোনো ইরানি পাইলট বন্দি নেই এবং তেহরানের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। দোহার পক্ষ থেকে জানানো হয়, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে আকাশসীমা লঙ্ঘনের কারণেই আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বিমানগুলোতে আঘাত হানা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিশেষ উদ্ধারকারী দল অনুসন্ধান চালিয়ে কেবল একজনের মরদেহই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। কাতার আরও উল্লেখ করে, উদ্ধার অভিযানের বিস্তারিত তথ্য খতিয়ে দেখার জন্য গত এপ্রিলেই ইরানি প্রতিনিধি দলকে দোহা সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যার কোনো উত্তর এখনও তেহরান দেয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনা ও যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় যখন কাতার অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, ঠিক সেই সময়ে এই তিন পাইলটের পরিণতি ঘিরে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। একদিকে তেহরানের বন্দি মুক্তির জোরালো দাবি, অন্যদিকে দোহার আনুষ্ঠানিক অস্বীকৃতি দুই দেশের এই বিপরীতমুখী অবস্থানে তিন বৈমানিকের জীবিত থাকা বা মৃত্যুর বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হিসেবেই ঝুলছে।

কি ঘটেছে কাতারে নিখোঁজ ইরানের তিন পাইলটের ভাগ্যে?

Friday, June 19, 2026

যেভাবে কূটনৈতিক চালে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি করাল কাতার

দীর্ঘ কয়েক মাসের ধৈর্যশীল ও পুঞ্জীভূত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর গত বুধবারে ফ্রান্সে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সব ফ্রন্টে লড়াই স্থগিতের ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এই চুক্তির পেছনে মূল মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের পাশাপাশি কাতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বহুপক্ষীয় এই মধ্যস্থতায় প্রথম থেকে ধারাবাহিক ও স্পষ্ট নেতৃত্ব দিয়েছে পাকিস্তান। তারা তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিশরকে নিয়ে একটি কূটনৈতিক ফ্রন্ট গঠন করে। তবে এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান মূলত কাতারের অনুসৃত নীতিই ব্যবহার করেছে। কাতার দুই পক্ষের সঙ্গেই তার অনন্য সম্পর্ক ও যোগাযোগের মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে একটি কার্যকর সংযোগকারী হিসেবে কাজ করেছে।

কাতারের বাস্তবসম্মত উদ্যোগ

গত এক সপ্তাহে কাতারি প্রতিনিধিদল দুইবার তেহরান সফর করেছে। সেখানে গত রোববার টানা ১৭ ঘণ্টার তীব্র আলোচনার পর এই চুক্তি চূড়ান্ত রূপ পায়। চলতি সপ্তাহেও দোহায় পরবর্তী আলোচনার সূচি রয়েছে। বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাতারের ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হলেও এই চুক্তিতে তাদের সম্পৃক্ততা অনেক পর্যবেক্ষককে অবাক করেছে।

বর্তমান যুদ্ধের আগে ওমান এবং কাতার যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনার আয়োজন করেছিল। তখন ওমান সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করলেও কাতার মূলত দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের কাজ করত। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর একযোগে হামলা চালালে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

ক্ষয়ক্ষতি ও অবস্থান পরিবর্তন

যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরীয় দেশগুলো অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই সংঘাতের সামনে চলে আসে। কাতার এতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। ইরানি হামলায় দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যায়, যা পুনরুদ্ধার করতে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।

দিনের পর দিন ইরানি হামলার মুখে গত ২৪ মার্চ কাতার আনুষ্ঠানিকভাবে এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। তারা তখন ইরানের হামলার মুখে নিজেদের সুরক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়।

কূটনীতিতে ফেরা

গত ৮ এপ্রিল স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি সাম্প্রতিক সপ্তাহে ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হলে কাতার আবারও আলোচনায় ফিরে আসে। মে মাসের শেষের দিকে একটি ইরানি প্রতিনিধিদল দোহা সফর করে। পাকিস্তান মূল প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে থাকলেও কাতার আগের মতোই দুই পক্ষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের (শাটল ডিপ্লোম্যাসি) কাজ শুরু করে।

নিজেদের সম্পদ ধ্বংস হওয়ার পরও কাতারের আবারও আলোচনায় ফিরে আসা সমালোচকদের জন্য একটি বড় বার্তা। অনেকে চেয়েছিলেন কাতার ইরানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে সামরিক পথ বেছে নিক। কিন্তু মাসব্যাপী যুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো চূড়ান্ত ক্ষতি করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে ছোট উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক শক্তি বৃদ্ধি কোনো কাজে আসত না।

কাতারের জন্য সবসময়ই কূটনীতি ও মধ্যস্থতা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী তাস। যুদ্ধের বিশাল খরচ ও মানবিক বিপর্যয়ের তুলনায় কূটনৈতিক পদক্ষেপের খরচ একেবারেই সামান্য। কাতার যদি ইরানের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করত, তবে তারা মধ্যস্থতাকারীর যোগ্যতা হারাত। একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে কাতারের জন্য এই কূটনীতি কোনো অসহায়ত্ব ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

যেভাবে কূটনৈতিক চালে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি করাল কাতার
১৬ জুন ফ্রান্সে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

Thursday, January 8, 2026

এক বছরে বাংলাদেশে ২৫৬টি মসজিদ নির্মাণ করেছে কাতার চ্যারিটি

এক বছরে বাংলাদেশে ২৫৬টি মসজিদ নির্মাণ করেছে কাতার চ্যারিটি। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে দেয়া হয়েছে পূর্ণাঙ্গ সরঞ্জাম। এর ফলে দেশের গ্রামীণ ও উপশহরগুলোতে মুসলিমদের জন্য নামাজ আদায়ের নিরাপদ স্থান সংকুলান করেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা হয়েছে শান্তির আবহ ও ধর্মীয় স্বস্তি। এ খবর দিয়ে অনলাইন গালফ টাইমস বলেছে, রোববার কাতার চ্যারিটি এক বিবৃতিতে এসব কথা জানিয়েছে।

তারা বলেছে টার্গেট করা এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদগুলো। সেখানে আগে মুসল্লিরা টিন অথবা কাদামাটি দিয়ে তৈরি অবকাঠামোতে নামাজ আদায় করতেন। তাতে তাদের মৌলিক নিরাপত্তা ও স্বস্তি থাকতো না। বর্ষার সময় বৃষ্টিতে সয়লাব হয়ে যেত মেঝে। অন্যদিকে গ্রীষ্মে ফ্যানের অভাবে গাদাগাদি করে নামাজ আদায় করাও হয়ে উঠতো মারাত্মক কঠিন। তাই ৫ বছর ধরে কাতার চ্যারিটি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে ৬০০ মসজিদ নির্মাণ করেছে।

mzamin

Monday, December 29, 2025

সবচেয়ে ধনী আরব পরিবারগুলোর সম্পদের পরিমাণ কত?

আরব বিশ্ব ইতিহাসের কিছু সবচেয়ে ধনী পরিবারের আবাসস্থল। বিপুল সম্পদ, বিলাসবহুল জীবনধারা ও গভীর সাংস্কৃতিক শেকড়ের জন্য পরিচিত এসব পরিবার বৈশ্বিক ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তবে তাদের সম্পদের উৎস শুধু আধুনিক তেল বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বহু ক্ষেত্রেই এই সম্পদের ভিত্তি গড়ে উঠেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা বাণিজ্য, উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে। সেটা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করেছে।

ব্লুমবার্গের ‘ওয়ার্ল্ডস রিচেস্ট ফ্যামিলিজ ২০২৫’ প্রতিবেদন উল্লেখ করে জিও নিউজ বলছে, বিশ্বের ২৫টি সবচেয়ে ধনী পরিবারের সম্মিলিত সম্পদ এক বছরে বেড়েছে ৩৫৮.৭ বিলিয়ন ডলার। তাদের মোট সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ এখন ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের মূল্যবৃদ্ধি এবং ধাতু ও পোষা প্রাণীর খাবারের মতো পণ্যের বাড়তি চাহিদার কারণে এই সম্পদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই তালিকায় আরব বিশ্বের তিনটি সবচেয়ে ধনী পরিবারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল নাহিয়ান, সৌদি আরবের আল সৌদ এবং কাতারের আল থানি পরিবার।

আল নাহিয়ান পরিবার
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি আমিরাতের একটি আবুধাবির শাসক পরিবার আল নাহিয়ান বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয়-ধনী পরিবার। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৩৫.৯ বিলিয়ন ডলার। আবুধাবির শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট। তেল আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই এই পরিবার অঞ্চলটি শাসন করে আসছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আর্থিক প্রভাবও বিস্তৃত হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শেখ তাহনুন ব্যক্তিগত ও সার্বভৌম সম্পদ মিলিয়ে প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদের তত্ত্বাবধান করেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছেন।

আল সৌদ পরিবার
সৌদি আরবের শাসক আল সৌদ পরিবার ব্লুমবার্গের তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে। তাদের আনুমানিক মোট সম্পদের পরিমাণ ২১৩.৬ বিলিয়ন ডলার। ৯৩ বছর বয়সী এই রাজবংশ তাদের বিপুল সম্পদের বড় অংশ গড়ে তুলেছে সৌদি আরবের বিশাল তেল সম্পদের ওপর ভিত্তি করে। ব্লুমবার্গ জানায়, এ বছরে সম্পদের মূল্যায়ন বেড়েছে মূলত অতীতের আয় প্রবাহের নতুন হিসাব এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যয় কমে আসার কারণে। প্রায় ১৫ হাজার বিস্তৃত আত্মীয়স্বজন নিয়ে গঠিত এই পরিবারের প্রভাবাধীন মোট সম্পদের পরিমাণ বাস্তবে আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। বহু রাজকীয় সদস্য সরকারি চুক্তি ও জমি লেনদেনের মধ্যস্থতা করে অথবা সৌদি আরামকোর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে সেবা প্রদানকারী ব্যবসা গড়ে তুলে আয় করেছেন। সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড বর্তমানে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ পরিচালনা করছে। আর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ব্যক্তিগতভাবে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন বলে জানা যায়।

আল থানি পরিবার
কাতারের শাসক আল থানি পরিবার ব্লুমবার্গের ২০২৫ সালের তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে। তাদের আনুমানিক মোট সম্পদের পরিমাণ ১৯৯.৫ বিলিয়ন ডলার। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে কাতার শাসন করে আসা এই পরিবারের ভাগ্য বদলে যায় মূলত দেশের বিশাল অফশোর প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রের কৌশলগত উন্নয়নের মাধ্যমে। যদিও তেল আবিষ্কৃত হয় ১৯৪০ সালের দিকে, তবে গ্যাস সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই কাতারের অর্থনীতি আমূল রূপান্তরিত হয় এবং পরিবারটি বৈশ্বিক ধনীদের শীর্ষ সারিতে উঠে আসে। আল থানি পরিবারের সদস্যরা কাতারের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব রাখেন। তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের মধ্যে রয়েছে হোটেল, বীমা প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণ কোম্পানি। এছাড়া তাদের বিদেশে উচ্চমূল্যের সম্পদও রয়েছে- লন্ডনের মেফেয়ারে বিলাসবহুল সম্পত্তি, স্টাড ফার্ম, ব্যক্তিগত ব্যাংক এবং বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন হাউস ভ্যালেন্তিনো সহ নানা খাতে বিনিয়োগ।

mzamin

Saturday, December 20, 2025

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কিনতে আলোচনা চালাচ্ছে কাতার, উদ্বিগ্ন ইসরায়েল

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ কিনতে আলোচনা করছে কাতার। ইসরায়েলের সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ১২ নিউজ এমন খবর দিয়েছে।

এফ–৩৫ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের কাছে এফ–৩৫ বিক্রির ঘোষণা দেন। ইসরায়েলের কাছে এই সিরিজের যে যুদ্ধবিমান রয়েছে, সৌদি আরবকেও সেই একই ধরনের বিমান দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প।

এই প্রেক্ষাপটে কাতারেরও একই যুদ্ধবিমান কেনার চেষ্টার খবর সংবাদমাধ্যমে এল। তবে পাঁচ বছর আগেও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে এ যুদ্ধবিমান কেনার চেষ্টা করেছিল।

চ্যানেল ১২ নিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাতারের এই আলোচনাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইসরায়েল। তবে আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আলোচনা প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোলে সৌদি আরব ও তুরস্কের পর কাতার মার্কিন এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার অপেক্ষায় থাকা দেশের তালিকায় যুক্ত হবে। মধ্যপ্রাচ্যে এখন পর্যন্ত শুধু ইসরায়েল এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, তুরস্ক ও সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি না করতে ইসরায়েলের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে লবিং করেছে। ট্রাম্প এই লবিংয়ের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন।

গত নভেম্বরে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস বৈঠকে করেন ট্রাম্প। বৈঠকে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, এফ-৩৫ বিষয়ে সৌদি আরব ও ইসরায়েলকে সমান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি জানি, তারা (ইসরায়েল) চাইবে, সৌদি আরবের যুদ্ধবিমানগুলো কম ক্ষমতাসম্পন্ন হোক। এটাকে আমি আপনাদের জন্য খুশির খবর বলে মনে করি না।...আমার মতে, তারা (ইসরায়েল ও সৌদি আরব) এমন পর্যায়ে আছে, যেখানে তাদের উভয়ের শীর্ষ মানের বিমান পাওয়া উচিত।’

তুরস্কের এফ-৩৫ পাওয়ার সম্ভাবনা কম

এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের তুলনায় তুরস্কের এফ-৩৫ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে জানান, সৌদি আরব একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি হলে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দ্রুতগতিতে অস্ত্র কিনতে পারবে।

তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথভাবে এফ-৩৫ তৈরির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনায় ২০১৯ সালে তুরস্ককে এই পরিকল্পনা থেকে বাদ দেয় ওয়াশিংটন।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিল সংশোধন করা হয়। এতে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট যদি নিশ্চিত করেন, তাঁরা রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আর রাখছেন না; তখন তুরস্কের কাছে যুক্তরাষ্ট্র এফ-৩৫ বিক্রির কথা ভাববে বলে উল্লেখ করা হয় মার্কিন প্রতিরক্ষা বিলের সংশোধনীতে।

গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানায়, তুরস্ক এফ-৩৫ কেনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়ার কাছে এস-৪০০ ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, নেতানিয়াহু চলতি বছরের শুরুতে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি না করতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে লবিং করেছেন।

নেতানিয়াহু কেন এমন করেছেন, এ বিষয়ে বলা হয়—সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। এ ছাড়া ফিলিস্তিন নিয়ে তুরস্কের বিভিন্ন বিবৃতিতে ক্ষুব্ধ ইসরায়েল।

গত সেপ্টেম্বরে কাতারের রাজধানী দোহায় ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল। এটা নিয়ে ইসরায়েল ও কাতারের সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল।

চ্যানেল ১২ নিউজ জানিয়েছে, এফ-৩৫ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-কাতারের আলোচনা নিয়ে ইসরায়েলের কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সর্বশেষ প্রযুক্তির দুটি স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান কেনার একটি প্রস্তাব তৈরি করছে ইসরায়েল। এ প্যাকেজে তারা একটি ‘এফ-৩৫এস’ ও আরেকটি ‘এফ-১৫আই’ যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তির গোলাবারুদ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা কেনার কথা ভাবছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-19%2Fg1ngvhmc%2FUntitled-1.jpg?rect=109%2C0%2C1182%2C788&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানিকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ এয়ার ফোর্স ওয়ানে এক বৈঠকে, ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ছবি: এএফপি

Sunday, December 7, 2025

সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার না হলে গাজা শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণ হবে না -কাতারের প্রধানমন্ত্রী

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার না হলে শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণ হবে না। গতকাল শনিবার কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মেদ বিন আবেদলরহিম আল-থানি এ কথা বলেন। কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত দোহা ফোরামে তিনি এ কথা বলেন।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে আমরা সংকটময় মুহূর্তে আছি। গাজা থেকে সব ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা ও উপত্যকাটিতে স্থিতিশীলতা না আসা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পূর্ণ হবে না।’ গত ১০ অক্টোবর কাতার, যুক্তরাষ্ট্র ও মিসরের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গাজা শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন হয়। এর মাধ্যমে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে দুই বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটে।

শান্তিচুক্তির দ্বিতীয় ধাপে ইসরায়েলকে গাজার বিভিন্ন স্থানে থাকা সেনাচৌকি প্রত্যাহার, একটি অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ শাসনভার গ্রহণ করা এবং সেখানে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য গঠিত বাহিনী (আইএসএফ) মোতায়েন করা হবে, যা এখনো শুরু হয়নি। কিন্তু ফিলিস্তিনি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আরব ও মুসলিম দেশগুলো স্থিতিশীলতা বাহিনীতে অংশ নিতে অনীহা দেখাচ্ছে।

ফোরামে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, এই বাহিনী নিয়ে এখনো আলোচনা

চলছে। এটি কীভাবে পরিচালিত হবে এবং কোন কোন দেশ এতে অংশ নেবে—তা নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে। ফিদান বলেন, ‘এই বাহিনীর প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত ইসরায়েলি সেনাদের হাত থেকে ফিলিস্তিনিদের পৃথক করা। এটাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এরপর আমরা অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারব।’

তুরস্ক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে অংশ নিতে চায় বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে ইসরায়েল বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে না। কারণ, তারা মনে করে হামাসের সঙ্গে আঙ্কারার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, চুক্তির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের পথ সুগম করতে

কাতার, তুরস্ক, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র একত্রে কাজ করছে। দুই দেশের জনগণের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে একটি স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।

মোহাম্মেদ বিন আল-থানি
মোহাম্মেদ বিন আল-থানি

Tuesday, September 23, 2025

ইসরায়েলকে মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী

গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) যৌথ প্রতিরক্ষা পরিষদ গত বৃহস্পতিবার কাতারের রাজধানী দোহায় জরুরি বৈঠক করেছে। এর উদ্দেশ্য ছিল কাতারে ইসরায়েলের হামলার পর এ অঞ্চলের জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা। সম্প্রতি দোহায় হামাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে ছয়জন নিহত হন।

জিসিসির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই বলেন, কাতারের ওপর এ হামলাকে সব জিসিসি সদস্যদেশের ওপর হামলা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

আল–বুদাইউই জানান, সদস্যদেশগুলো যৌথ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করবে, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদার করবে, আকাশ প্রতিরক্ষায় সমন্বয় করবে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে আগাম সতর্কতামূলক বার্তাব্যবস্থা চালু করবে ও যৌথ মহড়া চালাবে। এর মধ্যে একটি আঞ্চলিক বিমানবাহিনী মহড়াও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এ বছর শুরু হওয়ার পর থেকে কাতার হলো সপ্তম দেশ, যেখানে ইসরায়েল বোমা হামলা চালিয়েছে।

জিসিসিভুক্ত দেশ কারা, সামরিক খরচ কত

গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট। এটি ১৯৮১ সালে গঠিত হয়। এর সদস্য আরব উপদ্বীপের ছয় দেশ—বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।

জিসিসি মূলত নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সহযোগিতা বাড়াতে গঠিত হয়েছিল। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে এ জোট প্রায়ই একসঙ্গে অবস্থান নেয়।

গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মিলিটারি ব্যালান্স ২০২৪ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে জিসিসি দেশগুলো সম্মিলিতভাবে ১১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন (১১ হাজার ৪৫০ কোটি) ডলার সামরিক খাতে ব্যয় করেছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের ব্যয় সবচেয়ে বেশি—কমপক্ষে ৬৯ বিলিয়ন (৬ হাজার ৯০০ কোটি) ডলার। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বে সপ্তম স্থানে রয়েছে দেশটি।

এরপর রয়েছে ইউএই (২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার), কাতার (৯ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার), কুয়েত (৭ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার), ওমান (৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার) ও বাহরাইন (১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার)।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি কোথায়

যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে আসছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৯টি স্থায়ী ও অস্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে।

ঘাঁটিগুলোর মধ্যে স্থায়ী আটটি আছে জিসিসির পাঁচটি দেশ—বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এ ছাড়া মিসর, ইরাক ও জর্ডানেও ঘাঁটি রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র–কাতার কৌশলগত সম্পর্ক

১৯৯৬ সালে কাতারে আল উদেইদ বিমানঘাঁটি স্থাপন করা হয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি। ২৪ হেক্টর (৬০ একর) জায়গাজুড়ে থাকা এ ঘাঁটিতে প্রায় ১০০টি বিমান ও ড্রোন মোতায়েন আছে। প্রায় ১০ হাজার সেনাও অবস্থান করছেন এখানে।

এ ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) অগ্রবর্তী সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সম্প্রতি দোহায় ইসরায়েলের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কাতার সফরে যান। এর এক দিন আগে তিনি ইসরায়েলে বৈঠক করেছিলেন।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এ সফরের সময় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের কৌশলগত সম্পর্ক, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ এবং এমন হামলার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ব্যবস্থা নেব।’

সৌদি–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি

গত বুধবার রাতে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানের সঙ্গে একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (এসএমডিএ)’ স্বাক্ষর করেছে।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, যেকোনো একটি দেশের ওপর আগ্রাসনকে অপর দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে ধরা হবে।

এ চুক্তি এমন এক সময় করা হলো, যখন হামলার পর কাতারের পাশে সংহতি জানাতে আরব লিগ ও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) প্রায় ৬০টি সদস্যরাষ্ট্র দোহায় সমবেত হয়েছিল।

উপসাগরীয় দেশগুলোর বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা

জিসিসির ছয় দেশ নিজেদের জন্য স্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া ও চীনের তৈরি নানা ধরনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ, মাঝারি ও স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। দীর্ঘপাল্লা ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) বা এর বেশি দূরের হুমকি ঠেকায়, মাঝারি পাল্লা ৩০ থেকে ১০০ কিলোমিটার (১৯ থেকে ৬২ মাইল) ও স্বল্পপাল্লা ১ থেকে ৩০ কিলোমিটারের (শূন্য দশমিক ৬ থেকে ১৯ মাইল) মধ্যে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে।

সৌদি আরব

উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সৌদি আরবের। এ ব্যবস্থায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি থাড সিস্টেম ও দীর্ঘপাল্লার প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্র। এ ছাড়া রয়েছে মাঝারি পাল্লার আই-হক, স্বল্পপাল্লার ফরাসি ক্রোটাল, শাহিন ও মিকা ক্ষেপণাস্ত্র। আরও আছে অসংখ্য পয়েন্ট ডিফেন্স লঞ্চার, যেমন স্টিঙ্গার, অ্যাভেঞ্জার, মিস্ত্রাল ও এমপিসিভি।

প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সহায়ক হিসেবে রয়েছে বিভিন্ন দেশ, যেমন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ভালকান, সুইস/জার্মান ওয়েরলিকন ও সুইডিশ বোফর্স এল/৭০ কামান।

সৌদি আরব একমাত্র জিসিসি দেশ, যাদের কাছে চীনের তৈরি সাইলেন্ট হান্টার লেজার সিস্টেম আছে। এটি নিচুতে উড়তে থাকা ড্রোন এবং অন্যান্য হুমকি শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)

ইউএইর হাতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের থাড ও প্যাট্রিয়ট সিস্টেম। পাশাপাশি ইসরায়েলের তৈরি বারাক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। মাঝারি পাল্লার জন্য রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার চেওংউং ২। স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষায় আছে ফরাসি ক্রোটাল ও মিস্ত্রাল, রুশ ইগলা ও প্যানসির-এস১, সুইডিশ আরবিএস-৭০ ও ব্রিটিশ র‌্যাপিয়ার। এগুলোকে সহায়তা করে ইউরোপীয় বিমানবিধ্বংসী কামান।

সৌদি আরব ও আরব আমিরাত জিসিসির দুই দেশ, যাদের হাতে থাড (টার্মিনাল হাই অলটিচিউড এরিয়া ডিফেন্স) সিস্টেম আছে। এটি তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির বিরুদ্ধে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ক্ষমতা প্রদান করে।

কাতার

কাতারের দীর্ঘ ও মাঝারি পাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট সিস্টেম ও নাসামস-৩। স্বল্পপাল্লার জন্য রয়েছে রুশ ইগলা, মার্কিন স্টিঙ্গার, চীনা এফএন-৬ ও ফরাসি মিস্ত্রাল ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলোকে সহায়তা করে জার্মানির তৈরি গেপার্ড ও স্কাইনেক্স বিমানবিধ্বংসী কামান।

কুয়েত

কুয়েতের দূরপাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩। স্বল্পপাল্লার জন্য আছে ইতালির আসপিদে ক্ষেপণাস্ত্র ও স্কাইগার্ড ব্যবস্থা, স্টিঙ্গার, স্টারবার্স্ট ও এফআইএম-৯২ ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলোর সঙ্গে রয়েছে জার্মান ওয়েরলিকন জিডিএফ কামান।

বাহরাইন

বাহরাইন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ এমএসই ব্যবস্থা কিনেছে। ফলে সৌদি আরব, ইউএই, কাতার ও কুয়েতের পর তারাও দীর্ঘপাল্লার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জন করেছে।

মাঝারি ও স্বল্পপাল্লায় বাহরাইন নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের আই-হক ও ফরাসি ক্রোটালের ওপর। এ ছাড়া রয়েছে রুশ ইগলা, মার্কিন স্টিঙ্গার, সুইডিশ আরবিএস-৭০ পয়েন্ট ডিফেন্স ক্ষেপণাস্ত্র ও ওয়েরলিকন বিমানবিধ্বংসী কামান।

ওমান

উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের তুলনায় ওমানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা খানিকটা দুর্বল। দেশটির স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নাসামস, ফরাসি মিস্ত্রাল, মার্কিন জ্যাভলিন ও রুশ স্ট্রেলা-২ ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলোকে সহায়তা করে রুশ, সুইস ও সুইডিশ কামান।

একটি থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা
একটি থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ছবি: রয়টার্স

Saturday, September 20, 2025

আরব দেশগুলো এখন বুঝছে—ইরান নয়, ইসরায়েলই তাদের জন্য বড় হুমকি by সানাম ওয়াকিল

কাতারের দোহায় হামাস কর্মকর্তা ও আলোচকদের হত্যার মাধ্যমে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এটা উপেক্ষা করা আরব রাষ্ট্রগুলোর পক্ষেও সম্ভব নয়।

ইসরায়েল বরাবরই তার নিরাপত্তার স্বার্থে আগাম (আক্রান্ত হওয়ার আগেই) ও সীমান্তের বাইরে হামলার যৌক্তিকতা দেখিয়ে এসেছে। গত দুই বছরে ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল অন্তত ছয়টি দেশে (ফিলিস্তিনসহ) হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের এসব হামলার লক্ষ্য ছিল দেশটির নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের হুমকি দূর করা।

কিন্তু কাতারের রাজধানী দোহায় হামলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কাতার শুধু সমৃদ্ধ উপসাগরীয় রাজতন্ত্রই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগী ও ন্যাটোবহির্ভূত একটি মিত্র। একই সঙ্গে এটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল-হামাস আলোচনার একটি কেন্দ্র।

ফলে এই হামলা আরেকটি ‘টার্গেট কিলিং’ নয়, বরং এক মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা। এখন থেকে আরব রাষ্ট্রগুলো শুধু ইরানকেই নয়, ইসরায়েলকেও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

এটাই প্রথম নয় যে ইসরায়েল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলাকালীন হামলা চালাল। গত দুই বছরে লেবাননে হিজবুল্লাহ, সিরিয়ায় নতুন সরকার আল-শারা, ইয়েমেনে হুতি, এমনকি ইরানের বিরুদ্ধেও, যখন তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করছিল, উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের হত্যা করা হয়েছে, হামলা চালানো হয়েছে।

এসব হামলা সাধারণত আলোচনার অগ্রগতি ভন্ডুল করার সময়ই হয়েছে, যেন ইসরায়েল দেখাতে পারে যে তাদের কাছে কূটনীতি ও সামরিক চাপ আলাদা নয়। দোহার হামলা এই ধারা অনুসরণ করেছে। তবে এর প্রতীকী গুরুত্ব দীর্ঘ মেয়াদে সুদূরপ্রসারী হবে।

ইসরায়েলের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দোহার এক শান্তিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হানে, যেখানে সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সফর করেছিলেন এবং কাছেই ছিল একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। উপসাগরীয় শাসকদের কাছে বার্তাটি পরিষ্কার: মার্কিন মিত্রতা ও সামরিক ঘাঁটি তাদের রক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।

ইসরায়েল বহুদিন ধরেই কাতারের প্রতি ক্ষোভ পুষে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অনুমোদনে দোহা গাজায় বহু বছর ধরে অর্থ পাঠিয়েছে, অঞ্চলটিকে স্থিতিশীল রাখার প্রচেষ্টায়।

কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর সেই ব্যবস্থাকে হামাসকে শক্তিশালী করার অজুহাত হিসেবে তুলে ধরে ইসরায়েল। পরবর্তীকালে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা কাতারের অর্থ নিয়ে লবিং করেছেন বলে কেলেঙ্কারি ফাঁস হলে এই ক্ষোভ আরও স্পষ্ট হয়।

তবে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। কাতারে অবস্থিত আল-উদেইদ ঘাঁটি মার্কিন সামরিক শক্তির প্রধান ভরকেন্দ্র। এখান থেকেই আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ার অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ২০২২ সালে জো বাইডেন কাতারকে ‘ন্যাটোবহির্ভূত প্রধান মিত্র’ হিসেবে ঘোষণা করেন।

এমনকি গত জুনে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সময় ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার কাতারে হামলা হওয়া, সেটাও হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের দ্বারা যা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।

কয়েক দশকে ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে ইরানের কেন্দ্রে রেখে সংজ্ঞায়িত করেছিল। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বাহিনীগুলোকে সহায়তা এবং সীমান্তের বাইরে আঘাত করার সক্ষমতা নিয়ে তারা আশঙ্কায় থাকত। কিন্তু ইসরায়েলের গাজায় নির্বিচার অভিযান, পশ্চিম তীরে তৎপরতা এবং লেবানন-সিরিয়া-কাতারে ক্রমবর্ধমান হামলা এই ধারণা বদলে দিয়েছে।

আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে এখন ইসরায়েলই সবচেয়ে বড় হুমকি। অবশ্যই ইরানের ভূমিকাও মারাত্মক, তবে তার আগ্রাসন পরিচিত ও পূর্বানুমানযোগ্য। বিপরীতে ইসরায়েলের পদক্ষেপ দিন দিন আরও বেপরোয়া হচ্ছে, যা আরব বিশ্বের প্রচলিত কূটনৈতিক ও নিরাপত্তার নিয়ম-নীতি ভেঙে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা এ ধারণাকে আরও শক্ত করেছে। ট্রাম্প ও বাইডেন কেউই ইসরায়েলের হামলা নিয়ন্ত্রণ করেননি। কাতারে হামলার পর উপসাগরীয় শাসকদের বুঝতে হবে যে ওয়াশিংটন হয় অক্ষম, নয় অনিচ্ছুক, তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রকেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

এখন উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভবত নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াবে। একই সঙ্গে চীন ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ করবে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়াকে পুনর্বিবেচনা করবে। গাজায় যুদ্ধ চলতে থাকায় আব্রাহাম চুক্তি ও সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের স্বপ্ন কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে।

আরব অঞ্চলের জন্য এর তাৎপর্য স্পষ্ট; যে নিরাপত্তা কাঠামো এত দিন ইরানকেন্দ্রিক ছিল, সেটি এখন নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে, যেখানে ইসরায়েলকেই অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

একই সময়ে উপসাগরীয় শাসকেরা বৃহত্তর কৌশলগত স্বয়ংসম্পূর্ণতার অনুসরণে এগিয়ে চলেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি থেকে নিজেদের রক্ষা করার ব্যাপারে ক্রমেই আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হচ্ছেন।

দোহায় হামলাটি শেষ পর্যন্ত একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে; যা এই বোধকে সুস্পষ্ট করে যে ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং নিরাপত্তার নামে অংশীদারদের সার্বভৌমত্ব বহুবার ত্যাগ করা হয়েছে।

ফলে এখন প্রশ্নটা কেবল এটা নয় যে আরব রাষ্ট্রগুলো প্রতিক্রিয়া দেখাবে কি না? বরং এখন এটাও প্রশ্ন যে তারা ‘কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে’?

* সানাম ওয়াকিল, চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক
- গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া

কাতারের দোহায় হামাস কর্মকর্তা ও আলোচকদের হত্যার মাধ্যমে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
কাতারের দোহায় হামাস কর্মকর্তা ও আলোচকদের হত্যার মাধ্যমে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ছবি: রয়টার্স

কাতার ও ভারতের প্রতি ট্রাম্পের অবমাননা নতুন অস্থিরতা তৈরি করছে by নাসরিন মালিক

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা হঠাৎ করে জরুরি বৈঠক ও সম্মেলনে মিলিত হচ্ছেন। কারণ, কাতারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে ইসরায়েল দোহায় হামাস নেতাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। কাতার শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রই নয়, দেশটি গাজার শান্তি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুও।

এ হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করতে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান দোহায় এসে কাতারের আমিরকে আলিঙ্গন করেছেন। কয়েক বছর আগে যখন এ দুই দেশের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব ছিল, তখন এমন দৃশ্য ভাবাও সম্ভব ছিল না।

 এ ছাড়া সৌদি আরব ইসরায়েলি হামলার পর প্রতিক্রিয়া দেখাতে আরব, ইসলামি ও আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এবং ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে অপরাধ বলে নিন্দা জানিয়েছে।

সম্প্রতি আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে চীনের তিয়ানজিনে একত্র হতে দেখলাম। সেখানে তাঁরা হাসিমুখে কথা বলেছেন। এটি এই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি প্রতিচ্ছবি। এই সমাবেশের পেছনে কারণ হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণের কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি কিছুটা দূরত্বে চলে গেছেন।

ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরপরই যেসব বিদেশি নেতা ওয়াশিংটনে তাঁকে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছিলেন, মোদি তাঁদের একজন। তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে ট্রাম্পকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেখানে ট্রাম্প মোদিকে ‘মহান বন্ধু’ বলেছিলেন। সেখানে তাঁরা দুই দেশের মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ব্যবসা দ্বিগুণ করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। কিন্তু মাস কয়েক পরই ট্রাম্প ভারতের আমদানি করা পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপান।

ইসরায়েলের দোহা হামলার কয়েক মাস আগে ট্রাম্প কাতারের রাজধানীতে সফর করার সময় বলেছিলেন, ‘আমাদের এই বন্ধুত্ব দীর্ঘজীবী হোক।’ এখন বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্প কাউকে ‘বন্ধু’ বললে তার মানে কিন্তু সম্পর্কের নিশ্চয়তাকে বোঝায় না; বরং এতে সেই ‘বন্ধুর’ বিপদে পড়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে।

আসলে এসব সমাবেশ, নতুন একতার প্রকাশ ও আঞ্চলিক জোটের দৃঢ়তা কিছু ক্ষেত্রে কেবল দেখানোর জন্য। ভারত বা কাতারের ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরাসরি যাওয়ার সত্যিই আগ্রহ নেই। তাদের অসন্তোষ কিংবা বন্ধুত্ব দেখানো মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানোর জন্য যে তারা বিশ্বাসঘাতক নয় এবং তাদের কাছে অন্য বিকল্পও আছে।

তবে এসব আয়োজনকে সত্যিকারের শক্তিশালী জোট তৈরি করার চেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। ট্রাম্পের মতো সম্ভবত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও মনে করেন, তাঁরা এমন ‘মূল্য নির্ধারক’ হিসেবে থাকতে পারেন, যাঁদের হাতে বাজারে পণ্যের দাম ঠিক করার ক্ষমতা আছে। ইসরায়েল সম্ভবত মনে করে, তারা যাকে ইচ্ছা তাকে বোমা মেরে শেষ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভাবে, তারা যখন-তখন নিরাপত্তাচুক্তি ভঙ্গ করতে পারে এবং নিজের শর্ত যে কারও ওপর চাপিয়ে দিতে পারে।

কিন্তু যদি এটা খুব দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তখন যুক্তি মেনে চলা দেশগুলো এই অসংগত পরিস্থিতির সমাধান খুঁজতে শুরু করবেই। এটা এ কারণে নয় যে তারা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েলকে শক্তিধর দেখতে অপছন্দ করে। উপসাগরীয় দেশগুলোও এর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করেছে এবং সেখানকার কোনো কোনো দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। এখন এই দেশগুলোও মনে করছে, ট্রাম্প খামখেয়ালি এবং ইসরায়েল লাগামহীন। এ কারণে দেশগুলো তাদের নিজেদের ক্ষমতা যাচাই করছে এবং কীভাবে এক হওয়া যায়, সে চেষ্টা করছে। যখন কোনো ঘনিষ্ঠ মিত্রকে ধোঁকা দেওয়া হয়, তখন সবাই বুঝতে পারে, কেউ নিরাপদ নয়।

উদাহরণস্বরূপ, আব্রাহাম চুক্তির অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত কাতারে হামলার পর ইসরায়েলের প্রতি আগের মতো বন্ধুত্বপূর্ণ ভাষায় কথা বলেনি। তারা এর তীব্র সমালোচনা করছে। এই চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ ইতিমধ্যে সন্দেহের মুখে পড়ে গেছে।

ট্রাম্পের বিদেশনীতি এখন যেভাবে চলছে, তাতে তাঁর খামখেয়ালি ধরনটিকে বোঝা জরুরি। ট্রাম্পের এখন খুব একটা বিশ্বাসযোগ্যতা নেই এবং তাঁর অতিরিক্ত বিনিয়োগ সেই আস্থা ফেরাতে খুব একটা কাজে দেবে না।

* নাসরিন মালিক, দ্য গার্ডিয়ান–এর কলামিস্ট
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-16%2F8wg3krcj%2Fqataruaepresident.jpg?rect=67%2C0%2C864%2C576&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাতারের আমিরের সঙ্গে দেখা করেন আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট। ছবি: রয়টার্স

Tuesday, September 16, 2025

ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে হবে আরব ও মুসলিম নেতাদের: -কাতারের আমির

গাজা বিষয়ক সংলাপ বা আলোচনাকে ভণ্ডুল করে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাতারে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। পক্ষান্তরে আরব বিশ্বকে ইসরাইলি প্রভাববলয়ে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আরব ও ইসলামিক দেশগুলোর নেতাদের সম্মেলনে এসব কথা বলেছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি। তিনি বলেন, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে হবে আরব ও মুসলিম নেতাদের। তার ভাষায়, যে পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে, তাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করার চেষ্টা করে, সে আলোচনাকে ভেস্তে দিতে চায়। তাদের জন্য আলোচনা কেবল যুদ্ধেরই একটি অংশ। আরব ও মুসলিম নেতাদের উদ্দেশে দোহা সম্মেলনে সোমবার এসব কথা বলেন শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি।

তিনি আরও বলেন, ইসরাইলি সরকার গাজার চলমান যুদ্ধকে ব্যবহার করছে দখলদারিত্ব বাড়াতে এবং স্থিতাবস্থা পাল্টাতে। আলোচনার বিষয়টি কেবল গাজায় তাদের সামরিক অভিযানের অজুহাত। যদি ইসরাইল হামাস নেতাদের হত্যা করতে চায়, তবে কেন তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসছে? প্রশ্ন রাখেন কাতারের আমির।

তিনি অভিযোগ করেন, ইসরাইল তাদের জিম্মিদের ব্যাপারেও উদাসীন বরং শুধু নিশ্চিত করছে যে গাজাকে আর যাতে বসবাসযোগ্য রাখা না যায়। যদি সত্যিই জিম্মিদের মুক্তি চাওয়া হয়, তবে কেন আলোচক সবাইকে হত্যা করা হচ্ছে? এমন কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতক দলের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্ক রাখা যায় না।

শেখ তামিম গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা আখ্যা দেন। কাতারের আহ্বানে আয়োজিত আরব লীগ ও ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) যৌথ সম্মেলনের লক্ষ্য ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যেটি গাজায় যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয় বন্ধের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক আহ্বানের মুখোমুখি।

হামাস দাবি করেছে, গত সপ্তাহে দোহায় তাদের ওপর চালানো বিমান হামলায় শীর্ষ নেতারা বেঁচে গেছেন, যদিও ছয়জন নিহত হন। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়, যার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও আছেন। সম্মেলনের যৌথ বিবৃতিতে সব রাষ্ট্রকে আহ্বান জানানো হয় ইসরাইলকে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বাধা দেয়ার জন্য সব ধরনের আইনি ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে। এর মধ্যে আছে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা এবং তার বিরুদ্ধে আইনি মামলা শুরু করা।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘে ইসরাইলের সদস্যপদ স্থগিত করার প্রচেষ্টায় সমন্বিত ভূমিকা রাখতে হবে। এতে ফিলিস্তিনি ইস্যুর প্রতি সম্মিলিত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, বসতি সম্প্রসারণ এবং অধিকৃত ভূখণ্ডে নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দেয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করা হয়। এছাড়া গাজায় জরুরি মানবিক সহায়তা, পুনর্গঠন এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বর্ণিত অবরোধ ও অনাহার কৌশলের জবাবদিহি দাবি করা হয়।

নেতারা আবারও স্পষ্ট করেন, টেকসই শান্তি কেবল আরব শান্তি উদ্যোগ ও জাতিসংঘ প্রস্তাব বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। সম্মেলনের পাশাপাশি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)- যার মধ্যে কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আছে, তারা নিজস্ব বৈঠক করে যৌথ প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা সক্রিয় করার ঘোষণা দেয়। জিসিসি যুক্তরাষ্ট্রকেও আহ্বান জানায় যেন তারা তাদের প্রভাব ব্যবহার করে ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণে আনে। জিসিসি মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই বলেন, আমরা আমাদের কৌশলগত অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও আশা করি তারা তাদের প্রভাব ব্যবহার করবে ইসরাইলকে এই আচরণ বন্ধ করাতে। তাদের হাতে ইসরাইলের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ আছে। এখনই সময় তা প্রয়োগ করার। মিশর ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি কাতারই গাজা যুদ্ধকালে ইসরাইল-হামাস আলোচনায় মধ্যস্থতার নেতৃত্ব দিয়েছে।

 মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সোমবার বলেন, ইসরাইলের বর্তমান পদক্ষেপগুলো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যেকোনো শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা ব্যাহত করছে। দোহায় আরব-ইসলামিক সম্মেলনে তিনি বলেন, এখন যা ঘটছে তা ভবিষ্যৎ শান্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে, আপনার নিরাপত্তা ও এ অঞ্চলের জনগণের নিরাপত্তা বিপন্ন করছে এবং নতুন শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা কমাচ্ছে এমনকি বিদ্যমান চুক্তিগুলোকেও ভণ্ডুল করছে।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও সম্মেলনে অংশ নেন। প্রায় ৬০ দেশের নেতাদের মধ্যে ছিলেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ দ্বিতীয়, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

সম্মেলন শেষে যুবরাজ সালমান কাতারের আমিরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বার্তা পাঠান। তিনি লিখেছেন, জিসিসির সর্বোচ্চ পরিষদের বিশেষ অধিবেশন ও জরুরি আরব-ইসলামিক সম্মেলনের ফলাফলের জন্য আমরা প্রশংসা জানাই। এই সম্মেলনগুলো কাতারের অবস্থানকে সমর্থন করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও বিধি ভঙ্গের যেকোনো প্রচেষ্টা আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করি।

এদিকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল জানিয়েছে, তারা মঙ্গলবার কাতারে হামাসকে লক্ষ্য করে ইসরাইলি বিমান হামলার বিষয়ে জরুরি বিতর্ক আয়োজন করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার কাতারে পৌঁছার কথা। এর আগে তিনি ইসরাইলের হামাস নির্মূল প্রচেষ্টায় ‘অটল সমর্থন’ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, রুবিও সফরে কাতারের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করবেন।

mzamin

গাজা সংঘাত নিয়ে ইসরায়েলকে ‘অবিচল সমর্থন’ দেওয়ার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

ফিলিস্তিনের গাজায় নৃশংস হামলা ও হত্যাযজ্ঞের মধ্যে ইসরায়েল সফর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, গাজায় চলমান সংঘাতে ইসরায়েলকে ‘অবিচল সমর্থন’ দিয়ে যাবে তাঁর দেশ। উপত্যকাটি থেকে হামাসকে নির্মূল করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

রুবিও ইসরায়েলে পৌঁছান গতকাল রোববার। এরপর আজ সোমবার জেরুজালেমে নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে পরিকল্পনা করছে, তার সমালোচনা করেন তিনি। বলেন, এমন পদক্ষেপ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তা শুধু হামাসকে আরও সাহসী করে তুলবে।

রুবিও বলেন, ভালো একটি ভবিষ্যৎ গাজার বাসিন্দাদের প্রাপ্য। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত হামাসকে নির্মূল না করা হবে, ততক্ষণ তারা কোনো ভালো ভবিষ্যৎ পাবে না। নেতানিয়াহুর উদ্দেশে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি আমাদের অব্যাহত সমর্থন ও অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করতে পারেন।’ গাজা নগরী দখলে ইসরায়েলি পরিকল্পনা নিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করেন নেতানিয়াহু। তাঁকে সম্বোধন করেন ইসরায়েলের ‘সর্বকালের সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ হিসেবে। নেতানিয়াহু বলেন, রুবিওর সফর স্পষ্টভাবে এই বার্তা দিচ্ছে যে ইসরায়েলিদের পাশে আছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসার পর থেকেই ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প।

এমন সময় রুবিও ইসরায়েলকে সমর্থনের ঘোষণা দিলেন, যখন আজ শুধু গাজার উত্তরে গাজা নগরীতেই অন্তত ২৫ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। এর আগের দিনও শহর এলাকায় অন্তত ৫৩ জনকে হত্যা করা হয়। ইসরায়েলের হামলা ও হুমকির মুখে সেখান থেকে পালাচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। এর বাইরে পুরো উপত্যকায় চলছে ইসরায়েলের হামলা।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। জিম্মি করে গাজায় নিয়ে আসা হয় প্রায় ২৫০ জনকে। সেদিন থেকেই গাজায় তীব্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এর পর থেকে ২৩ মাসের বেশি সময়ে উপত্যকাটিতে হামলায় প্রায় ৬৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি মানুষ।

দোহা সম্মেলনে শক্ত পদক্ষেপের আশা

মধ্যপ্রাচ্যে নানা বিষয় নিয়ে চলমান সংকটের মধ্যেই ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় হামলা চালায় ইসরায়েল। দোহায় অবস্থান করা হামাস নেতাদের উদ্দেশ্য করে ওই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি ইসরায়েলি বাহিনীর। তবে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কাতার। বন্ধুদেশের ওপর হামলার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্পও।

এমন পরিস্থিতিতে আজ থেকে দোহায় শুরু হয়েছে আরব লিগ ও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) জরুরি সম্মেলন। সেখানে যোগ দিতে আরব ও মুসলিম দেশের নেতারা কাতারে পৌঁছেছেন। এর আগের দিন এসব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা।

গতকাল কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জসিম আল থানি ইসরায়েলের ব্যাপক সমালোচনা করেন। ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানানোয় আরব ও মুসলিম দেশগুলোর প্রশংসা করে তিনি বলেন, কাতারের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আইনি ব্যবস্থা নেবেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (বাঁয়ে) ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আজ জেরুজালেমে সংবাদ সম্মেলন করেন
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (বাঁয়ে) ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আজ জেরুজালেমে সংবাদ সম্মেলন করেন। ছবি: এএফপি

Monday, September 15, 2025

‘কাতার নিঃসঙ্গ নয়, পাশে আছে আরব ও ইসলামিক বিশ্ব’

কাতার নিঃসঙ্গ নয়। তার পাশে আছে আরব ও ইসলামিক বিশ্ব। কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরাইলের নৃশংস হামলার পর আরব ও ইসলামিক নেতাদের জরুরি সম্মেলনের প্রস্তুতি মিটিংয়ে এ অভয়বাণী দিযেছেন আরব লিগের সেক্রেটারি জেনারেল আহমেদ আবুল গেইতি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আরব নিউজ। এতে বলা হয়, তিনি রবিবার ইসরাইলের কড়া সমালোচনা করেছেন। সতর্কতা দিয়ে বলেছেন, একটি অপরাধের সময় নীরবতা আরও অপরাধের জন্য পথ তৈরি করে দেয়।

দোহায় বসছে এই জরুরি সম্মেলন। সেখানে আবুল গেইত বলেন- এই সামিট নিজেই একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। তা হলো- কাতার একা নয়। এর পাশে আছে আরব ও ইসলামিক বিশ্ব। তিনি সতর্ক করে বলেন, গাজায় যে গণহত্যা চলছে সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্ব দু’বছর ধরে নীরবতা অবলম্বন করছে। এর সরাসরি ফল হলো ইসরাইলের হামলা। উল্লেখ্য, গত ৯ই সেপ্টেম্বর হামাসের কয়েকজন কর্মকর্তার দোহা’র বাড়ি লক্ষ্য করে অপ্রত্যাশিত হামলা চালায় ইসরাইল। এর ফলে পুরো বিশ্বে নিন্দার ঝড় ওঠে। ফলে আরব ও ইসলামিক দেশগুলোর টনক নড়েছে। তারা জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে। এর আগেও যখন গাজাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া শুরু হয়েছে, তখন থেকেই এসব দেশ বা সংগঠন জোরালো নিন্দা প্রকাশ করেছে।

ব্যাস, ওই পর্যন্তই। ফলে ইসরাইল দেখেছে গাজাবাসীকে মেরে শেষ করে দিলেও তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলার কেউ নেই। তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। ইসরাইল ভাল করেই জানে, গাজার মাটিকে যদি ‘দোযখের আগুনে’ জালানো হয়, তবু ইসরাইলকে কেউ কিছু করতে পারবে না। ফলে এবারের এই সম্মেলন যখন আয়োজন করা হয়েছে, তা কিন্তু গাজায় গণহত্যার প্রতিবাদে নয়। এটা আয়োজন করা হয়েছে দোহায় হামলার কারণে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারির মতে, সোমবার এই সামিটে কাতার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইসরাইলি হামলার একটি খসড়া প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে। তার কথায় এটা স্পষ্ট যে, এটা দোহা হামলাকে কেন্দ্র করে। যখন এই সম্মেলন হচ্ছে, তখন গাজায় রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছে ইসরাইল।

একই প্রস্তুতিমুলখ মিটিংয়ে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মেদ বিন আবদুল রাহমান আল থানি আন্তর্জাতিক দুনিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দ্বিমুখী অবস্থান নেয়া বন্ধ করতে। একই সঙ্গে এটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ইসরাইলকে শাস্তি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সম্মেলন শুরুর আগে মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদে লাতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এ সময় তারা আরব-ইসলামিক ঐক্যের বিষয়টিকে জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। এ অঞ্চলে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অভিন্ন স্বার্থ ও স্থিতিশীলতার জন্য সমন্বয়ের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তারা। দোহা সম্মেলনে যোগ দিতে রোববারই সেখানে পৌঁছেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল সুদানি। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। সম্মেলনে যোগ দেয়ার কথা রয়েছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগানের। 

https://mzamin.com/uploads/news/main/180133_Abul-1.webp

কাতার ও উপসাগরীয় দেশগুলো কীভাবে ইসরায়েলের হামলার জবাব দেবে

মিডল ইস্ট আইঃ আমরা বিভিন্ন সংঘাতের মধ্যস্থতা করি, কখনো বিভিন্ন সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকি, কখনোবা শান্তির দূত হিসেবে ভূমিকা রাখি—কাতারের এমন একটি গর্ব ছিল।

কিন্তু সেই কাতারেই প্রথমবারের মতো বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলে। এতে করে জ্বালানি তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ পারস্য উপসাগরের ছোট দেশটি ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল।

গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে ইসরায়েলের আকস্মিক হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন কাতারের নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তবে হামাসের শীর্ষ কোনো নেতা নিহত হননি।

দোহায় হামলার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল নতুন এক সীমারেখা অতিক্রম করেছে। এবারই তারা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) কোনো সদস্যরাষ্ট্রে হামলার দায় স্বীকার করল।

কাতার জিসিসির এমন এক সদস্যরাষ্ট্র, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আঞ্চলিক সদর দপ্তর (সেন্টকম) অবস্থিত। সেখানে আট হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।

এখন কাতার কীভাবে ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেদিকে চোখ রাখছে সবাই।

লন্ডনের কিংস কলেজের উপসাগরীয় নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ‘স্বল্প মেয়াদে কাতার সেই হাতিয়ারগুলোই ব্যবহার করবে, যেগুলোতে তারা সবচেয়ে দক্ষ। তা হলো কূটনীতি ও আইন।’

ক্রিগ আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ পরিষদ যেখানে সম্ভব, সেখানেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছে কাতার।’

আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্রিস্টিন দিওয়ান বলেন, আরব লিগ, ৫৭ সদস্যবিশিষ্ট ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থাসহ (ওআইসি) অন্যান্য যৌথ প্ল্যাটফর্ম থেকেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিন্দামূলক বিবৃতি আদায়ের চেষ্টা করবে দোহা।

ক্রিস্টিন মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের মধ্যে এই হামলাকে কেন্দ্র করে কোনো মতপার্থক্য থাকলে তা শক্তিশালীভাবে সামনে আনা এবং ইসরায়েলের ওপর যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ সৃষ্টি করাই হবে এসব তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য।’

মঙ্গলবার হামলার পর কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানাতে একটি আইনজীবী দল গঠন করা হয়েছে।

কিন্তু কাতারের তরফে ইসরায়েলের হামলার সামরিক প্রতিশোধ নেওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করেন লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগ।

ক্রিগ বলেন, ‘কাতারের সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই, সেই সক্ষমতাও নেই। মধ্য মেয়াদে প্রতিরোধকৌশল নিয়ে চিন্তাভাবনায় তাদের মনোযোগ থাকবে বলে মনে হচ্ছে।’

ক্রিগ আরও বলেন, ‘ইরানের হামলার বিরুদ্ধে কীভাবে সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে কাতারের সামরিক উপদেষ্টারা আগে থেকেই ভাবছিলেন। এখন তাঁরা ইসরায়েলকে কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করছেন।’

গত জুনে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কাতারে অবস্থিত দেশটির সামরিক ঘাঁটি আল উদেইদে হামলা চালিয়েছিল তেহরান। খুব হিসাব-নিকাশ করেই এ হামলা চালানো হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রকে পরোক্ষভাবে সতর্ক করতে আগেভাগেই কাতারকে জানিয়েছিল ইরান। ফলে দোহা ও ওয়াশিংটন আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পেরেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করে ইরানের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছিল।

কিন্তু মঙ্গলবার এমন প্রস্তুতির কোনো সুযোগই ছিল না।

কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘দোহা কীভাবে ক্ষেপণাস্ত্রবৃষ্টি সামাল দিতে পারে, তা আমরা ইরানের হামলার সময় বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ইসরায়েল এমন অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা আমাদের রাডার শনাক্ত করতে পারেনি।’

কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন দাবি অস্বীকার করে বলেন, ‘ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে ওয়াশিংটন আমাদের আগে থেকে সতর্ক করেনি।’ ‘হামলার ১০ মিনিট’ পরই যুক্তরাষ্ট্রের তরফে তাঁদের কাছে সতর্কতা এসেছিল বলে জানান তিনি।

ক্রিগ বলেন, ‘কাতার নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে যেভাবে কল্পনা করেন, এ হামলা সেটার ওপর এক বড় ধাক্কা।’

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, ‘এখন আকাশ প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। সম্মিলিত নিরাপত্তাবলয় তৈরির বিষয়ে জিসিসির মধ্যে নতুন উদ্যোগ দেখা যাবে। কৌশলগত অংশীদারত্বে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা হবে।’

উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘যৌথ ক্ষোভ’

কাতারে ইসরায়েলের হামলার একটি অনিচ্ছাকৃত ফল হলো বছরের পর বছর ধরে গভীর মতপার্থক্যে বিভক্তি উপসাগরীয় দেশগুলো একে অপরের কাছাকাছি চলে এসেছে।

কাতারের প্রতি সংহতি জানাতে গত বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ দোহায় যান। গতকাল বৃহস্পতিবার যান সৌদি আরবের যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান।

গবেষক ক্রিস্টিন দিওয়ান বলেন, ‘কাতারের ওপর ইসরায়েলের হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে যৌথ ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি প্রতিবেশী রাজতন্ত্রের ওপর বিমান হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ নিজেদের মধ্যকার মতপার্থক্য সাময়িকভাবে মুলতবি রেখেছে। একটি রাজতন্ত্রের নিরাপত্তার বলয় ভেঙে যাওয়াটা তাদের সবার ওপর প্রভাব ফেলেছে।’

ইসরায়েলের হামলাকে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে পারে। এ ক্ষেত্রে কাতারের সঙ্গে প্রতিবেশী কিছু দেশের ২০১৭ সালের সুপরিচিত বিবাদ বাধা হয়ে না–ও দাঁড়াতে পারে। কারণ, দোহায় ইসরায়েলের হামলা এই সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে।

২০১৭ সালের জুন থেকে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি আরব, ইউএই, বাহরাইন ও মিসর সাড়ে তিন বছরের সর্বাত্মক অবরোধ বা নাকাবন্দী ঘোষণা করেছিল। কাতারের বিরুদ্ধে তারা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদের সমর্থনের অভিযোগ এনেছিল। কাতার এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে নাকাবন্দী প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

আনুষ্ঠানিকভাবে সেই বিবাদের অবসান হলেও দেশগুলোর মধ্যে এখনো কিছু মতপার্থক্য রয়ে গেছে। কিন্তু কোনো উপসাগরীয় দেশে ইসরায়েলের সরাসরি হামলা অঞ্চলটিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

উপসাগরীয় বিশেষজ্ঞ এবং বেকার ইনস্টিটিউটের ফেলো ক্রিস্টিয়ান উলরিকসেন মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ‘কাতারের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে যেসব বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ভাষা অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি কড়া। এ ক্ষেত্রে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। কারণ, কিছু আগপর্যন্ত তাদের সঙ্গে দোহার সম্পর্কে টানাপোড়েন ছিল।’

ক্রিস্টিয়ান বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের হামলাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে বর্ণনা করেছে। এটি অঞ্চলটির অন্যান্য দেশের ‘মনোযোগ’ এড়ায়নি।

সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেও এমন একটি ধাক্কা খেয়েছিল। ২০১০ সালে হামাসের সশস্ত্র শাখার জ্যেষ্ঠ অস্ত্র সংগ্রহ কর্মকর্তা মাহমুদ আল-মাভহুহকে দুবাইয়ের একটি হোটেল রুমে হত্যা করা হয়েছিল।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু ইসরায়েল এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। আবার বিষয়টি অস্বীকারও করেনি।

সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে অল্প কিছুদিন উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তাতে করে দুই দেশের গোপন সহযোগিতা কখনো বন্ধ হয়নি।

এক দশক পর ২০২০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি হয়, যা আব্রাহাম চুক্তি হিসেবে পরিচিত। এতে সবার আগে সই করেছিল আমিরাত ও বাহরাইন।

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা (জেনোসাইড) নিয়ে নিন্দা জানালেও আমিরাত বা বাহরাইন কেউ আব্রাহাম চুক্তি প্রত্যাহার বা স্থগিত করেনি। কিন্তু কাতারের ওপর হামলা এ পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।

ক্রিস্টিন দিওয়ান বলেন, ‘কাতারের ওপর হামলা সম্ভাব্য চরম সীমারেখা (রেড লাইন) বলে মনে হচ্ছে। জিসিসি সদস্যদেশের ভূখণ্ডে আঘাতকে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর সামষ্টিক হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।’

এ হামলার পর ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পুনর্মূল্যায়নের ব্যাপারে চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও মনে করেন ক্রিস্টিন।

এই বিশ্লেষক বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে ইসরায়েলকে এখন ইরানের সমতুল্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। সমস্যা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এ হুমকি মোকাবিলায় সমাধান হিসেবে পথ দেখাতে পারছে না।’

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস

কাতারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে আসছিল। কিন্তু তা সত্ত্বে ওয়াশিংটন এমন একটি দেশে ইসরায়েলের হামলা ঠেকাতে পারেনি, যেখানে হাজার হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছেন। এটা কাতারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে ভেবে দেখতে উৎসাহিত করবে।

ক্রিস্টিয়ান উলরিকসেন বলেন, ‘২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় এবং ২০২২ সালে আবুধাবিতে হুতিদের হামলার পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এর পর থেকে কৌশলগত ও নিরাপত্তায় বৈচিত্র্য আনতে দেশগুলো প্রক্রিয়া শুরু করে।’

এ বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেছে। জ্বালানি তেল উত্তোলন ও সরবরাহকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক প্লাস জোটের সদস্য রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও দেশগুলো মনোযোগ দেয়। পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব কিছুটা শিথিল করেছে সৌদি আরব ও আমিরাত।

সৌদি আরব ২০২৩ সালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছে। একই সময়ে ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। আর কাতারের সঙ্গে বিবাদ শেষ হওয়ার পর তুরস্কের সঙ্গেও সমন্বয় বৃদ্ধি করেছে।

ক্রিস্টিয়ান উলরিকসেন প্রসঙ্গক্রমে বলেন, রিয়াদ ও আবুধাবি নিরাপত্তা ও কূটনীতির ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের চেষ্টা করলেও একই সময়ে কাতার ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করছে।

২০২২ সালে জো বাইডেন প্রশাসন কাতারকে মেজর নন-ন্যাটো মিত্রের মর্যাদা দেয়। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য এটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ন্যাটো সদস্য না হয়েও দেশটির অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা পাওয়ার কথা রয়েছে। সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের এ অংশীদারত্ব নেই।

কিন্তু মঙ্গলবারের হামলা এমন অংশীদারত্বের বিশ্বাসযোগ্যতায় ফাটল তৈরি করেছে। ক্রিস্টিয়ান উলরিকসেন বলেন, ‘এ হামলা দোহার হিসাব-নিকাশে কোনো পরিবর্তন আনে কি না, সেটা দেখার বিষয়।’

ক্রিস্টিন দিওয়ান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করা হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রিস্টিন দিওয়ান আরও বলেন, ‘কাতারের জন্য সেন্ট্রাল কমান্ডের আঞ্চলিক সদর দপ্তর (সেন্টকম) বা সৌদি আরবের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। এটিই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মূল বিষয়।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-12%2Fpaivi4xz%2FQuatar-1.jpg?rect=116%2C0%2C1182%2C788&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলের বিমান হামলার পর ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। কাতারের রাজধানী দোহায়, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি